#বিশ্বাসের_সংসার
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
পর্ব ০১
বিয়ে বাড়ি মানেই চারদিক জমকালো আলো,হই-হুল্লোর আর বহু প্রানের চন্ঞলতা; আর তা যদি হয় হলুদের রাত তাহলে তো আনন্দ আকাশ ছোঁয়া যার কোন সীমানা নেই! কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এগিয়ে যায় নতুন কিছু অনুভূতি,,যাতে থাকে কিছু মানুষের নতুনত্বের স্বাদ নেওয়া আর কিছু মানুষের আপনজনদের রেখে নতুন করে আপনজন খোঁজার চেষ্টা। তবুও যেন খুশির আমেজে ভাটা না পড়ে তার প্রচেষ্টাও কিন্তু কম নয়!
কি মনে হচ্ছে না ,বিয়ে নিয়ে এত পাকা পাকা কথা কেন বলছি?
কারন এখন আমরা আছি একটি বিয়ে বাড়িতে!
তবে এই বিয়ে বাড়িটাও কিন্তু বাকী পাঁচটা বিয়ে বাড়ির মতো সাজুগুজু করেছে পার্থক্য শুধু সব জায়গায় বউ বর নিয়ে সবাই হই-হুল্লোর করে আর এখানে বর বউ ছাড়াই সব আয়োজন সম্পন্ন হচ্ছে !!
জ্বী হ্যা আপাতত এটাকে একটা বর বউ ছাড়াই বিয়ে বলতে পারেন কারনটা ধীরে ধীরে বলছি,একটু সময় দেন! চিন্তা করবেন না, আপনাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না!অবশ্য অপেক্ষা করে বিরক্ত হওয়ার কারনও নেই কারন বিয়ে বাড়িতে বর বউ না থাকলেও সুন্দরী ললনা আর সুদর্শন পুরুষের তো কমতি নেই! সুতরাং বর বউ আসতে আসতে আপনারা নিজেদেরটাও খুঁজে নেন এবং অবশ্যই এর পাশাপাশি বিয়ে বাড়ির ভোজনের স্বাদ নিতে ভুলবেন না! আরে কি বলছেন?বিয়ে বাড়ি আনবো আর ভোজন করাবো না! এটা কি কোনো কথা,তাও কিনা বাঙালি বিয়েতে! উহুমম, মোটেই না! বাঙালি বিয়ে মানেই কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া দাওয়া আর কনের বাপের বাড়ির লোকের চৌদ্দ গুষ্টির ষষ্টি করতে করতেই দাঁতের খিল্লি মারা! সে যাই হোক যার যে কাজ সে তাই করবে! সুতরাং আমিও নিজের কাজ করি , চলুন তাহলে বর বউ আসার আগেই তাদের কিছু আপনজনদের সাথে আপনাদের আলাপ করিয়ে দেই!!
টুম্পা:- তুহিন,এই তুহিন!!
( চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে সিড়ি দিয়ে উপরের দিকে উঠে আসছে সুন্দরী এক ললনা)
মীনা:- টুম্পা আপু তুহিন ভাইয়া তো বাইরে গেছে! তোমার কি লাগবে আমায় বলো এনে দেই!
( সিঁড়ির উপরের ধাপে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছে আমাদের কিউটের ডিব্বা)
টুম্পা:- বাইরে গেছে? কখন গেছে? উফ্ কিরকম লাগে যে! একটা কাজেও ওরে সময় মতো পাওয়া যায় না! বিরক্তিকর একটা পোলা!( বিরক্তি নিগড়াতে নিগড়াতে কথাগুলো শেষ করলো)
মীনা:-:- ভাইয়া তো একটা ছেলের সাথে কি যেন আনতে গেল!( মুখটা অসহায়দের মতো করে)
টুম্পা:-জাহান্নামে যাক,খালি আসুক আজকে বুঝামু তখন ওরে আমি! আচ্ছা শোন ছাদে যা,ছাদে গিয়ে দেখ বিপ্লব আছে নি! থাকলে নিচে আসতে ক!( আদেশ দিয়েই নিচের দিকে হাটা ধরলো)
মীনা:-আচ্ছা!( আজ্ঞা পালনে চললো ছাদের পানে)
এত সময়ে যারা বকবক করে মাথা ধরিয়ে দিলো তারা হচ্ছে কনের দুই বোন।জ্বী আমরা এখন কনের বাড়িতে আছি। টুম্পা হচ্ছে কনের আপন ছোট বোন আর তুহিন তাদের একমাত্র ছোট ভাই। মীনা কনের ছোট খালার ছোট মেয়ে,বিপ্লব মীনার আপন বড় ভাই আর টুম্পার ছোট।
বড় বোনের বিয়ের হলুদের আয়োজনের সমস্ত দায়িত্ব সে স্ব ইচ্ছেয়া নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।তাই তার এত হম্বিতম্বি।
মা:- টুম্পা!
টুম্পা:- বলো।
মা:- তোদের কি সব রেডি?
টুম্পা:- হ্যা, আচ্ছা মা আপু কি সত্যিই যাবে না?
মা:- না,ও তো আগেই বলেছে ও এইসব অনুষ্ঠান করবে না আর করলেও ও থাকবে না।
টুম্পা:- কিন্তু মা?
মা:-কোন কিন্তু নাই।আছেই আর একটা দিন,আর এই সময়ের মধ্যে অন্যের খুশির জন্য নিজের জীবনের সবচেয়ে বেশি চাওয়া ইচ্ছাটাকে আমি বিসর্জন দিতে বলতে পারবো না।।
টুম্পা:- আচ্ছা ঠিক আছে!
মা:-সাবধানে!কোনরকম উচ্ছৃঙ্খলতা যেন না দেখি!কেউ জানি কমপ্লেইন না করতে পারে!
টুম্পা:- আচ্ছা!
------+++#####+++---------####-------
সানজানা:- মা!ওমা! আমাকে ডাকছিলে?
( রান্না ঘরে ব্যস্ত থাকা মাকে ডাকতে ডাকতে সেদিকে দৌড়ে যাচ্ছিলো)
আম্মা:- হ্যা ডাক ছিলাম! তোমার ভাইয়ের সাথে কথা হইছে? সে কখন রওনা দিবে!
( হাতের কাজটা থামিয়ে রেখে মেয়ের মুখপানে প্রশ্ন ছুড়লো)
সানজানা :- ভাইয়ার সাথে কথা হইছে! ভাইয়া বলছে আমাদের এখানকার মধ্য রাতে রওনা দিবে! ইনশাআল্লাহ কাল দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাবে।
( বেশ বুঝদারের ভঙ্গিতে বললো)
আম্মা :- কি বলতেছো?এত দেরি করে টিকিট পাইলো! আর একটু আগের টিকেট পাইতো না!ওর বসে না যোগাড় করে দিতে পারবো কইছিলো!
( চিন্তার চাপে কপালের বলিরেখা দৃশ্যমান হলো)
সানজানা:- আম্মা চাইলেই সব পাওয়া যায়? তাছাড়া চেষ্টা করছে বলেই তো কালকের টিকেট পাইছে,তা না হলে আগামী মাসেও পেতো কিনা সন্দেহ!ঐটা বিদেশ আম্মা। তোমাগো বাংলাদেশ না !আর ভাই ঢাকা থেকে খুলনা আসতেছে না! যে চাইলেই যেকোন উপায়ে আসা যায়!
( মনে হচ্ছে মাকে বুঝাতে পারলো কিন্তু যখন বুঝলো না আম্মা বুঝেননি তখন বেচারী হতাশ দৃষ্টি ফেললো)
আম্মা:- আমি বুঝতাছি কিন্তু যদি কালকে সময়ের মধ্যে না আসতে পারে তাহলে বুঝতে পারতাছো কি একটা অবস্থায় পড়বো সবাই! আমাদের এখানে হলুদের অনুষ্ঠান করলাম না ,তাই সবাই বুঝতেও পারলো না বিয়ে হচ্ছে নাকি অন্য কিছু। কিন্তু মেয়েদের বাড়িতে হলুদের অনুষ্ঠান হচ্ছে আশেপাশে সবাই জানে ঐ বাড়ির একটা মেয়ের বিয়ে হবে।কালকে যখন সবাই জানবে যার সাথে মেয়েটার বিয়ে সেই ছেলেটাই এখনো আসেনি তাহলে কি একটা অবস্থায় ওরা পড়বে বুঝতে পারছো তুমি!
(গভীর চিন্তায় ডুবে কথাগুলো বললো)
আম্মা:- ওহ আম্মা; তুমি চিন্তা কইরোনা! ভাই ঠিক পৌছাইয়া যাইবো, তাছাড়া ভাই প্লেনে করে আসবে, গাড়ীতে না! যে জ্যামে আটকে থাকবে! তুমি চিন্তা না কইরা একমাত্র পোলার বিয়ায় আনন্দ করো! আর দোয়া করো যেন তোমার দোয়ার জোরে তোমার পোলা বিয়া কইরা তাড়াতাড়ি তার বউ নিয়া ঘরে ঢুকে।
( ঢং করে কথাগুলো বললো যাতে মায়ের মনের চিন্তা দুর হয় এবং তা করে নিজেই খিলখিলিয়ে হেসে দিলো)
মেয়ের কথা বলার ধরনে আম্মাও বেশ জোরেই শব্দ করেই হেসে উঠলেন। একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা! মা কি আনন্দ না করে থাকতে পারে তাও যদি ছেলে মেয়েকে সরাসরি না দেখেই মায়ের খুশিতে বিয়েতে রাজী হয়ে যায়! এরকম ছেলেতো সব বাবা মায়ের হয় না। আজকালকার ছেলে মেয়েরা তো বাবা মায়ের খুশির কথা দুরে থাক তাদের মতামতের আশাও করে না! বিয়ে করে তাদের সামনে এসে হাজির হয়! সেখান তাদের র ছেলে মেয়েকে দেখার ইচ্ছাও প্রকাশ করেনি যদিও বিয়ের কথা বলার সময় উনি নিজেই ছেলের মোবাইলে মেয়ের ছবি পাঠিয়েছিলো তখনও ছেলের কথা একটাই ছিলো "আম্মা তোমাদের পছন্দই আমার পছন্দ"! এই একটা লাইন যে প্রতিটি বাবা মায়ের কাছে কতটা দামী তা যদি সন্তানেরা বুঝতো তাহলে সব সন্তানই বাবা মায়ের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতো।
আম্মা:- ইয়া আল্লাহ আপনি আমার ছেলেকে আমার কাছে সুস্থ শরীরের ফিরাইয়া দিয়েন! আমি যেন ছেলে বউকে হাসিখুশি ঘরে তুলতে পারি! আপনি আমাদের এই খুশিকে আপনার বর্ষিত রহমত হিসেবে আমাদের উপর বজায় রাইখেন! আমীন!
( মায়ের দোয়া কখনো বিফলে যায় না!)
এত সময় আম্মা আর মেয়ের পরিচয় নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন,জ্বী ইনি হচ্ছেন বরের মা আর একমাত্র ছোট বোন সানজানা! সানজানা সম্পর্কে একটু বলি।
সানজানা হচ্ছে এই বাড়ির মানে চৌধুরী বাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।সবার চোখের তারা যাকে বলে। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী, প্রথম বর্ষে পড়ে; যথেষ্ট বুদ্ধিমতী,ধীর স্থির, সুন্দরী ভদ্র একটি মেয়ে।কোন অহংকার নেই।সবার সাথে অল্পতেই মিশে যেতে পারে,প্রচন্ড বন্ধুসুলভ তবে অল্পতেই কেঁদে দেওয়ার মতো একটা ভয়ংকর আবেগী রোগ আছে। সেটা অবশ্য পরিবারের সবার বিশেষ করে একমাত্র বড় ভাইয়ের অতিরিক্ত আদর আর আহ্লাদের কারনেই হয়েছে। আপাতত এতটুকুই জানেন পরের টুকু গল্পে থাকলেই জানতে পারবেন।
----------------------++++-------------------------------
গভীর রাত, জানালার শিকে হাত রেখে অদুর আকাশে নিজের নয়ন;জোড়া স্থির করে রেখেছে! আকাশটা বেশ পরিষ্কার, কোথাও মেঘের কোন আনাগোনা নেই।মাত্রই হলুদের অনুষ্ঠান শেষ করে সবাই ঘুমের দেশে তলিয়ে গেছে! ঘুম নেই শ'নির্দিষ্ট কিছু মানুষের চোখে তার মধ্যে সবার আগে এগিয়ে রয়েছে কনে নিজে!
বিয়ে নিয়ে সব মেয়েদের হাজারটা রঙ্গীন স্বপ্ন থাকলেও এই কনের যেন সেগুলোর কোনটাই নেই।থাকবেই বা কি করে?স্বপ্ন দেখার বয়সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে, খুঁজেছে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা! স্বপ্ন দেখার মতো সময় তো তার কখনোই ছিলো! এই যে এখন নিজের অদূরে থাকা ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতেও তার কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে সে চলে গেলে তার মায়ের কি হবে? কে রাখবে তার বেয়ারা ভাইয়ের খেয়াল,কেই বা ছোট বোনের ভবিষ্যতের দায়িত্ব পালন করবে! মা অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে কে যাবে! এসব ভাবনার মধ্যে নিজের জন্য কিছু ভাবতেই কেমন স্বার্থপর স্বার্থপর অনুভূতি হয়! কিন্তু কি করার আছে? মেয়ে হয়ে জন্ম নিলে বাবার বাড়ী ছাড়তে হবে এটাতো সৃষ্টিগত নিয়ম! তবুও যদি বাবা থাকতো তাহলে অন্য মেয়েদের মতো সে নিজেও নিজের বিয়ে নিয়ে খুশি থাকতো!
তানিয়া:- বাবা ছাড়া পৃথিবীটা বড্ড বেরঙিন! তোমাকে খুব মিস করি বাবা! কেন আমাদের এভাবে ফেলে চলে গেলে তুমি?
আজ বাদে কাল সন্ধ্যায় যার বিয়ে সে এখন অপেক্ষায় আছে সুইডেনের বিমান বন্দরে! টেকনিক্যাল কারণে তার জন্য নির্ধারিত বিমানটি আসতে দেরি হচ্ছে।তার মতো বহু পাবলিক অপেক্ষায় আছে নির্ধারিত বাহনটা আসার জন্য! সবাই সবার প্রিয়জনকে দেখার জন্য, নিজেদের অতি প্রয়োজনীয় কাজের তাড়ায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে আছে। সবার মুখেই অস্থিরতা, চিন্তা বিরক্ত ভাবে ফুটে উঠেছে। কিন্তু তার মধ্যে যেন একমাত্র একজনেরই এসবের ভেতরে অনেক বেশি কাজ করছে ভয়! ভয়! হ্যা ভয়! সেই শ্যামাবতীর জন্য ভয় হচ্ছে! সেই কাজল আখির জন্য ভেতরটা ছটফট করছে! সে জানে যদি সে সময় মতো না পৌছায় তাহলে এই সমাজ তার শ্যামাবতীর জন্য কতটা ভয়ংকর রুপ ধারন করবে! আচ্ছা ক্ষনিকের দেখায় কিংবা কারো কন্ঠস্বরে কি প্রেমে পড়া যায়? তাহলে কি সেও প্রেমে পড়েছে? উহুম সে প্রেমে পড়েনি! সে পড়েছে মায়ায়! ভয়ংকর মায়ায়! আর এই মায়া তার এ জীবনে কাটবে না! কাটাতেও চায় না সে! সে তো ঐ মায়ার সাগরে ডুবে ডুবে ভালোবাসতে চায়! গড়ে তুলতে এক বিশাল ভালোবাসার দুনিয়া! কিন্তু তার জন্য অবশ্যই সময়ের মধ্যে পৌঁছাতে হবে।
সাজেদ:- উফ্ এই এত ঝামেলা কেন এবারই হচ্ছে! ডিজগাস্টিং!
পর্ব ০২
সকাল সকাল হইচইয়ের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো তানিয়ার! ঘুমিয়েছে।ই তো মাত্র কিছু সময় আগে।এর মধ্যেই চারদিকের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল।পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় মাথাটা বেশ ভার লাগছে।
মা :- এই তোরা একটু আস্তে কথা ক! মাইয়াটা একটু আগেই ঘুমাইছে! ঘুম ভাইঙ্গা যাইবো।পরে দেখা যাইবো সারাদিন মাথা ব্যথায় ভুগবো।
কথা শেষ করে মা তানিয়ার ঘরেই ঢুকলো,ঢুকেই দেখলো তানিয়া নিজের মাথা দুই হাতে চেপে ধরে বসে আছে। বুঝতে অসুবিধা হলো না যে মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেছে।এই এক জ্বালা এই মেয়েকে নিয়ে ঠিকঠাক খাওয়া ঘুম না হলেই মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়।
মা:- আমি বুঝিনা আজ তোমার বিয়ে কাল থেকে তুমি অন্যের সংসারের হাল টানবা তো তখন কেমনে করে নিজের খেয়াল রাখবা! দেখি আমার দিকে ঘুরে বসো!
কথাগুলো বলতে বলতে মা তানিয়ার পাশেই বিছানায় বসে তানিয়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন। তানিয়া মায়ের গলার আওয়াজে মায়ের দিকে তাকালেন,তানিয়ার চোখ মুখ দেখে ধক করে উঠলো মায়ের মন। বুঝতে অসুবিধা হলো না মেয়ে তার সারারাত কেঁদেছে। মাঝরাতেও মেয়েকে উনি সজাগ দেখেছে,ভেবেছে নিজের মতো করেই হয়তো আগামী দিনগুলো নিয়ে ভাবছেন,তাই মেয়েকে একা সময় দেওয়ার জন্য আর রাতে বিরক্ত করতে আসেনি কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে তখন আসলে অন্তত মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেও মেয়েটা একটু শান্তি পেতো।
মা:- কি হয়েছে? কাদতেছো কেন?
মায়ের কোলে মাথা গুঁজে দিয়ে আদুরে গলায় বললো,
তানিয়া:- মাথা ব্যথা করতেছে!
মা:- কেন কাদ'ছো রাইতে?
তানিয়া চুপ করে মুখটাকে আরো একটু আড়াল করার জন্য মায়ের কোলের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করলো। মায়েদের কাছে বলা লাগে না! মায়েরা সন্তানদের মুখ দেখলেই বুঝে যায় ভেতরের অবস্থা। আর তাই তো উনিও বুঝে গেলেন নিজের মেয়ের না বলা ক*ষ্টের কারন টাকে।
তানিয়া যে বাবাকে মনে করে কাঁদছে তা মা খুব ভালো করেই জানে।উনি তো প্রতি রাতেই কাঁদে।দিনে তো হাজার বাহানায় নিজেকে আটকে রাখে কিন্তু রাতে! রাতে তো কোন ব্যস্ততা নেই, নিজেকে আটকানোরও কোন দরকার নেই।তাই বিনা শব্দেই অশ্রু বিসর্জন দেয়। কিন্তু ছেলে মেয়েদের কি আর সেই বুঝ আছে! যদিও ছোট দুটো নিজেদের চন্*ঞ*ল*তার মাঝেই সব যন্ত্রনা ভুলে যায় কিন্তু বড় মেয়ে! সে তো শত চেষ্টায়ও ভুলতে পারে না আর তাই তো নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় খুশির দিনেও সে নিজের চিন্তা বাদ দিয়ে তাদের চিন্তা করছে,আর তাই তো নিজের বাবাকে এত বেশি অনুভব করছে। মেয়ের ক*ষ্ট যে উনার ভেতরটা আবারও ঝলসে দিচ্ছে সেটা বুঝতে না দেওয়ার জন্য তানিয়াকে কোল থেকে তুলে,বালিশে শুইয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
মা:- শুনো মাথা ব্যথার জন্য একটা ওষুধ খেয়ে তারপর জানালা,দরজা ভালো করে আটকে তারপর একটা গভীর ঘুম দেও।ঘুম পরিপূর্ণ হল মাথা ব্য*থাও কমে যাবে। বিকেলে উঠে তারপর না হয় সাজগোজের জন্য রেডি হবে।
মা কথা শেষ করে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে আবারও সামনে মুড়ে বললেন,
মা :- সব চিন্তা মাথার থেকে বের করো। নিজের সামনের জীবন নিয়ে ভাবো। মনে রাখবে উপরে আল্লাহ আছেন,উনিই আমাদের সবার জন্য কোন না কোন ব্যব*স্থা ঠিক করে রেখেছেন।
তানিয়া মায়ের কথায় মাথা নিচু করে চাদরের মধ্যে আকিবুকি করতে লাগলো,মা তানিয়ার নিরবতাকে পর*খ করে চলে গেলেন।তানিয়াও মায়ের আজ্ঞাবহ সন্তানের মতো নির্দেশ পালন করে শুয়ে পড়লো।
--------------------------------------------------------------------
প্রায় ১৮/১৯ ঘন্টা জার্নির পর মাত্র বাংলাদেশ বিমান বন্দরে ল্যান্ড করলো সা*জেদ'দের প্লেন। প্রায় দেড় ঘন্টা যাবত অপেক্ষায় রয়েছে তাকে রিসিভ করতে আসা তার আপনজনেরা।
দীর্ঘ জা*র্নিও আজ যেন ক্লা*ন্ত করতে ব্যর্থ হলো এই প্রেমিক মনকে!
সাজেদকে নিয়ে সবাই চলে গেল কাছাকাছি বুকিং করা একটা হোটেলে। অলরেডি অনেক দেরি হয়ে গেছে।বিয়ের পর বৌ নিয়ে আবার ফিরতে'ও হবে। তাই খুব তাড়াতাড়ি!
বাদ মাগরিব বিয়ে পড়ানোর কথা থাকলেও এখন মনে হচ্ছে এশা*রের পরেও হওয়ার চা*ন্স কম। যদিও মেয়ে বাড়ির লোকদের সাথে কথা বলা হয়েছে। তবুও!
🧭🧭🧭🧭🧭🧭🧭🧭🧭🧭🧭🧭🧭🧭🧭
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বর মহা*শয়ের পদ ধুলি পড়লো তার শ্বশুর বাড়িতে।
বর এসেছে , বর এসেছে!!!
বর আসার উ*চ্ছ্বা*স ধ্বনিতে যেন মুখরিত হলো চারদিক। যদিও তানিয়া'দের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়েই সা*জেদরা বর পক্ষের তরফ থেকে খুবই কম লোক এসেছে।তবে এখানে এসে মেয়ে পক্ষের এত লোক সমাগম দেখেও বেশ ভালো লাগছে।।যদিও সেই খুলনা থেকে এ*তদুর অনেক লোক জন আনাও কষ্টের ব্যাপার। তাই এমনিতেও বরপক্ষ থেকে লোক কম আসার কথা।
আল্লাহর রহমতে সব নিয়মকানুন পালন করেই,কন্যার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে অবশেষে বাদ এশা*র বিয়ের সমস্ত কাজ সম্পন্ন হলো। যদিও এশা*র নামাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই , তবুও সবার অনুরোধে ইমাম সাহেব মুসল্লিদের এই বিয়েতে সামিল হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন।বিয়ের মতো আনন্দময় একটি কাজ,আল্লাহর বিধানের অন্যতম ফরজ একটি কাজ সম্পন্ন হতে দেখতে সব মুসল্লিদেরও বেশ আগ্রহ ছিলো। তাও আবার এই যুগে,যখন কিনা চারদিকে বিয়ে মানেই নাচগান,হ*ই-হু*ল্লো*র, এত*শত আয়োজন! বর বউ লোক লজ্জার মাথা খেয়ে ধেই-ধেই করে নেচে গেয়ে বিয়ে করে! সেখানে এই হবু দম্পতি তাদের নতুন জীবনের শুরুটাই করেছে আল্লাহর বিধান ফলো করে। মুসল্লিরা যারা এই এলাকায় থাকেন তারা অনেকেই মেয়েদের পরিবারের সম্পর্কে জানেন, মেয়ের সম্পর্কেও তাদের সামান্য ধারনা আছে তাই নিজেদের এলাকার একটি ভালো মেয়ের জীবনের এই ধাপে তারা নিজেদের সামিল করে দোয়া দিয়ে তাদের খুশির অং*শিদার হতে চায়।
বর এসেই সর্বপ্রথম নিজের এশা*রের নামাজ আদায় করে নিলো।এরপর খেজুর-খুরমা, মি*ষ্টি, ছানার মিষ্টি বিতরণ করে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ৭ লক্ষ টাকার মধ্যে তিন লাখ গয়না বাবদ এবং চার লাখ নগদ দেনমোহর পরিশোধ যোগ্য ধার্য করিয়া শুভ বিবাহ সম্পন্ন হলো।
#ফান:- সবাই বলেন আলহামদুলিল্লাহ 😁🤗😚
যারা আলহামদুলিল্লাহ বলছেন তাদের মধ্যে সকল অবিবাহিতদের বিয়েও তাড়াতাড়ি হয়ে যাক! আমীন!!!
মজার বিষয় হলো ,বিয়ে ঠিক হওয়া থেকে বিয়ে সম্পন্ন হওয়া অবধি বর বউ কেউ এখনো কাউকে সরাসরি দেখেনি। বিয়ের যেদিন কথা হচ্ছিলো তখন সানজানা বউয়ের একখানা ছবি তার ভাইয়ের মোবাইলে সে*ন্ড করেছিলো ,সেটাই ছিলো বরের সম্মতির মাধ্যম।আর কন্যার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিলো যদিও পরবর্তীতে একে অপরের ফেসবুক প্রোফাইলে থেকে নিজেদের অনেক ছবিই দেখে*ছিলো ।
তারপর বিয়ে ঠিক হওয়ার পর ফোনে দু চার বার টুকটাক কথাবার্তা হয়েছে।তবে মেয়ের অর্থাৎ তানিয়ার জড়*তার কারনে সেই কথার রেশ বেশি দুর টানতে পারে নি সা*জেদ। তবে যতটুকু শুনেছে আর দেখেছে তাতেই যেন সা*জেদের প্রান*না*শিণী রুপে পরিনত হয়েছে তানিয়া। আর তানিয়া! সেতো লজ্জায় কখনো চোখ তুলে একবারও দেখেনি আর ভবিতব্য কে।তবে ফোনে যে কতবার দেখেছে তার তো কোন হিসেবই নেই ! কিন্তু উপলদ্ধি করতে পারেনি কারন তার মনে নিজের বিয়ের খুশির চেয়েও বেশি প্রখর ছিল নিজের পরিবারের চিন্তা।
বিয়ে পড়ানোর পর যখন বর বউকে একত্রে বসানো হলো তখন বরদের পক্ষ থেকে সাজেদের বন্ধুরা আর তানিয়ার বোন বান্ধবীদের নানান রসকস মেশানো কথায় যেন কান গরম হয়ে আসছিলো তানিয়ার। লজ্জায় মাথাটা একদম নুইয়ে রেখেছিলো! পাশে বসা মানুষটার ও তো তার মতো লজ্জা লাগছে হয়তো কিন্তু সে তো দিব্যি মুখ টিপে হেসে যাচ্ছে।
সাজেদ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে লজ্জায় রাঙ্গা ঐ মায়াবতীর দিকে! যাকে কিনা একটু আগেই মাত্র নিজের নামে দলিল করে নিলো। চারদিকের মুখরোচক কথার ফাঁকেই সে এক পলক দেখে নিলো তার নব্য বিবাহিত বিবির দিকে, মাথায় লম্বা করে দেওয়া লাল ওড়নার ফাঁকে তার চোখের পিটপিটানি, অস্থিরতায় হাতের মুঠোয় নিজের হাতটাকে পিষে ফেলার প্রচেষ্টা, বারবার ঠোঁট কামড়ে ধরা সব কিছুই খুব অনুভবের সাথে পরখ করলো। চারিদিকে কি হচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই। এদিকে এই রমনী এতটাই নার্ভাস হয়ে আছে যে তার পাশে থাকা তার সদ্য হওয়া মানুষটি যে তার মাঝে কখন হারিয়ে গেছে সেটা সে দেখতেই পেলো না! আচ্ছা দেখলে কি ওর লজ্জার পরিমাণ বেড়ে যেতো? হ্যা যেতো*ই তো! হয়তো লজ্জায় মরেও যেতে চাইতো!
সা*জেদ:- উহুম; তোমাকে তো এমনিতে মরতে দেওয়া যাবে না সর্ব*না*শী! তুমি আমাকে যেভাবে এই কয়দিন পুড়িয়ে*ছো তোমাকে এক নজর দেখার দহনে ঠিক সেভাবেই আমি তোমাকে একটু একটু করে আমার ভালোবাসার মিষ্টি যন্ত্রনায় মার*বো! বি রেডি মিসেস তানিয়া সা*জেদ চৌধুরী!উপ*স সরি! মিসেস তানিয়া তাহের ভুঁইয়া। ক্ষমা করবেন বেয়াদিব হয়ে গেলো আর কখনো আপনাকে আপনার পিতার পদবী বাদে অন্য পদবী দিয়ে ডাকবো না!
( মনে মনে নিজের মাঝেই হাজারটা স্বপ্ন বুনে এগুলোই ভাবছিলো সাজেদ! এদিকে তার এইভাবে তাকিয়ে থাকাতে তার সদ্য বিবাহিত বিবির যে লজ্জার পরিমাণ অনেক বেশি বেড়ে গেলো সেটা সে জানতেই পারলো না!সাজেদের ঘোর ভাঙ্গলো যখন নিজের আশেপাশে খুব জোরে কিছুর শব্দ শুনতে পেল।
পর্ব ০৩
মাসুদ:- কি রে ভাই একটু তো লজ্জা রাখ! একদম পাবলিকের সামনেই গিলে খা*চ্ছি'স!
নিজের বন্ধুর এমন কথায় সা*জেদ বেশ লজ্জা পায় ,সে মুচকি হেসে চোখটা সরিয়ে নেয়,তানিয়ার লজ্জার পরিমান তো আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
সবকিছু শেষ করে শুরু হলো বিদায়ে'র পর্ব!
বিদায়; বিয়ের পর মেয়েকে তুলে দিতে হয় অসম্পূর্ণ অচেনা অজানা অথবা কিছুটা চেনা জানা মানুষের হাতে।যেই মেয়েকে আল্লাহর দরবারে বহু চেয়ে আনার পর অনেকগুলো বছর আদর আহ্লাদে লালন পালন করে,একটা সময় সেই মেয়েকে'ই তুলে দিতে হয় অন্য একজনের হাতে।যার পর থাকে না মেয়ের প্রতি কোন অধিকার, না থাকে কোন দাবী। একটা সময় যেই মেয়ে বাড়ির উঠান মাতিয়ে রাখে তার দুষ্টুমি'তে,যার কারনে প্রা*নব'ন্ত থাকে ঘরের প্রতিটি কোনা,যে কিনা ঘরের আলোর প্রতিক হিসেবে চিহ্নিত থাকে বাবা মায়ের কাছে , এক সময় সেই মেয়ে চির-চিরায়িত ঘরটিকে ছেড়ে চলে যায় অন্যের ঘর রাঙাতে,অন্যের বাড়ির উঠানের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলতে, সাজিয়ে তুলে নিজের ছোঁয়ায় অন্য একটি ঘরের প্রতিটি কোনা! ভাগ্য সহায় হলে হয়তো সেখানেও সে থাকে রানীর মতো নয়তো হয়ে যায় সবার অবহেলার পাত্রী !
পিতার ঘরের রাজকন্যা জীবন চক্রে হয়ে যায় স্বামীর ঘরের দাসী যদি ভাগ্য অতীব নিগ্রহ-কারী হয়।আর যদি কপালে পিতার মতো রাজা জোটে হয়তো সেখানেও সে রাজরানী হয়ে উঠে! সেটা তো কেবল ভাগ্য বিধাতার কারিশমার উপর নির্ভর করে!
বিদায় সময়ের তিক্ত পর্ব শেষ করে যথারীতি হাজারটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুন বউ কে নিয়ে রওনা দেয় বরযাত্রী।তখন প্রায় রাত বারোটা অতিক্রম করেছে। যেহেতু বর মশাই সরাসরি বিদেশ থেকে এখানেই এসেছে বিয়ে করতে তাই তার সাথে সমস্ত জিনিস পত্র তার উঠা হোটেলেই ছিলো। সেখানে গেল গুটি কয়েক আপনজন।আর বউ নিয়ে যাওয়া গাড়ীতে গেল গুটি কয়েকজন।
ঢাকা টু খুলনা!
আগে বেশ সময় লাগলেও এখন আর লাগে না।তার জন্য অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার মহান রাব্বুল আলামীন আর তার বান্দা হিসেবে বর্তমান সরকার।তার কারন পদ্মাসেতু উপহারটা আমরা তাদের তরফ থেকেই পেয়েছি। যার দরুন এখন বহু দুরের যাত্রাও সহজ হয়ে গিয়েছে।
বউ নিয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত প্রায় শেষের ভাগে এসে পৌঁছিয়েছে।ছেলের বিয়ে নাকি মা দেখতে পারেন না এই কুসংস্কারে বিশ্বাসী মা নিজের একমাত্র ছেলের বিয়েতে আসেননি। অথচ ছেলে মেয়ের বিয়ে নিয়ে মায়েদের কত উচ্ছ্বাস থাকে অথচ এইসব কুসংস্কারের কারনে সেগুলো একসময় নিমজ্জিত হয়ে যায়।বরের গাড়ীর সাথে এসেছিলো একমাত্র ছোট বোন সানজানা।এখানে বিমান থেকে নেমেই বিয়ে করতে যাওয়া ভাইকে বর সাজানো থেকে শুরু করে সবটাই সে করেছে বেশ দায়িত্বের সহিত। একদম মায়ের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠা বড় বোনের মতো করেই।সা*জেদ আশ্চর্য*ময় দৃষ্টিতে দেখছিলো তার চেয়ে ৬ বছরের ছোট বোনের পরিপক্ক হওয়ার দুর্দান্ত প্রমান! সানজানার পাশাপাশি সবরকম কাজে সাহায্য করেছিলো সাজেদের বড় চাচার ঘরে থাকা বড় দুই চাচাতো ভাবী আর ফুফাতো এক ভাইয়ের বউ।আরো ছিলো দুই ঘরের বড় দুইবোন। সব কিছু মিলিয়ে বিয়ের আগ থেকে শুরু করে শেষ অবধি খুবই সুন্দর আর সুষ্ঠুভাবে বিয়ে সম্পন্ন হতে সব রকমের সাহায্য তারা করেছে। তানিয়া'দের বাড়ির লোক থেকে শুরু করে আশেপাশের সবাই তাদের ব্যবহারে মুগ্ধ।কেউ কেউ তো জনম দুঃখী তানিয়ার এত ভালো ভাগ্য বলেও ফিসফিস করছিলো।
মানুষের এরকম ফিস-ফিসানিতে তানিয়ার কিছু না আসলেও তানিয়ার মায়ের যেমন খুশি লাগছিলো তেমনি ভয় ও হচ্ছে "পাছে লোকের চোখ না লেগে যায়" বলা তো যায় না লোকের চোখ লেগে তার মেয়ের সংসারে অশান্তির সৃষ্টি হয়! মায়েদের এ'রুপ চিন্তাকে যতই আমরা কুসংস্কার ভাবি না কেন আমাদের ধর্মীয় ম*তানুসারে'ও কিন্তু চোখ লাগা অর্থাৎ বদ নজর বলেও কিছু একটা আছে যেটাতে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হয়। সুতরাং আমাদের খুশির সময় অথবা ভালো বিষয় সবসময়ই যে অন্যরা ভালো ভাবে দেখবে তা কিন্তু নয় তাই বুঝতে হবে আমাদের গুরু জনরা যখন এ'রুপ কথা বলে তখন আমাদের একটু সাবধানে থাকাই শ্রেয়।
টানা ২৪ ঘন্টার বেশি ক্লান্তি এবং ঘুমহীন থাকার কারনে সা*জেদ বেশ ক্লান্ত ।তার এখন আশেপাশের কোন কিছুই খুব একটা ভালো লাগছে না।তবে তানিয়া সারাদিন ওষুধের প্রকোপে ঘুমানোর ফলে ঘুমটা খুব একটা না আসলেও অতিরিক্ত চিন্তার কারনে মানসিক এবং এত দুর জার্নিতে শারীরিক ভাবেও বেশ ক্লান্ত অনুভব করছে। আম্মা ছেলে আর নতুন বউকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে গেছে।তার চারদিকে যেন খুশির ঢেউ বইছে।গাড়ী থেকে নামানোর পর সবরকমের আনুষ্ঠানিকতা,আচার নিয়ম শেষ করে নতুন বউ ঘরে তুললো।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর নিজের একমাত্র ছেলেকে পেয়ে আম্মার যেন খুশিতে চোখের পানি আর শেষ হচ্ছে না। এদিকে যে নতুন বউ বসার ঘরে খালি বসিয়ে রেখেছে সেই দিকে কারো কোন খবর নেই। সবাই আম্মার সাথে তাল মিলা'চ্ছে চোখের জলের বন্যা বানানোর।
সা*জেদ,:- আম্মা কেন কাদতে'ছো? আশ্চর্য আমি আসাতে কি তুমি খুশি হওনি! তাহলে কি আমি আবার চলে যাবো?
আম্মা নিজের পুত্রের বুক থেকে মাথা তুলে চোখ মেলে তাকালো, সা*জেদ মায়ের চোখের পানি মুছতে মুছতে দুষ্টুমি করে বললো,,
সা*জেদ :- তোমার কি বউমা পছন্দ হয়নি; পাল্টিয়ে আনবো! বিদেশি সাদা মুরগি লাগবে?
আম্মা:- এইটা তুমি কি বললা আব্বা! তুমি জানো না তুমি আমার জন্য কি! আর বউমা পাল্টানোর কথা মনের ভুলেও আর কোনদিন বলবা না! আমার সাদা বয়লার মুরগি দরকার নাই আমি খাঁটি দেশি স্বাস্থ্যকর মুরগি অনেক খুঁজে বেছে বের করেছি যাতে আমার আব্বা সারাজীবন তাঁকে নিয়ে ভালো থাকতে পারে।
মা ছেলের এমন কথায় আশেপাশের সবাই একসাথে হেসে দিলো, তানিয়া তো হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মা ছেলের কথা শুনে আবার রাগ'ও লাগছে এই ভেবে যে মা ছেলে মিলে ওকে মুরগী বানিয়ে দিলো! শেষ অবধি মুরগী! ওহ নো এই কাদের পাল্লায় পড়লো অবশেষে!
তানিয়া'র ভাবনার অবসান ঘটাতে উপস্থিত হলো তার বড় জা!
(বড় জা)ফাতেমা:- নতুন বউ চলো আমার সাথে তোমাকে তোমার ঘরে নিয়ে যাই! আগে তুমি গিয়ে ফ্রেশ হও ততক্ষণে সা*জেদ সবার সাথে কথা শেষ করে আসুক!
বড় জা'য়ের আদেশে তানিয়া উঠে তার সাথে চলে গেল। তার যাওয়ার পানে একবার আড় চোখে তাকালো সা*জেদ; দৃষ্টির অগোচরে অন্যের কথার ছলেই একটা মুচকি হাসি দিলো এই ভেবে যে এখন থেকে তার ঘরটা অন্যের অধীনে। গিয়ে একজনকে পাবে যে কিনা তার একান্ত তার জন্য অপেক্ষায় থাকবে।
মেয়েদের কোন নির্দিষ্ট বাড়ি নেই! কোন নির্দিষ্ট ঘর তার জন্য বরাদ্দ নেই।জন্মের পর যেমন পিতার বাড়িই তার বাড়ি তেমনি বিয়ের পর স্বামীর ঘরই তার ঘর।এ দুটোকে নিজের বলে দাবী করলেও ছেলে মেয়েদের ঘরকে কখনো নিজের বলে দাবী করা যায় না, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম থেকেই সেটা কখনো বলে হয়ে উঠেনা।কেউ বলতে পেরেছে কিনা আমার জানা নেই তবে সত্যিকার অর্থেই নারীর নিজস্ব কোন ঘর নেই।নারীর জীবন হচ্ছে কচু পাতার পানির মতো! ভাসমান অবস্থায় থাকতে হয়, কোথাও স্থির হবার, কোথাও টিকে থাকার জন্য নয়।
আজ থেকে নিজের বলতে যেই ঘরটা সেই ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে তানিয়া! মাত্রই তাকে এই ঘরে নিয়ে আসা হয়েছে।ঘরটা বেশ বড় এমনকি এই বাড়িটাই বেশ বড়,এতটুকু সময়ে যতটা আন্দাজ করতে পেরেছে। চার সদস্যের একটি পরিবার এখানে থাকে, অথচ কতবড় একটা বাড়ি করে রেখেছে।আসার পর থেকে বসার ঘরে বসে যা বুঝেছে এই বাড়িটা বেশ সুন্দর করে গোছানো।তার মধ্যে যেন এই ঘরটা যেটা আজ থেকে তার সেটা মনে হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর আর গোছানো।
ফাতেমা:- আসো!
বড় জায়ের ডাকে নিজ ভাবনার থেকে বেড়িয়ে আসে, তারপর গুটি গুটি পায়ে হেঁটে ভিতরে ঢুকে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো,এর মধ্যেই ঘরে প্রবেশ করলো তার শ্বাশুড়ি আম্মা।
আম্মা:- দেখি আমি আমার নতুন আম্মার মুখটা একবার!
এই বাড়িতে প্রবেশের পর এই প্রথম তার শ্বাশুড়ি তার সাথে কথা বললো,যদিও আসার পর থেকে সবাই তাকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলো, অবশ্য সবই হয়েছিলো তার শ্বাশুড়ির ফরমাইশ অনুসারে। কিন্তু ভদ্র হমিলা একবারও নিজে এসে কোন কথা বলেনি ,কারন সে তো তার একমাত্র আদরের পুত্রকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। শ্বাশুড়ি মায়ের তার প্রতি এ'রুপ আচরনে তানিয়া একটু কষ্ট পেয়েছিলো বটে পরে পরিস্থিতি বুঝে নিজের মনকে শান্তনা দিয়েছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই শ্বাশুড়ী মায়ের মুখে এমন ডাক শুনে তানিয়ার যেন নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে গেল পার্থক্য শুধু মা বলতো 'মা' আর এখানে শ্বাশুড়ি মা বললো 'আম্মা' কিন্তু দুটো ডাকেই ছিলো ভালোবাসা আর মমতায় ঘেরা!
পর্ব ০৪
শ্বাশুড়ি মায়ের মুখে এমন মধুর ডাকে তানিয়ার আবেগে চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে গেল, নতুন বউয়ের চোখে পানি দেখে জা আর শ্বাশুড়ি দু'জনেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো!
ফাতেমা:-কি হয়েছে নতুন বউ! তোমার কি খারাপ লাগছে? তোমার মা বলেছিলো বেশি দুর জার্নিতে তুমি নাকি অসুস্থ হয়ে যাও।ঠিক মতো ঘুম না হলে মাথা ব্যথা করে! তোমার কি এখন মাথা ব্যথা করছে?
তানিয়া চুপ করে মাথা নিচু করে চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছে,শ্বাশুড়ি আম্মা মুখটা তুলে চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বললেন,
আম্মা:- মায়ের কথা মনে পড়ছে!
মনের কথা বুঝতে পারা'তে আশ্চর্য হয়ে শ্বাশুড়ি আম্মার দিকে তাকালো তানিয়া, নতুন বউয়ের চাহনি বুঝতে পেরে নিঃশব্দে ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে আম্মা বললেন,
আম্মা:- আমিও একসময় তোমার মতোই নতুন বউ ছিলাম! কোন পরিস্থিতিতে কি অনুভুতি হয় তা বুঝতে সময় লাগে না আমাদের তার চেয়ে বড় কথা আমরা মা ! মা হয়ে সন্তানদের মনের কথা না বুঝলে কিসের মা আমরা।
কথাটা শেষ করেই উনি তানিয়াকে জড়িয়ে ধরলেন,তানিয়া'ও শ্বাশুড়ি মায়ের এমন আদরে বিমুগ্ধ হয়ে নিজেও জড়িয়ে ধরলো,,শ্বাশুড়ি আম্মা জড়িয়ে ধরা অবস্থায়ই বললেন,
আম্মা:- একদিন তুমিও বুঝবে যখন তুমি মা হবে!
শ্বাশুড়ি আম্মার কথায় লজ্জা পেয়ে মুখটা আরো লুকিয়ে নিলো।ফাতেমা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো শ্বাশুড়ি বউয়ের এই মধুর মুহূর্ত।আপন মনেই চোখে এসে জড়ো হলো অশ্রু! তার ও তো শ্বাশুড়ি আছে,সে ও ভালো! কিন্তু কই ! সে তো কখনো এমন করে বুকে জড়িয়ে নেয় নি! বলেনি এমন মমতাময়ী দুটো বাক্য! শুধু ভালো হলেই কি হয়! কখনো কখনো তো তার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোও জরুরী!
সানজানা:- আচ্ছা বউ শ্বাশুড়ির এই ভালোবাসা মাখামাখি কি আজ রাতে শেষ হবে?বর যে বাইরে অপেক্ষায় রয়েছে!
সানজানার দুষ্টু হাসি মাখা কথায় আম্মা তানিয়াকে ছেড়ে সোজা করে ধরলেন,মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
আম্মা:- যাও এখন ফ্রেশ হও ! তারপর আমি এসে খাইয়ে দিবো।
আম্মার খাইয়ে দেওয়ার কথায় তানিয়া আবারও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো, সানজানা মায়ের পাশে এসে তানিয়ার হাতে একটা প্যাকেট দিলো, তানিয়ার প্রশ্নাত্নক মুখভঙ্গি,,আম্মা বললেন ,,
আম্মা:- তুমি যা পড়ে আরাম অনুভব করবে তাই পড়বে! কে কি বললো সেটা ভাবার দরকার নেই ! শুধু মনে রাখবে তুমি আমার বাড়ির বউ না মেয়েও,আর আমার মেয়ের যেমন দায়িত্ব এই বাড়ির সম্মান বজায় রেখে চলা ঠিক তেমনি তোমার ও কিন্তু সেই একই দায়িত্ব। কখনো কেউ যেন আঙুল তুলে এটা না বলতে পারে ঐ বাড়ির বউয়ের চলন খারাপ! তাই বলে আমি এটাও বলছি না তুমি তোমার খুশিকে বিসর্জন দিবে। শুধু একবার আমাকে জানাবে তারপর না হয় আমরা মিলে সিদ্ধান্ত নিবো কোনটা ভালো হবে! ঠিক আছে?
তানিয়া:- হুম!
শ্বাশুড়ি আম্মার এমন মিষ্টি উপদেশে তানিয়া অশ্রুসিক্ত হাসি উপহার দিলো,সাথে ছোট করে উত্তর।আম্মা ফাতেমা'কে অনুরোধ করে বললেন তানিয়ার সাহায্য করতে, সানজানা'কে তার সাথে যাওয়ার জন্য আদেশ করলেন। সানজানা আম্মার সাথে চলে গেলে ফাতেমা তানিয়ার কাছে এসে ওর কাঁধে হাত রেখে মায়াময় নজরে চেয়ে বললো,,
ফাতেমা:- অনেক ভাগ্যবতী তুমি! তাই এমন শ্বাশুড়ি জুটেছে,স্বামী ভাগ্যও তোমার ভালো হবে বলে দিলাম; কারন আমি আমার দেবর'কে চিনি! যথেষ্ট দায়িত্ববোধ সম্পন্ন একজন মানুষ তাই বলছি সবসময় তাদের আদেশ উপদেশ মেনে চলবে তাহলে দেখবে এভাবেই মাথায় তুলে রাখবে!
তানিয়া:- ইনশাআল্লাহ! দোয়া করবেন ভাবী যেন সবার মনের মতো হতে পারি!
নিচু স্বরে উত্তর প্রদান করলো তানিয়া। তানিয়ার হাতের প্যা*কে*টা'র দিকে তাকিয়ে বললো ফাতেমা,
ফাতেমা:- এইটা বোধ হয় এখন পড়ার জন্য দিয়েছে যাও ফ্রেশ হয়ে এটা পড়ে আসো। ততক্ষণে তোমার সাহেব ও চলে আসবে। আজকে তো আর তোমাদের বাসর হচ্ছে না! অবশ্য তোমরা চাইলে আজকেই বাসর করে নিতে পারো তবে ফুলের স*জ্জা চাইলে অবশ্যই কালকে পর্যন্ত অ*পে*ক্ষা'য় থাকতে হবে।
ফাতেমার এরকম দুষ্টু কথায় তানিয়ার সমস্ত বদন খানি যেন লজ্জা'য় রক্তিম আভায় ছেয়ে গেল,ওর লজ্জা মাখা মুখ দেখে উচ্চ শব্দে হেসে উঠলো ফাতেমা। তারপর তানিয়াকে ধরে ড্রেসিং টেবিলের ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়ে একে একে গায়ের সব গয়না খুলে দিলো।।
বিয়েতে তানিয়া সাদা লং গ্রা*উন পড়েছিলো,যেটা তার সবসময়ের ইচ্ছা ছিলো। সিম্প*ল সাদা গ্রা*উনে'র সাথে লাল হেব্বি কারুকাজ করা মসলিন দোপা'ট্টা, সুন্দর করে লাল হিজাব তার সাথে সাদা হিজাব ক্যাপ পড়েছিলো! গয়নাগুলো ছিলো সিম্পলে'র মধ্যে গর্জিয়াস।তবে পুরোটাই ছিলো পর্দার আড়ালে। সাদা গ্রাউনে শ্যাম বর্ণের বউটাকে মাশাআল্লাহ লাগছিলো। একে একে সম্পূর্ণ সাজ ছেড়ে তারপর চলে গেল ওয়াশ রুমে।
____________________________________________
নিজের সদ্য বিয়ে করা বউ কে বিয়ের প্রথম রাতে এরকম টপস আর প্লা*জো পড়া অবস্থায় দেখে সাজেদ থমকে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। দৃষ্টি আটকালো তার ভেজা খোলা কোমর অবধি লম্বা চুলে, যা দিয়ে এখনো পানি জ*ড়'ছে,অথচ এখনো ও তানিয়া টাওয়াল দিয়ে চুল মুছছে,, , স্নিগ্ধ পরিষ্কার স্বচ্ছ মুখখানি! যেখানে এখন নেই কোন কৃত্রিমতার ছো'য়া,সদ্য গোসল করার দরুন সমস্ত মুখ মন্ড*লি'তে পবিত্র একটা আভা ছড়াচ্ছে। যদিও তানিয়ার একটা পাশ দেখছে সাজেদ,শ্যাম বর্ণের লম্বা সরু নাকে ডায়মন্ডের ছোট নাকফুল টা যেন সাদা লাইটের আলোয় আরো বেশি ঝকমকে হয়ে উঠেছে।সাজেদ যেন নিজের স্ত্রী এমন রুপে বিমুগ্ধ হয়ে কোন অচেনা স্বপ্নের ঘোরে হারিয়ে যাচ্ছে। তার হুঁশ এলো পেছন থেকে কারো গলার শব্দে।
সানজানা:- ভাই সরো এখান থেকে!
সা*নজানা'র হঠাৎ ডাকে চমকে উঠে সাজেদ; পিছু ঘুরে দেখে সানজানা ট্রে হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে বোনকে পাশ দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে অন্য দিকে ঘুরে ঠোঁট কামড়ে হাসে।কি করবে সে এখন! নিজের ঘরে যেতেও আজ তার কতবার ভাবতে হচ্ছে।এই ঘরের বাথরুমে তানিয়া ছিলো বলে সে মা বাবার বাথরুম ব্যবহার করেছে। সানজানা কে দিয়ে নিজের কাপড় নেওয়ার কাজটা সেরেছে। ভেবেছিলো গোসল করে এসেই ঘুম দিবে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এই মেয়ে আজ রাতের বাকীটা সময়ের জন্য তার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এইসব আগডুম বাগডুম ভাবনার মাঝেই শুনতে পেলো নিজের আম্মার কন্ঠ!
আম্মা:- কি ব্যাপার আব্বা তুমি এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? আসো আম্মার সাথে।
আম্মার আদেশে ঘরে ঢুকলো, চোখের ইশারায় আম্মা বললো খাটে তার বাম পাশে বসতে,ডান পাশে অলরেডি তানিয়া বসে আছে,তানিয়া টপস আর প্লা'জো পড়লেও টপস'টা একদম হাটু অবধি,আর মাথায় ওড়না দিয়ে খুব সুন্দর করে আগাগোড়া ঢাকা! এখন কেউ বুঝবেই না তানিয়া কি ধরনের পোশাক পড়েছে!
আম্মা পাশাপাশি দুই জনকে বসিয়ে নিজে একটা চেয়ার টেনে সামনে মুখোমুখি হয়ে মাঝখানে বসলো, কিছু সময় মন ভরে দেখলো পুত্র আর পুত্রবধূকে। তানিয়া সাজেদের পাশাপাশি এভাবে গা লেগে বসায় লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে আর সাজেদ নিজের মায়ের মুখের দিকে চেয়ে মুচকি হাসছে! অনুভব করছে তার আম্মার খুশি!এত গভীর রাত বলা যায় কিছু সময় বাদেই ফজরের আযান পড়বে অথচ তার মায়ের মুখে মনে কোথাও কোন ক্লান্তির ছাপ নেই।
গতকালকে সারাদিন বিয়ের আয়োজনের পিছনে পরিশ্রম করেছে, শরীরের পরিশ্রমের চেয়েও বেশি ছিলো মানসিক পরিশ্রম।কারন যদি সাজেদ সময় মতো না পৌঁছাতে পারতো তাহলে কতবড় একটা দূর্ঘটনা ঘটে যেতো সেই চিন্তায় নাকি উনি সারাদিন কিছুই খায় নি অথচ দেখো ছেলে আর বউকে কাছে পেয়ে সব চিন্তা,ভয়,ক্লান্তি যেন হাওয়ায় উবে গেছে।
আম্মা পুত্র আর পুত্রবধূকে মন ভরে দেখে, বিমুগ্ধ একটি হাসি দিয়ে বললেন,
আম্মা:- মাশাআল্লাহ! একদম রাজযোটক❤️
আম্মার কথায় দু'জনেই বেশ লজ্জা পায় এবং মাথা নত করে ফেলে! আম্মা সেন্টার টেবিলে রাখা ভাতের প্লেট নিয়ে তাতে তরকারি নিয়ে মেখে খাইয়ে দিলো; সাজেদ পরম তৃপ্তিতে মায়ের হাতে খাচ্ছে,খুশিতে তার চোখে পানি ছলছল করছে! আজ দীর্ঘ পাচ বছর পর নিজের মায়ের হাতের রান্না খাচ্ছে তাও মায়ের হাতে! যতই দামী দামী রেস্তোরাঁ আর হোটেল থেকে খাবার খাক, মায়ের রান্নার তুলনা পৃথিবীর কোন রাঁধুনীর সাথে হয় না। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী রাঁধুনীর নাম যদি কেউ জিজ্ঞেস করে নিঃসন্দেহে সবাই তার মায়ের নামটাই বলবে।আর সেই মায়ের হাতে যখন খাওয়ার সুযোগ হয় তখন তো নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়।
শ্বাশুড়ির এত আদর আর মমতায় তানিয়ার বারবার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ছে,তার সাথে বারবার তার আঁখিও ভিজে আসছে। ছলছল দৃষ্টি নত রেখেই শ্বাশুড়ি আম্মার হাতে খাওয়ার পর্ব সারলো।
খাওয়া শেষে আম্মা বললেন,
আম্মা:- আব্বা আপনি আমার সাথে একটু আসেন তো।
আম্মার আদেশ মোতাবেক সাজেদ তার পিছু পিছু চলে গেল! এখন পুরো ঘরে তানিয়া একা! চারদিকে চোখ বুলাচ্ছে!
