সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১৩১

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_১৩১



[কপি করা/চুরি করা,নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ।দয়া করে এগুলো করবেন না কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন]


নাইফ নিজের পোশাক বদলালো না। ওভাবেই থম মেরে বসে র‌ইলো। এদিকে নূরের ফ্যাচফ্যাচ চলছেই। শক্ত পাথর দৃষ্টি নিরন্তর জমিনে পতিত রেখে চেয়ে আছে।


তুহি বিছানায় শুয়ে আছে নিথর চাহনিতে।নাবীহা নামাজ আদায় করে মু'য়াযের সাথে কথা বলছে।সেও যায়নি বড় ভাই আসার পর বাইরে। বরং অপেক্ষা করছে ছোটখাটো একটা ঝড়ের জন্য।যেটা আজ হবেই হবে।তাইফটা সেই যে বেরিয়েছে আর আসেনি। যাওয়ার সময় ফোনটাও নেয়নি।তাই ফোন‌‌ও করতে পারছে না। এমনিতেই মাথা গরম করে বেরিয়ে গিয়েছে,কি করছে আল্লাহ জানে। তুলতুল চিন্তায় স্থির থাকতে পারছে না। বারবার পায়চারি করছে আর ছোট বোনের দিকে তাকাচ্ছে। ঠিক তখনই মু'য়ায ফোন করে।ফোন তুলে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে ঠান্ডা মাথায় প্রাত্যহিক কথাবার্তা বলছে।


এমন সময়েই কলিং বেল বেজে উঠলো। পরপর তিনবার বাজলো।রেশমি দরজা খুললো।তাইফ মাথা নত অবস্থাতেই সালাম দিতে দিতে দরজা পেরিয়ে বসার ঘর অবধি আসতেই রেশমি পিছন থেকে ডেকে বললো,


“ বড় ভাই আসছে!"


তাইফ শুনে পিছু ফিরলো।কিছু একটা ভেবে নিজের ঘরের দিকে যেতেই থেমে গেলো।


নাইফ চোয়াল শক্ত করে নিলো। সালামের শব্দেই তাইফের কন্ঠ বুঝে বসা থেকে উঠে ঘরের দরজা পেরুতে পেরুতেই ডাক দিলো,


“ তাইফ!"


বড় ভাইয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে তাইফ থেমে গেল।পিছু ফিরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।নাইফ এসেই কোনদিকে না তাকিয়েই পরপর দুটো চড় দিলো।যেটার জন্য তাইফ প্রস্তত ছিলো না। দ্বিতীয় চড় গালে লাগতেই দেওয়ালে গিয়ে পড়ে।ওর হাতের সাথে লেগে দেওয়ালে টাঙানো ক্যালিগ্রাফির ওয়ালমেটটা পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে চুর্ণ বিচুর্ণ হয়ে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। সেগুলো মাড়িয়েই নাইফ তাইফের টি শার্টের কলার ধরে টেনে এনে ঘাড় চেপে ধরে নিজের মুখোমুখি করে ক্রোধান্বিত স্বরে চিৎকার করে বলতে থাকে,


“ তোকে কে অধিকার দিয়েছে আমার ব‌উকে শাসন করার? এত দুঃসাহস তুই পাস কোথায় থেকে? আমার ব‌উয়ের গাঁয়ে হাত তোলার মতো দুঃসাহসী কাজ করার কথা ভাবলি কার কথায়! কার হুকুমে এগুলো করেছিস?"


নাইফ তাইফের ঘাড় চেপে ধরে তীব্র আক্রোশ নিয়েই বলছে,ঘাড় ধরা অবস্থাতেই আবার অন্য হাত দিয়ে কানের উপর চড় দিলো এবং আবার‌ও বলতে থাকলো,


“ তোর মুখটাই রাখতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছা করছে এই কাঁচের মতোই গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলি।

জানোয়ার,তোর জন্য আজ আমার বাবার শিক্ষায় আঙ্গুল উঠেছে।তোর জন্য শুনতে হচ্ছে আমার বাবা মায়ের ন্যায্য শিক্ষা নাই। কুকুরের বাচ্চা,ঘরের ব‌উ,বড় ভাইয়ের ব‌উকে বাজার্নি বলতে দ্বিধা কাজ করলো না? নিজের বোনদের সাথেও এক‌ই ব্যবহার করবি? শুয়োর,তোকে আমার ব‌উ শাসন করতে বলেছি? আমার ব‌উ শাসন করার জন্য আমি নাই? মরে গিয়েছি আমি? আমার ব‌উ শাসন করার জন্য আমি না থাকলেও আমার বাবা মা আছে, তুই কে? তোকে কে দিয়েছে এই দুঃসাহস!"


