ভালোবাসা নাকি মোহ

  #ভালোবাসা_নাকি_মোহ

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 




পর্ব ০১

মাঝ রাতে নিজের ঘর্মাক্ত স্বামীকে বড় বিধবা জা'য়ের ঘর থেকে এলোমেলো অবস্থায় বের হতে দেখে ঠিক কি রকম প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত তা যেন এই মুহূর্তে ভুলেই গেছে প্রভাতি! নির্বাক হয়ে শুধু দেখছে মানুষটার বলিষ্ঠ শরীরে মাত্র লাগিয়ে আসা চিহৃ,বোঝাই যাচ্ছে খুব চট জলদি বের হয়েছে কাজ শেষ করে যাতে কেউ জানতে না পারে আর তাই তো গায়ের এলোমেলো পোশাক ও ঠিক করে আসতে পারেনি! কিন্তু ভাগ্য হয়তো সহায় ছিলো না তাই না হাতে ধরা পড়ে গেল! 

ধরা পড়ে গেছে? আদৌ কি এমনই! না প্রভাতি তো জানতো এই বিষয়ে আগে থেকেই কিন্তু কখনো তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেনি কারন তাতে সমস্যা বাড়তো, সংসারে জটিলতা সৃষ্টি হতো! তারা অস্বীকার করতো , উল্টো আমার উপর আরোপিত হতো সংসার বিচ্ছেদের বদনাম ! লোক মুখে রটিত হতো বিধবা জা''য়ে'র প্রতি হিংসা করেই এরকম মিথ্যা কথা রটাচ্ছি, মৃত ভাসুরে'র সন্তানদের দায়িত্ব না নেওয়ার জন্য‌ই এই পরিকল্পনা রচিত হয়েছে! তাই তো হাতে নাতে ধরার অপেক্ষায় ছিলাম কিন্তু তাতে কি হতো? 

এক বছরের জানা শোনার পর বিয়ের আসরে বসে ছিলাম আমি প্রভাতী মিনহাজ আবদুল্লাহ আল রাফি'র সাথে! পারিবারিক ভাবে ঠিক হ‌ওয়া বিয়েটা আমাদের জন্য‌ই এক বছরের সময় দেওয়া হয়েছিলো যাতে একে অপরকে জানতে পারি,বুঝতে পারি! সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী ই চলছিলো! বিয়েও হলো প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর! আড়াই বছরের একটা মেয়েও আছে! অথচ? 

মাস পাঁচেক হলো মাত্র বড় ভাসুর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে গেছেন,রেখে গেছেন পরিপূর্ণ এক যুবতী স্ত্রী আর ছয় বছরের একটি ছেলে এবং দুই বছরের একটি মেয়ে! এক কথায় ভরপুর সংসার! আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ির দুই ছেলে এক মেয়ে! মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দুই ছেলে নিয়ে যৌথ সংসার গড়ার ইচ্ছায় উনি দুই ছেলে ব‌উকে নিয়েই এক ছাদের নিচে থাকেন! সুখেই ছিলো সব কিছু!  বিয়ে করে এই বাড়িতে আসার পর থেকেই দেখেছি আমার স্বামী আর বড় জা মুক্তার মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব! অনেকে এটাকে ভালো চোখে দেখে তো অনেকেই খারাপ! আমার কাছে কোনরকম লেগেছে তা বুঝতে পারিনি কারন আমি এসব নিয়ে ভাবার ই সময় পাই না! বিয়ের আগে চাকরি করতাম, বাচ্চা হ‌ওয়ার আগ অবধি সেই চাকরি‌ই করতাম তাই ঘরোয়া এইসব বিষয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন মনে করি নি! তাছাড়া আমার শ্বাশুড়ির মতে তাদের মধ্যে ভাই বোনের মতো পবিত্র সম্পর্ক আমিও তাই বিশ্বাস করতাম কারন আমিও তো আমার ছোট ভাই আর বড় ভাবির মাঝে ভালো বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক দেখেছি! সত্যি বলতে আমার ভাবীর কাছে আমরা দুই ভাইবোন হলাম সন্তানের মতোই তাই সেই সম্পর্ক নিয়ে খারাপ চিন্তা করাও আমার জন্য গুনাহ মনে হতো! তাছাড়া আমার স্বামী অথবা জা কে কখনো কোন বাজে অথবা চক্ষুশূল কাজ করতে দেখিনি তাহলে সেই সম্পর্ক নিয়ে কোনরকম বাজে চিন্তা করার মতো বিচ্ছিরি কাজ কেমনে করি!

