গনতন্ত্রের মঞ্চনাটক সকল পর্ব

 উপন্যাস:- গনতন্ত্রের মঞ্চনাটক
লেখনিতে:- শেখ মরিয়ম বিবি

গনতন্ত্রের মঞ্চনাটক মরিয়ম বিবি - Morium Bibi


পর্ব:- ১



"দশটা গাড়ী পোড়াতে হবে। গাড়ী প্রতি দশ হাজার, একশো লোক দরকার যারা স্বেচ্ছায় নিজেকে রক্তাক্ত করতে পারবে। চিকিৎসার বন্দোবস্ত দলীয় এবং সরকারের তরফ থেকে করা হবে,সাথে আইনি জটিলতায় উকিল পাবে।তবে শব্দ শুধু চারটি উচ্চারিত হবে এর বাইরে একটা অক্ষর‌ও যদি উচ্চারিত হয় তাকে সেই আগুনেই জ্বলসে দেওয়া হবে।"


সামনে দাঁড়ানো সুঠামদেহী, সুদর্শন পুরুষের মুখ থেকে নির্গত বাক্যগুলো পঞ্চাশোর্ধ মোতাহের হোসেনের কপাল কুঁচকে দিলো।তিনি মনে মনে শত ভেবেও কুল পেল না এই সুদর্শন পুরুষটি এমন কেন?এর মুখ থেকে বের হ‌ওয়া শব্দগুলো কখনোই অন্যের জন্য মঙ্গলজনক হয় না কেন? বিরবির করে উচ্চারণ করলেন,


" ব্রিটিশদের বিদ্যালয় থেকে ব্যারিস্টারি পড়ে শুধু আইনি জ্ঞান‌ই নয়, ব্রিটিশদের বদমাইশি চাল‌ও সাথে করে নিয়ে এসেছে!"


আদেশকৃত বাক্যের পরিবর্তে নীরবতায় বিরক্ত হলো বয়স একত্রিশ পেরিয়ে যাওয়া সুদর্শন পুরুষটি,পিছু ঘুরে বিরক্ত চাহনি নিক্ষেপ করে,বাম ভ্রু উঁচিয়ে দাঁত খিচে কিছু জিজ্ঞেস করতেই মোতাহের হোসেন সচকিত হলেন।ঐ মুখ দিয়ে বাক্য নির্গত হ‌ওয়ার আগেই নিজের ঠোঁটের আগায় সাজিয়ে রাখা বুলিগুলো বুলেটের ন্যায় ছুঁড়ে দিলেন নিজের থেকে কম করেও বিশ বছরের ছোট এই জটিল লোকটার কাছে,


"কিন্তু কেউ নিজের শরীরে কেন আঘাত করবে স্যার, এটা কি.."


" আপনার কাছে চেক ব‌ইগুলো কি সিনেমার টিকিট কেনার জন্য দিয়ে রেখেছি? ওগুলো কেন রাখা হয় সাথে?"


"জ্বী স্যার বুঝেছি!"


লজ্জিত ভঙ্গিতে নিজের দোষ স্বীকার নিজের সম্মান রক্ষার করলেন বোধহয়,নয়তো এই পুরুষ বয়সের তোয়াজ না করেই যা আসতো তাই বলে দিতো মুখ দিয়ে।একে দেখে বোঝার‌ই উপায় নাই এ একজন উচ্চ শিক্ষিত লোক,ব্যারিস্টারি শেষ করে এখন রাজনীতির পাঠ চর্চা করতে নেমেছেন।


‘ ভাই ’ ডাকে মোতাহের হোসেনের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অদুরে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা পঁচিশ বছরের যুবকের পানে নির্ধারিত করলো, যুবকটি আতংকিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে।তার আতংকিত মুখশ্রীর রেশ মুহুর্তে ছড়িয়ে পড়লো উপস্থিত মোতাহের হোসেন ও তার স্যার সম্বোধিত পুরুষটির উপরে। ধীর পায়ে এগিয়ে এলো সেই যুবক। ইশারায় বাক্য বিনিময়ে বোঝা গেল মোতাহের হোসেনকে নিজের উপস্থিতি সরিয়ে ফেলতে হবে। অনুমতি নিয়েই বেরিয়ে গেলেন। ইশারায় আদেশ করা হলো বলার জন্য!


"ভাই, হাসপাতাল মাঠের পিছনে খালের পাড়ে ময়লার মধ্যে একটি লাশ পাওয়া গ্যাছে!"


"তো?"


নিরুত্তাপ প্রশ্ন,এতে তার কোন বিশেষ ভাবনা নেই এটাই বোঝালো যেন। কিছুক্ষণ নিরব থেকে জিজ্ঞেস করলো,


"প্রধান সমস্যা কি সেটা বল?"


" ভাই পোলাডা জাহাঙ্গীরের দলের।দল গঠনের গত মিটিংয়ে ইউনিট যুবলীগের সাংস্কৃতিক সভাপতি পদে সিলেক্ট হ‌ইছিলো।"


এখনও নিজের সঠিক উত্তর পায়নি তাই প্রশ্ন ঝুলিয়ে রাখলো চেহারায়, ছেলেটার প্যাচানো কথায় বিরক্ত‌ও হচ্ছে। ছেলেটা বুঝলো। কিন্তু সাহস করে বলার সাহস পাচ্ছে না।আমতা আমতা করতে থাকলো। বিরক্তিতে 'চ' বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করে তেতো মুখে ঝাড়লো লটকিয়ে থাকা বিরক্তি,


" সমস্যা কি? স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতে না পারলে আমার সামনে আসবি না! আমি এহেন সময় অপচয় পছন্দ করি না।যা মাঠে যা। গিয়ে দেখ সব ঠিকঠাক আছে কিনা?"


" ভাই!"


"কি নিয়ে এত ভয় পাচ্ছিস?"


ছেলেটা ভীত চাহনি। বিরক্ত লাগলেও এবার নিজেকে দমিয়ে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলে উত্তর এলো,


" ভাই এই পোলাডার সাথে গত পরশু সন্ধ্যায় মুরাদ ভাইয়ের হাতাহাতি হয়েছিলো তখন মুরাদ ভাইয়ের সামনেই সাঈদ ভাই থ্রেট দিয়েছিলো,সবার সামনেই তাকে জানে মারার হুমকি দিয়েছিলো। সেদিন রাত থেকেই নাকি পোলাডা নিখোঁজ আছিলো আর আজ তার লাশ পাওয়া গেছে,তাও আবার আমাদের সীমানায়‌'ই,ভাবছেন কথাটা ক‌ই গিয়া পৌছাইতে পারে!"


এতক্ষণ বিষয়টি হেলায় ছুঁড়ে দিলেও এখন মাথায় চাপ পড়লো।


নির্বাচন নিকটে, একদম দোরের দ্বারে দাঁড়িয়ে আছে।চারদিকে তা নিয়ে নানা ব্যস্ততা, এর মধ্যেই এলাকায় চলছে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল এর আয়োজন; আজ তার ফাইনাল ম্যাচ এবং শেষ দিন।এই উপলক্ষে ক্রীড়ামন্ত্রী মনজুরুল ইসলাম তৈয়ব, প্রশাসন মন্ত্রী খন্দকার মীর নাছির সহ আর‌ও রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন।এই অবস্থায় মাঠের পাশেই লাশ পাওয়া গেছে তাও কিনা বিরোধীদলীয় নেতার। বিষয়টা যথেষ্ট চিন্তার।অন্যদিন হলেও ধামাচাপা দেওয়া ব্যাপার ছিলো না কিন্তু আজ এই মুহূর্তে, নিশ্চয়ই এলাকা গরম হয়ে আছে!


"ভাই"!


"হুম"!


ছেলেটার ডাকে চিন্তায় বাধাগ্রস্ত হয়ে ছোট শব্দে উত্তর, " কি করবেন এহোন?আপনি যাইবেন?নাকি আমরাই ঠিকা দিয়া দিমু?যদিও পাবলিক বহুত ক্ষেইপা আছে!"


" ভাবতে দে,এক কাজ কর সাইদকে খবর দে, সাথে মুরাদরেও আসতে বল।আগে ওদের থেকে শুনি কেন জানি মনে হচ্ছে ঘটনায় অনেক প্যাচ,যা দেখাচ্ছে তা আসল নয় আর যা আসল তা দেখাচ্ছে না।"


" ভাই আমার‌ও এমন মনে হচ্ছে কিন্তু প্রমান ছাড়া কি..!"


" আগে যা ওদের আসতে বল,ক্লাবে যাবি নিয়া,আমি আগে ক্লাবে যাবো তারপর মাঠে, আচ্ছা খাবারের আয়োজন কেমন হয়েছে,সব ঠিকঠাক তো? আমি যেন কোনভাবেই অপমানের মুখোমুখি না হ‌ই!"


"ভাই কি বলেন? আপনাকে ছোট করার মতো কাজ কোনদিন করিনি আর করবোও না ইনশাআল্লাহ দেখিয়েন!"


"জানি,এই জন্যই তোকে এত ভরসা করি।এখন যা,দেরি হয়ে যাচ্ছে!

_আচ্ছা মুরাদের সাথে কি নিয়ে লাগছিলো ঐ ছেলের?"


"তাতো জানিনা ভাই, আমি মাঠের পাশেই প্যান্ডেলের কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা তাই দেখছিলাম, তখন‌ই দেয়ালের পিছন থেকে কয়েকটি ১৪/১৫ বছর বয়সী ছেলে বের হয়ে এলো আর চিৎকার শুরু করলো লাশ লাশ বলে। সাথে সাথে মাঠ ভরে গেল উৎসুক জনতায়,জানেন তো এদেশের মানুষ বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করার চেয়ে ভীর জমিয়ে তামশা দেখায় ওস্তাদ।তাই আমি তাদের ঠেলে কোনরকমে সেখানে গিয়ে দেখলাম।ভাই লাশটি কিন্তু পচে যাবে, খুবই বাজে ভাবে মারছে।চেহারা চিনতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে । মনে হচ্ছে কাল রাত গভীর হ‌ওয়ার প্রথম প্রহরেই কাজটা সারছে কিন্তু ভাই এমন বোকামি কেমনে করলো? মারলো তো মারলোই আবার মাইরা লাশ এইখানে ফালাইয়া গেলো? মানে...",


"ইচ্ছা করেই করছে, সামনে নির্বাচন, তোর কথা অনুযায়ী পরশুদিন আমার দলের ছেলেদের সাথে গ্যাঞ্জাম হয়েছে, মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। সবটা পরিষ্কার।ওরা আমাকে হ্যারেজ করতেই এই কাজটি করছে; নির্বাচনে আমার অবস্থা নিকৃষ্ট দেখাতেই এটা একটা ছোট ভুমিকা দেখালো মাত্র। সামনে আরও অনেক কিছু হবে,হতে চলেছে।"


" তাইলে এখন আমাদের করনীয় ভাই?"


"ঠান্ডা মাথায় সবটা ম্যানেজ করা!"


"কত্ত বড় শয়তান দেখছেন ভাই!"


"বর্তমানে রাজনীতির ময়দানে সবাই শয়তান,কেউ ওলি আউলিয়া না।এই যুগে ওলি আউলিয়ারা রাজনীতি করে না। রাজনীতি করতে হলে সবার আগে ভাঙ্গতে হবে নীতির শিকল, তারপর করতে হবে জনতার কাঁধে পা রেখে রাজ। একজন সফল রাজনৈতিক নেতা সেই হয় যে নীতিমালার নীতি নষ্ট করতে পারে,বাকী সব নীতির বুলি খালি চর্মের তৈরি খসড়া‌। বুঝছিস?"


" জ্বী ভাই!"


"এখন যা।আমিও কিছু সময়ের মধ্যেই আসতেছি!"


“ জ্বী ভাই, আসসালামু আলাইকুম ভাই!"


“ওয়ালাইকুম আসসালাম, সাবধানে যাবি!"


একজন আদর্শ কর্মীর ন্যায় সম্মতি জ্ঞাপন করে নেতার প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করাই এই ছেলের প্রধান কাজ।তার কাছে তার ভাই যা বলে তাই ঠিক,সেটাকে নিয়ে তদন্ত করা তার কাজ নয়। তসবিহ জপার ন্যায় সারাদিন খালি,

" যারে ছাড়া গতি নাই,সে আমাদের ইব্রাহিম ভাই!"


এই স্লোগান জপাই তার একমাত্র ধ্যান,জ্ঞান,বুলি!এ যেন দুনিয়াতে এসেছেই এই এক কার্য সম্পাদনে।


২.

"আমাদের দেশের পুরো নাম কি?"


"গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ"


"এদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থা কেমন?"


"গনতান্ত্রিক!"


"গনতন্ত্র বলতে তুমি কি বুঝো?"


" গনতন্ত্র হচ্ছে এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা যেখানে সে সমাজের জনগন‌ই সর্বেসর্বা।তারাই নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিনিধি নির্ধারণ করে,আইন প্রনয়ন করে, নিয়মনীতি তৈরির পর্যায়েও তাদের নির্ধারিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনে দেখা যায়, তাছাড়াও তারা সমাজের যেকোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারে নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে!"


"বাহ; দুর্দান্ত!তুমি তো দেখছি অনেক কিছুই শিখে গিয়েছো! এভাবেই এগিয়ে যাও, ইনশাআল্লাহ একদিন অনেক বড় হবে!"


"ধন্যবাদ নানা ভাই! কিন্তু নানা ভাই এখন তো আর জনগনের মতামত নিয়ে নির্বাচন হয় না, উল্টো তাদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হয় সিদ্ধান্তগুলো আর এটাকে নাকি বলা হয় স্বৈরাচারীতা! যা কিনা একটি সার্বভৌম , স্বাধীন রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ক্ষুন্ন করে,সে দেশের জনগণের জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে।"


"হ্যা নানা ভাই তুমি ঠিক বলেছো,এমনটাই হয়; তবে এটাও কিন্তু একসময় পরিবর্তিত হয় যদি জনগণ সচেতন হয়। কিন্তু নানা ভাই তুমি এত কথা কোথায় থেকে শিখলে?"


"নানা ভাই আমি তো স্কুলের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বড় আপু ভাইয়াদের থেকে শুনেছি‌লাম।গতকাল টিভিতেও দেখিয়েছে। আচ্ছা নানা ভাই আমাদের দেশে কি এখন স্বৈরাচারীতা চলছে?"


"ওর শৈশবটাকে রাজনীতির জটিলতায় কেন জড়াচ্ছেন আব্বা?এখন ওর বয়স হালুম টুকটুকির খুনশুটি উপভোগ করা,মুঙলি দেখে পশুদের বর্বরতা, মহত্ত্ব শেখা।তা না শিখিয়ে ওকে শিখাচ্ছেন স্বৈরাচারীতা কি?"


" নানা ভাই স্বৈরাচারী রাজত্বে আছো কিনা জিজ্ঞেস করলে না? মনে করো তাই আছো! দেশের চিন্তা না করলেও জীবন চলে যাবে কিন্তু যেখানে তোমার সব সেখানেই প্রধান স্বৈরাচার রয়েছে।"


"আব্বা!"


সাত বছরের প্রথম শ্রেনীতে পড়ুয়া নাতীকে স্কুলের সমাজ ও বিজ্ঞান ব‌ইয়ের একটা অধ্যায় পড়ানোর সময় উক্ত প্রশ্নগুলো করছিলেন ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার যার গোছানো ও সাবলীল উত্তর পেশ করেন তার কন্যার ঘরের প্রথম নাতী আহনান তালিব তান্না।ঘরের দোরে দাঁড়িয়ে পুরোটাই শুনছিলো মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার, ইসহাক আবদুল্লাহর বড় পুত্র সন্তান।


'ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার' কামরাঙ্গীরচর থানার বর্তমানে একটা নির্ধারিত ওয়ার্ডের কমিশনার তিনি। তার তিন সন্তানের মধ্যে বড় সন্তান হচ্ছে কন্যা ইয়ামিনা তানহা বিনতে ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার , দ্বিতীয় সন্তান মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার, এবং সর্বশেষ ও সবার কনিষ্ঠ সন্তান হচ্ছে পুত্র মোহাম্মদ ইউসুফ তাজিশ ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার।


চলবে!


আমি রাজনীতি নিয়ে লিখবো, আমার প্রধান চিন্তাই থাকবে আমাদের ভঙ্গুর রাজনীতির অবস্থান তুলে ধরা,তাই বলে অন্য কোন মশলা থাকবে না এটা কিন্তু নয়। তাই বলছি শেষ অবধি থাকুন ইনশাআল্লাহ আগের গুলোর মতোই হতাশ হবেন না।☺️


ভালোবাসা প্রিয়-পাঠক/পাঠিকা মহল। আপনারাই সাহস,তাই আপনাদের মন্তব্য আমার একান্ত কাম্য ।


পর্ব ২


"আসসালামু আলাইকুম কাউন্সিলর মামা", পেছন থেকে সম্মান সূচকে সেদিকে ফিরে দাঁড়ালো ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার, লোকটি নিজের সালামের উত্তর পাওয়ার আগেই পুনরাবৃত্তি ঘটালো, "আসসালামু আলাইকুম ইব্রাহীম ভাইয়া", "ওয়ালাইকুম আসসালাম",ভরাট কন্ঠে উত্তর প্রদান করে জিজ্ঞাসু নয়নে তাকিয়ে থাকলো,লোকটা তারাজকে কাটিয়ে ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের মুখোমুখি হয়ে হরবড়িয়ে বললো,"খবর পাইছেন নি? মাঠের ম‌ইধ্যে লাশ পাওন গ্যাছে!ক্যাডায় জানি মাইরা একদম ছেইচা ফালাইছে।চ্যাহারাই চিনোন যাইতাছে না। পুলিশ দিয়া মাঠ ভ‌‌ইরা গ্যাছে!মামা আপনের কিন্তু যাওন উচিত, যেহেতু ঘটনা আপনার ওয়ার্ডে ঘটছে, আপনার তো যাওয়াই উত্তম।এতে কিন্তু জনগণ খুশি অইবো, এমনিতেই আপনেরে ম্যালা ভালোবাসে তার মধ্যে আরও বাড়বো সেই ভালোবাসা।",  "আমি আসছি,আব্বা যাবেন না!", তারাজের কথায় লোকটা সেদিকে দৃষ্টি ফেললো, একবার ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের মুখে চেয়ে তারাজকে বললো," আপনে যাইবেন ভাই!" , " হ্যা কেন? আমি গেলে কি সমস্যা?", "না না সমস্যা না! তয়;" , "যান আমি আব্বার সাথে কথা শেষ করে আসছি!"

"আব্বা,খবরটা ভালো মতো দেখে আসি, আপনার এখন বাইরে যাওয়ার দরকার নেই, এমনিতেই তো আরেকটু পর বের হবেন,তাই একবারে তৈরী হয়ে বের হোন!", "সামলাতে পারবা? খবরদার মাথা গরম করবা না,যাই হোক ঠান্ডা মাথায় হ্যান্ডেল করবা!" , "জ্বী ইনশাআল্লাহ,দোয়া করবেন, আসি, আসসালামু আলাইকুম; আম্মা আমি আসি!" , " কাউন্সিলর হিসেবে নিজের এলাকায় এমন ঘটনায় তার যাওয়া উচিত থাকলেও তিনি জানেন তার চেয়েও পারফেক্ট মানুষ যাচ্ছে, তাছাড়া এই এলাকায় থেকে সাংসদ পদের জন্য নমিনেশন নিতে চাচ্ছে এমন মুহূর্তে এই রকম কাজে সম্পৃক্ত থাকা উচিত,তাতে ভালো একটা দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।"

"আসসালামু আলাইকুম হবু এমপি সাহেব!", এস আই কামাল ইব্রাহিমকে দেখে হাসি মুখে সালাম প্রদান করলো,তার মুখে নিজের প্রতি অহেতুক কথা শুনে মোটেই ভালো লাগলো না ইব্রাহিম তারাজের।কঠিন স্বরে সতর্ক করে বললো, "এখন‌ও হ‌ইনি তাই ঐ নামে সম্বোধন না করাই উত্তম,কারণ সবটা উপর‌ওয়ালার ইচ্ছায় ঘটে,কখন কি হয়ে যায় বলা যায় না।এই যে ছেলেটা এই কি জানতো এত তাড়াতাড়ি দুনিয়ার আলো বাতাস থেকে হারিয়ে যাবে?" , "তারাজের কথায় এস আই কামাল মাথা দুলিয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করলো, তারপর লাশের দিকে এগিয়ে গেল,যেতে যেতে বললো, " আমি ভাবছিলাম কাউন্সিলর আসবে, উনাকে কিছু.." , "আব্বার শরীরটা বেশি ভালো না,তাই আমি‌ই আসতে দেইনি তাছাড়া কিছু সময়ের মধ্যেই খেলার আয়োজন শুরু হয়ে যাবে তার আগেই এই ঝামেলা মিটাতে হবে!" 

লাশের চেহারা দেখে ছিটকে দূরে দাঁড়িয়ে পড়লো ইব্রাহিম,মনে হচ্ছে কেউ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পুরো চেহারা থেঁতলে দিয়েছে।হাত পায়ের আঙ্গুলগুলো থেতলানো। নিজের সমস্ত রাগ উগড়ে দিয়েছে।এতটা আক্রোশ কার থাকতে পারে;কিসের জন্য? গন্ধ বেরিয়েছে, মানুষ পচার গন্ধ! এই ছেলে নিখোঁজ গত পরশু থেকে তার মানে মেরেছে গত পরশুই। তারপর হয়তো একদিন লাশ নিজেদের কাছেই রেখেছে , তারপর ইচ্ছাকৃত তাদের এড়িয়ায় ফেলে রেখেছে। আচ্ছা সে যা ভাবছে তাই নাকি অন্য কোন ঘটনাও আছে? এটা কি কোন ভাবে তাদের রাজনৈতিক দ্বন্দের জন্য নাকি এই ছেলের ব্যক্তিগত গোপনীয় কিছু আছে? ইব্রাহিম মনে মনে ছক কষলো।ভাবতে থাকলো দুটো দিক! তার ছেলেরা করেনি সে নিশ্চিত কারণ তারা করলে কখনোই নিজেদের এড়িয়ায় লাশ ফেলবে না।তাহলে ঘটনা দুটো এক তার প্রতিপক্ষের কেউ দুই ছেলের ব্যক্তিগত। কথাগুলো ভাবছিলো আর দূরে থাক লাশের পুরো শরীরে নজর বুলাচ্ছে,চোখ গিয়ে আটকালো ছেলেটার নিম্নাঙ্গে, পুরুষাঙ্গে ভয়ংকর জমাট কালো রক্ত, মনে হচ্ছে! ভাবতেই চোখ বড় হয়ে গেল,এই ছেলে নিশ্চিত কোন মেয়ের দ্বারা এমন!

"অফিসার কি মনে হয়?" , " আমরা আইনের লোক ইব্রাহিম ভাই, আমাদের কোন মনে হ‌ওয়া নাই। সবটাই প্রমানের উপরে চলে! কানে খবর এসেছে এই ছেলের সাথে নাকি আপনার দলের ছেলেদের দ্বন্দ্ব চলছিলো, যেহেতু এখন কোন লিখিত অভিযোগ পাইনি তাই আপাতত কিছু বলছি না তবে যদি পাই তবে নিশ্চয়ই আমি বসে থাকবো না।" , "আপনার জন্য শুভকামনা,আমিও চাই আসল অপরাধীদের বিচার হোক,সে যেই হোক। এখন তবে আসি।যেকোন সহযোগিতায় স্মরন করবেন ইনশাআল্লাহ আমার আব্বার তরফ থেকে সব রকমের সহযোগিতা পাবেন।" কথা শেষ করে হাতের কালো রোদ চশমা চোখে তুলে দম্ভের সহিত হেঁটে গেলেন। ততক্ষণে লাশ তুলে গাড়িতে রাখা শেষ।আইনের লোকের সাথে যথেষ্ট সমীহ হয়েই কথা বলে ইব্রাহিম তারাজ,কারন নিজেইতো আইনের লোক। তাই সম্মানের জায়গায় সম্মান প্রদর্শন করতে ভুলে না।

"আসসালামু আলাইকুম ভাইজান!" সম্বস্বরে সালাম দিলো সবাই। ইব্রাহিম তারাজ নিজের গদিতে বসে রিল্যাক্স মুড থেকে বেরিয়ে কঠিন হয়ে চোখমুখ শক্ত করে জোরে ডাক দিলো, "ফয়সাল", "জ্বী..জ্বী ভাই" ," মুরাদ কোথায়? সাঈদকেও আসতে বলছিলাম! , "মুরাদ ভাই আসতাছে,সাঈদ ভাইয়েরে সাথে নিয়ে আসতাছে! , "আমি এসে বসে আছি আর সে! 

কথা শেষ করার আগেই উপস্থিত হয় মুরাদ,সাঈদ। সম্পর্কে দুজন খালাতো ভাই কিন্তু যেন এক‌ই শরীরের অংশ, একে আঘাত করলে অন্য ঠিক‌ই টের পায়। অনেকটা কান টানলে মাথা আসে এমন। ইব্রাহিম এর সাথে সম্পর্ক দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাইয়ের।মুরাদ মানুষ হিসেবে যথেষ্ট ভালো তার সাথে উঠাবসা স্কুল জীবন থেকেই কিন্তু সাঈদের সাথে পরিচয় মাস কয়েক হলো।মুরাদের পরিচিত তাছাড়াও দেখতে শুনতে নিরিহ ধাঁচের তাই দলে রেখেছিলো কিন্তু এখন মনে হচ্ছে!

"আসসালামু আলাইকুম নেতামশাই", "ওয়ালাইকুম আসসালাম,এত সময় কেন লাগলো মুরাদ? আমাদের সময়ের দাম আছে! কিছু সময়ের মধ্যেই মাঠে খেলা গড়াবে,আমাকে গিয়ে আমার প্লেয়ারদের সাথে আলোচনা সারতে হবে তা রেখে এখন আমি!" , "আমিও তো তাই ভাবছি এখন কিসের তাড়ায় ক্লাবে মিটিং সেট হলো? কথা তো হয়েছিলো ফাইনালের পর রাস্তায় নামবো তবে এখন কি?" , "জাহিদ নামের ছেলের সাথে কি সমস্যা তোদের? আর তুমি সাঈদ; এত রক্ত গরম কেন তোমার? এত তেজ কোথায় থেকে পাও? তোমাকে আমি আগেও ওয়ার্ন করছিলাম যাতে কোনরকম উক্ততুক্ত করতে না দেখি, তারপরও তুমি!", "ওর কোন দোষ নেই,তুই আগে আমার কথা মনে দিয়ে শোন,আমি বলছি কি হয়েছিল!", "ঐ ছেল..", কথা বলতে না দিয়ে মাঝ খান থেকে কথা বলায় মেজাজ বিগড়ে গেল তারাজের,তার কথা শেষ হ‌ওয়ার আগে কথা বলা তার পছন্দ নয়।কথার অসম্পন্নতা বেজায় বিরক্ত ঠেকায় তার মনে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে তাকালো মুরাদের দিকে,মুরাদ তারাজের এহেন ভঙ্গিমার সাথে পরিচিত তাই নিজের কথা থামিয়ে রাখলো, বুকে বেঁধে রাখা হাত খুলে সোজা হয়ে ইতিউতি করতে থাকলো,চট করেই আরাম কেদারা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো তারাজ।ক্রোধে লাল হ‌ওয়া পুরুষালী গালের শক্ত চামড়াগুলো কাঁপুনি খেতে থাকলো। ভীষণ চটে গেলে তার এই ভয়ংকর রুপ প্রকাশ পায়।নাকের ঢগা সিঁদুরের ন্যায় লালচে হয়ে উঠে, কাঁপতে থাকে হাতের শক্তিশালী কব্জিগুলো।ক্লাব ভর্তি যুবকদের মাঝেও এখন ভয় ঢুকে গেছে,ঘটনার আবহ যে তাদের‌ও ছুঁয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।তবে এটা কোন সাধারণ বিষয়ে না সেটাও বুঝতে পারছে।

তারাজ তেড়ে এসে মুরাদের মুখোমুখি দাঁড়ালো, দাঁত কিড়মিড়ি করছে, শব্দ গুলো শুনতে পাচ্ছে উপস্থিত সকলেই।

"তোর কি মনে হয় আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি?তুই ভুলে যাস কেন আমি জন্মগত রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। বাল্যকাল থেকেই রাজনীতির পাঠ চর্চা শুরু করেছি। তাছাড়াও আমি... মানুষের চোখ দেখলেই বলতে পারি সে কোন ঘাটে পানি খায়!" ,"শেষের লাইনটা সম্পন্ন করলো সাঈদের দিকে তাকিয়ে। সাঈদ একবার চোখ তুলে তাকিয়ে আবারও নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। তারাজ ধীর কিন্তু কঠিন বাক্যে বললো, "আমার দলে কোন মাদককারবারির জায়গা হবে না। আমার নাম ভাঙ্গিয়ে আমার‌ই সর্বনাশ করবে এমন কাউকে আমি মোটেই আমার ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিবো না।তাই আজকের পর থেকে আমার দলের কোন পদে তুই থাকবি না,না কোন বিষয়ে তোকে রাখা হবে! ইভেন আজকের পর থেকে আমার ক্লাবের আশেপাশেও যেন তোর ছায়াও না পড়ে! আর যদি কেউ তোর প্রতি সহায় হয় তবে সেও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারে।আই হ্যাভ নো প্রবলেম!" ,

 কথাগুলো শেষ করে শেষ বাক্যটা মুরাদের উদ্দেশ্যে ছিলো বোঝানোর জন্য মুরাদের চোখে চোখ রাখলো। মুরাদ কপালে ভাঁজ ফেলে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তারাজ নিজের কথা শেষ করে ফয়সালকে ডাকলো। ফয়সাল থমথমে মুখে সামনে এসে দাঁড়ালো।হাত বাড়িয়ে দিলো তারাজ,তার হাতে একটা প্যাকেট দিলো ফয়সাল।প্যাকেটটা খুলে লাল কিছু দানাদার বের করলো,হাতের তালুতে নিয়ে মুরাদের চোখের সন্নিকটে তুলে ধরলো। মুরাদ একবার তারাজের হাতের তালুতে তাকালো একবার তারাজের চোখে। বস্তুগুলো দেখে সবাই আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে,যারা দেখতে পারছে না তারা দেখার চেষ্টা করছে।

"ইয়াবা!কথিত বাংলায় যাকে বলে বাবা; ভদ্র লোকের ভাষায় যা ইয়াবা তা মাদকাসক্ত/নেশাখোরদের কাছে বাবা বলে সম্মানিত হয়!যার জন্য ধ্বংস হচ্ছে অজস্র মায়ের সন্তান,খালি হচ্ছে মায়েদের কোল, নষ্ট হচ্ছে বধূদের স্বপ্ন, হারিয়ে যাচ্ছে বহু প্রতিভাবান যুবক যুবতীর জীবন।যার জন্য আমাদের সমাজে এত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।যেটা বন্ধের জন্য এতশত আইনি স্লোগান।তা অবাধে বিক্রি হচ্ছে আমার ক্লাবে?আমার লোকেরাই করছে!সিরিয়াসলি!" , "মানে কি বলতে চাস তুই? কে করছে? আর তুই তার জন্য আমাকেই কেন?" , "তোর ভাই করেছে! শুধু তাই নয় সে স্বেচ্ছায় এই কাজগুলো আমার ক্লাবেই করেছে যাতে!" ,"কি সব বলছিস তারাজ? সাঈদ এমন ছেলেই নয়?তুই নিশ্চিত কারো কথায়!" , "আমি অন্যের কথায় নাচি না তা খুব ভালো করেই জানিস! আর কোন কিছুর সঠিক তথ্য না জেনে আমি কোন কাজ করি না তাও তোর জানা! তোর ভাই 'সাঈদ' মাহমুদের সাথে হাত মিলিয়েছে। মাহমুদ চিহ্নিত মাদক-কারবারি।এলাকায় তাকে সবাই সেই পরিচয়েই চিনে।তার সাথে তোর ভাইয়ের ঘনিষ্টতা দৃশ্যমান।তার সাথে উঠাবসা তোর চেয়েও ক্লোজ ভাবে।তুই তো চোখে প্রেমের চশমা পড়ে ঘুরিস।নারী আর বাড়ি তোর ঠিকানা তাই আর কোন দিকে খবর রাখার সময় পাস না। কিন্তু আমাকে তো রাখতেই হয় আফটার অল আমার বাবার কষ্টে গড়া পজিশন আমি কোনভাবেই বিনষ্ট হতে দিতে পারি না। কোনভাবেই আমি নিজের এত বছরের স্বপ্নকে ধ্বংস হতে দেখতে পারিনা।তাই আমাকে চোখ কান খুলে রাখতে হয় সবসময়। আমি নিজেই তোর ভাইকে এর আগেও সাবধান করেছিলাম,তখন শুধু তাকে সেবন করতে দেখেছিলাম,তাই সাবধান করে ছেড়ে দিয়েছিলাম ঠিক‌ই কিন্তু সেদিন থেকেই আমি নজরের রেখেছি, নজরে রেখে যা বুঝলাম লোভে তাঁতি নষ্ট হয়ে গেছে তাই নিজের মাসুম আলাভোলা চেহারার মাঝে কি ভয়ংকর নোংরা মানুষ লুকিয়ে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং আজ এই প্যাকেট তার পকেট থেকেই বের হয়েছে!"

 তারাজের কথায় মাসুদ আশ্চর্যের চুড়ান্তে,হতবিহ্বল হয়ে তাকালো সাঈদের দিকে,সাঈদ তারাজের শেষ লাইন শোনার পর থেকেই নিজের পকেট হাতড়ে বেড়াচ্ছে।সে এখানে আসার উদ্দেশ্য প্যাকেটটা পকেটে রেখেছিলো, আজ খেলার পর পঁচিশ পিস ডেলিভারীর কথা ছিল তাই প্যাকেট করে নিজের সাথেই নিয়ে একবারে তৈরি হয়েই বের হয়েছিল।আগের মালগুলো কমদামি থাকতো,এবার‌ই অনেক দামীগুলো সে হাতে পেল, এগুলো বেঁচে অনেক বেশী টাকার লভ্যাংশ তার পকেটে ঢুকতো কিন্তু এখন তো দেখছি অর্থের সাথে জীবনট নিয়েও টানাহেঁচড়া শুরু হয়ে যাবে।

"দ্যাখ তারাজ সত্যি বলছি এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, তাছাড়া তোর কি মনে হয় আমি জানলে এমন কিছুতে সমর্থন করতাম?আমি তো নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আমার সহজ সরল ভাইয়ের এহেন ধ্বংসে!" , "সাঈদ কবের থেকে এসবে জড়িয়েছিস?আর তোর এত কিসের দরকার ছিলো যে এমন ভয়ঙ্কর পথ বেছে নিলি?" কথা বলছিস না কেন?" , "আহ মুরাদ; এসব কথার জন্য এই জায়গা নয়, তাছাড়া ও যেই এক্সপ্লেইনেশন‌ই দিক না কেন আমি কোনমতেই আমার দলে ওকে আর রাখছি না আর না আমার কোনরকম সহযোগিতা কোনদিন ও আর পাবে; আজকের পর থেকে, এখান থেকেই ওর সাথে আমার চ্যাপ্টার ক্লোজ! এরপর ওর কোন বিষয়েই আমি অথবা আমার দলের কোন দায়বদ্ধতা থাকবে না।আমি আগেই বলেছি নির্বাচনের আগ অবধি আমি আমার সমস্ত সহযাত্রীকে অবজার্ভ করবো যাকে মনে হবে উপকারী সে থাকবে আর যে দলের জন্য ক্ষতিকারক তাকেই ছুঁড়ে মারবো। আমার সারাদিন ইব্রাহিম ভাই করা মানুষ দরকার নাই আমার দরকার আমার দলের জন্য প্রয়োজনীয় মানুষ।" , " ভাই একটা সুযোগ.." , "দিয়েছিলাম কিন্তু তুমি তার দাম দাওনি তাই কথা এখানেই শেষ! আর হ্যা মুরাদ বল তোর সাথে জাহাঙ্গীরের ছেলেদের সাথে কি সমস্যা হয়েছিল?"

প্রশ্ন করে টেবিলের উপর দু হাত রেখে কিছুটা ঝুঁকে আসে মুরাদের দিকে,মুরাদ নিজের ভাইয়ের কৃতকর্মের জন্য এমনিতেই লজ্জায় অবনতি হয়ে আছে।কথা বলতেও জিহ্বায় বাঁধছে,কেমন অস্বস্তিতে কন্ঠনালী অবরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।তারপরেও উত্তর করতে কোনমতে চোখ তুলে তাকালো।

" ও সেদিন তোর ভাবীকে টিজ করেছিলো,তাই আমি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি তাছাড়া ও ইচ্ছা করেই আমাকে বিরক্ত করছিলো,আসলে ও চাচ্ছিলো আমি যাতে ওর সাথে লাগি তাই!" , "তুই‌ও লাগিয়ে দিলি। একটা বিশ বাইশ বছরের ছেলে তোকে উস্কালো আর ওমনি তুই উস্কে গেলি ,তার মধ্যে পাবলিকলি থ্রেট করেছিস মেরে ফেলার! আচ্ছা কোনমতে সত্যি কি তোদের হাত আছে ঐ ছেলের মৃত্যুতে!" , " আমাকে তুই খুব ভালো করেই চিনিস তারাজ! মানুষ মারার মতো ভয়ংকর কাজ আমি করতে পারি না। তাছাড়াও এখন এমন ভুল তো কোনভাবেই করবো না।" , " কে মেরেছে আর কারা দায়ী তা অবশ্যই পুলিশ খুঁজে বের করবে।তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথাও নাই শুধু বলছি অবশ্যই পুলিশ তোদের দুজনকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছে।তাই বলবো সাবধানে।আর হ্যা তোর ভাইকে আমি আজ আর‌ও একবার সূযোগ দিলাম যাতে এই পথ থেকে সরে আসে নয়তো আমি নিজেই ওকে পুলিশের হাতে তুলে দিবো।দিস ইজ মাই লাস্ট এন্ড ফাইনাল ওয়ার্নি।" , "ফয়সাল!" ,‌" জ্বী ভাই", "দেয়াশলাই!" 

দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের কুন্ডলির মাঝে পুড়ে খাক হয়ে গেল পঁচিশ পিস ইয়াবা।সাঈদ সেদিকে তাকিয়ে র‌ইলো, দৃষ্টি তার কঠোর।হাতের মুঠোয় নিজের সমস্ত রাগকে আড়াল করে রেখেছে। সাঈদের এমন হিংস্র চেহারা আড়াল হলো না তারাজের। 

সকালে যখন ক্লাবে এসেছিল তখন সিগারেট জ্বালানোর জন্য দ্রুত গ্যাসলাইট বের করতে গেলে পকেট থেকে এটা পড়ে যায়, তাড়াহুড়োয় সাঈদ খেয়াল না করলেও চোখে পড়ে যায় ফয়সালের।ফয়সালকে দায়িত্ব দিয়েছিলো সাঈদের উপরে নজর রাখার।তাই তারাজ ক্লাবে আসার পথেই ফোনে সবটা বলে দেয় ফয়সাল।

ঐ ছেলে হত্যাকান্ডে সাঈদ, মুরাদের হস্তক্ষেপ নেই সেটা নিশ্চিত হয়েই বলতে পারে তারাজ তাই সেটা নিয়ে চিন্তিত নয় কিন্তু তার অধীনে থেকে কেউ মাদকের সাথে জড়িত থাকবে তা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।আইনের পাঠ পড়ে যত‌ই বেআইনি কাজ করুক এমন গর্হিত কাজ সে করতে পারবে না।তাছাড়াও সে দল গঠনে বেশ কসরত করছে,দলের জন্য ক্ষতিকারক কাউকে সে দলে রাখবে না।

বিশাল আয়োজনে শুরু হতে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল এর ফাইনাল পর্ব।পুরো কামরাঙ্গীরচর সাজ সাজ রব। চারদিকে রঙিন ব্যানার পোস্টারে ছেয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কোন বিয়ের বাড়ির দাওয়াতে এসেছে। শুধু খেলার জন্য‌ই নয় আজ অবধি এখান থেকেই আগামী নির্বাচনের জন্য দল গঠনের ঘোষণা আসবে।তার মিটিং‌ঝ হবে তাইতো এতশত বাদ্যবাজনার পসরা সাজানো হয়েছে।

মাইক সেট করে সব অলিগলিতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ধারাভাষ্যকারের বক্তৃতা।দলে দলে মানুষ এসে উপস্থিত হচ্ছে কুড়ারঘাট খেলার মাঠে। আশেপাশের ছাঁদ ভরে গেছে যুবক থেকে যুবতী, বৃদ্ধা থেকে বৃদ্ধ দিয়ে।

নানা রকম মজাদার লোভনীয় খাবারের ভ্যান নিয়ে সদর গেটের বাইরে বসেছে দোকানি মামারা।তার থেকে খানিকটা দূরে ছোট মেলা বসেছে যার মাঝে রয়েছে চরকি, নৌকা,প্লেন,ট্রেন সহ নাগরদোলা, জাদুর ঘর,খাবারের দোকান, সাজগোজের পন্য থেকে সব। কেউ কেউ খেলা দেখার জন্য আগে ভাগেই জায়গা দখলে নিচ্ছে,তো কেউ এদিকে ওদিকে হাঁটাহাঁটি করছে। চারদিক বাঁশির শব্দে, হারমোনিয়ামে শব্দে,মাইকের শব্দে কানে তব্দা লাগানোর উপক্রম তার মাঝেও আনন্দের রেশ কম নেই একবিন্দুও।এ যেন এক অন্যরকম ভালো লাগার অনুভূতি।এর মাঝেই চলেছে বিভিন্ন সাংগঠনিক দলের ভারী মিছিল নিয়ে মাঠে প্রবেশের আয়োজন।সবাই ব্যস্ত কার দল কতটা ভারী তা প্রমানের জন্য। বাদ নেই তারাজের দল‌ও!তারাও নিয়ে উপস্থিত হয়েছে সুসংগঠিত দল।

"এই মাত্র মাঠে প্রবেশ করলো এমপি পদে নমিনেশন প্রত্যাশী, জনবান্ধব,ন্যায়পরায়ন,সৎ সাহসী, শক্তিমান,বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করা মানবিক নেতা ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার ভাই।

আমরা সকলেই জানি তিনি আমাদের সম্মানিত,গুনী,সৎ,সাহসী,জনবান্ধব,ন্যায়পরায়ন তিনবারের কাউন্সিলর ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার সাহেবের সুযোগ্য বড় পুত্র।তিনি তার বাবার মতোই জনগনের চিন্তা করেন।তার মাঝেও আমরা একজন সত্যিকারের ভালো নেতার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারন করে তিনি সেই বাল্যকাল থেকেই জনগনের সেবায় মনোনিবেশ করার ইচ্ছা পোষন করেন যার জন্য এখন তিনি এমপি পদে লড়াই করে বিজয়ী হয়ে আমাদের দেশকে একজন ন্যায়পরায়ন,সৎ সাহসী, শক্তিমান সাংসদ,নেতাকে উপহার দিতে চাচ্ছেন।আমরা সকলেই তার এই সুন্দর মনোবাসনা পূরনের দোয়া করবো এবং অবশ্যই তাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবো ইনশাআল্লাহ।

আজকের এই চুড়ান্ত খেলায় যেই দুই দল লড়ছে তার মধ্যে রয়েছে "বড়গ্রাম রয়ালস" যেটার মালিকানায় রয়েছে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া ভাই তিনিও এমপি পদে নমিনেশন প্রত্যাশী,আর অন্য দলটি হচ্ছে ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার ভাইয়ের "পূর্ব রসুল পুর টাইগার্স" আমরা দুই দলের খেলোয়াড়দের জন্য দোয়া রাখলাম।উভয় টিমের খেলোয়াড়দের প্রতি র‌ইলো শুভকামনা। আশাকরি তারা নিয়মের মাঝেই সম্পন্ন খেলা শেষ করবে। কোনরকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা যেন না করি।

এই মাত্র আমাদের মাঝে উপস্থিত হলেন মহামান্য ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রী মহোদয়ের গাড়ী, কামরাঙ্গীরচর বাসী সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন,আমরা সবাই সরে দাঁড়াই......"

এক নাগাড়ে ধারাভাষ্য চালিয়ে যাচ্ছে উক্ত লোকটি। মানুষে গিজগিজ করছে চারদিক,কারো কথা কেউ শুনতে পাচ্ছে না। মন্ত্রী মহোদয়ের চেয়ারের পাশের চেয়ারগুলাই কাউন্সিলরদের তার পাশে রয়েছে অন্য সদস্যদের বসার ব্যবস্থা।

ঠিক নিয়ম অনুযায়ী বাবার পাশেই দম্ভের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বসে আছে তারাজ।সাদা পাজামা পাঞ্জাবীর সাথে কালো মুজিব কোট ,চোখে কালো রোদ চশমা,হাতে কালো বেল্টের ঘড়ি।চাপ দাঁড়ির ভাঁজে লেপ্টে থাকা শক্ত চোয়ালের হাড়গুলো নিজস্ব ধারা 

বজায় রেখেই অনবরত চাপ দিচ্ছে চুইংগাম নামক এক অদ্ভুত খাদ্যকে।সরু পাতলা হালকা গোলাপি ঠোঁটের উপর সজ্জিত গোঁফ খানদানি ব্যক্তিত্বের পরিচয় ফুটিয়ে তুলছে। একপাশ করে জেল দিয়ে আটকে রাখা ঘনসিল্ক চুলগুলো মৃদু দুলদুল করছে বাতাসের প্রকোটে। পেছনের সারিতে বসেছে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া।সবাই আপাতত মনোযোগ আবদ্ধ করেছে খেলায়,এখন একমাত্র উদ্দেশ্য এই খেলার মাঠে জয়  ।বাইরের চিন্তা সবাই বাইরে রেখেই এসেছে ।

সবরকমের নিয়মের আওতায় থেকেই বিজয়ী দল হলো ' পূর্ব রসুল পুর টাইগার্স '। ৩/১ গোলে এবারের 

বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল এর বিজয়ী দল হলো ইব্রাহিম তারাজ খন্দকারের 'পূর্ব রসুল পুর টাইগার্স '

চলবে!

লেখার সুবিধার্থে নিজের এলাকার নাম ব্যবহার করেছি,আসলে নিজের এলাকা ছাড়া কিছুই চিনি না।

আর হ্যা রাজনীতি নিয়ে ধারনা কম তবুও সাহস করেছি তাই ভুলত্রুটি দেখলে ধরিয়ে দিয়েন।

সবাই পড়ার পর অবশ্যই মন্তব্য করবেন প্লিজ ❤️


পর্ব ৩


"যারে ছাড়া গতি নাই সে আমাদের ইব্রাহিম ভাই" , "চাই,চাই দেখতে চাই, এমপি পদে মোগো ইব্রাহিম ভাই", "অসহায়ের মাথার তাজ তার নাম ইব্রাহিম তারাজ" , "হ‌ই হ‌ই র‌ই র‌ই তারাজ ভাই ছাড়া যোগ্য ক‌ই?"

নানারকম প্রশংসা বাক্যে ভেসে যাচ্ছে কুড়ারঘাট হাসপাতাল খেলার মাঠ।দুই জন মন্ত্রী, একজন উপমন্ত্রী,তিন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর,অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সহ নমিনেশন প্রত্যাশীসহ বহু কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দলের লোক দিয়ে মাঠ পরিপূর্ণ,কানায় কানায় পূর্ণ।তাই প্রতি দলের লোকেরা নিজেদের প্রধানকে বড় করতে, নিজের নেতাকে তুলে ধরতে এরকম স্লোগানের পর স্লোগান দিয়েই যাচ্ছে।তার মধ্যে সবাইকে ছাপিয়ে যাচ্ছে ইব্রাহিম তারাজের প্রতি তার সহোদরের ন্যায় কর্মীদের ভালোবাসা,স্লোগান, সম্মান সব।

বিজয়ী কাপ হাতে নিয়ে খেলোয়াড়রা উচ্ছসিত হয়ে মাঠের পুরোটা দৌড়াচ্ছে, ইব্রাহিম নিজেও নিজের খুশি আটকে রাখতে না পেরে দাঁড়িয়ে পড়লো, মন্ত্রী ও নিজের বাবার থেকে, বয়োজ্যেষ্ঠ অন্য নেতৃবৃন্দের অনুমতি নিয়ে মাঠের মাঝে ছুটে গিয়ে খেলোয়াড়দের সাথে কোলাকুলি করলো, হাসি মুখে সবাইকে বুকে আগলে নিয়ে পিঠে চাপড় মেরে বাহবা দিতে থাকলো। খেলোয়াড়রাও ইব্রাহিম কে পেয়ে খুশিতে বাকবাকুম হয়ে গেছে।হুট করেই ইব্রাহিম দলের দলপতিকে কাঁধে তুলে নিলো তাতে জনগণের মাঝেও উচ্ছ্বাস বয়ে গেল।

 একজন এমপি পদপ্রার্থীর এমন বাচ্চামোতে সবাই আপ্লুত। নেতা,সাংসদ মানেই কেন গম্ভীর,রগচটা হতে হবে? তার‌ও জীবন আছে এটাই তো প্রধান ভাবনা হ‌ওয়ার কথা।সে পারে বাকী পাঁচজন সাধারণ জনগণের ন্যায় জীবনযাপন করতে।

 ইব্রাহিম দলপতিকে কাঁধ থেকে নামাতেই ছেলেরা আবার ইব্রাহিমকে কাঁধে তুলে ধরলো।পুরো এগারোজন মিলে কাঁধে নিয়ে নাচতে শুরু করলো, ইব্রাহিম এর হাতে কাপ, ইব্রাহিম এর দলের ছেলেরা মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে শিটি বাজাচ্ছে,চিৎকার করে, বাঁশি বাজিয়ে উল্লাস প্রকাশ করছে।ইব্রাহিম এর খুশির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে কামরাঙ্গীরচর হাসপাতাল খেলার মাঠ। 

অন্যদিকে মঞ্চে বসে হতাশ মুখে সবটা কেবল দেখে যাচ্ছে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া।তার পক্ষের ছেলেদের স্লোগান দেওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। নীরবতায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে খেলোয়াড়রা।কিছুই করার নেই।তাই চুপচাপ শুধু দেখে যাচ্ছে অপর-পক্ষের উচ্ছাস,উল্লাস, উদ্দীপনা।

ভুরিভোজের আয়োজন করা হয়েছে কামরুল কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলায়।খেলা শেষ বিজয়ী ঘোষনা পর্ব শেষ করে পুরস্কার তুলে দেন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রী মনজুরুল ইসলাম তৈয়ব।তার সাথে নিজের মূল্যবান বক্তব্য রাখেন। অবহেলিত জনগোষ্ঠীর অঞ্চল কামরাঙ্গীরচর কিভাবে সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভূক্ত হ‌ওয়ার পর বদলে গেছে , তাদের সরকারের কামরাঙ্গীরচর নিয়ে ভবিষ্যত চিন্তা কি কি তা নিয়ে ছিলো তার বিশাল দীর্ঘ এক বক্তৃতা। এরপর রাখেন প্রশাসন মন্ত্রী।তিনি নিজস্ব সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বর্ণনা সহ কামরাঙ্গীরচরে ঘটমান অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত সব কর্মসূচি নিয়ে পর্যালোচনা-স্বরূপ বক্তৃতা পেশ করলেন। তার সাথে আইনি ব্যবস্থা কঠোর করতে, মাদকমুক্ত কামরাঙ্গীরচর,কিশোর গ্যাং মুক্ত যুব সমাজ গড়তে আদেশ করলেন। উপদেশ দিলেন আইনের সঠিক ব্যবহার করে যাতে সবাই আইনি সহায়তা নেয়। 

একেরপর এক বক্তৃতায় শেষ করেন কর্মসূচি এরপর ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার ও অন্য দুইজন কাউন্সিলরদের অনুরোধে রাতের খাবারে অংশগ্রহণ করেন উনারা।

ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের মূলত উদ্দেশ্য ছিলো নিজের ছেলেকে ফোকাস করা।যদিও ইব্রাহিম তারাজ নিজ যোগ্যতায় সবার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকে।তবুও তিনি বাবা হয়ে ছেলের স্বপ্ন পূরনে এক কদম এগিয়ে যেতে সাহায্য করলেন।কুটবুদ্ধিতে মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ তার এই ছেলেকে তিনি চিনেন, জনপ্রিয়তায় এখন‌ই তাকে ছেড়ে গিয়েছেন।আর এই ছেলে যে জয়ী হবেন বাবা হয়ে তা তিনি নিশ্চিত হয়েই বলতে পারেন তবুও আল্লাহর ইচ্ছায় যা হবে তাতেই খুশি থাকতে হবে। কিন্তু বাবা হয়ে কোন ভাবেই ছেলেকে সাহায্য করবে না তা কিভাবে হয়? তাইতোও এই বন্দোবস্ত।

ইব্রাহিম তারাজ নিজের বাবার মাথায় থাকা নিরব বুদ্ধি বুঝতে পেরে মনে মনে হাসলো। মনে মনে বললো, " আমার সহজ-সরল বাবা,তোমার এই আতিথেয়তা এখন আর কারো মনে চড়ে না। পেটে গিয়ে খাদ্যনালী হয়ে পাকস্থলীতে গিয়ে হজম হ‌ওয়ার আগেই তা গায়েব হয়ে যায় মোটা বান্ডেলের কড়কড়ে নোটের খসখসে আওয়াজে।এখন সবাই শুধু এটা মনে রাখে কে কত বড় এমাউন্ট দিলো। তুমি এত আয়োজন যার জন্য করছো তা পুরোটাই.." কথাটি ভেবেই একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো,

 বিরবির করে বললো,"সরি বাবা, তোমার সন্তান হয়ে তোমার নৈতিকতা বজায় রেখে চলতে পারলাম না।তবে আমি চেষ্টা করবো ক্ষমতা হাতে আসার পর অবশ্যই নিজেকে শুধরে নিতে।আই প্রমিজ টু ইউ!"

"তারাজ"! 

 "জ্বী আব্বা "! 

 "আসো" 

বাবার ডাকে নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো, ইসহাক আবদুল্লাহ ছেলের পানে হাসি মুখে তাকিয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে আছে।তার মুখের হাসি কোনভাবেই সরছে না। তিনি যেন ছেলের বিজয় এখন‌ই চোখে দেখতে পারছেন। ইব্রাহিম তারাজ বাবার হাসি মুখের তাকিয়ে আত্নগ্লানি অনুভব করলেন, তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাড়িয়ে রাখা হাতে হাত রেখে বাবার বরাবর হয়ে দাঁড়ালো।এক হাত ছেলের হাতে রেখে অন্য হাতে পিঠ চাপড়ে দিলেন, ইব্রাহিম বাবার কানের কাছে মুখ নিয়ে ছোট শব্দে জিজ্ঞেস করলো, "আব্বা আপনার কি মনে হয় আমি পারবো?", "ইনশাআল্লাহ!" , ছেলেকে বিশ্বাস রাখতে বলে সামনে এগিয়ে গেল যেদিকে মন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর খাবারের বন্দোবস্ত করেছেন।যেতে পথে জিজ্ঞেস করলেন, "ছোট জন কোথায় তোমার?" , "আসছে আব্বা!", "প্রোগ্রাম শেষ হ‌ওয়ার আগেই আসতে পারবে? নাকি আজ‌ও শেষে আসবে?" , "ওর প্রেজেন্টেশন ছিলো আব্বা,সেটা বেশি জরুরি!" , "ইসহাক আবদুল্লাহ ছেলের সাথে ছোট ছেলের বিষয়ে কথা বলতে বলতে পৌঁছে গেলেন জায়গা মতো।তাকে দেখে হাসি হাসি মুখ তুলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো মনজুরুল ইসলাম তৈয়ব ও মীর নাছির সহ আরও অনেকে।

"আসসালামু আলাইকুম তৈয়ব ভাই!", "ওয়ালাইকুম আসসালাম ইসহাক,কেমন আছেন?", "জ্বী ভাইজান আলহামদুলিল্লাহ, আপনাদের দোয়ায় আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা আমাকে স্বপরিবারে ভালো রেখেছেন।তা পরিবারের সবাই কেমন আছেন?" , "আলহামদুলিল্লাহ তারাও দুর্দান্ত।তো কি অবস্থা ইব্রাহীম তারাজ ভাই! আপনার নামে তো বেশ হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে; কি নমিনেশন পেয়েই গেলেন মনে হয়! কনফিডেন্স কেমন নিজের প্রতি? কি কি প্রতিশ্রুতি রাখছেন পাবলিককে গেলানোর জন্য?" , " জ্বী আমার অবস্থা আলহামদুলিল্লাহ!আর যদি বলেন হাঁকডাক সেটা উপর‌ওয়ালার রহম,তিনি যাকে চান সম্মানিত করেন আর যাকে চান.. তবে আমি নিজের প্রতি আসলেই কনফিডেন্স রাখছি,যদিও সব আল্লাহর ইচ্ছায় তবুও মানবমাত্র স্বপ্নপোষ্য। আর নমিনেশন দল যাকে যোগ্য মনে করবে তাকেই দিবে।এতে আমি বিচলিত ন‌ই! এরপর প্রতিশ্রুতির কথা বললে বলতে হচ্ছে,কথা বলার চেয়ে কাজে করা উত্তম।কারন অনর্থক প্রত্যাশার বুলি দিয়ে অন্যের দৃষ্টিতে নিজেকে সাধু বানানো যায় নিজের কাছে নয়; আমি নিজের কাছে পরিষ্কার থাকতে চাই অন্যের কাছে নয়! মুখ দিয়ে বললেই যেমন তা করা হয়ে উঠে না তেমনি না বলেও অনেকে অনেক কিছু করে দেখিয়েছেন সুতরাং আমি যখন কাজ করবো তখন পাবলিক দেখবে আর উপভোগ করবে,গেলানোর চিন্তা তারাই করে যারা যা তা অন্যের মুখে পুড়ে দেয় নিজের অস্থিবলে।আমি তেমনটা করতে ইচ্ছুক ন‌ই।"

তারাজের কথাটা ভালো লাগলো না মন্ত্রী মশাইয়ের কিন্তু কিছু করার নেই,এই ছেলের ত্যাড়া কথাই ছেলেকে দলে যোগ্য করে তুলেছে,তিনি জানেন এই ত্যাড়া ছেলেটি নিজের শয়তানি বুদ্ধিতে অনেকের চোখেই আশার আলো জ্বালিয়েছে তারা মনে প্রানে চায় এই ছেলে এবার এই আসনে এমপি পদে বসুক।তবুও কোথাও যেন ভালো লাগা কাজ করে ছেলেটিকে দেখে অবশ্য না লাগার‌ও কারণ নাই মোটা একটা বান্ডেল যে তার একমাত্র শালিকার ব্যাংকে ঢুকে গেছে যা পরবর্তীতে নগদ হয়ে নিজের আলমারির লকারে পুড়বে তিনি।

কথার রেশ চলতে র‌ইলো এর মধ্যেই হাজির হলো ইউসুফ তাজিশ খন্দকার। ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের সহকারী মোতাহের হোসেন সামনে তার পিছনে তাজিশ খন্দকার এসে বড় ভাই তারাজের বাহু ঘেঁষে দাঁড়ালো। তারাজের কঠিন অবয়ব মুহূর্তে শীতল রুপে ঢলে পড়লো!তাজিশ ভাইয়ের একপাশ বুকে জড়িয়ে সম্বর্ধনার ন্যায় বললো," কনগ্রাস দাদাই;প্রথম জয়ের শুভেচ্ছা! তারাজ ভাইয়ের উচ্ছাস অনুভব করলো। বাম হাত দিয়ে ভাইয়ের এক পাশ আগলে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে আদুরে স্বরে জিজ্ঞেস করলো," ঠিকঠাক পৌঁছাতে পেরেছিস?", বড় ভাইয়ের ভঙ্গিতে তাল মিলিয়ে ২৭ বছর বয়সী তাজিশ খন্দকার মুচকি হেসে উত্তর প্রদান করলো,"হুম!" , "সব কিছু কেমন ছিলো?", "আলহামদুলিল্লাহ, তুমি বলো?" , "জয়ী তো কেমন হতে পারি!", "আই ওয়াস সুপার এক্সাইটেড! বাট,আনফরচুনেটলি আই কান্ট এটেন্ড ইউর হ্যাপি মোমেন্টস উইথ ইউ!" , " ইটস ওখে বাডি,টাইম হ্যাজ গন এনিঅয়ার! উই উইল সেলিব্রেট আওয়ার ভিকটোরি ইনশাআল্লাহ!" , "ইনশাআল্লাহ!" ভাইদের আলাপচারিতায় বাধা দিলেন ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার,তিনি নিজের ছোট ছেলের হাত ধরে মনজুরুল ইসলাম তৈয়ব এবং মীর নাছিরের মুখোমুখি দাড় করিয়ে পরিচয় করানোর ভঙ্গিতে মুখ খুলতেই বীর নাছির নিজেই বললেন, "ইসহাক ভাই এটা নিশ্চয়ই আপনার ছোট পুত্র; মাশাআল্লাহ বাপ ভাইয়ের মতোই সুদর্শন ও ব্যক্তিত্ববান মনে হচ্ছে!" , মন্ত্রী মানুষের মতো উচ্চ পর্যায়ের শ্রেনীর মানুষের থেকে এমন প্রশংসায় ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের খুশি উপচে পড়লো, নিজের ছেলেদের তিনি যথেষ্ট ব্যক্তিত্ব দিয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন,উপর‌ওয়ালার অশেষ রহমতে তিনি সফল হয়েছেন।যেই দেখুক ছেলেদের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করবেই। তাজিশের কাছে মন্ত্রী সম্প্রদায় চেনামুখ তাই পরিচয় করানোর দরকার মনে করলো না দেখে নিজেই সালাম প্রদান করলো,"আসসালামু আলাইকুম আংকেল", "ওয়ালাইকুম আসসালাম,তা তোমার নাম যেন কি?" , " জ্বী আমার নাম, মোহাম্মদ ইসহাক আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ তাজিশ খন্দকার,সবাই শর্ট ফর্মে তাজিশ বলেই ডাকেন!" , " বাহ্ খুব সুন্দর নাম। তোমার বাবা যথেষ্ট রুচির পরিচয় দিয়েছেন পুত্রদের নাম বাছাইয়ে।"

মীর নাছিরের কথায় তাজিশ মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে নিলো,তারাজ আর‌ও একটু এগিয়ে আসলো, ইসহাক আবদুল্লাহ তৈয়বের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। আছে আরো বেশ কয়েকজন।সবাই সবার মতো আলাপ আলোচনায় মত্ত তার মাঝেও অনেকেই কান পেতে আছে এদিকে।কারণ স্পষ্ট অধিকাংশের‌'ই বিশ্বাস তারাজ নমিনেশন পেয়ে যাবে। তাজিশ কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করছে, রাজনৈতিক পরিবারের বড় হয়ে উঠলেও,এতটা জনসমাগমে তার উপস্থিতি নেহায়েত হাতে গোনা।সে বড় ভাইয়ের মতো এত হট্টগোল মাথায় নিতে পারে না।তার কাছে তারের পেচ খোলা সহজ মনে হয়, আইটির একের পর নতুন তথ্য উন্মোচিত করাও নির্ভেজাল লাগে এই রাজনৈতিক মারপ্যাচের চেয়ে। কিন্তু না চাইতেও বাবা ভাইয়ের খুশিতে সামিল তাকে হতেই হয়। কোনমতেই এই দুই জোড়া নয়নের খুশি সে মিস করতে চায় না।

"তো কি জানো তো তারাজ এবার নির্বাচনের মাঠ বেশ গরম হবে।" 

 মুখে চিকেন সাসলিকের একপিস পুড়তে পুড়তে কথাটা বললো তৈয়ব সাহেব,মুখের খাবার মৃদু তালে চিবুতে চিবুতে সেদিকে নজর আবদ্ধ করে কর্ণপাত করলো তারাজ,তার পাশেই রয়েছে তাজিশ।মীর নাছিরের পাশ ঘেঁষে বসেছে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া। বিপরীত দলের নমিনেশন প্রত্যাশী হলেও খেলায় অংশগ্রহণকারী দলের কর্ণধার বিধায় তাকেও তারাজ নিমন্ত্রণ করেন।সম্মানিত অতিথি বর্গের সম্মানে আসতে বাধ্য হয়। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও এক‌ই এলাকায় বসবাসকারী দুজন মানুষ প্রতিবেশী হিসেবে পরিচিত থাকে, তারপরে যদি এক‌ই ময়দানে টেকার বিষয়ে আগ্রহ থাকে তাহলে অবশ্যই উভয় পক্ষ থেকে আন্তরিকতা দেখাতে হয় হোক সেটা লোক দেখানো। মনে কি লুকানো আছে তা কে জানে! কেউ না! তাই তো নিজেদের মনের ভেতরে লুকায়িত কুটনীতি ভেতরেই রেখে প্রকাশ্যে দিব্যি হাসি মুখে কোলাকুলি চালিয়ে যায়।

শত্রুতার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে ভোটের ময়দানে,জেতা হারার লড়াই ঘটবে রনক্ষেত্রে।এখন না হয় একে অপরের ভাই ভাই!

"ঢাকা ২ আসনের এই অংশটি নিয়ে কৌতুহল অনেক নয়া রাজনৈতিক নেতার‌ই আছে। উন্নয়নশীল ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলের উন্নয়ন যেমনি চোখে পড়ার মতো তেমনি তার মাঝে চলমান রাজনৈতিক উদ্দীপনাও আলোড়ন সৃষ্টিকারী। তাছাড়া এই ছোট পরিসরে তৈরী হ‌ওয়া ঘনবসতি স্থানটি নিয়ে আমাদের সরকারের রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যাতে সুবিধা পাবে সম্পূর্ণ কামরাঙ্গীরচর-বাসী। তাই যেকোন ভাবেই সরকারের দীর্ঘকালীন টেকস‌ই হ‌ওয়া একান্তই জরুরী।এতে সরকারের প্রধান কাজ হলো উক্ত অঞ্চলের জন্য যোগ্য এবং জনবান্ধব, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব খুঁজে বের করা এবং তার দায়িত্বে এই আসনের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া। সুতরাং বুঝতেই পারছো সরকার খুব ভেবে চিন্তে নমিনেট করবে তার পরবর্তী প্রতিনিধিকে।তবে মজার ব্যাপার কি বলো তো? এই অঞ্চলের যেই নমিনেট হোক তাকে কিন্তু অনেক কঠোর সময় পার করতে হবে।কারণ অনেক প্রার্থী রয়েছেন লিস্টে,সবাই মোটামুটি বেশ জনপ্রিয়।কারো চেয়ে কারো অংশ কম নয়।এই যেমন তুমি; তোমার তো মাশাআল্লাহ বেশ দাপট দেখলাম,তেমনি রয়েছে কেরানীগঞ্জের সৈয়দ মনোয়ারের। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তার।আর‌ও একজন রয়েছে রাইসুল সাগর তিনি কিন্তু খুব‌ই সাহসী এবং মাঠ পেরোনো লিডার,আবার ঐদিকে রয়েছে সাভারের আইনুল মৃধা,তার‌ই এলাকায় রয়েছে আর‌ও একজন নারী প্রতিনিধি আনোয়ারা শান্তা। অলরেডি চারজন প্রার্থী রয়েছেন,হয়তো আর‌ও দুই চারজন আর‌ও যোগ হবেন এর মধ্যে থেকে নেত্রী অবশ্যই একজনকে পছন্দ করবেন। এরপর তো আবার রয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী।সব মিলিয়ে একটা কঠিন হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা। এই যে চারজনের নাম বললাম সবাই কিন্তু ছাত্র জীবন থেকেই দলের হয়ে কাজ করছে,প্রত্যেকেই নেত্রীর স্নেহভাজন, জনগণের কাছে পরিচিত মুখ,সেই হিসেবে তুমি কিছুটা পিছিয়ে আছো।হ্যা তুমিও তোমার বাবার সাথে মাঠে থেকে কাজ শিখেছো কিন্তু তবুও; তুমি কিন্তু মূলধারার আই মিন টু সে সরাসরি নিজেই কখনো এর আগে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামোনি সে ক্ষেত্রে তুমি বাকীদের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছো!তবে সত্যি বলতে আমি তোমায় নিয়ে আশাবাদী তোমার চোখেমুখে আমি যেই রাজনৈতিক খেল দেখেছি তাতে আমার মনে হয় তুমি নমিনেশন পেলেও পেতে পারো।তবে বেশি প্রত্যাশা রেখো না কারণ যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাতো প্রধান নেত্রী‌ই নিবেন!"

এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলেন তৈয়ব সাহেব তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তারাজ, বিষয়গুলো সে যে জানে না তেমন নয়।সে জানে কিন্তু তার নমিনেশন নিয়ে সন্দিহান প্রকাশটা তার হজম হচ্ছে না কারণ তার ভাষ্যমতে "শালা তোকে এই ঘন্টা খানেক আগেই একটা মোটা বান্ডেল দিয়েছি কি চুল কাটতে?" তাছাড়াও সামনাসামনি হয়ে বসা জাহাঙ্গীরের তিরষ্কার স্বরুপ হাসিও বিরক্ত লাগছে যার সবটাই হয়েছে এই বুড়ো ভামের জন্য।যদিও তার বাবা বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এই ভামের অহেতুক কথাগুলো।তার ভাইতো এইসবে নেই অবশ্য না থাকাই শ্রেয়।তবে তারাজ বুঝলো এই কথাগুলো বলার প্রধান উদ্দেশ্য হলো তখনকার কথার শোধ তোলা। বিষয়টি ভেবে ত্যাড়ছা হাসি দিলো যা আড়াল হলো না জাহাঙ্গীরের। তারাজ নিজের হাসি বজায় রেখেই প্রত্ততর করলো, " আমি অতসব ভাবছি না , শুধু ভাবছি কিভাবে জনগণের জন্য কাজ করা যায়। জনগনের জন্য কাজ করতে হলে দলের লোগো লাগে না,লাগে কেবল স্বচ্ছ মন।যদি তা করতে পারি তাতেই আমি ধন্য,আর যদি আমাকে যোগ্য মনে হয় তবে অবশ্যই পাবলিক বাছাই করবে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে তখন নিশ্চয়ই একদিন দলের লোগোও পেয়ে যাবো।

চলবে?

রাজনীতি মানেই রাজনীতি, আপনারা যেই দেশে বাস করেন আমি সেই দেশের রাজনীতি নিয়ে লেখার চেষ্টা করছি,সময়ের তালে পরিস্থিতি আগাবে।অন্য গুনী লেখিকা আপুরা দেখায় নির্বাচনের পরবর্তী ঘটনা আর আমি চেষ্টা করছি আগের পরিস্থিতি নিয়ে লেখার। আশাকরি সবাই সহায়তা মূলক ধৈর্য্য ধারণ করবেন।

ধন্যবাদ সবাইকে।

পড়ার পর অবশ্যই মন্তব্য করবেন প্লিজ 😥


পর্ব ৪


মুঠোফোনের কর্কশ শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল তারাজের। বিরক্তিতে ভ্রুদ্বয়ের মধ্যিখানে চর্মের ভাঁজ তৈরি হলো।ডান হাত বাড়িয়ে ঘুমঘুম চোখে বালিশ থেকে খানিকটা দূরে অবিরত বেজে চলা মুঠোফোনটি টেনে বন্ধ নয়নেই অনুমানে রিসিভে টান দিলো, রিসিভ করে,

 " আসসালামু আলাইকুম!"

"ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাই, ভাই জরুরী খবর হলো মুরাদ ভাইকে পুলিশ নিয়ে গেছে, সাঈদ ভাইকে ভোরেই নিছে।" , 

"রাখ, দেখছি!" 

কল কেটে মুঠোফোনটি বালিশের পাশেই রাখলো,থম মেরে কিছু সময় বালিশেই মুখ গুঁজে শুয়ে র‌ইলো। ফজরের আযান দেওয়ার কিছু সময় আগেই কাজ শেষ করেছে, নির্বাচন নিয়ে এত‌ই ব্যস্ত যে ঠিক মতো স্টাডি করতেই পারছে না,তবুও যেই কেইস হাতে নিয়েছে তার জন্য নিয়মিত কোর্ট চত্ত্বরে যেতে হয় সুতরাং ব‌ই ঘাঁটাঘাঁটি একান্তই জরুরী।আযান দেওয়ার পর নামাজ পড়ে কিছু সময় মুক্ত হাতে শরীর চর্চা করেছে। সূর্যোদয় দেখে এরপর ইশরাকের নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছে। চট করেই উঠে পড়লো।

বিছানা বরাবর বিপরীতে থাকা আড়শির উপরের দেওয়ালের সৌন্দর্যের সাথে সঠিক সময় মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য টাঙ্গিয়ে রাখা বিশাল রাজকীয় ঘড়িটার নিচের পেন্ডুলার ডং ডং শব্দটির সাথে ক্রমাগত পাল্লা দিয়ে ঘুরছে কাটাগুলো। ঘূর্নায়মান ঘন্টার কাটা গিয়ে আটকে আছে ৯ এ যার মিনিটের কাটা ৩০এ এবং সেকেন্ডের কাটা অবিরত নিজের কর্ম সম্পাদনে ব্যস্ত।এক নজরে সময় দেখে হাত দিয়ে ঘাড় মালিশ করতে করতে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। পছন্দ অনুযায়ী ফরমাল পোশাক বের করে বিছানার একপাশে সাজিয়ে রাখলো। 

একেবারে তৈরি হয়ে নিজের ঘর থেকেই চিৎকার করে বলতে থাকলো, " আম্মা আমি বের হবো!" 

অর্ধনির্মিত তিন তলা বিল্ডিংয়ের নিচ তলায় রাজনৈতিক আলোচনার জন্য বিশাল হলঘর,  একপাশে মোটামুটি আকারের একটি রান্নাঘর করা হয়েছে যাতে নেতাকর্মীদের চা নাস্তার জন্য ঘরোয়া রান্না ঘরে গিয়ে জ্বালাতে না হয়।অপর পাশে বাথরুম/ওয়াশরুম। আর রয়েছে বাবা ছেলের দুটো অফিস কক্ষ। পেশায় ইসহাক আবদুল্লাহ‌‌ও আইনজীবি,বারের সদস্য। আর তারাজ হচ্ছে ব্যারিস্টার।এক‌ই কক্ষে নিজেদের কাজ করা গেলেও ইচ্ছাকৃত আলাদা রেখেছে যাতে নিজেদের কাজের গোপনীয়তা বজায় থাকে। ইসহাক আবদুল্লাহ মাঝে মাঝে কোর্টে দাঁড়ান। হলঘরের পাশে ঘেঁষে আছে কাউন্সিলর অফিস।এক কথায় নিচের পুরোটাই নিজেদের কর্মজীবনের প্রয়োজনে ব্যবহার করছে।

দ্বিতীয় তলায় পাঁচ সদস্যের সংসার খেলা চলে।এক পাশে তারাজের রুম,তার পাশে তাজিশের রুম। অপরদিকে তানহার জন্য বরাদ্দকৃত রুম তার পাশে রয়েছে বাচ্চাদের রুম। মাঝে একটা রুম ফাঁকা রেখে শেষের রুমটা ইসহাক আবদুল্লাহ ও তার সহধর্মিণী থাকেন। তাজিশের রুমের পেছনের একটি রুম আছে। ফাঁকা রুম দু'টো অতিথিদের জন্য বরাদ্দ থাকে। মাঝে খাবার এবং বসার রুম একসাথেই করা হয়েছে শুধু কারুকার্য খচিত পর্দা দিয়ে আলাদ করে রাখা। রান্না ঘরের অংশটা খোলামেলা যা দেখা যায় একদম বসার এবং খাবার ঘর থেকেই। 

সবচেয়ে সুন্দর করে তোলা হয়েছে বিশাল চ‌ওড়া জায়গা নিয়ে বারান্দা।পুরো দোতলা চারদিকে ঘিরে আছে মনোরমা, মনোমুগ্ধকর সবুজাভ বারান্দা।ইট পাথরের বিল্ডিংয়ের বারান্দায় কোনা পূর্ণ সবুজায়নে। নানা রকম দেশী, বিদেশি ফুল ফলের গাছে সজ্জিত হয়ে নিজেকে সব থেকে আলাদা এবং সুন্দর করে তুলেছে বারান্দাটা।প্রতিটি রুম থেকেই বারান্দায় যাতায়াত করা যায় যদিও মাঝে মাঝে নিজস্বতা বজায় রেখে দেয়াল দেওয়া, মানে এক রুম থেকে অন্য রুমে যাতায়াত করা যায় না। আলাদাভাবে জোড়া দিয়ে তৈরি করা এই বারান্দায় ছাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে রঙীন টিন এবং খড়কুটো। বৃষ্টি বিলাসের জন্য একদম উপযুক্ত করে গড়া হয়েছে।বেতের টেবিল,চেয়ার পেতে রাখা আছে প্রতিটি বারান্দায়। দিনের প্রথম প্রহর কিংবা গোধূলি বেলায়, বৃষ্টি ভেজা দিবসে অথবা জ্বলমলে রোদে নিজস্ব সৌন্দর্য বজায় রেখে শান্তি প্রদানে সবটুকু ঢেলে দেয় এই সবুজ বারান্দাটা। কামরাঙ্গীরচরের অন্যতম সুন্দর এবং আকর্ষণীয় বারান্দা হিসেবে বেশ পরিচিত খন্দকারদের এই বাড়িটা। 

তৃতীয় তলায় ছাদ যার একপাশে রয়েছে বিশাল এক চিলেকোঠা। অপরদিকে অবসরে কিংবা নিজেদের যত্নে তৈরি করা হয়েছে মাঝারি ধরনের পাঠাগার ও ব্যায়াম ঘর।  যখন বন্ধু মহল কিংবা সমস্ত কাজিনদের নিয়ে আনন্দিত মুহূর্ত কাটায় তখন চিলেকোঠায় হয় তার বন্দোবস্ত।মোট কথা চিলেকোঠায় হচ্ছে দুষ্টদের আখড়া মেলে। বাকী অংশ এখনও অর্ধনির্মিত যার সবটা জুড়ে রয়েছে সবজি আর ফলের গাছ।পিলার টেনে রাখা বিদায় মৌসুমী সবজি চাষে বেশ সুবিধা হয়।ফলের গাছও অনেক। অবশ্য একপাশে বেশ কয়েকজোড়া কবুতরের খাঁচা রাখা,তার নিচে খোপ খোপ করে তৈরি করা হাস মুরগির,খোয়ার (ঘর)।পুরো পাঁচ কাঠার উপর নির্মিত এই তিন তলা বিল্ডিংটা আশেপাশে সবার কাছে বেশি প্রশংসিত শুধু তার সৌন্দর্যের, সবুজায়নের জন্য।

গাছ পালার যত্নে মিসেস ইসহাক বেশ খাটেন তবে কবুতর,হাস মুরগির জন্য লোক রাখা আছে। অবশ্য সপ্তাহের তিনদিন একজন নার্সারিয়ান আসেন যিনি গাছের পরিচর্যা করতে মিসেস ইসহাককে সহায়তা করেন। বারান্দার গাছগুলো সবাই মিলে যত্ন করে।

এই বিল্ডিংয়ের থেকে কিছুটা ফাঁক রেখে তৈরি করা হয়েছে বিশাল জায়গা জুড়ে একতলা বিশিষ্ট অর্ধপাকা বাড়ি যেটা পুরোটা ভাড়া দেওয়া।এটা থেকেও ভালো আয় হয় খন্দকারদের।

আইন পেশার পাশাপাশি অনেক আগের থেকেই ইসহাক আবদুল্লাহ গার্মেন্টস ব্যবসায় জড়িত, নিউ মার্কেটে দশটা দোকান রয়েছে যেগুলো ভাড়া দেওয়া।রনি মার্কেটেও দোকান রয়েছে বেশ কয়েকটি তাও ভাড়া দেওয়া।গ্রামে চাষবাস,গরুর-খাসির ফার্ম,হাস-মুরগির ফার্ম, মাছের পুকুর।যদিও এতকিছু সামাল দেওয়া তার একার পক্ষে সম্ভব হয় না আবার ছেলেরাও আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত হ‌ওয়ার আপ্রান চেষ্টায় আছে।তাই সবটা নিজেকে এবং লোক দিয়ে দেখভাল করতে হয়।এতে করে প্রচুর লোকবল দরকার হয়। ইসহাক আবদুল্লাহ তাই নিজের গ্রামের শিক্ষিত,সৎ গরীব ছেলেদের নিয়োগ দেন।তার সব প্রতিষ্ঠানে তার নিজের গরীব,মধ্যবিত্ত আত্নীয় এবং গ্রামের পরিচিত ছেলে মেয়েদের রাখেন।যেটায় তার নিজেরও মানসিক শান্তি কাজ করে। নিজেদের মাঝে গরীব, অসহায় রেখে বাইরের মানুষের প্রতি সহায় এবং সহযোগীতা দেখানো মোটেই অতি উত্তম কিছু নয়।তিনি এটাই মনে করেন,আগে নিজের মানুষকে সাহায্য করবেন এরপর বাইরের দিকে নজর দিবেন। এমনকি তিনি একমাত্র মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন নিজের এক দুঃসম্পর্কের মধ্যবিত্ত আত্নীয়ের ছেলের সাথে।মেয়ে বিয়ের সময় তিনি কেবল দেখেছেন ছেলের নৈতিকতা, চরিত্র ও মেধা এবং পরিশ্রমী মনোভাব।তিনি মনে করেন যার এই চারটা দিক ঠিক সেই উত্তম চরিত্রের। তার একমাত্র মেয়ের জন্য তিনি একজন সৎ,চরিত্রবান, পরিশ্রমী এবং নীতিজ্ঞান সম্পন্ন ছেলেই পছন্দ করবেন এবং করেছেন‌ও তাই।

তার বিবেচনা সম্মানিত হয়েছে, নিজের পরিশ্রমে আর মেধায় জামাই তার দেশীয় এক ব্যাংকে ভালো পজিশনে আছে।যদিও মাঝে মাঝে শ্বশুরের ব্যবসায়িক কাজে সহায়তা করতে দেখা যায় তাও একান্তই খন্দকার পরিবারের অনুরোধে। শ্বশুর এবং শ্যালকদের অনুরোধে শ্বশুর বাড়িতেই থাকে কারণ স্বামী স্ত্রী দুজন‌ই পেশাজীবী, সেক্ষেত্রে বাচ্চাদের সঠিক যত্নের অভাব যেন না হয় তাই এক রকম পরিস্থিতির কারণেই থাকতে বাধ্য হয়।

"আসসালামু আলাইকুম!"

" ***"

"জ্বী ভাই থানার মধ্যে, এখন ফোন দেওয়া যাবে না।বের হলে বলবো!"

"***"

" আরেহ ভাই,ভাইয়ের মাথা এমনিতেই এখন গরম আছে!আমি.."

"***"

" মুরাদ ভাইকে ধরে আনছে,সাঈদ ভাইয়েরে আনছে তাতে সমস্যা নাই কিন্তু মুরাদ ভাইকে আনার জন্য ভাইয়ের মেজাজ বেশি গরম হয়ে আছে।এখন এইসব বললে বেজায় ক্ষেপে যাবে!"

"***"

"আচ্ছা ঠিক আছে!"

কথা শেষ করে ফয়সাল ফোনটা নিজের পকেটে পুড়লো।

থানার ভেতর....

"আমি যখন বললাম কি মনে হয়, খুব তো গর্ব করে বলেছিলেন আইনের লোক প্রমান দেখে, মনে হ‌ওয়াতে নেই!এই আপনার প্রমান! কেউ বললো মনে হয় উমুক এটা করেছে আপনিও সেই মনে হ‌ওয়াতে তাল মিলিয়ে উমুককে গিয়ে আঘাত করলেন! এটাই কি আইনের ভাষা? আইন কি আপনাকে এটাই শিখিয়েছে?"

" তারাজ ভাই আপনে খামোখা চেততেছেন! আমি তো বললাম অভিযোগ পাইছি, আনছি। আমি কি কাল আনতে পারতাম না? আনি নাই কারন অভিযোগ ছিলো না।এখন অভিযোগ করা হয়েছে আমি আনতে বাধ্য। এরপর প্রমান‌ও পাওয়া যাবে!"

"কত খেয়েছেন? ডাবল দিবো শুধু পাবলিকলি তার নাম বলতে হবে!"

" এইসব কি বলতাছেন ইব্রাহিম ভাই! আপনে আইনের লোক হয়ে এইভাবে থানার ম‌ইধ্যে !"

" ওকে আপনার সাথে কোর্টে দেখা হচ্ছে; তবে বিষয়টা মোটেই ভালো লাগলো না,মুরাদের গায়ে এহেন অপবাদের দাগ আমি একদমই বরদাস্ত করছি না।আই সয়ার ইউ উইল পে ফর ইট।"

এস আই কামাল কিছুটা নার্ভাস অনুভব করলেন,কারণ অভিযোগের ভিত্তিতে আনলেও আসলেই উনি টাকা খেয়েছেন।আর তারাজ একজন ব্যারিস্টার, নিশ্চয়ই ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না।যে থানার মধ্যে উপস্থিত গোটা কয়েক অফিসারের সামনে এভাবে ঘুষ অফার করতে পারে,হুমকি দিয়ে যেতে পারে সে নিশ্চয়ই কোমরে শক্ত বাঁধন দিয়েই নেমেছে।সে জানে এইসব নীতির বুলেট ছড়ানো অফিসাররা টাকার কাছেই বিক্রি হয়ে যায়।অভিযোগের প্রধান অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সাইদকে। তারপর আছে মুরাদ,এর সাথে অবশ্য আরও বেশ কয়েকজন ছেলেকে জড়ানো হয়েছে।তবে তারাজের বেশি চিন্তার বিষয় মুরাদ।কারণ মুরাদের মা অসুস্থ, হার্টের অপারেশন করে বাড়ি আনা হয়েছে মাত্র ১৭/১৮ দিন,এর মধ্যেই এহেন ঘটনায় নিশ্চয়ই ভেঙে পড়েছে।তবে সাইদকে নিয়েও চিন্তিত কারণ সাইদের ড্রাগ ব্যবসার ব্যাপারটা খোলাসা হয়ে গেলে ওর জন্য ঝামেলা হয়ে দাঁড়াবে।

সাইদ ওর ক্লাবেই কাজগুলো করতো, এর অর্থাৎ হলো নিশ্চয়ই আরও অনেকেই আছে, এখনও তাদের হাতেনাতে পায়নি।পাওয়ার পর অবশ্যই বন্দোবস্ত করা হবে। কিন্তু তা তো জনগন বুঝবে না তারা শুধু জানবে ইব্রাহিম তারাজের ক্লাবে ড্রাগ বেচাকেনা হচ্ছিলো।আর এর মাঝে অহেতুক কারণে ফেঁসে গেল মুরাদ।তারাজের মন বলছে স্পষ্ট ব্যক্তিগত ঝামেলাকে রাজনৈতিক ক্যাচাল হিসেবে ব্যবহার করছে! বুঝতে পারছে কিন্তু প্রমানের অভাবে, অবশ্য প্রমানের যোগারও হয়ে গেছে।সাথে এই খেলার শোধ উপভোগ করার সময়‌ও ঘনিয়ে আসছে।কথাটা ভাবতেই কুটিল হাসিতে ফেটে পড়লো।

"ভাই সাব্বির ভাই ফোন দিছিলো,আপনে কোর্টে যাইবেন!"

"হ্যা এখন‌ই বের হবো!তুই সোজা ক্লাবে যাবি,আর লিফলেটে কি কি লেখা যায় তার কয়েকটি ডেমো তৈরি করবি! পারবি না?"

"জ্বী পারবো কিন্তু ভাই অভয় দিলে একটা কথা বলতে চাইছিলাম!"

"দিলাম!"

"ভাই সময় যত ঘনিয়ে আসছে পরিস্থিতি তত জটিল হচ্ছে, তাই বলছিলাম আপনি একা এতদূর যাইয়েন না , আমারেও নিয়া চলেন,আপনে কোর্টে পৌঁছাইয়া গ্যালে আমি আবার চইলা আসবো।আইসা না হয় !"

"দরকার নাই,আমি একাই যেতে পারবো। তাছাড়া আমার আজ বেশ কাজ আছে!আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে; তাই এদিকে তোর মতো একজন দরকার সুতরাং তুই এখানেই থাক।আর হ্যা ছেলেদের বলবি যে যত‌ই উস্কানিমূলক কথা বলুক কোনভাবেই মাথা গরম করা যাবে না!অন্তত মহাসমাবেশের আগে তো নয়‌ই। এরপর তো মাত্র কয়েকদিন, নমিনেশন পেপার হাতে পাওয়ার পর দেখাবো খেল।কে কতদূর দৌড়াতে পারে আর কে কতটা.."

কথা বলে হাসির চরিত্র বক্ররেখায় পরিবর্তন করলো,ফয়সাল এই হাসির অর্থ বুঝে তাই সেও ভাইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে একটু মুচকি হাসলো, পরক্ষনেই কিছু একটা মনে হতেই বললো,

"কিন্তু ভাই তাইলে আপনি গাড়ি নিয়া যান চিন্তা কম লাগবো।"

"না বাইক নিয়েই যাবো।তুই আমার জন্য এত চিন্তা করিস না! যা এখন ক্লাবে! মুরাদকে একটার সময় কোর্টে চালান দিবে,আমাকে তার আগেই গিয়ে পৌঁছাতে হবে!"

কথ শেষ করে ফয়সালের কাঁধ চাপড়ে কিছুটা ধাক্কা দিয়েই সামনে এগিয়ে দিলো,ফয়সাল আর কথা বাড়ানোর সাহস করলো না তয় কিছুটা চিন্তিত তো থাকলোই। ফয়সালের সাথে আর‌ও কয়েকজন ছেলে এসেছিলো,ভাইয়ের অন্ধ ভক্ত তারাও কিন্তু ফয়সালের মতো কাছের কেউ এখনও হতে পারেনি তাই ওরকম ভাবে কথাও কখনো বলা হয়নি‌।

হাইকোর্ট,সিএমএম‌এইচ এর পাশের প্রধান সড়কে বিরক্তিকর ট্রাফিক জ্যামে আটকে আছে শতশত গাড়ি। বাইক,রিক্সা,ভ্যান, প্রাইভেট কার, বাস সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক গাড়ি। চারদিকে হর্ণের শব্দে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা, এরমধ্যে অবিরত বেজে চলছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রচারনা মাইকিং।এ্যাম্বুলেন্সের সতর্ক বার্তাও শব্দ দূষণে প্রতিযোগীতায় নেমেছে। পুরো ফুটপাথ জুড়ে বসা ক্ষণস্থায়ী বাজার,যেখানে পাওয়া যাচ্ছে সব ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিস। কোর্টে পড়ার জন্য ফরমাল পোশাক থেকে শুরু করে টাই,জুতো থেকে মোজা,শাড়ী, কসমেটিকস, বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার,ড্রাইফুট। রয়েছে পত্রিকার,জুতো পালিসের দোকান,পাশ করে রাখা প্রশাসনিক গাড়ি। অতি ব্যস্ত এই সড়কে জ্যাম একদমই ডাল-ভাতের ন্যায় বরং কখনো ভুলত্রুটিতে ফাঁকা দেখলেই বুঝতে হবে এটা নিশ্চিত অনিয়মের স্বীকার,নয়তো আপনার চোখে ভ্যামো হলো বোধহয়।

দ্রুত যাওয়ার তাগিদে মানুষ যানবাহন ব্যবহার করলেও এই শহরে বলতে হয় দ্রুত যেতে চাইলে পায়ের ব্যবহার করো,নয়তো ঘুমিয়ে পৌঁছানোর ইচ্ছা পূরণে যানবাহনে চড়ো।

অসহ্যকর এই জ্যাম নামক জাহান্নামের মাঝেই আঁটকে আছে তারাজ। বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে রেখেছে,পড়নের কালো কোর্টটা অনেক আগেই খুলে বাইকের সামনের সিলিন্ডারের উপরে রেখেছে,সাদা শার্ট ঘামে ভিজে আঁশটে রঙ ধারন করেছে,মাস্ক পড়ায় কেবল চাক্ষুস কঠোর নয়নজোড়াই দৃশ্যমান।হাতের কালো বেল্টের ঘড়িটাও লেপ্টে আছে লোমশ হাতের চামড়ার সাথে। বিরক্তিতে বারবার এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে,পকেট থেকে টিস্যু বের করে কপালের ঘাম মুছতে মিররে তাকাতেই  স্থির হয়ে গেল,থম মেরে দেখতে থাকলো তার মিররে নিজের সৌন্দর্য পর্যবেক্ষন করা এক কাজল চোখীকে।

সাদা শাড়ীর উপরে কালো লম্বা ওকালতি পোশাক,কালো হিজাবের মাঝে থাকা গোলগাল চেহারায় ভরাট গলুমলু গালের অধিকারী এক দুর্ধর্ষ শ্যামকন্যাকে। কালো মাস্কে নিজের মায়াবী চেহারা আড়াল করে দ্রুত ঢেকে নিলো নিজের টসটসে লাল লিপস্টিক লাগানো ওষ্ঠজোড়াকে। অতিরিক্ত কালো পর্দায় সবটা ঢেকে থাকলেও উন্মুক্ত হয়ে পড়ে থাকলো সর্বনাশা আঁখি,যার মাঝেতে ঘন চিকন করে টানা কাজল।মায়াবী ডাগর ডাগর ঐ আঁখির উপরে যখন কালো রোদ চশমা ঠেলে দিলো তখন‌ই ভ্রম ভাঙ্গলো তারাজের। আশ্চর্য হয়ে ভাবতে লাগলো কি করছিলো এত সময় সে।মেয়েটি নিজের কাজ শেষ করে মিষ্টি হেসে বললো,

"ধন্যবাদ!" 

হায় সর্বনাশ! হ্যা এটাই বললো তারাজের হৃদযন্ত্র।কোকিলা কন্ঠে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে চলে গেল সর্বনাশীনি কাজলচোখী! কিন্তু বিধ্বস্ত! ভয়ংকর বিধ্বস্ত করে রেখে গেল দেশের ভবিষ্যৎ একজন সুদর্শন এমপিকে।তার যাওয়ার পথে তাকিয়ে ভুলে গেল এত সময়ের বিরক্তিকর জ্যামের কথা, মিনিট কয় এভাবেই তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে র‌ইলো,শাড়ীর সাথে কেইডস পড়তে এই প্রথম দেখলো তারাজ তার সাথে খেয়াল করলো কত দ্রুত হাটে একজন নারী তাও আবার শাড়ী পড়ে এবং সেই শাড়ীর উপরে লম্বা কোর্ট পড়িত। পথচারীদের জন্য তৈরি করা ঐ পথ পেরিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে সে,এত এত কোলাহল তাকে রুখতে ব্যর্থ হলো।মেশিনগানের ন্যায় দ্রুত কদমে হেটে ঢুকে পড়লো সিএমএম আদালতের গেট পেরিয়ে ভেতরে।রেশ কাটলো মনে হয়; না রেশ কাটেনি কারণ এই রেশ আর কাটার নয়।তবে যানবাহনের সচল হ‌ওয়ার শব্দে সচেতন হলো, কিছু মুহূর্ত ভাবলো কে ছিলো, কোথায় থেকে এলো,আর গেলো কোথায়? মনে পড়লো তার শরীরেও তার‌ই ন্যায় আইনের লোগো, দ্রুত গতিতে হেঁটে ঢুকলো আদালত প্রাঙ্গণে তার মানে সে এক‌ই নৌকার যাত্রী সুতরাং ইনশাআল্লাহ! কথাটা বিরবির করে বলেই মুচকি হাসলো তার সাথে শুরু করলো ড্রাইভ করা ‌।

চলবে?


পর্ব ৫


"এই প্যাচ থেকে বের হতে বেচারা তারাজ সাহেবের কোষ্ঠকাঠিন্য শুরু হয়ে যাবে তবুও বের হতে পারবে না!"

"এতটা কনফিডেন্ট?"

"ক্যান? সন্দেহ হয় !"

"না! তয় ক্যান জানি খেলাটা জমবো না?কারণ পাগলেও বুঝে মাইরা কেউ লাশ নিজের ঘরে পুতে রাখে না,সেই দিক দিয়া এইটা একটা মাছি মারার মতো ঘটনা হ‌ইলো মাত্র!"

"কি বলতে চাও তুমি? আমি সবসময়ই খেয়াল করছি তুমি আমার লোক হয়েও কাছ ঘেষো খন্দকারদের!আসল উদ্দেশ্য কি তোমার?"

"আপনার মঙ্গল!নুন খাই গুন না গাইলেও চুন লাগাতে দিতে পারি না। আপনার ক্ষতি হোক এমন বুদ্ধি আগেও দেই নাই এহন‌ও দেই না! আমি আপনারে আগেই বলছিলাম যাই হয়ে যাক এত বছরের দলের বাইরে গিয়ে দাড়াইয়েন না!দেখলেন তো এইবার মিটিংএ লিডার আপনেরে দাম‌ই দিলো না।একবার সাইধা কথাও বললো না, আপনার হালচাল‌ও পুচলো না! আর ঐদিকে তারাজ;তারে তো পারলে তহো‌ন‌ই কাঁধে নিয়া নাচে।যেন এমপি হ‌ইয়াই গেছে!"

"এমন কিছুই না,আসলে তার বাবা তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর,তাই এতোটা মাখো মাখো। তাছাড়া আর কিছুই না।দেখো নাই কিভাবে নেতা কথা শুনাইলো, এরপরও তোমার কিভাবে মনে হয় ওরে নমিনেশন দিবো? জয় তো দিল্লীকা লাড্ডু! আর সবচেয়ে বড় কথা রাজনীতির মাঠে টিকতে হলে মাঠে ঘাস খাওয়া গরুর ন্যায় পড়ে থাকতে হয়।হুট করে এসেই যে কেউ রাজনীতিতে টিকতে পারে না।এটা না অনেক সাধনার ফসল! যদি কেউ ভাবে দুই চারটা ক্রিকেট, ফুটবল ম্যাচ জিতেই জনগণের মনে জায়গা করতে পারছে,বাপের ক্ষমতা বলে ভোটারদের কিনতে পারবো তাহলে সে ভুল! এটা এমন একটা জায়গা যেখানে টিকতে গেলে দম নিয়ে দাঁড়াতে হয়, নিজের দম! বাপের নয়! বৈদেশি কাগজ থাকলেই মানুষ তারে নেতা বানাইবো এটা ভাবা ভুল!"

" এই কথা তো তারাজের সাথে যায় না।কারণ আপনি কয়েক বছর ধরে আছেন আর সে কিন্তু জন্মের পর থেকেই বাপের রাজনৈতিক খেলা দেখছে; সেই মোতাবেক সে এখান দিয়েও আপনার থেকে আগাইয়া আছে!"

"বাপের খেলা দেখছে,নিজে তো পার্টিসিপেট করে নাই। তাছাড়া কয়েক বছর বিদেশ আছিলো তখন কি দেশের পরিস্থিতি নিয়া ভাবার সময় ছিলো তার? বিদেশ থেকে আইসাই মাঠে নামলেই কি খেলায় জেতা যায়! আগে কি করছে না করছে তা জনগণের দেখার সময় নাই, জনগণ‌ দেখবো এখন কি করতাছে!" 

" হ এত এত পড়ালেখা করছে এমনিতেই,আইন নিয়া প‌ইড়া তোমার এই আইনি খেলা বুঝবো না এইটা কেবল তুমি আর তোমার গর্দভ মাথাই বিশ্বাস করে, আমগো করতে বলিও না!" 

কথাটা বিরবির করেই বললেন, কিন্তু শুনতে পেল না জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া। সামনে দাঁড়ানো জীর্ণশীর্ণ দেহের অধিকারী একনিষ্ঠ ভক্ত দাবি করা রহিম মোল্লার অতিরিক্ত ভক্তিপনা বরাবরই সন্দেহের সৃষ্টি করে।ঐ যে চিরায়িত গর্বিত বাক্য 'অতি ভক্তি চোরের লক্ষন' তার শুধু সেটাই মনে করিয়ে দেয়। তবুও বরদাস্ত করে,কারণ তার কাছ থেকে অনেক গোপন তথ্য পাওয়া যায় যা খুবই উপকারী হিসেবে কাজ করে। তবে কোথাও যেন মনে হয় এই লোকটা উভয় পক্ষের‌ই কাজ করে।তাই তো আসল ঘটনাই জানালো না।আর যা জেনেছে তা প্রকাশ করার দুঃসাহস করবে না সেটায় নিশ্চিত হওয়া যায়।

কোর্টে মুরাদের পক্ষে উকিল দাড় করিয়ে নিজের চেম্বারে গিয়ে বসলো। গ্রাহকের সাথে কাজ শেষে বেরিয়ে পড়লো পার্টি অফিসের উদ্দেশ্যে!উকিল যে আছে সে খুব দায়িত্ববান। মুরাদকে এখনও নিয়ে আসা হয়নি তবে চলে আসবে কিছু সময়ের মধ্যেই। সাঈদের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নিলো না।তবে চিন্তা হচ্ছে। কারণ কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কেউটে বের হয়ে আসবে যদিও সেটাই চাচ্ছে তারাজ।কারণ সবাই জানুক আসল হোতা কে? তাছাড়াও ভালো মানুষির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইবলিশকে সবাই চিনুক এটাও জরুরি! 

"হ্যালো আর ইউ তাজিশ?"

মিহি  মিষ্টি মেয়েলি কন্ঠে খানিকটা চমকে গেল তাজিশ! পিছু ঘাড় ঘুরিয়ে রমনীর পানে তাকাতেই কিছুটা স্তব্ধ হয়ে গেল,ফরমাল লেডিস শার্টের সাথে লুছ ফিটিং প্লাজো আর গলায় ঝোলানো ছোট্ট হিজাবি ওড়নায় নিজেকে পরিপাটি করে রাখা ফর্সা মায়াবী ছোট্ট একটি মুখ। ঠোঁট‌ সাজানো পিচ লিপস্টিকে।চিকন করে দেওয়া কাজল চোখের উপরে থাকা ঘন বড় বড় নকল পাপড়ি তার নিজস্বতা ঢেকেই বাহ্যিকতায় মেখে আছে। তাজিশের মনে মনে ভাবলো, এ কি নকল সৌন্দর্যের লীলাভূমি নাকি প্রকৃত রুপের মহিমা! পরক্ষণেই মনে করলো এই রমনী স্রষ্টার দানকে কৃত্রিমতার চাদরে মুড়ে রেখেছে। নিঃসন্দেহে এই নারী সুন্দরীদের কাতারে প্রথম সারিতে থাকার যোগ্য! তাজিশের আজগুবি ভাবনার অভিলাষ গুচলো সামনে দাঁড়ানো পাঁচ ফুটের তুলতুলে নরম মনের অধিকারীনি তুলির চিকন মিহি কন্ঠের ডাকে।

"এক্সকিউজ মি,আই সেইড ইউ সামথিং!"

"ইয়াহ!" 

"হুয়াট?" 

" আই ডিডেন্ট হিয়ার,হুয়াট ইউ ওয়ান্ট টু নো?"

মেয়েটা একটু কেমন করে তাকালো,তাজিশ বিব্রত হলো। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা নারীর পানে আর তাকানোর সাহস করলো না,ঐ চাহনি যথেষ্ট বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে। কিছুটা উচ্চ স্বরেই ফের নিজের প্রশ্ন রাখলো,

" আপনি কি তাজিশ?আই মিন ইউসুফ তাজিশ খন্দকার?"

"জ্বী!" 

নিজের পরিস্থিতি পাশে রেখে অটল কন্ঠে উত্তর করলো, মেয়েটা মনে হয় স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।

 মুহুর্তে হাসি হাসি মুখ করে বললো,

"আমি আপনাকেই খুঁজছিলাম।"

"কেন?"

"আমাকে আহনাফ হামিদ পাঠিয়েছেন আমি উনার ছোট বোন তুলি হামিদ!আপনাকে হয়তো বলেছে আমার একটা ব্যবসায়িক পেইজ হ্যাক করা হয়েছিল গতকাল রাতে; সেটা ব্যাক করাতে খুব ভালো একজন মানুষ দরকার,আই মিন বিশ্বস্ত! ভাইয়া আমাকে আপনার কথা বললো তাই আমি.."

"বসুন; বসে কথা বলি! তাছাড়া আপনার সমস্যা সম্পর্কে আমি অবগত, কাল রাতেই আহনাফ আমাকে জানিয়েছে।আসলে আমি তো আপনাকে দেখিন তাই ..! 

"ইটস ওখে ; আমি তো দেশে থাকতাম না।এসেছি মাস দুই হলো।আমার ব্যবসাটা কিন্তু সুইজারল্যান্ড থাকতেই,মা নিজে হাতে ধরিয়ে এই ব্যবসাটা শিখিয়েছিলো এছাড়াও প্রথম দিকে পেইজটা মা‌'ই চালাতো। এরপর আমি,একদম টিন‌-এইজ থেকেই শুরু করেছিলাম, এজন্য আমার এত টান এই পেইজটার উপরে।

কথাটা বলেই মুর্ষে পড়লো সদ্য ২২ পেরিয়ে ২৩ এ পদার্পণ করা এই ছোট্ট সবুজ প্রজাপতির ন্যায় রঙ্গিন রমনী। মায়ের ইহলোক ত্যাগের পর বাবা ভাইয়ের কাছে ফিরে আসে তুলি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই বাবা মায়ের বিচ্ছেদের পর সুইস মায়ের হাত ধরে পাড়ি দেয় সাদা মানুষের দেশে।  বাবার প্রতি অতি দুর্বল ১০ বছর বয়সী আহনাফ যায়নি মায়ের সাথে,তবে মাঝে মাঝে ঘুরতে গিয়ে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে আসতো মায়ের সান্নিধ্যে। কিন্তু তুলি কখনোই আসেনি বাবাকে দেখতে কিংবা বাবার দেশে বেড়াতে। হামিদ মোস্তাফা মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসতো নিজের রাজ্য ছাড়া রাজকন্যাকে! দ্বিতীয় বিয়ে করলেও সন্তানদের জীবনে তার প্রভাব পড়তে উনি দেননি। ইচ্ছা করেই বিয়ে করেন সন্তান গর্ভে ধারণে অক্ষম এক ডিভোর্সি নারীকে। আহনাফ হামিদ নিজের মায়ের স্নেহ যথাযথ না পেলেও সৎ মায়ের মমতায় ঘাটতি দেখেনি।তাই তাকেও মা বলে সম্বোধন করতে দুইবার ভাবেনি। ঐদিকে তুলি পায় আফ্রিকান এক মুসলিম পিতার পিতার পরিচয়,মায়ের দ্বিতীয় পক্ষের স্বামী এবং সেই স্বামীর আগের পক্ষের সন্তানের মাঝে আনন্দে কাটে তার শৈশব। তারপরও নিজের বাবার ভালোবাসায় আবেগিত হতে দ্বিধান্বিত হয়নি। একসাথে দুই দিকেই পেয়েছ স্নেহ,মমতা, ভালোবাসা।

নিজেদের মাঝে বনিবনা না হ‌ওয়ায় আলাদা হয়ে যান মিস্টার হামিদ মোস্তাফা এবং তার প্রাক্তন স্ত্রী সেনোরিতা মোস্তফা।পড়াশোনা করতে সুইজারল্যান্ড গিয়ে জড়িয়ে পড়েন মায়ায় এক সুইস সুন্দরী ললনার।সেই মায়া গিয়ে বাঁধে প্রণয়ের ডোরে। ভালোবেসে ধর্ম পরিবর্তন করে নিজেকে মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার ওয়াদা করেন, এবং ধর্ম পরিবর্তন‌ও করেন। কিন্তু প্রথমে সব ঠিক থাকলেও পরবর্তীতে তা আর সম্ভব হয় না।পিতার ধর্ম খ্রিস্ট থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যর্থ হয় সেনোরিতা সুচি। পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে মুসলিম ধর্মকে ভুলে গিয়ে নিজ খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারী বনে যান।করেন নানা নিয়ম-কানুন পালন।যা দৃষ্টি কটু হিসেবে ধরা পড়ে হামিদ মোস্তাফার পরিবারের গুরুসদস্যদের দৃষ্টিতে। তাছাড়াও পরিবারের সাথে তাল মেলাতে পড়তে হতো অনেক অশালীন পোশাক। নানারকম অঙ্গভঙ্গির সহিত করতো নাচ।

যা মানতে নারাজ ছিলো মোস্তফা পরিবারের সদস্যরা। শুরু হয় পারিবারিক কলহ। সৃষ্টি হ‌‌ওয়া কলহে দাম্পত্য জীবনের তৈরি করে নানা জটিলতা।এক সময় সূচির তরফ থেকে আসে বিচ্ছেদের আর্জি। বুঝাতে থাকলেন হামিদ মোস্তফা। মানলেন না সেনোরিতা সূচি।শেষ পরিনতি আলাদা হয়ে যাওয়া।

নিজেদের মাঝের বিচ্ছেদে প্রথমে মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকলেও পরে ছেলে মেয়ের চিন্তা করে স্বাভাবিক ভাবেই দেখা সাক্ষাৎ চলে।এতে করে দুজনের নতুন জীবনের উপরে যাতে প্রভাব না পড়ে তাতেও সচেতনতা অবলম্বন করেন উভয় পক্ষ।

" আপনার কাজ হয়ে যাবে। আশাকরি কাল সকালেই ইনশাআল্লাহ আপনার পেইজ আপনি বুঝে পাবেন।"

কথাটা বলে তুলির দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালো তাজিশ।তুলির চিন্তিত বিমর্ষ চেহারায় খুশির ছটা ছলাৎ ছলাৎ করে ঢেউ খেলে উঠলো। এত সময়ে দেখা মুখভঙ্গির পরিবর্তনে খুশি হলো তাজিশ নিজেও।তুলিকে আশ্বস্ত করতে আর‌ও একটু যোগ দিয়ে বললো,

"এই পেইজের সাথে আপনার ইমোশন এটাচ,এটা আমি এত সময়ে আন্দাজ করে নিয়েছি।পেইজটা আমি রাতেই পাবো ইনশাআল্লাহ তাও আমি কাল সকাল অবধি সময় নিচ্ছি ।আপনি এই অধমের উপর ভরসা করতে পারেন।"

"করলাম!"

খুশি মনে সম্মতি জ্ঞাপন করে নিজের টেবিলের উপরে ছোট কাঁধ ব্যাগটা হাতে তুলে নিলো,তাজিশ তড়িগড়ি করে উঠতে চলা তুলিকে উল্লেখ করে বললো,

"আরে বসুন,এক কাপ কফি না খাইয়ে ছাড়ি কিভাবে? আপনি শুধু আমার ক্লাইন্ট‌'ই না তার সাথে আমার খুব কাছের একজন মানুষের আদরের ছোট বোন!"

 "ইটস ওখে,আমি এখন কিছুই নিবো না। আপনার প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ! আমি এখানে আসার আগেই গাড়িতে বসে কফি পান করেছি।তাই এখন আর নিবো না!" 

"কিন্তু?"

"প্লিজ ফরমালিটি করবেন না!" 

"ওখে,বাট নেক্সট টাইম ইনশাআল্লাহ!"

"ইনশাআল্লাহ!"

কথা শেষ করে তুলি বেরিয়ে গেল,অবশ মুগ্ধ নয়নে তার পানে তাকিয়ে র‌ইলো তাজিশ,সুইসে বড় হ‌ওয়া এই নারী কত সুন্দর করে বাংলা বলে যেন আজীবন বাংলাদেশেই ছিলো।এটা কিভাবে সম্ভব।তবে এটা তো সত্যি সে সুইসেই বড় হয়েছে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই তাজিশ নিজের টেবিলে বসে ল্যাপটপটা টেনে নিলো।এখন সে ধ্যানজ্ঞান দিয়ে নিজের কাজে ডুব দিবে।

পার্টি অফিসের কাজ চুকিয়ে তারাজ আবারও কোর্টে আসলো।মুরাদের কেইস নিয়ে আদালতে তোলা হয়েছে।উকিল হিসেবে আছেন বিশিষ্ট ল‌'ইয়ার আইনুল হক। শুধু মাত্র মুরাদের কেইস লড়বে। ধারনা দিয়ে একটা বেশ জোড়ালো প্রমান জোগাড় করে নিয়েছিল তারাজ।যদিও তা মৌখিক তাই আজকেই কাজ হবে না।আর তারাজ চাচ্ছে‌ও না আজ‌ই হোক। অন্তত অন্ধ বিশ্বাসের জন্য এবং হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য তাকে শাস্তি স্বরূপ দুই চার দিন লাল দালানের মোটা চালের ভাত আর অর্ধ পঁচা তরকারি খা‌ওয়াতে চায়। এমন‌ই কথা বলে নিয়েছে তারাজ আইনুল হকের সাথে। তাছাড়াও মুরাদকে আটকে রেখে বাইরের অদৃশ্য সেই খুনীকে ফাঁসাবে,জম ফাঁসান ফাঁসাবে। 

মাঝ রাতে.......

নিজ বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে গা এলিয়ে মোটা আইনি পুস্তকে মনোযোগ দেওয়ার আপ্রান প্রচেষ্টায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছে ইব্রাহীম তারাজ!সারাদিন দৌড়ঝাঁপের পর সন্ধায় বসেছিল ক্লাব ঘরে গিয়ে। টুকটাক রাজনৈতিক আলাপ সেড়ে দশটার মধ্যে ঘরে ফিরে আসে যা সচরাচর দেখা যায় না।

 পরিবারের সাথে খুঁটিনাটি আলোচনা আর খুনশুটিতে মেতে রাতের খাবার শেষ করে নিজ বিছানায় আসে রাত প্রায় বারোটায়।তখন থেকেই এপাশ ওপাশ করে কাটিয়ে দেয় দেড় ঘণ্টা। কিন্তু ঘুম পরীরা আজ হার মেনেছে সেই শ্যামকন্যার কাজল আঁকা ডাগর ডাগর নয়নের তরে। সারাদিন নানা কাজের মাঝেও ভুলতে ব্যর্থ হয়েছে সেই রমনীর ঐ ভয়ংকর মায়াবী মুখশ্রী আর গহীন অরণ্যের ন্যায় বিলাসী আঁখির প্রতিচ্ছবি।নিজের নিব্বাপনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কিছু সময় পাইচারি করতে থাকে। ভালো লাগলেই হলো না, জানতে হবে এই ফুলের মালি কে? আদৌও এই বাগান মালিকানাধীন নাকি এখনও বিনা মালিকানায় অযত্ন অবহেলায় পার করছে যৈবনা কাল।পাইচারিতে কাজ না হ‌ওয়ায় হাত বাড়িয়ে বুক সেল্ফ থেকে আইনি পুস্তক তুলে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলো, উদ্দেশ্য আইনি জটিলতায় ফেলে আবেগের দড়ি লাগাম দেওয়া কিন্তু তা কি আদৌও সম্ভব? অজান্তেই বলে উঠলো,

"মারপ্যাচের হৃদমন্জিলে প্রণয়ের সুর বাজে!

কঠোরতার খাঁজ কেটে স্নিগ্ধতার রুপে সাজে!"

চলবে?


পর্ব ৬


"ইব্রাহিম!"

"জ্বী আব্বা!"

বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত সিড়ি পেরিয়ে নিচে নেমে সোফায় বসে থাকা ইসহাক আবদুল্লাহর মুখোমুখি দাঁড়ালো, ছেলের পানে চেয়ে ইশারায় পাশে বসতে আদেশ করলো।আদেশ অনুযায়ী নিজেকে স্থাপন করে বাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে আগ্রহী হয়ে চাইলো।

" তুমিও জানো মুরাদের মতো ছেলে এই কাজ করতে পারে না। তাছাড়া আমার ধারণা মতে তোমার কাছে যথেষ্ট সাক্ষি রয়েছে তারপর‌ও কেন ওকে ছাড়াচ্ছো না?"

"কারণ ওর শিক্ষা পাওয়ার দরকার আছে!"

"মানে কি?"

"আমি ওকে বলেছিলাম দলে নতুন লোক ঢুকানোর আগে নিজেকে সতর্ক রাখবি যাতে অতি ভক্ত বনে না যাস! কিন্তু তা না করে নিজেকে উদার বানানোর চেষ্টায় আমাকে ডুবাতে বসেছিল ; সংগঠন নিয়ন্ত্রণের প্রধান শর্ত নিজেকে আবেগমুক্ত রাখা।"

"তাই বলে নিজের বন্ধুকেও?"

" আমার কাছে আগে আমার নিজের সংগঠন তারপর অন্য কিছু!"

কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়ালো ইব্রাহীম তারাজ, কিছুটা এগিয়ে গিয়ে পিছু মুখি অবস্থায়‌‌ই বললো,

"আপনি ভাববেন না দুই চার দিন থাকবে এরপর চলে আসবে!"

ছেলের কথায় বুঝে গেল জামিন হয়ে গেছে কিন্তু নিজের কুটবুদ্ধিতে অযথাই গারদে আটকে রেখেছে মুরাদ নামক নিরিহ প্রাণীটিকে। কিন্তু তাও তিনি এর পরে আর কোন কথা বলবেন না কারণ জানে যত‌ই স্বৈরাচারী মনোভাব থাকুক ছেলে তার মানুষের কথা ভাবে।বলা যায় এক দেহ দুই চরিত্রে বসবাস করে।

"আপনি কি বলতে চাইছেন?"

"আমি ঠিকই বলছি,গোপন খবর মোতাবেক বেশ শক্তপোক্ত সাক্ষী আপনার বিরুদ্ধে উপস্থাপন করেছে ব্যারিস্টার ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার এবং সরাসরি সেই সমস্ত ডকুমেন্টস হাজির করা হয়েছে বিচারপতির কাছে। আমার পক্ষে কোনভাবেই এই কেইস আর জেতা সম্ভব নয়।

-হারার রেকর্ড না থাকলেও এবার হারতে হলো তাও আবার দুই দিনের এক ল'ইয়ার আইনুল হকের কাছে! এটা যে কি পরিমান লজ্জার তা বলে বোঝানো যাবে না। বাচ্চা একটা ছেলের সাথে শেষমেশ!"

" এখনও রায় দেওয়া হলো না এর মধ্যেই আপনি হেরে গেলেন হেরে গেলেন বলে আহাজারি কেন করছেন? মাত্র তো একটা শুনানি গেলো এরপর তো আর‌ও আছে! এত সহজ একটা খুনের আসামী, মাদক ব্যবসায়ীকে ছাড়ানো!"

" আপনি কার বুদ্ধিতে আজকাল চলছেন বলেন তো? কে আপনাকে বুদ্ধি দিয়েছিলো এত বছরের দল ছেড়ে বিপরীত দলে নাম লেখাতে? আবার নিজের‌ই অতীত দলের বর্তমান প্রার্থীর পাছায় খোঁচাখুঁচি করার জন্য উস্কানি কে দিচ্ছে?"

"এমন কিছুই নয়,আমি এত বছর খেটেও দলে শক্ত কোন পজিশন পেলাম না। ভেবেছিলাম এই বছর কেন্দ্রীয় যুবলীগের সভাপতি পদটা পাবো তাও দিলো না,দিলো কাকে! সেই কোন অষ্টাগ্রামের মাহিনকে।এত বছর খেটেও যা পেলাম না তা কিন্তু আমাকে শুরুতেই দিয়েছে এই দলে!

" শুনেন দল করতে হয় নিঃস্বার্থভাবে, শুধু পজিশন পাওয়ার জন্য দল করলে জীবনেও পজিশন পাওয়া যায় না! আপনি হয়তো জানেন না এই মাহিন দলের জন্য কি করছে! মাহিনের গর্ভবতী বোনকে কুপিয়ে মারছিলো আপনার বর্তমান দলের তৎকালীন ছাত্র কর্মীরা!মায়ের কোমরের হাড় ভেঙে দিছে,ঐ মহিলা এখনও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তাছাড়াও মাহিন নিজেই টানা এক বছরের উপরে হাজতে নারকীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো।সেই সময়ে মাহিনের পারিবারিক অবস্থা এতটাই করুন ছিলো যে তার বাবা স্টোক করার পর হাসপাতালের খরচ বহন করতে না পারায় লাশ‌ও নিয়ে আসতে দিচ্ছিলো না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারপর‌ও মাহিন দল বাদ দেয়নি‌, একমনে শুধু দলের একজন ন্যায়নিষ্ঠ কর্মী হয়ে খেটেই গেছে। কিশোরগঞ্জে বর্তমান দলের প্রতিষ্ঠিত রুপ দানে মাহিনের অবদান অনস্বীকার্য, কোনমতেই প্রধান সেই কথা,সেই ত্যাগকে অস্বীকার করতে পারবে না।যদি করতো তবে অবশ্যই তা ন্যায়সঙ্গত হতো না।তবে মাহিন কিন্তু দলের জন্য খাটলেও কখনো পজিশন নিয়ে কোন বাতচিটে যায়নি।এটাও ছিলো তাকে এতবড় পজিশন দেওয়ার অন্যতম কারণ।

-আপনিও অনেক করেছেন,জেল খাটছেন, কিন্তু তার বিনিময়ে পেয়েছেন‌ও, পরপর দুইবার কামরাঙ্গীরচর থানা যুবলীগের সভাপতি হয়েছেন,তখন যথেষ্ট কামিয়েছেন এরপর‌ও হয়তো সৎ আর একনিষ্ঠ ভাবে লেগে থাকলে ভবিষ্যতে জেলা,জেলা থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির সভা হতে পারতেন কিন্তু কার পরামর্শে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন আপনি জানেন!"

"এমন কিছু নয়,তবে আমি দলের জন্য যা করেছি তার বিনিময়ে পাওয়ার ছিলো অনেক, কিন্তু পেলাম না কিছুই। তাছাড়াও দলে এখন অসৎ লোকে ভরে গেছে তাই নিজেকে একটু!"

" বুঝতে পেরেছি! সে যাই হোক আমি আপনার কেইস নিয়ে যতটা আগালাম আপনাকে জানালাম তবে আমার মনে হচ্ছে আপনি বড়সড় আকারে ফেঁসে যাচ্ছেন।"

"দেখা যাক কে কাকে ফাঁসায়!"

নিজের চুক্তিকৃত আইনজীবী তরিকুলের সাথে কথা শেষ করে ফোন কাটলো জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া।দল ছাড়ার কারণ অবশ্যই নিজের পছন্দের স্থান না পাওয়া। পরপর দুইবার কাউন্সিলর পদের জন্য নমিনেশন দেয়নি। তাইতো এবার দল পরিবর্তন করে একবারে সাংসদ পদের জন্য আবেদন করেছে, নতুন দলের সর্বোচ্চ সমর্থন আছে।আশা করা যায় এবার নতুন দলে নিজের জায়গা শক্ত করে চেপে ধরবে। আপনমনে স্বপ্ন বুনে চলেছে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া।

"স্যার দেখতেই পারছেন এটা সম্পূর্ণ সাজানো গুছানো পরিকল্পিত একটি হত্যাকাণ্ড, শুধুমাত্র নিজের প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার জন্যেই একজন মানুষ হত্যা করে ফেললো, আবার সরাসরি মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে জড়িত এরা যদি রাষ্ট্রের শাসনে আসে তবে বুঝতে পারছেন জনগনের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? যারা নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থে দলীয় লোকদের মেরে গুম করতে দুইবার ভাবে না তারা ঠিক কতটা ভয়ংকর, কতটা ক্ষতিকর জাতীর জন্য!

-স্যার আমি জোর আবেদন করছি আপনি এর যথার্থ ব্যবস্থা নিন, এবং আমার মক্কেল মুরাদকে বেকসুর খালাসের মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন।স্যার মুরাদের আম্মা সদ্য হসপিটাল থেকে ফিরেছে, ছেলের এহেন ঘটনায় বৃদ্ধা মা আবার‌ও গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে।মক্কেলের দলপতি ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার যথেষ্ট মানবিক এবং সাংগঠনিক ভাবে ভালো মানুষ উনি নিজের দলের লোকদের প্রতি সদা সদাচরণ এবং সচেষ্ট মানবিকতা দেখানোর প্রয়াসে থাকেন।তাই তিনি নিজ দায়িত্বে মুরাদের মামলার খরচ বহন করে আমাকে হায়ার করেছে।

-স্যার আমি জানি আপনিও একজন ভালো এবং সৎ মানুষ,সদা সত্যের পথেই থাকেন।আমি বিশ্বাস রাখবো আপনি আপনার জহুরী দৃষ্টি ভঙ্গি দিয়ে আমার মক্কেল মুরাদকে বেকসুর খালাসের মাধ্যমে এই বানোয়াট মামলা থেকে রেহাই দিবেন।"

আইনুল হক মুখোমুখি বসা চেয়ারের সামনে থেকে অনর্গল বলে গেলেন নিজের কথাগুলো।জজ এখনও তারাজের উপস্থাপন করা কাগজ, কিছু ছবি এবং ভিডিও রেকর্ড এর ফুটেজ দেখছেন মনোযোগ দিয়ে।

জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার নির্দেশেই ঐদিন ঐ ছেলে মুরাদের সামনেই মুরাদের হবু স্ত্রীকে নিয়ে কুমন্তব্য করে। উদ্দেশ্য ছিলো মুরাদকে ক্ষ্যাপানো।মুরাদ ক্ষেপলেও বাকবিতন্ডা বেশিদূর আগাবে না বুঝেই ঐ ছেলে সাইদের সাথেও উল্টো পাল্টা কথা বলে যার একপর্যায়ে সাইদ রেগে গিয়ে মার্ডারের হুমকি দেয়।যা চড়াও করে বলা হয় আশপাশের উপস্থিত মানুষদের সহ পুলিশকে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী ছেলেটাকে বেদরম পেটানো হয়েছে রড জাতীয় কিছু দিয়ে। সবচেয়ে ভয়ানক আঘাত করা হয় পুরুষাঙ্গে।একের পর এক আঘাত করে স্থানটি ছেঁচে দেয়। পুলিশি ধারনা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় এরকম আঘাত করার কোন যুক্তিগত কারণ নেই,হয়তো ব্যক্তিগত এবং সেটাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক চালে খেলার চেষ্টা করা হয়েছে। যেহেতু পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাই বলে।

 তারাজের ধারনা অনুযায়ী যেহেতু মুরাদ সাইদের সাথে গন্ডগোলের শুরু হয়েছিলো ইভটিজিং নিয়ে, অর্থাৎ মেয়েলি ব্যাপার তাই এভাবে আঘাত করা হয়েছে যাতে সবাই বুঝে মুরাদের হবু স্ত্রীকে ইভটিজিং করার কারণেই মুরাদ ও সাইদ মিলে এমন কাজ করেছে অথবা কাউকে দিয়ে করিয়েছে! 

তারাজের ধারনা মনে ধরলো,তাই এটাকে নোট করে রেখেছিলো আইনুল হক।ব্যারিস্টার মানুষের চিন্তা শক্তি প্রখর হয়। অনেক গবেষণা করেই এরা সিদ্ধান্ত উপনীত হয়। ঘটনা আসলেই তাই ঘটেছিলো।তারাজ ধারনা করলেও বিশ্বাস নিয়ে দোনামোনায় ছিলো,তাই নিজের লাগানো টিকটিকি দিয়ে আসল ঘটনা উৎঘাটন করে।

বিশেষ মিটিং আয়োজন করে তারাজ মুরাদের কেইস নিয়ে আলোচনা সারলো যেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং বিচারপতি আনজার খাঁ,কারা প্রধান আবুল কালাম এবং পিপি মহিদুল।আইনুল হক খুব‌ই সাহসী এবং নির্ভরযোগ্য তবুও তারাজ নিজেই তাড়া দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে মুরাদকে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কারন মুরাদ তার ডান হাত।মুরাদ তার জন্য জীবন দিতেও দ্বিধা করবে না। আর মাত্র চারদিন পরেই দলের মহাসমাবেশ তখন মুরাদের মতো লোকবল দরকার আছে। তাছাড়াও মুরাদের মায়ের অবস্থা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।

তারাজ কাজটা সারলো একরকম গা ডাকা দিয়ে,কারণ যত‌ই হোক যতক্ষনে মুরাদ বের না হচ্ছে ততক্ষন সে নিজেকে মুরাদের লোক বলে পরিচয় দিবে না। কোর্টে যাতায়াত থেকে উপস্থিত থেকে শুনানির কাজ সাড়ছে মুরাদের বড় বোন মুনিয়া আর হবু স্ত্রী প্রভা। তাছাড়াও আসামি পক্ষের লোক কেইসের প্রধান বিচারপতির সাথে এভাবে আলোচনা করছে দেখলে যে কেউ বলবে টাকার জোরে সত্যকে মিথ্যা বলে প্রমানিত করছে। অথচ এই দুনিয়ায় সবটাই হয় টাকার জোরে। এছাড়াও রয়েছে আরও এক সমস্যা,এলাকায় মুরাদ,সাইদ এবং অন্যান্য ছেলেদের ফাঁসির জন্য আন্দোলন হচ্ছে,সবাই কঠোর বিচার চাচ্ছে।

বাড়ি বয়ে এসে ইসহাক আবদুল্লাহকে অনুরোধ করছে গরীব ছেলেটার প্রতি ন্যায় বিচার করতে।যাতে নিজের দলের ছেলে বলে কোনভাবে ছেড়ে না দেয়।তার সাথে তো আছেই বিপরীত দলের উস্কানিমূলক কর্মকান্ড।এমনকি ইব্রাহিম তারাজকে একরকম হুমকি দিয়ে গেছে অপরাধীদের দলে রাখলে এমপির পদের আসা ছাড়তে। কোনভাবেই একজন মানুষের খুনীকে তারা এলাকায় রাখতে চায় না।

পরিস্থিতি কয়েক দিনেই ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে, মানুষ বিশ্বাস করেই নিয়েছে এই হত্যাকান্ডের মূল হোতা মুরাদ, সাইদ।

 এর চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাইদের মাদক ব্যবসার কথা।যা এলাকায় বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়েছে। নিঃসন্দেহে এটা ছড়ানো হয়েছে,তারাজের ক্লাবে মাদকের আখড়া! কথাগুলো শুনতেই পাবলিক তেলেবেগুনে জ্বলার ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো। একজন সাংসদ পদ প্রার্থীর ক্লাবে মাদকের অবাধ ব্যাবসা কোনমতেই সাধারন মানুষ মানতে পারছে না।তাও যদি হয় ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের মতো একজন সৎ মানুষের সন্তান,তার উপরে তারাজ নিজেও আইনের লোক! আইনের লোকের ঘরে এমন বেআইনি কাজ কেউ‌'ই মানতে পারে না।এটাই স্বাভাবিক! 

ঠিক এই কারণেই তারাজ সাইদের পক্ষে কোন উকিল হায়ার করেনি তাছাড়া তারাজ‌'ও চায় সাইদ একটা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হোক। কিন্তু মুরাদের ব্যাপারে ছাড় দিতে পারলো না, রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুতেই এমন ঝটকা তারাজকে আর‌ও সচেতন করে তুললো।যদিও তারাজ মানসিক এবং বাহ্যিকভাবে প্রস্তত।ভয় পাওয়ার প্রশ্ন‌ই উঠে না যেখানে জন্মের পর থেকে নিজের পিতাকে এই ময়দানে লড়াই করতে দেখে এসেছে, সুতরাং তার ভালো করেই জানা রাজনীতি মানেই জেল-পুলিশ। 

তারাজ নিজ থেকেই জজকে খুলে বললো সাইদের সাথে নিজের সমস্যা সম্পর্কে।যেটা আরও সহজ করে দিলো মুরাদকে ছাড়ানোর ব্যাপারে।তবে তারাজ অনুরোধ করছে অন্তত চারদিন মুরাদ হাজতবাস করুক।আর সাইদের ব্যাপারে তারাজ কিংবা তার দলের কোন মাথাব্যথা নেই। তারাও তাদের দলে কোন মাদক-কারবারি জায়গা রাখেনি।

তারাজ এই সিদ্ধান্তে এক ঢিলে দুই পাখি মারলো। পাবলিকের মাথা কিছুটা ঠান্ডা হবে সাথে সাইদের শাস্তির বন্দোবস্ত যা তার দলকে আরও গ্রহনযোগ্য করে তুলবে।বাকী র‌ইলো মার্ডার মামলার ঝামেলা তাতো প্রমান দিয়েই সমাধান করলো।এতে করে অন্য আসামিদের জামিন‌‌ও নিশ্চিত হয়ে গেছে।

চলবে?

তাড়াহুড়ো করে লেখার জন্য বানানে ভুল থাকতে পারে, দেখিয়ে দিলে শুধরে নিবো ইনশাআল্লাহ ❤️☺️


পর্ব ৭


"কামরাঙ্গীরচরে উন্নয়ন, ইব্রাহিম ভাইয়ের দুই নয়ন!"

"নেতা মোদের ইসহাক ভাই,তার মতো দরদি কেহো নাই!"

"চল চল দলে দলে ইব্রাহিম ভাইয়ের ছায়াতলে!"

"উন্নয়নের জোয়ার সবখানে,উৎযাপন হবে ময়দানে!"

"হ‌ই হ‌ই  র‌ই র‌ই , ইব্রাহিম ভাইয়ের মতো নেতা ক‌ই!"

নানারকম স্লোগানে মুখরিত হয়ে আছে কামরাঙ্গীরচরের পথঘাট। একেরপর মিছিল নিয়ে বের হচ্ছে বিভিন্ন সাংগঠনিক সংগঠন । আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা একেরপর এক মিছিল নিয়ে রোড শো করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দিকে। সরকারদলীয় মহাসমাবেশ উপলক্ষে ভাষন দিবেন প্রধানমন্ত্রী। কেন্দ্রীয় কার্যালয় হয়ে আবার এই মিছিল যাবে শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।সেখানেই হবে আজকের প্রধান অনুষ্ঠান।শ শ মানুষ একসাথে হেঁটে,ট্রাকে চড়ে,বাইকে করে অংশগ্রহণ করছে এই মিছিলে। 

তারাজের পক্ষে স্লোগান দিলেও মূলত মিছিল বের হয়েছে ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের নামে। যেহেতু তিনি আওয়ামীলীগের দলীয় সদস্য এবং তাদের নমিনিত কাউন্সিলর সেহেতু তিনি কামরাঙ্গীরচর থানা ৫৬ নং ওয়ার্ডের তরফ থেকে এক বিশাল মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই মিছিলের স্লোগানের প্রধান লেখক হচ্ছে মুরাদ।কাল সকালেই তাকে রেহাই দেওয়া হয়েছে।এসেই বন্ধুর জন্য নেমে পড়েছে। তারাজের ডান পাশে রয়েছে তার বাবা ইসহাক আবদুল্লাহ বাম পাশে আছে মুরাদ ঠিক পেছনে রয়েছে ফয়সাল।একের পর এক প্রশংসিত বাক্যের তালে এগিয়ে চলছে মিছিল।

এদিকে অন্যান্য সংগঠনের ছেলেরাও এক‌ই সাথে এক‌ই উদ্দামে এগিয়ে যাচ্ছে।সবাই নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে দলের হয়ে নিজের যোগ্যতা প্রকাশ করতে।

-------------------------------------------------

"মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ দুই দল।তাদের ঘাত প্রতিঘাতের আঘাতে জর্জরিত সাধারণ জনজীবন! গনতান্ত্রিক দেশে আদৌও কি গনতন্ত্র আছে? প্রশ্ন রেখে যায় সাধারণ জনগণ দেশীয় কর্তাদের নিকট!" - মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে সনিয়া আনজুম,সময় সংবাদ ।

টেলিভিশনের পর্দায় চলমান খবরে হালকা চোখ বুলিয়ে নিজের কেইডসের ফিতেটা শক্ত করে গিট দিলো তাজিশ।এইসব তারা জানা খবর।ঘরেই যখন এত নেতা তখন এগুলো অবগত থাকাই স্বাভাবিক কিন্তু তার শুধু জানার দরকার ছিলো রাস্তাঘাটে চলাচলের অবস্থা কেমন?খবর দেখে যা বুঝলো আপাতত যানজট কম সুতরাং কম সময়েই সে তার গন্তব্যে ছুটতে পারবে। কথাগুলো চিন্তার পাশাপাশি সেন্টার টেবিলের উপরে রাখা বাইকের চাবিটা বাম হাতে মুঠোবন্দী করে ডান হাতে চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে আয়েশ করে বসলো সোফায়। টেলিভিশনের পর্দায় চলমান খবর শেষ হয়ে ইতিমধ্যে সরকারদলীয় মহাসমাবেশের লাইভ সম্প্রচার শুরু হয়ে গেছে। মনোযোগ দিয়ে দৃষ্টি আবদ্ধ করে কর্ণপাত করলো,তার সাথে চুমুকে চুমুকে শেষ করলো চা নামক এক অতি জনপ্রিয় গরম পানীয়।

---------------------------------------------

"আমাদের দাবি না মানলে আমরা বাধ্য হবো কঠোর প্রতিবাদে যেতে; কোন ভাবেই আমরা এই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করবো না। আমাদের গনতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে, ফিরিয়ে দিতে হবে সাধারণ মানুষের ভোটার অধিকার; আপনারা কেউ কোনমতেই আপস করবেন না।মনে রাখবেন আপস করা মানেই হলো অন্যায়কে মেনে নেওয়া! সরকারদলীয় অন্যায়,দমন নিপীড়ন চালিয়ে যাওয়া ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা সাধারণ জনগনের প্রতিনিধি হিসেবে কখনোই তা মেনে নিবো না।এর জন্য যদি আমাদের কঠোর থেকে কঠোরতর আন্দোলনে যেতে হয় তো যাবো! জীবন দিয়ে হলেও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় করেই ছাড়বো। স্বৈরাচারদের স্বৈরাচারী কাজ আর বজায় রাখতে দিবো না" 

বিরোধীদলীয় নেতার এমন মহান বাক্য শুনে বিতলা হাসি দিলো তারাজ। সারাদিন মহাসমাবেশের ব্যবস্তায় কোনদিকে খবর নেওয়ার সুযোগ না পেলেও নিজের বিশ্বস্ত লোক পাঠিয়েছিলো বিপক্ষ দলের অনুষ্ঠানে।তাদের মুখোমুখি অবস্থানে ছিলো তাদের দমন নিপীড়ন বন্ধে প্রতিবাদ ও দলীয় সদস্যদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা সভা। সেখানে উপস্থিত থাকার অনুমতি ছিলো সর্ব পর্যায়ের মানুষের,ছিলো জনমত সংগ্রহের আয়োজন। তার মধ্যে ছিলো নানা জনমত। তাতে বেশ কিছু আজগুবি কথাবার্তা তারাজকে হাসির খোরাক জুগিয়েছে। মনে মনে বললো,

"স্বৈরাচারের প্রবর্তক স্বৈরাচার বন্ধের আহ্বান করে; বাহ্ বেশ কৌতুক করে তো লোকটা! অবশ্য বুড়ো হয়ে গেল এমন আবছাব অনেকেই বকে! যদিও দিনশেষে সব‌ এক‌ই জাতের খড় খাওয়া গরু! আপনার বক্তৃতা বেশ লাগলো,আমরাও অপেক্ষায় আছি আপনার কঠোর থেকে কঠোরতর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার।এরপ‌রই তো দেখা যাবে কে কতটা দৌড়াতে পারে!"

"বিরবির করে কি বলছো ভাই?"

নিজের সাথে বকবক করা অবস্থায় তাজিশের কথায় ভাবনার ছেদ ঘটায় তারাজ।এত রাতে নিজের ঘরে ছোট ভাইকে দেখে কিছুটা প্রশ্নাত্বক ভঙ্গিমায় তাকিয়ে থাকে।তাজিশ বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে হাত দুটো দুই দিকে রেখে নিজের ভারসাম্য বজায়ের জন্য কিছুটা ঝুঁকে বসে আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,

"সরি এত রাতে তোমাকে বিরক্ত করতে আসলাম কিন্তু.."

"ইটস্ ওখে,সরি বলার কিছু নেই, বিশেষ জরুরী ছাড়া যে তুমি আমাদের কাছে আসো না তা আমরা জানি; তাই এত ইসপিস না করে বলেই ফেলো!"

"না আম আসলে.. আমি বলছিলাম কেমন গেলো তোমাদের আজকের প্রোগ্রাম?"

"তুমি আমাদের প্রোগ্রাম নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছো! সিরিয়াসলি! দ্যাট মিনস সামথিং ইজ ফিসি ম্যান? ডোন্ট ফিল ওকোয়ার্ড ,প্লিজ টেল মি!" 

তাজিশ জানতো ভাইয়ের কাছে সে খোলা ব‌ই,তার মুখ দেখেই সে অনেক কিছু আন্দাজ করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা তার ভাইয়ের নজর সবসময় তার দিকে থাকে।যত‌ই মনে হোক সে ব্যস্ত সে ঠিকই তার পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল।এই যে রাত প্রায় আড়াইটা,বাড়ি ফিরেছে একটার‌ও পরে, অথচ এত রাতেও সে নিজের ছোট ভাইয়ের সমস্যা শোনায় বেশ মনোযোগী।এসেই খাবার খেতে খেতে মায়ের থেকে পুরো দিনের খবরাখবর নিয়েছে,বড় আপুর অফিসিয়াল তথ্য নিয়েছে, দুলাভাই কেমন করে নিজের ব্যাংকিং সেক্টরে উন্নতি করবে তা নিয়েও চিন্তাভাবনা করছে,ছোট ভাগিনার পড়াশোনা নিয়েও তার চিন্তার শেষ নেই।বয়সের তালিকায় সে মেজো হলেও কাজে সে সবার বড়,এমনকি বড় আপুর কাছেও সে বড় ভাইয়ের সম্মান পায়। নিজের চেয়ে সাত বছরের ছোট ভাইকেও বড় আপু ভাইয়া বলে সম্বোধন করে। অবশ্যই সেটা একান্ত তার যোগ্যতার ফসল,কর্মগুনে সে সবার কাছে সম্মানিত,স্নেহিত।বাবার ব্যাবসায়িক কাজে সরাসরি হাত না লাগালেও বুদ্ধি পরামর্শ, খোঁজখবর নিয়েও যথেষ্ট সাহায্য করে।

তাজিশ নিজের গলায় কথা আটকে যাচ্ছে অনুভব করে হালকা শুকনো কাশি দিলো, তারাজের দৃষ্টি আর‌ও তীক্ষ্ণ হলো,ভাইয়ের জহুরী দৃষ্টিতে দৃষ্টি পড়তেই হঠাৎ করেই লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেল।তারাজ চোখ ছোট ছোট করে তাজিশের দিকে তাকালো, বিছানার দিকে মুখ করে রাখা আরামদায়ক একাকী উৎযাপন করা সোফায় বসে পায়ের উপর পা তুলে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো,

"আই থিংক ইউ ফলড ইন লাভ! এ্যাম আই রাইট?"

চমকে উঠলো তাজিশ,বড় বড় চোখ তাকালো তারাজের দিকে! মনে মনে আওড়ালো,"কিভাবে বুঝলে ভাই?" তাজিশের মুখভঙ্গি দেখে হঠাৎ করেই শব্দ করে হেসে উঠলো তারাজ,গা দুলিয়ে রুম কাঁপানো হাসিতে পড়ে যাওয়ার অবস্থা।গা ডুবানো সোফায় বসেও নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে চাপ খাচ্ছে, পেছনে হিলে মা পেছনে ঝুলিয়ে নিজের হাসিকে নিয়ন্ত্রণে নিলো।তাজিশ কাচুমাচু মুখে এখনও নিম্নমুখী হয়ে বসে আছে।তারাজ নিজেকে ধাতস্থ করে তাজিশের চোখে চোখ রেখে বললো,

"তুই কি ভাবছিস আমি বুঝবো না? আরেহ আমি কেনো; যেকোন মানুষ‌ই বলতে পারবে তুই প্রেমে পড়ছিস! আর এটার জন্য অবশ্যই কাউকে বেশি কষ্ট করতে হবে না!"

বড় ভাইয়ের এহেন কৌতুকে তাজিশ লজ্জা ব‌ই কিছু্ই পাচ্ছে না,তার মুখে কি লেখা আছে সে প্রেমে পড়েছে! নয়তো,তবে সবাই কিভাবে বুঝবে? ভাই না হয় তার চোখ পড়তে পারে তাই বলে কি সবাই? তাজিশের প্রশ্নের উত্তর তারাজ নিজ থেকেই দিয়ে দিলো,

 "তুই যেভাবে মেয়েদের মতো লজ্জায় নেতিয়ে যাচ্ছিস,তাতেই সবটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে তুই ফেঁসে গেছিস!"

"এমন কিছু না ভাই, খালি একটু...!"

"আচ্ছা বল কে সেই পুতুলটা,যে আমার আলাভোলা ভাইটাকে ফাঁসিয়ে ছাড়লো?"

"না মানে আসলে তুমি যা ভাবছো তেমনটা নয়,আসলে.!"

"আসলে নকলে বাদ, সঠিক কাটকাট উত্তর চাই!মেয়ের বাড়ি কোথায়? কি করে? সবটা একসাথে চাই!"

"উমম; আচ্ছা তুমি ঘুমাও, আমি পরে আসবো! ওখে গুড নাইট!"

"ওয়েট!"

তাজিশ না বলতে আসলেও বড় ভাইয়ের কাছে নিজেকে বেশরম জাহির করতে পারবে না বলেই না বলেই উঠে যাচ্ছিলো,তারাজ গদি ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে হুট করেই তাজিশের হাত চেপে ধরলো, শক্ত করে কব্জি ধরে নিজের সামনে বসিয়ে মুখোমুখি হয়ে চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলো,

"মেয়েটা কে?"

"আসলে আমি জানিনা তার‌ও আমার প্রতি সেইম ফিলিংস আছে কিনা তাই বলতে চাচ্ছি না!"

"তোমার তার প্রতি ফিলিংস আছে তো?"

"ঠিক কি বলবো বুঝতেছি না! শুধু জানি কাজের সূত্রে পরিচয় তার পর থেকেই কেমন একটা অনুভুতি হচ্ছে!"

"কতবার মিট করেছো?"

"মোট তিনবার!"

"তিনবার‌ই কাজের সূত্রে?"

"হুম!"

"তাতেই মনে হচ্ছে তার প্রতি তুমি দুর্বল হয়ে পড়েছো?"

তাজিশ উত্তর প্রদান করলো না,কেবল মাথা নুইয়ে নিলো।তারাজ বুঝলো ভাইয়ের মনের কথা। কিন্তু তারপরও শোনার আগ্রহে আবারও শুধালো,

" কিছু বলো?"

"আমি ঠিক বুঝতে পারছি না এটাকে কি বলে? লাভ অর আ্যাফেকশন?"

"লাভ যেখানে থাকবে আ্যাফেকশন সেখানেই থাকবে! দুটোর একটাতেও যদি ঘাটতি থাকে তবে সেটা পরিপূর্ণ নয়! একটা সুন্দর সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা,ভালোলাগা,মোহ, আকাঙ্ক্ষা সব থাকবে।একটার‌ও যদি অভাব থাকে তবে সেই সম্পর্কে ভাঙ্গন নিশ্চিত! সুতরাং তুমি আগে বুঝো, ভালো করে নিজেকে শুধাও কি হচ্ছে? কি চাচ্ছো? মাত্র তিনবারের সাক্ষাতে কখনোই লাভ হতে পারে না,এটা আপাতত তোমার মোহ!তুমি এক কাজ করো তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ রাখো! দেখো কি হয়! তার প্রতি অনুভূতিগুলো ঠিক কতটা প্রখর হয়,  

যখন মনে হবে তাকে ছাড়া নিজেকে শূন্য মনে হচ্ছে তখন ভাববে ভালোবাসা জন্মেছে।আর এই ভালোবাসা থেকেই তাকে পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হবে,তার ছোট ছোট বিষয়গুলো,অতি অপছন্দের বস্তুগুলো ভালোলাগায় মিশে যাবে।এই যে মোহ থেকেই ভালোবাসা সৃষ্টি হলো এটাই হবে একটি পরিপূর্ণ সম্পর্ক! অর্থাৎ মোহ এবং লাভ মিক্সড হয়ে একটা সুন্দর সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি হবে।"

"কিন্তু ভাই..!"

"এখন যাও,যা বলেছি তাই করো! তুমি নিশ্চয়ই টিএন‌এজ ন‌ও, আশাকরি ভুলভাল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের বয়সের এবং ব্যক্তিত্বের প্রতি অবিচার করবে না!"

"জ্বী!"

"গুড নাইট ভাই!"

"হ্যাভ আ্যা সুইট ড্রিম!"