নাইফ পরপরই কয়েকটি চড়, কিল, ঘুষি দিলো।অপর দিকে তাইফ দাঁত চেপে সবটা হজম করে নিলো।তার দৃষ্টি জমিনে। হাত পা ছেড়ে দিয়েছে।তাই যেভাবে মারছে সেভাবেই হেলে পড়ছে


ওয়ালমেট পড়ার শব্দেই আফিয়ার ঘুম ভেঙ্গে যায়।দরফড়িয়ে উঠে,বাইরে তখন নাবীহা,তুহির হ‌ইচ‌ই।তারা কাউকে থামতে বলছে।আফিয়ার বুকে কামড় দিলো।সোজা অবস্থা থেকেই লাফ দিয়ে উঠতে গিয়ে কোমরে ভীষণ চাপ লাগলো,চটাং করে আওয়াজ শোনা গেলো হাঁটুর জোড়ায়। সবকিছুকে ছাপিয়ে গাঁয়ের কাপড়টাও ঠিক করেনি।ওড়না ছাড়াই বাইরে বেরিয়ে দেখছে তার দুই ছেলের মধ্যে ঘটমান অবস্থা।সে থামাবে কি উল্টো এই অবস্থা দেখে স্থির হয়ে গেছে। এদিকে সালমা ফাওযিয়াও ঘুমের মধ্যে লাফিয়ে উঠেছে।তিনি নিজের ঘরে বসেই কাঁদছেন।নাইফকে তাইফের থেকে ছাড়ানোর জন্য নাবীহা,তুহি,রেশমি, রুকাইয়াহ টানাহেঁচড়া করছে।এই টানাটানির মধ্যে‌ই তুহির পায়ে কাঁচ ঢুকে যায়।সে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠলো। কিন্তু এত হ‌ইচ‌ইয়ের মধ্যে তার ছোট কন্ঠের চিৎকার কারো কানে গেলো না।তুহি সোফায় বসে পা মেলে দেখলো তলায় বেশ বড় একটা কাঁচের টুকরো লম্বা লম্বি করে ঢুকে পড়েছে।ন্যাকার একসের আদুরে আহ্লাদি তুহি রক্ত দেখে আরো চিৎকার করে কাঁদতে গিয়েও কাদলো না।কারণ আজকের এই পরিস্থিতি তার এই স্বভাবের জন্য‌ই ।তুহি নিজের দোষটা বুঝতে পারছে।তাই নিজের স্বভাবসুলভ চাপা কান্নাই সে করতে থাকলো।


ঐদিকে নাবীহা বড় ভাইয়ের থেকে ছোট ভাইকে ছাড়িয়ে নিয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলতে থাকলো,


“ ও আমাদের ছোট ভাই, ভাই।বাইরের কোন বখাটে নয় যে এভাবে পিটাচ্ছো।কি করছো গাল'টাকে।"


নাবীহা তাইফের গালে পড়া চার আঙ্গুলের ছাপের উপর আঙ্গুল ঘষতে ঘষতে বললো,


“ এভাবে কোন কিছু না শুনেই ব‌উয়ের কথায় ভাইকে পিটিয়ে খুব বিচার করছো! তোমার ব‌উ যে তোমার মা'কে প্রতিদিন অপমান করে সেই কথা বলে না?

স্বামীকে আঁচলের তলে রেখে অন্যের দোষ বলতে পারলে নিজের দোষ কেন বলতে পারে না? অসভ্য মহিলা।আমার মায়ের সাজানো গোছানো সংসার নষ্ট করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।বাইরেটা দেখতে যত সুন্দর ভেতরটা ঠিক ততটাই নোংরা!"


