সুখ_ফড়িং_সিজন_২ | সকল পর্ব

 


পর্ব_01

“ এক্সকিউজমি এখানে সম্রাট কে?"

এক ঘর ভর্তি পুরুষের মাঝে কাঠখোট্টা স্বরের এক কিশোরীর গলার আওয়াজে করা প্রশ্নটি,তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চাইতে তার কথার ভুল ধরাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করলো উপস্থিত ছেলেপুলে,তারা বললো,

“উনি এখানকার সভাপতি,ঠিক করে কথা বলুন।গিভ হিম রেসপেক্ট!"

রমনীর সোজা এবং ঘন চিকন ভ্রু দ্বয়ের মাঝে এতটাই খাদ তৈরি হলো যে দুটো ভ্রু একত্রে এসে জুড়ে গিয়েছে।তার কুঁচকে যাওয়া চোখ আর খিচিয়ে রাখা নাক দিয়ে ফোঁস করে শব্দ ছেড়ে তপ্ত স্বরে হালকা দাঁত চিবিয়ে বললো,

“ সম্মান দিতে হয় মানুষের কর্মের তরে,নাম কিংবা পজিশনের জোরে না!"

সচরাচর ক্লাবে নারী ঢোকা নিষেধ। বিশেষ জরুরী কিংবা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়া একদম‌ই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে ক্লাবে কোন নারীর প্রবেশ। তারপরও ঢুকে পড়েছে এবং সে অবিরত তোতা পাখির মতোই কথা বলে যাচ্ছে যা ক্লাবে উপস্থিত স্বকর্মে ব্যস্ত সকলকে ভীষণ বিরক্ত করছে। আবার বলছে কি যেনতেন কথা! সে কাউকে খুঁজছে খুবই তাড়া নিয়ে তাও কি-না ক্লাবের সভাপতিকে সরাসরি তালাশ করছে?

“ ভাইকে কি দরকার আমাদের বলেন,আমরাই আপনার কাজ করে দিবো!"

“ আমি যা বলার উনাকেই বলবো!আপনি প্লিজ আমাকে উনি অবধি নিয়ে যান!

 ব্লিয়ার্ডের  স্টিকটা তিন আঙ্গুলের মাঝে পেঁচিয়ে রেখেই ভ্রু কুঁচকে পিছনে হালকা ফিরে কান খাঁড়া করে বোঝার চেষ্টা করলো,তাকেই কেউ খুঁজছে?তাও কোন নারী? কেন? বন্ধুর অমনোযোগীতার সুযোগে হোলে বল ফেলেই স্টি/কটা হাতের ভাঁজে আঁকড়ে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বিচলিত কন্ঠে শুধালো,


“ what happened? Where is the meditation?


“ Nothing Serious, You continue..I will."


“ ভাই!"




কথার মাঝেই ঘরের বাইরে থেকে তার ডাক পড়লো। নিজের কথা সমাপ্ত না করেই পিছনে ফিরে ছেলেটার দিকে চাইলো,ছেলেটা সাড়া পেয়ে একটু ইতস্তত করে বললো,




“ একটা বাচ্চা মেয়ে আপনাকে খুজতাছে?"


“ বাচ্চা মেয়ে?"




কথায় খানিকটা আশ্চর্যই হলো উপস্থিত সকলে, এবং সমস্বরে বলেই ফেললো উপরের কথাটা। নিজের হাতের স্টিকটা বোর্ডের পাশে দাঁড় করিয়ে নিজ প্রিয় বন্ধু বাপ্পীর উদ্দেশ্য বললো,




“ Wait, I will be back in 10 minutes...."


“ yeah, Sure."




ক্লাবেই ঢোকা নিষেধ সেখানে সোজা সভাপতির রুমে ঢুকে পড়েছে।বেশ ঢিলেঢালা কালো বোরকা আর কালো হিজাবে আগাগোড়া মোড়ানো নারীটির দুই কাঁধ পেঁচিয়ে ঝুলছে একটা ছোট কালো চামড়ার ব্যাগ,যার একপাশে আবার একটা সুন্দর কাঠগোলাপের রিং ঝুলছে।ঐ নারীর সাথে সাধারণ সালোয়ার কামিজ পরিহিতা আরো একজন নারী আছে।নারীদ্বয়ের পিছনে থাকায় চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। আচ্ছা নারী নাকি কিশোরী? 


দ্রুত কদমে এগিয়ে গিয়ে ঐ কিশোরী অথবা নারীর সামনে উপস্থিত হতেই একটু থমকালো,চমকালো! আসলেই বাচ্চা মেয়ে! বোরকার কারণে বয়স একটু বেড়েছে বোধহয় নয়তো নাইন টেনের বালিকাই বোধ হয় হবে! 




“ Yes Mam, How can I help you?"


“ আমরা সম্রাট ভাইয়ার সাথে দেখা করতে চাই।যা বলার সরাসরি উনাকেই বলবো।'




নিজের সামনে প্রায় ছ ফুট লম্বা দানবীয় দেহের এক অতি সুদর্শন পুরুষের হটাৎ আগমনে খানিকটা ভরকালো বোধ হয় ঐ কিশোরী উপস বালিকা। কিছুটা অস্বস্তি পোষন করেই নিজের ব্যবহারে সংশোধন এনে সুন্দর ও মিহি সুরে ভদ্রতা দেখিয়ে ভাইয়া উচ্চারণ করেই বললো। বালিকা/ কিশোরী কিংবা রমনী যাই হোক; তার ভোল পাল্টানোতে বেশ মজা পেলো সুদর্শন পুরুষটি,সে নিজের ভারী অদ্ভুত সুন্দর অমায়িক হাসি উপহার দিয়ে নিত্যান্ত‌ই 


গাঢ় পুরুষালি ভরাট কন্ঠে শুধালো,




“ তার কাছে কি চাই?"




“ কমপ্লেইন করবো!"




“ কমপ্লেইন! কার নামে?"




একদম স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলো। উক্ত নারী, কিশোরী কিংবা বালিকা বোধ হয় রেগে গেলো হুট করেই, চোখ মুখ কুঁচকে দাঁত কামড়ে বললো,




“ উনার বাচ্চাদের নামে!'




“ বাচ্চা!"




হালকা চেঁচিয়ে, অতঃপর শান্ত এবং গম্ভীর,গমগমে কন্ঠে,




“ বাচ্চা আর আম মানে উনার! কোথায় থেকে আসবে! উনার তো বিয়েই হয়নি!”




“ হবেও না! এসব গু/ন্ডাপা/ন্ডাদের বিয়ে হয়েও লাভ কি? এরা তো ঘরে ব‌উ রেখেও বাইরের মেয়েদের উপরে কুনজর দেয়!"




চোখ বড় বড় করে সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির এই কথা শ্রবন করলো, অতঃপর কিছুটা রেগে চোখ রাঙানি দিতেই ঐ মেয়ের পাশে দাঁড়ানো অন্য মেয়েটা সেই তোতা পাখির বাম কনুইয়ে একটু চিমটি দিলে সে তার দিকে তাকালো,




“ কি! খামচাচ্ছিস ক্যান!"




“ চুপ থাক,ইয়ে মানে ভাইয়া আসলে আমরা বলছিলাম!"




“ হ্যা বলেছিলেন বাচ্চাদের নামে কমপ্লেইন!"




“ ইয়ে মানে বাচ্চা মানে হলো..........




ঐ মেয়েটা বুঝতে পারছে এই পুরষ রেগে গিয়েছে।তাই একটু ভীরু কিন্তু একদম শান্ত গলায় বলছে চাইলেন বিগড়ে দিলো সেই নারী।সে আগের মতোই করে বললো,




“ বাচ্চা মানে সাঙ্গপাঙ্গ! ঐ সম্রাট ভাইয়ের সাঙ্গপাঙ্গদের নামে কমপ্লেইন করার আছে এবং আমি ঐটা সরাসরি সম্রাট ভাইয়ের কাছেই করবো।তাই আপনি দয়া করে উনাকে একটু ডেকে দিবেন কষ্ট করে প্লিজ.."...




শেষের শব্দে অনুরোধ ছিলো এবং তাতে যথেষ্ট মার্জিত আচরণ লক্ষনের ছিলো।তাই পুরুষটা একটু শীতল চোখে এই তোতা পাখির মুখটা অবলোকন করে আন্দাজ করে নিলো এরা কি আসলেই কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা নিয়েই এসেছে নাকি অযথাই সময় নষ্ট হচ্ছে কিন্তু অভিযোগ করবে বলেছে তাও সাঙ্গপাঙ্গদের নামে! মানে কি সাঙ্গপাঙ্গ! গুন্ডা পালে নাকি যে সাঙ্গপাঙ্গ বলে? প্রত্যেকটি ছেলে উচ্চ শিক্ষিত এবং সামাজিক ভাবে সম্মানিত পরিবারের সন্তান। এরা এখানে আসে কেবল সামাজিক কর্মকাণ্ডের অংশ হতে। সুতরাং এদেরকে বলা যায় সমাজ সেবক অথবা স্বেচ্ছাসেবক।মেয়েটার ভুল শুধরানো উচিত,তাই বললো,




“ সাঙ্গপাঙ্গ না।এরা সবাই এই ক্লাবের সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবক। প্রয়োজনে দলীয় কর্মী বলতে পারেন। এখন বলুন কি অভিযোগ এবং কার নামে?"




“ সম্রাট ভাইকেই বলবো, বললাম তো!"




“ উনি এখন নেই। আপনার ভাষ্যমতে ব‌উকে রেখে অন্য কারো সাথে ডেইট করতে যেতে পারলেও যায়নি কারণ উনার এখনও ব‌উ হয় নাই।হয়তো হয়ে যাবে খুব শিগগিরই!"




কথাটা বলেই খুব গভীর চাহনিতে তোতা পাখির চোখে চোখ রাখলো।এই চাহনি কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকলো ঐ রমনীর কাছে।সে দ্রুত নিজের নজর সরিয়ে নিলো এবং সামনে অপর দিকে ঠিক পুরুষের পিছনে টাঙ্গানো বড় পোস্টার যাতে খুব সুন্দর করে ক্লাবের সকল গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং দায়িত্বরত পদের সকলের অবস্থান সহ বিস্তারিত পরিচয়ের বিবরণ তুলে রাখা আছে। সেদিকে তাকালো এবং সঙ্গে সঙ্গে আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেলো। তার মনে হলো এই মুহূর্তে তার মাথায় কেউ একটা দশ ইঞ্চি ইট দিয়ে বারি মারলে উত্তম হতো।হয়তো একেবারেই মরে যেতো নয়তো সেন্স হারিয়ে নিজের অল্প একটু ইজ্জত বাঁচিয়ে এখান থেকে সটকে পড়তে পারতো। কিন্তু তা হলো না।সে নিজের বিস্ময়কর,ভীতু আর নির্বুদ্ধি সম্পন্ন মস্তক ঘুরিয়ে বান্ধবীর পানে ফেলতেই সেও এক‌ই ভাবে তার দিকে তাকালো অতঃপর এক‌ই সুরে দুজনেই বলে উঠলো,




“ সরি ভাইয়া! আমরা আসলে আপনাকে চিনতে পারি নাই!"




সম্রাট এত সময় এদের কাজকারবার দেখছিলো।সে মাথাটা দু'দিকে হালকা দুলিয়ে ছোট্ট শব্দ উচ্চারণ করে বললো,




“ ইটস ওকে! 


_ আপনাদের অভিযোগ?"




“ ভাইয়া আসলে! "




এখন মেয়ে দুটো ভয় পাচ্ছে। বুঝতে পেরে ওদের নির্ভয়ে বলার জন্য অনুরোধ করলো,




“ নির্ভয়ে বলুন।কি হয়েছে?"




“ আমাদের ক্যাম্পাসে গিয়ে আমাদের এক ব্যাচমেটকে খুব বিরক্ত করে।ইভেন ধমক দিয়েছে যদি রাজী না হয় তবে তুলে নিয়ে যাবে। মেয়েটা খুবই গরীব ঘরের।শহরে শুধু পড়াশোনার জন্য এসেছে। বারবার মেয়েটা বুঝিয়ে বলেছে তাও শোনেনি। উল্টো ভয় দেখিয়ে বলেছে যদি রাজী না‌হয় তবে ঘরে ঢুকে তুলে নিয়ে আসবে আর দরকার হলে.."




থামলো, সম্রাটের কপালে ভাঁজ পড়লো। চোখের ইশারায় কথা সম্পূর্ণ করতে বললো,




“ দরকার পড়লে রে/ই/প করে বিয়ের জন্য রাজী করাবে। এতে নাকি তার বা.. ইয়ে মানে চুলও কেউ বাঁকা করতে পারবে না।সে যুব সংসদের সদস্য।তার কথায় এলাকা চলে!"




“ নাম কি রা/স্কে/লের?"




“ নাম জানি না।তবে দেখলে চিনবো!"




“ ভিকটিম কোথায়?"




“ ভয়ে আজ তিনদিন ধরে ক্লাসে আসে না। কিন্তু তাতে কী ও সেইফ বলেন? যেই লোক বলেছে ঘরে গিয়ে তুলে আনবে সে নিশ্চয়ই ঘরে যেতে পারবে তাই না!"




“ ও যে আমার গ্রুপের‌ই তা কি করে জানলেন? এমন‌ও তো হতে পারে আমার নাম ব্যবহার করছে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে?"




“ জ্বী আমরাও তাই ভেবেছিলাম। আপনার ছেলেপুলের কাজ সম্পর্কে আমরা অনেক শুনেছি।সবাই ভালো বলে। তাই বিশ্বাস হয়নি কিন্তু পরে.. 




“ কি?"




“ কয়েক জন বললো উনাকে আপনার সাথে অনেক বার দেখা গিয়েছে।আমি যেহেতু আপনাকে চিনি না।তাই আসলে প্রথমে.. কিন্তু আমার মনে হয়েছে এটা সরাসরি আপনাকেই জানানো উচিত হতেও তো পারে আপনার নাম ভাঙিয়ে আপনার দলের ছেলেরাই এগুলো করছে এবং আমি বিচার দেওয়াতে আমার পিছনে লেগে যায়!"




“ এত বুদ্ধি মাথায় নিয়ে ঘুমান কি করে?"




“ ঘুম হয়। শান্তির ঘুম হয়!"




সম্রাট বুঝলো এই মেয়ের মুখ চলে অতিরিক্ত।সে কথা ঘুরিয়ে আসল কথায় আসলো। বললো,




“ আপনার অভিযোগের প্রমাণ সহ কাল সকালে আটটার মধ্যে এখানে থাকবেন সঙ্গে ভিকটিমকে অবশ্যই আনবেন।"




“ কাল? সকাল আটটা!"




“ হ্যা! কেন?কোন সমস্যা?"




“ ইয়ে মানে; না সমস্যা নাই। ঠিক আছে আমরা চলে আসবো!"




“ ওকে!"




“ ওকেও ভাইয়া ‌।থ্যাংকু আল্লাহ হাফেজ!"




দায়ে পড়ে যেভাবে মানুষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করে ঠিক সেভাবেই বললো‌। সম্রাট বুঝেও হালকা মৃদু হাসলো।নিচু শব্দে বললো,




“ হু।"




চলে যাওয়ার জন্য পা ঘুরাতেই কিছু একটা মনে হতেই ডাক দিলো পিছন থেকে,




_ এক্সকিউজ মি; আপনার নামটা প্লিজ?"




“ পারী, পারীজাত আবরার চৌধুরী।"


পর্ব-02

ঐ শাবাগ,শাবাগ, শাবাগ!


ড্রাইভার পিজির সামনে থামান,ঐ পিজি,পিজি,পিজি।পিজির কে আছেন তাড়াতাড়ি নামেন!ঐ আপা নামবেন না?"




গলা ফাটিয়ে হাঁকানো শব্দে তড়িৎ গতিতে চমকে লাফিয়ে উঠলো পারীজাত। পিজি শব্দটা তার কানে বারবার পারী হয়ে বাজছে।কোনমতে নিজেকে ধাতস্থ করে সোজা হয়ে বসলো।


মিরপুর বেনারসী পল্লী থেকে বাসে উঠেছে,পিজির সামনে নামবে।কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল বুঝতেই পারেনি। ইস্ কি হতো যদি ঘুম না ভাঙ্গতো।অবশ্য চোখের‌ই কি দোষ;সে ও ক্লান্ত হয়।তাকে তো অবিরত সজাগ থাকা আর অশ্রু ঝড়ানো ছাড়া আর কোন বিরতিও দেওয়া হচ্ছে না।সবাই ক্লান্ত হয় শুধু ক্লান্তি আসে না পারীজাতের।পারীজাতদের ক্লান্ত হতে নেই।তারা ক্লান্ত হলে জীবন খেলবে কাদের নিয়ে!




“ পিজি,পিজি,ঐ আপা আপনি না পিজির সামনে নামবেন!"




“ জ্বী নামছি।


_ আসো মা!"




বলেই নিজের ডান পাশের সিটে বসানো তিন বছর নয় মাসের এক বাচ্চাকে শেষ লাইনটা বললো। বাচ্চাটা তার মায়া মায়া ডাগর চোখে ক্লান্ত মেখে মমতাময়ী মায়ের দিকে তাকালো।মেয়ের চাহনিতে এক‌ই ভাবে নিজের ক্লান্ত আর ভারী অক্ষুদ্বয়ের ইশারায় কিছু একটা বললো যা মুহূর্তেই ঐ প্রায় চার বছরের বাচ্চাটা বুঝে নিলো। মায়ের জামা আঁকড়ে সিট থেকে নামলো।


তাড়াতাড়ি করে নামতে গিয়ে মাথায় আঘাত পেলো। তারপরও কাঁধে চাপানো ব্যাগটা বাম হাতের তিন আঙ্গুলের জোরে শক্ত করে ধরে,ডান হাতে মেয়েকে আগলে আস্তে করে বাসের সিট ছাড়লো।




হেল্পারের হাঁক, 


“ আপা তাড়াতাড়ি নামেন,ঐ আর কে আছেন,পিজি শাবাগ শাবাগ!


_ ড্রাইভার মহিলা, বাচ্চা আছে লগে!"




বলতে বলতেই পারীজাত লাফিয়ে নামলো বাস থেকে। এরপর মেয়েকে আধ কোলে নিয়ে নামালো। একদম মাঝ পথে নামিয়েছে।ঐ পাশে আরেকটা বাস থেমেছে।পারীজাত ফোঁস করে একটা শব্দ ছাড়লো।এই শহরে কোন নিয়ম‌ই আর টেকস‌ই হয় না।কেউ কোন আইনের ধার ধারে না।নয়তো এখানে যাত্রী নামায় কেউ? এটা কি যাত্রী ছাউনি?


এখান থেকেই তুলছে আবার এখান থেকেই নামাচ্ছে।অথচ যেকোন একটি বড় দূর্ঘটনা ঘটতে পারে যেকোন মুহূর্তে।




“ আম্মু!"




দূরে থাকা শরবতের ভ্যান দেখেই নিচু আওয়াজে মা'কে ডাক দিলো সুখ! তার অত ছোট্ট আওয়াজে এই আওয়াজের শহরে দাঁড়িয়ে তার মা শুনলোই না কিছু। চারদিকে গাড়ীর হর্ন,ধুলা,মাথার তালু গলিয়ে দেওয়া রোদের তাপ,আর মানুষের কোলাহল সব মিলিয়ে বহুদিন পর পারীর কানে এক অন্যরকম তবলা বাজতে শুরু করলো।যা তার মস্তিষ্কের নিউরনের প্রতিটি কোষে সুড়সুড়ি জাগিয়ে তুলল। বারবার মনে করাচ্ছে বহু বছর আগের ছেড়ে যাওয়া সেই প্রহর যা সে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে এক অজানা শহরে। কিন্তু সে চলে গেলেই কি সব তাকে ছেড়ে দিয়েছে? স্মৃতি তো তাকে হেথা‌ও হাতড়িয়ে বেড়িয়েছে। আর এখন তো সে সেই স্মৃতির শহরে যেথায় রয়েছে তার সকল কিছু! 


মরুভূমিতে রোদের কারণে অনেক সময়‌ই পথিকের চোখে ভ্রম হয়,সে এমন কিছু অনুভব করে,দেখতে পায় যা আদৌতে বাস্তবে নেই।বলা যায় মরীচিকার আবির্ভাব ঘটে।


পারীজাতের মনে হচ্ছে তার সাথেও ঠিক তাই হচ্ছে। এই তো সে দেখছে তার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে তার সেই কাঙ্খিত পুরুষ যাকে এক নজর ছোয়ার ইচ্ছে সে বিগত চার বছর তিন মাস ধরে লালন করে পাথরের হৃদয়ে,ছটফট করছে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ার।যার কাছে তার এক পৃথিবীর নামে অভিযোগ করা বাকী আছে।যার কাছে তার আমানত সঁপে দেওয়া বাকী আছে।যার বাহুতে মাথা রেখে সে নিঃশ্বাস ত্যাগ করার প্রবল ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু! ভাবতেই পারলো না। এর বেশি ভাবা যে তার জন্য নিষিদ্ধ। ধাপ করে পড়ে গেলো জমিনে।তার পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বোধহয় জ্ঞান হারালো,আর জ্ঞান হারানোর মুহূর্তে কানে বাজলো,




“ আম্মু!"




তার সন্তান,তার অংশ,তার ভালোবাসার চিহৃ,তার সেই পুরুষের আমানত যাকে সে কথা দিয়েছিলো জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করবে। কিন্তু... ভেসে উঠলো জীবনের সেই মুহুর্ত যা তাকে নিয়ে গিয়েছিল এক অন্য পৃথিবীতে।




ফ্ল্যাশব্যাক...




“ এই রাব্বী! "




পারিজাত আর তার বান্ধবী মেহরিন বেরিয়ে যেতেই গর্জিয়ে ডাক দিলো , তার সিংহি গর্জনে বাইরে বারান্দায় ক্যারাম খেলায় মত্ত শীর্ণকায় দেহের এক যুবক দৌড়ে আসলো।হাতের তালুতে তার এখনো ময়দা লেগে আছে যা সে ক্যারাম কোটে মাখার জন্য মাত্র‌ই মুঠোবন্দী করেছিলো।ভাইয়ের ডাক কানে যেতেই সব ফেলে দৌড়ে চলে আসে পেছনে রেখে আসে উৎসুক আর জিজ্ঞাসু পাচ জোড়া চোখ।




“ ভাই!"




“ উইমেন্স কলেজের ভেতরে ছেলেরা ঢুকে কবে থেকে?"




“ জানি না তো ভাই!"




“ কি জানিস তাহলে? 


_ তোদের এলাকায়, তোদের পাড়ায় একটি মহিলা কলেজ! যেখানে সব তোর আমার বোনেরাই পড়ে! সেখানে গিয়ে কিছু বদ উৎপাত করে, আমার ওয়ার্নি সত্ত্বেও এত বড় কলিজার কাজ করে আর তোরা; তোরা আমার ছেলে হয়ে এতটুকু খবর রাখতে পারিস না?"




ছেলেটা মাথা নত করে অপরাধী ভঙ্গিতে বললো,




“ ভাই আপনি‌ই তো নিষেধ করছেন যাতে আমাদের কোন ছেলে মহিলা কলেজের সামনে না যায়! তাই আমরা ওদিকটায় কেউ যাই না।তাই খবর‌ও পাই না।


কিন্তু ভাই কিছু কি হয়েছে?"




কথাটা শেষ করেই নিজের নত মাথা উঁচু করে ভাইয়ের দিকে তাকালো।সম্রাট নিজের অধীনস্ত এই যুবকের দিকে বেশ কিছুক্ষণ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,




“ কাল  সকাল কলেজ বন্ধ হ‌ওয়ার আগ অবধি একটানা দাঁড়িয়ে থাকবি।কে কে মহিলা কলেজের সামনে ঘোরাফেরা করে তার লিস্ট করবি। এবং অবশ্যই খেয়াল করবি মেয়েরা কাকে দেখে ভয় পায়! চোখে তাকাবি!তাহলেই বুঝবি। কিন্তু খবরদার তোদের কোন ব্যবহার দ্বারা যেন কোন মেয়ে ভয় না পায়।" 




“ জ্বী ভাই!


_ ভাই!"




রাব্বীর সাথে কথা সম্পূর্ণ করে নিজের পা মাত্রই 


বাড়িয়েছে তখনই পেছন থেকে ডাক পড়লো,




“ হুম!"




“ ভাই,কাল যে বাচ্চাদের মাঠে গাছ লাগানোর জন্য চারা গুলো আনতে বলছিলেন সেগুলো বিকেলে ডেলিভারি দিয়ে যাবে! পেমেন্ট!"




“ ক্যাশে রাখা থাকবে,নিয়ে দিয়ে দিবি।আর হ্যা নার্সারিওয়ালকে বলবি সারে যেন সব মিক্সড থাকে।"




“ হ্যা ভাই বলছি ভাই!"




“ আচ্ছা যা।


ওহ ভালো কথা! লাঞ্চের জন্য ছয় প্যাকেট বিরিয়ানি আনতে বল।"




“ লাঞ্চ বাসায় গিয়ে করবি!সো..."




“ বাপ্পী ভাই দিলেন তো রিজিক নষ্ট করে!"




রাব্বী হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বের হচ্ছিলো। সম্রাটের বিরিয়ানি অর্ডারে বাগড়া দেওয়ায় রাব্বী মুখটা কালো করে ঐ কথাটা বললো।বাপ্পী রাব্বীর দিকে চেয়ে বললো,




“ রিজিক যে দেয় সেই নেয়।অযথা আমাকে কেন ব্লেইম করছিস! তোর রিজিকে থাকলে কোথা থেকে হাজির হবে তা তুই টের‌ও পাবি না।"




যুক্তি সঠিক,তাই আর কোন কথা বের হলো না।মুখটা কাচুমাচু করে এক ভাবেই দাঁড়িয়ে র‌ইলো।সম্রাট রাব্বীর মুখশ্রী দেখে হালকা হাসলো। অতঃপর ওয়ালেট বের করে একটা কচকচা হাজারের নোট বাড়িয়ে দিয়ে বললো,




“ মাহাদকে নিয়ে যাবি।একা খাবি না। দু'জনে শেয়ার করবি রা খবরদার পুরো ক্লাব ছড়িয়েছিস তো!"




“ ঢোলে বারি দিয়ে বন্ধু তুমি বলো নেচো না!


এই যে পেট পাতলা পুরুষ এর পেটে কথা টিকে? মেয়েদের চেয়েও পেট লুজ!"




“ মোটেই আমি এমন না।আমি যথেষ্ট কথা লুকাতে পারি।তাই না ভাই বলেন!"




“ হয়েছে এখন যা। আমিও বের হবো!"




“ কে এসেছিলো রে?"




“ এই একটা মেয়ে।মহিলা কলেজের!"




“ ওরা যে বললো বাচ্চা!"




বাপ্পীর কথায় হটাৎ করেই হেসে দিলো। একদম ধম ফাটা হাসি যাকে বলে। বাপ্পী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলো বন্ধুর পানে। অতঃপর জিজ্ঞেস করলো,




“ আশ্চর্য হাসছিস কেন এভাবে?


হাসির কি বললাম?"




“ বাচ্চা মেয়ে? 


_ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে বাচ্চা!"




“ এ্যা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট? বাচ্চা কেন বললো গর্দভ গুলো?"




“ কারণ দেখতে বাচ্চা‌ই! এই যে এতটুকু সাইজ কিন্তু কথা মাইরি.. কথার সাইজ তোকে আমাকে মিলিয়ে!"




সম্রাট হাতের ইশারার সাহায্যে পারীজাতের আকার বুঝিয়ে আবারও হাসলো। বাপ্পীর ঠোটেও হাসি ফুটেছে কিন্তু স্পষ্ট কিছু না বোঝায় তার প্রতিক্রিয়া বন্ধুর মতো চড়াও হলো না।তাই সে বললো,




“ খুলে বলতো সব!"




সম্রাট সব বললো। অতঃপর বাপ্পী‌ও হতবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সেও এক‌ই রকম হাসিতে ফেটে পড়লো।




যুব সংসদ ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন রমনী।পারীজাত আবরার চৌধুরী,মেহরিন আজীম, নিশি ফারিহা!পারীজাত বোরকা পরিহিত,বাকী দুজন সাধারণ সালোয়ার কামিজ।


খুবই সাহস আর আত্নবিশ্বাস নিয়ে পা রাখলো দ্বিতীয়বারের মতো এই ক্লাবে।পারীজাত আগেই বাগান বিলাসে সজ্জিত দরজা পেরিয়ে রডের সীমানা ক্রশ করেও পিছনে ফিরতে বাধ্য হলো কারণ! তার দুই বান্ধবী যাদের সে সাদা কাদা বলেই সম্বোধন করে,তারা ভয়ে ক্লাবের দরজায় পা রাখছে না।মেহরিন তাও বাগান বিলাসের নিচে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু যার জন্য আগমন সেই নিশি ফারিহাই আটকে আছে দরজার ওপারে।


মেজাজ বিগড়ালো পারীর।সে নিজের পেটে লাথি দিয়ে এদের জন্য দৌড়ে আসছে আর এরা এখন কি-না শেষ মুহূর্তে এসে এমন নটাংকি শুরু করেছে। দ্রুত কদমে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে চট করে নিশির বাহুতে দিলো এক চড়।নিশি আতংকিত চোখে বান্ধবীর পানে তাকালো।তার দুচোখে ছল থ‌ইথ‌ই।যা যেকোন মুহূর্তে গড়িয়ে পড়বে পড়বে ভাব! মুহুর্তে পারীর কঠোর মন নরম হয়ে গেলো। বান্ধবীর ছলছল চোখে তাকিয়ে নিজের প্রতি ধিক্কার করলো।তার বান্ধবী দুটো ভীষণ‌ই নরম স্বভাবের।তারা এত হট্টগোল,গ্যাঞ্জাম, লড়াই পছন্দ করে না।ভয় পায় এগুলোতে।সবাই কি আর পারীজাত নাকি যে সব কিছুতেই অভ্যস্ত থাকতে হবে! সবার জীবন কি পারীর মতো! 


নরম স্বভাবের ভীতু মেয়ে দুটোর দিকে চেয়ে একটু নরম গলায় বললো,




“ দেখ, আজকে ভয় পেলে আজীবন ভুগতে হবে।এখন তুই ভয়ে পিছিয়ে গেলে ঐ লোক কি তোকে ছেড়ে দিবে? সে নিশ্চয়ই তোর বাসায় গিয়ে তোর বাবা মায়ের মাথায় গুলি ধরে তোকে তুলে নিয়ে আসবে!তখন... তার চেয়ে ভালো আজ ওদের লিডারকে ওদের কর্মকান্ডের কথা বলে যাই।আমি শুনেছি উনি ন্যায় বিচার করে, নিশ্চয়ই আমাদেরটাও করবে।আর যদি না করে তবে পুলিশের যাবো। দরকার পড়লে এই লোককে পাবলিক প্লেসে ঝামা ঘষা দিবো!"




“ কাকে ঝামা ঘষা দিবেন আপা?"




পারীর ঠিক একটু পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিলো রাব্বী।তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পারীদের তদন্ত করা।সে নিজ কাজ সম্পন্ন করে মাত্র‌ই ক্লাবে পা রাখলো। এবং এসেই শুনতে পেলো শেষের লাইনগুলো।তার চোয়াল ঝুলে গেছে এই কথা শুনে। এই মেয়ে বলে কি! তার ভাইকে নাকি ঝামা ঘষা দিবে!




পারী হকচকিয়ে পিছনে ফিরলো‌। এবং অচেনা এই ছেলেকে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,




“ তা শুনে আপনি কি করবেন? আশ্চর্য গায়ে পড়ে কথা বলেন কেন?"




রাব্বীর মেজাজ চটছে।এই মেয়ে তো ভীষণ বেয়াদব। কিভাবে কথা বলে! তার ভাইকে কি-না ঝামা ঘষা দিবে! আবার তাকে বলছে যেচে কেন কথা বলছে! উফ্; এই বেয়াদব মেয়ের জন্য‌ই তাকে সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে ঐ মহিলা কলেজের দজ্জাল আয়ার সাথে ভাব করতে হয়েছে। এই মেয়ের জন্য সে তার বহু দিনের বালিকা প্রেমিকার স্কুলের সামনে গিয়ে অপেক্ষা না করার শাস্তি স্বরূপ আজ সারাদিন কথা বলা থেকে বিরত থাকার শাস্তি পাচ্ছে।একে তো একটা শিক্ষা দিবেই।




“ শুনেন আপনি কি নিজেকে নায়িকা শাবনূর ভাবছেন,যে আপনার গায়ে পড়ে কথা বলতে যাবো!"




কথাটায় অপমান ছিলো।বেশ অপমান ! ঘোর অপমান! পারী, পারীজাত মানবে কেন?সে জানে সে সুন্দরী না।তাকে দেখতে মোটেই নায়িকা লাগে নি। বরং তাকে এভারেজ সুন্দরীর তালিকায়‌ও রাখা যায় না।তাই বলে এভাবে অপমান করবে! অসম্ভব! সৌন্দর্য তো আল্লাহর দান।তাকে নিয়ে মানুষের অহংকার কেন থাকবে? আল্লাহ যাকে যেভাবে খুশি বানাবে, বানিয়েছে। তার জন্য অন্য কেউ কেন খোঁচা দিয়ে কথা বলবে! এটা মানার মতো নয়!


পারীও মানবে না।সে কোন অন্যায় কাজ অথবা কথার সাথে সমঝোতা করবে না। অবশ্যই এই লোককে উচিত কথায় জব্দ করতে হবে এবং পারী করবেও!


পর্ব-03


" আমি জানি আমি নায়িকা শাবনূর না।আর আমি নিজেকে নায়িকা ভাবিও না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে গায়ের রঙ সাদা দেখে আপনি নিজেকে শাকিব খান ভাবা শুরু করেছে দিয়েছেন। ভাবতেই পারেন তাতে আমার কিছু না। কিন্তু কি বলেন তো আল্লাহর ইচ্ছা হলেই যেকোন সময় হিরো আলম ও হয়েছে যেতে পারেন; না না হিরো আলম না! ঐ যে গলির মোড়ে এক পাগল মামা আছে না যে মেয়েদের কাপড় পড়ে ঘুরে বেড়ায় তার মতো হয়ে যেতে পারেন। তখন দেখবো আমি এই রূপের অহংকার কোথায় থাকে। অবশ্য চিন্তা নিয়েন না মাঝে মধ্যে আমি খাবার কিনে দিয়ে যাবোনি!"




“ কিহ আমাকে কি ফকির মনে হয় যে আপনি আমাকে ভিক্ষা দেওয়ার কথা বলছেন আর হ্যা আপনি আপনার...




“ কি হচ্ছে এখানে? কি নিয়ে এমন লাগছে দুজনের


মাঝে?"




রাব্বীর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে সম্রাট আর তেহজীব।তেহজীব এই ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক পদে আছে।সম্রাটের সমবয়সী,অত্র এলাকায় তার পৈত্রিক আবাসস্থল, পারিবারিক ব্যাবসা সামলায় এবং স্থানীয় এলাকার কল্যানের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রেখেছে নিজেকে। খুব‌ই ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দুজনের মধ্যে।সম্রাটের পাশেই দাঁড়ানো। দুজনের চোখেই কৌতুহল।দুর হতেই তারা খেয়াল করেছে এই দুজনের মাঝে কথা বলার ধরন যাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ঝগড়া করছে।


সম্রাট রাব্বীর থেকে একটু সামনে এগিয়ে দাঁড়ালো এবং পারীজাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ সমস্যা কি? 


_ আর তোর কি সমস্যা? মেয়েদের সাথে কথা বলার এটা কোন ধরন?"




“ ভাই আমি.."




“ কি বলেন তো ভাইয়া পৃথিবীতে কিছু ছেলে আসেই অযথা মেয়েদের সাথে ঝগড়া করতে! এরা নিজেদের ট্রম ক্রুজ ভাবে আর সবাইকে হেয় করে কথা বলে!"




রাব্বীর আগেই মুখ খুললো পারীজাত।তার চোখে আগুন জ্বলছে।রাব্বী‌ও রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বললো,




“ ভাই এই বেয়াদদপ মহিলার কোন কাজ করতে আমারে বলবেন না! আস্তো শাকচুন্নী একটা!"




“ হোপ; এইটা কোন ধরণের শব্দ! আর এগুলো কি আচরণ মেয়েদের সাথে!


উনারা আমাদের কাছে হেল্প নিতে এসেছে, এদের সাথে এমন ব্যবহারের মানে কি রাব্বী? আর মুখের ভাষার এমন অবনতি কেন হচ্ছে!"




সম্রাট ধমকে বললো রাব্বীকে।পারীজাত এক চোখ উপরে তুলে আরেক চোখ ছোট করে তাকিয়ে আছে রাব্বীর দিকে। মেহরিন,নিশি পারীজাতের পিছনে ভীত চোখে তাকিয়ে আছে।সম্রাট রাব্বীর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পারীজাতের দিকে এক পলক তাকালো অতঃপর মেহরিন আর নিশিকে দেখলো। নিশির ভীত চাহনি আর ঘর্মাক্ত মুখ , হাত কচলানোয় অনেক কিছু বুঝে নিলো।


রাব্বী ভাইয়ের ধমকে মাথা নুইয়ে নিয়ে অপরাধীর মতো কোনরকম শব্দ উচ্চারণ করে বললো,




“ সরি ভাই!"




“ সরি আমাকে না উনাদের বল।"




সরি বলতে হবে! ভাইকে বলছে তাতে তার একটুও সমস্যা নাই। কিন্তু ঐ মহিলা ও শাকচুন্নীকে বলবে সরি! এটা তো তাকে জুতা মারার মতো অপমান করা হলো। ভাইয়ের জুতা মারলেও সমস্যা নাই কিন্তু এটা তো!




“ I said say sorry her.."




“সরি !"




বলেই রাব্বী গটগট পায়ে হেঁটে বাগান বিলাসের দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো।রাব্বীর এই কাজে তেহজীব চোখ কপালে তুলে সম্রাটের দিকে তাকালো।সম্রাট রাব্বীর যাওয়ার পথে চেয়ে পারীজাতদের দিকে তাকালো। বললো,




“ I think I am late, sorry for waited you..and also sorry for my junior brothers ruff behavior..."




“ it's okay.."




“ I think she is Victim, am I right?"




সম্রাটের কথায় নিশি নিজের ভীত নয়ন তুলে সম্রাটের দিকে তাকালো।তার ছলছল চাহনি সম্রাটের ভাই সত্ত্বায় ধাক্কা দিলো। মুহুর্তে কল্পনা করলো নিজের বোনের মুখটা। সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে গেলো চোয়াল।তেহজীব সম্রাটের বরাবর দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,




 “ আপুদের সমস্যা কি?"




“ one Scoundrel মহিলা কলেজের ভেতরে ঢুকে threatened her!"




“ what? আমাদের মহিলা কলেজে? এই উইমেন্স কলেজে?"




“ হুম!"




“ কি বলিস কি! এত দুঃসাহস কার? কার কলিজা এত বড় যে আমার এলাকায় ঢুকে আমার এলাকারই মহিলা কলেজের ভেতরে ঢুকে! আবার মেয়েদের‌ও হুমকি দেয়!


কে সে আপু?"




নিশিকে জিজ্ঞেস করলো।নিশি উত্তর দিবে কি? সে এখন‌ই কান্না জুড়ে দিবে এমন ভাবে ঠোঁট মেলে রাখছে! পারীজাত নিজের বান্ধবীর কান্ডে বিরক্ত হয়ে নিজেই বললো,




“ আসলে ভাইয়া সে আমাদের ক্যাম্পাস এসে আমার ভীষন উত্যক্ত করে। আমাদের বলতে আমার এই ফ্রেন্ডকে,আমি একদিন প্রতিবাদ করায় আমাকে সেদিন.."




এতটুকু বলে পারীজাত থামলো‌।সম্রাটের কপালে ভাঁজ পড়লো।হাতের মুঠ শক্ত করে দাঁত আঁকড়ে থমথমে ভাব নিয়ে তাকিয়ে র‌ইলো।সে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত কথা শুনতে চাইছে না। কিন্তু তেহজীবের তাড়ায় তাই শুনলো,




“ গায়ে হা/ত তুলেছিলো?"




“ ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলেছিল বেশি ফটর ফটর করলে নাকি আমাকেই আগে.. ট্রাই করবে!"




কথাটা বলেই পারীজাত নিজের মাথা নিচু করে ফেললো।সে যে লজ্জা পাচ্ছে তা তার মাথা নত করাতেই জাহির হলো।তেহজীব ভরাট কন্ঠে শুধালো,




“ আপনি কেন লজ্জা পাচ্ছেন। লজ্জা তো পাবে ঐ শু** বাচ্চা! ওর সাহস কি করে হয় এই এলাকায় এসে মেয়েদের সাথে নোংরামো করার।




“ ওর পরিচয় কি?"




“ তাতো আমরা ওভাবে জানি না।তবে সে সবসময় বলে সে নাকি যুব সংসদের সদস্য,সম্রাট ভাইয়ের লোক।তাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না।"




তেহজীব ভ্রু কুঁচকে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,




“ আমাদের ছেলেরা? অসম্ভব! এটা প্লিজ যেন সত্যি না হয়। এটা সত্যি হলে আই সয়ার ইউ একেকটাকে এমন পে/টা/ন পে/টা/বো যে জীবনে আর পা দিয়ে দাঁড় হতে পারবে না!"




“ কুল; আগে দেখি কে বা কারা।


_আপনারা দেখলে চিনবেন না?"




“ জ্বী ভাইয়া চিনবো!"




সম্রাট পারীজাতের থেকে উত্তর পেয়ে নিশির দিকে তাকালো।মেয়েটা এখনও ভয়ে জমে আছে।সে গলায় দরদ ঢেলে স্নেহপূর্ণ চোখে চেয়ে আদ্র ভাবে বললো,




“ আপু তুমি ভয় পেয়ো না।স্কাউন্ডেলটাকে পেলে এমন শিক্ষা দিবো যে তোমার পায়ে পড়ে মাফ চাইবে!"




নিশি নিজের চোখ নামিয়ে নিলো।মেহরিন একটু সাহস করে বললো,




“ ভাইয়া ও আমাদের পারীজাতকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল।পারীর হাত মানে কনুই ছিলে গিয়েছিল। শুধুমাত্র নিশিকে সেইফ করতে গিয়েছিলো বলে!"




পারী এই কথাটা বলেনি।সম্রাট প্রশ্নাত্মক চোখে পারীর দিকে তাকালে দেখলো পারী নিজের ডান কনুইয়ে হাত রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছে।সম্রাট গমগমে কন্ঠে বললো,




“ কবে করেছিলো,আর বললে না কেন?"




সম্রাটের কন্ঠে কি ছিলো পারীর জানা নেই।তবে পারীর মনে হলো,তাকে খুবই অধিকার নিয়ে প্রশ্নটা করা হয়েছে।সম্রাট কঠোর চাহনিতে পারীর দিকে তাকিয়ে রইল ।পারী ছোট্ট করে উত্তর করলো,




“ এটা তো এমন কিছু না।নিশির বিষয়টি বেশি সিরিয়াস। তাছাড়াও ওর জন্য শাস্তি পেলেই তো আমার জন্য‌ও পাওয়া হলো।"




“ আসো আমার সাথে!"




🔺🔺🔺🔺🔺🔺🔺🔺🔺🔺🔺🔺🔺🔺🔺




‘চিয়ার্স-ওয়ান্স মোর’ বার এন্ড জুস কর্ণার নামের এই বিশাল ভিআইপি বার এবং রেস্টুরেন্টের 


 ড্রিংকস কর্ণারে বসে আছে এক অতীব সুদর্শন কিন্তু অগোছালো পুরুষ।গাল ভর্তি ঘন লম্বা দাঁড়ি আর বড় বড় গোঁফের আড়ালে ঢাকা পড়েছে তার আকর্ষণীয় কামুক ঠোঁট জোড়া।ভরাট গাল ভেঙে সেই কোন কালেই চাপার সাথে মিশে গিয়েছে তা হয়তো সে নিজেও জানে না।গায়ে চাপানো ছাই রঙা শার্টের উপর কালো ব্লেজার।পড়নের ডেনিম প্যান্ট আর হাতের দামী ঘড়িতে সে নিজের আভিজাত্য ঠিক‌ই জাহির করছে।


একটা রুবি পাথরের আংটি তার বাম হাতের মধ্যমা অঙ্গুলিতে বসানো।যার দাম তার কাছে তার জীবনের চেয়েও বেশি।তিন আঙ্গুলের চাপে লাল আঙ্গুরের জুসের গ্লাসটা চেপে ধরে রেখেছে ঠোঁটের সাথে। দৃষ্টি নিবদ্ধ আঙ্গুলের সেই আংটির দিকে।হালকা চুমুকে অল্প একটু গলাধঃকরণ করতেই পেছনে এসে কেউ আঁছড়ে পড়লো।যার দরুন গ্লাস গিয়ে আঘাত করলো তার ঐ লম্বা সুঠালো নাসিকার উপর। বিরক্তিতে মুখ তেতো হয়ে গেলো।


মেজাজ চড়লো আসমানে।বিরবির করে উচ্চারণ করলো কিছু খাস বাংলা শব্দ।প্রয়োগ করলো ভদ্রতা বজায় রেখে অতি সাধারণ তবে ভদ্রলোকের গালি যাকে বলে।




“ who is the Scoundrel? didn't you see.."




আর এগোতে পারলো না।থেমে গেলো সামনে দাঁড়ানো নারীর পানে দৃষ্টি পড়তেই। বোরকা হিজাবে আবদ্ধ বিধ্বস্ত এক অসহায় বদন,অশ্রু সিক্ত আখি জোড়া তার দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে। সবচেয়ে বেশি আহত করলো তার ঠোঁটের কোনে জ্বলজ্বল করা কুচকুচে কালো এক তিল।


এই পুরুষের সমস্ত ইন্ধন অচল হয়ে পড়লো। ঝাঁপসা দাঁড়ালো দৃষ্টি।তার সামনে উপস্থিত হলো সেই স্মৃতি যার তাড়নায় সে নির্ঘুম কাটায় প্রতিটি রাত।


পেছন থেকে ঐ নারীর উপর কারো প্রহারের আওয়াজে নিজের ভ্রম থেকে বেরিয়ে আসলো।নারীটি অসহায়ের মতো আর্তনাদ করছে আর কিছুর জন্য অনুরোধ করছে। নিজের টালমাটাল অবস্থা সামাল দিয়ে কঠোর চোখে তাকালো সেই পাষন্ড নরপিশাচের দিকে। কাকুতিমিনতি করেও নিজের ইজ্জত রক্ষার্থে ব্যর্থ নারীর চুড়ান্ত ইজ্জতহানী হ‌ওয়ার আগেই এগিয়ে গিয়ে নিজের খসখসা গলায় ধারালো জোর আওয়াজ তুলে বললো,




“ উনার হাত ছাড়ুন।নয়তো হাত ধরার জন্য আপনার হাতটাই থাকবে না!"




কথাটা ঐ নরপিচাশের ভালো লাগলো না।খ্যাটখ্যাটে মেজাজে তীব্র আওয়াজ তুলে প্রত্যুত্তরে বললো,




“ আমি পয়সা দিয়া কিন্না আনছি।ক্যামনে ছুমু তাকি আপনেরে বলতে অইবো? যান নিজের চরকায় ত্যাল দ্যান!"




“ পয়সা দিয়ে মানে?"




“ পয়সা চিনেন না? পয়সা মানে অর্থ যারে সহজ বাংলায় বলে টেকা টেকা! আমি নগদ কড়কড়া তিন লাখ দিয়া এই মালটারে কিনছি!"




“ উনি একজন নারী, মানুষ; কোন পণ্য নয়।তাই মাল বলা বন্ধ করেন!"




“ মা/গি মানুষ আবার মানুষ কিসের?এগুলা হ‌ইতেছে একেকটা মা/ল, খাসা মা/ল! টেকা বানানোর মাল! রাস্তায় নামাইয়া মেশিন ভাড়া দিলেই খালি টেকা আর টেকা!"




“ আপনাকে আমি বারণ করছি। এখনও সময় আছে!"




“ আমি কমুই।মা/লরে মা/ল কমু, পারলে বা/ল ছিড়া দিয়েন!"




“ আপনি নিজেকে সংযত করুন ,নয়তো আমি ভুলে যাবো আপনি বয়সে আমার সিনিয়র!"




“ ঐ যান তো গিয়ান দিয়েন না।মেজাজ গরম হ‌ইতাছে! এমনিতেই মা/গি চু/দু/র- বু/দু/র করতাছে।ক‌ইছি হুইয়া পড়তে, তুই চুপচাপ হুইয়া পড়বি, তাই না ! নাটক মা/রা/ই/তা/ছে!


_ ঐ তোরে ক‌ইছি না আমার কথার বাইরে এক পাও লড়বি না।তাইলে এইহানে আইছোস ক্যা! মা/গি তোরে আমি!"




কথাটা বলেই ঐ নারীকে প্রহার করতে হাত উঁচিয়ে তুলতেই হাতটা শক্ত করে আটকে দিলো।লোকটা নিজের হাতকে অন্য লোমশ লোহার মতো শক্ত হাতের মুঠোয় দেখে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলো। বিচ্ছিরি ভাবে মুখভঙ্গি করে জঘন্য গালি দিয়ে বললো,




“ ঐ মা/দা/র চো* হাত ধরলি ক্যান?"




“ আমি বারবার ওয়ার্ন করেছিলাম মেয়েটিকে ছাড়তে,শুনলি না।!"




“ এত দরদ উতলাইয়া উঠছে ক্যা?


_ নাকি মালটাকে মনে ধরছে?ধরলে সমস্যা নাই।নগদ পাইলে নগদি দিমু!তয় ওয়েটিং কাস্টমারের চাইতে বেশি দেওন লাগবো!"




নোংরা মস্তিষ্কের মানুষের চিন্তাও নোংরা থাকে।তারা সবাইকে নিজের কাতারেই রাখে।লোকটাও তাই করলো।সে নিজের মতোই ভাবলো বিপরীতে থাকা ঐ তেজী কন্ঠের মানুষটাকে।


অথচ সে বুঝতেই পারলো না তার এই কথায় ঐ ব্যক্তি রাগের সর্বোচ্চ চুড়ায় উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। মুখ বরাবর শক্ত জোরালো মুঠের ঘু/ষি মেরে মেয়েটার থেকে অন্তত পাঁচ কদম দূরে ফেলেছে।ঐ পাষন্ড লোকটা গিয়ে পড়লো টেবিলের উপর থাকা ওয়াইনের বোতলের উপর। মুহুর্তের মধ্যে পুরো বার জুড়ে হ‌ইচ‌ই শুরু হয়ে গেলো। ড্যান্স ফ্লোরে অশ্লীল ভঙ্গিতে নাচে ব্যস্ত থাকা তরুণ তরুণীরা সব ছোটাছুটি শুরু করলো।এক ঘুষি‌ই যথেষ্ট ছিলো। নাক দিয়ে গলগল করে রক্তের ধারা ব‌ইতে শুরু করলো। ঠোঁট কেটে ঝুঁলে পড়েছে।লোকটা আতংকিত হয়ে পড়েছে।ভীত চোখে তাকালো ঐ লোহার মতো দেহধারী দানবীয় মানবের পানে।চোয়াল শক্ত করে রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে গর্জিয়ে বললো,




“ বারবার বলেছি ছাড়তে, ছাড়তে,ছাড়লি‌ই না।তোর


কাছে মেয়ে মানুষ মানেই মা/ল।টাকা কামানোর মেশিন তাই না!


এমন হাল করবো যে জীবনে কোনদিন মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস‌ই পাবি না।"




কথাটা শেষ করেই উড়াধুরা লাথি মারতে থাকলো


লোকটার নিম্নাঙ্গে।এমন দানবীয় দেহের একেকটা লাথির ভার সহ্য হলো না। লোকটা কিছু করতেও পারছে না নাক মুখের ব্যথায়। বারবার কঁকিয়ে উঠছে।


নারীটি অশ্রু সিক্ত চোখে তাকিয়ে দেখলো কেবল। মিনিট বিশের মধ্যেই পুলিশ এসে হাজির হয়।ঐ নারীকে সহ দুজনকেই পুলিশ ভ্যানে করে তুলে নিয়ে থানায় যায়।




বারের ভেতর এমন হাতাহাতি সাধারণ ব্যাপার কিন্তু অসাধারণ হচ্ছে এহেন রক্তাক্ত ঘটনা। ঐ লোকটার মুখ দিয়ে এখনও রক্ত ঝড়ছে, এদিকে সে সুদর্শন পুরুষের রক্ত চক্ষু এখনো ঐ নরপিচাশের উপর।নারীটি একপাশে আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে নিরবে কাঁদছে। ওসি সবাইকে দেখার পর জিজ্ঞেস করলো,




“ কি নিয়ে লেগেছে দুজনের মাঝে?"




কেউ উত্তর দিলো না।ওসি সুদর্শন পুরুষকে ইঙ্গিত করে বললো,




“ পোশাকে দেখতে তো আপনাকে ভদ্র লোক ভদ্র লোক লাগে যদিও চেহারায় তার লেশমাত্র নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে এই একজন নারীকে নিয়ে এমন মারাত্মক হাতাহাতির কারণ কি? 


এরে তো দেখলেই বোঝা যায় দালাল; পয়সা বেশি চাইছে নাকি?"




উক্ত মানুষরূপী পিচাশকে বঞ্চনা করে কথাটা বলেছিলো। নিজের চোয়াল আগের মতোই শক্ত রেখেই অফিসারকে উত্তর দিলো,




“ ঐখানে দাঁড়িয়ে আছে ওনাকে জিজ্ঞেস করুন।"




বোরকা এবড়োখেবড়ো হয়ে গিয়েছে, হিজাবটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছে।তাও সেটা দিয়েই নিজেকে বেশ ভালো মতো ঢাকতে সক্ষম হয়েছে নারীটি। কিন্তু পুলিশের কাজ‌ই সন্দেহ করা। অহেতুক কথায় বিভ্রান্ত করে, জটিলতায় ফেলে, ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আসল সত্য আসামীর মুখ থেকেই বের করাই হলো পুলিশের কাজ। রিমান্ডের প্রথম ধাপ এটা,এটায় কাজ না হলেই চলে রোলারের ঢলা।




ওসি সাহেব একজন নারী কনস্টেবলকে আদেশ করলেন নারীটির থেকে কথা হাসিল করতে,নারী কনস্টেবল তাই করতে আরম্ভ করলেন।তিনি পাশেই পেতে রাখা বেঞ্চে বসিয়ে নিজের কর্কশ কন্ঠে শুধালেন,




“ এমন বোরকা হিজাব প‌ইড়া পর্দানশীন সা‌ইজা খামোখা ক্যান আসল পর্দাওয়ালীগো অসম্মান করোস বুঝি না বাপু!"




মহিলাটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে,চোখের জল ফুরিয়ে গিয়েছে মনে হয়। পুলিশের মনে দয়া মায়া কম।তাই হয়তো খুব সহজেই নারী কনস্টেবল ঐ নারীকে জব্দ করতে পারলেন। একদম সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলেন,




“ এই লাইনে ক‌য়দিন ধ‌ইরা আইছোস? আগে ক‌ই করতি? এই এলাকায় নতুন নাকি?"




এতক্ষণ নিরাশ্রু থাকা চোখ ফেটে ঝর্ণার মতো ব‌ইতে শুরু করলো জলের ধারা। কিন্তু তাতে আই পুলিশের মন গলে? সে চেঁচিয়ে বললো,




“ ঐ নাটক কমা! বহু দেখছি এই নাটক! বিগত দশ বছর ধ‌ইরা দেখতেই আছি তোগো মতো মা/গিদের এইসব ড্রামা তাই এই সস্তা চোখের পানি যার দাম ড্রেনের পানির মতোও নাই তা দেখাইয়া আমার মন গলানো যাইবো না।


সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করছি কোন টালবাহানা ছাড়াই উত্তর দে!


কি নিয়া লাগাইছোস! এই বুইড়া কি দালাল হয়,দেখতে তো বাপের মতো! অবশ্য এগো কাছে মা 


মাইয়া সব‌ই সমান! কিন্তু এই ভদ্রলোকের লগে কি নিয়া লাগাইছে!বেশি চাইছিলো টেকা?"




একাধারে করা প্রশ্নে পুলিশ না হাপালেও হাঁপিয়ে গেলো নারীটি, বিরক্ত হয়ে গেলো সেই সুদর্শন। চেঁচিয়ে উঠলো।বললো,




“ থামুন! কি সব বলছেন এগুলো? উনাকে দেখলে মনে হয় উনি প্রস্টিটিউট? চেহারা দেখে বুঝেন না!"




ওসি সাহেব নিজের জুনিয়রকে হালকা ধমকে বললেন,




“ আগে উনার কান্না থামান। পানি দেন খেতে!"




নারী কনস্টেবল তাই করলেন। ওসি সাহেব সেই পুরুষের দিকে একবার চাইলেন অতঃপর চাইলেন ঐ লোকের দিকে। তারপর সেই পুরুষের দিকে নিজের দৃষ্টি স্থির করে জিজ্ঞেস করলেন,




“ আপনি ঘটনার বিস্তারিত বলুন।"


 আগা থেকে গোড়া সবটা বলা হলো।ওসি সাহেব কিছু ঠাওর করে নারীটিকে নিজের দিকে ইশারা করে বললেন,




“ আপনি এখানে আসুন!"




ভীত এবং নিচু মস্তকে এগিয়ে এসে একটু দুরত্ব বজায় রেখে বললেন,




“ উনার সাথে কি সম্পর্ক!"




এত সময় এত ঘটনার পর মুখ খুলে নারীটা যা বললো তাতে সবার চোখ বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে গেলো।বলা চলে প্রায়‌ই বাবার বয়সী এই পুরুষকে ঐ নারী নিজের স্বামী বলে পরিচয় দিলো। এবং সঙ্গে এ‌ও জানালো যে তিন লাখ টাকার দেনমোহর শোধ বাবদ আজ তাকে তার বাবার ঘর থেকে স্বামীর ঘরে নিযে যাওয়ার কথা বলে এই ক্লাবে এনে সরাসরি এক অচেনা পুরুষ ঘরে ঢুকিয়ে রেখে চলে আসছিলো।মহিলাটা প্রথমে না বুঝলেও পরে যখন কিছু সন্দেহ হয় তখন‌ই সে আত্মরক্ষার জন্য বাইরে বেরিয়ে আসে এবং অনুনয় করে বলে তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে,তাকে তার স্বামীর সংসার করতে দিতে। কিন্তু স্বামী নামক জা/নো/য়া/রের বাচ্চাটা তো মানুষ‌ই না । মানুষের দরদ বুঝবে কি করে? তাই সে ভরা ক্লাবেই গায়ে আঘাত করতে থাকে যার দরুন ছিটকে গিয়ে ঐ লোকের উপরে পড়ে এবং পরের ঘটনা তো সবার‌ই জানা।




পুলিশ সব কিছু শোনার পর সেই স্বামী নামক নরপশুকে চৌদ্দ শিকের মাঝে ঢুকিয়ে নারীটির থেকে স্টেটমেন্ট রেখে তাকে নিরাপদে তার পিত্রালয়ে পৌঁছানোর অঙ্গীকার করে এবং সেই সুদর্শনকে মুচলেকা দিয়ে সতর্ক করে দেয় যেন ভবিষ্যতে কারো ভালো করতে গিয়েও এমন মারপিট না করে।তার সাথে উপদেশ দেয় ব


ভদ্র বাড়ির ছেলে হয়ে এমন অভদ্র আর অশ্লীল জায়গায় যেন না যায়।




থানার ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসে প্রশাসনের এই নরক থেকে। মুক্ত আকাশের দিকে চেয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, বিরবির করে বলে উঠলো,




“ কেন যে যাই তা কেবল আমার এই শূন্য অন্তর আর ঐ অন্তরের কারিগর জানে!"




কথাটা বলেই কল্পনা করলো সেই পূর্ণতাকে যার বিরহে এত শূন্যতা,




ফ্ল্যাশব্যাক...




ক্লাবে ঢুকেই পারীজাত, মেহরিন,নিশি দেখলো প্রায় শ খানেক ছেলে বলা যায় ১৮/১৯ - ৪০/৪৫ এর অনেক পুরুষ প্রায় শ প্লাস সবাই সিরিয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে।


পর্ব-04


শ খানেক পুরুষের মাঝেও পারীজাতরা নিজেদের আসামী খুঁজে পেলো না।সম্রাট, তেহজীব এবং বাপ্পী‌ও এসে উপস্থিত হয় তার সঙ্গে থাকে ক্লাবের সহ সভাপতি নাঈমুল হাসান,সহ সাধারণ সম্পাদক সিয়াম,ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাহসান কাব্য, উপদেষ্টা পরিষদের তিনজন আসিফ,মিনহাজ,ইমন, ক্যাশিয়ার ইন্তেখাব নাঈম সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা।এত এত পুরুষের মাঝেও ঐ ছেলেকে না পেয়ে পারীজাতরা বেশ ঘাবড়ে যায়।যদিও এখানে উপস্থিত সকলেই তাদের সাথে খুব‌ই নরম ব্যবহার করেছে তবুও।সবাই তাদের নির্ভয়ে থাকতে বলেছে এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে।নিশি ভীত সন্ত্রস্ত চোখে বারবার পারীজাতের দিকে তাকাচ্ছে আর ওর হাতের বাহু খামচে ধরছে। এদিকে নিশির কান্ডে পারীজাতের ভীষন রাগ চড়ছে।হাতটা জ্বালা করছে ও্য খামচানোয়।সিসিটিভি ফুটেজে ছেলেটার চেহারা ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। এমনকি ওর সাথের একটাকেও ঠিক মতো চেনা যাচ্ছে না।রাগের চেয়ে বেশি ভয় কাজ করছে।কারণ নিশির সাথে সত্যিই যদি ঐ ছেলে কিছু একটা খারাপ করে বসে তবে!




খানিকটা দূর থেকে সম্রাট নির্নিমেষ পারীকে পর্যবেক্ষণ করছে।ছিমছাম দেহের অধিকারীনি, উচ্চতা সর্বোচ্চ পাঁচ ফুট হবে!শ্যাম বর্ণের মুখটা ঘামে চিকচিক করছে। শুষ্ক ঠোটটা বারবার জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে নিচ্ছে।আজ‌ও কালো বোরকা আর হিজাবে আবৃত।কাধে চাপানো সেই গত কালের কালো চামড়ার ব্যাগটাই। আন্দাজ করেই নিলো মেয়েটার চোরা বয়স।তবে নিতান্তই কম বয়সী না।যত‌ই ছটফটে আর চঞ্চল হোক এই মেয়ে ভীষণ গভীর! এর ভেতরে অনেক কিছু লুকায়িত যা সে সচরাচর কাউকে দেখায় না।




নিশি যে বারবার পারীকে খামাচ্ছে আর তাতে পারী হয়তো ব্যথাও পাচ্ছে ত সম্রাট দূর থেকেই অনুমান করে নিলো।সে এগিয়ে গিয়ে নিশির পাশে দাঁড়িয়ে নিচু কন্ঠে বললো,




“ খামচানো বন্ধ করুন, আপনার বান্ধবী ব্যথা পাচ্ছে।"




ভয়ের চোটে নিশি ভুলেই গিয়েছিলো সে কি করছে। সম্রাটের উপস্থিতিও টের পায়নি।তাই হুট করেই এমন কথায় সে চমকে উঠলো। অতঃপর খানিকটা লাগিয়েই দুই কদম পিছিয়ে গেলো। এই মেয়ের এমন ভয়ে সহ সাধারণ সম্পাদক সিয়ামের‌ও রাগ উঠছে! সে বুঝতেই পারছে এত মানুষের মাঝেও এই মেয়ের এমন ভয়ের অযথা কারণ কি?তাও চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো।সম্রাট শান্ত চোখে নিশির দিকে তাকালো,নিশির ভীত চাহনিতে কিছুক্ষণ গভীর নজর রেখে গম্ভীর কন্ঠে বললো,




“ ভয়ের কারণ নেই। রিল্যাক্স থাকো। এখানে কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।"




“ আমাদের সব মেম্বার এখানে। সিনিয়র যারা আছেন তারা ভেতরে আছে। কিন্তু আমার মনে হয় তোমাদের তাদের দিয়ে কোন কাজ হবে কারণ তোমাদের আসামী ইয়াং কেউ এ্যাম আই রাইট!"




“ জ্বী ভাইয়া!"




মেহরিন প্রত্যুত্তর করলো।সম্রাট পারীজাতের দিকে চেয়ে বললো,




“ সিসিটিভির ফুটেজ বোঝ যায় না।তাই না! ঝাপসা প্রিন্টটা দাও তো দেখি!"




পারীজাত শুনলো না বোধহয়,সে তাকিয়ে আছে অন্যত্র।সম্রাট ভ্রু কুঁচকে পারীজাতের দৃষ্টিকে লক্ষ্য করে নিজেও সেদিকে তাকালো।পারীজাত খুব গভীর ভাবে দেখছে গাছের ছায়ায় নিজেকে আড়াল করা বাদামী টি শার্ট আর কালো জিন্স পড়নের এক লম্বা পাতলা ছেলেকে।পারীজাতের দৃষ্টি যেন পড়তে পারলো সম্রাট সে এগিয়ে গিয়ে বললো,




“ চেনা চেনা লাগছে!"




“ ঐ ছেলেটার সাথেই সেই বদমাইশটাকে একদিন দেখেছিলাম!"




ব্যস এতটুকুই যথেষ্ট ছিলো।পারীজাতের কনফিডেন্স লেভেলে চ‌ওড়া ছিলো।সে জোর দিয়ে বললো,




“ এই ছেলেকে একদিন ঐ ছেলেটার সাথে মিঠু মামার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খেতে দেখছিলাম!"




“Are you sure?"




“ 100%" 




“ রাব্বী!"




“ জ্বী ভাই!"




“ নাফিদকে এখানে নিয়ে আয়!"




রাব্বী ভাইয়ের আদেশ মতো কাজ করলো।নাফিদ নামের ছেলেটা মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছে।




“ আমার সাথে আসো!"




“ আমি করছি? আমি তো উনাদের চিনিও না!"




“ রিল্যাক্স ব্রো! না চিনলে তো তোমার কোন ভয় নাই।"




বলেই নাফিদকে একরকম টেনেই আনলো রাব্বী। সহ সভাপতি নাঈমুল হাসান চেয়ারে বসা ছিলো।নাফিদ সামনে আসতেই রাগের চোটে উঠেই লাগালো এক চড়! চড়ের আওয়াজ এতটাই তীব্র ছিলো যে উপস্থিত সবার কানে গিয়ে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করলো।নাফিদের পুরো মস্তিষ্ক ঝি ঝি করতে থাকলো। কানের লতি যেন কেটে পড়েছে এমন ভাবে যন্ত্রণা করছে।সিয়াম‌ও তেড়ে গিয়েছে।তেহজীব হাত মুঠ করে সোজা হয়ে চোয়াল শক্ত করে অগ্নি চোখে তাকিয়ে আছে নাফিদের দিকে।


কিন্তু একদম শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সম্রাট।তার চাহনিও অন্য দিকে।সে দেখছে অতি সাহসী রাণী পারীজাতের ভীতু মুখটা।একটা চড়ের শব্দেই মেয়েটা ভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়েছে।বাকী দুটো তো আগের থেকেই ভয় পাচ্ছে।




সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাহসান কাব্য নিশিকে উদ্দেশ্য করে বললো,




“ আপু এই স্কাউন্ডেলটা? তোমাকে থ্রেট ও দিয়েছিলো।"




“ ভাই না ভাই আমি উনাগো চিনি‌ই না! বিশ্বাস করেন ভাই! আমি যদি চিনতাম তাইলে কি আসতাম বলেন!"




নিশির আগেই স্বপক্ষে যুক্তি দেখালো নাফিদ।




“ চোপ! তোরে কথা বলতে বলছি? তোরে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে?"




নাফিদকে ধমক দিলো সিয়াম। বাপ্পী এগিয়ে সিয়ামকে উদ্দেশ্য করে বললো,




 “ আগে ঘটনার সত্যতা যাচাই করো। তারপর মারধর।"




“ আপু কথা বলছেন না কেন?"




নিশি উত্তর কিভাবে দিবে? সে তো এই ছেলেকে চিনেই না! সে তাকিয়ে আছে পারীজাতের দিকে।মেহরিন‌ও বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে অসহায়ের মতো‌।তার মনে হচ্ছে যদি পারীজাতের ভুল হয় তাহলে এই লোহার মতো পোক্ত হাতের আরেকটা চড় তাদের কানেও পড়বে।


কথাটা মনে মনে ভাবতেই নাফিদের দিকে ফিরে তাকালো।


সবাই পারীজাতের দিকে চেয়ে আছে কিন্তু পারীজাত কোন শব্দ উচ্চারণ করছে না।সম্রাটের কপালে ভাঁজ পড়লো,সে পারীজাতের দিকে একটু হিলে নিচু কন্ঠে বললো,




“ ভয়ের কিছু নেই তো।যা সত্যি তাই বলো।তুম কি দেখেছো ওর সাথেই সেই ছেলেটাকে? অথবা কি বলতে চাইছো তোমাদের অপরাধী ঐ ই?"




“ না উনি না।


_ আমি ..




“ কি আম আমি বলছেন তখন থেকেই? আমাদের আরো কাজ আছে, আপনার ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে কথা বলা..




“ সিয়াম?"




সম্রাট গর্জিয়ে উঠলো সিয়ামের উপরে।সিয়াম পারীর সাথে উচ্চ আওয়াজে কথা বলছিলো যা তার সহ্য হলো না।যার সাথে সে নিজেই নরম হয়ে কথা বলছে তার সাথে তার‌ই সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কথা বলাটা তার সহ্য হলো না।এত সময় চুপ থেকে হঠাৎ গর্জন করায় সবাই একটু চমকালো


বাপ্পী মনোযোগ দিয়ে নিজের বন্ধুকে দেখছে।পারীর একদম গা ছুঁই ছুঁই হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়তো বাতাস যাওয়ার জন্য একটু জায়গা ফাঁকা রেখেছে নয়তো।




“ আমি কথা বলছি না


তাহলে.."




“ সরি ব্রো!"




সিয়াম সরি বলে সরে গেলো। সম্রাট পারীর দিকে ঘুরে তাড়া দিয়ে বললো,




“ হ্যা বলো।ওর সাথে তোমাদের ইস্যুর কি সম্পর্ক!"




সম্রাটের গর্জন পারীকেও ভীত করে দিয়েছে।সে সম্রাটের থেকে একটু সরে দাঁড়ালো। চারদিকে উপস্থিত সব পুরুষের দিকে একবার চাইলো। দৃষ্টি থামলো নাফিদের লাল হয়ে যাওয়া গালে। অতঃপর কোনভাবে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,




“ আমি উনার সাথে একদিন মিঠু মামার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খেতে দেখেছিলাম।তখন উনারা নিজেদের মাঝেঈ আলাপ করছিলো।তাই আমার মনে হচ্ছে হয়তো উনি ঐ ছেলেকে চিনে!"




“ আমরা ছেলেরা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চা খাই।তখন অনেক ক্রেতার সাথেই সাময়িক ভাব হয়, টুকটাক আলাপ হয় তার মানে এই নয় যে সবাইকেই আমরা চিনি!"




তাহসিন কাব্য দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বললো। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আসিফ বললো,




“ এটা কোন ক্লু হলো?


_ প্রথমত সেই ছেলের কোন ছবি নাই? তার পরিচয় জানে না! তার মধ্যে সামান্য ক্লুও দিতে পারছে না! এর সমস্যা সমাধান কিভাবে হবে? 


_ উল্টো সবার মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। ছেলেরা অযথা হয়রানি হচ্ছে! তার চেয়ে বরং আপু আপনারা যদি সত্যিই কোন সমস্যায় পড়ে থাকেন তাহলে বলবো,দয়া করে যথার্থ প্রমান আর অপরাধীর পরিচয় নিশ্চিত করে তারপর আসবেন।অযথা সময় নষ্ট আর হয়রানী করবেন না আমাদের।এখানে উপস্থিত প্রত্যেকটি ছেলে ভালো এবং ভদ্র ফ্যামিলি থেকে বিলং করে।তারা এহেন অপমান একদম ডিজার্ভ করে না। সবচেয়ে বড় কথা আমরা সবাই শিক্ষার্থী নয়তো কর্মজীবী।আজাইরা সময় আমাদের নাই।"




পারীজাত লজ্জায় সেই যে মাথা নত করেছে আর তুলেনি।নিশি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।মেহরিন একদমই চুপ হয়ে আছে।সম্রাট পারীজাতের দিকে তাকিয়ে খুবই শান্ত কিন্তু গম্ভীর মুখে বললো,




“ কাল থেকে কেউ জ্বালাবে না।


যাও এখন!আর হ্যা সবসময় সাহসীকতার পরিচয় দিতে হবে না।"




পারীজাত তার সখিদের নিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো ক্লাব থেকে।বাপ্পী সবাইকে এক পলক দেখে নিয়ে বললো,




“ তোমাদের কি মনে হয় মেয়েটা আসলেই মিথ্যা বলেছে?"




“ আরে দূর! অযথা সময় নষ্ট! এই টপিক বাদ দাও তো ব্রো।চলো চা খাই!"




একটা সমস্যার সমাধান শেষ না করতে পারলেও নিজেদের ক্লাবের ছেলেরা যে এই বিষয়ে জড়িত না তা নিশ্চিত হতেই সবাই গা ঝাড়া দিলো। কিন্তু সবাই তো এক না।তেমনি নাইমুল,বাপ্পী,সম্রাট পারলো না।পারীজাতরা চলে যাওয়ার পরেও ওরা ঐ এক‌ই বিষয়ে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে আছে। ঐদিকে নাফিদকে চড় মারার কারণে নাইমুল ভীষণ লজ্জা অনুভব করে নাফিদের হাত ধরেই মাফ চাইলো।নাফিদ বড় ভাই মনে করে সবাইকে তাই মাফ করেও দিলো।


কিন্তু সম্রাটের বাজপাখি চাহনিতে নাফিদ গেঁথে র‌ইলো।




পরের দিন বেলা বারোটা...




উইমেন্স কলেজের দোতলা থেকে হকি স্টিকের আঘাতে গড়াতে গড়াতে পড়ে যাচ্ছে এক বোরকা পরিহিত পুরুষ।কালো শার্ট আর কালো ডেনিম প্যান্ট,কপাল অবদি লম্বা সিল্কি চুলে চোখ ঢেকে পড়া এক অতি সুদর্শন পুরুষের লোমশ সুঠাম হাতে 


হকি স্টিক,যা দিয়ে সে পরপর কয়েকটি আঘাত করলো ঐ বোরকা পরিহিত লোকটার হাঁটুতে। এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়লো।তারা একত্র হয়ে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে পড়লো।মাঠের মাঝ বরাবর আনলো ঐভাবেই পিটাতে পিটাতে। এরপর তার সিংহি গর্জনে ডাক দিলো,




“ মাহাদ "




“ জ্বী ভাই!"




“ বোরকা খোল!"




মাহাদ গিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করলো,ঐ লোকটা যে নিজেকে আড়াল করতে চাইছে তা তার বোরকাকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টাতেই বোঝা গেলো। তাও পারলো না। মাহাদের শক্তিশালী হাতের থাবড়ে নিভে গেলো তার সব প্রচেষ্টা।বোরকা খুলতেই শয়তানটার মুখ সামনে চলে আসলো।পারীজাত তেড়ে এলো, সম্রাটের থেকে এগিয়ে গিয়ে বললো,




“ এইতো এই শয়তান টা! শয়তানের বাচ্চা একটা! ভাইয়া আমাকে দ্যান লাঠিটা আমি ওকে একটু পিটিয়ে নেই।"




পারী বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছে।সম্রাট ঠিক‌ই কথা শুনলো, একদম এগিয়ে গিয়ে স্টিকটা দিলো।পারীজাত পরপর কয়েকটি আঘাত করলো বেশ জোরালোভাবে তাও কোথায়? পুরুষাঙ্গের দিকে।


ওর কাজে উপস্থিত সব পুরুষের মস্তক এমনিতেই নুয়ে গেলো। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে র‌ইলো কেবল রাব্বী আর সম্রাট! সে তো এদিকে ওদিকে আকাশ বাতাস দেখতে থাকলো!


পর্ব-05


“ ভাই মেয়েগুলো মানে ঐ আপুগুলো এই কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, ইতিহাসের শিক্ষার্থী।আর তাদের অভিযোগ সত্য! কয়েকদিন ধরেই এক বদমাশ মেয়েগুলো কে ভীষন বিরক্ত করছে। ওরা কিভাবে কলেজের ভেতরে ঢুকে বোঝার উপায় নাই কারণ প্রায়‌ই বিভিন্ন বেশে ঢুকে। মেয়েগুলো কতৃপক্ষের কাছে কমপ্লেইন করলেও প্রতিকার পায়নি।তারা নিজেদের কলেজের রেপুটেশনের চিন্তায় মেয়েদেরকেই চুপ থাকতে বলছে।


আশ্চর্যের বিষয় ঢোকার সময় কেউই দেখে না কিন্তু বের হবার সময় ঠিক‌ই দেখে।"




“ চিনতে পেরেছিস কে?"


“ না ভাই।তয় ও আমাদের লোক না। আমার মনে হচ্ছে নিজেকে সেইফ জোনে রাখতেই আমাদের ক্লাবের নাম বলেছে।"




“ ফুটেজ কি পরিষ্কার?"




“ না ভাই।আর কলেজের প্রধান গেইটের সিসিটিভি নষ্ট।ওটা কাজ হয় না।তাই সরাসরি কোন পিক আনতে পারিনি।"




“ হুম।


_ ঐ মেয়েটা কি যেন নাম?"




“ কোন মেয়েটা ভাই?"


“ ঐ যে বোরকা পড়া থাকে।কি নাম,কি নাম!"


“ ঐ যে কাউয়ার মতো কা কা করে ঐটা?"




রাব্বী একটু জোরেই বললো। সম্রাট বাম ভ্রু উঁচিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে চোখ লাল করে রাব্বীকে দেখলো।রাব্বী নিজের ভুল শুধরে বললো,




“ ঐ বোরকা পরিহিত আপুটা?"




“ পারীজাত।পারীজাত মেয়েটা বলেছিলো ওকে আমাদের নাফিদের সাথে চা খেতে দেখেছিলো।এক কাজ কর সময় আর দিন জেনে নিয়ে ঠিক ঐ সময়টার...চল আমিও যাবো!"




বলেই সম্রাট উঠে দাঁড়ালো। সম্রাটকে এই বিষয়ে বেশি মাথা ঘামাতে দেখে সবাই কৌতুহলী হলো।বাপ্পী বন্ধুকে মন দিয়ে খেয়াল করছে।গতকাল থেকেই তার উদ্বেগ নজরকাড়া। বিশেষ করে মেয়েটার জন্য! বাপ্পীও উঠে দাঁড়ালো বললো,




“ চল আমিও যাবো।"




“ আপডেট দিও ব্রো!"




তাহসান কাব্য বললো কথাটা। সিয়াম‌ও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো বললো,




“ চলো আমিও যাই


গিয়ে দেখি আসলেই শালাটা কে?"




“ আসো"




সম্রাট,বাপ্পী,সিয়ামদের সাথে গেলো মাহাদ, রাব্বী,মুন্সি,নাফিদ সহ আরো তিনজন।




চায়ের দোকানটা কলেজ গেইট থেকে খানিকটা দূরে, মিনিটে হিসেবে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে। কলেজের সামনে এমন একটি চায়ের দোকান থাকায় শিক্ষার্থীদের বেশ উপকার হয়।যদিও কলেজ ক্যান্টিন আছে তবুও। ক্যান্টিনের চেয়ে এই দোকানের মিঠু মামার চা বেশি মজাদার হয় যার কারণে মিঠু মামা শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়।




ওরা সবাই মিলে ভালো করে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে খুঁজে বের করলো গোপন ক্যামেরা।যা গাছের ডালের আড়ালে থাকায় অনেকেই বুঝতে পারে না


তবে সুবিধা বিষয় হচ্ছে সেটার প্রধান ফোকাস সরাসরি দোকানের উপরে পড়ে।যার কারণে চায়ের দোকানে আগত সকলকেই খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়।




নাফিদকে চা খেতে খেতে কারো সাথে খোশ আলাপে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে এমন একটি চিত্র ফুটেজ থেকে সংগ্রহ করা হলো। কিন্তু এই যে কলেজের ভেতরে ঢুকে তার প্রমান কি? ওহ পারীজাত বলেছিলো এই।




সম্রাট পারীজাতের ঘোলা প্রিন্ট করা চিত্র থেকে আদো আদো বোঝা যায় চিত্রটার সাথে নিজেদের সংগ্রহ করা চিত্রের মিল খুঁজে নিলো অতঃপর পরের দিন সকাল থেকে ছেলেদের কাজে লাগিয়ে কলেজে ঢোকা প্রতিটি ছাত্রী এবং তার অভিভাবকদের উপর নজর রাখায়।যার এক পর্যায়ে বোরকা পরিহিত এক লম্বা দেহধারীকে ভীষণ অস্বাভাবিক ভাবে কলেজে ঢুকতে দেখেই সন্দেহ জাগে। অতঃপর তারাও ঢুকে পড়ে এবং তাকে তাকে থেকে হাতে নাতে ধরে।


নিশি তখন ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য ক্লাস থেকে বেরিয়েছিল। যেহেতু ক্লাস টাইম তাই ওয়াশ রুমের দিকের বারান্দাটা একদিন শুনশান ছিলো।বদমাইশটাও তার‌ই সুযোগ কাজে লাগায়।


রাব্বীরাও তাই করে।




ক্লাবে যখন খুঁজে পাওয়া গেলো না অপরাধীকে তখন ভেতরে বসে এভাবেই তথ্য উপাত্ত নিয়ে পর্যালোচনা চললো।


এভাবেই ঐ ইভটিজারকে খুঁজে বের করে এবং তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করে।তার সাথে কলেজ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয় যাতে ভবিষ্যতে এমন সমস্যায় পড়লে আগে মেয়েদের চিন্তা করে, নিজেদের কলেজের না।




পারীজাতকে ডেকে এনে নিশ্চিত হয় অপরাধী চিহ্নিত করায়। অতঃপর শাস্তির প্রথম ধাপ তো আপনারা আগেই দেখছেন।




পারীজাত যখন বেদম পিটাচ্ছিলো তখন সম্রাট মনে মনে কল্পনা করলো কাল থেকে এই মুহুর্ত অবধি।




“ শোন পারী গুন্ডাটার পা ভেঙে দে।যাতে হেঁটে হেঁটে কোথাও যেতেই না পারে!"




“ না পারী এক কাজ কর,ওর শয়তানি বুদ্ধি ভরা মাথাটাই ফাটিয়ে দে।মাথাও থাকবে না কুৎসিত চিন্তা‌ও করবে না!"




“ 




মেহরিন পারীকে উৎসাহ দিয়ে কথাটা বললো। তাকে অনুসরণ করে শেষের লাইনটা বললো নিশি।রাব্বী এই কথাগুলো শুনে বাপ্পীর কানে কানে বললো,




“ ভাই,আমরাও মারার সময় একটু আধটু মায়া করি অথচ এই মেয়েদের দেখি তাও নাই!"




বাপ্পীও  রাব্বীর মতো ফিসফিস করে বললো,




“ কারণ ওরা মেয়ে! ওরা নিজের খুনিকেও মাফ করবে কিন্তু ইজ্জতের উপর হাত দেয় এমন কাউকে মাফ করবে না! তাই বলি সবসময় মেয়েদের রেসপেক্ট করে কথা বলবি।"




“ জ্বী ভাই!"




“ হয়েছে, হয়েছে, থামো এবার!"




বলেই সম্রাট এগিয়ে এলো। কিন্তু পারী থামলো না ।সে ঐ ছেলের হাঁটুতে একটি জোরালো ভারী মারলো,যার ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো ছেলেটা।পুরো কলেজ ক্যাম্পাস থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এহেন ঘটনায়। কতৃপক্ষের অনেকেই এর মধ্যেই দৌড়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছেন।তারা বলছে যা করার আইনের মাধ্যমেই করতে,নয়তো ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে করতে।




পারী আঘাত করতে থাকা অবস্থায় বললো,




“ আমি ওর মেশিন‌ই নষ্ট করে দিবো। মেশিনের জোরেই তো এত বাহাদুরি।মেশিন না থাকলেই সব ঠিকঠাক থাকবে।"




“ থামো বলছি।আর না।এবার থামো, ক্লান্ত হয়ে যাবে।"




বলেই সম্রাট পারীজাতের পিছনে দাঁড়িয়ে দুই ইঞ্চির মতো ফাঁক রেখে পারীজাতের হাত থেকে হকি স্টিকটা নিলো।স্টিক নিতে গিয়েই পারীজাতের ঘাড়ের কাছাকাছি তার মুখ চলে যায়।হাতের উপর হাতের ছোঁয়া লাগে। হঠাৎ করেই বেগানা পুরুষের ছোঁয়ায় পারী জমে যায়। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।তার হাত আলগা হয়ে স্টিক পড়ে যেতে নিতেই সম্রাট ধরে ফেলে।পারীর থমথমে মুখ দেখে দ্রুত সরে আসে। মুখটা শুকিয়ে যায় পারীর থমথমে চেহারা দেখে।সে পরিস্থিতি সামলাতে গলা খাঁকারি দিলো। অতঃপর বললো,




“ মাহাদ এটাকে নিজের ক্লাবে যা।যা হবার ওখানেই হবে। তোমরাও এসো।




বলেই সম্রাট এগিয়ে যায়।পারীর পা জমে গিয়ে নিজের যেন। তার ভেতর কোন অনুভূতি জেগে উঠলো।তার মাথায় বারবার ঘুরছে হুট করেই লাগা সে অযাচিত ছোঁয়া। কানের কাছে কারো গরম নিঃশ্বাসের অনু্প্রবেশ।


পারীকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দৌড়ে এলো নিশি, মেহরিন। মেহরিন পারীকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো,




“ কি লো যাবি না? চল, তাড়াতাড়ি যাই! গিয়ে দেখি কুকুরের বাচ্চাটাকে কি করছে ভাইয়ারা!"




“ হুম।"




বলেই নিশি পারীর হাত ধরে এগিয়ে যেতেই আবার‌ও পিছনে তাকাতে বাধ্য হলো।কারণ পারী এখনও নড়ছে না।মেহরিন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,




“ কি রে কি হয়েছে?


_ এক মিনিট,ঐটাকে মারতে গিয়ে কোথাও ব্যথা পেয়েছিস?"




চিন্তিত মেহরিন পারীর হাতে পায়ে আঘাত লেগেছে কি-না দেখার চেষ্টা করলো।নিশি বান্ধবীর কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো,




“ কোথায় ব্যথা পেয়েছিস বল!"




পারীর তো হুশ‌ই ছিলো না এত সময়।নিশির ধাক্কায় সে হুশে আসে। চমকে উঠলো,বললো,




“ কোথাও ব্যথা লাগেনি।চল তাড়াতাড়ি!"




বলেই সে আগেই দ্রুত কদমে হেঁটে এগিয়ে গেলো।মেহরিন নিশি এঁকে অপরের দিকে তাকিয়ে কাঁধ উঁচিয়ে ধরে ইশারায় প্রশ্ন করলো,




“ কি হলো!"




উত্তর তো নাই। তাই কেউ দিলো না।


ক্লাবের নিয়ম অনুযায়ী আগে ইচ্ছা মতো ধোলাই অতঃপর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এবং এখানেই এই এই কেচ্ছার সমাপ্তি ঘটে।


পারীরা যখন বিচার শেষে ফিরে আসতে চাইলো তখন পিছন থেকে তাহসান ঢেকে বললো,




“ এক্সকিউজ মি আপু?"




পারীরা তিনজন‌ই ফিরে তাকালো। তাহসান কাব্য এগিয়ে এসে বিনিত কন্ঠে বললো,




“ সরি আপু আমার মিস বিহেভিয়ার এর জন্য! আসলে বুঝেন‌ই তো প্রমান ছাড়া তো যে কাউকেই আমরা হেনস্থা করতে পারি না!"




“ ইটস্ ওখে ভাইয়া।আমরা কিছু মনে করিনি।এটা স্বাভাবিক বিষয়।


_ আসি হ্যা আসসালামু আলাইকুম!"




“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম আসবেন আবার,যেকোন প্রয়োজনে ভাইদের দরজা সবসময় খোলা আপনাদের জন্য!"




সিয়াম এভাবেই বিদায় দিলো পারীজাতদের।




দুইদিন পর....




নিশি আর মেহরিন ভীতু ভীতু চোখে ধীর পায়ে বাগান বিলাসের দরজায় কড়া নাড়লো।


দোতলা বিশিষ্ট বিশাল এড়িয়া নিয়ে এই ক্লাব।দোতলায় জিম ঘর,আর রেস্ট হাউজ।নিচ তলায় সুসজ্জিত মিটিং রুম, সাংস্কৃতিক কাজ করার জন্য একটি মাঝারি আকারের রুম সাজানো মানে সেখানে গিটার থেকে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র রাখা আছে।আর‌ও আছে ব্লিয়ার্ড বোর্ড,ছোট একটি কিচেন,বাইরের বারান্দায় ক্যারাম বোর্ড,লুডু কোর্ট,দাবা কোর্ট থেকে বাস্কেটবল,ক্রিকেট, ফুটবলের মতো খেলার আয়োজন করা আছে।আর সকালে এখানে কায়িম ব্যায়াম‌ও করানো হয়।




অত্র এলাকায় সমাজকল্যাণের অনেক কাজ‌ই এখান থেকে করা হয়। মোটামুটি ভালো ফান্ড‌ও কালেক্ট হয়। যেহেতু অরাজনৈতিক সংগঠন তাই কোন ছেলেদের পরিবার‌ও কোন অভিযোগ করে না


বরং তারা খুশিই হয় এই ক্লাবের সদস্য হতে পারলে।




নিশির হাতে একটা ইয়া বড় প্যাকেট। কেকের প্যাকেট।যার উপরে সুন্দর করে ব্র্যান্ডের নাম লেখা আছে,  “ Piyont's Sweet's and cake " Owner by Parijat Abrar Chowdhury . লেখাটার উপর খুব‌ই আলতো ভাবে হাত বুলিয়ে দিলো নিশি।




বাগান বিলাসের পরেই একটা বিশাল লৌহ দরজা।যেটা সবসময় খোলা থাকলেও আপাতত বন্ধ।হয়তো ভেতরে খুবই বিশেষ কোন মিটিং চলছে।তাই বন্ধ করে রাখা হয়েছে।নিশি মেহরিনকে বললো,




“ আমরা কি ভুল সময়ে এসে পড়েছি দোস্ত?


_তোর কি মনে হয় উনারা বিরক্ত হবেন আমাদের উপর?"