তারাজ ভাইয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে র‌ইলো কিছু সময়,ভাইকে বুঝ দিলেও নিজেই নিজের প্রতি বিরক্ত হলো।এত শত কাজের চাপেও সেই এক পলক দেখা রমনীকে ভুলতে পারছে না।তার ভাই তিনবার সাক্ষাৎ করেও বুঝতে পারছে না অথচ তার এক নজর দেখাতেই মনে হচ্ছে সম্ভব নয় তাকে বিনা বাঁচা।কি আশ্চর্য এখন কি এই বয়স আছে? তার বয়সী অনেক পুরুষ দুই বাচ্চার বাবা।বাবা মায়ের দায়িত্বহীনতার কারণে সে এখন‌ও সিঙ্গেল তাই বলে কি তাকে এমন নাদানিপনায় মানায়! বেশ কয়েকবার কোর্ট চত্ত্বরে খুঁজেছে,পায়নি। বুঝতে পারছে না ঐ শ্যামাবতী কি আদৌও এই কোর্টেই প্র্যাক্টিস করে নাকি অন্য কোন কোর্টে? কিভাবে খুঁজবে! কথাটা ভাবতেই তারাজের হুট করেই মনে হলো, "অবশ্যই আইনজীবী তালিকায় তার নাম থাকবে, খুঁজতে হবে; খুবই যত্ন দিয়ে খুঁজতে হবে।ঠিক খড়ের থেকে সুই খোঁজার মতোই খুঁজতে হবে।"

---------------------------------------------

"কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বিরোধীদলীয় দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব সানোয়ার উল্লাহ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা নসীব মিয়ানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ! অভিযোগ করা হচ্ছে নির্বাচনের সময় নাশকতার আশঙ্কায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান সহ আরও চারটি বিভিন্ন স্থানে নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ।যদিও বিরোধীদলীয় অন্যান্য নেতাকর্মীদের দাবী বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানি ও হিংসার বশিভুত হয়েই এহেন হীন খেলায় মেতে উঠেছে সরকারদলীয় নেতা কর্মীরা। নিশ্চয়ই সাধারন জনগন এর প্রতিবাদ করবে।" - পল্টন থানার সামনে থেকে আমি জাবের বলছি,এটিএন নিউজ।"

"আচ্ছা জাবের ধন্যবাদ আপনাকে,আমি আবারও ফিরে আসছি আপনার কাছে ততক্ষণে আমি একটু কথা বলতে চাই এই মুহূর্তে বিরোধীদলীয় কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত আমাদের প্রতিনিধি মাইশার সাথে,আমরা চলে যাচ্ছি সরাসরি মাঈশার কাছে,হ্যা হ্যালো মাঈশা; আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?"

"হ্যা,হ্যালো! হ্যালো শুনতে পাচ্ছেন? রাঈদ শুনতে পাচ্ছেন! হ্যা..হ্যালো আমি মাঈশা বলছিলাম সরাসরি বিরোধীদলীয় প্রধান কার্যালয়ের সামনে থেকে,হ্যালো শোনা যাচ্ছে!"

"হ্যা মাঈশা আপনি বলুন আমরা শুনতে পাচ্ছি! আমরা জানতে চাচ্ছি কি অবস্থা এখন প্রধান কার্যালয়ের সামনে এবং নেতাকর্মীদের মাঝে কি নিয়ে এখন আলোচনা চলছে? দলের প্রধান দুই মাথা আপাতত পুলিশি হেফাজতে আছেন এই অবস্থায় দলের আগামী কার্যক্রম কিভাবে কি হবে? সেই বিষয়ে কতটুকু জানতে পেরেছেন বা চেষ্টা করে সফল হয়েছেন তা আমাদের একটু জানান!"

"জ্বী রাঈদ আমি সেটাই বলছিলাম, আপনি ইতিমধ্যেই অবগত আছেন আজ সকাল সাড়ে আটটার সময় চলমান মিটিং থেকে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেছে মহাজোটের অন্যতম প্রধান কর্মী,দলীয় প্রধান মহাসচিব সানোয়ার উল্লাহ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলান নসীব মিয়ানকে। তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো হচ্ছে তারা গতকাল তাদের সভায় উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন যেটাতে উগ্রবাদীরা সাহস পেয়ে গেছে, তাছাড়া‌ও আর‌ও বেশ কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম অভিযোগটি হচ্ছে তারা আগামী নির্বাচনে দেশে সহিংসতা চালানোর জন্য গোপন বৈঠকে নিষিদ্ধ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে যদিও সবকটা অভিযোগ বানোয়াট, মিথ্যা, ভিত্তিহীন বলে দাবি বিরোধীদলীয় নেতা কর্মীদের।.."

"হ্যা মাঈশা এই অবধি খবর আমরা পেয়েছি, আপনার কাছে আমাদের প্রশ্ন ছিলো এখন কি অবস্থা,কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের আনাগোনা কেমন এবং তাদের পরবর্তী পরিকল্পনা কি? তারা কি আদৌও নিজেদের জেষ্ঠ নেতাদের জন্য পরবর্তী কোন কর্মসূচি পরিকল্পনা করেছে কি-না?"

"হ্যা রাঈদ আমি তাই বলছিলাম, গ্রেপ্তার করার ঘন্টা খানিকের মধ্যেই সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সরব হয়ে উঠছে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তা, তৃনমুল থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন সাংগঠনিক প্রধানরা এসে উপস্থিত হচ্ছে। এবং তাদের পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে আরও কিছু সময় বাদে জানা যাবে বলে আমাদের নিশ্চিত করেছেন হয়তো সহ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নকিবুল্লাহ খান আসলেই শোনা যাবে।যদিও কানা-ঘুষোতে অনেকটা তথ্য পাওয়া গেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো সম্ভবত গতকাল থেকে টানা অবরোধ চলবে যতদিন না গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের ছাড়া হচ্ছে!...

"আচ্ছা মাঈশা আপনার কথা অনুযায়ী আমরা বুঝতে পারলাম পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে তারা হরতাল কিংবা অবরোধ দিয়ে শুরু করতে পারে,আমরা আশাবাদী আপনি আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এভাবেই আমাদের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের মাঝে শেয়ার করবেন, ধন্যবাদ আমি এখন চলে যাচ্ছি পল্টন থানার সামনে জাবেরের কাছে, জাবের আপনার কাছে আপাতত আর নতুন কি খবর আছে?"

"নির্বাচনের সময় সাধারণ মানুষ কোনরকম সহিংসতা চাইছে না। তাছাড়াও....

টেলিভিশনের পর্দায় আজকের গরম দেখতে দেখতে চা পর্ব শেষ করলো তারাজ এবং তার বাবা ইসহাক আবদুল্লাহ।তাজিশ আর‌ও আগেই বের হয়েছে।পাশ থেকে ইয়ামিনা বলে উঠলো,

"হরতালের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির আরেকটা পায়তারা! সাধারণ মানুষের ভালো করতে গিয়ে আর‌ও সর্বনাশ!"

" পলিটিক্যাল ফ্যামিলির মানুষের থেকে এমন মন্তব্য যথোচিত নয় বুবুন!"

"মানছি আমি পলিটিক্যাল ফ্যামিলির তাই বলে যা সত্য তা তো এড়িয়ে যেতে পারি না। রাজনীতির এই চ্যাপ্টারটা আমার বরাবরই অপছন্দের!"

"তোমার পছন্দ দিয়ে তো আর দেশ চলবে না আম্মা! রাজনীতির প্রতিটি অধ্যায়ে থাকবে এমন কলহ/হানাহানি,অবরোধ/হরতাল/মারমুখী আচরণ, জেল/হাজত,থানা/পুলিশ! বিশেষ করে বর্তমান কালীন রাজনীতিতে সংযুক্ত থাকতে গেলে এসবে অভ্যস্ত হতে হবে। এগুলো এড়িয়ে তুমি রাজনীতির ময়দানে থাকতে পারবে না আম্মা!"

"আমার থাকার ইচ্ছেও নেই, তুমি এবং তোমার ভবিষ্যৎ কর্ণধার মিস্টার ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার ভাই থাকলেই চলবে। আমি বাবা শান্তি প্রিয় মানুষ শান্তিতে থাকতে পারলেই খুশি!"

"আল্লাহ তোমাকে সবসময় সুখী শান্তিতে রাখুক!"

"আমীন!"

বাবার কথায় তারাজ পাশ থেকে আমীন বলে বোনের দিকে হাসি মুখে তাকালো।

----

হরতাল,হরতাল হরতাল!


পর্ব ৮


"কি অবস্থা মিস্টার ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার ভাই?"

"যেমন'টা শোনার আশায় আপনি ফোন করেননি ঠিক তেমন'টাই আছে, আলহামদুলিল্লাহ!"

"তোমার সবসময় কেন মনে হয় আমি তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী ন‌ই?"

"কারন'টা স্পষ্ট নয় কি?"

"ঠিক কেমন'টা বলে তোমার ইঙ্গিত?"

"এক‌ই চরিত্রের দু'জন মানুষ কখনো একে অপরকে পছন্দ করে না,আর যাই হোক বাঘ কখনো চাইবে না জঙ্গলে তার চেয়েও শক্তিশালী কেউ থাকুক!"

"তুমি কি নিজেকে অতি শক্তিশালী বলে দাবি করছো?"

"আপনি বাঘ হলে না হয়!"

"তোমার ত্যাজ কিন্তু বিপদে ফেলতে সময় নিবে না।"

"বিপদ কাঁধে নিয়েই চলি,ভুলে যান কেন আমি রাজনৈতিক নেতার আগে ব্যারিস্টার ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার!"

"হ্যা,ব্যারিস্টার ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ নাম হাঁকিয়েছেন,বেশ কয়েকজন বড় বড় ক্লাইন্টের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে, আশাকরি তা ভবিষ্যতে আপনার ক্যারিয়ারের জন্য আর‌ও উত্তম সূযোগ এনে দিবে কিন্তু আইনের ধারা আর রাজনীতির পাঠ এক নয় এটাও আপনার মস্তিষ্কে গেঁথে রাখতে হবে। নয়তো.!"

"রাজনীতির নীতি গড়ে আইনের ধারায়,নীতি ভাঙ্গেও আইনের ধারায় তাই দেখি কি হয় ভবিষ্যতে!তবে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী হ‌ওয়ার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাচ্ছি!"

"বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তোমার কি মতামত? কি মনে হচ্ছে কিভাবে সামাল দিবে? বেশ তো প্রধানের সাথে দহরমমহরম ভাব জমিয়েছো!"

"প্রধানের সাথে কেমন ভাব জমলো সেটা একান্তই আমার আর তার ব্যাপার-স্যাপার, সেখানে তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ না করাই উত্তম নয় কি?"

"দ্যাখো ইব্রাহিম আমার তোমার সাথে দ্বন্দ্ব নেই,আমিও চাই না ভবিষ্যতে হোক, যেহেতু এক‌ই ছত্র ছায়ায় আছি,এক‌ই আদর্শে বিশ্বাসী সেহেতু আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হ‌ওয়াটাই বেটার নয় কি?"

দুরবার্তার অপরপাশে থাকা সরকারদলীয় মন্ত্রী মনজুরুল ইসলাম তৈয়বের কথার প্রত্ততরে তারাজ শুধু তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো যা অগোচরেই থেকে গেল তৈয়বের।সহজ ভাষায় নমিনেশন পাওয়ার কথা বলায় তৈয়ব সাহেব ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছিলো আপাতত পানিও গরম হয় মোটা অংকের তাপে, সেখানে ফ্রিতে নমিনেশন চাওয়াটা নেহায়েত বোকামি ব‌ই অন্য কিছু নয়। অথচ দল থেকে নমিনেশন পাওয়ার জন্য মাত্র কিছু হলেই চলে।তারাজ জানতো নিশ্চিন্তে নমিনেশন পাওয়ার জন্য তাকে মোটা অঙ্কের সংখ্যা ঝাড়তে হবে, সেটা'যে এত বড় দাবী করবে তাও কিনা বহুদিনের দলীয় কর্মীর সন্তানের থেকে তা ক্ষুনাক্ষরেও আন্দাজ ছিলো না। তাছাড়াও মনজুরুল ইসলাম তৈয়ব ব্যক্তিগত জীবন যাপনের কারণেও তাকে তারাজের মনে ধরে না।টাকার  নেশার চেয়েও বড় নেশায় আসক্ত এই বুড়ো ভাম,যাকে বলে নারী নেশা।নাতির বয়সী মেয়েদের নিয়ে রোজ রাতে রংমহলে রঙ তামাশায় মেতে উঠে।অথচ ঐ বয়সী তার নিজের‌ই দু'টো নাতী আছে। 

ছাত্র রাজনীতির অধ্যায়ে ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের সরলতার সুযোগ নিয়ে দল থেকে সুযোগ দেওয়ার পরেও এই মনজুরুল ইসলাম তৈয়বের অতি চালাকির কারণে বড় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারকে।দলের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর নিজস্ব লোকের প্রতি অন্ধের মত বিশ্বাস ভরসা ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের দৃষ্টি সবসময় নত করেই রেখেছিল।যার কারণে দেখেও দেখতে পারেনি অনেক কিছু, কিংবা বলা যায় অতিভক্তির কারণেই এড়িয়ে গেছে তার প্রতি হ‌ওয়া অন্যায়গুলো। এখনও সে সবাইকে ভাই ভাই করেই জীবন কাটিয়ে দেওয়ার পক্ষে, কোনভাবেই ক্ষমতা কিংবা পদের জন্য দলের বিরুদ্ধে যাবে না,বলবে না কথা তার প্রতি হ‌ওয়া অন্যায়ের।দিবে না জবাব তার ক্ষেত্রে ঘটা অবহেলার।

তারাজ নিজের বাবার এহেন নির্লিপ্ততায় এককালে গর্ব বোধ করলেও এখন বেশ বিরক্ত।কোন মতেই সে মানতে পারে না। যদি সময় মতো ইসহাক আবদুল্লাহ নিজস্ব অধিকার,স্থান বুঝে নিতো তাহলে আজ মন্ত্রিসভার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তিনিও থাকতো। কিন্তু না। বরাবরই অল্পতেই সন্তোষ প্রকাশ করেছে যার কারণে আজ অবধি কেবল কাউন্সিলর হিসেবেই লড়াই করে গেছে এবং এখন‌ও সেখানেই আটকে আছে।তবে তারাজ বাবার নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। সংসদ সদস্য থেকে মন্ত্রী সভা; সবখানেই সে নিজের বিচরণ ঘটাবে কে জানে কখনো সময় এলে ঐ পদের সবচেয়ে বড় পদটিও একদিন...

"আপনি আমার বাবার বন্ধু,এক হিসেবে বড় ভাই! সে মতে বড়জোড় আপনি আমার চাচার পদটা পেতে পারেন, আমার বাবা আবার আপনার প্রতি অন্ধ বিশ্বাসী,এই সম্মানিত পদটা আপনাকে দেওয়া হয়েছে শুনলে বেশ খুশি‌ই হবে।তাই আমিও ভাবছি বাবাকেই খুশি‌ করি। বন্ধুত্বটা আপনার আমার সাথে ঠিক যাচ্ছে না,আর আমরা বন্ধু না হ‌ওয়াই অতি উত্তম! কারণ আমি চাই না ভবিষ্যতে বন্ধুত্বের মর্যাদা নিয়ে আর কোন সমালোচনার ঝড় উঠুক।"

"তুমি বেশ কঠোর! এতটাও কঠোর যেন ঘরের রমনীর প্রতি হ‌ইয়ো না; শেষে আবার বিরক্ত হয়ে মাঝ রাতে পিরিতের মাঝেই বুকে ছুরি চালিয়ে দেয়!"

"ভাতিজার ব‌উ আর ভাতিজার রোমান্সেকর মুহূর্তে কি করবে তা নিয়ে আপনি কল্পনায় না ভাসলেই চলবে,আপনি নিজের গদি কিভাবে কি সামলাবেন তা নিয়ে ভাবেন, অনেক নতুন তরুণ প্রার্থী নমিনেশনের জন্য আবেদন করেছে বলা তো যায় না পরবর্তী প্রশাসন মন্ত্রী সেখান থেকেই কেউ হয়তো হয়ে গেছে !"

"স্বাগতম ,তয় কি বলো তো পুরানো চালে ভাতে বাড়ে বলেও একটা প্রবাদ রয়েছে.!"

"অতি পুরানো চালে পোকার আনাগোনা‌ও বেশি থাকে,তখন ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।"

"তুমি ব্যারিস্টার মানুষ,যুক্তি তর্কে পাড়া দায় তবে আমি কিন্তু আসলেই অপেক্ষায় র‌ইলাম নতুন পুরাতন লড়াইয়ের জন্য, আশাকরি তুমি‌ও অংশগ্রহণ করবে এই প্রতিযোগীতায়!"

"ইনশাআল্লাহ, শুধু লড়াই‌ই না ,জয়ী হয়েই প্রমান করবো কিছু পুরাতন কেবল সংখ্যাই বৃদ্ধি করে,আদৌও তে তা দিয়ে কোন কাজ হয় না।"

"দেখা যাবে ময়দানে! ভালো থেকো,আর হ্যা পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে খুব শীঘ্রই মিটিং ডাকা হচ্ছে, লড়াইটা আমাদের মাঝেই থাকুক, সেখানে যেন তৃতীয় পক্ষের কোন সুযোগ না থাকে!"

"নিঃসন্দেহে বিশ্বাস রাখতে পারেন,আমি আর যাই হ‌ই আপনার পিরিতের ভূঁইয়া ন‌ই,আমি ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার, ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের রক্ত! বিশ্বাস,ভরসা আমার শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয়।"

"দেখা যাক রক্ত কতটা কথা বলে!"

[ইব্রাহিম ও মনজুরুল আর‌ও কিছু রাজনৈতিক আলাপ সারলো,যা আপনাদের আপাতত না শুনলেও চলবে!]

-------------------------------------------------

ঢাকা-২ আসনটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নং ওয়ার্ড, ঢাকা মেট্রোপলিটন কামরাঙ্গীরচর ও হাজারীবাগ থানার সাবেক সুলতানগঞ্জ ইউনিয়ন, সাভার উপজেলার আমিনবাজার ইউনিয়ন, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন ও ভাকুর্তা ইউনিয়ন, কেরানিগঞ্জ উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন (হযরতপুর, কলাতিয়া, তারানগর, শাক্তা, রোহিতপুর, বাস্তা, কালিন্দী, এবং আগানগর ইউনিয়ন) নিয়ে গঠিত।

"এই আসনের কর্তা ব্যক্তিরা হলেন বর্তমান সরকার দলীয় নির্বাচিত সাংসদ।গত পনেরো বছর ধরেই সরকারদলীয় নির্বাচিত সাংসদ‌ই ছিলেন এই অঞ্চলের অভিভাবক তূল্য। আগাম নির্বাচনে কে হয় তাই এখন দেখার বিষয়।"

--------------------

ইন্ডিপেনডেন চ্যানেলে জনমত নামে নির্বাচন ভিত্তিক একটি অনুষ্ঠানের রিপোর্টারের কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো তারাজ।এর মধ্যেই ফোন এলো তার অধীনস্থ সাব্বিরের। টেলিভিশনের শব্দ কম করে, নিজের ফোনটা রিসিভ করে,

"আসসালামু আলাইকুম সাব্বির, বলো খবর কতটুকু?"

"ওয়ালাইকুম আসসালাম স্যার,স্যার ম্যামের যথেষ্ট তথ্য পেয়েছি,আমি কি হার্ড ফাইল করে দিবো না এমনিতেই পিডিএফ করে পাঠিয়ে দিবো?"

"সাব্বির এটা ব্যক্তিগত তথ্য,ব্যক্তিগত‌'ই রাখো।তবে হ্যা আগে বলো বাগান কি মালীবিহীন নাকি আগেই কেউ নিয়মিত পরিচর্যা করে যাচ্ছে?"

"স্যার মালীবিহীন, আপাতত পরিচর্যার কাজ তার জন্ম সূত্রে অভিভাবকরাই করেছেন কিন্তু স্যার!"

"আঁটকে গেলে কেন?ক্লিয়ার করো কন্ঠনালী!"

"স্যার আমি পিডিএফ ফাইল দিচ্ছি, আমার সাদ্যমতে যথেষ্ট চেষ্টা করে আমি এই অবধি তথ্য যোগাড় করতে পেরেছি।আমি চাচ্ছি আপনি নিজেই সবটা দেখুন!"

"এনিথিং সিরিয়াস? ওখে তুমি পাঠাও,আমি নিজেই দেখছি! আর হ্যা; থ্যাংকস ফর ইউর হার্ড ওয়ার্ক!"

"ওয়েলকাম স্যার, আপনার জন্য সবসময়ই!

"আল্লাহ হাফেজ, সাবধানে থেকো!"

টুং... শব্দে নিজের ফোনের দিকে নজর ফেললো,আসা ফাইলটির নোটিশের উপরে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিতেই খুলে গেল বায়ো অফ আফনূর রেজওয়ান শিকদার নামে একটি পিডিএফ ফাইল।

প্রথম পাতার কয়েক লাইন বেশ লাগলো, কিন্তু পিতার নামের বিস্তারিত ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে খানিকটা থমকালো‌। আফনূর নামক রমনীর পাসপোর্ট আকারের ছবিটার দিকে বেশ গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করলো। রমনী এখনও উড়ন্ত রঙিন প্রজাপতি,মালী বিহীন বাগানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গোলাপ।যাকে ছুঁতে গেলেই ক্ষত হতে হবেই।তারাজ হাসলো, বিরবির করে নিজেই নিজেকে বললো,"ভেবেছিলাম তুমি ভোরের স্নিগ্ধ শিশিরের ন্যায় শীতল,বরষার আলিঙ্গনে আলতো ভেজা বেলী, কাঠগোলাপের ন্যায় বিলাসী, কিন্তু তুমি তো সবাইকে ছাপিয়ে কাটাযুক্ত গোলাপ হয়ে গেলে মেয়ে!এত কাটা কেন তোমাকে ছোঁয়া অবদি! তোমাকে ছুঁতে যেতে কেন‌ই বা আমাকে ক্ষতবিক্ষত হতে হবে? কেন তুমি আমার কাছে অসাধ্যির ন্যায় আছড়ে পড়লে! তবে চিন্তা নিয়ো না মেয়ে,এই তারাজের চোখে যখন পড়েছো, মনে যখন তোমাকে জায়গা দিয়েছি তখন তুমিই কেবল তারাজের হৃদ জান্নাতের বাগান বিলাস হবে!আমার সবটা দিয়ে তোমাকে পবিত্রতায় ছেয়ে দিবো,কোথাও বিন্দুমাত্র নোংরার ছোয়া থাকতে দিবো না প্রমিজ টু ইউ। তোমাকে পেতে যদি রক্তের সাগর পাড়ি দিতে হয় তবে তাই দিবো,তবুও তোমাকে আমার চাই!চাই মানে চাই! তুমি না চাইলেও চাই!বি গেট রেডি ফর দি নেক্সট জার্ণি উইথ মি ইন আওয়ার লাইফ!"

----------------------- 

তিনদিন পর...... 

কোর্ট চত্ত্বরে ভীড় জমিয়ে সার্কাস দেখার মতোই উপভোগ করছে এক নারীর বিধ্বংসী রুপ।অবিচল এই নারী নির্দ্বিধায় একজন সুঠামদেহী পুরুষকে জুতা পেটা করে যাচ্ছে! 

সিএমএমএইচ এর বিল্ডিংয়ের পাঁচ তলার বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে নিজের এক গ্রাহকের সাথে জরুরি আলোচনা সারছিলো তারাজ।হ‌ইচ‌ইয়ের শব্দ শুনে বারবার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিলো। বিরক্তিতে চ বর্গীয় শব্দ তুলে ভ্রু কুঁচকে তাকালো নিচের দিকে,ঘটনা কি তা স্পষ্ট বোঝা না গেলেও,শোরগোলের উচ্চ মাত্রায় অনুভব হচ্ছে বিশাল কিছু।উপর থেকে এক গাদা পুরুষের মাঝে 

একজন নারীকে দেখা যাচ্ছে যার কান্ড দেখে তারাজ নিজেও হতভম্ব বনে গেলো। কিন্তু আরও বেশি আশ্চর্য হচ্ছেন এই দেখে যে একজন নারী একজন পুরুষকে এভাবে পেটাচ্ছে আর এত এত পুরুষ দাঁড়িয়ে দেখছে এর চেয়েও বেশি ভয়ানক লাগছে পুলিশের নীরবতা দেখে। আশেপাশে কোথাও কি পুলিশ নেই? কথাটা ভাবতেই দেখলো একজন পুলিশ দৌড়ে আসছে,তার পিছু পিছু অবশ্য আরও বেশ কয়েকজন আছেন। তারাজ খুব মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো, নারীটি পুলিশের সদস্যের সাথে কথা বলছে, তখনও এক হাত দিয়ে ঐ লোকটার কলারের অংশ চেপে ধরে আছে। পুলিশের অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে তারা নারীটিকে কিছু বোঝানো চেষ্টায় আছে কিন্তু সে বুঝতেই চাইছে না।আগ্রহ জাগলো বিষয়টি সামনে থেকে দেখার।তাই গ্রাহককে সাথে নিয়ে লিফটের সামনে গিয়ে লম্বা লাইন দেখে হেঁটেই নামার প্রস্তাব রাখলো। ভদ্রলোক রাজী হলেন, দু'জনেই একরকম দৌড়েই নামলো।

ঘটনাস্থল এসে দেখলো সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে এবং এত সময়ের ব্যস্ত স্থান এখন অনেকটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, তারাজ বিরক্ত হলো নিজের প্রতি।কি দরকার ছিলো এমন বাচ্চামোর! নিজের কাজে নিজেই বিরক্ত হয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই চোখ আটকালো জুতোপেটায় মাস্টার্স সম্পন্ন রমনীর দিকে। একপাশ দেখা যাচ্ছে,তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে একজন পুরুষ,সেও আইনের লোগো সম্বলিত।তবে এই নারীকেই দেখে মনেই হচ্ছে না এই মহিলা কিছু সময় আগেই এত বড় একটা কান্ড ঘটিয়ে উদ্ধার করেছে জাতিকে! কৌতুহল আবার জেগে উঠলো, দুই কদম এগিয়ে গিয়ে থমকে গেছে।

মনে হলো চেনা চেনা।হ্যা চিনতে পেরেছে।আজ সে পানি ফিরোজা রঙের একরঙা একটা সুতি শাড়ী পড়ে এসেছে তার উপরে আছে কালো লেডিস কোর্ট।উপরে আজকেও ম্যাচিং হিজাব,চোখে সেই একই ভাবে লেপা কাজল।বাকী মুখটা হিজাবে আবৃত হয়ে আছে। তবুও চিনতে কষ্ট হলো না।এই চোখ দেখে সে কোটি মানুষের মাঝে থেকেও খুঁজে বের করতে পারবে‌।আগালো না, শুধু দূরে থেকে দেখেই গেল।

------------------

২৫ দিন পর......

"ভোট চাই ভোটারের দোয়া চাই সকলের!"

"ইব্রাহিম ভাইকে দিবেন ভোট, থাকবেন সবাই একজোট!"

"রাজ পথের রাজ, তার নাম ইব্রাহিম তারাজ!"

"আসসালামু আলাইকুম চাচা,ভালো আছেন?"

"হয় বাবা আলহামদুলিল্লাহ, আপনে?"

" আপনে ক্যান ক‌ইতাছেন?আমি আপনার পোলা মতোই! আমারে তুমি ক‌‌ইরা ডাকবেন!"

"আইচ্ছা বাবা!"

"তো চাচা আপনার এই পোলা কি আপনার ভোটটা পাইবো?


পর্ব ৯


"ভাই আইজ কোনদিকে যাইবেন?"

"বাড়ি থেকে শুরু করবি,শেখ জামাল গিয়া থামবি!"

"আইজ ভূইয়ারাও ঐদিকে যাইবো। ওরা নাকি নেতাকর্মীদের নিয়া আইজ ঐদিকে চা আডডা দিবো!"

"সমস্যা কোথায়?দিতেই পারে!তোরা বরং সেই আড্ডায় গিয়ে সামিল হবি। ওদের আড্ডায় উপস্থিত মানুষের মাঝে লিফলেট বিলি করবি!"

"কি কন ভাই?গ্যাঞ্জাম লাইগা যাইবো!"

"গ্যাঞ্জাম লাগবো কেন?"

"কি বলতাছেন ভাই,লাগবো না! এক নেতার আড্ডায় গিয়ে আরেক নেতার লিফলেট বিলি..!!"

"নেতাও কারো বাপের না,নেতার পালে থাকা লোক‌ও কারো বাপের না। সাধারণ জনগণ সবার,নেতাও সবার হয়! একজন নেতার উপরে যেমন সাধারণ জনতার অধিকার তেমনি সর্বস্তরের জনগণের উপরে নেতাদের দাবি থাকে, সেখানে নির্দিষ্টভাবে কেউ রাজত্ব করতে পারে না।ওরা দাওয়াত দিবো তোরা সেই দাওয়াতে গিয়া সামিল হবি।মনে রাখবি মতবাদে আমি তোদের লোক হলেও একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তোদের প্রতি ওদের‌ও দাবি আছে। আবার এক‌ই কথা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তবে হ্যাঁ কোনরকম রক্ত গরম করা যাবে না। বরং পরিস্থিতিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে কথা পাড়তে হবে তবেই জনগনের দৃষ্টিতে গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।"

"আপনি যাইবেন না ভাই?"

"যাবো তবে এলাকায় না,আমি একটু সাভার যাবো। সেদিকে গিয়েও সার্ভে করি,দেখি কতজন আছে আমার জন্য খাটার জন্য!"

"তাইলে ভাই এদিকে মুরাদ ভাই থাকুক,আমি আপনের লগে যাই!"

"না মুরাদ একা না , মাত্র একটি ঝামেলা থেকে ছাড়া পাইছে!ওকে আপাতত কোন কাজে একা রাখা যাবে না। তাছাড়া আমি সাভার যাবো শুধু রাজনৈতিক নয় আমার আর‌ও কিছু অফিসিয়াল কাজের দরকার যাবো। সুতরাং আমার সাথে সাব্বির‌ও থাকবে।"

---------------------------------

"আসসালামু আলাইকুম,আসবো!

"আয় মুরাদ, কি অবস্থা?"

দরজায় খটখট শব্দ সেদিকে দৃষ্টি দিতেই মুরাদকে দেখতে পায়,মুরাদের সালামের উত্তর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো তারাজ,মুরাদ এগিয়ে আসতেই দুই বন্ধু কোলাকুলি করলো।মাদকের সেই ঘটনার পর মুরাদ একটু দূরে দূরেই থাকে।তারাজ বুঝেই নিজেই একটু স্বাভাবিক হ‌ওয়ার চেষ্টা করে।মুরাদকে তারাজ যথেষ্ট ভালোবাসে, সুতরাং একদমই অন্য কারো কারণে নিজেদের সুন্দর সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরাতে চায় না। আপাতত প্রচারণার মূল কাজ মুরাদ নিজ দায়িত্বে সামলাচ্ছে।ওকে সাহায্য করছে ফয়সাল।বলা যায় দুইজন বিশ্বস্ত কাঁধ এক হয়ে সামলাচ্ছে তাই তো তারাজ নিশ্চিত হয়ে কোর্টে নিয়মিত যাতায়াত করতে পারছে।নয়তো নির্বাচন কালীন এই সময়ে প্রচুর চাপ থাকে আইনপেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের উপরে,এর মধ্যেই দেশে চলছে টানা অবরোধ। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ চলছেই।এই তো গতকাল‌ই কোর্ট চত্ত্বর থেকে খানিকটা দূরে বিআরটিসির এক দ্বিতল বাস দূর থেকে কেউ বোমা মেরে আগুনে পুড়িয়ে দিলো ভাগ্যিস যাত্রীগুলো নেমে পড়েছিলো নয়তো কি হতো! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কি বা করার আছে? তবে হোতাদের খোঁজ চলছে,ধরতে পারলে এমন ঢলা দিবে পুলিশ! তখন বুঝতে পারবে দেশে অরাজকতা চালালে কি হয়!

"শুনলাম তুই নাকি আজ‌ও কোর্টে যাবি?"

"হ্যা এইতো বের হবো। আজ এ আর কোম্পানির সিইও বেলজিয়াম নায়েক এর ছোট ছেলের কেইসটা কোর্টে উঠবে,সেটা নিয়ে কাজ আছে!"

"কাল এত বড় ঘটনার পরও আজ কোর্ট বন্ধ রাখেনি?"

"বোকার মতো কথা বলিস না মুরাদ, এরকম ঘটনা এই সময়ে নেহায়েত তুচ্ছ ঘটনা ছাড়া কিছুই নয়, মারামারি হবে,আগুন লাগাবে, ভাঙচুর করবে,তবেই না বিরোধীদলীয় আন্দোলন বলে মনে হবে।তাকে নিশ্চয়ই সরকারদলীয়রা বাহবা দেবার জন্য সব বন্ধ করে বসে থাকবে না!"

"সব‌ই ঠিক আছে কিন্তু তুই নাকি সাভার‌ও যাবি?"

"হ্যা "

"রাজনৈতিক নাকি ব্যক্তিগত!"

ব্যক্তিগত শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে তার মানে মুরাদ কোনমতে আঁচ করেছে,তারাজ হালকা মুচকি হেসে মুরাদের দিকে তাকালো,মুরাদ হাস্যজ্জল ভাবেই চেয়ে আছে।

"ব্যক্তিগত কে বললো, আপাতত সবটাই রাজনৈতিক অথবা প্রফেশনাল।"

কথাটা বলে নিজের কাজে মন দিলো,মুরাদ আর‌ও একটু এগিয়ে এসে ,

"দেখ ব্যক্তিগত হোক কিংবা প্রফেশনাল যাই হোক আপাতত এই সময়ে কোথাও একা যাস না। চারদিকে ষড়যন্ত্রের জাল।ঢাকা পাঁচ আসনের প্রার্থী নিয়াজ দলীয় কোন্দলের স্বীকারে আজ নমিনেশন থেকে বাতিল হয়ে গেল।"

"কি বলিস?এটা কখন ঘটলো?"

"মাত্র‌ই কিছু সময় আগের ঘটনা,লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে!"

মুরাদের কথায় তারাজ একটু চিন্তিত হয়ে পড়লো,হাত বাড়িয়ে রিমোটের সাহায্যে টেলিভিশন চালু করে সময় সংবাদে চলমান সরাসরি সম্প্রচার দেখতে লাগলো।

-----------------------_---

"ভাইয়ের প্রচারণায় যাবি না?"

"আমি আর প্রচারণা!"

"কেন?"

"আমি কোনকালেই এই রাজনীতির এই খেলায় নাই; আর কোনদিন ছিলাম‌ও না।"

"ঠিক আছে; তাই বলে তোর ভাই এই প্রথম সরাসরি তাও একদম সাংসদ পদে লড়ছে সেখানেও থাকবি না!"

"বাবা তো ভালো,ভাই আমি নিজেও চায় না আমি তাদের এই পথে হাটি! বরং তারা সবসময়ই আমাকে তাদের এই রক্তের খেলার ময়দান থেকে দূরে রেখেছে।তারা চায় তাদের জীবনের এই দিকটা কোনভাবেই যেন আমার জীবনের উপরে প্রভাব না পড়ে।"

"স্ট্রেঞ্জ!"

বনানীর এক সুউচ্চ ভবনের টপ ফ্লোরে ব্ল্যাক কফি নামক এক অতি কুপানীয় পান করতে করতে বন্ধু আহনাফ হামিদ এর সাথে টুকটাক দৈনন্দিন আলোচনা করছিলো তাজিশ। অফিসের অবসরে আহনাফের প্রস্তাবেই এসেছিল।

"তা তোর বোনের কি যেন নামটা,ও হ্যা তুলি; তার ব্যাবসায়ের কি অবস্থা? আর কোন ঝামেলা হয়েছিল?"

"চলছে, পড়াশোনা রেখে সারাক্ষণ তাই নিয়েই পড়ে থাকে।যেন টাকা কামাই না করলে তার সংসার ভেস্তে যাবে!"

"এভাবে বলছিস কেন? এটা তো ভালো! এতটুকু বয়সেই নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে!যখন তার বয়সী মেয়েরা বাবা,স্বামীর অর্থ উড়াতে ব্যস্ত তখন সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে মেহনত করছে।"

"ভালো তাই বলে সব রেখে শুধু একটা নিয়ে পড়ে থাকাই উত্তম নয়! তাছাড়া বাবা ওর বিয়ে নিয়ে ভাবছে আর সেই মেয়ে আছে ! ওর যত টাকা উড়ানোর উড়াক তার জন্য না বাবার তরফ থেকে বাঁধা আছে আর না আছে আমার তরফ থেকে! কিন্তু সে তো?"

"ছেলে কি দেখা শেষ?"

ল্যাপটপে ডান হাতের আঙ্গুল আর বাম হাতে কফির মগ,আহনাফের কথায় ঠোঁটের আগায় থাকা কফিতে ঠোঁটটা একটু পুড়ে গেল বোধ হয়।আচানক শোনা কথায় কিছুটা হোঁচট খেল,শেষ লাইনটা আহনাফের দিকে চেয়ে‌ই জিজ্ঞেস করলো।

--------------------

"স্যার মে আই কাম ইন?"

"ইয়েস কাম ইন মিস আফনূর রেজওয়ান!"

"আসসালামু আলাইকুম,কেমন আছেন স্যার! আসসালামু আলাইকুম!"

নিজের গুরু র‌ইজ বিল্লাহকে সালাম প্রদান করে তার পাশে অবস্থানরত আর‌ও একজনকে দেখে তাকেও সালাম দিলো।আফনূরকে দেখে সেই ব্যক্তি বাঁকা ঠোঁটে হাসি বিনিময় করলো, সালামের প্রত্ততরে মিষ্টি করে বললো,

"ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ্"

সালামের উত্তর দেওয়াটা স্বাভাবিক কিন্তু এভাবে হাসার বিশেষ কারণ পেলো না আফনূর। কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলেও করাটা সমীচিন বোধ হলো না। বিল্লাহ নিজেই শুরু করলেন,

"ওয়ালাইকুম আসসালাম আফনূর,আমি আলহামদুলিল্লাহ,তুমি বলো?"

"জ্বী স্যার আলহামদুলিল্লাহ!আমাকে হঠাৎ জরুরি তলবের বিশেষ কোন কারণ?"

"হ্যা কারণ তো একটা ছিলো;উনাকে দেখো , পরিচিত হ‌ও! উনি হচ্ছেন..

"মোহাম্মদ ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার,আগামী নির্বাচনে ঢাকা দুই আসন থেকে সাংসদ পদপ্রার্থী!"

"তুমি চিনো?"

"উনাকে কে না চিনে? আমাদের এলাকায়‌ও বেশ জোরসোর প্রচারণা চলছে, আপনার জন্য অগ্রীম শুভকামনা স্যার!"

শেষ উক্তি তারাজের দিকে চেয়েই ছিলো।তারাজ বেশ আশ্চর্য হলো। তার সাথে খুশিও হলো। মনে মনে বললো,

"গ্রেট!"

" উনার আরও একটি পরিচয় হচ্ছে...

"উনি একজন নিয়মিত কাজ করা ব্যারিস্টার। এ আর কোম্পানির মতো বড় বড় কোম্পানির ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে উনি নিজের যথেষ্ট মেধার ছাপ দিয়ে রাখছেন।ব্যারিস্টার হিসেবে উনার যথেষ্ট প্রশংসা শোনা যায় কোর্ট চত্ত্বরে।"

"বাহ,বলতেই হয় আপনার শিষ্য!"

তারাজের প্রশংসায় লজ্জা মাখা হাসিতে মাথা নুইয়ে নিলো আফনূর,বিল্লাহ সাহেব নিজ অধীনস্থের এহেন দূরদর্শিতায় গর্বিত বোধ করলেন।তারাজ নিজেও আফনূরের মেধা আর তাকে রিসার্চ করে পড়ায় বেশ খুশি। যদিও মনে মনে হাসছে এই ভেবে যে,

"ইস্ যেটা সবার আগে জানা উচিত ছিলো তুমি শুধু তাই জানলে না নূরজান!"

"ওখে আফনূর তুমি বসো প্লিজ, তোমার সাথে তারাজের কিছু আলোচনা ছিলো!"

"আমার সাথে?"

"জ্বী, কেন?

"না মানে আমার মতো ছোটখাটো একজন!"

"মানুষ ছোট থেকেই বড় হয়,আর আমার তথ্য মতে আপনি সবেমাত্র একা কাজ শুরু করেছেন,এখন‌ও অনেক সময় আছে বড় হ‌ওয়ার । ইনশাআল্লাহ একদিন অনেক বড় ল‌ইয়ার হবেন! তবে অবশ্যই তার জন্য আগে মাঝ রাস্তায় কোমর বেঁধে ঝগড়া করা বন্ধ করতে হবে!"

"ঝগড়া আর আমি; না মানে স্যার!"

আফনূরের থতমত খাওয়া চেহারা দেখে তারাজের হাসি আসছে,কোন রকমে নিজেকে আটকে কেবল অপলক দেখে যাচ্ছে তার সামনে দাঁড়ানো লজ্জাবতীকে।

------------_---------_---_-----------

"আমি আপনার জন্য কি করতে পারি?"

"অনেক কিছু! ইভেন আপাতত আমার জন্য সবচেয়ে বড় কাজটা আপনি‌ই করতে পারেন।"

"একটু খোলাসা করলে ভালো হয় মিস্টার তারাজ!"

রেজওয়ান করিম এর কথায় গা হেলিয়ে একটু আরাম করে বসলো, পায়ের উপর পা তুলে ধীর কিন্তু তেজি কন্ঠে বলা শুরু করলো,


পর্ব ১০


"মিস্টার তাজিশ,মুখ লটকানো কেন?"

উদাসমনে পশ্চিমাকাশে তাকিয়ে ছিলো তাজিশ,এই সময়ে ভাইকে বাড়ি দেখে তারাজ একটু চমকালো।সাভার থেকে কাজ শেষ করে সোজা বাসায়‌ই চলে এসেছে, মাগরিবের পর নেতাকর্মীদের নিয়ে সাধারণ আলোচনায় বসবে। সকালে একটু কাজ করে কোর্টে গেল,সেখান থেকে সাভার গিয়ে ব্যক্তিগত কাজের সাথে রাজনৈতিক আলোচনা সারলো। বাসায় এসে নিচে গ্যারেজে তাজিশের বাইক দেখেই বুঝতে পারলো তাজিশ বাসায়। সিডিউল মোতাবেক তাজিশের এখন অফিস সময়,অথচ তাজিশ এখন বাসায়! নিশ্চয়ই কিছু ঘটেছে।

"আম্মা আমাদের দুই কাপ মশলা চা দিবে?শরীর ম্যাচ ম্যাচ করছে, একটু হালকা করে নিতাম!"

"হ্যা দিবো না কেন, নিশ্চয়ই আমি বানিয়ে দিচ্ছি!"

"তুমি বানাও আমি একটু ছোটর ঘর থেকে আসি!"

ছোট ভাইয়ের হালচাল বুঝতেই তাজিশের ঘরে গিয়েছিল,না পেয়ে নিজের রুমে গিয়ে আগে পরিচ্ছন্নতার কাজ সেরে নিলো। এরপর ঠিক অনুমান করে ছাদে পেয়ে গেল।তাজিশ ভাইয়ের গলার শব্দে সেদিকে ফিরে বসলো,

তারাজ ছাদে পাতানো প্লাস্টিকের চেয়ারের উপর নিজেকে ছেড়ে বসলো,হাতে ধোঁয়া উঠানো মশলা চায়ের কাপ, নিজে বাম হাতের কাপ ধরে রেখে ডান হাতেরটা বাড়িয়ে দিলো তাজিশের দিকে। চায়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ভাইয়ের উত্তর দিলো,

"ন্যাথিং মাচ;হোয়াট এবাউট ইউ?"

"লটস;বাট লেট গো মি,ছে এবাউট ইউ!"

"না তেমন কিছু নয়,আসলে?"

"যোগাযোগ করেছিলে তার সাথে আর? যদিও আমি নিজেই বারন করেছিলাম তবুও তুমি কি আর?"

"না ভাই, তোমার কথা অনুযায়ী আমি আর যোগাযোগ করিনি,তবে সে একবার নক করেছিলো তাও অফিসিয়াল কথাবার্তা হয়েছিলো শুধু!"

"ওহ , তোমার কি মনে হচ্ছে?"

"ওর ফ্যামিলি ওর জন্য পাত্র দেখছে!"

"মানে?"

"মানে আজ আহনাফের সাথে কথা হয়েছিলো,কথায় কথায় বলে ফেললো ওরা তার বিয়ে নিয়ে ভাবছে এবং পাত্র দেখার বিষটি‌ও ঘটছে।"

"ইটস সিম্পল!ঘরে বিবাহযোগ্য বোন থাকলে তাকে নিয়ে ভাবনা থাকবেই!তা নিয়ে চিন্তিত হ‌ওয়ার কিছু নেই।"

"তো এখন আমি?"

তারাজ ভাইয়ের মনের পরিস্থিতি অনুমান করলো।২৭ বছর বয়সী ভাইয়ের এই পরিস্থিতিকে কোনভাবেই সে ঠুনকো আবেগ বলে চালাতে পারলো না।তাজিশ ভদ্র ছেলে,স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও কখনো মেয়েদের বিষয়ে আগ্রহী দেখেনি।কোন মেয়ের প্রতি আবেগ প্রকাশ করেনি। সবসময় পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে সচেতন ছিলো,তার চেয়েও বেশি ছিলো বংশীয় সুচিবাই! কোথাও একটা এই বিষয়ে তাজিশ তার বাবার প্রতিচ্ছবি ,যেকোন বিষয়ে বংশের গরিমায় সে তারাজকেও হার মানাবে! 'জাতের মেয়ে কালো ভালো আর নদীর পানি ঘোলা ভালো' এই প্রবাদ বাক্য তাজিশ ভয়ানকভাবে রপ্ত করে নিয়েছে। ইসহাক আবদুল্লাহ সম্পর্ক গড়ায় সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয় বংশ জাত পাত কুলে! অর্থে ছোটবড় হলেও সম্মান এবং বংশ মর্যাদায় হতে হবে উচ্চ পর্যায়ের তবেই সেখানে সম্পর্কে পা বাড়াবে।তারাজ এই নীতির আওতায় নিজেকে আটকাতে না পারলেও তাজিশ বাবার পায়ে পা রেখে চলে। এমনকি বন্ধুত্ব‌ও করে বেছে বেছেই।যেকোন মানুষের সাথে মেলামেশা করা তাজিশের তালিকায় নেই। রাজনৈতিক কারণে তারাজ মিশলেও তাজিশ বন্ধুত্ব‌ও করে সবসময় বংশের অবস্থান দেখে। সেখানে তার নিজের জন্য কোন মেয়ে সে পছন্দ করেছে তাও এই বয়সে সুতরাং নিশ্চয়ই খামোখা সময় কাটানোর জন্য নয়। তাজিশ এখনও ভাইয়ের পানে চেয়ে আছে, নিশ্চয়ই ভাই তার কোন না কোন সমাধান দিবে।তারাজ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল,

চুমুকে চুমুকে শেষ করলো গন মশলায় দ্রবীভূত লাল রঙা অদ্ভুত স্বাদের পানীয়।তাজিশ ভাইকে অনুসরণ করে এক‌ই কাজ সারলো।চা পান শেষে কাপটা সামনে থাকা দেওয়ালের চ‌ওড়া বেষ্টিতে রাখলো,দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে হালকা শরীর চর্চা করলো,

"আহ্ এখন শান্তি লাগছে,এত সময় মনে হচ্ছিলো মাসলে জ্যাম লেগে গেছে,এই চায়ের যে উপকারিতা তা আসলে পান না করলে বোঝাই যায় না!"

"তবে সেটা আম্মার হাতে হলে বেস্ট হয় নয়তো নয়!"

"কজ আম্মা অলয়েস বেস্ট হয়!"

চায়ের স্বাদে আম্মাকে প্রশংসিত করলো দুই ভাই মিলে। তাজিশের চাও এত সময়ে শেষ,কাপটা টেবিলের উপরে রাখলো,তারাজ কিছুটা ঝুঁকে তাজিশের চোখে চোখ রেখে বললো,

"সরাসরি কথা বল,একদম সলিড প্রপোজ। এরপর ফলাফল কি হয় দেখ তারপর ভাবা যাবে কি করা দরকার?"

"সিরিয়াসলি?"

"হু!"

"যদি রিজেক্ট করে দেয়?"

"থিংক পজেটিভ,বি কনফিডেন্ট! যদি না কোথাও সেট থাকে,তোমাকে রিজেক্ট করার একটা কারণ‌ও নেই!সো বি কনফিডেন্ট এন্ড থিংক পজেটিভ।"

"তুমি এত কনফিডেন্স কোথায় থেকে পাও বলো তো?"

তারাজ মুচকি হাসি ব‌ই আর কোন উত্তর দিলো না। এমনিতেই সে আজ বেজায় খুশি।আসলে মানুষ যখন নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী পেয়ে যায় তখন খুশি হ‌ওয়াটাই স্বাভাবিক।

"ওয়েল চলো নিচে যাই!তোমাকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে দেখে আম্মা চিন্তিত হয়ে আছে,চলো আগে গিয়ে আমাদের জননীর চিন্তা কমাও!"

"হু!"

"আম্মা এখনও আমাদের ছোট বাচ্চার মতো ট্রিট করে ভাই!"

"কারণ সে আম্মা!"

----------------------------------

"আফনূর!"

"জ্বী আব্বু?"

"তোমার নতুন কেইসের কি খবর?"

"জ্বী ভালো, ইনশাআল্লাহ বিজয়ী আমরাই হবো!"

"ইনশাআল্লাহ!"

রেজওয়ান করিম খেতে বসে কথা খুব একটা বলেন না।তবুও বলতে হচ্ছে। সারাদিন মেয়ের নাগাল খুব একটা পান না। খাওয়ার সময়টাই মাত্র এমন পাওয়া যায়।তাই তিনি কথা বলার জন্য এই সময়টাই বেছে নিলেন।

"আম আমার আসলে তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো!

বাবাকে আমতা আমতা করতে দেখে আফনূর একটু আশ্চর্য হলো।কি এমন যেটা বলতে বাবাকে এহেন ভনিতা করতে হচ্ছে, নিজেই জিজ্ঞেস করলো,

"কি বলবে আব্বু?"

"বলছিলাম জানো তো সামনেই নির্বাচন, বলছিলাম যদি?"

"আব্বু প্লিজ এখন বলো না তুমি নির্বাচন নিয়ে ভাবছো?তাও কিনা এমন একটি দলের জন্য!"

"না আমি তেমন কিছু ভাবছি না ,আমি তো ভাবছি.

"আমরা তোমার বিয়ে নিয়ে ভাবছি!"

রেজওয়ান করিমের কথার মাঝেই কথাটা বলে উঠলেন মিসেস আফিয়া নূরন্নাহার! মায়ের কথায় সেদিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো আফনূর।বাবার আমতা আমতায় মনে হয়েছিলো পেশাগত কিন্তু মায়ের কাটকাট উত্তরে তার ভঙ্গিমায় পরিবর্তন ঘটলো,

"মানে?"

"তোমার বয়স বাড়ছে মা,তাই আমরা নিশ্চয়ই চোখ বন্ধ করে বসে থাকবো না! তাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি বিয়ের! আমি চাই তুমি দয়া করে কিছুদিন কোর্টে চক্কর দেওয়া বন্ধ করে একটু স্থির হ‌ও,আমরা তোমাকে পাত্রস্থ করি!"

"আম্মু কিসব বলছো? আমি একজন নিউ ল‌ইয়ার , তাছাড়া আমি বিয়ে নিয়ে ভাবছি না।"

"নূর! বয়স বাড়ছে সেদিকেও তোমাকে ধ্যান দিতে হবে! গুনে গুনে সাতাশ পার করছো!"

"তো ! তাতে কি হয়েছে? আমি নিশ্চয়ই বসে বসে তোমাদের অন্ন ধ্বংস করছি না? মোটামুটি ভালোই আয় করছি তাহলে সমস্যা কোথায়?"

"আফনূর!"

"কি আফনূর? তুমি প্রতি কথায় বয়স বাড়ছে বলে ঠিক কি বোঝাতে চাইছো? আমি নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে বোঝা হয়ে গিয়েছি? যদি না হ‌ই তাহলে কেন বারবার একই কথায় আঘাত করছো?"

"আপাই প্লিজ, ঠান্ডা হ‌ও! তুমি বুঝতে পারছো না কিভাবে মায়ের সাথে কথা বলছো!"

"সব বুঝতে পারছি,বোঝা হয়ে গিয়েছি! তাই তো প্রতি লাইনে বয়সের খোঁটা! ন‌ইলে কোন মা কি নিজের মেয়েকে এভাবে?"

"তুমি ভুল বুঝছো আপু! এমন কিছু না,মা তো শুধু তোমায়...!"

"থামো! এত কৈফিয়ত দিতে পারবো না! তুমি নিশ্চয়ই এতটা কামিয়াব হয়ে যাওনি যে তোমাকে আমি কৈফিয়ত দিয়ে চলবো!"

ছেলেকে থামিয়ে দিয়ে মেয়ের উদ্দেশ্য কথাটা বললেন মিসেস নূরন্নাহার, মেয়েটা জেদি তার চেয়েও বেশি হয়েছে এক রোখা,ত্যাড়া! কোনমতেই তিনি যেন মেয়েটাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে না।এই যে উকালতি পেশাটা! এটাকে উনি মোটেই সম্মান করে না। মিথ্যা কথায় মানুষের জীবন তছনছ করে দেয়,কত অসহায়ের সর্বস্ব শেষ হয়ে যায়। একমাত্র মেয়েকে তিনি ডাক্তার বানাতে চেয়েছিলেন! সাইন্স নিয়ে ভালো ফলাফল‌‌ও করেছিল কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মেয়ে তার আইন নিয়া পড়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ভালো অবস্থান নিয়ে উর্ত্তীণ হয়েছিলো কিন্তু পড়লো গিয়ে সেই আইনেই! তারপর শুরু করেছিলো হোস্টেল জীবনে থাকা নিয়ে যুদ্ধ।মা বাবা হয়ে উনারা যেন অসহায় হয়ে পড়েছেন, ছেলে মেয়ের সব আবদারেই তাদের হার মানতে হয়।এই যে বছর ধরে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে তাতে যেন মেয়েটা কর্ণপাত‌ই করছে না! সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হচ্ছ মেয়ের বাবার প্রতি।মেয়েকে এত তোয়াজ করে চলার কি আছে? উনি‌ বুঝেন না, বুঝেই কুল পায় না। মেয়েকে কিছু বলতে গিয়েও কেন এই বাবা নামক পুরুষটি এত সংকোচে ভুগে! অবশ্য কারণ তো আছেই।কারণটা মনে পড়লেই উনার নিজেরও অন্তরে আঘাত হানে,উনিও হার মেনে নেন পরিস্থিতির কাছে;যত‌ই মুখে মুখে মেয়েকে কটু কথা বলুক উনি নিজেই তো কষ্টে বিনাশ হয়ে যাচ্ছেন।যেখানে তার মেয়ের বয়সী অন্য ভাগ্নী ভাতিজীরা ভরা সংসারে সুখ বিলাচ্ছে সেখানে উনার একমাত্র মেয়েটা জীবনের জঘন্য অধ্যায়ের ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। নিজেকে আড়াল করে নিচ্ছে কপটতার চাদরে।

পরিস্থিতি ঘোলাটে দেখে রেজ‌ওয়ান করিম নিজেই সামলে নেওয়ার জন্য কথা বাড়ালেন,

"আহ্ নাহার থামো,মেয়ের সাথে আমাকে কথা বলতে দাও! তোমাকে কতদিন বলেছি আমাদের বাপ মেয়ের কথার মাঝে কেউ কথা বলবে না!"

"তুমি কথা বলো? এটাকে কথা বলা বলে?"

"তো তোমার মতো কি ধমকে মেরে কথা বলবো!আমার মেয়ের সাথে আমি কথা বলবো; কিভাবে বলবো সেটা আমি‌ই ঠিক করবো!তোমরা কেন তৃতীয় পক্ষের মতো নাক ঢুকাচ্ছো!"

"হ্যা তোমার‌ই তো মেয়ে; তাই তো তুমি দায়িত্বেই মেয়েটার জীবন শেষ করেছো! যদি আমার‌ও হতো!"

"আম্মু কি করছো? থামো!"

মায়ের মুখ দিয়ে বের হ‌ওয়া বেফাশ কথায় খানিকটা আঁতকে উঠলো আফির রেজ‌ওয়ান,বড় বোনের দিকে একবার আঁতকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় মাকে সাবধানী বার্তা প্রেরন করলো, ছেলের কথায় বাধাপ্রাপ্ত নূরন্নাহার বুঝলেন ঠিক কি করলেন,এত সময়ে তেজি মনোভাবে হঠাৎ করেই বেদনার বরফ ঢলে পড়লো,নরম স্নিগ্ধ নয়নে মেয়ের পানে তাকালো,জুটা হাতে এখনও কয়েকটি ভাতের দানা লেগে আছে,কখন যেন উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে খেয়াল‌ই করেননি আফিয়া নূরন্নাহার। নিজের ভুল বুঝতে দেরি করেছেন, অপরাধী সুরে ক্ষমা প্রার্থনা করতে যাবেন তার আগেই ভাতের প্লেট সামনে ঠেলে দিয়ে হাত গুটিয়ে চলে গেল আফনূর।না মুছলো চোখের পানি আর মুছলো হাতের নোংরা জুটা অংশটা।মেয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে নিজের দৃষ্টি সহধর্মিণীর পানে ফেললেন, অপরাধী কন্ঠে বললেন,

"বলতে বলতে এতটাও বলা উচিত নয় যতটায় মানুষের কলিজায় আঘাত লাগে!"

"আমি এমন করে?"

"আমি বুঝি, কিন্তু মেয়েটার সামনে এভাবে না বলাই শ্রেয়!"

নিজের কথা শেষ করে ভাতের থালায়‌ই হাত ধুয়ে উঠে পড়লেন রেজ‌‌ওয়ান করিম। দৃষ্টি ঘোলাটে। মেয়েকে বকতে গিয়ে মেয়ের মা তাকেই আঘাত করেছে, মেয়েটাও তার জন্য কষ্ট পাচ্ছে। নিজের এক সময়ের অতীত তাকে এখনো এভাবেই আঘাত করে যাচ্ছে।যদি আল্লাহ ক্ষমতা দিতো তবে তিনি নিশ্চয়ই সেই যন্ত্রনার অতীত বদলে নিতে নিতেন।মুছে দিতেন মেয়ের গায়ে উনার নিজের দোষে লাগা কলঙ্কের কালি।বদলে দিতেন মেয়েটার ভাগ্য! একমাত্র মেয়েকে নিজের অস্ত্র বানাতে গিয়ে , মেয়েকে নিজের ভবিষ্যৎ কর্ণধার বানাতে গিয়েই কখন জানি মেয়েটার জন্য বিপদ ডেকে আনলেন টের‌ই পেলেন না। তাই তো স্ত্রীও মেয়ের পরিস্থিতির জন্য উনাকেই দায়ী করেন। অবশ্য সত্যি তো এটাই! 

'নূর ভিলা' প্রধান সদস্য সংখ্যা ছয়! রেজওয়ান করিম, মিসেস আফিয়া নূরন্নাহার, রেজওয়ান করিমের মা রাজিয়া খানম,আফির রেজ‌ওয়ান,ও আফনূর রেজওয়ান আর একজন হচ্ছে মিসেস আফিয়া নূরন্নাহারের দুঃসম্পর্কের এক খালাতো বোন আলিয়া!যিনি বন্ধ্যাগত সমস্যার স্বীকার হয়ে স্বামী পরিত্যাজ্য একজন অসহায় নারী।আফনূরের জন্মের পর থেকেই এখানে আছেন,বিশেষত আফনূরের পরিচর্চা করতেই উনাকে এখানে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল এরপর এখানেই থেকে যান,হয়ে যান চিরস্থায়ী সদস্য।

এছাড়াও রয়েছে আরো তিনজন কাজের মানুষ। রাজনৈতিক পরিচয়ে রেজ‌‌ওয়ান করিম এক সময়ের বিরোধীদলীয় বেশ দাপুটে স্থানীয় নেতা ছিলেন, তাছাড়াও ব্যাবসায়ীক পরিচয়ে ছিলেন বেশ নামডাক।ব্যাবসায়ী পরিচয়ে আজও নামী হলেও রাজনৈতিক পাঠ চুকিয়েছেন আজ থেকে বছর কয়েক আগেই; অবশ্য ইচ্ছাকৃত নয়! বাধ্য হয়েই করেছেন । পরিস্থিতি বাধ্য করেছে যার সাথে বাধ্য করেছে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনে বিঘ্নিত হতে। আফনূর রেজওয়ান ও আফির রেজ‌ওয়ান তার দুই সন্তান,যার মধ্যে আফনূর বড় এবং একমাত্র কন্যা। আফির দ্বিতীয় এবং আপাতত একমাত্র পুত্র সন্তান কারণ পুত্র সন্তান আর‌ও একজন ছিলো যে কিনা তিন বছর বয়সে পানিতে পড়ে মারা গিয়েছিল।


পর্ব ১১


নিজের ঘর পেরিয়ে বারান্দার দরজা দিয়ে বাইরের ছোট্ট উঠানের ন্যায় খোলা জায়গায় বসে আছে আফনূর।দ্বোতলা বিশিষ্ট এই বিল্ডিংয়ের নিচ তলার দক্ষিনামূখী ঘরটা তার।দক্ষিনা বারান্দায় বাতায়নের বিচরণ সর্বদা সরব।নিচতলা ইট সিমেন্টের হলেও উপর অংশ কাঠ,টিন দিয়ে অত্যন্ত সুনিপুণ ভাবে নকশা করে তৈরি এই ছোট বাড়িটা। আফনূরের ইচ্ছানুযায়ী নিচের এই সর্ব কোনায় থাকা ঘরটাই তার জন্য বরাদ্দ, বাগানবিলাসী কন্যার কল্পনাকে বাস্তবিক করতেই বারান্দার দরজা বাহিরমুখীও রাখা হয়েছে একটি। চাইলেই যেকোন সময় এই বারান্দা দিয়ে বাড়ির পেছন বাগানে যাওয়া যায়,যেটা অত্যন্ত যতনে গড়ে তুলেছে আফনূর নিজেই। নানা রকম দেশী বিদেশী ফুলের পাশাপাশি রয়েছে দেশীয় সব ফলের গাছ। ঔষধি গাছের সংগ্রহ‌‌ও নেহায়েত কম নয়।বাড়ি খুব বড় করে না তুললেও বাড়ির চারদিকে বিশাল জায়গা জুড়ে দেওয়াল টেনে দেওয়া। যার মধ্যে বাড়ির দেওয়াল থেকে শুরু করে সীমানা দেওয়ালের শেষ প্রান্ত অবধি গাছগাছালি দিয়ে সবুজায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে রেজ‌ওয়ান করিম। ঋতুকালীন ফল থেকে সবজি কিংবা ফুলের চাহিদা মোটামুটি এখান থেকেই মেটাতে সক্ষম হয় রেজওয়ান পরিবার।এক পাশে রয়েছে মাঝারি আকারের একটি পুকুর যার শান বাঁধানো ঘাট তাক লাগিয়ে দেয় যে কারো দৃষ্টিকে।বিল্ডিংয়ের উপরের অংশ কেবল সৌন্দর্যের জন্য এবং ছেলে আফিরের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়েই তৈরি করা হয়েছে।মোট কথা বলা যায় বাড়ির প্রধান নকশাকার হচ্ছে এই দুই ভাই বোন আর তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টায় সর্বোচ্চ করেছে রেজ‌ওয়ান করিম।যদিও খুব একটা মনোযোগ দিয়ে না দেখলে বোঝার উপায় নেই পুরো বাড়ির মধ্যে পার্থক্য কোথায়!

"আম্মা!"

বারান্দা পেরিয়ে বাইরে পা রাখতেই অন্ধকারে ডুবে থাকা আরাম কেদারায় বসে দূর আকাশে তাকিয়ে থাকা আফনূরকে দেখে এভাবেই আদুরে গলায় ডাক দিলো তার খালা।যাকে সে ভালোবেসে ডাকে খালাম্মি।আলিয়া ভাগ্নির মনের কাছাকাছি ঠিক ততটাই যতটা হলে কন্ঠের স্বরেই বলতে পারে মনের হালচাল।আর এখন তো সবসময় চোখের সামনেই দেখে এই মেয়েটার করুন অবস্থা। সারাদিন কর্মের ব্যস্ততায় কোনরকম ভালো থাকলেও দিনশেষে একান্ত সময়ে ঠিকই তার দৃষ্টি ঘোলা হয়,বুকে হাহাকার জাগে। বেদনায় নীল হয়ে সমস্ত বদন। কিন্তু কি করবে সে? নীরবে দেখা ছাড়া করার নেই কিছু্ই,তাইতো প্রায় সময়‌ই একাই ছেড়ে দেয়, অন্তত অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বুকের পাথর হালকা করুক।

আফনূরের সাড়া না পেয়ে নিজেই আরেকটু এগিয়ে গেল, স্নেহ ভরা হাত মাথায় বুলিয়ে দিলো।অধিক প্রিয় ছোঁয়ায় আখিজোড়া বন্ধ করে নিতেই গড়িয়ে পড়লো উষ্ণ জল।

"অনেক ঠান্ডা পড়ছে,ভেতরে চ.."

"আম্মু সবসময় কেন এমন করে আমার সাথে?আমি কি নিজের ইচ্ছায় করেছিলাম!"

কথা শেষ করতো পারলো না আলিয়া,ঘুরে তার বুকে হামলে পড়ে বাচ্চাদের মতো কাদতে কাদতে কথাটা বললো আফনূর।আলিয়া আরও বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো, কন্ঠে মমতা ঠেলে আহ্লাদী সুরে বললো,

"মা তো মন থেকে বলে না।রাগের মাথায় কি থেকে কি বলে?"

"মা তো জানে আমি কেন বিয়ে করতে চাই না , তারপরও কেন বলে! আমার ভয় হয়; যেই ভয় আমাকে সামনে এগুতে দেয় না! তারপরও কেন জোর করে?"

"জোর করে তোমার কথা ভেবে।তোমার ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করে,তোমাকে সুখী দেখতে চায়! তাই তো!

- অতীতকে পায়ে পিষে ভবিষ্যৎ নিয়ে আগাও।যা হবে দেখা যাবে। ইনশাআল্লাহ!"

"কিন্তু খালাম্মি?"

"আচ্ছা এখন থামো!এত কাঁদলে পরে মাথা ব্যথা করবে,কাল যে আবার কোর্টে গিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতে হবে তার জন্য সুস্থ থাকা জরুরি না!"

"হু!"

"চলো ঘরে!"

নিজের বারান্দা থেকে বোন আর নিজ কন্যার এহেন আবেগীয় মুহূর্ত মুগ্ধ নয়নে অবলোকন করলেন মিসেস আফিয়া নূরন্নাহার,মেয়ের সাথে তার সম্পর্কটা খুব একটা ভালো নয়।তার জন্য অবশ্যই তিনি নিজেই দায়ী।ভালো করতে গিয়ে সবসময় উত্তেজিত হয়ে পড়েন,যার দরুন নিজ অজান্তেই মেয়েটাকে আঘাত করে বসেন।কখন জানি মেয়েটা তার থেকে দূরে সরে গেছে টের‌ই পাননি।উনি সবসময় মেয়ের অতীতের জন্য মেয়েকে,স্বামীকে কটু কথা বলেন।আসলে সত্যি‌ই কি তারা একাই দায়ী? তার নিজের কি কোন দায়বদ্ধতা আসলেই নেই! ছিলো তো!তাও ভালো একজন সঠিক মানুষ ছিলো তাদের জীবনে যার দরুন পুরোপুরি সর্বশান্ত হতে হতেও তিনি বেঁচে গেছেন।নয়তো সংসারটাও ভেসে যেতো। কথাটা ভাবতেই নিজ বোন আলিয়ার পানে তাকালো। কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় দুই চোখ ভরে উঠলো।তার সাথে অনুভব করলেন মেয়েকে নিজের আবেশে জড়ানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা।ঐ যে তার বোনের বুকে মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে নিজের বুককে হালকা করছে ; ক‌ই কখনো তার সাথে এমন করেছে বলে মনে পড়ছে না তো।তার বুকে মাথা রেখে শেষ কবে মেয়েটা এভাবে? না মনে পড়লো না! কি আশ্চর্য তার নিজের মেয়ে যাকে কিনা তিনি নিজের এই গর্ভে ধারন করেছে,যাকে আনতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি লড়াই করেছে তার সাথে তার খুব একটা গভীর মুহূর্তের স্মৃতি নেই! কেন নেই! কি করে থাকবে? যখন মেয়েটির সবচেয়ে বেশি তাকে দরকার ছিলো তখন তিনি ক্যারিয়ার নিয়ে দৌড়িয়েছেন। সন্তান জন্ম দিয়ে বোন আর কাজের লোকের উপরে ছেড়ে তিনি ছিলো ক্যারিয়ার আর তার স্বামী ছিলো রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। যেই ক্যারিয়ার আর রাজনীতি কাল হয়ে উঠেছে তাদের একমাত্র কন্যার জীবনে! কথাগুলো ভাবতেই বুকে ফাপর শুরু হয়ে গেল।টান লাগতে শুরু হলো শ্বাস প্রশ্বাসের গতিধারায়। নিজেকে ধাতস্থ করতে বসে পড়লেন বারান্দায় পাতা চেয়ারের উপরেই, অনুভব করলেন ঠিক কতখানি যন্ত্রনা দিয়ে আসছেন মেয়েটাকে সেই কিশোরী বয়স থেকেই।

----------------------------------

"আসবেন দাদী; আমরা আপনাদের সেবায় সবসময় সচেষ্ট!"

তারাজ কথাটা বলে আশি বয়সী ছমিরন বিবির হাতের তালুতে নিজের হাত ঢুকিয়ে হালকা স্নেহিত ছোঁয়া নিলো।এহেন আন্তরিকতায় বৃদ্ধা নারী বেশ সম্মানিত বোধ করলেন,মন থেকে দোয়া করে বললেন,

"আইচ্ছা ভাই, দোয়া করি জয় তোমার‌ই অউক!"

ছমিরন বিবির দোয়ায় খুশি হয়ে পাশ থেকে মুরাদ বললো,

"আপনারা চাইলেই হবে দাদী, আপনাদের প্রিয় ইসহাক ভাইয়ের ছেলে, অবশ্যই তার মতোই হবে!"

তারাজ দ্বিমত পোষণ করলো।বললো,

"না দাদী! বাবার পরিচয়ে নয় আমি চাই আপনারা আমাকে নিজের একটা পরিচয় গড়তে সুযোগ দিন 

ইনশাআল্লাহ আপনাদের হতাশ করবো না!"

"আল্লাহ আপনাদের সবসময়ই সম্মানিত করবো,আপনারা মাইনষেরে সম্মানিত করেন ব‌ইলা! আপনে নিশ্চিত থাকেন,আমগো পুরা খান্দানের ভোট আপনেই পাইবেন!"

আশ্বস্ত করে নমনীয় ভাষায় কথাটা বললো ছমিরন বিবির পঞ্চাশর্ধো ছেলে সানাউল্লাহ। নিজের তরফ থেকে বাড়িয়ে আর‌ও একটু বললো,

"আমি আমাগো প্রতিবেশীগোও ক‌ইছি ভোট দিলে দিবা তারাজ ভাইরে,হ্যায় ইসহাক আবদুল্লাহ ভাইয়ের রক্ত;যাইর ম‌ইধ্যে নাই কোন ভেজাল। তাছাড়া শিক্ষিত মানুষ,ব্যারিস্টার মানুষ হ্যায় খুব ভালো করেই জানে মানুষের ল‌ইগা কাম করতে হয় ক্যামনে!হ্যারাও ক‌ইছে ভোট আপনেরেই দিবো!"

সানাউল্লাহর কথা বেশ লাগলো তারাজ সহ তার দলের ছেলেপুলের।তারাও বাহবা দিতে কার্পন্য করলো না। গর্বিত ভঙ্গিতে ফয়সাল বললো,

"হ্যা চাচা আপনি আমাগো হ‌ইয়া প্রচারণা করেন ইনশাআল্লাহ ভাই আপনেগো খুশি করবো!"

"ইব্রাহিম ভাইয়ের মার্কা কি? জনগণের সম্মতি!"

দিলে ভোট ইব্রাহিম ভাইকে, শান্তি পাবেন মনের থেকে"

"আমার ভাই তোমার ভাই, ইব্রাহিম ভাই ইব্রাহিম ভাই "

" চল চল ভোট কেন্দ্রে, দিবো ভোট ইব্রাহিম ভাইকে!

আমার নেতা তোমার নেতা, ইব্রাহীম ভাই, ইব্রাহিম ভাই!"

স্লোগানে গরম হয়ে উঠলো তারাজের নিচ চলার অফিস কক্ষ,তার সাথে যোগ দিলো বাড়ির বাইরে থাকা ছেলেপুলের কন্ঠ। চারদিকে সরগরম পরিস্থিতি, মানুষ ভীর জমিয়ে দেখতে লাগলো, কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে যোগ দিতে থাকলো।

ছমিরন বিবির চোখের অপারেশন করতে মোটামুটি মোটা অংকের টাকার দরকার ছিলো,অতি দরিদ্র সানাউল্লাহর পক্ষে বৃদ্ধা মায়ের চিকিৎসার ভার বহন করা কষ্টকর হয়ে পড়ছিলো,তাই কারো বুদ্ধিতে কাউন্সিলর অফিসে এসেছিল সহায়তা নিতে। ইসহাক আবদুল্লাহকে না পেলেও দেখা হয়ে যায় তারাজের সাথে।তারাজ অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে দলীয় ছেলেদের নির্দেশনা দিচ্ছিলো কিভাবে আজকের ক্যাম্পেইন করবে।কোথায় কোথায় বসে নিজেদের প্রচারণা চালাবে,তখন‌ই দৃষ্টি গোচর হয় সানাউল্লাহ ও তার মাকে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মুরাদের দিকে তাকালে মুরাদ বলে,

"দেখছি!"

"বয়স্ক মানুষ,অফিসে নিয়ে আয়! সবাই বাইরেই থাক।"

ছেলেদের জন্য শেষের লাইন ছুঁড়ে মেরে অফিসে গিয়ে বসলো, বৃদ্ধা ছমিরন এমন সুঠামদেহী তারাজকে দেখে প্রথমে খানিকটা ভরকালো,ভয় পেল বোধহয়।মুরাদ নিজে তার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে আসছিলো, কিন্তু তিনি তারাজকে ভেতরে চেয়ারের রাজকীয় ভাবে বসা থেকে ইতস্তত করতে থাকেন, মুরাদ বুঝলো।মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই তারাজ নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে সম্মানের সহিত বললো,

"আসুন,আসুন ভেতরে আসুন।ভয় পাচ্ছেন কেন।আসুন!"

বৃদ্ধা ছমিরন বিবি ও তার ছেলে সানাউল্লাহ এমন আন্তরিকতায় অভিভূত হলেন,ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলেন,চেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত ভঙ্গিতে হাত তুলে সালাম দিলেন,তারাজ বসলো না।এমন দুজন বয়স্ক মানুষ দাড় করিয়ে রেখে নিজেকে চেয়ারে বসানো তার পুঁথিগত কিংবা পারিবারিক শিক্ষা কোনটাতেই নেই,এই শিক্ষা তার সাথে যায় না।তাই আর‌ও একটু আন্তরিক ঢেলে দিয়ে সালামের প্রত্ততর করে বললো,

" ওয়ালাইকুম আসসালাম,দাঁড়িয়ে আছেন কেন?বসুন! নিশ্চিত হয়ে বসুন!"

মুরাদ এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে দিলো, তারপর নিজে গিয়ে তারাজের পাশের চেয়ারে বসলো,মুরাদ বসার পর ছমিরন বিবি ও সানাউল্লাহ‌ও বসলো,তারাজ ধীর শব্দে জিজ্ঞেস করলো,

"হ্যা বলুন কিভাবে সাহায্য করতে পারি?"

সানাউল্লাহ নিজেই বললেন তাদের প্রয়োজনীয়তা, গম্ভীর ভঙ্গিতে নিজের এক হাত মুখের সামনে রেখে সবটা শোনার পর তারাজ বললো,

"তার মানে এই টাকা হলেই আপনার মায়ের চিকিৎসা হয়ে যাবে?"

" জ্বী স্যার,আমি কিছু সংগ্রহ করছি কিন্তু আর পারতাছি না।মায় আমার চোখেও দেখে না ঠিক মতো, আমি এত অসহায় এক..!

কথা শেষ করতে পারলো না, কেঁদে দিলো সানাউল্লাহ। নিজের চোখের পানি আড়াল করতে ডান হাতের বাহুতে মুখ লুকালো।তারাজ শান্তনা দেওয়ার ভঙ্গিতে আস্বস্ত করে বললো,

"আহ্ কাঁদছেন কেন। ইনশাআল্লাহ ব্যবস্থা হয়ে যাবে।আব্বা নাই তো কি হয়েছে! আমি দেখছি কি করা যায়!"

কথাটা শেষ করে নিজের দূরবার্তা বের করে বেশ কিছু সময় নিয়ে একটি নাম্বারে ফোন দিলো,প্রয়োজনীয় কথা শেষ করে টেবিলের উপরে রেখে দিলো মুঠোফোনটি। তারপর ছমিরন বিবির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"চা খাবেন?"

হালকা ঠান্ডা আর বয়স অনুমান করেই চায়ের প্রস্তাব দিলো,ছমিরন বিবি অবাক‌ই হলেন এবার।কারণ সচরাচর এহেন রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ি গেলে দুছাই ছাড়া কিছুই জোটে না এমন হতদরিদ্রের ভাগ্যে। সেখানে এই লোক কতটা আন্তরিক ব্যবহার করছে আবার খাবারের প্রস্তাব‌ও দিচ্ছেন। বৃদ্ধা নিজের আবেগ লুকাতে ব্যর্থ হলেন,চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো জল।যা থুরথুরে কুঁচকে যাওয়া চামড়ার গা গড়িয়ে পড়লো চিবুক ছুঁয়ে।তারাজ হালকা হেসে উনার হাতের উপরে হাত রেখে শান্ত হতে বললো, মুরাদের দিকে ইশারা করলো,মুরাদ কলিং বেলে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিতেই 'জরুরী' শব্দের সাথেই ভেতরে এলো ফয়সাল।

"ভাই!"

"ফয়সাল উনাদের জন্য চা বিস্কিট দিতে বল।"

"আইচ্ছা ভাই!"

ফয়সাল চলে গেল, তারাজ সানাউল্লাহর সাথে আনা সমস্ত তথ্যাবলী সম্মিলিত কাগজপত্র দেখে মুরাদকে বললো ছবি তুলে তার মাত্র কল দেওয়া নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপ করতে।মুরাদ কথা অনুযায়ী কাজ করতে লেগে পড়লো।তার ফাঁকেই টুকটাক আলাপে সানাউল্লাহর সমস্ত তথ্য নিলো তারাজ।এর মধ্যেই নাস্তা চলে আসলো, তাদের দিকে নাস্তার প্লেট বাড়িয়ে নিজে মুঠোফোনে আবারও সেই নাম্বারে কথা বলা শুরু করলো।

"আপনার মায়ের চিকিৎসার বন্দোবস্ত হয়ে গেছে,উনাকে নিয়ে কাল সকালে এই ঠিকানায় পৌঁছে যাবেন।বাকীটা উনারা দেখে নিবেন।"

একটা ঠিকানা লিখে কাগজটা সানাউল্লাহর দিকে বাড়িয়ে দিলো। তাদের ততক্ষণে নাস্তা করা শেষ। সানাউল্লাহ হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিলো।তারাজ নিজের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে কড়কড়ে হাজার টাকার দুটো নোট ছমিরন বিবির হাতে গুজে দিলো।সাথে বললো,

"দাদী চিন্তা করবেন না,খুব শীঘ্রই আপনি আবার সব পরিষ্কার দেখতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।এই টাকা দিলাম,এটা দিয়ে এখন যাওয়ার সময় ইচ্ছানুযায়ী ফলমূল কিনে নিবেন ঠিক আছে?"

"তুমি আমার চোখের ডাক্তার ঠিক ক‌ইরা দিছো তাতেই আমি খুশি টেকা লাগবো না ভাই?"

দ্বিমতে উত্তরে তারাজ বললো,

"ভাই ডাকছেন না? মনে করেন এইডা আপনের ভাই‌ই দিছে।খুশি হ‌ইয়া দিছে।"

"আল্লাহ তোমারে অনেক বড় করবো!"

"এই দোয়াই করিয়েন তাতেই হবে!"

কথা শেষ করেই মুরাদকে মেনশন করে বললো,

"সব রেডি? তাহলে বের হতে হবে!"

"হ্যা আমি দেখছি!"

মুরাদ উঠে পড়লে তারাজ ছমিরন বিবি ও সানাউল্লার উদ্দেশ্য বললো,

"এখন আমাকে উঠতে হবে, প্রচারণায় যেতে হবে! আপনি কাল সকালে অবশ্যই ঐ ঠিকানায় যাবেন, তারপর যা দরকার হবে ওরাই দেখে নিবে! আপনাদের সাথে অবশ্যই আমার ছেলেরা যোগাযোগ রাখবে।"

কথাগুলো সানাউল্লাহর চোখে চোখ রেখেই বললো,তারাও বুঝলো এখন যাবার সময়।তাই উঠে দাঁড়ালো তারাজ এগিয়ে এসে সাহায্য করলো ছমিরন বিবিকে,তখন‌ই উপরের শেষ কথা হিসেবে প্রথম বাক্য গুলো বলেছিলো তারা।

---------------

"নির্বাচনকালীন সময়ে এমন আন্দোলন দেখেনি আগে কেউ। বিরোধীদলীয় সমস্ত দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও কিসের জন্য এই আন্দোলন যার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সারাদিন নাগরিককে।এই দেশে কি সাধারণ জনগণের জন্য আসলেই কোন দল আছে? ভাবে তারা ভোটারদের নিয়ে। নাকি শুধু ভোটের মৌসুমেই সবটা চিন্তা উদয় হয়?প্রশ্নটা রেখে যাচ্ছে রাষ্ট্রের শাসকদের কাছে সাধারণ জনগণ!- দেশ টিভি,শাপলা চত্বর থেকে,মুনিয়া বিল্লাহ!"

টেলিভিশনের রঙিন পাতায় চোখ বুলিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে টিভি বন্ধ করে দিলো ভুঁইয়া। নির্বাচনী প্রচারণায় বড়‌ই ব্যস্ত দিন কাটছে।যদিও দলের উপর মহলের নানারকম অনুশাসনের মাঝেই বেশ চাপ নিয়ে এগুচ্ছে।তার‌ও বোধগম্য হচ্ছে না এহেন আন্দোলনের কারণ।এই দলটায় তার বরাবরই এলার্জি কাজ করলেও শুধুমাত্র পদের লোভে নাম লিখিয়েছে।দেখিয়ে দিবে অতীতের সেই দলকে যারা তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কখনোই উচ্চ পদে প্রার্থী হিসেবে গ্রহন করেনি।তবে চিন্তিত হচ্ছে এই তারাজ খন্দকারকে নিয়ে। চারদিকে তার‌ই গুনগাণ ভেসে বেড়াচ্ছে।শোনা যাচ্ছে বাড়ি বয়ে নাকি হতদরিদ্রের জন্য তাদের হারকিউলিস বনে গেছে।কথাটা ভাবতেই একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। বিরবির করে নিজের সাথেই বললো,

"এভাবে আর কতদিন? এগুলো পুরানো ট্রিকস!এখন যত‌ই করো ভোটের রাতের কড়কড়ে নোটের খসখসে শব্দে সব গুলিয়ে ফেলবে ভোটাররা। এগুলো আমাদের পুরানো অভিজ্ঞতা! এদেশের মানুষের টাকার ক্ষুধার কাছে সব ফিকে"

"মামা আসবো?"

মোটা ভারী কন্ঠের অধিকারী আনিসের ডাকে নিজে চিন্তাকে দমিয়ে মন দিলো আনিসের দিকে,

"হ্যা আসো!"

"মামা বড় গ্রাম মসজিদের সামনে গ্যাঞ্জাম লাগছে! ইব্রাহিমের পোলাপাইন আমগো পোলাপাইনের উপরে চড়াও হ‌ইছে।ঐ এলাকায় আপনের সবগুলো পোস্টার ছিইড়া ফ্যালছে।"

"কি ক‌স ! এত সাহস হয় কি করে? গাড়ী বাইর কর! আমি এখন‌ই বাইর হবো।আ হ্যা রাব্বিরে ফোন লাগা,এখন‌ই বাড়ির সামনে হাজির হ‌ইতে বলবি।"

"জ্বী মামা!"


পর্ব ১২


“নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী কোন প্রার্থী অপর প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণায় কোন প্রকার বাধা বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারবে না।এক‌ই এলাকায় উপস্থিত প্রার্থীর নির্বাচনী পোস্টার,ব্যানার কিংবা লোগো কোন কিছুর ক্ষয়ক্ষতির অপ্রচেষ্টা চালালে অভিযুক্ত প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল করা হবে।

- আপনি নিশ্চয়ই এই শর্ত জানেন মিস্টার ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার, তাহলে কেন এমন শর্ত ভঙ্গ করলেন?”

“প্রমান দেখান! প্রমান দিন যে এগুলো আমার ছেলেদের‌ই কাজ!আমি বলছি আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবো!নাকে খত দিয়ে ক্ষমা চাইবো তার থেকে!”

“আপনি নিজের ঠুনকো ইগো নিয়ে রাজনীতির ময়দানে লড়তে পারবেন?”

“সরি স্যার,এটা ইগো নয়! আমার আত্নবিশ্বাস ,আমি আমার বাবার থেকে শিখেছি,এই পথে টিকতে হলে মানুষের ভালোবাসা দরকার,মিথ্যা ছলচাতুরি নয়!”

“আপনার নামে আরও এলিগেশন পাওয়া গেছে! সেগুলো নিয়ে আপনার বক্তব্য কি?”

“এলিগেশন শুনি!”

“অর্থ দ্বারা সাধারণ ভোটারদের প্রভাবিত করছেন, তাদের টাকার বিনিময়ে ভোট দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন,টাকার বিনিময়ে ভোট প্রলুদ্ধ করেছেন এটাযে আইন ভঙ্গ করেছে।আপনি নিশ্চয়ই জানেন এই মুহূর্তে কোন প্রকার অর্থ লেনদেনের বিষয়টি নির্বাচনী আচরণবিধির বহির্ভূত!”

“আপনি নিশ্চয়ই প্রমানের সঙ্গে কথা বলছেন! আপনি হয়তো জানেন আমি একজন ব্যারিস্টার, জন্মগত রাজনৈতিক এবং আইনি পরিবারে বেড়ে উঠা সুতরাং নির্বাচনে লড়তে গেলে কি কি আইন মেনে চলতে হয় এটা আমার রগে রগে মিশে আছে,জানা।তাই এমন কিছু করবো না এতটুকু আমি প্রবল আত্ন বিশ্বাস নিয়েই বলতে পারি।আমি অনুরোধ করবো শুধু ভিত্তিহীন অভিযোগে নয়, শক্ত কাঠামোগত প্রমান নিয়ে আমাকে দোষারোপ করুন,নয়তো আমিও মানহানির মামলায় কোর্টে যেতে দ্বিধান্বিত হবো না।”

সামনে বসে থাকা নির্বাচন কমিশনের প্রধান বুঝলেন এই লোককে নড়ানো যাবে না। আসলেই যথেষ্ট প্রমান নিয়ে কথা বলেননি। নির্বাচনের সময় এমন অভিযোগ প্রতিপক্ষ করেই থাকে, যেহেতু শক্তিশালী প্রমাণ নেই সেহেতু উনাকে কেবল সাধারন সতর্ক বার্তা দিয়েই ছাড়তে হবে! তবে আরেকটু বাজিয়ে দেখতে সমস্যা নেই!তাই এবার বললেন,

“গত তিনদিন আগে আপনি একজন বৃদ্ধা এবং তার ছেলেকে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেননি? তাছাড়াও আপনার নির্বাচনী এলাকায় বেশ কিছু পরিবারকে আপনি আর্থিক সহায়তা করেছেন কিনা বলেন? খবর অনুযায়ী আপনি নিজেই সেধে গিয়েই কাজটা করেছেন, আমাদের তদন্ত অফিসাররা আপনাকে নিজ চক্ষে দেখেছে।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন লোকটা।

“আপনার খবরে এটাও নিশ্চয় রয়েছে আমি অত্র এলাকার বর্তমান কাউন্সিলর ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের সন্তান!আর আমার বাবার মানবিকতার কথাও জানেন! সুত্র অনুযায়ী অবশ্যই তথ্য আছে এমন টুকটাক আর্থিক সহায়তা আমার পরিবার থেকে অহরহ যায়।আর র‌ইলো বৃদ্ধা ছমিরন বিবি এবং তার সন্তানের কথা,অবশ্যই খবর নেওয়া উচিত ছিলো তারা আমার বাবার কাছে এসেছিলো, এবং তাদের সহায়তা আমার বাবার অর্থ থেকেই করা হয়েছে। যেহেতু বাবা ছিলেন না সেহেতু তাদের জন্য এই কাজটা আমাকেই করা হয়েছে!এক্ষেত্রে মনে হয় আমি কোন আচরণ কিংবা আইন ভঙ্গ করেছি।”

“আপনার এত অর্থের উৎস কোথায় থেকে?”

“নমিনেশন পেপার জমা দেওয়ার আগে উল্লেখ করেছি,আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন!”

“আমি আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই!”

“প্রথম উৎস আমার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ব্যাবসায়ের অংশ এবং সর্বোচ্চ উৎস আমার পেশা!খবর নিলেই বুঝবেন কতটা আসে!”

“আমরা আশা করবো আপনি কোনরকম আচরণবিধি লঙ্ঘনের চেষ্টা করবেন না,এটাই আপনাকে আজকে আমাদের তরফ থেকে সাবধানী বার্তা দেওয়া হলো। ধন্যবাদ আমাদের সাথে কোঅপারেট করার জন্য!”

“ ইনশাআল্লাহ সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো! আপনাদেরকেও ধন্যবাদ ”

ফ্লাশব্যাক............

তিনদিন আগের --------

দুই দলের হট্টগোলে বড়গ্রাম বড় মসজিদ থেকে শুরু হয়ে খলিফা ঘাট অবধি বিশাল জ্যামে আবদ্ধ হয়ে আছে অজস্র যান।কারণ হিসেবে দর্শিত হচ্ছে, প্রতিদ্বন্ধি দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে পোস্টার ছেঁড়া নিয়ে বিশাল দ্বন্ধ। ইতিমধ্যে দুই দলীয় প্রার্থীরা এসে উপস্থিত হচ্ছে,পুলিশ,আনসার‌ও এসেছে।যথাস্বাধ্য চেষ্টায় আছে সবাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিন্তু সময় লাগছে!

“আমরা কোন অনৈতিক দলের পোস্টার ছিড়িনি,এত সময় নেই আমাদের!”

“ঐ তোরাই ছিড়ছোস;খা** পোলা,চু** পোস্টার তোগো মা*** সাহস কি করে হয় !”

নানারকম উতপ্ত বাক্য বিনিময়ে পরিস্থিতি গরম,এর‌ই মাঝে উপস্থিত হয় তারাজদের বাইক, চালকের আসনে মুরাদ আর তার পিছনে তারাজ।প্রায় পঁচিশ খানার মতো বাইকে একসাথে আসলো, যাতে আছে প্রায় সত্তরের ন্যায় ছেলে।

অপর পাশে আরেকটু আগেই এসে পৌঁছিয়েছে ভূঁইয়ার গাড়ি। পুলিশ নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে দুই প্রার্থীকে মুখোমুখি হতে দেওয়ায় বাঁধা দিচ্ছে। মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই দলীয় সমর্থক

কেউ কাউকে এক চুল ছাড় দিতেও নারাজ।কথায় কথায় হাতাহাতি থেকে মারামারি শুরু হয়ে গেছে, এদিক থেকেই তারাজদের দল হতে কেউ ভূঁইয়ার দিকে অর্ধ ভাঙ্গা ইট ছুঁড়ে মারলো,যেটা গিয়ে পড়লো জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার ব্যক্তিগত সহযোগীর কাঁধে।যদিও সেটা মারা হয়েছিল জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়াকে লক্ষ্য করেই। ভূঁইয়ার সহকারী বিষয়টি আন্দাজ করতে নিজেই নেতার সামনে এসে দাড়ালো যার ফলে ইটের খন্ড তাকে আঘাত করে গেলো।

পরিস্থিতি আর‌ও ভয়াবহ হয়ে উঠলো, পাল্টা আঘাত শুরু হতে থাকলো, নিজস্ব সমর্থকদের উদ্দেশ্য তারাজ সাবধানী বার্তা দিতে থাকলেও পরিস্থিতি তার‌ও হাতের বাইরে।

একে একে আহত হলো প্রায় পঁচিশের মতো লোকসংখ্যা। উভয়পক্ষেই ছিলো এই সংখ্যার লোক।কেউ কেউ গুরুতর আহত হলো।বাদ যায়নি তারাজ নিজেও।দলীয় ছেলেদের সামলাতে গিয়েই পড়ে বিরোধীদলীয় ছেলেদের তোপে, তাদের হাতে হতে হয় বিধ্বস্ত,কারো ছুঁড়ে মারা পাথরে পিঠে আঘাত পায়, কারো লাঠির আঘাতে কানের নিচে ছুঁলে যায়,ব্যথা পায় কাধেও।তবে বেশি আঘাত পায় মুরাদ আর ফয়সাল।মূলত তারা এই ঝামেলায় সরাসরি রাস্তায় নামতে তারাজকে ওরা নিষেধ করেছিলো,তারাজকে একটা সেলুনে ভেতরে বসিয়ে নিজেরাই নামতে গিয়ে বলেছিল,

“দেখ তুই নামিস না।আমরা সামলে নিবো!”

কিন্তু তারাজ নিজে বসে থেকে তাকে সমর্থ করা সাধারণ মানুষকে মার খেতে দেখতে চায়নি তাছাড়া অযথা কেউ তার দলের ছেলেদের আঘাত করবে সেটাও মানতে পারেনি।তাই নিজেই উপস্থিত হয় উত্তপ্ত জনতার সামনে গিয়ে ফল স্বরুপ ঘটনা আর‌ও জ্বলে উঠে। ঘনীভূত হয় সমস্যা।

বাদ্য হয়ে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সমর্থ হয়,গুজব ছড়ানোর দায়ে গ্রেপ্তার করা হয় ভূঁইয়া সমর্থিত কয়েকজনকে, তারাজের দল থেকে গ্রেফতার হলো গন্ডগোলে উসকানি দেওয়ার জন্য।উভয় পক্ষের প্রার্থী রাত দেড়টায় গিয়ে বসে আছে থানায়।আইনি জটিলতায় পেঁচিয়ে কাউকেই ছাড়তে পারলো না পুলিশ, তবে তথ্য দিলো কোর্টে গিয়ে একদিনের মধ্যেই জামিন পাবে। 

আইনের বিশেষজ্ঞ তারাজ নিশ্চিত হয়েই বাড়ি ফিরলো, ঠিক করা হলো তাদের ব্যক্তিগত আইনজীবীকে।তবে এক্ষেত্রে ভূঁইয়া ছিলো স্বার্থপরের রুপে,সে থানা অবধি গেলেও কোর্টে গিয়ে নিজের সাদা পাঞ্জাবিতে দাগ লাগাতে নারাজ তাই কোন ব্যবস্থাও নিলো না। উল্টো তারাজের নামে অভিযোগ দায়ের করলো নির্বাচন কমিশনের নিকট।যার কারণে নির্বাচন কমিশন হতে তারাজকে শোকজ করা হয়েছিল।

"উত্তপ্ত কামরাঙ্গীরচরের পরিস্থিতি।দুই দলীয় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে চলছে অবিরত তর্ক বিতর্ক।এর মধ্যেই শোকজ করা হলো সরকারদলীয় নমিনিত প্রার্থী মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারকে।আজ সকালে তাকে স্বশরীরে নির্বাচন কমিশনের প্রধান অফিসে উপস্থিত থেকে কেন প্রতিপক্ষের প্রচারণায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা হলো,কেন তাদের প্রতি সদয় হলো না এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কৈফিয়ত চাওয়ার কথা আছে বলে জানানো হয়েছে আমাদের!

- এত কিছুর মাঝেও বাদ নেই প্রচারণা,যেন নির্বাচনে জিতেই গেছে বলে বিশ্বাস তারাজ সমর্থকদের।” -- কামরাঙ্গীরচর থানার সামনে থেকে, আবরার শুভ বলছি ,সময় সংবাদ!”

খবরের পাতায় নিজেকে নিয়ে প্রতিবেদন দেখেই ঘর থেকে বের হয় তারাজ।প্রবল আত্নবিশ্বাস আর নিজের একরোখা মনোভাবকে সঙ্গে নিয়েই উপস্থিত হয় নির্বাচন কমিশনের নিকট।

★★★★★★★★★★★★★★

খবরের কাগজে তারাজকে হেডলাইন করে লিখিত প্রতিবেদনটি পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আফনূর। মনে মনে বললো,

“এত ভালো প্রফেশনে থাকার পরেও কেন মানুষ এই পথে পা রাখে!”

“আপাই”

“হ্যা বল!”

আফিরের ডাকে নিজের হাতের কাগজটি রেখে পিছনে ফিরে দেখলো।ধূসর শার্টের সাথে সাদা প্যান্টের ফর্সা গড়নের ছেলেটিকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে,হাতে সাদা বেল্টের ঘড়ি, চুলগুলো একপাশ করে রাখা।গলায় সবসময়ই একটা লকেট‌ওয়ালা চেইন ঝুলে,এখন‌ও তাই। কাঁধে চাপানো ব্যাগটাকে শক্ত করে ধরে রেখে লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে উপর থেকে,নামা অবস্থায়‌ই আফনূরকে ডাকে। আফনূর উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাগটাকে তুলে নিলো,অপর হাতে শাড়ীর কুঁচি ঠিক করে ফাইল তুলে নিলো।আফির সামনে এসে বললো,

“আমি ভাবলাম তুমি রুমে তাই ডেকেছিলাম, কিন্তু এখানেই আছো!”

“ইটস ওখে ,চলো!”

দরজা পেরিয়ে যেতে যেতে আফির হাঁক ডেকে বললো,

“আম্মু,খালাম্মি আমরা আসি!”

আফির নিজের মাকে বললেও আফনূর কেবল বললো,

“খালাম্মি আসি,দোয়া করিও!”

বোনের কাজে আফির হতাশ হলো, কিন্তু কিছু বললো না।আফনূর দরজা দিয়ে বের হয়ে ইট বিছানো রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুধালো ভাইকে,

“আচ্ছা আব্বু কোথায় গেছে তুই কি কিছু জানিস?”

“স্পষ্ট কিছু জানি না আপাই,তবে শুনেছি আজ নাকি এখানে এমপি প্রার্থী ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার আসবে,তাই নাকি তাকে শুভেচ্ছা জানাতে ক্লাবে যাবে!”

থেমে গেল আফনূরের পা,থমকে তাকালো ছোট ভাইয়ের দিকে। আতংকিত স্বরে প্রশ্ন করলো,

“কি বলছিস? এটা কি করে সম্ভব?”

“জানিনা , শুধু জানি এতটুকু বুঝতে পারছি আব্বু তোর সাথে হ‌ওয়া অন্যায়ের শাস্তি দিতে এবার ভয়াবহ কোন পরিকল্পনা করছে।যার জন্য সে ইব্রাহিম তারাজের সাথে হাত মিলিয়েছে।”

“কখন হলো এটা?”

“আপাই তোকে বলা হয়নি, বেশ কিছু দিন আগে ইব্রাহিম তারাজের সাথে আব্বু মিটিং করে এসেছিল এবং তাকে নাকি আমাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ‌ও করেছিলো!”

“তোকে কে বললো?”

“কেউ না,আমি নিজেই আব্বুকে আম্মুর সাথে এই কথা বলতে শুনেছি,তাছাড়া তুমি সারাদিন কোর্টে থাকো তাই জানো না,আব্বু আবারও আগের মতো রাজনীতি নিয়ে ভাবছে,উঠে পড়ে লেগেছে ইব্রাহীমের হয়ে প্রচারণা চালাতে!”

“অসম্ভব!”

“এটা কোনভাবেই হতে পারে না,এর আগে একবার ওরা আমার জন্য আব্বুকে মারতে গিয়েও মারেনি, কিন্তু এবার ছাড়বে না!”

“কিন্তু এমনতো নাও হতে পারে!হতেও তো পারে ইব্রাহীম ভাই জিতে গেলে তিনি‌ই আমাদের সাহায্য করবে ঐ জানোয়ারদের উপর প্রতিশোধ নিতে?”

“ব্যবহার ঠিক করো! কাউকে ছোট করতে গিয়ে নিজের ব্যবহারকে নোংরা করবে না! তাছাড়াও আমি কোন প্রতিশোধের খেলায় নামতে চাই না।এমন প্রতিশোধ চাই না যেটাতে আমার পরিবারকে সাফার করতে হবে!”

“এমন কিছু হবে না আপাই,তুমি নিশ্চিত থাকো! ইনশাআল্লাহ সব ভালো হবে!”

“আব্বুর সাথে কথা বলতে হবে!”

“আজ না তোমার কোর্টে জরুরি কেইস নিয়ে ক্লাইন্টের সাথে কাজ আছে, তাহলে এখন চলো।আমার‌ও দেরি হয়ে যাচ্ছে!”

কথা কাটিয়ে বোনকে আপাতত ঠান্ডা করলেও মনে মনে দৃঢ় প্রত্যয় করলো, মনে মনেই বললো,

“আব্বুর ধারনা ঠিক হলে, আমি নিজেই ইব্রাহীম ভাইয়ের হয়ে কাজ করবো।তোমার সুখের জন্য করবো! আমি আমার সেই চঞ্চল আপাইকে ফিরিয়ে আনতে সব করবো।আমি বিশ্বাস করি ঐ কুত্তাদের কুত্তার মতো মারতে হলে ইব্রাহীম ভাইয়ের মতোই কাউকে তোমার পাশে চাই! আর তার জন্য যদি আমাকে তার হয়ে রাস্তায় নেমে কাজ করতে হয়, তো করবো! আফটার অল সে আমার একমাত্র জিজু হবে!”

কথাটা ভাবতেই মুচকি হাসলো আফির। বোনের পাশে ইব্রাহিম তারাজকে কল্পনা করেই হাসলো,চ‌ওড়া করলো ঠোঁটের প্রস্বস্ত। আফিরের হাসির উদ্দেশ্য বুঝলো না আফনূর,ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে হর্ণে চাপ দিলো,বিকট শব্দে হুশে এলো আফির। বোনের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে নিলো।যদি এখন জিজ্ঞেস করে কি ভাবছিলাম তো কি বলবে! উকিল বোনের চোখে চোখ রেখে মিথ্যা বলার মতো কৌশল এখনও রপ্ত করতে পারেনি ভবিষ্যৎ হার্টের ডাক্তার আফির রেজ‌ওয়ান।

“কি ভাবছিস এতো? আবার মুচকি মুচকি হাসছিস !”

দৌড়ে এসে বাইকে বসে হেলমেট লাগাতে লাগাতে মিনমিন করে উত্তর করলো,

“না তেমন কিছু না ,ঐ একটা ফানি ভিডিওর কথা মনে হচ্ছিলো তাই আর কি!”

বিশ্বাস হলো না , উত্তর অপছন্দনীয়।উকিল আফনূর রেজওয়ান দৃঢ় কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“মিথ্যা বলছিস তাই না? এই তুই কি আমার থেকে কিছু লুকাচ্ছিস? সত্যি করে বল!”

ধরা পড়ে গেল, কিন্তু আপাতত সত্যি উগড়ানো যাবে না।তাই সেও নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে পরবর্তী মিথ্যার জন্য প্রস্তুত হলো,যদিও স্পষ্ট নয় আমতা আমতা করতেই বললো,

" মি.মি.মিথ্যা  বলবো কেন? আশ্চর্য! আমি কি লুকাবো? আশ্চর্য তুমি এভাবে আমাকে আসামীর মতো জেরা করছো কেন?”

“সত্যি কিছু লুকাচ্ছিস না তো?”

“না!”

-এবার কিন্তু সত্যি‌ই আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, তুমি যদি না যাও তো আমি চলে.."

“ঠিক আছে,মেনে নিলাম! কিন্তু যদি কিছু খিচুড়ি পাকাস আর সেটা আমার থেকে লুকাস তো দেখিস আমি কি.."

"কিছু লুকাইনি,সত্যি!”

“আচ্ছা ঠিক আছে এখন চল!”

কথাটা বলেই আফনূর আফিরের পিছনে উঠে বসলো।আফির বেঁচে যাওয়ার ভঙ্গিতে লুকিয়ে দম ছাড়লো।আফনূর বসতেই বাইক চালিয়ে গেট পেরিয়ে চলে গেল গন্তব্য পানে।

দুই ভাই বোন টুকটাক কথার মাঝেই চলে যাচ্ছিল। আফনূর দুষ্টুমি করেই বলছিলো আফিরকে,

“আচ্ছা আজকাল তুমি বেশ সাজুগুজু করে মেডিকেল যাও ব্যাপার কি? হুম! কোন অঘটন ঘটিয়েছো নাকি?এই খরবদার কোন সিনিয়রের উপরে ফিদা হবে না।”

“কিসব বলছো?এমন কিছু হবে না! পড়েই কুল পাই না আবার প্রেমও করবো!”

- শোন প্রেম করতে যেই যোগ্যতা দরকার তা তোমার ভাইয়ের নেই!”

“মানে কি? কিসের কমতি আছে আমার ভাইয়ের?”

“সময়! যথেষ্ট সময়ের অভাব আছে! প্রেম করতে গেলে সবচেয়ে বেশি সেটার‌ই দরকার যা তোমার ভাইয়ের কোনদিন‌ই হবে না।সত্যি বলতে তোমাদের মেয়েদের ন্যাকামি‌ সহ্য করার মতো সময় আর ধৈর্য্য কোনটাই আমার নেই!”

“কিহ্ আমি ন্যাকামি করি!”

কথাটা বলতেই আফনূরের দৃষ্টি আঁটকে গেল রাস্তার মাঝে রাস্তা বিভাজনের জন্য দেওয়া বেড়ির উপরে থাকা ল্যাম্পপোস্টের পিলারের উপরে টাঙ্গানো পোস্টারে থাকা তারাজের বিশাল ছবিটার উপরে।

বাড়ির রোড ছাড়িয়ে সাভার প্রধান সড়কে আসতেই দেখতে পেল, 'মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারকে' শুভকামনা, শুভেচ্ছা জানিয়ে অজস্র পোস্টারে ছেয়ে গেছে তার সাথে তাকে স্বাগতম জানানোর জন্য সাভার বাসী প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করা আছে। নানারকম অফিসিয়াল ছবিতে ছেয়ে গেছে রঙিন কাগজে মুড়ানো ব্যানার,পোস্টারে।আজ যে ইব্রাহীম এই এলাকায় প্রচারণায় আসবে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এবং তাকে স্বাগতম জানানোর জন্য স্থানীয় দলীয় কমিটি সবরকমের বন্দোবস্ত করতে কোন খামতি রাখছে না।তার সাথ।শেষ কথাটা আর উচ্চারণ করলো না। মনে হলো এই আয়োজনের প্রধান হোতা কোনভাবে তার পিতা নয় তো!

★★★★★★★★★★★★★★★

“নারী মন বিশাল এক রহস্যের গুহা;যাতে একবার হারিয়ে গেলে মৃত্যু অবধি ফিরে আসা সম্ভব নয়!”

“হঠাৎ নারী মন নিয়ে পড়লি কেন?”

 ফিচেল হেসে হাতের কলমটাকে টেবিলের কোনে থাকা বিনে ছুঁড়ে মারলো তাজিশ।হতাশ ভঙ্গিতে লুকিয়ে ফেললো নিজের ব্যর্থতার শ্বাস। বন্ধুর আচরণে হতভম্ব মাহদী, শান্ত তবুও সবসময় প্রানবন্ত চিত্তে থাকা ছেলেটার মাঝে আজ কেমন উদাসীপনা।এই যে কলম ছুড়ে মারলো।এটা আসল তাজিশের কাজ নয়! আসল তাজিশ হলে অর্থাৎ তাজিশ ঠিক থাকলে ধীর পায়ে উঠে গিয়ে সুন্দর করে কলমটা বিনে রাখতো।কারণ তাজিশের মনোচিন্তায় বলে,'কলম দিয়ে জ্ঞান বিতরণ করি,সেই কলমকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি কেমনে। এটা ঠিক নয়! ভরাট কলমকে যেভাবে বুকপকেটে আগলে রাখি ,ঠিক সেভাবেই শূন্য কলমকেও বুক পকেটে আগলে না রাখলেও সযতনে নির্দিষ্ট স্থানে রাখাও আমাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।নয়তো কা জ্ঞান আহরণ করলাম যেটা সঠিক কাজেই এলো না।' এমন চিন্তার বন্ধু তার এখন কিনা এহেন দুর্লভ ব্যবহার করছে! ভাবাচ্ছে মাহদীকে,এখন আবার নারী মন,গুহা; কিসব নিয়ে চিন্তাও করছে! মাহদী হালকা ধাক্কা দিলো কাঁধে,শুধালো,

"এই তুই কি কোনভাবে‌ নারী গুহায় না মানে মনে ঢুকেছিস?”


পর্ব ১৩


যদিও একজন বর্তমান রাজনৈতিক নেতা কিংবা তাদের নির্ধারিত সমাজ প্রতিনিধিদের মধ্যে কেউ জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণায় নামতে পারবে না। তবুও ইসহাক আবদুল্লাহর বিষয়টি অন্যরকম।বাবা হয়ে ছেলের জন্য প্রচারনায় এসেছে! উহুম তারাজ নিয়ে এসেছে কারণ হিসেবে অনুরোধ করে বলেছে শুধু নির্বাচনী প্রচারণায় নয়,তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছুর জন্য তাকে যেতে হবে। ইসহাক আবদুল্লাহ জানতে চাইলে শুধু বলেছে গেলেই দেখবেন! ছেলের মতিগতির রগ কখনোই তিনি ধরত সক্ষম হয়নি।আজ‌ও ব্যর্থ রয়ে গেলেন।

বাবার সাথে মাকেও নিয়ে যাওয়ার তোর জোরে সবাই একটু ভাবকু হলো।তবে আপাতত সঙ্গে নিচ্ছে না।বাবা মা'কে পরে অন্য গাড়িতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলো।তারাও সম্মতি দিলো।

★★★★★★★★★★★★★★★★★

বন্ধুর অর্থহীন কথায় খানিকটা ভ্রু কুঁচকে নিলো তাজিশ,'নারী গুহা মানে কি'! বিরক্তি নিগড়ে ধমকে বললো,

“কথায় লাগাম দে।”

“যা বাবা আমি কি ইচ্ছে করে বলেছি নাকি? ওটা তো মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল!”

নিজের জন্য সাফাই দিতেই মৃদু শব্দে কথাটা বললো।তাজিশ খানিকটা চটে বললো,

“সবসময় মুখ ফসকে ওলোটপালোট কেন বের হয়! কখনো কখনো দু চারটা ভালো‌ও তো বের হতে পারে!”

এবার মাহদী এক ভ্রু উঁচিয়ে অনেকটা ত্যাড়া হয়েই বললো,

“তুই কিন্তু এখন কথা ঘুরাচ্ছিস!আসল কথা বল।”

“কোন আসল নকল নাই।”

“অবশ্যি আছে, নারীদের থেকে দূরবর্তী অবস্থানে নিজেকে অটল রাখা ইউসুফ তাজিশ খন্দকার হঠাৎ যখন নারী মন নিয়ে গবেষক বনে যায় তখন নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে!”

“না নাই!”

“আথে বল।ন‌ইলে কিন্তু খারাপ হবে। পরে আমাকে দোষারোপ করতে পারবি না!”

তাজিশ জানে মাহদী থ্রেট করেছে অর্থাৎ মোটেই সেটা ঠুনকো থ্রেট নয়। এই ছেলে ঠিক আসল ঘটনা খুঁচিয়ে বের করবে।যত‌ই হোক একজন গোয়েন্দা পুলিশের থেকে এগুলো লুকানো যায় না।যত‌ই সে বন্ধু মহলের কাছে কমেডিয়ান কিংবা আলাভোলা সেজে থাকুক আসলে সে প্রকৃত অর্থে ভয়ংকর মেধাবী আর সাহসী একজন মানুষ তাই তো নিজ যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেই যোগ দেয় বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ সংস্থায়। তাজিশ ভাবলো প্রথমে সবটা খুলে বলবে কি না আবার সিদ্ধান্ত নিলো বলবে না।যত‌ই হোক আহনাফ আর মাহদী সব‌ই তার কমন বন্ধু। জানাজানি হয়ে গেলে মাহদীর কানে যেতে সময় লাগবে না তাই কথা ঘুরিয়ে অন্য দিকে মোড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু লাভ হলো না তাই বিকল্প পথ হিসেবে খুলে বললেও কিছুটা মিথ্যার আশ্রয় নিলো।

“আসলে একটা মেয়েকে পছন্দ হয়েছিলো,প্রথমে প্রথমে ভেবেছিলাম সেও আমাকে পছন্দ করে কিন্তু?”

“কিন্তু কি?”

“তেমন কিছু নয়!”

“না করলে করে নিবে! তাতে ভাবার আছে!তুই কি কোন দিক থেকে অযোগ্য?”

“তুই বুঝতেছিস না। সে নাও বলেনি আবার পজেটিভ কোন ভাইব‌ও দেয়নি।ঠিক বুঝতে পারছি না তার উত্তর কি! ঐদিকে তার পরিবার তার বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে! এদিকে আমি উত্তরের জন্য তাকে চাতকের ন্যায় বিরক্ত করছি,তবে সে বিরক্ত‌ও হচ্ছে না। আসলে ঠিক কি যে চলছে তার মনে তাই বুঝতে পারছি না! তাই কথাটা বললাম!”

“ওহ আমি তো আর‌ও ভাবলাম বন্ধু আমার কোন নারীর গুহায় আঁটকে গেল।এখন তো দেখি গুহার চেয়েও গভীরে তলিয়ে গেছে”

“তুই আসলেই ভালো হবি না!তাই না!”

তাজিশ এক চোখ চোখা করে,কপালে দু'টো ভাজ ফেলার চেষ্টা করে মাহদীকে তিরষ্কার করে বললো কথাটা।ওর কথার বিপক্ষে এবার খুব ভদ্র হয়ে নিজের উত্তর ফেললো,

“আমরা ভালো হলে তোদের‌ই লস! চোর ডাকাতের সাথে লুকোচুরি খেলায় নামলে মুখ এমনিতেই পাতলা হয়ে যায়,যেথা সেথা বেফাঁস কথা বেরিয়ে যায়!”

“সে জন্য‌ই বলেছিলাম এই প্রফেশনে না যেতে। আসলে তুই কি পাস বলতো, মানুষের গালি ছাড়া!”

“শুধু গালি নয় বন্ধু তার সাথে মাঝে মাঝে তালিও পাওয়া যায়!”

“তোদেরকে দেখে তালি কে দেয়? আমি তো আজ অবধি গালি দিতেই দেখলাম!”

“দেয় দেয় ,মাঝে মাঝে যখন দুই চারটা.... "

“হ্যা হ্যা বুঝেছি,অযথা ভুজুং ভাজুং দেওয়া বন্ধ কর।”

মাহদীর নিজের পেশাকে নিয়ে বড়াই করার প্রয়াসে কৌতুকের জল ঢেলে দিয়ে তাজিশ মজা নিতে থাকলো।

★★★★★★★★★★★★★★★★

“আমাদের আগে জানতে হবে ধর্ষনের সংজ্ঞা কি? এরপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে আসলেই তা ধর্ষন ছিলো কি-না! আমি একজন নারী হয়েই বলতে পারি আজ বর্তমান সময়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নির্ধারিত আইনের সুযোগ-সুবিধা ভোগে এক শ্রেণীর নারী অনৈতিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু পুরুষকে ভোগাচ্ছে,তারা নিজেদের ফায়দার জন্য অসম্মানিত করছে অসহায়,ভদ্র শ্রেনীর পুরুষদের,ব্যাহত করছে তাদের সাধারণ জীবনযাপন,ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সহজতাকে।এর জন্য অবশ্যই দায়ী আমাদের দেশের অতিরিক্ত নারী স্বাধীনতার মনোভাব এবং তাদের প্রতি আমাদের প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সকল পর্যায়ের বিভিন্ন সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠানের নারী বিষয়ক সুশীল চিন্তা এবং তাদেরকে ছাড় দেওয়ার এক ভয়ানক দুর্বিষহ পর্যায়ের পাঁয়তারা।যদি সঠিক যাচাই বাছাই এবং পর্যালোচনা করে এদের আইনের আওতায় আনা যায় তাহলে আমি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি অনেক নারীর আসল রুপ বেরিয়ে আসবে। মাননীয় জজ সাহেব,আমি অনুরোধ করবো বিবাদীকে অন্তত একবার সুযোগ দেওয়া হোক নিজেকে প্রমান করার,আমাকেও একবার সুযোগ করে দিন একজন নির্দোষ, নিরাপরাধী, ভুক্তভোগীকে মিথ্যার জাল ছিঁড়ে বের করে আনতে।আমি উপর‌ওয়ালার প্রতি পুর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে বলতে পারি ইনশাআল্লাহ সত্য একদিন মুখোশ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবেই”

নিজের ক্লাইন্ট ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্তের হয়ে কোর্টে প্রথম দিনের কথায় মাত করে নিজের জন্য একটা সুযোগ চেয়ে নিলো আফনূর।কেইসের ডিটেইলস মোতাবেক 'বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানানো।'

২৯ বছর বয়সী দুই বাচ্চার মা সৌদি প্রবাসী ফয়সাল মিল্লাতের স্ত্রী এবং মিরপুর নিবাসী রবিউল্লার কন্যার সাথে চট্রগ্রামের হালিশহর থানার বরকতুল্লাহর পুত্র বায়েজিদের প্রণয়ের সূচনা হয় বছর এক আগে আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। প্রথমে ফেসবুকে সীমাবদ্ধ সম্পর্কে থাকলেও পরবর্তীতে তা একে অপরের নিকটে টেনে আনে যা পরিনত হয় গভীর প্রণয়ে। নিসা যে বিবাহিত তার সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলো বায়েজিদ।

তাদের আকুল জৈবিক ক্ষুধা ধীরে ধীরে গড়ায় গভীরতায়।প্রায়‌ই দুইজন এদিকে ওদিকে যেতো সময় কাটাতে, এমনকি বায়েজিদের মেস সদস্যদের অনুপস্থিতিতে প্রায়‌ই নিসাকে নিয়ে সময় কাটাতো বায়েজিদ নিজের মেসে।

একদিন হুট করেই স্বামীর সংসার ছেড়ে বায়েজিদের কাছে চলে আসে। বায়েজিদ বর্তমানে একটা বায়িং হাউসে কর্মরত রয়েছে। কাজের সুত্রে ঢাকায় বসবাস। আপাতত বাসস্থান হিসেবে ঠিকানা রয়েছে মুগদাতে।

নিসা নিজের সাজানো গোছানো সংসার ফেলে, সন্তানের মায়া ছেড়ে চলে আসে অনৈতিক এক সম্পর্কের টানে।আসার সময় তার স্বামীকে তালাক নামা দিয়ে আসে এবং স্বামীর গচ্ছিত নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে আসে।সে যে আর তার স্বামীর সংসার করছে না ফোনে সেই সত্যি কথাও বলে আসে।অযুহাত দিয়ে আসে স্বামীর দৈহিক অক্ষমতা অথচ সে ঐ ব্যক্তির‌'ই দুই সন্তানের মা।

এদিকে বায়েজিদের কাছে আসলে বায়েজিদ তাকে গ্রহন করতে অস্বীকার করে। আসলে তার শুধু নিসার প্রতি শারীরিক মোহ ছিলো‌। স্বাভাবিক ভাবেই দৈহিক প্রয়োজনীয়তা মেটাতেই সে নিসাকে ব্যবহার করেছে।নিসার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করতেই পরিবর্তন করে নিজের সমস্ত যোগাযোগ মাধ্যম, এমনকি বাসাও।

দিশেহারা হয়ে যায় নিসা।এক দিকে নিজের হাতে সাজানো স্বামীর সংসার ছেড়ে আসা অন্যদিকে প্রেমিকের থেকে বিতারিত হ‌ওয়া।নিসা জেদ করে বায়েজিদের বিরুদ্ধে মামলা করে। ধর্ষণ মামলা!যেই কেইস এখন লড়ছে বায়েজিদের হয়ে আফনূর রেজওয়ান আর নিসার হয়ে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।

আফনূর এরকম কেইস হাতে নেয় না কিন্তু সাধারণ ধারনা নিয়ে  নিসার চরিত্রের দিকটা ভেবেই নিলো।বায়েজিদ‌ যে নির্দোষ তা সে বলছে না।কারণ কোন সাধু পুরুষ কোনভাবেই বিয়ে ছাড়া বিবাহবর্হিভূত কাজে লিপ্ত হয় না।তবুও কেইসটা নিলো কারণ সে নিসার মতো মেয়েদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে চায়।এহেন কর্মকান্ডে নারীর তরফ থেকে সায় অত্যাধিক হয়, একজন বিবাহিত নারী কেন বিবাহবর্হিভূত অথবা পরোকিয়া সম্পর্কে জড়াবে? একজন স্বামী যখন বিশ্বস্তের হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিজের সর্বস্ব তার আঁচলে সঁপে দেয় এরপ‌রও কেন তাকে অন্য পুরুষের দারে কপাল ঠুকতে হবে?নিসাদের মতো কিছু কিট শ্রেনীর নারীর জন্য বদনাম হয় গোটা নারী জাতীর। পুরুষ বিশ্বাস করতে ভয় পায় স্ত্রী শ্রেনীর সকল নারীদের। সুতরাং এদের শাস্তির আওতায় এনে যথার্থ ভাবেই বুঝিয়ে দেওয়া উচিত সকল অন্যায়ের শাস্তি আছে, অপরাধী যেই হোক, যেভাবেই সংগঠিত হোক শাস্তির বাইরে কেউ নাই। আফনূর ধর্ষনের বিভিন্ন বিশ্লেষণ দিয়ে নিজের জন্য সময় চেয়ে নিয়ে সঠিক তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে নিজের ক্লাইন্টকে জেতানোর আশ্বাসে স্থির করলো,

{ধর্ষণের সংজ্ঞা,

দণ্ডবিধি ১৮৬০–এর ৩৭৫ ধারায় ‘ধর্ষণ’কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, পাঁচটি অবস্থায় শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ বলে গণ্য করা হয়েছে—

এক. নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে

দুই. নারীর সম্মতি ছাড়া

তিন. নারীর সম্মতি আদায়, তবে তা মৃত্যু কিংবা জখমের ভয় দেখিয়ে

চার. নারীর সম্মতি নিয়েই, কিন্তু পুরুষটি জানেন যে, তিনি ওই নারীর স্বামী নন এবং ওই নারী তাঁকে এমন একজন পুরুষ বলে ভুল করছেন যে পুরুষটির সঙ্গে তাঁর আইনসংগতভাবে বিয়ে হয়েছে বা বিবাহিত বলে তিনি বিশ্বাস করেন। 

পাঁচ. নারীর সম্মতিসহ বা সম্মতি ছাড়া—তবে সেই নারীর বয়স যদি হয় ১৪ বছরের কম। 

এখন, বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের বিষয়টি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি বিয়ের প্রলোভনে নারীর সম্মতি আদায় করেন, যা ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। 

মূলত, ৩৭৫ ধারায় প্রদত্ত সংজ্ঞার বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন ‘ধর্ষণ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত হবে না। 

অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২০ এর ২ (ঙ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘ধর্ষণ’ অর্থ ধারা ৯–এর বিধান সাপেক্ষে, Penal Code, ১৮৬০ (Act XLV of ১৮৬০) এর Section ৩৭৫ এ সংজ্ঞায়িত ‘rape’। 

অর্থাৎ দণ্ডবিধি, ১৮৬০–এর ৩৭৫ ধারায় প্রদত্ত ধর্ষণের সংজ্ঞা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ;

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০২০ এর ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন। 

এই আইনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ বিবাহবন্ধন ছাড়া ১৬ বছরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তাঁর সম্মতি ছাড়া বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাঁর সম্মতি আদায় করে, অথবা ১৬ বছরের কম বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ছাড়া শারীরিক সম্পর্ক করেন, তা হলে তিনি ওই নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবে। 

এই ধারায়ও সম্মতি নিয়ে দৈহিক সম্পর্ক হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। তবে বয়স হতে হবে ১৬ বছরের বেশি। 

[বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান মনে করেন, ‘নারীর সম্মতি ছাড়া হলে সেটি রেপ (ধর্ষণ)। বয়স যাই হোক। প্রশ্ন হচ্ছে, নারীর বয়স ১৬ বা ১৮ বছরের বেশি হলে তখন সেটি ধর্ষণ হবে কি না। এখানে প্রশ্ন থাকে সম্মতি কীভাবে আদায় করা হয়েছে।’ 

বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক ধর্ষণ হবে কি না জানতে চাইলে এই আইনজীবী বলেন, ‘বিয়ের প্রলোভনে এটি (শারীরিক সম্পর্ক) কোনো রেপ (ধর্ষণ) হয় না। যদি এমন হয়, প্রাপ্তবয়স্ক (বয়স ১৬ বা ১৮ বছরের বেশি হলে) একজন নারী ও প্রাপ্তবয়স্ক একজন পুরুষ উভয়ে সম্মতিতে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। তাঁদের বিয়ের প্রতিশ্রুতি থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। তখন সেটি কখনোই ধর্ষণ না।’ 

তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো অনেক মামলায় দেখি, একজন নারী বিবাহিত এবং তাঁর বাচ্চা আছে, তিনি আবার বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মামলা করেন।’ আইনজীবী ইশরাত প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘যে নারী এরই মধ্যে বিবাহিত তাঁকে আবার বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেয় কীভাবে? তাঁকে তো বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সম্ভব না। কেননা তিনি অলরেডি ম্যারিড।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের মামলাগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অপব্যবহার। এ নিয়ে কিছু মানুষ সুবিধা নেয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারা যারা আসলেই প্রকৃত ভিকটিম (ক্ষতিগ্রস্ত)। কারণ, এই ধরনের মামলা হলে আদালতে মামলার জট বাড়ে, তখন প্রকৃত ভুক্তভোগীরা বিচার পান না।’ 

অধিকতর ব্যাখ্যায় আইনজীবী ইশরাত বলেন, ‘বিয়ের প্রলোভন বললেই তো হবে না। এমনও তো হতে পারে, একটি ছেলেকে একটি মেয়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়, পরে মেয়েটি যদি তার কমিটমেন্ট (ওয়াদা) না রাখতে পারে, তাহলে ছেলেটি কি মেয়েটির বিরুদ্ধে রেপ কেস (ধর্ষণ মামলা) করতে পারবে যে, আমাকে বিয়ে করল না কেন? সম্পর্কে জড়িয়েছিল কেন? সেটা তো সম্ভব না। তাহলে এটাও রেপ হবে না।’ 

অন্যদিকে, দণ্ডবিধি ১৮৬০–এর ৪৯৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলকভাবে আইনসম্মত বিয়ের বিশ্বাসে প্ররোচিত করে, কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে আইনসম্মতভাবে না হয় এবং ওই নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে অপরাধী সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। 

এই ধারাটি মূলত বিয়ে বলবৎ আছে বিশ্বাস করিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অতএব, এই ধারায় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বা ভবিষ্যতে বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে দৈহিক সম্পর্ক করলে তা অপরাধ হবে না।- তথ্য সূত্র আজকের পত্রিকা]}

★★★★★★★★★★★★★★★★★★

“কি খবর জাহাঙ্গীর? তোমার প্রচারণার অবস্থা কি রকম?”

“ আলহামদুলিল্লাহ বড় ভাই, আপনাদের দোয়ায় ইনশাআল্লাহ ব্যালট এবার আমাদেরটাই ভরবে।”

“ইনশাআল্লাহ।দেখো তবুও বলবো সাবধানী হ‌ও; তোমার প্রতি পক্ষ ইব্রাহীমকে হালকা নিও না।ভুলে যেও না তার শরীরের ইসহাক আবদুল্লাহর রক্ত, রাজনীতির পাঠ জন্ম থেকে রপ্ত তাদের।”

দলীয় উচ্চ পদস্থ ব্যক্তির প্রতিপক্ষ নিয়ে চিন্তা ভালো লাগলেও প্রশংসায় মুখ তেতো হয়ে গেলো।কোন রকম নিম তেতোর ন্যায় থুতু টা গিলে নিয়ে নিজের রাগকে হজম করে ফেললো‌।চাপা শ্বাসের সাথে ধীর কন্ঠে প্রত্ততর করলো,

“হালকা নেই নি তবে খুব বেশি গুরুত্ব‌‌ও দিচ্ছি না।যত‌ই রক্তে থাক, গনতন্ত্রের দৌড়ানি এখন‌ও খায়নি। ওটা না খেলে কেউ পথের রাজা হতে পারে না, সাধারণের মতিগতি বুঝতে হলে কুরুক্ষেত্রে নামতে হয়।আর আপনার বোধহয় জানা আছে আমি মাঠ পর্যায় থেকে এই পর্যায়ে এসেছি। একজন সাধারণ কর্মী থেকে এখন আমি পার্লামেন্টের সদস্য হতে যাচ্ছি। নির্ঘাত মৃত্যুকে তুচ্ছ করে নিজের এই অবস্থান গড়ে তুলেছি, সুতরাং অবশ্যই ভালো করেই জানা আছে কোন বাঁদরকে কোন কলায় ভুলাতে হয়।”

“আমি আশা করবো তুমি তোমার আত্নবিশ্বাসের ন্যায়‌ই জ্বলজ্বল করবে ভোটের দিন!”

“দোয়ায় রাখবেন!”

কথা শেষ করে ফোনটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিলো , কিছু একটা মনে করে মুচকি হাসি দিলো।

“নির্বাচন হবে, নির্বাচিত এমপিও হবে তবে সেটা পূর্ব সিলেক্টেড,এই জঘন্য এলাকার অতি মূর্খ মানুষ কিভাবে বুঝব কে তাদের জন্য মঙ্গল? কেই বা আগামী পাঁচ বছরের তাদের ভাগ্যের কারিগর? অবশ্য তাদের জন্য উত্তম আমার চেয়ে আর কে হবে? যেই মানুষ নিজের দলের সাথে প্রতারণা করে সেই কিভাবে সাধারণ জনগণের জন্য কাজ করবে? আবেগ; আবেগ ঠিক এভাবেই সব শেষ করে দেয় ইব্রাহিম!আবেগ দিয়ে চলা লোক রাজনীতিতে মানায় না!তোমাকেও জনগণের প্রয়োজন হবে না।”

কি যে খিচুড়ি পাকাচ্ছে এই ভূঁইয়া তা কেবল সেই জানে। গনতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কথা বলা অতিমাত্রায় সংবেদনশীল লোকদের মাঝেই দোষের তীব্রতা থাকে বেশি।এরা নিজেদের অধিকার আদায়ে এতটাই সোচ্চার হয় যে ঠিক কখন অন্যের অধিকার হরণের প্রত্যক্ষ - পরোক্ষ ভূমিকায় অগ্রসর হয়ে থাকে তার‌ই নেহায়েত ধারনা রাখার প্রয়াস মাত্র করে না।

★★★★★★★★

√√তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন ঢাকা বিভাগের ঢাকা জেলার অন্তর্গত সাভার উপজেলার অধীন সাভার মডেল থানার একটি ইউনিয়ন। ইউনিয়নটির আয়তন ১৫.৫৫ বর্গ কিলোমিটার। ইউনিয়নের রাজফুলবাড়িয়া এলাকায় তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় অবস্থিত। ইউনিয়নটিতে পোশাক কারখানাসহ অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।[১]

'হেমায়েত পুর উচ্চ বিদ্যালয় ' সরকার পরিচালিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়।এই ইউনিয়নে মোট দুটো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম এটা।আজ তারাজদের মিটিং হবে এই বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে। একপাশ করে মঞ্চ তৈরি করা যার মুখোমুখি করে রাখা হয়েছে প্রায় শ'দেড় আর‌এফএল প্লাস্টিকের কেদারা। সাধারণ নাগরিক থেকে স্থানীয় সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আনাগোনায় গিচগিচ করছে প্রতিটি কোনা।তিল ধারণের ক্ষমতাও নেই কোথাও। তাদের মাঝে মধ্যমনি হয়ে সকলের আদেশ, উপদেশ, অনুরোধ মনোযোগ দিয়ে শ্রবন করছে এমপি পদপ্রার্থী ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার। সুদর্শন এই পুরুষের সৌন্দর্য অবলোকনে বাদ যাচ্ছে না কেউ‌ই ।নবম - দশম থেকে অষ্টম শ্রেণীর বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরাও।তারা ছাদের রেলিং ঘেঁষে, নিজের শ্রেনী কক্ষের বারান্দায় ঝুলে ছোট ছোট নজরে গিলে নেওয়ার মতো করেই তাকিয়ে দেখছে।এতো মানুষের মাঝে কোন রকমে মুখটা দেখা গেলেও তাতেই তারা বেশ আপ্লুত অথচ মনে করলো না এদের মাঝে বয়সের ফারাক।এই স্কুলের সুন্দরী শিক্ষিকারাও এই দিকে কম যাচ্ছে না। তারাও ভাবী এমপির দৃষ্টি আকর্ষণে বেশ মনোযোগী হয়েছে। নিজেদের পরিপাটি করে বিভিন্ন ছুতোয় মুখোমুখি হ‌ওয়ার প্রয়াসের অবিরত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

 প্রথমে সংবর্ধনায় স্বাগতমি ফুলেল শুভেচ্ছা, ছোট শিক্ষার্থীদের হাতে ব্যাচ পরিধান,স্বাগতম জানিয়ে কেক কাটা থেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপস্থাপন এবং পরিশেষে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিজস্ব এলাকার ভবিষ্যত নিয়ে আগামী চিন্তা ভাবনার দিকগুলো তুলে ধরলেন ইব্রাহিম তারাজ খন্দকারের সান্নিধ্যে।সবার সবটা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন ভবিষ্যত মাননীয় এমপি মহোদয়। শুধু শোনাই নয় সাধারনের মতবাদের উপর নিজের বক্তৃতা তৈরী করলো। মনে মনে বারবার মুখস্থ করলো কিভাবে তাদের মনের মনিকোঠায় নিজেকে সমাসীন করা যায়। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে নিজস্ব ভঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করলো,

“আসসালামু আলাইকুম”

থামলো একটু, বিপরীত থেকে সম্বস্বরে সালামের উত্তর আসলো,স্ট্যান্ডে লাগানো মাইকটাকে খুলে হাতে নিলো,ফুলেল মঞ্চ থেকে নেমে কাঠের তৈরি ধুলোয় মাখোমাখো কার্পেট বিছানো পাটাতনের ওপর দাঁড়ালো, পিছনে র‌ইলো স্টেইনলেস স্টিলের সেই দন্ডটা যাতে মাইক ঝুলিয়ে সকলে বক্তৃতা দেয়।

এক হাত পিছনে নিয়ে পিঠে ঠেকিয়ে ধরে,অন্য হাতে মাইকটা ধরে নিজের মুখের নিকটবর্তী তুলে নিয়ে মিষ্টি কন্ঠে উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“সবাই কেমন আছেন?”

'ভালো।আলহামদুলিল্লাহ।অনেক ভালো' এমন‌ই উত্তর আসলো একসাথে বিপরীত থেকে।তারাজ হাঁসি হাঁসি মুখ করে শুধালো,

“আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না আমি কেমন আছি?”

সবাই একটু লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলো,কেউ কেউ উচ্চস্বরে শুধালো।তারাজ মুখে হাসি বজায় রেখেই বলে চললো,

“আলহামদুলিল্লাহ্ আল্লাহর রহমতে আপনাদের  আর আমার বাবা মায়ের দোয়ায় অনেক অনেক ভালো আছি। আশাকরি এই ভালো থাকা দীর্ঘ হবে এবং তাতে আপনারাই আমাকে সাহায্য করবেন।....

- আমি অন্য সবার মতো এই করবো সেই করবো বলে আপনাদের আশা দিবো না, আপনাদের জন্য জীবন দিয়ে দিবো তাও বলবো না।আমি শুধু বলবো আমি নিজের সবটুকু শ্রম,ধ্যান আপনাদের সেবায় নিয়োজিত করতে আগ্রহী, আল্লাহ আমাকে সামর্থ্য দিয়ে যতটুকু পরিনত করেছেন ততটাই যদি আমার জীবনের অন্তিম অবধি রাখেন আমি বিশ্বাস করি,উপর‌ওয়ালার প্রতি পুর্ণ আস্থা রেখে বলতে পারি আমি পারবো আপনাদের সেবায় থাকতে।তবে আমাকে অবশ্যই আপনাদের সহায়তা করতে হবে।আমি যদি আপনাদের নিকট সাহায্য চাই তবে কি করবেন না?

সামনে থেকে ভেসে এলো হ্যা করবো।তারাজ নিজের বক্তব্য চালিয়ে গেল,

 "এই তো করবেন।অবশ্যই করবেন!এখন প্রশ্ন আসতে পারে আপনারা কিভাবে সাহায্য করতে পারেন? আপনারই পারেন!আপনারাই আমাদের মূল সাহস। আপনাদের একটা সিলে যেভাবে আমরা এই মর্যাদায়,ক্ষমতায় থাকি ঠিক তেমনি আপনাদের মাধ্যমেই আমরা একে সম্মানিত করতে সমর্থ হ‌ই।এর জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে আপনাদের কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞ।তারা জানেই না তাদের ক্ষমতা ঠিক কতটা, কোথায়!আর এই সুযোগটাই নেয় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা।আমিও নিচ্ছি এবং হয়তো ভবিষ্যতে‌ও নিবো।কি বলেন তো আমি কিন্তু তুলসী পাতা ন‌ই, আমার চরিত্র ফুলের মত পবিত্র‌ও নয়!আমার মাঝেও স্বার্থের টান আছে! আছে নিজেকে বড় ভাবার মতো অহংবোধ! এটাই স্বাভাবিক, পরিশেষে আমিও মানুষ। কিন্তু তাই বলে এই নয় অপরদিকের মানুষের কথায় আমার মনোভাব পরিবর্তন হয় না। তাদের কষ্টে আমার কষ্ট হয় না। তাদের নিয়ে আমি ভাবছি না।আমি স্বার্থপর আমার নিজের জন্য হলে,আমাকে যারা ভালোবাসে তাদের জন্য ঠিক কতটা স্বার্থপরতা করতে পারি তা হয়তো অনেকেই জানেন যারা আমার পরিচিত, এবং ভবিষ্যতে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ চাইলে আপনারাও সবাই জানবেন।এর জন্য আমাকে একটা সুযোগ দিন যাতে আমি আমার প্রিয় জনদের জন্য ঠিক কতটা স্বার্থপরতা দেখাতে পারি তা প্রমানিত করতে পারি।

একটু থামলো, এরপর আবার বলতে শুরু করলো,

"আমি এত সময়ে আপনাদের স্থানীয় সম্মানিত নেতাকর্মীদের দ্বারা আপনাদের টুকিটাকি প্রয়োজনীয়তার কথা শুনেছি,শুনেছি আপনাদের এলাকার নানা সমস্যার কথা। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ পূরণ করলে এবং আপনাদের দোয়া থাকলে সবগুলোর সমাধান হবে,আমি নিজের উপর বিশ্বাস রেখেই বলছি।এই যে সমস্যাগুলো শুনলাম নেতাদের দ্বারা, আমি চাইবো এগুলো আপনারাই বলুন। আপনাদের যেকোন সমস্যার কথা সরাসরি আমাকে বলুন।স্থানীয় প্রশাসন কিংবা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অথবা দায়িত্ব পালনে রত যেকোন পজিশনের মাধ্যমে আপনারা আমার কাছে নিজেদের যেকোন প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পারেন, এমনকি যদি কোন মানুষ এমন পর্যায়ভূক্ত তারা সহায়তা করতে অসম্মতি জানায় তাহলে আপনারা সরাসরি আমার সাথে যোগাযোগ করুন। যোগাযোগ করুন আমার দলীয় ছেলেদের সাথে। আশাকরি হতাশ হবেন না।আর এভাবেই হয়ে যাবে আপনাদের সহযোগিতা পাওয়া। মানে আমি বলতে চাচ্ছি এভাবেই আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন। নিজেদের যেকোন সমস্যার কথা, প্রয়োজন সরাসরি আমাকে বলে সাহায্য করতে পারেন।যাতে আমি জানতে পারি আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা ঠিক কি চাইছে,আমি কিভাবে তাদের কাজে আসতে পারি। আমি আপনাদের সেবায় শতভাগ নিজেকে বিলাতে চাই, তার বিনিময়ে চাইবো ভরসা, বিশ্বাস,আস্থা। আমার প্রতি এবং আমার দলের প্রতি।

--আমি বিশ্বাস করছি আপনারা করবেন।তাই অনুরোধ করবো কখনো আমার বিরুদ্ধে শোনা কথায় কান দিবেন না।যদি কখনো আমার সম্পর্কে কিছু শোনেন আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করবেন,আমার বাড়ির দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। 

- সরকার এবং সরকারের অধীনস্থ সকল মানুষ‌ই সাধারণ জনগণের সেবায় থাকে, সেক্ষেত্রে এটাকে চাকরি বলা যায়।আর চাকরি করে মানেই হলো চাকর।আমিও নিজেকে তেমনি চাকর মনে করেই আপনাদের সেবায় থাকবো। সুতরাং আমার বাড়িতে যেতে হলে আপনাদের ভাবতে হবে না। সবসময় নিমন্ত্রিত থাকবেন,যেকোন প্রয়োজনে, যেকোন সময়ে।আর যদি কেউ যেতে না পারেন তবে তাদের জন্যেও রয়েছে সুন্দর বন্দোবস্ত। আমাদের নিজস্ব একটি ওয়েবসাইট রয়েছে,যেটাতে আপনারা সরাসরি আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন।আমার ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজেদের প্রয়োজন, সমস্যা,অনুযোগ সব শেয়ার করতে পারেন, জানাতে পারেন আমাদের ভুলত্রুটি গুলো। উপদেশ দিয়ে সাহায্য করতে পারেন। সরাসরি আমি‌ই তা দেখবো, দেখবে আমার নিয়োজিত এডমিন প্যানেল। এরপর সেই অনুযায়ী করা হবে পরবর্তী কর্মসূচি। আশাকরি এটাতেও আপনাদের অনেক উপকার হবে।

-- অনেক লম্বা বক্তৃতা দিয়ে ফেলেছি,আর বলবো না।যদিও আমি শুরুতেই বলেছিলাম আমি এই করবো সেই করবো বলে আপনাদের আশ্বস্ত করবো না। তবুও অনেক কিছু বলেছি, কিন্তু কিছু কথা কিন্তু রয়েই যায় সেগুলো না হয় কাজে করে দেখিয়ে দিবো।আমি আপনাদের দোয়াপ্রার্থী, আপনাদের স্নেহের কাঙাল,আমাকে দোয়ায় রাখবেন,স্নেহ করবেন।আর একটা ভোট দিয়ে সুযোগ করে দিবেন যাতে আমি আগামী সাংসদ নির্বাচিত হতে পারি।পারি আপনাদের কাছে বারবার ফিরে আসতে, জানতে পারি আপনাদের গল্পগুলো। আসসালামু আলাইকুম,সবাই ভালো থাকবেন, একসাথে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট উৎসব পালন করুন। কোনরকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষতির কারণ হবেন না।আমি আমার প্রিয় সমর্থকদের উদ্দেশ্য তাই অনুরোধ করবো।নিজ নিজ দলকে সম্মান করবেন এবং অন্য দলীয়দের নিজস্বতাকে সম্মান করবেন। আল্লাহ হাফেজ!"

করতালির উচ্ছ্বাস আর উল্লাস ঝড়ে ভেসে যাচ্ছে পুরো মাঠ এড়িয়া,তারাজ পকেটে ঝুলানো রোদ চশমা নিজের চোখে পড়ে নিলো।ধীর পায়ে হেঁটে গেলে, নিজের আসনে বসলো রাজাধীরাজের ন্যায়।তালির শব্দে এখনো চারিদিক মাতোয়ারা। সুমধুর কন্ঠে বজ্রাঘাতের ন্যায় তেজি চাহনিতে সামনে দৃষ্টি আবদ্ধ। তারপর আর‌ও কিছু নেতাদের হালকা পাতলা বক্তৃতা দিয়ে শেষ করলো আয়োজন। এরপর চলবে মধ্যাহৃ এর খাওয়া দাওয়া।এরমধ্যেই চলে এলেন ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের গাড়ি।মাঠের এক পাশে গাড়ি থামিয়ে সহধর্মিণীকে আদেশ করলেন গাড়িতেই থাকার।তারাজের পাঠানো এবং স্থানীয় কিছু ছেলেপুলের সাহায্যে মঞ্চে পৌঁছালেন।

“আসসালামু আলাইকুম আব্বা!”

"ওয়ালাইকুম আসসালাম!কি অবস্থা এদিকে?”

“ আম্মা কোথায়?”

“গাড়িতেই আছে, তোমার এদিকের কাজ শেষ?”

“জ্বী চলুন;আম্মাকে নিয়ে আসতেন, আচ্ছা আমি নিজেই নিয়ে আসবো।একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো!”

“আসবে,তবে এখানে নয়।এত মানুষের মাঝে তোমার আম্মা স্বস্তি পাবে না।

- কার সাথে?”

“চলেন। দেখাচ্ছি!”

কথা বলতে বলতে তারাজ নিজের বাবাকে ভেতরে নিয়ে আসলো, ততক্ষণে পথে পথে অনেকের সাথেই কুশলাদি বিনিময় করলেন ইসহাক আবদুল্লাহ,স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার, নেতাদের সাথেও আলাপে আলাপে যথা স্থানে পৌঁছে এলো।

একজন সম্মানিত তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে এবং আগাম এমপির পিতা হিসেবে সম্মান পেলেন যথার্থ। তাদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসিয়ে তারাজ নিজেই বেরিয়ে গেল নিজের মা'কে আনতে!

মহিলাদের জন্য নির্ধারিত পাশে নিয়ে একজন স্থানীয় নারীর সাথে মা'কে পরিচয় করিয়ে দিলো,তিনিও অতি যতনে নিজের পাশে বসিয়ে ভোজের দেখভাল করলেন।খাওয়া দাওয়ার শেষ প্রান্তে উপস্থিত হলেন রেজওয়ান করিম।


পর্ব ১৪ 

“অকুন্ঠ অনুভূতি,

প্রিয়া কিংবা প্রেয়সী কোনটাই অভিবাদন করে নিজের একান্ত আপন ভাবার অধিকার এখন‌ও দেওয়া হয়নি,তাই চেয়েও নিজেকে দমিয়ে রাখছি!

নিজস্ব সত্তার বাইরে গিয়ে এক অন্যরকম আমিতে পরিণত হয়েছি কেবল‌ই আপনাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য। হয়তো আমি আপনার যোগ্যতার বাইরে,অপ্রতুল খুতের সঞ্চার নিয়ে আপনাকে চাওয়ার যেই দুঃসহ শপথ পাঠ করেছি তার জন্য আমাকে আপনি বৎসনা করছেন, হয়তো ঝড়ে যাওয়া বুনোফুলের ন্যায়‌ই করছেন অবহেলা।তবুও আমি আপনাকেই চাইবো।আমার এই কথাকে বাল্যপনা লাগছে না?হয়তো লাগছে! কি করবো বলেন তো; হয়ে গেছি আমি এমন! পৌঁছে গিয়েছি সেই বাল্যকালে যেথায় সকলে প্রিয় কিছুকে আপন করতে এমন‌ই পাগলামি করে।

আচ্ছা বলেন তো কেন করছেন এমন আমার সঙ্গে? কোথাও কি সত্য‌ই আমি অযোগ্য; উত্তরের অপেক্ষায় আর কত লগ্ন চাতকের মতোই ছটফট করবো? কেন দিচ্ছেন না জবাব! জানেন না প্রেমিকের কাছে এহেন অপেক্ষা মৃত্যু সম! দিবেন না এমন বেদনা! আমি আপনার তিরষ্কার সয়ে নিবো! সয়ে নিবো আপনার বিরহের তরে ছেয়ে যাওয়া কাতরতা তবুও স‌ইতে পারবো না আপনার এহেন অবহেলা,পারবো না মানতে আপনার এমন নিরবতায় রেখে দেওয়া এক ব্যাকুলতায় অস্থির চিত্তের মরনার্তনাদ! দয়া করে উত্তর দিন! জানি খুব বিরক্ত হচ্ছেন তবুও বলবো অন্তত একটা উত্তর দিন,দয়া করুন!"

.......

সাদা পৃষ্ঠায় দৃশ্যমান ড্রাফটের দিকে এক পলক তাকিয়ে দোনামোনায় আঙ্গুল গুলো কি-বোর্ডের উপরেই ঘূর্নায়মান থাকলো মিনিট কতেক, লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো। অবশেষে চাপ দিয়েই দিলো।চলে গেলো TuliAhnafs789@gmail.com নামের ই-মেইল ঠিকানায়। অপেক্ষা অপরদিক থেকে ফিরতি উত্তরের।তবে তাও আসবে কি-না জানা নেই!

“তাজিশ খেতে আসো!”

বড় বোনের ডাকে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টা করলো,ল্যাপটপ বন্ধ করে ছোট্ট একটি শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ট্রাউজারের দু-পকেটে দু হাত ঢুকিয়ে 

ধীর পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।তাজিশ দরজা পেরিয়ে যেতেই টুং করে শব্দ করে আলো জ্বলে উঠলো মুঠোফোনের বার্তা ঘরে।তাজিশ ফোনটা নেয়নি।তাইতো দেখতেও পেলো না কাঙ্খিত ব্যক্তির তরফ থেকে পাওয়া প্রত্ততরটি।

টেবিলে.....