তবে সব টা যেন হঠাৎ ঝড়ে এলোমেলো হয়ে গেলো।আর সেই ঝড় ছিলো আমার ভাসুরে'র হঠাৎ মৃত্যু! আল্লাহ জানেন কেন এই বয়সে ঐ রকম তরতাজা একজন মানুষ কে নিয়ে গেলেন তবে ( আল্লাহর) তার কোন কাজের কৈফিয়ত চাওয়ার দুঃসাহস তো আমার মতো নগন্য বান্দির নেই তাই আর সেই বিষয়ে কথা না ই বলি।

ভাসুরে'র মৃত্যুতে বাড়ি হলো নির্জন নিরব! সব কিছু কেমন থমথমে হয়ে গেছে ! পৃথিবীর নিয়ম অনুসারে এখন ভাসুরে'র বিধবা আর এতিম শিশুদের দায়িত্ব আমাদের মানে আমার স্বামীর উপর ই বর্তায়! তাতে আমার বিশেষ কোন অসুবিধা থাকার কারন নেই, কারন আমি বাস্তবতা বুঝি! আর হয়তো এই বোঝাই আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো! 

ভাসুরে'র তার স্ত্রী হিসেবে বড় জা যেমন ভেঙে পড়ে, অসহায় হয়ে পড়ে ঠিক তেমনি আমার স্বামী রাফিও বড় ভাইয়ের হঠাৎ প্রয়ানে স্তব্ধ হয়ে যায়! আর এটাই স্বাভাবিক! 

হঠাৎ অসহায় হয়ে পড়া দুই নর নারী একে অপরের সহায়ক হতে চেষ্টা করে, আমিও চুপচাপ দেখে যাই, দেখে যাই বললো মিথ্যা বলা হবে সমর্থন করে যাই!হৃদয়ের আত্নীয়,আত্নার আত্নীয় বিয়োগে একে অপরকে শান্তনা দিতে চেষ্টা করে, তার জন্য ই তাদের বেশির ভাগ সময় কাছাকাছি থাকতে হয়। কিন্তু কে জানতো তারা এক অপরের সহায় হতে গিয়ে আমাকে অসহায় করে দিবে! তারা কাছাকাছি থাকতে গিয়ে এতটাই কাছাকাছি হবে যে আমাকেই ছিটকে পড়ে যেতে হবে!

বাড়িতে আজ মিটিং বসেছে! স্বামী মারা যাবার নয় মাসের মাথায় কিভাবে মুক্তা ভাবী গর্ভবতী হয়! তাও পুরো সাড়ে চার মাসের!এত দিন নাকি বুঝতে পারে নাই তাই কাউকে কিছু বলতে পারে নাই কিন্তু হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ অসুস্থ মনে হ‌ওয়ায় শ্বাশুড়ি মা জোর করেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় আর তখনই বিস্ফোরিত হয় পুরো বিষয়টি!

