সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৭৪

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_৭৪



কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


বিশ্রাম নিয়ে এশার আদায় করে সবাই রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে।আফিয়া রান্না ঘরে হাত চালিয়ে সব করার চেষ্টা করছে।তাকে সাহায্য করছে রুকাইয়া,সুফিয়া আর দোয়া।

সাফিয়া কেমন জানি চুপচাপ আছে,রেজ‌ওয়ান‌‌ও।


 ফেরাটা কিছু সময় আগে কাদছিলো এখন তাকে তার বোন আর ভাইয়েরা তাকে সামলাচ্ছে।তাইফ নিজের বাইকের উপর বসিয়ে পুরো বারান্দা ঘুরিয়েছে।নাইফ কোলে নিয়ে বাড়ির বাইরে বাগানে নিয়ে হাটিয়ে এনেছে।


দোয়া একটার পর একটা খাবারের জিনিস এনে টেবিলে রাখছে তাই দেখে সাফিয়া এত সময়ের মনব্রত ভেঙে উঠে দাঁড়ালো এবং রান্না ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বললো,


“ আমি তো সেই কখন থেকেই বসে আছি।আমাকে কিছু করতে দাও। তোমাদের সাহায্য করি কিছু একটা করে?"


আফিয়া জোর দিয়ে বললো,


“ কিছু করতে হবে না।তুই যা।গিয়ে রেস্ট নে।এই সময়ে রেস্টের দরকার বেশি।"


আফিয়ার কথায় কেউ কিছু বুঝলো না। প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে র‌ইলো।আফিয়া মিটমিট করে হাসছে।দোয়া জিজ্ঞেস করলো,


“ কি হয়েছে বড় আপা! এই কথার মানে কি?"


সাফিয়া হয়তো বোনের কথায় কিছু একটা ঠাওর করতে পারলো।সে লজ্জা পেলো।এখানে দাঁড়িয়ে সেই লজ্জা আর বাড়াতে চায় না।তাই চলেই গেলো।কাজ করতে করতে আফিয়ার মাথায় কিছু একটা খেললো।সে নিজের হাতের কাজ রেখে দোয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,


“ দোয়া এই ভর্তাটায় একটু সরিষার তেল দিয়ে ভালো করে মাখো তো।আমি এখন‌ই আসছি!"


বলেই সে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে গেলো।ঘরে গিয়ে দেখলো ছোট মেয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে বল দিয়ে খেলছে আর পাশেই নাসিফ বসে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করছে। সে দ্রুত কদমে গিয়ে বললো,


“ শুনেন একটা কাজ করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি!"


“ কি, বলো?"


“ একটু কষ্ট করে বাইরে ইয়ে মানে ফার্মেসিতে যাবেন?"


“ এখন এই সময়ে ফার্মেসিতে? কেন?"


“ দরকার তাই!"


নাসিফ দুষ্টমি করে বললো,


“ ফার্মেসিতে কেন যাবো? এখন‌ও অনেকগুলো আছে। অন্তত পনেরো দিন যাবে!"


আফিয়া কাঁধে চাপড় মেরে বললো,


“ ধ্যাত! সবসময় আপনার এমন ফাইজলামি!

যান গিয়ে একটা না দুইটা আনবেন!"


“ মানে দুটো দিয়ে কি হবে! আমি এক প্যাকেট নিয়ে আসি!"


“ এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে। বাচ্চারা বড় হচ্ছে আর দিনদিনই আপনার মুখের লাগাম হারাচ্ছে!"


“ আশ্চর্য আমার উপরে কেন চটছো? তুমি‌ই তো বলছো দুইটা আনতে।তাহলে আমার দোষটা কোথায়?"


“ আমি আপনাকে ঐটা আনতে বলি নাই।আমি বলছি দুটো..!


“ আশ্চর্য তুমি আমাকে কি আনতে বলো নাই তাই তো বুঝতে পারছি না।"


“ আমাকে বলতে তো দেন!"


