#সুখ_নামের_মরীচিকা
#অনুগল্প
#রিমা_আক্তার
{ কপি/নকল নিষিদ্ধ}
প্রিয় মিনু,
বুকের মাঝে দীর্ঘদিন চেপে রাখা একটা কথা বলতে চেয়েও বলতে পারিনি! তোমার ঐ অসহায়ত্ব ভরা চাঁদমুখ, কাতর চাহনি দেখে আমি বারবার বলার চেষ্টা করেও থেমে গিয়েছি। নিগর্ত শব্দনালীকে গিলে নিয়ে,কন্ঠনালীকে অবরুদ্ধ করেছি শতবার! কিন্তু আজ আমি অপারগ হয়ে !
মিনু ,নারীত্বের পূর্নতা যেমন ‘মা’য়ের মতো মধুর শব্দ শোনায়!তেমনি একজন পুরুষের জীবনের পূর্নতাও তার অস্তিত্বের চিহ্ন, তার নিজের সন্তানের মুখে বাবা ডাক শোনায়! মা শব্দটা যেমন একজন নারীকে পূর্ণ করে, তেমনি বাবা ডাকটাও একজন পুরুষকে সার্থক করে। মিনু ,তুমি জানো আমি বাচ্চাদের কত ভালোবাসি! কিন্তু ভাগ্যের খেল কি নিষ্ঠুর দেখো, আমাকেই কি-না নিসন্তান হয়ে একটা জীবন কাটাতে হবে!এত নিষ্ঠুর বাস্তবতা আমি কিভাবে মেনে নিবো, বলো’তো?
মিনু, আমি অনেক চেষ্টা করেছি। পারছিনা আর! সত্যি, পারছিনা! আমি ভীষন চেষ্টা করলাম! কিন্তু,এত চেষ্টা করেও আমি নিজের মনকে বুঝাতে ব্যর্থ হলাম। সঙ্গে অনুভব করলাম, আমি কেনো এই ব্যর্থতার দায়ভার আজীবন বয়ে বেড়াবো! সমস্যা তো আমার নয়,তবে কেনো আমি আজীবন এই অপূর্ণতার ঘানি টানবো?
মিনু ,আমি তোমাকে ভালোবাসি! পৃথিবী গোল,চন্দ্র তার চারিদিকে ঘুরে, সূর্য তার বুক চেতিয়ে ধরিত্রীকে রশ্নি বিলিয়ে দেয়,সমুদ্রের জল নোনা , বিশ্ব ভ্রমান্ড সৌরজগতকে চতুর্দিকে ঘূর্নায়মান,এসব যেমন শ্বাশত সত্য, তেমনি সত্য আমি তোমাকে ভালোবাসি! আমার মিনু,আমি তোমাকে ভালোবাসি,তা আমি চিৎকার করে বলতে পারছি কিন্ত যেটা পারছি না তা একান্তই তোমাকে বলছি!মিনু , আমি পিতৃত্বের স্বাদ পেতে চাই! আমি না তোমাকে হারাতে চাইছি,না পারছি পিতৃত্বের মতো প্রগাঢ়, স্পন্দনশীল, অস্পর্শি অনুভূতিকে ছুঁয়ে দেখার মতো স্বাদ পাওয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে। আমার নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছে। আমি কি করবো বলোতো! আমাকে একটা পথ দেখাও! আমার জন্য একটু সহজ করে দাও বাচা! আমি রোজ মায়ের হাহাকার,তোমার সিক্ত নয়ন দেখেও ভীষণ ক্লান্ত! আমি না পারছি তোমাকে সুখি করতে, না পারছি নিজেকে সুখ দিতে! আমি বড্ড ক্লান্ত এই টানাপোড়েনের জীবনে!আমাকে উদ্ধার করো এই যন্ত্রনার মৃত্যু কূপ থেকে! আমি মুক্তি চাই,দয়া করে আমাকে মুক্ত করো!’
~ মেহতাব !