“তোমার সাথে তার পরিচয় কিভাবে হলো?”

“পরিচয় হয়নি,যেচে করেছি!”

“মানে?”

“আব্বা আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই,যদিও জানি এখন তার জন্য উত্তম সময় না তবুও এখন‌ই বলতে চাই”

তারাজ খেতে বসলে খুব একটা কথা বলে না। সুতরাং এমন সময় যখন কিছু বলার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং তার মুখোভঙ্গিতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যেনতেন বিষয়ে নয়।তাই মুখের ভেতরে থাকা খাবারগুলো চিবুনো বন্ধ করেই হালকা শব্দে তারাজকে বলার জন্য আদেশ করলো।

তারাজ একবার টেবিলে বসা তার পুরো পরিবারকে ভালো করে দেখে নিলো।সবাই তার দিকে উৎসুক জনতার ন্যায় কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।এরপর নিজের প্লেটে চোখ রেখে পঞ্চ অঙ্গুলির সহায়তায় ভাতের সাথে ডিমের ঘন তেলচে মসলা মাখাতে মাখাতে সহজ শব্দে বলেই দিলো অতি ভয়ংকর কথাটা।

“আমি রেজ‌ওয়ান করিমের একমাত্র মেয়ে আফনূর রেজওয়ানকে পছন্দ করি; সহজ কথায় আমি তাকে বিয়ে করতে চাই!”

সহজ একদম কোনরকম,ভনিতা কিংবা দোনামোনা, কোনরকম অস্বস্তি তার মাঝে দৃশ্যিত নয়।কথাটা শেষ করেই লোকমা তুলে মুখে পুড়লো।একবার‌ও তাকালো না কোনদিকে।অথচ তার কথায় কি প্রভাব হলো চারপাশে তার অবলোকন করার দায়‌ও তার নেই।

“ কি বলছো এসব?”

মুখ খুললেন ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের সহধর্মিণী।নিজ পুত্রের এহেন কথায় খুশি হ‌ওয়ার কারণ থাকলেও তার কাছে আপাতত 

বিষ ন্যায় ঠেকলো।কোন মতেই এটা আশাকৃত বাক্য ছিলো না। কিভাবে ভালো লাগবে!তিনি আর‌ও কিছু বলবেন তার আগেই মুখ খুললেন ইসহাক আবদুল্লাহ।

“মাথা ঠিক আছে তোমার?”

আঙ্গুলের কারিশমা থামিয়ে পেটের উপরেই হাত চাপা রেখে,নিজ পিতার পানে নিরুত্তেজ গলায় বললো,

“জ্বী আলহামদুলিল্লাহ আপনাদের দোয়ায় সুস্থ আছে!”

ইসহাক আবদুল্লাহ ছেলের হেয়ালিপনায় বিরক্ত হলেন,তেতো মুখে দাঁত চিবিয়ে রাগ নিগড়ে বললেন,

“হেয়ালি করবে না! অন্তত আমার সাথে তো নয়‌ই!”

“আমি হেয়ালি করছি না আব্বা, সিরিয়াস! বিয়ে করলে আফনূরকেই করবো! অন্য কাউকে না!”

শেষ কথাটা নিজ মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,ছেলের মুখোভঙ্গিতে কোনরকম দ্বন্ধতা ভাসলো না।তা নিয়ে আহত হলেন তাজিয়া খাঁ।মায়ের বাধ্য সন্তান তারাজ।সে যে কখনো মায়ের অবাধ্য হবে, কখনো মায়ের সাথে দ্বিমতে যাবে তা তো ভাবনার দ্বিকুলে ছিলো না। তিনি এবার‌ও কিছু বলার আগেই বলে উঠলেন ইসহাক আবদুল্লাহ,

“যেচে নিজের জন্য খাল কেটে কুমির আনতে চাচ্ছো কেন? কি চলছে তোমার মাথায়?”

“কুমির না ,ব‌উ আনতে চাচ্ছি আব্বা।বয়সতো কমছে না।বেড়েই চলছে! এইতো নির্বাচনের পরেই বত্রিশে উঠবে, এখনও বিয়ে করাবেন না!ব‌উ নিয়ে রোমান্স করার স্বাদ জাগছে আব্বা!দাদা হতে চান না?”

ভাতের লোকমা সাজাতে সাজাতে শেষ কথাটা বললো তারাজ, এদিকে তার কথায় চোখ বড় হয়ে গেল তাজিশের! খাবার গলায় আটকে নাকেমুখে জ্বালা ধরলো তানহার স্বামী বাদলের। তানহা ভাইয়ের কথায় হতভম্ব হয়ে গেলেও স্বামীর এমন নাস্তানাবুদ পরিস্থিতিতে তাকে সামলাতে উঠে দাঁড়ালো,পিঠে বার কয়েক পাতলা চাপড় দিলো। তাজিয়া খাঁ তাড়াতাড়ি পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো।মাথায় হালকা চাপড়ে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা করছে।এর মাঝে নিরুত্তাপ কেবল তিনজন ব্যক্তি; ইসহাক আবদুল্লাহ, ইব্রাহিম তারাজ, ইউসুফ তাজিশ।

“তুমি জানো তোমার আম্মা তোমার জন্য তার বান্ধবী..”

“জীনবটা আমার, একটা জীবন একসাথে আমি‌ই কাটাবো,তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটাও আমার‌ই থাকা উচিত নয়কি?”

হাতে তৈরি লোকমা প্লেটে রেখে দিলো ইসহাক আবদুল্লাহ, বিদ্রুপের সুরে বললো,

“শত্রুর মেয়েকে ঘরে তুলে আনা কোন ধরনের সিদ্ধান্তের মধ্যে পড়ে ইব্রাহীম ভাই?”

ইসহাক আবদুল্লাহর কথায় এবার সবাই ভ্রু কুঁচকে একে অপরের দিকে তাকালো,এখানে চলমান কথায় তারা শুধু এতটুকুই এই অবধি বুঝেছে তা হচ্ছে ইব্রাহীমের পছন্দ আর ইসহাক আবদুল্লাহ এবং তার সহধর্মিণীর পছন্দ এক নয়। কিন্তু শত্রু শব্দটার সাথে তাদের কৌতুহলের চেয়ে আতংকিত হতে বেশি দেখা গেল।তারাজ যে মায়ের পছন্দের কন্যাকে নিজের জন্য পছন্দ করেনি তাতো অনেকেই আগের থেকেই অনুধাবন করতে সমর্থ ছিলো কিন্তু তাই বলে এভাবে সবার সামনে খোলাখুলি করে বলবে তা বুঝতে পারেনি। তাছাড়াও এতদিন তারাজের ঠোঁট পাতলা খবর কেবলই তারা খবরের পাতা কিংবা রঙিন পর্দায় দেখার ন্যায় শুনেছে , বাস্তবে দর্শন কিংবা শ্রবন করার সৌভাগ্য তাদের হয়নি।

“শত্রু?কে শত্রু?”

“তুমি আগামী সাংসদ হবে,আর এখন তুমি বলছো বিরোধীদলীয় এক সাবেক ভয়ংকর নেতার মেয়েকে বিয়ে করবে? বিরোধীদলীয়! আসলেই তারাজ! তুমি তোমার মায়ের পছন্দকে তুচ্ছ করছো ঠিক আছে মেনে নিলাম। তোমার পছন্দ থাকতেই পারে।আমি কখনোই তোমার উপর এই বিষয়ে কিছু চাপিয়ে দিতে চাইনি।তুমি যাকে ভালো বুঝবে আমরাও তাকেই গ্রহন করে নিবো তাই বলে শত্রু পক্ষের!”

টেবিলে চাপড় মেরে কথাটা বললো ইসহাক আবদুল্লাহ, তারাজের বিরক্তি বেড়ে গেল।সে চাইছিলো শান্তি মতো কথা বলতে তাইতো খাবারের সময়টা পছন্দ করে নিলো কথা বলার জন্য যাতে তার বাবার রাগটা দমিত থাকে কিন্তু বাপ তার এতো  বেশি উত্তেজিত হচ্ছে কেন!নাহ,সে রাগবে না। তাহলে কাজ হবে না। নমিনেশন পেপার জমা দেওয়ার সময় নানা শর্ত ছিলো তা পূরণ করেই নমিনেট হতে হয়,তখন তারাজ নিজের সাথেও একটা ওয়াদা করেছিলো,'সে কখনো হুট রাগ রাগবে না,রেগে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিবে না। পরিস্থিতি যাই হোক রেগে যাওয়া যাবে না!' নিজেকে দেওয়া শর্ত পালনে ঠান্ডা মাথায়,

“আগে শান্ত হোন! ঠান্ডা মাথায় আমার কথা শুনুন।”

বাবা ছেলের উত্তপ্ত বাক্যে জর্জরিত সাধারণ সদস্যরা এবার একটু শ্বাস ছাড়লো,কারণ তারাজ ঠান্ডা থেকে বিষয়টি সামলে নেওয়ার প্রচেষ্টা করছে তার মানে সমস্যা সমাধানের পথ পেয়েছে।সবার প্লেটেই অর্ধ মাখা খাবার গড়াগড়ি খাচ্ছে, তারাজ সবার দিকে একবার তাকিয়ে বাদলের উপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে শান্ত গলায় বললো,

“কথা না গিলে খাবার গিলুন!পরে বলবেন শালারা না খাইয়ে রেখেছে!”

বাদল হতাশ হলো।এই শ্যালক তার বড়‌ই বেততামিজ বনে যাচ্ছে।রসকস ছিলো না কখনোই।কখন যে আবার রসের হাঁড়িতে চুব খেলো আল্লাহ মালুম।তবে তাতে মনে হচ্ছে মুখের খিল খুলেছে নয়তো এভাবে কথা গত বৈবাহিক জীবনে সে এই লোকের মুখ থেকে শুনেনি। কিন্তু যাই হোক ছোট বড় বিশেষ করে বাচ্চার সামনে এভাবে বলতে দ্বিধা করলো না।খুব‌ই আহত হলো। পর মুহূর্তেই উদিত হলো এই বেচারা আপাতত নিজের কাঙ্খিত নারীকে আপনগৃহে স্থান দেওয়া নিয়ে যুদ্ধে সামিল এখন সে দুই চারটা উটপটাৎ বলতেই পারে তা ধরে বসে থাকলে চলবে না।

তারাজ খাবারের প্লেটে অল্প কয়টা ভাত নিলো সাথে নিলো পাতলা মশুর ডাল,লেবু চিপড়ে লবনের সাথে মিশিয়ে ভাতের লোকমা তৈরি করতে করতে বলতে থাকলো,

“রেজ‌ওয়ান করিম; এক সময়ের বিরোধীদলীয় দাপুটে মাঠ কর্মী।স্থানীয় এলাকায় বেশ দাপট ছিলো তার সাথে ছিলো দলীয় উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের সাথে উঠা বসা দৃষ্টি কাড়ার মতোই। আর্থিক ভাবে উচ্চ বিত্তের কাতারে থাকায় অনেক নেতাই তাকে জ্বী হুজুর করতো।কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পদ দিতে আগ্রহী দেখাতো। রেজওয়ান করিম‌ও একরকম প্রস্তুতি নিয়ে নিচ্ছিলো এর মধ্যে শুরু হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন। চারদিকে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লো রাজনৈতিক বিভিন্ন দলীয়, সাংগঠনিক নানা ব্যক্তিবর্গ। সামরিক বাহিনীর দৃষ্টি ছিলো তৎকালীন সরকার এবং সরকারের অধীনস্থ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বরত সকল কর্মীদের উপর।সেই অনুযায়ী আগাতে থাকলেন।চাপে পড়ে গেল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সকল নেতাকর্মীরা।ছোট থেকে বড়,পথ  কিংবা মাঠ থেকে প্রধান কার্যালয় বাদ যায় নি কেউ‌ই! সবাইকে যেতে হলো চৌদ্দ শিকের ভেতরে।নিতে হলো লাল দালানের মোটা চালের ভাত আর অর্ধ পচা তরকারির বিষাদিয় স্বাদ। তাদের তালিকা থেকে বাদ পড়েনি রেজ‌ওয়ান করিম সহ তার বড় ভাই রাজীব আকন্দ।রাজীব আকন্দ ধরা পড়ার কারণ ছিলো ছোট ভাইয়ের রাজনৈতিক ক্ষমতায় দিশেহারা হয়ে যা খুশি তাই করতো। এমনকি নিজ এলাকায় মাদকের জাল বিছিয়ে দিতেও দ্বিধান্বিত হয়নি, করেনি কুন্ঠিত নিজের লোভকে।তৈরি করেছিলো নারী ব্যাবসার বিভৎস অবস্থান।আপন ছোট চাচার ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পিছু হটেনি তার একমাত্র ভাতিজা রাইয়াজ।রাইয়াজ অর্থ আর ক্ষমতায় দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল।যদিও চাচা তার কোন পদে ছিলো না তবুও তার অহমিকার অন্ত ছিলো না। অর্থ ভারে নুয়ে পড়তো যেকোন রাজনৈতিক নেতা তাই হয়তো তার এতটা ঔদ্যতা ছিলো।তাই তার কোন কিছুতেই লাগাম ছিলো না কিন্তু এত কিছুর মাঝেও পরম নির্লিপ্ত ছিলো মূখ্য ব্যক্তি রেজ‌ওয়ান করিম।

যেই ক্ষমতার দাপটে তার আত্নীয় বর্গ অস্থির ছিলো তা নিয়ে সে ছিলো নির্লিপ। বিশেষ কোন অনুভূতি তার মাঝে দেখা যেতো না।সে ছিলো নিষ্ঠ কর্মী,কেবল দলের জন্য করে গেলেই তৃপ্তি এতো।তবে তার কন্যা আফনূর রেজ‌ওয়ান যেন সেই অনুভূতির সুপ্ত বাসনা লালিত করছিলো ছোট্ট হৃদকুঠিরে। রঙিন ছবিতে বুনতে শুরু করেছিলো অনেক অনেক ধারনা, কিন্তু সেগুলো অচিরেই বিতারিত হতে চলছিলো।"


পর্ব ১৫


আম্মা আমার খুশির চেয়েও কি বড় কিছু তোমার জন্য আছে?”

ছেলের কথায় ছলছল চোখে সেদিকে তাকালো তাজিয়া খাঁ! কথাটা তার ছেলে খুব সহজেই বলে দিলো অথচ ভাবলোও না এতে মায়ের মনে কতটা আঘাত লাগলো। তারাজ মায়ের চোখে পানি দেখে নিজের প্রতি ধিক্কার দিলো। কিন্তু! সেতো অন্যায় কোন আবদার করেনি।তার যাকে মনে ধরেছে তাকেই নিজের করে পেতে চাইছে তবে মা কেন?না সে তার মায়ের হেঁয়ালি আবেগে গাঁ ভাসিয়ে নিজের ভালোবাসাকে ভেসে যেতে দিবেনা। সে একজন পরিপূর্ণ বয়সী যুবক, নিজের ভালোমন্দ বুঝার যেমন বয়স হয়েছে,তেমনি হয়েছে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা। খামখেয়ালিপনায় মাতা তার দ্বারা সম্ভব নয়।বাল্য কালে খেলার ছলে করা ওয়াদায় সে কোনভাবেই নিজের পরিপূর্ণ মস্তিস্কের সিদ্ধান্তকে তুচ্ছ করতে পারে না। তাছাড়া আফনূর কেবল‌ই তার আবেগ কিংবা ক্ষনিকের অনুভূতি নয়,সে তার যৌবনের প্রথম আকাঙ্ক্ষা, স্নিগ্ধ অনুভূতি, পবিত্র প্রেমের কবিতা। কোনমতেই সে আফনূর নামক রমনীকে ভুলতে পারবে না।যে কিছুর মূল্যেই হোক আফনূর রেজওয়ানকে তার চাই।তার জন্য নিজের স্বপ্নকে বাজি ধরে বিরোধীদলীয় বিতর্কিত নেতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে। শুধু মাত্র আফনূর নামক শ্যাম কন্যাকে পাবার আশায় নিজের সবটা বলিতে চড়িয়েছে। কিন্তু মা! মা'কে তো আঘাত করতে পারবে না তারাজ! মায়ের চোখে পানি তার কাছে মৃত্যুসম। মা'কে কিভাবে বোঝাবে?

তারাজ মায়ের পায়ের নিচে বসে দুই হাতে মমতাময়ীর কোমল হাত দুটো আঁকড়ে ধরলো,

“আম্মা ক্ষমা করে দাও, তোমার মনে আঘাত করার জন্য! কিন্তু বিশ্বাস করো আম্মা আমি সত্যি এই মেয়েটাকে ভালোবাসি! আর আমাদের তো তাকেই আপন করা উচিত যাকে আমাদের মন চায়! মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ কি সুখী হয় আম্মা? তুমিই বলো যদি আমি তোমার পছন্দের মেয়েটাকে সুখী করতে না পারি তবে কি তোমার ভালো লাগবে?তুমি তো জানো আমি পছন্দ করি না মায়াকে! ওকে সবসময় ছোট বোনের চোখে দেখেছি,এখন আমি কি করে? প্লিজ আম্মা এমন করে মুখ ফিরিয়ে নিও না। তোমার চোখে পানি আমার জন্য মৃত্যুর চেয়েও কঠিন শাস্তি!এর চেয়ে তুমি আমায় বিষ খাইয়ে দাও আমি শান্তি পাবো, কিন্তু এতটা কঠোর হ‌ইও না। তোমার অনুমতি ছাড়া আমি কোনভাবেই নিজের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে পা রাখতে পারবো না।প্লিজ আম্মা ; জীবনে সব চাওয়ার আগেই দিয়েছো তবুও এই শেষ বারের মতো চেয়ে নিচ্ছি।দয়া করে এভাবে মুখ ফিরিয়ে রেখো না আম্মা”

ছেলের আকুতিতে প্রাণ ফেটে যাচ্ছে তাজিয়া খাঁ এর।তার কাছে সন্তানের সুখ আগে। নিঃসন্দেহে তিনি একজন সন্তান পাগল মা।যে নিজের সন্তানের খুশির জন্য সব করতে পারে। কিন্তু তিনিও তো বাঁধা পড়েছেন।কথার বরখেলাপ কি করে করবেন? যে কথা,যেই ওয়াদা তিনি আজ থেকে বিশ বছর আগেই করেছেন।তখন কি জানতো শখের বসে করা ওয়াদা এতটা পোড়াবে উনাকে। এদিকে ছেলের কথাও ভাবতে হবে।ছেলে তো তার বহু আগেই বলে দিয়েছিল এই বিষয়ে তার মতামত। তবুও তিনি আশায় ছিলো হয়তো একদিন রাজী করাতে সক্ষম হবেন, ছেলে তাকে বারবার প্রত্যাখান করতে পারবে না।সেই মেয়েকেও নিজের ছেলের যোগ্য করে তুলছেন।তবুও কি-না ছেলে তার সেই বাইরেই পা বাড়ালো।বুকটা ভারী হলো। অস্থিরতায় কেমন করতে থাকলেন,ঘামে ভিজে যাচ্ছিলো কপালের উপরিভাগ।তারাজ মায়ের এহেন অবস্থায় ঘাবড়ে গেল, অস্থির চিত্তে সবাইকে ডাকতে থাকলো। মা'কে শুইয়ে দিয়ে ফ্যানের গতি বাড়িয়ে দিলো। এক হাত দিয়ে মায়ের হাতের তালুতে মালিশ করতে শুরু করলো।অপর হাত দিয়ে ফোনটা বের করে নিজেদের পারিবারিক চিকিৎসকের কাছে ফোন করতেই তাজিয়া খাঁ বললেন,

“ডাক্তারকে ফোন করো না।আমি এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবো।”

“এমনিতে কি করে ঠিক হবে আম্মা! দাঁড়াও আমি ফোন করছি!”

রুমে ঢুকে মা'কে এমন দেখেই কথাটা বললো তাজিশ,তানহা মায়ের অপর পাশে বসে কাজের খালাকে আদেশ করলো আইস প্যাক আনতে।তিনি দৌড়ে গেলেন। অনুশোচনায় তারাজ আর‌ও বেশি ঘাবড়ে যাচ্ছে।এমন অবস্থায় ইসহাক আবদুল্লাহ নিশ্চুপ হয়ে গেছে।একদিকে ছেলের জেদ অন্যদিকে স্ত্রীর খামখেয়ালিপনায় মেতে থাকা বাচ্চামো।তিনি আগেই বলেছিলেন ভবিষ্যতে নিয়ে যার প্রতিফলন এখন ঘটছে।

তাজিশ প্রেসার মাপলো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী,হ্যা প্রেসার হুট করেই অনেক বেড়ে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসায় ঠিক হবার সুযোগ আছে। তানহা সবটা নিজেই করলো, কিন্তু তারাজ মায়ের হাত ছাড়লো না। ওভাবেই হাত ধরে বসে আছে। ইসহাক আবদুল্লাহ সবাইকে আদেশ করলো ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করতে। না চাইতেও তাজিশ,তানহা ও তার স্বামী চলে গেছে। কিন্তু তারাজ না শোনার পাত্র আর না তাকে জোর করার মতো সাহস কারো আছে।ত্যাড়ামিতে সে সবসময় সবাইকে ছাপিয়ে।এ ক্ষেত্রেও তাই। তাছাড়া সবাই তার মনের কথা বুঝতে পারছে। তারাজের মনে এখন একটাই কথা বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার জন্য মায়ের এই অবস্থা!

মাঝ রাতে.......

ঘুম ভাঙ্গার শব্দে সচেতন হলো তারাজ। ওভাবেই বসে ছিলো সে, ঝিমাচ্ছিলো,চোখ লেগে আসছিলো। তাজিয়া খাঁ চোখ মেলে ছেলেকেই দেখলো প্রথমে। এখনও এভাবেই বসে থাকতে দেখে আবেগী হয়ে পড়লেন। বিধ্বস্ত মুখশ্রী,রক্তিম হয়ে আছে ফকফকা আঁখির কালচে বাদামী মনি জোড়া। ছলছলিয়ে উঠলো মাতৃ আখিদ্বয়। বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়লো দুই কোনা দিয়ে।তারাজ আহত হলো আবারও। শক্ত করে মা'কে জড়িয়ে ধরলো। ফুঁপিয়ে কেঁদে দিলো শব্দ করে,চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। শক্ত পোক্ত ছেলের চোখে পানি দেখে মায়ের মন বিক্ষিপ্ত হলো,খন্ডিত হলো নগনিত সংখ্যায়।ভুলে গেলেন সব ওয়াদার কথা । মনে রাখলেন শুধু একটা বাক্য 'আমার সন্তানের খুশির চেয়ে বড় আর কিছুই নেই। তাদের সুখেই আমার সুখ!'

--------------------------------------------------------

ডাক্তার চলে যাবার বেশ সময় পর নিজের ঘরে ফিরেছে তাজিশ।বালিশের উপর দুই হাত রেখে তার উপরে মাথা পেতে দিয়ে ভাবতে থাকলো,'খাবার টেবিলে তার ভাইয়ের চালু করা ঝড়ে অনেক কিছু হয়েছে।বাবার সাথে একদফা তর্ক,মায়ের মন ভেঙ্গেছে।যার কারণেই হয়তো মা এখন শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন।না এতে সে ভাইকে দোষ দেয় না,আর না দিচ্ছে মা'কে।সবটাই পরিস্থিতির কারণে। অবশ্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করে মানুষেরাই তবুও মানুষ দোষ দেয় পরিস্থিতিকে। আচ্ছা তার বেলায়‌ও কি এমন কিছু হবে? নাহ্! তার বেলায় হবে না। কোন সুযোগ নেই। কারণ তার জন্য মা আগেই নিজের কোন সখির মেয়েকে নির্বাচন করে রাখে নি।কি আশ্চর্য তার মায়ের মতো শিক্ষিত,আধুনিকমনার মানুষ‌ও কিনা এহেন বোকামি করে ফেলেছে! কিভাবে করলো? সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর সাথে এগারো বছর বয়সী ছেলের বিয়ে ঠিক করে রেখেছে? আচ্ছা তাদের কি তখন মনে হয়নি ভবিষ্যতে এদের নিজস্ব পছন্দ থাকতে পারে। নাকি তারাও ভেবেই নিয়েছিল তাদের ইচ্ছাই তাদের সন্তানদের ইচ্ছে অনেকটা বাংলা সিনেমার মতোই। যেখানে দেখানো হয় , ছোট্ট বেলায় একজোড়া বিয়ে ঠিক করে রাখে এবং এক সময় বড় হলে তাদের বিয়ে করিয়ে দেয় অথচ তাদের পছন্দের মানুষ থাকে,যাকে তাদের পরিবারের কারণে ধোঁকা দিতে হয়।ওহ সিনেমায় অবশ্য এমন দেখা যায় না।কারণ সিনেমাতে তো ছোট বেলার সঙ্গির সাথেই মিলমহব্বত দেখানো হয়।ওগুলো তো দেখায় ভারতীয় মেগা সিরিয়ালে।যেখানে কেবল‌ই কুটনিদের বসবাস! আচ্ছা ঐসব সিরিয়ালের প্রধান ভিলেন হয় শ্বাশুড়ি,ননদ।তবে কি তার মা,আপাও ওমন ভিলেন টাইপ শ্বাশুড়ি ননদ হবে? আচ্ছা ভাই যদি সত্যি সেই আফনূর না-কি কি বললো তাকেই বিয়ে করে? তবে কি মা ও আপাও ঐ এক‌ই ধরনের কুটনামি করবে? অবশ্য সেই মেয়েটি না মানে ভাবী তো শুনলাম উকিল, সুতরাং তার সাথে এগুলো পারবে না কিন্তু আমার তুলি? আচ্ছা তুলিকে আমি যদি বিয়ে করি তবে কি আমার‌ও পরিবারের সাথে এমন যুদ্ধ করতে হবে? আমি কি পারবো ভাইয়ের মতোই বাবার চোখে চোখ রেখে বলতে, “আমি ওকেই বিয়ে করবো আব্বা?নয়তো কাউকে না!” না আমি পারবো না,এটা আমার কাজ নয়।যত‌ই হোক এভাবে মুখের উপরে বলা আমার কম্ম নয়। ওটাতে ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার ফুল মার্কস নিয়ে পাশ হলে ইউসুফ তাজিশ খন্দকার ডাহা ফেইল।আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতেই ঘুমের দেশে পারি দিলো তাজিশ, মনেই পড়লো না মুঠোফোনটা একবার দেখার।'

আম্মা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর তারাজ মায়ের পাশ ঘেঁষে শুয়ে র‌ইলো বেশ সময় অতিক্রান্ত হ‌ওয়ার পর নিজের ঘরে ফিরে গেলো যাওয়া আগে আব্বার গায়ের চাদরটা ঠিক করে দিয়ে গেল। ঠান্ডাকরনের গতিটা কমিয়ে দিলো।দরজাটা বাইরে থেকে চাপ দিয়ে লাগিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতেই চোখ পড়লো সিড়ি দিয়ে বেয়ে উঠা বড় বোনের দিকে,হাতে পানির বোতল। নিশ্চয়ই পানি নিতে এসেছে।

তানহা উঠতেই তারাজকে দেখে থেমে গেল, এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,

“আম্মা ঘুমিয়েছে?”

“হুম!”

“আব্বা?”

“ঘুমে!”

তানহা ভাইয়ের বিধ্বস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বললো,

“আচ্ছা তুমিও যাও, অনেক রাত হয়েছে।আম্মা এখন ঠিক আছে। দেখবে সকালে একদম ঝড়ঝড়া হয়ে গেছে?”

“ইনশাআল্লাহ্”

-শুভ রাত্রি!”

কথাট বলেই তারাজ চলে যাচ্ছিলো,তানহা কিছু মনে করেই ডাক দিলো,

“ভাইয়া!”

বোনের ডাকে পিছু ফিরলো,তানহা এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলো,

“খুব ভালোবাসো মেয়েটাকে?”

তারাজ মুখ ফুটে উত্তর দিলো না

তানহা খেয়াল করলো মুহূর্তেই তারাজের মুখের ভঙ্গিমা বদলে গেছে।যেই মুখে এত সময় দুশ্চিন্তা, আতংক ছিলো তা এখন আর নেই। কেমন শান্তি, স্নিগ্ধতায় ছেয়ে গেছে। উত্তরের আশা রাখলো না। আসলে উত্তর পেয়েই গেছে।ঠিক কতখানি কাউকে ভালোবাসলে তার কথা মনে হতেই এমন অনুভব হয় তা তানহাও বুঝে। ভাইয়ের গালে আলতো হাতে আদর দিয়ে বললো,

“ইনশাআল্লাহ তোমার আফনূর তোমার‌ই হবে!”

বোনের কথায় আশ্বস্ত হলো। অবশ্য আশ্বস্ত তো তার মা‌'ই তাকে করেছে। মা যখন রাজী তার আর কোন বাধা নেই, এমনকি স্বয়ং আফনূর‌ও তাকে আটকাতে পারবে না।

“রাত্রির শেষে নব্য দিবসে, 

মুক্তির সোপান ধেয়ে আসে!

তমসার অসিতের ক্লান্তি লগ্নে,

আগমনী বার্তায় নব্যরা প্রহর গুনে।

অতীতে রয়ে যায় কাল শব্দটি,

আগামীতে ডাকে হায় নব্য বাচনটি।

স্বাগতম করো তাহাকে,আগামকে আপন করতে ডাকে যে তোমাকে!'

মুঠোফোনের বার্তা কেন্দ্রে এহেন সময়ে আসা বার্তায় খানিকটা চমকালো আফনূর। রাতের এখন মধ্যভাগ পেরিয়ে শেষ ভাগে যাচ্ছে এমন সময়ে কি বার্তা আসতে পারে? জরুরী,খুব জরুরী একটা কেইস নিয়ে পড়াশোনা করছে তাই রাত কখন কেটে যাচ্ছে টের‌ই পাচ্ছে না।।আগামী পরশু তার হেয়ারিং! কেইসটা তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।যেকোন মূল্যে জিতবে বলে আশ্বস্ত করেছে গ্রাহকে। সুতরাং জিততেই হবে ,সেটা যেকোন মূল্যে। অবশ্য সে সত্যির পথেই আছে। ইনশাআল্লাহ জিতবে বলেই আশ্বাসী তবুও।

বিরক্তিতে 'চ' বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করলো,হাত বাড়িয়ে নিলো স্মার্ট ফোনটা।বাটনে চাপ দিতেই ভেসে উঠলো উক্ত মেসেজ।ভ্রু কুঁচকে এলো।কে দিতে পারে এমন মেসেজ।তাও আবার একান্ত ব্যক্তিগত নাম্বারে যেটা কেবল তার পরিবারের লোক‌ই জানে! বার্তা কেন্দ্রে ঘেঁটে ঘেঁটে দেখার চেষ্টা করলো,ঐদিক থেকে আসা নাম্বারটা আপাতত বন্ধ বলছে।তার চেয়েও বড় কথা এটাও একটা ব্যক্তিগত নাম্বার। কিন্তু তাকে কেন এই সময় এই বার্তা দিবে? আফনূর বিরবির করে নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে থাকলো, তারপর আরও একবার মন দিয়ে পড়তে লাগলো বার্তাটা আর বোঝার চেষ্টা করলো আসলে এটার প্রধান উদ্দেশ্য কি?

-----------------------------------------------------------

'এলাকার উন্নয়ন যার মুখ্য চাওয়া, সে জনদরদী নেতা জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া!' 

যোগ্য নেতা বেছে নিজের মূল্যবান ভোট দিবেন! প্রিয় এলাকাবাসী ও সম্মানিত ভোটারগন, আপনাদের সঠিক সিদ্ধান্ত‌ই পারে আপনাদের জন্য সঠিক সেবক নির্বাচিত করতে।

আপনার ভোট আপনি দিবেন, নিজের ইচ্ছায় নিজের পছন্দের দিবেন।

অর্থ দিয়ে ভোট প্রদানে বিরত থাকুন,মনে রাখবেন ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন একটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। দেশের উন্নয়নে সিদ্ধান্তকে মূল্যায়ন করতে সঠিক প্রার্থী বুঝে আপনার মহামূল্যবান ভোট প্রদান করুন।

প্রিয় এলাকাবাসী, আসসালামু আলাইকুম।আসছে নির্বাচনে আপনাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বোচ্চ উত্তম সময়,বুঝিয়ে দিন গনতন্ত্রের ক্ষমতাই, বুঝিয়ে সাধারণ জনতার শক্তির সীমানা।......

নিজ বাড়ির সামনে এমন প্রচারণায় মুচকি হাসলো তারাজ, একজন প্রার্থীর বাড়ির সামনে দিয়ে এহেন প্রচারণা; তাতে হাসির খোরাক'ই জোগায়। পাঞ্জাবির বোতাম লাগাতে লাগাতে ভালো করে একবার নজর বুলিয়ে নিলো নিজের দিকে। আজ যাবে কেরানীগঞ্জ।সাদা পাঞ্জাবীর উপরে কালো কোট পরে নিলো, আঙ্গুলে ডগার সাহায্য চুলগুলোকে আবারও একবার গুছিয়ে নিলো, সুগন্ধি মেখে নিলো কোটের উপরে । আরও একবার উপর থেকে নিচ, সামনে- পিছনে ভালো করে দৃষ্টি ঘুরালো; সবকিছু ঠিকঠাক। নিজের সাথেই বললো,

“পারফেক্ট!”

কথাটা বলেই ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা মুঠোফোনটা হাতে নিলো,পাওয়ার বাটনে প্রেস করতেই একজোড়া মায়াবী আঁখি ভেসে উঠলো।তার দিকে খানিকক্ষণ অপলক তাকিয়ে র‌ইলো। এরপর মনে পড়লো রাতে তার পাঠানো বার্তার কথা। অপরদিক থেকে কোন রেসপন্স আসেনি।মেসেজ সিন দেখালেও উত্তর আসেনি, অবশ্য উত্তরের আশাও রাখেনি তারাজ। হঠাৎ করেই দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেলো। মুচকি হেঁসে লিখতে শুরু,

“আই হোপ খুব শীঘ্রই আপনার দেহের সুগন্ধি মেখে থাকবে আমার সর্বাঙ্গে!”

লেখাটা পাঠিয়েই শব্দ করে হাসলো,কারণ সে কল্পনা করছে এই মেসেজ দেখার পর আফনূরের মেজাজ কেমন হবে! ভ্রু কুঁচকে ভাববে, এরপর বিরবির করে কিছু খাটি বাঙ্গালী শব্দ ব্যবহার করবে। আফনূরের মুখ বিচ্ছিরি ধরনের খারাপ হয় যখন তার মেজাজ চটে যায়।তারাজ খেয়াল করেছে ক্লাইন্টের সাথে তার বিপক্ষীয় উকিল এবং তার ক্লাইন্ট উল্টাপাল্টা কিছু বললেই মুখ রকেটের ন্যায় ছুটিয়ে দেয় এবং সব খাঁটি লোকাল বাংলায় থাকে তা।এই নিয়ে এই মেয়ে ইতিমধ্যে বেশ নাম কামিয়েছে।

তারাজ ভাবলো আর‌ একটু লিখি? কথাটা বলে টাইপ করা ধরতেই আবার ফিরে এলো,না এখন আর না। আবার ঘন্টা দুয়েক পর। অবশ্য ততসময়ে হয়তো বার্তা তার কাছে অযাচিত লাগবে না।কারণ আসল ঘটনার ইতিবৃত্ত পৌঁছে যাবে।

---------------------------------------------------------------

“আম্মা!"

“জ্বী খালাম্মি?”

“ তোমার কি আজ খুব কাজ আছে বাইরে?তুমি তো বলেছিলে আজ তোমার কোর্টে কোন কাজ নেই তবে এভাবে তৈরি হচ্ছো যে?”

“কোর্টে কাজ নেই তো কি হয়েছে! কোর্ট যেই কাজ করি তার জন্য তো অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হয় খালাম্মি!”

“ঠিক আছে কিন্তু আমি বলছিলাম!”

“যা বলার দ্রুত বলে ফেলো, আমি এখন‌ই বের হবো!”

“আসবে কখন?”

“সঠিক বলতে পারছি না,তবে ঘন্টা আড়াই তো লাগবে!”

“তার মানে দুপুর নাগাদ তুমি ঘরেই থাকবে?”

“হ্যা তা থাকবো! কিন্তু আজ তুমি আমার ঘরে থাকা নিয়ে এত চিন্তা কেন করছো?”

“না মানে বলছিলাম বাসায় মেহমান আসবে! তাছাড়া তুমি আজ যদি আমার সাথে লাঞ্চে যোগ দাও আমি খুব খুশি হবো।”

“মেহমান!কেমন মেহমান?”

“সে তুমি আসলেই দেখতে পাবে! কিন্তু তুমি আসছো এটাই আসল কথা জানার ছিলো!”

“আমি বুঝলাম না ঠিক কি বুঝাতে চাইছো তুমি? খালাম্মি সত্যি করে বলো কে আসছে?

আফনূর তার খালার হাত দুটো ধরে অনুরোধ করলো,খালা পড়লো মুসিবতে।বললেও সমস্যা না বললেও সমস্যা। কিন্তু যত সমস্যাই হোক আজ তিনিও মুখ খুলবেন না। কোন মতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বললেন,

“বলছি তো আসো,আসলেই পরিচিত হবে।তবে আমি অনুরোধ করছি ঠিক সময়ে ঘরে ফিরে আসো প্লিজ!”

“খালাম্মি তুমিও  আমার সাথে লুকোচুরি করছো?”

“তোমার জন্য,দয়া করে আর কিছু জিজ্ঞাসা করে আমাকে কষ্ট দিও না।

আফনূর বুঝলো তার খালাও আজ তার বাবা মায়ের সাথে জোট পাকিয়েছে সুতরাং কোন কথাই তিনি বলবেন না। হতাশ হলো। যা হবে দেখা যাবে।আগে কাজ সেরে আসুক।


পর্ব ১৬


কেরানীগঞ্জ, বাংলাদেশের ঢাকা জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। কেরানীগঞ্জের সাবেক আয়তন বর্তমান কেরানীগঞ্জ থেকে শুরু করে ঢাকা মহানগর সহ গাজীপুরের একাংশ- এই বৃহত্তর এলাকাটি কেরানীগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

কেরানীগঞ্জ উপজেলার ঢাকা ২ আসনের সীমার অন্তর্ভুক্ত সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে অনত্যম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন হচ্ছে  কলাতিয়া।

কলাতিয়া ইউনিয়ন ঢাকা বিভাগের ঢাকা জেলার অন্তর্গত কেরানীগঞ্জ উপজেলার অধীন কেরানীগঞ্জ মডেল থানার একটি ইউনিয়ন। ইউনিয়নটির আয়তন ১৯.৩১ বর্গ কিলোমিটার। ইউনিয়নটি ১৮ টি মৌজা ও ৬০ টি গ্রাম নিয়ে গঠিত।

এই ইউনিয়নের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান  ‘কলাতিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের’ মাঠপ্রাঙ্গনে আজ তারাজের প্রচারণায় তৈরী করা মঞ্চের আশেপাশে অগনিত সমর্থনকারীরা তাদের ভালোবাসা নিয়ে উপস্থিত হবে।স্থানীয় দলীয় লোকজন থেকে শুরু করে প্রান্তিক সমর্থক সবাই ফুল নিয়ে তৈরি তাদের ভাবী এমপিকে বরণ করতে। 

কামরাঙ্গীরচর থেকে বাবুবাজার ব্রীজ অবধি সড়ক পথে জাহান্নাম রুপী জ্যাম ঢেলে আসা দায় হয়ে পড়ে।তাই তারাজ বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের এলাকা দিয়ে পায়ে হেঁটে প্রচারণার কাজ চালিয়েই মাদবর বাজারের ঠোডা নৌকা ঘাট হয়ে নৌকা দিয়েই নদী পার হয়ে বাবুবাজার নৌকা ঘাটে পৌঁছায়।এতে করে নৌকায়‌ও সে নিজের প্রচারণার কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছে। প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষের দাবী দাওয়াও শুনতে পেরেছে। বরাবরেই মতোই কোন আশ্বাসে সে ভরসা দেয়নি, চেষ্টায় নিযুক্ত থাকবে বলে ওয়াদা করেছে। তারাজের বন্ধুসুলভ আচরণ আর মানবিক চিন্তা সবাইকে বিমোহিত করে।

বাবুবাজার ব্রীজেই ছিলো তাকে স্বাগতম করে নেওয়ার জন্য কলাতিয়া ইউনিয়নের পক্ষ থেকে গাড়ির ব্যবস্থা। সকাল সকাল তার আগেই কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশের কিছু সদস্য এবং তার সমর্থকদের একদল এসে উপস্থিত থাকে বাবুবাজার ব্রীজের উপর মিটফোর্ডের পাশে। বাবুবাজার ব্রীজ থেকেই শুরু প্রচারণার কার্যক্রম। চারদিকে রঙিন পোস্টারে ছেয়ে আছে, তাদের মাঝেও সূর্যের ন্যায় নিজের উজ্জ্বলতা জানান দিচ্ছে ইব্রাহিম তারাজ খন্দকারের অর্ধ ছবিটা। 

দলীয় স্লোগানের সাথে হবু এমপির প্রশংসায় রবরব ধ্বনিতে প্রকম্পিত হচ্ছে পুরো কেরানিগঞ্জ এলাকা।

কলাতিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে তারাজের প্রচারনা চলছে,অপর দিকে কেরানীগঞ্জ নিবাসী জহিরুল ইসলাম আছে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।তার প্রচারণাও চলছে ধুমিয়ে,স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে নিচ্ছে আপনজনের সুবিধা। যথার্থ‌ই তাকে দেওয়া হচ্ছে গুরুত্ব।তবুও খামতি নেই তারাজকে সম্মানিত করতে‌।

মঞ্চে নিজের ভাষন,ওয়াদার কার্য শেষে তারাজ পায়ে হেঁটে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটের আবেদন করলো। সুদর্শন যুবক তারাজ!প্রথমেই আকর্ষণ কাড়ে নিজের বাহ্যিকতা দিয়ে, অতঃপর হৃদয়ে প্রবেশ করে নিজের মাধুর্যতায় মিশ্রিত ব্যবহার দিয়ে। স্বভাবতই তারাজ খুব সহজেই সকল শ্রেণীর মানুষের সাথে মিশে যেতে পারে।বেশ কিছু পথ,অলিগলি পায়ে হেঁটে কলাতিয়া পর্যবেক্ষন এবং সাধারণ নাগরিক, ভোটারদের নানারকম দাবি নিজের ঝুলিতে পুড়ে নিলো। এরপর বাইকে উঠে এগিয়ে গেল পরের ইউনিয়ন তারানগর ইউনিয়নে। সেখানেও তাকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বরণ করা হয় , স্কুলের একটি শ্রেনী কক্ষে বন্দোবস্ত করা হয় মধ্যাহৃ এর ভুরিভোজের।স্থানীয় দলীয় কর্মী এবং অন্যান্য সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা ও পরামর্শ সভায় খানিকটা সময় ব্যয় করে, তাদের সঙ্গে নিয়েই বেরিয়ে পড়ে ঐ এলাকা পরিদর্শন করার জন্য।

এক‌ইভাবে নিজের জন্য ভোট চাইতে থাকলো,কথায় কথায় নানা কথা বেরিয়ে আসে তার সাথেও বেরিয়ে আসে সাধারণ মানুষের মনে থাকা সরকার এবং সরকারের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কাজকর্ম নিয়ে সমালোচনা মূলক মন্তব্য।তেমনি তারাজ ভোট চাইতেই এক বৃদ্ধা বলে উঠলো,

“তোমরার ভোট নিবার ল‌ই আও; এইর পর তোমরার মুখ‌ও আর দ্যাওন না যাইতো!”

তারাজ প্রত্ততর করলো না , নিরব হয়েই র‌ইলো,সে যে আর‌ও শুনতে চায় বুঝলো বৃদ্ধা। মনের মাঝে লুকিয়ে রাখা ক্ষোভটা জেরে দিলো,

“এইযে দলে দলে এওন লোক আইতাছো,এওন এতো এতো ভালুবাসা, মহব্বত দেয়াইতাছো,এগুন তো পরে আর থাকবো না।কম তো দ্যাখলাম না , বয়স অইতে অইতে চুলের একটাও আর কালা নাই। কত এমপি আইলো আর গ্যালো,কত কত ওয়াদা করলো,এই করবো হেই করবো; কিন্তু ভোট শ্যাষ অইলেই আর খবর নাই।তাগো চান্দের নাহান মুখের আর দ্যাহা নাই। আসলে করছে তারা ঠিক‌ঐ খালি আমাগো দারে কিছু আয় নাই! আসলে তারা করছে খালি হ্যাগো নিজেগো আর তাগো চামচাগো উন্নতি।ব্যাংকে কুটিকুটি ট্যাহা, পোলাপাইন বিদ্যাস গিয়া পড়াল্যাহা করে,ব‌উরা দামী দামী গয়না প‌ইড়া ফুটানি মারে অথচ করার কথা আছিলো আমগো উন্নতি, হেই আমরাই না খাইয়া মরি! ভোট আইলেই তাগো দ্যাহা পাই নাইলে তারা আইবো তো দূরের কথা আমরা গ্যালেও কুত্তার মতো ব্যবহার ক‌ইরা খ্যাদাইয়া দেয়!”

“আরে চাচী এমন আর হইবো না। এইবার নতুন এমপি হিসেবে ইব্রাহিম ভাই আসবো,দেখিও তোমাদের জন্য ভালো ভালো কাজ করবো!”

“হগল ইব্রাহিম‌ই জেতার আগে ভালো কাম করে ,পরে আর কোন ইব্রাহীমরেই খুইজা পাওন যায় না।আপনেগো কাছে গ্যালেও তো কুত্তা বিলাইয়ের মতো খ্যাদাইয়া দ্যান,আপনেগো কাছে আপনেগো বাড়িতে পালা কুত্তা বিলাইয়ের‌ও দাম আছে কিন্তু আমগো মতো গরীবদের নাই,আমগো দাম খালি ভোটের সময়‌ই বাড়ে।”

পাশ যেতে যেতে নিচু শব্দেই কথাটা থেকে কথাটা বললেন অন্য একজন বৃদ্ধা। বয়সের কোটায় তাঁদের পঞ্চাশর্ধো বলা যায়। অবশ্যই অনেক লম্বা সময় পার করেছে জীবনে, দেখেছে অনেক কিছু! তাদের কোন অভিযোগ যে মিথ্যা নয় তাও মানতে বাধ্য তবে ঐ যে জাতে তারা রাজনৈতিক কামলা। সুতরাং যাই হোক নিজেদের ভুল স্বীকার করা যাবে না।

কেউ কিছু বললো না উনাকে, তারাজ এগিয়ে গিয়ে প্রথম বৃদ্ধার মাথায় হাত রাখলো, বৃদ্ধা লম্বায় বেশ খাটো হ‌ওয়ায় তারাজের জন্য সমস্যা হলো না।মাথায় হাত রেখে আদুরে ভঙ্গিতে বললো,

“আপনাদের অভিযোগ সত্য,আমি মানছি! অনেক নেতাই নিজেদের দেওয়া কথা রাখতে সক্ষম হয়না।কেউ কেউ নানা জটিলতায় বাধ্য হয়ে পিছিয়ে থাকে তো কেউ নিজের নৈতিকতার ভিত্তি শক্ত করে ধরে রাখতে স্থিরতা বজায় রাখতে পারে না।তবে সবাই তো এক নয়! কেউ না কেউ তো অবশ্যই নিজের ওয়াদায় সফল হয়। যদি তাই না হতো তবে কি এই অঞ্চলের এত উন্নতি হতো? আপনারা এখন সরাসরি গ্যাস ব্যবহার করছেন,এই যে পাকা রাস্তা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, চিকিৎসা খাতে এত এত উন্নতি নিশ্চয় কোন না কোন নেতার হাত ধরেই এগুলো হয়েছে। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও তো আপনাদের এখানে আছে। এরপরও কি  বলবেন কোন‌ উন্নয়ন‌ই হয়নি! হয়তো আপনাদের আরো দাবি দাওয়া আছে, থাকবেই; এটাই স্বাভাবিক আর এগুলো পূরণ করতেই আমাদের এগিয়ে আসতে হয়! এই দেশ আমাদের ,আপনাদের সকলের কষ্টের অর্থ দিয়ে চলে, আপনাদের শ্রমের মূল্যবান অংশ দিয়ে দেশের উন্নয়ন হয়। কিন্তু সেই উন্নয়নের ধারা কখন কোথায় কিভাবে ব‌ইবে তা নির্ধারণ করতে এবং তাকে পর্যবেক্ষন করতেই আমাদের নিযুক্ত করা হয়।আমরা তো আপনাদের সেবায়‌ই নিজেদের বিলিয়ে দিতে আগ্রহী কিন্তু তার জন্য সুযোগ দিতে হবে, আমাদের পাশে থেকে সাহায্য করতে হবে।এই সাহায্য করার প্রথম ধাপ‌ই হচ্ছে ভোট! ভোটের মাধ্যমে আপনারা একজন যোগ্য সমাজসেবক বেছে নিতে পারেন, পারেন নিজেদের জন্য একজন সঠিক রাষ্ট্র পরিচালককে বাছাই করে নিজেদের জন্য এবং দেশের জন্য কল্যান বয়ে আনতে।আমি জোর করছি না ,জোর করে আদায় করে নেওয়ার কিছুই নেই এখানে। ভোট হচ্ছে আপনারা সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ ‌। আপনারা কাকে নিজেদের সমাজপতি হিসেবে চাচ্ছেন তার জন্য নেওয়া সিদ্ধান্ত।যেটা আপনার একটা সিল মেরে জাহির করেন। সুতরাং আপনার ভোট আপনি দিবেন, বুঝে শুনে যোগ্য জনকে দিবেন।আমি শুধু দোয়া চাইবো,বলবো আমার জন্য দোয়া রাখবেন যেন আমৃত্যু আপনাদের সেবায়, মানবের তরে লড়ে যেতে পারি।”

“স্যার এইবার সরকার জিতলে কি জিনিসপত্রের দাম কমাইবো?”

“ইনশাআল্লাহ বিগত সময়েও আমাদের সরকার চেষ্টা করেছে সব কিছু সাধারনের নাগালের মধ্যে রাখার, এবারও আমাদের সেই চেষ্টা জারি থাকবে।”

“কিভাবে কি করবো? যেই আকারে আমলা কামলারা দুর্নীতি শুরু করছে তাতে তো কয়দিন পর সরকারের পা/ছার কাপড়‌ই খুইলা ল‌ইয়া দোড়াইবো!”

একজন চল্লিশার্ধো গৌড় বর্ণের অধিকারী পুরুষ কথাটা বললো,বলেই একটু আতংকিত চোখে তাকালো।তারাজ‌ও তাকিয়ে আছে তার দিকে, অনুমানে বুঝলো লোকটা পেশায় রিক্সাচালক হতে পারে। কিন্তু কিছু বললো না।অপর পাশ থেকে আরেকজন বৃদ্ধ বললেন,

“এই সরকাররে আবার ক্ষমতায় আনলে আমগো না খাইয়াই মরন লাগবো। জিনিসের দাম কমায় না,ডাক্তাররা ভেজাল,খাওনে ভেজাল। মারামারি,আর দাঙ্গাবাজি খালি। উন্নিতির নামে গরীব মাইনসের পকেট থেইকা টেকা চুরির নতুন নতুন ছিস্টেম চালু করে।আইজ ওরে ধরে কাইল হ্যারে ধরে।আবার উচিত কতা ক‌ইলেই ধইরা নিয়া গুম ক‌ইরা দেয়।দ্যাশটারে একদম শ্যাষ ক‌ইরা দিছে! আগে জ্বালাইতো রাজাকারের বাচ্চারা আর এহোন জ্বালায় এই নমোর বাচ্চারা! দ্যাশ স্বাধীন করছি আমরা, আমাগো বাপ ভাইয়ের রক্ত দিয়া,মা ব‌ইনেগো ইজ্জত দিয়া দ্যাশ মুক্ত অইছে আর অহোন মাতব্বরি করে ভীন দ্যাশের কর্তারা! আমগো দ্যাশের কর্তারা হ্যাগো পা চাইটা চাইটা খালি ক্ষমতা হাতে থাকোনের পায়তারা করে!এতগুলা বছর অইয়া গ্যালো এহোন দ্যাশ আর দ্যাশের মানুষ আসল স্বাধীনতার মজা বুঝলো না।খালি এই সরকার না যেই সরকার‌ই আহে চিন্তা খালি হ্যাগো নিজেগো নিয়া,না দ্যাশ নিয়া আর না আমগো সাধারণ জনগণ নিয়া এগো কোন চিন্তা আছে!আমি তাই ভাবছি আমি এইবার ভোট দিমু না ।কাউরেই দিমু না!”

ষাটের কোঠা পেরিয়ে হয়তো সত্তরোর্ধ্ব হবে বৃদ্ধার বয়স। বেশ ক্রোধিত হয়েই কথাগুলো উগড়ে দিলো স্বয়ং তারাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।হাতে একটা সরু বাশের দন্ড, কোমর খানিকটা বেঁকে আছে।হাটার সাহায্য নিতেই এই দন্ডের ব্যবহার হচ্ছে।চোখে মোটা ফ্রেমে আবদ্ধ ঘোলাটে সাদা একটা চশমা।কানের গোড়ায় আটকে থাকা দন্ডের এক পাশ খানিকটা নড়বড়ে, স্পষ্ট দৃশ্যমান। বোঝাই যাচ্ছে ৭১ এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সাহসী শক্তিমান কোন মানবের রক্ত।তাই তো কথায় এত ধার। একদমই ভয়ডর নাই চোখে মুখে। একজন সাংসদ প্রার্থীর সামনে তাও সরকার মনোনীত প্রার্থী যারা সাংসদ হ‌ওয়ার আগেই ক্ষমতায় আসীন হয়ে গেছে।তারাজ কিছু বলতে চাইলো না।এখন শুধু সবারটা শোনার সময়।প্রচারণায় ধৈর্য্য থাকতে হয় , একান্ত বাধ্যগত জরুরি নয়তো ভরাডুবি হতে কালক্ষেপণ হবে না।

 তারাজের কাশি উঠে গেল,খুক খুক করে কাশতে শুরু করলো। একটা বাড়ির সামনে চায়ের দোকান, সেখানে দাঁড়িয়ে‌ই এত সময় কাজ করছিলো। তারাজকে কাশতে দেখে দোকানের ভেতর থেকে একজন মধ্য বয়সী মহিলা বেরিয়ে আসে।হাতে করে একটা পানির বোতল নিয়ে আসে।মুরাদ এগিয়ে এসে পানির বোতলটা নিলো,মুখ খুলে দিতেই তারাজ একরকম টেনেই নিলো।ঢকঢক করে অর্ধেকের বেশি পানি শেষ করলো। চারদিকে চেঁচামেচিতে পরিবেশ গরম হয়ে যাচ্ছে। অনবরত মাইকে প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, নিজেরা মুখে কথা বলছে।তার মাঝে ধীর আওয়াজে তারাজ ভোটারদের সাথে কথা বলছে। পানি শেষ করে বোতলটা নিজের হাতে নিয়েই দোকানি মহিলার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো,মুরাদ পয়সা দিতে চাইলো ।ভদ্র মহিলা নিতে অস্বীকার করলে তারাজ নিজেই হাত বাড়িয়ে দিলো,আলতো হেসে বললো,

“আপনি পয়সা দিয়ে কিনে কেন সবাইকে ফ্রিতে খাওয়াবেন? আমার টাকা খরচ করে কেনার সামর্থ্য আছে, আপনি তাকেই ফ্রি দিবেন যার সামর্থ্য নাই।”

মহিলা তারাজের কথায় খুশি হয়ে টাকাটা নিলো। সবাইকে সালাম দিয়ে বিদায় নিতেই একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ বলতে শুরু করলো,

“স্যার আমার আব্বার কথায় কিছু মনে ক‌ইরেন না। বয়স অইছে তো তাই একটু বেশি কথা কয়! আসলে কি স্যার আমার দাদা যুদ্ধে গিয়া মারা গেছে,মানে শহীদ হ‌ইছে।এরপর‌ও আমার বাপে নিজেই গেছিলো যুদ্ধে! তহোন কোমরে আঘাত পাইছিলো যার জন্য আইজ পর্যন্ত কোমর সোজা ক‌ইরা দাঁড়াইতে পারে না।তাও যদি কিছু একটা পাইতো! কত মানুষ মুক্তিযুদ্ধে যাওনের ল‌ইগা অহোন সরকারের থেইকা পুরষ্কার পায়,ভাতা পায় কিন্তু আমার বাপে না পাইলো ভাতা আর না পাইলো কোন পুরুষ্কার!তাই আব্বা এতটা কষ্ট পাইছে যে এহোন যারে পায় তারেই কথা হুনায়।”

তারাজ ঐ লোকটির মুখোমুখি দাঁড়ালো,ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

“কেন আপনারা ভাতার জন্য আবেদন করেননি?”

“না স্যার করতে পারি নাই।”

“সব জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে, দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা সকল সাহসী যোদ্ধাদের তালিকা করা হয়েছে এবং তা প্রকাশ‌ও হয়েছে তবে আপনারা কেন তখন যোগাযোগ করেননি?”

“স্যার যোগাযোগ করছিলাম কিন্তু হ্যারা ক‌ইছে অহোন আর অইবো না!আসলে কি স্যার টেকা দিলে ঠিক‌ঐ অইতো!”

শেষের কথায় তারাজ উত্তর দিলো না।সব কথার উত্তর দিতে নেই, শুধু একবার ঐ এলাকার কমিশনারের দিকে তাকালো। বললো না কিছু,আসলে জানা আছে কারণ যার তার প্রত্ততর আসবে কোথা থেকে?

তারাজ লোকটির কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বললো,

“এখন তো ব্যস্ত,ভোটের পরে আমার সাথে সরাসরি দেখা করবেন আমি দেখি আপনার আব্বার জন্য কতটা করতে পারি। ইনশাআল্লাহ সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।”

কথা শেষ করেই মুরাদকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“উনাকে আমার একটা কার্ড দে তো!”

তারাজ কথা শেষ করতেই মুরাদ কার্ড দিয়ে বললো,

“যেকোন সময় চলে যাবেন, আশাকরি নিরাশ হবেন না!"

তারাজ যাওয়ার আগে আরও একবার উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বললো,

“আমি নিজেকে আপনাদের সেবক হিসেবে ব্যবহার করতে চাই। আশাকরি আপনারা আমাকে সেই সুযোগ দিবেন।আর হ্যাঁ আমার বাড়ির দরজা আমার ভোটারদের জন্য সবসময়ই খোলা থাকবে।যেকোন প্রয়োজনে সরাসরি দেখা করতে আপনাদের কারো থেকে অনুমতির দরকার নাই।কারো কাছে তোষামোদ করার প্রয়োজন নেই।আমি চাই আপনারা সরাসরি আমার সাথে কথা বলুন,যেকোন কথা; যেকোন প্রয়োজনে আমাকে বলুন। আমি শুনবো আপনাদের সব কথা।আমি শুনতে চাই। তার বিনিময়ে আপনাদের দোয়ায় থাকলেই আমি খুশি হবো। আসসালামু আলাইকুম, আশাকরি সবাই নির্দিষ্ট দিনে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের মূল্যবান ভোট দিয়ে আমাকে এই তারানগর ইউনিয়নে বারবার আসতে সুযোগ করে দিবেন। আল্লাহ হাফেজ।

চলমান ঘটনাবলী নিয়েই ভোটারদের প্রশ্ন বেশি থাকে, থাকাটাও একদমই স্বাভাবিক! মানুষ বর্তমানে বাঁচে। অতীতের খাতা সিল মেরে রাখে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে অবসর খুঁজে অথচ একটা জীবন রেলগাড়ির ন্যায় চলমান।কোথাও কোন বিরতি নেই নাই অবসরের সুযোগ। শুধু স্টেশনে গিয়ে থামে যেথায় কেউ উঠে তো কেউ নামে! তাও সেই ব্যস্ততায় মুড়িয়ে থাকে। প্রতি ধাপেই সাধারন নাগরিকদের অভিযোগের তীরে লক্ষিত হয়েই সামনে এগুচ্ছে তারাজ।কেউ কেউ প্রত্যাশা দিচ্ছে তো কেউ কেউ কটু কথায় তীর নিক্ষেপ করেছে। তারাজের এতে হেলদোল নেই, আসলে পুলিশ আর রাজনীতিবিদ এদের চামড়া হতে হয় গন্ডারের চামড়ার মতো।যত কথাই শুনুক নিরব থাকাই এদের ধর্ম নয়তো মানবিক নেতা হ‌ওয়া যায় না। একজন আদর্শ নেতা হতে হলে অবশ্যই কথার ধার সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে তবেই না পাওয়ার যাবে কাঙ্খিত আসন।

ঐ স্থান থেকে বেরিয়ে আসে বাইকে করে, এরপর আরও একটি ইউনিয়ন ঘুরে, সেখানের একটি ইয়ুথ ক্লাবে গিয়ে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সভা করে,নানা শ্রেনীর মানুষের সাথে মতবিনিময় করে। এরপর তার জন্য নির্ধারিত গাড়ীতে উঠে বসে।

“ ভাই আপনে এত রাগী মানুষ তাও কত ধৈর্য্য ধ‌রে মানুষের কথা শুনেন, আপনার কি তখন রাগ হয় না।”

“না হয় না! হলে কি আর এই পথে আসতাম?”

“ভাই আমার কিন্তু আজকে অনেক মেজাজ চটছিলো।ঐ বুড়া হালায় কেমনে আপনের চোখে চোখ রাইখা কথা ক‌ইলো।আরে ভাই অন্যায় যে করছে তারে গিয়া ক তা না আপনেরে পাইছে তাই আপনেরেই ক‌ইবো!”

“এটাই , স্বাভাবিক! ”

“ কেমনে ভাই?”

 এই প্রশ্নের উত্তর আসলো মুরাদের থেকে,

“এই আসনের আগের প্রার্থীও সরকার মনোনীত ছিলো,তার দ্বারা যখন তাদের দাবিদাওয়া পূরণ হয় নাই তখন তারা এই সরকারের যারে পাবে তারেই কথা শুনাবে এটাই স্বাভাবিক; তাছাড়াও ভোটের সময় জনগণের মুখে বুলি ফুটে,সুযোগ পায়।নেতারা তাদের দরজায় যায়, তাদের কাছে মাথা নত করে।একটা ভোটের জন্য হাতে পায়ে ধরে তুলোধোনা করে এটাতে তারা বেশ বড় মনে করে নিজেদের।তাই হাতে পাওয়া সুযোগকে পায়ে ঢেলে দিয়ে বোকামিটা করে না।যা ইচ্ছা হয় তাই বলে নিজেদের খুশি করে।

“মানুষের মুখ,আর ড্রেনের আনা এক‌ই ! যেখানেই থাকুক গন্ধ ছড়াইবোই!”

রেহানের কথায় মুরাদ,ফয়সাল শব্দ করে হেসে দিলো ।তারাজ মৃদু হেঁসে। হাসি থামিয়ে বললো,

“মানুষ বলবেই।তাদের বলার সময়‌ই এখন। পাঁচ বছর অপেক্ষা করে নিজেদের ক্ষোভ জাহির করার জন্য, এরপর শোনায়।আসলে জনগণের দেশ এটা। গনতান্ত্রিক দেশ।যেই দেশটার নামই ‘গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ সেই দেশের জনগণের মতামত রাখার জায়গা নেই! তারা কথা বলতেও ভয় পায়। তাদের কোন অভিযোগ করার অধিকার নাই।পরতে পরতে তাদের হেয় হতে হয় ,এই কারণেই তাদের রাষ্ট্রপতিদের উপরে এত ক্ষোভ জমে যায়।যার দরুন সুযোগ পেলেই মুখ ছুটে যায়। এক্ষেত্রে একজন নব্য রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে হয়েছিল তাই চুপ ছিলাম।দেখা যাক, সামনে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি।”

“জ্বী ভাই!”

“আসসালামু আলাইকুম আব্বা!”

ভাইব্রেট হ‌ওয়ার শব্দে পকেটে থাকা ফোনটা বের করে নিজের বাবা নাম্বার দেখে,সালাম দিয়ে আলাপ শুরু করলো,

“এইতো বাবুবাজার ব্রীজের উপরে আছি, নিচে সম্ভবত অনেক জ্যাম আব্বা! ভাবছি এখনও নৌকায়‌ই আসবো কি-না!”

****

“না না গাড়ির দরকার নেই,আমি রিক্সায় করেই আসবো তাছাড়াও ছেলেরা সব ঐ পাড়েই দাড়িয়ে আছে!”

*****

“জ্বী আপনারা তৈরি থাকুন আমি আসছি!

******

“জ্বী ,দোয়া করুন। আসসালামু আলাইকুম ”

কথা শেষ করেই ফোনটা আবার পকেটে ঢুকালো। আবারও সবাই টুকটাক কথায় মজে গেল।তারাজ মজলো নিজস্ব জগতে।আজকের পর অনেক কিছু পাল্টে যাবে। নতুনত্ব যোগ হবে। একাকীত্ব ঘুঁচবে।অতি সাধনায় পাওয়া মানবিকে নিজের করে পাবে।হয়তো সেই তরফ থেকে এখনও সাড়া আসেনি,আসার কথাও না।তবে তার তরফ থেকে বুনবে অজস্র ভালোবাসার কাব্য,এত বেশি এত বেশি ভালোবাসা দিবে যে মানবী না গলে উপায়‌ই পাবে না।

বাবুবাজার ব্রীজের উপর থেকেই গাড়ী থেকে নেমে গেল। তারাজকে প্রোটেক্ট করতে তার চারপাশে নেতাকর্মীদের ভীড় লেগেই থাকে।তার সাথে থাকে পুলিশ,আনসারের কিছু সদস্য।ধীর পায়ে সবাই নেমে গেল ঘাট দিয়ে,নৌকায় উঠে আগের মতোই চিৎকার করে নিজেদের নেতার প্রচারণায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো সবাই,পরপর কয়েকটি নৌকায় তাদের লোকজন।নৌকা ছাড়ার আগ মুহূর্তে বেশ কয়েকজন যাত্রীর কাছে লিফলেট বিলি করলো।নৌকা ছাড়লো। চারদিকে মাগরিবের মধুর ধ্বনির সাথে সাথেই রক্তিম লালীমায় ছেয়ে গেল গগন।নৌকা পাড় ছেড়ে মাঝ নদীতে যেতে যেতে অন্ধকারে ছাপিয়ে গেল পুরো নদী। নৌকা যখন মাঝ নদীতে পৌঁছালো ঠিক সেই মুহূর্তে শো করে একটা শব্দ হলো,আর ধপাস করে পানিতে পড়ার শব্দে চারিদিক ঝমঝমিয়ে উঠলো।


পর্ব ১৭


“বসো মা!”

উজ্জ্বল শ্যামা গড়নের মেয়েটার পড়নে পিচ রঙের সালোয়ার কামিজ, মাথায় বাড়তি করে দেওয়া সুতি কাপড়ের ওড়নায় চ‌ওড়া কপোল ঢেকে গেছে।ভাসা ভাসা বড় অক্ষিদ্বয়ের মাঝে সূক্ষ্ম কাজল টানা।যা দেখলেই উপলব্ধি হয় কোন এক প্রহরে লাগানো; যার শেষ রেশ ধরে রেখেছে কোনরকমে লেগে থেকে।

তাজিয়া খাঁ দূর থেকে ধীর কদমে এগিয়ে আসা আফনূরকে দেখলেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।দোষ ধরার জন্য নয়, শুধু বোঝার জন্য তার পছন্দের অপ্সরী মায়াকে পছন্দ করেনি,তো তার ছেলে এমন কাকে পছন্দ করলো যার জন্য এতটা উতলা।যেই ছেলের একমাত্র ভাবনায় থাকে কেবল রাজনীতি সেই ছেলে নিজের স্বপ্নকেও বাজীর ভেলায় উঠিয়েছে শুধুমাত্র একটা মেয়ের জন্য!

“আসসালামু আলাইকুম!”

বসতে বসতে নমনিত ভঙ্গিতে সালামের পাঠ চুকালো আফনূর।তাজিয়া খাঁ নরম দৃষ্টিতে আলোকপাত করছে আফনূরের সমস্ত মুখাবয়বের উপর।মায়ায় ডুবন্ত এক শ্যামপরী।চোখেই আছে বিশাল মায়ার রাজ্য যার গহীনতায় হারিয়েছে তার ছেলে,এমন মায়াবতীকে ত্যাগ করা আদৌতেই সম্ভব নয়।ফুলোফুলো গাল জোড়ায় বিনা প্রসাধনীতেই কেমন মসৃণতা। একদম চকচকে, কোথাও কোন বিন্দুমাত্র এচোড়ের দাগো নেই।পাতলা ছোট কমলার ন্যায় ওষ্ঠদ্বয়ের খাঁজ স্পষ্ট। তাতেও নেই নকলের আভা।ভালো লাগলো তার। একদমই সাদামাটা মনে হলো যদিও তিনি একটু ভাবুক কারণ মেয়ে আইনজীবী তার উপর আবার ছেলে, স্বামীর দলীয় দ্বন্দ্বতা আছে এরপর‌ও ছেলের পছন্দের তালিকায় জুড়ে গেছে ।তার ছেলে রুপে মুগ্ধ হয় না তবুও যখন হয়েছে সেটাকে কেবল রুপের ক্ষমতা নয় নিশ্চয় মেয়েটির মাঝে অসাধ্য সাধনের অলৌকিক ক্ষমতা আছে।

“মাশাআল্লাহ্, বলতে হয় আমার শ্যালকের পছন্দ আছে!”

তানহার পাশ থেকে বাদল কথাটা বললো,তানহাও তাল মিলালো।

“নিসন্দেহে আমার ভাই বরাবরই বেস্ট জিনিস চয়েস করে সেখানে জীবন সঙ্গিনী পছন্দ করেছে তা যে সেরাই হবে তা কি আর বলে বোঝাতে হয়!”

ভাইকে নিয়ে তানহার বরাবর বড়াই বেশি,বাদল জানে।তাই নীরবেই সম্মতি! ইসহাক আবদুল্লাহ বলা শুরু করলেন,

“রেজ‌ওয়ান সাহেব আমার ছেলেকে আপনি চিনেন, এবং আমার আগেই তার সাথে আপনার আলাপ হয়েছে সুতরাং আশাকরি বলতে হবে না তার সম্পর্কে!”

“একদম‌ই না!” 

বললেন রেজ‌ওয়ান করিম,তার পাশে বসা তার সহধর্মিণী আফিয়া নূরন্নাহার বললেন,

“ছেলে আসলো না যে?”

একটু থমকালেন অপর-পক্ষের ব্যক্তিবর্গ, কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে সংকুচিত চাহনি ফেললেন,তাদের সাথে তারাজের শেষ কথা হয়েছিলো পাঁচটা এগারোতে, এরপর আর কোন কথা হয়নি। এমনকি ফোনেও ঢুকতে পারেনি। তারাজের ফোন বন্ধ দেখে মুরাদকে ফোন দিয়েছিল তখন মুরাদ বলেছিলো অনেক ব্যস্ত আছে।তাই আর ফোন দিয়ে বিরক্ত করেননি। কিছুদিন বাদেই ভোট। এখন তো ব্যস্ত থাকবে এটাই স্বাভাবিক।তাজিয়া খাঁ ইশারা করলেন ইসহাক আবদুল্লাহকে কিছু একটা বলার জন্য।তাদের মুখভঙ্গি দেখে রেজ‌ওয়ান পরিবার‌ও নিজেদের দিকে চাওয়া চাওয়ি করতে থাকলো, ইসহাক আবদুল্লাহ একটু ইতস্তত হয়েই বললেন,

“আসলে বুঝেন তো নির্বাচনী প্রচারণায় কত ব্যস্ত; আজ গিয়েছিল কেরানীগঞ্জ, সেখান থেকে আসার পথেই একটা কাজে ব্যস্ত হয়ে যায় তাই আসতে পারলো না। তাছাড়া পাত্রী তার দেখাই তাই তার আর দেখার বিশেষ কারণ আছে মনে হলো না যদি আফনূর মা কথা বলতে চায় তবে যেকোন একদিন নিজেদের মধ্যে সময় করে নিবে; যেহেতু এক জায়গায়‌ই থাকো দুজন সারাদিন,কি বলো মা?”

কথাগুলো এক নাগাড়ে বলে শেষ করলেন ইসহাক আবদুল্লাহ।রেজ‌ওয়ান করিম নির্ভার হলেন।ছেলের খবর তার কাছে আগেই আছে। তবুও জিজ্ঞেস করা,কারণ যত‌ই হোক মেয়েকে দেখতে পাত্র পক্ষ এসেছে কিন্তু পাত্র নেই তাই একটু জিজ্ঞেস করে ফর্মালিটিজ সম্পূর্ণ করলেন মাত্র।

“ছেলে রাজনীতি করে?”

জিজ্ঞেস করলেন আলিয়া। চোখেমুখে উনার আতংক। উনার পানে তাকালেন খন্দকার পরিবারের উপস্থিত সদস্যরা।তারা ভ্রু কুঞ্চিত করলো কেউ কেউ । প্রশ্নটা বুঝলো না।রেজ‌ওয়ান করিম নিজের বড় শ্যালিকাকে চোখের ইশারায় থামতে বললেন,আলিয়ার দিক থেকে নজর ঘুরিয়ে নিজের মেয়ের দিকে তাকাতেই থমকে গেলেন।আফনূর বাবার পানে শীতল চাহনিতে চেয়ে আছে। তাদের বাবা মেয়ের চক্ষুসংযোগে ব্যাঘাত ঘটলো তানহার কথায়,

“কেন আপনারা জানতেন না?”

“আসলে আপা জানে না, তাই একটু সারপ্রাইজড।”

“ওহ, আচ্ছা; আমার ভাইতো এইবার সাংসদ পদপ্রার্থী!ঢাকা ২ আসনের, ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার!”

আফনূরের অক্ষিদ্বয় বড় হয়ে গেল।কোটর থেকে বেরিয়ে আসার মত করেই বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে তার বাবার পানে।তার এতদিনে তারাজ সম্পর্কে বেশ ধারণা হয়েছে।মিশুক চরিত্রের ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার; জুনিয়র সিনিয়র সকলের স্নেহভাজন এবং সম্মানিত ব্যক্তি। রাজনীতির ময়দানে নতুন নাম, কিন্তু তাতেই সে সবার চর্চার তালিকায় থাকে।ঢাকা ২ আসনের নির্বাচনী কার্যক্রম এখন রঙিন পর্দা থেকে মুদ্রিত কাগজ সবক্ষেত্রেই তার নাম থাকে।জেতার আগেই তার জয়জয়কার।এই তারাজের পরিচয় কোর্টে বেশ সমাদিত।তার প্রখর বুদ্ধি, তীক্ষ্ম নজর আর সচেতন মনস্তাত্ত্বিক পরিমন্ডলে আকৃষ্ট থাকে তার চারদিকে বিরাজমান সকলে। এগুলো সব‌ই আফনূরের কাছে প্রশংসনীয়,ভালো লাগার মতো কিন্তু তার রাজনৈতিক পরিচয়টাই ভালো লাগে না।সে সবসময় ভাবে ঠিক কেন তারাজ এই পথে,যদিও পরক্ষণেই আন্দাজ হয় পারিবারিক ধারা অব্যাহত রাখতেই তার এই পথে এগোনোর প্রয়াস। কিন্তু যত‌ যাই হোক তারাজের মতো মানুষ তার জীবনে! কখনোই সে তারাজকে নিয়ে এমন কিছু ভাবেনি; শুধু তারাজ কেন! কাউকে নিয়েই আর ভাবতে চায়নি।তার ভাবনার অবকাশ তো বহুবছর আগেই চুকে গেছে।

“ছেলের পছন্দ‌ই আমাদের পছন্দ, সংসার ছেলে মেয়ে করবে সুতরাং তারা যেহেতু একে অপরকে নিয়ে পজেটিভ সেহেতু অনার্থক কথা না বাড়াই।আমরা আজকে আংটি পড়িয়ে যাচ্ছি,বাকি আপনারা জানান কখন কিভাবে আকদের কাজটা সারতে চাচ্ছেন। ছেলের ইচ্ছা ভোটের আগেই সেড়ে ফেলবে।”

“আমিও তারাজ বাবার সাথে একমত,যাতে করে জামাইয়ের জেতার খুশিতে নির্দ্বিধায় আনন্দ উল্লাস করতে পারি!”

বেশ উচ্ছ্বসিত হয়েই কথাটা বললেন রেজ‌ওয়ান করিম।তার পানে এখনও ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে আফনূর।আলিয়া চেয়ে আছে আফনূরের দিকে। নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হচ্ছে উনার কাছে। উনার কথায় ভরসা পেয়েই তো মেয়েটি আজ পাত্র পক্ষের সামনে বসেছে।কি জবাব দিবে মেয়েটাকে। তানহা এগিয়ে এসে আফনূরের হাতটা ধরলো,গোলাকার হস্তের তুলতুলে অঞ্জলি,মসৃন মোমের ন্যায় লম্বা অঙ্গুলি। ছোট ছোট অযাচিত লোমে আর‌ও বৃদ্ধি পেয়েছে এই হাতের সৌন্দর্য। মুগ্ধ হলো তানহা।প্রশংসা করতে কার্পণ্য করলো না।আহ্লাদি হয়ে আফনূরের হাতটা নিজের গালে ঠেকিয়ে গদগদ কন্ঠে বললো,

“বাহ কি মসৃন তোমার হাতটা ভাবী! এত্ত তুলতুলে,আমার ধরতেই ভয় করছে! মনে হচ্ছে গলে যাবে!”

আফনূরের কোন প্রতিক্রিয়া নেই,বাবার থেকে চোখ সরিয়ে কোনমতে নিজের অশ্রুকে আটকে রাখলো। সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিবারের সামনে নিজের বাবাকে ছোট করতে চায় না। নয়তো তখন‌ই উঠে চলে যেতো যখন জেনেছে তাকে দেখতে আসা পাত্র পক্ষের পরিচয়। তাজিয়া খাঁ নিজের ব্যাগ থেকে একটা পুরানো নকশা খচিত ছোট্ট কাঠের বাক্স বের করলেন,সেটা খুলে জ্বলজ্বলে হীরের একটি ছোট্ট আংটি বের করলেন,কিছু সময় সেদিকে তাকিয়ে র‌ইলেন । এরপর হুট করেই সেটা বন্ধ করে আবার নিজের ব্যাগেই ঢুকালেন।উনার কাজে হতভম্ব হয়ে গেল উপস্থিত সবাই।

“কি করছো তাজিয়া?”

প্রশ্ন করলেন ইসহাক আবদুল্লাহ,সবাই আশ্চর্য বিমূঢ় হয়ে গেছে।তাজিয়া খাঁ নিজের নিকাবের নিচ দিয়ে হাত গলিয়ে গলায় জড়ানো সবচেয়ে ভারী মোটা চেইনটা খুললেন,সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন,

“আমি চাই আংটিটা আমার ছেলেই পড়িয়ে দিক।আমি চেইন দিয়ে আমার ব‌উমাকে বরণের প্রথম পর্ব সারতে চাই।”

তার কথায় প্রশ্ন করার কারণ থাকলো না তবুও সবার মনেই একটু তো খচখচানি থেকেই গেল।তানহা উঠে দাঁড়ালো,তার জায়গায় আফনূরকে বসালো।বাদল উঠে তানহাকে বসার জায়গা করে দিলো, সে গিয়ে বসলো অন্যত্র।তাজিয়া খাঁ আফনূরের গলায় চেইন পড়িয়ে কপালে চুমু খেল,স্নেহের হাত রাখলেন কপটে,মাথায়,

“ অনেক সুখী হ‌ও! আমি আংটি না পড়ানোর জন্য কষ্ট নিও না।এই আংটি আজ হলেও তোমার কাল হলেও তোমার! এটা তারাজের দাদীর,তিনি আমাকে দিয়ে বলেছিলেন আমি যেন আমার প্রথম পুত্রকে দেই এবং সে আবার তার প্রথম পুত্রকে দিবে। এটাই তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। সুতরাং এই সুন্দর আংটির অধিকারীনি কেবল এই বংশের বড় ব‌উদের‌ই ।আর আমি চাই এই আংটি তুমি আমার ছেলের হাতেই পড়ো।লোককথায় এই আঙ্গুলের সাথে সরাসরি হৃদয়ের যোগসূত্র,আর তোমার হৃদয়ের মিলন কেবল আমার ছেলের সাথেই ঘটুক।

অন্য কারো সাথে নয়।তাই আমি চাইছি সেই পড়িয়ে দিক তার ভাবী অর্ধাঙ্গিনীকে। আশাকরি তোমার এখন আর মনঃকষ্ট থাকবে না।”

অল্প স্বল্প আলাপেই তারাজের পরিবারকে মনে ধরলো আফনূরের, নিঃসন্দেহে শ্বশুর বাড়ি হিসেবে তারা সেরা হবে। কিন্তু তাতে কি? আসল সত্য যখন সবার সামনে আসবে তখন? তারাজের মতো ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ কি কখনোই তাকে অতীত জেনে মানবে?

আফনূরের নীরবতায় তার পরিবার হতাশ হলো‌।মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ভবিষ্যতে পস্তাবে না তো? কিন্তু এই পরিবারের লোকজনের সঙ্গে এই খানিক আলাপেই বেশ ভাব হয়েছে,মনেই হচ্ছে না এরা নব্যচেনা।কি দারুন অমায়িক সকলের ব্যবহার।এরা নিশ্চয়ই তাদের মেয়েকে ভালো রাখবে। খন্দকার পরিবার আফনূরের চুপচাপ থাকাটাকে স্বাভাবিক নিলো।যত‌ই বাইরে ফটরফটর করুক,আসলেতো সে বঙ্গ কন্যা? যাদের আসল অস্তিত্ব‌ই হচ্ছে লজ্জা; লজ্জায় যারা নিজেদের আব্রু বানায়।তারা নিশ্চয়ই বিয়ের কথায় লাফালাফি করবে না।তাজিয়া খাঁ আফনূরের কাঁধে হাত রেখে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো,এক হাতে জড়িয়ে রেখেই আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে গেল।

অপরদিকে......

সদরঘাট থেকে সোয়ারিঘাটের নৌকা ঘাট,ঠোডা সবটাই আপাতত ব্লক রাখা হয়েছে।রাত এখন প্রায় এগারোটা। সন্ধা ছয়টা পঁচিশ থেকে তল্লাশি চলছে,প্রায় পঞ্চাশ জনের ন্যায় ডুবুরি নামানো হয়েছে,তার সাথে নেমেছে অনেক মাঝিমাল্লা। সাঁতারে পটু এমন সাধারণ মানুষ‌ও নেমেছে, আসলে নামতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তাও কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।এই পাড়ে মানুষের চাপে ঘাট ভেঙে যাওয়ার অবস্থা,ঐপারেও দেখা যাচ্ছে অপ্রতুল মানুষের ছায়া। ইতিমধ্যেই ঢাকা ৭ আসনের সাংসদ পদ প্রার্থী, চকবাজার থানা পুলিশ, নৌ পরিবহন সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সহ নৌ পুলিশের লোক‌ও এসে গেছে।সবাই জোর তাগাদে বারবার তল্লাশি চালানোর জন্য হুংকার দিচ্ছে।তাতেও লাভ হচ্ছে না, চারদিকে কুটকুটে অন্ধকার।পানিপরিবাহিত টর্চ,অথবা হ্যারিকেন যত‌ই থাকুক বিশাল এই বুড়িগঙ্গায় তা নেহায়েৎ দূর গগণে জ্বলজ্বল করে জ্বলে থাকা তারার মতোই লাগে।অনেক থাকলেও পর্যাপ্ত নয়। বুড়িগঙ্গা মরে গেলেও তার অস্তিত্ব একেবারেই কম নয়, বিশাল সীমানা জুড়ে নিজের বিস্তৃত করে রাখা এই বুড়িগঙ্গায় একবার হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া ঠিক কতটা কঠিন তা যারা খোঁজ করে তারাই কেবল জানে।তার মধ্যে কুচকুচে কালো পানির দুর্গন্ধে চেয়েও ডুবুরিরা বেশি সময় পানির নিচে থাকতে পারছে না।


পর্ব ১৮


“আমাকে ভুল বুঝো না আম্মা! আমি সত্যিই প্রথমে জানতাম না ছেলে রাজনীতি করে! জানলে কখনোই তোমাকে ঐখানে নিয়ে বসাতাম না।”

আলিয়া খালাম্মির অপরাধী সুরে কথা বলায় আফনূরের খারাপ লাগলো।

নিজ বারান্দার বহির্মুখী কবাটের পাশে দাঁড়িয়ে মাঝ রাতে ঝিরিঝিরি বাতায়নের সাথে চিড়িচিড়ি নারকেল পাতার গাছের অবাধ লীলাখেলা দেখে চলেছে আপনমনে।তার অপলক অবলোকনে বাধাপ্রাপ্ত হলো আলিয়া খালাম্মির উক্ত কথায়। দ্বিধান্বিত আফনূর ঘুরে তাকালো,মায়ের চেয়েও বেশি আপন মনে হ‌ওয়া এই মানুষটি তার জন্য সবসময়ই মঙ্গল চিন্তায় নিয়োজিত তাকে নিয়ে নিজের মনে ক্ষুনাক্ষরেও ভুল ধারণা আসতে দেয় না‌।তার প্রতি রাগ, অভিমান তো কখনোই জমে না অন্তঃপুরিতে।

“তোমার প্রতি কোন অভিযোগ নেই খালাম্মি! আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত!”

“সত্যি বলছো আম্মা?”

“হ্যা ! আমি এই বিয়ে করবো! তবে তার আগে আমি উনার সাথে একটু আলাদাভাবে কথা বলতে চাই!”

“কিন্তু তোমার নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করতে হবে না!”

“আমি মনের বিরুদ্ধে যাচ্ছি না। ভেবে চিন্তেই সিদ্ধান্ত জানিয়েছি।”

আফনূরের কথায় খালাম্মি মনে মনে শান্তি পেলেন, প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে শুধু বললেন,

“আল্লাহ তোমার সহায় হউন!”

কথাটা বলেই আলিয়া চলে গেলেন। আফনূরের দৃষ্টি আবারও নিক্ষিপ্ত হলো দূর রজনীগন্ধার ডালে,সাদা ফুলের সুবাসে মাতোয়ারা প্রকৃতি। রজনীগন্ধার ডালে তাকিয়ে থাকতেই ঘোলা হয়ে গেল অক্ষুকোটর,ভারী হয়ে উঠলো অক্ষিপল্লব। কৃষ্ণগহ্বরের ন্যায় আখিদ্বয়ের দুই ধারে উপচে পড়লো কয়েক ফোঁটা মুক্তোর দানা।

 মনে পড়লো বহু বছর আগের কিছু বাক্য,

“স্নিগ্ধ রজনীগন্ধার মোহমোয়ী ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে আমি আকুল চিত্তে অপেক্ষমান চাতক প্রেমিক ঘটাবো মধুর মিলন তোমার সনে,নিরালায় সঙ্গোপনে; তুমি রজনীর বুকে জোৎস্না বিলিয়ে ঔজ্জ্বল্যতা ছড়ানো চন্দ্রিমা,আমি দূর হতে সেই সুধা পান করা পিপার্সিত কাতর প্রেমিক, তুমি আমাকে বিক্ষিপ্ত করে উল্লাসী হ‌ওয়া নিষ্ঠুর প্রেমিকা!তুমি মোহমোয়ী,তুমি বিলাসীনি,তুমি নিষ্ঠুর, বিনাশীনি।”

দুরবার্তার অপর দিকে থাকা মধুর কন্ঠের অধিকারীর এহেন প্রেমবাক্যে বারবার ভেসে যেতো ত্রয়োদশীয় তনয়া। উচ্ছসিত চিত্তে বুনতো অজস্র কল্পনার জাল, নিজেকে মাখাতো আবেগীয় সুঘ্রাণে।

“নীলকন্ঠির প্রেমে মজেছিলাম, বিষক্রিয়ায় হৃদাঙ্গ জ্বলার তো ছিলোই!”

“আপাই!”

পেছন থেকে ভাইয়ের ডাকে অতীতের হারিয়ে যাওয়া প্রান্ত থেকে ফিরে আসলো,গড়িয়ে পড়া পানির রেখা দুই আঙ্গুলে মুছে ফেললো।আফির বোনের মুখোমুখি এসে দাড়িয়ে অপরাধী সুরে বললো,

“ সরি আপাই; আমি তোমার থেকে লুকাতে চাইনি কিন্তু!”

“ইটস ওখে,আমি জানি তুমিও আমার ভালোর জন্য‌ই বলোনি!”

“আপাই বিশ্বাস করো, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তারাজ ভাই তোমাকে খুব ভালো রাখবে!”

“আমি এখন ঘুমাবো! সকালে কোর্টে যেতে হবে!”

আফির বুঝলো আফনূর এখন কথা বলবে না তাই এখন ঘুমানোর বাহানা দেখাচ্ছে।সে এটাও জানে এখন তার আপাই কাঁদবে,খুব করে কাঁদবে!যদিও আপাইয়ের কান্না তার পছন্দ নয়,সহ্য হয় না। তবুও এখন সে চলে যাবে।হয়তো এটাই শেষ কান্না। ইনশাআল্লাহ এরপর থেকে তার আপাই আর কাঁদবে না।তারাজ ভাইতো বলছে আপাইয়ের চোখের পানি তার হৃদয়ে দহন সৃষ্টি করে,কেউ নিশ্চয়ই নিজের অন্তরে সেই দহন জ্বালাতে চাইবে না।

“আচ্ছা।ঘুমাও,শুভ রাত্রি!”

“শুভ রাত্রি!”

-----------------------------------------------

পরেরদিন.....

সকাল সাটা চুয়ান্ন,পোস্তা ব্রীজ থেকে আরো খানিকটা দূরে নদীর পাড় ঘেঁষে স্রোতে ভেসে আসা এক ঝাঁক কচুরিপানায় ডুবে আছে একটা লাশ। সাদা পাঞ্জাবির মাঝে ফ্যাকাশে বদনের লোমশ হাতটা বের হয়ে আছে।নদীর পারে প্রাত্যহিক কাজ সারতে আসা এক ভবঘুরে যখন‌ই কচুরিপানা‌ মাড়িয়ে নদীর পানিতে পা চুবালো দৃশ্যমান হয় উপরোক্ত দৃশ্যটি। আঁতকে উঠলো, চিৎকার করে নদীর পার ছেড়ে চলে এলো বহু দূরে! তার চিৎকারে নদীর পাশ ঘেঁষে দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত কিছু মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়লো ঘটনাটি।

অপরদিকে - 

সদরঘাট থেকে কামরাঙ্গীরচর মাদবর বাজারের ঠোডা নৌকা ঘাট অবধি এখন‌ও থেমে থেমে বন্ধ আছে নৌকা চলাচল। একটু পরপরই নামছে পরিবর্তিত ডুবুরির দল।কাল রাত সাড়ে আটটা থেকে শুরু হ‌ওয়া এই উদ্ধার অভিযানে চারদিকে এখনও কৌতুহলী হয়ে উপচে পড়ছে মানুষ। একটা মানুষ; না এখন‌ সে মানুষ না! নেই ! মানুষ শব্দটা পরিবর্তন করে অনেক আগেই সে নিজের পাশে লাশ শব্দটি লাগিয়ে নিয়েছে।

কি অদ্ভুত মানুষের জীবন তাই না! কাল যে এই সময়ে মানুষ ছিলো। যাকে তার আপনজন বিশেষত কোন নামে সম্বোধন করেছে আজ তাকে এক বাক্যে লাশ বলে অবহিত করছে!আজ তার নেই কোন নাম নেই কোন পদবি! 

“আসসালামু আলাইকুম!”

*****

“জ্বী, আমরা আসছি!”

***

“আপনারা ওখানেই রাখুন!”

কথা শেষ করে ফোনটা বা হাতের মুঠোয় নিয়ে তারাজের দিকে তাকালো। নির্ঘুম, দুশ্চিন্তায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।আত্নগ্লানিতে ডুবছে।যাকে সুস্থ জীবন দিয়ে তার মায়ের বুকে ফিরিয়ে দেওয়ার ওয়াদা করেছিলো তার এমন অকালপ্রয়ানের খবর কি করে তার বৃদ্ধ বাবা মায়ের নিকট পৌঁছাবে! 

“পোস্তায় একটা লাশ ভেসে উঠছে! পুলিশের সন্দেহ!”

“গিয়ে দেখে আয়!”

“তুইও চল; আমার মনে হচ্ছে!”

“না আমি যাবো না; তোরা যা! গিয়ে দেখে আয়!”

“তাহলে চল তোকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি!”

“আমি কোথাও যাচ্ছি না আপাতত,তোরা কয়েকজন গিয়ে লাশটা শনাক্ত কর,যদি রেহান হয় তবে ওকে নিয়ে ওর মায়ের কাছে চল।ভদ্র মহিলা নিশ্চয়ই কাল রাত থেকে দুশ্চিন্তা করছে,তার চিন্তার লাগাম টানতে হবে!বলতে হবে তার ছেলেকে হেফাজত করতে যার হাতে সঁপে ছিলো তার কারণেই আজ তার মানিক চিরতরে সর্পিত হলো।”

“ওদের টার্গেট তুই ছিলি, তোকে এখানে রাখা মানে হলো কুকুরের তাড়ায় জন্য রেখে যাওয়া।”

“মরার সময় আসলে এমনিতেই মরবো।তখন কেউ শত চেষ্টায়‌ও আটকে রাখতে পারবে না। তাছাড়াও এই পথে যখন নেমেছি তখন সবকিছুর মায়া ত্যাগ করেই নেমেছি। নিজের জীবনের‌ও; তোরা যা, দ্রুত!”

মুরাদ আর কথা বাড়ালো না। ফয়সালের হাতে অর্পণ করলো তারাজকে।ফয়সাল যেন তারাজের দেহে মিশে যাওয়ার মতো করেই লেগে আছে।তারাজ এদের আদিখ্যেতায় বিরক্ত হচ্ছে। নেহায়েৎ রেহানের বিষয়ে সে ভীষন হতাশ, দুঃখী! নয়তো এদের নির্ঘাত দুই চারটা লাগিয়ে দিতো।রাত থেকে 

একেকজন বাচ্চার মতো আচরণ করছে,এরা নাকি আবার রক্তাত রাজনীতিতে নেমেছে। রাজপথের লড়াকু সৈনিক হ‌ওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছে।অথচ সামান্য আঘাতেই এরা জর্জরিত।সে নিজেও রেহানের জন্য কষ্ট পাচ্ছ কিন্তু সেটা অবশ্যই প্রকাশ্যে দেখানোর দরকার অনুভব করছে না।যত‌ই হোক,এই খেলায় কাউকে না কাউকে হারাতেই হয়, আপনজন না হারিয়ে কে‌উ‌ই প্রকৃত স্বাদ পায়নি,আর পাবে‌ও না।তার প্রমান ইতিহাসে বহু আছে।তারাজ রেহানের এহেন মৃত্যুতে কষ্ট পাচ্ছ,তাতে সন্দেহ নেই কিন্তু শোকাবিভূত হয়ে জীবন পার নিশ্চয়ই করবে না।

বেলা গড়িয়ে দশটা, রেহানের লাশ শনাক্ত করে  ঢাকা মেডিকেল নিয়ে যাওয়া হয়েছে, আপাতত তার পোস্ট মর্ডেম করা হবে এরপর মর্গে জায়গা হবে,আইনি জটিলতার মাঠ পেরিয়ে কোন এক পরন্ত লগনে মায়ের বুকে ফিরে যাবে রেহান নামক উনিশ পেরোনো সেই সদ্য প্রয়াত হ‌ওয়া চঞ্চল যুবকটি!

-----------------------------------------------------------

“হ্যালো!” 

“ইয়েস?”

“আপনি ব্যারিষ্টার ইব্রাহিম তারাজ খন্দকারের সহকারী সাব্বির তাই না?”

“আপনার স্যার এসেছে?”

“জ্বী না ম্যাম!"

“আচ্ছা; উনি কখন আসবে অথবা আজ আসবে কি-না কিছু জানেন? বলছে আপনাকে?”

“না ম্যাম,গত রাত থেকেই স্যারের ফোনটা অফ পাচ্ছি যদিও আমার মুরাদ ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে তিনি বলেছেন স্যার আজ খুব ব্যস্ত থাকবেন তাই হয়তো কোর্টে আসতে পারবে না,যেহেতু আজ কোন কেইসের হিয়ারিং‌ও নেই সেহেতু আসাটাও খুব জরুরী নয়! তাই আজকের সব মিটিং‌ও ক্যান্সেল করে দিয়েছ!”

সাব্বির এক নিঃশ্বাসে পুরোটা বললো। আফনূর হতভম্ব হয়ে গেল।এত কিছু তো সে জিজ্ঞেস করেনি ‌তাহলে এই ছেলে এতকিছু তাকে কেন বলতে গেল? আশ্চর্য! নিজের মনেই বিরবির করে বললো,‘আশ্চর্য!’ মুখে বললো,

“ওহ! আচ্ছা ঠিক আছে!”

কথাটা বলেই আফনূর পিছু মুড়তেই সাব্বির শুধালো,

“স্যারকে কিছু বলতে হবে ম্যাম?আমি নাম্বার দিয়ে দেই!”

আফনূর ঘুরে দাঁড়ালো,তার চোখে মুখে এখনও বিমূঢ়ের রেশ, কোনমতে শুধু বললো,

“ নাম্বার?”

“জ্বী ম্যাম, আপনি‌ না হয় ফোন করেই বলে দিলেন যা বলার?”

“আপনার কেন মনে হলো আমি তাকে কিছু বলতে চাই?”

সাব্বির অতিরিক্ত উত্তেজনায় মুখ দিয়ে বেফাঁস বলতে শুরু করছিলো কিন্তু আফনূরের সন্দিহান নজর তাকে থামিয়ে দিলো। ইতিউতি করতে থাকলো,ধাত্বস্থ করলো নিজেকে, আফনূর এখনো এক‌‌ই-ভাবে তাকিয়ে রয়েছে।

“উনার নাম্বারটা দিন!”

“ম্যাম কোনটা দিবো? পার্সোনাল নাকি অফিসিয়াল?”

আফনূর একটু ভাবলো,পরক্ষণেই মনে মনে নিজেকেই জিজ্ঞেস করলো,

“নিশ্চয়‌ই সে আমার নাম্বার চিনে না।ব্যক্তিগত নাম্বারে কল দিলে না‌ও ধরতে পারে,তাই অফিসিয়ালটাতেই দেই!”

“আপনি আমাকে.”

“দুটোই নিন,স্যার ব্যক্তিগত নাম্বার একমাত্র পরিবারের সদস্যদের‌ই দেন, আপনিও তো খুব শিগগিরই ইনশাআল্লাহ স্যারের পরিবারের সদস্য হবেন সেক্ষেত্রে আপনার অধিকার সবার চেয়ে বেশী!”

 আফনূরের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সাব্বির নিজের কথা উগড়েই দিলো। আফনূর এত সময়ে বুঝলো এত ম্যাম ম্যাম করার আসল কারন। সে তো ভেবেছিল সিনিয়র দেখে সম্মান করেছে আসলে তা নয়। কিন্তু কথা হচ্ছে এ কি করে জানে এই খবর?

যেই কথা মাত্রই কাল রাতে হলো তার খবর এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়লো কি করে? তারাজ নিশ্চয়ই এখন‌ই সবার সাথে বিষয়টা ভাগ করেনি! অন্তত ওর সাথে একবার সরাসরি কথা না বলে নিশ্চয়ই এহেন কাজ করতে পারে না।

“আপনি যেই নাম্বারে ডায়াল করেছেন তা আপাতত বন্ধ আছে!”

-আপনার ডায়ালকৃত নাম্বার'টিতে এই মুহূর্তে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না,দয়া করে আবার চেষ্টা করুন?”

উচ্চ শব্দে ফোনে চলমান কলটা দিয়ে টেবিলের উপর স্তপ করে রাখা ব‌ইগুলোর সাথে ঠেকিয়ে রেখেছে অত্যাধুনিক মুঠোফোনটি। পরপর দুবার দেওয়ার পর‌ও এক‌ই গান গেয়ে চলেছে কোকিলা আপা। বিরক্ত হলো আফনূর।রাগ করে তারাজের পরিচিতি কার্ডটা ছুঁড়ে মারতে গিয়েও মারলো না।ধুমড়ে মুচড়ে হাতের মুঠোয় নেওয়া ভারী ফর্মার কাগজটি তালু মেলে তাকিয়ে র‌ইলো। খেয়াল করলো পিছনে কলম দিয়ে কিছু লেখা। 

উল্টো করে পড়লো, 'মুরাদ ভাই -০১৭৭++++***' হঠাৎ করেই মুখে হাসি ফুটলো কিন্তু কেন জানা নেই!

নাম্বার টুকে কল দিলো, রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ ধরলো না। পরপর দুইবার দিলেও ধরলো না, তিনবারের সময় কল দিয়ে নিজেই কেটে দিলো। বিরবির করে বললো,

“নিশ্চয়‌ই ভ্যাজাইল্লা কিছু নিয়ে ব্যস্ত ।নয়তো বস‌‌ও ফোন ধরে না চামচাও ধরে না!”

রাগ করতে গিয়েও করলো না। নিজের অজান্তেই সুক্ষ কষ্ট অনুভব করলো। পরক্ষণেই কাজে মনোনিবেশ করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মোবাইলটা রাখার জন্য পাওয়ারে চাপ দেওয়ার আগ মুহূর্তে মনে পড়লো তারাজের ব্যক্তিগত নাম্বারটা চেনা চেনা লাগছে। নাম্বারটা আবার তুললো, পরপর দুটো নাম্বার যেখানে পার্থক্য শুধু দুটো সংখ্যার। তারাজকে ফোন দেয়া নাম্বারটা বন্ধ তাই অপর নাম্বারে ফোন দিলো। প্রথমবার কেটে গেল। দ্বিতীয় বার ডায়াল করার সময় দেখলো ব্যস্ত দেখাচ্ছে।

 তারাজের সাদা পাঞ্জাবির পকেটে থাকা আইফোনের ফ্লাশ জ্বলে উঠতেই আইকনিক সেই আইফোনের রিং বেজে উঠলো।তারাজ ফোনটা বের করে নাম্বার দেখতেই ভ্রু কুঁচকে নিলো।এই সময়ে এই নাম্বার থেকে ফোন আসাটা একদমই আকাঙ্ক্ষিত নয়।মোটেই নয়।এই নাম্বার থেকে ফোন আসবে রাতে।যখন দুজনের মাঝেই প্রণয়ের আকাঙ্ক্ষা আকাশ ছুবে, অনুরক্তিতে মেখে থাকবে হৃদপ্রাঙ্গন; অজস্র প্রেম মাল্য গলে জড়াবে নিভৃতেই।এখন এই সময়ে তো কথা বলাও সম্ভব নয়। চারদিকে এত এত মানুষ। সাধারণ মানুষ,পুলিশ, সহকর্মী! তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে তো সাধারণ কথাও স্বাভাবিক ভাবে বলা সম্ভব নয় তবে প্রেয়সীর সঙ্গে প্রেমালাপ করবে কি করে? প্রেমালাপ! হ্যা প্রেমালাপ'ই তো! আফনূরকে দেখলেই তার প্রেম প্রেম পায়! কবি হতে ইচ্ছে হয়,অথচ আজীবন কবিতায় লাড্ডা মেরেছে।এখন এই বয়সে এক রমনীর মায়ায় পড়ে তাকে কবি হতে হচ্ছে,বাসনা জেগেছে মনে প্রেয়সীর তরে কবি হতে,প্রেয়সীর চরণে পেতে দিতে কামনায় গাথছে অজস্র ভালোবাসার কাব্য, গেঁথে চরণে পড়িয়ে দিতে ইচ্ছে জাগে কবিতার বুননে মাল্য! নিজের বেহায়া মনকে ধমকালো। পরিস্থিতি মোটেই ভালো না।এহেন সময়ে এমন নিব্বাপনা সমুচিত নয়।কতশত সাংবাদিক আশেপাশে।বিয়ের আগেই সে চায় না এই বিষয়টুকু প্রকাশ হোক। এমনিতেই তার জন্য ইতিমধ্যেই তার একজন আপনজন চলে গেছে তাকে ছেড়ে। এহেন মুহূর্তে নতুন করে কাউকে হারাতে চায় না। অন্তত আফনূরকে তো নয়‌'ই! আফনূরকে নিয়ে কোন রিস্ক নয়! আফনূরের জীবনে এমনিতেই বিপদ কম নয় তার মধ্যে সে নিজেও বিপদের কারণ হতে পারে না।তাই কন্ঠে বেশ রুক্ষতা ঢেলে গম্ভীর হয়ে শুধু বলার প্রস্তুতি নিলো।ফোনটা রিসিভ করতেই মিহি কন্ঠে ভেসে আসা কথার প্রত্ততরে শুধু বললো,

“হ্যা.

“ব্যস্ত আছি। পরে  ফোন দিবো!”

কথাটা বলেই ফোনটা কেটে দিলো।না সালাম নেওয়ার অপেক্ষা,না সালাম দেওয়ার ইচ্ছা।আর না কোন কুশলাদি।এটা কেমন কথা হলো? দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো বুক চিরে। কিছু একটা মনে হতেই উক্ত নাম্বারটা নিয়ে নিজের মস্তিষ্কের সব অঙ্গাদির পরামর্শে ঘেঁটে দেখতে গেল।আর হ্যা! তাই পেল,যা ক্ষুনাক্ষরেও চায়নি। গত রাতে এমনকি এর আগেও একটা বার্তা এসেছিল যেই নাম্বার থেকে সেটা আর কারো নয়, তারাজের! স্বয়ং ইব্রাহিম তারাজ খন্দকারের। কিভাবে সম্ভব? তার মানে কি তারাজের মনে তাকে নিয়ে আগে থেকেই অনুভূতি ছিলো? তারাজ কি তবে তাকে! তাও কিভাবে সম্ভব? তাদের তো দেখা সাক্ষাৎ হয়েছেই মাত্র হাতে গোনা! কিছুই বুঝতে পারছে না আফনূর। মাত্র দু চার বারের দেখা সাক্ষাতে আদৌও কাউকে অনুরক্তিতে জড়ানো সম্ভব? আফনূরকে বেশী ভাবতে হলো না।তার মধ্যেই কর্কশ কন্ঠে বেজে উঠলো মুঠোফোনটা।জ্বলজ্বল করে জ্বলে থাকা মোবাইলের পাতায় ভেসে আছে প্রাইভেট নাম্বার যা কিনা একান্তই ব্যক্তিগতভাবে নিবন্ধন করা।যার দরুন নামটা খুব সুন্দর করে ফুটে উঠেছে,'ব্যারিষ্টার মোঃ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার!' কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা তুললো, রিসিভ বাটনে আঙ্গুলের কারিশমা দেখাতেই ওপাশ থেকে খুবই আদুরে ভঙ্গিতে সালাম প্রেরিত হলো।

“আসসালামু আলাইকুম নূরজান!”

থমকে গেল আফনূর। কিছু সময় আগে কথা বলার ধরন আর  কন্ঠস্বর আর এই মুহূর্তের কন্ঠস্বরের মাঝে বিশাল ব্যবধান।আগে ছিলো রুক্ষ সুক্ষ একটি তেজি কন্ঠ আর এখন।কত মধুর শোনাচ্ছে।এত মধুর,মোলায়েম কন্ঠ যেন বহুবছর আগে শুনেছিলো।কতশত ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছে এই শব্দে,এত কেন আবেগ ছিলো এই শব্দগুলোতে। আফনূরের রেসপন্স না পেয়ে অপর দিক থেকে এক‌ই কন্ঠস্বরের তাড়া!

আফনূর কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিলো,

“ওয়ালাইকুম আসসালাম!কেমন আছেন?”

“আমি আলহামদুলিল্লাহ, তোমার অবস্থা বলো? হঠাৎ এই অধমকে ফোন!”

“না মানে আসলে আমি!”

আফনূর থামলো, মনে হচ্ছে অপর প্রান্তে কেউ তারাজকে ডাকছে,তারাজ তাদের উদ্দেশ্য বললো 'একটু সময়!' আফনূরের সচেতন মন বললো, 'এখন নয়।তারাজ এখন ব্যস্ত। নিজেদের ব্যক্তিগত আলাপ পরেও করা যাবে!' তাই তারাজকে বললো,

“না এমনিতেই,আসলে আমি জাস্ট চেইক করছিলাম নাম্বারটা ঠিক আছে কি-না?”

আফনূরের কথায় তারাজ ঠোঁট কামড়ে একটু হাসলো। আফনূর এমনিতেই ফোন দেয়নি। অন্তত এই নাম্বারে নয়।কারণ এই নাম্বারটা শুধু মাত্র আফনূরকে জ্বালাতেই নেওয়া হয়েছিল,সেই নাম্বারে যেহেতু ফোন দিয়েছে।গত রাতে তাকে মেসেজ দিয়েছিলো।তার মানে তাকে ধুতেই কল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পারছে না।ইচ্ছা করছে একটু জ্বালাতে। কিন্তু সেও পারলো না। আপাতত থানার সামনে দাঁড়িয়ে তারা। রেহানের লাশটা আজ‌'ই চাচ্ছে। যেকোন ভাবেই আজকের মধ্যেই দাফন সম্পন্ন করতে হবে।ভোটের দিন ঘনিয়ে আসছে এখন এইসব নিয়ে ব্যস্ত থাকলে নির্বাচনী প্রচারণা কখন চালাবে? তাই তাড়াতাড়ি এই পাঠ চুকাতে চায়। কিন্তু আইনের ধারার শেষ নেই। একেরপর এক ধারায় আটকে দিচ্ছে।এর মধ্যেই আফনূর নামক রমনীর অনাকাঙ্ক্ষিত ফোন।প্রথমে যত‌ই ভাব দেখিয়ে তাড়া দেখাক।পর মূহুর্তে চিত্তে উদয় হলো সবার আগে তার পরিবার,আর এখন আফনূর‌ও তার পরিবারের অংশ! তার রমনী,স্ত্রী, অর্ধাঙ্গিনী! হোক সব শব্দের আগে হবু লাগানো। তাতে কি! তার‌ই তো! তার‌ই নুরজান! সবকিছুর উর্ধ্বে তার নূরজানের স্থান, নূরের সঙ্গে কোন ব্যস্ততা নয়।সব কিছুর গুরুত্ব ফিকে এক নূরের কাছে।

মন মস্তিষ্কের যুদ্ধে এবার‌ও হার মানলো মস্তিষ্ক। সবাইকে একটু পাশ কেটে থানার বাইরে বেরিয়ে রাস্তার অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে ফিরতি কল দিলো।কথা বলা শুরু হতেই অপর পাশ থেকে ডাক পড়লো যার আওয়াজ পৌঁছে গেল আফনূরের কান অবধি। আফনূর নিজেই বললো,

“আচ্ছা আপনি এখন কাজ করুন,আমি না হয় পরে ফোন দিবো!”

তারাজ বাঁধা দিতে গিয়েও দিলো না।সে এখন কোন মতেই শান্তি করে কথা বলতে পারবে না। বারবার কেউ না কেউ বিরক্ত করবেই! তাই রেখে দেওয়াই উত্তম!স্নেহিত ভাবে বললো,

“সাবধানে থেকো! আল্লাহ হাফেজ!”

আফনূরের ছোট্ট উত্তর,

“হুম!”

তারাজের সাথে কথা শেষ করে বেশ খানিকক্ষণ এভাবেই চুপচাপ বসে র‌ইলো। বুঝতে পারছে না। কি করবে! তার পরিবার তারাজকে নিয়ে খুব উচ্ছাসিত! সবার ধারণা তারাজের সাথেই সুখী হবে।আদৌও কি তাই সম্ভব? তারাজ জেনেশুনে কি  এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করবে যার চরিত্রে আছে কলঙ্কের কালি? যার দেহে আছে কাউকে পরিপূর্ণ করার অক্ষমতা! আফনূরের তো ইচ্ছে হয় কারো বুকে মাথা রেখে হুহু করে কাঁদতে, কাঁদতে কাঁদতে কারো বুক ভাসিয়ে দিতে।অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে কারো বুকের সাথে মিশে! কিন্তু ঐ যে তার অপ্রতুল অক্ষমতা তাকে বাঁধা দেয়,বিবেক নিষেধাজ্ঞা জারি করে বারবার কাউকে না ঠকাতে! 

আফনূর জানে তার পরিবারের কেউ তার সত্যতা বলেনি তারাজকে।তারা চায় এটা অতীত অতীতেই থাকুক। কিন্তু তারা বুঝে না সত্য আসলে কখনোই লুকায়িত থাকে না।তার উন্মোচন কখনো না কখনো ঘটেই। আজ অথবা কাল।একদিন হবেই। কিন্তু সবসময় সময় বুঝে হয় না। অসময়ে হলে ভালোর চেয়ে মন্দের দগ্ধতা বেশি হয় যার দরুন যন্ত্রনাও বেশি হয়!যেই যন্ত্রনা সহ্য করার ক্ষমতা আফনূরের নেই। তাই আফনূর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে বিয়ের আগেই তারাজকে সব বলবে,তাতে যা হবার হবে। অবশ্য এর আগেও দুবার সে দুই পাত্রের মুখোমুখি হয়েছিলো। তাদের‌ও সত্য বলেছিলো। এরপর যা হবার তাই হয়েছে।তারা স্পষ্ট না বলে দিয়েছে।ভালোই হয়েছে।তারা মহানুভবতা দেখিয়ে মিথ্যা বলেনি। অন্তত চুড়ান্ত ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেছে।

-------------------------------------------------

“তোমার কি আমার তরফ থেকে সহায়তা লাগবে?”

“না আব্বা সব মিটে গেছে।ওরা এখন‌ই রেহানের লাশকে ছেড়ে দিবে! ফয়সাল আছে হসপিটালে। ওরাই নিয়ে আসবে!”

“আচ্ছা সাবধানে থেকো।আর তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরো! তোমার আম্মা ফ্যাচফ্যাচ করছে!”

“আব্বা! এভাবে কেন বলছেন! আম্মা নরম প্রকৃতির! কাঁদা মাটির মতো”

“হ্যা।আমার‌ই ভুল হয়েছিলো।এমন কাঁদাকে ঘরে তুলে আনছিলাম! কথায় কথায় ফ্যাচফ্যাচানি শুরু করে দেয়! যার স্বামী রাজনীতি করে,ছেলেরা রাজনীতি করে সে এমন নরম কেন হবে!তাকে হতে হবে স্ট্রং লাইক বড় ব‌উমার মতো!কোন কিছু হলেই সে কাঁথা কম্বল মুড়ি দিয়ে ফ্যাচফ্যাচ করতে বসে! আশ্চর্য! মাথা খেয়ে নিচ্ছে আমার!”

“শান্ত হোন আব্বা! মাথা গরম করবেন না অন্তত আম্মার সামনে তো নয়‌ই!”

“আর শান্ত, তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরো।তোমাকে সুস্থ দেখলেই এই ফ্যাচফ্যাচ বন্ধ হবে।ঘরে টেকা যাচ্ছে না!চোখের পানি,সর্দি দিয়ে আমার ঘর নোংরা করে ফেলছে!ইস্!”

তারাজ বুঝলো তার বাবা তার মায়ের সামনে দাঁড়িয়েই‌ মা'কে চেতাতেই কথাগুলো বলছে,সে মুচকি হাসলো।আব্বা তার বেশ রসিকতা করে। বিশেষ করে আম্মাকে ক্ষ্যাপাতে তার বাবার জুড়ি মেলা ভার।সে কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে শুধু জিজ্ঞেস করলো,

“আব্বা নূরকে আপনার পছন্দ হয়েছে?”

“নূর কে?”

ইসহাক আবদুল্লাহ ভ্রু কুঞ্চিত করলেন,নূর নামক শব্দের সাথে সে পরিচিত আছে বলে বোধ উদয় হলো না। তারাজ বুঝলো ব্যাপারটা।এক রাত্তিরেই তারা আফনূর থেকে নূরকে আলাদা করতে পারবে না।সবাই কি আর সে ,যে এক পলকেই আফনূর থেকে নূরজানে নিয়ে আসবে! আসাও উচিত নয়।নূরজান কিংবা অদুরে নুর শুধুই তার জন্য। একান্ত‌ই তার শব্দ! ভালোবাসার শব্দ!

গলা খাঁকারি দিয়ে একটু গম্ভীর হয়ে আবারও জিজ্ঞেস করলো।তবে সম্পূর্ণ নামে,

“আম মানে আফনূরের কথা বলছিলাম!”

“ওহ বড় ব‌উমা! হ্যা হ্যা শুধু আমার' না! তোমার ফ্যাচফ্যাচে কাঁদা মায়ের‌ও বেশ মনে ধরেছে।সে তো নিজের গলার চেইন খুলে পড়িয়ে দিয়েছে!"

“কেন আম্মা আংটি নিয়ে না যাবে বললো!”

“গিয়েছিলো কিন্তু আমরা তোমার আম্মা চাচ্ছে এই আংটি তুমি‌ই ব‌উমাকে পড়িয়ে দাও! তাই নিজে আর পড়ায়নি।তাই হোক তুমি সব কথা বাড়ি ফিরে শুনো। দ্রুত আসো!”

“জ্বী, আসছি! ফ্রেশ হতে হবে, রেহানের জানাজা বাদ যোহরেই সাড়তে চাচ্ছি!"

“তাই নাকি! তাহলে তো..! আচ্ছা তুমি আসো তারপর দেখি!"

“আব্বা আম্মাকে একটু বলুন না রেহানের মায়ের কাছে গিয়ে তাকে একটু সামলাতে!”

“যে নিজের সুস্থ ছেলের শোকে কাতর সে সামলাবে ছেলে হারা মা'কে? তাহলেই হয়েছিল!”

“পারবে আব্বা,কারণ সেও মা! তার সন্তানকে বাঁচাতেই ঐ মায়ের সন্তান আজ.!”

তারাজের কন্ঠ কেঁপে উঠলো,রেহানের সাথে জড়িত কতশত স্মৃতি মনে পড়লো। তারাজ যত‌ই মিশুক হোক সবার সাথে নয়।তার সান্নিধ্যে খুব সান্নিধ্যে এসেছে কেবল ফয়সাল। মুরাদের সাথে সম্পর্ক ছোট থেকেই একদমই ভাইয়ের মতোই দুজন। এরপর ফয়সাল।যে কিনা নিজের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। এর বাইরে সবাই ভালোবাসা পেলেও এতটা নিকটে আসতে পারেনি। তারাজ দেখেছ তাদের সবার মাঝেও তারাজকে আগলে রাখার,তার কাছে অধীনস্থ মেনে নেওয়ার 

তীব্র মনোব্যক্ত ছিলো রেহানের মাঝে।

আজ থেকে বছর আড়াই আগে। নটর ডেম কলেজে, বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণি পড়ুয়া রেহানকে চকবাজার থেকে মাদকের সাথে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরিবারের কানে খবর যেতেই মা মূর্ছা যায়। একমাত্র উত্তরাধিকারী, একমাত্র সন্তানের এমন বিপদে যাওয়ায় বাবাও ভেঙে পড়ে। পাশাপাশি বাড়ি হ‌ওয়ায় আইনজীবী ইসহাক আবদুল্লাহর নিকট সহায়তা আশা করে।তিনি আইনজীবী পাশাপাশি কাউন্সিলর।তার‌ও দায়িত্ব রয়েছে একজন ভালো মেধাবী ছাত্র ও মায়ের সন্তানকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার।তিনি নিজের সদ্য বিলেত ফেরত পুত্র তারাজকে দায়িত্ব দিলো ভালো একটা আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করতে।তারাজ বাবার আদেশ সব মোতাবেক করলো। আইনজীবী বশিরের সাথে সর্ব প্রথম কৌতুহলী হয়ে রেহানকে দেখতে গেলো। আশ্চর্যের চুড়ান্তে গিয়ে খেই হারালো। ছোট্ট বেলায় পল্টি মুরগি বলে ক্ষ্যাপাতো রেহানকে।অত্যাধিক ফর্সা আর নরম শরীরের ছেলে ছিলো রেহান, একমাত্র সন্তান হ‌ওয়ায় মা তাঁকে আগলে আগলে রাখতো এমনকি মাঠেও খেলতে যেতে দিতো না।যদি পড়ে ব্যথা পায়।সেই ছেলের এই অবস্থা? কালসিটে পড়ে গেছে মুখে, ঠোঁটগুলোও ফ্যাকাশে হয়ে আছে।পুলিশ যে থানায় নিয়ে মেরেছে তার প্রমান দেখা যাচ্ছে তার হাতে পায়ে লেগে তাকা কালসিটে বেতের ছাপে!

সেবার নানা জটিলতা কাটিয়ে রেহানকে রেহাই করাতে পেরেছিলো। এরপর তার পরিবার রিহ্যাবে দিয়েছিলো।তিন মাস থাকার পর সেখান থেকে পালিয়ে বাসায় চলে আসে। ছেলের মুখ আর শারীরিক অবস্থা দেখে তারা আর রিহ্যাবে পাঠানোর সাহস করেনি।রেহান‌ও বাবা মায়ের পা ধরে কান্নাকাটি করে, মাফ চেয়ে ওয়াদা করেছিল কখনো আর ছুঁয়েও দেখবে না।যদিও তার সপ্তাহ পেরুতেই তাকে সিগারেট হাতে ধরা হয় এবং সাধারণ সিগারেট ছিলো না তাও নিশ্চিত করা হয়। সেদিন তারাজ রাগে একটি চড় দিয়েছিলো ওর বাবা মায়ের সামনেই।প্রতিবেশী হ‌ওয়া তারাজ তাজিশ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা বেশ ছিলো। তারাও খুব পছন্দ করেন ইসহাক সাহেবের এই দুই ধনকে।তারাজে সাহস করায় উনারা কিছু মনে করেনি। বরং বলেছিলো নিজের ভাই মনে করেই যেন তাকে নিজের কাছে আগলে রাখে তারাজ। একটু শুধরে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনে! তারাজ তাই করছিলো।রেহান বেশ স্বাভাবিক হয়েছে অনেক আগেই।তবুও তারাজ একটু দুরত্ব বজায় রাখতো যাতে কখনো রেহানের মনে না হয় তাকে সুযোই দেওয়া হচ্ছে।তাকে বুঝতে হবে সবকিছু কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়,আর যা অর্জন করতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় তাকে যেনতেন ভাবে নষ্ট করা যায় না।সেটা হোক মানুষের ভালোবাসা, সম্মান কিংবা অর্থ প্রাচুর্য।সে নিজের অধঃপতনে নিজের বাবা মায়ের যে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছে কেবল তাই নয় তার চেয়েও বেশি করেছে সম্মানের ক্ষতি। একজন পরহেজগার মায়ের সন্তান, একজন সাদামাটা জীবনের অধিকারী কঠোর পরিশ্রমী, সৎ ব্যাবসায়ীর সন্তান হয়ে সে নিশ্চয়ই মাদকের সাথে জড়িয়ে অন্যায় করেছে। বাবা মা'কে কষ্ট দিয়েছে তাদের সম্মান ক্ষুন্ন করেছে।এর জন্য অবশ্যই তাকে কঠিন মাশুল দিতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে সেই সবকে যা তার জন্য হারিয়ে গেছে।

চলবে??

দ্রুত লেখার জন্য এবং চেকিং না দেওয়ার জন্য বানানে সমস্যা থাকতে পারে,তাই দেখিয়ে দিলে উপকৃত হবো। ধন্যবাদ প্রিয় পাঠক পাঠিকা! ভালোবাসা সব্যার জন্য!😘

নতুন বছরে সবার জীবনে সব ভালো হোক।


পর্ব ১৯


‘ ঢাকা ২ আসনের প্রার্থী ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারকে হত্যাচেষ্টা! বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন...

মুঠোফোনে আগত নোটিফিকেশন চেইক করতে গিয়ে উক্ত লাইনটা পড়েই থমকে গেল আফনূরের বৃদ্ধাঙ্গুলি। স্তব্ধ নয়নে তাকিয়ে র‌ইলো।হুট করেই অন্তরে হাহাকার তৈরি হলো। কিন্তু কেন! নিজেকে সামলাতে কোনমতে স্থির করলো মস্তিস্কের নিউরনকে।আগত নোটিফিকেশন বারে ক্লিক করতেই বিস্তারিত পাতায় ঢুকে গেল,

....... আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা ২ আসনে সরকার দলীয় মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলিতে নিহত তার‌ই দলীয় কর্মী রেহান উদ্দিন।গতকাল সারাদিন কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্য বাবুবাজার নৌকা ঘাট হয়ে নৌপথে ফেরার সময় মাঝ নদীতে তাকেই লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়েছিল বলে ধারনা করে হচ্ছে। ঘটনাক্রমে দুষ্কৃতকারীদের লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয় এবং তাতে নিহত হয়  তার‌ই কর্মী রেহান উদ্দিন(২০)।এই খবর ছাপা অবধি এখনও রেহানের লাশ কিংবা মরদেহ উদ্ধারে সক্ষম হয়নি ডুবুরিরা।ধারনা করা হচ্ছে ব্যস্ত এড়িয়া বলেই হয়তো কোন মাঝারি আকারের মালবাহী জাহাজের সাথে বাড়ি গেয়ে লাশটা দূরে সরে গেছে।

তবে লাশ উদ্ধারের জন্য তৎপর হয়ে কাজ করছে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা।ডুবুরি,নৌ পুলিশ স্থানীয় সাতারুরা সহ একাধিক টিম সারারাত থেকেই অবিরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।এই ঘটনায় ইব্রাহিম তারাজ কোন প্রতিক্রিয়া না দেখালেও তার ব্যক্তিগত সহকারী মুরাদ হাওলাদার বলেছেন,তারা প্রতিপক্ষকেই এই ঘটনার জন্য দায়ী করছেন।রেহান হত্যার যথোপযুক্ত বিচারের দাবিতে তারা কঠোর প্রতিবাদে রাজপথে নামবে।এই খুনী, সন্ত্রাসীর ফাঁসি চায়। এরা কখনোই দেশ জাতির জন্য কল্যান কামনা করতে পারে না।

ইব্রাহীম তারাজ মুখ দিয়ে কথা না বললেও তার মুখ প্রতিক্রিয়া বুঝিয়ে দিচ্ছে নিজের সহোদরসম কর্মীর এমন আত্নত্যআগে তিনি ঠিক কতটা আহত।এইতো দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে ভোট,এর মধ্যেই কাছের বিশ্বস্ত একজন কর্মী হারানো তার জন্য দুঃখের‌ই বটে। আমরা মৃত রেহানের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

বাংলা ট্রিবিউন ,ঢাকা।

এই খবর ছাপার শেষ সময় ভোর পাঁচটা।এর পরের আপডেট পরবর্তী অন্য একটি খন্ডে,যেখানে উল্লিখিত করা হয়েছে রেহানের লাশ শনাক্ত করতে পারার বিষয়টি।

দ্বিধান্বিত আফনূর অস্থির হয়ে উঠলো। অজান্তেই গলায় হাত চলে গেল।তাজিয়া খাঁ এর পড়ইয়এ দেওয়া চেইনটা এখন‌ও গলায়। হাতটা চেইনের উপ্রে রেখেই ভাবতে লাগলো,কি আশ্চর্য! মাত্র একটা রাত, কিছু শব্দ! এতেই কেউ আপন হয়ে যায়? তবে কেন এত ছটফটানি শুরু হলো? তারাজের সাথে এখনও সম্পর্ক হয়নি, শুধু কথা হয়েছে, তাতেই? 

আফনূরের দেহ অসাড় হয়ে যাচ্ছে। কোন কিছু ভালো লাগছে না, মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে তারাজকে নিজ চোখে দেখলে ভালো লাগতো। পরক্ষণেই নিজেকে শাসালো।এসব কি? এখনও অনেক দূর বাকী; সত্যিটা তাকে জানানো বাকী! তার ভেতরে নিজের জন্য আদৌও খাঁটি অনুভূতি আছে কি-না তাও বোঝা দরকার,জানা দরকার সেই মানুষটির গহীনে তাকে নিয়ে চলমান অনুরক্তি।এত সহজেই কারো প্রতি আর দুর্বল হবে না আফনূর রেজ‌ওয়ান। কিন্তু! একবার তো অন্তত সিনিয়র সহকর্মী হিসেবে খবর নেওয়াই উচিত!

যোহর গড়িয়ে পড়েছে, সালাতের পর রেহানের লাশ কাঁধে তুলে নিয়েছে তার স্বজনেরা।তারাজ‌ও আগে আগে হাঁটছে সামনের এক পাশে হাত রেখে। রনি মার্কেট ব্রীজ পেরিয়ে বেড়িবাঁধে উঠতেই ফোনটা বেজে উঠলো। রিসিভ করার ইচ্ছা জাগলো না। ওভাবেই রেখে দিলো।ফোনটা নতুন। রাতে রেহান যখন গুলিবিদ্ধ হয়ে পানিতে পড়ে তখন তারাজের ফোন হাতেই ছিলো।পেছন থেকে নিক্ষেপিত গুলি ঘাড়ের মধ্যিমাংশ দিয়ে ঢুকে সামনের মধ্যিমাংশ ভেদ করে বেরিয়ে যায়।রেহান সামনের দিকে ঝুঁকে তারাজের গায়ে ঢলে পড়ে।তারাজ কিছু বোঝার আগেই রেহান সোজা হয়ে তারাজের হাতে হাত রেখে কিছু বলার চেষ্টা করতেই গলা দিয়ে ফরফরিয়ে রক্ত বের হয়,  রেহান শক্তিহীন হয়ে পেছনের দিকে ঢলে পড়ে।সোজা পানির গভীরে চলে যায় সাথে তারাজের ফোন‌ও। তাই সবাই রাতে তারাজকে ফোনে পায় না। সকালে শোনার পর তাজিশ নিজ উদ্যোগেই সবার আগে নিজ সহোদরের জন্য নতুন মুঠোফোনটা কিনে আনে। আপাতত নতুন ফোনেই আছে তারাজের সব সিম কার্ড।

বারবার বিরতিহীন বেজে চলায় বিরক্ত চলে আসে। ফোনটা বের করে, নাম্বার না দেখেই চাপ দিয়ে বন্ধ করে ফেলে।অথচ অপরদিকের মানুষটা নিজ অজান্তেই ছটফট করে চলেছে।

পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে রেহান নামক অতীত রক্তের অস্তিত্ব।নিজ কর্মের হিসেবে নিকেশে তাকে করতে হবে বহু কঠোর পরিশ্রম।মা বাবার আদুরে,শত ত্যাগের ভালোবাসার অস্তিত্ব এভাবেই বিলিন হয়ে যায় কারো ভয়াল থাবায়। হারিয়ে যায় রক্তের খেলায় বাজিমাতের নেশায়।কোন অপরাধের দায়ে নয় এরা হারায় কারো লিপ্সার তাড়নায়! কারো অতিলোভের ক্ষুধা নিবারণের পানে বিসর্জিত হয় এদের জীবন।অন্যের জন্য জায়গা তৈরি করতেই যেন এদের ভূগর্ভে আগমন। এরকম রেহান বহু আছে।যারা ক্ষমতার খেলায় বলির পাঠা হয়,যাদের রক্ত দিয়ে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে অভিভাবক নামক রাজনৈতিক কর্তারা।

‘ আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা-শারিকালাহু ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।’

     - অর্থ : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের উপযুক্ত না এবং আল্লাহর কোন অংশীদার নেই | আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হযরত মুহাম্মদ(সাঃ ) আল্লার শ্রেষ্ঠ বান্দা এবং আল্লাহ প্রেরিত রসূল |

বাড়ির এত এত চিন্তায় তাজিশ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল তুলি নামক রমনীর কথা।ভাইয়ের হঠাৎ বিয়ে নিয়ে তান্ডব।এর মধ্যেই তাদের‌ই একজন দলীয় কর্মীর হঠাৎ মৃত্যু তাও কিনা তার‌ই ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে।এই নিয়েও বেশ চিন্তিত যদিও সে জানে যত কিছুই হোক তার ভাইয়ের কোন হেলদোল নেই। বরং তার ভাই আপাতত মজে আছে নির্বাচনী প্রচারণায় আর নিজের মনোকুমারীকে নিয়ে।

‘ রবীন্দ্র সরোবর,লেক পাশে।বিকেল চার'টা।আগামী পরশু।’

তুলি হামিদের একাউন্ট থেকে আসা বার্তায় তাজিশের দেহকোষ চনমনে হয়ে উঠলো।অজানা ভালো লাগা, খারাপ লাগায় মিশে একাকার। বিহঙ্গের ন্যায় উড়ুউড়ু চিন্তাশক্তি।কি হবে,কি বলবে জানা নেই

শুধু জানে খারাপ যেন না হয়। কোনমতেই যেন নেতিবাচক কিছু না হয়!গতকাল রাতেই উত্তরটা এসেছে তার মানে সে বার্তা পাঠানোর পরপরই উত্তর এসেছে কিন্তু সে দেখেনি। ইস্ যদি এখন‌ও না দেখতো? তবে তো কাল যেতেই পারতো না।

 তাজিশের মনে পড়লো কাল তো তার মায়ের সাথে মার্কেটে যেতে হবে ভাইয়ের বিয়ের কেনাকাটা করতে! উফ! কি করবে? ঠোঁট কামড়ে ভাবতে লাগলো,এখন‌ও ই-মেল চেইক হতো না যদি না অফিসে ইমেইল করার জন্য জি-মেইল ফোল্ডারে ইন করতো।তাজিশ ভাবলো কি করা যায়? তুলিকে একবার ফোন দিবে? কিন্তু!

“  আচ্ছা তুলিকে আমাদের সাথে শপিং করার অফার দিলে কেমন হয়?উহু, না ; ব্যাড আইডিয়া! আহনাফকে না বলে তার বোনকে বললে সবাই ভালোভাবে নিবে না। তাছাড়া বাড়িতে কেউ যেহেতু জানে না সেহেতু!  কি করবো,কি করবো? চারটা! আমাদের শপিং করতে করতে রাত‌ও হয়ে যেতে পারে তবে কিভাবে কি?"

বিরবির করে নিজেই নিজেকে বলছে আর পায়চারি করে চলেছে অবিরত।পর মূহুর্তে একটা কিছু মনে পড়লো।চমকিত চোখে তুড়ি বাজিয়ে বললো,

“মিল গায়া,দিমাগকি বাত্তি খুলগায়া!”

খুশি খুশি মনে তুলির ই-মেইলে উত্তর দিয়ে দিলো। অতঃপর নিশ্চিত মনে তার মায়ের ঘরের উদ্দেশ্য পা বাড়ালো।

রেহানকে দাফন দিয়ে সবাই ফিরে আসে।রয়ে যায় রেহান তার চিরস্থায়ী ঘরে।কাল এই সময়ে সে তার ভাইয়ের হয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলছিলো, ' আমার ভাই তোমার ভাই, ইব্রাহীম ভাই, ইব্রাহীম ভাই!' অথচ আজ তাকে বলতে হচ্ছে নকীর মুনকির এর প্রশ্নের উত্তর! দিতে হচ্ছে কবরের ভয়াবহ প্রশ্নের উত্তর।যে কাল তার ভাইয়ের সামান্য গঞ্ছনায় ত্যাক্ত 

হয়ে পড়েছিলো,যে কিনা সামান্য নিচু কথায় ক্রুধিত হয়েছিল আজ তার সাথে ঠিক কি কি হচ্ছে তা হয় তো সে বুঝতেও পারছে না।

“ অফিসে যাবি।সবাই মূর্ছা যাচ্ছে,সব কটাকে সতেজ করতে হবে। রেহানের আসামী তো অবশ্যই ধরা পড়বে। আজ বাদে আর পাঁচদিন। এরপরে তো প্রচারণার কাজ বন্ধ, সো।সবার নজর তখন থাকবে সকল প্রার্থীর ধৈর্য্যের দিকে।আর হ্যা আমি যদি ক্ষুনাক্ষরেও খবর পাই এর সাথে তোর ভাইয়ের যোগসূত্র আছে খোদার কসম মুরাদ আমি ওকে মাটিতে পুঁতে ফেলবো!”

পা থেমে গেল মুরাদের।চকিত চোখে তাকালো তারাজের পানে,তারাজ দাঁত কিড়মিড় করছে।কাল থেকে শান্ত; তবে কি তারাজ অনুমান করেই নিয়েছে তাকে মারার জন্য সোহাগ‌ই এই ঘটনা! ওহ নোহ!সোহাগ এটা কি করলি? নিজের গায়ে আঘাতে যতটা না চটতো তার চেয়েও সহস্রগুন বেশী চটেছে রেহানের জন্য।কাল থেকে এখন অবধি একবারও রেহানের মায়ের মুখোমুখি হয়নি। শুধুমাত্র জবাবদিহিতার ভয়ে নয়,ঐ মায়ের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস পাচ্ছে না।যার ছেলেকে স্বাভাবিক অবস্থায় তার বুকে ফিরিয়ে দেওয়ার ওয়াদা করেছিলো তার সেই ছেলেটি আজ আর পৃথিবীতে নেই!ঠিক কতখানি বিধ্বস্ত তারাজের অন্তর তা কেবল হয়তো সেই অনুমান করছে আর করছে সবার রব।

সন্ধ্যা ৭ টা ১১ মিনিট,নিজ অফিস কক্ষে বসে আইন নিয়ে চর্চা করেছে,কিছু সময় আগেই রেহানদের বাড়ি থেকে ফিরেছে। তাজিয়া খাঁ ও তানহাও এসেছে। তানহা অফিস থেকে আজ এক সপ্তাহের ছুটি নিয়েছে ভাইয়ের বিয়ে বলে। এদিকে রেহানের মা'কেও দেখতে যেতে হয়েছে। মোটামুটি আজ খন্দকার পরিবারের সবাই রেহানদের বাসায় বেশ সময় কাটিয়েছে। দায়িত্ববোধ থেকে নয়, নিজস্ব কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে।আজ যেখানে তারাজ থাকতে পারতো সেখানে আছে রেহান।এই যা।এই একমাত্র কৃতজ্ঞতা বোধ থেকেই তারা রেহানের মায়ের প্রতি এত সহমর্মিতা দেখাচ্ছে।

তবে তারাজ এখনো রেহানের মায়ের মুখোমুখি হয়নি যদিও রেহানের বাবার হাত ধরে মাফ চেয়েছে।তিনিও মাফ করে দিয়েছেন।রেহানের মৃত্যুর জন্য তিনি তারাজকে দায়ী করেননি।তার ভাগ্য আর ছেলের আয়ুর সীমা বলেই কথার পরিসমাপ্তি টেনেছেন। 

ব‌ইয়ের পাতায় চোখ বুলাতেই মনে পড়লো মোবাইলের কথা। তড়িৎ গতিতে পকেটে হাত ঢুকিয়ে মোবাইল বের করলো। যেহেতু রাজনৈতিক কাজে তাকে না পেলে মুরাদকে সবাই ফোন দেয় এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাছাড়াও আজ সবাই জানে তারাজের মনোবস্থা।তাই অযথা কেউ বিরক্ত‌ও করেনি। অফিসিয়াল কাজ সাব্বির সামলিয়েছে।তাই আজ আর বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়নি।

পাওয়ার বাটনে চাপ দিতেই মোবাইল চালু হয়,পরপর অনেকগুলো বার্তায় টাল হয়ে পড়ে নতুন ফোনের বার্তা ঘর। পর্দায় ভেসে উঠে পর কয়েকটি 

মিস করে যাওয়া কল।ভালো করে দেখলে বোঝা যায় বেশ কয়েকটি পরিচিত নাম্বার।তার মাঝেও তিনবারের মতো কল দেওয়া নাম্বারটা জীবনে নতুন। তবুও পরিচিত,অতি পরিচিত।তারাজ একটু থমকালো এতগুলো কল কেন দিয়েছিলো। নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটেছে! ইস্ কেন তখন ফোনটা রিসিভ করেনি! একবার দেখেই নিতো নাম্বারটা।খুব কি বেশি সময় লাগতো?

নিজেকে নিজে বকাবকি করতেই কলে চাপ দিলো। অপরদিকে রিং হচ্ছে, তারাজের বুক ধরফর করছে। অস্থিরতা, চিন্তা আর অদ্ভুত এক অনুভুতি মিশেলে কেমন কেমন লাগছে। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ 

থেকে ভেসে আসলো খুবই মিহি এক কন্ঠ,কন্ঠরাণী আদবের সহিত সালাম,

“আসসালামু আলাইকুম!”

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম! আহ্ তুমি যখন ফোন দিয়েছিলে তখন আমি আজিমপুরে যাচ্ছিলাম তাই না দেখেই ফোনটা অফ করে ফেলেছিলাম আসলে বারবার ফোন আসছিলো তো তাই!”

“ইটস ওখে আপনাক কৈফিয়ত দিতে হবে না।আমি বুঝতে পেরেছি।”

“থ্যাংকস বোঝার জন্য!তা বলো কি করছো?"

“তেমন বিশেষ কিছু নয়,রেগুলার এক্টিভিটিস!স্ট্যাডি!"

“গুড!”

উভয় পক্ষ চুপ হয়ে গেল,কেউ‌ই যেন বুঝতে পারছে না কি বলবে! তারাজ সংকোচে,আফনূর দ্বিধায়! দুই দিকে দুইজনের মাঝে চলমান দুই অনুভূতি তাদের আঁকড়ে আছে। কিভাবে তারা নিজেদের মাঝের এই দূরত্ব কমাবে?

বেশ খানিকটা মুহূর্ত অতিক্রান্ত হলো।একে অপরের নিঃশ্বাসের গতি প্রগতির ধ্বনি গুনে। নিরবতায়, নিশ্চুপ বহমানতায়। অবশেষে তারাজ‌ই মনোব্রত ভঙ্গ করলো। শুধালো,

“ তখন ফোন দেওয়ার বিশেষ কোন রিজন ছিলো?”

“কেন রিজন ছাড়া দেওয়া যাবে না।?”

আফনূরের কথায় অধিকার বোধ,তারাজ একটু থমকালো । আফনূর যে খুব তাড়াতাড়ি তাদের সম্পর্কে ইতিবাচক হবে না সেই বিষয়ে সে নিশ্চিত তবে এখন কি?কোন মতে কি আফনূর ভাবছে তাকে নিয়ে,আফনূর কি এগিয়ে আসতে চাইছে।যদি তাই হয় তবে তারাজ তাকে অবশ্যই সাহায্য করবে, শুধু করবে কি! আফনূর যদি এক কদম বাড়িয়ে দেয় তবে তারাজ দুই কদম আগাবে।

“কেন দেওয়া যাবে না। অবশ্য‌ই দেওয়া যাবে।ইভেন আমাকে ফোন দেওয়ার জন্য তোমার কোন রিজনের দরকার নেই।আমি তোমার মানুষ,আমাকে তুমি যেকোন সময় যেকোন ভাবে নিজের কাছে ডাকতে পারো।”

আফনূরের গলা শুকিয়ে গেল।ঐ কথা টুকুই অনেক কষ্টে বলছে।যত‌ই হোক তাদের সম্পর্কের যেই অবস্থান তাতে হয়তো অন্য কোন মেয়ে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে থাকতো। দুই চারটা অদ্ভুত প্রশ্নে লাজুক হাসি দিতো।তারাজ‌ও কিছু কাব্যিক কথায় হবু স্ত্রীকে খুশি করতো,কিছু প্রেমময় বাক্যে কাবু করতো। কিন্তু তাদের বেলায় তা হচ্ছে না।তার দিক কারণ স্পষ্ট,সে দ্বিধায় ভুগছে। এক বার মনে হচ্ছে বিয়েতে সম্মতি দিয়ে ভুল করেছে আরেক বার মনে হচ্ছে ভুল না ,এটাই ঠিক।আর হলেও ভুল থেকেই ফুটবে নতুন কুড়ি যা দিয়ে ফুটবে কোন চমৎকার ফুল! তাইতো অনেক দ্বিধার দেওয়াল টপকে হলেও কথা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু তারাজ? তার কি সমস্যা? সে তো ঠিকঠাক কথা বলছে না।নাকি নির্বাচনী কাজে এত‌ই মনোস্থির যে মন অন্য কোথাও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে না। আচ্ছা এখন‌ই এত ব্যস্ত ভবিষ্যতে কি..

“নূরজান?আছো"

আবারও চমকালো, কত্ত সুন্দর করে নূরজান বলে সম্বোধন করে তারাজ।আবেগ ঢেলে দেয় ।তার মা তাকে নূর ডাকে বাকী  সবাই পুরো নামেই ডাকে। কিন্তু তারাজ! তার সাথে সম্পর্ক যেমনি সবার থেকে আলাদ তেমনি অনুভূতিগুলোও ভিন্নতায় জড়ানো।সেই ভিন্ন অনুভূতির স্রষ্ঠা স্বয়ং ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার!

একজন নারী তার সামনে উপস্থিত পুরুষের দৃষ্টি দেখলেই বুঝতে পারে তার প্রতি ঐ পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন, তাকে নিয়ে পুরুষটির মস্তিষ্কে আন্দোলিত অনুভূতিগুলো কি? একজন পরিপূর্ণ সচেতন নারীকে এগুলো মুখ ফুটে বলে বুঝাতে হয় না। কিন্তু নারীরা শুনে বুঝতে পছন্দ করে। বিশেষ করে ভালোলাগার, ভালোবাসার মানুষটির থেকে নিজেকে নিয়ে প্রশংসা, ভালোবাসার কথা শুনতে নারীরা পছন্দ করে।তারা চায় শখের,স্বাধের পুরুষটি তাকে নিয়ে দু'চার লাইন কবিতা লিখুক,বাক্য গাথুঁক অজস্র কাব্যের।যেথায় থাকবে কেবল সেই রমনীকে নিয়ে মুগ্ধতা,মোহতা আর প্রেমের জয়গান।

আফনূরের চোখেও পড়েছে তাকে নিয়ে তারাজের দৃষ্টি আঁকড়ে থাকা অনুভূতি গুলো।তার প্রতি তারাজের স্নেহিত ছোঁয়া,তার উপস্থিতিতে তারাজের উচ্ছাস! কিন্তু ঐ যে! তার নিজের‌ই শত দ্বিধা,পিছুটান।যতদিন কর্মসূত্রে তারাজের মুখোমুখি সে হয়েছে ততবার‌ই তারাজের প্রতি সে মুগ্ধ হতে বাধ্য হয়েছে। তারাজের কাজেই সে এতটা আকৃষ্ট হয়েছিল। কিন্তু দিন দিন যখন তারাজের তার প্রতি টান বাড়ছিলো তখন আফনূর নিজেই দুরত্ব বজায় রাখতে শুরু করলো।যখন আফনূর দুরত্ব টেনে আনলো তারাজ সরাসরি তার ঘরেই ঢুকে পড়লো।এরপর..

“কাল কি একবার দেখা করা যাবে?

“কোথায় কখন বলো?”

আফনূর আবারও আশ্চর্য হলো,আজ বাদে দিন চার পর যার নিবার্চন ।সে ঠিক তার মতো একজনের জন্য সময় বের করছে। আফনূরকে চুপ দেখে তারাজ বললো,

“এখন বলতে হবে না।তুমি ভেবে, নিজের সিডিউল দেখে আমাকে জানিও। আমি সবসময়ই এভেইলেবল।”

“সবসময়‌ই?”

“তোমার জন্য!”

আফনূরের হৃদয়ে কিছু নাড়া দিলো।কতটা আপন ভাবলে তারাজের মতো ব্যস্ত মানুষের কাছে সে এতটা গুরুত্ব পায়! লজ্জা‌ও পেল বোধহয়।কোন মতে বললো,

“কাল, কোর্টে করি?”

“ওখে ,আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো!”

“অপেক্ষা করা লাগবে না। আমার কাল সকালেই কোর্ট আছে!"

“ শপিং এ যাচ্ছো কখন তাহলে?”

“কিসের শপিং?”

“ওমা কাল আমাদের বিয়ের শপিং করতে যাচ্ছে তুমি জানো না?”

“বিয়ের শপিং? কিন্তু!”

“তোমাকে বলেনি, হয়তো কাল ভুলে গেছে। অসুবিধা নেই যেহেতু কাল মিট হচ্ছেই তো তখন আমি নিজেই তোমাকে তাদের কাছে পৌঁছে দিবো? ইনশাআল্লাহ!”

আফনূর কি বলবে বুঝতে পারছে না। এদিকে সে এখনও দ্বিধাই কাটাতে পারছে না আর ঐদিকে বিয়ের কেনাও শুরু করে দিয়েছে।এই মুহূর্তে তার কি করা বা বলা উচিত?

চলবে?

ক্ষমা নোট:-দিতে চেয়েছিলাম সকালে, দিলাম সন্ধ্যায়। আসলে কাল অনেক ঘোরাঘুরি করে আমি পুরোই চিৎপটাং হয়ে পড়ছিলাম,রাতে শুয়ে লিখতে লিখতেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ছি এরপর তো সকালে উঠে নিয়মিত কর্ম ব্যস্ততা তাই সারাদিনে আর দেওয়া হয়নি। দুঃখিত আমি।

বানান ভুল দেখলে ধরিয়ে দিবেন প্লিজ ❤️☺️


পর্ব ২০


“আপনাকে ফোন করার উদ্দেশ্যে নিশ্চয়ই বুঝেছেন? আমি মাত্র দুটো দিন ধৈর্য্য ধারণ করবো, এরপর বুঝাবো খেলা কি করে খেলতে হয়!”

