#তোমার_উষ্ণতার_খোঁজে

#অনুগল্প

#রিমা_আক্তার



[বৃষ্টিবিলাস করুন সবাই।]


ঝুম বর্ষনে মানবজীবন ওষ্ঠাগত,চারদিকের নোংরা কাদাপানি,স্যাতস্যাতে পরিবেশ, মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপণ প্রায় বিপর্যস্ত,তবে এসবের মাঝেও কেউ কেউ খুজে নেয় অন্যরকম কিছু অনুভূতি। কারো কাছে বৃষ্টি মানেই যেমন বিরক্তিকর বিষয়, তেমনি কারো কারো কাছে বৃষ্টি মানেই জীবণ, আর জীবন অর্থ’ই রোমান্সকর।

বর্ষনের দিনের বৃষ্টির ঝিরিঝিরি মিষ্টি সুর,থেমে থেমে আসা দমকা হাওয়া, প্রবলতায় সৃষ্টি হওয়া ছন্দে তখন মন অন্যকিছু’ই খোঁজে। কারো কাছে বৃষ্টির দিনের প্রথম চাহিদা মানেই খিচুড়ি , কারো কাছে সদলবলে পাগলামির তালে বৃষ্টিতে ভেজা,কেউবা জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে মিনারের সেই বৃষ্টিবিলাসী গান ‘ঝুম’ শোনার তালে গুনগুনিয়ে উঠে, কেউ আবার কোন বৃষ্টি বিলাসী লেখকের কল্পনার আঁচড়ে সৃষ্টি হওয়া প্রেমিকের প্রেমে পড়ে লজ্জ্বায় লালনীল হয়ে যায়। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় যাদের এগুলোর কোনটাই করার উপায় থাকে না। কিংবা চাইলেও কোনটাকে নিয়ে ভাবতে পারেনা । তার কারন অবশ্য দুটো, এক হয় সে বেকার নয় তার পায়ে পারিবারিক শিকল বাধা, এখানে প্রথম বিষয়টা ছেলেদের জন্য প্রযোজ্য আর দ্বিতীয়টা মেয়েদের জন্য। আর দ্বিতীয়টা কারনটা হলো মানুষের অভাব। যার মানুষের অভাব তার কাছে বৃষ্টি এক বিচ্ছিরি ঋতু,তার শূণ্যমনে জাগ্রত হাহাকার বলে,বৃষ্টি মানেই জনমনে ভোগান্তি! তবে শাহরিয়ারের মন আজ সব নিস্ক্রিয়তা দমিয়ে সেই অন্যরকম অনুভূতিতে মিশতে চাচ্ছে। সদ্য চাকরিতে যোগদান পত্র পাওয়া শাহরিয়ারের মনে এখন অন্যরকম অনুভূতিরা খেলা করছে।

ধানমন্ডি ৬ নং গলির ইউনিভার্সিটি উইমেন্স ফেডারেশন কলেজের ঠিক বিপরীতে থাকা তিরপাল টাঙ্গানো টং দোকানের নিচে বসে চা’য়ে চুমুক দিচ্ছে আর মনে মনে জল্পনা করছে অজানা, না পাওয়া কিছুর। পায়ের নিছে প্যাকপ্যাকে কাদা,সিগারেটের ফিল্টার, প্যাকেট , কলার খোসা, চিপ্সের প্যাকেট তার সঙ্গে বয়ে যাওয়া ড্রেনের পানি যা অতি বর্ষনের দাঁয়ে উপচে পড়ছে। তার মধ্যেই দোকানের বেঞ্চিতে বসে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে ভেজা শরীর উষ্ণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।মূলত বর্ষনে জাগা পুরুষ মনের আখাঙ্খাকে দমনের প্রচেষ্টা চলছে। বন্ধুকে ফোন করার জন্য মুঠোফোন বের করে ডায়াল করলো সদ্য বিয়ে সাড়া বন্ধু জুনাইদকে,


“ হ্যালো! ”


“ কিসের হ্যালো! এই ভরা বর্ষনে হ্যালো কিসের রে শালা? এখন বলবি ঠ্যালো। ওহ তুই ঠ্যালো বলবি কি করে,তুই তো আজন্ম আবিয়াইত্তা। আর তাই তুই হিংসে করেই আমার রোমান্টিক মুডের ত্যারোটা বাজাচ্ছিস, রাখ এখন হ্যালোর বাচ্চা। ”


শাহরিয়ারকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই জুনাইদ কল কেটে দিলো, অবশ্য বলার মতো অবস্থায় সেও ছিলো না কারন ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসছে কিছু অনাকাঙ্কিত সুখরব। যা শাহরিয়ারের একাকি জীবনে দহন লাগিয়ে দিয়েছে। তখন থেকেই সে এখানে বসে বসে ভাবছে জীবনের না পাওয়া না ছোঁয়া সেই অনুভূতিকে নিয়ে। হাতের মুঠোয় থাকা বাদামি প্রায় ভিজে যাওয়া খামটার দিকে জ্বলজ্বলে নয়নে চেয়ে ,