ঘরটা বেশ বড়! বড় মানে একটু বেশিই বড়! বে*ড'টাও বেশ বড়, একটা ফিক্সড আলমিরা'হ,বড় একটা স্টাডি টেবিল,তার সাথে লাগোয়া মাঝারি সাইজের বুক সে*ল্ফ যাতে ঠাসা ঠাসা বই। অপর পাশে ড্রেসিং টেবিল, মনে হচ্ছে নতুন কেনা। তার সামনে সুন্দর একটা টুল রাখা। তার থেকে কিছুটা দুরে একটা ওয়া*র'ড্রব এবং সেটার পাশে রাখা একটা টেবিল ফ্যান! অন্য পাশটা একটা বড় এলএডি টিভি।যেটা দেওয়ালে ফিক্সড করা,সেটাও নতুন দেখলেই বোঝা যায়।টিভির নিচেই রাখা একটা সুন্দর নিচু শোকেস যার মধ্যে খুব সুন্দর সুন্দর কিছু শো পিস রাখা। এবং সেটার উপরে রাখা মিউজিক সিস্টেম এবং সাউন্ড বক্স। ঘরটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন! তিন পাশেই দেওয়ালে খুবই সুন্দর রঙের আকাশী এবং ছাই স্যাডে'র পর্দা টানানো এক পাশে বারান্দায় যাওয়ার দরজা মনে হচ্ছে। সেই পাশটা গাছের লতা দিয়ে আবৃত করা। সবচেয়ে সুন্দর আর ভালো লাগার বিষয় হলো ওয়াশ'রুম যেই পাশে সেই পাশের দেওয়ালেও পর্দা টানানো এবং সেটা পুরো বাথরুমের দরজা কভার করা। অপরিচিত কেউ বুঝবেই না এখানে একটা ওয়াশ'রুম আছে। তার চেয়ে সুন্দর বিষয় প্রতিটি কোনায় একটা করে ফুল গাছ লাগানো, বোঝাই যাচ্ছে প্রতিনিয়ত পরিচর্যার ফলে গাছগুলো এত সুন্দর লাগছে। আজকে বিয়ে বলেই হয়তো বেডের পাশেও ফুল গাছের টব এনে রেখেছ যেখান থেকে ভেসে আসছে তাজা ফুলের সুগন্ধ; এই ফুলের নাম জানা নেই তানিয়ার তবে দেখতে যেমনি সুন্দর তেমনি তার সুবাস!আর সেই সুবাসে মুগ্ধ হয়ে শান্তির শ্বাস তুলতেই দরজা খোলার শব্দে চোখ মেলে তাকালো আর তার সাথেই আবদ্ধ হলো দুই জোড়া নয়ন!
পর্ব ০৫
চোখাচোখি হতেই লজ্জায় লাল হয়ে মুখ নামিয়ে নেয় তানিয়া,তবে সাজেদের অবস্থা একই,, তানিয়ার লাল হয়ে যাওয়া বদন খানি দেখে ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা ফুটে উঠল।ধীর পায়ে হেঁটে এসে হাত বাড়িয়ে দিলো তানিয়ার পানে; চোখের ইশারায় কিছু বলতেই ভেতরে এলো সানজানা, ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে এক গ্লাস দুধ তানিয়ার দিকে ধরে বললো,
সানজানা:- ভাবী ওষুধ খাওয়ার আগে এই গরম দুধটা খেয়ে নাও! দেখবে তোমার খুব ভালো লাগবে!
স্বামীর হাতে ওষুধ আর ননদে'র হাতে গরম দুধের গ্লাস দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলো তানিয়া, চোখের ইশারায় হাত থেকে দুধ আর ওষুধ নিতে বললো সাজেদ; ভাবীর আড়ষ্টতা বুঝতে পেরে সানজানা নিজেই বললো,
সানজানা:- ভাবী তোমার নাক দেখেই বোঝা যাচ্ছে ব্যথা করছে,হয়তো রাতে জ্বর ও আসতে পারে তাই আম্মা বলছে ঘুমানোর আগে এগুলো খেয়ে ঘুমাতে! অসুস্থ হয়ে পড়লে তো আর বিয়ের অনুষ্ঠানে আনন্দ করতে পারবে না! পরে দেখা যাবে যার বিয়ে তারই খবর নেই!
শ্বশুরবাড়ি সবার এত অমায়িক ব্যবহারে আবেগি হয়ে গেল তানিয়া,,শ্বা*শু*ড়ি আম্মার এত আদরে তো এত সময় সে সারপ্রাইজড হয়ে গিয়েছিল এখন স্বামী আর নন*দে'র কথায় যেন পুরোই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।কারো শ্বশুড় বাড়ি এতো ভালো হয় কি না তাতো ওর জানা নেই! কই ওর তো অন্য বোনের ও তো শ্বশুড়*বাড়ি আছে তারা তো এতটা কখনো করেনি।তানিয়া তো করতে দেখেনি।
সানজানা:- নাও ঠান্ডা হয়ে যাবে! ঠান্ডা হয়ে গেলে তো দুধ খেয়ে লাভ নাই!
ছলছল দৃষ্টিতে চেয়েই দুধটা নিলো, তারপর আস্তে আস্তে বেশ কয়েক চুমুকে দুধটা শেষ করলো , এত সময় ধরে দু'জনেই তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো।দুধ শেষ করার সাথে সাথেই দেখলো একটা ওষুধের হাত তো আরেকটা পানির গ্লাস ধরা হাত।
মুচকি হেসেই পানির গ্লাস নিয়ে ওষুধ খেয়ে নিলো। সানজানা'ও হাসি বিনিময় করে গ্লাস দুটো নিয়ে চলে গেল।সাজেদ গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। একবার তানিয়ার দিকে চেয়ে কিছু একটা মনে করে নিজের বারান্দায় গেলো,তানিয়া চুপ করে মাথা নিচু রেখে ফ্লোরের দিকে দৃষ্টি রেখে আড় চোখে সাজেদের কার্যক্রম দেখছে। কিছু সময় বাদেই আবার ফিরে এলো সাজেদ।
সাজেদ:- কিছু সময়ের মধ্যেই ফজরের আযান পড়বে,আমরা একসাথে নামায আদায় করে তবেই না হয় ঘুমাই।
মাথা তুলে সম্মতি সূচক ভঙ্গিতে নাড়া'লো! সাজেদ নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
সাজেদ:-আসো ততক্ষনে আমরা বারান্দায় বসি! তোমার ভালো লাগবে আশাকরি!
সাজেদের বাড়ানো হাতটা'কে একবার দেখে সাজেদের দিকে দেখলো,তার চোখে খুশি মুখে হাসি! বিশ্বাসের সহিত হাতটা ধরলো, লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আবারও চোখ নামিয়ে নিলো! সাজেদ তানিয়ার হাতটা শক্ত করে নিজ মুঠ বন্দি করে নিয়ে চললো বারান্দায়।
বারান্দার এক পাশে দুটো সুন্দর চেয়ার পাতা তার একপাশে ছোট একটি টি টেবিল।পুরো বারান্দাটা বাহারী রঙের ফুলের গাছ। বিয়ে উপলক্ষে মরিচ বাতি দিয়ে সাজানো বলে বারান্দাটা'ও জ্বলজ্বল করছে।মরিচ বাতির আলো ছাড়াও বারান্দা'র বাইরে বিশাল বড় একটা এলএডি লাইট জ্বলছে যার কারনে বাগানের অংশের অনেক দুর আলোকিত হয়ে আছে। বারান্দার এই পাশ দিয়ে পেছনের বাগান দেখা যায়।ঘন বাগান হওয়ায় খুবই অন্ধকার থাকার কথা কিন্তু চারদিকে এত বড় বড় লাইট জ্বালানোর কারনে বেশ অংশই আলোকিত হয়ে আছে যার জন্য রাতের বেলা ও বেশ ভালো লাগছে।
সাজেদ তানিয়া'কে এনে একটা চেয়ারে বসালো পাশেও নিজেও। দুজনের মাঝেই চলছে পিনপতন নীরবতা। একজন লজ্জায় কিছু বলতে পারছে না তো আরেকজন কি দিয়ে কিভাবে শুরু করবে সেটা নিয়ে বিশাল চিন্তায় ডুবে আছে।
সাজেদ:-তুমি জানো আমার আসতে কেন দেরি হয়েছে?
মাথা দুলিয়ে উত্তর তানিয়ার, এখনও তার নিরবতা,মাথা নো*য়া'নো দেখে সাজেদ একটু মজা করেই বললো,
সাজেদ:- তুমি কি আমাকে ভয় পাচ্ছো!
এবার ও মাথা দুদিকে ঘুরিয়ে না সূচকে উত্তর।সাজেদ এবার বললো,
সাজেদ:- তাই তো! আমি ও তো তাই জানতাম কিন্তু এখন কেন জানি মনে হচ্ছে আমার জানায় কিছু ভুল ছিলো!
সাজেদের এহেন কথায় তানিয়া এবার মুখ তুলে সরাসরি তাকালো সাজেদের চোখের দিকে, বুঝার চেষ্টা করছে সাজেদের কথা।সাজেদ গভীর দৃষ্টিতে তাকালো তানিয়ার চোখে,তানিয়া সাজেদের চাহনিতে লজ্জা পেলো তবে সরানোর সক্ষম'তা পেল না! কেন জানি সরাতেই ইচ্ছে করলো না! হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে ঐ গভীর সমুদ্রের মতো নয়নের বিশালতা'য়!
খুঁজছে নিজের জন্য কাঙ্খিত অনুভূতি! সাজেদ ও যেন তানিয়ার ডাগর আঁখির মাঝে খুঁজে বেড়াচ্ছে নিজেকে! প্রতিটি পুরুষই চায় তার জীবন সঙ্গী*নি'র ভেতর বাহিরে শুধু তারই অস্তিত্ব,তার অবাধ বিচরণ!
যেন একজীবনের তেষ্টা এই একজনের মাঝেই মিটে।একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় যত বৃদ্ধি পাচ্ছে তত যেন একে অপরের প্রতি অনুভূতির গভীরতা উপলদ্ধি করছে।
বাইরে কিছুর শব্দ আসছে হয়তো কোন নিশাচর চলাচলের শব্দ আসছে! সেই শব্দের সৃষ্টিই যেন তাদের অনুভূতি খোঁজা'য় ব্যাঘাত ঘটালো! সরিয়ে নিলো দৃষ্টি! লজ্জায় যেন তানিয়ার মুখ টকটকে বর্ন ধারন করেছে, ঠোঁটের কোনে লজ্জা মিশ্রিত হালকা হাসি! চোখ নামিয়ে নিল। সাজেদ ও বাইরে নজর রেখে ঠোঁট কামড়ে নিজের হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।
সাজেদ:- আচ্ছা আম্মা তোমাকে বলেছিলো কেন
আমার আসতে এত দেরি হচ্ছে!
তানিয়ার সংক্ষেপে উত্তর,,
তানিয়া:- হুম!
সাজেদ:- কি বলেছিলো?
তানিয়া:- আম্মা বলেছিলো আপনার অফিসে সমস্যা হয়েছিল তাই আপনার ছুটি ক্যান্সেল হয়ে গেছে তবে বিয়ের আগেই আসবেন!
সাজেদ:- তুমি জানতে চাও নি কি সমস্যা হয়েছিল?
তানিয়া:- উহুম!
তানিয়ার নিচু আওয়া'জে দেওয়া উত্তরে সাজেদের প্রশ্নে ছোট করে তানিয়ার উত্তর!
সাজেদ বুঝলো এই তোতাপাখির ন্যায় কথা বলা মেয়েটা আজ লজ্জায় একদম নেতিয়ে গেছে তবে তার তো জানা উচিত তাই নিজেই বললো,,
সাজেদ:- আমাদের বিয়ে উপলক্ষে ছুটি নেওয়া হয়েছিল আমাদের বিয়ে ফিক্সড হওয়ার কিছুদিন আগেই। কথা ছিল আমি এসে তোমাকে সরাসরি দেখার পরেই বিয়ে ফিক্সড হবে। কিন্তু যেদিন আমার ফ্লাইটে'র ডেট পড়লো তার আগের দিনই এক ঝামেলায় পড়ে গেলাম ! তারপর আর কি ছুটি ক্যান্সেল! তবে যেহেতু বিয়ের কারন দ'র্শি'য়ে ছুটির আবেদন করেছিলাম তাই তারা আমাকে আশ্বাস দিলো বিয়ের তারিখের আগেই আমার ছুটির ব্যবস্থা করা হবে এবং অবশ্যই তার জন্য লম্বা ছুটি ও দেওয়া হবে। তার সাথে যাতায়াত ব্যবস্থার সমস্ত খরচও তারা বহন করবে।যেহেতু টিকিটের পিছনে আমার খরচ হয়েছে এবং সেটা তখন বাতিল হয়েছে তাই তারা আর্থিক ক্ষতি-পূরনের আ*শ্বা'স ও দিয়েছিলো।
তানিয়া:- কি হয়েছিল?
তানিয়ার প্রশ্নে মুচকি হাসলো সাজেদ,ও তো এত সময় এটাই চেয়েছিল,তানিয়া জিজ্ঞেস করুক এত দেরি করার কারন কি? একজন স্ত্রী হিসেবে স্বামীর সাথে জড়িত সব বিষয়ে তার কৌতুহল থাকা উচিত বলেই মনে করে সাজেদ এবং তানিয়ার মতো সচেতন মেয়ের কাছ থেকে তো অবশ্যই প্রত্যাশিত ছিল।দেরি করে হলেও নিজের কাং*ঙ্খি'ত জিনিসটা পেয়ে সাজেদ উ*চ্ছ্বা*সিত হয়েই বলতে লাগলো,,
সাজেদ:- টেকনিক্যাল কিছু প্রবলেম হয়েছিলো, যেহেতু আমি আইটি ডিপার্টমেন্টে আছি সেহেতু এ সময় ঐখানে থাকা আমার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিলো। আসলে প্রধান সমস্যা ছিলো আমাদের কোম্পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাইট হ্যাক করা হয়েছিলো যার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লোপাট হয়ে যায়।এর জন্য আরো অনেক জটিলতা তৈরি হয়েছিলো আর এর কারনেই আমাদের যত ডিপার্টমেন্ট আছে সেখানকার সব সিনিয়র,সহ সিনিয়র কর্মকর্তার ঐ সময় উপস্থিত থাকাটা জরুরী ছিলো। শুধু জরুরী বললে ভুল হবে একান্ত বাধ্য ছিলো ।একজনও যদি ঐ সময় অফিস থেকে অন্য কোথাও যেতো তাহলে লিগ্যাল আ্যাকশন সবার আগে তার প্রতি ই নেওয়া হতো।এর জন্যই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ছুটি কাটানো সম্ভব ছিলো না।বুঝলে?
তানিয়া:- হুম!
তানিয়ার সন্তোষজনক উত্তর, ছোট করে হুম বলাতে সাজেদ ঠোঁট এলিয়ে নিঃশব্দে হাসলো,তার সাথে তাল মিলিয়ে হাসলো তানিয়া ও। কিছু মনে হতেই আবারও জিজ্ঞেস করলো,,
তানিয়া:- এখন কি সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে!
সাজেদ:- উহুম!
তানিয়া:- তাহলে?
সাজেদ:- পুরোপুরি হয়নি,হ্যাকার থেকে সাইট ফিরিয়ে আনা হয়েছে,তবে যেই তথ্য গুলো লোপাট হয়ে গেছে ওগুলো তো আর ফিরে আনিয়ে যাবে না। তাই সেগুলো নিয়ে তদন্ত চলছে।হয়তো খুব তাড়াতাড়ি তারও সন্ধান পাওয়া যাবে!
তানিয়া:- মানে!
তানিয়ার চিন্তিত মুখ,সাজেদ ওর চিন্তার রেশ অনুভব করতে চেষ্টা করছে, তানিয়া নিজেই বললো,,
তানিয়া :- মানে বলছিলাম,যদি সব সমস্যার সমাধান না হয়ে থাকে তবে আপনি ছুটি কিভাবে পেলেন? আপনার এগেইনস্টে আবার লিগ্যা'লি কোন পদক্ষেপ নিবে না?
এত সময়ে বুঝতে পারলো সাজেদ,,তাই নিঃশব্দে হেসে উত্তর দিলো,,
সাজেদ:- না! চিন্তার কারন নেই! আমি তাদের সন্দেহের বাইরে আছি ! আলহামদুলিল্লাহ! আর যদি আমাকে নিয়ে তাদের সন্দেহের কোন অবকাশ ও থাকতো তাহলে বিয়ে কেন আমার মা মরে গেলেও ছুটি তো দুরে থাক সুইডেনের বাইরে যাওয়ার অনুমতি কোনদিনও মিলতো না! সুতরাং তুমি চিন্তা করো না!
সাজেদের কথায় তানিয়া বড় করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো যেটাতে বোঝা'লো সে এখন চিন্তা মুক্ত; তানিয়ার এরুপ কাজে সাজেদ শব্দ করেই হেসে দিলো,সাথে তানিয়াও তাল মিলালো তবে তার হাসি ছিলো নিঃশব্দে!
তাদের কথার মাঝেই খুব কাছ থেকে ভেসে এলো আযানের মধুর সুর!
'হাই'য়া আলাল ফালাহ!!'
তানিয়া নিজের মাথায় থাকা ওড়না'টা আরো সুন্দর করে মাথায় এটে নিলো।তার সাথে শুনতে পেল নিজের খুবই কাছ থেকে সু মধুর কন্ঠে দেওয়া আযানের উত্তর! চোখ ঘুরিয়ে দেখলো সাজেদ আযানের সাথে সাথেই উত্তর দিচ্ছে! মুগ্ধ হয়ে গেল তানিয়া সাজেদের কন্ঠস্বর শুনে। মনে মনে আওড়ালো,,
তানিয়া:- এই লোক নাকি নয় বছর ধরে সুইডেনে থাকে! কে বলবে? কত সুন্দর করে আযানের উত্তর দিচ্ছে! আচ্ছা এটা কি নিয়মিত অনুশীলন ছাড়া সম্ভব! তার মানে উনি নিয়মিত নামায আদায় করে! অনেক মুসলমানদের মতোই অ*ত্যা*ধুনিকতা'র ছোঁয়ায় ভুলে যায়নি নিজের অস্তিত্ব!
তানিয়ার ভাবনার মাঝেই হাতে টান পড়লো,সাজেদ তানিয়ার হাত ধরে উঠানোর চেষ্টা করছে আর বলছে,,
সাজেদ:- চলো এখন একসাথে নামায আদায় করে নেই তারপর একটা লম্বা ঘুম দিবো!
তানিয়া নিজের চিন্তার রেশ না কাটাতে পেরে তাকে পাশে রেখে দিলো ,সাজেদের হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো,সাজেদ সামনে ফিরে আবারও পিছনে ঘুরে জিজ্ঞেস করলো,,
সাজেদ:- তোমার নামায আছে তো?
তানিয়া সাজেদের প্রশ্ন বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলো,,
সাজেদ:-না মানে তোমার কি শরীর ঠিক আছে নাকি ছুটি চলছে?
এত সময়ে বুঝতে পেরে লজ্জা আবারও ঘিরে ধরলো তানিয়াকে, মনে মনে বললো,
তানিয়া:- অসভ্য লোক; কিভাবে জিজ্ঞেস করে!
আর মুখে বললো,
তানিয়া:- হুম!
সাজেদ:-ওকে আসো!
কথা শেষ করে চলে গেল আগে,আর পিছনে রেখে গেল লজ্জায় রাঙানো এক নারীকে,যিনি কিনা সদ্য হওয়া স্বামীর প্রতি মুগ্ধ।
ঘরে এসে তানিয়া নিজের কাপড় বদলিয়ে নিলো,ব্যাগটা অনেক আগেই সানজানা রেখে গিয়েছিল। সেটা খুলেই বের করলো নিজের জন্য একটা সুতি থ্রী পিস।সাজেদ ওযু করে চলে গেছে বাইরে, তানিয়া একটু আপসেট হলো এই ভেবে যে ও ভেবেছিলো সাজেদ আজকে ওর সাথেই নামায আদায় করবে কিন্তু! তানিয়ার ভাবনা শেষ হবার আগেই সাজেদ ঘরে ঢুকলো ,হাতে দেখা গেল একটা নামাজী হিজাব আর দুটো জায়নামাজ!
পর্ব ০৬
ঢাকা থেকে খুলনা বউ নিয়ে আসতে যে অনেক রাত হবে সেটা সবাই আগেই আন্দাজ করেছিলো তাই বউ ভাতের অনুষ্ঠান বিয়ের একদিন পরে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। এতে করে সবাই খুব আনন্দের সহিত বিয়ের প্রতিটি আয়োজন উপভোগ করতে পারবে। সেই মোতাবেক আজকে কারো কোন ব্যস্ততা নেই।যেহেতু সবাই ফজরের নামাজের পর ঘুমিয়েছে তাই আম্মা বাদে সবাই ই বেশ দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছে।এর মধ্যে সবার পরে উঠেছে নব দম্পতি।তা নিয়ে সবার কত হাসাহাসি!
ফাতেমা:- আমি তো ভেবেছিলাম এই বর বউ আজ আর দরজা খুলবে না।
(মেজো জা)সানিয়া:- বেচারা দুইজন ঘুমিয়েছে নাকি একদম নামাজ পড়ে। তাছাড়া সাজেদ ও তো কাল কতটা পরিশ্রম করলো! সেই কোন সুদূর সুইডেন থেকে টানা ১৮/১৯ ঘন্টা জার্নি করে এসে সরাসরি আবার বিয়ের আসরে চলে গেল! সেখানে কত নিয়ম কানুন,কত কি ছিলো! আবার বউ নিয়ে ফিরতে ফিরতে প্রায় শেষ রাত! আর বেচারী তানিয়া ও তো কম মেহনত করেনি। যতই বলি বিয়ে উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম তো একটা মেয়েরই হয়। মানসিক মেহনত! এর চেয়ে বড় কষ্ট আর মে*হনতে'র বেশি কি আছে!
সবার খোশ গল্পের মাঝেই এসে উপস্থিত হলো তানিয়া আর সাজেদ! হাসি তামাশা মজার ছলে চলে গেল একটা বেলা ।।। দুপুরের খাবারের বিশাল আয়োজনের পরই শুরু হলো বিকেলের বিশেষ আয়োজন।।
যেহেতু কালকে সাজেদ তানিয়ার বাসর সাজানো হয়নি, এমনকি কোন ছবিও এই বাড়িতে এখনো তোলা হয়নি তাই সা*ন*জানা'র বুদ্ধিতে সবাই মিলে পরিকল্পনা করলো কালকের মিস করে যাওয়া সব আয়োজন আজ করবে।যেমন কথা তেমনি কাজ।
তানিয়াকে সা*ন*জা*নার ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো সাজানোর জন্য। এদিকে সাজেদ'কে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে রাখা হয়েছে ! সাজেদের কয়েকজন বন্ধু আর ভাবী'রা মিলে গেছে বাসর সাজাতে। সারা বিকেল এইসব আয়োজনের মাঝেই কেটে গেল। সন্ধ্যা বেলা যখন তানিয়া কে সা*ন*জানা'র ঘর থেকে বের করে আনা হলো। তানিয়াকে দেখে যেন সাজেদের হৃদস্পন্দন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল! মুগ্ধ চাহনিতে পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইলো মাথা নুইয়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসা অসম্ভব মায়াবতী নারীর দিকে। শুধু যে সাজেদ একা তা নয়। আশেপাশের সবাই এক অবিশ্বাস্য চাহনিতে তাকিয়ে আছে,, কালকের বিয়েতেও তানিয়া সেঁজেছিলো কিন্তু আজকের এই মেরুন জামদানী শাড়ী পড়া বধুর বেসে থাকা মেয়েটা আর কালকের
সাদা গ্রাউনে থাকা নতুন বউয়ের মাঝে যেন বিশাল ফারাক!কালকে দেখতে একজন কিশোরী বধূ মনে হয়েছিল আর এখন পরিপূর্ণ যুবতী নারী। যা যেকোন পুরুষের মাঝে উত্তেজনা তৈরিতে যথেষ্ট! কালকের সাজে একদম বাচ্চা বাচ্চা একটা লুক ছিলো আর এখন একদম পরিপক্ক একজন নারী।এই যে সাজেদ; সে তো রাতেই ঠিক করেছিল স্বামী স্ত্রীর এই সম্পর্ক চু"ড়া'ন্ত পর্যায়ে নেওয়ার আগে নিজেদের একটু সময় দিবে।একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করবে, প্রথমে তানিয়ার ভালো বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করবো , তারপর টিন এজার'দের মতো খুনসুটি'ময় প্রেম করবে কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে সব প্রতিশ্রুতি আজই ভঙ্গ হয়ে যাবে!
বায়েজীদ:- মাশাআল্লাহ! দোস্ত তোর ঘরে পূর্ণিমার চাঁদ নামলো আজ!
পাশ থেকে নিজের প্রিয় বন্ধু বায়েজীদের কথায় ধ্যান ভঙ্গ হলো সাজেদের, মুচকি হেসে আবারও দৃষ্টিপাত করলো মনের ঘরে আলো জ্বালানো রমনীর দিকে !
সানজানা:- ভাবী তুমি এখান বসো; ভাই তুমি এখনো কেন রেডি হওনি?
ছোট বোনের কথায় সাজেদ নিজের দিকে তাকালো,তার গায়ে দুপুরে পড়া নতুন পাঞ্জাবি,, ঠিকঠাকই আছে।এখনো ভাঁজ নষ্ট হয়নি ! তবে তার বোন রেডি বলতে কি বো*ঝা'চ্ছে!
নিজেকে পর্যবেক্ষণ শেষে বোনের তাকাতেই তার আক্কেল গুড়ুম অবস্থা,ওমা এ দেখি ভ্রু কুঁচকে ভয়াবহ লুক নিয়ে দাড়িয়ে আছে! শুধু কি বোন একা! তার সাথে জুড়েছে নতুন করে পাওয়া বোন মানে শা*লি'কারা আর সব সময়ের জন্য বাশ নিয়ে উপস্থিত থাকা ভাবী'রা!
সবার অনুরোধে সাজেদ অবশেষে হার মেনে আবারও বরের সাজে নিজেকে তৈরি করলো! এরপর শুরু হলো ফটোশুট নামক অত্যাচার! নানান পোজে,নানান জায়গায় দাঁড়িয়ে কতশত ছবি তোলা হলো।যদিও প্রধান লোকেশন হিসেবে নির্ধারিত ছিলো ছাঁদ, তবুও ফটোশুটের জন্য তৈরি ছিলো বাড়ির প্রতিটি কোনা'ই !
এরপর ছিলো নানা রকমের খেলার আয়োজন! প্রতি আয়োজনেই ছিলো সাজেদের পকেট কাটার ধান্দা! সাজেদ সব বুঝেও তাল মেলাচ্ছিলো কারন এতে তার কলিজার টুকরা ছোট বোনের খুশিই ছিলো প্রধান! এই এক বোনের জন্য তো হাসতে হাসতে সব দিতে পারে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করছিলো নিজের নব্য বিবাহিত বিবির লজ্জা রাঙ্গা মুখটা।প্রতিটি খেলায় তাকে ইচ্ছে করেই জিতিয়েছে সাজেদ, এবং সেটা সবাই বুঝতেও পারছিলো তাই তো তাকে জরিমানা করা হতো এবং সে খুশি মনেই সেই জরিমানা মেনে নিতো।এতে করে সবাই তানিয়াকে নিয়ে তাঁকেও মজার মজার রস-কস মেশানো কথা বলতো।তাতেই দেখা যেতো তানিয়া লজ্জায় রক্তিম হয়ে যেতো।
সারা বিকেলের সব রকমের আয়োজনের পর রাতের খাবারের পর নব বধূকে নেওয়া হলো সাজেদের ঘরে! বেলী ফুল ,রক্ত রাঙ্গা গোলাপ আর কাঠ গোলাপের মিশ্রনে ছিলো অসাধারণ ডেকোরেশন! তানিয়া ঘরে ঢুকে বিমুগ্ধ নয়নে দেখছিলো তাদের জন্য সাজানো বা*স*রে'র খাট'টা!
তানিয়া কে ঘরে ঢুকিয়ে দরজায় তালা দিয়ে দিলো ভাবী'রা! তানিয়া সবার পরিকল্পনা বুঝতে পেরে মুচকি হাসলো।আজকে বেচারা সাজেদের অবস্থা বেহাল করে তবেই ছাড়বে সবাই! তবে তানিয়া আশ্চর্য হয়েছিলো তার বোনদের প্রতি সাজেদ এবং তাদের পরিবারের সবার ব্যবহার দেখে! তানিয়ার সাথে এসেছিলো ছোট ই মীম এবং এক ভা*তি*জী মুসকান! যেহেতু ওরা সাজেদ'দের বাড়ির সবার বয়সের তুলনায় অনেক ছোট তাই কেউ কোনরকম বেয়াই'ন ধাঁচের কথা তো বলেই নাই বরং সবাই নিজেদের ছোট বোনের মতো করেই খেয়াল রাখছে। অবশ্য সাজেদের দুই একজন বন্ধুর অনেক আফসোস হচ্ছিলো এই ভেবে যে বেয়াইন'রা অনেক ছোট তারা চাইলেও কোন রকম মজা করতে পারতো না।তানিয়াকে ও শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিলো কেন ভাবীর বড় নেই! কেন ভাবী তাদের অধিকার হরণ করলো! এ'রুপ অনেক কথাই!
সানজানা:- ভাই পুরো বিশ হাজার দিতে হবে তা না হলে ঢুকতে দিবো!
সাজেদ:-তুই না আমার আপন বোন! পারবি ভাইয়ের সাথে এইরকম অন্যায় করতে?
ফাতেমা:- এই সান'জু খবর দার একদম ইমোশনাল কথায় পট'বি না! বলে দিলাম খারাপ হবে কিন্তু ?
সানজানা:- ভাই কোন কথা নাই; টাকা দাও চাবি নাও!
সাজেদ:- এমন করিস না বইন!দেখ এত সময় যা চাইছি'স তাইতো দিলাম এবার অন্তত ক্ষমা করে দে!
সাজেদের বন্ধু:- শালা এমন কি*পটা'মি করছিস ক্যান? একটা মাত্র বোন,যা চায় দিয়ে দে!
সাজেদ:- আচ্ছা নাম আমার বাচ্চা বোনের আর কাজ তোমাদের সবার?
সানিয়া:- উফ এত কথা ভালো লাগেনা; যদি আজকে রাতে বউকে চাও তবে টাকা দাও চাবি নিয়ে ভেতরে যাও! নইলে বাইরেই থাকো ! এমনিতেও আমাদের সবার ঘুম পেয়েছে অনেক ঘুমাবো! কালকে আবার তোমাদের রি*সিপশ*নে'র অনুষ্ঠান সো অনেক কাজ আমাদের কালকে!
সাজেদ সবার দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিয়ে সানজানা'র কাছাকাছি মুখ নিয়ে বললো,
সাজেদ:- ভাইকে ছেড়ে দে কালকে তোকে অনেক গিফট দিবো নে!
বায়েজীদ:- এই খবরদার কান পড়া দিবি না!
সানজানা ভাইয়ের থেকে দুরে সরে বললো,
সানজানা:- সে কালকের টা কালকে হবে। আপাতত এখনের টা দাও!
সাজেদ বুঝলো তার বোনকে ভালোই মগজ ধোলাই করা হয়েছে সুতরাং কিছুতে'ই লাভ হবে না।তবে শেষ চেষ্টা করাই যায় তাই বললো,
সাজেদ:-দেখ তুই কিন্তু তাড়াতাড়ি ফুপি হতে পারবি না এরকম করলে!
বায়েজীদ:- শালা বিদেশ থেকে এসে কি লেভেলের কন্জু'সি শুরু করছে,এখন বোনকে ফুপি না হওয়ার থ্রেট দেয়!
সাজেদ:- তুই না আমার বেস্ট ফ্রেন্ড!
বায়েজীদ:-আপাতত শুধু টাকাই বন্ধু!
ফাতেমা:- উফ কত কথা বলো তুমি সাজেদ! তোমার বউ যে অপেক্ষায় রয়েছে সেটা কি ভুলে গেছো?
বেচারা সাজেদ বুঝলো আজ আর রক্ষা নেই! তাছাড়া সে এমনিতেও দিতো , বোনের খুশির চেয়েও আর কি বেশি! তবে এতটুকু সময় শুধু মজা করার জন্যই এত কথা বলা! অবশেষে সানজানা'র মুখের দিকে চেয়ে দেখলো বোন তার চোখের ইশারায় টাকা দিতে বলছে, মুচকি হেসে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সেখান থেকে কার্ডটা বের করে ধরিয়ে দিলো সান*জানা'র হাতে! সাথে সাথে সবাই হইহই করে উঠলো।সাজেদ বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো! সানজানা বিজয়ের হাসি দিলো।সে ও জানতো তার বায়নার কাছে তার ভাই হার মানবেই! আর তাই তো সবাই তাকেই গুটি বানালো!
ইস আজকে ভাইয়ের কতগুলো টাকা চলে গেল! কথাটা ভাবতেই একটু আবেগী হয়ে গেল! তারপর ভাইকে জড়িয়ে ধরলো কিছু সময়! এর পর হাসি বিনিময় করে চলে গেল! সবাই সাজেদ'কে উইশ করে চলে গেল! এত সময় দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে সবটাই শুনছিলো তানিয়া!
পর্ব ০৭
দরজা খুলে যবু-থবু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লজ্জ্বাবতী নববধূকে দেখে আবার ও দ্রুত গতিতে হার্টবিট করতে লাগলো, তানিয়া দরজা খোলার শব্দে আগেই সরে গিয়ে খাটের পায়ার কাছে দাঁড়িয়েছে, অপূর্ব সুন্দর এক মূহুর্ত মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে সাজেদের কাছে, তানিয়া এখনও নিরব চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে! তার জড়তা কাটানোর কোন নাম গন্ধ নেই,সাজেদ ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়, তারপর তানিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে!
তানিয়া এখনও তেমনি দাঁড়িয়ে ছিলো, কিন্তু সাজেদ'কে এগিয়ে আসতে দেখে সাজেদে'র সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে, নিচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে গেলেই সাজেদ হাত দিয়ে আঁটকে দেয়,
সাজেদ:- কি করছো?
তানিয়া:- সবাই বলেছে আপনার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে হবে তাই!
সাজেদ:- কখনো না! আজকে যেই কাজটা করেছো সেটা আর কখনো করবে না! তোমার মাথা কেবল একজনের কাছেই নোয়াবে! আর নিশ্চিত সে আমাদের সবার রব,,মহান আল্লাহ পাক! আমাদের মাথা নিচু কেবল তার সামনেই হবে,তিনি বাদে অন্য কেউ এটার যোগ্য নয়; আশাকরি মনে থাকবে!
তানিয়া:- হুম,, কিন্তু সবাই বলেছিলো বলে তাই আমি!
সাজেদ:- সবাই কি বললো না বললো তাতে কি আসে যায় ! সত্যি কি সবার বলাতে মিথ্যা হয়ে যায়! তোমার মতো মেয়ে যদি এগুলো মানে তাহলে কি হবে?
তানিয়া সাজেদের কথায় চোখ তুলে তাকালো, সাজেদ এক অদ্ভুত চাহনিতে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে,
তানিয়া:- হুম,আর করবো না এমন কিছু!
সাজেদ:- এখানে বসো!
কথাটা শেষ করে বেডে বসিয়ে নিজে আলমিরার দিকে এগিয়ে গেল,একটা পার্ট খুলে কিছু একটা বের করলো, তারপর আলমিরার দরজা লাগিয়ে এগিয়ে এলো, তানিয়া শুধু দেখেই যাচ্ছে সাজেদে'র কাজ! সাজেদ তানিয়ার পাশেই বসলো,হাতে থাকা প্যাকেটটা তানিয়ার দিকে বাড়িয়ে বললো,
সাজেদ:- এটা তোমার ; খুলে দেখো পছন্দ হয় কিনা!
তানিয়া:- এটা কি?
সাজেদ:- খুলেই দেখো!
তানিয়া:- কৌতুহলী তানিয়া প্যাকেট খুলে মুগ্ধ হয়ে গেল, কি সুন্দর একটা বক্স,বক্সের দিকে তাকিয়ে সাজেদে'র দিকে তাকালো,সে ও মুগ্ধ চাহনিতে তানিয়ার কৌতুহলী নয়ন জোড়া দেখছে, তানিয়া বক্সটা খুলে যেন আরও বেশী মুগ্ধ হলো, বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেল;
সাজেদ: পছন্দ হয়েছে?
বিস্ময়ে তানিয়ার কথা বন্ধ হয়ে গেছে,সাজেদ বুঝেই নিলো নিজের স্ত্রীর অভিব্যক্তি,ডান হাত দিয়ে তানিয়ার বাম পাশের ছোট ছোট উড়ে বেড়ানো চুল গুলো ঠিক করে দিলো,কানের কাছে গুজে দিলো বড় কিছু চুল যেগুলো সাজের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য বের করে রাখা হয়েছিল, তানিয়া ছলছল চোখে তাকিয়ে রয়েছে,
সাজেদ:- বাসর ঘরে নাকি স্ত্রীকে গিফট করতে হয়,তাই এটা তোমার জন্য নিয়ে এসেছিলাম! তোমার পছন্দ হয়েছে তাতেই আমার সফলতা!
তানিয়া:- তাই বলে এত এক্সপেন্সিভ!
সাজেদ:- তো আমার বউ কি কম দামী নাকি! জীবনে বিয়ে করলাম একটা বউ ও আমার একটাই সুতরাং তাকে গিফট করতে গিয়ে যদি ভাবতে হয় দামী কম দামী তাহলে কিসের জন্য এত মেহনত করছি, কিসের তাগিদে বৈদেশে পড়ে থাকবো?
তানিয়া:- তাই বলে কেউ এত দামী কিনে নাকি?
সাজেদ:- এটা আর কি! জানো যখন এটা কিনতে গিয়েছিলাম তখন এটার পাশে থাকা প্লাটিনামের এক জোড়া বালা ছিলো,খুব ইচ্ছে করছিলো নেই, কিন্তু তখন আমার এত বাজেট ছিলো না তাই বাদ্য হয়ে ডায়মন্ডের ই নিলাম; তবে আমার সবসময়ই ইচ্ছা ছিলো বাসর ঘরে আমি আমার স্ত্রীর মুখ ডায়মন্ড দিয়েই দেখবো! তাই অনেক আগের থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম!
তানিয়া:- কিহ্!
সাজেদ:- হ্যা এতে চমকানোর কি আছে!
তানিয়া:- এরকম দামী অদ্ভুত ইচ্ছা কেবল আপনারা ই থাকতে পারে!
সাজেদ:- হ্যা দেখতে হবে না স্বামী কার!
সাজেদে'র কথায় তানিয়া হেসে দিলো, সাথে সাজেদ ও;
সাজেদ:- আমি কি পড়িয়ে দিতে পারি ম্যাম!
অনুমতি নেওয়ার ধরনে তানিয়ার হাসি বেড়ে গেল, তবুও মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো,সাজেদ নিজের হাত বাড়িয়ে তানিয়ার হাত ধরলো,খুব আলতো করে, লজ্জায় তানিয়ার হাসি উবে গেল, মাথা নুইয়ে নিলো, সাজেদ ডান হাতটা তুলে নিজের উস্কখু্স্ক ওষ্ঠের গভীর ছোঁয়া দিলো, নিজের স্বামীর প্রথম এরকম ছোঁয়ায় শিউরে উঠলো পূর্ণাঙ্গ যুবতী তানিয়ার অন্তঃস্থল,ডান হাতের চুড়ি গুলো খুলে নতুন করে পড়িয়ে দিলো উপহার স্বরূপ আনা হীরের চিকন একটা চুড়ি,বাম হাতেও পূ্র্ণরায় সাজেদে'র ছোঁয়া পেয়ে তানিয়ার শুস্ক অনুভূতি গুলো যেন আর ও চড়াও হলো, নিজের ডান হাতে দিয়ে চাদর আকড়ে ধরলো, সাজেদ একইভাবে বাম হাতে ও চুড়ি পড়িয়ে দিলো!
চোখ তুলে দেখলো লজ্জায় নেতিয়ে পড়া তানিয়ার মুখটা, নিঃশব্দে হেসে হঠাৎ ই উঠে দাঁড়ালো! এরপর বললো,
সাজেদ:- চলো দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নেই!
তানিয়া সাজেদের কথায় চোখ তুলে সাজেদের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো, মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো, এরপর ধীর পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালে সাজেদ জিজ্ঞেস করলো,
সাজেদ:- ওযু করতে হবে?
তানিয়া:- হুম; অনেক সময় এভাবে ছিলাম,ওযু আছে কিনা তাতো নিশ্চিত নই তাই বলছি!
সাজেদ:- হ্যা করে নেওয়া উচিত; চলো তোমাকে সাহায্য করি!
তানিয়া:- না থাক আমি পারবো! অসুবিধা হবে না!
সাজেদ:- কেন থাকবে! এমনিতেই এগুলো খোলা আমার দায়িত্ব; আর আমি নিজের দায়িত্বে কখনো অবহেলা করি না !
তানিয়া যে লজ্জায় না বলছে তা সাজেদ ঠিক ই বুঝতে পারছে আর তাই নিজের দুষ্টু বুদ্ধি খাটিয়ে তানিয়া কে আরো লজ্জায় ফেলার বুদ্ধি আটলো,,
তানিয়ার কোন না ই সাজেদ'কে থামাতে পারেনি, উপায় না পেয়ে লজ্জায় নেতিয়ে থাকা তানিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে কেবল উপভোগ করছে তার স্বামীর রোমান্টিক অত্যাচারগুলো; সাজেদ প্রতিটি অলংকার খোলার সময় অত্র স্থানে নিজের শুষ্ক ওষ্ঠের গভীর ছোঁয়া দিতে থাকে,যা বারবার শিউড়ে তোলে তানিয়ার সর্বাঙ্গ!
সব খুলে তানিয়ার দিকে মোহনীয় নয়নে তাকিয়ে থাকে কিছু সময় এর পর নিজেই সরে যায়; তানিয়া সুযোগ বুঝে দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ে! ওযু কর আগ-পিছ দাঁড়িয়ে দুজনেই নফল নামাজ আদায় করে,দু হাত তুলে পরম করুণাময়ের কাছে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক কিছু দাবী কর, অনেক সময় নিয়ে ছোট ছোট কিছু আমল করে!
নামাজ শেষে তানিয়া সাজেদের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে, নামাজের প্রতিটা দোয়ায় সাজেদ নিজের পরিবারের সাথে তানিয়ার এবং তানিয়ার পরিবারের, আশেপাশের মানুষের জন্য এবং মুসলিম জাহানের জন্য কল্যান চেয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে, নিজেদের আগত জীবন নিয়ে ও অনেক চেয়েছে,,কত মধুর কন্ঠে,কত আবেগ দিয়ে নামাজের দোয়া দরুদ পাঠ করেছে! তানিয়ার মনে হয়েছিল ওর পাশে ওর প্রিয় কোন ইসলামিক স্কলার বসে বসে আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দর ও সাবলীল এবং একমাত্র সত্য কিতাব পবিত্র আল কুরআন পাঠ করছে! খুশিতে কান্না করে দিলো! ও অনেক চেষ্টা করে সুন্দর ও মধুর সুরে কুরআন শরীফ পাঠ করার কিন্তু হয় না,,ও তো ঠিক মতো উচ্চারণ ই করতে পারে না,,তাই সবসময় চেয়েছে আল্লাহ যেন ওর কপালে একজন প্রকৃত মুসলিম রাখে যার মাধ্যমে ও আল্লাহর এই পবিত্র কালাম সঠিক ভাবে আয়ত্ত্ব করতে পারবে! সাজেদের সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর মনে হয়েছিল ওর এই ইচ্ছা হয়তো আর পূরণ হলো না,, কারণ সুইডেনের মতো দেশে বিগত কয়েক বছর ধরে বসবাসরত সাজেদ নিশ্চয়ই ধর্মীয় বিষয়ে খুব একটা পটু হবে না কিন্তু ওর চিন্তা ভুল প্রমাণ করে সাজেদ ওকে বিশাল একটা পুরষ্কার দিলো!
সাজেদ:- কি হলো কাঁদছো কেন?
তানিয়া:- আপনি অনেক সুন্দর কুরআন তেলাওয়াত করেন! কত মধুর লাগে শুনতে!
সাজেদ:- তাই!
মৃদু হেসে সাজেদের কৌতুহলী উত্তর, তানিয়া ও হালকা হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো, কিন্তু তানিয়ার কথা শেষ হয়নি সাজেদ বুঝলো এবং নিজে সেধেই জিজ্ঞেস করলো পরবর্তী কথা কি?
তানিয়া:- আমি ভালোভাবে কুরআন পড়তে পারি না,তাই সবসময় ভাবতাম আমার যার সাথে বিয়ে হবে সে যেন ভালো করে কুরআন পড়তে পারে, তাহলে আমিও তার থেকে শিখবো!
সাজেদ:- আচ্ছা;তারপর?
তানিয়া:- কিন্তু যখন আপনার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল তখন মনে হয়েছিল..
সাজেদ:- আমি কুরআন পড়তে পারবো না!
তানিয়া মাথা নুইয়ে ফেললো, নিজের অদ্ভুত চিন্তা যে সাজেদ বুঝতে পেরেছে তার জন্য লজ্জিত হলো,সাজেদ হঠাৎ করেই বেশ শব্দ করে হেঁসে উঠল, হাসতে হাসতে ই বললো,
সাজেদ:- বোকা মেয়ে সুইডেন থাকলেই কি কুরআন কেউ ভুলে যায়? আদৌও সম্ভব! সবার আগে আমি মুসলিম,জন্মগত মুসলিম, আমার আল্লাহর বান্দা,প্রিয় রাসুলের উম্মত! সুতরাং আমি যেখানেই থাকি কুরআন আমার হৃদয়ে আজীবন থাকবে! তাছাড়া আমি কর্মের কারণে সুইডেনে গিয়েছি তাও কয়েকবছর হলো মাত্র আসলে তো আমি জন্মগত বাঙালি, বাঙালি মুসলিম! সুতরাং কোন সুযোগ নেই কুরআনকে এক মুহুর্তের জন্য ও ভুল যাওয়া!!
--আর যদি বলো ভালো পড়ার বিষয়,হ্যা সেটা আমার একদম ছোট থেকেই আলহামদুলিল্লাহ ভালো! তুমি যদি আমার ঘর দুঃখিত আমাদের ঘর এখন তো এটা আমার একার নয় তোমারও ইভেন আমার চেয়ে ও এখন এটাতে তোমার বেশি অধিকার সুতরাং এটা আমাদের ঘর, তো তুমি যদি খেয়াল করো তাহলে দেখবে শোকেসে একটা মেডেল আর ক্রেস্ট রয়েছে যাতে স্পষ্ট লেখা আছে সুন্দর করে সুমধুর কন্ঠে কুরআনুল কারীম পাঠের জন্য দ্বিতীয় স্থান অর্জন কারী হচ্ছে মুহাম্মদ সাজেদ চোধুরী!
সাজেদের কথায় তানিয়ার চক্ষু চড়কগাছ, সাজেদ মাদ্রাসা লাইনে পড়াশোনা করেছে কিন্তু ও তো জানতো সাজেদ সাধারণ বিষয়েই পড়াশোনা করেছে তবে কি! জিজ্ঞেস করার আগেই উত্তর পেয়ে গেল,,
সাজেদ:- উহুম আমি মাদ্রায় পড়ি নি, আর এটা সরাসরি মাদ্রাসার কোন প্রতিযোগীতা ও ছিলো না,
এটা আমাদের স্কুলের সাথে'র মসজিদে কিশোর কিশোরীদের নিয়মিত নামাজী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রতিযোগীতা মূলক একটি আয়োজন করা হয়,তাতে সবাই উপস্থিত থাকতে পারবে বলে জানতে পারি,আমিও তখন সকালে নিয়মিত মাদ্রাসায় যাই কুরআন পাঠ করতে সাথে সোহা ও যেতো তখন ই আগ্রহ জমে প্রতিযোগীতায় নাম দেওয়ার এবং দেই ও! আমি সবসময়ই সবরকম প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে চেষ্টা করতাম! আল্লাহর রহমতে কখনো খালি হাতে ফেরত আসতে হয়নি সেদিন ও হয়নি, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে নগদ অর্থ সহ মেডেল,ক্রেস্ট নিয়ে তারপর এসেছিলাম!
তানিয়া মুগ্ধ হয়ে শুনছে, মাদ্রাসায় না পড়া সত্ত্বেও কুরআন পাঠের জন্য পুরষ্কিত হওয়া অবশ্যই ছোট বিষয় না,তার জন্য নিয়মিত অনুশীলন করতে হয় এবং করতো বলেই সে এত সুন্দর করে সুমধুর কন্ঠে কুরআনুল কারীম পাঠ করে!
সাজেদ:- ম্যাম আপনার বর ইসলামিক জ্ঞান খুব একটা না রাখলেও আপনাকে কুরআন পড়তে সহযোগিতা করার মতো নূন্যতম জ্ঞান উপর ওয়ালা উনাকে দিয়েছেন, সুতরাং আপনাকে চিন্তা করতে হবে না!!
কথাটা বলার সময় হুট করেই সাজেদ তানিয়ার গাল টেনে দিলো, লজ্জায় লাল হয়ে থাকা তানিয়া যেন আরো লজ্জায় ডুব দিলো! সাজেদ তানিয়ার অবস্থা দেখে হেসেই খুন!
পর্ব ০৮
তানিয়া হুট করেই চোখ তুলে সাজেদের দিকে চেয়ে কিছুটা উত্তেজিত হয়েই সাজেদের ডান হাতটা ধরলো, তারপর বেশ আবেগি হয়েই বললো,
তানিয়া:- আমাকে একবার সুরা আর রাহমান তেলাওয়াত করে শোনাবেন?
তানিয়ার হঠাৎ স্পর্শে সাজেদ আশ্চর্য হয়,এই প্রথম তানিয়া নিজের থেকে ওকে ছুঁয়েছে,কাল থেকে এই অবধি একবার ও না নিজের থেকে কাছে এসেছে না একবার ও ছুঁয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু দূর থেকে আড়চোখে দেখেছে বহুবার! কিন্তু প্রথম স্পর্শেই কি সুন্দর অদ্ভুত একটা আবদার করেছে,এই মুহূর্তে কোন মেয়ে এমন আবদার করে? ; খুশি হলো খুব,ভালোই লেগেছে, শুধু ই ভালো লাগা নয় একদম মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই একটি আবদার!
সাজেদ মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো, তারপর তানিয়ার ডান হাতটা নিজের ডান হাতের মাঝে মুঠো বন্দি করে নিলো, তানিয়ার হাতের উল্টো দিকে ছোট করে একটা চুমু দিলো, এহেন কাজে তানিয়া লজ্জা পেল খুব, কিন্তু সাজেদ এখনও ঠোঁটের কোনে হাসি বজায় রেখে শুরু করলো তেলাওয়াত করা,,আর মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলো তার সহধর্মিণী!
তানিয়া:- মাশাআল্লাহ!
শেষ হতেই তানিয়ার প্রশংসা,সাজেদ হাস্যমুখে তা গ্রহন করলো, এরপর হুট করেই উঠে দাঁড়ালো,
সাজেদ:- নাও ওঠো অনেক রাত হচ্ছে ঘুমাতে হবে কাল আবার অনেক কাজ করতে হবে!
জায়নামাজ তুলে ভাঁজ করে নিজেদের ওয়ারড্রবে রেখে দিলো, তানিয়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কি করবে তা যেন বুঝতে পারছে না,পরের ঘটনা কি ঘটতে পারে তাই ভাবছে,,সাজেদ জায়নামাজ রেখে তানিয়ার সামনে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো, তানিয়ার অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে,
সাজেদ:- আমি কি অনুমতি পাবো!
সহজ ভাবেই করা হলো প্রশ্ন কিন্তু উত্তর কি সহজ ভাবেই দেওয়া যায়,, তানিয়া ও পারলো না; তবে লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া শ্যাম বর্ণের টমেটোর মতো ফুলো ফুলো গাল দেখেই সাজেদ নিজের উত্তর পেয়ে গেছে! আরেকটু এগিয়ে একদম গা ঘেঁষে দাঁড়ালো,মাথার ওড়নাটা নিজের হাত দিয়ে ফেলে দিলো, খোঁপা করে রাখা ভেজা চুল গুলো ছেড়ে দিলো ,, এরপর!!( এত হুনতে মন চায় ক্যা,,বেচারী তানি লজ্জা পাচ্ছে!🥴)
তিন দিন পর ----------
বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষে নিজের বাড়ি ঘুরে এসেছে আজ সকালে তানিয়া! শ্বশুর বাড়ি মধুর হাঁড়ি এটা আগে শুনলেও এবার টের পেয়েছে! শ্বাশুড়ি মায়ের অত্যাধিক স্নেহ আর জামাই আদরের নামে মিষ্টি নির্যাতনে দু'দিনেই বেচারা সাজেদ কাহিল হয়ে পড়েছে! সারাদিন এটা খাও,ওটা খাও করে করে ওজন হয়তো কয়েক কেজি বাড়িয়ে দিয়েছে ; বিয়ে উপলক্ষে বেচারা কত কষ্ট করে ওজন কমিয়েছে অথচ মাত্র দুদিনেই সব শেষ!
তানিয়া সাজেদের কথা শুনে হেসেই খুন! আম্মা ও নিজের ছেলের অভিযোগ শুনে হাসছে,, সানজানা তো ভাইকে পচাতেই ব্যস্ত!
সাজেদ:- আম্মা এত খাবার মানুষ কিভাবে খায় বলো! প্রতি বেলায় ই এত এত খাবার রেডি করে! কিভাবে করে?
আম্মা:- তুমি জামাই তোমাকে খাওয়ানোর জন্য ই তো করেছে না হলো রোজ রোজ কি করে?
সাজেদ:- তাই বলে আম্মা এত খাবার! আমি কি রাক্ষস!
আম্মা:- এমনে বলে না আব্বা! তুমি এমনিতেই শুকিয়ে গেছো! আমি তো সময়ই পেলাম না ঠিক মতো রান্না করে খাওয়াতে,,তাও ভালো বেয়াইন খেয়াল করেছে!
সাজেদ:- আম্মা!
তানিয়া:-আম্মা আপনি ঠিক ই বলেছেন,,আমাকে সানজানা উনার আগের ছবি দেখিয়েছে সেটাতে উনাকে কত কিউট গলুমলু লাগছে অথচ এখন !
তানিয়ার চোখে দুষ্টুমি খেলা করছে, কথাটা বলেই মিটমিট করে হাসছে!
সাজেদ তানিয়ার কথায় ওর দিকে ফিরে বসে চোখ ছোট ছোট করে মুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
সাজেদ:- কেমন দেখায়!
তানিয়া:- না মানে বলছিলাম;;
সানজানা:- হিরো আলমের তালতো ভাই!
মাঝ খান থেকে ফোড়ন কেটে সানজানা পিঞ্চ করে কথাটা বলে, সাজেদ তানিয়াকে ছেড়ে সানজানাকে দৌড়ানি দেয়,আম্মা ছেলে মেয়েদের এমন ছুটোছুটি দেখে খুশি হলেন খুব, অনেক দিন প্রায় পাচ টা বছর পর নিজের ছেলে মেয়ের মাঝে এমন সময় দেখছে; নিঃসন্দেহে এই সময়টা উনার কছ খুব দামী!
সাজেদে মুখে তানিয়ার বাড়ির প্রশংসা শুনে ও খুব ভালো লাগছে,,লাগার ই কথা, কোন ছেলের মা যখন শোনে তার ছেলের শ্বশুর বাড়িতে ছেলেকে অনেক যত্ন খাতির করা হয়েছে তাতে সে খুশিই হয়! মেয়ের মায়েরা যেমন শ্বশুর বাড়িতে মেয়ের ভালো থাকা আশা করে তেমনি ছেলেদের মায়েরাও শ্বশুর বাড়িতে তার ছেলেকে গুরুত্ব দিবে,যত্ন আত্ন বেশি করে করবে এটাই আশা করে! এটাই স্বাভাবিক!
কিন্তু সাজেদের বলা অনুযায়ী অতটাও আম্মা আশা করে নি,করবেই বা কিভাবে?ঐ বাড়ির সবচেয়ে বড় আয়ের মাধ্যম ই ছিলো তানিয়া,, তানিয়ার উপরই সংসারের দায়িত্ব বেশি ছিলো,সেই তানিয়া ই এখন নাই তবে কিভাবে কি করবে!
