কথক:-সাইদুর তানজীব পারীর কথাটাকে বিশ্বাস করতে পারলো কি না বোঝা গেল না তবে এর বেশি পারীর সাথে আর আলোচনা করলো না। পারীকে বিদায় জানিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো এদিকে সম্রাট পারীর কথাগুলো নিজের মনেই চিন্তা করতে লাগলো আর পারীর বিরুদ্ধে জড়ো করলো হাজারটা অভিযোগ।
দুইদিন পরের ঘটনা,
আজকে পারী ছুটি নিয়েছে,কারন ঘরে কিছু জিনিস কেনাকাটা করতে হবে।সোহা পারীকে কিছু টাকা অগ্রীম দিয়েছে,পারীর মায়ের অসুস্থতার জন্য আর্থিকভাবে সাহায্য করতে চাইলেও পারী না বলে দিয়েছে, শুধু নিজের বেতনের থেকে অগ্রীম কিছু টাকা নিয়েছে।সেই টাকা নিয়েই বাজারের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে।
একটা কাঁচা বাজারের সামনে বিশাল জ্যামে গাড়ি নিয়ে বসে আছে সম্রাট। স্টিয়ারিং এ হাত রেখে বিরক্তিকর চাহনি দিয়ে একমনে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে, প্রচন্ড গরম তার মধ্যে এরকম জ্যাম,গাড়ীতে এসি থাকলেও অজানা কারনেই মেজাজ টা সকাল থেকে বিগড়ে আছে, যার কারনে ঘামছে,তার মধ্যে এরকম জ্যাম।
সম্রাট:- উফ্,কেন যে এরকম ব্যস্ত রাস্তার পাশে বাজার বসায় বুঝিনা!
কথক:- বিরক্ত হয়েই উক্ত কথাটি বলেই গাড়ী থেকে বের হয়ে একবার সামনের পরিস্থিতি বোঝার জন্য পা বাড়াতে গিয়েও থেমে যায়, গাড়ীর সাথে হেল দিয়ে দাঁড়িয়ে আশেপাশের চোখ বুলাতেই কিছু একটা দেখতে পায়। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তবুও ভালো করে বোঝার চেষ্টা করছে যা দেখছে তা কি সত্যি ই! সম্রাটের থেকে কিছুটা দুরের একটা সবজির ভ্যান গাড়ি থেকে সবজির জন্য বেশ দর কষাকষি করছে পারী! যেই পারী সবজির দোকান কেমন তাই জানতো না সেই কিনা আজ এরকম একটি জায়গা থেকে নিজেই বাজার করছে তাও আবার এরকম দামাদামি করে!
সম্রাট:- কি হচ্ছে এসব? আর ও এখানেই বা কেন?
সম্রাটের চিন্তার মাঝে ভাটা পড়লো পেছনের গাড়ীর হর্নে। নিজেকে সামলে পারীর দিকে চোখ রেখেই গাড়ীতে উঠে বসলো, স্টিয়ারিংএ হাত দিয়েই চালানো শুরু করলো,সম্রাটের গাড়ীর চাকা নোংরা কর্দমাক্ত পানির উপর দিয়ে যেতেই সেই পানির ছিটা পারীর গায়ে গিয়ে লাগলো,পারী নিজেকে সামলাতে চেয়েও পারলো না, নিজের হালকা ফিরোজা কামিজের দিকে চেয়ে ছুটে চলে যাওয়া গাড়ীর উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চেয়েও বললো না। দোকানির সাথে লেনদেন মিটিয়ে নিজের অবস্থা বুঝে আর কিছু না কিনেই চলে গেল।
তানহা:- আচ্ছা তুমি কি আমাকে আজকে একটু সময় দিতে পারবে?
কথক:-সম্রাটের উদ্দেশ্যে তানহার উক্ত কথাটি ছিল।
তানহার কথায় কপালে হালকা ভাজ ফেলে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তানহার দিকে তাকালে তানহা আবার বলা শুরু করল,
তানহা:- আসলে আজকে আমার এক ফ্রেন্ডের ম্যারেজ ডে তো সেখানে সবাইকে কাপল হিসেবে যেতে বলেছে!
( কিছু সময় থেমে নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে আবারও সম্রাটের মুখ পানে চেয়ে বলতে লাগলো)
আমার সব বন্ধু বান্ধবীরাই কাপলস শুধু মাত্র আমি একাই একা তাই বলছিলাম, তুমি যদি...!
সম্রাট তানহার কথা অসম্পূর্ণ রেখেই বললো,
সম্রাট:- তাহলে তুমিও কাপল হয়ে যাও! এখানে এতো ভাবার কি আছে? আর কতদিন নিজেকে সিঙ্গেল রাখবে এবার অন্তত পার্টনার খুঁজে নাও! তাহলে আর এরকম কাপলস প্রোগ্রামে যাওয়া নিয়ে ভাবতে হবে না!
তানহা:- আমি তো মিঙ্গেল হতেই চাই!
সম্রাট:- হুম ভালো তো! তাহলে অপেক্ষায় আছো কিসের?
তানহা:- তুমি জানো না?
সম্রাট:- আমি জানি না মানে?
তানহা:- তুমি কি সত্যিই জানো না,নাকি জেনেও না জানার ভান ধরেছো? আসলে কি সত্যিই তুমি আমার মনের ডাক শুনতে পাও না?
কথক:-সম্রাট এবার সিরিয়াস হয়ে তানহার দিকে তাকালো,তানহার চোখেমুখে এক না পাওয়ার যন্ত্রনা, নিদারুণ আকুতি। বিষন্নতা যেন উপচে পড়ছে। তবুও কেন পারে না সম্রাট এই চাহনিকে আগলে নিতে,পারে না বিষন্নতার জাল ছিন্ন ভিন্ন করে এই মেয়েটার আকুতিতে সাড়া দিতে,পারে না কেন ভালোবেসে বুকে আগলে নিতে! বুকে আগলে নিতে! কিভাবে পারবে এটা! আদৌ সম্ভব! এই বুকে যে অন্য একজনের বসবাস! হাজার আঘাত দিক সে, তবুও পারবে না এই বুকে অন্য কাউকে জায়গা দিতে।যদি সে তাতে পাপী হয় তবে সে পাপী,যদি লাগে বিশ্বাসঘাতকের ট্যাগ তবে লাগুক! তবুও না। এ জীবন থাকতে না। সম্রাটের চাহনিতে তানহা নিজের জন্য ভালোবাসা খুঁজছে কিন্তু না তাতে ও শুধু ওর জন্য সহানুভূতি আর সমবেদনাই খুঁজে পেল, ভালোবাসা নয় তাই নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতেই চলে গেল এক দৌড়ে সম্রাটের কেবিন ছেড়ে।তানহার যাওয়ার পানে তাকিয়ে সম্রাট একটা হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়লো। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বিশাল কাঁচের জানালার পাশে, উঁচু দালানে দাঁড়িয়ে নিচের মানুষের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো অতিতের কিছু কথা,
------ ---------অতীত -----------------
জব্বার মন্ডল:- সম্রাট ,আরে এই সম্রাট! আরে এই বেটা সম্রাট!
কথক:-অনেকটা উত্তেজিত হয়েই বেশ হম্বিতম্বি করেই গ্যারেজের দরজা পেরোতে পেরোতেই সম্রাটের নামের হর্ন বাজাচ্ছিলো জব্বার মন্ডল।
সম্রাট:- জ্বী মামা!
কথক:- বেশ দৌড়াতে দৌড়াতে এসেই জব্বার মন্ডলের সামনে এসে বললো কথাটা! জব্বার মন্ডল সম্রাট দেখেই জড়িয়ে ধরলো,খুশিতে উনি যেন আত্নহারা হয়ে পড়েছেন।সম্রাটও বুঝতে পারলো উনার খুশির উচ্ছ্বাসটা তাই নিজেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
সম্রাট:- মামা কি হয়েছে,এত খুশি কেন?
জব্বার মন্ডল:- খুশি মানে! আমি যে কি পরিমান খুশি তা বলে বোঝাতে পারবো না রে বেটা!
সম্রাটের থেকে নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতেই
কথাটা বললো,সম্রাট তার কথা বুঝতে না পেরেই মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো,উনি সম্রাটের চাহনি দেখেই শব্দ করেই হেসে উঠলেন তারপর চেয়ারে বসতে বসতে বলতে লাগলো,
জব্বার মন্ডল:-বাবু এক গ্লাস পানি দে!
কথক:-পানির ফরমাইশ দিয়েই সম্রাটের হাত ধরেই নিজের পাশের চেয়ারে বসিয়ে বলতে লাগলেন,
জব্বার মন্ডল:- পানিটা খেয়ে নেই!
সম্রাট মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিয়েই বসে রইলো পানি খাওয়ার পর জব্বার সাহেব বলতে লাগলো,
পর্ব ১৪
আমি অনেক দিন আগেই একটা গাড়ী ইমপোর্ট কোম্পানির সাথে কাজ করার ইচ্ছা করেছিলাম, তাছাড়া ঐ কোম্পানির সাথে আমি কথাও বলেছিলাম,যাতে উনাদের সমস্ত নষ্ট গাড়ী আমাদের এখানে সার্ভিস করতে দেয়। উনারা বলেছিলেন ভেবে দেখবেন! তারপর অনেক দিন কোন খবর নেই , হঠাৎ করে গত চারদিন আগে উনারা ফোন করে বললেন উনাদের সাথে দেখা করতে,তাই আমি পরেরদিন সকালে....
কথক:-বেশ উত্তেজিত হয়েই কথাটি এই অবধি বললেন জব্বার মন্ডল , উনি থেমে যাওয়াতে উৎসুক চাহনিতে তাকিয়ে রইলো সম্রাট! কিছুটা দম নিয়ে আবার বললেন,
জব্বার মন্ডল:-যাওয়ার পর আমি অপেক্ষায় ছিলাম কখন আমাকে ডাকবে মিটিং এর জন্য! এর মধ্যেই শুনতে পেলাম উনাদের একজন শেয়ার হোল্ডার নাকি নিজের পার্সেন্টে'র অংশ ছেড়ে দিচ্ছেন তাই উনারা নতুন শেয়ার হোল্ডার চাচ্ছেন আর সেটা'রই মিটিং হচ্ছে! আমিও সুযোগের ব্যবহারটা করলাম।
সম্রাট:- মানে!
কথক:-সম্রাটের বিস্ময়কর চাহনি! অজানা খুশিতে চোখ চকচক করছে,জব্বার মন্ডল সম্রাটের খুশিকে উপলব্ধি করতেই শেষ কথাটা বললেন,
জব্বার মন্ডল:- উনারা আমাকে ডেকে ছিলেন কিছু গাড়ীর সমস্যার সমাধানের জন্য,তাই উনাদের মিটিং শেষ হওয়ার পর যখন আমাকে আবার মিটিং এর জন্য ডাকা হলো তখন আমি সবার আগে উনাদের শেয়ারে বিষয়ে জানতে চাই।প্রথমে উনারা আমাকে এই বিষয়ে অবগত করতে না চাইলেও পরে কিছু একটা ভেবে পুরো বিষয়টি খুলে বলেন এবং সব শোনার পর আমি উনাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ দেখালে উনারা অনাগ্রহ দেখায়।আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমাকে ছোট্ট খাট গ্যারেজ মালিক মনে করেছে তাই দাম দিতে চায়নি।তাই যখন বললাম শেয়ারের পুরোটা আমি নগদ অর্থ দিয়ে নিবো এবং বর্তমান যত টাকা ঘাটতি আছে পুরোটা পুষিয়ে দিবো তখন একটু নড়েচড়ে উঠেছে। তারপর বলেছেন সময় দিতে ভেবে বলবেন,আমিও রাজী হয়েছি।
সম্রাট:- তারপর! ওহ তার মানে আজ উনারা পজেটিভ রিপ্লাই দিয়েছেন!
কথক:- খুশিতে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠতে উঠতেই উক্ত কথাটি বলে।
জব্বার মন্ডল:- হুম! আমার অনেক দিনের ইচ্ছা পূরন হলো।এর মধ্যেই সকালে খবর এলো আমার তানহা'র রেজাল্টের।
সম্রাট:- তানহা'র আজকে রেজাল্ট দেওয়ার কথা ছিলো?
জব্বার:- হ্যা কেন তুই জানিস না!
সম্রাট:- না তো আমাকে বলেনি
কথক:-সম্রাট কথাটা অনেকটা আশ্চর্য হয়েই বলে জব্বার মন্ডল ও আশ্চর্য হয় কারন তানহা নিজের ছোট থেকে ছোট বিষয় ও সম্রাটের সাথে শেয়ার না করে পারে না সেখানে রেজাল্টের বিষয়টা কেন বললো না। কিন্তু কিছু একটা মনে করেই সম্রাট কে বলে উঠলো,
জব্বার:- আচ্ছা বাদ দে!
কথক:-কথাটা বলেই উনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর সম্রাটের কাঁদে হাত রেখে সম্রাটের মুখোমুখি হয়ে বললেন,
জব্বার মন্ডল:- আজকে সন্ধ্যায় উনাদের সাথে মিটিং আছে,আর আমি চাই সেই মিটিং এ তুই আর তানহা আমার সাথে যাবি!
সম্রাট:-আমি!
জব্বার মন্ডল:- হ্যা তুই! কেন কোন আপত্তি আছে?
সম্রাট:- না মানে তানহা ঠিক আছে কিন্তু আমি !
জব্বার মন্ডল:- কেন! তুই গেলে কি সমস্যা? তানহা আমার মেয়ে তুই ও তো আমার ছেলে! হয়তো তানহাকে আমি জন্ম দিয়েছি,তানহা আমার রক্তের তাই বলে তুই কি আমার কম আপন? আমি কি কখনো তোকে সেই চোখে দেখেছি?
সম্রাট:- নাহ মামা আমি সেভাবে বলিনি,আমি তো শুধু যেটা ঠিক সেটাই বলছি!
জব্বার মন্ডল:- ঠিক বেঠিক বুঝিনা; আমার নিজের কোন পুত্র সন্তান নেই, আল্লাহর রহমতে দুটো বেহেস্ত আছে আমার কিন্তু দিনশেষে তারাও একদিন চলে যাবে পরের ঘরে! তখন তো আমার সব কিছু পড়ে থাকবে আর নয়তো জামাই নামক বদমাইশ-গুলো সব নিয়ে নিবে তখন কি হবে? তাই আমি চাই আমার পর আমার এই বিষয়গুলো তুই খেয়াল রাখবি। আর সেটা আমার ছেলের পরিচয়ে,তোকে কোনদিন ও অন্য চোখে দেখিনি বরাবর'ই নিজের ছেলে মনে করেছি। তোকে যতবার'ই দেখি মনে প্রশান্তি হয় এই ভেবে যে আমার'ও একটা ছেলে আছে! আর তুই শুধু আমার না তোর মামীর কাছেও ছেলের মতোই। আমার তানহা মানহা'র বড় ভাই!
সম্রাট:- মামা! তারপরও!
জব্বার মন্ডল :- কোন তারপরেও না! তুই আমার সাথে যাচ্ছিস এটাই ফাইনাল! তাছাড়া আমি ওদেরকে ও বলে দিয়েছি আমার সাথে আমার ছেলে আর মেয়ে আসছে।
সম্রাট:- মামা!
কথক:-জব্বার মন্ডল সম্রাটকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করেন! সম্রাট খুব'ই গরীব ঘরের ছেলে,বাবা ছিলো সামান্য রিক্সা-চালক তবে তার স্বপ্ন ছিলো বিশাল বড়,তাই তো নিজে শত কষ্ট করে হলেও সন্তানদের পড়াশোনা করানোর তীব্র ইচ্ছা ছিলো।তবে সম্রাট যখন আটবছর তখন ওর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে ,এর কারনে ওদের অবস্থা না খেয়ে থাকার পর্যায়ে চলে যায় যার দরুন ওর মা ওকে মানুষের সাহায্যে এই জব্বার মন্ডলের গ্যারেজে পিচ্চি হিসেবে কাজে লাগিয়ে দেয়। সেই থেকে সম্রাট জব্বার মন্ডলের কাছেই রয়েছে।উনি সেই আট বছর বয়সী সম্রাটের চোখে মুখে যেই আত্ন-বিশ্বাস আর সততা দেখেছিলেন তাতেই মুগ্ধ হয়েছিলেন।সম্রাট তখন স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।কারন নিজেরাই খেতে পারে না সেখানে স্কুলের খরচ কিভাবে বহন করতো।তবে বেশিদিন নিজের স্কুল থেকে দুরে থাকতে হয়নি।জব্বার সাহেব যখন কোন কাজে তার বাসায় পাঠাতেন তখনই সম্রাট গিয়ে তানহা'র সাথে খেলাধুলা করতো,তানহা'র বয়স তখন সবে চার। মাত্র স্কুলের দরজায় পা দিয়েছে।তাই তানহা'র কাছে সবকিছু ছিলো রঙিন।সেই রঙের নেশায় সে নিজের বইয়ের বাহারী রঙের ছবিগুলো হাতে বুলিয়ে দিতো আর খিলখিল করে হাসতো ।সম্রাট'ও গিয়ে তানহা'র সাথে সেই খেলায় মেতো উঠতো আর পাশাপাশি তানহা'কে অক্ষর শিখাতো বলতে গেলে সম্রাট'ই ছিলো তানহা'র অক্ষর জ্ঞানের শিক্ষক! আর তাই তো তানহা'র সাথে সম্রাটের বন্ধন ছিলো অসাধারণ।সম্রাটের তানহা'কে শেখানোর আগ্রহ'ই বলে দিতো পড়াশোনার প্রতি সম্রাটের আগ্রহ। তাছাড়াও সম্রাট সবসময়ই কোথাও কোন কাগজের টুকরো, পত্রিকা পেলেই সেটা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তো ।এই বিষয়গুলো কখনোই জব্বার সাহেবের নজরে এড়ায়নি।আর তাই উনি নিজেই অভিভাবক হয়ে সম্রাটকে ভর্তি করালেন স্কুলে ।সকালে স্কুলে পড়ে দুপুর থেকে রাত অবধি কাজ করতো ।আর সুযোগ পেলেই নিজের বই'য়ে মুখ গুজে দিতো।অবশ্য বলতে হয় সময় পেলে না বরং জব্বার সাহেব নিজেই সময় করে দিতো তবে বুঝতে দিতো না সম্রাটকে যাতে করে সম্রাট সময় আর সুযোগের মূল্য দিতে শিখে।ধীরে ধীরে সম্রাট বড় হতে লাগলো ,আর জব্বার মন্ডল এবং তার পরিবারের সাথে সম্রাটের বন্ধন আরো মজবুত হতে লাগলো।যখন সম্রাটের পরীক্ষার সময় হতো তখন জব্বার সাহেব সম্রাটকে পড়ানোর জন্য তানহা'র শিক্ষককে অনুরোধ করে ওকে পড়াতে বলে এবং তার জন্য উনি বাড়তি পারিশ্রমিক ও দেয়।ক্লাস এইটে সম্রাট ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পেলো। খুশি হয়ে উনি নিজেই একটা সাইকেল উপহার দেয়। এভাবে এস এস সি পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসে।সম্রাট প্রতিদিন আসা যাওয়া করে চাকরি তারপর পড়াশোনা করতো এতে ওর অনেক সময় নষ্ট হতো, কিন্তু পরীক্ষার সময় এত সময় নষ্ট করলে পরীক্ষার ফলাফল ভালো না'ও আসতে পারে তাই যথেষ্ট সময় নিয়ে পড়াশোনা করার দরকার। কিন্তু সম্রাটকে অনেক সময়ের জন্য ছুটি দেওয়াও সম্ভব নয় কারন সম্রাট ছিলো জব্বার মন্ডলের সবচেয়ে বেশি বিশ্বস্ত।ওকে রেখে উনি যেকোন সময় যেকোন জায়গায় চলে যেতে পারতেন। অনেক ভেবে জব্বার মন্ডল নিজের গ্যারেজের মধ্যেই একটা সুন্দর করে ঘর বানালেন এবং সম্রাটের থাকার উপযোগী করে তুললেন,তখন থেকেই সম্রাট সেই গ্যারেজে'ই নিজের ঘরবাড়ি বানিয়ে ফেললো।জব্বার মন্ডল চাইলেই সম্রাটকে নিজের কাছে নিজের বাসায় রাখতে পারতো কিন্তু ঐ যে সমাজ! আমাদের সমাজ কোন মানুষের ভালো কাজকে তো সহজে গ্রহন করতে পারে না।তারা ভালো'কে কালো বানানোর জন্য মুখিয়ে থাকে।আর তাই তো ভালো কাজ করতে চাইলেও অনেক সময় করা হয়ে উঠে না । ঠিক তেমনি জব্বার মন্ডল ও। একে তো তানহা ছিলো সম্রাট ঘেঁষা।তার উপর দুজন'ই ছিলো উঠতি বয়সের।আর সম্রাটকে এত আদর করাটা অনেক মানুষ ই নিতে পারতো না বিশেষ করে উনার কিছু মুখ ডাকা আত্নীয়-স্বজন। তাই উনি অনেক কিছু ভেবেই সম্রাটকে নিজের বাসায় আনেনি। এভাবেই সম্রাট বড় হয়,তানহা বড় হয়।সম্রাট এস এস সি তে গোল্ডেন পায়,এইচ এস সি তে তে গোল্ডেন পায় তাও আবার কমার্স নিয়ে। অনার্স এ ভর্তি হয় দেশের সবচেয়ে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তাও সম্পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে। তানহা'র চোখে সম্রাট ছিলো তার বন্ধু কিংবা বন্ধুর চেয়েও বেশি তবে সম্রাট বরাবর'ই তানহা, মানহা'কে নিজের বোন হিসেবেই দেখেছে। ওর কাছে ওরা ছিলো ওর ছোট বোনের সমতুল্য। সম্রাট নিজের অতীতের আদ্যো-প্রান্ত নিয়ে এতটাই গভীর চিন্তায় ছিলো যে কখন তানহা এসে ওর সামনে দাড়িয়েছে টের'ই পেল না।
পর্ব ১৫
তানহা:- I am sorry !
হঠাৎ তানহার গলার শব্দে বর্তমানে ফিরে আসে সম্রাট! নিজের ভাবনায় মশগুল থাকায় তানহার বলা কথাটা বুঝতে না পারায় তানহার দিকে তাকিয়ে রইলো, তানহা আবারও বলা শুরু করলো,
তানহা:- আমি দুঃখিত! আমার বোঝা উচিত ছিলো তোমার মনের অবস্থা! আমি আর..!
সম্রাট:- it's ok ! ভুলে যাও সব ।আমিও ভুলে গিয়েছি।
তানহা:- হুম!
তানহা কথা শেষ করে চলে যাওয়ার জন্য পিছু ঘুরতেই সম্রাটের কথায় আবারও ফিরে তাকালো,
সম্রাট:- তোমার ফ্রেন্ডের পার্টিতে কখন যেতে হবে?
তানহা সম্রাটের কথাঊ
খানিকটা surprised হয় তারপরও বলে,
তানহা:- ৮ টার দিকে!
সম্রাট:- ওকে তুমি রেডি থেকো! আমি যাবো!
তানহা:- সত্যি -ই?
সম্রাট:- হুম!
হালকা মৃদু হেসে তানহার দিকে মাথা দুলিয়ে! তানহা খুশি হয়ে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে রইলো।সম্রাট নিজের হাসিটা বজায় রেখে চেয়ারে গিয়ে বসলো।তানহা সেদিকে একবার তাকিয়ে চলে গেল নিজের কেবিনে।
------ সন্ধ্যা ৬:৩০ -----
কলিং বেলের শব্দ পেয়ে পারি চারদিকে তাকিয়ে একবার দেখলো কেউ আছে কিনা, কাউকে দেখতে না পেয়ে নিজেই দরজা খুলে দিলো,তানহাকে দেখতে পেয়ে সরে দাঁড়ালো,তানহা পারিকে দেখে কিছুটা অসস্থি বোধ করছে, কেন করছে জানে না তবে করছে।পারিও তানহাকে দেখে কিছুটা অন্যরকম অনুভব করছে, কেন তাও সে জানে না তবে এতটুকু বুঝতে পারছে কিছু দিন ধরে পারির প্রতি তানহার চোখে অন্য কিছু আছে,হতে পারে সেটা ক্ষোভ কিংবা হিংসা। হঠাৎ ই পারির মনে একটা প্রশ্ন জাগলো,
পারি:- আচ্ছা উনি কি সব জানেন!
প্রশ্নটা মনে জাগতেই তানহার দিকে তাকালো তানহা ততক্ষণে ভেতরে ঢুকে গেছে এবং সে সোজা সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগলো,পারি পেছন থেকে তানহার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো তানহা শাড়ী পড়েছে এবং খুব সুন্দর করে সেজেছে মনে হচ্ছে কোথাও যাবে। পারি কিছু সময় সেদিকে তাকিয়ে রইলো তারপর দরজা বন্ধ করে আবার ভেতরে চলে গেল! তানহা সম্রাটের দরজায় গিয়ে নক করলো,
সম্রাট:- ভেতরে আসো!
তানহা:- তুমি কি তৈরি?
সম্রাট:- হুম!
কথাটা সম্রাট নিজেকে আয়নায় দেখতে দেখতেই বললো, perfume ব্যবহার করে নিজেকে পরিপাটি করে তারপর পিছন ঘুরে তানহাকে শাড়ীতে দেখে হালকা মুচকি হেসে বললো,
সম্রাট:- বাহ শাড়ীতে তোমাকে বেশ সুন্দর লাগছে!
তানহা সম্রাটের কথায় লজ্জায় মাথা নুইয়ে রাখে! সম্রাট তানহাকে লজ্জা পেতে দেখে দুষ্টু হাসি দিয়ে তানহাকে ক্ষেপানোর জন্য বললো,
সম্রাট:- সিরিয়াসলি তুমি লজ্জা ও পাচ্ছো! আমি তো জানতাম লজ্জা তোমাকে দেখে লজ্জা পায়!
তানহা সম্রাটের কথায় ক্ষেপে যায়,কপাল কুঁচকে হালকা রাগ দেখিয়ে বলতে লাগলো,
তানহা:- By any chance তুমি আমাকে leg pull করছো!
সম্রাট:-আরে ধুর কি বলো leg pull আর তোমাকে! আমার ঘাড়ে কটা মাথা!
কথক:-সম্রাটের এহেন কথায় তানহা এক হাত কোমড়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে সম্রাটে দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ই একসাথে দুজন হেসে ফেললো,আর সেই হাসির আওয়াজে পুরো বাড়ি যেন ঝমঝমিয়ে উঠলো। তারসাথে আবারও বিষাদে ছেয়ে গেল পারির মন।ও নিচ থেকেই শুনতে পেলো তানহা সম্রাটের হাসির ঝংকার। অজান্তেই চোখ ভিজে যায়। মনের মধ্যে বলে গেল দুঃভাগ্য,
পারি:- সে সুখে আছে, বেঈমানরা সুখেই থাকে!
পারি সায়েরাকে নিচে বসিয়ে নাস্তা করাচ্ছিলো কিছু সময়ের মধ্যেই চলে যাবে বাসায়,এর মধ্যেই বাড়ির সব সদস্য নিচে চলে আসে তানহার আসার কথা শুনে,সোহাও মাত্র বাসায় এসে পৌঁছিয়েছে,ড্রয়িং রুমেই বসে রয়েছে।সম্রাটের পিছু পিছু তানহা ও নিচে চলে এলো। সম্রাট উপর থেকে পারিকে নিচে দেখে তানহার হাত ধরেই নিচে নেমে এলো আর সেটা দেখে সবাই মিটমিট করে হাসছিল।যদিও সেদিনের দেখা হবার পর পারির সাথে সরাসরি সম্রাটের দেখা হয়নি তবে আড়ালে আবডালে সম্রাট বেশ কয়েকবারই পারিকে দেখেছে যদিও তা পারির অগোচরে।পারিকে দেখানোর জন্য তানহার হাত ধরে নিচে নেমেছে ঠিকই তবে সেটা আদৌ পারি দেখেছে কিনা সেটা সম্রাট জানে না কারন একবারও পারি ওদের দিকে তাকায় নাই,এতে যেন সম্রাটের ইগোতে লাগলো। তাই নিচে নেমেই তানহার হাতটা ছেড়ে দিলো। চোখমুখে শক্ত করে একবার পারির দিকে তাকালো,সে আপনমনে সায়েরাকে খাওয়াচ্ছে। হঠাৎ সায়েরার কথায় নিজেকে স্বাভাবিক করলো,
সায়েরা:- মামু!
সম্রাট:- হুম মামু!
সায়েরা:- তুমি কোথায় যাচ্ছো! আমিও যাবো!
সোহা:- না মা! মামু মনিকে নিয়ে কাজে যাচ্ছে! তুমি যেতে পারবেনা!
সায়েরা:- মামু! ( ঠোঁট উল্টিয়ে সম্রাটের দিকে চেয়ে করুন চাহনি দিয়ে)
তানহা:- তোমাকে কালকে মামনি ফ্যান্টাসি কিংডমে নিয়ে যাবে। ওকে বেবি!
সায়েরার সামনে হাটু মুড়ে বসে তারপর সায়েরার গালে হাত দিয়ে আদুরে কন্ঠে বললো, সম্রাট ও এবার বসে পড়ে সায়েরার সামনে,গালে ঠোট ছুঁইয়ে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে আদুরে কন্ঠে,
সম্রাট:- মা ,মামু আপনাকে কালকে নিশ্চয়ই বেড়াতে নিয়ে যাবে ,আর অনেক Toys কিনে দিবে! So don't be sad please !
সায়েরার মুখ এবার খুশিতে চকচকে হয়ে উঠলো সে খুশির বহিঃপ্রকাশ নিজের মাথা দুলিয়ে বোঝায়, তারপর সম্রাট আর তানহার গালে ঠোট ছুঁইয়ে আবার ও পারির কাছে চলে যায়। সম্রাট সায়েরার যাওয়ার দিকে তাকাতেই পারির সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। পারি নিজের চোখ সরিয়ে অন্য দিকে ফিরিয়ে নেয় সম্রাটও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে,
সোহা:- তোমরা কিসের পার্টিতে যাচ্ছো?
তানহা:- আমার এক ফ্রেন্ডের Marriage anniversary তাই সেখানে যাচ্ছি।কাপলস প্রোগ্রাম তাই চাইলেও বেবিকে নিতে পারছি না!
সোহা:- It's ok ! তোমাকে কোন explanation দিতে হবে না।
তানহা সোহার কথায় হালকা হেসে দেয় সোহা আবারও বললো,তা কাপলস প্রোগ্রামে যাচ্ছো এভাবে কেন?
সোহার কথায় সম্রাটের কপাল কুঁচকে আসে তানহা না বুঝে সোহার দিকে তাকিয়ে রইলো,সোহা এগিয়ে এসে তানহার হাত নিয়ে সম্রাটের বাহুতে রেখে বললো,
সোহা:- এই যে এভাবে, এইভাবে কাপলস প্রোগ্রামে যেতে হয় !
সোহার কাজে সম্রাট কপাল কুঁচকে নিজের বাহুতে রাখা তানহার হাতটার দিকে তাকালো,তানহা লজ্জা মিশ্রিত হাসি দিয়ে আরো শক্ত করে ধরলো সম্রাটের বাহুটা,পারি এতক্ষণ সবই দেখছিলো ,সম্রাট হাতটা সরিয়ে দিতে চেয়েও কিছু একটা মনে করে সরালো না, একবার পারির দিকে তাকালো,পারি সম্রাটের তাকানোতে নিজের দৃষ্টি মিলিয়ে অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলো। সম্রাট চোয়াল শক্ত করে ঐ অবস্থাতেই সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল।পারি নিরুত্তাপ ভাবে নিজের কাজ শেষ করে সে ও চলে গেল!
------কয়েকদিন পরের ঘটনা--------
রাত ১২:১৫ মিনিট
নির্জন রাস্তায় দৌড়াচ্ছে একটা মেয়ে আর তার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে কিছু বখাটে! মেয়েটা প্রানপনে বাচার চেষ্টায় দৌড়াচ্ছে, হঠাৎ করেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল! কিছু একটা পড়ার শব্দে সম্রাট সহ আরো তিনজনের কপালে ভাঁজ পড়লো, সম্রাট এসেছিলো জরুরী একটা কাজে,সাথে ছিলো ম্যানেজারসহ আরো একজন লোক! মেয়েটা উঠে দাঁড়ানোর আগেই বখাটে গুলো মেয়েটার সামনে এসে দাড়িয়ে বিচ্ছিরি ভাবে হাসতে লাগলো,মেয়েটা আতংকে জমে গিয়েছে উঠে দাঁড়ানোর জন্য শক্তিটুকু ও পাচ্ছে না।এর মধ্যেই একজন মেয়েটার গায়ের শাড়ীটার দিকে হাত বাড়াতেই কপাল ধরে আর্তনাদ করে উঠলো!
পর্ব ১৬
ছেলেটার আর্তনাদ শুনে বাকী ছেলে গুলো সামনে তাকাতেই দেখতে পায় তিনজন মানুষ হাতে রড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,তার মধ্য থেকে একজন রড দিয়েই ঐ ছেলেটার কপালে হালকা আঘাত করে যার দরুন ছেলেটা কপালে হাত দিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে ঘষতে ঘষতে একটু দুরে সরে যায়। কিন্তু এই ছেলে গুলো ভয় না পেয়ে সামনে এগোতে নিলেই সম্রাটসহ বাকীরাও এবার রড তুলে দুই একটা আঘাত করতেই সবাই পালিয়ে যায়। এইবার সম্রাট ও বাকীরা নিচে পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে দৃষ্টি দেয়। মেয়েটা ভয় আর লজ্জায় চোখ মেলে ও তাকাতে পারছে না,হাটু মুড়ে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে।সম্রাট ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজের সাথের লোকদের দিকে একবার তাকিয়ে মেয়েটার সামনে গিয়ে হাটু মুড়ে বসে মেয়েটার উদ্দেশ্যে বলতে লাগলো,
সম্রাট:- দেখুন আপনি এখন নিরাপদে আছেন! ভয় পাবেন না প্লিজ,আমরা খারাপ লোক না!
মেয়েটা ভয়ে এতটাই জমে গেছে যে সম্রাটের কন্ঠ ও বুঝতে পারল না।ও আগের মতোই বসে রয়েছে,তবে এখন ওর শরীর মৃদু মৃদু কাঁপছে সম্রাট বুঝতে পারলো মেয়েটা কাঁদছে,ও উঠে দাঁড়িয়ে ওর সহকারীকে বললো,
সম্রাট:- পানি!
(সহকারী) মঈন দৌড়ে গিয়ে গাড়ী থেকে পানির বোতল এনে দিলো,সম্রাট বোতলটা নিয়ে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে,
সম্রাট:- নিন পানিটা খান দেখবেন কিছুটা ভালো লাগছে! এত সময়ে মেয়েটার কাঁপুনি ও থেমে গেছে।
মেয়েটা পানির বোতল নেওয়ার জন্য মুখ উপরে তুলতেই থমকে গেল চার জোড়া চোখ,স্তব্ধ হয়ে গেল চারিপাশ! মুহুর্তেই যেন পরিবেশ কেমন মধুর বিষাক্ততায় ছেয়ে গেল! অস্ফুট স্বরে উচ্চারিত হলো সম্রাটের মুখের ধ্বনি,
সম্রাট:- পারি!
সম্রাটের মুখে পারি শুনে মঈন ও ছুটে এলো,পারিকে দেখে চমকে গিয়ে বললো,
মঈন:- আরে আপনি, আপনি তো সায়েরা বেবির বেবি সিটার! আপনি এত রাতে এখানে?
পারি এখনও চুপ হয়ে আছে,সম্রাটের চাহনি ও নিরব,মঈন আবার ও বলে উঠলো,
মঈন:- দেখেছেন স্যার কি ভাগ্য আমরা অন্য কেউ ভেবে সাহায্য করতে এসেছিলাম কিন্তু দেখুন এসে দেখলাম আমাদের নিজস্ব মানুষ ই ! স্যার যদি আপনি সময় মতো সাহসী পদক্ষেপ না নিতেন তাহলে ভাবতে পারছি না কি হতো?
মঈন নিজের কথা কিছু সময় বিরতি দিয়ে আবারও বলতে লাগলো,
মঈন :- মিস পারি উঠুন,"আমার হাত," আচ্ছা আপনাকে মিস পারি বলবো নাকি মিসেস পারি তাতো জানিনা!
শেষের কথাটা মঈন মজা করেই বললো, তারপর নিজের হাতটা পারির দিকে বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই দেখতে পায় অলরেডি একটা হাত পারির সামনে বাড়ানো রয়েছে, হাতের মালিকের দিকে তাকিয়ে ওর চোখ ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম , উপর হয়ে পড়ে যাওয়ার কারনে পায়ে অনেকটা ব্যথা পাওয়ায় পারির উঠতে সমস্যা হচ্ছে, তবুও সম্রাটের বাড়ানো হাতটা না ধরে নিজেই অনেক কষ্ট করে উঠে দাড়ালো, সম্রাটের এই বিষয়টা হজম হলো না,হাতটা সরিয়ে চোয়াল শক্ত করে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করতে হাতের মুডটাকে আরো শক্ত করলো,সম্রাটকে এভাবে ইগনোর করার সাহস দেখানোর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য মঈন সম্রাটের দিকে তাকাতেই আতকে উঠলো,ও বুঝতে পারছে সম্রাট প্রচন্ড ক্ষেপে গেছে।তাই নিজের ফানি মুডকে পরিবর্তন করে সিরিয়াস মুডে চালু করলো,
পারি উঠি দাড়িয়ে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই সম্রাটের কথায় থেমে গেলো,
সম্রাট:- মঈন ওনাকে ওনার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসুন।আর হ্যাঁ বলে দিবেন রাত বিরাতে এভাবে একা না বেরোতে, সবসময় তো এরকম সাহায্য না ও পেতে পারে,বের হওয়াটা জরুরী হলে যেন উনার স্বামীকে নিয়েই বের হয়।
মঈন:- জ্বী স্যার!
সম্রাট:- আমার গাড়ীটা নিয়ে যান!
সম্রাট নিজের কথা শেষ করে অন্যদিকে চলে গেল,মঈন আদেশ কার্যকর করতে পারিকে গাড়ীর দিকে আগাতে নির্দেশ দিলো,পাড়ী খোড়াতে গাড়ীর দিকে না গিয়ে বিপরীত দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতেই মঈন বললো,
মঈন:- ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন,গাড়ী তো এদিকে!
পারি পিছনে ঘুরে নিচু স্বরে বলল,
পারি:- ধন্যবাদ! আপনারা অনেক করেছেন আমার জন্য,এত রাতে আর কষ্ট দিতে চাই না! আমি নিজেই যেতে পারবো!
মঈন:- কিন্তু!
পারি:- প্লিজ!
মঈন :- আপনি তো ঠিক মতো হাঁটতে ও পারছেন না, তাহলে যাবেন কিভাবে! তাছাড়া ওরা যদি আবার আপনাকে একা দেখতে পায় তাহলে বুঝতে পারছেন কি হবে?
পারি:- নতুন করে কিছু হওয়ার নেই,যা হবার হয়ে গেছে!
পারির কথা মঈন কিছুই বুঝতে পারলো না, বেকুবের মতো তাকিয়ে থাকতেই পারি আবারও সামনে ঘুরে খুড়িয়ে হাটা শুরু করতেই পিছন থেকে সম্রাট কোলে তুলে নিলো,পারি চমকে গিয়ে চিৎকার করার আগেই সম্রাটের গম্ভীর গলার আওয়াজে বুঝতে পারলো ও সম্রাটের কোলে,
মঈন:- গাড়ীর দরজা খুলুন!
মঈন হঠাৎ ঘটা বিষয়টার কিছুই বুঝতে না পেরে হা করে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে,পারিও সম্রাটের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে,ভয়ে কিছু বলতেও পারছে না, সম্রাটের মুখের রক্তিম আভাই বলে দিচ্ছে এই মুহূর্তে সম্রাট ঠিক কতটা রেগে আছে! মঈনের বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে থাকাতে সম্রাটের মেজাজ আরো বিগড়ে গেলো, চিৎকার করেই বললো,
সম্রাট:- আপনি এখনো এভাবে দাড়িয়ে আছেন কেন?
সম্রাটের চিৎকারে মঈনের হুশ আসে, দৌড়ে গিয়ে গাড়ীর দরজা খুলে দেয়,সম্রাট ড্রাইভারের পাশের সিটে পারিকে বসিয়ে অন্যদিক থেকে নিজে এসে বসে পড়ে,মঈন উঠার আগেই গাড়ী ছেড়ে চলে যায়।মঈন আর সাথে থাকা লোকটা পুরো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ তারপর তারাও নিজেদের মতো চলে যায়!
গাড়ীতে দুজন মানুষ,একে অপরের কত আপন তাও যেন কত পর! কেউ কোন কথা বলছে না,অথচ বলার জন্য কত কথা জমে রয়েছে! পারি মুখ ঘুরিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে,সম্রাট সামনের দিকে তাকিয়ে কঠিন চাহনি নিয়ে গাড়ী চালাচ্ছে, হঠাৎ করেই পারি বললো,
পারি:- গাড়ী থামান!
সম্রাট পারির কথায় কপাল কুঁচকে তাকায়, জোর কষিয়ে গাড়ীটা থামায়, পারির দৃষ্টি এখনো বাইরে, তাই বাদ্য হয়েই মুখ খুললো,
সম্রাট:- কেন!
পারি:- আমি এখান দিয়ে যেতে পারবো!
সম্রাট:- মানে?
পারি:- আমি নামবো!
কথাটা বলেই পারি নিজের সিটবেল্ট খুলতে চেষ্টা করতেই সম্রাট সিটবেল্ট হাত দিয়ে আটকে ধরলো,পারি সম্রাটের দিকে তাকাতেই সম্রাটের শক্ত চাহনি দেখে বেল্ট থেকে হাতটা সরিয়ে নেয়,সম্রাট ওরকম ভাবেই হাতটা রেখেই স্লো ভয়েসে বললো,
সম্রাট:- আমাকে বাধ্য করো না,আমি চাই না তোমার সাথে এমন কিছু করতে যার জন্য নিজেকে ঘৃণা করতে হয়!
পর্ব ১৭
নিজের কথা শেষ করে গাড়ী স্টার্ট দিতেই আবারো থেমে গেলে পারির কথায়,
পারি:- আমার বাসা এখানেই,আমি এখানেই নামবো!
সম্রাটের প্রশ্নাত্নক চাহনি,পারি কোন উত্তর না দিয়ে বেল্ট খুলে নেমে গেল,সম্রাট কিছু বুঝার আগেই ওকে ধন্যবাদ দিয়ে হাঁটা ধরতেই সম্রাটের ডাকে থেমে গেলে,
সম্রাট:- পারি!
অনেক প্রতিক্ষিত কিছু হঠাৎ করেই পাওয়ার পর যেরকম অনুভূতি হয় পারির ও যেন সম্রাটের মুখে নিজের নাম শুনে সেইরকম অনুভূতি হয়। প্রথম যেদিন সম্রাট পারিকে চিনতে অস্বীকার করেছিলো সেদিন অনেক কষ্ট হয়েছিলো, হাজার অভিমান অভিযোগ ও যেন থিতো হয়ে যায় সম্রাটের মুখের পারি নামক শব্দটির উচ্চারনে।
সম্রাটের ডাকে পারি থেমে গেলেও পিছনে ঘুরে তাকায় নি,তা দেখে সম্রাট নিজেই বের হয়ে এসে ওর সামনে দাড়ায়,
সম্রাট:- চলুন আপনাকে পৌঁছে দেই।এই এলাকা খুব নির্জন,একা যাওয়া ঠিক হবে না, আবারও বিপদে পড়তে পারেন।
পারি:- ধন্যবাদ স্যার, এমনিতেই এত রাতে অনেক কষ্ট করেছেন আমার জন্য,আর কষ্ট বাড়াতে চাই না, তাছাড়া আমার বাসা খুব সামনেই!
পারি নিজের ঠোঁটে মৃদু কৃত্রিম হাসি টেনে কথাটা বললো,সম্রাট পারির কথায় ধ্যান না দিয়ে সামনে এগোতে এগোতে বলতে লাগলো,
সম্রাট:- কথা না বাড়িয়ে চলুন,এতদুর যখন আসতে পেরেছি, এতটুকুও যেতে পারবো!
পারি:- কিন্তু স্যার!
সম্রাট পারির দিকে ঘুরে তাকালে সম্রাটের গম্ভীর চাহনি দেখে পারি মাথা নুইয়ে ফেলে সম্রাট আবার সামনের দিকে এগোতে শুরু করলে পারিও ওকে অনুসরণ করে ওকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, কিছু একটা মনে করতেই সম্রাট জিজ্ঞেস করে,
সম্রাট:- আচ্ছা আপনি এত রাতে ঘরের বাইরে বের হয়েছিলেন কেন?
সম্রাটের কথায় পারির পা থেমে যায়,যেই কাজের জন্য এত রাতে বের হয়ে নিজের সব হারাতে বসেছিল সেই কাজই করা হয়নি,ভয় আর সংকোচে সব ভুলে গেছে।পারি থেমে যাওয়াতে সম্রাট ও থেমে যায়,ওর মুখোমুখি হয়ে প্রশ্নাত্নক দৃষ্টিতে ইশারায় জানতে চাইলে পারি মাথা নিচু করেই বলে,
সম্রাট:-মায়ের জন্য ওষুধ আনতে ।
সম্রাট:-মানে?
পারি:- মায়ের ওষুধ শেষ হয়ে গিয়েছিল,খেয়াল করিনি, হঠাৎ করেই বুকের ব্যথা উঠলে ওষুধ খাওয়ানোর সময় দেখি ওষুধ শেষ,আর তাই !
সম্রাটের কপালে চওড়া ভাঁজ পড়ে পারির কথায়,ও এতদিন ধরে পারির কাজকর্ম কিছুই বুঝতে পারছে না।যেই পারিকে ও চিনে সেই পারির সাথে এই পারির কোন মিল পাচ্ছে না। কোন ভাবেই না। নিজের চিন্তাকে কিছু সময়ের জন্য ছুটি দিয়ে,পারিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
সম্রাট:-তা আপনি কেন বের হয়েছেন,আপনার বাড়িতে পুরুষ মানুষ নেই ?
পারি সম্রাটের এই কথায় মাথা নুইয়ে না বললো! সম্রাটের কপালের ভাঁজে আরো পরদ বাড়লো ,ও ওভাবেই জিজ্ঞেস করলো
সম্রাট:- আপনার স্বামী কোথায়?
এইবার পারি কোন জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলো, সম্রাট জবাবের আশায় ওর দিকে নিরব চাহনিতে চেয়ে রইলো, পারি কোন জবাব না দিয়েই ওকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল,সম্রাট হতভম্ব হয়ে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে পারির পিছনে হাঁটা ধরলো,স্বামীর কথায় প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াতে সম্রাটের এখন পারিকে নিয়ে চিন্তা হতে লাগলো, কয়েকমিনিট বাদেই পারি একটা টিনসেট ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো, যেটা দেখে সম্রাটের কপাল কুঁচকে এলো,এলাকাটা একটা বস্তির মতো , আশেপাশে অনেক হিজিবিজি করে ঘর তোলা,পারি যেই ঘরটার দরজায় নক করেছে সেটাও বেশ ছোট মনে হচ্ছে, সম্রাটের সম্ভিত ফিরে এলো বয়স্ক কারো কন্ঠস্বরে,
হাসান সাহেব:- পারি মা তুমি এসেছো? কোথায় ছিলে এতক্ষণ! ওষুধ পেয়েছো?
বিচলিত হয়ে দরজর সামনে দাঁড়িয়ে একসাথে এতগুলো প্রশ্ন করে ফেললেন হাসান সাহেব,পারি দরজা ঠেলে হাসান সাহেবকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রইলো,চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, কিন্তু তাতেও কোন হেলদোল নেই,মা যে বুকের যন্ত্রনায় ছটফট করছে ! আর সে কিছুই করতে পারছে না, মায়ের কাছে বসে মাকে জড়িয়ে ধরেই শব্দ করেই কান্না করে উঠলো, হাসান সাহেব আরো বিচলিত হয়ে গেলেন,পারির সামনে গিয়ে অস্থিরতার সহিত বলতে শুরু করলেন,
হাসান সাহেব:- পারি মা কি হয়েছে? তুমি এইভাবে কাদতেছো কেন? মায়ের জন্য ওষুধ পাওনি তাতে কি হয়েছে ?,তুমি চিন্তা করো না আমি যাচ্ছি দেখি গিয়ে কোন ভ্যানের ব্যবস্থা করতে পারি কিনা, আমরা ম্যামকে সরাসরি হাসপাতালেই নিয়ে যাবো!
হাসান সাহেব এই কথা বলে পারির মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই কিছু একটা মনে করে পারির দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখলো পারির শাড়ীতে কাঁদা মাটি লেগে আছে,উনি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
হাসান সাহেব:- পারি মা,তুমি কি কোথাও পড়ে গিয়েছিলে?
হাসান সাহেবের কথায় পারির কান্না আরো বেড়ে গেল,মাকে জড়িয়ে ধরেই মায়ের শাড়ীর আঁচল মুখে পুরে কান্না দমানোর চেষ্টা করলো,হাসান সাহেব আরো বিচলিত হয়ে উনার স্ত্রীর দিকে ইশারায় পারিকে শান্ত করার কথা বলে দরজার দিকে পা বাড়াতেই দরজার সামনে সম্রাটকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। ভ্রু কুঁচকেই জিজ্ঞেস করলো ,
হাসান সাহেব:- আপনি কে?
সম্রাট এক ধ্যানে পারির দিকে তাকিয়ে ছিলো, সবকিছু ওর মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।হাসান সাহেবের কথায় চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
সম্রাট:- জ্বী!
হাসান সাহেব:-আপনি কে আর আপনি আমাদের ঘরে কি করছেন?
সম্রাট:- জ্বী আমি আসলে!
পর্ব ১৮
সম্রাটের উত্তর দেওয়ার আগেই হাসান সাহেব বললেন,
হাসান সাহেব:-আপনাকে কেন জানি চেনা চেনা মনে হচ্ছে কোথাও দেখেছি কি!?
সম্রাট হাসান সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে কি বলবে তাই ভাবছে,এর মধ্যেই হাসান সাহেবের স্ত্রীর কথায় ও সেদিকে মনোযোগ দিয়ে বুঝতে পারলো পারির মায়ের অবস্থা ভালো না, ও তাড়াহুড়ো করে পারির মায়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে পারির উদ্দেশ্যে বলেলো,
সম্রাট:-পারি এখন কান্না করার সময় না , আমার মনে হচ্ছে উনাকে এখনই হসপিটালে নেওয়া উচিত !
হাসান সাহেব:-আমি যাইতেছি ,গিয়া দেখি একটা ভ্যানের ব্যবস্থা করতে পারি কিনা!
সম্রাট:-দরকার নেই আমার সাথে গাড়ী আছে,আপনি আমাকে একটু সাহায্য করুন গাড়ীর দরজাটা খুলে দিয়ে,
সম্রাট পারিকে পাশ কেটে পারির মাকে দুই হাতে কোলে তুলে নিতে নিতে হাসান সাহেবের উদ্দেশ্যে শেষের কথাটা বললো,পারি ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে!সম্রাট পিছু ঘুরে পারিকে বললো,
সম্রাট:-আমার সাথে আসো!
পারি:- হুম
<হসপিটালের ভেতর>
আইসিইউ কেবিনের সামনে নির্বাক দৃষ্টিতে আইসিইউ রুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে চেয়ারে বসে আছে পারি ,ওর থেকে কিছুটা দুরে দাঁড়িয়ে পারির দিকে তাকিয়ে রয়েছে সম্রাট! আর ওর দিকে গভীর দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে হাসান সাহেব! উনি নিজের ভেতরেই সম্রাটকে চেনার চেষ্টা করছে, হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই উনি দাঁড়িয়ে পড়লেন, সম্রাটের কাছে গিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতেই , সম্রাটের ফোনটা বেজে উঠলো,সম্রাট পকেট থেকে ফোন বের করে ওর বাবার নাম্বার দেখে ফোনটা রিসিভ করে,
সম্রাট:- হ্যালো বাবা !
বাবা:- কোথায় তুমি?
সম্রাট:- আছি এক জায়গায়! কি বলবে বলো!
বাবা:- কি বলবো মানে,কত রাত হয়েছে সেই খবর আছে তোমার? এখনও বাড়ি ফিরছো না কেন?
সম্রাট:- বাবা আমি আসলে .... ! আসছি কিছু সময়ের মধ্যেই !
সম্রাট শেষের কথাটা পারির দিকে তাকিয়েই বললো,পারিকে এই অবস্থায় একা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো না কিন্তু কিছু একটা ভেবেই চলে যাচ্ছে।ও ফোনটা পকেটে রেখে হাসান সাহেবের সামনে এসে বললো,
সম্রাট:- উমম্, আমি চলে যাচ্ছি, সকালে আবার আসবো ইনশাআল্লাহ! আর হ্যা যেকোন প্রয়োজনে আমাকে জাস্ট একটা ছোট কল দিবেন ওকে!
কথাটা বলে ওয়ালেট বের করে নিজের একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিলো, হাসান সাহেব কিছু বলার আগেই হালকা মুচকি হেসে পা বাড়ালো কিছু দুর গিয়ে আবারও ফিরে এসে পারির সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
সম্রাট:-কাল আপনার ছুটি,আপনি আপনার মায়ের পাশেই থাকুন আর হ্যা যেকোন প্রয়োজনে অবশ্যই একবার জানাবেন, সাবধানে থাকবেন! আসছি !
সম্রাট কথাগুলো পারির দিকে তাকিয়ে বললেও, পারির দৃষ্টি এখনও বন্ধ দরজাতেই,সম্রাট ছোট্ট করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে চলে গেল। হাসান সাহেব সম্রাটের যাওয়ার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে পারির কাছে এসে পারির মাথায় হাত রাখলেন,পারি ছলছল দৃষ্টি তুলে ওনার মুখপানে চাইলো,উনি মাথায় হাত বুলিয়ে,পারির পাশে বসেই পারির হাত ধরে জিজ্ঞেস করলো,
হাসান সাহেব:-এই কি সেই ছেলে, যার জন্য আমার পারি মায়ের জীবনে এত দুঃখ?
হাসান সাহেবের কথায় পারির ঠোঁটের কোনে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো,চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো দু ফোঁটা অশ্রু!
হাসান সাহেবের ভেতর থেকে বের হয়ে এলো তপ্ত নিঃশ্বাস, চাইলেও উনি কিছু করতে পারছেন না,বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে নিজেকে পাশে বসে থাকা ফুটফুটে সুন্দর কোমল মেয়েটার জন্য কিছু করতে না পারার কারনে।
সোহা:-ভাইয়া তুমি রাতে কোথায় ছিলে? কতবার ফোন করলাম রিসিভই করলে না!
সম্রাট:- কাজ ছিলো এক জায়গায়!
নাস্তার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে সবার জন্য নাস্তা তৈরি করতে করতেই প্রশ্নটা করলো সোহা, সম্রাট ও রেডি হয়ে বের হয়েছে,আগে হাসপাতালে গিয়ে পারির মায়ের খবর নিবে তারপর অফিসে যাবে! ওকে এত সকালে একদম তৈরি হয়ে বের হতে দেখে সোহা প্রশ্ন করলো,
সোহা:-ওমা এত সকালেই অফিসে যাচ্ছো?
সম্রাট:- না , অন্য জায়গায় একটু কাজ আছে আগে সেটা সাড়বো তারপর অফিসে যাবো।
সোহা:- ভাইয়া!
সম্রাট:- হুম!
সোহা:-সত্যি করে বলো তো কি হয়েছে?
সম্রাট:-মানে?
সোহা:- তোমাকে আজ বেশ কয়েকদিন ধরেই কেমন জানি ছন্নছাড়া লাগছে; তুমি কিন্তু আগে কখনো এরকম ছিলে না!
সম্রাট:- মানে?
সোহা:- মানে কি তাতো তুমি বলবে? কি লুকিয়ে বেড়াচ্ছো তুমি আমাদের থেকে!?
সম্রাট:- তুই যেমন ভাবছিস তেমন কিছুই না।আমি আসলেই কাজে ব্যস্ত আজকাল!
সোহা:- তার মানে তুমি বলবে না এই তো?
সম্রাট:- আশ্চর্য! কিছু থাকলে তো বলবো!
সোহা:- না থাকলেই ভালো!
সোহা যে শেষের কথাটা প্রচন্ড অভিমান নিয়ে বলছে সেটা বুঝেও সম্রাট আর কথা বাড়ালো না। নাস্তার টেবিলে বসে নাস্তা করতে করতেই সোহার উদ্দেশ্যে বললো,
সম্রাট:-আজকে সায়েরার ন্যান্সি আসবে না!
সোহা সম্রাটের কথায় ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
সোহা:-মানে?
সম্রাট:- পারি আজকে আসতে পারবে না, গতকাল রাতে ওর মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় হসপিটালাইজড করতে হয়েছে!
সোহা:-কি বলো!( চিন্তিত হয়ে কথাটা বললো,)
সম্রাট খাওয়া শেষ করে টিস্যু দিয়ে হাত মুছে দাঁড়িয়ে সোহার দিকে তাকিয়ে বললো,
সম্রাট:-হ্যা ওর মা গুরুত্বর অসুস্থ তাই আজ আসবে না।
সোহা:-কিন্তু তুমি সেটা জানলে কি করে?
পর্ব ১৯
সোহার প্রশ্নের উত্তরে সম্রাট কিছু সময় চুপ থেকে গত রাতের পুরো ঘটনা খুলে বললো,সোহা শুনে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো তারপর বললো,
সোহা:- তুমি তাহলে আমাকে ওদের কেবিন নাম্বারটা বলো আমিও গিয়ে দেখে আসি।
সম্রাট:- হুম!
এই বলে সম্রাট কেবিনের নাম্বার বলে চলে যায় হাসপাতালের উদ্দেশ্যে,সোহার যেতে দেরি আছে, ও একবারে সায়েরাকে তৈরি করে স্কুলে দিয়ে তারপর যাবে তাই এখনই গিয়ে পারির সাথে দেখা করে আসতে চায় এমনিতেও ওর এখন পারির সম্পর্কে অনেক খবর নেওয়ার বাকী যেটা শুধু পারি অথবা ওর আশেপাশের লোকজনই বলতে পারে।
পারি ওর মায়ের পাশে বসে মায়ের হাত ধরে মনে মনে কিছু একটা ভাবছে ,সম্রাট দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পারির দিকে কিছু সময় পারিকে দেখে তারপর কেবিনের সামনে এসে পারির আকর্ষণ নিতে হালকা একটা শব্দ করে,পারি পেছনে ঘুরে সম্রাটকে দেখে চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো মাথা নিচু করেই রাখলো,সম্রাট পারির মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে ওর মায়ের দিকে ইশারায় জানতে চাইলো,
সম্রাট:- কেমন আছেন এখন উনি?
পারি:- আগের চেয়ে ভালো!
সম্রাট:- আলহামদুলিল্লাহ!
পারি:- Thank you! কাল রাত থেকে আমার জন্য আর মায়ের জন্য যা করেছেন তাতে ধন্যবাদ দিলেও কম হয়ে যায় তবে এরচেয়ে ভালো আর কিছু আমার কাছে নেই যা দিয়ে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো।
সম্রাট:- It's ok! Formality করার দরকার নেই,ঐ সময় আপনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও আমি সাহায্য করতাম! যাই হোক আমি শুধু উনার খবরাখবর নিতে এসেছিলাম! ডাক্তার এসেছিলো?
পারি:-হুম!
সম্রাট:-কি বলেছেন?
পারি:-বলেছেন কিছু সময় পরেই আমরা চাইলে বাসায় নিয়ে যেতে পারবো।
সম্রাট:- তো আপনি নিয়ে যেতে চান?
পারি:- হুম!
সম্রাট:-ওকে তাহলে আমি ডাক্তারের সাথে ফাইনাল কথা বলে নেই।
পারি:-আচ্ছা
সম্রাট পারির সাথে কথা শেষ করে ডাক্তারের রুমে গিয়ে কথা বলে বের হয়ে কেবিনে এসে পারিকে জানালো ও সব ফর্মালিটিজ করে দিয়েছে , দুপুরের পর ওর মাকে চাইলে নিয়ে যেতে পারবে, আর কোন দরকার হলে যেন জানায়,পারিও মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে সম্রাটের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সম্রাটকে বিদায় জানিয়ে দিলে সম্রাট চলে যায়।যদিও পারিকে একা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো না তবুও যেতে হচ্ছে কারন জরুরী মিটিং আছে।এর মধ্যে হাসান সাহেবের সাথে কথা বলার ইচ্ছে থাকলেও তার দেখা পেলো না। সম্রাট যাওয়ার আগে সোহার আসার কথা জানিয়ে গেল।
সম্রাট যাওয়ার কিছু সময় পরেই সোহা এসে দেখে গেছে পারির মাকে এবং কোনরকম সাহায্য লাগলে তাকে জানাতে বলেছে।পারি এই কথার কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করেই ছিলো।
সম্রাট অফিসে বসে ভাবছে পারির সাথে দেখা হবার পর থেকে আজ অবধি সব ঘটনা।পারির ওদের বাসায় সামান্য একজন আয়ার কাজ করা, পারিদের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা,পারির মায়ের অসুস্থতা,পারির একা থাকা! সব কিছুই ওর মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে, কিছু একটা আছে যা ওর অবগতর বাইরে, ভাবতে ভাবতে মাথায় যন্ত্রনা শুরু হয়ে গেল। পিয়নকে ফোন করে কফির অর্ডার দিয়ে উঠে হেঁটে কাঁচের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো শহরের ব্যস্ততার মাঝে নিজের উত্তর খোঁজার বৃথা চেষ্টা করলো, পিয়ন কফি দিয়ে গেলে সেটাতে চুমুক দিয়েই মুচকি হেঁসে উঠলো, ফোনটা হাতে নিয়ে কাউকে ফোন লাগালো,
সম্রাট:- হ্যালো!
অপরপাশের:- আসসালামু আলাইকুম ভাই !
সম্রাট:-ওয়া আলাইকুম আসসালাম! তোমাকে একটা ছবি পাঠাচ্ছি,তার গত সাত বছরের বিস্তারিত জানতে চাই!
অপর পাশের:- জ্বী ভাই!
কথা শেষ করে ফোনটা কেটে দিলো,
--------দুদিন পরের ঘটনা---------
পারি আজ ডিউটিতে আসছে,সোহা দেখা করে আসার সময় পারিকে ওর মায়ের পাশে থাকার জন্য দুদিন ছুটি দিয়েছিলো।
মনি!
পারি:-হুম সায়ু সোনা বলো!
সায়ের:-তুমি কাল কেন আসোনি? জানো আমি কত মিস করেছিলাম তোমায়!
পারি:- তাই!
সায়েরা:- হুম!
পারি:-ওহ সরি বেবি,কালতো আমার মা একটু অসুস্থ ছিলো তাই আসতে পারিনি ! কিন্তু আমিও তোমাকে অনেক মিস করেছি!
পারি সায়েরার দুষ্টু মিষ্টি কথা চলতে থাকলো আর কিছুটা দুরে দাঁড়িয়ে সেগুলো উপভোগ করতে লাগলো সম্রাট; পারির ৭ বছরের অতিত জানার পর অভিযোগ কমলেও অভিমান কমেনি কিন্তু পারির সাথে ঠিক কি হয়েছিলো সেটা জানার অদম্য ইচ্ছা ও জেগে উঠেছে তবে তার জন্য একটু সময় নিচ্ছে সম্রাট!
সম্রাট যেই লোককে খবর জানার জন্য বলেছিলো সে সমস্ত খবর নিয়ে সম্রাটের কাছে সেটার বিস্তারিত যা বলেছিলো তাতে সম্রাটের কিছুই বোধগম্য হচ্ছিলো না। পুরো বিষয়টি ছিলো ঘোলাটে! তাই এমন কাউকে দরকার যে কিনা পরিষ্কার করে সব বলতে পারবে।আর তাই সম্রাট সিদ্ধান্ত নিল সরাসরি হাসান সাহেবের সাথে দেখা করার।
যেই কথা সেই অনুযায়ী কাজ। সম্রাট পারিকে ওর বাসায় দেখে পারির বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু বাসায় গিয়ে হাসান সাহেবের দেখা পেলো না কারণ উনি এখন কাজে আছেন।তাই সম্রাট ঠিকানা জেনে উনার কর্মস্থলে চলে যায়।
হাসান সাহেবের কর্মস্থলে গিয়ে উনাকে দেখে হাসান সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, হাসান সাহেবের সামনে হঠাৎ করে কেউ চলে আসায় উনি চমকে গিয়ে একটু পিছিয়ে যায়, সামনে তাকিয়ে সম্রাটকে দেখে উনি কপাল কুঁচকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
হাসান সাহেব:-জ্বী!
সম্রাট:-আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে!
হাসান সাহেব:-কোন বিষয়ে?
সম্রাট:-একটু বাইরে চলুন!
হাসান সাহেব কোন কথা না বাড়িয়ে সম্রাটের সাথে চলে গেল,উনার নিজের ও সম্রাটকে অনেক কথা বলার ছিলো, উনিও জানতে চায় কেন সম্রাট পারির জীবনটা এমন ছন্নছাড়া করে দিলো,
সম্রাট:-চা খাবেন?
হাসান সাহেব:- না ঠিক আছে! আপনি বলুন!
সম্রাট নিরব হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো,জানার ইচ্ছা অনেক কিছু কিন্তু কোথাও একটা আটকে যাচ্ছে, ভেতরে থাকা প্রশ্নগুলো বাইরে বের করতে পারছে না, কিছু সময় নিরব থেকেই জানতে চাইলো,
সম্রাট:- পারির স্বামী কোথায়?
হাসান সাহেব:-ও কোথায় তা যদি জানতাম তাহলে ওকে খুন করে তবেই শান্তির ঘুম দিতাম !
হাসান সাহেবের কথায় সম্রাটের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো,ও এভাবেই জিজ্ঞেস করলো
সম্রাট:-কেন?
ও আমার পারি মায়ের জীবনটা নরক বানিয়ে ছেড়েছে।
পর্ব ২০
সম্রাট:- আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনি দয়া করে আমাকে সব খুলে বলুন!
হাসান সাহেব:- তার আগে তুমি বলো কেন তুমি আমার পারির মায়ের সাথে এমন করলে?
হাসান সাহেব সম্রাটের মুখোমুখি হয়ে বসে দৃঢ় কন্ঠে শক্ত চাহনি নিক্ষেপ করে প্রশ্নটি করলেন,সম্রাট হাসান সাহেবের চাহনি দেখে কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেও নিজেকে হাসান সাহেবের দৃষ্টিতে প্রশ্নাত্নক করতে না চাওয়ায় আর হাসান সাহেবের প্রশ্নের মানেটা বুঝতে না পারায় বোকার মতো চেয়ে রইলো, হাসান সাহেব আবারও বেশ শক্ত কন্ঠেই প্রশ্নটি আওড়ালো,
হাসান সাহেব:-কেন করলে এমনটা?
কিছু সময় দম নিয়ে হাসান সাহেব আবারও বলতে লাগলেন,
হাসান সাহেব:-তুমি যদি আমার পারি মাকে না ঠকাতে তাহলে হয়তো আমার মায়ের জীবনটা এমন যন্ত্রনাদায়ক হতো না, শুধু মাত্র তুমি, হ্যা তুমি-ই দায়ী পারি মায়ের জীবনটা নরকে পরিনত হওয়ার জন্য ! ঐ রেহান তো শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো পারি মায়ের সর্বনাশের জন্য আর তুমি সেই সুযোগটাই দিয়েছিলো!
মানে!
সম্রাট আশ্চর্যিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে হাসান সাহেবের কাছে নিজের বিস্মিত দৃষ্টিতে প্রশ্নটি করলেন, হাসান সাহেব সম্রাটের চোখে চোখ রেখে বোঝার চেষ্টা করছে সম্রাটকে,সম্রাট ও ভাবেই বেশ উত্তেজিত হয়ে জানতে চাইলো,
সম্রাট:-চাচা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপনি কি বলতে চাচ্ছেন! আমার কারনে পারির জীবন নরকে পরিনত হয়েছে মানে কি?
হাসান সাহেব:- হ্যা তোমার কারনেই, তুমি যদি পারি মাকে ধোঁকা না দিতে তাহলে হয়তো কোনদিন আমার পারি মা ও জানোয়ার রেহানকে বিয়ে করতো না! তোমার দেয়া ধোঁকা সহ্য করতে না পেরেই নিজেকে শেষ করার পথ হিসেবে রেহানকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো যার খেসারত আজও দিয়ে যাচ্ছে!
সম্রাট:-মাম-মানে কি ! ধোঁকা দিয়েছি আমি তাও পারিকে? প্লিজ চাচা আমি জানি আপনি পারিকে অনেক ভালোবাসেন তাই বলে আমাকে মিথ্যা দোষারোপ করবেন না!
হাসান সাহেব:- আমি মিথ্যে দোষ দিচ্ছি?
সম্রাট হাসান সাহেবের কথায় বেশ উত্তেজিত হয়েই বলতে শুরু করে,
সম্রাট:- হ্যা দিচ্ছেন! কারন ধোঁকা আমি নই আপনার পারি মা আমাকে দিয়েছে। অবশ্য তাতে আমার দুঃখ করার কারন নেই কারন হয়তো পারি বুঝতে পেরেছিলো যে তার বাবা ঠিক ই বলছিলো "যে আমি ওর যোগ্য নই !" কিভাবে যোগ্য থাকতাম? দেশের সবচেয়ে স্বনামধন্য ব্যবসায়ীর একমাত্র আদরের মেয়ে পারি,আর আমি! আমি ছিলাম সামান্য একটা গাড়ীর মেকানিক! যার কিনা নুন আনতে পান্তা ফুরাতো ! তাই সে আমাকে ছেড়ে গেলো আর তাতে আমার দুঃখ বিলাস করা মানায় না! কিন্তু তাই বলে আমাকে ধোঁকাবাজ , প্রতারকের মিথ্যা অপবাদ দিলে যে আমি মেনে নিবো না ! কখনোই না!
হাসান সাহেব:- নাহ! আমার পারি তোমাকে ধোঁকা দেয়নি।সে সাহেবের কথায় তোমাকে ছাড়েও নি। বরং তোমাকে নিয়ে সংসার পাতার জন্য নিজের বাবার বিশাল সাম্রাজ্য ছেড়ে রাতের আঁধারে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলো তোমার কাছে আর ফিরে এসেছিলো বিধ্বস্ত হয়ে!
সম্রাট হাসান সাহেবের কথার আগাগোড়া এবার ও বুঝতে অক্ষম তবে বুঝতে পারছে কিছু একটা আছে যেটা ওর অগোচরেই ঘটেছিলো যার কারনেই পারি আর ওর পথ আজ আলাদা। নিজের কৌতুহল দমিয়ে না রেখে জিজ্ঞেস করলো,
সম্রাট:-মানে? বুঝিয়ে বলুন চাচা!
হাসান অনুমান করতে পারছেন এমন কিছু যা সবারই অগোচরে ছিলো যার জন্য অনেক কিছু এলোমেলো হয়ে গেছে,তাই উনি বলতে শুরু করলেন,
🕢🕢অতীত⏳⏳
সেদিন বিকেলে এসে সাহেব যখন বললো পারি মায়ের বিয়ে রেহানের সাথেই দিবে তখন পারি মা বেশ কান্নাকাটি করেছিলো, আমি প্রথমবারের মতো সেদিন পারি মাকে নিজের বাবার মুখের উপর কথা বলতে দেখেছিলাম, স্যার যখন এসে বলছিলো,
পরশ আবরার চৌধুরী:- আমি তোমার বিয়ে যার সাথে ঠিক করবো তোমাকে তাকেই বিয়ে করতে হবে!
পারি:-কিন্তু পাপা?
পরশ আবরার চৌধুরী:-কোন কিন্তু নয়,আজ অবধি আমি তোমার সব আবদার পূরন করেছি,সব রকমের জিদ মেনে নিয়েছি তাই বলে এই নয় আমি তোমার আবদার পূরণ করতে গিয়ে একটা রিক্সাওয়ালার ছেলের হাতে তোমাকে তুলে দিবো ! তাও যদি ঐ ছেলের নিজেকে বড় করার নূন্যতম ইচ্ছা থাকতো! আমি এরকম হেঁয়ালিপনায় আর ঘা ভাসিয়ে চলা ছেলের হাতে আমার একমাত্র মেয়েকে তুলে দিতে পারবো না।
পারি:- কিন্তু পাপা আমি..!
পরশ:- আর একটা কথাও এই বিষয়ে হবে না, তোমার বিয়ে রেহানের সাথেই হবে এবং সেটা খুব শীঘ্রই!
কথাটি বলে পরশ আবরার চৌধুরী সিঁড়ি বেয়ে উপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পারির কথায় আবার থেমে গিয়ে পেছনে তাকায়,
পারি:-আমি সম্রাটকে ভালোবাসি পাপা আর যদি বিয়ে করতে হয় তাহলে ওকেই করবো!
পরশ আবরার চৌধুরী:- জেদ করো না পারি, তোমার জেদ করে কোন লাভ হবে না! কারন আর যাই হোক একটা রিক্সাওয়ালার ছেলের হাতে নিজের একমাত্র মেয়েকে তুলে দিয়ে কোনভাবেই নিজের মানসম্মান নষ্ট করতে পারবো না! তাতে নিজের একমাত্র মেয়েকে যদি কোরবানি দিতে হয় দিবো, তবুও আমি আমার সম্মানের গায়ে একটা আচও লাগতে দিবো না!
পরশ আবরার চৌধুরী কথা শেষ করার সাথে সাথেই পারি তার সামনে দাঁড়িয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলে,
পারি:-আমিও তোমারই মেয়ে পাপা, তুমি যদি নিজের সম্মানের নামে অহংকারকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের মেয়ের খুশিকে কোরবানি দিতে পারো তাহলে আমিও নিজের ভালোবাসাকে টিকিয়ে রাখতে তোমার এই আত্ন-অহংকারে ঘেরা রাজপ্রাসাদ ঘুরিয়ে দিতে পারি!
কথক:-কথাটি শেষ করার সাথে সাথেই পারির গালে খুব শক্ত হাতের একটা থাপ্পড় পরে,থাপ্পড়টা এত জোরেই পড়ে যে পারি মুখ থুবড়ে মেঝেতে পড়ে যায় !
নিজের গালে হাত দিয়ে যখন মুখ ঘুরিয়ে সামনে তাকায় তখন দেখতে পায় নিজের পাপার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা আর তার সামনে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা থাপ্পড় দেওয়া মানুষটিকে!
গড়িয়ে পরে মুক্তোর দানা যা অবাধ্য হয়েই অক্ষুদ্বয়ের দ্বারপ্রান্ত ভিজিয়ে দিচ্ছে সাথে অস্ফুট স্বরেই বের হয়ে আসে!
পারি :-পাপা!
পরশ আবরার চৌধুরী কোন কথা না বলে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বললেন,
পরশ আবরার চৌধুরী:-তোমাকে কোনদিন শাসন করিনি বলেই আজ তুমি এতটা সাহস পেয়েছো অবশ্য তার জন্য ঐ রিক্সাওয়ালার ছেলেই দায়ী ,তবে আমি বিশ্বাস করি রেহান তোমাকে শুধরে নিতে পারবে!
পরশ আবরার চৌধুরীর কথায় রেহানের ঠোঁটের কোনায় বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো তার সাথে পারির জন্য কিছুটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,
রেহান:- বিয়ে তোমার আমাকেই করতে হবে পারি বেইবি,সো কোন রকম টালবাহানা করা আমি বরদাস্ত করবো না!
শেষের কথাটা বেশ রোষপূর্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করেই বললো, রেহানের কথা আর কথা বলার ভঙ্গি দুটোই পারি দাঁত মুখ খিচে হজম করে নেয়,ফ্লোর থেকে উঠে দৌড়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে কাঁদতে থাকে!
পরশ আবরার চৌধুরী ঘরে গিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে সোফায় বসে রইলেন, আর মনে মনে ভাবতে থাকলেন,
"যেই মেয়ের গায়ে নিজে আজ অবধি একটা আচড়ও লাগতে দেন নি সেই মেয়েকে থাপ্পড় খেতে দেখেও উনি নিরব ছিলেন" অবশ্য এতটুকু মেয়েটার জন্য দরকার ছিলো,বড্ড বেশি অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা, নিজের ভালোটাও বুঝতে শিখেনি,শিখেছে শুধু জেদ করতে, অবশ্য জেদ করলেও বেয়াদব ছিলো না! এখন এতটাই বেয়াদব হয়েছে যে নিজের পাপার মুখে মুখে তর্ক করতে ও ভাবে না,আর এই সবই হয়েছে ঐ রিক্সাওয়ালা ছোটলোকের বাচ্চার জন্য! ঐ ই আমার নাদান মেয়েটাকে এইভাবে নষ্ট করেছে,কি ভেবেছে এইভাবে ফুঁসলিয়ে ফাসলিয়ে আমার মেয়েকে বিয়ে করে এই বিশাল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে যাবে! হুহ সেটা আমি থাকতে এই পরশ আবরার চৌধুরী থাকতে সম্ভব নয়! কোনদিনও আমি এই সুযোগটা দিবো না!
উনার ভাবনার মাঝেই পারির মা মিসেস প্রিয়ন্তি খন্দকার ঘরে ঢুকে সোজাসুজি স্বামীর মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন করলেন,
প্রিয়ন্তি খন্দকার:- যেই মেয়ের গায়ে আজ অবধি আমরা হাত তুলিনি,যার গায়ের একটা মশার কামড় ও আপনার সহ্য হয় না আজ সেই মেয়েকে পুরো বাড়ি ভর্তি কাজের লোকের সামনে বাইরের একটি ছেলে হাত তুললো আর আপনি চুপচাপ তা দেখে চলে আসলেন?
পরশ আবরার চৌধুরী মাথা তুলে নিজ পত্নীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,
পরশ আবরার চৌধুরী:-ও কোন বাইরের ছেলে নয়, ও তোমার একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যত স্বামী সুতরাং তোমার মেয়ে কোন ভুল করলে তাকে শাসন করার অধিকার ওর অবশ্যই আছে আর সেখানে তোমার অথবা আমার বলার কিছুই নেই!
প্রিয়ন্তি খন্দকার:-ভবিষ্যতে কি সম্পর্ক হবে সেটা ভবিষ্যতে দেখা যাবে তাই বলে এখনই সে আমাদের সামনে আমাদের মেয়ের গায়ে হাত তুলতে পারে না!
পরশ আবরার চৌধুরী:-পারতো না যদি না আমাদের মেয়ে কোন অন্যায় করতো না, বরং ভুলটা আমাদের কারন আমরা আমাদের মেয়েকে সঠিকভাবে শিক্ষা দিতে পারিনি যার কারনে সে আজ নিজের বাবার মুখে মুখে তর্ক করতে দ্বিধাবোধ করেনি,বাবার কষ্টে করে তৈরি করা বিশাল সাম্রাজ্য ধ্বংসের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে তাও আবার একটা রিক্সাওয়ালার ছেলের জন্য ! আর তার জন্য এতটুকু শাসন দরকার আছে আর আমি মনে করি তাই আমাদের মেয়ের জন্য রেহানের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছেলেই যোগ্য জীবনসঙ্গী!
প্রিয়ন্তি খন্দকার:-তার মানে কি? আপনি মেয়ের মতের বিরুদ্ধে গিয়েই বিয়ে দিবেন?
পরশ আবরার চৌধুরী:- প্রয়োজন হলে তাই করবো! তবুও নিজের মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে কোন রকম হেলাফেলা আমি করবো না,আর আমার বিশ্বাস আমাদের মেয়েও সেটা একদিন বুঝতে পারবে!
প্রিয়ন্তি খন্দকার বুঝতে পারলেন তার স্বামীর সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নাই,উনি যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ে নিয়েছেন,এর বাইরে উনি অন্য কারো কথা কানে তুলবেন না।তাই উনার সাথে আর কথা বলেও লাভ নেই এখন শুধু মেয়েটার জন্য দোয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই এখন উনার।
সারা বিকেল এভাবেই কেটে গেল,রাতেও পারি না খেতে আসলো আর না কেউ খেতে ডেকেছে অবশ্য পারির মা খেতে ডাকতে চাইলেও পরশ আবরার চৌধুরীর চোখ গরমের কাছে তাকেও মাথা নত করতে হয়েছে।
পর্ব ২১
_____ ______বর্তমান________
এই অবধি বলে হাসান সাহেব থামলেন, সম্রাটের চোখ মুখে অজানা আশংকার চিন্তা, তবুও হাসান সাহেবের অস্থিরতা উপলদ্ধি করতে পেরেই ইশারায় একটি ছেলেকে পানি দিয়ে যেতে বললো,পানি দিয়ে যাওয়ার পর নিজেই বোতলের মুখ খুলে দিয়ে হাসান সাহেব কে পানি খাওয়ার জন্য বলার সাথে সাথেই উনি ঢকঢক করে প্রায় অর্ধেকটা পানি শেষ করে ফেললেন। তারপর কিছু সময় দম ছেড়ে আবার বলা শুরু করলো,
_________অতীত ________
হাসান সাহেব:-রাত তখন ১:৩০ টার ও বেশি, হঠাৎ করেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। বিছানায় থাকতেও কেন জানি ভালো লাগছিলো না তাই একটু বাইরে হাঁটার জন্য বের হলাম , হাঁটতে হাঁটতে বাগানের পেছনে অংশে গিয়ে দাড়ালাম , হঠাৎই অনুভব করলাম আমার মাথার উপরে দড়ির মতো কিছু ঝুলছে।কি ঝুলছে বোঝার চেষ্টা করতেই উপরের দিকে তাকাতেই এমন কিছু দেখতে পেলাম তা দেখার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না!
সম্রাট:- কি দেখেছিলেন?
হাসান সাহেবের আশ্চর্যময় ভঙ্গির কথায় সম্রাট কৌতুহল দমিয়ে না রাখতে পেরেই প্রশ্নটি করে ফেললো, সম্রাটের প্রশ্নের উত্তরে হাসান সাহেব হালকা মুচকি হেসে উত্তর দিলো,
হাসান সাহেব:-আমার পারি মা নিজের শাড়ি এবং চাদর মোটা করে বেঁধে সেটা ঝুলিয়ে তার মাধ্যমে উপর থেকে নিচে নামছে।
সম্রাট:-মানে
হাসান সাহেব :-মানে আমার পারি মা পালিয়ে যাওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা করেছিল।
আমি চাইনি আমার মা নিচে নামার সাথে সাথেই আমাকে দেখে ভয় কিংবা লজ্জা পাক তাই আমি একটু পাশ কেটে দেয়ালের পাশে গিয়ে লুকিয়ে পড়লাম। পারি মা নিচে নেমে আসে পাশে দেখছিল কেউ আছে কিনা যখন বুঝলো আশেপাশে কেউ নেই তখন পারি মা দৌড়ে গেল বাগানের পেছনের দেওয়াল টপকে বাড়ির বাইরে বের হওয়ার জন্য কিন্তু আমার মনে তো তখন ভয় করছিল প্রথমত ভয় করছিল পারি মা দেওয়াল টপকে পালাতে পারবে কিনা যদি পড়ে ব্যথা পায় আবার এটাও ভয় পাচ্ছিলাম এত রাতে একটা মেয়ে কিভাবে অত দূরে যাবে যদি রাস্তায় কোন বিপদ হয় তাই নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারলাম না! পারি মা তখন কিভাবে দেয়াল টপকে বাইরে বের হওয়া যায় তার জন্য চেষ্টা করছিল কিন্তু কিছুতেই দেওয়ালের নাগাল পারি মা পাচ্ছিল না তাই মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলো ,কিন্তু হঠাৎ যখন নিজের পায়ের সামনে একটি সিড়ি দেখল তখন বেশ খুশি হয়েছিল। পরক্ষণেই হয়তো মনে পড়েছিল এই সিড়ি এখানে কোথায় থেকে আসলো এটা ভেবেই যখন পিছনে ঘুরে আমাকে দেখে তখন ভয়ে দেওয়ালের সাথে লেগে গিয়েছিল। ভেবেছিলো আমি হয়তো সাহেবকে বলে দিবো। কিন্তু আমি তো তখন দোটানায় ছিলাম,একে তো আপনাকে চিনি না পারি মায়ের কাছ থেকে যা শুনেছি ততটুকুই জানতাম এর বেশি কিছু না , আরেকদিকে সাহেবের সম্মানের কথাও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো,যেই বাড়ির নুন খেয়েছি সেই বাড়ির মানুষের সাথে বেঈমানি কি করে করবো,তার চেয়েও বেশি ছিলো পারি মায়ের চিন্তা।এই বয়সের ছেলে মেয়েরা আবেগের বশে অনেক ভুল করে।সেই ভুলের শিকার হয়ে পারি মা না নিজের জীবনটাকে শেষ করে দেয়। আমার চিন্তায় ভাটা পড়লো পারি মায়ের করা আকস্মিক কাজে। আমার পায়ের ধরে করুন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল,ঐ চোখের চাহনি আর নিরবভাবে নির্গত পানি যেন আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিলো।আমার(লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) কাছে সব অন্যায় তখন ফিকে মনে হয়েছিল, শুধু একটা কথাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল সেটা ছিলো পারি মায়ের সুখ।আর যদি পারি মা মনে করে আপনার কাছেই সে সুখে থাকবে তো সেটাই হোক এর পরিনতি হিসেবে আমার কপালে যা আছে তাই হবে ,আমি তাই মেনে নিবো। এই ভেবেই পারি মায়ের সাথে আমিও বের হলাম আপনার ঠিকানায় যাবার উদ্দেশ্যে। ভেবেছিলাম আপনার হাতে পরি মাকে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরবো। কিন্তু কে জানতো সেই রাতই আমার পারি মায়ের জীবনে কাল ডেকে আনবে!
সম্রাট:-মা-মাম মানে কি চাচা! যদি আমার উদ্দেশ্যে আসেন তাহলে আমার কাছে না এসে কোথায় গিয়েছিলেন?
এই প্রশ্নটুকু সম্রাট বেশ ভয়ার্ত কন্ঠেই শুধালো,
হাসান সাহেব:-আপনার কাছেই গিয়েছিলাম!
সম্রাট:-কিহ?
হাসান সাহেব:- হ্যা।
সম্রাট:-কিন্তু কখন, কোথায়? আমার সাথে তো দেখা হয়নি!
হাসান সাহেব:- কি করে হবে? আপনি তো তখন অন্য কাউকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন?
সম্রাট:-কি কি বলতে চাইছেন আপনি?
হাসান সাহেব:- হ্যা, আমি যখন পারি মাকে নিয়ে আপনার গ্যারেজের ঠিকানায় পৌছাই ,তখন প্রায় রাত তিনটার কাছাকাছি,আমি আপনার গ্যারেজের গেটের সামনেই থেমে যাই। পারি মা আপনাকে সারপ্রাইজড করার জন্য পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকে যাতে কেউ টের না পায়, কিন্তু ভেতরে যাওয়ার ঠিক পাচ মিনিটের মধ্যে আবার ফিরে আসে, পারি মা ভেতরে ঢোকার পর চলে যেতে গিয়ে ও আমি থেমে যাই কেন জানি তখন মনে হচ্ছিল কিছু সময় থাকি যদি পারি মায়ের আমাকে দরকার হয় ঠিক তাই হলো। পাচ মিনিটের মধ্যেই পারি মা দৌড়ে বের হয়ে একদম সোজা মেইন রাস্তায় চলে যায়।কোনদিকে তাকাচ্ছিলো না ,কেমন জানি উদ্ভ্রান্তের মতো করছিলো , সেদিন যদি আমি চলে আসতাম তাহলে জানিনা তারপর থেকে কোনদিন পারি মায়ের দেখা পেতাম কিনা? ভাগ্যিস সাথেই ছিলাম,না হলে হয়তো কোনদিন নিজেকেও ক্ষমা করতে পারতাম না!
সম্রাট:-মানে আপনারা আমার কাছে গেলেন অথচ আমি জানলাম ই না।আর ও এমন কি দেখলো যাতে..!
হাসান সাহেব:-আপনি কোন এক নারীকে আষ্ঠেপিষ্ঠে জড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন!
পর্ব ২২
কথাটা বেশ শক্ত আর ক্রদিত কন্ঠেই বলে ফেললেন হাসান সাহেব,তার কথায় স্পষ্ট রাগ-ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ,তবে যেন কিছুই অনুভব করলেন না তিনি,হয়তো খুব সহজেই বলে ফেলার মনোভাব নিয়ে বহু বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে, নিজের ভেতরের বিবেককে আঘাত করার জন্যই আজ সম্রাটের ভেতরকে আঘাত করলেন, তবে এতে উনার মনোভাবের ধরন ধরা না পড়লেও সম্রাটের পায়ের তলার জমিন কেঁপে উঠলো। নিজের সম্পর্কে এমন একটি কথা শোনার পর যেন কিছুই বলার মতো নেই তবুও তো বলতে হয় আর তাই বেশ উচ্চ স্বরেই নিজের সাফাইতে বলে উঠলো,
সম্রাট:-What!
সম্রাটের উচ্চস্বরে প্রতিবাদে হাসান সাহেবের মুখভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি তিনি উনার মতো চাহনি নিয়ে সম্রাটের পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেললেন, কিছু সময় নিরব থেকে একমনে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকালেন, এইতো কিছু সময় আগেই আকাশটা বেশ রৌদ্রাজ্বল ছিল, চারদিকে ঝলমলে রোদের সোনালী চিকমিক ঝলকানিতে ঝলঝল করছিলো ধরনীর প্রতিটি কাঠামো! যেমন রৌদ্রের অভিলাসে সবার মনের বাগিচায় কোকিল গাইছিলো ঠিক তেমনি করেই যেন হঠাৎ করেই ময়ুরের আবদারে মেঘের ঘনঘটায় ছেয়ে গেছে বিশাল ছাঁদ, সে যেন নিজের যন্ত্রনার চিৎকারের ছন্দে , নিজের বুকের পাথর সরাতেই ধরনীর বুকে নিজের মিষ্টি জল ঠেলে দিতে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠছে আর তাই ঢেকে দিলো তার অন্ধকারতার চাদরে, হাসান সাহেবের নিরবতায় এবার সম্রাট বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লো, নিজের গায়ে মাত্র লাগা অপবাদের বিষক্রিয়া ছড়ানোর আগেই সে নিজেকে সেই বিষমুক্ত করার জন্য উঠে এসে হাসান সাহেবের পিছনে এসে দাঁড়ালো, হাসান সাহেব অনুভব করলেন সম্রাটের উপস্থিতি ,পিছু ঘুরে বলা শুরু করলেন অব্যক্ত কথা,
হাসান সাহেব:-হ্যা; বিন্দু মাত্র ও মিথ্যা বলছি না। আমার পারি মায়ের সেই আর্ত চিৎকার মিথ্যা নয়।
সম্রাট বরাবরই বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে,সে যে কোন পরিস্থিতিতেই নিজেকে শান্ত রেখে আগে সমস্যা বোঝার চেষ্টা করে তারপর সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, নিজের প্রতি এমন অপবাদের পরও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে শুধু পুরোটা জানার অপেক্ষায় যথেষ্ট চেষ্টা করছে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার। হাতের মুঠটা আরো শক্ত করে ধরলো।
হাসান সাহেব:- সেদিন যখন পারি মা দৌড়ে আপনার গ্যারেজ থেকে বের হয়ে সোজা মেইন রোডে চলে যায় তখন আমি ও তার পিছু যাওয়ার জন্য পা বাড়াই কিন্তু পরেই আমার মনে হয় ভেতরে গিয়ে আগে দেখা উচিত কি হয়েছে তারপর পারি মায়ের কাছে যাবো, আর তাই আমি আপনার গ্যারেজের ভেতরে ঢুকি। ভেতরে ঢুকে যখন আপনার ঘরের দরজায় পা রাখলাম তখনই বুঝতে পারি মায়ের ও ভাবে চলে যাওয়ার কারন।তাই আর দেরি না করে আমিও পারি মায়ের কাছে চলে যাই। গিয়ে দেখি রাস্তার মাঝখানে বসে পাগলের মতো চিৎকার করে কান্না করছে। নিজেকে আর ধরে রাখা সম্ভব হলো না। আমিও তার পাশেই বসে পড়লাম। দিলাম তাকে কাঁদতে। ভেবেছিলাম এর পরে আর কাঁদতে দিবো না কিন্তু কে জানতো এটাই ছিলো শুরু।
সম্রাট হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে হাসান সাহেবের দিকে,ও এখনও বুঝতে পারছে না ঠিক কখন পারি আর হাসান সাহেব ওর গ্যারেজে এসেছিলো ,আর কখনই বা ও অন্যকোন মেয়েকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিলো? কি বলছে উনি এসব? কিন্তু মিথ্যা ই বা কেন বলবে? নাহ আর পারছে না এইসব সহ্য করতে তাই এবার কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই আবারও থেকে যায় হাসান সাহেবের পরবর্তী কথায়,
হাসান সাহেব:- সেদিন সারারাত ঐ অবস্থায় বসেই কেঁদেছিলো, আমি ও পাশেই বসে ছিলাম, অনেক চেষ্টা করেছিলাম ওখান থেকে সরানোর কিন্তু কিছুতেই সরলো না। ভাগ্যিস ঐ রাস্তায় রাতে গাড়ি চলাচল কম।যখন ফজরের আযান শুরু হলো তখন নিজ থেকেই আপন মনে উঠে দাঁড়ালো, নিশ্চুপ হয়ে একা একাই হাঁটতে লাগলো, আমি আমার পারি মায়ের হাবভাব বুঝতে ব্যর্থ ছিলাম ঐ মুহুর্তে তাই কিছু চেয়েও বলতে পারলাম না। শুধু দেখছিলাম হঠাৎ করেই নিস্তেজ হয়ে যাওয়া ফুলের মতো মেয়েটার করুন অবস্থা। হাঁটতে হাঁটতে একটা নদীর পাড়ে গিয়ে থামলো,প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম এই ভেবে যে এখনই না নদীতে ঝাঁপ দেয়।তাই কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছিলাম, শুধু দেখলাম নিরব চাহনিতে নদীর বহমান রুপটা দেখতে থাকা সদ্য নিস্তেজ হওয়া প্রজাপতি টাকে। এত সময়ে একফোঁটা পানিও খেতে চায় নি। ওখানে প্রায় দুপুর অবধি বসে রইলো হাঁটুতে মুখ গুঁজে। এর মধ্যে একবারও কাঁদেনি,দেখিনি চোখের পানি। তবে ভেতরে যে শুধু পানি নয় রক্ত-ক্ষরন হচ্ছে সেটাও বুঝতে পারছিলাম আমি। অনেক বুঝিয়ে ওখান থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। কিন্তু দুপুর বেলা নিজেই উঠে দাঁড়ালো, কিছু না বলে আবারও হাঁটা শুরু করলো এবার গিয়ে থামলো বাড়ির সামনে। আমিও যেন এবার শান্তির নিশ্বাস নিলাম। ভেবেছিলাম পরিস্থিতি কিছুটা ঠান্ডা হলে আপনার কাছে আসবো জানতে চাইবো আমার পরীর অবুঝ মনটাকে আঘাত করার কারন, নিবো কৈফিয়ত ঐ চোখের পানি ঝরানোর জন্য।
কথক:-সম্রাটের চাহনি নিরব, উপলদ্ধি করতে পারছে পারির যন্ত্রনা কিন্তু কিছুতেই মানতে পারছে নিজের প্রতি ছোড়া অপবাদের কাঁদা, তবুও যেন কোথাও একটা অপরাধবোধে ঘিরে ধরছে, নিজেকেই নিজে অপরাধী বলে আখ্যায়িত করার প্রবল ইচ্ছা জাগছে, হঠাৎ করেই জানতে চাইলো সেইদিনের সেই সময়টার কথা!
সম্রাট:- আচ্ছা আপনারা এসেছিলেন কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না এটা কিভাবে সম্ভব? আমি আসলেই বুঝতে পারছি না কিছু? মানে আমার জীবনে পারি ছাড়া অন্য কোন নারী না আগে ছিলো না এখন আছে তাহলে আপনি এসব কি বলছেন? তাছাড়া গ্যারেজে সামান্য পিঁপড়া ঢুকলেও আমি বুঝতে পারি সেখানে আপনারা দুই-দুজন মানুষ আসলেন আবার চলেও গেলেন আর আমি বুঝতেই পারলাম না?
হাসান সাহেব:- তা তো জানিনা,তবে আমি যা বলেছি তার একটা কথাও মিথ্যা নয়। পুরো বিষয়টি আমি নিজে চোখেই অবলোকন করেছি।পুরোটা সময় ই পারি মায়ের কাছে ছিলাম।
সম্রাট:- পারি বাড়ি যাওয়ার পর কি হয়েছিলো?
হাসান সাহেব:- বাড়ি যাওয়ার পর! মায়ের জীবনটা নরকের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল।
সম্রাট:-চাচা!