আফিয়া একটু উঁচু কন্ঠেই বলে ফেললো যার দরুন তার পুঁচকে পুত্রি তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকালো,আফিয়াকে চটতে দেখে নাসিফ উঠে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় থামতে বললো,


“ ইস্ থামো থামো। আচ্ছা চেততে হবে না।কি লাগবে তাই বলো?"


“ এতক্ষণ..


বলেই আফিয়া একটু থামলো,মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু জোর করে ঠোঁট মেললো অতঃপর আবারও নাসিফের দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বললো,


“ দুটো প্রেগন্যান্সি কিট আনবেন।"


“ হাআ কি বলো?কখন! কিভাবে? আমি তো কিছুই জানি না। নিশ্চয়ই তুমি পিল মিস করেছো! আমি তো কখনো!"


“ থামেন; আল্লাহর দোহাই লাগে থামেন!"


বলে আফিয়াই নাসিফের মুখ চেপে ধরলো। তা দেখে তাদের মেয়ে ফোকলা মুখে হেসে দিলো। মেয়ের হাসি দেখে বাবা মাও হেসে ফেললো।আফিয়া নাসিফের কনুইয়ে হালকা চাপড় মেরে বললো,


“ অসভ্য লোক, সারাদিন মুখে কুলুপ আটকে রাখেন সেটাই ভালো।মুখ খুললেই আমাকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন।

_ দুটো কিট আনবেন আমার সন্দেহ হচ্ছে সাফিয়া!"


“ আমি ভাবলাম আমার ঘরে আর এ.."


“ আপনার আরো লাগবে?"


“ না আল্লাহর রহমতে আমি চারজন নিয়েই খুশি আছি। কিন্তু আমি কেন? যার টা তার স্বামী না আনবে!"


“ আনলে কি সারপ্রাইজ থাকবে?"


“ ওহ, সারপ্রাইজ! আচ্ছা ঠিক আছে।আর কি করার! আমিই যাচ্ছি তাহলে!"


“মেয়েকে নিয়ে যান।"


“ ওকে নিয়ে এত রাতে বাইরে!"


“ সবাই একটু রেস্ট নিক। আপনার মেয়ে আপনিই সামলান। এমনিতেই আপনার মেয়ের গায়ে তো মশাও পড়তে পারে না সো..!


“ হ্যা নিয়েই যাচ্ছি!"


এদিকে গিফট খোলার হিড়িক পড়েছে।তাইফের আজকের সব গিফট এক এক করে খুলে দিচ্ছে তার ভাইয়া আর মামা। তাঁদের ঘিরে সোফার চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে বাকীরা সবাই।নাবীহা মামার পাশে বসেছে।তাই আছে মাঝে!


প্রথম বক্স থেকে পেলো একটা সুন্দর রিমোট কন্ট্রোল এরোপ্লেন, তারপর পেলো এক সেড ইসলামিক শিশুতোষ গল্পের ব‌ই, তারপর পেলো প্যাস্টেল কালার বক্স ও ব্রাশের সেট,কোনটাতে ঘড়ি,কোনটাতে সোনার চেইন, ইত্যাদি ইত্যাদি কিন্তু তাইফের মন পড়ে আছে ঐ বড় প্যাকেটায়।কি আছে ঐটাতে? সালাহ্ ভাগ্নের মন পড়তে পেরেই নাইফকে বললো,


“ নাইফ, এগুলো পাশে রাখো। তারপর চলো ওটা খুলি।"


“ জ্বী মামু!"


বলেই নাইফ আগের গিফট ধরে তাইফকে জিজ্ঞেস করলো,


“ এগুলো নিয়ে ঘরে রাখবো? নাকি এখানেই দেখবার সব?"


সাফিয়া বললো,


“ নাইফ চেইনটা তোমার মায়ের হাতে দিয়ে আসো আগে! তাঁরা বাকীগুলা নাও।"


“ নেওয়ার দরকার নেই,পাশেই রাখো।দেখা তো হয়নি সবার।"


রেজ‌ওয়ান বললো।নাইফ খালুর কথা অনুযায়ী কাজ করলো।এক পাশ করে গিফট গুলো রেখে দিলো।মামা ভাগ্নে মিলেও ঐ প্যাকেটটা সরাতে পারলো না। তারপর রেজ‌ওয়ান এলো। এরপর তিনজন মিলে প্যাকেট সরিয়ে মাঝখানে আনলো।তাইফ উৎসাহিত হয়ে আশেপাশে ঘুরঘুর করছে।


“ আমি খুলবো এটা!"