“ধৈর্য্য ধরো! ধৈর্য্যের ফল সুমিষ্ট হয়। এতদিন সহ্য করেছো আরও একটু করো।”

“ চেষ্টা অব্যাহত!”

“শোন ইব্রাহিম, চারদিক এখন এমনিতেই সরগরম, নির্বাচনের মাঠে যারা আছে তারা অধিকাংশই আমাদের নিজস্ব। তবুও যেই কিছু সংখ্যক প্রার্থী ভিন্ন মতি'য় আছে তাদের দমনে খুব একটা ঘাম ছুটবে না। কিন্তু মাঠের বাইরে থেকে যারা সাধারণ জনতাকে উস্কানি দিচ্ছে তাদের নিয়ে ভাবো।ভোট মুখোমুখি, জনতার রায়‌ও জানা তবুও তাদের এই বাড়াবাড়ি রকমের উৎপাত প্রধানের মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে।তারা কেন এখনো তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার সুযোগ পাচ্ছে তাই জানতে চান দলীয় প্রধান। যদিও এই আন্দোলন নামক রঙতামশা আমাদের বিচলিত করতে সক্ষম নয় তবুও তো জনতার চোখে একটা কালো পট্টি বাঁধতে হবে।”

“এটাতে আমি বিচলিত হ‌ওয়ার বিশেষ কারণ দেখছি না।কারণ তারা যত উৎপাত করবে,যত বেশি বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি করবে, আন্দোলনে যত বেশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বাড়াবে সাধারণ জনতার চোখে তাদের তত বেশি‌ই নিচে নামানো যাবে। জনতা শান্তি চায়, দেশের উন্নতির চেয়েও তাদের কাছে বেশি জরুরি দেশের চলমান অস্থিরতাকে দমানো।তারা শান্তি চায়, নিশ্চিত জীবন চায়।আর এটা কেবল তখন‌ই সম্ভব যখন দেশে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সাধারণ জনগণের চোখে উন্নতির পট্টি বেঁধে তাদের কাঁধে ভর দিয়ে চলমান সরকার‌ই তাঁদের সেই মনোবাসনা পূরন করতে পারবে। আর এটা তখনই হবে যখন বিরোধীদলীয় নামক কোন দলের‌ই অস্তিত্ব আর এই দেশে থাকবে না।আর আমার মনে হয় এবার জিতলে এ দেশে আর কোন বড় রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকবে না।তাই না!"

“ তোমার চিন্তাশক্তি প্রখর কিন্তু তবুও।একটা ডামি তো থাকাই চাই।আর আশাকরি সেই ডামি কে তাও তুমি ভালো করেই বুঝেছো।তাই বলছি ওর সাথে অযথা লেগো না।আর যাই হোক ওর এত দূর হিম্মত নেই যে ও তোমাকে সরানোর পরিকল্পনা করবে!”

“ যদি ভুলেও ও এই কাজ করে আই স‌'আর আমি ওকে জাস্ট গুম করে দিবো,ওর লাশটাও ওর পরিবারের কেউ পাবে না!"

“কুল ডাউন। নিজেদের মাঝে মারামারি করে ভিন্নদের হাসির খোরাক দিও না।দেখা যাবে পরে যা হয়! এখন নিজের প্রচারণায় মনোনিবেশ করো!”.

“ধন্যবাদ! আসসালামু আলাইকুম!”

দলীয় প্রধান সম্পাদকের সাথে দীর্ঘ ফোনালাপে তারাজ নিজের মেজাজ ঠান্ডা করে নিলো। ঘটনার লাগাম টানতে চাইলেও পারছে না।সময় এখন অনুকূলে নেই,তাই ধৈর্য্য‌ই একমাত্র অবলম্বন।খবর মোতাবেক সোহাগ জামিন পেয়েছে।তবে কে বা কারা জামিন করিয়েছে আপাতত তার কোন খবর মেলেনি। সোহাগের কলিজার পাঠা নিশ্চয়ই এত বড় হয়নি যে একা একাই তারাজকে মারার মতো দুঃসাহস দেখাবে। নিশ্চয়ই পেছন থেকে কেউ কলকাঠি নাড়ছে।

দরজায় করাঘাতে তারাজের ভাবনায় ছেদ ঘটলো,

ভ্রু কুঁচকে সেদিকে না তাকিয়েই অনুমতি দিলো,

“দরজা খোলাই আছে!”

চাপানো দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো তানহা।মিহি কন্ঠে বললো,

“ভাইয়া তুমি কি এখন বেরুচ্ছো?”

“হ্যা আমি এখন‌ই বের হবো!”

“আমাদের সাথে জয়েন হচ্ছো কখন?”

“ ঠিক নেই,আমি হয়তো খুব বিজি থাকবো।”

“ তাতো তুমি সবসময়ই থাকো, অন্তত নিজের বিয়ের জন্য কিছুটা ছাড়তো নিতেই পারো!”

“ বিয়ের জন্য খাওয়া দাওয়া বন্ধ আছে? তবে কাজ কেন বন্ধ থাকবে!”

“ ভাই মানুষ জীবনে বিয়ে একবার‌ই করে,তাও যদি উপভোগ না করতে পারে তবে কেমন দেখালো ব্যাপারটা।"

“ আমার জীবনে বিয়ে নিয়ে বিশেষ কোন ইচ্ছা নেই,করার দরকার তাই করছি।সো কাজ বন্ধ রেখে সং সেজে বসে থাকায় বিশেষ সময় নষ্ট করার মতো সময় আমি দিতে পারছি না।”

“ তোমার নাই থাকতে পারে,আফনূরের তো আছে! একটা মেয়ে নিজের বিয়ে নিয়ে হাজারটা স্বপ্ন দেখে,কতশত ভাবে নিজেকে সাজায়। মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন‌ই হয়তো ব‌উ সাজা।হলুদে নানা রকম ভাবে নিজেকে সাজিয়ে বাহারী পোজে ছবি তোলা।তোমার এই তাড়াহুড়োর বিয়েতে তো তেমন কিছু‌'ই হচ্ছে না। সামান্য সময় বের করেও যদি তুমি তার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে সময় না দাও তবে কি করে হবে? আচ্ছা ভাইয়া একটা কথা সত্যি করে বলো তো এত তাড়াহুড়ার কি আসলেই দরকার ছিলো?"

বড় বোনের কথায় যুক্তি আছে।তাই নিজেকেই একটু জিজ্ঞেস করলো।সে কি আফনূরের জন্য সময় বের করতে পারছে না! পারছে তো। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না।এত ব্যস্ত মানুষ ব‌উয়ের জন্য সময় ঠিকই বের করে এটা শুনলে নিশ্চয়ই লোকে হাসাহাসি করবে তাই তো বিষয়টি একান্ত নিজের করেই রাখতে চাইতো।এই যে তার বোন ইয়া বড় একটা লেকচার দিলো ব‌উকে সময় না দেওয়ার জন্য, আসল ঘটনা জানলে এ নিজেও পা ধরে টানাটানি করতো।ঠিক‌ই বলতো, ‘আ্যা ভাইয়ের আমাদের জন্য সময় হয় না ,ব‌উয়ের জন্য ঠিক‌ই সময় বের করে নিয়েছে!' এই কথাটাই শুনতে চাইছে না‌। তাইতো অযথা এত চোটপাট দেখালো।

“তোমরা ওকে নিয়ে যাও! কেনাকাটা তো ওর জন্য করবে!”

“তোমার জন্য‌ও হবে।তাছাড়া ব‌উ তোমার, তুমিই পছন্দ করলে বেস্ট হতো!"

“বুবুজান ভুলে যাচ্ছেন, আপনার ভাই এমপি ক্যান্ডিডেট?”

“ সেটাই তো কথা; কেন তোমার নির্বাচনে আগেই বিয়ে করতে হচ্ছে তাই তো বুঝছি না? পরে করলে কি এমন হতো?আফনূর কি পালিয়ে যাচ্ছে!”

“ বুঝবে না।আমার হৃদয়ের দুঃখ তুমি বুঝবে না।

ছেলে হলে বুঝতে! ব‌উ ছাড়া কত কষ্ট!"

“ফাজিল ছেলে বড় বোনের সাথে ফাজলামো হচ্ছে!"

তারাজের রসিকতায় তানহা হেসে দিলো।হালকা চাপড় মারলো তারাজের বাহুতে।তারাজ‌ও বোনের সাথে তাল মিলিয়ে হাসলো। খুনশুটি শেষে তারাজ বললো,

“ আমি কোর্টে যাচ্ছি, সেখান থেকে ওকে পাঠিয়ে দিবো।তোমরা নিজেদের মতো করে কেনাকাটা করো। শুধু ওর ইচ্ছটাকে একটু প্রায়োরিটি দিলেই হবে।যেহেতু বিয়েটা ওর; বিয়ে নিয়ে স্বপ্নগুলোও ওর!"

“চিন্তা করো না। তাছাড়াও ওর তো সরাসরি আমাদের সাথেই জয়েন করার কথা ছিলো।যদিও পরে আন্টি ফোন করে জানিয়েছেন যে কাল নাকি ওর খুব সিরিয়াস একটি কেইসের হেয়ারিং আছে।

“হ্যা।তাই কোর্টে আসবে। চিন্তা করো না আমি সময় মতোই ওকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ!"

“ তুমি?"

“ আমাকে আজ আবার সাভার যেতে হবে! অনেক কাজ আছে! তাছাড়াও আজ এলাকায়‌ও একবার রাউন্ড দিতে চাই!"

“ একসাথে এতো প্রেসার নিচ্ছো,পারবে তো সবটা ম্যানেজ করতে?"

“ ইনশাআল্লাহ আল্লাহর রহমত আর তোমাদের দোয়া থাকলে পারবো!"

“ আল্লাহ তোমার সহায় হোক, আমাদের দোয়াও সবসময় থাকে!"

___________________________

“ভাই, আজ আমাদের কাজ কি?"

“ তোরা এলাকায়‌ই প্রচারণা চালা।আমি সন্ধ্যায় যোগ দিবো ইনশাআল্লাহ! আর হ্যা রেহানের মায়ের কাছে একবার গিয়ে দেখা করিস তো! মুরাদ কোথায়?

ফয়সালকে প্রশ্নটা করলেও নিজেই এদিকে ওদিকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো, ফয়সাল পেছন থেকে উত্তর করলো,

“ মুরাদ ভাইতো এখনও আসেনি।ভাবীর নাকি কি হয়েছে সেখানে গিয়েছে!"

“তার আবার কি হয়েছে?"

“ জানি না তো।"

“ আচ্ছা তোরা থাক,আমি দেখছি! শোন, এদিকের সব দায়িত্ব কিন্তু তোর হাতে,পারবি না একা সামাল দিতে?"

“ ইনশাআল্লাহ ভাই পারবো, কিন্তু মুরাদ ভাই?"

“ মুরাদ আমার সাথে যাচ্ছে, আজ আমার যাত্রা সঙ্গি ঐ ই হবে!"

“ আইচ্ছা ভাই, সাবধানে যাইয়েন।"

“ বি কেয়ারফুল!"

পকেট থেকে ফোনটা বের করলো, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ব্যাগটা এসে গাড়ীতে রাখলো আইনুল মিয়া নামক পঁচিশের কোটা পেরুনো এক যুবক।বাবার সমতূল্য বয়সী মোতাহের হোসেনকে দিয়ে ফুটফরমাইশ খাটাতে নিজের বিবেকে বাঁধে, যদিও তিনি কর্ম বলে দ্বিধান্বিত হন না তবুও‌। তাই তাকে দিয়েই তার‌ই পরিচিত যুবক আইনলু মিয়াকে নিজের ছোটখাটো কাজের সাহায্যের জন্য রেখেছ।এই যেমন তার অফিস গুছিয়ে রাখা, কাগজপত্র ঠিকঠাক জায়গায় রাখা।ব্যাগটা নিয়ে যাওয়া আসা করা। মাঝে মাঝে বিভিন্ন ডকুমেন্ট প্রিন্ট করা। অর্থাৎ টুকটাক কাজের জন্য নির্ধারিত লোক।

ছেলেটি মোটামুটি শিক্ষিত, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ এরপর আর পড়াশোনা করা হয়নি। যথেষ্ট ভালো সম্মানি দিয়েই তারাজ ছেলেটাকে নিজের জন্য নিয়োগ দিয়েছে।

_________________________________________

“ আফনূর,নূর মা!”

মায়ের ডাকে সচকিত আফনূর নিজের হাতের কাজ রেখে দরজা খুললো, বাইরে দাঁড়িয়ে মায়ের পানে চেয়ে মৃদু হাসলো, হাস্যজ্জোল আফিয়া নূরন্নাহার ভেতরে আসার জন্য পা বাড়াতেই আফনূর সরে দাঁড়ালো,মায়ের সাথে মাখোমাখো ভাব না থাকলেও মা তো মা'ই।এই যে তার বাবা মা'কে ছেড়ে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে এতে কিন্তু সবচেয়ে বেশি খারাপ বাবা মায়ের কথা ভেবেই লাগছে।সত্যিকার অর্থে এই দু'জন‌ই তো সবচেয়ে আপনজন,তার কষ্টে সবচেয়ে বেশি কষ্টিত তো তারাই হয়! হয়তো অনেক সময় রাগ করে অতিরিক্ত শাসন করে কিন্তু সেই শাসনেও তো তার‌ জন্য‌ই মঙ্গল কামনা থাকে।

“ কি করে রেখেছো ঘরের অবস্থা!"

তিনি কথা বলতে বলতে‌ই ঘর গুছানোর কাজে লেগে পড়লো।কাজ করা অবস্থায়‌ই বলতে থাকেন,

“শুনেছি তারাজ ছেলেটা অনেক গোছানো।এলোমেলো থাকা তার পছন্দ নয়। সবসময় পরিপাটি থাকে।কাজে কথায়‌ও তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।সেই জন্য‌ই তোমার বাবার বেশ মনে ধরেছে।যদিও আমি এখনও স্বচক্ষে দেখিনি তবে যতটুকু শুনেছি তাতে বুঝেছি বেশ বুঝদার‌ও।কিন্তু আমার চিন্তা হচ্ছে তোমাকে নিয়ে!"

আফনূর বুঝলো তার মা এরপরে কি বলবে তবুও সে কিছু বললো না। আসলে সে শুনতে চায় মায়ের মুখ থেকেই।হাত বাড়িয়ে এত সময় যা করছিলো তাই আবার করা শুরু করলো।আফিয়া নূরন্নাহার মেয়ের দিকে তাকিয়ে খানিকটা চেতেই বললেন,

“তুমি এত অগোছালো থাকো কেন নূর? মেয়ে তুমি! নিজের রুমটা তো গুছিয়েও রাখা যায়; তাই না?নয়তো কি করে তুমি তারাজের সাথে এডজাস্ট করবে?"

“ এডজাস্ট কেন করবো আম্মু?এডজাস্টের সংসার আমি করবো না।যেখানে আমাকে এডজাস্টের জ্ঞান দেওয়া হবে সেখানে আমি থাকবো না।"

“ এটা কোন ধরনের কথা? সংসার মানেই এডজাস্টম্যান্ট! দুটো মানুষ কখনোই এক হয় না! পছন্দ অপছন্দ সব সময়ই যে এক হবে তা কখনো ভাবা উচিত নয়।বিয়ে একটা পবিত্র সম্পর্ক ঠিক আছে, কিন্তু সেই বিয়েটা টিকিয়ে রাখতে গেলে অনেক কিছু ছাড় দিতে হয়। মানতে হয় অনেক নিয়ম-কানুন। তুমি যদি ভাবো তোমার কোর্টে দেওয়া যুক্তিতর্ক দিয়ে সংসার সামলাবে তাহলে ভুল,সংসার আর কোর্ট কাচারী এক নয়!মেয়েরা যত‌ই বিদ্যান হোক,যত এসটাবিলিসড হোক না কেন দিনশেষে তাদের চুড়ান্ত গন্তব্য সংসার‌ই হয়!”

“ এটা তুমি বলছো আম্মু? সত্যি!"

আফিয়া নূরন্নাহার বুঝলেন তিনি কি বলছেন আর এখন তার মেয়ে কি বলতে পারে!নিজেই এক সময় মেয়ের মতোই খামখেয়ালিপনায় মজে ছিলো

যার খেসারত দিতে হয়েছিল মেয়েকে দিয়ে। মেয়ে যখন তার হাতের নাগালের বাইরে চলে গেল, যখন

মেয়েকে নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু হলো তখন যেন উনার হুঁশ আসলো। মনে হয়েছিল তিনি একজন ব‌উ, কারো মা,কারো ঘরের কর্তৃ।

“ দেখো, আমি যেই ভুল করেছিলাম তুমিও কি সেই সেইম ভুল‌ই করতে চাচ্ছো ! আমি চাই না আমার জন্য আমার সন্তানেরা যেই ভোগান্তির স্বীকার হয়েছে তা তাদের সন্তানের সাথেও হোক।আমি তোমার মা, তোমার কাছে ভালো মা নাই হতে পারি কিন্তু তাই বলে এই নয় আমি তোমার কল্যান কামনা করতে পারি না।আমি সবসময়ই চাই আমার দু'টো সন্তান‌ই ভালো থাকুক।”

“ আমি জানি তুমি আমাদের ভালো চাও। কিন্তু.. যাই হোক আমি চেষ্টা করবো সুন্দর করে সংসার করতে। ইনশাআল্লাহ তাদের তরফ থেকে তোমাদের কাছে কোন কমপ্লেইন আসার সুযোগ দিবো না।"

আফিয়া নূরন্নাহার এগিয়ে এলেন,হাতে থাকা কুশনটা সোফায় রেখে আফনূরের পাশে এসে দাঁড়ালেন,আফনূর হাতে কাজ রেখে মায়ের মুখোমুখি দাঁড়ালো।

মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিলেন, চোখের কোনে জমে থাকা জলকনা আঙ্গুল দিয়ে মুছে ফেললেন। আফনূর মায়ের ভালোবাসা মেখে চুপ হয়ে র‌ইলো।

“ আমি সবসময়ই তোমার ভালোই চাই।এই জীবনে তোমাদের দুই ভাইবোনের খুশির চেয়ে বড় কিছু নেই! শেষ নিঃশ্বাস অবধি আমি তোমাদের সুখে দেখতে চাই।”

“আমি জানি আম্মু!"

“শোন তারাজ অনেক ভালো একটা ছেলে,দেখবে ও তোমার জীবনের কালো অধ্যায়কে ঠিক ভুলিয়ে দিবে!"

“ ইনশাআল্লাহ!”

“ওরা আজ শপিং এ যাচ্ছে,তুমি কি....

“আমি কোর্টে কাজ শেষ করেই উনাদের সাথে

 জয়েন দিবো!”

“ হ্যা, সাবধানে।"

"আল্লাহ হাফেজ আম্মু"

মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ব্যাগটা কাঁধে চেপে বের হয়ে গেল দরজা পেরিয়ে।আফিয়া নূরন্নাহার যেন ভেতর থেকে সুখ অনুভব করলেন।ঠিক কতগুলো বছর পর এভাবে মেয়ের সাথে কথা বললেন তা উনি নিজেও জানেন না হয়তো।

___________________

স্বাগতমি পোস্টারে ছেয়ে গেছে সাভারের রাস্তাঘাট, তাতে নিজের ভবিতব্যের হাস্যোজ্জ্বল চকচকে চেহারা দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছে আফনূর।তার সাথে গুছিয়ে নিচ্ছে নিজের গহীনের কথাগুলো।সবাই বিয়ের কেনাকাটায় মেতে উঠছে,অথচ আফনূর জানে এরপর কি হবে। আচ্ছা তারাজ কি বাকিদের মতোই মুখ ফিরিয়ে নিবে? নাকি সে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা প্রমান করবে।তারাজ যদি মেনেও নেয় তবে কি মন থেকেই মানবে? নাকি শুধু লোক দেখানো! 

কোর্টে......

“ ম্যাম , আই থিংক আজ আপনার কেইসের রায় হয়েই যাবে।আমি বলছিলাম!"

“ জ্বী বলুন,থেমে গেলেন কেন?"

“ আপনি রায়হান সাহেবের কেইসটা হাতে নিন।"

“ উনার কেইস হাতে নিতে তো সমস্যা নেই বশির ভাই! সমস্যা হচ্ছে উনি গায়ে পড়ে কথা বলেন সেটাতে! আমি এরকম দুশ্চরিত্র লোকের সাথে কোন লেনদেনে নেই।তাই দয়া করে রিপিট করবেন এই কথাটা।"

“ যদি একবার!”

“ প্লিজ!"

পর্ব ২১


“মা ছিলো ক্যারিয়ার সচেতন। একটা প্রাইভেট ফার্মে জব করতো। উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ছিলো।বিভিন্ন সময়ে কাজের সূত্রে বাইরে যেতো হতো ।তার ধ্যানজ্ঞান সবটাই ছিলো তার ক্যারিয়ারকে নিয়ে। আমাদের জন্য ভাবা অথবা আমাদের দেওয়ার মতো সময়‌ও সে পেতো না।যার কারণে আমার শৈশবে মায়ের সাথে খুব একটা মধুর স্মৃতি নেই।আমি প্রকৃত মায়ের ভালোবাসা বুঝেছিলাম খালাম্মির থেকে, তবুও।মা তো মা ই হয়।মায়ের মমতার সেই ক্ষুধা নিবারণ কি আর অন্য কিছুতে মেটে?

-- এদিকে বাবা ব্যাবসার পাশাপাশি তুখোড় রাজনীতিবিদ ছিলো।তার চিন্তাচেতনার বিশাল অংশ কেবলই ছিলো রাজপথ নিয়ে।তার‌ও আমাদের জন্য পর্যাপ্ত সময় হতো না। অফিসিয়াল কাজের পরে বাসায় যতটুকু সময় থাকতো তখনও বাবা বিভিন্ন নেতাকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মিটিং,আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত থাকতো। আমাদের দিকে খেয়াল করার সময়‌'ই হতো না।এর মাঝেই আমি একটু একটু করে বড় হচ্ছিলাম।সেদিকেও আমার বাবা মায়ের নজর পড়লো না। খালাম্মি আদর করলেও শাসনে তিনি ছিলেন ভীষণ নাজুক। আমাদের শাসন করার বিষয়ে তার মাঝে কাজ করতো দ্বিধাবোধ।হয়তো ভাবতো আমাদের বাড়ি থেকে আমাদের শাসন করাটা উচিত নয়। যেহেতু আমরা উনার সন্তান নয় তাতেও হয়তো কিছুটা সংকোচে থাকতো‌। যাই হোক অতিরিক্ত একাকীত্ব আর শাসনবিহীন‌ জীবনযাপন একসময় আমাকে নিয়ে যাচ্ছিলো বিপথে। বাড়িতে অনেক মানুষ আসতো তার মধ্যে আমার চাচাতো ভাইয়ের কিছু বন্ধুও আসতো।যৌথ পরিবার না হলেও পাশাপাশি বাড়ি হ‌ওয়াতে আমাদের বাসায় তাদের সারাদিনে প্রায়‌ই আসা হতো। বিশেষ করে আমাদের বাড়ি ফাকা থাকায় তাদের সকলের আমাদের বাসায় আড্ডা দেওয়ার জন্য সুবিধা হতো।তাই!”

আফনূর একটু থামলো। দীর্ঘ সময় কথা বলায় গলা শুকিয়ে আসছে,হাত বাড়িয়ে পানি খুঁজতেই তারাজ বোতল এগিয়ে দিলো। মুখোমুখি বসা, মাঝে সেগুন কাঠের তৈরি নকশাকৃত এক বিলাসী টেবিল।যার উপর রাখা আছে গরম গরম দু মগ কফি! মাত্র‌'ই  হোটেল বয় রেখে গেছে তারাজের একাধিক অফারে কেবল কফি‌'ই গুরুত্ব পেয়েছে। আফনূরের মুখপানে তারাজের জহুরী নজর।আফনূর নিজের অতীতের হালখাতা খুলে বসেছে,তারাজকে জানাতে চায় তার ছেড়ে আসা সময়গুলোর গল্প।যদিও তারাজ বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে না তবুও সে জানাতে আগ্রহী। কথাগুলো নাই বা শুনলো অন্তত এই ছুতোয় মন ভরে নূরকে তো দেখাই যায়। আফনূর পানি পান করলো, অর্ধ খালি বোতলটা নিজের পাশে রেখে তারাজের দিকে কোনমতে এক নজর দেখলো।এরপর ধীরে ধীরে খুলে বলতে থাকলো সবটা!

___________________________________________

“ মেয়ের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কি ঠিক করেছি আমরা?”

“ মতের বিরুদ্ধে যাইনি।এমন কিছু হলে এতদিনে মেয়ে অবশ্যই কথা বলতো আমাদের সাথে!"

“ কিন্তু রাজী কিনা তাও বুঝছি না!”

“ রাজী না হলে তো অবশ্যই বলতো।তুমি অযথা চিন্তা না করে কিভাবে কি করা যায় এই অল্প সময়ের মধ্যে তাই ভাবো। একমাত্র মেয়ের বিয়ে,বড় করে আয়োজন করতে না পারলেও বেয়াই বাড়ি থেকে যেন কোন অভিযোগের সুযোগ না পায়; ওহ হ্যাঁ তুমি মেয়ের গহনাগুলো বের করিয়ে এনেছো? আগামী পরশু থেকেই কিন্তু চারদিকে নিরাপত্তার নামে প্রশাসনিক নির্যাতন শুরু হয়ে যাবে।তখন আবার হাজার নাটকের মাঝে ফেঁসে গেলে ঝামেলা হয়ে যাবে।”

“ না এখনও যাই তবে আজকেই যাবো।আমি ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে রেখেছি। তাছাড়াও মেয়েকে নিয়ে কাল শপেই যাবো।ওর‌ও তো পছন্দের কিছু কেনা দরকার! জামাইয়ের জন্য কখন যাবে তুমি?”

“ জামাই তো আসছে,এখন এখানকার কাজ কখন শেষ হয় তার উপর নির্ভর করবে সবটা!"

“ আচ্ছা,যাই করো সাবধানে! আমাদের জন্য ছেলেটার কোন ক্ষতি না হয় এমন মুহূর্তে।"

“ আল্লাহ ভরসা। তিনি যা কল্যানকর তাই করবেন আমাদের জন্য!”

“ মেয়েকে কি বলে দিয়েছো তাদের সঙ্গে শপিংয়ে যেতে?"

“ হ্যা বলা হয়েছে।”

“ ছেলে কোথায়?"

“ মেডিকেলে।"

“ কখন আসবে?"

“ বললো তো তারাজের আগেই পৌঁছাবে!"

“ তার বোন জামাই হিসেবে তারাজকে বেশ মনে ধরেছে, সেদিন তারাজের খোঁজখবর নিতে সারারাত তারাজের বিভিন্ন সোশ্যাল প্লাটফর্ম ঘাটলো।পরে আমাকে এসে বলে বাবা হি ইজ সুপার আব্বু!"

“ এখন তোমার মেয়ের মনমর্জি ঠিক থাকলেই চলে!”

“ থাকবে ইনশাআল্লাহ!"

শেষোক্ত বাক্যটা আলিয়া পেছন থেকে এসে বললেন। তার দিকে তাকিয়ে আফিয়া নূরন্নাহার বললেন,

“ তুমি কথা বলেছিলে আপা তখন কি বললো? কি বুঝলে তুমি?"

“ ভেতর থেকে ভঙ্গুর একটা মেয়ে।যে জীবনের একটি অধ্যায় অন্ধকারে কাটিয়েছে।যাই হোক মুখে বলেছে রাজী। কিন্তু ভেতরে কি চলছে তা হয়তো আমরা সবাই‌'ই আন্দাজ করতে পারছি।"

“ কি করবো আপা? এভাবে কি চলত দেওয়া যায় বলো?”

“ এগুলো ভেবে সময় নষ্ট করো না এখন আর। এগিয়ে যখন যাচ্ছো,আফনূর‌ও রাজী হয়েছে তা হলে আর কি! কাজে নেমে পড়ো।সময় কম।"

“ হ্যা তাই তো! চলো আপা কিছু কাজ আছে; তোমার সাহায্য লাগবে!"

“ চল!"

___________________________________________

আফনূর কথায় বিরতি টানতে বাধ্য হলো তারাজের মুঠোফোনের কর্কশ শব্দে, টেবিলের উপরে রাখা গ্রে-ব্ল্যাক ব্লু'র কম্বিনেশনের আধুনিক দূরবার্তাটি! ইনকামিং কলের দুই পাশে লাশ সবুজের গোলাকার আলোর একটা বৃত্ত হচ্ছে সবুজ। তার মাঝে আঙ্গুল চাপ দিয়ে ধরে ডান দিকে টান দিতেই অপর প্রান্ত থেকে অত্যান্ত নিগূঢ় এক কন্ঠ ভেসে আসলো।

“ আসসালামু আলাইকুম বুবুন"

*****

“ হ্যা এইতো বের হচ্ছি!"

***

“ হ্যা হ্যা ও আমার সাথেই, আমার সামনেই বসে আছে।ওকে নিয়েই আসবো।বুবুন আমি উপরে উঠবো না কেউ একজন ওকে রিসিভ করো।আমাকে যেতে হবে।তুমি সব সামলে নিতে জানো।আই নো!"

আফনূর অপরপ্রান্তের কথা না শুনলেও তারাজের উততরৈ একটু ভাবুক হলো। তারাজকে সবটা খুলে বলেছে অনেক সময় হয়ে গেছে।তারাজ ঠান্ডা মস্তিষ্কে সব শুনেছেও । আফনূর আশা করেছিল তারাজ শোনার পর প্রতিক্রিয়া অবশ্যই দেখাবে। কিন্তু আফনূরকে সারপ্রাইজ করে দিয়ে তারাজের তরফ থেকে কোন রুপ প্রতিক্রিয়া এখনও পায়নি। উল্টো কেমন যে নির্লিপ্ত ভাবে এতক্ষণ আফনূরকেই দেখে যাচ্ছিলো।ভয়,জড়তা, লজ্জায় আফনূর কিছু বলতেও পারছিলো না ।আর উঠে চলে যাওয়ার ইচ্ছাও দেখাতে পারছিলো না।

“ চলো!"

ফোনটা কেটে নিজে উঠে দাড়ালো, আফনূরের উদ্দেশ্য কথাটি বলে চেয়ারে ঝুলিয়ে রাখা কোটটা হাতে নিলো। আফনূরের মুখোভঙ্গি হা! আশ্চর্য নাকি বিস্মিত বোঝা যাচ্ছেনা। তারাজের হালকা উচ্চ শব্দ চমকে উঠলো।

“ কি হলো উঠো! যেতে হবে আমাদের!"

আফনূর চমকে উঠলো,।ঝট করেই উঠে দাঁড়ালো, তারাজকে জিজ্ঞেস করলো,

“ কোথায় যাবো?”

“ তোমাকে বাসা থেকে বলেনি,আজ আমাদের বিয়ের কেনাকাটা হবে?"

“ না মানে আমি বলছিলাম..

“ দ্রুত করো,তোমাকে বসুন্ধরা নামিয়ে আমাকে সাভার যেতে হবে!"

“ কিন্তু আপনি আমার কথাগুলো..

“ কেনাকাটা শেষ করো, বাসায় যাও! আজ থেকে ঠিক চারদিন পর স্বামীর পাশে দাড়িয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিদর্শন করবে,তার একদিন পর স্বামীর বিজয়োৎসব উৎযাপন করবে।"

“ কিন্তু...?

“ আমি অতীত নিয়ে পড়ে থাকি না।আমি দেখি বর্তমান এবং তার দন্ডে নির্ধারিত ভবিষ্যৎ; আশাকরি এরপরে তোমার আর কোন কিন্তু পরুন্তু থাকবে না।"

আফনূর মাথা নুইয়ে নিলো। তারাজের কথায় সে আবেগি হয়ে পড়েছে।তারাজ সব শুনেও না শোনার মতোই রয়েছিলো তাই আফনূর ভেবেছিল তারাজ তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।না, তারাজ তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে কিন্তু গুরুত্ব দিচ্ছে না তার অন্ধকার অতীতকে। আফনূর ছলছল নয়নে অনুতপ্ত বদনে তারাজের দিকে তাকালো। তারাজ এখনো স্থির দৃষ্টিতে তার পানেই চেয়ে রয়েছে, শুধু বদলেছে তার হাতের অবস্থান।ডান হাতটা বাড়িয়ে দেওয়া আফনূরের পানে।আপনূর একবার তারাজের চোখে চোখ রাখলো,পরেই বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকালো,এই হাত কি তাকে আহবান করছে? জানান দিচ্ছে নতুনত্বের ছোঁয়ায় বিষাক্ততা ধুয়ে যাবে? আফনূর ভাবনা চিন্তায় নিথর দেহে হাত এগিয়ে দিলো।তারাজ শক্ত করে হাতের কব্জি আঁকড়ে নিলো নিজের পুরুষালী শক্ত হাতের মুঠোয়। শান্ত কিন্তু শক্ত কন্ঠে বললো,

“ আজ থেকে পথ চলা শুরু,এই পথ কেবল যেকোন একজনের শেষ নিঃশ্বাসে'ই আলাদা হবে।ততদিন অবধি না আমি ছাড়ছি না ছাড়তে দিচ্ছি!"

আফনূরের চোখ ঘোলাটে হয়ে উঠলো, পরক্ষণেই তা গড়িয়ে পড়লো।তারাজ নিজের বাম হাত এগিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে সেই অশ্রু তুলে নিলো।এক পলক তার পানে দৃষ্টি ফেললো। পরক্ষনেই সেই বৃদ্ধাঙ্গুল মুখে পুড়ে চুষে ফেললো। আফনূর কান্না থামিয়ে হতভম্ব বদনে চেয়ে র‌ইলো।তারাজ নিজের কাজ সমাপ্ত টেনে স্লো ভয়েসে বললো,

“ এই অশ্রুজল ভীষন মূল্যবান আমার কাছে,তার অপচয় বরদাস্ত করবো না। এর জড়ার অধিকার কেবল আমার সুখেই আছে! আমার শোকেও নয়!"

কথা শেষ করে আফনূরের হাত ধরে এগিয়ে যেতেই টান পড়লো হাতে। আফনূর নীচু হয়ে নিজের কালো পোশাকটি হাতে তুলে নিলো। এরপর পা বাড়ালো তারাজের পায়ে পা মিলিয়ে, এগিয়ে গেল নতুন জীবনের দিকে প্রথম ধাপে।

____________________________________

“ আম্মা আমাকে একটা অফিসিয়াল মিটিং এটেন্ড করতে যেতে হবে।আমি তোমাদের সাথে চারটার পর থাকতে পারবো।"

“ ছুটি নিয়েছো এরপর‌ও আবার কিসের মিটিং?"

“ কাজ থাকলে কি করা যায় বলো তো!"

“ তাহলে আমরা কিভাবে একা এতকিছু?"

“ আম্মা প্লিজ, চেষ্টা করো বোঝার! ভীষণ জরুরী!"

“ আম্মা আমার মনে হয় না ওকে এখন থেকেই খুব দরকার পড়বে!চারটার পর আসলেও সমস্যা নেই।

তত সময়ে আমরা না হয় খুঁটিনাটি মেয়েলি জিনিসপত্র কিনে ফেললাম।তাছাড়া আফনূর সঙ্গে থাকবে সুতরাং আমার বিশেষ সমস্যা হবে না। বিকেলে বাবু জয়েন দেওয়ার পরেই না হয় জুয়েলারির দোকানে গেলাম।"

"হ্যা তাও চলে।তবে চলে এসো তাড়াতাড়ি। বড় জন‌ও তো থাকবে না। তোমার আব্বাও থাকতে পারছে না। আমরা দুইজন মেয়ে মানুষ কিভাবে কি!" 

“ হয়ে যাবে আম্মা। টেনশন করো না!"

“ আমি চলে আসবো ইনশাআল্লাহ, চিন্তা করিও না।"

“ হুম!"

__________________________________________

“ আসসালামু আলাইকুম , রেজোয়ান ভাই, খবর কি শুনলাম?"

“ কোন খবরের কথা বলছেন তালুকদার?"

“ শুনছি আমাদের ভবিষ্যৎ এমপির নাকি আপনাদের বাড়িতে আনাগোনা বেড়ে গেছে!"

“ কোন এমপির কথা বলছেন?"

“ ঢাকা দুই আসনের এমপি ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার!"

“ সে এখন‌ই কিভাবে এমপি হলো? মাত্র তো নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে এখনও ভোটের চারদিন বাকি!এর মধ্যেই তাকে এমপি বলে মেনে নিলেন?"

“ আরেহ ভাই এসব কি নির্বাচন হচ্ছে? এটা তো কেবল লোকের চোখে ধুলে দিয়ে মুখ বন্ধের একটা মঞ্চনাটক চলছে! যার দর্শক নাদান সাধারণ জনতা। নির্বাচন হচ্ছে জনতার সিদ্ধান্ত! সেখানেই জনতাই সব।যাকে বলে গনতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু এই সরকারের অধীনে যত নির্বাচন হয় সব‌ই তো হয় 

তাদের মতামতে, তাদের নিজস্ব নির্ধারিত লোকদের নিয়ে। এখানে অন্য কারো না মতামতের অধিকার আছে আর না আছে কোন ভূমিকা আছে! সবটাই হচ্ছে তাদের পরিকল্পিত সাজানো গোছানো নাটক, গনতন্ত্র রক্ষার ওয়াদায় হয় ' গনতন্ত্রের মঞ্চনাটক'।"

“ এবার নিশ্চয়ই এমন কিছু হবেনা।"

“ এ কথা আপনি বলছেন? আপনি কি-না এই সরকারের তরফদারি করছেন? তার মানে তো নিশ্চয়ই যা রটেছে তার সত্যতাও আছে? আপনি কি আসলেই নিজের আদর্শের বাইরে যাচ্ছেন রেজ‌ওয়ান ভাই?"


পর্ব ২২


 

সাভার উপজেলার আমিনবাজার ইউনিয়নের সালে পুর হাজী বশির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে উপস্থিত স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা, তারপরও তাদের মাঝে রয়েছে আতংকের উঁকিঝুঁকি। ক্ষমতাসীন সরকার মনোনীত সাংসদ প্রার্থীর উপর হামলায় দেশ‌'ই সরগরম হয়ে উঠছে।তার উপরে সেই সাংসদ প্রার্থীর জীবনাংশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।কোথাও কোন লাল চিহৃ নেই।এমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একজন উদ্দীপ্ত যৌবক সেবক আসুক সকল মানুষের‌ই কাম্য যদিও সে বিতর্কিত সরকার দলীয় কর্মী তবুও! 

কথায় আছে যা দেখতে সুন্দর তা নাকি খেতেও সুস্বাদু হয়‌,যদিও এটা কেবল কথার‌'ই কথা

কারণ গুনীরা এটাও বলে গেছেন পোশাক দেখে কারো অন্তরের বাছবিচার করো না। তবুও, সাধারণ,সহজ মানুষ অন্যকে বিচার করার জন্য প্রথমেই লক্ষ্য করে তার পোশাক পরিচ্ছদ। সাধারণ জ্ঞান থেকে সংকলিত বোধ হচ্ছে,পোশাক পরিচ্ছদ নির্ণয় করে সেই মানুষটির ব্যক্তিত্ব, উপস্থাপনা জানান দেয় তার জ্ঞানের পরিসীমা। ছেঁড়া কাপড়েও নিজেকে উত্তম বলে বিবেচ্য করা যেতে পারে যদি সেই কাপড়টি হয় পরিষ্কার, নোংরামুক্ত।যদি ছেড়াকে কৌশলে নকশায় পরিবর্তন করে নিজের অনবদ্য রুচির পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হয় তাতেও প্রমানিত হয় উক্ত ব্যক্তির রুচিবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ, উন্নত চিন্তাশক্তির।

সমাজ সেবক হিসেবে সাধারণ জনতার চাওয়াও থাকে ওমন কাউকে।যাকে দেখলে ভেতর থেকে শ্রদ্ধা সম্মান উতরে আসবে,যার অঙ্গে অঙ্গে বিচরণ করবে নেতৃত্ব গুন ,যার নির্দেশনায় থাকবে সহচারীর প্রতি কর্তব্যবোধ! একজন নেতার প্রধান যোগ্যতা হচ্ছে নিজের কথায়, কাজে নিজের দিকে সামনে উপস্থিত মানুষের আকর্ষণ কাড়া।তার প্রতিটি কথা মন্ত্রের ন্যায় শ্রবন করানো।তার কথার পিঠে কথার যুক্তি দাড় করাতে না দেওয়ার মতো যুক্তিগত কথা উপস্থিত করা।নেতার গুনে তাকে নেতা বানানো হয়, সুতরাং নেতা কিংবা লিডার তাকে অবশ্যই জ্ঞানে,বিদ্যানে,কৌশলে,ছলে- বলে সব পাঠেই হতে হবে সেরা।যোগ্য নেতা তাকেই করা উচিত যে হয় সেরাদের সেরা! চরিত্রের সনদেও থাকতে হবে ফকফকা।কারণ দুষ্ট রাজার চেয়ে প্রেমিক রাজা রাজ্যের জন্য ক্ষতিকারক।নারীর প্রতি লিপ্সা যার মাঝে কিলবিল করে তার মাঝে মনুষ্যত্ব থাকে না আর না থাকে মানবিকতা । সুতরাং শাসক কিংবা নেতা যাই হোক তাকে হতে হবে ত্রুটিমুক্ত। কিন্তু তাও কি সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই তো যুগে যুগে এই ধরায় এই এত যুদ্ধ, বিদ্রোহ! নরম মৃতিকার বুকে অবধারিত হয়ে চলমান ক্ষমতার লড়াই, টিকে থাকার লড়াই।

ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার দেখতেও সুদর্শন, আবার নেতার গুনেও পরিপূর্ণ।রাজপথের নতুন সেবক! নতুন বলেই হয়তো এখনও তার সনদে ভদ্রতার লোগো।লাল চিহৃ কিংবা অসাধুতা এখনও লাগেনি লাগলেও হয়তোবা প্রকাশ্য নয়।নয়তো নিজের ধূর্ত খেলায় সে এতটাই পটু যে দৃষ্টির অগোচরেই রয়ে যায় তার কর্মের প্রতিফলন।সে যাই হোক লোকসমাগমে সে নির্ঘাত সাধু।আমরাও তাই বিশ্বাস করি। আসলে বিশ্বাস‌ই সব!বিশ্বাসেই মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর! আমার তর্কে বহুদূর না গিয়ে আপাতত ফিরে যাই সাভার উপজেলার  আমিনবাজার ইউনিয়নের স্কুল মাঠে,যেথায় চলছে ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারকে বরণের প্রস্তুতি।তার সহচারীরা তো তাকে স্বাগতম জানাতে সাংবাদিক থেকে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পন্ডশ্রম দিচ্ছে কিন্তু ইব্রাহীম ভাইয়ের খবর?

বসুন্ধরা শপিং মলের নারী ফ্যাশন সেকশনের একটি ব্যান্ডের দোকানে বিয়ের জন্য শাড়ী দেখছিলো তাজিয়া খাঁ,তানহা,আফনূর। তাজিয়া খাঁ, তানহা অনেক দামী দামী শাড়ির কালেকশন দেখালেও আফনূরের চোখ আঁটকে গেলো দেশীয় তাঁতের তৈরি জামদানীর উপরে।লাল সুতোয় গাঁথা অনবদ্য কারুকার্য খচিত,যার মাঝে কিছুদূর পর পর তামাটে রুপোয় মিশেল রঙের হালকা নকশায় জারদৌসির কাজ করা।মেরুন রেড রঙের এই শাড়ীটা বের করতেই দৃষ্টি থমকালো তাজিয়া খাঁ,তানহা সহ আশেপাশের আরো বেশ কিছু ক্রেতার।বিয়ের শাড়ীর জন্য খ্যাত এই দোকানে সকলেই মূলত আসে নিজেদের বিশেষ দিনে নিজেকে সাজাতে সবচেয়ে সুন্দর একটা শাড়ীর জন্য! সেখানে যদি চোখের সামনে এমন মুগ্ধকর শাড়ী চোখে পড়ে তখন না নিয়ে কি পারা যায়? আফনূর শাড়ীটা বের করতে বলায় দোকানি বের করে আফনূরের সামনে রাখে, আফনূর মতামতের জন্য হবু শাশুড়ি আর ননাসের পানে চাইতেই আফনূরের খানিকটা পিছিয়ে পাশে বসা এক ভদ্রমহিলা শাড়ীটা তুলে নেয়। আফনূর ছলাৎ করে তার দিকে নজর ফেললো,শাড়ীটা আফনূরের সামনে ছিলো, শাড়িটির এক কোনা আফনূর নিজের মুঠোয় আঁকড়ে ছিলো।টান লাগায় চমকে যায়।সেদিকে তাকাতেই দেখতে পেলো ঐ নারী ইতিমধ্যে শাড়ীটা নিজের কাঁধে লাগিয়ে দর্পনে নিজেকে দর্শন করছে। মুহুর্তে আফনূরের হাস্যোজ্জ্বল বদনে আঁধার নেমে গেল। আফনূরের চমকানোয় চমকায় তাজিয়া, তানহাও!তারাও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো ঐ মহিলাকে।তানহা ঐ মহিলার শাড়ীটা নিয়ে এমন করায় একবার তার দিকে তাকিয়ে পরেরবার আফনূরের পানে তাকালো। তানহা আফনূরকে জিজ্ঞেস করলো,

“ তোমার কি শাড়ীটা খুবই পছন্দ হয়েছে?"

কথাটা মুখে বলে খেয়াল করলো,

আফনূরের টানটান ললাটে দুটো ভাঁজ পড়েছে।মুখটা ছোট্ট করে রেখেছে,চোখ জোড়াও ঘোলা।প্রায় ঘন্টা দুই ঘুরার পর এই শাড়ীটা মনে ধরেছে তাও যদি অন্য কারো জন্য! তানহা উঠে দাঁড়ালো,তাজিয়া খাঁ কে পাশ কাটিয়ে আফনূরের সামনে দাঁড়িয়ে হুট করেই ঐ মহিলার কাঁধ থেকে শাড়ীটা কেড়ে নিলো।মহিলা চমকালো,ভ্রু কুঁচকে আতংকিত চোখে তানহার দিকে তাকালো,ক্ষীপ্র কন্ঠে শুধালো,

“ এইসব কি? ডাকাতের মতো আচরণ করছেন কেন?"

তানহা উত্তর দিলো না,হাত বাড়িয়ে আফনূরের বাহু ধরে বললো,

“ উঠো!"

আফনূর নিজেও আহাম্মক হয়ে গেছে। শাড়ীটা পছন্দ হয়েছে।ঐ মহিলা নেওয়ায় খানিকটা কষ্টও পেয়েছে কিন্তু তাই বলে এমন করে নেওয়ার কথা সে ভাবেনি। তানহার টানাটানির জন্য উঠে দাঁড়ালো।তানহা আফনূরকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো,শাড়ীটা কাঁধের উপর রেখে আফনূরকে এক নজর দেখলো।আয়নায় নিজেকে লাল শাড়িতে দেখে হঠাৎ করেই আফনূরের মাঝে লজ্জারা ভর করলো। কেমন জানি ব‌উ ব‌উ অনুভূতি হচ্ছে! কি আশ্চর্য ব‌উ'ই তো সে। তারাজের ব‌উ! আজ বাদে কাল সবাই তো তাকে তারাজের ব‌উ বলেই সম্বোধন করবে। আফনূরের মনে হচ্ছে তার পাশে তানহা নয়,তারাজ দাঁড়ানো। মিটিমিটি হাসছে, ঠিক যেমনি প্রথম দিন প্রথম দেখায় হেসেছিলো।সেই হাসিতে আছে আফনূরের জন্য মরনব্যাধি লজ্জা, ধ্বংসাত্মক সব অনুভূতি! লজ্জায় আড়ষ্ট আফনূর আর আয়নায় তাকিয়ে থাকার সাহস পেলো না।নজর নামিয়ে নিলো। আফনূরের লজ্জা মাখা মুখটা দেখে খিলখিল করে হেসে উঠলো তানহা। তাদের এই মিষ্টি মুহূর্তে গ্রহন লাগলো,ঐ মহিলার কর্কশ গলার স্বরে,

“ এ্যাই মেয়ে,তুমি আমার থেকে শাড়িটা কেড়ে নিয়ে ঐ মেয়ের গায়ে জড়িয়ে কি দেখছো?”

তানহা আফনূরের কাঁধ থেকে শাড়ীটা নিয়ে হাতে রেখে ভাঁজ দিতে দিতে বললো,

“ সব জিনিসে সবাইকে মানায় না।"

মহিলার গায়ে লাগলো কথাটা, তেলেবেগুনে জ্বলে বলতে থাকলো,

 “তাইলে এই শাড়ী কি এ্যাই মেয়ের গায়ে মানায়! এ্যাই মেয়ের গায়ের রঙ তো ময়লা, এগুলান সুন্দর লাগে ফর্সা মেয়েদের গায়ে, ঠিক আমার ব‌উয়ের মতোই"

“ আপনার বাড়ির হাড়ির খবর শোনার সময় নেই,এটা আমাদের ব‌‌উ বের করেছে মানে এটা আমাদের ব‌উয়ের জন্য‌ই নিবো! তাছাড়াও আপনার ব‌উ কালা না ধলা তা দিয়ে আমার কাজ নেই, আমাদের ব‌উ মাশাআল্লাহ; আমরা তাতেই খুশি!

- শাড়ীটা প্যাকেট করুন!"

মহিলার প্রত্ততর করে দোকানির উদ্দেশ্যে শাড়িটা ছুঁড়ে মেরে কথাটা বললো, দোকানি একবার তানহার দিকে তো একবার মহিলার দিকে তাকালেন,উনি ভাবুক, উজবুকের ন্যায় চেয়ে আছেন, তাজিয়া খাঁ তেজি কন্ঠে বললেন,

“ আপনি কি প্যাকেট করবেন?"

“ জ্ব জ্বী করছি!"

নরম স্বভাবের তাজিয়া খাঁ'ও চটে গেছেন।তার সামনে তার ব‌উমার গায়ের রং নিয়ে কটাক্ষে তিনিও যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছেন যদিও তিনি মেয়ের মতো প্রতিবাদ করতে পারেননি তবুও! মানুষের গায়ের রং নিয়ে তার কোন কালেই এমন নীচু মন মানসিকতা ছিলো না।তাই তো নিজের পছন্দের মায়া অপূর্ব সুন্দরী, ধবধবা ফর্সা হ‌ওয়া সত্ত্বেও ছেলের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে শ্যামাকন্যা এই মেয়েকেই ঘরে তুলতে উঠে পড়ে লেগেছেন।অথচ এই মহিলা কিনা তার'ই সামনে। নিজের ভেতরে ক্রোধকে কোনমতে চাপা দিতে চাইলেও দোকানির ব্যাক্কলের মতো তাকিয়ে থাকায় পারলেন না। শেষমেষ উক্ত কথাটি বলেই ফেললেন।

“ টাকার জোর দেখাচ্ছেন?এ্যাই, এ্যাই দোকানি কত দাম এই শাড়ীর?"

হম্ভিতম্ভি করতে করতেই আফনূরের সামনে এসে দাড়ালো, আফনূর বসেছিলো বসার জন্য পেতে রাখা টুলে।এমন অবস্থায় মহিলার নিতম্ব গিয়ে ঠেকলো আফনূরের মুখে। তানহা ক্ষেপে গেল,আফনূর হতভম্ব উনার কার্যক্রমে। বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,একটু বেশিই উচ্চ স্বরেই ছিলো চিৎকারটা,

“ আরে আপনি কি করছেন?"

নিজের পেছন থেকে এমন চিৎকারে আঁতকে উঠলেন, কিছুটা দুরে ছিটকে গেল,পিছু ফিরে চোখ রাঙিয়ে উচ্চ আওয়াজে চিৎকার করে বলে উঠলো,

“ এ্যাই মেয়ে এইভাবে ষাড়ের মতো চিল্লাছ্ছো ক্যান?বাপ মা আদব টাদব শেখায় নি কিছু?"

আফনূর উত্তর দিবে কি! কেমন ঘোরের মধ্যে চলে গেছে এতকিছুতে! আসছে নিজের বিয়ের কেনাকাটা করতে অথচ অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে ঝগড়ায় তাও কিনা সামান্য একটা শাড়ীর জন্য! তার অথবা তাদের মতো পরিবারের মানুষের কি এভাবে এমন জায়গায় ঝগড়া করা উচিত? কিন্তু দোষতো তাদেরও না। পছন্দের জিনিস তা যদি এমন করে কেউ কেড়ে নিয়ে যায় তখন কেমন লাগে? তাছাড়াও এই মহিলা এক দোকান মানুষের মাঝে তার গায়ের রং নিয়ে কথা শুনিয়েছে। মহিলার ভাগ্য নির্ঘাত ভালো তাইতো আফনূরের ঠোঁট কাটা জবাবের থেকে বেঁচে গেল। নয়তো মহিলাকে বুঝিয়ে দিতো এই আইনজীবী আফনূর রেজ‌ওয়ান কি জিনিস; ভাগ্যিস সাথে হবু শ্বাশুড়ি,ননাস সাথে নয়তো; আফনূর কি বলতে পারে না এই মহিলার পেট দেখতে মিরপুর স্টেডিয়ামের মতো বড়! নাকি বলতে পারে না তার সার্জারি করা ঠোঁটের গঠন বেড়িবাঁধের ভাঙ্গা বাঁধ,ওহ গালেও তো সুপারির চাষ করে রাখছে! নিজের দিকে না দেখে অন্যকে নিয়ে চর্চা বেশি করেন হয়তো তাই এই নিজের এই বেহাল অবস্থা! আহারে পেটু আন্টি নিজের প্রতি একটুও যত্ন নেন না অবশ্য নিবেন কিভাবে যেভাবে অন্যের জিনিসে দৃষ্টি রাখেন তাতে তো সময়‌ই পান না নিজের দিকে দৃষ্টি দিতে হয়তো!

এতকিছু ভাবলেও মুখে কিছুই বললো না , কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে র‌ইলো আর দেখতে থাকলো মহিলার তামাশা। কিন্তু আফনূরের এই পঁচা ইচ্ছাটি পূরণ হলো না।তানহা এগিয়ে এসে ,

“ ওকে শিখিয়েছে, বাট আনফরচুনেটলি আপনাকে আপনার বাবা মা শেখায় নি।

- আপনি কি শাড়ী বিক্রি করবেন? "

দোকানি শাড়ী প্যাকেট করে দাঁড়িয়ে ছিলো। তানহার কথায় হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে বুঝলো প্যাকেট রেডি।

“ বিল কোথায় পে হবে?"

" আসুন!"

দোকানের অন্য একটি ছেলে বললো।সবাই উঠে সেই দিকে গেলো। ঐ মহিলা শাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে থাকলো। ওদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে পরক্ষনেই দোকানির উপরে হামলা শুরু করলো।


পর্ব ২৩


“ Sorry if I am late."
চেয়ারে বসতে বসতে বললো তাজিশ, সামনে অতীব সুন্দরী তুলি হামিদের মুখে ভদ্রতাসূচক হাসি যার সাথে বেরিয়ে এলো,
“ it's ok."
”আসলে বাড়িতে বিয়ের তোরজোর চলছে তাই নিয়েই একটু ব্যস্ত, সেদিকে খানিকটা সময় দিতে গিয়েই..
“ প্লিজ এত এক্সপ্লেইন করবেন না,আপনি কর্মজীবী,ব্যস্ত মানুষ, দেরী একটু আধটু হ‌ওয়াটা স্বাভাবিক! আমি এতে মাইন্ড করি না। তাছাড়াও আমি জানি আপনি এখন হয়তো আপনার ভাইয়ের নির্বাচন কাজে বিজি আছেন!"
“ থ্যাংকস বোঝার জন্য,তবে আমি নির্বাচনী কাজে নয় বিয়ের আয়োজনে একটু ব্যস্ত!"
“ কার বিয়ে?”
“ ভাইয়ার!"
“ ভাইয়ার বিয়ে মানে? "
“ ভাইয়ার বিয়ে মানে ভাইয়ার বিয়ে,আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে!"
“ ভাইয়ার বিয়ে কবে?”
“ এইতো আগামী পরশু বাদে তার পরের দিনই, মানে তিনদিন পর!"
“ নির্বাচনের চারদিন বাকী না?"
“ হ্যা!"
“ তাহলে এখন এই সময়ে? আগেই ডেইট ফিক্সড করা ছিলো?"
“ নাহ,হুট করেই সবটা হয়ে গেছে।আসলে ভাইয়া চাচ্ছে নির্বাচনে জয়ের আগেই ভাবিকে ঘরে তুলতে,যাতে তার আনন্দে ভাসার মতো মানুষ তার পাশেই থাকে!"
“ রিলেশন ছিলো?"
“ না তবে ভাইয়ার পছন্দের,ভাবীর খবর জানা নেই। আমাদের‌ও পছন্দ হয়েছে, আর আম্মা তো পারলে এখনই ঘরে ব‌উ তুলে আনে! তিনদিন যে কিভাবে অপেক্ষা করবে তা শুধু আমার আম্মাই ভালো জানে!"
“ কেন?"
“ আম্মা ভাইয়া লন্ডন থেকে ফেরত আসার পর থেকেই বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলো, এতদিন ভাইয়া রাজী হয়নি তাই চেয়েও কিছু করতে পারেনি।এখন হয়েছে তাও আম্মার পছন্দের বিরুদ্ধে গিয়ে তাও আম্মা ভাবিকে মেনে নিয়েছে! তবুও বিয়ে করতেই হবে!"
“ আন্টির কি অন্য পছন্দ ছিলো?"
“ হ্যা আম্মা ভাইয়া ছোট্ট থাকতেই তার প্রাণ সখীর কন্যাকে পছন্দ করে তার পুত্র বধূ করার কথা দিয়েছিলো। কিন্তু বড় হয়ে তা আর সম্ভব হলো না।"
“ কেন ভাইয়ার কি তাকে পছন্দ হয়নি?"
তাজিশ ধীরে ধীরে সবটা খুলে বললো,সব শোনার পর তুলি বললো,
“ আপনার ভাইয়ের জন্য আপনার মা আগেই মেয়ে পছন্দ করে রেখেছিলো, আপনার জন্য রাখেনি?"
তুলির প্রশ্নে তাজিশ একটু থামলো, পরমুহূর্তেই উত্তর নিটল করলো,
“ না !"
“ কেন?"
“ কারণ তার সখীর একটাই মেয়ে!"
তাজিশ একটু শব্দ করেই হাসলো। তাজিশের হাসিটা মুগ্ধ হয়ে দেখলো তুলি। ঝকঝকে দাঁত, কোথাও উঁচু নিচু নেই, একদমই পরিপাটি দন্ত পাটি। হলদেটে ফর্সা মুখে হালকা ছাঁটে ঘন চাপ দাড়ি সাথে হালকা গোলাপী ঠোঁটের উপর সজ্জিত গোঁফ।যার উপরে রয়েছে উচু চৌক্ষস নাক।উজ্জীবিত চাহনির ভাসা ভাসা বড় আঁখি।ঘনপল্লবে ঘেরা তার দুদিক। উপরেই মধ্যিখানে সেতুটানা দেওয়া ভ্রু জোড়া।মাথা ভর্তি ঘন কালো চুল যাকে হালকা জেল দিয়ে উল্টো পিঠ করে আঁটকে রাখা। কপালের একটু নিচে চোখের কার্নিশ ঘেঁষে একটা কাঁটা দাগ,কানের গোড়ায় দৃশ্যমান একসাথে দুটো লাল তিল! পড়নে সাদা শার্টের উপরের বোতাম দুটো খোলা, ভেতরের সাদা সেন্টু গেঞ্জিটা উঁকি মেরে তাকিয়ে আছে!হাতের গোড়ায় রয়েছে সিলভার প্রলেপের বড় ডায়ালের ঘড়ি।পুরুষালী সুঠাম হস্তের লোমগুলো নেতিয়ে আছে শার্টের হাতের চাপে। পলকহীন দৃষ্টিতে সবটা অবলোকনে ব্যস্ত তুলির ঘোর কাটলো তাজিশের কাঁশির খুকখুক শব্দে।তুলিকে নিজের দিকে এমন করে তাকাতে দেখে অনেক আগেই তাজিশের হাসা বন্ধ হয়ে গেছে, লজ্জায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছিলো, কোন মতে নিজেকে স্বাভাবিক করতেই কাঁশির বন্দোবস্ত করলো।তুলি নিজের কাজে লজ্জিত হলো।আমতা আমতা করতে করতে ইতিউতি করতে থাকলো,তাজিশ পরিস্থিতি সামলাতে বললো,
“ ভাইয়ার বিয়েতে ক'দিন আপনাকে চাই! অনুরোধ নয়,আবদার করছি!"
 তাজিশের সহায়তায় তুলি স্বাভাবিক হলো কিনা বোঝা গেলো না ।তবে কথার উত্তর দিতেই বললো,
 “ আপনার ভাইয়ের পছন্দ অনুযায়ী নিজের পছন্দের মেয়েকে ত্যাগ করেছে,কারণ তাদের আপনার ভাইয়ের পছন্দকে ভালো লেগেছে যদি আপনার সাথেই সেইম হয় এবং আপনার পছন্দের মেয়েটাকে আপনার পরিবার পছন্দ না করে?"
“ এমন কিছু হবে না!”
“ যদি?...”
“ যা হবার নয় তার আগে পিছে যদি লাগিয়ে সহজ জীবনকে জটিল করার কোন মানেই নেই মিস তুলি!”
“ আমি শুধু জানতে চাচ্ছিলাম,এই আর কি!"
“ দেখুন,প্রথমত আমার জন্য আমার মায়ের এমন পছন্দ করা কেউ নেই,থাকলে আমি অবশ্যই জানতাম। দ্বিতীয় এটা জীবন! উপন্যাস কিংবা গল্প নয়! যে আমি আবেগে ভেসে গিয়ে মায়ের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে এমন একজনকে জীবনে জড়াবো যাকে আমি চাই না!আমি অবশ্যই এমন কাউকে বেছে নিবো যাকে আমি চাই।আর হ্যা যদি বলি আমার পরিবারের কথা তবে বলবো আমার বাবা-মা যথেষ্ট জ্ঞানী তারা কখনোই নিজেদের মতামত আমাদের উপর চাপিয়ে দিবেন না! সুতরাং আমি রিল্যাক্সে আছি!"
“ মায়ের সেই তরফের আমার এক কাজিন জেঈন ,তার সাথে আমার পরিচয় হয় যখন আমার বয়স ১৭ ,সে ছিলো আমার মায়ের সেই স্বামী মানে আমার পালিত বাবা জুনাইদ আসাবীর বোন জেঈদা আমিনের সন্তান!জেঈদা আমিনের স্বামী একজন খ্রিস্টান ধর্ম অনুসারী। উনারা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। ধর্ম কর্ম নিয়ে তাদের বিশেষ মাথা ব্যথা নেই। বাবার ধর্মে বিশ্বাসী জেঈন ছিলো আরও বেশী উদাসী।সে বিশ্বাস করলেও না পালন করতো মায়ের ধর্ম আর না পালন করতো বাবার ধর্ম! জেঈন, যখন প্রথম আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসে তখন সে ছাব্বিশের যুবক।আমাকে দেখে তার ভালো লাগলে সে আমাকে প্রপোজ করে। আমি প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। কিন্তু পরক্ষনেই জেঈনের আকর্ষণীয় লুকে আমিও মুগ্ধ হ‌ই। সতেরোর কিশোরী , আবেগে ভাসছিলাম। সুদর্শন জেঈন আসলেই যেকোন নারীর কাছে ডিমান্ডেবল।সেই জেঈন আমাকে পছন্দ করে বিষয়টি ভাবতেই আমি কেমন জানি উৎফুল্ল হয়ে পড়েছিলাম। দিন এক পরেই আমি তার প্রপোজ একসেপ্ট করি। সতেরো বছরের প্রথম অনুভূতি জেঈন প্যাট্রিয়াস। বিষয়টি তখন‌ও অনেকের কাছেই অজানা ছিলো, আমাদের সম্পর্কটা। কিন্তু সময়ের গড়পরতায় এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা।আমরা বিভিন্ন সময়ে বেড়াতে যেতাম,টুরে গিয়ে নিজেদের মতো উপভোগ করতাম।  ধীরে ধীরে আমাদের একে অপরের সাথে সময় কাটানোটা বাড়তে থাকলো যার ফলস্বরূপ সবার দৃষ্টিতে পড়ে গেলো। আমার দ্বিতীয় বাবা বিষয়টি নরমাল নিলেও বাধ সাধল আমার মা! তার ভাষ্যমতে জেঈন আমার যোগ্য নয়। অবশ্য তার কারণ হিসেবে মা দেখিয়েছিলো জেঈন বেকার,সে মেয়েদের নিয়ে আনন্দ করে,বাবার টাকা উড়িয়ে ক্লাব টুর নিয়ে পড়ে থাকে।আর মা হিসেবে তিনি কখনোই এমন কারো হাতে আমাকে তুলে দিবেন না। তাছাড়াও তিনি জানান আমার ধর্ম অনুযায়ী তিনি আমাকে সম্প্রদান করবেন,এটাই নাকি আমার বাবার সাথে তার চুক্তি হয়েছিল।”
লম্বা শ্বাস নিয়ে এখানে একটু থামলো তুলি।তাজিশ নিশ্চুপ হয়ে চেয়ে আছে।কি বলবে? বলার মতো আদৌও কিছু আছে? যাকে চেয়ে নিজেকে ভাসিয়ে দিচ্ছে তার মনে কি-না অন্য কারো বাস? তুলি দীর্ঘ এক শ্বাসের পর তাকালো তাজিশের দিকে। তাজিশের ঠোঁটের সেই হাসি মিলিয়ে গেছে অনেক কাল আগেই।তুলির কেন জানি নিজেকে অপরাধী লাগছে,এই তো খানিক সময় আগেই কি উজ্জ্বল প্রাণবন্ত হাসি জুড়ে ছিলো তার সামনে বসা এই সুদর্শন পুরুষের মুখে অথচ এখন...তাজিশ কিছু বলবে বুঝতেই তুলি ভাবলো না আর , নিজের কথাকে শেষ করতে তাজিশের উদ্দেশ্যে বললো,
“ আমাকে শেষ করতে দিন প্লিজ!”
নিজের কন্ঠে অবরুদ্ধ শব্দগুলো কেমন উশখুশ করছে,যেন তারা বিরক্ত হচ্ছে বদ্ধ ঘরে থাকতে।তাজিশ নিজেও কেমন জানি একটা অদ্ভুত অনুভূতির জালে আটকে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু করতেও পারছে না।তুলি নিজের কথাগুলো সাজিয়ে নিয়ে আবারও বলতে শুরু করলো,
“ মা আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলো তাদের সিদ্ধান্ত। আমার বাবাও!জেঈনকে বাধ্য করলো তার বাড়ি ফিরে যেতে।জেঈন চলে গেলে আমি মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ি।আমি  ভেবেছিলাম জেঈন হয়তো নিজেকে তৈরি করে আমাকে নিতে আসবে। কিন্তু না, তেমনটা হয়নি।আমি তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম।তার তরফ থেকে তেমন কিছু ছিলো না,যদিও আমি তখন ভাবতাম সে পারছে না আসলে সে চায়নি করতে।যাই হোক আমি অনেক চেষ্টায় প্রায়'ই আট মাস পরে তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য একটি মাধ্যম খুঁজে পাই এবং এরপর জানতে পারি...
থেমে গেল তুলি।তাজিশ ভ্রু কুঁচকে ফেললো। নিজের কাঙ্খিত নারীর প্রেমকাহিনী শোনার সৌভাগ্য হচ্ছে।তার মাঝে বিরতিটা বিরিয়ানির মাঝে এলাচের মতোই লাগছে।তুলি কথা থামিয়ে সামনে থাকা বোতল থেকে দু চুমুকে কিছুটা পানি পান করলো,তাজিশ চুপচাপ দেখলো কেবল।পানি পান শেষে বোতলের মুখ লাগিয়ে এক নজর তাজিশের পানে চাইলো। তাজিশের মুখোভঙ্গিতে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।এখন এই মুহূর্তে তাজিশের মনোভাব কেমন তার প্রতি, তাকে নিয়ে কি ভাবছে? কিছুই বোধগম্য হলো না।তুলি বেশি ভাবতে চাইলো না।কথা শুরু করতে থাকলো,
“ আমি যোগাযোগ করেছিলাম তার‌ই এক বন্ধুর মাধ্যমে,আমাকে সে সব মাধ্যম থেকে ব্লক করছিলো।আমি ভেবেছিলাম এটা আমার পরিবারের কাজ তারা হয়তো ভয় দেখিয়েই এমন কাজ করিয়েছে কিন্তু না। তারা কিছুই করেনি।সেই করেছে অবশ্য তার জন্য মোটা অংকের একটি ব্যান্ডেল নিয়েছিলো আমার পরিবার থেকে।যাই হোক, আমি যখন যোগাযোগ করলাম জানতে পারলাম সে অলরেডি অন্য একটা মেয়ের সাথে লিভ ইনে আছে এবং ঐ মেয়েটা অলরেডি চার মাসের প্রেগন্যান্ট!"
“ হুয়াট!"
মুখ খুললো তাজিশ, এমন কিছু শোনার আশা রাখেনি।একটু চমকালো। মাত্র আট মাসের মধ্যে অন্য একটি সম্পর্কে জড়ানো এবং সেখানে বেবির আগমন‌'ও! কিভাবে সম্ভব? 
তুলি লজ্জিত ভঙ্গিতে মাথা নত করলো,ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে বাম হাতের কব্জিতে অনবরত চাপ দিচ্ছে।হয়তো কিছু বলা বাকি যা বলতে পারছে না।
তাজিশ একটু নিজেকে ধাত্বস্থ করলো, তুলিকে সাহস দিতে বললো,
“ যা বলতে চান বলে ফেলুন,আমি কিছু মনে করবো না।"
তুলি মাথা তুলে তাকালো,চোখে চোখ রাখলো। পরক্ষনেই আবার‌ও নামিয়ে নিলো।ধীর কন্ঠে বললো,
“ জেঈন যখন আমাদের বাড়িতে ছিলো তখন‌ ও একবার আমার ক্লোজ হতে চেয়েছিলো,প্রথমে আমি মানা করলেও পরে রাজী হয়েছিলাম!"
তুলি আর বলতে পারলো না।থেমে গেল।স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তাজিশ। নিজের পছন্দের নারীর নিজ স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সে অনেক আগেই বেগানা পুরুষের সাথে! ভাবতে পারছে না।মাথা ফেটে যাচ্ছে।এত সময় সবটা স্বাভাবিক ভাবেই নেওয়ার চেষ্টা করছিলো,হ্যা প্রথম থেকেই কষ্ট পাচ্ছিলো কিন্তু শেষে গিয়ে! এটা কিভাবে? 
“ জেঈন আমার সাথে আর দেখা করেনি,আমি অনেক অনুরোধ করার পরেও দেখা করেনি। বরং আমাকে হুমকি দেওয়া শুরু করেছিলো যদি আমি তাকে বিরক্ত করি তবে সে আমার পরিবারকে বলবে, এরপর আমার সাথে তার ক্লোজ মুহূর্তের ছবিগুলো তাদের কাছে পাঠিয়ে দিবে!আমি ভয় পেয়ে যাই। তার থেকে নিজেকে সরানো কষ্ট ছিলো, তাও চেষ্টা করি।একা ঘরে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখি,কারো সাথে কথা বলতাম না।আমার মা ভাবেন হয়তো জেঈনকে ভুলতে না পারায় এমন করছি।তাই তিনি আমাকে গাইডলাইন দিতে লাগলেন যাতে আমি নিজেকে সামলাতে পারি। মানসিক ভাবে ভেঙে পড়া একজন মানুষ আর কিভাবে নিজেকে সামনে এগিয়ে নিবে?মা নিজের স্বপ্ন বুটিকের সাথে আমাকে জড়িয়ে নিলেন। অতটুকু বয়সেই আমাকে মায়ের কাজে সহযোগিতা করতে হলো।তখন রাগ হতো কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম ওটাই বেস্ট সিদ্ধান্ত ছিলো।"
তুলি থামলো আবার‌ও। তাদের টেবিল থেকে কিছুটা দূরে অন্য একটি বিল্ডিংয়ের কার্নিশের উপরে ছোট্ট চড়ুই বসে তিড়িং বিড়িং নাচে নিজের পারদর্শিতা দেখাচ্ছ,তুলি নিজের দৃষ্টি সেদিকে নিক্ষেপ করে পরবর্তী কথাগুলো বলতে শুরু করল,
“ বুটিকের কাজ করতে গিয়ে অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হতে থাকলো, তাদের জীবনের নানা গল্প শুনতে শুনতে বুঝতে শিখলাম জীবনের আসল অর্থ, প্রকৃত উপলব্ধি হলো।তার সাথে চিনলাম মানুষের ধরন।জেঈন আমাকে ভালোবাসতো তবে সেটায় গুরুত্ব ছিলো না।আসলে কেবল জেঈন‌'ই নয় ঐ দেশে অবস্থিত বেশিরভাগ মানুষ'ই ওমন; তাদের আবেগ কম।তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। শারীরিক সুখটাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।জেঈন‌ও তাদের মতোই।সে আমার মাঝে যা চেয়েছিলো তা হয়তো পুরোপুরি পায়নি তাই যখন আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে গ্রহন করার সুযোগ পেলো, ছাড়লো না। আদৌওতে ওটা ভালোবাসা ছিলো কিনা জানিনা,তবে আমার জীবনের একটা নষ্ট অতীত হয়ে রয়ে গেছে।"
“এখন আমাকে কেন এগুলো বলছেন?"
তাজিশ আর শুনতে চায় না,তাই শুধু নিজের কথাটুকু বললো।তুলি ছলছল চোখে অসহায় মুখে তাকালো। তাজিশের কেন জানি মায়া হলো না।তুলি তাও বলতে থাকলো,
“ আমি আসলে...!

পর্ব ২৪


“ গাবতলীতে নির্বাচন বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের ফাঁকা গুলি নিক্ষেপ। বিস্তারিত....
টাইটেল পড়েই সংবাদ পাঠিকা ইনায়া আনজাম বিস্তারিত পাঠ করতে শুরু করলেন,
রাজধানী ঢাকার গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নির্বাচন বিরোধী আন্দোলন সমর্থনকারীরা পরপর দুটো ককটেল বিস্ফোরণ ঘটালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যরা ফাঁকা গুলি ও গরম পানি নিক্ষেপ করতে বাধ্য হয়! এই হামলায় আহত হয়েছেন দু'জন পুলিশ সদস্য,তিনজন পথচারী সহ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা বেশ কয়েকজন।তার সাথে ক্ষতি হয়েছে আশেপাশে দোকানপাটের।আমরা এখন সরাসরি চলে যাচ্ছি ঘটনাস্থলে উপস্থিত আমাদের সহকর্মী তানিয়া রুবার কাছে যিনি আমাদের বিস্তারিত চিত্রপট দেখতে সহায়তা করবেন ,
“হ্যালো রুবা আমাকে শুনতে পাচ্ছেন? আপনার কাছে ঘটনাস্থলের কি কি খবর আছে আমাদেরকে বলুন?"
“ জ্বী ইনায়া আমি শুনতে পাচ্ছি, ঘটনার রেশ বেশ ভয়াবহ।যদিও আমি আপনাকে সরাসরি বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছি, ‘ চারিদিকে একটা আতংক বিরাজ করছে, তার সাথে আমি একটু যোগ করে বলছি, সারাদেশে চলমান নির্বাচন বিরোধী আন্দোলনের আজ মাস পেরুলো।দফায় দফায় অবরোধ,হরতাল দিয়েও আদৌওতে কোন সুফল আন্দোলনকারীরা পাচ্ছেন কি-না বোঝা না গেলেও তাদের দফায় দফায় এমন দেশকে অচল করার আন্দোলনে সাধারণ জনজীবনে ঘটছে ব্যাপক বিঘ্নতা। বিভিন্ন জায়গায় অগ্নি সংযোগ,গাড়ী ভাঙচুর;রেল লাইনের পাত কেটে ফেলা কিংবা উপরে ফেলাও হচ্ছে আন্দোলনের অন্যতম জঘন্য কর্মসূচির অংশ। তবুও জীবন বিপন্নতার আতংক নিয়েই ঘর থেকে বের হচ্ছে সাধারণ মানুষ।তেমনি আজ‌ও বের হয়েছে রাজধানীতে বসবাসরত কর্মজীবী, শ্রমজীবী কিংবা দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হ‌ওয়া মানুষ।আমরা সবাই জানি গাবতলী শহরের অন্যতম ব্যস্ত স্থান যেখানে দিনরাত মানুষের আনাগোনায় গমগম করে সেই গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নির্বাচন বিরোধী আন্দোলনের অবস্থান। তারা দূর পাল্লার বাস চলাচল থেকে স্বল্প পাল্লার বাস চলাচলে বারবার বাঁধা দেওয়ায় পরিবহন কর্মীদের সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়।যার এক পর্যায়ে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে,এতে করে সাধারণ মানুষের মনে ভীতির সৃষ্টি হয়, শুধু তাই নয়,বাস ছাড়াও কোন যান‌'ই চলতে দিচ্ছে না এই আন্দোলনকারীরা।ব্যক্তিগত গাড়ীও ভাঙচুর,অগ্নি সংযোগ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে!
ইতিমধ্যে কয়েকটি দোকানেও ভাঙচুর ঘটানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সহ আনসার মোতায়েন করা হয়েছিল, স্বাভাবিক লাঠিচার্জ দিয়ে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও গরম পানি নিক্ষেপ করে।....
“ রুবা আমাকে বলুন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কি রকম হয়েছে,আর আজ তো ঢাকা ১১ আসনের প্রার্থী খাইরুল মাইজদী'র প্রচারণার জন্য যাওয়ার কথা ছিলো তিনি কি এখনও পৌঁছিয়েছেন নাকি এমন পরিস্থিতিতে যাবেন না? এই বিষয়ে যদি কোন তথ্য পেয়ে থাকেন তবে আমাদের জানান।"
“ হ্যা ইনায়া, আজ গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের স্থানীয় শ্রমিক লীগের আয়োজনে খাইরুল মাইজদী'র নির্বাচনী প্রচারণায় আসার কথা ছিলো, ইতিমধ্যেই উনার পৌঁছানোর কথা থাকলেও পরিস্থিতির কারনে আজকের প্রচারণা প্রোগ্রামটি হয়তো বাতিল করা হয়েছে।যদিও আমি এখনও তার একান্ত নিকট কারো কাছ থেকে সঠিক কোন তথ্য পাইনি,তবে স্থানীয় কিছু কর্মীদের থেকে শোনা যাচ্ছে প্রোগ্রামটি ইতিমধ্যেই বাতিল হয়ে গেছে,ইনায়া আমি এখন আপনাকে পরিস্থিতির কিছুটা নমুনা দেখাচ্ছি ,এই যে আমার সামনে একটা প্রাইভেট গাড়ী দেখা যাচ্ছে, অবস্থা খুবই খারাপ করে ফেলেছে গাড়িটার,নোভা কোম্পানির এই ব্যক্তিগত গাড়িটির সবকটা গ্লাস ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে , আরও দেখা যাচ্ছে পেছনের দিকে আগুন লেগেছিল হয়তো পানি মারার কারণে নিভে গেছে,প্লেটে দেওয়া নাম্বারটা অক্ষত রয়েছে গাড়ীর মালিক হয়তো গাড়ীটা রেখেই চলে গেছে,,
“ ভাইয়া!"
চিৎকার করে ছিটকে উঠলো তানহা, জুতোর দোকানে বসে তারা জুতো দেখছিলো,এই দোকানেই চলছে টেলিভিশন, যার পর্দায় ভেসে উঠছে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাবলী,তার মধ্যে‌'ই দেখা যাচ্ছে আজকের গাবতলীতে ঘটে যাওয়া নারকীয় তাণ্ডব । 
“ এটা তো ভাইয়ের গাড়ী।"
নাম্বার প্লেট দেখেই তানহা চিনে ফেলেছে,হাত পা কাঁপছে ওর। আফনূর গাড়িটা দেখেই আঁতকে উঠেছিলো কারণ গাড়ী'টার অবস্থা করুণ দেখে কিন্তু তারাজের গাড়ী শুনেই আফনূর থমকে গেছে।এইতো ঘন্টা কয়েক আগেই তো লোকটার সাথে কথা হয়েছিল।কি হাসি হাসি একটা মুখ, সবসময়ই তার ঠোঁটের কোণে হাসিটা লেগেই থাকে। চিরন্তন উজ্জ্বল চঞ্চলা বদন। তীক্ষ্ম চাহনির নজর কাড়া দৃষ্টি। আফনূরের চিত্ত অস্থির হয়ে উঠলো। এদিকে মিসেস তাজিয়া খাঁ ছেলের গাড়ীর এমন অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
“ আমার বাপ কোথায়?"
তিনি যেন টিভির পর্দায়‌'ই খোঁজার চেষ্টা করছেন। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, বলতে থাকলেন,
“ও নেইতো ওখানে?”
“ কি হয়েছে? ”
পেছন থেকে কারো শব্দ তানহা ঘুরে দাঁড়ালো।তাজিশ এসে পৌঁছিয়েছে। সবাইকে এমন কাঁদো কাঁদো দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। তড়িঘড়ি করে মায়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি হয়েছে আম্মা?"
তাজিয়া খাঁ ছেলের বুকের উপরে হামলে পড়ে কাঁদতে শুরু করলেন।তাজিশ ভীত চোখে তানহার দিকে তাকালো।এই প্রথম আফনূরকে দেখলো।ছবি দেখলেও সরাসরি এখন‌ই দেখলো, আফনূরের চোখ‌'ও ছলছল। মা'কে বুকে চেপে আগলে রেখে তানহা'কে বললো,
“ আশ্চর্য বুবুন,কি হয়েছে বলছো না কেন?"
“ গাবতলীতে ভীষণ গ্যাঞ্জাম হয়েছে শুনেছো?অনেক ভাঙচুর হচ্ছে!"
“ আশ্চর্য, সেটা নতুন কি? হরতাল হলে এগুলো হয়‌'ই, কিন্তু তাতে কাঁদার কি আছে?”
“ ভাইয়ার গাড়ী!"
“ কি ভাইয়ার গাড়ী?"
“ ভাইয়ার খোঁজ নাও। কোথায় আছে?"
“ এর সাথে ভাইয়ার কি সম্পর্ক?"
“ টিভিতে দেখাচ্ছে ভাইয়ার গাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। ভেঙে একদম গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলছে কিন্তু ভাইয়া কোথাও নেই!"
“ ভাইয়াকে ফোন দিয়েছিলে?"
“ না আ.ম..আমি মাত্র দেখালাম, তার মধ্যেই তুমি চলে আসছো!"
“ ঠিক আছে আমি ফোন দিচ্ছি। তুমি শান্ত হ‌ও, আম্মা প্লিজ থামো! ভাবী আপনি তো ল‌ইয়ার এত তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়লে চলবে! আপনি তো এদেরকে শান্ত করবেন তা না করে আপনিও এদের দলে মিশে গেছেন!"
প্রথম কথাটা বোনকে বললো, দ্বিতীয় কথাটা মায়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো, মা'কে বুকে আগলে রেখেই আফনূরের দিকে তাকিয়ে শেষ লাইনটা বললো। তাজিশের মুখে ভাবি ডাকে ইতিমধ্যে আফনূরের কান্না থেমে গেছে। লজ্জারা ভীর জমিয়ে সিক্ত অনুভূতিকে জমাট বেঁধে ফেলছে।তার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই নিজেকে ধাতস্থ করলো।আগে সঠিক খবর জানা দরকার।হয়তো তারাজ ঠিকই আছে।
“ রিং রিং রিং!"
অপরদিকে রিং হচ্ছে,তাজিশ একটি শান্তির নিশ্বাস ছাড়লো। যেহেতু ব্যক্তিগত ফোনে রিং হচ্ছে তার মানে তার ভাইয়ের ঠিক থাকার বিষয়টি কিছুটা হলেও নিশ্চিত হ‌ওয়া যাচ্ছে।যত‌ই সামনে উপস্থিত তিন রমনীকে শান্তনা দিক, শান্ত থাকার পরামর্শ দিক, ভেতরে ভেতরে সে নিজেও তো অসম্ভব অস্থির হয়ে আছে।যতক্ষনে না...
“ আসসালামু আলাইকুম!"
 ঐ প্রান্তের ব্যক্তির কন্ঠে তাজিশের আঁটকে রাখা দমটা ফোঁস করে ছাড়লো, ধীর কিন্তু চঞ্চলা কন্ঠে শুধালো,
“ ঠিক আছো ভাই?"
“ হ্যা, আলহামদুলিল্লাহ!"
“ কোথায় আছো?"
“ আছি,সাভারের কাছাকাছি!"
“ সত্যি‌ই ঠিক আছো?"
“ আরেহ বাবা হ্যা আমি পারফেক্টলি ঠিক আছি।আলহামদুলিল্লাহ!"
“ না সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েছে! ভীষণ ভয়‌ও পেয়ে গেছে!"
“ কেন?"
তারাজ উঁচু কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, তারাজ আগের মতোই শান্ত হয়ে বললো,
“ গাবতলীতে যা হয়েছে তারা সব‌ই দেখেছ তাই!"
" কিভাবে?"
“ জুতোর দোকানে টিভিতে, লাইভ চলছিলো তখন তোমার পুড়ে যাওয়া গাড়ীটা দেখাচ্ছিল।আমি এসে দেখি সবাই কাঁদছে!"
“ আম্মাকে দে!"
“ হুম!"
 “নাও।",
ভাইয়ের আদেশ মোতাবেক ফোনটা মায়ের কানের সামনে ধরলো, তাজিয়া খাঁ কাঁদো কাঁদো চোখে ছোট ছেলেকে পরখ করলেন, তারপর ফোনটা কানের কাছে ধরতেই আবারও হাউমাউ করে কাঁদতে বসলো,তারাজ কিছু সময় শুনলো এরপর অদুরে সুরে ডাকলো,
“ আম্মা!"
“ কোথায় তুমি! ঠিক আছো?"
“ আলহামদুলিল্লাহ আমার আম্মার দোয়া আমার সাথে থাকে,তাহলে আমার কি কিছু হতে পারে? আর হ্যা আমি এখন সাভারের ভেতরে আছি, অর্থাৎ আমি প্রচারণায় অংশগ্রহণ করছি।তার মানে কি দাঁড়ালো আমি একদমই পারফেক্ট আছি সুস্থ আছি।"
“ তাহলে ঐ গাড়ি!"
“ এক‌ই গাড়ী অনেকের‌'ই হয় আম্মা, নাম্বার হয়তো ভুল দেখেছো।"
“ সত্যি বলছো!"
“ আচ্ছা তোমরা সবাই কোথায় এখন?"
তারাজ কথা ঘুরিয়ে ফেললো, অন্যদিকে নিতেই উক্ত কথাটি জিজ্ঞেস করলো,
“ বসুন্ধরা মার্কেটে!"
“ কেন গেছো?"
“ মানে কি?বিয়ের কেনাকাটা করতে!"
“ তাহলে তাই করো,আর কোন দিকে মন দেওয়ার দরকার নাই।তোমার ছেলে সুস্থ শরীরেই রাতে তোমার বুকে ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ!"
“ ইনশাআল্লাহ!"
“ তাহলে এখন আর কোন কান্না কাটি নয়!ওখে?"
" হুম!"
“ তাজিশকে দাও ফোনটা!"
" সাবধানে থেকো!"
বড় ছেলেকে সাবধান বলে ছোট ছেলের দিকে হাত বাড়িয়ে ফোন দিলো,তাজিশ হাতে নিয়ে মায়ের দিকে তাকালে ইশারায় তিনি বললেন তারাজ ওকে চাচ্ছে,
“ ভাই!”
“ তোর ভাবী কি সামনে?"
“ হুম!"
“ তাকে দে তো!"
“ দিচ্ছি!"
মা'কে ছেড়ে আফনূরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে বললো,
“ ভাই কথা বলবে!"
আফনূর আশ্চর্য হলো।এমন মুহূর্তে তার সাথে কি কথা বলবে? তাজিশ মাথা নুইয়ে রেখেছে। আফনূর লজ্জা পাচ্ছ বুঝলো।তাজিয়া খাঁ ইশারায় আফনূরকে কথা বলতে বললেন,তানহা এগিয়ে এসে চোখ দিয়ে ইশারা করলো,লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে আফনূর ফোন হাতে নিলো।
“ হ্যা..হ্যা.হ্যালো!"
আফনূরের কন্ঠস্বর ভারী, কান্না আটকে রাখলে যেমন হয় ঠিক তেমনি মনে হচ্ছে তারাজের কাছে। খুবই মোহনীয় কন্ঠে বলল,
“ উকিল সাহেবা, রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রীদের শক্ত, পাথরের ন্যায় কঠোর হতে হয়! যেকোন পরিস্থিতিতে তাদের নিজেদের সহ তাদের আশেপাশের মানুষের জন্য সাহস হতে হয় । সেখানে আপনি এত নরম হলে কিভাবে হবে?তাও কি-না উকিল হয়ে! শুনেন আমি আপনার দায়িত্বে আমার মা বোনকে রাখলাম তাদের কিভাবে সামলাবেন তা এখন থেকে আপনার উপর নির্ভর করে! আমি সারাদিনের ক্লান্তি শেষে আপনার কাছে শান্তি খুঁজতে যাবো। আশাকরি আমার মতো ক্লান্ত পথিককে হতাশ করবেন না। আপনার কাছে যেন আমার স্বর্গসুখের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়।আমি আপনার জন্য আমার হৃদয়ে প্রেমের প্রাসাদ গড়েছি সেখানের রানী আপনি। তার বিনিময়ে আমি কেবলি আপনার কাছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর প্রশান্তি চাইবো! কি দিবেন না?"
আফনূরের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো,এই মুহূর্তে কেউ এমন কথা কিভাবে বলতে পারে।এত চিন্তা,এত ভয় অথচ ঐ দিকের লোকটা একদমই নিটল, নিশ্চিত যেন কিছুই হয়নি। আফনূরের তরফ থেকে উত্তর আশা করেনি,তাই বেশি চাপ‌'ও দিলো না।শেষ করলো নিচের বাক্যটি দিয়ে,
“ উত্তর আমি স্বশরীরে আদায় করে নিবো ইনশাআল্লাহ, সাবধানে থাকবেন, ইচ্ছা অনুযায়ী যত খুশি কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরুন দ্রুত! আল্লাহ হাফেজ,দেখা হচ্ছে খুব শিগগিরই?"
নিজের কথা শেষ করে ফোনটা কেটে দিলো।আফনূর তাও অনেক সময় ফোনটা ওভাবেই ধরে ছিলো।
“ আফনূর!"
তানহা কাঁধে হাত রেখে হালকা ধাক্কা দিতেই আফনূর নিজের ঘোর থেকে বেরিয়ে আসলো, একটু আনমোনা ভঙ্গিতে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে মাথা নিচু করে ফেললো,
“ ভাইয়া কি বলছে?"
“ হুম!"
আফনূর অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো,কি বলবে বুঝলো না। দোনামোনা করতে দেখে তাজিশ‌'ই বললো,
“ যাই বলছে বলুক।এখন চলো কি কি কেনা বাকী কিনে ফেলো।ভাই দ্রুত কেনাকাটা শেষ করে বাড়ি ফিরতে বলছে।
অপরদিকে, গাবতলীতে একটি মাঝারি আকারের ফার্মেসিতে বসে নিজের কানের গোড়ায় ড্রেসিং সারছে তারাজ।হাতে ব্যান্ডেজ করানো হয়েছে,মাথার সেই আঘাতেও ইতিমধ্যেই একটি সেলাই দিয়ে ব্যান্ডেজ করানো শেষ। সাভার থেকে লোক আসছে।সাব্বিরের অবস্থা বেশ করুন তাই তাকে ইতিমধ্যেই এই এলাকার দলীয় ছেলেদের সহায়তায় হসপিটালে পাঠানো হয়েছে এবং হসপিটালে তার নিজের ছেলেরাও কয়েকজন পৌঁছে গিয়েছে।
নিজের হাতের ব্যান্ডেজের দিকে চেয়ে ভাবতে থাকলো, আজকের ঘটনা। কিভাবে নিজেকে সেইফ করলো।
।গাড়ীতে এলোপাথাড়ি লাঠি আর ইট নিক্ষেপ শুরু হয়। নির্বাচনী প্রচারণায় সচরাচর দলীয় জোট হয়ে গেলেও কোর্টে গিয়ে আফনূরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য নিজে একাই পৌঁছানোর কথা বলে একাই চালককে নিয়ে চলে যাবে বলে জানায়।
তারাজের সাথে ছিলো ওর ব্যক্তিগত সহকারী সাব্বির। সাব্বিরকে নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় না গেলেও আজ গিয়েছিল, যেহেতু মুরাদকে আগেই চলে যেতে বলেছে। গাড়ীতে আন্দোলনকারীদের হামলার পরপরই সাব্বির তারাজের উপরে চেপে নিজের পিঠ দিয়ে আগলে রাখে, কিন্তু তারাজ এমন অবস্থায় কোনমতেই বসে থাকতে পারছিলো না।ঐ আক্রমনের মাঝেই গাড়ীর দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আন্দোলন সমর্থনকারীরা পরপর কয়েকটি বারি মারে যার প্রতিটি হাতে,পিঠে এমনকি ঘাড়েও পড়ে।তবুও শক্তিশালী, সাহসী তারাজ নিভে যায়নি, কিন্তু যখন কান ছুঁয়ে মাথার কোনে লাগে তখনই নেতিয়ে পড়ে।
সাব্বির এমন পরিস্থিতিতে আগ কখনো পড়েনি।তাই সে ভয়ে চুপসে গেছে।তার উপরে তার ডান হাতের কনুইয়ে কাঁচ ঢুকে গড়গড় করে রক্ত বের হচ্ছিলো এর মধ্যেই পেছনে আগুন লাগতেই বাঁচার জন্য চিৎকার শুরু করতেই তারাজ ধাক্কা দিয়ে গাড়ী থেকে ফেলে দেয়,তার পর পর‌ই তারাজ‌ও লাফ দিয়ে বেরিয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা ইতিমধ্যেই অন্যদিকে চলে গেছে।আহত তারাজ কোনমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে উঠতে চেষ্টা করছিলো কিন্তু পায়ে কাঁচ টুকরো ঢুকে যাওয়ায় আর্তনাদ করে বসে পড়ে। ঐদিকে সাব্বির রাস্তায় কাঁচ ভাঙ্গার উপর গিয়ে পড়ে ।এতে করে তার বিভিন্ন অঙ্গে আঘাতের চিহ্ন গেঁথে যায়। সাব্বির বাঁচার জন্য চিৎকার করতে থাকে এর মধ্যেই কোন একজন মানুষ এসে টেনে তুলে।
তখন যেই গাড়ীর বেহাল দশা দেখে সবাই আতকে উঠে সেটা তারাজের‌ই ছিলো।


পর্ব ২৫


সাভার থেকে আসা লোকদের মধ্যে নিজের ছিলো মুরাদ,ফয়সাল,রাব্বী।ওদের দেখে তারাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো।এমন একটি আতংকিত মুহূর্তে নিজের লোক পেলে জীবন যেন সতেজ হয়ে উঠে।তারাজকে এমন অবস্থায় দেখে ওরা তিনজন‌ও আঁতকে উঠে।ফয়সাল তো কাঁদো কাদো সুরে বলেই ফেললো,
“ ভাই আগেই বলছিলাম আমরা আপনের সাথে যাই,আপনি নিলেন‌ই না! দেখেন এখন কি হ‌ইলো।ইয়া আল্লাহ আপনার কিছু হ‌ইলে আমগো কি হ‌ইতো!"
“ হয়েছে?"
“ কি ভাই!"
“ তোর মেলোড্রামা শেষ?শেষ হলে আমরা র‌ওনা দিতাম!"
“ভাই!আমি তো..
“ সাট আপ ফয়সাল; মেয়েদের মতো ফ্যাচফ্যাচ করবি না।জাস্ট বিরক্ত লাগে আমার কাছে এগুলো!"
“ জ্বী ভাই!"।
তারাজের বিরক্তিতে ফয়সাল চুপসে গেল।ফয়সাল হচ্ছে সেই কর্মী যারা নেতাকে অভিভাবক বলে সম্বোধন করে।যদিও তারাজের প্রতি ফয়সালের ভালোবাসা শুদ্ধ তবুও যত্রতত্র ওর ভালোবাসার বাড়াবাড়িতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে হয় তারাজকে।মুরাদ নিজেও যথেষ্ট চটে থাকে ফয়সালের এহেন মেয়েলিপনায়। সবচেয়ে বড় কথা ফয়সালের কারণে অন্য কর্মীরা তারাজের কাছ ঘেঁষতে পারে না 
যদিও এতে কিছুটা ভালোও হয়েছে অন্তত তারাজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয় না।
মুরাদ তারাজকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।মুরাদের বুক ধরফর করছে।বুঝাই যাচ্ছে ঘটনা বর্ণণায় বেশ ভয় পেয়েছে।তারাজ নিজের ক্ষত হাত দিয়েই মুরাদকে জড়িয়ে ধরলো।পিঠে হাত বুলিয়ে বললো,
“ শান্ত হ ভাই! আমি ঠিক আছি!"
“ তোকে আর একা ছাড়বো না যত যাই হোক!"
“ আচ্ছা ঠিক আছে একা ছাড়িস না। ইভেন আমি তো বলছি হাটতেই দিস না, কোলে নিয়ে হাটিস? ঠিক আছে!"
তারাজ টিটকারী মারলো।মুরাদ তারাজের পিঠে হালকা চাপড় মেরে ছেড়ে দিলো।হাতের ব্যান্ডেজে হাত বুলিয়ে বললো,
“ তুই যখন বাড়ি থেকে বের হোস, খালাম্মা ফোন করে বলে, আমার বাপকে তোর হাতে ছাড়লাম।খেয়াল রাখিস! জানিস কি বিশ্বাস থাকে উনার ঐ শব্দগুলোতে! কিছু সময় আগেও ফোন দিয়েছিল? আমি ফোন ধরিনি! কি বলতাম ধরে?এই যে আমি তার আমানতের খেয়াল রাখতে পারিনি!"
“ আচ্ছা ঠিক আছে! রিল্যাক্স হ ভাই! এরপর থেকে তোকে ছাড়া কোথাও যাবো না।প্রমিজ!"
“ সিওর!"
“ পাক্কা সিওর!"
“ বাসর ঘরেও না!"
“ যেভাবে লেপ্টে আছিস তা তো বিয়েই হবে না,আর বাসর তো!"
“ ছিহ কিসব বলিস!"
“ তুই যেভাবে আমাকে জড়িয়ে রেখেছিস‌ সবাই ভাববে আমার গে..
“ ছিহ; কিসব বলিস!আসতাগফিরুল্লাহ্!"
মুরাদ ছিটকে দূর সরে গেল।তারাজ নিজের কোট ঝাড়তে ঝাড়তে বললো,
“ শালা খবিস! আমার বাসরে থাকতে চায়!সর এখান থেকে! নয়তো পিচ্চি ভাবীকে ফোন করে বলে দিবো তুই আসলে ..! 
“ একদম উল্টো পাল্টা বলবি না?নয়লে কিন্তু! আচ্ছা যা মাফ করে দিলাম!"
” হুহ!
তারাজ মুরাদকে পাত্তাই দিলো না এহেন ভাবে সরে গেল। গাড়ীতে উঠে সাভার থেকে আসা লোকদের উদ্দেশ্য বললো,
“ আমরা এক গাড়ীতে আসছি আপনারা অন্যটায় আসুন প্লিজ!"
“ শিওর স্যার!"
কেউ একজন প্রত্ততর করলো। গাড়িতে উঠতে বসতেগ চালক গাড়ী চালানো শুরু করলো।তারাজ মুরাদকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ সাব্বিরের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখ।প্রোপার ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা কর। ছেলেটি মারাত্মক ভয় পেয়েছে।”
তারাজের কথার মাঝেই ফয়সাল প্রশ্ন করলো,
“ ভাই এমন নাদান উকিল ক্যামনে হইবো!"
“ উকিল হ‌ওয়ার সাথে এটার কি সম্পর্ক!"
তারাজকে করা প্রশ্নের উত্তরে মুরাদ উত্তর দিলো ফয়সালকে।ফয়সাল স্বপক্ষে যু্ক্তি পাতলো,
“ ভাই একজন পলিটিশিয়ানের , ভাইয়ের মতো একজন সাহসী ব্যারিষ্টারের সহকারী হয়েও এই সামান্যতেই ভয় পাইছে, তাইলে ভবিষ্যতে ওকালতি করতে গেলে এর চাইতেও খারাপ অবস্থায় পড়তে পারে তখন কি করবো?”
“ ও আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় নি তাই নার্ভাস হয়ে গেছে। তাছাড়াও যথেষ্ট সাহস দেখিয়েছে।আমাকে নিজের বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলো।আমি নিজেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম।তাই ওমন আতংকিত হয়ে পড়েছিলো।তুই যেমনটা ভাবছিস তেমনটা নয়!"
“তারপর‌ও ভাই আমার সাব্বির ভাইরে দেখলেই মনে হয় ..
“ সাট আপ ফয়সাল! অযথা বকবক করে মাথা ধরাস না।"
তারাজের ধমকে ফয়সাল চুপসে গেল। কাচুমাচু মুখে সামনে তাকিয়ে বসলো।
ফয়সালকে চুপ দেখে মুরা‌দও শান্ত হলো।নয়তো এত চিন্তার মাঝে অযথা তর্কে বিরক্ত হচ্ছিলো।মুরাদ তারাজের পাশ থেকে বলে উঠলো, 
“ আজকের প্রোগ্রামটা বাতিল করলে ভালো হতো না?"
তারাজ বিস্ফোরিত চোখে তাকালো,যেন মুরাদের থেকে এহেন কথা মোটেই আশা করে নি। হতভম্ব হয়ে শুধালো,
“ তুইও কি ফয়সালের মতো গবেট হয়ে গিয়েছিস?
রাত পোহালেই ভোট,আর এখন এই মুহূর্তে আমি কিনা নিজের প্রচারণা বন্ধ রাখবো!"
“ বন্ধ করতে বললাম কোথায়?বাতিল করতে, আচ্ছা সেটা বাদ তুই বলে দে আজকে তোর হয়ে অন্যকে প্রচারণায় থাকতে, তুই আহত সবাই জানে সেটা। তাছাড়াও এভাবে কিভাবে থাকবি বাকীটা সময়!"
“ কিছুই হবে না,এই সামান্য আঘাতেই যদি একজন নেতা চুপসে যায় তো তাকে অনুসরণ করা সাধারণ মানুষেরা কি করবে? তাছাড়াও আজকেই সাভারের দিকে আমার প্রচারণয়া অংশ নেওয়ার শেষ দিন, এরপর বাকী দুই দিন তো এখানের লোকেরাই করবে!"
“ ওখে! আমি ভাবছি তুই বাসরেও কি ভাবীর সামনে এই ব্যান্ডেজ নিয়ে যাবি!” 
মুরাদ দুষ্টুমি করে তারাজের মাথার ব্যান্ডেজে হাত রাখলো। তারাজ হালকা আর্তনাদ করে ভ্রু কুঁচকে মুরাদের দিকে তাকালো,
“ ব্যথা পাই; কি করতেছিস!"
মুরাদ দাঁত ক্যালিয়ে বললো,
“ ন্যাতা মাইনসের আবার ব্যথা কিসের !"
“ সাট আপ মুরু!"
“ না আমি সত্যি বলছি,দেখ ভাবী একমাত্র ব‌উ যেকিনা মাথা ভাঙ্গা বর নিয়ে বাসর করবো!"
“ শালা চুপ থাক ! নয়তো এখন তোর‌ মাথা ফাটিয়ে 
ভাবীর কাছে পাঠাবো!"
“ সে তো পুরানো মালকিন,এই প্রোডাক্টের ইতিবৃত্ত জানা তার! কিন্তু বেচারা ভাবী!”
“ ভাই আল্লাহর দোহাই লাগে তোর মুখ বন্ধ কর!"
“ না সিরিয়াসলি আমি এখন‌ই দেখতে পারছি তুই বাসরেই গিয়েই বলবি আমার মাথার ব্যান্ডেজ ঠিক করে দাও!"
“ আমি বাসরে কি করবো কি করবো না তাই নিয়ে তোর এয মাথা ব্যথা ক্যান ভাই? তুই নিজের চিন্তা কর না! বাই দা বাই আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আসলে তোর আগেই বাসর সারছি বলে তোর জ্বলছে!"
তারাজ বিটলা হাসি দিয়ে কথাটা বললো,মুরাদ হতাশ হয়ে করুন চোখে বন্ধুর দিকে চেয়ে বললো,
“ এমন এক পিচ্চির প্রেমে পড়েছি, এখনও বিয়েই করতে পারলাম না আর বাসর তো...কবে যে বড় হবে আর আমার বাসরের স্বাদ পূরণ হবে আল্লাহ মালুম!"
মুরাদের হতাশে পুরো গাড়ীতে হাসির রোল পড়ে গেল।তারাজ বিটলা হাসি দিয়ে বললো,
“ আমি তখন'ই বলেছিলাম বাচ্চা মেয়ে উপরে ফিদা হোস না! কিন্তু শুনলি না! এখন বুঝ! তখন যদি ঠিকঠাক একটা মেয়ের প্রেমে পড়তি তবে এতদিনে আমি অন্তত এক হালি বাচ্চার চাচ্চু ডাকতে শুনতে পারতাম!”
“ দহন বাড়াস না দোস্ত!"
“ অন্যের বাসর নিয়ে গবেষণা করলে দহন এমনিতেই বাড়বে!তাই বলি নিজের বাচ্চা প্রেমিকার দিকে তাকিয়ে থেকেই নিজেকে শান্তনা দে!"
“ ভাই,সব জায়গাতেই আপনাকে নিতে স্থানীয় নেতারাই আগে আসেন,তবে আজকে প্রথমে কেন এখানে এলো না!"
রাব্বী নামক অপর একজনের প্রশ্ন।তারাজ মাথাটা হেলিয়ে দিলো নিজের সিটে! যত যাই বলুক তার আসলেই এখন ভীষন মাথা ব্যথা করছে।কেন জানি খুব ইচ্ছে করছে সত্যি‌ই আফনূরকে বলতে , ‘ ব‌উজান মাথাটা ভীষন যাতনা দিচ্ছ,একটু আরামের প্রলেপ দিয়ে দাও না প্লিজ!' কথাটা মনে মনে ভাবতেই তারাজ নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেল।কি আজব! আগে কিছু হলে সবার আগে মনে পড়তো আম্মার কথা। আম্মার কাছে গেলেই যেন সব বেদনার অবসান ঘটে,অথচ আছ সর্ব প্রথম কেন আফনূরকে মনে পড়লো! তবে কি আফনূরকে নিয়ে বেশি ভাবছে তাই নাকি এটাই প্রেমের লক্ষন! ভালোবাসা নামক শব্দটি কি এতটাই শক্তিশালী যে যেকোন মুহূর্তে তার উপস্থিতি একান্ত‌ই কাম্য ! ভাবনার অতলে না ঢুকে প্রত্ততর করলো ,
“ কারণ আমি বারণ করেছি।ওরা আসলে কি এভাবে তোদের সাথে কথা বলতে পারতাম!"
___________________________________________
" সরি,নেক্সট মিস হবে না ওয়াদা করছি।"
****
“ প্লিজ!"
**** 
“ আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি!"
*****
“ প্লিজ!"
****
" ওখে স্যার!"
_____________________________
“ তুমি বলেছিলে তেমন কিছু হয়নি তবে এসব কি বাবা?"
রেজ‌ওয়ান সাহেবের উদ্বিগ্নতায় মৃদু হাসলো তারাজ। মিটিং শেষে গোপন বৈঠকে একটি রিসোর্টের কপি কর্ণারে বসেছে দুজন।আফির কিছু সময়ের মধ্যেই আসছে বলে জানিয়েছে।তারাজ সম্মানের সহিত বলেছিলো কেনাকাটা যা করার উনারাই যেন করে কিন্তু রেজ‌ওয়ান সাহেবের অনুরোধ একমাত্র জামাইকে তিনি নিজেই উপস্থিত থেকে জামাইয়ের পছন্দ অনুযায়ী কিনে দিতে চান।জামাইকে সাথেই নিয়েই যেতে ইচ্ছুক।আফিরের‌ও ইচ্ছা দুলাভাইকে নিয়ে তার পছন্দের সব কিনে দেওয়ার।তাই তো শত অনিচ্ছায়‌ও আসতে হলো।
“ আসসালামু আলাইকুম জিজু! শুনলাম আপনার উপরে নাকি হামলা হয়েছিল?"
“ ওয়ালাইকুম আসসালাম,হ্যা হয়েছিলো বটে তবে তেমন কিছু হয়নি!"
“ পুরো শরীরে ব্যান্ডেজ নিয়ে বসে আছেন,আর বলছেন কিছু হয়নি! কতটা কেটেছে যে এভাবে.?"
“ তেমন কিছু নয় আফির! হালকা পাতলা জাস্ট; ডক্টর অযথাই এত এত কাপড় পেচিয়েছে!"
“ হ্যা আপনাকে দেখতে এখন মুর্দার
মতো লাগছে।পুরো সাদা কাপড়ে মুড়ে আছেন! আমার আপাই ভয় পাবে এভাবে দেখলে!"
“ পাবে না,ভুলে যাও কেন তোমার আপা সাহসী রানীমা!"
কথায় কথায় কফি শপ থেকে বেরিয়ে তারা নিজেদের মতো চলে গেল!আফির মেডিকেল ছাত্র হলেও নিজেদের বেলায় বেশ নাজুক হয়ে যায়।
________________________________
“ বিষয়টি যত সহজ ভেবেছিলাম ততটাও নয়! ঐ লোক কিছুতেই ভাগে আসছে না! ওকে হাত করতে না পারলে কোনভাবেই আমি পারবো না!"
****
“ আপনি তো বললেন ওকে না সরাতে! তখন সরালেই ভালো হতো!"
**** 
“ হ্যা আপাতত মাথা ঠান্ডা রাখাই একমাত্র উপায়।"
***** 
“ এমন কিছু হবে না!সময় মতো পৌঁছে যাবে!"
***
কথোপকথনের শেষ পর্যায়ে বিনা উত্তরেই মুঠোফোনটা নিজের পকেটে পুড়লো। অপর প্রান্তে থাকা লোকটার মূল উদ্দেশ্য বোঝা না গেলেও এই ঘটনা প্রকাশ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তের মুখোমুখি সেই হবে।যদিও বিষয়টি নিয়ে অনেক ভেবেই জড়িয়েছে তবুও ভাবনার শেষ নেই।যত‌ই ভাবছে তত‌ই বেড়ে চলেছে। মাত্র দুইদিন হাতে এরপরেই আসল খেল শুরু।বাজিমাত তো করতেই হবে তা যেকোন মূল্যে!
বাজিমাত তো হবেই তবে কবে কিভাবে কার চালে মাত হবে এটাই এখন দেখার বিষয়!
_______________
পরেরদিন সকাল ....
রনি মার্কেট চৌরাস্তার মোড়ে নির্বাচনী প্রচারণায় সাময়িক ভাবে খোলা ক্লাবে চলছে সাধারণের মধ্যে আলোচনা তার মাঝেই টিভিতে চলছে সকালের খবর যাতে বারবার ধ্বনিত হচ্ছে,
গতকাল গাবতলীতে নির্বাচন বিরোধী আন্দোলনের মুখে পড়ে ঢাকা ২ আসনের সাংসদ প্রার্থী মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার গুরুতর আহত হয়েছেন, উনার সাথে থাকা উনার পেশাগত সহকারী সাব্বির আহমেদকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল ইমারজেন্সিতে নেওয়া হলে সেখান থেকে সাময়িক চিকিৎসা প্রদানের পর ল্যাব এইড হাসপাতালে ট্রান্সফার করা হয়। কিন্তু উনার ড্রাইভারের কোন হদিস এখন‌ও মেলেনি।ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারের বক্তৃতা অনুযায়ী কাল সাভার আমিনবাজার ইউনিয়নে নির্বাচনী প্রচারণায় যাওয়ার পথে উনি আন্দোলন সমর্থনকারীদের হামলার স্বীকার হলে উনার ব্যক্তিগত গাড়ী চালক নিলাশ তরফদার হুট করেই গাড়ীর সিট খুলে লাফ দেয়।সেই মুহূর্তে আন্দোলন সমর্থনকারী কিছু লোক তাদের উপরে চড়াও হয় যাদের হাতে ছিলো দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র সহ লাঠি, ক্রিকেট স্ট্যাম্প, বাঁশ ও ভারি পাথরের খন্ড! চালক বেরিয়ে যাওয়ায় গাড়ীটা থেমেই ছিলো যেই সুযোগে তারা এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে। ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারকে রক্ষা করতে উনার সহকারী সাব্বির আহমেদ নিজেকে দিয়েই প্রোটেক্ট করতে চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে ব্যর্থ হয়।তারাজ খন্দকার নিজের সহকারীকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ী থেকে রাস্তায় ফেলে এবং নিজেও লাফ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতে থাকে।তখন‌ও দাঙ্গাবাজদের আক্রমন চলছিলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই পুলিশ সদস্য ও র্যাবদের প্রশংসিত চেষ্টায় জানে বেঁচে ফিরে।তিনি এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন আন্দোলনরত দলের সমর্থকদের, এবং তার সাথে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে পুলিশ সদস্য সহ প্রশাসনকে।তিনি আরও জানান যারা দেশের আমানত নষ্ট করে মানুষের জীবনের উপরে হামলা করে ক্ষমতায় আসতে চান তারা কখনোই দেশের কল্যান কামনা করতে পারেন না।এরা কখনোই একটা দেশের জন্য আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালক হতে পারে না।তিনি আরও বলেন,' জনগণ অবশ্যই সব বুঝে! তাদের জন্য কে মঙ্গল,কে উত্তম তা নিশ্চয়ই ভোটের মাধ্যমেই তারা নির্ণয় করবে! জনগণ সর্ব ক্ষমতার অধিকারী সেই জনগণের রায়েই এই সরকার আবার ক্ষমতায় আসবে ইনশাআল্লাহ,এতে দুস্কৃতিকারীরা যত‌ই হম্ভিতম্ভি করুক দিনশেষে জয়ের মালা আমাদের‌ই হবে ইনশাআল্লাহ!'
ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার নিজের দেহের বিভিন্ন স্থানে গুরতর জখম অবস্থা নিয়েই নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ গ্রহণ করায় উক্ত স্থানীয় সাধারণ জনগণের মাঝে ভাবনার তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে।কেউ কেউ উনার নেতৃত্বের প্রশংসা করছে,কেউ কেউ বলছে উনি জবানে শক্ত।উনি বলেছিলেন এসে সবার সাথে আলাপ করবে, কিভাবে কি করলে আমাদের এলাকার উন্নয়ন সঠিকভাবে হবে তা সরাসরি আমাদের মুখ থেকেই শুনবে।উনি এসেছিলেন কথা দিয়ে রেখেছেন।এতেই বোঝা যায় কথায় কাজে মিল আছে!
আমাদের সাভার প্রতিনিধি মিল্লাতের সন্ধানে কিছু স্থানীয় বাসিন্দার সাথে আলোচনায় উনাকে নিয়ে সাধারণের ভাবনার বিশেষ অংশ ভাগ করছি আপনাদের সাথে আমাদের বিশেষ আয়োজন #গনতন্ত্রের_মঞ্চনাটকের মাধ্যমে;
১ম ব্যক্তির মতামত ,
“ যখন আগেরবার আসছিলো তখন বলছিলো সে কোন আশ্বাস দিবে না।সে আমাদের সমস্যা আমাদের সাথেই বসে শুনবে এরপর সিদ্ধান্ত নিবে কিভাবে কি করবে? কিন্তু করার জন্য অবশ্যই নির্বাচনে জিততে হবে যেহেতু সেহেতু ভোটটা যেন তাকেই দেই।তো সেই কথা অনুযায়ী কাল আসছে, আমাদের সাথেই বসছে।ঐ যে আমগো স্কুলের মাঠে জনগণের সাথে আলোচনার জন্য কালকে সাজানো হয়েছিল নাম দিয়েছিল প্রোগ্রামের 'জনপথের জনমত' তাতেই আমরা সরাসরি তার সাথে কথা বলার সুযোগ পাইছিলাম তখন নিজেদের সব কথা তাকে বলছি!এতেই কিন্তু বোঝা যায় কথায় কাজে মিল আছে,মানে এক বাপের ব্যাটা! এই বয়সে নেতা তো বহুত‌ই দেখলাম কিন্তু কথা দিয়ে কথা রাখতে দেখি নাই কাউরে।উনি কিন্তু কাইল বড়সড় আক্রমনের শিকার হ‌ইছিলো।হাতে গলায় কানে এমনকি মাথায়‌ও ব্যান্ডেজ করা ছিলো,সেই ব্যান্ডেজ চুইয়া চুইয়া রক্ত বাইর হ‌ইতেছিলো। এত বড় ঘটনার পর সে কাইল কিন্তু না আসলেও পারতো।তাও আসছে কারণ সে আমাগো কথা দিয়েছিল,আমরা তার জন্য অপেক্ষা করতেছি মাঠের মধ্যে, তাই আসছে।এই যে সামান্য ভাবনাটুকু এটাই কয়জন নেতা করে? আমি মনে করি একজন মানুষের মুখের জবান সবচেয়ে বড় সম্পদ তার রক্ষা করা একান্তই জরুরী। কাল তার এত বেশি জবানে শক্ত হ‌ওয়াতেই আমি বিশ্বাস করি সে পারবে,সে পারবে আমাদের এলাকা থেকে মানুষের ভোট কুড়াইতে। ইনশাআল্লাহ জয় তার‌ই হবে!"
২য় ব্যক্তির মতামত,
“ শুনেন আগের বার যে এমপি হ‌ইলো সে প্রচারণায় আসছিলো কেবল একবার তাও আসছে নেতা কর্মীদের সাথে স্কুল মাঠে গিয়ে বসছে, কিছু সময় নিজেদের মাঝে কথা বার্তা ক‌ইছে এরপর খাওয়াদাওয়া সাইরা বাড়ি ফিরে গেছে! সে কি নেতাকর্মীদের এমপি হয়েছিল? নাকি শুধু নেতাকর্মীদের ভোটেই তার জয় হবে? তার উচিত ছিলো জনগণের সাথে বসা। তাদের কথাই শোনা। এটা হলো তার নির্বাচনে জেতার আগের কথা।পরে জেতার পর তো তার খোমাই দেখলাম না,এলাকার উন্নয়ন আর কি বলবো? এই যে গ্যাস থাকে,পানির অবস্থা জঘন্য! খাওয়ার মতো ভালো পানি সাপ্লাই নাই,তারপরে রাস্তার অবস্থা দেখছেন? এই এলাকায় কোন মানুষ থাকতে পারে? মশার যন্ত্রনায় টেকা যায়? সেইদিন‌ও আমগো পাশের বাড়ির এক বাচ্চা ডেঙ্গু হয়ে মারা গেছে।কে দায় নিবো এর জন্য? এই ছিলো গত নির্বাচনে জেতা এমপির!যাগকে এবার যে আসছে,সে অন্তত এই নিয়ে দুইবার আসছে! আর সে এসে আমাদের সাথেই কথা বলতে, খোঁজ খবর নিছে! একজন জন প্রতিনিধির প্রধান কাজ কি? তার জনগণের ভালোমন্দ খোঁজ নেওয়া,উনি সেটাই আগে এসে করেন! উনি সবার আগে জিজ্ঞেস করে কে কেমন আছেন,কার কি দরকার? এই যে তার জিজ্ঞেস করার ধরন, জানতে চাওয়ার ইচ্ছা এটাই হলো তার সবচেয়ে বড় যোগ্যতার পরিচয়।আমি মনে করি তিনি এবার নির্বাচনে সরকারের জেতার জন্য ট্রাম্প কার্ড। শুধু উনি‌ই নয় উনারা মতো ইয়াং জেনারেশনের মাধ্যমেই এই দেশটা দুর্নীতি মুক্ত হবে।"
একেরপর এক মতামতের ভিত্তিতে চলছে প্রোগ্রাম, অন্তত পঁয়তাল্লিশ মিনিট।চলবে এভাবেই আগামী নির্বাচনের দিন অবধি....


পর্ব ২৬


ঘটনার একদিন পর.....
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যাচ্ছে নিয়মিত লাইভ টেলিকাস্ট " সংস্কারের রাজনীতি "তার মাঝে বসে নিজের উপস্থাপনায় তুখোড় মেধার পরিচয় দিচ্ছে রিডার মুনা সালিমা,
" শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত সকল প্রার্থীরা।যে যার মতো করে দিয়ে যাচ্ছে নানা আশ্বাস প্রত্যাশা। ভোটাররাও দিচ্ছে ভরসা।দহরম ভাবে চলছে প্রার্থী ভোটারের মুহূর্তগুলো।
- বিভিন্ন জায়গায় ছিন্ন কিছু হতাহতের দৃশ্য‌ও ক্যামেরা বন্দি হচ্ছে।তবুও জমজমাট আয়োজনেই চলছে নির্বাচনী সকল প্রচার প্রচারণার কাজ।
- ময়মনসিংহ ১২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তোয়াজেব হারুনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।তার নিকটস্থ ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী আঙ্গুর মিয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের মাধ্যমে তাকে অর্থ দন্ডে দায়বদ্ধ করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
- ঢাকা ২ আসনের প্রার্থী ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারকে গতকাল গাবতলীতে হামলা করা হয়েছিল।আপাত দৃষ্টিতে তা সাধারণ হামলা মনে হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে তা মোটেই স্বাভাবিক ছিলো না।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার উন্নত মান প্রোগ্রামের কর্ণধার বিপুল দাস বলেন,
“ সাধারন হামলার লক্ষন কাল ছিলো না।যেকোন গন্ডগোলে কোন ব্যক্তি অযাচিত ভাবে অথবা হুট করেই ঢুকে গেলে তাকে আঘাত করা হয় তবে এভাবে নয়।একের অধিক ইচ্ছে করে,এক সাথে জোট হয়ে এলোপাথাড়ি আঘাত করার উদ্দেশ্যে কেবল‌ই মারার জন্য হয়।আপনি নোটিশ করে দেখবেন গত পরশু যেভাবে একজন সাংসদ প্রার্থীকে একটা রাস্তার মাঝে তার গাড়ীর ভেতরে আক্রমণ করা হয়েছিল এটা নিশ্চয়ই ইচ্ছাকৃত এবং পূর্ব পরিকল্পিত।আপনি অতীতের যেকোন ঘটনা রিসার্চ করে দেখবেন এমন আক্রমণ কোন হরতাল কিংবা অবরোধে হয়নি। হ্যা আক্রমণ হয়,তবে হয়তো গাড়ীটাতে কয়েকটি আঘাত করে,আগুন লাগিয়ে পুড়ে দেয়। কিন্তু গাড়ীর ভেতরে ধারালো অস্ত্র নিয়ে আঘাত করতে এর আগে এ জাতী দেখেনি। আমার মনে হয় ঐ প্রার্থীর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া একান্তই জরুরী তার জীবন রিস্কে আছে।"
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপকের সাথেই তাল মিলিয়েছে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগন।সুশীল সমাজের প্রতিনিধি মিয়ানুল মিয়াজ বলছেন,
“ এটা একান্তই পূর্ব পরিকল্পিত এবং মারার উদ্দেশ্যেই করা একটি আক্রমন।কোন ভাবেই এটাকে স্বাভাবিক হরতালের চিত্র বলে ধরা যাবে না।এটার সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য তদন্ত করে তার যথাযোগ্য বিচারে আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি প্রসাশনের!"
“ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারকে এর আগেও হামলা করা হয়েছিল তখধ তার একজন কর্মী মারা গিয়েছিল, আপনার কি মনে হয় এই ঘটনার সাথে পূর্ব ঘটনার কোন যোগসূত্র আছে?"
মুনা সালিমার প্রশ্নে মিয়ানুল মিয়াজ জোর দিয়ে বললেন,
“ অবশ্যই আছে,এটা তো সুস্পষ্ট যে তাকে কেউ মারতে চাচ্ছে।এখন দেখার বিষয় এরা আসলে কারা? নির্বাচন কমিটির তথ্য মোতাবেক তার কারো সাথে কোন বিবাদ নাই। সুতরাং পূর্ব শত্রুতার জেরে করেছে বলে ধারনা করা যাচ্ছে না।তবে তার পেশা,তিনি তো ব্যারিষ্টার! সুতরাং সেই সূত্রে থাকলেও থাকতে পারে।তবে যাই হোক যেভাবেই হোক! উনার লাইফ রিস্ক আছে সুতরাং তার জন্য একান্ত জরুরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। তিনি একজন মেধাবী ব্যারিষ্টার! দেশের সম্পদ,জিততে পারলে সাংসদ হবে সুতরাং সব দিক দিয়েই তিনি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একজন পার্সন সুতরাং সব বিবেচনা করে রাষ্ট্রের উচিত তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সাধারণ মানুষ হলেও উচিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এবং আমি জোর দাবি জানিয়েই বলবো এই আক্রমণকারী, আততায়ীদের যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় আনা হোক।"
"আজ বিকাল থেকেই নির্বাচনের সকল প্রচারণা বন্ধ।এর মাঝেই  প্রার্থীরা নিজেদের সকল প্রচার প্রচারণার কাজ সমাপ্ত ঘটানোর চেষ্টা করছে।"
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন থেকে আমি মুনা সালিমা। আপনারা দেখেছেন নির্বাচন নিয়ে আয়োজিত বিশিষ্ট অনুষ্ঠান " সংস্কারের রাজনীতি"
টেলিভিশনের পর্দায় চলমান এই অনুষ্ঠানে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আফনূর। অঙ্গে তার সেই লাল খয়েরী জামদানি,মাথায় টানা দিয়ে খোঁপা করে বেলীর গাজরা দিয়ে অপূর্ব করে সাজানো হয়েছে।চোখে মোটা করে লেপ্টে দেওয়া হয়েছে মেঘপুঞ্জ থেকে ধার করে আনা কাজল। ঠোঁটে শোভা পাচ্ছে মেরুন লাল ম্যাট লিপস্টিক।হালকা মেকআপের আঁচড়ে সেজেছে আজ ফুলো ফুলো গাল দুটো। হাত ভর্তি সোনার চুড়ি,গলায় ঝুলছে লম্বা সিতাহার। আরেকটি চ্যাপ্টা জড়োয়া হার তার সাথে তারাজের মায়ের পড়িয়ে দেওয়া সে-ই চিকন চেইনটা।নাকটা আপাতত ফাঁকা রেখেছে। কোমরের বিছাটা আঁটসাঁট হয়ে আটকে আছে চিকন কোমরের বাঁকানো খাঁজে। নিজের রুমের সোফায় বসে নিজের ঘরের ছোট টিভিতে বসে দেখছিলো অনুষ্ঠানটা।
অল্প পরিসরে আয়োজন করেছে দুই পরিবারের সদস্যদের মতামতে।এর মধ্যে মতের ভাগীদার ছিলো না কেবল একজন,আর সে হলো আফনূর রেজ‌ওয়ান।যদিও আফনূরের ভেতরে এই নিয়ে বিশেষ কোন ভাবনা নেই।সে তো বিয়ে নিয়ে কোন ভাবনা কখনোই ভাবেনি।তাই যেভাবেই হোক তার মাথা ব্যথা নেই।সে খুশি। শুধু মানুষটা তাকে ঠিকঠাক বুঝলেই চলে।
চিন্তার পারদ বাড়লো।তারাজকে কে বা কারা মারতে চাচ্ছে। একবার নয় পরপর দুবার হামলা হলো। দুইবার‌ই ভয়ানকভাবে হয়েছে, আল্লাহর রহমতে,কিসমতের জোরে বেঁচে ফিরছে কিন্তু তাই বলে  কি বারবার? 
মোটামুটি অল্প কিছু লোককে নিমন্ত্রণ করেছে রেজওয়ান করিম। নিজের একান্ত ঘনিষ্ঠ দুজন বন্ধুকে তার পরিবার সহ, আফনূরের তিনজন বান্ধবী আর আফিরের দু'জন কাছের বন্ধু,আফিয়া নূরন্নাহারের বাপের বাড়ি থেকে তার বোনের পরিবার সহ , ভাইয়ের পরিবারের সদস্যদের। এই নিয়েই আজকের আয়োজন। আয়োজন করা হয়েছে মাঠ প্রাঙ্গনে।তাই সবাই আপাতত বাইরেই ঘোরাঘুরি করছে। নিজের ঘরে একাই বসে আছে আফনূর।তাই উকিল আফনূর দেশ বিদেশের খবরাখবর জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে টিভি খুলেই বসে। কিন্তু টিভি খুলতেই সর্ব প্রথম চোখে দৃশ্যমান হয় ঐ অনুষ্ঠানটি যা আপাতত তার চিত্তকে অস্থির করে তুলছে।হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুললো, কাঙ্খিত নাম্বার তালাশ করে কল দিতে থাকলো, পরপর দুবার কেটে যাওয়ার পর ও প্রান্ত থেকে কল আসলো, চটপট করে রিসিভ করেই অস্থিরতা কন্ঠে বললো,
“ হ্যালো!"
অপরদিকে এক অস্থির চিত্তের ধুকপুকানিতে তারাজের চিত্ত‌ও অস্থিরতায় ছেয়ে গেল। পরিবেশ পরিস্থিতি ভুলে ব্যাকুল হয়ে শুধালো,
“ নুরজান কি হয়েছে? আ' ইউ ওখে?"
আফনূর প্রত্ততর করবে কি! তারাজের মুখে এহেন জানে সে স্তব্ধ হয়ে গেছে আবার ঐদিক থেকে হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে।বোঝাই যাচ্ছে তারা সবাই একসাথে আছে। আফনূর কি বেশি চিন্তা করছে যার জন্য এমন একটা হঠকারী কাজ করে ফেললো।এই মুহূর্তে ফোন দেওয়াটা কি উচিত হয়েছে? হবে না কেন? সে তার বরের খবর নিতে ফোন দিয়েছে।যার বরের জীবন রিস্কে তাকে এতটুকু বেহায়া বেলাজ হতেই হয়!নয়তো? বর! তারাজকে সে বর  বলে সম্বোধন করেছে? কিন্তু? কিসের কিন্তু ঘন্টা দুই পর এমনিতেই লিগ্যালি বর হবে তখন ডাকতে পারলে এখন‌ও পারা যায়। আফনূর নিজেই নিজের সাথে কথা বলছে আর শাসন করেছে। আফনূরের উল্টাপাল্টা ভাবনায় ছেদ ঘটলো তারাজের উচ্চ কন্ঠে, এতক্ষণ ঐদিক থেকেও শব্দ আসা বন্ধ হয়ে গেছে।
“ আফনূর? হুয়ার আ' ইউ? নুরজান?"
“ হ্যা।হ্যা হ্যা.লো!"
“ হ্যা আমি শুনছি,তুমি ঠিক আছো?"
" হু,আপনি কখন আসবেন?"
তারাজ একটু টাস্কি খেল। এদিকে তাকে নিয়ে খিল্লি উড়াচ্ছে তার বন্ধুরা আর কর্মীরা। তাজিশ চুপচাপ ভাইয়ের নাজেহাল অবস্থা উপভোগ করছে।
“ কি ব্যাপার ছোটে মেয়া,আইজ একদম চুপ বনে গ্যাছো?"
মুরাদের দুষ্টুমিতে তাজিশের বিশেষ পরিবর্তন ঘটলো না। তারাজের হাতে থাকা ফোনটা এখন‌ও কানে চাপা,ঐ প্রান্ত থেকে আফনূরের নিঃশ্বাসের শব্দ বৈ আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। এইদিকে সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে সাদা পাঞ্জাবির সাথে এ্যাশ ব্লেজার পড়ুয়া স্মার্ট হ্যান্ডসাম পুরুষটা তার ছোট ভাই যার মুখে আপাতত আষাঢ়ের মেঘপুঞ্জি থেকে নেমে আসে আধার ছেয়ে আছে।তারাজের চিত্ত গহিন থেকে বলে উঠলো বিগত পরশু দিন থেকে সে তার ভাইয়ের মুখে হাসি দেখছে না।কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েছে।যার ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনায় থাকার কথা সেই কেমন ঝিমুচ্ছে।সব কাজ নিজের হাতে করেছে তবুও তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে আসলেই খুশি কি-না! কিন্তু কারণ কি? হঠাৎ করেই মনে পড়ার ভঙ্গিতে চমকে গেল। আফনূরের কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,যেন অনেক চেষ্টার পর শব্দগুলো কন্ঠনালী থেকে ওষ্ঠের খাঁজে 
এসেছে।
“ সাবধানে আসুন,রাখছি!"
কেটে দিলো ফোন।তারাজ নিঃশব্দে ফোন সরিয়ে ভাইয়ের রুক্ষ চাহনিতে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে র‌ইলো । ভেতরে ভেতরে নিজেকে ধিক্কার দিলো নিজের সুখে এতটাই মজে গেছে যে একমাত্র ছোট ভাইয়ের খোঁজটাও রাখার সময় পাচ্ছে না।

পর্ব ২৭


“ কামরাঙ্গীরচর ৫৬ নং ওয়ার্ড নিবাসী মোহাম্মদ ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের বড় পুত্র মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার আপনাকে নগদ ১০ লক্ষ ১ হাজার ১০১ টাকা এবং তার পাঁচ শতাংশ জমির মালিকানা দেনমোহর ধার্য করিয়া তাহার সহিত বিবাহের জন্য প্রস্তাব দিচ্ছে যদি আপনি রাজী হোন তবে বলুন কবুল!
*নিরবতা 
“ মা বলুন কবুল!"
****
“ মা কবুল বলুন!"
আফনূরের কন্ঠ রোধ হয়ে আছে। কান্না গুলো উপচে পড়ছে।চোখ ফেটে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে গাল ছুঁয়ে। আঁটকে রাখার সাধ্যি কার? ছলছল নয়নে, সিক্ত বদনে নিজের আশেপাশে তাকাচ্ছে। তার পাশে আপাতত তার খালাম্মি,খালামনি, বান্ধবী আর এক বোন আছে।এত মানুষের মাঝেও নিজেকে বড্ড একা আর অসহায় লাগছে।এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে, কিছু একটা খুঁজছে।কাজী সাহেব আবারও তাড়া দিলেন,
“ মা কবুল বলুন!”
“ আম্মু কবুল বলো!"
খালাম্মি কাঁধে হাত রেখে বললেন, আফনূর তার দিকে তাকাতেই আবারও দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আফনূরের চাহনি পড়তে পারলো মনে হয় খালাম্মি।তিনি আফনূরের ছোট খালাকে ফিসফিস করে বললেন কিছু একটা।
রেজ‌ওয়ান সাহেব বাইরে খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত। যেহেতু তেমন কাউকে বলেনি,আর বড় ছেলেও নেই তাই উনাকেই সবদিকে খেয়াল রাখতে হচ্ছে। তারাজের সাথে মোটামোটি ভালো লোক এসেছে। তারাজের দুই বন্ধু,দলীয় কর্মী তিনজন, সহকর্মী,পরিবারের সব সদস্য এবং ইসহাক আবদুল্লাহর কয়েকজন বন্ধু ও সহকর্মী ,তারাজের দুই খালা এবং তাদের স্বামীরা। এত মানুষের আয়োজনে অবশ্যই বেশি বন্দোবস্ত করতে হবে।আফির বাবাকে সহযোগীতা করতে তার সাথে খাবার পরিবেশনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। বাগানের চারদিকে সাজানো হয়েছে,যেখানে টেবিল পেতে খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে যাচ্ছে,রাতের প্রথম প্রহরেই ব‌উ নিয়ে র‌ওনা দিতে চায় খন্দকার পরিবার।নয়তো সাভার থেকে কামরাঙ্গীরচর যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে,যানযটের শহরে দশ মিনিটের রাস্তায় ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও সময় মতো গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না।
বাবুর্চিকে জামাইয়ের খাবারের স্বাদ যেন ভালো থাকে তাই বুঝাচ্ছিলেন,
“ আপনি খাসিটাকে ঠিকঠাক ভাঁজছেন? ভাজা হলে ঠান্ডা করার জন্য ঘরের ভেতর ফ্যানের নিচে রাখবেন।আমার মেয়েরা ওটাকে সাজাবে,ওরা তো তুলতে পারবে না এত ওজন।আপনি গিয়ে ওদের একটু সহযোগিতা করবেন।
-আর হ্যা খাবার পরিবেশনের আগে দেখবেন কোথাও যেন ময়লা না থাকে।প্রতিটি প্লেট ভালো করে দেখে পরিষ্কার করে সবার সামনে দিতে বলবেন। আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে, একমাত্র জামাই তার আপ্যায়নে কোন ত্রুটি আমি বরদাস্ত করবো না।"
“ জ্বী,আপনি চিন্তা ল‌ইয়েন না।"
“ দুলাভাই!"
শালীরা ডাকে পিছনে ঘুরে তাকালেন, আফনূরের খালা দ্রুত পায়ে দুলাভাইয়ের সামনে এসে বললেন 
“ আফনূরের কবুল পর্ব চলছে আপনি এখানে কি করছেন? আশ্চর্য বাপ মা একজন‌ও এই সময়ে মেয়ের কাছে নেই! মেয়েটা কাঁদছে! চলেন!"
“ হ্যা, হ্যা চলো! আমি তো আসছিলাম জামাইয়ের খাবারের খোঁজ নিতে। সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা খোঁজ নেওয়া দরকার না!"
“ সে নিবেন পরে।আগে মেয়ের পাশে গিয়ে বসুন।এই সময় মেয়েদের বাবা মায়ের দরকার হয় বেশি।"
“ তোমার আপা কোথায়?"
“ আপাও নাই। বোধহয় ঐ বাড়ির লোকের সাথে কথা বলছে!"
দু শালী দুলাভাই কথা বলতে বলতেই ভেতরে ঢুকলেন,তার সাথেই দেখা হয়ে গেল আফিয়া নূরন্নাহারের সাথে।তিনিও বোধহয় মেয়ের কাছে যাচ্ছিলেন।
মা'কে দেখে আফনূরের চাপা কান্না উপচে পড়ল। শব্দ করেই কেঁদে দিলো।ড্রয়িং রুমের মধ্যিখানে ফুলেল দেওয়ালের ও প্রান্তে থাকা সুদর্শন বরের কর্ণে গিয়ে ভারী খেল তার অর্ধ অর্ধাঙ্গিনীর বাঁধ ভাঙা কান্নার সুর। তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেঁকে আছে তার অন্তরে ঐ তিন অক্ষরের একটি শব্দ ঐ রমনীর মুখ থেকে শোনার জন্য। তারা মাঝেও সূক্ষ্ম যন্ত্রনা হচ্ছে এই ভেবে যে একটা মেয়েকে সে তার পরিবারের থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে।যত‌ই বলুক নতুনের সাথে পুরোনোকে সংযোগ ঘটানোর আদৌওতে তা হয় না।দুরত্ব একটা চলেই আসে।এই যে আফনূর নিজের চিরচেনা ঘর- দোর, পরিবারের আহ্লাদ, ভালোবাসা সবটাই তো আগের মতো থাকবে না। দিনশেষে তাকেও শুনতে হবে অতিথি শব্দটি। মেয়েদের জীবনটা আসলেই জটিল।কোথাও দীর্ঘায়িত হয় না এদের অবস্থান।
“ কি হয়েছে মা!"
আফনূরের কান্নারা থামার নাম‌ই নিচ্ছে না। এদিকে কাজী সাহেব তাড়া দিচ্ছেন
আফিয়া নূরন্নাহার মেয়েকে বুকের মাঝে চেপে ধরলেন। আদুরে গলায় সিক্ত নয়নে বললেন,
“ কবুল বলো মা!"
 তিনিও কান্নায় ভেঙে পড়লেন। খালাম্মি কাঁদছে, তাদের থেকে দূরে দাঁড়িয়ে রেজ‌ওয়ান সাহেব‌‌ও কাঁদছে। দেয়ালের এ পাশে মেয়ে বাড়ির কান্নার রোলে ছেলেরা হতাশ।করুন ভাবে চেয়ে আছে। অবশেষে না পেরে তারাজের এক খালা গিয়ে আফনূরের মা'কে এক হাতে হালকা জড়িয়ে ধরে আফনূরের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,
“ আপনি আমার সাথে আসুন, মেয়ের বিয়ে মা'কে দেখতে হয় না। ওকে ওর খালারাই সামলাক।"
তারাজের খালার সাথে তাল মিলিয়ে আফনূরের এক খালা বললেন,
“হ্যা হ্যা আপা তুমি দূরেই থাকো। আনলাম মেয়েকে থামাতে,এসে নিজেরাই কাঁদছো।মেয়েটাকে থামাবে কি তা না করে আর! পুরো মুখ ভিজিয়ে দিয়েছো।এই মেয়েকে আবার মেকআপ করাতে হবে।নয়তো এভাবেই ভুতের মতো শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে উঠতে হবে।"
খালার  কথায় আপাতত আফনূরের কান্না কিছুটা থেমেছে।তবে থেমে থেমে হিচকি তুলছে। খালাম্মি আরও একটু কাছ ঘেঁষে বসলো। আফনূরের এক খালু এসে বললো,
“ কাজী সাহেব আবার শুরু করেন।"
“ জ্বী!"
পূনরায় সব প্রক্রিয়ায় বলতে বলা হলো,
"বলেন মা কবুল"
আফনূর বললো,
“ ক.ক. কবুল!"
“আবার বলেন কবুল"
“ কবুল!"
“ আ..
“ কবুল!"
তৃতীয় বার কাজী বলার আগেই আফনূর বলে দেয়।
 আফনূরের তিনবার সম্পন্ন হ‌ওয়ার সাথে সাথেই সবার মুখে প্রবাহিত হলো,
 আলহামদুলিল্লাহ; আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ!"
তাও কাজী সাহেব জিজ্ঞেস করলেন বরপক্ষের সবাইকে,
“ আপনারা সবাই শুনেছেন!"
সমস্বরে সবাই বললো,
“ জ্বি;"
কাজী আরো উপস্থিত মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন,
“ আপনারাও শুনেছেন?"
এক‌ই সাথে সবাই বললেন,
“ জ্বী!"
এরপর কাজী সাহেব চলে গেল তারাজের কাছে,এক‌ই ভাবে তারাজের কাছে বললো,
“ বলেন কবুল!"
এক মুহুর্ত নষ্ট না করেই তারাজ গড়গড় করে তিনবার বললো,
“ কবুল,কবুল,কবুল!"
তারাজের এভাবে কবুল বলায় তার বন্ধু মহলে হাসির রোল পড়ে গেল। কিন্তু তাতে কি? তারাজের দ্বারা এত ন্যাকামি হবে না।ন্যাকামি যাদের অলংকার সে ইতিমধ্যেই করে ফেলছে!
খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে ব‌উ নিয়ে যাওয়ার পর্ব চলে আসছে। পাশাপাশি বসিয়ে দুজনকে খেতে দেওয়া হয়েছিলো।খাওয়া শেষে সব নিয়মকানুন মেনে ব‌উকে গাড়ীতে তুলে দিলো।তখন‌ও এক চোট কান্নার রোল পড়েছিলো। 
অবশেষে তারাজ ভাই তার কাঙ্খিত নারীকে নিজের দখলে নিতে পারলো এখন দেখা যাক কিভাবে তাকে নিয়ে দিনাতিপাত করে!
___________________________________________
রাত একটা বেজে চৌদ্দ মিনিট। খন্দকার বাড়ির সামনে এসে থামলো কালো পাজেরো।তার মধ্যে আছে বর ব‌উ।বিয়ের গাড়ী কিন্তু কোনরকম সাজসজ্জ্বা নেই।না বাড়িতে কোন সাজসজ্জা করা হয়েছে। একদমই নিরবেই সাড়া হয়েছে এই বিয়েটা।যেন কারো কর্ণে না পৌঁছায়।তবে ভেতরে আয়োজনের কমতি রাখেনি তাজিয়া খাঁ। নিজের প্রথম পুত্র বধূকে তিনি যথার্থ সম্মান আর রীতিতে ঘরে তুললেন। দরজায় দাঁড়ানো বর ব‌উকে দেখে তিনি খুশিতে, অতিরিক্ত আবেগী হয়ে কেঁদে দিলেন।
চোখের পানি আঁচলের কোনা দিয়ে মুছে বললেন,
“ মাশাআল্লাহ একদম রাজযোটক!একজন আরেকজনের জন্য‌ই সৃষ্টি হয়েছো মনে হচ্ছে! "
তারাজ মায়ের কথায় হেসে দিলো।আফনূর নত মস্তিকে দাঁড়িয়েই আছে। তারাজ একবার আফনূরের দিকে তাকালো। আফনূরের লজ্জায় সিক্ত রক্তিম গাল দুটো দেখে মুচকি হাসলো।তাজিয়া খাঁ এগিয়ে এলেন হাতে কুলোয় করে দ‌ই, মিষ্টি,শবরত নিয়ে। তিনি আগে আফনূরকে খাইয়ে দিলেন। আফনূর চুপচাপ মুখে পুড়ে নিলো। এরপর সালাম করতে যেতেই তাজিয়া খাঁ বাঁধা দিলেন,
“ ছিহ ছিহ কি করছো!পা ছুঁয়ে সালাম করতে নেই‌ মা! আল্লাহ পাপ দিবে আমাকে! মুখে সালাম দিলেই আমি খুশি।এসব করতে হবে না।"
তিনি আফনূরের মুখে, মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিলো। তারাজের দিকে তাকিয়ে দেখলো ছেলে তার চ‌ওড়া হাসি ঠোটে এটে দাঁড়িয়ে আছে যেন বিশ্ব জয় করে এসেছে। ছেলের মনোভঙ্গিতে হাসলেন তিনিও।পরে তারাজকেও খাইয়ে দিলো।তারাজ মায়ের গালে নিজের গাল ঘষে দিয়ে বললো,
“ ভালোবাসি আম্মা!"
আফনূর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মা ছেলের আহ্লাদ দেখছে।
“ আম্মা ওদের আসতে দাও,রাত হয়ে গেছে অনেক!"
“ হ্যা হ্যা আসো।"
সব নিয়মের পাট চুকিয়ে আফনূরকে নিয়ে যাওয়া হলো তারাজের ঘরে। বিশাল এই ঘরটাকে দেখে আফনূর মুগ্ধ হয়ে গেল। চারদিকে আভিজাত্য আর ঐতিত্যের ছোঁয়া। তার মাঝেও অভিনবত্ব করে তুলেছে সত্যিকারের গাছগুলো।প্রতিটি কোনায় মানিপ্লান্টের গাছ, বারান্দা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করানো বাগান বিলাসের লতাটা এতটাই মনোমুগ্ধকর লাগছে আফনূর উজ্জ্বল নয়নে চেয়ে দেখছে। তাজা ফুলের ঘ্রাণে মাতোয়ারা করে দিচ্ছে মন-মস্তিষ্ক।
“ উহুম,খুক খুক!"
আফনূর চমকে পেছনে তাকালো।ঘরের সৌন্দর্যে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে তারাজ কখন এসে ঘরে ঢুকেছে সেদিকে খেয়াল‌ই করেনি।তারাজ আফনূরের ঘা ঘেষে দাঁড়ালো। আফনূরের চমকানো আর‌ও একটু বেড়ে গেল।এমন মুহূর্তের জন্য এই ক্ষনের জন্য প্রস্তুত ছিলো না হয়তো। তারাজ আফনূরের চমকানোয় হালকা হাসলো।
“ এটা তোমার, তোমার জন্য আনা হয়েছে!"
নতুন একটি আলমিরাহকে নির্দেশ করা হয়েছে। আফনূর সেদিকে দেখে তারাজের দিকে তাকালো।তারাজ বললো,
“ ফ্রেশ হ‌ও,আমার আসছি!”
__________________________________________
পরপর চারটি গাড়ী এসে থামলো ভুঁইয়া'স ম্যানশনের সামনে। সামনের গাড়িতে কামরাঙ্গীরচর থানার পুলিশ সদস্যরা, পেছনে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অফিসার, ইনচার্জ, পরবর্তী দুটোতে আছে র্যাব বাহিনীর সদস্যরা আর সাংবাদিক শেষেরটায়। হুইসেলের ধ্বংসাত্মক শব্দে কানে তব্দা লেগে যাওয়ার উপক্রম চারদিকের বাড়ি ঘরের মানুষের।এত উচ্চ শব্দে নিজের ঘরের আরামদায়ক বিছানায় টিকতে পারলেন না মিসেস ভূঁইয়া।রাত পোহালেই ভোটের একদিন বাকী এমন মুহূর্তেও স্বামীর কুমড়ো পটাশের ন্যায় ঘুমে বিরক্ত হলেন কিছুটা। ঠেলেও উঠাতে না পেরে অবশেষে নিজেই উঠলেন।এর মধ্যেই শোনা গেল কলিং বেলের উচ্চ শব্দ; ভোর রাতের নিরবতায় চারদিকে ভয়ানক প্রতিক্রিয়া দেখালো এই কলিং শব্দ।