সম্রাটের বিস্ময়কর প্রশ্নাত্বক স্বরে,হাসান সাহেবের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল, আবারও বলতে লাগলেন,
কথক:- পারি দরজায় কলিং বেল দেওয়ার সাথে সাথেই কেউ একজন দরজাটা খুলে দেয় , পারি সেদিকে না তাকিয়ে নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই কারো শক্ত হাতের থাপ্পড়ে ফ্লোরে পড়ে যায়, এমনিতেই কাল থেকে না খাওয়া তার উপর অতিরিক্ত কাঁদার কারনে,আর এতটা পথ হাটার কারণে বেশ দুর্বল লাগছিলো শরীরটা,তাই থাপ্পড়ের ধকলটা নিতে পারলো না,মাথা নিচু করেই শুনতে লাগলো থাপ্পড় দেওয়া ব্যক্তির তিক্ত কথা,
পরশ আবরার চৌধুরী:-আমার ভাবতেই লজ্জা হচ্ছে তুমি আমার মেয়ে! শেষ অবধি একটা দু টাকার ছেলের জন্য নিজের বাবার মুখে চুলকানি মাখতেও তোমার বিবেকে বাঁধলো না।
পারি নিরব ভাবেই তাকিয়ে রইল জমিনের দিকে। পরশ আবরার চৌধুরী আবারও বলতে শুরু করলেন,
পরশ আবরার চৌধুরী:- আমার ভুল হয়েছে তোমাকে অতিরিক্ত স্বাধীনতা দিয়ে। শুরুতেই যদি তোমার পায়ে শিকল দিতাম তাহলে আর আজ এমন দিন দেখতে হতো না, এতটা সাহসও তোমার হতো না যে রাতের আঁধারে তুমি ঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে একটা সামান্য মেকানিকের সাথে রাত কাটিয়ে আসবে!
পরশ চৌধুরীর এই কথায় এবার পারি মুখ তুলে তাকালো, নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ গুলোর এমন পরিবর্তন যেন ওকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে, পাথরের দৃষ্টিতে নিজের বাবার পরিবর্তিত রুপটা দেখছে, পরশ চৌধুরীর কথার মাঝেই ফোড়ন কাটলো হাসান সাহেব,,
হাসান সাহেব:- স্যার ! আমি বলছিলাম...!
হাসান সাহেবের কথা শেষ হওয়ার আগেই পরশ আবরার চৌধুরীর রক্ত চক্ষু দেখে দমে গেল,পরশ আবরার চৌধুরী কিছু বলার আগেই রেহানের চরম অপমানে মাথা নুইয়ে গেল,পারি নিজের বাবার এমন ব্যবহার আর হাসান সাহেব কে করা রেহানের অপমান , সবই যেন সম্রাটের দেওয়া আঘাতের কাছে তুচ্ছ মনে করলো, তবুও নিজের জন্য না হয় অন্তত হাসান চাচাকে সেফ করতে এবার উঠে দাঁড়ালো, রেহানের সেই তিক্ত কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে,
রেহানের কিছু সময় আগেই বলা কথাটা টা ছিলো,
রেহান:- এই ছোটলোকের বাচ্চাই ওকে বের হতে সাহায্য করেছে, ইচ্ছা করছে ওকে জুতো পেটা করি, নিমক হারামের বাচ্চাগুলো যেই থালে খায় সেই থালেই ফুটো করে!
কথাটা বলেই রেহান মারার জন্য পা বাড়াতেই কিছু একটা ভেবে আবার থেমে যায়।
পারি নিজের মনেই কথাটা ভাবলো, তারপর কিছু সময় চোখ বন্ধ করে জোরে দম নিয়ে ধীর গতিতে হাসান সাহেবের সামনে গিয়ে নিভু নিভু চাহনিতে অল্প শব্দে বললো,
পারি:-তুমি এখান থেকে চলে যাও চাঁচা,আমাকে নিয়ে আর ভেবো না।
পারি কথা বলার সময় ওর চোখে অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট তবুও ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি,সেই হাসি যে সুখের নয় তা তিনি খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো তাই উনি কিছু বলতে চাওয়ার জন্য মুখ খুলতেই পারি বললো,
পারি:- ভেবো না! আমি মরবো না!
শেষের লাইনটা বেশ জোরেই বললো,পারির কথায় হাসান সাহেব ডুকরে কেঁদে উঠলো,পারি নিজের কথা শেষ করে ধীর পায়ে হেঁটে চলে গেল নিজের ঘরে , হাসান সাহেব সেদিকে কিছু সময় তাকিয়ে, একবার পরশ আবরার চৌধুরী আরেকবার রেহানের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল,পরশ আবরার চৌধুরী ও রেহান আগের মতোই কঠোর দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো পারির যাওয়ার পানে,দুরে দাঁড়িয়ে নিরব দর্শকের ভূমিকায় থেকে শুধু অশ্রুই বিসর্জন করলো মিসেস প্রিয়ন্তি খন্দকার।
পারি নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়লো,আর পারছে না শরীরের ওজন বয়ে বেড়াতে। সারাদিন চলে গেল কেউ আর ডাকতে এলো না, যদিও মিসেস প্রিয়ন্তি একবার দরজার সামনে এসে দাড়িয়ে ছিলেন কিন্তু কিছু সময় পারিকে দেওয়ার কথা ভেবেই আর দরজায় শব্দ করলো না। হাসান সাহেব ও নিজের ঘরে গিয়ে বসে রইলেন। রাতের খাবারের সময় মিসেস প্রিয়ন্তি ডাকার জন্য দরজায় গিয়ে আঘাত করলো ,পারি প্রথমে শব্দ না করলেও পরে শুধু একবার বলেছিলো,,
পারি:- এখান থেকে যাও,খাবো না আমি !
প্রিয়ন্তি:- মা আমার একবার দরজাটা খোল, মায়ের কথাটা শোন!!
পারি:- এখান থেকে যাও! প্লিজ!!!
পারি কথাটা বেশ রুঢ় ভাবেই বলে, মিসেস প্রিয়ন্তি আবার কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই,,পরশ আবরার চৌধুরী বললেন,
পরশ আবরার চৌধুরী:- না খাক! কিছু দিন না খেলে মরে যাবে না! আর এমন সন্তান থাকার চেয়ে না থাকাই শ্রেয়!
মানুষের সবচেয়ে আপন হয় মা বাবা।আর মেয়েদের কাছে প্রিয়জনের তালিকায় সবার উর্ধ্বে থাকেন বাবা নামক মানুষটি। সেই মানুষটি যখন এমন করে কথা বলে তখন সবকিছুই তুচ্ছ মনে হয়,পারির নিজের বাবার কথাটা তেমন অনুভূতি হলো,তাই ও আর না খেয়েই থাকার সিদ্ধান্ত নিলো যদি এতে মরে যায় তবে যাক। আর কে আছে যার জন্য বেঁচে থাকাটা জরুরী,যাকে ভালোবাসে সে এভাবে ঠকালো, যারা জন্ম দিয়ে এত ভালোবাসা দিয়ে এত বড় করলো তারাও আজ এভাবে আঘাত করলো। তাহলে আর বেঁচেই কি হবে? এইসব হাজার টা আজগুবি চিন্তা করতে করতেই আবারো ঘুমিয়ে পড়লো। সেদিন রাতটাও এভাবে কেটে গেল!
পর্ব ২৩
পারি না খেয়েই কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়। তারপরের দিনও ওর মা দরজায় নক করলে দরজা না খুলে ওর মাকে চলে যাওয়ার জন্য বাধ্য করে, ওর মা ও কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে চলে যায়। এভাবেই পরেরদিন ও কেটে যায়।পারির মা চেয়েও কিছু করতে পারে না। একদিকে মেয়ের জেদ অন্যদিকে স্বামীর জেদ আর রাগের কাছে ওনার নিজেকেই অসহায় মনে হতে লাগে।পারির বাবা রাগ আর অহংকারের তাড়নায় এতটাই অন্ধ হয়েছিলো যে,যে মেয়ে একবেলা একটু কম খেলে উনার খাওয়া বন্ধ হয়ে যেত,যে মেয়েকে সকালে না দেখে উনি কখনো অফিসে যান নি সেই মেয়ের না খেয়ে থাকা কিংবা দুদিনেও মুখ না দেখাতে কোন প্রভাব পড়ছে না ।
দুদিন পার হয়ে তিনদিনের সন্ধ্যায় পারির মা দরজায় নক করলে পারি কোন উত্তর দেয় না। মিসেস প্রিয়ন্তি মেয়ের গলার শব্দ না পেয়ে ভয় পেয়ে যায়। দুদিন দরজা না খুললেও ভেতর থেকে উত্তর দিয়েছে কিন্তু আজ তিন চার বার নক করার পরেও কোন উত্তর না পাওয়ায় উনি ভীতি গ্রস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি করে নিজের স্বামীকে ফোন লাগায়, পরশ আবরার চৌধুরী তখন মাত্র একটা মিটিং শেষ করে রেসট্রন থেকে বের হয়েছে। এমন সময়ে স্ত্রীর ফোন পেয়ে একটু চমকায়।চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে কপালে যতই হোক উনিতো বাবা, অজানা ভয়েই স্থির হয়ে যায় শরীর, উনার চিন্তার ভাবনার মাঝেই ফোনটা কেটে গেছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে কোনরকম কল ব্যাক করে, অপর পাশের মানুষের নিঃশ্বাস এর শব্দেই প্রিয়ন্তি মজুমদার দমহীন হয়েই এক নিঃশ্বাসে নিজের কথা শেষ করে। প্রিয়ন্তি মজুমদারের কথায় পরশ আবরার চৌধুরীও চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, ড্রাইভারকে দ্রুত গতিতে গাড়ির চালানোর নির্দেশনা দিয়ে নিজেও বসে পড়ে পিছনের আসনে।
বাড়ি পৌঁছে দেখে প্রিয়ন্তি মজুমদার মেয়ের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বারবার দরজা খোলার জন্য মেয়েকে অনুরোধ করছে, কিন্তু ভেতর থেকে কোন সারাশব্দ আসলো না। উনি সময় ব্যয় না করে কাজের লোকদের সাহায্যে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে থমকে যান।পুরো ঘরের অবস্থা তছনছ করে রেখেছে পারি। বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে।চোখটা কোটরের ভেতরে ঢুকে গেছে। মুখটা কেমন চিমসে গেছে। দুজনের ভেতরেই কেঁপে উঠলো। মিসেস প্রিয়ন্তি দৌড়ে গিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বারবার নাম ধরে ডাকতে থাকে। পরশ আবরার চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে বিছানায় অচেতন হয়ে থাকা নিজের পরীটার দিকে। দরজার বাইরে বাড়ির সব কাজের লোক জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তারাও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
পারীর অচেতন শরীর নিয়ে মিসেস প্রিয়ন্তির আর্তনাদের শব্দে পরশ আবরার চৌধুরী আরো বেশি অস্থির হয়ে পড়ে,উনি হাসান সাহেবকে ডাক্তার কে ফোন করে আনার জন্য বলে। রুমের ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় ছিড়ে কুটিকুটি করা অজস্র ছবি,শাড়ীর টুকরা, কানের দুল,নানারঙের কাঁচের চুড়ি! চুড়ির টুকরা! শব্দটি মনে করতেই উনি দৌড়ে পারির কাছে যায়।দেখতে পায় হাতের পাতা গুলো যেন কেউ ব্লেট দিয়ে ইচ্ছেমতো আঘাত করছে, ঠিক কতটা আঘাতের দাগ আছে তা নির্নয় করে বলাও অসম্ভব। এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না! মেয়ের ক্ষতবিক্ষত হাতের দিকে চেয়ে একবার মেয়ের নিস্তেজ হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে মেয়ের হাত দুটোতে ছোট্ট ছোট্ট আদরের পরশ বুলিয়ে শব্দ করেই কেঁদে দিলেন। মিসেস প্রিয়ন্তিও মেয়েকে জড়িয়ে কাঁদছেন আর বারবার পরশ আবরার চৌধুরীকে দোষারোপ করছেন।
ডাক্তার এসে পারীর হাত ব্যান্ডেজ করিয়ে স্যালাইন দিয়ে গেছেন আর বলে গেছেন আপাতত হসপিটালে নেওয়ার দরকার নেই।তবে পারীর বর্তমান মানসিক অবস্থা ভালো নয়। তাই ওকে একা ছাড়তে বারন করেছে। সবসময় কাউকে না কাউকে যেন ওর পাশেই রাখেন।
ডাক্তার যেহেতু পারিবারিক বন্ধু তাই আবরার চৌধুরী নিজের এবং মেয়ের ভবিষ্যত সম্মানের কথা ভেবেই হসপিটালে না নেওয়ার জন্য বলেছেন। না খেয়ে থাকা আর অতিরিক্ত কান্নার ফলেই পারী জ্ঞান হারায় তবে চুড়ি ভাঙার সময় হাত কেটে যাওয়াতে রক্ত ক্ষরন ও হয়। যেটা ওর হাতেই শুকিয়ে যায়। তবে খুব বেশি রক্তপাত না হওয়াতে তেমন সমস্যা হয়নি তাই ডাক্তার ও আর বেশি কিছু বলেনি।
সারা রাত পারির স্যালাইন চলে, মিসেস প্রিয়ন্তি মেয়ের মাথার পাশেই বসে থাকে,পরশ আবরার চৌধুরী ও পারির রুমের সোফায় শুয়ে থাকেন।কেউ আর সারারাতে পারিকে একা ছাড়ে না।
পরের দিন সকাল বেলা,,,
নিজের চোখের পাতা দুটো যেন অস্বাভাবিক ভারী মনে হচ্ছে, খুলতে কষ্ট হলেও জোর করেই আলাদা করলো দুচোখের পাতা। পিটপিট করে তাকাতেই সর্বপ্রথম দেখতে পায় নিজের মায়ের ঘুমন্ত মুখটা। সারারাত কেঁদেছে যার প্রমান দেয় মায়ের গালে থাকা পানির ছাপ। গত কয়েকদিন যে শুধু সে একা নয় তার মায়ের ও অনেক কষ্ট হয়েছে তাতো মায়ের চোখের নিচে কালো দাগই বুঝিয়ে দেয়। মায়ের মুখটা দেখলো নির্নিমেষ দৃষ্টিতে। চোখের কোন দিয়ে আলগোছে বেড়িয়ে গেল একফোঁটা নোনাজল। মুখটা ঘুরিয়ে নিজের ঘরে চোখ বুলাতেই দৃষ্টির আবদ্ধ হলো সোফায় আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকা বাবার দিকে। বাবার মুখটাও কেমন অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। যে মানুষ নিজের বিছানায় সামান্য কুঁচকে যাওয়া চাদরে ঘুমাতে পারে না সে আজ এভাবে সোফায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই হাতটা নাড়াতেই আর্তনাদ করে উঠলো,
পারি:- আহ্
পারির আর্তনাদের শব্দে হুড়মুড় করে উঠে বসলেন মিসেস প্রিয়ন্তি আর পরশ আবরার চৌধুরী।দুজনেই অস্থিরতার সহিত পারির সামনে এসে বসে।পারি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো ক্যানুলা লাগানো, হাতে জোর দেওয়ায় সেখানে খোঁচা লেগে একটু রক্ত বের হচ্ছে। রক্ত দেখে পরশ আবরার চৌধুরী উত্তেজিত হয়ে পড়ে। পারির হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে নিজের স্ত্রীকে আদেশ করেন ফাস্ট এইড বক্স আনতে।
পরশ আবরার চৌধুরী:- এটা কি করলে মামনি? তোমার কিছু লাগলে তুমি পাপাকে বলতে,নিজে কেন উঠতে গেলে? , দেখো তো তোমার একটু অমনোযোগিতায় কি হয়ে গেল! এখন আবার রক্তপাত হচ্ছে।
পারি চুপ হয়ে দেখছে নিজের বাবার এই অস্থিরতা। যে মানুষটা দুদিন আগেই তাকে কত শক্ত শক্ত কথা বলেছিলো আর আজ সেই মানুষটিই তার সামান্য আঘাতে কতটা যন্ত্রনা পাচ্ছে।যেন রক্তপাত পারির নয় উনার নিজের ই হচ্ছে।
পারির ভাবনার মাঝেই মিসেস প্রিয়ন্তি ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে হাজির হয়। পরশ আবরার চৌধুরী খুব যত্ন করে ক্যানুলা খুলে জায়গাটা থেকে রক্ত মুছে স্যাভলন দিয়ে পরিস্কার করে দেয়। তারপর একটা ছোট্ট করে ব্যান্ডেজ করে দেয় যাতে ধুলোবালি না লাগে।পারি শুধু চুপ হয়ে দেখছে নিজের প্রতি তার বাবা মায়ের ভালোবাসা আর ভাবছে কি করবে।
পারির মা মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে আদরের সুরে বললেন,,
মিসেস প্রিয়ন্তি:- এখন কেমন লাগছে প্রিন্সেস?
পারি কোন কথা না বলে মাথাটা নুইয়ে নিলো,,, মিসেস প্রিয়ন্তি মেয়ের নিরবতায় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তারপর পরশ আবরার চৌধুরীর দিকে তাকালে উনি বাইরে যাওয়ার জন্য নির্দেশ করেন।।
মিসেস প্রিয়ন্তি মেয়েকে আরো একবার চোখ বুলিয়ে চলে গেলেন,,, পারি এখনো মাথা নুইয়ে রেখেছে, বাবার হাতের মুঠোয় থাকা হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য কোন তাড়া দেখাচ্ছে না।। নিরবতার তার ছিঁড়ে পরশ আবরার চৌধুরীই প্রথম মুখ খুললেন;
পরশ আবরার চৌধুরী:- পাপার উপর এত রাগ যে এমন একটা কাজ করে ফেললে? পাপা কি এতটাই খারাপ!?
পারি চুপ হয়ে আছে। কি বলবে সে পাপাকে! সে কি আদৌ তার পাপার উপর রেগে এমন করে নিজেকে শেষ করার পরিকল্পনা করেছে? নাহ ! সেতো কোন বেঈমানের জন্য নিজেকে শেষ করতে চেয়েছিল! পারির আনমনে ভাবনার মাঝেই পরশ আবরার চৌধুরী পারির মুখটা উচু করে নিজের দিকে তাকাতে বললেন,,,
পারি নিজের পাপার ছলছল চোখের চাহনিতে অপরাধবোধ খুঁজে পেলো,ধক করে উঠলো অন্তঃস্থল!! তার পাপা কি আদৌ অপরাধী! সন্তানের ভালো চাওয়া কি আদৌ অপরাধ! সব বাবা মাই তো নিজের সন্তানের ভালো চায়। তাহলে সে কি করছিলো? দুদিনের একজন মানুষের জন্য নিজেকে শেষ করে নিজের বাবা মায়ের কোল খালি করতে চলেছিলো! আচ্ছা ওর যদি কিছু হয়ে যেতো তাহলে কি সেও ওর পাপা মায়ের মতো কষ্ট পেতো? নাহ! সে কেন কষ্ট পাবে! তার তো এখন অন্য কেউ আছে! কথাটা আনমনে ভাবতেই সেদিন রাতে দেখা সম্রাটের বুকে অন্য নারী শোয়া মুহূর্তের দৃশ্যটা আবার চোখে ভেসে উঠলো সাথে সাথে গড়িয়ে পড়লো দু ফোঁটা অশ্রু! মেয়ের চোখে পানি পরশ আবরার চৌধুরী আবারও উত্তেজিত হয়ে পড়লো, চোখের পানি মুছে দিয়ে নিজের বুকের মাঝে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
পরশ আবরার চৌধুরী:- আর কেঁদো না প্রিন্সেস! তুমি যা চাইবে তাই হবে! তুমি যাকে পছন্দ করো আমি তাকেই তোমার জন্য এনে দিবো!
পারি নিজের বাবার বুকে মাথা গুঁজেই কান্নার গতি বাড়িয়ে দিলো।এর মধ্যেই খাবার নিয়ে রুমে ঢুকলেন মিসেস প্রিয়ন্তি। তারপর দুজনে মিলে পারিকে খাইয়ে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে ঘুমানোর জন্য রেখে চলে গেলেন নিজেদের ঘরে।
ঘুম থেকে উঠে একবার নিজের ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলো পারি।শরীরটা এখন একটু হালকা লাগছে। নিজের হাতের ব্যান্ডেজটা দেখে তারপর উঠে বসলো।ভাবতে লাগলো বিগত কয়েকদিনের ঘটনাগুলো তারপর নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করেই নিলো সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। উঠে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখলো ওর বাবা মা দুজনেই বসে আছে।
সকালে ওষুধ খাওয়ানোর পর যে ঘুম দিয়েছিলো তা ভেঙেছে এখন দুপুরের পর।
ড্রয়িং রুমে বসে মিসেস প্রিয়ন্তি আর পরশ আবরার চৌধুরী আলোচনা করছিলেন কিভাবে রোহানের সাথে বিয়ে ভাঙার কথা বলবেন । আর কিভাবেই বা সম্রাটের সাথে বিয়ে নিয়ে আলোচনা শুরু করবেন,এর মধ্যেই পারিকে নিচে দেখে দু'জনেই ব্যতিবস্ত হয়ে পড়ে। হাত ধরে পরশ আবরার চৌধুরী মেয়েকে নিজের পাশেই বসালেন। তারপর,,
পরশ আবরার চৌধুরী:-এখন কেমন লাগছে আমার মামনির?
পারি:- হুম!
ছোট্ট শব্দে উত্তর দিলো পারি, পরশ আবরার চৌধুরী মেয়েক নিজের বুকে জড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,,,
পরশ আবরার চৌধুরী:- তুমি একটু সুস্থ হও তারপর তোমাকে নিয়েই যাবো সম্রাটদের বাসায়!
পারি:-কেন?
মিসেস প্রিয়ন্তি:-ওমা কেন মানে কি! বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে!
মিসেস প্রিয়ন্তির উত্তরে বাবার বুক থেকে মুখ ঘুড়িয়ে নিজের মায়ের দিকে নজয দিলো ,পারি চোখের চাহনিতে প্রশ্ন খুঁজে পেয়ে মিসেস প্রিয়ন্তি মুচকি হাসলেন,,পরশ আবরার চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,,
পরশ আবরার চৌধুরী:- হ্যাঁ! তুমি যদি তাতে খুশি হও ! তবে তাই হোক! তোমার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই!!
পারি:- কিন্তু?
মিসেস প্রিয়ন্তি:-আবার কিন্তু কিসের? হ্যা মানছি সবসময় ছেলে পক্ষই মেয়েদের বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে আসে, এইবার না হয় আমরাই যাই! ভিন্নধর্মী কিছু হয়ে যাক!
পারি:- দরকার নেই!
মিসেস প্রিয়ন্তির কথার পিঠে পারির প্রতিক্রিয়া স্বরুপ কথায় মিসেস প্রিয়ন্তি আর পরশ আবরার চৌধুরী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন,,
মিসেস প্রিয়ন্তি:- মানে? দরকার নেই কেন?
পারি :- দরকার নেই মানে দরকার নেই! তোমরা আমার বিয়ে যার সাথে ঠিক করেছো আমি তাকেই বিয়ে করবো!
পরশ আবরার চৌধুরী:- কিন্তু?
কোন কিন্তু নেই! আমি বিশ্বাস করি তোমরা আমার জন্য যা করো সেটাই ঠিক! তাই আমিও সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমাদের পছন্দের পাত্রকেই আমি বিয়ে করবো। !!
শেষের কথাটা বেশ জোরেই বললো পারি , তারপর সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে তাদের অবাক দৃষ্টি দেখে মাথা নুইয়ে চলে যেতেও সিড়ি থেকে ফিরে এসে পরশ আবরার চৌধুরীর সামনে দাঁড়িয়ে বললো,,,
পারি:- পাপা! I am sorry!! তুমি ঠিক বলেছিলে ও আমার যোগ্য নয় আর তাই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি! তুমি প্লিজ রোহানের সাথেই আমার বিয়ের ডেট ফিক্সড করো এবং সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হয়,যদি আজ হয় তবে আজই! প্লিজ!!!
কথা শেষ করে পারি দৌড়ে নিজের রুমে চলে যায়। এদিকে সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পারির শেষের দিকের সব কথাই শুনলো রোহান, ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা কুটিল হাসিটা চওড়া ,হলো মনে মনে বললো,
রোহান:- ফাইনালি! বলেছিলাম না তোমাকে আমার জালেই ফাঁসতে হবে! দেখলে তো ঠিক আমার কাছেই তোমাকে আসতে হলো। এইবার বোঝাবো এই রোহান কি জিনিস!
মিসেস প্রিয়ন্তি আর পরশ আবরার চৌধুরী পারির শেষের কথাটা বোঝার জন্য একে অপরের দিকে তাকাতুকি করতে লাগলো,, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলো ,,এর মধ্যে থেকেই পেছন থেকে রোহানের কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,,,
রোহান:- আসসালামু আলাইকুম আংকেল আন্টি!
পরশ আবরার চৌধুরী ও মিসেস প্রিয়ন্তি পিছনে ঘুরে রোহানের সালামের উত্তর দিয়ে বসার জন্য অনুরোধ করলো,রোহান সামনের সোফায় বসেই বলতে শুরু করলো,,,
রোহান:- আমি পারির কথা শুনেছি; আমার কোন সমস্যা নেই! এমনিতেও আমি চাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পারিকে আমার ঘরে নিয়ে যেতে জানেনই তো আমার পরিবার ওর জন্য কতটা ব্যাকুল হয়ে আছে! তাছাড়া কানাডায় আমার ব্যবসায়েরও অনেক ক্ষতি হচ্ছে তাই আমিও খুব শীঘ্রই চলে যাবো অবশ্যই তার আগে পারির সাথে বিয়েটা সাড়তে চাই যদি আপনাদের অনুমতি থাকে! কি আংকেল আন্টি অনুমিত পাবো তো ,এখন তো পারির ও মর্জি আছে!
নিজের কথা শেষ করে পায়ের উপর পা তুলে গা হেলিয়ে আরাম করে বসলো,,,অন্য সময় হলে পরশ আবরার চৌধুরী এক কথায় হ্যা বললেও এখন কেন জানি দোনামোনায় আছে,রোহান পরশ আবরার চৌধুরীর মতিগতি বুঝতেই শেষের কথাটা বলেছিলো,, পরশ আবরার চৌধুরী এখন ও পারির শেষের কথাটা ভাবছে,,যাকে বিয়ে করার জন্য রাতের আঁধারে ঘর ছাড়তেও ভাবেনি তার সাথে কি এমন হলো যে! উনার ভাবনার মাঝেই রোহান বলে উঠলো,,,
রোহান:- আংকেল আপনার অনুমতি থাকলে আজকে থেকেই প্রস্ততি নিতে চাই দুয়েক দিনের মধ্যেই বিয়েটা ও সেরে ফেলতে চাই!
পরশ আবরার চৌধুরী রোহানের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন,,,
পরশ আবরার চৌধুরী:- আমি তোমার সাথে এ বিষয়ে পরে কথা বলছি!!
পরশ আবরার চৌধুরী নিজের কথা শেষ করে উঠে চলে গেলেন পারির রুমের উদ্দেশ্যে।সাথে মিসেস প্রিয়ন্তি ও । রোহান বিষয়টা হজম করতে পারলো,রাগে চেহারা লালবর্ন ধারন করেছে,হাতের মুঠ শক্ত করে ধরে দাঁতে দাত চেপে উঠে দাঁড়ালো, উপরের দিকে চোখ বুলিয়ে মনে মনে কুৎসিত কিছু গালি দিলো , তারপর নিজের জগন্য পরিকল্পনাকে আরো একবার ঝলসিয়ে নিলো, এরপর হনহনিয়ে চলে গেল!!!
বর্তমান
হাসান সাহেব এই অবধি বলেই একটা দম ছাড়লেন,সম্রাট মাথা নুইয়ে রেখেছে,যেখানে পারির বাবা বিয়েতে ঐ সময় মত দেননি তাহলে কিভাবে? কথাগুলো ভাবতেই আবারো চোখ তুলে দেখলো হাসান সাহেবের হতাশ দৃষ্টি, বুঝতে পারলো আরো অনেক কঠিন কিছু শোনার বাকী আছে!
সম্রাট:- চাচা!
হাসান সাহেব:- সেদিন রোহান চলে যাওয়ার পর আমি উপরে সাহেবের ঘরে যাই। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সাহেবের অনুমতি নিতে চেষ্টা করি। অনুমতি পাওয়ার পর তার রুমে যাই।।
পরশ আবরার চৌধুরী:-আরে হাসান!
হাসান সাহেব:-সাহেব একটা কথা বলতে চাই যদি অনুমতি দেন!
পরশ আবরার চৌধুরী:- হ্যা বল!
হাসান সাহেব:- আপনি পারি মাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না, তাহলে পারি মা আবার ও অনেক কষ্ট পাবে!
হাসান সাহেবের কথায় পরশ আবরার চৌধুরীর টনক নড়লো,উনি পারির ঘরে গিয়ে পারির মনের কথা বের করার চেষ্টা করেছিলো কিন্তু পারি কিছুতেই মুখ খুলেনি।এত চিন্তায় উনি ভুলেই গিয়েছিল সেদিন রাতে যে হাসান সাহেব পারির সাথেই ছিলো,এখন উনি বুঝতে পারলেন সেদিন যাই হয়ে থাকুক সেটা অবশ্যই হাসান সাহেবের জানার কথা।তাই উনি নিজেই এবার জিজ্ঞেস করলেন,,,
পরশ আবরার চৌধুরী:- হাসান সেদিন রাতে তুই তো সাথেই ছিলি আমার পারির, তাহলে বল কি এমন করেছে ঐ ছেলে যার জন্য আমার মায়ের এমন পরিবর্তন হলো?
হাসান সাহেব মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলো,পরশ আবরার চৌধুরীর গর্জনে মাথা উঁচু করে সেদিন রাতে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন।সব শোনার পর পরশ আবরার চৌধুরী কিছুটা খুশি হলেও পারির পাওয়া কষ্টের কাছে তা তুচ্ছই মনে হলো তাই উনি বললেন,,,
পরশ আবরার চৌধুরী:-ঐ হারামীর বাচ্চাকে তো আমি জেলের ভাত খাইয়েই ছাড়বো!
হাসান সাহেব:-নাহ স্যার! যা হয়েছে ভালোর জন্যই হয়েছে, একবার ভাবুন তো যদি এটা বিয়ের পর হতো ! এখন তো ভালোই হয়েছে,পারি মা রোহান স্যারকে বিয়ে করতেও রাজী হয়েছে, তাহলে আপনার আর কিসের চিন্তা! ঐ ছেলে পারি মাকে ধোঁকা দিয়ে কি পেলো? কিছুই না! দয়া করে ঐ ছেলেকে নিয়ে আর কোনরকম ভাবনা না ভেবে আপনি রোহান স্যারের সাথে পারি মায়ের বিয়ে নিয়ে ভাবুন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়েটা দিয়ে পারি মাকে এই শহর থেকে দুরে পাঠান। দেখবেন এই শহরের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে পারি মা নিশ্চয়ই সুখে থাকবে!!!!
পর্ব ২৪
_____ বর্তমান______
সম্রাট:- তারপর পারির...
হাসান সাহেব:-সেইদিনের আলোচনার ঠিক তিনদিনের মধ্যেই রোহানের সাথে পারি মায়ের বিয়ে হয়ে যায়! রোহানের খুবই তাড়া ছিল,তাই সাহেব চেয়েও বড় আয়োজন করতে পারেনি।কাছের কিছু মেহমান আর রোহানদের পরিবারের লোকজন ছিলো শুধু সেই বিয়েতে! পারি মায়ের ও ইচ্ছা ছিল না বিয়েতে বেশি আয়োজন করার তাই সাহেব পারি মায়ের মানসিক অবস্থা আর রোহানের কথায় অল্প আয়োজনেই বিয়েটা সেড়ে ফেলেছিলো কিন্তু কে জানতো এই তাড়াহুড়োই পারি মায়ের জীবন অন্ধকারে ঢেকে দিবে। রোহান পারি মাকে নিয়ে সরাসরি কানাডা চলে যায়, বিয়ের পর এক মাস ভালোই ছিলো এরপরই প্রকাশ্যে আসে রোহানের আসল চেহারা!!
সম্রাট:- মানে?
--------অতীত -------
কানাডা;
কলিং বেলের আওয়াজে তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে আসতে গিয়ে ফ্লোরে পা পিছলে পড়ে যায় পারি,,হাতের কনুইতে ব্যথা পাওয়ার পরেও দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে আবারও দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে,, দরজার সামনে হাঁপাতে হাঁপাতে দেখতে থাকে রোহান একটা মেয়েকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে মেয়েটার ঠোঁটের মাঝেই ডুবে রয়েছে,,পারি এইরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে,, মেয়েটার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করলো, মেয়েটা শর্ট একটা টপস সাথে হট প্যান্ট পড়া বলা যায় একরকম অর্ধনগ্ন! সেও রোহানের স্পর্শে বেশ আপ্লুত হয়ে আছে। নিজের হতভম্ব হয়ে থাকা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতেই চিৎকার করে উঠলো,পারির চিৎকারে রোহান আর মেয়েটা একে অপরকে ছেড়ে একটু ফাঁকা হয়ে দাঁড়ায়, পারি বেশ উচ্চ স্বরেই জিজ্ঞেস করলো,,,
পারি:- এসব কি রোহান?
রোহান:- কোন সব?
রোহানের কথার ধরনে পারি বুঝতে পারলো, রোহান নেশাগ্রস্ত ,,তার কথার সময় মুখ খুলতেই সেই গন্ধে পরিবেশ মুহূর্তেই কেমন গুমোট রুপ ধারণ করলো,,পারি রোহান কে ধরতে গেলেই রোহান হাত সরিয়ে দেয়,রোহানের পাশে মেয়েটা এসে রোহানের বাম বাহু ধরে,,
Tiny:- Roh, baby who is she?
Rohan:- servent !
Tiny:- Really!
Rohan:- Yap babe!
Tiny:- Then how dare she to touched you?
Rohan:- Be cool baby,, it's just a normal matter,,I will handle it,,, you just come with me in my bedroom!
রোহান কে ধরতে যাওয়ার দরুন টিনি নামে মেয়েটার প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে রোহানের উত্তরে আর ব্যবহারে পারি যেন পুরো স্তব্ধ হয়ে গেলো, রোহান মেয়েটার কাছে ও কে কাজের লোকের পরিচয় দিলো,, রোহান নিজের কথা শেষ করে মেয়েটাকে নিয়ে নিজের শোয়ার ঘরে যেতেই পারি বাঁধা দেয়,তাই রোহান পারি কে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়ে তারপর মেয়েটিকে নিয়ে ভেতরে চলে যায়,এদিকে পারি পরে গিয়ে সেন্টার টেবিলে মাথা লেগে প্রচুর ব্যথা পায়,বিল্ডিং ও শুরু হয়। পারি উঠে গিয়ে দরজা ধাক্কাতে থাকে,প্রথম কয়েক মিনিট রোহান কোনরকম সাড়া না দিলেও মিনিট আটেক পরে বের হয়, পারি দরজা খোলার সময়ই দেখতে পায় মেয়েটা গায়ে চাদর জড়িয়ে বেডে আধশোয়া হয়ে দরজার দিকেই বিরক্তিকর ভঙ্গিতে চেয়ে আছে,রোহান ও কোনরকম নিজের শর্টস টা পড়েই বের হয়েই পারির দিকে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে বিচ্ছিরি কিছু গালি দিলো,, তারপর পারিকে চলে যেতে বললো,,পারি হুট করেই রোহানের পায়ে ধরে বসে পড়ে,,
পারি:- রোহান প্লিজ এমন করো না,তুমি এমন কেন করছো আমার সাথে?
রোহান:- oh so irritating you are? Just disgusting lady!!! Stay away from me,,, keep peace for the night, leave us!
মাতলামো করতে করতে রোহান কথাগুলো শেষ করে আবার ও ভেতরে ঢোকার জন্য পিছু ঘুরতেই পারি নিজের হাতের বাঁধন শক্ত করে, পায়ে বাধা পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে পারির হাত ধরে টেনে হিচড়ে পাশের রুমে নিয়ে ছুড়ে মেরে রুম লক করে দেয় ।।। পারি সারারাত এভাবেই দরজার পাশে কান্না করতে করতেই একসময় থেমে যায় আর ভাবতে থাকে,,সেতো রোহানের চরিত্র জেনেই বিয়ে করেছিলো,,, তাহলে কেন এত কষ্ট হচ্ছে ? স্বামী বলে? বেঈমানের বেইমানি সহ্য করতে না পেরেই নিজেকে শেষ করার পরিকল্পনা হিসেবেই রোহানের মতো উচ্ছ্বনে যাওয়া একটা ছেলেকে বিয়ে করেছিল তাহলে এখন,,হ্যা সেতো মানিয়ে নিয়েছিলো রোহানকে,,মন না হলেও শরীর দিয়ে বাধতে চেয়েছিলো রোহানকে,,রোহানও তো তার শরীর ই চেয়েছিলো,,মনের কদর তো সে কখনোই করেনি।। না জানতে চেয়েছিলো মনের খবর,,বিয়ের পর প্রতিটা রাতই সে শরীর নিয়ে খেলেছে, কোনদিনও নেয়নি মনের মাঝে চলা যন্ত্রনার খবর,জানতে চাইনি কতটা উপভোগ করছে সে এই শরীরের খেলা!
বিয়ে করে কানাডা আসার প্রথম দিনগুলি দাম্পত্য জীবনের শুরু হিসেবে পারি চেষ্টা করেছে রোহানকে মেনে নিতে, স্বামীর সবটুকু অধিকার দিতে তাই রোহানের ডাকে কখনো বিমুখ করেনি।।না চাইতেও রোহানের সঙ্গ দিয়েছে, স্বামী সেবার সব দায়িত্ব পালন করেছে, কিন্তু পনেরোদিন হতেই রোহান নিজের খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে লাগলো,, বাংলাদেশে দেখা রোহান ছিলো এই রোহানের শুধু নমুনা মাত্র,, প্রকৃত রোহান মাত্রই যেন নিজের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে পারির সামনে,,, রোহান নিজেকে বড় ব্যবসায়ী হিসেবে দাবি করলেও আসলে সেইরকম কিছুই সে নয়।। রোহান একজন মাদকাসক্ত এবং মাদক ডিলার।। রোহানের বাবা ছিলো একজন ভাগ্যান্বেষী বাংলাদেশী নাগরিক।।। সে ভাগ্যের সন্ধানে কানাডা পারি জমায় সেটাও অবৈধ পথে। এবং সে তাতে সফল হয়।তবে রোহানের বাবার উচ্চ বিলাসীতা তাকে অন্ধকারে টেনে নেয় ,,সেই সুত্রেই রোহানের বাবা রাজিব মির্জা কানাডার বিভিন্ন মাদক ডিলারদের সাথে এবং আদম ব্যবসায়ীদের সাথে হাত মিলিয়ে হয়ে যায় কানাডার এক ভয়ংকর আদম ব্যবসায়ী এবং মাদক ব্যবসায়ী।।। সেই সুত্রেই পরিচয় হয় কানাডিয়ান নাগরিক মিস জেসির সাথে যে কিনা সম্পর্কে রোহানের সৎ মা। রোহানের সৎ মা ছিল মাদকাসক্ত।।। একদিন মাদক কিনতে এসেই চোখে পড়ে রাজিব মির্জার।। প্রথমে রাজিব মির্জা ফ্রিতে মাদক দিয়েই জেসির নজর কাড়ে।জেসি ছিলো ধনী বাবার বিগড়ে যাওয়া অসম্ভব সুন্দরী একজন মেয়ে। রাজিব মির্জার নজর জেসির রুপের চেয়েও বেশি কেড়েছিলো জেসির বাবার টাকার পাহাড়। তাই সে ঝোপ বুঝে কোপ মারে। মাদকাসক্ত জেসির সাথে দৈহিক মিলনে আবদ্ধ হয় এবং সেটার ভিডিও ক্লিপ নিয়ে ব্লাকমেইল করা শুরু করে জেসির বাবা মিস্টার পিটারকে।।মিস্টার পিটার এতে বেশ কিছুটা আতংকিত হলেও জেসি ছিলো নিরুত্তাপ।। তার কাছে এটা কোন বিষয়ই নয়। কারন সে এর আগেও অনেকের সাথেই ফিজিক্যালি ইনভলভ হয়েছিলো।। মেয়ের এমন নিরুত্তাপ ভঙ্গি দেখে মিস্টার পিটার ও হতাশ হয়ে যান তবে উনি বুঝতে পারছিলেন না কেন রাজিব এই ভিডিও উনাকে দেখাচ্ছেন।।। মিস্টার পিটার রাজিব মির্জার সাথে দেখা করতে চাইলে রাজিব মির্জা রাজী হয় এবং দেখা করে, তিনি মিস্টার পিটারকে প্রস্তাব করে তার ব্যবসায়ের অর্ধেক মালিকানা এবং মিস জেসির সাথে বিয়ে দিতে।মিস্টার পিটার বুঝতে পারলেন কৌশলে উনার সমস্ত প্রপার্টির মালিক হতে চাচ্ছে রাজিব।তাই উনি রাজী হননা।এতে করে রাজিব ক্ষেপে যান এবং মিস জেসির সাথে অন্য অনেক ছেলের ভিডিও দেখায়। মিস্টার পিটার কানাডিয়ান হলেও উনি ছিলেন যথেষ্ট ভদ্র মার্জিত আর সম্মানিত লোক।উনি নিজের সম্মানের ভয়ে রাজিবের সাথেই মিস জেসির বিয়ে দেন যদিও এই বিয়েতে জেসির মতামত ছিলো না। দুই ধর্মের দুই জন মানুষ এক হয়ে যায়।ধর্ম আলাদা হলেও কর্ম ছিলো সম্পূর্ণ এক। মিস জেসিও ছিলো একাধিক পুরুষে আসক্ত আর রাজিব মির্জাও ছিলো একাধিক নারীর প্রতি আসক্ত।। তবে জেসি ছিলো পুরুষ আর নেশায় আসক্ত আর রাজিব মির্জার আসক্তির সীমানা ছিলো না। সে মিস্টার পিটারের অর্ধেক সম্পত্তির মালিকানা পেয়েও খুশি হতে পারে নি কারন উনি জানতে পেরেছিলেন মিস্টার পিটারের একমাত্র মেয়ে হলেও মিস্টার পিটারের কোন সম্পত্তির মালিকানা জেসি পাবে না।মেয়ের উচ্ছৃঙ্খল জীবনের জন্য মিস্টার পিটার নিজের সমস্ত সম্পত্তি অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য আগেই হুইল করেছেন। তাই উনি পরিকল্পনা করেন এক ভয়াবহ ঘটনার,জেসি এই বিষয়ে কিছুই জানতো না ।তাই জেসিকে জানায়, এবং জেসির মাঝে এমনভাবে বিষয়টা উপস্থাপন করে যে জেসির মধ্যে নিজের বাবার সম্পর্কে ক্ষোভের তৈরি হয় যার পরিনতি হয় জেসির মধ্যে একটা খুনির বহিঃপ্রকাশ, প্রথমে জেসি তার বাবাকে সমস্ত সম্পত্তি তার নামে লিখে দিতে বলে,মিস্টার পিটার রাজী হয় না তখন সে দাঁড়ালো অস্ত্র দিয়ে নিজের বাবাকেই আঘাত করে এবং মরনের পথে থাকা বাবার হাত থেকে জবরদস্তি করেই প্রপাটির দলিলে সই নিয়ে নেয় , মাদকাসক্ত জেসি নেশার ঘোরে বুঝতেই পারলো না রাজিব চালাকি করে সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে করেছে,, তবে রাজিব জেসিকে ঠকাননি কারন উনি জেসিকে সত্যিই ভালোবাসতো ।।।।
জেসির বাবার মৃত্যুটা চারদিকে একটা দূর্ঘটনা বলেই চালিয়েছে।। মিস্টার পিটারের উকিল ঝামেলা করতে চাইলেও রাজিবের শয়তানি বুদ্ধির কাছে হার মেনে সে নিজেও জীবন হারিয়েছেন।।
রাজিব সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে নিয়েছে ঠিকই কিন্তু জেসিকে ফেলে দেননি। সবসময় জেসিকে নিজের কাছে রেখেছে।জেসির রুপে শুধু রাজিব একা নয় আরো অনেকেই বশ হয়েছিলো।আর তাই রাজিব ও তাকে সেভাবেই ব্যবহার করেছিলো। নিজের স্ত্রীকে অন্যের বিছানায় তুলে দিতেও দ্বিধাবোধ করেন নি। যখনই কোন ক্লাইন্ট কে খুশি করতে হতো তখনই রাজিব মির্জা জেসিকে ব্যবহার করতো। কাউকে বদ করতেও জেসিকে ব্যবহার করতো ।।। জেসিও যেন রাজিব মির্জার ইশারার পুতুল হয়ে গিয়েছিল।চব্বিশ ঘন্টা নেশায় বুদ হয়ে থাকা জেসির যেন রাজিবকে খুশি রাখতে পারলেই হতো কারন রাজিব খুশি হলেই সে নিজের সব চাহিদা পূরন করতে পারতো।।
সব ঠিকঠাকই চলছিলো কিন্তু একদিন হঠাৎ সব পরিবর্তন হতে লাগলো,,,যখন জানতে পারলো রাজিবের একজন বাঙ্গালী বৌ আছে।হ্যা সেই বাঙালি বৌ- ই ছিলো রাজিব মির্জার প্রথম স্ত্রী এবং রোহানের মা।রাজিব মির্জা যখন প্রথম কানাডায় যান তখন সেখানকার এক বার ডান্সারের সাথে পরিচয় হয়,,,সেই মেয়েটিও ছিলো ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর জন্য কানাডায় পারি জমানো এক অসহায় নারী। গিয়েছিল সেলসগার্ল হিসেবে চাকরি করতে, মাত্র ইন্টারের ধাপ পাড় করা রোহিনী বাবার প্রয়ানের পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। কিন্তু দেশে কামানো অল্প পয়সায় জীবন চালাতে হিমসিম খাচ্ছিলো,তাই প্রতিবেশী এক মামার পরামর্শে নিজের বাবার শেষ সম্বল বিক্রি করে বিদেশ পারি দেয় বাবার রেখে যাওয়া ঋণ আর ছোট্ট ছোট্ট তিন ভাই বোন ও মায়ের দায়িত্ব পালন করতেই। কিন্তু কে জানতো সেটাই হবে তার জীবনের কাল।।
যেই দালালের সাহায্য নিয়ে অল্প টাকায় অবৈধপথে কানাডা আসেন,সে দালালই তাকে নারী পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেয় এবং তারা এনে এই ক্লাবেই বিক্রি করে দেয়।এই ক্লাবে আনার আগেই তাকে কয়েকদফা ধর্ষনের মতো নরকীয় যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়েছে। তারপর থেকেই শুরু হয় ক্লাবের এই ডান্সারের মতো জঘন্য জীবন যদিও উনি এই ক্লাবে আসার পর আজ অবধি কোন পুরুষের বিছানায় স্ব-ইচ্ছায় যান নি।
রাজিব মির্জার কানাডার জীবনের প্রথম পর্যায়ে প্রচুর হতাশায় ভুগছিলেন,, নিজের হতাশাকে কাটাতেই বারে পা রাখে এবং সে দিন প্রথম দর্শনেই নজরবন্দি হয় গোলগাল গড়নের মায়াবী মুখের দুধ সাদা চামড়ার রোহিনী রাজিব মির্জা নামক ভয়ংকর পুরুষের। শুধু যে রাজিব মির্জা একাই রোহিনীকে নজর বন্দি করেছিলো তা নয় রোহিনী নিজেও রাজিব মির্জার মাঝেই যেন প্রথম প্রেমিক পুরুষকে খুঁজে পায়। সারাদিন পুরুষের শরীরের স্বাদ নেওয়া রোহিনী রাজিব মির্জার মাঝে নিজের জন্য অন্য কিছু খোঁজে যদিও রাজিব মির্জার নজর কখনোই কেবল নারীর মনে থাকে না সে নারীর মনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় শরীর এবং অর্থ। কিন্তু বোকা ও সহজ সরল রোহিনী রাজিব মির্জার মিষ্টি দু চারটি কথাকে ভালোবাসা ভেবেই ভুল করে যার পরিনতি হিসেবে দাড়ায় বিয়ে।
হ্যা কিছু দিনের পরিচয়েই রাজিব মির্জা রোহিনীকে বিয়ে করে কিন্তু কিছুতেই রোহিনীকে ঐ ক্লাব থেকে সরাতে পারে না আসলে রাজিব মির্জা কখনোই চেষ্টা করেনি কারন রোহিনী ঐখান থেকে সরে আসলে সে টাকা পেতো না। রোহিনী ও ধীরে ধীরে বুঝতে পারে রাজিব মির্জার মুল আগ্রহ। রাজিব মির্জা তাকে বিয়েই করেছিলো টাকার জন্য।কারন কানাডায় থাকতে টাকার দরকার যেটা রাজিব মির্জার শেষ হয়ে গিয়েছিল। রোহিনী যখন বুঝতে পারলো তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। সে রাজিব মির্জার প্রতি চাপ দিতে লাগলো তাকে এখান থেকে উদ্ধার করার জন্য,, রাজিব মির্জাকে অনুরোধ করলো, যাতে তাকে এখান থেকে বের করে বাংলাদেশ পাঠিয়ে দিতে কিন্তু রাজিব মির্জা তাতে কখনোই রাজি হয় নাই। রোহিনী এইবার শক্ত হলো এবং সে নিজেকে রাজিব মির্জার থেকে দুরে রাখার চেষ্টা করতো কিন্তু যতই হোক বাঙালী নারী।তাই যখনই দেখতো রাজিব মির্জা অন্য মেয়েদের সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তখনই সে নিজের থেকেই রাজিব মির্জার কাছে ধরা দিতো এভাবেই চলতে লাগলো,বের কিছু মাস,এক সময় রোহিনী অনুভব করলো সে মা হতে চলেছেন,,
পর্ব ২৫
রোহিনী নিজের অনুভূতি রাজিবের সাথে শেয়ার করে, রাজিব ক্ষুদ্ধ হয় এবং সে রোহিনীকে এভোরশন করতে বলে,, রোহিনী আহত হয়,ভেবেছিলো অন্তত বাচ্চার জন্য হলেও রাজিব তাকে নিজের কাছে নেবে কিন্তু না , বুঝতে পারলো রাজিব তাকে শুধুই টাকার জন্য ব্যবহার করছে,এই ক্লাব থেকে চলে গেলে রোহিনীকে অনেক টাকা দিয়ে তারপর বের হতে হবে সবচেয়ে বড় কথা কানাডার মতো এত বড় দেশে যাওয়ার কোন জায়গা নেই,না আছে কোন আপনজন। চেনাজানার মধ্যে ক্লাবে ওর সাথে থাকা আরো বেশ কয়েকটি মেয়ে ছাড়া শুধু মাত্র রাজিবই ছিলো যাকে একমাত্র আপন মনে হয়েছে কিন্তু সেই রাজিব ও তো নিজ স্বার্থেই ব্যবহার করছে। রোহিনী চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ে নিজের অনাগত সন্তানের জন্য,ক্লাবে যারা কিনে এনেছেন তারা নিজেদের টাকা শোধ না হওয়া অবধি ছাড়বে না ,, সবচেয়ে বড় কথা রোহিনের প্রচুর ভিআইপি ক্লাইন্ট সেই লোভেই ক্লাব মেম্বাররা ওকে কখনোই ছাড়বে না,, রোহিনীর সাথে রাজীবের বিয়েটা হয়েছিল রাজীবের নিজস্ব একটা ফ্লাটে যদিও রাজিব তখন সেটা নিজের ফ্ল্যাট বলেছিল আসলে সেটা রাজিবের ফ্লাট ছিল না। রাজিব ঐ ফ্ল্যাটটায় আরো দুজন মানুষের সাথে শেয়ারে থাকতো তাদের অনুপস্থিতিতেই রোহিণীকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। ক্লাবে গিয়ে যখন কোন মেয়ে দ্বারা কোন ক্লাইন্ট খুশি হয় তখন সে চাইলে সেই মেয়েকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিজের বাসায় নিয়ে যেতে পারে তার জন্য অবশ্যই মোটা অংকের একটা অ্যামাউন্ট দিতে হয় কিন্তু যেহেতু রোহিনীর রাজিবের প্রতি একটা দুর্বলতা কাজ করতো সেই ক্ষেত্রে রোহিণী রাজীবের বিষয়টা নিজের থেকেই হ্যান্ডেল করেছে,, ক্লাবের মালিকরা বুঝতে পারেনি ,, রাজিবের সাথে রোহিনীর বিয়ের বিষয়টা একমাত্র রাজিবের একজন রুমমেট এবং রোহিনীদের সাথে থাকা আরো একজন মেয়ে জানতো এ বিষয়টা,,, রোহিনী নিজের অন্তঃসত্ত্বার কথা ওই মেয়েটাকে জানালে মেয়েটা তার খুবই কাছের একজন ক্লায়েন্টের মাধ্যমে রোহিণীকে ক্লাব থেকে বের হতে সাহায্য করে,, ওই লোকটিও রোহিণীকে পালাতে সাহায্য করে এবং রোহিণী পালিয়ে আর রাজিবের কাছে যায়নি কারণ রোহিনী বুঝতে পেরেছিল রাজীবের কাছে রোহিনী গেলে রাজিব তাকে আবার ও ঐ ক্লাবেই নিয়ে যাবে, এবং অবশ্যই বাচ্চাটা ফেলে দিবে কিন্তু রোহিনী কিছুতেই বাচ্চাটা এবরশন করাতে চাইনি সে বাচ্চাটাকে রাখতে চায় এবং নিজের করেই রাখতে চায়।। এভাবেই রোহিণী বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে থেকেই রোহানকে জন্ম দেয়,কখনো খেয়ে তো কখনো না খেয়ে,কখনো কখনো ভিক্ষা ও করেছে,,রোহিনী একদিকে ক্লাবের মালিকদের থেকে পালিয়েছে তো একদিকে রাজিবের থেকে আবার তো পুলিশের ভয় ছিলোই ! এভাবেই কেটে গেছে সাতটা বছর!!
এদিকে আন্ডারওয়াল্ডের সাথে রাজিবের সখ্যতাও এতটাই বেড়েছিল যে রাজিব রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মতো হয়ে গেছে। আদম ব্যবসা থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, সব জায়গায় ছিল রাজীবের অবাধ বিচারণ তার সাথে জড়িয়ে ছিলো প্রতারণামূলক বিভিন্ন কর্মকান্ডে। সেই সূত্রে দেখা হয় জেসির সাথে এবং তারপরে নানা ঘটনা ঘটিয়ে জেসিকে বিয়ে করে এর মধ্যে সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল রোহিনের কথা। প্রথম দিকে রোহিণীকে খোঁজার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ করে দেয়।
হঠাৎ করেই রোহিনীর বিষয়টা সামনে আসে রাজীবের সেই পুরনো রুমমেট যার সামনে রাজীবের সাথে রোহিনীর বিয়ে হয় তার সাথে একটা মিটিংয়ে রাজীবের দেখা হয় তখন কথা বলার এক পর্যায়ে রাজীব জেসিকে একা রেখে অন্য একজন ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলতে গেলে সেই রুমমেট নানান কথার ছলে রাজিবকে রোহিনীর সাথে বিয়ের বিষয়টি জানায়,, রাজিবের সাথে অন্যান্য মেয়েদের অবৈধ মেলামেশা জেসি মেনে নিতে পারলেও কেন যেন রোহিনীর সাথে রাজিবের বিয়েটা কিংবা রোহিনী রাজিবের প্রথম বউ এ বিষয়টা মেনে নিতে পারছিল না!!! বিষয়টা যেন ওর মাথার মধ্যে পোকের মত কিলবিল করতে থাকে,,, অস্থির হয়ে যায় জেসি,, পরিকল্পনা করে আরেকটা খুনের,,, সেই মুহূর্তে নিজের সমস্ত ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে খুঁজে বের করে রোহিনী কে,,, কিন্তু আশ্চর্য জনেক ভাবে সেখানে গিয়ে জেসি আতকে উঠে ,,কারণ জেসির আগে সেখানে উপস্থিত হয়ে যায় রাজীব।। রাজীবের চোখে মুখে যেন হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ।। সত্যি বলতে রাজীব রোহিণীকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করলেও সাথে রোহিণীকে ভালোও বেসেছিল। তাই রোহিণীকে নিজের কাছে আগলে না রাখলেও ক্ষতি করার কল্পনা কোনদিনও করেনি।। ছেড়ে দিয়েছিলো রোহিনীকে নিজের মতো করে বাঁচার জন্য। ওই মুহূর্তে বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য রাজিব মোটেই প্রস্তুত ছিল না কারণ তার মাথায় তখন শুধু কানাডায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নেশা ছিল,,তাই রোহিনীকে এবরশন করানোর জন্য জোর করেছিলো কিন্তু রোহিনী পালিয়ে যাওয়ার পর আর তার পিছু করেনি।নেয়নি তার খোঁজ।।
সেদিন মিটিংয়ে যখন রুমমেটের সাথে কথা বলছিল তখন রাজীব নোটিশ করেছিল পরবর্তীতে সে রুমমেটকে ধরেই সবকিছু জানতে পারে এবং জেসির বিগত দিনের চলন দেখেই বুঝে নেয় জেসির পরবর্তী পদক্ষেপ তাই আজ জেসির আগেই এখানে পৌঁছে যায়।।।
রোহিনী রাজিবকে দেখে কিছুটা ঘাবড়ে যায়,তার চেয়েও বেশি আশ্চর্য হয় জেসিকে দেখে। বুঝতে পারছিলো কেন ওরা এখানে। রাজিবের চাহনি ছিলো ভয়ংকর।। রোহিনী মিনতি করতে থাকে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য,, সে বিগত দিনে সন্তানের পরিচয়ের জন্য কোনদিন রাজিবের কাছে যায় নি আর ভবিষ্যতে যাবে ও না। কিন্তু রাজীবের মস্তিষ্কে চলতেছিল অন্য প্ল্যান। রোহিণীকে নিয়ে লেগে যায় রাজীব আর জেসির মধ্যে তর্কাতর্কি। একপর্যায়ে জেসি আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে যায় এবং রাজিবের হাতে থাকা পিস্তলটা নিয়ে রোহিণীকে গুলি করে।। মুহূর্তেই পরিবেশ আরো থমথমে হয়ে যায়। জেসি নিজের কার্যসিদ্ধ করে খুশি হলেও সে খুশী বেশি সময় স্থায়ী হতে পারেনি রাজিবের হুংকারে কারণে।
রাজিব রোহিনীর মৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারে নাই, তাই ও জেসিকে নিয়ে একটা অন্ধকার ঘরে শিকল দিয়ে বন্দি করে রাখে এবং সাথে করে নিয়ে আসে রোহানকে।।।
৬ বছরের রোহান নিজের চোখের সামনে নিজের মায়ের রক্ত লাশ থেকে ট্রমায় চলে যায়,, নিষ্ঠুর রাজিব জন্মের আগেই যেই সন্তানকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল , তার জন্মের ছয় বছর তাকে দেখে যেন পিতৃত্বের অনুভূতি অনুভব করলো,, শুধু যে পিতৃত্বের টানেই তা নয়,,রোহান ছাড়া তার পরবর্তী প্রজন্ম হতো না কারন অতিরিক্ত মদ্যপানের কারনে অনেক আগেই জেসি মা হওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে।।। সেদিক দিয়েও জেসির প্রতি রাজিব বিরক্ত তাই রোহিনীকে মারার কারনে আর অক্ষমতা দুই মিলিয়েই জেসি এখন রাজিবের চক্ষুশুল।
রোহান কে নিয়ে আসার তিন মাসের মধ্যেই কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে রোহান স্বাভাবিক হয়। রাজিব একজন পারফেক্ট বাবা হবার জন্য সবরকমের ভাবেই রোহানের দেখভাল করেছে। রোহিনীর খুনের কারনে জেসিকে ঐ বদ্ধ ঘরেই আটকে রেখেছে, শুধু তিনবেলা খাবার দিয়ে আসার জন্য লোকদের হুকুম দিয়েছে।
জেসি যেহেতু মাদকাসক্ত তাই মাদক নিতে না পারায় অস্থির হয়ে যেতো, পাগলের মতো আচরণ করতো, নিজের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করতে লাগলো,,খাবার দিতে যাওয়া লোকদের উপর জিনিসপত্র ছুড়ে মারতো, রাজিবকে গালিগালাজ করতো,,, এদিকে রোহান সুস্থ হলেও নিজের মায়ের মৃত্যু চোখে দেখা এবং খুনিদের দেখা দুটোই প্রভাব পড়ে রোহানের উপর।
রোহান রাজিবকে নিজের বাবা হিসেবে মেনে নিতে না পারলেও রাজিবের অর্থ- প্রাচুর্যের মোহে আটকে যায়,, কিন্তু জেসিকে সে কিছুতেই ছাড়বে না বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়।
কেটে যায় পুরো এক বছর! ঘটনার আবহে একদিন রোহান জানতে পারে বদ্ধ ঘরে আটকে থাকা জেসির কথা,,খুনি বাবার সাথে থেকে থেকে খুন করার কৌশল সে অনেক আগেই ভালোভাবে আয়ত্ত করেছে।। একদিন রাজিবের অনুপস্থিতিতে সেই ঘরের দিকে পা বাড়ায়,,আগেই চুরি করে একটা অস্ত্র নিয়ে রেখেছিলো নিজের কাছে,, দরজা খুলে দিতেই ভেতর থেকে জিনিস ছোড়া শুরু করে উন্মাদ জেসি,, প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও মুহূর্তেই নিজেকে ঠিক করে এলোপাথাড়ি গুলি করতে থাকে,,চুপ হয়ে যায় জেসির হইচই ,এত সময়ে বাড়ির সমস্ত কাজের লোক,গার্ডরা এসে দরজার সামনে উপস্থিত হয়,, ভীতসন্ত্রস্ত চাহনি নিয়ে তাকিয়ে থাকে সাত বছরের রোহানের দিকে! কোথা ও নেই ভয়ের ছাপ,নেই দ্বিধা!! চোখ দুটো যেন পাকা খুনির বহিঃপ্রকাশ!
খবর পেয়ে ছুটে আসে রাজিব মির্জা। ঘরের ঢুকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সাত বছরের রোহানের দিকে,ফ্লোরে স্তব্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে জেসির লাশ,, রক্তে ফ্লোর লাল হয়ে আছে,, ইশারায় হুকুম করে লাশের ব্যবস্থা করতে! জেসির কপালে কাফন ও জোটেনি,, নিজের বাবাকে খুন করেছে এই সন্দেহের জেরে আর উশৃঙ্খলতার কারনে অনেক আগেই আত্নীয়-স্বজনদের থেকে দুর হয়ে গেছে। তাই কেউ কোনদিন জানতেও পারেনি জেসির এই পরিনতি।। ছেলের চোখ দেখে ভয় পেয়েছিলো রাজিব মির্জা। এই চোখ তার জগতে খুবই জরুরী ,, কারন অপরাধীদের মুল অস্ত্রই ভয়! ভয় দেখিয়েই তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে।। কিন্তু উপরওয়ালার ইচ্ছে অন্য কিছুই ছিলো।।তাইতো একদিন শত্রু দলের হামলায় রাজিব মির্জা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে,ছেড়ে যায় লোভ আর প্রতারনায় গড়া বিশাল সাম্রাজ্য ।রেখে যায় নিজের পাপের পাহাড় আর একমাত্র সন্তান রোহানকে! ১০ বছরের রোহানের প্রতি মায়া হওয়ায় রাজিবের প্রতিপক্ষ দলের লোকেরা রোহানকে না মেরে একটা চাইল্ড কেয়ার এ রেখে দেয়। রাজিবের সমস্ত সম্পত্তি দখল করে নেয়।রোহান হয়ে যায় এতিম অসহায় কিন্তু খুনি বাবার রক্ত তার শিরা উপশিরায় ভয়ে বেড়াতো তাহলে সে ভালো হবে কি করে,,তাই তো নিজেকে শান দিতে থাকে।
১৮ বছর হওয়ার পর চাইল্ড কেয়ার থেকে বের হয়ে রোহান তার বাবার সমস্ত ক্রাইম পার্টনারদের সাথে যোগাযোগ করে,,বন্ধুর ছেলে বলে তারাও রোহানকে নিজেদের কাছে আগলে নেয়,, এগিয়ে যায় বাবার পথে,সেই প্রতারনা,খুন, আদম ব্যবসা, মাদকের ব্যবসা চার সাথে যোগ করে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা। মোট কথা সবরকমের অন্যায় কাজেই রোহান এগিয়ে থাকতো কিন্তু তাতে ও শুধু সামান্য একজন লোকের মতোই পারিশ্রমিক পেতো যেটাতে রোহানের মন ভরতো না,,, উদগ্রীব হয়ে উঠে রোহান সহজে বড় হওয়ার উপায় খুঁজতে লাগলো,, তখনই একদিন কানাডায় দেখা হয় পরশ আবরার চৌধুরীর সাথে,,একটা বিজনেস মিটিং এ পারির হাত ধরে কারো সাথে কথা বলছিলো পরশ আবরার চৌধুরী আর তার পাশেই দাঁড়িয়েছিলো মিসেস প্রিয়ন্তি খন্দকার। রোহান দুর থেকেই পারির প্রতি নজর ফেলে। কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কথা শুনতে লাগলো,এক পর্যায়ে বুঝতে পারলো পরশ আবরার চৌধুরী বাংলাদেশের একজন নামকরা ব্যবসায়ী।। আর পারি তার একমাত্র মেয়ে,, মুহূর্তেই শয়তানি বুদ্ধি খাটিয়ে করে ফেললো একটা নাটকের পরিকল্পনা! ছলেবলে কলা কৌশলে আকর্ষণ কাড়লো পরশ আবরার চৌধুরীর।। বোঝালো সে কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা এবং সেখানকার সবচেয়ে ধনী পরিবারের সন্তান। পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করলো নিজের সৎ নানা মিস্টার পিটারের নাম! পরশ আবরার চৌধুরী রোহানের বাহ্যিক চাকচিক্য দেখেই মজে গিয়েছিলেন, ভেতরের খবর জানতে কিংবা যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজনই অনুভব করেননি,হয়তো উনি নিজে সঠিক ছিলো বলে অন্য কেও তাই মনে করতো।আর এটাই ছিলো উনার ভুল,, রোহান বিয়ের সময় যাদেরকে নিজের বাবা মা হিসেবে পরিচয় করিয়ে ছিলো তারা সবাই ছিলো ভাড়া করা,প্রত্যেকেই বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকার মাধ্যমে ভাড়া করে আনা। এমনকি বিয়ের সময় দেখানো রোহানের সমস্ত কিছুই ছিলো নকল,তার তৈরি করা নাটকের অংশ!
পারি:- রোহান প্লিজ এমন করো না!
রোহান:- তোকে বলেছি না আমার কাজে বাধা দেওয়ার দুঃসাহস দেখাবি না! তাহলে?
কথা শেষ করার আগেই এলোপাথাড়ি থাপ্পর দিতে লাগলো পারিকে রোহান! আজকেও একজন নতুন মেয়ে নিয়ে হাজির হয় রোহান তার জন্য বাদা দিতেই পারিকে এভাবে আঘাত করতে থাকে।
এটা নতুন নয়, বিয়ের মাস পেরোনের আগেই যখন পারি টের পেল রোহানের আসল রুপের তখন থেকেই রোহান পারিকে কথায় কথায় গায়ে হাত তুলে, নেশায় টাল হয়ে যখন তখন বাধ্য করে শারীরিক মিলনের জন্য, নিত্যনতুন মেয়েদের নিয়ে আসে বেডরুমে, তাদের সেবাও পারিকে করতে হয়, তাদের সামনেই নেশা করে,বাজে ভাবে ইঙ্গিত করে কথা বলে।পারিও নিশ্চুপ হয়ে মেনে নেয় ,কারন সেতো স্বেচ্ছায় এই মরন বিষ পান করেছে তাহলে এখন কাকে অভিযোগ করবে উল্টো বাবা মাকে জানালে তারাও কষ্ট পাবে তাই কাউকে জানায় ও নি। কিন্তু যখন অত্যাচারের সীমা সহ্য ক্ষমতা অতিক্রম করে তখন এভাবেই আকুতি মিনতি করে।
বিয়ের তিনমাস অতিক্রম করেছে, রোহান ভেবেছিলো পারিকে বিয়ে করলে উপহার হিসেবে মোটা অংকের এমাউন্ট পাবে,পরশ আবরার চৌধুরীর ব্যবসায় নিজের বা ঢুকাতে চেয়েছিলো, ভেবেছিলো একমাত্র মেয়ের জামাই হিসেবে পরশ আবরার চৌধুরী তাঁদেরকে বেশিদিন বিদেশে থাকতে দিবে না কিন্তু পরশ আবরার চৌধুরী এমন কিছুই করেনি,,তিনি তো তার সমস্ত সম্পত্তি তার একমাত্র মেয়ে এবং জামাইয়ের নামেই দিবে ভেবেই কিছু দেননি , তাছাড়াও রোহানের এত প্রতিপত্ত ,রোহান কি তাদের কাছে থাকতে রাজী হবে! এই ভেবেই নিশ্চিত ছিলেন কিন্তু উনি তো জানতেন না রোহানের পরিকল্পনা!
এই তিনমাসের প্রথম মাস কোনরকম কাটলেও পরের সময়টা পারির জন্য বিভীষিকাময় হয়ে উঠে। রোহান নানান কৌশলে পারিকে তার বাবার থেকে টাকা আনতে বলে, পারি লজ্জায় বাবার কাছে ফোন দেয় না, ধীরে ধীরে বুঝতে পারে রোহানের আসলে কিছুই নেই,রোহান একজন প্রতারক, এবং রোহান নিজেই নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পারিকে বলে যেটা পারিকে আরো বেশি ভীত করে কারন একটা মানুষের ঠিক কতটা সাহস থাকলে অন্যায় করে আবার সে অন্যায়ের কথা জাহির ও করে তা ভাবলেই পারির শরীর ঝিম মেরে যেত। রোহান পারি কে নানানভাবে অত্যাচার করতে লাগলো টাকার জন্য,,এক পর্যায়ে পারি বাধ্য হয়ে নিজের বাবাকে সব বলে,, পরশ আবরার চৌধুরী ভেঙে পড়েন মেয়ের কথায়।। তিনি সরাসরি ফোন করে রোহানকে।। রোহান তখন আবার এক অন্য নাটক সাজায়, জানায় সে ব্যবসায়িক ঝামেলায় আছে, অনেক টাকা লোকসান হয়েছে সেগুলো শোধ করতে না পারলে তার জীবনের উপর হামলা করতে পারে,, তাছাড়া যারা পাওনাদার তারা খুবই ভয়ংকর, মাফিয়ার দলের লোক,তাই মাথা ঠিক নাই,রাগের মাথায় পারির সাথে খারাপ ব্যবহার করে। আর মেয়েদের বিষয়টা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলে কষ্ট ভুলতে নেশা করেছিলাম তার বশেই মেয়েদের সাথে মেলামেশা তবে আর এমন করবে না নিজেকে শুধরে নিবে। রোহানের নাটকে গলে যায় পরশ আবরার চৌধুরী।উনি আশ্বাস দেন টাকা দিয়ে সাহায্য করবে কিন্তু শর্ত একটাই পারিকে কষ্ট দিতে পারবে না। রোহান সম্মতি দেয়।পরশ আবরার চৌধুরী রোহানকে দেশে আসার জন্য অনুরোধ করে, রোহান বলে সে যদি কানাডার বাইরে যায় তাহলে পাওনাদাররা তার ক্ষতি করবে,তাই কষ্ট করে উনিই যেন কানাডায় আসেন,এতে করে পারির সাথেও দেখা হয়ে যাবে। রোহানের নাটকের কাছে আবারও বোকা বনে যান পরশ আবরার চৌধুরী।
কানাডা যাওয়ার পর পরশ আবরার চৌধুরী রোহানের পাতা ফাঁদে এমন ভাবে আটকে যায় যে বাধ্য হয় নিজের সমস্ত সম্পত্তি রোহানের নামে দিতে কিন্তু উনি পারিকে নিজের সাথে আনতে পারে নি,রোহান পারিকে দেয়নি। পারিও বুঝেছিলো হয়তো সম্পত্তি পাওয়ার পর রোহান শুধরে যাবে,, তাই সেও রোহানকে ছেড়ে বাবার সাথে যেতে রাজী হয়নাই,, রোহান সম্পত্তি পাওয়ার পর বেশ কিছুদিন ভালো থাকার ভং ধরে তারপর আবার সেই পুর্ব-রুপে ফিরে আসে,,পরশ আবরার চৌধুরী শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন,একে তো মেয়ের দুর্দশা তার উপর নিজের কষ্টে গড়া বিশাল সাম্রাজ্য এভাবে একজন নর পশুর হাতে তুলে দিলো সব কিছু মিলিয়ে উনি একদম ভেঙে পড়েন, মিসেস প্রিয়ন্তি ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন মেয়ের চিন্তায়। এদিকে রোহান চৌধুরীর সমস্ত সম্পত্তি হাতে পেয়ে যেন চাদ পাওয়ার মতো খুশি হয়ে যায়। কিছু দিন পারির প্রতি কোনরকম নির্যাতন না করলে ও আবার শুরু হয়ে যায় ওর অত্যাচার। প্রতিদিন মেয়ে নিয়ে বেডরুমে ঢোকানো, অনিচ্ছায় পারিকে বাধ্য করা শারীরিক মিলনে,এর সাথে তো আছেই রোহানের সেই অবৈধ কার্যক্রম। কিন্তু এর মধ্যেই ঘটে আরেক দুর্ঘটনা! হঠাৎ পারি অনুভব করে ও ভেতরে আরো একটা প্রান,, ঘটনার যেন পূনরাবৃত্তি ঘটে,, রোহান পারিকে বাধ্য করে এবরশন করাতে। এভাবেই কেটে যায় একটা বছর। রোহান পারি কে গায়ে আঘাত না করলেও মানসিক ভাবে পুরো দুমড়ে মুচড়ে রেখেছে। পরশ আবরার চৌধুরী মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যায়,, মৃত বাবার লাশ দেখতেও আসতে দেয়নি রোহান পারি কে। মিসেস প্রিয়ন্তি ও মেয়ে আর স্বামীর শোকে শয্যাশায়ী হয়ে যান। এদিকে চৌধুরী গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানি লস খেতে থাকে রোহানের খামখেয়ালিপনার কারনে,,এক একটা করে বিভিন্ন কোম্পানি বিক্রি করতে শুরু করে রোহান। পারি চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। আসলে বাঁচার অনিচ্ছাই পারিকে ভেতর থেকে মেরে ফেলেছে। তাই চেয়ে ও কোন প্রতিবাদ করতে পারে না। কিন্তু একবছর পর যেন পারির জীবনে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা পারির জন্য অপেক্ষা করছিলো,,
পারিদের যেই বাসায় পারিরা থাকতো সেই বাড়িটা ছিলো মিসেস প্রিয়ন্তির নামে ,পরশ আবরার চৌধুরী সম্পত্তি রোহানের নামে লেখার সময় ঐ বাড়িটা লিখেননি,অতি চালাক রোহান সম্পত্তি পাওয়ার খুশিতে সেই বিষয়টা খেয়াল করে নাই।
পরশ আবরার চৌধুরী মারা যাওয়ার পর তার ব্যাংক লোনের জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাড়িটা নিলামে তুলে,,সেখান থেকে কিছু টাকা বাড়তি থাকে যেটা মিসেস প্রিয়ন্তির একাউন্টে রেখে দেয়,,এত ধাক্কা মিসেস প্রিয়ন্তি নিতে পারেন নি ।উনি স্টোক করে কোমায় চলে যান। এই খবর পারির অবধি পৌঁছাতেই পারে না হাসান সাহেব।পারিদের এই দুঃসময়ে কোন আপনজন কেই কাছে পায়নি পারিরা ।
রোহান পারির বিয়ের এক বছরের পার্টি উপলক্ষে রোহানের কিছু বন্ধুরা বাসায় আসে, তাদের মধ্যে থেকে অনেকেরই নজর পরে পারির উপর। রোহানের জোরের কারনে পারি ওয়েস্টার্ন পোশাক পড়েছে যেটা পারির জন্য খুবই অসস্থিকর বিষয়। বারবার ড্রেসের এদিক ওদিক টানছে,, এদিকে রোহানের বন্ধুরা পারিকে চোখ দিয়েই গিলে খাচ্ছে। দুর থেকে রোহান বন্ধুদের এই কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করলেও কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না,, পার্টির পরের দিন রোহানের এক বন্ধু প্রস্তাব করে এক রাতের জন্য পারিকে তার কাছে দিতে, প্রথমে রোহান রিএ্যাক্ট করলেও বন্ধুর পরবর্তী কথায় রাজী হয়ে যায়,রোহানের বন্ধু পারির সাথে এক রাতের বিনিময়ে একটা রেসিং কার অফার করে লোভী রোহান সেই অফার কি করে অস্বীকার করে! তাই সে বন্ধুর এমন কুৎসিত প্রস্তাবে রাজী হয়ে যায়। কিন্তু রোহান জানতো পারি জীবন থাকতে কখনো এই প্রস্তাবে রাজী হবে না তাই ও পারিকে খাবারের পরে জুসের সঙ্গে এলকোহল মিশিয়ে দেয়, এবং পারি নেশাগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার পর রাতে সেই বন্ধুকে নিজেদের বেডরুমে ঢুকিয়ে দেয় এবং সেই রাতের পুরো ঘটনা ভিডিও করে রাখে। পারি যেহেতু নেশাগ্রস্ত ছিলো তাই নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়ের কোন প্রতিবাদ ঐ সময়ে করতে পারে নি। পরে সেই ভিডিও দেখিয়ে রোহান পারিকে ব্ল্যাকমেইল করে এবং পুনরায় ঘটনার রিপিট করার জন্য চেষ্টা করে ।।
এমনই এক রাতের ঘটনা। রোহানের এক ক্লাইন্ট রোহানকে পারির সম্পর্কে জানতে চাইলে,রোহান পারির পরিচয় দেয় এবং কথার তালেই বুঝতে পারলো সেই লোকের মতলব,,রোহান ও প্রস্তাবে রাজী হয়ে যায় কিন্তু শর্ত থাকে পারিকে তার রেস্ট হাউজে নিয়ে যাওয়ার । সেই কথা অনুযায়ী তার পরের দিন পার্টির কথা বলে পারিকে সেই লোকের রেস্ট হাউজে নিয়ে যায়,,পারিকে একা রেখেই চলে আসে,পারি পেছন থেকে অনেকবার ডাকলেও শোনেনা ,,,পারি ঐ লোককে দেখে তার কাছেও অনেক অনুরোধ করে কিন্তু সেও পারিকে ছাড়ে না ,পারির দিকে আঘাতে নিলেই পারি ঘরের এপাশ ওপাশ ছুটোছুটি করতে শুরু করে,লোকটি বিরক্ত হয় ,রেগে যায়,,পারিকে এক পর্যায়ে ধরে ফেলে,চুলের মুঠি ধরে খুব শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে, পারি নিজেকে রক্ষা করতে হাত পা ছোড়াছুড়ি শুরু করলে,,ঐ লোক বিরক্ত হয়ে খুব
জোরে একটা থাপ্পড় দেয় পারির গালে,,পারি তাল সামলাতে না পেরে ফ্লোরে পড়ে যায়,পড়ে যাওয়ার সময় হাতের স্পর্শে সেন্টার টেবিলে থাকা ফলের জুড়িটা নিচে পড়ে যায় তাতে হাত লেগে হাতটাও কেটে যায়,,এতে পারি আরো দুর্বল হয়ে যায়,আর সেই দুর্বল পারির উপরই সারারাত নির্যাতন চালায় অমানুষটা। সারারাতের অমানুষিক যন্ত্রনার পর নিথর দেহটা পড়ে থাকে বিছানার এক পাশে,,পারি আজ নির্বাক,নিশ্চুপ,, বেঁচে থেকেও মরে গেছে,, । সকাল বেলা নিভু নিভু চোখ মেলে নিজের অবস্থান বুঝে ডুকরে কেঁদে উঠে,,,বিছানা ছেড়ে উঠতে চেষ্টা করে কিন্তু মনের সমস্ত যন্ত্রনা যেন শরীরের ওজন বাড়িয়ে দিয়েছে। উঠতে চেয়েও পারলো না , এভাবেই আরো কিছু সময় কেটে গেল,,, তারপর অনেক কষ্টে উঠে গায়ে নিজের কাপড় জড়িয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে, জানোয়ারটা নেই ,এখনই বের হয়ে যাওয়ার সময় কিন্তু দরজাটা ভেতর থেকে লাগানো, এবং এটা এমন একটা রুম যার আরো কোন দরজা জানালা কিছুই নেই।।হতাশ হয়ে ফ্লোরেই বসে পড়লো, কাঁদতে কাঁদতে বারবার চিৎকার করে দরজা খোলার অনুরোধ করলো, কিন্তু কেউ কোন সারা দিলো না।ক্লান্ত হয়ে একসময় সেখানেই নিস্তেজ হয়ে বসে পড়লো,, এভাবেই বসে বসে কেটে গেল সারাদিন,,, সন্ধ্যার সময় দরজা খোলার শব্দে সচকিত হয়ে উঠে দাঁড়ালো,,কেউ যে আসছে সেটা ঠিক বুঝতে পারছে, হঠাৎ করেই যেন পারির মাথায় বুদ্ধির উদায় হলো,,চটপট করে নিজেকে লুকিয়ে ফেললো,,দেওয়ালে সৌন্দর্য বর্ধন করা পর্দার আড়ালে,, কাপড়ের ডিজাইনের ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো,,একে একে ঢুকলো তিন জোড়া পা ,, তার মানে ঘরে তিনজন পুরুষ মানুষ ঢুকেছে,, তারা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে যেসব আলোচনা করছিল তা শুনে যেন বাড়ির মাথা ঘুরে গেল,,,
পারি:-ছিহ একটা মানুষ এতটা খারাপ কি করে হয়,, অবশ্য না হওয়ার ইং কি আছে যে নিজের বৌকে অন্যের হাতে তুলে দিতে একবারও ভাবেনি তার জন্য এটা এমন কিছুই না।
নিজের মনেই কথা গুলো আওড়ালো পারি, আর ভাবতে লাগলো,,
পারি:-কিন্তু এখন আমি কি করবো, কিভাবে বের হবো এখান থেকে?
এর মধ্যেই ভেসে এলো একজন পুরুষের কথা,, বেশ রাগান্বিত আর অস্থি্র শোনালো সেই কন্ঠস্বর,,
Rohan's client's friend:-Where is the girl?
Rohan's client:- I don't know?
Rohan's client's friend:- What do you mean by don't know?
Rohan's client:- Come on! Please calm down!
Rohan's client's friend:- what calm! I just want the girl right now! Don't forget I paid you much in advance! So don't dare to be over smart with me!
পারি ওদের কথোপকথন শুনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ভেতরে ওর অন্তর আত্না কেঁপে উঠছে,এরা যে ওকে আজ পেলে আর ছাড়বে না ,, কিন্তু কি করে এই নরপশুদের হাত থেকে রক্ষা করবে নিজের জীবন,,ইজ্জত তো অনেক আগেই খুইয়েছে কিন্তু যদি মরে যায় তাহলে ওর মা বাবাও মরে যাবে, কথাগুলো ভাবছে আর অনবরত চোখের জল বিসর্জন দিচ্ছে,,
পুরুষ তিনজনের মধ্যে রোহানের ক্লাইন্ট আর তার বন্ধুই কথা বলছে অন্যজন চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে,, রোহানের ক্লাইন্ট আবার ও বলতে শুরু করলো,,
Rohan's client:- Trust me dude,, she was with me last night, and morning I left her in this room that moment he was senseless,, but I couldn't take risked that's why I also locked the door... but i don't know how she escaped,,,, how how!!
শেষের কথাটা পুরো রুমে চোখ বুলাতে বুলাতে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,এর মধ্যেই তৃতীয় জনের কথায় পারির আত্না কেঁপে উঠলো,,
3rd person:- Isshh; I got her!
কথা শেষ করেই লোকটি পারির উপর ঝাঁপিয়ে পরে পর্দা সহই পারিকে জড়িয়ে ধরে,,পারি এবার যেন মরে যাওয়াই উত্তম মনে করলো,,বাকী দুজন ও পারির সামনে দাঁড়িয়ে বিচ্ছিরি কিছু শব্দ উচ্চারণ করলো,রোহানের ক্লাইন্টের বন্ধু পারির উপর থেকে পর্দা সরিয়ে বিধ্বস্ত পারিকে টেনে বের করে আনলো,,পারি নির্বাক দৃষ্টিতে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, চোখের পানি যেন থামার নামই নিচ্ছে না,, মাঝে মাঝে পারি ভেবে পায় না ,এত পানি ওর চোখে কোথায় থেকে আসে,,সেই রাতে ওয়াদা করেছিলো কাঁদবে না কিন্তু সেই ওয়াদা ভঙ্গ হয়ে গেছে যেদিন রোহানের আসল চেহারা সামনে আসে,, সম্রাটের বিশ্বাসঘাতকতা যতটা আঘাত দিয়েছিলো তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি কষ্ট পেয়েছিলো যখন নিজের পাপাকে তার কষ্টে অর্জিত সমস্ত সম্পত্তি রোহানের মতো একটা জানোয়ারের হাতে তুলে দিয়েও তাকে নিয়ে যেতে না পেরে অসহায়দের মতো চেয়েছিলো,, অনুশোচনা আর অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিলো শক্ত ,দৃঢ় মনোবলের প্রতীক হিসেবে চেনা মানুষটার চোখে পানি দিয়ে সেদিন থেকেই চোখ যেন সাগরে পরিনত হয়েছে,চেয়েও তার ধারা বন্ধ করতে পারে না,,
Rohan's client's friend:- ok !
পর্ব ২৬
সম্রাট:- কি এমন হতো একবার সরাসরি আমাকে জিজ্ঞেস করলে,,,তাহলে আজ আমাদের মাঝে এত দুরত্ব থাকতো না! তোমার একটা ভুল ধারণা আমাদের জীবনের সব ওলটপালট করে রেখেছে তবে তুমি চিন্তা করো না এইবার আর কোন ভুলের শিকার আমি তোমাকে হতে দিবো না।
নিজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে,, আকাশের দিকে তাকিয়ে একা একাই কথাগুলো আওড়ালো সম্রাট।। হাসান কাকার থেকে বিগত দিনগুলোতে পারির জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো আবারও নিজের মনেই কল্পনা করতে লাগলো,ঠিক কতটা যন্ত্রনায় জর্জরিত হয়েছিলো তার পারি সেটাই উপলদ্ধি করতে চেষ্টা করছে,,,
হাসান কাকার শেষের কথাগুলো যেন বারবারই ওকে আঘাত করতেই ছিলো,, অবশ্যই কোথাও না কোথাও দোষ তো তারই ,,,মনে পড়ে গেল পারির সাথে প্রেমময় সম্পর্কের প্রথম দিকের একটা কথা,,
,,,,,,,অতিত,,,,
ভার্সিটির গেইটে আসার পথেই একটা মেয়ে হোচট খেয়ে পড়ে যায় সম্রাটের উপর, সম্রাট নিজেকে বাঁচাতে আর মেয়েটাকে সাহায্য করতেই মেয়েটাকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে,মেয়েটার মাথা গিয়ে ঠেকে সম্রাটের বুকের উপর,,সম্রাট ও মেয়েটা দুজনেই অসস্থিতে পরে যায় খুব দ্রুত একে অপরকে ছেড়ে উঠতে চেষ্টা করলেও মেয়েটার চুল সম্রাটের শার্টের বাটনে আটকে যায়,দুজনেই তাড়াহুড়ো করে চেষ্টা করে ছাড়াতে কিন্তু পারছিলো মেয়েটা তখনও চেষ্টা করছে আর সম্রাট অস্থির হয়ে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছিলো হঠাৎ করেই ওর চাহনি স্থির হয়ে যায় ,,অদুরে দাঁড়িয়ে থাকা পারির রক্তচক্ষু দেখে,,রাগে পারির চেরির মতো লাল ঠোঁট দুটো কাঁপছে ,, হাতগুলো যেন কচলে চামড়া তুলে ফেলার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েছে,, চোখগুলো লাল হয়ে সেই সাথে জলে টইটম্বুর হয়ে আছে,যেকোন সময় গড়িয়ে পড়লো বলে,, সম্রাট এক টানে মেয়েটার চুলের অংশ ছাড়িয়ে নিলো তার সাথে ছুটে গেল বোতাম টাও ,,মেয়েটাও আর্তনাদ করে উঠলো কিন্তু সেদিকে সম্রাটের হুশ নেই,,সে ছুটে চলে গেল দৌড়ে দরজা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে যাওয়া পারির দিকে,,,
সম্রাট:- Pari stop , Pari I say stop!
একটি মেয়েকে কি আর একটি ছেলের সাথে দৌড়ে পারে? পারিও পারলো না ,, সম্রাট পেছন থেকেই পারিকে দু হাতে আগলে ধরলো পারি নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করলো, কিন্তু এতে সম্রাটের বাঁধন আরও শক্ত হলো,,
সম্রাট:- দেখো তুমি যা ভাবছো তেমন কিছুই নয়,,
পারি:- ছাড় বলছি আমাকে,,আমাকে তুই আর ছুবি না ,,যা ঐ মেয়ের কাছে যা, যাকে এত সময় বুকের মাঝে আগলে রেখেছিলি,,,
সম্রাট:- কি সব বলছো,দেখো তুমি তা দেখেছো সেটা সত্যি হলেও বোঝাটা ভুল!
পারি:- কি! কি ভুল ? ঐ মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরাটা ভুল নাকি ঐ মেয়েকে জড়িয়ে তার চুলের ঘ্রান নেওয়াটা ভুল কোনটা?!
সম্রাট পারির কথায় কথায় কি করবে বুঝতে পারছে না, এদিকে পারি তিলকে তাল বানিয়ে কেঁদেকেটে নাকের পানি চোখের পানি এক করে ফেলেছে,, বারবার নাক টানছে আর আর হাত দিয়ে নাক মুছছে,,পারিকে এখন পাচ বছরের বাচ্চাদের মতো লাগছে,যেন খেলনা হারিয়ে ফেলে অথবা আবদার পূরণ করতে না পেরেই তার অভিযোগের ঝুলি খুলে বসেছে,,, পারিকে এই অবস্থায় দেখে সম্রাটের প্রচুর হাসি আসছে তবুও নিজের হাসিকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেললো কারন এমনিতেই একটু আগের ঘটনা নিয়ে আগুন হয়ে আছে আবার যদি তার বর্তমান অবস্থা নিয়ে হাসে তাহলে নির্ঘাত কল্লা যাবে,,পারি সম্রাটকে চুপ থাকতে দেখে আবারও বলতে লাগলো,,
পারি:-দেখলি তো এখন আর কোন কথাই নেই তোর মুখে তুই ,তুই তুই আসলেই একটা তুই,তুই খুব খারাপ,,
কথাটা বলেই পারি নিজের আবারও হাঁটা ধরলো,, পারি রেগে গেলে সবাইকেই তুই করে বলে সে বড় হোক কিংবা ছোট! সম্রাট ও তার অভ্যাসের সাথে অবগত,পারি পিছু ঘুরতেই সম্রাটের চেতন ফিরলো ,পারির হাতটা শক্ত করে ধরৈই বললো,,,
সম্রাট:-কেন থাকবে না অবশ্যই থাকবে,,, আগে নিজেকে ঠিক করো তারপর আসো আমার সাথে আমি সবটা বুঝিয়ে বলছি।
পারি:- নাহ আমি কোথাও যাবো না তোর সাথে,তোর যা বলার এখানেই বল;
কথাটায় বেশ তেজস্ক্রিয়তার আভাস পেল সম্রাট, বুঝতে পারলো এই পাগলকে আর ক্ষ্যাপানো ঠিক হবে না তাই এইবার বোঝানোর ভঙ্গিতে পারির সামনে দাঁড়িয়ে কিছু সময় আগের ঘটনার বিস্তারিত বললো,
সম্রাট:- দেখো আমি তোমাকে খুঁজতেই ঐখানে এসেছিলাম, হঠাৎ করেই মেয়েটা পড়ে গিয়েছিল পায়ে দড়িতে টান লেগে,,মেয়েটাকে না ধরলে মেয়েটাও পড়তো সাথে আমিও পড়তাম ,,নিচে কত ধুলো বালি তাছাড়াও ইটের খন্ড ছিলো,নিচে পড়লে নিশ্চিত আহত হতাম তাই তো নিজে বাঁচতে আর মেয়েটাকে আঘাত পাওয়ার থেকে রক্ষা করতেই,,,
পারি:- আমি জানি এগুলো!
সম্রাট:-মানে?
পারি:-মানে আমি জানি এইসব!
সম্রাট:- তাহলে তুমি এত সময় কাদছিলে কেন?
পারি:-ঐ মেয়ে কেন তোমার বুকে মাথা রাখবে,তুই কেন রাখতে দিবি!
সম্রাট:- হাহ
সম্রাট পারির কথায় হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলো,পারি সম্রাটের বুকের বাঁ পাশে আঙ্গুল ঠেকিয়ে বললো,,
পারি:- এইখানে শুধু আমি মাথা রাখবো ,এই ,এই জায়গাটা শুধু আমার ,, এইখানে অন্য কারো প্রবেশ আমি মেনে নিবো না ।
সম্রাট:-পারি!
পারি:-কি পারি হ্যা কি পারি?
পারি:-ইচ্ছে হোক অনিচ্ছায় হোক কেউ কেন এইখানে মাথা রাখবে কেন এই জায়গা ছুবে ,তুই কেন ছুঁতে দিবি!
সম্রাট:-পারি!
সম্রাট অসহায় চাহনিতে পারির দিকে তাকিয়ে রয়েছে,,পারির পাগলামোতে কাঁদবে না হাসবে?
পারি:- পারবো না ,আমি কিছুতেই পারবো না অন্য কারো সাথে শেয়ার করতে সে যেই হোক যেভাবেই হোক!
পারি:- কারো সাথে শেয়ার করতে হবে না পাগলি,আমি শুধু তোর,তোরই থাকবো ,মরার আগে অবধিও সম্রাট তোর, সম্রাটের বুকটা ও তোর; এখানে যতই অন্য কেউ মাথা রাখুক না কেন অন্তঃস্থল শুধু তোর থাকবে!!!
সম্রাট পারির চোখ গাল মুছিয়ে দিয়ে নিজের সাথে জড়াতে জড়াতেই কথাগুলো বললো,পারি সম্রাটের বুকে মাথা রেখেই আহ্লাদী কন্ঠে বললো,,
পারি:-আজকের পর যদি ভুলেও এখানে অন্য কেউ মাথা রাখে তাহলে বলছি সেদিনই তুমি তোমার পারিকে শেষবারের মতো দেখবে !
কথাটা শেষ করার আগেই সম্রাট পারি কে নিজের থেকে আলাদা করার চেষ্টা করলো আর বললো;
সম্রাট:- এই শব্দটা আর কোন দিন উচ্চারণ করবে না,,তুমি ছাড়া আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো বেঁচে তো থাকবো তবে লাশ হয়ে যাবো।
পারি নিজের বাঁধন আরো শক্ত করলো,সম্রাট ছাড়াতে ব্যর্থ হয়ে নিজের সাথেই শক্ত করে মিশিয়ে নিলো! আর মনে মনে ভাবতে লাগলো,,
সম্রাট:-এই পাগলী টাকে ছাড়া আমার একদিন ও চলবে না কিন্তু কি করে আমাদের এই অসম প্রেমের পরিনয় ঘটবে আদৌ পারির বাবা কোনদিন মেনে নিবে!
পারি সম্রাটের বুকে মুখ গুজেই বললো,,শুনো!
সম্রাট:- হুম!
পারি:-তুমি কখনো কাউকে এইভাবে জড়িয়ে ধরবে না!
সম্রাট: আচ্ছা পাগলি!
ওদের কথোপকথনের মাঝেই কারো গলার শব্দে দুজনই দুজনকে ছেড়ে দিলো,,
জাবেদ:- বাহ কি প্রেম, আজকাল পাবলিক প্লেসে ও জড়াজড়ি করছে,ছ্যা ছ্যা,ছ্যা,, ছ্যা সমাজটা একেবারে উচ্ছ্বনে গেলোরে,,,
জাবেদের কথায় প্রথমে সম্রাট আর পারি কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকলেও পরবর্তীতে ওর মুখভঙ্গি দেখে দু'জনেই উচ্চ স্বরে হেঁসে উঠলো,, সাথে জাবেদ ও,, তারপর দুজনে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখে নিলো কেউ এত সময় ওদের দেখছিলো কিনা,, ভাগ্যিস দুপুরের সময়ে এদিকটায় লোকজনের আনাগোনা কম, না হলে পাবলিক প্লেসে এত সময় এভাবে দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়ে এভাবে কথা বলছে দেখলে চারদিকে নানান গুঞ্জন শোনা যেতো।।। কাউকে দেখতে না পেয়ে দুজন ই শান্তির নিশ্বাস ছাড়লো।
জাবেদ:- তা দুজনের মধ্যে কি নিয়ে এত মান অভিমান চলছিলো?
আরেহ বলিস না আর,, এই যে ছিঁচকাদুনে বুড়ি আছে না,,, এর পরে সম্রাট এত সময়ে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা জাবেদকে খুলে বললো,এতে করে সম্রাট ও জাবেদ দু'জনে হাসতে শুরু করলো আর পারি ওদের হাসি দেখে গাল ফুলিয়ে রইলো,সম্রাট পারির ফুলো গালে আঙ্গুল দিয়ে খোঁচা মারতেই পারিও খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করলো
অতীতের কথায় মশগুল হয়ে বর্তমানে ও হেসে উঠলো সম্রাট!! অনেকটা সময় নিয়ে প্রশান্তির হাসি দিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে নিলো,,
সম্রাট:- তোমার ঐ হাসি হারিয়ে গিয়েছিল আমার জন্য আবার আমিই ফিরিয়ে আনবো,,,
চাচার সাথে কথা বলার সময় না বুঝলেও সম্রাট পরে বুঝতে পেরেছিল,,পারির বিয়ের দিন থেকে ঘটনার চারদিন পিছনে ফিরে নিজের কর্মকাণ্ড নিয়ে ভাবতেই মনে পড়ে ,, সেদিনের দুই/ তিন দিন আগেই পারির বাবার সাথে কথা হয় ,, ভদ্রলোক নানানভাবে বোঝাতে চেষ্টা করে পারিকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে সম্রাটের অক্ষমতা সম্পর্কে,, সম্রাট প্রথমে সব মেনে নিলেও শেষে আর পারেনি যখন পারির বাবা বলেন,,,,
,,,,,অতীত,,,
পরশ আবরার চৌধুরী:- দেখো তুমি গরীব সেটাতে আমার সমস্যা থাকলেও কিছু করার নেই,,যেহেতু আমার মেয়ের পছন্দ তুমি!
