#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৭৫
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
ধীর গতিতে দরজা খুলে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সাফিয়া।আফিয়া উৎসুক চোখে দরজার পানেই চেয়ে ছিলো।দরজা খুলতে একরকম ছুটেই এলো।
“ কি হয়েছে দেখি!"
সাফিয়া লজ্জা লজ্জা দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে হাত বাড়িয়ে দেখালো,
“ দুটো কিটেই দুটো করে লাল দাগ স্পষ্ট!"
আফিয়ার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।সে আজ সকাল থেকেই বোনকে খেয়াল করেছে।তার মনে হয়েছিলো এমন কিছু হতে পারে আর হলোও তাই।সে খুশিতে শব্দ করেই বললো,
“ আলহামদুলিল্লাহ,আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ!
_ আল্লাহ মনের খোয়াইশ পূরন করেছেন।"
সাফিয়া বড় বোনের খুশিতে হালকা হাসলো।এটা যদিও তার দ্বিতীয় মাতৃত্ব তবুও তার ভীষণ লজ্জা লাগছে।কারণ আগের বারের বিষয়টা প্রথম জেনেছিলো রেজওয়ান।তাও হাসপাতালে গিয়ে।আর আজ তার বড় বোন অনুমান করে ঘরেই বুঝে নিলো। যদিও খুশির বিষয়টি তবুও ঘর ভর্তি মানুষ তাই একটু লজ্জা লজ্জা লাগছে।
সে বললো,
“ এখন কাউকে বলো না।"
আফিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকালো, উচ্ছসিত খুশিটা নেতিয়ে পড়লো মনে হয়।একটু এগিয়ে এসে ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“ কেন? এই তুই রেজওয়ানের সাথে ওমন ব্যবহার কেন করেছিস? তাও সবার সামনে? ওর খারাপ লাগেনি?"
বোনের জেরায় সাফিয়া ইতস্তত করে বললো
“ বারবার ডাকছিলো তাই হঠাৎ করেই কেন জানি মাথাটা গরম হয়ে গেল।আর ওমন কর..
“ ঠিক আছে,এমন করিস না। পুরুষ মানুষ। সবসময় আমাদের তেজ সহ্য করার ক্ষমতা নাও থাকতে পারে।তাই হিতে কি করে বসে বলা যায় না।
যা এক কাজ কর,আমি ওকে পাঠিয়ে দেই তুই খুশির খবরটা দিয়ে দে।এতেই দেখবি রাগ গলে পানি হয়ে গিয়েছে।"
“ না আপা থাক,বাড়ি গিয়ে বলবো নে!"
“ না এখনই বলবি।আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
_ তোর ভাইয়া যা খুশি হবে না? বেচারাকে স্ট্রিপ আনতে পাঠানোর সময়ই দেখেছি খুশিতে ডগমগ করছে।"
সাফিয়া বসে রইলো ঘরে, আফিয়া খাবার ঘরে গিয়ে দেখলো বাচ্চারা গাড়ীতে বসে সেটা নিয়ে খেলছে আর বড়রা তাঁদেরকে দেখছে।কেউ কেউ খাবার টেবিলে গিয়ে বসেছে।আফিয়া দ্রুত কদমে এগিয়ে গিয়ে খাবার টেবিলে মৃদু হেসে দোয়ার সাথে আলাপরত রেজওয়ানকে বললো,
“ রেজওয়ান ভাই, তুমি একটু ভেতরে যাও তো।সাফিয়া কিছু বলবে তোমাকে।"
আফিয়া এদিকে আসতে দেখেই নাসিফ আফিয়ার দিকে চেয়ে ছিলো।রেজওয়ানকে ঘরে পাঠাতে দেখে কৌতূহলী নয়নে তাকিয়ে ছিলো,আফিয়া স্বামীর দিকে চেয়ে চওড়া হাসি দিলো।মাথা উপর নিচ দুলিয়ে সুসংবাদের জানান দিলো।নাসিফ শব্দ তুলেই বললো,
“ আলহামদুলিল্লাহ!"