“ নাবীহা কথাবার্তা ঠিক করে বল!"


“ ঠিক করে বলার কিছু নেই।বাবা আসলে আজ বিচার বসাবো। তুমি তোমার ব‌উয়ের কথায় আমার ভাইকে মারতে পারো না।"


“ তোর ভাই মানে কি? আমার ভাই না? আমার ভাই অন্যায় করেছে আমি শাসন করেছি।তার জন্য.."


“ আমি তোমার ভাই না।সৎ ভাই।সৎ ভাই আর ভাইয়ের মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা আজ তুমি ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছো। অবশ্য এটাও যে....


আফিয়া দেওয়ালে ঠেক দিয়ে হেলে পড়েছে।সে পাথর চোখে দেখছে,শুনছে।তার চার ছেলে মেয়ের মাঝে চলমান বিতর্ক। কিন্তু তাইফের শেষ কথাটা খুব লাগলো।চোখ বন্ধ করে নিলো।তার গাল গলিয়ে পড়লো উষ্ণ নোনা জল।নাইফ তাইফের কথায় স্তব্ধ হয়ে গেলো ।নিথর চাহনিতে তাইফের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি বললি তুই? আবার বল!"


তাইফ উত্তর দেওয়ার আগেই রেশমি চিৎকার করে বলে উঠলো,


“ ওরে আল্লাহ রক্ত! ওরে তুহি আপার পায়ে তো রক্তের বন্যা হচ্ছে!"


সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়লো তুহির দিকে।নাইফ তুহির কাছাকাছি থাকায় সে দ্রুত পা গেঁড়ে বসে তুহির পা ধরে তুলে ঐ অবস্থা দেখে আতংকিত গলায় বললো,


“ তুহি বুড়ি! এটা কিভাবে হয়েছে বনু?"


সারাদিন পর বড় ভাইয়ের আদুরে ডাকে তুহি নিজের সত্বায় ফিরে এসেছে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।পা ধরে নিজের বিধ্বস্ত মুখটা তুলে বড় ভাইয়ের দিকে চেয়ে হিচকি দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিজের পায়ের যন্ত্রনা জানান দিচ্ছে।মেয়ের কান্নায় আফিয়া যেন হঠাৎ করেই সজাগ হলো।সেও ছুটে এসে মেয়েকে আগলে ধরার জন্য পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। এদিকে তাইফ এসে নাইফকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো,


“ সরো এখান থেকে।ছোবে না আমার বোনকে"


নাইফ তাইফের দুঃসাহস দেখে বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে রইল।তাইফ তুহির পা নিজের হাতের মুঠোয় রেখে নাইফের দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বললো,


“ ও আমার বোন। আমার বোনের জন্য তোমাকে কষ্ট করতে হবে না।আমার বোনের সব প্রয়োজন আমি দেখে নিবো। তুমি দূরে থাকো আমাদের থেকে।"


ধাক্কা খেয়ে নাইফ এমনিতেই হতবাক হয়ে গেছে তার মধ্যে এই কথা।সে তাজ্জব হয়ে ভাইকে দেখছে। মারের জন্য এসব বলবে?বড় ভাই হয়ে ছোট ভাই-বোনকে শাসন করতে পারবে না? নাইফ উঠে সামনে দাঁড়িয়ে বললো,


“ তুই আমাকে ধাক্কা দিলি ক্যান? এত সাহস হচ্ছে দিনদিন!

সর আমাকে দেখতে দে।কি হচ্ছে,নাবু দেখ না!"


“ তুমি আমার এবং আমার বোনের থেকে দূরে থাকবে।ব‌উয়ের কথা যখন শোন‌'ই তবে সবটাই শুনবে! তোমার ব‌উ বলেনি তোমাকে, আমরা তোমার সৎ ভাই-বোন। আমাদের থেকে দূরে থাকতে!যদি না বলে তবে আমি বলছি, দূরে থাকবে আমার এবং আমার বোনের থেকে।তুহি শুধু আমার বোন।আমার আপন বোন।ওর যা দরকার তা সব আমিই দেখে নিবো।ওর ন্যাকামো, বিরক্তি করা,জেদ, রাগ সব,সব আমিই মাথা পেতে নিবো

তার জন্য যেই মাগী কথা শুনাবে ওর কপালে অমাবস্যা নামিয়ে ছাড়বো।আমি তাইফ, আমার বোনের জন্য সব করবো। কিন্তু ওর খুশির আগে কাউকে দেখবো না।এটা মুখে নয়,মন থেকে বলছি।"


“ তুই বলতে চাইছিস আমি মুখে বলি শুধু?