মাথার কাছের বেড সাইড ছোট্ট টেবিলের উপর গোলক দিয়ে চাপা দেওয়া একটা সাদা কাগজ। ফকফকা সাদা কাগজের উপর কৃষ্ণবর্ণে লিখিত বাক্যগুলোয় আবদ্ধ বড় বড় ডার্ক সার্কেলে ডোবা চোখ দুটো দিয়ে আনমনেই বর্ষণ হতে আরম্ভ করলো,যা তাহমিনা বেমালুম হয়ে রইলো!নিজের অপূর্ণতার দুঃখে তার বুক ভারি হয়ে থাকে সবসময়!তদ্দুপরে সারাদিন নানান লোকের কটুক্তি,শ্বাশুরির মুখ ঝামটা,শ্বশুরের মৌনতা তার কষ্টের পরিমান আরো বাড়িয়ে দেয়। লোক সমাজের গঞ্জনার ভয়ে তার ফাঁকা বুক তটস্থ থাকে সারাক্ষণ। তার বুকে এভারেস্টের মতো ভার জমে যায় নীল বেদনায়। কিন্তু এতকিছুর পরেও কোথাও একটা শান্তি ছিলো! কেউ একজন তার এই অক্ষমতার সঙ্গী ছিলো,কেউ তার ফাঁকা বুকের খাঁ খাঁ শূণ্যতার পরম পাওয়া, পূর্ণতা।এটাই তো তার শান্তির কারন ছিলো। কিন্তু আজ থেকে যেন তাও মিথ্যা প্রমান হয়ে দাড়ালো তার সামনে!
তাহমিনা উপরোক্ত কথাগুলো ভাবছে আর নিরব কান্নায় নিজের বুক ভাসাচ্ছে।
ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মেহতাব সিদ্দিকি আর ওয়েডিং প্ল্যানার তাহমিনার নয় বছরের বিবাহীত জীবন। পনেরো বছর ধরে ভালোবাসার সুতোয় বাঁধা তারা !ছয় বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর তারা নয় বছর আগে বিয়ে নামক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়! বৈবাহিক জীবন প্রথম কয়েক বছর আনন্দে কাটলেও, তাদের জীবনের সুখের পায়রা উড়ে যায় বছর ছয়েক আগে! যখন থেকে তার খুঁত সকলের চোখে বিঁধেছে!যখন থেকে সে জানতে পেরেছে তার জীবনের একটা অধ্যায় কখনো খোলার নয়। সে কখনো মাতৃত্বের মতো মধুর অনুভূতিটাকে উপভোগ করতে পারবেনা।না পারবে তার পাশে থাকা মানুষটাকে পিতৃত্বের স্বাদ দিতে! তার অক্ষমতার দহন অল্পদিনেই ছড়িয়ে গেলো তার আশেপাশের সকলের মাঝে!সেই দিনগুলোতে একজন ছাড়া কারো থেকেই সে বেশিদিন সহানুভূতি পেলো না!দিনের পর দিন কেটে গিয়ে মাস, মাসের পর বছর পেরুলো!শ্বশুর বাড়ির সকলের সাধারণ কথাটাও তখন তার কাছে গলার কাঁটার ন্যায় বিঁধতে আরম্ভ করলো!পরিবারের সদ্যসদের থেকে পাড়া প্রতিবেশি, সকলের চা’য়ের কাপের চুমুকে চুমুকে গল্পের বিষয়বস্তু হয়ে উঠলো তাহমিনা নামক নারীর অক্ষমতা!গল্প গিয়ে থামে মেহতাবের ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে। যেন মেহতাবের ভবিষ্যৎ তাদের চিন্তায়’ই পরিবর্তন হয়ে যাবে!