তানিয়ার সাথে সাজেদের বিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছিলো তখন অনেকেই নিষেধ করেছিলো ছেলেকে এখানে বিয়ে না দিতে; মেয়ে চাকরি করে,তাও আবার মার্কেটের মতো জায়গায়,যেখানে কতশত পুরুষের সাথে উঠাবসা সেই মেয়ে কি ভালো হবে? এটা আশা করাও তো ভুল! তাছাড়া মেয়েরা একদমই হতদরিদ্র, নিম্ন বিত্তের! সাজেদের মতো ছেলে কিভাবে এদের সাথে মানিয়ে চলবে! এরা তো সাজেদ'কে কখনোই ভালো খাতির করতে পারবে না! এত উচ্চ শিক্ষিত,ভালো পরিবেশে থাকা,ছেলে কিভাবে ওরকম পরিবেশে বড় হওয়া মেয়ের সাথে মানিয়ে নিবে? আর বিয়ের সময় ও সাজেদ কোন উপহার দিতে পারব না,ঈদ উৎসবে জামাই হিসেবে ভালো উপহার,ঈদি পাওয়া সাজেদের মতো ছেলে তো আশা করতেই পারে কিন্তু মেয়েদের যা অবস্থা তাতে বোঝাই যায় এটা একদমই আশায় গুড়ে বালির মতো হবে! হয়তো দেখা যাবে দূর ভবিষ্যতে সাজেদ অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়বে তখনও মেয়েরা পারবে না কোন সাহায্য সহযোগিতা করতে! আর যদি কোন বড় বাড়ির মেয়ের সাথে বিয়ে হয় তাহলে একবারেই সাজেদের ভবিষ্যত আলোয় ভরে উঠবে!
তাছাড়া শুনলাম মেয়ের গায়ের রং ও নাকি কালো তাহলে তুমি কি দেখে এমন মেয়ে নিজের ছেলের জন্য ঠিক করলে?
এতসব কথায় আম্মা শুধু দুটো কথাই বলেছে,১/ আমি ছেলেকে বিয়ে দিচ্ছি, হাঁটে বিক্রি করছি না যে তার থেকে মুনাফা আশা করবো! বিয়ে করে ছেলে আমার বউ আনবে,টাকার মেশিন না যে আমাদের টাকার কমতি মেটাবে আর ২/ আলহামদুলিল্লাহ আমার ছেলে শক্ত সামর্থ্যবান, তার রুচিতে ও বাঁধবে শ্বশুর বাড়ি থেকে কিছু আশা করা, এছাড়া আমার যতটুকু আছে আমার ছেলে যদি হাত পা নাড়ায় তবে তা দিয়ে তার পরবর্তী প্রজন্ম চলে যাবে ইনশাআল্লাহ! সুতরাং আল্লাহ ভরসা!
আম্মার এহেন উত্তরে অনেকেই নিজেদের প্রশ্নের মূখ্যম জবাব পেয়েছে,কেউ কেউ বুঝতে পেরেছে আম্মা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে তাদেরকেই অপমান করেছে,যারা মোটা অর্থের বিনিময়ে ছেলেকে বিয়ের নামে বিক্রি করে,উৎসবে সামিল হওয়ার নামে প্রতি পার্বনে ছেলেকে গুষ্টি-শুদ্ধ শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়,বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে তত্ত্ব না পেলে বউদের ঘাড়ে খোটা'র শুল বিধাঁতে থাকে,তারা এক কথাই যথেষ্ট অপমানিত হয়েছে,তাই আর কথা না বাড়িয়ে তোমার ছেলেকে "তুমি যা খুশী তাই করো , আমরা শুধু ভালোর জন্যই বলেছিলাম",বলেই চলে গেলেন!
যারা চাকরি করা নিয়ে মেয়ের চরিত্রে আঙ্গুল তুলেছে তাদেরকেও আম্মা দু চার কথা শুনাতে চেয়েছিলেন কিন্তু বলেন নি কারণ উনি জানে এতে উনাদের মেয়ে'দের প্রসংঙ্গ আসবে আর একজন মা হয়ে নিজের মেয়ে থাকা সত্ত্বেও অন্যের মেয়েকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য রাখা আম্মার মতো শিক্ষিত রুচিবান মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়!
তবে উনি জানেন উনি বেছে বেছে উনার ছেলের জন্য যোগ্য কাউকেই এনেছে, অর্থনৈতিক অবস্থা, গায়ের রং এসব তো সাময়িক ব্যাপার প্রকৃত বিষয় তো চরিত্র, মনুষ্যত্ব! আর উনি খুব ভালো করেই খবর নিয়ে দেখেছে শুনেছে মেয়ের সম্পর্কে!ছেলের ও পছন্দ হয়েছে সুতরাং কে কি বললো তাতে উনার
কি? সংসার উনার সেটাতে কি হবে না হবে তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ও উনার নিজের ই!
তানিয়া:- আম্মা কি ভাবছেন?
আম্মার হুশ ফিরলো হঠাৎ করেই তানিয়ার আম্মা ডাকে, সচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,,
আম্মা:- হ্যা বউ কিছু কইতাছিলা?
তানিয়া:- অনেক সময় ধরে দেখছি কিছু ভাবছেন, কিছু কি হয়েছে আম্মা?
আম্মা:- না না কি হইবো? তুমি এহন ও এইহানে বইয়া আছো ক্যান?
তানিয়া:- আম্মা;
আম্মা:- যাও যাও ঘরে যাও, কাপড়চোপড় ছাইড়া একটা ঘুম দাও,,ঘুম দিলেই আরাম লাগবো,,না আগে পরিষ্কার হইয়া আইসা কয়টা খাও তারপর একদম একটা লম্বা ঘুম দাও,, দেখবা একদম ফুর-ফুরা লাগবো!
তানিয়া:- না আম্মা আমি এখন আর খাবো না, পরিষ্কার হয়ে তারপর ঘুম দিবো,,তবে আপনার ছেলেকে কিছু খেতে দিয়েন উনি রাস্তায় কিছুই খান নি! অনেকবার বলেছিলাম প্রতিবারই শুধু এক কথাই বলছে, "অনেক খেয়েছি সকালে এখন আর খাবো না"! কিন্তু আম্মা উনি মাত্র দুটো পরোটা খেয়েছে, একটা ডিম! এতেই নাকি অনেক খেয়েছে!
আমাকে,সানজানাকে কত কি কিনে দিলো খেতে কিন্তু নিজেই কিছু খেলোনা!
আম্মা: - ঐসব বাহানা দিছে,আসলে অনেকদিন পর দেশে আসছে তো এখন ও বাইরের খাবার খেতে পারবে না,কষ্ট হয় বাইরের খাবার খেতে,, আবার খেলেও পেট খারাপ করে তাই খায় না,, আগের বার একবার খেয়ে একদম হাসপাতালে অবধি ভর্তি হতে হয়েছে!
তানিয়া:- তাই!
আম্মা:-হুম;
তানিয়া:- আল্লাহ আমি আরো কত জোর করলাম ভাগ্য ভালো তাতেও খায় নি ,,খেলে না জানি আবার অসুস্থ হতো!
আম্মা:- চিন্তা করো না, কয়েকদিন তারপর সে নিজেইতো বাইরের খাবার নিয়ে বসে থাকবে!
তানিয়া:- সত্যিই!
আম্মা:- হ! আচ্ছা যাও আবার পরে কথা হবে এখন গিয়ে পরিষ্কার হও!
পর্ব ০৯
শ্বাশুড়ির নির্দেশ মোতাবেক চলে গেল তানিয়া,সেদিন সারাদিন নিজেদের মতো করেই ঘর দুয়ারের কাজ করে এবং নিজেদের মাঝে গল্প,একে অপরের সাথে সময় কাটিয়েই দিনটা পার করে দেয়!
রাতে সাজেদের বড় ফুফুর বাড়ি থেকে ফোন করে দাওয়াত করা হয়!আম্মা জানিয়ে দেয় তারা যাবে!
নিজেদের বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে সাজেদ,সাজেদের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে তানিয়া; তানিয়ার বাম হাত সাজেদের ডান হাতের মাঝে, তানিয়ার চিকন চিকন আঙ্গুল নিয়ে বাচ্চাদের মতো খেলছে সাজেদ তার সাথে তানিয়াকে বুঝাচ্ছে তার ফুফুর বাড়ীতে কে কেমন ধরনের! এর মধ্যেই ফোন বেজে উঠলো,সাজেদ ধরলো না,কেন জানি এই মুহুর্তে তানিয়া ছাড়া অন্য কিছুই মনের আনাচে কানাচে আসতে দিতে চাইলো না! শুধু নিজেদের মাঝেই উপভোগ করতে চাইলো সময়টা; তাই করলো!
সকালে,,
তানিয়া বাথরুমে আছে,সাজেদ গোসল করে বেরিয়েছে, পাঞ্জাবীর বোতাম লাগানোর সময় মনে হলো গত রাতের ফোন কলের কথা, তাড়াহুড়ো করে ফোনটা হাতে নিলো, চার্জে লাগানো ছিলো, একবার সময় দেখলো পাওয়ার বাটনে প্রেস করে,সকাল আটটা সতেরো বাজে,তার পাশেই ভেসে আছে গতকালের মিসড কলের সংখ্যা কপালে বেশ চওড়া ভাঁজ পড়লো, আবেগের বশে কল টা রিসিভ করে নি,কখন কিভাবে ফোনটা সাইলেন্ট হয়েছে টের ও পায় নি,হয়তো বালিশের নিচে পড়ে থাকার কারনে নিজের থেকেই হয়েছে, হয়তো কোনভাবে চাপ লেগেছিলো, কিন্তু এতগুলো কল কেন দিয়েছিলো, ভাবতেই চিন্তা বেড়ে গেল!
লক খুলে কল করতে গিয়েও না করেই ই-মেইল চেক করলো,, দেখতে পেলো সেখানে অফিস থেকে বার্তা আছে, তাতে স্পষ্ট লেখা আছে ,
Hello,
Md Sajeed, how are you? We hope everything is going well in your life! We know it's your vacation time and also the most important time of your life you are enjoying but we are also helpless because you need to come back to the company as soon as possible,, the company needs you very much right now so please!
check your email we have sent you a copy of the ticket and schedule!
We hope you will be able to understand us..
Goodbye, best wishes for your journey!
Tom Brady
C/O
the company of black pearls
মূহুর্তেই মেজাজ বিগড়ে গেল,দেড় মাসের ছুটি, সেখানে কিনা মাত্র চার দিনেই বলছে ফিরে যেতে! এটা কেমন কথা! কি এমন হলো!বেশি আর ভাবলো না,দ্রুত কল দিলো!
তানিয়া বাথরুম থেকে অর্ধেক শাড়ী পড়েই বের হলো,বের হয়েই সাজেদের কুঁচকে যাওয়া মুখভঙ্গি আর হাতের ফোনের দিকে ভাবুক দৃষ্টি দুটোই আগে নজরে আসলো; কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে বুঝতে কষ্ট হলো না, অর্ধেক পড়া শাড়ীটা আগে ভালো করে পড়ে নিলো, এরপর আবার ও সাজেদের দিকে তাকালো, সাজেদ ফোনে কথা বলছে, অফিসের কারো সাথে কথাতেই বুঝলো,ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে পাশে দাঁড়ালো, সাজেদের পাশে দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ, সাজেদ ওকে একবার দেখে আবারও সামনে দৃষ্টি ফেলে কথা চালিয়ে গেল!
--কি হয়েছে?আপনার মুখটা কেমন দেখাচ্ছে!
সাজেদ উত্তর দিলো না, নিরবতায় কাটালো কিছু ক্ষণ, এরপর তানিয়ার দিকে তাকালো, তানিয়ার কাছে ভালো ঠেকলো না,একটু আগেই হাস্যজ্জ্বল মুখটা কেমন অন্ধকারে ডুবে আছে,
--কি হয়েছে!
-- না তেমন কিছু না, তুমি তৈরি হও আমি একটু আসছি!
কথা শেষ করেই বেরিয়ে গেল, তানিয়া চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে ই রইলো ওর যাওয়ার দিকে,,
-- আম্মা!
আম্মা নিজের গায়ের কামিজটা টেনেটুনে ঠিক করছিলো,বোরকা পড়বে বলে,ছেলের ডাকে সেদিকে ফিরলো,আব্বা খাটের পায়ায় হাত রেখে বসে বসে তসবিহ পাঠ করছেন,ছেলের ডাকে তিনিও সেদিকে সচকিত হলো,
-- আব্বা কিছু লাগবো?
-- আম্মা আমার জরুরী কথা ছিলো!
-- কি কথা আব্বা?
আব্বার প্রশ্ন,সাজেদ নিজের বাবার পাশে গিয়ে বসলো, ছেলের চোখ-মুখ দেখে আম্মা আব্বা দু জনেই একটু সিরিয়াস হয়ে পড়লো,আব্বা হাতের তসবিহ'তে নিজের আঙ্গুল থামিয়ে দিলো,আম্মা নিজের কাজ থামিয়ে ছেলের পাশে বসলো;
-- কি হয়েছে , তোমার চোখ মুখ এমন শুকনো কেন লাগছে?
-- আম্মা আমার অফিস থেকে মেসেজ এসেছে,আমাকে দু একদিনের মধ্যেই ফেরত যেতে হবে?
-- মানে কি?
আব্বার প্রশ্ন,আম্মা ও অস্থির হলো;
-- আবার ও ঝামেলা হয়েছে,, এবার সরাসরি আমার ডিপার্টমেন্টে'ই ,এই সময়ে উচ্চ পদে থাকা সব কর্মকর্তাদের সেখানে থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়! তাই আমাকে ও যেতে হবে,ওরা অলরেডি টিকেটের ব্যবস্থা করে ফেলেছে আমাকে অবশ্যই আজ
কালের মধ্যে গিয়ে কনফার্ম করতে হবে!
-- কিন্তু এই সময়ে!
-- আম্মা কিছু করার নেই! চাকরি করি আর কোম্পানির এই সময়ে তার পাশে না থাকলে কিভাবে হবে?
-- মাত্র ই বিয়া করলা; সপ্তাহ ও পার হলো না এর মধ্যেই?
আব্বার প্রশ্ন,সাজেদ বাবার কথায় তার দিকে ঘুরলো, ছেলের মুখ চিন্তিত,অল্প সময়েই কেমন নির্জীব হয়ে গেছে,আর কোন প্রশ্ন করার সাহস করলো না, নতুন বিয়ের পর মাত্র চার দিনের দিনই নতুন বউকে ছেড়ে যেতে তারও খারাপ লাগছে,, এখন সময় তার বউকে নিয়ে সময় কাটানোর, এদিকে সেদিকে ঘুরা-ঘুরি করার কিন্তু তা না করে যখন সদ্য বিবাহিতা বউকে রেখে এত দুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার মানে ঘটনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ! তাছাড়া এভাবে বিবাহিত ছেলেকে বারবার জিজ্ঞেস করাটাও সমীচিন নয়,,সে নিশ্চয়ই ইচ্ছা করে যাচ্ছে না,তারও যেতে ইচ্ছে করছে না সেটা তার চেহারা দেখলেই তো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে!
-- আব্বা আমি;;
-- তো তুমি কি এখন ঢাকা যেতে যাচ্ছো?
-- হ্যা জরুরী তো!
-- এখনই বের হবা?
-- হওয়া উচিত! কিন্তু ফুফু?
-- সে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না! আমি বলে দিচ্ছি,, তোমার কাজের চেয়ে তো আর বেড়ানোটা বেশি না!
-- বউ মা কে জানিয়েছো?
- না, এখনও বলিনি,তবে আমি বুঝতে পারছি না ওকে কিভাবে বলবো?
আম্মার কথায় তার দিকে ঘুরেই উত্তর দিলো সাজেদ,আম্মা ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে ভরসা রাখতে বলে বললো তানিয়ার সাথে কথা বলতে,,
-- যাও আগে বউমার সাথে আলোচনা করো,, তোমার সব বিষয়ে এখন থেকে সবার আগে তার সাথেই আলোচনা করবা,, দেখবা খুশি হইবো!
-- জ্বী আম্মা!
-- যাও চিন্তা কইরো না যা হওয়ার তাই হইবো!
আম্মা,আব্বার সাথে কথা শেষ করে তাদের ঘর থেকে বের হতেই দেখতে পায় তানিয়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে,ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ও হয়তো বা সব শুনেছে, মুখটাও কেমন মলিন হয়ে গেছে,,মেরুন কালো বোরকার সাথে ম্যাচিং হিজাব বাঁধা,শ্যাম রঙা ডাগর ডাগর বড় নয়নে চিকন করে কাজল টানা,মাঝারী মোটা ছোট ঠোঁটের সৌন্দর্যে লাগানো মেরুন লিপস্টিক, নাকে জ্বলজ্বল করে জ্বলে থেকে নিজের উপস্থিতি জানানো হীরের নাকফুল সব কিছুই ফিকে হয়ে গেছে হাসিখুশি মুখে হঠাৎ মেঘের ঘনঘটায়,,হ্যা তানিয়া সবটাই শুনেছে, আর এটাও বুঝতে পারছে সাজেদ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে,,সাজেদ যাবে এটা বড় কথা নয়, সাজেদ একবার ওকে জিজ্ঞেস ও করলো না, বিয়ের চারদিনে'ই ও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটা কি একবার'ও ওকে জিজ্ঞাসা করা যেতো না!
আম্মার বলা কথাগুলো ও শুনেছে,হয়তো সাজেদ ও বলতো সময় করে তবুও! মনের কোনে কোথাও আঁটকে আছে তবুও শব্দটা! তানিয়া কোন কথাই বললো না; নিরবে চলে গেল নিজেদের ঘরে, সাজেদ ও ওর পিছু পিছু গিয়ে ই ঘরেই ঢুকলো! তানিয়া ঘরে ঢুকেই নিজের হিজাব'টা খুলে ফেললো, এরপর একে নিজের গায়ের গহনাগুলো খুলতে লাগলো,সাজেদ কোন কথা না বলে মাথা নিচু করে খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসে রইলো, বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হলো, এর মধ্যেই তানিয়া নিজের বোরকা ও খুলে ফেলেছে, খোঁপা করা চুল গুলো খুলে দিলো,তখন তাড়াতাড়ির জন্য ভেজা চুলই পেঁচিয়ে কোনরকম খোঁপা বেঁধে ছিলো,,সাজেদ মাথা নত রেখেই বলতে লাগলো,,
-- গতকাল রাতে সুইডেন থেকে ফোন এসেছিলো,তখন তো রিসিভ করিনি তাই ওরা আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ,, ই-মেইল করে রেখেছিলো,আমাকে যত দ্রুত সম্ভব ওখানে গিয়ে পৌঁছাতে হবে!
এখনও তানিয়া চুপ, সাজেদ নিজের কথা চালিয়ে গেল,,
-- সকালে তুমি যখন ওয়াস-রুমে ছিলে তখন মেসেজ চেক করেছিলাম তখনই জানতে পারলাম ,, এরপর ফোন করেছিলাম,,ওরা বললো আবার ও কোম্পানিতে ঝামেলা হয়েছে,, এবং সেখানে খুব দ্রুত দরকার আমাকে,, শুধু আমাকেই নয় ,ছুটিতে থাকা সব কর্মকর্তাদের ই একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে!
-- কবে যাচ্ছেন?
অনেক সময় তানিয়া কোন কথা বলেনি, হঠাৎ করেই এমন প্রশ্নে সাজেদ একটু চমকালো, হতভম্ব হয়ে জানতে চাইলো,
-- কি বললে?
-- কবে যাচ্ছেন! মানে কবে রওনা দিচ্ছেন!
-- আজকে টিকেট কনফার্ম করতে যেতে হবে তারপর দেখি কখন ফ্লাইটের টাইম দেয়!
-- ওহ আচ্ছা!
তানিয়া নিজের চুলে আঙুল চালাতে চালাতে সাজেদের পাশে এসে বসলো, সাজেদ মাথা তুলে স্বাভাবিক ভাবে তানিয়ার দিকে নজর রেখে বসলো,,
-- তুমি কি আপসেট?
-- নাহ তো! আমি আপসেট কেন হবো?
-- সত্যিই তুমি আপসেট নও?
-- না ! আপসেট হওয়ার কোন কারণ নেই? আমি একজন প্রবাসীর স্ত্রী ! আর আমার মতে প্রবাসী আর প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের স্ত্রী হলে এগুলো মেনে নিতে হবে এটাই স্বাভাবিক! সুতরাং আমি দুঃখি নই!
-- Are you sure? আমি তো ভাবলাম এটা শুনলে তুমি অনেক কষ্ট পাবে, হয়তো অনেক কান্নাকাটি ও করবে!
-- আমি এত দূর্বল নই,,আর এত অল্পতেই কান্নার অভ্যাস আমার নাই! তাছাড়া আপনাকে তো যেতেই হতো,মানে আপনি যেতেন ই যদি বৈদেশে চাকরি করার ইচ্ছা আজীবন থাকে ; চাকরির চিন্তা না থাকলে সেটা আলাদা ব্যাপার! আপনি তো আর আমার জন্য এত ভালো চাকরি ছাড়তে পারেন না, আর আমিও তা করতে বলবো না!! সুতরাং কাজের তাগিদে যাওয়া যেহেতু লাগবে তাহলে যাওয়াই ভালো সেটা হোক দুদিন আগে অথবা পরে!
তানিয়ার কথায় সাজেদ আশ্চর্য হলো, তানিয়ার মুখভঙ্গি দেখে কিছু ই বোঝো যাচ্ছে না, অভিমান করছে নাকি কষ্ট পাচ্ছে কোনটা? সাজেদ তানিয়ার এক হাত নিজের দু হাতের মুঠোয় আগলে নিলো,,
পর্ব ১০
- দেখো আমি জানি এই মুহুর্তে চলে যাওয়াটা উচিত নয় কিন্তু কিছু করার ও নেই!!
-- আপনাকে এত বুঝাতে হবে না,আমি বুঝি এগুলো, আমি নিজেও তো চাকরি করেছি! যাই হোক আপনি কি আজই রওনা দিবেন!
তানিয়ার এমন নিরুত্তাপ ব্যবহার সাজেদের খুব একটা ভালো লাগলো না, বিয়ের মাত্র চার দিনেই স্বামী বিদেশে যাচ্ছে,কত বছর পর আসবে তার ও ঠিক নেই,অথচ এই রমনীর মাঝে বিশেষ কোন প্রভাব পড়তে দেখা গেলো না,,তবে কি তানিয়া সাজেদের চলে যাওয়াতে খুব একটা কষ্ট পাচ্ছে না! কেন? উত্তর নিজেই খুঁজে নিলো! ওদের বিয়েটা পারিবারিক ঠিক হওয়া,,না বিয়ের আগে প্রেম ছিলো না বিয়ে ঠিক হওয়ার পর ও কোনরকম প্রেম বাক্য রচনা করেছিলো, এমনকি বিয়ের পর ও একদিন দুজনে একদমই নতুন চেনা মানুষের মতোই ব্যবহার করেছে,, তাছাড়া বিয়ের পর শরীর কাছাকাছি আসলেও মন মনের কাছাকাছি আসতে সময় লাগে! সুতরাং এটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়,,এখন যদি সাজেদের প্রতি তানিয়ার টান অনুভব হয় সেটা নিছকই শরীরের টান হবে,যতই বলুক এত দ্রুত মনের টান তৈরি হয় না তাও আবার পারিবারিক হওয়া বিয়েতে,, আজকাল তো প্রেমের বিয়েতেই বিয়ের পর মনের টান কমে যায় সুতরাং!
তার মানে তানিয়ার মনে এখনও সাজেদ নিজের জন্য অনুভূতি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ নাকি সৃষ্টি হয়েছে তবে তানিয়া তা উপলব্ধি করতে পারছে না,, কিন্তু সাজেদ? তার ও কি একই অবস্থা! নাহ সে তো প্রথম দর্শনেই মন খুইয়েছে,, শুধু পুরোপুরি বুঝতে সময় নিয়েছে,, কিন্তু এখনও তা মুখে প্রকাশ করা হয়নি!
এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে আম্মা নিজের ছেলেকে আষ্ঠে-পিষ্ঠে জড়িয়ে ধরেই অবধারিত ভাবে চোখের পানির বন্যা বানাচ্ছেন!আব্বা নিজের আবেগ কে কোনরকম নিয়ন্ত্রন করে ছেলের মা'কে বোঝাচ্ছেন, এদিকে বেশ কিছুটা দুরে দাঁড়িয়ে মা ছেলের এমন আবেগময় মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছে তানিয়া এবং তার পরিবারের সদস্যরা!
সাজেদ নিজের মা বোন বাবাকে সামলে শ্বশুর বাড়ির সবার সাথে কথা বললো, বন্ধুদের সাথেও কিছু সময় কাটিয়ে আবার মায়ের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে,,
-- আব্বা তুমি বউমার সাথে কেন কথা বলছো না!
আম্মার কথায় সাজেদ তানিয়ার দিকে তাকালো, তানিয়া অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখে কিছু একটা দেখছে,আন্দাজ করতে পারছে তানিয়ার মনের অবস্থা,যতই টান না থাকুক বলুক না কেন,,সঙ্গীর দুরত্বে মনের কোনে কিছু টা হলেও কষ্ট হচ্ছে,,কাল রাতেও বুকের উপর শুয়ে কত কথা বলেছে,যেন ওর কথাই শেষ হয় না,, সবচেয়ে বেশি বার বলা কথা ছিলো,,আপনি আমাকে ভুলে যাবেন না তো? বিদেশের সাদা চামড়ার মাঝে তামাটে গায়ের এই নারীর কথা মনে থাকবে? আমাকে নিয়মিত ফোন দিবেন,,আমি আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকবো! জানেন তো আমি একা থাকতে পারি না,, আপনি চলে যাবেন,সানজানা ও হোস্টেলে চলে গেছে,এখন আমি একা এত বড় বাড়িতে ,, কিভাবে থাকবো?
তানিয়ার কথার পিঠে হু হা কিংবা কখনো নিরবতা ছাড়া আর কোন উত্তর সাজেদ দিতে পারেনি,,তবে খুব করে ছুঁয়ে দিয়েছে তানিয়ার সর্বাঙ্গ! যেন বহুদিনের আহার একবারেই সংরক্ষণের প্রচেষ্টায়, তানিয়া'ও নিজের স্বামীর সাথেই মিশে ছিলো প্রতিটি মুহূর্ত ; তাকে দুরে পাঠানোর আগে তার ছোঁয়া নিজের প্রতিটি লোম-কূপে মিশিয়ে রেখেছে, কিন্তু কেউ কাউকে বলতে পারেনি নিজের অন্তঃস্থলে গোপন কথাটি,কেউ বুঝতে পারছে না তো কেউ বুঝেও বলতে পারছে না!
-- যাও ওকে নিয়ে গিয়ে একটু দুরে দাঁড়িয়ে কিছু সময় দাও!
সাজেদ এই একটা কথার অপেক্ষায় ই ছিলো,, বড়দের সামনে স্ত্রীকে নিয়ে একান্তে কথা বলার মতো বেহায়া-পনা করতে পারতো না,, ওদিকে তানিয়া ও দুরে'ই দাঁড়িয়ে আছে,, মায়ের অনুমতি পেতে দেরি হলেও সাজেদের যেতে দেরি হলো না, হাতের ঘড়িতে সময় দেখে সবাইকে এক্সকিউজ মি বলে তানিয়ার বাম হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগলো!
তানিয়া হঠাৎ টানে একটু হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণেই সাজেদ'কে দেখে শান্ত হলো, অনেকটা দুরে একটু নির্জনে এসে বেশ কিছু সময় একমনে দেখতে লাগলো মাথা নিচু করে দু হাতের আঙ্গুলের উপর যুদ্ধ চালানো রমনীকে,, তারপর হুট করেই জড়িয়ে ধরলো,বেশ শক্ত করে, তানিয়া ও নিজের আবেগকে আটকে রাখলো না, শব্দহীন ভাবে ই কাঁদতে শুরু করলো, খামচে ধরলো কোটের এক অংশ,নিরব কান্নার দাপটে কেঁপে উঠছে সারা শরীর,সাজেদের শক্ত পুরুষালী বাঁধন ও তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না!
-- কেঁদেই বিদায় দিবে? যাওয়ার আগে কি এই মুখের হাঁসি দেখার সৌভাগ্য হবে না?
-- তানিয়ার কান্নার দাপট আরো বেড়ে গেলো!
সাজেদ মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো,আদুরে কন্ঠে বললো,,
-- আমি গিয়েই ফোন দিবো,,রোজ দুইবার নিয়মিত ফোন দেওয়ার চেষ্টা করবো, তুমি যখন খুশি ফোন দিও যতই ব্যস্ত থাকি চেষ্টা করবো ফোন ধরার,আর হ্যা আমি আমার এই তামাটে রঙের বউকে খুব ভালোবাসি,তার চোখের এই এবড়ো-থেবড়ো কাজল ও ভালোবাসি, চোখের ঘন বড় পাপড়ি গুলো কে ও ভালোবাসি , তার শুষ্ক ঠোঁট জোড়া'ও বড্ড ভালোবাসি,তার মায়াবী চাহনি ও ভালোবাসি,তার এলোমেলো শাড়ীর প্রতিটা ভাঁজ'কে ভালোবাসি, তার হাতের এই চিকন চুড়ির রুম-ঝুম শব্দ কে ও ভালোবাসি , নাকের ছোট্ট হীরের চকমকে আলোকেও ভালোবাসি,, তার নাকের উপর, ঠোঁটের নিচের, ঠোঁটের উপর এবং ঠোঁটের মাঝের ছোট ছোট তিলগুলোকেও ভালোবাসি, তার প্রতিটি হাসিকে ভালোবাসি,,চলার সময়ে তার কোমরের আঁকাবাঁকা ধরনকে'ও ভালোবাসি,তার ঢেউ খেলানো লম্বা কেশ'কেও ভালোবাসি,,তার হাতের মিষ্টি ছোঁয়া মাখানো প্রতিটি সুস্বাদু খাবার কেও ভালোবাসি,,,এত এত ভালোবাসাকে ত্যাগ করে কিভাবে কোন বেরঙের সাদা চামড়াকে আমি ভালোবাসবো? এক জীবনে এত ভালোবাসাকে ত্যাগ করা আমার দ্বারা সম্ভব নয়! তাই এটা কখনোই মনে আনবে না যে তোমার স্বামী তোমাকে ছেড়ে অন্য নারীতে মজেছে? সে শুধু তোমার,আর তোমার ই থাকবে,, দেহের দুরত্ব মানেই মনের দুরত্ব এটা কখনোই তোমার আমার ক্ষেত্রে ঘটবে না!! কারন আমি তোমাকে ভালোবাসি,আর এ জীবনে এই একজনকেই ভালোবাসার ক্ষমতা দিয়ে আল্লাহ আমাকে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন!
স্বামীর মুখে এমন আকুলতায় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখে হুট করেই তানিয়ার কান্না থেমে গেল,,, মুহূর্তেই রাজ্যের লজ্জা ঘিরে ধরলো, ছেড়ে দিলো সাজেদ কে, মনে পড়লো পাবলিক প্লেসে ই এত সময় এভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিল,,সাজেদ ও ছেড়ে দিলো,তানিয়া লজ্জায় মাথা তুলে একবার দেখতেও পারছে না,সাজেদ নিজের লজ্জাবতীর মুখটা তুলে ধরলো,কান্নার কারণে চোখের কাজল লেপ্টে পুরো চোখের পাশ মাখামাখি অবস্থা, নিজের আঙ্গুল দিয়ে যত্ন করে সেগুলো মুছে দিলো, কাঁপা কাঁপা ঠোঁট দেখেই ইচ্ছা করলো খুব শক্ত করে একবার ছুঁয়ে দিতে কিন্তু পাবলিক প্লেসে দেখে পারলো না,তাই কপালে খুব গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিলো! তানিয়া লজ্জা পেলেও নিজেকে গুটালো না,,স্বামীর এই ছোঁয়া সে পরম আবেশে আগলে নিলো হৃদয় কুঠিরে, সাজেদ দু গালে নিজের হাতদ্বয় রেখে আদুরে সুরে বললো,,
-- সবসময় আম্মার সাথে সাথে থাকবে, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করবে,, পড়াশোনা, নিজের লেখালিখি এগুলো নিয়ে একটু বেশি ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করবে,দেখবে দিনশেষে আমার সাথে কথা বলারই সময় পাবে না,,তো একা কিভাবে লাগবে? আর রাতের জন্য আমি তো আছিই! যতক্ষন ঘুম না আসে, ততক্ষন না হয় আমরা প্রেম করবো, ঠিক আছে!
-- হু!
মৃদু হেসে তানিয়ার ছোট উত্তর,এত সময়ে চোখ তুলে সাজেদ'কে দেখলো,অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে সাজেদ,তানিয়া'ও !
দূর থেকে ঘোষনার শব্দ শুনে হাত ঘড়িতে সময় দেখে,
-- চলো আমার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে!
তানিয়ার মুখটা আবার ও কালো হয়ে গেল,সাজেদ ছোট একটি শ্বাস ছেড়ে হাতটা মুঠো বন্দি করে আবার ও হাটা ধরলো,, সবাইকে শেষবারের মতো আলিঙ্গন করে তানিয়াকে নিজের বাবা মায়ের হাতে তুলে দিয়ে,,
-- আমার আমানত রেখে গেলাম,আমি আসা অবধি তার হেফাজতের দায়িত্ব তোমাদের!
-- আল্লাহ ভরসা, তুমি সাবধানে যাইয়ো আবার সাবধানে আইসো!
-- আসি আল্লাহ হাফেজ! আসসালামু আলাইকুম!
-- ফি আমানিল্লাহ্!!
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলে মানবজাতির ব্যস্ততা,,কেউ কারো জন্য থমকে থাকে না,থাকা উচিত ও না! নদীর চেয়েও বেশি স্রোত থাকে মানুষের জীবনে! যার পরতে পরতে থাকে নানা উচাটন!বেগে'র তাড়নায় কখনো তা কুলহীন আবার কখনো নতুন গন্তব্যের দিশা মেলে!
পথিকের পথের পানে চেয়ে তার এক নজর ফিরে দেখার জন্য যেই আকুলতা বিরাজ করে প্রতিক্ষমান
মনের, সেই বুঝে কেবল অপেক্ষার প্রহর কতটা নির্মম, কতটা যন্ত্রনা-দায়ক; অজস্র কষ্টের,গ্লানীর লাগাম বোধ হয় ক্ষীয় হয় সেই ফিরতি দৃশ্যের নজরে,অপেক্ষমান মনে তখন কেবল ই সুখের অপ্রতিম উচ্ছ্বাস, ঝর্ণার ন্যায় উচ্ছল আর প্রকৃতির মতোই মনোরম মাধুর্য্যের বহিঃপ্রকাশ তার দৃষ্টি কোনে উপচে পড়ে!
সাজেদ চলে গেছে আজ প্রায় দেড় মাস ,এই দেড় মাসের প্রথম দিকের দিনগুলো তানিয়ার সেরকমই কেটেছে,যতই বলুক মনের টান তৈরি হয়নি,,আসলে কিন্তু হয়েছে'ই,,তিন কবুলের অলৌকিক ক্ষমতা ই একে অপরের প্রতি টান তৈরি করে দিয়েছে,তার মধ্যে যাওয়ার বেলায় সাজেদের স্বীকারোক্তি তানিয়ার অস্তিস্ত্বে মিশে গেছে,এখন তানিয়ার দিন কাটে সাজেদের ফেরার অপেক্ষায়, দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততায় আর রাত কাটে সাজেদের প্রেম বাণে জর্জরিত হয়ে!
সাজেদের পরামর্শ কাজে লাগিয়ে এখন অনলাইনের মাধ্যমে নতুন কাজ হিসেবে বিভিন্ন দেশের রান্না শেখার ইচ্ছা পূরণের জন্য চেষ্টা করছে, তার পাশাপাশি শ্বশুরের সাহায্যে এলাকায় এক কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করছে,, যেহেতু পড়াশোনায়ও মনোযোগ দিতে হয় তাই শ্বাশুড়ি আম্মার পরামর্শে কোচিং এ পড়ানো টাই উত্তম বলে মান্য করলো!! প্রিয়জনের অপেক্ষা, নিজের প্রতি যত্নশীল করে তুলেছে তানিয়াকে,প্রতি ক্লাসের সময় শ্বশুর নিজ দায়িত্বে ঢাকা দিয়ে আসে!
ছেলের বউ নয় মেয়ে হিসেবে রাজ্য শাসন করার মতোই আছে শ্বশুরাল'য়ে তানিয়া, মাঝে মাঝে ব্যবসায়িক হিসাব নিকাশে'ও শ্বশুর বাবাকে সাহায্য করে! এভাবেই চলছে তানিয়ার দিনকাল,, কিন্তু?
পর্ব ১১
আজকাল তানিয়াকে একটা বিষয় খুব ভাবাচ্ছে তা হলো তানিয়ার ব্যবহৃত গোপন জিনিস গুলো খোয়া যাচ্ছে,,মানে চুরি হচ্ছে!!
মেয়েলি জিনিস চুরি হচ্ছে এটা আবার কেমন কথা?তাও আবার এমন জিনিস যা কাউকে সহজে বলাও যায় না, তানিয়া অস্থির হয়ে আছে এসব নিয়ে, সাজেদ কে বলেছে, সে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে,,তার ভাষ্যমতে তানিয়ার ভুলো-মন, কোথায় রেখেছ হয়তো তার মনে নেই; কিন্তু তানিয়া জানে সে ভুলেনি,কারণ সে তো অন্য কাপড়ের সাথেই রোদে শুকাতে দিয়েছিলো,তাও আবার বড় কাপড়ের নিচে, যেহেতু বাসায় আব্বা ছাড়া আর কোন পুরুষ নেই সেহেতু এটা নিয়ে বিব্রত হওয়ার ও বিশেষ কারণ নেই! আর কাপড় রোদ থেকে সেই আনে সুতরাং!আম্মাকে'ও বলেছে আম্মা ও সাজেদের মতো করেই বলছে,হয়তো বড় কাপড়ের সাথেই ভাঁজ করে রেখেছে নয়তো বাতাসের প্রবাহে কোথাও উড়ে গেছে! কিন্তু এগুলোর কোনটাই না!
আর ও একটা বিষয় ইদানীং তানিয়াকে ভুগান্তিতে রেখেছে,তা হলো তানিয়ার মনে হচ্ছে ওকে কেউ অনুসরণ করে! রাস্তায় যখন ই বের হয় মনে হয় কেউ পিছনে আছে, কিন্তু ঘুরলেই আর দেখতে পায় না! সেদিন ছাদে গিয়ে অনেক সময় গাছের পরিচর্যা করেছিলো, তখন দেখেছিলো দূর থেকে দুটি চোখ তাকে বিচ্ছিরি ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যা তাকে প্রচন্ড ভয় পেতে বাধ্য করেছে,,উহুম অন্য কিছুর ভয় না, সম্মানহানির ভয়!
এই বাড়িতে কাজের কারণে অনেক সময়ই অনেক পরপুরুষের আসা যাওয়া হয়,, মাঝে মাঝে সাজেদে'র প্রিয় বন্ধু বাপ্পী ও আসে! টুকটাক কথা বার্তা বলে,আম্মা আব্বার স্বাস্থে'র খবর নেয়, তাদের কি লাগবে না লাগবে তার ও সন্ধান চালায়,কখনো কখনো বাজার করেও দিয়ে যায় ; এমনকি ইদানীং তানিয়ার ও খোঁজ খবর নেয়,,যদিও সে তানিয়াকে ছোট বোন বলেই মান্য করে! তার চোখে তানিয়া নিজের জন্য স্নেহ বই অন্য কিছু কখনো দেখেনি,, একজন মেয়ে হয়ে একজন পুরুষের চাহনি বুঝতে নিশ্চয়ই কোন মেয়ের পক্ষে অসম্ভব কোন ব্যাপার নয়! তানিয়ার ও খুব বেগ পোহাতে হয়নি বাপ্পীর চোখের ভাষা বুঝতে!
বাপ্পী সাজেদের প্রিয় বন্ধু, বন্ধু কম ভাই বেশি! বাপ্পী বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান,, অনেক ছোট বয়সেই বাবাকে হারিয়েছে, মায়ের দায়িত্বে আজ সে সমাজে প্রতিষ্ঠিত,,দেশেই ভালো একটা ছোট খাটো ব্যবসা করছে,একা মা'কে গ্রামে রেখে দূরে কোথাও নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার ইচ্ছা তার নেই, তাছাড়া তার প্রেয়সীকে'ও আগলে রাখতে হবে,, সবকিছু ভেবে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গ্রামেই নিজের খুঁটি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে! একদম ছোট থেকেই বাপ্পীর সঙ্গে সাজেদের সম্পর্ক! কখনো কেউ বলতে পারে নাই তাদের মাঝে ক্ষনিকে'র জন্য ও মনোমালিন্য হয়েছে! কিংবা কখনো কেউ কারো বিরুদ্ধে বিরুপ মন্তব্য করেছে! এরা যেন একে অপরের আত্না, জীবনের কত চড়াই উৎরাই তে এক সাথে নিজেদের মূল্যবান সময় কাটিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই; এই যে এত দুরে সাজেদ থাকে অথচ একদম নিশ্চিত! কারণ সে জানে তার একজন ভাই রুপী বন্ধু আছে যে কিনা নিজের বুক দিয়ে তার পরিবারের হেফাজত করবে! সানজানা কেও চোখে হারায়,সানজানা ও সবসময় মনে করে তার নিজের দুটো ভাই আছে! শুধু সাজেদ কিংবা সানজানা ই নয়,আম্মা আব্বার কাছে ও বাপ্পী সমান গুরুত্বপূর্ণ; তারাও ওকে নিজের ছেলে ই মনে করে,, নিজেদের জীবনের খুশি ই না, ভালোমন্দ সব বিষয়েই ওর মতামত নেয়,ওর সাথে আলোচনা করে! ঠিক তেমনি বাপ্পী ও! বাপ্পীর মা মিসেস মুনিরা ও; উনি ও নিজের পরিবারের জন্য কোন সিদ্ধান্ত নিলে অবশ্যই সম্রাটের সাথে,তার বাবার সাথে,আম্মার সাথেও আলোচনা করেন! বলা যায় এই পরিবার একে অপরের পরিপূরক!
সুতরাং এমন কাউকে নিয়ে উল্টো পাল্টা চিন্তা করাও একরকম নিছকই পরিস্থিতির সৃষ্টি! যা তানিয়া ক্ষুনাক্ষরে'ও করতে চায় না,, তাছাড়া ঐ যৈ চাহনি তা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারে ওটা কোনভাবেই বাপ্পীর নয়! কিন্তু কিভাবে বের করবে? সাজেদ কেও বলতে পারছে না,, কোনরকম প্রমাণ ছাড়া ভিত্তিহীন অভিযোগ তাও কিনা অভিযুক্ত কে তাই জানে না;
তানিয়ার দিনকাল এভাবেই যাচ্ছিলো।।হুট করেই তার সাথে যোগ হলো নতুন সমস্যা!
তানিয়ার মোবাইল নাম্বার বাইরের কেউ জানে না, এমনকি কাজে সাহায্য করা আন্টি'ও না কিন্তু কিভাবে সেই নাম্বার অজানা কারো কাছে গেছে,যা দিয়ে তাকে নানাভাবে হয়রানি করছে,,কখনো প্রেমময় কবিতা লিখে তো কখনো উল্টো পাল্টা মেসেজ দিয়ে, তানিয়া এই কথা সাজেদকে'ও জানায় নি, কারন সাজেদ ঐদিকে'ই অনেক ঝামেলায় আছে,ওর কোম্পানীর ঝামেলা কমছে'ই না,,এর মধ্যে যদি আবার এদিকে'র এই খবর শুনে তাহলে! তাছাড়া এরকম ছোট খাটো সমস্যা তানিয়া নিজেই সমাধান করতে পারে তাই খুব একটা ভাবতেও চাচ্ছে না কিন্তু তবুও!তবে যতবার এই কাজ করে ঠিক ততবার ই সেই নাম্বার কে ব্লক করে, কিন্তু পরেই আবার নতুন নাম্বার দিয়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে,তাই বেশি চিন্তিত!
অস্থিরতা ভয় নিয়ে ই কাটছে তানিয়ার সময়; কলিং বেলের শব্দে নিজের ভাবনা থেকে মুক্তি পেল, বাসায় কেউ নেই,আম্মা গেছেন পাশের বাড়ির চাচীর সাথে তার গর্ভবতী মেয়ের জন্য পিঠা পুলি নিয়ে,আব্বা ও আছেন বাজারে, দোকানে, কাজের খালা ও নিজের কাজ শেষ করে বাড়িতে গেছেন,উনি আবার আসবেন সেই সন্ধ্যার পর,মোট কথা এখন পুরো বাড়িতে তানিয়া একা! কারো'ই এই বিকেলে আসার কথা নয়,, তানিয়া একটু ভাবলো, তারপর চিন্তা করে দেখলো কোন কাজে'ও তো আসতে পারে, তাছাড়া পাশের বাসার বউয়ের সাথেও বেশ ভালো খাতির হয়েছে তানিয়ার,, বাড়িতে একা দেখে হয়তো সেই ই এসেছে;সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ই দরজা খুলতে চলে গেল , এদিকে তাড়াহুড়ো য় নিজের গায়ের এলোমেলো কুঁচকে যাওয়া কাপড় ও ঠিক করতে ভুলে গেছে, মাথায় কোনরকম কাপড় টেনে দরজা খুলেই পুরো হতভম্ব
হয়ে গেল, সামনে যে পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে তাকে তানিয়া মুখ চেনা চেনে,,একে প্রায় ই আব্বার সাথে উঠোনে বসে খোশগল্প করতে দেখা যায়, তাছাড়া বেশ কয়েকবার বাপ্পী ভাইয়ার সাথেও এ বাড়িতে আসতে দেখেছে, শুনেছে এ ও নাকি সাজেদের বন্ধু,ঐ মুখে ডাকা বন্ধুর মতোই! কিন্তু এ হঠাৎ এখন এই সময়ে কেন!
অপর পাশের কন্ঠে সচকিত হলো, নিজের মাথার ঘোমটা ঠিক করে টানতেই মনে হলো জামার পেছনের অংশ টা হয়তো এলোমেলো, তাড়াতাড়ি করে এদিক সেদিক টেনে টুনে ঠিক করলো, এরপর দরজার হালকা ফাঁক দিয়ে দেখলো লোকটা এক মনে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে,অসস্থিতে পড়ে গেল,ঘোর লাগা চাহনি, অদ্ভুত!
-- জ্বী!
-- আসসালামু আলাইকুম ভাবী,ভালো আছেন?
-- জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো! আপনি?
-- আমিও আলহামদুলিল্লাহ; আপনাকে দেখে আরো বেশি আলহামদুলিল্লাহ!
-- মানে?
-- মানে এই যে আপনি এত সুন্দর,কি সুন্দর করে থাকেন, আপনাকে দেখলে খারাপ ও ভালো হয় যায়,,আমিও তেমনি?
-- সরি কি'সব বলছেন? আপনি কি কোন কাজে এসেছেন? কিন্তু আব্বা তো বাসায় নেই!
লোকটি এখন ও সেই একই ধরনের চাহনিতে তাকিয়ে আছে, যেটা তানিয়ার জন্য বড্ড অ-সস্থিকর ,, কিন্তু কিছু করতেও পারছে না, মুখের উপর দরজা লাগানো টা'ও অসমীচিন, তার উপর এ আবার সাজেদের বন্ধু,আব্বার সাথেও বেশ খাতির, আবার তানিয়া নিজেও নতুন বউ ,,পরে দেখা যাবে দরজা লাগিয়ে দিলে কি থেকে কি মনে করে,তখন তানিয়া সবাইকে গিয়ে কি জনে জনে বলবে যে সে আমার দিকে কু-দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো!কেউ বিশ্বাস করবে? এ এই এলাকার ছেলে,তাকে রেখে কি নতুন কাউকে বিশ্বাস করবে?
-- অসুবিধা নেই, বাসায় যে কেউ নেই সেটা আমি জেনেই এসেছি! আসলে আমি এসেছি আপনার সাথেই কথা বলতে!
-- মানে?
-- মানে বুঝেন নাই? ভাবী আপনি যথেষ্ট বুঝদার বয়সের একজন মানুষ! আপনাকে কি বলে বোঝাতে হবে?
-- আপনি ঠিক কি বলতে চান একটু পরিষ্কার করে বলবেন?
-- আম্ম্ম- আসলে বলছিলাম আমি ঘরে ঢুকে একটু বসি তারপর বলি?
তানিয়া ঘাবড়ালো, হঠাৎ ঘরে ঢুকতে কেন চাইছে,আম্মা আব্বা নেই,আর এই সময়ে একজন পর পুরুষ বাড়িতে,তাও কিনা আবার ভেতরে ঢুকার জন্য অনুমতি চাইছে?
আসলে সাজেদ দের বাড়িটা দোতালা, সম্পূর্ণ বাড়ি বিল্ডিং করা হলেও চারদিকে বাড়তি জায়গা জুড়ে আলাদা বারান্দা করা হয়েছে, মূল বিল্ডিং থেকে বের হলে প্রথমে এই বারান্দায় পৌঁছে, সেখান থেকে আরো একটি দরজা খুলে তারপর উঠোনে পৌঁছে এরপর প্রধান ফটক;; পুরো বাড়িকে বিশাল সুউচ্চ দেয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে, এমনকি বাগানের অনেক খানি অংশ, পুকুর সহ!যাতে বাড়ির মেয়ে বউ রা নিজেদের স্বাধীন মতো চলাচল করতে পারে,, পুকুরে'ও কাজ করতে কোন সমস্যায় পড়তে না হয়! তানিয়া'ও এখন অহরহ পুকুরে কাজ করে,যেহেতু পানি মটর কলের মাধ্যমে তুলতে হয়,মানে এতে অনেক বিদ্যুৎ বিল হয় ,তাই কিছুটা সাশ্রয় করতেই ইদানীং পুকুরের ব্যবহার বাড়িয়েছে, তাছাড়া পুকুরটাও অনেক সুন্দর পরিচ্ছন্ন করে রাখা, চারদিকে ছোট-বড় নানা প্রজাতির ফুল,ফল, ঔষধি গাছ দিয়ে সাজানো গোছানো একটা সুন্দর পুকুর;যে কেউ দেখলেই বলবে একবার এই পুকুরের নামতে,তানিয়া ও নিজের ইচ্ছে কে আঁটকে রাখে নি,,তাই মোটামুটি কাপড় ধোয়া থেকে হাড়ি পাতিল ধোঁয়া,ঘর দোর পরিষ্কার করতে,নিজের গোসল ও এখন পুকুরের পানি দিয়ে করে; যেহেতু আব্বা ছাড়া পুরুষ বাড়িতে নেই,আর আব্বা ও সবসময় বাড়ি থাকে না তাই তানিয়ার কোন অসুবিধা ই হয় না,,আর কোন পরপুরুষ আসলেও তানিয়া বাইরে বের হয় না!!
মূল বিল্ডিং থেকে বের হতেই যে বারান্দা তাকে কেউ কেউ পাচঁ-দুয়ার বললেও তানিয়ার ভাষ্যমতে তা আলগা বারান্দা!সেই বারান্দায় ও সুন্দর করে চেয়ার টেবিল পাতা,মাঝে মাঝে যখন কোন বিশেষ অতিথি আসেন, কিংবা ব্যবসায়িক আলাপ আলোচনার জন্য প্রায়ই মেম্বার চেয়ারম্যান আসেন তাদের নিয়ে আব্বা এখানেই বসেন,চা পান করেন; তানিয়া ও আম্মাও বিকেলে এখানে বসে একে অপরের মাথায় তেল দিতে দিতে খোশগল্প করেন!
অপর দিকে থাকা লোকটি'ও এখন বর্তমানে আলগা বারান্দার দরজার ওপারে; আর তানিয়া মূল বিল্ডিং এর ভেতরের দরজায় , তারপরও অজানা কোন কারণেই আতংকিত হয়ে গেছে, লোকটির মুখ ঘের দেওয়া শিকের কারণে পুরোপুরি দেখা না গেলেও,চোখ! ঐ যে চোখ! ঐ চোখ তো তানিয়া শুরুতেই চিনতে পেরেছে,,সেদিন ছাদে গাছে পানি দেওয়ার সময় দূর থেকে জঘন্য নজরে তাকিয়ে থাকা এই দু চোখ ই ছিলো! তার মানে কি?
পর্ব ১২
গ্রাম পঞ্চায়েতের নির্দেশে আজ বড়সড় বিচার সভা বসেছে, সেখানে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে তানিয়া আর সাজেদের মুখ ডাকা বন্ধু মারুফ,অপরাধ? তাদেরকে এক ঘরে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ধরা হয়েছে! হাতেনাতে ধরা পড়েছে!
চারদিকে ছিঃ ছিঃ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হচ্ছে পুরো চৌধুরী বাড়ির উঠোন,বিচার সভায় মাথা নিচু করে বসে আছে সাজেদের বাবা, বারান্দার গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আম্মা! নির্বাক চাহনি, থমথমে মুখভঙ্গি! যেই বাড়ির উঠোনে কেবল আনন্দের উৎযাপন হতো সেখানে আজ বসেছে বিচার সভা! তাও আবার কিনা তারই একমাত্র পুত্রবধূ! বুকটা ভার হয়ে উঠলো,কোন ভাবেই তার বিশ্বাস হচ্ছে না তানিয়া এহেন গর্হিত কাজ করতে পারে,আজ তিন মাসে যতটুকু দেখেছে তাতে উনি চোখ বন্ধ করে বলতে পারে তানিয়া কেমন! তাছাড়া তানিয়ার অতীত জীবনযাপন খুব ভালো করেই যাচাই-বাছাই করে নিজের ছেলের জন্য বেছে এনেছে! কিন্তু সত্যিটা আসলে কি?
--- চৌধুরী সাহেব,আপনে দশ গ্রামের মাইনসের বিচার করেন,আর আইজ সেইখানে আপনের বাড়ির উঠোনে বিচার বসছে! তাও কিনা একমাত্র পোলার নতুন বউয়ের পরকীয়া নিয়া!
আমরা বুঝতে পারছি এটা আপনের জন্য কত বড় অসম্মানের বিষয়! এই ব্যাপারে আপনাকে শান্তনা দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নাই আপাতত!
চেয়ারম্যানের কথা শেষ হতেই অপর একজন বলে উঠলো,
--- ছি ছি, সাজেদের মতো ছাওয়ালের বউ হইয়া এই কাম ক্যামনে করলো এই বেডি!
উনার কথা শেষ হতেই তার পাশের জন বলে উঠলো,
-- সাজেদের মায়রে কইছিলাম গিরামের মাইয়া দেখতে,গিরাম গঞ্জের মাইয়ারা ঘরের ব্যাডাগো লগেই কথা কইতে ভয় পায়,হ্যারা আবার পরপুরুষের লগে রাস্তায় দাঁড়াইয়া ক্যামনে কথা কইবো! এক ঘরে থাকা তো দূরেই থাক!এই মাইয়ারে প্রেথম দেইখাই আমার ভালা লাগে নাই ; এর চোখে মুখে কথা কয়,শহুরে থাকছে, আবার হুনছি বাজারে কামও করছে,মাইনে কত ব্যাডাগো লগে ওঠাবসা করছে তার যে চরিত্রের ঠিক থাকবো না এইডাই সহজ কথা! তা নিয়ে এত ভাবার কিছুই নাই!
উনার কথা থামতেই,পরের কথা শোনা গেল আরেকজনের থেকে,
-- আরে দূর এত কথার কি আছে,শহুরে থাকলেই কেউ খারাপ হয় না,আমগোও তো ছাওয়াল মাইয়া আছে,কই তারা তো এইরাম কিছু করে না,আসলে কথা হইলো চরিত্র হয় পারিবারিক শিক্ষা থেইকা,মায়ের চরিত্র যেইরাম ছাওয়াল মাইয়ার চরিত্রও সেইরাম হয়!খবর নিয়া দ্যাহেন এই মাইয়ার মায়ের চরিত্রও ছিলো এমন!