আমার স্বামী বসে আছে আমার শ্বশুরের পাশে,তার থেকে কিছুটা দুরে দাঁড়িয়ে আছে আমার জা মুক্তা! শ্বশুরের সামনা-মুখী হয়ে বসেছেন আমার ননাস রাজিয়া সুলতানা, আর তার স্বামী মোতাহার হোসেন এবং আমার শ্বাশুড়ি মা! আর আমি লজ্জায় চুপ করে বসে আছি নিজ ঘরের খাটের দাসা চেপে ধরে! কি ভাবছেন কাঁদছি? উহু কাঁদছি না ! এরকম বিষয়ে কাঁদার কোন কারন ‌ই নেই! কেন কাঁদবো? কেন কাঁদবো আমি! আমি কি কোন অপরাধ করেছি? আমি তো কেদেঁছিলাম প্রথম দিন! উহ দিন নয়! রাত! প্রথমবার যখন আমার স্বামী আমার গভীর ঘুমের সুযোগ নিয়ে নিজের শরীরের জ্বালা মেটাতে বড় ভাইয়ের বিধবার ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে ছিলো! যখন ঘুম ভেঙ্গে তাকে পাশে না পেয়ে সন্দেহে বশত ভাসুরে'র দরজায় কান পেতে ছিলাম! শুনতে পেয়েছিলাম তাদের সুখ আর্তনাদ! বুঝতে পেরেছিলাম তাদের মনোবাসনা পূরনের সর্বোচ্চ চেষ্টা! 

সন্দেহ কেন করেছিলাম? হঠাৎ কি আর সন্দেহ হয়? না! ধীরে ধীরে হয়! যখন ই অনুভব করলাম শান্তনা'র বানী আওড়াতে আওড়াতে তিন মাসের বিধবা ভাবীর সাথে আমার স্বামী প্রেম বানী'ও আওড়াচ্ছে! সকলের কাছে তা কেবল রসিকতা মনে হলেও আমার কাছে তা রস নিগাড়ানো'র প্রথম ধাপ‌ই মনে হয়েছিলো! পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিক প্রেমিকাকে পটাতে যেই বাক্য আওড়ায় তা নিশ্চয়ই ভাবীর সাথে আওড়ায় না তাও কিনা সদ্য বিধবা ভাবীর সাথে আবার সেই পুরুষ যদি হয় এক বাচ্চার বাপ! সে যাই হোক দিনদুপুরে তাদের কর্মকান্ড ই আমাকে সন্দেহ বাতিক হতে বাধ্য করেছে। আর তার প্রমান ও পেয়ে যাই সেই রাতে! তবে বুঝতে পারছিলাম ঘটনা একদিনে নয় কারন প্রথম বারেই কেউ এতটা সাবলীল ভাবে কারো ঘরে প্রবেশ করতে পারে না তার মানে প্রায় সময়‌ই এরকম কাজ করা হতো আমার নাকের ডগায় তা আমার মতো নির্বোধ বুঝতে পারে নি আর তার ই খেসারত এখন দিতে হচ্ছে!

আমার স্বামীকে হাতে নাতে ধরেছি তাও আজ প্রায় সাড়ে তিন মাস হয়ে গেছে! তাকে দেখে নিরবে ঘরে প্রবেশ করি,সে কিছু সময় আতংক,ভয় লজ্জায় কিংবা হতভম্ব হয়েই হয়তো দাঁড়িয়ে ছিলো দরজার সামনে! বুঝতে পারেনি বেচারা! তার মানবিক কাজের বহিঃপ্রকাশ যে এমনে ঘটবে,তার মানব দরদী মনের ভেতরের পাতা যে এভাবে আমার

 সামনে উন্মোচিত হবে তা হয়তো ক্ষুনাক্ষরে'ও আন্দাজ করে নি! 

এর পর থেকে আলাদা হলো আমাদের বিছানা! সে খাটে আর আমি আড়াই বছরের শিশু কে নিয়ে মেঝেতে মাদুর পেতে থাকতে শুরু করলাম! আর যাই হোক অন্যের একবার ব্যবহৃত জিনিস ব্যবহার করার অভ্যাস আমার নাই! রুচিতে কুলোয় না! আর এটা তো আস্তো একটা মানুষ! যদিও এটা প্রথম আমি‌ই ব্যবহার করেছি তবুও এটা এখন আরো একজনের ব্যবহৃত ! বলা যায় আমার বেড়ে রাখা খাবারের মধ্যে হঠাৎ করেই অন্য একজন নিজের নোংরা হাত দিয়ে দিলো সেটা নিশ্চয়ই আমি খাবো না! এটার ক্ষেত্রে ও তেমনি!