“সুখ একটা মরীচিকা। এটার প্রাপ্তি কিসে? কে, কতটা পাব, তা একমাত্র রবের ইচ্ছা?অথচ তা পাওয়া নিয়ে মানুষের কত কি আয়োজন ।”
স্থির ভেজা কন্ঠস্বর মেহতাবের। মাথার উপর চক্রাবৃতিকারে আওয়াজ তুলে ঘুরছে বহুদিনের পুরানো যান্ত্রিক ফ্যানটা। দৃষ্টি তার সেখানে অবিচল। ভেজা চোখের পাপড়িদ্বয় মৃদুমন্দ কাঁপছে তাতে। তার দিকে সিক্ত নয়নে পলকহীন চেয়ে আছে পাতলা দেহের ফ্যাকাশে বর্ণের এক মধ্যবয়সী নারী।
বিছানার চাদরের সাথে লেগে থাকা একটা আধ পোড়া মানব দেহ! ক্যান্সারের বিষ্ক্রীয়ায় সুর্দশন দেহখানা কঙ্কালসার হয়ে লেপ্টে থাকে সারাক্ষন বিছানায়। আজ প্রায় ছয় মাসের অধিক হলো মেহতাবের দেহে ক্যান্সারের বীজ পাওয়া গেছে! অথচ তার ঘরে এখন নতুন অতিথিকে স্বাগতম জানানোর আয়োজন চলছে । এইতো কিছুদিন বাকী…এরপরেই তার ঘর আলোকিত করে প্রবেশ করবে সিদ্দিকি পরিবারের প্রথম উত্তরসূরী!মেহতাব সিদ্দিকির ঔরসগত উত্তরসূরী!
তাহমিনা মেহতাবের জীবন সহজ করে দেয়। নিজের জীবনে একাকীত্ব মেনে নিয়ে সবার থেকে দুরে চলে যায়! মেহতাবও বাবা মায়ের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন করে এগিয়ে যায় । জীবন নতুন রঙে সাজায়। পিতৃত্বে স্বাদকে উপভোগ করার জন্য চাতকের মতো অপেক্ষা করতে থাকে কিন্তু মানুষ যা চায় তাই কি সে সবসময় পায়? তেমনি এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেলো তার সাথে। মাস ছয় আগেই তার জীবনে ঘটে গেলো সবচেয়ে করুন ঘটনা ! পরিপাকগ্রন্থের তীব্র ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের সরনাপন্ন হলে তারা জানায় খাদ্যনালীতে পচন ধরে তা ক্যান্সারে রুপ নিয়েছে। সময় খুব বেশি একটা নেই ।
খবরটা শোনার পরেই তার দেড় মাসের অন্তসঃত্ত্বা দ্বিতীয় স্ত্রীকে তার পরিবার নিজেদের কাছে নিয়ে যায়। তারা নিজেদের মেয়েকে একজন মৃত পথযাত্রীর জন্য ধুকে ধুকে মরার জন্য ফেলে রাখবে না। তারা ঐ দেড় মাসের অনাগত শিশুকে মেরে ফেলতেও প্রচেষ্টা করে। কিন্তু মেহতাবের শেষ চাওয়া হিসেবে সেই কাজটুকু আর করেনি! এদিকে একজন ক্যান্সারের মানুষের জন্য যতটা মানবিক যত্ন পাওয়া দরকার তা মেহতাবের ভাগ্য পায়নি। তাই’তো সে জীব্দদশায়’ই পরিত্যক্ত হয়ে আছে । একমাত্র ছেলের জীবনের এহেন করুন পরিণতিতে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে বিছানায় পড়ে যায় মান্সুরা বেগম। এখন আর তার প্রতিবেশিরা আসে না তাদের সহমর্মি হয়ে,কেউ এসে ভবিষ্যৎ নিয়ে উপদেশ দেয়না। কারো ভাবনা এখন আর এ বাড়ীর দৌড়গোড়ায় পৌছায় না। চায়ের কাঁপে গল্প জমে না। সব দিকে যখন নিঃসঙ্গতা তখন মেহতাব অনেক খোঁজাখুজির পর মিনুর ঠিকানা পায়,তার যে ক্ষমা চাওয়ার আছে।