মিহি মিষ্টি কন্ঠের অধিকারীনি নিশি। চুপচাপ আর শান্ত স্বভাবের। একটু নাজুক প্রকৃতির‌ও বলা যায়।


চুন থেকে পান খসলেই তার কাঁপা কাঁপি শুরু হয়ে যায়।সেই মেয়ে ওমন একটা হিংস্র লোকের নজরে পড়ে ছিলো,ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয় মেহরিনের।


নিশি বান্ধবীর থেকে কোন সাড়া না পেয়ে নিজের ব্যস্ত হাতের কনুই দিয়ে খোঁচা দিলো বান্ধবীর পেটের ডান কোনে। মেহরিন খোঁচা খেয়ে নিশির দিকে চোখ খিচিয়ে তাকালো,আস্তে করে বললো,




“ খামচাখামচির স্বভাব বদলাবি না? নাকি আমিও তোকে.."




“ জ্বী বলুন।"




মেহরিনের কথা শেষ হ‌ওয়ার আগেই দরজা খুলে উঁকি দিয়ে প্রশ্নটি করলো এক যুবক।নাম জানা নেই।সে হয়তো চিনলো ওদের তাই আবার‌ও কথা সেই বললো,




“ আপু আপনারা? আবার কোন সমস্যা হয়েছে?"




নিশি মেহরিন একে অপরের দিকে তাকালো।তারা পারীর মতো ফটাফট উত্তর দিতে পটু নয়। প্রসঙ্গত তারা এহেন সময়ে ঠিকঠাক কথা বলতেই পটু নয়।তাই একটু ভীত আর জড়তা নিয়ে নিশি মেহরিনের দিকে চেয়ে বললো,




“ তুই বল!"




মেহরিন বান্ধবীর এমন মুহুর্তেও তাকে ফাসানোয় ভীষণ নারাজ হলো। কিন্তু কিছু করারও নেই।তাকেই কথা বলতে হবে সেটা সে বুঝেই গিয়েছে।এই সময়ে সে পারীকে খুব মিস করছে। ইস্ মেয়েটা একটু বেশি কথা বলে! কিন্তু তাতে কি? কথা বলতে পারাও একটা বিশাল গুন।যা সবাই পারে না।এই যে নিশি আর মেহরিন পারছে না অথচ পারী থাকলে এতক্ষণে কাজ খতম হয়ে যেতো।




“ আপু? এনিথিং সিরিয়াস?"




ঐ যুবকের কথায় মেহরিন,নিশি সোজা হয়ে দাঁড়ালো।মেহরিন নিজের কথা গুছিয়ে নিয়ে বললো,




“ আসলে আমরা সম্রাট ভাইয়ার সাথেই একটু দেখা করতে এসেছিলাম।


_এই যে এই কেকটা উনাকে দিবো!"




নিশির হাত দেখিয়ে কথাটা বললো।যুবক একবার কেকের প্যাকেট দেখে মেহরিনকে বললো,




“ ভেতরে জরুরী মিটিং চলছে। আপনাদের বাইরে অপেক্ষা করতে হবে। তাছাড়াও মনে হয় ভাই কেক নিবে।হেলথ মেইনটেইন করে চলে তো!"




নিশি মেহরিন আবারও একে অপরের দেখলো এবং বললো,




“ সমস্যা নাই। আমরা অপেক্ষা করবো। ভাইয়া না নিলে জোর করবো না!




“ আচ্ছা আসুন।"




নিশি মেহরিন ভেতরে ঢুকতেই যুবক দরজাটা আবার‌ও ভেতর থেকে লাগিয়ে দিলো।


সাহস করে ভেতরে ঢুকলেও এখন তারা ভীষণ আতংকিত হয়ে পড়েছে কারণ এত বড় ক্লাব,দরজা বন্ধ অথচ ভেতরে কতকত পুরুষ!


পর্ব-06


সামনেই আগষ্ট মাস, জাতীয় শোক দিবস।যত‌ই অরাজনৈতিক সংগঠন হোক , জাতীয় আর আন্তর্জাতিক দিবস এবং উৎসব মূলক কর্মকাণ্ড সবসময় উৎযাপিত হয়। সাংস্কৃতিক থেকে ক্রীড়াঙ্গন সবক্ষেত্রেই তারা নিজেদের পদচিহ্ন রেখেছে।




আগস্ট মাস উপলক্ষে যুব সংসদের তরফ থেকে ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন চলছে যেটায় অংশগ্রহণ করতে পারবে বিভিন্ন পাড়া ভিত্তিক ক্লাবগুলো। আজকে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিকল্পনা সাজিয়ে দায়িত্ব বিভাজন করে নিবে অতঃপর সেই অনুযায়ী কাজে হবে।




সভাপতির চেয়ারে বসা সম্রাট গা ছেড়ে বসেছে নিজের আসনে।তাকে ঘিরে ক্লাবের বিভিন্ন বয়সের , নবীন থেকে প্রবীন সব গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা উপস্থিত।


তাহসান কাব্য সম্রাটের বিপরীতে বসেছে, পাশেই বসেছে সিয়াম।তার পাশে বসেছে বাপ্পী। এভাবেই একে একে সব সদস্যরা।




সেই যুবক মেহরিন আর নিশিকে বাইরে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বসতে বলে ভেতরে চলে আসে। আলোচনা কক্ষের দরজায় টোকা দেয়।




আদর নামের এক যুবক দরজার খিল তুলে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,




“ কি হয়েছে?"




“ মিটিং শেষ হয় নাই?"




“ হয়েছে, এখন এমনিতেই কথাবার্তা বলছে।


_ কেন কি হয়েছে?"




“ সম্রাট ভাইকে দরকার।সেদিন যেই মেয়েদের কেইস সলভ করলো তাদের দুজন ভাইয়ের জন্য কিছু নিয়ে এসেছে।"




“ কিছু মানে? ঘুষ!"




“ আরেহ ধুর! হয়তো কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এনেছে। তুই ভাইকে জিজ্ঞেস কর, উনাদের ভেতরে আসতে বলবো কি-না?"




“ ওয়েট!"




“ কি হচ্ছে ওখানে? কিসের ফুসুর ফুসুর চলছে?"




বাপ্পী চিৎকার করে প্রশ্ন করলো।আদর দরজা থেকে মুখ ঘুরিয়ে সবার দিকে একবার তাকিয়ে সম্রাটের দিকে বললো,




“ ভাই,সেদিন যেই আপুদের হেল্প করেছেন উনারা এসেছেন।কিছু বলবে হয়তো!"




সম্রাট ভ্রু কুঁচকালো।মনে মনে ভাবলো,আবার কি হয়েছে?সম্রাটের আগেই সিয়াম বললো,




“ ভেতরে আসতে বল।"




“ না থাক,আমি‌ই আসছি।"




বলেই সম্রাট উঠে দাঁড়ালো। সিয়াম ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,




“ আশ্চর্য ওরাই আসুক। তুই কেন যাচ্ছিস ব্রো?"




তাহসান, নাইমুলসহ বাকীরাও এক‌ই ভাবে চেয়ে আছে শুধু বাপ্পী মুখে মুচকি হাঁসি ফুটিয়ে বন্ধুকে পর্যবেক্ষণ করছে। সম্রাট সিয়ামের দিকে চেয়ে উত্তর দিলো,




“ আমরা এত গুলো পুরুষ,এমন বদ্ধ রুমে! মেয়েগুলো নার্ভাস ফিল করে।আমাদের‌ও বোন আছে,মাথায় রাখতে হবে।"




বলেই সে সিয়ামকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।সিয়াম সম্রাটের গমন পথে চেয়ে কিছু একটা আন্দাজ করে বাপ্পীর দিকে তাকিয়ে বললো,




“ কিরে? ওর হাবভাব তো সুবিধের না।


ক্লাবে নারীদের প্রবেশ নিষেধ ঠিক আছে তাই বলে আমাদের‌ও তো এভাবে দৌড়ানোর নজির নেই । তাহলে হঠাৎ করেই সভাপতি সাহেব এত বেশি.."




“ কুল ব্রো,এমন কিছু না। মেয়েগুলো ভালো, তাই হয়তো।"




বাপ্পী সিয়ামের কাঁধে চাপড় মেরে বললো,




“ আল্লাহ মালুম!"




বলেই তাহসান কাব্য হেসে দিলো।ওর সাথে তাল মিলালো নাইমুল সহ বাকীরাও।




“ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।"




নিশি, মেহরিন বসা থেকে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো। সম্রাট ওদের থেকে অনেকটা দূরেই দাঁড়িয়ে সালামের প্রত্যুত্তরে বললো,




“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,কি অবস্থা আপুরা? কেমন আছো সবাই?"




“ জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো‌ ভাইয়া।আপনি?"




“ আলহামদুলিল্লাহ,তা তোমরা দুজন... আরেকজন কোথায় সখি?"




নিশি মেহরিন একে অপরের দিকে তাকিয়ে একসাথেই বললো,




“ ও আজ আসেনি। একটু ব্যস্ত আছে!"




“ওহ আচ্ছা!"




কথাটা বেশ শুকনো গলায় বললো। মেহরিন নিজের হাতের প্যাকেটটা একটু উঁচুতে তুলে ধরে বললো,




“ ভাইয়া কিছু মনে না করলে,এটা নিন প্লিজ।"




“ কি এটা?"




সম্রাটের পিছন থেকে প্রশ্ন করলো সিয়াম। নিজের কৌতুহল দমিয়ে রাখতে না পেরে সেও উঠে এদিকে 


আসলো।সম্রাট একটু সরে দাঁড়ালো, সিয়াম সম্রাটের বরাবর দাঁড়িয়ে নিশির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,




“ কি এটাতে?"




সিয়ামের কথার ধরন‌ই একটু রুক্ষ, ভালো কথা বললেও মনে হয় ধমকাচ্ছে।নিশি সিয়ামের কথার ধরণে ভয় পাচ্ছে,সম্রাট বুঝতে পেরে সিয়ামের কাঁধে হাত রেখে ইশারায় থামতে বললো


 অতঃপর নিশিকে বললো,




“ এত কষ্ট করার কোন দরকার ছিলো না বোন।"




“ না না কষ্ট হয়নি ভাইয়া, একদমই কষ্ট হয়নি। তাছাড়াও আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন তাতে এটা কিছুই না।"




মেহরিন সৌজন্য সহিত হাসি দিয়ে কথাটা বললো,


নিশি বক্সটা সামনে এগিয়ে ধরল এবং বললো,




“ আপনারা কেক টা নিলে খুব খুশি হবো ভাইয়া! 


প্লিজ!"




সিয়াম যতটাই রুক্ষ নিশি ঠিক ততটাই নরম, আদ্র।




সম্রাট হাত বাড়িয়ে বক্সটা নিলো, এবং মিষ্টি করে ধন্যবাদ দিলো। সম্রাটের ধন্যবাদ শেষ হতেই অন্য একটি কন্ঠস্বর শোনা গেল,




“ এভাবে মাঝে মধ্যে কেক মিষ্টি দিয়ে যাইয়েন, ওকে! আমি খুব ভালোবাসি এগুলো খেতে।"




সবাই তাকিয়ে দেখলো নাইমুল দাঁড়িয়ে আছে,মুখটা হাসি হাসি।বোঝাই যাচ্ছে তার কথার উদ্দেশ্য মজা করা।




নিশি মুখ টিপে হাসলো, মেহরিন মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বললো,




“ জ্বী ভাইয়া দিয়ে যাবো, শুধু পেমেন্ট বিকাশ অথবা নগদ করলেই হবে!"




“ মানে কি? টাকা দিলে দিবে! এটা দিয়েও কি টাকা নিয়ে যাবে?"




“ জ্বী না।এটা হচ্ছে সম্রাট ভাইয়াকে ভালোবেসে দেওয়া,এখন যে দিয়েছে সে নিশ্চয়ই রোজ রোজ ভালোবেসে ফ্রিতে দিবে না! কারণ এটা তো তার ব্যাবসা!"




“ ওহ, তাতে কি। মাঝে মধ্যে না হয় পয়সা খসিয়ে বড় ভাইদের খাওয়ালে।"




“ আচ্ছা সে না হয় খাওয়াবো,যখন চাকরিবাকরির করবো, নিজেদের টাকা হবে তখন।এখন তো বাবা আর ভাইয়ার থেকে নেই।"




“ ওখে যাও দোয়া করে দিলাম। তাড়াতাড়ি বড় হ‌ও আর চাকরি বাকরি করে অনেক টাকার মালকিন হ‌ও।"




“ আমীন।"




সম্রাট নাইমুলকে থামাতে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,




“ হয়েছে?"




“ কি ?"




“ লোভটাকে একটু সামাল দেও,নয়তো খুব শিগগিরই হার্ট এ্যাটাক ফ্যাটাক হয়ে যাবে।"




“ এভাবে বলো না।


_ বেচারা প্রেমিকা ছাড়তে পারবে কিন্তু খাদ্য নয়!"




সিয়াম নাইমুলকে খুচা মেরে কথাটা বললো। নাইমুল দুই বন্ধুর এহেন অপমানে বেজায় দুঃখ পেলো।মুখভার করে ভেতরে চলে যেতে গিয়েও পিছিয়ে নিশি আর মেহরিনকে বললো,




“ আর যদি কখনো আনো তাহলে আমারটা আলাদা এনো।এরা যাতে দেখতে না পায়!"




বলেই চলে গেল।নিশি মেহরিন একে অপরের দিকে তাকালো এবং একসাথেই বললো,




“ জ্বী আচ্ছা ভাইয়া!"




নাইমুলের কথায় সম্রাট সিয়াম একসাথে হেসে দিলো।




“ চলো, ভেতরে চলো।"




“ না ভাইয়া আজ আর যাবো না।আপনি এটা নিন প্লিজ।আর হ্যা অনেক আগে তৈরি করা হয়েছে তো তাই নরম হয়ে যেতে পারে, তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলুন!"




“ ওকে, সাবধানে যেও।"




“ যেকোন দরকারে ভাইদের স্মরণ করো,তবে আমরা খেতে চাইবো না সুতরাং ভয় নাই।"




“ ইটস ওকে।"




সম্রাট সিয়াম দুষ্টুমি করে কথাগুলো বললো।নিশি মেহরিন বিদায় জানিয়ে চলে গেলো।




সম্রাট হাতে করূ বক্সটা নিয়ে ঢুকতে তার দিকে কৌতুহলি দৃষ্টি গুলো উপচে পড়তে থাকলো। সেগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে সম্রাট রাব্বীকে বললো,




“ ছু/রি আর প্লেট নিয়ে আয় তো। তাড়াতাড়ি কর!"




ম্যাঙ্গো ফ্লেভারের সাথে স্ট্রবেরি মিক্সড ফ্লেভার কেক, তাদের ক্লাবের থিম তার উপর মোটা প্রলেপ দিয়ে চকোলেট লেয়ারে ধন্যবাদ লেখা সঙ্গে একটি খুশির ইমোজি। বক্সের মুখ খুলতেই অসম্ভব সুন্দর একটা চোখে পড়লো। সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে সাজানোটখ যা সবার চোখেই গেঁথে গেলো।বাপ্পী উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,




“ কোন শপের এটা?"




সম্রাট বক্সের ঢাকনার তুলে ধরে দেখলো, গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, Priyonti's Sweet's and cake " Owner by Parijat Abrar Chowdhury...


‘ পারীজাত ' মস্তিষ্কে গেঁথে যাওয়া নামটা মনেও বোধহয় গেঁথে গেলো।




“ কাটতো খেয়ে দেখি।"


বলেই বাপ্পী উঠে দাঁড়ালো এবং অতি উৎসাহী হয়ে রাব্বীর হাত থেকে ছু/রিটা নিয়ে নিজেই কাটলো। কাটা পিসটা মুখে পুড়তেই তৃপ্তিময় আওয়াজে তুললো। নিজের আঙ্গুল চাটতে চাটতে বললো,




“ মেয়েটা শুধু কথায় না কাজেও আছে।জাসট ইয়ামমম!"




ওর কথায় প্রশংসার ফুলঝুরি ছুটতে থাকলো। সম্রাট বাপ্পীর হাত থেকে ছু/রি নিয়ে উপস্থিত লোক সংখ্যা হিসেব করে কেক কেটে প্লেটে তুলে হবার হাতে হাতে দিলো। এবং শেষ পিসটা নিজের মুখে ঢুকিয়ে চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে থাকলো স্বাদটা। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো প্রশান্তির হাসি যেই হাসি চোখ পিটপিট করে দেখলো তার বন্ধুরা।




🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸




জ্বী আপু আসসালামু আলাইকুম, আপনার কেকটা আমি নিজেই ডেলিভারি দিয়ে আসবো। চিন্তা করবেন না।


_ নো নো, এবার কোন ভুল হবে না ইনশাআল্লাহ।"




*******




“ আপু গতবারের চেয়ে এবার সবকিছুই অনেক দাম বেশি পড়েছে।আর আমি তো আপনাদের অর্ডারের পরিমাণ অনুযায়ী বাজার করি তাই আমার সবসময় নতুন দামেই কিনতে হয়। আসলে এটা তো আমার একদম নতুন ব্যাবসা আর আমাকেও অর্থনৈতিক ভাবে সহযোগিতা করার মতো কেউ নেই,যে একবারে অনেক বাজার করে রাখবো।যাই করি নিজেকেই করতে হয় সুতরাং বুঝতেই পারছেন।আমি চাইলেও আপনাদের থেকে কম নিতে পারছিলাম না।"




*****




“ জ্বী আপু, চেষ্টা করছি। ইনশাআল্লাহ আমার থেকে সবসময় ফ্রেশ খাবার পাবেন।আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।"




*****




“ জ্বী ইনশাআল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম, আল্লাহ হাফেজ।"




পারীজাত নিজের এক কাস্টমারের সাথে কথোপকথন শেষ করে কেকের জন্য মোল নিলো।


কাপল থিমের এক পাউন্ডের কেক হবে।ভ্যানিলা উইথ অরেঞ্জ।




মনটা তার বেশ ফুরফুরে।আজ সকাল থেকে তিনটা অর্ডার পেয়েছেন। অবশ্য গত সপ্তাহে একজন ফুড ব্লগারের বার্থডে কেক করে দিয়েছিল সেটা খেয়ে আপুটা বেশ ভালো রিভিউ দিয়েছিল তার সুবাদেই হয়তো অর্ডার বাড়ছে।




সময় পায়নি।তবে শুনেছে তার পেইজের ফলোয়ার লাইকার বেড়েছে।এমন করে যদি সব গ্রাহক একটু কষ্ট করে রিভিউ দিয়ে দেয় তাহলে হয়তো অনেক কাস্টমার বাড়বে।পারীজাত কথাগুলো ভাবছে আর মোলে তরল গরম চকোলেট ঢেলে দিলো। এরপর কি মনে করেই মোবাইলটা আবারও হাতে তুলে নিলো।রাত এখন বারোটা ঊনচল্লিশ মিনিট।ঘড়ি দেখেই লক খুলে নিজের পেইজে ঢুকলো। নতুন একটি রিভিউ শো হচ্ছে। মাত্র সতেরোটা রিভিউ ছিলো, এখন দেখাচ্ছে আঠারোটা।


পারীজাত রিভিউ অপশনে ঢুকে দেখলো আজ এখন থেকে ঠিক এক ঘন্টা আগে Md Samrat Mahmud Talukdar নামে একটি আইডি থেকে রিভিউটা করা হয়েছে। এবং নতুন ফলোয়ারের সংখ্যায়‌ও তার নাম রয়েছে।পারীজাত ঠিক দেখছে কি-না কিংবা সঠিক ধারণা করছে কিনা যাচাই করতে ঐ আইডিতে ঢুকলো,হ্যা সেই সম্রাট‌'ই যাকে সে ধারণা করেছিলো।


অজান্তেই তার ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটলো যা হয়তো পারীজাত নিজেও টের পেলো না।


পর্ব-07


চারদিকে লাশের বহর। তরল রক্ত মাংসের মানুষগুলো ঠাণ্ডায় জমে শক্ত শ্বেত বরফ খন্ডে পরিণত হয়েছে।একের পর এক লাশ লাইন করে শুইয়ে রাখা হয়েছে নদীর দুই ধারে।


লাল টসটসে ঠোঁটটাও কেমন ফ্যাকাশে দেখা যাচ্ছে।ঐ তো মেয়েটার ঠোঁটের কোণে দেখা যাচ্ছে লাল চিহ্ন,এক নিষ্ঠুর রাতের নিষ্ঠুরতাও ঐ সুন্দর কোমল মুখের সজ্জিত আভাকে মুছে ফেলতে পারেনি ঠিক‌ই কিন্তু আজীবনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে কন্ঠনালী।




শত-শত লাশের মাঝেই হন্নি হয়ে খুঁজে চলেছে নিজের অতি আপনজনদের।কিশোরীর বুকের উত্তাল বেগ জানিয়ে দিচ্ছে সে কতটা ব্যাকুল হয়ে খুঁজছে তাদের যাদের ছাড়া মানব জীবন শূন্য!




“ পাপা ! মাম্মা! ভাই!"




বুক ফাটা আর্তনাদ আর হাহাকারে ছেয়ে থাকা সম্পূর্ণ নদীর কুলে মানুষের স্রোত বয়ে যাচ্ছে । তার মাঝেই খালি পায়ে হাঁটু অবধি ফ্রক আর চুড়িদারে 


দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে দৌড়াচ্ছে এগারোর এক কিশোরী। জন্ম দেওয়া দুজন মানুষ আর রক্তের একটি চিহ্ন।তার পিছনে ছুটছে তার মামা। বারবার চিৎকার করে বলছে,




“ পারীজাত থামো! পরে যাবা!


_ আমরা দেখছি।"




কিন্তু কারো ডাকেই আজ পারীর কদম থামলো না।সে চিৎকার করে ডাকছে আর লাশের বহর পার করছে একের পর এক মুখ দেখে।শত লাশ পেরিয়েও নিজের বাবা মায়ের আর ছোট ভাইয়ের দেখা পেলো না।




একদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরেও পায়নি। নৌপুলিশ, নৌবাহিনী,ডুবুরিরা ঘোষনা দিয়ে দিলো আর কোন লাশ নেই।অথচ লঞ্চ যাত্রীর হিসাব অনুযায়ী এখন‌ও প্রায় ত্রিশের অধিক যাত্রী নিখোঁজ!




সুন্দরী এগারো,ঢাকা টু বরিশাল গামী অন্যতম বড় লঞ্চ। বিলাসবহুল এই লঞ্চের যাত্রী সংখ্যা হাজারের‌ও অধিক।


ছোট ভাইয়ের ছোট পুত্রের সুন্নাত খাৎনার নিমন্ত্রন উপলক্ষে নিজ গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা পরশ আবরার চৌধুরীর সম্পূর্ণ পরিবারের।সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই পরশ আবরার চৌধুরী নিজ সহধর্মিণী মিসেস প্রিয়ন্তি খন্দকার এবং একমাত্র পুত্র চার বছরের প্রাণ আবরার চৌধুরীকে নিয়ে অনুষ্ঠানের একদিন আগেই র‌ওনা দেন।মিসেস প্রিয়ন্তি খন্দকারের যাত্রা বাহনের মধ্যে অন্যতম পছন্দের বাহন লঞ্চ।তাই উনারা সেটাই পছন্দ করলেন নিজেদের জন্য।


ঢাকায় ছোট শ্যালক আর শ্যালক পত্নীর তত্বাবধায়নে রেখে গেলেন এগারো বছরের একমাত্র কন্যা সন্তান পারীজাত আবরার চৌধুরীকে। কারণ তার স্কুলে তখন ক্লাস পরীক্ষা চলছিলো।সে চাইলেই যেতে পারতো না।




তাই তাকে রেখেই উনারা যেতে বাধ্য হয়।কথা ছিলো অনুষ্ঠান শেষ করেই সেদিন সন্ধ্যার লঞ্চেই ফিরে আসব। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা তো ছিলো অন্যরকম।চাইলেই কি সব হয় আমাদের, মতানুযায়ী!


সেদিন‌ও ঠিক তাই ঘটেছিল।রাত পৌঁনে তিনটায় পাশাপাশি দুই লঞ্চের প্রতিযোগিতার শিকার হয় দুই লঞ্চে যাত্রা-রত হাজার দুইয়ের অধিক যাত্রী।


প্রতিযোগিতা করে চালাতে গিয়েই ধাক্কা লাগে একে অপরের সাথে অতঃপর যা ঘটার তাই ঘটলো!




বাবা মা'কে লঞ্চে তুলে দিয়ে এসেছিলো পারীজাত।মামা সাথে ছিলো।তাই সে জানতো বাবা মা সুন্দরী এগারোর যাত্রী। লঞ্চ ছাড়ার আগ অবধি সে ছিলো লঞ্চে,ছোট ভাইয়ের সাথে খুনসুটি করেছিলো,মায়ের কড়া আদেশ গলাধঃকরণ করেছিলো, বাবার আদর আর স্নেহে মাখামাখি করেছিলো অতঃপর লঞ্চ ছাড়ার পাঁচ মিনিট আগে সেখান থেকে চলে এসেছিলো।




লঞ্চে যখন ধাক্কা লাগে এবং লঞ্চ এক দিকে কাত হয়ে যায় তখন‌ই তার বাবা তার মামার নাম্বার ফোন করে,গভীর ঘুমে মগ্ন পারভেজ খন্দকার বোন জামাইয়ের ডাক শুনেনি। পরপর তিনটা কল দেয় পরশ আবরার চৌধুরী।তাও কল শুনেনি কেউ!


 ফজরের সালাত আদায় করতে উঠে পারভেজ খন্দকার ও উনার সহধর্মিণী আলিসা মনি।ভোর চারটার পর লঞ্চ বরিশাল সদর ঘাটে ভিড়তে পারে বলেই সবসময় নিশ্চিত থাকা যায়।যদি না নাব্য সঙ্কটে পড়ে অথবা মেঘের জন্য কোন সমস্যা হয় অথবা লঞ্চের কোন ঝামেলা হয়।


এই বিষয়টা মাথায় থাকাতেই ওযু করে এসে নামাজে দাঁড়ানোর আগেই একবার বোন আর বোন জামাইয়ের খোঁজ নেওয়ার জন্য ফোনটা হাতে নিতেই দুঃশ্চিন্তায় কপালে কয়েকটি ভাঁজ পড়ে। পরপর তিনটা কল, এবং অবশেষে একটা ভয়েস বার্তা!




দুশ্চিন্তায় কাঁপা কাঁপা হাতে কল ঢুকায় পরশ আবরার চৌধুরীর নাম্বারে কিন্তু! বন্ধ! বন্ধ! বন্ধ! 


পরপর কয়েকবার কল দিলো ঐ নাম্বারে,সোজা বন্ধ বলছে! কেন? 


অজানা ভয়ে হাত পা কাঁপতে শুরু করলো পারভেজ খন্দকারের। উনার স্ত্রী উনার এহেন অবস্থা দেখে নির্ভয় দিয়ে বললেন ভয়েস শুনতে।।তিনি তাই করলেন। ভয়েস মেসেজ অপশনে গিয়ে চাপ দিতেই ভারী কাঁপা আর্তনাদের স্বরে ভেসে আসলো এক নিষ্ঠুর বার্তা,




“ আর বোধহয় দেখা হবে না রে পারভেজ,আমার আমানতের খেয়াল রাখিস ভাই! আল্লাহ যদি রোজ হাশরের ময়দানে দেখা করায় আমি আমার আমানত বুঝে নিবো! 


_ ওরা লঞ্চটা ডুবাইছে রে.."



 



শেষ! এতটুকুই ছিলো! পারভেজ খন্দকার মোবাইল রেখে কাঁপা কাঁপা দেহ নিয়ে টেলিভিশন চালু করে ।প্রতিটি চ্যানেলের একটাই মুখ্য সংবাদ!




“ বরিশাল গামী দুই বিলাসবহুল লঞ্চের ভয়ানক প্রতিযোগিতার শিকার হলো হাজার হাজার অসহায় যাত্রী।এখন অবধি শোনা মতে নিহতের সংখ্যা শতকের ঘর পেরিয়ে গিয়েছে।কুয়াশার কারণে চারদিক দেখা যায় না তার মাঝেই চলছে উদ্ধার অভিযান। অনেক যাত্রীর আত্মীয়রা ইতিমধ্যেই নদীর তীরে এসে অবস্থান করছে নিজের স্বজনদের সন্ধানে।


আমাদের সাথেই থাকুন,সবার আগে সব রকমের আপডেট পেয়ে যাবেন।"




এরপর  শোনা গেলো কেবল এক আকাশ সমান আহাজারি আর আহাজারি।


যেই আহাজারির শব্দে আজ‌ও পারীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। যেমন করে এখনও ভেঙে গেলো। 




“ পাপা! মাম্মা!"




চিৎকার করে উঠে বসলো পারীজাত। সর্বাঙ্গ ঘেমে একাকার হয়ে গিয়েছে। থরথরিয়ে কাঁপছে তার হাত পা।চোখ দিয়ে অবিরত অশ্রু ঝড়ছে তার সঙ্গে 


চোখের সামনে ভেসে উঠে লাশের বহর; তিন দিন পর পাওয়া মায়ের গলে যাওয়া মুখটা আর মায়ের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ছোট সেই চাঁদ মুখো ছোট ভাই প্রাণের নিথর দেহ!


রাক্ষুসী নদীর ঐ অতল গহ্বরের থাবাও মায়ের থেকে আলাদ করতে পারেনি প্রাণকে কিন্তু পৃথিবীর নিষ্ঠুর মানুষগুলো ঠিক‌ই আলাদা করে দিয়েছিল পারীজাত আর প্রেয়শ্রীর থেকে তার বাবা মা আর আদরের ছোট্ট ভাইকে।


মায়ের সেই অর্ধগলিত ফুলে ফেঁপে উঠা দেহ খানি আর মায়ের পেটের মাঝে মাথা ঢুকে থাকা ছোট ভাই প্রাণের ফ্যাকাসে রক্তশূন্য দেহ খানা পারীজাতের অনেক রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।




বাঁচার প্রয়াস সবাই করেছিল যার প্রমাণ দেয় ছোট্ট প্রাণের হাতের আঙ্গুলের খাঁজে আঁটকে থাকা বাবার শার্টের ছেঁড়া অংশ।হয়তো বাবাও তাকে বাঁচানোর প্রয়াসে জড়িয়ে রেখেছিল বুকের মাঝে আর ছোট প্রাণ‌ও নিজের ভয়কে জয়কে করতে বাবার শার্ট আঁকড়ে ধরেছিলো। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল সবাই আল্লাহর পরিকল্পনা থেকে বাঁচতে। নিষ্ঠুর মানুষের খামখেয়ালিপনা থেকে বাঁচতে।




তবে পারীজাত তখনও জানতো না তাদের বাবা কোথায়? বেঁচে আছে নাকি মরেই গেছে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো আবারও পারীজাত তার সাথে মনে করলো মা ভাই'কে দাফন দেওয়ার দুই দিন পরের ঘটনা।


 পাঁচ দিন পর গলে পচে যাওয়া, মাছে খাওয়া একটা মরদেহ পাওয়া যায় হিজলার মিয়ারচর তীরে।গায়ের শার্ট ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে গিয়েছিলো।প্যান্ট কোমরের সাথে চেপে লেগে আছে পেটে কেটে গিয়েছিলো,পানি পেটে যাওয়ায় এবং ভিজতে ভিজতে ফুলে যাওয়ায় এমন অবস্থা হয়েছে। এছাড়াও সারা শরীরে অসংখ্য অসংখ্য কামড়ের দাগ। যাতে স্পষ্ট হয় নদীর মাঝে বসবাস রত কোন প্রাণী‌ই খাদ্য সংকটে এহেন ভয়ানক কাজ করেছিলো। বাবার এমন মৃত্যু পারীর জীবনের স্বাভাবিকতা কেড়ে নিয়েছিলো অনেকগুলো মাস সে একদম পাথর হয়ে গিয়েছিল।


যার প্রভাব এখনও মাঝে মাঝেই হয়!




আজ‌ও একটা লঞ্চ ডুবে ছিলো। চাঁদপুর গামী ছোট লঞ্চের যাত্রী সংখ্যা প্রায় দেড়শো ছিলো। তার মধ্যে 


থেকেই প্রায় চল্লিশটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।যেই খবর পড়ার পর থেকেই পারী অস্থির হয়ে উঠেছিলো। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিল কিন্তু তাতেও লাভ হলো না। স্বপ্নের মাঝেই ধরা দিলো মা বাবা আর ভাইয়ের করুন মৃত্যু দৃশ্য।




“ আসসালামু আলাইকুম,জ্বী বলুন!"




****




“ দুই পাউন্ডের?"




****




“হ্যা হবে।এটার প্রাইজটা একটু বাড়বে আপু।এটাতো আমার গত বছরের কেক,আর এখন তো জানেন‌ই জিনিসের কত দাম! সত্তর টাকার চিনি এখন একশো চল্লিশ টাকা.. মানে বুঝতেই পারছেন...




পারীকে থামিয়ে ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি কিছু একটা বললেন যাতে পারীর দুশ্চিন্তায় ভাঁজ খাওয়া কপালটা টানটান হয়ে গেলো তার সঙ্গে ঠোঁটে বিস্তার করলো এই উজ্জ্বল প্রাণবন্ত হাসি। হাসি হাসি মুখে পারী প্রত্যুত্তরে বললো,




“ জ্বী আপু অনেক ধন্যবাদ বোঝার জন্য। আপনাদের মতো কিছু চমৎকার ক্লাইন্ট আছে বলেই বোধহয় আমার মতো নব্য উদ্যোক্তাদের পথটা এত মসৃণ হয়।


এটাই অনেক আপু।আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো আপনাকে বেস্ট সার্ভিস দেওয়ার। ইনশাআল্লাহ আপনি অভিযোগ করার সুযোগ পাবেন না!"




কাস্টমারের সাথে কথোপকথন শেষ করে অর্ডার কনফার্ম করলো পারীজাত। মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করলো,শুকরিয়া আদায় করলো অতঃপর আল্লাহর এক বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট প্রকাশ করে তাকেও ধন্যবাদ দিলো।




রাতের স্বপ্ন তাকে আর ঘুমাতে দেয়নি।তখন বিছানা ছেড়েই দ্রুত পরিষ্কার হয়ে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে, কোরআন তেলাওয়াত করে অতঃপর নিজের পেইজের কিছু কাজ করে।তখন‌ই ভালো করে খেয়াল করলো, সম্রাটের সেই কেকের রিভিউতে বেশ কমেন্ট, লাইক, লাভ রিএ্যাক্ট পড়ছে। সবচেয়ে বড় কথা সম্রাটের রিভিয়ের পর থেকেই গত দুই মাসে বেশ বড় বড় কয়েকটি অর্ডার পেয়েছে অথচ পেইজের বয়স দুই বছরে পেরিয়ে যাচ্ছে।এই দুই বছরে সে কি না করেছে পেইজের রিচের জন্য, দিনরাত মেহনত করেও সে এতটা ভালো অর্ডার পায়নি। কিন্তু মাত্র দুই মাসের মধ্যেই তার পেইজের রিচ হুরহুর করে বাড়ছে তার সাথে অর্ডার হচ্ছে এবং আলহামদুলিল্লাহ সব কাস্টমার‌ই বেশ ভালো রিভিউ দিচ্ছে কেকের।




পারী মনে প্রাণে বিশ্বাস করছে এটা সম্রাটের ক্রেডিট কারণ অর্ডার করা অধিকাংশ কাস্টমারের আইডি সম্রাট এবং তার বন্ধু মহলের সাথে যুক্ত।


পারীর মনে হচ্ছে সম্রাটকে আবারও একটা ধন্যবাদ কেক দিতে হবে কিন্তু সেটা কি ভালো দেখায়? বারবার ক্লাবে যাওয়াটা কি তারা ভালো চোখে দেখবে? তাছাড়াও সম্রাটের চোখে কিছু একটা আছে যা পারীর চিত্তে কাঁপন ধরিয়ে ছাড়ে।


তবে কিভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে? বিশেষ কিছু রান্না করলে কেমন হয়? ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার মাথায় হাত উঠে গেলো।জিহ্ব কেটে বিরবির করে বললো,




“ ইস্ পারী তুই আজ‌ও ভুলে গিয়েছিস? কিভাবে ভুলতে পারলি? যেই মানুষটা তোর সামান্য কথাও মনে গেঁথে রাখে তার জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ কথাটা কিভাবে ভুলতে পারলি? তোর কি আসলেই কোনদিন কান্ড জ্ঞান কিছু হবে না? তুই কি সত্যিই কোনদিন মানুষ হবি না?"




নিজেকে বকতে বকতেই রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো।পড়নে তার হাঁটুর নিচ অবধি লম্বা গোলাপী প্রিন্টের টি শার্ট আর প্ল্যাজো।কোমর ছাপিয়ে নিচে নেমে যাওয়া ঘন কালো লম্বা চুলগুলো বিনুনির গাথুনিতে আটকা পড়ে আছে। ছোট ছোট চুলগুলো সব কপালের আশেপাশে আঁছড়ে পড়ে আছে।শ্যাম অঙ্গের রমনীটিকে দেখতে বড়‌ই অদ্ভুত লাগছে; তাতে তার কি! সে এভাবেই থাকতে আরাম বোধ করছে।




দুই মাসের তৃষ্ণার্ত ব্যাকুল এক পুরুষের মন লাজ- লজ্জার মাথা চিবিয়ে নিজের তৈরি আইনের শিকল ভেঙ্গে অবশেষে এসে দাঁড়িয়েছে মহিলা কলেজের সামনে। উদ্দেশ্য চোখের তৃষ্ণা নিবারণ।প্রাণ ভরে শ্বাস নেওয়া।


বারবার মিঠু মামার দোকানের সামনে যাচ্ছে তো আবার গেটের সামনে আসছে। যেখানে সে নিজেই আইন করে দিয়েছে মহিলা কলেজের সামনে কোন পুরুষ দাঁড়াতে পারবে না সেখানে সেই আজ এই কাজ করছে। বিষয়টি ঠিক কোনদিকে যাচ্ছে তা যেন তার ভাবনার‌ই দায় নেই।তা দায় শুধুমাত্র ঐ নারীকে এক পলক দেখায়।




সম্রাট আশ্চর্য হয়ে ভাবছে,দুই মাস সে পারীর দর্শন পাচ্ছে না।বেশ কয়েকবার চায়ের দোকানে বসে অপেক্ষা করেছিলো এক নজর দেখার জন্য কিন্তু পারীর ছায়াও সেখানে পড়েনি। অতঃপর হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে তাকে বারবারই।


কিন্তু আজ সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত, এবং সে খোঁজ নিয়ে জেনেছে আজ পারী ঠিক দশটার মধ্যেই ক্লাসে থাকবে অর্থাৎ পারী সাড়ে নয়টার মধ্যেই ক্যাম্পাসে উপস্থিত হবে।তাই সে সোয়া নয়টা থেকে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে।




সম্রাট অবিরত পায়চারি করছে, ঐদিকে আশেপাশের অনেক মানুষ তাকে আড়চোখে দেখছে। মোটামুটি পরিচিত মুখ সম্রাট।তার করা নিয়মের খবর‌ও সবার জানা।তাই সবাই অদ্ভুত চোখেই দেখছে যা তাকে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে বাধ্য করছে কিন্তু তাও সে এখান থেকে নড়বে না । একদম নড়বে না বলেই মনোঃস্থির করেছে।




হুট করেই সম্রাটের মুঠোফোন একটা কল আসলো,সে ফোনটা পকেট থেকে বের করে নাম্বার দেখলো। মায়ের কল।এই সময়ে মায়ের কল! ভাবছে কি করবে? ভাবতেই সিদ্ধান্ত এলো, মায়ের সাথে কথা বলবে ঠোঁট দিয়ে আর কাঙ্খিত নারীকে দেখবে নয়ন দিয়ে।কি আশ্চর্য! দুজন‌ই প্রিয় নারী। দুজনকেই একসাথে এক‌ই সময়ে পাবে!


ভাবতেই তার ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি ফুটে উঠলো।সে ফোনটা রিসিভ করতেই পাশ থেকে বাইকের শব্দ কানে এলো।সে একটু সরে দাঁড়িয়ে কাঁনে ধরে আদবের সহিত সালাম দিলো এবং বললো,




“ আসসালামু আলাইকুম আম্মাজান, কে..




আর বলতে পারলো না।তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো বাইক থেকে নামতে থাকা হাস্যোজ্জ্বল রমনীর বদনে আর বাইকে বসে থাকা সুদর্শন পুরুষের সুশ্রী মুখশ্রীর উপর।


পর্ব-08


সকাল সাতটা,




রাস্তার পাশে থাকা একটা খালি ভ্যানের উপর শুয়ে আছে, পাশেই দাঁড় করানো আছে তার ইয়ামাহা আর ১৫ এম এর বাইকটি।মাথা সহ বুক অবধি ঢেকে আছে কালো ব্লেজারের কাপড়ে। হেলমেটটা পাশেই রাখা।কোন রকম সিকিউরিটি ছাড়া একদম নির্ভার হয়েই এখানে শুয়েছে।যেন এ পৃথিবীতে চোর,ডাকাত, ছিনতাইকারী অথবা হাইজ্যাকার কোনটাই নেই। অবশ্য যার কাছে নিজের জীবনের‌ই কোন মায়া নেই তার কাছে এগুলো আর কি।


জীবনের মায়া থাকলে কি আর এভাবে হাঁটু,কনুই ছিলে যাওয়ার পর‌ও কেউ বিনা চিকিৎসায় রাত পার করতে পারে? 


সে পারে কারণ তার কাছে বাঁচা মরা দুটোই সমান।




“ রিং রিং রিং "




ফোনের বিকট শব্দে ভ্যানের মাথায় হ্যান্ডেলে বসে থাকা ছোট্ট চড়ুইটা বুঝি ভয়‌ই পেলো।তড়াক উড়ে চলে পালিয়ে বাঁচলো বোধ হয়। যান্ত্রিক শহরে থেকে পরের ঘরে নিজ রাজ্য বুনে নিজেকে রাজা দাবী করা চড়ুই‌ও দিনশেষে ভয় পায়।কাকে? যাদের ছায়ায় নিজেকে মেলে রাজা দাবী করে তাদের‌কেই। অবশ্য ভয় না পেয়েও বা উপায় কোথায়! এই পৃথিবীতে রাব্বুল আলামীনের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি যেই মানব কুল তাদের কীর্তি তো নেহায়েত মানবেই নেই।তারা কখনো সখনো হিংস্র হায়ানাকেও হার মানায়। তাদের শকুনি নজরে পড়লে যে কারো জীবন জাহান্নাম তূল্য হয়ে যায়, বাঘের থাবা থেকে রেহাই পেলেও এই মনুষ্য কুলের থেকে রেহাই পাওয়া যায় না।




চড়ুই উড়তে উড়তে গিয়ে বসলো বেশ খানিকটা দূরে এক সুউচ্চ ভবনের বিলাসবহুল ফটকের সৌন্দর্য বাড়াতে নিজেকে মেলে দেওয়া বাগান বিলাসের মগ ডালে।মগ ডাল যদিও বাগান বিলাসে থাকে না কারণ তাদের কান্ড শাখা ডগা যাই বলি ততটা মগ ডালের ন্যায় পোক্ত কিংবা সুঠাম নয়।তারা যত‌ই বৃদ্ধ হোক নর্মতা তাদের সহজাত প্রবৃত্তি,হয়তোবা প্রভুর কাছে অবনত থাকাই তাদের ধর্ম। প্রভু বলতে এখানে তাদের ঠাই দেওয়া প্রকান্ড বৃক্ষ কিংবা কোন ইট সিমেন্টের দেহকেই জাহির করা যায়।সে যাই হোক চড়ুই উড়ে গেলো,ভ্যানের নিচে প্রগাঢ় ঘুমে বিভোর থাকা কুকুর মহাশয়‌ও বিরক্তিতে নাক ছিটকে ঘেউ ঘেউ সুর তুলে অভিশাপ দিতে দিতে স্থান পদত্যাগ করলো,তার স্বাদের ঘুমখানা ভাঙ্গার দায়ে এই দানবের ন্যায় পুরুষকে নির্ঘাত অনাহারি থাকার অভিশাপ দিয়ে গেলো।


এতকিছু ঘটে গেলো অথচ ঘুম ভাঙল না কেবল সেই ব্যক্তির। অবশ্য ঘুমালে ঘুম ভাঙ্গে কিন্তু যে ঘুমায় না তার কিভাবে ঘুম ভাঙ্গবে?




পরপর আটটা কল আসলো। এরপরও আসবে।সে নিশ্চিত যতক্ষণ না কল তুলবে ততক্ষণ অবধি আসতেই থাকবে।তাই নিজের ব্রত ভেঙে অবশেষে ফোনটা পকেট হাতড়ে বের‌ই করলো। চোখের সামনে থেকে কালো কাপড়ের ব্লেজারটা সরিয়ে মুখ বরাবর ফোনটা তুলে ধরলো।পাওয়ারে চাপ দিতেই ভেসে উঠলো।




“ ইয়্যু মিসড ফাইভ কলস ফ্রমস পুচকি।


ইয়্যু মিসড থ্রি কলস বাডী। "




আশ্চর্য হ‌ওয়ার কারণ নেই।কারণ এটা নিত্যকার ঘটনা।তাই তার মুখের অভিব্যক্তি কোন রুপ পরিবর্তন ঘটলো না। শুধু পিটপিট চোখে চেয়ে র‌ইলো।এই চেয়ে থাকাল মাঝেই আরও দুবার কল আসলো এবং কেটেও গেলো। এগারো তম কল ঢুকতেই তার হৃদয়ে বোধহয় কিছুটি অনুভূতি দোল খেলো।যার কারণে রিসিভ বাটনে টান দিয়েই নিজের ভারী কন্ঠে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলো,




“ বল!"




*****




“ আছি কোথাও। চিন্তার কারণ নেই। বেঁচে আছি!"




****




“ কেন?"




*****




“ ডাক্তার আছে,ডাক দে। দেখে ওষুধ দিয়ে গেলেই সুস্থ হয়ে যাবে।"




****




“ আমি কি ডাক্তার? আমার কি কাজ?"




*****




“ বহুবছর আগেই এই ট্রিকস ব্যবহার করা শেষ; উনাদেরকে নতুন কিছু ট্রাই করতে বল!"




*****




“ যা খুশি হোক।আমি আসছি না।"




*****




“ রাখ !"




শেষে একটি কঠিন ধমক দিয়ে ফোনটা কাটলো।ফোন কেটে ওভাবেই অনেকক্ষণ শুয়ে‌ রইলো। শক্ত অনুভূতিহীন অক্ষু জোড়ার কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো গরম নোনা জল। পৃথিবীর সব তিক্ততা কেন তার সাথেই ঘটলো।এত কেন বিষ ছেয়ে আছে তার সর্বত্র! কেন সব সম্পর্কের দাম কেবল তাকেই দিতে হবে?




নিজের ভুল হাঁতড়ে বেরিয়েও কাউকে প্রখর ভালোবাসা ছাড়া আর কোনটাই পেলো না।


মিনিট পাঁচেক অতিক্রম হতেই আবারও কল আসলো। নাম্বার না দেখেই কল রিসিভ করতেই ঐপার থেকে কি ভেসে আসলো শোনা না গেলেও তা্য উত্তরে ঠিক‌ই বোঝা যাচ্ছে,




****




“ আছি; আশেপাশেই তোর!"




***






 



গোল্ডেন রোজে!"



****




“ জানি না! 


শুধু জানি পেতেই হবে!"




***




“ আসছি!"




কল কেটে চট করে উঠে বসলো।এতে করে কোমরে চাপ লেগে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব হলো। সঙ্গে হাঁটুর কাটায় জ্বালা আরম্ভ হলো। ককিয়ে উঠে কোমরে হাত রেখে অনেক সময় ঝুঁকে বসে র‌ইলো। সঙ্গে সঙ্গে কল্পনায় আর্বিভাব হলো এক অতি যত্নশীল নারীর প্রতিচ্ছবি।




“ কোমরে ব্যথা হচ্ছে?"




“ ভীষণ!"




“ একটানা বসে থাকলে এমন‌ই হয়!"




“ উফ্,হুম!"




নিজের কোমরে হাত রেখে কঁকিয়ে উঠলো এবং ব্যথাতুর আ‌ওয়াজ তুলে সম্মতি সূচক শব্দ বের করলো। সামনে থাকা নারীটির ভীষণ দরদ হলো,সে এগিয়ে এসে পুরুষটির বাম বাহুতে নিজের ডান হাত রেখে বাম হাতের আজলায় আঁকড়ে ধরলো পুরুষটার কোমরের ব্যথার জায়গায়।ব্যথার জায়গায় চাপ লাগায় আরো যন্ত্রনা অনুভত হতেই হাতটা সরিয়ে নিতে অনুরোধ করলো।




“ হাত সরাও,ব্যথা করছে!"




নারীটি করুন চোখে তাকিয়ে র‌ইলো কিছু সময়। মিনিট অতিবাহিত হতেই চমকিত ভঙ্গিতে বললো,




“ এক কাজ করো এখানে উপুড় হয়ে টান টান হয়ে শুয়ে পড়ো।"




“ কেন? কি করবে?"




“ শোও না দেখছি আমি।"




বলেই সে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।কিছু সময় পর আবার ফিরে এলো সঙ্গে নিয়ে এসেছে গরম গরম রসুন ছ্যাচার সাথে সরিষার তেল। ততক্ষণে পুরুষটা নিজের ফ্লোর বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে।তার পড়নে কেবলি একটা ট্রাউজার।ঘন লোমশ বুকটা নরম জাজিমের চাপে নেতিয়ে পড়েছে।উপুড় হয়ে শুয়ে কোমরে হাত রেখে চোখ বুজে আছে।নারীটি এসেই তার নরম কোমল হাতে সেই ব্যথার জায়গায় আলতো করে চাপ দিতে থাকলো।গরম কিছুর সাথে নরম ছোঁয়া পেয়ে চোখ মেলে তাকালো,চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,




“ কি করছো?"




“ কিছু না।শুয়ে থাক। দেখবে কিছু সময়ের মধ্যেই ব্যথা গায়েব হয়ে যাবে একদম ইনশাআল্লাহ।"




“ তোমাকে এত কষ্ট করতে হবে না পাখি,আমি একটা পেইন কিলার নিলেই ঠিক হয়ে যাবো।"




“ আচ্ছা সে দেখা যাবে।এখন একটু চুপচাপ শোও তো!"




তারপর আর কোন কথা হয়নি‌।সে নির্দেশ মোতাবেক শুয়ে র‌ইলো আর ঐ নারী! আদুরে আদুরে ছোঁয়ায় পুরো শরীর আলতো ভাবে চেপে চেপে মালিশ করে দিলো তার সাথে একদম পেশাদার থেরাপিস্টের মতো করে ব্যথার জায়গায় ম্যাসেজ করলো।কোমর থেকে শুরু করে মাথা,পায়ের পাতা অবধি এই মালিশের আদর চলেছিলো সেদিন।এত আদুরে ছোয়া আর ভালোবাসার যতনে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল।




সেই ঘুম ভেঙ্গেছিলো সেদিন সন্ধ্যায়।চোখ মেলে নিজের সামনেই দেখতে পায় ভালোবাসার সেই নারী,সেই মায়াবতীর মুখটা।তেল চিটচিটে নাকের উপর এক গুচ্ছ অবাধ্য চুল এসে উড়োউড়ি করছে


চোঁখের পাতায় আছড়ে পড়ে আছে আরো এক গুচ্ছ কেশ-লতা। 


সে নিজের ভাঁজ করে রাখা হাতটা উচিয়ে নাকের উপর থেকে চুলগুচ্ছকে সরিয়ে ঘুমন্ত পরীর নাকের উপরেই একটি চুমু দিলো। অতঃপর এক‌ই কাজ করলো চোখের পাতায়‌ও।


তার শুষ্ক খরখরে ঠোটের উষ্ণ ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙ্গে গেল ঘুম পরীর।চোখ মেলে নিজের একদম সন্নিকটে নিজ পুরুষকে দেখে একটু চমকালো কিন্তু পরক্ষনেই সব স্বাভাবিক করে ফেললো।ঐ ভাবে শুয়ে থেকেই পুরুষের কপালে,গালে হাত ছুঁয়ে মায়াময় চোখে চেয়ে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,




“ ব্যথা কমেছে?"




“ বোধ হয়,না কমলেও কমে যাবে।


_ এত কষ্ট করার কি দরকার ছিলো সোনা!"




“ তো আপনের অসুস্থতায় আমি সেবা করবো না তো কে করবে?


_ আরেকজন আছে না কি কোথাও?"




এহেন মুহূর্তে এহেন কথা কেবলি তার পক্ষেই সমূহ।তা এই পুরুষের ভালোই জানা।তাই সে তর্কে না গিয়ে স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে বললো,




“ এমন কিছু বলিনি।


_ তাছাড়াও!"




এতটুকু বলে থামলো। অতঃপর ঘোর লাগা গভীর চাহনিতে নারীটির তৈলাক্ত বদনে চেয়ে ওষ্ঠের খাঁজে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বললো,




“ এ জীবন একজনের নামে লেখা। আমৃত্যু আমি তার‌ই!"




ব্যস! আর কিছু দরকার নেই। এতটুকুই যথেষ্ট ছিলো তাকে বদ করতে। মুহুর্তে সে বুকের উপর আঁছড়ে পড়লো।দুই হাতে শক্ত করে আকড়ে ধরলো নিজের সাথে।বিরবির করে বললো,




“ তুমি ছাড়া আমার কেউ নাই।আমাকে বাদ দিয়ে আর কাউকে তোমার ভাবনায় আনলেও আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো।বিলিন হয়ে যাবে তোমার পারী।


কোথাও তার চিহ্ন‌ও খুঁজে পাবে না।বলে দিচ্ছি আমি!"




কথা শেষ হতেই নিজের ঢিলে হাতের বাঁধন শক্ত করলো।বুকের সাথে চেপে ধরলো।এতটই কঠিন হয়েছে এই বাধন যে মনে হচ্ছে বুকের সাথে বুকের চাপে পাঁজর ভেঙে খানখান হয়ে যাবে।সে নিজ নারীর ঘাড়ে মুখ গুজে দাঁত দিয়ে কামড় বসিয়ে বললো,




“ উল্টাপাল্টা বকতে নিষেধ করেছি না? তারপরও সাহস হয় কি করে?"




নারীটির তরফ থেকে উত্তর নেই। পুরুষ তার মতোই বললো,




“ না আমি তোমাকে ছাড়ছি আর তোমাকে ছাড়তে 


দিচ্ছি।


আমার নিঃশ্বাস শেষ হয়ে যাক, কিন্তু তুমি আমার। আমি আমার বিধবা করে রেখে যাবো।তাও আমি বিনা এই পৃথিবীতে তোমার প্রতি দ্বিতীয় কারো অধিকার আমি বরদাস্ত করবো না।তার জন্য যদি পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় আমি তাই করবো! তবুও তুই আমার, শুধুই আমার!"




তার কথা শেষ হতেই নারীটি নিজের মুখ তুলে তাকালো। সর্বক্ষণ কঠোর আভায় আঁটকে থাকা এই পুরুষের নয়ন জোড়ায় তার বেলাতেই কেবল শীতলতায় ছেয়ে থাকে।সবার সামনে যেই চোখে কেবল‌ই কঠোর আর হেয়ালিপনায় পূর্ণ তার বেলাতেই কেন তা ভালোবাসা আর ভালোবাসায় ট‌ইটুম্বুর থাকে! এত এত আদর থাকে! থাকে কামুকতা! মাদকীয় চাহনি! নারীটির এভাবে তাকিয়ে থাকায় ঘোর লেগে গেলো সেই পুরুষের পুরুষ সত্ত্বায়।একে অপরের সাথে এমনিতেই লেপ্টে আছে।উদাম গায়ের সাথে খোলামেলা হয়ে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে তাকে, মুহূর্তে সব ব্যথা,সব উচাটন কেটে গেলো। নিজেদের ভেতরে আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হলো।


শক্ত হাত জোড় নরম দেহের ভাঁজে ভাঁজে খেলতে আরম্ভ করলো।এহেন ছোঁয়ায় বরাবরই নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া নারীটির নিত্যাভাস। এখনও তাই করলো।সে লজ্জায় আড়ষ্ট করে দেওয়া পুরুষের বুকে‌ই মুখ গুজলো লজ্জা লুকাতে।অথচ তাতে এই পুরুষের আনন্দের শেষ নেই।সে অতি আলতো স্বরে ডাক দিলো,




“ ব‌উ!"




তাতেও লাভ হলো না।এতে করে সে দুষ্টু হাসি দিলো। নিজের হাতের কারিশমায় নারীটিকে আরো লজ্জায় ডুবিয়ে দিয়ে চুলের গোড়ায় আঙ্গুল গলিয়ে মুখটা উপরে তুলে চোখে চোখ রাখলো। ঠোঁটের কোনে এটে রাখা দুষ্টু হাসিকে প্রশমিত করে ঠোঁটের ভাঁজে ঠোঁট চেপে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে হাতের বাঁধনে চেপে ধরে নিজের আশি কেজী ওজনের দেহের নিচে চাপা দিলো তেপান্ন কেজীর ছোট কোমল লতার ন্যায় দেহখানাকে।


পর্ব-09


এইটা সম্রাট পারীজাতের ভালোবাসার মানুষদের জন্য!😚




কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 




ক্লাবের বাইরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকতে ইতস্তত করছে পারিজাত আর তার সখিরা।এক কদম বাড়িয়ে দু কদম পিছিয়ে যায়। এমতাবস্থায় হুট করে তীব্র আওয়াজ করে তাদের একটু দুরত্ব এসে থামলো কালো ধূসর ইয়ামাহা বাইকটা। বাইকের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক জোড়া ঈগল আঁখি তীব্র সন্ধানী নজরে চেয়ে থেকেই হেলমেটটা খুলে ফেললো।


হুট করেই বাইক এভাবে নিজেদের থেকে খানিকটা দূরে থামায় তিনজন‌ই চমকে যায়। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে একে অপরের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে পড়লো একদম থ হয়ে। নিজের হেলমেটটা খুলে এলোমেলো সিল্কি চুলগুলো মাথা ঝাঁকিয়ে সঠিক পথে এনে হেলমেট বোগল দাবা করে তিনজনের সামনে এসে দাড়ালো। 




“ কি সমস্যা? কি চাই আবার?"




চোখ কুঁচকে কপালের মাঝে দুটো ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করলো,পাশেই দাঁড়ানো সুটবুটে সাহেব বাবু সাজা বাপ্পীকে এক পলক দেখে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলতে আরম্ভ করলো পারজিতা..




“ Actually ভা.ভা..ভা..ভাইয়া!"




“ উম; আমার মায়ের পেটের বোন আছে।"




এমন মুহূর্তে এমন কথায় রমনী তিনজন ভ্যাবাচ্যাকা খেলো,একে অপরের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে বোঝার চেষ্টা করছে, ঐদিকে বাপ্পী অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে মুচকি হাসলো। সম্রাট আগের মতোই কাঠখোট্টা স্বরেই বললো,




“ যার তার মুখে ভাইয়া ডাক শুনতে চাই না। তাছাড়াও দুনিয়ার সবাই বোন হলে ব‌উ হবে কে?"




“ জ্বী মানে..স্যরি ভা.. একচুয়ালি.. আমি বলছিলাম?"




“তুমি থামো! ওরা বলুক!"




বলেই সম্রাট মেহরিন আজিমের দিকে ইশারা করে ইঙ্গিত করলো,এতে পারি একটু, অল্প একটু অপমানিত বোধ করে গাল ফুলিয়ে নিজের মুখটা বাংলার পাঁচ বানিয়ে দাঁড়িয়ে র‌ইলো,সম্রাটের আদেশ পেয়ে মেহরিন বলতে আরম্ভ করলো,




“ আসলে হয়েছে কি ভাইয়া?ঐ পারিজাতের একটা স্কুল ইয়ে মানে.."




“ এ্যাই তোমরা কি ইয়ে মানে, জ্বী মানে তো..তো তো ছাড়া কথা বলতে পারো না?


_ এর তো দেখি মুখ দিয়ে বারুদ ছুটে অথচ আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বললেই এর যত তোতলামি শুরু হয়ে যায়।কেন?"




“ আসলে আপনাকে দেখলে ভভভভয় লাগে ভাইয়া?"




এক রকম কাঁপতে কাঁপতেই কথাটা বললো ফারিহা।ফারিহার কথায় সম্রাপ হতভম্ব হয়ে গেলো।অবাক, বিস্ময় ভরা চোখে চেয়ে আছে।আর এদিকে বাপ্পীর তো হাসিই থামছেনা।সে মুখ ঘুরিয়ে বন্ধুর নাজেহাল অবস্থা দেখে অবিরত হাসছে,মাঝে মাঝে একটু উঁকি দিয়ে মেয়েদের মুখোভঙ্গি দেখছে।




নিজের অবাকতার চুড়া অতিক্রম করে, বিস্ময় কাটিয়ে সম্রাট জানতে চাইলো এই কথার কারণ কি?




“ মানে কি ? আমাকে দেখতে কি ভয়ংকর লাগে? আমি কি দেখতে খুবই বিশ্রী?"




ভয় পায় কিন্তু কেন পায় তার বিশ্লেষণ এদের কাছেও নেই কিন্তু সম্রাটের কথায়‌‌ও সম্মতি দেওয়া যাচ্ছে না তাই তীব্র গতিতে নিজদের মন্ডুটা দু দিকে ঘুরিয়ে বললো,




“ না না মোটেই না।আপনি মাশাআল্লাহ অনেক হ্যান্ডসাম,ইভেন আমার দেখা সবচেয়ে হ্যান্ডসাম ছেলেদের মধ্যে আপনি ফাস্ট তাই না রে মেহরিন,পারী?"




ফারিহা নিজের উত্তরের পক্ষে সাক্ষ্য নিতে নিজ সখির মতামত চাইলো।এক হাত দিয়ে পারীকেও খোঁচা দিলো সাক্ষী দিতে কিন্তু পারীতো কথা বলবে না।তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে না! তাহলে সে কেন কথা বলবে?বলবে না পারী একদম কথা। অন্তত এই লোকের সাথে তো নাই। কিন্তু না বললে হবে কি করে?কথা না বললে পারীর কাজ তো হবে না।এরা তো জানেও না ঠিকঠাক পারী ঠিক কেন এসেছে আজ! 




সম্রাট উত্তরের আশা করছে, কিন্তু সবার নয়।কেবলি পারীর।সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো পারীর বিরক্ত মাখা ঐ কাজল কালো আখিতে। আশ্চর্য; সম্রাট হঠাৎ করেই খেয়াল করলো পারীর চোখে কাজল! এই মেয়ে চোখে কাজল কেন টেনেছে? এমনিতেই ভয়ানক আকর্ষণ কাড়ে এই চোখ দুটো, তার মধ্যে আবার কাজল।নিজ মনেই বিরবির করে বলতে থাকলো,




“ উফ্; মাথা নষ্ট করেই ছাড়বে! ইস্! শুধু আমি হলেও তো চলতো! না জানি আর কতজনের মাথা খাচ্ছে এই মেয়ে!একে খুব তাড়াতাড়ি ভাঘে আনতে হবে নয়তো পাখি কখন কার ধান খেয়ে কার খাঁচায় বন্দী হয়ে যায় আল্লাহ মালুম! নো নো নো সম্রাট বি সিরিয়াস,এই পাখিকে এভাবে ছেড়ে রাখা যাবে না।যা কর শিগগিরই কর!"




“ ভাইয়া আপনি কিছু বলছেন?"




সম্রাটকে বিরবির করতে দেখে মেহরিন জিজ্ঞেস করলো, চমকে গিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করলো,




“ ইয়ে মানে না, তেমন কিছু না। হ্যাঁ পারী তুমি বলো কি বলতে এসেছো বা কি দরকার! আবার কেউ জ্বালাচ্ছে?"




শেষ কথায় তীব্র ক্ষোভ জাহির,পারী এই লোকের হুটহাট মুড সুইং এর মুন্ডুও বুঝলো না। কিন্তু মনে মনে বললো,




“ এত মুড সুইং তো আমার পিরিয়ডের সময়েও হয় না।"




“ পারী কি বলছো?"




পারী মনে মনে বললেও তার ঠোঁট ঠিক‌ই নড়ছে।বাপ্পী এবার না পেরে শব্দ করেই হেসে দিলো।ওর হাসিতে বিরক্ত চোখে তাকালো দুই জোড়া আঁখি,




“  তুই হাসছিস কেন? মাছিতে কাঁতুকুঁতু দিচ্ছে?"




“ হাসছি তোদের অবস্থা দেখে।"




“ এখানে হাসির কি ছিলো?"




“ নাথিং,পারীজাত বলো বোন,কি সমস্যা যার জন্য এই ভরদুপুরে এই কাঠফাঁটা রোদের মধ্যে এখানে দাঁড়িয়ে আছো?"




বাপ্পীর গলায় নম্রতা, স্নেহাশিস আভাস,পারী যেন এখন একটু সহজ হলো,সে নিজের কথা গুছিয়ে বললো,




“ ভাইয়া আসলে আমি একটি অনুমতি নিতে এসেছি।"




“ অনুমতি! কিসের জন্য?"




সম্রাটের প্রশ্ন,পারীর এবার বেশ সাবলীল ভাবে বলতে থাকলো,




“ আপনাদের ক্লাবের পিছনে যেই খেলার মাঠটা আছে, পরিত্যক্ত জমিটা যেইটা!"




“ হ্যাঁ ঐটা কি?"




“ আমার একটা ছোট স্কুল আছে যেখানে সব পথশিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয়,তো আমি যেখানে থাকি সেখানে একটা শাখা আছে, কিন্তু আমি আমার এখানেও মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনেও একটি শাখা খুলতে চাই।কারণ এদিকে অনেক বাচ্চা আছে যারা স্কুলে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে না কিন্তু ওদের‌ও তো পড়ার অধিকার আছে তাই না?


_ তাই আমি ভেবেছি প্রতিদিন ওদের পিছনে অন্তত দু ঘন্টা সময় দিবো আফটার ক্লাস,ক্যান আই দোস টাইম!"




“ জায়গা দরকার এই তো?"




পারীকে থামিয়ে শেষের কথাটা নিজেই বললো সম্রাট।


পারী মাথা উপর নিচ দুলিয়ে জ্বী আজ্ঞাবহ হলো,সম্রাট একবার নিজের বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আবারও পারীর দিকে তাকালো এবং বললো,




“ আমি যত দুর জানি তুমি মোটামুটি একটা বেকিং বিজনেস করছো, এরপর পড়াশোনা আবার বলছো তোমার এলাকায়‌ও একটা শাখা আছে,সেখানেও পড়াও এরপর আবার এই দিকে শাখা খুলে সেখানেও সময় দিবে বলছো, এতকিছু কিভাবে ম্যানেজ করবে?"




“ না আমি যদি এখানে ক্লাস করাই তবে ঐখানে বাদ দিবো!"




“ তবে ঐখানের বাচ্চাদের কি হবে?"




“ ঐখানে আমাদের অনেক স্বেচ্ছাসেবক আছে,তারাই পড়াবেন।ইভেন এখানেও তো শুধু আমি একা নয়, অনেকেই মানে আমার অনেক ব্যাচমেট,ক্লাসমেট পড়ানোর জন্য রাজী আছে কিন্তু অতদূর গিয়ে পারবে না বলেই এখানে খোলার চেষ্টা করছি। কিন্তু পারফেক্ট জায়গায় পাচ্ছি না!"




“ আচ্ছা তাই, তোমাদের সংগঠনের নাম কি?"




“ আমাদের বিদ্যানিকেতন!"




“ ওহ,নাম শুনেছি। তুমি সেটার সদস্য নাকি?"




“ জ্বী ভা?"




দিচ্ছিলো আবারও ভাইয়া বলে,সম্রাট আঙ্গুল উঁচিয়ে ইশারায় বললো,




“ না!"




পারী গাল ফুলিয়ে নিলো,সম্রাট একটু সময় ভেবে অতঃপর বললো,




“ আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি তাহলে কবে থেকে তোমার প্রোজেক্ট হাতে নিতে চাইছো?"




“ অনুমতি পেলে ইনশাআল্লাহ আগামী সপ্তাহ থেকেই করবো ভাইয়া?"




“ অর ইলস! নিড ইয়্যু এনি হেল্প?"




“ নো নো, শুধু এতটুকু হলে‌ই চলবে! বাকীটা আমার ম্যানেজ করে নিতে পারবো!"




“ ওকে, যেহেতু ভালো কাজ আমাদের চাইলে ইনক্লুড করতে পারো।এনি টাইপ অফ হেল্প উই উইল বি রেডি ফ হেল্প ইয়্যু!"




“ থ্যাংকস! শুধু একটু দেখবেন যাতে কেউ বিরক্ত না করে! তাহলেই চলবে!"




“ তাতো অবশ্যই,রাত দিন জেগে পাহারা দিচ্ছি এর আর নতুন কি?"




“ মানে!"




“ ও তুমি বুঝবে না, বাচ্চা মানুষ!"




বলেই সম্রাট পারীর গাল টেনে দিলো। সম্রাটের হঠাৎ এমন কান্ডে পারী জমে গেলো।মেহরিন,ফারিহা‌ও চোখ বড় বড় করে চেয়ে রইল। বাপ্পী ঠোঁট টিপে নিজের হাসি আটকে বন্ধুর আগে আগে এগিয়ে গেলো এবং চলতি পথে বিদায় নিতে বললো,




“ ওকে আল্লাহ হাফেজ বনুরা!"




সম্রাট পারীর বিস্ময়ে হা হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে চমৎকার ভাবে হেসে নিজ গন্তব্যে পা বাড়ালো।আর রেখে গেলো বিস্ময়ে আহাম্মক বনে যাওয়া এক নারীকে।







রবীন্দ্র সরোবরের পাশেই মুক্ত মঞ্চের এক কর্ণারে বেশ জমকালো আয়োজন করে কারো বার্থডে সেলিব্রেশন চলছে,রাতের এই আধারী মাঝে এক অম্বর তারকারাজির ন্যায় ঝলমলে হয়ে উঠেছে এই জায়গা টুকু। নানারকম লাল নীল মরিচ বাতি আর প্রদীপের শিখায় জ্বলকিত এই প্রাঙ্গণ জুড়ে চলছে আধুনিক মনস্কের বেশ ক জোড়া পাখির কলকাকলি।নানা রকম বাদ্যযন্ত্রের টুং টুং আওয়াজ আর মৃদু ভলিউমে বাজা কারো মিষ্টি গলার সুরেলা গান পরিবেশকে করে তুলেছে মোহনীয়।


তার সাথে গুনগুন করে অবিরত চলছে গল্পগুজব।




“ হেই ইয়ার যার পার্টি তার‌ই তো কোন খবর নেই?"




“ নিশ্চয়ই লায়লাকে ম্যানেজ করতে গিয়ে দেরি হচ্ছে! বেচারা মজনু!"




বলেই এক সঙ্গে হেসে উঠলো সবাই। তাদের হাসির মাঝেই কেউ একজন তীব্র বিতৃষ্ণা আর প্রকাণ্ড ঘৃণা ছুঁড়ে বললো,




“ আমি বুঝি না ও ঐ লো ক্লাস মেয়েটার মাঝে কি এমন পেয়েছে যার জন্য এমন হুর পরীকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে?ঐ মেয়ের না আছে ক্লাস আর না আছে রুপ-লাবণ্য; দেন হাউ ক্যান বি হিমস?"




“ সবাইতো  ক্লাস আর রুপ লাবণ্যের পিছনে ছুটে না  মোনালিসা জানু! কেউ কেউ পার্সন আই মিন রিয়েল মানুষ খুঁজে! এন্ড ট্রাস্ট মি ঐ মেয়েটাকে দেখলেই মনে হয় সি ইজ পারফেক্ট ওমেন ফ বিয়িং লাইফ পার্টনার!একচুয়ালি যদি ও না ঐ মেয়ের পিছনে থাকতো আমিই। পটিয়ে নিতাম!"




“ সিরিয়াসলি?"




বলেই মোনালিসা নামক নারীটা ছিটকে সরে দাঁড়ালো।নাক কুঁচকে মুখ তেতো হয়ে যাওয়া ভঙ্গিতে বললো,




“ তোর চয়েস যে লো কোয়ালিটির তা আমার আগেই আন্দাজ ছিলো কিন্তু আজ প্রমানিত হয়ে গেলো!


_ এনি ওয়ে তুই ঘুরলেও ঘুরতে পারিস কিন্তু আমি ইন শিওর করে বলতে পারি হৃদয়ের জীবনে পারমানেন্ট নারী এই হুর‌ই হবে!ঐ চিপকু না,লো কোয়ালিটির কেউ না।"




সে নিজের কথা শেয়ার করেই চলে গেলো পিছনে রয়ে যাওয়া দলের মধ্যে থেকে একজন বললো,




“ সবাই চিপকু,লো কোয়ালিটির, থার্ড ক্লাস! বাকী সব ভালো খালি উনি একাই!"




তার কথা শেষ হতেই আরেকজন বললো,




“ আমি বুঝি না ভাই,হৃদয় কার বয়ফ্রেন্ড? ওর নাকি হুরের?"




“ হৃদয় পারীর! মাঝখানে ওরা কাবাব মে হাড্ডি!




বলেই তিনজন জুসের গ্লাসের চুমুক দিতে দিতে হাসিতে ফেটে পড়লো।যা দুর থেকে অবলোকন করে দাঁত কিড়মিড় করে নিজের হাতের অবস্থা বারোটা বাজাচ্ছে মোনালিসা নামক অতি ভয়ংকর ময়দা সুন্দরী!


পর্ব-10


“. Hey bro what's up? long time after..!




“ yap,My all is good,say about you?"




“ nowadays passing like bakwas!"




“ why?"




“ nothing much serious but... সিঙ্গেল লাইফ আর কত কাটাবো?"




“ কেন ? তোমার না একটা টুনটুনি ছিলো?"




“ হাহ্ সেই টুনটুনি এক সরকারি পেটুয়া বুইড়া চান্দিছিলা টুনার সাথে ভাগছে! সাথে আমার মনটাকে ভাঙ্গছে!"




“ সিরিয়াসলি!"




“ হুম; সেই শোকে আমি এখন শোকাবাসী,তাইতো এত লেমন জুস ভালোবাসি!"




বলেই আবার জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে আরম্ভ করলো নিশিথ নামের এই সুদর্শন পুরুষ। মুক্ত মঞ্চের সন্নিকটে আসতে দেখেই দৌড়ে এসেছিলো সে কুশলাদি বিনিময় করে সাদর সম্ভাষণ জানাতে,কারণ জন্মদিনের পার্টি তার বন্ধুর হলেও সমস্ত দায়িত্ব তার কাঁধে অর্পন করে বন্ধু তার লায়লাকে ম্যানেজ করতে গিয়েছে। এদিকে পরিচিত, বন্ধুমহল সবাই আসা শুরু করে দিয়েছে পার্টিতে কিন্তু যার বার্থডে তার‌ই খবর নেই।




নিশিথের কদমে কদম মিলিয়ে বাকী ছেলেদের সঙ্গে আলাপে জমে গেলো মাত্র আগত দলটা।চার জনের একটা দল,সবার পরনে মেরুন রেড শার্টের উপর ব্ল্যাক ব্লেজার।আর মেয়েরা সবাই পরেছে মেরুন রেড, ব্ল্যাক কম্বিনেশনের পোশাক। বাহারী আধুনিক আউটফিটে একেকজন হলিউড হিরোইন সেজে আজকের এই পার্টি আরো জমকালো করে তুলেছে।সদ্য আগত দলের কয়েকটি ছেলের সাথে আগেই সবাই পরিচিত কিন্তু কিন্তু দুই একজন নতুন মুখ তাই পরিচয় পর্ব সেড়ে নিলো।




“ হ্যালো আ'ম বাপ্পী ,বাপ্পী খন্দকার।এন্ড মিট মাই ফ্রেন্ডস!"




নিশিথের পাশে দাঁড়ানো হেব্বি ওজনধারী ইন্তেখাব বিশ্বাস,বার্থডে বয়ের কলিগ।তাকেই নিজের পরিচয় দিলো বাপ্পী। বাপ্পীর সঙ্গে মোসাফা করে দৃষ্টি ফেললো বাপ্পীর পাশে দাঁড়ানো সুদর্শন উহুম, ভয়ংকর সুদর্শন পুরুষের পানে।এক‌ইভাবে নিজের হাত এগিয়ে দিতেই সেই পুরুষ নিজের গম্ভীর তবে সরস কন্ঠে নিজেকে উপস্থাপন করলো,




“ সম্রাট মাহমুদ তালুকদার,সবাই স..




“ স্যাম বলেই ডাকে!"




ইন্তেখাব বিশ্বাস হেসে নিজেএ শেষ কথাটা বললো, সম্রাট আশ্চর্যিত চোখে তাকিয়ে শুধালো,




“ কি করে জানলেন?"




“ মিউচুয়াল ফ্রেন্ড লিস্টে আছি তাই জানি, ফেমাস পার্সন, ক্রেজি এন্ড এ্যাটরাকটিভ ইভেন বহু নারীর রাতের ঘুম উড়ার কারণ, ক্রাশড বয়! জুনিয়র বয়'স আইকন! স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় মেধাবী মুখ,অলসো ফ্রেন্ড সার্কেলের ফেমাস সিঙ্গার, হেল্পফুল ফ্রেন্ড, পার্সন!"




“ ও মাই গুডনেস! হাও ম্যান! হাও ইজ পস্সিবল! আমি নিজেও তো নিজের এত গুণ সম্পর্কে জানি দেন হাও ইয়্যু?"




“ ঐ যে বললাম মিউচুয়াল আছি,তাই দেখছি,জানছি,শুনছি! অবশ্য ফ্রেন্ড সার্কেলে এমন একজন না থাকলে সার্কেলটা আসলে খুব একটা জমে না!"




“ নাথিং লাইক দ্যাট!"




বলেই সম্রাট লজ্জা মিশ্রিত হাসি দিয়ে নিজের বদন নত করে নিলো। তারপর , পরপর পরিচিত হলো,তাহসিন কাব্য,আখিল দাস।


বাপ্পীর টিমে ছিলো এরা,অতিথি হিসেবে এখন আগত।আর আগেই বার্থ ডে বয়ের সার্কেল থেকে উপস্থিত আছে, ইন্তেখাব বিশ্বাস,আভাস মৃধা,নিয়াজুল বিল্লাহ, সিদ্দিক তারিক,আল আমিন তরফদার,পিয়াস করিম,হাসিব মাহমুদ সহ আরো কয়েকজন। 


পুরুষ মহলের এই জটলা থেকে একটু দূরে রয়েছে দশ বারোজন নারীরা।যারা প্রত্যেকেই কোন না ভাবে ফ্রেন্ড সার্কেলের সাথে জড়িত। প্রতিজনেই বেশ ফেমাস নিজ নিজ অবস্থান আর পরিচয়ে।তবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হচ্ছে মোনালিসা,ফ্যাশন ডিজাইনার এন্ড বিউটি ব্লগার। বার্থ ডে বয় হৃদয় সহ সম্রাট, বাপ্পী, তাহসিন কাব্য,আল আমিনের ক্লোজ ব্যাচমেট।তবে হৃদয়ের কলিগ‌ও বটে।


এখানে উপস্থিত সবচেয়ে সুন্দর নারীটি হচ্ছে হুরেরজান সিদ্দিক।


সম্পর্কে হৃদয়ের কাজিন, তাছাড়াও তার আরও একটি পরিচয় আছে যা সময় হলে সবাই জানতে পারবেন!




সম্রাটদের টিমকে দেখে এগিয়ে এলো মোনালিসা ওরফে মোনা।




“ সেই স্যাম, কেমন আছো?"




“ মোনা! গুড! তোমার অবস্থা কি? কেমন যাচ্ছে দিনকাল?"




“ সব‌ই ভালো,তো,এত লেইট কেন হ্যান্ডসাম?"




মোনার কথায় সম্রাট হালকা হাসলো অতঃপর কারণ বলে আলাপ এগুলো। নিজেদের মধ্যে বাতচিতের মধ্যেই সময় কেটে গেলো।ঘড়ি কাটায় যখন বরাবর নয় তখন উপস্থিত হলো বার্থ ডে বয় হৃদয় আহমেদ, সঙ্গে এলো তার সেই বন্ধুদের কথিত লায়লা।




জটলার মধ্যে সকলেই যখন নিজেদের মধ্যে খোশ গল্পে মশগুল তখন ভীড় ঠেলে উপস্থিত হলো হৃদয় ও তার কাঙ্খিত নারীটি। তাদেরকে দেখে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো সবাই,




“ Happy birthday dear...


" Happy birthday bro..


“ Happy birthday dost..


“ Happy birthday Hridoy..


“ Many Many happy returns of the day in your life dear..




সবার চেঁচামেচিতে মুহূর্তেই কলকলিয়ে উঠলো নিরবতার চাদরে আচ্ছাদিত এই ঘন বনরাজির মাঝের ফাঁকা অংশটুকু।হৃদয়‌ও বন্ধুদের উল্লাসে মেতে এক‌‌ইভাবে নিজেকে উইশ করলো, হট্টগোল কমতেই নিজেদের মাঝে যখন একটু দুরত্ব টানলো ঠিক তখনই সবার নজর পড়লো,মেরুন লালের মাঝে কালো জিরো স্টোনের ছিটানো কাজ করা গ্রাউন আর মেরুন শেঠের কালো হিজাবে আবৃত শ্যামপরীর দিকে। ছোট এক জোড়া কমলার কোয়ার ন্যায় ঠোঁটে আজ মেরুন লিপস্টিক মাখা,ডাগর ডাগর আঁখিতে চিকন কাজল টেনে হালকা করে মেকাপের প্রলেপে আজ এই নারী নিজেকে সাজিয়েছে।তুলির আঁচরে নিজেকে করে তুলেছে অন্যন্য, মোহনীয়। মেরুন লিপস্টিক মাখানো ঠোঁটের নিচের ঠোঁটের কোনায় জ্বলজ্বল করছে কুচকুচে কালো তিল। ঘনঘন পলক ফেলে ঝাপটা মারছে ঘন বড় বড় পাপড়িদ্বয়ের সাহায্যে!


বাম হাতে একটা ঘড়ি,ডান হাত ফাঁকা।ডান পাশে হিজাবের ব্রুজ যেটা জ্বলজ্বল করছে।


পায়ে এক জোড়া প্লেন হিল। সবকিছু মিলিয়ে সবার চোখে ধাঁধা লাগিয়ে ছেড়েছে এই নারী।


এক ঝাঁক পুরুষালী কঠোর কর্ণিয়া তাকে ড্যাবড্যাব করে দেখতে থাকলো। হুর এগিয়ে এসে বললো,




“ পারী আপু? ফাইনালি তুমি এলে?"




বলেই সে পারীকে জড়িয়ে ধরলো,পারীও এক‌ইভাবে জড়িয়ে ধরে বললো,




“ আলহামদুলিল্লাহ হুর, তুমি কেমন আছো বলো?"




“ আলহামদুলিল্লাহ আপু।যাক এতক্ষণ কেমন জানি লাগছিলো,এখন বেশ লাগছে। কিন্তু লেইট কেন করলে?"




“ লেইট বলছো? ম্যাম তো আসবেই না।তার কথা আমার ফ্রেন্ডদের মাঝে সে এসে কি করবে? কি আজব কথা না, বল হুর!তুই বল!"




“ একদম ভাইয়া।


_ এটা ঠিক না পারী আপু! তুমি ভালো করেই জানো হৃদয় ভাইয়া তোমাকে ছাড়া এখন কেক কাটবে না।


গত বার‌ও,আগে তোমার সাথে কেটে এসেছে এরপর আমাদের সাথে! এনি ওয়ে এবারের কেকটাও নিশ্চয়ই তুমি মেইক করেছো?"




হুর আর পারীর কথার মাঝেই হৃদয় এগিয়ে এসে উক্ত কথাটি বললে হুর প্রথমে হৃদয়কে উত্তর দিয়ে পরের কথা গুলো পারীকে বললো।


পারী হুরের এমন আন্তরিকতা দেখে বিমোহিত হয়ে পলকহীন চোখে মেয়েটাকে দেখতে থাকলো আর মনে মনে ভাবলো,




“ এই মেয়েকে কেউ কিভাবে ইগনোর করতে পারে? এত আদুরে আর সহজ! আল্লাহ তুমি ওর মনের ইচ্ছা পূরণ করিয়ে দিও!"


অন্যমনস্ক পারীকে হালকা ধাক্কা দিয়ে হুর স্বাভাবিক করে বললো,




“ হয়েছে কল্পনা পরে করো,চলো সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।"




বলেই হুর পারীর হাত ধরে বাকী মেয়েদের মাঝে টেনে নিয়ে গেলো,যা একদম ভালো লাগলো না মোনালিসার।সে কপাল কুঁচকে একবার দেখলো হৃদয়কে আরেকবার দেখলো পারীকে।


আর‌ও ছয় জোড়া চোখ বিস্ময় আর বিস্ফোরিত চাহনিতে চেয়ে দেখতে থাকলো একবার পারীর দিকে তো আরেকবার হৃদয়ের দিকে।


নিজের হাতের মুঠোয় থাকা টিস্যুটাকে দেহের সর্বশক্তি দিয়ে চেটে ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে সম্রাট,ওর কানে হাত দিয়ে শান্ত থাকতে অনুরোধ করছে বাপ্পী।




“ এই মেয়েটা ঐ মেয়েটা না? ঐ যে ক্লাবে এসেছিল ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে বিচার চাইতে!


_ ও এখানে! ও কি হৃদয়ের সেই গার্লফ্রেন্ড,যার জন্য নিজের কাজিনকে রিজেক্ট করে যাচ্ছে?"




“ আল্লাহ নো'স!"




“ হা!"


 মেয়েদের আড্ডায় পারীর সাথে সবার পরিচয় পর্ব সারতেই হৃদয় এগিয়ে এসে বললো,




“ পারী!


_ কাম উইথ মি! চলো ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই!"




“ ওকে!


_ আমি আসছি হ্যাঁ!"




বলেই পারী হৃদয়কে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলো পিছু পিছু।




“ হেই‌‌ বয়েস; মিট মাই এনোদার ফ্রেন্ড পারীজাত আবরার চৌধুরী!"




“ আসসালামু আ..




বলেই পারী থেমে গেলো। সামনে দাঁড়ানো রক্তিম চোখে তাকিয়ে থাকা পুরুষটাকে দেখে। সম্রাটের কঠোর দৃষ্টি দেখে থমকালো যতটা না চমকে গেলো এই জায়গায় এই তিনজনকে দেখে। অস্ফুট স্বরে বলেই ফেললো,




“ ভাইয়া আপনি এখানে?"




পারী যত‌ই  নিচু কন্ঠে বলুক, হৃদয় ঠিক‌ই শুনে ফেললো। এবং সে কৌতুহলী চিত্তে জিজ্ঞেস করেই ফেললো,




“ তোমরা কি একে অপরকে চিনো?"




পারীর উত্তর দেওয়া আগেই সবটা বললো তাহসিন। সবটা শোনার পর হৃদয় পারীকে একটু রাগের সাথে অধিকার প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করলো,




“ এত কিছু হয়ে গেলো তুমি আমাকে কেন বলো নি পারী?


_আর এত সাহস কে দেখাতে বলছে তোমাকে? তুমি এত ছেলের মাঝে ক্লাবে কেন যাবে? আমি কেন আছি তাহলে?"




পারীকে এত অধিকার দেখিয়ে শাসন করাটা সম্রাটের কোনভাবেই হজম হচ্ছে না।সে দাঁতে দাঁত চেপে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে পারীর দিকে।


সেদিন ভার্সিটির গেইটে দাঁড়িয়ে যখন বোঝার চেষ্টা করেছিলো পারীকে ছেড়ে দেওয়া সঙ্গে থাকা পুরুষটা কে তখন কানের কাছে চেপে ধরে রাখা ফোন থেকে মায়ের কন্ঠে ভেসে আসে,




“ তোমার বাবা পড়ে গিয়ে কোমরে ভীষণ চোট পেয়েছে। আমি কি করবো?তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি আসো!"




বাবার দুর্ঘটনার কথা কানে যেতেই আর কোন দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় সম্রাটের ছিলো না।সে দৌড়ে নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায়।


পর্ব-11

“ আপু!"




এক প্যাকেট এনার্জি প্লাস বিস্কুট নিয়ে দৌড়ে এসেছে নাফিদ, বাচ্চাদের বসার জন্য বিছানো পাটির উপর প্যাকেটটা রেখে পারীর দৃষ্টি কাড়তেই ডাক দিলো।পারী তখন থ্রির একটা বাচ্চাকে পড়াচ্ছিলো।নাফিদের ডাকে ফিরে তাকালো,হাসি হাসি মুখে বললো,




“ জ্বী ভাইয়া!"




“ ওদের টিফিন!"




“ ধন্যবাদ!"




“ আসি তাহলে!"




“ জ্বী আচ্ছা!"




বলেই পারীর কিছু একটা মনে পড়তেই ডাকলো,




“ নাফিদ ভাইয়া শুনেন!"




নাফিদ ফিরে এলো,হাপাচ্ছে সে। হাঁটুর উপর হালকা ভর দিয়ে বললো,




“ জ্বী আপু বলেন!"




“ আচ্ছা উনি.. মানে সম্রাট ভাইয়া, বাপ্পী ভাইয়া এখন আর আসে না‌ কেন?"




নাফিদ এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানে না তাও অনুমান করেই বলে দিলো,




“ ভাইয়ার তো সামনে পরীক্ষা,তাই পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত আছে!"




“ ওহ্! কিন্তু উনার তো মাস্টার্স শেষ তারপরেও!"




“ বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছে!"




“ উনি বিসিএস দিচ্ছে?"




“ হ্যাঁ ,ভাই তো আগেও একবার দিয়েছিলো! কিন্তু হয়নি তাই এবার দ্বিতীয় বারের মতো চান্স নিলো।"




“ আচ্ছা, জানতাম না। থ্যাংকিউ!"




“ ইটস্ ওখে,যেকোন প্রয়োজনে আমাকে নক করিয়েন। সমস্যা নাই!"




“ ফি আমানিল্লাহ্!"




নাফিদ চলে গেলো।পারী চেয়ে র‌ইলো নিচে পড়ে থাকা প্যাকেটটার দিকে। এখানে স্কুল খোলার প্রথম দিন সম্রাট, বাপ্পী, তাহসিন,সিয়াম এসেছিলো। বাচ্চাদের জন্য অনেক খাবার দাবার নিয়ে। এবং সবসময়‌ই এদের মধ্যে থেকে কেউ না কেউ এসে বাচ্চাদের পড়াতে সাহায্য করতো। সম্রাট নিজেই সেদিন বলেছিলো,




“ এখানে বাচ্চাদের জন্য টিফিন আমি প্রোভাইড করতে চাই, প্লিজ না বলো না!"