পর্ব ২৮


“ আজ বিকাল ছয়টার পর থেকে নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ করার নির্দেশ।তাই শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় জোরদার চলছে কার্যক্রম। প্রার্থীরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নানারকম আশ্বাস প্রত্যাশা দিয়ে নিজেদের জন্য ভোট চাইছেন।তার সাথে ভোটাররাও নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে দিচ্ছে আশ্বাস, আস্থা।
- ঢাকা ২ আসনের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়াকে আজ ভোর রাতে তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে গত নভেম্বরের ২২ তারিখে দেওয়া হরতালে কামরাঙ্গীরচর সহ ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গাড়ী ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের সাথে জড়িতদের মূলহোতা হচ্ছে এই জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সংগৃহীত আসামিদের ছবি থেকে তাদের গ্রেফতার করা হলে তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তদন্ত চালিয়ে আজ ভোরের দিকে তাকে তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়।
-এ সময় পুলিশ ও র্যাব বাহিনীর যৌথ অভিযানে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার বাসভবনের চিলেকোঠার ঘর থেকে প্রায় শ খানেক ইয়াবা ও ফেনসিডিল সহ দেশী বিদেশী অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।আপাতত তাকে স্থানীয় থানায় রাখা হয়েছে সম্ভবত দুপুরের পর কোর্টে তোলা হবে!"
- চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় উত্তেজনা বিরাজ করছে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে।একদিন পর ভোট অথচ এই মুহূর্তে একজন শক্তিশালী প্রার্থীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে নির্বাচনী মাঠে চলছে জোর বিতর্ক।
কেউ কেউ বলছে এটা শুধু মাত্র মাঠ থেকে একজন যোগ্য শক্তিমান প্রার্থীকে হটিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের একটি জঘন্য সুক্ষ্ণ পরিকল্পনা।কেউ কেউ স্বপক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন।তবে প্রসাশন বলছে অন্য কথা,
~ "আমরা এতদিন তদন্ত করলেও সেই তদন্তের ফলাফলের উপর নির্ভর হতে পারছিলাম না।কারণ সঠিকভাবে উত্তর দিচ্ছিলো না কেউ।আমরা আন্দাজে ঢিল ছোড়ার মতো যে কাউকে ঢিল ছুড়ে মারতে পারিনা।আপনারা জানেন আইন প্রমানের উপর নির্ভর করবে।আর আমরা সবসময়ই সঠিক সত্য এবং নির্ভরশীল প্রমানের উৎস খুঁজি এরপর পদক্ষেপ নেই।"
অফিসারকে থামিয়ে ব্রিফিংয়ে অংশগ্রহণ নেওয়া এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলো,
“ আপনাদের তদন্তের ফলাফল কার নাম প্রকাশ করে স্যার!"
“ তাতো বললাম‌ই,আর দেখলেন‌ও আপনারা!"
অন্য একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলো,
“ কিন্তু স্যার আপনি বললেন তদন্তের ফলাফল দেখে আপনারা গ্রেফতার করেননি তবে কিসের ভিত্তিতে?"
“ আমি কখন বললাম তদন্তের ফলাফল দেখে করিনি।আমি বলেছি তদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী আমরা শতভাগ নিশ্চিত হতে পারছিলাম না।এই যে দেখুন উনি কিন্তু একদমই সাধারণ কোন নাগরিক নয়। উনি বর্তমান সরকারের এক কালের দাপুটে কর্মী ছিলো তার সাথে এবার দল পরিবর্তন করে দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছে, সুতরাং তাকে চাইলেই গ্রেফতার করা যায় না যতক্ষণ না শক্তিশালী কোন প্রমান পাচ্ছি।"
“ তার মানে বলতে চাচ্ছেন আপনি আপনাদের রিপোর্টের চেয়েও শক্তিশালী কোন প্রমান পেয়েছেন?"
“ জ্বী,জ্বী!আমরা খুবই প্রযোজ্য এবং সুগঠিত তথ্য পেয়েছি এবং তার সত্যতা যাচাই করেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।"
"এমনকি তথ্য পেলেন কিংবা কোথায় হঠাৎ করেই উদয় হলো এমন তথ্য?"
বাম পাশ থেকে অপর একজন প্রশ্ন করলো, অফিসার সাবলীল ভঙ্গিতে উত্তর দিলো,
“ তদন্তের স্বার্থে আপাতত আমরা আর কিছু বলছিল না তবে আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি ধীরে ধীরে সব জানতে পারবেন আশাকরি, ইনশাআল্লাহ। ধন্যবাদ সবাইকে আমাদের সাথে থাকার জন্য!"
"স্যার স্যার শেষ প্রশ্ন।"
অফিসের চলে যাচ্ছিলো। সাংবাদিকের অনুরোধে পিছনে ঘুরে দাড়াতেই ঐ সাংবাদিক প্রশ্ন করলো,
“ স্যার সাধারণ জনতার মতে এটা ক্ষমতাসীন দলের একটা পরিকল্পনা নিজের প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করার।যাতে কোন রকম হট্টগোল ছাড়াই একটা নাটকের মাধ্যমে জয় লাভ করা যায়।তারা অনেকেই ক্ষুদ্ধ মনোভাব থেকে বলছেন এই সরকার যেই গনতান্ত্রিক কথা বলে,যেই #গনতন্ত্রের_মঞ্চনাটক দেখায় এটা তার‌ই একটি অংশ কেবল! আপনি কি বলছেন,অথবা আপনাদের মতে এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আপনাদের কি মনে হয় এটা কি আসলেই সরকারের পরিকল্পিত কোন বিষয় নাকি পুরোটাই যেমনি দেখাচ্ছে ঠিক তেমনি?"
অফিসার মুখটাকে কঠোর করে ফেললেন। পর মুহূর্তেই হাঁসি হাঁসি ভাবে ধীরে দাঁতে দাঁত আঁকড়ে বললেন,
“ দেখুন এটা রাজনৈতিক কোন ইস্যু নয়। আমরাও রাজনৈতিক কর্মী ন‌ই।আমরা একটা প্রশাসনিক টিম আমাদের কাজ হচ্ছে সত্যটাকে যাচাই বাছাই করে 
আসল ঘটনাকে উদঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা।আমরা ঠিক তাই করেছি।এখানে রাজনৈতিক কোন ইস্যু আপাত দৃষ্টিতে নেই তাই এরকম উল্টো পাল্টা ভাবনায় সাধারণ জনগণের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবেন না।আর হ্যা অবশ্যই জোরালো প্রমানের ভিত্তিতেই উনাকে মানে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে!"
“ স্যার আমাদের সাথে যদি একটু ভাগ করতেন যে ঠিক কেমন প্রমান হঠাৎ করেই একদিন পর ভোট এই সময়ে আপনাদের হাতে আসলো যার ভিত্তিতে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার মতো একজন রাজনীতিবিদ,ব্যাবসায়ীকে গ্রেফতারের মতো পদক্ষেপ নিতে হলো?"
“ আমি তদন্তের স্বার্থে আপাতত কিছু বলতে পারছি না তবে এতটুকু জানাই উনার খুব কাছের লোক থেকে গতকাল আমাদের নিকট একটি ফোন আসে। সেখানে বিশেষ কিছু তথ্য থাকে যার সাথে আমাদের তদন্তের ফলাফল শতভাগ ম্যাচ করে। আশাকরি এরা বেশি আপাতত জানতে চাইবেন না।
- আর কারো কোন প্রশ্ন?"
অফিসার নিজে কথা শেষ করে সব সাংবাদিকদের উদ্দেশে বললেন।সবাই একবাক্যে না বলে দিলো।
সৌজন্যমূলক হাসি উপহার দিয়ে, উচ্চ স্বরে বললেন,
“ তাহলে ধন্যবাদ সবাইকে, আশাকরি সঠিক তথ্য দিয়ে আমাদেরকে সহায়তা করবেন, গুজব ছড়াবেন না ,গুজবে কান দিবেন না।গুজব ছড়ানো এবং তাকে বিশ্বাস করা দুটোই গর্বিত অপরাধ যা শাস্তির যোগ্য। ধন্যবাদ সবাইকে আবারও! আসসালামু আলাইকুম।"
জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে এলাকাবাসী। নির্বাচনী প্রচারণা বাতিল করে আপাতত তার  মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ ও আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তার দলীয় সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
ঐদিকে নিজের প্রচারণায় জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার। সকাল হতেই বিভিন্ন আয়োজনে চলছে তার প্রচারণা।
স্বতন্ত্র প্রার্থী‌ও কাটাচ্ছে ব্যস্ত সময়।এই মুহূর্তে নির্বাচনী কাজ থেকে পিছিয়ে আছে কেবল জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া।
“ পাপের ফল ভুগতেই হবে।অন্যায় করে কেউ পাড় পায়নি সেও পাবে না।"
টেলিভিশনের সামনে বসে লাইভ ব্রিফিং দেখছিলো ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার। উনার কানে ভোরেই এসেছিল জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার গ্রেফতারের খবর।তিনি খুশি নাকি দুখী বোঝা যাচ্ছে না। এককালীন দলীয় সহকর্মী,আবার গৃহ প্রতিপক্ষ‌ও ছিলো।আর এখন তো ছেলের  প্রতিপক্ষ তাও যেমন তেমন নয় একদম হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের যোগ্য।উনি নিশ্চিত ছিলেন এবার নির্বাচনে এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে,যদিও তিনি মনে মনে বিশ্বাস করেন এবং এই বিষয়ে নিশ্চিত যে উনার ছেলেই জিতবে তবুও ভেবেছিলেন একটা কড়া লড়াইয়ে বিতর্কবিহীন বিজয় ছিনিয়ে আনবে উনার ছেলে। কিন্তু এটা কি হলো? যাও এটাও তো একটা রাজনৈতিক খেলা যা তিনি খুব ভালো করেই বুঝতে সক্ষম হচ্ছেন। 
আপাতত তিনি বেশ খুশি,রাতে প্রথম পুত্র বধূকে ঘরে তুলেছেন। তাইতো চেয়েও ছেলেকে ডেকে তাকে এই বিষয়ে অবগত করতে পারছেন না। নিশ্চয়ই এখনও ঘুমাচ্ছে। মনে মনে আওড়ালেন,
“ ঘুমাক। একটু পর উঠলে এমনিতেই শুনতে পারবে।"
বিদখুতে শব্দে তারাজের ঘুমের রেশ কাটলো।বাম হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিতে যেতেই বাম পাশে শোয়া রমনীর কোমল ঢেউ খেলানো দেহে গিয়ে ঠেকলো শক্ত হাতটা।তড়াক করে উঠে বসলো।খেয়াল করলো তার হাত আফনূরের কোমরের খাদে আটকে গেছে।হালকা ঢোক গিললো।ক্লান্তি আর অবসাদে কাল আফনূরকে কাছে টানা হয়নি। তাছাড়া সে সময় দিতে চেয়েছে আফনূরকে কিছুটা।ব‌উ করে যখন ঘরে তুলেই এনেছে সুতরাং সে তো কোথাও চলে যাচ্ছে না। দুই একদিন পর কাছে টানলে এতটাও ক্ষতি হবে না। আবারও সেই শব্দ; বিরক্তি বেড়ে গেলো।কপালে তিনটা ভাঁজ ফেললো।কি করে ঐটা নিবে। ফোনটা আফনূরের ডান কাঁধের নিচে পড়ে আছে।ঐটা নিতে গেলে আফনূরকে ছোঁয়া‌ লাগবে যেটা করলে নিশ্চিত তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে।
কাল রাতে বাড়ি ফিরতেই দেড়টা প্রায়, এরপর ফ্রেশ হয়ে তাহাজ্জুদ এবং নিজেদের জীবনের নতুন শুরুর জন্য দু রাকাত নফল আদায় করতেই প্রায় রাত সাড়ে তিনটা বেজে গিয়েছিল তখন দুজনেই সিদ্ধান্ত নেয় একদম ফজর আদায় করেই ঘুমাবে। ততক্ষণে কি করা যায় ভাবতেই আফনূর পরামর্শ দিলো বারান্দায় বসে চাঁদ উপভোগ করা যায়।আফনূরের পরামর্শ তারাজের ভালো লাগে।সে সম্মতি দিয়েই বললো,
“ তুমি বারান্দায় যাও আমি কফি করে নিয়ে আসছি।"
“ আমি যাই,আপনি এখন একা একা কফি!"
“ পারবো,অভ্যাস আছে! তুমি চিন্তা নিও না।"
“ না তারপরও,আমি থাকতে!"
” চিন্তা নিও না নুরজান;আজকেই করছি। এরপর থেকে তোমাকেই করতে হবে। আজ আমার তরফ থেকে ট্রিট, মনে করো তোমার সিনিয়র তার বিয়ে উপলক্ষে তোমাকে ট্রিট দিচ্ছে।"
কথাটা বলেই তারাজ হালকা হাসলো, আফনূর তারাজের রসিকতায় হাসলো তার সাথে লজ্জায় মাথা নিচু করেই রাখছে।সে এতগুলো কথা তারাজের সাথে বলছে ভাবতেই খানিকটা লজ্জা ভীর করলো তার অক্ষুপটে। এমনকি আজ সারাদিনে এটাই তার সবচেয়ে বেশি কথা বলা হয়েছে।তারাজ লজ্জিত নববধূর পানে ঘোর লাগা দৃষ্টি দিয়ে মোহিত কন্ঠে বললো,
“ আজ নিজেকে কন্ট্রোল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাই লজ্জায় এমন করে লাল হয়ে যেও না যাতে টমেটোর মতো কামড়ে খেয়ে ফেলি!"
আফনূর চমকে তাকালো তারাজের দিকে। পরমুহূর্তেই চোখ নামিয়ে নিলো। তারাজের দৃষ্টি ঘোর লাগা।মরন মরন দশা হয়ে যাচ্ছে। এ কেমন নজরে তাকিয়ে আছে তারাজ, মানে উনি! তারাজ হয়তো বুঝলো! কাছাকাছি আসলো, না ছুঁয়েও না ছোঁয়ার মতোই,গা ঘেঁষা না লাগিয়ে আফনূরের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“ এভাবে ঠোঁট কামড়ানোর অধিকার তোমার নেই!ঐ কমলার কোয়া খাওয়ার অধিকার কেবলি আমার। তুমি আইনের লোক হয়ে এভাবে অন্যের সম্পতি দখল করে বেআইনি কাজ করত পারো না!আমি তোমাকে কিন্তু কঠোর শাস্তি দিবো!
তারাজের গরম নিঃশ্বাস আফনূরের কানে গিয়ে বারি খাচ্ছ,এমনিতেই তারাজ এত কাছাকাছি থাকায় আফনূরের শ্বাস বন্ধ হ‌ওয়ার উপক্রম।তার মধ্যে তারাজের এমন কথায় গরম হয়ে উঠলো সর্বাঙ্গ।কেমন শিহরণে দোল খেল দেহমন।তারাজ ওভাবেই নিজের পরবর্তী কথা বলো,
“ বড্ড ক্ষুধার্ত আমি, তবুও আজ ছাড় দিচ্ছি কাল কিন্তু নয়, ততক্ষণে আমার আমানত আমারই থাকে যেন। এমনিতেই এতগুলো দিন কেবল চোখে দেখেই তৃষ্ণা মিটিয়েছি আর নয় সুতরাং এই ক্ষুধা নিবারণের জন্য, পিপাসা মেটানোর জন্য নিজেকে তৈরি করো তার আর জন্য আজ রাতটাই কেবল পাবে তুমি"
তারাজ এত নিকটে থাকায় আফনূরের উত্তেজনা বেড়ে যাচ্ছে যার দরুন কাঁধের ওড়নাটা বাম কাঁধ থেকে ছুটে নিচে পড়ে গেল। আফনূরের শ্যাম বর্ণের দেহের উন্মুক্ত বক্ষ খাঁজ নজরে আবদ্ধ হতেই হালকা ঢোক গিললো, আরও একটু সন্নিকট হয়ে ধীমি কন্ঠ নেশাক্ত  আবেগে তারাজ বলল,
“ জ্বলজ্বল করা সন্ধ্যা প্রদীপ আজ রাতে সামলে রাখো নয়তো সত্যি‌ই নিয়ন্ত্রণ হারা হলে কেউ তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না।আমার মাথা আগেই নষ্ট করেছো নিজের গুল্ম লতার অঙ্গ দেখিয়ে এখন অন্তত;
“ আপনি এগুলোও দেখতেন; সব ..
“ আমি রক্ত মাংসের সাধারন একজন পুরুষ,সুফি দরবেশ কিংবা যন্ত্রের তৈরি রোবট ন‌ই!তাই বাকী সাধারণ পুরুষের ন্যায় আমার‌ও সব জৈবিক চাহিদা,কাম আছে! একজন সাধারণ পুরুষ তার কাঙ্খিত নারীকে যখন দেখে তার সবটাই দেখে।পা থেকে মাথা পুরোটাই,প্রতিটি লোমকুপকে সে স্পর্শ করে নিজের প্রণয়নী দৃষ্টি দিয়ে।সে নিজের নারীর মাঝে সবটাই খুঁজে বেড়ায়। নিজের বসন্তের সমস্ত রঙ উপচে দিতে চায়, নিজের অস্তিত্বের কাঙ্খিত আকাঙ্ক্ষা ঢেলে দিতে চায়।
সে খুঁজে বেড়ায় নারীত্বের উদ্দমতা। মেঘের ন্যায় কৃষ্ণকালো কেশের মাঝে প্রেমের উচ্ছাস,ঘন সন্ধ্যা নামা ভ্রুদ্বয়ের পরতে পরতে তালাশ করে নিজের প্রতি অনুভূতি,ডাগর ডাগর আখির অক্ষুকোটরে গভীর সমুদ্রের ন্যায় অতল মায়ার প্রদেশের গহীনে লুকায়িত সুপ্ত প্রেম কামনা,কোমল পুষ্পের পাপড়ির ন্যায় গোলাপী ওষ্ঠের খাঁজে তৃষ্ণার্ত প্রেমিক সন্ধানী হয়ে হাতড়ে বেড়ায় অমৃতা সুধা, চিবুকের চিলতে লোম শিরিশিরিয়ে জানান দেয় প্রেমিক মনে প্রেম নিগড়ানোর কাল পরিক্রমা, বক্ষের খাঁজে আগলে রাখা যৌবনের জোয়ার কাঙ্ক্ষিত নারীর প্রতি পৌরুষের আকাঙ্ক্ষা করে তুলে দ্বিগুণ,সে নিজেকে সেই জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়ার তীব্র বাসনায় বিক্ষিপ্ত দ্বন্দ্বে ছারখার হয়ে যায়!কোমল তরুর লতানো ডগার ন্যায় কোমরের বাঁক‌ও সেই পুরুষের নিদ্রা চুরি করে পালায়। পেটের হালকা মৃদু মেদ অস্থির করে তুলে সেই নারীকেই নিজের করার জন্য! পুরুষ তার কাঙ্খিত নারীকে প্রথম দর্শনেই পড়ে নেয়,করে নেয় পাঠ এ টু জেড! যে বলে কেবল মন পড়েছি সে ডাহা মিথ্যা বলে,কারণ মানুষ মনের চাইতে বেশি দেহের সন্ধান করে।"
তারাজ কথা শেষ করেই পিছু মুড়ে হাঁটা ধরলো। পিছনে রেখে গেল  বিধ্বস্ত এক নারীকে যে কিনা মাত্র'ই তার প্রেমের খাদে পড়ে আহত হলো।

পর্ব ২৯


কল্পনার রাজ্য থেকে টেনে আনলো ফোনের বিরক্তিকর শব্দ।সচকিত হয়ে তাকিয়ে দেখলো গভীর ঘুমে মগ্ন ঘুমপরী কে 
“আপনার ফোন বাজছে?"
আফনূরের কন্ঠে তারাজের ঘোর কাটলো। আফনূর ততক্ষণে নিজের আশেপাশে খুঁজতেই তারাজ বললো,
“ মেইবি তোমার বালিশের নিচে পড়েছে।রাতে ঐ পাশেই রেখেছিলাম।"
তারাজের কথা অনুযায়ী আফনূর বালিশের নিচেই পেলো মুঠোফোনটা। তারাজের দিকে ফোন বাড়িয়ে দিয়ে।নিজেও উঠে পড়লো।তারাজ ফোনটা নিয়ে চাপ দিয়ে দেখলো বেলা এখন নয়টা সতেরো।জিহ্বা কেটে বললো,
“ ইস্ অনেক বেলা হয়ে গেছে। এখনি বের না হলে আর কোন কাজ‌ই হবে না।"
তারাজের তাড়ায় আফনূর একটু লজ্জিত হলো‌।বিয়ের প্রথম দিনেই এত দেরি করে উঠা হয়তো উচিত হয়নি তাও আবার এমন দিনে। কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো,
“ স্যরি; আসলে আমি এত বেলা করে কখনো উঠিনি কিন্তু আজ!"
“ স্যরি কেন বলছো! ঘুমিয়েছি‌ই তো ভোরে, এতটুকু সময়ের ঘুমে নিশ্চয়ই তোমার ঘুম পূরণ হয়নি।আর‌‌ও একটু সময় ঘুমাও।আমি তো চাইলেও ঘুমাতে পারছি না।যেতে হবেই। তোমার তাড়া নেই!"
“ ইটস ওকে আমি আর ঘুমাবো না। এমনিতেও আমার অভ্যাস আছে রাত জাগার।খুব একটা সমস্যা কখনো হয়নি।"
“ তোমার ইচ্ছে,তবে চাইলে ঘুমিয়ে নিতে পারো।এখানে কেউ তোমাকে কিছু বলবে না।"
“ দরকার হবে না।"
আফনূর তারাজের সাথে কথা বলা অবস্থায়ই নিজের এলোমেলো কেশ রাশীকে খোঁপা বাঁধতে থাকলো।তারাজ মুগ্ধ হয়ে গেল আফনূরের ঘন কালো লম্বা কেশ দেখে। সবসময় হিজাবের ছায়ায় থাকে বলে কখনো আফনূরের চুল দেখা হয়নি।আর দেখার ইচ্ছাও জাগেনি। সৌন্দর্যের পূজারী সে নয়,সে তো দেখেছে মায়াবতীকে।তাই চুল ছোট না বড় তাতে তার মাথা ব্যথা নাই। কিন্তু এখন তার চোখ চমকে কপালে উঠে যাওয়ার উপক্রম। কোমড় ছাপিয়ে তা হাঁটুর‌ও নিচে।ঘন কুচকুচে কালো চুলের মাঝে কোন কাটসাট নাই। একদমই সোজা হয়ে নিম্নে ঝুলে আছে। ফটাফট খোঁপা করায় বুঝলো এই রমনী এতে অভ্যস্ত। খোঁপা শেষে তারাজকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আফনূর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে তারাজের মুগ্ধতা মাখানো নয়নে আটকে যায়। থমকে চেয়ে থাকে সেও। তারাজের ঘোর লাগা নজরে বেশিক্ষণ নজর মিলাতে ব্যর্থ হলো। নামিয়ে ফেললো। নিজের দিকে তাকাতেই খেয়াল হলো গায়ে ওড়না নেই। আড়চোখে তারাজের দিকে এক নজর তাকিয়ে দ্রুত নিজের ওড়না খুঁজে নিজেকে জড়িয়ে নিলো।তারাজ ঘোর থেকে বের হলো আফনূরের তাড়াহুড়ো দেখে।বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে যেতে যেতে বললো,
“ চুলে কখনো যেন কাঁচির ছোঁয়া না লাগে।"
এত সময় যে তারাজ আফনূরের চুলে মুগ্ধ ছিলো তা এখন আফনূর বুঝলো। নিজের ভাবনায় খানিকটা বিরক্ত হলো, লজ্জাও পেলো।সে ভাবছিলো তারাজ এত সময়.. মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বললো,
“ ছিহ আফনূর,কিসব ভাবছিলি মানুষটাকে নিয়ে,যে কি-না তোর স্বামী, বৈধতা আছে যার তোকে ঐ নজরে দেখার! আর তুই তাকেই!"
কথাগুলো ভাবতেই কল্পনায় চলে গেল।
গতরাতে তারাজ কফি নিয়ে আসার পর দুজন বারান্দায় গিয়ে বসে।সবুজায়নের মুগ্ধতায় ডুবে যায় আফনূর। ছোট একটি লাল বাল্ব জ্বলছিলো। সবুজের মাঝে এতটুকু লাল বাল্ব যেন সবুজ পৃথিবীর মাঝে রক্তিম সূর্য। অনেকটাই আমাদের দেশের পতাকাকে উপলব্ধি করায়।
নিচে বিছানো সবুজ ঘাস কার্পেটের উপরে পেতে রাখা দুটো বেতের চেয়ারে গা হেলিয়ে বসলো দুজনে।তারাজ কফির পাশে পাশে কিছু নিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে।আর আফনূর কফির সাথে অনুভব করছে এই সুন্দর বারান্দার মনোরম পরিবেশ।খেয়াল করে দেখলো সব রকমের ফুলের সমারোহ থাকলেও রজনীগন্ধা নেই।মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করেই ফেললো,
“ এখানে সব ফুল আছে, রজনীগন্ধা কেন নেই?"
তারাজ কফির কাফটা দু হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,
“ তুমি লাগিয়ে নিও!"
“ এগুলো কি সব আপনি লাগিয়েছেন?"
কফিতে চুমুক দিয়ে কিছু সময় চুপ থাকলো এরপর বললো,
“ না ।সব আমি লাগাইনি,সবাই মিলিয়ে লাগিয়েছে। আসলে আমার ভালো লাগলেও এত সময় তো ছিলো না।আর আমি তো প্রায় চার বছরের মতো দেশেও ছিলাম না।এসে দেখি আম্মা পুরো বাড়িসহ আমাদের সবার ঘরেই গার্ডেনিং করছে। প্রথমে সবজি গাছ লাগাতো‌।পরে কি মনে করে ঘরে ঘরে ফুল গাছ লাগানো শুরু করলো। এইতো এভাবেই ধীরে ধীরে এই অবস্থায় আসলো! তোমার নিজের‌ও তো গার্ডেনিং এর শখ আছে তাই না!"
“ হ্যা,আমি চেষ্টা করি লাগানো এবং অবশ্যই যত্ন করার।"
“ ভালোই হয়েছে আম্মার সঙ্গি হয়ে যাবে।আই থিংক আম্মা তোমাকে এর জন্যেই বেশি পছন্দ করেছে।"
তারাজের কথায় হাসি বৈ উত্তর দিলো না।তারাজ কফিটা শেষ করে আফনূরের দিকে ঘুরলো ততক্ষণে আফনূরের কফিও শেষ হয়েছে।সে বারান্দা দেখায় ব্যস্ত। তার বারান্দা বেশ সুন্দর কিন্তু তবুও মনে হলো সাভারের মাঝে এখনও খানিকটা সবুজের আবাস তাই হয়তো সে এমন করে সাজাতে আগ্রহ হয়েছে কিন্তু তারাজের বাড়ির এড়িয়ায় মনে হয় না এতটা গাছগাছালি আছে তবুও সে কত সুন্দর করে বারান্দাটা সাজিয়েছে।কতটা উন্নত চিন্তার অধিকারী হলে এত সুন্দর করে নিজে নিজেই ঘর বারান্দা সাজানো যায়। আফনূরের মনোযোগ বারান্দায় দেখে তারাজ মৃদু হাসলো। আলতো করে আফনূরের হাতে হাত রাখলো, আফনূর চমকে তাকালো,তারাজ আফনূরের চমকে আর‌ও সুন্দর করে হাসলো,বললো,
“ তোমার‌ই সব, দিনের বেলায় আরো ভালো করে দেখতে পারবে। চাইলে নিজের মতো করেই সংযোজন বিয়োজন করতে পারবে। আপাতত আমার কিছু কথা শুনো!"
আফনূর কিছুটা লজ্জা পেল তারাজের স্পর্শে আর কথায়। দৃষ্টি নত করে তার হাতের উপর রাখা তারাজের লোমশ হাতের উপর রাখলো। তারাজ কিছুটা কাছ ঘেঁষে আসলো,
“ আমাদের পরিবারের সদস্যদের সবার সাথেই তোমার বাহ্যিক পরিচয় হয়েছে। আশাকরি খুব শিগগিরই তাদের অন্তরের সাথেও পরিচয় হবে।আমি তোমাকে শুধু বলবো,এই ছোট্ট পরিবারের খুব আদরের তুমি, যদি তাদের আপন করতে পারো তো।
খুব সম্মান আর যতনে থাকবে যদি তাদের মনের সাথে নিজের মনকে জুড়ে নিতে পারো।আমি এক কথায় বলবো ব‌উ নয় মেয়ে হয়ে থাকবে যদি তাদের সবাইকে আপন করতে পারো, তাদের যথার্থ সম্মান 
দিতে পারো! আর আমি.."
 তারাজ থামলো, আফনূর চোখ তুলে তাকালো, তারাজের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কন্ঠে বললো,
“ আমি চেষ্টা করবো। শুধু আপনি পাশে থাকলেই চলবে!"
“ পাশে নয়,তোমাতে মিশে থাকবো! যেকোন পরিস্থিতিতে আমাকে নিজের মাঝেই পাবে! শুধু অনুরোধ করবো কখনো মিথ্যা বলবে না,কোন কিছু গোপন করবে না। সবসময় মনে বিশ্বাস রাখবে যেকোন পরিস্থিতিতে তোমার স্বামী তোমার পাশেই থাকবে।"
নত মস্তকে সম্মতি।কথা এখানেই থামলো। নিরবতায় কেটে গেল অনেকটা সময়।কেউ কোন শব্দ উচ্চারণ করলো না। নিশুতি রাতের অন্ধকার,শো শো বাতায়নের প্রবাহ, থেমে থেমে টুংটাং প্যাডেলের শব্দে কখন যেন ফজরের আযান পড়লো সেদিকে খেয়াল‌ই হলো না। ইতিমধ্যে আফনূরের চোখে তন্দ্রা নেমে এসেছে।আযানের ধ্বনিতে সেই তন্দ্রা কেটে যায়। একসাথে দুজন সালাত আদায় করে নেয়।
প্রথমে লজ্জায় আড়ষ্ট হলেও স্বাভাবিক নিয়মেই তারাজের বাম পাশের অধিকারীনি তার নিজস্ব স্থান দখলে নেয়।
আফনূরের কল্পনা বিলাসে বাঁধা আসলো তারাজের উচ্চ কন্ঠে,
“নুরজান,আমি বের হচ্ছি।তুমি যদি আর না ঘুমাও  তো রেডি হ‌ও,একসাথেই নাস্তা সারি।"
“ হুম; একটু সময় দিন!"
__________________________________________
বাড়ির গেটে দলীয় ছেলেদের নিয়ে তারাজের অপেক্ষায় রয়েছে মুরাদ। বন্ধুর বিয়ের প্রথম সকাল।এই মুহূর্তে তাদের বিরক্ত করতে কিছুটা ইতস্তত বোধ করেছে কিন্তু করা‌র‌ও কিছু নেই।আজ শেষদিন, অনেক ব্যস্ততা।অনেক কাজ বাকি। এমনিতেই মহল্লা গরম হয়ে আছে। সকালের তাজা খবর হচ্ছে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়াকে গ্রেফতার; এমন সময়ে এমন ঘটনায় বেশ আলোড়িত হয়েছে নির্বাচন মহল। তবুও থেমে নেই প্রচারণা। যেহেতু ভূঁইয়ার নামে আগে কোন অভিযোগ নেই, তাই আপাতত প্রার্থিতা বাতিলের থেকে বেঁচে গেছে তবে অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গেছে। সমর্থকদের মাঝেও দুই ভাগ ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে।
মুরাদের বোধগম্য হচ্ছে না বলে এই মুহূর্তে হঠাৎ করেই এত তাড়াহুড়োয় তারাজের বিয়ে করার কি দরকার হলো! এমন তো নয় আগেই ফিক্সড ছিলো,অথবা ভাবীকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে তবে!
আচ্ছা তারাজ কি ভূঁইয়ার খবর জানে না! জানার কথা তো অবশ্যই; তবে নাও জানতে পারে বেচারার কাল বাসর ছিলো! উফ্; বাসর! ভাবতেই আবার হতাশা চাপলো বেচারা মুরাদের উপরে!তার সব বন্ধুদের বিয়ে হয়ে গেছে,কারো কারো তো বাচ্চাও খেলা করে এদিকে সে, নাবালিকার প্রেমে মজে এখন হায়হুতাশ করেই রাত কাটে!
সবাই সতর্ক হলো তারাজকে লোহার ঐ নকশাখচিত দরজার খিল খুলে বেরিয়ে আসতে দেখে।
“ আসসালামু আলাইকুম ভাই!"
“ ওয়ালাইকুম আসসালাম,কি অবস্থা সবার?"
” আলহামদুলিল্লাহ ভাই!"
সবাই তারাজকে দেখে মিটিমিটি হাসছে। একমাত্র মুরাদের চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে তার মাঝে বিশাল হতাশার পাহাড় চেপে বসছে।তারাজ সবাইকে একবার দেখে মুরাদকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ কি ব্যাপার সবাই এভাবে হাসছে কেন?আর তোর চেহারার বা এই অবস্থা করে রেখেছিস কেনো?"
“ ভাই মুরাদ ভাই সারা রাত ঘুমায় নাই!"
“ কেনো?"
“ আপনি ভাবীকে নিয়ে বাসরে আর ভাই..
“ সাট আপ রবিউল!মুখে কিন্তু..
“ আচ্ছা থাম থাম! বুঝেছি, এবার আর অপেক্ষা করবো না।খালি ভোটের দিনটা যাক ‌তোকেও বাসরে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।নয়তো তুই কোথায় কি করে বসবি!"
“ ছিহ দোস্ত তোর আমাকে এমন মনে হয়! তুই তোর বন্ধুকে চিনিস না! এই রবিউলের বাচ্চার কথা বিশ্বাস করে বসে আছিস!"
“না বিশ্বাস আমি রবিউলকে করিনি, করেছি তোর চেহারায় যে বেচারা লুক আছে ওটাক!"
“ আরে ইয়ার..
“ ইটস্ ওখে,রিল্যাক্স! সময় এমনিতেই ঘনিয়ে এসেছে। ইচ্ছা জাগবেই,স্বাভাবিক!"
“ তারু!"
" আচ্ছা ওকে,এখন চল।তার আগে ওদের প্ল্যান শেয়ার কর!"
“ করেছি,তাও বলছি!"
মুরাদ ছেলেদের সাথে কথা বলে আজকের প্রোগ্রামের বিষয়াদি আলোচনা করছে, ঐদিকে বড় ফটক খুলার শব্দ পেয়ে তারাজ সেদিক তাকালো। তাজিশের বাইক দেখে খানিকটা ভ্রু কুঁচকে ফেললো।তাজিশ বাইরে যাবে!আজ তো তার ছুটি ছিলো! তবে কোথায় যাচ্ছে? ইতিমধ্যেই তাজিশ নিজের বাইকের হেলমেট হাতে নিয়ে বেরিয়েছে। ছেলেটা বাইকের চাবি আর বাইক তাজিশের হাতে দিয়ে ভেতরে চলে গেল।তাজিশ হেলমেট মাথায় পড়ে বেল্ট বাঁধতে নিলো তখন তারাজ এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কোথায় যাচ্ছিস?"
তাজিশ বেল্ট বেঁধে ভাইয়ের দিকে শান্ত গলায় বললো,
“অফিসে!"
“ তোর না আজ ছুটি ছিলো?"
“ হ্যা ভাই ছিলো, তবে আমি ক্যান্সেল করে দিয়েছি।অযথা ছুটি কাটিয়ে লাভ কি! তাই ভাবলাম অন্তত অফিসে গেলে অনেক কাজ জমে যাওয়া থেকে বেঁচে যাবো!
তারাজ কিছু সময় চুপ থাকলো। তাজিশের মুখের এই শ্রাবনের রঙ আজ দুদিন ধরে।কাল বিয়ের থেকে ফেরার থেকে খেয়াল করেছে। অনেক ব্যস্ততায় ভাইকে কাছে টেনে জিজ্ঞেস করতে পারেনি।আজ‌ও তো ব্যস্ততা ইভেন ব্যস্ততা এখন থেকে সবসময় থাকবে তাই বলে কি পরিবারকে সময় দিবে না!
তারাজ হুট করেই তাজিশের বাইকে চেপে বসলো,তাজিশ খানিকটা ভড়কালো।বড় ভাইয়ের মতিগতি বুঝতে অক্ষম তাজিশ পেছনে ঘাড় ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি করছো?"
“ চালু দে। আমার সাথে চল!"
“ কোথায় যাবো?"
“ মাঠে; আজকে শেষদিন,পাশে থাকবি!"
“ আমি!"
তাজিশের কন্ঠে বিস্মিত সুর।তারাজ দৃঢ় শব্দে বললো,
“ হ্যা,তুই চল। শুরু কর!"
তারাজের তাড়া।তাজিশ অসম্মতি দিতেই বললো,
“ কিন্তু ভাই আমি!"
“ স্টার্ট দে!"
 আর কথা বললো না তাজিশ।বাধ্য হয়ে অনুগত ভাইয়ের মতোই বাইক চালু করলো।তারাজ বাইকের দর্পনে সুদর্শন ভাইয়ের গভীর নয়ন অবলোকন করে গেল কেবল। এদিকে মুরাদ আশ্চর্যের চুড়ান্তে পৌঁছে বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে র‌ইলো।কারণ তারাজ মুরাদ ছাড়া কারো বাইকের পেছনে বসে না।আর তাজিশকে নিয়ে নির্বাচনী কাজে যাওয়ার প্রশ্ন‌ই তো উঠে না।কারণ তারাজ সবসময় এই হানাহানির পথ থেকে নিজের একমাত্র ভাইকে সেইফ রাখতে চেয়েছিল তবে আজ কি হলো।
“ ভাই আমি আপনার বাইকে বসি!"
মুরাদকে প্রশ্নটা করলো সানাউল নামে অন্য একজন কর্মী।মুরাদ একবার দেখে বললো,
“ বস!"
খুশিতে গদগদ সানাউল বসলো।মুরাদ ভাইকে তার ব‌ড়‌ই পছন্দ। শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক মুরাদ ভাই।কারো সাথে খুব একটা উচ্চবাচ্য করে না। সবসময় সব কর্মীকে ভাইয়ের মতোই আগলে রাখে। তারাজ ভাইও ভালো কিন্তু তার আশেপাশে থাকলে সবাই ভয়ে তটস্থ থাকে।কখন জানি কি ভুল করে বসে আর ভাই তাদের গুষ্টির ষষ্ঠী পূজার বন্দোবস্ত করে ফেলে।তার উপর যেই গর্জন বাবারে! রাগ করলে তারাজ ভাইকে ভয়ংকর লাগে।তাইতো তার আশে পাশে থাকতে সানাউলের ভয় হয় যদিও সবাই তারাজ ভাইকেই বেশি ভালোবাসে।
----------------------------------------------------------------
“ আমার ভাই তোমার ভাই, ইব্রাহীম ভাই ইব্রাহীম ভাই!"
“ ইব্রাহিম ভাইকে দিলে ভোট শান্তি পাবে এলাকার লোক!"
“ মাদক সন্ত্রাস নির্মূল করতে , ভোট কেন্দ্রে যাবো ইব্রাহীম ভাইকে জেতাতে।"
“ জনগণের নেতা কে? ইব্রাহিম ভাই ইব্রাহীম ভাই!"
স্লোগানে মুখরিত তারাজের পিছনে থাকা ছেলেরা।তারাজ,তাজিশ,মুরাদ সহ অন্যান্য নেতারা আগে আগে হাঁটছে।কখনো কোন দোকানের সামনে,কখনো কোন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থিত জনতার মাঝে লিফলেট বিলি করছে।অনুনয় করে ভোটের জন্য আর্জি রাখছে।তারাজ একটা দোকান থেকে তাজিশের জন্য মুখোশ কিনে দেয় যেটা আপাতত তাজিশ পড়ে নিজেকে ডেকে রেখেছে।ভাইয়ের পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে ভাইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে কথা বলছে। অল্প শব্দে ধীর গতিতে ভাইয়ের জন্য অনুরোধ করে ভোট চাইছে‌।যদিও তারাজ নিষেধ করছে তবুও।এতে করে ধীরে ধীরে তার অভিব্যক্তি বদলে যাচ্ছে।তারাজ কাজের পাশাপাশি ভাইয়ের চেহারাও খেয়াল রাখছে।
দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা  নামলো। পরিশেষে ভোটের প্রচারনার পরিসমাপ্তি ঘটলো; কাল থেকে প্রস্ততি চলবে হরদমে।সকল প্রার্থীরা নিজেদের শেষ দিনের প্রচারণায় যথা সাধ্য শ্রম দিলো।এখন দেখা যাক ফলাফল কি আসে! 
____________________________________________
জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের পর থেকেই প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তার দলীয় সহকর্মী আর নেতারা।সবার একই কথা এই সরকার নিজের প্রার্থীকে কোনরকম প্রতিদ্বন্ধিতা ছাড়াই বিজয়ী করতেই এই জঘন্য পরিকল্পনা করেছে। আমরা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা কোন মতেই এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে আসবো না কিন্তু পরবর্তীতে সাধারণ জনগণের চিন্তা করেই নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলাই যার ফলাফল এখন সবাই দেখতে পারছেন।আমরা বিশ্বাস করি এই জঘন্য মিথ্যাচার, গর্হিত অপবাদের হাত থেকে সাধারণ জনতাই আমাদের রক্ষা করবে।
আজ ছিলো নির্বাচনের অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের শেষ প্রচারনার দিন।আজ সন্ধ্যা থেকে ভোট কেন্দ্রে পৌঁছে যাবে সকল সরঞ্জাম।
চট্রগ্রাম হালিশহর স্কুল মাঠ কেন্দ্রে ইতোমধ্যেই পৌঁছে গেছে ব্যালট বক্স সহ ইভিএম মেশিন।
সিরাজগঞ্জ ৫ আসনের চৌহালির  রেহাই পুকুরিয়া আদর্শ মহাবিদ্যালয় কেন্দ্রে সিল মারা ব্যালট উদ্ধার করেছে স্থানীয় জনগন। একসময় তর্ক বিতর্কের মধ্যেই শুরু হয় মারামারি।পরে ঘটনাস্থলে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার গিয়ে নিয়ন্ত্রণে নেয় পরিস্থিতি।এই ঘটনায় আহত হয়েছে ত্রিশের অধিক, গুরতর আহত হয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দু'জন। ব্যালট পেপার ভর্তি বাক্স নিয়ে কেন্দ্র প্রবেশ করার সময় হাতে নাতে ধরা পড়ে এক লোক। স্থানীয় লোকেরা তাকে পুলিশে সোপর্দ করে। টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে ঐ কেন্দ্রে।
ক্লাবে চলছে দেয়াল জোড়া এল‌ইডি টিভি,তার পর্দায় ভাসছে সারাদিনের খুচরো খবর। দলীয় ছেলে এবং অন্যান্য নেতাকর্মীদের সাথে আগামী দিনের পরিকল্পনা সহ সারাদিনের কর্ম নিয়ে পর্যালোচনা করছে তখন‌ই আম্মার ফোন আসে।ফোনটা পকেট থেকে বের আম্মাকে দেখেই রিসিভ করেই কথা বলা শুরু করে,
“ আসসালামু আলাইকুম আম্মা!"
“ হ্যা কোথায় তুমি? তোমার ছোট ভাইয়ের‌ও তো কোন খবর নাই!"
“ আম্মা আমার আজ আসতে অনেক রাত হবে, তুমি চিন্তা নিও না।ছোট‌ও আমার সাথেই আছে।একসাথেই দুই ভাই ঘরে ফিরবো ইনশাআল্লাহ!"
“ তোমার সাথে? আজ কি রাতে ক্লাবেই থাকবে?"
“ না আম্মা, বাসায় ফিরবো।তবে দেরি হবে চিন্তা করিও না।"
“ আচ্ছা নিজেও সাবধানে থেকো।আর ভাইকেও দেখে রাখো।"
মা তাদের নিয়ে সবসময় চিন্তা করে। স্বাভাবিক করবেই! কিন্তু এত কাজের মাঝেও তারাজের মাথায় বাচ্চা ভুত চাপলো,তাই দুষ্টমি করে বললো,
“ হ্যা আম্মা চিন্তা করো না।আমিও ফিডার বানিয়ে নিবো ভাইকেও বানিয়ে খাওয়াবো।"
আম্মা মৃদু ধমকে,
“ ইব্রাহীম!"
তারাজ আম্মার ধমক খেয়ে হেসে দিলো। হাসতে হাসতে বললো,
“ আচ্ছা ঠিক আছে। স্যরি,মাফ করে দাও।"
“ পাজি ছেলে মায়ের সাথে ফাইজলামি করে!"
তাজিশ ভাইয়ের দুষ্টুমি বুঝে সেও হাসছে।এত বড় হয়েও সে এখন‌ও তার পরিবারের কাছে সেই ছোট্ট বাবু হয়েই আছে।এই যে ভাই সকাল থেকেই হাত ধরে রেখেছে।পাশে বসিয়ে রাখে।খাওয়ার সময়‌‌ও এত লোকের মাঝেই নিজের পাত থেকে মাংস তুলে তার পাতে দিচ্ছিলো। কয়েকবার খাইয়ে দিচ্ছিলো।সবাই বারবার এই বদ নেতার দিকে আর তার দিকে তাকাচ্ছিলো। যদিও প্রথমে সে একটু লজ্জা পাচ্ছিলো কিন্তু পরে ঠিক হয়ে গেছে।সে তো জানে তার বয়স ২৭ হোক ৪৭ তবুও সে তার পরিবারের সবার কাছে বাবু থাকবে। বিশেষ করে ভাইয়ের কাছে তো সবসময়ই ছোট থাকবে! থাকতেও চায়।
“ তুই নিজে থেকেই বলবি নাকি আমাকেই খুঁচিয়ে বের করতে হবে?” 
 তারাজের এহেন হঠাৎ প্রশ্নে তাজিশ চমকালো। হঠাৎ করেই এমন প্রশ্ন ! জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে তারাজ ফিরে তাকালো তাজিশের দিকে।তাজিশ হয়তো এখন বুঝতে পারছে না নয়তো বোঝার জন্য প্রশ্ন‌ই ঠিকঠাক শুনেনি। তারাজ আবারও প্রশ্ন করলো,
“ সমস্যা কোথায়? মেঘ জমেছে কেন মুখে?"
“ না তেমন কিছু নয় ভাই!"
“ আমি জোর করতে চাই না আর না তোমার সাথে জোর করার ইচ্ছা আছে! সুতরাং!"
“ ভাই প্লিজ!"
“ ইউসুফ!"
তারাজ রাগ করলেই কেবল তাজিশকে ইউসুফ বলে ডাকে।তাজিশ নিরুপায় হয়ে গেল। ভাইকে রাগাতে চায় না। কিন্তু বলতেও তো চাচ্ছে না।আবার না বলেও শান্তি নেই। এই পৃথিবীতে তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু‌ই তো হচ্ছে তার ভাইয়া।যার কাছ থেকে কোন কথাই সে কোনদিন গোপন করেনি তবে জীবনের এত বড় কথাটা কিভাবে গোপন করবে?
“ আমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি ভাই!"
“ কেন?"
“ আমার এক মন বলে এটা তার অতীত তুই চাইলে তুই ভবিষ্যত; আরেক মন বলে যার অতীত‌ই এতটা 
জটিল তার সাথে ভবিষ্যৎ কি গড়বি? আমি কি করবো ভাই? কার কথা শুনবো?"
“ ঘটনা কি?"
তাজিশ তুলির বলা সব কথা খুলে বললো।সব শোনার পর তারাজ বললো,
“ তুমি কি চাও?"
“ আমি বললাম তো সেটাই বুঝতে পারছি না।"
“ সমস্যা কি বুঝছো?"
“ ভাই একটা মেয়ে যাকে আমি পছন্দ করি,যাকে নিয়ে ভবিষ্যত গড়তে চাচ্ছি তার মনে অন্য কেউ আছে অথবা ছিলো! এটা মানতে পারছি কিন্তু তার দেহে অন্য একজনের অবৈধ ছোঁয়া আছে তাও তার মর্জিতেই এটা মনে করলেই ঘৃনায় আমার গাঁ ঘিনঘিন করছে ভাই! মানে মনে হচ্ছে .... আমি না কোনমতেই এটা মানতে পারছি না। একটা মেয়ে যার বয়স ১৭ ; সতেরো বছরের একটা মেয়ে কি বুঝে না কোনটা উচিত কোনটা উচিত নয়? অবশ্যই বুঝে তবে সে কেন?"
“ ও কি ওর কৃত কর্মের জন্য অনুশোচনায় ভুগছে?"
“ ও নিজের জন্য সাফাই দিচ্ছে। আমার মনে হয় না অনুশোচিত তবে ও যাই করুক আমি কেন জানি না বিষয়টি  মানতে পারছি না!"
“ খুঁতখুঁত হচ্ছে?"
“ মানতে পারছি না আবার ছাড়তেও..
তাজিশের কন্ঠস্বর ভারী হয়ে উঠলো। গলা কাঁপছে।ভাইয়ের প্রথম অনুভূতি তাও এভাবে কাঁটার ন্যায় বিঁধছে! বিষয়টি আহত করলো তারাজকে। একবার নিজের আর আফনূরের কথাও ভাবলো। তাজিশের দিকটাও ভাবলো।তার ভাইকে চিনে এখন ছাড়তে কষ্ট হবে বলে এমন করছে অথচ যদি সত্যি তারা এক হয় তবে আসলেই কোনদিন সুখী হবে না।ভীষন রকমের খুঁত খুতে স্বভাবের এই ছেলেটা কখনোই মন থেকে মানতে পারবে না।

পর্ব ৩০


“তোমার দেহের সব কলঙ্ক ভেসে যাক আমার ভালোবাসার স্রোতে; তোমার মনের সব বিষাদ মিটে যাক আমার প্রেমের তোপে!"
ঘুমন্ত স্ত্রীর তৈল্যাক্ত বদনে অপলক চেয়ে বিরবির করেই উক্তিগুলো উচ্চারণ করলো তারাজ।
 আম্মাকে রাতে আসার কথা বললেও এসেছে সে ভোর নাগাদ। একবারে নামাজ শেষ করেই আসে।তাজিশ‌‌ও তার সাথেই ছিলো সারারাত।ভাইয়ের সাথে বসে এই প্রথমবারের মতো সে সারারাত রাজনৈতিক আলাপে অংশগ্রহণ করলো।বেশ ভালোই লাগলো তার সাথে নিজের বুকে চেপে রাখা কষ্টের পাহাড়ের ওজন‌ও হালকা মনে হলো।ভাইয়ের কাছে ভাগ করে নিতে পারায় ভালো লাগলো।তার সাথে তারাজের উপদেশ‌ও মনে ধরলো। কষ্ট হলেও সে এই উপদেশ অনুসরণ করবে।যতই হোক তার জীবন তার।বাবা মায়ের অনেক সাধনা আর ভাইবোনের অনেক যতনের জীবন তার। সেটাকে ঠুনকো কারো জন্য এভাবে নষ্ট করবে না।তাকে ভালো থাকতে হবে,সে ভালো থাকলেই ভালো থাকবে তার পরিবারের সদস্যরা।
তারাজ তাজিশ বাসায় এসে দেখলো পুরো বাড়ি ঘুমে আচ্ছন্ন। তাদের মহামান্য পিতাও ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
যদিও এটা তারাজের‌ই উপদেশ।ওরা বাড়ির সামনে আসলে সিকিউরিটি দরজা খুলে দেয়। ভেতরের দরজা খুলে দেয় তানহা।তারাজ তাকেই ফোন দেয় দরজা খুলে দেওয়ার জন্য। এরপর ধীরে ধীরে যে যার ঘরে চলে যায়।
তারাজ ঘরের দরজায় টোকা দিতে গিয়ে দেখলো দরজা ইতিমধ্যেই তা খোলা। খানিকটা আশ্চর্যই হলো‌।দরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়েছে। ইতস্তত করে ভেতরে ঢুকলো। আফনূরের মাথায় নামাজের হিজাব বাঁধা, জায়নামাজ বিছানার এক কোনায় ভাঁজ করা। আফনূরের শোয়ার অবস্থান‌ও আড়াআড়ি।পড়নে তার হালকা গোলাপি লিলেন কুর্তি জামা যার মাঝে গাঢ়ো গোলাপী,সাদা,ব্লুর মিশেলে চেরি ফুলের ছাপা।তার পত্রপল্লবের রঙে আছে জলপাই আর গাঢ়ো সবুজ। সালোয়ার গাঢ়ো গোলাপী। অসম্ভব সুন্দর এই ঘুমন্ত রমনীকে আপাতত তারাজের কাছে সেই কল্প কথার তুষার কন্যার মতোই লাগছে।সেই যে দুষ্টু রানীর দেওয়া বিষাক্ত আপেলে কামড় বসিয়ে ঘুম দিলো এরপর আর সজাগ হলো না।তাকে সজাগ করতে উপস্থিত হলো সেই প্রেম কুমার যার ওষ্ঠের গভীর চুম্বনে আলোড়িত হলো তুষার কন্যার নিস্তেজ হৃদাঙ্গ,সংচলিত হলো রক্ত কনিকা আন্দোলিত হলো তার শিরা উপশিরা, সচকিত হলো প্রেমাঞ্চল। উষ্ণতায় ছড়িয়ে গেল প্রতিটি লোমকুপে তা।বিরবির করে শুধালো তারাজ উক্ত লাইনগুলো। অনুভব করলো নিজের অজান্তেই এই রমনী তার অস্তিত্বে মিশে গেছে। অপলক, নিটল চাহনিতে জ
ছুঁয়ে দিচ্ছে তার বৈধ নারীকে। দেখতে দেখতে দৃষ্টি আটকালো আফনূরের পায়ের কাছে।গোলাগাল পা জোড়া।ছোট ছোট লোমে শ্যাম ত্বকের সৌন্দর্যে উপচে পড়ছে।তার মাঝে চকচক করছে রুপোর চিকন নূপুর। পায়ের চারদিকে ঘুরিয়ে লাগানো মেহেদী যা প্রায় গোড়ালির থেকে উপরে উঠেছে। মুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে র‌ইলো কয়েক লগ্ন।
 তারাজ যেন ক্লান্ত হয় না তার আফনূরকে দেখে। এই যে সারাদিনের পরিশ্রমের পর একটু বিশ্রাম দরকার তাও বেমালুম ভুলে বসেছে।তার ঘোর কাটলো আফনূরের নড়াচড়ায়।আফনূর নড়তেই তার খেয়াল হলো আফনূরের পড়নে সালোয়ার নামে একটি প্লাজো পড়া যার নিম্নাংশ অনেক ঘের, যার দরুন সে বরাবরই নিজ স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।যেমন তার থাকার কথা গোড়ালি অবধি কিন্তু সে আছে আপাতত হাটুর‌ও উপরে! বিষয়টি বেশ বিব্রতকর! তারাজ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলো সে আফনূরকে বলবে যেন আর প্লাজো না পড়ে আর পড়লে যেন এর চেয়ে কম ঘেরে থাকে যতটা হলে হাঁটুর উপরে যাবে না।
আফনূরের নড়াচড়ায় তারাজ বুঝলো আফনূরের সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু কিভাবে সে কি করবে? ভাবতেই মনে হলো আগে নিজে ফ্রেশ হয়ে নেই।
আফনূরকে ওভাবেই রেখে নিজে উঠে ওয়ারড্রব থেকে রাতের পোশাক বের করে বাথরুমে গেলো।গোসল করে রাতের পোশাক পড়েই বের হলো।সময় নিলো সর্বোচ্চ পনেরো মিনিট। তার ঘুমানোর পরিকল্পনা আপাতত তিন ঘন্টা। আজকের ঘুমের জন্য এই তিন ঘণ্টাই বাজেটে আছে তার।
বিছানার সন্নিকটে এসে আফনূরের কাছ ঘেঁষে বসলো। এরপর আফনূরের গলার নিচ দিয়ে ডান হাত ঢুকিয়ে বাম হাত দিয়ে কোমর আগলে সোজা করে বালিশের উপরে মাথা রাখলো।এই কাজে এতটাই কাছাকাছি চলে আসতে হলো যে দুজনের শ্বাস প্রশ্বাস বারি খাচ্ছে।তারাজ ঠিকমতো মাথাটা বালিশে রেখে পা জোড়া সমান করে দিলো। মাথার হিজাব এসে আফনূরের চোখ ডেকে ফেলছে।খুব সাবধানে যাতে ঘুম না ভাঙ্গে ঠিক ততটাই সতর্ক হয়ে হিজাবের বাঁধন খুলে মাথা উঁচিয়ে হিজাবটা বের করতেই আফনূর ফট করে চোখ মেলে তাকালো।দুজোড়া নয়ন এক হলো। তারাজ হতভম্ব হয়ে গেছে। 
চাচ্ছিলো না আফনূরের ঘুম ভাঙ্গাতে।তানহা বলেছে আম্মাকে ঘুমে পাঠিয়ে সারারাত আফনূর নিজেই তাদের ফেরার অপেক্ষায় বসেছিলো।তাকে সঙ্গ দিতে তানহাও জেগে ছিলো। এখন নামাজ পড়ে হয়তো মাত্র‌ই ঘুমিয়েছে কিন্তু। তারাজের হতভম্বতা  মুহুর্তেই কেটে গেল। ঝাকড়ে ধরলো নেশা। সে এত সময় খেয়াল‌ই করেনি আফনূরকে ঠিক করে শোয়াতে গিয়ে সে ইতিমধ্যেই আফনূরের অঙ্গ দখলে নিয়েছে।তার উপরে অর্ধেক চড়ে আছে। ভাবতেই দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো আফনূরের ছোট্ট কমলার ন্যায় খসখসে শুষ্ক ওষ্ঠের উপর। ওষ্ঠের থেকে নজর সরিয়ে বাঁশের ন্যায় লম্বা তেলতেলে নাকের উপর ।ফুলোফুলো কোমর নরম গাল যার কোথাও একটা চিমটির দাগ‌ও নেই।তরতর করে দৃষ্টি উঠলো আফনূরের নয়নে।সদ্য কাঁচা ঘুম ভাঙ্গা আফনূরের চোখ এখন শ্বেত বর্ণ থেকে লোহিত বর্ণে রুপ নিয়েছে কিন্তু তাতেও যেন এক অতীব আকুল আকাঙ্ক্ষিত প্রণয়ের নেশা।সুধা পানের নেশা!অমরত্বের নেশা! নিজেকে বিসর্জনের নেশা। তারাজের ওয়াদা ভঙ্গ হলো।এইতো মাত্র আজ ঘন্টা খানিক আগেই সে নিজের সাথে নিজেই ওয়াদা করেছিলো নির্বাচনে জেতার পর আনুষ্ঠানিক ভাবে পরিচয় দেওয়ার পর‌ই সে আফনূরকে কাছে টানবে। মিশিয়ে নিবে নিজের অঙ্গের প্রতিটি লোমের সাথে কিন্তু তখন কি জানতো এই অধম এতটাই বেপরোয়া হয়ে যাবে ঘন্টা পেরুলেই। আফনূরের চাহনিও অপলক, নির্ভার। থেমে থেমে নেওয়া হালকা ঢোকে কন্ঠনালীর উচাটন। পুরুষালি ভারী দেহের নিচে চাপা পড়েও বক্ষদ্বয়ের উৎপীড়ন যার গতি নির্ধারণ করছে কাঙ্খিত অনুভূতিরা ।কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে ছোট্ট শ্বাস প্রশ্বাসের প্রবাহ।যা মুহুর্তে বন্ধ করে দিলো তারাজ নামক তার বৈধ পুরুষ। মিলিয়ে দিলো ওষ্ঠের সাথে ওষ্ঠের ভাঁজ।মিশে গেলো দুটি দেহ। মত্ত হলো নতুন এক খেলায়।যার কামনা আজীবন একজন মানব ও একজন মানবীর মাঝে থাকে। পূর্ণ হলো ভালোবাসার ষোলোকলা।দু দু হাতে চার হলো,দেহের সাথে দেহের খেলা চলতে র‌ইলো।
---------------------------------------------------------------
আজ সারাদিন ক্লাব থেকে ঘর,ঘর থেকে নির্বাচনী কেন্দ্রের আশপাশ করেই সময় কাটলো সকল প্রার্থীর ন্যায় তারাজের‌ও। ইতিমধ্যেই সতন্ত্র প্রার্থীকে ফোন করে অযথাই শুভেচ্ছা জানিয়েছে।আরো গোপন কিছু কাজ সেড়েছে।
তিন ঘণ্টা ঘুমানোর পরিকল্পনা থাকলেও অত ঘুমানোর সুযোগ আর হয়নি। আফনূরের সাথে সময় কাটিয়ে নিজের তৃষ্ণা মিটাতেই ঘড়ির কাঁটা সোয়া আটটায়। প্রথম বারের মতো হওয়ায় এরপর থেকে আফনূর লজ্জায় তার সাথে আর দৃষ্টি মেলায়নি।তবে তাতে তার কি! সে তো এরপরেও আফনূরের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে।আর তা দেখে যখন আফনূর লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে রাখে তাতে সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তো।তার হাসির ঝংকারে পুরো খন্দকার বাড়ি আন্দোলিত হচ্ছে। সন্তানের সুখেই পিতা-মাতার সুখ। তারাজের সুখেই এখন তার আম্মা সুখী। নিজের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে তাতেই যদি স্থির থাকতো তবে নিশ্চয়ই ছেলের এই প্রাণবন্ত হাসির দেখা মিলতো না। দিনশেষে তিনি তার সন্তানের খুশিতেই খুশি। মনে মনে আম্মা বললেন আলহামদুলিল্লাহ।
রাত থেকে শুরু হলো ভোটের আসল আমেজ।সকল প্রার্থীরা নিজ নিজ ক্লাব ঘরে,দলীয় ক্লাবে জড়ো হলো। দলমত নির্বিশেষে সকল প্রার্থীরা একত্রিত হলো ভোট কেন্দ্রের আশেপাশে যদিও কেন্দ্র প্রার্থীদের যাওয়া আপাতত নিষিদ্ধ কিন্তু সব প্রার্থীর কর্মীরা সরব হয়ে আছে।যাতে কোনরকম হাঙ্গামা না হয়। কিন্তু এদেশের নির্বাচন হবে আর তাতে রক্ত ঝড়বে না তা কি আদৌও সম্ভব?
বাড়িতে বসার ঘর,বাইরের অফিসিয়াল ক্লাব ঘর কিংবা অফিস কক্ষ করে করে।এভাবেই সময় কাটছে তারাজ সহ পুরো মিষ্টার খন্দকারদের।তার সাথে যোগ দিয়েছে তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী, স্থানীয় দলীয় নেতৃবৃন্দ থেকে সমর্থকবৃন্দ।
অন্দরে রয়েছে মহিলা সদস্যরা। আফনূরের খালাম্মি,মা ও এসেছে।রেজ‌ওয়ান সাহেব আসেন নি।তিনি নিজের এলাকায়‌ই জামাইয়ের হয়ে যথা সম্ভব কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই সাভারে তার আশেপাশে ছড়িয়ে গেছে তারাজের সাথে আফনূরের বিয়ের বিষয়টি।তাই কারো কারো চোখের বিষের ন্যায় ঠেকলেও কারো কাছে বেশ সমাদার পাচ্ছে। তিনি নিজ উদ্যোগেই জামাইয়ের সাথে পরামর্শ করে নিজস্ব কিছু ছেলে ভাড়ায় খাটাচ্ছে কেন্দ্রের আশেপাশে থাকতেই।যেকোন প্রয়োজনে তারা যেন সতর্ক, সচেতন থাকে।
কেরানীগঞ্জে আছে তারাজের নিকটাত্মীয় তাছাড়াও আছে নিজস্ব কর্মী থেকে সমর্থকদের মধ্যে একঝাঁক তারাজ পাগলা।
কামরাঙ্গীরচরে উপস্থিত তারাজ স্বয়ং নিজেই।তার সাথে স্থানীয় তিন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর।অন্যান্য নেতাকর্মীরা।চা পান থেকে সিগারেট,রাতের খাবারের ভরপুর ভুড়িভোজের আয়োজনে ছিলো খাস কাচ্চি বিরিয়ানির বন্দোবস্ত।রাতের মধ্যিভাগে একদল রেখেছে হালকা এ্যালকোহলের ব্যবস্থা।
কেউ কেউ দোয়ায় সামিল হচ্ছে। বিশেষ করে ঘরের মহিলা বৃন্দ সবাই দোয়ায় রেখেছে তারাজ বিজয় কামনা। আম্মা সিজদায় পড়ে আল্লাহর কাছে ছেলের জন্য জয় চাইছে তার পাশেই আছে ভাবী এমপির নব্য বিবাহিতা স্ত্রী আফনূর রেজ‌ওয়ান।তার পাশেই বসে দোয়া, বিভিন্ন আমল পালন করছে আফিয়া নূরন্নাহার ও তার বড় বোন আলেয়া খালাম্মি। ইতিমধ্যেই আফিয়া নূরন্নাহার জামাইয়ের জয়ের উদ্দেশ্য নিয়ত করেই বলেছেন আল্লাহর দরবারে নফল রোজার নিয়ত পালন করবেন যদি তার কন্যার স্বামী এবার বিজয়ী হতে পারে।
সারারাত মহিলাদের কাটলো ইবাদতে আর পুরুষদের কাটলো নানা কুটনৈতিক আর রাজনৈতিক আলাপে। তারাজ কোথাও স্থির থাকতে পারছে না। এদিকে খবরে বারবার দেখাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় সিল মারা ব্যালট পেপার ভর্তি ব্যালট বাক্স। আবার কোথাও ইতিমধ্যেই প্রার্থীকে বাতিল বলে ঘোষণা করা হচ্ছে তার মাঝেও সবচেয়ে বেশি দেখানো হচ্ছে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া খবরটা।যাতে সবার চোখ ছানাবড়া হলেও নির্লিপ্ত আছে ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার।
সাময়িক সময়ের জন্য খোলা ক্লাবের একপাশে লাগানো বড় পর্দায় দেখানো খবরে আপাতত ভাসছে,
“ জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার কেইসে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।গত বিফ্রিংৎয়ে পুলিশের মিডিয়া সেন্টার বলেছিলেন উনারা জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার ঘনিষ্ঠ কারো থেকে খবর পেয়েই উনাকে গ্রেফতার করেন। আজ সেই তথ্যের তথ্যদাতার'ই  লাশ উদ্ধার করা করলো পুলিশ জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার অবকাশ যাপনের তৈরি করা অবকাশভবন।
জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া বিগত কয়েক বছরে সরকার দলীয় একজন সৎ নিষ্ঠাবান ও সাহসী কর্মী ছিলেন।ছিলেন কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদের তালিকায়। স্থানীয় যুবলীগের সভাপতিত্ব করেছিলেন শেষ কমিটিতে। কিন্তু বছর খানেক আগেই হুট করেই দল পরিবর্তন করে বিরোধী দলে নাম লেখান এরপর থেকেই উনার নামে ভেসে আসে নানা গুঞ্জন।
গতকাল গ্রেফতারের সময় তিনি বারবার বলেছিলেন এটা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নীল নকশা কেবল।দল পরিবর্তন করে সত্য এবং সততার দলে নাম লিখিয়েছেন দেখে তার পূর্বের দলীয় লোকেরা তার সাথে এমন গর্হিত কাজ করছেন।
জাহাঙ্গীর আলম ভুঁইয়ার কথার ঘোর প্রতিবাদ করে সরকার দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি বলছে ভিন্ন কথা।তিনি জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার কথাকে কটাক্ষ্য করে বলছেন দলে থেকে কোনভাবেই অসৎ এবং অরাজনৈতিক কার্যে সফল হচ্ছিলো না এবং দলীয় প্রধান স্নেহ করে তার ভুলকে বারবার মাফ করে দিচ্ছিলো তবুও শুধরানোর নাম গন্ধ না দেখায় তাকে কোন পদে বহাল রাখবে না বলে ঘোষনা করেন।এর মধ্যেই বিরোধীদলীয় প্রস্তাব পেয়ে দীর্ঘ দিনের দল পরিবর্তন করে।এতেই বোঝা যায় এত এত পয়সা কামানোর রহস্য। কোথায় থেকে আসে এত এত অর্থ কি দিয়েই বা এমন অরাজনৈতিক কান্ড ঘটায়।আমরা আবারও বলছি বর্তমান জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার সাথে সরকারের কোন সম্পর্ক নেই। তিনি বর্তমানে বিরোধীদলীয় নামে যেই ভঙ্গুর একটা দল আছে যাদের না আছে অস্তিত্ব আর না আছে কোন সত্ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তিনি সেই দলের অংশ। এবং তা বোধহয় সমগ্র দেশবাসী জানে।আমরা তার দ্বারা সম্পন্ন হ‌ওয়া সকল গর্হিত কাজে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে প্রসাশনের নিকট যথাযোগ্য পদক্ষেপ নিতে বলছি।
জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার সহকারীর লাশ তার‌ই অবকাশভবন থেকে উদ্ধার করলো পুলিশ।ফোন দিয়ে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার সকল তথ্য ফাঁস করার পর থেকেই নিখোঁজ ছিলো সে।তার মোবাইল লোকেশন ট্র্যাক করেই পুলিশ তার লাশের হদিস পায়। এরপর সন্ধান চালানো হয় তার বিরুদ্ধে আর কি কি অভিযোগ আছে
আপাতত এই অবধি.... ভবিষ্যত জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার জন্য কি রাখছে তা আল্লাহ ভালো জানেন!
-----------------------------------------------------------------
ভোটের দিন সকাল দশটা.....
ঘরে ঘরে চলমান টেলিভিশনে ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেলের খবরের খন্ডাংশ!
উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে ভোট গ্রহণ। ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সব কেন্দ্রেই ভোটাররা আনন্দে ভোট দিচ্ছেন নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে ।
ঢাকার ১৭ আসনের ভোট গ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে। সরকার দলীয় প্রার্থী ও বিরোধীদলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে বাকবিতন্ডা থেকে মারামারির ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে ঐ এলাকা। স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত এস আই,ও নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত হয়ে ভোট গ্রহণ বন্ধের ঘোষনা দেন। এদিকে সেই ঘটনার জেরে দুই দলের প্রার্থীদের মধ্যে চলছে তুমুল তর্ক বিতর্ক। এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে বিশাল ক্ষোভ।কেধ তারা অন্যের ভুলের খেসারত দিচ্ছে তা জানতে চেয়ে নির্বাচন কমিশনের নিকট শোকজ নোটিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
হাজারীবাগ একটি কেন্দ্র থেকে সিল মারা ব্যালট বাক্স ভর্তি জব্দ করেছে স্থানীয় জনগন।
চলতে থাকবে এ ধরনের খবর আজীবন যতদিন এ দেশে নির্বাচন নামক প্রহসন চলবে.......
“ ভাই ওরা তো কেন্দ্রে ঢুকতে দেয় না।শালার বাচ্চারা বেশি বাড়াবাড়ি করতাছে ভাই।আপনে হুকুম দিলে ঘাড় থেকে ধরটা আলাদা ক‌ইরা দেই। কত্ত বড় সাহস ইব্রাহীম ভাইয়ের পোলাপাইনরে ঢুকতে দেয় না।"
 অপরদিক থেকে তারাজ কি বললো বোঝা গেলো না তবে ফয়সাল ঠান্ডা হয়ে গেল। ইশারায় নিজের সাথে আনা ছেলেদের এখান থেকে সরে পড়তে বললো। ঐদিকে পোলিং এজেন্টদের মাঝে আপাতত কিছুটা উত্তেজনা বিরাজ করতে দেখা গেল।ভোটার উপস্থিতি মোটামুটি ভালো।খুব কম‌ও  না আবার খুব বেশিও না। অবশ্য ভোটার দিয়ে কি হবে যদি ভোট দেওয়াই হয়ে যায়।


পর্ব ৩১


উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হলো এবারের ভোট উৎযাপন! সকাল থেকে শুরু হ‌ওয়া ভোট প্রদানের কার্যক্রম সমাপ্তি হয় বিকেল পাঁচটায়; এরপর থেকে চলছে ভোট গণনার কাজ। কেন্দ্রের বাইরে উচ্ছাসিত জনতার ভীড়।তার মাঝে মাঝে রয়েছে বিভিন্ন দলের সমর্থক, কর্মী,নেতাবর্গদের ভীড়।
তারাজ আপাতত নিজ ড্রয়িং রুমের সোফার নিচে বসে মায়ের কোলে মাথা রেখে খবর দেখছে। চিন্তা অস্থিরতা সব মিলিয়ে সত্যি‌ই এক অন্য রকম অনুভুতি জেঁকে বসেছে তার মধ্যে।সব পুরুষ মহল বাইরেও হলেও তারাজ এই মুহুর্তে নিজের জননীর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি অনুভব করলো যার কারণে হুট করেই ভেতরে চলে আসছে। আম্মা নিজের শক্ত মনের কঠোর ছেলেটাকে এমন দেখে নিজেও কিছু সময়ের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। এরপর মনে করলেন এই অস্থিরতা , দুশ্চিন্তা তিনি বিগত পঁয়ত্রিশ বছর ধরেই করছে।
“ বিভিন্ন কেন্দ্রের ভোট গণণা সম্পন্ন করে তার বেসরকারি ফলাফল ঘোষিত করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।জাল ভোটের অভিযোগে এক প্রার্থী পদত্যাগ করেছেন আজকের নির্বাচনে।
ইতিমধ্যেই আমার কাছে এসে পৌঁছেছে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফলের তালিকা।
ঢাকা তিন আসনের ৬২৩২৩৪ জন ভোটারের মধ্যে থেকে ৪২০০৯৯  ভোট নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিরোধী দলীয় আবদুল্লাহকে হারিয়ে এবারের সাংসদ হলেন নকিবুল্লাহ। স্বতন্ত্র প্রার্থী পারভেজ পেয়েছে ৯০১১ ভোট! ৮৮০০১ টি ভোট। অনেক ভোট বাতিল বলে গণ্য হয়েছে।
নকিবুল্লাহর ভক্ত সমর্থকদের মাঝে চলছে তুমুল উচ্ছাস।যদিও আজকের ভোট নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়ে গেছে।
ঢাকা দুই আসনের ফলাফল‌ও ঘোষনা করা হচ্ছে,আমরা এখন সরাসরি যুক্ত হচ্ছি আমাদের সেখানের সহকারী সাথে।
ঢাকা ২ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার, জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কালামের লড়াই এবার সমাপ্ত হলো‌। ৫৫৮৯৫৭ ভোটারের মাঝে পুরুষ ভোটার ২,৮৯,৪৫৫ , নারী ভোটার ২,৬৯,৪৮৯ জন। এর মধ্যে ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার পেয়েছে ২,৮৩,০৭০ ভোট ,তার নিকটবর্তী প্রতিদ্বন্ধী স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কালাম মাত্র ৪০,১০০ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলেন।তিনি পেয়েছেন ২,৪২,৬০০ ভোট।
জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া বিগত রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং সাম্প্রতিক আইনি জটিলতার কারণেই হয়তো একেবারেই মুখ থুবড়ে পড়লেন।তিনি পেয়েছেন সর্বমোট ৩৩,০২৫ ভোট।
৩৭০ টি ভোটের মধ্যে ১০০ অধিক ভোট নষ্ট এবং ২৭০ এর মতো ভোট পড়েনি।
বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয়ী এই প্রার্থীকে নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। বারবার দুস্কৃতিকারীদের আক্রমনের হাত থেকে‌ও ফিরে এভাবে জয়ী হ‌ওয়াতেও আনন্দ উৎসব উৎযাপন করছে তার সহকর্মী, অনুরাগীরা।তাতেও পাচ্ছেন সকল শ্রেণীর মানুষের ভালোবাসা।আমরাও তাকে জানাই আমাদের টেলিভিশনের তরফ থেকে শুভেচ্ছা। আশাকরি নিজ আসনের জনগণের মাঝে নিজেকে যোগ্যতা দিয়ে প্রমান করতে পারবে।
ঢাকা দুই আসনের আগামী পাঁচ বছরে অভিভাবক মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার! তার সমর্থক সহকর্মীদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ থেকে উল্লাস আয়োজন চলছে।আমরা সেখান থেকে যাচ্ছি ঢাকা ১৭ আসনের ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত আমাদের সহকর্মীর কাছে...”
টেলিভিশনের পর্দা থেকে জানার আগেই কেন্দ্র থেকে খবর চলে আসছে।তারাজের বাড়ির সামনে আতশবাজি থেকে পটাকা ফুটানো হচ্ছে তার সাথে ঢোল, বাঁশি,মাইক নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েছে তার ভক্তকুল!
আম্মা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে দুই রাকাত নামাজ পড়তে চলে গেলেন।তারাজ আম্মা গালে আদুরে গাল ঘষে বললো,
“ সব তোমার আর আব্বার দোয়ার ফল আম্মা! তোমরা ছাড়া এটা কখনোই সম্ভব হতো না।"
আফনূর দুর থেকে তারাজের খুশি দেখছে।তার চোখেমুখেও খুশির নোনা জল।সেই সকাল থেকেই তারাজের ছটফটানি দেখেছে।দেখেছ এতদিনের পরিশ্রম! বিরবির করে বললো, 'আলহামদুলিল্লাহ।' 
“ কনগ্রাচুলেশন ভাই ”
খুশিতে মাতোয়ারা তাজিশ ছুটে এলো তাজিশ‌। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে লাফাতে লাগলো।তারাজ ভাইয়ের পাগলামিতে হাসতে থাকলো। সেই পরশু  থেকেই সে ভাইয়ের আশেপাশে আছে। সারাদিন মুরাদের সঙ্গে থেকেই ভাইয়ের সকল কাজে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করেছে। তারাজের খুব ভালো লাগলো ছোট্ট ভাইয়ের এই উচ্ছাস, উল্লাস, আনন্দে।
পরবর্তী মুহূর্তগুলো আনুষ্ঠানিক বিজয় উৎসবে কাটলো।
বিভিন্ন জায়গা থেকে শুভেচ্ছা বার্তা,দলীয় শুভেচ্ছা বার্তা, সাংগঠনিক শুভেচ্ছা বার্তা থেকে শুরু সব রকমের প্রতিষ্ঠান থেকে ফুলের তোড়া পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হলো।তার সাথে এলাকায় আশেপাশে মিষ্টি বিতরণ করলো।নিজ বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে নিজের ভোটারদের উদ্দেশ্য আরো নানা প্রতিশ্রুতি দিলো।
এর মধ্যেই শোনা গেল বড়গ্রাম স্কুল কেন্দ্রে বিরোধী দলীয় ছেলেদের সাথে পোলিং এজেন্টদের হাতাহাতি শুরু হয়েছে। অভিযোগ দায়ের করা হলো তারা দুর্নীতি করেই জিতিয়ে দিয়েছে।তারাজ ভাবলো যাবে কিন্তু এই মুহূর্তে তার হাতে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা নেই তাই গেলো না।তবে ফোন করে থানায় নিজের ক্ষমতা জাহিরে বাদ রাখলো না।ওসি সাহেব‌ও জ্বী স্যার স্যার রব তুলে মুখে ফ্যান তোলার চেষ্টা করলো।রাতটা যেন চাঁদ রাতের চেয়েও বেশি উল্লাসিত হলো।
রাজনৈতিক সংগঠনের সকল নেতাকর্মীর সাথে নানা মিটিং, আনন্দ উৎযাপন শেষে ঘরে ফিরলো রাত আড়াইটার‌ও পরে! আফনূর তখন ঘরে বসে কিছু একটা করছিলো। আম্মা ততক্ষণে ঘুমে। আব্বাকে মাত্র‌ই ঘরে ফিরেছে,সেও এখন নিশ্চয়ই ঘুম দিবে।তাজিশ‌ও মাত্র'ই নিজের ঘরে গেল।সবাই যার যার ঘরে। আফনূরকে দেখে এক চিলতে হাসি দিলো।যাতে ছিলো ভরপুর পূর্ণতার তৃপ্তি।কাছে গিয়ে দেখলো আফনূরের হাতে ওজিফা যেটাতে সে আপাতত সুরা ইয়াসিন পাঠ করছে!খাটের উপর আসন দিয়ে বসে কোলের উপর রেখে মনোযোগ সহকারে পড়ছে।দরজার খট শব্দে সেদিকে তাকালেই চোখাচোখি হয়ে তারাজের সাথে।তারাজ নিজের হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে আফনূরের কাছ ঘেঁষে বসলো। আফনূর পড়া থামিয়ে সুতো দিয়ে চিহ্ন করে ওজিফা বন্ধ করে দিলো।তারাজ মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলো,
“ ঘুমাওনি এখনও?"
“ আপনাকে বাইরে রেখে ঘুমাই কি করে?"
হাস্যোজ্জোল প্রাণবন্ত উত্তর। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আফনূর।তারাজ মুচকি হেসে ঘড়িটা আফনূরের সামনে রাখলো। কিছু সময় একে অপরের দিকে তাকিয়ে র‌ইলো। দু'জনের ঠোঁটে‌ই বিরাজ করছে হাসি, একজন মুচকি হাসছে তো আরেকজন লজ্জায় আড়ষ্ট স্নিগ্ধ হাসি।ভেজা ভেজা গোলাপী ঠোঁটের হাসিতে প্রাণ জুড়িয়ে গেল তারাজের।দু হাত দুদিকে প্রসার করে ইশারায় ডাকলো বুকের মাঝে। মুহূর্তে আফনূর ঝাপিয়ে পড়লো। যেন এত সময় এটার‌ই অপেক্ষা‌ ছিলো।
মুচকি থেকে চ‌ওড়া হলো হাসির রুপ। আফনূর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তারাজকে যেন ছেড়ে দিলেই চলে যাবে। আবেগ আহ্লাদে আপ্লুত হয়ে বললো,
“ শুভেচ্ছা‌ প্রিয়! আল্লাহ আপনাকে সবসময় বিজয়ী করুক!"
“ শুকরিয়া প্রিয়তমা; সবসময় সৎ উপদেশ দিয়ে আমার পাশে থাকার আকুল আর্জি কবুল করার জন্য!”
“ আপনার সেবায় নিজেকে আজীবনের জন্য উৎসর্গ করেছি,শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ না করে কোনদিন ছাড়বো না আবার‌ও ওয়াদা করছি।"
“ আমিও করছি, জীবনের অন্তিম পর্বেও আপনি আমাকে নিজের সান্নিধ্যে পাবেন,যদি আগে চলে যাই তবুও আমার ভালোবাসা আপনাকে ছাড়বে না।
- ভালোবাসি প্রিয় বিবিজান!"
তারাজের শেষ কথায় আফনূর চুপ হয়ে গেল।কি সুন্দর করে তারাজ ওকে ডাকে! পুরো পরিবারের, নিজের দলীয় ছেলেদের সামনেও নুরজান বলে সম্বোধন করে। পরিস্থিতি, পরিবেশ আফনূরের প্রতি তারাজের ভালোবাসা পরিবর্তন করতে পারে না।এই মানুষটা নিজ সহধর্মিণীকে অসম্ভব ভালোবাসার ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে।এই মানুষটাকে রাজনীতির কালো অধ্যায়ের মাঝে পড়তেই দিবে না সে।অতি ভালোবাসায় সিক্ত যার অন্তর তাকে কোনভাবেই বিষাক্ত হতে দিবে না। একজন স্ত্রী হিসেবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছে নিজ স্বামীকে সঠিক পথে আনতে সে তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে ইনশাআল্লাহ।মনে মনে বিরবির করে নিজের সাথেই ওয়াদা করলো আফনূর।তারাজ হয়তো একটু কষ্ট পেলো আফনূরের প্রত্ততর না পেয়ে।কি জানি আফনূর বুঝলো কিনা? ঠিক মিনিট পেরুতেই তারাজের পিঠ খামচে ধরে লোমস বুকে মুখ গুঁজে পর মুহূর্তেই ঘন ঘন চুম্বনে সিক্ত করে দিলো স্থানটি। তারাজের মেঘ নামা আকাশে হঠাৎ সুখের বর্ষন ঘটলো। ঈষৎ কালো হয়ে যাওয়া বদন ঝলমলিয়ে উঠলো। ঠোঁটে আটলো চ‌ওড়া পরম প্রাপ্তির তৃপ্তি, চকচকে পরিপাটি দন্ত কপাটির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে হেঁসে দিলো। শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো পত্নীকে। আফনূর মুখটা কানের কাছে নিয়ে নিচু শব্দে বললো,
“আমিও ভালোবাসি প্রিয় স্বামী!"
বলেই আবারও লজ্জায় নিজের মুখটা লুকালো লজ্জা পাওয়া পুরুষের বুকেই। আবারও একে অপরের সাথে মিশে থাকলো। অনেক সময়, অনেক মুহূর্ত।কোন কথা নয়,কোন অক্ষর নয়। শুধু দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ,পাখার ভনভন শব্দ আর বারান্দা থেকে বাতাসের চোটে সৃষ্টি পাতার নড়চড়ের শব্দ!
“ চলেন নামাজ পড়ে নেই। বলেছিলেন আমাকে সাথে নিয়ে প্রতিদিন তাহাজ্জুদ পড়বেন! তাই আমিও একা পড়িনি!"
“ হুম! উঠো!"
আফনূর তারাজকে ছেড়ে দিলো।ধীর পায়ে উঠে তারাজের প্রয়োজনীয় সব নামিয়ে দিলো।
দু'জন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নামাজ পড়ে নিলো। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলো।
এরপর বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। মিনিট পাঁচেক দুজনে টুকটাক কথা বললো। কথা বলতে বলতেই তারাজ ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু ঘুমালো না আফনূর। ঘুমন্ত স্বামীর দিকে চেয়ে র‌ইলো এক ধ্যানে।ভরাট চেহারার মানুষ,চাপ দাড়ি এখন অনেক ঘন আর বড় হয়েছে, গোঁফ গুলো বেশ বড় বড় লাগছে। খারাপ লাগছে না। আফনূরের গোঁফ খুব একটা পছন্দ নয়, বিশেষ করে বড় বড়! কিন্তু তারাজকে দেখে মনে হচ্ছে পুরুষের সৌন্দর্য দাড়ি গোঁফেই। বিশেষ করে এমন ভরাট আর সুস্বাস্থ্য চেহারার পুরুষদের।কেমন রাজকীয় রাজকীয় জৌলুস ফুটে উঠেছে।এই লোক রাজনীতিতে আসবে না তো কে আসবে? রাজনীতি তো এদের মতো লোকের জন্য'ই।চেহারা‌ই তো কেমন শাসক শাসক ভাব,নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য'ই  আল্লাহ তাকে গড়েছে। সর্বাঙ্গে নেতা নেতা আদল!
তারাজকে দেখতে দেখতেই এগিয়ে গেল তারাজের দিকে। আরও একটু কাছ ঘেঁষতেই তারাজ নিজের বাম হাত বাড়িয়ে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। আফনূর লজ্জা পেলো। তারাজ তাহলে কি ঘুমায়নি। হয়তো ঘুম এখনও প্রখর হয়নি।আফনূরকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে আফনূরের গলায় মুখ গুঁজে শক্ত করে জড়িয়ে রাখলো। আফনূর সম্মতি ধাঁচে নিজেও জড়িয়ে ধরলো।আর কল্পনা করলো গত সকালের কথা।কাল সকালে যখন দুজনের মাঝের দূরত্বগুলো একদমই ঘুচে গেল তখন আফনূর তারাজের কাছে কিছু জিনিস চেয়েছিলো,যা তারাজ দেওয়ার ওয়াদা তো করেনি কিন্তু কাজে করে দেখিয়েছে।
ফ্ল্যাশব্যাক.....
তারাজের বুকের উপরে নগ্ন আফনূর যখন শাহাদাত অঙ্গুলির ঢগা দিয়ে আকিবুকি করতে করতে রঙিন স্বপ্নে বিভোর তখন তারাজ নিজের বুকের সাথে আরও একটু চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলো,
“ এই সুন্দর উপহারের জন্য কি উপহার দিবো আপনাকে বিবিজান?"
লজ্জা রাঙ্গা আফনূর কিছু বললো না।তারাজ বুক থেকে সরিয়ে নিজের বামপাশে শুইয়ে আফনূরের উপর অর্ধ চড়ে আদুরে স্বরে বললো,
“ এত সুন্দর একটা মুহূর্তের জন্য অবশ্যই তুমি কিছু প্রাপ্য। তাছাড়াও বাসরে ব‌উকে নতুন গিফট দিতে হয়, সেটাও তোমার প্রাপ্য।আমি তো কাল দেইনি।আজ দিচ্ছি; বলো কি চাই? যাই চাবে তাই পাবে!"
“ কাল তো উপহার দিলেন‌ই!"
আফনূর নিজের অনামিকা আঙ্গুল দেখিয়ে বললো,যেটাতে জ্বলজ্বল করছে সেই আংটিটা।তারাজ আফনূরের আঙ্গুলে আংটির উপরেই চুমু খেয়ে বললো,
“ এটা তো আমার জীবনে আসার জন্য। কিন্তু এমন একটি সুখ দেওয়ার জন্য অবশ্যই ইউ ডিজার্ভ এ্যা গিফট।টেল মি হুয়াট ইউ ওয়ান্ট নুরজান?"
আফনূর কিছু নিজের আঙ্গুলের দিকে চেয়ে র‌ইলো। এরপর তারাজের চোখে চোখ রাখলো।তারাজ আরও মিশলো আফনূরের সঙ্গে। হাতগুলো অবাধ্য হয়ে ছুঁতে থাকলো আফনূরের নরম অঙ্গগুলো। আফনূর নিজের ডান হাত গলিয়ে দিলো তারাজের বাম বাহুর নিচ দিয়ে। আলগোছে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে নিলো।তারাজ নিজের মুখটা আফনূরের মুখের কাছাকাছি নিয়ে নেশালো কন্ঠে বললো,
“ জান চাইলে তাও হাজির! একবার বলেই দেখো‌।"
কথা শেষ করেই আফনূরের কোমল ঠোঁট দুটো আবারও নিজের আয়ত্তে নিলো। আফনূর স্বামীর তালে তাল মিলিয়ে তাকে সঙ্গ দিলো। মিনিট পাঁচ পরে তারাজ ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরালো।ঘন ঘন শ্বাস প্রক্রিয়ায় উতলা দুজনের দেহ‌ই! আফনূরের বক্ষদ্বয়ের উচাটনের তালে ঢেউ খেলছে তারাজের দেহ‌ও।নাকের সাথে নাক ঠেকিয়ে ঘনঘন নিশ্বাস ছাড়ছে। ঠোঁটে ঠোঁট বারি খাচ্ছে , এমতাবস্থায় আফনূর বললো,
“ আমি চাই আপনি সলিড পন্থায় জিতুন। কোনরকম কারচুপিতে নয়!"
চমকে তাকালো তারাজ। মুহূর্তে চোখ মুখের প্রতিক্রিয়া বদলে গেল। আফনূরের উপর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলো। আফনূর থমকালো, কিছুটা 
ভয় পেলো। তারাজ কম্বলের নিচে হাতিয়ে নিজের জন্য কিছু খুঁজলো।না পেয়ে কম্বলের এক কোনা জড়িয়ে খাটের পায়ার কাছে থাকা নিজের পোশাক তুলে পড়ে নিলো। আফনূর উঠে বসে কম্বল দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিলো। তারাজের মুখোভঙ্গিতে ভয় করতে শুরু করলো।তারাজ উঠে বাথরুমে ঢুকে গেল। অনেক সময় লাগিয়ে গোসল সম্পন্ন করে বের হলো। ততক্ষণে আফনূর নিজের পোশাক পড়ে নিয়েছে।তারাজ বের হয়েও আফনূরের দিকে তাকালো না। আফনূরের গাল বেয়ে এর মধ্যেই বর্ষণ আরম্ভ হলো।হাতের মুঠোয় হাত রেখে অবিরত কচলাতে থাকলো। আফনূরের নাক টানার ফ্যাচফ্যাচ শব্দে তারাজ ধাড়াম করে আলমারির দরজা লাগালো।আচানাক এত তীব্র আওয়াজে চমকে গেল আফনূর। আফনূরের চমককে আতংকে পরিণত করে তারাজ আফনূরের সামনে এসে টানটান বুকে দাঁড়িয়ে গম্ভীর, ভারি কন্ঠে শুধালো,
“ যদি হেরে যাই?"
তারাজকে নিজের সামনে এমন ভাবে আসতে দেখে আগেই আফনূর চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলেছিলো। বন্ধ চোখের পাপড়ি ভিজিয়ে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। তারাজের কথায় বন্ধ আখির পর্দা তুললো।ঢোক গিলে দৃঢ় কন্ঠে উত্তর দিলো,
“ আমি গর্বে বুক উঁচিয়ে বলবো আমার স্বামী সৎ ছিলো।লড়েছে এতেই অনেক,জেতার জন্য অসাধু হয়নি।"
তারাজ আফনূরের কথায় আর কোন প্রতিক্রিয়া করেনি।চলে যায় গায়ে শার্ট জড়াতে জড়াতে। আফনূর তারাজের নির্লিপ্ততায় হতাশ হয়। কষ্ট পায়। আবার নিজেকেও ধিক্কার দেয়! সে কিভাবে আশা করেছিলো তারাজ তার কথায় এত বড় সিদ্ধান্ত নিবে! তাদের সম্পর্কের আজ মাত্র একরাত গেল।এর মধ্যেই কেউ কি এতটাও গুরুত্ব পায়! কিন্তু তাও তার মনে হয়েছিল তারাজ তার কথা মানবে। তাই তো সুযোগ বুঝেই প্রস্তাবটা দিয়েছিলো। কিন্তু হলো কি? তারাজ তো রাগ করে তার থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিলো।
সে তো জেনেই তারাজকে বিয়ে করেছে।কোন রাজনৈতিক নেতাই এতটা সাধু হয় না যে নিশ্চিত হেরে যাওয়ার দুশ্চিন্তা নিয়েই নির্বাচনে নামবে যেখানে জয়ের সুযোগ হাতের মুঠোয় থাকে। সেখানে তারাজ তো রাজনীতির পোকা।তাকে নিয়ে তার দলের‌ও অনেক আশা। সুতরাং হার মানা তো তারাজের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়। 
তারাজ সারা সকাল পেরিয়ে দুপুরেও আফনূরের মুখোমুখি হলো না। আফনূর লজ্জায় অপমানিত বোধ করছে।তার সাথে যোগ হয়েছে প্রথম দিনেই স্বামীর থেকে বিরুপ হ‌ওয়ার মতো জঘন্য পরিস্থিতি।স্বামীকে নারাজ করার মতো অপরাধ-বোধেও কুঁকড়ে যাচ্ছে।
“ আফনূর চলো তোমাকে ছাদে নিয়ে যাই ,দেখো তোমার ভালো লাগবে!"
আফনূরের মন খারাপ দেখে তানহা ভাবলো হয়তো বাবা মা'কে মনে করছে তাই মন ভালো করার উদ্দেশ্যে কথাটা বললো।
“ প্ল্যান পরিবর্তন কর।সব স্বাভাবিক ভাবেই হবে! হারজিত যাই হোক আমি মাথা পেতে নিবো।"
***
“ যা বলছি তাই কর। সবাইকে ওয়ার্ণ করে দে যাতে কোনরকম বাড়াবাড়ি না করে।আমি‌ও দেখতে চাই এতদিনের পরিশ্রমের ফলাফল কি আসে! মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাতে পেরেছি।কতটা ভালোবাসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছি!"
**** 
“ হ্যা যা বলছি তাই কর!যাই হয় হোক। কোনরকম বিতর্কিত কাজে থাকবি না কেউ।"
“ হ্যা হ্যা ঐদিক আমি সামলে নিবো।তোরা এইদিকে খেয়াল রাখ।"
****
“ আচ্ছা রাখছি! আসসালামু আলাইকুম!"
আফনূর ছাদের চিলেকোঠার জানালার পাশেই ছিলো। তারাজের বলা সব কথাই কর্ণকুহুরে ধ্বনিত হলো। খুশীতে উপচে পড়লো আনন্দ অশ্রু।দু হাতে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠলো।ওখান থেকে সরে আসার জন্য পা বাড়াতেই শুকনো পাতার উপর পা পড়তেই মরমর শব্দে সতর্ক হয়ে গেল।জানালার পাশে এমন শব্দ পেয়ে তারাজ ফোন হাতে বেরিয়ে এলো।বাইরে আফনূরকে কাঁদতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ আজকেই টাংকি ফুরানোর ওয়াদা করেছো? আজীবন তো কত কারণ থাকবে কাঁদার জন্য তখন কোথায় পাবে পানি?"
“ এভাবে বলছিস কেন ভাই? বিয়ের পর এমন হয়! ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।"
“ মানে কি ঠিক হয়ে যাবে?"
আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলো বোনকে।তানহা ছাদের ঐপাশে ছিলো।কোন একটা গাছের মরা পাতা ফেলছিলো। আফনূর হাঁটতে হাঁটতে এদিকে চলে আসছে। তখনই শুনে ফেলছিলো।
তানহা এগিয়ে এসে তারাজকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ নিজের পরিবার ছেড়ে আসছে, একটু মন খারাপ তো করবেই। ধীরে ধীরে ঠিক সবার সাথে ভাব হলেই ঠিক হয়ে যাবে। ততক্ষণ এমন একটু আধটু কাঁদবেই!"
“ ও ওর পরিবারের জন্য কাঁদছে?সিরিয়াসলি!"
আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলো তারাজ। চোখেমুখে অবিশ্বাস। আফনূর ধরা পড়ে গেছে এমন ভাবে মুখ লুকালো।তারাজ ভ্রু কুঁচকে বিরবির করে বললো,
“ কাঁদার কারন যদি জানতি তুই নিশ্চিত আমাকে দু চারটা চড় থাপ্পড় দিতি। আহারে আমার সহজ সরল বোন।"
বর্তমান.... 
কল্পনার রাজ্য থেকে বেরিয়ে আফনূর তারাজের সাথে একদম লেপ্টে গেল। সেভাবেই ঘুমের দেশে পাড়ি দিলো।

পর্ব ৩২


বিয়ে উপলক্ষে নেওয়া আর নির্বাচনকালীন ছুটি দুটোই আজ শেষ হয়েছে।আজ থেকে আবারও কোর্টে চক্কর দেওয়া শুরু হবে আফনূরের।ভোট শেষ হ‌ওয়ার দ্বিতীয় দিন আজ! সকাল সকাল উঠে শ্বাশুড়ি মায়ের সাথে রান্না ঘরে গিয়ে সাহায্য করতে চাইলেও তিনি নেননি।
“ সকাল সকাল উঠেছো ভালো কথা! এখন গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত কাজ সেড়ে অফিসের জন্য রেডি হ‌ও।যদি বের হতে আরও সময় বাকী থাকে,তবে ছাদে গিয়ে একটু গাছগুলোর যত্ন নাও।মন ফ্রেশ থাকবে, কোর্টে গিয়ে শান্তি মাথায় কাজ করতে পারবে!"
শ্বাশুড়ির অমায়িক ব্যবহার আর বন্ধুসুলভ আচরণে মুগ্ধ আফনূর।তাও জোর করে হাত থেকে একটা থাল টেনে নিয়ে বললো,
“ আম্মা দেন,আমি অন্তত থালা বাটি ধুয়ে সাহায্য করি।" 
আম্মা আফনূরের হাত থেকে থালটা নিয়ে বেসিনে রেখে বললেন,
“ থাল ধোয়ার জন্য যদি ছেলেকেই বিয়ে করাই তাহলে দুই দুইটা বুয়া রাখছি কেন?আমি ছেলে বিয়ে করিয়েছি ছেলের সেবা যত্ন করার জন্য! তুমি শুধু তাই করো, আমি তাতেই খুশি। আমাদের দিকে তোমাদের তাকাতে হবে না।আমি তা চাইও না।"
 আফনূর তাও গেলো না। আম্মা আফনূরকে চোখ রাঙানি দিয়ে বললেন, “ যাও এখান থেকে ”
দোনামোনা করে বেরিয়েই যেতে হলো তাকে। রান্না ঘরের আশেপাশেও আর থাকতে পারলো না।
তানহাও রেডি হয়ে বসার ঘরে বসে কিছু একটা পড়ছে। এগিয়ে গিয়ে দেখলো তানহার হাতে আপাতত একটি ম্যাগাজিন।যাতে বিভিন্ন নামীদামী ব্র্যান্ডের পোশাকের শো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
“ এটা সুন্দর তাই না বলো?রিসিপশনে পড়ার জন্য ভালো একটা কালেকশন হবে!"
তানহা উৎসুক হয়ে ম্যাগাজিনের পাতাটা আফনূরের দিকে ধরলো, আফনূর চোখ বুলিয়ে সম্মত মতে বললো,
“ হ্যা তোমাকে সুন্দর লাগবে! আবহাওয়া অনুযায়ীও ঠিক আছে।নিতে পারো!"
“ তুমি পোশাক কেনার সময় আবহাওয়া‌ও দেখো?"
আফনূর তানহার আশ্চর্যের প্রত্ততরে হাসলো,হাসি মুখেই বললো,
“ হ্যা আপু।আমি আবহাওয়ার অবস্থা দেখেই পোশাক পড়ে বাড়ি থেকে বের হ‌ই। সুতরাং কেনার ক্ষেত্রেও সেটাই গুরুত্ব বেশি পায়!অযথা অতিরিক্ত কাপড় কেনার অভ্যাস আমার নেই!"
“ বাহ্,বেশ ভালো তো! অবশ্য তাতে আমার ভাইয়ের‌'ই ভালো।পয়সা বাঁচবে!"
তানহার কথায় আফনূর মুচকি হাসলো।তানহা আফসোস করে বললো,
“ তোমার দুলাভাইয়ের অবশ্য এ নিয়ে অনেক আফসোস। কিন্তু কি করবো বলো তো , আমার যা দেখি তাই ভালো লাগে!"
“ কিনো তো।এত টাকা বাচিয়ে কি হবে? আমি তো ভাবছি এখন থেকে আমিও প্রচুর কেনাকাটা করবো; আফটার অল আমি একজ এমপির ব‌উ!টেকাই টেকা হি হি হি হি.."
দুজনে একসাথে হেসে উঠলে।
“ এখানে কি নিয়ে এত হাসাহাসি চলছে?"
পেছন থেকে তারাজের গলার স্বর। দুজনেই সেদিকে তাকালো।তারাজ এগিয়ে এসে আফনূরের গা ঘেঁষে বসলো। আফনূর লজ্জা পেয়ে একটু সরে বসতে চাইলেই হাত চেপে ধরে।আরো একটু কাছ ঘেঁষে বসে।তানহা তারাজের বাহুতে চাপড় দিয়ে,
“ বড় বোন সামনে একটু ত লজ্জা রাখ!"
“ লজ্জা কেন পাবো? আমি কি চুরি করেছি! নিজের ব‌উয়ের কাছে বসছি তাহলে লজ্জা কেন পাবো!"
“ ভাইয়া তুমি আসলে দিনদিন লাগাম ছাড়া হচ্ছো?"
“ লাগাভ ছিলো কবে যে এখন ছাড়ছে? তোমার ভাই আজীবন‌ই লাগাম ছাড়া ছিলো!"
খাবারের জন্য চেয়ারে বসতে বসতে কথাটা বললেন ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার। তারাজ সেদিক ভ্রু কুঁচকে তাকালো। নতুন ব‌উয়ের সামনে তে তার ইজ্জতের ফালুদা হতে চলছে তা খুব ভালোই বুঝতে পারছে!
“ তোমার বিহেভিয়ার ঠিক করো বুঝেছো; যত্রতত্র নিজের মুখ দিয়ে বেফাঁস কথা বলবে না।এমপি হয়েছো তার ওজন বুঝতে হবে। শুধু বড় বড় ভাষনে জনগণের ভোট আদায় করলেই চলবে না তার জন্য কাজও কিছু করতে হবে।"
" সকাল সকাল আমার কোন ব্যবহারে আপনার ভদ্রতায় কাঁদা ছিটালো?"
আফনূর কাল থেকেই বুঝেছে এই বাবা ছেলের মাঝে সবসময় মতবিরোধ চলে। সুতরাং এ বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না।তবে মনোযোগী স্রোতার মতোই চুপচাপ শুনতে লাগলো,
“ তুমি মোতাহার হোসেনকে কি বলেছো?"
“ কি বলেছি?"
“ ভুলে গেছো?”
“ মনে রাখার মতো কিছু হলে অবশ্যই মনে রাখতাম!”
কথাটা বলে তারাজ আফনূরের পেছন দিয়ে কাঁধের উপর হাত রাখলো, ইসহাক আবদুল্লাহ দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,
“ ঠিক হয়ে বসো বেয়াদপ ছেলে! বাবা,বড় বোনের সামনে কেউ এভাবে বসে?"
তারাজের কাজে আফনূর লজ্জায় মাথা নত করেই রেখেছিলো। ইসহাক আবদুল্লাহর কথায় মনে হচ্ছিলো মাটিতে মিশে যেতে! কিন্তু তারাজের কোন হেলদোল দৃশ্যমান হলো না।সে উল্টো কাঁধে রাখা হাতটা শক্ত করলো। আফনূর চোখ তুলে সেদিকে তাকালো।ফের তাকালো তারাজের দিকে। তারাজের মুখ থেকে নির্গত শব্দে হা হয়ে গেল তার মুখটা।বড় একটা মশা ঢুকার জায়গা তৈরি হলো,
“ আপনি যখন নিজের বিবির পাশে বসেন তখন আমরা কি কিছু বলি? তবে আমার বেলায় কেন আপনি এত বিরক্ত হচ্ছেন! যদি বেশি হিংসে হয় তবে যান আপনার বিবিকে ডেকে এনে নিজের পাশে নিয়ে বসুন!"
তাজিয়া খাঁ হাতে করে কিছু আনছিলেন, ছেলে বেলাগাম কথায় তিনি হতভম্ব বনে গেলেন,হাত থেকে পড়ে গেল জিনিসটা। তাজিশ মায়ের পিছুই ছিলো।পরে যাওয়া জিনিসটা তুলে মায়ের হাতে দিয়ে বললো,
“ অভ্যাস করে নাও,এখন থেকে রোজ শুনতে হবে মনে হচ্ছে।যেইভাবে তোমার ছেলের মুখ খুলছে!"
তাজিয়া খাঁ ছোট ছেলের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো।তাজিশ দ্রুত কদমে হেঁটে চলে গেল।
“ শোন নিজের মুখকে সামাল দাও। একজন সাংসদের মুখ এত ছুটা ভালো না।"
“ আপনিও নিজের দৃষ্টিকে সামলান, পুত্র আর পুত্রবধূর রোমান্টিক দৃশ্যে চোখ যায় কেন?"
“ ইব্রাহীম। "
তাজিয়া খার মৃদু ধমকে তারাজের কথা বন্ধ হয়ে গেল।সে নিজ বাহুতে আবদ্ধ নারীর বড় বড় চাহনি দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? আর মুখ এতটা ফাঁক করে রাখার কি দরকার! মশা ঢুকে যাবে তো!"
কথাটা বলেই ডান হাত দিয়ে মুখটা বন্ধ করে দিলো। লজ্জা আরও বাড়লো, মাথা নিচু করে হাতের উপর হাত রেখে দিম আওয়াজে বললো,
“ এভাবে কেউ বাবার সাথে কথা বলে আপনাকে না দেখলে বুঝতাম‌ই না!"
“ যাক তাও আমাকে দেখেই বুঝেছো।অন্য কাউকে দেখোনি।এটাই তোমার জন্য উত্তম, বুঝতে পারলে যে আমি আসলেই অন্যদের থেকে আলাদা। আশাকরি এরপর থেকে কখনো আমাকে অন্য কারো সাথে মিলাবে না!"
“ আমি কখন মিলালাম?"
” মিলাওনি,তবে ভবিষ্যতে যে মিলাবে না তার কি গ্যারান্টি!"
এই দুই কপোত কপোতীর কথায় ব্যাঘাত ঘটালো তানহার বাচ্চা এসে,
“ মামী-মনি!"
সে চিৎকার করে দৌড়ে এসে আফনূরের কোলে বসলো।তারাজ খানিকটা ভ্রুদ্বয় বাঁকা করলো। এরপর একটু সরে বসে বিরবির করে বললো,
“ সব কটা আমার রোমান্সের দুশমন!"
হাসি ঠাট্টায় খাবারের পর্ব চুকালো। ইসহাক আবদুল্লাহ আল ছেলের সাথে কথা বলার সময় পেলো না।তবে তিনি কিছুটা বিব্রত হচ্ছেন ইদানীং ছেলের অহেতুক লাগামহীন কথায়। এই তো সেদিন বিচার দিয়ে গেল তাঁর কাছে,তারাজ নাকি তাকে বলেছে,
“ এত দেরি হয় কেনো আপনার? ব‌উ ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করে না? গোপনে নতুন বিয়ে টিয়ে করেছেন যার জন্য নয়া ব‌উ ছেড়ে মন আসতেই চায় না?"
“ ছিহ্ ছিহ্ কি বলছেন তারাজ বাবা? এসব কেমন কথা?"
কথাটা বলেই তিনি হাতের সহায়তায় গালে চাপড় মারলেন,যেন বড় গুনাহ করে ফেলছেন।তারাজ ভ্রুদয়ের মিলন ঘটিয়ে তীক্ষ্ণ নজরে সন্দিহান হয়ে বললো,
“ আপনাকে আমার ইদানিং সন্দেহ হয়, কেমন যেন! আপনি দাঁড়িতে কলপ লাগিয়েছেন!ইয়াম্মা আপনি তো নয়া ছাট‌ও দিয়েছেন। একদমই নিউ স্টাইল! এখন তো আমি নিশ্চিত আপনি অন্য কোথাও গুল খাচ্ছেন।"
মোতাহার হোসেন কথা বলবে কি? এই অহেতুক কথায় তিনি বিব্রত, লজ্জিত হচ্ছেন।তারাজ এভাবে উনাকে অপমান করতে পারলো? তীব্র অপমানিত বোধ করলেন। ইসহাক সাহেবের কথায় তার এই বেলাগাম ঘোড়াকে দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন তার ফল স্বরুপ প্রতিনিয়ত অপমানিত হচ্ছেন। এতটুকু ছেলে এত বয়স্ক একজন লোককে যা নয় খুশি বলে অপমান করে চলেছে।তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আর কোনভাবেই এই ছেলের সঙ্গ তিনি বরদাস্ত করবেন না।আজকেই বলবেন ইসহাক আবদুল্লাহর নিকটে হয় তাকে নতুন কিছু কাজ দিক নয়তো তিনি আজকেই এই কাজ থেকে পদত্যাগ করবেন!
___________________________________________
“ আমি বলছি তাই,এর বাইরে একটা কথাও আমি মানবো না! ”
“ আমি রিক্সা নিয়ে চলে যেতে পারবো! দরকার নেই গাড়ী নেওয়ার!"
“ ফয়সাল,এখন‌ই গাড়ী বের কর।তোর ভাবীকে একদম কোর্টে নামিয়ে দিয়ে তারপর কোথাও গাড়ী পার্ক করে বসে থাকবি!আসার সময় সাথে নিয়ে তারপর আসবি!"
আফনূরের কথাকে একদম এড়িয়ে গিয়ে ফয়সালকে আদেশ করলো। আফনূর করুন চাহনিতে তারাজের দিকে তাকালো, বললো;
“ শুনেন না বলছি তো আমি ঠিক রিক্সা দিয়েই সুন্দর করে পৌঁছে যাবো,হুড‌ও উঠিয়ে নিবো। তবুও গাড়ি নেওয়ার দরকার নাই!"
“ যাবে তো তুমি গাড়িতেই, নয়তো না।নাও ডিসিশন ইজ ইউর'স!"
আফনূর গাল ফুলিয়ে র‌ইলো। তারাজের হেলদোল হলো না।সে ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে,ডান হাত পাঞ্জাবির পকেটে,বাম হাতে বাম পকেটে, ডান হাত ডান পকেটের কোনা ধরে রেখেছে। আফনূর গাল ফুলিয়ে করুন চাহনি ফেলে তাকিয়ে আছে।
“ ভাবী আসেন!"
ফয়সাল বললো, আফনূর তারাজের দিকে তাকিয়ে ফুঁস করে শ্বাস ছাড়লো। আফনূরের মুখ দেখে তারাজের হাসি আসলো।মুখ টিপে হেসেও দিলো। আফনূর গাল আবার‌ও ফুলিয়ে ফেললো।
“ যাও!"
ঠোঁট উল্টে নিজের গায়ের কালো পোশাকটাকে ভালো করে ভাঁজ করে বাম হাতের উপর রাখলো। এরপর ব্যাগটাকে শক্ত করে ধরে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলো,
“ কি হয়েছে ?"
তাজিশের কথায় সেদিকে ফিরে তাকালো দু'জনেই!
“ তুই কি বের হচ্ছিস?"
হাতে হেলমেট কাঁধে অফিসিয়াল ব্যাগ; তাজিশ নিজ কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে এসে সদর দরজায় ফুলো গালের আফনূর আর নিরুত্তাপ ভাইকে দেখে প্রশ্নটা করলো,
“ হ্যা ভাই!
- তোমাদের মাঝে কি হচ্ছে?”
“ তেমন কিছু না!"
“ ভাবী গাল ফুলিয়ে রাখছে তার মানে নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে?"
“ হ্যা হতো, তবে পাত্তা দেইনি তাই আপাতত চিন্তা নাই।"
“ মানে?"
“ মানে তোমার ভাবী মনি রিক্সা দিয়েই যাবে,তার গাড়িতে এলার্জি আছে!"
“ নো!গাড়ী ছাড়া একদমই এলাও করা যাবে না!"
“ ভাইয়া তুমিও!"
“ সরি ভাবি মনি,এটাতে আমি তোমাকে একদম‌ই সমর্থন করতে পারছি না!এটা মেনে নাও! তোমার জন্য‌ই ভালো!"
“ বুঝেছি!"
আফনূর গাল ফুলিয়ে হাত ঝাড়া দিয়ে গটগট করে হেঁটে গেটের বাইরে চলে গেল।ওর গাল ফুলানো মুখ আর হাঁটার ধরণে দুই ভাই শব্দ করে হেসে উঠলো!
_________________________________________
মুঠোফোনের ভাইব্রেটে পকেট হাতড়ে টেনে বের করলো। জ্বলজ্বল করছে পর্দা যার উপরে ইটালিক হরফে দৃশ্যমান,
“ Received 2 message."
   আঙ্গুলের ডগার ছোঁয়া লাগতেই খুলে গেল বন্ধ ফোনের পর্দা। হোয়াটসঅ্যাপ থেকে আগত বার্তা বক্সে ঢুকতেই চোখ বন্ধ করে ফেললো, মুহূর্ত পেরুতেই রক্তিম আভায় ছেয়ে গেল শ্বেত অক্ষুকোটর।হাতের শক্ত চাপে ডিসপ্লেতে অগনিত চূর্ণ হলো। বিরবির করে বললো,
“ ইউ উইল রিগরেট ফর দিস.. বাস্টার্ড!

পর্ব ৩৩


“ সরি করিম ভাই,এ ব্যাপারে আমি আপনাকে কোন সদুপদেশ দিতে পারছি না!"
“ আমার মনে হয় আপনি নেতার সাথে কথা বললেই হবে!"
“ হবে না করিম ভাই! দল থেকে এবার কোন বিতর্কিত লোককে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে না। তাছাড়াও আমি আপনার হয়ে কথা বললে পরে দেখা যাবে আমার পজিশন‌ই নড়বড়ে হয়ে যাবে।আমি আপনাকে এই বিষয়ে আর কোন সহযোগিতা করছি না।আপনি দয়া করে এই বিষয়ে কথা বলতে চাইলে আমাকে আর ফোন দিবেন না!"
কথা শেষ করেই খট করে কেটে দিলো।তার সাথে মুহূর্তে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য নাম্বারটা ব্লক করে দিলো।
করিম আকন্দ; বিতর্কিত একটা দলের অন্যতম কর্মী যার অবদান অনস্বীকার্য তবুও.. 
রাজনীতি; এমন একটা শব্দ যার যথার্থ অর্থ উত্থাপন করা আসলেই সম্ভব নয়।তাই তো বিভিন্ন বিশ্লেষক, ইতিহাসবোদ্ধা কিংবা ঐতিহাসিক,সমাজ রচায়ক, বিশ্লেষক বিভিন্ন ভাবে রাজনীতিকে বিশ্লেষায়িত করেছে! তাদের অন্যতম কয়েকজন হচ্ছে,
হ্যারোল্ড ল্যাজওয়েল। তার  মতে, রাজনীতি হল "যে যা, যখন, যেভাবে পায় সেটাই"।
আরেকজন হচ্ছেন ডেভিড ইস্টন, তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বহুবছর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে‌ও ছিলো তার অনেক অবদান।
রাজনীতির সংজ্ঞায় তিনি বলেন "এটি হল কোন সমাজের জন্য মূল্যবান বিষয়গুলোর কর্তৃত্বপূর্ণ সুষম বণ্টন"।
ভ্লাদিমির লেনিনের ছিলেন একজন মার্কসবাদী রুশ বিপ্লবী ও কমিউনিস্ট  রাজনীতিবিদ।তাকে ২০ শতকের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার  মতামত অনুযায়ী, "রাজনীতি হল অর্থনীতির সবচেয়ে ঘণীভূত বহিঃপ্রকাশ"।
বার্নার্ড ক্রিক ছিলেন একজন ব্রিটিশ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক যার মতামতকে "রাজনীতি জনসাধারণের মধ্যে করা নীতিশাস্ত্র" হিসাবে সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে। তিনি "চিন্তার রাজনীতি" বা আদর্শের বিপরীতে একটি "কর্মের রাজনীতি" এ পৌঁছাতে চেয়েছিলেন এবং তিনি মনে করতেন যে "রাজনৈতিক ক্ষমতা হল সাবজেক্টিভ মুডে শক্তি । " তিনি আচরণবাদের একজন প্রধান সমালোচক ছিলেন ।
বার্নার্ড ক্রিক দাবি করেন যে, "রাজনৈতিক হল নীতিমালার একটি স্বতন্ত্র রূপ, যার দ্বারা মানুষ নিজেদের পার্থক্য মিটিয়ে ফেলার জন্য, বৈচিত্রময় আগ্রহ ও মূল্যবোধ উপভোগ করার জন্য এবং সাধারণ প্রয়োজনের বিষয় পরিচালনায় সরকারি নীতি তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিলেমিশে কাজ করে"।
আড্রিয়ান লেফ্টউইচ সংজ্ঞা দেন যে, "রাজনীতি সমাজে ও সমাজসমূহের মধ্যে সমবায়, মতবিনিময় ও দ্বন্দ্বের সকল কাজের জন্ম দেয়, যার দ্বারা মানুষ তাদের জৈবিক ও সামাজিক জীবনের উৎপাদন ও প্রজননের নিমিত্তে মানবীয়, প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার, উৎপাদন ও বণ্টনের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে"।
ইবনে সিদার মতে, বিষয়াবলির ব্যবস্থাপনা করাই হল সিয়াসাত বা নীতি বা রাজনীতি।
সাহিব ইবনে আব্বাদও একই মত পোষণ করে বলেন, সিয়াসাত বা রাজনীতি হল রাজনীতিবিদ বা শাসকের কাজ, প্রশাসক তার প্রজাদের শাসন করে, আর তার নিম্নস্তরের শাসকেরা তাদের নিম্নস্তরের প্রজাদের শাসন করে, আর এটাই তাদের রাজনৈতিক বা শাসনের নীতি।
ফায়রুজ আব্বাদী বলেন, রাজনীতিবিদ বা শাসকরাই রাজনীতি বা শাসনতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করেন, তারাই এটি প্রতিষ্ঠা করেন, আবার তারাই এটি ধ্বংস করেন।
নানাভাবে সংজ্ঞায়িত রাজনীতি ব্যবহৃত হ‌ওয়ার কথা সর্ব মানবের স্বার্থে,যার প্রতিটি লাইনের অর্থে আছে সাধারণ এবং শাসকের সমতা।যার প্রয়োগ সবার জন্য সমান হ‌ওয়ার কথা। কিন্তু প্রত্যক্ষ হচ্ছে তা ব্যবহৃত হয় মুষ্ঠিমেয় কিছু ক্ষমতাশীল বর্গ দ্বারা তাঁদে‌র‌ই উন্নতির সর্বার্থে।তেমনি এর সংজ্ঞায় রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রনীতি থাকলেও আপাত রাজনীতিতে তার দৃশ্য বহু আগেই নস্যি হয়ে গেছে।এ দেশের শাসক গোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেবলি নিজেদের উন্নতির পেছনে দৌড়াচ্ছে, তাদের ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারে নিজেদের সময়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যার প্রভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে দেশ, দেশের সাধারণ জনতা আর মূখ্য রাষ্ট্র গড়ার আদর্শ প্রত্যয়, অচল হচ্ছে প্রকৃত রাজনৈতিক পরিকল্পনা। এ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে বলাই যায় সবটাই কেবল নাটক, উপস্থিত পুতুল শো। কিংবা সুকাঠামো, পরিপূর্ণ গঠিত, মঞ্চে সাজানো গোটা কয়েক মানবের অভিনীত নাটক, মঞ্চ নাটক! গনতান্ত্রিক দেশে অভিনীত গনতন্ত্রের মঞ্চনাটক!
দলের জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বিলিয়ে,অক্লান্ত পরিশ্রম,ব্যক্তিগত অর্থ আর পারিবারিক জীবনকে ব্যাহত করেও দল থেকে কোন কিছু আশা না করা করিম আকন্দ দলের এমন তাচ্ছিল্যে আহত হলেন।
দীর্ঘ সময়ের জেলবাসে নিজেকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সাধারনের জন্য! তাই মনোস্থির করেছিলেন পাকাপোক্ত স্থান গড়ার,যেখানে অবস্থান করলে কেউ তার যোগ্যতা কিংবা অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না।
এদেশে জনতার ভালো করতে চাইলেও ক্ষমতার দরকার হয়।যত‌ই বলুক কারো ভালো করতে চাইলে, সাধারণ, অসহায় হতদরিদ্রের সাহায্য করতে চাইলে এমনিতেই করা যায়! আদৌওতে তা সম্ভব নয়।ব্যক্তি প্রচেষ্টায় নির্ভর প্রতিটা প্রতিষ্ঠানকে ভুগতে হয় অপরিসীম,নিতে হয় অগাধ জরিমানার ভার।
বঙ্গদেশে বাঙালি আমজনতার সহায়তা করার প্রথমে ধাপ হ‌ওয়া উচিত ন্যায় বিচার পাওয়া।আর এই বঙ্গে ন্যায্য বিচার কেবল তারাই পায় যারা অর্থ দিয়ে বিচারকে পকেট পটাকার মতো ফুলিয়ে রাখতে পারে।ঠিক তেমনি শাসকের লক্ষ‌্য‌ও তারাই 
হয়।এই নিয়ম ভেঙে,রীতির শিকল ছিঁড়ে যারা ভিন্ন ধারায় হাটতে চায় তারাই চুড়ান্ত হেনস্থার শিকার হয়!
করিম আকন্দ তাদেরই দলের একজন।যারা নিয়মের বেরি ভেঙে চলতে চায়।যারা অন্যায়ের স্রোতে ভেসে না গিয়ে ন্যায়ের ক্ষরায় মিশে রয়।
“ আমি স্বতন্ত্র হয়ে লড়বো।প্রমান করে দিবো যে আমি নিরপরাধ ছিলাম।আমাকে শুধু শুধু ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।আমাকে অন্যায় ভাবে জেলবন্দি করে রাখা হয়েছে!"
নিজের সামনের সোফায় বসে থাকা বন্ধু খুলশিদের সাথে নিজের মনোবাসনা ব্যক্ত করলেন দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী করিম আকন্দ।তাকে ভরসা দিয়ে নিজের মতামতে খুলশিদ তালুকদার বললেন,
“ তুই আগা,ভোটের অভাব হবে না। এই এলাকা তাদের যেই ভোটার তা সব তোর জন্য; তোর টাকা খেয়ে,তোর কথা বিশ্বাস করে,তোর উপরে ভরসা রেখেই তাদের ভোট দিতো সুতরাং চোখ বন্ধ করেই বলা যায় এরা তোর‌ই ভোটার।”
“ পাশে থাকিস বন্ধু! তোরা পাশে থাকলে ইনশাআল্লাহ সব জায়গাতেই জয়ী হবো।"
অনুরোধ করে বললেন নিজের বাল্যকালের বন্ধু খুলশিদকে। খুলশিদকে অনুরোধ করে বলা হাতটা এখনো খুলশিদের হাতের মুঠোয়। এমতাবস্থায় খুলশিদের পাশে বসা ফর্সা, লম্বা সুদর্শন এক যুবক।নাম যার দিলশাদ তালুকদার। তার পানে চেয়ে বললো,
“ নিষাদ বাবা! আমি কিন্তু তোমাকে আমার পাশেই চাই। আমার নিজের তো সাবালক বড় পুত্র‌ নাই।তোমরাই আমার পুত্রের মতো।যাও আছে একটা ভাতিজা।তার মাথায় বর্তমানে অনেক মামলা ঝুলে আছে আর আমার পরিবারে আমার পাশে দাড়িয়ে আমাকে সাহস দেওয়ার মতো সাহসী যুবক নাই। তুমি মাশাআল্লাহ যেভাবে মাঠেঘাটে দৌড়াও তোমার তোমাকে দেখলে ভেতর থেকেই ভালো লাগা কাজ করে।আমি চাই তুমি আমার পাশে থাকো। ইনশাআল্লাহ্ চাচা ভাতিজার কাছে হার তাদের মানতেই হবে!"
কথাটা বলেই হাসলেন করিম আকন্দ আর খুলশিদ তালুকদার। কিন্তু তাতে সামিল হতে পারলো না দিলশাদ তালুকদার। আদৌওতে সে কোন কথাই শুনেনি।তার দৃষ্টি এবং শ্রবন শক্তি দুটোই অন্য কোথাও অবরুদ্ধ।বসার ঘর থেকেই দেখা যায় খাবার ঘরের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে টেবিলে নাস্তা পরিবেশনে ব্যস্ত এক কিশোরীকে।
লম্বা বিনুনি ঝুলিয়ে চটপট করে এ প্লেট,  ও প্লেটে নাস্তা সাজাচ্ছে।পড়নে তার হাটু সমান গোল সুতি ফ্রক। সামনের উপরি অংশে মোটা করে কুচি কুঁচি দিয়ে ফ্লোরাল করে ডিজাইন করা।চুড়িদার সালোয়ার। গোলাপী রঙের এই পোশাকে কিশোরীকে জলজ্যান্ত চলমান পুতুল মনে হচ্ছে।ঘরে উপস্থিত মেহমানদের খিদমতে এই আয়োজন।
চব্বিশের তরতাজা টাগড়া যুবকের মনে দোল খেয়ে গেলো নতুন অনুভূতিরা।আপনমনে ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো এক সুখ হাসি।যার প্রত্যক্ষদর্শী হলেন দুজন কিন্তু বুঝলেন কেবল একজন,অন্যজনের সরলমনা চিন্তা অতদুর পৌঁছালো না।খুলশিদ তালুকদার ছেলের নজরে নজর মিলিয়ে বহু দুরের ভাবনায় নিজেকে নিয়ে গেলেন, ঠোঁটের কোনের হাসিতে কিছু আটক করলেন। এদিকে সম্মতি ভেবে এই হাসিকেই আপন করলেন করিম আকন্দ।
“ নাস্তা নিয়ে আসছি আব্বু!"
নিজের সামনে কিশোরীর এমন মৃদু কন্ঠস্বরে চটক ভাঙ্গলো দিলশাদ তালুকদারের।এত সময় নিজের কল্পনায় এতটাই বিভোর ছিলো যে কখন কিশোরী তার সামনে এসে উপস্থিত হলো টের‌ই পায়নি। চঞ্চল কন্ঠের কিশোরীকে দেখে উচ্ছিলত করিম আকন্দ হাত ধরে নিজের পাশে বসার আদেশ করলেন।
বাবার আদেশ মোতাবেক কিশোরী তার পাশেই বসলো।গলায় ওড়না বিহীন, বাড়ন্ত যৌবনের উঁকিঝুঁকি,কাজলটানা বড় বড় ডাগড় আঁখি,কোমল ছোট্ট এক জোড়া ঠোঁট যাতে গোলাপী লিপমাম লাগানো,গালের গোলাপী আভায় একদম পরিপাটি সাজানো একটা পুতুল যেন দিলশাদের সামনে বসে আছে।অপলক দৃষ্টিতে সেই পুতুলকে অবলোকন করতে থাকলো দিলশাদ তালুকদার।করিম আকন্দ মেয়ের হাত নিজের হাতে রেখেই বন্ধুর ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন,
“ আমার একমাত্র রাজকন্যা আফিয়াত নুর আকন্দ,এবার নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী।এইতো আমাদের স্কুলেই পড়ছে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে।এ বছর টপ হয়ে প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো। তোমার আন্টিতো বাসায় থাকে না তাই ঘরের গিন্নি আপাতত সেই।"
বাবার কথায় লাজুক হাসলো আফিয়াত নুর। সামনে বসা সুদর্শন পুরুষের অপলক দৃষ্টিতে এক নজর দৃষ্টি মিলিয়ে নামিয়ে ফেললো। পরক্ষনেই কৌতুহলী মনের কৌতুহল দমাতে ব্যর্থ কিশোরী আবারও তাকালো তার পানে। আঁকড়ে ধরলো যেন ঐ দৃষ্টি। ফর্সা বদনের ধূসর মেরুন অক্ষিগোলক, শ্বেত কোটরের গভীর চাহনিতে মিশে গেলো নব্য কিশোরীর লাজুক নয়ন।তার ঠোঁটে আঁটকে থাকা ঐ মৃদু হাসি, হালকা গোলাপী এক জোড়া পাতলা চিকন ঠোঁটের উপরে হালকা ছাঁটের গোঁফ আর চাঁপা ভাঙা গালের চাপ দাঁড়িতে অপূর্ব এক মুগ্ধতায় হারিয়ে গেল কিশোরী আফিয়াত নুর আকন্দ।অপলক চাহনির ওজন সহ্য করতে না পেরে নামিয়ে নিম্নমুখী রেখেই হাতের তালু নিজের বাবার হাতে আবদ্ধ হাতের বাহুতেই খসতে লাগলো। নির্বোধ করিম আকন্দ এত কিছু খেয়াল‌ই করলেন না।উনি কেবল উনার স্বপ্নে বিভোর হয়ে তার বিস্তৃত বর্ণনা করতে লাগলো,
“ বুঝলে দিলশাদ বাবা,এই মেয়েই আমার ভবিষ্যৎ! আমি চাই আমার পরে আমার রাজনৈতিক ধারা ঐ বজায় রাখুক।জানো কি তুখোড় মেধা ওর!কত নিখুঁত বুদ্ধি দেয় আমার এই বাচ্চাটা!"
“ কেন? তোর তো ছেলেও আছে!"
“ হ্যা তা আছে তবে আমি মেয়েকেই আমার ভবিষ্যৎ কর্ণধার বানাতে চাই! ছেলের জায়গায় ছেলে আছে,থাকবে। সে তার বোনকে সহযোগীতা করবে তবে আমার বড় সন্তান হিসেবে আমি সব কিছুতেই আমার মেয়ের আগে রাখবো।
কি মা পারবে না?"
শেষের কথাটা নুরের মুখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন করিম আকন্দ।বাবার কথায় নিজের ঘোর এ ফিরলো আফিয়াত নুর।
চকিত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো “হ্যা বাবা?”
করিম আকন্দ মেয়ের চোখে কিছু একটা দেখলেন, পরক্ষনেই তা অগোচরে রেখেই জিজ্ঞেস করলেন,
“ বাবার পর বাবার ইচ্ছার দায়িত্ব নিতে পারবে না?"
বাবার এই ইচ্ছা আফিয়াত আগেই জানে।তাই দৃঢ় মনোবলের সাথে বললো,
“ পারবো আব্বু! ইনশাআল্লাহ!"
মেয়ের উত্তরে খুশি হলেন করিম আকন্দ।
এত সময়ে মুখ খুললেন সেই যুবক, হাস্যোজ্জোল মুখে কিশোরীর দিকে তাকিয়েই বললো,
“ পারতেই হবে, আপনার মেয়ে বলে কথা আংকেল!"
দিলশাদের কথায় গদগদ হয়ে করিম আকন্দ বললেন,
“ তোমাকেও চাই।আমি চাই তুমি নিজেই ওকে গাইড দিয়ে এগিয়ে নাও। তোমার তো ফলাফল দুর্দান্ত, ওকে একটু সময় দিয়ে পড়াশোনার বিষয়ে আরও ভালো ফলাফলের জন্য উপদেশ দিয়ে সাহায্য করতে পারো।"
না চাইতেই কিছু পেয়ে গেলে আর কি চাই! দিলশাদ দোনামোনা ছাড়াই বলে দিলো,
“ অবশ্যই আংকেল,যেকোন বিষয়ে আমাকে বললেই হবে আমি হাজির হয়ে যাবো, ওকে?"
“ ওকে?" ছিলো আফিয়াত নুরের দিকে চেয়ে করা প্রশ্ন।আফিয়াত নুর চমকে উঠলো। কন্ঠে কিছু ছিলো যা একদম ভেতর নাড়িয়ে দিলো।সেও ঐ ঘোর লাগা দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে ছোট করে বললো,
“ ওকে!"
করিম আকন্দ স্বাভাবিক ভাবেই নিলো। কিন্তু খুলশিদ যেন এক কিশোরী আর যুবকের না বলা কথাগুলো পড়ে নিলেন।মুখটা নিজের বাম দিকে ঘুরিয়ে সবা অগোচরেই হাসলেন। করিম আকন্দ দিলশাদের ডান হাত ধরেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বললো,
“ তুমি কিন্তু আংকেলের সাথেই থাকবে বাবা!"
“ আপনার জন্য জান হাজির আজ থেকেই, শুধু বলেন কি করতে হবে!"
----------------------------------------------------------------
বর্তমান ______
অন্ধকার এক কুঠুরিতে হাত পা বাঁধা সাতত্রিশের এক পুরুষ,গলার চারদিকে মোটা কালসিটের দাগ স্পষ্ট প্রমান দেয় তার প্রতি হ‌ওয়া  পৈচাশিক নির্যাতনের।হাত দুটো পিঠ মোড়া বাঁধনে শ্বাস প্রশ্বাসের প্রতিটি গতি দৃশ্যমান।বুকের পাঁজর গুলো দ্রুত গতিতে নিজদের কার্য সম্পাদন করছে।নিভু নিভু ঘোলা চোখে অন্ধকারে হাতড়ে নিজের তৃষ্ণা মেটাতে বিরবির করে অনুনয় করছে এক ফোঁটা পানির জন্য! কিন্তু চার দেওয়ালের এই অন্ধকার রাজ্যের উপস্থিত রক্ত মাংসের প্রহরীরা যেন সিমেন্টের তৈরি মন নিয়ে বেঁচে আছে। বিন্দুমাত্র দয়া, মায়া করার লক্ষ্য মাত্র তাদের মাঝে দেখা যাচ্ছে না। তীক্ষ্ম চাহনি আর লৌহ মুখোভঙ্গিতে তারা নির্লিপ্ততায় নিরব হয়ে সিনা টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে।

পর্ব ৩৪

ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাপিয়ে এক চিলতে আলোর দিশা পেলো বন্দি ব্যক্তি। খুট করে কেউ লোহার শক্ত দরজার খিল তুলে ভেতরে ঢুকলো। অন্ধকার কুঠুরির মাঝে বাইরের থেকে আসা আলোর রশ্নিতে তাকে এক বিশাল দৈত্যকার মানব মনে হচ্ছে।দেওয়াল ঘেঁষে একপাশ হয়ে বসে থাকা বন্দি লোকটা আতংকিত চোখে তাকালো।তার কপাল বেয়ে চুয়ে চুয়ে পড়া রক্তের ধারা চোখের পাপড়ির উপর শুকিয়ে মোটা প্রলেপে রুপ নিয়েছে যার দরুন চোখ মেলে তাকাতেও কষ্ট হচ্ছে!
কপালের উপরে লাগা রডের বারি এখন অনুভব হচ্ছে টনটনে ব্যথায়।সারারাতের অবিরত পিটুনিতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে নিম্নাঙ্গ।হাত দুটো অসাড় হয়ে গেছে। শুধু ঘনঘন নিশ্বাস নেওয়া ছাড়া আপাতত দেহের কোন অংশ আর কোন কাজ‌ই করতে সক্ষম হচ্ছে না।ঐ মানবের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আরো দুজন।তাকে ঘিরে দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ব্যক্তি পেছনে হাত রেখে টানটান সিনা উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ডান জন ওভাবে থেকেই মুখ খুললো,
“ ভাই সারারাত পিটিয়েছি।এর বেশি টর্চার করলে মরে যাওয়ার চান্স আছে।আপনি বলেছিলেন মারবেন না তাই আর...
কথা সম্পূর্ণ করতে দিলো না ব্যক্তিটি।হাত উঁচিয়ে থামতে নির্দেশ দিলো। অগ্নি চোখে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ ঐ আধমরার দিকে। এরপর ধীর কদমে এগিয়ে গেল। হাঁটু ভেঙ্গে বসতে দেখেই লোকটা মিশে গেল দেওয়ালের সাথে।যা দেখে কুটিল হাসি দিলো লোকটা।হাসিতে কি ছিলো জানা নেই,তবে আলো আঁধারির এই ঘরে উপস্থিত মানুষের ঘনঘন নিশ্বাস ছাড়া কেবল তার ক্রোধে কাপার শব্দ আসছিলো। চোখের জলন্ত অগ্নি নিয়ে তাকিয়ে থাকা লোকটার মুখ থেকে নির্গত হলো বাক্য,
“ ঠিক এতটাই ছটফট করেছিলো সেই ছোট্ট কিশোরী যার মনে দেহে তুই নোংরার দাগ লাগিয়েছিলি! তোকে মারবো না।মরতেও দিবো না। শুধু ছটফট করবি আর একটু একটু করে নিজেকে মরতে দেখে আফসোস করবি!”
লোকটার শুকিয়ে যাওয়া মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো উষ্ণ নোনা জল। অনুরোধের স্বরে বললো,
“ ছেড়ে দাও,আমি আর কোনদিন বিরক্ত করবো না!"
মজার কিছু শোনার ন্যায় বিদ্রুপ করে হাসলো, দাঁত চিবিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো,
“ তার জন্য সুযোগ পেলে তো!" কথা শেষ করেই
হাত বাড়িয়ে দিলে হাতের উপর একটি দন্ড রাখে কেউ একজন! এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে দন্ডটা নিয়ে ঐ নিস্তেজ লোকটার উপর। বীভৎস চিৎকারে পুরো রুম ভয়ংকর মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয়েছে।যেকারো কানের পর্দা ফেটে রক্তের স্রোত বয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।কিন্তু এতে নির্লিপ্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উপস্থিত সকলে।
নিজের সমস্ত ক্ষোভ ঝেড়ে ছুঁড়ে মারলো দন্ডটা।উপুড় হয়ে চুলের মুঠি ধরে ফিসফিস করে বললো,
“ একবার নয়, তিনবার তোকে বাঁচার চান্স দিয়েছিলাম কিন্তু তুই কি করলি? শুকিয়ে যাওয়া ঘা তাজা করতে অযথাই খোচাতে থাকলি, নিজের মরন নিজেই ডেকে আনলি।তবে আর কি? নে এবার তোর ইচ্ছে পূরণ করি,আফটার অল আ'ম আ্যা লয়াল এমপি!ওয়াদাবদ্ধ সবার প্রয়োজন পূরণ করায়।"
কথা শেষ করেই ছেড়ে দিলো।ডান পাশে তাকিয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত একজনকে বললো,
“ ঐ ওকে খাবার দে, খবরদার খাবার যেন অপচয় না হয়! আমি অপচয় বরদাস্ত করবো না! এরপর ওষুধ দিবি।”
“ জ্বী বস!"
প্রভুভক্ত প্রহরী অবনত মস্তকে আদেশ পালনে লেগে গেল। যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই বেরিয়ে গেল লোকটা।তার পিছু পিছু গেল সাথের দুজন‌ও! বন্দির মুক্তি চাই চিৎকার ভেসে বেড়াচ্ছে যার পরিসমাপ্তি ঘটলো দরজার খিল আটতেই।
 কেরানীগঞ্জ জঙ্গলের মাঝে একটা পরিত্যাক্ত ভবন যার হদিস অনেকেই জানে না।বিশাল এড়িয়া জুড়ে সুউচ্চ দেওয়াল দিয়ে ঘেরা সীমানার মধ্যিখানে একটা পুরানো পরিত্যাক্ত ভবন যার হদিস পাওয়াই মুসকিল তার অবধি পৌঁছানো তো আর কঠিন।
সবরকমের প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন এই ভবনটি মূলত একটি টর্চার সেল যেখানে যাকে খুশি ইচ্ছা অনুযায়ী প্রহার করা যায়।কেউ টের‌ও পায় না। জলজ্যান্ত কয়েকজনকে একসাথে পুতে রাখলেও কাক পক্ষিও টের পাবে না।বিল্ডিংয়ের বাইরের থাকা স্বচ্ছ পানির পুকুর যার মাঝে চাষ হয় মাংস খেকো বড় বড় মাগুর। জলজ্যান্ত অসুরের ন্যায় একজন মানুষ খেয়ে শেষ করতে এই মাছদের লাগে মাত্র দশ মিনিট।
“ আমি আগে কোর্টে যাবো সেখান থেকে তোর ভাবীকে নিয়ে একেবারে বাড়ি ফিরে লাঞ্চ করে ক্লাবে বসবো।তোরাও একেবারে লাঞ্চ সেরেই আসিস। বিকেলে খালপাড় নিয়ে আলোচনা মিটিং করতে হবে।"
“ ওখে!"
গাড়ীতে উঠতে উঠতে কথাটা বললো ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার। তার পেছনে পালোয়ানের মতো উচ্চ আর হেব্বি দেহের মানুষ দুজন মস্তক নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। গাড়ির ভেতরে অবস্থানরত মুরাদ বললো,
“ আমি যাই তোর সাথে।"
“ না তুই বাসায় যা।এত সকালে আমার পিছনে পরিস না। তাছাড়াও আমি বিবাহিত ভাই, একটু প্রাইভেট মোমেন্ট দে!"
“ নেতা মানুষের আবার প্রাইভেট কি! তারা জনতার সেবক,তাদের সব‌ই জনতার আর আমি জনতার সেবকের প্রহরী।আমি সবসময় আমার দায়িত্ব পালনে অটল।জান দিবো তবুও দায়িত্ব থেকে এক চুলও নড়বো না। সেখানে তো জনতার সেবককে পাহারা দেওয়া মতো গুরু দায়িত্ব পেয়েছি সেটা কিভাবে.... যাই হোক আমি...
“ থাম থাম তোর লেকচার থামা ভাই! আপাতত আমি কোন জনতার সেবক ন‌ই! এখনও সংসদে পা পড়েনি।যখন পড়বে তখন।এখন আমি আমার ব‌উয়ের বর আর আমি এখন তার সাথে স্পেশাল মুহূর্ত পালন করবো!সো ইউ সুড লিভ আস এ্যা পিচফুল প্লেজ......
“ ছিহ্ তাজু তোর নূন্যতম দয়া মায়া নেই। একজন ভুখা মানুষের সামনে এভাবে লোভনীয় খাবার নিয়ে যাচ্ছিস আর বলছিস কি টেস্ট ! "
মুরাদের কথায় তারাজ মিটমিট করে হাসছে।
বন্ধুর হাসিতে মুরাদের মেজাজ চটে গেলো। গাড়ীতে বসে নিজেই নিজেকে দশ কথা শোনালো।তারাজ কেবল হাসছে।
“ হাস,হাস, হাস! অত হাসতে পারিস দেখবো। দেখিস আজ রাতে ভাবী তোকে নিজের কাছেই ভিড়তে দিবে না।"
“ এটা তুই দুঃস্বপ্নে ভাবিস না। আমার মৃত্যুর আগ অবধি তাকে আমার কাছেই আসতে হবে। আমার বুকে মাথা রেখেই ঘুমাতে হবে ইনশাআল্লাহ!"
“ আল্লাহ কবুল করুক, আমীন।"
“ আমীন"
কথায় কথায় গাড়ী এগিয়ে যাচ্ছে। খুনসুটি বন্ধ করে ড্রাইভে মন দিয়েছে মুরাদ। তারাজ ওর পাশে বসে মুঠোফোনের স্ক্রিনে থাকা আফনূরের মুখটা দেখছে।যেটাতে সে লাল জামদানি জড়িয়ে সদ্য স্নান থেকে বেরিয়ে বারান্দার দোলনায় বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে চা'য়ে চুমুক দিচ্ছে। লম্বা চুলগুলো গামছা দিয়ে মুড়িয়ে পেছনে খোঁপা করে রাখলেও তা এখন কাঁধের উপর ঝুলে আছে,সামনে কিছু বেরিয়ে থাকা লম্বা ভেজা চুল থেকে থেমে থেমে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ছে,লাল ব্লাউজের ঘাড় থেকে হাতের দিকগুলো পানিতে ভিজে মেরুন রুপ নিয়েছে। সদ্য গোসল করায় স্নিগ্ধ পরিষ্কার চেহারা, ভেজা ঠোঁট,নাকে জ্বলজ্বল করছে হিরের নাকফুল,হাতে মোটা সোনার বালা।অপ্সরী রুপে মনের সুখে বারান্দা বিলাস করা আফনূরকে নিজের বাহুবন্ধনে না পেয়ে মাত্র ঘুম থেকে জেগে উঠা তারাজ লাফিয়ে উঠে নিজের ব‌উকে খুঁজতে বারান্দায় গিয়ে এই দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ায়।বাগান বিলাসের একটা ডাল আফনূরের মাথা থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে দিয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। বাইরের সূর্যের আলোর রশ্নি সেই ডালকে ছুঁয়ে আফনূরের নাকে বারি খাচ্ছে যার দরুন চিকমিক করছে সমগ্র বদন। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেই তারাজের মনে হলো এই মুহুর্ত ধরে রাখা উচিত।চট করেই ভেতরে ঢুকে মোবাইল নিয়ে ক্লিক করে ফেলো। তারাজের ফোনের শব্দে আফনূর আপন ভুবনের বাইরে আসে।এত সময় সে অন্য জগতে ছিলো। ঘটনা গতকালের।সেই মুহূর্তে ছবিটা নিজের মোবাইলের ওয়ালপেপারে রাখে,যখন‌ই ব‌উকে মনে পড়ে তখন‌ই মোবাইল বের করে ছবিটা দেখে।
আফনূরের স্নিগ্ধ মুখে হাত বুলিয়ে ডুব দিলো সেদিনের সেই বার্তায় যা এসেছিল.....
নির্বাচনে জয় লাভ এবং বিয়ের রিসিপশন পার্টির ঘোষনা দেওয়ার জন্য একটা ধামাকাদার পার্টির 
বন্দোবস্ত করে ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার। যেখানে উপস্থিত ছিলো সব গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ আর বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। ঢাকার স্বনামধন্য এক হোটেলে আয়োজিত এই আয়োজনে উপচে পড়া ব্যবস্থায় নিজের পুত্র বধূকে পরিচয় করিয়ে দেয় সবার সাথে।তার সাথে ছেলের বিজয়ে উল্লাসে ফেটে উঠে সবাই।
এত এত আয়োজনের মাঝেও নজর কেড়েছে আফনূরের প্রতি তারাজের টান।এত এত উচ্চ পর্যায়ের আর গুনীদের মাঝেও তারাজ আফনূরের হাতটা এক মুহুর্তের জন্য ছাড়েনি।সবাই মিটিমিটি হাসছিলো। অনেক নেতার দুলালীরা গিলে খাওয়ার মতোই তারাজকে দেখছিলো। আফনূরের প্রশংসা মুখে করলেও অন্তরে ছিলো হিংসে। কিন্তু তাতে কি? তারাজ তার নুরজানকে বগলদাবা করেই পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করেছে।
খাওয়া দাওয়া সেরে টুকটাক আলাপে ব্যস্ত অতিথিদের সাথে তারাজ, আফনূর। তখন হঠাৎ করেই আফনূরের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তারাজের কাছে মোবাইল রেখে ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলে তারাজ মুরাদের হবু ব‌উয়ের সাথে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়।
আফনূর চলে যাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে তারাজের পকেট  থেকে ভাইব্রেট হ‌ওয়ার শব্দে মোবাইল হাতরে ফোন বের করলো, বার্তা ঘরে আগত বার্তা দেখে খানিকটা ভ্রু কুঁচকে নেয়, অপরিচিত! লক খুলে খেয়াল করলো মুঠোফোনটা তার নয়। আফনূরের। 
গতকালকেই দুজনের জন্য এক‌ই কভার দিয়েছে।আফনূরকে এই ফোনটা বিয়ে উপলক্ষে উপহার করেছে তানহা।স্বামী স্ত্রীর এক‌ই ফোন রাখার জন্য‌ই উপহারটা দিয়েছে।তাই প্রথমে চিনতে পারেনি। 
বার্তা দেখে তারাজের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়।ভিডিও বার্তা! কি ছিলো তাতে? যার জন্য তারাজের এমন প্রতিক্রিয়া?