তবে তাতে আমার স্বামীর উপর বেশি একটা প্রভাব ফেললো না কারন যত‌ই বলি সেও পুরুষ মানুষ! আর তাদের কাছে শরীরের ক্ষুধা মেটানো'ই জরুরী সেটা হোক হালাল কিংবা হারাম! তার ক্ষেত্রে সেই বানী মিথ্যা হ‌ওয়ার কোন সুযোগ ই নেই। 

অবশ্য প্রথম ১৫ দিন সে কিছুটা শান্ত ছিল, একদম আদর্শ স্বামী হ‌ওয়ার প্রচুর প্রচেষ্টা করলো তাতে আমার হৃদয়ে এক চুল পরিমান টনক ও নড়লো না!  অবশ্য সে সেই রাত থেকে শুরু করে পরের পনেরো দিন হাজার ভাবে আমাকে বোঝাতে চেয়েছে,তার করা কাজের হাজারটা যুক্তি দেখাতে চেয়েছে , ক্ষমাও চেয়েছে এমনকি দুই চারবার পায়ে ধরেও ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু প্রতিবারই আমি এড়িয়ে গিয়েছি! আমি কোন কথা শোনার বা বোঝার বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাই নি কারন প্রতিবার ই আমার মন বলেছে একবার যে ঠকাতে পারে সে বারবার পারে! সুতরাং এইরকম বিশ্বাসঘাতক, বেইমান, প্রতারক, ছলনাকারীদের দ্বিতীয় সুযোগ দিতে নেই!আমিও তাই করেছি! তবে ভেবেছি হয়তো শুধরে যাবে কিন্তু তেমন কিছু হলো না‌। বরং পনেরো দিন পরেই সে আমাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবারও নিজের কাজে লেগে পড়ে! আর ধীরে ধীরে দূরে সরে যায় আমার মন মস্তিষ্ক থেকে!

দীর্ঘ দেড় ঘন্টা মিটিং চললো তাতেও কোন সুফল পাওয়া গেছে বলে মনে হলো না,এর মধ্যেই সম্ভবত 

মুক্তা ভাবীর মা বাবা ও চলে এসেছে।আমি যদিও দেখিনি তবুও বাইরের চিৎকার চেঁচামেচিতে তাদের গলার ও শব্দ পাচ্ছি! তাই ধারনা করেই বললাম।পুরো সময়'টাই থেমে থেমে শুনতে পেলাম আমার ননাসে'র মুখ থেকে নির্গত হ‌ওয়া কিছু বিচ্ছিরি শব্দ যা ছিলো আমার জায়ের জন্য! তার পাশাপাশি নিজের ভাইকে ও দিলো লানত! আর আমার জন্য চিরায়িত শান্তনা'র বানী শুধু শুনতে পেলাম না তাদের কোন শব্দ! 

আমি জানি এই সমস্যার সমাধান আপাতত নাই! কারন যত‌ই হোক আপাতত জা মহিলা গর্ভবতী, আর এই অবস্থায় বিচার বলতে যা হ‌ওয়া উচিত তা আমাদের মডার্ন জগতে চলে না। ঐদিকে যত‌ই হোক পেটের বাচ্চাটা এই বাড়ির সম্পদ বলেই আখ্যায়িত হচ্ছে যদিও এটা কেবল বাচ্চাকে বাঁচানোর একটা প্রচেষ্টা জা"য়ের মা বাবা করছে।আমিও অবশ্য তাতেই খুশি কারন যাই হোক এতে ঐ গর্ভে থাকা অবুঝ প্রাণের কোন দোষ নেই। তাছাড়া এমন একটা সময়ে জানাজানি হলো যে এবরশন ও করানো যাবে না ,মা বাচ্চার জীবনের ঝুঁকি রয়েছে! তাহলে এখন কি হবে? বাচ্চা পেটে থাকতে বিয়ে তো হয় না,আর সবচেয়ে বড় কথা আমার স্বামীর তো ব‌উ আছে! একটা চান্দের মতো বাচ্চা মেয়েও আছে তাহলে? কিভাবে কি হবে! এইদিকে এই কথা যদি বাইরে জানাজানি হয় তাহলে তো এই বাড়ির এত বছরের অর্জিত সম্মান সব ধুলোয় মিশে যাবে! আবার আমার স্বামী মহাশয় গোঁ ধরে বসে আছে,সে বিয়ে করতে পারবে না! কোন মতেই সে তার স্ত্রী সন্তানদের অধিকার ভাগ করতে পারবে না! তার এইসব ছ্যাবলা কথায় আমার পেট ফাটানো হাসি আসছে! মানে শোয়ার সময় মনে হয়নি তার স্ত্রী অধিকার সে ভাগ করছে এখন যখন জানাজানি হলো, বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপার আসলো তখন তার মনে হচ্ছে অধিকার ভাগ করার যাবে না!  