পারী প্রথমে রাজী না হলেও পরে রাজী হয়ে গেলো‌।কারণ তার একার পক্ষে তো সম্ভব নয় রোজ রোজ বাচ্চাদের নাস্তার ব্যবস্থা করা, সুতরাং তাকে ডোনেশন কালেক্ট করতেই হবে। এক্ষেত্রে যদি সম্রাট সেধে রোজ দেয় তাহলে সমস্যা কোথায়।এটা তো ও আর নিজের জন্য নিচ্ছে না।


কিছু সুবিধাবঞ্চিত অসহায় কিংবা পথ শিশুদের জন্য নিচ্ছে।এখানে সবার অধিকার আছে হস্তক্ষেপ করার।




সব ভেবে পারী সম্রাটের প্রস্তাবে রাজী হয়ে যায়।গত এক মাসের বেশি সময় ধরে এভাবেই সম্রাটের মাধ্যমে বাচ্চাদের টিফিনের বন্দোবস্ত হয়ে যায়। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে সম্রাট আসছে না।প্রথম দুই দিন পারীর কাছে সবটা স্বাভাবিক ঠেকলেও তার পর থেকেই কেমন শূন্যতা বিরাজ করছে তার চারপাশে, খাঁ খাঁ করছে। কিন্তু মুখ ফুটে তো জিজ্ঞেস‌ও করা যায় না।কে কি ভাবে?


তাছাড়াও পারী খেয়াল করেছে সম্রাট ওর আশেপাশে থাকলে সবার চোখ ওদের দিকেই থাকে,কেউ কেউ মিটিমিটি হাসে।যার কারণ পারীর অজানা।




________________




“ কিরে তুই মেয়ে মানুষের মতো পর্দা শুরু করলি ক্যান?"




ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বন্ধুর দিকে নিক্ষেপ করলো প্রশ্নটা।অবিরত বাস্কেটে বলটা ছুঁড়ে মারতে মারতে ঘেমে তার গায়ের গ্রে টি শার্ট ব্ল্যাক হয়ে গিয়েছে।কালো ট্রাউজার কোমর থেকে নেমে এসেছে। পিছন থেকে ছুঁড়ে আসা প্রশ্নের প্রত্যুত্তর করার প্রয়োজন মনে করলো না।তার মতোই সে খেলছে।যেন এটাই ধ্যানজ্ঞান। বিরক্ত হয়ে তেতে আসলো বাপ্পী। বন্ধুর কাঁধে ধাক্কা দিয়ে লক্ষ‌্যচুত্ত করে নিজেই বলটা কব্জির দুর্দান্ত কৌশলে স্বহস্তে ধারন করলো। হঠাৎ ধাক্কায় কয়েক কদম বিপরীতে গিয়ে পড়লো ফ্লোর বেডে।তাও থামলো না‌।পড়তে পড়তেই ঘাড় উঁচিয়ে বন্ধুকে দেখে সোজা হয়েই ধপ করে শুয়ে পড়লো।দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে পা জোড়াও মেলে দিলো। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,




“ কি করবো? কিভাবে ভুলবো? ঐদিকে গেলেই চোখের সামনে পড়বে!"




“ না গেলে বুঝি পড়ে না! রাত ভরে কাকে ভেবে জাগিস? মোবাইলের স্ক্রিনে কার ছবি ভাসে?"




“ ওকে সামনে দেখলে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো না দোস্ত,অযথাই ওর উপর চড়াও হবো। অনর্থক ঘটিয়ে ছাড়বো।দেখা গেলো খামোখাই মেয়েটা আমার দুর্ব্যবহারের শিকার হলো, দেখলি তো সেদিন কিভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলাম নয়তো!"




বলটাকে শেষ বার ছুঁড়ে মারলো ঝুড়িতে,যা হোল  দিয়ে গড়িয়ে পড়ে গড়াতে গড়াতে দরজার সামনে গিয়ে বারি খেলো দরজার কপাটে।




“ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্তত কিছু পেতে হলে কিছু তো ছাড়তে হবেই।তবে... তোর জন্য টাটকা খবর আছে! আই থিংক তোর জন্য টার্ম কার্ড হবে এটা!"




“ কি?"




বন্ধুর কথায় বাঁকা হেসে বন্ধুর পাশে বসে,দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখা গিটারটা তুলে নিলো, বৃদ্ধাঙ্গুলি,শাহাদাত আঙ্গুল আর মধ্যমার সাহায্যে টুং টাং করে শব্দ তরঙ্গ সৃষ্টি করে গেয়ে উঠলো,




যদি বারে বারে একই সুরে প্রেম তোমায় কাঁদায়


তবে প্রেমিকা কোথায় আর প্রেমই বা কোথায়?


যদি দিশেহারা ইশারাতে প্রেমই ডেকে যায়


তবে ইশারা কোথায় আর আশারা কোথায়?




যদি মিথ্যে মনে হয় সব পুরোনো কথা,


যদি চায়ের কাপেতে জমে নীরবতা,,


যদি মিথ্যে মনে হয় সব পুরোনো কথা,


যদি চায়ের কাপেতে জমে নীরবতা,,


তবে বুঝে নিও চাঁদের আলো কত নিরুপায়!




যদি প্রতিদিন সেই রঙিন হাসি ব্যথা দেয়


যদি সত্যগুলো স্বপ্ন হয়ে শুধু কথা দেয়


যদি প্রতিদিন সেই রঙিন হাসি ব্যথা দেয়


যদি সত্যগুলো স্বপ্ন হয়ে শুধু কথা দেয়।


তবে শুনে দেখো প্রেমিকের গানও অসহায়




যদি অভিযোগ কেড়ে নেয় সব অধিকার


তবে অভিনয় হয় সবগুলো অভিসার


যদি ঝিলমিল নীল আলোকে ঢেকে দেয় আঁধার


তবে কী থাকে তোমার, বলো কী থাকে আমার?




যদি ভালোবাসা সরে গেলে মরে যেতে হয়


কেন সেই প্রেম ফিরে এলে হেরে যেতে ভয়?


যদি ভালোবাসা সরে গেলে মরে যেতে হয়


কেন সেই প্রেম ফিরে এলে হেরে যেতে ভয়?


শেষে কবিতারা দায়সারা গান হয়ে যায়।




যদি বারে বারে একই সুরে প্রেম তোমায় কাঁদায়


তবে প্রেমিকা কোথায় আর প্রেমই বা কোথায়?


যদি দিশেহারা ইশারাতে প্রেমই ডেকে যায়


তবে ইশারা কোথায় আর আশারা কোথায়?




যদি মিথ্যে মনে হয় সব পুরোনো কথা


যদি চায়ের কাপেতে জমে নীরবতা


যদি মিথ্যে মনে হয় সব পুরোনো কথা


যদি চায়ের কাপেতে জমে নীরবতা


তবে বুঝে নিও চাঁদের আলো কত নিরুপায়!




ঘন্টা লাগিয়ে স্নান সেড়ে ধবধবে এক তোয়ালে দিয়ে নিজের লজ্জাস্থান ডেকে বের হলো‌, কাঁধে তার আরো একটি গোলাপি তোয়ালে। মাত্র ক্লিন সেইভ বের হয়েছে।ঘাড় থেকে একটু নিচে নামা সিল্কি চুলগুলো ভিজে চিপকে আছে কানের আশেপাশে।


গোলাপি তোয়ালে দিয়ে ঘাড় মাথা মুছতে মুছতে গান গাইছে বিরবির করে,




“ চোখে যার কাজল নেই,এমনি‌ই কালো,


এক পলকে দেখলে যারে লাগে ভালো!


এমন একটি মেয়ে যদি এনে দাও কেউ,উহুম পেয়ে গেছি এবং তাকেই করবো আমি ব‌উ, তাকেই করবো আমি ব‌উ!"




বিরবির করে গান গাইতে গাইতেই নিজের পোশাক বের করে নিলো,ক্রীম একটা শর্ট হাতার শার্ট,কালো জিন্স , ড্রেসিং টেবিলের পাশেই হাংঙ্গারে রেখে নিজের লম্বা সুঠাম অর্ধ নগ্ন দেহখানা নিয়ে দাঁড়ালো দর্পণের সামনে।


 দর্পণে পড়া স্ব-প্রতিবিম্বে দৃশ্যিত সিক্স প্যাক বডির সৌন্দর্যে মোহিত হয় সে নিজেই, বারংবার!তবে কি সেই নারী হবে না!তবে সে শুধু দেহের সাজে নয়,মনের রঙে রাঙিয়ে দিয়েই ঐ নারীকে ডুবাবে,জম ডুবান ডুবাবে,তার মাঝে ডুবাবে,তার প্রেমের অথৈ সাগরে ডুববে সেই নারী,তার ভালোবাসার স্রোতে ভাসবে সেই নারী,তার আদরে ,কামুকতায় মজে মিশে যাবে তার অস্থি মজ্জায়, প্রতিটি প্রেমনামক শিরা উপশিরায়! তার রক্ত নালীতে বাহিত প্রেম,সম্রাটের বিষিয়ে দেওয়া প্রেম।




নিজের সৌন্দর্যে নিজেই মাতোয়ারা হয়ে বিরবির করে বললো,




“ সাইকোলজি বলে নারী পুরুষের প্রতি প্রথম আকর্ষন অনুভব করে তার  ব্যক্তিত্ব দেখে কিন্তু কমন সেন্স বলে নারী পুরুষের প্রতি প্রথম আকর্ষন অনুভব করে পুরুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে। অতঃপর দেখে ব্যক্তিত্ব।তবে কি পারীও!


না আমার পারীজাত শুদ্ধ মনের অধিকারীনি‌।ওর মনটা পবিত্র,ওর কাছে শারীরিক সৌন্দর্যের চেয়েও ঢের গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র মন।ও যার কাছে গুরুত্ব পাবে, নিরাপত্তা পাবে তাকেই আপন করে নেয়।যার কাছে ও নিজেকে নিজের মতোই তুলে দিতে পারবে তাকেই আপন করে নেয়।


_ আই সয়ার মাই লাভ,পুরোটা দখল করে নিবো,তোমার বলতে তুমি থাকবে না,তোমার পুরোটাই সম্রাটের হবে, তুমি হবে সম্রাটময়! প্রিয়তমা,ডোন্ট ওরি,আই উইল কনফার্মড ইট দ্যাট নো বোডি ক্যান রিচ ইয়্যু ,নো বোডি ক্যান লাভ ইয়্যু! ইয়্যু উইল বি মাইন,অনলি মাইন।ফরেভার,সম্রাটস কুইন!"




বাঁকা হেসে সেন্ট ছড়িয়ে দিলো পুরো দেহে, অতঃপর পটাপট শার্ট চাপিয়ে প্যান্ট পরে নিলো। ফর্সা শরীরে ক্রীম শার্ট আর কালো জিন্স! অদ্ভুত রকমের সৌন্দর্য যাকে বলে। চুলগুলো উল্টো আঁচড়ে জেল দিয়ে সেট করে নিলো।আরো একবার আরশিতে তাকিয়ে অতঃপর বাইকের চাবি, মোবাইল,পাওয়ার ব্যাংক, ব্লু টুথ কানে লাগিয়ে নিয়ে মানিব্যাগ পকেটে পুরে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।যেতে যেতেই বলতে আরম্ভ করলো,




“ হ্যাঁ ও এখন কোথায় আছে?"




****




“ নিউ মার্কেট?এত সকালে নিউ মার্কেট কেন?"




****




“ ওহ, আচ্ছা শোন সামনে যাবি না,ও অকোয়ার্ড ফিল করতে পারে।দুর থেকেই নজরে নজরে রাখ!"




****




“ আর শোন,নিউ মার্কেট থেকে বেরুলেই আমাকে জানাবি।আমি কাছাকাছি আছি!"




****




“ স্টে এওয়ে ফ্রম হিম!"




__________




নিউ সুপার মার্কেট থেকে কেনাকাটা শেষ করে পারী মাত্র‌ই বের হলো, আশেপাশে তাকিয়ে রিক্সার খোঁজ চালালো,রিক্সা তো অনেক কিন্তু যেতে চায়না কেউই।কেন যে কামরাঙ্গীরচর যেতে চায় না তা পারীর মাথায় ঢুকে না। যদিও কমন একটা সমস্যা সবার অবগত তা হচ্ছে বিডিআর যা বর্তমানে বিজিবি নামে পরিচিত তার দুই নাম্বার গেইট থেকে শুরু হ‌ওয়া ট্রাফিক জ্যাম রনি মার্কেট ব্রীজ অবধি থাকে,যার জন্য রিক্সা থেকে শুরু করে ছোট বড় সব যান‌ই আঁটকে থাকে জঘন্য ভাবে। তাই অনেকেই সেদিকে যেতে চায় না কিন্তু পারীর তো যেতেই হবে।তার বাড়িই তো ঐদিকে।না যেয়ে উপায় আছে আদৌও? কি করবে কি করবে ভাবতে ভাবতেই কদম ফেলে এগিয়ে গেলো নীলক্ষেত অভিমূখে। উদ্দেশ্য রিক্সা না মিললে হলারে উঠবে যদিও তাতেও পারীর সমস্যা। ভয়ানক মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায় দূর্গন্ধ আর গরমে।তার সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে উঠা,চেপে চেপ বসা। ভীষণ কষ্টকর অস্বস্তিকর একটা ইস্যু। তা-ও কিছু করার নেই তো।গরীবের যান ঐগুলো। তাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ঐ যান গুলোই নির্ধারিত।




পারীর দুই হাত ভর্তি জিনিসপত্র, বেকিং সামগ্রী,কিছু ঘরোয়া তৈজসপত্র।কালো বোরকাটাও ভিজে জবজবে হয়ে গেছে।সুপার মার্কেটের ভেতরে এত গরম বলার বাইরে,তার মধ্যে ঘুরে ঘুরে জিনিস কেনাটাও একটা বড় চিন্তার বিষয়।দিন দিন জিনিসপত্রের দাম হুরহুর করে বাড়ছে,তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাকেও কেকের দাম বাড়াতে হচ্ছে। এতে করে মাঝে মাঝেই পুরানো ক্লাইন্টদের সাথে মনোমালিন্য ঘটে, যদিও সবাই এক না।কেউ কেউ পরিস্থিতি বুঝে নিজের থেকেই বাড়িয়ে দেয় মূল্য।




পারী চার নাম্বার গেইট দিয়ে প্রধান সড়কে বেরিয়ে ছিলো, উদ্দেশ্য চন্দ্রিমা মার্কেটের সামনে থেকে রিক্সা নিবে,ঐখানে দাঁড়িয়ে থাকা রিক্সা মামারা অনেক ভালো।তারা সব জায়গাতেই যেতে তৈরি থাকে, কিন্তু পারীর ভাগ্য আজ বড়‌ই খারাপ তাই কেউ রাজী হলো না।খাঁ খাঁ রোদের মাঝে খুব একটা রিক্সা ছিলোও না।যা কয়েকটি ছিলো তা সব এদিকে ভিআইপি রোড অভিমূখে অর্থাৎ তারা ধানমন্ডি কলাবাগানে,কিংবা তার থেকেও দূরে যাবার জন্য বসে ছিলো।মূলত তারা সেই এলাকার‌ই রিক্সাচালক।তাই তাদের আজ পারীর প্রতি দয়া হলো না।তারা পারীর হাতে ভারী ব্যাগ থেকেও নরম হলো না, তাঁদের মনে দয়া হলো না বাচ্চা মেয়েটার জন্য।




“ সবাই নিষ্ঠুর,কেউ একটু মায়া করে না।"




বলেই ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো, হাঁটতে হাঁটতে যখন নিউ মার্কেট চার নাম্বার গেইট পেরিয়ে দুই নাম্বারের সন্নিকটে পৌঁছালো ঠিক তখনই তার সামনে থেকে একটা বাইক দ্রুত গতিতে এসে হঠাৎ করেই তার সামনে ব্রেক কষলো।


ভয়ে আঁতকে উঠে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো পারী।বাম হাতের ব্যাগগুলো হাতের মুঠ ঢিলে হ‌ওয়ায় ধপ করে নিচে পড়ে গেলো,ডান হাতে ভারী ব্যাগ সহ হাতটা তুলে বুকের উপর রেখে বিরবির করে বললো,




“ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ!


আল্লাহ, আসতাফিরুল্লাহ!"




পারীকে বিরবির করে কিছু পড়তে দেখে মুচকি হাসলো হৃদয়, বললো,




“ পারী ভয় পেয়েছো? ও মাই গুডনেস মিস পারীজাত আবরার চৌধুরী ওরফে বাঘিনী রানীও ভয় পায় আজকাল?"




“ এভাবে কেউ সামনে এসে বাইক কষে হৃদয়? আমার পিলে চমকে গিয়েছে! মানে তুমি এত লাপার বা কেন !"




“ সিরিয়াসলি ভয় পেয়েছো? আম সো স্যরি ডিয়ার,আকচুয়ালি আমি জাস্ট.. ওহ সিট! প্লিজ বি রিল্যাক্স পারী!"




বলেই হৃদয় পারীর কাঁধে হাত রেখে পারীকে শান্ত করার জন্য ওর হাতের ব্যাগগুলো নেওয়ার চেষ্টা করলো,যাতে পারী একটু হালকা হয়ে নিজেকে স্থির করতে পারে।আসলেই পারী ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল যার কারণে ওর হাত পা কাঁপছে।




পারীর কাঁধে হাত,পারী হৃদয় অনেকটা কাছাকাছি, বিষয়টি কারো ঠিক কোথায় গিয়ে লাগলো যা হয়তো কাউকে কোনদিন বোঝানো যাবে না, দেখানো যাবে না।তবে কালো হেলমেটের আড়ালে থাকা রক্ত চক্ষু অনেক কিছুর হিসাব জমিয়ে রাখলো,হয়তো নতুন শুরু হবে নয়তো শেষ।


পর্ব-12


জাতীয় জাদুঘরের পিছনের আর পিজির সামনের মতো ব্যস্ত এড়িয়ার প্রধান সড়কের পথচারী চলাচলের নিচে একজন মহিলা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। তার পাশেই তিন কি চার বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে কাঁদছে। চলতি পথে এই দৃশ্যটা অনেকের মনেই নাড়া দিলেও ব্যস্ত জীবনের ব্যস্ততায় তা আর ঘেঁটে দেখার সময় মিলে না তবে কেউ কেউ ব্যতিক্রম‌ও হয়।যারা ব্যতিক্রম তারা ঠিকই সময় বের করে বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ায় তেমনি কিছু মানুষ এগিয়ে এসে ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি হয়েছে বাবু? কাঁদছো কেন? তোমার সঙ্গে কেউ নাই? কে হয় এটা?"


আবার কেউ জিজ্ঞেস করলো,


“ এ্যাই কি হয়েছে তোমার আম্মুর? অসুস্থ না-কি?ও আল্লাহ এতো বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। তোমার সাথে কেউ নাই?কি অবস্থা একজন মহিলা মানুষ লগে একটা বাচ্চা মেয়ে একা একা...."


অপরিচিত কারো জন্য এহেন দুশ্চিন্তা করতে এ শহরে অহরহই দেখতে পাওয়া যায় যদি বিপদে পড়ে তো।পারীর জন্যেও কাজ কেউ কেউ এমন দুশ্চিন্তা করলো হয়তো সময়ের উপহার এটা।কোন এক সময় সে অন্যের উপকার করতো আজ আল্লাহ অদৃশ্য উপস্থাপনায় তার‌ই বান্দা দিয়ে উপকারের ফেরেস্তা পাঠিয়েছেন।


কয়েক জন পুরুষ ছুটে গেলো পিজির আউটডোরের ইমারজেন্সি সেন্টারে‌। কিছু মিনিটের মধ্যে দুজন লোক আর একটা স্ট্রেচার এসে উপস্থিত হলো।ফুল বিক্রেতা কিছু মহিলারা আর পানির শরবত বিক্রেতা কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে স্ট্রেচারতে তুলে দিলো পারীকে। একজন মহিলা নিজের কোলে তুলে নিলো ছোট সুখকে।


অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর অতিমাত্রার গরমে পারীর রক্তচাপ কমে যায়।যার দরুন হঠাৎ করেই চেতন হারিয়ে ফেলে। স্যালাইন লাগিয়ে পারীর বেডের পাশেই সুখকে বসিয়ে রেখে একজন আয়া পাহারা দিচ্ছে।


কয়েক ঘন্টা ঠিক কত ঘন্টা তা পারীও হিসেব করে বের করতে পারলো না।যখন চোখ মেললো নিজের ডান পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা ছোট শুকিয়ে যাওয়া মুখটাই দেখলো।


চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে বুঝতে পারলো সে এখন হাসপাতালে আছে। নির্লিপ্ত চাহনিতে আবারও মেয়ের দিকে চাইলো। ছোট্ট দুটো হাত একত্রে ভাঁজ করে বাম গালের নিচে রেখে তার উপর গাল ঠেকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমিয়ে আছে।চোখ থেকে গাল অবধি কালো কালো ছোপ ছোপ দাগ,তার কান্নার চিহ্ন।বুক ফুঁড়ে একটা লম্বা শ্বাস বের হলো। অতঃপর উঠার চেষ্টা করতেই বুঝতে পারলো তার বাম হাতে টান লাগছে।মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পেলো স্যালাইন লাগানো,প্রায়‌ই শেষ দিকে। কিন্তু তাকে যে উঠতে হবে নয়তো...


“ নড়াচড়া করবেন না।যা বলার মুখে বলুন আমি সহযোগিতা করছি।"


একজন ক্লিনার ক্লিন করার পাশাপাশি পারীকে নড়তে দেখে কথাটা বললো।পারীর অসহায় চোখে চেয়ে মেয়ের দিকে ইশারা করে বললো,


“ আমাকে উঠতে হবে,মেয়েটা!"


“ আপনার মেয়েকে খাওয়ানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু সে খায়নি। বোধহয় বাইরের লোকের হাতে খাওয়া নিষেধ করেছেন তাই না?"


ঠোঁটের কোনে এক টুকরো হাসি দেখা গেলো‌‌। হ্যাঁ সে'ই শিখিয়েছে অপরিচিত কারো থেকে কিছু না নেওয়া অথবা খাওয়া!ক্লিনার মহিলাটি পারীর পাশের বেডের রোগীকে বলতে থাকলো,


“ এভাবে চারদিকে নোংরা ছিটিয়ে রাখছেন কেন? এটা হাসপাতাল আপনার বাড়ির ডাস্টবিন নয়। যতসব কোথায় থেকে উঠে আসে।

_ এ্যাই যে আপনি শুনুন, এখান থেকে উঠবেন না। স্যালাইন শেষ হলো বলে,আমি নার্সকে জানাচ্ছি। তিনি এসে খুলে দিয়ে যাবে।পন্ডিতি করে আবার বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকবেন না।

আচ্ছা আপনার বাড়ির লোক কোথায়? কাউকে তো দেখলাম না,সাথে ফোন টোন নেই নাকি? না থাকলে নাম্বার জানলে দিন আমি ফোন করে বলছি,সেই কোন সকাল থেকে এখানে এই হাসপাতালে এসে পড়ে আছেন কেউ খোঁজটোজ‌ও তো নিলো না মনে হয়। অবশ্য ব্যবস্থা থাকলে না নিবে।রাত তো ম্যালা হলো!"


“ কয়টা বাজে?"


ক্লিনার সুরাইয়া,পাশের পেসেন্টে বকতে বকতেই পারীর সঙ্গে এতগুলো কথা বললো।তার শেষ কথায় আঁতকে উঠে পারীর সময় জানতে চাইলো ক্লিনার মুখটা খানিকটা বেকিয়ে অনুমান করে বললো,


“ হবে হয়তো আটটা নয়টা।"


উনি যতটা বলছেন ততটা বাজেনি তবে কম‌‌ও না।তখন ইতিমধ্যেই সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ছুঁই ছুঁই, অর্থাৎ প্রায়ই সাড়ে সাতটা বাজে। সময় শুনতেই পারীর পিলে চমকে উঠলো।এত সময় সে এভাবে ছিলো।এই এতগুলো ঘন্টা তার বাচ্চারা না খাওয়া!ইস্! পারীর মাতৃপ্রাণ হঠাৎ করেই অনুভব করলো সে এভাবে কখনো হারিয়ে গেলে তার বাচ্চারা একবারে অসহায়, নিরীহ হয়ে যাবে।কেউ তো নেই দেখার।তার কপালটা কেন এমন হলো? কেন আল্লাহ তা এবং তার বাচ্চাদের জন্য কাউকে রাখলো না।এতটা অসহায় আল্লাহ কাউকে কেন বানায়?


পারীর চোখ ফেটে আবারও কান্না আসছে,একটা মুখ ভাসছে বারবার যেই মুখটা তার আশ্রয়।যেই মুখটা তাকে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়, যেই মুখটা তার অসহায়ত্ব জীবনের খোরাক,যেই মুখটা তার জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার একমাত্র অনুপ্রেরণা। মেয়ের দিকে চাইলো ফিরে, অতঃপর ঐ ছোট্ট মুখে কারো মুখের আদল কল্পনা করে আবারও বুক ভাসাতে থাকলো যার সঙ্গে হাতের ক্যানুলা দিয়ে রক্তের ধারা আবারও প্রবাহিত হতে আরম্ভ করলো টান লাগায়।


অতীত.....


ক্লাস শেষ করেই ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আসলো দ্রুত কদমে,আজকে বাচ্চাদের পরীক্ষা নেওয়ার কথা আছে। কিন্তু এখনো প্রশ্ন সাজাতে পারেনি।হৃদয় আসবে কাগজপত্র নিয়ে।


“ কারো একদিন হবো

কারো এক রাত হবো

এর বেশি কারো রুচি হবে না!

আমার এই বাজে স্বভাব কোনদিন যাবে না!"

- (রেহান রসুল)


গিটারের তারে নিজের আঙ্গুল ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে অবিরত ঠোঁট নেড়ে রেহান রসুলের এই গানটা গাইছে সম্রাট।তাকে ঘিরে বসেছে সব বাচ্চারা।পারী দ্রুত কদমে এগিয়ে আসতে গিয়েও থমকে গেলো সম্রাটকে দেখে।ঠিক কতগুলো দিন পর দেখলো অনুমান করতে পারলো না। সম্রাটের মাথার চুল থেকে হাঁটু ভাঁজ করে বসা সবটাই খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো।লোকটা আগের থেকেও সুদর্শন হয়েছে।চুলে নতুন হেয়ারকাট দিয়েছে। কন্ঠের এই জাদুময় সুর তো সেদিন হৃদয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানেই শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল।চোখ বন্ধ করে গিটারে আওয়াজ তুলতে তুলতে গান গাইছে সম্রাট,


ভুলভাল ভালোবাসি

কান্নায় কাছে আসি.

ঘৃনা হয়ে চলে যাই থাকিনা

কথা বলি একা একা সেধে এসে ...


“ পারী আপু দেখো ভাইয়া আমাদের গান শোনাচ্ছে

কত সুন্দর গায়, না বলো?"


সম্রাটের পাশে থাকা সাত বছরে মুনিয়া পারীকে দেখেই চিৎকার করে কথাটা বললো।মুনিয়ার জোরালো কথায় সম্রাট চোখ মেলে তাকালো, গিটারের তারে থেমে গেলো তারকে নাচানো অঙ্গুলিদ্বয়। চোখ ফিরিয়ে চাইলো বিস্মিত ঐ চাহনিজোরার দিকে। যে চাহনিতে অদ্ভুত এক অনুভূতি ছেয়ে গেলো পারীর নরম কোমল নারী কায়া মন দেহে।মগজ শিন শিন করতে থাকলো অজানা অনুভূতিতে।পারীর অনুভূতি হয়তো বুঝতে পারলো সম্রাট,সে মুখটা ঘুরিয়ে মুচকি হাসলো।


অতঃপর নিজেকে স্বাভাবিক রেখে মুখটা গম্ভীর করে শান্ত গলায় বললো,


“ কেমন আছো পারীজাত?"


পারীর খেয়াল করেছে,সবাই তাকে সংক্ষেপে পারী ডাকলেও একমাত্র সম্রাট‌ই তাকে পুরো নাম ধরে পারীজাত বলেই ডাকে।তার কানে যেন এই ডাকটা একটা চমৎকার গুঞ্জন তুলে।পারীর তরফ থেকে উত্তর না আসায় সম্রাট আবারও পিছু ফিরলো।পারীর তখন‌‌ও নির্বাক।ওর চাহনিতে চাহনি মিলিয়েই সম্রাট উঠে দাঁড়ালো।বাচ্চাদের মধ্যে সাত বছর বয়সী রিজভী,ক্লাস ওয়ানের ছাত্র,সে হঠাৎ করেই বলে উঠলো ,


“ ভাইয়া আজকে আমাদের পরীক্ষা নিবে আপু, তুমি থাকবে?"


সম্রাট রিজভীর দিকে চেয়ে ওর কথা শুনলো, অতঃপর আবারও পারীর দিকে চাইলো।রিজভীর প্রশ্নে সম্রাটের থেকে পারীর ধ্যান কাটে।সেও রিজভীর প্রশ্নের উত্তরে সম্রাটের কথা শুনতে আগ্রহী হলো।সম্রাট পারীর সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য যেকোনো বিষয়ে সম্মতি দিতে রাজী,এটা তো সাধারণ কোন বিষয়।সে দ্রুত গতিতে মাথা দুলিয়ে বললো,


“ অবশ্যই!"


“ স্যরি স্যরি গাইস,আ'ম ভেরি স‌্যরি ফ্র লেইট!"


হৃদয় দৌড়ে এসে পারীর পাশে দাঁড়ালো, মুহূর্তে সম্রাটের মনমস্তিস্ক বিগড়ে গেলো।পারীর পাশে দাঁড়ানোটা কোনভাবেই নিতে পারছে না সে।ঘাড়টা ডানমাব ঘুরিয়ে ডান হাত ঘষতে থাকলো। সম্রাটের মুখভঙ্গি হঠাৎ করেই পরিবর্তন ঘটলো যা খুব করে খেয়াল করলো পারী।


“ ওকে বাচ্চারা চলো ফটাফট যার যার জায়গায় বসে পড়ো, দ্রুত! সময় কম।

এমনিতেই লেইট হয়ে গিয়েছে,পরে তো সময় পাবে না!"


হৃদয় কোনদিকে তাকালো না। নিজের দেরিতে আসার ফলে বাচ্চাদের যেন দেরি না হয় তাই সে এসেই নিজের কাজে লেগে পড়লো। হৃদয়ের তাড়ায় পারীরো সব ভুলে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো।আর সম্রাট...!


পর্ব ১৩

পারী হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো,তখন প্রায়ই রাত এগারোটা..সে চিকিৎসার জন্য এসেছিল একটা সমস্যা নিয়ে। চিকিৎসক তাকে সেবা দিলো অন্যটার জন্য তবে উপকার হলো বটে।

অতিরিক্ত মাথা ব্যথা আর চোখে ঝাপসা দেখার সমস্যা নিয়ে সে এসেছিল,মনে অন্য কিছুরই ভয় জাগছিলো কিন্তু এ যাত্রায় কপাল বোধহয় ততটা মন্দ না থাকায় খানিকটা রক্ষা হলো।এখন‌ও শুধু ঔষধে‌ই কাজ হবে।

চিকিৎসকের ভাষ্যমতে অতি মাত্রায় চিন্তা করায় ব্রেইনে চাপ পড়ছে যেটার প্রভাব এখন অতিরিক্ত মাথা ব্যথা। দীর্ঘক্ষণ সেলাই কাজ করায় চোঁখের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই পরামর্শ হিসেবে চিন্তা মুক্ত এবং বিছানা বিশ্রাম একান্ত আবশ্যক।তবে... দীর্ঘমেয়াদি ওষুধের পরামর্শ‌ও দিয়েছে নয়তো তা ব্রেইন টিউমারের জন্য ভয়াবহ রুপ নিবে কারণ তেমনটাই লক্ষণ ধরা পড়েছে পরীক্ষায়।


কথাগুলো মনে মনে ভাবতে ভাবতেই হাত ইশারায় একটা বাস থামালো,বাসের সহকারী প্রশ্ন করলো,


“ ক‌ই?"


“ বোর্ডবাজার?"


“ হ হ উডেন উডেন,কাকা মহিলা লগে বাচ্চা আছে!"


যদিও এটা স্টপেজ না তবুও বাড়তি ভাড়ার লোভে এভাবে যাত্রী তোলা এই দেশের গণপরিবহনের চিরায়িত রূপ।পারী বাসে উঠলো, মহিলাদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসলো, কোলের উপর মেয়েকে বসিয়ে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে কপালে পরশ দিয়ে বললো,


“ ক্ষুধা লাগছে আম্মু?"


ছোট্ট সুখ নিজের শুকিয়ে যাওয়া মুখটা তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে উপরনিচ মাথা দুলিয়ে বোঝায়, হ্যাঁ!

পারীর ভীষণ কান্না পেলো, বাচ্চা মেয়েটা সারাদিন ভুক্ষা। আশেপাশের অনেক রোগীর সঙ্গে আশা মানুষ‌ই খাবার সেধেছিল কিন্তু সে খায়নি কারণ মায়ের নিষেধাজ্ঞা ছিলো।ভাবতেই তার গলায় বিশাল এক অপরাধবোধ চেপে ধরলো, কিসের এত গরিমা তার,তা তার নিজেরই বোঝা নেই।সে এখন যেই অবস্থায় তাতে কি তার বাচ্চাকে এসব শিক্ষা দেওয়া আদতেই মানানসই! তার বাচ্চাদেরকে সে এসব শেখায় যার ফলে তার বাচ্চারা দীর্ঘ সময় ক্ষুধার্ত থাকে, কাঁদতে কাঁদতে জমিনেই শুয়ে থাকে।কি এক জীবনে বেঁচে আছে! যেখানে বাচ্চাদের দু মুঠো খাওয়াতেই কত কি ভাবতে হয়!অথচ তার বাচ্চাদের জীবনটা কতটাই না আনন্দ আর বৈভবে কাটতে পারতো।তার বাচ্চাদের...তার বাচ্চাদের এই শিক্ষা দেওয়া তো তার একান্ত দায়িত্ব।কারণ ওদের দেহে যার রক্ত প্রবাহিত,যার ঐশ্বর্যের অংশ,যার পদবী ওদের বাস্তুগত জীবনের প্রদীপ তার শিক্ষায় শিক্ষিত করাই তো ওর দায়িত্ব,মা হলেও ওর চেয়েও ওদের প্রতি তার অধিকার যে অনেক বেশি।

পারীর ভাবনার মাঝেই তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুদানা যা গিয়ে পড়লো ছোট সুখের কপালে আর তা বেঁয়ে পড়লো চোখে।


“ আম্মু!"


সুখের সুখময় ডাকে পারীর ভাবনার সুতো কাটে।সে মেয়ের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের চটের ব্যাগটা হাঁতড়াতে থাকলো,একটা কলা আর কেক বের করলো।কলাটা ছিঁড়ে মেয়ের মুখের সামনে দিয়ে বললো,


“ বিসমিল্লাহ বলে মুখে দাও।"


সুখ‌ও তাই করলো,


“ বিছমিল্লা!"


বলেই সুখ কলায় কামড় বসায়। ছোট্ট ছোট্ট কামড়ে কলাটা খেয়ে কেকটা খেলো, এরপর পারী বোতলের ছিপ খুলে পানি খাইয়ে দিলো। খাওয়া শেষ হলে পারী নিজের ওড়না দিয়ে মেয়ের মুখটা মুছিয়ে দিয়ে আরো ভালো করে কোলের মধ্যে চেপে বসিয়ে মুখটা বুকের সাথে চেপে ধরে বললো,


“ এখন ঘুমাও!"


সুখ তাই করলো।সাড়ে তিন বছরের বাচ্চা সে, মায়ের ভীষণ বাধ্যগত সন্তান। এতটুকু মেয়েকে যা বলা হয় তাই করে।তবে কিছু কিছু সময় তার জেদ‌‌ও পারীকে পিছনে টানাহেঁচড়া করতে থাকে,যখন পারী অতীতে হারিয়ে নিজের অস্তিত্বের খোঁজ চালায়।


সুখ ঘুমাচ্ছে মায়ের বুকে মাথা রেখে কোলের উপর বসে।বাসে পা ফেলার জায়গা নেই,তাও সহকারী লোক তুলছে।পারীর পাশে বসা এক মহিলা,কারো সাথে খানিকটা ঝাঁঝালো গলাতেই কথা বলতে আরম্ভ করলো।এত সময় পারী আর তার মেয়েকে গুটুর গুটুর চোখে দেখেছে এখন ফোনে কথা বলছে।পারী মেয়ের মুখটা দেখে খানিকটা নিচু স্বরেই মহিলাটাকে বললো,


“ খালাম্মা, একটু আস্তে কথা বললে ভালো হয়। আমার বাচ্চাটা ভয় পাবে।"


“ এ্যাঁ কি ক‌‌ও?এ্যাই এক মিনিট,আপনি কারো খালাম্মা ডাকলেন? আমাকে দেখলে খালাম্মা লাগেনি?"


প্রায় চল্লিশোর্ধ বেশি হবে,তাও জিজ্ঞেস করছে তাকে খালাম্মা লাগছে কি-না?

অর্থাৎ সে নিজের বয়স বৃদ্ধির বিষয়টি সহজে নিতে পারে না।পারী নিজের মনে মনে‌ই বুঝে নিলো সে ভুল করছে।তাও এমন পরিবেশে।মহিলা পারীর দিকে কটমট করে চেয়ে আছে,পারী আর কোন সম্বোধন ছাড়াই নিজের অনুরোধ পূণরায় করলো,


“ আপনি একটু আস্তে কথা বলুন,আমার বাচ্চা ঘুমাচ্ছে!"


“ এইডা বাড়ি না। ঘুমানোর জায়গা না।এত‌ই যখন গাড়ীতে ঘুমানোর শখ তাইলে প্রাইভেট কারে উঠতে পারেন না? খালি বাচ্চা কেন,লগে আপনিও ঘুমাইলেন!"


মহিলার উচ্চ বাচনে এর মধ্যেই সুখের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে।সে মুখ তুলে মহিলাটাকে দেখছে, যে তার মা'কে কথা শোনাচ্ছে। ছোট্ট ঘুমুঘুমু চোখ জোড়া মেলে মহিলার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।পারী কথা বাড়ালো না। এমনিতেই তাঁর অনুভূতি এখন আগের মত চড়াও হয় না।সব সয়ে নেয়, নিচ্ছে।হয়তো পরিস্থিতি তাকে অনেকখানি শান্ত আর স্থির করে ফেলেছে নয়তো এহেন অভদ্র মহিলাদের সে নগদে শক্ত জবাব দিয়ে দিতো এককালে।

মেয়ের মুখটা ঘুরিয়ে আবারও বুকের সাথে চেপে ধরে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো।


রাতের প্রায় বারোটা ছুঁই ছুঁই তাও এই শহর কত ব্যস্ত। চারদিকে মালবাহী গাড়ির শোরগোল।কত হ‌ইহট্টা।পারীর এখনো আর একটা চিন্তা হচ্ছে।তার আইডি কার্ডটা হারিয়ে গিয়েছে।সেটা ছাড়া কিভাবে অনেক চলবে? কত কাজেই তো ঐটা জরুরি এই আইডি কার্ড যে তাকে আবারও কত ভুগাবে আল্লাহ জানে। এদিকে ফোনটা বন্ধ হয়ে আছে। ঐদিকে না জানি কত দুশ্চিন্তা করছে সবাই‌।ভাবতে ভাবতে কখন জানি জানালার সাথেই মাথা ঠেকিয়ে দিলো, ঠিক এই সময়ে জ্যামের কারণে গাড়ি থামলো চেরাগ আলি কলেজ রোড বাজারের সামনে চোখটাও খানিকটা লেগে আসছিলো, তখনই দেখলো পাশেই এসে থামা একটা বাইক।এক জোড়া ছেলে মেয়ে।ছেলেটা কালো ফর্মাল শার্ট আর সাদা গ্যাবার্ডিন প্যান্ট পরা,মাথায় কালো হেলমেট।মেয়েটা‌ও কালো সাদা সালোয়ার স্যুটে হেলমেট মাথায় দিয়ে ছেলেটার পিঠ জড়িয়ে বসে আছে।পারী চোখটা টানটান করে সেদিকে তাকিয়ে র‌ইলো। তার চোখের পাতায় কিছু ভাসলো,এই সড়কেই।এমন‌ই একটা সময়ে, ঠিক এভাবেই তবে উল্টো পথে।


ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছিল তখন।অতি মাত্রায় বৃষ্টির কারণে রাস্তায় পানি জমে যাওয়া এই সড়কের বৈশিষ্ট্য।সেদিন‌ও ঠিক তেমনটাই হয়েছিল ।সড়কে পানি,যার কারণে খানাখন্দে গাড়ির চাকা ফেঁসে রাস্তায় বিশাল বিশাল জ্যাম বাঁধিয়ে দিতো‌।সেদিন‌ও ঠিক তাই ঘটে।

তখন পারী সম্রাটের সম্পর্কটা মাখো মাখো, একদম নয়া দম্পতির মতোই। ছোটখাটো সংসার,আর আকাশসম ভালোবাসা।হুটহাট এদিকে ওদিকে ছুটে যাওয়া সময় কাটাতে।কখনো কখনো সম্রাটের ফ্ল্যাটে গিয়ে খেলনাপাতি খেলা, নিজেদের মাঝে একান্ত সময় কাটানোর পর এদিকে ওদিকে বেরিয়ে আসা। তেমনি একদিন সম্রাট খুব করে পারীর সঙ্গ চায়,আর পারী লং ড্রাইভে যাওয়ার আবদার করে। সম্রাট পারীকে নিয়ে পৃথিবী ঘুরতে চায় লং ড্রাইভ তো সাধারণ বিষয় তার জন্য।কথা অনুযায়ী গাজীপুরের একটা রিসোর্ট, দুজন মিলে বেরিয়ে পড়ে সকাল আটটার মধ্যে। নিজের বাইকে করে, সেদিন‌ও এমন‌ই এক জোড়া দম্পতি তারা। সেদিন সম্রাটের পরনেও ছিল কালো শার্ট আর সাদা প্যান্ট,পারীও পরেছিলো কালো সাদা সালোয়ার স্যুট। ঠিক যেমনটি সামনে থাকা দম্পতি।

তাদের রিসোর্টে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা তখন সাড়ে দশটার বেশি। দুজন ভেতরে ঢুকে আগে নাস্তা সারে। অতঃপর.....


“ চলো ঐ লেকের পাশে গিয়ে বসি। ভীষণ মনোরম জায়গাটা।"


“ হুম!"


বলেই পারী সম্রাটের বাহু আঁকড়ে ধরলো।এর ঠোঁটে দুষ্টু হাসি।সম্রাট আঁকড়ে ধরা হাতটা দেখে ঠোঁটের কানে ঝুলে থাকা হাসিটা দেখলো অতঃপর মুখ সামনে ফিরিয়ে মুচকি হেসে বলল,


“ উস্কে দিচ্ছ দাও,পরে কিন্তু দোষ দেওয়া যাবে না।আমি শুধু গল্প করার জন্যে‌ই বলেছিলাম এর বেশি কিছু ঘটলে দায়ভার তোমার!"


“ ওকে!"


বলেই পারীর সম্রাটের গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দৌড় দিলো সামনের দিকে।সম্রাট গালে হাত রেখে হেসে দিলো,পারীকে তাড়া দিতেই পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাকলো।

দুজনের খুনসুটি আর ছবি তোলায় কাটলো প্রথম প্রহরের লগ্নটা। এদিকে ওদিকে ছোটাছুটি,নৌকায় চড়ে লেক ঘোরায় দুজন‌ই ক্লান্ত হয়ে পড়লো।পারী ধাপ করে ঘাসের উপর বসে পড়লো, তারপর‌ই গা ছেড়ে শুয়ে পড়লো। যেহেতু বেলা দুপুরে গড়াচ্ছে তাই লোক সমাগম বাড়ছে।যদিও লোক কম, একেবারেই কম তাও... প্রেমিক প্রেমিকারা একান্ত সময় কাটাতে একরকম নিরিবিলি পরিবেশে‌ই খোঁজে।তাই পারীর এভাবে মাটিতে শুয়ে পড়ায় সম্রাট খানিকটা বিরক্ত গলায় বললো,


“ কি ব্যাপার এখানে এভাবে শুয়ে পড়লে কেন?"


পারী সম্রাটের দিকে মুখটা তুলে মিষ্টি হাসলো,যার বিনিময়ে রাগ জিইয়ে রাখা সম্রাটের পক্ষে সম্ভব নয়।সে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,


“ উঠো লোকজন এদিকে আসছে।"


“ ভীষণ টায়ার্ড লাগছে, একটু রেস্ট নেই প্লিজ!"


সম্রাটের মায়া হলো, তা-ও এভাবে!


“ রেস্ট নিলে এখানে কেন? ওদের রেস্ট হাউজ আছে! চলো সেখানে গিয়ে উঠি!"


কথাটা বলেই সম্রাট মুখটা ঘুরিয়ে ফেললো। ঠোঁক গিলে ইতিউতি করতে থাকলো।যেন ভীষণ কঠিন কিছু করে ফেলেছে।পারীও সম্রাটের শেষ কথায় চমকে উঠলো, লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো।এসব রিসোর্ট এর রেস্ট হাউজ মানেই তো ওসব...! ভাবতেই গা শিরশির করে উঠলো। সম্রাটের সঙ্গে তার তো আত্মার সম্পর্ক। বৈবাহিক সূত্রে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক।আইন ও ... শেষ বাক্যটা সম্পূর্ণ হলো না।কারণ তাদের সামাজিক কোন পরিচয় এখনো হয়নি। হ্যাঁ গুটিকয়েক লোকের জানা কিন্তু তাতে কি? যেই সম্পর্কে পারিবারিক কোন মতামত থাকে না তাতে কি আসলেই কোন? এটাও অসম্পূর্ণ র‌ইলো।পারীর তো পরিবার‌ই নেই,তার জন্য সেই সব।তবে সম্রাটের কথা তো এক‌ই।সম্রাট পারীকে ছাড়বে না কখনোই।না সে ঠকাবে তা পারীও জানে।মনে প্রাণে বিশ্বাস করে তবে কিসের বাঁধা? তারা স্বামী স্ত্রী,তার উপর সম্রাটের শতভাগ হক আছে।পারী চায় না বলেই সম্রাট তা আদায় করে না। নয়তো কি করতে পারে না?


“ উঠো,যাবে নাকি!"


পারীদের থেকে বেশ দূরে অন্তত একশো কদম দূরে একজোড়া দম্পতি বসেছে,তারা যদিও গাছের আড়ালে বসছে তাও তাদের কর্মকাণ্ড অনুমেয়।ভাবতেই সম্রাটের গা গুলিয়ে এলো।সে বিয়ে করা ব‌উকে নিয়ে এসেও বিব্রত হচ্ছে, দোনামোনায় রয়েছে আর এরা কিভাবে এসব অবলীলায় করতে পারে তাও কোন রকম দায়বদ্ধতা ছাড়াই?


গুগল থেকে বের করেছিল এই চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশে মোড়ানো রিসোর্ট এর খোঁজটা।পারী প্রাকৃতিক পরিবেশ পছন্দ করে তাই এখানে আনা কিন্তু ঢুকার কিছু সময় পর‌ই তার মনে হয়েছিল এখানে আসা উচিত হয়নি।কারণ এটার ভেতরে যারা আসে তারা অধিকাংশই এসব ধান্দায় আসে। এদের মাঝে পারীকে নিয়ে আসা মানেই তাদের চোখেও তারাও এক‌ই কাজ করতে আসছে যা সত্য নয়।


“ কি ভাবছো?"


“ জায়গাটা খুব একটা সুবিধার না,স্যরি! তোমাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে আসার জন্য আসলে আমি.."


“ আরেহ হয়েছে থামো,এত স্যরি কেন বলছো? তুমি কি জানতে যে এখানে এসব ঘটে?

তাছাড়াও এরা যা খুশি করুক,আমরা আমাদের মতো ইনজয় করি!"


“ ওকে,আসো!"


বলেই সম্রাট পারীকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বললো,


“ দেখি খালি রুম পাই কি-না!এখন রেস্ট নাও, দুপুরে খেয়ে‌ই র‌ওনা দিবো।"


“ হুম!"


যেহেতু রিসোর্ট সেহেতু সব ধরনের ব্যবস্থা থাকবে এটাই স্বাভাবিক।পারীর আঙ্গুলের ভাঁজে নিজের আঙ্গুল গলিয়ে সম্রাট এগিয়ে গেলো একটা অর্ধবিল্ডিংয়ের দিকে। চারদিকে দেওয়াল টেনে ছাদটা টিন দিয়ে বানানো।একপাশে একজন মধ্যবয়সী পুরুষ দাঁড়িয়ে দাঁত খিলানি করছে।সম্রাট পারীর হাতটা ধরে এভাবেই গিয়ে,


“ আসসালামু আলাইকুম!"


“ ওয়া আলাইকুম,জি, কিভাবে সহযোগীতা করতে পারি?"


সম্রাট পারী একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো, ভদ্রলোক আগ বাড়িয়েই সাহায্য করতে চাইছে অর্থাৎ সে এখানকার লোক এবং এসবে পটু।


“ রুম খালি আছে?"


“ কি রকম রুম লাগবো? এসি, নন‌এসি, বাঁশের নাকি পাকা দালানের?"


পারী সম্রাট দেখেছে এখানে খড়কুটোর‌ও ছোট ছোট কামড়া আছে,আর পাকা দালান‌ও।


“ এসি,দালানেই।"


ভদ্রলোক সম্রাট পারীক আগাগোড়া পরখ করতে থাকলো, উনার এমন চাহনিতে পারী সম্রাটের পিছনে আরো আড়ালে লুকিয়ে নিলো নিজেকে।সম্রাটের‌ও ভালো লাগলো না ব্যাপারটা। সামনে দাঁড়ানো মধ্যবয়সী লোকটার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা অনুমান করে সে নিজ থেকেই বললো,


“ আসলে আমরা ঢাকা থেকে এসেছি,ও আমার ওয়াইফ। অনেক সময় হাঁটাহাঁটি করে টায়ার্ড তাই একটু রেস্ট নিতেই কোথাও বসতে চাইছিলো কিন্তু এখানে বাইরে শুয়ে বসে তো আসলে রেস্ট নেওয়া যায় না।যেই গরম পড়ছে।তাই ভাবলাম দুপুরের লাঞ্চের আগে কিছু সময় একটু ঘরে.... বুঝতেই পারছেন বিবি হয়।এখন স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে এসেও যদি কষ্ট করে তবে আজীবন এই খোটা সহ্য করতে হবে। আচ্ছা আপনাদের এখানে ফর্মালিটিজ ফিলাপ করতে কি বিয়ের রেজিষ্ট্রি পেপার শো করতে হবে? করতে হলেও সমস্যা নেই আমার সঙ্গেই সব আছে।"


সম্রাট মানিব্যাগ বের করে কিছু খোঁজার চেষ্টা চালাতেই ভদ্রলোক বললেন,


“ লাগবে না লাগবে না। সমস্যা নেই, শুধু নিজেদের নাম ঠিকানা আর নাম্বার লিখে দিন!

কত ঘন্টার জন্য নিবেন?"


কত ঘন্টা! প্রশ্নটা এতটা বিব্রতকর যে সম্রাট‌ই লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।পারী তো মুখটা নামিয়ে থুতনিতে ঠেকিয়ে ফেলেছে। সম্রাটের শার্ট খামচে পিছনে মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিরবে।সে এখান থেকে গায়েব হতে পারলেই বাঁচে।অতি মাত্রায় ফর্সা ছেলেটার এমন রক্তবর্ণ ধারণ করা দেখে ভদ্রলোক উচ্চ স্বরে আওয়াজ করে হেসে ফেললেন। সম্রাটের কাঁধ চাপড়ে বললো,


“ লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। তোমাদের বয়স পাড় করে এসেছি তাই জানি।যাক বিয়ে করা ব‌উ নিয়ে ঘুরতে এসে একটু নিজেদের মতো সময় কাটাতে চাইছো তা বুঝতে পারছি।যাও যাও... লজ্জার কিছু নেই এটা স্বাভাবিক সৃষ্টি গত প্রাকৃতিক নিয়ম। সঙ্গে নারী থাকলে পুরুষের কামনা বাসনা বৃদ্ধি পায়, এবং যার জাহির করতেও পুরুষ ভালোবাসে।বিবিকে বেশি বেশি ভালোবাসা উচিত, এবং এটা স‌ওয়াবের কাজ। লজ্জা তো তাদের পাওয়া উচিত যারা বিনা দলিলে জমিন চাষে আসে। কিন্তু কি যুগ! তারা লজ্জা তো দূর, কুন্ঠিত‌ও হয় না।

ঐ বারেক, এগো রুমটা দেখিয়ে দে। একদম কর্ণারের শেষ রুমটা।আর হ্যাঁ সুযোগ সুবিধা খেয়াল করিস।যান বাবা যান, যেকোন প্রয়োজনে বারেকরে ডাইকেন।"


সম্রাটদের নির্দিষ্ট সময় বাঁধা হলো না। বরং তারা সময় কাটিয়েই সময়ের হিসাব দিবে।পারী আর মুখ তুলতে পারলো না। একদম সম্রাটের পিঠে মুখ মিশিয়ে ওভাবেই হাটতে শুরু করলে সম্রাট হাত পিছনে নিয়ে ওকে সামনে এনে পাশেই দাড় করালো কিন্তু নিজেও পারীর দিকে ফিরে তাকালো না।


ছিমছাম একটা কামড়া।একটা সেগুন কাঠের বেড,পাশেই একটা মিরর দাঁড় করানো,বাম পাশে বাথরুম,কোথাও জানালা নেই।একটা ছোট টি-টেবিল তার উপর একটা কাঁচের জগ আর একটা গ্লাস রাখা।উপরে ভ্যান ঘুরছে শব্দ করে।টাইলস করা।মাথার উপর টিন থাকলেও রুম শীতলের জন্য ফয়েল এর উপর মুলির বেড়া দেওয়া,তার উপর টিন।বেশ সুন্দর লাগলো পারীর কাছে।বারেক নামের লোকটা কামড়া খুলে দিয়ে ওদের ঢোকার জন্য জায়গা দিলো,পারীই আগে ঢুকলো।সম্রাট ভেতরে ঢুকে দরজা লাগাতে যাওয়ার সময় লোকটাকে ধন্যবাদ জানাতেই লোকটা বললো,


“ স্যার যেকোন দরকারে আছি,আমার কাছে সব ধরনের বন্দোবস্ত আছে।কোনটা লাগবো বললেই পাবেন!"


সম্রাট ঢোঁক গিলে হাসার চেষ্টা করে ইতস্তত ভঙ্গিতে বললো,


“ জি, দরকার হলে তবে হয়তো পড়বে না! ধন্যবাদ আপনাকে!"


বলেই দরজা লাগিয়ে দিলো। এর মধ্যেই পারী হিজাব খুলে ফেলেছে।ওড়নাটা একপাশে রাখা। সম্রাট চোখ ঘুরিয়ে এই দৃশ্য দেখেই আবারও ফিরিয়ে নিলো। এমনিতেই মোম আর আগুন একত্রে থাকলে মোমের গলা নিশ্চিত, দুর্ঘটনা ঘটেই আর এখানে তো তার বৈধতা আছে।পারী যতদিন না অনুমতি দিবে সম্রাট এগুবে না।

পারী হিজাব খুলতেই টিনের চালে ঝমঝমিয়ে কিছু পড়ার আওয়াজ পেয়ে সম্রাটের দিকে চাইলো।সম্রাট নিজেও চমকিত, আশ্চর্যিত। বৃষ্টি হচ্ছে? তাই বলে কি এত গরম পড়ছিল এই কয়দিন?


“ হঠাৎ বৃষ্টি!"


“বসন্তের শেষ সময়, আবহাওয়া উচাটন!কোন ঠিকঠিকানা নেই।”


“ আমরা যাবো কিভাবে?"


“ যেভাবে এসেছি সেভাবেই যাবো!"


“ জব বৃষ্টিতে বাইক চালানো সহজ নয়, তুমি!"


“ দেহমনের ভেতরে যেই ঝড় বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে তাই সামলানোর চিন্তায় কাহিল আবার তুমি বাইরের ঝড় বৃষ্টি নিয়ে চিন্তা দিচ্ছো!"


বিরবির করতে দেখে পারী বললো,


“ কি বলছো?"


"না কিছু না!"


“ আগে তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো এরপর আমি যাই!"


“ হুম!"


সম্রাট বাথরুমে ঢুকে শার্টের দ্বিতীয় বোতাম খুলে বুকটা উন্মুক্ত করলো। অতঃপর চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে আয়নার দিকে তাকালো,তার মন বলছে কিছু একটা ঘটাবেই আজ সে।

এখানে আসা ভীষণ ভুল হয়েছে। ভীষণ;এই ভুল কোনভাবেই পারীকে সাফার না করায়! কোনভাবেই পারীর চোখে নিজেকে নিয়ে....


“না না! সম্রাট; যেকোন ভাবেই নিজেকে সামলা।পারীকে কথা দিয়েছিস, সামাজিকতা ছাড়া ওর কাছে অধিকার নিয়ে যাবি না।ওকে কোনভাবেই সমাজের চোখে ছোট করবি না।"


নিজেকে ধাতস্থ করে বের করেন এলো।সম্রাটের ভেজা মুখটা দেখে পারী নিজের ওড়না নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বললো,


“ এটা দিয়ে মুছে নাও।"


সম্রাট তাই করলো।মুখটা মুছে পারীর দিকে না তাকিয়েই বিছানায় গিয়ে বসলো।পারী সম্রাটের হঠাৎ পরিবর্তিত মুখটা প্রশ্নাত্মক তবে বিহ্বল হয়ে দেখলো। পরিশেষে নিজেও বাথরুমে ঢুকে মুখে পানির ছিটা দিয়ে সামনেই তাকাতেই চমকালো। ছোট্ট এই বাথরুমের দেওয়ালে নানা রকম বাক্য লেখা।যা স্পর্শ করে এখানে কত লোকের একান্ত মুহূর্ত কেটেছে। বাক্যগুলো তার দেহমনে অন্যরকম একটা অনুভুতি ছড়িয়ে দিলো। লজ্জা,ভয়, আড়ষ্টতায় জর্জরিত হয়ে পড়লো সে। আয়নার পাশে কেউ তার নারীকে একান্ত করে পাওয়ার পরিতৃপ্ত অনুভূতি লিপিবদ্ধ করে রেখে গিয়েছে।এটা কি খুব জরুরী ছিলো?

হঠাৎ করেই পারীর মনে পড়লো,তার আগে সম্রাট এখানে ঢুকেছে তার মানে সেও তো এগুলো দেখেছে,পড়েছে তার মানে এই জন্যই তার মুখটা এমন রক্তিম হয়ে ছিল।


পারী দ্রুত নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে হলো। সম্রাট তখন বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আড়াআড়ি,তার শার্টের তিনটা বোতাম খোলা।পারী একটু আগেই সম্রাটের প্রতিক্রিয়া দেখেছিলো এখন তার‌ও ঠিক এক‌ই রকম লাগছে।তাও সে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ওড়নার কোনা দিয়ে মুখটা মুছলো অতঃপর খোঁপা ছেঁড়ে দিতেই লম্বা কালো চুলগুলো কোমড় ছাড়িয়ে নিচে পড়লো। তৎক্ষণাৎ সম্রাট ফিরে তাকালো।পারীর এই লম্বা চুল সম্রাটের অন্যতম দূর্বলতা।যা তাকে আরো ঘোরে ডুবিয়ে মারে।পাত্রী খোঁপা খুলে হাতের আঙ্গুলের সহায়তায় সুন্দর করে গুছিয়ে নিলো।বুকের উপর ছড়িয়ে রাখা হিজাবটা দিয়ে নিজেকে আরো সুন্দর করে ঢেকে নিয়ে বিছানায় ফিরে তাকালো, সম্রাট তৎক্ষণাৎ নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে উঠে দাঁড়ালো,বললো,


“ তুমি বাম পাশে শোও আমি ডান পাশে।"


“ হুম!"


বাইরে তখন তুমুল ঝড়বৃষ্টি,টিনের চালে ঝুমঝুম রব। খুব কাছে থেকেও একে অপরের কথা শোনা যাচ্ছিল না।আসার পথের কড়া চকচকে রোদালো আকাশ এখন কালো কুটকুটে মেঘে ডোবা। আকাশপাতাল কাঁপিয়ে বাজ পড়ছে। চারদিকের ডালপালা ভাঙ্গার প্রয়াসে মেঘেদের সংঘর্ষ চলছে। গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ তুলে গগন কাঁদছে। এদিকে বদ্ধ কামড়ায় দুই মানব মানবী নিজেদের সামলাতে সর্বোচ্চ চালাচ্ছে।

দু'টো বালিশ,একটা নকশিকাঁথা তার মাঝে দুজন নরনারী,মাঝে ফাঁকা চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি।দুই জনের একটা বিছানা। একান্ত সময়ের জন্য‌ই বোধহয় এতটা চাপা বিছানার আয়োজন।

সম্রাট ওভাবেই শুয়ে আছে। ঘুমানোর চেষ্টা করছে কিন্তু ঘুম যে আজ হবে না তাও বুঝতে পারছে।ভেতর বাহিরে চলমান ঝড়ে সবটা লন্ডভন্ড না হলেই চলে।পারীর অবস্থাও এক‌ই।


মিনিট পেরুলো, ঘন্টা ছুঁয়ে দিলো কিন্তু তাদের ঝড় থামলো না। ঐদিকে থেমে থেমে ঝড় আরো চড়াও হচ্ছে বাইরেরটা। ঠিক এমন‌ই একটা মুহূর্তে পারী পিছনে ফিরে সম্রাটের দিকে চাইলো, সম্রাট‌ এত সময় পারীর দিকেই চেয়ে ছিলো। ঘুমানোর জন্য তো তারা আসেনি।তারা এসেছিল নিজেদের মধ্যে সময় কাটাতে যেটা সম্রাটের ভাষ্যে গল্প করা।


সম্রাটের চাহনি ঘোর লাগানো যা পারীকে আচ্ছন্ন করে দিলো।পারী দু ইঞ্চি বোধহয় আগালো,দু ইঞ্চি এগিয়ে সম্রাটকে দুরত্ব শেষ করার আহ্বান দিল না কি! সম্রাট পারীক টেনে নিজের বুকের উপর ফেললো। ততক্ষণে ক্লিভেজ আঁকড়ে থাকা পারীর হিজাব গিয়ে সম্রাটের মুখে পড়লো।সম্রাট সেটা সরিয়ে মন ভরে ,নেশাক্ত চাহনিতে পারীকে পরখ নয় দৃষ্টি দিয়েই সর্বস্ব ছুঁয়ে দিতে থাকলো যেই ছোঁয়া পারীর কায়ামন দেহে বিছিয়ে দিলো এক অপ্রতিভ সুখের হাহাকার।পারী নিজেকে মেলে দিলো সবটা দিয়ে যা উপভোগ করলো সম্রাট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।


১৪


সেদিন তাদের ঘুম ভাঙ্গে মাগরিবের খানিকটা আগে,তখন চারদিক শান্ত।তবে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিল।পারীকে শক্ত করে জড়িয়ে নিজের বুকের উপর রেখেই ঘুমিয়ে ছিলো সম্রাট।চোখ মেলে পারী সবার আগে সম্রাটের লোমশ ফর্সা বুকটা দেখতে পায়। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে শব্দহীন ভাবে ঐ শক্ত বাঁধন খুলে নিজেকে মুক্ত করে।ধীর পায়ে হেঁটে বাথরুমে ঢুকে যায়।পারী যখন নিজেকে সম্রাটের বুক থেকে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করছিলো তখন‌ই সম্রাটের ঘুম ভেঙ্গে যায় কিন্তু পারী লজ্জা পাবে দেখে চোখ মেলেনি।পারী বাথরুম থেকে বের হতেই সম্রাট চোখ মেলে, ঠোঁট এলিয়ে তৃপ্তিময় হাসি দেয়,যেটাতে ছিলো বহুদিনের আকাঙ্ক্ষিত কিছু পাওয়ার তৃপ্তি। দীর্ঘ জীবনের এক তৃষ্ণা নিবারণের খুশি।


বাথরুমের আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো পারী। ভীষণ জ্বালিয়েছে এই কয়েক ঘণ্টা লোকটা। ক্লিভেজের খাদটায় লাল রক্ত জমে গিয়েছে জাঁদরেল লোকটার কামড়ে, ভয়ংকর কামড় আর চুম্বনের চিহৃ প্রতিটি নরম অংশে।যা এখনো স্পষ্ট ফুটে রয়েছে। পানি দিয়ে হাত মুখ ভিজিয়ে ভালো করে অতঃপর ওড়না দিয়ে গাঁ'টা হালকা মুছে খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে থাকলো, সঙ্গে কল্পনা করছে কয়েক ঘন্টার এই রোমাঞ্চকর মুহূর্ত।যা এখন বিবাহিত নারীর একজন স্ত্রীর জীবনের অন্যতম চাওয়া, পরম সুখের পাওনা।


“ পারী জান, তাড়াতাড়ি বের হ‌ও। মাগরিবের মধ্যে র‌ওনা দিতে হবে। দুপুরে খাওয়াও হয়নি।"


বাইরে থেকে সম্রাটের তাড়া,পারী চট করে দরজার দিকে ফিরে তাকালো। আবারও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিজেকে দেখলো,সব ঠিকঠাক আছে কি-না? দরজা খুলে বের হতে গিয়েও বের হলো না।দরজা খোলার শব্দে সম্রাট খানিকটা বাথরুমের দিকে এগুলো।সে এর মধ্যেই প্যান্ট পরে নিয়েছে।পারীকে বের হতে না দেখে মুচকি হাসলো,মনে মনে বললো,


“ এখন‌ও এই মেয়ে লজ্জায় মরে যাচ্ছে!

_ ওকে আমিই আসছি,তোমাকে বের হতে হবে না।"


বলে দরজা ঠেলে সম্রাট ভেতরে ঢুকতেই পারী সম্রাটের বুকে হাত রেখে বাঁধা দিয়ে বললো,


“ এ্যাই না না আমি বের হচ্ছি তো।এই যে..."


“ একা বের হবার দরকার নেই, একসঙ্গেই বের হ‌ই।এর ফাঁকে আরেকটু সময় না হয়.."


“ না না প্লিজ দেরি হয়ে যাবে।"


“ একটু একটু একটু জাস্ট এই যে একটু.."


“ না না, একটুও না।"


দু'জন খুনসুটি করছে এর মধ্যেই সম্রাট পারীকে বাথরুমের দরজায় চেপে ধরে,পারীর চাহনি থমকে যায় সম্রাটের ঠোঁটে যেখানে তার কামড়ের ছাপ এখনো স্পষ্ট ফুটে রয়েছে। সম্রাটের দৃষ্টি‌ও থমকায় পারীর রক্ত জমে থাকা ঠোঁটে। ঢোঁক গিলে সম্রাট, আবারও ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় পারীর রক্তাভ ঠোঁটের মাঝে। নিজের দু দুটোর মাঝে পারীর নরম কোমল ছোট ঠোঁট জোড়া আগলে নিয়ে পরম সুখে ডুবে যায়।তার সঙ্গে আবারও নিজের লাগামহীন হাতের কারিশমায় পারীকে উতলা করে তুলে।


“ ঐ মামা উঠবেন না।রাইত হ‌ইয়া যাইতাছে তো!"


বাইরে থেকে দরজায় করাঘাত, বারবার হাঁক ছেড়ে ডাকছে।সম্রাট ছেঁড়ে দেয় পারীকে।পারীও, দু'জন‌ই খুব দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে।একটু সময় কাটতেই পারী চোখ বুজে বাথরুম থেকে বেরিয়ে যায়। সম্রাট মুচকি হেসে নিজের ঠোঁট হাত বুলিয়ে আয়নায় তাকায়।লোমশ ফর্সা বুকটার মাঝে এক পরম সুখ অনুভব হচ্ছে।যেন বহুদিনের চলমান জলোচ্ছ্বাস থেমে গিয়ে পৃথিবীতে স্নিগ্ধ শান্তি নেমে এসেছে।সম্রাট আরেকটু এগুলো। আয়নার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে খেয়াল করলো,বুকের বাম পাশে কত বড় একটা দাগ হয়ে আছে, ঘাড়ের উপরেও।দাগ গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে হাসলো।


“ ধন্যবাদ প্রেয়সী, বহুদিনের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য।"


চট জলদি চোখে পানি দিলো,বাকী সব কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেলো।পারী ততক্ষণে হিজাব বেঁধে নিয়েছে। সম্রাট শার্ট গায়ে জড়াতে জড়াতে বললো,


“ এখানেই খাবে নাকি বাইরে গিয়ে?"


“ যেখানে ভালো হয়।"


পারী দৃষ্টি নিচে রেখেই উত্তর দিলো। সম্রাট‌ও পারীকে আর জ্বালাতে চাইছে না।তাই বিশেষ ভঙ্গিমা না করে বললো,


“ চলো দেখি কি অবস্থা!"


রিসোর্ট ক্যান্টিনে খিচুড়ির আয়োজন রয়েছে, বৃষ্টি দেখেই নাকি এই আয়োজন করা হয়েছে।ইলিশ নেই তবে রুই মাছ ভাজার সঙ্গে বেগুন,ডিম ভাজা দিয়ে তিন পদের ভর্তা থাকবে খিচুড়ি প্লেটে।সম্রাট পারী তাই নিলো।ভর পেট খেয়ে সব রকম বি মিটিয়ে বেরিয়ে পড়ে।যখন বের হচ্ছিল তখন বৃষ্টি ছিলো না। একদমই শান্ত এবং স্থির।তবে কিশোর কারাগারের কাছাকাছি আসতে আসতেই আবারও শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি, সঙ্গে বাতাস। ঠিক তখন‌ই পুরো রাস্তা জুড়ে লেগে যায় জ্যাম যা তাদের সেদিন প্রায় দেড় ঘন্টার মতো শুধু এখানেই আঁটকে রেখেছিলো।


“ ঐ বাইক,কি মামা উল্টা পথে আহেন ক্যা?"


কারো উচ্চ স্বরের চেঁচামেচিতে পারী বর্তমানে ফিরে আসে।চমকে উঠে চারপাশে দেখতে থাকলো,তার পাশের সেই ক্যাটক্যাটা মহিলা কখন নেমে গিয়েছে সে টের‌ই পায়নি। বরং এখানে এখন একজন তরুণী বসা এবং তারা অনেক দূরে এগিয়ে এসেছে।প্রায় বোর্ড বাজারের কাছাকাছি, এখানে একটা মালবাহী লরি পাশ কেটে যাওয়ার সময় উল্টোগামী বাইকারকে কথাটি বলে।

সুখ মায়ের বুকে মুখ রেখে এলোমেলো হাত পা ছড়িয়ে ঘুম।মেয়েকে শক্ত করে ধরে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলো, তাদের স্টপেজ চলে এসেছে বলে,তাকে নামতে হবে।


সম্রাট সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে মাত্র ঘরে ঢুকলো।খালি একটা ফ্ল্যাট,তার চেয়েও বেশি খালি তার অন্তর।খা খা একটা শূন্য প্রান্তর।যেখায় এক গহীন নিঃসঙ্গতা।ফ্ল্যাটে ঢুকে বিরবির করতে থাকলো,


“ পারীজাত,জান একটু এদিকে আসো না।দেখো না ঘাড়টা ভীষণ জ্বালাচ্ছে, তোমার জাদুকরি ছোঁয়াটা একটু দিবে প্লিজ!"


“ দিয়ে দিচ্ছি।"


সম্রাট পারীকে ডাকে, বারবার, হাজারবার লক্ষ্য সহস্রাধিক বার ডাকে কিন্তু পারীজাতের তরফ থেকে কখনোই কোন সাড়া আসে না। বরং যা আসে তাই সম্রাটের বুক চিঁড়ে হাহাকার,এক বিশাল পৃথিবীর ন্যায় হাহাকার।পারীর এই বুকে ঝাঁপিয়ে না পড়ার হাহাকার,মহাকারিগর তাকে বিচ্ছেদ মাখা জলরাশি দেয় কিন্তু পারীকে বুকে পাওয়ার সুখ দেয় না। কিন্তু এখন কে এই ডাকে সাড়া দিলো?


সম্রাট দৃষ্টি ঘোরায়, চোখের সামনে ভেসে উঠা মুখটা দেখে মুহূর্তে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় জ্বলে উঠলো। অগ্নিগিরির লাভায় পরিণত হলো।তার ঘাড়ে রাখা কোমল হাতটা ধরে ছুঁড়ে মারলো দূরে যার কারণে হোয়াইট মসলিন জড়ানো অতি ফর্সা চোখ ধাঁধানো রমনী তানহা গিয়ে পড়লো ড্রয়িং রুমের দেওয়ালে।


“ ইয়্যু স্লাট হাও ডেয়ার টু টাচ মি?"


“ স্বামীকে ছুবো তাতে সাহসের কি দরকার আছে?"


তানহার কথায় সম্রাট হাসলো, তাচ্ছিল্যের হাসি সেটা।তাতে তানহা অপমানিত বোধ করলো, তাতে কি? কিছু পেতে হলে যে কিছু হারাতে হয়তা তার তো জানা, সবচেয়ে বড় কথা চেয়ে পায়নি এমন কিছু তো নেই।তার চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাওয়ার হিসাব বরাবরই চমৎকার,তবে এক্ষেত্রে খানিকটা জটিলতা থাকলেও একদিন পাবে‌ই। কতদিন আর এড়িয়ে যাবে। একদিন না একদিন তো ধরা দিবেই, পুরুষ বলে কথা।


তানহা এগিয়ে এলো,সম্রাট কপালে হাত চেপে বিতলা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখেই বললো,


“ তুমি সবসময় জানতে চাও না পারী আর তোমার মাঝে পার্থক্য কিসে? এই যে এখানেই পার্থক্য! তোমাকে যেই শব্দ উচ্চারণ করে ডাকি তা শুনেও তুমি কীটের মতো আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করো,অথচ এর উচ্চারণ হতেই পারী আমার ত্রিসীমানা থেকে নিজের ছায়াটাকেও সরিয়ে নিতো।ওর প্রখর আত্নসম্মান রয়েছে যা তোর নেই।থু; তুই নারী জাতীর কলঙ্ক,তোর মতো নারীদের কুকুররাও ফিরে তাকায় না।!


একদলা থুথু তানহার মুখে ছুড়ে মারলো, দরজার কপাটে বীভৎস থাবড়া দিয়ে সেটা সরিয়ে আবারও বেরিয়ে গেলো।তানহা থমথমে মুখে কাঁপতে থাকা কপাটের পানে চেয়ে র‌ইলো।আজ কতগুলো বছর ধরে এক‌ই যুদ্ধ করে চলছে সে।কেন? নিজের ভালোবাসাকে নিজের করে পেতে,এর জন্য কি না সহ্য করছে সে?

প্রতিনিয়ত অপমান আর অবহেলা,এমন কোন নোংরা শব্দ নেই যা সম্রাট তার জন্য ব্যবহার করেনি।তানহার কান্নারা জেদে পরিবর্তন হলো,পাপড়ি ভেজা চোখ জোড়া মুছে নিলো।বিরবির করে বললো,


“ যেমন করে তোমার পারীকে তোমার জীবন থেকে সরিয়েছি ঠিক তেমন করেই তোমাকে আমার কাছে আনবো।আমিও দেখবো কিভাবে আর কতদিন দূরে সরে থাকো। তোমাকে তানহা মন্ডলের হতেই হবে।হতে হবে মানে হতে হবেই।"


নিজের সাথে ওয়াদা করে গটগট করে বেরিয়ে এলো ফ্ল্যাট থেকে। উদ্দেশ্য নিজের পিতার বাড়িতে।


সম্রাটের ফোন বেজে চলছে অনবরত,সকালে বাপ্পীর ফোন কলে জানতে পেরেছিল মা অসুস্থ,তাকে দেখতে চায়।তখন সে যায়নি কারণ সে জানতো আবারও বাবা মায়ের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল এর শিকার হতে হবে। ঠিক তাই!

সে যায়নি বলে ঠিক চলে এসেছে। কিন্তু তাতে কি?

সম্রাট বেশ কয়েকবার ফোনটার রিং বাজাকে এড়িয়ে চললো কিন্তু তারপরেও যখন কল দেওয়া বন্ধ হয়নি তখন বাধ্য হলো তুলতে। নাম্বারটা বেশ চেনা। শাহবাগ থানা থেকে ফোনটা এসেছে।


“ আসসালামু আলাইকুম!এনি আপডেট?"


ওপার থেকে কিছু একটা বললো। সম্রাটের চোখের মনি চকচক করতে থাকলো।সে ফোনে থাকা ব্যক্তিকে আসছি বলে কল কেটে দ্রুত বাইকে চড়ে বসলো।


শাহবাগ থানার এসআই মোহাম্মদ নাসিম একটা আইডি কার্ড উল্টেপাল্টে দেখছে। বহুদিনের ঝুলে থাকা একটা কেইসের সুরাহা মেলানোর চেষ্টা আর কি।একটা নিখোঁজ কেইস, যেন ভিকটিম মাটির তলে ঢুকে পড়েছে।পুরো শহর,দেশ চিরুনি তল্লাশি চালিয়েও যাকে পাওয়া যাচ্ছে না তার আইডি কার্ড মিললো পিজি হাসপাতালের সামনে! কি আশ্চর্য? তবে কি ভিকটিম দৃষ্টির পাশেই নাকি অন্য কারো দ্বারা বাহিত এটা!


“ এক্সকিউজ মি,এস‌আই নাসির আছেন?"


“ উনাকে আসতে দিন টুটুল সাহেব!"


সম্রাটের কন্ঠস্বর শুনে এস‌আই নাসির অধীনস্থ হাবিলদার টুটুলকে আদেশ করলে টুটুল সম্রাটকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়।


“ আসসালামু আলাইকুম,বসেন।"


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,এনি আপডেট প্লিজ !"


সম্রাটের কন্ঠ কাঁপছে ,এস‌আই দেখছে একজন পুরুষের ভেতর পোড়া হাহাকার।কেউ নিজের স্ত্রীকে এতটাও ভালোবাসতে পারে তা উনি এই প্রায় বদ্ধ উন্মাদ লোকটাকে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতো না।তিনি বেশি সময় নিলেন না।ড্রয়ার খুলে আইডি কার্ডটা টেবিল এর উপর রাখলেন, সম্রাট ভ্রু কুঁচকে উনার দিকে তাকিয়ে আছে,


“ এটা দেখুন তো,এটা আপনার নিখোঁজ স্ত্রীর কি-না?"


সম্রাট টেবিল থেকে তুলে নিয়ে চোখের সামনে ধরতেই চমকালো।ছলছল চোখে চেয়ে বুকের উপর চেপে ধরল,


“ আমার পারীজাত।"


“ তার মানে আমি সঠিক,এটা আপনার মিসিং ওয়াইফের‌ই কিন্তু মিস্টার সম্রাট একটা কথা বলুন তো,উনার কার্ডটা এতদিন পর কোথায় থেকে এলো? মানে কিভাবে এলো? কি আশ্চর্যের বিষয়?"


“ কোথায় পেয়েছেন?"


“ পেয়েছি বলতে একজন রিকশাচালক দিয়ে গেলেন।তিনি বললেন এটা নাকি পিজি হাসপাতালের সামনে থেকে পেয়েছেন! সুনাগরিক হিসেবে এটা সঠিক হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেই থানা অব্দি এলেন এই যা।তবে আমি ভাবছি!"


“ পিজি হাসপাতাল? পিজি হাসপাতালে কেন? কি হয়েছে?"


“ কার কি হয়েছে?"


“ আচ্ছা হাসপাতালের সিসিটিভি চেইক করি যায় তো! আউটডোরের আশেপাশে নিশ্চয়ই সিসিটিভি আছে!"


“ হ্যা আছে, কিন্তু তাতে কি বিশেষ সুবিধা হবে?না মানে এটা ঠিক হসপিটাল গেইটে না, খানিকটা মানে এপাড়ে পাওয়া গিয়েছে। জাদুঘরের পিছনের গেইটের দিক।"


“ তাও , একবার অন্তত চেষ্টা করি আমরা!"


এই কেইসের জন্য বহু পয়সা পায়, যদিও ঠিকঠাক কোন তথ্য নাই।তাই কোন সুরাহাই হয় না পরন্তু এই লোকের সেকেন্ড ওয়াইফের থেকে পয়সা নেওয়ার কারণে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে কাজটাও করা হয় না।যাক কি আর করা। একজন পাগল প্রেমিক, বদ্ধ উন্মাদ স্বামীর সঙ্গে দায়িত্ব পালনে সঙ্গে সেও একজন সু কামলার ভূমিকায় অভিনয় করতেই তাকে এর সঙ্গে তাল মেলাতে হয়।তাই এবার‌ও তার মিলিয়ে বললো,


“ চলুন তবে। গিয়ে দেখি আপনার কতটা উপকার করতে পারি।"


জাদুঘর গেইট থেকে চৌরাস্তার মোড়,স্টপেজ পুরোটা দেখা হলো। সারাদিনের ভিডিয়ো।এর মধ্যে নানারকম দৃশ্য চোখে পড়লো।কোথাও কোথাও থেমে থেমে জটলা,ছিনছাইয়ের কেইস,রিক্সাওয়ালাদের দ্বন্দ্ব, পেসেঞ্জার বাস‌ওয়ালা তর্ক বিতর্ক, বিভিন্ন পেসেন্ট নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে এর মধ্যেই দেখা গেল একটা মহিলা ঐদিকে মুখ ফেরানো সে একটা বাচ্চা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই রাস্তায় পড়ে গেল এর কিছুক্ষণ পর কিছু লোক আর ওয়ার্ডবয়রা ধরাধরি করে স্ট্রেচারে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। কিন্তু কারোই মুখ ঠিকঠাক বোঝা যাচ্ছে না।বিশ্ব সাহিত্যের অত উঁচু বিল্ডিং এর মাথায় থাকা ক্যামেরা ফুটেজ এগুলো, তারপর হাসপাতাল বিল্ডিং, মেডিসিন শপের বিল্ডিং সহ সড়কের অকেজো কেজো বিল্ডিং এর ফুটেজ। প্রায় ঘন্টা তিনেক লাগিয়ে দেখার পরেও তারা কোন সন্ধান পেলো না। অবশেষে সম্রাট আবারও এক বুক শূণ্যতার হাহাকার আর ব্যর্থতা নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেল সঙ্গে মনে মনে নিয়ত করলো যদি তানহাকে গিয়ে আবারো ফ্ল্যাটে পায় তবে এবার সত্যিই বালিশ চাপা দিয়ে মেরে আবারও জেলে যাবে।


১৫


বর্তমান ,

সম্রাট পারির জীবন যার যার গতি ধারায় চলছে , পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেও জীবনের নিষ্ঠুর সত্তা থেকে বাঁচা যায়না। তেমনি সম্রাটও পারেনা নিজের সাথে হওয়া অন্যায়কে ভুলে তাদেরকে ক্ষমা করতে যে বা যারা তার সাথে অন্যায় করেছে,যাদের জন্য আজ তার এই যাযাবর জীবন।

পৃথিবীতে একজন মানুষের সব চেয়ে আপন হয় মা বাবা,সেই মা বাবাই যখন কারো জীবনের জন্য কাল হয়ে ধারায় তবে সে যাবে কোথায়?একজন মানুষ বোধহয় এভাবেই জিন্দা লাশ হয়ে যায় ।

আজ চারদিন হল সম্রাটের কাছে খবর এসেছে তানহার বাবা এম্পি জব্বার মন্ডল বাড়ী বয়ে এসে তার মা বাবাকে শাসিয়ে গিয়েছে। যদি সম্রাট তাদের মেয়েকে নিয়ে স্বাভাবিক সংসার শুরু না করে তবে তিনি আবারও সম্রাটকে জেলে পুড়বে ,সঙ্গে মিস্টার মাহমুদের অহমিকার তাসের ঘরকে গুঁড়িয়ে দিবে ।। কথাটা ভাবতেই সম্রাটের হাসি পেল। সম্রাট তো এটাই চায় ।। সে যতটা সম্ভব তানহার থেকে দূরে থাকতে পারলেই বাচে । সুতরাং তার জেল বন্ধি জীবনই তাকে তানহা নামক আপদ থেকে দূরে রাখতে পারে, তাকে আমৃত্যু পারির হয়ে বাচতে হবে যার জন্য তাকে অইসব করতে হবে যা করলে পৃথিবীর আর কোন নারী তার আর তার পারির মাঝে আসার দুঃসাহস করবে না ,তাই সে জব্বার মন্ডলের হুমকিকে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে যেটার কারনে এখন তার মা আবারও হসপিটালাইজড তিনি অবশ্য সম্রাটকে তানহার জালে ফাসাতে এমন অসুস্থ প্রায়সই হয়,তাই মায়ের অসুস্থতা সম্রাটকে এখন বিচলিত করেনা খুব একটা কিন্তু দিনশেষে মা’ইতো তাই মুখ ফিরিয়েও থাকা যায়না তবে তানহা যদি আবারও বাড়াবাড়ি করে তবে! এবার সবচেয়ে সহজ হবে তানহার দমটা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া এতে দুটো বিষয় সহজ হবে, এক তানহার নোংরামো থেকে বাচা, দুই তার মা বাবার লোভের শাস্তি দেখতে পাওয়া।। যদিও সন্তান হিসেবে এই চাওয়াটা ভীষণ অন্যায় কিন্তু কিছু সময় ন্যায় অন্যায়ের ভেদাভেদ সম্পরক দেখে নির্ণয় করাটাও অন্যায়,অন্ত্যত নিজের সাথে। আর এখানে তো তাদের জন্য দুটো কতগুলো জীবন নষ্ট হলো।

সম্রাট এর ভাবনা আজকাল ফুরায়না, যেন সে ভাবনার মাঝেই বসবাস করে সুখ খুজে পায়,কিন্তু তার সুখের ফড়িং অজানায় হারিয়ে গিয়েছে তার কিভাবে সন্ধান করবে সম্রাট নামক চাতক পাখি!

বাইকে বসে যখন সে এসব ভাবছিল তখনি তার মুঠোফোনটা বেজে ঊঠলো , পকেট হাতড়ে বের করে দেখল ক্লাবের নাম্বার। ক্লাবের সঙ্ঘে তার লেনদেন তো কবেই চুকে গিয়েছে অথচ এখনও তাকে ছাড়া তারা কোন সিদ্ধান্ত নিতে চায়না। সম্রাট জানে তারা তাকে ভালবেসেই এসব করে কিন্তু সম্রাটের যে এখন এসব ভাল লাগে না।

পরপর তিনবার রিং ভাজলো , শেষ টা শেষ মুহূর্তে গিয়ে রিসিভ করে কানে ধরতেই এক কিশোরের কন্ঠসবরে ভেসে আসলো,


“ আসসালামু আলাইকুম ভাই,কেমন আছেন?”


‘ ওয়ালাইকুম আসসালাম,আলহামদুলিল্লাহ!তুই?’’


“ জি ভাই আলহামদুলিললাহ। ভাই ঠিক তিন্টায় মিটিং , তাহসিন ভাই আপনারে অবশ্যই থাকতে বলছে। ”


“ সাবির শোন , তাহসিন ভাইকে বল আমি বিজি , অন্যদিন …


“ ভাই আসেন না অনেক দিন দেখিনা আপনারে। তাছাড়াও আপনি ছাড়া মিটিং জমেনা। ”


আঠারো বছরের বাচ্চা একটা ছেলে , কী আকুতি নিয়ে তাকে বারবার স্মরণ করে । সম্রাট বাচচা ছেলেটাকে নিরাশ করলো না । সে গম্ভীর স্বরে নিশ্চিত করলো যে সে যাচ্ছে,


“ ওকে , চেষ্টা করছি।”


সাবির নামের ছেলেটার কল শেষ করে কিছু একটা ভাবল অতঃপর একটা নাম্বার তুলে কল দিল ।


“ হ্যালো , আসসালামু আলাইকুম, শোন তুমি ঐদিকটা দেখ আমি আজ বোধোহয় আসতে পারবনা । ”

“ ………”

“ ওকে। ”


হস্পিটালে মায়ের জন্য লোক নিয়োগ দিয়ে সে চলল নিজের রাজ্যে। ক্লাবের সামনের গেইটের ডিজাইন পরিবর্তন করা হলেও তার চারিদিকে ফুলের সমাহার আগের মতই , সদর গেইটে পা দিতেই তার দৃষ্টিকোণে জলছাপের ন্যায় ভেসে উঠলো স্মৃতিরা , সময়টা প্রায় ছয় বছর আগের , যখন তার চারিপাশে পারি নামক এক পরী।

ঠিক এখানে দাড়িয়েই তাদের কত গল্প গাথা হতো। সম্রাটের বুক কাঁপছে ,নিজের ডান হাতটা তুলে বুকের বা পাশে রাখলো , তার হার্ট বিট দ্রুত গতিতে চলছে । যেন তা যে কোনো সময় বের হয়ে আসবে । সম্রাট অনুভব করছে তার পা কাপছে, যেকোন সময় সে তার ব্যালেন্সড হারাতে পারে । হাত বাড়িয়ে বাগান বিলাসের জায়গা দখল করা জারুল গাছের চিকন ডালটা আকড়ে ধরলো। ঠিক সেই সময়েই নতুন একটা ছেলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পথে পরিচিত মুখ দেখে থেমে গেল ,


“ ভাই, আপনি সম্রাট ভাই না’’


সম্রাট চোখ তুলে তাকালো,চোখের পলক ফেলে সম্মতি সূচক উত্তর দিল।


“ ভাই,আপনি কি অসুস্থ? কেমন দেখাচ্ছে!”


“ না, ঠিক আছি। তুমি?”


ছেলেটা নতুন। এর আগে দেখেনি। অবশ্য দেখবে কি করে সে নিজেই তো কতদিন পর,দিন না অবশ্য বছর পর আসলো। সে ক্ষেত্রে তার কাউকে না চেনাটাই স্বাভাবিক তবে তাকে কিভাবে চিনলো?


“ ফারাবি ভাই,নিউ মেম্বার। আপনার সাথে আগে কখনো দেখা হয়নি,তবে অনেক ইচ্ছা ছিলো। আল্লাহ ইচ্ছা পূরন হলো অবশেষে। ”


মাত্র দাড়ি গজাচ্ছে, ১৮/১৯ বছরের তরুন হবে বোধহয় । ফ্যান্টাসিতে ভোগার বয়স , তাই এমন উত্তেজনা স্বাভাবিক। সম্রাট হাল্কা হাসলো,ছেলেটা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,


“ ভাই I think you fell sick , may I help you?”


“ Not necessary. তাহসিন আছে?”


“ আমি বাইরে যাওয়ার আগে দেখে গিয়েছিলাম ভাই,এখন আছে কিন…।


“ Dude তুমি এখানে কি করছো? ’’


তাহসিন খানিকটা দৌড়ে এদিকে এলো, সম্রাট নিজেকে ধাতস্ত্ব করলো,স্বাভাবিক ভাবে দাড়িয়ে সালাম দিলো,


“ আসসালামু আলাইকুম , কি অবস্থা? কেমন আছেন তাহসিন ভাই? ’’


তাহসিন সম্রাটের দুষ্টমিতে হেসে দিয়ে সম্রাটের বাহুতে হাল্কা জোরে আঘাত করে বললো,


“ ফোন তুলিস না কেন? ”


“ না তুললে এখানে কিভাবে দাড়িয়ে আছি?”