সম্রাট মাথা নুইয়ে রেখেই কথা শুনছিলো,,, পরশ আবরার চৌধুরী আবারও বলতে লাগলেন,,
পরশ আবরার চৌধুরী:- কিন্তু,,, যাই হোক আমার তোমাকে মেনে নিতে বাঁধা থাকলেও মেয়ের খুশির কাছে কোন কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়,,আর তাই আমি ও চাই আমার পারি মায়ের বিয়েটা তোমার সাথেই হোক! তবে শর্ত একটাই!
শর্তের কথা শুনে এইবার প্রথম সম্রাট সরাসরি পরশ আবরার চৌধুরীর চোখে চোখ রাখলো,,
সম্রাট:-শর্ত!
সম্রাটের কপালে ভাঁজ পড়ে,,,পরশ আবরার চৌধুরী বললেন,,
পরশ আবরার চৌধুরী:-Yes i have a condition!
সম্রাট:-কি শর্ত?
অনেকটা সময় পরশ আবরার চৌধুরী নিরব থেকে বললেন,,
পরশ আবরার চৌধুরী:-বিয়ের পর তুমি তোমার পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে না !
সম্রাট:- মানে?
পরশ আবরার চৌধুরী:-দেখো তোমাকে বিষয়টা পরিষ্কার করে বলি!
আমি তোমার সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি তুমি ছেলে হিসেবে ভালো , অবশ্যই একজন কন্যার পিতা হিসেবে আমি তোমার মতো ব্রিলিয়ান্ট, কঠোর পরিশ্রমী কোন ছেলেকেই পছন্দ করবো নিজের মেয়ের জন্য! তোমার শিক্ষাগত যোগ্যতাও আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে , তোমার প্রেজেন্টেশন ও অসাধারণ,, আমি এতটুকু বলতে পারি তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল,,, আর আমি অবশ্যই এমন একজনকেই আমার মেয়ের জামাই হিসেবে পছন্দ করবো যার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।।। আর আমার পছন্দের সব গুনই তোমার মাঝে আছে শুধু মাত্র,,,
সম্রাটের দৃষ্টি প্রশ্নাত্নক ,,পরশ আবরার চৌধুরী বললেন,,
পরশ আবরার চৌধুরী:- তবে কি বলো তো আমাদের তো একটা সামাজিক মর্যাদা আছে,,আমি না হয় তোমার ভবিষ্যৎ দেখে, মেয়ের খুশির জন্য তোমাকে মেয়ের জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নিবো কিন্তু আমাকে তো আমার সোসাইটিতে নিজের একমাত্র মেয়ের জামাইকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে তাই না! তখন তারা যদি জানে আমার একমাত্র মেয়ে জামাই সামান্য একজন রিকশাচালকের ছেলে, সামান্য একজন মটর মেকানিক তাহলে সেটা কি আদৌ আমার অথবা আমার পরিবারের জন্য ভালো হবে?
তাই আমি বলেছিলাম তুমি তোমার পরিবারের বিষয়টা লুকিয়ে রাখবে,বাকি তোমাদের বিয়ের সময় কিভাবে তোমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হয় সেটা আমি ই ভেবে দিবো তুমি শুধু সাথে তাল মিলিও তাহলেই হবে!
সম্রাট:- মানে আপনি বলছেন আমি আমার পরিচয় লুকিয়ে, মিথ্যা কথা বলে আপনার সোসাইটিতে এডজাস্ট করার চেষ্টা করবো?
পরশ আবরার চৌধুরী:- হ্যা সেটাই,, দেখো আমার একমাত্র মেয়ে আমার পারিজাত,তার সাথে বিয়ে হলে একদিন তুমিই হবে এইসব পতিপত্তের অধিকারী সুতরাং ভবিষ্যতে এইসব নিয়ে কোন মানুষের সন্দেহ থাকবে না তবে বিয়ের সময় অবশ্যই তুমি তোমার পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে এটাই একমাত্র পথ !
এত সময় সম্রাট খুব শান্ত ভাবে কথাগুলো হজম করছিলো এখন চট করে উঠে দাড়ালো, তারপর বেশ শান্ত ভঙ্গিতে অগ্নিজড়া দৃষ্টিতে বললো,,,
পর্ব ২৭
সম্রাট:- আপনি কিছু সময় আগে যেই শব্দটা উচ্চারণ করলেন, আপনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এত সময়ে আমার হাত উঠে যেতো, আপনি শুধু বেঁচে গেলেন পারির বাবা বলে!
সম্রাটের কথায় পরশ আবরার চৌধুরী উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পরে,উনি সম্রাটের কথায় বেশ অপমান বোধ করলেন,, সম্রাটের উদ্দেশ্যে কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে তার আগেই সম্রাট হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিয়ে নিজেই বললো,,
সম্রাট:- উহুম! আমি আপনার থেকে আর একটা কথাও শুনতে চাই না! এত সময় আপনি বলেছেন আর আমি চুপচাপ শুনেছি এখন আমি বলবো আর আপনি শুনবেন,," শোনেন আপনার অনেক অর্থ থাকতে পারে কিন্তু ব্যক্তিত্ব নেই। আর না আছে মনুষ্যত্ব! যদি থাকতো তাহলে অন্তত কোন সন্তানকে অর্থের লোভ দেখিয়ে তার বাবা মাকে ত্যাগ করার কথা বলতেন না।
মানে কিভাবে পারলেন এই কথা বলতে যে আমি আমার বাবা মা কে ত্যাগ করবো তাও আপনার মেয়ের জামাই পরিচয় নেওয়ার জন্য!
আমার বাবা হোক রিক্সাচালক তাতে কি ? আমাকে উনি ঐ রিক্সা চালিয়েই মানুষ করেছেন,এই যে আপনি বললেন না আমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, আমার প্রেজেন্টেশন অসাধারণ,, আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা আপনাকে মুগ্ধ করেছে,,ব্লা ব্লা! এই সবই কিন্তু ঐ রিক্সাচালক বাবারই অবদান,ঐ রিক্সা চালিয়েই উনি আমাকে আজ এই অবধি এনেছেন। আর এখন আমি তাকে ছেড়ে দিবো? আমার মা যিনি নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে আমাকে দুনিয়া দেখিয়েছেন,এই দুনিয়ার ভালো মন্দ শিখিয়েছেন এখন আমি তাকে আমার দুদিনের ভালোবাসার জন্য ছেড়ে দিবো? অসম্ভব! পুরো পৃথিবী ছেড়ে গেলেও যেই মানুষ দুটো আমাকে ছেড়ে যাবে না সেই মানুষ দুটোকে ত্যাগ করা প্রশ্নই উঠে না। আর আমার বোনেরা! যাদের কাছে আমি বাবার পরে সম্মান পাই,সেই বোনদের ছেড়ে বিলাসীতা গ্রহন করা আমার জন্য মরন তুল্য ! ঘর জামাই থাকাটা আপনার সমাজে সম্মানের হলেও আমাদের মতো রিক্সাওয়ালাদের ছেলেদের জন্য খুবই অপমানজনক।।।
শুনেন আমি আপনার মেয়ে পারিকে ভালোবাসি তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ভালোবাসি আমার মা বাবাকে! পৃথিবীর সমস্ত সুখ আমার পায়ে লুটোপুটি খেলেও আমার কাছে সবার আগে আমার মা বাবা,পরিবারকে।
কিছু সময় দম নিয়ে আবার ও বলতে শুরু করল,,
আপনার সোসাইটিতে হয়তো নিজের স্বার্থে বাবা-মাকে ত্যাগ করে কিন্তু আমার সোসাইটিতে তা করেনা,, আমাদের মত নিম্নবিত্ত ঘরের সন্তানদের কাছে বাবা-মা ই আগে ,,, তাই বলছি যদি মনে হয় আপনার মেয়ে পারি কি আমার হাতে তুলে দিবেন তাহলে অবশ্যই আমি যেভাবে আছি যেখানে আছি সেখানে সেভাবেই দিতে হবে! আমি যতটা ভালো পারিকে বাসি ঠিক ততটাই ভালোবেসে আগলে রাখবে আমার পরিবার!! আর এতে না দরকার আছে আমার আপনার প্রতিপত্ত আর না আছে দরকার আপনার সোসাইটিতে পরিচিতি।। আসি ক্ষমা করবেন বেয়াদিব করলে!!!
সম্রাট আরো অনেক কথা বলতে চেয়েছিলো কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে চলে যায় ,,,ও চায় না রাগের বশে এমন কোন কথা বলুক যেটা পারির বাবাকে অসম্মান করা হয় ,যতই উনি ওকে, ওর পরিবারকে অপমান করুক ও উনাকে করবে না কারন উনি পারির বাবা ,, উনাকে আঘাত করে কথা বললে পারিও কষ্ট পাবে যেটা সম্রাট দিতে চায় না।। সেই দিন পারির সাথে আর কোন কথা হয়নি। পারি বার বার ফোন দিলেও সম্রাট তোলেনি ।তবে পরের দিন পারি ফোন করে,,,
সম্রাট:-হ্যালো!
পারি:- কি ব্যাপার? ফোন ধরোনি কেন?
সম্রাট:- এইতো ছিলাম একটু ব্যস্ত! তুমি বলো?
পারি:- আমি কি বলবো? বলবে তো তুমি!
সম্রাট:- কোন বিষয়ে?
পারি:-আশ্চর্য! এভাবে জিজ্ঞেস করছো যেন কিছুই জানো না!
সম্রাট:- আমি সত্যিই জানিনা পারি তুমি কোন বিষয়ে কথা বলছো?
সম্রাট বেশ ক্ষিপ্ত সুরে কথাটা বললো,,পারি সম্রাটের গলার আওয়াজে একটু থিতু হয়ে জানতে চাইলো,,
পারি:-সম্রাট তুমি কি ঠিক আছো? তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?
সম্রাট:-নাহ আমার আবার কি হবে আমি ঠিক আছি!
পারি:- তুমি ঠিক নেই, নিশ্চিত কিছু হয়েছে তা না হলে তুমি এভাবে আমার সাথে কথা বলতে না!
সম্রাটের এত সময়ে হুশ এলো যে ও পারির সাথে বেশ রুঢ় ভাবেই কথা বলছে, নিজের ভেতরটা অশান্ত হয়ে আছে । কালকে পারির বাবার সাথে কথা বলে আসার পর থেকে এমনিতেই মেজাজ গরম ছিলো চার মধ্যে গ্যারেজে এসে আবার,,,, ভাবনা কে পিছনে ঠেলে পারিকে বললো,,,
সম্রাট:- পারি আমার একটা জরুরী কাজ আছে আমি ফ্রি হয়ে পরে তোমাকে কল দিচ্ছি,,
কথাটা বলে ফোন সরাতে গেলেই পারির আওয়াজ শুনে আবারও ফোন কানে তুলে ধরে,,
পারি:-হ্যালো ,,হ্যালো শুনো না শুধু একটা কথা বলো তারপর আমি ই ফোন রেখে দিবো!
সম্রাট:- হ্যা বলো!
পারি:- কালকে তো পাপার সাথে মিট করেছিলে,,পাপা কি বলেছিলো?
সম্রাট:- তোমার পাপা বলেনি?
পারি:- নাহ,আমি পাপার কাছে জানতে চাই নি, তাছাড়া আমি তোমার মুখ থেকেই শুনতে চাই!
সম্রাট:-তোমার পাপার থেকেই শুনে নিও ,রাখছি!
পারি:- হ্যালো শুনো না হ্যালো!!
পারির কথা শেষ না করেই ফোনটা কেটে পকেটে ঢুকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হতাশার একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো,,আজ অবধি কোনদিন নিজের দরিদ্রতা নিয়ে হতাশা কাজ করেনি তবে আজ করছে,,কেন তাকে এতটা গরীব অসহায় করে পাঠালো,যদি এতটা অসহায় না পাঠাতো তাহলে আজ নিজের ভালোবাসাকে আপন করে নিতে এতটা বাঁধা থাকতো না,,কালকে পারির বাবার কথায় সম্রাট স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে যে সে কিছুতেই নিজের মেয়েকে একজন রিক্সাওয়ালার ছেলের কাছে দিবে না ,,সম্রাট এটাতে পারির বাবার দোষ ও দেখে না,,কোন বাবাই জেনেবুঝে নিজের আদরের মেয়েকে একজন হতদরিদ্রের ঘরের বৌ করে পাঠাবে না। সেখানে পারি তো রাজার ঘরের একমাত্র রাজকন্যা।।।
সম্রাটের এহেন ব্যবহারে পারির ভেতরে খচখচ করতে থাকে,অস্থির হয়ে যায় পুরো বিষয়টা জানার জন্য,,ভালো কিছু যে হয়নি তাই খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে,, তবুও?
সম্রাট:-মামা আমি বুঝতে পারছি না কি বলবো কিন্তু বিশ্বাস করেন !
জব্বার মন্ডল:-আমি বুঝতে পারিনি,আমাকে ক্ষমা করে দিস বাপ!
সম্রাট:- মামা আপনি কেন ? না আমি আপনি দয়া করে এভাবে বলবেন না ! এখানে আপনার কোন দোষ নেই, তানহা ছোট, এখনও এত বয়স হয়নি যে ও ,যাই হোক কালকের কথা আমি ভুলে গিয়েছি , আপনিও ভুলে যান।
জব্বার মন্ডল:- হ্যা ভুলে তো যেতে চাই কিন্তু,,, যাই হোক তুই আমার অবুঝ মেয়েটার কথা মনে নিস না!
সম্রাট:- না মামা আমি কিছু মনে করিনি? আর তাছাড়া আমি জানি তানহা কেমন, নিশ্চয়ই কাল কিছু নিয়ে আপসেট ছিলো,,তা না হলে ও এমন করার মেয়ে না!
জব্বার মন্ডল:- তুই আমার কাছে আমার ছেলের মতোই ,,আমার মেয়েদের ব্যবহারে কষ্ট পেলে দুরে সরিয়ে দিস না , নিজের বোন মনে করে আগলে রাখিস, আমার তোর কাছে এই একটাই চাওয়া বাপ!
পারির বাবার সাথে দেখা করে আসার পর থেকেই সম্রাটের মন মেজাজ খিচে থাকে,পারিকে হারানোর চিন্তায় ভেতরে অস্থিরতা বেড়ে যায়,, সন্ধ্যায় একটা ক্লাইন্টের ফোন আসলে পার্কের পাশে গিয়ে অপেক্ষা করে এর মধ্যেই দুরে থেকে দেখতে পায় একটা ছেলে আর মেয়ে বেশ ক্লোজড হয়ে বসে আছে! প্রথমে সেদিকে খুব একটা খেয়াল না করলেও পরবর্তীতে মনে হয় চেনা কোন মুখ, ক্লাইন্টের আসতে দেরি দেখে সম্রাট অনিচ্ছা সত্ত্বেও বারবার সেদিকে চোখ বুলায় এরপর যেন হঠাৎ করেই মাথাটা গরম হয়ে যায়,,কারন ঐ মেয়েটা আর কেউ না স্বয়ং মানহা আর পাশের ছেলেটা ওদের ইউনিভার্সিটিতে একসাথে পড়ে,, বড়লোক বাপের বিগড়ে যাওয়া বখাটে,,এই ছেলের নামে মানহা আগে অভিযোগ ও করেছিলো তাহলে আজ এখানে কি তাও এই সন্ধ্যা বেলা এমন নির্জন অবস্থায়, এত কাছাকাছি!
পর্ব ২৮
সম্রাট সোজাসুজি গিয়ে ওদের সামনে দাড়ায়, হঠাৎ করেই একটা মানুষের পা নিজের সামনে দেখে দু'জনেই ভড়কে যায়,,চোখ উপরে তুললে সম্রাট দেখে দুজনই ভীতিগ্রস্ত চাহনি নিক্ষেপ করে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সম্রাট সোজাসুজি মানহাকে জিজ্ঞেস করে,,
সম্রাট:- কি ব্যাপার মানহা তুই এই ভরা সন্ধায় এখানে কি করছিস তা-ও এই বখাটেটার সাথে?
মানহা:- ভা-ভা-ভাই- য়া ! আমি আসলে!
ভয়ার্ত কন্ঠে মানহার আওড়ানো কথাটা শেষ করার আগেই ওর সাথে থাকা ছেলেটার কন্ঠে ওর দিকে তাকালো,,,
বিশাল:- হেই আপনার সাহস কি করে হয় আমাকে বখাটে বলার, do you know who i am?
সম্রাটের মেজাজ আরো গরম হয়ে গেল,,ক্ষুদ্ধ কন্ঠেই বললো,,
সম্রাট:- কেন জানবো না অবশ্যই জানবো,,আপনি বড়লোক বাপের বিগড়ে যাওয়া বখাটে , আপনার কাজই হচ্ছে নিরিহ মেয়েদের নিয়ে খেলা করা,, সারাদিন ড্রাগস নিয়ে ভার্সিটির সাধারণ ছেলে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা,,আর তাই আমি জানতে চাচ্ছি আপনার মতো একজন বখাটের সাথে মানহার কি দরকার তাও এই সময় এই নির্জন জায়গায়?
বিশাল:- আমাকেই তো মানহার দরকার!
কথাটা বেশ দাম্ভিকতা নিয়ে বললো,,ওর কথায় সম্রাটের কপালে ভাঁজ পড়লো,মানহার দিকে ঘুরে তাকালে দেখতে পায় মানহার লাজুক চিবুক,, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বারবার হাত কচলাচ্ছে! সম্রাটের কাছে মানহার হাবভাব ভালো ঠেকলো না,তাই জিজ্ঞেস করলো,,
সম্রাট:- মানহা! এই রাস্কেলটা কি বলছে?
সম্রাট চিৎকার করেই কথাটা বলে,সম্রাটের বলা রাস্কেল শব্দটা বিশালের রাগটা আরো বাড়িয়ে দিলো মনে মনে ভাবতে লাগলো,,
বিশাল:- সেদিন ইউনিভার্সিটির পুরো এক মাঠ ভর্তি ছাত্র ছাত্রীদের সামনে অপমান, পরে ভিসির কাছে কমপ্লেইন ,আজ আবার এইভাবে অপমান,,উহু কোনটাই ভুলবো না ,,সব কয়টা অপমানের প্রতিশোধ আমি খুব ভালো করেই নিবো ! আর সেটাও খুব করুন ভাবে অবশ্য তাতে সাহায্য আমাকে তোর নিজের লোকই করবে যাকে বাঁচাতে তুই এইসব করছিস সেই ই করবে,,তার জন্য আমার পাতা জালে ও তাকে আটকে ফেলা হয়েছে!!
মানহা:- আমি ওর সাথে দেখা করার জন্যই এসেছিলাম ভাইয়া!
মানহা:- মানে?
মানহা চুপ হয়েই আছে,সম্রাট আবার জিজ্ঞেস করলো,
সম্রাট:- সেদিন ওর নামে কমপ্লেইন করেছিলে ও তোমাকে উতক্ত করে আর আজ বলছো তুমি ওর সাথে দেখা করতে এসেছো?
মানহা:-আমি ওকে ভালোবাসি!
সম্রাট:- কি বললে!
মানহা:- আমি ওকে ভালোবাসি!
সম্রাট নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মানহাকে জোরে থাপ্পর দিয়ে বসে,মানহা ছিটকে নিচে পড়ে যায়,সম্রাট হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিচে পড়ে থাকা মানহার বাহুটা খুব শক্ত করে ধরে টেনে তুলে,মানহা পড়ে যাওয়াতে হাতের কনুইতে একটা ছুলে যায়,সেই জায়গায় হাত রেখে মাথা নিচু করে চোখের পানি ঝড়ায়, সম্রাটের গর্জিত আওয়াজে মাথা তুলে দেখে,,
সম্রাট:- হেই লিসেন এর পর আর কোনদিন যেন তোকে মানহার আশেপাশে না দেখি! যদি দেখি এর ফলাফল ভালো হবে না বলে দিলাম!
বিশাল রাগে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে সম্রাটের মুখোমুখি দাড়ায়, একবার অশ্রুসিক্ত মানহার দিকে তাকিয়ে সম্রাটের উদ্দেশ্যে বললো,,
বিশাল:- তোর সাহস কি করে হয় আমার সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে আমার সাথে কথা বলার,আর তুই কে যে তোর কথায় মানহার সাথে সম্পর্ক রাখবো কি রাখবো না সেটা ঠিক করতে হবে?
সম্রাট:- আমি কে সেটা তোর না জানলেও চলবে ,তুই শুধু এটা মনে রাখবি মানহার আশেপাশে তোকে যেন না দেখি !
বিশাল:- আমি তো যাবো না , কিন্তু পারলে মানহাকে আটকে রাখিস!
বিশাল কথাটা বেশ তাচ্ছিল্যের সাথে বললো,মানহা করুন দৃষ্টিতে তাকালো,মানহার দৃষ্টিতে বিশাল নিজের প্রতি অনুভূতি দেখলো যা তার জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলো,বিশাল আবারও বলা শুরু করলো,,
বিশাল:- আমার তো ভাবতেই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে যে একজন চাকর হয়ে তুই মালিকের মেয়ের গায়ে হাত তুলিস!
মানহার দিকে তাকিয়ে,,
বিশাল:- I am sorry to say,মানহা আমি তোমার মতো মেয়ের সাথে কোন সম্পর্ক রাখতে পারবো না যে কি-না নিজের বাড়ির কাজের লোকের হাতে এভাবে! আর তাছাড়াও এই ছোট লোকের বাচ্চাটা তোমার সামনে আমাকেও অপমান করেছে,এর আগেও করেছে,আমি শুধু তোমার জন্য হজম করেছি কিন্তু এখন যখন তোমার সামনে করলো আমি ভেবেছিলাম তুমি এইবার অন্তত প্রতিবাদ করবে, বুঝিয়ে দিবে ওর জায়গাটা কিন্তু নাহ তুমি তো চাকরের হাতে মার খেতে ব্যস্ত তবে আমি সেরকম নই ,আমরা চাকরকে চাকরের জায়গায়ই রাখি,
বিশালের কথায় সম্রাট বিশালের দিকে তেড়ে যায়, শুরু হয়ে যায় হাতাহাতি,একে অপরকে আঘাত করছে, এতক্ষনে অনেক মানুষ ও জমা হয়ে গিয়েছে এখানে। মানহা এইসব দেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে থাকে, বাড়িতে চলে যায়,মানহার কান্নার শব্দে সম্রাটের হুশ ফিরল, নিজের প্রতি নিজেই ধিক্কার দিলো এইরকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য।নিজেও চলে গেল জব্বার মন্ডলের বাড়িতে,, বাড়িতে গিয়ে দেখলো তানহা আর ওর মা মানহার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজা খোলার জন্য অনুরোধ করছে আর বারবার জানতে চাইছে কি হয়েছে; কিন্তু মানহা না কোন উত্তর দিচ্ছে আর না দরজা খুলছে। সম্রাট দৌড়ে গিয়ে তানহার পাশ কেটে দরজায় করাঘাত করতে করতে মানহাকে দরজা খোলার জন্য অনুরোধ করে,, তানহা ও ওর মা সম্রাটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে,সম্রাটে ডাকে মানহা দরজা খুলে বাইরে বের হয় সম্রাট কিছু বলার আগেই মানহা বললো,,
মানহা:- তুই এখানে কেন এসেছিস ছোট লোকের বাচ্চা?
সম্রাটের :- মানহা !
সম্রাট মানহার ব্যবহারে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সাথে তানহা ও ওর মা!
মানহা:- কি কি মানহা মানহা করছিস? ম্যাম বলবি এখন থেকে ম্যাম বলবি!
কথাগুলো বেশ চিৎকার করেই বলে,,মানহার কথার ধরন আর পরিস্থিতি বুঝার জন্য তানহা মানহাকে থামাতে,,
তানহা:- মানহা!
মানহা:- কেউ কথা বলবে না!
তাহনার উদ্দেশ্যে কথাটা বলে আবারও সম্রাটকে বলতে শুরু করলো,,
মানহা:- আসলে দোষ তোর না ,দোষটা আমাদের ই! আমাদের বোঝা উচিত ছিলো চাকরকে চাকরের জায়গায়ই রাখা উচিত,এর বেশি সম্মান পেলে তোরা ধরাকে সরা জ্ঞান করিস ঠিক যেমন আজকে করলি! তোর সাহস কি করে হয় আমার গায়ে হাত তোলার, যেখানে কোনদিন আমার বাবা মাই আমার গায়ে আজ অবধি একটা ফুলের টোকাও দেয়নি সেখানে আজ তুই পাবলিক প্লেসে এক মাঠ ভর্তি মানুষের সামনে আমাকে থাপ্পর মেরেছিস! বিশালকে ও মেরেছিস! তোর সাহস কি করে হয় আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বিশালের গায়ে তোলার!
জব্বার মন্ডলের স্ত্রী এত সময় মেয়ের পরিস্থিতি দেখে ভরকে যায়,, কিছুই মুখ দিয়ে বের করতে পারছে না তবে এতটুকু বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে যার দরুন সম্রাট মানহার গায়ে তুলেছে, থাপ্পড় দিয়েছে কথাটা যেন বিদ্যুৎ গতিতে উনার মাথায় চেপে বসলো ,উনি রাগান্বিত চাহনিতে মানহাকে জিজ্ঞেস করলো,,
জব্বার মন্ডলের স্ত্রী :- থাপ্পড় দিয়েছে মানে?
মানহা নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে কান্নারত ভঙ্গিতে বললো,
মানহা:- হ্যা থাপ্পড় মেরেছে,এই ছোট লোকের বাচ্চা এক মাঠ ভর্তি মানুষের সামনে তোমার মেয়ের গায়ে হাত তুলেছে!
মানহার কথায় ওর মা সম্রাটের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,,
জব্বার মন্ডলের স্ত্রী :-তোমার এত সাহস হয় কি করে আমার মেয়ের গায়ে হাত তোলার?
সম্রাট মানহার ব্যবহারে মাথা অনেক আগেই নামিয়ে নিয়েছে এখন সেটা আরও নিচু হলো,,কি বলবে,বলার মতো পরিস্থিতি আদৌ এখন আছে? তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকাই শ্রেয়, দরকার হলে পরে সব পরিস্কার করে বলা যাবে কিন্তু এখন যেই অপমানের শিকার হলো জীবনে কোন দিন তা ভুলা যাবে? না কোনদিন ও না! তার সাথে এটাও প্রমান হয়ে গেল পর কোন দিন আপন হয় না আর না তেলজলে মিশে? আচ্ছা যদি মানহার আপন ভাই আজ এই কাজটা করতো তবে কি মানহা তার সাথে ও এমন ঔদত্বপূর্ন আচরণ করতে পারতো?
তানহার মা:- কি হলো কথা বলছো না কেন? এত সাহস তোমার হয় কি করে যে আমার মেয়ের গায়ে তুলো?
তানহা:- মা!
তানহা:- তুমি চুপ থাকো!
তানহার মা:- কথা বলছো না কেন?
তানহা:- কি বলবে ও ? ওর কথা বলার মতো মুখ আছে? শুধু মাত্র ওর জন্য আজ আমি এত অপমানিত হলাম ! বিশাল ও আমাকে ছেড়ে চলে গেল!
মানহা:- এই ছোট লোকের বাচ্চা তুই জানিস বিশাল কে? তোর সাহস কি করে হলো ওর গায়ে তোলার?
মানহা নিজের নিয়ন্ত্রণ পাড় করে সম্রাটের কলার ধরে ঝাকাতে ঝাকাতে কথাটা বললো,তানহা এইবার রেগে যায়,মানহার হাতের মুঠোয় সম্রাটের কলার এটা যেন ওকে ভেতর আগ্নেয়গিরির উপলদ্ধি করতে লাগালো,, শক্ত হাতে মানহার হাত টা ধরে সম্রাটের কলার থেকে সরালো ক্রোদিত কন্ঠে বললো,
তানহা:- বাস অনেক হয়েছে, অনেক সময় ধরেই তোর দুঃসাহস দেখছি! সাহস কি করে হয় সম্রাটের কলার ধরার!
মানহা এখনো রাগে ফোঁস ফোঁস করছে, তানহা মানহার থেকে মুখ ফিরিয়ে ওর মায়ের দিকে ঘুরে বললো,
তানহা:- তুমি সম্রাটকে কেন জিজ্ঞেস করছো, তোমার মেয়েকে জিজ্ঞাসা করো কেন সম্রাট ওর গায়ে হাত তুলেছে! এত সময় ধরে এত কথা বলছে, বারবার সম্রাট ওকে থাপ্পড় মেরেছে সেটা বলছে,ও অপমানিত হয়েছে সেটা বলছে তাহলে এটা কেন বলছে না কেন ওকে অপমান করা হয়েছে? আর কে এই বিশাল যার জন্য ওর এত দরদ উতলে পড়ছে,যার জন্য নিজের বড় ভাইয়ের সাথে এরকম ব্যবহার করছে?
মানহা:- কে আমার বড় ভাই? এই ছোট লোকের বাচ্চাটা? কোনদিন ও না! ও আমার বাবার গ্যারেজে কাজ করা একজন শ্রমিক ছাড়া কিছুই না? যাকে বলে দাস! আর একজন দাসকে পায়ের তলায় রাখা যায়, মাথায় তোলা যায় না! নেহাৎই আমরা ভালো মানুষ তাই ওকে আজ অবধি অনেক সম্মান করেছি কিন্তু এখন থেকে আর নয়,তাই আজ বুঝিয়ে দিলাম ওর জায়গাটা!
কথাটা শেষ করে আবারও সম্রাটের মুখোমুখি হয়ে বললো,,
তুই আমার আর বিশালের মাঝে ফাটল ধরিয়েছিস , সুতরাং তুই নিজেই ঠিক করবি! দরকার পড়লে ওর পায়ে ধরবি, তবুও ওকে আমার কাছে নিয়ে আসবি আর না হলে ধাক্কা মেরে বের করে দিবো বাড়ি থেকে এবং গ্যারেজ থেকে!
জব্বার মন্ডল:- মানহা!!
আচমকা এক গর্জনে কেঁপে উঠলো মানহা,তানহা আর ওদের মা!
পর্ব ২৯
জব্বার মন্ডলের তেজি আওয়াজে চমকে সবাই পিছু ঘুরে দেখে তিনি ভয়ংকর রাগী লুকে তাকিয়ে রয়েছে মানহার দিকে,এত সময়ে ঘটমান সবটাই তিনি দেখেছেন এবং শুনেছেন।উনি বিচক্ষণ মানুষ তাই বুঝতে পেরেছে কারন ছাড়া সম্রাট মানহার গায়ে আঘাত করেনি। নিশ্চয়ই কারন আছে তাছাড়াও উনি বিশালের নাম শুনেই বুঝেছে বিষয় যাই হোক সেটা মোটেই ভালো না।আর তাছাড়া সম্রাট এখানে আসার পথে ফোনে আংশিক বলেছিলো আর তাই উনি এখন এখানে।
জব্বার মন্ডল:- তোমার সাহস কি করে হয় সম্রাটের সাথে এভাবে কথা বলার !
জব্বার মন্ডলের স্ত্রী:- তুমি আসলে!
তুমি চুপ থাকো! এত সময় ধরে মেয়ের বেয়াদবি দেখে যাচ্ছো,, মেয়েকে থামানোর চেষ্টা তো দুরে থাক, সম্রাটের সম্মান রক্ষার চেষ্টা ও করছো না ! এই শিক্ষা দিয়েছো মেয়েকে! এই আদব শেখাও সারাদিন ঘরে বসে।
জব্বার মন্ডলের স্ত্রী:- আমি তো ;
জব্বার মন্ডল:- কোন বাহানা দিবে না! তুমি না সম্রাটকে নিজের ছেলে বলো,এই তোমার ছেলেকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ! তোমার ই সামনে তোমার মেয়ে তোমার ছেলেকে এভাবে আঘাত করে কথা বলছে আর তুমি সেটা নিরব ভাবে দেখে যাচ্ছো? সত্যি নিজের ছেলে হলে পারতে এভাবে মানতে!
মেয়েকে স্বামীর রাগ থেকে বাঁচানোর চেষ্টায় জব্বার মন্ডলের স্ত্রী কথা বলার পরিপ্রেক্ষিতেই উক্তি গুলো উনাকে ছুড়ে দেয় জব্বার মন্ডল,, মেয়েকে বজ্র আওয়াজে সম্রাটের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য আদেশ করে,
সম্রাট:- মামা কি বলছেন? ও আমার ছোট বোন,আর ভাই বোনের মাঝে এরকম একটু আধটু ঝগড়া হয়,তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে না ! তাছাড়া আমি ওর প্রতি একটু রেগে নই! ওর এখন মাথা গরম তাই কি থেকে কি বলছে নিজেই বুঝতে পারছে না।পরে দেখবেন ঠিক বুঝতে পারবে আর অনুতপ্ত ও হবে।
সম্রাটের কথাকে অগ্রাহ্য করে জব্বার মন্ডল আবারও মানহাকে আদেশ করে সম্রাটের কাছে ক্ষমা চাইতে,মানহা রাগে ক্ষোভে সম্রাটকে আস্তে করে সরি বলে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে যায়! মানহা চলে যাওয়ার পর তানহা এসে সম্রাটের পাশে দাড়ায় আর পুরো বিষয়টি খুলে বলতে বলে, সম্রাট পুরো ঘটনা এবং বিশালের সম্পর্কে যা যা জানে তার পুরোটাই খুলে বলে। সবাই শুনে বুঝতে পারে মানহা একটা ট্রাপে ফেসে গেছে, এবং খুব ভালো ভাবেই।বিশাল ওকে ইমোশনালি আটকে ফেলেছে যার দরুন আজ ওর ব্যবহারের এই অধঃপতন!
সম্রাট জব্বার মন্ডলের বাসা থেকে বেড়িয়ে দিকবিদিক ভুলে হাঁটতে হাঁটতে সোজা নদীর পাড়ে যায়, কোথাও না কোথাও মানহার কথাগুলো খুব আঘাত করেছে,মানহা সত্যিই বলেছে তবে সেই সত্যিটাই খুব যন্ত্রনা দিচ্ছে কারন জব্বার মন্ডল এবং তার পরিবারের প্রতিটি মানুষের ব্যবহারে , তাদের আদর যত্নে সম্রাট ভুলেই গিয়েছিল নিজের অবস্থান। তার উপর পারির বাবার কথা,,পারিকে হারানোর ভয়! সব মিলিয়ে সম্রাটকে বেশ যন্ত্রনা দিচ্ছিলো। নদীর পাড় থেকে উঠে এসে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যায় নিজের বাবা মায়ের কাছে,মনটা বিক্ষিপ্ত, অশান্ত,অস্থির হয়ে আছে আর এই অশান্ত অস্থির মনকে ঠিক করতে একমাত্র একজনই পারে সে হচ্ছে মা!
মায়ের মুখ দেখলে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষেরই যত কষ্টই হোক,যতই বিক্ষিপ্ত থাকুক মন,যত অশান্তিই কাজ করুক সব কিছুই পানি হয়ে যায়। পরম আনন্দ আর শান্তির ছোঁয়া লেগে যায় দেহমনে। এই জন্যই হয়তো উপরওয়ালার পর উনি মায়ের সম্মান সর্বাধিক দিয়েছেন।কারন আল্লাহ নিজেকে ছাড়া তিনি তার সৃষ্টির সেরাদের জন্য সর্বোত্তম করে দান করেছেন মা নামক নরম মনের,সর্ব ত্যাগী কোমল নারীটি কে।
সম্রাট সেদিন এবং তার পরের দিন পুরোটা সময়ই কাটিয়েছে নিজের পরিবারের সাথে। জব্বার মন্ডল গ্যারেজে সম্রাট কে না পেয়ে বেশ হতাশ হয়। সম্রাটকে ফোন দিলে সম্রাট তুলে না,আসলে তুলবে কি ! পারির সাথে কথা বলার পর ফোনটা যে সাইলেন্ট করে রেখেছে সেটা তেমনই আছে। মানহার সময় ফোন বের কথা বলে আবারও সেভাবেই রেখে দেয়,তাই ফোনে রিং হলেও টের পায় না। এমনিতেই বাসায় পরিবারের সাথে সময় কাটানোর অন্য দিকে মন থাকে না।তাই জব্বার মন্ডল অথবা পারি কারো বিষয় ই মাথায় আসে নি।
জব্বার মন্ডল সম্রাট কে ফোনে না পেয়ে ওর বাবাকে ফোন দিলেই জানতে পারে বাসায় থাকার কথা।উনি নিশ্চিত হোন ঠিক আছে এই ভেবে। তিনদিনের দিন সম্রাট ডিউটিতে আসলে সম্রাট উনার কাছে আবারও পরিষ্কার হওয়ার জন্য কথা বলতে চাইলে জব্বার মন্ডল উক্ত কথাটি বলে। সারাদিন কোনরকম কাটলেও বিকেল থেকে পারির কথা মনে পড়তেই চিন্তা বেড়ে যায়। খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো হয়নি এই কয় দিন। সব কিছু মিলিয়ে চিন্তার দরুন সন্ধ্যা থেকে প্রচুর মাথা ব্যথা শুরু হয়।
সম্রাট আর পারির বিষয়টি জব্বার মন্ডল জানে। তানহা ও কিছু টা জানে। তবে পারির বাবার সাথে সম্রাটের কথা বলা নিয়ে কিছুই জানে না। কিন্তু সম্রাটের মুখ দেখে জব্বার মন্ডল কিছু একটা আন্দাজ করতে পারলেও তৎক্ষণাৎ কিছু বলেন নি। কারন উনি জানেন সম্রাট নিজের থেকেই বলবে যখন সময় হবে। কিন্তু কে জানতো এর মধ্যেই সব উলট পালট হয়ে যাবে।
সম্রাট মাথা ব্যথা সইতে না পেরে, সিদ্ধান্ত নেয় ওষুধ খাওয়ার , কিন্তু ঘুমের ও দরকার আছে। পিছনের কয়েকদিন ধরে রাতে ঘুম হচ্ছে না।আর এই পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে ভাবা উচিত তাই মাথাটা ঠান্ডা করাও দরকার।সব কিছু ভেবেই সম্রাট মাথা ব্যথার জন্য একটা টাফনিল আর বেশি পাওয়ারের দুটো স্লিপিং পিল খায়।
ওষুধের প্রকোপে সম্রাট বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, এদিকে পারি তার পরিবারের সাথে যুদ্ধ করছে।
মানহার সাথে ঐ ঘটনার পর সম্রাট জব্বার মন্ডলের বাসায় আর যায় নি তাই তানহা সম্রাটের মুখটাও দেখতে পারে নাই। এই বিষয় টা তানহাকে অস্থির করে তুলে,তাই সেদিন রাতেই কাউকে কিছু না বলে চুপিচুপি গ্যারেজে আসে। সম্রাটের প্রতি তানহার অনুভূতি শুধু তানহা ই অবগত আর কেউ না। তানহা গ্যারেজে ঢুকার সময় দরজা খোলা রেখেই ভেতরে চলে যায় যার কারনে পারি এসে দরজা খোলা পায়।
পারি যাওয়ার কিছু সময় আগেই তানহা গিয়ে পৌঁছায়। তানহা জানতো পারির প্রতি সম্রাটের দূর্বলতা তাই চেয়েও কখনো সম্রাটকে কিছু বলেনি। কিন্তু ঘুমন্ত অবস্থায় সম্রাটকে দেখে নিজের অনুভূতি গুলো চেপে রাখতে পারে নি। ও জানতো সজাগ অবস্থায় কখনোই ও সম্রাটের সান্নিধ্য পাবে না তাই ঘুমন্ত সম্রাটের বুকেই নিজের মাথা এলিয়ে দেয়। খুঁজে নেয় পরমানন্দ। সম্রাটের বুকে মাথা এলিয়ে নিজের অব্যক্ত অনুভূতি গুলো মনে মনেই ব্যক্ত করতে লাগলো আর এভাবেই ঘুমিয়ে পড়লো বুকের উপর। ঘুমের ঘোরেই সম্রাট তানহাকে আগলে নিলো নিজের মাঝে ঠিক সেই সময় উপস্থিত হলো পারি আর দেখতে পেল নিজের দুর্ভাগ্য কে। অথচ ঘুমে আচ্ছন্ন দুজন নরনারী জানতেই পারলো না তাদের জীবন এলোমেলো হয়ে যাওয়ার বার্তা পৌঁছে গেছে তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে।
খুব সকাল বেলা অজানা কারনেই সবার আগে জব্বার মন্ডল গ্যারেজে পৌঁছে । এসেই গ্যারেজের দরজা খোলা দেখে উনি ঘাবড়ে যান। ভীত হয় এই ভেবে যে, না জানি কোন জিনিস চুরি হয়েছে কারন উনার কাছে ক্লাইন্টদের প্রতিটি জিনিস ই মূল্যবান, ওগুলো আমানত,আর একজন মুসলমানের জন্য আমানত এর খেয়ানত করার মতো মুনাফিকতা আর কিছু তেই নেই। উনি চিৎকার করেই সব কর্মচারীকে ডাকেন । সম্রাট ছাড়াও আরো দুজন কিশোর বয়সী ছেলে গ্যারেজে থাকে,ওরা অবশ্য গ্যারেজের বাইরের দিকে চৌকি পেতে তাতেই ঘুমায় আর সম্রাট থাকে গ্যারেজের ভেতরে তৈরি করা সুন্দর একটা রুমে। ঐ ছেলে দুটো এত সকালে জব্বার মন্ডলকে গ্যারেজে দেখে একটু চিন্তিত হয়, জানতে চাইলে জব্বার মন্ডল রাগের সাথেই বলে, দরজা খোলা থাকার কথা, ছেলেগুলো ভয় পেয়ে যায়, জানায় তারা দরজা ভালো করে লাগিয়েই ঘুমিয়েছিলো। জব্বার মন্ডল সম্রাটকে ডাকতে বলে,ছেলে দুইটা ডাকার জন্য পা বাড়াতেই জব্বার মন্ডল থামিয়ে দেয় এবং নিজেই যাবেন বলে জানায়।
সম্রাটের দরজা ফাঁক দেখে একটু বিস্মিত হয়,কারন সম্রাট বরাবরই দরজা না লাগিয়ে ঘুমায় না । কিন্তু ওষুধের প্রকোপতা এত বেশিই ছিলো যে দরজা লাগানোর কথাও সম্রাট ভুলে গিয়েছিলো। দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়েই দেখতে পায় ঐ দৃশ্য। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেন উনার। বুঝতে চেষ্টা করছেন উনি ভুল কিছু দেখছেন। কিন্তু না সত্যি কখনো বদলানো যায় না।
জব্বার মন্ডল নিজের মেয়েকে সম্রাটের সাথে লেপ্টে থাকতে দেখে সহ্য করতে পারলেন না। ধপ করে পড়ে গেলেন। কিছু পড়ার শব্দে ছেলে দুটো এদিকে ছুটে এলো,এর মধ্যে তানহার ও ঘুম ভেঙ্গে গেল ! ধরফরিয়ে উঠে দাঁড়ালো, নিজের গায়ের পোশাক এলোমেলো, ঘুমন্ত সম্রাটের দিকে এক নজর তাকিয়ে সব ঠিক করে পেছনে ঘুরে নিচে পড়ে থাকা বাবাকে দেখে থমকে গেল,তার সাথে চমকালো ঐ ছেলে দুটো। তড়িঘড়ি করে বাবার সামনে এসে ডাকতে লাগলো,
তানহা:- বাবা!
জব্বার মন্ডল:- ছো- ছো -ছোবে না আমায়!
অনেক কষ্ট এই শব্দটা উচ্চারণ করলো জব্বার মন্ডল, নিজের বাবার মুখে এই কথা শুনে তানহার ঠোঁট ভেঙে কান্না আসছে তবুও নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে ছেলে দুটোকে অনুরোধ করলো জব্বার মন্ডল কে তুলে ধরার জন্য। ছেলে দুইটা এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়ে বেশ লজ্জা পায়, একে তো বসের মেয়ে তার সাথে নিজেদের আদর্শ মনে করা তাদের প্রিয় সম্রাট ভাইকে এমন একটা পরিস্থিতিতে দেখে ওরাও বেশ বাজে একটা মূহূর্তের মুখোমুখি কিন্তু এত সময়ে সম্রাটের টু শব্দ না দেখে সবাই একটু আশ্চর্য হলো, তানহা চিৎকার করে সম্রাটকে ডাকতে লাগলো,
তানহা:- সম্রাট প্লিজ উঠো ,দেখো বাবা কিভাবে যেন পড়ে গেছে!
জব্বার মন্ডল ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে,সম্রাট হইচই শুনে সামান্য নড়লো বই আর কিছুই করলো না।পাশ ফিরে আবারও শুয়ে রইলো। ওষুধের ডোজ বেশি হওয়ায় কোন কিছুই ওর মস্তিষ্ক ধরতে পারছে না। ছেলে দুটো তাড়াতাড়ি ধরাধরি করে জব্বার মন্ডল কে বাইরে ওদের বিছানার একপাশে বসালো। তানহা লজ্জা ভয় সব ভুলে নিজের বাবাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো, সম্রাটকে তোলার জন্য ওদের অনুরোধ করলো।ছেলে দুটো এমনিতে প্রথমে চেষ্টা করলেও পরে বুঝতে পড়লো সম্রাট নিশ্চিত ঘুমের ওষুধ খেয়েছে কারন ওর বিছানার পাশে এখনও সেই ওষুধের পাতা পড়ে রয়েছে।তাই এভাবে ডাকলে কাজ হবে না ভেবেই এক জগ পানি সবটুকু ঠেলে দিলো সম্রাটের মুখের উপর।
পর্ব ৩০
মুখের উপর কিছু পড়ছে অনুভব হতেই ধরফরিয়ে উঠে বসে সম্রাট। ঘুম ঘুম চোখে সামনে তাকিয়ে দেখতে পায় ছেলে দুইটা কিছু বলছে কিন্তু ওর মস্তিষ্ক ধরতে পারছে না তাই বোঝার জন্য চেয়ে থাকে,যখনই বুঝতে পারলো,লাফ দিয়ে উঠে দৌড়ে বাইরে বের হয়, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে পায় অস্থিরতায় বিপর্যস্ত জব্বার মন্ডল কে।
হাসপাতালের জরুরী বিভাগের করিডরে দাঁড়িয়ে রয়েছে সম্রাট, তানহা,মানহা ও ওদের মা।
সম্রাট এখনো কিছুই বুঝতে পারছে না। ওর ঘুমের রেশ এখনও কাটেনি। দেয়ালে মাথা হেলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক বার চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়েছে তারপরও ঘুম যেন যেতেই চায় না।কাল রাতে মন হয়েছিলো একটা গভীর ঘুমের দরকার তাই তো একসাথে দুটো বেশি পাওয়ারের ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। কিন্তু কেন জানতো এটাই এখন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।
সকালে এমন কি হয়েছে কিছুই বুঝতে পারছে না,তবে হাজারটা কথা ঘুরপাক খাচ্ছে মনে, কারন একে তো এত সকালে জব্বার মন্ডল সহ তানহা গ্যারেজে তার সাথে এমন কি হলো যাতে হঠাৎ ই জব্বার মন্ডল অসুস্থ হয়ে পড়েন, একেবারে হার্ট অ্যাটাক!
হ্যা জব্বার মন্ডল হার্ট অ্যাটাক করেছেন।সম্রাট দরজার বাইরে এসে বুকে হাত রেখে যন্ত্রনায় ছটফট করা জব্বার মন্ডল কে দেখে অস্থির হয়ে পড়ে কিন্তু তাকে তুলে ধরে কোন ভাবে সাহায্য করার মতো শক্তি তখন নিজের মাঝ পাচ্ছিলো না। বারবার চোখ লেগে আসছিলো।
সম্রাটের অবস্থা দেখে ছেলে দুটো বুঝতে পারে যে ওর দ্বারা কিছুই করা সম্ভব নয়,তাই নিজেরাই চেষ্টা করে তাকে প্রাথমিকভাবে সাহায্য করার।
এর মধ্যেই তানহা এ্যাম্বুলেন্স ফোন করে। কিন্তু জব্বার মন্ডলের অবস্থা বেগতিক দেখে সম্রাট ঐ অবস্থায় ছেলে দুটোকে আদেশ করে গাড়ী বের করতে।ওরাও তাই করে।সম্রাট আর তানহা পিছনে বসে জব্বার মন্ডলকে মাঝে রেখে ছেলেদের মধ্যে একজন ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ী চালায়। যেতে যেতে তানহা ফোনের মাধ্যমে নিজের মা বোনকে খবরটা জানিয়ে দেয়।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে।ডাক্তার জানিয়েছেন আপাতত জব্বার মন্ডল আশংকা মুক্ত তবে উনাকে বেশ কিছুদিন বেড রেস্ট দিয়েছেন।
একে একে সবাই দেখে এসেছেন।উনি ঘুমিয়ে আছেন, ওষুধের কারনেই ঘুমাচ্ছেন।
সম্রাট বাইরের বেঞ্চে বসে বসে ঘুমাচ্ছে। প্রথমে তানহা সহ বাকীরা আজ সম্রাটের এমন ঘুমের কারনে একটু চিন্তিত হলেও পরে ঐ ছেলেদের মাধ্যমে জানতে পারলো ও রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়েছে,যেহেতু এক টানা গভীর ঘুম দেওয়া হয়নি তাই এমন ঝিমাচ্ছে।তাই কেউ আর কিছু বলেনি তবে তানহা মনে মনে অপরাধবোধে ভুগছে।ও জানে সম্রাট না জানলেও এর বাবা জানে কাল রাতের কথা আর তার জন্য ই তার এখন এই অবস্থা।
আচ্ছা ওর বাবা সুস্থ হলে ও তার সামনে গিয়ে কিভাবে দাঁড়াবে আর যখন সম্রাট জানবে! তখন?
মিসেস জব্বার ও মনে মনে অপরাধবোধে ভুগছে, কারন উনি মনে মনে ভাবছেন,
মিসেস জব্বার মন্ডল:- জব্বার মন্ডল সম্রাটকে নিজের ছেলের মতোই ভাবে, ছেলের অভাব উনি সম্রাটের মাধ্যমে পূরন করেছেন,যদিও কোনদিন মেয়ে হওয়া নিয়ে কখনো জব্বার মন্ডল অভিযোগ কিংবা আফসোস করেনি কিন্তু তবুও কোথাও না কোথাও পুত্র সন্তানের কমতি উনি উপলদ্ধি করেন আর তাই তো ! আর আজ সেই মানুষের সামনেই সম্রাটকে উনি অপমান করেছেন,কত কটু কথা বলেছেন! উনি পারেনি এটা মেনে আর তাই হয়তো এখন হাসপাতালে এভাবে!
মানহা ও চুপ করে বেঞ্চে পা তুলে হাঁটুতে মুখ গুঁজে রেখে বসেছে।নিরবে চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছে।কারো মুখেই কোন কথা নেই,তড়ে ভেতরে ভেতরে সবাই কষ্ট পাচ্ছে।
দুপুরের শেষভাগে বিকেল হওয়ার সময়ে জব্বার মন্ডলের হুশ ফিরল মানহা এবং উনার স্ত্রী দেখা করে এসেছে। কিন্তু তানহা এখনও যায় নি।সম্রাট সবার পরে যাবে তাই উঠে ফ্রেশ হতে গিয়েছে এমনিতেও সেদিনের পর থেকে ও চেষ্টা করে তানহা মানহা আর মিসেস জব্বার এর স্ত্রীর থেকে দুরত্ব বজায় রাখতে।
সবাই দেখা করে আসার পর সম্রাট জব্বার মন্ডলের সাথে দেখা করতে যায়, সম্রাটকে দেখে জব্বার মন্ডল মুখ ঘুরিয়ে নেয় ,এটা দেখে সম্রাট আশ্চর্য হয়।তবে ও বুঝতে পারল ঘটনার সূত্রপাত কারণ কিছু সময় আগেই ওর সাথে কাজ করে সেই ছেলে দুইটা সব খুলে বলে। ওদের কথায় ও আশ্চর্য হয় ,তার সাথে ভীতও কারন যদি জব্বার মন্ডল ওকে ভুল বুঝে।যদি অপরাধী ভাবে তখন!
সম্রাট:-মামা;
জব্বার মন্ডল:- """
সম্রাট:- মামা!
এখনো জব্বার মন্ডল চুপ করে থাকে, পেছন থেকে তানহার গলার আওয়াজ শুনে সম্রাট চোখ মুখের ভঙ্গি শক্ত করে ফেলে, হাতের মুঠ জোরালো করে, কেন জানি তানহাকে একদম সহ্য হচ্ছে না।
তানহা:- বাবা!
জব্বার:- আমি ঘুমাবো;
সম্রাট বুঝলো জব্বার মন্ডল এখন আর কোন কথা বলবেন না , তাছাড়াও এখন উনাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করে চাপ দেওয়া যাবে না হিতে না আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন।
সম্রাট:- মামা নিজের খেয়াল রাখবেন,আমি আসছি! গ্যারেজ ফাঁকা,রাতে আবার আসবো।
সম্রাট কথা শেষ করে এক নজর জব্বার মন্ডলের দিকে দৃষ্টিপাত করে, চোখের কোনে আটকে রাখা পানিটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মুছে বের হয়ে গেল , যাওয়ার সময় দরজায় দাঁড়ানো তানহার উদ্দেশ্য বললো,
সম্রাট:- যেকোন প্রয়োজনে ফোন করবে।আমি চলে আসবো।
তানহা লজ্জা ভয়ে কোন উত্তর ই দিলো না,সম্রাট নিরবতাকে সম্মতি মেনেই চলে গেল। ডাক্তারের পরামর্শে জব্বার মন্ডলকে পরেরদিন সকালেই নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো উনার পরিবারের সবাই।
কিন্তু জব্বার মন্ডল রাতেই ফিরে যাওয়ার জন্য জোরজবরদস্তি করলেন,যদিও উনি মোটামুটি সুস্থ তবুও সবাই চিন্তা করছিলো। তবে উনার কাছে হার মেনে বাসায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
গাড়ী উনার এলাকায় আসার পরই উনি বললেন গ্যারেজে যাবেন, মিসেস জব্বার একটু রাগ করলেন,বারন করলেন না যেতে কিন্তু শুনলেন না জব্বার মন্ডল,,তানহা সাথে যেতে চাইলে চোখ রাঙানি দেয় তাতেই তানহার ইচ্ছা আর সাহস দুটোই হাওয়ায় উবে যায়।।
জব্বার মন্ডলের কেন জানি মনে হচ্ছে উনি যা দেখছেন সেটা ভুল, কিছু একটা আছে যেটা দেখা হয়নি।আর তাই উনি ভাবলেন ,না দেখা সেই সত্যটা দেখবেন।আর সেটা কোনভাবেই দেরি করা যাবে না। কারন উনি জানেন সম্রাট পারি নামক মেয়েটিকে অসম্ভব ভালোবাসে তাহলে কাল রাতে কি হয়েছিলো যার কারনে উনার মেয়ে সম্রাটের সাথে রাত কাটাবে?
তানহার সাথে সম্রাটের সম্পর্ক মানতে উনার আপত্তি নেই কিন্তু যদি সম্রাট তানহাকে ভালোবাসে তাহলে পারির সাথে কি সেটা জানতেই হবে!
এছাড়াও গতকালের আগে কোনদিন ওদের এভাবে দেখা যায় নি যার কারনে ওদের সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা করা যায়।
তানহাকে সম্রাটের সাথে খুনসুটি করতে দেখা গেছে,সম্রাটকেও তানহা কে শাসন করতে দেখা যায় তবে সেটা ভাই-বোন কিংবা বড়জোর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারনাই দিয়েছে তাহলে কাল রাতে কি এমন ঘটলো! উনি নিজের চোখের দেখাকে মিথ্যা ভাবতে পারছেন না আবার এতদিনের দেখাটাকেও অগ্রাহ্য করতে চাচ্ছেন না। সব কিছু মিলিয়ে উনার কাছে সব কেমন ঘোলাটে লাগছে তাছাড়া বিগত কয়েকদিনে সম্রাটের ব্যবহারেও কিছু একটা আঁচ করতে পারছেন।
গ্যারেজে ঢোকার সাথে সাথেই চোখে পড়ল বাইরে রাখা চৌকির উপর মাথা নিচু করে বসে থাকা সম্রাটকে। জব্বার মন্ডল কে দেখে ছেলে দুইটার থেকে একজন দৌড়ে আসলো , জব্বার মন্ডল এখনো বেশ কষ্ট করে হাঁটছেন তবুও উনি মনের জোরেই আসলেন কারন কিছু বিষয় দেরি করলে আরো বিগড়ে যায়। উনি সম্রাটের চোখে তানহার জন্য অন্য কোন অনুভূতি নয়,দেখেছে সহানুভূতি,স্নেহ কিংবা যত্ন আর উনি একজন পুরুষ মানুষ সুতরাং উনি কিছুতেই এটাকে ভালোবাসা বলতে পারেন না। আর নিজের এত আদরের সন্তানকে এমন একজনের হাতে তুলে দিতে পারবে না যার ভেতরে অন্য কেউ থাকবে,যেকিনা তার মেয়েকে ভালোবেসে আগলে রাখবে না।উনি বুঝেন ভালোবাসার কদর। তাছাড়াও সম্রাট যদি অন্য কাউকে নিজের মনে জায়গা দিয়ে রাখে তাহলে প্রশ্নই উঠে না তানহার সাথে ওকে বেঁধে দেওয়ার। সবকিছু বিবেচনা করেই সামনে এগোতে হবে।
সম্রাট:-মামা আপনি এই শরীরে কেন আসতে গেলেন আর হাসপাতাল থেকে আপনাকে ছাড়লোই কেন?
জব্বার মন্ডল:- আমি ঠিক আছি তুমি অস্থির হইয়ো না!
সম্রাট:- মামা;আপনি যা,,, !
সম্রাটের কথা হাত দিয়ে থামিয়ে দিলেন জব্বার মন্ডল,সম্রাট সবটা জানার পর বেশ লজ্জায় আছে তারচেয়ে বেশি আছে জব্বার মন্ডলের বিশ্বাস ভঙ্গের,যদিও এতে ওর হাত নেই তাতে কি যদি না জব্বার মন্ডল ওকে বিশ্বাস না করে। নিজের মেয়ের চেয়ে কি ও গুরুত্বপূর্ণ?
আমি কি বলবো,কি ভাববো সেটা বড় কথা নয়! আমি আসল বিষয়টা জানতে চাই। !!
সম্রাট:- মামা; আমি সত্যি বলছি গত রাতের কোন কিছুই আমার মনে নেই। কখন কি হয়েছে তাও কিছু মনে করতে পারছি না। মামা আমি আসলে কালকে ডাবল স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম তাই কিছুই মনে করতে পারছি না।
সম্রাটের কথা শেষ হতে না হতেই জব্বার মন্ডল বুকে বেশ চাপ অনুভব করলেন,সম্রাট দেখলো উনি প্রচন্ড ঘামছেন তাই তাড়াহুড়ো উনাকে ধরাধরি করে উনার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে নিয়ে গেলেন,রুমটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।
পর্ব ৩১
প্রাথমিক চিকিৎসায় জব্বার মন্ডল কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন এবং ক্লান্ত ও মানসিকভাবে দুর্বল থাকায় ওই সময় ঘুমিয়ে পড়েন।সেই ঘুম ভাঙ্গে দুপুরবেলা। চোখ খুলে উনি নিজের পাশে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে ঘুমন্ত সম্রাটকে দেখে। ছেলেটার মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে,চোখ গুলো যেন ভেতরে ডেবে গেছে,মুখটাও একটুখানি হয়ে আছে।উসখুশকো চুল,উনি ছোট্ট একটি দম ছাড়ে। তারপর চোখ ঘুরিয়ে নিজের টেবিলের দিকে চোখ পড়তেই মনে পড়ল, কেন এত প্রেশার নিচ্ছে,উনি যা জানতে চান তা তো এমনিতেই জানা সম্ভব। আস্তে ধীরে উঠে,খুব কষ্ট হচ্ছে! যেখানে ডাক্তার সম্পূর্ণ বেড রেস্ট দিয়েছে সেখানে উনি হসপিটাল থেকে সরাসরি এখানে এসে এত প্রেসার নিচ্ছেন!
উনি ওনার টেবিলে বসে গ্যারেজের নিরাপত্তার জন্য লাগানো সিসি ক্যামেরার গতকালের ভিডিও ফুটেজ দেখে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। তানহা নিজের অজান্তেই সম্রাট এবং তার নিজের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি করেছে।উনি ফুটেজে যে তানহার গ্যারেজে ঢুকা থেকে শুরু করে পারির চলে যাওয়া, সম্পূর্ণ ভিডিওটি দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। বুঝতে পারছে সম্রাটের জীবনে একটা বড় ঝড় আসতেছে।
সম্রাট:- মামা আপনি ওখানে কি করছেন, আপনি এতটা খামখেয়ালি কেন করছেন! ডাক্তার আপনাকে সম্পূর্ণ আরামে থাকতে বলেছেন আর আপনি এখানে তো এসেছেন ই তার উপর!
পিছন থেকে সম্রাটের কথায় জব্বার মন্ডল পিছু ঘুরে সম্রাটকে দেখেন,নিরব চাহনিতে তাকিয়ে থাকেন , বাইরের দৃশ্য দেখলেও ভেতরের খবর এখন উনার ওর কাছ থেকেই জানতে হবে, কিছু করার নেই,এখন জিজ্ঞেস না করলে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে কারন উনি বর্তমানে সম্রাট আর পারির সম্পর্কে সব কিছুই জানেন তাই উনি চাননা উনার মেয়ের একতরফা ভুলের মাশুল দুটি ভালোবাসার মানুষ দিক,এতে কেউ ভালো থাকবে না।পারিকে উনি দেখেছেন, দুএকবার কথাও হয়েছে,মেয়েটিকে উনার কাছে অসাধারণ লেগেছে,এত ধনী পরিবারের হয়েও কোন অহংকার নেই। কখনো কখনো উনি মনে হতো মেয়েটা তানহার কপি।তানহার মাঝেও কখন উনি ধনী গরীবের ভেদাভেদ দেখেনি মেয়েটিও তেমন। তাই নিজের মেয়ের কষ্টে উনি যতটা আঘাত পাবেন ঠিক ততটাই অনুভব করবেন এ মেয়েটার কষ্ট।তার চেয়েও পাবেন সম্রাটের জন্য।
জব্বার মন্ডল:- আমি ঠিক আছি,আরো ঠিক থাকবো যখন তোমরা সবাই ঠিক থাকবে!
সম্রাট মাথা নুইয়ে রেখেছে,কি বলবে বুঝতে পারছে না।
জব্বার মন্ডল:- আমি তোমাকে বিশ্বাস করি ঠিক তেমনি বিশ্বাস করি আমার মেয়েকেও। তুমি জানো আমার কাছে তুমি কতটা আপন তাই চাইতেও কখনো তোমার প্রতি বিশ্বাস হারা হইনি আজো চাইবো না তাই আশাকরি তুমি সত্যটাই বলবে।আমি আমার মেয়েকেও জিজ্ঞেস করতে পারতাম কিন্তু তাও করিনি কারণ আমি চাই তুমি বলো।
সম্রাট:- মামা আমি আসলেই জানিনা গতরাতে কি হয়েছিলো? আমার প্রচুর মাথা ব্যথা করার কারনে আমি স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম ,আর সেটা ভাঙ্গে আপনার অসুস্থতার সময় ওদের দেওয়া পানিতে। আপনি যখন হাসপাতালে ছিলেন তখনও আমি ঘুমের ঘোরেই ছিলাম তাই আমি চাইলেও এর বাইরে আর কিছুই বলতে পারবো না। কিন্তু মামা বিশ্বাস করেন আমি তানহাকে নিজের বন্ধু ছাড়া কখনো অন্য চোখে দেখিনি। আমার কাছে ও আমার ছোটবোনদের মতোই।
কিছুটা দম নিয়ে আবার ও বলা শুরু করে,
সম্রাট:-আপনি তো জানেন আমি পারিকে কতটা ভালোবাসি! ওকে ছাড়া অন্য কাউকে! আমি এটা ভাবতেও চাই না!
জব্বার মন্ডল উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন,সম্রাট এগিয়ে এসে উনার হাত ধরে সাহায্য করে,
সম্রাট:- মামা কিছু দরকার? আমাকে বলেন!
জব্বার মন্ডল:-আমি বাড়ি যাবো!
সম্রাট:-জ্বী আমি এগিয়ে দিয়ে আসছি।
জব্বার মন্ডল:-হুম চলো!
জব্বার মন্ডলকে গাড়ীতে উঠিয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসতে যাবে তখনই জব্বার মন্ডল সম্রাটের হাত দুটো আঁকড়ে ধরে, সম্রাট পিছু ঘুরে জব্বার মন্ডলের দিকে প্রশ্নাত্নক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে,
জব্বার মন্ডল:-কখনো যদি মনে হয় আমার মেয়ের কারনে তোর কোন ক্ষতি হয়েছে তাহলে মাফ করে দিস বাপ! আমি তোকে নিজের ছেলের আসনে বসিয়েছি,তুই ওদের কখনো আমার অনুপস্থিতিতে ফেলে দিস না!
সম্রাট:- মামা কি বলছেন! ওরা আমার কাছে সোহা,রুহার মতোই! ওদেরকে কখনোই নিজের পরিবারের বাইরে ভাবিনি। সুতরাং ওদের ফেলে দেওয়ার কথা আসবেই না কখনো। মামা আমি আপনার নুন খেয়েছি,আজ আমি যা তা উপরওয়ালার ইশারায় আপনার উছিলায়ই। আপনি না থাকলে তো আমি সামান্য রিক্সাওয়ালার ছেলে হয়েই থাকতাম হয়তো, সেখানে! আপনি দয়া করে এমন কথা আর কখনো বলবেন না প্লিজ।
জব্বার মন্ডল:-আমি জানি তবুও!
সম্রাট:-কোন কথা নয়।চুপ থাকেন,ডাক্তার আপনাকে রেস্ট নিতে বলেছে আর আপনি!
দুর্বল হাতের শক্ত থাপ্পড়ে মুখ থুবড়ে নিচে পড়ে আছে তানহা,তার বাবা তার প্রতি রাগ করবে সেটা জানলেও গায়ে হাত তুলবে সেটা সে কখনো ভাবতেই পারেনি। তবুও সে চুপ করে আছে, নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে কারন সে অপরাধী।তার অপরাধ হচ্ছে পাবে না জেনেও ভালোবাসা, অধিকার নেই জেনে ও অধিকার ফলানো।
জব্বার মন্ডল:- আমার ভাবতেই লজ্জা হচ্ছে তুমি আমার মেয়ে,কি করে পারলে এরকমটা করতে? যদি ঐসময় আমি না হয়ে অন্য কেউ হতো! কি হতো তার পরিস্থিতি বুঝতে পারছো তুমি?
তানহা:- বাবা আমি!
জব্বার মন্ডল:-চুপ; একটা কথাও আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই না! চলে যাও আমার সামনে থেকে!
বাবার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় , কষ্টে লজ্জায় তানহা আর কোন কথা না বলে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে যায়, সারাদিন এভাবেই ঘরে বসে কাটিয়ে শেষ করে, এদিকে সম্রাট পারির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে কিন্তু পারির ফোনে কল হচ্ছে তবে কেউ ধরছে না।ধরবে কি করে সেই রাতের ঘটনার পর পারি ফোন কোথায় রেখেছে তা তার নিজেরই জানা নেই। দুশ্চিন্তা সম্রাটের অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে।
তানহা সারাদিন কান্না করে কিন্তু রাতের বেলা সম্রাটকে ফোন করে সরি বলে,সম্রাট ও ক্ষমা করে দেয়।তানহা জানে সম্রাট সেদিন রাতে পারির আসার কথা সম্রাট জানে না তাই বুদ্ধি খাটিয়ে বলে,
তানহা:-আচ্ছা পারির কি খবর?তোমরা বিয়ে কবে করছো!
তানহা পারির কথা জানলেও সম্রাট জানে না,তাই ও বোঝার চেষ্টা করছে সম্রাটের সাথে পারির আর দেখা হয়েছিলো কিনা!
সম্রাট:-আর বিয়ে! যাকে বিয়ে করবো সে তো ফোনই তুলছে না!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাটা বললো সম্রাট,তানহার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো,ওর করা ভুলের জন্য সম্রাট পারির সম্পর্কে ফাটল না ধরলেই হয়! আচ্ছা এরকম যদি হয় আর সম্রাট জানতে পারে এর জন্য তানহা দায়ী তাহলে কি সম্রাট কোনদিন তানহাকে ক্ষমা করতে পারবে।যদি সম্রাট তানহার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় না রাখে, যদি বাবার মতো সে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়,যদি চিরতরে তাদের দেখাশোনা বন্ধ করে দেয়! তাহলে? কিভাবে বাঁচবে তানহা! সম্রাটের ভালোবাসা না ই পেল বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে তাদের মাঝে যে দেখা সাক্ষাৎ আছে,কথা হয়, অন্তত সপ্তাহে একদিন সম্রাটের মুখ দেখতে পায় সেটাই তো অনেক! এটাও যদি বন্ধ হয়ে যায়, হারিয়ে যায় তাদের বন্ধুত্ব তাহলে!
না আর পারছে না ভাবতে তানহা! নিজের কাছেই নিজেকে অসহ্য লাগছে!
জব্বার মন্ডল:-মামা কেমন আছেন এখন?
অস্থিরতার মাঝে অব্যহতি পেল সম্রাটের প্রশ্নে, নিজেকে ঠিক করে বললো,
তানহা:-ভালো আলহামদুলিল্লাহ।
একটু সময় থেমে আবারও জানতে চাইলো,
তানহা:-তোমার সাথে কি ওর ঝগড়া হয়েছে?
সম্রাট:-কার সাথে! পারির সাথে?
তানহা:- হুম!
সম্রাট:-কি যে বলো! পারি আর ঝগড়া!
তানহা:-কেন?
সম্রাট:-ও পুরো পৃথিবীর সাথে ঝগড়া করতে পারলেও আমার সাথে পারে না!
তানহা:-মানে?
সম্রাট:-মানে খুব সহজ! আমার সাথে ঝগড়া ওর দ্বারা সম্ভব নয়! আমি অনেক চেষ্টা করছি অন্তত মজা করে হলেও এক দুবার ঝগড়া করতে কিন্তু সে তা কিছুতেই করে না।
তানহা:-মানে তোমাদের মাঝে ঝগড়া হয় নি কখনো!
সম্রাট:-না ঝগড়া হয় না তবে মান অভিমানের প্রতিযোগিতা হয়!
তানহা:-মানে কি!
সম্রাট:-ওর যখন কোন বিষয়ে রাগ হয় তখন সে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে,কথা বলাও বন্ধ করে দেয়! কান্নাকাটি করে চেহারার হাল বেহাল করে ফেলে। অন্যসব প্রেমিকাদের মতো চিৎকার চেঁচামেচি করে না,যখন তখন ব্রেকাপের থ্রেট ও দেয় না। ওর ঐ যে গাল ফুলিয়ে বসে থাকা,কথা বন্ধ করে দেওয়া ওগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেই আমার অবস্থা যাচ্ছে তাই হয়ে যায়।ওর চোখের পানি আমার ভেতরে সবচেয়ে বেশি আঘাত করে এর চেয়ে বেশি সহজ হতো ঝগড়া করে যখনকার বিষয় তখনই শুধরিয়ে নেওয়া। কিন্তু ঐ মেয়ে তা করবে না! সত্য মিথ্যা বোঝার দরকার নেই তার দরকার আমার উপর নিরবে আঘাত করা আর ও তাই ই করে!
কথা শেষ করে সম্রাট ছোট্ট একটা দম ছাড়লো,তানহার মাঝে অনুশোচনা আর অপরাধবোধ আরও তীব্র হলো,তার সাথে ভয় বাড়লো যদি পারির না বুঝেই সম্রাটকে দোষারোপ করে তাহলে!
সম্রাট:-ভাবছি ওদের বাসায় যাবো!
তানহা:-কেন?
সম্রাট:-ফোন তুলছে না;সেদিন ওর বাবার সাথে দেখা করে আসার পর ফোন দিয়েছিলো আমি বেশ রুডলি কথা বলেছিলাম হয়তো তার জন্য কষ্ট পেয়েছে,তাই রাগ করেই ফোন বন্ধ রেখেছে! এখন যা করার আমাকে সরাসরি গিয়েই করতে হবে!
তানহা:-ভার্সিটি গিয়ে দেখো!
সম্রাট:-আমার সাথে রাগ করলে তার ভার্সিটি ও অফ যায়! তবুও আমি ফোন দিয়েছিলাম ওর বান্ধবীদের। তারা জানালো আজ চারদিন ভার্সিটি যায় না এবং কোনরকম খবর ও কেউ জানেনা।
তানহা:-কি বলছো!
সম্রাট:-হুম
তানহা:-তাহলে এবার?
সম্রাট:-বাসায় যাবো যাই হয়ে যাক!
তানহা:-ওহ!
সম্রাট পারির বাসায় তো যায় কিন্তু তার জন্য যেই সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিলো তার জন্য মোটেও সে প্রস্তুত ছিলো না।পারির বাড়ির রাস্তায় যেতেই ঝলমলে আলোতে সম্রাটের চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম, কিন্তু তার হৃদয় ঝলসে গেল তখন যখন সে দেখলো তার পথ অতিক্রম করে তার সামনে দিয়েই তার প্রিয়তমা অন্য কারো অর্ধাঙ্গিনীর বেসে চলে যাচ্ছে।হ্যা সেইদিন রাতেই রোহানের সাথে পারির বিয়ের হয়, লোকজনের সমাগম খুব বেশি না হলেও বাড়ির সাজসজ্জায় পরশ আবরার চৌধুরী কোন কমতি রাখেনি। মেয়েকে বিদায় সে রাজকীয় হালেই দিয়েছে,সম্রাট যখন পারির বাড়ি একরকম সাজে দেখলো তখনই ভেতরটা কেঁপে উঠলো, হারিয়ে ফেলার ভয়ে ওর পা জমে যাচ্ছিলো, অনুভব করছে হারিয়ে ফেলেছে সে তার হৃদমোহিনীকে,দুরে চলে যাচ্ছে তার প্রাননাশিনী। পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো মেইন ফটকের কিছুটা দুরে,আপন মনেই গড়িয়ে পড়লো নোনাজল।মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরেই বের হলো
সম্রাট:-সর্বনাশি!
সেদিন সেই নদীর পাড়ে চিৎকার করে কেঁদেছিলো সম্রাট! পুরুষের কাঁদতে নেই এই চিরায়িত মিথ্যা কথাটা কে সেদিন ভুলেই গিয়েছিল, সম্রাটের আর্তনাদ বাতাসের বেগে পৌঁছে গিয়েছিল তার সাথে জুড়ে থাকা প্রতিটি মানবের অন্তরে! দেখেছিল হৃদয় ভাঙা এক আহত প্রেমিকের জীবন্ত মরদেহ।
জব্বার মন্ডল নিজ সন্তানের করা অপরাধের দায়ে এতটাই অনুশোচিত হয়েছিলো যে তার জীবন যাপনেও সেটার প্রভাব পড়তে লাগলো, সম্রাটের মুখের দিকে তাকালেই তার মনে হতে লাগলো কোথাও না কোথাও এর জন্য তিনিই দায়ী।পারিকে হারিয়ে সম্রাট একদম ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছিলো, বেঁচে থাকার ইচ্ছা ও যেন ক্রমশ লোপ পাচ্ছিলো, তবুও জোর করেই বেঁচে থাকা আছে কারন তার কাঁধে ছিলো পরিবারের দায়িত্ব, অবিবাহিত বিবাহ যোগ্য বোনদের দায়িত্ব, অসহায় হতদরিদ্র মা বাবার দায়িত্ব।সব কিছু তাকে জোর করেই বাঁচাতে লাগলো।
সম্রাটের নিঃসঙ্গতা কাটাতেই তানহা আবারও সম্রাটের দিকে এগিয়ে এলো, তার মনে অনুশোচনা কাজ করলেও কোথা না কোথাও খুশির প্রলেপ ছিলো এই ভেবে যে সম্রাটের জীবনে পারির প্রবেশ নিষিদ্ধ।
নিজের ছন্নছাড়া জীবনে তানহার মতো বন্ধুকে পেয়ে একটা সময় সম্রাটও তানহার প্রতি নির্ভর করতে লাগলো তবে সেটা কেবল বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রেখেই ।এই বিষয়ে তানহাও অবগত ছিলো কিন্তু ওর মনে হতে লাগলো এক সময় এভাবেই সম্রাটের মনে সে জায়গা করে নিবে।
তানহার স্পর্শে সম্রাটের স্বাভাবিক হতে কিছু বেশি সময় লাগলো। প্রথমে এই বিষয়ে তানহার প্রতি জব্বার মন্ডল রাগ করলেও পরবর্তীতে মনে করলেন যদি ওদের ভাগ্য ওদের এভাবেই এক সাথে রাখেন তাহলে তাই হোক।এতে করে নিজের মেয়েও খুশি থাকবেন আর সম্রাট ও অতীতকে ভুলে সামনে এগোতে পারবেন।
মেয়ের করা অন্যায়ের কাফ্ফারা দিতেই সম্রাটকে উনি উনার ব্যবসায়ের সাথে পুরোপুরি জড়িত করলেন,গাড়ীর ব্যবসায় ফিফটি পার্সেন্ট এর অংশীদার করে দিলেন যেটা তখনো সম্রাটের জন্য ছিলো অজ্ঞাত।
পর্ব ৩২
দেখতে দেখতে সময় কেটে গেছে অনেকটা, পারির সাথে বিচ্ছেদের সময় প্রায় তিন মাস, এই তিন মাসে বদলেছে অনেক কিছু, তানহা সম্রাটের বন্ধুত্বের গভীরতা বেড়েছে, পারিকে ভুলে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা সম্রাট করেছে,এর সাথে বদলেছে নিজেকে, করেছে গম্ভীরতা আর কঠোরতার বেড়াজালে আবদ্ধ। আগের সেই চন্ঞল, হাসিখুশি সম্রাট আর নেই।এখন যেন হাসিটা তার জন্য বিষাদের ন্যায় লাগে।পারি নামক অধ্যায় বন্ধ করার সাথে সাথে নিজের জীবনের অনেক অধ্যায়ই সে বন্ধ রাখতে চায়।
তার সাথে সম্রাটের মনে এক ভ্রান্ত ধারনার জমা হয়েছে পারিকে নিয়ে। সম্রাটের মনে হতে লাগলো পারি ওর বাবার কথায় ওকে ছেড়েছে,হয়তো কোথাও উপলদ্ধি করতে পেরেছে যে সম্রাট তার জন্য যোগ্য পাত্র নয়,তার বিলাসী জীবনের কোনটাই তার দ্বারা পূরন করা সম্ভব নয়,সম্রাট স্বীকার করে তার অক্ষমতা কিন্তু পারি তো সবই জানতো;সব জেনেই সম্রাটকে বাধ্য করেছিলো তাকে ভালোবাসতে তাহলে আজ কেন পাগলের মতো ভালোবাসার পর টাকার কাছে তার ভালোবাসা হেরে গেল? কেন পারি তাকে এভাবে আঘাত করলো? সম্রাটের মনে প্রশ্নটা ঘুরপাক খায় কিন্তু?
সেদিনের পর সম্রাট পারির আর কোন খোঁজ খবর নেয়নি।আসলে নিতেই চায়নি।কারন সে এখন অন্যের ঘরনী! আর কি দরকার পুরোনো ডায়েরী ঘেঁটে তার জীবনে অশান্তি তৈরি করার! সে সুখে থাকতে চেয়েছে, হ্যা সুখে থাকার জন্যই তো তাকে ছেড়েছে তবে থাক সে সুখে।আগুন না হয় জ্বলুক আমার বুকে!
গান
"তোমরা সবাই থাকো সুখে;
আগুন জ্বলুক আমার বুকে"
আজকাল এই গানটা সম্রাটের খুব পছন্দের তালিকায় রয়েছে! কোথাও না কোথায় এই গানের মাঝে নিজের অনুভূতি খুঁজে পায়!
সারাক্ষণ কাজের মাঝে ডুবে থাকে,কারন একটাই যেই টাকার জন্য এত ভালোবাসার পরেও সে তার ভালোবাসার মানুষটিকে পেলো না সেই টাকা ইনকাম করা, মনের মধ্যে এক অদৃশ্য জিদ তৈরি হওয়া আর সেটা হলো 'টাকা' ইনকাম করা, টাকার পাহাড় গড়া । মনের যন্ত্রনা শরীরে অতিরিক্ত কাজের প্রেসার দিয়ে ভোলার অধম্য চেষ্টা করা। এর মাঝেই জব্বার মন্ডলের গাড়ীর ব্যবসার প্রসার ঘটানোর একটা বিশাল সুযোগ পেল।সম্রাট খুঁজে পেল নিজেকে তুলে ধরার একটা অপশন।
জব্বার মন্ডলের গাড়ীর ব্যবসার পুরো বিষয়টি নিজ তত্ত্বাবধায়নে করার প্রস্তাব রাখলো, খুশি হলেন জব্বার মন্ডল,হাতে তুলে দিলেন নিজের স্বপ্নকে। বিশ্বাস ছিলো সম্রাটের প্রতি,রাখলো সেই বিশ্বাসের মর্যাদা। তবে জব্বার মন্ডলের ভাগ্য হলো না সম্রাটের সফলতা চোখে দেখা।
বছর ঘোরার আগেই যখনই ব্যবসায়ের অবস্থা ঘুরে দাঁড়ালো ঠিক এমনই একদিন হঠাৎ করেই আসলো সেই দূর্ঘটনার দিন!
জব্বার মন্ডল গ্যারেজে কাজ শেষ করে রাত বারোটার পর বাড়ির উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ করেই পিছন থেকে দ্রুতগতির একটা বাইক এসে ধাক্কা দেয়।বাইকার ছেলেগুলোও ভয়াবহ আঘাত পায়, জব্বার মন্ডল ধাক্কা খেয়ে ছিটকে বিদ্যুৎতের খুটির সাথে খুব জোরে বারি খায়।এতে করে উনি মাথায় প্রচন্ড আঘাত পায়, তৎক্ষণাৎ প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়।যেহেতু প্রায় অনেক রাত ছিলো তাই অনেক সময় ঐ অবস্থায়ই তিনজনই রাস্তায় পড়ে থাকে। প্রায় আধঘন্টা পর তাদেরকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। একটা ছেলে হাসপাতালে নেওয়ার সাথে সাথেই মারা যায়, অপরজনের অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল থাকে, সাথে জব্বার মন্ডলের ও!
প্রায় তিনদিনের যুদ্ধ শেষে জব্বার মন্ডল পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।ঐ সময় সম্রাটসহ তানহার পুরো পরিবার অনেক চেষ্টা করেন জব্বার মন্ডলের জীবন বাঁচানোর, কিন্তু উপরওয়ালার ইচ্ছার কাছে সবাইকেই হার মানতে হয়।
জব্বার মন্ডলের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা খরচ হয় ,এর দরুন উঠতি ব্যবসায় ও অনেক প্রভাব পড়ে।
সম্রাট আশ্চর্য হয় যখন জানতে পারে জব্বার মন্ডল সম্রাটকে তার ব্যবসায়ের অর্ধেক অংশ দিয়ে গেছে।
জব্বার মন্ডল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ মুহূর্তে শুধুই সম্রাটের সাথে কথা বলেছিলো যা ছিল,
জব্বার মন্ডল:- বা-আ-আ-প;
কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে, তবুও সম্রাটের হাত দুটো ধরার জন্য নিজের দুর্বল হাতটা এগিয়ে দেয়, তুলতে কষ্ট হচ্ছে ; তার কষ্ট দেখে সম্রাট নিজেই এগিয়ে গিয়ে জব্বার মন্ডলের হাত দুটো আগলে ধরে নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে নিরবে অশ্রু জড়িয়ে বলতে লাগলো,,
সম্রাট:-মামা প্লিজ শান্ত হোন! আপনার কষ্ট হচ্ছে,একটু শান্ত হোন!
জব্বার মন্ডলের কষ্ট হচ্ছে কথা বলতে, খুবই আস্তে ধীরে ধীরে ভেঙে ভেঙে বলছেন
জব্বার মন্ডল:- বা-আ-প,আমি তো-ও-ওকে কখনো নি-ই,নি-ইজের ছেলের বাই-ইরে ভাবিনি! সওবব- সময় তোকে ছেলের মতোই দে-এখ-ছি, তুই জী-ই-বওনে আ-আসার আগে ছেলের কমতি মনে হ-হ-লেও তোকে জী-ইবনে পাও-ওয়ার পর কখনো সেইই কমতি মনে হয় নি।
জব্বার মন্ডল:-মামা আমি জানি আপনি সবসময় আমাকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবেসেছেন! আপনার অনুগ্রহ না থাকলে কখনোই হয়তো আজকের এই সম্রাট হতো না! আমি উপরওয়ালার প্রতি শুকরিয়া আদায় করে শেষ করতে পারবো কারন উনি আমার জীবনে আপনার মতো একজন বাবার ছায়া দিয়েছেন তাই অনুরোধ করছি মামা আমার মাথার উপর থেকে বাবার এই ভরসা ভরা হাতটা সড়াবেন না,পারবো না বাঁচতে মামা! প্লিজ মামা প্লিজ। অন্তত আপনার জন্য কিছু করার সুযোগটা একবার দেন!
সম্রাটের আকুতি ভরা কান্না আর জব্বার মন্ডলের কষ্ট দেখে কিছুটা দুরে রুমের এক কোনে দাঁড়িয়েই কাদছে বাকীরা, সম্রাটের পরিবারের সবাই ও আছে।
জব্বার মন্ডল:- আ-আ-মি এই শে-এ-ষ বেলায় এ-একটা জিনিস চাই-ইবো দিবি?
সম্রাট:-মামা! আপনার জন্য জীবনটা দিতে পারি আর আপনি চাইলে দিবো না এমন কি আছে?
য-ও-দি মনে হ-য় আ-আমার অথবা আ-মাআ-র প-রিইবা-আ-রে-র কা-র-ও-নে তোর কোন ক্ষতি হয়েছে তা-আহলে মা-ফ করে দিস বাআপ;
সম্রাট:- মামা কি বলছেন! আপনার জন্য আমার কি ক্ষতি হবে!
জব্বার মন্ডল:-কথা দে ক্ষ-ওমা ক-ওরে দি-ই-ইবি!
সম্রাট:-মামা!
জব্বার মন্ডল:-কথা!
সম্রাট:-মামা!
জব্বার মন্ডল:-ক-ও-থা!
তানহা:- সম্রাট প্লিজ বাবার কথা শোনো,বাবার কষ্ট হচ্ছে!
জব্বার মন্ডলের শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত গতিতে চলছে, বুঝতে পারলো সবাই উনি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, সম্রাট কথা দিলো! তানহা, মানহা ওদের মা দৌড়ে সামনে এগিয়ে এলো,সবার কান্নার শব্দে চারদিকে বেদনার সুর ভয়ে যাচ্ছে। জব্বার মন্ডল সম্রাটের হাতটা শক্ত করে ধরলেন, সেটা দেখে তানহা উক্ত কথাটি বললো,তানহা ওর বাবার এক হাত নিজের হাত নিলো,
সম্রাট:-কথা দিলাম!
জব্বার মন্ডল চোখের ইশারায় নিজের স্ত্রী কন্যাদের হাতগুলো বাড়িয়ে দিতে বললেন,সবাই হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পর হাতগুলো সম্রাটের হাতের উপর রেখে বললেন,
জব্বাল মন্ডল:- উ-উপ-র আল্লাহর পর জমি-ই-নে তোর কা-আছে আমা-মানত রে-এখে গেলাম,রোজ হাশরে আমি আমার আমা--আনত বুঝে নি-ইই-বো! খেয়াল রাখিস নি-ই-ইজের পরিবার মনে করে!
নিজের স্ত্রী কন্যাদের মুখপানে তাকিয়ে বললো,
জব্বার মন্ডল:-আজ থেকে আল্লাহর পর এই দুনিয়ায় অভিভাবক বলতে আমি ওকেই রেখে গেলাম তোমাদের জন্য! ওর অসম্মান করো না! মনে রেখো ও-ওকে কষ্ট দে-ও-ওয়া, আঘাত করা মানে আমাকে অ-অস-ম্মান করা,আ-আঘাত করা!
মানহা:-বাবা আমরা তোমার সব কথা রাখবো! তুমি প্লিজ একটু শান্ত হও!
জব্বার মন্ডল সবার মুখের দিকে একবার চেয়ে,নিজ পত্নীর মুখপানে তাকিয়ে ভালোবাসা ভরা মুগ্ধতায় ঘেরা অকৃত্রিম হাঁসি দিয়ে,
জব্বার মন্ডল:- লা ই -ইলা-হা ইল্লাল্লাহ -উ- মুহা-ম্মা-দুর রাসু-উ-লুল্লাহ !
পবিত্র কালিমা পড়েই, সম্রাটের বাহুর উপরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন!আর দিয়ে যান সম্রাটের কাঁধে একরাশ দায়িত্ব।
জব্বার মন্ডলের মৃত্যুর সাত দিনের মাথায় তার পারিবারিক এডভোকেট এসে জানালো, জব্বার মন্ডলের সমস্ত সম্পত্তি উনি অনেক আগেই উইল করে গিয়েছেন। যার মধ্যে গাড়ীর ব্যবসার অর্ধেক অংশ সম্রাটের,বাকী অংশ তানহা মানহার।উনার বর্তমান বাড়ির মালিকানাও তানহা,মানহা তবে অবশ্যই উনার স্ত্রীর দেখভালে কোন গাফিলতি হলে এই সম্পত্তি সরকারি এতিমখানায় চলে যাবে।উনার গ্রামের সম্পত্তিও উনি উনার স্ত্রীর নামে করে দিয়েছেন, সেখানে বিভিন্ন ভাবে আয় কৃত অর্থ দিয়ে তানহা,মানহার উচ্চ শিক্ষা এবং বিয়ের কাজ সারবেন এরপর উক্ত সম্পতিতে ওদের কোন অধিকার থাকবে না তারপর সেই সম্পতির বিষয়ে উনার স্ত্রীর সিদ্ধান্তই সব।গ্যারেজের জমির মালিকানা তানহার নামে তবে সেখান থেকে আয় কৃত অর্থ সম্রাটের,আর অবশ্যই সম্রাট জমির জন্য ভাড়া বাবদ কিছু অর্থ তানহাকে দিবে আর সেই সংখ্যা তানহা নিজেই ঠিক করে নিবে। বনানী সুপার মার্কেটে উনার তিনটা দোকান আছে,সেখানের দুটো দোকান উনি উনার দুই মেয়ের নামে এবং একটি দোকান সম্রাটের নামে করেছেন। উনার লাইনে তিনটা বাস আছে, সেখানের একটা বাস সম্রাটের,একটা মানহার আর একটা স্ত্রীর নামে।প্রাইভেট গাড়ী দুটো সবার ব্যবহারের জন্যই রেখেছেন। হিসেব মতো সম্পত্তিতে তানহার অংশ কম ছিলো , প্রথমত কারন ছিলো ওর করা অন্যায়,যাতে যথেষ্ট পরিমাণ রেখেছিলেন দ্বিতীয়ত্ব তানহার পড়াশোনা মোটামুটি শেষ পর্যায়ে অর্থাৎ তানহা অনার্স সম্পূর্ণ করেছে বাকীটা সে নিশ্চয়ই নিজেই ম্যানেজ করে পড়তে পাড়বে যদিও বেশি পড়াশোনা করার ইচ্ছা তানহার নেই সুতরাং উনি বুঝতে পারছিলেন তানহার পড়াশোনা এখানেই শেষ।আর এই তুলনায় মানহার মাত্র শুরু,সবেই মাত্র ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো,আর ওর অনেক পড়ার ইচ্ছা। সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনের খুব ইচ্ছে, সবচেয়ে বড় কথা মানহা শিক্ষার্থী হিসেবে অনেক ভালো,সব কিছুই যেমন তেমন করলেও পড়াশোনার বিষয়ে মানহা যথেষ্ট সচেতন। সুতরাং ভবিষ্যতে পড়তে যেন কখনো অর্থনৈতিক সমস্যার শিকার না হতে হয় তাই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্যই উনি এইভাবে সম্পত্তি বন্টন করেন।এতে অবশ্য তানহার কোন সমস্যা নেই।
পর্ব ৩৩
সম্রাটকে নিজেদের অভিভাবক হিসেবে মেনে নিতে জব্বার মন্ডলের পরিবারের কারোই কোন আপত্তি নেই।থাকবেই বা কেন, জব্বার মন্ডলের স্ত্রী নিজেও সম্রাটকে নিজের ছেলে ভাবেন।মানহা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, সম্রাটের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলো জব্বার মন্ডলের উপস্থিতিতে,সেটা অবশ্য সম্রাট বিশালের বিরুদ্ধে সব প্রমান দেখানোর পরই। বরাবরই মানহার কাছে সম্রাট বড় ভাইয়ের মতোই তাই নিজের পিতার অবর্তমানে তার রেখে যাওয়া অভিভাবককে মেনে নিতে তার কোন অসুবিধা নাই।তানহা তো সম্রাটকে অভিভাবকের জায়গা অনেক আগেই দিয়েছে।
এই বিষয় নিয়ে জব্বার মন্ডলের আত্নীয় স্বজন থেকে শুরু করে পাড়া প্রতিবেশীরাও অনেক কথা ছড়াছড়ি করেন,তার অনেক আত্নীয়-ই যারা ভেবেছিলেন জব্বার মন্ডলের ছেলে নাই, সুতরাং ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী জব্বার মন্ডলের মেয়েদের পর বাকী সম্পত্তি তাদের নামে চলে যাবে তারা বেশ ক্ষেপে যান, সম্রাটের নামে অনেক কথা রটাতে চেষ্টা করে এমনকি তানহাকে জড়িয়ে বাজে কথার গল্প বানাতেও কম চেষ্টা করেন না।কেউ কেউ সম্রাটকে ঘর জামাই করার কথাও বলেন, সম্রাটের সামনে দাঁড়িয়েও সম্রাটের পারিবারিক অবস্থা নিয়ে কটুক্তি করতে তারা পিছু পা হননি।
এভাবেই চলছিলো তাদের জীবন,সব রকমের নোংরামি কে পায়ে পিষে এগিয়ে চলছিলো তারা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সতর্ক আর শক্ত ছিল মিসেস জব্বার। তিনি দুই মেয়েকে যেমনি আগলে রেখেছেন তেমনি আগলে রেখেছেন স্বামীর রেখে যাওয়া অভিভাবককে ,
ছেলে তুল্য সম্রাটকে। কিন্তু কোনদিন সম্রাটকে তানহার বিষয়ে কিছুই বলেনি কারণ উনি জানতেন তানহার জন্য সম্রাটের মনে এরকম কিছুই নেই। তাছাড়াও যে পুরুষের মনে একবার অন্য নারী নিজের ভালোবাসার বীজ বপন করেছে সেই নারীকে ছেড়ে অন্য কাউকে জায়গা দেওয়া কোন সৎ পুরুষের পক্ষে সম্ভব নয় তাও যদি হয় সম্রাটের মতো পাগল প্রেমিক। তাই উনি কোনভাবেই সম্রাটের সাথে তানহাকে জুড়ে দিতে চায় না যদি না সম্রাট কোনদিন নিজে থেকে তাকে এই বিষয়ে কিছু বলেন। কারন জোর করে, অনুরোধ করে আর যাই হোক ভালোবাসা হয়না।আর উনি জেনে বুঝে নিজের মেয়েকে এমন অনিশ্চিত ভালোবাসার সংসার দিতে চায় না,যেখানে তার মেয়ে থাকবে উচ্ছিষ্ট।
এভাবে করেই কেটে গেল তাদের দিন, অনেকগুলো মাস,অনেকটা বছর! সম্রাট তানহা মিলে তাদের ব্যবসাটাকে খুব সুন্দর করে দাঁড় করালো এবং দেশের অন্যতম গাড়ি ব্যবসা কোম্পানি গুলোর মধ্যে নিজেদের অন্যতম হিসেবে তুলে ধরল, ইয়াং উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীদের মাঝে সম্রাটের নামটা এখন সবার মুখে-মুখেই থাকে, তেমনি করে তানহার নামটা থাকে ইয়াং মহিলা ব্যবসায়ীদের মধ্যে। গাড়ীর ব্যবসা বাদেও অন্যান্য ব্যবসা শুরু করলো,মার্কেটে দোকানের সংখ্যা বাড়ালো।মানহা গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করল উচ্চশিক্ষার জন্য চলে গেলো জার্মানি, সাথে করে নিয়ে গেল নিজের মাকে। সম্রাটের অধম্য চেষ্টা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে বদলে গেল তার পরিবারের ভাগ্যও। সোহার এল এল বি সম্পূর্ণ হলো,সে ব্যারিস্টারি শুরু করল, কাজ শেখার সময় নিজের এক সিনিয়র এর বন্ধুর সাথেই প্রণয়ে আবদ্ধ হলো।যার সাথে প্রণয়ে আবদ্ধ হলো সে নিজেও ব্যারিস্টার। সম্রাটের ছোট বোন রুহানি ও উচ্চ শিক্ষার জন্য আবেদন করলো এবং সে ও মেধার যোগ্যতায় চলে গেল অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়া মিসেস জব্বার এর ছোট ভাই থাকেন,উনি রুহানির নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলেন।
চলছিলো সবার দিনই কিন্তু কোথাও একটা থেমে যাচ্ছিলো কিছু মানুষের মন, সারাদিনের কর্ম ব্যস্ততায় নিজের মনের পোড়া ঘায়ের যন্ত্রনা ভুলে থাকা গেলেও গভীর রাতে যে সেগুলো বড্ড জ্বালায়। তেমনি করে জ্বলছিলো কিছু মানুষ।
মানহার সাথে মিসেস জব্বার চলে গেলে তানহা নিজের বাড়িতে একা হয়ে যায়।সম্রাট নিজের পারিশ্রমিক দিয়ে এই নিজেদের জন্য এই বাড়িটা করেছে, মিসেস জব্বার অনেকবার অনুরোধ করেছিলো পরিবার সহ তাদের বাড়িতে থাকার জন্য কিন্তু সম্রাট যায় নি। এমনকি ওর জন্য জব্বার মন্ডলের রেখে যাওয়া সম্পত্তিও নিজের জন্য ব্যবহার করেনি বরং ও নিজের পারিশ্রমিক হিসেবেই যতটুকু পাওনা তাই নিচ্ছে।
নিজের পারিশ্রমিক দিয়ে আলাদা ব্যবসা খাড়া করিয়েছে,এতে ওর বাবাও কিছু অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে,এতে করে অনেক নিন্দুকের মুখে তালা লাগাতে পেরেছে। সম্রাটের এই ব্যক্তিত্বই তানহাকে এতটা বেহায়া করেছে, সম্রাটের নিজেকে ওর থেকে দুরে রাখার প্রচেষ্টা ও বুঝে তবুও এই ভেবে থাকে যে, কোনদিন না কোনদিন সম্রাট ওকে মেনে নিবে। অপর দিকে সম্রাটের প্রতি তানহার দুর্বলতা সম্রাটের পরিবারের সবার চোখেই পড়ে এবং উনারাও তানহা কে বেশ পছন্দ করেন।
কিন্তু সম্রাটের মনের দরজা যে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে,সেখানে আর কোন নারীর প্রবেশ নিষেধ।সম্রাট কথা দিয়েছিলো তার পারীকে তাকে বিনা অন্য নারী এই বুকে জায়গা পাবে না তাহলে কিভাবে সেই কথার বরখেলাপ সে করে। সে তো ভালোবেসেছিলো ,নাই বা পাষাণী ভাসলো তাতে কি ! তার ভালোবাসা কি মিথ্যা হয়ে যাবে? কোন দিনও না! এক জীবন না হয় না পেয়েই ভালোবেসে কাটিয়ে দিলো।
সম্রাটের গম্ভীরতা তাকে তার পরিবারের কাছ থেকে দুরে নিয়ে যাচ্ছিলো,তার কঠোরতার ছাপ আশেপাশে বেশ প্রভাব ফেলেছিলো, কিন্তু তানহার প্রখর বুদ্ধির কাছে সব ফিকে হয়ে যাচ্ছিলো আর এটাই ছিলো তানহার প্রতি সম্রাটের অনুগত্য হওয়ার প্রধান কারন।তা না হলে সম্রাট কখনো তানহাকে ক্ষমা করতো না, জব্বার মন্ডলের ক্ষমা চাওয়ার কারন তার কাছে এখন পরিষ্কার।
সময় আপন গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে, এভাবেই কেটে গেছে প্রায় সাতটা বছর আর হঠাৎ করেই একদিন সামনে এলো সম্রাটের অতীত,আর তানহার করা অতীতের ভুল।
------------বর্তমান🧭🧭🧭
অতীতের মাঝেই আযানের মধুর সুরে সম্রাটের ভাবনার জগত ছিঁড়ে যায়,ভেসে উঠে বর্তমান ,ফিরে এলো বর্তমানে!