পর্ব ০২

আসলে সে ভেবেছিলো বিধবা ভাবীর সাথে শুয়ে একটু মজা নিবে, অবশ্য ভাবী ও তাই ভেবেছিল,, অতিরিক্ত গরম হলে যায় হয়! ঠান্ডা করার জন্য হোক কিংবা কিন্তু অতিরিক্ত সহায় নিতে গিয়ে যে পেট বেঁধে যাবে তা হয় তো মাথায়ই আসেনি যাই হোক এটা একান্তই তাদের বিষয় কিন্তু আপাতত মনে হচ্ছে সিদ্ধান্ত আমাকে ই নিতে হবে! 
আমি এবার নিজ স্থান ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম, উদ্দেশ্য বাইরে যাবো, দরজার সামনে এগোতেই শুনতে পেলাম কিছু পড়ার শব্দ, বেশ বড় কিছু পড়ার শব্দ কারন একদম কর্নারে হ‌ওয়া সত্ত্বেও আমার ঘর অবধি পৌঁছে গেছে সেই আওয়াজ! তাই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলাম, কিছুটা যাওয়ার পর বুঝলাম আমার স্বামীকে আমার ননাস থাপ্পর মেরেছে যার দরুন সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পড়ে যায় টেবিলের পাশে আর তার সাথেই হাত লেগে পড়ে যায় টেবিলের উপর থাকা পানির জগ'টা! আমি আর সামনে এগোলাম না! যত‌ই হোক সে আমার স্বামী, আমার সন্তানের বাবা! তাকে এভাবে অপদস্থ হতে সামনে দাঁড়িয়ে চোখে দেখার মতো অতটা'ও ধৈর্যশীল বা সাহসী আমি ন‌ই! তাই একটু আগে নিজের দ্বারা নেওয়া সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ করার জন্য ঘরেই ফিরে এলাম!
বোরকা পড়া,কোলে আড়াই বছরের মেয়ে এক হাত দিয়ে টেনে আনা ট্রলি দেখে মিটিং এ অংশগ্রহণ করা প্রত্যেক সদস্যের চোখে মুখে প্রশ্নের উড়াউড়ি! আমি কাউকে কিছু না বলে সোজা দাঁড়ালাম আমার শ্বশুরের সামনে, তার উদ্দেশ্য বললাম আমি চলে যাচ্ছি আর এটাই একমাত্র সমাধান! আমার কথায় পরিবেশ আবারও কেমন থমথমে হয়ে গেল, বুঝতে পারছে না হয় তো এই মুহূর্তে আমাকে কি বলা উচিৎ কিন্তু পরক্ষনেই ঘটা বিষয়ে কেউ বিরক্ত তো কেউ আশ্চর্য! 
আমার জা হুট করেই আমার পায়ের সামনে পড়ে গেল, বারবার আকুতি করে এটাই বলছে আমি যেন না চলে যাই, তার ভাষ্যমতে আমরা দুজন মিলে মিশে সংসার করবো! সে কখনো আমার কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না! আমি যা বলবো তাই মেনে নিবে বিনিময়ে শুধু তার সন্তানের পরিচয় টা দিলেই হবে! কোনদিন সতিনে'র চোখে দেখবে না,ছোট বোনের মতোই আমাকে আগলে রাখবে! তার কথায় আমি উত্তর দিলাম না! আমি তার কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলাম না; সত্যি বলতে এই মানুষ দুটোর সাথে কথা বলতেই আমার এখন ঘৃনা করে! তারচেয়ে বড় কথা উনার জন্য এই মুহূর্তে আমার মুখে যেই কথা আসছে তা উচ্চারণ করে আমি আমার ব্যক্তিত্ব - সম্মান নষ্ট করতে ইচ্ছুক ন‌ই! 