তাহসিন সম্রাটের শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখছে চুপচাপ,ফর্সা !লাল ফর্সা একটা মুখ,অদ্ভুত আকর্ষনীয় চেহারার গড়ন,মেয়েদের মতো করে বললে ভয়ানক সুন্দর একজোড়া চোখ,৫.১১ ইঞ্চির লম্বা দেহের চওড়া কাধ,চওড়া সুঠাম শক্তপোক্ত সিনা, পেটা পেট,নিয়মিত যোগব্যায়াম আর শারিরীক কসরতের কারনে কোনদিন এক বিন্দু মেদ জমেনি।মেয়েদের চেয়েও বেশি ফ্যাশনেবল,সচেতন,তাহসিনের মনে পরেনা এর আগে কোনদিন সম্রাটের মুখে কোন দাগ দেখেছে কিনা? সিল্ক চুলগুলো এতটা অগোছালো কখনো ছিলো!শার্টের কুচকানো হালই জানান দেয় এই সম্রাট আর সেই সম্রাট এক নয়! উপস্থিত সকলের অগোচরে তাহসিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। আনমনা মনেই বললো,


“ ভালোবাসার শাস্তি এতটা ক্ষত করে ,যেন জিন্দা লাশে পরিনত করে।”


“ বিরবির করে কি বলছিস? ”


সম্রাটের প্রশ্নে চমকে গেল তাহসিন।


“ ভাবছি!”


“ কি?”


“ তোর কথা!”


“ আমাকে নিয়ে আবার তুই কি ভাবছিস?”


“ এভাবে কতদিন? এভাবে কেউ বাচেনা দোস্ত,এভাবে বাচা যায় না। তোকে বাচতে হবে তো । অন্তত পারির খোঁজ পেতে হলেও তো একটা সুস্থ জীবন থাকা দরকার,কিন্তু তোর লাইফস্টাইল তো কোন ভাবেই বাচার মতো না । আচ্ছা একটা কথা বল, হুট করেই যদি কখনো পারি ফিরে আসে আর এসে তোর এই হাল দেখে তবে ওকে কী জবাব দিবি বলতো?”

তাহসিনের কথা শেষ হলো,সম্রাটের বুক ফুড়ে বেড়িয়ে এলো সেই শূণ্যতার হাহাকার যা তার ভালো থাকার,বেচে থাকার স্পৃহা শেষ করে দিয়েছে সেদিনই যেদিন থেকে বুকের বা পাশটা বিরানভূমিতে পরিনত হয়েছে সেথায় বাস করা নারীটির হারিয়ে যাওয়ায়।


সম্রাট ক্লাবের ভেতরে ঢুকলো না। বাইরে ,তাদের সেই খেলার মাঠে গিয়ে বসলো। তাহসিন ফারাবি নামের ছেলেটাকে বললো,


“ দুটো ঠাণ্ডা নিয়ে আয় তো !”


ফারাবি আদেশ পেতে দেরি হলেও দৌড় দিতে দেরি করলো না।

সম্রাট বাগানে পেতে রাখা বেঞ্চে গিয়ে বসলো। চারিদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখছে , সবকিছু ছাপিয়ে তার চোখে ভাসছে তার আর পারির সেই মুহুর্তগুলো।


অতীত ……………


সম্রাটের জীবনে বর্তমানে বন্ধুত্ব শব্দটা মাছের কাটার ন্যায় ঠেকছে।না পারছে তুলে ফেলতে আর না পারছে তা গিলে ফেলে গলাকে মুক্ত করতে। কেমন বিষের ন্যায় লাগছে। বাপ্পী বিছানায় আধ শোয়া হয়ে বন্ধুর ছটফটানি দেখছে। তার নিজেরই অসহ্য লাগছে। একটা মেয়ে নিয়ে বন্ধুদের মাঝে লাগবে এখন, যা কারো কাছে মোটেই কাম্য নয়।

“ আচ্ছা এখন ছটফট না করে বস, মেজাজ গরম হচ্ছে। ”

বাপ্পী সম্রাটকে শুকনো ধমক দিয়ে বালিশটা সম্রাটের পিঠে ছুড়ে মারলো। সম্রাট বালিশটা তুলে নিয়ে বাপ্পীর মুখে ছুড়ে মেরে একটু সময় কিছু একটা ভাবলো অতঃপর একরকম দৌড়ে গিয়ে বাপ্পীর উপর চড়ে বসল ,


“ তুই কার পক্ষে সত্যি করে বল নয়তো ……”


সম্রাট বাপ্পীর মুখের উপর বালিশ চাঁপা দিয়ে ধরলো,বাপ্পী নিরুদ্ধেগ হয়ে ওভাবেই থাকলো,মিনিট এক পর বালিশ সরিয়ে বাপ্পীর পাশেই টানটান হয়ে শুয়ে বললো,


“ কি করবো? কিভাবে হ্যান্ডেল করবো সবটা!”


“ সরাসরি প্রপোজ কর!”


“যদি রিজেক্ট করে দেয়?”


“ তাহলে ছেড়ে দিবি, এখন একটা মেয়ে নিয়ে বন্ধুদের মাঝে খুনোখুনি করবি নাকি ?”


বাপ্পীর যুক্তিসংগত কথাও এখন সম্রাটের কাছে অনর্থক মনে হলো। ও উঠে সোজা হয়ে বসে রইল। বন্ধুর নিরবতায় ত্যক্ত হয়ে বাপ্পী উঠে বসলো ,


“ প্রপোজ কর, যদি ওর আর হৃদয় এর মাঝে কিছু থেকেও থাকে তাও জানা যাবে, আর যদি………


“ থামলি ক্যান?”


“ কোথাও কানেক্টেড না থাকলে তো তোকে রিজেক্ট করার কারন নেই তাই না!”


১৬

বাপ্পীর পরামর্শ ভালো লাগলো,যা বলার স্পষ্ট বলবে। তাছাড়াও এভাবে লুকোচুরির ভালোবাসা আর কতদিন? পারিকে ইশারা ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা বহু করেছে কিন্তু অবুঝ বোকা নারী যেন বুঝেও বুঝে না।এই যে সম্রাট,সব কিছু ফেলে রেখে সকাল সন্ধ্যা তার পিছু পিছু ছুটে তার কারণ কি বুঝে না?
সেদিনের কথাই তো.... সম্রাটের এক ব্যাচমেট,মেয়ে! দীর্ঘদিন পর কানাডা থেকে দেশে এসেছে সামার ভ্যাকেশনে,এসেই আবদার করলো সম্রাট যেন তাকে সময় দেয়।
খানিকটা ঘোরাঘুরি করবে, টুকিটাকি প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করবে।তার অনুরোধ রক্ষার্থেই সম্রাটকে তাকে নিয়ে এদিক ওদিক যতসব মার্কেট আর মেয়েলি দোকানে ঘুরঘুর করতে হচ্ছিলো ঠিক সেই সময়ে, পারি আর তার দল মিলে গাউছিয়া মার্কেটের সামনের ফুটে দাঁড়িয়ে কিছু নিয়ে দরদাম বলাবাহুল্য এরকম বাকবিতন্ডা করেছিল সম্রাট নিজের সঙ্গে থাকা মেয়েটার কথা বেমালুম ভুলে পারির সঙ্গে থাকলো,তার থেকে প্রায় চার ঘন্টা সে পারি আর দলকে নিয়ে তাদের কেনাকাটায় সহযোগিতা করেছিল।

যখন সম্রাট নিজ বান্ধবীকে নিয়ে চাঁদনি চক পেরিয়ে গাউছিয়া হালিমের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু নিয়ে আলোচনা করছিল তখন‌ই তা চোখ আটকায় ঢাকা সু এর সামনে দাঁড়িয়ে পারি ও তার দলের ঐ বাকবিতন্ডার দৃশ্য এরপর...

“ তুই একটু এখানে দাঁড়া আমি আসছি..জাস্ট টু মিনিট!"

“ কোথায় যাচ্ছো সম্রাট?"

“ ওয়েট...!"

সম্রাট পারিদের দিকে এগিয়ে গেলো,

“ গার্লস!কি নিয়ে যুদ্ধ হচ্ছে?"

পরিচিতি কন্ঠে সবাই পিছু ফিরতেই সম্রাটকে দেখতে পায়।পারি চমকায়। সঙ্গে মেহরিন তবে নিশি না।তার কেন জানি সম্রাটকে দেখলেই কলিজা ফুলেফেঁপে ঢোল হয়ে যায়।সে অদম্য সাহস খুঁজে পায় নিজের ছটাকখানি আত্নায়। একটু আহ্লাদি নিশি, সম্রাটকে এই অল্প দিনেই বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করা শুরু করে দিয়েছে সঙ্গে সুযোগ পেলেই আবদার আর আহ্লাদ দেখাতে ভুলে না। তাছাড়াও সে অনুমান করছে পারির প্রতি সম্রাটের দুর্বলতা যা সে বেশ ভালো করেই ব্যবহার করতে পারবে।সে এখন তার‌ই সুযোগ নিলো,নাকটা ফুলিয়ে দোকানির নামে অভিযোগ দেওয়ার ভঙ্গিমায় বললো,

“ দেখুন না ভাইয়া,সেই কখন থেকে মামা অযথাই দাম ধরে বসে আছে!"

পারি কথা বলছে না। বরং সে মাথা নুইয়ে অযথাই দোকানের অন্য জিনিস ঘাটছে।সেও বোঝে তার প্রতি সম্রাটের চাহনির রঙটা! তবে? গুরুত্ব দিচ্ছে না। হয়তো চাইছে না। কিন্তু তারপরেও সম্রাটের উপস্থিতি কি তাকে অস্থির করে তুলে না? এই যে লোকটা তার একদম গা ছুঁই ছুঁই দাঁড়িয়ে আছে পাশের দোকানের ছেলেটার দৃষ্টি থেকে বাঁচাতে! পারি মুখটা ফিরিয়ে রেখেই মুচকি হাসলো কিন্তু দেখলো না তা কেউ।সম্রাট পারির দিকে চেয়ে পাশের দোকানের ছেলেটার দিকে একবার চাইলো অতঃপর চোখ রাঙানি দিয়ে নিশির দিকে ফিরে আবারও জিজ্ঞেস করলো,

“ হ্যাঁ বলো নিশি কি হয়েছে?"

“ এই যে এই দুল জোড়া আর এই তিন জোড়া চুড়ি,মামা সব মিলিয়ে আটশো বলছে,আমরা বলছি তিনশো পঞ্চাশ! এগুলা কিন্তু টিএসসিতে এমনিতেই তিনশো‌ই দাম চাইতো, আমাদের বলতে হতো না।আর মামা একটু গাউছিয়া মার্কেটের সামনে বসছে বলেই একেবারে আকাশে চড়ার মতো দাম চাইছে।তাও আমরা স্টুডেন্ট মানুষ, একটু মায়া করে পঞ্চাশ বাড়িয়ে বলেছি তাতেও মামার হচ্ছে না,সে গো ধরে বসে আছে সাড়ে ছয়শো দেওয়াই লাগবে! হলো কিছু বলেন?"

নিশি এমনভাবে অভিযোগ করছে যেন তার জমি কেউ জোরজবরদস্তি করে দখলে নিতে চাচ্ছে আর সে তাতে শালিস বসিয়েছে। সম্রাট ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো, দোকানির দিকে খানিকটা এগিয়ে যেতেই দোকানিও বাচ্চাদের মতো অভিযোগ করতে লাগলো,

“ দ্যাহেন মামা,কপাল খারাপ তাই মাইয়া মাইনসের জিনিস বেইচা পেট চালাই নাইলে মাইয়া মাইনসের লগে কাম করতাম না।কম করে হলেও এক ঘন্টা ঘাইট্টা এই এক জোড়া দুল আর তিন জোড়া চুড়ি পছন্দ করছে,তারপরেও করছে সবচেয়ে ভালো কোয়ালিটির মাল,দাম বেশি বাইর করার আগেই ক‌ইছি।তহন ধমক দিয়ে ক‌ইছে দামে সমস্যা নাই।যা কমু তাই দিয়ে নিবো।অথচ দেখেন অহন কেমন হুদাহুদি সময় নষ্ট করতাছে। কাস্টমার কম দেইখা এত কমে দিছি,নাইলে এত সময় ক‌ই একটা কাস্টমার নিয়া ব‌ইয়া থাকার।"

সম্রাট দোকানির অভিযোগ আমলে নিলো, কারণ সে এই তিন রমনীকে এতদিনে বেশ ভালো করেই বুঝতে পেরেছে তাই অসহায় দোকানির দু্ঃখ বোঝার মতো সহমর্মিতা জানিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“ বুঝতে পারলাম,এখন বলুন এগুলো কত করে রাখবেন, মানে কত হলে আপনার জন্য ঠিকঠাক!"

“ আবার আপনেও দামাদামি করবেন?"

“ দামাদামি কোথায় করছি? আমি তো আপনাকেই জিজ্ঞেস করলাম! আপনি এখন যেটা সলিড সেটা বলবেন আমাদের পুষালে নিয়ে যাবো।"

“ মামা,এইসব মিলাইয়া (আরেকটা দুল দেখিয়ে) আমি এগারো'শ বলছিলাম,তাগো লগে দামাদামি করেই এইটা (সেই দুলটা) বাদ দিয়ে আমি আটশো অবধি রাখতে পারবো বলে বলছি কিন্তু তারা এমন ছ্যাচড়ামি করতাছে যে আমি শুধু বেচার জন্য কেনা দামে বলছি তাও তারা দামাদামি করতাছে। এইরম কাস্টমার দিনে একটা পড়লেই মনে হয় ব্যাবসা ছাইড়া ভিক্ষা করি।তাও ভালো!"

শেষ কথাটা শুনে সম্রাট গলা খাঁকারি দিলো,পারি ফুঁসে উঠে বললো,

“ দেখুন মামা এখন কিন্তু আপনি আমাদের অপমান করছেন,এটা কিন্তু!"

সম্রাট আবার‌ও গলা খাঁকারি দিলো,থুতনির নিচে কন্ঠনালী চুলকে বললো,

“ আচ্ছা শান্ত হোন সবাই,মামা আপনি সব প্যাকেট করুন!"

“ কিন্তু ভাইয়া!"

মেহরিন কিছু বলার চেষ্টা করতেই সম্রাট মেহরিনকে বললো,

“ মনে করো এটা ভাইয়ার তরফ থেকে উপহার!"

বলেই হাসলো, এরপর ঐ পাশে সরিয়ে রাখা দুল জোড়ার দিকে চাইলো।তার ভীষণ মনে ধরেছে, জানতে জিজ্ঞেস করলো,

“ এটি কে পছন্দ করেছিলো?"

“ পারি ভাইয়া,ওকে ভীষণ সুন্দর লাগতো তাই না রে নিশি?"

“ হুম।"

সম্রাট দুল জোড়া হাতে তুলে নিলো, এদিকে পারি সেই দুল জোড়া সম্রাটের হাত দেখে খানিকটা মন খারাপ করলো,তার ভীষণ পছন্দ হয়েছে তবে এত দাম দিয়ে এই সামান্য জিনিস সে কিনবে না তাছাড়াও এই দোকানি তাদের এতক্ষণ অনেক কথা শুনিয়েছে,তার থেকে তো নিবেই না।সম্রাট দুল জোড়া দোকানির দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো,

“ এটাও প্যাকেট করুন!"

“ এই না না আমি এত দাম দিয়ে এসব নিবো না।ভাইয়া প্লিজ আমার জন্য অযথা.......!"

“ দেখা যাক কার জন্য...

দোকানি প্যাকেট করলো, ঠিক তখনই সম্রাটের ফ্রেন্ড মুনমুন এসে সম্রাটের উপর খানিকটা চেঁচিয়ে উঠলো,

“ এ্যাই তুমি আমাকে ঐখানে দাঁড় করিয়ে রেখে এখানে মেয়েদের মধ্যে কি করছো?"

মুনমুনের কন্ঠে কিছু ছিলো যা বোঝায় তার অধিকারের উচ্চতা।সম্রাট দুই হাত উপরে তুলে নিজের ভুল স্বীকার করে তার দুই পাশে থাকা নারীদের দেখিয়ে বললো,

“ মিট মাই জুনিয়রস,ওদের এখানে দেখে মনে হলো আসি। তাছাড়াও এরা যেখানে যায় সেখানেই ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে এখন সিনিয়র হিসেবে আমার তো উচিত এদের উদ্ধার করা তাই আর কি?"

“ এরা কি আমাদের ইউনিভার্সিটির? ইয়্যু মিন ইউনিভার্সিটির জুনিয়র!"

“ আরে না,ঐ আমাদের মহিলা কলেজের ছাত্রী এরা!"

“ তবে তোমার মানে আমাদের জুনিয়র কিভাবে হয়?"

“ হয় হয়,কোন একভাবে হয়, সেটা তুই বুঝবি না। আচ্ছা তোর কিছু পছন্দ হয় কিনা দেখনা।চল গিফট করি!"

জীবনে কোনদিন নিজের মায়ের পেটের বোনের জন্য কিছু কিনিনি সে আজ শুধু পারির সান্নিধ্যে থাকার জন্য অযথাই মেয়েলি সাজসজ্জার জিনিস কেনায় এতটা আগ্রহ দেখাচ্ছে। মুনমুন নিশির পাশে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য চুড়ি দেখছিল,তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেলো মেহরিন নিশি, কিন্তু মুনমুন পছন্দ করার জন্য সম্রাটের সহযোগিতা নিচ্ছে,সম্রাট‌ও খুব সাবলীলভাবে তাতে সহযোগিতা করছে। এদিকে এদের এই কেনাকাটার মহরমে পাশ হয়ে দাঁড়িয়ে র‌ইলো কেবলি পারি।সে মূলত মুনমুনকে দেখছে, ভীষণ সুন্দর আর আকর্ষণীয় গড়নের একজন নারী। সম্রাটের ঠিক কাঁধ পেরিয়েছে উচ্চতায়। দুজনের গাঁয়ের বর্ণ এক। চমৎকার একটা জুটি।আনমনে ভাবতেই পারির মুখটা আবার চুপসে গেলো।দোকানি আগের জিনিসগুলো প্যাকেটে ভরে সম্রাটের হাতে দিলো,তখন মুনমুন কৌতুহলী হয়ে প্যাকেটটা সম্রাটের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বললো,

“ এটাতে কি কি নিয়েছো দেখি?"

সম্রাট এক‌ইভাবে টেনে নিয়ে বললো,

“ এটা ওদের জন্য উপহার,তোমার দেখা লাগবে না। তুমি নিজের জন্য দেখো আমি গিফট করছি।"

“ চুড়ি নিবো এটা,দেখো ভালো লাগবে না!"

“ সুন্দর মানুষ যা পরে তাতেই ভালো লাগে,তা আবার বলার কি আছে?"

“ কি রসকষহীন তুমি,একটা সুন্দর মেয়ে তোমাকে সুন্দর লাগছে কি-না জিজ্ঞেস করেছে মানে হলো মেয়েটা তোমার থেকে কম্পিলিমেন্ট চাইছে, তোমাকে গুরুত্ব দিচ্ছে তার সৌন্দর্য নিয়ে দু চারটা বাক্য বলার। তুমি তাকে নিয়ে প্রশংসা করবে, ছন্দ বলবে তা না।খরুস!"

বলেই মুনমুন চুড়িগুলো হাতে ধরে দেখতে থাকলো। সম্রাট প্যাকেটটা মেহরিন নিশির সামনে ধরে বললো,

“ তোমাদের কোনটা কোনটা পছন্দ নাও!"

ওরা দুল জোড়া ছাড়া বাকী সবটাই নিলো,সম্রাট প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে শুধালো,

“ পারি চুড়ি নেয়নি?"

“ না ভাইয়া,ওকে কতবার বললাম নে নে নিলোই না।দুল জোড়া পছন্দ করেছিলো তাও দাম বেশি দেখে নিলো ‌না।কেমনটা লাগে বলেন তো!"

সম্রাট পারির দিকে ফিরে চাইলো, ঠিক তখনই পারি নিজের দৃষ্টি সরিয়ে অন্যত্র মেলে দিলো।
সম্রাট পারিকে না ঘেঁটে মুনমুনের পাশে দাঁড়িয়ে চুড়ি দেখতে থাকলো, নিজের পছন্দ অনুযায়ী দু মুঠো চুড়ি কিনলো।যা দেখে মুনমুন জিজ্ঞেস করলো,

“ এগুলো কার জন্য!"

“ কেউ আছে!"

“ কে সে? বলো?আই থিংক তুমি আমাকে গিফট করবে!"

সম্রাট মুনমুনের উত্তেজিতভাবে বলার ধরনে হাসলো, অতঃপর মুনমুনের দিকে পিঠ রেখে পারির হাত টেনে সামনে এনে দাড় করিয়ে দিলো,পারি নেত্র মেলে বড় বড় করে চেয়ে দেখলো সম্রাট আর আশেপাশের সবাইকে,সম্রাট পারির হাতে চুড়ি ঢুকিয়ে দেখলো,

“ বিউটিফুল!"

বলেই দোকানিকে বললো,

“ এই দুই জোড়া‌ও প্যাকেট করুন!"

পারির স্পন্দন প্রক্রিয়া থম মেরে গেলো, মেহরিন বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল সম্রাট আর পারির দিকে।নিশি মিটিমিটি হাসছে।আর মুনমুন কনফিউজড হয়ে চেয়ে আছে সম্রাটের দিকে। সম্রাট নির্লিপ্ত ভাবে দোকানিকে পয়সা দেওয়ার জন্য ওয়ালেট বের করে হাতে রেখে মুনমুনের উদ্দেশ্যে বললো,

“ চয়েস শেষ করো, পেমেন্ট করবো তো!"

মুনমুন হঠাৎ এমন কিছু দেখায় খানিকটা চমকে গিয়েছিল যার কারণে কিছু সময়ের জন্য সে গায়েব হয়ে যায় উক্ত পরিবেশ থেকে, সম্রাটের কথায় নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের জন্য চার মুঠ চুড়ি,তিন জোড়া দুল আর এক জোড়া স্লিপার কিনলো সেই দোকানির থেকে। কেনাকাটা শেষ করে মুনমুন ওদেরকে বিদায় দেওয়ার অভিপ্রায়ে যখন বলতে থাকলো,

“ ওকে গার্লস,থাকো তবে।চলো সম্রাট!"

সম্রাট তখন দোদুল্যমান মন নিয়ে বললো,

“ আহ্, মুন তুমি এখন একা কিছু সময় কাটাতে পারবে না?আমি ওদের রিক্সা করে দিয়ে আসে!"

“ ওদের রিক্সা করে দিতে তুমি যাবে কেন? ওরা কেউ বাচ্চা তো মনে হচ্ছে না!"

“ ইটস ওকে ভাইয়া আমরা যেতে পারবো!"

মেহরিন বললো,মেহরিনকে ধমক দিলো নিশি,

“ চুপ থাক মেহু,আপু আমরা বললে রিকশা মামা যেতে চায় না। দেখলেন না দোকানি মামাও আমাদের কাছে বেঁচতে চাইছিলো না,ভাইয়া আসছিলো বলেই না কেনা হলো।আপনি চিন্তা করবেন না আমাদের রিকশায় উঠিয়ে দিয়েই ভাইয়া আপনার কাছে ভো দৌড়ে আসবে।"

“ তাহলে আমিও যাই তোমাদের সাথে, এখানে দাঁড়িয়ে কি করবো?"

“ না এখানে থাকো,অযথা রোদে হাঁটলে তোমার চেহারায় র্যাশ উঠবে।"

“ আমার র্যাশ নিয়ে তোমার এত ভাবনা নাকি অন্য কিছু নিয়ে?"

মুনমুন খোঁচা কোথায় মেরেছে তা বুঝতে কারো সময় লাগেনি।পারি লজ্জায় লাল বর্ণ ধারণ করে খানিকটা এগিয়ে যেতে যেতে বললো,

“ আমি গিয়ে দেখি রিকশা পাই কি-না!"

“ আসি আপু আল্লাহ হাফেজ!"

“ নাইস টু মিট ইয়্যু গার্লস!"

“ সেইম টু ইয়্যু আপু!"

শেষ বাক্যটা নিশি বলেছিলো।সম্রাট মুনমুনকে অপেক্ষা করিয়ে পারির দিকে দ্রুত এগিয়ে গেলো। যাওয়ার পথে যখন দুজন কাছাকাছি হাঁটছে ঠিক তখনই সম্রাট পারির হাতের মুঠোয় দুলজোড়ার প্যাকেটটা পুড়ে দেয়।পারি আবারও চমকায়। নিজের চমৎকৃত ঔজ্জ্বল্য রেটিনা লুকাতে পারেনি, তবে বরাবরের মতোই উল্টোটা করলো,

“ কিন্তু এসব আমাকে কেন দিচ্ছেন ভাইয়া?"

ভাইয়া ডাকটাই সম্রাটের জীবনের এখন কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।এই মেয়েটা তার সমস্ত আবেগে পানি ঢেলে দেয় এই ভাইয়া ডাক দিয়েই!ক‌ই হৃদয়কে তো ভাইয়া ডাকে না!তার সব কাজেই কি এ ভাই ভাই ফিল পায়?কোন ভাই এভাবে দরদ দিয়ে তার বোনের হাতে চুড়ি পরিয়ে দেয়? এই মেয়েটা কি গর্দভ! বুঝে না কে কখন এভাবে একজন নারীর সাথে এত আদরে চুড়ি পরায়? এত জ্বালা সহ্য করে কোন ভাই? উফ্,মনে মনে এটাই বললো। অতঃপর পারির দিকে কটমট করে চেয়ে বললো,

“ তোমাকে না বলছি ভাইয়া ডাকবে না!"

“ কিন্তু!"

“ পারি রিক্সায় উঠ, তাড়াতাড়ি!"

নিশি রিকশায় চড়ে বসে পারিকে ডাকছে।সম্রাট নিজের কথা থামিয়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে রিক্সা‌ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে ভাড়া জেনে নিয়ে তা মিটিয়ে দিলো।যদিও ওরা নিতে চায়নি তবে তাতে সম্রাটের কি? সে নিজ দায়িত্ব কর্তব্যে ত্রুটি রাখতে চায় না।

রাতের মধ্যভাগ অবধি এসব ভেবে সম্রাট ঘুমায় তাহাজ্জুদ আদায় করে ফজরের পর।এর মধ্যে একবারও মুঠোফোন হাতে ধরেনি।যার কারনে মনেই করতে পারেনি আজ কত তারিখ।

সম্রাটের ঘুম ভাঙল সিয়ামের ফোনে,

“ হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।"

ঘুমুঘুমু কন্ঠে সালাম দিলো,সিয়াম বিস্মিত বাক্যে শুধালো,

“ তুই এখন‌ও ঘুমাচ্ছিস?"

“ হুম,কেন?"

“ যাহ্ বাবা,এত বেলা অবধি?রাতে কি করছিস?"

“ প্ল্যান!"

“ কিসের?"

“ কারো মন চুরির!"

“ তার জন্য তোর প্ল্যান এর কি দরকার? যেই লোলুপ মুখশ্রী দিয়েছে,সেটা যেকোন রমণীর চোখের সামনে তুলে ধরলেই কেল্লাফতে !"

সম্রাট মুচকি হাসলো ফোনের অপর প্রান্তে থাকা বন্ধুর কথা শুনে, বিরবির করে নিজের সাথেই বললো,

“ যদি সে পটতো,তবে তো এই রুপ সৌন্দর্য সার্থকতা পেতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে আমার মাঝে কেবল তার কোন হারিয়ে যাওয়া ভাইয়াকে খুঁজে পায়!"

“ কি সব বলছিস?"

“ না কিছু না, আচ্ছা এখন কয়টা বাজে?"

“ ডুড,ইটস এলিভেন পিএম,কাম অন হারি আপ!"

“ ওহ,শিট্ শিট্,শিট্ ম্যান!আই উইল বি দেয়ার ইন থার্টি মিনিটস!"

“ কাম অন, হারিলি!বি কেয়ার ফুল!"

চট করে গায়ের চাদরটা সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো, ডানে বামে শরীরটা ঘুরিয়ে একটু রিল্যাক্স করলো মাংসপেশীকে।ঘাড় ডান বাম করলো, আঙ্গুল গুলো আলতো ছোঁয়ায় চারদিকে ঘুরিয়ে সেগুলো‌ও রিল্যাক্স করে নিলো। এরপর চটপট করে আলমিরাহ খুলে নিজের পোশাক বের করে বিছানায় ছুড়ে মারলো। সেখানে সেগুলো রেখে দু'টো তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়লো।

ফটাফট সব সেড়ে প্যান্ট পরে শার্টটা গায়ে জড়াতে গিয়ে ফোনটা হাতে নিলো,তারিখ দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেলো।
ফাস্ট মার্চ! ওহ নো! এত বড় ব্ল্যান্ডার কি করে করতে পারলো সে? নিজেকে গালি দিতে দিতে ফোনের কল লিস্ট খুঁজতে থাকলো কিন্তু চমৎকারভাবে একটাবারও কোথাও সেই নাম্বার নেই,থাকার কথাও নেই।বিগত কয়েক মাসে তাদের একবার‌ও ফোনালাপ হয়নি।
এখন উপায়?

“ ধ্যাত্,এই মেয়ে আমাকে চুড়ান্ত পাগল বানিয়ে ছাড়বে। সামনে গেলেই সব গুলিয়ে যায়,বাকী কিছু তো মনেই থাকে না। আবার দূরে আসলে কে ছো মেরে নিয়ে যায় সেই চিন্তায় সব ভুলে যাই,উফ্!"

পেইজে গিয়ে দেখলো তার জন্মদিনের শুভেচ্ছায় ফেসবুক ভেসে যাচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে ফেললো,

“ শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব নেই,এরা কি রাতে ঘুমায় নি।যেন একে জন্মদিনের উইশ না করে ঘুমালে পাপ হয়ে যাবে।নরক চুড়ান্ত! ফাউল পোলাপাইন!"

সম্রাট ফেসবুকে আর উইশ করলো না। বরং মুঠোফোনটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

________________________________________

“ পারি আপু,শুভ জন্মদিন।তুমি অনেক ভালো। সবসময় এমন ভালো থেকো।"

বাচ্চারা আহ্লাদি গলায় শুভেচ্ছা জানিয়ে উপরোক্ত কথাগুলো বলছে।নিজের জন্মদিন উপলক্ষে পারি বাচ্চাদের জন্য বিরিয়ানি রান্না করে নিয়ে এসেছে সঙ্গে নিজের তৈরি কেক।সেই কেক কেটে এখন বিরিয়ানি খাওয়াচ্ছে।আজ তার জন্মদিন উপলক্ষে‌ই সবাইকে তাড়াতাড়ি আসতে বলছিলো।তেমনি চলছে। বাচ্চাদের হট্টগোলে ক্লাব থেকে ছেলেরা এসে খবর পায় পারির জন্মদিন।সিয়াম, তাহসান, তাজবির, তৌহিদ সহ আরো দুইজন এদিকে আসে। উদ্দেশ্য , মূলত পারিকে শুভেচ্ছা জানানো।
ঠিক সেই সময়‌ই হৃদয় এসে উপস্থিত হয়।

“ শুভ জন্মদিন রাজকন্যা!"

সবার পিছন থেকে হৃদয় বলে উঠলো।পারি ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। হৃদয়ের সাথে পরিচয় হ‌ওয়ার এই চার বছর ধরেই হৃদয় তাকে জন্মদিনে এভাবে সম্বোধন করে।যেই ডাকটা মূলত তার বাবার ছিলো।হৃদয়কে দেখে বাকীরাও খুশি হয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ করতে ব্যস্ত হলো, সঙ্গে পারির জন্মদিনে হৃদয়ের সারপ্রাইজ প্ল্যান!

“ পারি!"

“ হুম বলো!"

“ আজকে সন্ধ্যাটা আমাকে দিবে?"

সহজ প্রস্তাব,পারির হতবাক, বিস্ময়,চমক একত্রে মিলেমিশে জগাখিচুড়ীর মতো অনুভূতি হলো,তার চোখে বিস্ময়,মুখে হতবাক, ঠোঁট জোড়া ফাঁক হয়ে অস্বস্তি , প্রশ্নের ধারা বুঝতে এবার‌ও অক্ষম পারি জিজ্ঞেস করলো,

“ মানে?"

“ বলছিলাম আজ ফ্রি থাকো, তোমাকে নিয়ে কোথাও যাবো।"

“ কোথায়?"

“ গেলেই দেখবে। প্লিজ না বলো না!"

“ কিন্তু হৃদয়!"

“ নো কিন্তু টিনতু,ওকে এন্ড ফাইনাল।ডান!"

বলেই হৃদয় পারির গালে নিজের আনা হোয়াইট রোজ দিয়ে ছুঁয়ে দিলো। এদিকে হৃদয়কে পারির সাথে এভাবে দেখে সদ্য আবেগ সঞ্চার হ‌ওয়া প্রেমিক মনে ঝড় ব‌ইতে থাকলো। কোন অজানা ভয়।
হৃদয় পারির দিকে কুটিল দৃষ্টি ফেলে তৌহিদ,তাহসান,সিয়াম খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছে।তারা কেন জানি হৃদয়ে পারির পাশে সহ্য করতে পারছে না, তাদের বদ্ধ ধারণা পারির পাশে কেবল সম্রাট নামক সুদর্শন যুবককেই মানায়।

১৭

“ আচ্ছা সম্রাট কোথায়?"

“ আজকে পারীর জন্মদিন,ও কি জানে না?"

“ ও না জানলে কে জানবে?পারীর পায়ের নখ থেকে চুলের গোড়া অবধি ওর মুখস্থ থাকার কথা,ওকে চিনিস না?"

“ কিন্তু আমরা যা ভাবছি তা কি সত্য হতে পারে?"

“ আলবত, সম্রাটের চোখ দেখিস না? ও ইদানিং পড়াশোনা, সাংগঠনিক সব কাজ বাদ দিয়ে সারাদিন এই মেয়ের পিছু ঘুরঘুর করে।সেদিন দেখলি না, আমরা সবাই ওর জন্য অপেক্ষা করলাম অথচ সে বসে র‌ইলো এই মেয়ের জন্য।"

“ কোনদিনের কথা বলছিস?"

“ আরেহ,সেদিন যেদিন এখানে বাচ্চাদের জন্য বৈশাখী আয়োজন করা হলো।পারী সব বাচ্চাদের খাওয়াবে বলে রান্না করে এনেছিলো,তো আমাদের ক্লাবেও দাওয়াত ছিলো।আমরা সবাই এসেছিলাম কিন্তু তুই তো তখন গ্রামের বাড়ি ছিলি তাই জানিস নি!"

“ ওহ্!"

পারী আর নিশি সহ ওদের আরেকজন ক্লাস ফ্রেন্ড জেনি, বাচ্চাদের শিক্ষিকা। কোন ছেলেকে সম্রাট পারীর আশেপাশে এলাও করতে পারে না বলে নিজের ক্লাবের ছেলেদের মধ্যে থেকে শিক্ষক নিয়োগ করে দিয়েছে যেন সব তার জানার নিয়ন্ত্রণে থাকে।সেই ছেলেদের মধ্যে অবশ্য তারা নিজেরাই কয়েকজন আছে।বলা বাহুল্য যেহেতু পথ শিশুদের পড়ানো হয়, এবং বিনামূল্যে শ্রম তাই এখানে কোন নির্দিষ্ট শিক্ষক নেই। একান্ত যার যার সুযোগ বুঝে ক্লাস নিতে চলে আসে তাও মানবিকতা থেকে।এতে অবশ্য বাচ্চাদের বিশেষ অসুবিধা হয় না কারণ তারা এমনিতেই বিনামূল্যে খাদ্যের সঙ্গে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে আর সবাই তাদের যথেষ্ট স্নেহ করে তাই তারাও সবাইকে আপন করে নিতে পারে।

হৃদয় প্রায় পাঁচ পাউন্ডের একটা বিশাল কেক নিয়ে এসেছে বাচ্চাদের সঙ্গে বসে পারীর জন্মদিন উদযাপন করবে বলে। ঐদিকে সম্রাটের পরিকল্পনা ভিন্ন। কিন্তু এখন হৃদয়কে পারীর জন্য ব্যস্ত হতে দেখে ভেতরে ভেতরে জ্বলছে সঙ্গে চিন্তিত হচ্ছে এই ভেবে যে তার পরিকল্পনা ভেস্তে যায় কি-না?

সম্রাট গং যখন নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছিলো
তখন পারী হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলছিল তখন‌ই সম্রাটের ফোনে রিং বেজে উঠল যার আওয়াজে সবাই পিছনে ফিরে তাকায়। সম্রাট সামনে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজের ফোনটা তুলে কানের সামনে ধরতেই ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি কিছু একটা বললে সম্রাট কেবল বললো,

“ ওকে, থ্যাংকস!"

কেটে দিয়ে পারীর দিকে এগিয়ে গেল। ওকে দেখে ওর বন্ধুদের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। হৃদয় বসা থেকে উঠে সম্রাটের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

“ কেমন আছিস?"

“ ফাইন, ইয়্যু?"

“ আলহামদুলিল্লাহ,এনি ওয়ে তোর কোন খোঁজ‌ই নাই।কি করছিস আজকাল? সারাদিন ক্লাব নিয়েই পড়ে থাকিস নাকি জবটব!"

“ দেখছি, সবটাই দেখছি।দেখি আগে কোনটা লাগে কপালে!"

শেষ কথাটা পারীর দিকে তাকিয়ে বললো।পারী সম্রাটকে নিজের দিকে দৃষ্টি ফিরাতে দেখেই মাথা ঝুঁকিয়ে ফেললো। হৃদয় কিছু একটা অনুমান করে সম্রাটের চোখ পরখ করে চুপচাপ হয়ে যাওয়া পারীর দিকে চাইলো। অতঃপর নিজের মনে মনে‌ই কিছু একটা হিসাব কষে নিয়ে পারীর দিকে ফিরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো,

“ আজ সন্ধ্যা,আমি নিতে বিল্ডিংয়ের সামনে থাকবো, তুমি তৈরি থেকো,ওকে!"

পারী নিজের মুখটা তুলে এক মিনিট নিরব থেকে বললো,

“ ওকে!"

সম্রাট হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটাকে চেপে ধরলো শক্ত করে, অতঃপর দাঁতে দাঁত পিষে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে হৃদয়কে বললো,

“ তোর বাড়ির কি খবর?আর ঐ তোর ঐ কাজিনের কি খবর রে?"

“ সব আলহামদুলিল্লাহ,আর কোন কাজিনের কথা জিজ্ঞেস করছিস?"

“ যার সাথে তোর বিয়ের কথা চলছিল?"

হঠাৎ করেই এমন প্রশ্নে হৃদয় খানিকটা ভরকালো সঙ্গে বিব্রত হলো।যদিও বিষয়টি সবার জানা তারপরেও বারবার এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে ভালো লাগে না তার।সে তাও এবার‌ও সাবলীলভাবে উত্তর করলো,

“ আছে ও ওর মতোই আছে। হঠাৎ তুই ওর কথা কেন জিজ্ঞেস করছিস?"

“ এমনি।কখনো দেখলাম না তোর সঙ্গে তাই আর কি!"

“ না দেখাটাই স্বাভাবিক,ও তো কাজিন।আর একজন মেয়ে কাজিন নিশ্চয়ই দিনরাত ছেলে কাজিনের সঙ্গে থাকবে না। তাছাড়াও.."

“ তাহলে সম্পর্কটা কি শুধু কাজিনেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি এগুবেও?"

“ এগুনোর সুযোগ নেই।কারণ আমি বহু আগেই অন‌্য মোহনায় ভেসে বহুদুর এগিয়ে গিয়েছি!যেখান থেকে ফেরার পথ আর নেই।"

হৃদয় শেষ কথাটা বাচ্চাদের পড়া বোঝানোয় ব্যস্ত পারীর দিকে অপলক চেয়ে বললো। সম্রাটের দৃষ্টি‌ও সেখানে।হৃদয় আর সম্রাট যখন নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলো তখন‌ই পারী বাচ্চাদের কাছে চলে যায়।

“ আচ্ছা তো এখন কি শুধু কথাই বলবি নাকি চা পানির‌ও ব্যবস্থা হবে? হৃদয় চলো ক্লাবে গিয়ে বসি।"

সিয়ামের প্রস্তাব নাকোচ করে হৃদয় বললো,

“ স্যরি ডুড,আমাকে যেতে হবে। লাঞ্চ টাইমের ছুটি নিয়ে এসেছি। বাচ্চাদের সঙ্গে পারীর আজকের দিনটা সেলিব্রেট করার জন্য,করা হলেই চলে যাবো। সন্ধায় আবার তাড়াতাড়ি বের হতে হবে।"

“ ওহ, তাহলে!"

“ তোমরা ক্লাবে কেন যাবে, প্লিজ এখানে থাকো।"

হৃদয় সবাইকে থাকতে বললো, বিশেষ করে সম্রাটকে মেনশন করে বললো,

“ থাক দোস্ত, তুই থাকলে পারির ভালো লাগবে।
ও তোকে বড় ভাইয়ের চোখে দেখে।"

আবার ভাই! তাও বড় ভাই! সম্রাটের ইচ্ছে করছে হৃদয়ের মাথাটা দুভাগ করে ফেলতে কিন্তু পারছে না।সে নিজের রাগ দমিয়ে একটা বিতলা হাসি দিয়ে হৃদয়কে বললো,

“ হ্যা আমার বোন মানে তো তোর‌‌ও বোন।"

“ মানে কি?"

“ যা তুই বুঝেছিস তাই!"

একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছে,উহুম! মোটেই সে হাসি সুন্দর নয় বরং একে অপরকে টিস করে হাসছে।

বাচ্চাদের মাঝে বসে পারী কেক কাটলো, বাচ্চাদেরকে খাইয়ে দিলো। অতঃপর সবাই নিজেদের মতো নিজেদেরটা নিয়ে খেলো,পারী বাচ্চাদের পর নিশি, মেহরিনের হাতে খেলো, বাচ্চারা‌ও খাইয়ে দিলো।

এরপর বাচ্চাদের যে যে পড়াবে তারা বাদে বাদ বাকী সবাই চলে গেলো,পারী বাচ্চাদের পড়িয়ে আরো আধ ঘন্টা পর বের হবে।ক্লাস আছে তার, অবশ্য নিশি এখন‌ই চলে যাবে।ওর নাকি একটা টিউশনি আছে, নতুন নিয়েছে। মেহরিন আর পারী আরেকটি ক্লাস শেষে তারপর বাড়ি যাবে,এখন বাচ্চাদের পড়িয়ে তারপর নিজেদের ক্লাসে যাবে।নিশি আজ আর ক্লাস করবে না।

সবাই চলে যাচ্ছে তখন হৃদয় বলে উঠলো,

“ পারী সন্ধ্যায় রেডি থাকবে,আমি আসবো পিক করতে।"

সম্রাট খানিকটা দুরত্ব বজায় রেখে বাচ্চাদের পড়ানোর নামেই এখানে বসে আছে।সেও শুনলো।কেন জানি পারী একবার ফিরে সম্রাটকে দেখলো।সেটা হৃদয়‌ও খেয়াল করলো।
কিন্তু সে খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিলো। বিশেষ অভিব্যক্তি তার মুখে ফুটে না। অনিচ্ছা স্বত্বেই পারী হ‌দয়কে হ্যাঁ সম্মতি দিল,পারীর হ‌্যা শুনেই সম্রাট চট করে হাতে থাকা কলমটা জমিনে মুচড়ে ধরে ভেঙে ফেললো,

” এ মা, কলমটা ভেঙে গেলো তো ভাইয়া!"

সম্রাট যেই বাচ্চাটাকে পড়াচ্ছিল সেই বাচ্চাটা আর্তনাদ করে উঠলো, নিজের ছোট দুটো হাত দুই গালে রেখে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল সম্রাটের হাতের তালুতে ভেঙে দ্বিখণ্ডিত হয়ে থাকা কলমখানার পানে।

“ সমস্যা নাই আমার কাছে আছে।"

বলেই সে নিজের পকেট হাতড়ে একটা কলম বের করলো,পারী সম্রাটের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। হৃদয় মনে মনে বললো,

“ কন্ট্রোল হৃদয় কন্ট্রোল।আজ পারীর বিশেষ দিন,দয়া করে কোন বাজে সিচুয়েশনে ওকে ফালাস না।"

হৃদয় নিজেকে সামলে পারীকে বললো,

“ শোন, তোমার গিফট তোমার ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছে। আশাকরি পছন্দ হবে।আর হ্যাঁ ঐটায় যেন দেখতে পাই।ওকে? এখন আসি। সন্ধায় দেখা হচ্ছে!"

“ হুম!"

পারী ধীর আওয়াজে প্রত্যুত্তর করলে হৃদয় চলে গেলো। সম্রাট আড়চোখে দেখলো পারী কতটা আন্তরিক হয়ে হৃদয়কে বিদায় দিচ্ছে।ও আর কোন কথা বললো না।

____________________________________

বিকেল বেলা..

পারী বিকেলে ফ্ল্যাটে ঢুকে অর্ডার করা কেকের সরঞ্জাম গুছিয়ে তৈরি করে রাখলো, অতঃপর গেলো নিজে তৈরি হতে।হৃদয়ের দেওয়া গিফট প্যাকেটটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা।
সেটার দিকে তাকিয়ে ভাবলো,এটায় কি আছে? কি থাকতে পারে? হৃদয় খুব আন্তরিক হয়ে ওর জন্য গিফট কিনে,কেন এতটা আন্তরিকতা থাকে তা পারী বুঝে।বিগত চারটা বছর যেই মানুষটা ওর ছায়া হয়ে ওর বিপদে আপদে সবসময় পাশে থাকছে তার মনের খবর পারী জানবে না? অবশ্যই জানে,সে তো কিছু মাস আগেই পরিচিত হ‌ওয়া মানুষটার চোখের ভাষাও জানে। কিন্তু পারী না তাকে চায় আর হৃদয়কে!
হৃদয় জীবনসঙ্গী হিসেবে নিঃসন্দেহে যোগ্য,ওর মতো একজন পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী হ‌ওয়া নারী জন্মের সার্থকতা। কিন্তু সেই সৌভাগ্য যে পারীর নেই। হৃদয় বহু আগেই অন্য কারো।পারী একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের চিত্ত পোড়ার কারণ হতে পারবে না।কারো অন্তরের দহনের দায় নিয়ে সে সুখী হতে চায় না। তাছাড়াও পারীর চোখে হৃদয় আজীবন একজন ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছুই না।পারী মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো, হৃদয়কে আজ স্পষ্ট করে সবটা বুঝিয়ে বলবে যেন সে অযথাই কোন মিথ্যে আশার স্বপ্ন না বুনে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটা খুলতেই দেখলো চিনি গুঁড়া জর্জেট কাপড়ের সুন্দর একটা গ্রাউন।
লাল কাপড়টাতে কাপড়ের নিজস্ব ঔজ্জ্বল্যতা ছাড়া আর কোন কাজ নেই কিন্তু তারপরেও চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে পারীর। সুন্দর এই গ্রাউনটার সাথে রয়েছে সুন্দর একটা হালকা সুতার কাজ করা হিজাব, একজোড়া ব্রুজ আর স্টোনের ব্রেসলেট ঘড়ি।ফ্লাট হিলের এক জোড়া স্যান্ডেল।

“ মায়া পরীকে রক্তিম জবায় দেখার খুব স্বাদ জাগলো,মায়া পরীকি এই চাতকের সেই স্বাদ পূরণ করবে?"

হৃদয়ের হাতের গোটা অক্ষরে লেখা ছোট একটি চিরকুট!পারী চিরকুটটা ব্যাগের মধ্যে রাখলো।পরনে এখন তার সাদা সালোয়ার কামিজ।
সব কিছু বিছানায় রেখে ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ পায়চারি করতে থাকলো,সে বুঝতে পারছে তার মন অন্য কোথাও পড়ে গিয়েছে। যেটা উচিত ছিলো না। এদিকে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব হৃদয়ের সঙ্গে।হৃদয় শুরু থেকেই এই সম্পর্কটা অন্যদিকে ভেবে এসেছিল,সেটা পারী জানতো, বুঝতো। কিন্তু ভেবেছিল পারীর নিরব প্রত্যাখ্যানে সে বুঝবে, একদিন ঠিকই সরে যাবে। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি বরং তার অনুভূতি দিনদিনই প্রগাঢ় হচ্ছে।তার সঙ্গে বাড়ছে পারীর প্রতি তার অধিকারবোধ।যেটাও অনুচিত।

এদিকে সম্রাট নামক এক রাজকুমারে সাথে হঠাৎ পরিচয়,যা তার নারী মনকে চঞ্চল করে তুলেছিল।পারীর চোখে এখনো এঁটে আছে সেই প্রথম দর্শন!যখন সম্রাট ক্লাবের ভেতর রুম থেকে বেরিয়ে আসছিল তাদের ডাকে,ঘন কালো সিল্ক চুল গুলো কপালে আঁছড়ে পড়েছিল,রাশভারী মুখটাতে কৌতুহল ভরা চাহনি,ঘন খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি আর ভারী গোঁফের মাঝে লুকিয়ে থাকা পাতলা মসৃণ ঠোঁট,ঘন চিকন ভ্রু দ্বয়ের মাঝে ভাঁজ ফেলে ভীষণ গম্ভীর গলায় শুধিয়েছিলো, “কি চাই?”
এক মুহুর্তে যেন পারী হারিয়ে গিয়েছিল কোন অজানায়। কি দরাজ হৃদয় কাঁপানো কন্ঠস্বর,পুরুষ মানুষ‌ও এমন হয়।এত সুদর্শন আর নজরকাড়া? আজীবন পারী যেমন ব্যক্তিত্ববান আর দরাজ কন্ঠের পুরুষের তালাশ করেছিল সম্রাট যেন এক পলকেই সেই পুরুষের প্রতিচ্ছবি নিয়ে তার সামনে হাজির হয়েছিল সেদিন।

পারী সম্রাটের উপরে নিজের মন হারিয়েছিল সেদিনই কিন্তু,সাহস করে আগায়নি।
কারণ সম্রাটের বেশভুষায় আর আভিজাত্য পূর্ণ জীবনযাপন‌ই জানিয়ে দিয়েছিলো সম্রাট নামক রাজকুমার সম্রাট না হলেও আসলেই একজন প্রকৃত রাজকুমার,যে তার মতো নগণ্য প্রজার ধরাছোঁয়ার বাইরে।সে ঐ লোকের দাসীর‌ও নখের যোগ্য নয়,পাশে দাঁড়ানো তো এক জন্মের দুঃস্বপ্ন।তাই তো কখনো সখনো যখ‌ন‌ই সম্রাট তার পাশে তার বরাবর হয়ে দাঁড়ায় সে সরে যায়,পাশ থেকে সরে দুরত্ব রেখে দাঁড়ায় কারণ তার ভেতরে দহন শুরু হয়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার ভয়ে জ্বলে যায় অন্তর,ভুল থেকে সবটা খুইয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়ে সে আগেই নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চায়।
সে জানে এক জনমে সব পাওয়া যায় না,যদিও পারী কিছুই তো পেলো না তাও! আল্লাহ যতটা দিয়েছে পারী তাতেই খুশি,তাতেই কৃতজ্ঞ।এর বেশি জোর করে চাওয়ার মতো দুঃসাহস পারীর নেই।সে পারবে না গন্ডি পেরিয়ে আসমানের চাঁদ ছোঁয়ার মতো বিশাল কিছু হাসিল করতে। তাছাড়াও সম্রাট কেন‌ই বা তার মতো মেয়ের জন্য এতটা পাগল হবে যতটা হলে সব ছাড়া যায়? অসম্ভব! পারী জানে,সম্রাট কখনোই তাকে তার বরাবর করে ভাবতে তার পারবে না। হয়তো এখন খানিক সময়ের মোহে তার পিছু ছুটছে,পারী কখনো যদি দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় তখন অবশ্যই সেও ভুলে যাবে।ছেলেরা এমন‌ই হয়, তাদের আবেগের স্থায়ী ক্ষণ,তাতে কোন লেশ জিইয়ে রাখার অভিলাষ থাকে না।

পারী নিজের সীমানা বুঝে, বুঝে নিজের অবস্থান।সে সম্রাট হৃদয় কারো পাশেই দাঁড়ানোর যোগ্য নয়, বন্ধুত্ব কিংবা সহকর্মী হিসেবেই তারা একে অপরের জন্য ঠিক কিন্তু জীবনসঙ্গী! সেটা পারীর জন্য নয়।

পারী যখন এগুলো ভাবছিল তখন সম্রাট পারীর বিল্ডিংয়ের নিচে দাঁড়িয়ে ফোন করলো,পারীর চিন্তায় রাশ টেনে মৃদু আওয়াজে বেজে উঠলো তার আধুনিক মুঠোফোনখানা।

“ আননোন!"

অপরিচিত নাম্বার দেখে ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে নিলো,বিরবির করে নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করলো,

“ এটি কার নাম্বার?"

নাম্বার না চিনলেও কল তোলার‌ই ছিলো,কারণ সে একজন অনলাইন ব্যাবসায়ী।বেকার, কাস্টমার হতে পারে, যদিও এটা একান্তই পার্সোনাল নাম্বার।এটাতে শুধু তার পরিচিত বলতে মেহরিন,নিশি হৃদয় সহ বিশেষ পরিচিতি দুই একজন কল করে।এটাই তার চিন্তার কারণ!

“ আসসালামু আলাইকুম!"

“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,নিচে নামো দ্রুত!"

“ জি; কে বলছিলে....."

পারীর বাক্য শেষ হয়নি,তার কন্ঠের মালিককে চেনা হয়ে গিয়েছে, ঐদিকে সেই কন্ঠ মালিক‌ও পরিচয় দেওয়ার বালাই না রেখেই নিজের স্বভাব সুলভ চরিত্রে বজায় থেকে বললো,

“ ড্রেস চেঞ্জ করার কোন দরকার নেই। যেভাবে আছো সেভাবেই বেরিয়ে আসো। তুমি আমার কাছে সবসময় সবভাবেই সুন্দর,আমি তোমাকে সব রুপেই দেখতে আগ্রহী।"

“ কিন্তু আমি এখন!"

“ সময় মাত্র পাঁচ মিনিট! গ্যাস বিদ্যুৎ চেইক করবে,ঘর লক করবে, অতঃপর তরতর করে নিচে নেমে আমার সামনে এসে উপস্থিত হবে, পুরো ঘটনা ঘটাতে সময় পাবে মাত্র পাঁচ মিনিট। এর বেশি এক ন্যানো সেকেন্ড পেরুলেই আমি নিয়ম ভেঙে বিল্ডিংয়েই উঠে যাবো অতঃপর..."

“ আসছি!"

পারী সম্রাটকে বেশ ভালো করেই রপ্ত করেছে,এই লোক যখন বলেছে পাঁচ মিনিট পেরুলে উপরে চলে আসবে তাহলে আসবেই।কারো কথা শুনবে না।আর যদি এমন কিছু হয় তবে পারীর কপালে দুর্দশা নেমে আসবে।ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়ার সময় বড় বড় অক্ষরে স্পষ্ট শর্ত করে লিখে নিয়েছে ফ্ল্যাটে ওমুক ভাই তমুক ভাই পরিচয়ে কোন ছেলে,বাড়তি মেয়ে আনা যাবে না।কোন ভাই,মামা, খালু আসতে পারবে না। যেহেতু পারীর জীবনে তেমন কেউ নেই তাই এসব নিয়ে পারীর চিন্তা‌ও নেই।আর হৃদয় কখনো বিল্ডিংয়ের সামনেও আসে না। সেখানে এই লোক হুট করেই!

“ উফ্! আল্লাহ জানে, ম্যানেজারের চোখে পড়লেই কিসসা শুরু হয়ে যাবে।এটা কি করলো উনি?"

বিরবির করতে করতে সত্যিই পারী সব দেখে ঘরে তালা লাগিয়ে নিচে নেমে গেলো।পরণে তার সাদা ঘরের পরা সালোয়ার কামিজ,অন্য একটি কালো থ্রি পিসের কালো ওড়না পেঁচানো যেটা দিয়ে সে এত সময় ভেজা চুল পেঁচিয়ে রেখেছিল।

সম্রাট বাইকে বসা,মাথায় হেলমেট।আরেকটা হেলমেট তার ডান হাতের হ্যান্ডেলে আঁটকে রাখা।পারীকে দেখেই মৃদু হাসলো,সদ্য স্নান করা মুখটা চকচক করছে, কোনরকম প্রসাধনী ছাড়াই এই মেয়েকে ভয়ংকর সুন্দর লাগে।পারী ফর্সা,লাল ফর্সা। ঠোঁট দুটো টকটক লাল।তবে এখন ফ্যাকাশে লাগছে কোন কারণে। চুলগুলো ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখা যা সম্রাটের ভালো লাগলো।যদিও এবার‌ই প্রথম পারীকে বোরকা ছাড়া দেখছে,তাও!
কব্জি সমান লম্বা,হাতা, হাঁটুর নিচে নামানো লম্বা কামিজ আর ঢোলা সালোয়ারে অপ্সরা লাগছে তার কাছে।

” আসসালামু আলাইকুম!"

পারীর সালামে সম্রাটের ভ্রম কাটলো,সে সচকিত হয়ে সোজা হয়ে বসলো। অতঃপর খুব তাড়াহুড়ো দেখিয়ে পারীকে বললো,

“ এদিকে এসো দেখি!"

বলেই ঝুলিয়ে রাখা হেলমেটটা পারীর মাথায় ঢুকিয়ে দিতে দিতে বললো,

“ মাথাটা উঁচু করো,এইতো হয়ে..."

“ কিন্তু এখন আমরা কোথায় যাবো তাছাড়াও হৃ.."

“ হিস্!"

সম্রাট নিজের তর্জনী দিয়ে পারীর ঠোঁট চেপে ধরলো,মুখে বললো

“ কথা বলো না।উঠো তাড়াতাড়ি।দেরি হয়ে যাচ্ছে!"

এদিকে সম্রাটের এই গভীর ছোঁয়ায় পারীর ষষ্ঠ ইন্দ্রন থমকে গিয়েছে,সে তার ঠোট চেপে ধরা এই আঙ্গুলের ছোঁয়ায় কেঁপে উঠলো,তার কঠোর অনুভূতিরা ভেতরে চেপে রাখা অগ্নিলাভায় গলে যাচ্ছে। স্থবির হয়ে আছে তার চারিপাশ। সম্রাট যে কাজটা একটু আগে করলো তাতে তার মাঝে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না,সে যেন এটাতে অভ্যস্ত।খুব সাবলীলভাবে সে বাইকে বসে পারীকে বসার জন্য বললো,পারীর নিজ লুকায়িত আবেগ থেকে সজাগ হয়ে বলতে চাইলো,

“ কিন্তু আমার তো..!"

“ পারীজাত!"

পারী থেমে গেলো,তার বাবার দেওয়া এই নামটা একমাত্র বাবাই এভাবে ডাকতো,আর এখন ডাকে সম্রাট।ও খেয়াল করেছে সম্রাট পারীকে পারীজাত শুধু তখনই ডাকে যখন ওরা একা থাকে এবং যখন সম্রাট ওর প্রতি পূর্ণ অধিকার খাটিয়ে কিছু করে। সম্রাটের গম্ভীর চাহনি আর ভারী শব্দগুচ্ছ পারীর কথা বন্ধ করে দেয়।সে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাই করে যা সম্রাট বলে। এখন‌ও করলো।সে বেমালুম ভুলে বসলো তাকে নিতে কেউ আসবে এবং সে তাকে কথাও দিয়েছিল।

________________________________________

হাঁটু অবধি ভাঁজ করে রাখা কালো জিন্সের আড়ালে থাকা উন্মুক্ত কর্দমাক্ত লোমশ পা জোড়া পরপর এগিয়ে আসলো সম্মুখ পানে।ডান হাত পিছনে রেখে বা হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল আর তর্জনীর দ্বারা কন্ঠনালীর নীলাভ শিরাটা হালকা করে আলতো ছোঁয়ায় চুলকাতে চুলকাতে সাদা সালোয়ার ঢাকা উন্মুক্ত পা জোড়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো।

কচি কচি দুর্বার ঘ্রাণ আর তার কিনার হয়ে বয়ে চলা মৃতপ্রায় খাল,তার চারদিকে কচুরিপানার ঝাকেরা নিজেদের আবাস গড়ে রাজ্য আমার বলে ঘোষণা করেছে, খানিকটা শুকিয়েও নিজেকে এখানকার অতি জনপ্রিয় আদিবাসী বলে পরিচিত করতে একটুও কার্পণ্য করছে না শ্বেত সবুজাভ ঐ কাশফুলেরা। কচুরিপানার ঝাঁক আর অর্ধ মৃত কাশফুলেদের সাথে দ্বন্দ্বে পিছিয়ে নেই নানা রঙের মাতালো ঘ্রাণের মনোমুগ্ধকর রুপের অধিকারী বুনো ফুলেরা। বেলা পরে যাওয়া বিকেলের মিষ্টি গোধূলীমাখা রোদ , পাশে বয়ে যাওয়া খালের কুলকুল পানির গুনগুন, চারদিক থেকে আসা নানা ফুলের সুবাস আর কচি পাতা,দুর্বা ঘাসের মাতাল করা ঘ্রাণ,দুর অজানায় হয়তো কোন মগডালে বসে থেকে শিস দিচ্ছে কোন কন্ঠ রাণী।

পিছনে রাখা ডান হাতটা সামনে এনে উঁচু করে তুলে ধরলো, ফর্সা লোমশ হাতের মুঠোয় টিয়া রঙা ডাঁটির মাথায় হালকা গাঢ় মিশেলের বেগুনী রঙের মধ্যে সাদা,সবুজাভ,পাউডার ব্লু আর নীলাভ রঙের এই অতি সস্তা কিন্তু অন্যান্য রুপসী ফুল ধরা পুরুষের ঐ উঁকি দেওয়া লোমশ বুকটা সাদা শার্টে আবৃত।অথচ কলার থেকে বুক অবদি দু'টো বাটন খুলে রাখায় তারা ঠিক‌ই মুখ উঁচিয়ে পারীকে জানান দিচ্ছে তারাও আছে!

ডাগর ডাগর আঁখি, কৌতুহলী, উৎসাহী।লাল ওষ্ঠের উপর লিপবাম লেপ্টানো যার দরুন তা আর‌ও রসালো, লোভনীয় হয়ে উঠেছে।সাদা সালোয়ার কামিজের উপর কালো রঙের ওড়না।যা দিয়ে মাথা থেকে কোমর অবধি আড়াল করে রেখেছে। প্রেমিক দৃষ্টিতে সাক্ষাৎ হুর বনে যাওয়া এই রমনীর তরে নিজ জীবন উৎসর্গ করার প্রত্যয়ে ব্যাকুল ব্র্যাগ্র চিত্ত ফুঁড়ে পুরুষটি অবশেষে নিজের খসখসে ওষ্ঠের ফাঁক দিয়ে বের করলো সেই বিশেষ বানী খানা যা তার বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা,আশা, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটালো।

“ পারীজাত,ভালোবাসি!"

১৮

ট্রাফিক সিগ্যানাল শেষ হবার সাথে সাথে সম্রাটের কল্পনার জাল ছিন্ন হয়। এত সময় সে কল্পলোকে ভ্রমণ করছিলো । তারা এখন সংসদ ভবনের সামনে জ্যামে বসে আছে ,পারীকে এত কাছে এর আগে কখনো পাওয়া হয়নি, আজ এত কাছে পেয়ে তার পুরুষালী অনুভূতিরা মাথায় ঝি ঝি ধরিয়ে দিচ্ছে, কখন যে সে অনুভূতির সাগরে ডুবে গিয়েছিল তা বুঝতেই পারিনি। চারিদিকের গাড়ীর হর্ন কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে। ওদের পিছনে থাকা প্রাইভেট গাড়ীর প্যাসেঞ্জারের বোধহয় তাড়া বেশি। বিরতিহীন হর্ন দিয়ে যাচ্ছে,সম্রাট পিছনে ফিরে সেদিকে একবার দেখলো। সঙ্গে পারী না থাকলে নেমে ঐ লোকের কানে এখন তবলা বাজাতো শব্দ দূষণের দায়ে। সম্রাটের চাহনি বুঝে পারী সম্রাটকে আকড়ে ধরে রাখা জায়গায় খামচি দিলো। সম্রাট নিজের বুকের কাছে আকড়ে ধরে রাখা হাতটা দেখে আবারো চলা শুরু করল। এদিকে পারীর ফোন অবিরত বেজে কেটে যাচ্ছে, কিন্ত পারী সাহস করে তুলতে পারছে না। না সে সম্রাটকে ভয় পাচ্ছে না, সে হৃদয়কে কৈফিয়ত দেয়ার ভয়ে ফোন তুলছে না। এদিকে পারীর হৃদয়ের ফোনকে এড়িয়ে যাওয়া সম্রাটের মনে ভ্রান্ত ধারনার জন্ম দিলো। সে মনে মনে ক্রুর হেসে জিজ্ঞেস করলো,

“ কে ফোন করছে এত বার? ’’

পারী ভয় ভয় কন্ঠে বললো,

“হৃদয়!”

এরপর আবার নিরবতা, মিনিট দুই পেরুতেই পারী একটু সাহস করে জানতে চাইলো,

“ কোথায় যাচ্ছি আমরা ?”

“ গেলেই দেখবে। ’’

“ কিন্তু আমার !”

“ধরে বস পারীজাত।’’

বলেই সম্রাট নিজেই পিছন থেকে পারীর দুই হাত সামনে টেনে এনে নিজের বুক সাথে চেপে ধরে। যার কারনে পারী গিয়ে সম্রাটের পিঠের উপর আছড়ে পড়ে।আত্ন রক্ষার্থে খামচে ধরে সম্রাটের বুকের মাংসপেশি। ওর ঠোঁট গিয়ে ছোঁয় সম্রাটের কানের লতি। শিউড়ে উঠে দুজনই। সম্রাট মুখ ফিরিয়ে পারীর দিকে তাকালে দুজনের চোখে চোখ আটকায়, পারী লজ্জায় দৃষ্টি নামিয়ে ফেলে। নিচু কন্ঠে বলে,

“ স্যরি।”

“ স্যরি বলার কিছু নেই তো, তোমারই তো। ”

সম্রাট এর আগে হাজারবার ইশারা ইংগিতে ভালোবাসা জাহির করলেও এভাবে কখনো সরাসরি বলেনি। আজ এমন সরাসরি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশে পারীর নাভীশ্বাস হওয়ার উপক্রম । ওর ভেতরে চলা উচাটন তরঙ্গের ন্যায় ওর বুকে উত্থান পতন সৃষ্টি করলো। যা সম্রাটের কানেও পৌছে যায়। সম্রাট পারীর ভেতরে চলা ঝড়কে অনুভব করে মুচকি হাসে। এ যেন বিজয়ের হাসি। সে পারীর হাতটা আরো শক্ত করে ধরলো। পারীকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। ওভাবেই বাইক ছুটে চললো গন্তব্যে।
এদিকে পারীর মুঠোফোনে অবিরত ফোন আসতে থাকলো। পারী ভীষন বিব্রত ফিল করছে। ফোনটা ধরে যে কিছু একটা বলবে তাও সাহসে কুলাচ্ছে না । কি বলবে তাও বুঝতে পারছে না , এদিকে সম্রাটের ঠোটে খেলে যাচ্ছে ক্রুর হাসি , যেন সে বিশাল কোন যুদ্ধে জিতে গিয়েছে। সে নিশ্চিত পারী নামক রমণী তারই। দ্রুত গতিতে বাইক টেনে তারা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌছে যায়। ওরা যখন পৌছায় তখন আছর পেরিয়ে গেছে। শেষ বিকেলের মিঠা রোদে খালের পানি চিকমিক করছে। কুলকূল রব চলছে তাতে,চারিদিক থেকে বুনো ফুলের মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। দুরে কোথাও অবিরত ডেকে যাচ্ছে অজানা কোন পাখি। সম্রাট বাইক থামিয়ে এক পাশে রাখলো, দুজনেই পাশাপাশি দাড়িয়ে রইলো কিছুক্ষন,অতঃপর পারীর বাম হাতটা নিজের ডান হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে নিরিবিলি জায়গা খুজে দাঁড়ালো। পারী সম্রাটের হাতের মুঠোয় থাকা তার হাতটা দেখলো। কত অধিকার নিয়ে ধরেছে,যেন এই হাত ধরার অধিকার কেবলই তার । পারী নিজের হাতটা ছাড়ালো না । রেখে দিলো ওভাবেই, থাকুক না কারো অতি অধিকারের ছাপ,কারো পরম ভরসার ছোঁয়া , কেন জানি তার মনে হচ্ছে আজকের পর হয়তো এই মানুষটার এতো অধিকারবোধ আর তার জন্য থাকবেনা । পারী সব ভুলে মুগ্ধ নয়নে সম্রাটকে দেখতে লাগলো। সকালে দাড়ি ছেটেছে বোঝা যাচ্ছে,চুলগুলো জেল দিয়ে উল্টো করে সেট করা। ফর্সা মুখের মাঝে লাল গোলাপী এক জোড়া ঠোঁট , চেহারা জুড়ে তার ঔজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের আভা ছড়ানো। পারীর মুগ্ধতা প্রগাঢ় হয়, অহর্নিশি তা সে উপলদ্ধি করতে পেরেছে, যা আজ থেকে নয় ,বহুদিন আগে থেকেই। পারীর মাঝে হাহাকার জাগলো, কেন সে এই পুরুষকে নিজের জন্য চাইতে পারছে না, ওহ! সবার জন্য যে সব চাওয়া থাকতে নেই । ভাবতেই অর নয়ন ভরে উঠতে চাইলো,কিন্তু পারী এখন কান্না করবে না তাই নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে নিতে চেষ্টা করলো সম্রাট চারপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে পারীকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“পারীজাত জায়গাটা কেমন লাগছে। ”

সম্রাট কথা শেষ করে পারীর দিখে মুখ ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো পারী তার দিকে ঠিক কতটা মুগ্ধতা নিয়ে অপলক চেয়ে আছে। পারীর চাহনি উপচে পড়ছে ভালো লাগারা। একে অপরের চোখে চোখ মিলিয়ে হারিয়ে গেলো অনুভুতির সাগরে। তাদের এই সুন্দর মুহুর্তের মাঝে ব্যাঘড়া দিলো পারীর ফোনে আসা কল। বিরক্তিতে মেজাজ তেতো হয়ে গেলো সম্রাটের । চ বর্গীয় শব্দ উচ্চারন করে মুখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে বিরবির করে গালি দিলো,

“ বীচ। ”

পারী হৃদয়কে কৈফিয়ত দেওয়ার ভয়ে এবারও ফোনটা তুললো না, সে আড়চোখে সম্রাটের পানে চেয়ে রইলো। সম্রাট পারীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো,

“ এতবার কে ফোন করছে? ”

পারী ভীত চাহনি অবনত করে বললো,

“ হৃদয়। ”

সম্রাট ঘাড়টা এদিকেওদিকে ঘুড়িয়ে স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“ ও তোমাকে এত বার কেন ফোন করছে? কি চাই ওর? ”

পারী এবার সাহস করে নিজের দৃষ্টি উপরে তুললো, কিছু সময় আগের সেই ভালোলাগার সব অনুভূতি গিলে নিয়ে সাবলীল ভাবে বললো,

“ কি চায় তা তো আপনিও বুঝেন ভাইয়া। ”

“ Shut up Parijat, I say shut up. Don`t call me again with this world. Do you understand. ”

এই মুহুর্তে পারীর মুখে ভাইয়া শব্দটা সম্রাট কোন ভাবেই ফান হিসাবে নিতে পারলো না। তাছাড়াও এই মুহুর্তে ভাইয়া শুনে সকালে হৃদয়ের বলা কথাটা মনে পড়ে গেলো । হৃদয় কতটা আত্নবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলো পারী তাকে ভাইয়ের চোখে দেখে। সম্রাট বুক ফাটা তৃষ্ণায় মরে যাবে কিন্ত পারীর চোখে একটু আগে দেখা অনুভূতির বদলে অন্য কিছু দেখতে পারবেনা, এটা সহ্য করতে পারবে না। যেই অনুভূতি কিছু সময় আগে ছিলো, তা সে আজীবনের জন্য চায়। পারী সম্রাটের ধমকে কেপে উঠলো। কিন্ত সে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে আজ সম্রাটের সঙ্গে চুড়ান্ত কথা বলবে যেন সম্রাট তাকে নিয়ে কোন রকম ভাবনা না পুষে। এরপর হৃদয়কে বলবে। পারী তাদের এই আবেগের খেলা বন্ধ করে তাদের থেকে দূরে চলে যাবে নয়তো আজীবন পা না পাওয়ার আবেগময় দ্বন্দে ভুগবে। যা আদৌওতে উচিত নয়। পারী এমন দ্বিধায় ভরা জীবন চায় না ।
পারীর ফোনটা আবারও বেজে উঠলো। সে নাম্বারটা দেখে সামনে অগ্নিরূপ ধারন করে কপালে ভাজ ফেলে দাড়িয়ে থাকা পুরুষটিকে দেখলো। সম্রাট ঈগল চোখে পারীর মুঠোয় থাকা ফোনের দিকে চেয়ে আছে,আরেকবার রিং হতেই পারীর মুঠোয় থাকা ফোনটা কেড়ে নিলো। পারী চমকে গেলো। সম্রাট রিং কেটে পাওয়ারে চাপ দিয়ে বন্ধ করে দিলো,তারপর নিজের পকেটে ঢুকিয়ে ফেললো। পারী হতভম্ব হয়ে গেলো। হঠাৎ ঘটে যাওয়া কান্ডে সে বিস্মিত,হতবাক! হাত বাড়িয়ে বললো,

“ আরে আমার ফোনটা , ঐটা নিলেন কেন? দিন বলছি। ”

“ এখন থেকে এক ঘন্টার মধ্যে তুমি এটা পাবেনা। ”

“ কিন্ত আমার হৃদয়ের সাথে কথা আছে। ও আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ”

“ করুক। তাতে তোমার কি?”

“ মানে কি, আমার কি!তো ও আমার জন্যই ……

“ লিসেন, তুমি আজ এখন থেকে হৃদয়ের সাথে কোন রকম যোগাযোগ রাখবে না, বুঝেছো! তোমার যেকোন প্রয়োজনে আমি আছি,যেকোন মুহুর্তে আমি তোমার দ্বোরে তোমার জন্য হাজির থাকবো ! কিন্তু তোমার ছায়ায়ও আমি কাউকে সহ্য করতে পারবো না। বুঝেছ? আমার কথার অন্যথা হলে I swear parijat আমার দ্বারা অনর্থক ঘটে যাবে। তুমি কিন্ত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জন্য দায়ী থাকবে। ”

সম্রাট পারীর দুই গাল নিজের দুই হাতের আজলায় তুলে ধরে ক্ষীপ্র কন্ঠে বললো,

“ আমি তোমার আশেপাশে তো দূরে থাক, তোমার ত্রিসীমানায়ও নিজেকে বৈ অন্য কাউকে মেনে নিতে পারবোনা । আমি সম্রাট মাহমুদ তালুকদার উপরে বিরাজমান সৃষ্টিকর্তা আর তার সৃষ্টিকৃত সকল কিছুকে সাক্ষী রেখে বলছি পারীজাত আবরার চৌধুরীকে ভালোবাসি,আমি পারীজাত আবরার চৌধুরীর এক জীবনের ভালো থাকার কারন হতে চাই। আমি তার জীবনের সুতোয় নিজের জীবনকে জড়িয়ে নিলাম। আমি একাগ্র চিত্তে পুরো ধরণীকে সাক্ষী রেখে আবারও বলছি আমি সম্রাট মাহমুদ তালুকদার পারীজাত আবরার চৌধুরীকে ভালোবাসি। শুনেছো তুমি পারীজাত? বুঝেছো তুমি পারীজাত!”

পারীজাত শুনছে,তার চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সুর্দশন এই যুবকের বলা বাক্যগুলো । তার পা থকে মাথা অব্দি শিরশির করছে সম্রাটের ছোয়া আর মুখে বলা বাক্যে।…কিন্তু তাও সে নিস্প্রহ চাহনিতে চেয়ে রইলো যা দেখে সম্রাটের ভেতর নড়ে উঠলো। পারীর চোখে কিছুক্ষন আগে দেখা সেই অনুভূতির বিন্দুমাত্র লেশ নেই এখন । কেমন অনুভূতিহীন চোখে পারী চেয়ে আছে। সম্রাটের ঠোট কাপছে। তার আর পারীর দুরত্ব কয়েক ইঞ্চির । ঐ চোখের মাঝে সম্রাট নিজের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট দেখতে পারছে অথচ তার মাঝে তার জন্য বিন্দুমাত্র অনুভূতি নেই।
পারী সম্রাটের ভাবনাকে চুড়ান্ত প্রমান করতেই অভাবনীয় কাজটা করে ফেললো।

১৯

সম্রাট পারীকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পনেরোর মধ্যেই হৃদয় এসে পারীর নাম্বারে ফোন করতে থাকে। সেই ফোন করার বিরতি টানে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পর। বিক্ষিপ্ত, বিদীর্ন শূণ্য মন নিয়ে সেদিন হৃদয় নিজ বাড়িতে ফিরে যায়। বারবার রিং বেজে যাওয়ার পরেও পারী কেন তার ফোন তুলেনি! যেখানেই যাক,যার সঙ্গেই যাক অন্তত একবার তো জানিয়ে যেতে পারতো, তার সঙ্গে যেতে ইচ্ছুক নয় সেটা বলতে পারতো! হৃদয় কি তাকে জোর করতো? কখনো নয়। পারীর পচ্ছন্দ নয় এমন কোন কাজ হৃদয় পারীর উপর চাপিয়ে দিবেনা। পারীকে কোন বিষয়ে জোর করবেনা, জোর করার হলে চারটা বছর অপেক্ষা করতো না। সে তো চায় পারী স্বেচ্ছায় তার আবেদন গ্রহন করুক। যতদিন না গ্রহন করে হৃদয় অপেক্ষা করবে। তাও না পারীকে জোর করবে আর না অন্য কাউকে পারীর জায়গা দিতে পারবে, এতে যদি এক জীবন এভাবেই কেটে যায়,একাকীত্নে আর বিরহে তবে কাটুক। পারী কি কখনো জানবে হৃদয় নামক এই পুরুষ তাকে ঠিক কতখানি ভালোবাসে!
বিকেল বেলা হাসোজ্জ্বল ছেলে বেরিয়ে গিয়ে এখন বিধ্বস্ত হয়ে ফিরেছে ,মা মিসেস অন্তরার কলিজায় মোচড় দিলো। যদিও তিনি পারীকে হৃদয়ের একজন বন্ধু ছাড়া জীবনসঙ্গী হিসাবে মেনে নিতে পারবেন না তাও ছেলের বিধ্বস্ত চেহারা উনার মাতৃচিত্তে আঘাত করলো। তিনি মনে মনে আহত হলেন এই ভেবে যে তিনি মা হয়ে ছেলের জীবনের সুখের পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। তিনি নিজের মৃত স্বামীর ওয়াদা রক্ষার্থে ছেলের জীবন শূলে চড়াচ্ছেন । ছেলেটা তার প্রতিনিয়ত একটু একটু করে ধ্বংস হচ্ছে আর তিনি মা হয়ে নিরব দর্শকের ভূমিকায় দাড়িয়ে আছেন। কিন্তু কিছু করার বা বলার সামর্থ নেই।
হৃদয় নিজ ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে ভাঙ্গা মন আর ক্লান্ত দেহ টেনে নিয়ে বিছানায় ছেড়ে দিলো। মাথা নরম জাজিমে পরতেই তার নয়নের কোন গড়িয়ে পরলো ভারী গোটা গোটা জল। তার বুকের মাঝে হারাবার ধামামা ভাজতে থাকলো অবিরত। সম্রাটের চোখে যেদিন প্রথমবার সে পারীর জন্য অনুভূতি দেখেছে সেদিন থেকেই তার অন্তরে রক্তক্ষরন শুরু হয়ে গিয়েছিল কারন সম্রাটের উপস্থিতিতে পারীর ছটফটানি আর তার আখিজোড়ায় ভাসা মুগ্ধতায় ঘেরা চাহনি। তাই তো সে ইদানীং বেশি বেশি পারীর আসেপাশে ঘুরঘুর করতো , বাকযুদ্ধে জড়াতো সম্রাট নামক বন্ধু রুপী প্রতিদ্বন্ধীর সাথে। কি আশ্চর্য! এক টিফিন ভাগ করে খেতো এই সম্রাটের সাথে, ক্লাসের সবচেয়ে ভালো বণ্ডিং তাদের ছিলো। এদের একজনের অগোচরে আরেকজনের নামে কেউ কোন কথা বলতে পারতো না, কোনদিন নিজেদের মধ্যে সামান্য কথা কাটাকাটিও হয়নি। অথচ আজ একটা মেয়ে নিয়ে তাদের মধ্যে নিরব দ্বন্ধ চলছে। কথাগুলো ভাবতেই কাদতে কাদতেই হেসে ফেললো। মাথার নিচে দুই হাত রেখে পুরো মাথার ভর ছেড়ে দিলো।
“ তুমি যাতে সুখি আমিও তাতেই সুখি,দুঃখরা না ছুইবে তোমায় আর না ছুবে আমায়, তুমি কাউকে পেয়ে সুখি আমি তোমার সুখ দেখে সুখি!”

“ শেষ?”

সম্রাট পারীর নির্জিব চাহনিতে বলা কথায় থমকে গেলো। পারী নিজের দুগালে থাকা সম্রাটের হাত দুটো একরকম ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো। এতে সম্রাট দুকদম পিছিয়ে গেল। পারীর কাজে সম্রাট হতবাক চোখে তাকিয়ে রইলো।পারীই আবার বলল,

“ এই সামান্য কথা বলার জন্য আমাকে টেনেহিচড়ে এতোদুর নিয়ে আসছেন? আপনি কি বোকা?

সম্রাট নিরুত্তাপ,একমনে চেয়ে রইলো সামনে দাড়িয়ে তার হৃদয় পোড়ানো নারীর পানে,পারীই আবার বলা শুরু করলো,

“ আপনাকে দেখে বোঝাই যায় না আপনি এতটা ইমম্যাচিউর,অথচ কাজে তার বিপরীত!”

“ কি বলতে চাইছো?”

সম্রাট এক কদম এগিয়ে এলো পারীর দিকে, পারী তৎক্ষণাৎ তিন কদম পিছিয়ে গেলো। সম্রাটের চেহারা থ হয়ে গেলো। ও পারীর পিছিয়ে যাওয়া কদমের দিকে চাইলো। পরক্ষনেই চোখ তুলে নিশ্চল ঐ চাহনিতে চাইলো,পারী নিজের অভিব্যক্তি স্বাভাবিক রেখে আগের মতোই কাঠখোট্টা স্বরে বলতে রাখলো,

“ দেখুন ভাইয়া, আমি আপনার অনুভুতিকে সম্মান করছি,কিন্ত গ্রহন করার ইচ্ছা নেই। ক্ষমা করবেন। ”

“ কারন?”

সম্রাটের কন্ঠস্বর ভারী, পারীর রুহে লাগলো, তাও আগের মতোই কাঠিন্যতায় বজায় থেকেই বললো,

“ তা বলতে আমি বাধ্য নই!”

“ আলবাত বাধ্য!”

সম্রাটের শব্দে জোর,পারী ভীত হলো,তাও নিজের অবস্থান থেকে নড়লো না,

“ মোটেই আমি বাধ্য না। এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়, যার তার কাছে তার জন্য কৈফিয়ত দিতে আমি বাধ্য নই। আর না কেউ আমাকে এই বিষয়ে জোর করার অধিকার রাখে। ”

“ আলবাত তুমি বাধ্য , আমি তোমাকে একটা প্রপোজ করেছি আর তুমি সেটাকে প্রত্যাখান করেছো , আমার প্রপোজ করার কারন যেমন আছে তেমনি তোমার প্রত্যাখানেরও আছে। সুতরাং তুমি আমাকে প্রত্যাখানের কারন দর্শনের জন্যেও তুমি বাধ্য। ”

পারী জানে সে সম্রাটের সঙ্গে বেশি সময় এভাবে যুক্তি তর্কে টিকতে পারবে না। তাই যেভাবেই হোক তাকে দ্রুত এখান থেকে যেতে হবে।

“ দেখুন কিছু সময় চাইলেও কিছু কিছু বিষয়ের কারন সবাইকে বলা যায় না। প্রাইভেট/প্রাইভেসি বলেও দুটো শব্দ আছে। যাই হোক
আমি বাসায় যাবো, আপনি নিয়ে যাবেন নাকি আমি একাই চলে যাবো? ”

সম্রাট পারীর গতিবিধি গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষন করছে , পারী যে বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চাইছে তা ও ভালো করেই বুঝতে পারছে। পারী নিজ কথা শেষ করে পিছু ঘুরতেই সম্রাট ওর দুই বাহু খামছে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে কঠোর চোখে চেয়ে দাতে দাত পিষে জিজ্ঞেস করলো,

“ কারনটা কি হৃদয়? ”

পারী হতাশ,হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো। সম্রাট স্থির থাকতে পারছে না। পারীর প্রত্যাখান ইতিমধ্যেই তার অন্তরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তার মধ্যে পারীর এহেন হেয়ালিপ্নায় আরো বেশি জ্বলছে। পারী তার ইমোশনকে গুরুত্ব দিচ্ছে না বরং তা নিয়ে এমন গা ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে যে সম্রাটের থেকে প্রপোজ পাওয়া নেহায়েত তুচ্ছ কিছু, তার মধ্যে এমন কিছু বিশেষত্ব নেই যার জন্য এই প্রপোজাল গ্রহণ করা যায়। পারী রিজেকশন দেখাতেই পারে তবে তার জন্য যথার্থ কারন পারীকে দেখাতে হবে। সম্রাট হৃদয় নয় যে বছরের পর বছর তার পিছনে পরে থাকবে এই আশায় যে কোন একদিন অপরদিকের মানুষটার মনে হবে কেউ তাকে ভালোবাসে তারপর সে তা গ্রহন করবে কি করবেনা তা সিদ্ধান্ত দিবে। সম্রাট ভালোওবেসেছে নিজের মর্জিতে জীবনের সঙ্গে জড়াবেও নিজের মর্জিতে, এখানে দ্বিতীয় কারো হস্তক্ষেপ সে এলাও করবেনা। এমনকি স্বয়ং পারীরও না। সম্রাট আরো একটু এগিয়ে আরো শক্ত করে চেপে ধরে পারীকে নিজের গা ছুইছুই করে দাঁড় করিয়ে চোয়াল শক্ত করে ক্ষ্যাপাটে স্বরে বললো,

“ হৃদয় কে ভালোবাসো? ওর জন্য আমাকে রিজেক্ট করছো? চুপ করে থাকবে না পারীজাত, কথা বলো! তুমি যতক্ষন না আমাকে ভ্যালিড রিজন দেখাবে আমি তোমাকে কোথাও যেতে দিবো না। তোমাকে আমাকে রিজেক্ট করার একদম সুস্থির পারফেক্ট কারণ অবশ্যই দেখাতে হবে। ”

সম্রাটের চোখে যেন আগুন ঝড়ছে। রক্তবর্ন ধারন করেছে তার সারা বদন,ফর্সা চেহারা এখন লাল টমেটো হয়ে আছে। পারীর দুনিয়া থমকে আছে,সম্রাট এতো কাছে যে ওর নিঃশ্বাসের উষ্ণতা পারীর চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে। তাদের উভয়ের গা এতোটাই নিকটে যে পারীর সারাঙ্গে অজানা অনুভুতির তড়িৎ বয়ে যেতে থাকলো। ওর পা থেকে মাথা ঝিমঝিম করছে,ও অনুভব করছে যে কোন সময় সে চেতন হারাতে পারে যদি সম্রাট আরেকটু সময় ওর কাছাকাছি এতটা মিশে থাকে। পারীর ভীতু , দ্বিধা ভরা মুখ চোখ সম্রাটকে আরো মর্মাহত করলো,কিন্তু তাও যে তার উত্তর আজকেই চাই। পারী এবারও অভাবনীয় একটা কাজ করলো, সে তার দুই বাহু ধরে রাখা ঐ শক্তিশালী সুঠাম হাত দুটো ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে তার জন্য অগাধ ভালোবাসা জিইয়ে রাখা ঐ সুপ্রস্থ বুকটায় ধাক্কা দিলো, যেই ধাক্কায় সম্রাট কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো,পড়তে পরতে জুতোর সোল দিয়ে পায়ের তলার মাটি আকড়ে নিজেকে রক্ষা করে নিলো । চূড়ান্ত অবাক হয়ে তাকালো পারীর দিকে,চারিদিকে ইতিমধ্যেই অনেক মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এদিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে,পারী মৃদু চেচানো স্বরে বললো,

“ কথায় কথায় এভাবে গায়ের উপর পড়বেন না, অযাচিত ঝাপ্টাঝাপ্টি করবেন না। অসহ্য লাগছে আমার,গা ঘিনঘিন করছে আপনার এভাবে বারবার অযাচিত ছোয়ায়, দয়া করে আমাকে এভাবে ধরবেন না, আমি কোন বাজারের মেয়ে না ! আর রইলো কথা আমার কাউকে ভালবাসার কথা, for kind your information আমি একজন এডাল্ট মেয়ে, স্বাধীন,স্বনির্ভর, so আমি কাকে ভালোবাসবো,কাকে আমার জীবনের জন্য চয়েস করবো সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে অন্য কারো অননুমিত অযাচিত হস্তক্ষেপ আমি বরদাস্ত করবো না। আমি কাউকে সেই অধিকার, অনুমতি দেইনি। আপনাকে তো নাইই। দয়া করে আমার অভিভাবক হবার চেষ্টা করবেন না। আমার দরকার নেই আপনার অহেতুক গায়ে পড়া অভিভাবকত্বের,চাই না আমি আপনার সস্তা ভালোবাসা। আর রইলো হৃদয়ের কথা, আমার আর হৃদয়ের মাঝে যা আছে তা আমাদের জন্য অমূল্য । সেটা কি , কতটা তা একান্তই আমাদের মধ্যেকার বিষয়, তা নিয়ে যারতার সাথে আলাপ করতে আমি একেবারেই ইচ্ছুক নয়। দয়া করে আমাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে অবাঞ্চিত কোন পরিস্থিতির মাঝে আমাকে অথবা হৃদয়কে নিয়ে ফেলবেন না। আপনাকে অনুরোধ করছি! ”

পারী নিজের দুই হাত একত্রে করে করজোড়ে বললো শেষ কথাটা,ওর চোখ ছলছল করছে,তাও মুখভঙ্গি কঠোর । অতঃপর চুড়ান্ত পেরেক মারলো সম্রাটের আবেগে,নির্লিপ্ত ভাবে নিরস গলায় বললো,

“ আমার এখন নিজের উপর রাগ হচ্ছে, সেদিন কোন কুলক্ষ্যে যে আপনার কাছে সাহায্য চাইতে গিয়েছিলাম আল্লাহ জানে! না আমি সেদিন ঐ কারাগারে যেতাম আর না আপনার সাথে দেখা হতো আর না আজকের মতো এত কুৎসিত দিন আসতো। ”

সম্রাটের মুখ দিয়ে এরপর আর একটা শব্দও বের হয়নি। সে নিরব চাহনিতে কেবল দেখছিলো তার পারীজাতকে যে কিনা কিছু সময় আগেই তার কলিজা কেটে ছিড়ে ফালাফালা করে দিয়েছে।
পারী নিজের কথা শেষ করে দেখলো সম্রাট ওর সামনে থেকে চলে গিয়েছে, গিয়ে বাইকে বসছে। পারী কিছু মূহুর্ত থ মেরে দাড়িয়ে রইলো,তার হাত পা কাপছে, ভাগ্যিস সম্রাট সামনে থেকে চলে গিয়েছে,নয়তো যদি এখন এখানে থাকতো তবে নিশ্চিত দেখে ফেলতো তার পারীজাতের ভেতরে চলা তান্ডবকে। সম্রাট বাইকে গিয়ে বসলেও না পারীকে ডাক দিলো আর না বাইক স্টার্ট দিলো। অর্থাৎ সে পারীর জন্য অপেক্ষা করছে ! পারী গিয়ে বাইকের পাশে খানিকটা সম্রাটের পিছনে গিয়ে দাড়ালো,সম্রাট নিজের বাম হাতে থাকা হেলমেটটা এগিয়ে দিলো, কিন্তু পারীর দিকে একবার ফিরেও তাকালো না , উল্টো পাশে তাকিয়ে থেকেই পারীর হাতে হেলমেটটা দিলো। পারী হাত বাড়িয়ে নেওয়ার সময় ওর আঙুলের ছোঁয়া সম্রাটের রিস্টে লাগে, পারী চমকে গেলো। কিন্তু সম্রাটের ভাবান্তর নেই,সে নির্লিপ্ত,নিরুত্তাপ,নিগ্রাহ হয়ে আছে। পারীর কান্না আসছে, মাত্র দুপলকের এমন অবহেলা,অবজ্ঞা সহ্য হচ্ছে না তবে সে চুড়ান্ত ভাবে এই মানুষটাকে কিভাবে হারাবে?