পর্ব ৩৫


পার্টি শেষ করে সবাই বাসায় পৌঁছালে আফনূরকে ঘরে পাঠিয়ে নিজ অফিস কক্ষে যায়। নিজের লকারের ভেতর লুকানো লকার খুলে একটা মুঠোফোন বের করে।
পাওয়ারে চাপ দিয়ে অন করতেই পরপর বেশ কয়েকটি বার্তা ঢুকে। সেগুলো এড়িয়ে গিয়ে একটা নাম্বারে চাপ দিতেই কল ঢুকে।
“ একটা নাম্বার মেসেজ করছি, যেখানেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক,ওকে আমার চাই; চাই মানে চাই!জীবিত চাই!যদি ওর শরীরের প্রতিটি অঙ্গ‌ও কেটে যায়, রক্তের শেষ বিন্দু অবশিষ্ট থাকে তবুও ওকে আমার চাই , জীবন্ত চাই! কালকের মধ্যেই!"
কথা শেষ করেই ফোনটা কাটলো।কুটিল হাসি ঠোটে এটে বিরবির করে বললো,
“ আজরাঈল নিমন্ত্রণ করছিস তার সাথে সাক্ষাৎ তো করতেই হবে!"
“ তুই কি এখানেই নামবি না আমি নেমে যাবো?”
অতীত থেকে ফিরে এলো। গাড়ী বাবুবাজার ব্রীজের নিচে নামার সিড়ির সামনে।মুরাদ তারাজের দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো। তারাজ নিজেকে স্বাভাবিক করে মাস্কটা ভালো মতো মুখে এঁটে বললো,
“ তুই গাড়ী নিয়ে যা!আমরা রিক্সা নিয়ে আসবো!"
“ সিরিয়াসলি?”
“ হ্যা, প্রতিদিন রিক্সা নিয়ে ফ্যাচফ্যাচ করে,আজ যেহেতু সাথেই যাবো সুতরাং রিক্সায়‌ই নিয়ে যাবো।এর সাথে আমারও রোমান্টিক রিক্সা ভ্রমন হয়ে গেলো!”
তারাজ কথা বলেই মুরাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিলো।মুরাদ হেসে সম্মতি দিয়ে গাড়ি নিচের দিকে টানলো।  তারাজকে নিচে রেখে বেরিবাঁধ হয়ে চরের উদ্দেশ্য চলে গেল। এদিকে তারাজ মাস্কটা চেক করে দেখলো ভালো মতো ঢেকেছে কি-না!রিক্সা ডেকে নিলো। গন্তব্য হাইকোর্ট,সি এম এম এইচ।
রিক্সায় বসে ভাবতে থাকলো,সেই অতীত যা নিয়ে এত লুকোচুরি..... যা ছিলো সেই ভিডিও বার্তায় আফনূরকে ভয় দেখানোর জন্য ফাঁদ।যেই ফাঁদে ফেঁসে আফনূর নিজের কৌশরের চঞ্চলতা হারিয়েছে। হারিয়েছে অনুভূতি!
ফ্ল্যাশব্যাক.....১৩ বছর আগে.....
করিম আকন্দ নিজের প্রচেষ্টায় লোকদের সমর্থন কুঁড়াতে চেষ্টা করছে তাকে সহযোগিতা করছে তার নিকটস্থ বন্ধুরা ,সমর্থক আর খুলশিদ ও দিলশাদ তালুকদার।
করিম আকন্দের নির্বাচনী কাজের সহায়তায় দিলশাদের এ বাড়িতে যাওয়া আসা বেড়ে গেল।তার সাথে বাড়লো আফিয়াতের সাথে দেখা সাক্ষাৎ। পড়াশোনার বাহানায় একদম বেডরুমেও প্রবেশাধিকার পেয়ে গেল। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ আর আর একজন কিশোরীর এমন অবাধ দেখা সাক্ষাৎ তার পরিবারের চোখে ধরা পড়েও পড়লো না।হয়তো তারা স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছে।
কখন কিভাবে মনের লেনদেন চুড়ান্ত হলো নির্ধারিত জানা নেই দুজনের কারোই।তবে হয়েছে খুব গভীরভাবে‌ই।
দিলশাদ মন থেকেই ভালোবাসতো আফিয়াত নুরকে, নুরের পবিত্র কিশোরী মন‌ও শুদ্ধ ভালোবাসায় বিভোর ছিলো। কিন্তু সব ভালোবাসার পূর্ণতা পাওয়া যায় না।ঠিক তেমনি পেলো না ওদেরটাও।
আসলে ভালোবাসলেই হয় না,ওয়াদা করলেই হয় না।সেই ভালোবাসাকে ভালো রাখতে, ওয়াদাকে দায়িত্ব নিয়ে পূর্ণতা আনতে অদম্য ইচ্ছা আর মনোবল দরকার হয় যা সবার থাকে না।সবাই পারে না পৃথিবীকে তুচ্ছ করে সবকিছুকে মাড়িয়ে প্রিয় মানুষটির হাত শক্ত করে ধরতে‌।দিলশাদও পারেনি। সমাজের দায়ের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছিল নিজের ভালোবাসাকে,ছেড়ে দিয়েছিলো যাকে বুক দিয়ে আগলে রাখার ওয়াদা করেছিলো।
রাইয়াজ আকন্দ , আকন্দ পরিবারের অন্যতম সদস্য।করিম আকন্দের বড় ভাই রাজিব আকন্দের একমাত্র পুত্র এবং একমাত্র সন্তান।বংশের‌ও প্রথম পুত্র সন্তান।তাতেই তার ভাবের অভাব হয় না।মদ্যপ বাবা রাজীব আকন্দের উশৃঙ্খল জীবনের একনিষ্ঠ ভক্ত। নেশা ভান থেকে মেয়েবাজী সব কিছু্ই ছিলো রাজীব আকন্দের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চট্টগ্রামের হ‌ওয়ায় পাহাড়ী অঞ্চলের আশেপাশে বেশ কিছু নারী পাচার গ্যাংয়ের সাথে তার ছিলো বেশ খাতির।নেশার তালে টাল হয়ে সবরকমের বেআইনি কাজ করানো তাকে দিয়ে সহজ ছিলো।
অগাধ সম্পত্তির মালিকানা পেয়ে নিঃস্ব হয়ে ছোট ভাইয়ের উপর নির্ভরশীল।কারণ সহজ! নেশার নেশা আর মেয়েবাজী বাদশাকেও ফকির বানিয়ে ছাড়ে।তাকেও তাই করেছে।
করিম আকন্দ ছিলো স্বজনপ্রীতির রোগে আক্রান্ত।ভাইয়ের অপরাধ দেখেও বরাবরই না দেখার মতোই ছিল।নিজেও রাজনীতির নেশায় নেশাগ্রস্ত।উনার এহেন উদাসীনতায় বিরক্ত উনার স্ত্রী আফরাত নাহার। তিনি ভাবতেন একদিন উনাদের দশাও রাজীব আকন্দের পরিবারের মতোই হবে।তাই উঠেপড়ে লাগলেন একটা সুন্দর ক্যারিয়ার গড়ায়।দুটো সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন ধ্বংস না হয় তাই চিন্তায় মগ্ন হয়ে টাকা কামাইয়ের জন্য দিনরাত এক করে ফেললেন। যদিও এদিক থেকে করিম আকন্দ আলাদা। তিনি সবকিছুর আগে নিজ সন্তানের প্রতি যত্নশীল ছিলেন। কিন্তু ভুল সবার‌ই হয়, উনাদের‌ও হয়েছিলো।
আফরাত নাহার কর্মে ব্যস্ত হয়ে সন্তানদের থেকে দূরে সরে গেলেন তেমনি করিম আকন্দ একদমই রাজপথের পথিক হয়ে সব দিক ভুলতে বসলেন।
করিম আকন্দের সহায়তা বাড়ির পাশেই রাজীব আকন্দের বাড়ি উঠে।তাই যাতায়াত সুবিধা ভালো হ‌ওয়ায় যখন তখন চলে আসতো। আফিয়াতদের বাসার ছাদের চিলেকোঠায় ছিলো তার আসর জমানোর উত্তম স্থান।
সময়ের ফেরে কেটে গেল দুটো বছর, চৌদ্দ বছরের কিশোরী আফিয়াত নুর ষৌড়সী কিশোরী! এস এস সির পর আপাতত অবসরে আছে। এদিকে নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় দিলশাদ ব্যস্ত নিজের কাজে।আরেক দিকে তার বৈদেশে যাওয়ার বন্দোবস্ত‌ও চলছে যার অর্থায়নে রয়েছে করিম আকন্দ।
আফিয়াত নুরের প্রতি দিলশাদের মনোভাব করিম আকন্দের চোখে এতদিনে ধরা পড়েছে।মেয়ের মনের ইচ্ছাও আন্দাজ করতে সময় লাগেনি।তাই নিজের স্বার্থেই শুধু ব্যবহার নয় বরং নিজের মনের মতো করেই মেয়ের ভবিষ্যৎকে গড়ে তুলতে উঠেপড়ে লাগলেন করিম আকন্দ।মেয়ের থেকে বয়সে বেশ বড় হলেও ছেলের সার্বিকতা চিন্তা করে বয়সে আঁটকে থাকেনি। বরং দুজনের মাঝে যেন ভাল বোঝাপড়া তৈরি হয় তাই সবসময় দুজনকে সময় দিতেন । আফিয়াতকে স্কুল থেকে নেওয়ার আসার কাজটাও দিলশাদ করতে থাকলো। কিন্তু ঘটনার চাক্কা ঘুরে গেল দিলশাদ যাওয়ার আগ থেকেই!
নির্বাচনের আগে ব্যাপক প্রচারণার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় সকল নমিনেশন প্রার্থীর। এমনিতেই করিম আকন্দ দলের বাইরে গিয়ে লড়াই করার জন্য চেষ্টা করছে তার মধ্যে তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান।এর মধ্যেই আরো দুটো মামলা দায়ের হয়েছে উনার নামে। যেহেতু দলের বিরুদ্ধে লড়ছেন তাই বোঝাই যায় শত্রুতার শুরু কিভাবে হচ্ছে কিন্তু তবুও তিনি দলের বিরুদ্ধে কোনরকম কথা বলেনি। শুধু নিজের কথাই বলছে আর বলেছেন মানুষের সেবার ইচ্ছা।
অর্থ দিয়ে দলীয় অনেক কাজেই সহায়তা করতেন তিনি,তাই উনার এমন হটে যাওয়ায় দলীয় বড় পদের অনেকের‌ই মাথা গরম হয়ে যায়। যার দরুন লেগে যান তার পিছনে। উদ্দেশ্য করিমকে সরানো।
রাজনীতি... এই পথে যে একবার যায় তার ফিরে আসার কোন উপায় নেই।আর না আছে এখানে সৎ লোকের ভাত! করিম আকন্দের বেলায়‌ও তাই ঘটছে।দল উনাকে না কোন পদের জন্য সমর্থন দিচ্ছে আর না দিচ্ছে একাকী নির্বাচনে অংশ নিতে। বারবার আঘাত করছে সবলতায়, ভেঙে দিচ্ছে মনোবল।তাই সুযোগ খুঁজলেন চুড়ান্ত দূর্বলতার। একদিন পেয়েও গেলেন।
“ ওর মেয়েটা কি করে এখন,মেয়েটা কিন্তু দেখতে সেই হয়েছে?"
“ আপাতত বাসায়‌ই থাকে,শুনলাম সদরের গার্লস কলেজে ভর্তি হবে!"
“ আর ঐ ছেলেটা?"
“ দিলশাদ! ভাই ওর তো সিরিয়াস খবর আছে! "
“ কি?"
“ শুনলাম কানাডা যাচ্ছে উচ্চ শিক্ষার জন্য, আর জানেন এই অর্থের যোগান কোথায় থেকে আসছে? 
করিম ভাই দিচ্ছে!"
“ কি বলিস? কৃতজ্ঞতার দাম এতো? নাকি আরো উদ্দেশ্য আছে!" 
“ খবর মোতাবেক ঐ ছেলের সাথে করিম ভাইয়ের মেয়ের লুতুপুতু চলছে, সম্ভবত করিম ভাই বন্ধুর মেধাবী ছেলেকে ঘর জামাই বানাতে চাচ্ছে তার জন্য‌ই এই উদ্যোগ!"
“ তাই নাকি!"
“ হ্যা ভাই,খবর একদম পাক্কা।ছেলে তো একদম মেয়ের বিছানা অবধি পৌঁছে গেছে!"
“ আরেব্বাস! এমন সুস্বাদু খবর আগে দিস নি ক্যান?এটাই তো মুখ্য হাতিয়ার হবে ভদ্রলোক করিম আকন্দকে আটকানোর। ঘরের মেয়ে দিয়ে ব্যবসা করা লোক কিভাবে জনতার সেবা করবে, কিভাবে নারী উন্নয়ন করবে তা বোঝাই যাচ্ছে! এই লাইন, জাস্ট এই লাইনটুকু যদি মানুষের কানে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তবেই দেখবে তার নির্বাচনের ভুত ঘাড় থেকে নামবে!"
“ বাহ্ বস,সেই একটা পয়েন্ট নোট করছেন তো!"
“ ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে?"
“ জ্বী ভাই আপনার পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় র‌ইলাম।"
“ হু!"
অজানা দুজন ব্যক্তির আলাপে বোঝাই যাচ্ছে তারা করিম আকন্দের দলের কোন লোক যারা চান না করিম আকন্দ নির্বাচনী মাঠে নামুক।
ব্যস্ত দিলশাদ আফিয়াতকে সময় দিতে পারছে না। এদিকে অবসরে থাকা আফিয়াত একা হয়ে পড়ায় হতাশ, অবসাদে ভুগতে শুরু করলো দিলশাদের এমন ব্যস্ততায়।মা'ও সময়  দিতে পারছে না।যদিও তিনি সময় কোনকালেই দেয়নি তবুও।বাবাও ব্যস্ত।আজকাল একাই খেতে হয়। খালাম্মি পাশে থাকলেও কেমন যেন শূন্যতা ঘিরে থাকে তার চারদিকে। ছোট ভাইটার আর কি! সে তো নিজ খেলায় মত্ত।ষোল বছরের এক কিশোরী কি আর দশ বারো বছরের ভাইয়ের সাথে খেলে নিজের সময় কাটাতে ইচ্ছুক হয়! সমবয়সী বোনেরাও অনেক দূরে। রাজনৈতিক নানা ঝামেলায় একা বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ তার উপরে ইদানিং বাড়ি বয়ে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে যাতে তার বাইরে যাওয়া নিয়ে আরো বেশি বিধিমালা জারী হয়েছে। একমাত্র দিলশাদ কিংবা রাইয়াজের সাথেই বাইরে যাওয়ার অনুমতি পায়।
এদিকে আজকাল বাড়িতে রাইয়াজের বন্ধুদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। একদিন বিকেলে ছাদে গেলো আফিয়াত। চিলেকোঠার ঘরে তার যাওয়া হয় না কারণ ঐ ঘরটা রাইয়াজের দখলে।যেখানে বড় ভাই তার বন্ধুদের নিয়ে আসর জমায় সেখানে না যাওয়ার প্রশ্ন‌ই উঠে না।
“ ঐটা তোর চাচার মেয়ে না?"
“ হ্যা!"
সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে উড়িয়ে উত্তর দিলো রাইয়াজ।চোখ তার জানালার বাইরে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরীর দিকে।রাইয়াজের বন্ধু মানজিত, গাঁজার টানে মেয়েলি নেশা অনুভব করে,সে যখন এমন উড়ন্ত প্রজাপতি দেখবে তার নেশা চড়বে এটাই স্বাভাবিক।
হাতের জলন্ত সিগারেট মুখে পুরে কুচকুচে কালো ঠোঁট দিয়ে চেপে রেখে টকটকে লাল চোখে তাকালো আফিয়াতের দিকে।ওড়না বিহীন বুকটা দৃশ্যত, ফিটিং কামিজের উপর দেহের প্রতিটি খাঁজ বোঝা যায়। চুরিদার পায়জামার কারণে পা থেকে উপরের অংশ সবটাই অতিরিক্ত এঁটে আছে।যা লোলুপ দৃষ্টিতে ভক্ষণ করতে লাগলো মানজিত।রাইয়াজ তখন গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে আগডুম বাগডুম বকছে।তার ঘরেই যে সিধ কাটার এনে ঢুকিয়েছে সেদিকে কোন খবর নেই!

পর্ব ৩৬


“ তুমি কি আজ আমার সাথে একটু শপিংয়ে যাবে শাদ?"
আফিয়াতের আবদারী সুর,দিলশাদ খানিকটা বিরক্ত হলো বোধহয়।একটু ঝাঁঝালো স্বরে বললো,
“ আ্যা ইউ সিক? ইউ নো হাও বিজি পাসিং মাই ডেইস!দেন হাউ ইউ!”
“ সরি শাদ! আমি বুঝতে পারিনি তুমি এতটাই বিজি যে আমাকে দেওয়ার মতো এক ঘন্টাও নেই!বুঝলে আমি.."
দিলশাদ একটু থমকালো। মনে হলো সে বিগত কয়েকমাস আফিয়াতকে সময় কম দিচ্ছে কিন্তু করার‌‌ও কি আছে! নির্বাচনী কাজে মাঠেঘাটে দৌড়ঝাঁপ, নিজের উচ্চ শিক্ষার জন্য কানাডার ভিসার জন্য এদিকে ওদিকে দৌড়ঝাঁপ করা সবকিছু মিলিয়ে নিজেকেই সময় দিতে পারছে না সেখানে আফিয়াতকে! আচ্ছা আফিয়াত কি বুঝেও বুঝেনা! ও কি এতটাও অবুঝ!ষোল বছর বয়সী মেয়েরা বিয়ে করে এক বাচ্চার মা‌ও হয়ে যায়।সংসার সামলায় তবে আফিয়াত কেন এত অবুঝ! ও কেন বুঝেও বুঝেনা।রাগ চড়লো দিলশাদের। সারাদিনের পরিশ্রমের পর রাতে ফোন দেয় একটু শান্তির জন্য,দু চারটা প্রেমের কথা বলবে তা না।একটু আদরে সোহাগে প্রেম দিয়ে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দিবে তা না করে খালি ঘ্যান ঘ্যান।বিয়ের আগেই এই মেয়ে এত ঘ্যান ঘ্যান করছে তবে বিয়ের পর কি করবে কে জানে? 
দিলশাদের মনে হঠাৎ করেই আফিয়াতের প্রতি বিতৃষ্ণা চাপলো,আপন মনেই নিজেকে বললো,
“ বাচ্চা একটা মেয়ে অথচ এর ঘ্যানঘ্যানিতে আমার বিরক্ত লাগা শুরু হয়ে গেছে, বিয়ে করিনি এখন‌ই এমন করছে, বিয়ে করলে কি করতো?"
একাকী বলা কথাটা যে অপরপ্রান্ত পৌঁছে গেল সেদিকে বেমালুম রয়ে গেল দিলশাদ। আফিয়াত কট করে কলটা কেটে দিলো।কল কাটার শব্দে দিলশাদের হুশ আসলো,‌টুট টুট শব্দটা এখনো বাজছে তার কানে।
“ আফি শুনে ফেললো?"
নিজেকেই প্রশ্ন করলো‌।ফের উত্তর‌ও নিজেই দিলো!
“শুনলে শুনেছে! ওর সব কথাতেই তাল মেলানো সম্ভব নয়।ওকেও বুঝতে হবে বড় হচ্ছে! এখন ওকে বাচ্চামো মানায় না।আজ বিয়ে করলেই কাল বাচ্চা পয়দা করবে আর এখন তার নিজের‌ই বাচ্চামো জারি রয়েছে,ডিসগাস্টিং!”
কথাটা বলে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে মেরে এলোমেলো হয়ে শুয়ে পড়লো। তৎমুহূর্তে আখিপটে ঘুমেরা নেমে এলো।
এদিকে আফিয়াত দিলশাদের বলা কথাগুলো বারবার মনে করছে। কান্না করেনি। আফিয়াত কান্না করে না।তবে ভেতরে ভেতরে হাহাকারে শেষ হয়ে যায়।আজকাল মায়ের ব্যস্ততা আকাশচুম্বী।এই তো কাল মা অফিসিয়াল কাজে তিনদিনের জন্য চট্টগ্রামের বাইরে যাবে। এদিকে বাবাও নাকি ঢাকা যাচ্ছে। দু'জন‌ই যাবে তবে একসাথে নয়। খালাম্মি নানা বাড়ি যাবে।নানা ভাইয়ের শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়,তাই দেখভালের জন্য একজন লোক দরকার। দিলশাদ হয়তো খুবই শীঘ্রই চলে যাবে কানাডা। সবকিছু মিলিয়ে ভীষন একাকী সময় কাটছে। কোচিংয়ে যাওয়ার বিষয়েও পারিবারিকভাবে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। যেহেতু এতদিন দিলশাদ‌ই পড়াতো তাই অন্য কোন শিক্ষক রাখেনি বাবা। অবশ্য তার জন্য নিষেধাজ্ঞা দিলশাদ‌ই দিয়েছিলো।
বন্দি, বন্দি, বন্দি! ভীষন বন্দি একটি জীবন পাড় করছে আপাতত আফিয়াত। ভীষন অসহায় লাগছে নিজেকে। দিলশাদের কথাগুলো বারবার মাথায় বারি খাচ্ছে। দিলশাদ কি বললো,
“ আমি ঘ্যান ঘ্যান করি? তাতে ওর বিরক্ত লাগছে?
- ঠিক আছে আর করবো না ঘ্যান ঘ্যান, বিরক্তের কারণ‌ও আর হবো না! কোনদিন যদি ফ্রি হ‌ও! আর  মনে হয় আফির কথা তবে এসো! আম আমি বিরক্ত হবো না!"
রাত কেটে গেল। আফিয়াতের অক্ষুপটে ঘুমেরা নামলো না। সারারাত খাটের পায়ার সাথে হেলান দিয়ে বসে কাটিয়ে দিলো।আজানের শব্দে উঠে দাঁড়িয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ওযু করে এসে নামাজের জায়নামাজ বিছিয়ে বসে পড়লো।নামাজ শেষে কিছু সময় থম মেরেই বসে থাকলো। এরপর উঠে বারান্দায় গিয়ে সূর্য উঠা দেখলো।ধীর পায়ে বেরিয়ে রান্না ঘরে গেল।সব নিরব! একদম নির্জন! কোন শোরগোল নেই।আফিয়াতের মনে পড়লো ওর বান্ধবীরা বলে, কিভাবে সকালে উঠে তাদের মায়েরা ওদের জন্য নাস্তা তৈরী করে। প্রায় সবাই‌ই বলে আজান দিলেই তাদের বাড়ির সবাই উঠেপড়ে।নামাজ পড়ে একসাথে আড্ডা দিয়ে চা পান করে,একসাথেই নাস্তা করে।অথচ আফিয়াতের মনে পড়লো না তারা কখনো এভাবে একসাথে বসে খেয়েছে কিনা?কখনো সকাল সকাল মা উঠে তাদের দুই ভাইবোনের জন্য নাস্তা তৈরি করে স্কুলে দিয়ে আসছে কিনা? এই যে আফিয়াত ভীষন একাকী অনুভব করছে,এটাও সে মা'কে বলতে পারবে না! এই যে একটা নির্ঘুম রাত কাটলো,ভীষন মাথা ব্যথায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম প্রতিটি নার্ভ তাও কিন্তু মা জানে না। বাবাকে তো মাঝে সাঝে পেলেও পাওয়া যায় কিন্তু মা! সকালে কোনরকম নাস্তার টেবিলে দেখলেও সে থাকে তার তাড়নায়। নিজের ডায়েট চার্ট অনুসরণ করে খাওয়া,ফাইল ঠিকঠাক নিলো কি-না দেখা! অফিসিয়াল বিভিন্ন তথ্য আপডেট দেওয়া নেওয়া এগুলোই করে খাবার টেবিলে বসেও। তার যে দুটো সন্তানের খাবারের খোঁজ রাখা জরুরি তা জন্য না সময় হয় আর না ইচ্ছা! দীর্ঘ এক শ্বাস ছাড়লো যাতে করে সব না পাওয়াকে উড়িয়ে দিলো। এগুলা তার মা'কে বলা যাবে না।শুনলে বলবে,
“ আফিয়াত তুমি এত ফালতু আবেগ কোথায় থেকে পাচ্ছো? এসব‌ই কি জীবনের উদ্দেশ্য? শোন আমার কাছে তোমার এহেন অহেতুক কথা শোনা কিংবা আবেগে ভেসে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় নেই! আর আমি এটাও চাই না যে তুমি এসব করে নিজের জীবনের মূল্যবান সময় অপচয় করো!সময়ের অনেক দাম আফি! এখন তোমার সময় মন দিয়ে পড়াশোনা করা।তাই করো, সামনে হায়ার একাডেমিক এরপর‌ই ইউনিভার্সিটি, তোমাকে মেডিকেলে চান্স পেতে হবে! তাও বেটার পজিশন নিয়ে! আশাকরি তুমি আমাদের হতাশ করবেন না!”
মায়ের এই কথা বহুবার শোনা হয়ে গেছে আফিয়াতের।তাই মুখস্থ‌ও হয়ে গেছে। বাবাকে বললে বলবে,
“ তোমার মা তোমার ভালোর জন্যই বলে বাচ্চা! মায়ের কথা শোনো।"
খালাম্মিকে কি বলবে!সে তো মা না।তবুও চেষ্টা করে মায়ের মতো যত্ন নেওয়ার কিন্তু তিনিও তো নিজের ব্যক্তিগত জীবনে ব্যস্ত।স্বামী, সংসার,বাবার বাড়ি সব কিছু নিয়েই উনাকে অনেক চিন্তায় থাকতে হয় ।এর মধ্যে ! না আফিয়াত আর ভাবলো না।তাকেই তার জীবনের সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত হতে হবে! রান্না ঘর থেকে কড়া করে এক কাপ দুধ চা বানিয়ে নিলো।সোজা ছাদে‌। রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে বসে চা পান করলো।
চিলেকোঠার জানালা দিয়ে রক্তিম আভায় সিক্ত এক কিশোরীর স্নিগ্ধ বদনের চেয়েও তার ফিটিং গেঞ্জির উপর দিয়ে দৃশ্যমান বক্ষে চোখ আটকালো।লোলুপ দৃষ্টি ফেলে সেদিকে পানে চেয়ে র‌ইলো মানজিত!হাতের কাপ থেকে বারবার চুমুক দিয়ে নেওয়া চায়ের স্বাদের চেয়েও জঘন্য স্বাদ অনুভব করলো ঠোঁটে চেয়ে। বিরবির করে কিছু উচ্চারণ করলো , নিজের ডান হাতটা নিজের পুরুষাঙ্গে রেখে অসভ্য ক্রিয়ায় ব্যবহার করতে থাকলো।
রাতভর নেশায় ডুব মেরে মানজিত,রাইয়াজ, নাসির তিনজন‌ই আফিয়াতদের বাসা রয়েছে। যেহেতু ছাদে যাওয়ার জন্য বাইরে থেকে একটা অতিরিক্ত সিঁড়ি রয়েছে তাই ওদের যাওয়া আসার খবর কারো কানে যায় না।আর আফিয়াতরাও বেশি একটি মাথা ঘামায় না।
চা শেষ করেও বেশ সময় ওভাবেই বসেছিলো আফিয়াত। পরমুহূর্তেই মনে হলো সে নিজের ছোট্ট বাটন ফোনটা রেখে এসেছে।ইস্ এখন একটা ছবি তুলতে পারতো যদি ফোনটি সাথে থাকতো‌।ঐ তো ঐ গাছের উপর পাখি বসছে,যার মাথার উপর সূর্য মামা নেমেছে। 
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই রেলিং থেকে নামতে গিয়েই পিছু ফিরতেই কারো শক্ত বুকে মাথা ঠুকে পরে যেতে নিলেই কেউ কোমর খামচে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।ভয় পেয়ে আফিয়াত‌ও তার বাহু খামচে ধরলো।উদাম শরীর,লোমশ ফর্সা বুক।আফিয়াতের মুখ গিয়ে ঠেকলো তার বুকের মাঝে, চোখেমুখে লোমগুলো সুড়সুড়ি দিচ্ছে।আফিয়াত কিছু বলার আগেই খেয়াল করলো লোকটা ও কোমরের নিচে হাত নামাচ্ছে, একদম নিজের সাথে চেপে ধরে মিশিয়ে নিচ্ছে।মুখ উঠিয়ে চোখমুখ কুঁচকে সেদিকে তাকালো, মানজিত ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো।চোখে তার লিপ্সা! রক্তিম মনির মাঝে লালসার বাস। দুর্গন্ধে বমি আসার উপক্রম! আফিয়াত ধাক্কা দিলো, মানজিত আরও শক্ত করে চেপে ধরলো, আফিয়াত নিজের ডান হাত দিয়ে কোমরের নিচে রাখা মানজিতের হাতটা সরাতে চেষ্টা করলো,মানজিত হাত আরো নিচে নামিয়ে খামচে ধরলো,ভীতু চাহনি ছল ছল করে উঠলো,আফিয়াত তাকালো মানজিতের চোখে,মানজিত আফিয়াতের এহেন ভয় ভয় চাহনিতে মজা পাচ্ছে।
পাখির কলকাকলি আর বাতাসের শো শো শব্দ ছাড়া আপাতত আর কোন শব্দ,কোন আয়োজন নেই।এই সময়ে এত নির্জনে দুজন ছেলে মেয়েকে এতটা ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে দিলশাদের মাথা গরম হয়ে গেল।এই সময় ছাদে এসে সকালটাকে উপভোগ করতে আফিয়াতকে সেই শিখিয়েছে।তাই সকালে উঠেই নামাজ আদায়ের পর মনে হলো রাতের জন্য আফিয়াতের কাছে ক্ষমা চাইবে সাথে করে বুঝিয়ে বলবে এখন সে কতটা ব্যস্ত। কিন্তু দুর থেকে যখন দেখলো দুটো ছেলে মেয়ে এতটা কাছে তার পায়ের তলার রক্ত মাথায় উঠে গেল।এমন সময় এখানে নিশ্চয়ই বাইরের কেউ হবে না তবে কে? আফিয়াতের খালাতো বোনেরা কেউ হবে না।কারণ কাল‌ও সারাদিন করিম আকন্দের সাথেই ছিলো তারা কেউ আসেনি।তবে; কে? আফিয়াত! ভাবতেই পায়ের তলার জমিন কেঁপে উঠলো। তরতর করে রক্ত গুলো মস্তিষ্কের নিউরনে পৌঁছে গেল।এই সময়ে ছাদে একমাত্র আফিয়াত আর ছাদের চিলেকোঠায় রাইয়াজ আর তার নেশাখোর বন্ধুরাই থাকতে পারে তাছাড়া আর কেউ নয়!তবে কি আফিয়াত তাদের কারো সাথে কোন ভাবে! দিলশাদ আর ভাবতে চাইলো না । সে এখানে থাকলে বিশাল কেলেঙ্কারি বেঁধে যাবে! দিন কয়েক বাদেই নির্বাচন, তাছাড়াও তার কানাডার ভিসাও কনফার্ম হয়ে গেছে। সকালে উঠেই খবরটা পেয়েছ তাইতো উচ্ছল চিত্তে এসেছিল আফিয়াতকে বলতে কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল?"
তীব্র ঘৃণা আর আক্রোশে ফেটে পড়লো দিলশাদ। কিন্তু তা প্রকাশ না পরে নিজের ভেতর রেখেই চলে গেল। সিদ্ধান্ত নিলো কঠিন কিছুর।যার প্রভাবে কারো কতটা ক্ষতি হতে পারে তার পরিমাপের যন্ত্র হয়তো আবিষ্কার হয়নি।
“ কি হচ্ছে এখানে?"
কারো গম্ভীর কন্ঠে আফিয়াত সেদিকে তাকালো, মানজিত‌ও! রাইয়াজ শর্টসের পকেটে হাত গুজে দাঁড়িয়ে আছে।ওর পড়নে হালকা গোলাপি সেন্টু গেঞ্জি।চোখ দুটো দিয়ে আগুন ঝড়ছে,চট করে ছেড়ে দিলো আফিয়াতকে। আফিয়াত পড়েই আর্তনাদ করে উঠলো।রাইয়াজ ক্রোধে ফেটে পড়া অবস্থায় এগিয়ে এলো।মানজিত আমতা আমতা করতে থাকলো। নিজের দুই হাত বাড়িয়ে বোঝানো ভঙ্গিতে বললো,
“ তুই যা ভাবছিস তেমন কিছু নয়, আসলে তোর বোন পড়ে যাচ্ছিলো তাই জাস্ট সাহায্য করার জন্য ধরেছিলাম!"
রাইয়াজ মানজিতের কথায় একটু থামলো।নিচে পড়ে ব্যথায় আর্তনাদ করা আফিয়াতের দিকে তাকালো।আফিয়াত উঠতে চেষ্টা করছে,হয়তো হাঁটুতে চাপ লেগেছে তাই ব্যথা পাচ্ছে।রাইয়াজ হাত বাড়িয়ে বললো,
“ উঠ!"
আফিয়াত হাতের সামনে ভাইয়ের হাত পেয়ে বোধহয় একটু আশ্বাস পেলো।হাত বাড়িয়ে দিয়ে উঠতে চেষ্টা করলো।রাইয়াজ‌ই একরকম টেনেই তুললো। এরপর নিচু কিন্তু শক্ত ভাষায় জিজ্ঞেস করলো,
“ এত সকালে এখানে কি করছিস?"
ভাইয়ের গলার স্বরে ভয় পেলো আফিয়াত। সম্পর্কে তারা আপন চাচাতো ভাইবোন, পাশাপাশি‌ই থাকে। একরকম বলা যায় রাইয়াজ তাদের বাসায়‌ই থাকে তবুও তাদের মাঝে বিশাল দূরত্ব।তার কারণ স্পষ্ট। রাইয়াজ এবং তার বাবার উশৃঙ্খল জীবনের জন্য তাদের থেকে দূরেই রাখে তার বাবা মা! বছরেও তাদের মাঝে দু চারটা কুশলাদি কথাও হয় কি-না সন্দেহ।রাইয়াজ বাড়ি আসলে আফিয়াতের ঘর থেকে বেরুনো নিষেধ!স্পষ্ট নিষেধ।রাইয়াজ‌ও আগ বাড়িয়ে কথা বলে না।সেও বুঝে তার স্বভাবে ভয় পেয়েই তার থেকে আফিয়াত আর তার ছোট ভাই আখিরকে দূরে রাখে।তাই সেও যেচে কথা বলে সম্পর্কে বাঁধতে চায় না। বরং দূরে থাকাই শ্রেয়।এতে তার অন্ধকার জীবনের প্রভাব পড়লে তাদের‌ও ক্ষতি হবে।রাইয়াছ যত‌ই খারাপ হোক তার বাড়ির মেয়েদের ক্ষতি তার কাম্য নয়।
আফিয়াতের নীরবতায় ক্ষুব্ধ হলো রাইয়াজ।হালকা চেঁচিয়ে বললো,
“ উত্তর দিচ্ছিস না কেন?”
আঁতকে উঠলো আফিয়াত। কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে দেখালো রেলিংয়ের উপর রাখা একটা চা'য়ের কাপ।রাইয়াজ সেদিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
কাঁপা গলায় বললো,
“ চা খেতে আসছিলাম ভাইয়া!"
“ চা খেতে এই অন্ধকারে ছাদে আসা লাগে? ঘরে জায়গা নেই!" 
“ আমি সূর্যের আলো দেখতে দেখতে খেতে এসেছিলাম!"
“ এইসব আউল-ফাউল কাজ ঐ দিলশাদে শেখায় না! দাঁড়া ওর এই বাড়ি আসা বন্ধ করতেছি!"
আঁতকে উঠলো আফিয়াত।এই ভাইকে সে চিনে।তার বাবাকেও চিনে। নিজের ভাই, ভাতিজা যা বলে তাই করবে! সত্যি‌ই কি দিলশাদের এই বাড়ি আসা বন্ধ করে দিবে! রাইয়াজ আবারও ধমকে উঠলো,
“ দাঁড়িয়ে আছিস কেন বেহায়ার মতো; যা এখন‌ই নিচে যা! আর যেন কখনো যখন তখন ছাঁদে না দেখি!"
আফিয়াত কাপ রেখেই দৌড় দিলো।মানজিত দৌড়ে যাওয়া আফিয়াতের পেছনে চেয়ে লোলুপ জিহ্বটা কামড়ে ধরলো।রাইয়াজ বোনের যাওয়ার পথে চেয়ে উদাম মানজিতের দিকে তাকালো।
একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষের চাহনি বুঝে।রাইয়াজও নিজ বন্ধুর চাহনি পড়ে ফেললো। ক্ষুদ্ধ হলো নিজের প্রতি মানজিতের মতো মাগী/বাজকে ঘরে আনায়।

পর্ব ৩৭


“ আসসালামু আলাইকুম, চাচাজান!"
“ ওয়ালাইকুম আসসালাম বাপজান! কি অবস্থা তোমার?"
“ জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো; আপনি কেমন আছেন?যদিও আজকাল আপনাকে বেশ খোশ মেজাজেই দেখা যায়!"
“ আমিও আলহামদুলিল্লাহ,হ্যা তুমি ঠিকই বলছো। আল্লাহর রহমতে আজকাল দিনকাল ভালো যাচ্ছে!তা তুমি থাকো কোথায়, দেখাই যায় না!"
“ আমাকে কি করে দেখবেন ? আপনার তো এখন দিলশাদ আছে যাকে আপনি একদম মেয়ের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন!"
কথাটা করিম আকন্দের কানে গিয়ে বিধলো।রাইয়াজ তীব্র আক্রোশ নিয়েই বলেছে তাও তিনি বুঝতে পারলেন। চোখমুখ কুঁচকে ভাতিজার মুখ বরাবর দাঁড়িয়ে শান্ত কন্ঠে বললেন,
“ কি বলতে চাইছো ঠিক করে বলো!"
রাইয়াজ তাকালো।তার চোখে স্পষ্টভাবে ক্ষোভ! কীসের ক্ষোভ? আপন চাচার প্রতি! তাকে গুরুত্ব না দেওয়া! এবার জেল থেকে বের হবার পর থেকে যখন থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে নিজেই এবার পদের জন্য লড়বে তখন থেকেই ভাই ভাতিজাকে দূরে রেখেছে তাই এতো ক্ষোভ! করিম আকন্দ রাইয়াজের ক্ষোভের কল্পগল্প গাথলেও উচ্চারণ করলেন না। বরং শান্ত ভাবেই পরপরই জিজ্ঞেস করলেন,
“ তোমার কথা বুঝতে পারছি না। কষ্ট করে খোলাসা করো।"
“ আপনি এবার সরাসরি নিজেই নির্বাচন করছেন শুনে খুশি হয়েছিলাম। ইচ্ছা ছিলো আপনার পাশে থেকে সাহায্য করবো কিন্তু আপনি তো একবার ডাকলেন‌ও না।তাই যেচে আসিনি ভেবেছি আপনি জ্ঞানী সচেতন মানুষ, নিশ্চয়ই বুঝেই সব করেছেন। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে আপনি ভোটে জেতার নেশায় এতটাই উন্মাদ হয়ে গেছেন যে তার জন্য নিজের মেয়েকেই নিলামে তুলছেন!"
‘মেয়েকে নিলামে তুলছেন’ লাইনটা দ্বিতীয়বার কানে বাজলো।মাথায় রক্ত উঠে গেলেন।কঠিন, উচ্চ গলায় চেঁচিয়ে বললেন,
“ মুখে সামাল দাও! কিসব বলছো? মেয়েকে নিলামে তুলছি মানে কি রাইয়াজ! আমার মেয়েকে নিয়ে একদম বাজে কথা বলবে না। তোমার কি বিবেকে বাঁধে না নিজের আপনচ ছোট চাচাতো বোনকে নিয়ে এমন অশ্লীল কথাবার্তা  বলতে?”
করিম আকন্দের উঁচু স্বর রাইয়াজের মতো মাতালের সহ্য হলো না।সমানতালে চেঁচানো ভঙ্গিতেই বললো,
“ আমার সামান্য কথাতেই আপনার ইজ্জতে লাগলো, তাহলে বাইরের লোকজন বলে তখন শুনেন না?"
“ বনিতা বাদ দিয়ে স্পষ্ট করে বলো!"
“ আপনি যে নির্বাচনী কাজে দিলশাদকে ঘরে ঢুকিয়েছেন সেই দিলশাদ যখন খুশি আপনার মেয়ের বেডরুমে ঢুকে যায়! আপনি বুঝেন বিষয়টি কোনদিকে যাচ্ছে!"
আপন ভাতিজাকে রেখে পরের ছেলেকে কাছে টেনে নিচ্ছে,তাকে দিয়ে নিজের দল ভারী করাচ্ছে এটাতে রাইয়াজের ভেতরে যেই ক্ষোভ জমা  হচ্ছিলো তা যেন একসাথেই উগড়ে দেওয়ার মনোবাসনা। করিম আকন্দ তাই ভাবলেন।ভাতিজার অগ্নিগোলকেথ ন্যায় হিংস্র চাহনি পর্যবেক্ষন করে শান্ত গলায় বললেন,
“ তুমি যে দিলশাদকে সহ্য করতে পারছো না তা আমি ঠিক বুঝতে পারছি।তবে হিংসায় এতটাও অন্ধ হয়ে যেও না যে নিজের ঘরেই কালিমা লেপো। মনে রেখো আফিয়াত তোমার বংশের‌ই ইজ্জত। তোমার আর আখিরের একমাত্র বোন।চাচাতো হলেও তোমার‌ই বোন।তাকে কলঙ্গিত করলে তোমার গায়েই লাগবে,লোকে তোমাকেই বলবে,ঐ যে সেই মেয়েটার ভাই যাচ্ছে।তাই মুখ দিয়ে যেই শব্দ উচ্চারণ করেছো তা যেন আর দ্বিতীয়বার না হয়!"
রাইয়াজ স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে বললো,
“ আমি জানি,আর জানি বলেই বলছি বিবাহযোগ্য হয়ে যাচ্ছে,এই সময়ে আপনি দয়া করে ওর ঘরে যে কাউকে ঢুকে যাওয়ার অনুমতি দিবেন না।"
রাইয়াজের সাথে কথা বলতে বলতে সোফায় বসলেন করিম আকন্দ।চোখ উঁচিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন,
“ মেয়েটা আমার, সিদ্ধান্ত‌‌ও আমি‌ই নিবো!"
রাইয়াজের মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। মনে মনে বিরবির করলো,
“বুড়ো নির্বাচনে জেতার জন্য পাগল হয়ে গেছে।তাই চোখ থাকতেও অন্ধ!" 
পরমুহূর্তেই উচ্চ শব্দ বললো,
“ ভবিষ্যতে বলতে আসবেন না যে রাইয়াজ বাপ তুই ঠিক‌ই বলেছিলি!"
কথা শেষ করেই রাইয়াজ গটগট করে চলে গেলো
তার যাওয়ার পথে চেয়ে থেকে বিরবির করে করিম আকন্দ বললেন,
“ নতুন করে আর কোন ঝামেলা না করলেই হলো এখন!"
____________________________________________
“ আমার মনে হয় এটা তুই আফিয়াতকে বলতে পারিস! দেখ বাচ্চা মেয়ে, সুদর্শন পুরুষ দেখছে হয়তো ভালো লেগে গেছে।তুই বড় ভাই,পাশে বসিয়ে আদর করে বুঝিয়ে বললে হয়তো কাজ হয়ে যাবে!"
গ্লাসে থাকা ওয়াইনের শেষ অংশটুকু এক চুমুকে গলাধঃকরণ করে পাশে বসে বন্ধু মহলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বন্ধু উল্লাসের দিকে তাকালো। সবসময়  সুবুদ্ধি দিয়ে সঠিক পন্থা বের করে দেওয়ার জন্য এই বন্ধুর প্রতি সদা কৃতজ্ঞ থাকে রাইয়াজ আকন্দ।
চাচার সাথে মতবিরোধ হ‌ওয়ায় বিস্তারিত বন্ধুর সাথে খুলে বললো। আফিয়াতের চেয়েও বেশি দরকার তার নিজের।আগে চাচার কাজ করার জন্য‌ই তার পকেটে সবসময় ভরা, গরম থাকতো। এখন যেহেতু সব দিলশাদ‌ই সামলায় তাই তার পকেট‌ও ঠান্ডা, একদম এভারেস্টের ন্যায় ঠান্ডা থাকছে।
আফিয়াতের চেয়েও বেশি দরকার তার নিজের দিলশাদকে হটানো। উল্লাসের দিকে চেয়ে বললো,
“ কিভাবে? আমাদের মাঝে তো খুব একটা কথাবার্তা হয় না! আমাদের মাঝে সাধারণ ভাই বোনের মতো সম্পর্ক না।ওর মা আমাদের পছন্দ করে না বলে ছোট থেকেই একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে ওরা,আমিও খুব একটা গা মাখি না।"
“ মাখ।বড় ভাই যেভাবে ছোট বোনের সাথে কথা বলে ঠিক সেভাবেই কথা বল,আফটার অল তোরা আপন চাচাতো ভাই-বোন!"
“ বলছিস?"
“ হ্যা,তবে অন্য কোথাও! যাতে কেউ না বুঝে তুই ওর ব্রেইন ওয়াশ করছিস!"
বুদ্ধি পছন্দ হলো, বোতলের শেষটুকুও গ্লাসে ঢাললো, হাতে নিয়ে কিছু একটা ভাবতে ভাবতেই সেটার দিকে তাকিয়ে থাকলো এরপর এক চুমুকে সব শেষ করলো।
___________________________________________
আজ দুই দিন পেরিয়ে গেল দিলশাদ আফিয়াতকে ফোন দেয় না।তার চেয়েও বড় কথা আফিয়াতের নাম্বার ব্লক করা।আফিয়াত কাঁদবে না কি করবে বুঝতে পারছে না।বাসায়‌ও আসে না। বাবাকে জিজ্ঞেস করবে তার।ও উপায় নেই।তিনি ঢাকা, মা'কে তো জিজ্ঞেস করার প্রশ্ন‌ই উঠে না।যদিও মা‌ও বাড়ির বাইরে। পুরো বাড়িতে শুধু আফিয়াত,আখির,আর দুজন কাজের লোক।ভীষন একাকীত্বের মাঝে বসবাস আফিয়াতের দিনকাল। কাউকে পাশে বসিয়ে নিজের খারাপ লাগাটাও ভাগ করতে পারছে না। শুধু উদাসমনে তাকিয়ে থাকে,আর একটু পরপর নিজের লাগানো গাছের পরিচর্যা করে।
বিকেল বেলা....
বাড়ির বাইরে থাকা ছোট্ট একটি বাগান, নিজের লাগানো বিভিন্ন রকম দেশী বিদেশী ফুল গাছে ফুল ধরেছে।উদাসী আফিয়াত একমনে তাই দেখে যাচ্ছে।আর বারবার চোখের পানি মুছছে।বড্ড কষ্ট হচ্ছে। দিলশাদের ব্যবহারে।ফোন ধরতে হয় দেখে ব্লক মেরে দিছে। অথচ আফিয়াতের কত কষ্ট হচ্ছে।এমন সময় হুট করেই পাশে এসে বসলো‌ রাইয়াজ আকন্দ। নিজের পাশে এমন চট করে কাউকে বসতে দেখে চমকে গেল আফিয়াত।ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো।ভ্রু কুঁচকে আফিয়াতের ভীতি প্রদর্শন দেখলো রাইয়াজ।খিটখিটে মেজাজে বললো,
“সবসময় এত আতংকিত থাকিস কেন?তোকে কি সবসময় কুত্তার দৌড়ানির উপর রাখে!"
প্রথমেই রাইয়াজের এমন আতংবাজির মতো আগমন তার উপর এমন কথা, আফিয়াত থ হয়ে আছে। নির্বাক, নির্লিপ্ত। ইতস্তত করছে এখানে বসবে কি না উঠে যাবে তাই ভাবছে। রাইয়াজ যেন বুঝলো আফিয়াতের অভিব্যক্তি ।তাই হাত বাড়িয়ে আফিয়াতের হাত টেনে নিয়ে বললো,
“ বস এখানে!"
রাইয়াজের স্পর্শে আফিয়াত আরো ঘাবড়ে গেল। কখনো কথাই বলে না সে যদি হঠাৎ এমন করে অবশ্যই কিছুটা ভয় লাগবে।রাইয়াজ নিজের পাশে বসিয়ে বললো,
“ ভাই হ‌ই তোর! আপন চাচাতো ভাই,বড় ভাই! চোখের সামনেই তোকে দুনিয়ায় আসতে দেখছি।এই এতটুকু ছিলি আজ কত বড় হয়ে গেছিস!"
রাইয়াজ কথা বলে ভাবুক হয়ে গেল।আফিয়াত বুঝলো না হঠাৎ এসব কথার মানে কি? রাইয়াজ আবারও বললো,
“ অথচ দেখ এত বছরেও আমাদের কোন ভালো স্মৃতি নাই। অবশ্য ভালো খারাপ কোনটাই নাই।কেন এমন হলো বল তো!"
আফিয়াত ভাবলো আসলেই তো। বান্ধবীরা ভাই-বোন,কাজিনদের কত কথা বলে অথচ তার বলার মতো কোন স্মৃতি নাই।ভাবুক আফিয়াত উত্তর দিলো,
“ জানি না তো!"
“ আমি জানি, আমার বদমেজাজি স্বভাবের জন্য‌ই এমন হয়েছে।তোর মা চায় না তুই অথবা আখির কেউ আমার সাথে মিশে খারাপ হয়ে যা। আমি সম্মান করি তার চিন্তাকে।তাই নিজেও সেধে কখনো তোদের সাথে কথা বলতে আসি না কিন্তু আজ মনে হলো..
রাইয়াজ থামলো।আফিয়াত উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে।সে কারণ জানতে ইচ্ছুক। রাইয়াজ উৎসুক আফিয়াতের অপেক্ষা কমিয়ে কথা বাড়ালো।
“ আমার মনে হচ্ছে তুই কিছু নিয়ে চিন্তিত।তাই ভাবলাম একবার কথা বলে দেখি কি এত চিন্তা আমার এই পিচ্চি বোনের পিচ্চি মাথায় চাপ দিচ্ছে।
বলতে পারিস ভাইয়ের কাছে নির্দ্বিধায়, একদম বন্ধু ভেবে!"
কথা শেষ করে রাইয়াজ আফিয়াতের মুখের দিকে তাকালো,আফিয়াত নিরব অপলক চোখে দেখছে রাইয়াজকে।এত বছরে এই প্রথম তাদের মাঝে এমন কথা বলো।তাও আবার খুবই স্বাভাবিক ভাবে।আফিয়াত কোন কিছু বলার ইচ্ছে রাখলো না।তাই বললোও না।রাইয়াজ আর একটু কৌশলী হলো।আদুরে গলায় বলল,
“ তুই না চাইলে বলতে হবে না।তবে বলবো যখন মনে হয় বড় ভাইকে বলবি চলে আসবি।আর হ্যা তোর জন্য একটা প্রস্তাব আছে।আজ আমার এক ফ্রেন্ডের জন্মদিন উপলক্ষে পার্টি আছে,চাইলে আমার সাথে যেতে পারিস, অবশ্য তুই গেলে আমি খুশি হবো।সবাই প্রায়‌ই নিজের ভাইবোনকে নিয়ে আসে, আমার তো মায়ের পেটের আপন কোন ভাই বোন নাই।তোরাই আপন,তাই বললাম আর কি!”
আফিয়াত এখন‌ও উত্তর দিলো না।রাইয়াজ উঠে গিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে বললো,
“ আচ্ছা যাই,তুই বোধহয় আমার সাথে গল্প করতে ইচ্ছুক নয়,তবে আমি ইচ্ছুক ছিলাম!
যাওয়ার সময়‌ও বলছি চাইলে যেকোন বিষয়ে বলতে পারিস।তোর একাকীত্ব কাটাতে আমি তোকে ঘুরিয়ে আনতেও পারবো।সময় আছে যথেষ্ট!"
রাইয়াজ চলে গেল।বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলো।
সারা বিকেল আফিয়াত ভাবলো।রাইয়াজ খারাপ সেটা শুনেছে; দেখেনি কোনদিন।তার অথবা তাদের সাথে খুব মাখোমাখো ব্যবহার না থাকলেও খারা‌প‌ও না।তার দিকেও স্নেহ ভরা দৃষ্টিতে তাকায়। তাকানোর ভঙ্গি অবশ্যই সে বুঝে।কে কেমন করে তাকায়। দিলশাদ যখন তাকায় তার চোখেমুখে প্রেম আছড়ে পড়ে, অবর্ণনীয় এক আঙ্খাকা তার চোখের তারায় ভেসে উঠে।তবে সে চাহনিতে কামনা থাকে না।থাকে না লালসার আগুন। মানজিতের চোখে ছিলো লালসা, লিপ্সা। কুৎসিত সেই চাহনিও আফিয়াত দেখেছে।রাইয়াজের চাহনিও দেখেছে। সবসময় শাসন ভাসে,স্নেহ ভাসে।হয়তো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করে না কিন্তু কোথাও না কোথাও সুপ্ত ভালোবাসাও আছে।আফিয়াত ভাবলো তার তরফ থেকেও কখনো রাইয়াজকে ভাই বলে সম্বোধন করায় চেষ্টা ছিলো না।মা বলেছে দূরে থাকতে, থেকেছে তার কারণ ঘাটেনি। কখনো বড় ভাই বলে সম্বোধন‌ও করেনি।  কিন্তু 
অথচ আজ রাইয়াজ তার মন খারাপ দেখেই ছুটে এসেছে। তার মানে নিশ্চয়ই রাইয়াজ তাকে আপন বোনের ন্যায়‌ই দেখে।বোন তে সে অবশ্যই তবূ আপন নয়।চাচাতো।তাতে কি ! যদি স্নেহ ভালোবাসা থাকে তবে আপন পর কোন বিষয় নয়। তাছাড়াও তারা এক‌ই রক্তের সুতরাং তাদের মাঝের দূরত্বও কাম্য নয়।সে যদি রাইয়াজের সাথে স্বাভাবিক ভাইবোনের সম্পর্ক রাখে হয়তৈ তার এই একাকীত্ব কেটে যাবে।আর বাইরে যাওয়ার সময়‌ও বিশেষ দ্বিধা থাকবে না। স্বাভাবিক ভাই বোন হয়েই উপভোগ করবে নিজেদের সময়গুলো।
আফিয়াত সিদ্ধান্ত নিলো সে বড় ভাইয়ের সাথে তার বন্ধুর জন্মদিনে যাবে। কিন্তু তার আগে অনুমতি নেওয়া দরকার। নিজের বাটন ফোন তুলে মায়ের নাম্বারে কল দিলো। নাম্বারটা বন্ধ দেখাচ্ছে।
আফিয়াত নিজ দায়িত্বে বুঝে নিলো মায়ের ফোন বন্ধ,কারণ মা নিশ্চয়ই মিটিংয়ে আছে। মিটিংয়ে ঢুকলে ফোন বন্ধ করেই ঢুকে।বাবার নাম্বারে ফোন দিলো। পর পর দুটো কল দেওয়ার পর ফোনটা তুললো,অপর পাশ থেকে রিসিভ হ‌তেই গড়গড় করে বলতে থাকলো,
“ আব্বু আমি একটু বাইরে যাবো ভাইয়ার সাথে!"
যেতে বোধহয় বললো।টুটটুট করে কেটে গেল। আফিয়াত একটু হতাশ হলো।পুরো কথাটা বলতেও পারলো না।তাই কিছু সময় ভাবুক হয়ে বসে র‌ইলো। পরমুহূর্তেই আবারও কল দিলো দিলশাদের নাম্বারে।এবার‌ও আশাহত হলো। নাম্বারটা এখনও ব্লক লিস্টে! ছলছল নয়নে কিছুক্ষণ ফোন দেখলো। এরপর বিরবির করে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলো।
হুয়াইট কালার হাঁটু সমান সিল্কনেট মিশ্রড কাপড়ের ফ্রক আর লেগিংস,হুয়াইট এক জোড়া কেডস,কানে পাথরের টপ,গলায় চিকন পাথরের লকেট পড়ে চুলগুলো দুইপাশে বাটারফ্লাই ক্লিপ দিয়ে টেনে, দুটো লুছ জুটি করে দুই পাশে ছেড়ে দিয়েছে। ফিটফাট হয়ে ধীর পায়ে ছাদে উঠে আসছে,ভীতু ভীতু চোখে তাকিয়ে দেখলো কেউ আছে কি না। চিলেকোঠার বাতি জ্বলছে,বোঝাই যাচ্ছে আছে! 
দরজায় টোকা দিল,রাইয়াজ আওয়াজ করলো,
“ ওয়েট!”
আফিয়াত হাত গুটিয়ে আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়ালো। খানিকক্ষণ প্রথম রাইয়াজ দরজা খুলে আফিয়াতকে পরিপাটিভাবে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি চাই?”
আফিয়াত একটু থমকালো, হতভম্ব হয়ে গেল।রাইয়াজ কি ভুলে গেছে। পরক্ষনেই মনে পড়লো সে তখন কোন উত্তর দেয়নি।তাই হয়তো বুঝতে পারছে না।তাই নিজেই বললো,
“ তুমি বলেছিলে বন্ধুর বার্থডে পার্টিতে নিয়ে যাবে!"
রাইয়াজ সত্যি‌ই ভুলে গেছে।আসলে মিথ্যা মনেই রাখে কে! সে তো তখন বলার জন্য কিছু না পেয়ে মিথ্যা বলেছিলো কিন্তু এখন! বুদ্ধি খাটিয়ে স্বীকার করলো,
“ হ্যা বলেছিলাম কিন্তু তখন তো কিছু বললি না তাই বুঝতে পারিনি।তুই কি যাবি আমার সাথে?"
“ হুম!"
মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো।রাইয়াজ বললো,
“ একটু অপেক্ষা কর, আমি এখন‌‌ই বের হবো।ব্যাগটা নিয়ে নেই।"
রাইয়াজ আগে আগে তার পিছনে আফিয়াত।রাইয়াজ নিজের বাইকে বসে হেলমেট পড়ে ইশারায় আফিয়াতকে বসতে বললো,আফিয়াত বসে পড়লো।যদিও এর আগে রাইয়াজের সাথে বাইরে যাওয়া হয়েছে তবুও কিছুটা আমতা আমতা করছিলো কারণ এখন রাত প্রায়‌ই নয়টার উপরে বাজে।
প্রচুর শব্দে উটপটাং গান বাজছে। চারদিকে তরুন থেকে মাঝ বয়সী মানুষের কোলাহল।একপাশে বসেছে জুয়ার আসর।তার থেকে দূরে টেবিলের পর টেবিল সাজিয়ে থরে থরে বোতল রাখা। যেখানে বসে গ্রোগ্রাসে মত গিলছে সবাই।নাচের তো কোন আকার নেই।যে যেভাবে পারছে নেচে চলছে। বিচ্ছিরি ভাবে একে অপরকে ছুঁয়ে দিচ্ছে।ষৌড়সী আফিয়াত নতুন পৃথিবীর মাঝে এসে পড়লো।ঢোক গিলছো ছোট করে। বিরবির করে বললো ,
“ এটা কোথায় এসেছি আমরা ভাইয়া!"
“ নতুন দুনিয়া, যেখানে কেউ দুঃখী থাকে না,আজ থেকে তোর‌ও কোন দুঃখ থাকবে না।”
ভাইয়ের কথার অর্থ অনুধাবন করতে পারলো না ষৌড়সী।আর সময়‌ও পেলো না ।তার আগেই এক রমনী এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো রাইয়াজের গলে।আফিয়াত ছিটকে দূর সরে গেল।ঐ মদ্যপ রমনীর পড়নের পোশাকে তার বিশেষ অঙ্গ ডাকতে ব্যর্থ।বড় ভাইয়ের সামনে এহেন পরিস্থিতিতে লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে।তাই মাথা নিচু করে পিছিয়ে যেতেই পিছন থেকে কেউ কোমর চেপে ধরলো।মুখ ঘুরিয়ে দেখতেই দেখলো মানজিত।এখন‌ও তার হাত আফিয়াতের কোমরের নিচে,হিপে রেখে বারবার শাহাদাত অঙ্গুলি দিয়ে গভীর ভাবে ছুচ্ছে।আফিয়াত ধাক্কা দিলো। পালোয়ানের মতো দেহকে একচুল‌‌ও সরাতে পারলো না। উল্টো মানজিত নিজের অন্য হাত দিয়ে সামনের কোমর জড়িয়ে ধরলো। রাইয়াজকে সেই রমনী নিজের মাঝে মজিয়ে রেখেছে। আফিয়াত আহ করে আর্তনাদ করে উঠলো,
“ ভাইয়া!"
হুসে আসলো রাইয়াজ। রমনীকে হটিয়ে আফিয়াতের দিকে তাকালেই দেখলো মানজিত দূরে দাঁড়িয়ে আর আফিয়াত থরথরিয়ে কাঁপছে।কাছে গিয়ে আদুরে স্বরে জিজ্ঞাসা করলো,
“ কি কি হয়েছে?"
আফিয়াত ইশারা করে সেদিকে তাকিয়ে বলতে গিয়েই দেখলো কেউ নাই! চমকালো।রাইয়াজ মৃদু ধমকে বললো,
“ কি হয়েছে বল?”
 আফিয়াত কাটা গলায় বলতে চেয়েও পারলো না।ঐ রমনী এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
“ হু ইজ দিস প্রিটি গার্ল রাজ?".
রাইয়াজ সোজাসুজি বললো,
“ বোন!ছোট বোন!"
“ওহ রিয়েলি! সি ইজ ঠু মাচ প্রিটি!” 
বলেই আফিয়াতের গাল টিপে দিলো। অপছন্দ হলেও আপাতত ভদ্রতার খাতিরে মুখ বুজে রইলো আফিয়াত। এরপর বলতে চেয়েও আর বলা হলো না। রমনী দুজনকে টেনে নিয়ে গেল কেক সাজানো একটা টেবিলে।কেক দেখে রাইয়াছ নিজের বুদ্ধিমান বন্ধু উল্লাসের দিকে চেয়ে হাসলো।
ব্যাগ নেওয়ার কথা বলে ঘরে ঢুকে উল্লাসকে সবকিছু মেসেজ করেই বলেছে।এটাও বলেছে যাতে একটা কেক রেডি রাখে। বন্ধু করেছেও তাই!
ভীতির সাথেই মিথ্যা জন্মদিনের কেক কাটলো। কিন্তু কিছুই বুঝলো না আফিয়াত।স্বভাব সুলভ মদের বোতলে আর অন্য নেশায় মজে গেল‌।তার সাথে আনা নিজের ছোট বোনের কথাও বেমালুম ভুলে গেল। মানজিত দূর থেকেই নিজের কার্য হাসিল করলো, আফিয়াতকে দেওয়া সফট ড্রিংকসের মাঝেই মিশিয়ে দিলো ফ্লিবানসেরিন।আফিয়াত আতংকগ্রস্ত হয়ে এদিকে ওদিকে তাকাতে থাকলো।এই সময়ে ঐ মেয়েটা এসে বললো,
“ বোর হচ্ছো? ডোন্ট ওরি ওর কাজ শেষ হলেই চলছ আসবে! তোমার ভাই হেব্বি একটা মাল! এত মাল টানে তাও তাল হারায় না।কি যে ভালো বেড পার্টনার তা যদি তুমি বুঝতে! বাই দা ওয়ে তোমার বয়ফ্রেন্ড কেমন,আই মিন বেড পার্টনার হিসেবে কেমন?"
কথাটা বলেই চোখ টিপ দিলো।আফিয়াত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে! কি বলছে এই মেয়ে? বেড পার্টনার মানে! মনে মনে বললো, পোশাকের মতো এর মস্তিষ্ক‌ও নোংরা নয়তো কেউ এমনটা ভাবতে পারে? রমনী বোধহয় মজা পাচ্ছে এসব কথায়।তাই আর একটু বাড়িয়ে বললো,
“ শুনলাম তুমি নাকি একদম নিজের ঘরেই নিয়ে আসো।কি সাহস মাইরি তোমার! অবশ্য তোমাদের মতো রিচ ফ্যামিলির ছেলে মেয়েদের জন্য এগুলা পান্তা ভাত। কিন্তু আমার বাবা মা হলে তো হট্টগোল বাঁধিয়ে ফেলতো।কি যে বিরক্তিকর তারা যদি বোঝাতে পারতাম। সবসময় কানের সামনে ক্যাচরক্যাচর করতেই থাকে।তাই কি করেছি বল তো? ”
আফিয়াত মনে মনে ভাবছে, “ আমি কি করে জানবো!"
রমনী হাতের গ্লাসে থাকা লাল পানির এক চুমুক গলায় দিয়ে বললো,
“ ছেড়ে দিছি।"
আফিয়াত ভ্রু কুঁচকে নিলো।কি ছাড়ছে?রমনী হয়তো বুঝলো আফিয়াতের অভিব্যক্তি তাই বললো,
“তাদের ছেড়ে দিছি।যারা আমার ব্যক্তিইত জীবনে নাক গলাবে তাদের রেখে লাভ কি? আমার সুখ যাদের পছন্দ নয় তাদের জীবনে রাখি না। কিন্তু মারতে তো পারবো না তাই ছেড়ে দিছি!"
মাতাল রমনী আকডুম বাগডুম বলতেই থাকলো।এর মধ্যেই একটা ছেলে আসলো যার হাতের ট্রে তে বেশ কয়েকটি গ্লাস, সেখান থেকে একটা গ্লাস নিয়ে রমনী আফিয়াতের দিকে বাড়িয়ে বললো,
“ এই নাও!"
গ্লাসে থাকা হলদে রঙের তরল দেখে আফিয়াত জিজ্ঞেস করলো,
“ এটা কি?"
“ লেমন জুস উইথ লো শ্যাম্পেইন!"
” আমি এগুলা খাই না!"
অনিচ্ছুক হয়ে সড়িয়ে দিলো।রমনী পুনরায় গ্লাসটা সামনে ধরে বললো,
“ আরে মজা করছি।এটা শুধু জুস,খাও ভালো লাগবে!"
এত সময়ে ভয়ে আফিয়াতের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল।কেক খাওয়ার পরেও পানি খায়নি ভয়ে কিন্তু এখন এটা দেখে মনে হচ্ছে আসলেই জুস।তাই আর দ্বিমত করলো না। গ্লাসটা হাতে নিয়ে চুমুক দিলো।প্রথমে একটু খটকা লাগলো।রমনীর চোখের ইশারায় উৎসুক দেওয়ায় পুরোটা এক চুমুকে শেষ করলো।
বেশ দূরে থেকেই বিজয়ী হাসি দিলো মানজিত।তার দিকে উল্টো হয়ে হাত উঁচিয়ে থাম দেখিয়ে বললো,
“ অল সেট!"

পর্ব ৩৮


রাত বেড়ে অনেক,রাইয়াজের ঘোর ডুবলেও নেশার টান কমে নাই।সে এখনও ব্যস্ত নিজের দুনিয়ায় তার সাথে করে যে নিজের ছোট বোনকে এনে একজন বার ডান্সারের হাতে তুলে দিয়েছে সেদিকে কোন হদিস নাই।মাতাল রাইয়াজ মদের চেয়েও বেশি মাতাল হয়েছে নারীর নেশায়।ঐদিকে, তার সেই বার রমনী আফিয়াতের হাতে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট মেশানো জুস বলে এ্যালকোহল খাইয়ে অপেক্ষায় আছে আফিয়াতের তাল হারানোর।
“ না ইউ ক্যান গো।নেক্সট স্টেপ আই উইল হ্যান্ডেল!"
বার্তা আসলো,তা পড়েই রমনী সৌজন্যে বললো,
“ ডিয়ার আফিয়াত আই হ্যাভ টু গো,প্লিজ ইউ স্টে হেয়ার।রাজ, হোপ কাম সুন।"
আফিয়াতকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে হিল উচিয়ে গটগট করে হেঁটে একগাদা মদ্যপ ছেলে মেয়ের মাঝে হারিয়ে গেল। এদিকে প্রথম বারের মতো এ্যালকোহলে ভুক্ত আফিয়াত সবকিছু অন্যরকম দেখতে থাকলো। ঝাঁপসা ঝাঁপসা চোখে হাতরিয়ে কিছু খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে উঠতেই পা ভেঙ্গে পড়তে নিলেই কেউ এসে আগলে ধরে। নেশায় লেগে যাওয়া চোখ মেলে তাকিয়ে ঘোলাটে হয়ে আসলো উপস্থিত মুখখানি।ভাঙ্গা শব্দে জিজ্ঞেস করলো,
“ কে তুমি?"
লোকটার উত্তর ' দিলশাদ'। আফিয়াত জোর দিয়ে বললো,
“ মোটেই তুমি শাদ ন‌ও! শাদ কখনোই এখানে আসে না। তুমি নিশ্চয়ই অন্য কেউ!"
আফিয়াতের কঠোর বিশ্বাসী কথায় উপস্থিত লোকটার মুখ দিয়ে নির্গত হলো জঘন্য শব্দ, বিরবির করে বললো,
“ মা/গীর কি মগজ; এই অবস্থায়‌ও ভা/তাররে ঠিকঠাক‌ই চিনে!”
লোকটার বিরবির করে কথা বলায় আফিয়াত ঘোর লাগানো গলায় বললো,
“ এই তুমি কি বলছো?কি বলছো বলো!"
লোকটা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে হালকা হেসে বললো,
“ তুমি এখন নেশার ঘোরে আছো তাই চিনতে পারছো না।আমি শাদের বন্ধু, তোমাকে নিয়ে যেতেই আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছে!চলো।"
বলেই হাত ধরে টানতে লাগলো।আফিয়াত জেদ করে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লো। উল্টো হাত টেনে জেদি দেখিয়ে বললো ,
“ না আমি যাবো না।অচেনা লোকের সাথে যেতে বাবা নিষেধ করেছে।আমি ভাইয়ার সাথেই যাবো নয়তো শাদকে গিয়ে বলো আমাকে এসে নিয়ে যেতে।"
লোকটার মেজাজ খিচে গেলো।সেই কাল থেকে অপেক্ষা করছে অথচ এখন কি-না এত নটাংকি সহ্য করতে হচ্ছে! মেজাজ বিগড়ালেও শান্ত থাকতে হবে। কাল সকালে ছাদের ঘটনায় রাইয়াজ তাকে প্রচুর কথা শুনিয়েছে।তখন থেকেই কাজটাকে জেদে পরিণত করেছে।যদিও আপাতত তাকে কাজ‌ই করতে হবে।
হাঁটু ভাঁজ করে আফিয়াতের সামনে বসলো। কন্ঠটা নরম করে বললো,
“ শাদ এখানে আসে না তুমি‌ই তো বললে!তবে ? চলো শাদ অপেক্ষা করছে, তাছাড়াও তোমার ভাই এখানে আছে। তুমি তো জানোই তোমার ভাই শাদকে পছন্দ করে না।"
লোকটার কথায় যুক্তি আছে।তাই আর দোনামোনা করলো না।উঠে দাঁড়ালো। লোকটা বললো,
“ তুমি হাঁটতে পারছো না,চলো আমি তোমাকে সাহায্য করি।"
“ ওকে!"
কোমরের নিচ চেপে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে হাঁটতে লাগলো,আফিয়াত চক্ষুদ্বয় কুঁচকে বললো,
“ তুমি আমার হিপে কেন ধরেছো!"
“ যাতে তুমি পড়ে না যাও।”
আর কথা বলার সুযোগ পেলো না।কেমন উদ্ভ্রান্তের
মতো লোকটার বাহু আঁকড়ে ধরলো। বুকের মাঝে ঢুকে পড়লো।লোকটাও সুযোগ পেয়ে আরো চেপে মিশিয়ে নিয়ে হাঁটতে থাকলো।দুর থেকে সবটাই দেখলো দিলশাদ। এবার‌‌ও দেখলোই কেবল,বুঝলো না কিছুই!রাগে থরথর করে কাঁপছে,পাশে থাকা টেবিলের উপর থেকে গ্লাসগুলো সব ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।তার আকস্মিক এমন কান্ডে তার সাথে উপস্থিত দুই জন হতভম্ব হয়ে গেলো।
মাতাল আফিয়াতকে নিয়ে আকন্দ বাড়ি পৌঁছালো।ট্যাক্সি থেকে নেমে সদর দরজায় টোকা দিলে খুলে দিলো প্রহরী। লোকটার মুখ চেনা তাই কিছু বলতে চেয়েও বললো না।পাশে লোকটার গায়ে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে থাকা আফিয়াতকে দেখে থমকালো।পা এগিয়ে দরজা দিয়ে বাইরে এসে বললো,
“ আফিয়াত আম্মা আপনে এহোন এই ভোর রাতে বাইরে!"
মাস্ক পড়া লোকটা বললো,
“ সরেন ঘরে দিয়ে আসি।"
দাড়োয়ানকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে গেল। সকালের ডিউটি ফজর থেকে শুরু করে তাই তিনি জানতেন না আফিয়াত রাতে বের হয়েছে। এদিকে মাস্ক পড়া লোকটা আফিয়াতকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে গিয়েও বাঁধা পেলো।টোকা দেওয়ার মিনিট দশ পর একজন মহিলা খুলে দিলো। বাড়িতে থাকা অন্য একজন গৃহকর্মী। আফিয়াতকে দেখে আর্তনাদ করে বললো উঠলো,
“ আফা আপনে ক‌ই আছিলেন সারা রাইত?"
কথা শেষ করেই খেয়াল  করলো আফিয়াতের হুশ নেই।তার চেয়েও বড় কথা আফিয়াতের গায়ের পোশাক আশাক, চুলগুলো অগোছালো। লোকটার চোখেও কেমন চাহনি।তার হাত কোমরের উপরে যা দিয়ে শক্ত করে আফিয়াতকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। গৃহকর্মী রুবি শুকনো ঢোক গিলে বললো,
“ আপনি কে?ভাইয়া ক‌ই?"
“আগে ওকে ভেতরে রাখি!" বলেই অনুমতি ব্যতিত‌'ই ঢুকে গেল। রুবি মাথা দুলিয়ে আগে আগে গেল। আফিয়াতকে ঘরে রেখেই লোকটা কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বেরিয়ে গেল। পুরোটা সময় রুবি থ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।লোকটা কথা বলার সুযোগ‌ও দিলো না। এদিকে আফিয়াতকে দেখে কেমন খটকা লাগছিলো।রুবি খেয়াল করে দেখলো আফিয়াতের ঠোঁট অনেক জায়গা জুড়ে লাল হয়ে আছে যেমনটা কামড় দিলে হয় ঠিক তেমনি কাটার দাগ।
“ কে ছিলো? দিলশাদ ভাইয়া তো না!আর আফার অবস্থা এমন আউলাঝাউলা ক্যান?ইয়া আল্লাহ সারা রাইত ক‌ই থেইকা কি ক‌ইরা আসছে?"
বিরবির করতে করতে চলে গেল।
___________________________________________
দিনক্ষণ অনেক পেরিয়ে সব প্রায় কেমন হয়ে গেল।সেদিন রাতে কি হয়েছিল কিছুই মনে পড়ছে না আফিয়াতের।তবে কিছু একটা হয়েছে তা ঠিক বুঝতে পারছে।কারন রাইয়াজ পরেরদিন সকালে ফিরে একরকম পাগলামি করছিলো। বারবার জিজ্ঞেস করছিলো আফিয়াত ঠিক আছে কিনা।রুবি ভোরের কথা সব খুলে বলায় রাইয়াজ সেদিন থেকেই কেমন আতংকিত হয়ে থাকে।কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। এদিকে আফিয়াত নিজের শরীরের বেশ কিছু চিহ্ন পায় যা তাকে চিন্তিত করে তুলে। শরীর কেমন ব্যথা ব্যথা অনুভব হয়।
সবকিছু ছাপিয়ে যায় আফিয়াতকে না জানিয়ে এমনকি করিম আকন্দের সাথে দেখা না করেই দিলশাদের দেশ ত্যাগ করাটা। সেই রাতে যে শেষ কথা হলো এরপর আর কোন কথা,দেখা কিছুই হয়নি আফিয়াত দিলশাদের মাঝে। এমনকি আফিয়াত দেখা করার জন্য বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে যায়।এই বিষয়ে করিম আকন্দের মাঝেও দুশ্চিন্তা কাজ করতে থাকে।দিলশাদ বাইরে গিয়ে নিজের উচ্চ শিক্ষার পাঠ চুকাক তা তিনিও চাইতেন তবে এই মুহূর্তে এমন একটি সময়ে চলে যাবে তা ভাবনাই আসেনি।তার চেয়েও বড় কথা একদম উনাদের না জানিয়েই গেল তা নিয়ে আরো বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন। সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছেন বারবার চেষ্টা করেও কেন দিলশাদের দেখা তার মেয়ে পাননি সেটা ভেবেই।
অপরদিকে সেই রাতের পর রাইয়াজের তরফ থেকে আফিয়াতের উপরে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি হয় বাইরে যাওয়া নিয়ে। করিম আকন্দ‌ও এই বিষয়ে কিছু বলেনি।কারণ তিনিও আফিয়াতকে নিয়ে চিন্তিত।তবে বন্ধ হয়নি মানজিত কিংবা অন্য বন্ধুদের নিয়ে রাইয়াজের চিলেকোঠার আসর।
আফিয়াত দিলশাদের এমন করে চলে যাওয়ায় বেশ ভেঙে পড়ে। ঘর থেকেই বের হতে চাইতো না।
তার মধ্যে একদমই গৃহবন্দি হয়ে পড়ায় আরো বেশি একা হয়ে যায়।
দেখতে দেখতে চলে গেল মাস।মাধ্যমিক পরীক্ষার ছুটিও চলে গেল সাথে করে নিয়ে এলো উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যস্ততা। ভর্তি হলো উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।তার সাথে আফিয়াতের বাইরে বের হ‌ওয়ার অনুমতি‌ও জুটলো সাথে থাকবে রাইয়াজ আকন্দ।যেন একজন দায়িত্বশীল বড় ভাইয়ের ভূমিকায় আজীবন নির্ধারিত।তবে সময় খুব ভালো গেলো না। এমনিতেই দিলশাদের চলে যাওয়ার পর থেকেই আফিয়াত ঝিমিয়ে পড়েছে তার মধ্যে আশেপাশের মানুষের আজব আজব ব্যবহার।
নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা হলো, স্বতন্ত্র প্রার্থীর তালিকায় নাম আসলো করিম আকন্দের। চারদিকে প্রচারণার হুমড়ি পড়লো। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেল শহর থেকে মফস্বলের পাড়া মহল্লা কিংবা গাঁয়ের পথঘাট। এমন সময়ে মোবাইলে মোবাইলে একটা এস এম এস গেলো।করিম আকন্দকে সতর্ক করে বলা হলো যেন পিছু হটে।এক‌ই বার্তা বেশ কয়েকবার এলো। কিন্তু রাজনীতির পোকা করিম আকন্দ কোন মতেই সেই হুমকিকে পাত্তা দিলো না।তাই চুড়ান্ত পর্যায়ে তাকে একটি এম এস এস পাঠানো হলো। সেটা ছিল একটি স্বল্প সময়ের ভিডিও বার্তা।দেখার পর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতোই তিনি অনুভব করলেন করিম আকন্দ।পিতা হয়ে সন্তানের এমন রুপ দেখবে তা ভাবনার অকুলেও ছিলো না।
“ আশাকরি এবার থামবেন নয়তো এই ভিডিও কাল ক্যাসেট হয়ে বাজারে বিক্রি হবে তার সাথে বিক্রি হবে অতি আত্নসম্মানের পুটলিও।"
বুঝতে বাকী র‌ইলো না কেন, কোন উদ্দেশ্যে তাকে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।তিনি তাও যেন না দমার অনুপ্রেরণা নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে স্থির র‌ইলেন। কিন্তু তিনি বুঝতেই পারলেন না উনার এই জেদ উনার একমাত্র মেয়ের জীবন থমকে দিবে।
সবার আগে মেয়ের সাথে কথা বলতে চাইলেন তবে সেটা তিনি কি করে বলবেন? তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে মেয়ের মায়ের সাথে কথা বললো।আফরাত নাহার স্বামীর কথা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। যেই মেয়েকে তিনি ঘরের বাইরেই যেতে দেন না সেই মেয়ে কি করে এমন গর্হিত কাজ করলো?কবে করলো? সবাল আগে তিনি কথা বললো  মেয়ের খালা লায়লার সাথে।যেহেতু আফিয়াত মায়ের চেয়ে বেশি লায়লার সাথেই থাকে।
“ এটা তো স্পষ্টত তুমি আমার অনুমতি ছাড়াই বাইরে গিয়েছো! আমি শুধু জানতে চাই কবে কার সাথে গিয়েছো?"
বোনের সাথে কথা বলার পর নিশ্চিত হয়েছেন যা হয়েছে সবটাই উনাদের অনুপস্থিত সময়ে।তাই সরাসরি মেয়ের সাথেই কথা বললেন। আফিয়াতের ঘরে বসে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন উক্ত কথাটি।
“ আমি সত্যি‌ই জানি না আম্মু এটা কিভাবে হলো।আমি তো কোথাও যাইনি তোমাদের অনুমতি ছাড়া!"
আফিয়াতের উত্তর আফরাত নাহারের যুতস‌ই হলো না। তিনি কন্ঠে রাগ আর চোখে তেজ ঢেলে গর্জিত শব্দে বললেন,
“ ভালো করে ভেবে সত্যি কথা বলো।এটা ছেলে খেলা নয় আফি!"
মায়ের রাগে বীভৎস চাহনিতে আফিয়াত ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে উঠলো।তার আসলেই মনে পড়ছে না সে কোথায় গিয়েছিল। আর কিভাবে কি হয়েছে।আফরাত নাহার হতাশ হলেন।ষোল বছরের এই মেয়েকে তিনি গৃহবন্দি করেই মানুষ করেছে যাতে শকুনের নজর থেকে বাঁচানো যায়। তিনি জানতেন তার স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের কোন্দল তার সংসারেও আঘাত হানবে তাই বলে এভাবে মেয়ের ইজ্জত নিয়ে?তিনি স্বামীর প্রতি রাগে ক্ষোভে মেয়েকে চড় থাপ্পড় থেকে শুরু করে লাঠি দিয়েও আঘাত করতে ভুল মনে করলেন না।এক দুপুর আফিয়াতের উপরে চললো প্রহার। এরপরও আফিয়াত কোন কিছু বললো না। আর্তনাদ ছাড়া আর কোন শব্দই তার মুখ দিয়ে নির্গত হলো না।
আফিয়াতকে প্রহার শেষে ক্লান্ত দেহ আর চিন্তিত চিত্ত নিয়ে যখন তিনি বাইরে এলেন তখন সেই রুবি, গৃহকর্মী ভয়ে ভয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।প্রখর বুদ্ধি, সুতীক্ষ্ণ চিত্তের অধিকারীনি আফরাত নাহার রুবির মুখ দেখেই বুঝলেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু উগলাতে চায়।
 কঠোর গলায় বললেন,
“ যা বলবি একদম সত্যি।এক চুলও মিথ্যা নয়!"
রুবি গড়গড় করে রাইয়াজের সাথে আফিয়াতের বাইরে যাওয়া থেকে শুরু করে পরের ভোর রাতে বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে আসা সবটাই খুলে বললো। রাইয়াজের নাম উঠতেই আফরাত নাহারের মাথা গরম হয়ে গেল। বুঝতে বাকি র‌ইলো ঘটনার শুরু কোথায় থেকে তবে একটু ভুল বুঝে ফেললেন যার খেসারত দিতে হবে কঠিন মূল্য চুকিয়ে।
“ আগেই বলেছিলাম তোমার ভাই আর তার ঐ মাতাল ছেলেকে আমার বাড়ি থেকে দূরে রাখতে, তুমি শুনলে না আমার কথা।এখন কি হলো? আমার মেয়েটাকে বেশ্যাদের পথে নামিয়ে ছেড়েছে!"
“ মুখ সামলে কথা হলো নাহার! সবকিছুতেই আমার ভাইকে টানবে না।এখানে সমস্যা অন্য কোথাও সেটা তুমি বুঝতে পারছো না।অযথাই চিৎকার চেঁচামেচি করে মাথা গরম করিও না।! 
“ আমি আর কথাই বলবো না। শুধু শেষবারের মতো বলছি তোর এই রাজনীতি আজ এই দিনে এসে দাড় করিয়েছে,এখন বাকী শুধু আমাদের মরে যাওয়া। অবশ্য তুই আমরা মরে গেলেও আমাদের লাশ রেখেই রাস্তায় নেমে পড়বি।তোর মতো নেশাখোর খান্দানের থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশাও করা যায় না।"
“ মুখ সামলে কথা বলতে বলছি নাহার।স্বামীকে তুইতুকারি কোন ধরনের শিক্ষার মধ্যে পড়ে। আমার তো নেশাখোর খান্দান তবে তুমি কি? নিজের দিকে তাকাও আগে। ছেলে মেয়েকে সঠিকভাবে লালন পালন করলে আজ এই দিনে এসে দাঁড়াতে হতো না।আমি বাবা, পৃথিবীর সব বাবারাই পেটের দায়ে ঘরের বাইরে থাকে, বাচ্চাদের সঠিকভাবে পালন করে মায়েরা। কিন্তু তুমি ? তুমি কি করেছো? সারাক্ষণ শুধু নিজের ক্যারিয়ার নিয়েই তোমার চিন্তা ভাবনা।তোমার থেকে বাচ্চারা সময় পায় কতটুকু! যাও গিয়ে জিজ্ঞেস করো তাদের জীবনে তোমার গুরুত্ব কতটা! আর আমি তাদের পাশে কত সময় থাকি!”
“ কি করেছো থেকে? এই তার নমুনা? এইভাবে মেয়েকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে? এইভাবে মেয়েকে নিজের উত্তরসূরী বানানোর প্ল্যান ছিলো? এই সত্যি করে বলো তো তুমি জেনে বুঝেই কোন নেতার মন জোগাতে এই কাজ করেছো তাই না! স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মেয়ে হুশেই ছিলো না। নিশ্চয়ই নিজের নেশাখোর ভাতিজার কুবুদ্ধিতে এমন জঘন্য প্ল্যান সাজিয়ে নিজের প্রচারণার জন্য যাতে মানুষ তোমাকে দয়া করে ভোট দেয়!কি জঘন্য তুমি আর তোমার খান্দান! নিজেদের স্বার্থে মেয়েকেও অন্যের বিছানায় পাঠাতে দ্বিধা কাজ করলো না!"
রাগের পারদ উপচে পড়লো।এমন জঘন্য কথা কোন মা কিভাবে নিজের সন্তানকে নিয়ে বলতে পারে? কিভাবে একজন স্ত্রীর ভাবনা থাকতে পারে দীর্ঘ জীবনের সঙ্গীর প্রতি? রাগে হতবিহ্বল করিম আকন্দ ফেটে পড়লেন।সপাটে এক চড় বসালেন আফরাত নাহারের ধবধবে ফর্সা গালে। অপ্রস্তুত নাহার গিয়ে পড়লো টি টেবিলের উপর, মাথা গিয়ে ঢেকলো বেতের মোড়ায়।প্রচন্ড জোরে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলেন।করিম আকন্দ তাও থামলো না। বিচ্ছিরি কিছু শব্দ উচ্চারণ করে স্পষ্ট করে বললেন,
“ মা হ‌ওয়ার আগে মানুষ হ‌ওয়া উচিত ছিলো তোমার। তোমার মতো জঘন্য মনের,বিচ্ছিরি মগজের নারীর মা হ‌ওয়ার যোগ্যতাই রাখে না। তোমার তো আঁটকুড়ে থাকা উচিত ছিল। আফসোস হচ্ছে আল্লাহর সিদ্ধান্তে তিনি কেন তোমার মতো এক অসভ্য নারীকে দুইটা সন্তান দিছে! শোন স্পষ্ট অক্ষরে বলছি যদি আমার রাজনীতি নিয়ে সমস্যা হয় তবে এখন‌ই বেরিয়ে যাও।আমার জীবনে তোমার কোন দরকার নাই।”
বাবা মায়ের তর্কের পিঠে তর্ক চলতে থাকলো।যার সমাপ্তি ঘটলো মায়ের গৃহত্যাগে।যাওয়ার সময় রাগে অন্ধ নাহার একবার বিধ্বস্ত মেয়ের মুখের দিকেও তাকালো না।আর না দেখা করলো। শুধু ছেলের হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে বেরিয়ে গেল।
রাত পেরিয়ে দিন,দিন পেরিয়ে রাত।চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান দুনিয়ার সব স্বাভাবিক চলতে থাকলো শুধু আটকে থাকলো আফিয়াত নুর আকন্দ! মায়ের গৃহত্যাগ,বাবার রাজপথে ব্যস্ততা অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি আহত করলো দিলশাদের খবর না পাওয়া। সবকিছুতেই আফিয়াতের জীবন নিঃস্ব লাগছে।আফিয়াত দিন থেকে দিন অতলে হারিয়ে যাচ্ছে একাকির গহিনে।
সপ্তাহ পেরুলো। কোনমতে নিজ ঘর থেকে বেরুলো।বসার ঘরে বিমর্ষ করিম আকন্দের দিকে নজর পড়লো।আজ এতদিন পরেও কোন হদিস পেলো না সেই রাতে কারা ছিলো আফিয়াতের সাথে। যদি সেই হদিস পেতো তবে অবশ্যই আসল সত্য উদঘাটন করতে সমর্থ হলো। এদিকে আফরাত নাহার সবরকমের যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে। রাস্তায়‌‌ও বের হতে পারছে না। সবাই যেন কেমন নজরে তাকায়।যেই দৃষ্টিতে আগে ছিলো সম্মান আর স্নেহ সেই দৃষ্টিতে আজ ঘৃনা আর ক্ষোভ। মানুষের কত রুপ তা তিনি যেন এখন চোখে চোখ রেখে উপলব্ধি করছে।
আফিয়াত ধীর পায়ে এগিয়ে আসলো।করিম আকন্দ নিজের সামনে কাউকে দেখে চোখ উঁচিয়ে তাকালো।মেয়ের মুখ দেখে ধক করে উঠলো বুকটা।তাদের মেয়েটা যে কষ্ট পাচ্ছ তা যেন উনারা ভুলেই গেছে। নিজেদের ইচ্ছা,ইগো, সামাজিক মর্যাদা নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে যাকে কেন্দ্র করে এতকিছু তার দিকেই কোন খোঁজ নেননি।
আফিয়াতের গায়ে কলেজের পোশাক,করিম আকন্দ মায়াময় কন্ঠে বললেন,
“ কলেজ যাচ্ছো আম্মা!"
মাথা নিচু রেখেই বললো, 
“ জ্বী বাবা, নতুন ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, ক্লাসমেটরা ফোন দিয়েছিলো!তাই"
“ যাও। তবে একা যেও না। রুবিকে নিয়ে যাও!"
রাইয়াজের খোঁজ নেই, করিম আকন্দ আর আফরাত নাহারের ঝগড়ার সবটাই তার কানে গেছে।সে প্রধান ফটকের কপাটের বাইরে দাঁড়িয়ে সবটাই নিজ কর্ণে শ্রবন করেছে।সেদিন থেকেই লাপাত্তা সে। অবশ্য এমন লাপাত্তা হয়েই থাকে মাঝে মধ্যে তাই কেউ বেশি কিছু ভাবে না এখন আর।
 রুবিকে নিয়েই বের হলো আফিয়াত।রুবির চাহনিও অদ্ভুত।আজকাল সে আফিয়াতের দিকে কেমন করে যেন তাকায়।যেই তাকানো তে থাকে ঘৃনা,ঘৃনা আর ঘৃনা।আফিয়াত বুঝেও কিছু বললো না।গাড়িতে চড়ে রুবির পাশে বসেই কলেজ গেল। গাড়ীতে রুবিকে অপেক্ষায় রেখে সে নিজের ক্লাসের দিকে যেতেই খেয়াল করলো চিরচেনা সেই পরিবেশ আজ তার বহু অচেনা।সবার অদ্ভুত চাহনি আর ঠোঁট ভঙ্গি তাকে কুন্ঠিত করে ফেললো। আতংক ছড়িয়ে দিলো চিত্তে।
“ ভিডিওটা কিন্তু জোস ছিলো।"
“ আমি আগেই বলেছিলাম চিকনি মালগুলা কিন্তু সেই হয়! এগো সেক্স লেভেল সেই!"
“ হেয় এত গরম কেন তুমি!"
“ হায় কি দিছিলা সেদিন, ইস্ যদি আমিও সেদিন থাকতে পারতাম!"
“ আব্বে সেই খানে যারা ছিলো তারা সবাই আমাগো বড় ভাই,একেকটার বডি দেখেছিস কি ওজন।ঐ ভাইয়াদের মাঝে আমরা চান্স‌ই পেতাম না!"
“ আচ্ছা ঐ রকম ব্যাডাদের ওজন ক্যামনে নিলা? এই চিকনা শরীরে.."
“ আরে দূর চিকনা তো কি হ‌ইছে,মালতো খাসা! একদম পুরাই...
“ আমগো একদিন চান্স দাও,সত্যি ক‌ইতাছি কাউরে কমু না।"
ক্লাস রুমের উপস্থিত ক্লাসমেটদের বিতর্কিত নজর সহ্য করতে না পেরে একটা ফাঁকা রুম দেখে সেটাতে বসে নিজের অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিলো তখন‌ই কিছু ছেলে এসে এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে।আফিয়াত ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যায়। হাতে থাকা ব্যাগটাকে সামনে রেখে শক্ত ভাবে জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে। ছেলে গুলা আর‌ও কিছু বলতে চাইছিলো কিন্তু তখন‌ই রুমে আসে ঝাড়ুদার খালা।
রুমটা মূলত ডিগ্রীর। ছেলে গুলাও ডিগ্রীর শিক্ষার্থী।
ঝাড়ুদার খালাকে দেখে তারা সটকে যায়।আফিয়াত যেন একটু শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু খালাও কেমন কেমন করে তাকায় তাতে শ্বাস নেওয়া আর কঠিন হয়ে গেল। লজ্জিত ভঙ্গিতে আফিয়াত রুম থেকে বেরিয়ে সোজা কলেজের পেছনের দিকে চলে যায়।
সকাল পেরিয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা কিন্তু আফিয়াতের ক্লাস শেষ হয় না? রুবি গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে গিয়ে খোঁজ নিতেই জানলো আফিয়াতের ক্লাস শেষ পাঁচটার সময়‌ই... তবে আফিয়াত কোথায়?

পর্ব ৩৯


হাইকোর্টের থেকে শুরু হ‌ওয়া ট্রাফিক জ্যামের চাপ বহুদূর অবধি।তাই তারাজ রিক্সা থামিয়ে ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়লো।ফুটের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখতে থাকলো ফুটে পাতা ভাসমান পসরা সাজিয়ে বসা দোকানিদের ব্যস্ততা। দেখতে দেখতেই চোখে বাঁধলো রেশমী চুড়ির দোকান। আমাদের সমাজ তালিকায় যারা একদম তলানিতে সেই বেদে সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন নারীকে দেখা যায় কোর্ট চত্ত্বরে প্রায়‌ই নানা রকম দেশীয় ধাতুর গহনার পসরা সাজিয়ে বসতে।রেশমী কাঁচের চুড়ি, পুঁতির মালা -দুল, আলতার কৌটা তার সাথে দেশীয় ফুলের মালা। মৃৎশিল্প  সহ বাঁশের তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র থেকে ঘর সাজানোর নানা রকম জিনিসপত্র। মশলাদার চটকদার খাবারের দোকান‌ও চোখে ধাঁধা লাগিয়ে ছাড়ে।
তারাজ ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসলো এক খালার দোকানের সামনে! সাধারণ পোশাক পড়নে।গ্রে রঙের কটন মিক্সড গেঞ্জি ফেব্রিক এর টি শার্ট সাথে কালো ট্রাউজার।এক জোড়া কালো কেডস। মাস্কটা ভালো মতো এটে নিলো মুখের উপর।
এক হাঁটু ভেঙ্গে মাটিতে রেখে অন্য হাঁটু ভাঁজ করে বসলো দোকানি খালার সম্মুখে।
খালা স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে তাকালো।তারাজ হাত বাড়িয়ে এক জোড়া ঝুমকা হাতে নিলো।
“ এটা কিসের?"
“ মেটালের বাবা!"
“ মেটালের? ওজন তো বেশি নয়,কানে সমস্যা হবে?"
“ অইতো না।রোজ‌ই তো বেচি কেউ তো কয় না এগুলা পড়লে সমস্যা অয়।তয় অনেকের কানেই সোনা ছাড়া কিছুই মানায় না।হ্যাগো মতো কারো ল‌ইগা দেখলে নিয়েন না।" 
তারাজ ভাবলো সে তো জানে না আফনূরের সাথে এমন সমস্যা আছে কিনা?ভাবলো একটু সময়। এরপর বললো,
“ কত দিবো?"
“ একশো ক‌‌ইরা।"
“ প্যাকেট করেন।"
প্যাকেট করতে বলে নিজেই হাত বাড়িয়ে চুড়ির বাক্স খুলতে চেষ্টা করলো।খালা ঝুমকো জোড়া বিক্সুট রঙের ছোট্ট এক কাগজের মোড়কের মধ্যে ঢুকিয়ে নিজের কোলের উপর রাখলো। এরপর তারাজকে জিজ্ঞেস করলো,
“ চুড়ি দেখবাইন বাবা?”
“ জ্বী,এই আকাশী কালারটা দেখান তো!"
খালা চুড়ি বের করে তারাজের হাতে দিলো। নিজের আঙুলের মাঝে রেখে বোঝার চেষ্টা করলো ঠিকঠাক হবে কি-না আফনূরের মাপ অনুযায়ী।খালা বুঝলো তারাজের সমস্যা।এমন মধুর সমস্যায় সব পুরুষ ক্রেতারাই পড়ে।তাই উনাদের বুঝতে সময় লাগে না। খালা তারাজের দিকে তাকিয়ে হালকা মিষ্টি হেসে বললো,
“ যার জন্য নিবাইন তাঁর মাপ জানুউইন? না জানলে আনদাজ ক‌ইরতে পারবাইন?"
“ মাপ জানি তবে সন্দেহ হচ্ছে।কারণ তার জন্য এখনো এমন কিছু কেনা হয়নি।"
“ আনদাজ ক‌ইরতে পারবাইন না?"
“ হুম পারবো!
- একটু ওয়েট!"
কথাটা শেষ করেই তারাজ উঠে দাঁড়ালো। পকেট হাতরে ফোন বের করলো,
“ ওয়ালাইকুম আসসালাম! কোথায় তুমি?"
****
“ একটু বাইরে আসো। তাড়াতাড়ি!"
***
“ একদমই সিএমএম এর বাইরে।প্রধান গেট পেরিয়ে আসো দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি।"
সুন্দর করে নিজের লোকেশন বুঝিয়ে ফোনটা কেটে দিলো। আফনূর আসতে আসতে সে অন্য আরো কিছু পছন্দ করতে বসলো। এক লহর কাঠবেলীর মালা নিলো, কাঠগোলাপ নিলো একটা। সবকিছু প্যাকেট ভরে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে র‌ইলো পাশেই।এর মধ্যেই অন্য ক্রেতা আসলো।তাই সরে গিয়ে পাশ হয়ে দাঁড়ালো।সেই ক্রেতা চলেও গেল।আবার তারাজ হাঁটু ভেঙ্গে বসে আরো কিছু দেখতেই হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে সে উপস্থিত হলো আফনূর।
“ কি করছেন আপনি এখানে?"
হাপাচ্ছে তবুও ঠোঁটের কোনে জ্বলজ্বলে হাসি।তারাজ‌ও সেই হাসিতে তাল মেলালো।উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“ খুব বিরক্ত করলাম?"
আফনূর ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো।হাসি মিলিয়ে গেল।বললো,
“ এমন কিছু না।দৌড়ে নেমেছি সেই নয়তলা থেকে আবার এতদূর আসছি তাই একটু হাপাচ্ছি এই যা কিন্তু আপনি এই বেশে এখানে?"
“ সে বলবো ক্ষনে, আপাতত এখানে আসো।যার জন্য তোমাকে এত খাটতে হলো।তা আগে সাড়ি।"
কথা শেষ আফনূরের হাত টেনে নিচে বসালো, নিজেও বসলো।খালা ততক্ষণে চুড়ির মুঠো বের করে ফেলছে।তারাজ আফনূরের হাত টেনে নিয়ে হাতের উপর রেখে শুধালো,
“ পছন্দ হয়েছে?"
আফনূরের ঠোঁটে চ‌ওড়া হাসি ফুটে উঠলো।হাত আরও একটু বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“ অনেক!"
“ পড়িয়ে দেই?"
“ আমি ধন্য হবো!"
তারাজ চুড়ি পড়িয়ে দিলো।শ্যামা হাতের উপর আসমানী রঙের চুড়িগুলো অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।এক গোছা কাঁচের চুড়ির পাশে চিকন সোনার চুড়ি,কি সুন্দর লাগছে। তির্যক ভাবে নারিকেল পাতার ফাঁক দিয়ে আছড়ে পড়া তেজস্বী সূর্যের আলোয় আরো ঝিকমিক করছে সবগুলো চুড়ি।তারাজ হাসি ফুটিয়ে বললো,
“ মাশাআল্লাহ!"
কথা শেষ করেই চুড়ির উপরেই হাতে চুমু খেল। লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে আফনূর দৃষ্টি নামিয়ে নিলো।খালা মিটিমিটি দুষ্ট হাসি দিলো।
নিজ কাজ শেষ করে বাকী জিনিসগুলো খালাকে বের করতে বলে আফনূরকে জিজ্ঞেস করলো,
“আমি পড়িয়ে দিলে আপনি ধন্য কেন হবেন ম্যাম?"
“ ওমা, একজন এমপি, একজন ডাকসায়ে ব্যারিষ্টার নিজের মূল্যবান সময় খরচ করে এক অতি সাধারণ রমনীকে গুরুত্ব দিচ্ছে এটা নিশ্চয়ই অনেক বড় কিছু অন্তত সেই রমনীর কাছে। সেক্ষেত্রে সে নিজেকে ধন্য মনে করবে এটাই তো স্বাভাবিক বরং না করাটাই অস্বাভাবিক। সবচেয়ে বড় কথা অনেক ললনার ঘুম কেড়ে নেওয়া এক যুবকের পাত্তা পাচ্ছি তাই তো অনেক,তো সেখানে যদি সে আমাকে এতটা গুরুত্ব দেয় যে নিজের জীবন রিস্কে আছে জেনেও এমন করে ফুটপাতে বসে প্রেম ঢালা সাজায় তবে কি আমার উচিত নয় নিজেকে সবার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবা! আমাকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার জন্যে,সেক্ষেত্রেও আমি ধন্য এমপি সাহেব!"
“ আপনি আমার অর্ধাঙ্গিনী,দেহের অর্ধেক অংশ। দেহের সবচেয়ে দামী আর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের খন্ডাংশ আপনি। আপনার মূল্য আমার জীবনে জীবনের ন্যায়‌ই !আর কি বললেন? অনেক ললনার ঘুম কাড়ি? আমার কোন ললনার ঘুম কাড়ার শখ নেই কেবলই আপনি ছাড়া।আমি শুধু চাই আপনার স্বপনে জাগরণে সর্বত্র কেবল আমার বসবাস! আপনার ভেতর বাহিরে শুধু আমার‌ই রাজত্ব চলুক।
এই পুরুষের এক জীবনের সঙ্গিনী আপনি, আপনাতেই জীবনাসান হোক। আপনার চেয়ে গুরুত্ব আর কিছু নেই! সেটা হোক পদ কিংবা পজিশন! আপনার চেয়ে গুরুত্ব কেবল আপনার ভালো থাকাই।"
“ বাবা ল‌ইন ,খালাম্মারে এগুলাও পড়াই দ্যান দেহি। চান্দের লাহান মুখখানি ক্যামন জ্বলজ্বল করে!"
খালার কথায় নিজের থেমে গেল। এমনিতেই তারাজের প্রেম বিলাসে লজ্জা রাঙ্গা হচ্ছিলো তার মন খালার কথায় লজ্জা প্রজাপতিরা জেঁকে ধরলো।তারাজ ঝুমকো জোড়া আফনূরের হিজাবের উপরেই কানের সাথে লাগিয়ে দেখলো।সিলভার মেটালের তৈরি গোলাকার মাঝারি মাপের ঝুমকো জোড়া বেশ লাগছে।হাতের মুঠোয় রেখে কাঠবেলীর মালাটা আফনূরের হাতে পেঁচিয়ে দিলো। এরপর বললো,
দেখো তো আর কিছু নিবা?"
আফনূর বললো,
“ আপনি দেখেন!"
তারাজ‌ই দেখলো,একটা সুন্দর পায়েল।সেটাও বের করতে বললো,পায়েল দেখে আফনূরকে বললো,
“ একটু দাঁড়াও!"
আফনূর দাঁড়ালো।তারাজ কি করতে চাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না।খালা বের করে দিলো। এরপর সেটা নিয়ে আফনূরের পায়ের গোড়ালিতে হাত রেখে বললো,
“পা তুলো।”
আফনূর আঁতকে উঠে বললো,
“ কি করছেন? পায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?"
“ কি সমস্যা! চুপচাপ দাঁড়াও।”
“ কিন্তু?"
“ তুমি শিক্ষিত মানুষ অশিক্ষিতের মতো করো না!"
নিজেই পা তুলতে চেষ্টা করলো। আফনূর পা উঠিয়ে দিলে সেটা নিয়ে নিজের হাঁটুর উপর রেখে পায়েল পড়িয়ে দিলো।মনে হলো ষোলকলা পূর্ণ হলো।হাসি দিয়ে বললো,
“এটাও নিবো।"
এরপর আর‌ও টুকিটাকি জিনিস নিলো আফনূর।সব নেওয়া শেষে খালাকে জিজ্ঞেস করলো,
“ কত হয়েছে খালা?"
“ ৭৫০ টেকা বাবা!"
“ ৭৫০! আচ্ছা দাঁড়াও।"
তারাজ মানিব্যাগ বের করে একটা নতুন হাজার টাকার নোট খালার হাতে দিলো,
“ ভাংতি নাই এত বড় নোট বাবা!"
“ লাগবে না,রেখে দেন।ওটা আপনার বকশিস।”
“ কিন্তু?"
“ রাখেন।চা পান খেয়েন। মনে করেন ছেলে দিয়েছে খুশি হয়ে এর বদলে আমাদের ভবিষ্যৎ রাজপুত্র রাজকন্যার জন্য দোয়া করলেই চলবে।”
“ আল্লাহ আপনার ঘর চান্দের জোৎস্না দিয়া উজ্জ্বল ক‌ইরা রাখুক সবসময়,বংশ বড় করুক। অনেক অনেক বাত্তি জ্বলুক আপনার উঠানে।"
“ আমীন!
"খালার দোয়ার সাথে তাল মিলিয়ে তারাজ বললো।
আফনূর সেই যে চুপ হয়েছে তো হয়েছেই।আর মুখ খোলেনি। যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই খালা বললো,
“ আপনে কোন এলাকার এমপি বাবা?"
তারাজ একটু থমকালো এরপর বললো,
“ আমি আমার ঘরের কর্তীর মনের রাজ্যের এমপি খালা!"
খালা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো।বুঝলো না বোধহয়। এরপর হেসে দিলো।হয়তো নিজ দায়িত্বে কিছু বুঝে নিলো। খালার প্রতিক্রিয়া দেখে আফনূর মুখ লুকিয়ে হাসলো।এটাও মনে মনে ভাবলো সে একটু আগে কি ভুলটাই না করেছিলো।তারাজ মুখ ঢেকে বেরিয়েছে অথচ সে বারবার এমপি সাহেব বলে ডাকছিলো।ইস্! যদিও তারাজের মুখোভঙ্গিতে কোন সমস্যা হতে পারে বলে মনে লাগেনি তবুও।তারাজ আফনূরের হাত ধরে এগিয়ে গিয়েও আবার পিছু ফিরলো এরপর মানিব্যাগ খুলে একটা কার্ড বের করে বললো,
“ আপনার যেকোন গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে আমাকে স্মরণ করতে পারেন।আমার কর্তীকেও,সে প্যাক্টিসিং ল‌'ইয়ার। যেকোন আইনি ঝামেলায় চলে আসবেন!”
“ আইচ্ছা বাবা!"
কথা শেষ করে চলে গেল।কোট চত্বরে শতশত ল‌'ইয়ারের মাঝে মিশে গেল।

পর্ব ৪০


কোর্ট পাড়া থেকে তাতী বাজার দিয়ে ঢুকে শাঁখারি পট্টি যেতেই অনেক বিরিয়ানীর দোকান আপনার চোখে ক্ষুধার আগুন ধরিয়ে দিবে। পুরান ঢাকায় গেলে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে ইচ্ছা জাগবেই এক প্লেট কাচ্চি মেরে দিতে।যদি খাদক মানে খেতে পছন্দ করেন তো কোন কথাই নেই।সে অবশ্যই একটুখানি ঢু মেরে কয়েক প্লেট লুচি আর বিভিন্ন রকমের কাবাব দিয়ে পেট পুজো সেরে ফেলবেন।তার সাথে থাকবে হরেকরকম মিষ্টান্ন,দধি, লাচ্ছি আর নানা রকম পানের আয়োজন।অবশ্য বিরিয়ানীর জন্য বিখ্যাত হচ্ছে নাজিরা বাজার। 
পুরান ঢাকার নাম শুনতেই মাথায় আসবে অসংখ্য অলি-গলি, শতবর্ষী সব বাড়ি, আর বাহারি সব খাবারের কথা। বিরিয়ানি, কাবুলি, খিচুড়ি, হালিম, বাকরখানি, রুটি, কাবাব, শরবত, দোলমাজাতীয় তরকারিসহ জিভে জল আনা এসব খাবারের জন্য খাদ্যরসিকদের পছন্দ পুরান ঢাকা। স্বাদে, গন্ধে ও গুণগতমানে কোনটিই কোনটির চেয়ে কম নয়। এসব খাবারের জনপ্রিয়তা ছাড়িয়ে গেছে দেশের গণ্ডিও।
রকমারি খাবারে সমৃদ্ধ পুরান ঢাকা'য় খাদ্য রসিকদের প্রধান আকর্ষণ কাচ্চি। তাই তো পুরনো ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোড, নাজিমুদ্দিন রোড, উর্দ্দু রোড, বংশাল, সিদ্দিক বাজার, চকবাজার, নবাবপুর, ইসলামপুর, ওয়ারী, মালিটোলা এবং মৌলভীবাজার এলাকায় কাচ্চি বিরিয়ানির দোকানগুলোতে ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিনিয়ত ছুটে আসেন মানুষ।
ইতিহাস বলে, মোঘলদের বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের প্রতি ছিল দুর্বলতা। বাংলায় মোঘল শাসনামলে পুরান ঢাকাবাসীর মধ্যে বিরিয়ানি জনপ্রিয়তা পায়। যে ঐতিহ্য পুরান ঢাকাবাসী এখনও ধরে রেখেছেন। বিয়েবাড়ি থেকে মুসলমানি, ঈদ, জন্মদিন কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে তাই তো রসুইঘরে চলে কাচ্চি পাকানোর ব্যস্ততা।
কোর্ট থেকে কাজ শেষ করে হেঁটেই দুজন পৌঁছায় নাজিরা বাজার। ফাঁকা দেখে একটা দোকানে ঢুকে দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়। অবশ্যই তাতে থাকে বিরিয়ানি আর কলিজা ঠান্ডা করা লাচ্ছি।
“তুমি আরও নিবে?"
আফনূরের এক প্লেটের সাথে তারাজ দেড় প্লেট সাবার করছে তারপরেও আফনূরের খাওয়া শেষ হচ্ছিলো না। অপেক্ষায় থেকে অবশেষে শেষ করতে দেখে তারাজ উক্ত কথাটা বললো। আফনূর চোখ কপালে তুলে বললো,
“ অসম্ভব!এটাই অনেক কষ্টে খেয়েছি।"
“ হাফ প্লেট ছিলো নুরজান! এতেই?"
“ আমি বিরিয়ানি পছন্দ করি তবু‌ও কেন জানি আজ খেতে পারছি না”
 কোর্টে থাকা অবস্থাতেই সিদ্ধান্ত নেয় আজ বাইরেই খাবে তবে বিরিয়ানি খাবে। আফনূর দ্বিমত করেনি।
অবশ্য ভোজনরসিক বরের ব‌উ হলেও আফনূর খুব একটা ভোজন বিলাসী নয়।তার খাওয়াদাওয়া পরিমিত।তবে তারাজ খেতে বসলে একদম পেট ছেড়ে বসে। তার খাবারের তালিকায় সবার আগে থাকে বিরিয়ানি এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তেহারি।তাই এখনূ এই দম্পতি তেহারি দিয়ে আহার সাড়লো। শেষ করে লাচ্ছি ওয়ান টাইম গ্লাসে করে হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
“ এ্যাই রিক্সা!"
রিক্সা ডেকে উঠে গেল গন্তব্যে।হুড ফেলে দিলো।
দু'জনের মুখের মাস্ক। আফনূরের কোট তারাজের বাহুতে।বসার পর ভালো করে দেখে নিলো আফনূরের শাড়ীর কোন কোনা ঝুলে আছে কি-না। সবকিছু ঠিকঠাক দেখে চালককে বললো,
“ চলেন!"
মাস্ক পড়া থাকলেও উচ্ছ্বাসিত আফনূরের হাসি তার চোখেমুখে ভাসছে। তারাজ সেই চোখে তাকিয়ে হাসলো। আফনূর শক্ত করে তারাজের বাহু আঁকড়ে কাঁধে মাথা রেখে বসেছে।সেই মাথায় অল্প মুহূর্ত তাকিয়ে নিজেও শক্ত করে হাত ধরলো। মনে মনে বললো,
“ তোমার সব ভরসার কেন্দ্র যেন আমাতেই হয়। দেহের অবসান হলেও আত্নার বসবাস তোমাতেই যেন রয়।"
টু টাং আওয়াজ তুলে প্যাডেলের পর প্যাডেল মেরে এগিয়ে চলছে পুরান ঢাকার অলিগলি দিয়ে। তারাজের হাতের মুঠোয় আফনূরের হাত, কাঁধে রাখা কাঁধ। সামনে তাকাতেই আফনূরের অক্ষিপটে ভেসে উঠলো অতীতের সেই তিক্ততা।
ফ্ল্যাশব্যাক,
“ আমি এত কিছু বুঝি না।আমি শুধু আমার মেয়েটাকে চাই।আজ একরাত পেরিয়ে গেছে। আমার বাচ্চা, আমার মেয়েটা নেহায়েত বাচ্চা।এই দুনিয়ার নিষ্ঠুরতা থেকে সবসময় আগলে রাখার চেষ্টা করেছি কিন্তু শকুনেরা বাচ্চারা আমার সেই মেয়ের দিকেই হাত বাড়িয়েছে।ওরা আমার দূর্বলতায় আঘাত করেছে, করেছে আমার কলিজায়।যদি বিন্দুমাত্র ক্ষতি করে আমি বলছি কাউকে ছাড়বো না।"
করিম আকন্দের এমন ধমকে আদৌও কাজ হলো বলে মনে হলো না। বরং অপর প্রান্ত থেকে কি বললো তা আন্দাজ করা গেলো হয়তো করিম আকন্দের উত্তর থেকেই।
“ আমি আপনাদের আগেও বলেছি ঐ ভিডিওর সাথে আমার মেয়ের কোন যোগসূত্র নেই। সেদিন আমাদের অনুপস্থিতিতে আমার ভাইয়ের ছেলে আমার মেয়ের মন ভালো করতেই বাইরে নিয়ে গিয়েছিল তখন‌ই তাকে উল্টাপাল্টা খাইয়ে এমন করেছে। আমার মেয়েটা বাচ্চা,এখনো দুনিয়ার এত জটিলতা সে বুঝে না।দেখুন..
**
“ অসম্ভব! আমার ভাতিজা এমন করতেই পারে না।সে যত‌ই খারাপ হোক নিজের বোনের সাথে এমন জঘন্য কাজ সে করতেই পারে না।"
****
অপর প্রান্তের কথা শেষ। ফোনটা টুট টুট করে কেটে গেল।করিম আকন্দের যেন মাথা ঘুরতে থাকলো। এটা সে কখনোই মানতে পারবে না।তার রাইয়াজ এতটাও জঘন্য নয়।এক‌ই রক্তের,এক‌ই বংশের ছেলে হয়ে নিজের রক্তের সাথে এমন ঘৃণিত কাজ কখনো সম্ভব নয়!
গতকাল সন্ধ্যা থেকে লাপাত্তা মেয়ের চিন্তায় খাওয়া দাওয়া সব বাদ দিয়ে দিয়েছে। এদিকে আফরাত নাহার‌ও মেয়ের জন্য কান্নাকাটি করে ইতিমধ্যেই কয়েকবার বেহুঁশ হয়ে গেছে যদিও তিনি তারপরও সব দোষের ভাগীদার আকন্দ বংশকেই করছে। তাতে তার প্রতিও বিতৃষ্ণা বাড়ছে।ক‌ই মেয়ের জন্য দোয়া করবে তা না করে এখনও তার পরিবারের মন্দ গাইতেই ব্যস্ত আছে।তিনিও ক্ষ্যাপাটে সুরে বলে দিয়েছে যদি কোন মতেই মেয়ের এমন গায়েব হ‌ওয়ার পিছনে আফরাত নাহারের হাত থাকে তবে তিনি সেদিন‌ই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন।
তবে এই মুহূর্তে করিম আকন্দের চিন্তার পারদ বাড়লো অপর প্রান্তে থাকা তদন্ত অফিসারের কথায়।আজ সপ্তাহ পেরুলো রাইয়াজের লাপাত্তার।কেউ জানে না কোথাও আছে! আগেও এমন লাপাত্তা থাকতো তবে পথেঘাটে অনেকের কাছেই তার খোঁজ মিলতো।তার চেয়েও বড় কথা এতদিন থাকতো না সর্বোচ্চ পাঁচ দিন নিখোঁজ থাকতো এর পর নিজেই হাজির হতো ঘরে। কিন্তু এবার কোথায়? তার চেয়েও বড় কথা ফোনটা আজ সাতদিন ধরেই নিখোঁজ! কেন? এই কথা তার মাথায়‌ই আসেনি।ভাই ভাতিজার কারণে দল থেকে ছিটকে পড়ায় তাদের প্রতি মনোক্ষুণ্ন হয়েছিল যার কারণে তাদের এবার কোন কাজেই রাখেনি।তাই তো পরের ছেলেকে দিয়ে সব করাতে হচ্ছে।সেই পরের ছেলেও তো আঘাত করলো। একদম কলিজায় আঘাত করলো। বিশ্বাস,ভরসা, নির্ভরতা সব ভেঙ্গে দিয়েছে।কি করে তার মেয়েটা সহ্য করবে? যদি সত্যিটা জানতে পারে! কিন্তু জানবে তো একদিন অবশ্যই।। কিন্তু জানার জন্য তো আগে মেয়েটাকে খুঁজে বের করতে হবে।
অন্ধকার বদ্ধ রুমের আরাম চেয়ারে বসে একাধারে ভাবতে থাকলো কি হচ্ছে তার সাথে? কাল থেকেই আজ সন্ধ্যা অবধি পাগলের মতো সন্ধান চালিয়েছে। নিজের ক্ষমতার সবটুকু ঢেলে দিয়ে মেয়ের সন্ধান চালাচ্ছে কিন্তু কোন ছোট একটা আশাও দেখছে না যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
ভাবতে ভাবতেই বুক ফেটে যাচ্ছে,চাপা আর্তনাদে করে উঠলো, অন্তঃস্থলে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে ডাকতে লাগলো,
“ আম্মা,আপনি কোথায় আছেন? ফিরে আসেন! আপনি আসলে বাবা সব ছেড়ে আপনাকে নিয়েই থাকবো। আপনার কিছু হলে নিজের সাথে চোখ মেলাতে পারবো না । আব্বুকে এত বড় শাস্তি দিয়েন না আম্মা! আল্লাহ আপনার রহমত বর্ষণ করেন, আমার বাচ্চাটার হেফাজত করেন!"
বাচ্চাদের কিছু হলে বাবারা কাঁদে না কে বললো? বাবারাও কাঁদে!তারা তাদের বুকের ক্ষত দেখাতে পারে না। মায়েদের মতো বুক চাপড়ে কান্না করতে পারে না।পারে না মায়েদের মতো অল্পতেই অজ্ঞান হয়ে নিজেদের শোক প্রকাশ করতে।তাই তাদের কষ্ট দেখা যায় না।বোঝা যায় না। কিন্তু তারাও কাঁদে,তাদের‌ও কলিজা পুড়ে যায় মানিক হারানোতে ।
আরো একটি রাত পেরিয়ে গেল। নির্ঘুম, দুশ্চিন্তা নিয়েই কাটলো করিম আকন্দের রাত।
ভোরের সূর্যের আলো ফোটার আগেই কলিং বেলের বিকট শব্দে ধরফরিয়ে উঠলেন, হাতে থাকা আফিয়াতের ছবিটা নিচে পড়ে গেলো। রুপোলি ফ্রেমে বাঁধা কাঁচের ফ্রেমটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। করুন চোখে সেটাকে দেখে নিজের অবস্থান বুঝলো।রাতে সেই যে বসেছে তারপর কখন কিভাবে চোখ লেগে গেল বুঝতেই পারলো না। ছলছল চোখে ফ্রেমটা তুলতে নিচে ঝুকতেই কলিং বেল আবারও বেজে উঠলো,তিনি ছবিটা তুলে সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে গেল।ঘরের দোর পেরিয়ে বসার ঘরে যেতেই দেখলো রুবি দরজা খুলে বাইরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে,
“ কে এসেছে রুবি?"
“ জানি না খালু। কাউকে তো দেখছি না।"
রুবির ভীত উত্তর। করিম আকন্দ এগিয়ে বাইরে বের হলেন।সদ্য আলো ফুটতে শুরু করেছে।লালীমায় ছেয়ে গেছে পূর্বাকাশ। অজানা আশঙ্কায় হাত পা কাঁপতে লাগলো।কয়েক কদম পেরুতেই বেলী গাছ তলার নিচে ব্লু পলিথিনের ব্যাগ দেখলো। ধুমড়ে মুচড়ে রাখা ব্যাগটা দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। কৌতূহল জাগলো। গেটের পাহাড়ায় থাকা দাড়োয়ানকে ডাকলো,
“ জাহাঙ্গীর!"
ঝিম মেরে বসে থাকা জাহাঙ্গীর লাফিয়ে উঠলো,কয়েক সেকেন্ড লাগলো পরিস্থিতি বুঝতে, এরপর ভেতরে দৌড়ে আসলো,
“ স্যার ।"
“ কে আসছিলো?"
“ কে আসছিলো!"
উল্টো প্রশ্ন,তার মানে সে জানেই না।রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বললো,
“ খাঁ**র বাচ্চা টাকা দিয়ে রাখছি কি ঘুমানোর জন্য?
আমার ঘরে ডাকাতি হয়ে গেল আর তুই ঘুমাচ্ছিস?"
জাহাঙ্গীর ভীত সন্ত্রস্ত, লজ্জিত হলো। করিম আকন্দ কখনো কোন কর্মীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না।রাজীব আকন্দ আর রা‌ইয়াজ আকন্দের খারাপ ব্যবহারে বরং লজ্জা পেয়ে ক্ষমা চায়।অথচ আজ! নিজের দোষ‌ই দিলো জাহাঙ্গীর।তার মনিবের খারাপ সময় চলছে এই মুহূর্তেও সে নিজের কাজে গাফিলতি করে ঘুমাচ্ছিলো।আর এই সুযোগেই নিশ্চয়ই,
“ এই আকবর; রফিক!"
হাক দিলেন করিম আকন্দ
বাড়ির পেছনের দিকে থাকে তার কয়েকজন লোক।যারা তাকে নিরাপত্তা দিতেই থাকেন।
জাহাঙ্গীর নিজের ভুল স্বীকার করে বললো,
“ ক্ষমা করবেন স্যার,চোখ লেগে গিয়েছিল!আমি কি করতে পারি?"
“ তোমাদের চোখ লেগে যায় কি করে? আমার মেয়ে নাই, আমার মেয়ে নিখোঁজ! আর তোমরা সবাই বেমালুম নাক টেনে ঘুমাচ্ছো? এতটা নেমকহারামি কেমনে করো?"
জাহাঙ্গীর নিরুত্তর।রফিক, আকবর ছুটে এলো।চোখ ঢলতে ঢলতে বললো,
“ স্যার কোন কিছু হয়েছে?"
ক্রোধে ফেটে চিৎকার করে বললেন,
" আর কি হ‌ওয়ার বাকী আছে? আমার মেয়ে, আমার কলিজার টুকরা, আমার রাজকন্যা আমার একমাত্র মেয়ে নিখোঁজ! এর চাইতেও বেশি আর কি হবে আমার সাথে!"
“ সরি স্যার আমরা এভাবে কিছু বলতে চাইনি আসলে ভাবছি এখন....
করিম আকন্দের এমন ভয়ানক রুপে ভীত রুবি পা এগিয়ে বললো,
“ একটু আগেই কেউ একজন অনেক জোরে বারবার কলিং বেল বাজাইতেছিলো, আমি খালু দুইজনেই আইসা দেখি কেউ নাই। ঐদিকে দাড়োয়ান দেখেই না কাউকে!"
“ কি বলছেন? এটা কিভাবে সম্ভব? যেখানে দরজা লাগানো!"
“ তবে কি আমরা মিছা ক‌ইতাছি?"
” আহ্ রুবি চুপ থাকো।" 
রফিকের সাথে রুবির তর্কে বিরক্ত আকবর ধমক দিলো। বুদ্ধিল ঘট থেকে কিছু বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে বললো,
“ যদি এমন কিছু হয় তবে নিশ্চয়ই আশেপাশে কিছু আছে যা দেওয়ার জন্য‌ই ওরা এসেছে, কিন্তু কথা হলো কিভাবে আসছে!"
“ এমন কিছু মনে হলে আগে সেটা খোঁজো!"
রফিক বললো। তারপর দুজনে খুঁজতে খুঁজতে রুবি ও জাহাঙ্গীরকে বললো,
“ দাঁড়িয়ে আছো কেন? খুজো!"
করিম আকন্দের চোখ আটকালো সেই পলিথিনের ব্যাগে। তিনি জাহাঙ্গীরকে বললো,
“ ঐটা দেখো তো!"
জাহাঙ্গীর মনিবের আদেশ অনুযায়ী পলিথিন ব্যাগটা তুললো,খুলে দেখলো ভেতরে একটা....

পর্ব ৪১


“ ওদের কথা না শুনলে আমাকে ওরা মেরে ফেলবে আব্বু!তুমি.. আহ্ !"
রেকর্ডার বন্ধ হয়ে গেল।শেষ; এতটুকুই ছিলো রেকর্ড করা।পূনরায় চালু করলো,এক‌ইভাবে শোনা গেল সেই অতি পরিচিত কন্ঠস্বরে বাঁচার তীব্র আকুতি,
“ ওদের কথা না শুনলে আমাকে ওরা মেরে ফেলবে আব্বু! তুমি..আহ্!”
“এটা আমার মেয়ের কন্ঠ; আমার মেয়ে কাঁদছে,ওরা আমার মেয়ের সাথে কি করছে?”
উত্তেজিত হয়ে পড়লেন করিম আকন্দ। কান্নায় ভেঙে পড়ে অশ্রুপাত করতে করতে আকবর রফিকের উদ্দেশ্য কথাগুলো বললেন।
ব্যাগ হাতড়ে আরো কিছু খোঁজা চেষ্টা করতেই পেয়ে গেল ওড়নার কোনে লাল দাগে সরু করে লেখা দুইটা লাইন,
“ এখনও সময় আছে জেদ ছাড়ুন।নয়তো লাশটাও খুঁজে পাবেন না!
- এটা হুমকি নয়, চুড়ান্ত কথা।"
করিম আকন্দ একজন বাবা! বাবাদের কাছে সবার আগে সন্তান! তবুও এখানে উনার আত্নসম্মানের বিষয়, বিষয় ন্যায়ের সাথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।উনি নিজেই এক সময় যেই দলের হয়ে কাজ করতো আজ সেই দলের দ্বারাই ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন।অপরাধ? দলের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশগ্রহণ! না ! অপরাধ হলো উনি যদি জিতে যান তবে হেরে যাবে বিগত দিনে সাধারণ মানুষের ক্ষতি করার মনোবাসনা! যারা এতদিন মানুষের সেবার নামে করেছে নানা দুর্নীতি, অর্থলুট,গুম হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ তারা ক্ষতির সম্মুখীন হবে! মাদক কারবারিদের পয়সা কামাইয়ের পথে সমস্যা সৃষ্টি হবে।তিনি কি জানেন না, তার ভাই ভাতিজার পেছনের মূল হোতা কে? তার ঘরে কার উসকানিতে মাদকের আখড়া গড়ে উঠেছে! নিশ্চয়ই জানেন,আর জানেন বলেই তিনি তাদের থেকে এড়িয়ে চলে নিজেকে সমাজ সেবায় প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তাই তো এত এত বাঁধা আর বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন তবুও তিনি মাথা নত করবে না! করবে না অন্যায়ের সাথে আপোষ! তবে তার সন্তান,তার পরিবার! আল্লাহ চাইলে পরিবাকরকেও হেফাজত করবেন ইনশাআল্লাহ!
প্রেরনকৃত টেপ রেকর্ডার এবং সেই ওড়না নিয়ে চললো তল্লাশির নামে লোক দেখানো নাটক।তার সাথে চলছে নানা কথার প্রহসন।করিম আকন্দের দম আটকে আসছে যেন। একদিকে মেয়ের অবস্থা,অন্যদিকে ভাতিজা নিখোঁজ। পুলিশের সন্দেহের তীর রাইয়াজের দিকে।তারা ভাবছে রাইয়াজ নিজেই এগুলো করছে তাই তারা আগে রাইয়াজের খোঁজ চালাচ্ছে।
ঘড়ির কাঁটা থামে না।আর না থামে সময়।তার গতিতে সে এগিয়ে যায়।তেমনি পেরিয়ে গেল তিনদিন।পুলিশ থেকে র‍্যাবে চলে গেল কেইস,যোগ হলো সেনাবাহিনীর সদস্যরা। নিজের অর্থের ব্যবহার সর্বোচ্চ চলছে, তার সাথে আগের সহোচরদের সহায়তাও কিছু কিছু পাচ্ছে কিন্তু ফলাফল এখনও শূন্য! 
এর মধ্যে তিনবার এক‌ই রকমভাবে বার্তা আসলো।সর্বদাই সতর্ক করার জন্য। প্রতিটি প্রমান করিম আকন্দ প্রসাশনের হাতে দিতো কিন্তু সুরাহা যেন হয়ে হচ্ছিলো না। তিনদিন পর আসলো সেই দিন যখন ঘটনার রেশ পুরোই উল্টে গেল।
বাতাসে বাতাসে ভেসে এলো উত্তর কাট্টলি পাহাড়তলী এলাকা থেকে  এক অজ্ঞাত যুবকের লাশ পাওয়া গেছে। এদিকে করিম আকন্দ প্রেশার বাড়িয়ে ঘরে পড়ে আছে।
যারা আশেপাশে এতদিন উৎসাহ দিতো তারাও যেন পিছু হটতে থাকলো।কোন অজানা আশঙ্কায় অথবা কোন ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়াতেই।
অসহায় হয়ে পড়লেন করিম আকন্দ।যাদের পেছনে নিজের অর্থ খুইয়েছে,যাদের কল্যানার্থে এত কিছু তারাই কেমন দূরে দূরে থাকছে।
আকবর রফিক সহ তার বেশ কয়েকজন পয়সা দিয়ে পালিত লোক আছে যারা কাজ করে গেল নিরলসভাবে।তারাই শুধু পাশে র‌ইলো। তবে এর মধ্যেই ফিরে এসেছে খালাম্মি লায়লা।তিনি এসেই যখন পরিস্থিতি এত জটিল দেখলেন ফোন দিয়ে নিজের ফোনকে শাসালেন। তিনদিন পরের খবরে করিম আকন্দের হৃদপিন্ড ধরাক ধরাক করতে লাগলো।
“ স্যার, ওরা বলছে একবার গিয়ে দেখতে,ছবি অনুযায়ী ঐটা রাইয়াজের ‌দেহ!"
মাথায় ঠান্ডা ব্যাগ নিয়ে বসে ছিলেন।করুন চাহনিতে আকবরের দিকে তাকালো। বললেন,
“ এতটা নিশ্চিত হয়ে কি করে বলছো?”
“ আজ পেনেরো দিনের মতো হয়ে গেল,কোন খোঁজ নেই । নিশ্চয়ই এতদিন.."
“ এভাবে বলো না আকবর,আমি মরে যাবো। আমার ছেলে মেয়ের কিছু হলে!"
“ স্যার আমি বলছিলাম আপনার ওদের কথা মেনে নেওয়াই উচিত!"
“ হেরে যেতে বলছো?এভাবে বাঁচবো!"
“ আফরাত মামনি আর রাইয়াজ বাবার কিছু হলে আপনি বাঁচবেন?”
“ চলো আগে গিয়ে দেখি,যদি সত্যি নাই হয়!" 
রাজিব আকন্দ আর তার সহধর্মিণী বিন্দিয়া আক্তারকে সাথে নিয়ে করিম আকন্দ লাশ শনাক্ত করতে গেলো।
__________________________________________
“ রোগীর সারা শরীরে ভয়াবহ আঘাতের লক্ষণ
তার চেয়েও বিচ্ছিরি কথা হচ্ছে এই রোগীর সাথে যৌন নির্যাতন হয়েছে! যেন কোন পিশাচের কাম ক্ষুধা মেটানোর জন্য এমন পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে!"
ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নিয়ে গেছে পুলিশ।তার আগে দেওয়া ব্রিফ ছিলো এটা।সারা শরীরে ভারী কোন দন্ডের আঘাত।কালশিটে দাগগুলোতে চলটা পড়ে গেছে।যেন ধারালো কিছু দিয়ে আঁচড় কাটলেই সেটা আচড়ের সাথে উঠে আসবে।বিন্দিয়া আক্তার সাথে সাথেই ঐ স্থানেই বেহুঁশ হয়ে পড়লেন।রাজীব আকন্দ পাগলের মতৈ নিজেই নিজেকে আঘাত করতে থাকলেন সাথে বলতে থাকলো,
“ আমার পাপেই সব শেষ হলো। আমার ছেলেটা আমার পাপের জন্য মরে গেল।ওরে করিম তোর জন্য সব হয়ে গেল।আমার ছেলেটাকে ওরা মেরে ফেললো রে...
করিম আকন্দ নিথর চোখে দেখলো কেবল।যত‌ই খারাপ হোক তার তো রক্ত।
করিম আকন্দের কান্না কিংবা রাজীব আকন্দের আহাজারি কোনটাই মানুষের মন গলাতে পারলো না। বরং তারা যেন খুশি‌ই হলো। রাজীব আকন্দ আর রাইয়াজ আকন্দের ভয়ে অনেক বাবা মা‌ই নিজের মেয়েদের ঘর থেকে বের করতে ভয় পেতো।
অনেক মায়ের কলিজার টুকরা নষ্ট পথে গেছে তাদের হাত ধরে। মাদকের কারবার থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি সবকিছুতেই ছিলো রাইয়াজের পদচারণা। রাজিব আকন্দ ছিলো ছেলের প্রধান ওস্তাদ। সুতরাং এমন একজন মানুষের মৃত্যু সাধারণ মানুষের জন্য খুশির খবর‌ই।
ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নিয়ে গেলে কিছু দলীয় ছেলে আর অন্যান্য লোক গেলো হাসপাতালে। বিন্দিয়া আক্তার আর করিম রাজীব আকন্দ বাড়ি ফিরলো। করিম আকন্দ তাদের র‌ওনা দিলো থানার উদ্দেশ্যে।
“ আপনার কাছে নির্বাচনে লড়াই করাই যখন মূখ্য তখন এভাবেই সব হারাবেন একে একে...
বার্তার সাথে একটা ছোট ভিডিও,অর্ধবস্ত্র এক কিশোরীর হাত দুটো পিছমোড়া বাঁধা,বুকের সামনে কাপড়টা ছেঁড়া,যেটা ঝুলে আছে কোনমতে। অন্তর্বাস দৃশ্যমান।চোখে মুখে আতংক আর অসহায়ত্ব। ঠোঁটের চারদিকে আলকাতরার মতো কালো প্রলেপ।গালে এচোড়ের দাগ। চুলগুলো এলোমেলো , জটপাকানো।করিম আকন্দ চোখ বুঝে ফেললেন। বুঝতে বাকী র‌ইলো না মেয়ের সাথে কি হচ্ছে! পুত্র সন্তান হারানোর শোক সহ্য করা যায় 
কিন্তু কন্যা সন্তানের ইজ্জত হরণের দুঃখ নয়।তিনি আর পথ চলার সাহস শক্তি পেলেন না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলো। নিজ অফিসে ফিরে গেলেন। সবাইকে জানিয়ে সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করলেন। আকবরকে দিয়ে হাসপাতাল থেকে লাশ বাড়ি আনার সমস্ত বন্দোবস্ত করা হলো। রিপোর্ট অনুযায়ী,
‘ রাইয়াজের মৃত্যু হয়েছে এখন থেকে ঠিক বাইশ ঘন্টা আগে। অতিরিক্ত পেটানোর জন্য দম বন্ধ হয়ে মারা গেছে।মৃত্যুর আগেও রাইয়াজ প্রচুর নেশাদ্রব্য সেবন করেছে।হয়তো তাকে করানো হয়েছে।তার শরীরে আঘাতের বেশ কিছু আলামত পাওয়া গেছে। তাছাড়াও রাইয়াজ যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে । সম্ভবত তাকে আটক করে রাখা তাদের মধ্যে থেকে কেউ লেসবিয়ান ছিলো।মারার আগেও তাকে যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছিল।
রক্তে ইয়াবা সহ ফেনসিডিল এর লক্ষণ পাওয়া গেছে।"
রাইয়াজ মাদকসেবী এবং কারবারী সুতরাং তার দেখ থেকে এগুলো পাওয়া যাবে তা স্বাভাবিক।এটা নিয়ে ভাবার বিশেষ কিছু নেই। কিন্তু অস্বাভাবিক ছিলো সমকামিতার স্বীকার হ‌ওয়া।যেটা অত্যন্ত লজ্জার আর বিব্রত বোধ করায় সবাইকে।যদিও মৃত্যু মানুষ তবুও এই একটা বিষয় চাউর হলো চারদিকে।
করিম আকন্দ লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখলেন তার সহধর্মিণী ফিরে এসেছেন। তিনি যেচে কথা বললেন না। কিন্তু আফরাত নাহার ক্রোধে ফেটে পড়লেন,
চিৎকার করে বললেন,
“ আর কি চাও! একজনকে তো দুনিয়া থেকে বিদায় করলে এখন কি আমার মেয়েটাকেও খেয়ে ফেলতে চাও? তোমার এই রক্তের খেলায় আর কে কে বলি হবে বলো!সব খেয়ে শান্তি হবে তোমার?
“ আহ্ নাহার থামো? শুরু করে দিও না! সবসময় আমাকে দোষারোপ করবে না?মেয়ের জন্য আমার‌ও চিন্তা হচ্ছে। ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে দাও!"
“ ম্যাম আপনি মাথা ঠান্ডা রাখুন,আমরা দেখছি বিষয়টি!”
রফিক বললো কথাটা,নাহার রফিকের উপর চিৎকার করে বললেন,
“ দেখতে দেখতে একজনের লাশ এনেছো।আর কত দেখবে?"
নিরুত্তর রফিক মাথা নত করে বসে র‌ইলো।করিম আকন্দ স্ত্রীর চিৎকার চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে বললো,
“ এখানে বসে অযথা তর্ক না করে যাও বড় ভাবীর কাছে যাও! তাকে গিয়ে শান্তনা দাও, মানুষ মানুষের মতো ব্যবহার করো!"
কথাটা শেষ করেই নিজের রুমে গেলো।
ফোন লাগালেন সেই নাম্বারে যেটা থেকে অবিরাম বার্তা আসতো। পুলিশের কাছে এবার আর কোন তথ্য দেননি।উনার বোঝা হয়ে গেছে পুলিশ সব কিছু আগের থেকেই জানে।তাই তাদের সব কিছু নিয়েই ঢিলেমি।
করিম আকন্দ বিশ্বাস করে নিলেন ক্ষমতা ছাড়া কোন কিছুই কার্যকরী নয়।যত‌ই টাকা থাকুক, দিনশেষে তিনি এখনও ক্ষমতার বাইরে।যত‌ই টাকা খরচ করুক আদৌওতে ওরা ক্ষমতা, দলের‌ই গোলাম। কিন্তু তিনি এই ক্ষমতা চান না যেই ক্ষমতার জন্য সব হারাতে বসেছে।উনি শুধু উনার সন্তানকে চান। যদি তাতে তার নিজের জেদকে বিসর্জন দিতে হয়,যদি মাথা নত করতে হয় তবুও করবে! দিন শেষে সন্তান নিয়ে বাঁচতে চান কেবল।
মাত্র কয়েকদিন বাদেই ভোট। এমন সময়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে চমকে গেলেন অনেকেই।কেউ কেউ ভাবলো ভাতিজার মৃত্যু শোকে এমন সিদ্ধান্ত।এটা ভাবাও স্বাভাবিক কারণ আফিয়াতের নিখোঁজ খবর সবটাই আড়ালে।মেয়ের ভবিষ্যৎকে নিরাপদে রাখতেই করিম আকন্দ এতদিন গোপনে রেখেছিলো।যার সুযোগ নিলো আততায়ীরা।
“ আমার মেয়েকে ছেড়ে দাও।আমি তোমাদের দাবী মেনে নিয়েছি!আর কোন নির্যাতন করো না তোমাদের দোহাই লাগে।"
***
করিম আকন্দ কথা বলার সুযোগ পেলো না।ফোনটা টুটটুট করে কেটে গেল।সেই সন্ধা কাটলো আরও বেশি আতংক আর সংকায়।রাইয়াজের দাফন কাফন শেষে নির্জন বিরানভূমিতে পরিনত আকন্দ ভিলায় ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল।থেমে থেমে বিন্দিয়া আক্তারের আর্তনাদ আর আর আফরাত নাহারের গুনগুন কান্না ছাড়া কিছুই শোনা যায় না।ঘরের বারান্দায় অবিরত পায়চারী করতে করতে বারবার ফোন দিতে থাকলো ঐ নাম্বারে। কিন্তু বন্ধ! পুলিশের সহায়তায় ভরসা নাই। পাচ্ছেন না। রাতের কুটকুটে অন্ধকার ছাপিয়ে ভোরের সূর্য রশ্নির দেখা মিললো। কিন্তু কোন উত্তর ঐ প্রান্ত থেকে আসলো না।
একদিন পর....
সকাল বেলা... বাড়ির পেছনের বাগান থেকে উদ্ধার করা হলো ক্ষতবিক্ষত আফিয়াতকে। বিবস্ত্র, চেতনহীন। সর্বাঙ্গে অজস্র আঘাত আর আঁচড়ে চিহৃ।
সকাল বেলা বাড়ির চারদিকে এক পাক ঘুরে দেখা দেখভালের দায়িত্ব পাওয়া মনোয়ারের অন্যতম দায়িত্ব।সেই দায়িত্ব পালনেই সকাল বেলা সেদিকে গেলেই বড় কড়াই গাছের নীচে পাতার ঝোপে পড়ে থাকতে দেখে এক নারী দেহকে। সাহস করে সামনে গিয়ে দেখতেই চমকে যায়। পাঁচদিন.. পুরো পাঁচদিন পর! 
চিৎকার করে পুরো বাড়ি জড়ো করে ফেলে।ঘুমের কড়া ওষুধের প্রকোপে বিভোর করিম আকন্দ জানতেও পারলেন না তার চেয়েও রাজকন্যা নিজ রাজত্বে ফিরে এসেছে। করিম আকন্দের ছটফটানি দেখে আফরাত নাহার নিজেই ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেন।পাছে উনাকেও না হারাতে হয়! সারারাত জায়নামাজ বিছিয়ে মেয়ের জন্য দোয়া করেছেন। নিজের ভুলভ্রান্তির জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।সকালে জায়নামাজের উপরেই তন্দ্রায় ঝিমুচ্ছিলো তখন‌ই মনোয়ার চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে থাকলে তিনি লাফিয়ে উঠে। দ্রুত বাইরে বেরিয়ে মেয়ের এহেন হাল দেখে বুক ভেঙে চিৎকার করে উঠে।
এক মাস পর.....
হাসপাতালের বেডে শুয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে আফিয়াত নুর।আফরাত নাহার বসে আছেন মেয়ের শিউরে।লায়লা খালাম্মি বাইরে গেছেন কোন কাজে।করিম আকন্দের অবস্থাও খুব একটা ভালো না। সেদিন মেয়ের অবস্থা দেখে হার্ট অ্যাটাক করে। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হ‌ওয়ার আগেই আবারও ব্রেইন স্ট্রোক করে করে যখন সেই প্রথম পাঠানো ভিডিও ভাইরাল করে দেওয়া হয় এবং তাতে লেখা হয় পাঁচদিন আফরাত এই ছেলেদের সাথেই ছিলো। চারিদিকের মানুষের ছি ছি উনার হৃদয়কে আর সুস্থ হতে দেয় না।না দেয় মস্তিষ্ককে ঠান্ডা হতে।আজ এক মাস যাবত হাসপাতালে পড়ে আছেন।

পর্ব ৪২


জীবনের দুঃসময়ে চেনা যায় আত্নীয় আর অনাত্নীয়! বিপদের সময় সদুপদেশ দিয়ে পাশে উপস্থিত বন্ধু‌ই হয় প্রকৃত বন্ধু। সুসময়ে তো অনেকেই থাকে,তাই প্রকৃত বন্ধু নির্বাচন করতে হলে অবশ্যই বিপদের সময় কে আপনার পাশে থাকে তা দেখতে হবে এবং তার থেকেই নির্ধারন করতে হবে সঠিক এবং সৎ বন্ধু।
দীর্ঘ আট মাস পর দেশের মাটিতে পা পড়ে দিলশাদ 
তালুকদারের। সম্পূর্ণ নতুন রুপে তার পরিচয় ঘটে সবার সাথে।তাকে বরণ করতে চলছে তার পরিবারে নানা আয়োজন।খোশ মেজাজে ব্যস্ত মুহূর্ত পার করছে তালুকদার পরিবারের সদস্যরা। তাদের এই খুশিতে সামিল হয়েছে আশেপাশে প্রতিবেশী থেকে বন্ধু মহল। কিন্তু সেই বন্ধুমহলের তালিকায় নেই আকন্দ পরিবারের কেউ।অথচ তাদের পরমাত্নীয় হ‌ওয়ার কথা ছিলো তাদের‌ই।
“ আম্মা; আম্মা উঠো।উঠে গিয়ে একটু হাত মুখ দিয়ে আসো।আমরা বাইরে যাবো। বাইরের বাতাস লাগলে মনটা একটু ফ্রেশ লাগবে।”
“ আব্বু প্লিজ আমি বাইরে যাবো না। আমার ভালো লাগে না!"
বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে আফিয়াত। দৃষ্টি তার উদাসীন। ফর্সা বদনের চকচকে হাসি টা আর নেই।ছয় মাস আগের সেই দাগ এখনও তার চিহ্ন রেখে দিয়েছে। আজীবনের জন্য লেগে যাওয়া এই দাগ স্পষ্ট জানান দেয় জীবনের সেই অমানিশার কথা। মেয়ের এমন হালের জন্য সবসময়ই নিজেকে দায়ী করেন করিম আকন।
হাসপাতাল থেকে এসেছে আজ চার মাসের অধিক সময় হলো। যথেষ্ট উন্নত চিকিৎসা নিলেও আফিয়াত আর স্বাভাবিক হয়নি। ডাক্তার বলেছিলো অতিরিক্ত শারীরিক অত্যাচার আর মাদকের প্রভাবে মানসিক ভাবে আফিয়াত অনেক ভেঙে পড়েছে।এখন যতটা আছে সবার ভালো ব্যবহার আর বন্ধুসুলভ আচরণে ধীরে ধীরে সুস্থ হলেও হতে পারে। কিন্তু যদি আর কোন অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হয় তবে ঘটনার বিপরীত‌ও ঘটতে পারে। হয়তো তাই হলো!
অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবার জোর আর মায়ের অযাচিত আচরণ থেকে বাঁচতেই বোধ হয় আফিয়াত বাইরে বের হলো।করিম আকন্দ আগের সেই দাপট নিয়ে এখন আর চলতে পারেন না।সারা এলাকায় এখন তাকে নিয়ে নানা ধরনের চর্চা হয়।কেউ কেউ আড়ালে আবডালে বলে বেড়ায়,‘ মেয়ে নিয়ে ব্যাবসা করতো,এমন তো হ‌ওয়ার‌ই ছিলো!', ‘ হ্যা দেখোনি কত ছেলে আসা যাওয়া করতো!', ‘ ক্লাবেও তো যেতো। এতটুকু মেয়ের এত এত গুন!', বাবা হয়ে এসব কি করে করতো! ক্ষমতার লোভ সব বুঝলে! মেয়ের লোভ দিয়ে ছেলেদের হাতে রাখতো। ছিহ্!’ এরকম নানা কুৎসা আজ তার নামে রটে।করিম আকন্দ শুনেন আর হাসেন।মনে মনে ভাবেন আর বিরবিরিয়ে বলেন,
“ যাদের জন্য এত ভাবতাম আজ তারাও আমার জন্য ভাবে তবে পার্থক্য শুধু আমি তাদের কল্যান চাইতাম আর তাদের চাওয়ায় আমার কুৎসা রচনা।"
“ আব্বু!"
আফিয়াতের সরু ডাকে করিম আকন্দের ভাবনার ঘোর কাটে। পার্কের এক কোনে বসে আছে বাবা মেয়ে। আফিয়াতের দৃষ্টি অদূরের এক ঝলমলে বাড়ির দিকে।একতলা বিশিষ্ট পুরাতন বিল্ডিংয়ে রঙের আঁচড় পড়েছে।ক্রিম রঙের পুরানো প্রলেপ তুলে তাতে আকাশী রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।তার চেয়েও বড় কথা সম্পূর্ণ বাড়িটা ছোট ছোট মরিচ বাতি দিয়ে সজ্জিত।ভ্রু দ্বয় কুঞ্চিত করে সেদিক তাকিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো আফিয়াত তার বাবাকে,
“ ও বাড়ি এভাবে সাজিয়েছে কেন আব্বু!"
বাড়ি নয়।তার দৃষ্টি মেয়ের দিকে।প্রশ্নের জবাব কি দিবে। আপাতত নিজের প্রতি‌ই রাগ হচ্ছে । বাইরে নিয়ে আসছে মেয়ের মন ভালো করতে। উল্টো মন খারাপের জন্য এখানেই কেন! কিন্তু তিনিও কিভাবে জানবে আজ এখানে!
“ আব্বু চলো আমরা ঐ বাড়ি যাই গিয়েই দেখি কি হচ্ছে আজ ওদের বাসায়! আমাদের তো বললো না আসতে!”
বাচ্চা মানুষ হয়তো একেই বলে।আজ এতগুলো মাস যারা তার এত এত খারাপ সময়েও একটা খোঁজ নিলো না তারা কি না নিজেদের খুশির সময় তাকে বলবে! করিম আকন্দের মায়া হলো নিজের এই সতেরো ছুঁই ছুঁই কিশোরী পানে। কিন্তু এখন উনার মেয়েকে নিয়ে এখান থেকে যাওয়াই উত্তম মনে করলো তাই বললেন,
“ আমাদের যেহেতু বলেনি সুতরাং যাওয়া উচিত নয় আম্মা।চলো আমরা বাড়ি ফিরে যাই। সন্ধ্যার আযান পড়লো ব‌লে।”
“ না আব্বু! আমি ও বাড়িতে যাবো।আমার মন বলছে শাদ এসেছে!"
কলিজায় কামড় দিলো করিম আকন্দের। মেয়েটা বুঝেই গেলো। কিন্তু কিভাবে? মনের টান কি এটাকেই বলে। আচ্ছা মনের টান কি শুধু একার আফিয়াতের‌ই আছে! দিলশাদের নেই! থাকলে কি পারতো এভাবে এত কষ্ট দিতে এই বাচ্চাটাকে!
“ না চলো। মাগরিবের নামাজ পড়তে হবে ।তাই এখন বাড়ি যাওয়া উচিত।"
“ তুমি যাও।আমি আজ ও বাড়িতে যাবোই।"
বলেই উঠে সেদিক হাঁটতে লাগলো আফিয়াত।করিভ আকন্দ পড়লেন মহা মুসিবতে। কিভাবে থামাবেন বুঝতে পারলেন না।
“একদিন তো এই সত্যর মুখোমুখি হতেই হবে! তবে না হয় আজ‌ই হোক!"
করিম আকন্দ আফিয়াতের পিছু দ্রুত গতিতে কদম মেলালেন।
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে আরাম কেদারায় বসে গা এলিয়ে পেপার পড়ায় ব্যস্ত পঞ্চাশর্ধো খুলশিদের বিরতি টানতে বিরক্ত লাগছে।গলা উঁচিয়ে ডাক দিলো নিজ সহধর্মিণীকে।
“ আরে মনিরা বিবি তাড়াতাড়ি দেখো কে আসছে!"
স্বামীর প্রতি বিরূপ মন্তব্য করে মনিরা বেগম ছুটে এলেন।ত্যক্ত কন্ঠে শুধালেন,
“ কি এমন রাজ্যপাঠ চলছে যে এখান থেকে উঠে গিয়ে দরজা খোলা যায় না!"
“ আহ যাও তো; কানের সামনে বাজনা বাজিও না। শান্ত মনে পড়তে দাও।"
“ পড়তে পড়তে উপরে চলে যাবে একদিন!"
বলতে বলতে দরজার খিল তুলে কপাট দ্বয় ভাগ করতেই মুখ হা করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সামনে দাঁড়ানো কিশোরীকে এই মুহূর্তে একদম‌ই আশা করেননি তিনি।
বাড়ির সামনের ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে ঠিক উপরের ঘরের জানালার পাশে এক নারীর অস্তিত্ব আফিয়াতের অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে সে অনুমতি বিহীন পা বাড়িয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
“ চাচী মনি শাদ এসেছে!"
মনিরা বেগমের বিরক্তি বাড়লো। চোখমুখ কুঁচকে বিচ্ছিরি মুখোভঙ্গিতে বললেন,
“ ক্যান?"
করিম আকন্দ নিরব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।মনিরা বেগম দরজা থেকে সরলেন না। আফিয়াত এক পা দরজার কার্ণিশে ঠেকিয়ে দাঁড়ালো।আরেক পা বাইরে। ভেতরে যাওয়ার জন্য আঁকুপাঁকু করছে। কিন্তু মনিরা বেগমের কঠোর চাহনি স্পষ্ট বোঝাচ্ছে তিনি যেতে দিবেন না।তাতে আফিয়াতের কি? সে তৈ আজ শাদের সাথে সরাসরি কথা বলবেই! কেন শাদ তার সাথে এমন করছে! কোন অপরাধের শাস্তি দিচ্ছে? নাকি সেও অনেকের মতোই বিশ্বাস করে যে সব দোষ আফিয়াতের।শাদ তৈ তার আফিকে চিনে , তবে কিভাবে সে! না মোটেই শাদ অন্যদের মতো ভাবতে পারে না। নিশ্চয়ই সে অন্য কোন কারণে অভিমান করেছে যার সমাধান তাদের সরাসরি কথা বলাতেই সম্ভব!
“ নুরজান কাঁদছো কেন?"
চিন্তিত, নরম কন্ঠস্বরে নিজের ভাবনার দেশ থেকে ফিরে এলো আফনূর।অতীত ভাবতে ভাবতে কখন যেন নয়নের বারিধারা ছুটে গেছে তা বুঝতেই পারেনি।দুহাতের শক্ত বাঁধনের উপর সিক্ত গরম কিছু অনুভব হতেই তারাজ খেয়াল করলো তার উৎস তার সহধর্মিণীর দু নয়ন‌।রিক্সাওয়ালকে বললো,
“ এ্যাই রিক্সাটা একটু পাশ করেন তো!"
রিক্সাওয়ালা খানিক সময়ের মধ্যেই পাশ করলো।তত সময় তারাজ আফনূরের হাতের কব্জিটা শক্ত করে নিজের মুঠোয় ধরে রাখলো।রিক্সা পাশ করতেই ঘুরে আফনূরের দিকে তাকিয়ে দু হাতের আজলায় তুলে মুখটা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি হয়েছে বলো? কাঁদছো কেন?"
আফনূর তারাজের এই ব্যতি ব্যস্ততায় আবারও মুগ্ধ হলো।তার সাথে বাড়লো সম্মান‌।তারাজ সব আফনূরের মুখে শুনেছে অথচ তাও বিশ্বাস করে।কতটা ভালোবাসে! কতখানি আগলে রাখে! বিশেষ মুহূর্তেও আফনূরের ভালো খারাপের চিন্তায় বিভোর থাকে।এত আলগোছে ধরে যেন ব্যথা বেদনা আফনূরের ছায়াও মাড়াতে না পারে!কতখানি ভালোবাসলে এতটাই আদুরে এতটা নরম করে এতটাই স্নিগ্ধ ভাবে ভালোবাসা যায়! তা আফনূরের জানা নেই।সে শুধু জানে তার স্বামী রুপক এই মানুষটি তাকে অসম্ভব ভালোবাসে।তার পরিমানে হয়তো আফনূরের ভালোবাসা কিঞ্চিত কিন্তু আফনূর‌ও তাকে ভালোবাসে, ভালোবেসে ভালো থাকতে চায়।নয়তো এই মানুষটির সাথে অন্যায় হবে।ঘোর অন্যায় হবে! আফনূর অন্তত এই অন্যায়টি করতে চায় না।তাই তো সর্বোচ্চ চেষ্টা সে করে তারাজের সব কিছুতে সামিল হয়ে তারাজে মাতোয়ারা হয়ে থাকতে।ভাবুক ছলছল আফনূরের প্রতি তারাজের যে ভালোবাসা তা কি আফনূর ঠিকঠাক অনুধাবন করতে পারে! হয়তো পারে,নয়তো নাও পারে!
তারাজ দ্বিধান্বিত,কপালে ভাঁজ ফেলে আবারও জিজ্ঞেস করলো,
“ কি হয়েছে বলো? হঠাৎ করেই কি হলো! এই তো দিব্যি ভালো ছিলে;তো এখন‌ই আবার কি হলো?"
“ আপনি আমার জীবনে প্রথমে কেন এলেন না?কেন‌'ই বা আমার জীবনের প্রথম প্রেম,প্রথম অনুভূতি, প্রথম আকাঙ্ক্ষা আপনি হলেন না?কেন আমার জীবনের একমাত্র অনুভূতি, একমাত্র পুরুষ আপনি‌ই হলেন না? বলুন না কেন?কেন আমার জীবনের অতীত কেউ হয়ে র‌ইলো,কেন অনুভূতিতে তিক্ততা এলো?কেন এত বিষাদ ছেয়ে গেল আমার অতীতে!"
তারাজের মস্তিষ্ক সবসময় সচল থাকে।এই কথার কারণ বুঝতে কাল ক্ষন লাগলো না। মুহুর্তে তার অন্তরে সূচ ফোটানোর ন্যায় কিছু বিধলো। আফনূর তার অতীত নিয়ে ভাবছিলো।কেন ভাবছিলো? আফনূর তার বুকের সান্নিধ্যে বসে নিজের প্রাক্তনের কথা ভাবছিলো! কেন ভাববে! যেখানে তার সর্বত্র ছড়িয়ে রেখেছে আফনূর নামক রমনীকে যাকে সে অতি প্রেমে বিভোর হয়ে ডাকে নূরজান বলে সে! কেবলি তার। সে কেন অন্য কাউকে নিয়ে ভাববে তাও কিনা তার‌ই বুকের পাশে বসে!চোয়াল শক্ত করে ফেললো।রাগে মস্তিষ্কের রগগুলো টনটন করছে।সে কোনভাবেই আফনূর নামক ললনার মন মস্তিষ্কের ত্রিসীমানায়‌ও তাকে ব্যতিত অন্য কারো বাস মেনে নিবে না হোক সে অতীত।তবুও না। আফনূরের অতীত নিয়ে ভাবনা না থাকলেও অতীতের কেউ এসে তার বর্তমান নষ্ট করবে সেটা সে মোটেই মানতে রাজী নয়।তাইতো আফনূরের অগোচরেই কাজ সারলো। কিন্তু যখন আফনূর,স্বয়ং আফনূর তাদের দাওয়াত দিয়ে আনে তখন সে কি করবে! কত ছলাকলায় সে সেই অতীত থেকে আফনূরকে দূরে রাখছে তা যদি আফনূর জানতো।কথাগুলো ভাবতেই তারাজের চোখে ভাসলো তাদের সেই বিবাহোত্তর সংবর্ধনায় উপস্থিত সকল মেহমানদের সাথে তারা যখন গল্প করছিলো তখন কথার তালে তালে এদিকে ওদিকে তাকাতে গিয়েই দৃষ্টি পড়ে দূরে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে আপনূরকে অবলোকন করা এক পুরুষের দিকে।যার দৃষ্টি অপলক চেয়ে আছে আফনূরের অপূর্ব সুন্দর মুখশ্রীর দিকে। তারাজের মেজাজ বিগড়ে গেল।রাগে তরতর করে রক্ত গুলো পায়ের তালু থেকে মাতার তালুতে উঠে গেল। হাতের মুঠ শক্ত করে চেপে ধরে দাঁত দাঁত আঁকড়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে লাগলো। কিন্তু বিপত্তি ঘটতে গেল তখন যখন আফনূর,
“ শুনছেন?"
আফনূরের মিহি ডাকে তারাজের মনোযোগ ভঙ্গ হলো। আফনূর তার দিকে চেপে গলা নামিয়ে নিচু কন্ঠে বললো,
“ একটা সাহায্য দরকার!"
তারাজ নিজের ভ্রুতে ভাঁজ ফেলে একইভাবে আফনূর দিকে কান পেতে বললো,
“ কি সাহায্য?"
আফনূর এক‌ইভাবে বললো,
“ একটা খালি রুম দরকার, আমার মনে হচ্ছে শাড়ীর কুঁচি খুলে যাচ্ছে। বোধহয় সিল্কের পেটিকোট দেখে শাড়ী আঁকড়ে ধরে রাখতে পারছে না।তাই বলছিলাম...
কথা শেষ করেই ভীত লজ্জিত চোখে এক পলক তারাজের দিকে তাকিয়ে পরক্ষনেই নিজের নজর নামিয়ে ফেললো, তারাজ ফোঁস করে একটা ছোট শ্বাস ফেলে বললো,
“ চলো!
- এক্সকিউজ মি!"
সবাইকে ভদ্রতা-সুলভ সামলে নিজেই হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগলো। একদম গায়ে গাঁ ঘেঁষে নিয়ে গেল।যাতে আফনূর এদিকে ওদিকে তাকাতে না পারে।তার সাথে খেয়াল রাখলো সেই পুরুষের দিকে।
একজন পুরুষ অন্য একজন পুরুষের দৃষ্টি বুঝে।বোঝে তাদের মনোভাব। সেখানে যদি পুরানো সূত্র থাকে তাহলে তো কথাই নেই। বুঝতে এবং বোধগম্য হতে সময় লাগে না।ঐ দৃষ্টি ভয়াবহ আগুন লাগিয়ে ছাড়বে।যা তারাজ চায় না।ঐ দৃষ্টি দেখলে কিছুটা হলেও আফনূরের মনে প্রভাব পড়বে! হবে তাদের মাঝে দুরত্ব।যা কোন মতেই তারাজের সহ্য ক্ষমতার মধ্যে নয়। তারাজ আফনূরের সর্বত্র বিরাজ করতে চায়,চায় আফনূর অস্থি মজ্জায় মিশে যেতে তবে।
নাক টানার শব্দে তারাজের চিন্তায় লাগব ঘটলো। আফনূরের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি তারাজের উত্তপ্ত মন মস্তিষ্ক শীতলতা ছাইয়ে ছিলো। মুহুর্তে রাগ দলবদল করে নিজের প্রতি চেপে বসলো।সে কিভাবে এই মুহূর্তে এইসব নিয়ে ভাবছে যেখানে তার নূরজান কাঁদছে,তার নূরের কষ্ট হচ্ছে। তারাজের কাঁপা কাঁপা কন্ঠে উচ্চারিত হলো এক গুচ্ছ শব্দ,
“ প্রথম তো সবাই হতে পারে কিন্তু চুড়ান্ত শেষটা কতজনে হয়;আমি তোমার শেষ এবং চুড়ান্ত এটাই সত্য!নিরেট বাস্তব!"