“ চায়ে আর কতকাল! শিগগিরিই কারো অঙ্গের উষ্ণতা জরুরী,নয়তো হৃৎপিণ্ড রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে শীতলতায় মেরে ফেলবে! ”


কিন্তু মনের মতো উষ্ণতাকে কোথায় পাবে? জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো ক্যারিয়ার গড়া, তাই আজ অব্ধি মনের মণিকোঠায় কোন রঙিন প্রজাপতিকে বসতে দেওয়ার সুযোগ দেয়নি , দীর্ঘ ২৯ বছরের তৃষ্ণা মেটাতে প্রস্ফুটিত ফুল কোথায় পাবে যে এই চাতক ভ্রমরের পিপাসা মেটায় !

“ স্যরি ! ”


পায়ের উপর নোংরা পানি ছিটে লাগায় চোখমুখ কুঁচকে নিয়ে কিছু বলার জন্য মাথা তুলতেই মিষ্টি স্বরের ক্ষমা প্রার্থনায় থেমে গেল কিন্তু ভদ্রতাসূচক কিছু বলা উচিত ভেবেই মুখটা ঘুরিয়ে তাকাতেই থমকে গেলো, ভেজা বদনের নম্রতা আর ভীরুতায়। ভেজা পল্লব ঘেরা অক্ষিদ্বয়ের কাজল আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে । কর্ণ লতিকার বারিধারা চিবুক ছুঁয়ে থুতনি বেঁয়ে ভূপতিত হচ্ছে!ম্লান হয়ে যাওয়া ওষ্ঠরঞ্জনী চিপকে লেগে আছে মেয়েটার ভেজা নরম ঠোঁটের খাজে,তাতেও কি আকর্ষনীয় আর ভয়াবহ মাদকীয় লাগছে! মেয়েটা শ্যামা,কিন্তু অতিরিক্ত ভেজায় ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। তার পাশেই দাড়িয়ে রইলো,শাহরিয়ারের গভীর চাহনি বুঝতে পেরেই কিনা জানা নেই সে নিজের জামা,ওড়না টেনেটুনে দেখলো । এত করে শাহরিয়ার দৃষ্টি সরাতে বাধ্য হলো। শাহরিয়ার বিব্রত হয়ে লজ্জিত মুখটা সরিয়ে অন্যত্র চাইতেই তার খেয়ালে এলো মেয়েটা সাদা সালোয়ার কামিজ পরা যা এর মধ্যেই ভিজে একাকার। পিছনের দিকের খোলা চুলের ফাঁকফোকর দিয়েও অন্তঃবসন উঁকি দিচ্ছে।পরক্ষনেই সে নিজের আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে রাগে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে হাতের খামটা শক্ত করে মুঠো করে ফেললো। মেয়েটা আগের মতোই কোন কারনে মাথা নুইয়ে রেখেছে। সে কি বুঝতে পারছে তাকে এখানে উপস্থিত প্রতিটি পুরুষ নিজের পৈশাচিক নজরে গিলে খাচ্ছে! শাহরিয়ারে এই মুহুর্তে নিজের পুরুষ হওয়ায় লজ্জা লাগছে। একটা মেয়ে বিপদে পড়েও তাদের কামুকতা থেকে রেহাই পায় না, ছিহ এই জন্মের প্রতি।!

কি হলো শাহরিয়ারের মনে তা সে নিজেও বুঝলো না কিন্তু পলকেই কিছু একটা ঘটলো! সে নিজের কালো স্যুটটা নিয়ে মেয়েটার গায়ে চাপিয়ে দিল, যা মেয়েটার কোমর অব্ধি ঢেকে দিলো। অজানা অচেনা মেয়েটার হাত ধরে ঐ আকাশ ভাঙ্গা বর্ষনের মধ্যেই নেমে গেলো। গনস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের সামনে এসে রিক্সায় বসিয়ে দিয়ে,


“ ম্যাম যেখানে যায় নিয়ে যান !”

বলে নিজের চামড়া উঠে যাওয়া মানিব্যাগ হাতরে একশো টাকার দুটো নোট রিক্সাওয়ালার হাতে পুরে দিলো। কোন দিকে না তাকিয়েই সে হাটা ধরলো ঐ শান বাধানো হাসপাতাল পথ ধরে।গনস্বাস্থ্য থেকে ল্যাব এইড তারপর আরও দুরে …………… ঝুম বর্ষনে মাথার ঝাঁকড়া চুলগুল বারবার কপালে নেমে পড়ছে, আর সে তা বারবার ঠেলে উপরে তুলছে। আর দুর থেকে দুরে হারিয়ে যাওয়া লম্বা পুরুষটার দিকে বিস্মিত অপলক চেয়ে রইলো রিক্সার ছোট্ট জানালা দিয়ে, এক বিস্মিত সদ্যা যুবতী । যে কিনা দমকা হাওয়ার ন্যায় তাকে ভাসিয়ে দিলো এক অজানা অনুভূতিতে।


সমাপ্ত...