এত শত কথায় তানিয়া নিরুত্তাপ থাকলেও এখন আর রইলো না,কথা যখন তার মাকে নিয়ে তখন সে কোন ভাবেই চুপ থাকতে পারবে না! আশেপাশের বলা সব কথাই সে চুপ থেকে হজম করে নিচ্ছিল কারণ সে বুঝতে চাইছিলো এই এক বিশাল সমাগমে উপস্থিত সকল বিবেকবান মানুষের বিবেকের দৌড় কতদূর! তাকে নিয়ে সালিশ চলছে অথচ তাকেই কোন কিছু জিজ্ঞেস করা হলো না,তার চেয়েও বড় কথা যার সাথে তাকে জড়িয়ে কথাগুলো বলা হচ্ছিলো সেই মানুষরূপী পশুর অভূতপূর্ব সাহসের সীমা দেখে! কি অবলীলায় সেই জানোয়ার মিথ্যার উপর মিথ্যা বলে যাচ্ছে, সামান্য কিছু অহেতুক প্রমাণ আর অনর্থক বার্তার মাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ দাবি করছে,তার সাথে অনাচারের আশ্রয় নিয়ে নোংরা কাঁদা মেখে দিচ্ছে তানিয়ার চরিত্রে! তানিয়া এই নোংরা কথাগুলোর বিপরীতে কথা বলতেই পারে,পারে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে কিন্তু এতে কথার পিঠে কথা বাড়া বই আর কিছুই ঘটবে না! এই যে এত কথা হচ্ছে কিন্তু তাঁকে একবারও কেউ ডাকলো না,আর না তার থেকে জানার চেষ্টা করেছে কি হয়েছিলো সেই বদ্ধ রুমে! তার চেয়েও বড় কথা এই সালিশের একমাত্র আসামী যেন তানিয়া একাই, চারদিকে কেবল তার চরিত্র নিয়েই তোলপাড় হচ্ছে অথচ ঘটনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মারুফ নামক পুরুষের যেন কোন অস্তিত্বই নেই,তার চরিত্র নিয়ে না হচ্ছে সমালোচনা আর না হচ্ছে তাকে নিয়ে মাথাব্যথা!
এই সমাজ এমন কেন? সবসময়ই কেন শুধু নারীরাই হয় বৈষম্যের শিকার? কেন এহেন ঘটনায় কেবল নারীকেই হতে হয় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামি? চরিত্র কেবল নারীরই কেন খারাপ বলে যাচিত হয়? এতে তো পুরুষও জড়িয়ে থাকে তবে কেন তাকে ঢেকে মুখ্যম দরজা কেবল নারীকেই বানানো হয়?
আচ্ছা সবার মতো করে কি সাজেদও তাকে বিচার করবে?
পর্ব ১৩
-- আপনেরা থামুন!
হাজার জনের হাজার কথার ধোপে টিকলো না তানিয়ার সহ্যের বাঁধ, ভেঙে গেল চিরায়িত নিয়মেই,কেউ কপাল কুঁচকে তো কেউ নাক উঁচিয়ে,তাকিয়ে আছে তানিয়ার মুখপানে!তানিয়া মজলিসের মধ্যিখানে নিজের অবস্থান ঠিক করে চেয়্যারম্যান থেকে থেকে শুরু করে বিচার সভায় স্থান গেড়ে বসে প্রতিটা মানুষের মুখ দেখে নিলো এক দর্শন, মোটামুটি কিছু সংখ্যক মানুষকে চিনে,তবে অধিকাংশ অচেনা,অথচ এই অচেনা মানুষেরাই কত সহজে,অতটা অবলিলায় তার চরিত্রের সনদ দিয়ে দিচ্ছে! অথচ দেখা যাবে এরা কেউ ঠিক মতো ওর নামটাই জানে না! ঘটনার ইতিবৃত্তও জানে না কিন্তু বিচারক সেজে শাস্তি ঘোষণার অপেক্ষায় বসে আছে! যেন এতেই তাদের জাত উদ্ধার হয়ে যাবে!
হঠাৎ করেই অপরাধীর এমন আত্নচিৎকার পঞ্চায়েতের আসরে বজ্রাঘাত করার ন্যায় পরিবেশ তৈরি হলো! এমনিতেই দৃষ্টি কটু তার মধ্যে সেটা আরো জোড়ালো হলো,শোনা গেল আর কয়েক অভিযোগীয় সুর,
-- ছিছি কিরাম তারা বেডি ছাওয়াল,এতগুলান ব্যাডা ছাওয়াল গো মাইঝখানে কিরাম অইরা গলা ফাডাইয়া চিৎকার করতেছে!
-- আরে দূর,এগো কি লাইজ লজ্জা আছেনি,থাকলে কি আর আজ এইখানে থাকতো?
-- কিরাম কইরা পারে এরা,স্বামীর অনুপস্থিতিতে তারই বন্ধুর লগে শুইয়া পড়তে! ছিহ এগো মুখ দেখাও তো পাপ!
চারদিকে তিরস্কার ধ্বনি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে,তানিয়ার নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে,এখানে একমাত্র শ্বশুর শাশুড়ি ছাড়া আর কোন আপনজন নেই যেকিনা দু একটা শব্দ তানিয়ার হয়েও বলতে পারে, শ্বশুর শাশুড়ি তো চুপ হয়ে শুনেই যাচ্ছে,হয়তো তারাও বিশ্বাস করছে,তা না হলে কেন তারা তানিয়ার জন্য একটা শব্দও বলছে না!
তানিয়া ভাবছে তার নিজের মা হলেও কি এমন নিরব ভূমিকা পালন করতো? না ! তার মায়ের সামনে তার দিকে আঙুল তাক করলে সেই আঙ্গুলটা তার মা খুব যত্নে ভেঙে দিতো, কোনদিনও এহেন গর্হিত অপবাদ নিজের মেয়ের প্রতি সহ্য করতো না! মায়ের কথা মনে হতেই বুকটা ভার হয়ে উঠলো,চোখ ফেটে অশ্রুধারা প্রবাহিত হতে চাচ্ছে,তানিয়া নিজেকে বুঝ দিলো তার নিজের জন্য নিজেকেই কথা বলতে হবে! এখানে তার কেউ নেই,কোন আপনজন নেই! সে নিজেকে এভাবে অপদস্থ হতে দিতে পারে না,পারে না তার চরিত্রে কাঁদা লাগানোর সুযোগ দিতে!
ধীর পায়ে হেঁটে মাথা নত করে বসে থাকা শ্বশুরের কাছে গেল,নিচু মস্তিষ্কে জিজ্ঞেস করলো,,
-- আব্বা আপনেও কি বিশ্বাস করেন আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য?
পঞ্চাশোর্ধ বয়স্ক লোকটি মাথাটা উচু করে অসহায় নয়নে তাকিয়ে রইলো,তার চোখে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচল প্রতীয়মান,তানিয়ার ভেতরে কিছু একটা ভাঙার অনুভূতি হলো,এই মানুষটিকে এতদিন কখনো শোনেনি নাম ধরে ডাকতে, সবসময়ই ডাকার জন্য "মা" শব্দটি ব্যবহার করে ,খেতে বসলে নিজের পাশে ডেকে বসায়,হাসি হাসি মুখে এটা ওটা চেয়ে নেয়, কখনো কখনো নিজের হাত দিয়ে ভালো মন্দ তুলে তানিয়ার প্লেটে দেয়,এক সন্তান কর্মের জন্য বৈদেশে থাকে,অন্য সন্তান জ্ঞান অর্জনের জন্য,তাই হয়তো দুইজনের সাময়িক অভাব একজন দিয়েই পূরণ করার চেষ্টা করে! প্রতিবার যখন মা ডেকে তানিয়াকে ডাকে তানিয়ার মনে হয় ওর নিজের বাবা ওকে ডাকছে, অন্যরকম অনুভূতি ছেয়ে যায় হৃদয়স্থলে! কখনো কোন বিষয়ে আজ অবধি অভিযোগ তার তরফ থেকে তানিয়া পায়নি,তাই হয়তো তানিয়া ভুলেই গিয়েছিল এটা নিজের বাবা নয় শ্বশুর! কিন্তু আজ এই মানুষটির মাঝে এমন দোনামোনা তানিয়ার অস্তিত্বের ভিত নড়িয়ে দিচ্ছে!
তানিয়া শ্বশুরের অসহায় অপরাগ মুখপান অবলোকন করে কিছু সময়, এরপর মুখ ঘুরিয়ে গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্বাশুড়ি আম্মার দিকে তাকালো, এরপর চারিদিকে তাকালো, সবার চোখেই তার জন্য ঘৃনা,কেউ কেউ হয়তো করুণার চোখেও দেখছে,তবে কোন কোন চোখ তার প্রতি সদয়ও মনে হচ্ছে!
সুপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পা চালিয়ে একটু দ্রুত আম্মার কাছে গেলো। তানিয়াকে দেখে আম্মা সোজা হয়ে দাঁড়ালো, চোখেমুখে অসহায়ত্ব স্পষ্ট, কিন্তু তারপরও তানিয়ার কেমন জানি লাগলো, মনে হলো যা শুনতে চায় তাই এবার শোনা যাবে!
-- আম্মা আমি আজ প্রায় তিনমাস আপনের কাছে আছি,আপনি কি কখনো এমন কিছু অনুভব করেছেন যাতে মনে হয় আমার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ সত্য হতে পারে?
-- না!
আম্মার স্পষ্ট স্বরে উচ্চ আওয়াজ করে উচ্চারিত শব্দ "না" । পরিবেশ অনেকটাই হেলে দিলো, আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে আছে সভা ভর্তি লোকজন! কেউ কেউ একে অপরের মুখপানে তাকিয়ে আছে,চোখে চোখে প্রশ্ন হচ্ছে! এমন কথা আগে কেউ হয়তো শোনেনি,দেখেও নি! এরকম বিষয়ে বরাবরই মানুষ এর উল্টোটা হতে দেখেছে! এমন ঘটনায় বরাবরই শ্বাশুড়ি চরিত্রের নারীটি বউমা চরিত্রের বিপরীতে থাকে!সমাজ,সংসার, কিংবা অন্য লোকবল! সবার আগে বউমার চরিত্রে দাগ শ্বাশুড়িই লাগায়!সেখানে এই শ্বাশুড়ি কিনা তার বউয়ের পক্ষে কথা বলছে,যেখানে তার বউমাকে পরপুরুষের সাথে একটা বদ্ধ দরজার ঘরে একসাথে পাওয়া গেছে,তাও কিনা হাতেনাতে!
-- সাজেদের মাও কি পাগল হইয়া গেছে!
-- নাহ পোলার বউয়ে জাদু করছে!
-- নাহ আছে সুরাত আর না আছে চরিত্র তারপরও এই বউ নিয়া সাজেদের মায়ের এত নখরামির কি আছে ? বুঝিনা আপু এদের হাবভাব!
কথার শেষ নেই,যে যা পারছে বলে যাচ্ছে , আম্মা সেদিকে মন দিলো না! তানিয়া শ্বাশুড়ির দিকে এগিয়ে এসে গ্রিলে হাত রেখে বললো,
-- আম্মা আপনে আমাকে চিনেন,আমি জানি আপনি অনেক বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণ মানুষ, আপনি যা বলেন আর করেন সবটাই নিজ বুদ্ধি দিয়ে করেন; তাই আমি বলছি আপনি সত্যি করেই বলেন আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করেন?
আম্মা পুরোপুরি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গ্রিলে রাখা তানিয়ার হাতের উপর নিজের হাত রাখলো, এরপর আশ্বাসের সাথে বললো,
-- আমি তোমারে বিশ্বাস করি,আমি জানি আমি যাকে পছন্দ করে আমার আব্বার জন্য আনছি সে কখনো খারাপ হতে পারে না কিন্তু আমি চাই তুমি সেইটা প্রমাণ কইরা দাও,যাতে কইরা এই যে এক উঠান মানুষ আছে এদের সবার মুখ আজীবনের জন্য বন্ধ হইয়া যায়!
মুচকি হাসি ঠোঁটের কোনে ভেসে উঠলো, শ্বাশুড়ির এমন হাসিমাখা মুখ তানিয়াকে সাহস দিলো,হাসির বিনিময়ে হাসি উপহার দিয়ে মুখ হা করে শ্বাস নিলো, এরপর আবার হেঁটে এগিয়ে গেল মাঝ উঠানে;
পর্ব ১৪
-- শহরে থাকলে,দশ পুরুষের মাঝে কাজ করলেই যে সেই নারী খারাপ হয়ে যাবে সেটা কে বলেছে আপনাদের? ঘরে থাকলে,গ্রামের হলে খারাপ হয় না এটা কোন হাদিসে লেখা আছে?
তানিয়ার বিপরীত হয়ে করা প্রশ্নে নাকমুখ কুঁচকানো ছাড়া আর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো বলে মনে হয় না, তানিয়া চেয়ারম্যানের সামনে দাঁড়িয়ে উঁচু কন্ঠেই জিজ্ঞেস করলো,
-- আপনি এই এলাকার মাথা? এই এত কম বুদ্ধি নিয়ে কিভাবে এত বড় দায়িত্ব পালন করেন?
-- কি বলতে চাও তুমি?
চেয়ারম্যান শহিদুল মোল্লার গর্জিত স্বরে করা প্রশ্নে অনেকেই একটু নড়েচড়ে দাঁড়ালো, সাজেদের বাবাও নিজ পুত্রবধূর এমন দুঃসাহসে কিছুটা বিরক্ত হলেন, উনি নিচু আওয়াজেই বললেন,,
-- বউ মা কথা বুঝে শুনে বলো! যার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছো উনি বয়সে তোমার গুরুজন ,অত্র তিন গ্রামের চার বারের চেয়ারম্যান; উনার সাথে এভাবে কথা বলতে পারো না!
-- ক্ষমা করবেন আব্বা যদি আমার কথায় আপনার খারাপ লাগে তবে আমি কিন্তু আমার কথায় মোটেই দ্বিধাবোধ করছি না! বরং আমি আপনাদের দেখে আশ্চর্য হচ্ছি কিভাবে আপনারা একজন মানুষ সম্পর্কে সবটা না জেনে তাকে নিয়ে মন্তব্য করেন?যারা কোনদিন আমাকে দেখেওনি, এমনকি আমাকে চেনেও না হয়তো আমার নামটাও জানেনা তারাই কতটা সহজেই, সাবলীল ভাবে আমার চরিত্র নিয়ে বিচার করে ফেলছে! তার চেয়েও বড় কথা ঘটনা যেখানে দুজনকে কেন্দ্র করে সেখানে কেবল খালি আমাকে নিয়েই কেন এত কথা হচ্ছে? আরো একজন তো আছে তার কথা কেন কেউ বলছেন না? সে পুরুষ বলে? সে আপনাদের এলাকার ছেলে বলে? আমাকেই তুলোধুনো করা হচ্ছে কারণ আমি ভীন এলাকার? কি আশ্চর্য আপনাদের বিচার বিশ্লেষণ? একবারও আপনাদের জানতে ইচ্ছে করলো না আসল সত্যটা কি? দু চার জন কিছু একটা বললো তাতেই আপনারা চলে এসেছেন আমাকে চরিত্রহীনা প্রমাণ করতে? এটাই আপনাদের চিন্তার বিকাশ? এই করেই গ্রামের সালিশের পদ্ধতি পরিচালনা করছেন? আদৌও এতে সঠিকভাবে বিচার হয়তো?সত্যিকারের ভুক্তভোগী বিচার পায় তো?
-- তুমি কি বলতে চাও আমার বিচার পদ্ধতি সঠিক নয়?
রক্তচক্ষু নিয়ে চেয়ারম্যানের প্রশ্ন,
তানিয়া ভয় পেল না,ভয় পাওয়ার কারণও নেই, নিজের আত্নবিশ্বাসী কন্ঠেই প্রত্তত্তর করলো,
-- আপনি নিজেই বিবেচনা করুন; আমার জন্য যেই সভা বসিয়েছেন আদৌও আমি এর যোগ্য কিনা? ফাঁসির আসামিকেও বলা হয় নিজের হয়ে কথা বলতে,খুনের মামলায় বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামিকেও জিজ্ঞেস করা হয় আসল ঘটনার ইতিবৃত্ত, তাঁকেও আত্নঃপক্ষ সমর্থন করতে দেওয়া হয়! যেখানে প্রমাণ হওয়ার আগে কোর্ট-কাচারিতেও অপরাধীকে আসামি বলে সম্বোধন করা হয় না সেখানে কোনরকম যুক্তি ্গত কারণ ছাড়াই বারবার আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠছে,সেই অবধি চুপ থাকলেও চলতো সবাই মিলে তো আমার মায়ের চরিত্র নিয়েও কথা বলা শুরু করেছে!এটাই কি আপনাদের বিচার পদ্ধতি?
চেয়ারম্যানের তানিয়ার যুক্তিটা মনে ধরলো,তাই কিছুটা দমে গিয়ে ধিম আওয়াজেই বললেন,
-- এরা গ্রামের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষ, এদের কথা কানে না তুললেই হয়;যাই হোক তুমি এই ঐ বইলা আসল ঘটনা থেকে বিচার ভঙ্গ করতে চেষ্টা করতাছো, কিন্তু তাতে লাভ কিছুই হইবো না!
-- তবে আসল ঘটনাটা কি সেটা কি সত্যিই আপনি জানেন?
-- না জানার কি আছে,তুমাগো দুইজনরে এক ঘরে এক লগে পাওয়া গেছে তার মানে কি অইলো এইডা কি এহনও ভাইঙ্গা কইতে হইবো?
অপর একজনের উক্ত কথায় তানিয়া তার দিকে ফিরে তাকাল, কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বললো,,
-- এক ঘরে একসাথে দেখছেন তার মানে কি একসাথে শুয়ে ছিলাম, লেংটা ছিলাম?
এহেন প্রশ্নে চারদিকে আরো একবার ছিছি ধ্বনি বেজে উঠলো। আমাদের সমাজে ঠোঁট কাঁটা পুরুষকে সাহসী পদবী দিলেও ঠোঁট কাঁটা নারীদের বেশরম বেলাজ পদবীই দেওয়া হয়, তানিয়া একজন নারী, একজন বউ হিসেবে এমন কথা এক উঠোন মানুষের মাঝে বলতে পারে সেটা কারো ভাবনায়ও আসেনি, তাছাড়াও এমন ঘটনায় নারীরা সর্বদাই মুখ লুকিয়ে থাকে, সেখানে তানিয়া উঠোন ভর্তি মানুষের মাঝে অনবরত নিজের হয়ে কথা বলে যাচ্ছে,তাও কিনা একদম পটাপট উত্তর দিয়ে বিচার পদ্ধতিকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলেছে!
-- ছি ছি এ কেমন বউ? এতগুলান ব্যাডা ছাওয়ালগো মাইঝে এমন বেশরমের মতো কথা কইতাছে?
এই কথার উত্তর দেওয়া দরকার মনে হলো না, তানিয়া চেয়ারম্যানের দিকে ঘুরেই নিজের কথা বললো,
" আমি যখন অনুষ্ঠানে ঘোরাঘুরি করছিলাম তখন আমার মনে হয়েছিল আমার শাড়ীতে সমস্যা হচ্ছে,তাই একটু ফাঁকা রুম খুঁজছিলাম, খুঁজতে খুঁজতেই কর্ণারের রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম, তখনই দেখা হয় উনার সাথে। আমাকে সাহায্য করার নামেই আমার সাথে সেই অবধি গিয়েছিল,আমি উনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঐ রুমে ঢুকে নিজের শাড়ী ঠিক করছিলাম,যার কারণে আমার আঁচল খোলা ছিলো,জায়গাটা নিরব দেখে দরজার খিল লাগানোর দরকার মনে করিনি কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি উনি সেখান থেকে চলে না গিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলো,দরজা খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে,আমি বুঝতেই পারিনি কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম তখন উনি একদমই আমার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো! আমি কিছু বলার আগেই হুড়মুড়িয়ে আপনারা ঢুকে পড়েছেন,কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেরাই নিজেদের মতো করে গল্প বানিয়ে যাচ্ছেন আর আপনাদের সেই সুযোগ নিচ্ছে ভদ্রলোকের মুখোশধারী এই লোক!
-- কি বলতে চাও মারুফ সুযোগ নিয়েছে!
-- আরে এই মহিলা এখন মারুফকে ফাঁসিয়ে নিজেকে বাঁচাইতাছে!
মারুফের স্ত্রী কথাটি বললো, রাতে ঘটা ঘটনার পর থেকে এই মাত্র কথা বললো মারুফের স্ত্রী নিশাত; বিয়ের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতে গিয়ে যখন শুনলো তার স্বামীকে স্বামীর প্রবাসী বন্ধুর বউয়ের সাথে একঘরে ধরা হয়েছে তখন থেকেই কেমন চুপ হয়ে গিয়েছিল, এবং পুরো সকাল থেকে এই এই বিচার সভায় মাত্রই মুখ খুললো,তানিয়া তার কথায় মুচকি হাসি দিলো,নিশাতের বুঝতে বাকি রইলো না এটা যে তার প্রতি তাচ্ছিল্যের হাসি ছিলো,
-- সত্যই তাই! আপনার মনে হয় আমি আপনার স্বামীকে ফাঁসানোর জন্য আমাকে এমন ভাবে নিজের বদনাম করার দরকার আছে?
-- ***
-- আপনি একজন অসুস্থ মানুষ,ব্যর্থ স্ত্রী,কারণ যেই স্ত্রী নিজের এমন দুশ্চরিত্র স্বামীর হয়ে তরফদারী করে সে আর যাই হোক সুস্থ হতে পারে না! আপনি নিশ্চয়ই জানেন আপনার স্বামী কতটা ভালো!
-- কি বলতে চান?
-- যা ভেবেছেন তাই? আর না বুঝলে আপনার স্বামীকে জিজ্ঞেস করেন আশাকরি উত্তর পেয়ে যাবেন!তার মোবাইল ফোনও চেইক করতে পারেন, আপনার সাধু স্বামীর চরিত্রের সনদপত্র পেয়ে যাবেন!
তানিয়া নিশাতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে চেয়ারম্যানের উদ্দেশ্য বলতে লাগলো,
-- আমার এই বাড়িতে আসার পর যখন আপনাদের ছেলে মানে সাজেদ আবার চলে যায় তার কিছুদিন পর থেকেই আমি কিছু বিষয়ের মুখোমুখি হচ্ছি, যেমন কখনো আমার ব্যবহৃত গোপন জিনিসপত্র চুরি হতে লাগলো, এছাড়াও বিভিন্ন নাম্বার থেকে বিভিন্নভাবে আমাকে হ্যারেজ করা হতো! আমি প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও পরে খেয়াল করলাম উনি যখনই আমাদের বাড়িতে আসতো তখনই এমন হতো, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারলাম না তাই নিজেকে শান্ত করতেই প্রমাণ খুঁজলাম এবং একদিন স্বচক্ষে তার প্রমাণও পেলাম!
-- কিভাবে?
-- একদিন পুকুরে গোসল করে নিজের কাপড় মেলে দিয়েছিলাম উঠোনে,সেদিন প্রথম খেয়াল করলাম উনি পুকুরের পাশে থাকা বড় গাছটার আড়ালে লুকিয়ে থাকে, আমার কলিজা শুকিয়ে গেল ভয়ে; কারণ আমার মনে হচ্ছিলো আমার গোসলের পুরোটা সময় উনি ঐ অবস্থাতেই ছিলেন তার মানে উনি আমাকে গোসল করা অবস্থায় দেখছিলেন,এটা কি প্রতিদিনই করেন? আমি ভয় লজ্জায় তারপর থেকে আর কোনদিন পুকুরে গোসল করিনি কিন্তু তখনই আমি খেয়াল উনি আমার বড় কাপড়ের মাঝ থেকে ছোট কাপড়গুলো বের করে নিয়ে গেলেন! এখন নিশ্চয়ই বলে বোঝাতে হবে না সেটা দিয়ে উনি কি করবেন? এছাড়াও উনি আমাকে নানাভাবে বিরক্ত করেছেন এই যে এক সভা ভর্তি মানুষ বললো আমি উনার সাথে পথেঘাটে ঘেঁষাঘেঁষি করি তারা কিন্তু নিজেরাও দেখেছে উনি আমাকে কিভাবে জ্বালিয়েছে আর আমি কিভাবে সেটা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছি, তারপরও এরা আজ আমার দোষ দিচ্ছে অথচ আসল অপরাধীকে নিয়ে কোন কথাই বলছে না!
-- ও তোমাকে বিরক্ত করতো সেটা তুমি আমাকে কেন বলোনি বউমা?
সাজেদের বাবা উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো,
-- কি বলবো বাবা, বললেও তখন আমারই দোষ হতো? আমি সুযোগ দিয়েছি তাই বলতে পারছে এটাই হতো তখন সবার কথা! তাছাড়া আমি তখন লজ্জায়ই বলতে পারিনি তবে আমি ভেবেছিলাম আমি নিজেই এর সমাধান করতে পারবো কিন্তু তার আগেই !
নিজের কথাই নমনিত মাথায়ই বললো, বাবা কিছুটা এগিয়ে এসে বললো,
-- ও তোমাকে কবে থেকে জ্বালাচ্ছে?
অতীত,,
সেদিনের পরও কেটে গেছে আরো বারো দিন,,সেদিন ঐ লোক ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কথাই বলেছিলো,তার কথার মূল প্রসঙ্গ ছিলো সাজেদের খুঁটিনাটি দোষ দেখানো এবং তানিয়ার প্রশংসা করে তাকে বশ করার একটা সুক্ষ্ণ প্রচেষ্টা,, তানিয়া সবটা বুঝতে পেরেছে,,এ ধরনের লোকের মতি বুঝতে তানিয়ার মতো মেয়েদের খুব একটা বেগ পেতে হয় না, তানিয়ারও হয়নি,তবে তানিয়া তার কথা প্রেক্ষিতে পাল্টা কোন প্রতিক্রিয়াও দেখায়নি,,
তাছাড়া তানিয়ার কাছে স্পষ্ট ঐ লোক সেদিন কথার প্যাচে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে লোকটা তাকে পছন্দ করে এবং সেটা কিরকম পছন্দ তা না বলাই ভালো!! কারণ নিজের বন্ধুর সদ্য বিবাহিতা বউয়ের কাছে নিজের বউয়ের বদনাম বলা,তার বন্ধুর বদনাম করে নিজেকে উচু মাকামে তুলার চেষ্টা কারা করে তা আমাদের সমাজের মানুষ বুঝে,এ ধরনের মানসিকতার মানুষের থেকে দুরে থাকাই শ্রেয়, এদের সাথে কথা বলতেও রুচিতে বাধে ! তানিয়াও সেদিন একা দেখে তার সাথে কোন বিতর্ক সৃষ্টি করেনি ! শুধু শুনেই গেছে এবং বুদ্ধি খাটিয়ে সু কৌশলে বিতারিত করেছে!
তবে তানিয়ার ভুল ছিলো তার কথাগুলো চুপচাপ বরদাস্ত করা কারণ এটাই তার জন্য এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে,, যেমন এখন প্রায় লোকটি তাকে রাস্তায় যেকোন জায়গায় থামিয়ে কথা বলার চেষ্টা করে! কোচিং সেন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,
পর্ব ১৫
এমনই একদিন কোচিং যাওয়ার পথে মারুফ তানিয়ার রাস্তা আগলে ধরে,তানিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে খুব দ্রুত হাঁটতেছিলো, যেহেতু দৃষ্টি জমিনের দিকে ছিলো তাই উপরের কিছু খেয়াল করেনি, দ্রুত হাঁটার ফলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মারুফের সাথে গিয়ে ধাক্কা খায়,মারুফ তানিয়াকে রক্ষা করতে গিয়ে কোমর চেপে ধরে,তানিয়া নিজেকে সামলাতে প্রথমে মারুফের শার্ট খামচে ধরলেও যখনই অনুভব করে মারুফ ওর কোমর চেপে নিজের সাথে মিশিয়ে নিচ্ছে এমনকি মারুফের অন্য হাত তানিয়ার উপরের দিকে তিরতির করে উঠে যাচ্ছে তখন তানিয়া মারুফের দিকে তাকায়, মারুফের চোখের ভাষা এত জঘন্য ছিলো যে তানিয়ার ইচ্ছা করছিলো ও মরে যাক! পড়ে গেলে পড়ে যেতো কেন নিজেকে বাঁচাতে এই জানোয়ারকেই ধরতে গেল,তানিয়া হুট করেই মারুফের শার্ট ছেড়ে দিলো! কিন্তু মারুফ তো ছাড়েনি বরং সে ইচ্ছামতো তানিয়ার শরীরে হাত বুলাতে লাগলো,
-- কি করছেন কি ছাড়ুন?
তানিয়া হালকা ধমকে বললো, মারুফ দাঁত বের করে বললো ,
-- আরে ছাইড়া দিলে তো পইড়া যাইবা,তখন তোমার এই চিকনি কোমর ভাইঙ্গা যাইবো! তারপরে তো সাজেদের কোন কামেই আইবানা!
-- সেটা সাজেদ বুঝবে আপনি ছাড়েন!
তানিয়া মোচড়ামুচড়ি করতে লাগলো,মারুফ আরো একটু শক্ত করে চেপে ধরে বললো,
-- খালি সাজেদ বুঝলেই হইবো? আমাগোও তো বুঝতে হইবো! তাছাড়া সাজেদের অনুপস্থিতিতে তার এই সুন্দরী বউয়ের খেয়াল রাখা বন্ধু হিসাবে তো আমগোই দায়িত্ব!
-- আপনি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছেন!
-- বাড়াবাড়ি আর কই করলাম! কতবার সুযোগ চাইলাম একটু বাড়াবাড়ি করতে, দিলাই না! কি হয় একটু আধটু বাড়াবাড়ি করলে,বলছি তো কেউ জানব না, একটা কাকপক্ষীও টের পাইবো না!
সীমা অতিক্রম করে গেছে মারুফ, তানিয়ারও ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙছে তাই আর সহ্য না করে মারুফের ফর্সা গালে নিজের পাঁচ আঙুলের ছাপ বসিয়ে দিলো, মারুফ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো,তানিয়া এমন একটি কাজ করতে পারে এটা তো ভাবনার ত্রিদেশেও ছিলো না,তানিয়া চড় মেরে আঙ্গুল উঁচিয়ে চোখে আগুনের ফুলকি জ্বেলে মারুফকে বললো,
-- যেই দুঃসাহস আজ দেখালেন ভবিষ্যতে আর করবেন না! আপনার সাহস কি করে হয় আমাকে এরকম নোংরা প্রস্তাব দেওয়ার? আপনাকে ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তে এখানে পিষে ফেলতে! আফসোস পারলাম না!
ভবিষ্যতে এই নোংরা মুখ নিয়ে আমার সামনে আর কখনো আসবেন না!
--- ভবিষ্যতে কি করুম না করুম হেইডা তো পরে দেখা যাইবো; কিন্তু তুমি এখন যেই কাজটা করলা এইডা কিন্তু মোটেই ভালো হইলো না! এর খেসারত তোমাকেই দিতে হইবো,আমি ঠিক উসুল কইরা নিমু!
মারুফ নিজের গাল ঘসতে ঘসতে ক্রোধান্বিত চোখে তানিয়াকে হুমকি ছুঁড়ে মারে; তানিয়া কোন কিছু না বলে সেভাবেই চলে আসে;পিছন থেকে শুনতে পেল মারুফের শেষ কথা;
-- তৈয়ার থাইকো! আমি এই চড়ের বদলা এমনভাবে নিমু যে পুরা গ্রাম দেখবো!
---------------------------------------------------------------------
-- মিথ্যা কথা কইতাছে! এহন নিজের দোষ ঢাকার লাইগা আমারে একা ফাসাইতাছে!
আত্নঃপক্ষ সমর্থনে মারুফের চিৎকারে অতীত থেকে বর্তমানে আসে সবাই, মারুফ চুপ থেকে সব শুনছিলো কারণ মারুফের ভাবনা ছিলো তানিয়া বলার সুযোগ পাবে না! অবশ্য এটাই হয়, এরকম ঘটনার বিচারে নারীরা কথা বলার সুযোগ পায় না,আর পেলেও লজ্জায় বলতে পারে না! মারুফও তাই ভেবেছিলো ,তানিয়াকে কিছু বলার সুযোগ দেয় হবে না,নয়তো লজ্জায় তানিয়া মুখই খুলবে না! কিন্তু মারুফের ধারনাকে বালি চাপা দিয়ে তানিয়া লাজলজ্জাকে বস্তায় ভরে পুকুরে চুবিয়ে রেখে নিজের জন্য সবার সমানে কথা বলছে! যদিও কেউ কতটা বিশ্বাস করেছে সেটাই এখন বলা বাহুল্য কারণ চোখে যদি ছিটাফোটাও দেখে তবে সেটাই সত্য মুখে বর্ণণা করা ইতিহাসের চেয়ে! কারণ বিচার হয় সত্যের ভিত্তিতে, প্রমাণের মাধ্যমে!
-- মোটেই আমি মিথ্যা বলছি না! যখনই কেউ থাকতো না তখনই আপনি বাসায় আসতেন এরপর কি করতেন আর বলতেন তা যদি এখানের কেউ দেখতো তাহলে দেখতেন আপনার কি অবস্থা হতো?
-- তা তুমি যা কইতাছো তার কোন প্রমান আছে?
-- আমিও একদিন দেখছি ও মানে মারুফ ভাই ভাবীরে কোচিংএর রাস্তায় আটকাইছিলো!
প্রথম কথা ছিলো মারুফের পক্ষ সমর্থনে বলা কোন একজনের, দ্বিতীয় কথাটা ছিলো অন্য একজনের যে কিনা একদিন তানিয়াকে মারুফের প্রতি বিরক্তি ঝাড়তে রাস্তায় দেখেছিলো,ছেলেটার বয়স ১৬ কি ১৭ হবে,স্কুল পড়ুয়া,হয়তো ঐ কোচিংয়েই ক্লাস করে!
-- তুমি কেমনে দেখলা?
চেয়ারম্যানের প্রশ্নে ছেলেটা নিজের কথার সবটা খুলে বলা শুরু করলো,
-- আমি কোচিং থেকে আসতেছিলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ করেই দেখলাম তাল গাছের নিচে দাঁড়াইয়া কেউ একজন একটা মহিলারে থামতে কইতাছে,মহিলাটা একটু দূরে ছিলো,সে খুব তাড়াতাড়ি হাঁটতেছিলো,ঐ লোকটাও পরে দৌড় দেয়, দৌড়ে মহিলার সামনে গিয়া দাঁড়ায়,এতে ঐ মহিলা রেগে যায়,কিছুটা পিছাইয়া যাইয়া লোকটার উদ্দেশ্য কিছু একটা কইতাছিলো! কি কইতাছিলো তা তো শুনতে পারি নাই তয় রাইগাছিলো সেইটা ঠিকই বুঝছি! যেহেতু আমি ক্ষেতের আইলের উপর দিয়া যাইতাছিলা তাই সামনামুখী হইয়া থাকায় উনারে মানে এই ভাবীরে দেখেছিলাম তয় মারুফ ভাইয়ের চেহারা স্পষ্ট দেখিনাই, অন্ধকারে হওয়াতে হালকা আবছা আবছা দেখছি !
-- আরো প্রমাণ চাই?
কথা শেষ করে সময় না দিয়ে তানিয়া দৌড়ে বাড়িতে ঢুকে, উঠোন ভর্তি মানুষের মুখ থমথমে,তানিয়া কাউকে কিছু বলার সুযোগ দিচ্ছে না! তারা কেবল নিরব হয়ে দেখেই যাচ্ছে,মারুফ ইতিউতি করছে,তানিয়াকে ফাঁসাতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে যাচ্ছে মনে হচ্ছে!
মারুফ ভেবেছিল তানিয়ার সাথে একঘরে পেলে হয় তানিয়াকে লাঞ্ছিত করবে সবাই নয়তো তাদের বিয়ে দিয়ে দিবে; গ্রাম অঞ্চলে তাই ঘটে! গ্রামের সহজ-সরল মানুষ এরকম মুহূর্তে বেশ হিংস্র হয়ে উঠে!তারা আগপিছ কোন কিছুই ভাবে না, শুধু ভাবে এথ একটি বিহিত; আর যেহেতু মারুফ অত্র গ্রামেরই ছেলে সেহেতু তাকে খুব একটা দোষ দেওয়া হবে না,যা হবে তা তানিয়ারই হবে! তানিয়ার করা প্রত্যাখান আর থাপ্পরের জবাব সে এভাবেই দিতে চেয়েছিলো কিন্তু পাশা উল্টে গেল তানিয়ার সাহসী প্রতিবাদের তোপে!
চেয়ারম্যানের হাতে থাকা ফোন মাটিতে পড়ে গেল,রাগে তরতর করে কাপছে তার বয়স্ক শরীর,এত বছর ধরে বিচার সালিস করছে আজ অবধি কেউ তার উপর আঙ্গুল তোলার সাহস করেনি,অথচ আজ কিনা ভিন দেশি এক মেয়ে আঙ্গুল তুললো তো তুললো একদম তাকে ভুল প্রমাণ করেই ছাড়লো,তার গ্রামের ছেলেপুলে দ্বারা তারই গ্রামের বউ জ্বীরা এরকম হেনস্থা হচ্ছে! ব্যাপারটা মানতেই কষ্ট হচ্ছে!
চেয়ারম্যানের প্রতিক্রিয়া দেখে উঠে দাঁড়ালো তানিয়ার শ্বশুরও! পড়ে থাকা ফোনটা তুলে আলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাওয়ার বাটনে চাপ দিয়ে মোবাইলের আলো জ্বালালো, এখনও মেসেজে গুলো দেখা যাচ্ছে , কুরুচিপূর্ণ ভাষায় করা প্রতিটি বার্তাই প্রমাণ করছে তানিয়ার প্রতি মারুফের মনোভাব, নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রন করতে ব্যর্থ হয়ে খানিকটা দ্রুতই হেঁটে গিয়ে মারুফের গালে থাপ্পর দিলো, পরিবেশে একটা হইচই বেঁধে গেল,শান্ত শিষ্ট মানুষের অগ্নিমূর্তি ধারণ দেখে অনেকেই নড়েচড়ে উঠলো, থাপ্পর খেয়ে হজম করলেও মারুফ দাঁত কিরমির করে বললো,
-- আপনে নিজের পোলার বউয়ের মিথ্যা কথা শুইনা আমার গায়ে হাত তুললেন, মুরব্বি দেইখা বাইচা গেলেন,অন্য কেউ হইলে বুঝাইয়া দিতাম গায়ে হাত তোলার মজা!
-- মান্দাদীর পুত তোর সাহস কি করে হয় আমার ছেলের বউয়ের দিকে নজর দেওয়ার, তোর চোখ তুইলা যদি কুকুরকে না খাওয়াই তাইলে আমার নাম ও সাজ্জাদ
-- চৌধুরী সাহেব থামেন,নোংরা মাইরা নিজের হাত নষ্ট কইরেন না ,আপনেরে এইসবে মানায় না!
-- আহা গায়ে তোলাতুলি কইরেন না ,আগে অপরাধ প্রমাণ হোক, কে আসল অপরাধী তাও প্রমাণ হোক এরপর দেখা যাইবো বিচারে কি হয়!
অন্য একজন মুরুব্বির কথায় সাজ্জাদ চৌধুরী নিজের আসনে এসে বসলেন।তাল হাত থেকে ফোনটা নিয়ে একে একে মেসেজ গুলো পড়লো বিচারকের আসনে বসা সবাই! গ্রাম্য সালিস হলেও এতে বিচারের সময় উপস্থিত থাকে স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত ওসিরাও; উনি মেসেজ দেখার সাথে সাথেই বলে উঠলো,
-- এই মেসেজ যে উনার থেকেই এসেছে তার প্রমাণ কি? না মানে আপনার বক্তব্য অনুযায়ী এই বার্তা উনি দিয়েছেন, কিন্তু তা প্রমাণের জন্য সঠিক কোন তথ্য আছে?
-- প্রথম প্রথম না বুঝলেও পরে উনার আমার প্রতি আকর্ষণ আর উনার আমাকে বলা কথাবার্তাই আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে!
-- দেখুন ভাবতে বাধ্য করা আর নিশ্চিত হওয়ার মাঝে পার্থক্য আছে,এখন অভিযোগ আপনাদের দুজনের বিরুদ্ধে,এমন সময় আপনি যে নিজেকে বাঁচাতে উনাকে ফাসাচ্ছেন না তার কি সত্যতা আছে! হতেই পারে হাতেনাতে ধরা খেয়ে নিজের সংসার বাঁচাতেই আপনি এখন সব দোষ উনার ঘাড়ে দিচ্ছেন!
-- এটাই আমি বলতে চাইতেছি ওসি সাহেব!
একদিন বাড়িতে গিয়েছিলাম খালা খালুর খবর নিতে,তখন কুশলাদি জিজ্ঞেস করার একসময়ে আমাকে বললো নতুন বিয়া কইরা আপনের বন্ধু চইলা গেছে,কি যে কষ্ট হয় আমার তাতো বলে বোঝাতে পারবো না! নতুন নতুন অবস্থায় স্বামী ছাড়া থাকতে কষ্ট হয়! আরো কত কি যে কইছিলো তা বলতেও আমার লজ্জা করতাছে! কিন্তু আমার দোষ ছিলো আমি প্রতিবাদ না করে তার দুঃখের কথা শুনছিলাম এতেই সাহস পেয়ে গিয়েছিলো,তাই যখনই দেখা হতো ইনিয়েবিনিয়ে অনেক কথাই বলতো, আমি খুব একটা পাত্তা না দিলেও বন্ধুর বউ বইলা এড়াইয়াও যাইতে পারতাম না; তখন কি জানতাম একদিন এভাবেই আমাকে ফাসাইবো!
চেয়ারম্যান কাকা আমি আপনের এলাকার ছাওয়াল, জন্ম থেইকা দেখছেন আগে কখনো আমার নামে এমন অপবাদ শুনছেন; আপনের কি মনে হয় এই দুই দিনের মাথারী যা কইলো এগুলা সত্যি!
-- আমারও এইডাই কথা মারুফকে দেখতাছি এত বছর ধইরা , কোনদিন কোন মাইয়ার দিকে খারাপ নজরে তাকাইতেও দেখি নাই তাইলে মারুফ এমন একটা কাজ করতে পারে তার কোন যুক্তিতে বিশ্বাস করুম, এর আদৌও কোন সত্যতা আছে?
যুক্তি তর্ক চলছে,তানিয়া বুঝলো এরা সহজে বিশ্বাস করবে না,যেই ভয়ে এতদিন কাউকে কিছু বলে নাই,সেই ভয়ই সত্যি হলো,এত কিছুর পরও কেউ বিশ্বাস করলো না! কি করবে এখন?
পর্ব ১৬
-- আপনাকে যেই মেসেজ পাঠাইছে সে নিশ্চয়ই আপনাকে চিনে,তা না হলে আপনার নাম্বার কিভাবে পেল!
-- জানিনা, শুধু জানি একটা নাম্বার নয় একাধিক নাম্বার দিয়ে মেসেজ পাঠায়,আমি যতবার নাম্বার ব্লক করেছি ঠিক ততবারই নতুন নতুন নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে! আর ঠিক ততদিন থেকেই উনি আমাকে বিরক্ত করছে!
তানিয়া কথা বলার সাথে সাথে ব্লক করা নাম্বার গুলো বের করে ওসিকে দেখাতে লাগলো,বেশ কয়েকটি নাম্বার,ওসি সেখান থেকে একটা নাম্বার নিজের ফোনে তুলে নিয়ে ফোন দিলো, নাম্বারটা বন্ধ বললো,
-- বন্ধ দেখাচ্ছে!
ওসি থানায় ফোন করে নাম্বার গুলো বলে সেগুলোর বিস্তারিত তথ্য খুঁজে বের করে জানাতে বললো!
আরো একবার চেষ্টা করি,বলেই আবারও অন্য একটি নাম্বার তুলে নিয়ে ফোন দিলো এবং এটাতে রিং হচ্ছে,অপরদিক থেকে একজন ফোনটা ধরলো, এবং
--*""
-- আপনার পরিচয়?
-- ***
-- আমি ওসি তোফাজ্জল, আপনি যেই সিমটা ব্যবহার করছেন এটা কি আপনার?
-- **
-- বেশি কথা না বলে যেটা জানতে চাইছি সেটার উত্তর দিন,না হলে চৌদ্দ শিকের ভেতরে ঢোকার জন্য প্রস্তুত থাকুন!
-- **
-- বয়স্ক না বয়স্ক ! যখন অন্য মহিলাদের উল্টাপাল্টা মেসেজ দেন তখন মনে থাকে না আপনি বয়স্ক মানুষ! শুয়োরের বাচ্চা লাঠির মাথা যখন পেছন দিয়ে ঢুকাবো তখন বুঝবি পুলিশের ডান্ডার মজা কি?
-- ***
-- এখন নাম্বার তোর না! একটু আগেই তুই কিনে নিছিলি?
-- **
-- কোথায় পাইছিলি?
--- ***
--- পড়ে থাকা সিম কেন নিয়েছিলি? জানোস না পাওয়া সিম ব্যবহার করতে নাই,এখন আমি যদি বলি তুই জঙ্গিদের সাথে মিলিত আছিস! এটা একজন কুখ্যাত পলাতক জঙ্গির সিম!
-- **
--- তুই কোন গ্রামে যেন?
--**
-- এখনই আমার সামনে হাজির হ! তারপর দেখি! আর যদি মনের ভুলেও সিম বন্ধ করে রাখার সাহস করিস তাইলে বলে দিচ্ছি তোর চৌদ্দ গুষ্টিকে আজ থানার মোটা ভাত খাওয়াবো!
-- **
ফোনে কথা শেষ করে ওসি তোফাজ্জল তানিয়ার উদ্দেশ্য বললো,"আপনি অনেক বড় ঝামেলায় জড়িয়ে আছেন, আপনার উচিত ছিলো এগুলো আগেই দেখানো",ওসির কথার মাঝেই মারুফ বললো,
-- দেখো তুমি কিন্তু খামোখাই আমার একার দোষ দিতাছো! তুমি নিজেও জানো গত রাতে যা হয়েছিল তা তোমার আমার ইচ্ছায়ই হয়েছিল! তাইলে এখন আমার একার দোষ কেন দিতাছো।
কথা শেষ করতেই তানিয়া ক্ষিপ্র হয়ে মারুফের গালে আবারও একটি চড় দিলো,
-- কুত্তার বাচ্চা তুই কি বলতে চাস?
-- বারবার গায়ে তুলে ভালো করছো না! আগেও একই কাজ করেছো,আজকে একটু আগেই তোমার শ্বশুরও একই কাজ করলো,আর তুমি আবারও!
মারুফের মা চিৎকার করে বলে উঠলো,,
-- এইসব কি হইতেছে যে খুশি সে আমার পোলার গায়ে হাত তুলতাছে,যদি অপরাধ আমার পোলা কইরাই থাকে তাইলে তার সাথে তো এই বেডিও করছেও,এরে ক্যান কেউ কিছু কইতাছে না!
চারিদিকে আবারও হইচই শুরু হয়ে গেল,ওসি সাহেব চিৎকার করে থামতে বলছে, চেয়ারম্যান সাহেবও উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে শান্ত করতে চাইছে, কিন্তু এরমধ্যেই কয়েকজন তানিয়ার গায়ে আঘাত করলো , তানিয়া নিজেকে রক্ষা করতে সরতে গিয়ে পড়ে গেল, পরপর কয়েকটি পায়ের চাপও খেল হাতে, বুকে, পেটে,আব্বা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে,আম্মা দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো,ওসি দ্রুত হেঁটে একদম মাঝখানে এসে তানিয়াকে আড়াল করার চেষ্টা করলো , তার সাথে চিৎকার করে বললো,
-- আপনারা কেউ দয়া করে আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না! অপরাধী যেই হোক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে! আর যদি দুজনই অপরাধী হয় তবে দুজনকেই পরোকিয়ার দায়ে আপনাদের গ্রাম্য রীতি অনুযায়ী যা শাস্তি তা আপনারাই দিতে পারবেন, এতে আমি কিংবা আমার আইন কোন বাঁধা দিবো না!
কিন্তু কোন ভাবেই কিছু হচ্ছে না,কেউ শান্ত হওয়ার নাম নাই,তাই ওসি বাধ্য হয়ে ফাঁকা গুলি ছুড়ে,এতেই সবাই নিজনিজ স্থানে থেমে যায়;
-- আর একজনও যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে এরপরের গুলিটা তার কলিজায় ঢুকাবো!
-- এই মুরব্বি আপনি আসেন! উনাকে উঠান,উঠিয়ে ঘরে নিয়ে যান!
আম্মার উদ্দেশ্য কথাটা বললো ওসি তোফাজ্জল, আম্মা দৌড়ে এসে তানিয়াকে তোলার চেষ্টা করছে,, তানিয়ার কপাল কেটে রক্ত বের হচ্ছে ,নাক দিয়েও রক্ত বের হচ্ছে হাতের কব্জিতে সমস্যা হচ্ছে হয়তো পায়ের চাপে আঙ্গুল ভেঙ্গে গেছে, হাঁটুতেও বেশ ব্যথা পেয়েছে,উঠে দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে ,
-- এই আপনারাও আসেন, কয়েকজন মিলে উনাকে তুলে ঘরে নিয়ে যান!
মুখে আঁচল গুঁজে দাড়িয়ে থেকে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা কয়েকজন যুবতী নারীর উদ্দেশ্য বললো ওসি, তারা এগিয়ে এসে তানিয়াকে ধরাধরি করে তুলে দাঁড় করালো, এরপর হাত ধরেই ধীর গতিতে ভেতরে নিয়ে গেল,
-- কি হবে এখন চেয়ারম্যান সাহেব? ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল!
-- এই বেডি ছাওয়াল যদি সাজ্জাদ ভাইজানের ছাওয়ালের বউ না হইতো তাইলে পরে এতক্ষনে বুঝাইয়া দিতাম এইরাম কামের শাস্তি!
-- থামেন মিয়া,সব যদি আপনেরাই বলেন তাইলে আমারে আনছেন ক্যান?
-- আইচ্ছা তাইলে আপনিই কন এহোন শাস্তি কি হইবো!
চেয়ারম্যান তার পাশে বসা লোকটার সাথে কথোপকথন শেষ করে তানিয়ার শ্বশুরের দিকে চেয়ে বললো,
-- চৌধুরী সাহেব আপনিই বলেন এখন আমাদের করণীয় কি?
-- আপনেগো বিচারে যা সঠিক তাই করবেন,তবে এতটুকু শুধু বলতে চাই ছেলের বউ দেখে না ,এই তিনমাসে এতটুকু চিনছি যে এই মেয়ে এমন কাজ করতে পারে না , তবুও মানুষ তো! মানুষের মন কখন কিভাবে বদলায় বলা যায় না,খালি আমি বলবো একটু বিবেচনা করে করবেন যাতে নির্দোষ কেউ শাস্তি না পায়!
উপস্থিত সবাই বুঝলো সাজ্জাদ চৌধুরী নিজের পুত্র বধূকে রক্ষা করতেই কথাটা বললো,যতই ভালো মানুষ হোক আর সৎ লোক হোক যেহেতু এখন উনি অপরাধীর বাড়ির লোক তাই এখন উনার কথার মূল্য থাকবে না এটাই স্বাভাবিক! এখনও রইলো না, কিন্তু পরক্ষণেই পাশা উল্টে গেল আম্মার ফের আগমনে,হাতে করে গিলাফে জড়ানো পবিত্র আল কুরআন নিয়ে উপস্থিত হলো আম্মা!
-- দাঁড়ান আপনেগো শাস্তি শোনানোর আগে দাঁড়ান!
সবার মনোযোগ গিয়ে পড়লো মধ্য বয়স্ক চল্লিশোর্ধ নারীর উপর,
-- অনেক সময় ধইরা আপনেগো বিচার দেখতাছি,আমি এই বাড়ির বউ হইয়া আসার পর থেইক্কাই আমার স্বামীকে, সাজেদের আব্বারে বিচার সালিশ করতে দেখতাছি তাই আমি জানি এরকম বিচার সভায় মেয়েদের থাকা নিষেধ, একমাত্র বিশেষ জরুরী না হলে তাদের ডাকা হয় না,তাই আমিও এতসময় আসি নাই, কিন্তু যখন দেখলাম আমার বাড়ির নতুন বউ নিজের ইজ্জতের জন্য লড়তাছে তখন না আইসা আর পারলাম না! আইচছা মারুফ তোমারে ছোট বেলা থেইকা দেখতাছি আর আমার ছাওয়ালের বউরে দেখতাছি মাত্র তিন মাস ধইরা! আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি তার মাঝে খারাপ কোন কিছু দেখি নাই! তয় তোমারটা বলতে পারবো না কারণ তোমারে দেখছি দূর থেইকা ,আর দূর থেইকা দেইখাই কাউরে বিচার করোন যায় না যেখানে সামনে থাইকা করলেই অনেক সময় ধোঁকা খাওয়া লাগে!
-- তুমি কি কইতে চাও সাজেদের আম্মা,আমার ছাওয়ালেরই সব দোষ?
-- দোষ কার তাতো বিচারক নির্ধারন করবো আমি ক্যাডা তা করার?
-- তুমি এইডাই কইলা একটু আগে!
-- এত মাইনসে এত কথা কইছে , আমার বউরে তো পিডানিও দিলা,তাই আমি এহোন আর কিছু কমু না! খালি মারুফরে জিজ্ঞাস করুম!
আম্মার কথায় এতসময় মাথা নত করে সাক্ষাত ফেরেস্তা সেজে থাকা মারুফ মাথা তুলে তাকালো, সবার নজরই আম্মার উপরে,
-- মারুফ তুমি কইতাছো কাইল রাইতে যা হইছে তা তোমার আর আমার সাজেদের বউয়ের ইচ্ছায় হইছে! আর আমার বউ যা কইছে তা সবটাই মিথ্যা কথা! তাই না?
-- জ্ব-জ্বী!
-- সবচেয়ে বড় বিচারক কে জানো? আল্লাহ! তার উপরে আর কারো চলে না! আর সেই কিন্তু আমগো সারাজীবনের লাইগা সঠিক পথের দিশা দিয়া দিছে। আমার মনে হয় তার বিচারের উপরে আঙ্গুল তোলার সাহস এইখানের কারো নাই!
-- আপনি কি করতে চান ভাবীসাহেব?
-- বেশি কিছু না , চেয়ারম্যান সাহেব,খালি একটু সহজ ভাবে বিচার সারতে চাই! মারুফ তুমি একটু ওযু কইরা নেও , ঐ মনির মা মারুফরে একটু পানি দেও,আর আমার বউমারেও আনো!
আম্মা কথা শেষ করতেই মাথায় ঘোমটা টানা তানিয়া বাইরে চলে এলো, আম্মা গিলাফ থেকে কুরআন শরীফ বের তানিয়ার হাতে দিলো, তারপর জিজ্ঞেস করলো,
-- তুমি যা কইছো তার সবটাই কি সত্য? বুইঝা দেখো,যা কইবা হিসাব কইরা কইবা তোমার হাতে কিন্তু সাধারণ কোন বই না, মুসলিম ধর্মের সবচেয়ে বড় গ্রন্থ, সমগ্র জীবনের সঠিক পথ প্রদর্শনের একমাত্র উপায়,ভাইবো না আজকে মিথ্যা বইলা পার পাইলেই বাইচা যাইবা, আল্লাহ কিন্তু তার পবিত্রতা রক্ষা তিনি নিজেই করবেন সুতরাং যা কইবা একদম সত্য কইবা!
-- আম্ ম আমি যা বলছি তার একটা কথাও মিথ্যা না, পবিত্র আল কুরআন শরীফ স্পর্শ করে ওয়াদা করতেছি আমার আল্লাহর নামে আমার মুখ থেকে নির্গত প্রতিটি শব্দই সত্য!
তানিয়ার কথায় পরিবেশ অনেকটাই শীতল হয়ে গেল,কারণ সবাই মুসলিম,আর একজন প্রকৃত মুসলিম মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যতই অপরাধী হোক আর সাহসী হোক পবিত্র আল কুরআন ছুঁয়ে মিথ্যা বলার সাহস কারো নাই! আর যদিও এই দুঃসাহস দেখায় তো তার জন্য অবশ্যই পরমকরুনাময় একদিন তাকে কঠোর শাস্তি দিবেন!
তানিয়ার কথা শেষ হতেই আম্মা বললো,
-- মারুফ এইবার তুমি কও!