ঘরের মধ্যে তান্ডব চালিয়ে এখন সেই বিধ্বস্ত পরিবেশেই হাটুর মধ্যে মাথা গুজে বসে আছে সম্রাট,চারদিকে জিনিসপত্র ভাঙ্গাচূড়া,দুই হাতের তালু থেকে কনুই অব্ধি জায়গায় জায়গায় রক্ত জমে কালশিটে হয়ে আছে, জমিনের সাদা টাইলসের উপর ফোঁটা ফোঁটা জমাট বাঁধা কালচে লাল রক্ত । ঘরের দরজায় পা দিতেই বাপ্পীর কলিজায় মোচড় দিলো। ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে একেবারে নিরব , বাকহীন, শব্দহীন বন্ধুকে এভাবে দেখে। ধীর পায়ে বেছে বেছে জায়গায় পা রেখে বন্ধুর পাশে গিয়ে বসল।

“ নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার মন্ত্র জানিস?’”

বাপ্পী প্রশ্ন করে উত্তরের আশায় মিনিট দুই অপেক্ষা করলেও সম্রাট মুখ তুলেও তাকালো না,বাপ্পঈ নিজেই উত্তর দিলো,

“ আঘাত করা বিষয়টাকে অথবা মানুষ্টাকে জাস্ট অন্তর থেকে মেরে ফেলা।
তুই ওকে এমন ভাবে ইগনোর করবি যেন কখনো চিনিসইনি। তার উপস্থিতি এমন ভাবে উপভোগ করা যেন তার সাথে তোর কোনকালেই কোন সম্পর্ক ছিলো না। শোন মেয়েটা তোর অতিরিক্ত মনোযোগ পেয়ে তোকে সস্তা ভেবে ফেলছে,ও বুঝতেই পারছে না ঠিক কাকে প্রত্যাখান করলো। দোস্ত তুই সম্রাট , একটা মেয়ে তোকে এভাবে ভাঙ্গতে পারেনা।তুই অনেকগুলো বাচ্চা ছেলের আইডল, দয়া করে ওদের নিরাশ করিস না।
আমি বলবো না তুই ওকে ভুলে আরেকজনকে নিয়ে পরে থাক। বরং বলবো, ওকে দেখিয়ে দে ওর মত একজন তোকে হারিয়ে ঠিক কি হারালো। ওকে আফসোস করতে হবে,ওকে ভেতর থেকে স্বীকৃতি দিতে হবে যে তোকে রিজেক্ট করা ওর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
চল উঠ , হাত পা ব্যান্ডেজ করে দেই।বিল্ডিং হচ্ছে তো। ”

পারীকে ওর বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে সোজা নিজের ফ্ল্যাটে চলে আসে,পারীর প্রতিটি কথা তখনও কানের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ওর ছোয়া পারীকে এতটাই অস্বস্তিতে ফেলে যে সে নিজেকে বাজারের মেয়ে বলতেও একবার ভাবেনি, তার কন্ঠস্বর কাপেনি। ওর উপস্থিতি তাকে এতটাই বিরক্ত করে যে তার জন্য ভালোবাসা লালন করা বুকে আঘাত করতেও খারাপ লাগেনি। সে নিজের অনুভুতির উপর ধিক্কার জানায়,নিজের অনিয়ন্ত্রিত আবেগ আর অবান্তর আঙ্খাকার উপর তিরস্কার জানিয়ে নিজের বুকের ভেতরে চলা দহনকে নেভাতে ঘরের মধ্যে হাতের সামনে যা পায় তাই আছড়ে ফেলে,পাগলের মত বুকের উপর হাতঁ দিয়ে কিছু একটা হাতড়ে বেড়ায়। চুল টানতে থাকে। ওর এমন পাগলামি দেখে ওর অন্য হাউজমেটরা বাপ্পীকে ফোন দিয়ে জানায়। বাপ্পী তো জানেই আজ ও পারীকে প্রপোজ করবে তাই এখানের এই পরিস্থিতির কারন ওকে বলতে হয়নি।

এদিকে…………

২০

পারীকে সম্রাট ওর বাড়ীর সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়। যাওয়ার সময় সম্রাট একবার ফিরেও তাকায়নি,পারীর সালামের উত্তর তো দেয়‌'ইনি বরং সালাম শেষ হ‌ওয়ার আগেই চলে যায়। সম্রাটের নিরব অবজ্ঞা পারীকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় জগত থেকে।ও শূন্য মস্তিষ্কে চেতন হারা হয়ে ধীর পায়ে হেঁটে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে চলে যায়।
নয় তলায় চিলেকোঠার মতো একটা সুন্দর পরিপাটি গোছানো ফ্ল্যাট।মাঝারি আকারের একটা বেডরুম, ড্রয়িং ডাইনিং এডজাস্ট,কিচেন ও বিশাল চ‌ওড়া একটা ব্যালকোনি।

পারী ফ্ল্যাটের সামনে আসতেই তার নাম্বারে ফোন ঢুকে। ফোনের উচ্চ শব্দে পারীর অবচেতন মন চেতনে আসে।সে চমকে যায়। তড়িৎ গতিতে মুঠোয় থাকা ফোনটা তুলে দেখলো ‘ নিশি কলিং ' ।

পারী তুললো না কলটা। ওভাবেই রেখে দিলো,দরজায় কপাল ঠেকিয়ে খুব অস্বাভাবিক ভাবে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলো, শ্বাসকষ্টের ন্যায় হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে,তার সঙ্গে ঝুম বৃষ্টির ন্যায় বর্ষণ হতে থাকলো দু আঁখি ঝাঁপিয়ে। নিরবে কাঁদছে, দাঁতে দাঁত চেপে। আবারও রিং বাজলো,পারী তুলেও দেখলো না। এভাবে পরপর দশ বার হ‌ওয়ার পর পারী নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে, মিনিট দুই সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করে, স্থির হয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে।

সেই বিকেলে না খাওয়া অবস্থায় বের হয়েছিল, মাত্র গোসল করে। চুলের গোড়াও শুকায়নি তখন।এখন ঘামে ভিজে আরো জবজবে হয়ে আছে পুরো গা,চুল।কান্নার কারণে আরো বিধ্বস্ত হয়ে আছে মুখটা।পারী দরজা খোলা রেখে ওভাবেই নিজের ঘরে যায়,দিক হারা পারী সোজা বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার নলে চাপ দিয়ে বসে পড়ে জমিনে,গায়ের ওড়না এর মধ্যেই তা গাত্র ছিন্ন করে কদম তলে স্থান নিয়েছে।পারী দুই হাঁটুর মাঝে মুখ লুকিয়ে হিচকি দিয়ে কাঁদছে।পুরো বাথরুম বীভৎস আর্তনাদে কাঁপতে থাকলো। কাঁদছে পারী কাঁদছে। কোন অজানা কারণে কাঁদছে। সে স্বেচ্ছায় নিজের জন্য কান্না বেছে নিয়েছে।

“ পারী!"

নিশি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজা খোলা পেয়ে আতংকিত হয়ে ঘরে ঢুকে চিৎকার করে ডাকতে থাকলো, কিন্তু পারীর শব্দ পেলো না। শোয়ার ঘরে ঢুকে বাথরুমের কাছাকাছি যেতেই ভেতর থেকে ভয়ানক আর্তনাদ শোনা যায়।নিশি চমকে উঠে,ভয় পেয়ে যায়।ও দরজায় চাপড় মেরে পারীকে ডাকতে থাকলো।
পারী তখন বাথরুমে পা মেলে বসে দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে কাদছিলো।নিশি জোর হাতে চাপড় মেরে পারীকে ডাকছে, কয়েকবার ডাকার পর পারী কান্না থামিয়ে শান্ত হয়। কান্না থামিয়ে ধীর পায়ে উঠে দরজা খুলে দেয়। অনেক সময় ভেজার কারণে পারীর পুরো শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যায়।নিশি চমকে উঠে পারীকে দেখে।চোখে রক্ত জমে আছে,পুরো মুখ ফ্যাকাশে, রক্তশূন্য।

“ পারী কি হয়েছে তোর? এমন করে কাদছিলি কেন?"

পারী নিজেকে আর শক্ত রাখতে পারছে না। পরিবার পরিজনহীন পারীর কান্না করার জন্যে‌ও একটা কাঁধ নেই। কিন্তু পারী একটা বুক পেয়েছিল, দু'টো হাত পেয়েছিল,একটা ছায়া পেয়েছিল। যে কিভাবে যেন পারীর বিপদের সময় ঠিক চলে আসতো। কিভাবে যেন লোকটা পারীর ভরসা, বিশ্বাস, আস্থার জায়গা হয়ে গিয়েছিল।পারী দেখেছিলো ঐ চোখে পারীকে আগলে রাখার প্রতিজ্ঞা।পারী পেয়েছিল নির্ভর করার আশ্বাস ঐ লোকের কথাতে। কিন্তু সব শেষ,আজ থেকে সব শেষ করে দিয়েছে পারী নিজেই।পারী জানে এরপর, আজকের পর ঐ লোক কোনদিন‌ পারীর ছায়ায়‌ও পা রাখবে না।পারীর মুখটাও আর কোনদিন দেখবে না হয়তো। পারী ঐ লোকটা,ঐ প্রখর আত্নবিশ্বাসী, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোকটার সুপ্রশস্ত ভালোবাসায় ট‌ইটম্বুর ভরা বুকটা হারিয়ে ফেলেছ, স্বেচ্ছায়।সে তাকে অপমান করেছে,তাকে আগলে রাখার জন্য যেই বুকটা তার সামনে পেতে দাঁড়িয়ে ছিলো সেই বুকে সে আঘাত করেছে।পারী জানে তাকে হয়তো অনেকেই ভালোবাসবে কিন্তু তার মতো করে কেউ কি বাসবে? পারীর কেন বারবার মনে হয়,কেন এতটা বিশ্বাস ঐ লোকের উপর!ক‌ই হৃদয়‌ও তো আজ চার বছর ধরে তাকে নিজের অনুভূতি বোঝানোর চেষ্টা করছে,তাতে কেন পারীর মন ভিজেনি।অথচ ঐ লোকটা কিছু না বলেও কত কিছু বলে দিয়েছে,এতটাই বলেছে যে পারী আজ তার জন্য বুক চাপড়ে কাঁদতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু পারী পারছে না তার দিকে এগিয়ে যেতে।পারীর সাহসে কুলালো না। পারী যে গৃহহীন কাঙ্গাল,সে কি করে সম্রাট নামক শাহজাদার হাত ধরবে?

নিশি ওয়ারড্রব খুলে পারীর কাপড় এনে দেয়।নিজেই মাথা গা মুছিয়ে পারীকে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে কাপড় বদলাতে সাহায্য করে। কিন্তু কোন প্রশ্ন করলো না।

কাপড় বদলে পারী থম মেরে বসে রইল নিশির কাঁধে মাথা ফেলে।নিরবে তার চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝড়ছে।নিশি অনেক সময় চুপ থাকার পর বললো,

“ কি হয়েছে বলবি? কার জন্য কাদছিস? আমি যদি অনুমান করি তুই স্বেচ্ছায় এই কান্না চেয়ে নিয়েছিস, তাই না?"

পারী নিরুত্তর,নিশিও আর কোন প্রশ্ন করলো না।কি দরকার কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার। নিশ্চয়ই সীমা অতিক্রমের ভয় আছে।নিশি তো জানে, দুজনে‌র সীমান্তে কত বাঁধা!

একদিন পর সকাল বেলা....

অতিরিক্ত ভেজার কারণে পারীর গাঁ কাঁপিয়ে জ্বর হয়।নিশি, মেহরিন দুজন‌ই পাশে বসে ওর দেখভাল করছে।পারী এতিম দেখে নিশির মায়ের পারীর প্রতি সবসময়ই মায়া হয়।তিনি নিজেও এসে একবার পারীকে দেখে যায়,স্যুপ বানিয়ে খাইয়ে দিয়ে যায়।মেহরিনের মা আইনের লোক,তিনি সময় করে আসতে পারেননি।তবে এতিম পারীর জন্য তার ভেতরেও মায়া কাজ করে। বলাবাহুল্য তিনিই দায়িত্ব নিয়ে এই ফ্লাটটা ভাড়া যোগাড় করে দেয়। মায়ের অনুমতি নিয়ে নিশি, মেহরিন আজ সারাদিন পারীর সঙ্গে থাকছে।পারী সুস্থ না হ‌ওয়া অবধি এখানেই থাকবে।
নিশি পারীর হাত পা মুছিয়ে দিচ্ছে, পাশেই মেহরিন বসে পারীর পেইজ ইনবক্সে আপডেট দিছে,ওরা দুজন পারীর মডারেটর।পারী যে অসুস্থ তার কারণে কিছু কাস্টমারের অর্ডার বাতিল করছে,আর কারো থেকে সময় চেয়ে নিচ্ছে।
মোবাইল স্ক্রল করতে করতে দেখলো বাপ্পীর আইডিতে নতুন আপডেট,

“ আসসালামু আলাইকুম সবাইকে,
সবাইকে অনেক ধন্যবাদ যারা খোঁজ খবর নিচ্ছেন তবে হাসপাতালের দৌড় ঝাঁপের কারণে ফেসবুকে ঢুকা হচ্ছে না তাই রিপ্লাই করতে পারছি না।আর এই মুহূর্তে জনে জনে ইনবক্স করে উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।আমার ভাই সম্রাট ঠিক আছে আপাতত,ব্যথা কমেছে,পা ব্যান্ডেজ করা,আগামী সপ্তাহের মধ্যেই খুলে দেওয়া হবে।ওর পাশে ওর ফ্যামিলি আছে।আপনারা‌ও দোয়া করবেন যেন তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে যেতে পারি।"

মেহরিন পোস্ট পড়েই ভ্রু কুঁচকে নিয়ে নিশির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“ এ্যাই নিশি,সম্রাট ভাইয়ার কি হয়েছে রে?"

নিশি মেহরিনের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল, যার মানে আমি কি করে জানবো?

“ বাপ্পী ভাইয়া কি সব পোস্ট করেছে।পা ব্যান্ডেজ করা মানে!"

একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল,পারী গভীর ঘুমে।ওকে ঠান্ডা মাথার জন্য ওষুধ দিয়েছে, সেটার কারণেই গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে।
নিশি পারীর গাঁ মোছানো শেষ করে মেহরিন এর কাছে আসে। দুজন মিলে সম্রাট,ওর বন্ধুদের আইডি ঘেঁটে‌ও তেমন কিছু পায় না। শেষে বাধ্য হয়েই বাপ্পীকে মেসেঞ্জারে ফোন দেয়। অতঃপর.....

আরো একদিন পর....

পারীর জ্বর নামে।নিশি, মেহরিন এখন বাড়ি চলে যাবে।তখন‌ই মনে পড়ার ভঙ্গিতে ওরা বললো,

“ ওহ,পারী জানিস কি হয়েছে? অবশ্য তুই জানবি কি করে? তুই তো নিজেই জ্বর বাঁধিয়ে চিৎপটাং হয়ে ছিলি!"

“ ছ্যাহ্,কি সব বলিস? আমি চিৎপটাং হয়ে শুই না।আমি কাত হয়ে শুই!"

“ হ‌ইছে ব‌ইন, তিনদিন ছিলাম তোর পাশে,আমাগো জায়গা এই এত্ত বড় খাটে হয় নাই।তোর মৃগী রোগীর মতো মোচড়ামুচড়ির জন্য।ফুটবল খেলোস না কি ঘুমাইলে? "

নিশি তিরষ্কার করে বললো,নিশির পর মেহরিন জিজ্ঞেস বললো,

“ তাছাড়াও তোরে নতুন চিনি না। তোর খাওয়া থেকে নাওয়া সব মুখস্থ আমাগো তাই আমাগো লগে চাপা পিটাবি না।”

“ তোরা আমার প্রিয় বান্ধবী? কি নিষ্ঠুর তোরা? আমি একজন অসুস্থ মানুষ, ঠিক মতো খাইতেও পারতাছি না আর তোরা আমার লগে এমন ব্যবহার করোস?"

“ এ্যাই ঢং করিস না। একদম লাত্থি মাইরা খাটের নিচে ঢুকাইয়া রাখমু ঢংগি! ইচ্ছা ক‌ইরা জ্বর বাধাইয়া আমাগো খাটাইছোস বান্দির মতো,এহোন আবার ঢং করোস?"

“ আইচ্ছা পারী,সত্যি ক‌ইরা ক,কোন পোলার ল‌ইগা কাইন্দা জ্বর বাধাইছোস? ঐ পোলার হাড্ডিগুড্ডি ভাইঙ্গা গুঁড়া গুঁড়া ক‌ইরা মেথি গুঁড়ার লগে মিশাইয়া ইঁদুররে খাওয়ামু।"

বান্ধবীদের কথায় পারী হতভম্ব হয়ে গেছে,চোখ গোল গোল করে চেয়ে আছে।এরা এখনও সিরিয়াস না।এরা ওকে ভালো করে জিজ্ঞেস করবে, ওর দুঃখের কথা শুনবে,ওকে শান্তনা দিবে তা না।উল্টো ওকে নিয়ে খিল্লি উড়াচ্ছে। মানে কি? পারী গাল ফুলিয়ে র‌ইলো মুখ ঘুরিয়ে। বলবে না আর এদের সাথে কথা।নিশি, মেহরিন পারীর এহেন গাল ফুলানোয় পাত্তা তো দিলোই না, উল্টো ভাবলেশহীন ভাবে বললো,

“ আমরা বিকেলে আবার আসবো কিন্তু দয়া করে আবার কোন বা**দের জন্য বাড়িওয়ালার পানি অপচয় করিস না।মনে রাখিস অপচয়কারী শয়তানের ভাই!"

নিশির মুখে গালি শুনে পারীর হিচকি উঠে গেল,ও মনে মনে বিড়বিড় করে বললো,

“ কাকে গালি দিচ্ছিস জানলে নিজেই নিজেকে গালি দিতি।বেকুব মাইয়া!"

মেহরিন পারীকে বিড়বিড় করতে দেখে বললো,

“ দ্যাখ পারী মনে দুঃখ ল‌ইস না।এই পোলা মানুষ দুনিয়াতে আহেই আমগো কলিজা ভাজতে,দেহোস না ঐ মাঙ্গের নাতী আরিফ্ফা আমারে কেমনে দিনরাত জ্বালায়। আইচ্ছা পারী তুই প্রেমে পড়লি কহনরে? এক মিনিট তোর মতো ফাজিল মাইয়ার প্রেমে পড়লো কেডায় আগে হেইডা ক! আগে সেই মগারে দেখতে চাই!"

পারীর চোখ বিস্ফোরিত হলো,সে বড় বড় করে চেয়ে জিহবা কাটলো অগোচরে, কন্ঠে বিস্ময় ঢেলে বললো,

“ ছ্যাহ্ কি কস? মগা অইবো ক্যা? হেয় দুনিয়ার সবচাইতে সুদর্শন বুদ্ধিমান আর .....

পারী জেগে জেগে কল্পনা করতে লাগলো,সম্রাটকে দেখছে অদৃশ্য দৃষ্টিতে।নিশি, মেহরিন পারীর দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজেরাও সেদিকে চাইলো, অদৃশ্য সেই ব্যক্তিকে দেখার অভিপ্রায় করে নিজেরাও কিছু খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলো। অতঃপর দুই বান্ধবী এক সাথেই মৃদু চিৎকার করে লাফিয়ে দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে বললো,

“ ওরে আল্লাহ,শেষ মেষ তুই আশিক জ্বীন এর উপরে ফিদা হ‌ইলো পারী! হায় এ কি হলো আমাদের তারছিড়া এই বান্ধবীর! শেষ মেষ কি-না জ্বীনের প্রেমে? হ্যারে পারী তোর কি এই পৃথিবী ভালো লাগছে না? তুই এখন জ্বীনলোকে যাবি? লাইক নাগলোকের মতো যেমনটা দেখায় নাগিন সিরিয়ালে?"

“ আচ্ছা পারী সেখানে কি তোর কোন দেবর আছে? ইয়ে মানে যদি দেখতে হ্যান্ডু হয় তবে আরিফ্ফাকে বাদ দিয়ে আমিও একটা জ্বিনের লগে ভাগমু,তাইলেই এই আরিফের বাচ্চাটার শিক্ষা অইবো!"

“ আচ্ছা পারী জ্বিন লোকে দুলাভাইয়ের জুতা চুরির নিয়ম আছে? আচ্ছা জুতা চুরি করলে কি পয়সা দিবো নাকি সোনাদানা মনি মুক্তা মুখের উপর ছুঁড়ে মেরে বলবে , ‘লে লো জিতনা দিল চাহে ’ আচ্ছা ওয়েট,জ্বিনরা তো আবার আরবী বলে। হিন্দি বাংলা কিছুই বুঝবো না। আচ্ছা পারী তুই কবে আরবী শিখলি রে?"

মেহরিনের এই কথায় উত্তর দিলো নিশি,

“ আরে ধুর,তুই জানোস না জ্বিনেরা অনেক ক্ষমতাশালী, অনেক জাদু জানে। আমার মনে হয় পারীকে জাদু দিয়েই আরবী শিখিয়েছে তাই না রে পারী! আচ্ছা আমাদের কয়টা শিখানা!"

পারী এদের এত কাল্পনিক কথাবার্তায় বিস্ময় খেয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে।কি সব বলছে এরা।না এরা বেশি সময় তার আশেপাশে থাকলে সে সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যাবে। এদেরকে এখন‌ই সরাতে হবে নয়তো তার জন্য পাবনার সিট কনফার্ম হয়ে যাবে।

“ আচ্ছা তোরা মানিকজোড় হয়ে কোথায় যাচ্ছিলি? বাসায় তো যাবি না নিশ্চিত তাহলে কোথায় যাচ্ছিস সেটা বলে ফটাফট বের হ এখান থেকে!"

“ আমরা কোথায় যাচ্ছিলাম?"

বলে নিশি মেহরিন একে অপরের দিকে চাইলো, পরমুহূর্তেই এক‌ইসাথে মনে পড়ার ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো,

“ ওহ,আমরা যাচ্ছিলাম হসপিটালে!"

পারী ভ্রু কুঁচকে নিলো,কপালে ভাঁজ ফেলে শুধালো,

“ হাসপাতালে কেন? কার কি হয়েছে?"

“ ওহ,তুই তো জানিস না। জানবিই বা কেমন করে,কোন এক আশিক জ্বিনের পাল্লায় পড়ে জ্বরটর বাঁধিয়ে তিন দিন ধরে চিৎপটাং খেয়ে আছিস।তাই তুই কিছু জানবি না স্বাভাবিক... কিন্তু তোর আশিক জ্বিন যদি জানতে পারে তুই সম্রাট নামের কোন ছেলের জন্য চিন্তা করছিস তবে কিন্তু ভীষণ ক্যাচাল করবে।এই আশিক জ্বিন কিন্তু ভীষণ হিঃসুটে হয়। এরা পছন্দের নারীর আশেপাশে অন্য পুরুষকে সহ্য করতে পারে না।"

“ সম্রাট! সম্রাট মানে কোন সম্রাট,কার কথা বলছিস তুই?"

পারী শোয়া থেকে উঠে বসলো, ভীষণ দুর্বল লাগছে তার শরীর।তাও তার চোখেমুখে অস্থিরতা ছেয়ে গিয়েছে।নিশি, মেহরিন চেহারায় দুঃখি দুঃখি ছাপ ফেলে ভীষণ মন খারাপ করে বললো,

“ আরে আবার কোন সম্রাট! আমরা কয়টা সম্রাটকে চিনি ? একজনকে চিনি,সেই একজন হচ্ছে আমাদের সকলের সম্রাট ভাই।তোর অবশ্য কি লাগে তা জানি না কারণ তোর তো আবার ভাইয়া ডাকা নিষেধ।"

“ কি হয়েছে তাই বল!"

পারীর অস্থিরতা চোখে বিধার মতো।মেহরিন, নিশি দুষ্টুমির খোল ছেড়ে চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পারীর কাঁধে হাত রেখে শান্ত হতে বললো,

“ রিল্যাক্স হ,তেমন কিছু হয়নি।আর যতটা হয়েছে ততটা শিগগিরই সুস্থ হয়ে যাবে।"

“ কি হয়েছে বলবি তো!"

“ ভাইয়া পরশুদিন মাঝ রাতে বাইক নিয়ে রাইডে বের হয়েছিল,তো গতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিএনজির সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তার পাশের একটি খাম্বায় বারি খায়, হাঁটুতে লেগেছে,আর টুকটাক এচোড় পড়েছে। এছাড়া মাথাটাথা ঠিক আছে।ভাগ্য ভালো যেখানে পড়েছিল সেখানে নতুন রাস্তার জন্য বালু এনে ফেলছিলো,ভাইয়া বালুতে পড়ায় মাথায় বা অন্য কোথাও গুরুতর আঘাত পায়নি।"

পারী কথাটা শুনে স্থির হয়ে গেলো,থম মেরে ভাঁজ করে রাখা হাঁটুর দিকে তাকিয়ে নিরবে আবারও কাঁদতে থাকলো। মেহরিন, নিশি আবারও একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো।নিশি পারীর কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বললো,

“ চিন্তা করিস না পারী।উনি এখন ঠিক আছে।আর..... আমাদের একবার যাওয়া উচিত।আমরা অবশ্য কাল জানতে পেরেছি তাও বাপ্পী ভাইয়ার ফেসবুক আইডির বদৌলতে নয়তো জানতাম‌ই না।আমরা কাল‌ই যেতাম দেখতে কিন্তু তোর এত খারাপ অবস্থা, হুঁশ‌ই ছিলো না।এই অবস্থায় তোকে একা রেখে কি করে যাই,তাই আর যাওয়া হয়নি।সময়ে অসময়ে আমাদের কতভাবে সহযোগিতা করেছে ভাইয়া,তার এই সময়ে একটু গিয়ে দেখা করে আসা উচিত, তাই না!
শোন পারী মন খারাপ করিস না।আমরা গিয়ে দেখে আসি।তুই সুস্থ হলে আবার তোকে নিয়েও যাবো।"

“ না আমি যাবো না।আমি কোথাও যাবো না।"

বলেই পারী অন্যদিকে ফিরে শুয়ে পড়লো।চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছে।নিশি, মেহরিন আবারও মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো, অতঃপর পারীর উদ্দেশ্য করে বললো,

“ আচ্ছা তোকে যেতে হবে না,এখন রেস্ট নে।শোন তোর মাথার সামনেই লেবুর শরবত করা আছে।বমি করলে একটু খেয়ে নিবি।স্যুপ‌ও আছে,ফল কেটে রেখেছি,পাস্তাও করে রেখেছি,যা মন চায় খাস। কিন্তু না খেয়ে থাকবি না। আমরা হাসপাতাল থেকে বাড়ি গিয়ে শাওয়ার নিয়ে খাবার নিয়ে আসবো।আম্মু বলেছে রাতের খাবার রান্না করে দিবে আমাদের জন্য।তুই এতটুকু সময় একটু একা কষ্ট করে থাক।ভয় পাস না।আমরা শিগগিরই চলে আসবো! আর হ্যাঁ, ভাইয়ার খবর‌ও দিবো নে।"


২১

ল্যাব এইড হাস্পাতাল………।

সম্রাট বেডে শোয়া, তার ডান পাশে চেয়ারে বসা মিসেস মাহমুদ, সম্রাটের মা। তিনি ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সম্রাটও ইহজাগতিক সব দুঃখ বেদনা পাশে রেখে মায়ের মমতা মাখা পরশ অনুভব করছে।
সেদিন রাতে বাপ্পী সম্রাটের হাতে পায়ে ঔষধ লাগিয়ে কাটা স্থানে ব্যান্ডেজ করে দেয়। রাতে বাড়ী না ফিরে সম্রাটের সাথেই থাকে যেন ও নিজের আর কোন ক্ষতি করতে না পারে। কিন্ত তাতে বিশেষ লাভ হয়না। মাঝ রাতে উঠে সম্রাট বেরিয়ে যায়, সে তখনো পারীর রিজেকশন বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার তখনও পারীর থেকে উত্তর চাই। পারীর সাথে কথা বলতে হবে আবারও। সম্রাট নিজের মনকে কোনভাবেই শান্ত করতে পারছে না। উত্তেজিত হয়ে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে,মাঝ পথে যাওয়ার পর হাতের ব্যথায় তাল হারিয়ে বিপরীত থেকে আগত সিএনজির সাথে ধাক্কা লেগে পাশেই থাকা খাম্বার সাথে আঘাত পেয়ে নিচে থাকা বালুর স্তপে গিয়ে ছিটকে পড়ে।
সিএনজি চালক গিয়ে অপরদিকের নালায় পড়ে যায়। উনারও হাতে ফ্যাকচার হয়েছে। পেসেঞ্জারের মাথায় লাগে,প্রায় দেড় ঘন্টা পর পথচারী আর অন্য গাড়ী চালকের সাহায্যে হাস্পাতালে নেয়া হয়। এরমধ্যেই সম্রাটের নাম্বারে বাপ্পী ফোন করে যার মাধ্যমে বাপ্পী সম্রাটের খোজ পায়।

নিশি , মেহরিন কেবিনের দরজায় টোকা দিলে বাপ্পী আধ শোয়া অবস্থা থেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলে ওদেরকে দেখে বিস্মিত চোখে চেয়ে রইলো। নিশি,মেহরিন হাস্যজ্জ্বোল ভাবে বললো,

“ ভাইয়া কেমন আছেন? ”

“ আমি আছি আলহামদুলিল্লাহ, কিন্তু তোমরা হঠাৎ করেই না বলে যে!”

ওরা একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে বললো,

“ ভাইয়াকে দেখতে আসছি। ”

“ তা তো বুঝতে পারছি ,কিন্তু…”

বাপ্পী আসলে চায়না সম্রাট পারী জড়িত কারো সঙ্গে আপাতত কোন যোগাযোগ করুক। কিন্তু এই মুহুর্তে চলে আসা এদেরকে কি করবে! বাপ্পীর ভাবনা চিন্তার মাঝে সম্রাটের গলা ভেসে আসলো,

“ কে আসছে? ”

বাপ্পী দু- চোখ বন্ধ করে সুক্ষ্ণ শ্বাস ছাড়লো,অতঃপর দরজা থেকে খানিকটা সরে দাড়িয়ে ,

“ পারীর বান্ধবীরা এসেছে! ”

সম্রাট চমকায়, মনে মনে আওড়ায় ,

“ সে আসেনি! ”

বাপ্পীকে পাশ কাটিয়ে ওরা ভেতরে উকি দেয়, মিসেস মাহমুদ দরজার দিকে এগিয়ে এসে বললো,

“ আসো মা আসো। ”

সম্রাট গলা উঁচিয়ে ডাকলো,

“ ভেতরে আসো । ”

ওরা ভেতরে ঢুকে সম্রাটের মায়ের সাথে পরিচিত হলো, আর সম্রাট ওদের দিকে প্রশ্নাত্নক চোখে চেয়ে আছে,সে যাকে চাইছে সে তো আসেনি। মিসেস মাহমুদের কৌতুহলকে দমিয়ে দিয়েছে বাপ্পী শুরুতেই ওদেরকে নিজেদের জুনিয়র বলে পরিচয় দিয়ে। সম্রাট যখন দেখলো ওরা দুজনই এসেছে, সে তখনই মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকলো।
ওরা নিজেদের মধ্যে কথা শেষ করে চলে আসে। এর মধ্যে পারীকে নিয়ে আর কোন কথা বাপ্পী তুলতে দেয়নি।

বিকেল বেলা…

পারী মটকা মেরে শুয়ে শুয়ে বিভিন্ন সময়ে লুকিয়ে চুড়িয়ে তোলা সম্রাটের ছবিগুলো দেখছে । তখনই তার মুঠোফোন বেজে উঠলো, মাথার সামনে পড়ে থাকা অবহেলিত ফোনটা তুলে দেখলো হৃদয়ের নাম্বার। সেদিনের পর তিন দিন কেটে গেলেও হৃদয় পারীকে আর ফোন করেনি। ভীষন ভাবে সেদিন আঘাত পেয়েছিলো, হয়তো ভেবে নিয়েছে পারী সম্রাটের প্রস্তাবে রাজী হয়েছে আদৌতে যা পারীর দ্বারা সম্ভব হয়নি।

রবীন্দ্র সরোবরের লেক ঘাটে বসে পারী চারদিকে ঘূর্নায়মান রঙীন মুহুর্ত দেখছে আর অপেক্ষা করছে। হৃদয় আসবে, কাল ফোন করার পর পারী নিজেই দেখা করতে বলছে, তাই এই অপেক্ষা। জ্বর আপাতত নেমে গেলেও শরীরটা ভীষন দূর্বল তাও আজ সে এখানে এসেছে। মাত্র তিন দিনেই চেহারা ভেঙ্গে একাকার। রুগ্ন হাতটা তুলে পাশে থাকা কামিনী গাছের ডালের শুকনো ডাল ভেঙ্গে তা দিয়ে পায়ের নিচের সিক্ত মাটিতে আকিবুকি করতে থাকলো,ঠিক তখনই এক জোড়া কালো লোফার পরিহিত পা তার সামনে এসে দাঁড়ায় । পারী নিজের দৃষ্টি উপরে তুলে লেকের অপর দিকে উদাসীন চোখে চেয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে নিজের হাত গুটিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসল।

“ স্যরি। ”

পারীর নিচু আওয়াজে বলা শব্দটায় হৃদয় মুচকি হাসি দিলো, যা ছিলো স্পষ্টতই পারীকে বিদ্রুপ করে। পারীর দিকে না তাকিয়েই পাশে বসলো।
অনেক সময় কেটে গেলো নিরবতায়। নিরবতাকে ছিন্ন করে পারীই বলা শুরু করলো,

“ আমি সেদিন……

“ প্লিজ । ”

দৃষ্টি অন্যত্র রেখেই হাত উচিয়ে খানিকটা উঁচু কন্ঠে তেজালো গলায় পারীকে থামিয়ে দিলো। পারীর সাথে হৃদয় আওয়াজ আজকের আগে কখনো এতটা রূঢ় করেনি। পারী চমকালো। হৃদয়ের দিকে ফিরে তাকালো। অথচ হৃদয় এখনো মুখ ফিরিয়ে আছে। পারীও নিজ দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।

“ আমি তোমার কাছ থেকে কোনরূপ অযুহাত চাইছিনা। জীবনটা তোমার, তাতে কাকে জড়াবে তা একান্তই তোমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত,এখানে আমি অথবা অন্য কারো মতামত গুরুত্বপূর্ণ নয় । ”

“ হৃদয় , আমি তোমাকে একজন বন্ধুর বাইরে অন্যকিছু কখনোই ভাবিনি। সত্যি বলতে তোমার প্রতি আমার ভাবনা কখনোই বন্ধুর চেয়ে বেশি আসেনি। আমি তোমাকে…।

“ পারী প্লিজ থামো।”

আবারও থামিয়ে দিলো। অতঃপর নিজেই বলতে থাকলো,

“ পৃথিবীতে সব জোড় করে পাওয়া গেলেও কারো ভালোবাসা পাওয়া যায়না। তবে যত্নে,দোয়ায়,সবরে পাওয়া যায়। এটা আমি মনেপ্রানে বিশ্বাস করতাম,তাইতো …… কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি আমি যে গাছের গোড়ায় পানি ঢেলে তার ফুলের আশায় চাতকের মতো অপেক্ষায় আছি সে ফুলের মধু অন্য কোন ভ্রমরের জন্য। সেই ফুলের অধিকারী অন্য কেউ। আর আমি…।

“ আমি তোমাকে কখনো কোন ভাবেই আশা দেইনি হৃদয়। আমি সবসময়ই আমার তরফ থেকে পরিষ্কার ছিলাম। ”

“ তুমি কি তোমার সিদ্ধান্তে খুশি পারী? ”

পারী হৃদয় পাশাপাশি বসে কথা বলছে,দুর থেকে দুজনকে খুব কাছাকাছিই লাগছে। লেক এর ব্রীজে দাড়িয়ে তা নিজ অলক্ষ্যে প্রত্যক্ষ করলো আরেকজন। আঘাত প্রাপ্ত পা এর যন্ত্রনা মন ভাঙ্গার দহন দমাতে পারেনি, সকালে নিশি,মেহরিন চলে যাওয়ার পর তা আরো প্রখটাকার ধারন করেছে। মায়ের সামনে নিজের ভঙ্গুর চিত্ত দেখাতে চায়না, তাছাড়াও কারো সামনেই আর নিজের পোড়া বুকের ক্ষত দেখাতে চায়না বলে সবার অগোচরে হাস্পাতাল থেকে বেরিয়ে আসার সময় হৃদয়ের কাছে ধরা পড়ে যায়।নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে অন্যত্র চেয়ে বললো,

“ একটু খোলা আকাশের নিচে যেতে চাই,ব্যস আর কিছু না। ”

থেমে নেই সময়,কেটে গেল অনেকগুলো দিন। সম্রাটকে তার জননী নিজ গৃহে নিয়ে আসে। একমাত্র ছেলেকে ওভাবে ফেলে আসা তার মাতৃসত্ত্বায় সমর্থন করতে দেয়নি,যদিও তাতে ছেলের কিছুই যায় আসে না। বরং সে যেন মা বাবা পরিবার থেকে দুরে থাকতে পারলেই বাচে । ছেলেটা কেনো এতো গৃহ বিবাদি মিসেস সুবহা মাহমুদ বুঝতে পারেন না। এত বড় বাড়ী , এত গুলো ঘর ফাকা পড়ে থাকে অথচ তার তিন সন্তান তিন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মিসেস সুবহা মাহমুদের কাছে এই উত্তর জানা নেই।

মাহমুদ তালুকদার ও সুবহা তালুকদার সম্পর্কে কাজিন, মাহমুদ তালুকদারের দুই ভাই আর এক বোন থাকলেও সুবহা তালুকদার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান । পারিবারিক ভাবেই বিয়েটা হয়। সহায় সম্পত্তিতে দুজনই টেক্কা দেয়ার মতো। প্রচুর বৈভবের মাঝে তাদের পূর্ব থেকে বর্তমান প্রজন্ম জীবন যাপণ করলেও কেউ কখনো ক্ষমতার দৌরার্ত্নে যায়নি কখনো। কিন্তু কোন ভুতের পাল্লায় পড়ে মাহমুদ তালুকদার এই বয়সে এসে রাজনীতি নামক উঁই পোকার পিছনে ছুটছে তা তিনি বুঝেন না। তার সঙ্গে ছেলেটাকেও টেনে নেয়ার প্রয়াস করছে যার জন্য ছেলেটা দুরে দুরে থাকছে। তিনি ছেলেকে রাজনৈতিক ভাবে সমাজে প্রতিষ্টিত করতে চাইছে। অথচ ছেলের ইচ্ছা জেলা প্রশাসক হবার। ছোট থেকেই এই পদকে সে ভীষন পচ্ছন্দ করে। ব্যাবসায়ি হিসাবে সমাজে প্রতিষ্টিত তালুকদার ইদানিং রাজনৈতিক ভাবেও সমাদৃত অথচ তার একমাত্র উত্তরাধিকার হিসেবে জন্ম নেওয়া একমাত্র ছেলে এসবের ধারেকাছেও নেই। সে অবশ্য সামাজিক কাজে বাপকেও ছাড়িয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তাতে কি! তাতে তালুকদার সাহেব ছেলের প্রতি ভীষন বিরক্ত। তালুকদার সাহেবের ভাবনা হচ্ছে, রাজনীতি করবে না তবে কেন অযথা এসব মানুষের পিছনে পয়সা উড়ায় !

“ তুমি কি এবার পরীক্ষায় অংশ্রগ্রহণ করবে? ”

বাগানের দুই আম গাছের সাথে একটা ঝুল বাধা, সম্রাট তাতে পা মেলে শুয়ে সকালের রোদ উপভোগ করছে। সঙ্গে কিছু একটা ভাবছে ঠিক তখনই প্রশ্নটা করলো তালুকদার সাহেব। সম্রাট চট করে চোখ মেলে পা গুটিয়ে নিলো। মাহমুদ সাহেব ছেলের পা সরিয়ে নেওয়ার পর হওয়া ফাকা জায়গায় বসলো,যতই দ্বিমত থাকুক একটাই তো পুত্র তার,দিন শেষে এইতো তার ভরসা। তার এই বিশাল পতিপত্তির যোগ্য উত্তরসূরী। দুই মেয়ে আর এক ছেলে , এরাই তো উনার ভবিষৎ । এদের জন্যই তিনি এত কিছু করছেন। বাবাকে বসতে দেখে সম্রাট আধ শোয়া হয়ে বসে উত্তর করলো,

“ জি ! ”

“ বললাম এত কষ্ট করতে হবেনা। এমপি সাহেবকে বললেই সব হয়ে যাবে। তুমি…

“ বাবা প্লিজ, আমি নিজ যোগ্যতায় পেতে চাই। কারো ক্ষমতার দাপটে না। ”

মাহমুদ তালুকদার এবারও নিরাশ হলেন। তারপরেও ছেলের মাথায় হাত ছুইয়ে দিয়ে স্নেহপূর্ন কন্ঠে বললো,

“ তুমি আমার এক মাত্র ছেলে,আমার একমাত্র যোগ্য উত্তরসূরী। আমার যা কিছু আছে সবই তোমার তবে কেনো এতো কষ্ট তুমি করতে চাইছো, চাকরি করাটা কি খুব দরকার ! ”

“ বাবার অঢেল সম্পত্তি থাকলেই চাকরি করা যাবেনা এটা কোথাকার লজিক বাবা? সবারই নিজস্ব তৈরি পরিচয় থাকা উচিত , আর আমি তাই করতে চাই,তুমি প্লিজ আমাকে আটকিও না। ”

“ ঠিক আছে। আমি তোমাকে কখনোই কোন বিষয়ে বাধা দিতে চাইনি। এবারও দিচ্ছিনা। তুমি নিজের স্বপ্ন পূরনে সবসময়ই তোমার বাবাকে পাশে পাবে,যেকোন সময়,আমি বিশ্বাস রাখি আমার ছেলের সিদ্ধান্তের উপর । ”

“ থ্যাংকু বাবা, আমি তোমার বিশ্বাসের অমর্যাদা করবো না। দোয়া করো।”

“ হুম্ম, আসো নাস্তা করে নেই। ”

২২

রুহানি তালুকদার, সম্রাটের ছোট বোন। স্থানীয় একটা কলেজের বানিজ্যিক শাখার ছাত্রী। পরিবারের সবার ছোট বলে একটু বেশিই আহ্লাদি আর ন্যাকু।তবে বুদ্ধিমতী ভীষণ, পরিস্থিতি বিবেচনায় যথেষ্ট প্রখর জ্ঞান রাখে এই কিশোরী।বড় ভাই হিসেবে সম্রাট এই বোন বলতেই পাগল,যদিও তার পরপরই ছোট বোন হিসেবে সোহানি ভীষণ চাপে থাকে তার তরফ থেকে।সোহানী তালুকদার এবারের আইনের ছাত্রী। চতুর্থ বর্ষে রয়েছে যার দরুন এখন থেকেই বড় বড় আইনজীবীদের সঙ্গে তার হাতে কলমে প্রশিক্ষণ চলছে।সম্রাট এই দুই বোনের একমাত্র এবং বড় ভাই।
সম্রাটের জীবনেও তারা সবচেয়ে বেশি দামী।তিন ভাই বোন যখন একত্রে হয় তখন বিশাল এড়িয়া জুড়ে থাকা তালুকদার বাড়ির এই দ্বিতল ভবনে হাসির ফোয়ারা ছুটে।নিচ তলার আবাসন থেকে দ্বোতলার ছাঁদ,কিংবা বাগানে সুসজ্জিত অবসর কাটানোর আয়োজন, সবখানে চলে তিন ভাই বোনের দস্যিপনা।আবার সম্রাট চলে গেলেই সব শেষ, শান্ত শূনশান নিরবতায় ছেয়ে থাকে।কারণ তখন তারাও নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিকে এই বিশাল প্রাঙ্গন জোড়া বাড়িতে একা তড়পায় সুবহা তালুকদার কারণ মাহমুদ তালুকদার সকালে বেরিয়ে গভীর রাতে ফিরে। কোথায় যায়, কি করে তা কোনদিন জানা হলো না তার। জিজ্ঞেস করেও বিশেষ লাভ হয় না। কখনোই তিনি সোজাসাপ্টা উত্তর দেননা বরং ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যা বলেন তা সুবহার বোঝার সামর্থ্য থাকে না।

সম্রাট অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে প্রায় সপ্তাহ পেরুলো।এতে করে মনের চাপ কমলেও মগজের কমেনি।পারীর রিজেকশন তাকে এখন‌ও ভাবায়।একা হলেই সে এসব ভাবতে বসে। ঘুরেফিরে পারি,হৃদয়ের ফেসবুক আইডি স্টক করে।কি যেন খুঁজে বেড়ায়।
এই এক সপ্তাহতেই তার পা পুরোপুরি সুস্থ।সে এখন ঢাকা ফিরে আসার জন্য ছটফট করতে থাকে যা তার মা বাবা সহ সবার চোখেই বিঁধে। তালুকদার সাহেব ছেলের প্রতি অতি দূর্বলতার কারণে কিছু বলতেও পারছে না আবার যেতে দিতেও ইচ্ছুক নয়।তিনি চিন্তিত ভঙ্গিতে ছেলেকে আটকানোর পাঁয়তারায় এঁটে বলার চেষ্টা করলো,

“ তুমি বিসিএসের প্রিপারেশন তো এখানে থেকেই নিতে পারো! তার জন্য আলাদা থাকা কি খুব জরুরী?"

সম্রাট সোফায় আড়াআড়ি হয়ে শুয়ে ছিলো,টিভির রিমোট টিপতে টিপতে চ্যানেল বদলাচ্ছিলো।বাবার কথায় তা বাদ দিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললো।পা টেনে স্বাভাবিক ভাবে বসলো, অতঃপর জিজ্ঞেস করলো,

“ এক‌ই কথা বিগত কত বছর ধরে জিজ্ঞেস করছো বাবা, কিন্তু কেন?"

“ কেনটা তুমি ভালো করেই জানো বাবা। আমার একমাত্র পুত্র সন্তান তুমি, তোমাকে এভাবে দূরে রাখতে আমার ভালো লাগছে না। তাছাড়াও....বয়স হচ্ছে আমার! এত বড় ব্যাবসা, এতকিছু একাকী আর কত? এখন একটু হাল ধরো! চাকরি করতে চাইছো অনুমতি দিচ্ছি, কিন্তু তুমি চাকরি করলে কি এগুলো ফেলে দিবো? এগুলোর কি হবে?"

সম্রাট বাবার কথায় বিশেষ গা মাখলো না।সে ভীষণ গা ছাড়া হয়ে দায়সারা ভাবে বললো,

“ সে যখনেরটা তখন দেখা যাবে।এখন আমি এসব নিয়ে ভাবতে চাইছি না।কাল..."

“ একা একা থেকে কি মজা পাও!"

“ ভালো লাগে। তাছাড়াও বিসিএসের পড়াশোনা নিরিবিলিতে পড়তে,বোঝো‌ই তো ঐখানে আশেপাশে কত বুক মার্কেট, চাইলেই যখন তখন ব‌ইয়ের জন্য দৌড়াতে পারি।এটা কি এখানে থেকে সম্ভব? আর লাইব্রেরী,সেটাও তো ক্যাম্পাসেই। সুবিধা বুঝেই তো এতদূর একা থাকি। নয়তো কি থাকতাম? আমার‌ও কষ্ট হয় তোমাদের ছেড়ে থাকতে।"

“ তার মানে তুমি যাবেই?"

“ জি বাবা!"

“ আচ্ছা ঠিক আছে যাও,তবে কাল নয়।পরশু দিন থেকে!"

সম্রাট ভ্রু কুচকালো, জিজ্ঞাসু চোখে বাবার দিকে চাইলো। মাহমুদ তালুকদার ছেলের চাহনি পড়ে বললো,

“ এমপির বাসায় নিমন্ত্রণ আছে।তিনি খুব করে বলেছেন তোমাকে যেন নিয়ে যাই।"

“ আবার আমাকে উনি কোথায় দেখলো বাবা?"

“ দেখছে,ঐ তো ফেসবুকে!"

“ আমার ফেসবুক মানে আমার আইডিতে উনি কি করেন?"

“ তোমার নয়,আমার। তোমার বোন একটা পারিবারিক ছবি আপলোড করেছিলো সেখান থেকে দেখেছে।আর তাছাড়াও আমার ছেলে তুমি! তোমাকে চিনবে না এই তল্লাটে এমন কেউ আদৌও আছে?"

“ ওহ, আচ্ছা আচ্ছা। কিন্তু আমি যাওয়া কি ঠিক হবে ?"

“ কেন ঠিক হবে না?"

“ কারণটা তুমি নিজেও জানো বাবা।উনার ইথিক্স আর আমার ইথিক্সের পার্থক্য এভারেস্ট সম।পরে দেখা গেল আমার জন্য তুমি ছোট হবে!"

“ এমন কিছুই হবে না কারণ এমন কিছু তুমি করবে না।আমার তোমার প্রতি ভরসা আছে মাই সান!"

বলেই তিনি সম্রাটের পিঠ চাপড়ে উঠে গেলেন।সম্রাট ভাবুক হয়ে ঠোঁটে ডান হাতের মুষ্টি ঠেকিয়ে কিছু ভাবতে থাকলো।
বাবার প্রিয় এমপি সাহেব,নাম জব্বার মন্ডল,পেশা গাড়ির পার্টস ইমপোর্ট এন্ড রিসাইক্লিং। পারিবারিক অবস্থান,দুই কন্যা ও এক পত্নী।অত্র এলাকার পরপর তিনবারের এমপি।এখন অবদি তাকে কেউ হারাতে পারেনি।শোনা যাচ্ছে এবার ইলেকশন হলে বোধহয় মন্ত্রীত্ব পাবেন।পেলেও পেতে পারেন। এলাকায় যথেষ্ট কাজ করেছেন।সেখান থেকে ভীষণ সুনাম কুড়িয়েছেন। নিশ্চয়ই তাকে ভোটে বিজয়ী করা হবে। কিন্তু সম্রাটের সাথে তার দ্বন্দ্ব ঠিক দলীয় মতাদর্শে।উনার মতাদর্শ আর সম্রাটের নাগরিক মতাদর্শ এক নয়। অরাজনৈতিক চিন্তাশীল সম্রাট তালুকদার জাতী গোষ্ঠী ভেদাভেদ ভুলে সবসময় মনুষ্যত্বে বিশ্বাসী।সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের কোন মনুষ্যত্ব নেই।এটাই সম্রাট আর তার বাবার প্রিয় এমপি সাহেব এর মাঝের পার্থক্য।

এদিকে.....

নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা এলাকার একটা প্রধান সড়কের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে পারিজাত। উদ্দেশ্য বহুদিন পর মামীর কাছে যাওয়া।সেই মামী যে তার মায়ের মৃত্যুর পর তাকে মায়ের স্নেহ দিয়ে লালন পালন করেছেন।

প্লাস্টিকের বস্তা টাঙিয়ে দরজা বানানো হয়েছে।এমন একটা দরজা পেরিয়ে পারি নিজের ব্যাগটা নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। চারিদিকে শূনশান নিরবতা।থাকাটাই স্বাভাবিক।এ বাড়িতে এখন আর বাচ্চা নেই।যারা আছে তারা আবার নিজ নিজ সংসারে। আপাতত দুজন মধ্যবয়সী মহিলা ও একজন তাদের চেয়ে বয়স্ক পুরুষ।তবে এখন হয়তো পুরষজন বাড়িতে নেই। তিন রুমের একটা ছোট বাড়ি।মাঝে ছোট একটি উঠান,তার ডান পাশে রান্না ঘর।একটু দুরত্ব রেখে ছোট একটা রুম। নতুন বানানো হয়েছে। আত্নীয়দের ছেলেদের থাকতে দেওয়ার জন্য ঐটা বানানো হয়েছে।বাম পাশে কলপাড়।পারি চারদিকে নজর বুলিয়ে দেখলো, বহুদিন পর এলো এখানে।আজ প্রায় চার বছর হবে সে এই বাড়ি ছেড়েছিল। অনেক করে মনকে বুঝিয়ে নিজেকে দমাতো এখানে আসা থেকে কিন্তু এবার আর পারেনি।মনের বিক্ষিপ্ততা কোনভাবেই তাকে আটকাতে পারেনি।
মানুষ যখন মনের ভেতরে জ্বালা অনুভব করে তখন সবার আগে নিজের সবচেয়ে শান্তির জায়গা খুঁজে,আর সেই জায়গা কেবলি মায়ের বুক।পারির তো মায়ের বুক হারিয়েছে বাল্যকালেই। কিন্তু যাকে মা মনে করে এত বছর বেঁচে ছিলো তার কাছেই সে শান্তি খুঁজে নেয়।তবে কপাল যে খুব একটা সুপ্রসন্ন নয়,তাই সেই মা‌ও তাকে আগলে রাখতে পারছে না।

পারি সব চিন্তা ভাবনা পাশে রেখে মৃদু স্বরে ডাক দিলো,

“ মামনি! মামী!"

সে ডাক দিয়েই দরজায় করাঘাত করলো,তিরিশ সেকেন্ড অতিবাহিত হতেই একজন মধ্যবয়সী মহিলা দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল।
পারি ঐ চাহনি বুঝতে পেরে হালকা হেসে সালাম দিলো,

“ মামী আসসালামু আলাইকুম।"

মহিলাটা পারিকে টেনে ভেতরে ঢুকিয়ে গলায় জড়িয়ে নিলেন, ভীষণ ভেজা গলায় অস্ফুট স্বরে,

“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম, কেমন আছো তুমি পরী?"

বহুদিন পর মাতৃসুলভ স্নেহে পারি বিগলিত হয়ে পড়লো, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে কাঁপা স্বরেই বলল,

“ আলহামদুলিল্লাহ; আপনারা কেমন আছেন মামী?"

“ হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ!"

তিনি বলেই পারিকে ছাড়লেন।পারিও স্বাভাবিক হয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“ মামনি ভেতরে আছে?"

“ হুম,যাও যাও! সারা দিনরাত কাঁদে তোমার চিন্তায়!"

পারি ব্যাগটা শক্ত করে ধরে এগিয়ে গেলো, পেছনে পেছনে গেলেন মহিলাটিও।পারি ঘরে ঢুকেই ঠোঁট উল্টে কান্না আটকানোর প্রয়াস করতে থাকলো।
বিছানায় শুয়ে আছে ভীষণ রোগাসোগা একজন নারী।বয়সে সে মধ্যবয়সী হলেও দেখতে বৃদ্ধা মনে হচ্ছে। দীর্ঘদিনের শারীরিক অবস্থার অবনতি আর মানসিক চিন্তা তাকে এই অবস্থায় এনে রাখছে।পারি ব্যাগটা হাত থেকে ছেড়ে দিয়ে মহিলাটির বুকের উপর গিয়ে পড়লো,ভেজা কাঁদো কাঁদো কন্ঠেই বললো,

“ মামনি, কেমন আছো তুমি? এই যে দেখো আমি এখানে!"

বলেই পারি নিজেই মহিলাটার হাত তুলে নিজের গালে মুখে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখালো।মহিলাটির প্রতিক্রিয়া দেখানো বলতে কেবল অশ্রু ঝড়ানো অবদিই।এ ছাড়া তিনি নিজ থেকে কিছু‌ই করতে পারেন না।
অনেক সময় কাটলো এভাবেই,পারি স্বাভাবিক হলো।আগের মহিলা পারির কাছে এসে পারিকে তুলে ধরে বললো,

“ পরি উঠো,যাও হাত মুখ ধুয়ে আসো। অনেক দূর পেরিয়ে আসছো। কিছু খাও আগে।"

“ আমি গোসল করবো মামী।"

“ হ্যাঁ করো, আচ্ছা এক কাজ কর ঐ রুমের ভেতর যাও।ঐখানেই গোসল করতে পারবা।"

পারি চমকিত চাহনি জিজ্ঞেস করলো,

“ রুমের ভেতর গোসলখানা করছো?"

“ হ্যা করছি। তোমার মামনিকে তো বারবার বাইরে নেওয়া যায় না। তাছাড়া কাপড়চোপড় বদলাতেও ঝামেলা হয় তাই করাই লাগলো!"

“ ওহ্, আচ্ছা আমি যাই তাহলে!"

বলেই পারি সেই ঘরে গেলো।তার সঙ্গে ভাবতে থাকলো তার জীবনের উত্থান পতনের গল্পগুলো!

মামা মামীর বিয়ের অল্প দিনের মধ্যেই তার মা বাবা চলে যায় এরপর থেকে সে মামা মামীর কাছেই থাকে।পরশ আবরার চৌধুরীর শেষ কথাটা পারভেজ খন্দকারের মনমস্তিস্কে ঢুকে যায়।বাদ যায় না উনার স্ত্রী রেশমির‌ও।

পারভেজ ছিল অল্প আয়ের মানুষ,তা দিয়েই তাদের বেশ চলতো। নিসন্তান পারভেজ রেশমি দম্পতির ভীষণ আদুরে রাজকন্যা হয়ে উঠেছিল পারিজাত। কিন্তু ভাগ্যটা তো পারিজাতের! সেখানে সুখ থাকবে দুঃখ থাকবে না তা কি করে হয়?

ঢাকায় একটা ছোটখাটো কোম্পানির ক্যাশিয়ার পদে চাকরি করতো পারভেজ। একদিন ক্যাশ থেকে মোটা অংকের টাকা গায়েব হয়ে যায়।কে নিয়েছে তার কোন হদিস মেলেনি। কিন্তু তার দায়ভার চাপে পারভেজের কাঁধে,পারভেজ সাহেবকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়।তাকে অর্থলোপাটের অভিযোগে কারাবন্দী করলে অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার শর্তে নিজ স্বামীকে ফিরিয়ে আনে রেশমি। নিজের পৈত্রিক সহ স্বামীর পৈতৃক সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে যতটুকু ছিলো সব বেঁচে স্বামীকে দায় মুক্ত করে।সব এই অবদি স্বাভাবিক থাকলেও সমাজের কিছু লোক তা থাকতে দিলো না।তারা পারভেজ খন্দকারকে নিয়ে যাচ্ছে তাই রটনা ছড়াতে লাগলো। নানাভাবে উপাধি দিতে থাকলো যা পারভেজ খন্দকারের মতো সাদাসিধে আর সৎ মানুষ নিতে পারেনি।তিনি কথার ভারে নুয়ে পড়ছিল জীবনের কাছে। হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়ে মৃত্যুকে আপন করে নেয়। স্বামীর অকাল প্রয়াণ আর সমাজের লোকের নানা মুখরোচক কথায় রেশমি‌ও স্ট্রোক করে বিছানায় পড়ে যায়। পারি হয়ে যায় আবারও একা,নিঃস্ব। ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছিল না সে। কিন্তু আল্লাহ এতটাও নির্দয় না যে,তিনি পারির জন্য‌ই বোধহয় রেশমির বড় ভাইকে রেখেছিলো। যিনি নিজের পরিবার সহ নারায়ণগঞ্জ সদরে থাকতেন।
বোনের বিপদে তিনি নিজের সবটুকু দিয়ে এগিয়ে এলেন সঙ্গে ছিলেন উনার সহধর্মিণী। অত্যাধিক মায়িক আর মমতাময়ী একজন নারী।কিশোরী পারিকে দেখে তার ভেতরের মমত্ববোধ এতটাই কেঁদে উঠেছিল যে নিজের স্বল্প আয়ের স্বামীকে বললেন,

“ এতটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে,কার কাছে রাখবেন? ওর চাচা চাচী তো একটা খোঁজ‌ও নেয় না। আমাদের সঙ্গে নিয়ে চলেন। আমাদের তিনজন যেমন করে বাঁচবে ও তেমন করেই বাঁচবে।"

স্ত্রীর আচরণে মুগ্ধ হন হাসান সাহেব।তিনি সহধর্মিণীকে জানান,

“ ও আমার বোনের কাছে তার স্বামীর রেখে যাওয়া আমানত,এখন বোনের অসুস্থতায় আমার দায়িত্ব বোনের দেখভাল করা। সেক্ষেত্রে তার সঙ্গে যাই হবে তার প্রতি যত্নশীল হ‌ওয়া।তার সাথে জড়িত সকলকে নিয়ে ভাবা।কতটুকু একটি মেয়ে,বয়স আর কত? এই তো ষোলোতে পড়লো কেবল।এই বয়সে....হাহ্! যাই হোক তুমি বলাতে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি। আশাকরি তুমি নিজ ওয়াদায় অটুট থাকবে।আমি বিশ্বাস করি তোমাকে,আস্থা আছে আমার তোমার উপর।মেয়েটা আমাদের বাড়িতে অবহেলিত থাকবে না!"

হাসান সাহেবের স্ত্রী আসমা বেগম কথা রেখেছেন,তিনি এখন অবধি পারিকে নিজ সন্তানের চোখেই দেখে আসছে কিন্তু পারির কিসমত‌ই যেখানে সাহায্য করে না সেখানে অন্য লোকের কি দায়!

_____________________________________

সম্রাট.....

এমপির বাড়ির পেছনের খোলা জায়গায় ছোটখাটো আয়োজনে একটা প্রোগ্রাম চলছে।এটা মূলত রাজনৈতিক খোশালাপের জন্য।সম্রাট বুঝতে পারছে না এখানে তার কি কাজ! সে কোন রাজনৈতিক কর্মী নয়, তার বিশেষ আগ্রহ‌ও নেই, তারপর? তবে তার বাবার আগ্রহ আছে,তার বাবা এবার চেয়ারম্যান পদে দাঁড়াতে চাইছে।সে বুঝে, বুঝতে পারছে, একমাত্র ছেলে সে তার বাবার।বাবা চাইছে তার একমাত্র ছেলে তার পাশে থাকুক।যুবক ছেলেরা হয় বাবাদের সাহস।সম্রাট অবশ্য তাতে অনীহা জানাচ্ছে না।অন্য সময় হলে সে এখানে থাকতে আপত্তি জানাতো না। জানানোর প্রশ্ন‌ই আসতো না। কিন্তু এখন বিষয়টা অন্য দিকে। সম্রাটকে যে ঢাকা যেতে হবে যেকোনো উপায়ে।পারির সাথে আবারও কথা বলতে হবে,তাকে জানতে হবে কেন পারি তাকে না, হদয়কে চয়েস করেছে। তাছাড়াও....হুর নামের মেয়েটার কথাও কেন পারি ভাবলো না।একটা মেয়ে যে কি-না ছোট থেকেই একজনের সঙ্গে নিজ নাম জোড়া দেখে বড় হয়েছে সেই মেয়েটিকে কাদাতে পারির বুক কাঁপছে না? এতটাই নিষ্ঠুর পারিজাত? তবে কি সে কোন নিষ্ঠুর নারীকে চিনতে ভুল করেছে? তার তো মনে হয়েছিল তার পারিজাত,যাকে সে ভালোবাসে,সেই পারিজাত নিজের তৈরি কেকের ক্রীমের চেয়েও নরম।তবে ভুল কোথায়? চেনাতে নাকি বোঝাতে!
সম্রাট মানতে পারছে না,দুজন যখন দু'জনকে ভালোবাসে তখন তৃতীয় জনের চিন্তা করার কারণ নেই।কারণ একতরফা ভালোবাসার জন্য কেউ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ছেদ ঘটায় না। হৃদয় পারি একে অপরকে ভালোবাসে সেখানে কেন তারা হুরকে নিয়ে ভাববে? যেখানে হুর সবসময় হৃদয় দ্বারা প্রত্যাখিত! তবে কেন সে, কিসের দায়ে তার আবেগ অনুভূতি নিয়ে ভাববে? এটা আদৌওতে হয়? এমন চাওয়া কখনো সমুচিত?

সম্রাট বাগানজুড়ে হাঁটছে আর এগুলো ভাবছে। ঠিক তখনই তার কাঁধে কারো হালকা ছোঁয়া লাগে।চমকে উঠে সম্রাট।চট করে পাশ ফিরতেই এক সুদর্শনার দর্শন ঘটে।সে নিজেও সম্রাটের পানে লজ্জিত শীরে চেয়ে রইল,সম্রাট অদ্ভুত চাহনি মেলে বললো,

“ তানহা!"

২৩

তানহা জব্বার মন্ডল, সম্রাট বাপ্পীর কলেজের এক ব্যাচ জুনিয়র। বেশ ভালো সখ্যতা ছিলো।তবে তানহা কলেজ শেষ করেই গ্রাজুয়েশনের জন্য বাইরে চলে যায়।তাই অনেকদিন যোগাযোগ ছিলো না।

শ্বেত পদ্মের ন্যায় বর্ণের তানহার পরনে লং কটন সিল্ক বেবি পিংক গ্রাউন। লম্বায় ঘন চুলের উপর হালকা লালচে রঙ করা।বড় বড় ডাগর চোখে চিকন করে কাজল টেনে তাতে নকল পল্লব লাগানো। ঠোঁটে রয়েছে ম্যাট লাইট পিংক লিপস্টিক।সে মোহনীয় চলনে সম্রাটের দিকে এগিয়ে আসলো। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মিষ্টি হাসলো,এক‌ইভাবে সেও চমকানো শব্দ উচ্চারণ করে বললো,

“ স্যাম,ইয়্যু!"

“ হ্যাঁ,বাট তুমি এইখানে?"

“ আগে বলো তুমি এখানে এত বছর কিভাবে? হাও?"

“ আমি ঐ...বাবার সাথে এসেছি এমপি সাহেবের ইনভাইটে এটেন্ড করতে কিন্তু তুমি!"

“ ওহ্,তার মানে তুমি আমার অতিথি!"

“ মানে!"

“ মানে তুমি এমপি সাহেবের ইনভাইটেড দ্যাটস মিন তার অতিথি, এন্ড দ্যাটস‌ হুয়াই আমার‌ও অতিথি কজ তোমার এমপি সাহেব আমার বাবা!"

বলেই তানহা হেসে দিলো।
সম্রাট চমকালো, বিস্ময়কর চাহনিতে চেয়ে রইল। তানহা নিজের হাসি আটকে নিয়ে বললো,

“ এভাবে তাকিও না প্লিজ প্রেমে পড়ে গেলে ফেঁসে যাবে কিন্তু!"

সম্রাট নিজের চাহনি স্বাভাবিক করে ঢোক গিলে গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“ মানে আমি বুঝতে পারছি না, সিরিয়াসলি!"

“ আরে হ্যাঁ, বাবাকে নিয়ে কেউ মজা করে! সত্যিই এটা আমার বাড়ি!"

“ ওহ্,এর আগে কখনো বলোনি আর তোমার সোস্যাল প্ল্যাটফর্মেও কিছু বোঝার মতো নেই!"

“ কারণ আমি দেইনি। নির্ঝঞ্ঝাট জীবন উপভোগ করতে চাই। তাছাড়াও আমি চাই না আমার বাবার পরিচয়ে কেউ আমার সাথে পরিচিত হোক।বুঝোই তো মানুষ সুযোগ নিতে পছন্দ করে।"

“ হুম,তা ঠিক।এনি ওয়ে কি করছো আজকাল? গ্রাজুয়েশন নিশ্চয়ই শেষ?"

“ হ্যাঁ,তা শেষ! "

“ তবে কি নিয়ে কাটছে দিন? এনি ওয়ে দেশেই থাকছো নাকি আবারও..

“ ভেবে তো ছিলাম চলে যাবো কিন্তু এখন ভাবছি থেকেই যাই,কি বলো?"

“ আমি কি বলবো, তোমার যা ইচ্ছা!"

“ আচ্ছা তোমার খবর কি বলো? ওয়েল তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড বাপ্পী, রাইট! ওর কি খবর?আসেনি এখানে?"

“ না,আসলে আমি এসেছি অসুস্থ দেখে।ও তো জব নিয়েছে তাই আর সম্ভব হয়নি।"

“ ওহ্,, হ্যাঁ দেখেছিলাম তুমি বাইক এক্সিডেন্ট করেছো! এখন কি ঠিক আছো?"

বলেই তানহা সম্রাটের পায়ের দিকে তাকালো, ভীষণ চিন্তিত লাগলো ওর চোখমুখ, সম্রাট খানিকটা ইতস্তত বোধ করলো তানহার প্রতিক্রিয়ায়, নিজেকে ধাতস্থ করে গলা পরিষ্কার করলো শুকনো কাঁশি দিয়ে অতঃপর,

“ আলহামদুলিল্লাহ ঠিক আছি, দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
চলো কোথাও গিয়ে বসি।"

ওরা কথা বলতে বলতে বসার জন্য ফাঁকা জায়গা খুঁজতে থাকলো এদিকে ওদের দিকে গভীর চাহনিতে চেয়ে র‌ইলো মাহমুদ তালুকদার।চোখে ভাসলো কিছু অপ্রতিভ সুখের আকাঙ্ক্ষা।

অপরদিকে..

পারিজাত বিকেলের দিকে বাইরে বের হবার জন্য আঁকুপাঁকু করলেও ভেতর থেকে সাহস আসছে না।এই অবধি চলে আসলেও অতীতের কাল চিত্র যে এখন‌ও সামনে এসে দাঁড়াবে না তা তো নিশ্চিত করা যায় না। কিন্তু এভাবেই বা কত দিন বাঁচা যায়? তাকে তো মানতেই হবে,অতীত না যায় ভুলা আর না যায় মিটিয়ে দেওয়া।তবে তার লেশে লাগাম টেনে সংকুচিত করাই যায়।পারিজাত তাই করবে। চেষ্টা করবে অতীতের ধূলোমাখা বেদনাকে চাপা দিয়ে নতুন করে জীবনকে ভালোবাসতে।

সে পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে ঘর থেকে উঠানে আসতেই ভেতর থেকে আর্তনাদের স্বরে চেঁচিয়ে ডাক দিলেন হাসান সাহেবের স্ত্রী আসমা বেগম।

“ পারি ক‌ই যাও!"

পারি উঠান থেকেই উত্তর দিলো,

“ একটু বাইরে থেকে হেঁটে আসি মামী।"

“ যাইও না। দাঁড়াও!"

তিনি বেরিয়ে এসে বললেন,

“ শোন এলাকায় নরপিশাচ ঢুকছে, কয়দিন ধরে হাঙ্গামা হচ্ছে।"

“ কিন্তু তাতে আমার কি? আমি কি করবো? তাছাড়াও..."

“শকুন গুলার চোখ থেকে মাইয়ারাও রক্ষা পায় না।
বলা যায় না কোনটার চোখে পড়ে যাও‌,এগো তো বুক পিঠ নাই!"

মধ্য বয়সী আসমার চোখেমুখে আতংক, সুন্দরী মেয়ে ঘরে রাখলেই বোধ হয় এমন‌ই লুকিং থাকতে হয়।পারি কথা বাড়ালো না।উঠান থেকে ভেতরে ঢুকে চৌকির কোনে পা ঝুলিয়ে বসলো।আসমা মামীও পারির পাশে বসে পড়লো, অতঃপর বুঝানোর ভঙ্গিতে বলতে আরম্ভ করলো,

“ গত তিনদিন আগে একটা মেয়ের ধর্ষিত লাশ পাওয়া গিয়েছে,শোনা গিয়েছিল বর্তমান চেয়ারম্যানের চ্যালা মাকসুদকেই নাকি সবাই দেখেছিল রোজ ঐ মেয়েটাকে বিরক্ত করতে, কিন্তু কোন প্রমাণ না থাকায় কেউ কিছু করতে পারেনি।
আমি আর তোমার মামা এই জন্যই তোমাকে এখানে আনি না মা, আল্লাহর রহমতে তোমার উপচেপড়া রূপ, এমনিতেই জীবনে বিপদের কমতি নাই,তার মধ্যে আবার একটা...."

“ পচে যাওয়া দেহের আর পচন কিসে হবে মামী? যা পচার তা আগেই পচে গিয়েছে। আচ্ছা সমস্যা নাই,আমি বাইরে যাচ্ছি না তবে কোন দিন করি। এভাবে বসে থাকতে ভালো লাগছে না।"

“ আচ্ছা পারি কেক বানাতে কি কি লাগে? তোমার কেকের অনেক প্রশংসা শুনি, একদিন বানিয়ে খাওয়াও আমাকে!"

“ ওকে,মামী!"

__________________

বাড়ির ছাদের একপাশে সুন্দর করে বেডিং করা,মাথার উপর খড়ের ছাউনি দেওয়া , বৃষ্টিকালীন দিনে এখানে বসে রাত্রীযাপন করাই যায়।যদিও এখন বর্ষাকাল না,তবে রাতের চন্দ্র বিলাস অথবা মন খারাপের মুহূর্ত উৎযাপনের জন্য
তালুকদার বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের তিন তালুকদারের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা এটা।
সম্রাট এখানে বসেই গিটারের তারে হাত বুলাচ্ছে,আর মনে মনে ভাবছে বিগত দিনের কথাগুলো।পারির প্রতি সম্রাটের অনুভূতি তো প্রকাশ্য ছিলো,তার চোখেমুখে ভাসতো সেই নিষ্ঠুর নারীর প্রতি থাকা অনুভূতিগুলো। কোনদিন তো সম্রাট লুকোচুরি করেনি,তবে কি সেই নারী বুঝতো না? না বুঝলে সে কেন এতটা নিরব সম্মতি দিতো? কারো প্রতি কোন অনুভূতি ছাড়াই কি সেই মানুষটিকে এতটা আস্কারা দেওয়া যায়? আদৌও কেউ দেয়? সম্রাট যখন যেভাবে বলতো পারি ছুটে চলে আসতো।কত সময় কত জায়গায় হাত ধরেই নিয়ে গিয়েছে কোনদিন তো পারি বলেনি ওর সম্রাটের ছোঁয়ায় অস্বস্তি হয়।
সম্রাট নিজেও পারির চোখে দেখেছে তার প্রতি থাকা মুগ্ধতা।তবে কেন সেদিন পারি ওকে প্রত্যাখ্যান করলো? কিসের জন্য? কোথায় খুঁজে পাবে সেই উপযুক্ত কারণ? হৃদয়কে পারি ভালোবাসে? সত্যিই ভালোবাসে? হৃদয়ের জন্য‌ই পারির সেই অনুভূতি!

“ দূরের আকাশ নীল থেকে লাল, গল্পটা পুরানো..ডুবে ডুবে ভালোবাসি, তুমি না বাসলেও আমি ভাসি।!"

গিটারের তারে বিদ্যমান আঙ্গুল গুলো অনবরত ছন্দ তুলে দিচ্ছে,সম্রাট নিচু ভাঙ্গা কন্ঠে তা গেয়ে যাচ্ছে আপন মনে।

_______________________________

ঢাকা ফেরার কথা একদিন পরে থাকলেও সম্রাটকে থেকে যেতে হলো আরও চারদিন,এমপির মেয়ে তানহা জব্বার মন্ডলের সঙ্গ দিতে তাকে থাকতে হলো। এমপি সাহেব খুব করে অনুরোধ করেছেন যেন সম্রাট তার মেয়ের সঙ্গী হয় শহর ঘোরায়। শারীরিক ভাবে সুস্থ হলেও মানসিক চাপ কমাতেই সম্রাট‌ও তানহার মতো সুন্দরী নারীর বন্ধুত্বের প্রস্তাবখানা কবুল করে নিলো।

“ আচ্ছা জীবনসঙ্গী হিসেবে তোমার কেমন মেয়ে পছন্দ?"

একটা রোড সাইড রেস্টুরেন্টে বসে অপেক্ষা করছে খাবারের জন্য,তানহা নিজের ডান হাতটা টেবিলের উপর রেখে তাতে গাল ঠেকিয়ে বসেছে,সম্রাট খানিকটা হেলে বসে অন্যত্র চোখ রেখেছে , ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অন্য বিষয়।তানহার দৃষ্টি ওকে অস্বস্তিতে ফেলছে, কোনভাবেই তানহার চাহনি বন্ধুসুলভ না। ঐ চাহনি ভয়ংকর কিছু চাইছে যা দেওয়া সম্রাটের পক্ষে নয়।তার চেয়েও বড় কথা এই চাওয়াটা যেন কোনভাবেই এমপির কানে না যায়।কারণ এতদিনে সম্রাট বুঝে নিয়েছে এমপি মেয়েদের খুশির জন্য সব পারে।এই মেয়ে ক্ষুণাক্ষরেও যদি কাউকে চেয়ে বসে এমপি কোনভাবেই দ্বিমত করবে না।
সম্রাটের ভাবনায় ধাক্কা দিয়ে বাঁধা সৃষ্টি করলো তানহা,

“ হ্যালো কি ভাবছো?"

“ স স‌ স্যরি, কিছু বলছো?"

হকচকিয়ে উঠলো সম্রাট,তানহা অদ্ভুত চাহনি মেলে দেখলো কিয়ৎকাল, অতঃপর আবারও বললো,

“ কোথায় ছিলো মন? এ্যাই গার্লফ্রেন্ড আছে তোমার?"

এই প্রশ্নটা এই নিয়ে কম করে হলেও দশবার করেছে,প্রতিবার‌ই এড়িয়ে গিয়েছে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বলা উচিত।মিথ্যে করে হলেও বলা উচিত! সম্রাট তাই করলো,

“ হ্যাঁ আছে!"

সম্রাটের উত্তরে মুহূর্তে তানহার হাস্যোজ্জ্বল বদনখানি মলিনতায় ছেয়ে গেলো। চকচক করা অক্ষিকোটর আঁধারে ডুবে গেলো,সোজা হয়ে বসে নিরুৎসাহিত গলায় আবারও শুধালো,

“ সত্যিই!"

“ কিন্তু তোমার..."

“ হাইড করে রেখেছি, ব্যক্তিগত সম্পর্কটা আসলে হাইড রাখতেই পছন্দ করি। তাছাড়াও ও মেয়ে না? ওর ও তো পারিবারিক চাপ থাকতে পারে।সব বিষয় বিবেচনায় রেখেই আমরা হাইড রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।বিয়েটা হোক এরপর তো সারা দুনিয়াই জানবে। তুমি কাউকে বলো না হ্যাঁ,আমি চাইছি না এত তাড়াতাড়ি ওর বিষয়ে কাউকে জানাতে।

_______________________

পারি ঢাকা ফিরেছে আজ সকালে,তার ফেরার মূল উদ্দেশ্য হৃদয়ের বাগদানে অংশ নেওয়া। নয়তো আর কয়েকদিন থাকতো। কিন্তু হৃদয়কে কথা দিয়েছিল সে হৃদয়ের পাশে থাকবে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই দিনে তাই।

পারি মনে মনে হাসছে, পারি জানে হৃদয় আসলে বোঝার চেষ্টা করছে পারির জন্য হৃদয়ের মনে যেই অনুভূতি তার ছিটেফোঁটাও কি পারির মনে লাগেনি হৃদয়ের জন্য?

“ হাহ্"

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পারি মনে মনে বললো, ‘ যে ঐ চোখে তাকিয়ে হৃদয়ে লুকানো অনুভূতিকে মিথ্যা বলতে পারে সে তোমার অনুভূতির রঙে রাঙাতে পারে না নিজেকে। তুমি বন্ধু বৈ কিছুই নয়, কিন্তু সে সবটা দখলে নিয়েও কিছু হতে পারেনি।'

“ জীবনটা খুব স্বচ্ছতা দেয়নি আমাকে,আমি চাইলেই সব পেতে পারি না।সব পাওয়ার অধিকার আমার স্রষ্টাই আমাকে দেয়নি।"

“ তুই কি সত্যিই হৃদয় ভাইয়ার প্রোগ্রামে যাচ্ছিস পারি?"

বোরকার হিজাব খুলে বারান্দায় থাকা কালো গোলাপের গাছটা দেখছিল আর মনে মনে ভাবছিলো তখন‌ই নিশি বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে প্রশ্নটা করলে পারি সেদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে খুব সাবলীলভাবেই বললো,

“ শুধু আমি নয়,তোরাও যাচ্ছিস,তাই পটাপট তৈরি হ।"

“ আচ্ছা সত্যি করে বল, তুই কি সত্যিই হৃদয়কে কখনোই ভালোবাসিস নি? দেখ পারি জীবন একটাই তা, ত্যাগে কাটালেই হয় না।"

“ আমিও জানি জীবন একটাই,তাই এক জীবনেই যা করার করে নিতে হবে, সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মানুষের কল্যাণ চাওয়া।একটা জীবন শুধু ভোগ করলে হবে না,ত্যাগ‌ও করতে হবে!"

“ তোকেই কেন ত্যাগ করতে হবে? হৃদয় ভাইয়া তোকে ভালোবাসে,তবে কেন তুই তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছিস?"

মেহরিনের এহেন প্রশ্নে পারি হাসলো মৃদু,ব্যাগ থেকে কেকের জিনিসপত্র বের করতে করতে বলতে থাকলো,

“ তোরা ভুল ভাবছিস, হৃদয় আমার জন্য শুধু‌ই বন্ধু, ঠিক তোদের মতোই‌।এর বেশি কিছু না।তাই ত্যাগট্যাগ কিছুই করছি না আমি, শুধু ওকে ওর জন্য সঠিক যে তার হাতে তুলে দিয়েছি, ব্যস্। এখানে এত সিনক্রিয়েট করার কিছু হয়নি।"

মেহরিন এই কথা এই নিয়ে হাজার বার শুনেছে তাই বিরক্ত হয়ে ছিটতে ছিটতে পারির হাত থেকে সব নিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো।ওর যাওয়ার ধরন দেখে পারি মুচকি হাসলো।নিশি একটু এগিয়ে এসে নরম গলায় ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“ তবে সম্রাট ভাইয়াকে ফিরিয়ে দিয়েছিস কেন?"

নিশির প্রশ্নে পারি চমকে গিয়ে তাকালো,এটা শুধু তাদের মাঝে ছিলো তবে নিশি জানলো কেমন করে?

২৪

উর্ধ্ব গগণে ঝলমল করছে এক মস্ত বড় চাঁদ, রুপোলি থালার ন্যায় চকচক করছে। নিজের নরম স্নিগ্ধ রূপ ছড়িয়ে প্রকৃতিকে করে তুলেছে আরও প্রাণবন্ত মাধুর্যময়। ঘোর লাগানো অনুভূতিদের উস্কে দিয়ে নিঃসঙ্গদের ছটফটানিতে সে দিব্যি মিটিমিটি হাসছে। কিন্তু যারা হৃদয়ের অদলবদল ঘটিয়ে প্রণয়ের আকাঙ্ক্ষায় হাহাকার করছে তাদের জন্য এ এক অপার সম্ভাবনা,কোন বাঁধা, নিষেধাজ্ঞা তাদের হৃদয়ের সঙ্গমকে আঁটকে রাখতে পারে না।এমন‌ই এক দন্ডে বাপ্পী নিজ প্রেয়সীর সঙ্গে প্রেমালাপে মত্ত,দিকহারা প্রেমিক সে, ধানমন্ডির সুবিন্যাস, বিস্তৃত অত্যাধুনিক ফ্লাটে নিজের ঘরের বারান্দার রেলিংয়ের বেড়িতে পা ঝুলিয়ে বসে ঘোর লাগা আবেগে কথা বলছে ঠিক তখনই মুঠোফোন কাঁপিয়ে ভাইব্রেট হতে থাকে।
বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলে, ত্যক্ত স্বরে প্রেয়সীকে বললো,

“ জান,এক হারামজাদার চুলকাচ্ছে,ওকে একটু শান্ত করে আসি।"

শান্ত শিষ্ঠ নিপাট ভদ্রলোক বাপ্পীর মুখে এহেন বাক্যে প্রথমে ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা শ্রেয়সী,সুশ্রী,নরম মনের মেয়েটা ভিমড়ি খেলো, পরক্ষনেই খিলখিল করে হেসে উঠলো,সে বুঝতে পারলো নিশ্চয়ই কোন বন্ধু ফোন দিয়েছে যাতে সে বিরক্ত অনুভব করে এহেন বাক্য বললো। মিষ্টি ভাষী,নম্র মেয়েটা স্বভাবসুলভ শীতল কন্ঠেই অনুমতি দিলো।

“ আচ্ছা!"

বাপ্পী ফোনটা কাটলো,এখন রাতের মধ্য প্রহর। প্রেমিক প্রেমিকার জন্য সবচেয়ে শান্তির সময়। বিরক্তিহীন, অবিরাম প্রেম করা যায়। তার মধ্যে আজ পূর্ণিমা।ভরা পূর্ণিমার এই রাতে তার ভীষণ স্বাদ জাগলো মনের রাণীকে নিয়ে নদীর মাঝে নৌকা বিলাস করতে।তার পরনে থাকবে সাদা পাতলা শার্টের সঙ্গে ব্লু চেইক লুঙ্গি,আর তার রাণীর অঙ্গ জড়িয়ে থাকবে সাদা শুভ্র রঙা শাড়ি‌।আলতা মাখানো পায়ের সৌন্দর্য দ্বিগুণ করে তুলবে তার পরিয়ে দেওয়া রুপোর নূপুর।আলগা খোঁপার সঙ্গে চোখ ভর্তি মোটা করে দেওয়া লেপ্টানো কৃষ্ণ কাজল আর ঠোঁট ভর্তি টকটকে লাল লিপস্টিক। প্রলেপহীন স্বচ্ছ পরিষ্কার বদন। সে নৌকা বয়ে নেওয়ার আড়ালে আড়চোখে রাণীকে দেখবে,আর তার রাণী....

বাপ্পীর কল্পনা বিলাসে আবারও বাঁধা পড়লো।এবার‌ও উচ্চ আওয়াজে বেজে উঠলো হাতের মুঠোয় থাকা মুঠোফোনটা।কপাল কুঁচকে ' চ ' বর্গীয় শব্দ বিরবির করে উচ্চারণ করেই ফোনটা সামনে ধরতেই দেখলো সিয়ামের ফোন।এত রাতে সিয়াম! সিয়াম নেহায়েত সময় মেনে চলা লোক।এত রাতে ও সজাগ,এটাই তো ভাবার বিষয়।
ভাবতে ভাবতেই ফোন কানে তুললো, অপরপক্ষ থেকে ফোন রিসিভ হতেই ভেসে আসলো কিছু ভৎসনা বাক্য। বাপ্পী দাঁত খিচে তা হজম করে নিলো।সেই ব্যক্তি ভৎসান বাক্য নিক্ষেপে ক্ষান্ত হয়ে অতঃপর শান্ত হলো।বাপ্পী টিপ্পুনি কেটে বললো,

“ তুই কি বুঝবি পূর্নিমায় প্রেয়সীর সঙ্গে চন্দ্র বিলাসের অনুভূতি কেমন? আজীবন কুমার থাকা লোকেরা এসব বুঝে না।"

এর বিপরীতে কি বললো শোনা না গেলেও বাপ্পী অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো,তার হাসিতে অপর দিকের লোকটা বিরক্ত হলেও আর কোন শব্দ উচ্চারন বোধহয় করেনি।তবে শেষ বাক্যে কি একটা বললো যা শুনে বাপ্পীর ভ্রুদ্বয়ে পরদ জমলো, ভাঁজ ফেলে বললো,

“ দাঁড়া দেখছি তো!"

হোয়াটসঅ্যাপে আগত বার্তা বহরের টাল ঠেলে সদ্য আগত বার্তাটা দেখলো। চোখ কপালে তুলে হা হয়ে চেয়ে র‌ইলো। অতঃপর চট করেই আবারও কল দিলো সেই নাম্বারে,

“ হাও ইজ দিস পস্সিবল?"

.....

“ আচ্ছা আমি বুঝতেছি না কি হচ্ছে? পাশেই তো পারি দাঁড়ানো এবং ওকে দেখে কোনভাবেই মনে হচ্ছে না ও অখুশি, ভীষণ উৎফুল্ল লাগছিলো।আর আমাদেরকেও বলেনি, মানে বুঝলাম না কিছু! হুট করেই!"

.......

“ আই থিংক ও বুঝতে পেরেছে আমরা সবাই সম্রাটের পক্ষে এন্ড দ্যাটস হুয়াই...এনি ওয়ে সিদ্ধান্ত তো মারাত্মক আত্মঘাতী এখন এটা কার্যকর হলেই চলে তবে...পারি কেন সম্রাটের প্রোপোজাল রিজেক্ট করলো এখন এটাই বড় কথা। আচ্ছা তবে কি ওর অন্য কোন পছন্দ আছে?"

...

“ আচ্ছা রাখছি,আমার মনে হয় একবার স্যামকে জানানো উচিত।"

......

“ হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই রাখ আমি দেখছি।"

কথা শেষ করেই বাপ্পী হোয়াটসঅ্যাপে জ্বলজ্বল করা ছবিগুলো দেখছে,যেটায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে হৃদয় হুরের হাতের অনামিকায় একটা ছোট হিরের আংটি পরিয়ে দিচ্ছে।পাশেই পারির হাস্যোজ্জ্বল বদনখানি।সে ভীষণ উৎফুল্ল চোখে চেয়ে ঠোঁটে মিষ্টি হাঁসি ধরে রেখে দাঁড়িয়ে আছে ফুল দিয়ে সাজানো একটি ছোট থালা হাতে নিয়ে,যেটাতে আংটি সাজিয়ে রাখা হয়েছিল।পরনে তার লম্বা সাদা গ্রাউন।চোখ জোড়া খুশিতে জ্বলজ্বল করছে। বাপ্পী নিজ মনেই বিব্রত হলো এভাবে অন্য মেয়ে খুঁটিয়ে দেখায়। নিজের দৃষ্টি সংযত করে চাপ দিয়ে ফরোয়ার্ড করে পাঠিয়ে দিলো সম্রাটের নাম্বারে।
অতঃপর ফোন করলো।

সম্রাট এখনো সেভাবেই বসে আছে ছাদে।তার ঘরে মন টিকছে না। কিছু একটা দুশ্চিন্তায় ভেতরে দহন হচ্ছে।কেন জানে না।তবে মনের ভেতরে অজানা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।সোহানি, রুহানি বেশ কয়েকবার এসে ডেকে গিয়েছে কিন্তু তাদের কথায় বিশেষ পাত্তা না দিয়ে বরং ধমকে নিচে পাঠিয়ে দিয়েছে।
এলোমেলো সুর গাঁথছিলো আর চাঁদের দিকে অনুভূতিহীন চাহনিতে চেয়ে ছিলো। হুট করে পাশেই থাকা মুঠোফোনে বিকট শব্দে বিরাজমান নিরবতা ভেঙ্গে কেঁপে উঠলো প্রকৃতি।
সে গিটারের তারে হাত থামিয়ে ভ্র কুঁচকে তাকালো আগত কলার কে দেখতে।বাডি ইজ অনগোয়িং ইন কল! বাক্যটা মনি কোঠায় ভাসতেই হাত বাড়িয়ে রিসিভ করলো,এত রাতে কল আসায় চিন্তারা চেপে ধরতেই অপরপাশের ব্যক্তি খুব সন্তর্পণে হোয়াটসঅ্যাপের কথা বললো।

সম্রাট তাই করলো, হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে ছবিটা দেখে সে বিস্মিত, বিহ্বলিত! কি হয়েছে? কি হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করলো।কেন'ই বা এত জটিলতা তা-ও বুঝতে চেষ্টা করছে।

সময় বহমান... অপেক্ষা অথবা থেমে থাকার নিয়ম তার সংবিধানে নেই।সে চলছে তো চলবেই।তার কোন দায়ভার নেই,নেই পিছুটান।তাকে কেউ আঁটকে রাখতে পারে না, পারে না বেঁধে রাখতে।তাকে আঁটকে না রাখা গেলেও তার স্রোতে বয়ে তার সঙ্গে মিশিয়ে নেওয়া যায়।তবে এতে অবশ্য লাভ হয় মানবের‌ই।কারণ সময়ের কাজ সময়েই করতে হয়, অর্থাৎ আমাদেরকেই তার সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়।

সম্রাট রাজধানীতে ফিরেছে প্রায় দু সপ্তাহ পেরুলো। আশ্চর্যজনক ভাবেই হোক কিংবা অনাশ্চর্যের হোক,এই পনেরো দিনে একবারও সম্রাট পারির মুখ দেখতে পায়নি।এক পলক দেখার জন্য, প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য সে চাতকের ন্যায় অপেক্ষায় বসে রয়েছিল পারির ক্যাম্পাসের সামনে।পারি,হৃদয় কেউই আর বাচ্চাদের স্কুলে আসেনা আর তো না আসে নিশি, মেহরিন।উল্টো শোনা যাচ্ছে ওরা স্থান পরিবর্তন করার প্রচেষ্টা করছে।বিষয়টা সম্রাটকে ভেতর থেকে উদ্বেল করে তুলছে। ঠিক কি সমস্যা তা তার বোধগম্য হচ্ছে না।তবে সে চেষ্টা‌ও থামাচ্ছে না।না পারির সঙ্গে দেখা করার,আর না সত্যটা উদঘাটন করায়।
তার মন বারবার বলছে কিছু একটা আছে যা সে জানে না, কোথাও দেখার বাইরে রয়ে গিয়েছে এমন কোন কারণ যা পারি তাকে বলতে চায় না। কিন্তু সময়ের কাজ সময়ে না করলে তবে কি আর সাধন হবে!
একদিকে পারির চিন্তা অন্যদিকে বাড়িতে চলমান মূর্তিমান আতঙ্ক। সম্রাট অস্থির হয়ে এদিক ওদিক হাঁটছে,অবিরাম।এর মধ্যেই এই নিয়ে তিন কাপ চাপ ঘন্টা পেরোনোর আগেই শেষ করেছে।আজকে যেকোন ভাবেই হোক পারিকে রিচ করতেই হবে।ফোনটাও বন্ধ, যোগাযোগ করার আর তো কোন মাধ্যম তা অবগত নেই।নিশি, মেহরিন‌ও জানে না।জানে না নাকি তাকে জানাতে চাইছে না! তাও বোধগম্য হচ্ছে না।

বরিশাল,চরকাউয়া...

একটা শান বাঁধানো পুকুরঘাটে পা ডুবিয়ে বসে আছে পারিজাত। মুগ্ধ নয়নে পথের ধারের ক্ষেতের পাশে থাকা এই বিশাল গভীর পুকুরটা অবলোকন করছে। দ্বি-প্রহরের ঝলমলে রোদ,তার পরেও নয়ন জুড়ানো এক প্রশান্তিময় পরিবেশ।ভ্যাপসা গরমের মাঝেও বাতাবরণের মৃদু ঝাঁপটায় সব শীতল হয়ে যায়।হালকা গোলাপি রঙের সালোয়ার কামিজের সঙ্গে হালকা ফিরোজা রঙের ওড়না মাথায় পরা। সালোয়ার গোড়ালি থেকে এক হাত উপরে তুলে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে বসে কতশত রয়ে যাওয়া অতীত ভাবছে।
কখনো এককালে এই পুকুরের মালিকানা তাদের ছিলো,সে খুব ছোট থাকলেও ততটাও ছিলো না যে বুঝবে না কোনটা কার ছিলো! এগারো বছর বয়সী পারির এতটুকু বুঝ অবশ্য ছিলো কিন্তু যা ছিলো না তা হলো জোর খাটিয়ে নিজের জিনিস নিজের বলে দাবি করা।আর ঐ যে সময় গেলে সাধন হয় না।তাই পারির‌ও আর হলো না।এখন এসব আর কোন কিছুই নাকি পারির নেই।সব এখন অন্য কারো মালিকানাধীন।চাচীর বর্ণণামতে বাবার রেখে যাওয়া ঋণ শোধ করতেই নাকি সব কিছু বিক্রি করতে হয়েছিল অথচ পারি শুনেছে এই পুকুর যারা কিনেছে তাদের থেকেই নাকি বড় চাচা পরে নিজের নামে লিখে নিয়েছে,তাহলে অর্থ কি দাঁড়ালো? সে নিজের ভাইয়ের ঋণ শোধ করতে ভাইয়ের সহায়সম্বল বিক্রি করেছে নিজের কাছেই।
কথাগুলো ভাবতেই হা করে একটা ছোট শ্বাস ছাড়লো তার সঙ্গে উড়িয়ে দিলো সব দেনাপাওনার হিসেব।পারি আর এসব নিয়ে ভাবতে চায় না।কি হবে এসব নিয়ে ভেবে! একটা জীবন একাকী চলেই যাচ্ছে।চলে যাবেও ! কোথাও নিশ্চয়ই থেমে থাকবে না। অনন্তকাল ধরে এই ধারাই চলে আসছে মানবজীবনে। অর্থ, সম্পদ কোন কিছুই মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারে না যদি না তা রবের ইশারা না হয়।
পারিও বিশ্বাস করে তার জীবনে যা ঘটছে আর ঘটবে সবটাই তার ভাগ্যের জোরে।উপর‌ওয়ালা তাকে সৃষ্টি করার বহু আগেই তো তার ভাগ্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন সেটার পরিবর্তন পরিবর্ধন‌ও কেবল তার‌ই ইশারায় ঘটবে অন্যথায় না।

“ পারি,এই ভরদুপুরে এইহানে ব‌ইয়া আছো ক্যা? আহো,উঠো। ভরদুপুরে মাথারিরা ঘাটকুলে , জঙ্গলে থাকে? শহরে থাইকা থাইকা বেলাগাম অইয়া গ্যাছো একদম!"

চাচী,পরশ আবরার চৌধুরীর বড় ভ্রাতা ফারাজ আবরার চৌধুরীর সহধর্মিণী মেহরুবা সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত সহকারী,যার প্রধান কাজ‌ই হচ্ছে মেহরুবা সিদ্দিকীর ফুটফরমায়েশ খাটা। ‌পুকুর পাড়ের ঐপাড়ে থাকা টিউবওয়েল থেকে কলস ভর্তি পানি নিয়ে গোরুর চারায় ( বড় মটকা জাতীয় মাটির পাত্র যেটাতে গোরুকে খাবার দেয়) দিবে।সেটাতে ভুষি,দানা,খ‌ড়, কাঁচা ঘাস ভাতের মাড় মিক্সড করে গোরুকে খেতে দিবে।তাই তিনি পানি নিয়ে যাওয়ার পথেই এভাবে পারিকে সতর্কবার্তা দিলেন।পারি এক পলক সেদিকে তাকিয়ে আরো একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে উঠে দাঁড়ালো,দু হাত দিয়ে জামার পেছনের নিচের অংশ ঝেড়ে নিয়ে লেগে থাকা কাঁচা মাটির উঠতি অংশ ফেলে অনুসরণ করলো গৃহমুখী কাঁচা মাটির পথটাকে।

“ পারি,পারিজাত তাই না?পরশ কাকার মেয়ে?"

চারদিকে সুউচ্চ দেওয়াল টানা বিশাল বাড়িটার দরজায় পা রাখতেই পেছন থেকে কেউ একজন কথাগুলো বলে উঠলো।পারির পা থমকে গেলো। তাকে এখানে কারো চেনার কথা নয়।কারণ সে বহু বছর পর এখানে পা রেখেছে ঠিক কতগুলো বছর পর? বারো বছর বয়সে এই বাড়ির চৌকাঠে শেষ পা রেখেছিল আর আজ সে তেইশ বছর বয়সী তরুণী! তাহলে কে-ই বা চিনলো?

পারি মুখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। লম্বাটে গড়ণের এক যুবক।মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল, এলোমেলো, অগোছালো সিল্ক চুলের একগাছি চুল চ‌ওড়া চ্যাপ্টা কপালের উপর ছড়িয়ে আছে।গভীর ঘোলা জলের ন্যায় ঘোলাটে চাহনি,রোদে পোড়া ত্বকের চোয়াল ভাঙ্গা গাল, কানের গোড়া থেকে চুল ছুঁয়ে সরু রৈখিক ধারায় গজানো এক মুঠো পরিমাণ চিকন দাড়ী আর খোঁচা খোঁচা গোঁফের এক শীর্ণ জীর্ণ দৈহিক অবয়বের পুরুষ! পরনে ছাইরঙা কটনসিল্ক শার্ট,ধূসর ঘিয়ে মিক্সড রঙের লুঙ্গি যা স্পষ্ট ভাবে বহুদিনের জমানো ময়লা নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর প্রমাণ রাখে।
নিকোটিন পোড়া ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে পূণরায় ছেলেটা বলে উঠলো,

“ পারিজাত তুমি তাই না? বাহ্ বড় হয়ে গিয়েছো বেশ! এতটুকু মেয়ে ছিলে যখন এখান থেকে শেষ বার গিয়েছিলে আর আজ কত বড় হয়ে গিয়েছো ঠিক যেন বিয়ের যোগ্য!"

প্রথম দর্শনেই এহেন মন্তব্য! পারির ভ্রু দ্বয়ে ভাঁজ পড়লো,কপাল কুঁচকে এলো।সে এখনও ঠিক মতো চিনতেই পারলো না অথচ সামনে দাঁড়ানো ছেলেটা কি সব বলে যাচ্ছে!

তার মুখ খোলার আগেই ছেলেটাই বলে উঠলো,

“ চিনতে পারছো না? আরেহ আমি জাবেদ! তোমার জাবেদ ভাই,ঐ যে... ওহ্ তোমার মনে নেই? তোমার চাচীর ভাইপো। মানে আমি তোমার ফারিশ ভাইয়ের মামাতো ভাই কাম বন্ধু! এখনও মনে পড়েনি, ছোট বেলায় কত আমার কাঁধে চড়তে আর এখন..বড় হয়ে গিয়েছো বেশি! তাই না! তবে আমি কিন্তু এখনও......!"

পারি লোকটার দিকে থমথমে মুখে চেয়ে আছে। এতগুলো কথা এক দমে বলে দিলো,তাও সব অনর্থক, শুধু পরিচয় দিলেই যথেষ্ট ছিলো কিন্তু লোকটা রেল গাড়ির মতো কত কি বলে গেলো।
পারির খুব একটা মনে পড়লো না এত কথার পরেও তবে ঝাপসা কিছু স্মৃতিপটে ভেসে আসছে।তার ছোট বেলার বিশেষ কিছু দিন ছাড়া গ্রামে কাটানো হয়নি তেমন।ঐ সময়টুকুতেই সে কার সাথে কখন
কি করেছে তা স্পষ্ট মনে থাকাও সম্ভব নয়।তবে কারো মুখের উপর চিনি না বলাটাও সমীচিন নয়।এসব ভেবে পারিও পারলো না।সে নির্লিপ্ততা বজায় রেখে অবলীলায় বলে দিলো,

“ জি,মনে পড়েছে ভাইয়া। কেমন আছেন আপনি?"

পারির মনে পড়ায় অথবা চেনায় যেন অপরদিকের লোকটার চোখেমুখে খেলে গেলো এক অজানা সুখ।সে অজ্ঞাত অনুভূতি মিশিয়ে তাকালো পারির ঔজ্জ্বল বদনে, প্রতিক্রিয়াহীন চাহনি আর শুষ্ক ঠোঁটে।পারি ঐ চাহনিতে বিব্রত হলো, কন্ঠ দিয়ে বহু কষ্টে শব্দ সৃষ্টি করে বললো,

“ ভেতরে যাই,চাচী ডাকছে।"

বলেই সে ভেতরে পা বাড়ায়,জাবেদ খানিকটা গলা চড়িয়ে বলে,

“ যাও যাও,আমিও আসছি।"

25

“ হাঙ্গাদিন ট‌ইট‌ই হইরা কোম্মে ঘুইরা বেড়াও?দ্যাহো বেড়াইতে আইছো বেড়াও।কোন কেলেঙ্কারি বাজাইয়া মান সম্মান খুয়াইও না। তুমি তো আর জনম ভর থাকবা না,থাহোন তো লাগবে মোগোই।মোগোই যত ঝুট ঝামেলা সামলাইতে অইবে হানে।”

বড় মটকা থেকে পানি উঠিয়ে গোরুর চারায় দিতে দিতে একাধারে কথাগুলো বললেন পারির চাচি।

মামীর কাছে বেড়াতে যাওয়ার পর থেকেই পারির মনটা কেমন ছটফট করছিলো একবার মা বাবাকে দেখার জন্য।যদিও তাদের চিহ্ন আদৌও আছে কি-না তা পারি নিশ্চিত ছিলো কিন্তু তারপরেও সে ছুটে এসেছে বরিশাল। নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে হৃদয়ের আকদের অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে‌ তার তিনদিন‌ পরেই বরিশাল চলে আসে।
বহুদিন পর নিজ পৈত্রিক ভিটায় পা দিতেই পারির অন্তরে এক অদ্ভুত অনুভূতি ঝিমঝিমিয়ে উঠে।যদিও এখানে তার বেড়ে উঠা কিংবা দীর্ঘদিন যাপনের অভিজ্ঞতা নেই কিন্তু তাও যতটা আছে তা মোটেই সুখকর নয়।

পরশ আবরার চৌধুরী আর প্রিয়ন্তি খন্দকারের মৃত্যুর পরপরই পারির মামা পারভেজ খন্দকার পারিকে নিয়ে এখানে এসেছিলেন।যদিও তাদের উদ্দেশ্য পারিকে এখানে রেখে যাওয়া ছিলো না তবুও সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়াতেই যেন তারা পারির অভিভাবকত্ব নিয়ে একটা আলাপ তুলেছিলেন।তখন মাত্র এগারো বছর বয়সী পারির দায়িত্ব নেওয়ার কথা উঠতেই পারির বড় চাচী মেহরুবা সিদ্দিকীর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম।তিনি নির্ভাবনায় ভরা মজলিসে জানিয়ে দেন উনার ঘরে বালেগ ছেলে আছে,এই সময়ে ঘরে একটা উঠতি বয়সের মেয়ে রাখতে ইচ্ছুক নন তিনি।
স্ত্রীর পা চাটা ফারাজ করিম চৌধুরী‌ও সেদিন পত্নির পক্ষে থাকার প্রমাণ দেন নিরব থেকেই। এরপর আর কি! এগারো বছর বয়সী পারিকে নিজ পিতার ভূমি, অস্তিত্ব সব ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল এক নিঃস্ব মামার হাত ধরে।

ঠিক কতগুলো বছর? পারির এখন বছর একুশ পেরিয়ে বাইশে পড়বে।এইতো...মোট এগারো বছর পর! না এর মধ্যে আরো একবার এসেছিলো তাও মামা মারা যাবার পর।মামা মারা যাবার পর হাসান আংকেলের হাত ধরে কিশোরী পারি আরো একবার এই বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছিল একটু ঠাঁইয়ের জন্য। কেননা তখন পারির জীবনের চেয়েও বেশি ইজ্জত রক্ষার্থে এখানে থাকা জরুরি হয়ে পড়েছিল কিন্তু পারির ঠাঁই তখন‌ও এক সপ্তাহের বেশি হয়নি।

এরপরেও পারি এখানে এসেছে তবে উদ্দেশ্য এই বাড়িতে থাকা ছিলো না।পারি এসেছিল বাবা মা'কে এক নজর দেখেই চলে যাবে এই ভাবনাকে সঙ্গে নিয়ে কিন্তু আশেপাশে মানুষের চোখে পড়ে যাওয়ায় আর অজানা কোন কারণেই যেন এবার চাচী পারিকে দুদিন থেকে যাবার অনুরোধ করলো।পারিও শহরের নিঃসঙ্গতা থেকে রেহাই পেতে আর বাবা মায়ের কবরের সঙ্গে দু'টো দিন বেশি কাটানোর সুযোগ পেয়ে শত অপমানকে হজম করে রয়ে গেলো এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঠিকানায়।এর মধ্যেই ফারিশ ভাই পারির বাড়ি ফেরার খবর পেয়ে অন্তত তিনি আসার আগ অবধি থেকে যেতে অনুরোধ করেন।

ফারিশ চৌধুরী,পারিজাতের বড় চাচার একমাত্র সন্তান! ছোট বেলায় পারির সঙ্গে বেশি সময় না কাটালেও পারির মনে আছে দাদা বাড়ি মানেই ফারিশ ভাইয়ের স্নেহ ভরা আদর।এই বাড়িতে যতবারই পারি আর প্রান আসতো ফারিশ তাদের ভীষণ আদর করতো। ফর্সা রোগাপাতলা একটা ছেলে।পারির চোখে ভেসে ওঠে, লম্বা গড়নের রোগাসোগা দুধে আলতা বর্ণের একটি বালক।পারির চেয়ে আট কি নয় বছরের বড় একটা কিশোর।ঘন কুচকুচে কালো চুল, সবসময় আর্মি কাট দিয়ে রাখতো।এক রঙা শার্ট আর জিন্স পরে পুরো বাড়িময় সাইকেল নিয়ে চক্কর দিয়ে বেড়াতো।পারিদের জন্য এটা ওটা পেড়ে নিয়ে আসতো এরপর...তার মায়ের হাতে ইচ্ছা মতো বকুনি খেতো।প্রিয়ন্তি খন্দকারকে ভালোবেসে বিয়ে করার অপরাধে পরশ আবরার চৌধুরীকে বড় ভাইকে চোক্ষুশূল হয়ে থাকতে হতো।যার দরুন পারিরা কখনোই এই বাড়িতে যথার্থ মর্যাদা পায়নি।আর না পেয়েছে স্নেহ মমতা।

“ আম্মা!"

পারি নিজ ভাবনার অতলে ডুবে রয়েছে, ঠিক তখনই কারো হেঁড়ে গলার স্বরে চমকে উঠলো।পিছনের বারান্দার চৌকিতে বসে সে উর্দ্ধ গগনে সদ্য উঠে জ্বলজ্বল করা সন্ধ্যা তারকার পানে চেয়েছিলো,এখান থেকে সোজা পারিবারিক কবরস্থানটা ।
যেই ভাইকে জীবিত অবস্থায় কখনো ক্ষমা করেননি,যেই ভাইয়ের সহধর্মিণীর সঙ্গে ভালো করে দু'টো কথা বলেননি,যাদের রেখে যাওয়া আমানতের কখনো যত্ন নেননি তাদের কবরের যত্নে পারির দুচোখ ভরে উঠে, ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে।এটা ঠিক কেমন প্রহসন পারি জানে না! জীবিত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষের কবর এত কদর পায় কেন?
মানুষ থাকতে কদর না করে মরে গেলে কিসের তরে এত কদর,এটা কি আদিখ্যেতা নয়?

রাশভারী পুরুষালি কন্ঠের সেই হেঁড়ে স্বর আবারো ভেসে আসলো,

“ আম্মা কোথায় তুমি?"

পারি গায়ের ওড়নাটা টেনেটুনে ঠিক করে উঠে গিয়ে সামনের বারান্দার কোনায় দাঁড়ালো, এভাবে ভর সন্ধ্যায় হুটহাট করেই পরপুরুষের সামনে যাওয়া উচিত নয় ভেবেই বাইরের দিকে আর এগুলো না।পারি বারান্দায় পৌঁছাতে পৌঁছাতেই মেহরুবার গলার আহ্লাদি বাক্যে পারির কৌতুহল বাড়লেও সে আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইল!

“ আল্লাহ মোর মনু চ‌ইলা আসছে! এত সময় লাগলো ক্যা মনু?"

“ ভুলবশত লোকাল বাসে উঠে পড়েছিলাম আম্মা। জানোই তো তাগো কান্ডকারখানা,সত্তর জায়গায় থামায় খালি,বাদ দেও সেইসব কথা,বলো কেমন আছো তোমরা?"

মেহরুবা ছেলেকে জড়িয়ে ধরেই গদগদ কন্ঠে প্রশ্ন করতেই ফারিশ উত্তর দিয়ে মা'কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।ফারিশের গলার স্বরে বাইরের উঠানে আরো একজনের উপস্থিতি শোনা যায়।ফারিশের সদ্য বিবাহিতা সঙ্গীনি তুবা জান্নাত।স্বামীর উপস্থিতি অনুভব করেই সে মাথায় ঘোমটা টেনে উঠানে এসে হাজির হয়।ফারিশ মা'কে ছেড়ে ব‌উয়ের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে,

“ কেমন আছো? স্বাস্থ্য মন সব ভালো?"

তুবা মাথা দুলিয়ে জানান দিলো,হ্যা তার সব ঠিক! ফারিশ ব‌উয়ের থেকে চোখ সরিয়ে মায়ের পানে চেয়ে শুধালো,

“ আব্বা কোথায় আম্মা?"

“ হাটখোলা গ্যালো।আইজগো হাটবার না?"

উচ্চ মাধ্যমিক পাশ দেওয়া তুবার ভাষাও সহজ-সরল গ্রাম্য যা ফারিশের ভালো লাগার অন্যতম কারণ।বিয়েটা পারিবারিক আনুষ্ঠানিকভাবে হলেও পছন্দটা ফারিশের নিজের। ভীষণ চতুরতার সাথে মা বাবাকে তুবার বাড়ি পাঠিয়েছিল নিজের জন্য ব‌উ করে আনতে । ভালোবাসার পাখিকে ফারিশ ভালোবেসেই যতনে রেখেছে কিন্তু তারপরেও তার পাখি সুখে নেই।কারণটা খুব তুচ্ছ তার কাছে কিন্তু সমাজের কাছে নয়।

ফারিশ মা ব‌উয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই উঠানের কোনে বাঁশের খুঁটির মাথায় লাগানো ষাট ওয়াটের লাল বাল্বের আলোয় বারান্দায় ছায়া পড়া মানব মূর্তি দেখে কপাল কুঁচকে ফেলে।আনমনা হয়েই প্রশ্ন করে,

“ ঐখানে কে?"

লম্বা রোগাপাতলা দেহের নারী মূর্তি বাতির আলোয় বিশাল দৈত্যরূপ ধারন করেছে।ফারিশের করা প্রশ্নে সকলে সেদিকে ফিরে তাকাতেই তুবার কপালের ভাঁজ টানটান হয়ে যায়। কিন্তু মেহরুবা আগের মতোই ললাটে ভাঁজ ফেলে থেঁতো মুখ সামনে ফিরিয়ে নিয়ে বললো,

“ আর কি,ঐ যে আপত আইসা চাপছে মোর কপালে! তোমার বাপের হঠাৎ হ‌ইরাই দরদ উতলাইয়া উঠছে।মরা ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে এহোন মোর কাঁন্ধে আইনা ফেলছে! আজাইরা কান্ডকারখানা সব!"

“ পারিজাত!"

ফারিশের বিস্মিত চাহনি,কপালের ভাঁজগুলো টানটান হয়ে গেছে।কেমন এক ভালো লাগায় ছেয়ে গেছে অন্তর। অন্যরকম প্রশান্তিতে শিড়দাড়া শিতল হয়ে গেলো।নিজ অজান্তেই শব্দ করে উচ্চারণ করলো বহুন আকাঙ্ক্ষিত শব্দটা।

“ পারিজাত!"

পারি চমকালো,থমকালো। বহুদিন পর কেউ এই নামে তাকে ডাক দিলো! বাবার পর একজন মানুষ ডাকতো,এটা পারি ভুলেই বসেছিলো।ভুলে যাওয়ার কারণেই সম্রাটের ডাকে তার অনুভূতিগুলো এত চাওর হতো। কিন্তু তাতেই বা কি? দু'টো ডাকে দুরকম অনুভূতি কাজ করে।এখন যেই মানুষটা পারিজাত বলে তাকে সম্বোধন করলো সেই মানুষটার সাথে ওর রক্তের সম্পর্ক।হয়তো এক‌ই বাবার সন্তান না,এক‌ই মায়ের ওরসজাত নয় তারা । কিন্তু তাতে কি? তাদের দেহে ব‌ইছে এক‌ই বংশের রক্তের ধারা।এক‌ই পদবি,এক‌ই পরিচয় পার্থক্য শুধু সময়ের খেলে হারিয়ে যাওয়া কিছু অনুভূতি, অনুরক্তি। পারি অনুভব করছে তার কান্না আসছে! ভীষণ কান্না আসছে। বহুদিন, বহুবছর পর কারো ডাকে তার কান্না আসছে।কেউ তাকে ডাকছে ভীষণ আদর দিয়ে, ভীষণ স্নেহ, মায়া দিয়ে।এটা কি রক্তের বন্ধন তাই! পারি অনুভব করছে তার মাথা উপর থেকে হারিয়ে যাওয়া ছায়া হঠাৎ করেই ফিরে আসছে।

ফারিশ পূণরায় হাঁক দিলো তবে এবার তার কন্ঠস্বর ধীরে ধীরে সন্নিকটবর্তী হলো,সে বারান্দার দিকে এগিয়ে আসতে আসতেই বলছে,

“ পারিজাত!"

“ জি,ভাইয়া!"

পারি নিজের কান্না আটকাতে পারেনি।তার অবরুদ্ধ কন্ঠ ফুঁপিয়ে উঠেছে,সে শব্দ দুটি উচ্চারণ করেই ফুঁপিয়ে উঠে সঙ্গে সঙ্গে মুখ চেপে নিজের নিছক কান্নার স্বর অবরুদ্ধ করে নেয়।

২৬



ফারিশের গলা যত নিকটবর্তী হচ্ছে পারিজাতের কান্নাও তত উতঁলে উঠছে।দুই হাতের তালু'য় পারি নিজের কান্না লুকালো।ফারিশ ততক্ষণে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মুখ ঢেকে রাখা পারির দিকে চাইলো। লাল বাল্বের আলোয় একজোড়া শীর্ণ হস্ত।ফারিশ আগের মতোই আদুরে সুরে বললো,

“ পারিজাত,ভাইয়ার দিকে তাকা।কি হয়েছে,আরে পাগলি কাদছিস কেন?"

পারি চেয়েও কান্না থামাতে পারছে না। কারণ তার বাবার কথা মনে পড়ছে।ফারিশ দেখতে হুবহু পরশ আবরার চৌধুরীর মতো।যেন উনিশ আর বিশের পার্থক্য।চাচা ভাতিজার এত মিল হয় তা পারির জানা ছিলো না।এরা যদি বাপ বেটা হতো তবেও অনেকে জমজ ভাই ভেবে ভুল করতো। কিন্তু তারা চাচা ভাতিজা,তাও কত্ত মিল। কন্ঠস্বরে মনে হচ্ছে পরশ আবরার চৌধুরী‌'ই পারিজতাকে ডাকছে।

পারির কান্নায় ফারিশ বিব্রত হচ্ছে,এত বছর পর দেখা হলো অথচ ওকে দেখেই কাঁদছে! কেন কাঁদছে মেয়েটা?
ফারিশ জানে,এ বাড়ির কেউ পারিজাতকে পছন্দ করে না। নিশ্চয়ই কটু কথা বলেছে কেউ,যা ফারিশকে দেখে মনে করে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।

ফারিশ নিজের স্ত্রীকে ইশারায় তাদের কাছে আসতে বলে।তুবা স্বামীর ডাকে সাড়া দিয়ে পারির পাশে দাঁড়িয়ে পারির মাথায় হাত রেখে স্নেহ ভরা গলায় বলে,

“ পারি কাইন্দো না।দ্যাহো তোমার দাদো আইছে।হ্যার লগে ভালা মন্দ কথা ক‌ও,দ্যাহো কেমনে তোমার দিকে চাইয়া র‌ইছে।আরে পাগল মাইয়া,কান্দো ক্যান!"

তুবার গলায় দরদ ঝরা বাক্য,পারি অতি আবেগে কিনা জানা নেই তবে সে বহুদিন পর কোন আপনজনের সান্নিধ্য পেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে‌ই যাচ্ছে।

মেহরুবা সিদ্দিকী পারির প্রতি ফারিশের এই দুর্বলতা‌ই সহ্য করতে পারেন না।এবার‌ও তার বিপরীত হবার সুযোগ র‌ইলো না।তিনি ছিটতে ছিটতে এদিকে এগিয়ে এসে ফারিশকে বললো,

“ মনু, তুমি যাইয়া গা গোসল দাও।এসব তামশা দেইহা তোমার কাম নাই!"

ফারিশ মায়ের কথার বিপরীতে একনজর ফিরে তাকালো,তৎমুহুর্তে পারির দিকে ফিরতেই দেখলো পারি নিজের চোখ - মুখ মুছে স্বাভাবিক হ‌ওয়ার চেষ্টা করছে।ফারিশ পারিকে বিব্রত করতে চাইলো না,তাই নরম গলায় বললো,

“ হাত মুখ ধুয়ে আয়। একসাথে খেতে বসবো। তখন কথা হবে!"

কথা শেষ করেই ফারিশ নিজ ঘরে চলে গেল।

_________________________

“ নিশি!"

দীর্ঘ একুশ দিন পর সম্রাট পারির খোঁজ পাওয়ার মতো একটা সূত্র পেলো,নিশিকে দেখে।এই তিন সখিই গাঁ ঢাকা দিয়েছে।যেটা সবাইকে বিস্মিত করেছে।

নিশি অদূর থেকে ভেসে আসা পরিচিত পুরুষ কন্ঠে পিছু ফিরে তাকালো,সম্রাটকে দেখে উজ্জ্বল বদনে আঁধার ছাপিয়ে মেঘে ঢেকে গেলো।সম্রাট নিশির পরিবর্তিত আননে চেয়ে ধীর কদমে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।বাৎসল্যতায় মৃদু স্বরে বললো,

“ কেমন আছো পিচ্চি?"

নিশি সম্রাটকে এড়িয়ে যেতে চায়,কেননা সম্রাটের মনের ঝড় সম্পর্কে সে অবগত, ঐদিকে বান্ধবীর অসহায়ত্ব‌ও। কিন্তু তা সম্রাটকে বোঝানো তার পক্ষে সম্ভব নয়,তাই সে কথা বলার চেয়ে এড়িয়ে চলাটাই বেশি ফলপ্রসূ সমাধান ধরে নিয়েছিল।তবে চাইলেও কিছু সময় কিছু বিষয় এড়িয়ে চলা সহজ নয়। যেমন এখন নিশি পারেনি।সম্রাট বরাবরই তার উপর স্নেহাসিশ।নিশির আপন কোন বড় ভাই নেই,তাই তাকে যে বড় ভাইয়ের মতো স্নেহ ভরা কথা বলে সে তার প্রতিই সেরূপ দূর্বলতা অনুভব করে।যেমনটা করে সম্রাটের প্রতি।

” জি ভাইয়া আলহামদুলিল্লাহ।"

নিশি উত্তর দিলো মাথা ঝুঁকিয়ে রেখে, কাঁধে ঝোলানো টোটা ব্যাগের ফিতেটা শক্ত করে ধরে নিচের দিকে টেনে রেখেছে।সম্রাট নিশির মুখভঙ্গি পড়ে নিয়ে আগের মতোই তরঙ্গহীন কন্ঠে বললো,

“ তোমাদের দেখি না আজকাল! কি ব্যাপার সবাই কি পড়াশোনা লাটে তুলে দিয়েছো নাকি বিয়ের সানাই বাজছে? তবে আমাদের দাওয়াত দিতে ভুলো না কিন্তু, গিফট দেই আর না দেই,বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালনে একটুও ভুল করবো না!"

নিশি সম্রাটের রসহীন রসিকতায় হালকা হাসলো মুখ তুলে। অতঃপর হাসিটা বজায় রাখার প্রয়াস চালিয়ে রেখে বললো,

“ এমন কিছু না। আসলে ফারিহা ওর দাদা বাড়ি গিয়েছে,আর পারি...

এতটুকু বলেই আবারও মাথা নুইয়ে নিলো।সম্রাট কন্ঠে চলমান ঝঞ্ঝাটকে গিলে নিয়ে ছন্দহীন শব্দে বললো,

“ বলো, সমস্যা নেই।"

নিশি নিজের নেত্রজোড়া তুললো।সম্রাটের শ্রীহীন আননের পানে কীয়ৎকাল চেয়ে থেকে বললো,

“ পারিও গ্রামে গিয়েছে।এখন পেইজের কাজ সব আমাকে একাই দেখতে হচ্ছে তাই কলেজে আসা হয় না।"

“ ওহ,তা ফারিহার হঠাৎ গ্রামে যাওয়ার কারণ! মানে এই সময়ে?"

ফারিহার নাম তুলে প্রশ্ন করলেও সম্রাটের মন যে পারির নাম‌ই তুলেছিলো, নিশি তা সম্রাট না বললেও বুঝে নিয়েছে।
সেও ছন্নছাড়া শব্দে বলে দিলো,

“ফারিহা গিয়েছে ওর এক কাজিনের আকদে জয়েন করতে কিন্তু ভাইয়া, পারিজাত গ্রামে গিয়েছে আজ প্রায় একুশ দিন।ওর পরের দিনই ফিরে আসার কথা ছিলো। কিন্তু একদিন পর ফোন দিয়ে জানালো ওর চাচা চাচী কিছুদিন থেকে যেতে বলেছে।যদিও ও চাচা চাচীর কথায় রাজী হয়নি। তবে ওর একজন কাজিন আছে,ও তার কথা ফেলতে পারে না।তার অনুরোধেই থেকে গিয়েছে।এখন কবে আসবে তা জানি না।ওর সঙ্গে আমার আজ চারদিন কোন যোগাযোগ নেই।ঐখানে নেটওয়ার্ক ভীষণ ঝামেলা করে।জানি না কেমন আছে এখন?"

নিশির চেহারায় গভীর চিন্তার ছাপ‌,ফারিহার চেয়েও নিশির সাথে পারির সম্পর্ক গাঢ়।সম্রাট খেয়াল করেছে পারির ভালো মন্দ সব বিষয়ে‌ই নিশির খেয়াল থাকে।মেয়েটা পারিকে ভীষণ অনুভব করে। নিঃসন্দেহে পারির বন্ধু ভাগ্য চমৎকার,এমন বন্ধু পাওয়া সৌভাগ্যের কথা।
সম্রাট নিশির কথার বিপরীতে বলতে চাইলো।

“ গ্রামে বলতে ওর ..."

সম্রাটের কথায় দাঁড়ি বসিয়ে নিশি‌ই বললো,

“ দাদা বাড়ি। অবশ্য ঐটা এখন দাদা বাড়ি নেই।সেটা হয়ে গিয়েছে চাচা বাড়ি।ওর চাচা মানুষ খুব একটা ভালো নয়।ভালো হলে কি এতিম ভাতিজিকে এভাবে পথে ফেলে রাখতে পারতো বলেন? মৃত ভাইয়ের সম্পত্তি দখল করে ভোগ করতো?"

“ কি বলছো?"

“ জি সত্যিই,এটাই আমার চিন্তার বিষয়।পারি এবার যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল, ঐখানে গিয়ে ও ওর ভাগের অংশ চাইবে।সেটা বিক্রি করে মামীর চিকিৎসা করাবে। কিন্তু আমার সাথে শেষ যোগাযোগ অবধিও এই বিষয়ে ও কথা তুলতে পারেনি।জানি না এখন কি অবস্থায় আছে!"

“ হয়তো নেটওয়ার্ক সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়াও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ থাকে না লং টাইম, মোবাইলের চার্জ‌ও শেষ হয়ে যেতে পারে।"

“ হতে পারে কিন্তু.....

নিশি আবারও থেমে গেলো,সে ভাবুক চিত্তে অদূরে চেয়ে আছে। গৌর বর্ণের পাতলা গড়নের মেয়ে নিশি।মুখ জুড়ে মায়ার ছড়াছড়ি। ছোট্ট একটা মুখ। চোখগুলোও ছোট ছোট। নিশির চেহারায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ছাপ রয়েছে, অবশ্য নিশি চাটগাঁর মেয়ে।তাও একদম পাহাড় ঘেঁষা অঞ্চলের। সেক্ষেত্রে এমন গাঠনিক গাঁথুনি পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।তবে বেশ লম্বা।সম্রাট যেখানে ছয় ছুঁই ছুঁই সেখানে নিশি ওর কাঁধ ছাড়িয়েছে। একদম লিকলিকে , লম্বা, মায়াবতী মেয়েটার নেত্রকোঠরে দুশ্চিন্তা,ভয় বিরাজমান। সম্রাটের অন্তঃস্থলে সেই অনুভূতি গুলো পলকে বিচ্ছুরিত হলো। ওর এত সময়ে মনে হলো নিশির এই ভয় অহেতুক নয়। কিছু একটা আছে যা নিশিকে চিন্তিত করছে।

“ নিশি,যদি তোমার সময় থাকে আমাকে পাঁচটা মিনিট দিবে?"

নিশি সম্রাটের প্রশ্নে সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকালো।নিশির‌ও মনে হচ্ছে সম্রাটকে সবটা বলা উচিত।কেন না,সম্রাট পারিকে ভালোবাসে।যেই ভালোবাসা এখনো সম্রাটের চোখে ভাসে।আজ কতদিন হলো পারি সম্রাটের থেকে দূরে সরে রয়েছে। তাছাড়াও,নিশি পারির থেকেই শুনেছে সে কিভাবে সম্রাটকে হার্ট করেছে। কিভাবে সম্রাটের অনুভূতিকে তিরস্কার করে সেদিন এই সুদর্শন পুরুষের মন ভেঙ্গেছে। যেই বেদনা সহ্য করতে না পেরেই সেদিন সেই দূর্ঘটনা ঘটিয়েছিলো সম্রাট নামক এই সাহসী, উদ্দামি আর দৃঢ় চিত্তের পুরুষটা।

কিন্তু পারিই বা কি করতো? পারি নিজেও অসহায়।পারির যুক্তি‌ও ঠিক।যত‌ই ভালোবাসা থাক, তাদের মাঝের আকাশ-পাতাল পার্থক্য ডিঙিয়ে সেই ভালোবাসার বিজয় একেবারেই অনিশ্চিত।পারি এহেন দুঃসাহস দেখাতে পারবে না।নিশিই কি পারতো? ভাবনার শেষ নেই।তাও আজ নিশি সবটা সম্রাটকে খুলে বলবে।কেন পারিজাত সম্রাটের ভালোবাসাকে অস্বীকার করেছে, কেন-ই বা সে নিজেকে সবার থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।

___________________________________

“পারি!"

নিজেদের পুকুরের ঘাঁটে পা ঝুলিয়ে বসে আছে পারি। দৃষ্টি তার বাবা মায়ের কবরের পানে।মন খারাপের মুহূর্তগুলো এখন তার এখানেই কাটে।
তুবা দূর থেকে পারিকে ডাকছে, কিন্তু সেই শব্দ পারির কানে যে পৌঁছায়নি তা সে বেশ বুঝে নিলো।
নরম মনের তুবা, শ্বাশুড়ির কটু ব্যবহারে অতিষ্ঠ হ‌ওয়া পারিকে সহযোগিতা করতে না পেরে ভীষণ অসহায় অনুভব করে।সে নিজেও কি সেই কটুক্তি থেকে রেহাই পায়! গরীর ঘরের মেয়ে বলে দিনরাত মুখ ঝামটার তলে থাকতে হয়।বিয়ের তিন বছর পেরিয়েও সন্তানের মুখ দেখাতে না পারা তুবাও শ্বাশুড়ির চোক্ষুশূল।

তুবা শুনেছে, কিভাবে তার শ্বাশুড়ি পারির মা'কে এই বাড়ির সম্মান, অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।এখন আবার পারির পিছনে পড়েছে।মেয়েটা এমনিতেই অসহায়।তার মধ্যে আবার নতুন করে আগুনে ঢেলে দিচ্ছে।বোকা মেয়েটাও নিজেকে বাজিতে তুলে ধরেছে।

"পারি!"

“ পৃথিবীর সংখ্যালঘু মানুষ হয়তো বিধাতা প্রদত্ত সুখ নিয়ে ধরনীতে বাস করে,আর বাকীরা এক জীবনর সব প্রাপ্য ত্যাগের বিনিময়ে বিধাতার থেকে তা অর্জন করে নেয়।"

বিরবির করে পারি নিজের সাথেই কথা বলছে।তুবা পারিকে ডাকতে ডাকতে পারির সন্নিকটে এসে দাঁড়ায়,পারির ঠোঁট নড়তে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে কয়েক পলক। অতঃপর পারির কাঁধে হালকা ধাক্কা মেরে বললো,

“ এ্যাই পারি? কি বিরবির করো ওম্মে চাইয়া? আশিক জ্বিনে ধরছেনি! ধরতেও পারে।যেই চন্দ্রিমা বদন!তার ম‌ইধ্যে ঘোরো খালি জঙ্গলে জঙ্গলে!"

তুবার ধাক্কায় পারি হকচকিয়ে উঠে‌।ধরফরিয়ে উঠে পাশেই দাঁড়ানো তুবাকে দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যায়।বুকে থুতু ছিটিয়ে পরক্ষনেই আতংকিত কন্ঠে বলে,

“ ভাবী আপনি? কখন এসেছেন এখানে? আমি তো খেয়াল‌ই করি নাই!"

“ হ্যা খেয়াল করবা কেমনে? ধ্যান তো আশিকের কাছে রাইখা দেছো!"

“ জ্বি,আশিক?"

“ হ, আশিক না তার নাম?তাইলে কি বাদশা, মহারাজ,সম্রাট?এই হেয় কি জ্বিনেগো সম্রাট!"

তুবা মজার ছলে পারির অন্তরে সুঁচের ফোঁড় তুলে দিচ্ছে তা সে জানলো না। বহুদিন পর সম্রাট
শব্দে পারির অন্তর আবারও অব্যক্ত বেদনায় নীল হয়ে গেলো।নয়ন অন্তরিক্ষে জাগ্রত হলো সেই পুরুষের গাঢ় অভিমান ভরা নেত্রযুগল। বিধ্বস্ত বদনের আহুতি।তাকে ছোঁয়ার অপবাদে কলঙ্কিত, অপমানিত এক প্রেমিকের নিজেকে হারিয়ে ফেলার হাহাকার ভরা নীলাভ বদন! পারির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
সেদিন পারির অযুহাতহীন নাকোচে যেই পুরুষ অতটা বিধ্বস্ত হয়েছিল সে যখন জানবে কয়টা দিন বাদেই পারি অন্য কারো ঘরনী হবে তখন সে কি করবে?

পারির মনে খচখচিয়ে উঠলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন, যার ঘরে যাবে সে-ও কি পারিকে সম্রাটের মতো করেই ভালোবাসবে? পারি কি পারবে,সেই পুরুষকে ঐ সিংহ মানবের ন্যায় সবটা উজাড় করে ভালোবাসতে?

_______________________________

“ আসুন, আসুন মন্ডল সাহেব। প্লিজ আসুন!"

মাহমুদ তালুকদারের গলা নিগড়ে চুঁইয়ে পড়ছে আন্তরিকতা।তালুকদার সাহেবের ন্যায় এত বড় মাপের লোকের এমন আন্তরিক ব্যবহার‌ই মন্ডল সাহেবকে মুগ্ধ করে।তিনি এই বিশাল মনের লোকটার ভক্ত এটা স্বীকার করতে কার্পণ্য করেন না। তালুকদার বসার ঘরের সুপ্রশস্ত, সুসজ্জিত আসনে নিজের সুঠাম দেহখানা প্রতিস্থাপিত করে সামনের ফাঁকা আসন দেখিয়ে আগের ন্যায়‌ই অনুনয় করে বললেন,

“ প্লিজ বসুন। আশাকরি আসতে কষ্ট হয়নি!"

“ না, কষ্ট হবে কেন? এই পথ থেকে এই পথ, কতটুকু আর দুরত্ব!"

মন্ডল যতটা সহজ বলে জানালেন তা আসলে ততটা সহজ নয়।ঢাকা, তেজগাঁও থেকে গাজিপুর আসা খুব একটা সহজ নয়।যানজটের আঁতুড় ঘর ঐ অঞ্চল দু'টো,সেখান স্থানান্তরিত হ‌ওয়া খুব একটা আরামপ্রদ নয়।তবে নিজস্ব যানবাহন থাকলে কষ্ট খানিকটা কম হয় এই আর কি!

সাদা পাঞ্জাবি পরুয়া তালুকদার সাহেবের সামনে ধূসর কাবুলি পরিহিত জব্বার মন্ডল। অর্থ বিত্তে কেউ কারো চেয়ে কম নয়।তবে পারিবারিক সূত্রে রাজনৈতিক দাপটে একটু উপরে রয়েছেন জব্বার মন্ডল।যেই কারণে তালুকদার সাহেবের মতো লোক‌ও নমঃ নমঃ করে।

দু'জন ওজনদার লোক বসে গল্পের ছলে দৈনন্দিন কর্ম জীবন নিয়ে আলোচনা করছেন,তার মধ্যেই উপস্থিত হলেন মিসেস তালুকদার।নাস্তার বিশাল বহর নিয়ে মাঝের টি টেবিলটা টেনে নিয়ে একে একে সাজিয়ে দিলো নাস্তার সব কটা আইটেম।

তালুকদার নিজে হাতে তুলে জব্বার মন্ডলের হাতে দিলেন। বিগলিত সুরে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। জব্বার মন্ডল‌ও তা হাতে তুলে নিয়ে বিনয়ী হাসি দিয়ে কথার মোড় ঘুরিয়ে বলতে লাগলেন,

“ মাহমুদ ভাই ‌সাহেব। আপনার সাথে বিশেষ জরুরী বিষয়ে আলোচনা সারতেই এত দূর পথ অতিক্রম করে এলাম। আশাকরি আপনি আমাকে নিরাশ করবেন না।"

“ ভরসা রাখতে পারেন। তালুকদার বাড়ির চৌকাঠ থেকে পক্ষিও নিরাশ হয়ে যায় না।সেখানে আপনি স্বয়ং মাহমুদ তালুকদারের অতি প্রিয় একজন। নিশ্চয়ই..."

উপরোক্ত কথার প্রেক্ষিতে জব্বার মন্ডল প্রাণখোলা নিঃশব্দ হাসি দিলেন। হাসলেন তালুকদার নিজেও। অতঃপর আশ্বস্ত গলায় বললেন,

“ বলুন যা বলতে চান।আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করবো।"

“ আপনার ছেলেটাকে চাইছি।"

২৭

“ আব্বা পারিজাতের বিয়া নিয়া ভাবছেন সে ভালো কথা। অন্তত পিতার মতো একটা দায়িত্ব পালন করতাছেন,দেইখাই খুশি লাগতাছে। কিন্তু...

ফারাজ করিম বারান্দায় হোগল পাতার পাটি বিছিয়ে এক হাঁটু জমিনে ভাঁজ করে রেখে অন্য হাঁটু ভাঁজ করে তাতে ডান হাতের কনুই ঠেকিয়ে বসে হাত পাখা নেড়ে নিজের গা শীতল করার প্রয়াস চালাচ্ছে। ছেলের খোঁচা মারা কথায় ভ্রু-কুটি করে তাকালেন। ফারিশ বাবার চাহনিকে পাত্তা না দিয়ে সাবলীল কন্ঠেই বললো,

“ আমি জানি আপনি এমনি এমনি পারির বিয়া দিতাছেন না।আপনি আসলে লোক মুখে লবন ছিটালেন।যেন তারা ভাইজিকে ঠকানোর দায়ে আপনেরে কথা শুনাইতে না পারে। কিন্তু আব্বা.....যেই কথা বলার তা লোকে আইজ হলেও বলবে কাইল হলেও বলবে।আপনি যেই নিয়তে পারির বিয়া নিয়ে ভাবছেন সেই নিয়ত বাদ দিয়ে শিগগিরই মাইয়াডার যতটুকু যা পাওনের তা শোধ করে দেন।আমি আগামি বছর আপনেরে আর আম্মারে ওমরাহ পালনে পাঠাইতে চাইতেছি।তাই দয়া করে অমন উত্তম ইবাদত সাড়ার আগে আল্লাহর বান্দার হক বুঝিয়ে দেন।নচেৎ..."

“ কিসের হকের কথা বলতেছো তুমি? কি নিয়তে বিয়ে দিতেছি, মানে?......কি রকম কথা বলো, মানে বুঝলাম না! কথা বার্তা ক‌ওনের আগে একটু হিসাব নিকাশ করে ক‌ও! আমি তোমার আব্বা হ‌ই। তুমি আমার আব্বা ন‌ও।"

ফারাজ করিমের ক্রোধিত কন্ঠস্বর,ফারিশ হতাশ চোখে চেয়ে রইল।মেহরুবা সিদ্দিকী ঘর থেকে বারান্দায় এসে বাবা ছেলের বাতচিতের শেষাংশ শ্রবন করেই পাশে বসলো।ফারিশ বাবাকে ছেড়ে মা'কে ধরলো।মিহি,অনুচাঙ্গ স্বরে আদবের তালে বললো,

“ আম্মা,আপনি আব্বাকে বুঝান।বয়স হয়েছে।মরার ভয় যেন করে।পারির ভাগ পারিকে বুঝিয়ে দিক,নয়তো আমাকে হিসাব দিক আমি ওকে ওর প্রাপ্য অর্থ বুঝিয়ে দিবো।যেন ও নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে পারে।
পারিকে...."

“ শুনছোস তোর পোলার কথা? এহোন আমারে কয় আমার কি করা উচিত কি করা উচিত না।এহোন‌ই আমারে মরার হুমকি দেয়।এই দিন দেহোনের ল‌ইগা দুনিয়ায় আছি?"

ফারাজ করিম উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। মেহেরুবা সিদ্দিকী ছেলের পানে চোখ রাঙিয়ে স্বামীর কাঁধে হাত রেখে শান্ত হবার জন্য অনুরোধ করে বলে,

“ আমনে ঠান্ডা হন,আমি বুঝাইতাছি পোলারে।"

ফারিশ ততক্ষণে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে।তা দেখে মেহরুবা চেঁচিয়ে উঠলো। ঝাঁঝালো গলায় বললো,

“ এত দরদ দেহাইও না।ঐ মাইয়ার ল‌ইগা যে পাত্র আসছে তাই অনেক।ঐ মাইয়া যে চোখ ফুটার আগেই নাক কাটছে হেই খবর রাহো?"

মেহরুবা সিদ্দিকীর এহেন কথায় ফারিশ চোখ-মুখ কুঁচকে ফেললো। নাক কেটেছে মানে কি?
মেহরুবা সিদ্দিকী ছেলের অজ্ঞতা দেখে ঠোঁট বেঁকিয়ে ভেংচি কাটলেন। এরপর বললেন,

“তোমার তো খালি মনে হয় আমরা তোমার চাচাতো ব‌ইনের খবর রাখি না। আমরা জঘন্য, নিষ্ঠুর।ভালো অ‌ইতো যদি তোমার কথা স‌ইত্য প্রমাণ করতে পারতাম। কিন্তু আমরা তোমার মনের মতো খারাপ না।তাই খবর রাখছি ব‌ইলাই জানতে পারছি তোমার মরা চাচার রাইখা যাওয়া ঐ আপদ আরো বছর সাত আগেই এক পোলার লগে ধরা প‌ইড়া হেগো নাক কাটছিলো।
অত সতি সাবিত্রী‌ও না যে তার জন্য পীর খুঁজে আনবা।"

“ আম্মা কিসব বলতেছেন। দয়া করে কারো নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার মতো জঘন্য গুণাহ কামাইয়েন না।"

ফারিশ চিৎকার করে উঠলো মায়ের উপর। মায়ের বাধ্য সন্তান ফারিশ,সে আজ পারির জন্য মায়ের সাথে তর্ক করছে এটা মেহরুবা সিদ্দিকী কেন মানবে? তিনি উঠানে নেমে গেলেন। হাঁক পেড়ে পারিকে গালিগালাজ করতে থাকলেন।মৃত প্রিয়ন্তি খন্দকারকে‌ও ছাড় দিচ্ছেন না। উনার চেঁচামেচিতে প্রতিবেশিরা উঁকিঝুঁকি মেরে কিসসা দেখতে থাকলেন।ফারিশ নিজের বাবা, মায়ের সম্পর্কে বেশ জ্ঞাত‌। তারা যে বরাবরই এভাবে‌ই সবার মুখ বন্ধ করে দেয় তাও তার জানা।তবে এবার ফারিশ নিজের কাছে ওয়াদা বদ্ধ।যতটা সম্ভব পারির হক বুঝিয়ে মেয়েটাকে এই বাড়ির চৌকাঠ থেকে সরানো।
না ফারিশ কোনভাবেই পারির জীবন নরকে ঠেলে দিবে না। তার বাবা মা লোভে পড়ে যেভাবে একটা নরখাদকের সঙ্গে পারিকে বেঁধে দিচ্ছে তাতে সে নিশ্চিত পারির জন্য ভালো কিছু অপেক্ষা করছে না।

মেহরুবা সিদ্দিকী চিৎকার চেঁচামেচি করে অবস্থা ঘোলাটে করে দিলেও ফারাজ করিম চৌধুরী‌ নিরব থাকলেন। তিনি আগের মতোই কুটিল চোখে চেয়ে থেকে নিজ পুত্রকে ভৎসনা দিচ্ছে নিরবে।

ফারিশ বাবার নিরবতাকে সহ্য করতে না পেরে স্থান ত্যাগ করলো।সে নিজেই গ্রামে এসেছে বিশেষ কাজে,ঝামেলা মাথায় নিয়ে।এখন এখানে পারিকে নিয়ে আরেক চিন্তায় ডুবেছে।পারিকে এখানে থাকতে বলার কারণ ছিলো। ফারিশ জানে তার বাবা মা পারিজাতকে ঠকাচ্ছে।তাই সে ভেবেছিল এবার কিছুটা হলেও পারিকে উদ্ধার করে দিবে,যেন মেয়েটা নিজের জন্য কিছু একটা গুছাতে পারে।আর কতকাল অন্যের দায়িত্বে থাকবে।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো। কারণ এটা লম্বা সময়ের বিষয়।তার বাবা কৌশলে সবটা নিজেদের নামে করে রেখেছে। এগুলো উদ্ধার করতে গেলে অনেকদিন খাটতে হবে।তবে এখন সবকিছু ছাপিয়ে বেশি ভাবাচ্ছে পারির বিয়ে।

ঘরের খাটের পায়ার সাথে গা সেঁটে বসে পারি নিরবে কাঁদছে।অতীত খুব ভয়াবহ।তা কখনো ছাড়ে না। শুধুমাত্র তার একটা ভুলের জন্য আজ তার মৃত মা'কে নিয়েও মেহরুবা সিদ্দিকী কটু কথা বলার দুঃসাহস দেখায়।পারি বুঝতে পারে,চাচী না হয় পরের বংশের, কিন্তু তার বড় চাচা! ফুফুরা! তারা তো তার আপন রক্ত।পারি তাদের মৃত ভাইয়ের রেখে যাওয়া একমাত্র অস্তিত্ব।পারি তো কখনও তাদের কাছে তেমন কিছু চায়নি।পারি শুধু চেয়েছিল একটু ভালোবাসা, নিরাপত্তা।তাতেও তাদের এত বিতৃষ্ণা, কেন? ভালোবেসে বিয়ে করে পাপ যদি কেউ করেই থাকে তবে তা করেছে তার বাবা মা‌।তারা তো এখন নেই।তবুও তার শাস্তি কেন আজীবন পারিকে দিচ্ছে তারা?পারির জন্য কি একটুও মায়া হয় না তাদের? তারা যদি পারিকে ঠাঁই দিতো তবে কি কেউ পারতো ওভাবে পারির গাঁয়ে দাগ লাগাতে!

পারি তার অতীত ভুলকে ভাবছে,পাশেই খাটের দাসে হাত রেখে ভাবুক চোখে ননদের দিকে চেয়ে রয়েছে তুবা ভাবী।ফারিশ হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকেছে। মায়ের থেকে শোনা কথায় তার মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছে।যত‌ই দূরত্ব থাক, পারি তাদের বংশের মেয়ে।তার কোন ভুল সিদ্ধান্তের ফলে তার ভবিষ্যৎ নষ্ট হলে সে ভাই হয়ে ছেঁড়ে দিতে পারে না। অবশ্য‌ই শাসন করার অধিকার রাখে সে।যদিও বা সে তার বড় ভাই হ‌ওয়ার দায়িত্ব আজ অবধি ঠিকঠাক পালন করতে পারেনি, তাতে কি! এখন থেকে করবে। যতটা শেষ পারে সবটাই করবে।

“ পারি উঠ! আমাকে বল আম্মা কি বলতেছে এসব?"

ফারিশকে দেখেই পারি আড়ষ্ট হয়ে চুপসে গেলো।কান্নাও বন্ধ হয়ে গেছে।অতি রাগলে শুভ্র ফারিশ কৃষ্ণচূড়ার মতো রক্তিম হয়ে যায়।তুবা ফারিশকে দেখে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, অনুনেয়ের সুরে বললো,

“ রাগের মাথায় উল্টাপাল্টা কিছু ক‌ইয়েন না যেন...ও বিবাহ যোগ্য মাইয়া মানুষ।বড় ভাই হয়ে সেয়ানা ব‌ইনের গায়ে হাত তুলে না।গুণা...."

“ তুমি বের হ‌ও।এখানে শুধু আমরা দুই ভাই বোন থাকবো।"

ভাইয়ের মেজাজ আর ভাবীর সহানুভূতি,এক চালে চলমান।পারি উঠে দাঁড়ালো।অপরাধীর ন্যায় মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে খাটের কার্নিশ ছুঁয়ে।তুবা স্বামীর রাগে নিভে গিয়ে পারির দিকে করুন চোখে চেয়ে নিরবে চলে গেলো বাইরে। ঐদিকে প্রতিবেশীদের গুণগুণে বাড়ির উঠোন গমগম করা শুরু করেছে।

_________

“ পারির তখন বয়স পনেরো কি ষোল।ও ওর মামা মামীর সাথে নারায়ণগঞ্জ সদরে থাকতো। নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তো।মামা মামী ওকে খুব ভালোবাসতো। নিসন্তান দম্পতির চোখের তারা ছিলো ও। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সবটা দিয়েই ভালোবাসতো। কিন্তু....উঠতি বয়সের পারি ভীষণ ছটফটে আর চঞ্চল প্রকৃতির ছিলো। দেখতে তো মাশাআল্লাহ।এখন পারি যতটা সুন্দরী তখন তার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় ছিলো।হয়তো জীবনের উজান ভাটা আজ পারিকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে কিন্তু তখন তো অতটাও বুঝদার ছিলো না তাই বোধহয় তেমন করে জীবনকে বোঝার মতো জ্ঞান পরিপক্ক হয়নি।
______যাই হোক।পারি পড়াশোনা ছাড়াও আদার্স এক্টিভিটিতে ছিলো বেশ এক্টিভ।নাচ,গান, চিত্রাঙ্কন, বাস্কেটবল অথবা দাবা। স্কুলের পক্ষ থেকে ও জেলা পর্যায়ে‌ও খেলেছে। এবং সব জায়গাতেই বেশ সুনামের সাথে উতড়ে এসেছে।ওর ঘরে এখনও ওর অনেক সার্টিফিকেট রয়েছে যেগুলো জানান দেয় ওর মাঝে লুকিয়ে ফেলা সে সকল প্রতিভার কথা।সব‌ই ঠিকঠাক ছিলো কিন্তু পারি একটু ভুল করে ফেলে বন্ধু নির্বাচনে।"

নিশি এখানে থামে।সম্রাট কৌতুহলি নয়নে একটানা চেয়ে রয়েছে নিশির ছোট্ট মুখপানে। নিশি ক্যাফের দরজার পানে চেয়ে রয়েছে, অপলক। কিছু একটা ভাবছে। দু'জনের সামনে পড়ে রয়েছে দু'টো কফির কাপ। ঠান্ডা কফি তাতে নিরব শ্রোতা হয়ে মাঝে কান পেতে রয়েছে।সম্রাট আগের মতোই চেয়ে রয়েছে।পারির এত গুন সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলো সে।তবে স্কুলে বাচ্চাদের বিভিন্ন বিষয়ে পারির আগ্রহী করে তোলায় কখনো সখনো তার ধারণা হতো পারির এই বিষয়ে জ্ঞান রয়েছে কিন্তু এতটা জানা ছিলো না। অবশ্য সে খুব একটা জানেও না।কারণ সে জানতে চায়নি।পারি এতিম,মা বাবা কেউ নেই।মামা মামীর কাছে বড় হয়েছে, এতটুকু‌ই তার জানার দরকার ছিলো এবং সে জেনে নিয়েছে।সে ব্যক্তি পারিকে ভালোবাসে,তার সৌন্দর্য অথবা আর্থিক অবস্থানকে নয়।তাই তো তার আর কিছু জানার দরকার পড়েনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কাউকে ভালোবাসলে তার আগাগোড়া সবটা জানতে হয়।কেন না,তাতেই সেই মানুষটির প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে ধারণা রাখা সহজ হয়।
এখন মনে হচ্ছে এই দিকে হৃদয় এগিয়ে ছিলো।কেন না ,হৃদয় সবসময় বলতো।সে যতটা পারীকে জানে,তার সিকে ভাগ‌ও সম্রাট জানে না।আসলেই জানে না।
নিশি নিরবতাকে ভেদ করে পূণরায় বলা আরম্ভ করলো,

“ এস‌এসসি পরীক্ষার আগে ওর এক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়।মেয়েটা ওর সাথে কোচিংয়ে পড়তো।সেও ভালো শিক্ষার্থী। কোচিংয়ে দুজন দুজনার ভালো বন্ধু হলেও দুজন ছিলো হাড্ডাহাড্ডি পর্যায়ের প্রতিযোগী।
_____পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তাদের মাঝে সবসময় নিরব যুদ্ধ চলতো।পারি পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভীষণ গোয়ার ছিলো,তাকে যেকোন ভাবে ভালো করতেই হবে।তবে ও কখনো অসৎ পন্থায় আগায়নি। কিন্তু তাই বলে কি সবাই তাই করবে?
_______________ পারিকে দমাতে সেই মেয়ে এক কুৎসিত খেলা খেলে। কোচিং ক্লাস টেস্টে প্রথমে পারিকে নকল করার অপবাদে সবার সামনে অপমানিত করে।পারি সেই অপবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, অনেক শিক্ষকদের‌ও এটা মানতে কষ্ট হয়।পারি তাদের সহযোগিতা নিয়ে নিজেকে প্রমাণ করায় কিন্তু তাকে কে ফাসিয়েছে তা জানতে পারেনি। ধারনা করেছিল শুধু, কিন্তু কেবল ধারনা নিয়ে কাউকে অভিযুক্ত করা যায় না, উচিত‌ও না।তাই সেইদিন পারিও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা মানুষটার কিছুই করতে পারেনি। এতে মেয়েটাও সুযোগ পেয়ে যায়।
________________________ ঐ কোচিংয়ে একজন শিক্ষক ছিলো মেয়েটার বড় ভাইয়ের বন্ধু ।সে আবার পারিকে পছন্দ করতো।তা কিভাবে যেন মেয়েটা জেনে যায়। চঞ্চল হলেও পারি ভীষণ অমায়িক ও হেল্পফুল ছিলো।তার এই স্বভাবের কারণেই সে সবার কাছে প্রিয় ছিলো।স্যারটাও তা দেখেই বোধহয় পারিকে পছন্দ করে ফেলে।এটাও মেয়েটার হজম হয় না।তার তো পারিকেই হজম হয় না।তার মধ্যে পারি ছিলো গরীব ঘরের সুন্দরী মেয়ে,যাকে বলে আগুন সুন্দরী।তার প্রতি পুরুষ লোকের দুর্বলতা থাকবেই,এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের বিকার মস্তিষ্কের কাছে তা স্বাভাবিক নয়।পারির রূপ‌ও ছিলো তার বড় শত্রু।
_________ পরীক্ষার আগে আগে, একদিন কোচিংয়ে....পারি নিজের শেষ ক্লাসের শেষ নোট নিয়ে আলোচনা করতেই স্যারের সাথে দেখা করার জন্য টিচার্স রুমে যায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিলো। ঐদিকে মেঘলা আকাশ আঁধার ছাপিয়ে চারদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রেখেছে।সব মিলিয়ে পরিবেশটাও রোমাঞ্চকর।পারি টিচার্স রুমের সামনে গিয়ে সেই স্যারকে ছাড়া কাউকে পায় না। ঐদিকে স্যার যে তাকে পছন্দ করে তা সেই নকলের ঘটনার পর পুরো কোচিং সেন্টারে রটে গিয়েছিল।তাই পারি চেষ্টা করতো স্যারকে এড়িয়ে চলার।এটা আবার সেই স্যারের ইগোতে লেগেছিলো।সে ভাবতো পারি সুন্দরী দেখে তাকে ইগনোর করছে, কিন্তু কেন করবে? পারি সুন্দরী,মেধাবী, তা ছাড়া আর কি যোগ্যতা পারির আছে যে তার মতো একজন ছেলেক এভোয়েড করে যাবে?
ও বলতে ভুলে গিয়েছিলাম,সেই স্যার আবার স্থানীয় এক নেতার ভাই। অর্থ বিত্তেও অবস্থা বেশ চড়া। তাই পারির মতো তুচ্ছ মেয়ের অবজ্ঞা হজম করার প্রশ্নই উঠে না।সেও পারেনি।"

এই অবধি শোনার পর সম্রাটের হাত কাঁপছে,তার হাতের মুঠোয় থাকা মুঠোফোনটা অনবরত দুলছে তার হাতের কম্পনে।সে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত কথা শুনতে চায় না।এমন কিছু না হোক যেটা সে সহ্য করতে পারবে না।নিশি থেমে গেল কীয়ৎকালের জন্য।তারপরেই আবার বলতে লাগলো।

__________________

হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে পারি কাঁদছে।তার পাশে বসে রয়েছে তার রক্তের সম্পর্কের একমাত্র আপনজন।যে নিজের পিতা মাতার অমানুষের মতো আচরণ আর নিজের অক্ষমতায় ভুগছে।সে নিজেকে একজন অযোগ্য, অপদার্থ ভাই হিসেবে দেখছে। তাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আজ শুধু সদিচ্ছার অভাবে এত বড় ঘটনার শিকার হয়েছে তাদের‌ই বাড়ির মেয়ে।সেই অন্যায়ের দায়ভার কি শুধু সেই কালপ্রিটদের।না! তাদের‌ও সমান সমান ভাগ রয়েছে। তাদের‌ও সমান শাস্তি প্রাপ্য।

ফারিশ পারির মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহ ভরা কোমল গলায় বললো,

“ বিয়েটা কি বুঝে শুনে করছিস?"

পারি মাথা তুললো।ভেজা গাল, চোখ মুখ মুছে নিয়ে শান্ত গলায় বললো,

“ বড় চাচী বলেছে,বিয়েটা করলে ওরা মামীর চিকিৎসার বন্দোবস্ত করে দিবে।আমি একাকী মামীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে পারছি না‌।আমার জন্য যারা এত করলো তারা যদি আমার জীবনের একটু ত্যাগে ভালো থাকে তবে তাই হোক ভাইয়া!
এমনিতেই, আমাকে তো একদিন বিয়ে করতেই হতো‌।তবে এখন করলেই বা কি!"

“ তোর কাউকে পছন্দ আছে?"

ফারিশের প্রশ্নে থমকে গেলো পারিজাত।নিটল চোখে চেয়ে রইল।তার নেত্রজোড়ায় ভেসে উঠলো সেই পুরুষালী অবয়ব যা তার অন্তর জুড়ে বিরাজমান।

২৮

বর্তমান....

ক্লাবের বাগানে বসে অতিতের সাগরে ডুবে যাওয়া সম্রাট বর্তমানে ফিরে এলো পরিচিত কন্ঠস্বরে।

তাহসিন, পাশে বসলো ধপ করে।বর্তমানে এক পিতার বাপ তাহসিন।বছর তিন আগে বিয়ে করেছে। ঘরে সুন্দরী ব‌উ আর নবজাতক নিয়ে তার সুখের সংসার।চাকরির পিছনে ছুটে হতাশ হলেও পরবর্তীতে নিজের সময়ের গুরুত্ব বুঝে ছোটখাটো ব্যাবসা শুরু করে।যা মোটামুটি ভালোই আয় দিচ্ছে।যদিও তাহসিন বিত্তবান পিতার আদরের দুলাল তাই অর্থকড়ি নিয়ে ভাবনা নেই।সে চাইলে বসে বসেই খেতে পারে। কিন্তু দায়িত্বশীল আর ব্যক্তিত্ববান পুরুষ তা করে না।
তাই তাহসিনরাও করেনি।

“ কি ভাবছিস?"

সম্রাটের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো। সম্রাট আগের মতোই নির্লিপ্ততা বজায় রেখে ছোট করে বললো,

“ কিছু না!"

তাহসিন জানে সম্রাট কি ভাবছে! তাই আর ঘাটালো না। বরং কথা ঘুরিয়ে নিজেদের ক্লাব সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়ে গেলো।সম্রাট অনিহা দেখিয়ে বললো,

“ দেখ,আমাকে এসবে আর জড়াস না ভাই।আমি আগের মতো...."

“ কি! কি আগের মতো?
_____ ভাই কেউ বলেছিলো,কোন এক বিশেষ মনীষী বলছিলো বোধহয়, ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্ক যদি ছিন্ন হয় তবে নারীর কারণে। তুই আমার রক্তের না হলেও, ভাই তো! এখন একজন নারীর জন্য আমাকে ছেড়ে দিবি?"

তাহসিন দুষ্টুমি করে বললেও সম্রাটের এই দুষ্টমি ভালো লাগলো না।ও রক্ত চোক্ষুতে তাহসিনের দিকে চাইলে তাহসিন নিজের দুই হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণের ন্যায় ভঙ্গি করে বললো,

“ স্যরি ব্রো!
আই জাস্ট কিডিং।আই নো,সি ইজ হুয়াট ফ্র ইয়্যু!'

শেষ কথাটা বলে সম্রাটের কাঁধ চাপড়ে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। অতঃপর আগের মতোই দরদ ভরা কন্ঠে বললো,

“ আই উইশ তোকে সহযোগিতা করতে পারতাম।মন থেকে শান্তি লাগতো দোস্ত।সত্যি বলতে,পারিকে আমরাও খুব মিস করছি।
_____ মেয়েটা এভাবে কিভাবে গায়েব হতে পারে? কি মায়া ভরা কন্ঠে ভাইয়া ডাকতো। যেখানেই থাক,নিরাপদে থাক।এই দোয়া ছাড়া আর কি বা করার আছে!"

সম্রাট চুপ, ও ভাবছে পারির আইডি কার্ড পাওয়া গিয়েছে।তার মানে পারি এশহরেই কোথাও না কোথাও আছে। কিন্তু কোথায়? সবচেয়ে বড় কথা,পারির আসল আইডি কার্ড তার ঘরেই।তবে এই কার্ড কোথায় থেকে এলো? সেকেন্ড কপি তুলেছে? হয়তো! কিন্তু ঐ কপি কেন তুলেছে?আর কে'ই বা তুলেছে!

“ আচ্ছা এখন চুপ না থেকে কিছু একটা বল! কিভাবে কি করবি? "

“পারির আইডি কার্ড পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু ওর কোন হদিস সেখানে ছিলো না।"

“ মানে?"

তাহসিন চমকিত হয়ে সোজা হয়ে বসলো।সম্রাটের দিকে তাকিয়ে, উত্তরের আশায় র‌ইলো।

____________________________

“ দাঁড়াও!
_____কোথায় যাচ্ছো?"

জব্বার মন্ডল দো'তলার বারান্দার রেলিং এর পাশে দাঁড়িয়ে নিজের বড় মেয়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা করলেন।তানহা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। বাবার প্রশ্নে থেমে গেলো। মাথা ঘুরিয়ে উপরের দিকে চাইলো,বাবার কঠোর চাহনিতে নত হয়ে গেলো তার দম্ভ ভরা মস্তক।জব্বার মন্ডল আগের মতোই তেজি, রুক্ষ স্বরে বললেন,

“কি হলো? কথা বলছো না কেন ? কোথায় যাচ্ছো, আমি জিজ্ঞেস করেছি তো নাকি?"

তানহা গলায় আঁটকে থাকা ঢোঁক গিলে নিয়ে, চোখ উপরে তুলে ভাঙ্গা শব্দে বললো,

“ ও--ও-ও বাড়ি যাচ্ছি বাবা।ওকে একবার!"

“ কোথাও যাবে না। চুপচাপ নিজের ঘরে যাও!"

“ কিন্তু বাবা?"

“ কোন কিন্তু পরন্তু নয়।মান সম্মান আমার যা খোয়ানোর তা তুমি খুইয়েছোই।আর কিছু করে আমাকে আত্মঘাতি হতে বাধ্য করো না।"

বাবার ঠান্ডা গলায় দেওয়া হুমকিতে তানহা ভেঙে পড়লো। হুহু করে কেঁদে উঠলো সে। সিঁড়ির রেলিং ছুঁয়ে সিঁড়ির উপর‌ই বসে পড়লো। মেয়ের এহেন হালে মা হয়ে মিসের জব্বার কষ্ট পেলেও কিছু বললেন না। কেননা এই কান্নার দায়ভার তার নিজের‌ই।সে অনেক বুঝিয়েছে মেয়ে ও মেয়ের বাবাকে।জোর করে কারো সঙ্গে সংসার করা গেলেও তার ভালোবাসা পাওয়া যায় না।যখন সেদিন, সে হাসপাতালে সেই মেয়েটির জন্য করা সম্রাটের পাগলামি দেখেছিলো তখন‌ই তিনি মেয়েকে বুঝিয়েছিলেন, এভাবে জোর করে তৃতীয় ব্যক্তি না হতে।স্বামীকে অনুরোধ করেছিলেন, ক্ষমতার জোর খাটিয়ে অযথা কারো উপর আমাদের মেয়ের ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়ে তিনটা জীবন নষ্ট না করতে। কিন্তু না।সেদিন উনার কথা কেউ শুনেনি। নূন্যতম গুরুত্ব‌ও দেয়নি। বরং উনি যেন বিয়েতে বাগড়া না দিতে পারে তাই মা হয়েও উনাকে সেই বিয়েতে উপস্থিত থাকতে দেওয়া হয়নি।সে কি অপমান।তিনি সেদিন অঝোরে কেঁদেছিলেন মেয়ের অদূর ভবিষ্যতের লাঞ্ছনার দৃশ্য কল্পনা করে।
সেই তো, তাই ঘটলো।

আজ চার বছর হয়ে যাচ্ছে অথচ মেয়েটা না পেলো স্বামীর সোহাগ আর না পেলো একটা সুস্থ সুন্দর সংসার। বরং দিনরাত এক অপরিচিত মেয়ের হাহাকার,আর অভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শুনেছেন তিনি,ঐ মেয়ের পেটে সম্রাটের সন্তান ছিলো। পাঁচ মাসের ভরা পেট নিয়ে মেয়েটাকে তারা কোথায়.....

মিসেস জব্বার আর ভাবতে পারছেন না।উনার বুক ফেটে যাচ্ছে। মেয়ে আর মেয়ের বাপের পাপের শাস্তি কল্পনা করে।তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, পৃথিবীতে ঘটা সকল অন্যায়ের শাস্তি এই পৃথিবীতে‌ই পেয়ে যায় মানুষ। আল্লাহ কাউকে ছাড় দেন না। সেখানে তো ঐ মেয়েটা ছিলো এতিম, গর্ভবতী।তবে কি তার অন্তর থেকে নির্গত হ‌ওয়া হাহাকার কাউকে ভালো থাকতে দিবে? দিচ্ছে না তো।মিসেস তালুকদার শয্যাশায়ী আজ সাড়ে তিন বছর ধরে। ছেলের প্রতি করা নিজেদের অন্যায়ের দায়ে ছেলের থেকে ত্যাজ্য হ‌ওয়া পিতা-মাতা তারা।এই শোক স‌ইতে পারেননি মিসেস মাহমুদ তালুকদার। স্ট্রোক করে বিছানায় পড়ে র‌ইলেন। এদিকে মাহমুদ তালুকদার আগের মতো শারীরিক ভাবে সক্ষম না হওয়ায় ব্যাবসা বানিজ্য সব ছেড়েছুড়ে গৃহবন্দি হয়ে রয়েছেন। যদিওবা ব্যাবসার হাল ছেলে এবং ছোট মেয়ে ধরেছে, তাতে কি? একমাত্র ছেলে সন্তান হয়েও তাদেরকে বাবা- মা ডাকে না।এটা কি কম বড় শাস্তি!

আর উনার মেয়ে?উনার স্বামীর করা সকল বর্বরতার ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই উনারা সামাজিক ভাবে যথেষ্ট হেনস্থার শিকার হয়েছেন,উনার স্বামী রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে দলীয় ভাবেও কটাক্ষের মুখে পড়েন।মেয়েটা সমাজের চোখে হয়ে যায় ভ্রষ্টা।না পেলো স্বামী সুখ আর না পেলো সামাজিক মর্যাদা। শুধু হারালোই। নিজের জেদ,অহমিকায় ডুবে থেকে সব হারালো মেয়েটা। অথচ এখন‌ও শুধরাচ্ছে না।
মা হয়ে মেয়ের এমন অবনতি তিনি কিভাবে বরদাস্ত করে যাবেন? কিন্তু তিনি করতেও পারেননি কিছু ,
তিনি যে নিরূপায়!

“ আপু!"

মানহা বড় বোনের কাঁধে হাত রেখে কাঁদো কাঁদো গলায় ডাক দিলো।তানহা মাথা তুলে বোনের দিকে চেয়ে বোনের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,

“ কেন আমাকে সে একটু ভালোবাসলো না বল? কেন ভালোবাসলো না? আমি কিসে কম? কি নাই আমার? কেন ঐ পারিই তার সব ভালোবাসা পাওয়া যোগ্য? পারিই কেন? আমি ন‌ই কেন?"

মানহা বোনের বুকফাটা আর্তনাদ নিরবে শুনছে আর নৈঃশব্দ্যে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। কিছু করার নেই তার।আজ এত বড় বছর ধরে এগুলো দেখে যাচ্ছে সে।তার ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়।তার বোনের কষ্ট দেখলে পারির প্রতি রাগ জন্মে
যদি পারি নামক কোন মেয়ের অস্তিত্ব‌ই এই দুনিয়ায় না থাকতো তবে তার বোনকে এত কষ্ট পেতে হতো না।তার মনে হচ্ছে সব ধ্বংসের একটাই কারণ,পারির এই পৃথিবীতে আসা।
আবার এটাও মনে হয়,জোর করে ভালোবাসা তো হয় না।সে কখনোই সম্রাটের চোখে তার বোনের জন্য বিন্দুমাত্র অনুভূতি‌ও দেখেনি।এই তো কিছু মাস আগে,তার বোন গাড়ি দুর্ঘটনায় হসপিটালে ছিলো।সম্রাটকে ফোন করে সে জানালো খবরটা।সম্রাট এলো তো নাই, উল্টো বলেছিলো,

“ জানাজার সময় কখন জানিও,শত হলেও আমার জোর করে হ‌ওয়া রক্ষিতা। মাটি না হোক, অন্তত একদলা থুতু তো দিতেই পারি ওর কবরের উপর!"

যেভাবেই হোক,বিয়েটা হয়েছিল। তা-ও ধর্মীয় নিয়মানুসারে,তিন কবুল বলে।দুই পরিবারের সব সদস্য,এক হাসপাতাল মানুষকে সাক্ষী রেখে।সেই ব‌উকে কেউ রক্ষিতা বলে সম্বোধন করতে পারে? ঠিক কতটা ঘৃণার পাত্রী হলে তা করা সম্ভব! মানহা বয়সে ছোট হলেও এই হিসাব করাটা খুব সহজ তার জন্য।
এরপর তানহার কোন বিষয়ে মানহা সম্রাটকে ডাকেনি,আর না জানিয়েছে।এতে অবশ্য সেই পুরুষের কোন হেলদোল হয়নি।সে তো অস্থির হয়ে, পাগলের ন্যায় চষে বেড়াচ্ছে দেশের প্রতিটি অলিগলি। খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই নারীকে যাকে তার বাবা নিজের মেয়ের সুখের জন্য তুলে দিয়েছিল কিছু আদম ব্যবসায়ীদের হাতে।

_______________________

তালুকদার বাড়ির বাগানের ছাউনিতে বসে রয়েছে মাহমুদ তালুকদার! গতকাল থেকে মিসেস তালুকদারের অবস্থা খুব একটা ভালো না। ছেলেকে জানিয়েছে, কিন্তু তার তরফ থেকে বাবা মায়ের প্রতি দায়িত্বসূলভ কোন বার্তা আসেনি।সে নিয়োগকৃত কর্মীকে আদেশ করেই খালাস।
মাহমুদ তালুকদার বুঝেন,তিনি নিজের একমাত্র ছেলেকে আজীবনের জন্য হারিয়েছেন। নিজের মিথ্যা বংশীয় অহম,জেদকে গুরুত্ব দিয়ে ছেলেকে বিগড়ে দিয়েছেন।
মিথ্যা অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ছেলেকে বাঁধতে চেয়েছিলেন।তাই এখন তাদের সত্য অসুস্থতাও ছেলেকে টলাতে পারে না।

“ স্যার, ঔষধটা নিন।"

আটাশ বছর বয়সী তরুণ,এই বাড়িতে রয়েছে আজ তিন বছরের অধিক সময় ধরে। দায়িত্ব মাহমুদ তালুকদার ও মিসেস তালুকদারের দেখভাল করা। জরুরী সেবায় নিয়োজিত সে।
এবং, এই বাড়িতে ঘটা সকল গোপন তথ্য জায়গা মতো পৌঁছে দেওয়া।

তালুকদার সাহেব ঔষুধটা নিয়ে গলাধঃকরণ করে পানির গ্লাসটা তরুণের হাতে দিয়ে শুধালেন,

“ তোমার ছোট স্যার ফোন করেছিলেন? কোথায় আছেন এখন?"

তরুণের মুখটা শুকনো হয়ে গেলো।সে জানে,বড় স্যার কি শুনতে চায়। কিন্তু বড় স্যারের মুখে হাসি ফোটানোর মতো সুখবর তার কাছে আপাতত নেই।তার ভীষণ মায়া হয় এই বৃদ্ধ লোকটার উপর। পঞ্চাশোর্ধ এবং ষাটের ঘরের মাঝে দন্ডায়মান এই লোকটার কষ্ট তার ভালো লাগে না। নিজ পিতার জন্য যতটা মায়া হয়, ঠিক ততটাই এই লোকের জন্যেও জাগে। কিন্তু... সে শুনেছে এই লোকের অতিতে ঘটানো পাপের কথা।কারো মন ভাঙ্গা মসজিদ ভাঙ্গাতূল্য অপরাধ। সেখানে এই লোক নিজের গর্ভবতী পুত্রবধূকে নাকি...

তরুণের দোটানা ভাবনার রেশে দাঁড়ি বসিয়ে তালুকদার সাহেব আবারও এক‌ই প্রশ্ন করলেন,

“ কি ব্যাপার, বললে না যে!"

তরুণ ঢোঁক গিলে কন্ঠনালী পরিষ্কার করে নিলো।নিচু কন্ঠে, নত মস্তকে বললো,

“ স্যার বলেছে,তিনি ডাক্তার নন। অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে।তাকে বিরক্ত না করতে!"

এতটুকু বলে তরুণ চুপ হয়ে গেলো। তালুকদার সাহেব জানতো ছেলে এমন কিছুই বলবে।বিগত চার বছরে‌র‌ও অধিক সময় ধরে এই বলেই এসেছে।
তাদের কর্মফল।ভোগ করতে তো হবেই।
তালুকদার সাহেব আর কিছু বললেন না।পাশেই দাঁড় করিয়ে রাখা লাঠিটা শক্ত করে চেপে ধরে উঠে দাঁড়ালো। তরুণ এগিয়ে এসে সাহায্য করার জন্য হাত বাড়াতেই তালুকদার সাহেব হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিলো। এরপর স্ব-শক্তিতে চললেন নিজের ঘরের দিকে।

____________________________________

বিছানায় সব মেডিক্যাল কাগজ মেলে বসেছে পারি। দেখছে নিজের দেহের ভঙ্গুর হাল।গত তিন মাস আগে করা টেস্ট রিপোর্টগুলো ভাঁজ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো।কাল আবার‌ও যেতে হবে।পরপর কয়েকটি চেকাপে থাকলে হয়তো কিছুটা হলেও উপকার হবে।নয়তো বড়সড় ধাক্কা আসবে।সে নিজের জন্য এত ভাবতো না যদি না,তার মাথায় কারো আমানতের দায়িত্ব থাকতো।পারি রিপোর্টগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিজের জন্য এক স্যুট কাপড় ঢুকালো। বাচ্চাদের জন্য নিলো দু'টো সেট। দু'জনকে নিয়েই যাবে।এখানে একজনকে রেখে গেলে তার রাতে ঘুম হয় না দুশ্চিন্তায়।

ছটফট করে কাজ করতে করতে বুকে ব্যথা অনুভব হচ্ছে। অস্থিরতাকে দমিয়ে চৌকির উপর বসে পড়লো। কিন্তু তাকে দ্রুত বের হতে হবে। কেননা,পরের বাস ধরলে পৌঁছাতে মাঝরাত হয়ে যাবে।আর মাঝরাতে গাজীপুরের রাস্তা মানেই বিপদ।তাকে আবার কাল সকালে যেকোন উপায়ে হাসপাতালে থাকতেই হবে। অতঃপর সন্ধায় আবারও ফিরতে হবে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে।বুকের ব্যথাকে পাত্তা না দিয়ে দ্রুত উঠে পড়লো।সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিয়ে, তালা-চাবি নিয়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। অতঃপর....

কি অপেক্ষা করছে পারির জন্য?

২৯

“ যাকে নিয়ে গড়েছি প্রেমের আবাস,তাকে বিনে সেথায় থাকা, এ যেন এক করুন উপহাস।"

সম্রাট জানে না কেন,তবে তার আজ খুব অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটবে।যা অপ্রত্যাশিত।সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য বেরিয়েও যায়নি।সে এলোমেলো ড্রাইভ করে এদিকে ওদিকে যাচ্ছে, যেখানে যেখানে তার আর পারির স্মৃতি রয়েছে। ঐদিকে অফিস থেকে ঘনঘন ফোন আসছে।আজ মিটিং রয়েছে।

বেলা তখন দশটার একটু পর... শাহবাগ চত্ত্বর পেরিয়ে মৎস ভবনের দিকে গাড়ি ঘুরালো, ঠিক সেই সময়ে একটা ফোন আসে।

সম্রাট মুঠোফোনে অচেনা নাম্বার দেখে কপাল কুঁচকে নেয়। কেননা, অচেনা নাম্বার!
সে এখন কোন অচেনা নাম্বার কাটে না।যদি পারিজাত ফোন দেয়! এই একটা আশায়। তবে তাকে হতাশ করে দিয়ে পারি কখনো ফোন করেনি। হয়তো করবেও না। আর যে বা যারা ফোন দেয় তাদের সম্রাট চায় না।

তানহার আসল নাম্বার ব্লক লিস্টে থাকায় সে তখন যেখানে থাকে সেখান থেকেই যে কারো নাম্বার দিয়ে কল করে, যদিও ঐ কন্ঠ শোনার সাথে সাথে‌ই সম্রাট কল কেটে ব্লক লিস্টে ফেলে দেয়।তাতে কি? সেই বেহায়ার তো কল করা বন্ধ হয় না।এই মেয়ের জন্য‌ই এত কিছু,সত্যি বলতে সম্রাট নিজের বাবা মায়ের কাছেও এই মেয়ের জন্য‌ই যায় না।দেখা গেলো,সম্রাট ঐ বাড়িতে গিয়েছে শুনলেই উড়ে এসে স্ত্রী-গিরী ফলাবে।যা সম্রাটের একদম সহ্য হয় না।সম্রাটের স্ত্রী শুধু একজন,সম্রাটের অর্ধাঙ্গীনি,তার হৃদয়ের রাণী,তার প্রেয়সি,তার বধূ তার বিবিজান,সবটা সম্বোধন শুধু একজনের জন্য নির্ধারিত।তাতে সম্রাট কাউকে ভাগ বসাতে দিবে না।
যেখানে সম্রাট শরীর ছোঁয়ার অনুমতিই দেয়নি, সেখানে অনুভূতির কিভাবে দিবে? অসম্ভব। সম্রাটের দেহের প্রতিটি লোম থেকে ভেতরের মাংসপিণ্ড পর্যন্ত, সবকিছু‌ই একজনের নামে লেখা।সে থাকলেও তার, না থাকলেও তার।সম্রাট কখনোই ওয়াদার বরখেলাপ করবে না।আর তো না আমানতের খেয়ানত করবে!