“ রুকাইয়া ফ্রিজ থেকে মিষ্টি বের করো।আর ফিন্নির বাটিটাও বের করে রাখো।খাওয়ার পর দিও সবাইকে।"
“ জ্বী ভাবী।
একটা খুশির দিনে আরেকটি খুশির বার্তায় গাজী বাড়ি মুখরিত হয়ে উঠলো।রাতের খাবার দাবারের পর মিষ্টি মুখ থেকে আনন্দ,হইচই করেই রাতের এগারোটা পার করলো। এরপর যার যার ঘরে সে সে গিয়ে শুয়ে পড়লো।
সময় কি বেঁধে রাখা যায়! যায় না তো! শীত গিয়ে আবারও শীতের আগমন, বসন্তের নতুন কুড়ি বুড়িয়ে গিয়ে ঝড়ে পড়া থেকে আবারও নতুন কুড়ির জীবনচক্রের পরিক্রমায় সময়ের দৌড় চলে না। মানুষের জীবনের মুহূর্তগুলোও নানা রঙের দোলায় ভাসতে ভাসতে একুল থেকে ওকুল করতে থাকে।তেমনি পরতে পরতে জমে যায় স্মৃতিরা।
মোবাইলে বাচ্চাদের ছবি দেখতে দেখতে নানা অতীত কল্পনা করছে আফিয়া।চোখে তার চশমা উঠেছে।সেটার আড়ালেই লুকিয়ে আছে সেই মায়াবী ডাগর আঁখি জোড়া।ওড়নার কোনা দিয়ে চোখটা ভালো করে মুছে নিলো। ঠোঁটের কোনে পরিপূর্ণ হাসি।নাইফ এখন বুয়েটের শিক্ষার্থী,প্রথম বর্ষের।তাইফ এখন হাফেজ।গত সপ্তাহেই পরীক্ষা শুরু হয়েছে ইনশাআল্লাহ শেষ হবে এই সপ্তাহের মধ্যেই। ছেলেটা ভালোই মনোযোগ দিয়ে নিজের পড়াশোনা করছে।নাসিফ আফিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজেদের ইচ্ছামত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পূরণ করেছে অল্প সময়ের মধ্যেই ছেলেকে হাফেজ বানিয়ে এখন ছেলের ইচ্ছা পূরণ করবে তারা।ছেলেটার আর্মিদের প্রতি বেশ ঝোঁক।তাই তারা ভেবেছে মাদ্রাসায় ৫ ম অবধি শেষ করেই ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে ভালো কোন ক্যাডেট মাদরাসায় দিয়ে দিবে। নিজের ইচ্ছাও পূরন করুক।তবে ছেলে তার আগের মতোই জেদী রয়ে গিয়েছে। একটুও আধটু ছাড় কেবল তার ভাই বোনদের জন্য নয়তো কাউকে ছাড় দেয় না।
নাবীহা এখন ৯ম শ্রেণীতে।সেও বিজ্ঞান বিভাগ নিয়েছে। তার ইচ্ছা কেমিস্ট্রি নিয়ে খেলা। মেয়েটা এখনই বেশ পরিশ্রমী হয়ে উঠেছে। আহ্লাদি ভাবটাও কমে গিয়েছে।কেমন জানি ধীরস্থির আর শান্ত স্বভাব ভর করেছে তার উপর। পড়াশোনা আর নিজের চিত্রাংকন, ক্যালিগ্রাফি করে সময় পেলে মায়ের কাছে সহযোগিতা করে টুকটাক।তবে ছোট বোনের খেয়াল রাখতে ভুলে না একদম।তার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীই হচ্ছে তার ছোট বোন।
তাবিহা ওয়াসিয়া তুহি! সে এখন চড়ুয়ের মতো ছটফটে হয়েছে।গাজী পরিবারের আত্না নামক পাখিটা তার মাঝেই আঁটকে থাকে।সে পুরো বাড়ির আনাচে কানাচে নিজের অস্তিত্ব ছড়িয়ে রাখে। সারাদিন এটা ওটা ভাঙ্গা,ফেলে দেওয়া,না পেলে জমিনে গড়াগড়ি দিয়ে চিৎকার করে পুরো মহলের মাথায় তোলা তার নিত্য কাজ।