বিগত ঘটনার রিসার্চের মাঝেই কখন যে রাত কেটে ভোর হতে চললো টেরই পেলো না সম্রাট, আযানের ধ্বনি শুনতে পেয়েই বুঝলো আরো একটি রাত নির্ঘুম কাটলো তার।চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বুকটা টান টান করে নিজের ক্লান্তি সরানোর চেষ্টা করলো,চোখ দুটো বন্ধ করে,আযানের ধ্বনি শ্রবন করতে করতে প্রলম্বিত শ্বাস ছাড়লো। চোখ মেলে হাত দুটো এক করে ফজরের এই সময়ের পবিত্র বায়ু মুঠ ভর্তি করলো, তারপর নিজের সমস্ত মুখে তা মেখে নিলো। ধীর পায়ে হেঁটে ঘরের ভেতরে চলে গেল।অযু করে নামাজ আদায় করে ড্রেস চেঞ্জ করে বেরিয়ে পড়লো সকালের শারীরিক চর্চার প্রয়োজনীয়তা মেটাতে।
দৌড়াতে দৌড়াতে ভাবতে লাগলো আগামী দিনের করনীয়! প্রেয়সীর মনে আবারও জায়গা নিতে পোড়াতে হবে অনেক কাঠখড়।তার সাথে করতে হবে আবারও সমাজের সাথে যুদ্ধ। দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ থেমে গেল, আবারও মনে পড়লো অতীতের সেই দিনের কথা,যখন ছেলে দুটোর কাছ থেকে জানতে পেরেছিলো ওর অজ্ঞাত অবস্থায় ওর সাথে তানহার কাটানো রাতের কথা! হাসান চাচার কথায় প্রথমে নিজের প্রতি কিছুটা প্রশ্নাত্নক ভাব থাকলেও পরে একা ভাবার পর মনে পড়েছিলো,তখনই আর বুঝতে বাকী রইলো না সেদিন রাতেই পারি এসেছিলো সব ছেড়ে ওর কাছে ওর সাথে জীবনের বাকি পথটা চলতে কিন্তু শুরু করার জন্য এসেই যেন সব শেষ করে ফেললো!
কথাটা ভাবার সময় ওর প্রচুর অভিমান হলো,পারি কি ওকে একবার জিজ্ঞেস করতে পারতো না! ওর প্রতি কি বিশ্বাস রাখা যায় না! ভাবতে ভাবতে নিজেই নিজের উত্তর খুঁজে পেল,ঐ সময়ে পারির জায়গায় দাঁড়িয়ে ঐরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সে নিজেও কি এত কিছু ভাবতে পারতো! এতটা ধৈর্য্য শক্তি থাকতো! আর পারি তো মেয়ে মানুষ,মেয়েরা তো একটু বেশিই অভিমানী হয় সেখানে পারি তো সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। যে কিনা তার আশেপাশে বসা কোন মেয়েকেই সহ্য করতে পারতো না সেখানে যদি কেউ মাঝ রাতে তার বুকের উপর শুয়ে থাকে তাহলে সে সেটা কিভাবে মেনে নিবে?
একটা হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে আবার হাটা শুরু করলো!
পর্ব ৩৪
পারি ডাইনিং টেবিলে দাঁড়িয়ে সায়েরার জন্য দুধ রেডি করছিল,সোহার আজ কোর্টে খুব জরুরী কাজ আছে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কেসের হেয়ারিং রয়েছে যার জন্য খুব ভোরে বের হয়ে গেছে। কোর্টে যাওয়ার আগে মামলার বাদীর সাথে কথা আছে সেগুলো সারতে হবে।
পারি এসে দেখে সায়েরা ঘুমাচ্ছে।তাই ওকে তুলে ফ্রেশ করিয়ে রুমে সামনে বই দিয়ে বসিয়ে রাখে, কিছু সময় পড়াটা একবার রিভিশন দেওয়ার জন্য।পারিকে পাওয়ার পর সায়েরার বেশ পরিবর্তন হয়েছে।এখন সে বেশ সকাল সকাল উঠে, এবং কোনরকম দুষ্টুমি ছাড়াই পড়তে বসে।রাতেও কোনরকম বাহানা ছাড়া পড়তে বসে,খেতেও বসে।
সায়েরার এই পরিবর্তন যে পারির সান্নিধ্যে এসে হয়েছে তা সবারই খুব ভালো করে বোঝা হয়ে গেছে। আর তাই এই বাড়ির প্রতিটি সদস্যের কাছেই পারি এখন খুব ভালো লাগার একজন মানুষ।
পারি শুধু সায়েরার একার নয় , সম্রাটের বাবা মায়ের খেয়ালও খুব যত্ন সহকারে করে। এতে করে সম্রাটের বাবা মায়ের কাছেও পারি এখন খুব নির্ভরতার নাম।বলতে হয় পারি এখন বাড়ির প্রতিটি মানুষের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে সবার সব ভালো লাগেনা ঠিক যেমনি ভালো লাগেনা তানহার এই বাড়িতে পারির উপস্থিতি।ওর ভেতরটা খুব জ্বলছে এই কারনে যে সম্রাটের জীবনে আবারও পারির আগমন।যেকোন কারনেই হোক, ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় পারি চলে যাওয়াতে ও যেমন কিছু সময়ের জন্য কষ্ট পেয়েছিলো তেমনি সম্রাটকে পাওয়ার খুশিতে আপ্লুতও হয়েছিলো।আর তাই পারির এই হঠাৎ প্রত্যাবর্তন ও মানতে পারছে না।ওর অন্তঃস্থল ওকে বারবার বোঝাচ্ছে এবার ও সম্রাটকে চিরজীবনের জন্য হারাবে।
পারি সায়েরার দুধে হরলিক্স মিক্স করছিলো,সম্রাট মর্নি ওয়ার্ক করে মাত্রই দরজা দিয়ে ঢুকছিলো, ডাইনিং এ পারিকে দেখে ঠোঁটের কোনে দুষ্টু হাসি দিয়ে একবার ভালো করে পারিকে স্ক্যান করলো! পারির গায়ে একটা ধুসর রঙের এক রঙা সুতি শাড়ী। সম্রাট মনে করলো, এইবার পারির সাথে দেখা হবার পর থেকে পারিকে কখনো সাজগোজ করতে দেখেনি, এমনকি ভালো কোন রঙের কাপড়ও পড়তে দেখিনি। কেমন যেন নেতিয়ে গেছে, সবসময় বিধবাদের মতো সাদামাটা ভাবে চলে, কোনরকম যেন বেঁচে আছে। কথাগুলো ভাবতেই সম্রাটের মনটা বিষিয়ে উঠলো।
সম্রাট:- আমার জন্য এক কাপ কফি নিয়ে আমার রুমে আসো তো!
হঠাৎ কারো এমন কথায় পারি চমকে উঠে, পিছনে ঘুরে সম্রাটকে দেখে হ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকে,কি বলছে বোঝার চেষ্টা করছে,যখন বুঝলো তখন কাকে বলছে তা বোঝার চেষ্টা করছে কারন এখানে ও ছাড়া আর কেউ নাই।সম্রাট না দেখেই বুঝতে পারলো পারির অবস্থা, তাই উপরে উঠতে উঠতে পিছু না ঘুরেই বললো,
সম্রাট:- তোমাকেই বলেছি! come first!
পারির কপালে ভাঁজ পড়লো,ভাবতে লাগলো সম্রাট কেন ওকে ডাকছে! সেদিনের ঘটনার পর থেকেই কেমন জানি ওর প্রতি সম্রাটের ব্যবহারে পরিবর্তন ঘটছে,আর তাই তো ইচ্ছা করেই সম্রাটকে এড়িয়ে যেতো। কিন্তু এখন? আর কাউকে তো দেখছেও না যাকে বলবে সম্রাটের জন্য কফি নিয়ে যেতে! এসব ভাবনার মাঝেই শুনতে পেলো,
সম্রাট:- ভাবনাকে দুরে ঠেলে তাড়াতাড়ি আসো!
আবারও সম্রাটের কন্ঠস্বর,চোখ উপরে তুলে দেখলো সম্রাট সিড়ির উপরের ধাপে দাঁড়িয়েই উক্ত কথাটি বললো, কিন্তু এখনও পিছনে ফেরেনি, আসলে ও জানে পারির বর্তমান মুখভঙ্গি একদম বেক্কলের মতো হবে আর সেটা দেখে ও নিজের হাসি আটকে রাখতে পারবেনা। আর তাই সামনে তাকিয়েই মিটিমিটি হাসছে।
পারি সম্রাটের কথায় নিজের ভাবনাকে সত্যিই পিছনে ঠেলে দিলো, তারপর দুধের গ্লাসটা এক পাশে ঢেকে রেখে চলে গেল কিচেনে,আছমা খালাকে বললো,,
পারি:- খালা!
আছমা খালা পারির ডাকে ওর দিকে তাকালো।
আছমা খালা:- বলো মা!
পারি:- ছোট সাহেব কফি চেয়েছে!
খালা:- ওহ আচ্ছা দাড়াও দিতাছি!
খালা হাতের কাজটা রেখে কফির জন্য পানি চুলাতে দিতেই পারি বললো,
পারি:-খালা তুমি রাখো আমি করছি!
খালা পারির কথায় একবার পারির দিকে তাকালো কারন পারির কন্ঠে কিছু ছিলো যেটা খালা ধরতে পারলো না।তবে কিছু বললো ও না কারন তার এতে সাহায্যই হবে।তার হাতে এখন অনেক কাজ।সবাই অফিসে যাবে।সবার নাস্তা রেডি করতে হবে। আবার সবার জন্য দুপুরের খাবারও পাঠাতে হবে। সেগুলোরও প্রস্ততি নিতে হবে। সব কিছু মিলিয়ে এই এক কাপ কফি বানিয়ে যদি পারি তাকে সাহায্য করতে চায় তাহলে তারই ভালো সুতরাং অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময় আপাতত খালার নেই।
এদিকে পারি কফি বানাতে বানাতে ভাবতে লাগলো,সম্রাট ওকে বলেছে নিয়ে যেতে,কফি বানিয়ে তো দিলো কিন্তু নিয়ে কিভাবে যাবে?যেকোন কারনেই হোক ও সম্রাটের মুখোমুখি হতে চায় না।কিছুতেই না। ভাবনার মাঝেই কফি তৈরি হয়ে গেল। সম্রাটের জন্য নির্ধারিত মগে ঢেলে খালার উদ্দেশ্যে বলল,
পারি:- খালা কফি হয়ে গেছে; তুমি গিয়ে দিয়ে আসো!
খালা পারির উদ্দেশ্যে বললেন,
খালা:- ওমা!তুমিই যেহেতু বানাইছো তাহলে তুমিই দিয়া আসো!
পারি:-আমি!
খালা:- হ তুমি!
পারি:-কিন্তু আমি কিভাবে!
খালা:-ক্যা তুমি গেলে কি হইবো?
পারি:-না মানে আমি কি করে যাই!
খালা:- যেমনে কইরা কফি বানাইছো,আমারে না জিগাইয়া ও একদম ঠিক মগেই কফি ঢালছো তেমনি কইরা হাতে কফির মগ লইয়া হাইটা হাইটা দোতালার কিনারের রুমে গিয়া দিয়া আইবা!
পারি খালার এত বড় ভাষনে একটু চিন্তিত হলেও না চিনে মগে ঢালার কথায় বিব্রত হলো,যদিও খালা তখনও ওর দিকে না তাকিয়েই কথাগুলো বলছিলো তারপরও কেন জানি বেশ লজ্জা অনুভব করছে, খালাকে কি আর বলা যায়,যে সেই পুরুষের সবকিছুই ওর জানা! আর এ বাড়িতে আসার পর তাকে দেখার পর না চাইতেও তার সবকিছুই তার প্রতি ওর আকর্ষণের কারন হচ্ছে।সে ক্ষেত্রে সামান্য কফি মগ চেনা কি আর ব্যাপার!
পারি:- না মানে তুমি তো রোজ দাও তখনই দেখেছিলাম,তাছাড়া প্রায়ই উনাকে এই মগেই কফি খেতে দেখি তাই চিনতে অসুবিধা হলো না কিন্তু তাই বলে আমি উনার রুমে!
খালা:- তাছাড়াও তোমাকেই যেতে বলছে,আমি নিজের কানে শুনছি! এখন এত কথা না বইলা যাও তো ।তা না হলে দেখবা কফি ঠান্ডা হইয়া আইসক্রিম হয়ে যাইবো! ছোট সাহেব আবার আইসক্রিম খায় না।উল্টা দেখবা রাগে তুফান উঠাইয়া ফেলছে,বাবারে বাবা যেই রাগ উনার!
পারি:-কিন্তু খালা!
খালা:-আমার হাতে অনেক কাজ! না হলে আমি যাইতাম! এহন আর কথা কইয়া আমার সময় নষ্ট কইরো না।
পারি বুঝলো খালাকে বলে আর লাভ নেই,তাকেই যেতে হবে।তাই আর কথা না বাড়িয়ে চললো সম্রাটের রুমে,যেতে যেতেই শুনতে পেল খালার সতর্কবাণী।
খালা:-দরজায় গিয়া নক কইরো! বিনা অনুমতিতে যাওয়া ছোট সাহেবের পছন্দ না!
খালার কথা শুনলো তবে কিছু বললো না।পারি সম্রাটের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, এই ঘরে এর আগেও একবার এসেছিলো ,সায়েরার জোরের কারনে তবে সেদিন জানতো না এই ঘরের মালিকের খবর তাই ভয় কাজ করলেও অসস্থি কাজ করেনি কিন্তু এখন কেন জানি দুটোই একসাথে চেপে ধরেছে।
সম্রাট:- ভেতরে এসো!
ভেতর থেকে এমন আদেশ সূচক বাক্যে পারি হতভম্ব হয়ে গেল, মনে মনে বললো,
পারি:- কিভাবে বুঝলো!
সম্রাট:- কফি চেয়েছি আইসক্রিম নয়!
কাঠখোট্টা কন্ঠে এমন ব্যঙ্গাত্নক কথায় পারির বিরক্তি বেড়ে গেলো,বিরবিরিয়ে বললো,
পারি:- এমন ভাবে আদেশ করে যেন আমি ওর বিয়ে করা বউ!
মনে মনে সম্রাটের আগামী চৌদ্দ পুরুষের গুষ্টির ষষ্টি করতে করতেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো,ঘরে ঢুকে সামনে চোখ তুলে তাকাতেই চোখ দুটো আপনা-আপনিই বড় হয়ে গেল,স্থির হয়ে আছে।সম্রাট একটা মিন্ট কালারের টাওয়াল পেঁচিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ওকেই দেখছে, ঠোঁটে মৃদু দুষ্টু হাসি,যেন চাওয়া অনুযায়ী পেয়ে গেল এমন প্রাপ্তির হাসি। সম্রাটের চাহনি আর উদাম গায়ে এরকম ভাবে দাড়িয়ে থাকা দেখে পারির লোমকুপ পর্যন্ত কেঁপে উঠলো,স্থির থাকাও কষ্ট হচ্ছে আবার সম্রাটের শরীরের লোভনীয় দৃশ্য থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়াও কষ্ট হচ্ছে।সম্রাট পারির মনোভাব বুঝে ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা দুষ্টু হাসিটা আরো চওড়া করলো,পারির হাতের কম্পন দেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো।
পারি সম্রাটের এভাবে এগিয়ে আসা দেখে হালকা ঢোক গিলে চোখ দুটো জোর করেই সরিয়ে নিলো,বাম হাতের মুঠোয় পুরে নিলো শাড়ীর আঁচলের একাংশ,যেন এখন কেবল এই আচঁলই পারে সম্রাটের এমন ভয়ঙ্কর চাহনি থেকে রক্ষা করতে। শরীরের কাঁপন যেন পুরো কাপিয়ে দিচ্ছে,সেই কাঁপুনি দ্বিগুণ করতেই সম্রাট যেন ইচ্ছে করেই কফি মগ নেওয়ার সময় আলতো করে ছুয়ে দিলো পারির আঙ্গুলগুলো। সম্রাটের ছোঁয়া পেতেই নিজের চোখ বন্ধ করে নিলো। মাত্র খালি হওয়া হাতটা দিয়ে শাড়ীর একাংশ মুঠ বন্দি করলো, বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট মাংস পিন্ডের ধুকপুকানি কয়েকগুণ বেড়ে গেল যখন অনুভব করলো সম্রাটের নিঃশ্বাস তার কর্নের উপর নিগ্রে দিচ্ছে !
পর্ব ৩৫
সম্রাট:- Be ready for being my whole life coffee maker!
সম্রাট কথা শেষ করার সাথে সাথেই যেন পারির সমস্ত ইন্দ্র কাজ করতে শুরু করলো,চট করেই চোখ মেলে তাকালো,এক হলো দুই জোড়া নয়ন। সম্রাটের চাহনি ছিলো ভয়ানক মাদকীয়।পারির ছিলো প্রশ্নাত্নক, কৌতুহলে ভরা। সম্রাট ঠোঁটের কোনের হাসিটা বজায় রেখেই কফি মগে ঠোঁট ছোয়ালো,যেন কফি মগে নয় স্পর্শটা পারির ঐ শুষ্ক ওষ্ঠদ্বয়ে করেছে,পারির ধুকপুকানি বেড়ে যেন তিনগুণ হয়ে গেছে।একে অপরের দিকে ওভাবেই তাকিয়ে আছে। হঠাৎ কিছু পড়ার শব্দে দুজনই সচকিত হলো,পারি সম্রাটের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচু করে নিলো, এদিকে ওদিকে তাকিয়ে আরও একবার সম্রাটের পানে চেয়ে পিছিয়ে গেল একটু সরেই দৌড় দিলো।সম্রাট এখনো ঐভাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে,পারির ছুটে যাওয়া দেখে নিঃশব্দে হেসে উঠলো,কফিটা শেষ করে মগ টা সেন্টার টেবিলের উপর রেখে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখেই হেসে দিলো।পারি যে ওকে এভাবে দেখেই এরকম ভাবে তাকিয়ে ছিলো সেটা বুঝতে ওর একটুও সময় লাগেনি।
পারি সম্রাটের রুম থেকে দৌড়ে এসে তানহার সামনে পড়লো। তানহা সম্রাটকে ডাকার জন্যই ওর রুমের দিকে আসছিলো , বেখেয়ালে হাত লেগে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য পাশে দাড় করানো কৃত্রিম ফুলের টব টা পড়ে যায়।সেই শব্দই তখন পারি আর সম্রাটের কানে যায়।
পারিকে সম্রাটের রুম থেকে এভাবে দৌড়ে বের হয়ে আসতে দেখে আবারও জানা আতংকে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।পারিকে খুব অস্থির লাগছে।
পারিও এমন অবস্থায় তানহার সামনে পড়ে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো।সম্রাট যে আজ ওকে এভাবে এরকম কথা বলবে,তা ও ক্ষুনাক্ষরেও বোঝেনি।তানহার সামনে পড়ে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।
সম্রাটের কথার মানে ও ঠিকই বুঝতে পেরেছে।
বিগত কিছু দিনের ওর প্রতি সম্রাটের বিহেভিয়ার আর এটেনশনেই বুঝিয়ে দিচ্ছে সম্রাট কি চাচ্ছে! কিন্তু সম্রাট এমন কেন চাচ্ছে? ওর সাথে তো তানহার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, তাছাড়া একবার বিশ্বাস করে যে ভুল করেছে সে ভুল আর দ্বিতীয়বার করতে চায়না!
তাহলে কি সম্রাট এক সাথে দুই নৌকায় পা দিতে চাচ্ছে! না তা হতে দেওয়া যাবে না! সম্রাটকে আর প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। ওকে ওর ভুলটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে তার সাথে তানহাকেও সাবধান করতে হবে,বলতে হবে নিজের জিনিস নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে। সম্রাটের দ্বারা ও প্রতারিত হয়েছে আর কোন মেয়ে যেন না হয়।অন্তত তানহার মতো এত সুন্দর আর ভালো একটা মেয়ে যেন না হয়। এমন কজন আছে যে নিজের ভালোবাসার মানুষকে পেতে এত বছর অপেক্ষা করে!
তানহা একমনে তাকিয়ে দেখছে পারিকে আর ভাবছে পারি কি ওর চেয়েও বেশি সুন্দর,এর জন্যেই সম্রাট পারিকে ভুলতে পারে না।
তানহা:-( মনে মনে) হ্যা সুন্দরই তো!দুধে আলতা গায়ের রং, লম্বায় ও আমার চেয়ে বেশি, চুলগুলো ও তো অনেক লম্বা! এত সুন্দরী রেখে কেন সম্রাট আমাকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিবে? অবশ্যই তারা একে অপরের জন্য একদম পারফেক্ট।যাকে বলে রাজযোটক! সে রাতে ওমন কিছু না হলে হয়তো ওদের এতদিনে সুখের সংসার থাকতো,সায়েরার মতো দু একজন বাচ্চাও থাকতো কিন্তু !
পারি তানহার দিকে চেয়ে হাসার চেষ্টা করছে কিন্তু কেন জানি পারছে না! হতাশ হয়ে চোখ নামিয়ে নিলো।
আশ্চর্য জনক বিষয়। দুজন নারী। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে অথচ কেউ কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারছে না।দুজনই মনে মনে অপরাধবোধে ভুগছে, দু'জনই নিজেদের ভাগ্যের পরিহাসে আক্রান্ত,দুজনই হারানোর যন্ত্রনায় জর্জরিত হচ্ছে।
তানহা মনে মনে নিজের অপরাধের অনুশোচনা করছে,পারি অপরাধ করার আগেই তার ভয়ে তটস্থ হয়ে যাচ্ছে। দুজনের মাঝেই অসস্থি ও লজ্জা কাজ করছে। পার্থক্য শুধু কারনে। পারি তানহাকে চিনেনা কারন তানহাকে আগে কখনো দেখেনি। এমনকি সেদিন রাতেও তানহার মুখটা ছিলো ওর বিপরীতমুখী।তাই ও মুখ দেখেনি।দেখলে হয়তো!
পারি:- সরি ম্যাম! আমি আসলে!
তানহা:-আপনি কেন সরি বলছেন,সরি তো আমি বলবো!
পারি:- ম্যাম আপনি!
তানহা:-কি ম্যাম ম্যাম করছেন তখন থেকে! আমি কি আপনার অফিসের বস নাকি স্কুলের শিক্ষিকা?
পারি:-জ্বী!
তানহা:-সোহা আপুকে আপু বলে ডাকেন না?
পারিজ্বী।
তাহলে!
আমি!
তানহা:-আমাকেও আপু বলে ডাকবেন! এমনিতেও আপনি আমার ছোটই হবেন!
পারি:-ঠিক আছে তবে আপনি ও আমাকে তুমি করে বলবেন প্লিজ!
তানহা:- ও হ্যা আপনি কেন সরি বলছেন তা না জানলেও আমি সরি বলছি কারন আমার হাতে লেগে আপনাদের বাড়ির এত বড় ক্ষতি হয়ে গেল!
কথাটা তানহা নিচে পড়ে থাকা ভাঙ্গা টবের দিকে চেয়েই বললো। পারি তানহার ইশারা অনুযায়ী তাকিয়েই উত্তর দিলো,
পারি:-এর জন্য আমাকে কেন সরি বলছেন,এটা তো আপনারই বাড়ি সুতরাং এখানে ভালো মন্দ যাই হোক সেটাও আপনার,আমি তো একজন কাজের লোক মাত্র!
পারির কথায় কিছু একটা ছিলো যেটা বুঝতে তানহার সময় লাগলো না, তবুও সেটাকে এড়িয়ে উত্তর দিলো,
তানহা:-কে বলেছে আপনি এখানে শুধু একজন কাজের লোক! এ বাড়ির কারো আচরণে কি এটা কখনো মনে হয়েছে! আমার তো মনে হয় এ বাড়ির কেউ কারো সাথে এমন আচরন করবে!
পারি:- না আমাকে কেউ কিছু বলেনি,তবুও আমি আমার গন্ডি টা জানি। তাছাড়া হয়তো কিছুদিন বাদেই আপনি এখানকার নিয়মিত সদস্য হবেন সুতরাং!
তানহা:- সে পরেরটা পরে দেখা যাবে কিন্তু আজকের পর যেন কখনো না শুনি এইরকম কথা। মনে রাখবেন এই বাড়িতে থাকা এবং কাজ করা প্রতিটি সদস্যই এই পরিবারের মেম্বার!
পারি:- জ্বী!
নত মস্তকে পারির উত্তর।দুজনই দুজনের প্রতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য এতগুলো কথা বললো।পারি ভেবেছিলো সম্রাটের ঘর থেকে এভাবে দৌড়ে আসার কারন তানহা জানতে চাইবে,তাই আগেই সরি বলছিলো কিন্তু তার পরিবর্তে তানহার এরকম ব্যবহারে সে মুগ্ধ সাথে অপরাধবোধ ও বেড়ে গেলো।এই ভেবে যে না জানি ওর জন্য তানহার সাথে সম্রাট কোন খারাপ ব্যবহার করে।
এত সময়ে দুজন রমনীর সব কথাই নিজের ঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনলো সম্রাট।তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার মাঝেই মনে পড়লো বাইরে কিছুর শব্দ হয়েছিলো,কি হয়েছিলো সেটা দেখার জন্য বের হতেই দেখতে পেলে দুরে দাঁড়িয়ে থাকা পারি আর তানহাকে। তাদের মাঝে কি নিয়ে কথা হচ্ছে সেটা বোঝার জন্য কান পেতে রইলো, প্রথমে ভেবেছিলো হয়তো তানহা পারির সাথে খারাপ ব্যবহার করবে, কিন্তু তেমন কিছু করেনি দেখে ভালো লাগলো।তবে পারির এই বাড়ির কাজের লোক কথাটা যেন সম্রাটের মাথা গরম করে দিলো।যাকে সে কিনা নিজের রাজ্যের রাজ-রানী করতে চায় সে নিজেকে দাসী হিসেবে বেছে নিচ্ছে। অস্ফুট স্বরেই বললো,
সম্রাট:- ইডিয়ট মেয়ে!
---+++-----+++++-------+++---
তানহা:-আসবো?
সম্রাট:-হ্যা আসো!
তানহা:-কোথায় যাবো আমরা আজকে?
সম্রাট:- জরুরী একটা মিটিং আছে,তোমাকে বলা হয়নি।সেখানেই যাবো। তারপর তুমি অফিসে আর আমি একটু আমার ব্যক্তিগত একটা কাজে যাবো!
তানহা:- ব্যক্তিগত !
সম্রাট:-হ্যা! কেন আমার ব্যক্তিগত কিছু থাকতে পারে না ?
তানহা:-কেন পারবে না ! অবশ্যই পারে!
সম্রাট:- তো!
তানহা:- আমি আসলে এভাবে কিছু মনে করে বলিনি।তুমি এর আগে এমন করে বলো নি তাই আর কি ! যাই হোক আমরা কি এখনই বের হবো?
সম্রাট:-হুম ; তুমি ড্রয়িং রুমে গিয়ে অপেক্ষা করো আমি আসছি!
তানহা:- আচ্ছা!
তানহা চলে যাওয়ার পর সম্রাট একবার আয়নায় ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো,ও বুঝতে পারছে ইদানিং না চাইতেও ওর দ্বারা তানহা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে, তবুও কিছু করার নেই,তানহার প্রতি রুড না হলে তানহা আবারও ভুল করবে,পারির ফিরে আসা যে তানহা খুব একটা ভালো ভাবে নিচ্ছে না সেটা ওর ভাবভঙ্গিই বলে দিচ্ছে। আর যাই হোক এইবার পারিকে হারানোর ঝুঁকি কিছুতেই নেওয়া যাবে না।
পর্ব ৩৬
বাড়িতে গিয়ে দরজায় নক করার পর হাসান সাহেবের স্ত্রী দরজা খুলে দিলে ভেতরে ঢুকে বিছানায় মায়ের জায়গাটা ফাঁকা দেখে পারি শ*ক*ড! মা নেই; কোথায় গেল মা? মা তো হাঁটতেও পারে না! তাহলে?
পারি:- চাচী; চাচী!
ভেতর থেকে দৌড়ে এলেন হাসান সাহেবের স্ত্রী,পারির ভয়ার্ত দৃষ্টিতে বুঝতে পারলেন পারির চিন্তার কারন,উনি দরজা খুলেই ভেতরের রুমে গিয়েছিল পারির জন্য পানি আনতে,
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- তুমি বসো, তোমার মা আছে!
পারি:- আছে মানে কোথায় মা!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- হাসপাতালে।
পারি:- হাসপাতালে মানে? কি হয়েছিলো ! আমাকে কেন জানাও নি! কেমন আছে এখন? ঠিক আছে তো আমার মা!
বিচলিত অ*স্থি*র পারির চোখ ভিজে উঠলো অসুস্থ অচল মায়ের জন্য। হাসান সাহেবের স্ত্রী পারির অস্থিরতা উপলদ্ধি করলেন! উনি পারির হাত ধরিয়ে বসিয়ে দিলেন বিছানার উপর,পানি খাওয়ার জন্য চোখের ইশারায় অনুরোধ করলেন,পারির অস্বীকারের ভঙ্গিকে গ্রাহ্য করলেন না।নিজেই মুখের সামনে তুলে ধরলেন পানির পাত্র।পারি উনার সম্মানে পান করলো পানিটুকু।
হাসান সাহেবের স্ত্রী:-তোমার মায়ের কিছু হয়নি,তবে আর যেন তাকে অন্যের উপর নির্ভর না হতে তাই উনাকে সচল করার চেষ্টায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
পারি:-মানে?
হাসান সাহেবের স্ত্রী:-মানে তুমি তো জানো তোমার মায়ের সঠিক চিকিৎসা হলে উনি সুস্থ হয়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে।তাই তাকে ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেখানে রেখেই উনার চিকিৎসা করা হবে, দরকার পড়লে বিদেশ থেকে ভালো ডাক্তার আনা হবে!
পারি: - কি সব বলছেন আপনি চাচি!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- আমি ঠিকই কইতাছি!
পারি:-আপনি কি বলছেন বুঝতে পারছেন! মায়ের চিকিৎসার জন্য কত টাকা দরকার জানেন তো! তাহলে! মায়ের চিকিৎসা জরুরী সেটা আমার চেয়ে ভালো কে জানে কিন্তু এত টাকা জোগাড় করাও আমি আমার সাধ্যের বাইরে।
হাসান সাহেবের স্ত্রী:-তোমাকে টাকা দিতে হবে না!
পারি:-আমাকে টাকা দিতে হবে না মানে কি!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- তোমার টাকা দেওন লাগবো না!
পারি:- আমার মায়ের চিকিৎসার টাকা আমি দিবো না তো কে দিবে? কে এই মানব দরদী যে কিনা আমার মায়ের চিকিৎসার জন্য এত টাকা দিয়ে আমাকে সাহায্য করবে?
হাসান সাহেবের স্ত্রী:-:-ঐ যে ঐ ছেলেটা!
পারি:- কোন ছেলে?
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- ঐ যে সেদিন ম্যাডামকে হাসপাতালে নিতে আমাদের সাহায্য করলো!
পারি:- কোন ছেলে!
এক মিনিট তুমি বলতে চাইছো সেদিন রাতে যে এসেছিলো আমার সাথে মা'কে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল?
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- হ্যা হ্যা সেই ছেলেটাই!
পারি:-কিহ!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- কি হইছে পারি মা! তোমার
চাচা তো কইলো ছেলেটা ভালো।
পারি:- মা কোন হাসপাতালে আছে?
হাসান সাহেবের স্ত্রী:-কি জানি নাম; ওহ মনে পড়ছে **** কেয়ার হাসপাতাল। তোমার চাচাও ঐখানে আছে।
পারি:- আচ্ছা আমি আসছি!
কথা শেষ করেই পারি বের হয়ে গেল।হাজারটা চিন্তা ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।সম্রাট কেন ওকে না জানিয়ে এরকম একটা কাজ করলো!
পারি:-(মনে মনে)সম্রাট তো জানে ঐ হাসপাতালের চিকিৎসার ব্যয় বহন করার মতো ক্ষমতা আমাদের এখন আর নেই তাহলে!সেকি কোনভাবে আমাকে টাকার মাধ্যমে কন**ভে**ন্স করার চেষ্টা করছে?
পারি:- মা মা!
ঘুমন্ত মায়ের মুখের দিকে চেয়ে নিচু স্বরে ডাকলো। মিসেস প্রিয়ন্তি একবার হু বলেই আবার ও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। ওষুধ আর মেসেজের কড়া ডোজের কারনেই উনার ঘুম এত প্রগাঢ় হলো।
হাসান সাহেব:- তুমি আমার সাথে রাগ করো না পারি মা! আমি ম্যাডামের এই অবস্থা আর দেখতে পারছিলাম না তাই!
পারি:- তোমার সাথে রাগের কিছু নেই। তুমি আমাদের কষ্ট দেখেই এই কাজ করেছো।আসলে কি বলো তো এখন আমাদের যা অবস্থা তাতে আত্ন সম্মান রক্ষা করে বেঁচে থাকা খুবই কষ্টকর কিন্তু তারপরেও!
হাসান সাহেব:- তুমি কি এখানে ম্যাডামের চিকিৎসা করাতে চাও না পারি মা?
পারির চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকাতে হাসান সাহেবের চিন্তা বাড়লো বই কমলো না।তবে এরপর আর কিছু বলার জন্য খুঁজেও পেলেন না তাই নিরব হয়েই দাঁড়িয়ে রইলেন পরির পাশে।
মাঝরাতে মায়ের ঘুমন্ত মুখটা বারবার ভেসে উঠছে পারির চোখে মুখে,এই কেবিনটা খুবই সুন্দর করে গোছানো,কেন ই বা থাকবে না এমন পরিপাটি! এতগুলো টাকা নিচ্ছে যে! যে তার মাকে এখানে ভর্তি করিয়েছে তাহার কড়া নির্দেশ যাতে রোগীর প্রতি নূন্যতম অবহেলা না করা হয়! এবং এই কেবিনের আশেপাশে কোন**রকম শব্দ না হয়।কেবিন টা বেশ বড়।দুপাশে দুটো বেড ।বুঝাই যাচ্ছে একটা রোগীর জন্য আরেকটি রোগীর সাথে থাকবে তার জন্য।এটাচ বাথরুমটাও বেশ রাজকীয় ভাবে তৈরি করা। সবকিছু মিলিয়ে একদম সুন্দর ঘরোয়া পরিবেশে এখানে রোগীদের চিকিৎসা করানো হয়। সবকিছু দেখে পারির ভালো লাগলেও যখন ই মনে পড়ে সম্রাটের কথা তখনই মনটা বিষিয়ে উঠে।
পারি:- (মনে মনে বিরবির করছে )সকাল হলেই মাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে।যতই হোক ঐ লোকের টাকায় আমার মায়ের চিকিৎসা আমি করাতে পারবো না।আর যত দ্রুত সম্ভব নতুন একটা চাকরির ব্যবস্থাও আমাকে করতে হবে। তার আশেপাশেও থাকতে চাইনা আমি।
পরেরদিন সকাল আটটা;;🧭🧭
মাকে তোলার চেষ্টা করছে পারি, কিন্তু কিভাবে সম্ভব! যতই হোক একজন অসুস্থ মানুষকে এভাবে তোলার মতো সামর্থ্য কোন মেয়ে মানুষের নেই তাও যে কিনা একদম নির্জী***ব,পা টাও নড়াতে পারে না। মিসেস প্রিয়ন্তি মেয়ের অবস্থা বুঝে নিরবেই চোখের জল ফেলেন! বিগত বছরগুলোতে তাই করে এসেছে।
মিসেস প্রিয়ন্ত স্বামী সন্তানের শোকে ষ্টোক করে প্যারালাইজড হয়ে যান। নিয়মিত পরিচর্যা আর সঠিক চিকিৎসার অভাবে উনার অবস্থা এতটাই ক্রিটিক্যাল হয়ে যায় যে উনি একদম অচল হয়ে বিছানায় পড়ে থাকেন,উনার সব কাজ অন্য কাউকে করে দিতে হয়, যতদিন পারি ছিলো না ততদিন হাসান সাহেবের স্ত্রী করতেন কিন্তু পারি আসার পর নিজের মায়ের দায়িত্ব ও নিজেই নেয়।
মা পড়ে যেতে নিলেই মা'কে সহ পারিকে কেউ পিছন থেকে আগলে নেয়। মা'কে ঠিক করিয়ে শুয়ে দিয়ে পারির উপর থেকে নিজেকে সরাতে সরাতে বললেন,,
সম্রাট:-ইডিয়ট মেয়ে! তুমি পারবে এভাবে মাকে সরাতে! কাউকে ডাক দিলেই তো হতো!
সম্রাটের এমন ধমকের সুরে কথা বলায় পারি সম্রাটের দিকে কোধার্ন্বিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললো,,
পারি:- আমি আমার মায়ের সাথে কি করবো না করবো সেটা কি এখন আপনার থেকে জানতে হবে?
পারির এহেন কথায় সম্রাট হালকা মৃদু হেসে উত্তর দিলো,
সম্রাট:-হ্যাঁ হবে কারন এখন থেকে উনি একা তোমার মা নয়,আমার ও মা!
পারি:-কি বলতে চান কি আপনি? আর আপনার সাহস কি করে হয় আমার অনুমতি ছাড়া আমার মা'কে এখানে নিয়ে আসার?
সম্রাট:- সাহসের তো এখনও কিছুই দেখালাম না জান! তাছাড়া নিজের মায়ের জন্য কিছু করবো তার জন্য তোমার মতো বাচ্চা মেয়ের থেকে অনুমতি নিবো! হাও ফানি!
সম্রাট কথা আর কথা বলার ধরন দুটোই যেন আগুনে ঘি ঢালার কাজ করলো,পারি ক্ষিপ্ত হয়ে সম্রাটের দিকে তেড়ে আসলো,,
পারি:-এই এই আপনি কাকে বাচ্চা বলেছেন হ্যা! আর এইসব কি বলছেন জান টান?
সম্রাট:- আরেহ বাহ, বাচ্চা মেয়েটার তো দেখি এখনও আগের মতোই রাগ আছে!
পারি:-আবারও! উফ অসহ্য,এই আপনি এখানে কি করছেন এখন?
সম্রাট:- মা'কে দেখতে আসলাম।
পারি:-কেন! আর এক মিনিট আপনি বারবার আমার মা'কে মা বলে সম্বোধন করছেন কেন?
সম্রাট:-কি আজব পারি! তোমার মা কি আমার মা নয়! শ্বাশুড়িকে কি মানুষ মা বলে ডাকে না!
পারি:- নাহ আমার মা আপনার মা নয় আর মা কেন আপনার শ্বাশুড়ি হতে যাবে!
সম্রাট:-আজব বৌয়ের মা তো শ্বাশুড়িই হয়। তাহলে আমার বেলায় কেন নয়!
পারি:- কারন আমার মা আপনার শ্বাশুড়ি নয়, আমার জানামতে আপনার শ্বাশুড়ি এবরোডে আছেন।যান সেখানে গিয়ে মা মা করেন!
সম্রাট:- আমি আমার জায়গা মতোই আছি,সরে গেছো শুধু তুমি!
এত সময় সম্রাটের কন্ঠে রশিকতা থাকলেও শেষের কথায় বেশ হতাশা প্রকাশ পেল,পারি সম্রাটের কথার পিঠে কিছু বলবে তার আগেই কেবিনে নার্সের আগমন হয়,
নার্স:- সরি ম্যাম আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে!
পারি:-ইটস ওকে!
নার্স:- ম্যাম আপনি আমাকে একটু পাশ দিন আমি এখনই ম্যামের সব কাজ করে দিচ্ছি।
পারি:- জ্বী একটু তাড়াতাড়ি করবেন,আমি মা'কে বাসায় রেখে তারপর কাজে যাবো; সো প্লিজ হারি!
সম্রাট:-বাসায় রেখে যাবে মানে! বাই এনি চান্স পারি তুমি কি মাকে বাসায় নিয়ে যেতে চাইছো?
পারি:-হ্যা!
সম্রাট:-কিন্তু কেন?
পারি:-কারন এত দামী হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করানোর মতো এবিলিটি আমাদের এখন আর নেই! তাই;
সম্রাট:-সাট আপ পারি! তুমি খুব ভালো করেই জানো তুমি কেন মা'কে নিয়ে যেতে চাচ্ছো! এখানে যদি আমি ব্যতিত অন্য কেউ হতো তাহলে তুমি সব জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও মায়ের চিকিৎসা ঠিকই করাতে কিন্তু আমার থেকে সাহায্য নিতে চাইছো না বলেই এখন এরকম ব্যবহার করছো!
পারি:-ধন্যবাদ বোঝার জন্য!
সম্রাট:- ওহ সাট আপ পারি!এখান থেকে মাকে নেওয়ার কথা তুমি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো!
প্রথমে পারির স্বীকারোক্তিতে রেগে উচ্চ স্বরে ধমকে উঠলেও পরবর্তীতে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে নিচু কন্ঠেই কথাটা বলে।
পর্ব ৩৭
সম্রাট:- দেখো পারি শুধু শুধু জেদ করে মায়ের চিকিৎসার অসুবিধা করার কোন মানেই হয় না তাই বলছি! আমাকে আমার কাজটা করতে দাও! প্লিজ।
পারি:- না আমার মায়ের চিকি*ৎ*সার দায়িত্ব আমার নিজের,সেটা যেভাবেই হোক আমি নিজেই পালন করবো তাই দয়া করে আপনি আমাকে বিব্রত করতে আসবেন না।
পারি:-আর হ্যা আমি খুব শীঘ্র*ই এই চাকরিটা ছেড়ে দিবো শুধু অল্প সময়ের জন্য ই আমি আপনাদের আশেপাশে আছি তাই এমন কিছু করবেন না যাতে আমাকে লোকের কথার তোপে পড়তে হয়!
সম্রাট:-তুমি ভালো করেই বুঝতে পারছো!
নার্স:- আপনারা দয়া করে বাইরে গিয়ে কথা বলুন,এত চেঁচামেচি পেসেন্টের জন্য ঠিক না!
আপনি দয়া করে মায়ের কাজ টা একটু যত্ন করে করবেন,কথাট বলেই সম্রাট পারির হাতটা ধরে বাইরে বেরিয়ে এ*লো,পারি সম্রাটের এহেন কান্ডে বেশ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো, নিজের বন্ধি হাতের কব্জি টাকে সম্রাটের মুঠোয় একবার দেখে সম্রাটের মুখপানে তাকিয়ে ঝটকা দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো,
পারি:-কি চান আপনি কেন এভাবে আমার পিছু লেগেছেন?
সম্রাট:- তোমার পিছু নই , সামনে আছি আমি।
কথাটা শেষ করেই পারির দিকে তাকালো,পারির বিরক্তিকর চাহনি, রাগের অভিলাষ মুখশ্রীতে। সবকিছু উপেক্ষা করেই বললো,
সম্রাট:-ওখানে আমাদের জন্য মায়ের ডিস্টার্ব হচ্ছে তাই এখানে নিয়ে আসলাম। এবার বলো কি সমস্যা তোমার আমি মায়ের চিকিৎসা করালে?
পারি:-আমি কেন আপনার সাহায্য নিয়ে আমার মায়ের চিকিৎসা করাবো? কি হন আপনি আমার!
সম্রাট:- আমি কিছু হইনা তোমার?
সম্রাটের বেদ**নার্ত প্রশ্ন,পারির কঠোর উত্তর।
পারি:-কিছু হন বুঝি? ও হ্যা হন তো!আমি যেখানে কাজ করি আপনি সেখানের সর্বেসবা!সেই হিসেবে আপনি আমার বস আমি আপনার কর্মচারী!
সম্রাট:- পারি!
পারি:-হ্যাঁ এটাই একমাত্র সম্পর্ক আপনার সাথে আমার,এর বাইরে তো আর কোন সম্পর্ক আছে বলে তো আমি জানিনা!
সম্রাট নিরব হয়ে তাকিয়ে আছে পারির দিকে।
পারি:- আপনি প্লিজ এখান থেকে চলে যান! আপনি আমার মতো মানুষের জন্য ভেবেছেন তাতেই আমি কৃতজ্ঞ, আমার মায়ের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন তাতে আমি ঋণী! দয়া করে এর বেশি কিছু করে আমাকে এতটা দায়বদ্ধ করবেন না যার দরুন আমাকে লোকের কাছে ছোট হতে হয়!
সম্রাট:- ঠিক আছে আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু দয়া করে মায়ের চিকিৎসা করা নিয়ে কোন রকম বাধা আমাকে দিও না।
কথা শেষ করেই সম্রাট পারির দিকে চে**য়েই পিছু হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছু দুর গিয়ে সামনে ফিরে হাঁটা ধরলো,এত সময়ে পারি একবারও সামনে তাকালো না কিন্তু দুর হতেই কেন জানি খুব ইচ্ছে করলো একবার ঐ মানুষটাকে দেখার,চোখ তুলে উপরে তুলতেই অজা*ন্তে*ই ঝরে পড়ে দুফোঁটা অশ্রু। নিজেকে ধাতস্থ করে, চোখের পানি মুছে চলে গেল মায়ের কেবিনে!
পারির দেরি দেখে সোহা পারিকে ফোন দেওয়ার জন্য ড্রয়িং রুমে বসে ফোনটা হাতে নিয়ে পারির নাম্বার তুলতেই কলিং বেল বেজে উঠলো, হাতের ফোনটা না*মি*য়ে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো।
সম্রাট দেখেই বুঝলো কেন এখনো বাসায় আছে সোহা, তাই সোফায় বসে নিজে থেকেই বললো,
সম্রাট:-আজকে মিস পারির আসতে দেরি হবে।
পারির আসতে দেরি হবে এটা যতটা না আ*শ্চ*র্যিত করেছে তার চেয়েও কয়ে*কগুণ বেশি করেছে,সম্রাট কিভাবে এই কথা জানালো তাতে।
সোহা:- তুমি কি করে জানলে?
সম্রাট বুঝতে পার**লো ,ভুল সময়ে ভুল কথা বলে ফেলেছে।যতই হোক পারি আর ওর বিষয়ে ওদের বাড়ির কেউ জা**নেনা আর এখন এরকম অবস্থায় জানতে পারলে সবার মাঝে পারিকে নিয়ে বাজে চিন্তা আসতে পারে।আর পারির প্রতি কোনরকম বাজে প্রতিক্রিয়া মানা অসম্ভব। তাই আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,,
সম্রাট:-ইয়ে আমি আসলে একটু *** হাসপাতালের দিকে গিয়েছিলাম একটা ক্লাইন্ট এর সাথে কথা বলতে।তখন দেখেছিলাম ঐ যে উনার চাচাকে, তখন শুনছিলাম উনার মাকে নাকি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।
সোহা:- কি বলছো ! আবারও সিরিয়াস কিছু হয়েছে কি? ঐ হাসপাতালের তো অনেক খরচ! পারি তো এত খরচের ভার বহন করতে পারবে বলে মনে হয় না!
সম্রাট:-তুই চিন্তা করিস না! আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলে এসেছি! ভদ্র মহিলার চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ আমাদের কোম্পানির তরফ থেকেই দেওয়া হবে।
সোহা:- সত্যিই! পারি মেনেছে?
সম্রাট:- হ্যা সত্যিই! না মানার কি আছে?
সোহা:-না মানে পারি অনেক আত্নবোধ সম্পন্ন একজন মেয়ে।আমি এর আগেও অনেকবার টাকা দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি কিন্তু নেয় নি!
সম্রাট:- সোহা; যারা নিজেরা মাসে কয়েক লাখ টাকা দিয়ে শত শত মানুষ**কে সাহায্য করতো তারা কিভাবে অন্যের সাহায্য নিবে বলতো?
সোহা:- মানে?
সম্রাট:- তুই জানিস পারি কে? পারির আসল পরিচয়?
সোহা:-আসল পরিচয় মানে! পারি কি আমাদের ভুল তথ্য দিয়েছে?
সম্রাট অনেকটা সময় নিচু হয়ে চুপ করে রইলো , বুঝতে পারছে না আজকেই কি সবটা পরিষ্কার করে বলবে? আদৌও বলা উচিত হবে?
সম্রাট:- হ্যা উচিত! এমনিতেই অনেকটা সময় হারিয়ে গেছে আমাদের জীবন থেকে ।আর না।আর কোন কারনেই আমি পারিকে হারাতে পারবো না। আজকে অন্তত বলি এতে অন্ত*ত এই বাড়ির কারো পারির প্রতি পরবর্তীতে কোনরকম অভিযোগ থাকবে না। ( মনে মনে এই কথাগুলো ভেবেই সিদ্ধান্ত নিলো পারির সত্যিকারের পরিচয় সবার সামনে আনবে।
সোহা:-ভাই তুমি কি এমন কিছু জা*নতে পেরেছো যা আমাদের জানা হয়নি!
সম্রাট মাথা নুইয়ে রেখেই বললো,
সম্রাট:- তোর কি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পরশ আবরার চৌধুরীর কথা মনে আছে?
সোহা:- পরশ আবরার চৌধুরী?
সম্রাট:- হুম!
সোহা অনেক সময় ধরে চিন্তা করলো কিন্তু কিছুই মনে পড়লো না, সম্রাটের দিকে অসহায়ের মতো করে তাকালো,
সম্রাট:- মনে পড়ছে না! চৌধুরী গ্রুপ অব কোম্পানির নাম শুনেছি*স? যেটা হঠাৎ করেই ব্যবসায়ীক ধস নামে তারপর দেনার দায়ে সমস্ত সম্পত্তি নিলামে উঠেছিলো! আর নিজের সবকিছু এভাবে হারানোর যন্ত্রনায় পরশ আবরার চৌধুরী হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যান!
সোহা সম্রাটের কথা শেষ হতেই মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,,
সোহা:-হ্যা হ্যা মনে পড়েছে!
যতদুর শুনেছিলাম উনি ব্যক্তিগত ভাবে যথেষ্ট ভালো মানুষ ছিলেন। অসহায় গরীবদের অনেক সাহায্য ও করতো।বেশ কিছু এতিমখানায় ও নাকি উনি নিয়মিত ডোনেট করতেন। কিন্তু হঠা*ৎ করেই এমন কি হলো যাতে এভাবে লোকট সর্বশান্ত হয়ে গেল! আসলে আল্লাহ পাক কখন কাকে কি করবেন তা কেবল উনিই ভালো জানেন।
সোহার কথায় সম্রাট একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিছুই বললো না,সোহা কিছু সময় নিরব থেকে আবারো জানার উদ্দেশ্যে বললো,
সোহা:- কিন্তু এখানে উনার প্রসংঙ্গ আসছে কেন?
সম্রাট:-পারির পুরো নাম কি?
প্রশ্ন করে সোহার দিকে উত্তরের আশায় তাকায়,প্রথমে সোহা না বুঝলেও পরে পারির পুরো নাম মুখে একবার বিরবির করে তারপর সম্রাটের দিকে তাকালেই সম্রাট বলে ,,
সম্রাট:- পারিজাত আবরার চৌধুরী! মিস পারির পুরো নাম পারিজাত আবরার চৌধুরী; সবাই ভালোবেসে পারি ডাকলেও বাবা মা ভালোবেসে পরি বলেই ডাকতো!
সোহা:- ভাই! পারি কি পরশ আবরার চৌধুরীর মেয়ে! এটা কি সত্যিই! পারি মরহুম ব্যবসায়ী পরশ আবরার চৌধুরীর সেই একমাত্র মেয়ে?
প্রশ্নাত্নক চমকিত চাহনি, অবিশ্বাস্য একটা বিষয় যখন কেউ জানে তখন যেমন অনুভূতি হয় সোহার ও এখন তেমনই অনুভূতি হচ্ছে। সম্রাট ওর কৌতুহল বুঝেই পুরো বিষয়টা খুলে বলে শুধু পারির সাথে ওর সম্পর্ক আর একটা বিষয় বাদে। সোহার যেন মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গেছে ও ভাবতেই পারছে না পারির মতো একটি মেয়ে এতটুকু জীবনে এত ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের কৌতুহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেললো,,
সোহা:- ভাই তুমি এত কিছু কিভাবে জানো? না মানে ওদের সাথে তো ব্যবসায়িক কোন সম্পর্ক আছে বলে তো আমার মনে হয় না তাহলে এত ভেতরের খবর কিভাবে জানো? এগুলো তো কোন নিউজপেপার ও দেখিনি! তবে?
সোহার প্রশ্নে সম্রাটের মুখ চুপসে গেলেও দুরে থেকে অন্য কারো উত্তরে সোহার ভ্রু কুঁচকে গেল,,
তানহা:- কারন এছাড়াও পারির অন্য একটি পরিচয় আছে যার দরুন তোমার ভাইকে সব জানতে হয়!
সোহা:- মানে? কি বলতে চাইছো তুমি?
তানহা:- পারি শুধু পারিজাত আবরার চৌধুরী ই নয়! পারির পরিচয় শুধু পরশ আবরার চৌধুরীর মেয়ে ছাড়াও ওর আরো একটি পরিচয় আছে আর সেটা হচ্ছে পারি তোমার ভাইয়ের এক্স গার্লফ্রেন্ড!
পর্ব ৩৮
তানহার মুখ থেকে এই মাত্র নির্গত হওয়া শব্দটা যেন সোহার উপর বজ্রাঘাত করলো, তার ভাইয়ের একজন ভালোবাসার মানুষ ছিল যার বিরহে তার ভাই সাত সাতটা বছর ভুগছে!অথচ তারা তা বুঝতেই পারলো না। এর জন্যই তো তার ভাইয়ের মাঝে হঠাৎ করেই এত পরিবর্তন,অথচ তারা কতসব ভাবতো! মনে করতো অতিরিক্ত কাজের প্রেশারেই কিংবা হঠাৎ করেই প্রতিপত্তির পেছনে ছুটতে ছুটতে এমন করেই পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু না তা তো না! তার ভাইয়ের এই বদলের কারন কারো প্রতারনা,কারো ছেড়ে চলে যাওয়া!
সোহা:- কি কি বলছো তুমি তানহা!
তানহা:- হ্যা আমি ঠিকই বলছি পারি তোমার ভাইয়ের এক্স এবং একমাত্র প্রেমিকা যাকে পাওয়ার জন্য আজ ও তোমার ভাইয়ের তীব্র পাগলামী।
সোহা:- ভাই!
সম্রাট নিরব হয়ে তাকিয়ে আছে ফ্লোরের দিকে,সোহার কথায় মুখ তুলে তাকালো ,সোহার কলিজা যেন মোচড় দিয়ে উঠলো, নিজের সামর্থ্য, শক্ত মনের ভাইয়ের অসহায় বেদনার্ত মুখ দেখে,,
তানহা:- তোমার ভাইয়ের এই যে আমূল পরিবর্তন তার নেপথ্যেও রয়েছে পারি নামক ঐ সুন্দরী মেয়েটা!
সোহা:- মানে কি বলছো, সবটা পরিষ্কার করে বলো তানহা!
সম্রাট:-তানহা!
তানহা:- আর কত লুকাবে নিজের যন্ত্রনা! অন্তত এবার কারো সাথে ভাগ করো!
সম্রাট:- কি চাইছো কি তুমি!
তানহা:- তুমি খুব ভালো করেই জানো!
সম্রাট:- তোমার চাওয়া কোনদিনও দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়!
তানহা:- তুমি কি সত্যিই বুঝতে পারছো আমি আসলেই কি চাই!
সম্রাট:- নাহ আমি বুঝতে পারছি আর না বুজতে চাইছি! তাই দয়া করে এই কথা এখানেই শেষ করো!প্লিজ তানহা!
সম্রাট কথা শেষ করে উঠে চলে গেল, সিঁড়ির সামনে গিয়ে পিছন মুড়ে বললো,
সম্রাট:- এখন যেসব কথা হলো এগুলো আমাদের মাঝেই থাক।আর হ্যা পারি এই বাড়িতে এতদিন যেমন ছিল তেমনি থাকবে।আমি চাই না পারি এখানে আসতে কোনরকম হে*জিটেট ফিল করুক।ও যদি একবার বুঝতে পার যে এই বাড়ির মানুষ ওর অতিত সম্পর্কে সব জানে তাহলে ও আর এই বাড়িতে কোনদিনও আসবে না।আর এই মুহূর্তে পারির জন্য একটা চাকরির খুব প্রয়োজন। আশাকরি আমার কথা তোমরা বুঝতে পারছো!
তানহা আর সোহা নিরব থেকে শুধু চেয়ে দেখলো এক হতাশ প্রেমিকের যন্ত্রনা লুকানোর চেষ্টা।
পারি বেশ দেরি করে এলো,এসেই সর্বপ্রথম মুখোমুখি হলো তানহার।তানহার মুখোমুখি হওয়াতে কিছুটা বিব্রত বোধ করলো,কেন জানি তানহাকে দেখলেই নিজের মধ্যে অপরাধ বোধ জেগে ওঠে,তানহা'ও পারির দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো এরপর তানহাই আগে জিজ্ঞেস করলো,
তানহা:- কি অবস্থা তোমার মায়ের?
নিজের মায়ের অসুস্থতার কথা তানহা কিভাবে জা*নলো মনে মনে প্রশ্নটা আ*ওড়াতে'ই তানহা নিজের থেকেই উত্তর দিলো,,
তানহা:-সম্রাট এসে বললো তোমার মা'কে নাকি হসপিটালে ভর্তি করিয়েছো!
পারি:- জ্বী জ্বী আপু!
তানহা বুঝলো পারি কথা বলতে সংকোচ বোধ করছে তাই পারির হাত দুটো ধরে বললো,
তানহা:- তুমি এমন নিজেকে ছোট মনে করছো কেন? দেখো আমাদের কোম্পানির তরফ থেকে প্রতি বছরই এমন কাউকে না কাউকে সাহায্য করা হয় সেখানে তো তুমি আমাদের ঘরের লোক তুমি তো সবার আগে সেটা ডি*জা*র্ভ করো। যদি তোমার মায়ের এমন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থার কথা আগে জানতাম তাহলে অবশ্যই আমরা আগেই এর জন্য এগিয়ে যেতাম কিন্তু এখন আর কি করার আছে? যা হবার তা তো হয়েই গেছে। তবে দেরিতে হলেও সম্রাট যখন এসে জানালো তোমার মায়ের চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ কোম্পানি বেয়ার করবে তখন আমি সত্যিই খুব খুশি হয়েছিলাম! সে যাই হোক এখন কেমন আছে তোমার মা?
পারি:-জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো!
তানহা:-আচ্ছা কোন অসুবিধা হলে সম্রাটকে না জানালেও আমাকে অন্তত জানাতে কোনরকম হে*জি*টেট ফিল করো না !
তানহা:- জ্বী আপু!
তানহার সাথে কথা শেষ করে সায়েরার রুমের দিকে যেতেই সামনে পড়লো সোহা:-
পারি:- সরি, সরি আপু! আমি আসলে!
সোহা:-আমি জানি ভাই আমাকে বলেছে তোমার মাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে! তো এখন কি অবস্থা উনার?
পারি:- জ্বী আলহামদুলিল্লাহ এখন আপাতত ভালো!
সোহা:- আশাকরি উনি দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে যাবেন আগের মতো!
পারি:-ইনশাআল্লাহ!
সোহা:- তুমি গিয়ে বাবুর রুমটা গুছিয়ে রাখো,ওকে ওর নানা ভাই স্কুলে নিয়ে গেছে! চাইলে একটু রেস্ট ও নিয়ে নিতে পারেন।
পারি:- ধন্যবাদ আপু! আপনারা সবাই আসলেই অনেক ভালো! আমি খুব লাকি আপনাদের এখানে কাজ করতে পেরে!
সোহা:- আমরাও লাকি তোমার মতো একজন মানুষের সাথে কাজ করতে পেরে।
সোহার সাথে কথা বলার সময় পারি খেয়াল করেছে সোহার আজকের চাহনি ছিলো অন্যরকম! বুঝতে পারছে হয়তো কিছু হয়েছে তবে সেটা ওর সাথেই জড়িত কিনা বুঝতে পারলো না।।
দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল অনেকটা, অনেকগুলো দিন। সেদিন হাসপাতালে পারির নিষেধাজ্ঞার পর সম্রাট আর পারির মুখোমুখি হয়নি। পারি মনে মনে অনেকবার দেখার ইচ্ছা পোষন করলেও পরক্ষনেই নিজেকে নিজেই শাসন করেছে।তার ভাষ্যমতে সম্রাট তানহার সম্পত্তি,আর সেদিকে চোখ দেওয়া তার জন্য অন্যায়। তাছাড়াও সে বিধবা,ধর্ষিতা নারী ! কাজেই সম্রাটের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া তার জন্য অনুচিত।তাই বরাবরই নিজের মনকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু কিছু বিষয়ের পরিবর্তন ঘটলো সেদিন থেকেই যেদিন সকাল বেলা একটা খুশির খবর এলো আর সেটা হলো সম্রাটের ছোট বোন রুহানি,তানহার ছোট বোন মানহা আর ওদের মা মিসেস জব্বার।
রুহানি নিজের পরিবারের সাথে সময় কাটাতে ছুটি নিয়ে এলেও মানহা আর ওর মায়ের আগমন হয়েছে অন্য কারনে আর সেটা হলো তানহার বিয়ে!
যতই হোক নিজের এত বড় মেয়েকে তো আর উনি অন্যের আশায় ছেড়ে দিতে পারেন না তাই উনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবার সম্রাটের সাথে সরাসরি কথা বলবে। এভাবে আর কতদিন! কতদিন মানুষ এভাবে ছন্নছাড়া হয়ে বাঁচতে পারে? তাছাড়া তানহা'রও অনেক বয়স হয়েছে।যদিও উনি এইসব মানে'না তবুও বড় মেয়ে বিয়ে না দিয়ে তো ছোট মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যায় না! আর সম্রাট! ওর জীবনটা কি এভাবেই কেটে যাবে? ওর মা বাবার কি ইচ্ছে হয় না ছেলের নাতিনাতনিদের সাথে খেলতে! ছেলের বৌয়ের সেবাযত্ন নিতে? তাহলে? তাই উনি ঠিক করেছেন এবার সম্রাটের সাথে সরাসরি কথা বলে তবেই এর একটা বিহিত করেই যাবেন!
তানহা:- মা তুমি কেন বলো নি আমাকে যে তুমি আজ আসছো!
( নিজের মায়ের গলা ধরে মায়ের সাথে লেগে কথাটা বললো)
মিসেস জব্বার:-বললে কি আর সারপ্রাইজ হতো! তাই তো না বলে আসা!
তানহা:- হুম বুঝেছি, এইসবে এই পাকা বুড়িটা'র বুদ্ধি তাই না! কিন্তু তাই বলে তোমরা সবাই একসাথে কিভাবে?
( মানহার কান ধরে প্রথম লাইনটা বললেও পরে ছেড়ে দিয়ে শেষের কথাটুকু বললো)
মিসেস জব্বার:- হ্যা আমাদের আসার কথা মানহা'ই রুহি'র সাথে শেয়ার করেছে তারপরে ও আসার কথা বললো তবে একটু সময় লাগবে বলে অনুরোধ করলো, আমার মনে হলো এক সাথে'ই যাই তাই আমরা একদিনেই আসলাম। তারপর এই তো এসেই তোমাদের সারপ্রাইজড করে দিলাম!
তানহা:-ইয়েস মম আ'ম সো হ্যাপি!
মিসেস জব্বার:- আচ্ছা শোন সম্রাট আসলে জানাবে আমার ওর সাথে কিছু কথা আছে!
তানহা:- কথা ? কোন বিষয়ে মা?
মিসেস জব্বার:-তোমাদের বিষয়ে!
তানহা:- আমাদের বিষয়ে মানে?
মানহা:-তোমাদের বিষয়ে মানে তোমাদের বিয়ের বিষয়ে!
তানহা:- মা কি বলছো তুমি এসব? তুমি তো জানো!
মিসেস জব্বার:- হ্যা জানি আমি! কিন্তু তোমরা কি ভেবে দেখেছো কিভাবে আছো তোমরা দুজন এখন? এটার কি কোন মানে আদৌ আছে তানহা? যে চলে গেছে তার কথা ভেবে সম্রাট এভাবে নিজের সারাটা জীবন নষ্ট করতে পারে না! আর না, জেনে বুঝে তোমাকে এভাবে অবহেলা করতে পারে! এটা ঠিক না! আর তাই আমি ঠিক করেছি এবার তোমাদের একটা হিল্লে করে তবেই আমি ক্ষান্ত হবো।
তানহা:- কিন্তু মা!
মিসেস জব্বার:- কোন কিন্তু নয় আমি যা বলার ওর সাথেই বলবো! তোমাকে কিছু বুঝতে হবে না!
তানহা:- ওর সাথে এই বিষয়ে কথা বলে লাভ নেই!ওর বাবা মা ও অনেকবার বলেছেন কিন্তু কোন কাজই হয়নি!
মিসেস জব্বার:- ও কি বাবা মায়ের কথাও এখন আর শোনেনা?
তানহা:- শোনে। তবে এই বিষয়ে নয়! তাই আমার চাই না তুমি যেচে পড়ে কথা বলে অপমানিত হও!
মিসেস জব্বার:- ছেলেটা'র কত পরিবর্তন হয়েছে!
মানহা:-হ্যা মা ভাইয়ার মাঝে আগের সেই ভাইয়াকে খুঁজেই পেলাম না!
তানহা:- কারন তোমার ভাইয়া আগের সেই ভাইয়া নেই তাই!
মিসেস জব্বার:-না সবাই এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না ! আমি আজই ওর মায়ের সাথে কথা বলবো!
তানহা:-মা প্লিজ! এমন করো না! তাহলে আবারো সব এলোমেলো হয়ে যাবে!
মিসেস জব্বার:- তাহলে ঠিক আছে; করবো না এমন কিছু! বলবো না কারো সাথে কথা; তাহলে তুমিও আমার কথা মেনে নাও!
তানহা:- মানে? কি বলতে চাইছো তুমি!
মিসেস জব্বার:- আমার চাওয়া একটাই, তোমার একটা গতি করা! তুমি যেভাবে নিজের জীবনকে চালা'চ্ছো সেটা কোন জীবনই নয়।তাই আমি চাই তোমার জীবনের একটা গতি হোক!
তানহা:-তুমি ঠিক কি চাইছো সেটা একবার পরিষ্কার করে বলবে প্লিজ!
মিসেস জব্বার:-তোমার বিয়ে!
তানহা:-বিয়ে মানে?
মিসেস জব্বার:- হ্যা আমি চাইছি তোমার বিয়ে দিতে! তোমাকে একটা ভালো পাত্র'স্থ করে দিতে পারলে আমি মরেও শান্তি পাবো! না জানি কোনদিন তোমার বাবার মতো হঠাৎ করেই চলে যাই! তাই আমি চাইছি অন্তত তোমাকে বিয়ে দিয়ে তোমার সংসার করা দেখতে! আল্লাহ তাইলে মানহার'টা হবে তবে তোমার'টা আগে তারপরেই না!
তানহা:-এটা সম্ভব নয়!
মিসেস জব্বার:- কেন সম্ভব নয়?
তানহা:- তুমি তো জানো মা তারপরও কেন এরকম করে বলছো!
মিসেস জব্বার:- তাহলে আমি যা করতে চাইছি আমাকে তা করতে দাও!
পর্ব ৩৯
তানহা মায়ের মুখের উপর আর কোন কথা বললো না।যা হবে তা হবেই। সুতরাং এখন সবটা সময়ের হাতেই ছেড়ে দিলো।
মিসেস জব্বার সম্রাট এবং সম্রাটের মা বাবার অনুরোধে ওদের বাসায়ই থেকে গেলো।
পারির সাথেও উনার দেখা হয়েছে। পারিকে উনার ও বেশ পছন্দ হয়েছে যদিও এখনও উনি পারির সম্পর্কে কিছুই জানে না। এদিকে রুহানির আবদারে সবাই মিলে পিকনিকে যাওয়ার প্ল্যান করলো।
পারি সারাদিন এখানে কাজ করে রাতের বেলা মায়ের কাছে গিয়ে থাকে। যদিও সম্রাট সবটা জানে তবুও দুর থেকে অন্যের মাধ্যমে অনেকবার বুঝিয়েছে যাতে পারি হাসপাতালে সবসময় না থাকে। কারন ওর ও মানসিক শান্তি দরকার কিন্তু কে শোনে কার কথা ।পারি ই তো পারি!
তানহার মা ঠিক করলেন উনি সরাসরি সম্রাটের বাবা মায়ের সাথে কথা বলবে, তারপর সবাই মিলে সম্রাটকে ম্যানেজ করবে।ঠিক যেমনি কথা তেমনি কাজ।উনি বিকেলের চা পানের সময় কথা তুললেন,,
মিসেস জব্বার:- ভাই সাহেব আমার একটা কথা ছিলো বলতে পারেন আমি এর জন্যই এইবার এসেছি!
মিস্টার মাহমুদ:- জ্বী ভাবী বলেন!
মিসেস জব্বার:-আমি আসলে বলতে চাচ্ছিলাম সম্রাট আর তানহার বিষয়ে!
মাহমুদ সাহেব :- মানে?
মিসেস জব্বার:-আমি বলতে চাইছিলাম সম্রাট আর তানহার বিয়ের ব্যাপারে কি ভাবলেন।দেখেন আমার তানহার অভিভাবক তো এখানে আপনারাই।তাই আপনাদের মতামত তো অবশ্যই সবার আগে জানা উচিত।
মাহমুদ সাহেব:- কি বলবো ভাবী জান।ছেলেটা তো এই বিষয়ে কথাই শুনতে চায় না, আমাদের তো তানহা মাকে খুবই পছন্দ।আমরাও চাই তানহা মা খুব তাড়াতাড়ি আমাদের ঘরের বউ হয়ে আসুক কিন্তু কেন যে ছেলেটা এমন করে বুঝিনা অথচ দুজন সারাদিন এক সাথেই থাকে।কেউ কাউকে ছাড়া কিছুই বুঝে না। কিন্তু বিয়ের কথা বললেই কেমন করে উঠে!
মিসেস জব্বার:- হ্যা সেটা তো আমিও জানি।তাই বলছিলাম ওদের না জানিয়ে যদি বিয়েটা ঠিক করে একটা সারপ্রাইজ দিয়ে দেই কেমন হয়?
মিসেস মাহমুদ:- আমিও সেটাই বলছি! হয়তো ছেলেটা লজ্জায় এমন করে।আসলে কি ভাবী জান ,আপনাদের কাছে আমাদের অনেক ঋণ, আল্লাহর রহমত আপনাদের অনুগ্রহের কারনেই আমরা আজ এখানে আছি।আজ আমার ছেলের যা অবস্থা তা পুরোটাই আপনাদের সহযোগিতার ফল।হয়তো এই কারনেই আমাদের ছেলেটা এমন মনে করছে,ওর মনে হচ্ছে ও আপনাদের মেয়ের যোগ্য না।যেই বাড়িতে চাকরের কাজ করেছে সেই বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করার কথা ভাবাটাও যে অনেক বড় বিষয়।
মিসেস জব্বার:- এই কথা টা আর কখনো বলবেন না।সম্রাটকে কখনো আমি অথবা আপনাদের ভাইজান ছেলে বই অন্য কিছুই ভাবি নাই। চাকর ভাবা তো দুরের কথা। একমাত্র ওকে ভালোবাসি বলেই নিজের সব আত্নীয় স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।কারন একটাই আমি অথবা আমরা যাকে ভালোবাসি তারা তাকে কিভাবে অসম্মান করে?
মিসেস মাহমুদ:- আমরা কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে।
মিসেস জব্বার:- কৃতজ্ঞ হওয়ার কিছুই নেই।এখানে আমরা আমাদের স্বার্থের জন্য সব করেছি। আমাদের ছেলের কমতি ওর মাধ্যমেই পূরনের চেষ্টা করেছি আর তাই তো আপনাদের ভাই যাওয়ার আগেই ছেলের মতো করেই ওকে সব কিছুর অংশিদা'র করে গেছে। সাথে করে গেছে আমাদের একমাত্র অভিভাবক, আল্লাহর পর এই দুনিয়ায় অভিভাবক বলতে আমরা এখন ওকেই তো বুঝি।তাই আমি চাই সবসময়ের জন্যেই ওকে একদম আইনত ভাবেই আমাদের অভিভাবক বানাতে।
মাহমুদ সাহেব:- সবই বুঝলাম কিন্তু যাদের নিয়ে আমাদের এত কথা তাদের মতামতের তো দরকার আছে।
মিসেস জব্বার:- হু অবশ্যই; তানহার মতামত আমার জানাই আছে।আর সম্রাট সে তো শুনছি বেঁকে বসে আছে।তাই বলছিলাম কি আমরা যদি একটু অন্যরকম ভাবে চেষ্টা করি তাহলে হয়তো হয়েই যাবে।
মাহমুদ সাহেব:- অন্যরকম বলতে কিভাবে?
মিসেস জব্বার:-আমাদের একটু ড্রামা করতে হবে!
মিসেস মাহমুদ:- ড্রামা!
মিসেস জব্বার:- হ্যা একটু ছোট ড্রামা করলেই আমার মনে হয় ওকেই ম্যানেজ করা যাবে।
এরপর মিসেস জব্বার সবটা বুঝিয়ে বললেন তাদেরকে। ঠিক করা হলো পিকনিক থেকে আসার পর তাদের এই পরিকল্পনা কার্যকর করা হবে।
ঐদিন রাতের বেলা,
সোহা:-পারি তুমি কালকে আমাদের সাথে যাচ্ছো!
পারি:- সরি, আপু কোথায়?
রুহা:-ও মা পারি আপু তুমি জানো না! আমরা সবাই তো কালকে পিকনিকে যাচ্ছি,ফুল ফ্যামিলি!
আসার মাত এই তিন দিনেই পারির সাথে রুহানির ও একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যেহেতু রুহানি অনেক ছোট পারির থেকে তাই পারিকে তুমি করে সম্বোধন করতে পারিই বলেছে,তেমনি রুহানি কে ও পারি যেন তুমি করি বলে সেই অনুরোধ ও রুহানি রেখেছে।তবে মানহা কেন জানি পারিকে কোন অজানা কারনেই পছন্দ করে না। কিন্তু এখন ও কোন খারাপ ব্যবহার করেনি। মানহা পারিকে পছন্দ করে না পারি সেটা ওর ব্যবহারেই বুঝতে পেরেছে তাই মানহার আশেপাশে ও একটু কমই থাকে। পারি ইদানিং ইচ্ছে করেই সবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখছে কারন ওর অনুভব হচ্ছে এই পরিবারের সবার ভালো ব্যবহারে দুর্বল হয়েই ও আবার ও সম্রাটের প্রতি আকর্ষিত হচ্ছে যেটা একদমই চাচ্ছে না।
পারি:- ওহ তাই নাকি সেটা তো ভালো কথা! যাও সবাই মিলে একসাথে কোথাও যাওয়ার আনন্দ ই আলাদা।
রুহানি:- হ্যা সেটা তো আমি জানি আর তাইতো বলছি তুমিও যাবে আমাদের সাথে!
পারি,:- কে আমিই ! কিন্তু আমি কেন?
সোহা:- কেন তুমি কি আমাদের পরিবারের কেউ না!
পারি:- না মানে আপু! এটাতো পারিবারিক টুর এখানে আমি গিয়ে কি করবো?
সোহা:- সবাই যা করবে তুমিও তাই করবে! তাছাড়া তুমিও কিন্তু আমাদের পরিবারের একটা সদস্য সেটা আগেই বলেছি।
পারি:- ঠিক আছে কিন্তু?
রুহানি:- কোন কিন্তু পারিন্তু না ! তুমি যাচ্ছো এটাই ফাইনাল। সবচেয়ে বড় কথা তুমি না গেলে তোমার সায়ু বেবি'কে কে সামলাবে? তুমি ছাড়া কেউ আছে যে ওকে সামলাতে পারে? ও তো তুমি বলতেই পাগল!
পারি:- আমি সবকিছুই বুঝলাম তারপর আমার মনে হয়!
মানহা:-যদি যেতে না চায় তাহলে এত রিকু*য়ে*স্টের কি আছে রুহা!
সি*ড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কথাটা ছুড়ে দিলো মানহা! কারো কথায় পিছনে ফিরে ওকে দেখলো বাকী তিনজন!
মানহা:- তোমরা যাওয়ার কথা বলার দরকার বলে'ছো! সে যাবে না ! বলেছে যাবেনা! অবশ্য এটাই বলার কথা! কারন যতই হোক পিকনিক টা কিন্তু পারিবারিকভাবে সময় কাটানোর জন্য।এর মধ্যে যদি বাইরের কেউ থাকে তবে সেটা মোটেই ভালো বিষয় নয় আমি বলছি না এটা শুধু আমাদের সমস্যা হবে।এতে অবশ্য উনি নিজেও কমফোর্ট ফিল করবে না। সুতরাং শুধু শুধু এত অনুরোধ করে নেওয়ার কি আছে সেটাই বুঝতে পারছি না।
সোহা:- তুমি এসব কি বলছো মানহা?
মানহা:- আমি ঠিকই বলছি সোহা আপু!
রুহা:- না মানে তুমি বুঝতেছো না মানহা! আমি তোমাকে বিষয়টা খুলে বলি!
মানহা:- কিছুই খুলে বলার মতো এখানে আমি দেখছি না!
রুহা:- তুমি আমাদের কথাটা শোনো আগে!
মানহা:- রুহা বেবি তুমি এই বলবে তো সায়েরা বেবির দেখভালের জন্য ওকে নিতে চাইতো ,তাহলে তোমার মনে রাখা উচিত আমরা এতগুলো মানুষ ওখানে সায়েরা বেবির সাথে থাকবো। সবাই সায়েরার আপনজন। আমরা সবাই মিলে একদিন পারবো ওকে সামলাতে। তাছাড়া আপুনি'ও আছে। আর আপুনি কিন্তু সেই ছোট থেকেই সায়েরার খেয়াল রেখে আসছে।ইভেন সবসময় সোহা আপুর চেয়েও আপুনি র সাথে বেশি থেকেছে। সুতরাং মাত্র একটা দিন বেবির খেয়াল রাখার জন্য একস্ট্রা লোক নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই।
তার চেয়ে বরং উনাকে একদিনের জন্য ছুটি দিয়ে দাও আমার মনে হয় এটাই উনার জন্য উত্তম।আমি তো শুনলাম উনার মা নাকি হাসপাতালে, একদিন না হয় মায়ের সেবা করুক! কি ! কি বলেন আপু! আমি ঠিক বললাম না!!( শেষের কথাটায় কি ছিলো বুঝতে পারলো না পারি,তবে প্রথমে যে ওকে অবজ্ঞা করেই বলেছে সেটা খুব বুঝলো আর তার সাথে মনে করিয়ে দিলো ওর বর্তমান অবস্থা তাই মুচকি হেসে মৃদু শব্দে ওর উত্তর দিলো।
পারি:- হুম
রুহা:- তার মানে তুমি সত্যিই যাচ্ছো না!
পারি:- তোমরা যাও! গিয়ে আনন্দ করো !
সোহা:- তুমি গেলে আমরা সত্যিই খুব খুশি হতাম! তুমি এটা ভেবো না আমরা বেবির জন্য তোমাকে নিতে চেয়েছি আমরা আসলে চেয়েছি তুমি আমাদের সাথেই আমাদের মতো করে
সময়টা উপভোগ করো!
পারি:- আপু আপনাকে খুলে বলতে হবে না ! আমি জানি আপনাদের; তাই প্লিজ কখনো আমার কাছে নিজেকে এভাবে এক্সপ্লেইন করবেন না। আমি সত্যিই যেতে চাই না । তাছাড়া মায়ের সাথেও আজকাল সময় কাটানো হয় না ।যেহেতু আপনারা সারাদিনের জন্য প্ল্যান করেছেন সেহেতু এই দিনটা আমি আমার মায়ের সাথেই কাটাতে চাই প্লিজ
সোহা:- ওকে যেহেতু তুমি ই যেতে চাও না সেহেতু আর কি করার আছে।ওকে কালকে তোমার ছুটি! তোমার মায়ের জন্য কিছু লাগলে অবশ্যই জানাবে একদম হেজিটেট ফিল করবে না
পারি:- জ্বী আপু।
মানহা কেন এরকম ব্যবহার করলো সেটা কেউ বুঝলো না এমনকি সে নিজেও না তবে কোন অজানা কারনেই পারিকে সহ্য করতে পারছে না।
পর্ব ৪০
পারি রাতে মায়ের সাথে হাসপাতালে ছিলো,সকালে নার্স এলে তার হাতে মা'কে তুলে দিয়ে ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাসায় আসলো। ইচ্ছা করলো আজকে মায়ের জন্য ঘর থেকে খাবার তৈরি করে নেওয়া। হাসপাতাল থেকেই মায়ের খাবার দেওয়া। সম্রাটের রেফারেন্স এর কারনে বিশেষ সুবিধা বলতে একটু বেশিই বিশেষ সুবিধা পায় । যদিও এতে কিছুটা ওর বাবার পরিচয় আর সম্মানের কথাও উল্লেখ করা আছে তবুও পারি বুঝে সবই টাকার খেলা। আজ সম্রাটের টাকার জন্যই ওর বাবার সম্মানের কথাও মনে পড়লো অথচ এতদিন কারো ওর বাবার সম্মানের কথা মনে ছিলো না। কথা টা ভাবতেই একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো।
কি রান্না করবে মায়ের জন্য,ভাবতে ভাবতেই মনে হলো ঘরে তেমন কোন বাজারই নেই।থাকবেই বা কি করে এখন তো ঘরে চুলোই জ্বলে না।যেখানে খাবার খাওয়ার জন্য কেউ নেই সেখানে রান্না করে কি হবে। সকালে বেশিরভাগ দিনই না খেয়ে যাওয়া হয় কাজে।হয় সেখানে গিয়ে নাস্তা করে না হয় কখনো মায়ের সাথে হাসপাতালে করে। অথবা কোনদিন সকালে আর খাওয়াই হয় না। আর মা হাসপাতালে থাকার পর তো ঘরে রাতের রান্নার জন্য চুলোই জ্বলে না। বেশিদিন সোহা জোর করে খাইয়ে তারপর ছাড়ে আর না হলে হাসান কাকাই খাবার নিয়ে হাজির হয়।
পারি:- নাহ এক কাজ করি আগে বাজার করে নিয়ে আসি কিছু তারপর একবারে ফ্রেশ হবো! (কথাটা বিরবির করে নিজের সাথেই বললো।)
যেই ভাবা সেই কাজ হাতের পার্স টা নিয়ে বাজারের ব্যাগটা খুঁজতেই দরজায় শব্দ হলো,পারি সেদিকে চেয়ে কপাল কুঁচকে তাকালো,
পারি:- এখন আবার কে এসেছে?কাকা তো কাজে, তাহলে!
আবারও শব্দ হলো,পারি এবার ব্যাগ খোঁজা বাদ দিয়ে দরজা খুলতে গেল কিন্তু আশ্চর্য দরজায় যেন ঝড় চলছে, খোলার সময়টাও দিচ্ছে না।।
পারি:-কে ভাই একটু সময় তো দেন,দরজা দেখছি ভেঙে ফেলার পায়তারা করছেন!
দরজা খুলে পারি হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো, দরজার সামনে যেন পুরো মহল্লা এসে দাঁড়িয়েছে তারমধ্যে দরজায় আঘাত করা লোকটাকে দেখে পারির চোখেমুখে আগুনের ফুলকি ভেসে উঠলো, আর তাতে ঐ পাশে থাকা মানুষের যেন কিছুই এলো-গেলো বলে মনে হয় না।
পারি :- আপনি!
----------------------------------------------------------------------
পিকনিক স্পট,,
সায়েরার সাথে দুষ্টুমিতে মেতে আছে সম্রাট!
সায়েরা:- মামু!
সম্রাট:- হুম মা!
সায়েরা:- মনি কেন এলো না?
সম্রাট:-তার কাজ আছে হয়তো!
কি কাজ?
সম্রাট:-তাতো জানি না!
সায়েরা:-কেন জানো না!
সম্রাট:- কারন আমাকে বলেনি!
সায়েরা:-কেন বলেনি?
সম্রাট:- তাও জানিনা!
সায়েরা:-কেন জানো না!
সম্রাট বুঝলো তার ভাগ্নীর প্রশ্নের ঝুড়ি খুলে গেছে আর তাই এখন তাকেই কিছু একটা করতে হবে,
সম্রাট,:- আচ্ছা তুমি আমাকে একটা কথা বলো!
সায়েরা:- কি কথা?
সম্রাট:- তোমার মনিকে তোমার কেমন লাগে?
সায়েরা:-খুব ভালো!
সম্রাট:- অনেক ভালো!
সায়েরা:- হুম্মাম অনেকক ভালো এইযে এত্তত্তগুলা ভালো!( নিজের হাত দুটো প্রসারিত করে দেখালো)
সম্রাট:- আচ্ছা তুমি কি চাও তোমার মনি তোমার সাথে সারাজীবন থাকুক!
সায়েরা:- হুম তাই তো!
সম্রাট:- তুমি তোমার মনিকে বলতে পারবে?
সায়েরা:-কি ?
সম্রাট:- তোমার মনিকে বলবে যেন এখন থেকে তোমার সাথে আমাদের বাসায় ই থাকে।
সম্রাটের কথায় সায়েরার মুখটা একটু খানি হয়ে গেল, হঠাৎ করেই প্রানোচ্ছল ভাগ্নীর মুখটা কালো হয়ে যাওয়াতে সম্রাটের কপাল কুঁচকে গেল, ছোট মায়াবী মুখটা তুলে ধরে বললো,,
সম্রাট:- কি হয়েছে আমার মায়ের, হঠাৎ করেই মুখটা এমন চুপসে গেল কেন?
সায়েরা:- আমি তো মনিকে বলেছি আমার সাথে আমার ঘরে থাকতে কিন্তু মনি থাকতেই চায় না!
ভাগ্নীর কষ্টের কারন জানতে পেরে সম্রাট একটা সূক্ষ শ্বাস ছাড়লো। তারপর ভাগ্নীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
সম্রাট:- তাতে কি তুমি আবারও বলবে, এবং এবার কি করবে বলোতো!
সায়েরা:- কি ?
সম্রাট:- তুমি এবার বাড়ি অসুস্থ হওয়ার অভিনয় করবে তারপর মনিকে ব্লাকমেইল করবে যাতে মনি তোমার কথা শুনতে বাধ্য হয়! যদি এই কাজটা করতো পারো তবে মামু তোমাকে কি দিবে বলো তো!
সায়েরা:- কি !
সম্রাট:-ইয়া বড় একটা টেডি দিবো সাথে এত্তগুলা চকোলেট দিবো নে!
সায়েরা:- সা'চ্চি?
সম্রাট:-মু'চ্চি!
সায়েরা:- হি হি হি হি!
মামা ভা*গ্নীর খিলখিল হাসির ফোয়ারা'তে ভেসে উঠলো আশেপাশের সবার মন; দুর থেকে তাকিয়ে সেই সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করলো তাদের আপনজন! একমাত্র সায়েরার সাথে থাকলেই সম্রাটকে এরকম হাসিখুশি থাকতে দেখা যায়,তবে ইদানিং এর বাইরেও সম্রাটের মাঝে পরিবর্তন লক্ষ*নীয় যেটা কম বেশি সবার চোখেই পড়েছে যদিও তার একান্ত কারন কেবল দু'জন ই জানে। আর তারা হচ্ছে তানহা এবং সোহা! বহুবছর পর নিজের ছেলের মুখে এরকম হাসি দেখে আবেগে আপ্লুত হলেন মাহমুদ সাহেব আর মিসেস মাহমুদ। মিসেস জব্বার ও অবাক হয়ে দেখছে বহু পুরানো সেই সম্রাটকে।ঐ ঘটনার পর সম্রাটকে উনি আর প্রান খুলে হাস হাসতে দেখেনি।এটা যে শুধু সায়েরার কারনে নয় সেটাও খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে তাহলে এই পরিবর্তনের কারন কি?
সোহা:- এই তোমরা কি খালি খেলবে'ই নাকি খাওয়াও লাগবে; আসো তাড়াতাড়ি আসো!
সম্রাট:- হ্যা আসছি; মা উঠেন আমরা এখন খাবো!
সোহা:- কোলে নাও!
সম্রাট:- আসো!
ভা*গ্নী'কে কোলে নিয়ে সবার কাছে যাওয়ার জন্য হাঁটা শু*রু করলো,কোল থেকে নামিয়ে নিজেও বসার জন্য নিচু হতেই ফোনটা বেজে উঠলো,,
রিং রিং রিং রিং!!!!
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করলো, সামনে তুলে নাম দেখে কপালে একটা চিন্তার ভাঁজ পড়লো, নাম্বার দেখে কেন জানি মনের মধ্যে এক অজানা আ*ত"ঙ্ক ছড়িয়ে গেল,,
সম্রাট:- হ্যালো!
অপর পাশের ব্যক্তি'টা কি বললো তা বোঝা না গেলেও ভালো কিছু যে নয় তা সম্রাটের কপালের রগ ভেসে উঠা দেখেই বুঝা গেল!
সম্রাট:- আমি আসছি!
কথা শেষ করেই সম্রাট ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নিজের জ্যাকেট টা হাতে নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলতে বলতে হাঁটা ধরলো,,
সম্রাট:- তোমরা ইনজ'য় করো আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে!
কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেল আর রেখে গেলো এক ঝাঁক কৌতুহলী দৃষ্টি।।
----------------------------------------------------------------------
সম্রাট:-হ্যালো! আমি সম্রাট মাহমুদ তালুকদার বলছি, সিও অফ এস টি এ কোম্পানি অফ লিমিটেড। ইমারজেন্সি সার্ভিস দরকার!
সম্রাট:- ওকে প্লিজ!**** দেয়ার'স আ্যা বিগ ইসু দ্যাট ক্রি*য়েটে'ড বাই দ্যা রাস্কেল ফর মাই ফিয়'ন্সে।সি ইজ ইন ট্রা'ভল!প্লিজ গো ওর সে*ন্ড ইউর ফোর্স হা'রি আপ!( চিৎকার করে কথাগুলো বলতে লাগলো)
সম্রাট:- ইয়া'হ, ইয়া'হ!!আই উ**ইল রিচ এস সুন এস প*সি*ব*ল! প্লি*জ!
ও*পাশে'র ব্যক্তি ও তাড়া খেয়ে চলে গেল নিজ দায়িত্ব পালনে.
সম্রাট ব্ল'টুথ দিয়ে কথা বলতে বলতে গতি সীমা অতিক্রম করেই ড্রাইভ করছে, কারন আজ দেরি হয়ে গেলে সে যে তার পারিকে আবারও হারাবে।
----------------------------------------------------------------------
১/ছিহ্ চেহারা দেখে কেউ বুঝবে এর চরিত্র কেমন!
২/আমাদের মহল্লায় এইরকম নোংরা মেয়ে মানুষ থাকতে পারে না!
৩/ ঘরে অসুস্থ মা আর দেখো কি সব করে বেড়াচ্ছে! ছিহ ছিহ!
৪/আরে দুর এইসব করেই তো টাকা কামাই করে আর সেগুলো দিয়ে মায়ের চিকিৎসা করাচ্ছে! শোনোনি কতবড় হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে! এত টাকা কোথায় থেকে আসে?
৫/আরে ঐ যে উনি! ঐ যে পুরুষ মানুষটা আসে না! উনিই তো দেখলাম সেদিন ঐ মহিলাকে নিয়ে গেলো এম্বুলেন্সে করে!
৬/হ্যা তা কি এমনি এমনিই নেয়! দেখো না কতবড় গাড়ী করে আসে ,সেটার সব জানালা কালো কাঁচের;অত রাতে একজন মেয়ে মানুষকে দিয়ে যায় তাও কিনা বাড়ির কাজের লোক তাহলে বুঝতো কি হতে পারে এ গাড়ীর ভেতরে! বড়লোকেরা তো এই ধরনের অসহায় মেয়েদের সু্যোগ এভাবেই নিয়ে থাকে।তাই বলে এই মেয়েরাও এমনিতে সুযোগ দিবে?
৭)একে এই মহল্লায় রাখা যাবে না পরে দেখা যাবে আমাদের বউ জ্বী রাও এর মতো নোট*ং*রামো করার সুযোগ নিবে! একে এই মহল্লা থেকে বেল করেন!
৭/এতই যখন শরীরে ক্ষুধা তাহলে তো পতিতালয়েই যেতে পারে! ভদ্র সমাজে থেকে এইসব করার মানে কি!
৯/এর জন্য না আবার আমাদের স্বামীরা ও খারাপ হয়ে যায় কারন এদের তো চক্ষু লজ্জা কম! পরের স্বামীর প্রতি বেশিই নজর পড়ে!