বলতেই নাইফ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,


“ হ্যাঁ খুল।আয় আমি দেখিয়েছে দেই।"

নাইফের হাতে কেচি না দিয়ে নিজেই এক কোনায় কেটে দিলো,ঐ কাটা অংশে হাত ঢুকিয়ে তাইফ ফ্যারফ্যার করে পুরো র্যাপিং কাগজটা ছিঁড়ে ফেললো। এরপর একটা মোটা কাপড়ের প্যাঁচ দেখা গেলো কিন্তু তাতেও বোঝা যাচ্ছে ভেতরে কি আছে!

সবাই মিলে সেটাও খুলে ফেললো! রেসিং কার! ওয়াওওও!

তাইফ দুই গালে হাত দিয়ে চমকিত চোখে তাকিয়ে বললো,


“ ওয়াওও রেসিং কার!"


গিফট দেখে সবাই খুশি হলো।তাইফের অনেক দিনের ইচ্ছা ছিলো রেসিং কার।নাসিফ বলেছিলো কিনে দিবে কিন্তু তার আগেই গিফট পেয়ে গেলো।তাইফ খুশি ডগমগ করছে।সে দৌড়ে রান্না ঘরে গেলো,মায়ের ওড়নার কোনা ধরে টানতে টানতে বললো,


“ আম্মা আসো দেখে যাও! ঐটা কি গিফট!"


আফিয়া ছেলের এত খুশি দেখে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লো।বাচ্চাটা তার অল্পতেই কত যে খুশি হয় তা তো সে ভালোই জানে।আর যদি পায় নিজের ভাবনার বাইরে কিছু তাহলে তো কথাই নেই।


“ মা রান্না করছি। তুমি বলো কি পেয়েছো?"


“ না তুমি আসো দেখে যাও!"


বলে সে হাত ধরে টানতে লাগলো ঐদিকে আফিয়ার হাতে গরম কড়াই। মাত্র তরকারি রান্না করে বাটিতে ঢালছে।সে তড়িঘড়ি করে কড়াইটা রাখলো। তারপর ছেলের হাত ধরে থামিয়ে বললো,


“ তুমি এত ছটফট করো তাইফ।দেখছো তো মায়ের হাতে গরম কড়াই তার মধ্যেই।যদি তোমার হাতে পায়ে পড়ে যায়! তখন?"


“ তুমি আসো!"


আফিয়া ছেলের হাতে হাত রেখেই রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা বসার ঘরে আসলো। একদম মাঝখানে কালোর মধ্যে বটল গ্রীন,লাইট অলিভ মিশ্রনে বাংলাদেশ আর্মির সাথে ম্যাচ করা দুর্দান্ত একটা রেসিং কার।এর মধ্যেই ঘরে ফিরে আসলো নাসিফ।সেও চমকে গেছে এটা দেখে।বুঝতে সময় লাগলো না কে দিয়েছে। কিন্তু এত দামী গিফট! কি দরকার ছিলো?


গাড়ী দেখে আরো একজন খুব খুশি হলো।সে হচ্ছে তুহি।বাবার কোল থেকে বারবার ঝুঁকে পড়ছে।তাইফ বাবাকে দেখে দৌড়ে বাবার কাছে গিয়ে বললো,


“ বাবা এইটা তুমি দিয়েছো না!"