তিনটা বছর পেরিয়ে সে এখন সাড়ে চারে।তাকে মাদ্রাসা, স্কুলে ভর্তি করানো হলেও খুব একটা লাভবান তার পিতামাতা হলো না। একদমই পড়তে চায় না।পুরো ক্লাসে আফিয়াকে তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নইলে চিৎকার করে বাইরে বেরিয়ে আসে।তবুও তার পিতার আদেশ মতে মেয়েকে চিমটিও দেওয়া যাবে না। ঐদিকে মা বোন ভাই কারো কাছেই সে ঘরে পড়তে চায় না।তাই তার জন্য একজন গৃহ-শিক্ষিকা রাখা হয়েছে।তবে তাকে নিয়েও বিস্তর গবেষণা করে খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার বাবা মা।তাকেও মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হবে। ইচ্ছা আলেমা বানানোর। আল্লাহ কবুল করলে ইনশাআল্লাহ হবে।
সবাই মোটা ভালো আছে যদিও সালমা ফাওযিয়ার শরীরটা ইদানিং ভালো যাচ্ছে না। তার মধ্যে নিয়াজ মোর্শেদও হঠাৎ করেই একদিন পা পিছলে পড়ে গিয়ে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী হয়ে আছেন। নিয়মিত ফিজিওথেরাপি চলছে,একটু উন্নত হলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে।
আজ নাফিসা আসছে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। অবশেষে তার আসার সৌভাগ্য হয়েছে।সেই কারনেই বাড়িটা আজ একটু গোছগাছ করানো হয়েছে।নাফিসার ঘরদোর গুছিয়ে রাখা হয়েছে।
“ আম্মু!"
নিজের কেচি বেল্টের ভাঁজ ঠিক করতে করতে মায়ের দরজার সামনে এসে দাড়ালো তুলতুল।
আফিয়া মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে মেয়েকে দেখছে। মাশাআল্লাহ,কত সুন্দর লাগছে।যদিও তার মেয়ে এভাবে যেতে পারবে না।এটার উপরেই বোরকা পড়তে হবে। শুধুমাত্র পর্দার জন্য মেয়ের স্কুল পরিবর্তন করিয়ে গার্লস স্কুলে দিয়েছে।
নাফিসা ফ্লাইটে উঠার আগেই ভাইয়ের বউকে ইনফরম করতেই ফোন করেছিলো।সে ফোনালাপ শেষ করে নিজের মোবাইলের ওয়ালপেপারে থাকা চার মানিকের ছবি দেখছিলো তখনই হুট করেই গ্যালারীতে ঢুকে বাচ্চাদের বিভিন্ন সময়ের ছবিগুলো দেখছিলো।
“ আম্মু আমাকে কয়টা টাকা দেও না!"
আফিয়া মেয়ের কথায় হাতের মোবাইলটা বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“ সে না হয় দিলাম কিন্তু তা দিয়ে হবেটা কি তাতো আমাকে আগে জানতে হবে তাই না?"
“ আমার স্কুলের সামনে যেই আন্টিটা ভিক্ষা করে না, ঐ আন্টির মেয়ের নাকি বিয়ে তাই উনি সবার কাছে সাহায্য চাইছে।কাল তো আমার কাছে খালি অল্প কয়টা টাকা ছিলো যেটা বাবা আমাকে গত উইকে টিফিনের জন্য দিয়েছিল।তাই দিতে পারিনি।বলেছি আজ দিবো।প্লিজ আম্মু দাও!"