কলটা কেটে গিয়ে আবার বেজে উঠলো। বিরক্ত হয়ে কাটতে চাইলেও কাটলো না,ঐ যে আশা! যদি পারি হয়!

তেতো মুখে কলটা রিসিভ করে লাউড স্পিকারে দিয়ে রাখলো,

“ হ্যালো!কে...."

“ হ্যালো জিজু আমি....

বাকীটা বলতে না দিয়ে ঝাঁঝালো স্বরে শুধালো,

“ কি চাই?"

“ জিজু , আপনি একটু সুপার মেডিক্যাল...

“ কেন?"

“ আপু, সুইসাইড এটেম্পড করেছে।আপু...

“ সত্যি?"

“ হ্যা আপু,হাতের রগ কেটে...

“ গ্রেট,সি ডিড এ্যা ভেরি গুড জব।এই কাজটা আরো আগে কেন করেনি বলো তো?আমি অন্তত শ্বাস নিতে পারতাম শান্তিতে।"

“ জিজু! আপনি এসব কি বলছেন? আমার আপু আপনাকে ভালোবেসে!"

“ ভালোবাসা না,ঐটাকে ভালোবাসা বলে না।"

চেঁচিয়ে বললো কথাটা।রাগে তার রগ নীলাভ হয়ে যাচ্ছে।মাথার মধ্যিখানে ধোঁয়া ছুটছে মনে হয়। রাগের চোটে গাড়িতে ব্রেক টানলো।পাশ করে আগের মতোই চেঁচিয়ে বলতে থাকলো,

“ ভালোবাসা কি আগে বোঝো। আল্লাহর দোহাই লাগে তোমাদের।আগে তোমার বুঝতে শেখো কোনটা ভালোবাসা আর কোনটা জেদ!
______তোমার বোনকে আমি হাজারবার, অজস্রবার বুঝিয়েছি,তাকে আমি ভালোবাসি না। তোমার বাপকে অবধি বুঝিয়েছি।মেয়ের জেদে তাল মিলিয়ে আমাকে ফোর্স করলে মেয়ের জীবনের অনিষ্ট ছাড়া কিছুই পাবে না। তারপরেও সে জেদ করে আমার লাইফ, আমার....লিসেন,আমি বিয়ের আগে,অযুত, লক্ষ, নিযুতবার তাকে বুঝিয়েছি,সে আমাকে ভালোবাসলেও আমি তাকে ভালোবাসি না।আমি পারিজাতকে ভালোবাসি।আর পারিজাত আমাকে। আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাঝে সে একতরফা ভালোবাসাকে গুরুত্ব দিয়ে আমার জীবন থেকে পারিজাতকে সরাতে যেই নোংরা খেলা খেলেছে তাতে ওকে জবাই করলেও আমার যন্ত্রনা কমবে না।
___________আর তোমার বাপকে তো....ট্রাস্ট মি! আমার যদি আমার স্ত্রী সন্তানকে খোঁজার তাগিদ না থাকতো তবে তোমার বাপ বোনকে জবাই করতে আমি সম্রাট দু'বার ভাবতাম না।
লিসেন,আমি যেভাবে আমার সন্তান হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছি, ঠিক সেভাবেই তোমার বাপকেও সন্তান হারানোর ভয় তাড়িয়ে বেড়াবে। এবং এটা দেখেই আমি শান্তি অনুভব করবো।সো....কে মরলো কে বাঁচলো আমার কি ভাই! আমি তো কাউকে চিনি না।
ডোন্ট ডিস্টার্ব মি।আমি আমার রাণী সাহেবা আর রাজকুমারীকে খুঁজতে বের হয়েছি। এবং সো কল্ড গল্প শুনতে আগ্রহী ন‌ই।"

“ জিজু জিজু প্লিজ ফোনটা কাটবেন না।আপনি শুধু একবার...

সম্রাটের এত বিষাক্ত কথার পরেও মানহার অনুনয়। সম্রাট ভ্রু কুঁচকে নিয়ে অনাগ্রহী সুরে বলে,

“ আমি করবো? আশ্চর্য! আজব,কেউ একজন সুইসাইড এটেম্পড করলো তাতে আমার কি?যার সাথে লেনদেন নেই,সে মরলেও, কি বাঁচলেও কি!"

এ পর্যায়ে মানহা রেগে গেলো,সে চিৎকার করে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই সম্রাট আগের চেয়েও বেশি গর্জিয়ে বললো,

“ ডোন্ট সাউট,হাও ডেয়ার ইয়্যু টু সাউটিং অন মি! হাও!....লিসেন, ওকে কোনদিন আমি নিজের স্ত্রী বলে মানিনি। যেখানে ওর সাথে বিয়েটাই মানি না সেখান ও মরলো কি-না, বাঁচলো কি-না তা ভেবে আমার কাজ কি?
________আর তোমার বাবার কপাল ভালো,আমি আমার স্ত্রী সন্তানকে খোঁজায় ব্যস্ত,আই সয়ার! নয়তো, অনেক আগেই তোমার ঐ অসভ্য,বদ জেদি বোন আমার হাতে খুন হতো।"

মানহা ফুঁপিয়ে উঠলো,যদিও সম্রাটের মায়া হলো না।কেন না তার মায়া মানবিকতা সব সে রাতেই ফুরিয়ে গিয়েছে, যখন সে জেল থেকে বেরিয়ে তার পারিজাতের খোঁজ নিতে গিয়ে জানে এরা সব মিলে তার পারিজাতকে কোথাও, কারো হাতে তুলে দিয়েছে।যারা তার গর্ভবতী স্ত্রীকে করুনা করেনি,যারা তার ঔরসজাত সন্তানের প্রতি মানবিকতা দেখায়নি তাদের জন্য তার ভেতর থেকে এসব শব্দ ব্যবহৃত হ‌ওয়া নিজ ভালোবাসাকে অপমান করার সামিল।সে আগের মতোই নির্লিপ্ত থেকে নিরেট কন্ঠে বললো,

“ মারা গেলে বলো, দেখি একবার গিয়ে....এনি ওয়ে আমার এসব শুনতে ইচ্ছে করছে না।আমাকে আর ফোন করবে না।"

বলেই ফোনটা কাটলো। ওষ্ঠদ্বয় ফাঁক করে শব্দ করে একটা শ্বাস ছাড়লো।সে নিজেকে চিনতে পারছে না।যে একসময় সামাজিক, মানবিক কাজে রপ্ত ছিলো,যার ধ্যানজ্ঞান অন্যের কল্যাণে নিয়োজিত ছিলো।যার ঠোঁট ভেদ করে কখনো অন্যের জন্য কু-চিন্তা বের হয়নি।সে আজ অবলীলায় কারো মৃত্যু কামনা করছে। হ্যাঁ, সম্রাট মনেপ্রাণে‌ই তানহার মৃত্যু কামনা করছে।তানহা মরে যাক,জব্বার মন্ডল সন্তান হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করুক।তানহা তো তার থেকে পাওয়া অপমান, অবহেলায় শিক্ষা পেয়েই যাচ্ছে। বেঁচে থাকলে আরো জঘন্য হবে সেই শাস্তি।তার চেয়ে বরং মরে গিয়ে বেঁচে যাক।

সম্রাট গাড়িতে উঠে বসলো।তাকে অফিসে যেতে হবে। জীবনে আর যাই হোক,পয়সা কামানো জরুরি।পয়সা ছাড়া যেখানে পানিও গরম হয় না। সেখানে তাকে তার ব‌উ বাচ্চাকে খুঁজতে হবে। পয়সা ছাড়া, কিভাবে সম্ভব তা! এই যেই থানায় থানায় খোঁজ দেওয়ার দায়িত্ব সে দিয়ে রেখেছে তা কি এমনি এমনি কেউ পালন করে? উহুম! সব‌ই তার দেওয়া মোটা ব্যান্ডেলের কারিশমার কামাল।

সম্রাট চলে গেলো নিজ গন্তব্যে।

পিজি হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়ে বিশ টাকা দিয়ে একটা পানির বোতল আর পনেরো টাকা দিয়ে দু'টো কলা কিনে নিলো পারি। বাচ্চাদের সে বাইরের ভাজাপোড়া খাওয়ায় না।তার চেয়ে চেষ্টা করে যেকোন ফল কিনে দিতে।ফলে অন্তত ভাজাপোড়ার মতো অস্বাস্থ্যকর জীবানু নেই।
মেয়ের হাত ধরে ধীর পায়ে উপরের দিকে যাচ্ছে। ছোট সুখ, মায়ের হাতের মুঠোয় নিজের বাম হাত রেখে ডান হাতে একটা ছোট্ট পুতুল আঁকড়ে গুটি গুটি পায়ে মায়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে।পরনে তার একটা হালকা গোলাপি সুতি ফ্রক।মাথায় দু'টো ঝুঁটি বাঁধা,পায়ে একজোড়া ব্লু কেইডস।পারি ভেতরের ভীড় দেখে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে এক্সেলেটরে উঠলো।পারি মাথা ঘুরিয়ে আশপাশ দেখছে।

গাইনি বিশেষজ্ঞ নাসরিন খাতুনের কাছে সে দেখাবে। থাইরয়েডের সমস্যা ধরা পড়েছিলো সেবার। যদিও এটার প্রথম লক্ষন তার গর্ভকালে‌ই দেখা দিয়েছিল।তবে প্রসবের পর তার আর কোন হদিস ছিলো না। কিন্তু বিগত এক বছর ধরে শারীরিক অবস্থার অবনতি সন্দেহ সৃষ্টি করে। কক্সবাজারে সরকারি হাসপাতালের অবস্থা করুন। তাছাড়াও পারি এই চিকিৎসকের চিকিৎসা আগেও নিয়েছে তাই ভেবেছিল এখানেই দেখাবে।কম পয়সায় ভালো চিকিৎসা।নয়তো এতদূর আসতো না। তাছাড়াও মেয়েটাকেও একবার দেখিয়ে নিবে।মেয়েটার প্রসবের রাস্তায় ইনফেকশন হয়েছিলো।যেটা ভালো করে চেকাপ করানো দরকার।

ভাবতে ভাবতে উপরে চলে আসে।ছয় তলায়।ছয়শো এগারো, বারো রুম।

দীর্ঘ সিরিয়াল অতিক্রম করে পারি যখন ভেতরে ঢুকে তখন ডক্টরের শেষ সময়। এরপর আর পেসেন্ট দেখবেন না। মানে তিনি পারিকেও দেখবেন না। বেরিয়ে যাচ্ছেন! উনার জরুরী রাউন্ড আছে বলে।পারি হতাশ চোখে চেয়ে রইল।আশাহত হলো।এই সময়ে এখন কেউ এভাবে ফিরিয়ে দেয়? বাইরে পেসেন্টের লম্বা সিরিয়াল আর এদিকে তিনি চলে যাচ্ছেন! দোষ‌ও দেওয়া উচিত নয়।কেননা সকাল নয়টা থেকে একটা অবধি টানা পেসেন্ট দেখেছেন তিনি,এখন আবার রাউন্ডে যাবে। একজন মানুষ হিসেবে দোষ দেওয়া যাচ্ছে না কিন্তু পেসেন্টরাও বা কি করবে? সেই কোন সকাল থেকে সিরিয়ালে আছে।এখন এই সময়ে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হবে?

ডাক্তার বেরিয়ে যাওয়ার সময় এটেনডেন্ট সবার উদ্দেশ্যে বললেন,

“ নামাজের পর আসুন। দুপুরের পর ডাক্তার খন্দকার বসবেন।"

পারি এটেনডেন্টকে জিজ্ঞেস করলো,

“ আচ্ছা দুপুরের পর তিন তলায় যে উনি বসেন,তা কি আজ‌ও বসবেন?"

এটেনডেন্ট ক্ষেপে যাওয়া পেসেন্টে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।তার মধ্যে চেম্বার লক করায় ব্যস্ত, ঐদিকে একেক পেসেন্ট একেক প্রশ্ন করে মাথা খেয়ে নিচ্ছে। এতকিছুর মধ্যে তিনি পারির কথা ঠিকঠাক শুনলো কিনা বোঝা গেলো না, তবে আন্দাজে বলে দিলেন,

“ হ্যা হ্যা,তিনটার পর আসেন।"

পারি কথাটা শুনে ভীড়ে ঠেলে বেরিয়ে আসলো।এত ভীড়ের চাপে ছোট্ট সুখ চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে । গরম আর ভীড় দেখে ভয়ে সে ফুঁপিয়ে উঠলো।পারি সেখান থেকে বেরিয়ে মেয়েকে সামলাতে আদুরে গলায় বললো,

“ কি হয়েছে আম্মা? এই তো আমরা এখান থেকে এখুনি বেরিয়ে যাবো।যাবে তুমি আম্মুর সাথে ঘুরতে!"

সুখ মায়ের গলা জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে মাথা দুলাচ্ছে।পারি মেয়ের ভেজা চোখ মুখ মুছে দিলো ওড়নার কোনা দিয়ে। এরপর ভাবলো কিছু একটা।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে, শাহবাগ মোড়ে আসলো। একবার ভাবলো মেয়েকে জাদুঘর ঘুরিয়ে দেখাবে।পর মুহূর্তে কিছু একটা চিন্তা করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।সে হাঁটতে হাঁটতে টিএসসি পানে যেতেই শাহবাগ থানা চোখে পড়ে। সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লো।তার মনে পড়লো,সে গতবার এসে নিজের আইডি কার্ড হারিয়েছে।সে যদিও নিশ্চিত নয় এখানে হারিয়েছে কি-না! নিজের ঘরে অনেক খুঁজেও পায়নি।তাই ধারনা করেছে, সেদিন বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাওয়ার সময় তার ব্যাগ খোলা ছিলো।আর ব্যাগেই থাকে সবসময় আইডি কার্ড।তার মনে হলো, হলেও হতে পারে এখানেই পড়েছে।যদিও আমাদের দেশের সাধারণ জনতা এত সচেতন নয় তবুও একবার চেষ্টা করতে দোষ কি?
পারির এসব ভেবে একবার পা বাড়িয়েও পিছিয়ে গেলো।

“ যেই দেশে জরুরী আইনি সেবা নিতেই টাকা ছাড়া কাজ হয় না সেখানে আমার আইডি কার্ডের জন্য ফাও কাজ করবে? এটা ভাবাও তো বিলাসিতা!"

সে ভেতরে ঢুকলো না। মেয়েকে নিয়ে এগিয়ে গেলো টিএসসি মোড়ে। যেখানে অজস্র স্মৃতি গাঁথা তার অতিতের। কল্পনার সাথে তাল মিলিয়ে মেয়েকে নিয়ে ধীর গতিতে হাঁটছে। এদিকে ঘুরতে পেরে ছোট্ট সুখের মনে সুখ ফড়িংরা উড়ে বেড়াচ্ছে।
সে হাত নাচিয়ে নাচিয়ে এটা ঐটা দেখছে আর মা'কে প্রশ্ন করছে।
পারিজাত , নজরুল সমাধির সামনে যেতেই দেখলো এক বৃদ্ধ সুন্দর সুন্দর নূপুর নিয়ে বসেছে। ঘুঙুর,বিছা,কোমর পাট্টা সহ নানা কিছু।তার পাশে একজন কয়েকটি শিশুতোষ গল্পের ব‌ই নিয়ে বসেছে।পারি সেদিকে এগিয়ে গেলো। মেয়ের জন্য কিছু কিনতে মনটা আঁকুপাঁকু করছে। কিন্তু ব্যাগে যে খুব একটা পয়সা নেই।যা দিয়ে সে তার শখ পূরণ করতে পারবে। যদি ডাক্তার টেস্ট দেয়? তাহলে তো আবার অনেক গুলো খরচা পড়বে! এদিকে মেয়েটাকেও তো দেখাতে হবে।সব কিছু বাদ দিলেও সুচিকিৎসা তো বাদ দেওয়া যাবে না।এটা একান্তই বাধ্যতামূলক, জরুরি।পারি ভাবুক মনেই হাত বাড়িয়ে ছোট এক জোড়া নুপূ্র দেখলো।মেয়েটার জন্য রূপার নুপূ্র গড়াতে গিয়েও গড়ায়নি। ছোট মানুষ হারিয়ে ফেলে যদি এই ভয়ে। নূপুর জোড়া নাড়াচাড়া করতে করতেই চোখ পড়লো ব‌ইয়ের দোকানে।নুপূর কিনলে সেটা পায়ে থাকবে,লাভ কি? পারি নিজের জীবনে অনেক কষ্ট করেছে।এতটা যে, এখন ছোট ছোট শখকেও বিলাসিতা মনে হয়।তাই এই শখটাকেও তাই মনে হচ্ছে।সে নুপূ্র রেখে দু'টো ব‌ই নিলো।যা দিয়ে ভবিষ্যতে আলো হবে।পারি চায় তার বাচ্চারা বাবার মতো পড়াকু হোক।যেন কেউ বলতে না পারে,পারি বাচ্চাদের সঠিক মানুষ গাইডলাইন দিতে পারেনি।

ব‌ই কিনে ব্যাগে ঢুকিয়ে,একটা পুতুল‌ওয়ালা ব্যান্ড কিনে মেয়ের মাথায় পরিয়ে দিলো। অতঃপর মিষ্টি হাসলো। ছোট সুখ‌ও খুশি।

“ আমার আম্মুর পছন্দ হয়েছে?"

“ হুম!"

বলেই সে হাসলো।পারি মেয়ের হাত ধরে অনেক সময় পার করলো নজরুল সমাধির সামনে।
সুখ একটা সাজানো কবর দেখে জিজ্ঞেস করে,

“ আম্মু,ঐতা কি?"

“ ঐটা কবর মা!"

“ কবল কি আম্মু?"

“ কবর! কবর হচ্ছে ঘর।"

” ঘল?"

“ হুম!"

“ কিন্তু আমাদের ঘল তো বল,এইতা ছোত ঘল।"

“ হ্যাঁ মা।এই ঘর ছোট‌ই হয়!"

“ একানে কে গুমায়?"

“ ঐখানে একটা দাদু ঘুমায়।"

“ দাদু!"

“ হুম,উনি হচ্ছেন আমাদের জাতীয় কবি,বলো তো সে কে?"

“ জাতি কবি?"

“ জাতি কবি না মা, জাতীয় কবি। তোমাদের শিখিয়েছিলাম না মা?"

সুখের মনে পড়লো,মা তো তাদের শিখিয়েছে। জাতীয় কবি,বিশ্ব কবি আর কি কি কবি! কিন্তু সুখের কি এত সব মনে থাকে! সুখ ছোট না! সে ভার মুখে অভিযোগের ন্যায় বললো,

“ আমি তো ছোত বাবু,বাবুরা কি ছব পালে নাকি?"

পারিজাত মেয়ের পাকা কথায় অভ্যস্ত,তাই চমকালো না।সে তো জানেই উত্তরের পরিবর্তে এমন কথাই আসবে তার মেয়ের তরফ থেকে।যখন পড়ায় তখন সে হাজার বাহানা করে,আর যখন এমন করে পড়া ধরে তখনই তার এত গুছানো যুক্তি উপস্থাপন করা হয়।
পারিজাত চোখ ছোট ছোট করে মেয়ের দিকে চাইলো!বললো,

“ তুমি ছোট?"

সুখ মাথা উপরনিচ করলো, অর্থাৎ হ্যাঁ! সে ছোট।পারি মেয়ের কান টেনে ধরে বললো,

“ পাকা কথায় ছোট থাকো না? পড়া ধরলেই ছোট হয় যান আপনি?"

“ আমি বাবাকে বলে দিবো, তুমি কান তানো!"

গোল গোল চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো। মুহুর্তে মেয়ের প্রতিক্রিয়া বদলে পারির বিস্মিত হলো না।সাড়ে তিন বছরের এই পুঁচকে মেয়েটার এসব নাটকে মা পারি অভ্যস্ত।তবে পারি চমকায় তার বাচ্চাদের এই বাক্যটায়। তারা না দেখা বাবার প্রতি কত দুর্বল। কিছু হলেই তারা বাবাকে বলে দিবে বলে আশ্বাস রাখে।

পারি মুহূর্তেই মেয়েটাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।তার সন্তান,তার ভালোবাসার চিহ্ন।সে কোন কারণেই তাদের এই ছোট্ট জানদের চোখের পানি সহ্য করতে পারবে না। দুষ্টুমির ছলেও না।

ঘন্টা খানেক এদিকে ওদিকে দাঁড়িয়ে,মা মেয়ে খুনসুটি করলো।সময় কাটানোর জন্য কত কি! অতঃপর আবারও হেঁটে হেঁটে এদিকে আসতেই সেই থানার সামনে চোখ পড়লো।এবার পারি কেন জানি ভাবনা চিন্তা ছাড়াই ভেতরে ঢুকে পড়লো।

বাইরের দরজায় দাঁড়ানো কনস্টেবল পারিজাতকে ভেতরে আসতে দেখে থামিয়ে দিয়ে বললো,

“ কি চাই?"

“ আমার জাতীয় নাগরিক আইডি কার্ড হারিয়ে গিয়েছে,জিডি করবো!"

“ আচ্ছা ভেতরে যান।এ যে এদিকে!"

তিনি দেখিয়ে দিলেন,পারিও সেদিকে গেলো।
সময় বোধহয় সুপ্রসন্ন সম্রাটের প্রতি তাই কি-না জানা নেই।পারি গিয়ে ডেস্কে বসা অফিসারকে সালাম দিলো।তখন সেই অফিসার এসে উক্ত ডেস্কের সামনে দাঁড়ালো একটি ফাইল হাতে নিয়ে।পারির মাথায় ওড়না টানা। মাতৃত্বজনিত কারণে মেয়েদের মাঝে অনেক পরিবর্তন ঘটে।তেমনি কারো কারো কন্ঠস্বরেও পরিবর্তন ঘটে। এছাড়া যেহেতু অফিসার পারিকে সরাসরি কখনো দেখেনি তাই এক দেখাতেই চেনার কথাও না।পারি ডেস্কের অফিসারকে সালাম দিতেই অফিসার সালামে উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“ জি, বলুন কিভাবে সাহায্য করতে পারি?"

“ আমি একটা জিডি করতে চাইছি!"

“ আচ্ছা! কোন বিষয়ে, মানে সমস্যা কি?"

“ আসলে..

“ বসুন আগে!"

তিনি পারিকে চেয়ার দেখিয়ে দিলেন।চেয়ার সরানোর সময় পারির চেহারা ঐ অফিসারের চোখে পড়লো, সরাসরি।ত অফিসার ভ্রু কুঁচকে নিলো,ভাবলো। অতঃপর চোখ বড় বড় করে ফেললো। পারির বসে,সুখকে নিজের ডান হাত দিয়ে ধরে রাখে। অতঃপর,

“ আসলে আমি কক্সবাজার থাকি।গত তিন মাস আগে আমি পিজিতে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম,প্রেসার ফলড করে আমি এপাশে মেইন সড়কে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাই। এরপর অন্য পথচারীরা ধরাধরি করে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।সেই সময়ে আমার ব্যাগ খোলা থাকায় হয়তো তখন জাতীয় পরিচয়পত্র পড়ে যায়।তাই আমি..."

“ তিন মাস আগের ঘটনা নিয়ে এখন আসছেন জিডি করতে?"

“ আসলে....বাড়ি গিয়ে খেয়াল করেছি আমার কার্ডটা পাচ্ছি না।"

“ এখানেই পড়েছে আপনি নিশ্চিত করে হলেন?"

“ আমার ঘরে অনেক খুঁজেছি,পাইনি। তাছাড়াও আমার কার্ড সবসময় আমার ব্যাগেই থাকে।সেটা কখনো আমি অন্য কোথাও রাখি না।
আর সেই বার ছাড়া আর কখনো কোথাও এভাবে আমি বেকায়দায় পড়িনি তাই বলা যায় আমি পঁচানব্বই পার্সেন্ট নিশ্চিত!"

“ এতদিন আগে হারিয়ে যাওয়া জিনিস কি এখন.."

“ দেখুন স্যার,আমি পাবো না তা নিশ্চিত। কিন্তু যেন কেউ এটার অসৎ ব্যবহার করতে না পারে অথবা করলেও আমি ঝামেলায় না পড়ি তাই আর কি! বুঝেন‌ই তো গরীব মানুষ।সিঙ্গেল মাদার,আমি কোন অযাচিত ঝামেলায় ফেঁসে যাওয়া মানেই হলো আমার বাচ্চাদের জীবন নিয়ে টানাহেঁচড়া।তাই সচেতনতা থেকেই..."

“ হ্যাঁ, সচেতনতা আসলে!যদি আরেকটু সচেতন হতেন তবে নিশ্চয়ই আজ এখানে আসতে হতো না।
___ এ্যাই মবিন,দেখো তো পাওয়া কোন আইডি কার্ডের মধ্যে ইনারটা আছে কি-না?
_________ দেখুন,আপনি তো এসব বুঝবেন না।এসব তো এভাবে দেওয়া যায় না। অনেক নিয়ম-কানুন আছে।যদি পেয়ে থাকে তবে দিবে, নয়তো কোন আশা রাখবেন না ।"

বলেই তিনি উঠে দাঁড়ালো।পারিজাত তো জানতো, হারিয়ে যাওয়া আইডি কার্ড পাওয়া যায় না। এ দেশের মানুষ এত সচেতন‌ এখন‌ও হয়নি যে অন্যের কার্ড পেলে সেটা তুলে থানায় জমা দিয়ে যাবে।এত অবসর কারো নেই।জগত যেখানে আপনা জান বাঁচা চাচাতে অভ্যস্ত, সেখানে কোথাকার কার জাতীয় পরিচয়পত্র পড়ে রয়েছে,সেটা তুলে আবার কষ্ট করে থানায় আসবে পয়সা খরচা দিয়ে।

ডেস্ক বসা অফিসার উঠে যেতেই পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অফিসার,সেই এস‌ আই নাসির তিনি এবার সরাসরি পারির দিকে চাইলেন।ভীত, দ্বিধাগ্রস্ত এক নারী-মুখ।ছবির মতো রূপবতী হলেও চিন্তা, দারিদ্র্যতা সেই সৌন্দর্য্যের উপর প্রলেপ দিয়ে রেখেছে যার কারণে প্রথম দেখায় সহজে চেনা যাবে না।
নাসির পারির দিকে সন্দেহের নজরে চেয়ে জেরার করার মতো জিজ্ঞেস করলেন,

“ আপনি কোথায় থেকে এসেছেন বললেন?"

সহজ-সরল পারিজাত সহজ মনেই বললো,

“ কক্সবাজার, ভেতরের দিকে। প্রত্যন্ত গ্রামে!"

“ ঐখানে কি পরিবার সহ থাকেন!"

পুলিশ অফিসারের জেরার ধরন সুবিধের না। এমনিতে পারি এসব থানাপুলিশ ভয় পায়।সে কম্পিত কন্ঠে এই উত্তর‌ও দিলো,

“ জি।"

“ আপনি কি কক্সবাজারের স্থানীয়?
____ভয় পাবেন না,আমি এমনিতেই জিজ্ঞেস করছি! যেহেতু আপনি, বলছেন আপনি কক্সবাজারে থাকেন তাই আর কি! বুঝেন‌ই তো, আমরাও মাঝেসাঝে যাই বেড়াতে।কেউ একজন পরিচিত থাকলে বিষয়টা সহজ হয়ে যায় না। তাছাড়াও.... পরিচিত মানুষের মাধ্যমে যেকোনো স্থান ঘোরাও সহজ।পয়সাও কম লাগে
বুঝেন‌ই তো পুলিশ মানুষ,সরকারি বেতন আর কয় টাকা।তা দিয়ে তো সবসময় বিলাসিতা করা যায় না!"

পারি অনিচ্ছায় ফিকে হাসলো। এরপরে বললো,

“ না,আমি স্থানীয় নয়। ব্যক্তিগত কারণবশত ঐখানে থাকি।"

“ আচ্ছা আপনার নামটা কি যেন বললেন? পারিজাত! ওহ, হ্যাঁ পারিজাত আবরার চৌধুরী! তাই না?"

যেন উনার হঠাৎ করেই কিছু একটা মনে পড়লো,এমন ভঙ্গিতে কথাটা বললেন।পারি দুই ভ্রু একত্রে করে ফেললো। অতঃপর জিজ্ঞেস করলো,

“ আপনি কি করে জানলেন?"

লোকটা থতমত খেয়ে গেলো, মুহূর্তে নিজেকে ধাতস্থ করে বললো,

“ আপনি একটু আগেই তো জিডি পেপারে লিখালেন।ভুলে গেছেন।"

এবার পারি একটু আড়ষ্ট হলো।আসলেই তো।এস আই নাসির কথা না বাড়িয়ে বললো,

“ আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এই নামের একটি কার্ড পাওয়া গিয়েছে, বহুদিন আগে।আমার কাছেই এসেছিল,তবে যিনি পেয়েছেন আমি তার কাছেই রাখতে বলেছিলাম।
_____ আমি আপনাকে সহযোগিতা করতে হয়তো পারবো, তবে আপনাকে এখানে অপেক্ষা করতে হবে। কিছু সময়, যতক্ষণ উনার আসতে লাগবে আর কি!!"

এস আই নাসিরের কথায় পারি একটু আস্বস্ত হলো।পুলকিত বোধ করে বললো,

“ আপনি উনাকে আসতে বলুন, আমি হাসপাতাল থেকে ডাক্তার দেখিয়ে আসি। যাওয়ার পথে না হয়.....!"

“ আপনার কি আমাকে আপনার ব্যক্তিগত কর্মচারী মনে হয়?
________আমি আপনার জন্য কাউকে অপেক্ষা করিয়ে রাখবো আবার নিজেও...
___________আমাদের সময়ের মূল্য আছে মিসেস তা.পারিজাত। আপনার যদি মনে হয় কার্ডটা আপনার দরকার তবে এখানেই বসে থাকুন।এক চুলও নড়বেন না।আর দরকার না হলে আসতে পারেন। অযথা আমাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন না।আমরা আজাইরা বসে থেকে স্যালারি নেই না। প্লিজ!"

নাসির খানিকটা ক্ষ্যাপা গলায় কথাগুলো বললো।পারির বিব্রত হলো, অচেনা অজানা পুরুষের কাছে এমন দুর্ব্যবহার পেয়ে।সে এমন কি বললো যেটা অফিসারকে ক্ষেপিয়ে দিলো।এখন পারির নিজের উপরেই রাগ হচ্ছে।কেন সে আজ এখানে আসতে গেলো? এখন কিভাবে কি করবে? আজ চলে গেলে এই অফিসার মনে হয় না আর কোনদিন সহযোগিতা করবে! আবার ডাক্তারের কাছেও তো যাওয়া জরুরি।পারি নিজের হাতের বাটন ফোনটা চেপে সময় দেখলো।ডাক্তার বসছে আড়াইটার পর,থাকবে পাঁচটা অবধি।এখন বাজে প্রায় তিনটার বেশি। দোটানায় ভোগা পারি আড়চোখে নাসির অফিসারের দিকে চাইলো। কৃষ্ণ বর্ণের লোকটা ভীষণ সুঠামদেহী।চেহারাটাও মায়াময়।লোকটার নাকের ডগায় রাগ জমে থাকে।দেখলেই বোঝা যাচ্ছে।কপাল কুঁচকে, সিরিয়াস মুডে ফোনে কিছু করছে।পারি উনার এমন ব্যবহারে ভেতরে ভেতরে লজ্জা পেলো। দ্বন্দ্ব ভরা মনে বাইরের বেঞ্চে গিয়ে বসলো। এদিকে পারি যেতেই অফিসার সম্রাটের নাম্বারে ফোন করলো। কয়েকবার, কিন্তু নাম্বারটা বন্ধ বলছে।অফিসার ভ্রু কুঁচকে ফেললো।বিরবির করে বললো,

“ এর আবার কি হলো? আবার কোথায় কি ঘটিয়ে ফোন ভেঙ্গে বসে আছে আল্লাহ জানে!"

এই কেইসের কারণেই সম্রাটের সাথে সম্পর্কটা বন্ধুত্বপূর্ণ হয়েছে।তাই এত চিন্তা।সম্রাটকে না পেয়ে ফোন লাগালো বাপ্পীর নাম্বারে। বাপ্পী তার অফিসের ম্যানেজমেন্টে এডমিন হিসেবে নিযুক্ত।সে নিজের কেবিনে ল্যাপটপে কাজ করছিলো।সে নিজেও সম্রাটকে ফোন লাগাচ্ছে কিন্তু বন্ধ দেখাচ্ছে বিধেয় সেও দুশ্চিন্তায় রয়েছে। ঐদিকে তানহার বাড়ি থেকে বারবার ফোন করে তাকে প্যারা দিচ্ছে।এতে করে মাথা ভীষণ গরম হয়ে রয়েছে।বাপ্পী বুঝতে পেরেছ এই কারণেই সম্রাট ফোন বন্ধ করে কোথাও গিয়ে বসে আছে।
মেজাজের তাপের পারদ একশোর উপরে,এমন মুহূর্তে ফোনটা বেজে উঠলো।কোনদিকে না তাকিয়ে ফোনকা রিসিভ করেই কানের কাছে ধরেই বলতে আরম্ভ করলো,

“ আরে আশ্চর্য,বললাম তো ও কোথায় আছে আমি জানি না!
_______কেন বারবার.."

“ উহুম!আমি এস আই নাসির বলছিলাম,আপনি বাপ্পী..!"

এস নাই নাসির শোনার সাথে সাথেই বাপ্পী নিজের অভিব্যক্তি বদলে নিলো। চিন্তিত গলায়,উঠে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করলো,

“ সম্রাটের কিছু হয়েছে?"

“ দেখুন বাপ্পী সাহেব, কিছু এখনো হয়নি।
_____ তবে মনে হচ্ছে হয়েও যেতে পারে।আমি অনেক সময় ধরে উনাকে কল করছি। কিন্তু উনি মেইবি ফোন বন্ধ করে লাইক এমন কিছু ...

“ মেইবি মোবাইলে চার্জ দিতে ভুলে গিয়েছে। জানেন‌ই কি ভাবে দিন কাটাচ্ছে।"

“ হুম,আপনাকে এখুনি জরুরি আসা দরকার যে!"

“ কেন অফিসার!"

“ আসুন,আমার মনে হচ্ছে একটা ভালো, সুখবর আপনাদের দিতে পারবো।আসুন, আসলেই দেখা যাক কি অপেক্ষা করছে আপনাদের জন্য। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব!"

পারি চিন্তায় অস্থির, এদিকে কার্ড না নিয়েও যেতে পারছে না। ঐদিকে ডাক্তার দেখানোও জরুরি।আজ দেখাতে না পারলে আবার কাল আসতে হবে।সেই গাজিপুর থেকে এখানে আসা কম কষ্টের বিষয় নয়, আবার একটা বাচ্চাকে নিয়ে আসতে হয় সারাদিনের জন্য।মেয়েটার ঠিক মতো খাওয়াদাওয়াও হয় না।ঐদিকেও চিন্তা থাকে।পারির মনে হচ্ছে হঠাৎ করেই বুকে ব্যথা করছে। ইদানিং এমন হয়, অল্প চিন্তাতেই বুক ধরফর করে, অস্থিরতা অস্থি মজ্জায় ছড়িয়ে পড়ে।হাত পা কাঁপতে থাকে। মেয়েটাও পুলিশ দেখে ভয়ে চুপসে গিয়েছে। একদম মায়ের গা সেঁটে বসে রয়েছে।পারি বারবার ঘড়ি দেখছে। নাসির সাহেব দুর থেকে পারির দিকে নজর রাখছে যেন চলে না যেতে পারে।গেলেও তিনি জানতে পারেন।

“ এটা ওকে দিন!"

বলেই একজন কনস্টেবল এক কাপ লাল চা আর এক প্যাকেট চিপস পারির হাতে পাশে খালি জায়গা রেখে দিলো।পারি বিস্মিত চোখে চাইলো, অতঃপর কনস্টেবলকে বললো,

“ কিন্তু আমরা কিছু..."

ততক্ষণে নাসির সাহেব এদিকে এগিয়ে এসেছেন,তিনি আগের মতোই রাশভারী গলায় বললেন,

“ নিন,আমার তরফ থেকে!"

“ বাট আমি এভাবে..."

“ অসুবিধা নেই। কক্সবাজার গেলে না হয় একদিন আপনার বাসায় নিয়ে আপ্যায়ন করলেন।শোধবোধ হয়ে গেলো।
______নিন, সংকোচ করবেন না।
________মনে করুন আপনার মেয়ের কোন মামা দিয়েছে! খাও মামুনি!"

লোকটার এবারের কথায় আন্তরিকতা স্পষ্ট, নরম সুরে সুখকে বললো। অতঃপর লোকটা জিজ্ঞেস করলো,

“ মেয়ের নাম কি?"

ছোট সুখ এত সময় ভয় পেলেও তাকে চিপস দেওয়ায় সেই ভয় কেটে গিয়েছে। মায়ের আগেই সে পট করে বলে দিলো,

“ পাকিজা মামুদ (মাহমুদ) ছুখ!"

পারি মেয়ের এহেন উচ্চারণে লজ্জিত ভঙ্গিতে মুখ লুকিয়ে হাসলো। অফিসার সুখের মাথায় হাত রেখে মিষ্টি করে মুচকি হাসলো অতঃপর বললো,

“ মাশাআল্লাহ, খুব সুন্দর নাম তোমার মামুনি। ইনশাআল্লাহ তুমি আজীবন তোমার নামের মতোই সুখে থাকবে!"

নাসির সাহেবের দোয়ায় পারির মনটা কেমন করে উঠলো।কত শখ করে মেয়ের নাম রেখেছে সুখ। অথচ জন্মের আগে থেকেই তাদের কপালে সুখ জুটলো না।যে নামটা সিলেক্ট করেছিল সে কি জানতো তার সুখের কপালে সুখ স‌ইবে না! নাসির সাহেব মনে মনে বললেন,

“ একদম বাপের কপি মনে হচ্ছে। চোখ আর নাকটাই মায়ের বাকী যা সব মনে হচ্ছে বাবার পেয়েছে।"

পারি চায়ের কাপ হাতে তুলে নিয়ে বললো,

“ আর কত সময় লাগতে পারে ধারনা করতে পারছেন? আসলে আমাকে ডাক্তার দেখিয়ে আবার সন্ধ্যার আগেই বাস ধরতে হবে। গাজীপুরে যাবো.."

“ গাজিপুরে কেন?"

লোকটা অতিমাত্রায় প্রশ্ন করে,এত ব্যক্তিগত খবর দেওয়া লাগবে জানলে সে আসতোই না। দরকার নেই তার জাতীয় পরিচয়পত্রের। ঐ ছাতা ছাড়া এতদিন চলেছে,সামনেও চলে যেতো। কিন্তু এখন আর কি করবে? সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে লোকটা তাকে সন্দেহ করে বলেই এখানে বসিয়ে রেখেছে।এখন তো চাইলেও চলে যেতে পারবে না।পরে দেখা যাবে কিসে না কিসে ফাঁসিয়ে দেয়।
পারির উত্তর দেওয়ার অনীহা অনুমান করেই মোটা ভারী স্বরে ফের প্রশ্ন করলো,

“ বললেন না, আপনি এসেছেন কক্সবাজার থেকে তবে গাজীপুর কি?"

“ আসলে গাজিপুর এক আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছি। চিকিৎসা নিতে তো দুই তিনদিন লাগে,থাকবো কোথায় তাই আর কি!"

“ আচ্ছা, কেমন আত্নীয় আপনার? মানে পারিবারিক রিলেটিভের মধ্যে কেউ!"

“ জি!"

পারি ডাহা মিথ্যে বলে দিলো।নাসির ভ্রু কুঁচকে নিলেন। তথ্য অনুযায়ী পারির কোন আপন রিলেটিভ ঐপাশে নেই।যারা আছেন তারা কেউ নারায়ণগঞ্জ,আর বাকীরা বরিশালের দিকে। কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছে যারা ঢাকা নিবাসী।তবে গাজিপুর আবার কোন আত্নীয় টপকে পড়লো! নাকি সম্রাট সাহেব নিজেই জানে না! এমন‌ও হতে পারে নতুন করে বানিয়ে নিয়েছে। মেয়েদের তো আত্নীয় বানাতে সময় লাগে না, সেখানে এই ভদ্রমহিলা প্রায় চার বছর ধরে নিখোঁজ। বেঁচে আছে কিভাবে? এটাই তো বড় প্রশ্ন!

পারির প্রশ্নে নাসির ফোন দিয়ে বাপ্পীকে জিজ্ঞেস করলে জেনে কত সময় লাগবে।বাপ্পীর কথা অনুযায়ী তার এখনও ঘন্টা দেড়েক লাগবে। নাসির সাহেব জানেন এই কথা বললে কোনভাবেই পারিকে আঁটকে রাখা যাবে না।তাই তিনিও মিথ্যে করে বললেন,

“ এই তো কাছাকাছি। বিশ পঁচিশ মিনিটের মতো লাগবে।আপনি বসুন, রিল্যাক্সে।এত কষ্ট করে এসেছেন, নিয়েই যান।"

পারি অফিসারের কথায় হতাশ হলো। ছোট করে ফোঁস আওয়াজ তুলে একটা সুক্ষ্ম শ্বাস ছেড়ে দেওয়ালে গা হেলিয়ে বসলো।

মিনিট পেরিয়ে ঘন্টাও চলে যায়,পারির অপেক্ষা শেষ হয় না।এই নিয়ে দুইবার অফিসারকে জিজ্ঞেস করেছে,তিনিও মিথ্যে কল করার অভিনয় করে ওকে বসিয়ে রেখেছে। এভাবেই ঘন্টার কাঁটা পেরিয়ে মিনিট ছুঁয়ে এক ঘন্টা চল্লিশ মিনিটের মাথায় শাহবাগ থানায় এসে পৌঁছায় বাপ্পী।

দুশ্চিন্তা, অস্থিরতায় ছটফট চিত্তে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে, এদিকে পারী অবসন্ন মনে অন্য দিকে চেয়ে রয়েছে।এখন আর সময় নেই।আজকে আর ডাক্তারকে দেখাতে পারবে না।ভেবেই হতাশ হলো। মনে মনে নিজেকেও কয়েকবার ইস্টুপিড বলে গালি দিলো।কোন কুকুরের তাড়া খেয়ে এখানে এসেছে আজ! সেই অপয়া চিন্তাকে লানত দিতে থাকলো।তাই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা বাপ্পীর দিকে চোখ পড়েনি।

এদিকে বাপ্পীদের মতো গেটাপের লোকেদের তো থানায় ঢুকতে কোন বিধিনিষেধ নেই। তাছাড়াও পরিচিত মুখ।তাই সে সরাসরি‌ই ঢুকে পড়ে ভেতরে। নাসির সাহেব তখন গভীর মনোযোগ সহকারে কোন একটি কেইস ফাইল পড়ছিলেন।বাপ্পী সামনে দাঁড়িয়েই সালাম দিলো,

“ আসসালামু আলাইকুম অফিসার!"

সালামের শব্দে চোখ তুলে তাকালেন। বাপ্পীকে দেখে ছোট করে একটা শ্বাস ছাড়লেন, অতঃপর আলসে ভঙ্গিতে বললেন,

” অবশেষে আপনি এসে পৌঁছালেন! আরেকটু দেরি হলে তো চলেই যেতো,আবার খোঁজা লাগতো!
______ আসুন আমার সাথে,এই যে এদিকে!"

তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বাপ্পীকে নিয়ে দরজার দিকে এগুলেন।বাপ্পী উনাকে অনুসরণ করে যেতে থাকলো। অতঃপর সেই সময় এলো...

“ দেখুন তো উনাকে চেনা লাগে কি-না!"

“ পারি!"

বাপ্পীর বিস্মিত চাহনি। অবিশ্বাস্যে কন্ঠ রোধ হয়ে যাচ্ছে। বহু কষ্টে আবারও বললো,

“ সিরিয়াসলি,পারিজাত!"

কারো কন্ঠে নিজের নাম শুনে চমকে গেলো পারি। একেবারেই অপরিচিত নয়। মনে হচ্ছে পরিচিত।সে সামনে তাকাতেই বাপ্পীকে দেখে চমকে গেলো।তড়াক করে উঠে দাঁড়ালো। শব্দহীন অপলক চোখে চেয়ে রইল কেবল।বাপ্পী নিজ উদ্বেলিত কন্ঠকে সামলে পুলকিত নয়নে চেয়ে বললো,

“ কোথায় ছিলে তুমি? কোথায় কোথায় না খুঁজছি আমরা! এই তুমি ঠিক আছো?"

বাপ্পী খুশিতে আত্নহারা। সেই যখন খুশিতে আত্মহারা,আঁটকে রাখতে পারছে না নিজেকে।তবে সম্রাট ঠিক কতটা পাগলামি করবে!

পারি ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে থাকলো কীয়ৎকাল। এরপর আড়চোখে একবার অফিসারকে দেখে চোখ নামিয়ে নিলো। ততক্ষণে দৃষ্টি তার ঘোলাটে।দু-নেত্র ছাপিয়ে বর্ষণ শুরু করে হয়ে গিয়েছে ।

মা'কে এভাবে কাঁদতে দেখে সুখ আতংকিত হয়ে গেলো। ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই সে শব্দ করে চিৎকার করে উঠলো। তখন‌ই বাপ্পীর চোখ গিয়ে পড়লো ছোট সুখের ঐ ভেজা বদনে।

অফিসারের সাথে সব কথা শেষ করে বাপ্পী পারিকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরলো।যদিও পারি যেতে চাইছিলো না। কিন্তু বাপ্পীর বুঝিয়ে বলায় রাজী হয়।বাপ্পী গাড়িতে বসে এত বছরের সব ঘটনা পারিকে খুলে বলতে থাকলো এক‌ এক করে।

৩০


“ আমাকে কি বলবে কোথায় ছিলে? আমরা তোমাকে খুজেনি এমন কোন জায়গা বাদ রাখিনি।বন্ধুটা আমার পাগল হয়ে গিয়েছে।
_____ তোমাকে বলতেও কষ্ট হচ্ছে,আমরা তোমাকে ব্রোথেলেও খুঁজেছি।
_______কত রাত এই হোটেলে সেই হোটেলে কাটিয়েছি তোমার সন্ধানে!"

বাপ্পীর গলা কাঁপছে।যেই মেয়েটাকে ছোট বোনের চোখে দেখে,তাকে নিয়ে কত রকম ভাবতে হয়েছিল ঐ সময়গুলোতে।বাপ্পীর কথায় পারী হুহু করে কেঁদে দিলো! তার জায়গা তো সেখানেই হতো,যদি না সেদিন জানোয়ার রূপধারী ঐ লোকটা মানুষ হতো! কি আশ্চর্য এই পৃথিবীর মানুষগুলো।দেখতে দোপেয়ে জীব, মানুষ হয়েও মানুষ না।কেউ কেউ নিজের মাঝে জন্তত্বকে ধারণ করেও আকস্মিক মানবে রূপান্তরিত হয়।কি চমকপ্রদ এক গ্রহ এই পৃথিবী।যেখানে ক্ষণিকে ক্ষণিকে মানুষের রূপ বদলায়।

পারি মাথা হেলিয়ে দিলো গাড়ির জানালার কাঁচে,সুখ তার চাচুর কোল ঘেঁষে বসেছে।বাপ্পী নিজেই এভাবে বসিয়েছে।মেয়েটার মাঝে সে নিজের বন্ধুর সুঘ্রাণ পাচ্ছে।মায়াময়,আদুরে একছটা মুখ।ভীত তবে আনন্দিত চোখজোড়া। বাপ্পীর মন শান্ত হয় এমন সুন্দর একটা মেয়ের মুখ দেখে।তার নিজের‌ও কন্যা সন্তান পছন্দ, কিন্তু তার বোধহয় আর সন্তানের বাবা হ‌ওয়া হবে না।তবুও, আল্লাহর রহমতে সে খুশি।এক সন্তান নিয়েই খুশি।

পারি জানালার কাঁচে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করতেই চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো নোনা জল। বন্ধ পাতার আবডালে ভেসে উঠলো সেই রাতের সেই বীভৎসতা।

তখন সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এসেছিল। নিজের সুসজ্জিত তিন কামরার ফ্ল্যাটের এক্সট্রা বারান্দার রেলিং ধরে গগন পানে চেয়ে ছিলো। অভূতপূর্ব রহস্যময়ী ঐ আকাশে তখন রঙের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছিলো। মাগরিবের আযান হয়তো পড়েই গেলো। ঠিক তখনই গৃহকর্মী পায়রা পাশে দাঁড়িয়ে বললো,

“ মামিম্মা, আপনের ফোন বাজে!"

পারি তখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এরমধ্যেই বেশ উঁচু হয়েছে পেটটা।যেখানে আজকাল মানুষের ছয় সাত মাসেও পেট দেখা যায় না সেখানে পেটের কারণে পারি নিজের পা‌য়ের আঙ্গুলগুলোও দেখতে পারে না দাঁড়িয়ে থেকে। তাই তো আজকাল তার সব ব্যক্তিগত কাজেও সাহায্য লাগে। তাকে সাহায্য করতেই সম্রাট নিজ গ্রাম থেকে এই খালাকে এনেছে।

পারি ফোনটা নিয়ে কানে ধরতেই অপর-প্রান্ত থেকে শোনা গেলো,

“সম্রাট সাহেবকে কিছু লোক তুলে নিয়ে গিয়েছে। তাদের গেটাপে মনে হচ্ছিল তারা ডিবির লোক।"

“ মানে কি? কি সব বলছেন?"

“ দেখুন,এত মানে তো জানি না।তবে চোখের সামনে ঘটা ঘটনা দেখেই আপনাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেই জানালাম।রাখছি।”

বলেই লোকটা কল কেটে দিলো, এদিকে পারির চিবুক বেয়ে ঘাম ছুটছে।বিগত কিছুদিন ধরেই সে সম্রাটকে চিন্তিত দেখেছে। চিন্তিত হবার যথেষ্ট কারণ ছিলো।তানহা এর মধ্যেই একবার এই ফ্ল্যাটে এসে হাঙ্গামা করে গিয়েছে। পারির গায়েও হাত তুলে গিয়েছে।আর শ্বশুর শাশুড়ি তো রোজ তিনবেলা রুটিন মেনে পারিকে অভিশাপ দেয়। শ্বাশুড়ি মা তানহার সঙ্গে এসেছিলেন।সেবার‌ই প্রথম পারি তার স্বামীর গর্ভধারিনী'কে দেখেছিল । আর প্রথম সাক্ষাতেই তিনিও জঘন্য ব্যবহার করে গিয়েছেন।
তা নিয়ে সম্রাট‌ও যথেষ্ট সিনক্রিয়েট করে এসেছিল সেই বাড়িতে গিয়ে।তানহাকে থ্রেট করে এসেছে ভবিষ্যতে পারির ছায়ায়‌ও যেন দাঁড়ানোর দুঃসাহস না করে।

এই বিষয়গুলো ভাবতেই পারি অস্থির হয়ে উঠে। নাক-মুখ ঘেমে একাকার হয়ে যায়।বুকের ফাপড় বেড়ে যায়।সে মৃদু চেঁচানো গলায় বলতে থাকে,

“ ডিবি নিয়েছে মানে! আপনি কে বলছেন? হ্যালো, কোথায় থেকে বলছেন? আরে শুনছেন? কে আপনি?
_____ হ্যালো! হ্যা হ্যা হ্যালো! আরে কথা বলুন!"

পারি চেঁচিয়ে বলেই যাচ্ছে। এদিকে এই অল্প সময়েই তার চেহারার হাল বেহাল হয়ে যাওয়াতে খালা ভয় পেয়ে যায়।তিনি পারিকে ছটফট করতে দেখে হাত ধরে নিয়ে বসার ঘরের সোফায় বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

“ শান্ত হোন মামী।আপনি আগে শান্ত হোন। বাচ্চার ক্ষতি হবে!"

খালার কথা শেষ হতেই পারি পেটের উপর হাত রেখে হাউমাউ করে কেঁদে দিলো,ক্রন্দনরত কন্ঠে তুতলিয়ে বলতে থাকলো,

“ ও রা ওরা কেন আমাদের একসাথে থাকতে দিতে চায় না খালা? কি দোষ আমার বলো তো! ভালোবাসা কি দোষের? আমি কি খুব বড় দোষ করেছি ওকে ভালোবেসে? কেন- কেন এমন করে বারবার আমার সাথে! ওদের কি আমার বাচ্চাটার জন্যেও মায়া হয় না!কেন করে এমন..."

পারি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। গর্ভের বাচ্চার বয়স পাঁচ মাস,সময়টা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য অসচেতনতায় অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।খালা পারিকে ছেড়ে পানি নিয়ে আসে।পারির মুখের সামনে ধরে বলে,

“ পানি খাইয়া ঠান্ডা হোন। এরপর মাথা ঠান্ডা করে ভাবেন।হ‌ইতেও তো পারে আপনেরে ভয় দেখানোর ল‌ইগা মিথ্যা বলছে কেউ! মামার এমন কিছু হবে কেন? তিনি কি চোর ডাকাত যে ডিবি নিবো? আর তাছাড়াও তিনি কম ক্ষমতার লোক! চাইলেই তিনারে ডিবি নিতে পারবো? তিনার যেই বড় পদ,কত ক্ষমতা।
মামী আপনি শিক্ষিত মানুষ, এগুলা বুঝেন না!"

খালার কথায় পারি পানি পান করে, ওড়না দিয়ে ঘাড়, নাক-মুখ মুছে নিয়ে ফুপাতে থাকে।বাইরে একটু শান্ত হলেও তার ভেতর অস্থির।সে অজানা ভয়ে ভেতর ভেতর সিঁটিয়ে যাচ্ছে।ফোনটা তুলে বাপ্পীকে জানাতে বাপ্পী‌ও অবিশ্বাসী স্বরে উল্টো ওকেই জিজ্ঞেস করে,

“ তোমাকে কে বলছে?"

পারি সবটা জানানোর পর বাপ্পী ওর থেকে লোকটার নাম্বার নিয়ে কল দেয়। নাম্বারটা সংযোগ বিচ্ছিন্ন!
এরপর.....

তিনদিন পারি পাগলের মতো সম্রাটকে খুঁজেছে।কোন খোঁজ নেই।বাপ্পী ও ওদের বন্ধুমহল,পারির চাচাতো ভাই ফারিশ, বান্ধবীরা । যে যেভাবে পেরেছে সম্রাটকে খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কোন হদিস নেই। এদিকে প্রথমে চব্বিশ ঘন্টার আগে পুলিশ এফ‌আইআর নিতে চায় না।পরের দিনগুলোয় তারা ইচ্ছে করে ঢিলেমি করেছিলো তা সবাই টের পাচ্ছিল কিন্তু করার‌ও কিছু ছিলো না। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই চেষ্টা করে যাচ্ছিল। এদিকে পারির নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পারিকে বাপ্পী নিজের বাড়িতে এনে রাখে।তখন বাপ্পীর ব‌উ‌ও গর্ভবতী।তার ডেলিভারির তারিখ সন্নিকটে।

এই তিনদিনে পারি শ্বশুর বাড়িতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও করতে পারেনি, সাহসে কুলোয়নি। কিভাবে সাহস করবে? বাপ্পী সেই বাড়িতে খোঁজ নিতে যাওয়ায় তারা পারিকে ফোন করে যা খুশি বলেছে।যেন পারির কারণেই সম্রাটের এমন অবস্থা হচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে পারি সম্রাটের জীবনের অভিশাপ।যেই অভিশাপের কারণে সম্রাটের জীবনে সুখ নেই।সম্রাট শান্তি পাচ্ছে না।তারা পারিকে মানসিক ভাবে মেরে ফেলার সব উপায়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
চারদিন পর সম্রাটের খোঁজ মিলে।সরকারি অর্থ লোপাট, ঘুষ লেনদেনের মতো জঘন্য সব এলিগেশন দিয়ে তাকে হাজতে ভরা হয়।তিনদিন সে ডিবির স্পেশাল ফোর্সের তদন্তাধীন ছিলো।আজ স্বীকারোক্তি পাওয়ার পর হাজতে পাঠানো হয়েছে।

এই খবরটা কানে যেতেই ফারিশ থমকায়। কিভাবে সম্ভব? সে নিজেও ডিবিতে আছে।সে তো জানেনি এমন কোন কিছু। কিন্তু..থাকলেও জানা যে খুব সহজ তা তো নয়।টিম ওয়ার্কের বিষয় আছে।এসবে অনেক গোপনীয়তা থাকে। কিন্তু সে এটাও বিশ্বাস করতে পারছে না সম্রাটের মতো ছেলে এমন গর্হিত কর্মকান্ড ঘটাতে পারে। অসম্ভব!

এবার খবরটা সরাসরি কারাগারে থেকেই দূরবার্তা যোগে আসে।তাও সরাসরি সেই মানুষটার কন্ঠেই।

তিনদিনেই পারির শরীর ভেঙ্গে একাকার। খাওয়া নাওয়া কিছুই করে না।কেবল চাতকের মতো পথের দিকে চেয়ে থাকে। অপেক্ষা,একটু দেখার অপেক্ষা। কান্না আর বিরবির করে দোয়া,এই তার করণীয় অবশিষ্ট থেকে যায়।
নয় মাসের ভরা পেট নিয়ে তখন বাপ্পীর ব‌উ পারির সেবাযত্ন করছে।বয়সে সে পারির চেয়ে খানিকটা বড়।তাই বড়বোনের মতো শাসন‌ও করে। এদিকে বাপ্পীও অস্থির।সে বুঝতে পারছে বিষয়টা। পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা,যার ফলাফল বাপ্পীর অনুমেয়ের মধ্যেই। তাই সে পারিকে নিজের কাছে এনে রেখেছে যেন পারি অবধি পৌঁছাতে হলে তাদের এবার বাপ্পীর মুখোমুখি হতে হয়।

ফারিশের সহযোগিতায় পারি সম্রাটের সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়েও দেখা করতে পারেনি।কোন এক অদৃশ্য শক্তি ফারিশের ক্ষমতার লগিতে টান দিয়ে ধরে রাখে।ফারিশ বোনকে সহযোগিতা করতে না পেরে অসহায়ের মতো আত্মসমর্পণ করে।
উকিল,পুলিশি সহযোগীতা।সব দিক থেকেই নিরাশা।কেউ এগিয়ে আসে না।পারি অবরুদ্ধ করে নেয় নিজেকে।সে মেনে নেয়,তাকে ভালোবাসার শাস্তিই ঐ মানুষটা পাচ্ছে।কেন তার মতো তুচ্ছ কাউকে ভালোবেসে এত প্রেমভরা বুকটা কারো বুটের তলে পিষবে।

নিখোঁজ হবার পর থেকে না সরাসরি সম্রাটকে দেখতে পেয়েছে আর না কথা বলার ব্যবস্থা করতে পেরেছিলো।কোনভাবেই সুযোগ পায়নি। কিন্তু ফারিশের বদৌলতে এতটুকু জেনেছে তারা সম্রাটকে অনেক মেরেছে।এ শুনে পারি আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে যায়,সে সম্রাটকে খুঁজতে বের হবে। অতঃপর বাপ্পী বাধ্য হয়ে তন্নিকে দিয়ে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দু'দিন রাখে।

ষষ্ঠ দিনের ঘটনা.....

চারদিক যখন নিরাশার চাদরে ঢেকে পড়ে তখন পারিই নিজেই নিজের জন্য আশার প্রদীপ খুঁজে বের করে।সে সবার অগোচরে, বেরিয়ে পড়ে বাপ্পীর ঘর থেকে।
পাঁচ মাসের ভরা পেট নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ে, উদ্দেশ্য বাগেরহাট, শ্বশুরালয়ে যাওয়া।

সেবার প্রথম পারি শ্বশুর বাড়ির চৌকাঠে পা রাখে। কিন্তু নির্মম সত্য হলো পারির পায়ের ধূলোও নাকি সেই বাড়ির চৌকাঠকে কলুষিত করেছিল। একজন গর্ভবতী নারী, তাদের বাড়ির একমাত্র পুত্রবধূ যে কি-না তাদের‌ই বংশ লালন করছে নিজ গর্ভে।যার জঠরে তাদের‌ই ছেলের অংশ বেড়ে উঠছিল,সেই নারীকে তারা নিজ চৌকাঠ‌ও পাড় হতে দেয়নি।

সারাদিনের না খাওয়া একজন অন্তঃসত্বা নারী।সেদিন শ্বশুর বাড়ি, স্বামীর পৈতৃক ভিটায় গিয়ে ভিক্ষুকের মতো স্বামীকে ভিক্ষা চেয়েছিলো। নিজের সন্তানের পিতাকে ফিরিয়ে দিতে অনুরোধ করেছিলো তাদের চরণে পড়ে। তারা দয়া করেনি। বরঞ্চ পা ছোঁয়ার অপরাধের লাত্থি দিয়ে ফেলে দিয়েছিলো। তিরষ্কার করে বলেছিলেন,

“ তোমার সাহস কি করে হয় আমাকে ছোঁয়ার। তোমাদের মতো মেয়েরা পারেই শুধু এসব করতে।
শোন ভালোই ভালো সময় থাকতে সরে যাও নয়তো.....
______ আর যদি মনে করো,পেটে ধরা এই বোঝা আমাদের উপর চাপিয়ে দিবে, তাহলে ভুল করবে। খবরদার! ভবিষ্যতে এমুখো হবে না।নচেৎ নুন খাইয়ে মেরে ফেলতেও আমার হাত কাঁপবে না।"

শ্বশুরের এত বিষাক্ত কথায়‌ও পারি নড়েনি।পা ধরে বসেছিল। শ্বাশুড়ি মা তা দেখে পারিকে ধাক্কা দিয়ে স্বামীর পা থেকে সরিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেললো। তেড়ে গিয়ে মুখের উপর থুতু ছিটিয়ে বলেছিলেন,

“ যাওয়ার পথে পদ্মায় ঝাঁপ দিস। তোর মতো আপদ মরলেই আমরা বাঁচি। যাও...এ বাড়ির ত্রিসীমানায়‌ও তোমার ছায়া‌ও দেখতে চাই না আমি। আমার একমাত্র ছেলেকে কেড়ে নিয়েছো তুমি।আমার ছেলের কিছু হলে তোমাকে আমি নিজ হাতে খুন করবো! "

তিনি চেঁচামেচি করছেন। তার মাঝেই শ্বশুর সিকিউরিটি ডেকে পারিকে বাড়ির উঠান থেকে‌ই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করিয়ে দেয়।

এদিকে এসব দৃশ্য প্রতিবেশীরা উঁকিঝুঁকি মেরে দেখছিলো‌।এক মা'কে, গর্ভবতী মা। বিধ্বস্ত, বিক্ষিপ্ত নারী। অসুস্থ, ক্লান্ত,পিপাসর্ত নারী।যিনি কিনা শ্বশুর বাড়ির উঠান থেকেই ভৃত্যের হাতে ঘাড়ধাক্কা খেয়ে পথে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলো।

পারি ঢাকার উদ্দেশে যখন বাগেরহাট বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছায় তখন প্রায় সন্ধ্যা সাতটার বেশি।এশারের ওয়াক্ত ছুঁইছুঁই। মফস্বলের বাসস্ট্যান্ড এলাকা,ঐ সময়ে নির্জন‌ই থাকে। সে অন্ধকার জায়গা খুঁজে নিয়ে আড়াল হয়ে বসে। লোকের কৌতুহল ডোবা চাহনি তাকে আড়ষ্ট করে। মনে হয় শ্বশুর, শ্বাশুড়ির বলা কথাগুলো এখানের কেউ শুনে ফেলেছে।তাকে নিয়ে উপহাস করছে। তাদের বলা কথাগুলো বারবার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে।এতে করে সে উপস্থিত জগত ভুলে দিকহারা হয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বসেছিলো। ঠিক তখনই তার মুখ চেপে ধরে নিজের কাঁধে তুলে নেয় কেউ।

পারির যখন জ্ঞান ফিরে তখন সে এক অজানা জায়গায়।কুটকুটে অন্ধকার আর ভ্যাঁপসা দুর্গন্ধে দমবন্ধকর কোন পরিবেশে পড়ে রয়েছে। হাতটা পিঠমোড়া বাঁধা।পা‌'ও ধারালো কিছু দিয়ে বেঁধে রাখা। মুখে টেপ লাগানো। এমনিতেই পিপাসা,ক্ষুধায় কাহিল,তার মধ্যে শ্বাস প্রশ্বাস‌ও নিতে দিচ্ছে না তারা।হাতটাও এত শক্ত করে বাঁধা যে নড়তেও পারছে না। ঐদিকে গাঁয়ে ওড়না নেই।মাথার হিজাব খুলে কোথায় ফেলে দিয়েছে, ওরাই জানে।

গোঙানির শব্দে পারির হুঁশ ফিরেছে বিষয়টা বুঝতেই কেউ একজন অন্ধকার ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দিলো। মুহূর্তেই লালচে আলোয় ডুবে গেলো ঘরটা। পারি নিভু নিভু চোখে চেয়ে দেখলো। ছোট একটি কামরা। ভাঙ্গা তৈজসপত্র ফেলে রাখা।বোঝাই যাচ্ছে স্টোর রুম। সেখানে সে এক কোনায় নোংরার মাঝে পড়ে রয়েছে।

সে ঠোঁট নাড়িয়ে বিরবির কর বলেছিলো,

“ পানি!"

লোকটা পারির কথা বুঝলো কি-না জানা নেই।তবে অনুমান করেছে বোধহয়।তা লোকটার নিজের মুখের সামনে পান করার জন্য ধরা পানির বোতলটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরাতেই বোঝা গিয়েছিলো।

সেদিন পারির সাথে অনেক কিছুই হতে পারতো। কিন্তু কিছু সময় মানুষ যেমন জানোয়ার হয়,তেমনি জানোয়ার রুপীর মানুষ‌ও মানুষ হয়ে যায়।

পানি পানের পর পারি ঝিমাতে থাকে।তা দেখে কালো,লম্বা গড়নের এক রোগা-পাতলা লোক পারির সামনে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ে।বুক পকেট থেকে বাদামি খাম থেকে সাদা দ্বিভাজিত একটা কাগজ বের করে পারির সামনে ধরে বললো,

“ এটায় সাইন কর।"

দুর্বলতায় নেতিয়ে পড়া পারি বাম দিকে ঝুঁকে থাকা কাঁধটা সোজা করে মাথা তুলে ঐ কাগজের দিকে চাইলো। তালাক নামা! তার সেই ভঙ্গুর দৈহিক অবস্থার মাঝেও মস্তিষ্ক সচল।সে হাসলো হালকা করে।সে তো জানতো, সমস্যাটা আসলে কোথায়।পারির ঠোঁটে হাসি দেখে লোকটা বিভ্রান্ত হলো বোধহয়,সে খানিকটা রসিকতা করেই বললো,

“ কি শোকে পাগল হয়ে গেলা নাকি? স‌ই টা দিয়ে দেও,জায়গার জিনিস জায়গায় পৌঁছে যাবে।নয়তো....."

লোকটা থামলো।পারি এত সময়ে চোখ তুলে চাইলো ঐ লোকের পানে। লম্বাটে চেহারার গড়ন, কপাল থেকে ডান ভ্রু ছুঁয়ে একটা কাঁটা দাগ কানের লতি পর্যন্ত নেমেছে। মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া কালো চুল।ঘন চোখের পাপড়ি।পোড়া মাটির মতো গাত্ররঙ। এতকিছুর মাঝেও মায়া গাঁথা এক চেহারা।মোটেই ভয়ংকর লাগছে না।পারির এমন গভীর পর্যবেক্ষণে লোকটা ঢোঁক গিললো।যত‌ই সন্ত্রাসী,নারী-কারবারি হোক,তার‌ও তো লাজ লজ্জা আছে। এভাবে,এত গাঢ় চাহনিতে কেউ পর্যবেক্ষণ করে?

লোকটা কাশি দিলো।পারির‌ও ঘোর কাটলো।সে আসলেই ঘোরে ছিলো।তার আশেপাশে সে সেই মানুষটিকে খুঁজছে।তার শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। ক্ষুধায় নাড় ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। বমি আসছে কিন্তু পেটে কিছু না থাকায় তাও হচ্ছে না।লোকটা পারির কাহিল অবস্থা ছোট লোচনে চেয়ে শুধিয়েছিলো,

“ তুমি কি সাইনটা করবে না?
______ না করলেও ব্যাপার না।এরা তোমার স্বামীর বিরুদ্ধে আর কি কি কেইস দেওয়া যায় তাই লিস্ট করে রেখেছে।আর কি বলো তো,যা কেইস দিবে তা প্রমাণ করতেও সময় লাগবে না। অলরেডি প্রমাণিত তোমার স্বামী সরকারি আড়াই'শ কোটির হিসাব গড়মিল করেছে।সেই অর্থ সে লোপাট করে অন্যত্র সরিয়ে রেখেছে।এখন দেখো এর মাঝে যদি আরও কিছু দেয় তবে কি হবে!"

লোকটার কথায় পারি নিভু, নেতিয়ে পড়া নেত্রে চাওয়ার চেষ্টা করছে।তার মাথা আবার ঝিমঝিম করছে। চারদিক ঘুরছে।সেই সময়ে কানে এলো আরো দু'টো কন্ঠস্বর।

“ শোন,আমার তালাক নিয়ে বিশেষ চিন্তা নেই। যেহেতু পোয়াতি তাই তালাকে স‌ই করলেও লাভ হবে না।এটা শুধু মেয়েটার মনের শান্তির জন্য করা।নয়তো..... যাই হোক।একে এমন ভাবে ঠিকা দিবে যেন জীবনে আর কোনদিন এই আপদের মুখ আমাকে না দেখতে হয়।আমার মেয়ের জীবন ফ্লোলেস হ‌ওয়া চাই।ডু ইয়্যু আন্ডারস্ট্যান্ড!"

“ জি স্যার।"

“ ওকে ফাইন, তোমার একাউন্টে টাকা পৌঁছে যাবে।আজ এখন‌ই একে এই শহর ছাড়া করো।যেন কাল সকালে ওর টিকিটাও কেউ খুঁজে না পায়।"

“ স্যার, গর্ভবতী মারা ঠিক হবে?"

সদ্যাগত দ্বিতীয় কন্ঠস্বর,এতে ক্ষেপলেন প্রথমজন।তিনি দাঁত খিচিয়ে চাপা গলায় বললেন,

“ মেয়ের বাবা হয়েছো? হ‌ওনি তো! হলে বুঝতে, মেয়ের সুখের জন্য সব পাপ তুচ্ছ লাগে।"

এরপর আর কিছু পারির কান ধারণ করতে পারেনি
তবে অনুভব করেছে তার হাত চেপে ধরে কেউ ঐ কাগজে কিছু একটা করছে।

এরপর.....

একদিন পর পারির জ্ঞান ফিরে। তখন‌ও সে একটা কামরায় বন্ধ।তবে এবার ভিন্ন রকম। বুঝতে পারছিলো তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু রুমটা সুবিধা জনক এলাকায় না। রুমের পরিবেশ তার কলিজার পানি শুকিয়ে ফেলেছে।তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে ফেলা হয়েছে যেখানে কোন নারী সদিচ্ছায় যায় না।

পারি আঁতকে দেওয়ালের সাথে লেগে যায়। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মিনিট তিরিশ পেরিয়ে যখন আবার জমিনে লুটিয়ে পড়ে তখন কেউ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে।পারিকে নিচে দেখে মুখের উপর পানি ঢেলে দেয়। ক্লান্ত দেহ আর টেনে নেওয়া যাচ্ছিল না। ঐভাবেই জমিনে পড়ে রয়।নিথর চোখে চেয়ে রয়। সেই লোকটা পারির সামনে বসে পারির দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই পারি একটু নড়ে।তাতে সে লোকের ভাবান্তর হয় না।সে পারিকে টেনে তুলে দেওয়ালে ঠেক দিয়ে বসিয়ে দিয়ে বলেছিলো,

“ তোমার স্বামীরে বোধহয় ছাড়বো না। কেননা তুমি হ‌ইলা তার কারণ।তারে ছাড়লেই তুমি যাইবা,সেও......
_______যাই হোক, বিষয়টা হ‌ইলো তুমি এদিকে থাকলেই তোমার আর তোমার বাচ্চার জন্য কল্যান।তাই বলছি.....
_________আমার মনে হয় তুমি বুদ্ধিমান। ঐদিকে পা না বাড়াইয়া এইদিকে থাকো, ভালো থাকবা।"

পারি নিরুত্তর।কি বলবে? সে এখন কোথায় তাই তো জানে না! কিভাবে কি করবে? এদিকে শরীর আর চলে না।খেতেও হবে। লোকটা কি মনে করে বেরিয়ে যায়। ঘন্টা খানেক পর পারির জন্য ভাত তরকারি পাঠিয়ে দেয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পারি সেই খাবার মুখে তুলে।মুখ দিয়ে ঢুকে গলা দিয়ে নেমে পেটে পড়তেই ঠিক এ‌ক‌ই প্রক্রিয়ায় সব উগড়ে বেরিয়ে আসে। বুক ভেসে যায় বমিতে।পারির বুকফাটা আর্তনাদ করে কান্না আসলেও করতে পারে না।কষ্ট হয়। সামনে থাকা বোতলের পানি দিয়ে মুখ,গলা মুছে নেয়। নিঃশব্দে কান্না করে।পেটের উপর হাত রেখে বিরবির করে শুধু সম্রাটে ডাকে আর আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়।

এভাবে কাটে আরো চারদিন। খাওয়া ছাড়া আর কিছুই সেখানে জুটেনি।ঐ ছেঁড়া, নোংরা বোরকাতেই পারির পাঁচদিন কাটে। তারপর একদিন এলো সেই সময় যখন পারি নিজের ইজ্জত,জান নিয়ে বেঁচে ফিরে সেই জাহান্নাম থেকে।

পারিকে যখন অন্য জায়গায় পাঠানোর নামে পাচার করা হচ্ছিল তখন পারি দ্বিতীয় কারবারির প্রধানের পায়ে পড়ে যায়। অনুরোধ করে।তার পরিস্থিতি সব খুলে বলে।কপালের সুলিখন কিনা জানা নেই তবে সদ্য গর্ভবতী স্ত্রীকে হারানো সেই পুরুষের এই গর্ভবতী নারীর প্রতি করুনা হয়।
সে পারীকে কেনার নামে পালিয়ে যেতে সাহায‌্য‌'ই করে না শুধু,এই অবধি পারি ও তার বাচ্চাদের নিরাপত্তার সকল দায়িত্ব অভিভাবকের ন্যায় পালন করে যাচ্ছে।সেদিন পারিকে পালাতে সাহায্য করার সময়ে বলেছিলো,

“ তোমাকে একটা কথা ক‌ই! তোমার ভালোর জন্য। যদিও আমার পেশায় এসব ঠিক না।তাও বলতেছি, তোমাকে কলিমের কাছে বিক্রি করছে। যতদূর বুঝছি, তোমার সতিনের বাপে আর তাতে সমর্থন করছে তোমার শ্বশুর।এখন তুমি যদি তোমার স্বামীর জন্য সেদিকে এখন‌ই ছুইটা যাও তাইলে কিন্তু বিপদ ছাড়া ভালো কিছুই হ‌ইবো না। তোমার প্যাটে বাচ্চা।এই সময়ে তোমার দরকার সুস্থ থাকা,নিরাপদে থাকা। কিন্তু তুমি আজ পনেরো দিন ধ‌ইরা যেমনে পেরেসানিতে আছো তাতে কিন্তু বড়সড় বিপদ ঘটতে পারে।তখন স্বামীর কাছে কি জবাব দিবা? তার আমানত তোমার কাছে। তোমার উচিত আগে তার আমানত রক্ষা করা।সে বাইচা থাকলে একদিন দেখতে পারবাই। কিন্তু তার জন্য তোমারে আগে নিজের বাচ্চা আর নিজের নিরাপত্তার চিন্তা করতে হ‌ইবো।"

পারি সেদিন বাচ্চাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এদিকে আর পা বাড়ায়নি। ঐদিকে ধীরে ধীরে তার মস্তিষ্কেও এটা গেঁথে গিয়েছিল সম্রাটের সাথে যা হচ্ছে সবটা তার জন্য‌ই হচ্ছে।সে না থাকলে একদিন না একদিন সম্রাট তানহাকে মেনে নিয়ে সুখে থাকবে।আর সেও বাচ্চাদের নিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতে পারবে।তাই তো সে ফেলে যাওয়া পথের পানে আর ফিরে তাকায়নি।নিজ সন্তানের জন্য, ভালোবাসার জন্য নিজেকেই সরিয়ে নেয়।সে চায়নি,তার জীবনটাও তার মায়ের মতো হোক।তার ভালোবাসার শাস্তি তার সন্তানরা পাক।

গাড়ি বাপ্পীর বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে এসে থামলো।হর্ণের শব্দে পারি সোজা হয়ে বসে।সবটা শোনার পর বাপ্পীও চুপ হয়ে যায়। ওদের ধারনার বাইরে মেয়েটা সহ্য করেছে।

সুখ উৎসুক চোখে জানালা দিয়ে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে।বাপ্পী গাড়ি থেকে নেমে সুখের দিকে হাত বাড়িয়ে ডাক দিলো,

“ মা, আসেন!"

সুখ গাড়ির সিট থেকেই ঝুঁকে লাফ দিয়ে চাচার কোলে উঠলো।বাপ্পীও কোলে নিয়ে হেসে দেয়,আদুরে গলায় বলে,

“ ব্রাভো প্রিন্সেস। একদম বাবার মতো হবেন। ইনশাআল্লাহ।"

বলেই সে কপালের কোনে চুমু দিলো।সুখ এই অল্প কিছুক্ষণ আগেই চেনা চাচুর আদরে বিগলিত হাসে।তার ভালো লাগছে এই চাচ্চুটাকে।যদিও সে সবাইকে মামা ডাকে।একেও মামা ডেকেছিল কিন্তু এই মামাটা বলেছে তাকে চাচু ডাকতে।চাচু! সুখের জন্য এটা একটা নতুন শব্দ। কিন্তু সুন্দর,ভালো লেগেছে।সে তার চাচ্চুর গলা শক্ত করে ধরলো দু'হাতে।

বাপ্পী সুখকে কোলে নিয়ে ঘুরে গিয়ে ঐপাশের দরজা খুলে দিলে পারি বাইরে নামে। দৃষ্টি তুলে সামনের সুউচ্চ ভবনের পানে চাইতেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে।ছলছল, আবেগে উদ্বেলিত হয়ে কান্না থামাতে পারেনা। বাপ্পী ওর অনুভূতি বুঝতে পেরে মাথায় হাত রেখে বললো,

“ আল্লাহর উপর ভরসা রেখে এগিয়ে চলো। ইনশাআল্লাহ, পথ মসৃণ'ই পাবে।"

দরজার বাইরে থাকা মানুষটাকে দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তন্নির।মেয়েটা ফ্যালফ্যাল করে অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে আছে।বাপ্পী ওর চাহনি দেখে,ওর মনের অকথ্য অনুভূতি বুঝতে পেরে মুচকি হেসে বললো,

“ আরে আজব। তোমার ননদ এসেছে। ঘরে ঢুকাবে না?"

পারির থেকে চোখ সরিয়ে স্বামীর দিকে চাইলো। আগের মতোই নির্বাক। বাপ্পী ওর পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে সুখকে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো,

“ এই নেও,আমার ছেলের ব‌উ নিয়ে আসছি।"

তন্নির অবাকতার রেশ কাটেনি।পারি সংকোচে হয়ে দাঁড়িয়েই আছে।তা দেখে বাপ্পী পারিকে বললো,

“ ঢুকো ভেতরে।কি আশ্চর্য, একজন খুশির ঠেলায় কথাই বলতে পারছে না। আরেকজন নতুন মানুষের মতো লজ্জা পাচ্ছে! এটা কি অচেনা কারো ঘর!"

এই অবধি বলে আবার এগিয়ে আসলো দরজার দিকে, অতঃপর পারির মাথায় হাত রেখে স্নেহভরা গলায় বললো,

“ আগেও বলেছি, এখনো বলছি। এটাকে নিজের আপন ঘর মনে করবে।আমার ছোট বোন বলি, শুধু মুখেই না। মনে প্রাণে মেনেই বলি
তাই , কখনোই এই ঘরে আসার ক্ষেত্রে হেজিটেড ফিল করবে না।এটা তোমার বড় ভাইয়ের বাসা, মানেই বাবার বাসা।মেয়েরা যেমন নাইয়রি যায়,তুমিও তেমনি আসবে।এখানে কোন লজ্জা অথবা ভাবনার বিষয় নেই। তুমি আসবে, নিজের মতো দাবি করে যা খুশি চেয়ে নিবে। নিজের মতো চলবে। এক্ষেত্রে কোন বিধিনিষেধ নেই।বুঝেছো?
___আসো এখন!"

বাপ্পীর ভাতৃত্বসুলভ কথায় পারির চোখ ছলছল করে উঠলো।তা দেখে এবার তন্নি বাপ্পীকে সরিয়ে দিয়ে বললো,

“ যাও তো কাদিও না। এমনিতেই এখনো কাঁদার অনেক কারণ আছে।আগে ঢুকাতে দেও ঘরে।এত বছর পর ননদিনী আসছে।"

বলেই তন্নি পারিকে নিয়ে ভেতরে ঢুকালো।হুট করেই গলায় জড়িয়ে ধরলো।এবার সে নিজেই কেঁদে দিয়েছে।ওর কান্নায় পারি হতবাক হয়ে গেলো। বাপ্পী জানে ওর কান্নার কারণ।পারি হারিয়ে যাওয়ার পর সে নিজেকে দোষারোপ করতো।তাকে তার স্বামী দায়িত্ব দিয়েছিলো বন্ধুর ব‌উয়ের খেয়াল রাখতে। কিন্তু সে পারেনি। তার উপস্থিতিতেই মেয়েটা কখন ঘর থেকে বেরুলো,আর কোথায় গায়েব হয়ে গেলো।এই আত্মগ্লানিতে সে দীর্ঘদিন মানসিক অশান্তিতে ছিলো।এখন পারিকে দেখে সেগুলোই মনে পড়েছে হয়তো।

এদের কান্না দেখে কাঁদো কাঁদো মুখে চেয়ে আছে সুখ,যেন সেও কেঁদে দিবে এখুনি।পারির চোখ মেয়ের উপর পড়তেই সে দ্রুত তন্নিকে থামিয়ে বললো,

“ থামো ভাবি,নয়তো আমার মেয়ে এখন‌ই কেঁদে ফেলবে।আমার মেয়ে কারো কান্না সহ্য করতে পারে না।প্লিজ থামো।"

মেয়ের কথা বলতেই তন্নি থেমে যায়।সে পারিকে ছেড়ে স্বামীর কোল থেকে সুখকে নিয়ে রসগোল্লা সাইজের চোখ করে দেখতে থাকলো।সুখ‌ও দেখছে। গোলগোল করে চেয়ে।সে ঠোঁট টিপে ঘনঘন পলক ফেলে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে বললো,

“ তুমি কেন কাঁদো?"

তন্নি প্রশ্ন শুনে মুচকি হাসলো। এরপর সুখের গালে চুমু দিয়ে বললো,

“ ঘরে ননদিনী আসছে,ছেলের ব‌উ আসছে। কাঁদতে তো হবেই!"

“ কেন কাঁদতে হবে?"

“ সে তুমি এখন বুঝবে না
আগে বড় হ‌ও!"

“ মাম্মা একটা বেবি গার্ল ?"

শয্যা কক্ষের সামনে কোমরে দু হাত রেখে একটা ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে তার হাটু সমান প্যান্ট আর গেঞ্জি। মায়ের কোলে একটা মেয়ে বাবু দেখে তার কৌতুহলি চোখ, বড় বড় করে এদিকেই চেয়ে আছে।বিস্ময়ে ভরা চাহনি।তাকে তো বাবা সকালেই বললো,সে দুষ্টুমি না কমালে তারা একটা মেয়ে বাবু নিয়ে আসবে আর তাকে অন্য কারো বাসায় পাঠিয়ে দিবে। তাহলে কি বাবা সত্যিই মেয়ে বাবু নিয়ে আসলো?

___________________________________________

মাগরিবের নামাজ আদায় করে বায়তুল মোকাররমের সিঁড়ির উপর‌ই আধ শোয়া হয়ে আকাশ পানে চেয়ে আছে। হঠাৎ করেই কি মনে করে মুঠোফোনটা বের করলো,মানহার সাথে কথা শেষ করেই বন্ধ করে রেখেছিলো।নয়তো বারবার ফোন করতো।যদিও মানহা মেয়েটা সে'বার ঐভাবে বলার পর ফোন করেনি কিন্তু আজ করেছে মানেই হলো আবারও করতে পারে।

লক খুলে স্ক্রিনে বাপ্পীর এতগুলো কল দেখ ভয়ে গলা শুকিয়ে গেল।চেইক করে দেখলো সেই বিকেল থেকে পরপরই অনেক গুলো কল।তার মধ্যে মানহা, নাসিরের কল‌ও আছে।বাপ্পীকে আগে কল দিলো। চিন্তায় গলা শুকিয়ে কাঠ, কিছু হয়নি তো!

“ হ্যা...

এদিকে হ্যালো বলার আগেই ঐদিকে বাপ্পী....

“ কোথায় তুই , সারাদিন ফোন বন্ধ করে রেখে কি শুরু করেছিস? মেরে ফেলতে চাস?"

“ আস্তে। দম নে।আর আমার জন্য তুই মরবি ক্যান? তুই কি আমার ব‌উ লাগিস?"

ভাবলেশহীন কথা।বাপ্পী ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে সামনে বসা পারির দিকে চাইলো।ও সম্রাটকে সরাসরি দেখাতে চাইছে।বলতে নয়।তাই পারির কথা না বলে আগের মতোই স্বাভাবিক ভাবেই বললো,

“ হুর শালা।ব‌উ হবো কেন?
____ বেয়াই বানাবো!"

বাপ্পীর কথায় সম্রাট মুখ বেঁকিয়ে ভেংচি কাটলো, নাটুকে সুরে বললো,

“ বয়েই গেছে তোর ঐ ভাঙ্গা রেকর্ডের কাছে আমার রাজকন্যা দিতে!"

“ ঐ, তুই কিন্তু আমার ছেলের মান-সম্মানে আঘাত করছিস!"

“ যার নাকের সর্দি মোছার সক্ষমতা হয়নি,তার আবার মান-মর্যাদা।এ ভাই,রাখতো তোর আকাশ-কুসুম স্বপ্ন,এহেন অমানিশার জোৎস্না দেখা বন্ধ কর। তোর ছেলেকে আমি আমার মেয়ে জামাই বানাবো না।আমি আমার মেয়ে বিয়েই দিবো না।"

“ দেখা যাবে বন্ধু।"

“ হুহ্!"

“ যেখানেই থাকিস এখুনি বাড়ি আয়!"

বাপ্পীর কন্ঠ কেমন ঠেকছে।সম্রাট নিরুৎসাহিত গলায় বললো,

“ কেন?"

“ আয়, আসলেই দেখবি!"

হেয়ালি কথা।ওর কন্ঠে রসিকতা স্পষ্ট।সম্রাট ভ্রু কুঁচকে নিয়ে তেতো মুখে বললো,

“ রসিকতা করার জন্য এতগুলো কল দিয়েছিস?দেখ কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। অনেকদিন পর,একটু শান্তি অনুভব হচ্ছে।কেন জানি বুকটা শীতল লাগছে!"

বাপ্পী সম্রাটের কথায় হাসলো।পারির পানে চাইলো।মনে মনে বললো,

“ কারণ তোর শান্তির ঔষধ পাওয়া গেছে ভাই।"

শব্দ করে বললো,

“ তোর শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হোক।"

সম্রাট তাচ্ছিল্য ভরা হাসিতে ফেটে পড়তেই বাপ্পী বললো,

“ তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়,পাগলামি করিস না আর।"

“ কিন্তু কেন? কোন জরুরী কাজ..!"

“ ঐ যে বললাম বেয়াই পাতাবো।আজ তার চুক্তি হবে।আয় বলছি ভাই,ইটস ইমার্জেন্সি।তোর শান্তি আজীবন নিশ্চিত হবে ইনশাআল্লাহ।"

“ আচ্ছা.."

বলেই সে ফোনটা কেটে দিলো।পারি এদের দুই বন্ধুর এমন খুনসুটি দেখে হাসলো।এরা এমন‌ই করে সবসময়।

পারি বসার ঘরে বসে দেওয়াল ঘড়ির দিকে চেয়ে আছে।বিশাল সাইজের এন্টিক ঘড়িটা দারুন নকশাখচিত। চমৎকার তার কাঁটা গুলো। এদিকে সুখকে এখন আর পাওয়ার উপায় নেই।সুখ তার চাচা চাচীর আদরে গলে যাচ্ছে।

বাপ্পী তন্নির একমাত্র ছেলে বুরাক,সেও সুখকে ইচ্ছা মত কচলাচ্ছে।যেখানে সে নিজেই একটা বাচ্চা সেখানে সুখ নাকি তার কাছে বাবু।এসব ভেবেই পারি মুচকি হাসলো। আবার ঐদিকের চিন্তায় অস্থির লাগছে।

ঠিক আধ ঘন্টার মাঝেই কলিং বেলটা বেজে উঠলো। কলিং বেলের শব্দে পারি উঠে দাঁড়ালো।তার বুকের মাঝে চলা ঝড়ের প্রবাহ বেড়ে চলেছে।হাত পা কাঁপছে। নিজের ওড়নার কোনা খামচে ধরে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তার মনে হচ্ছে সে পড়েই যাবে।

গৃহ পরিচারিকা খালা দরজা খুলে দিতেই শোনা গেলো কাঙ্ক্ষিত,পাগল করা প্রেমিকের আগমনি বার্তা। সে গাঢ় পুরুষালী, মুগ্ধ করা, মাতাল করা, কন্ঠনালী দিয়ে যখন বললো ,

“ আসসালামু আলাইকুম, চাচু!"