চোখ তুলে তাকালাম আমার স্বামীর পানে,ছলছল দৃষ্টিতে মুঠোবন্দী করে বারবার ইশারায়, শুধু ইশারায় নয় বিরবির করেই বলছে আমি যেন না যাই কিন্তু আমি তো আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি আর কারো কথায় তা পরিবর্তন করবো না! 
আমার মেয়ের দিকে তাকিয়ে শ্বাশুড়ি মা আর্তনাদ করে উঠলো, চোখের জল নাকের জল এক করে হাউমাউ করে কাঁদছে আর বলছে এই চাঁন্দের মতো মাইয়ার কথাও কেন একবার আমার স্বামী ভাবলো না! আমি চলে গেলে মাইয়া'ডার কি হ‌ইবো! তার কথায় বিরক্ত লাগছে,কারন আমার স্বামী আর জায়ের এই পরিনতি হ‌ওয়ার জন্য উনার এই কান্নাই দায়ী, বারবার বড় ছেলে সন্তানের দায়িত্ব ছোট ছেলের কাঁধে চাপিয়ে দিতে গিয়ে ব‌উ-য়ের দায়িত্ব ও দিয়ে দিয়েছে! না'হ তার দোষ নেই! কারন উনি তৎক্ষণাৎ যা ভালো তাই ভেবেছিলেন! কারো দায়িত্ব নিতে গেলেই যে তার সাথে শুয়ে পড়তে হবে এটা নিশ্চয়ই দায়িত্ব বোধের তালিকায় থাকে না!
উনার থেকে মনোযোগ সরিয়ে শ্বশুরের উদ্দেশ্যে কাট কাট গলায় জানালাম,আমি তাদের ছেলের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করলাম, এবং আজকের পর থেকে আমার সন্তানের দায়িত্ব থেকেও তাকে মুক্ত করলাম! আমি যাওয়ার পর‌ই ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবে! এবং অবশ্যই আজকের পর কোনদিন আমার সন্তানের আশেপাশে যেন তাদের ছেলেকে না দেখি কারন আমি চাই না এমন নোংরা চরিত্রের পিতার সান্নিধ্যে আমার সন্তান বেড়ে উঠুক; সুতরাং তার সাথে কোনরকম যোগাযোগ রাখতে আমি নারাজ! আর হ্যা আমার সন্তান আজ থেকে জানবে সে এতিম! তার জন্মের আগেই তার বাবা তাকে ছেড়ে চলে গেছে! 
কথাটা শোনা মাত্রই আমার স্বামী তেতে উঠল,প্রথমে সে আমাকে কিছুতেই ছাড়বে না, দ্বিতীয় আমি যদি যাই তবে অবশ্যই যেন তার সন্তানকে রেখে যাই! কিন্তু তাতে ও কোন লাভ হলোনা।আমার কথার নড়চড় হতে আমি দিলাম না! আর আমাকে আটকানোর মতো পরিস্থিতি আপাতত কারো ছিলো না! আমি পা বাড়াতেই আমার জা বললো,এত তেজ ভালো না! সে তো বলছে আমার সব কিছু মেনে নিয়েই সংসার করবে, তারপরেও কেন আমি এত তেজ দেখাচ্ছি! কথাটা আমার গায়ে আগুন লাগানোর মতোই জ্বলে উঠলো,, কিছু বলতে না চেয়েও বলে ফেললাম,," আপনার শরীরে অনেক ক্ষুধা ভাবী, আর তাই তো স্বামী মারা যাওয়ার তিন মাসের মাথায় দেবরের সাথে শুয়ে পড়লেন! কিন্তু আমার শরীরে এত ক্ষুধা নাই তাই আমি সারাজীবন একা কাটাতে পারবো কিন্তু সতীনে'র সংসার নয়! সতীন দেখে বিয়ে বসি নি সুতরাং সতীন নিয়ে সংসার করার প্রশ্ন‌ই উঠে না!ওটা আপনার মতো অতিরিক্ত গরম শরীরের নারীদের জন্য প্রযোজ্য! কথাটা বলে পিছু ফিরে দেখলাম না! দেখার প্রয়োজন নেই বলেই মনে করলাম! কারন আমি বরাবরই অতীতে'র কালো অধ্যায় ঘাঁটতে অপছন্দ করি! 