চারপাশের এমন ধি*ক্কা*রে পারির মরে যেতে ইচ্ছা করছে, বারবার আল্লাহর চাইছে পায়ের তলার মাটি যেন ফাঁক হয়ে যায়,মনে হচ্ছিলো এই জমিনের ফাঁকেই সে নিজেকে লুকিয়ে ফেলুক;প্রতিটি শব্দ ছিলো তার দিকে চরিত্র*হী'নার অপবাদ দিয়ে। আশেপাশে কেউ আফসোস করছে তার সৌন্দর্য নিয়ে তো কেউ সেই সৌন্দর্য নিয়েই কুৎসিত সব বাক্য ব্যবহার করছে।
দরজা খুলে পারি যাকে দেখে, সে ছিলো এই এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসী মাকসুদ। স্থানীয় ক্ষমতাধর লোকদের যত আকা*জ কু*কা*জ সব এই মাকসুদই করে। পারি যখন এই মহল্লায় আসে তখন থেকেই পারির প্রতি তার লোলুপ দৃষ্টি পড়ে।মাকসুদে'র আগেও তিনটা বউ ছিলো।প্রতিটি বউ ছিলো অসম্ভব সুন্দরী, প্রথম বউ ওর অতিরিক্ত অত্যাচারের কারনে মারা যায়,বউটির পরিবার ছিলো অনেক অসহায় আর গরীব। মেয়ের মৃত্যুর প্রতিবাদ করার সাহসও তাদের হয়নি । এরপরে বউরা অত্যাচার সইতে না পেরে যে যার মতো চলে গেছে, কোথায় গেছে কার সাথে গেছে সেই সন্ধান কেউ জানেনা এমনকি মাকসুদ নিজেও না।আসলে সে জানার প্রয়োজনই অনুভব করেনি।কারন তখন তার জঘন্য নজর পড়ে পারির উপর।পারিকে নিজের করার জন্য সে এতটাই উতলা হয়ে যায় যে পারির প্রতিটি পদক্ষেপে নজর রাখে। এমনকি সেদিন রাতে যেই ছেলেরা পারিকে আক্রমণ করে তারাও এই মাকসুদে'র লোকই থাকে। হ্যা মাকসুদ ও ছেলেদের আদেশ করেছিলো তার জন্য পারিকে তুলে নিয়ে যেতে কিন্তু ঐ ছেলেরা নিজেরাও নেশাগ্রস্ত ছিলো যার দরুন তারা তাদের বসের আদেশ অমান্য করে নিজেরাই পারির উপর হামলে পড়ে যার দরুন সম্রাটের মুখোমুখি হতে হয়।
নিজের পাঠানো ছেলেদের এমন দশা দেখে মাকসুদে'র মাথা গরম হয়ে যায়,খবর লাগায় সম্রাটের, সেখানে গিয়ে জানতে পারে সম্রাটের বাড়িতে পারির আনাগোনা।এর পর থেকেই এই ভয়ানক পরিকল্পনা আঁটে। এতদিন পারি আর সম্রাটের সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে আজ সুযোগ বুঝে পারির বাড়িতে লোক নিয়ে হামলা করে।হ্যা সম্রাট যে আজ পুরো পরিবার নিয়ে পিকনিকে যাবে আর পারি ও বাসায় একা থাকবে সেটা সে জেনেই আজ এখানে এসেছে।তার ভয়াবহ পরিকল্পনা হচ্ছে পারিকে সবার সামনে হেনস্থা করে আবার নিজেই বাঁচানোর উদ্দেশ্যে মহান সেজে পারিকে বিয়ে করা।পারি এরকম পরিস্থিতিতে নিজেকে বাঁচাতে অবশ্যই তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হবে আর যদি তা না হয় তবে সে খুব ভালো করেই জানে কিভাবে বিয়েতে রাজী করাতে হয়।
পর্ব ৪১
রোহানের সাথে থাকা কালীন এর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির শিকার পারি হয়েছিল কিন্তু এরকম জঘন্য কথার মুখোমুখি হয়নি তাই যেন কষ্টের পরিমাণ উপলদ্ধি করতে কষ্ট হচ্ছে না। তার চেয়েও বড় কথা তার জন্য তার বয়স্ক হাসান চাচা আর তার সহধর্মিণী চরম পর্যায়ের অপমানিত হচ্ছে। চাচার গাঁয়েও হাত তুলেছে। মেয়েদের দালাল বলে বারবার অপবাদ দিয়েছে। নিজের জীবনের চরম ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া পারির নিজের জন্য খারাপ না লাগলেও তাদের জন্য লাগছে যারা জীবনের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তেও তার পাশে থেকে তাকে সাহায্য করেছে।
শয়তান মাকসুদ নিজের র*চয়ি'ত গল্পের অংশ হিসেবে পারিকে হেনস্থা করার পর পারিকে শাস্তি হিসেবে তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব রাখে তখনই যেন পারির ভেতরের জ্বালাময়ী রুপ বের হয়ে আসে।সে প্রতিবাদী কন্ঠে বলে,
পারি:- জীবন থাকতে আমি এই নরপশু'কে বিয়ে করবো না!
পারির কথায় একদল মানুষ হইহই করে উঠে,পারির চরিত্রে যত সম্ভব ট্যাগ লাগানো যায় সেইটা চেষ্টা ই তারা করে।
এদিকে মাকসুদ যখনই বিয়ের প্রস্তুতি হিসেবে কাজীকে আনতে পাঠায় তখনই সেখানে এসে হাজির হয় উক্ত থানার ভারপ্রাপ্ত উচ্চ কর্মকর্তা।
সম্রাট জানে এই ধরনের বখাটেরা ছোটখাটো অফিসারদের নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেই সব অপকর্ম করে তাই সে সবার উপরের মহলেই ফোন লাগায় যার দরুন সিনিয়র অফিসার উপস্থিত হয় এখানে।
পারিকে দ্বিতীয় বার পাওয়ার পর এবং সেদিন রাতে পারির উপর মাকসুদ বাহিনীর হামলার পর থেকেই সম্রাট একজন লোক হা,*য়া'র করে যার কাজ কেবল পারির উপর নজর রাখা। নিজ দায়িত্বে নিয়োজিত ঐ লোকটিই সম্রাটকে ফোন করে খবরটা দেয় তবে নিজস্ব একটা কাজে একটু আটকে যাওয়ায় খবর দিতে দেরি হয়।
পুলিশ এসে যখন পারির এর অবস্থা দেখে তখন সে কিছুটা আতংকিত হয় কারন এই ধরনের কাজ করার আগে মাকসুদ তার সাথে চুক্তি করেই নেয় যাতে মাকসুদে'র বিরুদ্ধে কোন আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হয় এমনকি কেউ আইনি পদক্ষেপ নিতে গেলে ঐ ভুক্তভোগী পরিবার'কেই নানান মামলার ঝামেলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়! মাকসুদ এর পরিকল্পনা এটাও ছিলো । কিন্তু কে জানতো এই কাজটাই আজ অফিসারের জন্য খারাপ কিছু বয়ে নিয়ে আসবে।যেই লোক সরাসরি হেড অফিসে ফোন দিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তার ঘাম ছুটাতে পারে তার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারনা করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।
অফিসারকে দেখে মাকসুদ কিছুটা বিরক্ত হয়;
মাকসুদ:- আরে মিয়া আপনি অহন এহানে কিল্লাই'গা! আপনেরে কেউ কমপ্লেইন করছে?
অফিসারের প্রতি মাকসুদ এর বিরক্তিকর ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখে অফিসার কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে যায়,আরে ভাই টাকা খাই তাই বলে কি দাম নাই! কি ভাবে এরা? কয়টা টাকা দিয়া কি মাথা কিন্না নিছে!
অফিসারের ভাবনার মাঝেই শুনতে পায় মাকসুদের খিটখিটে মেজাজে বলা কথা,,,
মাকসুদ:- কে বলছে আমারে বলেন তো এক পোঁচে শেষ করে দেই শালার জীবন ইতিহাস!
অফিসার:- উফ থামো তো একটু! সবসময় বেশি কথা বলো!
মাকসুদ:- আমার সাথে ঠিক করে কথা বলেন অফিসার; ভুলে যাবেন না মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা পৌঁছে যায়!
অফিসার:- হ্যা তো টাকা দাও বলে কি মাথা কিনে নিয়ে'ছো? যে যখন যা বলবে তাই শুনতে হবে!
মাকসুদ:- কি কইলেন আপনি!
মাকসুদ এর কন্ঠস্বরে বুঝতে পারলো ও ক্ষেপে গেছে, একে ক্ষেপালে অফিসারের অবস্থা যে হালুয়া হয়ে যাবে! তাই শান্ত মনে বুঝানোর ভঙ্গিতে বললো,,
অফিসার:- দেখো তোমার সাথে এখন ঝগড়া করতে আসি নাই।আর এখন ঝগড়া করলে তোমার ও ক্ষতি আমার ও ক্ষতি! তাই বেশি কথা না বলে চুপচাপ আমি যাই কই তা শোনো!
মাকসুদ অফিসারের শান্ত কথায় বুঝতে পারলো বিষয়টা সিরিয়াস,তাই নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে দমিয়ে নিলো, তারপর অফিসারের আরেকটু গা ঘেঁষে বললো,,
মাকসুদ:- কিছু সিরিয়াস?
অফিসার:- সিরিয়াস মানে অসম্ভব সিরিয়াস!
কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো মাকসুদ, বিরক্ত লাগছে তার এখন এই মুহূর্তে অফিসারের এমন প্যাচা'নো কথায়,তার এখন কেয়ামত হয়ে গেলেও এইদিকে কোন মন নেই কারন তার চিন্তা কতক্ষনে পারিকে নিজের অধীনে নেওয়া যায়।আর এদিকে কিনা এই অফিসার আসছে কোন বেহুদা প্যাচা'ল নিয়ে!
মাকসুদ:- উফ্,এত প্যাচা'ন ক্যান! যা বলার তা বলে বিদায় হন তো! সময় মতো টেকা পৌ'ছাই'য়া যাইবো আপনার একাউন্টে!
অফিসার:- তোমার সমস্যা কি জানো? তুমি কারো কথা আগে শুনতে চাও না!
মাকসুদ কপালের ভাঁজ আরো গভীর করলো, অফিসার নিজের থেকেই বললেন,,
অফিসার:- কিছু করার আগে চারদিকের খবর নাও? নাকি মেয়ে মানুষের শরীরের গন্ধে সব ভুলে যাও?
মাকসুদ:- মাইয়া মাইনষের শরীরের ঘ্রা*নে'র চেয়ে ভালা জিনিস এই পৃথিবীতে আর কিছু নাই! তাই হুদাই কথা না প্যা'চা*ই'য়া আসল কথায় আহে'ন!
অফিসার:- যেই মেয়েকে নিয়ে নাটক সা*জা**ই'ছো তার খবর কিছু জানো? জানো তার ক্ষমতা কতদূর!
মাকসুদ:- কি কইবার চান?
অফিসার:- এই মেয়ে ইয়াং বিজনেসম্যান , এই বছর আ্যা**ওয়া**র্ড পাওয়া বর্তমানের ব্যবসায়ি হিসেবে যার নাম সবার আগে আসে সেই সম্রাট মাহমুদ তালুকদারের বাগদত্তা যার এক হুকুমে হেড কোয়ার্টার থেকে স্বয়ং সিনিয়ররা ফোন দেয়! বুঝতে পারছো কি খিচুড়ি পা*কাই'ছো! নিজে তো ফাস'বা সাথে আমারে'ও ডু*বা'বা!
অফিসারের কথায় মাকসুদ কিছুটা ভয় পেলেও,নড়েচড়ে উঠলেও, নিজের ভেতরেই দমিয়ে রাখে, অফিসারের সামনে প্রমান করার চেষ্টা করে এতে তার কিছুই যায় আসে না।আসলে পারির নেশা এভাবে চেপে ধরছে যে ওর বোধ বুদ্ধি দুটো'ই লোপ পেয়েছে। অফিসার মাকসুদের নির্লিপ্ত ভাব দেখে বললো,,
অফিসার:- তুমি তো দেখছি গায়েই মাখ'লা না ব্যাপারটা! আমাকে কেন পাঠানো হয়েছে জানো? তোমাকে গ্রেফতার করতে! যদি তা না করি তবে আমার অবস্থা ও খারাপ করে দিবে! এখন বলো তুমি কি করবা?
মাকসুদ:- আপনে কি আমারে ভয় দেখাই*তা*ছে'ন!
অফিসার:- আরে দুর তোমারে ভয় কেন দেখা'মু,সতর্ক করতে আসছি! এখন কি করবা তোমার সিদ্ধান্ত কিন্তু এই মেয়ের সাথে খারাপ কিছু ঘটলে তার জন্য আমি তোমারে গ্রেফতার করতে বাধ্য হমু!
মাকসুদ:- হেইডা পরে দেখা যাইবো! আপনে কি আমারে ধইন্ঞ্চা ভাবছেন যে গ্রেফতারের ভয় দেখান? ভুইলা যাইবে'ন না আপনার মতো অফিসার এই মাকসুদ পকেটে নিয়া ঘুরে!
পকেটে নিয়ে ঘোরার কথাটা অফিসারের গায়ে লাগলেও কিছু বললেন না কারন এরকম ঘুষখোর অফিসারদের এইরকম কথা হজম করে তবেই না পকেটে টাকা ঢুকাতে হয়।আর মাকসুদ কথাটা একদম মিথ্যা বলে নাই,কয়েক থানার এই শ্রেনীর অফিসারকে কিনে নেওয়ার টাকা এই মাকসুদের আছে ! তাছাড়া স্থানীয় অনেক ক্ষমতাবানদের হাত ও মাকসুদের উপর রয়েছে! তবে এই মুহূর্তে অফিসারের মাকসুদের চেয়ে নিজের চাকরির চিন্তা বেশি! কারন মাকসুদকে গ্রেফতার করার আগেই জামিন রেডি হয়ে যায় কিন্তু উনার চাকরি হারালে তার জন্য কি করবে? শুধু কি চাকরি তার সাথে বেআইনি কাজে সহযোগিতা করার অপরাধে না আবার জেল জরিমানা ও হয়!
মাকসুদ অফিসারের কথাকে তোয়াজ না করে চলে গেল।এত সময় বেশ কিছুটা দুরে দাঁড়িয়ে তারা তাদের এই শলা-পরামর্শ চালিয়ে যাচ্ছিলো।।
মাকসুদের নির্লিপ্ত**তা অফিসারের প্যা**ন্ট খারাপ করার উপক্র*ম করে দিলো।
সম্রাট যখন পারির বাড়ির সামনে এলো হঠাৎ করেই যেন ওর শরীরে কাঁপুনি ধরে গেল,, বাড়ির সামনে অগনিত লোকের ভীড় ! কেমন জানি অন্য রকম একটা পরিবেশ! চারিদিক থেকে নানান গুঞ্জন ওর কানে আসছে! সব কিছু ঠেলে ভেতরে ঢুকে যা দেখলো তাতে যেন ও বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।রাগে চেহারা লালবর্ন ধারন করলো।।।
বিছানায় লাল শাড়ী পড়ুয়া নতুন বউয়ের বেসে বসে থাকা পারিকে দেখে সম্রাটের পায়ের জমিন যেন আরো একবার সরে যাওয়ার উপক্রম।স্তব্ধ নির্বাক চাহনি কিন্তু কথা যেন অজস্র বলছে। ভীড় ঠেলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো,সম্রাটকে দেখে চারদিকের গুঞ্জনের পরিমান যেন বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে গেল! সব গুঞ্জনকে দুর ছাই বলে হাঁটু গেড়ে বসলো পারির পায়ের সামনে, নিজের সামনে এভাবে কাউকে বসতে দেখে এত সময় পর চোখ তুলে তাকালো অসহায়, নিস্তেজ নয়ন'জোড়া! এক হলো দুই জোড়া নয়ন! একজনের অভিযোগ অপরজনের অজানা রয়ে যাচ্ছে , তো অপরজন জেনেও অসহায়!
মানুষের নানান কথায় ও যখন পারিকে বিয়ের জন্য রাজী করানো গেল না তখনই মুখ্য চাল টা দিলো মাকসুদ! হাসান সাহেব আর তার স্ত্রীকে আটক করে তাদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে বাধ্য করলো বিয়ের আসরে বসতে!
পর্ব ৪২
সদর দরজা খুলে বধূ বেসে দাঁড়িয়ে থাকা পারিকে দেখে যতটা আশ্চর্য আসমা খালা না হয়েছে তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি হয়েছে সম্রাটের হাতের মুঠোয় পারির হাত দেখে।
পুরো বাড়িতে থমথমে একটা ভাব হয়ে উঠলো কিছু মুহূর্ত আগেই। কলিং বেলের আওয়াজে নিজ রুম থেকে বেরিয়ে আসলো সবাই। সম্রাটকে ও'মন অস্থির আর তাড়াহুড়ো করে আসতে দেখে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো,তাই সম্রাট আসার কিছু সময় বাদে তারাও চলে আসে।
সম্রাট:- খালা ওকে আমার রুমে দিয়ে আসেন!
আসমা খালাকে উদ্দেশ্যে করে কথাটা বললো,খালা ডে*ব*ডে*বি'য়ে সম্রাট পারিকে দেখছে, বাড়ির সবাইকে নিয়ে সম্রাটের মাথায় কিছু আসছে না।এই মুহূর্তে পারিকে ছাড়া অন্য কোন ভাবনা তার মাথায় নাই।
সম্রাট:- খালা আমি কিছু বলেছি!
ধম'কে কথা টা বলে সম্রাট; সম্রাটের ধম'কে করা থতমত খেয়ে গেল, তাড়াহুড়ো পারির সামনে গিয়ে বললো,'
খালা:- আসো আমার লগে!
পারি এখনো নিরুত্তাপ ভাবে দাড়িয়ে আছে, তার কোন হেলদোল না দেখে খালা কি করবে বুঝতে পারছে না! সম্রাট পারির দিকে ফিরে বললো,
সম্রাট:- রুমে যাও!
সম্রাটের আদেশে পারি সম্রাটের দিকে তাকালো,, চাহনিতে কি ছিলো বুঝতে পারলো না সম্রাট; পারির চোখে চোখ রেখেই বললো,,
সম্রাট:- সারাদিন অনেক ধকল গেছে তোমার উপর, রুমে গিয়ে রেস্ট করো!
পারি এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে,সম্রাট খালাকে ইশারায় বলে পারির হাত ধরেই নিয়ে যেতে,খালাও আদেশ অনুযায়ী কাজ করতে গেল, নিজের হাতে টান অনুভব করায় পারি সম্রাটের থেকে চোখ সরিয়ে খালার দিকে দেয়,খালা পারির চোখ দেখে কিছু একটা বুঝলো তবুও কিছু বললো না,, চোখের ভাষায় কথা বলে,যা মানুষকে বাধ্য করে অপর মানুষের কথা বুঝতে ! খালাও যেন পারির চোখেই বুঝতে পারলো কিছু,তাই চোখের ভাষায় আস্বস্ত করে,হাতটা খুব আলগোছে ধরে তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে নিয়ে যায় সম্রাটের রুমে।পারির হাঁটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে এই মুহূর্তে তার অবস্থা!
মাহমুদ তালুকদার:- এই সব কি সম্রাট?
সম্রাট:- আমি ও অনেক টায়ার্ড ! যা বলার কালকে সকালে বলবো!
সম্রাটের মা :- মানে কি?তুমি এত বড় একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেললে আর এখন বলছো তুমি টায়ার্ড? এর জন্যই তখন এত তাড়াহুড়া করে চলে আসলে?
সম্রাট:- মা যা জানার আর বলার আমি কালকে সকালেই বলবো!
আর কেউ কিছু বলার আগেই সোহা বললো,
সোহা:- মা ভাইকে যেতে দাও!
সোহার কথায় সবাই সোহার দিকে তাকালো, সোহার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, সোহা এই ব্যাপারে কিছু বলতে চায়।সম্রাট বোনের সমর্থনে কারো দিকে না তাকিয়ে চলে গেল উপরে!
ঘরে গিয়ে দেখলো পারি বেডের পাশে ফ্লোরে হাঁটু ভাঁজ করে তার মধ্যে মুখ গুঁজে কাঁদছে! পারিকে কাঁদতে দেখে সম্রাটের কষ্ট হলেও কিছু বললো না,ওকে ওর মতো ছেড়ে দিয়ে আলমারি খুলে নিজের কাপড় নিয়ে চলে গেল ওয়াশ'রুমে।
পারি ঘরে কারো আনাগোনা অনুভব করতেই চোখ মেলে তাকালো,ওয়াশ'রুমে ঢোকার সময় সম্রাটকে দেখলো! সম্রাটের সাথে কথা বলার ইচ্ছে নাই।তাই মুখটা ঘুরিয়ে নিলো, অভিমানের সাথে যোগ হয়েছে রাগ।হ্যা রাগ; প্রচুর রাগ!বিয়ে ভাঙতে গেলে বিয়ে করতে হবে এটা কেমন কথা?
ফ্লাশ-ব্যাক;
মাকসুদ যখন পারির ঘরে কাজী নিয়ে এসে সম্রাটকে দেখে তখন আবারও পরিস্থিতি বিগড়ানোর চেষ্টা করে, সম্রাট মাকসুদ'কে দেখেই ক্ষেপে যায়! পরপর তিনটা ঘুসি দেয় নাকের উপর কোনরকম কথা ছাড়াই! সম্রাটের এমন অতর্কিত হামলায় মাকসুদ কি করা উচিত ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। দুজনের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়।এর মধ্যেই অনেক মানুষ জড়ো হয়, তারা তামাশা দেখলেও মাকসুদের চ্যালা-প্যালা'রা আবারও সম্রাটকে জড়িয়ে পারি'কে তুলে বিভিন্ন নোংরা কথা বলতে থাকে।সব কিছুই পারি নির্বাক হয়ে শুধু দেখতে থাকে।এক পর্যায়ে উঠে সম্রাটকে চলে যেতে বললো,সম্রাট রক্তচক্ষু নিয়ে পারির দিকে তাকালে পারি বেশ ভয় পায় তবে সেই ভয়কে প্রকাশ না করে সম্রাটকে বলে,,
পারি:- আপনি কেন আমার বিয়েতে এসে এরকম অশান্তি করছেন?
সম্রাট:- পারি!
গ*র্জা*নো কন্ঠে সম্রাটের হুংকার,পারি নিজেকে ধাতস্থ করে,,
পারি:- প্লিজ আপনি চলে যান!
সম্রাট:- চুপ থাকো!
পারি:- চুপ থাকবো মানে! আপনি আমার ঘরে এসে আমার ই হবু বরকে মারছেন আর আমাকেই ধমক দিয়ে বলছেন চুপ থাকতে!
সম্রাট:- shut up,i say just shut up! don't say one more word!
পারির হঠাৎ এই পরিবর্তনে মাকসুদ কিছুটা আশ্চর্য হয়, হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকে পারি আর সম্রাটের পানে। সম্রাট পারির সাথে কথা বলার মাঝেই ঘরে দৌড়ে ঢুকে হাসান সাহেব আর তার স্ত্রী! তাদেরকে দেখে পারির আত্নায় পানি আসে! দৌড়ে গিয়ে হাসান সাহেবের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে! তাকে ধরেই চিৎকার করে কান্না শুরু করলো,সম্রাট চোখের ইশারায় কিছু বললে হাসান সাহেব মাথা নাড়ায়।পারি হাসান সাহেবের বুকে পড়েই কাঁদতে থাকে। হাসান সাহেব পরম আদরে নিজের বুকের মাঝেই আগলে রাখে।
হাসান সাহেবের কাছে পারি তার নিজ সন্তানের চেয়েও বেশি আদরের।এই মেয়েকে উনি জন্মের পর থেকে মেয়ের মতো করেই আদর যত্নে রেখেছেন। উনি ছিলেন পরশ আবরার চৌধুরীর অফিসের পিয়ন। পারি যখন মিসেস প্রিয়ন্তির গর্ভে আসেন তখন একদিন মিসেস প্রিয়ন্তি অফিসে আসেন। মিসেস প্রিয়ন্তি অসাবধানতায় সিড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায়।তখন পরশ আবরার চৌধুরীর ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এ।তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে না পেরে হাসান সাহেব নিজেই ছুটে চলে যান মিসেস প্রিয়ন্তি'কে নিয়ে হাসপাতালে, পুরোটা সময়ই নিজ দায়িত্বে উনি মিসেস প্রিয়ন্তির দেখভাল করে। রিক্স থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব সহকারে ডাক্তারকে অনুরোধ করে চিকিৎসা চালাতে।সেদিন সিজারের মাধ্যমে মাত্র সাড়ে সাত মাসে পৃথিবীর মুখ দেখে পারি।পারির জীবনও ছিলো হুমকির মুখে।ডাক্তার পারিকে ওটি থেকে বের করে আনার পর প্রথম উনার কোলে'ই দিয়েছিলো! কিছু সময় রাখার পর নিয়ে যাওয়া হয় অবজারভেশনের জন্য। পুরো এক মাস পারি ছিলো ডাক্তারদের বিশেষ প*র্য*বে*ক্ষনে'র অধীন। পৃথিবীর মুখ দেখার পর প্রথম যেই মানুষটির ছোঁয়া পেয়েছিল, রক্তের টান না থাকা সত্ত্বেও কেন জানি পারি তার প্রতি দূ'র্ব'ল হয়ে পড়েছিলো! হাসান সাহেবের মাঝেও পারির জন্য অন্যরকম টান দেখতে পান পরশ আবরার চৌধুরী।
সেদিন উনি নিজের চাকরি কিংবা অধিকারের সীমা নিয়ে চিন্তা করেন'নি উনার এই মা*নবিকতা'য় মিসেস প্রিয়ন্তি মুগ্ধ হোন।পরশ আবরার চৌধুরীকে বলেন।পরশ আবরার চৌধুরী হাসান সাহেবকে খুশি হয়ে প্রমোশন দিতে চাইলে মিসেস প্রিয়ন্তিই বলেন হাসান সাহেব কে পারির জন্য বাসায় নিযুক্ত করতে।তখন থেকেই এই বন্ধন আরো মজবুত হয়।
পিতার স্নেহে যেই মানুষটি বড় করেছেন তাকে কোনদিন বাবা না ডাকলেও তার মাঝে বাবার ছায়া সবসময়ই খুঁজে পায় পারি। আর তাই তো নিজের চরম কষ্টের মুহূর্তে তাকে পেয়ে যেন কান্না'রা বাঁধ ভেঙে পড়ছে।
হাসান সাহেবের স্ত্রী পারির পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে কাঁদছেন! বাবা মায়ের অতি আদরে বড় হওয়া পুতুলের মতো মেয়েটা কেন এত কষ্ট পাচ্ছে তার জন্য আল্লাহর দরবারে তার অভিযোগের শেষ নেই।
মেয়েটার ভালো দিনের জন্য প্রতি নামাজে তিনি দোয়া করে যাচ্ছেন অথচ আল্লাহ যেন তাদের দোয়া কবুলই করছেন না!
হাসান সাহেব পারিকে নিজের বুকে আগলে রেখেই সম্রাটের দিকে চেয়ে অনুমতি দিলেন।এত সময়ে পারির কান্না থামার নাম নিলো। পারি সোজা হয়ে দাঁড়াতে'ই পাশে এসে সম্রাট দাঁড়ায়, কাজী সাহেবের উদ্দেশ্যে বলে,,
সম্রাট:- কাজী সাহেব আপনি বিয়ে পড়ানোর প্রস্ততি নেন।
বিয়ে পড়ানোর কথায় পারি করুন দৃষ্টিতে সম্রাটের দিকে তাকায়,সম্রাট পারির চাহনিকে এড়িয়ে কাজী সাহেবের সাথে কথা বলে,সব কিছু নিজেই বলছে আর কাজী সাহেব শুধু লিখছেন।বরের নাম সম্রাট বলতেই,,
পারি:- মানে কি ?
সম্রাট কপালে ভাঁজ ফেলে পারির দিকে তাকায়,
পারি:-সম্রাট বর মানে কি! আপনি বরের জায়গায় নিজের নাম কেন লিখছেন?
সম্রাটের বিরক্তিকর চাহনি,হাসান সাহেব এগিয়ে এসে পারির মাথায় হাত রেখে বলেন,,
হাসান সাহেব:- যা হচ্ছে তা হতে দেও মা!
পারি:- কিন্তু চাচা?
হাসান সাহেব:- তোমার জন্য এটাই উত্তম!
পারি:- কিন্তু এটা কি করে হয়?
সম্রাট:- কেন হয় না? নাকি ঐ লম্পট মাকসুদ কে বিয়ে করতে চাও! বলো তাহলে! তবে তুমি যেটাই চাও বিয়ে তোমাকে আমাকেই করতে হবে!
পারি:- অসম্ভব!
সম্রাট:- সব সম্ভব!
পারি:- আমি মরে গেলেও আপনাকে বিয়ে করবো না!
সম্রাট:-মরা তো দুরের বিষয় তুমি জীবিত অবস্থায়ই আমাকে বিয়ে করবে তাও এখনই!
পারি:- কখনোই না; আপনাকে বিয়ে করার চেয়ে ঐ লম্পট মাকসুদকে'ই বিয়ে করা উত্তম!
কথা শেষ হতে দেরি হলেও পারির গালে সম্রাটের পুরুষালি হাতের চড় পড়তে দেরি হয়নি।হুট করেই এমন আঘাত পারি সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে ধরলেই হাসান সাহেবের স্ত্রী হাত দিয়ে আগলে ধরেন,পারি নিজের গালে হাত রেখে অবাক হয়ে সম্রাটের দিকে তাকায়, সম্রাটের চোখে আগুন জড়'ছে, দাঁত কি'ড়মিড়ি'য়ে বললো,
সম্রাট:- তোর এই জেদ ই তোর জীবন ধ্বংস করার জন্য দায়ী! তুই নিজেও ভালো থাকতে চাস না সাথে আমাদের ও থাকতে দিস না! তোকে কতবার বলেছিলাম জেদটা কমাতে! কিন্তু তুই!
একটু থেমে দম নিয়ে নিজেকে শান্ত করে কাজী সাহেবের উদ্দেশ্যে বলে,
সম্রাট:- আপনার হয়েছে?
কাজী সাহেব এত সময় এই দুইজনের কাহিনী দেখছিলো,, এমনিতেই মাকসুদের চ্যালা-প্যালা'রা বেচারা কাজীকে ভয় দেখিয়ে তুলে আনছেন, তারপর এখানে এসেই বরের উপর অন্য একজনের হামলায় বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, তারপর বর পরিবর্তন, আবার সেই বর কিনা এখনো নিজের না হওয়া বউকেই এভাবে সবার সামনে মারছে।
সম্রাট:- আপনি কি দেখছেন?
সম্রাটের ধম'কে নিজের চেতনে ফিরে আমতা আমতা করে বললেন,,
কাজী সাহেব:- হ্যা হ্যা হয়ে গেছে কিন্তু বউ তো মনে হয় রাজী না।
সম্রাট:- সেটা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না! আপনি নিজের কাজ করুন!
পরিশেষে বউয়ের অনুমতি ছাড়াই বিয়ে সম্পন্ন হয়,পারি চাইলেও আর কোন কথা বলতে পারেনি! সম্রাট ও দেয়নি কথা বলার সুযোগ তবে হাসান সাহেবের স্ত্রী আর হাসান সাহেব নিজেই পারিকে বুঝিয়েছেন অনেকভাবে!
দরজা খোলার শব্দে পারি বুঝতে পারে সম্রাট ওয়াশ'রুম থেকে বেরোচ্ছে।তাই নিজেকে গুটিয়ে নিলো, আবারও পায়ের ভাঁজে মুখ গুঁজে রইলো।
সম্রাট:- মনে হচ্ছে কান্না করে সমুদ্র বানানোর ডিল করেছো!
পর্ব ৪৩
সম্রাটের খোঁচা মারা কথায় পারি চোখ তুলে তাকালো,চোখ দিয়ে সম্রাটকে গিলে খাওয়ার উপক্রম! সম্রাট মজা করে ভয় পাওয়ার ভঙ্গিতে বললো,
সম্রাট:- ওরে বাবারে,যেমনি তা*কা'চ্ছো মনে হচ্ছে খেয়ে ফেলবে!
পারি এখনও দাঁত কিড়মি'ড় করেই তাকিয়ে আছে। সম্রাট হাঁটু গেড়ে পারির সামনে বসে,পারির এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিতে দিতে বললো,
সম্রাট:- এত বিরহ কিসের জন্য? ঐ লম্পট মাকসুদকে বিয়ে করতে না পারায় নাকি আমার সাথে বিয়ে হওয়াতে!
পারি:- প্রতারকের চেয়ে লম্পট ভালো!
পারির কথায় সম্রাট কষ্ট পেলেও হালকা হেসে উড়িয়ে দিলো, তারপর বললো,
সম্রাট:- কিছু সময় আমাদের দেখার মাঝেও ভুল থাকে! যাই হোক আমি জানিনা তুমি কেন আর কিসের জন্য এরকম করছো তবে এতটুকু বলবো,যাই হোক যদি আমার সাথে সরাসরি কথা বলতে তাহলে হয়তো আমাদের এতটা ভুগতে না ও হতো!
সম্রাট জানে পারির এরকম করার কারন তবুও পারির মুখে শোনার জন্য কথাটা বললো,ও চায় পারি সরাসরি সেই রাতের কথা ওকে জিজ্ঞেস করুক,তবেই ও তার উত্তর দিবে।
পারি সম্রাটের কথায় কিছুটা ধাঁধায় পড়ে যায়।তবে কিছু বলে না । মুখটা ঘুরিয়ে অন্য দিকে চেয়ে থাকে,সম্রাট সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতের টাওয়াল'টা পারির কোলের উপর ছেড়ে দেয়,,
সম্রাট:- যাও ফ্রেশ হয়ে আসো। তারপর খাবে!
পারি নিজের কোলের উপর সম্রাটের ব্যবহৃত ভেজা টাওয়াল দেখে বিরক্ত হয়ে সম্রাটের পানে তাকায়,সম্রাট ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করছিলো,পিছু ঘুরে বললো,
সম্রাট:- কি হলো এখনও বসে আছো কেন? যাও ফ্রেশ হয়ে আসো! তারপর একসাথে খাবো!
পারি এখন নির্বাক হয়ে শুধু সম্রাটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে,সম্রাট পারির এহেন কাজে কপাল কুঁচকে তাকালো, কিছু সময় তাকাতেই কিছু একটা মনে পড়তেই কপাল টান টান করে বললো,,
সম্রাট:- তুমি ওয়াশ'রুমে যাও আমি আসছি!
সম্রাট চলে গেলে পারি সম্রাটের টাওয়াল টা নিয়ে চলে গেল ফ্রেশ হতে! সম্রাট বাইরে যাওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই আবার ফিরে আসলো পারির জন্য একটা লেমন সুতি শাড়ী নিয়ে। সোহা আর পারির শারীরিক গঠন সেইম হওয়ায় ব্লাউজের সমস্যা হলো না। সম্রাট শাড়ীটা বেডের একপাশে রেখে বারান্দায় চলে গেল।পারি ফ্রেশ হয়ে এসে বেডের পাশে শাড়ী দেখেই বুঝলো শাড়ীটা ওর জন্যই রাখা। কিছু সময় ভাবলো পড়বে কিনা তারপর নিজের অবস্থা দেখে চিন্তা কে দুর করে শাড়ীটা নিয়ে চলে গেল আবারও ওয়াশ'রুমে।
সম্রাট ভাবছে কিছু মিনিট আগের কথা,,সোহার দরজায় নক করার সাথে সাথেই সোহা দরজা খুলে দাঁড়ালো,,
সোহা:- ভাই কিছু লাগবে?
সম্রাট আমতা আমতা করে বললো,,
সম্রাট:- উ-উম- আস-লে তোর একটা ড্রেস দে না! ওর তো এখানে আপাতত কিছু নেই! কাল সকাল ছাড়া আনতেও পারছি না!
সোহা কিছু মুহূর্ত নিজের ভাইকে দেখে তারপর বললো,,দিচ্ছি দাঁড়াও!
মিনিট দেড়েক এর মধ্যেই এই শাড়ীটা নিয়ে এলো,সম্রাট শাড়ীটা দেখে তারপর মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে শাড়ীটা নিয়ে চলে আসার জন্য পিছু ঘুরতেই সোহার ডাকে থেমে গেল,
সোহা:- ভাই!
সম্রাট:- হুম!
সোহা:- তুমি তোমার সিদ্ধান্তে খুশি?
বোনের এহেন প্রশ্নে সম্রাট মুখ ফুটে কোন উত্তর না দিলেও চোখের ভাষায়-ই তার উত্তর পেয়ে গেছে সোহা! ভাইয়ের অনুভূতি বুঝতে পেরে সোহাও হালকা হাসলো।
পারি কোনরকম ওয়াশ রুম থেকে শাড়ী পড়ে বের হয়ে আসলো,,ওয়াশ রুমে শাড়ী পড়ার মতো কঠিন কাজ আর কি আছে!
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ী ঠিক করছিলো, তখনই দরজায় নক হলো,পারি চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবছে কে হতে পারে! সম্রাট দরজায় শব্দ হওয়ার বিষয়টা বুঝতে পেরে রুমে ঢুকলো,পারিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেই গিয়ে দরজা খুলে দিলো,আসমা খালা খাবার নিয়ে এসেছে। একবার পারিকে তো একবার সম্রাটকে পর্যবেক্ষন করে তারপর খাবারের ট্রে টা টি টেবিলের উপর রেখে চলে গেল! সম্রাট বোনের বুদ্ধি দেখে মুচকি হাসলো।সোহা ঠিক ই বুঝতে পেরেছে পারি আজ কোন মতেই খেতে নিচে যাবে না আর তাই দুজনের খাবারই পাঠিয়ে দিয়েছে কিন্তু এখন এই ম্যাডাম খেলেই হয়!
সম্রাট:- চলো খেয়ে নেই! প্রচন্ড ক্ষুধা লাগছে!
পারি শাড়ী ঠিক করে চলে গেল বারান্দায়,, সম্রাটের এইসব ওর কাছে অতিরিক্ত মনে হচ্ছে! সম্রাটের প্রতি অভিমানের চেয়ে নিজের প্রতি ঘৃনা হচ্ছে বেশি কারন ওর ধারণা সম্রাট শুধু ওর বিয়ের কথাই জানে এর বাইরেও যে ওর জীবনের অন্ধকার অধ্যায় আছে সেটা তো জানে না।জানলে নিশ্চয়ই ওর মতো মেয়েকে নিজের জীবনে দ্বিতীয়বার জড়া'তো না। তার চেয়ে ও বড় কথা ও এখন আর নিজেকে সম্রাটের যোগ্য মনে করে না তাই তো সম্রাটের থেকে সবসময় দুরে দুরে থাকার চেষ্টা করে কিন্তু এখন কি থেকে কি হয়ে গেল? কিভাবে এরপরে তানহার মুখোমুখি হবে? কিভাবে তানহার প্রশ্নের জবাব দিবে? ও তো জানে একটা মেয়ের জন্য এই মুহুর্তগুলো কেমন হয়! মন ভাঙার যন্ত্রনা তো ও বহু আগেই উপলদ্ধি করেছে! সেই একই যন্ত্রনা তানহার মতো মেয়েকে কি করে দিবে? আর সম্রাট! তাকেই বা কিভাবে মেনে নিবে? যে কিনা একাধারে দুটো মেয়ের মন ভেঙ্গে দিলো! আচ্ছা শুধু কি তারা দুজন ই নাকি আরও কেউ আছে? হ্যা আছেই তো সেই নারী যাকে বুকে জড়িয়ে পরম শান্তির ঘুম দিয়েছিলো সেই রাতে! আচ্ছা ঐ মেয়েটা কোথায়? নাকি তাকেও সম্রাট এইভাবে আঘাত দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে! এত এত প্রশ্নের মাঝে নিজেকে কিভাবে সম্রাটের সামনে ঠিক রাখবে? কিভাবে?
সম্রাট:- খেতে আসো!
পারির তরফ থেকে নিরবতা ছাড়া কোন উত্তর নেই,সম্রাট এগিয়ে এসে বললো,,
সম্রাট:- রাগ তো আমার উপর তাহলে কেন নিজেকে কষ্ট দিবে! আসো খেয়ে নিবে!
পারি:-আপনি এখান থেকে যান প্লিজ! আমাকে একা ছেড়ে দিন!
সম্রাট:- পারি!
সম্রাটের করুন সুর,পারির গলার আওয়াজ যেন আর চওড়া হলো,,
পারি:- আমাকে দয়া করে একা ছেড়ে দিন! প্লিজ!
সম্রাট:- ছেড়ে দিবো , খাবারটা যদি খেয়ে নাও!
পারি বুঝলো সম্রাট নিজের কথা না মানিয়ে ছাড়বে না ,তাই বাধ্য হয়েই ভেতরে ঢুকে গেল,সম্রাট পারির যাওয়া দেখে আর ভেতরে গেল না, বারান্দায়ই দাঁড়িয়ে রইলো।ও জানে এখন ও ভেতরে গেলে পারি আর খাবে না! তাই ওর না যাওয়াই উত্তম! পারি ভেতরে গিয়ে খেয়ে সোফায় শুয়ে পড়লো,ষ। সারাদিন অনেক ধকল গেছে! এখন একটু রেস্ট দরকার! সোফায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে রইলো।শাড়ী দিয়ে নিজেকে ভালো করে ঢাক'লো।
সম্রাট বেশ সময় বাদে ভেতরে ঢুকলো,পারিকে এভাবে সোফায় শুয়ে থাকতে দেখে একবার পারির সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে ঘুমন্ত পারির মুখটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলো, এলোমেলো হয়ে থাকা চুলে গুলো ঠিক করে দিলো! কপালে একটা ভালোবাসার স্পর্শ দিতে গিয়েও থেমে গেল।তারপর উঠে গিয়ে বেডের পাশে রাখা পাতলা একটা সুন্দর নকশী কাঁথা এনে পারির গায়ের উপর ছড়িয়ে দিলো।
টেবিলের দিকে চেয়ে খাবারগুলো একবার দেখলো, একবার ভাবলো খাবে কি না! পরে খাবার নষ্ট হবে ভেবে খেয়েই নিলো!
পারি এখনও ঘুমায় নি।চোখ বন্ধ করে সম্রাটের গতিবিধি অনুভব করছিলো।সম্রাট চলে যেতেই বন্ধ চোখ গড়িয়ে পড়লো দু ফোঁটা অশ্রু।
সকালে বাড়িতে মিটিং বসলো! হ্যা মিটিং ই বলা যায় এটাকে! সোহা গতকাল কে কিছু বলতে গিয়েও বলে নি। তানহা কাল থেকেই কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছে।গত রাতের বিষয়টা হওয়ার ছিলো! হবে জানতো তবুও মানতে কষ্ট হচ্ছে! মানহা যেন ভেতরে ভেতরে ভয়ংকর ক্ষেপে আছে পারির উপর।ওর ইচ্ছে করছে পারিকে ধরে ইচ্ছে মতো চড়াতে। কতবড় সাহস যেই বাড়িতে কাজ করে সেই বাড়ির মালিককেই বিয়ে করে বসে আছে! এর জন্য ই তো পারিকে ওর একদম সহ্য হয় না! ও আগেই বুঝতে পেরেছিলো পারির প্রতি সম্রাটের দূর্বলতা। এদিকে রুহানি আছে অন্যরকম একটা পরিস্থিতিতে।পারিকে ওর খুব অপছন্দ না হলেও তানহার বিষয়টা মাথায় আসলে কেন জানি রাগ হচ্ছে আবার খারাপ ও লাগছে! তানহার বিষয়ে কোনরকম দূর্বলতা না থাকলে পারিকে নিজের ভাবী মানতে রুহানির কোন অভিযোগ নেই কিন্তু এখন তো!
এই মুহূর্তে এখানে সবাই উপস্থিত থাকলেও অনুপস্থিত মাত্র পারি একাই! সম্রাটই ওকে বারন করেছে নিচে আসতে! পারিও আসতে চায় নি,কারন এই বাড়ির মানুষের মনে এখন ওর জন্য শুধু ঘৃনা ই আছে সেটা ও কালকে রাতেই বুঝতে পেরেছে।আর তাই এই মুহূর্তে কারো মুখোমুখি হওয়ার মতো সাহস ওর আপাতত নাই।
তানহা সবার থেকে দুরে দাঁড়িয়ে আছে,ও শুধু শুনতে চায় সম্রাট কি বলে!
সম্রাটের মা:- এরকম একটা কাজ করার আগে আমাদের কথা না ই ভাবলে অন্তত তানহা মায়ের কথাও ভাবলে না তুমি?
সম্রাট:- ভাবলে আমার তোমাদের কথাই ভাবা উচিত তানহার নয়!
মাহমুদ তালুকদার:- কিভাবে পারছো এভাবে কথা বলতে?তোমার কি একবারও তানহার জন্য খারাপ লাগছে না!
সম্রাট:- না তো খারাপ লাগার মতো কোন কাজ তো কখনোই আমি তানহার সাথে করি নি!
ছেলের ত্যা'ড়া কথায় নিজের রাগ কে দমন করতে না পেরে উঠে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিলো! সম্রাট বাবার এমন আ*চর'নে কষ্ট পেলেও মাথা তুলে তাকালো না। ছোট বড় সবার সামনে যে তার বাবা তার সাথে এরকম একটা ব্যবহার করবে সেটা সম্রাটের চিন্তায়ই আসে নি। সোহা, রুহা দু'জনেই হকচকিয়ে উঠলো বাবার এমন অগ্নি-রুপ দেখে।তারা কখনো তাদের বাবাকে রাগতে দেখেনি,,গায়ে হাত তোলা তো দুরে থাক! আর সম্রাটের বিষয়ে তো সবসময়ই বাবাকে অন্যরকম দেখেছে।আর আজ! তাদের সামনে,পুরো এক ঘর লোকের কিনা তার বাবা তার ভাইয়ের গাঁয়ে হাত তুললো!
পর্ব ৪৪
মাহমুদ তালুকদার:- আমি ভাবতে পারছি না তোমার এত অধঃপতন কি করে হলো? যাদের দয়ায় আজ তোমার এই অবস্থা তাদের সাথে বেঈমানি করতে একবারও বুক কাঁপলো না!
সম্রাট এখনও চুপ করে ফ্লোরে'ই চোখ রেখেছে!
মাহমুদ তালুকদার:- যেই মেয়েটা তোমাকে তার সবটা দিয়ে ভালোবাসলো তাকে ঠকাতে তোমার একবারও আটকালো না! মনে পড়েনি মেয়েটা কিভাবে এট মেনে নিবে?
সম্রাটের মা:- সত্যি করে বলো তো বিয়েটা কি তুমি নিজে ইচ্ছে করেই করেছো নাকি ঐ মেয়ে তোমাকে ফাঁদে ফেলে বাধ্য করেছে বিয়ে করতে?
উপর থেকে এই কথা শুনে পারির পা থমকে গেছে,মাত্রই ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছিলো নিচের চেঁচামেচি শুনে! কিন্তু এই কথার পর পা বাড়ানোর সাহস হলো না; সম্রাট এত সময়ে চোখ তুলে তাকালো, মায়ের দিকে করুন চাহনি নিক্ষেপ করে জিজ্ঞেস করলো,,
সম্রাট:- কি বলতে চাইছো তুমি?
সম্রাটের মা:- নিশ্চয়ই এই মেয়ে তোমাকে কোন ফাঁদে ফেলছে? আমাদের ই ভুল হয়েছে! বিশ্বাস করে ঘরে কা*ল-না*গি*নী রেখেছিলাম! বুঝতেই পারি নাই এই কাল নাগি'নী আমার সংসার ধ্বংস করে দিবে যার শুরু করেছে আমার ছেলেকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে!
সম্রাট:- মা কি সব বলছো? ভেবে বলো একবার! যাকে নিয়ে কথাগুলো বলছো সে তোমার একমাত্র ছেলের বউ!
সম্রাটের মা:- কোন দিনও না ! আমি ঐ মেয়েকে কোনদিনও আমার ছেলের বউ বলে মেনে নিবো না ! একটা ডিভোর্সি মেয়েকে কেন আমি আমার অবিবাহিত একমাত্র ছেলের বউ হিসেবে মানবো?
সোহা:- মা কি সব বলছো?আস্তে বলো পারি শুনছে!
সম্রাটের মা :- ঠিকই বলছি!
মানহা:- শুনলে কি হবে? যা সত্য আন্টি তো তাই বলছে! এইসব ছোট লোক নষ্ট মহিলারা মানুষের বাসায় কাজে ঢুকে সেই বাড়ির মালিকদেরই ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে ! এটা তো নতুন কিছু না! অহরহ ঘটছে! আমার তো শুরুতেই এই পারিকে একদম পছন্দ হচ্ছিলো না!সব সময় সন্দেহ হতো !কেমন জানি করতো ভাইয়া'কে দেখলে'ই!আর কাল দেখো ঠিক ই ভাইয়াকে বিয়ে করে বাড়ির বউ হয়ে বসে আছে!
সম্রাট:- Shut up Manha!
সম্রাটের ভয়ংকর গর্জনে মুহূর্তেই পরিবেশ কেমন থমথমে হয়ে গেল,,মানহা কেঁপে উঠলো,ওর মা ও কেমন আঁতকে তাকিয়ে রইলো ছেলের পানে ! পুরো ঘরে যেন এই মুহূর্তে গুমট একটা রুপ ধারন করেছে! সম্রাট নিজেকে শান্ত করে তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বললো,,,
সম্রাট:- কারো সম্পর্কে কিছু বলতে হলে তার সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা থাকতে হয় মানহা! এটা তুমি কবে বুঝবে?
মানহা:- ভাইয়া আমি...!
সম্রাট:- যাকে নিয়ে এত বড় একটা কথা বললে জানো সে কে? এখন আমার স্ত্রী সেটা না হয় বাদই দিলাম! তার আগেও তার একটা পরিচয় আছে!
কথাটা শেষ করে মানহার থেকে মুখ সরিয়ে নিজের বাবা মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো,,
সম্রাট:- তোমাদের যত অভিযোগ সব আমাকে নিয়েই করবে,পারিকে নিয়ে আমি একটা কথাও শুনতে চাই না! কারো মুখে না!
সম্রাটের বাবা:- বাহ্ ঐ দুদিনের মেয়ে তোমার এতই আপন যে তার জন্য তুমি আমাদের সাথে এভাবে কথা বলছো!
সম্রাট:- হ্যা বলছি কারন তোমাদের কাছে যে দুদিনের মেয়ে আমার কাছে সে বর্তমানে আমার স্ত্রী! তারচেয়ে বড় কথা সে আমার নয় বছর আগলে রাখা সুপ্ত ভালোবাসা!! যাকে হারিয়ে আমি সাত সাতটি বছর মনের গহীনে লুকিয়ে রেখেছি! তাকে যখন আবারও ফিরে পেয়েছি তখন সে বিধবা কিংবা ধর্ষিতা যাই হোক আমি তাকে আমার করেই ছাড়বো এটাই স্বাভাবিক আর এটাই হওয়ার ছিলো!
সম্রাটের মা:- তাহলে তানহা মায়ের কি হবে?
সম্রাট:- তানহা!
সম্রাট:- তানহার কথা এখানে বারবার কেন আসছে?
মাহমুদ তালুকদার:- তানহা মায়ের কথা কেন আসছে তুমি জানো না? আমরা সবাই চেয়েছি তানহা মায়ের সাথেই তোমার বিয়ে হোক! তাছাড়া তুমিও তো!
সম্রাট:- আমি কখনো চেয়েছি!
সম্রাটের মা:- মানে!
সম্রাট:- মানে ক্লিয়ার! আমি কি কখনো তোমাদের বলেছি আমি তানহাকে বিয়ে করতে চাই! বলিনি তো! তাহলে ? তাহলে কেন তোমরা বারবার তানহার কথা বলছো! আমি কোন দিনও তানহা কে বিয়ে করার কথা ভাবিনি আর ভাবতেও চাই না! তাহলে?
সম্রাটের মা:- কিন্তু কেন! কি সমস্যা তানহা মায়ের মাঝে?
সম্রাট:- কোন সমস্যা নেই তবুও আমি তানহা কে বিয়ে করবো না! কখনোই না,এমনকি যদি পারিকে ও কোনদিন না পেতাম তবুও না!
মিসেস জব্বার:- কেন? কি সমস্যা আমার মেয়ের মধ্যে যার কারনে তুমি এরকম একটা কথা বলতে একবারও ভাবলে না? কোন দিক দিয়ে আমার তানহা তোমার অযোগ্য!
গত রাত থেকে আজ সকাল অবধি মিসেস জব্বার এই মাত্র প্রথম কথা বললো, সম্রাট জানতো সবার মাঝে উনিই প্রথম হয়তো সম্রাটকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে কিন্তু যখন কাল রাত থেকে এই অবধি কোন রকম কথাই বলেনি ,,তাই সম্রাট ভেবেছিলো ,হয়তো উনি পারি আর সম্রাটের বিষয়টি সহজ ভাবেই নিয়েছেন,হয়তো জানে পুরানো দিনের কথা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না!
সম্রাট:- তানহার মাঝে কোন সমস্যা নেই! তানহা আমার অযোগ্য নয়! আমিই তানহার অযোগ্য! সবচেয়ে বড় কথা আমি কখনো তানহা কে সেই দৃষ্টিতে দেখি নি যেই দৃষ্টিতে দেখাতে আপনারা চেয়েছেন।। আর যদিও আপনাদের কথা অনুযায়ী তানহা কে বিয়ে করতাম তাহলেও তানহা কখনো আমার সাথে সুখী হতো না! কারন আমি ওকে কখনো ভালোই বাসতে পারতাম না!
মিসেস জব্বার:- সত্যি করে বলো তো ঠিক কি কারনে আমার তানহা তোমার ভালোবাসা পাওয়ার অযোগ্য? এমন কি খামতি রয়েছে ওর মাঝে যার দরুন কোন দিনও ও তোমার ভালোবাসার যোগ্য হবে না! আমার মেয়ে তো তোমাকে উম্মাদে'র মতো ভালোবাসে! তারপর ও এমনকি আছে!
সম্রাট:- হ্যা ওর এই একতরফা উম্মাদে'র মতো ভালোবাসা'ই আমার আর পারির ভালোবাসা'র মাঝে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে ! ওর এই উম্মাদের মতো ভালোবাসা ওকে বাধ্য করেছিলো সেদিন রাতে ওরকম একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটাতে যার শিকার হয়েছে আমার আর পারির সুন্দর সম্পর্ক! প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আমার চরিত্র! নষ্ট হয়েছে পারির সুন্দর গোছানো জীবনটা! আমাদের দুজনের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে সাত সাতটি বছর! ঐদিন রাতে যদি ওরকম একটা জঘন্য কাজ না করতো তাহলে আমার আর পারির মাঝে হয়তো কোন ভুলের সৃষ্টি হতো না হয়তো আমাদের জীবনে এতটা যন্ত্রনা'ও থাকতো না! হয়তো আজ সুন্দর গোছানো একটা সংসার থাকতো!হয়তো!!! কিন্তু!
অতিরিক্ত ক্রোধের বশীভূত হয়ে এক নাগাড়ে কথাগুলো শেষ করে সবার দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলো এই ভেবে যে যেই কথা এত বছর নিজের মাঝেই লুকিয়ে রেখেছিলো তানহার সম্মান রক্ষার্থে সেই কথাগুলো সবার সামনে এভাবে বলে তানহাকে কত বড় ক্ষতির সম্মুখীন করলো! ভাবতেই তানহার দিকে তাকাতেই দেখলো,,, লজ্জায় আড়ষ্ট, অনুশোচনায় জর্জরিত ভেজা মুখখানা! তানহা হয়তো ভাবতেই পারে নি সম্রাট সবার সামনে এইভাবে এই কথাগুলো বলবে! তানহা অপরাধ বোধে ভুগছে সেটা তো সম্রাট জানতো কিন্তু আজকের পর হয়তো কোনদিন সবার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে ও পারবে না! লজ্জা আর নিজের প্রতি ঘৃনায় যদি কিছু করে ফেলে!
উপর থেকে সব কথাই পারি শুনছিলো! কিন্তু ঠিক কোন বিষয়ে কথা বলছে সেটা এখনও বুঝতে পারছে না!
পারি:- (মনে মনে) আচ্ছা ও কোন রাতের কথা বলছে! সে রাত মানে কি! ও কি ঐ রাতের কথা?
না পারি আর ভাবতে পারছে না,, মা হাসপাতালে যাওয়ার পর থেকে না চাইতেও এক অজানা চিন্তা মস্তিষ্ক দখল করেছে,তার মধ্যে গতকাল মাকসুদের ঐ জঘন্য পরিকল্পনার শিকার হতে হতেই বেঁচে গেছে,, তারপর থেকেই সম্রাটের সাথে বিয়ে নিয়ে নিজের সাথেই নিজের যুদ্ধ আর এখন এতকিছু! ভাবতে না ভাবতেই পারি ধাপ করে নিচে পড়ে গেল!
উপর থেকে কিছু পড়ার শব্দে সবাই উপরে তাকালো,, সম্রাটের হঠাৎ কিছু মনে হতেই দৌড়ে গেল উপরের দিকে,, পিছনে রেখে গেল এক ঝাঁক প্রশ্নাত্নক দৃষ্টি, যাদের মাঝে রয়েছে এখনও অজস্র কৌতুহল! এতটুকু তো বুঝতে সবাই পেরেছে সম্রাট আর পারির পুরানো সম্পর্ক ছিলো, কিন্তু সেই রাত মানে কি ? এখন ও তো জানা বাকী! তবে সব কৌতুহল দমিয়ে সম্রাটের যাওয়ার পর পরই সবাই ওর ঘরের দিকেই গেলো!!
সম্রাট:- পারি! এই পারি!!
সম্রাট গিয়ে দেখতে পায় পারি ওর ঘরের দরজা থেকে একটু দুরে পড়ে আছে, পাশেই ফুলের একটা আর্টি'ফিশিয়া'ল টপ পড়ে আছে।যেটা পড়ার শব্দই নিচ থেকে পেয়েছে! সম্রাট দৌড়ে গিয়ে পারিকে ডাকতে থাকে! পারির কোন রকম নড়চড় না দেখে সম্রাট উত্তেজিত হয়ে যায়! সম্রাটকে এমন অস্থির হতে দেখে ওর মা বাবা সহ সবাই একটু আশ্চর্য হয়ে যায়! দুর থেকে তানহা ও দেখছে সম্রাটের এই অস্থিরতা! সম্রাট আপনজনদের কষ্টে কষ্ট পায়,, তাদের যন্ত্রনায় ছটফট করে কিন্তু এতটা অস্থির,এতটা ছটফটানি কারো জন্য কখনো দেখেনি! এতেই তো প্রমান হয় ওদের ভালোবাসার গভীরতা! আচ্ছা সম্রাট সবার সামনে অতীতের সেই জঘন্য রাতের কথা বলে কি ভুল করেছে! না করে নি তো! সেটা তো সত্যি ছিলো! আর সত্য তো কখনো লুকিয়ে রাখা যায় না! সেটা তো কখনো না কখনো প্রকাশ হয়ই ! আর তানহার বেলায়ও হওয়ার ছিলো তাহলে!
সোহা:- ওকে তুলে ঘরে নিয়ে যাও ভাই!
সম্রাটের অস্থিরতা সবাই ই আশ্চর্য হয়ে দেখছিলো তাদের মধ্যে থেকে সোহা ই বললো উক্ত কথাটি! সম্রাট নিজের বোনের কথায় পারিকে তুলে ঘরে নিয়ে যায়! এর মধ্যেই সোহার স্বামী নিজেদের পারিবারিক ডাক্তারকে ফোধ করে! সোহা পানি নিয়ে সম্রাটের হাতে তুলে দিলে সম্রাট হালকা পানি ছিটাতে ছিটাতে পারিকে নাম ধরে ডাকতে থাকে! বেশ কিছু সময় কেটে গেলেও পারির হুঁশ না আসাতে সবাই বেশ আতংকিত হয়ে যায়!
পর্ব ৪৫
ডাক্তার যখন পারিকে দেখে যায় তখন ও পারি বেহুঁশ ছিলো।
সম্রাটের অস্থিরতা দেখে সবাই খুব আশ্চর্য হয়েছিলো,দুরে দাঁড়িয়ে তানহা ও দেখছিলো সম্রাটের পারির জন্য এই অস্থিরতা,ভয় , ছটফটানি! সম্রাট নিজের আপনজনের কষ্টে কষ্ট পায়! ছটফট করে তাদের যন্ত্রনায়! অস্থির হয়ে যায় তাদের ভালো রাখতে! সেটার পরিমাণ সবাই জানে কিন্তু পারির জন্য এই ছটফটানি,ভয় অস্থিরতা যেন সবকিছু ছাপিয়ে!
সম্রাট:- ডাক্তার কি অবস্থা? ওর এখনো সেন্স কেন আসছে না?
ডাক্তার সম্রাটের চিন্তা- গ্রস্ত মুখটা দেখলেন তারপর জিজ্ঞেস করলেন,,
ডাক্তার:- কি হয়?
সম্রাট:- স্ত্রী!
সম্রাট এর উত্তরে ডাক্তার একটু আশ্চর্য হলেন ,, অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকালেন সম্রাটের মুখপানে,, পারিবারিক ডাক্তার হওয়ার কারণে আর মাহমুদ তালুকদারের নিয়মিত চেকাপের জন্য প্রায় উনি এই বাসায় আসেন। সেই সূত্রেই সবার মতো তার ও ভাবনা ছিলো তানহা ই সম্রাটের ভবিষ্যত সঙ্গিনী!পারিকেও চিনেন তবে সায়রার আয়া হিসেবেই! হঠাৎ আয়ার কাজ এরকম একটা মেয়েকে সম্রাটের মতো মানুষের নিজ স্ত্রী পরিচয় দেওয়াটা উনার কাছে কেমন লাগলো!
দৃষ্টি ঘুরিয়ে পারির দিকে নিলো,পারির অপরুপ মুখশ্রী দেখার পর কিছু সময়ের জন্য ভাবলেন, মেয়েটা অসম্ভব সুন্দরী! যেকোনো পুরুষেরই স্ত্রী হিসেবে এক দেখায় ই পছন্দ হবে! বলা যায় কাঙ্খিত নারী হিসেবে এই নারী একদমই প্রথমে থাকবে। হয়তো রুপের মোহেই নিজের ক্লাস ভুলে এইরকম একটা কাজ করেছে কিন্তু যতদূর উনি সম্রাটকে জানে তাতে এটা মানতেও আটকাচ্ছে! আর যাই হোক সম্রাটের মতো ব্যক্তিত্ববান পুরুষ রুপের মোহে আটকাবে না ! তাহলে! তাহলে এরকম একটা ঘটনা ঘটানোর মানে কি?
সম্রাট:- ডাক্তার সাহেব?
ডাক্তার:- জ্বী জ্বী!
ডাক্তার নিজ ভাবনায় মশগুল, সম্রাটের ডাকে সচকিত হয়ে পড়লো,,
সম্রাট:-ওকে কি হসপিটালে নিতে হবে?
ডাক্তার:- না তার দরকার হবে না! মনে হচ্ছে অতিরিক্ত মানসিক চাপে ছিলো যেটা উনার মস্তিষ্ক নিতে পারেন নি আর তাই হঠাৎ এরকম ভাবে সেন্স হারায়।তবে আপাতত উনি ঠিক আছে কিন্তু উনাকে সম্পন্ন বেড রেস্টে থাকতে হবে কিছুদিন! কারন উনি শুধু মানসিক ভাবেই নয় শারীরিক ভাবেও অনেক দূর্বল! আমি আপাতত একটা স্যালাইন লাগিয়ে দিয়ে গেলাম।এটা শেষ হলে অবশ্যই উনাকে একটু লিকুইড জাতীয় খাবার খাওয়াবেন! অবশ্যই চিকেন স্যুপ অথবা এই টাইপের কোন খাবার ই দিবেন আর অবশ্যই চেষ্টা করবেন কোন রকম চিন্তা যেন উনি না করেন! আশাকরি বুঝতে পেরেছেন! আসি আপাতত! কথা শেষ করে ডাক্তার চলে গেলেন,দরজা অবধি গিয়ে পিছন ফিরে আবার এক নজর দেখলেন পারির জন্য সম্রাটের অস্থির চাহনি! চিন্তা-গ্রস্ত মুখ ভঙ্গিই প্রমান দেয় এটা মোহ না ভালোবাসা! ডাক্তার কে এগিয়ে দিতে গেল সোহার স্বামী!
সোহা:- ভাই চিন্তা করো না! সব ঠিক হয়ে যাবে!
নিজের ভাইয়ের মাথায় ভরসার হাত বুলিয়ে কথাটা বললো সোহা, পুরো ঘরে পারি ব্যতিত ওরা দুই ভাইবোনই আছে।একটু সময় থেমে বললো,
সোহা:- তুমি এখানে ওর কাছেই থাকো; আমি বাইরে আছি! কিছু লাগলে আমাকে একটা মিসকল দিও!
সম্রাট বোনের ও এরুপ ভরসায় ছলছল চোখে তাকালো, ভাইয়ের চোখের পানিই বলে দিচ্ছে বর্তমানে তার মনের অবস্থা।তাই কাঁধে রেখে বললো,
সোহা:- বাইরে আমি দেখে নিবো! তুমি শুধু নিজেদের সম্পর্কে সময় দাও! অনেক করেছো আমাদের জন্য, এইবার না হয় আমরা একটু করি!
কাঁধে ভরসার স্নেহ দিয়ে চলে গেল।সম্রাট বোনের উপর বিশ্বাস আর উপর আল্লাহর উপর সব ছেড়ে দিলো।উঠে গিয়ে দরজা লক করে ঘুমন্ত পারির সামনে এসে বসলো।।
'''''''''''''''''''বাইরে ড্রয়িংরুমে''''''''''''''''''
সম্রাটের মা:- কি অবস্থা সোহা? ডাক্তার কি বললো?
সোহা:- আপাতত ঠিক আছে! সেন্স ফেরিনি তবে চিন্তার কারন নেই!
মিসেস জব্বার:- হঠাৎ করেই সেন্স কেন হারালো?
সোহা:- অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর শারীরিক দুর্বলতার কারণেই হঠাৎ জ্ঞান হারায়! আপাতত স্যালাইন চলছে! তবে ওকে বেড রেস্টে থাকতে হবে বেশ কিছুদিন!
সোহা:- আসমা খালা?
আসমা খালা:- জ্বী খালাম্মা!
সোহা:- তুমি চিকেন উইথ ভেজিটেবল স্যুপ করার জন্য সব রেডি করো তো? আমি নিজেই রান্না করবো!
পারির অবস্থা বর্ণনা করে আসমা খালাকে স্যুপ করার জন্য আদেশ দিলো।এর মাঝেই ফোড়ন কেটে বলতে লাগলো মানহা;
মানহা:- বাহ সোহা আপু তুমি তো দেখছি ভালোই সেবা করা শুরু করে দিয়েছো! তার মানে তুমি ঐ মেয়েকে নিজের ভাবী হিসেবে মেনে নিচ্ছো !
সোহা:- না মানার কি আছে মানহা? ও তো আসলেই আমার ভাবী! বড় ভাইয়ের বউ তো ভাবীই হয়! আর ভাবীকে ভাবী মানতে সমস্যা কোথায়?
মানহা:- সমস্যা আসলে ভাবী মানতে নয়! তবে ভাবীর জায়গায় ঐ মেয়েকে মানতে! যতই হোক জায়গাটা আমার আপুর তাই না!
সোহা:- ভুল বললে মানহা! ঐ জায়গা বরাবরই পারির ছিলো! মাঝখানে শুধু শুধু অন্য কেউ ঢোকার চেষ্টা করেছিলো! অথচ সে ওদের বিষয়ে কিন্তু সব টাই জানতো!
মিসেস জব্বার:- কি বলতে চাইছো তুমি? কাকে ইঙ্গিত করছো?
সোহা:- ক্ষমা করবেন আন্টি! আপনাদের অনুগ্রহে এত দুর এসেছি! আমাদের জীবনে আজ যা আছে তাতে আপনাদের অবদান অস্বীকার করার মতো জঘন্য মানুষ আমরা নই কিন্তু তাই বলে কখনো সত্য কে এড়ানো যায় না!
মিসেস জব্বার:- কি বলতে চাইছো যেটা পরিষ্কার করে বলো! কিসের সত্য ! কোন সত্যের কথা বলছো?
সোহা:- আন্টি যেই কথা বলতে গিয়েও আমার ভাই বলেনি শুধুমাত্র তানহার সম্মানের কথা ভেবে আমি চাই না সেটা আমার দ্বারা সবার সামনে আসুক! এটা কারো জন্য ই ভালো হবে না তাই বলছি দয়া করে সব কিছু এখন যেমন চলছে তেমনই চলতে দিন।ভাইয়া পারিকে ভালোবাসে! পারিও ভাইকে ভালোবাসে! ওরা একে অপরের সাথে সুখী হতে চায় তাহলে আমাদের সেখানে বাঁধা দিয়ে কি লাভ! আর যদি বলি তানহার কথা! তাহলে একটা কথাই বলবো তানহা এমনিতেও কোনদিন ভাইয়ের সাথে সুখী হতো! কারন আর যাই হোক একটা মনের বিরুদ্ধে সংসার করা গেলেও ভালোবাসা যায় না!
মিসেস জব্বার:- এমন কি আছে যেটা তোমরা জানো আমি জানি না! যেটা সবার সামনে আসলে আমার মেয়ের সম্মানের ক্ষতি হওয়ার ভয় দেখাচ্ছো!
সোহা:- আমি আগেই বলেছি আন্টি আমি এটা বলতে চাই না।আপনি যদি শুনতে চান তাহলে তানহার কাছেই শুনেন,আমার মনে হয় এটাই উত্তম! আপনার নিজের মেয়ের মুখে তার কৃতকর্মের কথা শুনলে অবশ্যই বিশ্বাস হবে। আমাদের টা না ও হতে পারে,,তবে এই কথা শুধু আমি কিংবা ভাই একাই নয় মামাও জানতো ! এর জন্যই মামা হার্ট অ্যাটাকও করেছিলো।। আর এইসব কথা আমি তানহার মুখ থেকেই শুনেছি!! ওর নিজের মুখের করা স্বীকারোক্তি, অবশ্য ও আমার সাথে করেনি করেছে আল্লাহর দরবারে! আল্লাহ ওকে নিশ্চয়ই মাফ করে দিয়েছে কারন পাপ করে অনুতপ্ত হলে আল্লাহ তার প্রত্যেক বান্দাকেই মাফ করে!
সোহার কথায় মিসেস জব্বার তানহার দিকে তাকিয়ে আবার সোহাকে বললেন,,
মিসেস জব্বার:- তোমার মামা জানতো অথচ আমি জানতাম না! কিভাবে সম্ভব! আর কি বললে? এর জন্যই তোমার হার্ট অ্যাটাক করেছিলো?
সোহা:- জ্বী আন্টি!
মিসেস জব্বার কি বলবে ভেবে পাচ্ছেনা,,উনার যেন মাথা ঘুরছে! এমন কি কথা যেটা উনার স্বামী যে কিনা কোনদিন কোন কথা উনার কাছ থেকে গোপন করেনি সে এমন কি গোপন করে গেছে যেটা নিজেরই মেয়ের বিষয়ে, যার জন্য উনি হার্ট অ্যাটাক করে মৃত্যু-সম যন্ত্রণা সহ্য করেছেন! কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই উনি তানহার দিকে তাকালো, তানহা ও অপরাধী দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে, মায়ের চোখের সন্দেহ যেন অপরাধ বোধ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলো। নামিয়ে নিলো দৃষ্টি! মিসেস জব্বারের মনে পড়লো সেই দিনের কথা যেদিন জব্বার মন্ডল হার্ট অ্যাটাক হয়ে হাসপাতালে ছিলেন! সবার সাথে কথা বললেও তানহার সাথে বলে নি।তানহা কে যখন উনি জব্বার মন্ডলের সাথে দেখা করতে বলেছিল তানহা তখন না বলেছিলো! বারবার বলছিলো বাবার সামনে দাঁড়ানোর সাহস নেই! জব্বার মন্ডল ও মেয়ে কে দেখার জন্য একবার ও বলেনি বরং যখন তানহা সম্রাটের সাথে জব্বার মন্ডলকে দেখতে কেবিনের ভেতরে ঢুকলো তখন উনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো! তাহলে কি? উনার মেয়ের দ্বারা এমন কোন অপরাধ হয়েছিলো যেটা জব্বার মন্ডল বাবা হয়ে মুখে আনতে পারে নি!
পর্ব ৪৬
সোহা:- "মা-বাবা" ভাই সেই ছোট থেকে আমাদের জন্য চিন্তা করে আসছে। কখনো কোনদিন মুখ ফুটে নিজের জন্য কিছু চাইতে আমি দেখিনি। সবসময় নিরবে শুধু আমাদের চাহিদা পূরণ করেছে। অথচ সেই মানুষটি কতটা যন্ত্রণা বুকে চেপে রেখেছে তা আমরা কেউ কোন দিন বুঝতে ও পারিনি! আমরা ভাইয়ের হঠাৎ হঠাৎ পরিবর্তনের কারন কখনো জানতে চেষ্টা করি নি বরং তার পরিবর্তনকে আমরা আমাদের মতো করেই ভেবে নিয়েছি! কিন্তু এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো সবটা! তাই বলছি যা হচ্ছে তা মেনে নাও!পারির জীবনের অতীতের কালো অধ্যায়ের কথাটা ভুলে যাও! ডিভোর্স কোন মেয়ের ইচ্ছায় হয় না! কোন মেয়েই নিজের হাতে নিজের সংসার ভাঙ্গতে চায় না,গায়ে লাগায় না ডিভোর্সি তকমা! পারির ও তেমনি ইচ্ছা করে এই কাজটি করেনি।পারি ঠিক কতটা সাফার করার পর এই কাজটা করতে বাধ্য হয়েছে তা তোমরা কেউ ই জানো! ভাবতেও পারছো না ঐ মেয়েটা এতটুকু জীবনে কতটা নারকীয় যন্ত্রনা ভোগ করেছে! যদিও মানুষের ভাগ্য উপর ওয়ালার হাতেই, আমাদের সাথে যা হয় তা সম্পূর্ণ আল্লাহর ইশারায় ই হয় তবুও এর জন্য কিন্তু আমাদের কর্ম ই দায়ী! কর্মই ভাগ্যকে সাজায়! ঠিক তেমনি পারি আর ভাইয়ের জীবনের এই টানাপোড়েনের জন্য কোথাও না কোথাও তানহার করা সেই রাতের সেই ছোট ভূলটাই দায়ী। ভাইয়ের তেমন ক্ষতি না হলেও পারির জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছিলো ! যেটা কাটাতে মেয়েটাকে অনেক দাম দিতে হয়েছে!
সোহা নিজের মা বাবার উদ্দেশ্য কথাগুলো বলে আবারও মিসেস জব্বারের দিকে এগিয়ে যায়, মিসেস জব্বার সোহার কথাগুলো শুনতে পেলেও উনার মস্তিষ্কে কাজ করছে সেই রাত শব্দটা! তানহা এখনো মাথা নত করেই রেখেছে, চোখ দিয়ে অবিরত পানি জড়ছে,, মানহা, রুহানি সহ বাকি সবাই নির্বাক হয়ে শুধু শুনে যাচ্ছে! পুরো বিষয়টি পরিষ্কার না হলেও এতটা তো বোঝাই যাচ্ছে অপ্রীতিকর কিছু একটা আছে যেটা কেউ পরিষ্কার করে বলতে চাচ্ছে না হয়তো মুখে সবার সামনে বলতে লজ্জা পাচ্ছে!
মিসেস জব্বার:- তুমি নিজে কিছু বলবে নাকি আমাকে?
মায়ের প্রশ্নে তানহা দুই ফোঁটা জল ফেলানো ছাড়া কোন সদুত্তর দিলো না! দৌড়ে চলে গেল নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমটায়!!
সম্রাট যেদিন সোহার কাছে পারির সাথে ওর সম্পর্ক খোলাসা করে সেদিন এশার নামাজের সময় এই বিষয়ে কিভাবে তানহা জানে এবং আর কি কি জানে মোট কথা আরো বিস্তারিত জানার জন্যই সোহা তানহার ঘরে যায়,দরজা হালকা ফাঁক থাকায় সেখান দিয়েই তানহা কে সিজদারত অবস্থায় দেখে নিঃশব্দে ওর ঘরে ঢুকে সোফায় গিয়ে বসে।সিজদা থেকে উঠে মোনাজাতে যখন আল্লাহর দরবারে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত প্রকাশ করছিলো, বারবার মাফ চা্চছিলো তখনই আসল সত্যি শুনতে পায়! প্রথমে খুব রাগ হচ্ছিলো, ইচ্ছে করছিলো তখনই কষে কয়েকটি চড় দিতে পরক্ষনেই মায়া হতে লাগলো এই ভেবেই যে মেয়েটি নিজের আবেগ, একতরফা ভালোবাসা বয়ে বেড়াতে না পেরেই অজান্তেই একটা ভুল করেছে।তার জন্য শাস্তিও পেয়েছে। মৃত্যুরদিন অবধি ভালো মতো কথা বলেনি জব্বার মন্ডল মেয়ের সাথে! এর চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কি হতে পারে! আর সম্রাট তো অজানা কারনেই কষ্ট পাচ্ছে মাঝখান ভূল বুঝে দূরে চলে গেছে পারি! এর কারনেই পরেরদিন পারিকে দেখে সোহার মাঝে অন্যরকম ভালোলাগা,কষ্ট অনুভব হচ্ছিলো যার দরুন পারি ওর চোখে অন্যরকম কিছু দেখতে পেয়েছিলো!
পারি:- উহ্; ইইহ!!!
হালকা গোঙানির শব্দে মুখ তুলে তাকালো সম্রাট; পারির হুঁশ আসলেও ডাক্তারের দেওয়া স্যালাইনের কারনেই বেশ সময় ঘুমিয়েছিলো।তাই সম্রাট ওর পাশেই ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ে।কাজ তো করতে হবে! তাই পারিকে দেখার পাশাপাশি কাজ টাও করতে থাকে!
সম্রাট:- পারি! পারি!
কারো ডাকে নিজের ডানপাশে ফিরে তাকালো,নিভু নিভু চাহনিতে সম্রাটের মুখটা দেখলো! ডাক্তার স্যালাইনের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়ার ধরুন ঘুমটা ভালো চেপে রেখেছে।তাও চেয়েও চোখ মেলতে পারছে না,, সম্রাটের আদুরে ডাকে সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু সেই শব্দ সম্রাটের কান অবধি পৌচ্ছাছে কিনা কে জানে!
সম্রাট:- পারি জান এখন কেমন লাগছে?
পারি:- ইহ্!
সম্রাট:- তুমি কি আরেকটু ঘুমাবে!
সম্রাটের কথা শেষ হতে না হতেই আবার ও ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো পারি!
মিসেস জব্বার:- সত্যি করে বলো এমন কি করেছিলে তুমি যেটা বলতেই সবার লজ্জা করছে? তাতে কি শুধুই তোমার দোষ নাকি সম্রাট ও সমান অপরাধী?
তানহা এত সময়ে মুখ খুললো,,
তানহা:- না সম্রাটের কোন দোষ নেই! যা হয়েছে তার সবটাই আমার একার দায়! সম্রাট তো সেদিন হুশেই ছিলো না!
এরপর সেদিন রাতের ঘটনার পুরো বিষয়টি একে একে খুলে বললো তানহা। কথাগুলো বলতে দেরি হলেও গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে দেওয়া থাপ্পড় গালে পড়তে দেরি হলো না! পর পর কয়েকটি চড় দিয়ে ধপ করেই ফ্লোরে বসে পড়লো মিসেস জব্বার! উনার মেয়ে হয়ে শেষে কি না নিজেই নিজের ইচ্ছায় নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে গিয়েছিলো একজন পর পুরুষের কাছে। ভাবতেই ঘৃনায় গা রি রি করছে। আর শুধু কি তাই! অজান্তেই হোক এখন তো মনে হচ্ছে উনার মেয়েই দায়ী সম্রাট পারির জীবনের এই পরিনতি'র জন্য! যখনই পারিকে সম্রাট নিজের পুরানো ভালোবাসা বলে পরিচয় করিয়েছে তখনই উনি পারিকে চিনতে পেরেছেন কারণ সম্রাট যে একটা মেয়ের প্রতি অসম্ভব দূর্বল ছিলো সেটা উনি জানতেন এবং পারি সম্রাটের বিচ্ছেদের খবর ও জানতো কিন্তু তার কারন যে তার নিজেরই মেয়ে!
মাহমুদ তালুকদার:- তুমি সব কিভাবে জানো?
সোহা পারির সম্পর্কে বিস্তারিত বলার পর মাহমুদ তালুকদার আশ্চর্য হয়েছেন, বিস্মিত আর লজ্জা বোধ অনুভব করছেন। মেয়েটার সাথে উনারা কত খারাপ ব্যবহার করলো কালকে, হোক সরাসরি না কিন্তু করেছে তো! মিসেস মাহমুদ ও লজ্জিত হচ্ছেন! কিভাবে উনি মেয়েটাকে বাজে বাজে কথা বলে কষ্ট দিয়েছেন আর সেটা সহ্য করতে না পেরেই তো মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়লো!
কত বড় ঘরের মেয়ে হয়েও এত নিরীহ আর শান্ত!না মনে কোন হিংসা আর না ঘৃনা! আজ এতদিন উনাদের এখানে কাজ করছে অথচ উনারা কোনদিন পারির ব্যবহারের বুঝতে পারেনি পারির পরিচয় কতটা আভিজাত সম্পন্ন! সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো মেয়েটিকে কোনদিন কোন কাজে উনারা অবহেলা দেখেনি,কাজের প্রতি যথেষ্ট দায়িত্বশীল। উনাদের সেবা যত্ন করার সময়ও কতটা আপন ভেবে করেছে!!
সোহা:- বাবা, পারির সম্পর্কে ভাই আমি আমাকে প্রথমে বলেছে! তারপর তানহার কাছে থেকেও শুনেছি! তোমার জামাইয়ের শুরু থেকেই পারিকে চেনা লাগছিলো ,,তাই আমি যখন ভাই আর পারির কথা শেয়ার করি তখন ও ওর সিনিয়রের সাথে আলোচনা করে এরপর আরো বিশদ ভাবে জানতে পারি পারির পুরো বিষয়টি! এত ধনী বাবার একমাত্র মেয়ে হয়েও শুধু মাত্র ভাইয়ের জন্য নিজের জীবনকে বাজী ধরে ছিলো।ও ভেবেছিলো ভাই ওকে ঠকিয়েছে আর তাই তো জেনে বুঝে একজন নোংরা মানুষের সাথে নিজের জীবন জড়িয়ে নিজেকে শেষ করতে চেয়েছিলো!
সম্রাটের মা:- কি বলছো?
সোহা:- হ্যা মা!
রুহানি:- মা আমার তো পারি আপুকে খুব পছন্দ,,তোমরাও মেনে নাও! দেখো ভাই তো ভালোবাসে আর তার চেয়ে বেশি কি দরকার?
পারি আপুর অতীতের অংশটা আমরা ভুলে গেলেই চলে! আর তাছাড়া তানহা আপুকে ভাইয়া কখনোই মেনে নিবে না! সুতরাং!!
সম্রাটের মা:- সবই বুঝতে পারছি কিন্তু ভাবীকে কি জবাব দিবো? আমরা তো!
সোহা:- এখানে জবাব দেওয়ার কিছু নেই মা! মামী বুদ্ধিমান মানুষ! সব সময়ই সু-বিবেচক; উনি নিশ্চয়ই সেধে সেধে নিজের মেয়ের জীবন নষ্ট করবে না! আর যদি বলি তানহার কথা! তাহলে বলতে হয় তানহা যথেষ্ট ধৈর্যশীল একটি মেয়ে,,ও নিজেকে সামলাতে জানে! হ্যা হয়তো অতীতে একটা ভুল করেছে তবে সেটা আবেগের তাড়নায় করা ভুলই বলতে পারি আমরা! কিন্তু সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি নিশ্চয়ই করবে না! আর তাছাড়া এখন ভাই পারি বিবাহিত! ওদের আলাদা করার কথা মাথাও আনা যাবে না। সুতরাং তানহা কেই নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে!
মাহমুদ তালুকদার:- সবই বুঝলাম কিন্তু ঐ মেয়েটার কথাও তো ভাবতে হবে!
মিসেস জব্বার:- আপনাদের আর কিছুই ভাবতে হবে না! আমার মেয়ের জন্য যা ভাবার তা এখন থেকে আমিই ভাববো!
মিসেস মাহমুদ:- ভাবী!
মিসেস জব্বার:- না আমি রাগ করিনি! রাগ কেন করবো? রাগ করার কোন অধিকার আমার নেই! কারন অন্যায় আমার মেয়েই করেছে! তার করা ছোট ভুলের শিকার হয়ে কতটা ছটফট সম্রাট করেছে তা আমি নিজের চোখে দেখেছি! পারি মেয়েটার দোষ দিবো না; সে তো পরিস্থিতির শিকার;কোন মেয়েই নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে অন্য কোনো নারীকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় মেনে নিবে না!
সোহা:- আন্টি?
মিসেস জব্বার:- ধন্যবাদ সোহা তোমাকে! তুমি না বললে আজ এত বড় সত্য জানাই হতো না! উল্টো সারা জীবন সম্রাটের প্রতি রাগ থেকে যেতো,ভুল বুঝতাম! ছেলেটা অনেক কষ্ট করেছে,, যদি নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথেই ও সুখী হয় সত্যিই বলছি তাতে আমার চেয়ে খুশি কেউ হবে না!
সবাই যখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলো তখনই পিছনে থেকে শেষের কথাটা বললেন মিসেস জব্বার,, কিছু সময় থেমে তারপর বলা শুরু করলো,,
মিসেস জব্বার:- আচ্ছা যাই হোক তোমরা নতুন বউকে সবার সাথে পরিচয় করানোর জন্য আয়োজনের ব্যবস্থা করো! আমি তো বলবো ওদের পূনরায় বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে শত হোক একটা মাত্র ছেলে আর তার বিয়েতে কোন আয়োজন হবে না তাতো হয় না!
মিসেস জব্বারের কথায় সোহা, মিসেস মাহমুদ, মাহমুদ তালুকদার, রুহানি সবাই বিস্মিত হলেন! উনারা ভেবেছিলেন মিসেস জব্বার একবার অন্তত খুবই বাজে ভাবে প্রতিক্রিয়া করবে! পারির সাথে সম্রাটের সম্পর্ক ভাঙার কথা বলবে কিন্তু উনি তো মনে হচ্ছে সবার চেয়ে বেশি খুশি এই বিষয়ে! মানুষ এতটা ভালো কি করে হয়! জব্বার মন্ডল ছিলেন অসাধারণ মানবিক একজন মানুষ তার কাছে উনারা সবাই ঋণী! মিসেস জব্বার ও তার চেয়ে কম নয়! এই পরিস্থিতিতে ও উনারা সম্রাটের খুশিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন!
মিসেস জব্বার:- আমি জানি আপনারা কি ভাবছেন! দেখুন সম্রাটকে বরাবরই আপনার ভাই ছেলে মেনেছে! মানতো বললে ভুল হবে! সবাই জানে সম্রাট আমাদের ছেলে! জন্ম দিলেই যে বাবা মা হয় তা না হলে নয়! এমন তো নয়! যেহেতু আমাদের ছেলে নেই।আর আমি জানি উনি কোনদিন মুখে না বললেও একটা ছেলের অভাব উনার মাঝে ছিলো , সবসময় ছিলো! উনি সবসময়ই ছেলের কমতি অনুভব করতো আর তাই তো সম্রটকে পাওয়ার পর থেকেই নিজের বুকে টেনে নেয়! সত্যি বলতে আমার ও কোথাও একটা শান্তি অনুভব হচ্ছিলো ঐ সময়! মনে হচ্ছিল এইতো আমার সংসার সম্পূর্ণ হলো! দুই মেয়ে এক ছেলে আমরা স্বামী স্ত্রী দুজন! পাঁচ সদস্যের সুন্দর একটা সংসার আমার! কত যে শান্তি লাগতো আমার কাছে তা বলে বুঝাতে পারবো না! কিন্তু সম্রাট কোনদিন মা বলে তো ডাকেনি,ডাকবেও না তাতো জানি! যতই বলি ও তো আর আমার পেটের নয়! আর এই জগতে পেটের ছেলে ছাড়া যদি কেউ মা ডাকে সেতো মেয়ের জামাই অথবা আইনত ভাবে নেওয়া দত্তক ছেলে! সম্রাটকে ছেলের নজরে দেখেছি ,ঐ অতটুকু সম্রাটকে মেয়ের জামাই ভাবতে পারিনি,,আর দত্তক ও নেই নি তাই কোনদিন মা বলার জন্য বাধ্য করতে পারিন তবে ওর মুখে মামী মা ডাকটাও আমার কলিজা ঠান্ডা করে দিতো এখনও দেয়!
একদমে কথাগুলো বলে একটু শ্বাস নেয়ার জন্য থামে,,বড় করে শ্বাস নিয়ে তারপর আবার বলা শুরু করে,
পর্ব ৪৭
মিসেস জব্বার:- জানেন আপনার ভাই সবসময় বলতো,,
"""""""""""""অতীত;"""""""""
জব্বার মন্ডল:- জানো সম্রাট যখন আমার আশেপাশে থাকে আমার কি যে শান্তি অনুভব হয়! যখন দায়িত্ব সহকারে সব কাজ করে, কোন কাজে নিজ থেকেই পরামর্শ দেয় তখন মনে হয় এইতো আমার সুযোগ্য পুত্র! আমি মরার পর আমার দাফনের জন্য আমার মেয়েদের এখন আর ভাইয়ের জন্য আফসোস করতে হবে না! তাদের সেই আফসোস, আমার ছেলের হাতে একমুঠো মাটির ইচ্ছা এই জন্ম না দেওয়া ছেলেই পূরন করবে!
তুমি তো জানো না সম্রাটকে তো সবাই আমার নিজের ছেলেই ভাবে,, কিন্তু যখন মামা ডাকে তখন সবাই বুঝে ও আমার নয় আমার বোনের ছেলে! তাতে কি বলো? ভাগ্নে আর ছেলে কি আলাদা? আমার কাছে তো সবই এক! হ্যা হয়তো আপন বোনের ছেলেও কখনো এতটা আপন হতে পারেনি! পারবে কি করে তাদের তো আমার চেয়ে আমার অর্থ কড়ি বেশি প্রিয়! আর এই যে মুখে ডাকা সম্পর্ক এটা দেখো কতটা বিশ্বাস আর ভরসার যোগ্য! সবই তো হয়েছে সম্রাটের সততা আর নির্লিপ্ত চরিত্রের কারনে!
মিসেস জব্বার:- তুমিও কিন্তু যথেষ্ট ভালোবাসা দেখিয়েছো ! আর তার জন্যই সম্রাট এতটা সৎ আর ভালো মনের হয়েছে! কি বলো তো "সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ" এটাও তেমনি! সেই কতটুকু বয়স থেকে সম্রাট তোমার সাথে আছে,ওর ভেতরে যত গুণ,যত বৈশিষ্ট্য সবটাই তোমার মতো! একদম হুবহু! আর এই কারণেই কিন্তু সম্রাটকে তোমার ছেলে বলতে একটু দ্বিধা কাজ করে না! আর মজার বিষয় কি দেখো ও দেখতেও কিন্তু হয়েছে একদম তোমার মতোই! ওর বাবা মায়ের ছিটেফোঁটাও ওর মধ্যে নেই! একদম তোমার কপি! লম্বা, ফিটনেস, গায়ের রঙ, কথার ধরন,চলার ধরন, চুলগুলো ও তোমার মতো ঘন! মোদ্দে কথা একসাথে পাশাপাশি দাঁড়ালে যে কেউ ই বাপ বেটা মনে করবে!
জব্বার মন্ডল:- হুম তা তুমি একদম ঠিক বলেছো! শুধু কি আমার পাশে; তানহা মানহার পাশ দাঁড়ালে মনে হয় তিন ভাই বোন! কি যে ভালো লাগে একসাথে তিনজনকে দেখলে! আমার একজীবনের আশা পূরণ করেছে মহান রাব্বুল আলামীন সম্রাটের মতো একটি ছেলে আমাকে দিয়ে! আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করতে পারবো না!
অতীত মনে করে চোখের কোনে সুখের অশ্রু ভীড় জমায়,হালকা হতে লাগলো দৃষ্টি! হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে বর্তমানে ফিরে এলো মিসেস জব্বার!
মিসেস জব্বার:- যাকে সন্তানের মতো ভালোবেসেছি তাকে কিভাবে দূরে সরিয়ে দিতে পারি বলেন! তাছাড়া ভুল আমার মেয়ের সেই শাস্তি অন্যকে দিতে পারি না! আর সম্রাটের প্রতি কোন অন্যায় হতে যেমন আমি দেখতে পারবো না তেমনি হতেও দিবো না। নিজের দ্বারা তো নাই।ওর মনে কষ্ট দিয়ে নিজের মেয়ের সুখ চাইতে পারি না। এরকম কিছু হলে আমি তার কাছে কি জবাব দিবো? সে তো আমার কাছে তার ছেলে মেয়েদের আমানত হিসেবে রেখে গেছে! সেই আমানত এর খেয়ানত কিভাবে করি? সবচেয়ে বড় কথা উনি সম্রাটকে ছেলের ন্যায় দেখেছেন,মেয়ের জামাই নয়! এরকম হলে অবশ্যই আমার সাথে আলোচনা করতো!
সবাই চুপ হয়ে এখনো মিসেস জব্বার এর কথাই শুনছে! উনারা জানেন সম্রাটের প্রতি বাবা মায়ের যত দায়িত্ব এই মানুষ দুটোই পালন করেছে! আর তাই তো মা ঘেঁষা সম্রাট খুব সহজেই বাবা মায়ের থেকে দূরে থেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে! উনারা অবশ্য তাতে কষ্ট পাননি কারন সঠিকভাবে সন্তানদের লালন পালন করার মতো অবস্থা তাদের ছিলো না! আর তাই তো ছোট সম্রাটকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান কিছুটা উন্নতি করতে চেয়েছিলো! তবে হয়তো পরম দয়ালু আল্লাহ একটু বেশি প্রসন্ন হলেন আর এই ফেরেস্তা'র মতো মানুষদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো যার মারফত আজ তাদের জীবন এতটা গোছানো সুন্দর!
মিসেস জব্বার:- তাছাড়া আপনার ভাই ও পারির সাথে সম্রাটের বিষয়টা জানতো ।।তাই তো যখন সম্রাটের সাথে পারির সম্পর্কে ভাঙন ধরে এবং সম্রাট ডিপ্রেশনে চলে যায় তখন সে কি ছটফটানি তার ভেতরে! শুধু একটাই কথা সে পারলো তার ছেলের সুখ টা এনে দিতে! আমি তার কথা তখন না বুঝলেও পরে উনি বলার পর বুঝেছিলাম সম্রাটের সাথে ওর প্রেমিকার ব্রেক আপ হয়ে গেছে! ইয়াং ছেলে তাই মানতে পারছে না! আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে তবে এটা বুঝতে পারিনি এই ভাঙ্গনের পিছনে রয়েছে আমার মেয়েরই হঠকারী সিদ্ধান্তে নেওয়া কোন অসভ্য লেভেলের কাজ!
কিছুক্ষণ থেমে আবারও বললেন,,
মিসেস জব্বার:- যাই হোক আমার মনে হয় অতীতে যা হয়েছে তা তো হয়েই গেছে! আমি শুধু বলবো আপনারা পারলে আমার মেয়েটাকে ক্ষমা করে দিবেন!
মাহমুদ:- ভাবী কি বলছেন! আপনি এভাবে কেন ক্ষমা চাচ্ছেন? দয়া করে এমন কিছু করে আমাদের ঋনের বোঝা আর বাড়াবেন না! আমাদের কাছে তানহা মায়ের কোন অপরাধ নেই! আমি তো মনে করি এটা এখন ওদের নিজেদের ব্যাপার ওরা নিজেরাই ঠিক করে নিবে!
মিসেস জব্বার:- না ওদের ব্যাপার নয়! সব জেনেও তানহার এভাবে সম্রাটের পিছনে পড়ে থাকার মানেই হলো নিজের জীবনকে নষ্ট করা সাথে সম্রাটের ও ! আর আমি এটা কিছুতেই হতে দিতে পারি না! তাই ঠিক করেছি খুব তাড়াতাড়ি সম্রাট পারির বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমি তানহা কেও আমার সাথে নিয়ে যাবো ! আমার বড় ভাইয়ের শ্যালকের ছেলে "আল-আমীন আবদুল্লাহ রাফাত " ওর জন্য অনেক আগেই তানহা কে চেয়েছিলো কিন্তু যেহেতু আমার মেয়ে সম্রাটের প্রতি দুর্বল তাই আমিই বারন করেছি এখন ভাবছি সেই কথাটা আবারও তুলবো। তবে অবশ্যই সেটা এখান থেকে যাওয়ার পর!
মিসেস মাহমুদ:- জোর করে কিছু করা কি উচিত হবে ভাবী জান ! পরে না ...!
মিসেস জব্বার:- ও আমার মেয়ে; ওকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় সেটা আমার খুব ভালো করেই জানা! আপনারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব; বাদ দেন সবটা আমিই দেখছি মত তাড়াতাড়ি সম্ভব আয়োজন করতে হবে!
কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়ালেন মিসেস জব্বার,,বাকীরা ভালো করেই জানেন যখন বলছেন উনি সামলে নিবেন তাহলে তাদের এখন আর কোন কাজ নেই।চেয়ে চেয়ে দেখা আর উপভোগ করা ছাড়া!
ওষুধের প্রকোপে ঘুমের পরিমাণ এতই গভীর হলো যে সেই ঘুম ভাঙ্গতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো! পারি চোখ মেলে দেখতে পেলো রুহানি আর সায়েরা ওর পাশেই বসে রয়েছে! দুজন ফিসফিস করে কিছু বলছে আর মোবাইল দেখছে!
পারি:- উ*হ!
হালকা ব্যথা*যুক্ত শব্দ করে উঠলো পারি! শোয়া থেকে উঠতে গিয়ে একটু ব্যথা অনুভব করলো ডান হাতের উলটো পিঠে! চেয়ে দেখলো ক্যা*নু*লা লাগানো! খাটের পাশেই রয়েছে মাত্র শেষ হওয়া স্যালাইন সহ বোতল আর তার স্ট্যান্ড!বুঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে! মাথায় হালকা চাপ দিতেই মনে পড়লো,,
সকালে পারি ভাবছিলো কিভাবে বাইরে যাবে! এখন তো সায়েরা কে স্কুলের জন্য তৈরি করাতে হবে। কিন্তু কিভাবে সবার সামনে যাবো?এসব ভাবনার মাঝেই শুনতে পেলো হালকা চেঁচামেচির শব্দ! বুঝতে পারলো বাইরে ওকে নিয়েই এত চেঁচামেচি হচ্ছে! খারাপ লাগছে খুব! সম্রাটের প্রতি রাগ হলেও আবার ভালো ও লাগছে এই ভেবে যে মানুষ টা ওর জন্যেই তো সবার সাথে এত যুদ্ধ করছে! আচ্ছা যদি এতই ভালোবাসে তাহলে সেদিন রাতে কি ছিলো! কেন ই বা! আচ্ছা চোখের দেখার বাইরে ও কি কোন সত্য থাকে যেটা না জেনেই আমরা ভুল করি!