মেহতাব মিনুর হাত ধরে উপরোক্ত বাক্যগুলো বলছিল,মিনু ছলছল চোখে নিজের জীবনের একমাত্র সুর্দশন পুরুষকে দেখছিলো। যে এখন নিজের জীবনের পড়ন্ত বেলায় একাকি অসহায় হয়ে তার’ই দ্বারে এসে দাঁড়িয়েছে । অথচ এই লোকটাকে সুখি করতেই তো সে সব অনুভূতিকে গলা টিপে হত্যা করে সবকিছু ছেড়েছুড়ে …………মিনুর চাঁপা আর্তনাদ, নিরব কান্না আর দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ। শব্দহীন কান্নার সাক্ষী হিসেবে তার ডান আঁখি থেকে এক ফোঁটা উষ্ণ জল টুপ করে মেহতাবের শুকনো হাতের পিঠে পড়ে। মেহতাব তা দেখে শুকনো হাসে।তার চাহনি আগের মতোই নিঃশ্চল। কি যে যন্ত্রনা ছিলো তাতে, তা কেবল আল্লাহ আর সে’ই বোধহয় জানে ! মেহতাব নিজের শুকনো রুক্ষ হাতটা মিনুর হাতের উপর রেখে ভাঙ্গা, ভেজা কন্ঠে বললো,
“ তোমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে তোমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে ভুল করেছিলাম,হয়তো বিধাতা তারই শাস্তি স্বরূপ আমার জীবনের ক্লান্তি লগ্নে তোমাকেই সহায় বানিয়ে পাঠিয়েছেন।”
“এমন কিছু নয় মেহতাব।”
মেহতাব এবার মাথাটা হালকা ঘুরিয়ে মিনুর দিকে চাইলো, নির্জিব হাতটা তুলে মিনুর নরম কোমল হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো। কাঁপা, ভেজা গলায় , আবদারের সুরে অনুনয় করেই বললো,
“আমি কি তোমাকে একবার জড়িয়ে ধরতে পারি মিনু?”
মেহতাবের আবদারে মিনুর কাদার মতো নরম হৃদয় চমকায়, ভেজা পল্লবের আখিজোড়া কেপে উঠে, সে হাত গুটিয়ে নিয়ে আরক্ত মুখে বলে,
“ আমি তোমার জন্য পরনারী মেহতাব,এসব আবদার অনুচিত। আমাকে কলুষিত করার মতো অবুঝ আবদার করবে না,দোহাই লাগে !”
মিনুর মতো নরম নারীর শক্ত কণ্ঠে দেওয়া উত্তরে মেহতাবের মুখটা লজ্জায়,অপমানে রক্তিম হয়ে উঠে,নিজ অপরাধে আবারও লুটিয়ে পড়ে অদৃশ্য এক জমিনে।তবুও, নিস্পৃহ চাহনি মেলে,ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। রুদ্ধশ্বাস হয়ে বলে,
“ হাত ছাড়ার শাস্তি পরপুরুষ বানিয়ে দিবে জানতাম না!”
“ হাত ছাড়লেই পর হয়ে যায়না মেহতাব,পর হয় মন ছাড়লে!......তার সাথে সব সম্পর্ক বিনাশ হয়ে যায়, তোমার সাথে মনের বিচ্ছেদ সেদিন’ই হয়ে গিয়েছিলো যেদিন তোমাকে অন্যের জন্য মুক্ত করে দিয়ে গিয়েছিলাম। বাদ দেও, তুমি এখন নিজের দিকে যত্নশীল হও! যে আসছে তাদের নিয়ে সুখি হও।আমি সর্বসাকুল্যে তোমার সুখ কাম্য করি। ”
“ আর সুখ, এখন শুধু মৃত্যুই কেবল সব প্রাপ্তির চাহিদা পূর্ণ করতে পারে !”
“ এভাবে বলো না মেহতাব, উপরওয়ালা কারো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখেন না। তিনি কাউকে অতৃপ্ত রেখে দুনিয়া থেকে নেয় না। নিশ্চয় তিনি তোমার জন্যেও কিছু উত্তম ভেবে রেখেছেন। তোমার পরীক্ষা নিচ্ছেন !”
“ তবে কেন তোমার আমার একটা সুখের সংসার চিরস্থায়ী হলো না মিনু?”
“ হয়তো তাতে কল্যানজনক কিছু পাওয়ার ছিলো না।”
“ সতিই কি তাই?”
মিনু এই কথার প্রত্যত্তর আওয়াজ করে করলো না। মনে মনে বিরবির করে বললো,
“ সত্যিই তাই মেহতাব। নয়তো আমি মানুষ চিনতাম কি করে?”
সমাপ্ত.






0 মন্তব্যসমূহ