সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৭৬

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_৭৬



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


“ ভাবী তাইফ তো শান্ত হয়ে গিয়েছে একদম!"


“ হ্যাঁ আল্লাহর রহমত।

জিফা জ্বালায় না জিয়ানকে কোলে নিলে?"


“ না তেমন না। আল্লাহর রহমতে জিফাটা অনেক শান্ত হয়েছে ভাবী।জানো ক বুদ্ধি আল্লাহর রহমতে, নিজে ডায়পার নিজে খুলে আবার নিজেই সেটাকে বিনে রেখে আসে!"


“ মাশাআল্লাহ! আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখুক দীর্ঘদিন।

এ্যাই ফাতিন কি এবার‌ও গ্রামেই সময় কাটাবে?"


“ জানি না।তবে এবার বোধহয় ও গ্রামে একটা বাংলো বানানোর প্রচেষ্টা করছে।ওর ইচ্ছে আমরা বৃদ্ধ বয়সে দেশের মাটিতে চাষবাস করে কাটাবো।"


“ বাহ্ হঠাৎ এই ইচ্ছা?

জন্মের পর থেকেই সে দেশের বাইরে তাহলে হঠাৎ এই ইচ্ছা কেন করলো?"


“ নানান দেশে ঘুরে নাকি তার এটাই মনে হচ্ছে নিজের দেশ সেরা।দেশ প্রেম জেগে উঠেছে হঠাৎ করেই। আমার শ্বাশুড়ি অবশ্য অনেক আগেই আসতে চেয়েছিল কিন্তু ঐ যে.. জীবন যেখানে একবার গোড়াপত্তন ঘটায় সেখান থেকে চাইলেই বেরিয়ে আসা যায় না।তাদের‌ও দশা তাই হয়েছে! "


“ হুম।তবে বাচ্চাদের ফিউচার আসলে ঐদিকেই সেইফ।এখানে না আছে সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা আর না আছে চিকিৎসা,জীবনের নিরাপত্তা! রোজ শুনতে হয় ধর্ষণের কাহিনী,সড়ক দুর্ঘটনা, অর্থ লোপাট, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় সাধারণ মানুষ হেনস্থা!কি যে অবস্থা!"


“ এটা সব দেশেই হয় ভাবী।আমরা ভাবি যে এটা কেবল আমাদের দেশের‌ই সমস্যা কিন্তু এই সমস্যা গুলো সব দেশেই হয়! তাছাড়াও..


“ আম্মু!"


ননদকে নিয়ে নিজের ঘরের বারান্দায় বসে গল্প করছে আফিয়া।নাইফ বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে ডাক দিলো, আফিয়া পিছু মুড়ে ছেলের দিকে চেয়ে উত্তর করলো,


“ হুম বলো!"


“ আমি রেডি,টিফিন দিবে না?"


“ হ্যা দাঁড়াও দিচ্ছি!"


বলেই উঠে দাঁড়ালো।তুহি ঘুমাচ্ছে।নাইফ বিছানার মাঝ বরাবর শুয়ে থাকা বোনের কাছে গিয়ে নাক টেনে দিলো।তুহি কপাল কুঁচকে নড়েচড়ে উঠলো। নাইফ আবার গালে চুমু দিলো। দাঁড়ির খোঁচায় তুহি আবারও নড়ে উঠলো,কপাল কুঁচকে ঠোঁট উল্টে গালে হাত দিয়ে আবারও শুয়ে পড়লো।নাইফ বোনকে এভাবে জ্বালিয়ে হেসে দিলো। আফিয়া দরজায় দাঁড়িয়ে এটা দেখে এগিয়ে এসে কাঁধে হালকা চাপড় মেরে ধাক্কা দিয়ে বললো,


“ যাও এখন, একদম উঠাবে না। কাঁদবে!"


“ আম্মু ওকে নিয়ে যাই।তাইফ খুব খুশি হবে!"


“ ঘুমাচ্ছে তো!"


“ সমস্যা নাই। উঠিয়ে ফেলি।এত কেন ঘুমাবে ও!"


বলেই নাইফ বোনকে একরকম টেনেই কোলে তুলতে চেষ্টা করলো যার ফলে তুহি চিৎকার দিয়ে উঠলো।

নাইফ বোনকে হালকা চাপড় মেরে বলছে,


“ যাবা না ছোট ভাইয়ার কাছে! চল উঠো ঘুম থেকে।"


“ সারা রাস্তা কান্না করবে! সেটা ভালো হবে?"


“ করবে না দেখো। তোমার মেয়ে বাইরে গেলেই তো বাঁদরের মতো ফালাতে চায় আর তুমি বলছো কাঁদবে!"


“ সামলাতে পারবে?"


“ আম্মু!"


“ আচ্ছা ঠিক আছে যাও।যা খুশি তোমার বোনকে তুমি!

_ এক কাজ করো গায়ের জামাটা বদলে মাথায় একটা হিজাব পড়িয়ে নিও,না হলে তো আবার তোমার ছোট ভাইয়ের মান সম্মান ক্ষুন্ন হবে!"