পর্ব ৪৩

সোয়ারি ঘাটের মতো ব্যস্ত পথের পাশে রিক্সা যাত্রার বিরতি সময়ের মাঝেই স্বামীর বুকের মাঝে লুকিয়ে অঝর ধারায় কেঁদে তার বুক ভাসাচ্ছে আফনূর।অথচ ভাবলোও না যার বুকে সে মুখ লুকিয়ে নিজের বুক হালকা করছে তার বুকটা কতটা ভারী করে তুলছে।তারাজ রোড ঘাট সব ভুলে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে নিজের সাথে তার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করছে নিজের ক্রোধ, হিংসা আর অভিমানকে।সে তার প্রেয়সীর সাথে কোনমতেই কঠোর, দুর্ব্যবহার করতে চায় না তাতে তাকে যতটাই আঘাত সহনশীল হতে হয় সে হবে।নুরজানের জন্য তার জান হাজির সেখানে এটা কি! নেহায়েৎ তুচ্ছ একটা বিষয়।
“ এ্যাই রিক্সা এইহান তে হরা!"
পেছন থেকে একটা মালবাহী ভ্যানের থেকে এমন চিৎকারে তারাজ সচকিত চোখে রিক্সাওয়ালার দিকে তাকালে দেখলো ঐ বেচারা অসহায় চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।তারাজ গলা খাঁকারি দিলো, আফনূর নিজেকে সামলে ঠিক হয়ে বসলো। দু'জন‌ই একটু সরে বসলো। আফনূর লজ্জায় আর মাথা তুললো না। কিন্তু তারাজ সোজা হয়ে বসে আগের মতোই আফনূরের হাত আগলে নিয়ে রিক্সাওয়ালকে বললো,
“ চলুন!"
প্যাডেল মারলো,চাক্কা ছুটলো।আপন গতিতে গন্তব্য পানে এগিয়ে গেল।
____________________________________________
কলিং বেল অনবরত বেজে চলছে। চোখ মুখ কুঁচকে সুফিয়া নামের তাজিয়া খাঁ'য়ের সহকারী, গৃহকর্মী পঁচিশের কোটা পেরোনো যুবতী ছুটে এলো। বিরবির করে বললো,
“ দরজা ভাইঙ্গা ফ্যালেন! অধৈর্য হয়ে উঠে, যত্তসব!"
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন বোরকা পরিহিতা দুজন আর একজন যুবক।সুফিয়া অচেনা কাউকে দেখে কপালের ভাঁজ বজায় রেখেই বললো,
“ কারে চাই?"
একজন ভদ্র মহিলা নরম সুরে বললো,
“ আমি মমতা,খুলনা থেকে আসছি।তাজিয়ার সাথে দেখা করবো!"
‘ মমতা,খুলনা থেকে ' এতটুকু পরিচয়‌ই যথেষ্ট সুফিয়ার জন্য। মুহুর্তে হাসি হাসি মুখে দরজা থেকে সরে দাড়িয়ে বললো,
“ ওহ খালাম্মা! আহেন আহেন ভেতরে আহেন!"
দরজার ওপাশে থাকা তিনজন‌ই ভেতরে পা রাখলো।
“ কে আসছে সুফিয়া?"
বলতে বলতে উপর থেকে নিচে নামছিলো তানহা।শেষ ধাপে নেমে বোরকা পড়ুয়া নারী দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“ আপনারা?"
“ আফা উনারা খুলনা থেইকা আসছে,মমতা খালাম্মা।আমগো খালাম্মার..
“ মমতা আন্টি!"
“ হা'রে মা চিনতে পারছে আমারে!"
কথাটা বলেই মমতা নামক রমনী নিজের বোরকার নিকাব তুলতে তুলতে এগিয়ে এলেন। তানহাও কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েও তাকে জড়িয়ে ধরলো।মমতা খালাম্মা আদুরে হাত বুলিয়ে দিলো তানহার পিঠে।কপালে চুমু দিয়ে বললো,
“ কেমন আছেন আম্মাজান?জামাই বাবা, নানাভাই কেমন আছেন?"
“ আলহামদুলিল্লাহ,সবাই ভালো আছে!তুমি বলো কেমন আছো?"
“ আলহামদুলিল্লাহ,ভালো বলেই তো খুলনা থেইকা ঢাকা চলে আসছি তোমাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য!"
“ অনেক খুশি হয়েছি,সত্যি‌ই খুশি হয়েছি! এটা কে? আ.আ.. আমি যদি ভুল না হ‌ই তবে মায়া তাই না?"
প্রশ্নটা মমতার দিকে চেয়ে ছিলো।তিনি হাস্যোজ্জ্বল চোখে চেয়ে ঝরঝরে উত্তর দিলেন,
“ হ্যা মায়া'ই !”
“ ওমা মাশাআল্লাহ কি সুন্দর,ও কি একদম ফুল পর্দায় থাকে?"
“ চেষ্টা করি আপু!"
রিনরিনে কন্ঠে উত্তর দিলো মায়া।তানহার কাছে বাঁশির সুরের ন্যায় কানে গিয়ে বাজলো।কি শ্রুতিমধুর কন্ঠ। তানহা এগিয়ে গিয়ে মায়াকেও জড়িয়ে ধরলো।মায়াও এক‌ইভাবে জড়িয়ে ধরে নিজেদের মাঝে কুশলাদি বিনিময় করলো, এরমধ্যে চলে আসছে তাজিয়া খাঁ! তিনি দূরে থেকেই মমতাকে দেখে উচ্ছাসিত হয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে হেসে দিলেন।
“ মমতা'রে কেমন আছিস? শরীর স্বাস্থ্য ভালো তোর!"
“ হ্যা আলহামদুলিল্লাহ, তোর খবর বল! কেমন কি?"
কুশলাদি বিনিময়ের পর ভেতর ঘরে নিয়ে গেলো মেহমানদের কিন্তু..? 
তানহা আর তাজিয়া খাঁ মনে মনে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন।যদিও সবটা আগেই জানানো হয়েছে তবুও হঠাৎ করেই সবার এমন মুখোমুখি হ‌ওয়ায় পরিবেশ কতটা ঘোলাটে হবে আর সম্পর্কগুলো কতটা জটিলতায় জড়িয়ে যাবে তা একমাত্র স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জানেন।
বাড়ির সামনে রিক্সা থামিয়ে তারাজ আফনূরের উদ্দেশ্য বললো,
“ তুমি ভেতরে যাও,আমি একটু ক্লাব থেকে ঘুরে আসছি!"
“ আচ্ছা!"
“ এখান দিয়ে সোজা গিয়ে ডানে মোড় নিবেন!"
আফনূর ভেতরে চলে গেল।তারাজ গেল ক্লাবের দিকে।
“ আসসালামু আলাইকুম,ভাবী!"
“ ওয়ালাইকুম আসসালাম!কি অবস্থা সবার সুফিয়া!"
আফনূর দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে সবার সারা দিনের খোঁজ নিতে থাকলো আফনূর। বাসায় ঢুকে এটাই তার প্রথম কাজ।সুফিয়াও খুশিমনেই সারাদিনের সবার সব কথা তার ভাবীকে বলে।
“ ভাবী বাইত্তে তো মেহমান আইছে!"
“ তাই! কারা এসেছে?"
“ আপনের শ্বাশুড়ির বাপের বাড়ি থেকে।তার প্রাণের সখী হয়!"
“ আম্মার বান্ধবী!"
“ হ ভাবী!"
“ আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যাও,আমি ফ্রেশ হয়ে তারপর দেখা করবো!"
আফনূর সোজা নিজের ঘরে গেল। সারাদিনের ক্লান্তিকর চেহারা নিয়ে মেহমানদের সামনে যাওয়াটা ঠিক মনে করলো না।তাই একবারে গা গোসল দিয়ে পরিষ্কার হয়ে ঝরঝরে মনে তাদের সামনে যাওয়ার ইচ্ছা পোষনে সোজা গিয়ে কাপড় নিয়ে গোসল খানায় ঢুকে পড়লো।
“ কে আসলো সুফিয়া?"
“ ভাবীসাব আইছে খালাম্মা,ক‌ইলো একেবারে ফ্রেশ হয়ে এখানে আসবে!"
“ হ্যা সেটাই উত্তম। এমনিতেই অনেক ক্লান্ত।আজ তো একটা কেইসের হেয়ারিং ছিলো।"
“ ব‌উমাও কি আইনজীবী নাকি?"
“ প্রশ্ন করলেন মমতা!"
তাজিয়া খাঁ আফনূরের আগমনের খবরে একটু ভীত হচ্ছেন।যদি আফনূরের সামনে মমতা অথবা তার পরিবারের কেউ কোন পুরানো কথা তুলে তাহলে বিষয়টি খারাপ দিকে যেতে পারে। আবার বলাটাও অনুচিত নয়।
“ জ্বী খালা,আফনূর আইনজীবী!"
“ ওহ তার জন্য‌ই!"
“ তার জন্য কি?"
জিজ্ঞেস করলো তানহা।মমতা বললেন,
“ ওদের কি আগের থেকেই জানাশোনা ছিলো যা তোরা জানতি না!"
“ এমন কিছু নয় মমতা।
__সেসব তোকে বলবো পরে।এখন চল আগে গিয়ে গা গোসল দে।খাওয়া দাওয়া কর। এরপর ধীরে ধীরে সব শুনতে পারবি‌।চলো মায়া মা!"
“ জ্বী খালামনি।"
তাজিয়া খাঁ সবাই তাড়া দিল অতিথির রুমে পাঠিয়ে দিলো।তানহা সাথে গেলো।তাজিশ তারাজের পাশে যেই খালি রুমটা সেটাতে মায়া আর তার মায়ের থাকার ব্যবস্থা হলো।অন্যদিকে কোনার ঘরে দিলো 
মায়ার ভাই মাহীমের থাকার ব্যবস্থা করে।
___________________________________________
“ আসসালামু আলাইকুম ভাই!"
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।"
“ আসসালামু আলাইকুম এমপি সাহেব!"
“ ওয়ালাইকুম আসসালাম,সবাইকে!"
“এদিকের খবর কি ফয়সাল?"
“ ভাই,বাবুল কাউন্সিলর আসছিলো। অনেকে সময় অপেক্ষা করে চলে গেছে একটু আগেই! আপনার সাথে জরুরী কথা ছিলো বললো।মুরাদ ভাই,আমি অনেক জিজ্ঞেস করার পরেও বললো না।তাই আমরা বললাম আপনাকে ফোন করে সময় নিয়ে যেন পরের বার আসে!"
“ এমনকি কথা যা তোদের বললো না।
_ যাই হোক, আমার কাল শপথ। অনেক ব্যস্ত সময় কালকের দিনটা।সো আজ একবার এলাকাটা ঘুরে দেখতে চাই!"
“ হ্যা,তার আগে আপনার বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হ‌ওয়া উচিত এমপি সাহেব!জনে জনে দেখানোর দরকার নাই আপনি বিবাহিত, আপনার একজন সুন্দরী ব‌উ আছে!"
তারাজ থ হয়ে চেয়ে আছে মুরাদের দিকে। মানে ও বলছে কাজের কথা! তার মধ্যে এ কি বললো মুরাদ।ও খেয়াল করলো মুরাদের কথার সাথে সাথে সবাই মিটিমিটি হাসছে।ভ্রু কুঁচকে সবাইকে দেখলো এবার গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ আমি কি কোন জোকস্ বলছি? তোরা সব হাসছিস কেন?
_ আর এই তোর কি সমস্যা? বল আমি জামাই তোর আসলে সমস্যাটা কোথায়? সবসময় এমন উল্টাপাল্টা বকিস কেন?"
“ আমার কোন সমস্যা নাই।তবে এ অবস্থায় এলাকা পরিদর্শনে গেলে এমপি মশাইকে নিয়ে এখন যে হাতেগোনা কয়েকজন হাসছে না তখন পুরো মহল্লাবাসী হাসবে!”
“ কেন? কি সমস্যা হয়েছে?”
“ ভাই আপনের টি শার্টে লিপস্টিক লেগে আছে!"
কথাটা বলেই ফয়সাল মুখে আঙ্গুল দিয়ে দাঁত কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করলো।তারাজ চোখ নামিয়ে নিজের টি শার্টের দিকে তাকালো।ডান পাশে বেশ খানি জায়গা জুড়ে কালচে মেরুন ওষ্ঠ ছাপ পড়ে আছে।বুঝলো আফনূরের কষ্টের ছাপ এভাবেই তার কাপড়ে বসে গেছে। কিন্তু তাই বলে এভাবে সবার সামনে লজ্জায় পড়তে হলো! তারাজ বোধহয় আসলেই লজ্জা পেল।ডান হাত দিয়ে ঘাড় চুলকানোর অভিনয় করে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে নিজেকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করলো।তখন‌ই শুনতে পেল মুরাদের কথা,
“ চল আমরা সব প্রস্তুতি নেই,এমপি মশাই ঘর থেকে বিদায় নিয়ে আসুক!"
“ হ্যা ভাই চলেন!"
সবাই একে একে উঠে গেল। তারাজের সহকারী এসে বললো,
“ স্যার কোন ডকুমেন্ট নিতে হবে?"
“ না আপনি তৈরি থাকুন।আর আমার ড্রোনটা নিয়েন তবেই চলবে! 
_আমি ২০/২৫ মিনিটের মধ্যেই আসছি।"
“ জ্বী স্যার!"
_________________________________________
বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বাইরের দিকে অফিসের দরজায় পাঞ্জাবি পড়ুয়া কাউকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো।সময় এখন প্রায় আছর শেষ মাগরিবের অগ্রভাগ।অফিস এখন বন্ধ।আবার মাগরিবের পর ইসহাক আবদুল্লাহ বসবেন। তাহলে কে এখানে?
“ কে?"
কালো পাঞ্জাবী পড়ুয়া শ্যাম সুদর্শন লোকটা ঘুরে তাকালো। লম্বায় তারাজের চেয়ে একটু কম। সুস্বাস্থ্য নয়,আবার অস্বাস্থ্য‌ও নয়। মোটামুটি চলে।
তারাজ দু কদম এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো
“কে আপনি?”
“ আমি মাহীম সিদ্দিক; মমতা আঞ্জুমানের ছেলে,খুলনা থেকে এসেছি।"
একদমে নিজের পরিচয় দিলো।তারাজ ভ্রু কুঁচকালো।খুলনা বৈ বাকী সব তার খুব একটা পরিচিত লাগছে না। কিন্তু যেহেতু খুলনার থেকে আসছে সুতরাং কোথাও না কোথাও তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ আছেই। ভাবতেই মনে পড়লো তার মায়ের প্রানের সখীর নাম‌ও মমতা কিন্তু এই মমতা আঞ্জুমান তার মায়ের সখী মমতা কিনা তার জন্য দেখতে হবে আগে। কিন্তু এই যুবক এখানে কেন?"
“ খুলনা থেকে! কার কাছে এসেছেন?"
“ আপনি আমাকে চিনতে পারেননি তাই না?
_ আপনি ইব্রাহিম তারাজ খন্দকার না? আমি কিন্তু ঠিকই চিনেছি! দেখেন মনের টান থাকলে অবশ্যই চেনা যায়। অবশ্য বড়লোকদের আবার গরীব আত্নীয়দের কথা মনেই থাকে না এটাই স্বাভাবিক! সেখানে আমরা তো তেমন একটা আত্নীয়‌ও না। আমাদের আর কি মনে রাখবেন যাও একটি সম্পর্ক হতে গিয়েছিলো তাও হয়েও হলো না আপনি চান নি বলে।এখানে তো মনে আরও রাখার কথা না।তবে আমাদের মনে আছে।গরীব তো তাই!আমি হচ্ছি মাহীম সিদ্দিক, আপনার মায়ের প্রিয় সখী মমতা আঞ্জুমানের একমাত্র ছেলে,যার সাথে আপনার বাগদান হয়েছিলো সেই মায়ার একমাত্র এবং বড় ভাই।"
মাহিম রেলগাড়ির গতিতে নিজের ইতিবৃত্ত বলতেই তারাজ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। মানে শুধু পরিচয় জিজ্ঞেস করাতেই এত কথা কে বলে ভাই?তবে একটু বিব্রত হলো তার সাথে খানিকটা বিরক্ত। সংশোধন করে বললো,
“ বাগদান হয়নি,হবেও না।জানাই ছিলো।তবুও অহেতুক কথায় আঁটকে ছিলো! সুতরাং এখানে কোন দায়বদ্ধতা আমার নেই।আর হ্যা আত্নীয়তা হয় আত্নার জোরে; কোন সামাজিক বাধা সূত্র থেকে নয়! আপনার মায়ের সাথে আমার মায়ের ছোট্ট বেলার সম্পর্ক, আশাকরি সেই সম্পর্কে কোন ফাটল অহেতুক কোন অজুহাত দেখিয়ে ধরাবেন না।
_ আর হ্যা আপনাকে না চেনার সহজ কারণ হচ্ছে আমাদের বহুবছর দেখা সাক্ষাৎ নেই। সুতরাং মনে না থাকাই স্বাভাবিক। বরং মনে রাখার ভান করলেই আপনার সাথে মিথ্যা বলা হতো। আপনিও হয়তো মনে রেখেছেন আমার বর্তমান দেখে নয়তো আপনার‌ও মনে থাকতো না।যাই হোক আপনার স্মৃতি শক্তির প্রখরতায় আমি মুগ্ধ,আর আমি কোন বেয়াদবি করলে তার জন্য দুঃখিত!"
মাহিম যে একটু আগে একটু বেশি‌ই বলে ফেলেছে তা সে অনুধাবন করলো। বুকটা ভার করে তারাজকে বললো,
“ সরি,আমার দ্বারা কষ্ট পেলে।আসলে নিজের বোনের কষ্টে আমি কিছুটা আহত তাই আর কি মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে! তুমি প্লিজ কিছু মনে করো না।"
“ করিনি,ইটস ওখে।
_ আচ্ছা আমি এখন ভেতরে যাবো।আমাকে আবার বের হতে হবে। আপনার সাথে আশাকরি আবারও কথা হবে!"
তারাজ কথায় ফুলস্টপ বসিয়ে ভেতরে যাওয়ার জন্য নক দিতেই খেয়াল করলো দরজা ইতিমধ্যেই খোল।যেহেতু মাহিম বাইরে সুতরাং দরজা খোলা থাকাটাই স্বাভাবিক।চাপানো দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো।বসার ঘর থেকে হালকাপাতলা হাসা হাসির শব্দ আসছে,মায়ের কন্ঠস্বর।মা সহসা এত উচ্চ শব্দে হাসে না। বহুবছর পর নিজের সখীকে পেয়ে বোধহয় বাঁধনহারা হয়ে গেছেন। দ্রুত পায়ে উঠে বসার ঘরে গেল‌।সোফায় এক অতি সুন্দরী রমনীর আসন ঘেরে বসা দেখে বুঝতে সময় নিলো না এটাই মমতা আঞ্জুমান।মায়ের পাশে মায়ের গাঁয়ে গাঁ ঘেঁষে বসলো। আদবের সাথে বললো,
“ আসসালামু আলাইকুম খালামনি।"
মমতা প্রান খোলা হাসি দিলো।তার ঝকঝকে মুক্তোর ন্যায় চকচকে দন্ত কপাটির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বললো,
“ চিনলি কি করে বাপজান? আমি তো ভেবেছিলাম চিনবি‌ই না!"
“ সত্যি বলতে পুরোপুরি চিনতাম না । কিন্তু আমার জননীর এই প্রাণখোলা হাস্যোজ্জোল মুখটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে আমার সামনে উপস্থিত এই সুন্দরী কে হতে পারে! তাছাড়াও এতটাইও মন ভুলা হয়নি যে একেবারেই চিনবো না।"
“ বাহ্ বেশ বুদ্ধিমান তো! এর জন্য‌ই বলি জনগণের এত ভোট কিভাবে এখনকার এমপিরা পায়।এবার বুঝলাম আমার বাপজানের বুদ্ধির তীরে সবাই কুপোকাত হচ্ছে!"
প্রশংসায় লজ্জা পেল। মুচকি হেসে আম্মার দিকে চেয়ে বললো,
“ আমি একটু এলাকা পরিদর্শনে যাবো তার আগে ফ্রেশ হ‌ওয়া দরকার বলে আসলাম।
_তোমরা গল্প করো। আমি রাতে তোমাদের সাথে জয়েন হবো, ইনশাআল্লাহ!"
“ ইনশাআল্লাহ!"
তারাজ উঠে গেল।যেতে যেতে শুনতে পেল একটি লাইন,
“ ব‌উ কোথায়? একবারও দেখলাম না! ছেলে ঘরে ফিরেছে তাতেও সে ঘর থেকে বেরুলো না!"
“ আসবে,কাজ শেষ হলেই আসবে!"
__________________________________________
তারাজ ঘরে ঢুকে দেখলো আফনূর নিজের হাতে পায়ে প্রসাধনী মাখছে।মাত্র গোসল শেষে বেরিয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। একমনে নিজের কাজ করছে।তারাজ ঘরে ঢোকার আগে শুকনো কাশি দিলো।কাশির শব্দে আয়নায় তাকিয়ে দেখলো তারাজ যদিও কাশির শব্দে সে বুঝে গেছে তারাজের আগমন তবুও।
“ ফ্রেশ হয়েছো?"
“ এইতো মাত্র শেষ করলাম!"
“ গেস্টদের সাথে দেখা করোনি?"
“ না , ভাবলাম নতুন মানুষ। একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যাই।নয়তো পেত্নির মতো লাগবে।"
“ বাইরে থেকে এসে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হচ্ছো সেটা ঠিক আছে। কিন্তু পেত্নীর মতো লাগবে এটা কেমন কথা ?"
“ এমনিতেই কালি।তার মধ্যে সারাদিন ছিলাম বাইরে রোদের মধ্যে! এখন তো আরও বিশ্রী দেখা যাচ্ছে।এই অবস্থায় যদি উনাদের সামনে যাই তখন তারা কি ভাববে? ভাববে না তারাজ আমার পরীর মতো মেয়ে রেখে কি একটা পেত্নী ধরে এনেছে! ইজ্জত শ্যাষ অইয়া যাইবো এমপি সায়েবের!"
আফনূর কথা শেষ করেই খিলখিলিয়ে হাসতে থাকলো।তারাজ ভ্রু কুঁচকে কোমরে হাত রেখে তাকিয়ে আছে। তারাজের মুখোভঙ্গিতে আফনূরের হাসি আরও বেড়ে গেল।তারাজ ফোঁস করে ছোট্ট একটি শ্বাস ছেড়ে ডান হাত দেখিয়ে বললো,
“ থাপ্পড় চিনো? এক থাপ্পড় দিয়ে মাথার সব লুজ স্ক্রু টাইট করে দিবো ফাজিল মেয়ে একটা!"
কথা শেষ করেই তারাজ ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। আফনূরের হাসির ঝড় আর বেড়ে গেল‌। ওয়াশরুমের দরজা অবধি গিয়ে ফিরে এসে আফনূরের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,
“ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আর পবিত্র রমনীর মধ্যে দ্বিতীয় জন আমার স্ত্রী।তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করা আমি মোটেই বরদাস্ত করবো না!"
তারাজ কথা শেষ করেই চলে গেল।দরজা লাগানোর আগে বললো,
“ পাঞ্জাবি দাও। আমি এলাকা পরিদর্শনে যাবো।"
তারাজের ঠোঁট লাগানো কপালের অংশ হাত দিয়ে ছুয়ে দিলো আফনূর।চ‌ওড়া হাসি এটে তারাজের কথাগুলো পুনরায় শুনলো।প্রান ভরে শ্বাস নিলো আঁখিদ্বয় বুঝে। মনে মনে বললো,
“ পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী নারীও আপনার স্ত্রী এমপি সাহেব!"
তারাজের পোশাক দিয়ে মাথায় ওড়না পড়ে ঘর থেকে বের হলো আফনূর।বসার ঘরের দিকে না গিয়ে সোজা রান্না ঘরে গেল। উদ্দেশ্যে সন্ধ্যার নাস্তা।তারাজ বের হবে,তাকে একটু কিছু খাইয়ে দিতে চায় আফনূর।
“ ভাবী যারা আইজ বাড়িত আইছে আপনে জানেন এরা আসলে কে?"
খালেদার ফিসফিস করে বলা কথায় আফনূর আগ্রহ দেখিয়ে শুধালো,
“ কে ?"
“ ইয়া আল্লাহ ভাবী আপনে জানেন না? এরা তো আপনার শ্বাশুড়ির বাড়ির লোক!"
“ ওহ,তাই ! আমি তো ভাবলাম তুমি অন্য কিছু বলবে!"
আফনূর কথার ধরনে খালেদা আমতা আমতা করতে থাকলো,হাতের কচলানোয় বোঝা যাচ্ছে সে সাহস করে বলতে পারছে না। আফনূর সাহস দিয়ে বললো,
“ যা বলতে তাও নির্ভয়ে বলো।আমি‌ই তো! সমস্যা নাই।”
“ ইয়ে মানে আসলে কিছু মনে না করলে ‌ক‌ই! এই যে খালাম্মা আসছে না, উনার মেয়ের সাথে।ঐ যে ঐ মেয়ে,যেটা উনার সাথে আসছে একদম ধবধবা ফর্সা কদুর মতো হেই মাইয়াডার লগেই কিন্তু আমগো বড় ভাইজানের বিয়া ঠিক আছিলো। আপনি ভাইজানের জীবনে না আইলেই তার সাথেই বিয়া অইয়া যাইতো!"
“ তাই; ইস্ কি একটা ভুল হয়ে গেল বলো তো? আমি চলে আসলাম আর তুমি একটা ধবধবা ফর্সা কদুর মতো ভাবি মিস করলা! বিশ্বাস করো খালেদা আমি জানলে কখনোই তোমার ভাইয়ের জীবনে আসতাম না।
_ এখন কি করা যায় বলো তো; আমি কি তোমার ভাইজানকে আবার বিয়ে দিয়ে তোমার জন্য ঐ ধবধবে ফর্সা কদুর মতো ভাবীকে আনবো!"
“ ইয়া আল্লাহ ভাবী কি কন এগুলা।বড় ভাইজান হুনলে আমারে তিন তলার বারান্দা থেকে ফালাইয়া দিবো!"
“ ক্যান দিবো; তুমি তার শুভাকাঙ্ক্ষী!তার জন্য কত্ত ভাবো!"
“ ভাইজান আপনি বলতে পাগল,আপনি তারে ছাইড়া দিলে হ্যায় সব ওলোটপালোট কইরা দিবো!"

পর্ব ৪৪

“ আসসালামু আলাইকুম!"
হাতে ট্রে নিয়ে বসার ঘরে পা দিয়েই সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিলো। সালামের প্রত্ততরে সবাই বললো,
“ ওয়ালাইকুম আসসালাম।"
আফনূর হাতের ট্রে টা সেন্টার টেবিলের উপর রাখলো। পাশাপাশি রাখলো খালেদার হাতের ট্রে। বিকেলের নাস্তার বেশ আয়োজন করেছে।
মমতা আঞ্জুমান আফনূরের মুখে চেয়ে আছে।
ফর্সাও না আবার কালোও না ।আবার শ্যামাও না।বলা যায় শ্যাম বর্ণ থেকে উজ্জ্বল। ফর্সা থেকে একটু কম।মুখে তেমন কোন প্রসাধনী নাই।হয়তো গোসল করে হালকা কিছু ব্যবহার করেছে। চেহারাটা এখনও ভেজা ভেজা।মাথার চুলগুলো‌ও ভেজা, কোমরের অংশ ভেজা দেখা যাচ্ছে।মাথায় মোটামুটি কপাল ঢেকে পড়া একটা লাল সুতি ওড়না,পড়নে বিস্কুট রঙের সালোয়ার কামিজ।নাকে মাঝারি আকারের হীরের নাকফুল,কানে ছোট্ট একজোড়া দুল,গলায় একটা মোটা চেইন, হাতে সোনার বালা। নতুন ব‌উয়ের ঘরোয়া সাজ!মন থেকেই একটা ভালো লাগায় ছেয়ে গেল মমতার।
মুখে হালকা মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললো,
“ বসো মা এখানে!"
আপাতত এই বসার ঘরে আছে আফনূর সহ পাঁচজন! তাজিয়া খাঁ,তানহা,মমতা আঞ্জুমান,মায়া সিদ্দিক ও আফনূর।মায়ার মুখটা আপাতত দেখা গেলেও সারা শরীর লম্বা সুতি ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখা।তাও কোমড় ছাপিয়ে গোড়ালির একটু উপর অবধি লম্বা চুলগুলোর বেনী ঝুলে আছে সোফার পাদদেশে। আফনূরকে বসতে দেওয়ার জন্য তানহা উঠে গেল তাজিয়া খাঁ আর মমতা আঞ্জুমানের মাঝ থেকে।মমতা আঞ্জুমান আফনূরের হাত ধরে নিজের পাশে বসালেন। আফনূর মাথা নুইয়ে রেখেছে।তিনি আফনূরের মুখটা ডান হাতের চার আঙ্গুল দিয়ে উপরে তুলে বললেন,
“ মাশাআল্লাহ, আমাদের তারাজের পছন্দ ভালো।কি মায়াবী মুখ তোমার।"
আফনূর লজ্জা মাখা হাসি দিলো কিন্তু ওভাবেই বসে র‌ইলো।তানহা মায়ার উদ্দেশ্য বললো,
“ মায়া নিচ্ছো না কেন?নাও! এগুলো সব কিন্তু আমাদের আফনূর করেছে!"
মায়ার কানে গেলো না।তার চোখ আফনূরে আবদ্ধ।সে এক ধ্যানে আফনূরকে দেখছে!তানহা হাত দিয়ে ধাক্কা দিলো।
“ এই মায়া!"
“ জ্বী..জ্বী..!”
চমকে উঠলো। সবারই দৃষ্টি পড়লো মায়ার দিকে।মায়া থতমত খেয়ে তানহার পানে তাকিয়ে আছে।তানহা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“ কি হয়েছে তোমার? ধ্যান কোথায় ছিলো।এত সময় ধরে ডাকছি!"
মায়া সবার দিকে তাকালো।সবাই কিভাবে তার দিকে অদ্ভুত চোখে চেয়ে আছে।সে নিজেকে সামলালো। থেমে থেমে বললো,
“ না এমনিতেই, কিছু না। আসলে আমি বড়দের কথা শুনছিলাম।যাই হোক কি বলছিলে তুমি আপু!"
মায়ার গলা কাঁপছে।তানহার কাছে মায়ার কথাটা বিশ্বাস যোগ্য হলো না।কারণ সে তো দেখেছে কেমন এক দৃষ্টিতে মায়া আফনূরকে দেখছিলো। বিষয়টি খটকা লাগলো। কিন্তু কথা বাড়ালো না।এর মধ্যেই কারো পায়ের আওয়াজ শোনা গেল।তানহা নিশ্চিত হয়েই বললো,
“ ছোট আসছে মনে হয়!" 
তানহার কথা সতর হলো। দরজার থেকে খানিকটা দূরে অবস্থান করেই তাজিশ সালাম দিলো,
“ আসসালামু আলাইকুম আম্মা!"
পুরুষালী কন্ঠে মায়া দ্রুত নিজেকে ঘোমটার আড়ালে ঢেকে ফেললো। দাঁড়িয়ে পড়লো।তানহা মায়ার ব্যবহারে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে। তাজিয়া খাঁ বললেন,
“ কিরে মায়া উঠলি কেন মা?"
“ না খালাম্মা,ঘরে যাই আমি!"
“ কেন,কিছু তো খেলে না মায়া!"
“ পরে খাবো আপু।এখন আমি আসি!"
মায়া দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল।তখন মাত্র দরজায় পা রেখেছে তাজিশ,মায়ার গতিতে তার ডান হাতে মায়ার কনুইয়ের আঘাত লাগলো।চমকে উঠলো তাজিশ।মায়াও আঁতকে উঠলো। পর্দার জন্য এত তাড়াহুড়া করছিলো যাতে তাজিশের চোখে না পড়ে,অথচ একদম গাঁয়ে ছোঁয়া লেগে গেল।মায়া দ্রুত ওড়না ঘোমটা লম্বা করে নিজের মুখটাকে পুরো আড়াল করে রাখলো।তারাজ থমকে দাঁড়িয়ে গেছে।বাম হাতের তালু দিয়ে ডান হাতের কনুই ঘষছে।ওর চোখ মায়ার দিকে।ঘোমটার আড়াল থেকে কিছু দেখা যাচ্ছে না। দৃষ্টি সরাতে গিয়ে নত হয়ে নামলো মায়ার পায়ে। ধবধবে ফর্সা একজোড়া রক্তিম পা। আবারও চোখ সরিয়ে উঁচিয়ে ওড়নায় ঢাকা মুখের দিকে চেয়েই বললো,
“ তোমার কি খুব জোরে লেগেছে?"
মায়া খুব নিচু আওয়াজে,রিনরিনে কন্ঠে বললো,
“ না। দুঃখিত আমি খেয়াল করিনি।"
“ ইটস ওখে!"
“ শুকরিয়া!"
বলেই মায়া উল্টো পথে হাঁটা ধরলো।তাজিশ আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে র‌ইলো।কে এটা? 
তারাজ বসার ঘরে দোরগোড়ায় তাজিশকে থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো,
“ কি ব্যাপার এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?কি হয়েছে?"
“ না কিছু না।"
তারাজ খেয়াল করলো তাজিশের দৃষ্টি অন্যত্র।সেখানে সেও তাকালো।দ্রুত পায়ে হেঁটে চলা সবুজ সালোয়ার কামিজের মেয়েটিকে দেখলো।পর মুহূর্তেই বললো,
“ পরিচয় হয়েছে?"
“ কার সাথে?"
“ যে যাচ্ছে!"
“ না! কে ঐটা? কেমন আজব ব্যবহার করছে!"
“ আজব না! শুনেছিলাম পর্দা করে তাই হয়তো তোকে দেখেই এমন করছে!"
“ ওহ্!"
“ চল,সবাই বসার ঘরে আছে।
আমি একটু দেখা করে যাই,এখন‌ই বের হবো।"
“ হ্যা চলো। আম্মার সাথে দেখা করে আমিও ঘরে যাবো।খুব টায়ার্ড লাগছে!"
“ মনে হচ্ছে কাজের খুবই প্রেসার যাচ্ছে!"
“ হ্যা একটু প্রেসার আছে।তবে আজ একটা নতুন ক্লাইন্টের সাথে মিট করতে গাজীপুর গিয়েছিলাম, লম্বা সময়ের জার্ণি ছিলো তাই একটু বেশি‌ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।এর বেশি কিছু নয়!"
“ওহ। আচ্ছা চল।"
“ আসো,বসো।"
দুই ভাইকে একসাথে দেখে তাজিয়া খাঁ বললেন।তিনি একটু সরে বসে তারাজের জন্য জায়গা করে দিলো। তারপর বললো,
“ এখানে বসো, ব‌উমার পাশে। তোমার খালামনি দেখবে তোমাদের একসাথে!"
তারাজ মায়ের আদেশ অনুযায়ী বসলো। তারাজের গায়ে এখন একটা সাদা পাঞ্জাবি।সাথে কালো জিন্স। পায়ে ঘরে পড়ার একটা স্লিপার । আফনূরের পাশে বসে একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসলো। এরপর হাসি হাসি মুখে মমতার উদ্দেশ্য বললো,
“ খালামনি কিছু খেয়েছো?
_ নাস্তা দিয়েছো?"
কথাটা শেষ করেই আফনূরের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলো। আফনূর ছোট্ট করে নিচু আওয়াজে বললো,
“ দিয়েছি কিন্তু খাচ্ছে না তো!"
“ কেন?"
“ আরেহ বাবা খাবো।আগে তোমাদের দু'জনকে মন ভরে দেখে নেই।"
“ সে তুমি মন ভরে দেখতে পারবে। অনেক সময় আছে।এখন নাস্তা করো। আমার বউ কিন্তু দুর্দান্ত নাস্তা বানায়। নিজের ব‌উ দেখে বলছি না,এই যে আমার মা তোমার সখীকে জিজ্ঞেস করো।"
মুরুব্বিদের সামনে তারাজের বেশরমের মতো ব‌উ ব‌উ করায় আফনূর লজ্জা পেলো। এদিকে তাজিয়া খাঁ তারাজের তালে তাল মিলিয়ে বললো,
“ হ্যা।সে কথা মানতেই হবে। আমার ব‌উমা কিন্তু মাশাআল্লাহ ভালো রান্না জানে।তার হাতের রান্না খেলে আঙ্গুল চেটেপুটে খেতে হবে!"
“ আম্মা প্লিজ !"
আফনূর লজ্জা পেয়ে আম্মাকে থামতে অনুরোধ করলো। আম্মা হাত বাড়িয়ে আফনূরকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরলো।তারাজ মুচকি হেসে ব‌উ আর মা'কে দেখছে। তানহা দুষ্টুমি করে বললো,
“ বুঝলে খালামনি, আজকাল আমার আফনূরকে হিংসে হয়। আমার মা তো আমাকে ভুলেই গেছে।তার সবকিছুই এখন তার ব‌উমা।এই যে দেখো এভাবে কিন্তু একবারও আমাকে জড়িয়ে ধরে না।অথচ যখন‌ই দেখবা এভাবেই ছেলের ব‌উকে জড়িয়ে রাখে।"
“ দূর হ ফাজিল মেয়ে! একদম আমার ব‌উমাদের নিয়ে হিংসে করবি না।
আমাকে ছেড়ে তুই চলে যাবি। আমার সাথে আমৃত্যু আমার ব‌উ মা'রাই থাকবে। তাছাড়াও তারা নিজেদের মা বাবাকে ছেড়ে আমার কাছে আসছে। অবশ্যই তাদের গুরুত্ব আমার কাছে সবার আগে,সবচেয়ে বেশি।সেখানে কোন কৃপণতা আমি করবো না।"
শ্বাশুড়ির কথায় আফনূর আবেগী হয়ে শ্বাশুড়ির সাথে মিশে গেল।গলা জড়িয়ে বুকে মুখ রেখে বললো,
“ আম্মা আপনি অনেক ভালো। আপনাকে সত্যি‌ই খুব ভালোবাসি!"
তাজিয়া খাঁ'ও মিশিয়ে রাখলো নিজের সাথে।তানহা দুষ্টুমি করে ছলছল চোখে তাকালো।তারাজ নিজ স্ত্রী আর মায়ের এমন সম্পর্ক দেখে আবেগী চোখে তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে আছে মমতাও।যত‌ই খুশী হোক কোথাও যেন পিনের খোঁচার ন্যায় বিঁধলো।এই জায়গাটা তার মেয়ের হতে পারতো অথচ! মেয়ের কথা মনে হতেই মায়ার কথা মনে পড়লো।উঠে দাঁড়ানো ভঙ্গিমা করে বললো,
“ ওহ আমি গিয়ে একটু দেখে আসি,মায়াটা কি করছে!"
তানহা মমতাকে বললো,
“ আপনি বসুন খালামনি। আমি দেখে আসি!"
“ আচ্ছা, যাও।"
তানহা উঠে গেল।মমতা আবার নিজের জায়গা বসে পড়লো।তারাজ উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“ ওখে,তোমরা আলাপসালাপ করো।আমি বের হচ্ছি।তুই যা ফ্রেশ হয়ে আয়!"
“ নাস্তা করে যান।
ভাইয়াও করো!"
“ হ্যা ভাবিমনি, আমি তো এই ইয়াম্মি নাস্তা দেখে লোভ সামলাতে পারছি না।"
তাজিশ হাত বাড়িয়ে একটা প্লেট থেকে পিটা জাতীয় কিছু নিলো।তারাজ তাজিশের মাথায় গাট্টা মেরে বললো,
“ এ্যাই, জীবানু ভরা হাতেই খাবি! পরে তো বদনা খোঁজার টাইম‌ও পাবি না,দেখা গেলো কাপড়চোপড় সব মেখে ফেলছিস।"
“ না পেলে নাই।তুমি পরিষ্কার করবে , এমনিতেই এটা তোমার দায়িত্ব।বড় ভাই বলে কথা।আবার এমপিও।ভোট দিয়ে জয়ী করেছি কিছুটা ফায়দা তো নেওয়াই চাই!”
“ সিরিয়াসলি! তোর ময়লা পরিষ্কার করানোর জন্য 
ভোট দিয়েছিলি।এই তোদের মতো পাবলিকের জন্য‌ই এই দেশটা এত নোংরায় ডুবে থাকে।"
“ ভুল বললে! আমাদের জন্য নয়। তোমার মতো এমপিদের জন্য।যারা অসহায় নাগরিকদের মুখের খাবার কেড়ে নিয়ে এমন বর্বরতা করে!"
“ কি!"
ওদের দুই ভাইয়ের খুনসুটিতে সবাই হাসতে থাকলো।তারাজ বারবার তাজিশের হাত থেকে খাবার নিয়ে প্লেটে রাখতে চায়।তাজিশ সেটা তুলে মুখে দিতে চায়। অবশেষে আফনূরের কথা শোনা গেল,
“ কি করছেন আপনি! খেতে দিন ভাইয়াকে।নিজেও খান! আপনার না বের হতে হবে! দেরি হচ্ছে না?"
তারাজ আফনূরের দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু উঁচিয়ে বললো,
“ ওর পেট এমনিতেই লুজ। বার মাসের এগারো মাস ওর লুজমোশন হয়েই থাকে, অতঃপর অতি আদর দেখিয়ে খাওয়ানোর পর যদি পেট খারাপ হয় তবে তার টেক কেয়ারের দায়িত্ব কিন্তু আপনার, নুরজান!"
“ হবে না। ইনশাআল্লাহ! আর হলেও দেখা যাবে। আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।আপনি ঘরের চিন্তা না করে বাইরের চিন্তা করুন,ঐটাই আপনার আসল দায়িত্ব এমপি মশাই!"
আফনূরের কথায় তাজিয়া খাঁ'য়ের ঠোঁটের হাসি চ‌ওড়া হলো।বিয়ের পর দিন সকালে তিনি বুঝিয়েছিলেন আফনূরকে। একজন রাজনীতিবিদ লোকের স্ত্রীদের তাদের স্বামীর প্রতি কেমন আচরণ থাকতে হয়।চোখ যেন ভেসে উঠলো সেই মুহূর্তটা।
ফ্ল্যাশব্যাক...
“ শোন মা,তুমি আমার মেয়ের মতোই অথবা আমি বলবো না মেয়েই। কারণ তোমাকে আমি পেটে ধরিনি,আর না মেয়ে হিসেবে দত্তক এনেছি। তোমাকে নিজের ছেলের সাথে বিয়ে পড়িয়ে ব‌উ করে এনেছি। সুতরাং তুমি আমার ছেলের ব‌উ'ই ।অন্যদের মতো বলতে পারবো না যে তুমি আমার মেয়ে , মেয়ের মতোই।
আমার মনে হয় এতেই সম্পর্কের সৌন্দর্য থাকে,থাকে নির্দিষ্ট গন্ডি।এতে যেমন তুমি বুঝবে তোমার আমার সাথে কতটা পথ চলতে হবে,তেমনি মাথায় রাখবে আমার প্রতি,আমার সাথে তোমার আচরণ কেমন হ‌ওয়া উচিত। আমার কাছে তোমার চাওয়া পাওয়াও কতটা থাকা উচিত! ঠিক তেমনি আমিও বুঝবো,আমার‌ও মাথায় থাকবে তোমার সাথে আমার সম্পর্কের সীমানা কোথায় কোথায়,কখন আমি তোমার সাথে কতটা কথা বলতে পারবো, কতটা সেবা আমি তোমার থেকে আদায় করে নিতে পারবো।কখন কিভাবে তোমাকে উপস্থাপন করতে পারবো।তবে আমি এটাও বলবো না যে তুমি আমার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলো। বরং বলবো যেকোন সমস্যার কথা তুমি নির্দ্বিধায় আমাকে বলতে পারো।হতেও পারে সেটা আমার ছেলেকে নিয়ে‌ই । অথবা আমাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে।তাতে কি হবে বলো তো মা,আমি কিন্তু তোমার আগে এদের সবার সাথে জড়িত, সুতরাং এদের সব সমস্যা, ইচ্ছা অনিচ্ছা আমি তোমার আগেই তোমার চেয়েও ভালো জানি।হ্যা হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই আমার জানাও ভুল হতে পারে তবে জানি তো! তুমি যদি বলো তবে আমি সেটা তোমার সাথেই ভাগ করে নিজেরাই আলোচনা করে সমাধান করতে পারবো, তাই না!"
তিনি কথাটা বলে থামলেন, আফনূরের সম্মতি এলো মাথা হিলিয়ে।শাড়ীর আঁচল ঘোমটা দিয়ে শ্বাশুড়ির সামনে বাবু হয়ে বসে আছে। একদম নিচু কন্ঠে উচ্চারণ করলো,
“ জ্বী, আম্মা!"
আম্মা আফনূরের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
“ আমার সামনে মাথা নুইয়ে রাখার দরকার নেই।আমি শ্বাশুড়ি,অন্য কিছু ন‌ই! তোমার মতোই সাধারণ মানুষ।"
আফনূর মাথা উঁচিয়ে অদ্ভুত এই রমনীকে দেখলো। আম্মা হয়তো আরও কিছু বলবে তাই মুখ খুললো, এবং বলা শুরু করলেন,
“ শোন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি, আজীবন আমি এখন যা বলবো এই কথাটা মাথায় রাখবে।
 আশাকরি আমার ছেলেও তোমাকে মাথায় তুলে রাখবে এর জন্য!
আমি যখন এই বাড়িতে ব‌উ হয়ে আসি তখন তোমার বাবা মানে তোমার শ্বশুর,তিনি ছিলেন মাঠের কর্মী। খাওয়া নাওয়া সব বাদ দিয়ে কেবল রাজনীতি আর ব্যাবসার পেছনে ছুটতেন।কতদিন,কত রাত তিনি ঘরে আসতেন না তার ইয়ত্তা নেই।আমি নতুন ব‌উ থেকে পুরানো ব‌উ হলাম,ব‌উ থেকে মা হলাম তিনি হদিস‌ও রাখতেন না। এর মধ্যেই আমার শ্বশুর মানে তোমার দাদা শ্বশুর আল্লাহর ডাকে সাড়া দিলেন।স্বামীর শোকে আমার শ্বাশুড়ি মাও শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন। তোমার শ্বশুর ছিলেন বাবা মায়ের একমাত্র যক্ষের ধন, একমাত্র পুত্র।তিন কন্যার পর একটাই পুত্র তাদের তাও কি-না সংসার বিবাগী বিষয়টি তাদের আরো বেশি অসুস্থ করে তুলতো।আমাকে খুব স্নেহ করতেন, সবসময় চোখে চোখে রাখতো।পাছে আমি তাদের ছেলেকে ছেড়ে যাই যদি। কিন্তু তারা জানতেন না তাদের এই বেপরোয়া ছেলেটা আমাতে মত্ত ছিলো।যতদিন ঘরের বাইরে থাকতো,ঠিক‌ই ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিতো। তারপর বাড়ি আসলে পায়ের কাছে হাঁটু ভেঙ্গে বসে কানে হাত দিয়ে ক্ষমা চাইতো, বারবার বলতো ক্ষমা করতে। সারারাত নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরে রাখতো আর বলতো আমি যেন তাকে ক্ষমা করে দেই।তাকে ছেড়ে যেন কোথাও না যাই। 
বিশেষ দিনগুলোতে দূরে থাকলেও ঠিক‌ই আমার কাছে গিফট পৌঁছে যেতো। আমি বুঝতে পারলাম এই লোকটি যত‌ই রাজনীতি করুক, পথেঘাটে ছুটে বেড়াক এর সংসারে প্রতিও টান আছে। তবে মানুষের সেবা করার যেই মনোবাসনা তাকে জেঁকে বসেছে তার থেকে সে নিজেকে ছাড়াতে পারছে না।আমি ধীরে ধীরে ভাবতে লাগলাম আমার স্বামী তো খারাপ কিছু করছে না! তার ভালো কাজের প্রশংসা মানুষ বাড়ি বয়ে করে যায় তবে কেন আমি তাকে সংসারের মায়াডোরে বাঁধতে চাচ্ছি।আমি আমার শ্বাশুড়ি মায়ের সাথে আলোচনা করলাম।তাকে বোঝালাম আমি তার ছেলের সংসার ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।আর না তার ছেলেকে বাঁধতে হবে।তিনি যেভাবে চান সেভাবেই সব হোক। আমি তার পাশে থেকে তাকে আগ্রহ দিতে চাই।তার অনুপ্রেরণা হতে চাই। তোমার শ্বশুরকে বললাম যাই করো অসৎ হ‌ইও না।আর দয়া করে কোন নারী কেলেঙ্কারির সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলো না।তুমি রাজনীতির পথের সব গলিতে বিচরণ করো খালি দিন শেষে মনে রেখো ঘরে তোমার জন্য কেউ চাতকের ন্যায় অপেক্ষায় আছে।কেউ তোমার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছে! তোমার ঘরে আল্লাহর দান ষ, একটা রাজকন্যা আছে।যাতে তাকে কোনদিন শুনতে না হয় 'তোমার বাবা অসৎ',যাতে আমাকে শুনতে না হয় ,‘ আমার স্বামী কোন নারীর সাথে ধরা পড়েছে!'
_সেদিন তোমার শ্বশুর আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলেছিলো,‘ আমি তার জীবনের সেই নারী যার জন্য তার এক পুরুষ জীবন ধন্য;তাকে যদি আল্লাহ জান্নাতে দেয় তবে তিনি আমাকে চাইবেন সত্তর হুরের বদলে! কারণ শান্তি তিনি আমাতেই পাচ্ছেন!" আমি কথাটা শুনে খুশিতে কেঁদে দিয়েছিলাম ঠিক‌ই কিন্তু  তেমন গুরুত্ব দিলাম না কারণ দিনশেষে নেতাদের অনেক কেচ্ছাই কানে যেতো।তাই আমি যত‌ই মুখে বলি, অন্তরে ভয় তো কিছুট হলেও ছিলো।তবে সেই ভয় তিনি ধীরে ধীরে কমিয়ে দিলেন। অবশ্য এতেও আম্মার, মানে তোমার দাদী শ্বাশুড়ির অবদান ছিলো।তিনি ছেলেকে নিজের শিউরে বসিয়ে বুঝালেন,‘ যদি সাধারণ মানুষের সেবা করতেই হয় তবে যেন একটা পাকাপোক্ত জায়গা গড়ে তবে করে।এতে অবশ্য‌ই মানুষ উপকৃত হবে নয়তো প্রকৃত সাহায্য প্রয়োজন এমন কেউ কোন সহায়তা পাবেই না।’ শয্যাশায়ী মায়ের কথায় হয়তো তার মনে কিছু একটা হয়েছিলো এরপর থেকেই তিনি দলীয় পদে লড়তে লাগলেন,পেয়েও গেল।থানা সভাপতি দুইবার হলো, এরপর কাউন্সিলর পদে লড়লেন, পরপরই তিনবার বিজয়ী হলেন। আল্লাহর রহমতে তার পদ আর যোগ্যতা নিয়ে কখনোই কোন মানুষ আঙ্গুল তুলতে পারেনি।না পেরেছে তার সততার দিকে কালি মিশ্রিত তীর নিক্ষেপ করতে। বরং বিবাদী অনেক মানুষের মুখেই তার প্রশংসা শোনা যায়। এখনও, সবার মুখেই তার সফলতার চর্চা হয় । তিনি যে শুধু রাজনীতি মাঠে নিজের যোগ্যতা দেখিয়েছেন তা কিন্তু নয়! সমান তালে বাপের রেখে যাওয়া সম্পত্তির দেখভাল করেছে, করেছে উন্নতি।কোথাও আল্লাহর রহমতে তিনি থামেন নি,থামতে হয়নি।আর না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে কখনো কোন বিশাল ঝামেলার মুখোমুখি করছেন।সবটাই হয়েছে তার চেষ্টা, মনন,আর সততার জোরে কিন্তু তিনি কাকে এর  কৃতজ্ঞতা জানায় জানো? "
আফনূর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, আম্মা হাস্যোজ্জোল প্রাণবন্ত চোখেমুখে নিজেই উত্তর দিলেন,
“ আমাকে!"
তিনি বলেন,‘ তুমি যদি বাকী স্ত্রীদের মতো সারাক্ষণ ঝগড়া ফ্যাসাদ করতে, সংসারে অশান্তি বাঁধিয়ে আমাকে পিছু টানে রাখতে তবে কখনোই এতটা আগানো সম্ভব হতো না।আমাকে তুমি সংসার থেকে দূরে রেখে সব দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছো বলেই আমি বাইরে এতটা আগাতে পেরেছি,পেরেছি নিজের শেকড় মজবুত করতে। নিজের অর্থ, সম্মান, প্রতিপত্তি বৃদ্ধি সব,সব দিকেই আমি এগিয়ে গিয়েছি কেবল তোমার সহযোগিতায়। আল্লাহ আমার জীবনে তোমাকে তার শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে প্রেরন করেছে। আমি আল্লাহর কাছে প্রতি নামাজে যত‌ই শুকরিয়া আদায় করি না কেন তা নেহায়েত কম‌ই হয়! আমি আমৃত্যু এর জন্য আমার রবের দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি।আমি এও দোয়া করি যাতে আমার সন্তানদের জীবনেও তোমার মতোই একজন জীবনসঙ্গিনী আসে।তারাও যেন সঙ্গীনির তালে মিশে জীবনের সফলতার সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে!"
তিনি সব কৃতিত্ব আমাকে দিতো অথচ আমি দেখতাম তিনিও কম করেননি।আমি কিন্তু কখনোই তারাজ, তাজিশের স্কুল,কলেজে যাইনি। বরং নিজেই নিয়ে যেতো। আমি কেবল তানহাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে তিনি ঘরেই রাখতেন,বাইরের অংশ পুরোটাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলো এরপরেও... আমি এত কথা কেন বললাম বুঝতে পেরেছো মা?
আফনূর মাথা নুইয়ে রাখলো কিছু মুহূর্ত, এরপর মাথা তুলে শ্বাশুড়ির দু হাতের আজলায় নিজের হাত রেখে বললো,
“ আমাকে আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই চলবো আম্মা, শুধু শিখিয়ে দিয়েন।যদি ভুল করি তখন বকা দিয়েন, তবুও নিজের আঁচলের ছায়া থেকে সরিয়ে দিয়েন না। আপনার ছেলেও যেন আমাকে নিয়েও এভাবেই গর্ব করতে পারে সেই পথ প্রদর্শন করিয়েন।আমি সবসময়ই আপনার অনুগত হয়ে চলবো কথা দিচ্ছি!"
“ আমার নয়,স্বামীর অনুগত হ‌ও।তার সাথে তর্ক নয়।নরম হয়ে আদরে সোহাগে প্রেম দেখিয়ে, ভালোবাসায় মজিয়ে নিজের কথা রাখো।যুক্তিগত কথা! খামখেয়ালিপনায় তাকে হয়রানি নয়।যথোচিত এবং যথার্থ কথা বলবে।কখন কোনটা বলতে হবে,কি বললে, কিভাবে বললে কাজ হবে সেটা আগে ঠাওর করতে হবে। এরপর নিজের কথা ফেলতে হবে।সব সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে চাপিয়ে দেওয়া যেমনি যাবে না তেমনি তার সব কথায়‌ও তাল মেলানো যাবে না।আগেই বলেছি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, অবস্থা বুঝে এরপর কথা পাড়বে।তার ভালো কাজে প্রশংসা যেমনি করবে তেমনি মন্দ কাজেও সুন্দর করে, সোহাগ দেখিয়ে বোঝাবে।মনে রাখবে পুরুষ মানুষকে বশ করার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো তাকে সোহাগ করা।সোহাগ দেখিয়ে বড় বড় মাফিয়াকেও কাবু করা যায়,আর এতো ঘরের পুরুষ। সুতরাং তর্ক নয়, যুক্তি! রাগ নয় সোহাগ, ভালোবাসা!তার সবদিক খেয়ালে রাখবে এবং এটাও তাকে বোঝাবে যে তার অন্তঃদেশের খবর‌ও তোমার কাছে থাকে, সুতরাং সে কোনমতেই তোমার গন্ডির বাইরে নয়‌।আর‌ও বেশি উপলব্ধি করাবে তুমি তার জন্য কতটা যোগ্য যাতে সে বাধ্য হয় নিজের সব গোপন কথা তোমাকে বলতে।তোমাকেই নিজের সবচেয়ে গোপন আর নিশ্চিত উপদেষ্টা ভাবতে একান্তই বাধ্য হয়। দেখবে নিশ্চিত মনে এক জীবন এক সঙ্গে কাটিয়ে দিয়েছো।আমি আশাবাদী তুমি পারবে।আমার বেলাগাম ঘোড়াকে লাগামে আনতে!"
“ ইনশাআল্লাহ আম্মা, আপনি পাশে থাকলেই অবশ্যই পারবো।!"
“ আল্লাহ তোমার সহায় হোক।ফি আমানিল্লাহ্!"

পর্ব ৪৫

১৪৮। (১) তৃতীয় তফসিলে উল্লিখিত যে কোন পদে নির্বাচিত বা নিযুক্ত ব্যক্তি কার্যভারগ্রহণের পূর্বে উক্ত তফসিল-অনুযায়ী শপথগ্রহণ বা ঘোষণা (এই অনুচ্ছেদে "শপথ" বলিয়া অভিহিত) করিবেন এবং অনুরূপ শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করিবেন।
(২) এই সংবিধানের অধীন নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির নিকট শপথগ্রহণ আবশ্যক হইলে 2[* * *] অনুরূপ ব্যক্তি যেরূপ ব্যক্তি ও স্থান নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ ব্যক্তির নিকট সেইরূপ স্থানে শপথগ্রহণ করা যাইবে।
3[২(ক) ১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন ব্যক্তি যে কোন কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।]
 এই সংবিধানের অধীন যে ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথগ্রহণ আবশ্যক, সেই ক্ষেত্রে শপথগ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।
এই শপথ অনুষ্ঠান হবে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে ।স্পিকার প্রথমে নিজে এমপি হিসেবে শপথ নেবেন।পরে তিনি অন্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।
সংসদ নির্বাচনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে সংসদে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এরপর ৩০ দিনের মধ্যে অধিবেশন ডাকতে হবে।
প্রথম অধিবেশন শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে কেউ শপথ না নিলে বা স্পিকারকে অবহিত না করলে সদস্য পদ খারিজ হবে।          
শপথ শেষে নতুন সংসদ সদস্যরা সংসদ সচিবের কার্যালয়ের স্বাক্ষর খাতায় সই করবেন এবং একসঙ্গে তাদের ছবি তোলা হবে।
এমপিদের শপথের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হবে নতুন সরকার গঠনের পর্ব। রাষ্ট্রপতি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন। এরপর বঙ্গভবনে হবে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ। 
আজ শপথ, দশটার মধ্যে সংসদে উপস্থিত থাকতে হবে তারাজকে।তাই সকাল সকাল সবাই নাস্তা সারার জন্য টেবিলে এসে পড়েছে।
আফনূরের‌ও গুরুত্বপূর্ণ একটি কেইসের জন্য কোর্টে যাওয়া জরুরি। ঐদিকে তারাজকে তৈরী হতে সহযোগিতা করতে হবে। ফজরের আযান পড়ার সাথে সাথেই উঠে পড়েছে। একসাথে উভয়‌ই সালাত আদায় করে তারাজ প্রাত্যহিক শারীরিক চর্চা করতে ছাদে উঠে,আর আফনূর কিছু সময় কোরআন তেলাওয়াত করে রান্নার উদ্দেশ্য রান্না ঘরে যায়। রান্না ঘরে ঢুকে দেখে আম্মা আগেই চলে এসেছে
তার সাথে তার দুই সহকারী খালেদা আর সুফিয়াও আছে।ছয় হাতে দ্রুত কাজ করছে।
“ আম্মা আমাকে দিন,আপনি ঘরে যান।”
আম্মা আফনূরের পানে চেয়ে বললো,
“ তোমার নিজেরও তো কাজকর্ম আছে। সেগুলো সেরেছো?"
“ জ্বী আম্মা সব রাতেই গুছিয়ে রেখেছি।আপনি বলুন সকালের নাস্তায় কি রাখবেন আজকে!"
“ ইব্রাহীম তো সকালে এমনিতেই ভারী খায় না।তার মধ্যে তোমার শ্বশুরের শরীরের অবস্থা ভালো না। কয়েকদিন ভারী খেয়ে রোগগুলোকে তরতাজা করিয়েছে।তাই ভেবেছি আজ সব হালকা খাও! ইব্রাহীম আজ তো সারাদিনের সফরে যাবে,তাই ওকে একটু হালকা তবে স্বাস্থ্যকর কিছু করে দাও।"
“ রুটি আর সবজি করি বাবার জন্য, আপনার ছেলেকে কর্নফ্লেক্স আর ফ্রুট সালাদ দেই?আপনি আর আপা দুলাভাই কি খাবেন বলেন!"
“ আমাদের জন্য আলাদা আর কি করবে? তোমার শ্বশুরের সাথেই দাও।এক‌ই খাই! আমার‌ও তো আর বয়স কম না। শুধু তোমার আপাকে কর্নফ্লেক্স আর সালাদ দাও।জামাই ও আমার মতোই রুটি সবজি খাবেনে দেখো।"
“ মেহমানদের জন্য কি করবো আম্মা?"
“ তাদের জন্য গোস্ত নামিয়েছি,সাথে রুটি করে দাও। রুটি,সবজি, গোরুর গোস্ত ঝুড়ি ভাজা করো।
_ আর হ্যা দুধ বসাও,চাল ধুয়ে পাশে রাখ সুফিয়া।পায়েশ আমি রাধবো!"
সব নির্দেশনা দিয়ে আম্মা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আফনূর সুফিয়া আর খালেদার সহায়তায় সাড়ে সাতটার টার মধ্যে সব রেডি করে ফেললো। ঘরে দিয়ে দেখলো তারাজ গোসল করে বেরিয়েছে। কোমরে এখনও তোয়ালে পেঁচানো।
“ কাপড় বের করে দাও।তাড়াতাড়ি করো!"
“ দিচ্ছি, একটু!"
“ মাথায় ওড়না দেওয়া সালোয়ার কামিজ পড়ুয়া আফনূরকে আপাতত খুব‌ই ব্যস্ত আর ঘরোয়া ব‌উ লাগছে। খোঁপা বাঁধা চুলগুলো ওড়নার আড়ালেই রয়েছে,তবে সামনের দিকে ছোট ছোট চুলগুলো বেরিয়ে আছে,যা আপাতত বাতাসের তোপে উড়োউড়ি করছে।এমপি তারাজ সব রেখে আপাতত সেদিকে ধ্যানমগ্ন। আফনূর তারাজের জন্য কালো সাদা পাঞ্জাবির সাথে সাদা পাজামা এবং কালো ব্লেজার বের করে দেখিয়ে বললো,
” এটা ঠিক আছে?"
তারাজ আফনূরের গলায় স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর করলো,
“ হু। পারফেক্ট!"
“ ওখে।তাহলে তাড়াতাড়ি করেন।"
“ এমন তাড়া দিচ্ছো সকাল থেকে মনে হচ্ছে আজ শপথ আমার নয় তোমার‌ই।"
“ আমার‌ই! আপনার যা তা সব‌ই আমার, এমনকি আপনার ক্ষমতাও!"
কথাটা শেষ করেই আফনূর তারাজের দিকে চেয়ে
চোখ মারলো।তারাজ আফনূরের দুষ্টু কথায় তারা মিলিয়ে প্রসন্ন চিত্তে বললো,
“ একদম; জীবনটা বাদে সব আপনার!"
“ জীবন আমার চাইও না। আমার তো শুধু এই গোটা মানুষটাকে চাই!"
কথায় কথায় চললো খুনসুটি আর খুনসুটিতে মেতে থেকেই আফনূর তারাজকে তৈরি করে দিলো।
“ আম্মা ভাই কি বের হয়ে গেছে?"
“ না, এখনতো খেতেই আসেনি।"
“ ব‌উ কি এখনও ঘুম থেকে উঠেনি?কি বলিস! আজ তার স্বামীর এত বড় দিন আর সে এখনও ঘুমে?"
মমতা খালামনির কথায় তাজিশ নিরব চোখে তাকিয়ে আছে,তানহা তান্নাকে স্কুল বাসে উঠিয়ে দিয়ে ঘরে ফিরতেই এই কথা শুনে টেবিলের সামনে গিয়ে চেয়ারে বসে নিজের প্লেট সাজিয়ে কনফ্রেক্স নিতে থাকলো।পরে কি বলে শোনার জন্য উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে। মাত্র সপ্তাহ পেরুতেই সব বলে সবাই।
“ আরে না।বউমা  সকালেই উঠে!"
“ তাতে কি? সেই তো সব তোকেই করতে হচ্ছে! ছেলে বিয়ে দিয়েও যদি এই বয়সে এত সকালে তোকেই করতে হয় তবে ছেলে বিয়ে দিয়ে লাভ কি?"
“ মানে কি খালামনি?"
“ ছেলে বিয়ে দেয় ছেলের প্রয়োজন মেটাতে! ঘরে এনে ঝিয়ের কাজ করাতে না।"
তানহার কথার মাঝেই খাবার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উত্তর দিলো তারাজ।তাজিশ‌ও ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ছিলো ঠিক‌ই তবে বড়দের কথার পিঠে কথা বলা তার কম্ম নয়।তবে তারাজ ছাড়ার পাত্র নয়।আফনূর‌ও তখন মাত্র আসার পথে ।সে কোন কথাই শোনেনি।তবে তারাজের শেষ লাইনটা তার কানেও পৌঁছায়।প্রশ্নাত্নক চোখে তারাজের পানে চেয়ে আছে।কি বিষয়ে এই কথা বললো তা জানার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু তারাজ আর কথা বাড়ালো না । আফনূরকে বললো,
“ নাস্তা দাও তাড়াতাড়ি।"
“জ্বী!"
একে একে টেবিলে উপস্থিত হলো সব সদস্য। শুধু মায়া বাদে।যেহেতু মায়া পর্দা মেনে চলে তাই সবার সাথে খেতে বসতে পারছে না।
টেবিলে তারাজের ডান পাশে আফনূর বাম পাশে তাজিশ। আফনূর হাতে হাতে সব সামনে এগিয়ে দিতে থাকলো।মমতা তারাজের সেই উত্তরে বেশ ক্ষুদ্ধ হলো, বললেন,
“ বাড়ির ব‌উয়ের সংসারি কাজ করা যদি ঝি গিরি  হয় তবে কি তোমার মা‌ও ঝি গিরি করছে?"
কথাটা বেশ লাগলো তারাজের কানে গিয়ে। কটাক্ষের জবাবে আর‌ও কিছু বলতে যাবে তার আগেই আম্মা এত সময়ে মুখ খুললেন,
“ আরে মমতা তুই ভুলভাল ভাবছিস! ব‌উ মা সকালেই উঠেছে,আর এগুলো সব ব‌উমাই‌ তৈরি করেছে।আমি তো শুধু এখন টেবিলে এসে তোদের খাবার নিতে সাহায্য করছি।"
মমতা খালামনি নিজের ভুল বুঝে চুপ হয়ে গেলেন। লজ্জিত ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে রেখেছে।তারাজ কিছু আর বললো না। চুপচাপ যার যার প্লেট নিয়ে বসে আছে। এদিকে আফনূরের কৌতুহল মিটলো না।ঘটনা জানার জন্য আম্মাকে প্রশ্ন করলো,
“ কি হয়েছে আম্মা? কোন কিছু কি নষ্ট হয়েছে?"
আম্মা কি বলবেন ভেবে পেলেন না। এদিকে মমতা খালামনির লজ্জার পরিমান আরো একটু বাড়লো।তিনি তখনও খাবারে হাত লাগায়নি। আফনূরের কৌতুহল মিটাতে তারাজ গম্ভীর গলায় বললো,
“ কিছু হয়নি।আমাকে সালাদ দাও আগে!"
আফনূর তারাজের গলার স্বরেই নিশ্চিত হলো কিছু একটা হয়েছে।তবে আর বেশি ঘাঁটানো উচিত নয় আপাতত; তাই পূনরায় কোন প্রশ্ন করলো না।
সবাই নিজেদের মতো নিয়েই খাচ্ছে। তারাজ বললো,
“ বসে পড়ো।বের হবে না?"
“ হ্যা বসছি।"
তারাজকে নাস্তা সাজিয়ে এক‌ই নাস্তা নিজের জন্য নিলো।সবাই সবার মতো চুপচাপ খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে চামচ প্লেটের শব্দ আসছে।
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে  পাশাপাশি বসা তারাজ, আফনূরকে দেখছে মায়া।তারাজ খেতে বসেও কত যত্ন করে আফনূরকে। নিজের খাবারের পাশাপাশি একটু পরপরই আফনূরের দিকে তাকাচ্ছে।খুব খারাপ লাগলো মায়ার। এই জায়গায় সে থাকতো অথচ! ছলছলিয়ে উঠলো অক্ষুকোটর। বুদ্ধি হবার পর থেকেই সে শুনে এসেছে তার জন্য কাউকে নির্বাচন করা আছে।সে একজনের নির্ধারিত ব‌উ।তখন থেকেই নিজেকে তৈরি করেছে একজনের জন্য।তারাজ কি পছন্দ করে কি পছন্দ করে না সব কিছুর খোঁজ রাখতো।সেই অনুযায়ী নিজেও চলতো।এই যে পর্দার অন্তরালে নিজেকে লুকিয়ে রাখা সবটাই তারাজকে খুশি করতে।যাতে তারাজ তাকে সবসময় পবিত্র ভাবে পায়,স্বচ্ছ চরিত্রের অর্ধাঙ্গিনীর মনোকামনা সব পুরুষের‌ই থাকে।তাই কখনো কোনদিন কোন ছেলে বন্ধুও বানায়নি।আড্ডাবাজি করা মেয়ের সাথেও মিশতো না। ফোনে অতিরিক্ত বার্তালাপা‌ও করেনি।এত কিছু করেও লাভ কি হয়েছে? সেই তো যার জন্য এত কিছু করলো সেই ছেড়ে দিলো।
সেই কোন ছোট বেলায় দুই একবার দেখেছিলো,তাদের বাড়ি আর তারাজের নানা বাড়ি পাশাপাশি।তারাজ যখন নানা বাড়িতে বেড়াতে যেতো তখন তাদের দেখা হতো। একসাথে খেলতে চাইলে কখনোই তারাজ তার সাথে খেলতো না।তাজিশ খেলতো কিন্তু তারাজ বিরক্ত হয়ে ঐ জায়গা থেকেই চলে যেতো। শেষ দেখা বোধ হয় দশ বছর আগে হয়েছিলো।তখন তারাজের বয়স সম্ভবত ২১ ,তারাজ তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আর মায়া মাত্র দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী।তারাজ তাদের বাড়ি কখনোই কেন জানি যেতে চাইতো না।
মায়া তারাজের অগোচরে তারাজের সব খবর‌ই রাখতো কিন্তু তারাজ মায়ার খোঁজ নিতো না।তখন মায়া ভাবতো হয়তো একেবারে বিয়ের পর‌ই তাদের মুখোমুখি দেখা হবে কিন্তু?
কিছুদিন আগে যখন তার মা বললো তারাজ বিয়ে করে ফেলছে তখন তার মনে হয়েছিলো বুকের উপর বিশাল এক পাথর দিয়ে কেউ অনবরত আঘাত করছে। পাঁজরের প্রতিটি হাড় ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে।যতটা কষ্ট হলে নিজেকে শেষ করতে ইচ্ছে হয় ঠিক ততটাই তার হচ্ছিলো।তবে দ্বীনি শিক্ষার জন্য আল্লাহর ভয়ে পারেনি। কাঁদতে কাঁদতে আজ এতগুলো রাত পার করছে। তবুও? না দেখা এই মানুষটিকে দেখতে তার ব‌ড়‌ই ইচ্ছা চাপলো।তাই তো মা ভাইকে অনুরোধ করলো তাকে যেন একবার এই বাড়িতে নিয়ে আসে
সে চোখের দেখা হলেও দেখবে। তৃষ্ণা নিবারণ করবে বহুবছর জমিয়ে রাখা চোখের পিপাসা।তার সাথে দেখবে সেই সৌভাগ্যবতীকে যার জন্য তাকে এতটা তুচ্ছ করলো ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার।
তারাজ খাওয়া শেষ করে টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ালো। আফনূরের দিকে তাকালে আফনূর‌ও তাকালো।
“ সব রেডি?"
“ জ্বী; উঠছি একটু!"
তারাজ গিয়ে সোফায় বসে জুতো পায়ে দিলো। ততক্ষণে আফনূরের খাওয়া শেষ।সে তারাজের ব্যাগটা নিয়ে তারাজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
“ মাথা ঠান্ডা রাখবেন।রিল্যাক্স থাকবেন!"
“ জ্বী ম্যাম; আপনি তো আমাকে মনে হচ্ছে প্রথমবারের মতো স্কুলে পাঠাচ্ছেন যেভাবে সাবধানী বার্তা দিচ্ছেন!"
“ এমন‌ই! আপনি কি এর আগেও সংসদে গিয়েছিলেন!"
“ তা যাই নি ঠিক।"
এর মধ্যে আম্মা হাতে করে পায়েশ নিয়ে এলো।তারাজের সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
“ নাও তাড়াতাড়ি হা করো!মুখ খোলো!"
তারাজ চুপচাপ মুখ খুললে, আম্মা ফটাফট দু চামচ পায়েশ মুখে দিলো। তারপর আফনূরের দিকে চামচ বাড়াতেই আফনূর বললো,
“ আমি কেন? আজকে তো আমার পরীক্ষা না আম্মা!"
“ মুখ খুলো।"
আফনূর চুপচাপ হা করে খেয়ে নিলো।
“আম্মা আসি,দোয়া করিও।আব্বা দোয়া করিও।”
তারাজ ব্যাগটা হাতের মুঠোয় ধরে সবার কাছে দোয়া চেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময়‌ই তাজিশ গলা আঁকড়ে বললো,
“ শুভকামনা ভাই, আল্লাহ তোমাকে অনেক সফলতা দিক!"
ভাইয়ের পিঠে হালকা চাপড় মেরে বললো,
“ আমীন!"
তাজিশ তারাজের সাথেই বেরিয়ে গেল।যাওয়ার পথে তাজিশকে দায়িত্ব দিলো,
“ তোর ভাবীকে কোর্ট প্রাঙ্গণ রেখে আসতে পারবি?"
“ তুমি যাও,আমরা যাচ্ছি!"
তারাজ তাজিশের সাথে কথা শেষ করে আফনূরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আফনূর হাস্যোজ্জ্বল চোখে বললো,
“ আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আপনার দায়িত্ব অনেক বেড়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ!"
“ ইনশাআল্লাহ!"
“ সাবধানে থেকো।বেশি চাপ নিয়ে কোন কাজ করবে না।যেকোন সমস্যায় কল দিবে।ওখে?"
“ ওখে!"
যে যার গন্তব্যে ছুটলো।
সংসদ ভবনের নিম্নতলায় শপথ কক্ষে সংসদের স্পিকার সর্ব প্রথম শপথ বাক্য পাঠ করেন এবং পরে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পাঠ করান।
মাননীয় স্পিকার পারভীন সুলতানা নিজ শপথ পাঠ শেষ করে সাংসদদের উদ্দেশ্য বললেন,
“ জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত সকল মাননীয় সদস্যবৃন্দ আসসালামু আলাইকুম;আপনাদের আন্তরিক অভিনন্দন।এখন আপনাদের শপথ বাক্য পাঠ করানো হবে। এখন আপনাদের সকলকে অনুগ্রহ করে দাঁড়িয়ে শপথ বাক্য পাঠ করার অনুরোধ করছি এবং সকলেই আমি বলার পর আপনাদের নাম বলবেন, এবং আমি বলার পর পরই বলবেন, ধন্যবাদ।
_আমি.."
“ আমি মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার , সংসদ সদস্য নির্বাচিত হ‌ইয়া সশ্রদ্ধ চিত্তে শপথ বা দৃঢ় ভাবে ঘোষণা করিতেছি যে,আমি যেই কর্তব্য ভার গ্রহণ করতে যাইতেছি যে তাহা আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব।আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষন করিব এবং সংসদ সদস্য রুপে আমার কর্তব্য পালনকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হ‌ইতে দিবো না।"
“ সকলকে অভিনন্দন!"
অভিনন্দন জানিয়ে সাংসদদের শপথ পাঠ করানোর পর্ব শেষ করলেন। এরপর চলবে ফটোসেশন পর্ব। তারপর দলীয় মিটিং।মোদ্দে কথা আজ সারাদিনের আয়োজন!
“ কনগ্রাচুলেশন মিসেস ইব্রাহীম; আজ থেকে তো ব্যারিষ্টার ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার পুরোপুরি ক্ষমতার অধিকারী ।এখন তো আপনাকে পাওয়াই যাবে না।”
“ আমাকে পাওয়া না পাওয়ার সাথে ব্যারিষ্টার সাহেবের কি লেনদেন?"
“ এখন তো আপনিও নিশ্চয়ই তার সাথে কাজে লেগে যাবেন। এখন বোধহয় প্র্যাক্টিস নিয়মিত করবেন না!"
“ উনি নিজেই যেখানে প্র্যাক্টিস ছাড়ছে না সেখানে আমি কি? তাছাড়াও তার ক্ষমতা তার কাছে,সেটার সাথে আমার কোন যোগ সূত্র নেই। এত কষ্ট করে পড়াশোনা শিখে নিশ্চয়ই সেটাকে অকেজো করে রাখবো না! আমার ইচ্ছা ছিলো অসহায়দের আইনী সহায়তা করা তাই করবো।আর উনিও চান না আমি উনার রাজনৈতিক পাঠে আগ্রহী হ‌ই।"
“ যাক বেশ লাগলো আপনার কথাটা শুনে। আপনার মতো ট্যালেন্টেড ল‌ইয়ার যদি হারিয়ে যায় তো বেশ ক্ষতি হয়ে যাবে এই কোর্ট পাড়ায়!"
“ এমন কিছুই হবে না খলিল ভাই!"
“ ভাবীমনি! তোমার হয়েছে?"
কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ক্লান্ত দেহখানি একরকম টেনেই আনছে তাজিশ। খানিকটা দূরে থেকেই আফনূরকে ডাকলো। আফনূর পরিচিত কন্ঠস্বরে সেদিকে তাকিয়ে দেখলো ক্লান্ত দেহের হাস্যোজ্জ্বল তাজিশকে।আফনূর সাথের লোকটাকে ভদ্রতা সূচক বিদায় জানিয়ে তাজিশের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,
“ এত কষ্ট করে তুমি আবার এত দূর আসতে গেলে কেন ভাইয়া?সোজা বাসায় চলে যেতে।"
“ তোমাকে রেখে যাই কি করে?আমার ভাই আমাকে ছোট্ট একটি দায়িত্ব দিয়েছে,সেটা‌ই যদি ঠিকঠাক পালন করতে না পারি!তবে.."
“ তোমার ভাইয়ের শুধু শুধু চিন্তা!"
“ শুধু শুধু না। রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য,তার উপর নিজেও আইনজীবী,বর‌‌ও আইনের লোক।সব মিলিয়ে অবশ্যই চিন্তার কারণ আছে। তাছাড়াও একজন এমপির ব‌উয়ের পাশে যদি একটা বডিগার্ড না থাকে তবে কেমন পানসে লাগে না সবটা!"
তাজিশ শেষ কথাটা দুষ্টুমি করেই বললো, আফনূর হেসে দিলো ওর কথায়।
“ হ্যা তা অবশ্য ঠিক বলেছো। একজন এমপির ব‌উয়ের আশেপাশে গোটা কয়েক প্রহরী না থাকলে আসলেই ব্যাপারটা জমে না। এমনিতেই একটু আগেই একজন বলছিলো আমি এখন থেকে নিশ্চয়ই আর কোর্টে আসবো না।"
“ কেন? এমন কথা কেন বললো?"
“ তার ধারনা এখন থেকে আমার বরের অনেক ক্ষমতা তাই হয়তো আমি সেই ক্ষমতার চাউল খাবো! অবশ্য এটা সে মুখে মুখে বলেছে মনে মনে তো বলছে স্বামী অনেক অবৈধ ইনকাম করবে তখন কি আর আপনার ইনকাম করার দরকার হবে?"
“ তোমার কি মনে হয় ভাই তাই করবে?"
“ মোটেই না। তবে যদিও কখনো ভুল করেও করার চেষ্টা করে ওয়াদা করছি জীবন দিয়ে হলেও তাকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্।"
“ ইনশাআল্লাহ ; করবে না দেখি!"
“ দেখা যাক!"
ঘরে বাইরে ব্যস্ত তারাজ। আফনূর‌ও আছে নিজের মতো করেই।সবাই সবার দৈনন্দিন কাজে মজে আছে। এদিকে ভীষণ খারাপ ও একাকী সময় পার করছে মায়া।মায়ারা চলে যেতে চাইলেও তাজিয়া খাঁ দিলেন না।তিনি অনুরোধ করে বললেন আর কিছুদিন থেকে যেতে।আর মধ্যে সবচেয়ে বড় খুশির বার্তা হলো,তারাজ মন্ত্রী সভার একজন সদস্য হ‌ওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছে।তারাজ মাত্র মন্ত্রীর সভার শপথ গ্রহণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে নিয়োগ পেয়েছে। প্রচুর ব্যস্ততায় দিন যাচ্ছে তার। পরিবারের সাথে ঠিক মতো খেতেও পারছে না।তাই তিনি কথা পাড়তে পারছেন।
মন্ত্রী পদের দায়িত্ব তারাজকে সম্মানিত করার পাশাপাশি কাঁধের চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।ঠিক মতো আফনূরের সাথেও একান্তে কথা বলতে পারছে না।খুব শিগগিরই মন্ত্রী পাড়ার বাসভবনে উঠতে হবে।তার মধ্যে আফনূরের পেশাগত দিকটাও দেখতে হচ্ছে।
সারাদিনের নানা প্রশাসনিক কাজের ধকল শেষ করে সবে মাত্র ঘরে ফিরলো তারাজ। রাতের এখন মধ্যিভাগের প্রথম প্রহর। আফনূর বারান্দায় দোলনায় বসে একটা আইনি ব‌ই'য়ে ডুবে আছে।তারাজ যে ঘরে ঢুকেছে সেদিকে কোন হুঁশ‌ই নেই। আফনূরের এমন ডুবে যাওয়াটা তারাজের পছন্দ হলো না।সে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের আগমনের জানান দিলো। আফনূর চমকে উঠলো।তারাজ আফনূরের এমন প্রতিক্রিয়ায় তাচ্ছিল্য সহিত বললো,
“ এতটা অন্যমনা হলে কিভাবে চলবে মিসেস নুর! একজন মন্ত্রীর মিসেসকে অবশ্যই সচেতন ও সজাগ থাকতে হবে!ঘুমের মাঝেও চোখ কান খুলে রাখতে হবে। সেখানে ব‌ইয়েই হারিয়ে গেছেন। আপনার ঘরে যে একটা আস্তো আশি কেজী ওজনের মানুষ ঢুকে পড়লো তাই আপনি জানলেন না।"
আফনূর তারাজের তাচ্ছিল্য বুঝলো। কঠোর কন্ঠে বললো,
“ কারো ঘরে ঢুকতে গেলে যে আগে নক করে অনুমতি নিতে হয় তা কি বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার জানেন না! এতটুকু ম্যানার্সের জ্ঞান কি তার নেই! তবে কি আমরা ধরে নিবো আইন প্রনেতা নিজেই আইন পাঠে দূর্বল!”
তারাজ আফনূরের তিরষ্কারের উত্তরে চোখ কুঁচকে তাকালো। খরখরে গলায় শুধালো,
“ নিজের ঘরে আসতেও অনুমতি লাগবে?"
“ আপনার ঘর?"
আফনূরের প্রশ্নে তারাজ হতভম্বতা নিয়ে তাকালো, আফনূর নিজেই উত্তর দিলো,
“ এটা আপনার ঘর না,এটা কোন মন্ত্রী এমপির ঘর না! এটা আমার আর আমার সাধারণ ব্যারিষ্টার সাহেবের ঘর!যেখানে আমি যেভাবে খুশি সেভাবে থাকতে পারি।তাতে আমার সাহেবের কোন মাথা ব্যাথা নেই! তাছাড়াও..
থেমে গেল আফনূর।তারাজ কোমরে হাত গুজে দাঁড়ালো।নিরব গলায় বললো,
“ শেষ করো!"
“ আমার সামনে যে দাঁড়ানো সে আমার স্বামী নয়।সে এখনও একজন মন্ত্রী!"
“ মানে?"
তারাজ অবাক চোখে দেখছে। আফনূর হাতের ব‌ই দোলনায় রেখেই ঘরে ঢুকলো।তারাজ ওর পিছনে গিয়ে ঘরে ঢুকলো। বললো,
“ কি হলো কথা সম্পূর্ণ করো!"
“ কিছু না।আপনি ফ্রেশ হোন!"
“ না শেষ করো!"
“ কি শেষ করো শেষ করো লাগিয়ে রেখেছেন! রাত দেখছেন কয়টা বাজে! আমি কি এখনো ঘুমাবো না! সকালে উঠে আমাকে অনেক কাজ করতে হবে!তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ুন!"
আফনূর কথা শেষ করেই তারাজের জন্য কাপড় নিয়ে গোসলখানায় রেখে আসলো।ওর চোখ মুখ কেমন বিষন্নতায় ছেয়ে গেছে।চোখ দুটো ছলছল করছে।তারাজের মনে হলো কলিজায় গিয়ে কিছু একটা বিধলো।কেমন সুক্ষ্ণ চিনচিনে ব্যথা লাগছে। আফনূরের চোখে জল।মুখটা বিষন্নতায় ডুবে গেছে। হঠাৎ অনুভব করলো তারাজের হাত কাঁপছে।তারাজ সময় ক্ষেপন করলো না।ফট করেই আফনূরের হাতের কবজি চেপে ধরলো।একটানে নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরে রাখলো অনেক সময়।তত সময়ে আফনূর তারাজের বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে।তারাজ পিঠে হাত বুলিয়ে আদুরে কন্ঠে বললো,
“ হিস্ কাঁদবে না। তোমার কান্না আমার দুনিয়া তোলপাড় করে দেয়!"
এমন আদুরে ভাবে কেউ কথা বললে কি আর কাদা যায়! আফনূর‌ও থেমে গেল।তবে থেকে থেকে হিচকি তুলছে।তারাজ আরও একটু শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বললো,
“ কি হয়েছে আমার নুরজানের! কিসের জন্য এত অভিমান জমিয়েছে তার হৃদমঞ্জিলে?"
আফনূর তারাজকে শক্ত করে মিশিয়ে নিলো।খামচে ধরলো পিঠের পাঞ্জাবির অংশ।ওর ভেতরে কেমন অস্থিরতা চলছে,ছটফট করছে।তারাজের ভাবনাদেশে এক অতি ভয়ানক কিছু উতলে উঠলো‌।জানা আশংকায় ছলাৎ করে উঠলো কলিজা, ভেতরে ভাঙচুর শুরু হয়েছে। তারপর নিজেকে সামলে আবারও জিজ্ঞেস করলো,
“ বলো না ব‌উ; কি এমন বিষাক্ত জীব যা আমার মধুরানীকেও জ্বালাচ্ছে!ওকে আমি পায়ের তলায় পিষে মারবো!"
“কামরাঙ্গীরচর নিবাসি মোহাম্মদ ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকারের বড় পুত্র মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার আমাকে ভীষন বাজেভাবে জ্বালাচ্ছে মন্ত্রী সাহবে!"
তারাজ থমকে গেল।কি বললো আফনূর! পুরোটা একবার নিজের মগজে বাজালো।অস্ফুট হাসা ফুটে উঠলো‌। আফনূরকে আরো একটূ চেপে ধরলো ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলো,
“ কে জ্বালাচ্ছে?"
আফনূর এক‌ই উত্তর দিলো।তারাজ জিজ্ঞেস করলো,
“ কিভাবে জালাচ্ছে?"
“ সে আমাকে সময় দেয় না।তার কাছে দেশের জনতাই সব ,অথচ আমিও যে একজন নাগরিক এ দেশের,আমারও যে মৌলিক কিছু অধিকার আছে তা সে বেমালুম ভুলে আছে!"
“ ওহ,এটা ভীষণ বড় অপরাধ! তো তার জন্য কি শাস্তি দেওয়া যায় বলেন তো!"
“ তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নাই।আমি তাকে কষ্ট দিতে পারবো না আর পারবো তার কষ্ট সহ্য করতে!"
"তবে কি করলে  আপনি খুশি হবেন তা তো বলুন!"
আফনূর তারাজের বুক থেকে মুখ উঠালো,তারাজ নিজের ডান হাতের চার আঙ্গুল দিয়ে আফনূর সিক্ত মুখটা মুছে দিলো। আফনূর আহ্লাদি হয়ে বললো,
“ আজ কতদিন হয়ে গেছে আপনি আমাকে একটু সময় দেন? একসাথে বসে একটু কথা বলেন না!"
তারাজ ছোট্ট একটি শ্বাস ছাড়লো। এরপর একটু নিরব হয়ে আফনূরকে দেখলো। এরপর বললো,
“ আজকে সারারাত কথা বলবো।চলবে?"
“ ঘুমাবেন কখন?"
“ একটা রাত না হয় নাই ঘুমালাম; আমার না ঘুমালে যদি কোন নাগরিকের উপকার হয় তবে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী হিসেবে আমি অবশ্য‌ই নিজের এক রাতের ঘুমকে ত্যাগ করলাম।"
আফনূর প্রত্ততর করলো না।তারাজের বুকেই আবার মুখ লুকালো।সে কোন মন্ত্রী টন্ত্রী নয় তাই সে কোন ত্যাগফ্যাগ‌ও করতে পারবে না।সে আজ তার ব্যারিষ্টার সাহেবের সাথে সারারাত জেগে থেকে চন্দ্রবিলাস করবে! আজকের রাতটা তাদের আর চাঁদের।প্রেম বাতাসে মেখে জোছনায় উড়িয়ে দিবে!
চলবে!
বিশেষ দ্রষ্টব্য:- প্রত্যেকটি তথ্য আমি সরকারি বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘেঁটে বের করছি।তাই ভুলভ্রান্তি আমার দোষ নয়।তবুও বলছি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশাকরি সবাই।
আর হ্যা অনেক পরিশ্রম করে তবেই লিখি তাই কেউ কপি করার দুঃসাহস দেখাবেন না।

পর্ব ৪৬

“ তোমার সাথে আমার একটু জরুরী কথা আছে। সময় হবে কি একটু মন্ত্রী সাহেব!"
পাঞ্জাবীর হাতা টেনে ঠিক করছিলো তারাজ।আজ তৃতীয় অধিবেশন। দুপুরে খেয়ে একেবারেই বের হবে দেখে আজ সকাল থেকেই ঘরে আছে।
এখন বেলা দশটা। আজকের সিডিউল অনুযায়ী এখন ক্লাবে যাবে, সেখান থেকে এলাকা পরিদর্শনে বের হবে। তারপর বাড়ি ফিরে গাঁ গোসল দিয়ে নামাজ আদায় করে দুপুরে খাওয়ার পাঠ চুকিয়ে বের হয়ে যাবে।কাল রাতটা আফনূরের সঙ্গে খুনসুটিতেই কাটিয়েছে তার সাথে বহুদিন পর প্রিয়তমাকে বুকের মাঝে চেপে রেখে প্রশান্তির শ্বাস ছেড়েছে। গতকাল সারাদিন যেই দুশ্চিন্তা আর ভয়ে তার কেটেছে তার থেকেও মুক্তি পেয়েছে। তবে একটু দুঃখ‌ও পেয়েছে। আফনূর তার থেকে সত্য লুকানোয়। অবশ্য আফনূর হয়তো তাকে কষ্ট দিতে চায় না বলেই বলেনি। কিন্তু.... তারাজ ভাবলো বেশ সময় নিয়ে। মনে মনে আওড়ালো,
“ সময় এসেছে সব খোলাসার।লুকোচুরির সমাপ্তি টানা জরুরী নয়তো আর‌ও খারাপ কিছুও হতে পারে!”
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই পাঞ্জাবির হাতা ঠিক করছিলো তখন আম্মার উক্ত কথায় থেমে গেল।যেই দর্পনে নিজেকে দেখে কাজ করছিলো,সেই দর্পনেই কপোটে দাঁড়িয়ে থাকা আম্মার আড়াআড়ি প্রতিচ্ছবি ভেসে আছে।তারাজ ভ্রু কুটি করলো, পিছনে ফিরে এক পা দুই পা করে পাঁচ কদম এগিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন আম্মা?আসো! আমার রুমে ঢুকতে তোমার অনুমতি নেওয়া লাগবে কেন?”
আম্মা ছেলের মনোভাব বুঝলেন, সঙ্গে সঙ্গে হালকা মিষ্টি হেসে উত্তর করলেন," ছেলে এখন আমার বিবাহিত! এখন কি আর সে বাচ্চা আছে? নাকি অবিবাহিত আছে?এক সময় পর বাচ্চাদের ঘরে যেতেও বাবা মায়ের অনুমতি নেওয়া উচিত,এতে তাদের সম্মান কমে না বরং উভয় তরফেই সম্মান আর শ্রদ্ধা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা মজবুত হয়!"
“ আচ্ছা তাই!"
“ হ্যা আব্বা তাই!"
“ ঠিক আছে তবে আজকের পর কখনো এটা বলবে না যে তোমার জন্য সময় আছে কিনা? আমার কাছে সবার আগে আমার পরিবার তারপর অন্য কিছু!"
“ আচ্ছা আর বলবো না।তবে একটা কথা তো অবশ্যই বলতে হয় আর তা হচ্ছে এখন কি আর আমার সন্তান আমার  একার আছে? সে এখন সাধারণ মানুষের সম্পদ।তার উপর এখন সাধারণ মানুষের  অধিকার সবকিছুর আগে তারপর আমি, পরিবার।যেখানে অন্যের কল্যানের কথা আসবে সেখানে আমি কোনদিন না তোমার বাবাকে বাঁধা দিয়েছি আর না তোমাকে দিবো।”
তারাজ মায়ের কথায় হেঁসে মা'কে জড়িয়ে ধরলো। মায়ের কাঁধে মাথা রেখে আমোদিত কন্ঠে বললো,
“ জানো আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে?"
“ বলো!"
“ তুমি!
_ তোমার মতো মা আছে বলেই আমি আজ এতদূর অবধি পৌঁছাতে পেরেছি,নয়তো কখনোই সম্ভব হতো না।"
“ তুমি এতদূর এসেছো কারণ আল্লাহ চেয়েছেন তাই।তিনি তোমার একাগ্রতা,অধ্যাবসায় আর সৎ মনোবাসনায় খুশি হয়েই তোমার পরিশ্রমের ফল স্বরুপ এই বিজয় দিয়েছে তবে তাই বলে এটাকে নিজের সফলতা ভেবে নিও না। মনে রাখবে সফল তুমি তখন‌ই হবে যখন তোমার অনুপস্থিতিতেও লোকে তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকবে,যখন তোমার কর্ম দ্বারা কেউ উপকৃত হবে এবং তার মুখ দিয়ে তোমার জন্য দোয়া নির্গত হবে।সফলতার এখনও অনেক বাকী বাবা!"
“ ইনশাআল্লাহ তোমার দোয়ায় তাও হবে আম্মা!"
“ আল্লাহ তোমাকে অনেক অনেক বড় করুক,যত বড় হলে মানুষের জন্য সবটা দিয়ে দেওয়া যায়।"
“ আমীন!"
“আচ্ছা বলো কি বলতে চাইছিলে?"
“ তোমাকে যা বলবো...!"
“ কি হয়েছে আম্মা? কি এমন কথা যা বলতে এত ভাবছো?"
“ তুমি একটু বসো। তারপর আমি বলছি মন দিয়ে শুনবে!"
“ বারান্দায় চলো!"
মা ছেলে বারান্দার অরন্যের মাঝে পেতে রাখা আসনে গিয়ে বসলো।বাহিরের কড়া রোদেও এক অকৃত্রিম শীতলতা ছেয়ে আছে পুরো বারান্দা জুড়ে।গাছের সুফলতা এটাই। অতিরিক্ত তাপ শোষণ করে আপনাকে দিবে স্নিগ্ধ শীতল পরম শান্তির আবহাওয়া।তারাজের চোখে মুখে দুশ্চিন্তা, আম্মা আমতা আমতা করছে। তারাজ মায়ের দিকে নরম হয়ে বললো,
“ আম্মা চিন্তার কোন কিছু?"
“ না ।আসলে তুমি কেমন ভাবে নিবে তাই.. 
“ বলো আম্মা। তোমার কথা কিভাবে নিবো মানে, সেটাই কেন ভাবছো?"
“ আমি না মায়াকে তাজিশের জন্য রাখতে চাচ্ছি!"
তারাজ বুঝলো না আম্মার কথার মানে। প্রশ্ন করলো,
“ মানে?"
“ মানে আমি চাইছি তাজিশের ব‌উ করে মায়াকে রাখতে।মেয়েটাকে আমার বেশ লাগে।"
কিছু মুহূর্ত তারাজ চুপ করে র‌ইলো। আম্মা তারাজের উত্তরের আশায় তাকিয়ে রয়েছে।মায়াকে যে তাজিয়া খাঁ'য়ের ভালো লাগে তা নতুন নয়।তবে এত বেশি‌ই ভালো লাগে যে বড় ছেলের ব‌উ করতে না পারলেও ছোট ছেলের জন্য করতে চাইছে। চাওয়াটা খারাপ নয়।তবে বিষয়টি কোনদিকে যাচ্ছে তাই বোঝার চেষ্টা করছে।তারাজ ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না।এত বড় পদে স্থাধ দখল করেছে নিশ্চয়ই তার মাঝে কিছুটা হলেও অপ্রতিভ জ্ঞান,প্রখর বুদ্ধি আছে। এত বড় দেশের এত বড়  অবস্থানে আছে তার মানে অবশ্যই সে যোগ্য। অবশ্যই তার মাঝে সেই গুণাবলী বিদ্ধমান।
মায়া যে আড়ালে আবডালে তারাজকে চোখে চোখ রাখে তা তারাজ বেশ অনুভব করছে শুধু তাই নয় তারাজ যখন আফনূরের সাথে, আশেপাশে থাকে তখনও মায়ার চোখ কেবল ওদের দিকেই নির্দিষ্ট থাকে। মায়ার পর্দার আড়ালে ঢেকে থাকা ঐ অক্ষু জোড়ায় তারাজের প্রতি কি অনুভূতি ভাসে তা তারাজের কাছে ধরা পড়েছে সেদিন রাতেই যখন তারাজ আফনূরের সাথে ছাদে বসে চন্দ্রবিলাস করছিলো আর নিজেদের আগামীর পরিকল্পনা করছিলো। চিলেকোঠার বাঁশের তৈরি জানালার ফাঁক গলিয়ে ছলছল অক্ষু জোড়া যখন অপলক চোখে তারাজকে দেখছিলো ঠিক ঐ মুহুর্তে হাতের কাপটা রাখতেই তারাজ পিছু ফিরে তাকিয়েছিল। অজানা কারণেই চিলেকোঠার জানালার দিকে চোখ চলে যায়। অকল্পিত ভাবেই থমকে যায় তারাজের নয়ন। ছলছল দৃষ্টি আর কোন মতে মুখ ডাকার চেষ্টা করে নিজেকে আড়ালে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো ঐ রমনীকে চিনতে কষ্ট হয় না তারাজের।
“ কি ভাবছো এত! একটা উত্তর দিতে এত সময় লাগে?"
আম্মার ডাকে সচকিত হয়ে উঠল তারাজ। কোনমতে সামলে বললো,
“ সেটা আমাকে না বলে ছোটকে বলো আম্মা। বিষয়টি ওর জানা দরকার!"
“ সে তো জানাবে তুমি! তোমার ছোট ভাইকে কিভাবে বলবে সে দায়িত্ব তোমার! কিন্তু আম আমি বলছি এতে কি তোমার কোন সমস্যা আছে?"
“ আমার কি সমস্যা থাকবে? তুমি তোমার সখির জি'কে নিজের বাড়ির পুত্র বধূ বানাতে চাচ্ছো সেটা
তো তোমার ছোট্ট বেলার ইচ্ছা। আমার জন্য একবার তা ভেস্তে গেলেও এখন আবার চাচ্ছো ছোট ছেলের জন্য আনতে। ভালো কথা সেটা।কিন্তু আমার কথা হচ্ছে যার সাথে বাঁধার পরিকল্পনা করছো আগে তার মতামত নাও।তার‌ও পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার আছে!"
তারাজের কথায় যুক্তি আছে কিন্তু শেষের লাইনটা আম্মার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিলো।তাজিশ‌ও কি তাকে হতাশ করবে? তারাজের মতোই তাকে বলবে নিজের পছন্দের কথা! বললে সে নিশ্চয়ই জোর করবে না কিন্তু! যাই হোক উনার কাছে ছেলে মেয়েদের খুশি‌ই সবার আগে। সেখানে না হয় উনি নিজের এই ইচ্ছাটাকে আজীবনের জন্য দাফষ দিবেন।
“ আচ্ছা তুমি চিন্তা নিও না।আমি ওর সাথে আগে কথা বলি তারপর তুমি খালামনির কাছে কথা পাড়ো।
এখন আমাকে বের হতে হবে আম্মা।দেরি হয়ে যাবে নয়তো!"
“ হ্যা যাও, সাবধানে থেকো।"
“ নুরজান!"
তারাজ চিৎকার করে হাঁক ছাড়ল। নিজের ম্যানিব্যাগটা পকেটে ঢুকিয়ে আম্মার দিকে চেয়ে বললো,
“ বেশি চিন্তা নিও না।আমি দেখছি বিষয়টি।"
কথা শেষ করেই আফনূরের আগমন ঘটলো দৃশ্যে,সে তড়িঘড়ি করে শুধালো,
“ আপনি রেডি হয়ে গেছেন?"
“ কোথায় ছিলে তুমি! বের হবো তো!"
“ এই তো একটু আপার কাছে ছিলাম।বাবুর জন্য ড্রেস সিলেক্ট করছিলাম!"
“ ওর আবার কি হয়েছে?"
“ স্কুলে প্রোগ্রাম আছে। তার জন্য ড্রেস সিলেক্ট করতেই পারছে না।আপা যেটাই দেয় সেটাই তার অপছন্দ হয়। অবশেষে আমার পছন্দেরটাই নিলো।”
“ এখন‌ই এত নখরামি শিখে গেছে।দয়া করে তুমি আর আহ্লাদ করে মাথায় চড়িয়ে রেখো না।পরে আর নামাতে পারবে না।"
“ ওমা ও ছোট মানুষ।নখরামির কি বুঝে! বাচ্চারা একটু আধটু জেদ করবে না তো কি বুড়োরা করবে?"
“ বাচ্চা বলেই বলছি, বাচ্চা বয়সেই যার এত মর্জি,এত জেদ সে বুড়ো হলে কি করবে?পরে তো আমার বোনটাকে জ্বালাবে;বাপ তো একটা মেনি বিড়াল!"
“ ওর দোষ কোথায়! ছোট থেকে যাদের দেখে বড় হচ্ছে তারা কি ভালো?তারাও তো মর্জির ভুত মাথায় চেপে রাখে। একেকজন জেদের গোডাউন।তো ও যা শিখবে তাই করবে।এটাই তো স্বাভাবিক।আর দুলাভাই বেচারা নিরীহ মানুষ তাকে নিয়ে এমন কথা কেন বলেন! আপনার বোন জামাই ভূলে যান!"
“ বাহ্ বেশ তরফদারি করা হচ্ছে তো।আবার দুলাভাইয়ের পক্ষেও লড়াই করা হচ্ছে!"
এমন কিছু না।"
ভ্রু উঁচিয়ে করা তারাজের প্রশ্নে আফনূর কেমন মিইয়ে গেল।তারাজ যে ভয়াবহ হিংসুক তাকে নিয়ে সেটা সে ভালো করেই অবগত।এখন এই যে তার বিরুদ্ধে গিয়ে দুলাভাইয়ের পক্ষে কথা বলছে তার প্রতিশোধ ঠিক নিবে রাতে বেলা। ঠিক তাই বললো তারাজ যেই আফনূর পাচ্ছিলো এত সময়ে,
“ এই বেয়াদবির শাস্তি তুমি রাতে পাবে,ওয়েট ফর দ্যাট টিল নাইট...!

পর্ব ৪৭

“তুলির সাথে আর যোগাযোগ হয়েছিল?"
“ না!"
“ এখনও খুব মিস করিস!"
“ তেমন কিছু হ‌ওয়ার মতো গাঢ় সম্পর্ক ছিলো না আমাদের!"
তাজিশের কথায় কিছু ছিলো।তারাজের খারাপ লাগলো।মুখ ঘুরিয়ে ছোট ভাইয়ের পানে তাকালো।কফির মগে ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখা তাজিশকে দেখে অগোচরে একটি ছোট শ্বাস ছাড়লো।প্রথম অনুভূতিগুলো খুব প্রখর হয়। প্রথম ভালোলাগা,প্রথম ভালোবাসা। মানুষ শেষ নিঃশ্বাস অবধি ভুলতে পারে না।যত‌ই মুখে বলুক ব্যাপার না,আসলে এটাই প্রকৃত ব্যাপার।চাইলেও ভুলা যায় না।হয়তো জীবনের তাগিদে, পরিস্থিতির তাড়নায় একসময় সবটা সয়ে যায়,গোপনে কোথাও দীর্ঘশ্বাসের চাপায় রয়ে যায় তবুও তো রেশ লেগেই থাকে!
নিজের ছোট ভাইটার জীবনের প্রথম অনুভূতির গভীরতা তারাজ আন্দাজ করতে পারে।তার চোখে মুখে স্পষ্ট ভেসে উঠতো সেই অভিলাষ।অক্ষুপল্লবে
জ্বলজ্বল করা ঐ ভালো লাগার নিগূঢ়তম আকাঙ্ক্ষা কখনো লুকানো যায় না। পৃথিবীর কোন প্রেমিক‌ই নিজের প্রেম জোছনা লুকিয়ে রাখতে পারেনি।সত্যিকারের প্রেমিক প্রেমিকার উপস্থিতিতে যত টা না তার প্রেমে পড়ে তার চেয়েও কয়েক সহস্রাধিক অধিক সেই  ভাগ্যবতীর আড়ালে পড়ে। 
প্রকৃত প্রেমিক প্রেম জাহিরের চেয়ে নিরবে নিভৃতে তা অনুভব করায় বিশ্বাসী।তাজিশ‌ও কি ধাতের! হ্যা তাজিশ সেই ধাতের'ই শুধু পার্থক্য সে বাকী প্রেমিকদের মতো নিজেকে নোংরা ধুলো ময়লায় লেপন দিয়ে নিজের ব্যক্তিত্বের সাথে লড়াই করতে ব্যর্থ! আসলেই ব্যর্থ! না। তারাজের মন মস্তিষ্কের এই কথার সাথে সম্মত হতে পারলো না।সে স্পষ্টত প্রতিবাদী হয়ে বললো, ‘ নোংরা ধুলোয় জড়ানো অনুভূতিরাও স্বচ্ছতায় আসতে পারে কিন্তু পচে দূর্গন্ধ ছড়ানো অনুভূতি কখনোই আর স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে না।আর না সেই অনুভূতির পিছনে ছোটা উচিত,এতে সময়ের অপচয় বৈ আর কোন দ্বিতীয় অর্থ দাঁড়ায় না।
সুতরাং তাকে ছেড়ে নতুনত্বের স্বাধ খোঁজা উচিত। নেওয়া উচিত পূনরায় নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলার প্রয়াস।
তারাজ হাতের মগটা শক্ত করে চেপে ধরে বাম দিকে মুখ ফিরিয়ে একটা শুকনো  কাশি দিলো।তাজিশ ততক্ষণে কফির মগের শেষ চুমুকটা দিলো। তারাজ 
স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ালো, চুমুকে চুমুকে শেষ করলো কফি। অনেক সময় দুই ভাই ওভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলো।
খোলা ছাদের চারপাশ রাতের নিস্তব্ধতায় ঘিরে আছে। মাঝে মাঝে কেবল দূর থেকে টুং টাং রিক্সার বেল,কখনো কখনো বড় কোন গাড়ীর শব্দ কানে এসে লাগছে।এত এত শব্দের মাঝেও সবচেয়ে মধুর শোনাচ্ছে ছাদ বাগানের গাছের বিভিন্ন পাতার সাথে পাতার ঝগড়ার শব্দ যার স্রষ্টা স্বয়ং বাতায়ন‌।এক থালা আকাশ জুড়ে টিমটিমে প্রদীপের মতোই জ্বলজ্বল করছে দূর গগনের বুক বিস্তির্ণ তারকা রাজী।
সারাদিনের ক্লান্তির অবসান ঘটিয়ে রাতের এখন মধ্য প্রহর।তারাজ কর্ম ব্যস্ত তাজিশকে ল্যাপটপের সামনে থেকে তুলে এনে ছাদে বসে কফি পানের প্রস্তাব দিলো।বড় ভাইয়ের এত রাতে কফি পান করার প্রস্তাব মানেই গুরুত্বপূর্ণ কোন আলোচনা তা তাজিশ খুব ভালো করেই জানে।তাই দ্বিতীয় কোন শব্দ উচ্চারণ করে অযথা শব্দ অপচয়ের দায়ে দুষিত হতে চায় না বলেই নিরবে ভাইয়ের কদমে কদম মিলিয়ে ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ালো। পাশে দাঁড়ানো বড় ভাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ কথা শোনার জন্য তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করে জানতে চাইলো, “বিশেষ কোন ইস্যু?"
তারাজ কথা শুরু করার জন্য‌ই উক্ত প্রশ্নগুলো করেছিলো যার উত্তর তাজিশ দিয়েই দিলো কিন্তু আসল কথা যে এটা নয় তাও সেই ভালো করেই বুঝতে পারছে তাই কফির মগ রেলিংয়ের ওপর রেখে শান্ত কন্ঠে আবারও জিজ্ঞেস করলো,
“ এনিথিং সিরিয়াস ভাই?"
তারাজ একই জায়গায় মগ রেখে তাজিশের দিকে তাকালো, এরপর আস্তে করে বললো,
“ সামনে আগাবী? নিজেকে একটা সুযোগ দে!”
“ মানে কি বলছো,আমি কিছুই বুঝতে পারছি না ভাই? হঠাৎ এমন কথা কেন?"
“ আমি বলতে চাচ্ছি তুই সামনে এগিয়ে যাবি‌। আম্মা আব্বা তোর বিয়ে নিয়ে ভাবছে।তারা চায় তুইও বিয়ে করে সংসারি হ। অবশ্য সত্যি বলতে আমিও চাই!"
“ মানে কি সব বলছো? এটা কি করে সম্ভব হয়!
“ কেন সম্ভব নয়।তুই নিজেইতো বললি তোদের সম্পর্ক তেমন গাঢ়ো ছিলো না তবে কিসের এত পিছু টান?"
“ কোন পিছুটান নয় ভাই।আমি এখন‌ই বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়!"
“ যুক্তি-সংগত কারণ দর্শা!"
“ কারণ বলতে গেলে একটাই বলবো আমি এখনো বিয়ের জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত ন‌ই!"
“ এটা তেমন কি? মেয়ে দেখলে হয়ে যাবি!"
“ আমার এখনো বিয়ের বয়স হয়নি তবে কেন!"
“ তোর বয়সে অনেকেই বিয়ে করে বাচ্চার বাপ হয়ে বসে আছে, তোর নিজের বন্ধুরাও! সুতরাং এটা একদমই লেইম একটা যুক্তি!"
“ নিজে তো একত্রিশ বছর বয়সে বিয়ে করেছো তবে আমার সাথে কেন এমন করছো? মাত্র সাতাশ!"
“ আমার জন্য ঠিকঠাক মেয়ে খুঁজতে একত্রিশ পেরিয়ে গেছে তোর জন্য লাগেনি।আর এক মিনিট তুই কি বাই এনি চান্স আমাকে বয়স নিয়ে খোঁটা দিলি!"
“ মোটেই আমি তোমাকে কোন খোটা ফোঁটা দেইনি।ওটা শুধু কথার কথা বলছি।যাই হোক কি বললে তুমি, মেয়ে খুঁজতে সময় লাগেনি! তার মানে মেয়ে তোমরা এর মধ্যে‌ই দেখে ফেলেছো!"
তারাজ আবারও গলা খাঁকারি দিলো। কন্ঠনালী পরিষ্কার করে তাজিশের দিকে গম্ভীর মুখে তাকালো তারাজ।তাজিশের মনে হলো এই মুহূর্তে তার ভাইয়ের মাঝে তিনটা রুপ দেখলো।
“ আম্মা তোর জন্য মায়াকে পছন্দ করছে!"
“ হুয়াট!"
চিৎকার করে উঠলো তাজিশ।তারাজ এই প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলো।
তাজিশ বললো,
“ মায়া মানে ঐ অদ্ভুত মেয়েটা? মানে কিভাবে ভাই?"
“ অদ্ভুত মানে?"
“ অদ্ভুতই তো। দেখলেই কেমন দৌড় দেয়,
যেন ওকে আমি চিবিয়ে খেয়ে ফেলবো।"
“ এমন কিছু না।মেয়েটা খাস পর্দা করে তাই পরপুরুষ দেখলে একটু অস্বস্তি বোধ করে এর জন্য স্থান ত্যাগ করে চলে যায় তাতে হয়তো একটু বেশিই তাড়াহুড়ো করে এই যা আর কি!"
“ সে যাই হোক,আমার ওকে অদ্ভুত‌ই লাগে। পর্দা করা নারী তো আর কম দেখলাম না এই জীবনে।"
“ এটা বাদ দে, আসল কথা বল।তোর সিদ্ধান্ত কি?"
“ এটা কি করে সম্ভব ভাই। আম্মা এটা ভাবে কিভাবে?"
“কেন? সমস্যা কোথায়?"
“ মায়াকে আম্মা ছোট থেকে তোমার জন্য পছন্দ করে রেখেছিলো,এটা সবাই জানতো।তার মানে অবশ্যই মায়াও জানতো। যদিও ঘটনাচক্রে তোমাদের জুটি বাঁধেনি তাই বলে তো এই বিষয়টা ভুলে যাওয়ার মতো নয়।যাকে আমার বড় ভাইয়ের জন্য... আমার পক্ষে সম্ভব নয়!"
“ বিয়ে ঠিক হয়েছিল কে বললো তোকে? এত বছর ধরে এইটাই জানলি? আম্মা কথা দিয়েছিলো, অফিসিয়ালি কথা হয়নি।আর না আমার কোন মত ছিলো! সবটাই ভালো করে জানা তোর।তবে কিসের 
জন্য এই অহেতুক বাহনা দেখাচ্ছিস!"
“ ভাই প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড!"
“ ওখে আমি এখন‌ই মতামত জানাতে বলছি না,আগে একটু ভাব।ভালো করে ভাব।এটাতে আম্মার ইমোশন জড়িয়ে আছে।হ্যা আমি পারিনি দাম দিতে,যদি তোর আমার মতোই কোন যুক্তিগত কারণ থাকতো তবে আমি নিজেই আম্মাকে না বলে দিতাম। কিন্তু আমি কোন শক্ত কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।ভাই দেখ মায়া মেয়ে হিসেবে যথেষ্ট ভালো,তোর মনের মতো।ঠিক যেভাবে তুই চাস তেমনি।তাই বলছি তাড়াহুড়ো করে কোন সিদ্ধান্ত নিস না।"
তাজিশ চুপ থাকলো বেশ খানিকটা মুহূর্ত।
এরপর বললো,
“ আমি ভাববো। এরপর জানাবো।"
“ গুড।"
তাজিশের উত্তর এমন হবে তা তারাজের জানাই ছিলো।সত্যি বলতে এই বিষয়ে তারাজের নিজের‌ই কোন ইতিবাচক মনোভাব ছিলো না। তবুও শুধু আম্মার জন্য তাজিশকে বুঝালো। এরপর সিদ্ধান্ত অবশ্যই তাজিশের নিজের।এতে করে আম্মাও তারাজকে কোনভাবে আর দোষারোপ করতে পারবে না।
চাপানো দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেললো। ঘুমন্ত আফনূর বিছানায় এলোমেলো ভাবে শুয়ে আছে।টি শার্টের নিম্নাংশ উপরে উঠে গিয়ে হালকা মেদ যুক্ত পেটটা দৃশ্যমান।প্লাজোর অবস্থান আপাতত হাঁটুর‌ও অনেক উপরে। চুলগুলো এলোমেলো ভাবে বিছানায় ছড়ানো। হাঁটুর নিচ অব্দি লম্বা ঘন কুচকুচে কালো চুলগুলো তারাজের ঘুমের ওষুধ।এই চুলের ঘ্রাণ নাকে না আসলে ঘুম‌ই হয় না।তাই আফনূরকে কড়া নির্দেশ দেওয়া কোনমতেই চুলকে ছোট করা যাবে না।আর না চুলে নকল কোন প্রসাধনী ব্যবহার করা যাবে।সোজা কথা চুল যেমন আছে তেমনি থাকবে। যেহেতু আফনূর অফিস থেকে এসে রাতে গোসল করে তাই সবসময় ওর চুল ভেজাই থাকে,যার কারণে ঘুমানোর সময় খুলে রাখে।ঘরের বাইরেও চুল খুলে বের হয় না।তারাজ ছাড়া এ বাড়িতে আফনূরের চুলের মাপ কেবল তানহা আর তাজিয়া খাঁ‌'ই জানে। 
নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে আফনূরের পায়ের সামনে দলা পাকানো কম্বলটা টেনে গায়ে দিয়ে দিলো,নিজেকেও কম্বলের তলে নিয়ে নিলো।হাত বাড়িয়ে আফনূরের পেট চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। কপালে,নাকে, চোখে,গালে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলো।গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আফনূর থেমে থেমে কেঁপে উঠছে তার স্বামীর এমন প্রেমময় ছোঁয়ায়। অবশেষে তারাজের ঠোঁট স্থায়ীত্ব ভাবে দখলে নিলো আফনূরের ঠোঁটে গিয়ে।গভীর আবেশে ছুয়ে থাকা ঠোঁটের আকুলতায় নড়েচড়ে উঠলো আফনূর।স্বামীর তালে তাল মিলিয়ে মিশিয়ে নিলো নিজের মাঝে। ভালোবাসার নিঃশ্বাস ধারা ঘনীভূত হলো রাতের মধ্যভাগের শেষ প্রহরে।
“ দিলশাদ তালুকদার,চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর,লেকচারার, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং তার সবচেয়ে বড় পরিচয় এক্স মন্ত্রী আঙ্গুর মাইজদীর একমাত্র ভাগ্নী জামাতা।"
****
“ খুব দ্রুত! অনেক জালাচ্ছে।আর নেওয়া যাচ্ছে না।”
***
“ বেশি কিছু না।খালি সামাজিক ভাবে ওকে ন্যাংটো করে দিবে।যাতে হাড়ে হাড়ে টের পায় অতিরিক্ত লোভে কি হয়!"
***
“ উহুম মারবে না! ওর কাছে আমি ঋণী।ওর জন্য‌ই আমি জীবনের সবচেয়ে বড় উপহারটা পেয়েছি।ওকে মারবে না শুধু......
“বৈবাহিক জীবনে নিসন্তান আঙ্গুর মাইজদির একমাত্র উত্তরাধিকারী তার ভাগ্নী ন‌ওশাবা খলিল। দত্তক না নিলেও তার সন্তান রুপি এই ভাগ্নী তার সবকিছুর একমাত্র অংশিদার।
বছর তের কি চৌদ্দ আগে এক নির্বাচনী জনসভায় আঙ্গুর মাইজদির সাথে পরিচয় হয় দিলশাদ তালুকদারের পিতা খুলশিদ তালুকদারের সাথে। সাতাশের দিলশাদ তালুকদার ছিলো অসম্ভব সুদর্শন আর আকর্ষণীয়।যেকোন রমনীর চোখেই এঁটে যেতো।ঘুম কেড়ে নেওয়ার দায়ে যদি তাকে হাজতবাস করানো হতো তাতেও কাউকে দোষের ভাগীদার করা যেতো না
তেমনি মামার অতি আদরের দুষ্টু ভাগ্নির দৃষ্টিতে আঁটকে যায় সেই পুরুষ। নিজের পর্যায়ে না পড়লেও পারিবারিক অবস্থান বেশ সম্মানিত আর ছেলের ভবিষ্যত উজ্জ্বল ভেবেই ভাগ্নির জন্য প্রস্তাব রাখে আঙ্গুর মাইজদি। কিন্তু..”
“ কিন্তু?"
“ বাঁধ সাধলো আঙ্গুর মাইজদির তৎকালীন এক প্রতিপক্ষ!"
“ মানে?"
“ করিম আকন্দ; এক সময়ের মাঠ কাঁপানো এক রাজনৈতিক দলের মাঠ কর্মী। দৃষ্টি ভ্রমে তাকে মাঠ কর্মী মনে হলেও সে ছিলো ঐ দলের অনেক রাঘববোয়ালের সোনার ডিম পাড়া হাস। অর্থ, বুদ্ধি,ক্ষমতা জৌলুস সব,সবটা উজাড় করে দিয়েই সে সেই দলকে ভালোবাসতো।এমনকি নিজের সংসার,স্ত্রী, পরিবারকে বাজীতে তুলে রাখতো।কিন্তু, দিনশেষে একটাই কথা সত্য এবং তা হচ্ছে এটা হলো ‘রাজনীতি যার নেই কোন নীতি!’
“ কিন্তু দিলশাদ প্রসঙ্গের সাথে করিম আকন্দের সম্পর্ক কি ছিলো?"
“ করিম আকন্দের বাল্য বন্ধু খুলশিদ তালুকদার।পেশায় ব্যাবসায়ী করিম আকন্দ, পৈতৃক সূত্রে অঢেল সম্পত্তির মালিক। ব্রিটিশ সরকারের আমল থেকে রাজনীতির সাথে পারিবারিক ভাবে জড়িত। তাছাড়াও তৎকালীন ব্রিটিশ প্রসাশনের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল ছিলো তার দাদাজান।বাপের ক্ষমতায় করিম আকন্দের বাবাও বেশ ভালো দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয় । অল্প বয়সে বিয়ে করে ভদ্রলোক পাকিস্তানী প্রসাশনে যোগ দেয়।পরিবার সহ স্ত্রী রয়ে যায় বঙ্গে।দাদা, বাবার ক্ষমতার জোরে ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান,উভয় সরকারের অধীনেই বেশ অর্থ কামাই করে তার সাথে দখল করে অনেক জমি। জমিদার বললেও ভুল হবে না।তবে পারিবারিক প্রথাকে ভেঙে সম্পূর্ণ আলাদা পথে হাঁটতে লাগলো করিম আকন্দ ও তার বড় ভাই রাজীব আকন্দ।
করিম আকন্দ পেশায় বাবা,দাদার থেকে আলাদা হলেও রক্তে প্রবাহিত রাজনৈতিক পোকা ঠিক‌ই বয়ে বেড়াতে থাকলেন, এদিকে অগাধ সম্পত্তির ভার সহ্য হলো না রাজীব আকন্দের।নারী থেকে কোকেন পব নেশাই তার ছিলো।যার দরুন অল্প বয়সেই নিজের অংশ খুইয়ে ছোট ভাইয়ের উপর নির্ভরশীল হলো।তার ধারায় আরেকজন ছিলো!”
“ সে কে আবার?"
“ রাইয়াজ আকন্দ,রাজীব আকন্দের একমাত্র সন্তান।"
“ ওহ,সে ও কি বাপের মতোই ছিলো!"
“ পারফেক্ট উত্তরাধিকারী হিসেবে সে ছিলো প্রকৃত উদাহরণ।সে যাই হোক,করিম আকন্দ একদিকে সফল ব্যাবসায়ী অন্যদিকে অনেক সফল রাজনৈতিক নেতার বিশেষ পরামর্শ দাতা। কিন্তু ঝামেলা হলো তখন থেকেই যখন তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলো।ঐ সময়ে বড় ভাই রাজীব ও তার পুত্র রাইয়াজের জন্য তিনি ফেঁসে গেলেন।পুরো দেড় বছর হাজতবাসের মধ্যে উপলব্ধি করলেন তার দল থেকে কোনরকম সহায়তা তিনি পেলেন না অর্থাৎ তারা এতদিন তাকে অর্থের জন্য ব্যবহার করছিলো।হাজত থেকে বের হলেন,দলের সিনিয়রদের সাথে আলোচনা করে নমিনেশন পেতে চাইলেন। ঠিক তখনই,তখন‌ই ফ্ল্যাশ হলো রাজনীতির পর্দা!"
যেহেতু তখন সব দল নির্ভেজাল, ঝামেলামুক্ত একদম ফ্রেশ নেতাদের নিজের দলে ভেড়াচ্ছেন, সুতরাং নারী কেলেঙ্কারির,মাদকের দায়ে অভিযুক্ত কাউকে তারা দলে রাখতে চাইলেন না।তারা স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিলেন এই কথা।
করিম আকন্দের মন ভাঙলো কিন্তু হার মানলেন না। তিনি জেদ ধরে স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচনে লড়তে মাঠে নেমে গেলেন। কাহিনী মোড় ঘুরলো এখান থেকেই।”
“ জিততে পারেনি?"
“ জিতবে তো তখন যখন শেষ অবধি টিকতে পারবে!"
“ মানে?"
“ নির্বাচনে জিততে নিজের ভাই,ভাই পো কে দূরে রাখলো। যেহেতু তাদের কারণেই তার জীবনে একটা দাগ লেগেছিল তাই।সেই সময়ে শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে এসে পাশে দাঁড়ালো...
“ খুলশিদ তালুকদার?"
“ হ্যা।তার সাথে ছিলো দিলশাদ তালুকদার।আগেই বলেছি ঐ লোকের অসম্ভব ভয়াবহ যোগ্যতা ছিলো মানুষের আকর্ষণ কাড়ার। টগবগে যুবক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মেধাবী শিক্ষার্থী দিলশাদ তালুকদার! করিম আকন্দের মতো বিচক্ষণ লোকের মনেও গেঁথে গেলেন তার সাথে গাথলো আরেকজনের মনে!"
কথাটা শেষ করেই তারাজ চুপ হয়ে গেল।মুরাদ কৌতুহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো,
“ কে ছিলো?"
“ করিম আকন্দের একমাত্র কন্যা আফিয়াত নূর!"
মুরাদের কেমন লাগলো‌।এই লাইন বলতে গিয়ে তারাজের থেমে যাওয়ার কারণ কি? নামগুলো এত পরিচিত কেন লাগছে?এমন কিছু কি শুনবে যা শোনা উচিত নয়,অথবা শুনলে কষ্ট লাগবে!
তারাজ নিজেই বলা শুরু করলো,
“ কথায় আছে পঁচা শামুকে পা কাটা, কিংবা অতি বাছবিচারেই খুঁত থাকে! করিম আকন্দের বেলায় তা একদম যথার্থভাবে ফলে যায়। রাজনৈতিক সহায়তা এবং পরামর্শ দাতা হিসেবে নির্বাচন করলেন খুলশিদ তালুকদারকে এবং নিজের ডান হাত এবং ভবিষ্যত হিসেবেও পছন্দের চূড়ায় উঠালেন দিলশাদ তালুকদারকে।তার সাথে অর্পণ করলেন নিজের কন্যার দায়িত্ব।"
“ কি বলিস?"
“ হ্যা; তবে সব ঠিকঠাক‌ই চলছিলো বছর খানেক কিন্তু ঝামেলা হলো তখন যখন মাঠ গরম হলো নির্বাচনের জন্য। চারদিকে হ‌ইহল্লা শুরু হলো।করিম আকন্দ মনোনয়ন পেলেন সাথে পেলেন সাধারণ জনতার সমর্থন।তার সাথে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন সহ তার নিজ দলের অনেক নেতা-কর্মীরা।নানা ভাবে হুমকি ধামকি দিয়ে তাকে নিষেধ করা হলো নির্বাচনে না নামতে। উনাকে বারবার সাবধান করে বললেন পিছু হটতে।
কিন্তু একরোখা, জেদি, প্রখর আত্নসম্মানবোধ সম্পন্ন করিম আকন্দ শুনলেন না।তার কাছে আত্নসম্মান আগে কোন কিছু না। সর্বোপরি তিনি ছিলেন জনতার কল্যানের কাঙাল ছিলেন।মাথায় মনে গেঁথে নিয়ে ছিলেন সাধারণ মানুষের সেবা করতে হলে অবশ্যই তাকে আগে ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।তাই পিছু হটলেন না।এটাই তার জন্য কাল হলো।"
“ কৌতুহল জাগিয়ে থামবি না!"
“ স্বাভাবিক ভাবেই রাজনীতির নোংরা চাল শুরু হয়ে যায়। বিরোধীদলীয় সহ আশেপাশের সব শত্রু মহল মাথা চাড়া দিয়ে উঠে,করিম আকন্দের দূর্বলতা তল্লাশি চালিয়ে খুঁজে বের করে।তার সাথে হাত করে করিম আকন্দের আশেপাশে সার্বক্ষণিক লেগে থাকা কিছু লোভী স্বার্থপরদের।"
“ দিলশাদ!"
“ উহুম! খুলশিদ তালুকদার!"
“ ঐ এক‌ই ,বাপ বেটাই তো!"
“ মোটেই না।বছর পাঁচেক আগ অবধিও দিলশাদ জানতো না এই নিষ্ঠুর সত্যটা। ও বেচারা তো বাপকে বিশ্বাস করেই ধরা খেয়েছে।"
“ সিরিয়াসলি!"
“ হ্যা। জঘন্য পরিকল্পনা রচায়িত হয় খুলশিদ তালুকদারের নেতৃত্বে। আঙ্গুর মাইজদি ভাগ্নির জন্য প্রস্তাব রাখে।খুলশিদ দোটানায় পরে যায়। একদিকে করিম আকন্দের সাথে এত বছরের বন্ধুত্ব তার পাশাপাশি ছেলে মেয়ের মনের লেনদেন ঘটে গেছে যার জন্য তারা বড়রাও এটাকে গুরুত্ব দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্কের জন্য কথাবার্তা ঠিক করে রাখে।
করিম আকন্দের অগাধ সম্পত্তির অর্ধেক মালিকানা এই কন্যা আফিয়ান নূরের নামে,তার মানে বিয়ের পর সব দিলশাদ তালুকদার‌ই পাবে। ঐদিকে আঙ্গুর মাইজদি,একজন এমপি,যে কিনা এর আগেও একবার এমপি ছিলো।সে আবারও এমপি নির্বাচনে লড়ছে।তার একমাত্র ভাগ্নি।তার টাকার পাহাড়।সব কিছুর উত্তরাধিকারী একমাত্র ঐ ভাগ্নি!কানাডার নাগরিকত্ব পাওয়া।মেয়ে কানাডায়‌ই থাকে।বিয়ের পর দিলশাদকে কানাডা সেটেল করার সব ব্যবস্থা সহজেই করতে পারবে।দিলশাদের জীবন সেটেল মানে তাদের সবার জীবন সেটেল। সবচেয়ে বড় কথা মেয়ে অসম্ভব সুন্দরী। সবকিছু ভাবতেই খুলশিদ তালুকদারের মাথায় লোভ নামক শয়তান চেপে বসলো।আঙ্গুর মাইজদির সাথে হাত মিলিয়ে তৈরি করলেন এক নোংরা নাটকে দৃশ্য যার প্রধান হাতিয়ার আফিয়াত নূর আকন্দ!"
“লোভ! হায়রে সম্পত্তির লোভ মানুষকে আসলেই জানোয়ার বানিয়ে ছাড়ে!
_এরপর?"
“ ঘরের মধ্যে রাইয়াজের মাধ্যমে আঙ্গুর মাইজদির লোক ঢুকিয়ে দেয়।নেশাখোর রাইয়াজ নেশার যোগান যেখান থেকে পেতো তাকেই আঁকড়ে ধরতো।তার‌ই সুযোগ নিলো আঙ্গুর মাইজদির নির্দিষ্ট লোক মানজিত।মানজিতের লক্ষ্য থাকে আফিয়াতকে দিয়ে সামাজিক ভাবে করিম আকন্দের বরবাদি।তাই ঘটালো।ছলকলায় রাইয়াজের মাধ্যমে করিম আকন্দের ঘরে ঢুকলো।তাকে তাকে থেকে আফিয়াতের কাছাকাছি আসা চেষ্টা করতো। কিন্তু পারতো না রাইয়াজের জন্য।রাইয়াজ নেশাখোর হলেও এ দিকে সচেতন ছিলো।বোনকে দূর থেকেই আগলে রাখতো।এখানে বলা উচিত যে রাজীব আকন্দের জন্য রাজীব আকন্দের পরিবারকে প্রচুর অপছন্দ করতেন করিম আকন্দের মিসেস।যার দরুন পাশাপাশি থাকলেও তাদের মধ্যে পারিবারিক কোন ভালো সম্পর্ক ছিলো না কিন্তু করিম আকন্দ ছিলেন বড় ভাইয়ের প্রতি দূর্বল তাই স্ত্রীর অপছন্দ হ‌ওয়া সত্ত্বেও তিনি তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন।আবার দিলশাদের সাথে বিয়ে ঠিক করায়‌ও উনার স্ত্রীর মত ছিলো না। এখানেও ঝামেলা ছিলো।মা চাইতো নিজের ভাইয়ের ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিবে,ঐদিকে মেয়ের মন গেঁথেছে বাবার বন্ধুর ছেলের দিকে,বাবাও নিজ স্বার্থে রাজী হয়ে গেল।এখানে কিন্তু বাবা নিজের স্বার্থে রাজী হয়েছিলো,মেয়ের খুশির জন্য নয়।তা নিয়েও করিম আকন্দ আর তার সহধর্মিণীর মাঝে বিশাল দ্বন্ধ সৃষ্টি হয়।আগের থেকেই দুজনের বনিবনা ছিলো না এই ঘটনার কারণে তা আরো বেড়ে যায়।"
“ বেচারা সংসার জীবনেও হ্যাপি ছিলো না।"
“ হ্যা আফিয়াতর আর আখির দুই ভাই বোন মায়ের যত্ন পেয়েছে তার খালার কাছে যে কিনা তাদের সাথে থাকতো।মায় ছিলো কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের নামকরা একজন অফিসার।ক্যারিয়ার‌ই ছিলো তার ধ্যানজ্ঞান; বাবা রাজনীতি আর ব্যবসা নিয়ে পড়ে থাকতো।যার কারণে অল্পতেই দিলশাদের যত্নশীল মনোভাবের প্রতি দূর্বল হয়ে যায় আফিয়াত নূর, এবং এক পর্যায়ে নিজের চেয়ে এগারো বছর বড় এক পুরুষের সাথে প্রণয়ে জড়িয়ে পরে।
_এটা বাদ আসল কথায় আসি,রাইয়াজের কারণেই মানজিত আফিয়াতের সাথে তেমন কিছু করতে পারছিলো না।তাই বাইরে করার সিদ্ধান্ত নিলো। এদিকে খুলশিদ চাপ দিচ্ছিল আঙ্গুরের ভাগ্নির সাথে সম্পর্ক গড়তে।কানাডা সেটেল হতে।দিলশাদের মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিলো। পারিবারিক অশান্তি, রাজনৈতিক প্রেসার, নির্বাচনী প্রচারণার কাজের ব্যস্ততা সব মিলিয়ে আফিয়াতের সাথে ঠিকঠাক যোগাযোগ হচ্ছিলো না। তাই নিয়েই দুজনের মাঝে লেগে যেতো। স্বাভাবিক, ষোল সতেরো মেয়ে, বাচ্চা! পরিবারের থেকে সময় পেতো না, যার কাছ থেকে সময় পেতো তাকেই আগলে রাখতে চাইতো সেও যখন সময় দেয় না তার ভেতরে খারাপ লাগা কাজ করা শুরু হয় । তাই নিয়েই তর্ক করতো,অত্যধিক কাজের চাপ,আর পারিবারিক অশান্তির জন্য দিলশাদের মেজাজ সবসময় খিটখিটে হয়ে থাকতো যা সে ঝাড়তো ঐ বাচ্চা মেয়েটার উপর। আফিয়াত রাগে অভিমানে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।সুযোগ নেয় মানজিত। উদাসীন আফিয়াতের প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়ে রাইয়াজের অন্য বন্ধুদের মাধ্যমে রাইয়াজকে রাজী করিয়ে ক্লাবে নিয়ে যায়।এর মধ্যেই দিলশাদ একদিন ভোরে মানজিতের সাথে আফিয়াতকে দেখে ফেলে।এটা ছিলো দূর্ঘটনা, পরিকল্পনায় এটা ছিলো না।দিলশাদ‌ও রাগ করে যোগাযোগ করেনি।সেদিন রাতেই বড় ভাই রাইয়াজের বন্ধুর জন্মদিনে অংশ নিতে তার সাথে ক্লাবে যায়।এটাই ছিলো প্রথম ভূল এবং শত্রুর প্রথম বিজয়!
জুসের সাথে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট মিশিয়ে খাইয়ে আফিয়াতের  সর্বনাশ করলো,সেটা রেকর্ড করে করিম আকন্দের কাছে পাঠিয়ে তাকে থ্রেট দিলো।দিলশাদকে ক্লাবে পাঠিয়ে আফিয়াতের নেশাক্ত অবস্থার দৃশ্য সরাসরি দেখিয়ে ভূলভাল বুঝিয়ে দূরে সরিয়ে রাখলো।দিলশাদ রেগে বাপের সিদ্ধান্ত মেনে কানাডা চলে গেল।
 এদিকে রাইয়াজ বোনের এত বড় সর্বনাশ মানতে না পেরে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেই গুম হয়ে থাকে।করিম আকন্দ তাও থামলো না। মেয়েকে কলেজ থেকে অপহরণ করে চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হলো আপন চাচাতো ভাইয়ের সাথেই করিম আকন্দের মেয়ে ঘর ছেড়েছে। মোটামুটি পাড়াপড়শিরা সবাই জানতো দিলশাদের সাথেই করিম আকন্দের মেয়ের সম্পর্ক আছে। বিষয়টি কি হলো? মেয়ের সম্পর্ক একজনের সাথে, পালিয়েছে অন্যজনের হাত ধরে! তবে কি মেয়েটার চরিত্রে সমস্যা? নাকি এখানে জোরজবরদস্তি রুপক কিছু আছে! এটা ছিলো বাইরের দিক, ভেতরের খবর তো শুধু করিম আকন্দের কাছে  ছিলো।তিনি মেয়ের চিন্তায় সব কাজ বন্ধ করে হন্নি হয়ে খুঁজতে লাগলেন।ভোটের দিন দোড়গোড়ায় এমন মুহূর্তে তার দূর্দশা তাকে কোন কাজেই মন দিতে দিলো না।যত‌ই হোক উনি তো বাবা।
আইনি সহায়তার নামে তামাশা চলছিলো‌। জেদ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, একদিন রক্তাক্ত ওড়না আর আফিয়াতের কিছু নগ্ন ফুটেজ তার কাছে আসলো যা দেখার পর নিজেকে সামলাতে পারেননি। অসুস্থ হয়ে পড়েন। জানিয়ে দেন তিনি নির্বাচন কেন, কোনদিন রাজনীতির কোন পাতায়‌ই তার নাম থাকবে না!
“ ইস্!পরে.."
“ একদিন পর বিবস্ত্র জ্ঞানহীন মেয়েকে পেলেন নিজের বাড়ির বাগানে। মেয়ের অবস্থা দেখে হার্ট অ্যাটাক করেন,বাবা মেয়ে একসাথেই হসপিটালে থাকেন।দিন কাটলো।মাস কাটলো। বছরের মাথায় দিলশাদ ফিরে এলো সাথে এলো তার কানাডিয়ান বধূ মাইজদির ভাগ্নি রিয়ানা। 
অসুস্থ আফিয়াত বিকেল বেলা মাঠে হাঁটতে গিয়ে দিলশাদের বাড়ির সাজসজ্জা দেখে কৌতূহলী হয়ে বাড়িতে ঢুকেই দেখতে পায় দিলশাদের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা এবং তার নববধূর লাজুক মুখশ্রী। চোখের সামনে দিলশাদকে অন্য নারীর সঙ্গে সহ্য করতে না পেরে আফিয়াত ঐখানেই ব্রেইন স্টোক করে এবং পরিশেষে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেড় বছর মানসিক হাসপাতালে থাকে।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মেয়েকে বাঁচাতে এবং ঐ জঘন্য পরিস্থিতি থেকে নিজ পরিবার একমাত্র পুত্রকে রক্ষার জন্য করিম আকন্দ বাধ্য হয়ে পৈতৃক ভিটামাটি ত্যাগ করে। গোপনে গোপনে সহায়সম্বল সব বিক্রি করে,নাম পরিবর্তন করে করিম আকন্দ হয়ে যায় রেজ‌ওয়ান করিম,আফরাত নাহার হয়ে যায় আফরা নূন্নাহার,আফিয়াত নূর আকন্দ হয়ে যায় আফনূর রেজ‌ওয়ান,আখির আকন্দ থেকে আফির আকন্দ।
সাভারে এসে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করে, এখানেই নতুন করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে নিজেদের মতোই ঝংঞ্ঝাটবিহীন জীবনযাপন করে।
পড়াশোনায় তিন বছর পিছিয়ে গিয়েও স্থানীয় কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে মায়ের বিরুদ্ধে গিয়েও আইন নিয়ে পড়াশোনা করে গতবছর আইন পাস করে। আপাতত ব্যারিষ্টার ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারৈর সহধর্মিণী হিসেবে তার সংসার এবং কোর্ট সামলাচ্ছে।"
তারাজের কথা শেষ হতেই মুরাদের হাত থেকে মোবাইল ছুটে পড়ে যায়।মুরাদের চোখেমুখে বিস্ময়।তারাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো, বিতৃষ্ণা নিয়ে বললো,
“ এমন অদ্ভুত রিএ্যাকশন কেন দিচ্ছিস?"
“ এটা ভাবির ইতিহাস ছিলো?"
“ এটা বুঝতে এত সময় লাগে?"
কথাটা বলেই তারাজ নিজের হাতের মুঠোয় থাকা কাঁচের গোলকটা ছুঁড়ে মারলো।মুরাদ দু হাতের তালুতে আটক করে দৃঢ় আত্নবিশ্বাসী কন্ঠে বললো,
“ বুঝে ছিলাম। কিন্তু তারপরও.... 
“সন্দেহ ছিলো তাই জিজ্ঞেস করেছি।এখন বল এসবের জন্যেই এতকিছু করছিস?"
“ উহুম।এর জন্য নয়। কাহিনী আছে!"
সন্ধ্যা সাতটা......
“ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ দিলশাদ তালুকদারের বাসভবন তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ ।
গোপন তথ্য থেকে পরিচালিত এই অভিযানে একাধিক বেআইনি দেশী ও বিদেশী অস্ত্র ও বিপুলসংখ্যক বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একটা টিম।বলা হয়েছে তিনি দীর্ঘদিন দিন ধরে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের মাঝে মাদক সরবরাহ করতেন। এছাড়াও এই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটি হলো তিনি নিজ বিভাগের মেয়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে হ্যারেজ করতো বলেও অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।যদিও তিনি দাবী করছেন সবটাই তার বিরুদ্ধে আনিত মিথ্যা বানোয়াট আর ভিত্তিহীন অভিযোগ। চট্টগ্রাম গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান এস বি বুলবুল বলছেন,
‘ সব আসামী‌ই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে,সত্যটা আসলে বেরিয়ে আসে তদন্তের পর।' তিনি এক্স প্রতিরক্ষামন্ত্রী আঙ্গুর মাইজদির ভাগ্নি জামাত‌ও ছিলেন।"
বসার ঘরে বসে পুরো পরিবারের সাথে চা নাস্তা করতে করতে টিভিতে খবর দেখছিলো আফনূর।আর টিভি'র পর্দায় রঙচঙ মেখে আসা অতীব সুন্দরী রমনীর মুখে এমন কথা শুনে থম মেরে গেল।দিলশাদ! বহুবছর পর সেই নাম! বহুবছর? না এই তো গত দু'দিন আগেও তো দেখা হলো! কোর্ট চত্ত্বরে।তাকে দেখেই ছুটে এসেছিল। কেন এসেছিল? কি এমন দরকার ছিলো তার! 
“ আম্মা আমি একটু ঘর থেকে আসছি!"
“ হ্যা যাও!"
হাতে থাকা পিরিচটা টেবিলের উপর রেখে আফনূর নিজের ঘরে চলে গেল।
ঘরে এসে মুঠোফোনে সার্চ দিয়ে দিলশাদ তালুকদার নামের আইডি ঘেঁটে বের করলো। চট্টগ্রামের বিভিন্ন পেইজ,গ্রুপে একাধিক বার শেয়ার করা হয়েছে এই খবরটি। পড়তে পড়তে আফনূরের চোখে ভাসলো মধ্য বয়সী দিলশাদকে। ফর্সা চামড়া এখন আর ফরসা নাই।কেমন কালচে ভাব চলে এসেছে।আগের মতো চাপ দাড়ি নাই।বড় বড় দাড়িতে চাপা ভাঙ্গা গালটাও ভরাট লাগছে।শরীরটা আগের মতোই পেটা আছে। পার্থক্য? পার্থক্য শুধু চেহারায় বয়সের ছাপ। কিন্তু তা একটু বেশি লাগছে।এতটাও বয়স কোথায়! মাত্র তো আটত্রিশ! 
“ আফি!"
আফনূরকে দেখেই তার সেই ডাক! কি আকুতি ছিলো।কি আকুলতা মিশে ছিলো।যেন বহু প্রতিক্ষিত কিছু পেয়েছে। কিন্তু, কেন?
আফনূর তার কথা শুনেনি। শুনতে চায়নি। যে একদিন আফনূরের কথা শুনেনি তার কথা কেন শুনবে আফনূর! কিসের দায়! যেই লোক আফনূরের জীবনের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তে তাকে ছেড়ে দিয়েছিল তার কথা কেন শুনবে আফনূর। শুনবে না কিছু!
আফনূর সেদিন দিলশাদের ডাকে থামেনি, শোনেনি তার কথা। কিন্তু খবর তার কানে ঠিক‌ই এসেছিল।আসা বার্তা ছিলো,‘ রিয়ানার সাথে বনিবনা না হওয়ায় তালাক দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল যার কারণে রিয়ানা তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করে।রিয়ানা জন্মসূত্রে কানাডিয়ান নাগরিক। দৃষ্টিতে আটকায় বঙ্গদেশের যুবক দিলশাদ কিন্তু তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভাবেনি।না ভেবেছিলো দিলশাদ নিজে।বাবার চাপ,আফিয়াতের প্রতি ক্ষুব্ধ হ‌ওয়া, সুন্দরী রিয়ানার তার প্রতি দূর্বলতা সবকিছু মিলিয়ে ঐ মুহুর্তে সে নিজেও ঘোরে ছিলো। রিয়ানার রুপের ঘোরে।এটাই কাল হলো। কানাডিয়ান সংস্কৃতির আদলে বড় হ‌ওয়া রিয়ানার সাথে মাস তিনেকের মধ্যেই অশান্তি শুরু হয়ে গেল।সেই অশান্তির অবসান ঘটলো বছর সাত আগে। ততদিনে তারা দুই সন্তানের জনক জননী। সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে আরও দুই বছর ছাদ আলাদা করেও সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। কিন্তু পাঁচ বছর আগে সেটাও ছিন্ন করে দেয়।তার সাথে মুখোমুখি হয় সেই তেতো সত্যর যা তার বাপ দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল।
সত্য জানার পর থেকেই আফিয়াতের খোঁজ চালায় অবশেষে পেয়েও যায় গতবছরের শেষ দিকে। কিন্তু আফিয়াত অবধি পৌঁছানোর আগেই করিম আকন্দের মুখোমুখি হয় এবং তিনি স্পষ্টভাবে নিষেধ করে দেয় ।দিলশাদের ভয়েই করিম আকন্দ তারাজের সাথে আফনূরের বিয়ের জন্য রাজী হয়‌।এই ঘটনা কানে যাওয়ার পর থেকেই দিলশাদ পাগলাটে স্বভাবের হয়ে উঠে।কোন মতেই যখন আফনূরের সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলো না তখন অন্য পথ অবলম্বন করে।
“ তুই কি ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিস?"
“ হ্যা ভাই! আমি অনেক ভেবে দেখেছি।এটাই ঠিক।সবাই খুশি, আমিও খুশি। তুমি আম্মাকে হ্যা বলে দিও।"
“ কিসের জন্য হ্যা বলবে?"
তারাজের ঘরে বসে দুই ভাই কথা বলছিলো।তখন আফনূর ঘরে ঢুকতে ঢুকতে শেষ লাইনটা শুনেছিলো যার জন্য উক্ত কথাটি জিজ্ঞেস করলো।তারাজ হাসতে হাসতে বললো,
“ ছোট জা'কে ঘরে তোলার জন্য প্রস্তুত হোন মিসেস নুর জান।"
“ সত্যি!"
 চমকিত চোখে তারাজ তাজিশের দিকে চেয়ে প্রশ্নটা করলো আফনূর।তাজিশ লজ্জা পেয়ে বললো,
“ আমি আসছি ভাবী মনি।তোমরা কথা বলো।"
“ আরে ভাইয়া লজ্জা পাচ্ছো কেন?"
“ যেতে দাও বেচারাকে।"
হাসতে হাসতে বললো তারাজ। আফনূর তারাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ ঘটনা কি সত্যি? সত্যি করে বলুন তো!"
তালাজ আফনূরের হাত ধরে টেনে নিয়ে নিজের কোলে বসালো।ডান রানের উপর বসিয়ে আফনূরের কাঁধে নাক ঘসে বললো,
“হুম; আম্মা মায়াকে তাজিশের জন্য ঠিক করতে চাইছে।"
“ কিহ!"
আফনূর চমকে উঠে প্রশ্নটা করলো। প্রস্তত ছিলো না এই কথার জন্য।তারাজ আফনূরের পেট চেপে নিজের সাথে লাগিয়ে ঘোর লাগা কন্ঠে বললো,
“ এত লাফাচ্ছো কেন! ঠিক মতো আদর করতে দাও।"
“ পুরোটা বলুন!"
“ ওহ মিসেস ল‌ইয়ার ; অন্যের চিন্তা রেখে নিজের ক্ষুধার্ত স্বামীর ক্ষুধা মেটান।এটা আপনার জন্য ফরজ কাজ!"
“ আমার স্বামীর এত ক্ষুধা কেন লাগে!"
“ এমন রসালো খাবার চোখের সামনে যদি সারাদিন ঘুরঘুর করে তবে খিদে এমনিতেই পাবে!"
“ চোখ বেঁধে...
“ হিস কোন কথা নয়। চলো, বেডে চলো!"
আফনূর আর কথা বলার সূযোগ পাচ্ছে না। তারাজ কোলে তুলে বিছানায় শোয়ায়। আফনূর বললো,
“ কি করছেন,দরজা খোলা কেউ চলে আসবে তো!"
“ কেউ আসবে না।যদি আসেও তাকে গুলি মেরে উড়িয়ে দিবো! স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আগমনী কাজে বাঁধা দেওয়ার শাস্তিস্বরূপ তাকে শুলে চড়িয়ে মারবো।আইন না থাকলে নতুন করে পাশ করিয়ে নিবো।"
“ না‌ প্লিজ দরজা লাগিয়ে আসুন।"
তারাজ আফনূরের উপর থেকে উঠে টি শার্ট খুলে সোফায় ছুড়ে মারলো। দরজা লাগিয়ে আফনূরের দিকে আগাতেই আফনূর বললো,
“ বলছিলাম কি মন্ত্রী মশাই...
“ কোন বলাবলি নাই।এখন শুধু কাজ হবে কাজ!"
“ শুনেন না..
আফনূরের মুখ বন্ধ করে দিলো নিজের শক্ত ওষ্ঠের ভাঁজে আফনূরের কোমল ওষ্ঠ জোড়া তুলে নিয়ে। বেগতিক হারে চুম্বনে অস্থির করে তুললো আফনূরকে।হাতের আনাগোনা লাগামহীন হয়ে আফনূরের প্রতিটা নরম কোমল অঙ্গ জুড়ে ছুঁয়ে দিতে থাকলো। আফনূর‌ও অতি আবেদনে সাড়া দিতে থাকলো।পিঠ খামচে নিজের সাথে লেপ্টে নেওয়ার জোর চেষ্টা চালাতে থাকলো।
ভালোবাসার মুহূর্ত কেটে যায় দ্রুত। এভাবে একে অপরের সাথে মিশে থাকুক।
গভীর রাতে তারাজের লোমশ বুকে মাথা ঠেকিয়ে শুইয়ে আছে আফনূর। গভীর ঘুমে তখন তারাজ। 
যেদিন রাতে তারাজের সাথে অযথা কথা কাটাকাটি করতে গিয়েছিলো,সেদিন দুপুরে‌ই কোর্টে দিলশাদকে দেখেছিলো।তখন থেকেই ছটফট করছিলো।যেই ছটফটানি কেবল তারাজ‌ই থামাতে পারে।তাই তো তখন থেকেই অপেক্ষায় ছিলো তারাজের সান্নিধ্যের জন্য কিন্তু সেদিন তারাজ অন্যদিনের চেয়েও বেশি রাত করে ঘরে ফিরে।