তানিয়া সৎ সাহসের সাথে নিজের কথায় অটল থাকলেও দুষ্টু মারুফ তা কিভাবে করবে! আমতা আমতা করতে করতে বললো,
-- এইসব কি খালাম্মা? এহোন কি নিজের কথা বিশ্বাস করাইতে হইলে কুরআন শরীফ ছুঁয়ে বলতে হইবো? তাছাড়া এগুলো ঠিক না! আপনি এইডা নিয়া যান, তাছাড়া যা কইবেন আমি তাই করতে পারুম;
-- ক্যান আমার বউমার তো অসুবিধা হয় নাই,তাইলে তোমার ক্যান হইতাছে? তুমি তো সত্য বলতাছো!
মারুফের দোনামোনা ভাব বুঝতে সময় লাগলো না উপস্থিত সকলেরই , গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে নানা রকমের; কেউ কেউ এটাকে উত্তম পদ্ধতি বলছে,তো কেউ ভেলকিবাজী; কিন্তু মারুফের অনীহাই প্রমাণ করলো মারুফ যে মিথ্যাবাদী!
-- আপনি কিন্তু নিজেই প্রমাণ করলেন আপনি মিথ্যা বলছেন?
মারুফের তরফদারি করা সবাই আপাতত চুপ,কারণ সত্য বললে নিশ্চিত কুরআন শরীফ স্পর্শ করতে ভয় পেতো না,যেহেতু ভয় পেয়েছে সেহেতু এটা স্পষ্ট মারুফ মিথ্যাবাদী! তাই আপাতত তারা চুপ থেকে শেষ পর্ব দেখার অপেক্ষায় আছে,
-- দেখলেন তো কত সহজেই সত্যটা প্রমাণ হইয়া গেল! আমি যদি এহন আমার ছাওয়ালের বউরে কই আগুনে ঝাঁপ দিয়া নিজেরে সতী প্রমাণ করো ও কিন্তু তাও করতে ভাববো না ! কিন্তু এই যে মারুফ,এ কিন্তু!
-- বুঝলাম খালাম্মা,আপনি বিষয়টি সহজ করে দিলেন এখন বাকি কাজটা আমাকেই করতে হবে!
ওসি দাঁড়িয়ে উঠে, মারুফের মুখোমুখি দাঁড়ালো, এরপর বললো,
-- আসল সত্যিটা কি আপনিই বলবেন নাকি আমাকে অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে?
ওসি কথা শেষ করার আগেই উপস্থিত হলো সেই লোকটা যার সাথে ফোনে কথা হয়েছিলো,
--- আসসালামু আলাইকুম স্যার; আমি মহিউদ্দিন যার সাথে ফোনে কথা কইছেন!
পর্ব ১৭
পুলিশি জেরার মাধ্যমে এটা নিশ্চিত হওয়া গেল যে মহিউদ্দিন নামের লোকটা সিমটা গ্রামেরই এক রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে, সুতরাং এই সিমের মালিক অন্য কেউ! ওসি তোফাজ্জল থানায় ফোন দিয়ে তাড়া দিলো দ্রুত সমস্ত নাম্বারের রেজিস্ট্রেশন করা লোকের তথ্য বের করতে।
মারুফ যে মিথ্যা বলছে এবং সম্পূর্ণরূপে দোষটা মারুফের একার এবং এক্ষেত্রে তানিয়া একজন ভুক্তভোগী!
আম্মার বুদ্ধিতে সহজ হয়ে গেল বিচার করা। ওসি সাহেব আইনি ভাবে জেরা সহ নানান হুমকি ধামকি দিয়ে মারুফের মুখ থেকে অবশেষে সত্যি কথা বের করতে সক্ষম হলো!যদিও মারুফ স্বীকার করতে চাচ্ছিলো না!
বিয়ের দাওয়াতে অংশগ্রহণ করতেই উক্ত স্থানে গিয়েছিল,যদিও শ্বশুর শাশুড়ির সাথেই ছিলো, কিন্তু হাঁটাহাঁটির একপর্যায়ে পায়ের পারা লেগে শাড়ীর আঁচলটা এলোমেলো হয়ে যায় সাথে সাথে কুঁচিও খুলে যায়,তাই তানিয়া একটা জায়গা খুঁজছিলো যেখানে গিয়ে শাড়ীটা ঠিক করতে পারবে,তখনই সামনে এসে উপস্থিত হয় মারুফ, সেদিনের পর থেকেই মারুফকে দেখলে তানিয়ার রাগ তিরতির করে বেড়ে যায়,তার মধ্যে ওরকম অবস্থায় যখন সামনে এসে দাঁড়ায় তখন তো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাই কঠিন তবুও দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছিলো!
তবে আগ বাড়িয়ে মারুফই প্রথম কথা বলে,
-- কি হইছে সমস্যা হচ্ছে কোন? সাহায্য লাগবে?
-- আপনাকে না বলেছি আমার সামনে আসবেন না! তারপর আবার কেন এসেছেন,দেখেন সেদিন ছেড়ে দিয়েছি বলে আজ কিন্তু ছেড়ে দিবোনা!
-- আহ্ রাগ করো ক্যান! আমি কি উনিশ বিশ কিছু বলছি?সাহায্যই তো করতে চাইতেছি!
-- দরকার নেই আমার আপনের সাহায্যের! আমি নিজেই নিজের ব্যবস্থা করতে পারবো!
-- আরে দূর,এখানে কিছু চিনো?তাছাড়া আমি ছাড়া কেউ নাই এখন সাহায্য করার জন্য!
মারুফ কথা বলেই যাচ্ছে এর মধ্যে তানিয়া এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের জন্য একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজছিলো, কিন্তু তানিয়া পাওয়ার আগেই মারুফই বললো,
-- ঐ কর্ণারের দিকে একটা ফাঁকা রুম আছে তুমি চাইলে সেদিকে গিয়ে দেখতে পারো!
বিপদ কালে বুদ্ধি ভ্রম বলে একটা প্রবাদ আছে; তানিয়ারও তাই হয়েছিলো তাই মারুফের দেখানো রুমে যায়,পিছু পিছু মারুফও যায়,যেহেতু গ্রাম অঞ্চল আর রাতের অনুষ্ঠান তাই এপাশটা বেশ নিরব আর অন্ধকার, কোনরকম দূর থেকে আশা মরিচ বাতির আলোয় কিছুটা আলো আলোকিত হয়ে আছে,তার মাঝেই তানিয়া নিজের কাজ শেষ করতে চেয়েছিল কিন্তু যখন বুঝলো মারুফ ওর পিছনে তখনই ,
-- একি আপনি আমার পিছনে কেন আসছেন?
-- আরে এদিকটা তো অন্ধকার,তাই ভাবলাম তুমি ভয় পাবে তাই তোমাকে সাহায্য করতে আসলাম!
-- আমি আগেও বলেছি আমার আপনার সাহায্যের দরকার নাই! আপনি প্লিজ যান এখান থেকে!
কথা শেষ করে তানিয়া ঐ ঘরে ঢুকে দরজা চেপে দেয়,পুরো লাগিয়ে দিলে অন্ধকারে ছেয়ে যেতো তাই পুরোটা লাগিয়ে খিল আঁটে না,আর সেই সুযোগই নেয় মারুফ। তানিয়া যখন নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তখনই ধীর পায়ে নিঃশব্দে ঘরে মারুফ,তানিয়া নিজের কাজে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে ওর একদম কাছাকাছি এসে ঠিক যতক্ষন না শরীরে শরীর ছুঁয়েছে ততক্ষণে টেরই পায়নি!মারুফ তানিয়ার কাছাকাছি যখনই এলো ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে এলো তুমুল চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ!দরজায় ধুপধাপ আওয়াজে তানিয়া পিছু ঘুরতেই মারুফের বুকের সাথে ধাক্কা খায় তার সাথে তানিয়ার হাতে থাকা আঁচলের কাপড়ের ভাজটা নিচে পড়ে যায়,মারুফ লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তানিয়ার উন্মুক্ত অংশে ,আর তানিয়া ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে দরজার দিকে! দরজা খোলার দরকার পড়েনি তার আগেই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে একদল যুবক! এরপর সাথে সাথেই পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে চৌধুরী বাড়ির বউয়ের সাথে মারুফকে একই ঘরে ধরা হয়েছে!
পরপর কয়েকটি থাপ্পরে মারুফ গড়গড়িয়ে পুরোটা বের করে দেয়,ওসি তোফাজ্জল রেগে পুরো লাল হয়ে গিয়েছে! অবশেষে অপরাধী বের হলো! মারুফের মা,বউ সবাই মুখ ঢেকে নিজেদের লজ্জার হাত থেকে রক্ষা করছে, মারুফকে মাঝখানে দাড় করিয়ে রাখা হয়েছে,যারা মারুফের হয়ে তানিয়াকে নানা কথা বলছিলো তারা সবাই চুপ করে তাকিয়ে আছে!
চেয়ারম্যান মুখ খুললো অনেক সময় পর, সচরাচর পঞ্চায়েতের বিচার কার্যে আইনের কোন দরকার হয় না,সেখানে পঞ্চায়েতের প্রধানরা যা বলে তাই সব, কিন্তু আজই প্রথম তাদের বাইরে গিয়ে আইনের লোক হয়ে ওসি সাহেব কাজটা করলো,তাতে উনি খুব একটা খারাপ মনে করেননি কারণ আজ যা অবস্থা হয়েছিল তাতে দরকার ছিলো,হয়তো গতানুগতিক ধারার নিয়মে বিচার করা হলে তানিয়ার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতো! তানিয়া নিয়ম ভেঙে নিজের জন্য কথা না বললে কোনদিনও সত্যটা সামনে আসতো না,আর ভদ্রলোক সেজে ঘুরে বেড়ানো মারুফের মুখোশও কোনদিন খুলতো না!
-- তা ওসি সাহেব এখন এর কি ব্যবস্থা করবেন?
-- অবশ্যই হ্যারেজের দায়ে মামলা হতে পারে তাঁর সাথে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সামাজিক ভাবে অসম্মানিত করার জন্যও!
-- চৌধুরী সাহেব?
-- আমি অবশ্যই মামলা করবো! আমার বউমাকে হ্যারেজ করার জন্য করবো, আমাদের পরিবারের সম্মানহানির জন্যও মামলা করবো!
-- আল্লাহ কি ভাবছিলাম আর কি হলো?
এগুলোই গুনগুন করে বলছিলো আশেপাশে থাকা দর্শকদের ভূমিকায় থাকা
বিচার সভায় নির্ধারন করা হলো মারুফের শাস্তি, তানিয়াকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল! সভার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তানিয়াকে ডাকা হয়, চেয়ারম্যান কিছুটা এগিয়ে এসে তানিয়ার মাথায় হাত রেখে বললো,
-- প্রথমে রাগ হয়েছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তুমি আজ প্রতিবাদ না করলে সত্যটা সামনে আসতো না! আর তুমিও অনেক বড় ভুলের স্বীকার হতে! এভাবেই থেকো সাহসী, সবসময়!
-- দোয়া করবেন!
-- আপনি এখন চাইলে এর নামে মামলা করতে পারেন,আপনি করলেই আমি এর প্রতি আইনি পদক্ষেপ নিতে পারি তা না হলে নয়!
-- অবশ্যই আমি করবো!
হুট করেই তানিয়ার পায়ে পড়ে গেল মারুফের স্ত্রী, আকুতি মিনতি করতে লাগলো যাতে মারুফের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেয়,
-- আমি নিজে জামিনদার হচ্ছি,উনি আর কোনদিন এরকম করবো না!
-- আমি যদি অপরাধী হতাম তাইলেও কি এমন করে বলতেন,একটু আগেও তো নিজের স্বামীর হয়ে আমাকে দোষারোপ করছিলেন! আমার আপনাকে দেখলে করুনা হয় এই ভেবে যে আপনিও একজন নারী,আমার সাথে হওয়া অন্যায়ের শাস্তি না চেয়ে তাকে বাঁচানোর জন্য অনুরোধ করছেন! কিন্তু ক্ষমা করবেন আমি আপনার অনুরোধ রাখতে পারছি না,কারণ সুযোগ আমি আপনার স্বামীকে এর আগেই বহুবার দিয়েছি আর তার জন্য আজ উপযুক্ত শাস্তিও পেয়েছি!
কথা শেষ করেই তানিয়া ওসির উদ্দেশ্য বললো,
-- আমি আইনি ব্যবস্থা নিতে চাই আপনি যা করার করেন!
-- হ্যা আপনি দ্রুত ব্যবস্থা নিন অফিসার! আমি আর কোন রিক্স নিতে চাই না!
এক উঠোন ভর্তি মানুষের মাঝেই মারুফের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়,যারা তানিয়াকে ছিছি করছিলো তারা অনেকেই তানিয়ার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে,কেউ কেউ দূর থেকেই শান্তনা দিচ্ছে, আম্মা তানিয়াকে কারো সাথে কথা না বলার জন্যে ইশারা করে ওকে ঘরে যেতে বললো! তানিয়া তখন অনেক আঘাত পাওয়াতে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে,কথাও বলছে খুব ধীরে তারপরও জোর করে নিজের কথা শেষ করে ঘরে চলে গেল!
বিচার শেষে খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই চলে গেল!
আমাদের সমাজে এরকম ঘটনা অহরহই ঘটে, গতানুগতিক ধারার নিয়মে বিচার সভায় কখনো মেয়েদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়না( খুব কমই ক্ষেত্রে দেওয়া হয়), তাদের নিজেদের হয়ে দুটো কথা বলার জন্য হলেও কখনো সুযোগ দেওয়া হয় না,এতে সুযোগ পায় সুযোগ সন্ধানী কিছু অসাধু লোক! তানিয়ার ক্ষেত্রেও তাই হতে চলেছিলো!তবে তা কেবল একান্তই তানিয়ার প্রতিবাদি হওয়াতেই পারেনি!
তানিয়ার সর্ব শরীর ব্যথা করছে,পেটে বার কয়েক লাথি লাগায় পেটে বেশি ব্যথা করছে,তানিয়া সভার থেকে আসার পর সেই যে নিজের ঘরে ঢুকেছে আর বের হয়নি, খাটের কোনে বসে দাসের উপর হাত রেখে নিরবে কান্না করছে,আজ কতগুলো মানুষ ওর গায়ে হাত তুলেছে,লাথি কিল যে যা পেরেছে সেভাবেই মেরেছে,এর চেয়ে বেশি অপমান অসম্মান আর কি হতে পারে,এক উঠোন মানুষের মাঝে ওর শরীরের কাপড় সরে গিয়েছিল তখন,কত জঘন্য নজর ওর উপরে পড়েছিলো এটা ভেবে আরো বেশি কান্না আসছে! আর গত রাতে যদি সময় মতো ঐ ছেলেরা না আসতো তবে কি হতো! সবকিছু চিন্তা করতেই তানিয়ার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে,মনে মনে আওড়ালো আজ যদি আম্মা বিশ্বাস করে নিজ দায়িত্বে তার জন্য না লড়াই করতো তা হলে তার জন্য কত ভয়াবহ কিছু ছিলো তা ভাবতেই তার কলিজা কেঁপে উঠছে; ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে এর মাঝেই অনুভব করলো শীতল একটা হাতের ছোঁয়া,
মাথায় আম্মার আদুরে ছোঁয়ায় কান্নাগুলো শব্দ করে বেরিয়ে এলো, তানিয়া আম্মার বুকে মুখ গুজে চিৎকার করে কান্না করছে,
-- কাইদো না, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন!
-- আম্মা আজ আপনি না থাকলে আমার কি হতো?
-- কিছুই হইতো না , আল্লাহ সবচেয়ে বড় বিচারক, উনি কখনো অন্যায় হতে দিবে না নির্দোষের প্রতি!তুমি অন্যায় করোনি তাই তোমারও কিছু হতো না!
-- আম্মা সবাই আমাকে অবিশ্বাস করছিলো তাহলে আপনি কেন বিশ্বাস করলেন!
-- কারণ আমি নিজের প্রতি বিশ্বাস করি, আমার আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখি , আর সে যার সাথে আমার একমাত্র ছেলের জীবন জুড়ে দিছে নিশ্চয়ই সে এত খারাপ হবে না!
-- আম্মা, মায়ের কথা মনে পড়তাছে!
-- যাইও কাল পরশু,দেইখা আইসো গিয়া নিজের মায়েরে!
পর্ব ১৮
ঘুমের ওষুধের প্রকোপে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে তানিয়া,আম্মা তখন গোসল করিয়ে হালকা পাতলা কাপড় পড়িয়ে দিয়েছিল, এরপর নিজে মেখে ভাত খাইয়ে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিল সাথে ঘুমের ওষুধও; মানুষ কিছু সময় এতটাই অমানুষ হয়ে যায় যে নিজেদের হিতাহিত জ্ঞানও বিসর্জন দেয়! তানিয়ার শরীরের প্রতিটি আঘাতের ছাপ তাই প্রমাণ করছে!
তানিয়ার সমস্ত শরীর এতটাই ব্যথা করছিলো যে উঠতেই কষ্ট হচ্ছিলো তার সাথে শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিলো তাই আম্মা জ্বর,শরীর ব্যথার সহ ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বিছানায় শুয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে চলে যায়!
সারাদিনের মানসিক ধকলে আম্মাও অনেক ক্লান্ত তাই সেও চলে যায় বিশ্রাম নিতে, আব্বা বিচার সভা থেকে এসে ঘরের বারান্দায় রাখা আরাম কেদারায় বসেছিলো সেই অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ে।সারা রাত দুশ্চিন্তায় ঘুম হয়নি,সারা সকাল কি হবে, কি হবেনা এই ভাবনায় বিভোর ছিলো তাই খাওয়া নাওয়াও চিন্তার বাইরে ছিলো! যখনই সত্য বাইরে এলো এবং অপরাধী বিচারের আওতায় গেল তখনই মন ও শরীর ক্লান্তি ঝেড়ে একটু নিশ্চিন্ত হলো,তবে মনে মনে অনুশোচনায় ভুগছে তাই কারো সাথে কোন কথা না বলে সভা থেকে এসে চুপ করে এই আরাম কেদারায় বসে রয়েছে এবং একসময় সেখানেই ঘুম দিলো!
তানিয়ার ঘুম ভাঙলেও ওষুধের প্রকোপে চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে, তবুও মেলতে হলো কারণ ওদিকে ফোন বেজে যাচ্ছে অনবরত! ফোনের কর্কশ শব্দেই ঘুম ভাঙলো,ব্যথায় নড়তে কষ্ট হচ্ছে তবুও উঠলো; একটু নড়েচড়ে দেখলো ফোনটা ড্রেসিং টেবিলের উপরে রাখা,হাত টানা দিয়ে ফোনটা নিলো, ততক্ষণে কল কেটে গেছে; সাজেদের কল! এসময়? এসময় তো ফোন করার কথা না! কখনো করে না! তবে এখন? কিছু কি হয়েছে? তানিয়ার মনে মনে ভাবনার মাঝে বাধা সৃষ্টি করলো সাজেদের পরবর্তী কলে!
-- আসসালামু আলাইকুম!
-- ***
--- জ্বী?
-- ***
-- কো-কো-কোন ভিডিও?
--***
-- আমি সত্যিই জানিনা আপনি কিসের ভি-ভিডিওর ক-কথা বলছেন?
--***
-- আপনি কি-কিসব বলছে-ছেন?
---***
--- আ-আমি-মি আগে দে-দেখি, তারপর বলছি!
তানিয়া সাজেদের সাথে কথার মাঝে কথা থামিয়ে, হোয়াটসঅ্যাপে সাজেদের পাঠানো দুই মিনিটের একটা ভিডিও ওপেন করলো,যেখানে দেখা যাচ্ছে অন্ধকার ঘরে মারুফ তানিয়া কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, তানিয়ার বুকের কাপড় পড়া,আর এদিকে কিছু লোকের হইচইয়ের শব্দ! ভিডিওর টাইটেল ছিলো " দেখুন কিভাবে প্রবাসী স্বামীকে ধোঁকা দিয়ে তারই বন্ধুর সাথে পরোকিয়া করতে গিয়ে ধরা খেল নতুন বউ"! গত রাত থেকে এই ভিডিওর ভিউ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার,রিচ এর কয়েকগুণ! স্থানীয় এক ইউটিউব চ্যানেল থেকেই ভিডিওটি করা হয়েছে!
তানিয়ার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, কিছু না করেও আজ কত বড় অপবাদে অভিযুক্ত! এই ভিডিও সাজেদের কাছ অবধি পৌঁছে গেছে, না পৌঁছায়নি! ভিডিওটি শেয়ার দিয়ে তার নিচে মেনশন দেওয়া হয়েছে সাজেদকে! তার মাঝে কতরকম মন্তব্য করা হয়েছে! আশ্চর্যের ব্যাপার এখানেও দোষারোপ কেবল তানিয়াকেই করা হচ্ছে,কেউ মারুফকে নিয়ে কথা বলছে না! কি আজব না! তানিয়া কিছুই করেনি,তা তো আজ দুপুরে প্রমাণ হয়েছে, কিন্তু এই ভিডিও করা হয়েছে কাল রাতে,ভিডিওটি ছাড়া হয়েছে প্রায় সকালের দিকে, মানে ভোর রাতের পর! তাহলে কি দাঁড়ালো? ভিডিওটি দেখা প্রতিটি মানুষেরই ধারণা হলো তানিয়া দুশ্চরিত্রা! নিজের প্রবাসী স্বামীকে ধোঁকা দিয়ে তার বন্ধুর সাথে পরোকিয়া করছে! মানে ভিডিও দেখা ৩০ হাজার মানুষ জানবে তানিয়া খারাপ,তার থেকে শুনবে আরো ৩০ হাজার,সেই ৩০ হাজার থেকে শুনবে আরো ৩০ হাজার মানে এভাবেই সমালোচনা করা হবে তানিয়ার চরিত্র নিয়ে অথচ কেউ সত্যিটা জানবেই না! কান্নারা বুকফাটা আর্তনাদে বেরিয়ে আসতে চাইছে কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের করতেও কষ্ট হচ্ছে!
আবারও সাজেদের কল; তানিয়াকে কোন কিছু বলতে না দিয়ে নিজেই বলা শুরু করলো,
-- মাত্র তিন মাস, মাত্র তিন মাস হয়েছে আমি এসেছি,এর মধ্যেই এত কুড়কুড়ানি উঠে গেল তোর যে আমারই বন্ধুর সাথে শুয়ে পড়তে হলো? মাগী ,বারোবাতারী তোর এত চুলকানী ক্যান? বলেছিলাম না যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি ফিরে আসবো; এতটুকু ধৈর্য্য ধরতে সময় নিলি না! বেশ্যা বাজারি মেয়ে মানুষ,এখনই এমন খানকি হয়েছিস নাকি আগেই ছিলি! মানুষ ঠিকই বলছে বাজারে কাজ করা মেয়েদের চরিত্র ভালো হয় না, এরা একশো ব্যাডার স্বাদ না নিয়ে থাকতে পারে না! আমিই ভুল ছিলাম,আমি তোর মিষ্টি কথা আর ভোলাভালা চেহারা দেখে গলে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম সবাই এক না কিন্তু আমি ভুল আর তুই সেটা আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলি! আমার পক্ষে আর যাই সম্ভব হোক তোর মতো বারোবাতারী,পাড়ার বেশ্যা,খানকি দুই নাম্বার মেয়ে মানুষ নিয়ে সংসার করা সম্ভব না! আমি তোকে তালাক দিবো! আর সেটা খুব তাড়াতাড়ি! আমাকে আর ফোন দিবি না, তালাকের কাগজ পাওয়ার সাথে সাথে আমার বাড়ি ছাড়বি,আমি এসে তোর নোংরা চেহারাটা আর দেখতে চাই না আমার ঘরে !
সাজেদ নিজের কথা শেষ করে ফোন কেটে দিলো আর এখানে আহত এক নারীকে করে গেল বিধ্বস্ত এক নারীতে রূপান্তর! তানিয়ার কানে ধরা ফোনটা আলগোছে নিচে পড়ে গেল,খাটের পাশে বসা অবস্থায় থাকায় সেটা পায়ার সাথে বাড়ি খেয়ে ঝকঝকে সাদা টাইলসের উপর পড়ে কয়েক খন্ডে পরিনত হলো! ফোন ভাঙ্গার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি খন্ড খন্ড হলো তানিয়ার মন! সাজেদ তানিয়াকে অবিশ্বাস করলো! তাতেও দুঃখ হলো না! কারণ দূর দেশ থেকে যা দেখেছে তাই বিশ্বাস করছে সেটা না হয় স্বাভাবিক কিন্তু তাই বলে তানিয়াকে কিছু বলার সুযোগও দিবে না? সাজেদের তানিয়াকে উল্লেখ করে বলা প্রতিটি শব্দই কানে বাজছে!
তানিয়া মিনমিন করে কয়েকবার আওড়ালো,
-- আমি বাজারের মেয়ে মানুষ! দুই নাম্বার মেয়ে মানুষ! পাড়ার বেশ্যা!খা-খানকি? বারোবাতারী!
শব্দগুলো উচ্চারণ করতেই চিৎকার করে কান্না শুরু করলো, শব্দ যেন বাইরে না যায় তাই আঁচলের একাংশ মুখে পুরে নিলো! ডান হাতটা কামড়ে ধরে রাখলো,বাম হাত দিয়ে নিজেকেই আঘাত করতে লাগলো!
যখন মনের ব্যথা প্রবল হয় তখন শরীরের ব্যথা ক্ষীণ হয়ে যায়! সর্ব শরীরের ব্যথাও এখন তুচ্ছ সাজেদের আখ্যা করা কয়েকটি শব্দের কষ্টের কাছে!তানিয়ার কেমন যেন লাগছে,দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে! ও ভেবেছিলো সাজেদ একবার পুরো ঘটনা জানতে চাইবে,হয়তো অবিশ্বাস করবে কিন্তু তারপরও অন্তত একবার বলবে,
--- সত্যি করে বলোতো কি হয়েছিলো সেই রাতে? আমি তোমার মুখ থেকেই শুনতে চাই!
কিন্তু সাজেদ তানিয়ার আশাঁতে গুড়েবালি ঢেলে উল্টো হাজারটা তকমা লাগিয়ে দিলো ওর চরিত্রে, তার সাথে জানিয়ে দিলো নিজের সিদ্ধান্ত! তানিয়া সাজেদের সিদ্ধান্ত মেনে নিবে! যদি কেউ না রাখতে চায় তবে তানিয়া থাকবে না তার সাথে!এমনিতেও সংসার টিকে বিশ্বাসে! সেখানে যদি বিশ্বাসই না থাকে তবে কিসের সংসার? আর যদি বিশ্বাস থাকতোই তবে একবার হলেও সাজেদ তানিয়াকে বলার সুযোগ দিতো! সত্য মিথ্যা জানার জন্য হলেও একবার তানিয়াকে জিজ্ঞেস করতো! হুট করেই উচ্চারণ করতো না এই শব্দগুলো,করতো না তালাকের মতো বিষধর শব্দ উচ্চারণ! সাজেদ কখনোই তানিয়াকে বিশ্বাস করেনি,করতে পারেনি! হয়তো সবসময় মনে মনে ভাবতো তানিয়ার চরিত্রে এমন সমস্যা আছে,তা না হলে কেবল এক ভিডিও দিয়েই কিভাবে এত বড় বড় তকমা লাগিয়ে দিতে পারে যদি না তার ভেতরে এরকম ভাবনা পুষে না রাখে!
মুখে কাপড় গুঁজেও কান্নার শব্দ আটকাতে ব্যর্থ হলো!
এদিকে আম্মা কিছু একটার শব্দ পেয়ে উঠে দাঁড়ালো, এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু সময় ভাবলো এরপর উঠে বারান্দায় গেলো,আব্বা নিচে পড়ে আছে! আম্মা চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলো; দৌড়ে আব্বার কাছে গিয়ে বসলো,
-- এই আপনার কি হইছে?
আব্বা ইশারায় বললো, "উনি ঠিক আছে"! আম্মা চিৎকার করে কাজের খালাকে ডাকতে লাগলো, তানিয়াকে ডাকতে লাগলো, পরক্ষণেই মনে পড়লো উনি নিজেই তানিয়াকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে এসেছে সুতরাং তানিয়া এখন গভীর ঘুমে! ওর ঘুম ভাঙতে দেরি আছে, তাছাড়া ওর শরীরের যা অবস্থা তাতে এখন ও কিছুতেই সাহায্য করতে পারবে না!উনি দৌড়ে ঘরে গেলেন, খুঁজে বের করলেন তার নিজের মুঠোফোন, ফোন দিলেন বাজারে চেম্বার নিয়ে বসা তাদের পারিবারিক ফার্মাসিস্ট তরিকুলকে! সেও সাজেদের স্কুল বন্ধু!
-- চিন্তার কারণ নেই চাচী আম্মা! ডায়াবেটিস লো হয়ে গিয়েছিল,তার সাথে প্রেশারও অনেক বাড়ছে!তাই মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। আমার মনে হয় কালকের ঘটনার কারণেই এমন হইছে!
-- হ আব্বা তুমি ঠিকই বলছো! যেই মানুষ দশ গ্রামের মানুষের বিচার করে তার বাড়ির উঠানেই যখন তারই পোলার বউ নিয়া মানুষে বিচার বসায় তখন তার আর কি অবস্থা হইতে পারে! কালকে রাইতেও কিছু খায় নাই,সকালেও; না খাওনদাওন আর না ওষুধ! দুপুরে আমি বউরে নিয়াই ব্যস্ত আছিলাম! উনার দিকে খেয়ালই দিতে পারি নাই! আমার এই বেখেয়ালেই এহোন এই অবস্থা!
-- আপনের আর কি দোষ! এই বয়সে এত দিক সামলান তাই তো অনেক! আমি তো শুনলাম আপনার বুদ্ধির কারণেই ভাবী আজকে এতবড় ঝড় থেকে রক্ষা পাইছে! তা না হলে কি হইতো তা তো কেবল আল্লাহই জানে! তা ভাবী কেমন আছে এখন?
-- এখন তো ঘুমায়!আমি তোমার লগে কথা বইলা ঔষধ খাওয়াই দিছি এরপরই ঘুম! এখনও ঘুম ভাঙ্গে নাই ,ভাঙ্গলে সবার আগে এখানেই আসতো,আইসা জিজ্ঞেস করতো আম্মা আব্বারে নাস্তা দিছেন?
আম্মা নিজের কথা শেষ করে একটু হাসলো ,সাথে তরিকুলও! তরিকুল কিছু একটা মনে করতেই আম্মাকে জিজ্ঞেস করলো,
-- সাজেদ জানে এই ঘটনা?
-- না আব্বারে তো কইনাই! কি কমু ! এমনেই ঐদিকে এত চিন্তায় আছে,তার মধ্যে আবার এদিকের কিছু বলা যায়! তাছাড়া অযথাই বইলা লাভ কি,এহোন তো ঝামেলা শেষই হইয়া গেছে!
-- তবুও চাচী আম্মা, আমার মনে হয় আপনার নিজের বলা উচিত, কারণ এইসব বিষয় লুকানো থাকে না! অন্য কারো কাছ থেকে মশলা মাখিয়ে শোনার আগে আপনাদেরই বলে দেওয়া উচিত; এতে আপনাদেরই ভালো হবে!
-- তাও ঠিক বলছো তুমি!
-- আইচ্ছা আমি আসি তাইলে, দরকার হইলে ফোন দিয়েন!
পর্ব ১৯
সন্ধ্যা পেরিয়ে গভীর রাত হয়ে গেছে,আম্মা তখন থেকেই আব্বার পাশে বসে আছে! স্বামীর অসুস্থতায় অন্য কোন কিছু খেয়ালে নেই! কিভাবে থাকবে সেও তো বয়স্ক মানুষ! ঘরে উপস্থিত তিন সদস্যের তিনজনই মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত! দুপুরের পর অনেকেই এসেছিলো শান্তনা নামক নুনের ছিটা দিতে; আম্মা এমনিতেই এদের সাথে এখন কথা বলতে চায় না তার মধ্যে আব্বার শরীরের অবস্থা! যদিও আম্মা মুখ ফুটে কিছু বলেনি তবুও কাজের খালা নিজে আম্মার মনোভাব বুঝতে পেরে কাউকে বাসায় ঢুকায়নি!
মাঝরাতে,
ধরফরিয়ে উঠে মোবাইলের কর্কশ শব্দে,আব্বার পাশেই অর্ধশোয়া অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছিলো,একটু সময় থম মেরে নিজেকে ঠিক করলো, এরপর আব্বার দিকে তাকালো, ওষুধের কড়া ডোজে আব্বা গভীর ঘুমে আছে! সকাল ছাড়া ঘুম ভাঙ্গবে না! আম্মা মোবাইলের জন্য এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখলো ওয়ারড্রবের উপর তার আর আব্বার ফোন একসাথে!উঠে ফোনটা নিলো, সাজেদের ফোন! একবার না একাধিকবার! কলিজায় কামড় দিলো!ঐদিকে কোন সমস্যা হলো? নাকি এদিকের খবর পেয়েছে! পেলে পেতেও পারে ! তাতে তো অসুবিধা নেই!
আম্মা ফোন রিসিভ করতেই কলটা কেটে গেল,উনি ফিরতি কল করতেই ঐ প্রান্ত থেকে আবার কল আসলো তাতে আম্মার কল কেটে গেল,আম্মা দ্রুত কল রিসিভ করেই কানে দিয়েই বললো,
-- আব্বা কি হইছে,এই সময় কল দিলা! এহোন তো তোমার অফিস টাইম!কোন কিছু কি হইছে?
-- এখনও আরও কিছু হওয়া বাকি আছে আম্মা?
সাজেদের কন্ঠে উত্তেজনা,আম্মা কন্ঠ শুনে আরো বেশি আতংকিত হয়ে পড়েছে; অস্থির স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
-- কি কইতাছো আব্বা?
-- কি বলতাছি তা তুমি আমার চেয়ে ভালো জানো; এখনও এত বড় বিষয় আমারে জানাওনি কেন?
আম্মা বুঝেও না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করলো,
-- তুমি কোন বিষয়ে কথা বলতাছো!
সাজেদের অভিযোগের ডাক,
-- আম্মা!
আম্মার শীতল উত্তর,
-- হ আব্বা!
-- আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি!
আম্মা আতংকিত মনে প্রশ্ন করলো,
-- কিসের সিদ্ধান্ত?
-- আমি ওর সাথে আর সংসার করবো না! কাল সকালেই উকিল ডাকবা,আমি কালকেই ওকে ডিভোর্স দিবো,আর ও যেন কালকেই আমার ঘর ছাড়ে !
আম্মা জানতো সাজেদ ভয়ংকর রাগ করবে কিন্তু এরকম সিদ্ধান্ত নিবে সেটা ভাবেনি,কিছুটা আহত হলো,
-- মানে কি কইতাছো তুমি এইসব? কারে তালাক দিবা,কারে ঘর থেইকা বাইর কইরা দিবো?
শীতল কন্ঠে সাজেদ নিজের মাকে ডাকলো,
-- আম্মা আমি;
আম্মা কন্ঠে রাগ ঢেলে জিজ্ঞেস করলো,
-- হ কও শুনি,তুমি এতবড় সিদ্ধান্ত নিয়া ফেলছো এখন আমারে কইতাছো ক্যান?
-- আম্মা আমি এরকম দুই নাম্বার মেয়ে মানুষ নিয়ে সংসার করতে পারবো না! তুমি;
চিৎকার করে উঠলেন আম্মা, উচ্চ আওয়াজেই বলতে লাগলো,
-- থামো তুমি! কার সাথে কি শব্দ উচ্চারণ করতাছো! নিজের বিয়া করা বউরে দুই নাম্বার কইতে তোমার জিহ্বায় আটকাইলো না!
বিরক্তি ঝেড়ে সাজেদের আক্ষেপিয় সুর,
-- আম্মা তুমি ওর হইয়া কথা কেন বলতাছো! সত্যি করে বলোতো কেন তোমরা ওরে এখনও বাঁচাইতাছো?
আম্মা খুব রেগে না গেলে কখনো ছেলে মেয়ের নাম ধরে ডাকে না,যখন তাদের নাম ধরে ডাকে তখন নিশ্চিত হয়ে বলা যায় আম্মা প্রচন্ড ক্ষেপে গেছে, সাজেদ মায়ের মুখে নিজের নাম শুনে এমনিতেই একটু থমকে গেছে, তার মধ্যে মায়ের রাগ হওয়ার কারণ খোঁজার চেষ্টা করছে,
-- সাজেদ! আমার কথা শুনো, কই থেইকা কি শুনছো আর কি বুইঝা কি সিদ্ধান্ত নিছো তা তুমি জানো আর তোমার আল্লাহ জানে,তয় আমি খালি কমু আমার ছাওয়াল এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত একবার তার আব্বা আম্মার লগে কথা কইতো, একবার অন্তত জিজ্ঞাস করতো সত্যটা জানার জন্য! তা যখন করো নাই তাইলে কইতে হয় আমার শিক্ষায় ভুল আছিলো; আমি তোমারে শিক্ষাইতে পারিনি নাই যে সংসার টিকে বিশ্বাসে, হটকারী করে সংসার করা যায় না!
তালাকের মতো শব্দ উচ্চারণ করে ফেললা এর অর্থ বোঝো?
বিয়া সংসার এগুলো কি মুখের কথা? একজন মানুষের সাথে এক জীবন কাটানো এত সহজ? বিপদে আপদে একে অপরের সাথে সেঁটে থাকতে হয়,হাতে হাত ধরে একটা জীবন কাটানো কম কষ্টের বিষয় নয়;তুমি যদি সামান্য বিপদ দেইখাই তার হাত ছাইড়া দেও তাইলে তুমি তার কিসের সঙ্গী হইলা? পবিত্র কালেমা পাঠ কইরা, আল্লাহকে সাক্ষী রাইখা তার ভালোমন্দের দায়িত্ব নিছো, সারাজীবন তার জীবনের সব পরিস্থিতিতে তার পাশে থাকার
ওয়াদা করছো,এই সামান্য ব্যাপারেই সেই ওয়াদার দাম কইমা গেলো? আমি এত বছরে তোমারে এই শিক্ষা দিলাম!
-- আম্মা তুমি কি বলতেছো? এরকম একটা জঘন্য ঘটনার পরও কি সেই বউ নিয়া সংসার করা যায়?
-- না যায় না যদি সেটা সত্য হয়! তোমার কি মনে হয় সত্য হলে এখনও ঐ বউ আমার ঘরে হইতো?আমি তোমার জানার আগেই তার সাথে তোমার ছাড়াছাড়ি করাইয়া দিতাম না!
-- তুমি ঠিক কি বুঝাইতে চাইতাছো আম্মা?
-- তুমি আমারে কও তুমি কার থেইকা শুনছো? কতটুকু শুনছো?
-- আমারে জুনায়েদ, শিকদার বাড়ির জুনায়েদ বলছে! বিশ্বাস করি নাই তাই ভিডিও দেখিয়েছে!
-- ভিডিও?
-- হ্যা আম্মা ভিডিও! সারা দুনিয়ার মানুষ এখন আমার বউয়ের সাথে আমার বন্ধুর ভিডিও দেখতাছে!
-- কি কও ? কিসের ভিডিও? ভিডিও আবার কখন হইলো?
-- আম্মা তুমি কিসের কথা বলতাছো এত সময় ধরে,আর আমি তোমারে কি বলতাছি!
-- তুমি আমারে একবার ভিডিও দেও দেখি!
-- আম্মা আমি কিভাবে তোমারে?
-- দেও?
সাজেদ কল কেটে ভিডিওটি পাঠালো,আম্মা ভিডিও দেখে থ হয়ে গেল,না উনি ঘটনা জানেন কিন্তু উনি ভয় পাচ্ছে তানিয়ার জন্য! এই ভিডিও দেখার পর তানিয়ার কি অবস্থা হবে; এটা ওর সারাজীবনের জন্য প্রভাব ফেলবে, কিছু না করেও সারাজীবন মানুষের চোখে খারাপ হয়ে থাকবে! এই ভিডিও যতদিন থাকবে তানিয়ার জীবন ততটাই যন্ত্রনা-দায়ক হয়ে উঠবে!জনে জনে গিয়ে তো আর বলে বোঝানো সম্ভব নয় এটা সত্য নয়, মিথ্যা ঘটনা! আল্লাহ কি হবে এবার!
আম্মা ভিডিও দেখে ধপ করে বসে পড়লো, মুহূর্তেই সাজেদের কল,রিসিভ করলো,
-- আম্মা কি বলবা তুমি এইবার! এরপরও!
-- এই ভিডিও কেমনে বন্ধ করা যায় আব্বা! বউমা মইরা যাইবো এই ভিডিও দেখলে!
-- যাক মরে! ওর মতো কলঙ্কিনী বাঁচার চেয়ে মরে যাওয়াই বেটার!
-- না বুইঝা এমন কোন কথা বইলো না যেটার জন্য পরে আফসোস করতে হয়!
-- আম্মা আমার এতো হেয়ালি ভালো লাগতাছে না! আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এখন যদি তোমার কিছু বলার থাকে সেটা বলো!
-- যদি তোমার সিদ্ধান্ত তুমি নিয়াই থাকো তাইলে আমি আর কিছু বলবো না কারণ যদি নিজের স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাস না রাখতো পারো তাইলে তোমার তার সাথে সংসার না করাই ভালো!কারণ আমি সত্যি বললেও তুমি বিশ্বাস করবা না! তোমার মনে তারে নিয়া যেই ধারণা তৈরি হয়েছে তা কেবল তুমিই বদলাইতে পারো আর কেউ না!
আম্মা চায় সাজেদ নিজ থেকে সত্যি জানার আগ্রহ দেখাক, কারণ মন থেকে বিশ্বাস করা আর মুখে বিশ্বাস করি বলার মাঝে বিশাল তফাৎ,মন থেকে বিশ্বাস ভরসা না থাকলে মুখে যতই খই ফোটাক দিন শেষে অবিশ্বাসের দোলাচল প্রতীয়মান হয়েই যায়! মনের মাঝে খচখচানি থাকলে তার বহিঃপ্রকাশও ঘটে!তাই মন থেকে, হৃদয় থেকে বিশ্বাস করতে হয়,ভরসা করতে জানতে হয় তবেই দুজনের মাঝে প্রকৃত ভালোবাসা নিহিত থাকে!আম্মা নিজের বিচক্ষণ ছেলের এমন আচরণে মনোক্ষুণ্ন হলেন যতটা হয়েছেন সকালে নিজ স্বামীর ব্যবহারে! উনি বিশ্বাস করেন উনার স্বামীও নিজ ছেলের বউকে অবিশ্বাস করেছেন! কিভাবে করলেন,আজ তিন মাসের মতো মেয়েটাকে দেখছে; কখনো ফোনেও কারো সাথে অযথা কথা বলতে দেখেনি, পরপুরুষ এলে ঘরের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রাখার মতোই থেকেছে,সেখানে হুট করেই একটা ঘটনা ঘটলো আর তাতেই উনি এতদিন দেখা মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাবেন কেন? একটুও কি বিশ্বাস রাখা যেতো না? যদি ঘটনা সত্যিই হতো তবে হতো! তাতে কি খুব খারাপ হয়ে যেতো! রাখতো তার সংসারে! তবুও তো নিজেকে হেয় করা হতো না
যে মেয়ের বয়সী একটা মেয়ে যে কিনা নিজের একমাত্র ছেলের রেখে যাওয়া আমানত তাকেই বিশ্বাস করে তার জন্য দুটো কথা বলতে পারলো না!
-- আম্মা আমি তোমাকে বিশ্বাস করি! আম্মা আমি তোমাকে পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি বিশ্বাস করি কিন্তু আমি এটাও জানি তুমি কতটা নরম মনের,তোমাকে কেউ চরম আঘাত করেও যদি চোখের পানি ফেলে বলে ভুল হয়ে গেছে ক্ষমা করে দেন তুমি তাও দিবে ; তাই এক্ষেত্রে!
-- করো না বিশ্বাস!
-- করি আম্মা করি! তোমারে না করলে কারে বিশ্বাস করবো!
-- আমি তোমাকে আমারে বিশ্বাস করতে কই নাই! বলছি তোমার স্ত্রীরে বিশ্বাস করতে! তার এখন তোমার সঙ্গ দরকার; তুমিই পারো তারে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে! তুমি যদি ভুল বুইঝা দূর কইরা দেও তাইলে তো তার মরন ছাড়া পথ থাকবো না! এমনিতেই এই ভিডিও দেখলে কি করবো আল্লাহই জানে! দুপুরের পর থেইকা একটা কথাও কয় নাই মাইয়াডা! অমানুষের মতো আচরণ করছে আজকে সবাই,সারা শরীরে মাইরের আঘাতে বিষ হয়ে গেছে,পুরা শরীর নীল কালার হইয়া গেছে! আমি যা সন্দেহ করতাছি তা যদি হয় তাহলে অবস্থা খারাপ কিছু হইবো!
-- মারের আঘাত মানে? কে মারছে? আম্মা আমাকে সবটা খুলে বলো!
এতসময় যত যাই বলুক তানিয়াকে কেউ মারছে কথাটা শোনা মাত্রই সাজেদের হৃদয়ে বড়সড় ধাক্কা খেল মনে হয়,যতই বলুক ছেড়ে দিবে আদৌও এতো সহজ; এই তিনমাসে তানিয়ার জায়গা কোথায় দিয়েছে তা কেবল ঐ ই জানে!হ্যা সন্ধ্যার সময় ভিডিও দেখার পর থেকেই যেই যন্ত্রনা হৃদয়ে শুরু হয়েছে তা তো কাউকে বোঝাতে পারবে না, তাছাড়া যদি স্ত্রী এমন গর্হিত কাজ করেই থাকে তবে কোন আত্নসম্মান সম্পন্ন পুরুষের পক্ষে তাকে নিয়ে সংসার করা সম্ভব নয় অন্তত সাজেদদের মতো পরিবারের ছেলেদের পক্ষেতো নয়ই!
আম্মা রয়ে সয়ে সবটা খুলে বললো,সবটা শোনার পর সাজেদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতোই শব্দ হলো! মস্তিষ্কের নিউরনগুলো ছিন্ন ভিন্ন হয়ে এদিকে ওদিকে ছোটাছুটি করতে লাগলো, হৃদয় কুঠির থেকে কেউ বারবার ধিক্কার দিচ্ছে! একটা ভিডিও দেখে ঠিক কতটা আঘাত ও তানিয়াকে দিয়েছে তা হয়তো কেবল তানিয়াই জানে! হঠাৎ মনে হলো তখন তানিয়া কোন কথা বলেনি,কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ফোন রেখে দিয়েছে!
-- আম্মা আমি তোমারে পরে ফোন দিতেছি!
কল কেটে কল লাগালো তানিয়ার নাম্বারে ! বন্ধ! সাজেদের মনে কু ডাকছে; রাগের মাথায় নিজের কোন ক্ষতি করে ফেললো নাতো?
পর্ব ২০
পরপর কল করেও যখন ওপাশে ফোনটা বন্ধ বলছে,তখন সাজেদের অস্থিরতা হুরহুর করে বেড়ে গেল! তানিয়া আত্নসম্মান সম্পন্ন মেয়ে, নিজের প্রতি এমন অবিচার মেনে নিবে না ঠিকই কিন্তু এরকম মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও কোন মেয়ের পক্ষেই সম্ভব নয়! ভুল কিছু করে বসেনি তো?
-- আম্মা!
-- হ কও?
-- আমার রুমে যাও তোমার বউমার মোবাইল বন্ধ বলতাছে!
-- ও তো ঘুমায়,আমি নিজেই তো ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পারাই দিয়া আসছিলাম!
-- না আম্মা ওর সাথে সন্ধ্যার কিছু সময় আগে আমার কথা হইছে!
-- কি কও! তুমি কিছু বলছো?
সাজেদ কোন উত্তর দিলো না,কি বলবে যা বলেছে তা কি বলার মতো? ছেলের নীরবতায় আম্মা উত্তর খুঁজে পেল; তার জন্য বললো,
-- আগেই বলছিলাম এমন কিছু বইলো না কিংবা কইরো না যার জন্য পরে পস্তাইতে হয়!
কথা বলতে বলতেই আম্মা সাজেদের ঘরের দিকে আগালো,দরজা নিজেই চেপে দিয়ে গিয়েছিল,তাই সেটা নিয়ে সমস্যা হলো না,দরজা খুলে অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেলো না,সুইচ দিয়ে বাতি জ্বালালো,
বিছানা খালি,চোখ ঘুরিয়ে বাথরুমের দিকে দিতেই কলিজায় মোচড় দিলো! অস্ফুটে বেরিয়ে এলো;
-- আল্লাহ গো!
মায়ের আর্তনাদ কর্ণকুহুরে যেতেই ধক করে উঠলো সাজেদের বুকও,
-- আম্মা কি হয়েছে? সব ঠিক আছে?
-- আব্বারে বউমা !
কথা শেষ করেই ফোনটা রেখে তানিয়ার কাছে গিয়ে বসলো,দেওয়ালের সাথে মাথা ঢেস লাগানো অবস্থায় এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে ফ্লোরে, নিম্নাংশ রক্তের স্রোতে ভেসে একাকার চেহারা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে,আম্মা খেয়াল করে দেখলো বাথরুম থেকে রক্তের দাগ!
-- আল্লাহগো বউমা ! ও বউমা ! আল্লাহ আমার কি সর্বনাশ হইলো?
আম্মা তানিয়ার পাশে বসে ওকে ধরে আর্তনাদ করে যাচ্ছে, ওদিকে সাজেদ অনবরত আম্মাকে ডাকছে? আম্মার আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছে তার সাথে ভয় বৃদ্ধি পাচ্ছে ! নিজের অজান্তেই নিজের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে ফেললো! কিভাবে এর মাশুল দিবে! কিছু সময়ের জন্য মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো! মনে হচ্ছে হৃদয় নামক যন্ত্রও বেশ ব্যথা করছে! নিজেকে সামলে কলটা কাটলো! এরপর কল দিলো বাপ্পীর নাম্বারে!
আম্মা তানিয়াকে উঠানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই তানিয়া চোখ মেললো না! পুরো বাড়িতে কোন পুরুষ মানুষ নেই,যাও একজন আছে সে নিজেও অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে! এত রাত প্রায় ভোরের দিকে,হয়তো কিছু সময় পরেই আজান পড়বে ! এখন এই সময় মানুষ কোথায় পাবে? কি করবে,কি করবে ভাবতে ভাবতে আম্মার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে! ওদিকে রক্ত বন্ধ হচ্ছে না!
তানিয়ার এলোমেলো শাড়ীটা ঠিক করে ফ্লোরে ভালো করে শুয়ে দিয়ে দৌড় দিলো নিজের ঘরের দিকে,ঘরে নিজের ফোন খুঁজতে লাগলো কিন্তু হায় ফোন পাচ্ছে না ; হুট করেই মনে পড়লো ফোন নিয়েই সাজেদের ঘরে গিয়েছিল,তাই আবারও দৌড় দিলো!
বিছানায় অবিরত বেজে যাওয়া সাজেদের কলই বুঝিয়ে দিচ্ছে ওদিকে ছেলের অস্থিরতা!তাই আগে কল ধরলো ,কথা সাজেদই শুরু করলো,
-- আম্মার তানিয়ার কি হয়েছে?
ছেলের কন্ঠ শুনে অজানা ভয়ে ঢোক গিললো, এরপর কিছুটা লুকিয়ে তারপর বললো,
-- না তেমন কিছু না মনে হয় ঘুমের ঘোরে হাটতে গিয়া পড়ে গেছে তাই বেহুঁশ আছে!
সাজেদ মায়ের মিথ্যা কথা স্পষ্ট বুঝলো,তাই জোরালো গলায় বললো,,
-- আম্মা সত্যি বলো আমি জানি ওর ভয়াবহ কিছু হয়েছে!
ছেলের কাছে ধরা পড়ে সত্যি লুকানোর আর চেষ্টা করলো না, তাছাড়া কার থেকে লুকাবে,সে তো স্বামী তার অধিকার নিজের স্ত্রীর সবকিছু জানা,
-- আমি জানিনা আব্বা,বউমা বাথরুমের দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে পড়ে আছে,বউমার রক্তে ফ্লোর ভাইসা গেতাছে! বাথরুমেও অনেক রক্ত!
-- আম্মা!
সাজেদের চিৎকার তার মায়ের কলিজায়ও আঘাত করতাছে,দরজায় শব্দ পেয়ে এদিকে তাকালো, সাজেদ অপর প্রান্ত থেকে বললো,
--- বাপ্পী আসছে,দরজা খুলে দাও!
-- আইচ্ছা!
সাহস পেলো,যেতে যেতে ফোন দিলো ফার্মাসিস্ট তরিকুলকে!
কল দিতে দিতেই দরজা খুলে দিলো, তরিকুল ধরছে না হয়তো ঘুমে আছে! এর মধ্যেই আজান পড়ে গেল চারদিকে!
-- কি হয়েছে চাচী আম্মা?
বাপ্পীর বউর চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করা, বাপ্পীও আম্মার দিকে তাকিয়ে আছে!
-- আমার সাথে আসো!
বাপ্পী আর তার বউ তানিয়াকে এমন অবস্থায় দেখে চিৎকার করে উঠলো!
দুপুরে ২:৪৮ মিনিট; সেই থেকে প্রচেষ্টার পর কিছু সময় আগে চোখ খুলেছে তানিয়া! অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ আর ঘুমের ওষুধের প্রকোপে এতই ক্লান্ত ছিলো যে শরীরের নার্ভগুলো রেসপন্স করতে সময় নিলো!
-- বউমা এখন কেমন লাগতাছে?
পিটপিট করে তাকালো চারদিকে, একবার সবাইকে দেখে আবারও চোখ বন্ধ করে নিলো!
-- ভাবী!
সাজেদের বউয়ের বিচলিত কন্ঠস্বর!
--- উনি আজ সারাদিন ঘুমাবেন,বড্ড ক্লান্ত হয়ে আছেন মানসিক ভাবেও শারীরিকভাবেও! উনাকে ছেড়ে দিন!
ডাক্তার নিজের কথা বলা শেষ করে চলে গেলেন!
রাতের ঘটনা --
তানিয়া সাজেদের সাথে কথা বলার পর থেকে অনেক কান্নাকাটি করে,এতে যেমনি মস্তিষ্কে চাপ পড়ে তেমনি শরীরেও! প্রায় দুটোর পর হঠাৎ করেই প্রচন্ড আকারে পেট ব্যথা বেড়ে যায়! দুপুরের পর থেকে চিনচিন ব্যথা করলেও সন্ধ্যায় তা বেড়ে গিয়েছিল কিন্তু মাঝরাতে তা অসহনীয় পর্যায়ে যায়,সহ্য করতে পারছিলো না! এদিকে ঘুমের কারণে উঠতেও কষ্ট হচ্ছে! তবুও কোনরকম পা টেনে বাথরুমে ঢুকে,কমোডে বসতেই মনে হলো পা দিয়ে গড়িয়ে গরম কিছু পড়ছে! তাকিয়ে দেখলো লাল রঙে ছেয়ে গেছে ফ্লোর! চিৎকার করে সেখানেই বসে রইলো! প্রায় আধঘন্টা কাদার পর উঠতে চেয়েও উঠতে না পেরে দেওয়াল ধরে দাঁড়ালো তারপর কমোডে গিয়ে বসলো আর তার সাথেই দেখলো নিজের অনাগত সন্তানের ক্ষুদ্র মাংস পিন্ড কিভাবে কমোডের জলের সাথে মিশে গেল বর্জ্যের সাথে! বুঝতে দেরি হলো না তার অজান্তেই কেউ তার জীবন থেকে হারিয়ে গেল!
কান্না থেমে গেল,একদম চুপ হয়ে গেছে, পেটের ব্যথা কমছে কিন্তু প্রচন্ড মাথা ব্যথা শুরু! এর জন্যই কি তবে পেটের ব্যথা শুরু হয়েছিলো! এতক্ষণ পেরিয়ে গেলেও রক্ত পড়া বন্ধ হলো না কিন্তু সেদিকে তানিয়ার কোন হুঁশ নেই! ও বাথরুম থেকে বেরিয়ে বাথরুমের দরজায় পা দিতেই মাথা চক্কর দিলো,পড়ার আগেই দেওয়াল ধরলো শক্ত করে, এবং এভাবেই একসময় বসে পড়লো কখন কিভাবে জ্ঞান হারালো নিজেই বুঝলো না!