ওর খুশি,আবদার, চাওয়ার কদর করি না?তুই একাই ওর সব.."


নাইফের গলা কাঁপছে।এত সময়ের রাগ কখন জানি দুঃখে পরিণত হলো টের‌ই পায়নি। হয়তো তাইফকে আঘাত করতে করতেই ভেতরের আগুন নিভে গিয়েছে। কিন্তু তাইফ থামেনি।তার রাগ, ক্ষোভ দুঃখ একাকার হয়ে আরো কিছু তেতো কথা বেরিয়ে এলো যেটা নাইফের বুক এফোঁড়ওফোঁড় করার জন্য যথেষ্ট ছিলো,


“ হ্যাঁ,তুমিও ভাই। কিন্তু ঐ যে,সৎ! সৎ ভাই। তুমি আমাদের সৎ ভাই,সৎ ভাইয়ের মতোই থাকো।অযথা আপন হ‌ওয়ার দরকার নেই।"


তুহি ব্যথা ভুলে নির্বোধের মতো চেয়ে পায়ে তুলা দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করায় ব্যস্ত থাকা বড় বোনকে জিজ্ঞেস করলো,


“ আমি তোমাদের আপন বোন ন‌ই? আমি তোমাদের সৎ বোন?"


নাবীহার হাতের কাজ থেমে গেলো। নিজের দৃষ্টি তুলে মায়ের দিকে চাইলো।ছলছল করা ঐ বয়স্কা ঘোলা অক্ষিগোলকের পানে চাইলো। পরক্ষনেই বোনকে নিজের বুকের সাথে চেপে জড়িয়ে ধরে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলতে থাকলো,


“ কে বলছে তুমি আমাদের বোন না। তুমি আমাদের বোন। আমাদের সবার তুহি বুড়ি।আমরা চার ভাই বোন।এখানে আর কোন কিন্তু নাই সোনামনি। তুমি শান্ত হ‌ও, সারাদিন কেদেছো,এখন তো তোমার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যাবে।আর কেঁদো না।ভাইয়ারা তো প্রায়ই এমন ঝগড়া করে দেখো না। ওদের আর কি। দুজন‌ই পচা।"


তুহি বোনের বুকের মধ্যে নিরব হয়ে লেপ্টে আছে।

আফিয়া নিরব পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো।নাইফ চুপ হয়ে গিয়েছে।তাইফ নিজের কথা শেষ হতেই বড় বোনের বুকে ছোট বোনকে দেখে এবং পায়ের রক্ত পরিষ্কার দেখে ছিটতে ছিটতে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। বন্ধ ঐ ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো জিনিস ভাঙ্গার বীভৎস শব্দ।


নাইফ পা ভেঙ্গে তুহির সামনে বসলো।নাবীহা বড় ভাইয়ের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে নিজের বাঁধন ঢিল করলো।তুহি মাথা তুলে বড় ভাইয়ের দিকে তাকালো, ঠোঁট ভেঙে, নাক ফুলিয়ে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো,নাইফ বোনের মুখ দু হাতের তারায় নিয়ে বিরবির করে বললো,


“ তুমি আমার বোন, আমি তোমার ভাইয়া। ঠিক আছে? এটাই সত্য! আর কোন কথায় বিশ্বাস করবে না ! বুঝেছো?"


তুহি মাথা উপর নিচ দুলালো।সময় পেরুলো তিরিশ মিনিটের ন্যায়।তাইফ শান্ত হলো।তুহি ঘুমিয়ে পড়েছে।ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নাবীহা মাথায় হাত রেখে পাশেই বসে আছে। ঐদিকে নাইফ বসার ঘরে বসে রয়েছে। সবকিছু স্তব্ধ।


আটটার পর...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