রুহানি:- ভাবী ! ঠিক আছো? দাঁড়াও আমি সাহায্য করছি!
সায়েরা:- মামনি তোমার কষ্ট হচ্ছে?
নিজের শারীরিক যন্ত্রনার মাঝেই ভাবি আর মামনি ডাকটা যেন পারিকে থমকে দিলো।ওর বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে! দুজনেই মোবাইল রেখে পারিকে ব্যস্ত হয়ে উঠলো!!
রুহানি:- ভাবী তোমার কিছু লাগবে? আচ্ছা তুমি কি ওয়াশ রুমে যাবে? আমি সাহায্য করবো নাকি ভাইয়াকে ডাকবো? ভাই নিচেই আছে! মঈন সাহেবের সাথে অফিসিয়াল কথা কাজ করছে!
সায়েরা:- মামনি তুমি কি পানি খাবে? আমি এনে দেই তোমাকে?
পারি কথা বলবে কি! ও তো ওদের মুখে নিজের প্রতি এত আবেগ দিয়ে ভাবী,মামনি ডাক দেখে আপ্লুত হয়ে উঠলো,, তাহলে কি ওদের বিয়েটা সবাই মেনে নিয়েছে ? নাকি এই অবুঝ মেয়ে দুটোই শুধু! কথাগুলো ভাবতেই পারির চোখ ভরে উঠলো! আপন মনেই গড়িয়ে পড়লো তা নিজ গতিতে! পারির চোখের পানি দেখে রুহানি অস্থির হয়ে পড়ে,সায়েরা'র ও কাঁদো কাঁদো মুখ ভঙ্গি! ছোট্ট সায়েরা কারো চোখেই পানি দেখতে পারে না! কাউকে কাঁদতে দেখলে সে ও তার সাথে গলা মিলিয়ে কাঁদতে বসে! সেখানে তো তার অতি প্রিয় মনি মা যে কিনা আজ থেকে তার মামনি!সে কাঁদল অথচ সায়েরা কাঁদবে না তা কি করে হয়! পারি নিঃশব্দে কাঁদলে'ও সায়েরা গলা ছেড়েই কাঁদতে লাগলো!! সায়েরা কান্না শব্দ পেয়ে পারির কান্না থেমে গেলো,,
টেনে বুকে আগলে নিলো!
পারি:- কেঁদো না মা! এই দেখো তোমার মনি আর কাঁদছে না!
সায়েরা:- তুমি কেন কাঁদো মনি? আমি তোমাকে মামনি ডেকেছি বলে কি তুমি কষ্ট পাচ্ছো! তাহলে আমি তোমাকে আর ডাকবো না! তুমি তো মনি হও! খালা মনি বলেছে তোমাকে মামনি ডাকতে বলছে!!
হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলতে লাগলো সায়েরা! পারি নিজেকে সামলে সায়েরা'কে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো,রুহানি হতভম্ব হয়ে শুধু দেখতে লাগলো! দুইজনের কান্নার কারন বুঝলো না,,এর মধ্যেই হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো সম্রাট, সোহা!
সম্রাট:- পারি Are you ok? মামু কি হয়েছে?
পর্ব ৪৮
ঘরের ঢুকে পারি আর সায়েরা'কে এভাবে কাঁদতে দেখে আতংকিত হয়ে উঠলো সম্রাট! সোহা'ও অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,,
সোহা:- কি হয়েছে? তোমরা এভাবে কাঁদছো কেন? সায়ু মা কি হয়েছে? ব্যথা পেয়েছো বাচ্চা?
কেউ কোন কথা বলছে না দেখে রুহানির দিকে তাকালে রুহানি বলতে লাগলো,,
রুহানি:- আমি নিজেও বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে?
ভাবী তো ঘুমিয়ে ছিলো,তাই আমরা পাশেই বসে ছিলাম, হঠাৎ করেই ভাবীর উহ্ শব্দ শুনে আমরা কাছে আসতেই ভাবী কাঁদতে শুরু করলো, জানতে চাইলে আরো কাঁদতে লাগলো ! এর মধ্যেই সায়ু ও কাঁদতে শুরু করলো! আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না ! কাকে রেখে কাকে থামাবো?
সোহা:- ওহ বুঝেছি!
রুহানি:- কি?
সোহা:- তুই জানিস না; সায়ু কাউকে কাঁদতে দেখলে তার সাথে সে ও কাদতে শুরু করে! তাই!
রুহানি:- ওহ ওহ আচ্ছা! আমি তো আসলে ভয় পেয়েছিলাম ভাবীর হঠাৎ কান্না দেখে তাই এত কিছু মাথায় আসেনি!
সোহা:- সবই ঠিক আছে কিন্তু ভাবী তুমি কাঁদছো কেন?
সোহার ভাবী ডাকাতে পারি চোখ মেলে তাকালো, কান্নার গতি কমলেও হিঁচকি উঠে গেছে, সম্রাট হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কি করবে বুঝতে পারছে না! পারির চোখ দিয়ে এখনও অবিরত বর্ষন হচ্ছে!
সম্রাট:- পারি কি সমস্যা! তোমার কি খুব খারাপ লাগছে?
মাথা দুলিয়ে না বললে,
সম্রাট:- মা কে মিস করছো? আচ্ছা ঠিক আছে তুমি ঠিক হও তারপর না হয় নিয়ে যাবো হাসপাতালে!
এর মধ্যেই ঘরে ঢুকলো মিসেস মাহমুদ ও মাহমুদ তালুকদার তাদের সাথে মানহা ও মিসেস জব্বার!
মিসেস মাহমুদ:- কি হয়েছে ও কাঁদছে কেন?
সোহা:- বুঝতে পারছি না মা! কিছু তো বলছে ও না!
মিসেস মাহমুদ:- দেখি আমাকে একটু দেখতে দেও!
সোহাকে পাশ কাটিয়ে পারির পাশে গিয়ে বসলো, তারপর পারির মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলতে লাগলো,,
মিসেস মাহমুদ:- বউ মা কি হয়েছে? আমাকে বলো! কোথাও কষ্ট হচ্ছে? তোমার কি নিজের মায়ের কথা মনে পড়ছে?
মিসেস মাহমুদ এর এত আদুরে ডাকে যেন পারির কান্না আরো বেড়ে গেল,কেমন জানি অনুভূতি হচ্ছে! খুশি তো হওয়ার কথা তবুও কেন খুশি হতে পারছে না! কোথাও যেন অপরাধ বোধ কাজ করছে, মনে হচ্ছে তানহার জীবনটা নষ্ট হবে ওর কারনে, আবার মনে হচ্ছে ও সম্রাটের যোগ্য নয়! নিশ্চয়ই সবাই যখন জানবে ওর বিগত বৈবাহিক সম্পর্ক-কালীন সময়ের কথা তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিবে। আর সম্রাট ও কে তো ঠকানো হবে! সম্রাট বিয়ে ডিভোর্স জানলেও তারপরের খবর তো জানে না! কতটা নারকীয় ছিলো ঐ সময়গুলো!
সম্রাট:- Stop it পারি! কি হচ্ছে টা কি সেই কখন থেকে কেঁদেই চলে'ছো তো কেঁদে'ই চলে'ছো! নিজে তো কাঁদছো তার সাথে বাচ্চা মেয়েটাকে ও কাদা'চ্ছো? কি সমস্যা টা কি তোমার? এতগুলো মানুষ এত সময় ধরে জিজ্ঞেস করছে কারো কথার কোন উত্তর ই দি'চ্ছো না!
সম্রাটের হুংকারে কেঁপে উঠল পারি, আশেপাশের অনেকেই চমকে উঠেছিলো, কিন্তু পারি সম্রাটের এমন ভয়ঙ্কর গর্জনের সাথে আগে কখনো পরিচিত ছিলো না তাই ওর কেঁপে উঠা টা ছিলো অসম্ভব ভয়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো! এত সময় ধরে সবার প্রশ্নের উত্তরে পারির কান্না দেখে সম্রাটের রাগ উঠে গেল, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরেই গর্জে উঠলো!
মিসেস জব্বার:- সম্রাট কি হচ্ছে? মেয়েটা অসুস্থ! আর তুমি এই সময়ে ওর সাথে এরকম ব্যবহার কিভাবে করতে পারো?
মিসেস জব্বার আশ্চর্য হয়ে জানতে চাওয়া প্রশ্নে সম্রাট নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করে বললো,
সম্রাট:- সরি মামী! কিন্তু কি করবো বলেন? সেই কখন থেকে কান্না করছে! এভাবে কাঁদলে ওর মাথা ব্যথা করবে! ডাক্তার বারবার বলেছে ওকে চিন্তা-মুক্ত থাকতে আর এই মেয়েকে দেখেন কান্না করার প্রতিযোগীতায় নেমেছে যেন কেঁদেই সাগর বানাবে!
মাহমুদ তালুকদার:- তাই বলে;
মিসেস জব্বার:- যাই হোক রুহি তুমি সায়ু কে নিয়ে বাইরে যাও! এখানে থাকলে ও ও কাঁদতে থাকবে! অনন্ত একজনকে থামাও!
রুহানি সায়েরা'কে নিয়ে বাইরে চলে গেল! সম্রাটের ধম'কে পারি তার শ্বাশুড়ির বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগলো, তিনি থামানোর চেষ্টা করে মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন,,
মিসেস জব্বার:- ওর হাত দিয়ে দেখো রক্ত পড়ছে মনে হয়!
মিসেস জব্বারের কথায় সবাই আতংকিত চোখে তাকায় পারির ডান হাত দিয়ে গড়িয়ে পড়া রক্তের চিকন লাইনের দিকে!
সম্রাট:- পারি!এটা কিভাবে হলো?
সম্রাট পারির হাত ধরে ভীতু চোখে জিজ্ঞেস করলো! পারি এখনো শ্বাশুড়ির বুকেই মুখ গুঁজে রেখেছে!
মিসেস তালুকদার, নিজের হাতের মুঠোয় ধরে মুখটা তুলে ধরে বললেন,,
মিসেস মাহমুদ:- এই মেয়ে এই এতটুকু বিষয়ে এভাবে কাঁদতে হয়? মেয়েদের এত নরম হলে চলবে? সামনে তো এর চেয়েও বেশি রক্ত দেখতে হবে তখন!
এরকম মূহুর্তে মায়ের এরকম কথায় সম্রাট একটু লজ্জা পেলেও কিছু বললো না কারন উনি এই গুমোট পরিবেশ পরিবর্তন করার জন্য ই কথাটা বলেছে, সবাই প্রথমে একটু বেকুব বনে গেলেও পরক্ষনেই বুঝতে পেরে মিটিমিটি হাসছে! রুহানি ফাস্ট এইড বক্স সামনে রাখলে সম্রাট মাথা নিচু করেই হাতটা পরিষ্কার করলো! কিন্তু এর মধ্যে কিছু ই বুঝলো না একমাত্র পারি আর রুহানি!
মায়ের কথায় সম্রাট ও বেশ লজ্জা পাচ্ছে,সেটা ওর মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে,,পারির কান্না কিছুটা কমে আসলেও হিঁচকি থামে নি! মিসেস জব্বার রুহানি কে উদ্দেশ্য করে বলেন 'এক গ্লাস পানি আনো! রুহানি আদেশ মোতাবেক ঘরেই থাকা জগ থেকে পানি ঠেলে দিলে উনি সম্রাটের মায়ের দিকে ইশারা করে বোঝায় পারিকে পানি খাওয়াতে! পারির চোখ দুটো ভালো মতো মুছে তারপর মুখের সামনে গ্লাস ধরে বললো 'পানি খাও " পারি শ্বাশুড়ির কথা মতো পানিটুকু এক দমে শেষ করলো! এর মধ্যেই পারির হাত পরিষ্কার করে সেখানে ওষুধ লাগানো হয়ে গেছে! সম্রাট পারির ভেজা চোখ-মুখে মায়াময় দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে ! পারি ও এবার সম্রাটের দিকে দৃষ্টিপাত করে, সম্রাটে'র চাহনি দেখে লজ্জা পেয়ে মাথা নুইয়ে নেয়! মিসেস মাহমুদ ও মিসেস জব্বার বুঝলেন দুজনকে কিছু সময় একা ছাড়া উচিৎ! উনা'রা সবাই এটাই ভেবে নিয়েছেন হয়তো হাতের রক্ত দেখে ভয় পেয়েই এভাবে কাঁদছে! তাই আর কেউ এই বিষয়ে কোন কথা না বলে চলে যায়! তবে মানহা'র একটু বিরক্ত লাগছিলো সবকিছু কিন্তু কিছু করার নেই বলে চুপ করেই রইলো!
সম্রাট:- কেন কাঁদছো? কি হয়েছে বলো?
সবাই চলে যেতেই সম্রাট পারির হাত দুটো ধরে কথাটা জিজ্ঞাসা করে,পারি কোন উত্তর দেয় না! সম্রাট হতাশ হয়! বিয়ের আগে তাও কথার উত্তর দিতো! ঠিক না হোক বেঠিক ভাবে হলেও দিতো কিন্তু বিয়ের পর থেকে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছে! পারির এই নিরবতা ওকে খুব কষ্ট দিচ্ছে!
সম্রাট:- (মনে মনে) আমি জানি তোমার আমাকে নিয়ে অভিযোগ আছে কিন্তু সেটা কেন একবার সরাসরি আমাকে জিজ্ঞেস করছো না? তুমি জিজ্ঞেস করলে কি আমি বলবো না? তুমি জানতে চাইলে আমি নিশ্চয়ই বলবো! তবে কেন সব নিজের মাঝে লুকিয়ে রাখছো? তুমি তো এমন ছিলে না পারি! কতটা বদলে গেছো তুমি, নিজের মাঝেই নিজেকে গুটিয়ে রাখতে শিখে গেছো! এভাবে থাকলে তো তুমি বাঁচবে না! তোমার বাঁচার জন্য হলেও তো নিজের কষ্ট গুলো ভাগ করতে হবে!
সময় অনেক অতিবাহিত হয়ে গেল এভাবেই কিন্তু পারি একবারের জন্য ও সম্রাটের দিকে তাকালো না!সম্রাট ওভাবেই পারির দিকে তাকিয়ে ছিলো, কিন্তু ওর প্রতি পারির এতটা অনিহা দেখে আর পারলো না থাকতে! ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস! নিজের মনকে শান্ত করতে একটু সময় দরকার আর সেই সময়ের জন্য এখান থেকে বেরোনোর দরকার! কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই উঠে পড়লো বসা থেকে; পারির থেকে মুখ ঘুরিয়ে বললো,,
সম্রাট:- আমি বাইরে যাচ্ছি আসতে সময় লাগবে! তোমার যদি মা'কে দেখতে যেতে ইচ্ছে করে তবে ড্রাইভার'কে বললেই হবে নিয়ে যাবে! তবে হ্যা আজ না বেরোলেই ভালো হয় , তোমার বিশ্রাম দরকার,আজ অন্তত সেটাই করো!
কথাটা শেষ করে হনহনি'য়ে বের হয়ে গেলো!সম্রাট বের হতেই মুখ তুললো পারি, তাকিয়ে রইল সম্রাটের যাওয়ার পথে,,আপন মনেই গড়িয়ে পড়লো দু ফোঁটা পানি! এত সময় অনেক কষ্টে নিজেকে আটকে রেখে ছিলো কিন্তু এখন আর পারলো না! সম্রাটের প্রতি অভিমান থেকে নয় নিজের প্রতি হওয়া ঘৃনা'ই কথা বলতে বাধা দিচ্ছে,,আসলে পারির মাঝে জড়তা কাজ করছে!
-------------মনে মনে ভাবছে,,
পারি:- আমি কিভাবে তোমার সামনে নিজেকে তুলে ধরবো? আমি তো তোমার সেই পবিত্র পারি নেই! আমার সারা অঙ্গে কিছু নরপশুর নোংরা ছোঁয়া! আমি পারি না সেগুলো ভুলে যেতে! এই অপবিত্র নোংরা শরীরে তোমার দেওয়া পবিত্র ছোঁয়া আমি কিভাবে নিবো?
পর্ব ৪৯
________সম্রাট চলে যাওয়ার পর অনেক সময় কেটে গেল,, পারি ওভাবেই একমনে বসে থাকলো কিছুক্ষণ, অনেক কিছু ভাবছে,কি যে চলছে পারির মনে তা পারি নিজেই জানে! সম্রাট যাওয়ার কিছু সময় বাদেই ঘরে ঢুকলো রুহানি সোহা! সম্রাট যাওয়ার সময় বলে যায় পারির পাশে থাকতে।আর এই সময় পারির যেই মানসিক অবস্থা তাতে সোহার মতো একজনের খুব দরকার ওর পাশে থাকার তাই সোহা ই চলে আসলো!
------- ঘরে ঢুকে পারিকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে ছোট একটি হতাশার দম ছাড়লো, তারপর পারির পাশে বসে পারিকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো, এরপর নিজ থেকেই বলতে শুরু করলো,,
সোহা:- কি ভাবছো ভাবী?
হঠাৎ নিজের খুব কাছে কারো গলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে চমকে উঠে পারি, ধর'ফরি'য়ে উঠে পাশে তাকাতেই সোহা কে দেখে,, নিজের মধ্যে এতটাই ডুবে ছিলো যে কখন সোহা রুহানি ঘরে ঢুকেছে তা বুঝতেই পারেনি!
সোহা:- কোথায় ডুবে ছিলে? সেই কখন এসেছি বুঝতেই পারো নি?
রুহানি:- আর কই ? নিশ্চয়ই ভাইয়ার কথা ভাবছিলো! তাই না ভাবী!
নিজেকে স্বাভাবিক করে মাথা নত করেই ছিলো, রুহানির কথায় একটু লজ্জা অনুভব করে,রুহানি যে মজা করে কথা বলছে বুঝতে পারছে,
সোহা:- সত্যি তাই নাকি ভাবী?
সোহার কথায় ও দুষ্টুমি বহিঃপ্রকাশ,তাতে পারির হেলদোল নেই ,ওর ভাবনার বিষয় সোহার মুখে ভাবী ডাক'টা!
পারি:- তুমি আমাকে ভাবী কেন ডাক'ছো আপু?
সোহা:- ওওও মা বড় ভাইয়ের বউকে ভাবী ডাকবো না তো কি ডাকবো !
সোহা বিস্ময়কর ভঙ্গি করে কথাটা বললো,সোহার কথায় আর বলার ধরনে পারি না হেসে পারলো না তবে হালকা করেই ঠোঁট দুটো প্রসারিত হলো!
পারি:- কিন্তু আমি তো তোমার ছোট তাছাড়া আমি!
সোহা:- কি তুমি! দেখো তুমি ছোট হও আর যাই হও বড় ভাইয়ের বউ তাও আবার আমাদের একমাত্র বড় ভাইয়ের বউ তোমাকে তো ভাবী বলেই ডাকবো! এখানে তোমার কোন আবদার চলবে না! আরে তুমি বড় কেন ছোট ভাইয়ে'র বউ হলেও তোমাকে ভাবী বলেই ডাকতাম! একমাত্র ভাইয়ের বউ বলে কথা!
রুহানি:- একদম ঠিক বলেছো আপুনি! আমার তো কত দিনে'র শখ আমি রায়-বাঘিনী ন'নদিনী হবো কিন্তু তারপর ভাবীকে ইচ্ছা মতো জ্বালাবো ! ভাইয়ের কাছে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলে ভাবীকে মার খাওয়াবো আরা আমি কুইন ভিক্টোরিয়ার মতো পা দুলিয়ে দুলিয়ে হিটলারি হাসি দিবো! হু হা হা!
কথাট বলে হাসতে শুরু করলো, আবার পরক্ষনেই থেমে গেল এবং মুখট একটুখানি করে বললো,,
রুহানি:- কিন্তু আমার ভাই তো বিয়েই করতে চাইতো না! আমার তো মনে হতো আমার এই ইচ্ছা আর এ জীবনে পূরন হবে না! কিন্তু না আমার ভাই আমাকে নিরাশ করেনি হয়তো বুঝতে পেরেছে সে তার ছোট বোনের মনের খোয়াইশ আর তাই তো কালকে হুট করেই তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নিয়ে এসে আমার ইচ্ছা পূরনের সুযোগ করে দিলো! ভাবী রেডি থেকো, নন্দিনী দের জ্বালা সওয়ার জন্য!
রুহানি কথা শেষ করে ভিলেনের মতো লুক নিয়ে পারির দিকে তাকালো,, সোহা ওর তামাশা দেখে ওকে দৌড়ানি দিতেই ভয় পাওয়ার মতো অভিনয় করে দৌড় দিলো! তার সাথে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো সোহা,, রুহানির কথা আর কাজে পারিও নিজের হাসিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না! ও মুচকি হেঁসে উঠলো,, পারির ঠোঁটে হাসি ফুটেছে দেখে সোহা খুশি হলো মনে মনে ধন্যবাদ দিলো রুহানি কে! রুহানি যে এই আবোল তাবোল কথা বলেছে শুধুমাত্র পারিকে স্বাভাবিক করার জন্য সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে! হাঁসি মুখে পারির হাত দুটো ধরলো,পারি নিজের হাতে সোহার হাত দেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে সোহা বলতে লাগলো,,
সোহা:- আমি জানি তোমার মনে কি চলছে? তবে আমি বলবো যা চলছে তা বের করে দাও! মনে রাখবে অতীত অতীত ই হয়; সেটা ভুলে যাওয়া যেমন সহজ নয় তেমনি সেটাকে পাশে রেখে সামনে আগানো'ও সহজ নয়! এর জন্য অবশ্যই অতীত কে পেছনে রেখেই আগাতে হয়। তোমার জীবনের নির্দিষ্ট কিছু অল্প সময় হয় তো খারাপ ছিলো , কিন্তু অধিকাংশ অংশ তো অবশ্যই ভালো ছিলো! তাই না
পারি চুপ করে শুধু উপর নিচ মাথা হেলালো ,,
সোহা:- তাহলে তুমি কেন অতীত আঁকড়ে ধরে রেখেছো? দেখো যাই হোক তোমাকে তো বাঁচতে হবে! আর তার জন্যই তোমাকে নিজের প্রতি যত্নশীল হতে হবে!ভালোবাসতে হবে নিজেকে, নিজের আশেপাশের মানুষগুলো কে!
পারি এখনও চুপচাপ বসে রয়েছে,,সোহা আবারও বললো,
সোহা:- আমি জানি তুমি ভাইয়ের প্রতি রেগে আছো কিন্তু আমার মনে হয় তোমার ভাইয়ের সাথে সরাসরি কথা বলা উচিত এতে করে অন্তত তোমার ভুল টা ভাঙ্গবে!! আমি শুধু একটাই কথা বলতে চাই, নিজের রাগ অভিমান কে এতটা বড় করে দেখো না যে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষ ও হারিয়ে যায়!! ভাই তোমাকে কতটা ভালোবাসে তা তুমি হয়তো অনুভব করতে পারো নি কিন্তু যদি তুমি ভাইকে এতটুকু ও ভালোবেসে থাকো তাহলে তোমাকে বলবো ভাইয়ের সাথে সরাসরি কথা বলো ! নিজেদের দুরত্ব ঘুচিয়ে নাও! দিনশেষে একে অপরের সাথে ভালো থাকো!!
পারি:- আমি তোমার ভাইকে ভুল বুঝে দূরে নেই! ওর প্রতি রাগ থাকলেও সেটা এখন আর গুরুত্ব নেই কিন্তু ওর কাছাকাছি থাকার ও অধিকার আমার নেই!
সোহা:- কি বলছো? তুমি ভাইয়ের স্ত্রী ! তুমি না থাকলে কে থাকবে?
পারি:- আমি ওর যোগ্য নই আপু! ওর জন্য তানহা আপুই ঠিক আছে! ওরা একে অপরের জন্য ঠিক! আমি শুধু শুধু ওদের মাঝে দেওয়াল হতে চাই না!
সোহা:- পারি কি বলছো তুমি? তানহার প্রতি ভাইয়ের কোন টান নেই এমনকি আমি তোমার আগে অন্য কোন মেয়ের প্রতি ভাইয়ের বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখিনি! হ্যা তানহার ভাইয়ের প্রতি একটা টান আছে, কিন্তু সেটাতো এক-পাক্ষিক! আর তার জন্য তোমাদে'র দুজনের কেন ত্যাগ করতে হবে?
পারি:- আপু আমি..
সোহা:- দেখো সেসব নিয়ে তোমাকে আর ভাবতে হবে না।হ্যা তোমার সামনেই আমরা সবাই ভাই আর তানহার বিয়ে নিয়ে আলোচনা করেছিলাম কিন্তু তখন আর কেউ এত বড় সত্য জানতো ! কিন্তু এখন যখন সবাই জানে তখন দেখো সবাই কিন্তু সুন্দর করে মেনে নিয়েছে এমনকি তানহা নিজেও! ও নিজেই এখন তোমার আর ভাইয়ের বউ ভাতের আয়োজন করছে! তারপরও কি আর কিছু বলার থাকে!
পারি:- আপু আমি সেটা!..
সোহা:- কি তুমি! এখন ও ভাইয়ের প্রতি রেগে আছো? দেখো আমি চাইলেই তোমাকে সত্যি ই টা বলতে পারি কিন্তু চাচ্ছি না ।।কারন আমি চাই তুমি ভাইয়ের সাথে সরাসরি কথা বলো এই বিষয়ে! আমি শুধু এতটুকু বলবো "অনেক সময় আমার চোখের দেখাও সঠিক হয় না, ঘটনার পিছনে ও ঘটনা থাকে; আর সেটা সম্পূর্ণ জেনে তবেই বিচার করা উচিত"!
পারি বুঝতে পারলো না সোহার কথার মানে, তবে কথা যে ওদের মাঝে ভুল সৃষ্টির বিষয়ে সেটা বুঝতে পারছে; তাহলে কি ওর দেখার মাঝেও কিছু ভুল কিন্তু!
রুহানি:- আপুনি তোমাকে নিচে ডাকছে!
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সোহার উদ্দেশ্য কথাটা বললো রুহানি,সোহা চোখের ইশারায় সম্মতি দিলো,উঠে দাঁড়িয়ে পারির হাত ধরে বললো,
সোহা:- নিচে চলো! দেখবে সবার সাথে কথা বললে ভালো লাগবে!
পারি:- কিন্তু আপু?
সোহা:- কোন কিন্তু না! আমি বলছি তুমি উঠো! আর এমনিতেও কিছু সময় বাদে সবাই রাতের খাবার খাবে তুমি ও একসাথে বসে খাবে!
পারিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দুই বোন মিলে ওর হাত ধরে নিয়ে গেল নিচে!
ড্রয়িং রুমে """"""""---------"""""""
সবাই এখানে ওখানে বসে কথা নানান বিষয়ে বলছে, তার মাঝে মাঝে পারি সম্রাটে'র রিসিপশনে'র আয়োজন নিয়েও আলোচনা হচ্ছে! নেই শুধু মানহা তানহা দুইবোন! তানহা সে ই যে ঘরে ঢুকেছে এর পর আর বের হয়নি,মানহা বোনের পাশেই থাকছে কিছু সময় বাদ বের হয়ে শুধু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে! মন থেকে পারিকে মানতে পারছে না আবার নিজের বোনের দোষ' কেও ছোট করে দেখতে পারছে না তাই কোনরকম কথা ও বলছে না। শুধু চুপ করে দেখেই যাচ্ছে সবকিছু!
মিসেস জব্বার মেয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে সম্রাটের খুশিকে বড় করে দেখছেন এতে উনার প্রতি সবার শ্রদ্ধা যেমন বাড়ছে তেমনি সবাই চমকিত ও হচ্ছে উনার মানসিকতা দেখে!
সম্রাটের মা:- আরে বৌমা তুমি এত কষ্ট করে কেন নামতে গেলে? কিছু লাগলে আমাকেই বলতে!
সোহা:- না মা ও ইচ্ছে করে নামেনি! আমি ই জোর করে আনলাম! কালকে থেকে তো ঘরেই পড়ে আছে, বাইরে এসে সবার সাথে একটু কথা বার্তা বললেও ভালো লাগবে! তাছাড়া ভাই ও তো নেই এখন! কি করবে একা একা ঘরে? তাই সাথে করেই নিয়ে আসলাম!
সম্রাটের মা:- ঠিক আছে, কিন্তু ডাক্তার তো বললো ওকে রেস্ট নিতে!
মিসেস জব্বার:- ভাবী রেস্ট মানে শুধু শুয়ে থাকা নয়! শুধু শুয়ে থাকলে আরো সমস্যা হয় অনেক সময় তাই মাঝে মধ্যে হাঁটা চলা'ও করা উচিত!
পর্ব ৫০
মিসেস জব্বারের কথার পরে বলার মতো আর কোন কথা কারো থাকেনা!
পারি নিজের প্রতি এই পরিবারের সবার এরকম পরিবর্তন আর আচরন মুগ্ধ হয়ে দেখছে,, সকালে ও সবাই ওকে নিয়ে কত খারাপ চিন্তা করছিলো, কতরকম বাজে শব্দ ব্যবহার করছিলো অথচ দিন গড়াতেই সবার এই আমূল পরিবর্তন! কিভাবে? তাহলে কি সম্রাট সবাইকে ম্যানেজ করতে পেরেছে! কিন্তু তাহলে তানহা আপু? কথাটা ভাবতেই মিসেস জব্বার এর দিকে তাকিয়ে দেখলো তার হাসি হাসি মুখ! কিভাবে উনি এত খুশি নাকি শুধু লোক দেখানোর জন্যই এই খুশির অভিনয়! কিন্তু উনার চোখে মুখে কোথাও তো কোন ভনিতার ছাপ নেই তাহলে? নিজের মেয়ের খুশি যার কারন নষ্ট হলো তাকে কি আদৌ কখনো এভাবে আপন করে নেওয়া যায়? আচ্ছা ওর মা হলে কি পারতো?
মিসেস জব্বার হয়তো বুঝতে পারছে ওর মনের খবর তাই নিজেই এগিয়ে এসে দু হাতের আজঁলায় পারির মুখটা ধরলো! মায়া মায়া দৃষ্টিতে পারির দিকে তাকিয়ে কিছু সময় নিরব রইলো,পারিও যেন বহুদিন পর মাতৃস্নেহ উপলব্ধি করলো! ওর মা তো আজ এতটা বছর ধরে বিছানায় পরে আছে, অতটা বছর মায়ের আদর এভাবে পাওয়া হয় না! কথাগুলো ভাবতেই পারির চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো নোনাজল! মিসেস জব্বার এক হাতের তিন আঙুল দিয়ে পরম স্নেহে মুছে দিলো, তারপর সেই হাত মাথার রেখে বললেন,,
মিসেস জব্বার:- আমি জানি তুমি কি ভাবছো? তবে তুমি চিন্তা করো না! আমি মন থেকেই চাই তুমি সম্রাটের সাথে সুখী হও! সম্রাট শুধু তোমার শ্বশুর শ্বাশুড়ির একার ছেলে নয় , আমার ও একমাত্র ছেলে আর ওর খুশি আমার কাছে অনেক দামী তাই নিজের মেয়ের একার খুশিকে দাম দিতে গিয়ে আমি আমার ছেলের খুশিকে, পছন্দ কে যেমন গলা টিপে মেরে ফেলতে পারি না তার সাথে পারি না তোমার জীবনের খুশিকে ও! যদি সম্রাট তানহার সাথে নিজের জীবন সাজানোর কথা কখনো একবার মজার ছলে'ও বলতো তাহলে'ও হয়তো আমি ভাবতাম কিন্তু ও কখনোই এমন কিছু বলেনি! তাই শুধু একজনের জন্য দুজনকে কষ্ট দেওয়ার মানে হয় না আর তাছাড়া তুমিও তো আমার মেয়ের মতো'ই তাহলে কিভাবে আমি!! যাই হোক আমি'ও চাই তুমি অনেক সুখী হও জীবনে,অতিত ভুলে সামনে আগা'ও; মানুষের জীবনে অনেক কালো অতিত থাকে তাকে আকড়ে ধরে রাখতে নেই,তাকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া ই বুদ্ধিমানের কাজ!
মিসেস জব্বারের মাতৃস্নেহে বলা কথাগুলো পারির মন ছুঁয়ে গেছে ,ও সম্মতি ভরে মাথা নাড়ালো, সবাই পারিকে ঘিরে বিভিন্ন কথা বলতে লাগলো,এর মধ্যেই সোহা চলে গেল টেবিলে খাবার সাজাতে পারির ও সোহার সাথে যেতে চাইলো, কিন্তু সোহা দুষ্টুমি করে বললো,,
সোহা:- না থাক ভাবী আজকে তুমি নতুন বউ একটু বিশ্রাম করো কাল থেকে না হয় সবার সেবা যত্ন করো! এমনিতেও এটা তোমার সংসার,এখন থেকে তোমার ই রাজত্ব চলবে!
পারি:- আপু!
সোহা:- আরে ধুর আমি দুষ্টুমি করছিলাম , তুমি সিরিয়াসলি নিও না!
সবাই ওদের কথোপকথনে হেসে দিলো ,এর মধ্যেই ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলো সম্রাট! ও আসতেই সবার আগে চোখ পড়লো পারির হাস্যোজ্জ্বল লজ্জা রাঙ্গা মুখে, মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো,,পারির গায়ে গতরাতে পড়া সেই শাড়ীটা,যদিও ব্লাউজটা বেশ ঢোলা ছিলো কিন্তু আঁচল দিয়ে নিজেকে কভার করার কারনে তা আর বোঝা যাচ্ছে না! সম্রাটের দিকে তাকিয়ে সাইদুর তানজিব হেসে কৌতুক করে বললো,
সাইদুর তানজিব:- উহুম উহুম!! এভাবে তাকালে নজর লেগে যাবে! তাছাড়া বাসর ঘরের জন্য ও কিছু বাকী রাখা উচিত সুমন্ধি বাবু!
তানজিবে'র কথায় সম্রাট লজ্জা পেয়ে মাথা নুইয়ে উপরের দিকে হাঁটা ধরলো,যাওয়ার পথে শুনতে পেলো সোহার গলার স্বর,,
সোহা:- ভাই ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি নিচে আসো! খেতে বসবে, সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে!
রুহানি:- আচ্ছা ভাইয়ের হাতে অত ব্যাগ কেন?
সোহা:- সেটা জেনে তুই কি করবি?
রুহানি:- আমি তো এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম!
মিসেস জব্বার:- আচ্ছা ঠিক আছে এত কথার কি আছে,হয়তো পারির জন্য কিছু শপিং করেছে! ওর তো কোন কাপড় আনা হয়নি! তাই হয়তো!
সবাই আলোচনার মাঝেই খাবার টেবিলে এসে বসে পড়লো, সারাদিন এর মধ্যে এই প্রথম ঘরের বাইরে এলো তানহা,মানহা বোনকে অনেক ভাবে বুঝিয়ে তারপর বাইরে আনতে সক্ষম হয়েছে! সম্রাটের পাশের চেয়ারে পারিকে বসে থাকতে দেখে বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো,এই চেয়ারে এতদিন ও বসতো অথচ এখন থেকে আর ! কথাটা ভাবতেই আবারও গলায় কান্না'রা ধলা পাকানো শুরু করলো,
মানহা:- আপু!
নিজের বোনের এমন শান্ত ডাকে নিজেকে ঠিক করে নিয়ে বসে পড়লো বিপরীত চেয়ারে! পারি তানহার দিকে তাকালো,ধক করে উঠল ওর মন,মেয়েটা এই এক বেলায় নিজের কি হাল করেছে কেঁদে কেঁদে! আবার ও জেঁকে ধরলো অপরাধ বোধ! অনুশোচনায় নিজেকে শেষ করতে ইচ্ছে করছে! অনুভব করছে সেই রাতে সম্রাটের দ্বারা হওয়া প্রতারনার মুহূর্ত!
এত সময়ে সবার বোঝানোর ফলে যতটা নরম হয়েছিলো ওর মন এখন এই মুহূর্তে তানহার মুখ দেখে ঠিক ততটাই আবার শক্ত হয়ে গেল! ধাতস্থ করে নিলো নিজের অস্থিরতাকে, সিদ্ধান্ত নিলো কঠিন কিছুর! যতই হোক যেই যন্ত্রনায় নিজে জ্বলেছে সেই একই যন্ত্রনা তানহার মতো মিষ্টি শান্ত সুন্দর মনের মেয়েকে পেতে দিবে না !
পারির এরকম উল্টো পাল্টা ভাবনার মাঝেই ওর পাশে এসে বসলো সম্রাট! পারিকে অন্য মনস্ক দেখে কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু আওয়াজে বললো,
সম্রাট:- এখন আবার কি জট পাকানোর চিন্তা করছো? যাই করো না কেন,দুরে যাওয়ার চিন্তা একদমই না! আগেরবার আমি অসহায় ছিলাম তাই ছেড়ে দিয়েছি কিন্তু এখন আর নই ! পৃথিবীর শেষ প্রান্তে'ও যদি তুমি যাও আমি সেখান থেকেই ঘাড় ধরে তোমাকে তুলে নিয়ে আসবো!
সম্রাটের এহেন শান্ত ধমকে পারি হতভম্ব হয়ে গেল,ও আশ্চর্য হয়ে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, ওদের এমন অবস্থা দেখে সবাই মিটিমিটি হাসছে যদিও এদের মাঝের কথপোকথন কিছুই তারা বুঝতে পারছে না!
খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে যে যার রুমে চলে গেল ঘুমাতে,কালকে সব রকমের অশান্তির মাঝে পারি সম্রাটের মাঝে এক বিছানায় শোয়া নিয়ে অশান্তি না হলেও আজকে তা হচ্ছে! কালকে পারির মানসিক অবস্থা ভেবেই সম্রাট আলাদা শুয়েছিলো কিন্তু আজ মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি সুড়সুড়ি দিচ্ছে আর তাই পারির পাশে শুয়ে পড়তেই পারি লাফ দিয়ে উঠে পড়লো,
পারি:- এই কি ব্যাপার আপনি আমার পাশে কেন শুয়েছেন?
সম্রাট:- মানে কি পারি? আমরা স্বামী স্ত্রী ! একসাথে শোবো না তো কি করবো?
সম্রাট জানতো এত তাড়াতাড়ি পারি ওর সাথে বেড শেয়ার করবে না,এক ঘরে থাকলেও পারি যে এখনও ওকে মন থেকে মেনে নিতে পারছে না সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারে,আর সেটা যে শুধু সেই রাতের অভিমান কিংবা রাগের জন্য নয় তাও বুঝতে পারছে।পারি নিজের বিগত বৈবাহিক সম্পর্কের তৃক্ততা'র রেশ থেকে এখনও নিজেকে মুক্ত করতে পারে নি সেটা সম্রাট ওর আশেপাশে থাকলে ওর অস্থির,ভয় ভয় চাহনি'ই বুঝিয়ে দেয়! কিন্তু সম্রাট চায় পারি ওর সাথে সেইসব বিষয়ে সরাসরি কথা বলুক যা ওকে কষ্ট দেয়!আগে তো পারি তাই করতো! কিন্তু সেই আগের উচ্ছল দুরন্ত পারি আর এখনকার এই শান্ত নিশ্চুপ পারি যে এক নয় তা ও খুব ভালো করেই বুঝতে পারে, তবুও ও চায় পারি আগের মতো চঞ্চল আর দুরন্ত হয়ে উঠুক আর তার জন্যই পারিকে তার অতিতে'র ঐ কালো অধ্যায় ভুলতে হবে আর সেটা কেবল সম্রাটের সান্নিধ্যে'ই সম্ভব!
পারি:- মানে কি!হ্যা মানছি আমরা স্বামী স্ত্রী কিন্তু তাতে কি আমি তো এই বিয়ে মানি না ! ( কাঁপা কাঁপা গলায় পারির উত্তর)
সম্রাট:- ( করুন একটি লুক নিয়ে) কি বলছো এসব পারি? মান'ছো আমরা স্বামী স্ত্রী আবার বল'ছো বিয়ে মানো না! এটা কিছু হলো?
পারি:- হ্যা হলো! কবুল বলে বিয়ে করলেই স্বামী স্ত্রী হওয়া যায় কিন্তু সেই বিয়েতে একজনের মত না থাকলে তাকে বিয়ে বলে মন থেকে মানা যায় না!আর সেখানে আপনি তো আমাকে জোর করে ধম'কে বিয়ে করেছেন এরপরে'ও কি করে ভাবলেন আমি এই বিয়ে মেনে নিবো?
সম্রাট:- আমি তোমাকে জোর করেছি! ধমকে বিয়ে করেছি! এই এত বড় অপবাদ টা তুমি আমাকে দিতে পারলে পারি?
সম্রাটের অসহায়ত্ব চাহনি,একদম মাসুম একটা মুখ বানিয়ে কথাটা বললো,পারি ওর বলার ধরনে হতভম্ব হয়ে গেল! ও যা করেছে পারি তো তাই বলেছে! এখানে তো একচুলও মিথ্যা নাই তারপরও এত মাসুম ভাব নিয়ে কথা কেমনে বলে কেউ? যেন এই বিষয়ে সে একদম অজানা!
সম্রাট:- তুমি কি করে পারলে আমার মতো এত ভালো একটা ছেলের বিরুদ্ধে এত বড় একটা অপবাদ দিতে! একবার ও আমার এই সাদাসিধে মুখটা তোমার ভাবনায় এলো না!
পারি:- কিহ! আপনি আর সাদাসিধে! সিরিয়াসলি! আপনি সাদাসিধে হলে মিচকে শয়তান কে?হনুমানের নাতি কে? বাঁদরের দাদা কে?
সম্রাট:- আমি মিচকে শয়তান! হনুমানের নাতি বাঁদরের দাদা! এগুলো কি ধরনের কথা পারি? কোথায় থেকে শিখেছো এইসব! আগে তো এমন অদ্ভুত কথা বলতে না!
পারি:- হ্যা অবশ্যই আপনিই এগুলো! আর আগে কি করতাম না করতাম তা ভুলে যান! আগের পারি আর এই পারি আর এক নয়! দুটো সম্পূর্ণ আলাদা!
সম্রাট:- হ্যা তা তো অবশ্যই! আগের পারি আর এখনকার পারি এক নয়; আগের পারি ছিলো একদম গলুমলু কিউট চকোলেট কেক আর এখনকার পারি হচ্ছে পুরো হট কেক! আগের পারিকে আদর করতে ইচ্ছে করলেও এখনকার পারির মাঝে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে! আগে ধরলে সফট লাগতো একদম যেন তুলোর বস্তা এখন কেমন লাগে সেটা অবশ্য ধরলে বোঝা যাবে! ধরবো একবার?
পারি:- ছিহ কিসব কথা এগুলো! আর তুমি আমাকে নিয়ে এসব ভাবতে!
পর্ব ৫১
এক বিছানায় শোয়া নিয়ে এক কথায় দু কথায় দুজনের মধ্যে তুলোর যুদ্ধ বেঁধে গেল,পারির সব কথার উত্তর হিসেবে সম্রাটের ত্যাড়া প্রত্যুত্তর পারিকে ক্ষেপানো'র জন্য যথেষ্ট ছিলো! হলো ও তাই! পারি কথায় না পেরে হাতের কাছে থাকা কুশন ছুঁড়ে মারে সম্রাটের মুখের উপর,সম্রাট সেটা ক্যাচ ধরে আবার'ও পারিকে ছুঁড়ে মারে! আর কি শুরু হয়ে যায় ছোড়াছুড়ি খেলা এক পর্যায়ে দুজনই দুদিক থেকে কুশন'টা নিয়ে টানাটানি করে তারপই বেচারা কুশন সইতে না পেরে নিজেকে দু ভাগে বিভক্ত করে দেয় যার দরুন তার গহ্বরে লুকিয়ে রাখা নরম শ্বেত শিমুল তুলো গুলো ছড়িয়ে পড়ে পুরো কক্ষে! তার সাথে শুভ্রতায় ছেয়ে যায় দুজনের পুরো অঙ্গ!
দুজনেই দুজনের দিকে চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে, হঠাৎ করেই পারি শব্দ করে হেসে উঠল তার সাথে হাসতে শুরু করে সম্রাটের মন! পারি খিলখিলিয়ে হেসেই চলেছে, হাসি থামার নামই নিচ্ছে না! ফরসা মুখের মাঝে ঝকঝকে সাদা দাঁত গুলো মুক্তোর ন্যায় মনে হচ্ছে সম্রাটের কাছে,মাথার উপর সাদা তুলো উড়ছে তার মাঝেই পারির হাসি! সম্রাটের ভেতরে ভালো লাগার ঝড় বয়ে যাচ্ছে,এক মনে দেখেই যাচ্ছে পারির হাসি!
এই হাসি ফিরিয়ে আনতেই তো এত কষ্ট করলো,, কিছু একটা মন করেই এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
সম্রাট:- এই তুমি হাস'ছো কিসের জন্য!
পারির হাসি থামার নাম নেই,হাসি থামানোর চেষ্টা করতে করতেই আঙ্গুলের ইশারায় দেখিয়ে বলতে লাগলো,
পারি:- তো -তো-তোমার ভ্রু চুল!
কথা অসম্পূর্ণ রেখে আবার হাসতে শুরু করলো, পেটে হাত দিয়েই হাসতে হাসতে বেডে গড়াগড়ি খাচ্ছে,সম্রাট কিছু একটা মন করে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো,, নিজের অবস্থা দেখে এইবার বুঝলো পারির হাসির কারন! ভ্রু তে তুলোর গুঁড়ো অংশ লেগে থাকার কারনে ভ্রু-গুলো সাদা সাদা দেখাচ্ছে মানে মনে হচ্ছে পেকে গেছে, চুলের ও অবস্থা সেইম! আর তাতেই পারির হাসির ফোয়ারা ছুটে যায়! কপালে ভাঁজ দিয়ে,এক চোখ উঁচিয়ে একটু এগিয়ে এসে পারিকে হালকা ধমকে বললো,,
সম্রাট:- এই থামো! খুব হাসি আসছে তাই নাহ!
সম্রাটে এহেন ধমকে পারির হাসি দিয়ে রোল দ্বিগুণ হয়ে যায়,সম্রাট এইবার অসহায় এর মতো করে তাকায়, বাচ্চা চাহনিতে পারির দিকে তাকিয়ে বলে,,
সম্রাট:- This is not fair Pari jan!
পারি:- why! you looks like a old Grandpa!
সম্রাট:- তাই না! দাঁড়াও বুঝাচ্ছি Grandpa কি করতে পারে!!
কথা শেষ করেই সম্রাট দৌড়ে বিছানায় উঠে,সম্রাট'কে উঠতে দেখে পারি পালানোর জন্য যেই নামাতে যাবে ওমনি সম্রাট নিজের দু হাতের মাঝে আটকে দেয়,,পারি ছোটাছুটি করে ছাড়ানোর জন্য কিন্তু সম্রাট ছাড়ে তো নাই উল্টা বাঁধন আরো শক্ত করে,, হাসতে হাসতে পারি যখন অনুভব করে সম্রাটের গরম নিঃশ্বাস ওর ঘাড়ে কাঁধে তীব্র ভাবে আঘাত হানছে, তখনই হাসি থেমে যায়,, অজানা আবেশে'ই চোখ বুজে আসে; সম্রাট আলতো করে ছুঁয়ে দেয় পারির গলা, এতো সময়ে দুজনের দুষ্টুমিতে পারির শাড়ী এলোমেলো হয়ে গেছে, আঁচল খুলে কখন যে নিচে পড়েছে সেদিকে পারির খেয়াল ই নেই,,সম্রাট পারির উন্মুক্ত কাঁধে,চিবুকে গলায় আলতো করে ছোট ছোট স্পর্শ দিয়ে যখন ধীরে ধীরে গলার নিচে নামতে গেলো, হঠাৎ করেই পারি ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো,বেশ জোরেই ধাক্কাটা দেয়,পারির এমন আকস্মিক কা'ন্ডে সম্রাট বেড থেকে নিচে পড়ে যায়,, কোমড়ে,হাতে ব্যথাও পায় প্রচন্ড! হয়তো পায়েও মোচড় খেয়েছে!কিন্তু সেদিকে ধ্যান নেই,ওর সম্পূর্ণ মনোযোগ পারির দিকে,,পারি নিজেও হতবুদ্ধি হয়ে গেছে, নিজের করা কাজে! কিন্তু! কথাটা মনে হতেই ঐভাবে'ই উঠে বেড থেকে নেমে যেইনা দৌড় দিবে তখনই বুঝতে পারলো ওর গায়ের কাপড় ঠিকঠাক নেই! লজ্জায় যেন মাথা কাটা যাওয়ার উপক্রম! সম্রাট পারির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে নিজের দৃষ্টি নত করে নেয়! পারি শাড়ী ঠিক করে দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দরজা লাগিয়ে দরজা ঘেঁষে'ই বসে পড়ে! নিরবে বিসর্জন দিতে থাকে অশ্রু! সম্রাট এখন ও আগের মতোই বসে আছে,ওর গাল বেয়ে ও মেঝে ছুঁলো জল!
সম্রাট:- I am sorry,, তোমাকে সময় দেওয়া উচিত ছিলো! কিন্তু আমি কেন পারি না তোমার আসে -পাশে থাকলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে!
মনে মনে অপরাধ বোধ জেগে উঠলো সম্রাটের, বিরবির করে কথাগুলো বললো,
সম্রাট:- আর কত করবো! তোমাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তোমাকে হারানোর পর যেন আরো বেড়ে গেছে! সাত টা বছর! সাত সাত টা বছর কি খুব কম ছিলো পারি? যে আরো অপেক্ষা করতে হবে আমাকে!
দরজার এপাশে সম্রাটের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে,আর ওপাশে পারির!
পারি:- I am sorry! I know again i hurt you! but I can't! I can't !
পারি দাঁত দিয়ে নিজের হাত কামড়ে কান্না করে যাচ্ছে, পাগলের বিধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে, নিজের চুল টেনে নিজের কান্না থামানোর প্রচেষ্টা করছে,সম্রাটকে এভাবে আঘাত করে নিজেই নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে,,সম্রাট যখন একদম কাছাকাছি এসেছিলো,মিশে যেতে চাইলো ওর মাঝে তখনই ওর মনে হলো ও সম্রাটকে ঠকা'চ্ছে,তানহার অশ্রুসিক্ত চোখজোড়া ভেসে উঠলো মানসপটে! নিজের মনে সদ্য জাগ্রত অনুভুতি'কে দুরে ঠেলেই দূরে সরিয়ে দিয়েছিলো সম্রাটকে! ধাক্কা খেয়ে সম্রাট যখন নিচে পড়ে যায় তখন অন্তঃস্থলে চাপ অনুভব হয়! মনে হলো যদি সম্রাট গুরুতর আঘাত পায় তখন! সম্রাটের ওমন অসহায় চাহনি, বিধ্বস্ত ভাবে তাকানো সবকিছু পারির কলিজা ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিলো তাই তো নিজেকে বাঁচাতেই ঐভাবে দৌড়ে চলে আসা!
পারি বুঝতে পারছে না ঠিক কি করবে?সম্রাটকে না পাওয়ার কষ্টের চেয়ে ও যেন পাওয়ার পর হারানোর ভয়, কষ্ট বেশি হচ্ছে! না পারছে আগলে ধরতে আর না পারছে ঠেলে দূরে দিতে!
ঘরের ভেতরে সম্রাট আর বারান্দায় পারি দুজনেই দুপাশে বসে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে!
ঠিক কত সময় এভাবে কাটিয়েছে তার হিসাব নাই! তবে সম্রাট বুঝলো ও এখানে থাকলে পারি আজকে আর ঘরে ঢুকবে না,তাই কষ্ট করে উঠে দাড়ালো, তারপর বারান্দার দরজায় নক করে বললো,,
সম্রাট:- আমি বাইরে চলে যাচ্ছি,তুমি ভেতরে এসো!
চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে আবারও পিছনে ফিরে বললো,,
সম্রাট:- বাইরে বেশি সময় থেকো না,ঠান্ডা লেগে যাবে! আমি আসছি!
কথাটা শেষ করে আর এক মিনিট দাঁড়ালো না,,চলে গেল গেস্ট রুমের দিকে!
সম্রাটের এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গেস্ট রুমে যাওয়া প্রশ্নাত্নক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো তানহা! নিজেকে স্বাভাবিক রাখার সবরকম চেষ্টা করছে তানহা,, বুঝতে পারছে আর কিছু করার নেই ভবিতব্য কে মেনে নেওয়া ছাড়া! নিজের ঘরেই বসে হাজার রকমের চিন্তা ভাবনার মাঝেই পিপাসা পায়! ঘরের বেড সাইড টেবিলে রাখা জগ'টা ধরে দেখলো পানি নাই! তাই পানি নেওয়ার জন্য বাইরে বের হতেই দেখতে পায় সম্রাট খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে, গেস্ট রুমে ঢুকতেই চোখ কুঁচকে ফেলে! কপালে ভাঁজ পড়ে! মাথায় চিন্তা'রা ঝাঝাঁলি দেয়! বুঝতে পারছে সম্রাট আর পারির মাঝে কিছু হয়েছে!
তানহা:- (মনে মনে) আচ্ছা এতটুকু সময়ের মধ্যে আবার কি হলো? রাতের খাবারের সময় ও তো দেখলাম দুজনেই খুব স্বাভাবিক! আসলেই কি স্বাভাবিক নাকি শুধু দেখানোর জন্য! পারি তো সম্রাটের উপর রেগে ছিলো! সম্রাট কি সত্যিটা বলে দিয়েছে? যদি বলে থাকে তাহলে তো পারির আমার সাথে এত স্বাভাবিক কথা বলার নয়! নাকি বলেই নি আর এর জন্য এখনও দুজনের মাঝে দুরত্ব!
নাহ আমাকে সবটা পরিষ্কার করে জানতেই হবে! অন্তত একবার সরাসরি পারির সাথে কথা বলতে হবে!
শেষের কথাগুলো তানহা উচ্চারণ করেই বললো!
দেখতে দেখতে কেটে গেলো আর দুদিন; এর মধ্যে সম্রাট আর পারির খুব একটা কাছাকাছি আসে নি! কেন আসবে? আর নিজে সেধে যাবে না!
সম্রাট:- ( মনে মনে) এবার পারি আসবে! আসতেই হবে! এক মুহুর্তের দেখা দৃশ্যই বড় হয়ে যাবে আমার নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কাছে? অসম্ভব! কেন বিশ্বাস করবে না ও আমাকে! বিশ্বাস করতেই হবে! না করলেও সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করতে হবে ওকে! যতদিন না ও জিজ্ঞেস করছে ততদিন আমি সত্যটা ওকে বলবো না! দেখবো কতদিন এভাবে আমাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে!
আপন মনে বিরবির করতে করতে শার্টের হাতা'র বোতাম লাগাচ্ছে,,অফিসে যাবে! রিসিপশনে'র আয়োজন করার জন্য এত ই ব্যস্ত যে অফিসে'ও দুদিন ঠিক-ঠাক সময় দিতে পারেনি! তাছাড়া সামনে একটা লম্বা ছুটি নেওয়া'র ইচ্ছা তার জন্য অবশ্যই অনেক কাজ এগিয়ে রাখতে হবে!
পর্ব ৫২
দেখতে দেখতে কেটেছে তিনটা দিন! মিসেস জব্বারে'র তাড়ায় খুবই দ্রুত ভাবে সম্রাট পারির রিসিপশনে'র সবকিছু আয়োজন করতে হলো! এর মধ্যে রোজ ই একবেলা করে পারি নিজের মায়ের সাথে সময় কাটিয়ে এসেছে! যদি'ও এখনো খুব একটা উন্নতি হয়নি মিসেস প্রিয়ন্তির তবু'ও কেউ আশাহত হচ্ছে না! সম্রাট খুব দায়িত্বের সাথে তার জন্য চেষ্টা করছে।এর মধ্যেই এক বিদেশী বড় ডাক্তারের সাথে আলোচনা করেছে যিনি আপাতত ইন্ডিয়ার চেন্নাইতে প্র্যাকটিস করছেন!
তবে সব স্বাভাবিক থাকলেও স্বাভাবিক নেই পারি সম্রাট এর সম্পর্ক! সেই রাতের পর থেকেই দুজনে'র মাঝে দুরত্ব বজায় থাকে,পারি সম্রাটের কাছাকাছি থাকতে চেয়ে'ও থাকে না আর সম্রাট ও নিজের থেকে আর এগোয় না!
সম্রাট নিজের মতোই চলছে দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততায়,,আর পারির মনে চলছে অন্য পরিকল্পনা!
তানহা আড়ালে আবডালে থেকে সম্রাট পারির এই বিষয়টা নজরে রেখেছে ! ও বুঝতে পারল এখনও ওদের মাঝে আগের ভুলের দেওয়াল'টা রয়েই গেছে তাই ও সিদ্ধান্ত নিলো যেহেতু পারি সম্রাটের বিয়ে হয়ে'ই গেছে এবং তারা এখন একসাথে, সুতরাং কিছুতেই আর সম্রাটকে নিজের করে পাওয়া হবে না; তাহলে শুধু শুধু কি দরকার ওদের মাঝে এই মিথ্যা'র দেওয়াল দিয়ে রাখার তাই নিজেই সরাসরি পারির সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল!
কিন্তু এদিকে পারি'র মনে তো চলছে আরেক বিষয়! ও শুধু অতীতে সম্রাটে'র করা ভুল নয় নিজের সাথে হওয়া ঘটনার রেশে'ই আটকে আছে! কেন জানি মনে হচ্ছে সম্রাটকে ঠকা'চ্ছে! আচ্ছা সম্রাট যদি বিগত কয়েক বছর এর ঘটনা সম্পর্কে পুরোপুরি জানতে পারে তাহলে কি এভাবেই সব মেনে নিবে? যতটা সহজে মেনে নিয়েছে ওর ডিভোর্স এর কথা!
সম্রাট পারির রিসিপশন ঘনিয়ে এলেও এখনো তানহা একবার ও সাহস করে পারির মুখোমুখি হয়ে সত্যটা স্বীকার করতে পারে নি!
আর সম্রাট পারির নিজেদের মাঝে দুরত্ব বজায় রেখেই চলছে যা দৃষ্টি এড়ালো না কারো'ই কিন্তু কেউ খুব একটা পাত্তা দিলো না কারন সবাই ওদের নিজেদের মধ্যে ই ছেড়ে দিয়েছে!
রিসিপশনে'র আয়োজন করা হলো গার্ডেন এড়িয়া'য়! একে একে সব আত্নীয় স্বজন এবং ব্যবসায়িক সুত্রে পরিচিত সকল মানুষ দেখা করে যাচ্ছে,,স্টেজে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে হাসিমুখে আলাপ করছে পারি সম্রাট! পারির মনে মনে চলছে স্টুপিড একটা পরিকল্পনা! তানহা ভাবছে আজকে'ই সত্যি'টা বলবে সেটা যেভাবেই হোক!
পারি:- আসসালামু আলাইকুম চাচা!
পারির তরফ থেকে আসলেন হাসান সাহেব আর তার স্ত্রী!সম্রাট পারির অভিভাবক হিসেবে সবার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিলো!
হাসান সাহেব:- কেমন আছো সেটা আমি জিজ্ঞেস করবো না ! কারন আমি জানি আমার মা এখন খুব সুখে আছে!
হাসান সাহেবের স্ত্রী :- হ্যা এমন জামাই পেলে সব মেয়েই নিজেকে সুখী মনে করবে! দেখো একদম যেন রাজ-যোটক মনে হচ্ছে!
কথাটা বলে দুজনেই সুখের হাসি হাসলেন, কিন্তু পরক্ষনেই চুপসে গেলো পারির মুখ দেখে!
হাসান সাহেব:-কি হয়েছে মা?
পারি:- চাচা আমার আপনার সাথে খুব জরুরী কথা আছে!
হাসান সাহেব:- হ্যা বলো!মা!
পারি আমতা আমতা করছে দেখে হাসান সাহেবের স্ত্রী ওর হাতে হাত রেখে ভরসা দিলেন,নিরবতায় কিছু সময় পার করে মায়াময় দৃষ্টি দিয়ে উনার প্রতি নিজের আনুগত্যের কথা বলে,বললো;
পারি:- আমি জানি আপনারা আমার এবং আমার মায়ের জন্য অনেক করেছেন, এতটা রক্তের আপনজন ও করে নি; তারাতো বিপদে পরার পর থেকেই খোঁজ খবর নেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে অথচ আপনারা!
হাসান সাহেব:- আমরা কি তোমার আপন কেউ না!
পারি:- না না চাচা আমি এভাবে বলিনি;আমি তো আসলে এটাই বলতে চেয়েছি!
হাসান সাহেব:- হয়েছে তোমাকে এতটা খোলামেলা করে কিছু বলতে হবে না! আমি তোমার মুখ দেখলেই বুঝতে পারি!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- তোমার কি হয়েছে মা? কি নিয়ে তুমি এত অস্থির হয়ে আছো বলো তো?
পারি:- চাচী!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- হুম বলো!
পারি:- আমি আসলে বলতে চাইছি; আজকে যদি আমি আপনাদের সাথে আপনাদের বাসায় যাই তাহলে কি খুব অসুবিধা হবে?
হাসান সাহেব:- মানে! না মানে; তুমি তো আজ এমনিতেই যাবে! তবে এভাবে কেন বলছো মা!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- হ্যা নিয়ম অনুযায়ী তুমি আর জামাই বাবা আজকে এমনিতেই আমাদের সাথে যাবে! তা নিয়ে তুমি এত চিন্তা কেন করছো মা!
হাসান সাহেব:- তুমি কি ভাবছো আমরা জামাইয়ের যথাযথ মর্যাদা দিতে পারবো না! তুমি এইসব নিয়ে এতটা ভেবো না ; আমি ভুলে যাই নি তুমি কার মেয়ে,কোন বাড়ির মেয়ে! হয়তো আমি তোমার বাবার মতো অনেক আয়োজন করতে পারবো না তবে আমার সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো জামাই আপ্যায়নের ! দেখবে কোনরকম অভিযোগ করার সুযোগ তাদের দিবো না!
পারি:- আমি জানি চাচা;আমার প্রতি আপনাদের ভালোবাসা মুখে প্রকাশ করার দরকার নেই! সেটা আমি খুব ভালো করেই অনুভব করতে পারি!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- হ্যা মা তুমি এত ভেবো না; তোমার চাচা নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছে, ইনশাআল্লাহ জামাইয়ের কোন অসুবিধা হবে না! তাছাড়া আমাদের জামাই তো মনের দিক থেকে অনেক ভালো!
পারি:- হ্যা আমি জানি সে অনেক ভালো মানুষ আর তাই তো তাকে ঠকাতে চাই না;( কথাটা মনে মনে আওড়ালো ;তারপর উনাদের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো) কিন্তু আমি তো একা যেতে চাই !
চমকিত ও প্রশ্নাত্নক চোখে একে অপরের দিকে তাকালো হাসান সাহেব ও তার স্ত্রী এবং এক সাথেই প্রশ্ন ছুড়ঁলো পারির দিকে;
-মানে কি পারি মা?একা যাবে কেন?
পারি:- হ্যা আমি একাই যাবো এবং আর কখনো আসবো না!
কথাটা বলার সময় গলাটা ধরে উঠলো,কান্না গুলো কন্ঠ নালীতে জট পাকিয়ে গেছে, কেমন জানি অনুভূতি হচ্ছে,যন্ত্রনার চেয়ে ও বেশি কিছু,এত কষ্টের পর পাওয়া তারপরেও আগলে রাখতে না পারা! কেন এমন হচ্ছে? কেনই বা এমন হলো! খুবই দরকার ছিলো এতটা যন্ত্রনা-ময় হওয়ার এই জীবন টা! মানুষের ভাগ্যে সুখ দুঃখ দুটোই থাকে!তাহলে পারির জীবনের সুখের কোটা কি আট বছর আগেই ফুঁড়িয়ে গেছে! হারিয়ে গেছে সুখ ফড়িং নামক সেই রঙিন প্রাণীটি!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- পারি মা এমন কথা কেন বলছো? কেউ কি তোমাকে কিছু বলছে?
হাসান সাহেব:- হ্যা মা আমাকে বলো যদি কেউ কিছু বলে থাকে! আমি এক মুহুর্ত ও আমার মেয়েকে এমন জায়গায় রাখবো না যেখানে কেউ তাকে খারাপ নজরে দেখবে! যেখানে মানুষের মনে আমার মাকে নিয়ে কোনরকম বাজে চিন্তা থাকবে!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- আশ্চর্য তাদের মনে যদি খারাপ কিছু থাকে তাহলে তারা কিভাবে এত ভালো ব্যবহার করছে!সবাই কি তাহলে মুখোশের আড়ালে নিজের আসল চেহারা লুকায়? আর জামাই বাবা ও কি সবার মতোই?
হাসান সাহেব:- পারি মা চুপ করে থেকো না! আমার বলো কি হয়েছে যার জন্য তুমি এমন কথা বলছো?
হাসান সাহেব ও তার স্ত্রী বেশ উত্তেজিত হয়ে গেছে,তারা পারির চলে যাওয়ার জন্য সম্রাট এবং তার পরিবারের সদস্যদের ই দোষ মনে করছে,উনারা ভাবছেন উনারা পারির অতিত জেনে পারিকে মানতে পারছে না! এতটাই উদগ্রীব আর উত্তেজিত যে পারিকে কথা বলার সুযোগ ও দিচ্ছে না, উনাদের অবস্থা বুঝে পারি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এরপর দুজনের দুই হাত নিজের দুই হাত দ্বারা আবদ্ধ করে,,
পারি:- চাচা চাচী আপনারা শান্ত হোন;আপনারা যা ভাবছেন তেমন কিছুই হয়নি! আমাকে কেউ কিছু বলেনি! এমনকি আমার আগের বিয়ে কিংবা তালাক কোনটা নিয়েই তাদের কোন মাথা ব্যথা নাই! উল্টো তারাতো সবাই অনেক খুশি আমার জন্য, সবাই খুব ভালো! মন থেকেই মেনে নিয়েছে সবকিছু! আমি তো উনাদের এত ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ, তাদের এত যত্ন আদর সবকিছুই আমাকে বাধ্য করছে তাদের ভালোবাসতে কিন্তু?
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- কিন্তু কি পারি মা? কি নিয়ে তুমি দুশ্চিন্তা করছো?
পারি:- চাচী আমি তো;আমি আসলে!
হাসান সাহেব:- হ্যা মা বলো;কি নিয়ে তোমার এচ দুশ্চিন্তা?
পারি:- চাচা উনারা আ-মার -আমার বিয়ে কিংবা ডিভোর্স এর কথাই জানে তার পর কিংবা এর মাঝের কথা তো জানে না? যদি সবটা জানে তাহলে কি আমাকে কখনো এভাবে মন থেকে মেনে নিতে পারবে? যদি জানতে পারে তারা যেই মেয়েটাকে নিজেদের বাড়ির একমাত্র পুত্র বধূ হিসেবে মূল্যায়ন করছে সেই মেয়েটা কোন একসময় পতিতালয়ে ছিলো; সেই মেয়েটা নিজ স্বামী হত্যা দায়ে জেল হাজতে ছিলো? কোন দিন ও কি মেনে নিবে?আর সম্রাট! সে যদি জানতে পারে? তাহলে!
হাসান সাহেব:- পারি মা তুমি যা ভাবছো-?
পারি:- চাচা আমি যখন তার চোখের দিকে তাকাই আমার তখন নিজেকে অপরাধী মনে হয় ! মনে হয় আমি তাকে ঠকাচ্ছি! একজন স্বামী তার স্ত্রীর মাঝে যেই সতীত্ব চায় তার কোনটাই আমার মাঝে নেই! না আমি পবিত্র না আমি শুদ্ধ! তাহলে আমি কিভাবে নিজেকে তার কাছে তুলে ধরবো? কিভাবে?
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- কিন্তু সে তো সবটা জেনেই তোমাকে গ্রহন করেছে; তাছাড়া তুমি তো আর ইচ্ছে করে কিছু করোনি! সবটাই হয়েছে তোমার অনিচ্ছায়! দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে তুমি ঐরকম একটা খারাপ পরিস্থিতিতে ফেঁসে গিয়েছিলে!
পারি:- সেটা আমার দুর্ভাগ্যের বিষয়;তার জন্য আমি অন্য একটা মানুষের জীবন নষ্ট করতে পারি না! তাছাড়া যেই চোখে আমি ভালোবাসা খুঁজি সেই চোখে আমি নিজের জন্য করুণা দেখতে পারবো না! আর যদি সত্যিই কোনদিন আমাকে আমার অতীতের জন্য তিরষ্কার করে! মানতে অস্বীকার করে অতীত সহ আমাকে! তখন?
পর্ব ৫৩
হাসান সাহেব:- পারি মা আমার মনে হয় তুমি অযথা চিন্তা করছো! এমন কিছুই হবে না! তাছাড়া সম্রাট বাবা সব জানে! সব জেনেই তোমাকে গ্রহন করেছে !
পারি:- চাঁচা সে জানে আমার বিয়ের কথা, ডিভোর্সের কথা; কিন্তু তার বাইরে আর কিছু তো জানে না! আর ওর পরিবারের লোকজন! যখন উনারা জানবেন তখন? তখন কিভাবে আমি তাদের সামনে দাঁড়াবো?
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- পারি মা আমার মনে হচ্ছে তুমি নিজেকে কষ্ট দেওয়ার জন্য শুধু শুধু এতকিছু আগেই ভেবে নিচ্ছো? এমন কিছু হবে বলে মনে হয় না! তাছাড়া .!
হাসান সাহেব:- পারি মা সত্যি করে বলতো তোমাকে কেউ কিছু বলেছে এই বিষয়ে? তাহলে আমি এখনই জামাইকে জানাচ্ছি! জামাই সব জেনেই তোমাকে গ্রহন করছে, তাহলে তার পরিবারের লোকজন কেন?
হাসান সাহেব বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন,উনি কথা শেষ না করেই সম্রাটকে খোঁজার জন্য এদিকে ওদিকে তাকাতে লাগলো,পারি বুঝলো এই মুহূর্তে সম্রাটের মুখোমুখি উনাকে হতে দেওয়া যাবে না! সম্রাট জানতে পারলে কোনদিন ও ওকে যেতে দিবে না; আবার সত্যিটা সম্রাটের সামনেও আসতে দেওয়া যাবে না! ঘৃনা হয়তো করবে না কিন্তু করুনা তো করবে নিশ্চয়ই! এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়! ভালোবাসার মানুষের চোখে ঘৃনা সহ্য হলেও করুনা নয়!
পারি:- চাচা তুমি কি চাও তোমার মেয়েকে খুনি ভেবে তার স্বামী ঘৃনা করুক তাও কিনা নিজ স্বামীর?
হাসান সাহেব থম মেরে গেল পারির কথায়! কি বলবে? কি বলা উচিৎ? কিন্তু পারি কেন বারবার বলছে সম্রাট ওকে ঘৃনা করবে? উনি তো সম্রাটকে সবটাই খুলে বলেছে; তখন তো মনে হয় নি পারিকে নিয়ে সম্রাটের মনে কোন-রকম প্রশ্ন আর বাকী আছে! তাছাড়া এই বিয়েটা হওয়ার কিছু সময় আগেও সম্রাট উনাকে আশ্বস্ত করেছিলো সব রকমের পরিস্থিতিতে সে পারির পাশে থাকবে তাহলে এখন?
হাসান সাহেব:- মা জামাই তোমাকে কিছু বলেছে?
পারি:- না , চাচা সে জানলে তো বলবে! সে তো কিছুই জানে না আমার জীবনের সেই ৭ বছরের কালো অধ্যায় সম্পর্কে! আর সেটাই তো;
হাসান সাহেব:- জানে!
পারি:- মানে?
হাসান সাহেব:- জামাই বাবা সব জানে এবং সে সব জেনেই তোমাকে আপন করেছে!
হাসান সাহেব এত সময় কথা বলে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে পারি জানেনা যে সম্রাট বিগত আট বছরের প্রতিটি ঘটনাই জানে আর বিয়েটাও জেনে শুনেই হয়েছে!
পারি:- কি বলছো চাঁচা; ও সব কি করে জানে?
হাসান সাহেব পারিকে সম্রাটকে বলা প্রতিটি কথাই খুলে বললো,পারির যেন নিজেকে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে; সম্রাট সবটা জানে,জেনেই ওকে গ্রহন করেছে; এতে খুশি হবে? নাকি সম্রাটের এই ভালোবাসা কে করুনা ভেবে দূরে সরে যাবে? আর ও যদি সবটা মেনে নিয়ে সম্রাটের সাথে থাকে তাহলে তানহার কি হবে? তানহা তো! আচ্ছা সম্রাট কি সত্যিই ভালোবাসার জন্য ই ওকে গ্রহন করলো! নাকি করুনা! কিন্তু করুনা কেন করবে? সম্রাটের কি দায় ওকে করুনা করে বিয়ে করার! কাউকে সাহায্য করার জন্য নিশ্চয়ই বিয়ে করার দরকার ছিলো না!আর যদি সত্যিই তানহার প্রতি অনুভূতি থাকতো তবে কি ওকে বিয়ে করতো? কিন্তু তানহা'র সাথে তো ওর পারিবারিক ভাবে সব ঠিক ছিলো! তাহলে? আচ্ছা সম্রাটকে ছেড়ে গেলে সম্রাট কি তানহা'কে আপন করে নিবে? পারবে আবারও পারিকে ভুলে তানহার সাথে নিজের জীবনটা গোছাতে? যদি গুছিয়ে নেয়! কিন্তু তাহলে পারির কি হবে? বিগত সময়গুলোতে যতটা কষ্ট পেয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রনা-ময় ছিলো সম্রাটকে না পাওয়া! সেই সম্রাটকে পেয়েও আবার হারালে পারবে বাঁচতে?
সম্রাট:- Meet my lifeline Mrs Pari Abrar chowdhury!
পারির ভাবনার সুতো কাটলো কারো গভীর ছোঁয়ায়! সুমিষ্ট কন্ঠে প্রচুর অধিকার বোধ নির্গত হলো যেন!সম্রাট নিজের ডান হাত পারির পেছনের কোমড়ে রেখে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো! সামনে দাঁড়ানোর দুজন দম্পতির সাথে পরিচয় করানোর জন্য ই কথাগুলো বললো! তাদের বেশভূষায় বুঝতে পারলো তারা সম্রাটের ব্যবসায়িক সূত্রে পরিচিত!
তাদের সাথে পারি'কেও পরিচয় করিয়ে দিলো, পারির ভাবনা সঠিক প্রমান হলো!পারি ও হেসে হেসে সব কথায় উত্তর দিলো! কথা শেষ করে পারিকে আবার ও হাসান সাহেব ও তার স্ত্রীর নিকট রেখে উনাদের থেকে অনুমতি নিয়ে চলে গেল সেই অতিথিদের নিয়ে! পারি দূর থেকেই দেখতে লাগলো সম্রাট নামক সুদর্শন পুরুষটিকে যে কিনা একান্ত ই তার! চাইলেও সে তাকে ছুঁয়ে দিতে পারে! কিন্তু!
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- পারি মা তুমি কি ভাবছো?
পারি:- চাচী আমার কি করা উচিৎ?
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- যেটা যেভাবে হচ্ছে সেভাবেই মেনে নেওয়া!
পারি:- কিন্তু চাচী আমি মেনে নিলে যে অন্য একটি নিষ্পাপ মেয়ে কষ্ট পাবে?.
হাসান সাহেবের স্ত্রী:- আর না মানলে তোমরা দুজন!দেখো পারি মা তোমার আর জামাই বাবার এক হওয়া উপরওয়ালার ইচ্ছে ছিলো তাই এত কিছুর পরেও আজ তোমরা এক হয়েছো! আজ তোমরা স্বামী স্ত্রী! আর এই সম্পর্ক টা আল্লাহর ইচ্ছায় হয়! এটাতে কোন মানুষের মর্জি খাটে না! তাই বলছি তুমি এদিক ওদিক না ভেবে নিজের চিন্তা করো! এতটুকু বয়সে অনেক কিছু সয়েছো! এখন শুধু নিজের আর নিজের সংসার নিয়ে ভাবো!
"নিজের সংসার " কথাটা শুনেই কেমন জানি ভালোলাগায় ছেয়ে গেল পারির মন মঞ্জিল! কই বিয়ে তো আগে ও একটা হয়েছিল কিন্তু সেটাতে তো এমন অনুভূতি হয়নি; হবে কিভাবে? সেখানে তো মানুষ ছিলো না! ছিলো একটা জানোয়ার ! খুব ভয়ংকর জানোয়ার!পারির ভেতর অস্থির হতে লাগলো রোহানে'র সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো ভেবে; কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে;হাত পা অসার হয়ে যাচ্ছে!
সম্রাট:- পারি Are you ok?
যখনই পারি পরে যেতে নিলো পিছন থেকে নিজের বাহুবন্ধনে আগলে ধরলো সম্রাট! দূর থেকেই বারবার পারির তাকানো নোটিশ করেছে সৌন্দর্য বর্ধনে'র জন্য পাশেই সাজানো দর্পনে, এক পাশে দাঁড়িয়ে অতিথি'দের সাথে কথা বলছিল আর পারির লুকোচুরি দৃষ্টিতে ওকে দেখার দৃশ্য দেখছিলো, তখনই খেয়াল করে পারির হঠাৎ অস্থিরতা! বুঝতে পারলো কিছু একটা নিয়ে পারির মন অস্থির হয়ে উঠেছে!
পারি:- হুম!
ছোট্ট শব্দে পারির উত্তর,এক মনে তাকিয়ে আছে সম্রাটের চোখে, সম্রাটের কপালে চওড়া ভাঁজ,পারির ভেজা পাপড়ি যুগল, মুখের মাঝে বিচরন করা হতাশা,ভয় সব কিছুই প্রত্যক্ষ, দৃশ্যমান! খুঁজতে লাগলো তার কারন,তার মধ্যে ই ঘটলো বিস্ময়কর ঘটনা! হঠাৎ ই পারি ঝাঁপিয়ে পড়লো সম্রাটের বুকে! দু হাতে শক্ত বাঁধনে আকরে ধরলো সম্রাটকে ! পারি বাঁধন শক্ত করছে তার সাথে বাড়িয়ে দিচ্ছে কান্নার প্রকোপ! নিঃশব্দ কান্নায় বারবার কেঁপে উঠছে শরীর; সম্রাটের সাদা শার্টের বুকের অংশ ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে ওর চোখের পানিতে! সম্রাট হতভম্বের মতো তাকিয়ে রই'লো! কি করবে! পারির কান্নার কারন বুঝতে পারছে না, হঠাৎ পারি এভাবে জড়িয়ে ধরাতে এমনিতেই আশ্চর্য, বিমুর তার মধ্যে এভাবে কাঁদার কারন কিছুই বুঝতে পারছে না! তারপরেও আগলে ধরলো নিজের রমনীকে! বাম হাত দিয়ে পারির পিঠে রেখে ডান হাতে মাথায় হাত বুলাতে লাগলো,,
সম্রাট:- হুশ থামো! থামো! অনেক কেদেছো! এবার বলো কেন কাঁদলে? কে কি বলেছে? পারি! থামো এবার; বেশি কাঁদলে আবার মাথা ব্যথা করবে!
সম্রাট নিজের মতো করেই পারিকে শান্ত করার চেষ্টা করছে,পারির কান্না থেমে গেলেও থমকে থমকে হিঁচকি তুলছে! এর মধ্যেই পাশে এসে দাঁড়ালো পরিবারের সবাই! হাসান সাহেব ও তার স্ত্রী ও আছেন পাশে তারাও পারিকে শান্ত করার চেষ্টা করছে! সবাই বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে হঠাৎ পারির এমন কান্নার কারনে!
সোহা:- ভাই কি হয়েছে ওর! ওকে তো চাচার কাছেই রেখে গিয়েছিলাম যাতে নিজেদের মতো করে কথা বলতে পারে তার জন্য; এর মধ্যেই এমন কি ঘটলো যার কারণে এভাবে কাঁদছে মেয়েটা!
মিসেস মাহমুদ:- বউ মা কি হয়েছে তোমার বলো তো?
মিসেস জব্বার:- আমার মনে হচ্ছে এমন আয়োজনে নিজের বাবা মায়ের কথা মনে পড়ছে! তাই ! যাই হোক সম্রাট ওকে নিয়ে ভেতরে যাও! অনেক হয়েছে অতিথি কে সময় দেওয়া; মেয়েটা সেই কোন বেলা থেকে এভাবে দাঁড়িয়ে, বসে আছে! ওর একটু রেস্ট দরকার! তুমি ওকে নিয়ে ভেতরে যাও এদিক টা আমরাই সামলে নিচ্ছি!
মাহমুদ তালুকদার:- হ্যা হ্যা ভাবী-জান ঠিক কথাই বলেছে; তুমি বউ মা ঘরে নিয়ে যাও! ওকে একটু বিশ্রাম নিতে দাও! তোমরা তো আবার ও বাড়িতে যাবে!তখন আবার মেয়েটার উপর দিয়ে ঝক্কি ঝামেলা যাবে সুতরাং এখন একটু বিশ্রাম নেওয়াই উত্তম!
সবার পরামর্শে সম্রাট পারিকে নিয়ে ঘরে যাওয়াই উত্তম মনে করলো, নিজের বুকের থেকে দু হাতের আজঁলায় পারির মুখটা তুলে ধরলো, অতিরিক্ত কান্নার কারনে মুখটা লাল হয়ে গেছে,মেকাপ চোখের পানিতে ভিজে পুরো মুখটা কাঁদা কাদা লাগছে, চোখের কাজল ও লেপ্টে গেছে পাপড়িগুলো এখনও ভেজা সিক্ত! এমন অবস্থায় ও পারিকে অসম্ভব সুন্দরী মনে হলো সম্রাটের কাছে কিন্তু পরিস্থিতি আর পারির সাথে ওর সম্পর্কের অবস্থা বুঝে নিজের মন ঘুরা'লো, সবার সামনেই পাঁজাকোলা করে তুলে নিলো পারিকে! এরকম পরিস্থিতিতে ও সবাই হেঁসে দিলো! সবার উচ্চ স্বরে হাসিতে পারির লজ্জা বেড়ে কয়েক'গুণ, নিজেকে বাঁচাতেই লুকা'লো সম্রাটের বুকে! রুহানি ভাই ভাবীর রোমান্টিক দৃশ্য আরো উপভোগ্য করতে সিটি বাঁজালো,তার সাথে তাল মিলালো সম্রাটের গুটি কয়েক বন্ধু!
সম্রাট:- এক কাজ করো,শাড়ী পাল্টে অন্য কিছু পড়ো যেটাতে তুমি আরাম পাবে!
ঘরে নিয়ে বেডে বসিয়ে দিলো পারিকে,,কোলে নিয়ে আসার সময় বুঝলো পারির গায়ে জড়ানো শাড়ীটা বেশ ওজন!এটা নিয়ে বেশি সময় থাকলে যেকোনো মেয়েই অস্থির হয়ে যাবে তাই বললো কথাটা;পারি এতটাই লজ্জা পেয়েছে যে সম্রাটের পানে মুখ তুলেই তাকাচ্ছে না,তখন হঠাৎ ই সম্রাটকে সবার সামনে এভাবে জড়িয়ে ধরা পরে আবার সম্রাটের এভাবে কোলে তুলে নেওয়া সবকিছু মিলিয়ে লজ্জায় যাই যাই অবস্থা এখন পারির!
হাসান সাহেবের সাথে যেতে এখন ও ঢের দেরি! সবে মাত্র মধ্য দুপুর,সময় ৩:৪০ হবে!আর যেতে যেতে কম করেও সন্ধ্যা সাতটা বেজে যাবে; তাই পারিও মনে করলো এই শাড়ী বদলে হালকা পাতলা কিছু একটা পড়াই উত্তম! কিন্তু বাইরে সবাই কি মনে করবে? নতুন বউ ! বৌভাতের দিন!
সম্রাট:- তুমি যেটা পড়ে কমফোর্ট তাই পড়বে!কি বলেছি আমি? তুমি যেটা পড়ে কমফোর্ট ফিল করবে তাই পড়বে! এ বাড়িতে কেউ তোমাকে কিছু বলবে না! আর বাইরের লোকেরা কি বললো সেটা না ভাবলেও চলবে!ওকে!
আদেশ-সূচক বাক্য,পারি শুধু মাথা দুলালো, মুখে উচ্চারণ করার সাহস হলো না! লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আছে! সম্রাট বুঝতে পারছে পারি লজ্জা পাচ্ছে তাই হাঁটু মুড়ে ওর সামনেই বসলো
পর্ব ৫৪
সম্রাট:- পারি!
সম্রাটকে নিজের সামনে এভাবে বসতে দেখে পারি চোখ তুলে তাকালো কিন্তু কিছু বললো না!
সম্রাট:- দেখো বিগত দিনে কি হয়েছে না হয়েছে সব ভুলে যাও! তুমি শুধু বর্তমানে বাঁচবে! এটাই একমাত্র উপায় নিজেকে ভালো রাখার !
-পারি! আমি তোমাকে আগেও ভালোবেসেছি এখনও বাসি, আজীবন যতদিন এই দেহে প্রাণ আছে ঠিক ততদিন ও তোমাকেই ভালোবাসবো! আমার জীবনে তুমি ছাড়া অন্য নারীর জায়গা না আগে ছিলো না ভবিষ্যতে কোনদিন ও হবে!
পারি সম্রাটের এভাবে এত সহজে সাবলীল কন্ঠে বলা স্বীকারোক্তি শুনে শিউরে উঠলো, প্রথমবার যখন সম্রাটের মুখে ভালোবাসি শুনেছিলো তখন ও ঠিক এমন অনুভূতি হয়েছিলো,,দূরে চলে যাওয়ার এত বছর পর, আবারও পূনরায় দেখা হবার পর এই প্রথম সম্রাট ঠিক আগের মতো করেই বলে দিলো নিজের মনের কথা!
সম্রাট পারির হাত দুটো এক করে নিজের দু'হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো! পারি সম্রাটের এহেন ছোঁয়ায় কেঁপে উঠলো, সম্রাটের এরকম হুটহাট গভীর ছোঁয়া কখনোই পারি স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে না! তোলপাড় শুরু হয় হৃদয়ের গহীনে!শিড়-শিড়িয়ে উঠে মস্তিষ্কের নিউরন!
সম্রাট:- তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছো।
পারি হতভম্ব চাহনিতে তাকিয়ে আছে সম্রাটের এই কথায়!সম্রাট একটু সোজা হয়ে বসলো,পারির হাত দুটো আগের মতোই ধরে রেখে মুখ টা পারির কাছাকাছি নিলো,এখন খুব কাছ থেকে একে অপরকে দেখছে, দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ ও যেন দুজন শুনতে পাচ্ছে! চোখে চোখ রেখেই সম্রাট বললো পরবর্তী কথা;
সম্রাট:- তুমি নিজের মাঝে নেই! এই যে আমার সামনে আছে এই পারি সেই পারি নয়! তুমি নিজের মাঝে নিজেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করো! যা কিছু খারাপ তা ভুলে নতুন করে, নতুন উদ্যমে বাঁচা শুরু করো! তুমি চাইলেই তা সম্ভব! পারি তুমি একদম বদলে গেছো? আমি জানি পরিস্থিতি তোমাকে এমন করেছে তাও তো একবার চেষ্টা করতেই পারো! তুমি জানো তোমাকে আমি আর আগের মতো করে খুঁজে পাই না! তুমি আর আমার আগের সেই পারি নেই!
-- আমার পারি ছিলো উচ্ছল, প্রাণবন্ত, চঞ্চল এক রমনী! তার চোখেমুখে ছিলো বাঁচার প্রবল ইচ্ছা! সে জানতো প্রাণ খুলে হাসতে! আর তুমি?
-- তোমার মনে আছে শেষ কবে হেসেছিলে?
পারি সম্রাটের কথায় ভাবতে লাগলো; আসলেই তো শেষ কবে মন খুলে হেসেছিলাম! হাসি তো?
সম্রাট:-দেখো আমাদের জীবনে কিছু খারাপ সময় ছিলো তার মাঝে ভালো সময় ও তো ছিলো ! তবে..
পারি:- আমার হারিয়ে যাওয়ার কারন ও তো আপনিই ছিলেন?
সম্রাট ভেবেছিল পারিকে আগের কথা মনে করিয়ে নিজেদের মাঝের জড়তা কাটাবে কিন্তু তার কারনে যে পারির আবার ও সেই রাতের কথা মনে হবে তা মাথায় আসেনি! কিন্তু এবার প্রচন্ড অভিমান হলো,বাইরে পারির বলা প্রথম-দিকের বেশ কিছু কথা ওর কানে এসেছে তাই ভেবেছিল পারিকে বোঝাবে কিন্তু তেমন কিছুই করতে পারলো না! উল্টো পারির কথায় বিক্ষিপ্ত মনে তাকিয়ে রইলো নিষ্ঠুর প্রেয়সির পানে!
পারি:- আপনি যদি আমাকে ওভাবে না ঠকাতে'ন তবে নিশ্চয়ই এমন দিন আসতো না?
-- কেন করেছিলেন এমনটা? কেন ভাঙ্গলেন আমার মন?কেন করেছিলেন এমন?
সম্রাটের ইচ্ছা করছিলো উত্তর দিতে কিন্তু দিলো না কেন জানি প্রচন্ড অভিমান জমা হলো হৃদয় কোনে,কেন পারি ওকে বিশ্বাস করে না! এত কিছুর পর ও কেন বুঝতে পারে না সম্রাট শুধু ওকেই ভালোবাসে? ও এতটা এগিয়ে আসার পরও কেন এক অভিযোগেই আটকে আছে পারির পা!
কোনরকম উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়ালো!
পারি আবারও ফুঁপিয়ে কাঁদছে! ও বলতে চায় নি কিন্তু কেন জানি মুখ ফুটে বেরিয়েই আসলো মনের কোনে থাকা প্রশ্ন! ভেবেছিলো সম্রাট উত্তর দিবে,হয়তো কোন যুক্তি দেখাবে! যদি নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায় তাহলে ক্ষমা করে দিবে কিন্তু সম্রাটের নিরবতায় তার অহংকার প্রকাশ পেল! সে কেন নিজের ভুল স্বীকার করে না! কেন বলেনা পারি ভুল হয়ে গেছে! ক্ষমা করে দাও! কেন বলে না! সে ভুল করেছে আবার আমাকেই বলছে আমি বদলে গেছি? কেন বদলে গেলাম সেটা কেন বলছে না?
হনহনি'য়ে দরজা অবধি গেল, আবারও পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলো হাঁটুতে মুখ গুঁজে কান্না-রত নব বধূর সাজে থাকা প্রিয়তমাকে! চলে যেতে চেয়েও ফিরে এলো,,
সম্রাট:- ফ্রেশ হয়ে নাও! হালকা পাতলা কিছু একটা পড়ো তারপর রেস্ট নাও, আমাদের আবার বের হতে হবে সেই বাড়ির উদ্দেশ্যে!
--- আমি তোমাকে কোন উত্তর দিবো না! কারন আমার কাছে কোন উত্তর নেই! সবচেয়ে বড় কথা আমি আমার অপরাধ টাই জানিনা তবুও এতটুকু বলবো ভালোবাস'লে তার প্রতি বিশ্বাস রাখাও জরুরী! যদি কখনো মনে হয় সে বিশ্বাস ভেঙ্গেছে তবে তার চোখে চোখ রেখে তার কৈফিয়ত ও নিতে হয়! তুমি কৈফিয়ত চাইছো না অভিযোগ করছো! অভিযোগ করার অধিকার তোমার আছে তবে সেটা করতেও বড্ড দেরি করেছো ! এই অভিযোগ যদি আরো আট বছর আগে করতে তাহলে হয়তো ঘটনা এতটা না ও ঘটতে পারতো !
---যাই হোক তুমি আপাতত নিজেকে ঠিক করো!
পারির উদ্দেশ্যে বলা কথা গুলো শেষ করে চলে গেল সম্রাট; দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সামান্য থাকা ফাঁক দিয়ে পুরো ঘটনাই দেখলো তানহা ; নিশ্চিত হলো কিছুই ঠিক হয়নি! তখন পারিকে ওভাবে ভেঙে পড়তে দেখে এগিয়ে গিয়েছিল সাহায্য করতে কিন্তু তার আগেই সম্রাট চলে এসেছিলো! এরপর সোহার কথায় এসেছিলো ঘরে যদি পারির কোন সাহায্য দরকার হয় যদিও সম্রাট রুহানি'কে আসতে বলেছিলো কিন্তু ও নিজেই রুহানি কে অন্য কাজে ব্যস্ত রেখে চলে এসেছে! কারন পুরোপুরি সবটা বুঝে তারপর পারির কাছে নিজ অপরাধের স্বীকারোক্তি এবং সম্রাটকে মিথ্যা অপবাদ থেকে মুক্তি দেওয়া!
-------------------------------------_-------------------------------
তানহা:- আমি জানি আমাকে এখন তোমার খুব অসহ্য লাগছে! হয়তো খুন করতেও ইচ্ছে করছে; কিন্তু আমি ! তুমি চাইলে যেকোন শাস্তি দিতে পারো আমি মাথা পেতে নিবো!
পারি নির্বাক,নিশ্চুপ! কি বলবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই নারীকে! যে কিনা কিছু সময় আগেই কিছু বছর আগে নিজের করা ভুলের স্বীকারোক্তি দিয়েছে!
হ্যা সম্রাট যখন বেরিয়ে গিয়েছিল তখন তানহা ওর মুখোমুখি হয় নি! সম্রাট বের হবে বুঝতেই ও সরে গিয়েছিল! কারন জানে সম্রাট তানহা'কে পারির মুখোমুখি হতে দিবে না! সম্রাট হয়তো ভাবে তানহা পারির জন্য ক্ষতিকারক! কথাটা ভাবতেই নিজের প্রতি তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো!
সম্রাট চলে যাওয়ার পরই তানহা ঢুকে,,পারির মাথায় হাত রাখতেই পারি মাথা তুলে তাকিয়ে তানহা কে দেখে কিছুটা বিব্রত হয়! এ সময় তানহা কে এখানে আশা করে নি!
পারি নিজের চোখ মুছে ইতিউতি করতে লাগলো,তানহা বললো তোমাকে সাহায্য করি সাজগোজ তুলতে! এরপর একে একে পারির গায়ের সব গয়নাগুলো খুললো,পারি বসেই রয়েছে! মাথা নত করে!তানহা আড়চোখে পারিকে দেখছে আর নিজের কাজ করছে,,সব অলংকার খুলে নেওয়ার পর বললো,
তানহা:- উঠো ফ্রেশ হয়ে আসো! তোমার সাথে কিছু কথা আছে! তাড়াতাড়ি এসো,খুব জরুরী কথা!
পারি কিছু সময় ভাবে তানহার এখন কি কথা থাকতে পারে, তবুও কোনরকম প্রতু্ত্তর না করে উঠে দাড়ালো, এরপর একটা হালকা কালারের থ্রিপিস চলে গেল ফ্রেশ হতে!
বের হয়ে দেখলো তানহা ঘরে নেই,দরজা'টাও চাপানো; মনে মনে ভাবলো তানহা বললো জরুরী আছে তাহলে কোথায় গেল! পরক্ষনেই ভাবলো মেকাপ তোলার পর গোসল করতে ও অনেক সময় নিয়েছে ও ! হয়তো এর মধ্যে তানহা ও কোন কাজ পড়ে গেছে! যাই হোক; কথাগুলো মনে মনে ভেবেই হাতের টাওয়ালে'র দিকে নজর বুলালো এরপর ওটাকে মেলে দেওয়ার জন্য বারান্দা'য় গিয়ে দেখতে পেলো তানহা বারান্দার রেলিং ধরে তাকিয়ে আছে পাশে থাকা ছোট ছাদ বাগানে!
ওর চোখ মুখ উদাসীন! কেমন যেন হয়ে গেছে মেয়েটা এই মাত্র ক'দিনে! আবারও অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগলো পারি! হাতের টাওয়াল রেলিং উপর মেলতেই শুনতে পেলো তানহার গলার স্বর;
তানহা:- আজকে তোমাকে কিছু সত্য বলবো! আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য! যার সাথে জড়িয়ে আছো তুমি এবং সম্রাট!এই সত্য জানার পর হয়তো আজকে থেকে আর কখনো আমার মুখটাও দেখতে চাইবে না! করবে না ক্ষমা! আমি ক্ষমা করতেও বলবো না! কারন তোমার সুন্দর জীবন যন্ত্রনা-ময় করার জন্য আমার সেই ভুল দায়ী !
কথাগুলো পারির দিকে না তাকিয়ে ই বললো তানহা,,পারি বুঝলো না কিভাবে তানহা বুঝলো পারির আগমন,প্রশ্ন করতে যাওয়ার মাঝেই এক নাগাড়ে বলা কথাগুলো শুনে থেমে গেল! তানহা ঘুরে তাকালো আশ্চর্য হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা পারির দিকে,, মেয়েটা আশ্চর্য কেন তা বুঝলেও প্রশ্ন করতে পারে না কেন বুঝলো না! এই মেয়েটা কি জানতে চায় না! চাইলে কেন সম্রাটকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে না? সরাসরি জিজ্ঞেস করলেই তো সমাধান হয়ে যায় তবে কেন করে না! অভিমান! হ্যা এই মেয়েটা প্রচন্ড অভিমানী! হবেই তো ! বড়লোক বাবার অতি আদরে পালিত মেয়েরা এমনিতেই অভিমানী হয়! এরা কথায় কথায় অভিমান করে! অভিমান করে দূরে চলে যায় কিন্তু অভিযোগ করতে পারে না!