আফিয়া বড় একটা টিফিন ক্যারিয়ার ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে অপেক্ষা করছে বাচ্চাদের।নাইফ বোনের এক হাত মুঠোয় পুরে বের হলো।সাদা একটা লম্বা সুতি কুর্তির উপর লাল টুকটুকে হিজাব পড়িয়েছে।তুহিকে সাজগোজ করানোর ব্যাপারে নাইফ ভীষণ অভিজ্ঞ।হাতে এক জোড়া সোনার বয়লা যেটা সবসময় হাতেই থাকে।চোখ পিটপিট করে ভাইয়ের হাত ধরে এগিয়ে আসছে তুহি। নিশ্চয়ই তার ভাইয়া বলেছে বেড়াতে যাবে তাই কোন শোরশারাবা করেনি।নয়তো ঘুম ভাঙ্গানোর দায়ে পুরো বিল্ডিং মাথায় তুলতো।


“ এক কাজ করো,ভাইকে একটু খাইয়ে তারপর এসো।আর বলো আমরা তাকে খুব ভালোবাসি।তার জন্য দোয়া করছি।"


“ হ্যাঁ তাতো বলবোই।

_ চলো বুড়ি।"


“ আসসালামালাইকুম!"


বলে তুহি নিজের মা'কে সালাম দিলো।তার সালামের আদব এখনো আসেনি।আফিয়া মেয়ের সালামের উত্তর দিয়ে এগিয়ে গেলো তাদের পিছু পিছু।সালমা ফাওযিয়া বসার ঘরেই বসে ছিলেন,কোন একটা আমল করছেন।তিনি দুই নাতী নাতনিকে কাছে টেনে দোয়া পড়ে গাঁয়ে ফু দিয়ে দিলেন। অতঃপর ফি আমানিল্লাহ্ বলে আল্লার কাছে সোপর্দ করলেন।


নাফিসা কাল আসার পর তেমন ভারী কিছু খাবে না হালকা রান্নাই করেছিলো আফিয়া। কিন্তু আজ মোটামুটি বেশ রান্না হয়েছে।ঘরে ভালো মন্দ হয়েছে আর সে মা হয়ে বাচ্চাকে রেখে খাবে! এটা কি কোন মায়ের পক্ষে সম্ভব! আফিয়াও পারে না।তাই যখন‌ই ভালো ভালো রান্না হয় সে দ্রুত বাটি ভরে নিয়ে যায় ছেলের জন্য,নয়তো কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেয়।আজকেও নাইফ নিয়ে গেলো। অবশ্য কেউটা নাইফ‌ই হয়।


____________________


সন্ধ্যা সাতটা....


আফিয়া মাগরিবের সালাত আদায় করে জায়নামাজে বসেই বিরবির করে দোয়া পাঠ করছে,

তার পাশেই আছে নাফিসা।সেও দোয়া পাঠ করছে। ঠিক এই মুহূর্তে আফিয়ার মুঠোফোন বেজে উঠলো।দোয়া শেষ করে বাজতে বাজতে থেমে যাওয়া মুঠোফোনটা তুলে নিয়ে দেখলো সালাহর ফোন।আফিয়ার ভ্রু দ্বয়ের মাঝে বিশাল ভাঁজ পড়লো‌।এই সময়ে সালাহর ফোন! কেন?

এখন তো নামাজের সময়।সালাহর মসজিদে থাকার কথা তাহলে এই সময়ে!


“ কি হয়েছে ভাবী?"


“ সালাহ এই সময়ে কেন ফোন করেছে।এখন তো ওর মসজিদে থাকার কথা!"


“ ফোনটা ব্যাক করে দেখো।হয়তো মসজিদ থেকে বেরিয়েই কল করেছে।"


“ আই হোপ, এমনিতেই সকালে বাজে স্বপ্ন দেখেছি,তখন থেকেই মনটা কেমন কু ডাকছে। বাচ্চা দুইটা এখনো বাড়ি ফিরলো না, বলো তো কেমনটা লাগে!"


কল করতে করতেই আফিয়া কথাগুলো বললো নাফিসাকে। এর মধ্যেই কল রিসিভ হতেই শোনা গেলো ভারী কন্ঠস্বর, আফিয়া ভ্রু কুঁচকে অস্থির কন্ঠে শুধালো,


“ কি হয়েছে তোর গলা..


****


“ মানে কি?কি হয়েছে আগে সেটাতো বল?"


****


“ হায় আল্লাহ! কি বলিস? কখন হয়েছে?"


বলতে বলতেই আফিয়ার কন্ঠ ভারী হয়ে উঠলো।সে অস্থিরতায় উঠে দাঁড়িয়ে মাথার হিজাব টেনেটুনে খুলে ফেলতে ফেলতে বললো,


“ দোয়া কেমন আছে?"


***


“ আচ্ছা শান্ত হ, আল্লাহ যা করেন কল্যানের জন্য‌ই করেন।"


****


“ কান্নাকাটি থামা।তুই কাঁদলে দোয়াকে কে সামলাবে?