আফিয়া জানে তার দরদি কন্যা অবশ্যই সেই টাকা দিয়ে দিয়েছে এখন হয়তো তাতে তার মন ভরেনি কিংবা কম মনে হচ্ছে তাই এখন আবার দিবে।যাক, ভালো কাজ!ভালো কাজে বাচ্চাদের উৎসাহ দিতে হয়।আর আল্লাহ যখন তাকে এত দিয়েছে সে সেখান থেকে আল্লাহর বান্দাদের একটু দিলো তাতে নিশ্চয়ই কমবে না।আফিয়া নিজের ড্রয়ার খুলে ব্যাগ থেকে কয়েকটি কচকচে নোট বের করে বললো,
“ আমি শুনেছি তোমার নিরু আন্টি বলেছিলো কথাটা।তাই আমিও ভেবেছিলাম কিছু একটা দিবো।
যাই হোক উনাকে বলবে উনার মেয়ের বিয়ের জন্য উপহার।আর হ্যাঁ নিজের হাত খরচ নিজের কাছেই রাখবে।ঐটা পথেঘাটে তোমার বন্ধুর কাজ করবে"
মায়ের কাছে অল্প চেয়েছিলো কিন্তু বিনা বিচারে বেশি পেয়ে নাবীহা উচ্ছ্বসিত হয়ে নিজের মা'কে জড়িয়ে ধরে বললো,
“ থ্যাংকু আম্মু। তুমি এত্ত ভালো।"
ছোট মেয়েকে নিয়ে এত বেশি দৌড়ের উপর থাকতে হয় যে বড় মেয়েকে এখন আর স্কুলে দিয়ে আসতে পারে না তাছাড়াও মেয়েটার ক্লাস টাইম বিকেলে।২.৩০ থেকে ৫.৩০ অবধি ক্লাস।মাঝে ৩০ মিনিটের টিফিন।এই সময়ে একজন গৃহিণীর পক্ষে তো সম্ভব নয়।আফিয়া ভাবছে কিভাবে মেয়েকে সকালের সিফটে আনা যায় কিন্তু তাতেও তো রিস্ক হয়ে যায় কারণ ক্লাস পরিবর্তনে বাচ্চার পড়াশোনার উপর চাপ বাড়বে, ঝামেলা হবে।
কলিং বেলের শব্দে সচকিত হয়ে উঠল আফিয়া,হাতে তার ডিম লেগে আছে।রুকাইয়া ছুটিতে গ্রামে আছে। নতুন একটি মহিলা রেখেছে। নাম আসমা।সে সকাল সন্ধ্যা থাকে।রাতে নিজের বাড়ি চলে যায়।ছেলে মেয়ে বড় হচ্ছে তার সাথে আফিয়ার মাথায়ও উদ্ভট চিন্তা ভাবনা আসছে। সুফিয়া নামের যেই মেয়েটা ছিলো ওর বয়স মোটামুটি নাইফের চেয়ে কয়েক বছর বড়। কিন্তু দেখতে মাশাআল্লাহ। তাছাড়াও কেন জানি আফিয়ার মনে হচ্ছে বিবাহযোগ্যা ছেলে মেয়ের সামনে প্রায় সমবয়সী কাজের লোক থাকা উচিত নয়। আবার আফিয়ার নিজের বয়সের চেয়ে বড় কাউকে হুকুম দিয়ে কাজও করাতে পারবে না। এদিকে মেয়েদের নিরাপত্তার কারণে ছেলে কাজের লোকও রাখতে পারবে না।কাজের লোক রাখায় আফিয়ার এত বাছবিচার দেখে নাসিফ কেবল হাসে।
কিন্তু এতে আফিয়ার সিদ্ধান্তে হেলদোল হয় না। সে নিজের সিদ্ধান্তে অটল।এখন এই ছুটা খালা আর রুকাইয়া দিয়েই চলে তার সংসারি কাজকর্ম।তবে মাঝে মাঝে আরো একজন খালা আসে, টুকিটাকি সাহায্য করে দেয় বিনিময়ে নগদ কিছু সম্মানি নিয়ে যায়, সঙ্গে এটা ওটা আফিয়া দিয়ে দেয়।