সব ছেড়ে এসেছি আজ প্রায় বাইশ বছর! মেয়ের বয়স এখন চব্বিশ ছেড়ে পঁচিশে পড়বে! ও হ্যা আজ আমার মেয়ের বিয়ে! আজ আবার ও দেখা হবে তাদের সাথে,,তবে এক‌ই পরিচয়ে নয়! কারন আমার মেয়ে জানে তার বাবা মৃত আর আজ যেই মানুষেরা তার বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে তাকে দেখতে আসবে তারা তার পূর্ব পরিচিত সম্পর্কে বেশ দূরের চাচা চাচী!
হ্যা তারা বিয়ে করেছে, অবশ্য করতে বাধ্য হয়েছে! আমি আসার কয়েকদিনের মধ্যেই ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিয়েছিলাম,এরপর নিয়ম অনুসারে আমাদের ডিভোর্স সম্পন্ন হয়! তার মধ্যে ই সময়ের পরিক্রমায় আমার জায়ের পেটে থাকা আমার স্বামীর সন্তান দুনিয়ার মুখ দেখে!  তারপরেই আমার শ্বশুর জোর করেই বড় ছেলের বিধবার সাথে ছোট তালাকপ্রাপ্ত ছেলের বিয়ে দেন, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় বিয়ে করার সাথে সাথেই আমার স্বামী ওহ সরি এক্স স্বামী গায়েব হয়ে যায়! এরপর ফিরে প্রায় আড়াই বছর কিন্তু এর মধ্যে ঘটে যায় বহু ঘটনা! তাদের কৃর্ত-কলাপ পাড়ায় জানাজানি হয়ে যাওয়াতে আমার শ্বশুর হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান! এটা তো হ‌ওয়ার ই ছিলো তবু ও কেন ভদ্রলোক এতটা কষ্ট পেলো বুঝলাম না! যাই হোক কেন জানি তাদের জন্য আমার নূন্যতম সহানুভূতি ও কাজ করে না! যোগ্য উত্তরসুরীর অভাবে পারিবারিক ব্যবসায় ও ধস নামে ! আর তার পর না হয় নাই বললাম! হয়তো পাঠক মহল বুঝতে পারছেন!
ওহ হ্যা আমার এক্স স্বামী ফিরে এসে তার রেখে যাওয়া ভাবী উপস স্ত্রীর সাথেই সংসার শুরু করে এবং তাদের ঘরে এখন চারজন সন্তান,দুটো তার বড় ভাইয়ের আর দুটো তার নিজের ঔরস-জাত! শুনেছি মোটামুটি তারা ভালো ই আছে! 
তবে আলহামদুলিল্লাহ আমি অনেক ভালো আছি! এক মেয়ে নিয়ে আমার সুখের শেষ নাই!মেয়ে আমার ডাক্তারি পড়ছে,জামাই একজন সফল ডাক্তার যদিও নতুন তবুও বেশ নাম ডাক আছে! আলহামদুলিল্লাহ আমি সুখী!গলা উঁচিয়ে চিৎকার করে বলতে পারি আমি সুখী!
#আমি এই গল্পের মাধ্যমে আমাদের সমাজের দুই ধরনের নারীকে দেখাতে চেয়েছি,, একজন যে কিনা স্বামী বিয়োগে নিজেকে এতটাই অসহায় ভাবতে শুরু করলো যে নিজ দেবরের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তেও সংকোচ বোধ করে নি,এক বার হয়তো ভাবার ও দরকার মনে করে নাই যে ঐ দেবরের ও ব‌উ আছে, বাচ্চা আছে!