_ আচ্ছা আমি আসছি।এখন‌ই র‌ওনা দিচ্ছি!"


নাফিসাও ভাইয়ের ব‌উয়ে চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে এক‌ই ভাবে চঞ্চল কন্ঠে শুধালো,


“ কি হয়েছে ভাবী?"


“ দোয়ার মিসক্যারিজ হয়েছে!"


বলেই আফিয়া ফুঁপিয়ে উঠলো। 


“ দু'টো বছর ধরে বাচ্চা দুটো চেষ্টা করছে, আল্লাহ মুখ তুলে চাইলো কিন্তু দিয়েও আবার নিয়ে গেলো! কি করে সামলাবে ওরা নিজেদের?"


“ তুমি নিজেকে সালমাও। তুমি ভেঙ্গে পড়ো না। তুমি যাও তৈরি হ‌ও,আমি ভাইকে বলছি।"


আফিয়া আর কথা বাড়ালো না। দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে গিয়ে বোরকা পরতে লাগলো। এদিকে নাফিসা নাসিফ,সালমা ফাওযিয়া,নাযির আহমাদকে জানিয়ে দিলো সবটা।


“ আমারও যাওয়া উচিত, কি বলো? বেয়াইন নিশ্চয়ই ভেঙে পড়েছে, একমাত্র ছেলের এই খবরটা! আহারে! বাচ্চা মেয়েটা !"


বলেই চ কারান্ত শব্দ তুলে আফসোস করতে থাকলেন তিনি।নাফিসা মায়ের কথায় সম্মতি দিয়ে তাকে তৈরি হতে সাহায্য করলো।


আফিয়া বোরকা পরেই বেরিয়ে এসে দেখলো তার শ্বাশুড়ি‌ও তৈরি।নাবীহা নিজের ঘরে বসে পড়ছিলো। পানি নিতে বাইরে বেরিয়ে মা আর দাদীকে বোরকা পরিহিত অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলো,


“ তোমরা কোথায় যাচ্ছো?"


আফিয়া মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,


“ আমরা একটু তোমার নানী বাড়ি যাচ্ছি মা। তুমি ঘরের খেয়াল রেখো।আর হ্যাঁ তোমার ভাই আর বোন আসলে তাদেরকে নাস্তা পানি দিও। ঠিক আছে; মা তাড়াতাড়ি চলে আসবো।"


“ আচ্ছা!"


“ তোমরা যাও তো সেসব আমি দেখে নিবো নে!"


বলেই নাফিসা তাড়া দিতে থাকলো।শহীদ আরজু মনি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে দোয়াকে। প্রচন্ড বিল্ডিং হচ্ছিলো মেয়েটার।একদম নেতিয়ে পড়েছে সে।চোখ দুটো কেমন নির্জিব আর নিস্পৃহ ঠেকছে সবার কাছে। সালাহ্ চেষ্টা করেও নিজেকে দমাতে পারছে না। বারবার ঢুকরে কেঁদে উঠছে।গায়ে চাঁপা সাদা শার্টটা ঠান্ডার মাঝেও ঘেমে জবজবে হয়ে গিয়েছে।ইন করা কোমরের অংশটা বেরিয়ে কুঁচকে রয়েছে, ফোল্ড করা হাতের অংশটা খুলে ফেলেছে, বারবার সেটা দিয়ে নিজের সিক্ত নয়ন মুছছে।


সাফিয়ার দ্বিতীয় প্রেগন্যান্সির পর থেকেই দোয়া একটা বাচ্চার জন্য খুব পাগলামি করছিলো।প্রথমে সালাহ্ রাজী হচ্ছিল না কারণ সামনেই দোয়ার তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল। কিন্তু বোনদের বুঝে আর ভাগ্নে ভাগ্নির উপস্থিতি তাকেও নাড়া দেয় পিতৃত্বের স্বাদ নিতে। অতঃপর চেষ্টা করতে থাকলো কিন্তু দুটো বছর পেরিয়েও তাদের চেষ্টা সুফল আনলো না।তাও তারা হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে থাকলো । অবশেষে মাস তিনেক আগে সুখবরটি আসে।

দোয়া এখন সাড়ে চার মাসের গর্ভবতী ছিলো। সালাহ্ নিজের সবটা দিয়ে দোয়ার দেখভাল করতে থাকলো।যাতে কোন ভারী কাজ না করতে হয় তাই সে দুটো কাজের লোক রাখলো।যেটা তার জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার তাও।আফিয়াও ভাইয়ের ব‌উয়ের যত্নে বিশেষ খেয়াল দায়িত্ব পালনে ভাইয়ের ব‌উয়ের জন্য মাঝে মাঝেই রুকাইয়াকে পাঠিয়ে দিতো। সুলতানা আযিযাহ তো ছেলে ব‌উকে যেন মাটিতেই পা রাখতে দিবে না এমন ভাবে রাখতো।অথচ এত যতনের,এত চেষ্টার পরেও স্বপ্নটা কেমন থেঁতলে গেলো, চুরমার করে দিলো অনেক ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষাকে।


চলমান....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