যাদের জন্য এত বাছাবাছি তাদের ভুবনই আলাদা।তারা কোনদিন রান্না ঘরে উঁকি দিয়েও দেখে না।
নাইফের মাঝে এখন ভারীত্ব চলে এসেছে।বিশ ছুঁই ছুঁই নাইফ এখন দেখতে পূর্ণাঙ্গ পুরুষ।গাল জুড়ে তার হালকা ছাঁটে চাপ দাঁড়ি, ঘন সিল্কি আর্মি কাট চুল, সুসজ্জিত পুরুষের অলংকার বিশ্লেষিত গোঁফ তার গোলাপি ঠোঁটের সৌন্দর্য আরো কয়েকশ' গুন বাড়িয়ে তুলেছে। সুঠামদেহী সুশ্রী চেহারার মাধুর্যযে কতল হয় অনেক রমনী। ক্লাস থেকে ব্যাচ, ব্যাচ থেকে ডিপার্টমেন্ট সর্বত্রই সে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সুদর্শন মামুর সুদর্শন ভাগ্নে বলেও বেশ সুনাম কামাচ্ছে। যদিও ভাগ্য ক্রমে মামার ক্লাস তার হবে না বলেই মনে হচ্ছে কারণ মামা খুব শিগগিরই পিএইচডির জন্য বেরিয়ে যাবে।মামীর মাস্টার্স শেষ। দুজনেই একসাথে যাবে। প্রস্তুতি তাই চলছে।
সারাদিন পড়াশোনা আর বিভিন্ন সোস্যাল ওয়ার্ক, অবসরে আর্টিকেল লেখা।এই হচ্ছে তার দুনিয়ার কাজ।আখিরাতের কাজেও অনেক সময় কাটায়।আর বাকী সময় তার পরিবারের। কখনো সখনো ক্লাস শেষে হুট করেই ছোট ভাইয়ের মাদ্রাসার সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়,ভাইকে টুকটাক বাইরের চটকদার খাবার কিনে দিয়ে আসে। ক্যালিগ্রাফি শেখার জন্য রঙ, বোর্ড কিনে দিয়ে আসে। অনেক সময় নিয়ে ভাইয়ের সাথে খুনসুটি করে আবার বাড়ি ফিরে আসে।বাড়ি ফেরার পথে ছোট বোনদের জন্য হুবহু খাবার নিয়ে আসতে ভুল করে না। বাড়িতে তার জন্য এখন তার মায়ের চেয়েও অধির আগ্রহে অপেক্ষা করে তার কলিজা,তার সবচেয়ে আদরের অধিকার,তার ছোট বোন তুহি।ভাইয়ের কাছে তার কত কথা।যার শেষ হয় না রাতের মধ্য প্রহর ছাড়া।নাইফও সব মন দিয়ে শুনে, টুকটাক উত্তর দেয়।মাঝে একা পড়েছে খালি নাবীহা।সে বড় ভাইকে দেখে,মামীর পরামর্শ নিয়ে পড়াশোনায় এত বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছে যে মাঝ রাতে ভাই-বোন নিয়ে মেতে থাকার সময় তার নেই।
“ ভাইয়া!"
“ হুম বলো বনু!"
নাইফ নিজের খাতায় একটা নকশা তুলতে তুলতে বোনের দিকে না তাকিয়েই উত্তর করলো।তুহি নিজের কোমর সমান চুল গুলো সামনে এনে এলোমেলো করে গেঞ্জির হাতা থেকে হাত বের করে ভুত সাজার প্রয়াস করে ভাইয়ের সামনে গিয়ে বললো,
“ হালুম!