একদিন পর ----
এই খবর পুরো গ্রাম ছড়িয়ে গেল,যারা কাল তানিয়ার মৃত্যু কামনা করছিলো তারাই অনেকে আফসোস করছে! কেউ কেউ গো জাতের মানুষ আছে যারা ভাবে তানিয়া মিথ্যা বলছে তার জন্য ওর সাথে এমন হয়েছে! মারুফকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে তার বিচার করছে আল্লাহ! কেউ কেউ তো এক কাঠি উপরে থেকে বলছে" বাচ্চাটা মারুফেরই , সাজেদের মতো পোলা যাতে না ফাঁসে তাই আল্লাহ নিয়ে গেছে! আর যাদের নূন্যতম জ্ঞান আছে তারা ঠিকই বুঝলো ঘটনা আর তাতে তারা অনুশোচনাও ভুগছে! কাল অনেক মানুষের অতর্কিত আঘাতের ফলে পেটে চাপ পড়েছিলো, এবং কয়েকটি আঘাত সরাসরি তলপেটে লেগেছিল, তার মধ্যে গত পরশু রাত থেকে না খাওয়া এর মধ্যে চিন্তা করছে! সবকিছু মিলিয়ে তানিয়ার শরীরে থাকা ছোট্ট প্রাণ নিতে পারেনি এতকিছু তাই তো সবাইকে ছেড়ে চলে গেল কারো জানার আগেই!
-- ভাবী ভাইয়ের সাথে কথা বলো! দেখো ভাই চিন্তা করছে! বলছে আমরা নাকি মিথ্যা বলছি, এখনও তোমার জ্ঞান ফেরেনি! তুমি কথা বললেই তো বুঝবে যে আমরা সত্যি বলছি!
সানজানা কাল দুপুরের পরই এসে হাজির হয়েছে; বাড়ির খবর পেয়েছে তারই এক বান্ধবীর থেকে! তাই সবকিছু ছেড়ে কালই নিজের পরিবারের কাছে চলে এসেছে,আসার পর থেকেই তানিয়ার আশেপাশে আছে! আব্বা আপাতত সুস্থ,উনিও এসে তানিয়াকে দেখে গেছে!
কাল থেকে তানিয়ার সাথে কথা বলতে চাইছে সাজেদ কিন্তু তানিয়া সুযোগই দিচ্ছে না,যখনই কাউকে কেবিনে দেখে চোখ বন্ধ করে ফেলে! এটা বুঝতেই কাল সারাদিন গড়িয়ে রাত পার হয়ে গেছে, কিন্তু সাজেদ ঠিকই বুঝতে পারছে তাই সেই সানজানাকে বোঝালো, এরপর থেকেই সানজানা তানিয়ার পেছনে পড়ে আছে! কিন্তু তানিয়া মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে!
এদিকে আব্বার কাছে ফোন এলো ওসি তোফাজ্জলের , তানিয়াকে বিরক্ত করা প্রতিটি ম্যাসেজের সিমের মালিক মারুফ, তাছাড়াও ঐদিন যেখানে তানিয়াকে হ্যারেজ করেছিলো সেখানের একটা সিসিটিভি ফুটেজ থেকে আসল সত্যটা বের করা হয়েছে!যেহেতু ঐটা একটা কমিউনিটি সেন্টার ছিলো সেহেতু পুলিশের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে যে কোনরকম শক্তিশালী প্রমাণ থাকলেও থাকতে পারে! তাই উনি নিজের কৌতুহল মেটাতেই ওখানে যান এবং গিয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করেন!
আব্বা অভিযোগ করলো ভিডিও নিয়ে! উনি আশ্বস্ত করলো আজকেই ঐ ভিডিও ডিলেট করার সমস্ত বন্দোবস্ত করে ফেলবেন!তার সাথে যেই বা যারা এই ভিডিও করে আসল সত্য উদঘাটন না করে ভুয়া তথ্য দিয়ে প্রচার করছে তাদের সবাইকে আইনের আওয়তায় আনা হবে! এবং অবশ্যই আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর জন্য একটা বিবৃতিও দিবেন যাতে তানিয়ার ভবিষ্যতে কোন সমস্যা না হয়!
বর্তমানে আমাদের সমাজে বয়ে যাচ্ছে ভাইরাল হওয়ার প্রচন্ড জ্বরের ভাইরাস,যার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে মানুষের আবেগ,আবেগকে পুঁজি বানিয়ে প্রকাশ করা হয় নানা রকমের অহেতুক বিষয় আর আমরাও তা অবলীলায় হজম করে নিচ্ছি! আরো একটি বিষয় হচ্ছে গুজব,আসল নকল,সত্য মিথ্যা যাচাই-বাছাই ছাড়াই অহরহ যেখানে সেখানে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন বিষয়,এতে লাভ না হলেও ক্ষতি কম হয়না! অনেক সময়ই এরকম অপরাধের শিকার হয়ে প্রাণনাশের ঘটনাও অহরহ ঘটছে! রোজ রোজ ভাইরাল হচ্ছে নানা রকম লিংক, ছড়ানো হচ্ছে গুজব আর তাতে ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ছে অনেক ভুক্তভোগী; এক্ষেত্রে শিকার হচ্ছে গ্রামের অনেক অসহায় মেয়ে নারীরা! তারা হয়তো জানেও না তাদের কতশত ভিডিও পাওয়া রায় নোংরা এ জগতে,আর এগুলো করে থাকে তাদেরই আশেপাশের মানুষেরা!
আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি সমস্যা হচ্ছে আমরা নিজের খেয়ে পরের গবেষণায় সময় অপচয় বেশি করি!না জেনে না বুঝে অনেক সময়ই অন্যের বিষয়ে অহেতুক অযাচিত হস্তক্ষেপ করি, আমাদের এই হস্তক্ষেপ তাদের উপকার তো করেই না বরঞ্চ ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়! এটা কখনো বুঝে তো কখনো না বুঝেই করি; কিন্তু করি!
তানিয়ার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে,সত্য প্রমাণ হওয়ার আগেই তানিয়াকে শারীরিকভাবে প্রহারের কারণে তানিয়ার যেই ক্ষতি হয়েছে এটা কি আদৌও কেউ পূরণ করতে পারবে? পারবে না! অথচ বিচার শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করে সত্য জানার জন্য অপেক্ষা করলে কিন্তু প্রেক্ষাপট এরকম হতো না!
এরকম অহেতুক অযাচিত হস্তক্ষেপের শিকার অহরহ গৃহবধূ,মেয়েরা হচ্ছে, আমাদের সমাজেই হচ্ছে এবং তার জন্য আমরাই দায়ী!
পর্ব ২১
সময়ের কাটা ঘুরে পেরিয়ে গেছে বহুদিন! নদীর মতোই শীতল কখনো তো সাগরের মতো উত্তাল! উচাটন লেগেই থাকে আর সেটাকে জয় করেই এগিয়ে চলে মানবের জীবন সাইকেল! এই কারণেই গুণী শিল্পী শাহ আলম সরকার বলেছেন,
হাওয়ার উপর চলে গাড়ী
হাওয়ার উপর চলে গাড়ী
লাগেনা পেট্রোল ডিজেল
মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল
কি চমতকার গাড়ির মডেল গো
চমতকার গাড়ির মডেল
মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল
হাওয়ার উপর চলে গাড়ী
হাওয়ার উপর চলে গাড়ী
লাগেনা পেট্রোল ডিজেল
মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল
চমতকার গাড়ির মডেল গো
চমতকার গাড়ির মডেল
মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল
দুই চাকায় করেছে খাড়া
জায়গায় জায়গায় স্ক্রপ মারা
বাহাত্তর হাজার ইস্পাত দিয়া
এই সাইকেল গড়া
দুই চাকায় করেছে খাড়া
জায়গায় জায়গায় স্ক্রপ মারা
বাহাত্তর হাজার ইস্পাত দিয়া
এই সাইকেল গড়া
চিন্তা করে দেখনা একবার
চিন্তা করে দেখনা একবার
দুইশ ছয়টা হয় এক্সেল
মানুষ একটা ‘দুই চাকার সাইকেল
কি চমতকার গাড়ির মডেল গো
চমতকার গাড়ির মডেল
মানুষ’ একটা দুই চাকার সাইকেল
নতুন সাইকেল পুরান হইবে
কলকব্জায় জং যে ধরিবে
বেল বাতির ঐ ঠনঠন আওয়াজ
বন্ধ যে হইবে
নতুন সাইকেল পুরান হইবে
কলকব্জায় জং যে ধরিবে
বেল বাতির ঐ ঠনঠন আওয়াজ
বন্ধ যে হইবে
এক কদম আগে না বাড়বে
এক কদম আগে না বাড়বে
হাজার বার মারলে পেডেল
মানুষ একটা ‘দুই চাকার সাইকেল
কি চমতকার গাড়ির মডেল গো
চমতকার গাড়ির মডেল
মানুষ ‘একটা দুই চাকার সাইকেল
ফুরাইলে সাইকেলের বাতাস
সেদিন হবে সর্বনাশ
গিয়ার তোমার কাজ করবেনা
রাখিও বিশ্বাস
ফুরাইলে সাইকেলের বাতাস
সেদিন হবে সর্বনাশ
গিয়ার তোমার কাজ করবেনা
রাখিও বিশ্বাস
গুনী সরকার হয়ে আলাশ
গুনী সরকার হয়ে আলাশ
থাকবে ভব মেডিকেল
মানুষ একটা’ দুই চাকার সাইকেল
কি চমতকার গাড়ির মডেল গো
চমতকার গাড়ির মডেল
মানুষ একটা’ দুই চাকার সাইকেল!
গানের মতোই তৈরি আমাদের এই দেহখানা! যার মাঝে সবচেয়ে নরম যন্ত্র হচ্ছে হৃদয়! এই হৃদয় যেমনি নরম তেমনি শক্ত! তা শুধু পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট হয়! যার স্রষ্টা হয় মানুষ নিজেই!
বাড়িতে তোরজোর চলছে কারণ পাকা দেড় বছর পর সাজেদ বাড়ি ফিরছে!আম্মা এতদিন পর নিজের নাড়ী ছেড়া ধনের মুখ দেখবে বলে ব্যাকুল হয়ে আছে! তানিয়াও খুশি কিন্তু সেটা জাহির করছে না! একদম শীতল হয়ে সবকিছু আয়োজন করছে!
হাসপাতাল থেকে এসেও তানিয়া সাজেদের সাথে প্রায় তিনমাস কথা বলেনি! সাজেদ তানিয়ার সব খোঁজখবর আম্মার মাধ্যমেই নিতো!
তানিয়া সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছে সাজেদের ব্যবহারে!সাজেদ ভিডিও দেখে ভুল বুঝেছে এটা স্বাভাবিক তবে তানিয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ঐ শব্দগুলো বলা আর সাথে সাথে তালাক দেওয়ার কথা বলা ; কোনটাই তানিয়া নিজের মন মস্তিষ্ক থেকে সরাতে পারে না,যার কারণে চেয়েও সেদিনের পর থেকে সাজেদের সাথে স্বাভাবিক হতে পারেনি! তিন মাস কোন কথাই বলেনি; তানিয়াতো হাসপাতাল থেকেই নিজের মায়ের কাছে ফিরে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু আম্মার কারণে পারেনি! আম্মার বোঝানো,আব্বার অনুরোধ, অনুতাপের কন্ঠে আবদার করা,সানজানার আবদার কোনটাই তুচ্ছ করে চলে যেতে পারেনি তবে শুধু সাজেদকেই ক্ষমা করতে সময় নিয়েছে!তাও পুরো তিনমাস!
সাজেদের প্রতি বিরূপ হওয়ার কারণ ছিলো যার কারণে কেউ কিছু বলেনি ,তবে সাজেদ নিজের কর্মে অনুতপ্ত তাই তানিয়াকে কখনো জোর করেনি! হাসপাতাল থাকা অবস্থায় একবার কন্ঠ শোনার জন্য কয়েকবার জোর করেছিলো কিন্তু তাতেও তানিয়া কথা বলেনি তখনই সাজেদ হার মেনে নিয়েছিল ; বুঝতে পেরেছিলো তানিয়া ওকে অনেক দুরে ঢেলে দিয়েছে! কেনই বা দিবে না? ওকি বাইরের লোকের চেয়ে কম আঘাত করেছে? বাইরের মানুষের দেওয়া কষ্ট গাঁয়ে লাগে না কারণ তাদের সাথে আমাদের কোন লেনা দেনা নেই কিন্তু নিজের সবচেয়ে কাছের কেউ যখন আঘাত করে তখন তার যন্ত্রনা সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়; তেমনি সাজেদের দেওয়া আঘাত সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে! তাই নিজের অপরাধ বোধের দায় কমাতে কখনোই তানিয়ার উপর চাপ দিতে চায় না, সুতরাং যতদিন তানিয়া এভাবে থাকতে চায় থাকুক, সাজেদ শুধু চায় তানিয়া ওর হয়েই থাকুক!
এদিকে তানিয়া সাজেদ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে ব্যস্ত হয়ে যায় নিজের অন্যান্য কাজে! নিজের পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী হয়, লেখালিখিতে সময় বেশি দেয়, তাছাড়া কোচিং সেন্টারের ক্লাসগুলো আরো বাড়িয়ে নেয়, এর মধ্যে দুই তিনবার চেয়ারম্যানের দাওয়াতে বিভিন্ন বিচারেও উপস্থিত ছিলো! তাছাড়া এলাকার এক নারী সংগঠনেও নিজের নাম জড়িয়েছে! যেখানে নারীদের নিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়! আবার বিকেল বেলা বাসার উঠোনেই অসহায় গরীব বাচ্চাদের ফ্রিতে পড়ায়! তানিয়ার কর্মকাণ্ডে এলাকার অনেকেই ওর প্রতি খুশি; আবার কেউ কেউ আড়ালে আবডালে মুখ ভেংচিও কাটে!তবে তানিয়া কোনদিকে তাকায় না,সে বরাবরই নিজের কাজে বেশি সময় দেয়, এখনও তাই করছে! বিয়ের আগে করার ইচ্ছাগুলো টাকার অভাবে করতে পারেনি তবে এখন টাকার অভাব নেই! সাজেদ প্রতি মাসে ব্যাংকে মোটা এমাউন্ট পাঠায়, এদিকে আব্বাও বেশ ভালো অংক তানিয়ার হাতে দেয় হাত খরচের জন্য যদিও তানিয়া নিতে চায় না কিন্তু আম্মা আব্বার সাথে পেরে উঠে না, এছাড়াও নিজের কোচিং থেকে পাওয়া স্যালারী তো আছেই! এর মধ্যেই আরো একটা কাজ হয়েছে তা হলো তানিয়ার একটা ইবুক প্রকাশ হয়েছে এবং সেটা বেশ ভালো সাড়া পাওয়ায় সেখান থেকেও ভালোই আয় হচ্ছে! সুতরাং অর্থনৈতিক অবস্থা তানিয়ার ভালোই যাচ্ছে! তবে দিন শেষে সাজেদের কমতি ঠিকই পোড়াতো; সাজেদের একতরফা মেসেজে ইনবক্স ফুল হয়ে থাকতো,তার মাঝে থাকতো হাজারটা আকুতি মাখা কথা,কত শতবার ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান, একাধারে ফোন বেজে যেতো, কখনো কেটে দিতো তো কখনো মিউট করে রাখতো! কখনো কানে দু হাত চাপা দিয়ে সেই শব্দ শোনা থেকে বিরত রাখতো! কিন্তু কল কাটতো না,এক সময় সাজেদ কল দেওয়া বন্ধ করে দিতো!
সবকিছু ঠিকঠাক চললেও সাজেদের সাথে এভাবেই যাচ্ছিলো তানিয়ার দিনকাল, কিন্তু তিন মাসের মাথায় একদিন রান্নাঘর থেকে কাজ করা অবস্থায় শুনতে পায় সাজেদ অনেক অসুস্থ! হসপিটালে নেওয়া হয়েছে; শোনা মাত্রই কলিজায় কামড় দিলো! মনে হলো এর জন্য ঐ দায়ী! ও সাজেদকে এড়িয়ে চলে এতটাই কষ্ট দিয়েছে যে সাজেদ এখন হাসপাতালে ভর্তি! সেই খবরও শোনার পর আম্মাকে জিজ্ঞেস করারও সাহস পায়নি, কিন্তু আম্মা নিজেই বলেছিলো,,
-- সাজেদ হাসপাতালে, খাওয়া দাওয়া করে না ঠিক মতো,ঘুমায় না! জ্বর বাধাইয়া বইসা আছে!বুকেও নাকি অনেক ব্যথা করতাছে! আল্লাহ জানে আমার পোলাডা কেমন আছে!
তানিয়া শ্বাশুড়ির কথা শুনেও কোন কথা বললো না,উনি তানিয়াকে শোনানোর জন্যই বলছে আর উনিও জানে তানিয়ার খারাপ লাগলেও কোন প্রতিক্রিয়া দেখাবে না; কাজ শেষ করে তানিয়া নিজের ঘরে চলে যায়! সারাক্ষন ছটফট করে কাটালেও গভীর রাতে সাজেদের ভিডিও কল তানিয়াকে আর শক্ত রাখতে পারেনি ,ওপাশে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা পুরুষের চোখের পানি তানিয়াকে অস্থির করে তুলেছিলো! নিজের শক্ত খোলস থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড় ভাঙ্গা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলো! অসুস্থ মানুষটির মুখে তিনমাস পর শোনা আদুরে ডাক, " বউ " তানিয়াকে দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছিলো! ভেতরে অনুশোচনায় ভুগচ্ছিলো! সাজেদ ভুল করে ক্ষমা চেয়েছে তানিয়া তো ক্ষমা করতে পারেনি তবে কে বড় হলো? ক্ষমা তো মহৎ গুণ! কেন তানিয়া নিজের স্বামীর দ্বারা অজান্তেই হওয়া ভুলের ক্ষমা করতে পারলো না! তানিয়াও কাঁদছিলো সাথে সাজেদও! সেদিন থেকে সাজেদের সাথে যোগাযোগ ঠিকঠাক করলেও কেন জানি আগের মতো স্বাভাবিক হতে পারেনি! এটা সাজেদের তরফ থেকেও হচ্ছিলো! দুজনের মাঝেই কোন একটা ব্যাপার ঢুকে গিয়েছিল যেটা দুজনকেই হতাশ করছিলো! এভাবেই কেটে গেল পুরো দেড় বছর, অবশেষে সাজেদ ছুটি পেয়ে দেশের মাটিতে পা রাখলো!
তানিয়া নিজেকে সাজেদের পছন্দ অনুযায়ী সাজিয়ে তো রেখেছে কিন্তু ঐ যে দুজনের মাঝে তৈরি হওয়া অদৃশ্য দেওয়াল সেটাই কেন জানি ভাঙ্গতে পারছে না!
দরজায় কলিং বেলের শব্দে তানিয়া নিজের বর্তমানে ফিরে এলো,দৌড়ে যেতেই দেখলো আম্মা দরজার খিল খুলে দিচ্ছে; মা'তো! দরজায় সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো! যেদিন থেকে শুনেছে সাজেদ আসবে সেদিন থেকে ছেলের পছন্দের রান্না করতে শুরু করছে,তার যাতে অসুবিধা না হয় তাই পুরো বাড়ির চারদিকে পরপর তিন চারবার পরিষ্কার করিয়েছে! কাল রাত থেকে ঘুম উজার করে বসে আছে! সুস্থ অবস্থায় নিজের কাছে না দেখা অবধি
শান্তি নাই ! সকাল থেকেই রান্না করছে কত সময় আবার দরজার দিকে নজর রাখছে কত সময়!
তানিয়ার ভেতরেও ছটফট করছে কিন্তু সেটা নিজের মাঝেই চাপা দিয়ে রাখছে, সবাই যদি একই অবস্থা করে তবে কি হবে!
-- আসসালামু আলাইকুম আম্মা!
সাজেদ দরজা খুলে নিজের মায়ের মুখ'ই প্রথম দেখবে জানা কথা! তাই সর্বপ্রথম সালাম মায়ের উদ্দেশ্যেই দিলো! মা এতদিন পর ছেলেকে পেয়ে তার বুকে পড়েই কাঁদতে শুরু করলো,আর সাজেদ তাকে বোঝাতে লাগলো! তানিয়া আড়াল থেকে মা
ছেলের আবেগ ক্ষন মুহূর্ত দেখতে লাগলো!
পর্ব ২২
-- আম্মা আমি সেই সুইডেন থেকে না খাওয়া,বিমানেও কিছু খাইনি এসেই তোমার হাতে বেশি করে খাবো বলে!
-- কি কও? এত সময় না খাওয়া কেন? এ জন্যই তুমি এত শুখাইয়া গেছো!
-- শুকাইনি ঠিকই আছি!তুমিই খালি শুকনো দেখো!
কথা বলতে বলতে সাজেদ আম্মাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়েই বসার ঘরে সোফায় এসে গা ছেড়ে দিয়ে বসলো, আম্মা এখনও ছেলেকে এক হাত দিয়ে আগলে রেখেছে,তানিয়া দ্রুত পাকের ঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে বানিয়ে রাখা লেবুর শরবতটা নিয়ে এলো; সবাইকে সেটা খেতে দিলো!
ঘরভর্তি সাজেদের বন্ধু আর চাচাতো ভাইদের উপস্থিতি,তানিয়া সবার সেবাযত্নে লেগে গেল,এরা সাজেদকে আনতে গিয়েছিল! তাই সবাই বেশ ক্লান্ত! সাজেদ সবার সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলছে,আর আড়চোখে তানিয়াকে দেখছে! কিন্তু তানিয়া এখনও সাজেদের দিকে তাকাচ্ছেনা; যখন দরজায় ছিলো তখন তাকিয়েছিলো কিন্তু সাজেদ দেখেনি;সাজেদ আম্মার সাথে নিজের গাল ঘষে আদুরে স্বরে বললো,
-- এখন তুমি আমাকে ঘরে যেতে দাও!
-- হ্যা হ্যা যাও! বউমা!
-- জ্বী আম্মা!
-- যাও আব্বার সাথে ঘরে যাও!
শ্বাশুড়ির অনুমতি পেয়ে হাতে থাকা কাজ পাশে রেখে ধীর পায়ে হেঁটে গেল সাজেদের পিছন পিছন,সাজেদ নিজের কাঁধের ব্যাগটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে,অন্য হাত দিয়ে আরেকটি ট্রলি টেনে নিয়ে যাচ্ছে! আরো অনেকগুলো ট্রলি আছে, সেগুলো বেশ বড়,তুলে নিয়ে যেতে হবে তাই আপাতত ওগুলো বসার রুমের একপাশে জায়গা পেয়েছে!
রুমে ঢুকে সাজেদ কাঁধের ব্যাগটা বিছানার পাশে ঠেস দিয়ে রাখলো, ট্রলিটা ওয়ারড্রবের সামনে রেখে দিয়ে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলো,তানিয়া কোন কথা না বলে ফ্যানের পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো! দ্রুত করে সাজেদের জন্য এনে রাখা নতুন তোয়ালে, লুঙ্গি বের করলো, সেগুলো গোসলখানায় রেখে বের হতেই সাজেদের মুখোমুখি হলো! এতসময়ে সাজেদ নিজের বস্ত্র খুলে উদাম হয়ে গেছে, এতগুলো মাস, এতগুলো দিনের পর হঠাৎ করেই সাজেদকে নিজের সামনে এমন দেখে খানিকটা অপ্রস্তুত হলো তানিয়া;যেই না সাজেদকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া ধরলো সাজেদ হাত বাড়িয়ে বাহু ধরে একদম নিজের বক্ষমাঝে মিশিয়ে নিলো!
খুব শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে রাখলো, সাজেদের শরীর কাঁপছে, তানিয়া স্পষ্ট অনুভব করছে ভয়ানক ভাবে সাজেদের শরীর কাঁপছে! কেন কাঁপছে? নিজের ঘাড়ে গরম কিছু অনুভব করতেই চমকালো! সাজেদ কাঁদছে! কেন? প্রশ্ন করা হলো না, এদিকে সাজেদের বাঁধন আরো শক্ত হলো; তানিয়াও তার সাথে মিশে যেতে তাকে কোনরকম বিরক্ত না করে তার বুকের মধ্যেই চুপ হয়ে রইলো! তানিয়ার ভেতরেও কাঁপুনি শুরু হয়েছে; মনে হচ্ছে বহুবছর পর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ঠাঁই পেলো! অজান্তেই ফুঁপিয়ে কেঁদে দিলো! এভাবেই একে অপরকে জড়িয়ে কেটে গেছে প্রায় দশ মিনিট! সাজেদ তানিয়াকে এভাবে ধরেছে যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে! তানিয়াও এতগুলো মাস পর নিজের স্বামীর এহেন অস্থিরতা বুঝতে পেরে তাকে নিজের মাঝে মিশিয়ে নিলো!
সাজেদের কান্না থেমে গেছে, কিন্তু তানিয়া এখনও ফোপাচ্ছে, নিজের বুক থেকে আলগা করে দুই হাত দিয়ে তানিয়ার চোখ মুছে দিলো,কপালে সময় নিয়ে গভীরভাবে চুমু দিলো!দু হাতের আঁজলায় তানিয়ার মুখটা নিয়ে নিজের খুব কাছাকাছি নিলো!
-- তৃষ্ণার্ত কাকের যেমন পানির জন্য ছটফটানি থাকে ঠিক তেমনি ছটফট করেছি আমি এতগুলো মাস এই মুখটা একবার সরাসরি দেখার জন্য! শুধু উপরওয়ালা জানে কতটা রাত আমি কাটিয়েছি এই প্রতিক্ষায় কবে এতটা সামনে থেকে ছুঁয়ে দিতে পারবো!
সাজেদের আবেগি কথায় তানিয়ার কান্না বেড়ে গেলো,সাজেদ আবারও বুকে জড়িয়ে নিলো! তানিয়ার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার রেস সাজেদের মাঝে এখনও বিদ্যমান! তাই ওর এত অস্থিরতা! আরও কিছু সময় এভাবেই কাটালো, এরপর তানিয়াই নিজেকে সামলালো,
-- ফ্রেশ হোন! সবাই বাইরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে,খাওয়া দাওয়া করে ঘুম দেন তারপর সব কথা হবে!
এতসময়ে সাজেদের সাথে এভাবে লেপ্টে ছিলো বিদায় কিছুটা লজ্জা ভীর করলো তানিয়ার মুখ-খানিতে! সাজেদ সেটা দেখে মুচকি হেসে তানিয়ার নাকের উপর ছোট্ট করে চুমু দিয়ে বললো,
-- বিয়ের এতদিন পরেও আমার মিসেসের এত লজ্জা কোথায় থেকে আসে?
-- যান!
তানিয়া লজ্জা পেয়ে সাজেদের বুকে হালকা চাপড় মেরে কথাটা বলে, এরপর সাজেদের দিকে তাকিয়ে অনুরোধের স্বরে বলে,
-- যান গোসলখানায়,গোসল দেন, তারপর চলেন খাবেন; আম্মা কত কিছু আয়োজন করছে তার আব্বার জন্য!
সাজেদও ভদ্রলোকের মতো তানিয়ার আদেশ মোতাবেক কাজ করলো। এদিকে তানিয়া মাত্রই সাজেদের খোলা কাপড়গুলো তুলে ময়লা কাপড়ের ঝুড়িতে রাখলো! এরপর সাজেদের ফোনটা নিয়ে চার্জে দিলো! তারপর একবার ঘরে চোখ বুলিয়ে চলে গেল বসার ঘরে!
সবার সাথে গল্প করতে করতে খাওয়া দাওয়া শেষ করতে অনেক রাত হয়ে গেছে; সাজেদ আফসোস করছে সানজানা না আসায়! প্রতিবার সানজানাই অতি আনন্দে সাজেদের ব্যাগ গুলো খুলে।এটা ওটা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে,এত গুলো দিন পর এসে এখনও ছোট বোনের মুখ দেখতে পাওয়ায় খারাপ লাগছে খুব! কিন্তু কিছুই করার নেই, কারণ সানজানার পরীক্ষা চলছে!
রাত পার হয়ে সকাল,সকাল পার হয়ে এখন দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল! সাজেদের আসার একদিন পূর্ণ হলো! পুরোটা সময় নিজের ঘরেই কাটিয়েছে, কিছু সময় ঘুমিয়ে তো কিছু সময় তানিয়ার সাথে খুনসুটিতে মেতে। তানিয়া আপাতত নিজের সব কাজ থেকে কিছুদিনের ছুটি নিয়েছে!
সাজেদ আপাতত আজকে বাসায় কাটাচ্ছে আর তানিয়া, আম্মা মিলে ওকে খাইয়ে একদিনেই মোটা বানানোর চেষ্টায় আছে তা নিয়ে সাজেদের খিটমিট লেগে আছে!আব্বা শুধু বসে বসে এদের দেখছে!
আগামীকাল সাজেদের বন্ধুরা সবাই আসবে!
তাই নিয়েও অনেক বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে যদিও সাজেদ বলেছে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে নিতে কিন্তু গৃহস্থ বাড়ির বউ মেয়েরা এগুলো মানে না তারা বাড়িতে আসা মেহমানদের নিজেরাই রান্না করে আপ্যায়ন করতে পছন্দ করে বেশি তাইতো নিজেরাই সবটা করছে!
সাজেদ ঠিক করেছে কালকেও বাসায় কাটিয়ে পরশুদিন সানজানার কাছে যাবে।বোনটাকে দেখে না কতদিন,বেচারীও ফোন করে কান্না করে দিয়েছিলো!
----------------------
সানজানার হোস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাজেদ আর তানিয়া! হোস্টেল সুপারের সাথে কথা হয়েছে,এখনই নামছে বলে জানিয়েছে!
দরজার ম্যারম্যার শব্দে নিজেদের থেকে মনোযোগ সরিয়ে সেদিকে মন দিলো,সাজেদ দরজার দিকে মুখ ফেরাতেই বুকের উপর ঝাপিয়ে পড়লো সানজানা!
-- ভাই I missed you so much!
-- আচ্ছা কাদতেছিস কেন? আমি কি এতদূর আসলাম তোর চোখের পানি দেখার জন্য?
-- তুমি এখন কেন এলে; আমার ছুটি নেই!
ভাইবোনের আহ্লাদ দেখতে লাগলো নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা তানিয়া! সাজেদ তানিয়ার সাথে অনেক গল্প, খুনসুটি করে বোনের জন্য আনা গিফটগুলো দিয়ে,আরো কিছু অর্থ দিয়ে চলে গেল!
দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরো কিছুদিন,সাজেদ ঘর বাইরে করেই সময় কাটাচ্ছে! তানিয়াও এর মধ্যেই নিজের কাজে আবার লেগে পড়েছে, সাজেদ বারণ করেছে অন্তত ও থাকা অবধি সময়টা ওর জন্য রাখা কিন্তু তানিয়ার কথা, "এগুলো দায়িত্ব যা চাইলেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না"! তাছাড়া সাজেদ বেড়াতে যেতে চাইছে তাই তানিয়া চাইছে যাওয়ার আগেই বাচ্চাদের সিলেবাসটা শেষ করতে ;তাই সাজেদও আর বেশি জোর করলো না!
ক্লাবের সামনে রাখা ক্যারাম বোর্ডে ক্যারাম খেলছিলো সাজেদ আর ওর বন্ধুরা ,তার পাশের আরেকটি বোর্ডে খেলছিলো গ্রামেরই কিছু ছেলেরা!
নানান কথার ছলে তারা সাজেদকে উদ্দেশ্য করে তানিয়া আর মারুফের কথা তুললো,
-- বুঝিনা সাজেদ ভাই কিভাবে পারলা এখনও এই বউ নিয়া থাকতে! তোমার জন্যে কি মাইয়া মাইনসের অভাব পড়ছিলো!
--কি বলতে চাস তুই!
-- আমি যা বলতে চাই তা তুমি বুঝছো? তোমার বউ যেই কেলেংকারি করছে তোমার জায়গায় আমি থাকলে ঐ বউরে লাথি মাইরা কবেই বাইর কইরা দিতাম! আর তুমি তো দিব্যি সংসার করতাছো!
সাজেদ গুটি ছেড়ে দিয়ে হাতের মুঠ বেঁধে নিলো,রাগে শরীর জ্বলছে,যেই কথা শেষ হয়েছে বহুবছর আগে তা আবার তোলার কারণ কি!ছেলেটা আবারও বললো,
-- অন্যায় কিন্তু তোমার বউয়েরই বেশি কিন্তু ক্ষমতার জোরে শাস্তি কেবল মারুফ ভাইই পাইলো! যদি মারুফ ভাইরে একা শাস্তি না দিয়া তোমার ঐ বারোবাতারী বউরেও দিতা ,তাইলে ;
আবার এত কিছুর পরেও যদি শুধরাইতো তাও কাজে আসতো! এখন আবার মহিলা সংগঠন নামে বেহায়াদের নিয়ে সংগঠনে যোগ দিয়েছে! সবই নোংরামি করার ধান্দা; এইসব সংগঠনছ কি হয় জানা আছে!
কথা শেষ করার আগেই সাজেদ ঝাঁপিয়ে পড়ে ঐ ছেলেটার উপরে ; কারণ পরের কথাটা যে ছিলো খুবই জঘন্য, সাজেদ শুনতে পারবে না,কেবল এই ছেলে যে বলছে তাই নয়,তার আশেপাশের গুলো হেসে হেসে মজা নিচ্ছে ! পুরানো কাসুন্দি ঘাটার কারণ বুঝলো না, কিন্তু এরা যে মারুফের চরিত্রের আর তার জন্যই মারুফের জন্য এত দরদ তা ঠিকই বুঝতে পারছে! বাপ্পী সহ সাজেদের সব বন্ধুরাই ব্যাপারটাতে ক্ষেপে গেছে, সাজেদের মতো ওদেরও রাগ উঠে গেছে! কিন্তু এদের সাথে মুখ লাগাতে চাইছিলো না! কিন্তু পারলো কই?
সাজেদের সাথে হাতাহাতি লেগে গেল,সাজেদ একদম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, কুকুরের মতো পেটাচ্ছে,ওদের থেকে আরও কয়েকজন সাজেদের উপর চড়াও হতেই সাজেদের বন্ধুরা নামলো,বেশ বড়সড় হট্টগোল বেঁধে গেল!
পর্ব ২৩
হাতের কনুইতে ব্যান্ডেজ, ঠোঁটের কোন ফাটা,ফুলে দুই ভাগ হয়ে আছে,গায়ের সাদা টি শার্টের জায়গায় জায়গায় ময়লার দাগ,রক্তের ছিটা ছিটা ! সুস্থ ছেলেটা সকালে বেরিয়েছে সেই ছেলে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরেছে এভাবে আহত হয়ে। আম্মা আঁতকে উঠলো!
-- কি হয়েছে? এরকম দেখাচ্ছে কেন তোমারে আব্বা?
-- কিছু হয় নাই আম্মা! আমি ঠিক আছি!
-- একসিডেন্ট করছো? কই কই ব্যথা পাইছো?
-- কিছু হয় নাই,কোথাও ব্যথা পাই নাই!
বেশ চেঁচিয়েই বললো, আম্মা একটু চমকালো, সাজেদ কখনো বাবা মায়ের সাথে উচ্চবাচ্য করে না! হঠাৎ কি হলো?
সাজেদ কোন দিকে না তাকিয়ে হনহনিয়ে ঘরে চলে গেল, কয়েক মুহূর্ত বাদেই আবার ফিরে এলো,
-- আম্মা!
-- হ্যা বলো!
আম্মা এখনও সাজেদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে ছিলো,সাজেদ আবার ফিরে আসাতে বুঝলো কিছু একটা হয়েছে কিন্তু কি,
-- ও বাড়ি আসেনি?
-- না তো! কি হইছে?
সাজেদ কোন কিছু না বলে আবারও হনহনিয়ে ঘরে চলে গেলো,যাওয়ার পথে দেওয়ালে ঝুঁলে থাকা মানি প্লান্টের গাছের টবটা হাত দিয়ে ফেলে দিয়ে গেল।
আম্মা আচমকা ঘটমান কাজে চমকে উঠলেন,এমন অহেতুক কাজ করার ছেলে সাজেদ নয়।দৌড়ে এলো কাজের খালাও,তিনি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে সাজেদের যাওয়ার পথে! সাজেদ ঘরে গিয়ে পায়চারি করতে লাগলো,বেশ অস্থির হয়ে আছে! কোনভাবেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না! রাগে মাথার তার সব ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম! হুট করেই সেন্টার টেবিলের উপরে থাকা পানির জগটা ছুঁড়ে মারলো! হাতের মুঠ শক্ত করলো, নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে পারছে না! চোয়ালের হাড়গুলো পিষে যাচ্ছে এমন ভাবে চোয়াল শক্ত করে রেখেছে,কার উপর রাগ হচ্ছে,ঐ ছেলেদের উপরে নাকি তানিয়ার উপর? ড্রেসিং টেবিলের উপরে থাকা সজ্জার সমস্ত সামগ্রী ছুঁড়ে মারলো, সেগুলো সব এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইলো!তাতেও রাগ কমছে না,বিছানার চাদরটা একটানে নিচে ফেলে দিলো! সাজেদ হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে! বারবার ছেলেগুলোর সেই কথাগুলো কানে বাজছে,
-- আরে আমগো লগে রাগ দেখাইয়া লাভ কি! যা সত্যি তাই কইছি!
-- বেশ্যা নিয়া সংসার করো! করতে পারো শুনতে পারো না!
-- আরে ধুর খবর নিয়া দেখ ওর বউরে এই কামে ঐ নামাইছে তাইতো এহোনও এক লগে আছে! বুঝোস না বউ ভাড়া দিয়া খায়!
-- আরে সুইডেনে থাকে,ওর নিজের চরিত্রের কোন ঠিক ঠিকানা আছে?যার নিজেরই চরিত্রের ঠিক নাই হেয় আবার ঘরের বউ রাখবো কেমনে?
-- টেকা আছে তাই ক্ষমতা দেখাস! মারুফরে জেলে ঢুকাইছোস,তোর বউয়ের আকাম দেখাইছে দেইখা জাহাঙ্গীররে মানহানি মামলা দিছোস,তারে জেলের ভাত খাওয়াইছোস! চ্যানেল বন্ধ করাইছোস! এত কিছু করছোস তাও কি পারছোস তোর বউরে সামলাইতে? তোর বউতো এহোনও বাইরের ব্যাডাগো লুঙ্গির তলে থাকে! সারাদিন বেশ্যাগো লইয়া সংগঠনের নামে বাজার খুইলা রং তামাশা কইরা বেড়ায়!
-- আগে নিজের ঘর ঠিক কর! তোর বউয়ের চরিত্র এতই সাধু তাইলে মারুফ এতদুর কেমনে গেলো! যদি দোষ মারুফেরই থাকে তাইলে আগে কেন জানায় নাই, তোরেও তো কয় নাই!কেমন স্বামী তুই! তোর মতোন ব্যাডার স্বামীর হওয়ারই কোন যোগ্যতা নাই!
এরকম হাজারটা তাচ্ছিল্যের কথায় সাজেদ দিকবেদিকহীন হয়ে যা পায় তা দিয়েই ওদের আঘাত করতে থাকে,সাজেদকে এমন দিক শূন্য দেখে বাপ্পীই প্রথমে নিজেকে ঠান্ডা করে, ওদের অন্য বন্ধুরাও প্রচন্ড ক্ষেপে ঐ ছেলেদের সাথে হাতাপাই শুরু করে দিলো, একমাত্র বাপ্পীরই মনে হলো এভাবে হাতাহাতি করলে এক পর্যায়ে বড়সড় কিছু একটা ঘটে যাবে।
তাই ও সাজেদের কোমর চেপে ধরে সাজেদকে সরিয়ে আনে, কিন্তু এর মধ্যে অঘটন যা ঘটার তা ঘটে যায়।কারো একজনের আঘাতে ঐ দলের একজনের মাথা ফেটে যায়,আর সাথে সাথেই গলগলিয়ে রক্ত বের হয়! পরিস্থিতি দেখে ক্লাবের কর্তৃপক্ষের লোকজন স্থানীয় থানায় ফোন দেয়! কয়েকজন মিলে ঐ ছেলেকে পাশের একটা ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে রক্ত পড়া বন্ধ করায়,ব্যান্ডেজ করিয়ে দেয়, ওষুধ পত্র কিনে দেয়,এর মধ্যেই চলে আসে থানার লোকজন! তারা এসে পরিস্থিতি শুনে সবটা বুঝলো,দোষটা ঐ তরফের,তবে সাজেদদেরও দোষ আছে ! সাজেদের দিকে তাকিয়ে অফিসার একটু অবাক হলো কারণ ,সাজেদকে চিনতে পেরেছে,যেহেতু আব্বার সাথে থানার লোকজনের পরিচয় ভালো,আর আব্বার সাথে সাজেদের চেহারার দারুন মিল,এতই মিল যে, যে কেউ সহজেই চিনতে পারবে এটা সাজ্জাদ চৌধুরীর ছেলে!
-- আপনি ভদ্রলোকের ছেলে,আপনাকে কি এসবে মানায় বলুন?
অফিসার বিনয়ী হয়ে সাজেদের কাঁধে হাত রেখে কথাটা বলে, সাজেদ অফিসারের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতেই অফিসার থামিয়ে বললো,
-- আমি জানি! আপনার স্ত্রীর এই বিষয়টি মোটামুটি সবই জানি,আমি এটাও বুঝতে পারছি আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি, কিন্তু আমি তবুও বলবো এটা আপনাদের মতো ঘরের ছেলেদের মানায় না! তাছাড়া এটা কি ভালো দেখালো বলেন? ওরা বলেছে তা কেবল আপনি শুনেছেন, আপনারা কয়েকজন শুনছেন কিন্তু এখন কি হলো সবাই শুনছে!যারা ভুলে গিয়েছে তাদেরও আরো একবার মনে পড়লো,যারা আগে জানতো না তারাও আজ জেনে গেল! তো লাভ টা কার হলো,এদের মতো অশিক্ষিত বর্বরদের আর লসটা হলো আপনাদের মতো শিক্ষিত সম্মানিত ঘরের লোকদের! আপনার বাবা সম্মানিত,বিচার করেন দশ গ্রামের,সেই সুবাদে শুনেছি উনি যথেষ্ট জ্ঞানী,তার ছেলে হয়ে এমন অজ্ঞানীদের মতো কাজ করলেন কিভাবে?
যাই হোক আমি অনেক জ্ঞান দিলাম, আপনাকে দেখলেই বোঝা যায় আপনিও যথেষ্ট জ্ঞানী মানুষ, জানামতে আপনি সুইডেন থাকেন, সেখানে ভালো চাকরি করেন,তো এরকম হটকারী কাজ করা নিশ্চয়ই আপনার দ্বারা শোভা পায় না!
অফিসার কথা শেষ করে কিছু সময় দম নিলো এরপর আবার বললেন,,
-- এখন উনারা যদি আপনার নামে কমপ্লেইন করে তবে আমি আপনাকে এবং আপনারা বন্ধুদের গ্রেফতার করতে বাধ্য হবো!
-- ওরা করবে কিনা জানিনা তবে আমি করছি!
অফিসার একটু চমকালেন বোধহয়, কুঁচকে যাওয়া দৃষ্টি ফেলে জিজ্ঞেস করলেন,
-- মানে?
-- আমি ওদের প্রত্যেকের নামে মানহানির মামলা করবো! ওরা যেই শব্দ আমার স্ত্রীকে নিয়ে উচ্চারণ করেছে তার প্রতিটির জন্য ওরা জঘন্য রুপে মার ডিজার্ভ করে! আমি ওদের!
কথা শেষ করার আগেই আবারও তেড়ে যেতে নেয়, অফিসার দু হাতে জাপটে ধরে থামায়,ক্রোধান্বিত চোখে তাকিয়ে বলেন,
-- আপনি আইনের লোকের সামনে এভাবে আক্রমনাত্নক ব্যবহার করতে পারেন না! আমি কিন্তু বাধ্য হবো আপনার হাতে হাতকড়া পড়াতে!
বাপ্পী এত সময় ফার্মেসির ভেতরে ঐ ছেলেদের সামলাচ্ছিলো, কারণ ও চায়না আইনি জটিলতায় জড়িয়ে সাজেদের সুইডেন ফেরত যাওয়ায় কোন সমস্যা হোক! বাইরের হইচই শুনে বাইরে এসে আবারও সাজেদকে চেততে দেখে দৌড়ে আসে।
-- কি করছিস? নিজেকে সামলা!
-- কি করে সামলাবো? আমার মাথায় আগুন ধরে যখনই ওদের কথাগুলো মনে পড়ে!
-- এই উনাকে সামলান! তা না হলে বাধ্য হবো আঘাত করতে! এত করে বুঝাচ্ছি বুঝতেই চাইছে না! উনি কি করে সাজ্জাদ সাহেবের ছেলে হয়?
বাপ্পী জাপটে ধরে দুরে সরিয়ে নিয়ে গেল, সাজেদের অন্য বন্ধুরা অফিসারকে বুঝাতে লাগলো সাজেদের অবস্থা,অফিসার সবটা শুনে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে উভয়পক্ষকে নিজেদের ঝামেলা নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে নিতে বললো! কিন্তু ঐ পক্ষ অস্বীকার করলো তখন অফিসার তাদের একটু ভয় দেখাতে সচেতন স্বরুপ বললো,
-- এখন আপনারা মিটমাট না করলে করতেই পারেন তবে কি বলেন তো উনি অলরেডি আপনাদের নামে মানহানীর মামলা দায়ের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে,আমি ভাবলাম আপনারা এক এলাকায় বসবাস করেন, এরকম তুচ্ছ ঘটনায় নিজেদের মাঝে মামলা মোকদ্দমায় না জড়িয়ে সবটা এখানেই মিটমাট করে নেওয়াই ভালো তাই একই প্রস্তাব উনাদেরও দিয়েছি ।উনারা সম্মতি দিয়েছে এখন আপনারা বলছেন মানবেন না! এ কথার পর তো উনারাও মানবে না,তবে আমি বলবো উনি মামলা দায়ের করলে কিন্তু আপনারা চরমভাবে ফেঁসে যাবেন,কারণ দোষটা কিন্তু শুরুতেই আপনারা করেছেন , একজন মহিলার মানহানি করেছেন, বুঝতে পেরেছেন কি করেছেন, এর সাথে যদি নারী নির্যাতন ও শ্লীতাহানির মামলা দেয় তবে কিন্তু জীবন গারদেই পচবে! তাছাড়া এ মামলায় উনার জিত নিশ্চিত কারন এখানে উনাদের সমর্থনই বেশি।
পর্ব ২৪
-- দাঁড়াও!
দরজায় পা দিয়ে ঘরের তছনছ অবস্থা দেখেই থমকে গিয়েছিল তানিয়া তার মধ্যে ভেতরে ঢুকতেই সাজেদের কঠিন বাক্য! হতবাক হয়ে সাজেদের দিকে তাকালো,তাতেই নজরে এলো সাজেদের বিধ্বস্ত মুখখানি, ঠোঁটের কোন ফুলে একাকার হয়ে আছে, হাতের কনুইয়ে করা মোটা ব্যান্ডেজ! অগ্নি ঝড়া চাহনি,শক্ত চোয়াল!
মুখ ফুটে প্রশ্ন করার জন্য মুখও খুলতে পারছে না,কেমন হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো,সাজেদই বললো,
-- কোথায় গিয়েছিলে?
খাটের উপর পা ঝুলিয়ে,দুই পাশে হাত ঠেকিয়ে কিছুটা ঝুঁকে বসেই করলো প্রশ্ন,তানিয়া আশ্চর্য হলো! সাজেদ তো জানে তানিয়া এসময় কোথায় থাকে তবে কেন এই প্রশ্ন করছে? সাজেদের চোখ দিয়ে আগুন ঝড়ছে! তানিয়ার ভয় হলো! সাজেদকে এরকম রূপে কখনোই দেখেনি! শুকনো ঢোক গিললো! তানিয়ার নিরুত্তর সাজেদকে আরো বিক্ষিপ্ত করলো, কিছু সময় মাথাটা নত করে রাখলো, তানিয়া ঘরে ঢোকার জন্য পা বাড়াতেই আবারও শুনতে পেল,
-- ওখানেই দাঁড়াও!
-- কেন?
তানিয়া প্রশ্ন করেই ফেললো, সাজেদ উঠে দাঁড়ালো, ধীর পায়ে এগিয়ে এলো,তানিয়া দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে,
-- কোথায় ছিলে?
-- আমি কোথায় ছিলাম তা তুমি ভালো করেই জানো!
-- না জানিনা?
-- মানে কি? রোজ যেখানে থাকি আজ সেখানেই থাকবো,আর এখানে না জানার কি আছে?
-- প্রশ্নের বিপরীতে প্রশ্ন নয়, উত্তর চাইছি! আর তুমি অনবরত তর্ক করে যাচ্ছো!
তানিয়া বুঝলো কিছু একটা হয়েছে,সেটা সাজেদকে দেখলেই বোঝা যায়,তাই তর্ক না করে কথা ঘুরিয়ে সাজেদের হাতের কনুইয়ের ব্যান্ডেজে হাত বুলিয়ে অস্থির কন্ঠে বললো,
-- আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?কি হয়েছে? বাইক এক্সিডেন্ট করছেন?আমাকে কেন ফোন দেননি; বাপ্পী ভাইয়া তো বললো আপনার কোন বন্ধু এক্সিডেন্ট করছে আপনি সেখানেই আছেন তাই ফোন ধরেন নাই! উনি আমাকে মিথ্যা কেন বলছে?
আপনি শিখিয়ে দিয়েছেন!
তানিয়ার আবেগি কথাগুলো আপাতত সাজেদের বেশ বিরক্ত লাগছে তার মধ্যে প্রশ্ন এড়ানো, রাগটাকে বাড়িয়ে দিলো, তানিয়ার হাতটা নিজের বাহু থেকে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলো,তানিয়া চমকে গেল,ভয়ও পেল,সাজেদ দাঁত কিড়মিড় করে বললো,
-- আমি- আমি সঠিক উত্তর চাই? কোথায় ছিলে তুমি, কার সাথে ছিলে?
কোথায় ছিলে অবধি ঠিক ছিলো, কিন্তু কার সাথে ছিলে প্রশ্নটা কেমন ঠেকলো? এটা কেমন প্রশ্ন! কিন্তু সাজেদের রাগের তোপে সেটার বিপরীতে প্রশ্ন করার সাহস দেখালো না,চোখ নামিয়ে সাজেদকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকলো, কাঁধের ব্যাগটা সেন্টার টেবিলের উপর রেখে জিনিসপত্র তুলতে লাগলো,এভাবে এড়িয়ে যাওয়া রাগের মাঝে আগুনে ঘি ঢালার ন্যায় কাজ করলো,তানিয়া জিনিসপত্র তুলতে তুলতে বলতে থাকলো,
-- দুপুরে কতবার ফোন দিলাম ধরলেন না!পরে বাপ্পী ভাইয়াকে ফোন দিলাম উনি বললেন আপনি নাকি কোন বন্ধু এক্সিডেন্ট করছে সেখানে ব্যস্ত আছেন! তাই ফোন তুলছেন না,তার জন্যই আমি আর ফোন দেইনি! তাতে এত রাগ করার কি আছে যে ঘরে তুফান তুলে ফেলছেন! তাছাড়া আমি এসময়..
কথা শেষ করার আগেই সাজেদের লাথিতে সেন্টার টেবিল উল্টে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে পড়লো, ঝনঝন আওয়াজে চুর্ণ বিচুর্ণ হয়ে গেল তার কাঁচ,সেই সাথে ঝরঝর করে ঝরে পড়লো ড্রেসিং টেবিলের আয়নাও! তানিয়া ভয়ে আঁতকে উঠে হাত পা গুটিয়ে সরে গেল, সাজেদের দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো,সাজেদ যেন ক্ষিপ্ত বাঘ হয়ে আছে! তানিয়ার দুই বাহু খামচে ধরে তুলে দাঁড় করালো, তানিয়ার ঐ জায়গাগুলো জ্বালা করতে শুরু করলো, কিন্তু রাগে বেহুঁশ সাজেদ সেদিকে খেয়ালই করলো না তার সাথে করলো আরো একটি ভুল,
-- আমার সব বন্ধুদের সাথে তোর এতো কিসের ভাব? আমার সন্ধান করতে হলেই তাদের ফোন কেন দিস! সবার কাছে তোর নাম্বার কি করে থাকে! নাকি আমাকে খোঁজার বাহনায় তাদেরও মারুফের মতো ব্যবহার করোস? আমার অনুপস্থিতিতে খালি মারুফই ছিলো নাকি আরও দুয়েকজন আছে যাদের সন্ধান পেতে আমাকে তোকে খুন করতে হবে?
তানিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল, সাজেদের একের পর এক অপবাদে, আপন মনেই গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু! সাজেদ তো হুশেই নেই,রাগের শিকার হয়ে কি করলো বুঝতেই পারলো না! কিন্তু তবুও থামলো না আর না তানিয়া থামালো,
-- তোকে বলেছিলাম না আমি যতদিন আছি তুই ঘরের বাইরে কোথাও যাবিনা! তাহলে কেন যাস? আমার কথার চেয়েও বাইরে যাওয়া বেশি দরকারি! তার মানে কি বাইরে কেউ আছে যে আমার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ? মাগী বেশ্যাগিরী করতে বাইরে যাস? তুই কি ভাড়া খেটে আমাকে খাওয়াস যে তোর বাইরে না গেলে চলবে না!
-- সাজেদ!
বাইরে থেকে আম্মার চিৎকার, থেমে গেল সাজেদ! চোখ দিয়ে আগুন ঝড়ছে,যা জ্বালিয়ে দিচ্ছে সামনে উপস্থিত স্তব্ধ বাকরুদ্ধ হতাশ নারীর কোমল হৃদয়কে! চোখের বর্ষন থেমে গেছে,তার সাথে দৃষ্টি হয়েছে পাথর! সাজেদ নিজের ধরে রাখা হাতটা আলগা করলো, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো তানিয়াকে
,ফ্লোরে পড়তেই মুহুর্তেই রক্তে রঞ্জিত হলো তানিয়ার মাথার পেছনের অংশ! সেন্টার টেবিলের কোনা মাথার পেছনের দিকে গেঁথে গেছে! আম্মা চিৎকার করে দৌড়ে ঢুকতে গিয়েও থেমে গেল,ঘরের অবস্থা দেখে একবার রক্ত চক্ষু নিয়ে সাজেদকে দেখলো, তখন ভাঙচুরের শব্দে এসেছিলো, দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলের এমন হঠাৎ প্রকাশিত ব্যবহারে কিছুটা আতঁকে চলে যায়, ভেবেছিলো বাইরের কারো সাথে কিছু হয়েছে,তার জন্য এমন করছে, তানিয়া আসার পর উনিই তাড়াতাড়ি ঘরে পাঠান,তানিয়া আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবারও ভাঙচুরের শব্দে দৌড়ে আসে ,এসেই দেখতে পায় তানিয়ার ভয়ার্ত মুখ আর সাজেদের হিংস্র ব্যবহার! তিনি নিজেও হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে,এ কোন সাজেদ? এই সাজেদ উনার ছেলে হতে পারে না? আগে কখনোই এই রুপ দেখেনি!তার ছেলেকে সে এমন শিক্ষা দেননি যে ঘরের বউয়ের সাথে এমন জঘন্য ব্যবহার করবে! এরকম নোংরা শব্দ উচ্চারণ করবে তার ছেলে তাও কিনা নিজেরই স্ত্রীর সম্পর্কে! আগেরবার দুর থেকে করেছে সেটা মেনে নিয়েছে কিন্তু এবার তার চোখের সামনে বসে না মানতে পারছেন না! উনি সাজেদের সাথে কথা না বলে সাবধানে পা ফেলে তানিয়ার কাছে গেলো! তানিয়ার চোখ নিভু নিভু! আকস্মিক ঘটনার রেশ আর মাথায় মাত্র পাওয়া আঘাতের ব্যথা দুটোই তানিয়াকে ক্লান্ত করে তুলেছে, ঝিমিয়ে পড়েছে! একদম স্থির হয়ে আছে, শুধু দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে! আম্মা দুই হাত দিয়ে তানিয়াকে আগলে ধরে আদুরে কন্ঠে বললো,
-- বউমা কিছু হয় নাই, এখনই ডাক্তার চইলা আসবো,সব ঠিক হইয়া যাইবো! আজ তোমার আব্বা আসুক এর একটা বিহিত করবোই! কি করে এত সাহস হয় যে আমার ঘরের বউকে ও আঘাত করে! কোথায় থেকে এই শিক্ষা পেয়েছে!