ছেলের কথায় নাসিফ মনটা খারাপ হয়ে গেলো।ছেলেটা এই গিফট তার কাছে চেয়েছিলো। অনেক আগে।তখন সে বলেছিলো যদি মাদ্রাসায় ঠিকঠাক পড়াশোনা করে তাহলে দিবে।সে ভেবেছিল এবার একটা রেসিং কার কিনে দিবে কিন্তু তার আগেই অন্য কেউ! আফিয়া নাসিফের মন পড়তে পারাটা খুব ভালোভাবে রপ্ত করেছে।তাই এখনো সময় লাগলো না।নাইফের নানা বাড়ি থেকে কিছু নেওয়াটা তার পছন্দের না। যেখানে নাইফ নাবীহার প্রতিই তারা তাদের কোন দায়িত্ব পালন করলো না। সেখানে তাইফের প্রতি এমন অতিরিক্ত খরুচে আদর ঠিক যে হজম হবে না তাতো স্বাভাবিক!


তুহি নামতে না পারার জন্য তাইফের চুল ধরে টানছে।তারিফ ব্যথা পেয়ে আহঃ সূচক শব্দ করেই মাথা উঁচিয়ে বোনকে দেখলো।এক আঙ্গুল গালে পুরে আরেক আঙ্গুল চুষছে আর অন্য হাত দিয়ে যচ অপকর্ম করছে।বোনকে দেখে হাত বাড়িয়ে বললো,


“ তুহি বাবু তুমি গাড়িতে বসবে বলে এমন করছো?আসো ভাইয়ার কাছে। গাড়ীতে আগে;তোমাকেই বসাবো আমি!"


নিজেই হাটতে পারে না সে আবার নাদুসনুদুস একটি বাবুকে কোলে নেওয়ার প্রয়াস করছে।নাইফ দেখে উঠে এলো,ছোট ভাইয়ের থেকে বোনকে কোলে নিয়ে বললো,


“ নিজেই হাটতে পারিস না আবার আরেকজনে নিস।আয়!"


“ দাঁড়াও দাঁড়াও আগে সেট করে দেই।"


সালাহ্ সুন্দর করে প্যাকেটগুলো সরিয়ে কাপড় দিয়ে মুছে দিলো। এরপর গাড়ির একসিটে তাইফ আরেক সিটে তুহিকে বসালো,নাইফ পাশ থেকে ধরে রেখেছে।তা দেখে ফেরাও বায়না আরম্ভ করলো। অতঃপর তাইফের কোলে তুহিকে বসিয়ে দিয়ে ফেরাকে পাশে বসিয়ে বেল্ট বেঁধে স্টার্টে চাপ দিলো। যেহেতু ব্যাটারি চালিত।আর তাইফ এই গাড়ির সব বুঝে।তাই তাকে নতুন করে শেখানোর কিছু নেই।সে ঐ খোলা জায়গায় যতটুকু পারলো খেললো অনেক সময় দুই বোনকে নিয়ে।


বাচ্চাদের খেলার মাঝেই সব তৈরি হয়ে গেলো।খাবার‌ও সাজানো শেষ।এখন খেতে বসবে।তখন সাফিয়া বললো,


“ আমি একটু আসছি।"


সাফিয়াকে ভেতরে যেতে দেখে আফিয়া নাসিফকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো,


“ জিনিস কোথায়?"


নাসিফ‌ও ইশারায় বুঝিয়ে দিলো,


“ ড্রয়ারে!"


হাতের কাজ ফেলে রেখেই দ্রুত কদমে নিজের ঘরে গেলো এবং জিনিস নিয়ে গেস্ট রুমে ঢুকলো। সাফিয়া মাত্র বাথরুমের দরজায় খিল দিয়েছিলো এমন সময়ে টোকা দেওয়ায় খুলতে বাধ্য হলো।

বড় বোনকে দেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে র‌ইলো।আফিয়া হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,


“ চেইক কর!"


“ কিন্তু আপা এমন কিছু...!"


“ চেইক কর দেখ আগে!"


বিব্রত চোখে সাফিয়া বোনকে দেখতে চাইলো না।দরজা লাগিয়ে কিছু মুহূর্ত থম মেরে দাঁড়িয়ে র‌ইলো। আল্লাহ জানে কেমন হবে।তার‌ও মনে হচ্ছে এমন‌ই হবে কিন্তু তারপরেও কেন?


চলমান.....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