_ ভয় পাও আমাকে! আমি ভুত!"
নাইফ বোনের এমন পাগলামি দেখে পেট ধরে হাসতে লাগলো।ভাইকে ভয় পেতে না দেখে বরং তার উপর হাসতে দেখে গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে রইলো তুহি।কপাল কুঁচকানো, চোখ ছোট ছোট করে রাখা, গাল ফুলিয়ে বেলুন বানিয়ে রেখেছে। বোনের এই অবস্থা দেখে নাইফের হাসি আরো বেড়ে গেলো।এতে করে ক্ষেপে গেলো তুহি।সে ভাইয়ের পেন্সিল কম্পাস ছুড়ে মেরে বললো,
“ আমি না ভুত! ভয় পাও না কেন তুমি? তুমি কি অনেক সাহসী?বাবার মতো সাহসী!"
নিজের দুই হাতে কাঁধের দিকে উঁচিয়ে অনেকটা মাসেল দেখানোর মতো করেই বললো কথাটা।নাইফ নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করে বোনকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে গাল টেনে দিয়ে বললো,
“ এত্ত কিউট ভুত তো আমি জীবনে প্রথম দেখলাম তাই ভয় পাইনি। কিন্তু আমার ভয় পাওয়া উচিত ছিলো তাই না!"
ভাইয়ের কথায় মাথা উপর নিচ দুলিয়ে বললো,
“ হুম!"
“ আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি এখন আবার সাজো আমি ভয় পাচ্ছি!"
বলেই নাইফ নিজেই চুলগুলো সামনে এনে এলোমেলো করে দিলো। তুহি আবার আগের মতো করেই খেলতে আরম্ভ করলো।
দুই ভাই বোন এভাবেই খেলতে থাকলো রাতের সাড়ে বারোটায়।
“ তোমার ছেলে মেয়ে এখনো ঘুমায়নি?"
“ আমার ছেলে পড়ছে,আর আপনার মেয়ে আমার ছেলেকে বিরক্ত করছে।"
“ পড়ছে না ছাই করছে। সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। মোবাইলে অত কিসের পড়া?"
আফিয়া বিছানা ঝাড়ছিলো। স্বামীর অহেতুক কথায় চোখ,কপার কুঁচকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বললো,
“ আশ্চর্য কথা বার্তা বলেন! এত শিক্ষিত হয়ে লাভ কি আপনার? সারাদিন তো দেখি নিউজ শুনছেন,পড়ছেন তাহলে এটা জানেন না আপনার সরকার এখন পড়াশোনা সব ঐ মোবাইলেই ঢুকিয়ে দিয়েছে।তাহলে বাচ্চারা করবে টা কি?"
“ হ্যাঁ সে তো শুধু তোমার ছেলের জন্যই দিয়েছে,বাকী আমার মেয়ে তো পড়ছে না। অহেতুক তর্ক না করে খবর নাও ছেলে কোথায় কি করে? যেই মাঞ্জা মেরে বের হয় তাতে আমি নিশ্চিত মেয়েলি ঘটনায় জড়িয়েছে তোমার ছেলে পরে দেখবে কোথায় থেকে একটা ধরে নিয়ে আসবে তখন শত কেঁদেও কুল পাবে না।আর আমি তো .."
“ হইছে থামেন।যান আপনার ছোট মেয়েকে এনে ঘুম পাড়ান।
_ যত্তসব আজগুবি কথাবার্তা!সেয়ানা ছেলে, ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে; এত এত ছেলে মেয়ের মাঝে পড়াশোনা করে সে মাঞ্জা মারবে না তো কি মাঞ্জা আপনার মতো বুড়ো ভাম মারবে নাকি?"