তার এই সহায় নেওয়ার সুযোগে সে অন্য নারীকে অসহায় করে দিচ্ছে,কেড়ে নিচ্ছে অন্য একটি বাচ্চার সুন্দর ভাবে বাঁচার অধিকার! অপরদিকে অন্য জন ছিলো সমাজের সেই নারীদের রুপ,যারা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে চায় না আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ও অনীহা প্রকাশ করে! তারা তাদের প্রতি এতটাই আত্মবিশ্বাসী থাকে যে তারা মনে করে এইসব এড়িয়ে নিজেকে ঝামেলা মুক্ত রাখাই শ্রেয়! একা জীবন কাটানো সহজ যদি নিজের প্রতি ভালোবাসা থাকে! 
পুরুষের দোষ এই গল্পে দিবো না কারন যদি জা চরিত্রের নারীটি সুযোগ না দিতো তবে নিশ্চয়ই দেবর নামক পুরুষটি লুফে নিতে পারতো না,,এতটা'ও সাহস হতো না সবল স্ত্রী রেখে বিধবা ভাবীর দিকে নজর দেওয়ার; এক্ষেত্রে অবশ্যই দোষের ভাগ বেশি বর্তায় নারীর দিকে!!!
আমাদের সমাজে এমন অনেক নারী আছে যারা অন্য একজন নারীর সংসার নষ্টের কারন! 
 সুখী হ‌ওয়ার জন্য পাশে যে পুরুষ ই থাকা লাগবে তার কোন যুক্তি-গত কারন নেই! একজন আত্ন সম্মান বোধ সম্পন্ন মানুষ কখনোই এরকম নোংরা পরিস্থিতিতে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে চাইবে না, অন্তত আমি তো নাই! আমি এরকম মানুষ থেকে বহু দূরে সরে যাই! আমার কাছে এর চেয়ে সঠিক সমাধান নেই! কারন আল্লাহর বিচার সর্বোচ্চ কঠিন আর আমি তার জন্য ই অপেক্ষমান! আর যদি আসে ভালোবাসার কথা তাহলে বলবো; জীবনে যদি কাউকে একবার মন থেকে সত্যি ভালোবাসা যায় তারপর আর কাউকে ভালো লাগে না, ভালোবাসার তো প্রশ্নই উঠে না আর সে যদি হয় বৈধ সঙ্গি! তার অনুপস্থিতিতে যদি কারো প্রতি অনুভূতি সুড়সুড়ি দেয় তাহলে বুঝতে হবে দুটো বিষয়,এক নিজের সঙ্গী'র প্রতি সত্য শুদ্ধ ভালোবাসা নেই,দুই নতুন জনের প্রতি শারীরিক মোহ! অথবা নতুন পুরাতন দুজনের প্রতি‌ই মোহ কারন ভালোবাসা একবার ই হয়! 
আমার এক্স স্বামী আর জায়ের মাঝে কোনটা ছিলো সেটা পাঠক-গন‌'ই ঠিক করে দেন!আমি অতটা জ্ঞানী ন‌ই 
ধন্যবাদ সবাইকে ,, মন্তব্য করে আপনাদের সিদ্ধান্ত জানাতে ভুলবেন না দয়া করে!
আমি জানি অনেক আপু একটু বিরক্ত হবেন এই ভেবে যে একদম গেঁয়ো টিপিক্যাল ধাঁচের চিন্তা ভাবনা আমার; হ্যা আপনাদের অভিযোগ সত্য! কিন্তু আমি আমার আশেপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই এই বিষয়টা অনুভব করেছি! এমন অনেক মেয়েকে'ই দেখেছি স্বামী নামক পুরুষের এই রকম চরিত্রের সাথে এডজা'স্ট করেও বলে এইতো ভালোবাসা! আবার অনেকেই নিরবে সরে গিয়ে নিজেকে সম্মানের উচ্চ শিখরে তুলে ধরেন হয়তো এটাই তাদের প্রতিবাদের ধরন!

স মা প্ত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