তানিয়া শ্বাশুড়ির আদরে তার কোলেই লুটিয়ে পড়লো,তবে কোন শব্দ ওর দিক থেকে নেই,একদম নির্জীব, আম্মা ঘাড়ের দিকে হাত দিয়ে দেখলো রক্ত এখনও অনবরত পড়ছে,এটা তানিয়ার সমস্যা,কোন স্থানে কেটে গিয়ে রক্তপাত হওয়ার সুযোগ পেলে রক্তপাত বন্ধ হয় না যতক্ষনে না ওষুধ লাগানো হয়! আম্মা রক্ত দেখে মনে মনে ভীত হলেন,কারণ তানিয়া একদম নেতিয়ে গেছে, কোনরকম শব্দ করছে না,তার চেয়েও বড় কথা চোখের পলকও ফেলছে না!
-- সাজেদ?
আম্মা দৃষ্টি ঘুরিয়ে সাজেদকে ডাকতেই দেখলো, সাজেদ নেই! আম্মা তানিয়াকে আগলে নেওয়ার পরপরই সাজেদ বেরিয়ে গেল, একবারের জন্যও দেখলো না তার ছুঁড়ে ফেলায় তার সবচেয়ে কাছের মানুষের অবস্থা কি হলো? কতটুকু ক্ষত করলো সেই অসহায় নারীর শরীরের আর কতটা করলো তার হৃদয়ে! ভগ্ন হৃদয়ের নারীকে একা রেখে চলে গেল স্বামী নামক শক্তিশালী পুরুষটি,সে তার শক্তির পরীক্ষায় পাশ করলেও ধৈর্য্যের পরীক্ষায় নির্ঘাত ফেইল করা ছাত্র প্রমাণ হলো! ভালোবাসায়, সংসারে বিশ্বাস কতটা জরুরি তা কোনদিন সে বুঝলোই না!
---------------------------------------------------------------------
গভীর ঘুমে আছে তানিয়া,ডাক্তার মাথা ভালো করে ওয়াস করে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে গেছে!তার সাথে দিয়ে গেছে ঘুমের ওষুধ! যেটা খেয়ে আপাতত ঘুমে বিভোর হয়ে আছে! তার থেকে খানিকটা দূরে অপরাধের দায়ে মাথা নুইয়ে বসে আছে সাজেদ! তখন করা ব্যবহারের নিজের প্রতিই ঘৃনা হচ্ছে! ঐ ছেলেদের সাথে নিজের কোন পার্থক্য খুঁজে পেল না! ওরাও হয়তো কখনো তানিয়াকে সরাসরি কটুক্তি করে না, কিন্তু ও নিজে!
আচ্ছা ও কি আদৌও তানিয়াকে কখনো বিশ্বাস করেছে, কখনো ভালো সত্যিই বেসেছিল? ভালোবাসলে এভাবে আঘাত করা যায়? শরীরের আঘাত তো শুকিয়ে যাবে কিন্তু পরপর দুবার মনে যে আঘাত দিলো সেটা কি আদৌও কখনো মুছবে! গতবার সইতে না পেরে মিসক্যারেজ হয়ে গিয়েছিল, এইবার সরাসরি আঘাত করে বসলো, একদম আহত করে ছাড়লো? কিভাবে করলো? এতটা হিংস্র কিভাবে হতে পারলো? একবারও কেন মনে করলো না ওর তানিয়া কতটা নাজুক! আচ্ছা তানিয়ার ঘুম ভাঙ্গার পর কিভাবে ও তানিয়ার মুখোমুখি হবে? কোন মুখে গিয়ে বলবে ভালোবাসি! সত্যি কি ভালোবাসে? আদৌও এভাবে কাউকে ভালোবাসা যায়? ভালোবাসার মানুষটিকে এভাবে আঘাত করা যায়?
সাজেদ ভেঙে পড়েছে, নিজের অপরাধের ভারে নুয়ে পড়েছে, চক্ষু ফেটে অশ্রুরাশী গাল ভিজিয়েছে,চিবুক ছুঁয়ে তা ঝকঝকে টাইলসের উপর নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে! তাতে কি এতে কি অপরাধের দায় আদৌও কমবে; করবে তানিয়া মাফ? পাবে সাজেদ নিজের ভুলের জন্য মাফ নাকি এখানেই হবে এই সংসার নামক খেলার ইতি?
পর্ব ২৫
বসার ঘরের বড় জোড়া সোফায় হাত ভাঁজ করে কপালের একপাশ চেপে ধরে বসে আছে আব্বা! গতকাল রাতের থেকে দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা চেপে ধরেছে! ছেলের করা ব্যবহারের কথা শুনে খানিকটা হতাশ হলেন! উনি নিজের ছেলেকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পেরেছেন বলেই এতদিন গরিমা করতো কিন্তু পরপর দুইবার তার মুখের ভাষার কথা শুনে আর গতকাল রাতে তার কাজের কথা শুনে বরই হতাশ হলেন!না উনিও ব্যর্থ, সঠিক শিক্ষায় পুত্রকে শিক্ষিত করতে পারেননি! যদি পারতো তবে এইদিন দেখতে হতো না,উনার ছেলে কিনা শেষ অবধি বউ পিটিয়ে আহত করে ফেলছে! এটা উনার শিক্ষা নয়,উনি তো এমন কখনোই করেননি, কখনো সাজেদের মায়ের সাথে নোংরা ভাষা ব্যবহার করেননি!এত বছরের সংসার জীবনে কখনো ঝগড়া হয়নি তেমন নয়,ঝগড়া হয়েছে তবে কখনোই উনি নিজের মুখের ভাষা খারাপ করে নিজের ব্যক্তিত্বে আঘাত করেননি,স্ত্রী গায়ে আঘাত তো দুরের কথা।কথা কাটাকাটি করেছে তাও শালীনতা বজায় রেখে, সেভাবেই নিজের ছেলে মেয়েকে মানুষ করেছে শিক্ষা দিয়েছেন! তবে কিভাবে সাজেদ এতটা!
তাছাড়াও ঐ ঝামেলার উপস্থিত অনেক মুরব্বি ছিলো যারা উনাকে বেশ মান্য করে চলেন, উনাদের থেকে খবর পেয়েছে গতকালের ঘটনার,সেখানেও নাকি সাজেদকে উচ্চ শব্দে গালিগালাজ করতে শোনা গেছে, অফিসার বারণ করার পরও উত্তেজিত হয়েছিল যার কারণে অফিসার গ্রেফতার করার হুমকি দিয়েছে,উনার ছেলেকে একজন ওসি থানায় নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয় সেটাও শুনতে হয়েছে,এটা কতটা অপমানজনক ব্যাপার তা সাজেদ বুঝলো না কিভাবে? সেই ছেলেরা কি বলছে তাতে উনার মাথা ব্যথা নেই ,কারণ বেকার লোকদের কাজই হলো অন্যের বিষয়ে বেগার খাটুনি দেওয়া! এরা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোকেই নিজের একমাত্র দায়িত্ব কর্তব্য বলে মনে করে; তাছাড়া এত দিনের পুরানো কথা যখন তুলেছিলো তার মানে ওরা সমস্যা সৃষ্টির জন্যই করেছে,এটা বোঝাই যায়,তাই ওদের কথায় কান না দিয়ে চলে আসাই উচিত ছিলো! তা না করে ওদের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হওয়া শিক্ষিত, ভদ্রলোক পরিচয়ে পরিচিত সাজেদদের খাটেনি!এতে শুকনো গু ছিটিয়ে দুর্গন্ধ বের করার মতোই কাজ হলো! যদিও ঘটনা মিথ্যা তবুও তা কয় জনে মানে? এখন কি হলো? যেই কথা হয়তো এতদিনে মানুষ ভুলে গিয়েছিলো সেই কথা আবারও মনে হলো সাথে করে যোগ হলো না জানা নতুন কয়েকজন! এতে করে তাদেরই সম্মান কমলো এর চেয়ে ভালো হতো ওদের কথায় কোনরকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে স্থান পরিত্যাগ করা!
তানিয়ার ভাই এসেছে, তানিয়াকে নিয়ে যাবে, আপাতত বসার ঘরে আব্বার সামনের চেয়ারে মাথা নত করে বসে আছে! আব্বা এখনও ওভাবেই বসে আছে! উনি বুঝতে পারছেন না এই মুহূর্তে ঠিক কি বলা আর করা উচিত! উনার ছেলের ব্যবহারে এমনিতেই উনি হতাশ তার মধ্যে এখন তানিয়ার চলে যাবার সিদ্ধান্ত । তানিয়াকে মানাও করতে পারছে না যেখানে তার ছেলের কারণেই দুই দুইবার
তানিয়া রক্তাক্ত হয়েছে! কিন্তু এভাবে তো ছেলের সংসার ভাঙ্গতেও দেখতে পারেন না বাবা হয়ে!
-- এত দুর থেকে এসেছো যাও ভেতরে গিয়ে আগে গা গোসল দাও,খাওয়া দাওয়া করো তারপর রেস্ট করো! তারপর দেখা যাক কখন যাবে!
-- না তালই যেতে হবে! ছুটি নিয়ে আসিনি! বলছি কালকেই ডিউটিতে থাকবো!
-- তাই বলে এভাবে.
কথার মাঝেই কারো হাটার শব্দে সেদিকে তাকালো,তানিয়া বোরকা পড়ে একদম তৈরি হয়ে তারপর এসেছে,ছোট একটি ব্যাগ হাতে,
একটু এগিয়ে বললো,
-- ভেতরে আমার বইয়ের একটা বান্ডেল আছে নিয়ে আয়!
তানিয়ার ভাই উঠে দাঁড়িয়ে একবার তানিয়াকে দেখলো,বুকটা মোচড় দিলো,বোনের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে আর কোন কথা বললো না, কিছু একটা চরম খারাপ হয়েছে তা বুঝতে সমস্যা হলো না! ইচ্ছা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করলো না,একদম বাড়ি গিয়ে শুনবে বলে মনস্থির করলো, এরপর হেঁটে তানিয়ার ঘরের দিকে গেল,
-- তুমি তাহলে চলেই গেলেন যাবে এই বুড়ো বুড়িকে ছেড়ে বউমা!
শ্বশুরের আদরমাখা ডাকে তানিয়ার কোমল মন নরম হলেও,তাতে আবেগের ঠাই দিতে চায় না!যার সাথে জড়িত বলেই এই মানুষগুলোর সাথে এত মধুর সম্পর্ক তার সাথেই যখন থাকবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে কোনভাবেই কোন কারণে সিদ্ধান্ত বদলানো যাবে না! তানিয়া বদলাতে চায় না!
-- আমাকে ক্ষমা করবেন আব্বা! আম-আমি পারবো না আর এভাবে থাকতে ! এত অবিশ্বাস নিয়ে থাকা যায় না!
-- আমি জানি আমার ছেলে অন্যায় করেছে কিন্তু তবু একবার যদি ভাবতে!
-- আব্বা ক্ষমা করবেন!আমি আপনাকে অনেক সম্মান করি কিন্তু এখন কোনভাবেই আমার পক্ষে এখানে থাকা সম্ভব নয়!
ছেলের বউকে এর চেয়ে বেশি বোঝানোর মতো কোন যুক্তি-গত কারণ খুঁজে পেলো না!চুপ করে মাথাটা নত করেই রইলো; আম্মা ঘরের দোরে খিল এটে বসে আছে, সকালে উঠে তানিয়ার সিদ্ধান্ত জানার পর অনেক সময় চুপ ছিলো, তার কিছু সময় পর থেকে বোঝানোর চেষ্টা করলে তানিয়া স্পষ্ট জানিয়ে দেয় ও আর কোন ভাবেই এখানে থাকবে না! সাজেদের সাথে সংসারও করবে না ! আম্মাও বুঝলো সাজেদের একটা শিক্ষা দরকার আছে! তাই উনিও আর বারণ করলো না! আম্মা সাজেদের প্রতি বিরক্ত,পরের কথায় যেই পুরুষ ঘরে অশান্তি করে, ঘরের স্ত্রী সন্তানদের প্রতি অন্যায় করে, অবিচার করে, তাদের প্রহার করে তারা আর যাই হোক উত্তম পুরুষ হতে পারে না! উনি নিজের প্রতিই ক্ষুদ্ধ সন্তানকে সঠিক শিক্ষা না দিতে পারায়। তানিয়া নিজের ভাইয়ের উদ্দেশ্য বললো,
-- তুই বাইরে গিয়ে দাড়া আমি আসতেছি!
-- আচ্ছা!
বলেই বইয়ের ব্যান্ডেলটা নিয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই দরজায় খটখট শব্দ এলো,এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো,দরজা খুলে দিতেই বাপ্পী ভেতরে ঢুকলো,তানিয়ার ভাইকে দেখে একটা সৌজন্য হাসি দিলো, তারপর জিজ্ঞেস করলো,
-- কেমন আছো?
-- এইতো ভাই আলহামদুলিল্লাহ!
-- তো এগুলো নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?
-- ঐ বাড়ি যাবে,তাই!
-- পাগল হয়ে গেছো? ও না হয় এখন রাগের মাথায় উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই বলে তুমিও ওর সাথে তাল মেলাবে ! তুমিও কি মেয়ে মানুষ হয়ে গেলে? এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া মেয়েদের মানায় কিন্তু পুরুষের নয় ! তোমাকে আমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান মনে করতাম কিন্তু তুমি আমাকে হতাশ করলে ছোট ভাই!
-- মানে আমি কিছুই বুঝলাম না! আমাকে সকালে ফোন করে বললো এসে নিয়ে যেতে ! এতবার জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে? বললো না! তবে এতটুকু বুঝতে পারছিলাম যে কাঁদতেছিলো! তাই বেশি সময় না নিয়ে চলে আসলাম! এখন মনে হলো যাই হোক বাসায় নিয়ে যাই দুই একদিন থাকলে এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে!তখন নিজেই বুঝবে কি করা উচিত ছিলো!
-- তোমার কি তাই মনে হয়? আমার কিন্তু অন্য কিছু মনে হচ্ছে!
-- মানে?
-- চলো গিয়ে ওখানে বসি! তারপর কথা বলি!
বাপ্পী তুহিনকে সাথে করে নিয়ে সোফায় বসলো বসতে বসতে আব্বার উদ্দেশ্য বললো,
-- আসসালামু আলাইকুম চাচাজান!
আব্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সালামের উত্তর দিয়ে পাশাপাশি বসলেন,
-- দেখো তুমি এখনও ছোট,বিয়েও করোনি তাই সাংসারিক ঝামেলা বুঝো না! তাই তোমাকে বিস্তারিত না বলতে পারলেও এতটুকু বলবো বাসায় গেলে না এখানে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে!স্বামী স্ত্রী মধ্যে মাঝে মাঝেই এমন ঝামেলা হয়,তাই বলে কি সংসার ছেড়ে যেতে হবে?
-- সামান্য কিছু হলে ওর মাথায় ব্যান্ডেজ কেন?
বাপ্পী একটু চমকালো ,মাথায় ব্যান্ডেজের কথা মনে ছিলো না ! এটা অবশ্যই একজন ভাই হিসেবে চিন্তার বিষয়,বাপ্পী তুহিনের দিকে তাকালো, ছেলেটার চোখমুখ শক্ত, বারবার হাতের কব্জি মুচড়াচ্ছে , নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে! স্বাভাবিক, পৃথিবীর প্রতিটি ভাইয়েরই নিজের বোনকে এমন দেখলে রাগ হয়! সেখানে বোন যদি হয় মায়ের মতো স্নেহ তুল্য তাহলে তো তার জন্য নিজের জীবনও কোরবানি করতে পারে! ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাপ্পী বললো,
-- দেখো স্বামী স্ত্রী মধ্যে একটু আধটু হয় তখন কি আর দুজনে হুশে থাকে! তেমনি কালকে তোমার ভাইয়াও ছিলো না!রাগের মাথায় তোমার বোন আসার আগেই ঘরে ঝড় তুলেছিলো! এরপর তোমার বোনের উপর রাগ দেখাতে গিয়ে ধাক্কা মেরেছিলো তাতে টেবিলের কোনায় ব্যথা পায় ,এতেই ওর মাথার পেছনে একটু কেটে গেছে!
-- যাই হোক হয়েছে তো!
-- তো নিয়ে গেলে!
-- চল!
কথা শেষ করার মধ্যেই তানিয়া চলে এলো!
বাপ্পী তানিয়াকে দেখে একটু বিব্রত হলো,কারণ কাল রাতের ঘটনা সবটাই সাজেদ একটু আগে ফোন দিয়ে বলেছে,সাজেদই এখন ওকে আসতে বলছে! বন্ধু তার বউকে মেরে আহত করেছে আর তার জন্য বউ চলে যাচ্ছে,আর তার জন্য এখন তাকে ওকালতিতে নামতে হয়েছে,বিষয়টাতে বেশ বিব্রত হচ্ছে! ওদিকে তানিয়ার মুখ দেখেই খারাপ লাগলো,
পর্ব ২৬
তানিয়া বাপ্পীকে দেখে চোখ নামিয়ে নিলো,ভীষন লজ্জা পাচ্ছে,এই মানুষটাকে ও সবসময় বড় ভাইয়ের চোখে দেখেছে,যেদিন থেকে এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে সেদিন থেকে,সাজেদ বিয়ের পর যখন গেল তখন নিজেই বলেছিলো যেকোন প্রয়োজনে বাপ্পীকে বলতে ! তানিয়া কখনোই তেমন কিছু বলতো না, স্বামীর বন্ধুদের থেকে যতটা দূরে থাকা যায় ততটাই মঙ্গল, অথচ এত চেষ্টা এত সাধনা সবটাই পানি হয়ে গেল,একদম বৃথা!
-- কি অবস্থা তোমার এখন?
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বাপ্পীই প্রথমে শুরু করলো,তানিয়া ইতস্তত করে বললো,
-- এই তো আলহামদুলিল্লাহ!ওঠ!
বাপ্পীকে উত্তর দিয়ে তুহিনকে বললো,তুহিন বোনের কথায় সায় দিয়ে উঠতেই বাপ্পী থামিয়ে দিলো,
-- বলো! তুমিও বসো!
বাপ্পীর আদেশে তুহিন বসলেও তানিয়া এখনও দাড়িয়ে আছে, বাপ্পী তানিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-- আমাকে না নিজের বড় ভাই মানো? আমার কথাও কি শোনা যায় না!
তানিয়া করুন দৃষ্টিতে তাকালো,তানিয়ার চাহনি বাপ্পীর বেশ খারাপ লাগলো, নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বললো,
-- আমি জোর করবো না; আর যতই বলি তোমাকে জোর করার অধিকার আমার নাই! শুধু বলবো আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনে একবার নিজের সাথে বোঝাপড়া করো তারপরও যদি মনে হয় চলে গেলেই এই সমস্যার সমাধান হবে তবে তাই করো কেউ তোমাকে আটকাবে না! কিন্তু যদি আমার কথা শুনো তবে বলবো ছেড়ে চলে গেলেই সব সমস্যার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় না! আর তোমার মতো বুদ্ধিমতীর থেকে এমন হঠকারিতা মানাও যায় না!
-- আমি হঠকারিতা করছি?
-- তোমার মনে হয় না চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত খুবই বাজে!
কার সাথে রাগ করে যাচ্ছো! নিজের স্বামীর সাথে? এই রাগ করে কি লাভ বলো! পারবে এই রাগটা সারাজীবন ধরে রাখতে ? আমি তো নিশ্চিত তুমি যাওয়ার পর ও যদি কোনভাবে অসুস্থ হয় তুমি সেই মুহূর্তে চলে আসবে! তবে গিয়ে তাকে অসুস্থ করে দেওয়ার মানে কি! হ্যা সে কাল যা করেছে নিতান্তই জঘন্য!এর জন্য অবশ্যই শাস্তি সে প্রাপ্য! আর আমার মনে হয় তুমি থেকেই সেই শাস্তি দিতে পারো!অযথা চলে গিয়ে মানুষকে হাসার সুযোগ দিও না!
-- আমার পক্ষে এখানে থাকা কোনভাবেই সম্ভব নয়! যেখানে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস থাকে না সেখানে আর যাই হোক সংসার করা যায় না! আমি অন্যায় করলে সবরকমের শাস্তি মাথা পেতে নিতেও রাজী কিন্তু কারণ ছাড়া অহেতুক অপবাদ মেনে নিতে নয়।
-- তুমি আমার,এই যে তোমার ভাইয়ার কথা শুনো। ঘরে যাও! দরকার হলে আপাতত আলাদা ঘরে থাকো,ওকে আমি দেখছি ওর সাহস কি করে হয় আমার বোনের গায়ে হাত তোলার! ওর সাথে সমস্যা হয়েছে বাইরের লোক, তার ঝামেলা বাইরেই থাকবে সেটা কেন ঘরে নিয়ে এলো?
তানিয়ার বাপ্পীর সাথে কথা বলতে অস্বস্তি হচ্ছে কারণ সাজেদের কাল রাতে বলা কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে।
-- মাথা ঠান্ডা করো,এমন সময় দুই পক্ষেরই মাথা গরম থাকলে চলে না; একজনকে ঠান্ডা থাকতে হয়!
তানিয়া কথা না বলে সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে,আব্বা তানিয়ার উদ্দেশ্য বললো,
-- চলে যেও না মা,তুমি চলে গেলে তোমার এই বুড়ো শ্বশুড় শ্বাশুড়ির কি হবে বলো? তুমি ছাড়া আমরা তো এখন একদমই অসহায়! তুমি পারবে এতটা কঠোর হতে!
তানিয়া চুপ করে দাঁড়িয়েই রইলো, বাপ্পী বললো,
-- বসো,তোমাকে হয়তো কালকের কথা কেউ বলেনি! পুরোটা শুনলে বুঝতে পারতে কাল ওর ওরকম করার কারণ!
তানিয়া বাপ্পীর কথা অনুযায়ী বসলো, এরপর বাপ্পীর দিকে তাকালো,তার মানে ও শুনতে চায়,যদিও সাজেদকে ক্ষমা করবে কিনা তা কেবলই ও জানে,
-- কাল ক্লাবে আড্ডা দিচ্ছিলাম তখন পাশে থেকে কিছু মানুষ.......
এরপর বাপ্পী একে একে সবটা খুলে বললো,যদিও এতে তানিয়ার প্রতি রাগ হওয়ার কারণ খুঁজে পেলো না! তবুও তানিয়ার মনে একটু মায়া হলো! ও নিজের আঘাতে এতটাই ক্ষান্ত যে সাজেদের আঘাতের কথা মনেই ছিলো না। তবেও হৃদয় কোনে হওয়া যন্ত্রনার চিৎকার এখনও এতটাই বেদনায় কাতর করছে যে কোনভাবেই সাজেদকে ক্ষমা করার ইচ্ছা জাগছে না! নিজের সিদ্ধান্তে অটল, এদিকে চোখের পানি ফুরায় না , সাজেদের খারাপ ব্যবহারের থেকে পাওয়া কষ্ট শরীরের কষ্টকে তুচ্ছ করে দিচ্ছে! কিন্তু শরীর জরে পুড়ে যাচ্ছে,মাথাও ভার হয়ে আছে!
তানিয়া যখন নিজের সিদ্ধান্তে অটল সেখানে কারো কিছু বলার থাকে না,এত সময়ে তুহিনও বুঝলো পুরো বিষয়টি, এখন সেও বেঁকে আছে ! বারবার বোনের মুখের দিকে তাকাচ্ছে,আর ভাবছে,
সকালে ,,
তানিয়ার ঘুম ভাঙ্গলে অনুভব করলো ওর মাথাটা অনেক ভার হয়ে আছে , শরীরের ওজনও বেশি মনে হচ্ছে! নিজের পাশে তাকাতেই দেখলো সাজেদ ওকে জড়িয়ে ধরে ওর ঘাড়ের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে! একদম সামনাসামনি! সাজেদের ঠোঁটের কাঁটা জায়গাটা এখন একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে,কেমন কালশিটে হয়ে গেছে! ফর্সা মুখের হালকা গোলাপী ঠোঁট জোড়া কেটে যাওয়া জায়গায় পুরোটাই কালো কালো হয়ে আছে! অপর একটি হাত তানিয়ার মাথার উপর রাখা , ওটাতে ব্যান্ডেজ করা! মাথা ঘুরাতে গিয়েই অনুভব হলো ওর ঘাড়ের দিকে ব্যান্ডেজ করা! তখনই মনে পড়লো রাতে সাজেদকে জঘন্য ব্যবহারের কথা! ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো,সাজেদ নড়েচড়ে উঠলো ,তানিয়ার দিকে তাকিয়ে অপরাধী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
-- বউ কি হয়েছে?
সাজেদের আদুরে ডাক তানিয়ার মন গলাতে ব্যর্থ হলো,ও সাজেদকে সরিয়ে উঠে পড়লো,শরীর তুলতে কষ্ট হলেও কষ্ট করে উঠে খুঁজে বের করলো ব্যাগটা ,সেখান থেকে ফোন বের করে ফোন দিলো তুহিনকে, সাজেদ সবটাই শুধু দেখে যাচ্ছে, একবার ডাক দিলো তাতে তানিয়ার এড়িয়ে যাওয়াই বুঝিয়ে দিলো ওর প্রতি কতটা অনিহা তৈরি হয়েছে!তাই সাহস করে কিছু বলার চেষ্টা করলো না!চুপ করে রইলো! তানিয়া তুহিনকে ফোন দিলো তুহিন রিসিভ করতেই,
-- হ্যালো!
-- ***
-- তুই যেখানেই থাকিস এখনই এদিকে আসার জন্য রওনা দিবি!
--***
--- আয়! আসলেই বুঝবি আমি এতো কথা ফোনে বলতে পারবো না!
কথা বলেই ফোন কেটে দিলো,শরীরটা বড্ড কাঁপছে,ধীর পায়ে হেঁটে বাথরুমে ঢুকলো, বাথরুমে ঢুকে অঝোরে কাঁদতে লাগলো,গায়ে থাকা টি শার্টটা টেনে ছিঁড়ে ফেললো,কলের নিচে বসে দাঁত দিয়ে হাত কামড়ে মাটি চাপড়ে নিজের কান্না থামানোর চেষ্টা করেছে, শব্দ যাতে বাইরে না যায় তাই টি শার্ট মুখে পুড়ে নিয়েছে কিন্তু কোনভাবেই তা পারেনি, শব্দ বাইরেও গেছে আর তা সাজেদের কর্ণকুহুরেও পৌঁছেছে!যেটা সাজেদকে আরো বেশি অপরাধী করেছে!
সাজেদ হাতপা গুটিয়ে মাথা নত করে বসে রইলো, শরীরের ক্ষতগুলো জ্বালা করছে কিন্তু তার ক্ষমতা মনের চেয়ে বেশি নয়! নিজের অপরাধ তাকে খুব পোড়াচ্ছে! রাতে যখন তানিয়া ঘুমিয়ে ছিলো অনেক রাত অবদি তানিয়ার পাশে বসে ছিলো,গলা জড়িয়ে করা ঘাড়ের ব্যান্ডেজটা বুকের পা পাশে বারবার আঘাত করেছে,রাগে নিজের হাত দুটো বারবার আঘাত করেছে দেওয়ালে তাতে হাতের বেশ কয়েক জায়গা ছুলেও গেছে!
পায়চারি করেছে, ফুঁপিয়ে কেঁদেছে, কোনভাবেই বোঝাতে পারছিলো না কিভাবে ও তানিয়াকে এভাবে আঘাত করলো; কিভাবে?কিভাবে?
এরকম করে অর্ধেকেরও বেশি রাত কাটিয়েছে! এরপর এক সময় তানিয়ার পাশে এসে বসে, অনেক সময় নিয়ে তানিয়ার সমস্ত মুখ জুড়ে ছোট্ট ছোট্ট চুমু দিয়ে ভরিয়ে দেয়! গায়ের শাড়ীটা সরিয়ে ব্লাউজটা খুলে ফেলে এরপর হাতের যেখানে খামচে ধরেছিলো সেখানে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দেয়! হাতের বাহুতে মাথা রেখে অনেক সময় কাঁদে , কান্না থামিয়ে আবারও চুমু দিতে থাকে, এরপর আবারও মুখের পুরোটা জুড়ে চুমুতে ভরিয়ে দেয়! তারপর উঠে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে টাওয়াল ভিজিয়ে আনে! তানিয়ার সমস্ত শরীর বস্ত্রহীন করে ভেজা টাওয়াল দিয়ে মুছে দেয়! এরপর একটা পাতলা টি শার্ট আর প্লাজো পড়িয়ে দেয়! তারপর নিজে ফ্রেশ হয়ে টি শার্ট আর ট্রাউজার পড়ে তানিয়ার উপর নিজের এক হাত রেখে অপর হাতটা তানিয়ার ঘাড়ের কাছে রেখে ঘুমিয়ে পড়ে! এর মধ্যে ভুলেই যায় নিজের ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগানোর কথা,ব্যান্ডেজ করা হাতটার ব্যান্ডেজ খুলে ফেলেছে ,তাতেও রক্ত চুঁইয়ে ছোপ ছোপ দাগ পড়ে যাচ্ছে! কিন্তু সাজেদের কোন দিকেই খেয়াল নেই,খেয়াল কেবল তানিয়ার ক্ষততে যেটা সে নিজেই তৈরি করেছে!
তানিয়া যখন বসার ঘরে বসে নিজের কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলো,আর সবাই ওকে বুঝাচ্ছিলো ঠিক তখনই সাজেদ আসে! এত সময় ঘরেই বসে ছিলো! বাপ্পীকে ফোন করে ঐ আসতে বললো,বাপ্পীর কথা তানিয়া খুব মানে, কিন্তু যখন মনে পড়লো রাতে ওর বন্ধুদের সাথে কথা বলার জন্য কি শব্দ তানিয়াকে বলেছিলো! তখনই উঠে দাঁড়ালো, বেশ সময় পায়চারী করলো! কোনভাবেই তানিয়াকে আজ বাপের বাড়িতে যেতে দেওয়া যাবে না! আজ গেলে আর কখনোই ফিরে আসবে না!দ্রুত বেরিয়ে গেল, বসার ঘরে একদম তানিয়ার সামনে গিয়ে ডানে বামে কোথাও তাকালো না , শক্ত করে তানিয়ার বাহু ধরে দাঁড় করিয়ে কোনদিকে না তাকিয়ে একরকম টেনেই ঘরের দিকে নিয়ে গেল,এই অল্প সময়ে ঠিক কি হলো এটা বুঝতেই তানিয়ার অনেক সময় লেগে গেল, শুধু তানিয়াই না , সাজেদের এহেন কর্মকান্ডে হতভম্ব উপস্থিত সকলেই, আম্মা মাত্রই ঘর থেকে বেরিয়েছে, তখনই দেখলো সাজেদ হনহনিয়ে এলো আর তানিয়াকে টানতে টানতে নিয়ে গেল!
পর্ব ২৭
তানিয়া অনুভব করছে ওর ঘাড়ে গরম তরল কিছু,তার মানে সাজেদ কাঁদছে! নিজের রাগকে আর ধরে রাখতে পারলো না বলেই মনে হয়! কিভাবে পারবে? কোন পুরুষ মানুষ কাঁদে এটা তানিয়া আজ প্রথম দেখলো! কেন কাঁদছে? তানিয়ার জন্য?
সাজেদ তানিয়াকে ঘরে এনেই ওর হাতের ব্যাগটা ছুড়ে মারে,দরজা বন্ধ করে কিছু সময় এদিকে ওদিকে পায়চারি করে, তানিয়া কেবল সাজেদকে দেখেই যাচ্ছে! এত অস্থির সাজেদকে ও চিনে না! এতদিনেও এই সাজেদকে দেখেনি,সবাই বলতো সাজেদ খুব বুদ্ধিমান,স্থির আর ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া মানুষ অথচ এই মানুষটাই ওর সাথে প্রতিবার হঠকারিতা করে!
সাজেদ হুট করেই তানিয়াকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে,একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়,তানিয়া কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না! সাজেদকে জড়িয়েও ধরে না! কিন্তু সাজেদ যেন তানিয়াকে নিজের বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে চাইছে! বাঁধন শক্তের চেয়েও শক্ত করছে!তার সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে কান্নার ফলে শরীরের কাঁপুনি!
তানিয়া যখন অনুভব করলো সাজেদ কাঁদছে, সাজেদের শরীর কাঁপছে, সাজেদের শরীর অনেক গরম তখনই নিজের রাগ অভিমান সবটাই দূরে সরিয়ে রাখলো!কেন জানি মনে হলো কিছু জিনিস চাইলেই ছেড়ে যাওয়া যায় না! এই যে সাজেদের অস্থিরতা, এটার কারণ ও ! ওর জন্য সাজেদের মতো ভদ্রলোকও পাবলিকলি মারামারি করে, পুলিশের দ্বারা হেনস্থা হয়! এটা তো ওর জন্যই করেছে! তাছাড়া রাতে আঘাত করেছে তার পর থেকেই কেমন চুপসে গেছে, সকালে ঘুম থেকে উঠার সময় দেখেছে ওকে কিভাবে আঁকড়ে ধরে ছিলো, সামান্য গোঙানির শব্দে ধরফরিয়ে উঠেছে, সারাদিন ঘর থেকে বের হয়নি; এখনও না খাওয়া! অথচ সে নিজেও আহত হয়ে আছে! কাল থেকে এখনও একবারও ওষুধ খেতে দেখেনি, কিন্তু তানিয়াকে ঠিকই সবাই মিলে ওষুধ খাবার সবটাই খাইয়েছে,জোর করে হোক! বাপ্পীর কথা অনুযায়ী, কালকে মারামারির সময় হাতে মোচড় খেয়েছিলো, ধাক্কা দিতে গিয়ে কনুইয়ে ধারালো কিছুর আঘাতে অনেকখানি কেটে গেছে! সবটাই হয়েছে তানিয়ার জন্য! কোথা না কোথাও তানিয়ার এখন নিজেকেই অপরাধী লাগছে,কি হতো শুরুতেই যদি মারুফের অসভ্যতার কথা আর কাউকে না হোক অন্তত সাজেদকে বলতো!তবে নিশ্চয়ই জল এতদুর গড়াতো না! কেউ তানিয়ার চরিত্র নিয়ে যেমনি প্রশ্ন তুলতে পারতো না তেমনি সাজেদকে যেখানে সেখানে হেনস্থা হতে হতো না! একজন কর্মঠ পুরুষকে যখন কেউ খোঁচা মেরে বলে সে তার বউকে ভাড়া দিয়ে খায় তখন সেই কেবল বুঝে তার কোথায় লাগে! এর মধ্যে তানিয়া সাজেদের কথার অমান্য করেছে! সাজেদ বারবার বলেছে এত কিছু করা লাগবে না! দরকার হলে বাসায় বসে বাচ্চাদের ফ্রিতে পড়াক, অর্থনৈতিক সমর্থনে সাজেদ পাশে থাকবে! কিন্তু তানিয়া সেগুলোর কোনটাই করেনি বরং এতদিন আসার পরও তানিয়া নিজের দৈনন্দিন কাজে এতই ব্যস্ত যে সাজেদকে সময়ই দিতে পারেনি! হয়তো এর জন্যই এতটা ক্ষোভ জমে গেছে,তার সাথে যোগ হয়েছে বাইরের মানুষের তিক্ত কথা, জঘন্য অপবাদ! তানিয়া স্থির থাকলেও সাজেদ পারেনি,তাই তো কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
-- প্লিজ যেও না! তুমি চলে গেলে বাঁচব না!
এতটুকুই যথেষ্ট একজন স্ত্রী রাগ ভাঙানোর জন্য,তানিয়ার মতো মেয়েদেরও ! যতই মুখে বলুক থাকবে না,পারবে না এর সাথে সংসার করতে দিনশেষে তানিয়াও জানে ওকে এই সংসারেই আসতে হতো! কিন্তু ঐ যে অভিমান সেটাই পারছে না সরিয়ে দিতে! সাজেদ বিরবির করে বলে যাচ্ছে তার সাথে তানিয়াকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে,
-- সরি,আমি ইচ্ছে করে করিনি,রাগে মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল,জানোয়ার হয়ে গিয়েছিলাম! তুমি যেকোন শাস্তি দাও মাথা পেতে নিবো কিন্তু প্লিজ ছেড়ে যেওনা! মানতে পারবো না!
সাজেদ বিরবির করে বারবার একই কথা বলে যাচ্ছে,তানিয়া নিজের শক্ত মনোবল ভেঙে হাত উঁচিয়ে সাজেদকে জড়িয়ে ধরলো, বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়লো। তানিয়ার কান্না সাজেদকে আরো অস্থির করে তুললো,ও তানিয়াকে বুক থেকে সরিয়ে দুহাতে মুখটা তুলে ধরলো, বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চোখটা মুছে দিলো, এরপর তানিয়ার সমস্ত মুখ জুড়ে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে থাকলো, তানিয়ার কান্না থেমে হিচকিতে পরিণত হয়েছে! সাজেদ তানিয়ার কপালের সাথে নিজের কপালে মিলিয়ে,
-- যাস না পাগলী, তোকে ছাড়া নিঃশ্বাসও নিতে পারবো না! তোকে আঘাত করে নিজেকেই শেষ করে ফেলতে ইচ্ছে করছে! বড্ড ভালোবাসি যে তোকে,তাই নিজের সব রূপই তোর সামনে তুলে ধরি!
স্বামীর আদুরি কথায় তানিয়া আবারো কাঁদতে লাগলো,তার সাথে বিরবির করে অভিযোগ করে যাচ্ছে,
-- আপনি খুব খারাপ! খুব বাজে! আপনার ঘরে বউ থাকা উচিত না! অসভ্য লোক,বাইরের ত্যাজ ঘরের বউকে দেখায়!
এরকম অভিযোগ আর কান্না কাঁটায় ব্যস্ত এই দম্পতি, এদিকে তাদের নিয়ে চিন্তায় অস্তির বাড়িতে উপস্থিত অন্য সদস্যরা!
--------------------------------------------------
সকল প্রেমিক স্বামী হয়, কিন্তু সব স্বামী প্রেমিক হয় না ! এটা তো কেবল নারীটির কিসমতের উপর নির্ভর করবে সে কেমন স্বামীর সুখ পেলো! এই যে তানিয়া! আপাতত স্বামীর প্রেমিক রুপে আচ্ছন্ন হয়ে আছে;যেই মানুষটিকে কেবল স্বামীতেই কল্পনায় রেখেছে,সে যে কখনো প্রেমিক হবে তাকি তানিয়া জানতো!স্বামীর স্বামী রুপে যতটা মুগ্ধ হয়েছিলো তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি মুগ্ধ হচ্ছে তার প্রেমিক রুপে!
-- বউ!
সাজেদের আদুরে কন্ঠের ডাকে ভাবনার রাজ্য থেকে বর্তমানে ফিরে এলো,সাজেদ বাথরুম থেকে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসলো,এসেই বিছানায় তানিয়ার পাশে বসলো,তানিয়া চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে, সাজেদ তানিয়া মাথার পাশে বসে উপর হয়ে তানিয়া কপালে একটা চুমু দিলো,
-- উঠতে হবে না!
-- উঁহু!
-- উঠো! আমাদের বের হতে হবে!
-- আরেকটু ঘুমাতে ইচ্ছে করছে!
-- এখন আর কোন ঘুম নয়! উঠো!
সাজেদের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত উঠতেই হলো,গায়ে সাজেদের টি শার্ট, কোনরকম সেটা সহ নিজেকে চাদরে মুড়িয়ে উঠলো,ওকে এভাবে দেখে সাজেদ হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো,
-- ওভাবে ঢেকে রাখার কি আছে? যা দেখার তা আগেই দেখেছি!
-- অসভ্য!
কথা শেষ করেই তানিয়া নিজের হাত দিয়ে সাজেদের বাহুতে হালকা চাপড় মারলো! সাজেদ তানিয়ার দুই হাত নিজের দুই হাত দিয়ে আটকে একদম সামনে নিয়ে আসলো,এক হাতে দিয়ে দুই হাত ধরলো অন্য হাত দিয়ে তানিয়ার একগাল চেপে ধরে একদম মুখের কাছে নিয়ে বললো,
-- স্বামীর গায়ে হাত তুলো নারী! তোমার কি জাহান্নামের ভয় নেই!
-- ব্যথা পাই!
-- এখনই ব্যথা কমিয়ে দিচ্ছি!
সাজেদ কথা শেষ করেই তানিয়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে নিলো!
---<<<<<<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>>>>>>>--------
-- ভাবী তোমার ঠোঁটে কি হয়েছে?
-- কো-কো-কোথায়!
-- ঐতো কেমন ফুলে আছে!
সানজানার কথায় তানিয়া নিজের ফোনটা বের করে তার মধ্যে নিজেকে দেখতেই লজ্জা পেল, এটা সাজেদের কাজ, তখনকার কথা মনে হতেই কেমন লাল বর্ণ ধারণ করলো শ্যামলা বদন! সানজানা ভাবীর ভাবভঙ্গি দেখে নিজেও লজ্জা পেল! ভাবিকে যে এই মুহূর্তে এমন প্রশ্ন করা ঠিক হয়নি সেটা খুব ভালোই বুঝতে পারলো!তার পরমুহূর্তেই বেরিয়ে এলো সাজেদ,সাদা শার্টের সাথে ব্লু জিন্স সাথে ব্লু শেড কালো রোদ চশমা! ইন করা শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা, কোমরের দিকের অংশ টানতে টানতে বের হতেই সামনাসামনি হলো দুই ননদ ভাবীর, দুইজনের দৃষ্টি দুই রকমের, একজন মিটিমিটি দুষ্টু হাসি দিচ্ছে তো আরেকজন চোখ রাঙিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে যাচ্ছে! সাজেদ কোনটারই কারণ বুঝতে পারছে না!
-- কি এভাবে তাকাচ্ছো কেন? যেন এখনই খেয়ে ফেলবে!
আর এই তুই এভাবে শাকচুন্নী মার্কায় হাসি দিচ্ছিস কেন? কি সমস্যা!
-- সমস্যা তো তুমি আর একটু পরে বুঝবে, আমি যাই গাড়ীতে গিয়ে বসি!
তাড়াতাড়ি এসো ভাই ভাবী!
বোনের কথা আগামাথা না বুঝে বেকুবের মতো বউয়ের দিকে তাকালো,ওমা তার চোখের চাহনিতো অদ্ভুত; কেমন করে তাকিয়ে আছে তানিয়া!
-- কি কি হয়েছে! এভাবে তাকিয়ে থাকো কেন?
-- কি করেছেন আপনি এটা?
--কি করেছি?
-- দেখেন!
ইশারায় তানিয়া নিজের ঠোঁটের দিকে তাকাতে বলে,
--কি চুমু চাই? সেটা বললেই হয় এভাবে চোখ রাঙানোর কি আছে! আমাকে বললে তো আমি এমনিতেই দেই!এইসবের জন্য আমি সবসময় রেডি!
সাজেদ কথা বলেই তানিয়ার দিকে এগিয়ে যেতেই তানিয়া নিজের আঙ্গুল দ্বারা সাজেদের পেটে গুঁতো দিয়ে আটকে দেয়,ধীর আওয়াজে বলে,
-- অসভ্য পুরুষ সবার সামনে আমাকে লজ্জায় না ফেললে চলে না; কি করছেন আমার ঠোঁটের অবস্থা; এখন আমি কিভাবে সবার সামনে যাবো?
-- যাওয়া যাবে না তাই না! তাহলে এক কাজ করি ওরাই যাক,আমরা ঘরেই থাকি, আরও কিছু কারণ বানাই রাতে একদমই ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ যায়!
-- এই এই একদম না! দূরে থাকুন আমার থেকে!
তানিয়া কথা শেষ করেই দৌড়ে বেরিয়ে যায়, সাজেদও হাসতে হাসতে ওর পিছু নেয়।
পর্ব ২৮
সাজেদ তানিয়া অসুস্থতা কাটিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে ঘুরে এসেছে বেশ কয়েকদিন, এদিকে সাজেদের ফিরে যাওয়ারও সময় ঘনিয়ে এসেছে,এখন তাই আত্নীয়-স্বজনদের সাথে শেষবারের মতো দেখা সাক্ষাৎ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে! তাই কাল রাতে ইন্ডিয়া থেকে ফিরে এসেই আজ সকালে সাজেদের বড় চাচার বাসায় দাওয়াতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বের হলো!
এতদিনের ঘুরাঘুরিতে তানিয়া একটু বেশিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ,তাই যেতে চাইছিলো না কিন্তু সাজেদের জন্য যেতে হচ্ছে! চলে গেলে আবার কবে না কবে আসবে তার ঠিক নেই, ততদিনে কে বাঁচে আর মরে সেই চিন্তা করে অবশেষে সব ক্লান্তিকে দূরে ঢেলে বেরিয়ে গেল!
----------------------------------------------------------
-- আসসালামু আলাইকুম ।
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম! কি অবস্থা তোমাদের!
-- এইতো বড় আব্বু আলহামদুলিল্লাহ, তোমার কি অবস্থা বলো!
-- আমরাও আলহামদুলিল্লাহ! তা আসতে সমস্যা হয়নি তো!
-- না না আমাদের কোন সমস্যা হয়নি!
-- যাক আলহামদুলিল্লাহ! আমি তো আরো চিন্তা করছিলাম বড় রাস্তাটা ভাঙ্গা, কিভাবে গাড়ী নিয়া এতদূর আসবা!
-- নাহ অসুবিধা হয় নাই!
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সবার সাথে সালাম আদাব বিনিময় করে কুশলাদি শেষ করে সোফায় গা ছেড়ে দিলো, সাজেদকে দেখে ওর বড় ভাইয়ের ছেলে দৌড়ে ওর কোলে বসে পড়লো,
-- চাচু!
-- হ্যা চাচু,তুমি স্কুলে যাওনি?
-- উহুম!
-- কেন?
-- মা বলেছে তুমি আর চামনি আসবে!তাই আমি যাইনি!
-- ওহ তুমি আমাদের জন্য যাওনি!
-- হুম!
-- তুমি তোমার চাচু আর চামনিকে এত্ত ভালুবাসো!
সাজেদ নিজের ভাতিজার সাথে খুনসুটিতে মেতে উঠেছে , এদিকে তানিয়া সবার সাথে কথা বলত বলতে রান্না ঘরে গিয়ে ঢুকলো, সেখানে বড় চাচী আর তার বড় ছেলের বউ রান্না করছে,
-- আসসালামু আমি বড় আম্মু! ভাবী আসসালামু আলাইকুম!
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম বউমা! কেমন আছো তোমরা?
-- আলহামদুলিল্লাহ! ভাবী কি করো?
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম, এই তো চাটনিটা একটু নাড়া চড়া করছি,তোর কি অবস্থা ? কেমন বেড়ালি দু'জনে বল?
-- ভালোই,তুমি ফ্রি হলে তোমাকে আমাদের ট্রিপের ছবি দেখাবো নে!
-- হ্যা, খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফ্রি হই তারপর শান্তিতে দেখবো!
-- আমাকেও দাও কিছু করি,!
-- না না ,অনেক দুর থেকে জার্নি করে এসেছো ,এখন গিয়া বিশ্রাম নাও!
-- আরে অসুবিধা হবে না,গাড়ীতে করে এসেছি, সমস্যা কোথায়!
-- তবুও!
-- ছোট বউ ঘরে যাও,গিয়ে বিশ্রাম নাও, তারপর যদি মনে হয় পারবা তখন দেখা যাইবো কি করতে দেই?
-- বড় আম্মু!
-- ঘরেই তো কত কাজ করো শুনি,তোমার শ্বাশুড়ি তো ফোন দিলেই কেবল খালি তার বউমার প্রশংসা করে! তার বউমা এই করে,তার বউমা সেই করে!
-- প্রশংসার ফুলঝুড়ি ছুটে আম্মা!
-- হ্যা, অবশ্য ছোট বউও প্রশংসার দাবিদার, তাকে করতেই হতো!
-- কি যে বলেন আপনারা! আম্মা আমাকে অনেক ভালোবাসে তাই একটু এমন করে! তা না হলে..
-- হয়েছে লজ্জা পাওয়ার কিছু হয় নাই এইখানে, যাও ঘরে গিয়া হাত মুখ ধোও!
তানিয়া বড় জায়ের কথা আর চাচী শ্বাশুড়ির আদেশে ঘরে ফিরে এলো! বসার ঘরে আসতেই ছোট্ট মুঈন চাচাকে ছেড়ে চাচীর কাছে ছুটে এলো,
-- চামনি! কুমন আছো?
-- এই তো চামনি অনেক ভালু আছে! আপনি কুমন আছেন?
-- ভালু!
ছোট্ট মুঈন অনেক সময় ধরে তানিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো, কিন্তু কিছু বললো না।তানিয়াও বেশ কিছু সময় এদিকে সবার সাথে দুষ্টুমি করে ভেতরে চলে গেল, সেখানে গিয়ে বোরকা খুলে একদম হাত মুখ ধুয়ে ঝরঝরা হয়ে বসার রুমে আসে!
এর মধ্যেই হালকা নাস্তা দেওয়া হয়েছে, সাজেদ সানজানা, আব্বা, আম্মা, বড় চাচা, তার মেজো ছেলে , তার ছেলে মেয়েরা এসেছে তারাও বসে এক সাথে নাস্তা করছে, সানজানাকে দেখে সাজেদের মেজো ভাইয়ের বউ উঠে দাঁড়ালো,
-- আসসালামু আলাইকুম!
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাবী! কেমন আছেন?
-- এই তো আলহামদুলিল্লাহ!
-- এই এক মিনিট তোমার ঠোঁটে কি হয়েছে? এমন ফুলে আছে কেন?
মেজো ভাবীর কথায় সাজেদের কাশি উঠে গেছে,আর তানিয়া নিজের মুখে শাড়ীর আঁচল গুজে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে,অন্যরাও তানিয়ার দিকে প্রশ্নাত্নক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে,মুঈন বললো,
-- চামনি তুমাকে কি পিপায় কামড় দিয়েছে?
-- হ্যা বড় পিঁপড়ায়!
রান্না ঘর থেকে প্রিচ নিয়ে আসতে আসতে কথাটা বললো,বড় ভাবী! সাজেদের কাঁশি উঠা আর তানিয়ার হাবভাব দেখে মোটামুটি সবাই বুঝতে পারছে ব্যাপারটা, তানিয়ার তো ইচ্ছে করছে মাটি খুঁড়ে তার মধ্যে ঢুকে যেতে, এদিকে সাজেদ কোনরকম কাঁশি থামিয়ে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আছে;যেন এখানের কোন কথাই সে শুনতে পারছে না!
এদিকে মেজো ভাবীও বিষয়টি বুঝতে পেরে তানিয়ার চারিদিকে ঘুরে ঘুরে গুনগুন করছে,
-- " তোমার মধু মাখা পানে পরাণ ধইরা টানে"
তানিয়া কোন কথা না বলে স্থান পরিত্যাগ করাই উত্তম মনে করলো,তাই দেখে সানজানা,মেজো ভাবী,বড় ভাবী হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে, এদিকে বিপদে পড়েছে বড়রা! সাজেদ নির্লজ্জের মতো ঐ অবস্থাতেই বসে আছে,তাই দেখে মেজো ভাই সাজেদের পিঠে চাপড় মেরে বলে,
-- বেলাজ কোথাকার! এভাবে বেচারিকে শরমে না ফেললেও পারতি!
নিজের কথা শেষ করেই সেও স্থান ত্যাগ করলো,বড়রা ছোটদের এইসবে কান দিলো না তারা তাদের মতো দৈনন্দিন জীবনের আলোচনা করছে!
খাওয়া দাওয়া শেষ করে বাকীটা দিন এভাবেই আনন্দ উল্লাস করে কাটালো। মুরব্বিদের অনেক স্মৃতিবিজড়িত কাহিনীর শ্রোতা হিসেবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিলো ছোটরাও, তাদের খুনসুটিতে মেতে রইলো বড়রাও! এক পর্যায়ে বড়রা উঠে গেলে,সবাই আবার তানিয়া সাজেদকে নিয়ে মজা করতে শুরু করে! তানিয়ার ঠোঁটে এখন স্বাভাবিক হলেও, কামড়ের কারণে দাগ হয়ে
গেছে, তাই নিয়ে সবাই সাজেদকে পচাচ্ছে! এদের এই খোঁচাখুঁচিতে লজ্জায় তানিয়ার জানপ্রাণ যায় যায় অবস্থা!
তানিয়া সাজেদ সবার মধ্যমনি হয়ে বসেছে বৈঠক ঘরের বারান্দায়! জায়গাটি বেশ বড়, একদম মাঝারি সাইজের উঠান বলা যায়! যেহেতু বৈঠকে বসে অনেকসময় পুরো খান্দানের লোক উৎসবের দিনগুলোতে আনন্দ করে তাই জায়গাটা বড় করেই বানিয়েছে!
তারা ভর্তি বিশাল অম্বরের মাঝে রুপালি থালার ন্যায় চকচকে চন্দ্র, খোলা আকাশের নিচে পাকা জমিনের উপর মাদুর বিছিয়ে,বোল ভর্তি চানাচুর, টমেটো, কাঁচামরিচ,ধনিয়াপাত,পেঁয়াজ,আচারের সরিষা তেল দিয়ে মাখানো দেশি মুড়ি মাখা! তার সাথে বৈঠকখানার বারান্দার পাশ জুড়ে লাগানো সন্ধ্যা মালতী আর কচি ঘাসের মিষ্টি গন্ধ ফুরফুরে বাতাসকে করে তুলেছে মোহনীয়!কেমন আবেগী হয়ে উঠে প্রতিটি প্রেমিক মন! শিহরিত হয়ে উঠে কিশোর কিশোরীদের প্রথম অনুভূতি! পরিবেশকে সঞ্চালনায় তার সাথে বেজে চলেছে পুরানো দিনের বাংলা রোমান্টিক গান,
কিছুটা স্বপ্ন আর কিছুটা সত্যি
ফাঁকি তো নেই কোথাও একরত্তি
তুমি আছো আমি আছি
ছুঁয়ে ছুঁয়ে কানামাছি
কিছু রোদ, কিছু মেঘ, কিছু কুয়াশায়
(কথা:- কিশোর মজুমদার, সুরঃ সুব্রত পোদ্দার, সংগ্রহ:- গুগল)
সবাই টুকটুক করে মুঠো ভর্তি মুড়ি মাখা নিচ্ছে তার পাশাপাশি তানিয়া সাজেদের হানিমুনে গিয়ে ঘুরার ছবি দেখছে তার সাথে সমান তালে চলে যাচ্ছে ওদেরকে নিয়ে মজা করা!
সাজেদ প্রথমেই তানিয়াকে নিয়ে কাশ্মীর যেতে চেয়েছিলো কিন্তু তানিয়ার কথা ছিল যেখানে দেশই ঘোরা হলো না সেখানে বৈদেশে ঘুরে কি স্বাধ! তানিয়ার কথায় সাজেদ আর বেশিদূর ভাবেনি, তাছাড়া তানিয়া এখনও নিজের দেশই সিকি ভাগের মতো দেখেনি সেখানে আসলেই বিদেশ গিয়ে কি বুঝবে প্রকৃত সৌন্দর্যের!