পর্ব ৪৮

কেরানীগঞ্জ কারাগারে নির্দিষ্ট একটি কামরায় আঁটসাঁট হয়ে নতুন বিছানো মাদুরের উপর বসে আছে।ঘাড়টা নিচে নামানো, স্থির নিথর চাহনি।চার পাঁচজনের এই রুমে মাত্র একা থাকার অনুমতি পেয়েছে। সারারাত ঘুমাতে পারে না মশার জন্য,এখন শান্তি পাচ্ছে না মাছির জন্য। এখনও বাড়ি তার কিছু আনার অনুমতি পায়নি।তাই চেয়েও কেউ কিছু দিতে পারছে না।
সকালে লাইন ধরে যেই খাবার এনেছে তাতো বাড়ির কুকুরকেও খেতে দেয় না।শরীরটা কেমন বিষে ছেয়ে গেছে।ভ্যাপ্সা গরমে শরীর মাংসগুলো‌ও সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছে বোধহয়। টিমটিমে লাল বাত্তির আলোয় আলো আঁধারির খেলা চলছে।ঘাড় টা উঠিয়ে বাম ঘুরে ফ্রেশ কোম্পানির পুরানো একটা বোতল, মুখটা খুলে অনেক কষ্ট করে দুই চুমুক পানি খেল। আশ্চর্য কাল সকাল অবধি ভালো ছিলো।অথচ এখন গলার ব্যথায় পানিও পান করতে পারছে না। 
ক্যাচ করে শব্দ হলো। বোতলের মুখ লাগাতে গিয়েও থেমে গেল দিলশাদ।ব্যথায় টনটন করছে,তবুও ঘাড়টা ঘুরিয়ে ডান পাশ করলো।বুটের আওয়াজ তুলে তিনজন অফিসার ঢুকলো। একজন জেলার, আরেকজনকে চিনে না তার পিছনে যেই জন তিনি প্রধান কারারক্ষী এবং অবশেষে তার পিছনে দুজন লোক।আবছা আলো ছায়ায় তাদের ঠিক মতো চেনা যাচ্ছে না। অফিসাররা এগিয়ে এলো, একজন দিলশাদের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে লাঠির আঘাত করলো পাশের দেওয়ালে, উচ্চ কন্ঠে বললো,
“ উঠে দাঁড়ান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আপনার সাথে কথা বলবে!"
দিলশাদের চোখ বড় হয়ে গেল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! তার মানে আফিয়াতের স্বামী! আফিয়াতের স্বামী তার কাছে কেন? তবে কি আফিয়াত তার বাবার প্রতিশোধ নিতেই স্বামীর ক্ষমতার ব্যবহার করছে! না এটা কিভাবে সম্ভব? নিশ্চয়ই সম্ভব নয়।কারণ প্রতিশোধ নেওয়ার মানেই হলো আফিয়াতকে নিজের অতীতের সেই কালো অধ্যায় উত্থাপন করতে হবে,আর কোন নারী নিশ্চয়ই নিজের এত বড় সর্বনাশ করবে না।কেউ নিজের সম্ভ্রমহানীর ইতিহাস বলে নিজের ঘর ভাঙ্গবে না।আফিয়াত‌ও বলেনি।বলতে পারবেই না।তবে কেন?
দিলশাদের ভাবনার মধ্যে আরেকজন অফিসার দিলাশদের বাম পাশে দাঁড়িয়ে হুংকার দিলো,
“ কি হলো উঠেন না কেন?কথা কানে যায় না? স্যার কি আপনার মতো আজাইরা যে এখানে সারারাত দাঁড়িয়ে থাকবে?"
“ আহ্ থামুন!"
হাত উঁচিয়ে থামতে নির্দেশ দিলো মুরাদ।তারাজ পাশে দাঁড়ানো,দুটো হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে সিনা টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে।মুরাদ তারাজের পাশ থেকে বললো,
“ আপনারা‌ সবাই বাইরে চলুন,স্যার একা কথা বলবে।"
“ কিন্তু স্যার?"
একজন অফিসার দোনামোনা করতে থাকলেন।তারাজ এক ভ্রু উঁচিয়ে চোয়াল শক্ত করে সেই অফিসারের দিকে তাকালো। মুরাদের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেছে।তারাজ কিছু বলার আগে মুরাদ‌ই বললো,
“ আপনার কোন সমস্যা আছে?"
“ ন.ন..ন..না স্যার!"
“ তাহলে!"
“ যা.যাজ..যাচ্ছি স্যার!"
সবাই চলে গেল।মুরাদ তারাজের কাছ ঘেঁষে বললো,
“ আমি যাবো না।একা ছাড়বো না!"
তারাজ চোখ কুঁচকে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো,
“ মেজাজ চটাবি না। বাচ্চাদের মতো জেদ না করে বের হ!”
তারাজের তেতো কথায় মুরাদের মেজাজ থেঁতো হয়ে গেছে।তেতো মুখেই বেরিয়ে গিয়ে ঐ কামরার পরের কামরার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।প্রতিটি কক্ষে একাধিক আসামী‌। একজন আরেকজনের উপরে উঠে শুয়ে আছে।গভীর ঘুমে বিভোর।মুরাদ ভেবে কুল পেলো না এমন পঁচা গরমে এরা কি করে এত শান্তির ঘুম দিচ্ছে।বড্ড মায়া জাগলো পরক্ষনেই মনে পড়লো এরা সবাই আসামী।কারো না কারো ক্ষতি,বিশাল ক্রাইম করেই এখানে এসেছে। এদের তো শাস্তি হ‌ওয়াই উচিত। এদের জন্য সহমর্মিতা দেখানো মানেই হলো এদের সমর্থন করা।
মুরাদ ভদ্রলোক, এটা করবে না।
“ দিলশাদ তালুকদার! এক সময়ের কিশোরী, যুবতীদের ক্রাশ! এক্স মিনিস্টার আঙ্গুর মাইজদির আদরের এক্স ভাগনি জামাতা! চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ।সব‌ই ঠিক আছে শুধু...
চরিত্রে জং ধরেছে। তাই তো আরেকজনের ব‌উয়ের দিকে নজর ফেললেন। আপনাকে আমি বারবার ওয়ার্ন করেছিলাম এদিকে হাত না বাড়াতে! আপনি কি করলেন? নোংরামো!সেই তেরো বছর আগে আপনার বাবা যেই নোংরা খেলা খেলেছিলো আপনি ঠিক তাই করতে যাচ্ছিলেন! হুয়াই?কি ভেবেছিলেন ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার হাওয়াই মিঠাই? মুখে পুড়লেই ভ্যানিশ! যেভাবে করিম আকন্দের সাথে খেলেছিলেন আপনার বাবা আপনিও ঠিক সেভাবেই ইব্রাহীম তারাজ খন্দকারের সাথে খেলবেন,আর সে আঙ্গুল মুখে পুরে চুষতে থাকবে আর আপনার বিজয় দেখে মুখ লুকিয়ে পালাবে!আমাকে কি সরল রেখা ভেবেছিলেন? একবার অন্তত আমার ব্যাকগ্রাউন্ড ঘাঁটা উচিত ছিল।যতটা শুনেছিলাম তাতে আপনাকে বেশ বুদ্ধিমান‌ই লাগতো কিন্তু এখন কি দেখলাম!"
“ আমার বাসায় মাদক আর অস্ত্র আপনি রেখেছিলেন তাই না!"
 মুরাদকে বাইরে পাঠানোর পর ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো বলছিলো তারাজ।ওর কথায় সন্দেহ থাকার কারন নেই।দিলশাদ উক্ত প্রশ্ন করে তারাজের দিকে চেয়ে র‌ইলো।তারাজ কুটিল হাসি দিয়ে বললো,
“ চু চু চু; আপনার জন্য মায়া হচ্ছে কারণ..... হু হা হা হা! বারবার আমাকে মারার প্রয়াস!"
দিলশাদের পিলে চমকে উঠলো।তারাজ কি করে জানলো।ওর থুতনি কাঁপছে। কাঁপা চাহনি ফেলে কঠোর চোখে দাঁড়িয়ে থাকা তারাজকে দেখলো।হুট
করে তারাজ নিচু হয়ে দিলশাদের মুখের কাছে নিয়ে আসলো,নিচু কন্ঠে ভেঙে ভেঙে বললো,
“ তোকে আমি তখন‌ই শেষ করতে পারতাম কিন্তু তাতে আমার নুরজানের সমস্যা হতো, কষ্ট পেতো।তোর সাথে আমার শত্রুতা খোঁজ করতে গেলেই আমার নূরের জীবনের সেই বিভৎস মুহূর্ত আবারও ওর চোখের সামনে ভেসে উঠতো,জনজনে ছড়িয়ে যেতো।লোকে ওকে নিয়ে চর্চা করতো যা আমার পবিত্র নুর নিতে পারতো না।আমি নুরের ভুলেও আমার নুরের চোখে পানি দেখতে পারবো না। সেখানে অন্য কারো জন্য তো.... অসম্ভব!"
“ কি করতে চাও আমার সাথে?"
“ তিলে তিলে মারবো!"
তারাজের কথায় দিলশাদ কিটকিটিয়ে হেসে দিলো‌।সেই হাসিতে কি ছিলো জানা নেই তারাজের তবে দিলশাদের চাহনি সহ্য করতে পারলো না‌। রাগে কিড়মিড় করতে করতেই দিলশাদের গলা চেপে ধরে চাপা চিৎকার করে দাঁত খিচে বিচ্ছিরি কিছু শব্দ উচ্চারণ করে বললো,
“ বাই*দ,খাঁ**র ছাওয়াল,তোর পু*** মধ্যে আস্তো গজারি ঢুকাতে ইচ্ছা করছে,তোর সাহস কি করে হয় আমার স্ত্রীর দিকে হাত বাড়ানোর।তোর এত বড় কলিজা তুই কোর্ট অবধি পৌঁছে গিয়েছিস নুরকে দেখতে! ন*র বাচ্চা তোর চৌদ্দ গুষ্টিকে একসাথে জ্বালিয়ে মারতে আমার, এই তারাজের মাত্র চোখের ইশারা‌ই কাফি!"
তারাজ শরীরের সব ভর ছেড়ে দিয়ে দিলশাদের গলা চেপে ধরছে।৮০ কেজী ওজনের ভারে দিলশাদের জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে।চোখ উল্টে যাওয়ার উপক্রম,মুখ দিয়ে লালা জড়ে থুতনি বেয়ে গলা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে।অথচ তার ঠোঁটের কোনের হাসিটা এখনও বিদ্যমান।যা তারাজকে আরও বেশি উত্তেজিত করে তুললো।তারাজ শক্তি আর বাড়িয়ে হাতের চাপ বৃদ্ধি করলো।দিলশাদ ফ্যাসফ্যাসে গলায় আটকে আটকে ভেঙে ভেঙে বলতে চেষ্টা করছে,
“ও আ.আমার জী.ই.ই.বনে প্র.পথম এসেছে,ওওওর প্রতি আআআমার অঅঅধিকার সবার আগে!আমি জাআআআনি ও ও এখখনো আমমাআকেই ভাআআলোবাসেএ তুমি অযথা...
তারাজের সহ্য সীমা অতিক্রম হয়ে গেছে।ও জানে দিলশাদ অযথাই এগুলো বলছে, আফনূর এখন শুধু তারাজকেই ভালোবাসে। সেটা আফনূর মুখে যত না বলে তার চেয়েও সহস্রগুন বেশি আফনূরের চোখ বলে। কিন্তু তবুও! অতিরিক্ত হিংসুক তারাজ যেন আর মানুষ র‌ইলো না।রাগে ক্ষোভে হাতের চাপ কঠোর করলো,চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল।দিলশাদ তারাজের হাতে খামচে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো! এমনিতেই সারাদিনের ধকল এরপর না খাওয়া, নির্ঘুম দেহ! অস্থির হয়ে ছটফট করতে করতে হাত পা ছোড়াছুড়ি করতে থাকলো।
মুরাদের কানে শব্দ যেতেই দৌড়ে আসলো।সেলের দরজা তুলে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে তারাজকে টেনে সরাতে চেষ্টা করলো, কিন্তু মনে হচ্ছে তারাজের ভেতরে আজ দিলশাদের আজরাঈল প্রবেশ করেছে।সে চিৎকার করে গালি দিচ্ছে আর বলছে, 
“ তোকে আজ জানে মেরে তবেই দম নিবো।শু*র তোর সাহস কি করে হয় আমার নুরের দিকে নজর দেওয়ার!তোর ...
সব অফিসাররাও এতক্ষণ দৌড়ে এসে ভেতরে ঢুকেছে!
সবাই মিলে টেনে হিচড়ে অবশেষে সরাতে সক্ষম হয়।দিলশাদ নিস্তেজ শরীর ছেড় ধপাস করে ফ্লোরে পড়ে যায়।তারাজ হাতা ঝাড়া দিয়ে সবাইকে দূরে সরিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়।ঘেমে একাকার অবস্থা।ডান হাতের কনুই দিয়ে মুখটা মুছে নেয়।ওর চোখমুখে এখনও জলন্ত লাভা ফুটে আছে।মুরাদ বাদে সবাই ভয়ে তটস্থ হয়ে গেছে।মুরাদ তারাজের কাঁধ চাপড়ে শান্ত গলায় বললো,
“রিল্যাক্স হ; যা চাচ্ছিস হয়ে যাবে। অযথা কষ্ট করে নিজের এনার্জি লসের মানে নেই!"
তারাজকে কথাটা বলে জেলারের দিকে চেয়ে বললো,
“ আশাকরি কি করতে হবে তা বলে বোঝাতে হবে না!"
“ নো স্যার,উই আন্ডারস্ট্যান্ড; ইউর উইশ উইল বি ফুলফিলড ,জাস্ট গিভ আস সাম টাইম প্লিজ।"
“ ডু দ্যা ওয়ার্ক ফাস্টলি!"
“ ইয়েস স্যার!"
প্রধান কারারক্ষী এগিয়ে এসে তারাজের দিকে চেয়ে বললো,
“স্যার প্লিজ স্যার আপনি শান্ত হোন, আমরা দেখছি বিষয়টি।আপনি যা চাচ্ছেন তা এখুনি হয়ে যাবে।আপনি দয়া করে এখানে এই গরমে আর কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। আপনি আমার রুমে গিয়ে একটু ফ্যানের নিচে বসুন, প্লিজ। ফুরফুরে বাতাসে মেজাজ‌ও ফুরফুরে হয়ে যাবে।আপনি এখান থেকেই গুড নিউজ সাথে করে নিয়ে যাবেন। ইনশাআল্লাহ!"
“ আমরা বাইরে যাই।ওরাই করুক।"
মুরাদ তারাজের কাছ ঘেঁষে কথাটা বললো।তারাজ মুরাদের দিকে অগ্নি চক্ষু ফেলে তাকালো।তারাজের সব ভঙ্গিমাই মুরাদের আয়ত্ত্ব সুতরাং এটাও বুঝতে সময় লাগলো না।
জেলার, কারারক্ষী, অপর অফিসার সবাই তারাজের দিকে চেয়ে আছে।মুরাদ নিস্পিহ চাহনিতেও তারাজের মনোভাব পরিবর্তন হলো না। অবশেষে তারাজের ইচ্ছে তারাজের সামনেই পূরণ হলো।
সকাল দশটা বেজে একান্ন মিনিট...
 কোর্ট প্রাঙ্গণ পেরিয়ে বাইরের একটি চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা পান করতে করতে নিজের গ্রাহকের সাথে কেইস সংক্রান্ত আলোচনা করছিলো আফনূর।দোকানের টেলিভিশনের পর্দায় সময় সংবাদের শীর্ষ খবর প্রচার করছে যার মাঝে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,
“ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ দিলশাদ তালুকদার গতকাল রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
গত পরশু তাকে মাদক ও নারী নির্যাতন মামলায় গ্রেফতার করা হলে গতকাল আদালত তাকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল যার প্রধান মামলা আছিলো নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহ করা।
ময়নাতদন্তের তথ্য অনুযায়ী রাত দেড়টা থেকে দুটোর মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ এ্যাটাক হয়ে মারা যান।সমস্ত আইনি জটিলতা শেষে আগামী কাল লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানা গেছে।"

পর্ব ৪৯

“ দেখো প্রত্যেক প্রাণীকে তার পাপের শাস্তি পেতে হবে এটাই সত্য!
সে এবং তার পরিবার তোমার সাথে যেই অন্যায় করেছে তার জন্য শাস্তি পাওয়াটাই উচিত, সেখানে!
যাই হোক এই অল্প বয়সে এভাবে অপমানিত হয়ে চলে যাওয়ার জন্য আমার‌ও একটু খারাপ লাগছে তবুও বলবো তুমি নিজেকে সামলাও। জামাইয়ের খারাপ লাগবে যে তার ব‌উ পরপুরুষের জন্য শোক পালন করছে বলে।”
সকাল সকাল আকন্দ পরিবারের আগমন ঘটে খন্দকার বাড়িতে।দিলশাদের মৃত্যু সংবাদ বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।আজ লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী হার্ট অ্যাটাক হয়েই মারা গেছে। হয়তো অত্যধিক মানসিক চাপ নিতে পারেনি।
করিম আকন্দ আর আফরাত নাহারের মনে হলো এই মুহূর্তে মেয়ের পাশে থাকা একান্ত জরুরি কারণ উনারাও বিশ্বাস করেন আফনূরের মনে এখনো কোথাও না কোথাও দিলশাদ রয়ে গেছে।যাতৈ কান্না কাটি না করে,মন খারাপ করে বসে না থাকে তাই উনারা এসেছে মেয়েকে সামলাতে।
তারাজ আজ আফনূর সাথে বেশি সময় দিতে পারছে না।যেহেতু নতুন দায়িত্ব পেয়েছে আবার দায়িত্ব হাতে নিতেই এত বড় একজন আসামীর কারাগারে মৃত্যু হয়েছে সুতরা আজ তার উপর দিয়ে অনেক চাপ যাবে। সারাদিন গনমাধ্যম কর্মী থেকে অনেক বিষয়কে তাকে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে সামলাতে হবে। তাছাড়াও আফনূরের আজ মন খারাপ হবে যেটা সে কোন মতেই বরদাস্ত করতে পারবে না। আবারও নিষেধ‌ও করতে পারবে না। সবকিছু মিলিয়ে সে আজ আফনূর থেকে দূরে থাকাই উত্তম মনে করলো।
“ স্যার গত পরশু দিলশাদ তালুকদারকে কোর্ট কারাগারে প্রেরণ করলো,আজ তাকে আবার কোর্টে উঠানোর কথা ছিলো কিন্তু গত কাল রাতেই মারা গেলেন এখন তার কেইসে কি হবে?"
“ যে চলে গেছে সে সঙ্গে করে নিজের কৃতকর্মের ফলাফল নিয়েই গেছে। এখানে আর বলার কিছু থাকে বলুন?"
“ স্যার,স্যার নিশ্চয়ই তিনি এই কাজগুলো একা করতেন না? এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হতে হলে স্ট্রং টিম দরকার হয় তার মানে নিশ্চয়ই মৃত তালুকদারের সাথে আরো লোক জড়িত ছিলো আপনারা কি সেই বিষয়ে তদন্ত করছেন আর করলেও তার ফলাফল কতটা সময়ক্ষেপণ?"
“ দেখুন দিলশাদ তালুকদার নামটা কিন্তু খুব  হালকা নয়।তিনি এক্স মিনিস্টার আঙ্গুর মাইজদির ভাগ্নে জামাতা ছিলেন সেই ক্ষমতার বলেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় টপকে টপকে অধ্যাপক হয়েছিল তার সাথে প্রসার করেছিল নিজের অবৈধ কার্যক্রমের গন্ডি। নিশ্চয়ই তাতে বড় কোন ইন্ধনদাতা ছিলো।কারো বলেই সে করতে সাহস পেয়েছে।নয়তো এত বছরেও কি ওরা ধরা পড়তো না? এখন বোঝাই যায় এই ব্যাক পজিশনে নিজেকে আড়াল করে দিলশাদ তালুকদারের মাথায় লবন রেখে কে বা কারা বর‌ই খেতো।তবে আমরা আপাতত সুসংগঠিত কোন প্রমান ছাড়া কথা বলছি না। তদন্ত চলছে, তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে আপনাদের সব জানানো হবে!"
“ স্যার আমার একটা প্রশ্ন!"
“ জ্বী বলুন!"
“ স্যার আমি বলছিলাম,এই যে কোর্টে একজন এত বড় মামলার আসামী মারা গেলো, হার্ট অ্যাটাক করে , উনাকে কি কারাকর্তৃপক্ষ মেডিকেল সুযোগ সুবিধা দিতে পারেননি যথা সময়ে? আপনার কি মনে হয় এটা কি আকস্মিক মৃত্যু নাকি পরিকল্পিত ভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে?"
“ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেখেছেন? কি লেখা ছিলো? ‘He died of a heart attack in his sleep ,অর্থাৎ সে ঘুমের মধ্যে হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে যেটাকে মেডিকেলের ভাষায়    
সাডন কার্ডিয়াক ডেথ বা সাডন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ বলে৷ ‘ তো একজন আসামীর ঘুমের সময় নিশ্চয়ই কারাকর্তৃপক্ষ তাকে পাহারা দেওয়ার জন্য বসে থাকবে না যে কখন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটবে আর তারা তাকে মেডিকেল ফ্যাসিলিটি দিবে!আর শেষে কি জিজ্ঞেস করলেন যেন?"
“ এটা কি ন্যাচারাল ডেথ অর প্রি প্ল্যানাড ?"
“ উনাকে পরিকল্পিত হত্যা করে কার লাভ? আপনার? আমার তো না। আমার সরকারের‌ও না। তবে? উনাকে হত্যা করে আমার মনে হয় না কোন লাভ কারো হবে,হ্যা হবে তবে লাভ নয় লোকসান হবে? এই যে উনি এত বড় একটা মামলার আসামি ছিলেন উনি থাকলে উনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরো সহজেই অনেক বড় বড়‌ রাঘববোয়াল গুহা থেকে টেনে বের করা যেতো এখন সেটা জটিল হয়ে গেল। আবার নতুন করে এই কেইস নিয়ে স্ট্যাডি করতে হবে গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য সংস্থার ,আর যথারীতি এটা একটা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। সুতরাং উনার মরে যাওয়ায় লাভ নাই,লস বৈ‌। আশাকরি আপনি উত্তর পেয়েছেন।
ধন্যবাদ আপনাদের সকলের সহযোগিতার জন্য!”
“ স্যার স্যার শেষ প্রশ্ন স্যার!"
“ আর না ,আর না।  স্যারকে যেতে দিন।সরুন সরুন।"
“ এটা শেষ শেষ প্রশ্ন স্যার!"
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার চলে যাচ্ছিলো 
সাংবাদিকের এমন মিনতি শুনে থেমে দাঁড়ালো। কালো চশমার আড়ালে থাকা গম্ভীর চোখজোড়া শীতল করে নির্দিষ্ট সাংবাদিকের উপর অর্পিত করে শুধালো,
“ আপনার শেষ প্রশ্নটা করুন!"
“ ধন্যবাদ স্যার,স্যার আমি জানতে চাইছিলাম আপনি সদ্য মাত্র দায়িত্ব পেলেন, এমনিতেই আপনি এবারের মন্ত্রিসভার সবচেয়ে নতুন এবং কমবয়সী মন্ত্রী। আমাদের সূত্র মোতাবেক সরকার প্যানেলে এখনও তর্ক বিতর্ক চলছে আপনাকে মন্ত্রী সভায় রাখার জন্য তাও আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে। দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথেই যেখানে সরকার এত বড় একটা ঘটনার মুখোমুখি হলো তার সমাধা হ‌ওয়ার আগেই আপনি এখন পনেরো দিনের ব্যক্তিগত ছুটি নিচ্ছেন এটা কি একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর মধ্যে পড়ে? যেখানে আপনার উপর পুরো প্রসাশন,আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ও আইন বিভাগের নির্ভরতা সেখানে মন্ত্রীপরিষদ গঠনের সাথে সাথেই হঠাৎ ছুটি নেওয়াটা কতটা যুক্তিসঙ্গত বলে আপনার মনে হচ্ছে?"
তারাজ চোখের চশমা খুলে ডান হাতের মুঠোয় ভাঁজ করে ধরে রেখে সব সাংবাদিকদের উদ্দেশে বললো,
“ আমাকে নিয়ে আমাদের দলের মধ্যে কি হচ্ছে কি হচ্ছে না তা একান্ত‌ই দলীয় বিষয়,দলের সম্মানিত গুনি এবং যথার্থ যোগ্যরাই তা নিয়ে পর্যালোচনা করছে।যোগ্য না হলে নিশ্চয়ই তারা আমাকে এত বড় পদের জায়গায় ,এত উচ্চ সম্মানের পদে বহাল করতো না।কিছু একটা নিশ্চয়ই আমার মাঝে পেয়েছে তাই তারা আমাকে এটার যোগ্য মনে করেছে নচেৎ দলের বদনাম করার জন্য তো রাখবে না।আর যারা সমালোচনা করছে তারাও নিজেদের দিক থেকে সঠিক তবে আমি বলবো তাদের উচিত নিজেদের মাঝে বিদ্বেষ না ঢুকিয়ে দল এবং সাধারণ মানুষের কল্যানের জন্য মিলেমিশে থাকতে আমি তাদের সহযোগিতা একান্ত‌ই কাম্য করছি।
পরিশেষে বলবো আমার ছুটির বিষ, ‘ সাংসদ, মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ কিংবা আইন বিশেষজ্ঞ, সব,সব কিছুর আগে আমি একজন সাধারণ মানুষ! রক্ত মাংসের মানুষ।আমার ব্যক্তি জীবন আছে! পরিবার আছে,সংসার আছে! আমি সাধারন জনগনের সম্পদ এখন, কিন্তু আমার পরিবারের অংশ, তাদের অস্তিত্ব আমি জন্ম থেকেই।আমার কাছে সবার আগে আমার পরিবার । পরিবারের জন্য পুরো পৃথিবী ত্যাগ করতে পারবো কিন্তু পরিবারকে নয়।আমি পারিবারিক সময়ের জন্য‌ই ছুটি নিয়েছি ততদিন আমার পরবর্তী যারা আছেন তারা খুব যত্ন সহকারে সবদিক সামলে নিতে পারবে বলেই আমি আশাবাদী।আর হ্যা,আপনারা হয়তো ভালো মতোই অবগত আছেন,আমি ভোটের দুদিন আগেই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিবাহ সম্পন্ন করেছি।তো, নির্বাচনের কাজে এত‌ই চাপে ছিলাম যে আপনাদের ভাবীর সাথে দু মিনিট ভালো মন্দ কথাও বলতে পারিনি আর না এখন পারছি। সারাদিন আমি থাকি দেশের কাজে ব্যস্ত আর আপনাদের ভাবী থাকে কোর্টে মানুষের মামলা নিয়ে ব্যস্ত। দাম্পত্য জীবন তো দূরে থাক, বন্ধুত্বপূর্ণ দুটো কথা বলতেও আমাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।তাই ভাবলাম,যাই হোক এখন আপনারাই বলুন আমার কি করনীয়! আপনারাও তো পুরুষ! বিয়ের পর ব‌উয়ের ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চয়ই ধারনা আছে! আর যারা এখন‌ও সিঙ্গেল আশাকরি খুব শীঘ্রই এই অনুভূতির সাথে পরিচিত হয়ে যাবেন।আমরা পুরুষরা ঘরে যত‌ই বড় বাঘ সিংহ হ‌ইনা কেন ঘরে গেলে ব‌উদের সামনে ঠিকই মেনি বিড়াল হয়ে যাই।আমিও আসলে আপনাদের মতোই,এর ব্যতিক্রম ন‌ই!তাই আমি কিছুদিন একান্ত নিজের মতো করে ব্যক্তিগত জীবন কাটাতে চাই।দোয়া করবেন যেন দ্রুত আপনাদের জন্য নতুন অতিথি নিয়ে আসতে পারি। ওহ আমি কিন্তু সাধারণ পুরুষ হয়ে কথাগুলো বলেছি, মন্ত্রী কিংবা সাংসদ নয়।আর হ্যা নারী সাংবাদিকের বলছি আপনারা আবার মাইন্ডে নিয়েন না।আমরা পুরুষরা আসলেই গৃহে অবহেলিত থাকি!
আশাকরি আপনি যা শুনতে চেয়েছেন তার যথার্থ উত্তর পেয়েছেন।"
তারাজ শেষের কথাগুলো হাসতে হাসতে বলছিলো ওর সাথে তাল মিলিয়ে একদল সাংবাদিক‌ও হাসছিলো।পরপর নানা প্রশ্ন উত্তরের পর্ব শেষ করে সাংবাদিকদের সাথে মিটিং পর্ব শেষ করে।মুরাদ পুরোটা সময় নিজের দায়িত্ব পালনে স্থির ছিলো।তারাজকে সরকারের তরফ থেকে দেহরক্ষী দিলেও তারাজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে মুরাদ, ফয়সালকে নিজের সাথে রেখেছে।
কাল অফিসে এসেই নিজের জন্য পনেরো দিনের ছুটির আবেদন করেছে। পুরোপুরি আসন ঘেরে বসার আগে আফনূরকে নিয়ে মধুচন্দ্রিমা সাড়তে বড়‌ই উদগ্রীব সে।খুব দ্রুত নিজেদের মাঝে নিজেদের অস্তিত্বের উপস্থিতি তার একান্ত চাওয়া।যাতে আফনূর নিজের পিছুটান পুরোপুরি ছাড়তে পারে। কখনো মনের ভুলেও পিছু ফিরে না তাকায়।গত রাতেও আফনূর নিরবে অশ্রু ঝড়িয়েছে।তারাজ দেখেও না দেখার মতোই নিরব ছিলো।স্ত্রী তার প্রাক্তনের বিরহে পুড়ছে আর সে পুড়ছে স্ত্রীর এহেন আচরণে।যদিও তারাজ জানে আফনূর তাকে ভালোবাসে তবুও; এই যে কোথাও একটা তবুও রয়ে যাচ্ছে এটাই তারাজকে জ্বালাচ্ছে, অন্তরটা ভীষন পুড়াচ্ছে।যার অস্তিত্ব জুড়ে তার বসত গড়তে চায় তার অবলীলায় প্রাক্তনের বিরহ উৎযাপন করা তারাজকে আহত করছে।এটা কি নূর বুঝবে কখনো?
“ আমি তোকে কিছুই বলতে চাই স‌ই!"
“ তোকে দেখে মনে হচ্ছে খুব সিরিয়াস কিছু বলবি স‌‌ই!কিছু কি হয়েছে?"
তাজিয়া খাঁ উচ্ছসিত মনে মমতা আঞ্জুমানের সামনে বসে আছেন।আজ সারাদিন কথা বলবে বলবে করেও বলা হয়নি। নতুন বেয়াইন বেয়াই আজ হুট করেই এসেছিলে, প্রথম বার আসলো। তাদের আপ্যায়ন আর দেখভালেই সারাদিন কেটে গেল।বেশ ব্যস্ত একটি দিন কাটিয়ে এখন রাতের এগারোটা বেজে যাওয়ার পর অবশেষে একটু আরাম করে কথা বলতে পারছেন।সকালে যখন তারাজ জানালো তাজিশের মতামত তখন‌ই ইচ্ছে করছিলো ছুটে এসে বলতে,
“ স‌ই লো,তোর মেয়েটাকে সত্যি আমার করতে পারবো বোধ হয়। আমার তারাজের ব‌উ না হয়েছে তো কি হয়েছে আমার তাজিশের ব‌উ হবে!"
কিন্তু পারলেন ক‌ই! সারাদিনের ব্যস্ততায় দুদন্ড কথাই বলতে পারেনি ।যাই হোক অবশেষে পানের ঢালা সাজিয়ে বসেছে দুই স‌ই।এক খিলি পান বানিয়ে মমতা আঞ্জুমানের হাতে তুলে দিয়ে আরেক খিলি পান নিজের গালে পুড়লেন।
উপরোক্ত কথাটি বললেন পান গালে দাঁতের চিপায় চুন মাখা আঙ্গুল ঘসতে ঘসতে, মমতা আঞ্জুমান ধীরে পান চিবুচ্ছে আর নিজের স‌ইয়ের এত উচ্ছ্বাসের কারণ খতিয়ে দেখছেন।
“ খালি পান‌ই চাবাবি না কি বলবিও !"
“ ছোট থেকেই আমাদের ইচ্ছা ছিলো আমরা একে অপরের সাথে ছেলে মেয়ে বিয়ে দিবো। আল্লাহ সেই ইচ্ছা পূরণ করতে সমর্থন‌ও দিয়েছেন তাই তো আমাকে ছেলে আগে পরে তোকে মেয়ে দিলো।আমরাও আগাচ্ছিলাম কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা হয়তো আমাদের থেকে একটু আলাদা ছিলো তাই কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে তবুও কিন্তু হচ্ছে!"
মমতা আঞ্জুমান কিছুই বুঝতে পারছেন না কথার আগামাথা।ভ্রু কুঁচকে উৎসুক হয়ে বললো,
“ কিভাবে?"
তাজিয়া খাঁ মমতা আঞ্জুমানের দুই হাত ধরে আবেদনের ভঙ্গিতে বললেন,
“ আমার ছোট ছেলেটার জন্য তোর মেয়েটাকে দে।"
“ কি সব বলছিস?"
“ হ্যা,কথা ছিলো আমার বড় ছেলের জন্য আনবো তোর মায়াকে। আল্লাহর ইচ্ছা অন্য ছিলো তাই ছোট জনের জন্য চাচ্ছি। আমার ছোট ছেলেটাকে তো দেখছিস কত শান্ত শিষ্ট। নিজের ছেলে বলে নয়,আমার তাছিশের মতো ভদ্র,সুশীল ছেলে তুই লাখে একটা পাবি।তোর মায়ার সাথে ওর ডোরটা বাঁধতে চাই স‌ই!"
“ কিন্তু এটা কি করে হয়?"
“ কেন হয় না?"
“ আমরা যেখানে বড় ভাইয়ের জন্য মেয়েকে রেখেছিলাম সেখানে সেই ঘরেই ছোট ভাইয়ের সাথে! না স‌ই ব্যাপারটা কেমন দেখাচ্ছে?"
“কিছু দেখাচ্ছে না। তাছাড়া আমার পরিবারের কারো সমস্যা নাই তাইলে তোর কি সমস্যা।বিয়ের কথা আমাদের বড়দের মাঝে ছিলো, ওদের মাঝে তো নয়।এমন‌ও না যে ওরা একে অপরের সাথে মেলামেশা করেছে তাইলে সমস্যা কোথায়! তুই না করিস না স‌ই।আমি নিশ্চিত ওরা একে অপরের সাথে সুখী হবে, দেখিস!"
“ আমাকে একটু সময় দে,আমি ওদের সাথে কথা বলি তারপর জানাই।"
“ আইচ্ছা সময় দিলাম।তয় এতটুকু জানিস আমার পরিবারের সবাই রাজী, আমার ছোট আব্বাও!আমি তোর মায়াকে আমার ঘরের মায়াবতী করতে চাই। আল্লাহ একজন রাগিনী দিয়েছে আমার বড় ব‌উমার মাধ্যমে, আরেকজন মায়াবতী আসুক, রাগিনী আর মায়াবতী মিলেই সংসারটাতে টক ঝাল মিষ্টিতে মাখামাখি করে রাখুক।আর কিছুই চাই না আল্লাহর দরবারে!"

পর্ব ৫০

স্রষ্টার চমকদার নিয়মানুযায়ী ধারাবাহিক ভাবে পরপর কেটে গেল অনেকগুলো দিন। সপ্তাহ পেরিয়ে মাসের শেষ। অবশেষে তারাজের ছুটি মঞ্জুর হলো সাথে আফনূরের অনেকগুলো জটিল কেইস থেকে আপাতত বিরতি নেওয়ার সুযোগ এলো।এর মধ্যেই টুকটাক খুচরো প্রয়োজনীয় কেনাকাটার কাজ‌ও আফনূর নিজ দায়িত্বে শেষ করেছে। মন্ত্রী মানুষের ব‌উকে দেওয়ার সময়‌ই হয় না। সেখানে কেনাকাটার জন্য আলাদা করে সময় বের করা কঠিন। আফনূর শিক্ষিত, বুঝদার রমনী।এই ছোট্ট হিসাব সে অবলিলায় বুঝতে পারে। তাছাড়াও শ্বশুর থেকে শ্বাশুড়ি মা,ননাস,ননাসের স্বামী,তাদের একমাত্র পুত্র এবং অতি আদরের একমাত্র দেবর যে দেবর কম ভাই বেশি সবাই,সবাই আফনূরকে বেশ কদর করে। তাদের ঠোঁটের আগায় থাকে আফনূরের প্রশংসা বানী।সংসার জীবন আফনূরের জন্য দুনিয়ার বেহেস্তে ন্যায় লাগছে।সুখ আর সুখ।তারাজ সময় যে দেয় না এমন নয়! সারাদিন যত‌ই ব্যস্ত থাকুক ফোন করে খবরাখবর নিতে ভুলে না। দুপুরে জিজ্ঞেস করবে খেয়েছে কিনা, বিকেলে বলবে খেয়েছে কিনা, সন্ধ্যায় বলবে খেয়েছে কি-না? আফনূরের খাওয়া থেকে নাওয়া সবকিছুর খবরাখবর তার নখ দর্পনে থাকা তার জন্য একান্ত জরুরি।আর রাত? রাত তো তারাজের‌ ভালোবাসা মাখতেই পেরিয়ে যায়। আফনূরের গা ঘেঁষে না ঘুমালে ঘুম হয় না তারাজের, এদিকে তারাজের বুকে মাথা না রাখলে আফনূরের ঘুম হয় না। 
আফনূর সেদিনের পর থেকে আর দিলশাদকে মনে করে কাঁদেনি।মায়ের বোঝানোর পর নিজেই নিজের সাথে কথা বলেছে, অনুভব করেছে তারাজের কেমন লাগে যখন সে তারাজের বুকের উপর শুয়ে অন্য পুরুষের জন্য কাঁদে! তারাজ যদি এক‌ই কাজ করতো তখন আফনূরের কেমন লাগতো? আঁতকে উঠলো আফনূর। হঠাৎ করেই অনুভব করলো সে তারাজের সঙ্গে কোন নারীকে নিয়ে কল্পনাও করতে পারছে না বাস্তবে সহ্য করা তো দূরের কথা।এই যে মায়া,যার প্রতি তারাজের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।তবুও তো আজকাল তার মায়াকে দেখলে কেমন হিংসে হিংসে লাগে।না, মায়ার সৌন্দর্যের জন্য নয়।
কারণ তারাজ সৌন্দর্যের পুজারি নয় তবুও! তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিলশাদ নামক অধ্যায়কে সে আর কখনোই খুলবে না।যার সাথে লেনাদেনা নেই বহুবছর ধরে তার জন্য বর্তমানকে কষ্ট দেওয়ার মানেই হয় না।সেদিন থেকেই আফনূর মনেপ্রাণে তারাজকে নিয়ে ভাবে।তারাজ‌ও  হয়তো এটা উপলব্ধি করতে পেরেছে তাই সেও বেশ ফুরফুরা মেজাজে থাকে।
“ হ্যা আম্মা বলো!"
“ কোথায় আছো এখন?"
“ আমি এখন বান্দরবান বাসস্ট্যান্ডে আছি, একটু জিরিয়ে আবার র‌ওনা দিবো।"
“ সাবধানে থেকো আব্বা! ঠিকঠাক খেয়ে নিও।আর হ্যা পাহাড়ে উঠার সময় সতর্ক থেকো!"
“ আচ্ছা আম্মা, চিন্তা করিও না।আমি নিজের খেয়াল রাখবো। তুমি নিজের দিকে ধ্যান দাও!"
“ তোমরা ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকবো।এই   আব্বা, শুনো যদি কোন পাহাড়ি কন্যা মনে ধরে যায় অথবা তোমার মতোই ঘুরতে গেছে এমন কাউকে চোখে লাগে তুমি কিন্তু নিশ্চিত মনে আম্মারে বলবা। আম্মা ঢাক ঢোল পিটিয়ে তাকে ঘরে তুলে আনবো"
তাজিশ হাসলো মায়ের কথায়।মা আজকাল তাকে নিয়ে পড়েছে।যখন‌ই তাদের মাঝে কথোপকথন শুরু হয় তার সমাপ্তি ঘটে তার বিয়ে নিয়ে।যেখানেই যাওয়ার কথা বলবে শেষের ফরমায়েশ থাকবে মেয়ে পছন্দ নিয়ে।
“ নূর, নূরজান!"
গলা ফাটানো চিৎকারে আফনূর হাতে থাকা সাবান মাখানো প্লেটটা বেসিনে রেখে হাতটা ধুয়ে পাশে থাকা ছোট্ট তোয়ালে দিয়ে হাতটা মুছে নিলো।সুফিয়া এসে বললো,
“ ভাবী আপনেরে আগেই ক‌ইছি আমি ধুই, আপনি শুনলেন‌ই না।এহোন ভাইয়ের রাগ সহ্য করেন গিয়া!"
আফনূর সুফিয়ার কথায় উত্তর দেওয়া প্রযোজ্য মনে করলো না। নিজের কাজ শেষ করে ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য তারাজের মেজাজ চটিয়ে দেওয়া। একমাত্র তারাজের মেজাজ চটলেই সে তারাজের সাথে কথা বলার সুযোগ পায়।নয়তো তারাজের তাড়ায় সে গা ঢাকা দেয়।তারাজের এত ব্যস্ততা আফনূরকে বিরক্ত করে তুলছে। গতকাল কথা দিয়েছিলো তাকে নিয়ে একটু খোলা পরিবেশে যাবে। অথচ বিকেল তো ভালো কথা , সে রাতেই ফিরেছে দেড়টার পর!আবার এসেও কিসব রাজনৈতিক প্যাচালে ব্যস্ত ছিলো মুঠোফোনে।তাকে ঐ এক‌ই জিনিস নিয়ে পড়ে থাকতে দেখে কখনো যেন আফনূরের চোখ লেগে গিয়েছিল তা আফনূর নিজেই জানে না।আফনূর রাতে পাশে বসে খেয়েছে তো ঠিকই কিন্তু? কথা তো বলেইনি। উল্টো ভেতরে রাগ পুষে রাখতে একদম ভুল করেনি।এখন তার এমন ধীর গতিতে পৌঁছানোর জন্য ঘরে যেতে দেরি হচ্ছে তাতে অবশ্যই তারাজের মেজাজ গরম হবে এবং সে আফনূরকে দুই চারটা ধমক দিবে তখন‌ই আফনূর ফেটে পড়ে তার রাগ উগড়ে দিবে।
কিন্তু আফনূর ভাবলোই না তারাজ আর যাই করুক তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয় না কখনোই।
“ বলুন!"
হাতের ফাইলটা হালকা ভাঁজ করে আফনূরের দিকে তাকালো।বললো
“ বলুন মানে? কোথায় ছিলে এতক্ষণ?"
“ ছিলাম কোথাও!আপনি বলুন!"
আফনূরের দিকে গভীর ভাবে চাইলো‌। কন্ঠস্বর অদ্ভুত লাগছে।চোখ দুটো কেমন যেন,খটকা লাগলো তারাজের কাছে। আফনূর কখনো এভাবে কথা বলে না। অন্তত তার সাথে।ফাইলটা ভাঁজ করে বিছানার উপর রাখলো।গভীর চাহনিতে আফনূরের দিকে এগিয়ে গেল। আফনূর যত‌ই রেগে থাকুক ভেতরে ভেতরে ঠিক‌ই গলে যাচ্ছে তারাজের চাহনিতে সেই সাথে ভয়‌ও পাচ্ছে।পাছে হাত টাত তুলে না ফেলে গায়ে।
তারাজ আফনূরের মুখোমুখি দাঁড়ালো। আফনূর নিজের দৃষ্টি নামিয়ে ফেললো।হাত বাড়িয়ে আফনূরের বাহু চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। গভীর থেকে গভীরতর দৃষ্টিতে আফনূরের চোখ,নাক, ঠোঁট সবকিছুই পরখ করলো। ঠোঁটটা আফনূর কানের কাছে নিয়ে একদম নিচু গলায় বললো,
“ আজ রাত অবধি টিকিয়ে রাখো,কাল রাতে কোন্যা গিয়ে ভাঙ্গাবো ঠিক তাদের পদ্ধতি, মিসেস!"
[ কোন্যা - এটি তুরস্কের রোমান্টিক শহর হিসেবে খ্যাত। কবিদের আনাগোনা বেশি এ শহরে। কোন্যাতে আপনার প্রথম গন্তব্যটি হওয়া উচিত মেভালানা জাদুঘরে। গোলাপ দ্বারা সজ্জিত তুরস্কের বিখ্যাত কবি ম্যাভলানা রুমির সমাধি আছে সেখানে। সন্ধ্যার দিকে কোন্যার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে। ওই সময় এক কাপ তুর্কি চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে সেখানকার প্রেমে পড়ে গিয়ে আপনি কবি হয়েও উঠতে পারেন] 
তারাজ কথা বলেই আফনূরকে ছেড়ে দিলো।তারাজের কথার অর্থ অনুধাবন হতেই আফনূর চমকিত হয়ে তারাজের দিকে তাকালো।তারাজ আফনূরের চোখের চমক দেখে চোখ মারলো। লজ্জায় আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিজের এক হাত দিয়ে অন্য হাত মোচড়াতে থাকলো।তারাজ বিছানার সামনে গিয়ে ফাইলটা তুলে বাম হাতের মুঠোয় আঁটকে রেখে,ডান হাত দিয়ে নিজের কালো মুজিব কোটটা টেনে ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিলো। এরপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে বললো,
“ রাগ অভিমান যাই হোক তার বহিঃপ্রকাশ বেড রুমেই থাকবে,এর ছিটো-ফোটাও যেন বেডরুমের  দরজা না পেরোয়! আশাকরি আপনার যুক্তি-তর্ক ভর্তি জটিল মস্তিষ্কে আমার এই সহজ ধারা স্থায়ীভাবে প্রবেশ করেছে!"
আফনূর এখনও নিরব।সে না চোখ তুলে তাকাচ্ছে আর না কোন প্রত্ততর দিচ্ছে।তারাজ কাজ শেষ করে অন্য হাতে অফিস ব্যাগ তুলে নিলো।এটাতে ল্যাপটপ থেকে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আফনূর সকালে উঠেই তারাজকে দেখিয়েই ঠিকঠাক করে রাখে।আজ‌ও তাই রাখাই আছে। সুতরাং তারাজের দেখে নেওয়ার দরকার হয় না।
তারাজ আফনূরের সামনে দাঁড়িয়ে কপালে গভীর আবেগে চুম্বন করলো। নিয়মিত কর্ম এটা। আফনূর পরম ভালোবাসায় চোখ বন্ধ করে ফেললো।তারাজ ঠোঁট উঠিয়ে বললো,
“ সব কিছু গোছগাছ করে নিজেও তৈরি থাকবে, আমার এসে যাতে আর অপেক্ষা করতে না হয়। নয়টার মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে হবে তবেই এগারোটার মধ্যে বিমান বন্দরে থাকা যাবে।"
“ হু!"
এত সময়ে মুখ খুললো তাও একদমই ছোট্ট একটি উত্তর।তারাজ হাসলো। এরপর দোয়া দরুদ পড়ে বেরিয়ে পড়লো,আফনূর‌ও পিছু পিছু গেলো।নিচে নামতে নামতে শুনলো আফনূর বিরবির করে দোয়া পড়ছে।বসার ঘরে পা দিতেই আম্মার সাথে দেখা হলো,
“ বেরিয়ে যাচ্ছো?"
“ জ্বী আম্মা।ছোট ফোন দিয়েছিলো?"
“ হ্যা, বললো বান্দরবান বাজারে আছে।কিছু খেয়ে আবার র‌ওনা দিবে!"
“ যাক আলহামদুলিল্লাহ এখনও সহি সালামতে আছে।
 আম্মা তুমি ওকে আপাতত বিয়ের জন্য আর প্যারা দিও না।বয়স‌ই কত! একটু নিজেকে সময় দিক, উপভোগ করুক জীবনটা।সময় হলে এমনিতেই একটা মায়াবতীও চলে আসবে আর তোমার ছেলের বিয়ের শখ‌ও পূরন হবে!এখন ওকে ওর মতো থাকতে দাও।"
“ হ্যা আমিও তাই ভেবেছি।হয়তো একটু বেশি বেশিই করে ফেলছি আমি।তবে ও যদি কাউকে পছন্দ করে আমি না বলবো না।তাই বলেছি যদি ঘুরতে গিয়ে কাউকে মনে ধরে আমাকে যেন জানায়।"
“ তার মানে ওখানেও ওকে তুমি ওকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছো?"
“ অশান্তির কি করলাম।ব‌উ সাথে থাকলে ঘুরেফিরে আনন্দ পাবে।তার জন্য‌ই তো বিয়েটা করা জরুরি!"
“ আম্মা!"
“ নিজের ছেলে মেয়ে হলে বুঝবে।এখন না।"
তারাজ আর কি বলবে? বাবা মায়ের চিরায়িত সাধারণ বক্তব্য এখানেই আটকায়।তারাজ এমনিতেই মায়ের সাথে তর্ক করে না ।তাই এখনও করলো না।তবে ভাইয়ের কথাও ভাবছে।মায়াকে বিয়ে করার জন্য তো সেই রাজী করিয়ে ছিলো। কিন্তু কি হলো! আবারও মনটা ভাঙ্গলো বেচারার!
“ সাবধানে থেকো আম্মা,নুরজান তুমিও নিজের আর আম্মার খেয়াল রেখো।”
“ হ্যা রাখবে,তুমি সাবধানে যাও।ফি আমানিল্লাহ্!"
তারাজ জানে এখন আম্মাও অন্তত দশ মিনিট নানা দোয়া পড়বে ছেলেদের জন্য।
তারাজ দরজা পেরিয়ে নিচে নামতেই নেতাকর্মীদের মাঝে মিশে গেলো। অনেকের অনেক সমস্যার সমাধান এখন তাকে খুঁজে বের করতে হবে।আজকে একটা মিটিং আছে। মিটিং নয় ঠিক, জনসভা।কুড়ারঘাট হাসপাতাল মাঠে, এলাকায় কিশোর অপরাধ হুরহুর করে বাড়ছে।কে বা কারা এই কিশোর অপরাধীদের মূলহোতা,কাদের উস্কানিতে অল্প বয়সী এই ছেলেরা এভাবে উচ্ছন্নে যাচ্ছে তা নিয়ে সাধারণ নাগরিক কমিটির তরফ থেকে এক বিশাল আলোচনা সভা ডাকা হয়েছে যার প্রধান অতিথি ব্যারিষ্টার ও আইন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইব্রাহীম তারাজ খন্দকার এমপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। বিশেষ অতিথি আইনমন্ত্রী শফিক বিল্লাহ, এবং প্রধান পুলিশ কমিশনার বারকাত নিয়াজ। আলোচনা সভার আয়োজনে রয়েছে তিন ওয়ার্ডের
তিনজন কাউন্সিলর ও স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা।
যেহেতু আয়োজক প্যানেলের বিশেষ একজন হচ্ছে মোহাম্মদ ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার তাই তিনি আগেই চলে গিয়েছেন সভা স্থলে!তারাজ প্রায়‌ই পৌঁনে এক ঘন্টার মতো অফিস কক্ষে বসে বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষের সাথে আলাপ আলোচনা করে তাদের সমস্যা সম্পর্কে জেনে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে মিটিং পর্ব শেষ করলো।প্রধান ফটক পেরিয়ে রাস্তায় বের হতেই তাকে নিয়ে স্লোগানে চঞ্চল হয়ে উঠলো আশপাশ।
“ আমার ভাই তোমার ভাই, ইব্রাহীম ভাই, ইব্রাহীম ভাই!”
“ নেতা মোগো ইব্রাহীম ভাই,মোগো কোন চিন্তা নাই!"
বসার ঘরে বসে ব‌উ শ্বাশুড়ি গল্প করছিল। তানহা আপাতত কিছু দিনের জন্য গ্রামে শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছে।ছেলের স্কুল ছুটি তাই স্বামী স্ত্রী দুজনেই অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নিজ বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে। খন্দকার ভবনে আপাতত অবস্থান করছে দুই ব‌উ, একজন পুরাতন আরেকজন নতুন।
তাজিয়া খাঁ নিজের জীবনের কিছু মিষ্টি, কিছু তেতো আর কিছু পানসে অভিজ্ঞতা ভাগ করছে পুত্রবধূর সাথে।আফনূর‌ও তা মনোযোগ দিয়ে শুনছে।এমন মুহুর্তেই আফনূরের মুঠোফোনটা বেজে উঠল। আফনূর পেছনে সোফায় অবহেলায় ফেলে রাখা মুঠোফোনটা সামনে টেনে এনে দেখলো তানহার কল।সে শ্বাশুড়ির উদ্দেশ্য বললো,
“ বুবু ফোন দিয়েছে আম্মা!"
“ তাই!"
“জ্বী!"
“ দেখো কি বলে?"
“ জ্বী দেখছি, আসসালামু আলাইকুম বুবুন! কেমন আছেন?"
***
“ জ্বী আলহামদুলিল্লাহ, আমার সবাই ভালো আছি! বাবু কেমন আছে বুবুন?"
***
“ ওহ;তাই নাকি! আচ্ছা থাক বকা দিয়েন না। একটু আধটু দুষ্টুমি না করলে কি বাচ্চা আর বাচ্চা থাকবে।ওরাই তো দুষ্টুমি করবে।তবেই না মনে হবে বাচ্চা মানুষ।"
****
“ আহারে, আচ্ছা আমার সাথে কথা বলিয়ে দিন।আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি।"
*** 
“ আচ্ছা থাক বকিয়েন না। জ্বী বুবুন।"
****
“ আপনার ভাইতো বলছে নয়টার মধ্যে আমরা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্য বের হয়ে যাবো।তার মানে বারোটার সময় আমাদের ফ্লায়িং টাইম!"
***
“ না বুবুন।কিছু সময় আগেই বের হয়ে গেছে।আজ তো এলাকায় ঐ যে হাসপাতাল মাঠে জনসভা আছে। তারপর বোধহয় অফিসে যাবে।সেখান থেকে এসেই হয়তো রওনা‌ দিবে।"
***
“ না আমাকে বলে গেছে সব রেডি করে নিজেও রেডি থাকতে!"
***
“ আমি আম্মার সাথে গল্প করছি!"
***
“ হ্যা বুবুন,এখন‌ই যাবো।নয়তো দেরি হয়ে যাবে পরে আমাকে ইচ্ছা মতো দিবে!"
***
“ ইটস ওখে বুবুন,আমি পারবো সমস্যা নাই। আপনি নিজের খেয়াল রাখুন।আর হ্যা আংকেল আন্টিকেও আমার সালাম দিয়েন। দুলাভাইকে বলবেন তার শ্যালকের ব‌উ তাকে মিস করছে!"
***
“ আচ্ছা রাখছি তাহলে বুবুন। আসসালামু আলাইকুম। তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসুন, সবদিক কেমন খালি খালি লাগে বাবুকে ছাড়া।আমরাও চলে যাবো আজ,ভাইয়াও চলে গেছে বান্দরবান ঘুরতে, আপনিও নাই, আম্মা পুরো বাসায় একা হয়ে গেছে!"
**** 
“ ইনশাআল্লাহ! সাবধানে থাকবেন,বাবুকে বকবেন না। ভাইয়াকে,তার বাবা মা'কে ও আমাদের জন্য দোয়া করতে বলবেন!"
***
“ আসসালামু আলাইকুম, আল্লাহ হাফেজ বুবুন!"
****
আফনূর তানহার সাথে কথোপকথন শেষ করে ফোন কেটে দিলো।তাজিয়া খাঁ জিজ্ঞাসু চোখ তাকিয়ে আছেন, আফনূর হেসে দিয়ে বললো,
“ বাবু হাঁসের লেজ কেটে দিয়েছে,তাও সে থামেনি নতুন কবুতর এনেছিল তা সব ছেড়ে দিয়েছে। খাঁচা খুলে ফেলেছিলো সুযোগ পেয়ে চারটার থেকে তিনটাই উড়াল দিয়ে চলে গেছে।তাই বুবুন বকাঝকা করছে এই হলো ঘটনা।"
তাজিয়া খাঁ নাতীর কীর্তি শুনে হাসলেন বেশ সময়। এরপর আফনূরের দিকে চেয়ে বললেন,
“ তুমি যাও। প্রস্তুতি নাও।"
“ জ্বী আম্মা যাচ্ছি!"
আফনূর শ্বাশুড়ির অনুমতি নিয়ে উঠে গেল বসা থেকে। নিজের ঘরের দিকে যেতে পথেই আবারও মুঠোফোন বেজে উঠলো।মা লেখা!
“ আসসালামু আলাইকুম আম্মু!"
****
“ জ্বী আলহামদুলিল্লাহ!"
***
“ হ্যা যাবো তো।কেন আম্মু?"
***
“ ওহ তার জন্য।এটা কোন ব্যাপার না। আমাদের উড়াল সময় তো রাতে আম্মু। মিটিং শেষ করেই বাড়ি ফিরবে। সমস্যা নেই তো!"
***
“ না।এখনো তৈরি করিনি।তবে এখন করতে বসবো।হয়ে যাবে সব।এত চিন্তার কিছু নেই।"
***
“ আচ্ছা ঠিক আছে রাখছি। আল্লাহ হাফেজ আম্মু, আসসালামু আলাইকুম।"
আফনূর ঘরে গিয়ে প্রথমে দর্পনের সামনে গিয়ে নিজের দিকে তাকালো।বেশ সময় পরখ করে সিদ্ধান্ত নিলো প্রাথমিক ঘরুয়া রুপচর্চার।ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে প্রয়োজনীয় সব বের করে মুখে প্যাক লাগিয়ে লাগেজ গুছাতে বসে পড়লো।কিছু সময় পর মুঠোফোনে টুং করে বার্তা ঢুকলো।হাত বাড়িয়ে মুঠোফোন ধরে দেখলো তাজিশের তরফ থেকে বার্তা এসেছে। মেসেঞ্জারে গিয়ে দেখলো একটা ছবি পাঠানো,
“ কি করছো ভাবীমনি?"
সুন্দর একটি পাহাড়ের দৃশ্য ধারন করেছে নিজ মুঠোফোন তাজিশ।সেটাই আপাতত আফনূর দেখছে বার্তার মাঝে। উত্তর দিলো,
“ লাগেজ গুছাই ভাইয়া! তুমি কি করছো? নিশ্চয়ই অনেক মজা করছো!"
“ হ্যা,বেশ মজা হচ্ছে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে উঠতে আমি আসমানেই উঠে যাবো মনে হচ্ছে।"
কথাটার পাশে একটা গাল ফুলানো ইমুজি। আফনূর হাসলো, এরপর উত্তর দিলো,
“ সে তুমি যেখানে খুশি যাও,যাওয়ার আগে আমার জন্য একটা ঝগড়া করার পার্টনার এনে রেখে তারপর যাও!"
“ ভালো থাকতে ভালো লাগে না তোমাদের, এইজন্যই বলে সুখে থাকতে ভুতে কিলায়"
“ সুখ তো তখনই প্রকৃত ভাবে উপলব্ধি হয় যখন মাঝে মাঝে দুঃখ দোলা দেয়!"
“ মনে হচ্ছে তোমাদের জ্বালায় আমার সন্ন্যাসী হ‌ওয়া আর হলো না।"
“ আগেই বলেছি যাই করো সমস্যা নাই,আগে আমার সঙ্গী এনে দিয়ে যাও।শোন আমি এসে যেন শুনি তুমি সঙ্গি চয়েস করে ফেলেছো। একদম তোমার বিয়েতে নাচাগানা করে তবেই কাজকর্মে জয়েন দিবো বলে দিচ্ছি।"
“ দেখা যাবে!"
“ দেখা যাবে মানে কি ভাইয়া? বলো ইনশাআল্লাহ!"
“ আচ্ছা ইনশাআল্লাহ!"
আফনূর তাজিশের বলার ভঙ্গিতে হাসলো।তাজিশ শুধালো,
“ কখন র‌ওনা দিবে?"
“ নয়টার সময়!"
“ ভাই মিটিং অফিস এক সাথেই শেষ করে আসবে!"
“ হ্যা তাই তো বললো।"
“ আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি গোছগাছ করো। সাবধানে যেও আর সাবধানে ভাইয়ার সাথে সাথেই থেকো।যাওয়ার আগে আমাকে ফোন করিও!"
“ আচ্ছা ভাইয়া,তুমিও সাবধানে থেকো। আসসালামু আলাইকুম। আল্লাহ হাফেজ!"
“ ওয়ালাইকুম আসসালাম, আল্লাহ হাফেজ।"
আফনূর কথোপকথন শেষ করতেই দেখলো তার মুখের প্যাক শুকিয়ে ত্বক টানছে। একেবারে গোসল শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। এরপর ধীরে ধীরে সব গুছাবে বলেই মনোস্থির করলো।
আফনূর নিজের ঘরে যাওয়ার পর আম্মা মোবাইলে ওয়াজ শুনছিলো,তখন‌ই আম্মার ফোনে রিং ঢুকে।চোখ বন্ধ হাতের ডান পাশে সোফায় রেখে ওয়াজ বাজাচ্ছিলো
 আম্মা,চোখ মেলে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে দেখলো জ্বলজ্বল করে জ্বলা নামটি,‘ মমতা ’ ,
“ আসসালামু আলাইকুম!"
আম্মাই আগে সালাম দিলো,অপরপাশ থেকে সালামের উত্তর এলো,সাথে জানতে চাইলো কুশলাদি, আম্মা হাস্যোজ্জ্বল মুখে উত্তর দিলেন,
“ আলহামদুলিল্লাহ আমরা সবাই ভালো,তোর বাড়ির খবর বল সবাই কেমন আছো? মায়ারা দুই ভাই বোন কেমন আছে?"
*****
“ তাই নাকি,কি খবর স‌ই!"
****
“ কি মনে করবো! তুই বল। মনে করার মতো কি আছে?"
****
“ মায়ার বিয়ে ঠিক করেছিস; 
আম্মা একটু থমকালো, মুহূর্ত পেরুতেই নিজেকে সামলে নিয়ে খুশি খুশি মনে শুধালো,
” তাই! কবে করলি?"
****
“ আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ!"
***
“ ছেলে কি করে?"
****
“ ঢাকায়; ক‌ওমী মাদ্রাসার শিক্ষক?"
****
“ বাহ চমৎকার। ভালো হয়েছে, খুবই ভালো হয়েছে।মায়ার জন্য আল্লাহর রহমতে খুবই ভালো সম্বন্ধ ঠিক করতে পেরেছিস।মায়ার সাথে এমন কাউকেই যায়।ওর মতো পর্দানশীল মেয়ের জন্য ঐ পরিবেশ,ঐ পরিবার একদম আল্লাহর রহমত হিসেবেই আসছে!"
****
“ কি বলিস স‌ই? মায়া আমার মেয়ের মতো।সেই কোন ছোট বেলায় কি ইচ্ছা ছিলো তা পূরণ হয়নি বলে আমি ওর মঙ্গল চাইবো না! আমার ছেলেদের ওর বিয়ে দিতে পারিনি তাই বলে ওর অন্যত্র ভালো বিয়ে হোক সেটা আমি চাইবো না? এই আমাকে তুই চিনিস!
যদি আমার ইব্রাহীম রাজি থাকতো আর তোর মায়া রাজী না থাকতো তাহলেও আমি জোর করতাম না তাহলে তাজিশ মায়ার বেলায় কেন জোর করবো? আমার ছেলে রাজী বলে,আর তোর মেয়ে কেন রাজী নয় তাই! মোটেই এমন কিছু আমি কখনো ভাবিনি। আমার কাছে যেমন আমার ছেলেদের ইচ্ছা,খুশি আগে তেমনি তোর মায়ার‌ও! সেখানে তো; যাই হোক শোন আমি এসব নিয়ে এখন আর ভাবি না। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে আল্লাহর হাতে সুতরাং আমি তুই চাইলেই হবে না। আল্লাহর ইচ্ছাও থাকতে হবে।
তুই মায়ার একটি অতি উত্তম সম্বন্ধ ঠিক করে ফেলছিস এটাই আপাতত আমার জন্য সবচেয়ে খুশির খবর।তা তারিখ কবে দিলি?"
***
“ মারহাবা,অতি উত্তম দিন।"
****
“ সবার কথা জানিনা, তাদের জীবনের ব্যস্ততা তো জানিস‌ই তবে আমি আর তোর দুলাভাই ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে অবশ্যই আসবো তুই নিশ্চিত থাক।"
***
“ হ্যা, হ্যা।হ্যারে ওর শ্বশুর বাড়িতে কে কে আছে?"
এরপর আম্মা আরো গল্প করলেন নিজের স‌ইয়ের সাথে।সব পরিস্থিতি অনুভব করে মায়া‌ই না করে দিয়েছিল।নিজ সিদ্ধান্ত জানানোর দিন সন্ধ্যায়‌ই তারা নিজেদের বাড়ি ফিরে যেতে চাইলে এই বাড়ির সবার অনুরোধে পরের দিন সকালে যায়। ঘটনার মাস পেরুতেই মায়ার বিয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হলো।
এই বিষয়ে তাজিশ ছিলো নিরুত্তাপ,সে রাজী হয়েছিল কেবল মায়ের জন্য।না হওয়াতে মায়ের জন্য খারাপ লাগলেও মনে মনে মায়ার সিদ্ধান্তে সে খুশি।তারাজ‌ও খুশি কারণ কোথাও না কোথাও একটু খচখচানি থাকতো ভেতরে ভেতরে।
স্লোগানে মুখরিত এলাকায় শুধু মুখেই না।মাইকেও চলছে সমানতালে স্লোগান, বিভিন্ন নেতাকর্মীদের বন্দনা তার পাশাপাশি এলাকায় চলমান নানা সংকটের সমাধান চাওয়ার এবং পাওয়ার প্রত্যাশা ও আশ্বাস! 
পলকে পলকে একেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় নেতা থেকে অতিথি নেতাকর্মীদের সমাগমে গমগম করছে রনি মার্কেট ব্রীজ থেকে কুড়ারঘাট হাসপাতাল খেলার মাঠ অবধি।এক জনের পথ এক জন দিয়ে যাচ্ছে ভাষন, দিচ্ছেন আশার বার্তা। পর্যায়ক্রমে এলো তারাজের পালা।
পাশে বসা নিজ পিতা এবং অন্য সুধী সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের দিকে চেয়ে হাসি বিনিময় করে অনুমতি চেয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। কোট টেনে আবারও ঠিক করে ধীর পায়ে হেঁটে ফুলেল মঞ্চের নির্ধারিত স্থান মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।এক মাঠের আনাচে কানাচে, আশপাশের বাড়ির ছাদ, বারান্দা,জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখা উৎসুক জনতার পানে নজর বুলিয়ে স্বভাব সুলভ হাসি দিয়ে নিজের বক্তব্য শুরু করলো সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে
“ আসসালামু আলাইকুম সবাইকে, আশাকরি সবাই আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছেন,আমিও আলহামদুলিল্লাহ আপনাদের দোয়ায় এবং আমার আম্মা আব্বার দোয়ায় আল্লাহর রহমতে অনেক অনেক ভালো আছি। আমার বক্তব্যের প্রথমে‌ই আমি কৃতজ্ঞ জ্ঞাপন করছি আমার মহল্লার, এলাকার সর্ব সাধারণ মানুষের প্রতি যারা নিজেদের প্রখর বুদ্ধি খাটিয়ে,সৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের মূল্যবান ভোট দিয়ে আমাকে জয়যুক্ত করেছেন এবং আমাকে আমার এলাকার মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।এই ঋণ শোধ যোগ্য নয়। তবুও বলবো আমাকে আপনাদের যেকোন ভালো কাজের দরকারে অবশ্যই স্মরণ করবেন, মনে রাখবেন আমি আপনাদের‌'ই ছেলে, আপনাদের‌'ই ভাই, আপনাদের‌ই বন্ধু! সুতরাং আমার কাছে আসতে কিংবা আমার কাছে নিজেদের আর্জি পেশ করতে কখনোই ভাববেন না, রাখবেন না কোন দ্বিধাবোধ।
এখন আমি বলছি আপনাদের উদ্দেশ্যে আমার কিছু ছোটখাটো উপদেশ, এখানে অনেক জ্ঞানী গুণী,বিবেচক এবং প্রবল চিন্তাশীল মানুষ উপস্থিত আছেন হয়তো। তাদের কাছে আমার এই অল্প বয়সের উপদেশ ভালো না‌ও লাগতে পারে তবুও বলছি, এই যে নিজেদের সৎ বুদ্ধি,কঠোর মনোভাব এবং উচিত উন্নত চিন্তা দিয়ে আমাকে জয়ী করে নিজেদের ছেলেকে নিজেদের ঘরের কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন ঠিক সেই বুদ্ধি,সেই চিন্তাশক্তির বলেই নিজের ঘরে থাকা আপনাদের আসল সন্তানদের খেয়াল রাখুন। তাদের গড়ে উঠার সঠিক পথ প্রদর্শক হোন। তারা কখন কোথায় কার সাথে কথা বলছে,কার সাথে মিশছে সেটার প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখুন। বন্ধু নির্বাচনে বিশেষ মনোযোগী হোন,তাকে পরামর্শ দিন, তাদের উপদেষ্টা হোন। আপনারা‌ই আপনাদের সন্তানদের আসল এবং একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে যান। ওদের আস্বস্ত করুন যে আপনারাই ওদের একমাত্র সৎ এবং আসল বন্ধু।যাতে ওরা আপনাদের কাছে নিজেদের খোলা ব‌ইয়ের মতোই খুলে রাখতে পারে।
আর হ্যা, অতিরিক্ত কিছু করবেন না। মনে রাখবেন অতিরিক্ত মানেই খারাপ! সেটা যাই হোক! অতি যার সাথে যোগ হবে তার দ্বারা ক্ষতি‌ই বেশি হবে। সুতরাং যাই করুন,আদর, স্নেহ,ভালোবাসা, শাসন সবটাই,সবটাই করবেন বরাবর! অতিরিক্ত করতে গেলেই হয় নষ্ট হবে না হয় ধ্বংস হবে! তাই বলছি সন্তানদের সময় দিন, তাদের বন্ধু হোন, তাদের পরামর্শক হোন, তাদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন , ভালো-মন্দ বলার আগেই বোঝার চেষ্টা করুন এবং সঠিক সময়ে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিন এখন কি করতে হবে,কি করলে আমার সন্তান সুপথে থাকবে।তার চেয়েও বড় কথা আপনার পরিবারের সাথে সংযুক্ত সেসকল মানুষ যাদের দ্বারা আপনার সন্তান বিপথগামী হতে পারে বলেও আপনি আশংকিত কিংবা বিপথে থাকা পরিজন আছে এমন কারো কাছে খুব বেশি ঘেঁষতে দিবেন না। মনে রাখবেন সৎ সঙ্গ‌ই সৎ পথে রাখে,অসৎ সঙ্গ বিপথে হাঁটায়!
এরপরও যদি কোন সাহায্য লাগে,আমার টিমের সাথে যোগাযোগ করবেন, আমাদের স্থানীয় একটি টিম গঠন হয়েছে যেটার নাম “রিসাইক্লিং টিন‌এইজ"
মানে আমরা আমাদের কৈশোরকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা করছি আজকের কৈশোরের হাত ধরেই। আশাকরি সবাই উপকৃত হবেন।
আর কিশোর ভাইয়া, কিশোরী আপুদের উদ্দেশ্য বলছি, তোমাদের বয়স এখন রঙ্গিন প্রজাপতির মতো, শুধু উড়তেই ইচ্ছা করবে।যা দেখবে তাই ভালো লাগবে,তাতেই আনন্দ পাবে কিন্তু সব ভালো লাগা,সব আনন্দ যে চিরস্থায়ী নয় ,সব যে আমাদের জন্য কল্যানকর নয় তা কিন্তু বুঝবে না।এটা বোঝার জন্য পরিপক্ক বুদ্ধি তোমাদের নাই,আর না হয়েছে সেই ধৈর্য্য তাই অনুরোধ করে বলবো নিজেদের মনের সব খুশি, সব খেয়াল নিজের পরিবারের বড়দের সাথে ভাগ করে নিবে,
তাদের জানাবে।দেখবে তারা তোমাদের জন্য প্রকৃত জিনিস, সঠিক ভালোবাসা নির্দিষ্ট করে খুঁজে বের করে তোমাদের সামনে উপস্থাপন করবে। সুতরাং বাবা মা'কে গুরুত্ব দাও বেশি বেশি। বন্ধু নির্বাচন দিতে পোশাক নির্বাচন সব কিছুই তারা তোমাদের জন্য বেস্টটা খুঁজে বের করবে। দেখবে জীবনে অনেক বড় হবে। অনেক উন্নতি করবে। খারাপ সঙ্গ এড়িয়ে যাবে।বেশি বেশি ব‌ই পড়বে,নামাজ, কোর‌আন তেলাওয়াত করবে। তোমরাই বাংলাদেশ, তোমাদের হাত ধরেই আগামীর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে,হয়ে উঠবো মধ্য আয়ের দেশে মধ্যে অন্যতম উদাহরনযোগ্য।আমি চাই আমার এলাকা থেকেই পরবর্তী মন্ত্রী,এমপি আসুক। আমার উত্তরাধিকার আমি কাকে দিতে পারবো তা নির্ভর করবে তোমাদের কর্মের উপর। ইনশাআল্লাহ তোমরা সব বদ সঙ্গ আজ থেকেই ত্যাগ করবে।
আজকে এখানেই রাখছি ইনশাআল্লাহ পরবর্তীতে অন্য কোথাও কথা হবে। ধন্যবাদ সবাইকে, আসসালামু আলাইকুম,ভালো থাকবেন সকলে।”

সমাপ্ত।

সারপ্রাইজ পর্ব

রাত আট বেজে এগারো মিনিট,
গ্রে রঙের টি শার্টের সাথে এ্যাশ ব্ল্যাক পাতলা লেদার জ্যাকেট,ব্ল্যাক গ্যাবাডিং প্যান্ট ,গ্রে ব্ল্যাক কেইডস,হাতে ব্ল্যাক লেদার বেল্টের ঘড়ি,মুখে ব্ল্যাক কটন মাস্ক। কাঁধে মাঝারী সাইজের ট্রাভেল ব্যাগ ঝুলিয়ে নিজেকে আয়নায় পূনরায় দেখে ধীম আওয়াজে বললো,
“ নূর,আমি নিচে অফিসে অপেক্ষা করছি,তুমি দ্রুত বের হ‌ও। ইমারজেন্সি প্রয়োজনীয় সব আমি নিজের ব্যাগেই নিয়েছি,তুমি শুধু তোমার হ্যান্ড ব্যাগ নিয়ে নামো।লাগেজ খালেদা আর সুফিয়া নামিয়ে দিয়েছে,ফয়সাল গাড়ীতে রেখে আসবে।"
সোফায় বসে আরো একবার পায়ের কেইডসের ফিতে টেনে দেখে নিলো শক্ত হয়েছে কি-না বাঁধন! আফনূর হিজাবের শেষভাগ ডান কাঁধে পিন মারতে মারতে শুধু বললো,
“ ওখে!"
দ্রুত কদমে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো।আম্মা বসার ঘরেই ছিলো।তারাজকে নিচে দ্রুত নামতে দেখে তিনিও উঠে দাঁড়ালেন, পিছু পিছু গেলেন।তারাজ মায়ের উপস্থিতি অনুভব করতেই বললো,
“ আমি অফিসে আছি আম্মা,কিছু কাজ ফিনিস করেই বের হচ্ছি। তুমি একটু আব্বার চেম্বারে অপেক্ষা করবে প্লিজ!"
“ ধীরে সুস্থে নামো।"
মুরাদ অফিসের ভেতরেই ছিলো।কিছু ডকুমেন্টস দেখছিলো।তারাজ দ্রুত কদমে নিজের আসনে বসে, মুরাদের উদ্দেশ্য করে বললো,
“ কখন এসেছিস?"
“ এইতো মিনিট দশ হলো!"
“ ওয়েল,ফাইলটা দে!"
“ এটা কি এখন‌ই সেরে যাওয়া খুব জরুরী?"
“ হ্যা। ফেলে রাখলেই জমে যাবে!"
“ সবকিছু আছে, ভালো করে দেখে এরপর সিদ্ধান্ত নে!"
তারাজ প্রত্ততর করলো না।এক মনে পুরোটা ফাইল পড়ে শেষ করলো, এরপর বন্ধ করে মুরাদকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ দিলশাদ তালুকদারের সাহসের যোগানদাতা তার নিজ পিতা খুলশিদ তালুকদার এবং তাকে সবরকম ভাবে সহাযোগীতা করেছেন তৎকালীন মন্ত্রী আঙ্গুর মাইজদি। অর্থাৎ মরহুম তালুকদার ঘটনার মূলহোতা আঙ্গুল মাইজদি ও অধ্যাপক খুলশিদ তালুকদার।"
টেবিলের উপর রাখা গোলকটা ডান হাতের মুঠোয় রেখে অবিরত ভাবে টেবিলের উপর ঘুরাচ্ছে,চেয়ারে গা এলিয়ে হালকা হেলে বসেছে। অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে মুরাদের দিকে চেয়ে কথাগুলো বললো।মুরাদ অস্ফুটে বললো,
“ ঘটনার শুরু, শেষ পর্যন্ত দেখতে উদগ্রীব হয়ে আছি!"
তারাজ মাথা দুলিয়ে বললো,
“ হুম, পারবি! 
বাই দা বাই,ঐ মেয়েটার খবর কি?"
“ সি ইজ নো মোর,তাকে নিজেদের কাজ শেষ করেই খতম করে দিয়েছে। তথ্য মতে মেয়েটাকে কোন উপজাতির হাতে তুলে দিয়েছিলো।তারাই নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে জিন্দা দাফন করেছে!"
আঁতকে উঠার মতো তারাজ চমে উঠলো‌।সোজা হয়ে বসে চঞ্চল কন্ঠে শুধালো,
“কি বলিস?"
“ হ্যা!"
“ দেয়ার'স ওয়াজ হেব্বি ডেঞ্জারেস!"
“ তুই বোধ হয় কম!"
মুরাদের টিটকারীতে তারাজ দম ফাটানো হাসিতে মেতে উঠলো।মুরাদ নিজেও হাসছে। কারণ একজন ভয়ংকর শয়তানি বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যখন এমন নিরীহের মতো আচরণ করে তখন না হেসে আদৌতেই পারা যায় না।
তারাজ বললো,
" বেচারা নাচনেওয়ালি,নাচেই ঠিক ছিলো।কি দরকার ছিলো রাজনৈতিক এসব কুটক্যাচালে জড়ানোর, অল্প কিছু টাকার লোভ‌'ই ছাড়তে পারলো না কিন্তু জীবনটা ঠিকই তুলে দিলো।রাইয়াজ হত্যাকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলো এই বার ডান্সার।"
“ লোভ, লোভ; এই লোভ‌ই তো সব নষ্টের গোঁড়া। লোভ লালসা না থাকলে কি এত গল্পের সৃষ্টি হতো!"
আফসোস করতে থাকলো মুরাদ।তারাজ মুরাদের আফসোসের সুরে তাল না মিলিয়ে নিজের কথা বললো,
“ আচ্ছা শোন, ডকুমেন্টসগুলো অতি সাবধানে পুলিশ সুপারের নিকট হস্তান্তর করবি। কাকপক্ষী‌ও যেন টের না পায়!"
“ আমি বোধ হয় এই বিষয়ে অভিজ্ঞ!"
“ ওয়েল, বেস্ট অফ লাক!"
“ আর ঐটাকে কি করবি?"
“ কে, মানজিত?"
“ হ্যা,ঐ রাস্কেলের নামটাই উচ্চারণ করতে ইচ্ছে করছে না আর তুই খাইয়ে দাইয়ে পালছিস! কেন?
তারাজ হালকা হাসলো,একটু সময় ভাবলো।যে কারণে বন্দি করে রেখেছে সেই কাজ মিটে গেছে।অযথা রিস্ক নেওয়ার কারণ নেই,যেহেতু সে বেশ কিছুদিন দেশের বাইরে অবস্থান করবে সুতরাং কোনরকম ক্লু এখানে রেখে না যাওয়াই উত্তম,
“ আমার আফ্রামগুলো অনেক দিন তাজা মাংসের স্বাদ পায়নি, ওদের হয়তো খুব ইচ্ছে করছে, ইচ্ছাটা পূরণ করে দেই!"
কথা শেষ করে তারাজ নিজের সেই লুকিয়ে রাখা ফোনটা বের করলো, নির্দিষ্ট নাম্বারে কোড ব্যবহার করে লিখলো,
“ ২০৮১৮১৬  ৮৯১৩!"
“ ইব্রাহীম!"
বাইরে থেকে হাঁক দিলেন ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার।তারাজ বাবার ডাকে সচকিত চোখে একবার দরজার দিকে  তাকালো।মুরাদ‌‌ও আতংকিত চোখে তাকিয়ে আছে সেদিকে। কিন্তু দরজায় কাউকে দেখতে না পেয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলো মেসেজ সিন হয়েছে কি-না?সবুজ এরো চিহিৃত দগদগে দাগে স্পষ্টত লেখা রয়েছে,সিনড' । লেখাটা পড়েই চাপ দিয়ে ধরলো,তিনটা অপশন ভেসে উঠেছে, ‘ ফরোয়ার্ড,ডিলিট,কপি ’ । ডিলিটে চাপ দিয়ে প্রেরনকৃত বার্তাটি মুছে ফেললো
এরপর ফোনটা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দিলো। দ্রুত পাসওয়ার্ড দিয়ে লকারে লুকিয়ে ফেললো নিজের কৃতকর্মের একমাত্র যৌক্তিক সাক্ষীকে।এই পাস‌ওয়ার্ড কেবল তারাজ‌ই জানে,তার ফিঙ্গার ছাড়া পাসওয়ার্ড দিয়েই খুলবে না।
তাই সে নিশ্চিত মনে যেতে পারে।
“ চল!"
“ হু!"
🖤🖤🖤🖤🖤🖤🖤🖤🖤🖤🖤🖤🖤🖤🖤
অফিস কক্ষ থেকে বেরিয়ে দরজার পাশে এক লোকের সাথে আলাপরত ইসহাক আবদুল্লাহকে দেখে তার দিকে এগিয়ে গেলো তারাজ। ছেলেকে দেখে নিজের কথা থামিয়ে বাম হাত বাড়িয়ে নিজের দিকে ইশারা করলেন! তারাজ এগিয়ে গিয়ে বাবার হাতের বেষ্টিনে নিজেকে আঁটকে নিলো।
“ একেতো চিনেন‌ই , আপনার এলাকার সাংসদ, দেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী!"
লোকটা সম্মতি সূচক মাথা দুলিয়ে বললেন,
“ হ্যা উনাকে আবার কেউ না চিনে! এবার তো বিপুল ভোটের ব্যবধানে জিতেছে। আবার একদম‌ই নতুন সাংসদ হয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেলো। সারপ্রাইজিং ইস্যু।সবার চোখে তার চেহারা ভাসে!"
লোকটার প্রশংসায় তারাজ লজ্জাসীন চোখ নামি নামিয়ে ফেললো। ইসহাক আবদুল্লাহ গর্বে বুক ফুলিয়ে ছেলেকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বললেন,
“ হ্যা,উনি‌ই হচ্ছেন আমার বড় পুত্র, ইব্রাহীম তারাজ ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ খন্দকার।"
“ আপনার বড় ছেলে!"
“ হ্যা, আমার দুই পুত্রের মাঝে এই বড়,আর মেয়ে সবার বড়,ছোট ছেলে একটা আইটি ফার্মে আছে।
আপনার ভাবী,দুই পুত্র,এক পুত্রবধূ,এক কন্যা,কন্যা জামাতা আর একমাত্র নাতী,এই নিয়ে আলহামদুলিল্লাহ এই অধমের সুখের সংসার।আমি ভাই রাজনীতি করি আর যাই করি আমার কাছে আগে আমার সংসার,ছেলেকেও তাই বলেছি। রাজনীতি করো আর যাই করো সংসার যেন ঠিক থাকে।”
“থাকবে থাকবে!বাবার অনুসারী তো, ইনশাআল্লাহ থাকবে। তাছাড়াও চেহারা দেখলেই বোঝা যায় দায়িত্বশীল পুরুষ।"
তারাজ বাবা ও তার পরিচিতর  আলাপে মজতে পারলো না।তার সময় চলে যাচ্ছে। উসখুস করতে থাকলো। ইসহাক আবদুল্লাহ ছেলের মনের কথা বুঝতে পারলো।তিনি তারাজকে বাহুবন্ধন থেকে ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ তোমার সময় কয়টায়?"
তারাজ ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে বললো,
“ এখন‌ই র‌ওনা দিতে হবে।
নূর বের হচ্ছে না কেন?"
সিঁড়ির দিকে চেয়ে অযথাই প্রশ্নটা করলো,তারাজের প্রশ্ন শেষ হতেই নূরের আগমন ঘটলো। আম্মা দরজার ভেতরেই মুখে ওড়না চেপে দাঁড়িয়ে আছেন। যেহেতু অফিসের এই দিকে সবসময় লোকজন থাকে তাই আম্মা পর্দাবিহীন বের হয় না। কিন্তু এই সময়ে না বের হয়েও পারা যায় না তাই ওড়না দিয়ে নিজেকে ঢেকে বের হয়েছে।
“এত সময় লাগলো কেন তোমার?দেরি হয়ে যাচ্ছে তো আমাদের!"
“ সরি,আমি আম্মার সাথে কথা বলেছিলাম তাই দেরি হয়ে গেছে।"
“ আফনূর!"
“জ্বী আব্বা!"
“ এদিকে আসো আম্মা!"
শ্বশুরের ডাকে সাড়া দিয়ে আফনূর তার পানে এগিয়ে গেলে ইসহাক আবদুল্লাহ আফনূরের মাথায় হাত রেখে স্নেহ ভরা চোখে চেয়ে পরখ করে নিলো।
গ্রে কুর্তির সাথে কালো সালোয়ার, হাঁটু সমান কুর্তির ওপর পায়ের গোড়ালি অবধি লম্বা কোটি, কাঁধে কালো লেডিস ব্যাগ,চোখে কেবল কাজল দেওয়া,মুখে কালো মাস্ক।হাতে তাদের পড়িয়ে দেওয়া সেই চুড়িখানা। আফনূর শ্বশুরের স্নেহ ভরা চাহনিতে হেঁসে ফেললো, আহ্লাদি গলায় শুধালো,
“ কি হয়েছে আব্বা?"
“ মাশাআল্লাহ আমার মা'কে আসলেই আমার মায়ের মতোই লাগছে।"
“ মা'কে তো মায়ের মতোই লাগবে আব্বা; আপনি কিন্তু নিজের খেয়াল রাখবেন। মায়ের সাথে একদম খোঁচাখুঁচি করবেন না।আর হ্যা দয়া করে এই কয়েকটি দিন একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবেন,বুবুন‌ও চলে আসবে হয়তো এই সপ্তাহের মধ্যেই।"
“ দেখেছেন কিভাবে শাসন করে!"
ইসহাক আবদুল্লাহ ঐ লোকটার উদ্দেশ্য বললো, লোকটা ঝকঝকে দাঁত বের করে হেসে দিলেন, বললেন,
“মেয়েরাই বড় মা হয়ে যায়।এটাই তো স্বাভাবিক!
আপনি সৌভাগ্যবান যে আপনার ঘরে এমন একটা রাজকন্যা আছে।"
“ হ্যা আলহামদুলিল্লাহ, আমিই আসলেই সৌভাগ্যবান যে আমার ঘরে এরকম দুটো রাজকন্যা দিয়েছে।"
“ দুটো?আপনার না একটাই মেয়ে?"
“ হ্যা ছিলো এক সময় একটি মেয়ে,পরে মনে হলো আরেকটি মেয়ে থাকা জরুরি তাই ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দিলাম,নিয়ে এলাম আরেকটা রাজকন্যা।"
“ ওহ, আমি তো ভাবলাম।যাই হোক এটাই কি আপনার মেয়ে?"
“ হ্যা,ছেলে বিয়ে করিয়ে এই মেয়েই এনেছি।"
“ মাশাআল্লাহ,ছেলের ব‌উ তবে! "
“ হ্যা, আমার পুত্র বধূ কিন্তু ল‌ইয়ার!"
“ তাই নাকি, তা কোথায় বসো মা তুমি?"
“ হাইকোর্টে আংকেল!"
“ তোমার একটা কার্ড দিও তো, যাতে যেকোন দরকারে তোমার সাথে কথা বলতে পারি।"
" হ্যা হ্যা আমি দিয়ে দিবো নে,ওরা এখন বের হচ্ছে!"
“ কোথায় যাচ্ছো মা?"
“ ওরা বেড়াতে যাবে,যাও আম্মা।তোমাকে পরিচয় করানোর জন্য‌ই থামিয়েছি্!
তারাজ আফনূরের জন্য গ্যারেজের দিকে অপেক্ষায় আছে, এদিকে বাইরে থেকে রিক্সা থামার শব্দ এলো। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে সেদিকে তাকিয়ে ফয়সালের উদ্দেশ্য বললো,
“ এখন আবার এই সময়ে কে আসছে?"
“ গিয়ে দেখতেছি ভাই!"
ফয়সাল দু কদম এগুতেই দৌড়ে কাউকে আসতে দেখে থেমে গেল।চেনা মুখ।ঘামে সিক্ত ফর্সা বদন লালচে আভায় ছেয়ে আছে।বাইরের এল‌ইডি বাতির আলোয় স্পষ্ট তা ফুটে উঠেছে।
“ ভাইয়ারা কি চলে গেছে?"
“ না। আপনে এমন দৌড়িয়ে আসছেন কেন?"
“ আর বলিয়েন না সেই কোন সন্ধ্যায় র‌ওনা দিয়েছিলাম, রাস্তায় এত জ্যাম; বলার বাইরে! ভাবলাম আপু ভাইয়ার সাথে দেখা করে যাই ওরা যাওয়ার আগে।"
“ ওহ আসেন আসেন,এখনি র‌ওনা দিবে।ভাবী ভেতরে,ভাই গ্যারেজে গাড়ী বের করতাছে!
“ কে রে ফয়সাল?"
“ ভাই!"
“ আফির!"
 ফয়সালের থেকে উত্তর পাওয়ার আগেই তারাজ, মুরাদ এগিয়ে এসেছে। ঘর্মাক্ত শরীরে হাঁপানির রোগীর মতো হাঁপাতে থাকা আফিরকে দেখে তারাজের ভ্রু কুঁচকে গেল। খুশির সাথে প্রশ্ন জাগলো মনে,ভীত হলো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছুর জন্য। কিন্তু তারাজকে নিশ্চিত করলো আফিরের মুখের হাসি, ঠোঁট এলিয়ে তারাজের সামনে এসে বললো,
“ ভাইয়া আসসালামু আলাইকুম!"
“ ওয়ালাইকুমুস সালাম।"
বলেই তারাজ আফিরকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরলো।আফির‌ও তারাজের পিঠে হাত রেখে প্রশান্তির শ্বাস ছাড়লো।
“ এত হাপাচ্ছো কেন?"
“ ছয়টা অবধি ক্লাস ছিলো,সেই ক্লাস শেষ হতেই পৌঁনে সাতটা বাজিয়ে দিলো ইডিয়ট প্রফেসর। এরপর নিলাম রিক্সা,এত জ্যাম? বলার বাইরে; আজিমপুরেই এক ঘন্টার মতো বসেছিলাম,ভেবেছি হয়তো দেখাই হবে না।তাই নিউ পল্টন ঢুকতেই জ্যাম দেখেই নেমে পড়েছি, অনেক দ্রুত হেঁটে সিকশন এসে রিক্সা নিলাম,আবার রনি মার্কেট ব্রীজের উপর আঁটকে পড়েছি জ্যামে। বাড়ির সামনে এসে আমার কিছুতেই তর স‌ইছিলো না তাই দৌড়ে ঢুকেছি!"
“ আস্তে, দম নাও,আমরা এখনো বের হতে পারিনি। তবে বের হবো একটু পর।"
“ আপাই কোথায়?"
“ আছে ভেতরেই,সবার থেকে বিদায় নিচ্ছে।যাও ভেতরে যাও।আম্মাও নিচে আছে!"
“আচ্ছা।"
আফির ভেতরে ঢোকার আগেই আফনূর বেরিয়ে এলো। ভাইকে দেখে খুশিতে উতলা হয়ে ছুটে এসে গলায় জড়িয়ে ধরে হেসে দিলো।আফির‌ও এতদিন পর বড় বোনের ছোঁয়া পেয়ে আপ্লুত হয়ে গেল।
“ এখন এই সময়ে তুই এখানে ভাই?"
“ আমি ভাবলাম তোমাদের সাথে দেখা করে যাবো।আবার কবে দেখা হবে কে জানে?"
“ মাত্র পনেরো দিন পরেই আমরা চলে আসবো ভাই!"
“ তাও।আমি যদি তোমাদের সাথে এয়ার পোর্টে অবধি যাই কোন সমস্যা হবে?"
“ কোন সমস্যা হবেনা। বোনের সাথে যাচ্ছো সমস্যা কিসের?"
পেছন থেকে কথাটা বললো তারাজ।আফির বোনকে ছেড়ে দুলাভাইয়ের দিকে চেয়ে থেকে বললো,
“ধন্যবাদ ভাইয়া!
আমি আন্টির সাথে মিট করে আসি।"
“ হু!
চলো আমরাও আম্মার সাথে শেষ দেখা করে আসি!"
“ জ্বী।"
আফিরের পিছু পিছু তারাজ আফনূরকে নিয়ে ভেতরের দিকে গেল।যাওয়ার পথে মুরাদকে বললো,
“ গাড়ি বাইরে বের করতে বল সবাইকে।এখন‌ই আসছি!"
“ আচ্ছা!"
ফয়সাল আর মুরাদ গাড়ি নিয়ে বাইরে বের হয়ে গেল। ওদের গাড়ির পিছনে আরো দুটো গাড়ি গেল। সরকারের তরফ থেকে পাওয়া প্রশাসনিক গাড়ি। তারাজ, আফনূর,আফির, আম্মার সাথে দেখা করে কথা বলে তারাও বেরিয়ে পড়লো।
গাড়ীর সামনের সিটে মুরাদ আর ফয়সাল, পিছনে তারাজ, আফনূর,আফির।
আফনূর বললো,
“ এত রাত অবধি কিসের ক্লাস নিলো আজ?মাত্রই তো পরীক্ষা শেষ হলো।এখন‌ই এর মধ্যেই আবার এত চাপ দিয়ে কি ক্লাস নেয় এত!"
বোনের কথার পিঠে আফির উত্তরহীন,আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই মুরাদ বললো,
“ সব বিষয়েই ভীষন সিরিয়াস স্টুডেন্ট আমাদের আফির ভাইজান ভাবি,কোন কিছুতেই পিছিয়ে পড়তে চায় না তাইতো রাত জেগেও ক্লাস করে বাচ্চাটা!"
“ হ্যা তাতো জানি কিন্তু তাই বলে এখন‌ই? গত পরশু মাত্র ওর সেকেন্ড প্রুফ শেষ হয়েছে এর মধ্যেই কিভাবে এত দ্রুত একদম রাত জাগা ক্লাস শুরু হলো?কিরে?"
আফনূরের কথায় তারাজ,মুরাদ হেসে দিলো। এত জোরে যে মুরাদকে গাড়ির ব্রেক কষতে হলো।ফয়সাল অবুঝের মতো নিজের দুই সিনিয়র ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।সে কিছুই বুঝতে পারছে না।আফির ক্লাস করতেছে ভালো কথা, এখানে এত হাসার কি হলো? আফিরের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করে দেখলো তার মুখটা লটকানো,সে মাথা নিচু করে রেখেছে।কিছু কি লুকানোর চেষ্টা করছে।ফয়সাল নিজেই বুঝে নিলো,কিছু আছে যা সে জানে না।
“ আশ্চর্য‌ এভাবে হাসছেন কেন আপনারা?"
মুরাদ নিজেকে সামলে নিয়ে আবারো গাড়ি চালানোয় মনোযোগ দিলো।তারাজ আফনূরের দিকে চেয়ে বললো,
“ আমার সহজ সরল ব‌‌উ,রাত জেগে ক্লাস মানে এখনো বুঝে নাই!"
“ এভাবে না পেঁচিয়ে সোজাসুজি বলেন না!"
তারাজ ঠোঁট চ‌ওড়া করে প্রাণখোলা হাসি দিলো।আফির এখনও মাথা নুইয়ে রেখেছে।
আফনূর একবার তারাজকে, আরেকবার আফিরকে দেখে বললো,
“ স্পষ্ট করে বলুন তো কি বলতে চাইছেন আপনি?""
“ আরো বোকা ল‌ইয়ার রাতে কোনো প্রফেসর ক্লাস নিক আর না নিক প্রফেসরের মেয়ে তো নিতেই পারে। সেক্ষেত্রে স্টুডেট যদি হয় প্রেমিক পুরুষ, তো সে পরীক্ষার পর দিন কেন পরীক্ষা স্থগিত করে হলেও সেই ক্লাসে এটেন্ড করবে।"
“মানে ! আফির তোর ভাইয়া এসব কি বলছে!"
আফিরের মনে হলো আগ বাড়িয়ে বোন আর বোন জামাইকে এগিয়ে দিতে এসে নিজেই বিপদে পড়ে গেলো।ইস্ দুলাভাই কি করে জানলো।আফিরকে জেরা করতে দেখে তারাজ নিজেই উত্তর দিলো,
“ তোমার ভাই মেডিকেলে দ্বিতীয় প্রফ শেষ করে এখন তৃতীয় ইয়ারে আছে,সো একটু আধটু করতেই পারে।তা নিয়ে অযথা সিনক্রিয়েট করার মানেই হয় না।"
“ তাই বলে এখন‌ই?  সবচেয়ে বড় কথা মেয়ে কেমন না কেমন!"
“ ও ভালো, খুব ভালো মেয়ে আপাই!"
“ তুই চুপ থাক,তুই কিছু বুঝিস? এখন‌ও মানুষ চিনতে শিখেছিস!
“ ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের ননদ সাজছো দেখি। না দেখেই মন্তব্য করছো?"
“এমন কিছু নয়,আমি শুধু চাই আমার ভাইয়ের মনে কোন দাগ না পড়ুক ।আর তাই..
“ প্রফেসর ডাঃ ওয়ালিউল্লাহ হকের একমাত্র কন্যা সন্তান উষা হক।যথেষ্ট মার্জিত আর শালীন। দেখতে অতিব সুন্দরী আর গুনবতীও।ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রথম বর্ষের প্রথম টার্ম দিয়ে আপাতত ফলাফলের জন্য অপেক্ষমাণ। ক্লাসে টপ শিক্ষার্থী। উচ্চ মাধ্যমিকের মেধাতালিকায় সারাদেশে ২৩ নাম্বার ছিলো, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে সারাদেশে ৩ নাম্বারে ছিলো। তোমার ভাইয়ের সাথে মাস পাঁচেক ধরে সম্পর্কে আছে।"
তারাজের গড়গড় করে বলা বিস্তারিত শুনে আফনূরের মুখ হা হয়ে গেল।ও বিস্মিত চোখে শুধালো,
“ আপনি এতকিছু কি করে জানেন?"
তারাজ এক চোখ উপর আর অন্য চোখ নিচে রেখে ইশারা করলো‌। আফনূর নিজেই নিজের প্রতি বিরক্ত হলো।তারাজকে জিজ্ঞেস করছে কি করে জানে? একজন ব্যারিষ্টার, সাংসদ, মন্ত্রী তিনি।যদি এই সামান্য ঘিলু না থাকতো তবে কি এতবড় পদের জন্য নির্বাচিত হতো? 
আফিরের দিকে ফিরে বুকে হাত বেঁধে বললো,
“ তুই আমাকে হতাশ করলি ভাই!"
আফির অপরাধী চোখে আফনূরের দিকে তাকালো, লজ্জিত ভঙ্গিতে বললো,
“ সরি আপাই!"
“ এখন সরি বলে কি লাভ হবে? তুই ওয়াদা করেছিলি প্রেম করলে সবার আগে আমাকে বলবি। কিন্তু দেখ পাঁচ মাস হয়ে গেছে,আমার আগেই তোর দুলাভাই এমনকি মুরাদ ভাই পর্যন্ত জেনে গেছে অথচ আমি কিছুই জানলাম না, আর না টের পেলাম!"
“ আমি সত্যি‌ই জানি না ভাইয়ারা কিভাবে জানলো? 
আমরা তো নিজেদের বিষয়টি গোপনে রেখেছি এখনো,ইভেন আমাদের বন্ধু বান্ধবীরাও জানে না।"
“ কেন?"
“ কারণ আমি চাই না । এভাবে প্রকাশ্যে নিজেদের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে অন্যদের আলোচনার জন্য কোন টপিক দিতে চাই না। তাছাড়াও প্রফেসর হক প্রেম ভালোবাসা পছন্দ করেন না।উনি জানলে নিশ্চয়ই সমস্যা হবে তাই...
" উনি জানেন!"
মুরাদের কথায় তারাজ ব্যতিত সবাই চমকে উঠলো।আফির ভীত চোখে মুরাদের দিকে চেয়ে আছে।মুরাদ নিজের কথা বাড়ালো,
“ তোমার কি মনে হয়, উনার মেয়ের প্রয়োজন উনি জানেন না?রাত বিরাতে মেয়ে এটা দরকার ওটা দরকার বলে বেরিয়ে যায় আর উনিও সেটা নিরবে মেনে নেয়! তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগেনি কিভাবে?"
আফনূর মুরাদের থেকে চোখ সরিয়ে তারাজকে উদ্দেশ্য করে শুধালো,
“ আপনি কথা বলেছেন উনার সাথে?"
“ আমি একা নই আব্বু আম্মুও সাথে ছিলো।"
“ মানে কি সবাই জানে শুধু আ..
“ সবাই জানে না।কারণ এখনও তুমি জানো নি।ইভেন আমি,মুরাদ,আব্বু আম্মু,খালাম্মি  আর ডাঃ হক ও মিসেস জেনী ছাড়া আর কেউই জানে না।সো সবাই জানে না।"
“ আপনি শুরু থেকেই সব জানতেন অথচ আমাকে একবারও বলেননি! কিন্তু কেন?"
“ কারন তাহলে তুমি পাঁচ বছরের আগেই সবাইকে জানিয়ে দিতে। তাছাড়াও তোমার ভাই যদি এটা জেনে যেতো তবে এই যে লুকোচুরি করা,ভয়ে ভয়ে থেকে দুজনের ক্যারিয়ার গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়, সবটাই ভেস্তে যেত এবং এখন থেকেই যাবে।এখন তারা অবলিলায় প্রেম কাহিনী রচনায় ব্যস্ত থাকবে।"
“ এমন কিছু করবো না দেখিয়েন।ভালো ফলাফল নিয়েই মেডিকেল কমপ্লিট করবো ইনশাআল্লাহ!"
“ ইনশাআল্লাহ,দেখা যাক। শুধু এতটুকু বলছি যদি উষার ফলাফল খারাপ হয় এবং আপনি দূর্দান্ত মার্কস নিয়ে এমবিবিএস সম্পন্ন না করতে পারেন তবে কোন মতেই ডাঃ হক আপনার হাতে নিজের রাজকন্যা সপঁবেন না। এটা উনি স্পষ্ট বাংলায় বলে দিয়েছেন।"
ভয়ে আফিরের মুখটা ছোট্ট হয়ে গেল।মিনমনি করতে করতে হাত ঘষতে থাকলো,জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো।কালো দর্পন পেরিয়ে শুধু রাতের ঢাকার লাল নীল হলুদ বাত্তির কারসাজি দৃশ্যত হচ্ছে।
আফিরের দিকে তাকিয়ে ফয়সাল বললো,
“ তলে তলে আফির ভাইও টেম্পু চালায় অথচ আমরা তাকে কত নিরীহ ভাবতাম, আসলে চোখে চশমা পড়লেই নিরীহ হয় না!চশমার ভেতরেই থাকে নারী বদের মেডিসিন!"
ফয়সালের কথায় তারাজ,মুরাদ আবারও শব্দ করে হাসলো।আফির লজ্জা আর ভয়ে আর এদিকে তাকাচ্ছেই না।এক মনে কালো কাঁচের বাইরে থাকা ঐ কুটকুটে অন্ধকারকে অবজ্ঞা করে রঙের ভেলায় ভাসিয়ে রাখা রঙিন ঢাকাকে দেখতে লাগলো।
ভাইয়ের চুপসে যাওয়া বদন দেখে করুন চোখে তারাজের দিকে তাকালো আফনূর, আফনূরের মুখোভঙ্গি দেখে তারাজ মুচকি হাসলো। আফনূর গাল ফুলালো।তারাজ চোখ মারলো।তারাজের দুষ্টুমি দেখে আফনূর হা করে রইলো।তারাজ হাত বাড়িয়ে আফনূরের মুখ বন্ধ করে দিলো। লজ্জায় আফনূর সামনের সিটে বসা ফয়সাল,মুরাদকে দেখলো। তারা সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে তাদের মনোযোগ নেই বোঝাই যাচ্ছে সুতরাং লজ্জা পাওয়ার দরকার নাই। কিন্তু আসলেই কি তাই? মুরাদ,ফয়সাল সব‌ই দেখেছে তাই তারা ঐদিকে ঘুরে মিটিমিটি হাসছে যা অন্ধকারের কারণে আফনূর দেখতে পায়নি।
বিমানবন্দরে নেমে চেকিং দিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাওয়ার পূর্বে আবারও উপস্থিত সবার থেকে বিদায় নিলো।মুরাদ গলায় জড়িয়ে বললো,
“ সাবধানে থাকিস, এদিকের চিন্তা করার দরকার নেই, নিজেদের মতো সময়টা উপভোগ করবি।"
তারাজ মুরাদের কথার উত্তরে হাসি দিয়ে বললো,
“ কাল সন্ধ্যায় তৈরি থাকবি!"
মুরাদ ভ্রু কুঁচকে শুধালো 
"কেন?"
“ কারণ আমি এসে তোকে পাঠাবো পিচ্চি ভাবীর সাথে!"
তারাজ উত্তর দিয়েই হাসলো। মুরাদ বুঝতে না পেরে আবারো জিজ্ঞেস করলো,
“মানে? বুঝলাম না!"
“ কাল আম্মা,আব্বা আর খালাম্মা যাবে পিচ্চি ভাবির বাবা মায়ের সাথে চুড়ান্ত আলোচনা সারতে, উহুম কালকেই আপনার কাজ তামাম করে তবেই আসবে!"
“ মানে কি ভাই?"
ফয়সাল জিজ্ঞেস করলো,
তারাজ মুরাদকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে বললো,
“ মানে এই কাল থেকে তোর দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল, পিচ্চি ভাবী কলেজে যায়, কোথায় কখন কিভাবে যায় তার খেয়াল রাখতে হবে না!আরে ইডিয়ট তোদের পিচ্চি ভাবী সত্যিকার অর্থেই পিচ্চি ভাবী হয়ে যাবে!কালকেই এই বলদকে জবাই করা হবে!"
ফয়সালের ব্যাক্কল মার্কা প্রতিক্রিয়া দেখে তারাজের শেষ লাইনগুলো ছিলো।মুরাদ আশ্চর্যের চুড়ান্তে, আফনূর মিটিমিটি হাসছে,আফির উচ্ছাস প্রকাশ করে বললো,
“ আরেব্বাস,মুরাদ ভাইয়ার বিয়ে।হেব্বি মজা হবে তো; কিন্তু ভাইয়া আর আপাই তো থাকবেন না!"
“ সমস্যা নাই,ভাবীর খুব শিগগিরই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হবে। তো আমি চাই পরীক্ষার আগেই বিয়ের কাজটা সেড়ে রাখতে যাতে মুরাদের পক্ষে ভাবী কে পরীক্ষার সময় দেখতে সুবিধা হয়।আর এখন তো শুধু আকদ হচ্ছে, অনুষ্ঠান করে উঠিয়ে আনবো আমি আসার পরেই। আমার ভাইয়ের বিয়েতে আমি নাচবো না তা কি করে হয়! কবজি ডুবিয়ে খাবো, নাচগান সব করবো তবে আপাতত তোমরা শুধু আকদের আয়োজন করো।আমি ছোটকেও বলেছি আজ রাতেই ব্যাক করতে। ইনশাআল্লাহ সব যেন ঠিক হয়!"
“ নো চিন্তা ডু ফুর্তি ভাই,আমি আর ছোটভাই,আফির ভাই মিলে সব ম্যানেজ করে নিবো।আর বাকী ছেলেরাও তো আছে!"
“ হ্যা গুড!"
মুরাদ খুশিতে কাঁদো কাঁদো হয়ে তারাজের গলায় ঝুঁলে পড়লো।বললো,
“ শুকরিয়া বলবো না। তোর বিয়ের জন্য আমি অনেক কষ্ট করছি!"
মুরাদের কথায় সবাই হেঁসে দিলো।তারাজ পিঠ চাপড়ে বললো,
“ যা ফাইনালি তোর‌ও বাসর হচ্ছে!"
তারাজের কথায় হাসির রোল আরেকবার পড়লো।মুরাদকে ছেড়ে আফিরকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো তারাজ, বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে কানে কানে ছোট্ট করে বললো,
“ থ্যাকংস ফর এভিরিথিং ভাই!"
“ ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবেন না ভাইয়া।আমি সব আমার বোনের সুখের জন্য করেছি। দরকার হলে ভবিষ্যতে আরো করবো!"
“ সাবধানে থেকো। পড়াশোনায় বেশি মনোযোগ দেও নয়তো সত্যি উষা পাখিকে ছাড়তে হবে, এবং এটা আমি‌ই করবো!"
“ ভাইয়া প্লিজ!"
আফিরকে ছেড়ে দিয়ে,আফিরের গালে হাত রেখে শেষ লাইনটা বললো,আফির ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো হয়ে অনুরোধ করছে।সে আফিরকে ছেড়ে ফয়সালের দিকে চেয়ে বললো,
“ আমার সবাইকে দেখে রাখার দায়িত্ব তোর হাতে, যেভাবে রাখছি সেভাবেই নিবো মনে থাকে যেন।"
প্রবল আত্নবিশ্বাস হয়ে ফয়সাল ওয়াদা করলো,
“ জান দিবো তবুও আপনার একটা কাঠিও নড়বড়
করতে দিবো না ভাই।"
তৃপ্তির হাসি দিয়ে ফয়সালেল গলা ধরে টান দিয়ে নিজের বুকের উপর ফেললো।ফয়সাল‌‌ও নিজের প্রানপ্রিয় ভাইয়ের বুকে লেপ্টে গেল।
আফির গিয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“ সাবধানে থেকো,আর ভাইয়ার সাথেই থেকো।একা একা কোথাও যাবে না।"
আফনূরের চোখ ছলছল করে উঠলো,সে ভেজা চোখে ছোট ভাইয়ের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বললো,
“ মনে হচ্ছে তুমি আমার বড় ভাই।ছোট বোনকে বিয়ের পর বিদায় দিচ্ছো।"
আফির আফনূরের দিকে পা থেকে মাথা অবধি তাকিয়ে বললো,
“ বড়‌ই তো! দেখো আমি তোমার চেয়ে কত বড়? "
লম্বায় প্রায়‌ই ছয় ফুট ছুঁইছুঁই আফিরের কাঁধের নিচে পড়ে থাকা আফনূরের চোখ মুখ কুঁচকে গেলো।সে নাক খিচে বললো,
“ লম্বায় বড় হলেই কেউ বড় হয়না।বয়সে বড় হতে হয় তবেই না..
“ কে বলছে তোমারে? লম্বাতেই বড় হয়,বয়স কে দেখে!"
“ আচ্ছা আপনি তবে এখন থেকে আমার সুমন্ধি 
ঠিক আছে? এখন তাহলে আমরা যাই সুমন্ধি ভাইয়া!"
“ ওকে, আমার বোনকে দেখো রেখো বুঝেছো, নয়তো!"
আফির দুষ্টুমি করে কথাটা বললো,ওর সাথে সবাই হেসে দিলো। সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল ভেতরে।
কোন্যা.....
কোনিয়া বা কোন্যা বৃহত্তম প্রদেশের কেন্দ্রে অবস্থিত, বৃহত্তম সমভূমিতে ( কোনিয়া সমভূমি ), এবং তুরস্কের সপ্তম সর্বাধিক জনবহুল শহর। শহরটি মধ্য আনাতোলিয়া অঞ্চলের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত এবং প্রদেশের সর্বদক্ষিণে বৃষ পর্বতমালা দ্বারা ঘেরা । চলুন কোনিয়া সম্পর্কে একটু জানা যাক,
দ্বাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কোনিয়া তার সম্পদ এবং প্রভাবের উচ্চতায় পৌঁছেছিল যখন রুম এর সেলজুক সুলতানরাও তাদের পূর্বে আনাতোলিয়ান বেইলিকদের , বিশেষ করে ডেনিশমেন্ডদের , এইভাবে কার্যত সমস্ত পূর্ব আনাতোলিয়ার উপর তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে । তারা ভূমধ্যসাগর ( অ্যালানিয়া সহ ) এবং কৃষ্ণ সাগর ( সিনোপ সহ ) বরাবর বেশ কয়েকটি বন্দর শহরও অধিগ্রহণ করে এবং এমনকি ক্রিমিয়ার সুদাক-এ একটি সংক্ষিপ্ত পদাধিকার লাভ করে । এই স্বর্ণযুগ 13 শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। [ তথ্যসূত্র উইকিপিডিয়া]
পারস্য ও মধ্য
 এশিয়া থেকে অনেক পারস্য ও পারস্যায়ণ তুর্কি আক্রমণকারী মঙ্গোলদের থেকে পালাতে বা একটি নতুন প্রতিষ্ঠিত রাজ্যে শিক্ষিত মুসলমানদের সুযোগ থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আনাতোলিয়ান শহরে চলে আসে । [২৫]
1307 সালে আনাতোলিয়ান সেলজুক সালতানাতের পতনের পর , কোনিয়া কারামানিদের রাজধানী হয়ে ওঠে , একটি তুর্কি বেলিক , যা 1322 সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল যখন শহরটি কারামানওলুর প্রতিবেশী বেইলিক দ্বারা দখল করা হয়েছিল । 1420 সালে, কারামানওলুর বেইলিক অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং 1453 সালে, কোনিয়া কারামান আইলেটের প্রাদেশিক রাজধানী করা হয় ।
উসমানীয় শাসনের অধীনে , কোনিয়া সুলতানের পুত্রদের ( শেহজাদে ) দ্বারা শাসিত হয়েছিল , যার শুরু শেহজাদে মুস্তফা এবং সেহজাদে সেম (সুলতান মেহমেদ দ্বিতীয়ের পুত্র ), এবং ভবিষ্যতের সুলতান সেলিম দ্বিতীয়ের সাথে অব্যাহত ছিল ।
1483 এবং 1864 সালের মধ্যে, কোনিয়া ছিল কারামান আইলেটের প্রশাসনিক রাজধানী । সংস্কারের তানজিমাতের সময়কালে, এটি কোনিয়ার বৃহত্তর ভিলায়েতের আসনে পরিণত হয়েছিল যা 1864 সালে প্রবর্তিত নতুন ভিলায়েত ব্যবস্থার অংশ হিসাবে কারামান এয়ালেটকে প্রতিস্থাপন করেছিল ।
1832 সালে কাভালার মেহমেদ আলী পাসা আনাতোলিয়া আক্রমণ করেছিলেন যার পুত্র, ইব্রাহিম পাসা , কোনিয়া দখল করেছিলেন। যদিও ইউরোপীয় শক্তির সাহায্যে তাকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, তারপরে কোনিয়া পতনের দিকে চলে যায়, যেমনটি ব্রিটিশ ভ্রমণকারী উইলিয়াম হ্যামিল্টন বর্ণনা করেছেন, যিনি 1837 সালে পরিদর্শন করেছিলেন এবং 'ধ্বংস ও ক্ষয়'-এর একটি দৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন, যেমনটি তিনি রেকর্ড করেছেন। এশিয়া মাইনর, পন্টাস এবং আর্মেনিয়ায় তাঁর গবেষণা , 1842 সালে প্রকাশিত । [26]
তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় (1919-22) কোনিয়া একটি প্রধান বিমান ঘাঁটি ছিল । 1922 সালে, বিমান বাহিনীর পরিদর্শক হিসেবে নামকরণ করা হয়, কোনিয়াতে যেটার সদর দপ্তর ছিল।
1923 সালের আগে, 4,000 অর্থোডক্স, তুর্কি-ভাষী এবং গ্রীক-ভাষী খ্রিস্টান সেখানে বাস করত। গ্রীক সম্প্রদায়ের সংখ্যা প্রায় 2,500 জন যারা তাদের নিজস্ব খরচে একটি গির্জা, একটি ছেলেদের স্কুল এবং একটি মেয়েদের স্কুল রক্ষণাবেক্ষণ করেছিলেন। 1923 সালে গ্রীস এবং তুরস্কের মধ্যে জনসংখ্যা বিনিময়ের সময় , কাছাকাছি সিলে গ্রামের গ্রীকরা শরণার্থী হিসাবে চলে যেতে এবং গ্রীসে পুনর্বাসন করতে বাধ্য হয় । [৩০]
কোনিয়াতে ভ্রমনবিলাসীদের জন্য সবচেয়ে বেশি আগ্রহের সৃষ্টি করে বিখ্যাত দার্শনিক ও সুফি মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী।
ইংরেজিতে তাকে সবচেয়ে বেশি বলা হয় রুমি । তার পুরো নাম তার সমসাময়িক সিপাহসালার দিয়েছেন মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন আল-হুসাইন আল-খতিবি আল-বালখি আল-বাকরি ( আরবি : محمد بن محمد بن الحسين الخطيبي البلخي البكري )। [২৮] তিনি মোলানা জালাল আদ-দীন মুহাম্মাদ রুমি ( مولانا جلال‌الدین محمد রুমী ) নামে বেশি পরিচিত । জালাল আদ-দীন একটি আরবি নাম যার অর্থ "বিশ্বাসের গৌরব"। বালখি এবং রুমি তার নিসবাস , যার অর্থ যথাক্রমে " বালখ থেকে " এবং " রুম থেকে " ('রোমান,' যাকে ইউরোপীয় ইতিহাস এখন বাইজেন্টাইন আনাতোলিয়া বলে)।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রামাণিক রুমি জীবনীকার ফ্র্যাঙ্কলিন লুইসের মতে , "তিনি আনাতোলিয়ান উপদ্বীপ যা বাইজেন্টাইন বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল, তুলনামূলকভাবে সম্প্রতি মুসলমানদের দ্বারা জয় করা হয়েছিল এবং এমনকি যখন এটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল তুর্কি মুসলিম শাসকদের, এটি এখনও আরব, পারস্য এবং তুর্কিদের কাছে রুমের ভৌগলিক এলাকা হিসাবে পরিচিত ছিল। যেমন, আনাতোলিয়ায় জন্মগ্রহণকারী বা রুমি নামে পরিচিত অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব রয়েছে, যা আরবি থেকে ধার করা একটি শব্দ যার আক্ষরিক অর্থ 'রোমান'। ,' যে প্রেক্ষাপটে রোমান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিষয় বা কেবল আনাতোলিয়ায় বসবাসকারী ব্যক্তিদের বা এর সাথে সম্পর্কিত জিনিসগুলিকে বোঝায় ।" [৩০] তিনি "রুমের মোল্লা" ( ملای روم মুল্লা-ই রুম বা ملای رومی মুল্লা-ই রুমি ) নামেও পরিচিত ছিলেন। [৩১]
রুমি ব্যাপকভাবে মাওলানা / মোলানা [১] [৩২] ( ফার্সি : مولانا ফার্সি উচ্চারণ: [মৌলানা] ) ইরানে এবং তুরস্কে মেভলানা নামে পরিচিত । মাওলানা ( مولانا ) আরবি শব্দের একটি শব্দ , যার অর্থ "আমাদের প্রভু"। মৌলবী / মৌলভী (ফার্সি) এবং মেভলেভি (তুর্কি) শব্দটিও আরবি বংশোদ্ভূত, যার অর্থ "আমার প্রভু", তার জন্য প্রায়শই ব্যবহৃত হয় । 
কোনিয়ার সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং ভ্রমনপ্রিয়দের জন্য আকর্ষণীয় স্থান‌ই হচ্ছে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির সমাধীস্থল যা মেভলানা জাদুঘর নামেই খ্যাত এবং বিখ্যাত সেই আজিজে মসজিদ!
মেভলানা‌ জাদুঘর থেকে খানিকটা দূরে একটা হোটেলে উঠেছে তারাজ আফনূর দম্পতি।দিন পেরিয়ে দু দিন হলো। বাড়িতে যোগাযোগ করে নিজেদের নিরাপদে পৌঁছানোর খবর দেওয়ার পর আর কোন যোগাযোগ করেনি। অবশ্য রাজনৈতিক প্যাচাল ঠিক‌ই চলছে অবিরত।
“ বাইরের তামপাত্রা আপাতত পাঁচে আছে। আফনূর আড়মোড়া ভেঙে আবারও কম্বলের নিচে নিজের তুলতুলে পা দুটো গলিয়ে দিলো।তারাজ ভ্রু কুঁচকে ফেললো। ত্যক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“ সমস্যা কি নূর! আবারও কম্বলের নিচে কেন ঢুকেছো?বের হবে না?"
আফনূর‌ও এক‌ই ভঙ্গিমায় উত্তর দিলো কিন্তু তারাজের দিকে তাকালো না।বললো,
“ ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি!"
“ মানে কি; এখন ঘুমাবে!"
“ ঘুমাবো মানে ঘুমাবো,এটাও বুঝেন না!"
তারাজের দিকে না তাকিয়েই বললো,কম্বল দিয়ে নিজেকে নাক অবধি ঢেকে চোখ বন্ধ করে রাখলো।তারাজ বিরক্ত হলো,রাগতে চাইছে না কিন্তু, বিছানার কাছাকাছি গিয়ে হাত দিয়ে আফনূরকে টেনে তোলার চেষ্টা করে বললো,
“ এখানে কি ঘুমাতে এসেছো?"
“ তো কি জন্য এসেছি?"
আফনূরের প্রশ্নে তারাজ হতভম্বতা নিয়ে বললো,
“ মানে কি এখানে কেন এসেছি? আমার হানিমুনে আছি তুমি ভুলে গেছো নুরজান?"
শেষের কথায় দুষ্টু হাসি ছিলো তারাজের ঠোঁটে কিন্তু তা নিমিষেই মিলিয়ে গেল আফনূরের ঝাঁঝালো উত্তরে,
“ ওহ আপনার মনে আছে আমরা এখানে হানিমুনে এসেছি। আমিতো আপনার রাজনৈতিক প্যাচাল শুনতে শুনতে ভেবেছি আপনি নিশ্চয়ই কোন রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছেন, একজন ব্যক্তিগত সহকারী আর রাতে ঘুমানোর জন্য কোলবালিশ দরকার তাই আমাকে সাথে করে নিয়ে এসেছেন।"
তারাজ এত সময়ে বুঝলো সকাল থেকে গাল ফুলিয়ে থাকার কারণ।সে নিজেও পা তুলে বিছানায় উঠে বসলো, কম্বলের নিচে পা ঢুকিয়ে আফনূরের পায়ে পা দিয়ে ঘষা দিয়ে বললো,
“ ও সরি নূরজান।কি করবো বলো, তোমাকে তো বুঝতে হবে আমার অবস্থাটা।যাই হোক এখন থেকে যতদিন আছি ততদিন শুধু মধুচন্দ্রিমার মধু পান করবো,মধু দিয়ে গোসল করবো আর ,আর আর...!"
তারাজ কথা বলতে বলতে আফনূরের দিকে ঝুঁকছে,যত তারাজ ঝুঁকছে আফনূর তত‌ই নিচের দিকে নামছে, অবশেষে আফনূর তারাজের বুকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে বললো,
“ এখানে আমাকে নিয়ে অনেক জায়গায় ঘোরার কথা ছিলো,আগে সেগুলো পূরণ করুন তারপর ভেবে দেখবো আপনার সাথে মধু বিকিকিনি করবো কি-না!
তারাজ নিজের ঘন লোমশ বুকের উপর হাত বুলিয়ে বললো,
“ এভাবে এখানে ধাক্কা দিলা? দুঃখ দিলা মাইয়া! স্বামীর সাথে এমন ব্যবহার করলে জান্নাত পাইবা না!"
“ সে দেখা যাবে,আমাকে জান্নাতের লোভ না দেখিয়ে নিজের জন্য জান্নাত নিশ্চিত করুন। ওয়াদা ভঙ্গকারী মুনাফিক হয়ে যায় জানেন না?"
তারাজ অদ্ভুত চোখে চেয়ে র‌ইলো কিছু সময় এরপর বিছানা থেকে নেমে সোজা হয়ে কোমরের দিক থেকে প্যান্ট টেনে ঠিক করলো,আফনূরকে বললো
 "চলো তৈরি হ‌ও।এখন‌ই বের হবো।”
“ আগে বলুন বাইরে গিয়েও আপনি ফোনে কোন কাজে ব্যস্ত হবেন না।যদি এটা নিয়ে ওয়াদা করেন তবেই বের হবো নয়তো এই আমি ঘুমালাম!"
“ আচ্ছা বাবা ঠিক আছে,করবো না কাজ।এখন তৈরি হ‌ও!"
“ মুমিনের ওয়াদা আমৃত্যু টিকে!"
তারাজ প্রত্ততর করলো না কারণ এটাতে কোন উত্তর থাকেও না। নিজের কর্ম সম্পর্কে সেতো জানেই তবে কোন মুখে নিজেকে প্রকৃত মুমিন দাবী করবে। আফনূর তৈরি হ‌ওয়ার আগেই তারাজ তৈরি হলো।বাইরে বের হ‌ওয়ার আগে একবার মোবাইল দেখে নিতে চাইলো। আফনূরকে জিজ্ঞেস করলো,
“ যাওয়ার আগে একবার দেখে নেই?"
জামার গলা ঠিক করতে করতে আফনূর বললো,
“ দেখুন!"
“ সরকার দলীয় বিগত মেয়াদের ডাকসায়ে মন্ত্রী আঙ্গুর মাইজদির বাসভবন থেকে বিপুল পরিমান মাদক সহ তার সহকারী করিম ইমতিয়াজকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।আঙ্গুর মাইজদি এখন কানাডা আছেন, কানাডিয়ান হাইকমিশনে আবেদন করা হয়েছে আঙ্গুর মাইজদিকে দেশে প্রেরণ করার জন্য।
কারাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া‌ দিলশাদ তালুকদারের বাবা খুলশিদ তালুকদারকে স্থানীয় আইন বিভাগের গোয়েন্দা সংস্থার একদল সদস্য গ্রেফতার করেছেন, অভিযোগ রয়েছে তিনি নিজ পুত্র দিলশাদ তালুকদারের সহিত মিলিতভাবে এক‌ই অপরাধ সংঘটিত করতেন।
এছাড়াও বলা হচ্ছে আঙ্গুর মাইজদির সাথে খুলশিদ তালুকদারের গভীর অবৈধ অস্ত্রের ব্যাবসায়িক সম্পর্কের কথা। সম্পর্কে শ্বশুর এবং বাবার দ্বারা প্রভাবিত দিলশাদ তালুকদারের অপরাজনৈতিক এবং অবৈধ সকল কর্মকাণ্ডের মদতদাতা ছিলেন এই দুই সিনিয়র রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যাবসায়ী।
বিভিন্ন জাতীয় ও ব্যক্তিমালিকানা নিউজ পোর্টাল এবং খবরের লিংক দিয়ে তারাজের সব যোগাযোগ মাধ্যম ভরে গেছে।সে সেগুলোকে দেখে কুটিল একটি হাসি দিলো আফনূরের অগোচরে।
মনে মনে পূনরায় ধন্যবাদ দিলো আফিরকে।
সন্ধ্যার টার্কিশ শহর মানেই এক অন্যরকম ভালো লাগায় ছেয়ে যাওয়া। অলিগলি পেরিয়ে বড় সড়কে উঠলেই আনন্দে মন পুলকিত হয়ে যায়। জ্বলজ্বলে আলোকিত পাহাড় ঘেঁষা এই শহরের আনাচে কানাচে ঐতিহ্য, ইতিহাস আর প্রেমের গান বাজে,সেই গানের তালে তালে গুনগুন করে তাল মিলিয়ে নিজের প্রেয়সিকে শোনায় সকল প্রেমিকরা। নানা ছন্দে বাঁধে কবিতা,প্রেমের কবিতা,ধ্যানের কবিতা, দেশের কবিতা, ধর্মের কবিতা।
তারাজ আফনূরের এক আঙ্গুল নিজের দুই আঙ্গুলের চাপে আঁকড়ে ধরে কদমে কদম মিলিয়ে হাঁটছে আর গুনগুন করে বলছে,
তুমি কি আমায় ভালোবাসো?
আমার প্রতি ভালোবাসার যে সৌধ তুমি নির্মাণ করেছো,
সে সৌধের উচ্চতা কি তোমার প্রতি তোমার ভালোবাসার চেয়েও ক্ষুদ্র?
একজন প্রেমিক প্রশ্ন করলো তার প্রেমিকাকে।
আমার নিজ জীবনের আত্মাহুতির মধ্য দিয়েই
আমি বাঁচতে চেষ্টা করেছি সতত
তোমার জীবনের মাঝেই।
প্রেমিকাকে উত্তর দিল তার প্রিয়তম।
অদৃশ্য হয়েছি আমি আমার আত্মজীবন
এবং অন্তরিত সমস্ত গুণের আঁধার থেকে।
বেঁচে আছি আমি শুধু তোমারই জন্য।
আমার জীবনে অর্জিত সকল শিক্ষাই
আজ আমি ভুলে গেছি।
কিন্তু তোমার সাথে পরিণয় হবার পর থেকেই
হয়েছি আমি বিরল প্রতিভাবান।
সকল শৌর্য আজ হারিয়ে ফেলেছি আমি।
কিন্তু জানো?
তোমার শক্তির স্পর্শে স্পর্শিত হয়ে
হয়েছি প্রবল শক্তিমান।
যদি আমাকে সত্যিকার অর্থেই ভালোবাসি,
তবে জানবে, আমি তোমাকেও ভালোবাসি।
আর যদি, আমি তোমাকেই ভালোবাসি,
তবে জানবে, ভালোবাসি আমাকেও, আমার আত্মাকেও।[ মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি]


সমাপ্ত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