তানহা:- তুমি জানতে চাও না কি এমন সত্যি?
পারি:- আপু আম,,!
তানহা:- আচ্ছা পারি যদি জানতে পারো আমার জন্য তোমার আর সম্রাটের জীবনে আজ এত জটিলতা?
তানহা:- আপু তুমি কি বলছো?
তানহা:- যদি শোনো সেই রাতে সম্রাটের বুকে থাকা মেয়েটা আর কেউ নয়; তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তোমার তানহা আপু!
পারি যেন নিজের কানকে'ও বিশ্বাস করতে পারছে না! কি বলছে তানহা এসব? সে রাতের মেয়েটা তানহা? তার মানে?
তানহা মুখটা ঘুরিয়ে রেলিং বাইরে দূর আকাশে তাকালো, এরপর একে একে খুলে বললো সবটা! এদিকে নিশ্চুপ পারি যেন আরো নিশ্চুপ হয়ে গেছে! যার সাথে অন্যায় করেছে বলে অপরাধবোধে ভুগছে সেই কিনা নারকীয় যন্ত্রনা দেওয়ার জন্য দায়ী! আসলেই কি তানহা দায়ী? নাকি ও নিজেই! যদি একবার; চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবার সম্রাটের মুখোমুখি হয়ে কথা বলতো তাহলে কি আদৌ এতগুলো বছর ওদের ভুগতে হতো?
পর্ব ৫৫
রুহানি:- ভাবী!
অকুল ভাবনার মাঝেই শোনা গেল রুহানির ডাক,,তানহা শুনতে পেলেও পারি এখনো অবচেতন মনে ভাবছে বিগত দিনের কথা!
তানহা:- পারি!
পারি:- হুহ!
পেছন থেকে কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে পারিকে ডাকে তানহা, আনমনে থাকায় পারি চমকে উঠে! চোখের ইশারায় সামনে তাকাতে বললে,পারি ঘরের দরজায় রুহানি কে দেখে,,
রুহানি:- ভাবী! এখানে কি করছো তুমি! ফ্রেশ হয়েছো? এখন কেমন লাগছে তোমার?
পারির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে প্রশ্নগুলো করে যাচ্ছে রুহানি,, ওর চোখে মুখে চিন্তার ছাপ,,মনে হচ্ছে পারির জন্য অস্থির ছিলো এত সময়; রুহানিকে দেখে পারির মনে পড়ে গেল সম্রাটের বলা কিছু কথা যা সম্রাট ওদের সম্পর্কের শুরুর দিনগুলোতে বলেছিলো,,
অতিত--------------
পারি:- আমি তো রাঁধতে ও পারি না! এক কাপ কফি ও করতে পারি না!
সম্রাট:- তাতে কি হয়েছে?
পারি:- আমি কিভাবে তোমার খেয়াল রাখবো? তোমার বাবা মায়ের খেয়াল রাখবো!
সম্রাট:- আমার বাবা মায়ের খেয়াল রাখার জন্য তোমাকে রান্না জানতে হবে কে বললো?
পারি:- কে বলবে! আমি কি জানিনা? বিয়ের পর অবশ্যই একটি মেয়ের প্রথম কাজ হলো শ্বশুর শ্বাশুড়ির সেবা করা,ননদ দেবরের খেয়াল রাখা! এটা তো কমন ব্যাপার এটা সবাই জানে!আর তারপর প্রথম ধাপ ই হলো তাদেরকে রান্না করে খাওয়ানো!
সম্রাট:- জ্বী না;
পারি:- কি জ্বী না?
সম্রাট:- বিয়ের পর একটা মেয়ের প্রধান কাজ হলো তার স্বামীর সেবা করা; স্বামীর সেবাই প্রথম সুতরাং তুমি শুধু আমার সেবা করতে পারলেই চলবে!
পারি:- কিভাবে?
সম্রাট:- এই ধরো "আমি যখন কাজে যাবো তুমি আমাকে দরজা অবধি বিদায় দিতে আসবে তারপর আমার জুতো পড়িয়ে দিবে এরপর একটা বাই বাই কিস দিবে , অবশ্যই সেটা লিপ কিস হতে হবে! এরপর আমি যখন আসবো তখন দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে, তারপর ওয়েল-কাম কিস দিবে সেটাও লিপ কিস; আমার হাতের ব্যাগটা নিবে, তোমার হাতে এক গ্লাস পানি আমাকে খাইয়ে দিবে! তারপর আমার সাথে গোসল করবে! এরপর আমরা একসাথে এক প্লেটে ভাত খাবো,রাতে ঘুমানোর সময় তুমি অবশ্যই আমার হাত পা টিপে দিবে অবশ্যই দিনে কম করেও একশোবার ফোন দিবে ,,আর!
পারি:- আর?
সম্রাট:- আর!
পারি:- আর?
সম্রাট:- আমাকে খুব আদর করতে দিবে!
পারি:- ওরে দুষ্ট!
সম্রাট এতসব মজার ছলেই বলছিলো,পারিও বুঝতে পারছিলো সম্রাটের দুষ্টুমি,,পারি সম্রাটের কাঁধে হালকা একটা চাপড় মেরে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়ায়,ওরা আপাতত আছে একটা নদীর পারে,যমুনা নদীর পারে! বাঁধ দেওয়া পাথরের খন্ডে বসে বসে এই সেই নিয়ে কথা বলছিলো তার পরিপ্রেক্ষিতে ই আসে পারির রান্নার কথা!
সম্রাট আজকে সকালে বাসায় গিয়েছিলো তো সেখান থেকেই সরাসরি পারির সাথে দেখা করে পারিকে নিয়ে এখানে এসেছে সময় কাটাতে! বাড়িতে গেলে মা বোনরা কতরকম আয়োজন করে সম্রাটকে খাওয়ায় তাই নিয়ে নিজের বোনদের প্রশংসা করে নানান কথা বলছে সেই কথা শুনেই পারির মনে হলো ও রান্না পারে না,, ঠিক মতো নিজের বিছানাও গোছাতে পারে না,ঘরের একটা কাজও ও করতে পারে না, তাহলে কি সম্রাটের পরিবার ওকে মেনে নিবে? একজন বাড়ির বউ হতে হলে যা করা দরকার তার কোনটাই ও পারে না!
এই মুহূর্তে নিজের মায়ের প্রতি রাগ হতে লাগলো, অভিমান ও হচ্ছে! কেন ওর মা ওকে ছোট থেকেই সব শিখিয়ে দেয় নি! সম্রাটের মা ওর বোনদের সব কাজ শিখিয়েছে,,ওরা সব কাজ পারে! এমনকি ওদের তো অনেক রকম সেলাইয়ের ও দক্ষতা আছে আর এদিকে পারি! কোন কাজই জানেনা!
পড়াশোনা,নাচ গান ছবি আঁকা এই ছিলো ওর জগতের প্রধান কাজ! খাওয়ার সময় ও কোনদিন নিজের হাতে খেতে পারতো না, সবসময় বাবা মা দুজনেই পাশে বসে খাইয়ে দিতো!
সবসময় বাবা সন্তানদের অতিরিক্ত আদরে নষ্ট করে দেয়, ঠিক যেমন করেছে পারির সাথে! নাহ আজকে বাসায় গিয়ে ই মা কে বলতে হবে ওকে ঘরের সব কাজ শিখিয়ে দিতে! বিয়ের আগেই সব কাজ শিখে নিবে যাতে বিয়ের পর সম্রাট এভাবেই ওকে নিয়েও সবার সাথে আলোচনা করতে পারে! ওর কাজের প্রশংসা করতে পারে!
সম্রাট:- কি ভাবছো?
পারি:- কিছু না!
সম্রাট:- কিন্তু আমার কেন মনে হচ্ছে আমার পারিজাত বিশাল চিন্তায় আছে!
পারি:- আচ্ছা বিয়ের পর যদি আমি তোমার বোনদের কাছে সেলাই শিখতে চাই তাহলে কি ওরা শেখাবে না?
সম্রাট:- কেন শেখাবে না! নিশ্চয়ই শেখাবে! কিন্তু তুমি হঠাৎ সেলাই শেখার প্রতি এত ঝুঁকলে কেন?
পারি:- এমনিতেই; ইচ্ছা করলো তাই! তুমি বলো শেখাবে কিনা?
সম্রাট:- আমি এতটুকু মনে প্রাণে বিশ্বাস করি আমার বোনদের ভাবী যে হবে সে হবে পৃথিবীর সবচেয়ে লাকি মেয়ে! আমার বোনেরা তাদের ভাবীকে মাথায় তুলে রাখবে! আর তুমি সেলাইয়ের কাজ শেখার কথা বলছো!
পারি:- তুমি কত লাকি তোমার এত সুন্দর কিউট আর ভালো দুটো বোন আছে আর আমাকে দেখো!না আছে বোন আর না আছে ভাই! জানো ছোট বেলায় ভাবতাম আমি একাই ভালো কিন্তু এখন মনে হয় ভাইবোন থাকাটা খুব জরুরী! অন্তত নিজের মনের কথা শেয়ার করার জন্য হলেও একজন থাকা খুব জরুরী!
এরকম কথার মাঝেই কেটে যাচ্ছিলো বেলা !
-------------------বর্তমান ------
রুহানি:-ভাবী তুমি কি এখন ঠিক আছো? যেতে পারবে আমার সাথে?
পারি:- হুহ!
রুহানি:- তোমাকে রেডি করিয়ে দেই চলো! চাচা চলে যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছিল ভাই বললো তোমাকে রেডি হতে সাহায্য করতে!
পারি নিজের অতীত ভাবনার পরিসমাপ্তি ঘটালো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরী মেয়েটা রুহানির মিষ্টি হাসি দেখে,,মনে মনে আওড়ালো ঠিকই বলেছিলো সম্রাট তার বোনদের ভাবী যে হবে সেই মেয়েটা হবে সবচেয়ে লাকি! মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই তা সম্পূর্ণ প্রমান পেয়েছে! প্রতিটা ক্ষন পারিকে নিয়ে ভাবনা,উনিশ বিশ হলেই দৌড়ে আসে,এত ছটফটানি মনে হয় আপন ভাইবোন করে না! তাহলে কি আমি সেই লাকি মেয়েটা! হ্যা আমি ই তো! আমি ছাড়া আর কে?
পারি চলো আমিও তোমাকে সাহায্য করি! একদম আমাদের সম্রাটের সম্রাজ্ঞী করে দেই!
পিছন থেকে কাঁধে হাত রেখে হালকা জড়িয়েই কথাগুলো বললো তানহা,,পারি আশ্চর্য হয়ে দেখছে তানহা নামক মেয়েটাকে! এই যে কিছু সময় আগেও মেয়েটা নিজের জীবনের তিক্ত কথাটা শেয়ার করছে , চোখের সামনে নিজের ভালোবাসার মানুষের সংসার করা দেখছে! কিভাবে করছে?পারির কেন জানি তানহার প্রতি রাগ হচ্ছে না, উল্টো তানহার জন্য খারাপ লাগছে!
পারিকে আবার ও নতুন করে সাজিয়ে দেওয়া হলো,,এইতো কিছু সময় আগেই যেই পারি এই বিয়ের থেকে মুক্তি চাইছিলো এখন সেই পারি নতুন করে স্বপ্ন বুনছে জীবনকে নতুন রঙে রাঙিয়ে তোলার ! মেকাপে'র পরতে পরতে স্বপ্নের আনাগোনা বৃদ্ধি পাচ্ছে!তার সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে বহু আকাঙ্ক্ষিত পুরুষটিকে একবার ছুঁয়ে দেওয়ার অপ্রতিভ মনোবাসনা!
সোহা:- হয়েছে তোমাদের?
রুহানি:- এইতো আপু ফাইনাল টাচ দিয়ে দিলাম!
সোহা:- মাশাআল্লাহ, খুবই সুন্দর লাগছে আমাদের ভাবী-জান'কে;
সোহা ভাবী ডাকলেও ভাবীজান বলে প্রথমবার ডাকলো,পারি লজ্জায় চুপ করে মাথা নুইয়ে নিলো!
সব রকম নিয়মকানুন শেষে নতুন বর বউ বেরিয়ে গেল ফিরতি তে!
হাসান সাহেব নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেছেন জামাই আদরের! সম্রাট উনার আতিথেয়তায় মুগ্ধ,সাথে আসা ছোট সায়েরা ও যেন নতুন নানা নানী এবং এখানে নিজের বয়সী বন্ধু বান্ধবী পেয়ে খুশি তে আত্ন-হারা; পারি হাসান সাহেবের স্ত্রীর থেকে মায়ের মতোই যত্ন আর ভালোবাসায় বিগলিত হয়ে অনেক সময় কান্না করে!
সম্রাট আর পারির সাথে রাতে সায়েরা থাকায় পারি আর সম্রাটের সাথে কথা বলতে পারে নি! এদিকে সম্রাট ও মুখ ফুলিয়ে আছে! মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বলবে না সেধে আর কথা!
দুদিন থাকার কথা থাকলেও তানহা'দের চলে যাওয়ার তাগিদে একদিন পরেই বাড়িতে ফিরে আসতে হয় ওদের! খারাপ লাগলেও কারো পক্ষে কিছু করার ছিল না, এখানে থাকলে তানহার পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়! ওর নিজেকে সময় দেওয়া উচিত, নতুন করে সবটা গোছানোর জন্য আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে আর তার জন্য সবার আগে সম্রাটের থেকে দূরে যেতে হবে!
তানহা:- সরি! আমি জানি আমার ভুলের ক্ষমা এই ছোট্ট একটা শব্দের মাধ্যমে সম্ভব নয় তবুও বলবো যদি পারো তো ক্ষমা করে দিও!
সম্রাট:- এভাবে বলো না! আমার তোমার প্রতি অভিযোগ থাকবে না যদি তুমি আমাকে একটা কথা দাও !
তানহা:- কি কথা বলো! তোমার জন্য সব পারবো!
শেষের কথাটা বলে চোখ দুটো নামিয়ে ফেললো, বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কোনে আটকে থাকা জল-টুকু মুছে ফেললো; সম্রাট সবটাই দেখলো কিন্তু কিছু বললো না! কি বলবে? কি বলা উচিত এই মুহূর্তে?
সম্রাট:- নিজেকে সুযোগ দিবে! মামী যাকে ঠিক করবে তাকেই মেনে নিবে! মন থেকে গ্রহণ করবে!
তানহা:- ( মনে মনে - এ জীবনে নতুন কেউ হয়তো আসবে কিন্তু মনে কারো জায়গা আর হবে না, মনের মসজিদে আজীবন তুমিই থাকবে খাদেম হয়ে, ভালোবাসার যেই বীজ তোমার নামে বোপন করেছি তার সুমিষ্ট ফল হয়তো অন্যের দখলে যাবে কিন্তু বিশ্বাস করো সেটার মাঝেও থাকবে তোমাকে না পাওয়ার তীব্র যন্ত্রনা! কেন হলে না আমার,খুব কি ক্ষতি হতো এ জীবনে আমার হয়ে যাওয়া!)
সম্রাট:- তুমি কি আমার কথাগুলো শুনেছো?
তানহা:- হুম!
ছোট কথায় উত্তর দিয়ে নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলো,ফকফকা পরিষ্কার কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরের ব্যস্ততম পরিবেশ, সেখানে চোখ রেখেই বললো,,
তানহা:- পারির উপর রাগ করো না! ওর কোন দোষ নেই! ওর জায়গা থাকলে যেকোনো মেয়েই এমন প্রতিক্রিয়া দেখাতো!
সম্রাট কোন প্রতুত্তর করলো না,তানহা'ই আবার বলতে লাগলো,
তানহা:আমি ওকে সবটা বলে দিয়েছি!
সম্রাট:- মানে ?
তানহা:- সত্যিটা!
সম্রাট:- কি সব বলছো? কোন সত্যিটা?
তানহা:- ওর সবটা জানা উচিত! মেয়েটা অনেক কষ্ট করেছে,তাই ওর কষ্টের পরিমাণ আর বাড়াতে চাই নি! আর এর জন্য অবশ্যই ওর সম্পূর্ণ সত্য জানার দরকার ছিলো!
সম্রাট:- কিন্তু !
পর্ব ৫৬
সম্রাট:- কিন্তু !
তানহা:- এই বিষয়ে আর কিছু বলো না প্লিজ!
সম্রাট:- ওকে!
তানহা:- আমি চাই তোমরা দুজন সুখে থাকো! অনেক বেশি সুখে!
সম্রাট:- আর আমাদের ব্যবসায়ের কি হবে?
তানহা:- তার জন্য তো তুমি ই আছো!
সম্রাট:- সে না হয় আমি আছি কিন্তু তুমিও তো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একান্ত প্রয়োজন!
তানহা:- তোমার বউকে নিবে!
সম্রাট:- কি বলছো?
তানহা:- ঠিকই বলছি; পারি জন্মগতভাবে ব্যবসায়িক পরিবারের মেয়ে,দেখবে ওর মধ্যে একজন ভালো ব্যবসায়ী হওয়ার সব গুন আছে! তাছাড়া যেহেতু ও তোমার ঘরের মানুষ সুতরাং ওর চেয়ে ভালো হেল্পফুল আর কাউকে পাবে না!
সম্রাট:- ব্যবসা আর পারি! হুহ্! তাহলেই হয়েছে! ও যে কি পরিমাণ আবেগী তা তোমার ধারনা বাইরে! ওকে নিয়ে ব্যবসা করার চিন্তা করলে অল্পদিনের মধ্যেই আমাকে আবার রাস্তায় বসতে হবে!
সম্রাটের কথায় তানহা শব্দ করেই হাসে,সম্রাট ও হেসে দেয়,পারি যে আবেগী তা কিছুটা বুঝতে পেরেছে,দেখেছে মেয়েটা নিজের কষ্টকে চেপেও অন্যের জন্য অস্থির হতে! এতেই বোঝা যায় এই মেয়ের মন কেমন!
তানহা:- তবু ও একবার চেষ্টা করো আর আমি তো আছি ই তোমাকে সাপোর্ট করার জন্য!
সম্রাট:- ওকে এসব বাদ দাও,চলো বাসায় যাই তোমাকে তো আবার রেডি হতে হবে!
হাসান সাহেবের বাসা থেকে এসে রেডি হয়ে সম্রাট সরাসরি অফিসেই এসেছিলো, তানহা আগের থেকেই এখানে ছিলো,যাওয়ার আগে সম্রাটকে সবটা বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার ছিলো যেহেতু এখন থেকে একাই সবটা করবে!
মাহমুদ তালুকদার:- ভাবীজান আমাদের দ্বারা কষ্ট পেলে ক্ষমা করে দিয়েন,,জানি আপনাদের সেবা ঠিক মতো করতে পারিনি তবুও!
মিসেস জব্বার:- এভাবে কেন বলছেন ভাই সাহেব! আমরা কি আপন না?
মিসেস মাহমুদ:- অবশ্যই আপন!এই দুনিয়ায় আপনাদের চেয়ে আপন আর কে আছে আমাদের?
মিসেস জব্বার:- তাহলে কেন বলছেন এরকম কথা? আপন লোকেরা কখনো এত ফরমালিটি করে?
মাহমুদ তালুকদার:- আচ্ছা ভুল হয়েছে আর করবো না! তয় খুব তাড়াতাড়ি আবার আসবেন সেই কথা দিয়ে যেতে হবে!
মিসেস জব্বার:- ইনশাআল্লাহ; আচ্ছা আমাদের বউ মা কোথায়! ওকে তো দেখছি না!
পারি:- এই তো আমি মামী;
এই কয়েকদিনের মধ্যেই পারি আর মিসেস জব্বারের সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিক আর সুন্দর হয়ে গেছে,তার জন্য অবশ্যই মিসেস জব্বার এগিয়ে এসেছে,আর পারিও মায়ের মতো মিসেস জব্বারের এমন মাতৃতুল্য স্নেহে বিমোহিত হয়ে তার দিকে এগিয়ে গেছে! তাছাড়া পারিও এই বাড়ির সবার মতোই উনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ,উনি সবটা সহজ ভাবে মেনে নিয়েছে বলেই সবাই ওকে মেনে নিয়েছে এটা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হয়নি,, তাছাড়া সম্রাটের বর্তমান অবস্থা যে তাদের ই সহায়তায় সম্ভব হয়েছে! সুতরাং স্ত্রী হয়ে স্বামীর জন্য কল্যান-কর এমন মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা ওর দায়িত্ব বলেই মনে হয়!
মিসেস জব্বার:- কি এনেছো?
পারি:- মামী আমি আসলে;
মিসেস জব্বার:- হ্যা বলো! দেখি!
মিসেস মাহমুদ:- বউ মা তুমি আবার রান্না ঘরে কেন গিয়েছিলে? তোমাকে না বললাম একটু বিশ্রাম নিতে!
পারি:- না মা আমি ঠিক আছি! আসলে আমি ভাবলাম যাওয়ার আগে মামী-মায়ের জন্য কিছু একটা রান্না করি; যদিও আমি ভালো রান্না জানিনা তবুও আসলে!
মামী মা! ডাকটা শুনে সবাই একটু আশ্চর্য হয়ে দাঁড়ায়,মা তো তানহা মানহা ডাকেই, সম্রাটের বোনরা আর সম্রাট তো মামী ডাকে কিন্তু পারির মুখে মামী মা ডাকটা যেন মিসেস মাহমুদের খুব বেশি ই ভালো লাগলো!মামীর পর মা লাগিয়েছে তার মানে কি মেয়েটা উনার মাঝে নিজের মা কে খুঁজে নিচ্ছে!
মিসেস জব্বার:- আমার মেয়ে যা রান্না করেছে তা কখনো খারাপ হতেই পারে না!
পারি কিছু টা আশ্বস্ত হলো মনে হয়,আগেও টুকটাক রান্না করে সাহায্য করেছে এই বাড়িতে কিন্তু এখন বিষয়টা আলাদা,এখন ও এই বাড়ির বউ সুতরাং সবকিছুতেই একটু সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি বলে মনে হচ্ছে!
সম্রাটের:- আমাদের ও একটু দিও!
দরজায় পা দিয়ে সম্রাট তানহা শুনেছিলো পারির কথা গুলো,,তাই ওরাও ওকে উৎসাহ দিতে কথা টা বলে! পারি সম্রাটকে দেখে খুশি হয়, প্রথমবার শ্বশুর বাড়িতে রান্না করলো স্বামীই যদি না খায় তাহলে কেমন লাগে ব্যাপারটা!
মাহমুদ তালুকদার:-আলহামদুলিল্লাহ!
মিসেস জব্বার:-মাশাআল্লাহ!
মিসেস মাহমুদ:- বউ মা আমি বলবো না তুমি সবসময় রান্না আরো কিন্তু মাঝে মধ্যে এরকম মজাদার খাবার নিশ্চয়ই বানিয়ে খাওয়াতে পারো:
রুহানি:- হ্যা ভাবী আমি তো খুব মিস করবো এইরকম মজাদার ইয়াম্মি খাবার; হুহ!
সবাই খাবারের প্রশংসা করেছে, রুহানি তো মিস করার কথা বলে ন্যাকা কান্নাই শুরু করে দিয়েছে; কিন্তু সম্রাট এখনো খেয়েই যাচ্ছে ! খেয়ে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে চুপচাপ উপরে উঠে গেলো,ওর যাওয়ার পথে পারি শুকানো মুখে তাকিয়ে রইলো, মুহূর্তে ই শুষ্ক নয়ন-জোড়া ছলছল হয়ে উঠলো,এই মুহুর্ত মিস করলো না তানহা,, চাঁপা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, নিজেকেই দোষী মনে হচ্ছে আবার ভাবলো ওদের একান্ত সময় হলে অবশ্যই ঠিক হয়ে যাবে; তাই সবার আড্ডার মাঝেই একটি সুন্দর প্রস্তাব তুললো;
তানহা:- আমি একটা কথা বলতে চাই যদি মা আর আংকেল আন্টি অনুমতি দেন!
মিসেস মাহমুদ:- হ্যা মা বলো!
তানহা:- আমি বলছিলাম বিয়ের পর সম্রাট পারির কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ হয় নি! এমনিতেই ওদের মাঝে দীর্ঘ একটা সময়ের দুরত্ব ছিলো তার উপর বিয়েটাও একরকম হঠাৎ করেই হয়ে গেল! সব কিছু মিলিয়ে ওদের নিজেদের জন্য একদম সময় মেলেনি! তাই আমি বলছিলাম ওদের যদি কোথাও দুরে বেড়াতে যাওয়ার জন্য পাঠানো হয় তাহলে কেমন হয় ব্যাপারটা!
মানহা:- তুমি বলতে চাইছো হানিমুনে!
নিজের বোনের ঠোঁট কাটা কথায় তানহা একটু লজ্জায় পড়ে যায় যতই হোক ও বড়দের সামনে এভাবে সরাসরি হানিমুন শব্দ টা উচ্চারণ করতে চায় নি! কিন্তু তার পাকা বোধ তা আর বাদ রাখলো কই!
মিসেস মাহমুদ:-বাহ এতো উত্তম প্রস্তাব!
মিসেস জব্বার:- আমার ও বেশ মনে ধরেছে,,এত কাজের চিন্তায় এটাতো মনেই ছিলো না! ভাগ্যিস তুমি মনে করেছিলে!
সবার এই আলোচনায় অস্বস্তিতে পড়ে গেল পারি,,সব লজ্জা রাঙা মুখ নিয়ে এই জায়গা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিতেই বাধা পড়লো,
মিসেস জব্বার:-কোথায় যাচ্ছো ! এইদিকে আসো!
মিসেস জব্বারের আদেশি ভঙ্গিতে বসতে বলার কথায় পারি কিছু সময় চুপ থেকে বললো,
পারি:- মামীমা আমি এগুলো কিচেনে রেখে আসি!
মিসেস জব্বার:- তার জন্য এই বাড়িতে অনেক লোক আছে! তুমি তুই এখানে আয়!
মায়ের মতো মমতায় দেওয়া ডাক ' তুই এখানে আয়' কিভাবে কেউ ফেলে দেয়; লজ্জা ঠেলে বসে পড়লো গা ঘেঁষে!
মিসেস জব্বার:- কিছু সময় আগে কি বলে যেন ডেকেছিলি?
পারি:-জ্বী!
মিসেস জব্বার:- কি বলে ডেকেছিলি?
পারি:- মা-মামী-মা!
মিসেস জব্বার:- আরেকবার বল!
পারি:- মামীমা!
মিসেস জব্বার:- মামীটা বাদ দিবি,এখন থেকে শুধু মা বলে ডাকবি! কিরে ডাকবি না!
মায়ের ভালোবাসা পায় না আজ প্রায় নয় বছর,বাবা তো চলেই গেল একা করে, হাসান সাহেব ও তার স্ত্রীর মাঝে ছিলো বাবা মায়ের ছায়া,এই বাড়িতে শ্বশুর শ্বাশুড়ির কথা নাই বা বললো , উনাদের মতো শ্বশুর শ্বাশুড়ি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার তারপরও মিসেস জব্বারের এভাবে মা ডাকতে দেওয়ার আদেশ যেন আবেগ কে উপচে দিচ্ছে!কান্না থামিয়ে রাখা পারির মতো আবেগী মেয়ের পক্ষে অসম্ভব! ঝাঁপিয়ে পড়লো মিসেস জব্বারের বুকে; উনিও আগলে নিলো পরম মমতায়,
মিসেস জব্বার:- আজ থেকে আমার তিন মেয়ে! তানহা,পারিজাত,মানহা!
মানহা কিছুটা বিরক্ত প্রথমে হলেও ক্ষণেই বদলে গেলো,, অনুভব করলো বাবা ছাড়া কতটা অসহায় অনুভব করে ও; আর সেখানে পারির তো বাবা নেই ই ,মা থেকেও নেই! তাহলে মেয়েটা কত দুঃখী!
তানহা:-বাহ আমার আরো একটি অংশিদার বাড়িয়ে দিলে মা! তোমার ছোট মেয়ে কি কম ছিলো যে এখন মেজো মেয়েও নিয়ে আসলে!
দুষ্টুমি করে তানহা বললো,সেটা বুঝে মিসেস জব্বার মেয়ের মাথায় চাপড় মেরে বললেন;
মিসেস জব্বার:- একদমই আমার মেয়ের পিছনে লাগবে না!
তানহা'কে অন্য হাতে নিজের কাছে টেনে নিলো, পারিকে ধরে রাখা হাতটা আর একটু শক্ত করলো, তারপর দুজনের মাথায় চুমু দিয়ে বললেন,,
মিসেস জব্বার:- কেউ কারো অংশ নিতে পারে না,সবার জন্য ই আলাদা আলাদা জায়গা থাকে সেটা কর্মের মাধ্যমে অর্জন করে নিতে হয়! আমি পারিকে মন থেকে মেয়ে বলে মেনে নিয়েছি আশাকরি তোমরা দুইবোন ও তাই করবে!
মানহা:- আমাকেও একটু আদর দাও আমি ও তো তোমার মেয়ে, শুধু বড় দুজনকেই আদর করছো!
দুর সোফায় বসে থাকা মানহা দৌড়ে মায়ের কাছে এসে তানহা পারির উপর দিয়েই গলা জড়িয়ে ধরলো, মিসেস জব্বার মেয়ের বাচ্চামোতে হেসে দিলো,কপালে চুমু দিয়ে বললো,
মিসেস জব্বার:- হয়েছে এবার!
তানহা:- উফ মানু সর! মুটকি একদম ভর্তা হয়ে যাচ্ছি!
মানহা:- কি আমি মুটি! তুমি এভাবে বললা কেন?
তানহা:- মুটিকে মুটি নয় তো কি বলবো,চিকনি চামেলি?
মানহা:- আম্মু!
পারি:- আপু ও তো মুটি নয়,তাহলে ওকে তুমি কেন মুটি বলছো?
মানহা:-এই তো মেজো আপু তুমি ই বলো আমি কি মুটি!
পারি:- না তুমি তো গলুমলু!
মানহা:- মেজো আপু!
সম্রাট:- মেজো আপু?
সম্রাট উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আবার ও নিচে নামলো, কি করবে? ভেবেছিল কোনরকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে উপরে চলে গেলে পারিও তার পিছু পিছু যাবে কিন্তু রুমে গিয়ে অনেক সময় অপেক্ষা করার পর বউ তার রুমে যাওয়ার নাম নাই,তাই বেচারা হতাশ হয়ে ফ্রেশ হয়ে আবার নিচেই নেমে আসলো ,তখন ই দেখলো মানহা কোমরে হাত দিয়ে পারির দিকে চোখ কুঁচকে মেজো আপু বললে মৃদু চিৎকার করছে তখনই উক্ত প্রশ্ন করলো!
মানহা:-জ্বী দুলাভাই!
সম্রাট:- দু-দু-দুলাভাই মানে কি?মানহা কি হচ্ছে এসব!
মানহা:- জ্বী হ্যা আপনি আজ থেকে আমার দুলাভাই!আর পারিপু আমার মেজো আপু!
সম্রাট:- মানে কি সব বলছিস আর কি দুলাভাই দুলাভাই করছিস বলতো মানহা!
মিসেস মাহমুদ বউমাকে আজ থেকে ভাবীজান নিজের মেয়ে হিসেবে মেনে নিয়েছে! সেই হিসেবে তুমি মানহার দুলাভাই!
মায়ের কথায় সম্রাট পারির দিকে তাকালো হাস্যজ্জ্বোল পারির মুখই বলে দিচ্ছে এই বিষয়ে সে কতটা খুশি! তার খুশিতে সম্রাটের নিজেকে ও খুশি মনে হচ্ছে;
তানহা:- হ্যা আর আমি তোমার জেড্ডাস হই মানে বড় শ্যালিকা; সুতরাং সেই হিসেবে তুমি আমাকে এখন থেকে রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলবে!
সম্রাট :- আচ্ছা তাই!
তানহা:- হুম!
সম্রাট:- ওহ বড় আপু তাহলে আপনার পায়ে ধরে সালাম করতে হয়!
কথাটা বলে ই সম্রাট তানহার পায়ের দিকে ঝুঁকতেই তানহা দৌড়ে ছিটকে উঠে পড়লো,তার সাথেই পুরো ঘর জুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল!
মানহা:-উফ মা তুমি আগে কেন পারিপুকে মেজোপু বানালে না? তাহলে অন্তত আমার গেট ধরা,হাত ধোয়া, জুতো চুরির টাকা গুলো হাত ছাড়া হতো না!
সম্রাট:- ছিঃ মানু তুই ভাইকে এভাবে ফকির বানানোর ধান্দা করছিস!
মানহা:- কে ভাই! কার ভাই! এখন থেকে তুমি আমার ভাই না! তুমি দুলাভাই! বুঝেছেন দু-দু-দুলাভাই!
সম্রাট:- ওকে তাহলে আর কি; অবশ্য এতে আমারও ভালো হলো! মাঝে মধ্যে শালী আধা ঘরওয়ালীর সেবাও নেওয়া যাবে!
মানহা:- দেখা যাবে দু-দুলাভাই!
মিসেস জব্বার:-ওকে জামাই বাবা তাহলে তুমি জামাই আদরের জন্য রেডি হও!
এত সময় মানহা তানহার সাথে দুষ্টুমি করলেও মিসেস জব্বারের জামাই ডাকে কাশি উঠে গেছে,আর তাতে আরো একবার হাসির আমেজে মেতে উঠেছে পুরো ড্রয়িং রুম!
সারোয়ার তানজীব:- কি নিয়ে এত খুশি সবাই?
পর্ব ৫৭
রুহানি:- আর কি ! আপনার নজর লাগছে আমার ভাইয়ের উপর!
সাইদুর তানজিব:- মানে?
রুহানি:- মানে আর কি? আপনি কালকে বললেন ভাই বেঁচে গেছে তার শ্যালক শ্যালিকা নাই সুতরাং কোন খরচ ও নেই;
সাইদুর তানজিব:- তো?
রুহানি:- তো আবার কি! আপনি যে আমাকে মাঝে মাঝে ট্রিট দেন,তাতে আপনার অনেক কষ্ট হয় আমি বুঝি অবশ্য কনজুসদের কষ্ট হলে আমার ভালো লাগে তাই বলে আপনি সরাসরি আমার ভাইয়ের সুখে নজর দিবেন?
রুহানি:- ছোট বউ উল্টাপাল্টা কি সব বলছো সবার সামনে? আমি তোমাকে খাওয়ালে কষ্ট কেন পাবো! যতই হোক তুমি আমার ছোট বউ! তোমার বোনের বেলায় যেমন তেমন তোমার জন্য আমার সব উজার করে দেই!
রুহানি:- চাপাবাজি বন্ধ করেন! গতকাল না আপনার আমাকে সিনেমা দেখানোর কথা ছিলো? তারপর কোথায় গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন?
সাইদুর তানজিব:- আর বলো না, নতুন কেস'টা নিয়ে হেব্বি ঝামেলায় আছি!
সোহা:- কিসের ঝামেলা? তোমাকে না বললাম এই কেস'টা ছেড়ে দিতে!
সাইদুর তানজিব:- চাইলেই কি সব ছাড়া যায়? তুমি পেরেছো এমন কিছু করতে?
সম্রাট:- কিসের সমস্যা?
সোহা:- আর বলো না ভাইয়া! একজন পলিটিশিয়ানে'র ছেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ,ও অভিযোগকারীনি'র হয়ে কেস'টা লড়ছে !যেদিন থেকে কেস টা হাতে নিয়েছে সেদিন থেকেই বার কয়েক কেস টা ছেড়ে দেওয়ার জন্য হুমকি পেয়েছে! আমিও কতবার বললাম! শুনেই না আমার কথা!
সাইদুর তানজিব:- কি সব বলছো তুমি?
সম্রাট:- কেন ছাড়বে? আইনের লোক হয়ে ভয় পেলে সাধারণ মানুষ কাদের উপর নির্ভর করবে?
সোহা:- কিন্তু ভাইয়া?
মিসেস জব্বার:- সম্রাট ঠিক ই বলেছে সোহা! একবার ভাবো তো ঐ মেয়ের জায়গায় আমাদের পরিবারের কোন মেয়ে হলে কি তুমি একই কথা বলতে?
সোহা:- নাহ, কখনোই না!
সাইদুর তানজিব:- তাছাড়া তুমি নিজেও যদি এই কেস হাতে নিতে তাহলে কিন্তু কখনো এভাবে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে না! তবে আমার বেলায় কেন?
সোহা:- কারন আমার কাছে;..
সম্রাট:- ও কেস টা লড়বে! বাকীটা আমি সামলে নিচ্ছি!
সোহা বুঝলো যেখানে পুরো পরিবার সাইদুর'কে সমর্থন করছে সেখানে ওর একার নিষেধাজ্ঞা কিছুতেই সাইদুর'কে থামাতে পারবেনা! তাছাড়া সাইদুর তো ঠিকই করছে, শুধু শুধু ভয় কেন পাবে!
আর যেখানে সম্রাট বলছে বাকীটা ও সামলে নিবে সেখানে আর বলার কিছু নেই!
কথায় কথায় যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো, আগের থেকেই সবকিছু রেডি করে রেখেছে, শুধু নিজেদের তৈরি হওয়া বাকী! পারি নিজের তৈরি করা বিশেষ আইটেম সাইদুর কে ও দিলো! সাইদুর খুশি হয়ে বড় ভাই হিসেবে সালামী দিলো! তার মাঝেই জানা হলো পারিকে মেয়ে বানানোর ইতিহাস! এতেই বুঝতে পারলো রুহানির নাটকের কারণ!
--------------------------------------------------------------------
ব্লেজার খুলে হাতে নিয়ে আস্তে করে হাঁটতে হাঁটতে উপরে উঠছে,রাত প্রায় একটার কাছাকাছি,তানহা দের চলে যাওয়ায় বাড়িটা কেমন শুনশান হয়ে গেছে, মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেও কত হইহুল্লোরে মেতে-ছিলো, কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে সব কিছু নিরবতায় ছেয়ে গেছে!
সোহা:- ভাই এসেছো?
সম্রাট:- হুম!
সোহা:- চলে গেছে!
সম্রাট:- হ্যা ওদের প্লেন ফ্লাই করার পরই আমি এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েছি!
সোহা:-ভালো করেছো! এখন রুমে যাও,ভাবী রুমেই আছে!
সম্রাট:- হুম,,
কথা শেষ করে এগিয়ে গেল, ভাইয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সোহা একটা মুচকি হাসি দিলো , মনে মনে বললো,
সোহা:- যাও তোমার জন্য বিগ সারপ্রাইজ অপেক্ষা করেছে!
ঘরের দোরে পা দিয়েই কিছু একটা অনুভব হলো,হালকা করে ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই মুগ্ধ হয়ে গেল সম্রাটের চাহনি!
ছোট ছোট প্রদীপের আলোয় জ্বলজ্বল করছে পুরো ঘর, সুবাসিত বেলির গন্ধে চারিদিকে শুভ্রতায় ছেয়ে আছে,হাতের ব্লেজার সোফায় রেখে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বেডের পাশে,পুরো বিছানায় গোলাপ, বেলির মিশ্রনে সুন্দর করে লেখা আছে 'I Love You" মুচকি হাসলো সম্রাট,মনে মনে ভাবলো, এভাবে বললে তো হবে না! তোমাকে সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বলতে হবে! পিছনে ঘুরতেই চোখ পড়লো ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা একটা গিফট বক্স তার, এবং সেটা দিয়ে চাপা দেওয়া একটা সাদা কাগজ, বুঝতে পারলো এটা একটা চিঠির মতোই কিছু!
হাত বাড়িয়ে বক্স'টা নিলো,খুলে দেখলো তার মাঝে খুব সুন্দর একটা রিং,রুবি পাথরের রিং! পাথরের চারদিকে প্লাটিনাম দিয়ে বাঁধানো, সম্রাট আশ্চর্য হয়ে গেছে,এই আংটির দাম অনেক! পারি এত টাকা কোথায় পেলো! ও তো এখনও পারিকে কোন টাকা দেয় নি তাহলে? পরক্ষনেই মনে হলো চিরকুটে'র কথা,বক্স'টা রেখে চিরকুট'টা তুলে নিলো,খুলে দেখলো খুব সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,
সুদর্শন প্রিয়তম,
আমি জানি এই মুহূর্তে তুমি আশ্চর্য হয়েছো, প্রশ্নের উড়াউড়ি তোমার হৃদয় গহীনে! উত্তর পেয়ে যাবে যদি পুরোটা একবার পড়ো!
আমি তোমাকে ফিরিয়ে দিবো এত সাহস আমার কই?
যেই তোমাকে হারানোর কষ্ট ভুলতেই রোহানে'র মতো জানোয়ার কে বিয়ে করেছিলাম!যে জীবনে তুমি থাকবে না সে জীবনের মূল্য নেহাৎই তুচ্ছ ছিলো আমার কাছে! আর তাই তো জেনে বুঝে বেছে নিজেকে শেষ করার জন্য ই বেছে নিয়েছিলাম রোহানকে! জানো আমি যখন দ্বিতীয় বার তোমাকে দেখেছিলাম তখন মনে হয়েছিলো বেঁচে না আসলেও পারতাম ! কারন আমি আর যাই পারি না কেন তোমাকে অন্য কারো সাথে দেখার মতো সহ্য ক্ষমতা আমার নেই! কিন্তু? তারপরও কেন জানি নিজের অবাধ্য মনকে বোঝাতে পারি নাই, যতবার ঘৃনায় সরে যেতে চেয়েছি ততবারই মনে হয়েছে এই মুখ দেখেই এই জীবন কাটিয়ে দিতে পারবো! কিন্তু যখনই তোমাকে দেখতাম তখনই সেই রাতের কথা মনে পড়তো তাই চেয়েও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হতাম!
পূনরায় যখন তোমাকে পাওয়ার সুযোগ উপর ওয়ালা করে দিলো তখন বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো আমার অন্ধকার অতীত! আমি চাই নি তোমাকে ঠকাতে! আমার কাছে তখন সেই রাতের চেয়ে ও জঘন্য অতীত ছিলো! কোথাও না কোথাও আমি তোমাকে ও দায়ী করতাম,, সবসময় মনে হতো তুমি আমাকে না ঠকালে আমি তো আর রোহান কে বিয়ে করতাম না! রোহান কে বিয়ে না করলে আমার জীবন এতটা নারকীয় ও হতো না! এর জন্য অবশ্যই তুমি দায়ী!
তাতেও বাঁধা দিতো আমার অশান্ত অবুঝ চিত্ত! হয়তো তোমার ভালোবাসার জোর এতটাই ছিলো যে আমার অজান্তে তৈরি হওয়া অভিযোগের জাল সবসময়ই ছিঁড়ে যেতো!
আমি জানি আমি অপরাধী! যদি একবার তোমাকে বিশ্বাস করতাম,যদি না ফিরে গিয়ে তোমার কাছেই এর উত্তর চাইতাম তবে নিশ্চয়ই এতটা যন্ত্রনা হতো না!
কিন্তু আমি কি করবো? তুমি তো জানো আমি কেমন? আমি পারিনা নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে অন্যের দখলে দেখতে! সেই রাতের দৃশ্য মনে পড়লে আমার আজও কষ্ট হয়! যদিও বর্তমানে সত্যিটা আমি জানি!
আচ্ছা সে রাতে আমার জায়গায় তুমি থাকলে কি করতে? আমি যদি অন্য কোন ছেলের সাথে ওভাবে থাকতাম,তবে কি তুমি এভাবেই চলে আসতে! না! আমি জানি তুমি তছনছ করে দিতে সব,হয়তো আমার হাড়গোড় ও ভেঙে দিতে কিন্তু আমি তো তোমার মতো নই! ওভাবে প্রতিবাদ করার মতো সাহস যে আমার নেই! সত্যি বলতে আমি তোমাকে কারো সাথে শেয়ার করার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি না! তাই ঐরকম একটা দৃশ্য দেখার পর আমার করণীয় কি ছিলো?ঐ মুহুর্তে আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারি নি!
তুমি জানো বাবা যখন রোহান কে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দেয়,আমি তখন অস্বীকার করি,এতে বাবা প্রথম বার, জীবনের প্রথম বার আমার সাথে কঠোর ব্যবহার করে! বাবার মুখে মুখে তর্ক করার জন্য বাবার সামনে রোহান আমাকে চড় মেরে ছিলো! কিন্তু বাবা কিছু ই বলেনি! উল্টো সেও যা নয় তাই বলে আমাকে খুব বকেছিলো , কারন সে ভাবতো রোহান আমাকে শাসন করার অধিকার রাখে! সেই সময়ও অতটা কষ্ট আমার হয়নি যতটা কষ্ট সেই রাতে হয়েছিলো! আমি তো তোমার সাথে থাকার জন্য ই গিয়েছিলাম কিন্তু গিয়ে যখন দেখি তোমার বুকে অন্য কেউ তখন মনে হয়েছিলো বেঁচে থেকে লাভ কি? নদীর পারে গিয়েছিলাম মরতে কিন্তু পিছনে হাসান চাচা ছায়ার মতো ছিলো,আমি জানি ঐ মুহুর্তে আমি যাই করতাম সেটার প্রভাব সবচেয়ে বেশি ঐ মানুষটার উপর পড়তো,তাই তার জোরাজুরিতে ই বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হই!
যখন বাসায় গেলাম বাবার করা ব্যবহার আমাকে আরো চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছিলো!ঘরে ঢুকে কয়েকবার সিদ্ধান্ত নেই আত্নহত্যা করার,বার কয়েক নিজেকে আঘাত করি হাত দিয়ে কিন্তু তাতে কি কেউ মরে? গলায় ফাঁস দেওয়ার চেষ্টা ও করেছি কিন্তু ভয় পেয়ে আবার নিজেই খুলে ফেলেছি,সত্যি বলতে নিজের হাতে নিজেকে শেষ করার মতো সাহস আমার নেই! তাই সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি বেছে নেই ! রাগে ঘরের যেই জিনিসপত্র ভেঙে ছিলাম তার মাঝেই হেঁটে বেরিয়েছি কয়েকবার, তাতে পায়ে যা ক্ষত হয়েছে তা দিয়ে বেশ রক্ত যাচ্ছিলো এরপর তো জানিনা কি হয়েছিল তবে যখন চোখ মেলি তখন নিজেকে বিছানায় শোয়া আর বাবার মুখটা ই সবার আগে দেখি!
বাবা মায়ের মুখ দেখার পর নিজেকে বড্ড বেশি অপরাধী মনে হচ্ছিল,আমি নিজের কয়েকদিনের ভালোবাসাকে না পেয়ে নিজেকে শেষ করতে যাচ্ছিলাম অথচ যেই মানুষগুলো দীর্ঘ 21 টা বছর আমাকে লালন পালন করল তাদের কথা একবারও ভাবলাম না! বাবা মা আমার এই অবস্থা দেখে রাজি হয়ে যায় তোমার সাথে আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য! হাসান চাচাকে তোমার সাথে যোগাযোগের কথা বললে হাসান চাচা বাবাকে সত্যিটা বলে দেয়,বাবা খুব রেগে যায় এরপর ও তোমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু আমার মনে তখনও চলছিল সেই রাতের ঘটনা যা আমি চেয়েও ভুলতে পারছিলাম না, তাই বাবাকে বলি খুব তাড়াতাড়ি রোহানের সাথে আমার বিয়ের আয়োজন করার কথা! আমি রোহান'কেই বিয়ে করবো!রোহানও রাজি হয়ে যায় এবং সে খুব সহজেই পুরোটা আয়োজন করে ফেলে!
আমার রাগের মাথায় নেওয়া সেই সিদ্ধান্তই আমাকে নিয়ে যায় নরকে যা আমার শরীরটাকে কলুষিত করে দেয়! তুমি সেদিন যখন আমাকে ছুঁয়েছিলে আমি তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম কারন আমার মনে হয় আমি তোমার যোগ্য নই!আমি তো আগের মতো পবিত্র নই! রোহান আমাকে পতিতালয় পর্যন্ত নিয়ে ছেড়েছে!ও আমার দেখা সবচেয়ে জঘন্য মানুষ,কোন স্বামী নিজের স্ত্রীকে একাধিক পুরুষের কাছে বিক্রি করতে পারে আমি ওকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না!
আমি এতটাই ভীতু যে ঐ মুহুর্তে ও নিজেকে রক্ষা করতে পারি নি,যতবারই ঐ জানোয়ার গুলো আমাকে ছুঁতো ততবারই নিজেকে শেষ করতে চাইতাম কিন্তু পারতাম না,ওরা নিজেরাই পাহারায় রাখতো যাতে নিজের ক্ষতি না করতে পারি! আর আমিও তো ছিলাম ভীতুর ডিম!তাই সহ্য করা ছাড়া কিছুই করার ছিলো না কিন্তু যেদিন শুনতে পাই আমার বাবার কষ্টের সব সম্পত্তি রোহানের কারনে শেষ আর আমার বাবা সইতে না পেরে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে সেদিন কিভাবে যেন সাহসী হয়ে উঠি! আর তাই নিজের হাতেই শেষ করি ঐ নরপশু টাকে! হ্যা আমি নিজেই নিজের হাতে স্বামী নামক ঐ নরপশু'কে হত্যা করি!
ও সেদিন ওর ঐ বন্ধুর কাছে এসে ছিলো যার সাথে সাত দিনের চুক্তি করেছিলো এবং তার পরিবর্তে ও একটা ফ্লাট এবং কার নেয়, কিন্তু ওর ঐ বন্ধু ওকে ধোঁকা দিয়ে আমাকে অন্য একজনের কাছে বিক্রি করে দেয় যে কিনা ছিলো বার এবং একটা অবৈধ ক্লাবের মালিক যেখানে জোর করে তুলে এনে মেয়েদের বিক্রি করা হতো!
পর্ব ৫৮
রোহানের সাথে আলোচনা না করে আমাকে বিক্রি করার কারনে ওদের মাঝে তর্কাতর্কি হয়,এক পর্যায়ে শুনতে পাই আমি যেখানে আছি সেখানে আমি ছাড়া আরো বেশ কয়েকজন মেয়ে আছে! এবং আমাদের প্রত্যেককেই ওরা বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে দিবে!
আমি জানিনা কোথায় থেকে কিভাবে আমার মাঝে সাহস সঞ্চার হলো!
যেতে রাজী না হওয়াতে রোহান আমাকে আবার ও আঘাত করে! পশুর মতো আমাকে যন্ত্রনা দেয়! এখান থেকে চলে গেলে আর আমার দেখা পাবে না বলে আবারও আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু ততক্ষণে আমি নিজেকে প্রস্তত করে নিয়েছি,রোহান যখন আমাকে মারছিলো তখন পাশে পড়ে থাকা একটা সেন্টার টেবিল আমার গায়ের ধাক্কা লেগে উল্টে যায় আর তাতে সেটার গ্লাস ভেঙ্গে কয়েক টুকরো হয়ে যায়! আমি সেই টুকরার একটি বেশ বড় অংশ নিয়ে রোহানের ঘাড়ে বসিয়ে দেই,প্রথমে রোহান আঁচ না পেলেও পরবর্তী ধাপে ওর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠে! কিন্তু ততক্ষণে আমার উপর যেন রোহানের আজরাইল চেপে বসেছে,তাই পরপর একই জায়গায় কয়েক ধাপের আঘাতে রোহান নামক জানোয়ারের সমাপ্তি ঘটাই! আমি তখন নিজের মাঝে ছিলাম না! রোহানের মৃত্যুতে আমার চোখে পানি আসেনি, তবে মুক্তির খুশিতে এসেছিলো ঠিকই!
কিন্তু পরক্ষনেই মনে হয় আমি এখনও বন্দিনী! আমি হুঁশে আসি ঘরের দরজায় জোরালো করা-ঘাতে! রোহানে'র আর্তনাদে ছুটে আসে বাইরে থাকা জানোয়ার গুলো,আমি নিজেকে আবার ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত করি,হাতে থাকা কাঁচের অংশ টা সাবধানে নিয়ে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়ি,ওরা ততক্ষণে দরজার লক খুলে ফেলে, হঠাৎ দরজা খুলে যাওয়ার কারনে ভেতরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, রক্তাক্ত রোহান'কে দেখে থমকে যায় ততক্ষণে আমি নিজের দ্বিতীয় কাজ সেড়ে ফেলি!
এমন একটা বিষয় হজম করতে ওদের বেশ সময় লাগছিলো,এরই মাঝে আমি দরজা বাইরে দিয়ে লাগিয়ে বের হয়ে আসি, কিছু সময় এদিকে ওদিকে খুঁজতে লাগলাম বন্দি থাকা মেয়েদের, কিন্তু পরেই বুঝলাম আমার দ্বারা ভুল হচ্ছে ! আমি নিজেই এখানে নিরাপদ নই তার মধ্যে আমার শরীরে তখনও রক্ত জড়ছে! ভেতর ঘর থেকে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আরো দুজন ভেতরে এলো,তার মানে এরা এত সময় দরজায় পাহারাদার হিসেবে ছিলো,আমি ঐ সময় নিজেকে টেবিলের নিচে লুকিয়ে ফেলি,ওরা যখন দরজার দিকে এগিয়ে গেল , কোনরকম নিজের জীবন বাঁচিয়ে দিকবিদিক ভুলে শুধু দৌড়িয়েছি! কিন্তু রাস্তায় নেমে যেন পড়লাম আরেক বিপদে!
কারন তখন অনেক রাত,বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা তার সাথে জায়গাটা ছিলো খুবই নির্জন! আশেপাশে কোন বসতবাড়ি নেই,আমি যেন অকুল পাথার দেখতে পেলাম! কোনভাবে হাটার চেষ্টা করছি এর মধ্যেই শুনতে পাই কয়েক জোড়া পায়ের হাঁটার শব্দ! শিশির ভেজা রাতেও যেন শুকনো পাতার মরমর শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,ভয়ে নিজের মাঝে ছিলাম না! তবুও আমাকে চেষ্টা করতে হতো কারণ তখন শুধু আমার একার জীবন বিপন্ন ছিলো না,তার সাথে আরো কয়েকটি মেয়ের জীবন ও জড়িয়ে ছিল!
ওদের সবার হাতে লাইট ছিলো আর আমি ছিলাম অন্ধকারে! দুর্বল আর অসুস্থ! হয়তো পরম করুণাময়ের দয়া হলো,তাই আমার মাঝে অজানা এক শক্তি অনুভব হলো, বুদ্ধি খাটিয়ে অন্ধকারে ঝোপের মাঝেই নিজেকে লুকিয়ে ফেলি তত সময়ে ওরা আমার খোঁজে অনেক দূরে চলে গেছে,আমি কিছু সময় সেখানেই নিজেকে বিশ্রাম দিলাম! কিন্তু জায়গা ছাড়তে হবে সেটা যেকোন কিছুর মূলে ই হোক!
ওরা বেশ দূরে চলে যাওয়ার পর আমি উঠে দাঁড়ালাম, উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করলাম,অন্ধকারে কোথায় যাচ্ছি জানিনা,ভয় আর ঠান্ডায় আমার চলন বারবার থেমে যাচ্ছিলো, মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে হাঁটছিলাম, ভাবনা ছিলো একটাই যেকোন উপায়ে এখান থেকে বের হতে হবে,এর মধ্যেই বুঝতে পারলাম ওরা আমার পিছু নিয়েছ,হয়তো হাটার সময়ে পাতার শব্দ পেয়ে বুঝে গেছে আমার অবস্থান! তবুও পিছু ফিরলাম না,যদি ওরা ছাড়া অন্য কিছু হয়,যদি ভয়ঙ্কর কোন পশু হয়! আচ্ছা মানুষের চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু আছে! অন্তত বিগত কয়েকদিনের পরিস্থিতি দেখে তো এটাই বলা যায় সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে মানুষ!
দ্রুত গতির হাঁটা আমি দ্রুত গতির দৌড়ে পরিনত করলাম, কিন্তু পুরুষদের সাথে কি একটা মেয়ে পারে! কিন্তু আমি সেদিন পেরেছিলাম হয়তো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার রহমত হয়েছিলো আমার প্রতি! তাই সেদিন আমি পেরেছিলাম!
দৌড়াতে দৌড়াতে পরিশেষে আমি খুঁজে পেলাম লোকালয়,কানাডার লোকালয়ে তো আমাদের গ্রামের চেয়েও কম মানুষের বসবাস! আমি একটা ঘরের করি-ডরে গিয়ে পরে যাই;
এরপর যখন চোখ খুলি তখন আমি নিজেকে আবিষ্কার করি হাসপাতালে! ডাক্তারের কথা অনুযায়ী আমি পুরো তিনদিন অজ্ঞান ছিলাম!
নিজেদের ঘরের বাইরে হঠাৎ কিছুর শব্দ পেয়ে ভেতরে থাকা মানুষ বাইরে আসে, এবং যখন দেখতে পায় একজন মেয়ে এভাবে পড়ে আছে তখন তারা সাহায্য করতে গেলে আমার গায়ে আঘাতের চিহ্ন দেখে সেটাকে পুলিশ কেইস ভেবে সরাসরি স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে ফোন করে! তারপর উনারা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে!
তিনদিন পর যখন আমার হুশ আসে তখন আমি পুলিশকে পুরোটা খুলে বলি! তারা আমার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী উক্ত স্থানে গিয়ে যা দেখেন এবং বলেন তাতে আমি আরো বড় ঝটকা খেলাম!!
আমাকে যেখানে রাখা হয়েছিলো সেটা আর কিছুই না, ওটা একটা নিবন্ধনকৃত পতিতালয় ছিলো! ওখানে অনেক উঁচু পর্যায়ের কানাডিয়ানদের আনাগোনা! ওখানে রেখে মেয়েদের শারীরিক ভাবে তৈরি করে যাতে ভিআইপি ক্লাইন্টদের খুশি করতে পারে! এরপর সেখান থেকে বিভিন্ন ক্লাবে,বারে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং কাজ শেষে আবারও সেখানে ফিরিয়ে আনা হয়!
পুলিশ পুরো বিষয়টি এভাবে কোর্টে তুলে যাতে উল্লেখ হয় আমি অবৈধভাবে কানাডায় গিয়েছি, এবং স্বেচ্ছায় ক্লাইন্ট রোহান'কে মেরেছি!আমি পেশাগত বে*শ্যা!
রোহান খুশি হতে পারেনি বলে আমাকে টাকা দিতে চায় নি আর তাই আমি তাকে দাঁড়ালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করি এবং তাতে রোহান নিহত হয়!নিহত রোহান কে ফেলে রেখে আমি পালানোর চেষ্টা করলে উনারা আমাকে আটকায় এবং তার কারনেই আমার গায়ে ঐ আঘাত গুলো ছিলো। তবুও আমাকে আটকাতে পারেনি উল্টো আমি তাঁদেরকে আহত করে পালিয়েছি!
অর্থাৎ ঐ লোকেরা পুরো বিষয়টি এভাবেই সাজিয়েছে,আমি যেই মেয়েদের সাহায্য করতে চেয়েছিলাম তারাও আমার বিপক্ষে স্বাক্ষী দিয়েছে!আমি আর ও একবার মানুষ চিনলাম! কানাডিয়ান আইন অনুযায়ী আমার শাস্ত্রির ব্যবস্থা চলছিলো এর মধ্যেই আমার জীবনে আল্লাহর রহমত হয়ে আসে রোহান আর আমি যেখানে থাকতাম তার পাশের অন্য বাড়িতে কাজ করা মেইড মিস কেইট! কিভাবে কখন জেনেছে জানিনা তবে উনার একটা স্বাক্ষী দেওয়ার সাহসে পুরো সত্যটা সামনে আসে!
উনি যখন রোহান আর আমার সম্পর্ক সম্পর্কে পুলিশের কাছে বলেন এবং আমার প্রতি রোহানের আচরণের দিকটাও তুলে ধরে তখন পুলিশ তদন্তে নামে এবং দেখতে পায় এই নারকীয় সত্যটা, ততদিনে আমার সাজা ঘোষণা হয়ে গেছে! কিন্তু পুলিশের মানবিক দৃষ্টিকোণ আর অতি সৎ স্বাভাবিক সহায়তায় আমি ৫ বছরের মাথায় মুক্তি পাই আর তার সাথে দেশে ফেরার সমস্ত ব্যবস্থাও কানাডিয়ান সরকার করে দেয়;
দেশে ফিরে জানতে পারি আমার মায়ের অবস্থা কতটা করুন! বিপদের সময় এগিয়ে আসেনি কোন সুসময়ের আত্নীয়! আমার বাবার কষ্টে গড়া সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে এ রোহান! টাকার অভাবে মায়ের চিকিৎসা হয়নি! হাসান কাকা নিজের সবকা দিয়ে চেষ্টা করে চলেছে! কোথায় যাবো, কি করবো বুঝতে পারছিলাম না, সাহায্য করলো বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের লোকজন; খোঁজ বের করলো হাসান কাকার! পুরো একটা বছর উনি নিজের বুকের সাথে আগলে রেখেছে,ঠিক বাবার মতো করেই! এরপরেই বের হলাম রোজগার করতে! কত নোংরা পরিস্থিতিতে পড়েছি তার হিসেব নেই তাই যেদিন তোমাদের বাড়ির কাজটি পেলাম সেদিন নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল!
আমি তোমাকে দেখার আগ অবধি জানতাম না এই বাড়ি তোমার,হয়তো আল্লাহ আমাদের এক করতেই আবারো এক জায়গায় এনে দাড় করিয়েছে! তবে জানলে হয়তো সেদিন ও মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতাম!
আমি অপবিত্র! নোংরা জানোয়ারদের ছোঁয়ায় ক্ষতবিক্ষত আমার অঙ্গ! কিভাবে তোমার সামনে নিজেকে তুলে ধরবো! হাসান কাকা বলেছে তুমি সবটা জেনেই এই বিয়ে করেছো! কিন্তু তবুও আমি পারি না ! কি করবো বলো?
আচ্ছা আমার সাথে ই কেন এমন হলো? আমি তো কারো ক্ষতি করি নি তবে কেন?
সবাই বলে আমার ফিরিয়ে দেওয়াতে তুমি আহত হও! আমিও জানি বারবার প্রত্যাখানে তোমার ভেতরে কি ঝড় বয়ে যায়!
আমি নিজেকে হাজার বার তোমার থেকে সরিয়ে নিতে চেয়েও হেরে গিয়েছি তোমার ভালোবাসার কাছে! আচ্ছা আমার এই নোংরা অপবিত্র শরীর কি তোমার সান্নিধ্য পাওয়ার যোগ্য?
পারবে আমাকে আগের মতো ভালোবাসতে নাকি পুরো সত্যটা জানার পর ঘৃনা হচ্ছে!
আমি তোমার উত্তরের আশায় থাকবো,তুমি যা বলবে তাই আমি মাথা পেতে মেনে নিবো! কিন্তু আমি চাই তুমি ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নাও! এখন অনেক দেরি হয়ে যায় নি,সময় আছে! কোনদিন তোমার ভুলেও মনে না হোক আমি তোমাকে ঠকিয়েছি! তাই তুমি ভাবো ভেবে যা সিদ্ধান্ত নিবে সেটাকে আমি সম্মানের সাথেই গ্রহন করবো!
ইতি,
তোমার অপেক্ষায় তোমার'ই সুখ ফড়িং!
পুরো লেখাটা পড়ে কিছু সময় থমকে দাঁড়িয়ে রইলো সম্রাট,,জানতো তবে এতটা নয়! কিভাবে জানবে! নিশ্চয়ই পারি এই কথাগুলো হাসান সাহেবের সাথে শেয়ার করে নি! করবেই বা কিভাবে? কোন মেয়ের পক্ষে ই এই কথাগুলো একান্ত আপনজন ছাড়া কারো সাথে শেয়ার করা আদৌও সম্ভব?
তবে পারি যে জেল ফেরত ছিলো সেটা সম্রাট অনেক আগেই জেনেছে কারন সাইদুর তানজিব যখন বলেছিলো পারিকে চেনা-চেনা লাগে সবার কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক থাকলেও সম্রাটের কাছে লাগেনি কারন সাইদুর চিনে অথচ পারি চিনেনি তার চেয়েও বড় কথা চেনার কথা আসতেই পারি তখন বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল যেটা চোখ এড়ায়নি সম্রাটের! পরবর্তীতে সম্রাটের আদেশে সাইদুর ই খুঁজে বের করে আসল সত্যটা!আর সবার আগে সেটা সম্রাটের সাথেই আলোচনা করে! কিন্তু কেন জেলে ছিলো এটা জানতে পারে নি! এত আগের কেস নিয়ে ঘাটতে কেই বা চায়!
হাতের কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের উপর রেখে সামনের দিকে তাকাতেই দেখতে পায়,লাল জামদানি'তে রক্ত জবা সেজে থাকা পারিকে!
পর্ব ৫৯
গোল্ডেন পাড়ের লাল জামদানি শাড়ি, গলায় চিকন চেইন তার মাঝে লাল গোল্ডেন মিশেলে ছোট্ট একটা লকেট, কানে ছোট্ট এক জোড়া ঝুমকো দুল, নাকে ছোট্ট ডায়মন্ডের নাক ফুল, হাতে চিকন দু জোড়া চুড়ি, কোমরে লতানো ডিজাইনের পাতলা একটা বিছা জড়ানো, হালকা মেকাপে'র মাঝে ঠোঁটের টুকটুকে লাল লিপস্টিক,আর চোখে মোটা করে দেওয়া কালো কাজলে যেন আসমান থেকে নেমে আসা হুর মনে হচ্ছে ! বেলির মালা যেন ঘাড়ের উপর সাজিয়ে রাখা লুছ খোঁপার সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে,তার সাথে থাকা রক্তিম গোলাপের রক্তিম আভা লজ্জা রাঙ্গা পারির মুখটাও রক্তিম করে তুলেছে! লজ্জা রাঙ্গা মুখ নিচু করে রেখে হাতে হাত ঘষে চলছে সমানতালে,তার সাথে মিষ্টি ধ্বনির সৃষ্টি হচ্ছে হাতের চুড়ি-দ্বয় দিয়ে!
সম্মোহিত হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সম্রাট,, চোখের পলক যেন থমকে গেছে, মুগ্ধতায় ঘিরে রয়েছে চারদিক,পারি'র নমনিত দৃষ্টি ও বারবার বলছে এভাবে না তাকাতে,এই চাহনিতে সর্বনাশা জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে!
ধীর পায়ে এগিয়ে যেতেই শুনতে পেল মিষ্টি কন্ঠে বলা বাক্য-খানি,
পারি:- তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো,আমি সবকিছু ওয়াশ-রুমে রেখে এসেছি, তারপর যা বলার বলো!
পারি'র বলাতে মনে পড়লো বাইরে থেকে এসে এখন ও ফ্রেশ হওয়া হয়নি, নিজের দিকে এক নজর দেখে পারি'র উদ্দেশ্য বললো,
সম্রাট:- হুম; এখানেই থাকবে!
লজ্জা লাগলেও এই মুহূর্তে সম্রাটের চাহনি থেকে নিজেকে বাঁচানোর এই একটা উপায় ই ছিলো,পারি জানে সম্রাট পুরোটা জানার পরও কখনোই ওকে ত্যাগ করবে না, তবুও সম্পূর্ণ রূপে শুরু করার আগে সবটা জানানোর প্রয়োজন মনে করলো যাতে ভবিষ্যতে সম্রাট কখনো ওর দিকে আঙুল তুলতে না পারে!
বারান্দার পাশে থাকা ছোট্ট ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে,তারায় ঝলমলে বিশাল অম্বরের মুগ্ধতায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছা করছে,হালকা স্নিগ্ধ বাতাসে উড়ে এলোমেলো ভাবে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ছোট অবাধ্য চুলগুলো!
পারি:- আমি জানি তুমি কি বলবে! তবুও আমি চাই তুমি একবার মুখে বলো! তোমার সামনে দাঁড়ানোর সাহস নেই,তাই তো লিখে বলেছি নিজের অপারগতার কথা! হয়তো আমি তোমাকে ঠকাচ্ছি,হয়তো তোমার সাথে অন্যায় করেছি! তবুও চাইবো তুমি একবার ক্ষমা করে নিজের বুকে জায়গা দাও, পরম আল্লাহ ছাড়া এই জগতে একমাত্র আপন তুমি! তুমি দূরে ঠেলে দিলে কিভাবে বাঁচবো!
অনুভব করলো পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে,কে দাঁড়িয়ে আছে সেটা বোঝার জন্য পিছু ঘোরার দরকার পড়ে না,কারন এই ছোঁয়া অতিপরিচিত! পারির পিঠ গিয়ে সম্রাটের বুকে লেগে আছে! একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইলো বেশ কিছু সময়! দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ, বাতাসের মিষ্টি গন্ধ আর বয়ে চলার ফিসফিস শব্দ,তারায় ঝলমলে আকাশ রাতের নিস্তব্ধতা সব কিছুই আজ যেন প্রকৃতিকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে! পারি অনুভব করলো সম্রাটের আঙুল ওর আঙুল ছুঁয়ে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে আসছে, সম্রাটের পুরুষালি হাতের আলিঙ্গন আরো মজবুত হলো বাহু-দ্বয়ে ,দুই হাত দিয়ে বাহু আঁকড়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো, শক্ত পুরুষালি ঠোঁটের ছোঁয়া যখন বাম কাঁধে অনুভব করলো সিড়সিড়িয়ে উঠলো পুরো অঙ্গ!
সম্রাট পারির কাঁপুনি অনুভব করলো, গভীর করলো বন্ধনী,তীব্র করলো ওষ্ঠের ছোঁয়া, নিজের শাড়ি মুঠো করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রশ্ন করলো সম্রাট কে;
পারি:- তুমি কিছু বলবে না?
পারির প্রশ্নে সম্রাটের ঘোর কাটলেও ছেড়ে দিলো না,আরো আবেশে জড়িয়ে নিলো, মুহূর্তে ই পিছু হয়ে ঘুরে থাকা পারিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বুকের মধ্যে চেপে ধরলো,
সম্রাট:- অনুভব করো!
বুকের মাঝে দ্রুত গতিতে বেজে চলা হৃদ-ক্রিয়া জানান দিচ্ছে পারির উত্তর, তবুও বুঝতে নারাজ পারি শুনতে চায় অমূল্য সেই শব্দ,সম্রাট শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেও পারি এবারও নিরুত্তাপ,
সম্রাট বুঝলো পারির মনোভাব কিন্তু এবার ও মুখে কিছু বললো না, বুকের মাঝে আগলে রেখেই কিছু সময় অতিবাহিত করলো এরপর হুট করেই পারিকে কোলে তুলে নিলো,প্রথমে কিছুটা আতংকিত হয়ে পড়লেও পর মুহূর্তে ঘটনা বুঝতে পেরে বেশ হতভম্ব হয়ে সম্রাটের মুখের দিকে তাকায়, সম্রাটের চাহনিতে দুষ্টুমি খেলা করছে, অসম্ভব মোহনীয় নজরে পারিকেই দেখছে, লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নেয় পারি,দু হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সম্রাটের গলা,সম্রাট ও নিজের সাথে আরো গভীর ভাবে চেপে ধরে, ঘরে এনে বিছানায় বসিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো,,
সম্রাট:- কিছু কথা মুখে নয় কাজে বোঝাতে হয় তাই না!
সম্রাটের কথার মানে বুঝতে একটু সময় লাগলো না পারির,লালিমায় মাখো নজর নিচু হয়ে এলো,সম্রাট গিয়ে বারান্দার দরজা বন্ধ করে দিলো,পারি কেমন অনুভব করছে,জানে পরবর্তী মুহুর্ত, সম্রাটের সাথে এরকম একটা মুহূর্তের স্বপ্ন তো বহু বছর আগেই দেখেছিলো কিন্তু মাঝের ঘটনা গুলো কেমন সব এলোমেলো করে দিলো,সম্রাট ধীর পায়ে এগিয়ে এসে খাটের পাশে দাঁড়ালো,এক টানে নিজের গায়ের টি শার্ট খুলে ফেললো, সম্রাটের টি শার্ট খুলতে দেখে পারির অস্থিরতা আরো বেড়ে গেল,সম্রাট পারির অস্থিরতা অনুভব করছে, মিটিমিটি হেসে পারির দিকে ই এগিয়ে আসছে,দু হাতে পারির ছোট্ট মুখটা নিজের খুব মুখের কাছাকাছি নিয়ে আসলো,খুব গভীর করে দেখছে পারির কাজল কালো নয়ন জোড়া,যখন ঠোঁটের দিকে দৃষ্টি পড়লো নিয়ন্ত্রণ হারা হয়ে পড়লো ,, এগিয়ে গেল তার দিকেই ,এমন মুহূর্তে,,
পারি:- আমার উত্তর চাই!
থেমে গেল সম্রাট, কিছুটা ঢিলা হয়ে গেল হাতের বন্ধনী, চোখে চোখ রেখেই বললো,
সম্রাট:- আমার পারিজাত সবসময়ই পবিত্র, ঠিক যেমন ফুল পবিত্র!
পারি:- তোমার আমার প্রতি কোন অভিযোগ নেই?
সম্রাট:- আছে! থাকবে না কেন! তুমি বারবার আমাকে আঘাত করেছো? একবার ভুল বুঝে দূরে চলে গেছ, আবার যখন নিজ থেকে বেহায়ার মতো এগিয়ে গেলাম তখন টাকা-পয়সার মতোই অন্যকে দান করতে চলে-ছিলে,, এরপর যতবারই আমি এগিয়ে এসেছি সম্পর্কে পূর্ণতা দিতে ঠিক ততবার ই তুমি এভাবেই আমাকে বাধা দিয়েছো! আমাদের সম্পর্কে শুরু থেকে আজ অবধি যতটা উত্থান পতন হয়েছে সবটাই তোমার একার কারনে! এরপর ও অভিযোগ থাকবে না বলে তোমার মনে হয়!
সম্রাটের কথায় পারির চোখ ছলছল করছে, সম্রাটের অভিযোগ গুলো ঠিক, সম্পর্কের শুরু ওর দিক থেকে যেমনি হয়েছিলো ঠিক এই সম্পর্কে টানাপোড়েন সবটাই ওর একার দায়িত্বে হয়েছে,সম্রাট কখনোই কোন বিষয়ে ওর সাথে বিতর্কে যায় না!তবে ওর খামখেয়ালিপনা আর অতিরিক্ত জেদি মনোভাবের কারণে ভুক্তভোগী হয়েছে বহুবার!
সম্রাট:- তবে আজকে কোন ভাবেই এই মুহুর্ত নষ্ট করতে দিবো না আমি!
পারি:- I am sorry!
সম্রাট:- উহু, sorry তে কাজ হবে না!.
পারি:- তাহলে কি করলে হবে?
সম্রাট উত্তর মুখ দিয়ে না দিলেও ওর চোখ দেখেই পারি উত্তর বুঝে নিলো, নিজেকে বাঁচাতে সম্রাটের বুকে মুখ গুজলো,সম্রাট শক্ত করে ধরে কানের লতিতে ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
সম্রাট:- আমাদের একটা ফুটবল টিম বানানোর কথা ছিলো তাই না! তার জন্য কাজ তো অবশ্যই করতে হবে, এখন তুমি সেই কাজটাই করবে তবেই তোমার সব অপরাধ মাফ হবে!
পারি নিজেকে আরো লুকিয়ে ফেলল,দ্রুত গতিতে চলতে থাকা হৃদয়ের বাদ্য কর্ণগোচর করতে ব্যর্থ হলো না সম্রাট,,
তুমি সবসময় পবিত্র, সদ্য ফোটা রক্ত জবার মতো, তুমি শীতল অনুভূতি, ঠিক ভোরের শিশির বিন্দুর মতো, তুমি রঙের বাহার মেলে ধরা সেই ঘাস ফড়িং যাকে দেখলে আমার হৃদয়ে লালন করা সুপ্ত অনুভূতি'রা জানান দেয় ভালোবাসার রঙে নিজেকে রাঙাতে,সুখের লহমায় ভেসে যেতে, তুমি আমার ভালোবাসার সুখ ফড়িং , তুমি আমার ভালো থাকার সুখ ফড়িং! তোমার চঞ্চলা মন আর উত্তাল চলন আমার হৃদয়ে ঝড় তুলে দেয়,যাকে শান্ত করতে আমার তোমাকেই চাই, একান্তই তোমাকে চাই! হবে কি তোমার ভালোবাসার ঘরে আমার মতো এক ভালোবাসার কাঙালের আশ্রয়! দেবে কি বসতে তোমার হৃদয়ের শীতলপাটি বিছিয়ে যেথা আমি নিবো এক প্রশান্তির নিঃশ্বাস ; শোনাবে কি সেই প্রেম-বাক্য যাতে ধন্য হয় এই ক্লান্ত প্রেমিকের মন! পাবো কি অনুমতি সেই ঘরের মালকিনের মিষ্টি সুধা পান করার!
এত সুন্দর করে,এত আবেগ মিশিয়ে কেউ যদি নিজের অনুভূতির জানান দেয় তবে কি তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেওয়া যায়, কখনোই না, পারি ও পারলো না! মিশে গেল সেই প্রেমিক পুরুষের সাথে যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে বহুবছর আগে! প্রেমিক স্বামী হয়, কিন্তু কজন স্বামী প্রেমিক হয়?
পারির হয়েছে, সম্রাট যেন নব রুপে ধরা দিয়েছে ওর কাছে!
অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একসাথে হলো এই প্রেমিকযুগল! নিজেদের মাঝের ভুল - অভিমানের যেই দেয়াল তাঁরা তুলেছিলো তাকে ভেঙে মিশে গেল একে অপরের সাথে!
ভোরের মিষ্টি রোদের সোনালী ঝলকানি র হালকা উঁকিঝুঁকি তে কপাল কুঁচকে এলো পারির,, বাম হাতে ভর দিয়ে,বাম দিকে কাধ হয়ে মাথা উঁচিয়ে পারিকেই দেখছিলো সম্রাট,অভ্যাসগতই তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙ্গেছে,যখন থেকে চোখ মেলেছে তখন থেকেই শুধু পারিকেই দেখে যাচ্ছে,কাল রাতে দুজন কত কাছে ছিলো,এই কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তো সেই কবেই শুরু হয়েছে তবে কালকের পর থেকে সেটা বেড়ে গেছে, ভেবেছিল পারির সাথে স্বেচ্ছায় আর কথা বলবে না, কিন্তু ঐ চিঠি পড়ার পর ও যদি সম্রাট মুখ ঘুরিয়ে রাখতো তাহলে পারি যেকোন বড় ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে! তাছাড়া সবটা পরিষ্কার হয়েই গেছে তবে কেন সে অভিমান পুষিয়ে রাখবে!
চোখে রোদ পড়াতে পারি নড়েচড়ে উঠলো,এটা দেখে সম্রাট আরো একটু এগিয়ে এসে রোদের দিকে নিজের পিঠ রাখলো, পারি শান্ত হয়ে আবার ও ঘুমের দেশে চলে গেল, সম্রাট মুচকি হেসে কল্পনায় ডুব দিলো!
অতীত নয় বছর আগে;;;;;
সম্রাট তখন অনার্স ফাইনালের পরীক্ষার্থী, পড়াশোনা নিয়ে এমনিতেই ব্যস্ত তার মধ্যে খবর এলো বার্ষিক ফুটবল প্রতিযোগিতার কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিষয়ে সম্রাট কখনোই খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবে নিজেকে জড়াতে চাই তো না,,কাজ করে পড়াশোনা করার সময় ই হতো না সেখানে অতিরিক্ত কিছু করা বা চাওয়া সেটা একদম ই বাড়াবাড়ি মনে হতো! তবুও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার কারনে অনার্স জীবনের শুরু তেই ফুটবল প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিলো,ভালো খেলার কারনে প্র্যাকটিস অবস্থায় ই সবার নজরে আসে! তাই কোচ দলনেতা হিসেবে ওকেই নির্বাচন করে সেই সুবাধে মোটামুটি ভালোই পরিচিত লাভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল শিক্ষার্থীদের কাছে!
এরকম একদিন ফুটবল প্র্যাকটিস করার সময় চোখ যায় পাশে থাকা বাস্কেটবল খেলতে ব্যস্ত থাকা কিছু মেয়েদের উপর!
পর্ব ৬০
হালকা গোলাপী রঙের লেডিস টি শার্টের সাথে অফ হোয়াইট লেডিস ফর্মাল প্যান্ট,দুটো বেণী করা লম্বা চুল দু পাশে দুলছে,কানে সাদা মুক্তার টপ পড়া গোলাপী লিপবাম দেওয়া রমনীকে যেন সদ্য ফোঁটা গোলাপ কলি মনে হচ্ছে! অতিরিক্ত ফর্সা হলেও গোলাপী ড্রেসের কারণে পুরো মুখটা'য় কেমন গোলাপী একটা আভা ফুটে উঠেছে!
বল বাস্কেটে ছুঁড়ে মারার পর পর ই খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে,কখনো চোখ বন্ধ করে তো কখনো উল্টো হয়ে বল ছুঁড়ছে এবং সেটা একদম পারফেক্ট'লি বাস্কেটে গিয়ে পড়ছে! নিঃসন্দেহে এটা তার অসাধারণ প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ, এবং সেটা সে নিজেও উপভোগ করছে তার সাথে বন্ধুদের করতালি এবং প্রশংসা বাণী দুটোই তাকে আর ও বেশি উৎসাহিত করছে যার দরুন গোলাপ রাঙ্গা ঠোঁটের হাঁসি থামছেই না!
-hey bro, what are you doing man ! where is your concentration?
অনুশীলন রত অবস্থায় থাকা অন্য এক ছেলের কথায় ধ্যান ফিরে সম্রাটের,,মুখে এবং চোখে হঠাৎ ই কোন পাওয়া খুশির আভা প্রজ্জ্বলিত হয়! একবার বাস্কেটবল কোর্টের দিকে চোখ বুলিয়ে নিজের অনুশীলনে মনোনিবেশ করে!
অনুশীলন শেষে সবাই সবার মতো নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যেতেই আবার ও মনে পড়ে গোলাপী মেয়েটার কথা! কিন্তু হায় কোর্ট তো খালি ! সূক্ষ্ণ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে! কোমরে হাত রেখে এদিকে ওদিকে একবার দেখে কোথাও না দেখতে পেয়ে নিজের কাজে আবার ও মনোযোগ দেয়!
কিন্তু কিসমতে যে আবার ও দেখা হবার কথা লিখা ছিলো!
ফুটবলের ফাইনাল খেলার দিন আবার ও হঠাৎ করেই দেখা পেয়ে যায় সেই গোলাপের! অথচ এতদিন অনেক খুঁজেছে! ফাইনাল খেলার সময় যখন অবস্থা খুবই শোচনীয়, দলের সবাই বেশ হতাশ তখনই হঠাৎ করেই স্টেডিয়াম থেকে ভেসে আসে জয়ধ্বনি,উহুম তখনো জিত হয় নি তবুও এরকম জয়ধ্বনি খেলোয়াড়দের মাঝে উত্তেজনা তৈরি করে,আর তাই হয়তো পারি হঠাৎ করেই নিজের থেকে চিৎকার করা শুরু করে,উহুম চিৎকার নয়! জয়ধ্বনি,,স্লোগান দিচ্ছে যাতে তাদের খেলায়ার'দের মাঝে উত্তেজনা তৈরি হয়! হলো ও তাই! হঠাৎ করেই নিভিয়ে যাওয়া টিম জেগে উঠলো! তার মাঝে সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত হলো টিম ক্যাপ্টেন সম্রাট মাহমুদ তালুকদার!
ঠোঁটের কোনে আটকে থাকা হতাশার দীর্ঘশ্বাস চওড়া হাসিতে পরিণত হলো, কিভাবে যেন পূণরায় জোস ফিরে এলো! উদ্দাম গতিতে দামাল ছেলেরা জিতে নিলো ম্যাচ তার সাথে জিতে গেল ম্যান অফ দা ম্যাচ, সর্বোপরি জিতে নিলো ভার্সিটির আপাতত ক্রাশ পারিজাত আবরার চৌধুরীর মন!
হ্যা পারি সেদিন সম্রাটকে উৎসাহিত করতেই ওভাবে চেঁচিয়ে'ছে! খেলা চলাকালীন দিনগুলোতে পুরো সময় ই পারি সম্রাটকে নজরে রেখেছে! বাস্কেট-বলে সেদিন সম্রাটের ওরকম দেখার বিষয়টা পারির অগোচরে করতে পারেনি,হ্যা পারি দেখেছে সম্রাটের মুগ্ধ চাহনিতে তাকিয়ে থাকা,,আর তাই তো লজ্জায় গোলাপী হয়ে গিয়েছিল!
তবে এবার ও সরাসরি দেখা কিংবা কথা হয়নি ওদের! কারণ খেলা শেষ করে সমস্ত ফর্মালিটিজ শেষ করেই সম্রাট স্থান পরিত্যাগ করে!
দেখা নেই বহুদিন দুজনের, একজন ব্যস্ত নিজের চুড়ান্ত পরীক্ষার পড়াশোনা নিয়ে, আরেকজন ব্যস্ত নতুন পরিবেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা নিয়ে!
এরপর হঠাৎ করেই একদিন দেখা হয় আবার ও দুজনের,, নবীন বরণ উৎসবে লাল জামদানি শাড়িতে ,গাঁজরা-গোজা খোঁপায় আর রক্ত জবা লিপস্টিকে, অমাবস্যার ন্যায় কুচকুচে কালো কাজলে যখন স্টেজে নজরুল সঙ্গীতের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করতে দেখে মুহূর্তে ই যেন সম্রাটের হৃদ ক্রিয়া বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে যায়; থমকে যায় চাহনি, পরবর্তীতে নিজেকে সংযত করে দৃষ্টি নামিয়ে নেয়,ভালোলাগার রেস'টাকে দমিয়ে নেয়! নিজেকে বোঝায় সবকিছু তে মুগ্ধ হতে নেই! সবকিছু সবার জন্য নয়! কিছু কিছু চাওয়া না পাওয়াই শ্রেয়! কিছু চাওয়া না চাওয়াই মঙ্গল! আর গরীবদের বেলায় তা একান্তই জরুরী!
নিজেকে শাসিয়ে স্থান পরিত্যাগ করে, এরপর দেখা নেই বহুদিন! পরীক্ষা শেষ হওয়ার কিছু দিন পরেই সম্রাট পারির সন্ধানে গিয়েই জানতে পেরেছিলো পারির ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে! পারির ওয়েস্টার্ন ধাঁচের চলন বলনে কিছু টা মনোক্ষুন্ন হলেও, পরবর্তীতে ওর পারিবারিক অবস্থা বুঝতে পেরে, বুঝতে পারে ওর লাইফ স্টাইল সম্পর্কে ! আর তার সাথে নিজের অবস্থান নিয়ে বিব্রত হয়! উপলব্ধি করে দুজনের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক! যা টপকানো'র সাহস ও সামর্থ্য কোনটাই নেই! তাছাড়া যদি পারি ই না গ্রহন করে! কেন ই বা করবে ? সামান্য একজন মটর মেকানিক্সকে কেন ই বা একজন কোটিপতির এক মাত্র সন্তান নিজের জীবন সঙ্গী হিসেবে গ্রহন করবে? ওর জন্য তো
বহু ধনীর দুলাল অপেক্ষায় থাকে,কত কত বড়লোক বাবার সন্তানেরা ভার্সিটির এড়িয়ায় ওর জন্য ঘুরঘুর করে! তবে কেন সে একজন সামান্য রিক্সা চালকের ছেলেকে নিয়ে ভাববে!
এরকম বহু ভাবনার বেড়াজালে নিজের আবেগকে আবদ্ধ করে নিলো সম্রাট, অনার্স পরীক্ষার পর নবীন বরণ উৎসবে দিন যে ভার্সিটি আসলো এরপর আর আসেনি! আর এই অনুপস্থিতি খুব অস্থির করে তুললো শান্ত-শিষ্ঠ পারিকে!
দেখতে দেখতে কেটে গেছে বহুদিন,, সম্রাটের অনুপস্থিতি খুব করে কাঁদাচ্ছে পারি কে! অতিরিক্ত আবেগী পারি যেন নিজের না বলা অনুভূতির মানুষটাকে না দেখতে পেয়ে প্রায় পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম! আর এদিকে সম্রাট নিজের আবেগ অনুভূতি কে গলা চেপে হত্যা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে জীবনের দৈনন্দিন ব্যস্ততায়!
তবে বিধাতার ইচ্ছা যে অন্য কিছু ছিলো ,,
মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয়ে যায়,,সম্রাট আবার ও নিয়মিত ভার্সিটি আসা শুরু করে,খবর পারি অবধি পৌছে যায়, ভার্সিটির কোন বিষয়ে না থাকা সম্রাট রেজাল্টে টপ এবং পরপর দুইবার ফুটবল ম্যাচ জেতাতে বেশ পরিচিত লাভ করে যার দরুন তার উপস্থিতি অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই বেশ উপভোগ্য তাছাড়া তার সুদর্শন পুরুষ হিসেবে ও বেশ জনপ্রিয়,যার দরুন বহু নারীর পছন্দের তালিকায় নিঃসন্দেহে প্রথমে কিন্তু তাতে সম্রাটের কিছুই যায় আসে না।সে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত আর তাই সে খুব ভালো করেই জানে যারা তার মেধা এবং শারীরিক অবস্থার উপর ফিদা তারাই তার ব্যাকগ্রাউন্ড জানলে হাসাহাসি করবে,জানে না বললে ভুল হবে! জানে তবে তারাই যারা ওর সত্যিকারের বন্ধু! যাদের ওর পারিবারিক অবস্থা নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই! সম্রাট যেহেতু ভার্সিটিতে নিয়মিত আসে না সেহেতু ওর সবার সাথে খুব একটা সময় কাটানো হয় না তাই ওর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কোন ঝামেলা পোহাতে হয় না! তবে যাদের সাথে সময় কাটানো হয় তারা সবটাই জানে!
নিজের তথ্য দাতার থেকে খবর পেয়ে পারি নিজেই ছুটে আসে সম্রাটের বিভাগের দিকে,দূর থেকে দেখেই মুখে হাঁসি ফুটে উঠে কিন্তু পরক্ষণেই মুখটা অন্ধকার হয়ে যায় যখন দেখলো সম্রাট ওকে দেখে মুখটা ঘুরিয়ে ফেলে,কপাল কুঁচকে একটা বিরক্তিকর আভা ফুটিয়ে তোলে! অজান্তে কান্না করে দেয় পারি! কিন্তু তাতেও সম্রাটের হেলদোল হলো না! নিষ্ঠুর পুরুষ চলে যায় আপনমনে!
সেদিন পারি আর বাকী ক্লাসগুলো করে না! সম্রাট ও এরপর আর ভার্সিটি আসে না! শান্ত পারি আর শান্ত না থেকে খোঁজ লাগালো সম্রাটের,, তথ্য সংগ্রহ করলো ওর বন্ধুর মাধ্যমে! জানতে পারলো সম্রাটের সম্পর্কে; বিস্তর জেনেও কোন ভাবাবেগ দেখা দিলো না ওর মধ্যে! সম্রাটের দেখা পাবে এটাই ওর জন্য পরম পাওয়া ছিলো!
কিন্তু কিভাবে দেখা করবে সেটা নিয়ে পড়ে গেল বিশাল চিন্তায়; বুদ্ধি দিলো সাথে থাকা কুট-বুদ্ধি ওয়ালা বান্ধবীরা! নিজের হাতে নষ্ট করলো মাত্র জন্মদিনে উপহার পাওয়া নতুন গাড়ী'টার! ফোন করলো সম্রাটের গ্যারেজে,ততৎক্ষনাৎ সার্ভিসের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো গাড়ী সাথে গেলো গাড়ী'র মালকিন নিজে!
সম্রাটকে সাহায্য করা ছেলেগুলো কাজ করতে চাইলে পারির নিষেধাজ্ঞার কাছে হার মানলো, পারির আবদার সম্রাটকে ই ঠিক করতে হবে!বাধ্য হয়ে ডেকে আনা হলো
সম্রাট এসে পারিকে দেখে চমকা'লো কিন্তু তার রেশ বেশি দুর টিকলো না,কারন জানতো এমনটাই হবে! পারি যে সম্রাটের অ থেকে ং পর্যন্ত খবর নিয়েছে সেটা সম্রাটের কান অবধি পৌঁছে গেছে! তাই নিজেকে ধাতস্থ করে কাজে লেগে যায়,গাড়ী ঠিক করা অবধি পারি পাশেই বসে ছিলো, একমনে এক ধ্যানে শুধু দেখে গেছে তার দেখা সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষটিকে,যার তার প্রতি নেই কোন টান,নেই কোন অনুভূতি!সত্যিই কি তাই! উহুম! তা হলে নিশ্চয়ই এই হালকা ঠান্ডা আবহাওয়ায় ও এত ঘামতো না সম্রাট; পারি যে ওকে দেখেই যাচ্ছে সেটা ভাবতেই কেমন অস্থির অনুভব করছে! যেই মেয়ের থেকে বাঁচতে এত যুদ্ধ নিজের সাথে করে যাচ্ছে সেই মেয়েই ওকে এভাবে এক চিত্তে দর্শিয়ে যাচ্ছে আর ও চেয়েও পারছে না তাকে এক নজর দেখতে!এক নজর দেখতে না পারার যে কি কষ্ট সেটা যদি সম্রাট পারিকে বোঝাতে পারতো!
সম্রাট:- সজিব ম্যাডাম'দের জন্য কফি নিয়ে আয়!
ছোট্ট ছেলেটার নাম ধরে ডেকে কফি অর্ডার দিলো,এটা শুধু বাহানা ছিলো আসল উদ্দেশ্য ছিলো পারির ধ্যান অন্যত্র সরানো,পারির এই এক মনে ওকে দেখে যাওয়াটা ওকে বেশ অস্থির করে তুলছে!
পারি:- আমি কফি না জুস অথবা কোল্ড ড্রিংকস খাবো!
একদম সহজ আবদার, কোনরকম দোনামোনা নেই,যেন অতিপরিচিত,প্রাত্যহিক আচরণ, নিয়মিত আলাপ করা মানুষের সাথে ই বললো কথাটা,সম্রাট কিছুটা আশ্চর্য হলো! যতই দেখা হোক,হয়েছে তো দূরে থেকেই,কথা তো ভালো কথা কোনদিন সামনাসামনি দেখাও তো হয়নি দুজনের! অথচ এই মেয়ের আবদারে মনে হচ্ছে বহু সময়ের পরিচিত কারো সাথে কথা বলছে! নিজের বিস্ময়ের মাঝেই বললো,,
সম্রাট:- ম্যাম কি কি খাবে জেনে নে, তারপর যা! তাড়াতাড়ি আসবি!
সজিব:- আইচ্ছা!
ছেলেটা সম্রাটের কথায় সম্মতি দিয়ে পারির সামনে এসে দাঁড়ায়,পারি একবার ছোট্ট বাচ্চা ছেলেটাকে দেখে নেয় ভালো করে তারপর করে বসে অদ্ভুত এক কাজ, ছোট্ট শ্যাম বর্ণের নাদুসনুদুস ছেলেটার গাল দুটো একবার টেনে দেয়,তো একবার টিপে দেয় আর সাথে সাথে ই নিজেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে! ওর সাথে ওর বান্ধবীরাও হাসছে! সম্রাট হাসির শব্দে গাড়ীর ভেতর থেকে মুখ বের করে মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে পারির ভুবন ভোলানো হাসি! কিন্তু বেচারার সেই মুগ্ধতায় পানি ঢেলে ছেলেটা চিৎকার শুরু করে,,
সজিব:- ভাইয়া!
গাল এভাবে টেনে দেওয়ার বিষয়টি ছেলেটার ভালো লাগেনি,তার ইগোতে লেগেছে,কেন একটা অপরিচিত বেগানা নারী তাকে ছুঁলো এটাই তার আক্ষেপ! ওর কথা শুনে পারি'দের চোখ কপালে উঠার উপক্রম,
এতটুকু বাচ্চা সে আবার বেগানা/বেগান নারী পুরুষের মাঝেও তফাৎ বুঝে! আশ্চর্য আল্লাহ কি দিন আসলো!
সম্রাট:- ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী তাই এইসব বিষয়ে বুঝতে সময় নেয় নি তাছাড়া ওর গাল টানা ওর একদম পছন্দ নয়! তাই এমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে!
পারি:- আউউউ সুইট!
কথাটা শেষ করে আবার ও গাল টেনে দেয়, এবার চিৎকার দেওয়ার আগেই অন্য একটি ছেলে মুখে হাত দিয়ে চাপা দেয়,ছেলেটা অগ্নিমূর্তি হয়ে পারিকে দেখছে কিন্তু পারি'তো তার সেই রুপ দেখে হেসেই চলেছে, অপরদিকে সম্রাট মুগ্ধ নয়নে দেখছে পারির হাসি মাখা মুখটা!
পর্ব ৬১
সম্রাট:- অনেক হয়েছে এবার যে যার কাজে যাও!
নিজের মুগ্ধতাকে ছুটি দিয়ে,সবার উদ্দেশ্যে কথাটা বলে,পারি সম্রাটের এহেন কথায় মুখ ভেংচি দেয়,সম্রাট আড়চোখে তা দেখে আক্কেল গুড়ুম হওয়ার উপক্রম,এই মেয়ে এমন বাচ্চা তাতো সে আগে বুঝতে পারেনি,,
সজিব:- কন কি কি আনমু?
নিজের জেদ'কে বিতারিত করে সম্রাটের ধমকে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও পারির সামনে গিয়ে চোখমুখ কুঁচকে পারির কাছে জানতে চায় পারির ইচ্ছা,,
পারি:- ফুচকা ছয় প্লেট, অরেঞ্জ জুস একটা,চিপস ছয়টা অবশ্যই পটেটো ক্র্যাক্রার্স আনবে, আপাতত এগুলো'ই আনো পরে লাগলে আবার বলবো! ওহ হ্যা ওরা ঠান্ডা কিছু নাকি কফি খাবে তা ওদের থেকেই শুনে নেও!