আফিয়া ইদানিং কথায় কথায় বুড়ো বলে,নাসিফের ধারণা এটা তাকে অপমান করার জন্য নির্বাচিত শব্দ।সে মুখটাকে বাংলার পাঁচ বানিয়ে বললো,
“ হ্যাঁ আমি তো বুড়ো হয়ে গেছি,আর আপনি তো এখনো কচি খুকি রয়ে গিয়েছেন!"
আফিয়া হাতের ফুল ঝাড়ুটা বিছানার উপর ঠাস করে ফেলে বললো,
“ আমি বুড়ি হয়ে গিয়েছি সেটা আমি যেমন জানি তেমন মানিও।আর তাই আমি বাইরে গেলে এক বোতল সেন্ট মেখে,চুল উল্টো আচড়িয়ে,ইন করে কচি সেজে বাইরে যাই না।আমি জানি আর বছর দুই পর আমি শ্বাশুড়ি হবো,তাই আমি সেভাবেই চলি। আপনের মতো তো কলপ মেখে কচি সেজে রাস্তায় বের হইনা।"
নাসিফ কোন কথা বললো না।এক ফ্রেন্ডের টিটকারীর কারতে তার কথাকে অমান্য করে মাথায় কলপ দিয়েছিলো গত মাস পাঁচ আগে।কানের গোড়ায়,ঘাড়ের কাছে দুই চারটা সাদা চুল উঁকি দিয়েছিল তাই। ঘটনা পাঁচ মাস আগের অথচ পাঁচ মাস ধরেই এই শাস্তি চলছে।
হয়তো আজীবন চলবে।নাসিফ আর কথা বাড়ালো না। শুধু যাওয়ার পথে বললো,
“ ভালোর জন্য বলি তো শোন না কথা,পরে বলতে এসো না ওগো আপনে ঠিকই বলেছিলেন।"
কথাটা ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে আফিয়া মুখ ঝামটা মেরে আবারও নিজের কাজ করতে করতে বললো,
“নিজে যে পাকার আগেই প্রেম করছে সেই বেলায় কিছু না। খালি অন্যেরটা দেখে।
জুয়ান ছেলে মাঞ্জা মারবে না তো কি বুইড়ারা মারবে?"
এই কথাটাও নাসিফের কানে গেলো।নাসিফ ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়লো। বয়সের সাথে সাথে কতকিছু বদলায়।আগে আফিয়া তাকে ভয় পেতো এখন সে ভয় পায় আফিয়াকে। শুধুই কি সে একা! বড় ছেলে ছাড়া বাকী সবাই এখন আফিয়াকে তোয়াজ করে চলে।
“ তোমরা কি একটু থামবা প্লিজ! আমার ডিস্টার্ব হচ্ছে তো!"
মেয়ের কথায় পিছন ফিরে তাকিয়ে আফিয়া ধমক দিয়ে বললো,
“ কিহ! কাকে শাসন করতে আসছো তুমি?"
মায়ের ধমকের চুপসে গিয়ে আমতা আমতা করে নাবীহা বললো,
“ আমি হইচইয়ের কারণে কনসেনট্রেট দিতে পারছি না।তাই বলছি!"
“ রাতের বাজে সাড়ে বারোটা,যাও চুপচাপ শুয়ে পড়ো।সকালে নামাজ পড়ে কোরআন পড়ার পর নিজের একাডেমিক পড়াশোনা করবে।রাত ভরে পড়াশোনা আর দিনভরে ঘুম!এটা আমার সংসারে একদম চলবে না।"
নাবীহা চলে গেলো। জানে, এরপর কথা বাড়ালো গাজী পরিবারের কপালে শনি নামিয়ে ছাড়বে আ মোল্লা বাড়ির নিয়াজ মোর্শেদ মোল্লার এই জেষ্ঠ কন্যা!
চলমান...







0 মন্তব্যসমূহ