আমাদের দেশের অধিকাংশ ধনী লোকের সমস্যা হলো, এরা কিছু সময় আর অর্থ হলেই চলে যায় ইউরোপ আমেরিকার দর্শনীয় স্থানে অথচ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশেই রয়েছে! হয়তো তারা অনেকেই ঠিক মতো নিজের দেশের এই সৌন্দর্যের খবরও জানে না! অবশ্য এতে কেবল তাদের একারই দোষ দেওয়া যায় না! কারণ আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলো এখনও উন্নতির নিম্নে রয়েছে,এত সুন্দর সুন্দর জায়গা থাকতেও কেউ তার হদিস পায় না কেবল প্রচারণার অভাবে! আবার যেগুলো প্রচারনার মাধ্যমে পরিচিত লাভ করেছে সেখানেও বিদ্যমান বহু সমস্যা! থাকার সমস্যা, যাতায়াত সমস্যা, নিরাপত্তা সমস্যা সহ আরো নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় দর্শনার্থীদের! এক্ষেত্রে বেশি স্বীকার হয় নারীরা! এমনিতেই আমাদের দেশের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম প্রধান দেশের মেয়েদের একা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারটা খুব সহজেই গ্রহন করেনা সমাজ সংসার! সেখানে যদি থাকে নিরাপত্তায় ভোগান্তি তবে তো কথাই নেই!অথচ ইউরোপ আমেরিকার মতো বিশাল দেশেও মেয়েরা অহরহ বেরিয়ে যাচ্ছে দেশ ভ্রমনে,এটা অবশ্যই তাদের অত্যাধিক গোছানো সুন্দর শাসন ব্যবস্থার কারণেই সম্ভব হয়েছে, তাদের নিয়মতান্ত্রিক পরিচ্ছন্ন যাতায়াত ব্যবস্থা দর্শনার্থীদের আগ্রহ কয়েকগুণ করে তুলে!তার সাথে পর্যটন কেন্দ্রের পরিচ্ছন্ন পরিকল্পিত ভাবে সাজানো গোছানো পরিবেশ মানুষকে করে আরো বেশি আগ্রহী!যেই কারণে ঐসব দেশের যেকোন পর্যটন শিল্পের চাহিদা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে,! তাইতো আমাদের মতো দেশে বসবাসরত বহু ধনীর পছন্দের প্রথম তালিকায় থাকে বিদেশ ভ্রমন!
তবে ইদানিং সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের পর্যটন শিল্পেরও উন্নতি হচ্ছে!যার কারণে আমাদের দেশের পর্যটন শিল্পেরও চাহিদা বাড়ছে,তার সাথে বাড়ছে ভ্রমন পিপাসু মানুষদের নিজের দেশকে জানার আগ্রহ! দেশকে সমস্ত বিশ্বের কাছে তুলে ধরার আগ্রহ!হয়তো এভাবেই সারা বিশ্বের কাছে আমাদের মাতৃভূমিও জনপ্রিয়তা লাভ করবে নিজের অপার সৌন্দর্যের প্রদর্শন করিয়ে! দিনদিন বাড়বে বৈদিশিক পর্যটকের আনাগোনা, বাড়বে পর্যটন ক্ষেত্রে সরকারি কোষাগারের আয়ের জমা!
আমরা সবাই চাই সারা বিশ্ব দেখুক আমাদের মাতৃভূমির সৌন্দর্য, আমাদের মায়ের তুল্য দেশের সৌন্দর্য, তার সাথে উপভোগ করুক বাঙালিয়ানা, বাঙালির আপ্যায়ন!অনুভব করুক প্রকৃত মাটির গন্ধে বেড়ে উঠা কৃষিভিত্তিক এই কাদামাটির দেশের মানুষের ভালোবাসা!নদীর তীরে গড়ে উঠা যোদ্ধাদের সাহসীকতা! উচু পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা বাঙালির অস্তিত্বের আরেক সুন্দর অংশ! আঞ্চলিক গানের তালে বলে বেড়ানো মনের কথা, জলরাশির উচ্ছাসে ভেসে বেড়ানো চিরসবুজ মায়ের অপার সম্ভাবনাময় সৌন্দর্যের কোনটাই যে ফেলনা নয় তা কেবল বোঝানোর সময়, এবং তা আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই সম্ভব বোঝানো!
পর্ব ২৯
ইদানিং তানিয়ার শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না,এই তো সেদিন কেমন সবটা ভাসিয়ে দেওয়ার মতো করেই বমি করলো! তাছাড়া ভালো মন্দ যেকোন খাবারেই নাকি গন্ধ পায়! কাশ্মীরে যেখানে যায় মানুষ সুস্বাদু আর মজাদার খাবার খেতে সেখানেও কোন কিছু ঠিকঠাক খেতে পারেনি, বিশেষ করে মাছ আর দুগ্ধ জাতীয় কোন খাবারই তানিয়ার মুখে লুচেনি! তখন সাজেদ ব্যাপারটি খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি কারণ স্থান পরিবর্তনের কারণে অনেকেরই এমন সমস্যা হতে পারে!
তবে ইদানিং বিষয়টি চোখে পড়ার মতো সমস্যা হচ্ছে! এমনিতে তানিয়ার গ্যাসের সমস্যা আছে, যার কারণে প্রায়ই এমন হয়, কিন্তু তাছাড়াও তানিয়ার ঘনঘন জন্ডিসের সমস্যা হয়!তবে এবার লক্ষণ গুলো আরো বেশি প্রকোপ আকার ধারণ করছে,যেমন একদম আলসে হয়ে যাচ্ছে,দুই তিন মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পরই বসার জন্য উছপিছ করে, আবার বসার কিছু মুহুর্তেই শুয়ে ঘুমিয়ে যায়!চেহারাও কেমন ভেঙে যাচ্ছে,রাতে ঘুম কমে যাচ্ছে তার সাথে নাকি শরীরের ওজন বাড়তি মনে হচ্ছে অথচ তানিয়ার শরীর একদম শুকিয়ে যাচ্ছে!
আম্মার মনে হলো অন্য কোন সমস্যা,সাজেদকে বলার চেষ্টা করেও বললো না যতই হোক বিবাহিত ছেলেকে এভাবে বলতে কিছুটা লজ্জা লাগছিলো! আর তানিয়া বরাবরই নিজের প্রতি উদাসীন!তাই আম্মা কৌশলে ছেলের কানে কথাটা তুললো,
-- আব্বা!
-- জ্বী আম্মা!
-- তোমার উচিত বউমআরএ নিয়া হাসপাতালে যাওয়া! একবার গিয়া দেখো ডাক্তার কি বলে?
-- হ্যা আম্মা আমিও তাই ভাবছি! ভাবছি কি আমি তো কালকে ওকে বললাম কিন্তু তুমি তোমার বৌমাকে তো চেনো সে কোনমতেই ডাক্তারের কাছে যাবে না! এখন ও কি বাচ্চা যে আমি ওকে জোর করে নিয়ে যেতে পারি বলো?
--যেতে না চাইলে তো জোর করেই নিয়ে যেতে হবে এভাবে তো অসুস্থ ফেলে রাখা যাবে না! তাছাড়া তাছাড়া তোমার বউকে তুমি জোর করতে না পারলে কে করবে বলো? আমি বলি কি বুঝিয়ে শুনি দেখো আজকেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও; আমার কিন্তু লক্ষণ ভালো ঠেকছে না!
আম্মার কথায় সাজেদের হাত থেমে গেল, ল্যাপটপের বাটনে হাত থামিয়ে আম্মার দিকে ফিরে বললো,
-- তুমি কি ভয়ানক কিছু চিন্তা করছো আম্মা?
-- আল্লাহ না ভয়ানক কিছু ভাবছি না তবে যা ভাবছি তাও তো নিশ্চিত না তাই বলি কি তুমি ডাক্তারের কাছে গিয়ে নিয়ে একবার চেক করে দেখো! আমার মনে হয় আমাদের জন্য খুশির খবর আছে!
-- খুশির খবর!
-- হ্যা তুমি গিয়ে দেখো!
-- কিন্তু আম্মা!
-- আম্মা আম্মা কইরো না আব্বা যা বলছি তাই কর তুমি নিজেই উত্তর পাইয়া যাবা!
সাজেদ হতভম্ব হয়ে আম্মার কথা শুনলো, তানিয়াকে নিয়ে চিন্তিত কিন্তু চাকরির সেটিং করতে গিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা মাথায়ই আসে নাই!তানিয়া নিজেও কখনো কিছু বলে না। আম্মা না বললে হয়তো মাথায়ই আসতো না! নিজেই নিজেকে মনে মনে গালি দিলো!
-- তুই এতো স্টুপিড কি করে হতে পারিস সাজেদ? তোর বউ অসুস্থ;তাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার কথাও তোর মায়ের মনে করিয়ে দিতে হয়! এভাবে কিভাবে চলবে! তানিয়ার সামনে মুখ দেখাবি কেমনে?
খাটের উপর এক পা ভাজ করে অন্য পা ঝুলিয়ে রেখে ল্যাপটপে হাত রেখে অন্যমনস্ক হয়ে নিজেকে মনে মনে গালি দিচ্ছিলো ঠিকই কিন্তু বিরবির করে বলাতে ওর ঠোঁট নড়ছিলো,তাই দেখছিলো তানিয়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে! চোখ ছোট ছোট করে সাজেদের ঠোঁটের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু ব্যর্থ হলো তবে সাজেদের মুখভঙ্গি দেখে ওর পেট ফাঁটা হাসির ঝংকারে সাজেদের হুঁশ ফিরলো,
--কিভাবে পেত্নীর মত হাসছো কেন?
পেত্নী বলায় তানিয়ার হাসি বন্ধ হয়ে গেল, মুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
-- কি বললেন আপনি আমাকে? আমি পেত্নী?
-- তো ওভাবে হাসছো কেন?
-- নিজে যে পাগলের মত বিড়বিড় করছিলেন! সে বেলায়!
-- কি আমি পাগল? আমাকে পাগলের মতো লাগে!
-- যা আজিব! আমি কখন বললাম আপনি পাগল? আমি তো বললাম পাগলের মতো বিড়বিড় করছিলেন!
-- হ্যা এখন তো পাগলই হবো! আর তো কতকিছু বাকী আছে! বুড়ো হয়ে গেলে তো দামই থাকবে না!
-- যাক বুঝছেন তার জন্য ধন্যিপাতা! এখন বলেন তো কি এতো বিড়বিড় করেছিলেন?
-- এদিকে আসো কানে কানে বলি!
-- না থাক কানে কানে বলা লাগবে না,দূর থেকেই বলেন!
-- না আসো এদিকে আসো! পাগলের পাগলামি দেখাই!
-- না দরকার নাই! আমি পাগল বলিও নাই, আমার পাগলামি দেখারও দরকার নাই!
-- আরেহ সেটা বললে কিভাবে হয়!একটু তো দেখতে হবে!
সাজেদ কথা বলতে বলতে ধীর পায়ে হেঁটে এসে তানিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো,আর তানিয়া সাজেদকে উঠতে দেখেই বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই সাজেদ ক্ষপ করে হাত ধরে ফেললো,একটানে কোলে তুলে নিয়ে ভিলেনি হাঁসি দিয়ে বললো,
-- পাগল বললে, পাগলের পাগলামি দেখবে না তা কি করে হয় সুন্দরী!হু হা হা!
সাজেদ হাসতে হাসতেই তানিয়াকে বিছানায় ছুঁড়ে মারলো, তানিয়া কোমর ধরে মৃদু চিৎকার করে উঠলো,
-- ও মাগো আমার কোমর গেলো গো! এই পাজি বদমাইশ লোকটা আমার কোমর ভেঙে দিলো গো!
সাজেদ তানিয়ার ন্যাকা কান্না বুঝতে পেরে, কোমরটা শক্ত করে চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে নিলো,
-- আহারে, আসো আমি ভেঙ্গেছি আমিই ঠিক করে দেই!
-- নাহ দরকার নেই!
-- আরে কেন নাই আছে!
নিজেদের খুনসুটিতে মেতে গেল প্রেমিক যুগল!
পরের দিন,,
হাসপাতালের জরুরী ওয়ার্ডের সামনে বসে আছে সাজেদ, ইমারজেন্সি ভিত্তিতে তানিয়ার চারটি ব্লাড টেস্ট এবং ইউরিন টেস্ট দিয়েছে,ব্লাড দেওয়া শেষ, ইউরিন জমা দিয়েছে এখনই, আপাতত তানিয়া ডাক্তারের সাথে তার চেম্বারেই আছে,আরও কিছু টেস্ট নাকি এখনই করাবে!তাই অস্থির চিত্তে ক্রমাগত পা নাড়াচ্ছে! ভেতরে কি হচ্ছে তা জানার জন্য ছটফট করছে কিন্তু এটার ভেতরে আপাতত তার যাওয়া নিষিদ্ধ,এতে একটু বেশিই বিরক্ত হচ্ছে তার সাথে বাড়ছে চিন্তা!
খট করে দরজা খোলার শব্দে চোখ উঁচিয়ে তাকালো সেদিকেই, দরজা খুলে আয়ার মতো এক ভদ্রমহিলা মিষ্টি হেসে বললেন,
-- আপনে কি ভেতরের পেসেন্টের স্বামী?
-- জ্বী!
অস্থির গলায় উঠে দাঁড়িয়েই উত্তর দিলো সাজেদ, ভদ্রমহিলা নিজের ঠোঁটের কোনের মিষ্টি হাসি বজায় রেখেই বললো,
-- আপনেরে ভেতরে ডাকে,আসেন!
-- জ্বী!
ফটাফট পা বাড়িয়ে দ্রুত কদমে হেঁটে দরজা ঢেলে ভেতরে ঢুকলো,ডাক্তারের হাসি হাসি মুখ আর তানিয়ার নত মুখ দুটোই সাজেদকে চিন্তিত করলো,
-- এভাবে শুকনো মুখ না করে মিষ্টি নিয়ে আসেন মিস্টার সাজেদ!
-- মানে মিষ্টি কিন্তু কেন?
-- ওমা এত বড় গুড নিউজ দিবো তার পরিবর্তে সামান্য মিষ্টিও পাবো না সাজেদ সাহেব!
-- গুড নিউজ, মিষ্টি মানে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না! আমাকে একটু খুলে বলুন!
তানি কি হয়েছে বলো আমাকে?
ডাক্তারের হেয়ালিপানা সাজেদকে বিচলিত করে তুলছে,তাই অস্থির হয়ে তানিয়াকেই জিজ্ঞেস করলো,তানিয়া লজ্জায় মুখটা আরো ঝুকিয়ে নিলো, সাজেদ মুখ ঘুরিয়ে ডাক্তারের দিকে আবার তাকালো,ডাক্তার মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ালো এরপর তানিয়ার সামনে এসে তানিয়ার হাতটা তুলে হাতের মুঠোয় ভরে রাখা কিটটা দেখালো,প্রথমে সাজেদের কপাল কুঁচকে গেলে,ক্ষণিক বাদেই টানটান কপালের উপর ঘাম জমতে শুরু করলো তার সাথে উদয় হলো হৃদয় কাড়া মনোরম চওড়া হাঁসি, খুশিতে সাজেদ দিকবেদিকহীন হয়ে পড়েছে, কিটটা হাতে নিয়ে লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে বসে থাকা তানিয়ার চেয়ার ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরালো, মুহুর্তেই হাসি হাসি মুখের রঙ বদলে গেল,তানিয়ার অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে থাকা সাজেদকে ধাক্কা দিলো ভেতর থেকে ,অতি ব্যস্ত হয়ে পড়লো,ডান হাত বাম গালে
রেখে কন্ঠে সহস্র ভালোবাসা ঢেলে বললো,
-- বউ কি হয়েছে?এভাবে কাঁদছো কেন?
তানিয়া কিছুই বললো না ,তবে ফুঁপিয়ে কেঁদে সাজেদের কোমর জড়িয়ে ধরলো, সাজেদ তানিয়ার পিঠে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললো,
-- বউ কি হয়েছে? কাঁদছো কেন বলো আমায়?
-- আমার ভয় করছে, আবার আগের মতো কিছু হলে?
-- এমন কিছুই হবে না, আল্লাহ ভরসা!
-- আমার সত্যিই ভয় হচ্ছে!
-- তুমি অযথাই ভয় পাচ্ছো, এমন কিছুই হবে না পাখি! আল্লাহ নিশ্চয়ই এবার আমাদের সন্তানের সুখ দিবেন!
তানিয়া হিচকি তুলে কাঁদতে লাগলো,সাজেদ বোঝানোর ভঙ্গিতে নানা কথা বলে যাচ্ছে,ডাক্তার তানিয়ার কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বললেন ,
-- আপনি চিন্তা করবেন না মিসেস সাজেদ! আপনার শারীরিক অবস্থা মাশাআল্লাহ যথেষ্ট ভালোই মনে হচ্ছে তবে আপনি যদি এভাবে চিন্তা করেন তাহলে সেটার প্রভাব অবশ্যই আপনার বাচ্চার উপর পড়বে,তাই অদূরে কি হবে সেটা নিয়ে এখনই চিন্তা না করে বর্তমানে পাওয়া খুশিটাকে উৎযাপন করুন ! আমি মনে করি এতে অবশ্যই আপনার জন্য মঙ্গলজনক কিছু আছে!
বেশ কিছু সময় লাগলো তানিয়ার নিজেকে স্বাভাবিক করতে,তানিয়া স্বাভাবিক হলে সাজেদ ডাক্তারের সহযোগীকে বেশ কিছু টাকা দিলো মিষ্টি আনার জন্য, এরমধ্যেই তানিয়ার বাকী রিপোর্ট চলে আসলো, তানিয়ার জন্ডিস ধরা পড়েছে,তানিয়া একটু ঘাবড়ালো,সাজেদও চিন্তিত হলো। কিন্তু ডাক্তার সমাধান করে দিলেন যথার্থ চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে! হাসপাতালের কাজ মিটিয়ে খুশি মনে নিজ গৃহের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লো হবু পিতা মাতা!
বারান্দায় বসে চার খলিফার জীবনী পড়ছিলেন আম্মা,সাজেদ তানিয়া সেই সকালে বেরিয়েছে, এখনও আসেনি তাতে একটু চিন্তা হচ্ছে,কি হলো না কি হলো! ফোন দিয়েছিলো দুপুরের দিকে,সাজেদ বলেছে বাসায় এসে জানাবে, এরপর থেকে এখানেই বসে আছে,একা মানুষ, আব্বা ব্যাবসায়িক কাজে গ্রামের বাইরে গেছেন,আসতে আসতে অনেক রাত হতে পারে, বলেই গেছে,সাজেদ তানিয়াও নাই, তাই একা একা আর দুপুরে তেমন কিছু খায়নি, সকালের আটার রুটি ছিলো, তাই দিয়ে লাউ রুই মাছের ঝোল করা হয়েছিলো সেখান থেকে একটা রুটি খেয়েছে মাত্র ঝোল দিয়ে! পানি খেয়ে এই বইটি নিয়ে এখানেই বসেছে সেই সময় থেকে, অপেক্ষায় আছে ছেলে বউয়ের, হর্ণের শব্দে চোখ তুলে দেখলো দরজার দিকে, কেউ বাইরে পকেট দরজার কাটা অংশে হাত ঢুকিয়ে ভেতরের দরজার সিটকিনি খোলার চেষ্টা করছে, আম্মা উঠে দাঁড়ালো, এরমধ্যেই দরজা খুলে গেল,সাজেদ ভেতরে ঢুকে বড় দরজা খুললো,আম্মার মুখে হাঁসি ফুটলো,তানিয়া এর মধ্যে ভেতরে ঢুকে পড়ছে,
-- আম্মা আসসালামু আলাইকুম!
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম,আসছো তোমরা?
-- হ্যা আম্মা,এই তো!
-- আমি তো আরও কত চিন্তা করছিলাম, কোথায় আছো এখনো এলে না!
সাজেদ বাইক পাশ করে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
-- আম্মা পানি দাও!
আম্মা সবসময় ফ্রিজে লেবুর শরবত করে রাখে,বাইরে থেকে কেউ এলে তাকে আগে এটাই খেতে দেয়, এখনও তাই করলো, তানিয়ার উদ্দেশ্য বললো,
-- বউ মা যাও নিজের ঘরে গিয়ে আগে পরিষ্কার হও, এরপর খাওয়াদাওয়া করে বিশ্রাম নাও!
পর্ব ৩০
বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে আব্বা,মুঈদ, বাপ্পী, তুহিন সহ আরো একজন বিশেষ মানুষ! দীর্ঘ চার বছর পর সাজেদ আজ দেশের মাটিতে পা রাখছে,তাকে নিতেই এত মানুষের আয়োজন!
কত শত মানুষ অপেক্ষায় আছে, কেউ প্রিয়জন ফেরার আসায় আর কেউ প্রিয়জনদের ছেড়ে তাদের স্বপ্ন পূরণের আশায়!নানা মানুষের নানা প্রয়োজন,কত রঙের পোশাক তার সাথে কত রঙের কর্মকান্ড! সবটাই নিজের ছোট্ট ছোট্ট নয়নে অবলোকন করে যাচ্ছে ছোট পরী! বড় বড় পাপড়ির মাঝে আড়াল থাকা ধূসর,ব্লু মেরুন মিশেলে আল্লাহর তৈরি সুন্দর নয়নের মনির পর্দায় চারদিকের রঙিন ছবি নিরবে অবলোকন করে যাচ্ছে,তার সাথে বদল হচ্ছে তার মুখের অঙ্গভঙ্গি!দুধ ফর্সা মুখের মাঝে কমলার কোষের ন্যায় ছোট্ট ঠোঁট জোড়া,তা বারবার চেপে ধরছে একে অপরকে দিয়ে, ফুলো ফুলো ফর্সা গালের গোলাপী আভায় ছেয়ে আছে পুরো মুখশ্রী, ছোট ছোট হাত জোড়ার এক হাত দিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেছে রক্তিম গোলাপের গুচ্ছ,খুব যত্নে, ছোট্ট ফর্সা পায়ের স্নিগ্ধতা বাড়িয়ে তুলছে পায়ের পুতুল ওয়ালা গোলাপী কেডস,গোলাপী সাদার মিশ্রনে তৈরি সুতি ফ্রকে একদম জলজ্যান্ত একটা পুতুল! সে যেমনি চারিদিকে ঘটমান সবটা অবলোকন করছে তেমনি তাকে দেখে আশেপাশের মানুষের মাঝেও বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠেছে! পুতুলের রাবার ব্যান্ড দিয়ে দুই জুটি করা কাঁধ অবধি ঘন কুচকুচে কালো চুলগুলোর ছোট ছোট অংশ এদিকে ওদিকে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে! অন্য একটি হাত তার মামার হাতের মুঠোয়, সেদিকে তার কোন বিশেষ ভাবাবেগ নেই,সে ব্যস্ত ব্যস্ত দুনিয়ার রঙিন ছবি দেখতে!
দূর থেকে দাঁড়িয়ে নিজের পুতুলকেই একমনে দেখে যাচ্ছে সাজেদ! বাবা,ভাইরা আসবে জানতো কিন্তু মেয়েকেও আনা হবে তা ক্ষুনাক্ষরেও জানতে দেয়নি কেউ! এত দুরের পথে এতটুকু মেয়ে কিভাবে আসবে!
হাতে টান পড়ায় মামার দিকে তাকায়, পিটপিট চাহনিতে প্রশ্নের প্রজাপতি উড়ে দেয় নিজের মামার কাছে, তুহিন ভাগ্নীর মনোভাব বুঝতে পেরে হেঁসে দেয়,আদুরে সুরে বলে,
-- আপনার পাপাকে নিবেন না?
ছোট পরী তার মাথা মৃদু দুলিয়ে সম্মতি দেয়,"হ্যা" যার অর্থ সে নিবে! সাজেদ দূর থেকে এখনও আপনমনে মেয়েকে দেখে যাচ্ছে,ওর চোখ চিকচিক করছে জলে,যেকোন সময় তা গড়িয়ে পড়বে! যাকে তার মায়ের গর্ভে সাড়ে তিন মাসের রেখে গিয়েছিল সে এখন তাকে নিতে বিমানবন্দরে এসেছে, শেষবার তো তাকে এখানে এই বিমানবন্দরে তার মায়ের পেটের উপরেই আদর করেছিলো!আজ সে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাও কিনা তারই জন্য!
-- যাও আব্বা যাইয়া কোলে নাও!
আব্বার কথায় সাজেদ তার দিকে ফিরে তাকালো,চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো,প্রথম বার নিজের সন্তানকে সরাসরি দেখছে এই খুশি কি করে প্রকাশ করবে! ছেলের অবিভ্যাক্তি বুঝতে পেরে আব্বা নিজের বুকে টেনে নিয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে দিলো!বাপ্পী কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করলো,মুঈদ বললো,
-- যা যা গিয়ে কোলে নে! দেখ কলিজা ঠান্ডা হয়ে যাবে!
সাজেদ নিজেকে ঠিক করে ,চোখ মুছে সামনে এগোয়,তুহিন ভাগ্নীর হাত ধরে সামনে বাড়িয়ে দেয়,
হঠাৎ করেই নিজের সামনে কাউকে বসতে দেখে ছোট্ট পরী ভয় পায়, পিছিয়ে গিয়ে মামার পিছনে দাঁড়ায়, মেয়ের আতংকিত মুখ দেখে সাজেদ আঁতকে উঠে, পিছিয়ে গেল কেন? তাকে কি চিনতে পারছে না! হতাশ হলো সাজেদ! এমন তো হওয়ার কথা নয়! তার জন্য সে অনেক কষ্ট করেছে যাতে মেয়ে প্রথম দেখায়ই তাকে চিনতে পারে!
-------------------------------------------------------------------
সাজেদ যখন সুইডেনে ফিরে যায় তখন তানিয়া সাড়ে তিন মাসের গর্ভবতী, সাজেদ আসার সময় আগের কোম্পানিতে রিজাইন লেটার জমা দিয়ে এসেছিলো, কারণ সাজেদ মনে করে ঐ সময় যদি কোম্পানির কারণে তাকে ফিরে যেতে না হতো তবে অবশ্যই কখনো ঐ ঘটনা তানিয়ার সাথে ঘটতো না ,আর তাদের প্রথম সন্তানের এত করুন পরিণতি হতো! মনের ক্ষোভে স্বপ্নের চাকরি দাফন দিয়ে আসে তাঁর সাথে অন্য একটা কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বন্দোবস্ত করে আসে!
তবে ঐখানে সাজেদের অবস্থানে যে ছিলো তার আরো কিছুদিন দায়িত্ব ছিলো তাই সাজেদ বেশ কিছুদিন বেশি সময় পায় যেটা সাজেদ দেশে এসে তানিয়ার সাথে সময় কাটিয়ে শেষ করে!
তানিয়াকে গর্ভকালীন অবস্থায় রেখে যেতে সাজেদের ইচ্ছে করছিলো না কিন্তু যে আসছে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চিন্তা করে অবশেষে যেতে বাধ্য হয়! তবে যাওয়ার আগে তানিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করে যায় বহু আয়োজন! পুরো বাড়িতে সিসি ক্যামেরা লাগায়,ঘরে, এমনকি বাথরুমেও সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে যায়,যাতে তানিয়ার প্রতি কদমের খবর তার কাছে থাকে! একজন মহিলা রেখে যায় সবসময় তানিয়ার সাথে থাকার জন্য! তাছাড়া সে তার সন্তানের বেড়ে উঠার প্রতিটি মুহূর্ত দেখতে চায়, অনুভব করতে চায় তার বেড়ে উঠার মুহূর্তগুলো! তানিয়ার যখন রাতে ঘুমাতো তখন ল্যাপটপে ভিডিও চালু করে তানিয়াকে দেখতো! তারপর মেয়ে হওয়ার পর থাকতো মেয়েকে নিয়ে!
তানিয়া যখন কাজে ব্যস্ত থাকতো তখন সিসি ক্যামেরার সাহায্যে,ভিডিও কলের সাহায্যে মেয়েকে পাহারা দিতো, মেয়ের সাথে কথা বলতো,খেলা করতো, দুষ্টুমি করতো, এভাবেই মেয়েকে শান্ত রাখতো,যখন ঘুমিয়ে থাকতো তখন এক ধ্যানে মেয়ের পানে তাকিয়ে থাকতো! ধীরে ধীরে মেয়ে বড় হচ্ছে তার সাথে সাজেদের কথা বাড়ছে,যেন সব কথা কেবল মেয়েই বুঝে,তাকে না বলতে পারলে সাজেদের কোন কাজই হতো না,এভাবেই কাটিয়েছে বিগত কয়েকটি বছর,মেয়েও অতদূর থাকা বাবার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে,ভিডিওতে চেহারার তো ভালোই,অডিওতে কন্ঠ শুনলেই চিনতে পারে এটা তার বাবা!বাবার প্রতি তারও অসম্ভব টান! তানিয়া মাঝে মাঝেই অভিযোগ করে সাজেদ দুরে থেকেও মেয়ের সাথে নিজের যেই বন্ধন তৈরি করেছে তা তানিয়া সামনে থেকেও পারেনি আর এটার জন্য সাজেদ দায়ী! সাজেদ সবসময় মেয়েকে নিয়ে থাক তাইতো মেয়ে তার প্রতি টান অনুভব করার সময় পায় না! যদিও সাজেদকে চেনানোর জন্য তানিয়াও অনেক কষ্ট করেছে,কারণ সাজেদের মনের ভয় তার মেয়ে যদি বড় হয়ে তাকে না চিনে! কত প্রবাসীদের দেখেছে বহুবছর সন্তান থেকে দূরে থাকার কারণে সন্তানেরা বাবাকে চিনে না, মায়ের পেটে রেখে চলে গেছে, এসেছে বহুবছর পর তখন সন্তান বাবা হিসেবে মানতে ইতস্তত বোধ করে,কথা বলে না এড়িয়ে যায়,কখনো কখনো অনেক বছর সময় নেয় বাবাকে বাবার মতো সম্মান করতে অথচ এই সন্তানের ভবিষ্যত এর চিন্তা করেই দূর দেশে একাকিত্ব জীবন পাড় করে বাবা নামক চরিত্রের সেই অভিনেতা! সাজেদ কোনভাবেই নিজের সন্তানের এমন চাহনি বরদাস্ত করতে পারব না,তাই বারবার সবাইকে অনুরোধ করেছে যাতে তার মেয়েকে বোঝায় তার বাবা কেমন! তানিয়া ছবি টাঙানো পছন্দ করে না তবুও শুধু মাত্র মেয়েকে তার বাবার সাথে পরিচিত রাখার জন্য, সবসময় বাবার কাছাকাছি অনুভব করানোর জন্য পুরো ঘর জুড়ে সাজেদের ছবি টাঙ্গিয়েছে, বিছানার মাথার পিছনের দেওয়ালে বড় করে সাজেদের ছবি টাঙানো যেটা দেখলে মনে হয় জলজ্যান্ত সাজেদই দাড়িয়ে আছে!
সব ঘরেই সাজেদের ছবি বড় করে টাঙ্গানো, পরী যেখানেই যায় তার বাবার মুখ দেখতে পায়। মেয়ের মুখও সাজেদই প্রথম দেখে!তানিয়ার আবদার ছিলো প্রসবের সময় যেন সাজেদ তানিয়ার পাশে থাকে, সাজেদ সরাসরি থাকতে পারেনি কিন্তু ভিডিও কলে থেকে তানিয়ার সাহস ঠিকই জুগিয়েছে!যখন ডাক্তার বললো মেয়ে হয়েছে তখন সাজেদের সে কি কান্না! খুব করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিল যাতে তাকে প্রথম সন্তান কন্যা দেওয়া হয়, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছিল তাইতো তার ঘর আলো করে জান্নাতের এক টুকরা দেওয়া হয়েছিল সেদিন! সাজেদ খুব কেঁদেছিল খুশিতে,সেই মাসের পুরো স্যালারী অসহায় মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিল, মিষ্টি কিনে পথে ঘাটে যাকে পেয়েছে তাকেই খাইয়েছে!সাজেদ সেদিন খুশিতে পাগল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল!
আবার মেয়ে বড় হওয়ার মধ্যেও করেছে অশেষ পাগলামী! মেয়ের সবকিছু সে সুইডেন থেকে পাঠিয়ে দিতো, খাবার থেকে শুরু করে কসমেটিক্স, এমনকি পোষাক! সাজেদের এহেন পাগলামিতে তানিয়া অতিষ্ঠ কারণ উনিশ বিশ হলেই তানিয়াকে ঝাড় খেতে হতো! তবুও তো কোথাও না কোথাও শান্তি লাগতো এই ভেবে যে সাজেদ এবার তাকে মিস করার সুযোগই দেয়নি! ঐ বৈদেশে থেকেও ঠিকই নিজের স্বামী, বাবা, সন্তান হওয়ার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করার চেষ্টা সবসময়ই করেছে!এটা কজন পুরুষ করে?
মামার পিছনে দাঁড়িয়ে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা মানুষের পানে ভয়ার্ত চোখে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে,সবাই একটু আশ্চর্য হলো,পরী চঞ্চল বাচ্চা,খুব একটা ভয় পায় না,তবে অচেনা কাউকে দেখলে প্রথমে একটু সময় নেয় তার সাথে পরিচিত হতে কিন্তু সাজেদের ক্ষেত্রেও এমন হবে সেটা কেউ ভাবেনি!সাজেদ করুন দৃষ্টিতে মেয়েকে দেখছে,এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে কিন্তু পরক্ষণেই কিছু একটা ভাবলো, তারপর মৃদু হেসে বললো,
-- প্রিন্সেস!
তুহিন ভাগ্নীকে সামনে এনে দাঁড় করালো, এরপর দুই কাঁধ ধরে আদুরে গলায় বললো,
-- আম্মা আপনি চিনতে পারছেন না উনি কে?
মামার কথায় পরী একবার পিছনে ঘুরে সাজেদকে দেখলো, এরপর আবার মামার দিকে তাকালো , হাতের ফুলের তোড়াটা শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো এরপর সবার দিকে তাকালো, সবাই তো তাকেই দেখছে, আব্বা কিছুটা এগিয়ে এসে পরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
-- আপামনি দেখতো চিনতে পারো কিনা?
দাদার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার পাঞ্জাবির একাংশ হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে একমনে সাজেদকে দেখতে লাগলো, সাজেদ মেয়ের চোখে গভীর দৃষ্টিতে তাকালো, মুহূর্তেই শুনতে পেল অতি আকাঙ্ক্ষিত সেই শব্দটি,
-- পাপা!
বলেই পরী তার বাবার কাছে ছুটে এলো সাজেদ খুশিতে আত্নহারা হওয়ার যোগান,তার মেয়ে তাকে চিনতে পেরেছে এটা যে কি পরিমান খুশির তা হয়তো কেবল সেই বুঝতে পারছে, দুই হাত মেলে দিয়ে বুকের মাঝে লুকিয়ে ফেললো তার ছোট্ট পরীকে,তার অস্তিত্বের অংশকে!বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে খুশিতে দুই হাত দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে পরী,তার হাসিতে আন্দোলিত হচ্ছে আর চারিদিক যেই স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বাবা নামক মানুষটি! সাজেদ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়ে বারবার চুমু দিচ্ছে মেয়ের মাথায়, পরীও বাবার সরাসরি প্রথম স্নেহ উপভোগ করছে! বাবা মেয়ের এমন মিলনে চোখ ভরে এলো উপস্থিত অনেকেরই!
মেয়েকে কোল নিয়েই সাজেদ উঠে দাঁড়ালো,এক হাত ছেড়ে,অন্য হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে রেখেই বাবার মুখের দিকে তাকালো, মিষ্টি হাসি ঠোঁটের কোণে, সাজেদও হাসছে, মুহূর্তেই মেয়ের পুরো মুখে চুমুতে ভরে দিলো,হাত, হাতের তালু, গলা, চোখ, নাক,গাল সব জায়গায়,সব জায়গাতেই চুমু দিতে লাগলো,পরী বাবার আদরে সিক্ত হলো,সাজেদ এত বছর পর নিজের সন্তানের শরীরে গন্ধ অনুভব করলো। এটা যে তার অস্তিত্ব,তার ভালোবাসার ফসল!
সবরকমের নিয়ম শেষ করে গাড়ীতে গিয়ে বসলো,মাঝের সিটে সাজেদ, আব্বা আর তাদের মাঝে পরীর জন্য নির্ধারিত জায়গা, পিছনে তুহিন, বাপ্পী, সামনে ড্রাইভার, মুঈদ! নিজের কোর্ট খুলে সিটের হ্যান্ডেলে রেখেছে,পরী তার বাবার কোলে বসেছে,সাজেদ গাড়ীতে উঠে কাঁধের ব্যাগ থেকে এক প্যাকেট চকোলেট বের করলো, মেয়ের জন্য সে সুটকেসে ভর্তি চকোলেট এনেছে কিন্তু এই প্যাকেটটা সুইডেন বিমানবন্দর এলাকা থেকে কিনেছে , বাড়িতে ঢুকে সবার আগেই মেয়ের হাতে তুলে দিবে তাই! এখন তো বাড়ি অবদি অপেক্ষাও করতে হচ্ছে না!তাই প্যাকেট খুলে মেয়ের সামনে ধরলো,বাবার হাতে লোভনীয় খাবার দেখে পরী নিজের ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হেসে দিলো, সাজেদ মেয়ের মন পড়তে পেরে সেও হাসলো, চোখের ইশারায় নিতে বললো, ছোট্ট ছোট্ট হাতে আর কতটুকু নেওয়া যায় তবুও পরী নিজের চেষ্টা মতো বেশ কিছু নিলো,পরীর এই কাজে সবাই হেঁসে দিলো,পরী তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে হাসি হাসি মুখে, হয়তো সে বোঝার চেষ্টা করছে কেন সবাই হাসছে? সাজেদ চকোলেটের প্যাকেট পরীর জন্য রাখা জায়গায় রেখে দুই হাতে মেয়ের মুখ তুলে ধরলো, তারপর পুরো মুখে আবারও চুমু দিলো , মুঠোবন্দী হাতের উপর চুমু দিলো, এরপর বললো,
-- আম্মা এগুলো সব আপনার,কেউ আপনারটা নিবে না!আপনি ধীরে সুস্থে একটা একটা করে খান!
বাবার কথায় খুশি হয়ে পরী হেসে দিলো, জিজ্ঞেস করলো,
-- সাচ্চি?
-- মুচ্চি!
নাক টেনে দিয়ে সাজেদ বললো, এগুলো পরীকে সাজেদই শিখিয়েছে!
পর্ব ৩১ (অন্তিম)
বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক রাত হবে,এখনই সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের প্রথমার্ধে ,শীত আসছে আসছে এমন সময়, তবুও বাতাসের আর্দ্রতায় শরীর হিম হয়ে যাওয়ার উপক্রম! সাজেদ সবার উদ্দেশ্যে বললো,
-- আমার মনে হয় কোথাও থেমে রাতের খাওয়া সেরে নেওয়া উচিত! বাড়ি পৌঁছাতে অনেক রাত হবে ততক্ষণ বাবু জেগে থাকবে না!
সাজেদের কথায় যুক্তি আছে, তাই গাড়ি রেস্টুরেন্ট খুঁজে,সেখানে সবাই নামলো, সাজেদ এক মিনিটের জন্যও মেয়েকে কোল ছাড়া করলো না,সেও পরম আনন্দে বাবার কোলে বসেই খাওয়া থেকে শুরু করে সবটা শেষ করলো, সাজেদ একটু একটু করে সব ধরনের খাবার থেকে মেয়েকে খাওয়াল নিজের হাতে! মেয়ে তার চুকচুক করে চিবিয়ে ধীরে ধীরে খায় সেটা মন ভরে দেখলো,নিজে কেবল সামান্য কিছু খেল! প্রতি মিনিটে মেয়ের কপালে চুমু দেয়,হাতে চুমু দেয়! পরীও তার বাবাকে নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে খাইয়ে দিলো,ছোট হাতের ছোট্ট লোকমা সাজেদ পরম তৃপ্তিতে খেল! খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে আবার বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করলো!
গাড়িতে উঠে জানালা ভালো করে লাগিয়ে দিলো কারণ এত সময় জানালা খোলা ছিলো পরী তা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতো একদম মায়ের মতো হয়েছে এই বিষয়ে! তবে এখন বেশ ঠান্ডা লাগছে,তাই জানালা লাগিয়ে কোট টা পরীর গায়ের উপর দিয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো,একদম আগাগোড়া জড়িয়ে রাখলো যাতে বাতাস ঢুকার কোন সুযোগ না থাকে! লাগলেই ঠান্ডা লাগবে নিশ্চিত! পেট ভরা, অনেক সময়ের জার্নি তাই ক্লান্তি লাগছে তার মধ্যে বাবার শরীরের উষ্ণতা পেয়ে পরী একদম নেতিয়ে পড়ল,গরম অনুভব হতেই বাবার বুকে মাথা রেখে একদম ঘুমের দেশে পারি দিলো! গাড়ির সবার চোখেই ঘুম কেবল সাজেদ ছাড়া! কারণ এমনিতেই সুইডেন এর সময় অনুযায়ী এখনও ঘুমের সময় হয়নি তার মধ্যে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ড্রাইভার একা হয়ে যাবে তখন দেখা যাবে সেও ঝিমাচ্ছে! সাজেদ কোন কথা না বলে মেয়েকে আরও শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো,ভালো করে ঢেকে দিলো, এরপর একটু শোয়া অবস্থায় মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো! নাক,চোখ, ঠোঁট মায়ের, ঠোঁটের উপর তিল, চোখের পাতায় তিল,কানের গোড়ায় তিল সবটাই মায়ের মতো হয়েছে! অনেক সময় তাকিয়ে বুঝলো মুখের আদল তার নিজের মতো হয়েছে,হাত পায়ের গড়নও বাবারটা পেয়েছে,গায়ের ফর্সা রঙ পরিবারের সবাইকে ছাপিয়ে গেছে! আল্লাহ মনে মনে উপরওয়ালার প্রতি শুকরিয়া জানালো এমন জলজ্যান্ত একটা পুতুল তাকে দেওয়ায় জন্য তার সাথে তার হেফাজতের জন্য দোয়াও করলো!
তানিয়া বসার ঘরে অপেক্ষায় বসে আছে,কখন সবাই আসবে! এত দূর কখনো মেয়েকেও একা ছাড়েনি,আজ যখন শুনেছে সবাই তার বাবাকে আনতে যাবে তার সেকি বায়না ,তার বায়নার কাছে তানিয়ার নিষেধাজ্ঞা কখনোই টিকেনি আজও টিকলো না! কিন্তু আজ...
কলিং বেলের আওয়াজে চমকে উঠলো,একটু চোখ লেগে গিয়েছিল, ধরফরিয়ে উঠে দাঁড়ালো, আম্মা নিজের ঘরে জায়নামাজে বসে ছেলের সুস্থ ভাবে ফেরার জন্য আল্লাহর দরবারে আর্জি জানাচ্ছে!এটা সবসময়ই করে! উনিও বেরিয়ে আসলো, তানিয়া নিজেকে ঠিকঠাক করে দৌড়ে দরজা খুলতে বেরিয়ে গেল, ততক্ষণে আম্মাও বসার ঘরে এসে পড়েছে!
-- আসসালামু আলাইকুম!
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম! কি অবস্থা আপনাদের?
দরজা খুলে সর্ব প্রথম সাজেদের দেখাই পেল তানিয়া,চোখে মুখে খুশি উপচে পড়লো, সাজেদ ইশারায় চুপ থাকতে বললো,পরী তার বাবার কাঁধে পরম শান্তিতে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে,সবাই শব্দহীন ভাবে ঘরে ঢুকলো,সাজেদ কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা নিজেদের ঘরে চলে গেল, তানিয়াও পিছনে পিছনে গেল, বিছানার মাঝ বরাবর বালিশ পেতে চাদর টেনে ঠিকঠাক করলো,সাজেদ আস্তে করে পরীকে শুইয়ে দিলো, এরপর চাদর টেনে বুক অবধি ঢেকে দিলো! আর এদিকে তানিয়া একমনে সাজেদকে দেখছে! সাজেদ আগের চেয়েও বেশি সুদর্শন হয়েছে! স্বাস্থ্য কমিয়েছে, আগের চেয়েও বেশি ফর্সা হয়েছে,গোঁফ- চাপ দাড়িতে নতুন করে ছাট দিয়েছে,চুল ছোট করে আর্মি কাট দেওয়া যদিও এটা সাজেদের সবসময়ের চুলের কাট তবুও সব কিছু মিলিয়ে মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দর ও সুদর্শন লাগছে! সাজেদ মেয়েকে শুইয়ে তানিয়ার দিকে তাকাতেই তানিয়ার মুগ্ধ চাহনি দেখে হাসলো,দুই হাতে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো, চুলের উপর চুমু দিয়ে বললো,
-- আমার মিসেস তো একদমই চোখের পলক ফেলছে না!
তানিয়া কথা বলছে না কিন্তু চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছে, এতদিন পর এই মানুষটির ছোঁয়া পেতেই নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারেনি!দুই হাত দিয়ে খুব শক্ত করে সাজেদকে জড়িয়ে ধরলো, সাজেদ পরম ভালোবাসায় নিজের সহধর্মিণীকে মিশিয়ে রাখলো, এভাবেই নিজেদের মধ্যে বেশ কিছু সময় পার করলো, এরপর সাজেদ বেরিয়ে গেল বসার রুমের উদ্দেশ্য! আম্মা ছেলেকে দেখেই তার বুকে হামলে পড়লো,সাজেদ মুচকি হেসে মাকে জড়িয়ে নিলো,আদুরে গলায় বললো,
-- আমার শিশু কন্যাও তো এত কাঁদেনি যত কান্না আমার এই বড় মেয়ে করছে !
-- চুপ থাকো তুমি সবসময় ফাইজলামী করো! ভুলে যাও আমি তোমার মা ! তুমি আমাকে তোমার ঐ পুঁচকে মেয়ের সাথে মিলাও!
-- আহ্ আমার মেয়ে পুঁচকে হয়েও বুঝে খুশিতে হাসতে হয় কাঁদতে নয়! আর তুমি আমার মা হয়েও বুঝো না,নাকি আমি আসাতে খুশি হওনি!
মা ছেলে অনেক সময় এভাবেই পার করে এরপর যে যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে যেহেতু সবাই বাইরে থেকেই খাওয়া দাওয়া শেষ করে এসেছে তাই এখন আর খাওয়া নিয়ে কোন আয়োজন করতে হলো না!
🌅🌄🌅🌄🌅🌄🌅🌄🌅🌄🌄🌄🌄🌅🌄
অনেক দিন পেরিয়ে গেছে সাজেদ এসেছে,সাজেদ সবসময় বাড়িতে মেয়ের সাথেই থাকে,মাদ্রাসায় নিয়ে যায়, এখানে সেখানে বেড়াতে যায়! এভাবেই কাটছে দিন!
একদিন তানিয়া সাজেদ আর পরী বাজারের রাস্তা দিয়ে সাজেদের এর বন্ধুর বাসায় যাচ্ছিলো তখনই একজন মুরব্বি দাড়ঁ করালো, সাজেদ সম্মান রক্ষার্থে দাঁড়ালো,তানিয়া সাজেদ থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো, মুরব্বি বিভিন্ন কথার ছলে আবারও পুরানো কাসুন্দি ঘাটতে বসলো,
-- তোমার বউ কি ভালো হইছে নাকি এখনও আগের মতোই ছুঁকছুঁক করে?
-- মানে?
-- না মানে আগে একবার ঐ তোমার বন্ধু মারুফের সাথে যেই কিচ্ছা ঘটাইলো!সেইটার কথাই বলছিলাম!
-- আমার বউ কোন কিচ্ছা ঘটায়নি,ওটা নিছকই একটি অহেতুক অভিযোগ ছিলো,তার চেয়েও বড় কথা আমার স্ত্রী ঐ সময়ে ভুক্তভোগী ছিলো,এই কথা পুরো গ্রাম জানে! আপনি জানেন না?
-- না মাইনে তুমি আমারে ভুল বুঝতাছো! আমি তো খালি তোমার ভালোর লইগাই কইলাম! তোমরা বিদেশে থাকো, জানো তো না তোমাগো বউ জ্বীরা এইখানে কি করে! তাই তোমাগো অভিভাবক হইয়া সেগুলোর খোঁজখবর রাখা, এবং তা তোমাদের পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে ..
কথা শেষ করতে দিলো না সাজেদ, বিরক্ত হলো,বহু বছর পেরিয়ে গেছে যেই ঘটনার তা আজ আবারো খুঁচিয়ে বের করার কারণ বুঝলো না, প্রচন্ড ক্ষিপ্র হয়ে বললো,
-- আপনি আমার অভিভাবক নন, আমার আম্মা আব্বা বেঁচে আছেন,তারাই আমার অভিভাবক আর তাদের চেয়েও উপরে যিনি আছেন তিনি! আমি আমার স্ত্রী সন্তানদের দায়িত্ব তাদের উপরেই ন্যস্ত করেছি তাই তাদের নিয়ে অহেতুক ভাবনা আপনাকে ভাবতে হবে না! আর হ্যা দায়িত্ব নামক নুনের ছিটা দিয়ে মানুষের মিষ্টি জীবনে তেতোর সৃষ্টি করবেন না দয়া করে! আপনাকে যদি বলা হয় তবেই, না হয়তো অযথাই নিজের গন্ধ নাকের অনুপ্রবেশ ঘটাবেন না ! অন্তত আমার জীবনে না,আমি আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে বাইরের কোন লোকের থেকে একটা শব্দও শুনতে আগ্রহী নই!
কথা শেষ করেই স্থান ত্যাগ করলো, পঞ্চাশর্ধো বয়স্ক লোকটি মুখ থমথমে করে দাঁড়িয়ে রইলো , ভেবেছিলো কি আর হয়ে গেল কি! এই তো পাশের এক ছেলের বউ নাকি নিজের মামাতো ভাইয়ের সাথে ভেগে গেছে,তাই নিয়েও তো গ্রামে কত সালিস চলছে,সেই ছেলে সেই বউ আর তার মামাতো ভাইয়ের নামেও মামলা করেছে, মানহানীর মামলা দিয়েছে! তাই নিয়েও পুরো গ্রামে চর্চা হয়েছে,তার মধ্যে আগে এমন কাজ ঘটানো অনেকের নাম ই উঠে এসেছে,তার মধ্যে সাজেদের বউয়ের নাম দুই একজন তুললেও তাদের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে সত্যের তোপে! সেই দুই একজনের মধ্যে উনিও ছিলেন!
পরের আলোচনা সমালোচনা করে লাভ ক্ষতি না হলেও কিছু মানুষ এগুলা করে মজা পায় , এদের কাজই হলো কার ঘরে চাল আছে,কার ঘরে ডাল নাই এগুলো নিয়ে পরিচর্চা করা কিন্তু চালডাল দিয়ে সাহায্য করা নয়! তেমনি কোন বাড়ির বউ কালা আর কোন বাড়ির বউ ধলা তা নিয়ে পরে থাকাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব বলে মনে হয়! এরা অন্যের তরকারিতে নুন দিতেই মজা পায় বেশি নিজের খবর রাখার দরকার নাই!
সাজেদ রাগে লাল হয়ে ফিরে যায় যা দেখে তানিয়া বারবার জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে , কিন্তু সাজেদ কিছু বলে না! সেদিন রাতে সাজেদ সিদ্ধান্ত নেয় আর সুইডেন যাবে না,মেয়ে বড় হচ্ছে তার সাথে তাকে নিয়ে নিরাপত্তার চিন্তাও বাড়ছে, বহু দিন হয়ে গেলেও মানুষের মুখের দরজা বন্ধ হয়নি, একটা মিথ্যা অহেতুক অপবাদ দিয়ে মাঝে মাঝেই তাদের বিব্রত করা হয়! নিশ্চয়ই তানিয়া এইসব নিয়ে কষ্ট পায় কিন্তু লজ্জায় হয়তো তার সাথে বলে না! তবে এভাবে চলতে দেওয়া যাবে না! তানিয়ার জন্য যতটা জরুরি এগুলো বন্ধ করা তার চেয়েও বেশি জরুরি মেয়ের জন্য! এখন ছোট কিন্তু বছর গড়াতেই সে বড় হবে,স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে একদিন স্বামীর সংসারে যাবে তখনও দেখা যাবে এই পরচর্চাকারী মানুষের জন্য ওদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠবে! তাই শক্ত মনে এদের জবাব দিতে হবে এর জন্য একজন সামর্থবান পুরুষের উপস্থিত থাকা একান্ত জরুরী! সাংসারিক অনেক বিষয় চিন্তা করে সাজেদ অবশেষে সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করলো ও আর বিদেশ যাচ্ছে না! সাজেদের সিদ্ধান্তে পরিবারের সবাই খুশি!
বর্তমানে সাজেদ ছোটখাটো একটা ব্যাবসার চিন্তা করছে,তার জন্য বাজারের আশেপাশে খালি জমি খুঁজছে যেটাকে নিজের জন্য অফিস হিসেবে বিল্ডিং বানাবে!
সাজেদ তানিয়ার সংসার এভাবেই চলে যাবে,হয়তো কখনো দুঃখ,কখনোও সুখ আসবে কিন্তু দিন শেষে একে অপরের সাথে এভাবেই লেপ্টে থাকবে! কারণে বিশ্বাসের গোড়া মজবুত হয়ে গেছে,এখন শত ঝড়েও তা ভেঙে পড়ার সুযোগ নেই!
সংসার হলো একটি ছোট্ট দুনিয়া যার মাঝে গড়ে উঠে মনুষ্যত্বের তরু, সঠিক পরিচর্যায় তা হয়ে উঠে বিশাল বৃক্ষ যা পরবর্তীতে ছড়িয়ে যায় সারা পৃথিবীতে!এর জন্যই এতে যত্নের দরকার হয়, তার জন্য তৈরি করতে হয় মায়া যার উদ্ভব হয় বিশ্বাস ভরসা থেকে! যখন কারো প্রতি ভরসা করতে পারা যায়, বিশ্বাস করা যায় তার প্রতি এমনিতেই মায়া, টান তৈরি হয়!এই টানই একদিন রুপ নেয় ভালোবাসায়,তাই তো ভালোবাসার প্রথম শর্ত বিশ্বাস! সংসার নামক ছোট্ট দুনিয়ায় টিকতেও দরকার বিশ্বাস,একে অপরকে বিশ্বাস করেই দুইজন মিলে গড়তে হয় বিশ্বাসের পৃথিবী যাকে আমরা বলি সংসার!
আমাদের সমাজে পরোকিয়ার দায়ে ভেঙে যায় বহু সংসার! ইদানিং তা আরো প্রকট আকার ধারণ !পরোকিয়া একটি গর্হিত অপরাধ,এর জন্য কোন ক্ষমা অবশ্যই যোগ্য না বলে আমি ব্যক্তিগত মতামত প্রধান করি কিন্তু কেন জানিনা মনে হয় কখনো কখনো অনেক নিরীহ মানুষ এতে স্বীকার হয়, মানে যেকোনো এক পক্ষের অতিরিক্ত দৈহিক লোভের স্বীকার অপরপক্ষ হয়,তাই সঠিক ভাবে তদন্ত করে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত!
আমাদের সমাজে গ্রামে এখনও বিচার সভায় নারীদের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হয় না খুব একটা, তাদের কথা শোনা আর না শোনা দুটোই এক মনে করে! যার কারণে অনেক নারীই মিথ্যা হয়রানির স্বীকার হয়! তারা তাদের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেও দ্বিধাবোধ করে কারণ পাছে তাদের অবমূল্যায়ন করা হয়! কিন্তু যদি তাদের সুযোগ দেওয়া হয় তবে দেখা যায় অনেক জটিলতা সহজেই কেটে যায়,তারাও সুযোগ পায় নিজেদের হয়ে লড়াই করার! তবে আফসোস এমন কিছু খুব একটা দেখা যায় না!
সংসার টিকে বিশ্বাসে তাই নিজের সঙ্গীকে/সঙ্গিনীকে বিশ্বাস করা একান্ত জরুরী তবেই হবে সুখের, শান্তির সংসার!
আমার মনে হয় আমি আমার দেওয়া নামের সাথে আমার পুরো উপন্যাসের মিল রাখতে সক্ষম হয়েছি!
এখানেই শেষ করলাম বিশ্বাসের সংসার এর কল্পকাহিনী! ইনশাআল্লাহ আবার দেখা হবে অন্য কোথাও!
ধন্যবাদ সবাইকে আমার পাশে থাকার জন্য,😊
স মা প্ত







1 মন্তব্যসমূহ
ধন্যবাদ পাশে থাকবেন সবসময়।
উত্তরমুছুন