পারির অর্ডার শুনে সবাই তাকিয়ে রয়েছে,মানে একজনের জন্য ছয় প্লেট ফুচকা,ছয়টা চিপস! সম্রাটের তো কাশি উঠে গেছে,এই মেয়ে কি ওকে ফকির বানানোর ধান্দায় নেমেছে! এত কিছু অর্ডার দিয়ে এখন আবার বলছে লাগলে পরে আরো দিবে!
তবে হাসি ও আসছে অনেক পারির পাগলামি দেখে!জানে এগুলো পুরোটাই ওকে নাস্তানাবুদ করার জন্য ই করছে!
সম্রাট:- ম্যাম যা যা বললো তার সব নিয়ে আয়! তাড়াতাড়ি আসবি আমার কাজ প্রায় শেষ!
সজিব:- আইচ্ছা;
সজিব অর্ডার দিতে চলে গেল,সম্রাট নিজের কাজে মনোযোগী হলো,পারি'ও আবার সম্রাটের দিকে মনোনিবেশ করলো,আর তা দেখে ওর বান্ধবীরা মিটমিটি'য়ে হেসে চলছে, সবটাই সম্রাটের কানে আসছে কিন্তু তবুও নিরুত্তর হয়ে রইলো;
খাবার নিয়ে আসলে পারি'দের সামনে ছোট একটি টেবিল পেতে দেওয়া হয় তার মধ্যে সবগুলো রেখে ওরা গোল হয়ে বসে, চিপস গুলো পারি সব নিজের কাছে রাখে, সেটা দেখে ওর বান্ধবীরা চোখ মুখ কুঁচকে নেয়,মানে ওদের ও দিবে না,তা কি করে হয়! কিন্তু পারি তো পারি ই! ফুচকার প্লেট চার বান্ধবী চারটা নিলো,দুটো বাকী,সজিব খাবার দিয়েই নিজের কাজে চলে যায়,পারি এদিকে ওদিকে তাকিয়ে ওকে খুঁজে,তা দেখে অন্য একজন জানতে চাইলে,
পারি:- বাচ্চা টা কই!
এর মধ্যেই সজিব কে এদিকেই এগিয়ে আসতে দেখা যায়,তা দেখে হাসি ফুটে পারির মুখে,
পারি:- এদিকে এসো!
সজিব তো পারিকে সহ্যই করতে পারছে না,এখন আবার ডাকছে মনে হয় আবারও গাল টানার ইচ্ছা হয়েছে; ইচ্ছা করছে মবিল মেরে পারির মুখ কালো করে দিতে কিন্তু এত সুন্দর একটা মেয়েকে কালো করতেও দ্বিধা বোধ কাজ করছে!
সজিব:- কন!
পারি:- এদিকে এসো
সজিব:- ক্যান?
পারি:- বসো আমার পাশে!
সজিব:- কি করতে হইবো?
পারি:- কিছু না, আমার পাশে বসো আর এই প্লেট থেকে খাও!
সজিব:- কিন্তু আপনার টা আমি খামু ক্যান?
পারি:- এটা আমার না, তোমার।
সজিব:- আমার!
পারি:- হ্যা; তোমার !
সজিব:- কিন্তু এগুলো তো আপনার জন্য আনাইলেন!
পারি:- আরে ধুর মিয়া কি বলো,এত গুলো কিভাবে আমি একা খাবো!
সজিব:- তয়!
পারি:- সবার জন্য এনেছি, সবাই মিলে একসাথে খাবো তাই!
পারি নিজের কথা শেষ করে বাকী ছেলেদের বললো অন্য প্লেটটা নিয়ে খেতে, সবাই বেশ অবাক হলো পারির ব্যবহারে, আবার খুশি ও হলো ! সম্রাট আড়চোখে সবটাই দেখছে,পারির ব্যবহারে আবার ও মুগ্ধ হলো,সজিব ও পারির এখনকার ব্যবহারে মুগ্ধ হলো,গাল টানার বিষয়টাও ভালো লাগলো,খুশি খুশি পারির পাশে বসেই খেতে লাগলো, পারি উঠে দাঁড়ালো, ধীর পায়ে হেঁটে গাড়ী'র সামনে গিয়ে দাঁড়ালো,, সবাই টুকটাক আলোচনার মধ্যেই মজা করে ফুচকা খাচ্ছে!
মুখের সামনে ফুচকা দেখে আশ্চর্য চোখে পারির দিকে তাকালো,হাসি হাসি মুখটা বারবার চোখের ইশারয় বলছে ফুচকা খেতে,,
সম্রাট:- এসব কি?
পারি:- ফুচকা!
সম্রাট:- সেটা আমিও দেখতে পারছি, কিন্তু আমার সামনে কি করছে সেটা জানতে চাইছি!
পারি:- কি করছে মানে কি? খাওয়ার জন্য দিচ্ছি!
সম্রাট:- আমি ফুচকা খাই না, তাছাড়া আপনি কেন আমাকে খাইয়ে দিবেন?
পারি:- আশ্চর্য! আমি ছাড়া কে খাওয়াবে? আছে নাকি কেউ? থাকলেও তাকে বিদায় করুন,না হলে আমি কিন্তু!
সম্রাট:- কি সব আজাইরা কথা হচ্ছে এগুলো! আপনি আপনার খাবার খান আমাকেও আমার কাজ করতে দেন;
পারি:- একটা নিলে কি হয়!
সম্রাট:- না আমি এই সব অদ্ভুত খাবার খাই না!
পারি:- প্লিজ!
সজিব:- ওস্তাদ খাও অনেক মজা!
পারি:- হ্যা প্লিজ!
সম্রাট:- আরে আমি;;
কথা বলার জন্য মুখ খুলতেই টুপ করে একটা ফুচকা সম্রাটের মুখে ঢুকিয়ে দেয়, সম্রাট আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকে,কি বলবে? কি করা উচিত এই মুহূর্তে? এই মেয়ের থেকে দূরে থাকার জন্য প্রতি নিয়ত নিজের সাথে যুদ্ধ করছে আর এই মেয়ে তো ওর ভেতর ই গেঁথে বসার পরিকল্পনা করছে!
পারি বিশ্ব জয়ী হাসি দিয়ে আবার ও নিজের দলের কাছে ফিরে এলো, সম্রাটের কাজ ও শেষ হয়ে গেছে! সবটা পূণরায় চেক দিয়ে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে পারির সামনে এসে দাড়ালো,
সম্রাট:- কাজ শেষ! একবার চেক করে দেখতে পারেন!
পারি:- দরকার নাই!
সম্রাট:- মানে?
পারি:- মানে I trust you!আমি জানি আপনার হাতে জাদু আছে, সুতরাং অযথা চিন্তা নিয়ে লাভ নাই!
সম্রাট:- আচ্ছা! তা আপনি কি করে জানেন?
পারি:- এত পপুলার মানুষের খবর নেওয়া কোন কঠিন কাজ নয় নিশ্চয়ই!
সম্রাট:- পপুলার আর আমি!
পারি:- হুম!
সম্রাট:- সেটা কিভাবে?
পারি:- ওমা! সম্রাট বললেই ভার্সিটির মেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে,ফুটবল ম্যাচের ফাইনালের দিন মেয়েরা ছবি তোলার জন্য কিভাবে লাইনে দাঁড়িয়েছিলো! পপুলার না হলে তো এমন হতো না, পপুলার বলেই হয়েছে!
সম্রাট:- কি সব যা তা বলছেন! এমন কিছু না!
পারি:- সত্যি ই কিছু না!
সম্রাট:- নাহ!
পারি:- কি না !
সম্রাট দেখছে পারির মুখ লাল হয়ে গেছে,রেগে যাচ্ছে! কেন? এই মেয়ে কি জেলাসি ফিল করছে? আদৌও সম্ভব? কিভাবে? এখনও তো ওদের মাঝে তেমন কিছু হয়নি! তাহলে?
পারি:- কি হলো বলছেন না কেন? কি না? কোনটা না?
সম্রাট:- বাদ দিন!
পারি:- কেন বাদ দিবো! আমাকে আমার উত্তর দিতেই হবে এবং তাও এখনই!
সম্রাট:- আশ্চর্য!
পারি:- কি আশ্চর্য!.
সম্রাট:- আচ্ছা আমি বুঝলাম না আমার সাথে মেয়েরা ছবি তুললে আপনার কি সমস্যা? আপনি কেন এত রি-এ্যাক্ট করছেন?
পারি চোখ মুখ কুঁচকে নাক ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে,পারির চেহারা দেখে এই মুহূর্তে সম্রাটের পেট ফাটা হাসি আসছে, কিন্তু তাও নিজেকে সংযত রেখে আবার ও বললো,,
সম্রাট:- ভালো খেলেছি,পর পর দুই বার ম্যাচ জিতেছি সেই সুবাধে মেয়েদের চোখে হিরো হতেও পারি, তাছাড়া দেখতেও মোটামুটি হ্যান্ডসাম সুতরাং মেয়েরা দুই একজন লাইনে থাকতেই পারে,অবশ্য যদি না ই থাকে তবে কিসের কি পুরুষ হলাম; এই যে এত মেহনত করে জিম করে শরীর বানালাম তাতে যদি দু চার জন রমনীকে কুপোকাত ই না করতে পারি তবে কিসের পুরুষ হলাম!
পারি:- তাই না!
সম্রাট:- কোন সমস্যা!
পারি:- নাহ! ওকে! এই চল !
ছলছল চোখে নিজের বান্ধবীদের উদ্দেশ্যে বলে নিজেই হনহনিয়ে গাড়ীতে উঠলো, সম্রাট আশ্চর্য বিমুড় হয়ে দেখছে পারিকে,এই কিছু সময় পূর্বে খিলখিলিয়ে হেঁসেছিলো আবার এই এখনই সামান্য কথায় কাঁদতে শুরু করলো,এই মেয়ে এত সেনসিটিভ! তাছাড়া ও বললো'ই বা এমন কি যাতে কারো কান্না চলে আসে! পারির গাড়ী স্টার্ট দেওয়াতে মনে পড়লো,
সম্রাট:- এক্সকিউজ মি! আমার মনে হয় আপনি কিছু ভুলে যাচ্ছেন!
সম্রাট গাড়ী'র জানালায় টোকা দিয়ে পারির উদ্দেশ্য করে কথা টা বললো,পারির বান্ধবীরা ঢুকতে গিয়েও দরজা খুলে দাড়িয়ে রইলো,বুঝলো না সম্রাটের কথার মানে,পারি'ও উজবুকে'র মতোই তাকিয়ে আছে,সম্রাট নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করলো,
সম্রাট:- ম্যাম আই থিংক আপনি ভুলে গেছেন, অসুবিধা নাই; আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি!
পারি তখনও তাকিয়ে আছে সেই একই ভঙ্গিতে,সম্রাট একবার ভালো করে বেকুব পারির দিকে তাকিয়ে তারপর কিছুটা নিচু শব্দেই বললো,,
সম্রাট:- পেমেন্ট!
পারি:- কিসের পেমেন্ট!
সম্রাট: - ওমা এই যে কিছু সময় আগে গাড়ী সার্ভিস করালেন সেটার পেমেন্ট করবেন না!
পারি:- ওহ; কিন্তু আমার কাছে তো কোন টাকা নেই!
ডাহা মিথ্যা কথা,সম্রাটকে ক্ষেপানো'র জন্যই বলছে,
ওর বান্ধবীরা ও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে,সম্রাট কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে, অবিশ্বাস্য ব্যাপার, অবশ্যই অবিশ্বাস্য ব্যাপার! বড়লোক বাপের মেয়ে তার কাছে টাকা নাই,হুহ্ তাও সম্ভব! আর সেটা বিশ্বাস করতে হবে? এদের ব্যাগ ঝাড়া দিলে দু/চার পাঁচ হাজার এমনিতেই বেরিয়ে আসে ! আর এই মেয়েকে সে তো আগেই দেখেছে কিভাবে ক্যান্টিনে বসে টাকা উড়ায় বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়ার সময়,, গরীবদের ও সাহায্য করার দৃশ্য তার চোখ এড়ায় নাই,,অথচ এখন কি সব বলছে!
সম্রাট:- টাকা না থাকলে কাজ কেন করালেন!
পারি:- আমি কি জানতাম নাকি আপনাকেও টাকা
দেওয়া লাগবে!
সম্রাট:- মানে কি আমাকে দেওয়া লাগবে? আমি কি কাজ করিনি? আমার কি শ্রম খরচ হয়নি? সময় লাগেনি!
পারি:- আচ্ছা ঠিক আছে দিচ্ছি!
কথা শেষ করে পারি গাড়ী থেকে নামলো, তারপর সম্রাটের সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো ওকে,সম্রাট সহ বাকীরা উৎসুক চোখে পারির কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছে,হুট করেই সম্রাটকে ক্রস করে সামনে এগিয়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে গেল, সেখানে অনেক সময় নিয়ে কিছু একটা খুঁজলো,পেয়েও গেল,মুখে বিশ্বজয়ের হাসি দিয়ে হাত বাড়িয়ে সেটা নিলো, এরপর আবার ফিরে এলো সম্রাটের দিকে, সবাই এখনো দেখছে পারির গতিবিধি, সম্রাটের সামনে দাঁড়ালে প্রশ্নাত্নক নজরে সম্রাট মাথা হেলালো,পারি হাতে থাকা কালো মানিব্যাগ খুলে দেখতে পেলো কচকচে কতগুলো হাজার টাকার নোট,সেখান থেকে তিনটা নোট বের করে সম্রাটের হাতে দিলো! সম্রাটের বিস্ময়ের সীমা আকাশ ছুঁলো,ওর টাকা ওকেই দিচ্ছে তাও আবার কি ওরই করা কাজের জন্য! আশ্চর্যে চোখ বড় হয়ে হলো, বাকীদের ও একই অবস্থা!
পারি যেন নিজের কৃত কাজে মহা খুশি, হাসিহাসি মুখ নিয়ে বললো, এবার ঠিক আছে, নাকি আরো লাগবে,লাগলে বলেন অসুবিধা নাই! আমার কাছে নেই তো কি হয়েছে আমার বয়ফ্রেন্ডের কাছে ঠিক ই আছে!
"বয়ফ্রেন্ড "শব্দটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে চারদিকে, সম্রাটের কাশি উঠে গেছে, হঠাৎ পারির মুখে এই শব্দ শুনে! পারি চওড়া হাসি দিয়ে বলল ও আচ্ছা বোনাস দেওয়া লাগবে! অবশ্য যেই সুন্দর কাজ করেছেন তাতে বোনাস তো প্রাপ্যই! কথা শেষ করে যা করলো তা সবার ভাবনার বাইরে ,,হুট করেই সম্রাটে থুতনিতে কামড় বসিয়ে দিলো!
হুটহাট আক্রমনে আহত সম্রাট প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময় ও পেল না,পারি নিজের কাজ শেষ করেই ভোঁ দৌড়,ওর সাথে সাথে ই গাড়ীতে বসলো ওর বান্ধবীরা ,অথচ সম্রাট এখনো আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে ছটফটে পারির পানে! তার সাথে আসমাধ থেকে পড়ার মতো অবস্থা হয়ে আছে বাকীদের!
পারি গাড়ী স্টার্ট দিয়ে চলে গেল,তখন সম্রাটে একই অবস্থা,পারির বয়ফ্রেন্ড বলা এরপর ঘটানো কাজ দুটোই এখন ভাবনার রাজ্যে ঘুরাচ্ছে!
সজিব:- ওস্তাদ!
অন্য একটি ছেলেও পাশ থেকে ডেকে উঠলো,"ভাই"
সম্রাটের খবর নেই,তাই হাত দিয়ে হালকা ধাক্কা দিতেই সম্রাট চেতনে আসে, নিজের থুতনিতে হাত বুলিয়ে ভাবছে পারির কথা,ব্যথা করছে,তার সাথে হঠাৎ পাওয়া ভীষণ প্রিয় কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করলো, থুতনিতে হাত বুলাতে বুলাতে পিছু ফিরতে শুনতে পেল গাড়ীর হর্ণ! আবার পিছু ঘুরেই দেখলো গাড়ী থেকে পারি নেমে আসছে,
সজিব:- এই পাগল মাইয়া আবার আইছে! হেই সময় কামড় দিছে এহন আবার কি করবো?
সম্রাট দাঁড়িয়ে পড়লো,পারি সামনে এসে দাঁড়ায়,চোখে চোখ রেখে বললো,,
পারি:- আজকের পর যদি অন্য মেয়েদের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করতে দেখি তাহলে বলে দিচ্ছি এই টা মেরে মাথা ফাটিয়ে দিবো!
হাত থাকা ছোট্ট কাঁচের গোলাকৃতি শো পিস ধরনের জিনিস দেখিয়ে বললো, তারপর হুট করেই সম্রাটের ডান গালে চুমো খেয়ে বললো,
পারি:- ভালোবাসি!
ব্যাস বলা শেষ তো যেভাবে ঝড়ের গতিতে এসেছিল ঠিক সেভাবেই ঝড়ের গতিতে চলে গেল,আর রেখে গেল ঝড়ের প্রভাবে বিধ্বস্ত এক বিপন্ন পুরুষ কে!
পর্ব ৬২
সজিব:- দেখছো কি পাগল মাইয়া, একবার কামড় দেয় আবার একবার চুম্মা দেয়!
সজিবের এহেন কথায় সম্রাট খুকখুক করে কেশে উঠলো,পাশে থাকা বড় ছেলে গুলো মিটমিটিয়ে হাসছে,
সম্রাট:- এত হাসার কি আছে! যাও সবাই নিজের কাজে যাও,এই তুই ও যা!
সবাইকে হালকা ধমক দিয়ে নিজেকে উদ্ধার করলো!
পরেরদিন সকাল বেলা পারি ভার্সিটির গেটে দাঁড়িয়ে রয়েছে,সম্রাট সাইকেল টা রেখে এসে দূর থেকে নোটিশ করলো, অবশ্য আসার সময় ই খেয়ার করেছে, কিন্তু সেদিকে না গিয়ে অন্যদিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পারি সামনে এসে উপস্থিত,
পারি:- দাঁড়ান! কই যাচ্ছেন ওদিকে,আমি যে এখানে দাঁড়িয়ে সেটা দেখেন নি?
সম্রাট:- দেখেছি, কিন্তু তাতে আমার কি?
পারি:- আপনার কি মানে কি?আমি তো আপনার জন্য ই দাঁড়িয়ে আছি!
সম্রাট:- কিন্তু কেন?
পারি:- কেন মানে কি! সেই কোন সকাল থেকে এসে এখানে অপেক্ষায় আছি আর আপনি এসেই কিনা!
সম্রাট:- দেখো তুমি আমার ছোট, জুনিয়র, যতদূর বুঝতে পারছি তুমি নিউ স্টুডেন্ট! সেই মোতাবেক নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি তোমার বয়স কম! আর এই বয়সে ভুলভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু সিনিয়র হয়ে,ম্যাচিউর একজন মানুষ হয়ে সেই ভুলকে মাথায় তোলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়!
পারি:- ভুল! কোনটা ভুল!
সম্রাট:- সবটাই ভুল,তুমি যাই চাইছো আর যা করছো তার পুরোটাই ভুল,আর এটা বয়সের দোষ! এই বয়সে এরকম হয়! এটাই স্বাভাবিক; আমিও সেভাবেই নিচ্ছি কিন্তু তাই বলে তোমার তালে তাল মেলাতে পারছি না! তাই বলছি দয়া করে নিজেকে থামাও, এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি করো না যাতে তোমার ও অসম্মান হয় আর আমাকেও হাসির পাত্র হতে হয়!
পারি:- আমার অনুভূতি গুলো ভুল মনে হচ্ছে? হ্যা আমি হয়তো অন্য সব মেয়েদের মতো করে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি নি,হয়তো কালকে একটু পাগলামি করেছি তাই বলে ভুল মনে হয় সেটা আপনার কাছে!
সম্রাট:- না এমন কিছু নয়! তবে আমার প্রতি অনুভূতি জাগাটাই ভুল!
পারি:- আর আপনার?
সম্রাট:- মা -মা-মানে?
পারি:- আপনার আমার প্রতি কোন অনুভূতি নেই?
সম্রাট:- না মান-নে না!
পারি:- আমার দিকে তাকিয়ে বলুন,চোখে চোখ রেখে বলুন!
সম্রাট:- দেখো তুমি অযাচিত আচরণ করছো! এটার কোন মানেই নেই!
পারি:- আমার অনুভূতি ভুল, চোখের ভাষা বুঝতে পারা অযাচিত আচরণ! তাহলে ঠিক কোনটা?
আপনার আমাকে এভাবে এড়িয়ে যাওয়া? আমার সবটাই বয়সের দোষ তাহলে আপনার টা কি ম্যাচিউরদে'র মতোই!
সম্রাট পারির চোখে চোখ রাখতে পারছে না, বারবার এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে,চোখে চোখ রেখে এই অনুভূতি অস্বীকার করার ক্ষমতা কোন প্রেমিকের নেই তাও যখন তার প্রেয়সী অবলিলায় তার প্রতি নিজের অনুভূতির জানান দিচ্ছে,পারির চোখ ছলছল, সম্রাটের এভাবে এড়িয়ে যাওয়া মানতে কষ্ট হচ্ছে,অতি আহ্লাদে বড় হওয়া পারি বলতে পারবে না অবহেলা কাকে বলে,এড়িয়ে যাওয়ার কষ্ট কি! কিন্তু যেদিন থেকে সম্রাটের প্রতি দূর্বলতা অনুভব করেছে সেদিন থেকেই এই বিষয়ের সাথে পরিচিত হচ্ছে, এতদিন সম্রাট ওর অনুভূতি জানেনা বলে নিজেকে শান্ত রেখেছে কিন্তু কালকে বলার পর থেকে ও এভাবে কথা বলায় নিজেকে আটকাতে পারলো না,অতি আবেগি পারি এবার নিজের চোখের বাঁধ ভেঙে দিলো,আপন মনে গড়িয়ে পড়লো,সম্রাট ওকে রিজেক্ট করছে,ও সম্রাটের চোখে নিজের প্রতি অনুভূতি দেখেছে,সেই প্রভাবে প্রভাবিত হয়েই তো ওর মাঝেও অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে তবে কেন সে নিজের কথা স্বীকার করছে না! কেন পারির অনুভূতি গুলো কে ভুল বলে আখ্যায়িত করছে, ফোঁপানির মৃদু আওয়াজে চোখ ঘুরিয়ে পারির দিকে তাকাতেই সম্রাটের বুকে চিনচিন অনুভব করলো, মুহুর্ত সময় কাঁদতে ই চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে, নাকের ডগায় মনে হচ্ছে রক্ত জমাট বেঁধে আছে,কলিজা মোচড় দিলো সম্রাটের,কি বললো ও যাতে পারি এভাবে কাঁদছে,,
সম্রাট:- আরে তুমি এভাবে কাঁদছো কেন? আমি তো শুধু!
আর বলার সুযোগ পারি সম্রাটকে দেয় নি, ঝাঁপিয়ে পড়লো সম্রাটের বুকে,পুরো এক ক্যাম্পাস মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে কখনো কোন মেয়ে এভাবে একজন পুরুষ কে জড়িয়ে ধরে নিজের অনুভূতির জানান দেয়, আকুল ভাবে তাকে চায় তা কেউ কখনো দেখেছে বলে মনে হয় না,
পারি:- প্লিজ এভাবে আমাকে দুরে সরিয়ে দিবেন না,আমি পারবো না!
সম্রাট স্তব্ধ হয়ে শুধু দাঁড়িয়েই আছে,পারি শক্ত করে দুহাতে আঁকড়ে ধরে আছে ওকে, কিন্তু ও এখনও পারিকে স্পর্শ করে নি,নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ই আছে দুর দুরান্তে,পারির প্রতি নিজের আবেগকে যতই নিয়ন্ত্রণ করুক,পারির অবস্থা ওকে ভেঙে দিচ্ছে, আবার নিজের অবস্থান ওকে বাঁধা দিচ্ছে, পারি কে ছেড়ে দিলে পারি কি করবে! হয়তো দু একদিন কাঁদবে তারপর নিশ্চয়ই ওকে ভুলে গিয়ে অন্য কারো মায়ায় বাঁধা পড়বে কিন্তু যদি একবার ওর সাথে জড়িয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যতে কি হবে?পারির বাবা মা কোনদিন ওদের সম্পর্ক মেনে নিবে না,কেউ ই নেয়,এত ধনী ব্যক্তির মেয়ে একজন রিকশাচালকের ছেলের বউ হবে এটা কখনো মানার নয়! অবশ্যই এটা দোষের নয়! সুতরাং জেনে বুঝে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার মানে হয় না!
সম্রাট:- ছাড়ো!
পারি:- না!
জেদী পারি ছাড়ার বদলে হাতের বাঁধন আরো শক্ত করলো,সম্রাট নিজেকে সংযত করে, শক্ত হাতে সেই বাঁধন খুলে ফেললো,দুহাত ছাড়িয়ে সামনে এনে শক্ত কন্ঠে বললো,
সম্রাট:- দেখো তুমি ধনীর দুলালী,না চাইতেই পাওয়ার অভ্যাস তোমার,সেই ক্ষেত্রে চাইলেই পাওয়া যায় এমন মনোভাব তোমার থাকতেই পারে, কিন্তু তোমার এটাও মনে রাখা উচিত আমি কোন বস্তু নই;মানুষ! সুতরাং আমারও ইচ্ছা অনিচ্ছা থাকতেই পারে, যেমন তুমি আমাকে চাইছো কিন্তু আমি তোমাকে চাইছিনা!কি বলেছি বুঝতে পেরেছো! আমি তোমাকে চাই না! তাই দয়া করে অযথা আমাকে বিরক্ত করবে না; লিসেন,তোমার বাবার অঢেল সম্পদ তার দ্বারা তোমার জীবন অবলিলায় চলে যাবে, কিন্তু আমার জন্য এই ভার্সিটির সনদপত্র যোগার করা খুবই জরুরি,কারণ আমার ভাগ্য এটাতেই আঁটকে আছে, সুতরাং আমাকে অনেক পড়াশুনা করতে হবে,ভালো রেজাল্ট করতে হবে তাই বলছি দয়া করে আমাকে বিরক্ত করো না! তুমি নিজের মতো থাকো আমাকেও আমার মতো থাকতে দাও!
কথা শেষ করে সম্রাট ঝড়ের গতিতে চলে গেল আর রেখে খেল হৃদয় ভাঙা অবুঝ রমনীকে,এক ক্যাম্পাস ভর্তি মানুষের সামনে এভাবে অস্বীকার করাতে পারি আর ও ভেঙে পড়লো, চারদিকে নানান গুঞ্জন শুরু হলো,পারি নিতে পারলো না সম্রাটের এরকম শক্ত কথা,কান্নায় ঢলে পড়তেই দুর থেকে দৌড়ে এলো ওর কয়েক জন বান্ধবী,ওরা দেখেছে সম্রাটের জন্য পারির করা পাগলামি গুলো,এত ধনী বাবার মেয়ে হয়েও কিভাবে সম্রাটের জন্য নিজেকে তৈরি করেছে, সম্রাটের নিম্নবিত্ত পরিবারের সাথে মানিয়ে চলার জন্য তাদের জীবনযাপন অনুসরণ করছে, এদিকে এই সম্রাট কিভাবে ওকে কাঁদাচ্ছে!
পারির নিরব কান্নার দাপটে কেঁপে কেঁপে উঠছে ওর সর্বাঙ্গ,ওর বান্ধবীরা হাত ধরে ধরে ওকে ক্যান্টিনে নিয়ে গেল, সেখানে নিয়ে পানি খাইয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে,পারির কান্না থেমেছে কিন্তু কেমন থম মেরে গেছে,ওর বান্ধবীরা করুন চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে, এদিকে আশেপাশে নানান রকম কথার ফুলঝুরি ছুটছে,কেউ কেউ কেমন অদ্ভুত চাহনিতে তাকাচ্ছে বারবার পারির দিকে, পারি নিতে পারলো ,উঠে দাঁড়ালো, দৌড়ে চলে গেল ভার্সিটির বাইরে, চারতলার বারান্দা থেকে সবটাই দাঁড়িয়ে দেখলো সম্রাট, পুরুষালি পাথরের ন্যায় শক্ত চাহনিও ঘোলা হয়ে উঠলো নোনা জলে,ডান হাতের কনুইয়ের সাহায্যে মুখ মোছার ন্যায় মুছে ফেললো তা,হয়তো এভাবেই হারিয়ে যায় বহু ভালোবাসা, অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় প্রত্যাশা!কি করবে? গরীবদের যে ভালোবাসতে নেই, শুরু না হওয়া এই বিচ্ছেদ মেনে নেওয়া গেলেও শুরুর পর মানতে কষ্ট হয়! কোন ভাবেই তখন নিজেকে ভালো রাখা যায় না!
সম্রাটের:- তোমাকে ছোঁয়ার নেই তো আমার সাধ্যি! যদি পরের জন্মে( মৃত্যুর পর বেহেস্তে) বিধাতা আমার ইচ্ছা জানতে চায় তবে সেথায় আমি তোমাকে ই চাইবো ! এই জন্মে তোমারে ছোঁয়ার সামর্থ্য যে দেয় নি! ভালোবাসি খুব বেশি ভালোবাসি আমার পারিজাত! আমার ভালো থাকার সুখ ফড়িং, ভালোবাসার সুখ ফড়িং!
কেটে গেল অনেকগুলো দিন,সম্রাট রোজ আসে বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু কেমন জানি শুন্যতা অনুভব করে,অথচ বিগত ছয় বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে,আগে কখনো এমন অনুভূতি হয় নি, হবে কিভাবে আগে তো কেউ ছিলো না যার জন্য হৃদয় স্থলে ফাঁকা ফাঁকা লাগতো, এদিকে ওদিকে তাকিয়ে খোঁজে কিন্তু পায় না,ওর বন্ধুরাও বন্ধুর এই নিরব আর্তনাদ দেখে, বুঝতে পারে কিন্তু কিছু করার নেই ! সম্রাটের যুক্তি ঠিক আছে,যতই হোক পারির বাড়িতে কাজ করা দারোয়ানের অবস্থা ও সম্রাটের চেয়ে ভালো, সুতরাং এরকম একটা পরিবারের মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর মানেই হলো যেচে নিজেকে শেষ করা! তাই তারাও সম্রাটকে উৎসাহিত করতে পারে না, যা হবার নয় তা না ভাবাই উত্তম!
প্রায় পনেরো দিন পর ক্যাম্পাসে এলো পারি,চোখ মুখ কেমন শুকিয়ে গেছে,ফর্সা মুখটা মলিন দেখাচ্ছে, চোখের নিচের কালো দাগ ই বলে দিচ্ছে তার নির্ঘুম রাতের কথা,গলুমলু মেয়েটার শরীর ও যেন অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, গলা, চোয়ালের হাড় গুলো ভেসে উঠছে,মেয়েটা নিশ্চয়ই অনেকদিন ধরে খাওয়া দাওয়া করে না,ওকে দেখে ওর বান্ধবীদের কান্না করে দেওয়ার উপক্রম! নির্জীব পারি ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে ওদের দিকে,সব বান্ধবীরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে দেখছে।সবার সামনে গিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করলো, কিন্তু ভেতরে কষ্ট চেপে ঠোঁটে হাসি ফোটানোর মতো শক্ত মেয়ে পারি নয় তাই পারলো ও না! চোখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো চার তলার বারান্দা, চোখাচোখি হয়ে গেল দুই জোড়া নয়ন,রোজ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা সম্রাট ও এক নজর দেখার তাগিদে তাকিয়েছে মাত্র তখনই দেখতে পেলো ফিরোজা কুর্তা পড়া ফ্যাকাসে মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে,,এত দুর থেকে বোঝা না গেলেও মনে হচ্ছে মেয়েটি অসুস্থ! পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল, এরকম অবহেলায় ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না দমাতে ব্যর্থ চেষ্টা করলো পারি!
পর্ব ৬৩
কে বলেছে ছেলেরা কাঁদে না, ছেলেরাও কাঁদে তবে সেটা হয় আড়ালে আবডালে নয় অন্তঃস্থলে লুকিয়ে লুকিয়ে,,এই যে এখন সম্রাট কাঁদছে তবে সেটা কেউ দেখছে না,এতে অশ্রু না ঝড়লেও রক্তক্ষরণ ঠিকই হচ্ছে,, সম্রাট পারির অবস্থা দেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি! কিভাবে পারবে? কেউ তাকে ভালোবেসে নিজেকে শেষ করছে অথচ সে একজন কাপুরুষের মতোই তাকে এড়িয়ে চলছে,না পারছে নিজের সীমানা অতিক্রম করে তাকে ছুঁয়ে দিতে আর না পারছে তার থেকে অনেক দূরে চলে যেতে; জীবনটা কেমন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, চারদিকে কেমন শূন্যতা বিরাজ করছে, নিজেকে সামলাতে ওয়াস রুমে চলে এসেছে,চোখে মুখে পানি দিচ্ছে, কোনভাবেই নিজের ভেতরের ঝড় কে বাইরে প্রকাশ করতে চায় না, বন্ধুর অস্থিরতা বুঝেই পিছু পিছু ছুটে এলো জাবেদ, কাধ হাত দিয়ে শক্ত হতে বললো,ঘুরেই জাবেদ'কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে,হাত পা কাঁপছে, জাবেদ ই প্রথম বলা শুরু করলো,
জাবেদ:- এখন কি মনের বিরুদ্ধে চলবি!
সম্রাট:- আমি বামুন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে চাই না,ও যদি সামান্য উঁচুতে থাকত তাহলেও আমি চেষ্টা করতাম কিন্তু ও আমার জন্য আকাশের চাঁদ, যেটা শুধু মাথা উঁচিয়ে দেখাই যায়, ছোঁয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবা যায় না!
জাবেদ:- কিন্তু ও যদি এগিয়ে আসে তখন!
সম্রাট:-সবে আঠারো ছোঁয়া মেয়ে, পৃথিবী তার কাছে রঙের ফানুস,তাই যা দেখে তাই ভালো লাগে হয়তো তেমনি করেই আমিও ওর একা ভালোলাগার বিষয়, কিন্তু যখন সত্যটার মুখোমুখি হবে তখনই বুঝতে পারবে নিজের ভুল!
জাবেদ:- আমার মনে হয় না মেয়েটা আবেগে গা ভাসিয়ে চলে! হয়তো বড়লোকের মেয়ে আহ্লাদী তবে; তাই বলে কি সব বড়লোকের মেয়েরাই এমন হবে!
সম্রাট:- আমি জানিনা আর জানতেও চাই না,আমি ওদিকে হাত বাড়াতেই চাই না! আমার নিজের পরিবারের চিন্তা করতে হবে!
জাবেদ:- পারবি নিজের মনকে বোঝাতে!
সম্রাট:- পারবো,আমাকে পারতেই হবে!
পারা না পারার যুদ্ধে গড়িয়ে গেছে বহু সময়, দেখতে দেখতে কেটে গেল কয়েকটি মাস, দ্বিতীয় সেমিস্টার শেষ করে প্রথম বর্ষ পার করে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এখন পারিজাত আবরার চৌধুরী, ভার্সিটির প্রথম দিকে নরম কোমল মেয়েটাও এখন নিজেকে শক্ত করে নিয়েছে, সম্রাটের অবহেলা আর অবজ্ঞা ও এখন অনেকটা সয়ে গেছে,ধনী বাবার মেয়ে ও হয়ে ও একদম সাধারণ ভাবে নিজেকে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, সম্রাট যে ওর ধনী হওয়ার কারণেই ওকে অস্বীকার করছে,সেটাও ওর কান অবধি পৌঁছে গেছে, হাজার বার হাজার উপায়ে বুঝিয়ে সম্রাটকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে যে সম্রাটের দারিদ্র্যতা ওর জন্য কোন ব্যাপার নয়! সম্রাট যেভাবে রাখবে ও সেভাবেই থাকবে কিন্তু সম্রাটের কঠোর মনোভাব থেকে এক চুল ও কেউ সরাতে পারেনি ;
নবীন বরণ উৎসব!!!!
নতুন শিক্ষার্থীদের আগমনে মুখরিত ক্যাম্পাস তার সাথে নবীন বরণ উপলক্ষে সাজসাজ রব চারদিকে,বাহারী কৃত্রিম ফুলে আর ফেস্টুনে যেন নতুন বউ সেজেছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় , সম্রাট অনার্স পার করে মাস্টার্স ফাইনালের শিক্ষার্থী তাই ওর মাঝে এর খুব একটা প্রভাব না ফেললেও অনার্স পড়ুয়াদের জন্য এটি অতীব খুশির দিন!
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত হয় লাল হলুদ মিশ্রনে পোশাক কোড,আর তাদের আগমন জানানো দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত হয় ব্লু গোলাপী রঙের; মেয়েরা গোলাপী শাড়ি আর ছেলেরা ব্লু পাঞ্জাবি; তাদের সাথে তাল মিলিয়ে সব সিনিয়রদের ও বাধ্য করা হয় সেইম রঙের পোশাক পরিধান করতে যাতে নতুন দের আলাদা করে চিনতে সুবিধা হয়!
সম্রাট অনিচ্ছা সত্ত্বেও ব্লু পাঞ্জাবি পড়ে এসেছে, কিছু ই করার নেই,কারণ পছন্দ টা পারির! এই দায়িত্ব পারির ছিলো, এবং সে যে ইচ্ছা করেই করেছে সেটা বুঝতে ও খুব বেগ পোহাতে হয় নি সম্রাটের!
মেজেন্ডা গোলাপী শাড়ীতে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিলো পারিকে, এমনিতেই অতি মাত্রায় ফর্সা সুন্দর মেয়েটা,তার মধ্যে মেজেন্ডা গোলাপী রঙ টা যেন সৌন্দর্য আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে, সিলভার ধাঁচের গহনা আর মোটা করে দেওয়া কালো কাজল সাথে ঠোঁটে ডিপ গোলাপী লিপস্টিক পারিকে করে তুলেছে অসম্ভব মোহনীয়, ভয়ংকর আকর্ষণীয়! ক্যাম্পাসে পা দিতেই সবার নজর কেবল ওর দিকেই, এতে যেমনি মেয়েদের আক্রোশের শিকার হচ্ছে তেমনি ছেলেদের আগ্রহের কারণ বাড়ছে! আবার অনেক ছেলে মেয়েরা ও হা করে দেখছে এই অপূর্ব সুন্দরী রমনীকে, প্রোগ্রামের নানান কাজের বাহানায় সিনিয়র জুনিয়র অনেকেই ওর সাথে কথা বলতে আসছে, এবং তার সাথে স্মৃতি রাখার বাহানায় ছবি ও তুলছে,কোন কোন সিনিয়র পেছন থেকে কাঁধে হাত দিয়ে ও ছবি তুলে নিতে চেষ্টা করছে,দূর থেকে সম্রাটের বন্ধুরা সবটাই খেয়াল করছে!
ব্লু পাঞ্জাবি পড়া অতি সুদর্শন পুরুষ টা নিজের সাইকেল পাশ করে রেখে বন্ধুদের কাছে যেতেই চোখে পড়লো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব সুন্দর রমনীকে,তাকে দেখে যতটা মুগ্ধতায় চোখ বড় হয়েছিলো ঠিক ততটাই কুঁচকে গেল তার পাশে থাকা পুরুষটিকে দেখে, কাঁধে হাত রেখে ছবি তোলার চেষ্টা করছে, দু'জন ই ওর পরিচিত,পারির চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই ব্যাপারে পারি কতটা অসন্তুষ্ট, কিন্তু তাতে ঐ পুরুষের হেলদোল নেই,সে তার মতোই প্রয়াস চালাচ্ছে, পাশে দাড়ানো ছেলেটাকেও চিনে, মাস্টার্সের ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী, মাত্র ই অনার্স শেষ করলো,এই ছেলেকে সে শুরু থেকে দেখেছে প্রতি সেমিষ্টারে একজন নতুন গার্লফ্রেন্ড থাকে, পোশাক বদলানোর মতোই এ প্রেমিকা বদলায়,আর বরাবরই শিকার হয় একজন নবীন শিক্ষার্থী! পারি তো নতুন নয়,তবে কি ওর দৃষ্টি আগের থেকেই ছিলো , আগে সুযোগ পায় নি হয়তো তাই এখন তার সুযোগ নিচ্ছে ,, ভাবনার মাঝেই শুনলো বন্ধুর কন্ঠস্বর,,
জাবেদ:- অনেক সময় ধরেই চলছে,যে পারছে ছবি তুলছে আর এই মেয়েও আশ্চর্য কোন বাঁধা দিচ্ছে না, বুঝতে পারছে না এই ছবি ওর জন্য কতটা বিপদজনক হতে পারে!
কেন জানি সহ্য হলো না,দ্রুত গতিতে হেঁটে পৌঁছে গেল তাদের সামনে,পারি একটু হক-চকালো, অনেকদিন,উহুম অনেক মাস পর সম্রাট এভাবে ওর সামনাসামনি এসে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু চোখ মুখ এমন কঠোর কেন? আশ্চর্য কি প্রশ্ন করছি,এই পুরুষ তো এমনই! পারির সামনে এ বরাবরই এমন কঠোর মুখ নিয়ে আসে! সবার সাথে হা হা হি হি করলেও পারির বেলায় এ একদম গোমড়া মুখো হয়ে যায়! যেন হাসলেই পারি তাকে গিলে খাবে; হাজার বার চেষ্টা করেও একে পারির সামনে স্বাভাবিক ব্যবহার করতে দেখেনি!
সম্রাট:- কি হচ্ছে এখানে?
সায়মন:- ভাইয়া আপনি এখানে?
সম্রাট:- কেন কোন সমস্যা! আমি এসে কি বিরক্ত করলাম?
পারি বুঝলো না সম্রাটের কথার মানে, আসলে ও ধরন ই বুঝতে পারেনি, সম্রাটের হঠাৎ রেগে যাওয়ার কারণ কি হতে পারে তা ওর মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে,,
সায়মন:- আসলে!
সম্রাট:- আসলে নকলে বাদ দাও ; এখানে কি হচ্ছে তাই বলো; আর তুমি এভাবে ওকে ধরে রেখেছো কেন?
কথাটা বলেই পারির কাঁধ থেকে সায়মনের হাতটা সরিয়ে নিলো,পারি আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে,সম্রাট রক্ত চক্ষু নিয়ে ওকে পর্যবেক্ষণ করছে,পা থেকে মাথা অবধি অবলোকন করছে,পারি লজ্জা আর ভয়ে মাথা নুইয়ে নিলো, সায়মন কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো,
সায়মন:- আসলে ভাইয়া আমি আমার ফ্রেন্ডকে নিয়ে একটুও ভালো ছবি তোলার চেষ্টা করছিলাম আর কি তাই একটু ক্লোজ!
বলতে দিলো না বাকীটা রক্তচক্ষু নিয়েই ছেলেটাকে প্রশ্ন করলো,
সম্রাট:- ও তোমার বন্ধু কি করে হয়? তুমি মাস্টার্সের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আর ও অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাহলে কিভাবে ও তোমার বন্ধু হয়!
সায়মন:- না ভাইয়া তেমনটা নয় যেমন আপনি ভাবছেন আসলে আমরা মাত্র ই বন্ধুত্ব করলাম!
পারি:- কখন করলাম বন্ধুত্ব?
মাঝ থেকে পারির বিস্ময়কর প্রশ্ন, সম্রাট দুজনকেই অবলোকন করছে, পারি আবার বললো,
পারি:-আমি তো মাত্র ই একে আপনাকে আজ প্রথমবারের মতো দেখলাম,আগে কখনো দেখিও নি, তাহলে কিভাবে!
সায়মন:- আরে এই যে আমরা ছবি তুললাম;
পারি:- হ্যা সেটা তো আপনি এসে বললেন আর আমি অনুমতি দেওয়ার আগেই ছবি তুলে ফেললেন তাহলে আমরা বন্ধু কি করে হলাম!.
সায়মন:- আরে তুমি বুঝতে পারছো না ব্যাপারটা আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলছি!..
কথা শেষ করতে পারলো না সায়মন; তার আগেই কথা বলার সময় নিজের ফোন উঁচিয়ে পারিকে বোঝানোর ভঙ্গিতে ফোনটা সামনে নিতেই সম্রাট হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়, ক্যামেরা চালু করা, তাড়াতাড়ি গ্যালারী তে গিয়ে পরপর তোলা প্রতিটি ছবি ডিলেট করে দেয়,প্রতিটি ছবি ডিলেট করার সময় দেখেছে কিভাবে পারির সাথে ঘেঁষে ছবি গুলো তুলেছে,যে কেউ দেখলেই বলবে এদের মাঝে গভীর সম্পর্ক রয়েছে!এটা যে একসময় ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করতো তা সুনিশ্চিত হয়ে বলা যায়,,ছবি ডিলেট করে সায়মনের হাতে ফোন দিয়ে দিলো,এর মধ্যে সায়মন চাইলেও সম্রাটের রক্তিম মুখ ভঙ্গিতে তাকানো দেখেই চুপ হয়ে গেছে,,
সায়মন:- ভাই ছবিগুলো!
সম্রাট:- দেখো অন্য মেয়েদের সাথে তুমি যা খুশী করো তাতে আমার কোন মাথা ব্যথা নাই,,I just don't care, what I say? just don't care! but stay away from her,, just stay away from her because she is mine, she is my lady; do you understand!
অতিরিক্ত রাগে বজ্রকণ্ঠে বলা শব্দ টি উচ্চারিত হতে লাগলো চারিদিকে তার সাথে পারিরও, "She is mine, She is my lady" কথাটা ভনভন করছে চারদিকে, সায়মন নিজেও চমকিত,অন্য মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করলেও পারিকে নিয়ে সিরিয়াস হওয়ার পরিকল্পনা করলো মাত্র ই এর মধ্যে ই চরম লেভেলের ধরা খেয়ে বসে রইলো,পারি হুট করেই অতিরিক্ত খুশিতে সম্রাটকে সবার সামনেই জড়িয়ে ধরে!পারির শক্ত গভীর ছোঁয়ায় হুশে এলো সম্রাট,মনে পড়লো কিছু সময় আগে নিজের মুখে দেওয়া স্বীকারোক্তির বিষয়টা; কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে,এই মেয়েকে এমনিতেই দুরে রাখতে পারেনি এখন তো আর ও পারবে না!!
পর্ব ৬৪
নিজের বলা কথায় যখন নিজেই ধরা খেয়ে গেছে বলে মনে পড়লো তখনই সম্রাট গোলগোল চোখে পারির দিকে তাকালো,পারি বিশ্ব জয়ী হাসি দিয়ে জড়িয়ে ধরে সম্রাটের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে,চোখ বন্ধ করে নিলো,মুখ চোখ কুঁচকে কপালে কয়েক পরদ ভাঁজ ফেলে সুক্ষ্ণ নিঃশ্বাস ছাড়লো,পারি তখনো পিটপিট করে চেয়ে আছে, মিটিমিটি হাসছে! চোখ মেলে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে থাকা পারিকে দেখে নিলো আরো একবার এরপর নিজের হাত দিয়ে আলগোছে পারির বাহু ধরে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিলো,পারি'ও ভদ্র মেয়ের মতোই ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, লজ্জা লজ্জা ভাব করে মাথা নুইয়ে ঠোঁট টিপে নিজের হাসি সংবরন করার চেষ্টা করছে,
সম্রাট:- দেখো একটু আগে যা শুনেছো তা ভুলে যাও! ওটা শুধু তোমাকে ঐ ছেলের থেকে বাঁচানোর জন্য ই বলেছি!এর বেশি কিছুই না!
মূহুর্তে ই পারির হাসি হাসি মুখটা কালো হয়ে গেল, লজ্জা রাঙ্গা মুখে কালো মেঘ জমে গেল, কপালে তিন ভাঁজ ফেলে গাল ফুলিয়ে তাকালো সামনে দাঁড়িয়ে মাত্র ই ইয়া বড় এক মিথ্যা বলা সুদর্শন সুপুরুষ এর দিকে ; সম্রাট আবার ও বলা শুরু করলো,
সম্রাট:- আর তুমি এভাবে কেন সেজোছো? এত সাজার কি আছে? নবীনদের বরন করা হবে তাই সাজবে তো ওরা; তুমি কেন সেজেছো? আবার শুনলাম যার তার সাথে ই নাকি ফটোশুটে নেমেছো? নিজেকে নায়িকা মনে হচ্ছে? নাকি সুন্দরী বলেই নিজের ডিমান্ড জাহির করছো? কোনটা!.
রাগের চোটে একদমেই এতগুলো কথা শেষ করলো,এতে পারির কপালের ভাঁজ কমলো না বরং তিন থেকে মনে হয় আরো একটু বাড়লো ই! তার সাথে তার ও মেজাজ তেতে উঠল, কি ভাবছে এই ছেলে তাকে! বেশি পাত্তা দিয়ে ফেলেছে বলে সে যা না নয় তাই বলছে! নিজেও ভালোবাসবে না আর অন্যদের ও কাছে আসতে দিবে না! মগের মুল্লুক পেয়েছে নাকি!
হঠাৎ করেই পারির মাথায় শয়তানি বুদ্ধি চাপলো, সম্রাট ওকে অন্য কারো সাথে দেখলে রাগ করে তার মানে স্পষ্ট! সম্রাটের মাঝেও পারিকে নিয়ে ইনসিকিউরটি কাজ করে, হিংসা অনুভব করে তবে এটাই তো ভালো পদ্ধতি সম্রাটকে ঘায়েল করার! যেমনি ভাবা তেমনি কাজ!
পারি:- আপনার কি তাতে?
হঠাৎ করেই তেতানো কন্ঠে পারির নিভু নিভু চিৎকার, সম্রাট প্রথমে একটু থতমত গেল,পারির এমন প্রতিক্রিয়ায়,পরবর্তীতে পারির দিকে কপাল কুঁচকে তাকালো,পারি রেগে নাগিনের মতো ফোঁস ফোঁস করছে,কি বললো এই মেয়ে? মনে করার চেষ্টা করলো! ওর কি? ওর কি মানে কি ? ওর কিছু না তো কার কিছু হবে? এভাবে ঢ্যাং ঢ্যাং করে যার তার সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করবে আর সেটা মেনে নিবে,তাও সম্রাট! অসম্ভব? রাগ এবং মস্তিষ্কের অযাচিত আচরণে উদ্ভট চিন্তা করছে সম্রাট! নিজের মুখে নির্গত স্বীকারোক্তি অস্বীকার করতে কি থেকে কি বলবে নিজেই আন্দাজ করতে পারছে না!পারি আবার ও বললো,
পারি:- আপনি বলে বেড়ান আপনি আমাকে ভালোবাসেন না, আচ্ছা ঠিক আছে ভালো কথা!
সম্রাট:- ভালো কথা!
পারি:- হ্যা ভালো কথা! ভালো কথা না? ভালো কথাই তো?
সম্রাট :- পারি!..
পারি:- কি পারি!আমি ভালোবাসি কিন্তু আপনি ভালোবাসেন না,আর সেটা কিন্তু আপনি একটু আগেও বলেছেন যদিও তার আগে অন্য কথা বলেছেন কিন্তু আপনি এটাও বলেছেন আমাকে ঐ ছেলের হাত থেকে উদ্ধার করতেই ওটা বলেছেন , সুতরাং তার মানে হলো আপনি আমাকে ভালোবাসেন না!
সম্রাট:- হ্যা তো?
পারি:- এখন দেখেন আপনি ভালো না বাসেন তাতে তো আর আমার জীবন থেমে থাকবে না! কেউ না কেউ তো আসবে,আর এটাই স্বাভাবিক; তার জন্য নিশ্চয়ই আমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে! আর প্রস্তুতি মানেই হলো নিজেকে ফিটফাট রাখা! এর জন্য অবশ্যই আমাকে এভাবেই সাজুগুজু করতে হবে!তবেই না ছেলেরা আমাকে পছন্দ করবে!
কথাটা বলেই পারি লাজুক লাজুক হাসি দিলো, সম্রাটের মুখের নমুনা দেখে মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে হাসি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে , সম্রাটের তো রাগ উঠে সপ্তম আসমানে, ইচ্ছা করছে পারিকে ইচ্ছা মতো ক্যালানী দিতে কিন্তু আফসোস পারলো না,অন্য কেউ হলেও হয়তো চেষ্টা করতো কিন্তু এটা পারি,আর ও কোনভাবেই পারিকে আঘাত করার চেষ্টা ও করতে সাহস পায় না! তার মধ্যে আজকে তো পারি'কে অপ্সরী লাগছে এখন তো কোন ভাবেই না!অপ্সরী! ওহ এই মেয়ে আজ তাহলে ছেলেদের পটানোর জন্যই এভাবে নিজেকে অপ্সরী রুপে উপস্থাপন করেছে! মনে পড়তেই পারির হাত মুঠোবন্দী করে একরকম টেনেই নিয়ে যেতে লাগলো, সবাই শুধু উপস্থিত নাটক দেখার মতো করেই নিরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে,
পারি:- কি আশ্চর্য! এভাবে গরুর মতো করে টানছেন কেন? বললেই তো আমি ভদ্র মেয়ের হেঁটে যাই! তাছাড়া আপনার বেশি তাড়া থাকলে তো আমাকে কোলে করেই নিয়ে যেতে পারেন! তা না করে গরুর মতো! উফ্ আসতে! আমার শাড়ী খুলে যাবে! পরে আমি আর পড়তে পারবো না! আমি শাড়ী পড়তে পারি না!
বকবক চলছে থামার নাই, সম্রাট আগে কখনো পারি কে এত কথা বলতে দেখেনি,নরম ,শান্ত ,ভদ্র চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে বলেই জানতো কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ওর সামনে আসলেই পারি বাঁচালের মতো ই এক দমে কথা বলতে শুরু করে! যেন কথার শেষ নেই!শাড়ী খোলার কথা বলতে বলতেই শাড়ীর এক কুঁচি খুলে গেল,এত সময় সম্রাটের টানে এগিয়ে গেলেও,এখন এক হাতে কুঁচি ধরে সম্রাটের মুষ্টিবদ্ধ হাতের নখ বসিয়ে দিলো সম্রাটের কব্জিতে, শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, বাধাগ্রস্ত হয়ে পিছু ফিরে পারির বিরক্তিকর চাহনি দেখে এক ভ্রু উঁচু করে প্রশ্নাত্নক নজরে পরখ করতে করতেই নজর গেল নিচে, এবং বুঝতে পারলো কুঁচি অলরেডি খুলে গেছে! দাঁড়িয়ে পড়লো! পারি কুঁচি ধরে রেখেই ঠোঁট উল্টে তাকিয়ে আছে, সম্রাট কিছু সময় কিছু একটা পরখ করলো, ভাবলো এবং মূহুর্তে ই পারি ভাসমান অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করলো!
সম্রাট:- বললেই হতো কোলে চড়তে ইচ্ছে করছে! শুধু শুধু এভাবে শাড়ী খুলে ফেলার কি দরকার ছিলো!
পারি:- কি আমি আপনার কোলে উঠার জন্য শাড়ী খুলেছি?
সম্রাট:- হ্যা তো!তা না হলে হঠাৎ শাড়ী কেন খুলে যাবে?
পারি:-নিজেই তো গরুর মতো টানছিলেন যার কারণে আমার শাড়ীটা খুলে গেল! এখন আমি কি করবো?
সম্রাট:- সামলাতে না পারলে পড়ো কেন? ওহ আপনার তো আবার ছেলে পটানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে?
পারি:- হ্যা তো! কত কষ্ট করে একটা ছেলে পটালাম
আর আপনি কি করলেন এসেই ধমকে ধামকে তাকে তাড়িয়ে দিলেন, একবার বললেন ভালোবাসেন আবার বললেন ভালোবাসেন না,এখন আবার গরুর মতো টেনে আমার শাড়ীই খুলে ফেললেন,একদম আমার প্রেস্টিজের বারোটা বাজিয়ে দিলেন,হায় এখন আমার কি হপ্পে!
পারির রেডিও চলতে চলতেই ধপাস করে নিচে পড়ে গেল যদিও ব্যথা খুব একটা পাওয়ার কথা নয় তবুও পারি তো পারিই,,
পারি:- আম্মু!
সম্রাট:- Shut up Pari! একদমই অযথা শব্দ করবে না, তুমি একদমই ব্যথা পাওনি!
পারি:- আপনি কি বুঝবেন আপনার তো লোহার শরীর,,তুলোর ব্যথা আপনি কি বুঝবেন!
সম্রাট হাসবে না কাঁদবে তা ওর বোধের বাইরে,চেনা পারিকে আজ একেবারেই অচেনা লাগছে,এই মেয়ে যে এত কথা বলতে পারে তা তো ওর জানাই ছিলো না! একদমই নতুন রুপে ধরা দিলো আজ।
পারি:- আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছেন? কি আপনি এই বন্ধ করে আমাকে মেরে গুম করে দিবেন?
সম্রাট:- চুপ থাকো,এত কথা কেন বলছো? এত কথা তো বলো না তুমি?
পারি:- বলছে আপনাকে!
সম্রাট কথা বাড়ালো না, বুঝতে পারছে এই মেয়ে আজ ওকে কথার জালেই পেঁচিয়ে মারবে,তবে এই মুহূর্তে অযথা এই রমনীর জালে নিজেকে পেঁচানোর প্রয়োজন আপাতত নেই,তার চেয়েও বরং কাজের কাজ করা যাক! কুঁচি ধরে রাখা হাতটা ওভাবেই রেখেছে, সম্রাট হাঁটু গেড়ে বসে হাত থেকে কুঁচিটা নিলো,খুব আলগোছে ধরে বেশ কিছু সময় দেখলো তারপর হুট করেই সবটা কুঁচি খুলে ফেললো,পারি মূহুর্তে ই কেমন স্তব্ধ হয়ে গেল,এমন কিছু সম্রাট করবে তা তো ভাবনার বাইরেই ছিলো! সম্রাট শাড়ীর ঐ অংশটা হাতে নিয়ে কিছু একটা ভাবছে চোখ বন্ধ করেই, তারপর চোখ খুলেই ফটাফট কুচির ভাঁজ দিলো এবং তারপর যথা স্থানে গুজে দিলো অথচ তার এই কাজে যে একজনের নাভিশ্বাস হওয়ার উপক্রম তা সে বুঝলোই না! দম বন্ধ করে চোখ বুজে কাঁপতে থাকা পারির রক্তিম গোলাপের মত মুখটা চোখের পলক ফেলতে বারন করছে , পলকহীন চোখে তাকিয়ে রয়েছে,পারি সম্রাটের কাজে লজ্জায় চোখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না, সম্রাট ও মোহনীয় নজরে দেখেই যাচ্ছে,ধীর পায়ে পারির খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়,পারি নিজের নৈকট্যে সম্রাটের উপস্থিতি টের পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো সম্রাটের বুকে, শক্ত, খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সম্রাটকে! এবার ও সম্রাট ধরলো না,তবে পূণরায় শিউরে উঠলো ওর সর্বাঙ্গ! অনুভব করছে এই ছোঁয়া, বুকের দিকটা ভেজা ভেজা অনুভব হতেই বুঝলো পারি কাঁদছে! নিজেকে আটকালো না,দু হাতে হালকা করে জড়িয়ে ধরলো, কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
সম্রাট:- তুমি আগুন নিয়ে খেলছো পারি! জানো না এর পরিণাম কি হতে পারে?
পারি:- আমি জানতেও চাই না,আমি শুধু জানি আমার আপনাকেই চাই !
সম্রাট:- কিন্তু আমাদের মাঝে আকাশ পাতাল ফারাক! কিভাবে তুমি সেই!
সম্রাট:- কিছু চাই না, শুধু আপনাকেই চাই! যেভাবে রাখবেন সেভাবেই থাকবো! আপনার পরিবারের সবার খেয়াল রাখবো, কাউকে অভিযোগ করার সুযোগ দিবো না! কোনদিন কোন অভিযোগ ও করবো না! শুধু আপনি একবার বলেন ভালোবাসি পারি !
সম্রাট:- আর তোমার পরিবার?
পারি:- আমার বাবা মা খুব ভালো, তাদের কাছে মানুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই, তাছাড়া আপনি তো আর বেকার নন, অশিক্ষিত ও নন! বাবা মায়েরা তাদের মেয়ের জন্য যা চায় আপনার মাঝে তার সবটা আছে তবে কেন আপনি এত চিন্তা করছেন!
বাঁধন শক্ত হলো,খুব গভীর করে জড়িয়ে ধরলো সম্রাট পারিকে,পারির কান্না থেমে গেল লজ্জায়! সম্রাট পারলো না নিজেকে আর ধরে রাখতে! কিভাবে পারবে? কোন মেয়ে কখনো এভাবে নিজের জন্য প্রেম ভিক্ষা চেয়েছে? কেউ কি শুনেছে? নাকি দেখেছে? হয়তো এটাই প্রথম! তবে প্রেমিক পুরুষ কিভাবে নিজেকে বেশিদিন বেঁধে রাখবে? এক সময় তো হার মানার ই ছিলো!আজ সম্রাট ও হেরে গেল! পারির পাগলামি ভালোবাসায় নিজেকে জড়িয়ে নিলো ! পরে যা হবে দেখা যাবে!
বাঁধন খুলে,দু হাতের আজলায় কান্নায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটা তুলে ধরলো একদম নিকটে,খুবই কাছে, চোখাচোখি হতেই চোখ নিলো পারি, মুচকি হেসে ডান হাত দিয়ে সমস্ত মুখটা আলতোভাবে মুছে দিলো সম্রাট,তার সাথে সাথে ই পারি অনুভব করলো কপালে উষ্ণ ছোঁয়া!
পর্ব ৬৫
বাতাসেও যেন এই প্রেমিকযুগলের প্রেমের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিলো, ভার্সিটির গসিপ কুইনদের ও রোজকার গসিপের টপিক ছিলো সম্রাট পারির ভালোবাসার গল্প! এভাবেই দিন কাটছিল তাদের,, কখনো দূর অজানায় ঘুরতে যাওয়া, কখনো এদিকে ওদিকে ফড়িং এর মতোই উড়ে বেড়ানো!
রোজ বান্ধবীদের নিয়ে ফুচকা খেয়ে সেই বিল সম্রাটের কাঁধে তুলে দিতো,, সম্রাট ও পরম আনন্দে তা পূরণ করতো!
অতি আদরে বড় হওয়া পারির কখনো কোন বড় আবদার সম্রাটের নিকটে ছিলো, একটা বেলি ফুলের মালা,এক মুঠ রেশমী চুড়ি অথবা এক প্লেট ফুচকা কিংবা কখনো কখনো পথের পাশের ফাস্টফুড! এতেই ছিলো পরম খুশি!
সম্রাট কে ছোট করে কথা বলা বন্ধু বান্ধবীদের থেকে ও নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে,তার চারপাশে শুধু সম্রাট-ময় করে রেখেছিলো, হুটহাট এটা ওটা রান্না করে সম্রাটকে চমকে দেওয়া ছিলো সবচেয়ে সুন্দর উপহার! রান্নাঘরে কখনো না যাওয়া পারির নতুন হাতের অখাদ্যে'র ন্যায় রান্না ও সম্রাট পরম আবেগে খেয়ে নিতো!
বড়লোক বাপের মেয়ে গরীব স্বামীর বউ হওয়ার জন্য নিজেকে সব দিক থেকেই প্রস্তুত করতে লাগলো! খুনসুটি,প্রেম ,ঝগড়া,একে অপরের সাথে মিষ্টি প্রতিযোগিতা কিংবা কাউকে অন্য কারো সাথে দেখলে তা নিয়ে অহেতুক ঝগড়া এভাবেই যাচ্ছিলো তাদের দিনগুলো!
পারির অহেতুক জেদ আর রাগের শিকার হয়েও হার মেনেছে বহুবার,অন্যায় না করেও অপরাধের দায়ে মাথা নুইয়ে'ছে, আবার নিজেই আগলে ধরেছে, পারি'ও নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার নিজেই স্বীকার করছে!
দিন যাচ্ছিলো তার সাথে বেড়ে যাচ্ছিল সম্রাট পারির প্রেম কাব্যের পর্ব গুলো! কিন্তু হুট করেই এলো সেই দিন যা সব শেষ করে দিলো !
বর্তমান;;
আড়মোড়া ভেঙে নিজেকে চোখ খুলে সর্ব প্রথম সম্রাটকে'ই দেখতে পায় পারি,প্রথমে কিছুটা আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকে পরক্ষণেই নিজের অবস্থা মনে পড়ে লজ্জায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে, সম্রাটের অপলক চাহনি তখন ও পারির উপর বিস্তার, কল্পনায় ব্যাঘাত ঘটে পারির নড়চড়ে,পারি উঠে গেছে বুঝতে পেরে হালকা হেসে কাঁথার উপর দিয়েই জড়িয়ে ধরে,,
সম্রাট:- এভাবে নিজেকে লুকিয়ে ফেললে কি হবে মিসেস,যা দেখার তা দেখেই ফেলেছি!
সম্রাটের এহেন কথায় পারির লজ্জা বেড়ে কয়েকগুণ, চাদরের ভেতর থেকেই সম্রাটের পেটে গুঁতো দেয় এতে সম্রাট ব্যথা না পেলেও সুড়সুড়ি লাগে,
সম্রাট:- পারিজাত!
আবার ও শুরু হয়েছে দুজনের দুষ্টুমি, এদের নিজেদের থেকে ধ্যান ফিরে বাইরে কারোর কন্ঠে, সম্রাট পারির থেকে নিজেকে সরিয়ে দরজায় নজর দিলো,,
সোহা:- ভাই,ভাবী ওঠো! আর কত ঘুমাবে?
সম্রাট:- আসছি!
সম্রাট নিজে বিছানা ছেড়ে দরজা খুলতে চলে যায়, পারি চাদরের নিচে থেকে মুখ তুলে একবার সম্রাটের দিকে তাকিয়ে ভোঁ দৌড় দেয় বাথরুমে!
দরজা খুলে সোহাকে দেখে চওড়খ হাসি দেয়,সোহাও ভাইয়ের হাসির পরিবর্তে হাসি উপহার দেয়,,
সোহা:- শুভ সকাল ভাই!
সম্রাট:- শুভ সকাল বনু!
সোহা:- ভাবী উঠছে?
সম্রাট:- হুম! বাথরুমে আছে!
সোহা:- তুমি ও তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে ভাবীকে নিয়ে নিচে আসো!
সম্রাট :- তুই যা আমরা আসছি!
সোহা যাওয়ার সময় মিটমিটিয়ে হাসছিলো, সম্রাট ও বোনের সামনে কথা বলতে বেশ জড়তা'য় পড়ে গিয়েছিল, নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝলো সোহার হাসির কারণ,সোহা যেতেই নিজেকে দেখে নিজেই নিঃশব্দে একটা হাসি দিলো!
সময় বয়ে চলে আপন গতিতে,তাকে আটকানোর ক্ষমতা এক উপরওয়ালা বই আর কারো নেই! দিনের পর রাত রাতের পর দিন এভাবেই বয়ে চলে অবিরত ভাবে!কখনো কোন বাঁধা তাকে আঁটকে রাখতে পারে না! সুখ দুখ উভয়কে সঙ্গে নিয়েই বয়ে চলে সে নিজের বাহুতে! শীত,গ্রীষ্ম,বর্ষা,শরৎ,হেমন্ত বসন্ত পুস্তকের ভাষায় ষড়ঋতু! কিন্তু ষড়ঋতুর মাঝেও মানবের হৃদয়ে থাকে আরো বহু ঋতু! সুখ, দুঃখ, পাওয়া না পাওয়ার মতো বহু আকাঙ্ক্ষিত মন-ঋতু বিরাজ করে মানব হৃদয়ে! কভু তা ধরা দেয় প্রেমিক প্রেমিকার মধুর মিলনে তো কভু তা বিচ্ছেদের বিষাদ সুরে! এভাবেই কেটে যায় এক জীবন! কেউ পূর্ণতায় ঘিরে থাকে তো কেউ পূর্ণ শূন্য মিলিয়ে,কারো জীবনের কোটা শুন্যতায় বিরাজমান!
এভাবেই কেটে যাচ্ছে সম্রাট পারির জীবনের সন্ধিক্ষণ; বহু পাওয়া না পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে এক অপরের সাথে থেকে! ক্ষণিকের বিচ্ছেদ মিলনকে করেছে মধুর চেয়েও মধুময়! দিয়েছে অনেক প্রাপ্তির সুসংবাদ! তেমনি এক সুসংবাদের জন্য হাসপাতালের জরুরী বিভাগে অপেক্ষায় রয়েছে পুরো তালুকদার বাড়ি! হ্যা আজ আরো একটি সুসংবাদ দিচ্ছেন উপরওয়ালা তাদের!
দেখতে দেখতে কেটে গেছে বছর দেড়েক,এর মধ্যে পারির মা হওয়ার সুখবর দিয়েছে সবাইকে নতুন করে সুখী হবার আনন্দ, তানহা'র বিয়েও হয়ে গেছে সেই কাজিন আল আমিন এর সাথেই! সে সবটা জেনেই মেনে নিয়েছে তানহা'কে! তানহা ও মন থেকে ভালোবেসে শুরু করেছে নিজের নতুন জীবনকে, চেষ্টা করছে সুন্দর করে সংসার করার জন্য!
ডাক্তার:- সুসংবাদ মিস্টার তালুকদার, আপনার ঘর আলো করে রাজকন্যা এসেছে!
এত সময়ের অপেক্ষা মুহূর্তে ই মধুর মনে হলো! ডাক্তারের কোলে সাদা তোয়ালে তে থাকা ছোট্ট ফুটফুটে একটা মুখ দেখে,দু হাত বাড়িয়ে নিজের বুকে টেনে নিলো, চোখ দিয়ে আপন মনে ই গড়িয়ে পড়লো আনন্দ অশ্রু! প্রথম বার হবার অনুভূতি কোন ভাবেই প্রকাশ করার মতো নয়,, সবাই এগিয়ে এসে কোলে নিতে চাইলো কিন্তু ছোট পারি যেন নিজের বাবার কোলে'ই বেশি খুশি তাই হাত দিয়ে বাবার টি শার্টের একটুখানি আঁকড়ে ধরে আছে,সে যাবে না তার বাবাকে ছেড়ে,,তা দেখে সবাই হেসে উঠল, সম্রাট মেয়ের মুখে চুমু দিয়ে ডাক্তারকে বললো,
সম্রাট:-: আমার স্ত্রী?
ডাক্তার:- উনি সুস্থ আছেন,নরমাল ডেলিভারি হওয়াতে একটু ক্লান্ত হয়ে গেছেন তবে চিন্তার কিছু নেই; আপাতত ওষুধের প্রকোপে ঘুমাচ্ছেন!
সম্রাট:- আমি দেখতে পারবো একবার?
ডাক্তার:- নিশ্চয়ই তবে একটু সময় পর,,উনাকে কেবিনে দেওয়ার পর!
কথা শেষ করেই ডাক্তার নিজের কাজে চলে গেলেন! একজন নার্স এসে হাত বাড়িয়ে বাবুকে নিতে নিতে বললেন,,
নার্স:- ওকে কিছু সময়ের জন্য আমরা অবজারভেশনে রাখবো! এরপর সবাই নিতে পারবেন;
কথা বলেই নিয়ে চলে গেল! সবাই সেদিকে তাকিয়েই বললো,মানে কি?
সম্রাট:- এক্সকিউজ মি!
নার্স:- জ্বী বলুন!
সম্রাট:- আমার বাচ্চার কি হয়েছে,ওকে অবজারভেশনে রাখার কি দরকার?
নার্স সম্রাটের অস্থিরতা দেখে একটু হাসলো যদিও এটা তার কাছে নতুন নয়,রোজ ই এরকম ঘটনার মুখোমুখি হয়,বাবা মায়েরা এমন অস্থির হয়েই থাকে তাও যদি হয় প্রথম বারের মতো! উনি হাসি বজায় রেখেই বললো,
নার্স:- চিন্তার কিছু নেই স্যার, আপনি শান্ত হোন, নরমালে হওয়া সব বেবিকেই আমরা কিছু ঘন্টা নিজেদের অবজারভেশনে রাখি যাতে কোন সমস্যা হলে আমাদের সমাধান করতে সুবিধা হয়! যদিও আপনার বেবি মাশাআল্লাহ সুস্থ তবুও তার প্রয়োজনেই!
সম্রাট নার্সের কথা বুঝতে পারলো তবুও বললো,,
সম্রাট:- সত্যি ই কোন সমস্যা নেই তো?
নার্স:- না স্যার;
সম্রাট:- আমি কি ওকে দেখতে পারবো?
নার্স:- দুঃখিত স্যার বেবিদের ওখানে সবাই কে এলাও করা হয় না!তবে আপনি বাইরে থেকে দেখতে পারবেন!
সম্রাট:- আচ্ছা ঠিক আছে!
কথা বলেই নার্সের সাথেই চললো , নার্স বেবি কেয়ারের মধ্যে ঢুকে ছোট একটি সুন্দর কেবিনে বাবুকে শুইয়ে দিলো, সম্রাট দূর থেকেই নিজের মেয়েকে দেখলো মন ভড়ে, কিছু সময় বাদেই সোহা দৌড়ে এলো,
সোহা:- ভাই ভাবীকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে!
সম্রাট:- সত্যি!
সোহা:- হুম!
সম্রাট:- ওকে চল!..
পারি:- আমার বেবি কোথায়?
সম্রাট:- আছে জান!
কেবিনে ঢুকেই পারির প্রশ্নের উত্তরে কথাটা বললো সম্রাট;সম্রাটকে ঢুকতে দেখে সবাই বেরিয়ে গেল,সম্রাট গিয়ে পারির সামনে বসলো, ক্লান্ত মুখের মাঝেও খুশির ছাপ,সম্রাট হালকা উবু হয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো,
সম্রাট:- কেমন লাগছে এখন?
পারি:- আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের বেবি কেমন আছে?..
সম্রাট:- আলহামদুলিল্লাহ, আপাতত বেবি কেয়ার সেন্টারে আছে!
পারি:- কেন?
উত্তেজিত হয়ো না, সুস্থ আছে; আলহামদুলিল্লাহ! ওরা শুধু কিছু সময় পর্যবেক্ষণে রাখবে, তারপর দিয়ে যাবে!
পারি:- ও দেখতে কার মতো হয়েছে!
সম্রাট:- আমার মেয়ে অবশ্যই আমার মতোই হবে!
বেশ গর্ব করেই কথাটা বললো সম্রাট,পারি ওর বলার ধরনে হেসে দিলো,সাথে সম্রাট ও।পারি সম্রাটের হাতের উপর হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো,
পারি:- মেয়ে হওয়াতে সত্যিই তুমি খুশি হয়েছো?
সম্রাট পারির হাতটা উচু করে তাতে ছোট একটি চুমু দিয়ে কাছাকাছি এসে বললো,,
সম্রাট:- আমি এখন নিজেকে সবচেয়ে বেশি সুখী মনে করছি কারণ আল্লাহ আমাকে উনার রহমত হিসেবে কন্যা সন্তান দিয়েছেন,,উনি যার উপর খুশি হয় তাকে কন্যা সন্তান দেন! আর তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি মেয়ে বাচ্চাদের প্রতি কতটা দুর্বল! সেখানে আল্লাহ আমাকে মেয়ে দিয়েছে আর আমি খুশি হবো না!
সম্রাটের কথায় পারি তৃপ্তির হাসি দিলো,সবার শ্বশুর বাড়িতে ছেলের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও একমাত্র ওর শ্বশুর বাড়িতে ই হয়তো মেয়েদের জন্য এত বেশি ভালোবাসা!
বাচ্চার কান্নার আওয়াজের দুজনেই সচকিত হয়ে,নার্স ওদের মেয়েটাকে এনে দুজনের মাঝে শুইয়ে দেয়,,
নার্স:- ক্ষুধা লেগেছে তাই কাঁদছে আপনি খাইয়ে দিন,আমি আবারও ওকে নিয়ে যাবো!
নার্সের সহায়তায় পারি মেয়েকে খাওয়াতে শুরু করলো!!
পর্ব ৬৬
অন্তিম পর্ব
সন্তান আল্লাহ তাআলার অনন্য উপহার। সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার রয়েছে বহু দায়িত্ব ও কর্তব্য। যা ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত ইবাদত হিসেবেই পরিগণিত। অনুরূপ একটি সুন্নত আমল হলো আকিকা। ইসলামের পরিভাষায় সন্তান জন্মগ্রহণের পর আল্লাহর শুকরিয়া ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও শিশুর নিরাপত্তার জন্য পশু উৎসর্গ করাকে আকিকা বলে। আমাদের দেশে অনেকের মাঝে একটি ধারণা আছে যে আকিকার মাধ্যমে শিশুর নামকরণ করা হয়। কিন্তু আসলে তা নয়। শিশুর সুন্দর ও ভালো অর্থবহ নাম রাখা একটি স্বতন্ত্র সুন্নত। আকিকা করা আরেকটি স্বতন্ত্র সুন্নত।
আকিকা সম্পর্কে হাদিস শরিফে রয়েছে: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক শিশুরই আকিকা জরুরি।’ (আবু দাউদ: ২৮৪০; মুসনাদ আহমদ: ২০০৯৫)। হজরত আলী বিন আবি তালেব (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি ছাগল দিয়ে হাসানের আকিকা দিলেন।’ (তিরমিজি: ১৬০২; মুস্তাদরাকে হাকেম: ৭৫৮৯)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইহুদিরা পুত্রসন্তানের আকিকা করত কিন্তু কন্যাসন্তানের আকিকা করত না। তোমরা পুত্রসন্তানের জন্য দুটি ছাগল এবং কন্যাসন্তানের জন্য একটি ছাগল দিয়ে হলেও আকিকা করো।’ (বায়হাকি, সুনানে কুবরা: ১৯৭৬০; মুসনাদ বাযযার: ৮৮৫৭)।
আকিকা করার উত্তম ও সুন্নত দিবস হলো সন্তান জন্মের সপ্তম দিন। সপ্তম দিনে আকিকা করতে না পারলে চৌদ্দতম দিনে বা একুশতম দিনে আকিকা করবে। (তিরমিজি)। যদি তা-ও সম্ভব না হয় তাহলে পরবর্তী সময়ে যেকোনো সময় আকিকা
করা যাবে। তবে সপ্তাহের যেই বারে বা
যেই দিনে সন্তান জন্ম হয়েছে তার পূর্বদিনে করলে তা উত্তম হবে। বিশেষ কোনো কারণে এর ব্যতিক্রম হলেও অসুবিধা নেই। অভাবের কারণে যদি কোনো ব্যক্তি তার সন্তান শিশু থাকতে আকিকা না করে থাকেন, ওই সন্তান বড় হওয়ার পর যদি তার সামর্থ্য হয়, তখন সে তার নিজের আকিকা করলেও সুন্নত আদায় হবে এবং তার পিতা-মাতাও এর সওয়াব পাবে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.) নবুওয়াত পাওয়ার পর নিজের আকিকা নিজে করেছেন।’ (বায়হাকি)।
আকিকা হলো আল্লাহর শুকরিয়া আদায় ও তাঁর নৈকট্য লাভের একটি উত্তম উপায়। আকিকার মাধ্যমে শিশু সব ধরনের বিপদ-আপদ, বালা-মুসিবত থেকে আল্লাহর রহমতে নিষ্কৃতি লাভ করে। এ ছাড়া আকিকার বহু তাৎপর্য ও কল্যাণময় দিক রয়েছে। ‘এতে আছে ধর্মীয়, নাগরিক ও আত্মিক অনেক উপকারী দিক। যথা: ভদ্রোচিত পন্থায় সন্তানের বংশপরিচয় প্রকাশ করা। কারণ, বংশপরিচয় প্রকাশ না করলেই নয়। যাতে অনভিপ্রেত কথার সূত্রপাত না হয়। এ কাজ শিশুটির জন্মের পরমুহূর্তেই তাকে এ কল্পনায় নিয়ে যাবে যে সে তার সন্তানকে মানব কল্যাণের পথে উৎসর্গ করে দিল, যেমন হজরত ইব্রাহিম (আ.) করেছিলেন তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইলকে (আ.)। আকিকার আরেকটি দিক হলো, সন্তান দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া জ্ঞাপন করা। কেননা, সন্তানই অন্যতম সেরা নেয়ামত। আর এ সন্তান হলো পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সম্পদ ও সন্তানসন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৪৬)।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে এ প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যে সে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে আনন্দিত হয়। তাই মানুষের কাছে তার স্রষ্টা ও দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশই কাম্য। এ জন্যই হজরত হুসাইন (রা.) থেকে সদ্য সন্তানের পিতা হওয়া ব্যক্তিকে অভিবাদন জানিয়ে এমন বলার কথা বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাকে যা দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাতে বরকত দিন। তুমি দানকারীর শুকরিয়া আদায় করো, সে তার বয়স পুরো করুক এবং তোমাকে তার পুণ্য প্রদান করা হোক।’ (মুসনাদ ইবনুল জা ‘দ: ১৪৪৮; ইবন আদি, আল-কামেল: ৭ / ১০১; ইনব আবিদ্দুনইয়া, আল-ইয়াল: ১ / ২০১)। আকিকার ফলে তার পরিজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধব এ সংবাদ জানবে এবং শিশুকে মোবারকবাদ দিতে উপস্থিত হবে। এতে করে সমাজে সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় হবে। সর্বোপরি এতে ইসলামের সামাজিক দায়িত্বচর্চার উপলক্ষ হয়।
যে ধরনের ও যে বয়সের ভেড়া, ছাগল বা দুম্বা কোরবানির ক্ষেত্রে বৈধ, তা দিয়ে আকিকা করতে হবে। গরু, মহিষ বা উট সাতটি ছাগলের সমান ধরে যেভাবে কোরবানি করা যায় অনুরূপ আকিকাও করা যাবে। অনুরূপ একই পশুতে একাধিক আকিকা একত্রে হিস্যা হিসেবে শরিকে করা যাবে এবং কোরবানির সঙ্গেও আকিকার অংশ দেওয়া যাবে।
আকিকার পশু জবেহ করার পর এর ব্যবহার ঠিক কোরবানির পশুর মতোই। ফলে তা তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এক ভাগ পরিবার, এক ভাগ সাদাকা ও এক ভাগ হাদিয়ার জন্য। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘মোস্তাহাব হলো আকিকার গোশত নিজেরা খাওয়া, গরিবদের মাঝে দান করা এবং বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে হাদিয়া পাঠানো। যেমন কোরবানির ক্ষেত্রে করা হয়।’ (নাসায়ি: ৪২২৯; শরহু মাআনিল আছার-তহাভি শরিফ: ১০১৫)।
আকিকার পশুর গোশত আকিকাদাতা স্বয়ং, যার জন্য আকিকা সে নিজে, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-অনাত্মীয়, ধনী-গরিবনির্বিশেষে সবাই আহার করতে পারবেন। কাঁচা গোশত হাদিয়া দিতে পারবেন অথবা রান্না করেও খাওয়াতে পারবেন। (আসান ফিকাহ)।
হাদিয়া বা উপহার দেওয়া ও গ্রহণ করা সুন্নত। কিন্তু বিয়ে-শাদি, সুন্নতে খাতনা ও আকিকার মতো ধর্মীয় ইবাদত ও পর্বগুলোকে এর সঙ্গে শর্তযুক্ত করে পবিত্র ও আনন্দঘন অনুষ্ঠানকে নিরানন্দ ও বিষাদময় করা মকরুহ ও ক্ষেত্রবিশেষে হারাম। (ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম)। উপহার পাওয়ার উদ্দেশ্যে ইবাদত অনুষ্ঠান করা অত্যন্ত গর্হিত ও গুনাহের কাজ। (ইমদাদুল আহকাম)।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) বলেন, আকিকার পশুর চামড়া এবং যা বিক্রয় না করে পারা যায় না, সে অংশগুলো বিক্রি
করা হবে, তারপর তার মূল্য সদকা করা হবে। আকিকার বর্জ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘চামড়া ও বিক্রয়যোগ্য বর্জ্য বিক্রি করা হবে এবং তা সদকা করা হবে।’ (তুহফাতুল মাওদুদ: ৭০; কাশশাফুল কিনা: ৩ / ৩১)। অথবা সদকার হকদার এমন কাউকে দান করে দেওয়া যাবে। (আহসানুল ফাতাওয়া)।
ধর্মীয় রীতি অনুসারে মেয়ের আকিকা সম্পূর্ন করে নাম রাখলো "পাকিজা মাহমুদ সুখ" ! হ্যা সুখ;সম্রাট পারির সুখ! ভালোবাসার সুখ ফড়িং!
হাসপাতালে তিনদিন থাকার পর পারিকে ছেড়ে দেওয়া হয়,মা ও মেয়ে একদম সুস্থ! তাই সম্রাট সময় নিলো না ,৭ দিনের মধ্যেই আকিকার কাজটি সম্পন্ন করলো!
সময় গড়িয়ে যায়,যাচ্ছে;তার সাথে ঘনিভূত হচ্ছে ভালোবাসার পাখিদের মধুর প্রেম বাক্য! কিচিরমিচির করা ছোট্ট চড়ুইয়ের মতোই ছটফটে এক শিশুর চঞ্চলতায় মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো সুখ নীড় হ্যা সম্রাটের বাড়ির নাম পরিবর্তন হয়েছে! আগে নাম ছিলো "মাহমুদ প্যালেস "এখন তা হয়েছে "সুখ নীড়"! সম্রাট তার মেয়ের মাঝে নিজের সব সুখ খুঁজে পায়, ছোট্ট সুখ ও বাবার কাছেই যেন সবচেয়ে বেশি সুখী থাকে!
সায়েরারও আজকাল খেলার একমাত্র সঙ্গী তার আদরের ছোট্ট বোন সুখ!
ছোট্ট কন্ঠের আদুরে ডাকে সুখ ও আপ্লুত হয় খুব! বাচ্চা বড় বোনের স্নেহ আর আদরে সেও সারাক্ষণ তার বড় বোনের গা ঘেঁষে থাকতে পছন্দ করে!
মিসেস মাহমুদ আর মাহমুদ তালুকদারের ও সারাদিন যায় নাতনি'দের পিছনে ছুটাছুটি করে! তাদের ও আজ পরম সুখের দিন! নাতনি দের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে থাকে তাদের চারিদিক! এটাই এখন তাদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের বিষয়,এর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিলেন আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার মানে হজ্জ পালন করতে যাবে!
মিসেস পরশ আবরার চৌধুরী ও আল্লাহর রহমতে কিছুটা সুস্থ হয়েছে,স্পষ্ট ভাবে না পারলেও ভাঙ্গা কন্ঠে ই সবার সাথে কথা বলে! তবে এখনও হাত পা নাড়াতে পারেন না ,কিন্তু হুইল চেয়ারের সাহায্যে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন!
পারি সম্রাটের প্রতি কৃতজ্ঞ, সম্রাটের অস্বাভাবিক প্রচেষ্টায় ই আজ নিজের মায়ের মুখে কথা শুনতে পাচ্ছে,আর এটাই বারবার তাকে সম্রাটের প্রতি কৃতজ্ঞ করে তুলে!
নতুন হাঁটতে শেখা ছোট সুখ আজকাল হুটহাট এদিকে ওদিকে চলে যায় আর এতে পারির মেজাজ তুঙ্গে উঠে যায়,, কিন্তু কিছুই করার নেই সহ্য করতে হবে কারণ মার তো দূরে থাক, মেয়ের দিকে চোখ রাঙিয়ে কথা বলাও সহ্য হয় না এ বাড়ির কারো! আর তার বাবার কাছে তো মেয়ে যা বলে,যা করে তাই ভালো,,এই তো সেদিন ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে পেটের সাথে চেপে ধরে ল্যাপটপটা নিয়ে কলের নিচে রেখে পানি ছেড়ে দিলো কারণ সে এটা পরিষ্কার করবে! ল্যাপটপের উপর কোথায় থেকে উড়ে এসে একটা ছোট পোকা বসেছিল সেটা দেখে হাত দিয়ে পোকা টাকে মারার জন্য চাপড় দেয় আর সত্যি ই পোকাটা মরে ল্যাপটপের স্ক্রিনে লেগে যায়,তখন তার মনে হলো এটা পরিষ্কার করা দরকার! আর কি তারপর যা হওয়ার তাই হলো!
অফিসিয়াল সমস্ত ডকুমেন্ট ছিলো তাতে,এত বড় ক্ষতি হওয়ার পর পারি ভয় পেয়েছিল হয়তো সম্রাট মেয়ের প্রতি প্রচন্ড রেগে থাকবে,মারতে ও পারে কিন্তু পারিকে চমকে দিয়ে মার তো দুরের কথা একটা ছোট ধমক ও দেয়নি বরং সে ভাবছে তার মেয়ের মাথায় অনেক বুদ্ধি যার কারণে ল্যাপটপ পরিষ্কার করার চিন্তা মাথায় এসেছিল!
এভাবেই চলছে পারির সংসার জীবন,ওহ তানহা'র ঘরেও এসেছে খুশির বার্তা! ছেলে সন্তানের জননী হওয়ার সৌভাগ্য আল্লাহ ওর জন্য নির্ধারিত করেছে যদিও তানহা এতে একটু আফসোস করছে কারণ ওর সুখের মতো একটি ছোট ময়না পাখির আঙ্খাকা ছিলো তবুও আল্লাহর ইচ্ছা ই সব হয় আর উনি যা উত্তম আমাদের জন্য তাই দেন এই বিশ্বাসে'ই নিজেকে খুশি রাখছে! খুব শীঘ্রই তানহা ও নিজের সন্তানের মুখ দেখবে!
সম্রাটের ব্যবসা, পারিবারিক দায়িত্ব কোন কিছু ই পারির প্রতি ভালোবাসার কমতি ঘটাতে পারেনি! সবকিছু এক পাশে রেখে পারি জন্য সময় এক পাশে রাখে!
মাঝে মাঝেই মাঝ রাতে হুটহাট লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়ে,পথের ধারের খাবার কিনে খাওয়া, খুনসুটি করা সবকিছু চলছে!
পারিকে ব্যবসায় হাত লাগানোর প্রস্তাব সম্রাট ও তানহা দিয়েছিল কিন্তু পারির এক কথা সে সংসার করবে, নিজের মতো করে নিজের সংসারের খুঁটিনাটি সমস্ত কাজ করবে! আর কি! পারির প্রতি জোর করে কিছু চাপানোর মতো পুরুষ সম্রাট নয়!
সবার জীবন আলহামদুলিল্লাহ খুব সুন্দর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে,সোহা নিজের কাজের চাপে আজকাল বেশ ব্যস্ত থাকে, তবুও চেষ্টা করে পরিবারকে সময় দেওয়ার,সায়েরার চিন্তা ও আজকাল করা লাগে না কারন ছোট সায়েরা এখন নিজের মায়ের চেয়ে মামনির কাছে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে! অবশ্যই এটা পারির মাতৃসুলভ মমতার কারণেই সম্ভব হয়েছে!
মানহা রুহানি তারাও নিজেদের মতোই নিজেদের পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার গড়ায় ব্যস্ত আর মিসেস মন্ডল ও দুই দিকের দুই মেয়ের নাতি নাতনি নিয়ে আছেন মহা আনন্দে! পারির মেয়েকে এখনও সরাসরি না দেখতে পাওয়ায় ভীষণ আফসোস করছে,তানহা'র ডেলিভারী'র পরই দেশে আসার ইচ্ছা জানিয়েছে!
হাসান সাহেব ও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে পারির জন্য , সুখ, সায়েরার জন্য টুকটাক নিয়ে এ বাড়িতে আসার,যাতে পারি নিজের বাবার কমতি অনুভব না করে,যদিও সম্রাট উনাকে একটি দোকান কিনে দিয়েছেন যেটা তে আপাতত উনি মুদি ব্যবসা করছে!
আমাদের জীবনে সুখ দুঃখ উভয় বোন ই আসে! সুখ এসে সুখের বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় তো দুঃখ এসে খরায় শক্ত করে তুলে!তার সাথে শিখিয়ে যায় কিভাবে প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হয়! সেই শিক্ষা যে আয়ত্ত্ব করতে পারে সেই পায় জীবনের প্রকৃত স্বাদ !
বিশ্বাস হচ্ছে কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ অনুভূতি! তাকে ধরে রাখতে জানতে হয়,তার মূল্য বুঝতে হয়!যখন কাউকে বিশ্বাস করি তখন তাকে তার মূল্য বুঝতে দেওয়া উচিত, আবার সেই বিশ্বাসের মাঝে যখন অবিশ্বাসের ক্ষুণ পোকা দেখা দেয় তখন অবশ্যই তার প্রতিকার করা উচিত অবশ্যই সেই বস্তুকে ছুঁড়ে ফেলা নয়!
সবসময় চোখ যা দেখে তাই সত্য নয়,দেখার মাঝেও ভুল থাকে,বোঝার মাঝেও খামতি থাকে তাই যা দেখেছি তাকে যাচাই করা উচিত ,ভাবা উচিত নিজ থেকে না বুঝলে অনুসন্ধান করে বের করা উচিত কি হয়েছে, কেন হয়েছে? প্রথমবারেই তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া কিংবা তাকে নিজ থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়!
পারি যদি সেই রাতেই সম্রাটের সাথে কথা বলতো অথবা চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত একবার সম্রাটের সাথে সরাসরি কথা বলতো, জানতে চাইতো আসল সত্য ঘটনা তাহলে নিশ্চয়ই ওর জীবনে এত কঠিন সময় আসতো না! এত ভুলের তৈরি হতো না! তাই বিশ্বাস করলেই হয় না সেই বিশ্বাসের গোড়াও মজবুত রাখতে হয়!
পারি:- Thank you!
সম্রাট:- কেন?
পারি:- এত ব্যস্ততার মাঝেও আমার ইচ্ছা কে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য!
সম্রাট:- আমার কাছে সবার আগে পরিবার,আর পরিবারের মাঝে সবার আগে তুমি!
স্বামীর মুখে নিজেকে নিয়ে একরকম কথা শুনলে যেকোন নারী ই সুখ অনুভব করবে পারিও করছে,সাগর তীরের প্রচন্ড বাতাসে পারির ছোট ছোট চুল গুলো ওড়নার মাঝে থেকেও বেরিয়ে পড়েছে,আর তা এদিকে সেদিকে উড়াউড়ি করছে, সম্রাট নিজের ডান হাত দিয়ে চুল গুলো সরিয়ে কানের নিচে গুজে দিলো,পারির মাথার ওড়না ঠিক করে দিয়ে কপালে উষ্ণ ছোঁয়া দিলো আর সাথে বললো,
সম্রাট:- ভালোবাসি পারিজাত!
পারি:- আমিও ভালোবাসি!
কথাটা বলেই স্বামীর বুকে মুখ গুজে উষ্ণতা খোঁজার চেষ্টা করছে, হালকা হিমেল হাওয়া আর তার সাথে পরন্ত বিকেলের গোধূলির আলোয় পরিবেশ হয়ে উঠেছে প্রেমময়! তার মাঝে ই দাঁড়িয়ে সেন্টমার্টিনের সৈকতের মনোরম দৃশ্য অনুভব করছে এই কপোত কপোতী! বিলিয়ে দিচ্ছে প্রেমের সুর,ছন্দ, তাল!
পারির আবদারে হালকা শীতের মাঝেই আজ পুরো পরিবার সেন্টমার্টিনের সৈকতে এসেছে বেড়াতে!
ভালোবাসা সুন্দর যদি তা হয় সুন্দর মনের মানুষের সাথে,যদি হয় একজীবনের জন্য এক প্রেমিক পুরুষ / অথবা এক রমণীর সঙ্গে!
সম্রাটের জীবনে পারি এসেছিল ফড়িং এর মতোই হুট করেই উড়ে ;সম্রাটের দৃষ্টিতে সবচেয়ে সুন্দর প্রাণী হচ্ছে ফড়িং,যার মাঝে থাকে বহু রঙের বহর! ওর কাছে মনে হয় বাহারী রঙের পোশাক পরিধান করে সুখের বার্তা নিয়ে আসে ফড়িং, ছোট বেলায় মন খারাপ থাকলে ফড়িং দেখলেই ও খুশি হয়ে যেতো আর তাই তো যেদিন পারিকে প্রথম দেখেছিলো সেদিন অজান্তেই খুশি হয়েছিলো হালকা গোলাপী রঙের পোশাক পড়া পারিকে ও ওর নিজের কাছে মনে হয়েছিল সবচেয়ে সুন্দর একটা ফড়িং, হয়েছিল এক অজানা অনুভূতি যাকে নাম দিয়েছিল সুখ,আর তাই তো পারিকে ডাকে সুখ ফড়িং বলে!
অন্তিম পর্ব!
আমার কিশোরী বয়সের অনুভূতি এই "সুখ ফড়িং "
সেই ২০১১/২০১২ তে শুরু করেছিলাম তাও নিজের প্রথম ডায়েরীতে হাতে লিখে তার সমাপ্তি করলাম আধুনিক মাধ্যম ফেসবুকের পাতায় টাইপ করে! জানিনা কতটুকু পেরেছি তবে চেষ্টা করেছি নিজের সবটুকু দিয়ে,, আমি জানি আমি ভালো লিখতে পারি না তাই আশাও করি না যে আপনাদের আহামরি ভালো লাগবে তবুও বলবো যেমন ই লাগুক জানাতে ভুলবেন না! লেখালিখি নেশায় পরিনত হচ্ছে তাই এটা আমি ইনশাআল্লাহ চালিয়ে যাবো হয়তো নিয়মিত নয়তো অনিয়মিত,,তবে থাকবো এর মাঝেই!!
ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই নতুন গল্প নিয়ে দেখা হবে তার সাথে চলমান গল্প "বিশ্বাসের সংসারে"ও কথা হবে আপনাদের সাথে!
স মা প্ত
0 মন্তব্যসমূহ