পারি ফুঁপিয়ে উঠলো।পারির কান্না দেখে বাপ্পী উঠে দাঁড়ালো,পারি কান্না করুন চোখে দেখে মুখটা ঘুরিয়ে মৃদু শ্বাস ফেলে সালামের উত্তর দিলো।

ততক্ষণে সম্রাট বসার ঘরে উপস্থিত।তার দৃষ্টি স্থির সেই কাঙ্খিত নারীর পানে।হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা পড়ে গেলো।ঐ রুক্ষ,খরখরা পোড়া কালচে ওষ্ঠদ্বয় কেঁপে উঠলো। মরুভূমির মতো শুকিয়ে যাওয়া বুকের মাঝে আনন্দের জলোচ্ছ্বাস শুরু হলো। পুরুষ কাঁদে না।কে বলে? এই যে সম্রাট নামক পুরুষের ঐ তেজি লোচন ভেদ করে উষ্ণ নোনাজলেরা প্লাবন ঘটাচ্ছে তার চিত্ত জুড়ে! এই যে সম্রাটের বক্ষ মাঝে সাইক্লোন শুরু হয়ে গিয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে পাওয়ার খুশিতে।

পারিও নিজেকে সামলাতে পারেনি।একটা ফর্সা, সুঠামদেহী, তেজি পুরুষকে সে রেখে গিয়েছিল। রক্ত কবরীর ন্যায় ঔজ্জ্বল্যতা তার ঐ নেশালো চোখে ছিলো।
অথচ এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মাঝে সে একজন ভঙ্গুর দেহের পোড়া মনের মানুষ দেখতে পাচ্ছে।সে নিজের উতলে আসা কান্নাকে দমাতে ব্যর্থ হয়, শব্দ করে কেঁদে দিলো।তার কান্না ঐ পুরুষের বুকের চিনচিনে ব্যথাটা বাড়িয়ে তুললো।

পুরুষটা নিজের আশপাশ ভুলে ছুটে গিয়ে দু'হাতের আঁজলায় ক্রন্দনরত রমনীর স্যাঁতস্যাঁতে,ফ্যাকাশে বদনখানি তুলে ধরে নিস্পলক চেয়ে রইল।তার অক্ষু ফেটে ঝড়ে পড়া মুক্তোর দানা গিয়ে এই রমনীর চিবকু ভিজিয়ে দিলো। থরথর করে কম্পমান ওষ্ঠজোড়া তার বুকের মাঝে মিশিয়ে নিতে সে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।
নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে পাগলের মতো বলতে থাকলো,

“ পারিজাত! আমার পারিজাত,আমার জান।কোথায় ছিলে তুমি, কোথায় না ....আমার...!

সম্রাটের কন্ঠস্বর রোধ হয়ে গেলো।সে পারিকে পারে না বুকের সাথে পিষে তার হৃদপিন্ডের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে।এত শক্ত করে চেপে ধরেছে যে পারির শ্বাস নিতেই কষ্ট হচ্ছে।সে নিজের অস্থিরতাকে,খুশিকে কিভাবে সামলাবে জানে না।
পারি নিজেও সম্রাটের পরনের কালো শার্টটা এত শক্তি দিয়ে খামচে ধরেছে যে সেটা ভেদ করে তার নখ সম্রাটের পিঠে ক্ষত সৃষ্টি করে দিয়েছে।

দু'জন এভাবেই একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছে ।
এদিকে তাদের এই মহামিলনের কান্না বুঝতে না পেরে আরেকজন চিৎকার করে উঠলো। বাচ্চা কন্ঠের চিৎকারে পারির হুঁশ আসে।সে সম্রাটকে ঠেলে নিজেকে ছাড়িয়ে ঐদিকে তাকালে সম্রাট‌ও ওর দৃষ্টি খেয়াল করে তাকাতেই দেখলো সেখানে দাঁড়িয়ে কাঁদছে তার ছোট্ট রাজকন্যা।সম্রাট পারির দিকে তাকালে পারি চোখের পলকে বুঝিয়ে দেয়।
এদিকে বাবা মাকে জড়িয়ে ধরেছিল,তা তো ছোট সুখ বুঝেনি।সে ভাবছে তার মা'কে লোকটা কষ্ট দিচ্ছে তাই মা কাঁদছে।

সে এদিকে ছুটে এসে তার হাতে থাকা পুতুলটা দিয়ে সম্রাটের গাঁয়ে আঘাত করে বললো,

“ তুমি পঁচা! কেন আমাল আম্মুকে ব্যতা দেও!"

এই কথা শুনে বাপ্পী শব্দ করে হেঁসে দিলো।বাপ্পীর হাসিতে পারি লজ্জা পেলো।সে লজ্জায় রাঙা হয়ে মুখ নামিয়ে নিলো।সম্রাট বাপ্পীর দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে ইশারায় হুমকি দিয়ে করুন চোখে নিজের মেয়ের দিকে চাইলো।সুখ তার মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর রাগী চোখে বাবাকে দেখছে।

বাপ্পী হাসি দেওয়ায় তন্নি প্রথমে চোখ রাঙানি দিলেও পরে সে নিজেই মিটিমিটি হাসতে থাকলো।

এদিকে বুরাক এগিয়ে এসে মাতব্বরি করে বললো,

“ আলে বাবু,আলে মেয়ে বাবু তুমি কেন আমার চাচুকে মারছো?তোমাকে তো আমি একটা পিপপিপ বাঁশি দিলাম,তাও তুমি কেন চাচুকে মেরেছো বলো,আমার চাচু কি ব্যথা পায় না!"

সে ভ্রু কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলে, কোমরে দুই হাত রেখে শাসাচ্ছে সুখকে।তা দেখে হতবাক সম্রাট।তার মেয়েকে তার সামনেই এভাবে এই পুঁচকে ছেলে শাসন করছে? বাপ্পী আবারও হাসতে লাগলো।ও এবার জমিনে গড়াগড়ি খাচ্ছে আর বলছে,

“ বল বেয়াই হবি?"

“ অসম্ভব!"

বলেই সম্রাট অসন্তোষ প্রকাশ করে বললো,

" আব্বা, আপনার জন্য মেয়ে খুঁজে দিবো চাচু। কিন্তু আপনি আমার মেয়ের উপর অভিভাবকত্ব দেখাইয়েন না। আপনার মতো বদরাগীর কাছে মেয়ে দিবো না।"

বলেই সে বুরাককে তুলে একটু দূরে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলো।এটা দেখে পারি হতাশ চোখে তাকায় সম্রাটের দিকে। ও মনে মনে বলে, এরা কারা ভাই! ফিডার খায় বাচ্চারা এখন‌ও!আর এরা দুই বন্ধু কিসব নিয়ে ঝগড়া করছে আবার বাচ্চাদের কি সব বলছে!
ও কপালে হাত দিলো। এদিকে সম্রাটের চাহনি মেয়ের দিকে।সে আকুতি ভরা চোখে চেয়ে আছে।ছলছল করছে তার আঁখি জোড়া। ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে।

সুখ‌ও অপলক চেয়ে আছে।তার কাছে চেনা চেনা লাগছে।এই মুখটা সে চিনে।তার বাবার ছবি আছে তাদের ঘরে।সে চিনে তো তার বাবাকে। কিন্তু এইটা কি আসল বাবা? ছবির বাবাতো বিদেশে।সুখ মুখ তুলে মায়ের দিকে চাইলো।পারি কপাল কুঁচকে রাগের ভনিতা করে মেয়ে বললো,

“ বাবাকে কেউ মারে?"

সুখ মুখ ফুটে উচ্চারণ করলো,

” বাবা!"

মেয়ের মুখে বাবা শব্দটা শুনে সম্রাট নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি।সে কম্পিত কন্ঠে মেয়েকে ডাকে,

“ আম্মা! বাবার কাছে আসবেন না!"

সুখ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল কীয়ৎকাল,তন্নি আবেগি চোখে চেয়ে ভেজা গলায় বললো,

“ বাবার কাছে যাও মামুনি!"

সুখ নিজের মায়ের দিকে চাইলো,পারি ইশারায় যেতে বললে সুখ বাবার দিকে তাকায়। ছোট কন্ঠে বললো,

“ বাবা!"

সম্রাট মেয়েকে বাজপাখির মতো ছো মেরে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।

৩১

মেয়েকে চুমুতে চুমুতে সিক্ত করেও সম্রাটের পিতৃসত্ত্বা ক্ষান্ত হয়না।এক পলক মেয়ের ঐ বিস্মিত ছোট শিশু বদনখানা দেখছে,আবার মেয়ের হাত ধরে নিজের গালের সাথে চেপে ধরে মেয়ের নাকে, মুখে, কপালে আদর করছে।সুখ ফ্যালফ্যাল চোখে বাবার এমন আবেগী কান্ড দেখছে। বাবা এইতো কাঁদে আবার এই মুচকি হাসে। কতগুলো চুমু খেলো।তার গাল দুটো'তো ভিজেই যাচ্ছে বারবার। নাকে'ও চুমু খায়। নাকে কেউ চুমু খায়? নাকে সর্দি থাকে না! কিন্তু বাবা তাও চুমু দেয়। আম্মুর মতো।তার ছোট হাতজোড় বাবার বুকের কাছে চেপে ধরা।
একটু পরপর সে হাত দুটো বাবা অজস্র চুমুতে ভিজিয়ে দিচ্ছে।

মেয়েকে কোলে নিয়ে ফ্লোরে'ই হাঁটু ভাঁজ করে বসে রয়েছে।তার দু নয়নের তৃষ্ণা এক ঘন্টা কেন, মনে হচ্ছে এই এক জীবনেও মিটবে না। ঠোঁটের কোনে লুকিয়ে রয়েছে স্নিগ্ধ প্রাপ্তির রেখা। প্রস্তরের ন্যায় ভারি বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকা পালকের ন্যায় শুভ্র হৃদয় হালকা হবার অনুভূতি মেশানো, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পূর্ণতার প্রকাশ্যমান সতেজ রেখা।

সম্রাটের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে।তার পারিজাত,তার ভালোবাসা,তার অস্তিত্ব।তার ভালোবাসার চিহ্ন,তার এক জীবনের সাধনার ফল,এখন তার বক্ষপিন্ডের নিকটে, তার বক্ষ পাঁজর জুড়ে বিস্তৃত দহন যাতনার অবসান ঘটিয়ে তার সম্মুখে বিস্মিত নেত্রে চেয়ে রয়েছে তার‌ই পানে।

পারি বাবা মেয়ের মিলন মুহূর্তে ছলছল চোখে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কোন বাক্য উচ্চারণ করেনি।সে তো জানেই লোকটা কতটা ভালবাসে তার অংশের চিহৃকে।সে তো জানেই এই লোকের সবটা জুড়ে সে এবং তার সন্তান।

সম্রাট বারবার মেয়ের মুখটা বুকের উপর চেপে ধরে,আবার দুহাতে তুলে মুগ্ধ হয়ে দেখে। চোখের পাতায় চুমু দেয়।এমন করতে করতেই হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যায়।সে পারির দিকে চেয়ে সিক্ত নয়নে কিছু জানতে চাইলো। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই পারি উপরনিচ মাথা দুলিয়ে কিছু একটা বোঝালো। তার ওষ্ঠকোনে সুখানুভূতির মিশেলে কান্নার দমক। সেটাকে চেপে রেখে বললো,

“ এখুনি গাজিপুর যেতে হবে।নয়তো আরো দেরি হয়ে যাবে!"

সম্রাট মেয়েকে বুকে চেপে রেখে চট করে উঠে দাঁড়ালো। ভীষণ তাড়াহুড়ো দেখিয়ে বললো,

“ তাড়াতাড়ি চলো।"

বাপ্পী ভ্রু কুঁচকালো, কাত হয়ে বসা থেকে সোজা হয়ে বসলো। পরক্ষনেই উঠে দাঁড়িয়ে চিন্তিত গলায় শুধালো,

“ কি হয়েছে? কোথায় যাবি এখন আবার তোরা?"

“ এখুনি গাজীপুর যেতে হবে ভাইয়া, নয়তো বেশি দেরি হয়ে যাবে!"

“ কিন্তু তোমরা তো এখনো কিছু খেলেই না।মেয়েটাকে তো অন্তত খাওয়াও!"

“ হ্যা তাই তো! আর তোরা, এখুনি কেন?
______ আচ্ছা শোন, যেখানেই যাস, যা।অন্তত পেটে দুটো দানা দিয়ে যা।পারি কিন্তু সেই সকাল থেকে না খাওয়া।ও না বললেও আমি বুঝতে পারছি। যেহেতু
হাসপাতালে এসেছিল সেহেতু খাওয়ার সুযোগ ছিলো না বোঝাই যায়।মেয়েটাও তো..."

“ হাসপাতালে কেন?"

সম্রাটের চোখেমুখে ভয়, দুঃশ্চিন্তা। অস্থির কদমে সে পারির দিকে এগিয়ে এলো।পারির উপর থেকে নিচ অব্দি পরখ করে পারির দু বাহু ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করলো,

“ কি হলো বলছো না কেন? কি হয়েছে? হাসপাতালে কেন ছিলে তুমি?বলো!"

পারি সম্রাটের অস্থিরতা অনুভব করে ওর দুহাত জড়িয়ে একত্রে করে নিজের বুকের সামনে ধরে ওকে শান্ত করতে ধীর কন্ঠে বললো,

“ শান্ত হ‌ও,তেমন কিছু না।"

“ যেমনি হোক। বলো আমাকে।"

“ আচ্ছা আগে ঐদিক থেকে আসি। তারপর তো তোমাকে বলবো।না বলে পারবো?"

“ পারি,আমার কাছ থেকে কিছু লুকাবে না পাখি।যাই হয়ে যাক,আমার কাছ থেকে একটা শব্দ‌ও লুকাবে না জান।বুঝেছো?"

“ হুম!"

মৃদু হাসির সহিত বললো পারি। অতঃপর......

এই দুজনের সফরসঙ্গী হলো বাপ্পী।গাড়ির সামনে চালকের পাশে বাপ্পী।আর তাদের পিছনে সম্রাট,তার কোলে তার মেয়ে আর পাশেই সঙ্গিনী হিসেবে পারিজাত।
সম্রাটের দৃষ্টি স্থির তার কোলে বাবুই পাখির মতো শান্ত হয়ে বসে থাকা তার ফড়িং ছানা।তার সুখ। ছোট্ট ছোট্ট চোখ জোড়া এদিকে ওদিকে মেলে অবাক হয়ে দেখছে সব।রাত প্রায় আটটা।

পারির ছটফটানি আর সম্রাটের অস্থিরতা দেখে কেউ কিছু মুখে দেয়নি।তন্নি সুখের জন্য একটু খাবার বক্সে ভরে বাপ্পীর হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।পারি যেমন অস্থির হয়েছিল তাতে বোঝাই যায় সে এখন কিছুই মুখে তুলবে না।তাই শুধু সুখের জন্য‌ই দিয়েছে।বাপ্পী সেই বক্সটা পারির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

“ নিজে তো খেলে না।ওকে একটু খাওয়াও। বাচ্চাটা অসুস্থ হয়ে পড়বে তো!"

পারির আগে সম্রাট হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে সুখের শুকিয়ে যাওয়া মুখটাকে আরেক পলক দেখে নিয়ে পারিকে বললো,

“ পারবে নাকি আমিই খাওয়াবো!"

পারির সম্রাটের দিকে চেয়ে বললো,

“ চেষ্টা করতে পারো!"

সম্রাট সুখকে তাদের মাঝে বসিয়ে দিয়ে গাড়ির জানালা খুলে হাত ধুয়ে নিলো। অতঃপর বক্স খুলে দেখলো তাতে ভাত, সবজি, চিকেন। পাশেই একটা সিদ্ধ ডিম।সে নিজের অনভিজ্ঞ হাতে প্রথম লোকমা তুলে ধরলো মেয়ের মুখের সামনে।সুখ বাবার হাতে থাকা দানাগুলো দেখে মায়ের দিকে চাইলো।
পারি মেয়ের মনোভাব ঠাওর করে চোখের পলক ফেলে বললো,

“ বাবার থেকে খেতে মায়ের অনুমতি লাগে না আম্মু!"

মা, মা'কে ছাড়া অন্য কারো হাতে খেতে নিষেধ করেছে।এটা সুখের সবসময় মনে থাকে।তাই তো বাচ্চাটা সারাদিন না খেয়ে থাকলেও মা ব্যতিত অন্য কারো হাতে খাবে না। সম্রাট পারির দিকে চাইলো মুগ্ধ নয়নে।এই অল্প সময়েই সে পারির মাতৃত্বের শিক্ষায় মুগ্ধ। এতটুকু বাচ্চা তার।অথচ কতটা পরিনত বুদ্ধি তার। মনে মনে বললো,

“ আমি কৃতজ্ঞ তোমার প্রতি পারি। এত সংগ্রামের মাঝেও আমার বাচ্চাকে আমার মনের মতো করে গড়ে তুলতে পেরেছো তুমি।"

যেখানে দুরে থাকা বাবাকে সারাদিন মোবাইলে দেখে,কথা বলেও বাচ্চারা চিনতে পারে না। সেখানে তার বাচ্চা শুধু ছবি দেখেই বড় হয়েছে,অথচ প্রথম দেখাতেই তাকে চিনে ফেলেছে।যেন জন্ম লগ্ন থেকেই বাবার বাহুডোরে হেসে খেলে বড় হয়েছে।সুখ মায়ের অনুমতি পেয়ে বাবার দিকে ফিরে চাইলো।সম্রাট অস্ফুট হেসে মেয়ের মুখে প্রথম লোকমা তুলে দিতেই তার চোখের কোন গড়িয়ে পড়লো অশ্রুরা।
পিতৃত্বের স্বাদ এত মধুর তা সে এতটা আগে বুঝেনি।

______________________

গাজীপুর চৌরাস্তায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে ওদের রাত প্রায় বারোটা বেজে গিয়েছে। ভয়ে, চিন্তায় মুখটা চিমসে গিয়েছে। মেয়েটা খাওয়ার পর‌ই তার বাবার গায়ের সাথে লেপ্টে ঘুমিয়ে পড়েছে। সম্রাটের দুচোখেও চিন্তা, অস্থিরতা আর হাহাকার।বাম হাত দিয়ে মেয়েকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে ডান হাত দিয়ে অবিরত মেয়ের মাথায় হাত বুলাচ্ছে।এ যেন এক খন্ড সুখ।যা তার চিত্তকে শীতল করে রাখছে কিন্তু,তাও চিন্তায় জমে যাচ্ছে সে।

চারিদিকে টিন দিয়ে বেড়া দেওয়া তিন তলা একটা পুরানো বাড়ির দোতলায় উঠে দরজায় দু'টো টোকা দিতেই ভেতর থেকে খুলে দিলো কেউ।সুখ এখন তার চাচার কোলে।উপরে উঠার সময় বাপ্পীই চেয়ে নিয়েছে।কেননা,একটু পরেই যে তার বন্ধুর অস্থিরতা আবার বেড়ে যাবে।পারি দরজায় পা রাখতেই ভেতর থেকে একজন মহিলা বললেন,

“ এত দেরি হলো পারি! বাচ্চাটা অসহায়ের মতো জানালার ধারে বসে রয়েছে। কেমন স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রয়েছে।না কাঁদছে আর না কিছু বলছে!"

“ স্যরি আপা।আসলে..."

পারিকে শেষ করতে না দিয়ে পারির পিছনে থাকা মানুষগুলোর উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ আসুন আসুন, ভেতরে আসুন।"

উনাকে ফোন করে আগেই সব জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।তাই তিনি সবাইকে না চিনলেও অনুমান করেই আন্তরিকতা দেখিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে বসালেন।বাপ্পীর কোলে ঘুমন্ত সুখকে দেখে হাত এগিয়ে দিয়ে বললেন,

“ও তো ঘুমাচ্ছে।দিন আমার কাছে দিন। বিছানায় শুইয়ে দেই।"

সম্রাট দিতে না চাইলেও পারি বলাতে বাপ্পী বললো,

“ আপনি বিছানা দেখিয়ে দিন।আমিই শুইয়ে দিচ্ছি।আপনি আবার কষ্ট করবেন!"

তিনি দু কামরার ফ্ল্যাটের ডান পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে আরো দু'টো বাচ্চা শুয়ে আছে।তিনি তার পাশেই আরেকটা বালিশ রেখে কুঁচকানো চাদর টানটান করে দিয়ে বললেন,

“ এখানে শুয়ে দিন।"

এদিকে পারি বসার ঘরের সাথের বারান্দার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে ডাক দিলো,

“ সমৃদ্ধ,আব্বু! আম্মু এসেছি তো!"

ছোট একটা শিশু ছেলে,তার ছোট্ট দুটো হাতের মুঠোয় বারান্দার শিক চেপে ধরে অভিমানি চোখে চেয়ে আছে অন্ধকার পথের পানে।ফুলোফুলো গাল দুটো অভিমানে আরো বেশি ফুলে রয়েছে। পরনে গেঞ্জি কাপড়ের কালো হাফপ্যান্ট আর হাতকাটা খয়েরি রঙের গেঞ্জি।পারি ছেলের অভিমান দেখে করুন চোখে চাইলো স্বামীর পানে।সম্রাট আলো আঁধারির মাঝে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছে অপলক তবে ঘোলাটে নয়নে।তার ঐ শক্ত,কঠোর নয়ন জোড়া আজ বেশি জ্বালাচ্ছে।এই অভিমানী শিশুটা, ছেলেটা তার।তার‌ই অংশ।যার মাঝে সে নিজের শৈশবকে দেখছে।
পারি একটু এগিয়ে গিয়ে ছেলের পিছনে বসে দুহাতের বেড়িতে জড়িয়ে ধরে অপরাধী কন্ঠে বললো,

“ মায়ের সাথে কথা বলবে না? খুব রাগ হয়েছে আজ আমার শেহজাদের তার আম্মুর প্রতি?"

একটুও নড়লো না সে।আগের মতোই বাইরে চেয়ে রয়েছে।আগের মতোই শক্ত করে ধরে রেখেছে তার ঐ নরম হস্তদ্বয় দিয়ে ঐ শক্ত লৌহের দন্ডকে।
পারি ছেলের পিঠে মাথা ঠেকিয়ে দিয়ে ক্রন্দনরত গলায় বললো,

“ সমৃদ্ধ যদি তার মায়ের সাথে রাগ করে তাহলে মা কাকে বাবা বলে ডাকবে? মায়ের কি আর কেউ আছে? সমৃদ্ধ আর তার বনু ছাড়া!"

এতেও সে নরম হলো না। তাকালো না অপরাধী মায়ের দিকে ফিরে। পারি বুঝলো, তার ছেলের আজ ভীষণ রাগ হয়েছে।হবার‌ই কথা,সেই কোন সকালে,ফজরের নামাজ পড়ে বের হয়েছে। যাওয়ার সময় বাচ্চাটা ঘুমিয়ে ছিলো।ঘুম থেকে উঠার পর কান্না করায় আপা ফোন করে কথা বলিয়েছিল।তখন বেলা প্রায় দশটা। এরপর তো কথাও হয়নি। এতটুকু মানুষ, অচেনা মানুষের মাঝে ছিলো তাও মা বাবা ছাড়া। তা-ও ভালো, মানুষগুলো ভালো।তাই নিশ্চিত থাকা যায়। নয়তো পারি কি করতো! এই দুটো বাচ্চাকে একসাথে নিয়ে আদৌও সে বাইরের কোন কাজ করতে পারতো? সম্ভব!

সম্রাট ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে পারির পাশে বসলো। ছেলের মাথায় স্নেহের হাত রেখে ভেজা কন্ঠে উচ্চারণ করলো,

“ সমৃদ্ধ! বাবার সাথেও কথা বলবে না! খুব রাগ হয়েছে আমার শাহজাদার!"

‘ বাবা ' শব্দটা ছোট সমৃদ্ধের কাছে অপরিচিত নয়।সবার যে বাবা থাকে তা সে বুঝে।তার‌ও বাবা আছে,তবে বিদেশে থাকে।এটাও সে জানে।
মা বলে তাদের, প্রতিদিন।বাবার ছবি দেখিয়ে বলে,

“ উনি হচ্ছেন তোমাদের বাবা। বিদেশে কাজ করতে গিয়েছে। তাই কেউ বাবা বলতে বললেই তাকে বাবা বলবে না।বুঝেছো? আমি কি বলেছি! বাবা একজনই হয়।আর তোমাদের বাবা হচ্ছেন এই ছবিতে যিনি, তিনি।তাকে ছাড়া কেউ বললেই বাবা ডাকা যাবে না। চকোলেটের লোভেও না।"

সমৃদ্ধের মন বোধহয় একটু গললো।সে ফিরে তাকালো।তার সামনে বসা দুজন অপরাধী।এক মা। আরেকজন তার বাবা। সমৃদ্ধ যত‌ই ছবি দেখে চিনুক,একটু তো খটকা লাগবেই।সে ঐ আলো ছায়ার বারান্দার মাঝে দু'জনকে দেখে একটু ভরকালো। মায়ের পানে চেয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে অভিযোগ করে কাঁদো কাঁদো সুরে বললো,

“ কেন আমাকে নিয়ে যাওনি? আমি ভয় পাই না বুঝি!"

“ কিসের জন্য ভয় পাবে আমার শাহজাদা? _______ রাজকুমার'রা বুঝি ভয় পায়! রাজকুমাররা হয় সাহসী। একেবারে বাঘের বাচ্চার মতো।ভয় পেলে কেউ শাহজাদাকে সম্মান করবে?"

মায়ের কথায় সে মুখটা ছোট করে বলে,

“ কিন্তু ছোত বাবুলা ভয় পায়!"

“ না, শাহজাদারা ভয় পায় না।আর আম্মুর শাহজাদারা তো একবারেই ভয় পায় না। তুমি ভয় পেলে আম্মুকে, বনুকে দুষ্টু লোকের হাত রেখে রক্ষা করবে কে?"

“ আমি কলবো!"

সে নিজের বুকে হাত রেখে বললো।সম্রাট অপলক চেয়ে রয়েছে ছেলের মুখপানে।পারি ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে অগোছালো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বললো,

” দেখো তো এটা কে?"

সমৃদ্ধ মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বাবার দিকে চাইলো, আত্নবিশ্বাসী স্বরে পুলকিত চোখমুখে বললো,

“ বাবা!"

মুহুর্তে সম্রাট ছেলেকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে দুহাতের মাঝে ছোট নরম তুলতুলে মুখটা তুলে ধরে বললো,

“ আরেকবার বলো!"

“ বাবা!"

৩২

দীর্ঘ বিচ্ছেদের অবসানে আজ সম্রাট পারি এক। তাদের ভালোবাসার অস্তিত্বরা তাদের বুক জুড়ে বিচরন করছে।কত ত্যাগ,কত অপমান,কত লাঞ্ছনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে তারা এক মুঠো সুখ পাচ্ছে।

দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দন্ডায়মান পারির দৃষ্টি স্থির ঐ পাঁচ ছয় হাতের বেডে সোজা হয়ে শুয়ে ঘুমে মগ্ন থাকা পুরুষটার উপর।
তার চকচকে মসৃণ গাল দুটোয় আজ দু'টো কাটা দাগ দগদগ করছে। কপালের কোনে তীর্যকভাবে চেয়ে রয়েছে একটি দাগ।মাথার মাঝ বরাবর তার আঠারোটা সেলাইয়ের দাগ। অথচ পারি আজ অবধি এই পুরুষের এমন পাগলামি ভালোবাসার কারণ খুঁজে পায় না।সে-ও তো ঐ মানুষ গুলোর মতোই মনে করে, তানহা তার চেয়ে ঢের বেটার।তানহাই সম্রাটের যোগ্য সঙ্গীনি হতে পারে।অথচ এ যেন এক চমকপ্রদ বিষয়। এই পুরুষের প্রাণপ্রিয়া সে।তার প্রাণভোমরা সে। প্রাণ পাখিটা সে-ই। যাকে ভালোবাসতে, ভালোবেসে বুকের মাঝে মিশিয়ে রাখতে এই লোকটার কতশত পাগলামি। পুরো পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করে। নিজের বাবা মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। নিজের স্বপ্নের চাকরি হারিয়েছে। নিজের ব্যক্তিত্বের বাইরে গিয়েও কত কি ঘটিয়েছে!
একটা মানুষ এত ভালো কি করে বাসতে পারে! পারি তো পারেনি! পারি পারেনি কেন?না পারিও পেরেছে,হয়তো পারির তেমন কোন পিছুটান নেই বলেই তা দেখা যায় না।

ঘন লম্বা দাড়ি আর বড় গোঁফের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া সম্রাটের শ্রী বদনখানা পারির অতি পরিচিত,অতি প্রিয়।তাই এই লোকের এই নতুন রুপ তাকে বিচলিত করেনি ঠিক‌ই কিন্তু ভীষণ হাহাকার। সৃষ্টি করছে অন্তরে।কেননা,এত অগোছালো, অপরিচ্ছন্ন সে এর আগে কখনো এই পুরুষকে দেখেনি।যার শার্টে ভাঁজ পড়তে দেখেনি।অথচ সে কি এলোমেলো হয়ে বেঁচে ছিলো এতগুলো বছর।

পারির চোখে অশ্রু ঠোঁটে হাসি। দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হ‌ওয়ায়। হারিয়ে‌ও তার‌ই থাকার খুশিতে।তার পিতৃত্বের তৃষ্ণা মেটানোর আনন্দ। বাচ্চাদের পিতার স্নেহ পেতে দেখার আনন্দ।

সম্রাটের দুই বাহুতে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে তার দুই সন্তান।সেও বহু বছরের ঘুমে বিভোর হয়ে আছে।

এদিকে বেলা এখন প্রায় বারোটা।পারিজাত ঘুম থেকে উঠছে দশটার সময়। অবশ্য তারা ঘুমিয়েছেই ছ'টার পর। গাজীপুর থেকে ফিরতে প্রায় চারটা বেজে গিয়েছিল।

এখানে ফিরে পারি ফ্রেশ হয়ে আজানের জন্য অপেক্ষা করলেও সম্রাটের দৃষ্টি নড়েনি তার ঘুমন্ত দুই সন্তানের বদন থেকে। অপলক চেয়ে ছিলো। একটু পর পর দুজনকে চুমু দিতো। তাদের ছোট ছোট হাত,পা তুলে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অবাক হয়ে দেখতো।আর বিরবির করে বলতো,

__ওরা সত্যিই এসেছে? সত্যিই আমি আমার সন্তানকে ছুঁয়ে দেখছি? পারি বলো না! আমি কি সত্যিই দেখছি? পিতৃত্বের স্বাদ কি এমন‌ই হয় পারি?
_ পারি বলো, তুমি যখন প্রথম ওদের কোলে নিয়েছিলে তোমার অনুভূতি‌ও কি এমন ছিলো? যেমনটা এখন আমার?

পারি মুখে শব্দ তুলে পারেনি।।তবে খুশিতে সিক্ত টলমলে আঁখি জোড়া দিয়ে তা বুঝিয়েছিল। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো সে একজন পিতার খুশি।যেই খুশিটা সে আরো আগে দেখতে পেতো। অনুভব করতে পারতো। কিন্তু কিছু স্বার্থপর, নোংরা মানুষের জন্য এত দেরি হয়ে গেলো।

অতঃপর আজান দেওয়ার পর এক সঙ্গে সম্রাট, পারিজাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে। এরপর দুই পাশে দুই সন্তানকে রেখে দু হাতে জড়িয়ে মাঝে শুয়ে পড়ে সম্রাট।পারি বাবা, সন্তানদের বিরক্ত না করে সে নিজেও মেয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে।আজ ঘুমটা যে হবে নিশ্চিন্তের, শান্তির,পরিপূর্ণ।

_বাবা!"

ঘুমন্ত বাবার দিকে চেয়ে নিজেদের ছোট্ট ছোট্ট ইঁদুরে দন্তকপাটি বের করে হাসছে বাচ্চা দুটো। তাদের চোখে অবিশ্বাস্য এক পাওয়ার খুশি।যেন তারা ঘুম থেকে উঠে এমন কিছু পাবে,দেখবে তা কখনো ভাবতেই পারেনি। সমৃদ্ধ নিজের দু হাত বিছানায় রেখে সামনের দিকে ভর ছেড়ে উবু হয়ে চেয়ে আছে ঘুমন্ত সম্রাটের মুখপানে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে একবার বাবাকে দেখে আরেকবার মাকে।রাতে সে বোধহয় ঘোরে ছিলো।যেই ঘোর এখন কেটে গিয়েছে।সে ছবিতে দেখে বড় হ‌ওয়া মানুষটাকে এখন নিজের সামনে দেখছে।তার ছোট ছোট আলমন্ড রঙের চোখজোড়ায় বিস্ময়,পুলক।সুখ নিজের ডান হাতের ছোট তর্জনী দিয়ে বাবাকে ছোঁয়।গালে হালকা ছুয়ে আবার দেখে।বাবা ঘুমুচ্ছে।বুঝতে পেরে নিঃশব্দে দু' হাতে তালি মেরে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।আবার নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরে শব্দ বন্ধ করে দেয়।

পারি নিজের দুই সন্তানের প্রতিক্রিয়া দেখছে আর মিটমিট করে হাসছে।বুলি শেখার প্রথম শব্দ‌ই ছিলো ‘বাবা'! অতঃপর যখন ঘরের বাইরে পা রাখতে শিখলো তখন থেকেই তাদের প্রথম জিজ্ঞাসা ছিলো,' বাবা কুতায়!'

বাচ্চা দু'টো বাবা কে? কি করে! তা না বুঝলেও বাবা বলতে কিছু পৃথিবীতে আছে তা তারা বুঝেছিলো। বাবা পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরাপদ ছায়া সন্তানের জন্য।বাবা ছাড়া সন্তানরা কিছু না, তা সে খুব ভালো করেই বুঝে। নিজেকে দিয়ে তো তা সহজেই অনুমেয়। বাচ্চাদের কি বলবে।

সমৃদ্ধ উঠে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে,

_আম্মু, বাবা চলে এসেছে?

পারি মাথা উপরনিচ করে ছোট শব্দে বলে,

_ হুম!"

সমৃদ্ধ কথা শেষ করে আবার দৌড়ে বাবার পাশে বসে। বিছানা দুলছে,কারো ফিসফিস শব্দ শোনা যাচ্ছে।সম্রাটের ঘুম ছুটে গেলো।কপাল কুঁচকে নিয়ে ডান হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরলো। ঠিকঠাক ঘুম না হ‌ওয়ায় চোখ জ্বলছে। মাথা, কপাল ব্যথায় টনটন করছে। সে চোখ খিচে চুপ করে রইলো কীয়ৎকাল, পরক্ষনেই কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিমায় চট করে চোখ মেলে ফেললো। তৎক্ষণাৎ তার দিকে চেয়ে তার মুখের কাছে উবু হয়ে বসা দু'টো মুখ দেখে চমকে গেলো।যারা বিস্ময় নিয়ে তাকেই দেখছে।

__________________________

_ মাম্মা,বেবি গার্ল কোথায়?আসবে না আমার বাড়িতে? আমরা খেলবো তো!"

বুরাক মায়ের পিছু পিছু ঘুরছে আর এভাবে সুখের খোঁজ করছে।সে তো জানে না রাতে সুখরা তাদের বাড়িতেই ছিলো।তন্নীও মজা নিচ্ছে। ছেলেকে বলছেও না। অবশ্য বললেও মুসিবত হয়ে যাবে।দেখা গেল সে শোনা মাত্রই ঐ ঘরের দরজায় গিয়ে বারবার বিরক্ত করবে।তাই আপাতত এভাবেই চুপ থেকে ছেলের ঘ্যানঘ্যানানি সহ্য করছে।

_মাম্মা,বেবি গার্ল কেন চলে গিয়েছে?

_ কারণ তুমি বেবি গার্লকে বকেছিলে! ভুলে গিয়েছো?

বুরাক মনে করার চেষ্টা করলো, মনে না পড়ায় মা'কে জিজ্ঞেস করলো,

_ কখন বকেছিলাম।

_ বকোনি তুমি? তোমার পাপার সামনেই তো বকলে!

_ কিন্তু আমি তো ওকে পিপপিপ বাঁশি দিয়েছিলাম।

_ কাউকে বকে পিপপিস বাঁশি দিলেই বুঝি মিটে গেলো?

এতটুকু বলে তন্নী ছেলের পাশে হাঁটু মুড়ে বসলো। অতঃপর বুঝানোর মতো করে বললো,

____ শোন তোমাকে একটা কথা বলছি, তুমি কিন্তু ওকে বকবেও না মারবেও না। যদি এগুলো করো তবে কিন্তু চাচু খুব কষ্ট পাবে।আর কোনদিন আসবে না আমাদের বাড়িতে। ‌বুঝেছো?

_ তাহলে বেবি গার্লকে আসতে বলো।আমি ঘরঘর খেলবো তো!

_ আসবে, ওয়েট করো। তোমার বেবি গার্লের সঙ্গে তোমার জন্য আরো একটা সারপ্রাইজ‌ও আসবে।বুঝেছো!"

_ ছাপপাইজ! কখন আসবে মাম্মা ছাপপাইজ!

_ অপেক্ষা করো বাবা।আসবে।এখন চলো কিছু একটা খাও।সেই সকালে শুধু একটু জুস খেলে।এখন যদি না খাও তবে আমি বেবি গার্লকে আসতে বলবো না।

মায়ের লোভনীয় প্রস্তাবে বুরাক বেশি মর্জি করলো না। মায়ের হাতের মুঠোয় হাত রেখেই খাবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো।

ডাইনিং এ এসে তন্নীর মনে হলো পারিদের ঘুম থেকে তোলা উচিত।বারোটা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সকালের নাস্তা তো হলোই না।দুপুরেও দেরি হয়ে যাবে।

__________________________________

এদিকে ঘরের ভেতরে,

সুখ, সমৃদ্ধ দুই ভাই-বোন বাবার দুই পা'য়ের থাইয়ের উপর বসে অপলক চোখে দেখছে। তাদের বিস্ময় কাটে না।এক‌‌ই ভাবে সম্রাট‌ও দেখে যাচ্ছে।চোখ মেলেই যখন সে তার সন্তানদের মুখটা দেখলো অপ্রার্থিব সুখে তার দেহমন শীতল হয়ে গেলো। সমস্ত ক্লান্তি, দৈহিক পীড়ন মুহূর্তে উবে গেলো। চনমনা হয়ে উঠে দেহের প্রতিটি কোষ।
সে চট করে উঠে বসলো,বিস্মিত চাহনি প্রকট করে সবার আগে বললো,

_ শুভ সকাল, আমার আম্মা আব্বা।

কেউ শুভ সকাল বললে তাকেও শুভ সকাল বলতে হয়।এটা দুই ভাই বোন জানে। সমৃদ্ধ তাই করলো। এদিকে সুখ আবারও নিজের মুখ চেপে ধরে হাসলো।
সম্রাট দু হাত দিয়ে দুজনকে তুলে নিজের দু থাইয়ের উপর বসিয়ে কপালে চুমু দিলো। অতঃপর বললো,

_কখন উঠেছেন আপনারা?

উত্তরটা পারিই দিলো।

_ অনেক সময় হয়েছে। কিন্তু এখান থেকে নড়ছেই না।যেন নড়লেই বাবাকে হারিয়ে ফেলবে।

কথাটা বলেই পারি মুখটা ছোট করে ফেললো।সম্রাট এক নজর পারির ঐ মেঘাচ্ছন্ন মুখটা দেখে আবারও নিজের ছেলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো।

সুখ বাবার মুখটা নিজের দুহাতের আঁজলায় রেখে জিজ্ঞেস করলো,

_ বাবা, তুমি আবাল চলে যাবে?

সম্রাট মেয়ের প্রশ্নে থমকালো। অতঃপর কপালে চুমু দিয়ে আস্বস্ত করে বললো,

_ বাবা আর কোথাও যাবো না আম্মা। আপনাদের বাবা আপনাদের সাথেই থাকবে।

_ বাবা; আমাদেল ছাথে থাকবে? আল আমলা একছাথে বেলাতে যাবো!একছাথে খেলবো! তাই না বাবা?

সমৃদ্ধ বিস্ময় প্রকাশ করলো।তার প্রশ্নে সম্রাট হাসলো।একই ভাবে বুকের সাথে চেপে ধরে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে ছেলেকেও আস্বস্ত করলো,

_ হ্যাঁ আব্বা।আপনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই হবে।

_ বাবা,আমলা ফুতবল খেলবো।কিকেত খেলবো।পাল্কে গিয়ে দুলনায় চলবো। ঠিক আছে বাবা!

_ হ্যাঁ। বাবা।

পারি বাবা সন্তানদের মাঝে ঢুকে বললো,

_ আচ্ছা সব করো,এখন আগে মুখ ধুয়ে পরিষ্কার হ‌ও। কিছু পেটে দাওনি এখনও!

_ কি বলছো কি? কত বেলা হয়ে গিয়েছে!

_ আমি কি করবো? উঠলো‌ই তো খানিকটা সময় আগে।তাও যাবে না কোথাও , জেদ চেপে বসেছিল।

_ যান উঠেন আপনারা। তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে নিন । খেতে হবে।

সম্রাট ছেলে মেয়েকে তাড়া দিলো।পারি মেয়ের হাত ধরতেই সে হাত ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে বাবার দিকে ঘেঁষে বললো,

_ আমি বাবাল কাছে ধুবো।

_ আমায় বাবা মুখ ধুয়ে দিবে।

সমৃদ্ধ‌ও এক‌‌ইভাবে বললো। সম্রাট ছেলে মেয়ের জেদ দেখে পারির দিকে চাইলে পারি একপলক দৃষ্টি মিলিয়ে মেয়ের হাত ধরে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বললো,

_ বাবা পারবে না মা।

_ না আমি বাবাল কাছে ধুবো!

_ রাখো তুমি,আমি পারবো!"

বাবা পারবে না কথাটা যেন গায়ে লাগলো।কেন সে পারবে না? নিশ্চয়ই পারবে! সব কি মায়েরাই পারে কেবল!বাবারাও পারে। সম্রাট‌ও পারে।পারিজাত কি ভেবেছে সে তার সন্তানদের যত্ন নিতে অক্ষম! অসম্ভব।এই নারীর এই ভুল ধারণা ভাঙতে হবে। অতঃপর তাকে বেস্ট বাবা হতে হবে।হবেই হবে।

দু'জনকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বাথরুমে ঢুকলো। পিছু পিছু পারিও ঢুকলো।পারি তাদের ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে রইল।সম্রাট ভাবছে কি দিয়ে শুরু করবে। একসাথে তো দু'জনকে ব্রাশ করানো সম্ভব নয়। একজন একজন করে করতে হবে।তবে কাকে দিয়ে আরম্ভ করবে!

_ একজনকে কমোডে বসিয়ে দাও।দেখো কে পটি করবে!

সম্রাট বাথরুমের দিকে মুখ ফিরিয়ে পারিকে দেখলো অতঃপর পারির হাত থেকে ব্রাশ নিয়ে বললো,

_ তুমি যাও।আমি আমার মতো করে বুঝে নিবো!

বলেই পারির মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিলো।পারি হতবাক হয়ে গেলো এহেন কান্ডে। অতঃপর দরজায় চাপড় মেরে বললো,

_ পরে আমাকে ডাকলে কিন্তু আসবো না।বলে দিচ্ছি।

এর ঠিক দুই মিনিট পরেই পারি বলে চেঁচিয়ে উঠলো।পারি দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো।সে তো জানে একসাথে দু'টো বাচ্চাকে পরিষ্কার করা মুখের কথা না। তা-ও আবার অনভিজ্ঞ পুরুষের জন্য।

_ একটু দেখো না। কিভাবে ওকে পটি..

আর বললো না।পারি হেঁসে দিলো সম্রাটের দুই মিনিটের মধ্যে কাহিল হ‌ওয়া দেখে।
পারি ভেতর ঢুকে বললো,

_ বলছিলাম।যাই হোক,দেখি আমাকে দেখতে দাও।

সমৃদ্ধ কমোডে বসার আগেই কাজ সেরে ফেলছে।প্যান্ট মেখে ফেলেছে। যেটা সম্রাটকে বিচলিত করে ফেললো।এটা বাচ্চাদের স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সে তো এটা আগে করেনি।তাই একটু বিচলিত হলো।পারি টিস্যু দিয়ে প্রথমে পরিষ্কার করে পরে পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে দিলো। সম্রাট সবটা ভালো করে খেয়াল করে শিখে নিলো। এদিকে সে মেয়েকে কোলে তুলে সুন্দর করে ব্রাশ করিয়ে দিচ্ছে।সুখ একটু একটু করে থুতু ফেলছে আর বাবাকে দেখছে।হাত নাচিয়ে নাচিয়ে কিসব বলছে।সম্রাট মেয়ের কথা শুনে মিষ্টি করে হাসছে।পারি বাপ মেয়ের কথায় কান না দিয়ে ছেলেকে পরিষ্কার করিয়ে ব্রাশ করানোর কথা বলতেই সে জেদ ধরলো,

_ বাবার হাতেই ব্রাশ করবে।

_ ওর ব্রাশ করা হলে আমাকে দাও।ওকে এখন ব্রাশ...

_ না!

মায়ের কথা শেষ হবার আগে সুখ না বলে দিলো। অর্থাৎ সে মায়ের কোলে এখন যাবে না।আর কি! অতঃপর সম্রাট মেয়ের দাঁত ব্রাশ করানো শেষ করলো তড়িঘড়ি করে এরপর মুখ ধুয়ে তার মায়ের কোলে দিয়ে ছেলেকে এক‌‌ই ভাবে পরিষ্কার করলো।এতে করে সে নিজেই পুরো ভিজে জবজবে হয়ে গেছে।এখন কি করবে! তার তো কাপড়‌ও নেই এখানে যে গোসল করবে!

_ দু'টো বাচ্চাকে একটু মুখ ধুয়াতে গিয়ে পুরো নেয়ে সাড়ছে।আবার আসছে আমি পারবো বলতে!

_ তুমি বোধহয় খুব শুকনো থাকো।

_ আলবৎ থাকি।আমি কি ভিজেছি, দেখো!

_ হয়েছে! এখন আমি কি করবো সেটা বলো!

_ গোসল ছাড়া আর কি উপায়!

_ তাহলে পরবো... এক কাজ করো তোমার ওড়নাটা দাও।সেটা পরে আগে আপাতত গোসল সাড়ি তারপর ব্যবস্থা করছি।

পারি তাই করলো‌। তার সঙ্গে বেশি কাপড় তো নেই।নিজের পরনে থাকা ওড়নাটাই দিলো। এদিকে দরজায় কড়াঘাত হতেই পারি দরজা খুলে দিলো।

_ বেবি গালকে ডাকো মাম্মা।

দরজা খুলতেই পারি সবার আগে এই বাক্যটা শুনতে পেলো।সে হেসে দিলো বুরাকের আধেলা বুলিতে তার মেয়েকে বারবার বেবি গার্ল ডাকায়।

বেবি গার্ল শব্দ কানে যেতেই সুখ উঁকি দিলো দরজার দিকে। অতঃপর ফোকলা হেঁসে বললো,

_ বুলাক ভাইয়া,আমি একানে!

বুরাক দৌড়ে সুখের সামনে গিয়ে দাড়াতেই সমৃদ্ধকে চোখে পড়লো। সমৃদ্ধ‌ও তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে।বুরাক চমকে যাওয়ার ভঙ্গিতে দু হাত উঁচিয়ে তালি দেওয়ার মতো করে বলে উঠলো,

_ মাম্মা আরেকটা বেবি বয় এসেছে।দেখো মাম্মা।

বলেই সে নিজের মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে হাত ধরে টানাটানি করছে আর বারবার সমৃদ্ধের দিকে ইশারা করছে।

এদিকে সুখ বিছানা থেকে হিচড়ে নামলো।বেশ দাম্ভিকতায় বললো,

_ এইতা আমাল ভাইয়া, বুলাক ভাইয়া।

বুরাককে দেখে চোখ পিটপিট করে চেয়ে থেকেই সমৃদ্ধ তার মায়ের কাছে গিয়ে আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে র‌ইলো।আড়চোখে বুরাককে দেখছে।পারি ছেলেকে সহজ করতে হাত ধরে বুরাকের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে পরিচয় করালো,

_ বাবা,ভয় কেন পাচ্ছো।ভয়ের কিছু নেই তো মনা।ও তো ভাই হয় তোমার।ভাইকে কেউ ভয় পায়!

_ কে কাকে ভয় পাচ্ছে?

বাথরুম থেকে বেরিয়েই সম্রাট এদিকে চেয়ে প্রশ্নটা করে। পরনে ওর রাতে বাপ্পীর দেওয়া কালো ট্রাউজার আর ধূসর টি-শার্ট।মাথা মুছতেছে পারির ওড়না দিয়ে।এটা দেখে তন্নী জিভ কাটলো, লজ্জিত ভঙ্গিতে বললো,

_ ইস্,স্যরি রাতে তোয়ালে দিতে ভুলেই গিয়েছি।আমি এখুনি নিয়ে আসছি।

_ এই লাগবে না আর। আমি একটু পর‌ই বের হবো,তখন কাপড় নিয়ে আসবো।

_ আচ্ছা! স্যরি ভাইয়া।সত্যিই মনে ছিলো না।

_ ইটস ওকে তন্নী।এটা সাধারণ ব্যাপার।

তন্নী লজ্জিত হাসলো। অতঃপর পারিকে তাড়া দিয়ে বললো,

_পারি তাড়াতাড়ি ওদের নিয়ে আসো।খাওয়াও বাচ্চা দু'টোকে।

তন্নী চলে গেলো। এদিকে একটু পর‌ই বের হবো।কথাটা সুখের কানে ঢুকতেই সে ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,

_ তুমি কুতায় যাবে বাবা? কেন যাবে!

কথা শেষ হবার আগেই তার গাল ভিজে গিয়েছে। কন্ঠস্বর ভারি হয়ে উঠলো। অর্থাৎ এই মুহূর্তে সে চিৎকার করে কান্না করে দিবে।পারি আবশ্যক বিপদের সংকেত পেতেই মেয়ের দিকে এগিয়ে গেলো ততক্ষণে মেয়ে তার বাবার বুকে আশ্রয় নিয়েছে।সম্রাট মেয়ের গাল মুছিয়ে,কপালে চুমু দিয়ে আদুরে গলায় বললো,

_ কোথাও যাবো না আম্মা।ঐটা তো এমনি এমনি চাচীমনিকে বলেছি। মজা করেছি।

সুখের বিশ্বাস হলো না।সে ছোট দু'হাতে বাবার গলা শক্ত করে জড়িয়ে থাকলো। সমৃদ্ধ এসে বাবার কোমর পেঁচিয়ে ধরলো।এদের দিকে গোলগোল চোখে চেয়ে রয়েছে বুরাক।পারি‌ও দেখছে ছলছল নয়নে।

_____________________

সম্রাট তার সমৃদ্ধ, সুখকে খাইয়ে দিচ্ছে।আর পারি খেতে খেতে বাবার সাথে ছেলে মেয়ের গল্প শুনছে
তারা যেন গল্পের পসরা মেলে বসেছে। সুখ বরাবরই হাত নাচিয়ে নাচিয়ে কথা বলে। মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বোঝায়। প্রতি কথায় একটা প্রশ্ন রেখে যায়।আবার সেটার উত্তর‌ও তাকে দিতে হয়।

সম্রাটের সামনে কেউ হাত নাচিয়ে কথা বললে সে ভীষণ বিরক্ত হতো।এমনকি ম্যানার্সলেস বলেও সম্বোধন করতো।সে এখন দিব্যি হাসি মুখে, প্রশান্ত নয়নে মেয়ের কথা শুনছে।সুখের গল্প শেষ হয় না।
বলতে হয় সুখ হচ্ছে বাকপটু। এতটুকু মেয়ের কতশত গল্প থাকে। প্রশ্ন যেন শেষ হতেই চায় না। এদিকে সমৃদ্ধ শান্ত, চুপচাপ স্বভাবের।সে আপনমনে খেলে। কাউকে বিরক্ত করা তার ধাতে নেই। বরং তাকে কেউ বিরক্ত করলে সে চটে যায়।সে একাকী খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। খাওয়ার সময়েও তার মর্জি কম। সেখানে সুখকে খাওয়াতে পারিকে বরাবরই কৌশলী হতে হয়।তার দু'টো সন্তান,জমজ সন্তান। অথচ দু'জনের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট বোঝা যায়।
সমৃদ্ধ এই অল্প বয়সেই বুঝদার।তাকে কিছু বুঝিয়ে বললে একদম জেদ করে না। ঐদিকে সুখ আগাগোড়া জেদি। তার কথা শোনা লাগবেই। বুঝিয়ে বললে তৎক্ষনাৎ শান্ত হলেও তার মন থেকে মুছে যায় না কিছু।
কথা বলা শুরু থেকেই সমৃদ্ধকে পারি বুঝিয়েছে সে বড় ভাই,সুখ তার ছোট বোন।ব্যস্।এতেই হয়ে গিয়েছে। অতটুকু বাচ্চা ছেলে। কি বুঝেছে আল্লাহ জানে। সে ভীষণ গুরুগম্ভীর ভাবে বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করে। সবসময় সুখের হাত নিজের মুঠোয় রাখে। নিজের পাত থেকে তুলে সুখকে দেয়।যদিও তাদের এখনো তার মা'ই খাইয়ে দেয়। তবুও ছোট সমৃদ্ধের চোখেমুখে দায়িত্ব পালনের দৃঢ় প্রত্যয় ফুটে উঠে।

_ বাবা, তুমি জানো ছুখ দুততুমি করে আল বালবাল ব্যথা পায়!

বোনের নামে নালিশ।সুখ ভাইয়ের নালিশ দেওয়া দেখে গাল ফুলায়।দু হাত বুকে বেঁধে ফোঁস করে গাল ফুলিয়ে বললো,

_ আমি দুততুমি করি না ভাইয়া। তুমি মিত্যা বলো কেন?

_ তাহলে তুমি কেন ব্যতা পাও বলো?

সমৃদ্ধ বোনের দিকে চেয়ে কপাল কুঁচকে বলে। সুখ ভাইয়ের উত্তরে বলে,

_ আমি দুততুমি করিনা। পুতুল আমাকে ফেলে দেয়।আল আমি ব্যতা পাই!

_ আম্মু বলেছে না, পুতুল পঁচা। পুতুলকে খেলতে না।

সম্রাট নিজের জমজের তর্কবিতর্ক শুনছে।যদিও সবটা তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তবে এতটুকু বুঝেছে কারো সাথে খেলতে গিয়ে ব্যথা পায় আর তা নিয়েই এত বাকযুদ্ধ।

সে রুটির শেষ টুকরোটা ছেলের মুখের সামনে ধরে।

_ খেতে বসলে এত কথা বলতে হয় না মনা।খাবার গলায় আটকে যাবে।

_ আমি খাবো না।

সমৃদ্ধ মুখ ফিরিয়ে নেয়।সম্রাট হাত দিয়ে ছেলের গালটা আলতো ভাবে চেপে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে বললো,

_ খেতে হবে।এক পিস রুটি দুই ভাইবোন মিলে শেষ করতে পারছো না।
তোমরা ফিট হবে কিভাবে!

ভাইকে চেপে খাওয়াতে দেখে সুখ আলগোছে চেয়ার থেকে নামার চেষ্টা করছে।সম্রাট আড়চোখে মেয়ের পন্ডিতি দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো। অতঃপর কোমর চেপে নিজের কোলের উপর বসিয়ে আটকে দিলো।সুখ হাত দুটো শূন্য বাড়িয়ে বাবার সাথে জেদ ধরে বলছে,

_ আমি খাবো না।

_ খেতে হবে আম্মা। এতটুকু খাবার না খেলে আপনি সুস্থ থাকবেন কি করে?

পারি অপরপাশে বসে মিটি মিটি হাসছে বাবার সাথে ছেলে-মেয়ের যুদ্ধ দেখে।মনে মনে বলছে,

_ এখন বোঝো কেমন লাগে! কাল তো খুব বলেছিলে, ছেলে মেয়েকে খাওয়ানো তেমন কি ভারি কাজ?

কলা গোল স্লাইস করে কেটে তার উপর মধুর একটা পোর্শন দিয়ে তার উপর কিসমিস জেলি, বাদাম,সাদা তিল, কোকো পাউডার ছিটিয়ে হালকা ব্রেক করে স্মুথি একটা ডেজার্ট বানিয়েছে তন্নী। এটা মূলত বাচ্চাদের জন্য উপকারী ভেবেই বানিয়েছে। দেখতে লিকুইড চকোলেটের মতো দেখায়, যে কারণে বাচ্চারা লোভে পড়েই চেটেপুটে খায়।
মিক্সড হানিনাট জেলি দিয়ে পাউরুটি খাইয়ে সম্রাট দুজনকেই এটা খাওয়ালো।রুটি খাওয়ানোর সময় যুদ্ধ করতে হলেও এটার সময় দু'জন‌ই শান্ত ছিলো। তবে ডিম খায়নি একজনেও।পারি নিজের নাস্তা সেরে লিভিং রুমে গিয়ে আরামসে বসেছিলো।সম্রাট ডিম খাওয়াতে ফেইল তো হয়েছেই সঙ্গে বাচ্চাদের সঙ্গে প্রথম যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পারির পাশে গিয়ে শব্দ তুলে ধপ করে বসে পড়ে।পারির কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিতেই পারি শব্দ করে হেঁসে উঠলো। অতঃপর, সম্রাট মাথা তুলে চোখ রাঙিয়ে পারির দিকে চাইতেই পারির হাসির জোর আরো বেড়ে গেলো।তা নিয়ে দেখে সম্রাট ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো,হতাশ গলায় বলে,

_ স্বামীর দুর্দশা দেখে হাসে কেবল তোমার মতো নিষ্ঠুর স্ত্রী।

_ হাহ্! কেন? কাল তো খুব বলেছিলে, বাচ্চাদের খাওয়ানো তেমন কোন বিষয়‌ই না। একটু আদর করলেই ওরা চুপচাপ খেয়ে নেয়!
___ শোন দুনিয়ার অন্যসব বাচ্চাদের কথা‌ও যদি বলতে আমি চুপচাপ মেনে নিতাম। কিন্তু এটা তোমার বাচ্চা! আফটার অল...

পারির খোঁচায় সম্রাট চোখেমুখ কুঁচকে ফেললো।

_________________________________________

এদিকে বুরাক সুখের পিছনে পিছনে আসছে আর বলছে,

_ এ্যাই বেবি গাল তুমি খেলবে না? চলো ঘরঘর খেলি!
__ বেবি গাল হাউজে যাবে?

সমৃদ্ধ তখন থেকেই দেখছে তার বোনকে বেবি গার্ল ডাকছে ছেলেটা।তার মোটেই এই ডাকটা পছন্দ হচ্ছে না।সে বুরাক ধরে রাখা সুখের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। বোনের সামনে দাঁড়িয়ে রক্ষাকারী ভাইয়ের মতোই বললো,

_ আমার বনুকে বেবি গাল বলবে না।আমার বনু এইটা।ওর নাম ছুখ।বেবি গাল বলবে না।

তন্নী ডাইনিং টেবিলে বসে শাক বাছছিল।এদের কথায় চোখ বড় বড় করে ফেললো। সমৃদ্ধের চোখেমুখে ভাসছে তার বোনকে রক্ষা করার অভিপ্রায়।যেন বোনকে কোন ক্ষতিকর বিষয়ের মুখ থেকে উদ্ধার করতেই হবে।বুরাক সেকেন্ড খানিক ঠোঁট চেপে চুপ করে রইলেও সেও আক্রমণাত্মক ভাবে সুখের হাত ধরে টানাটানি শুরু করে বললো,

_ এইতা আমার বেবি গাল। তুমি যাও পঁচা বেবি বয়।

_ না,এইতা আমার বনু। তুমি পঁচা ছেলে।আমার বনুকে ধলবে না।

বলেই সে আবারও হাত ছাড়ানোর জন্য টান দিলো।এবার সে বোনের দুই হাত ধরে রেখেছে।সুখ মাঝে । একদিকে বুরাক টেনে নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে রাখছে তো আরেকদিকে তার ভাই দেওয়াল হয়ে বাঁধা সৃষ্টি করছে। সে এদের টানাটানিতে ব্যথা পেলো। অতঃপর সে গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলো।
পারিজাত,সম্রাট লিভিং রুমে খুনসুটিতে ব্যস্ত ছিলো।মেয়ের কন্ঠস্বর শুনে ছুটে এদিকে আসে।

_ কি হয়েছে?

তন্নী প্রথমে বুঝতে পারেনি ঘটনা এতদূর গড়াবে। কিন্তু যতক্ষনে বুঝেছে ততক্ষণে সুখের কান্না পুরো অ্যাপার্টমেন্ট কাঁপিয়ে দিয়েছে।

_ আর কি? একজনের বেবি গাল, আরেকজনের বনু। বনুকে বেবি গাল ডাকা যাবে না।আর বেবি গালকে বনু বলবে না।

_ কি সব বলছো? মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে আমার!

তন্নী পারিজাত,সম্রাটের বিভ্রান্ত বদন দেখে শব্দ করে হাসে। অতঃপর সবটা বুঝিয়ে বলায় সম্রাট কোমরে হাত রেখে নিজের ঐ এক ছটাক ছেলের পানের চাইলো। ছেলেটার চোখেমুখে কেমন গুরুগম্ভীর আভা।দৃঢ় তার সিদ্ধান্ত। যেন তার বোনকে ছুলেই সে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিবে।
কেমন একটা ভালো লাগা অনুভূতি সম্রাটের অন্তরটাকে শীতল করে দিলো।ছোট বেলায় সেও এমন ছিলো। বোনদের বিষয়ে তার বরাবরই নজরদারি বেশি ছিলো।তার বোনেরা কার সাথে খেলবে, মিশবে সবটাই তার সিদ্ধান্তে হতো‌।বোনেরাও অবশ্যই সেই সম্মান দিয়েছে। কখনোই তার বিরুদ্ধে যায়নি।এখনো না।
তার ছেলেটার মাঝেও সেই গুণ দেখে স্বাভাবিক ভাবেই পিতা হিসেবে তার ভালো লাগা কাজ করছে।পারি ছেলের হাত ধরে নিজের দিকে টেনে নিয়ে কিছু বলবে তার আগেই সম্রাট মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। অতঃপর ছেলের হাত ধরে লিভিং রুমে যেতে যেতে পারিকে বললো বুরাককে নিয়ে আসতে।

সুখ বাবার কোলে উঠতেই চেঁচানো বন্ধ করলেও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।তা দেখে সম্রাট মেয়ের চোখের পাতায় চুমু দেয়,আদুরে হয়ে বলে,

_ আমার প্রিন্সেস কেন কাঁদছে?

_ ভাইয়া,বুলাক ভাইয়া মালামালি কলে।আমি ভয় পাই!

ঠোঁট ফুলিয়ে ফুলিয়ে কাঁদছে আর হাত নেড়ে নেড়ে কথাগুলো বলছে।সম্রাট মেয়ের মাথাটা বুকের সঙ্গে আলতো করে চেপে ধরে বুঝিয়ে বলতে থাকে,

_ আচ্ছা ঠিক আছে এখন তুমি থামো।আমি দু দু'জনকে‌ই বকে দিচ্ছি যেন আর মারামারি না করে।আমার প্রিন্সেস ভয় পায়।
_______ঠিক আছে এখন থামো।

সুখ বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে‌ই ফুপানো বন্ধ করে।তবে মাঝে মাঝে নাক টানার আওয়াজ করছে।

_ এখন বলো কি হয়েছে? দু'জন কি নিয়ে ফাইট করছো?

সম্রাট মেয়েকে কোলে বসিয়ে ছেলেকে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলো। সমৃদ্ধ কপাল কুঁচকে বুরাককে দেখলো। অতঃপর নালিশ দেওয়ার অভিপ্রায়ে বললো,

_ বনুকে বেবি গাল বলে।

_ তার জন্য ফাইট করছো?

_ আমি ফাইত করি না বাবা।ও পঁচা বয় বলেছে আমাকে আর বনুকে বেবি গাল বলেছে!

_ আচ্ছা।বেবি গাল বলায় তোমার খারাপ লাগছে?

_হুম!

সমৃদ্ধ মাথা উপরনিচ করে বললো।সম্রাট তন্নীর দিকে চাইলো,সে মিটিমিটি হাসছে। ঐদিকে পারিজাত ছেলের দিকে অবাক,হতবাক চোখে চেয়ে রয়েছে। সম্রাট দৃষ্টি ঘুরিয়ে বুরাককে দেখলো।তার চোখেমুখে এখনো আক্রমণাত্মক ভাব। মানে সেও ক্ষেপেছে।
সবার অবস্থা দেখে ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকলো,

_ কিন্তু বাবা তাতে কি হয়েছে? বেবি গাল তো খারাপ কিছু না!

_ না ও বনুকে বেবি গাল বলবে না।এইতা আমার বনু না?

ফোঁস আওয়াজ তুলে শ্বাস ছাড়লো সম্রাট।ছেলের রোগ ধরতে পেরেছে।এক‌ই রোগ। বাপের রোগে আক্রান্ত হয়েছে ছেলেটা। তা-ও এখন তো বুঝাতে হবে।তাই সে বলতে লাগলো,

_ শোন বাবা। তোমরা দুজন ফাইট করবে না আর।বুঝেছো?

হয়তো বুঝেনি তাই কোন পরিবর্তন দেখা গেলো না।সম্রাট নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে এবার‌ও অবাক হলো।ছেলে তা নড়চড় করে না সিদ্ধান্ত থেকে।

_ বাবা আমার,এত জেদ করতে হয় না। শোন বেবি গাল খারাপ কথা না। তুমি জানো বেবি গাল মানে কি? বেবি মানে বাচ্চা মানে বাবু।আর গাল মানে মেয়ে।তাহলে বেবি গাল মানে হলো মেয়ে বাবু। তুমি আর বনু কি বাবু না?
____ তুমি‌ই তো কাল বলেছিলে তুমি বাবু? তো এখন কি হলো?

সমৃদ্ধ বাবার কথাগুলো বুঝেছে হয়তো।তার চোখেমুখের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন হয়েছে। তা-ও সে চুপ। সম্রাট বুরাককে ডাক দিলো,

_ বাপ এদিকে আয় তো!

_ বাবা বলবা না!

বলেই সে সম্রাটের কাঁধে চাপড় মারলো।সম্রাট আহাম্মক হয়ে গেল ছেলের কথায়। বিস্মিত গলায় শুধোয়,

_ বাবা ডাকা যাবে না?

_ না,ওকে বাবা বলবা না!

_ কেন?

_ আমি বাবা না!

_ হ্যা তুমিতো আবার বাবা‌ই কিন্তু তাতে কি....মানে তোমাকে ছাড়া কাউকে বাবা ডাকা যাবে না!

_ না!

চেঁচিয়ে উঠলো। শান্ত-শিষ্ঠ সমৃদ্ধ ক্ষেপে গিয়েছে।সে হাত ছুঁড়ে জেদ চেপে ছলছল চোখে চেয়ে রয়েছে বাপের দিকে। সম্রাট ছেলের ভেজা চোখ দেখে মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে পাশেই বসালো। অতঃপর ছেলেকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বুকের উপর চেপে ধরল।ছেলের গালে,কপালে চুমু দিয়ে বললো,

_ আচ্ছা ঠিক আছে। তোমাকে ছাড়া কাউকে বাবা ডাকবো না। তা-ও তুমি কেঁদো না। আল্লাহর দোহাই লাগে।তোমরা দুই ভাই বোন কেঁদো না।বাবার কষ্ট হয়।

সমৃদ্ধ লাল চোখে বুরাকের দিকে চেয়ে রয়েছে।বুরাক‌ও তাই। সম্রাট ছেলেকে শান্ত করে সোজা করে বসিয়ে দিলো।বুরাককে টেনে এনে নিজের অপর পায়ের উপর বসিয়ে দিয়ে ছেলের দিকে চেয়ে বললো,

_ বাবা,বুরাক ভাইয়া হয় তোমার।ভাইয়ার সাথে কোন বিষয়ে ফাইট করতে হয় না।
আর বেবি গাল পঁচা কথা নয়। তুমি যেমন বনু ডাকো।তেমনি ভাইয়া‌ও বেবি গাল ডাকে। এখানে রাগ করতে নেই।এখানে বনু যেমন তোমার বনু,তেমনি বুরাকের‌ও।বুঝেছো?

_ হু!

সমৃদ্ধ মাথা উপরনিচ করে ইশারায় বুঝায়।সম্রাট আগের মতো করেই বললো,

_ এখন তোমরা দুজন ফ্রেন্ডশিপ করবে। ঠিক আছে?
___ চাচু,ভাইকে স্যরি বলো।

_ সলি!

_ বাবা, তুমি‌ও স্যরি বলো!

_ সলি!

দু'জনেই গাল ফুলিয়ে রেখেছে।সম্রাট এই চার রত্তির ইগো ম্যানদের দেখে এক চিলতে হাসলো। অতঃপর বললো,

_ হাত মেলাও দু'জন! বলো বন্ধু আজ থেকে!

_ কিন্তু আমার বন্ধু আছে বাবা!

সমৃদ্ধ বলেই বাবার দিকে তাকালো।মানে সে বুরাকের সাথে বন্ধুত্ব করবে না। মায়ের দিকে পা
ফিরে বললো,

_ আমার অনেকগুলো বন্ধু না আম্মু বলো!

ছেলের পন্ডিতি বুঝতে পেরে পারিজাত পাশ থেকে বললো,

_ তাতে কি হয়েছে? বুরাককেও বন্ধু বানিয়ে নাও। তাছাড়া...

মায়ের পুরো কথা শোনার ধৈর্য্য নাই।কেননা মা সাপোর্ট দিচ্ছে না। সম্রাট ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো,

_ আপনার বন্ধুরা কোথায় বাবা?

_আমাদেল বাসায়, অনেক বন্ধু!

সে হাত দুটো প্রসারিত করে দেখালো।তার বাসা বলতে তারা এতদিন যেখানে ছিলো সেখানকার কথাই বলছে বাচ্চাটা।সম্রাট ছেলের মাথাটা বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে আলতো গলায় বললো,

_ আচ্ছা ব্যাপার না।সেখানেও বন্ধু আছে।এখানেও থাকুক।
____ এখন তুমি ভাইয়ার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করো তো। তোমাদের ফ্রেন্ডশিপ হলেই বাবা গিফট দিবো। দু'জনকেই। কিন্তু ওয়াদা করতে হবে যেন আর কোনদিন দুজন ফাইট না করো!
নাও সে ফ্রেন্ড!

_ ফেনদ!

_ফেনদ!

প্রচন্ড অনীহায়েও গিফটের লোভে দুজন সমঝোতা করলো।সুখ ফ্যালফ্যাল চোখে শুধু দেখলো।পারিজাত সোফায় হেলে কাত হয়ে বসে গালে হাত ঠেকিয়ে বললো,

_ এই জন্যই বলে, রক্ত কথা বলে।আজ অবধি আমি ছেলেকে এত জেদ করতে দেখিনি।অথচ আজ ..... বাপরে।

বাচ্চাদের মিটমাট করিয়ে খেলতে পাঠিয়ে দিলো।তন্নী কিচেনে।সম্রাট পারির কাঁধে হাত রেখে পারিকে নিজের কাছে টেনে নিলো। আপাতত লিভিং রুমে কেবল তারা।সে পারির গলায় মুখ গুজে দিলো। চিবুক থেকে লেহন করতে করতে পারির বক্ষবিভাজন বরাবর নামলো।আলতো কামড়ে পারির বক্ষখাজের মাংসপিণ্ড আঁকড়ে ধরে বিরবির করে বললো,

__ বাচ্চারা ব্যস্ত আছে।আমার এখুনি যাওয়া উচিত নয়তো..

কথা শেষ করেই পারির কায়ায় শিহরণ তুলে গাঢ় ছন্দে চুম্বন করলো। অতঃপর চট করে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বললো।

_ আসছি। সাবধানে থেকো।

বলেই সে মুঠোফোন হাতে তুলে দরজার দিকে পা বাড়ালো।পারি কুশন তুলে পিঠ বরাবর ছুঁড়ে মারলো। মৃদু শব্দে বলে,

_ অসভ্য লোক।আমাকে অস্থির করে এখন...

পারির কথায় সম্রাট ঠোঁট কামড়ে হাসলো। দীর্ঘ সময়ের তৃষ্ণা।এত সহজে কি আর মিটে। কিন্তু উপযুক্ত সময় তো এখনো আসেনি যে জাপ্টে ধরবে।সময় সুযোগ বুঝেই সে ঝাঁপিয়ে পড়বে তৃষ্ণা মেটাতে।

৩৩
_বাবা কুতায়?

সমৃদ্ধ মায়ের ওড়নার কোনা মুখে চেপে ধরে মৃদু চেঁচিয়ে কাঁদছে আর বাবার খোঁজ জিজ্ঞেস করছে। পারিজাত অসহায় চোখে চেয়ে রয়েছে ছেলের ভেজা মুখের দিকে। কি অবস্থা এতটুকু বাচ্চার। সে আওয়াজ করে কাঁদবে না, কখনো আওয়াজ বেরিয়ে গেলে এভাবে মুখ চেপে রাখে যেন শব্দ বেরুতে না পারে। কোথায় থেকে এই বুদ্ধি আবিষ্কার করেছে, তা আল্লাহ মালুম।
এদিকে তার বোন বিছানায় গড়াগড়ি খাবে, হাত পা ছোড়াছুড়ি করবে, চাঁপা কাঁদবে, কাঁদতে কাঁদতে হিচকি তুলে নাক মুখ সর্দি দিয়ে ভাসিয়ে ফেলবে। কখনো কখনো বাচ্চা দুটো এত জেদ করে যে পারির ভীষণ বিরক্ত লাগতে শুরু করে। ইচ্ছে হয় এদেরকে রেখে একাকি কোথাও চলে যেতে। কিন্তু যাবে কোথায়? তার তো বাবার বাড়িও নেই।
এসব মনে পড়লেই তার বুকে হাহাকার জেগে উঠে। দু'টো বাচ্চাকে সে কীভাবে এই পৃথিবীতে এনেছে তা তো শুধু আল্লাহ আর সে জানে। মেয়েরা মাতৃত্বকালীন সময়ে কত রকম জটিলতায় পড়ে। স্বামী, শ্বশুরালয়ের সব আপনজন, নিজের মা, বাবা, ভাই-বোন, অন্যান্য আত্নীয় স্বজন! কত মানুষ থাকে তাদের আশেপাশে একটু যতন করার জন্য। অথচ পারি দু'টো বাচ্চাকে জন্ম দিয়েছে একটা শূণ্য ঘরে। পারি বিশ্বাস করে, তার প্রতি আল্লাহর অশেষ রহমত, দয়া রয়েছে। নয়তো বাচ্চা দুটো কীভাবে এই পৃথিবীতে সুস্থ সবল এলো! যেখানে অনেক যতনেও সুস্থ বাচ্চা পাওয়া কঠিন হয়ে যায় অনেক মায়ের জন্য। সেখানে মেহেরবানী করে আল্লাহ তাকে দু'টো জীবন দান করেছে, যারা জন্ম নেওয়ার আগ থেকেই যুদ্ধ করে চলেছে। এসব ভাবার পর আর রাগ থাকে না। শীতল হয়ে যায় তার অন্তর। যদিও খানিক সময়ে মনে করে, যদি তার মা থাকত তবে নিশ্চয়ই তার বাচ্চা লালন করায় এত ক্লান্তি আসত না। একা একা দুটো বাচ্চা লালনপালন, পেট চালানোর জন্য লড়াই, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা, কত কি একা একা করতে হয়েছে। মা থাকলে নিশ্চয়ই এতটা কষ্ট হত না। মা বাবা জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা। পারির ভাগ্য তো শূণ্য। তাই বাবা মায়ের ভালোবাসা অল্পতেই গুটিয়ে গেল। কিন্তু পারি তার বাচ্চাদের জন্য বাঁচতে চায়। বহু বছর, যুগ। পারি প্রতি ওয়াক্তে আল্লাহর কাছে চায়, অনেকগুলো বছর যেন সে নিজের সন্তানদের ছায়া হতে পারে। যাদের জন্য এত সংগ্রাম। সেই বাচ্চাদের ছেড়ে চলে যাবে? এটা কী সম্ভব! এটা পারি মুখ ফস্কে বলে ফেললেও মন তো বাচ্চাদের জন্য কাঁদে!

_ বাবা‌ যাব!

সুখ ব্যাগ থেকে নিজের কাপড় বের করে বিছানায় জমিয়ে রেখেছিল। সেগুলো‌‌ই ছুঁড়ে ফেলে দিল। পারি চোখ পাকিয়ে তাকাতেই তন্নি সুখকে কোলে তুলে নিল। কিন্তু লাভ হল না। সে মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে রেখেছে। হিচকি দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে তার। সর্দিতে নাকে বেলুন ফুলে রয়েছে। তন্নি নিজের ওড়না দিয়ে পুরো মুখ মুছিয়ে দিল। তা-ও কান্না থামে না। ঐদিকে সমৃদ্ধ মায়ের ওড়নার কোনা মুখে ঢুকিয়ে বাকীটা নিজের গলায় পেচাচ্ছে। ছেলের নাটক রক্ত চোখে দেখে হাত বাড়িয়ে মেয়েকে নিল। কোলে বসিয়ে পিঠের উপর দুটো দিতে গিয়েও দিল না। সে বাচ্চাদের গায়ে হাত তুলে না। অবশ্য এখন তোলার সাহস‌ও করবে না। তাদের বাবার কানে গেলেই কপালে শনি নামিয়ে ছাড়বে।

পারি মেয়েকে কোলে বসিয়ে ছেলেকেও কাছে টেনে নিল। মুখ থেকে ওড়না সরিয়ে কপালটা মুছে দিয়ে আবারও বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগল,

_ বলছি তো বাবা চলে আসবে। দেখ, বাবা তোমাদের জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসবে। এখন একটু থাম।

কিন্তু কে শুনে কার কথা? তারা নিজেদের প্যানপ্যানানি জারি রেখে ফুসফুস করে যাচ্ছে। সমৃদ্ধ মায়ের হাঁটুতে চাপড় মেরে বলল,

_ কখন আছবে বাবা?

_ এই তো এলো বলে।

তন্নী কথা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই কলিং বেল বেজে উঠল। তন্নী,পারি কান সজাগ করে কলিং বেলের শব্দ শুনে ওদেরকে শান্ত করার পূর্বেই শোনা গেল খালার উঁচু গলার কথা। গৃহকর্মী খালা দরজা খুলতেই সম্রাট সালাম দিল,

_আসসালামু আলাইকুম।

খালা সালামের উত্তরের বিনিময়ে সম্রাটকে উঁচু আওয়াজে বলল,

_ মামা তাড়াতাড়ি যান, ঘরে যুদ্ধ লেগে গেছে।

খালার বলার ভঙ্গিতে সম্রাটের ভ্র কুঁচকে এলো।

_বাবা!
_বাবা!

_ঐ যে বাবা চলে এসেছে!

তন্নি বলতে দেরি করলেও সুখ, সমৃদ্ধ ছুটে ঘর বেরিয়ে যেতে দেরি করেনি। বিছানা থেকে নামার জন্য কারো সাহায্য লাগেনি। নিজেরাই হিচড়ে নেমে ছুটে এসে বাবার কোমর পেঁচিয়ে ধরে। সম্রাট দু পা পিছিয়ে যায়। তার হাতের ব্যাগগুলো নিচে পড়ে যায়। বাচ্চা দুটোর শরীর কাঁপছে। তার অনুমান হতেই সে হাঁটু ভেঙ্গে বাচ্চাদের সামনে বসে পড়ে। ফর্সা মুখটা লাল টমেটো হয়ে আছে। অতিরিক্ত কাঁদায় চোখ লাল হয়ে গেছে। সর্দিতে নাকটা সাদা হয়ে আছে। সম্রাট দু'জনকে বুকের মাঝে মিশিয়ে নিল। নরম কণ্ঠে বলল,

_ এই তো বাবা! কেন কেদেছ তোমরা?

_তুমি কুতায় গিয়েছিলে বাবা?

সুখ ঠোঁট উল্টে আবারও কেঁদে দিবে দিবে ভাব ধরে প্রশ্নটা করল। সমৃদ্ধ বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা এলিয়ে রয়েছে। সম্রাট মেয়েকে মুখটা দুহাতে তুলে অপরাধী গলায় বলল,

_ বাবা তো বাইরে আপনাদের জন্য গিফট আনতে গিয়েছিলাম। ভুল হয়ে গেছে আম্মা। এরপর আপনাদের রেখে কোথাও যাব না। যেখানেই যাব নিয়ে যাব।

_ছত্তি?

_ একশ ভাগ সত্যি! কিন্তু এখন আগে আপনারা কান্না থামান। কতক্ষণ ধরে এভাবে কাঁদছেন? আপনাদের চোখ মুখ ফুলে ঢোল হয়ে আছে। আপনাদের আম্মা কোথায়?

_ আম্মা কী করবে? আম্মার কথা এরা শোনে? সেই তিন ঘন্টা ধরে প্যান প্যান করেই যাচ্ছে। কত করে বোঝালাম শুনেই না।

_ তাই মেরেছ?

সম্রাটের অহেতুক সন্দেহে পারির ভ্রু কুঁচকে এলো। কপালে ভাঁজ পড়ল। সে নাক কপাল এক জায়গায় করে তেতানো গলায় বলল,

_ আমার ক্ষমতা থাকলে শুধু ওদের না। ওদেরকে যে... তাকেও কটা দিতাম।

বলেই সে ছিটতে ছিটতে নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরের দিকে চলে গেল। সম্রাট হতভম্ব চোখে সেটা দেখল। বোঝার চেষ্টা করল, পারি ঠিক কী বলেছে? পারি কী তাকে থ্রেট দিয়ে গেল?
তন্নী পারির কথা শুনে ফিক করে হেসে দিল। ওড়নার কোনা মুখে চেপে হাসির শব্দ বেরুনোর পথ বন্ধ করে হাসতে থাকল। এদিকে বুরাক ছুটে এসে সুখ, সমৃদ্ধকে দেখে মুরব্বিদের মত করে বলল,

_ এ্যাই মেয়ে বাবুর ভাই, তুমি কাঁদো কেন? তুমি ছেলে না? ছেলেরা কাঁদে নাকি!

এদের কথার মধ্যেই দরজা থেকে শোনা গেল,

_ স্যার এগুলো কোথায় রাখব?

দু'টো বড় বাক্স মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিল্ডিংয়ের দুজন সিকিউরিটি। সম্রাট বাচ্চাদের একসাথে কোলে তুলে নিল।

_ এখানেই, এক পাশে রাখুন।

_ এইতা কী বাবা?

সুখের বিস্ময়কর চাহনি। বড় বড় পাপড়ির চোখ দুটো বড় বড় করে মেলে দেখছে সে। সমৃদ্ধ একবার বাক্স দেখে আরেক বার বাবার মুখটা। বুরাক বাক্সের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে ও বোঝার চেষ্টা করছে এটা কী?
পারির একটা ওড়না ভিজিয়ে এনেছে। সেটা দিয়ে বাচ্চাদের মুখ মুছিয়ে দিবে। কিন্তু তারা পারির থেকে মুখ ফিরিয়ে বাবা আর বাবার আনা বাক্সের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

_আমাকে দেও!

পারির দিয়ে দিল। সম্রাট পরম শান্তিতে বাচ্চাদের মুখ পরিষ্কার করিয়ে দিল। পারিকে বলল,

_ আমাকে একটা কল দিলেই তো আমি বুঝিয়ে বলতাম। তখন এত কাঁদত না।

_কতগুলো কল দিয়েছি!

_কল দিয়েছ?

কথাটা শেষ করেই সম্রাট ট্রাউজার হাতড়ে মোবাইল বের করল। বিগত তিন ঘণ্টায় আটান্নটা কল! চোখ কপালে তুলে তাকাল। পারি দুহাত বুকের উপর বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল। সে কাঁধ উঁচিয়ে বলল,

_ তাহাদের কাজ এটা!

সম্রাট ছেলে মেয়ের মুখের দিকে অপরাধীর মত তাকিয়ে বলল,

_ বাবার ফোন সাইলেন্ট করা। তাই কলের রিং শুনিনি। স্যরি! কিন্তু সাইলেন্ট তো তোমরাই করেছ। এখানে আমার দোষ নেই।

ওরা কী অত কিছু বুঝে? তারা বাবার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে হাঁটু নাচাচ্ছে। আবার চোখ ঘুরিয়ে ঐ বাক্সগুলোতে ফেলছে। সম্রাট বাচ্চাদের মনোভাব বুঝতে পেরে পারিকে বলল,

_ অনুমান করে এনেছি, এমনিতেই আগের চেয়েও তো শুকিয়ে গেছ। ছোট বড় হতে পারে। চেঞ্জ করা যাবে।

প্রায় দশ বারোটা ব্যাগ ছিল সম্রাটের হাতে। যা নিচে পড়ে গিয়েছিল। সেগুলো পারির দিকে বাড়িয়ে কথাগুলো বলল। পারি মিষ্টি হেসে সেগুলো নিয়ে মাথা দুলিয়ে বলল,

_হুম।

এরপর বড় একটা সুটকেস দেখে কৌতূহলী হয়ে বলল,

_ এটাতে কী?

_ খুলেই দেখ।

তন্নি পারিকে সাহায্য করল। বিশাল বড় একটা সুটকেসটা। লক খুলতেই পারির চোখ কপালে উঠে গেছে। ঐটা ভর্তি বাচ্চাদের পোশাক। আবার ব্যাগেও আছে।

_ এত গুলো একবারে!

_ এগুলো এখন কিনেনি। এগুলো একটু একটু করে জমিয়েছে।

তন্নি বলে পারির দিকে তাকাল। পারি তন্নির কথা বুঝতে পারেনি। এদিকে পারি, তন্নির দিকে সম্রাটের মন নেই। সে ব্যস্ত নিজের ছেলে-মেয়ের কথা শুনতে। তারা ঐ বাক্সে কী রয়েছে তা নিয়ে কৌতুহলী। বাবাকে বলে যাচ্ছে,

_ বাবা এতা কী?

_ ঐটাতে আমার আম্মা আব্বার খুশি আছে।

_ খুছি!

_হুম। এখানে বস, বাবা দেখাই।

বাচ্চাদের কোল থেকে নামিয়ে পাশেই বসাল। এরপর একটা বাক্স খুলতে শুরু করল।

_বাপ্পী বলেছে, যেখানে যা পছন্দ হয়, তাই কিনে ঘরে রাখে। জিজ্ঞেস করলে বলত, ‘ আমার বিশ্বাস একদিন খুঁজে পাব। সেদিন খেলবে। কোন কিছুর জন্য যেন অপেক্ষা করতে না হয়।' যেখানে যা বাচ্চাদের জন্য ঠিক মনে হত। তাই কিনে ফেলত। তোমার জন্য অনেক শাড়ি‌ও কিনে রেখেছিল। শুনেছি গতমাসে তানহা ভাইয়ার অগোচরে গিয়ে সেই শাড়ি ছুঁয়েছিল তাই সেগুলো সব জ্বালিয়ে দিয়েছে। তার কথা, তানহার গাঁয়ের হাওয়া‌ও তোমার গা ছুয়ে যেতে দিবে না।

পারির চোখ ভরে উঠল। তার তো এখন ঐ বুকে মুখ গুঁজে এক পশলা চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করছে। যতক্ষণ না পারি হাউমাউ করে কাঁদতে পারবে, ঐ বুক ভাসাতে পারবে, ততক্ষণ পারির বুক হালকা হচ্ছে না।

_এত বল পুতুল! আমাল জন্য বাবা?

বিশাল সাইজের একটা টেডি। সুখের চোখ খুশিতে বড় বড় হয়ে গেল। সে পুতুলের গলা জড়িয়ে ধরল। পুতুল তার চেয়েও বড়। তা দেখে তন্নি হেসে ফেলল,

_ ওমা সুখ, কে কাকে কোলে নিবে? টেডি সুখকে নিবে না সুখ টেডিকে নিবে!

এমন রসিকাত বোঝার বয়স তখন তো তার হয়নি। সে বরং নিজের খুশি জাহির করতে চাচীকে বলল,

_ চাচীমনি দেখ, এটা আমার। বল পুতুল। দেখ কত বল পুতুল!

সম্রাট মেয়েকে দেখল। একটা বক্স ভর্তি শুধু তার মেয়ের জিনিস। সে খোদার কাছে প্রতিবার আর্জি করেছে, তাকে যেন একটা জান্নাত দেয়। আল্লাহ তার আর্জি কবুল করেছে। সে মেয়েকে টেনে নিয়ে গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,

_এখানের সব তোমার আম্মা!

বিশাল সাইজের বক্সটা ভর্তি বিভিন্ন ধরনের পুতুল, কিচেন সেট, ডক্টরস সেট, ফেইক সাজুগুজুর জিনিস, ফ্রুটস, ফিশ সেট, ডল হাউজ, বাবলস, কালার্স সেট, ব্রাশ, ড্র‌ইং বুক সহ মেয়েলি নানা রকমের খেলনা।
সমৃদ্ধ বোনকে এত খেলনা দিতে দেখে বাবার হাতে আঙ্গুল দিয়ে খুঁচিয়ে ডাকে,

_বাবা!

সম্রাট ছেলের উদ্দেশ্য বুঝে টেনে কাছে নিয়ে কপালে চুমু দিল। গালে আলতো ছুঁয়ে কপালের উপর পড়ে থাকা বড় বড় চুলগুলো সরিয়ে দিল। অন্য বক্সটা দেখিয়ে বলল,

_ এখানের সব তোমার আব্বা।

ওত বড় বাক্সের সব তার? কথাটা শুনে সমৃদ্ধ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল বাবার দিকে। সম্রাট বক্সটা খুলে ফেলল। বিশাল সাইজের এই বক্সে ছেলেদের সব খেলনা। নানা রকমের রেসিং কার, ব্যাটারি সহ এরোপ্লেন, হেলিকপ্টার, কার, নানা রকমের বন্দুক, পিস্তল, বল, ব্যাট কত কি! সম্রাট একটি কার ছেলের হাতে দিয়ে আরেকটি নিজের হাতে রেখে বলল,

_ এটা বুরাককে দাও। বলেছি না, বন্ধুত্ব করলে দু'জনকে গিফট দিবো! একটা তুমি রাখবে, একটা তোমার বন্ধুকে দিবে। ঠিক আছে? আর এখানের সব দু'জনে মিলেমিশে খেলবে। বোনকেও নিবে তোমার সাথে!

সমৃদ্ধ বুঝল। সে বুরাকের হাতে কারটা দিয়ে বলল,

_ বনদু আমরা। তুমি আমি, ঠিক আছে?

_ঠিক আছে বনদু!

ছেলেদের মুখের হাসি দেখে সবাই হাসল। সম্রাট মেয়েকে কোল বসিয়ে বলল,

_ আমার আম্মার গিফট পছন্দ হয়েছে?

_হুম!

সম্রাট পারির দিকে চেয়ে বলল,

_ ড্রেস গুলো ট্রায়াল দাও! সমস্যা হলে চেঞ্জ করতে হবে না?

_হুম, যাচ্ছি।

পারি যেতেই সম্রাটের মুঠোফোন বেজে উঠল। সাউন্ড সিস্টেম ঠিক করায় কল শোনা গেছে। সম্রাট মোবাইল তুলে দেখল অফিসার নাসিরের কল।

_ আসসালামু আলাইকুম অফিসার! ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে পারব না বলেই ধন্যবাদ দিচ্ছি না। কিন্তু একবার একসাথে দু মুঠো খেতে চাই। সময় করে যদি আসেন খুব খুশি হব।

.......

_সিয়র। প্লিজ, আমরা অপেক্ষা করব।

.........

_ ওয়া আলাইকুম আসসালাম। অপেক্ষায় থাকলাম। আল্লাহ হাফেজ।

তন্নি সম্রাটের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রয়েছে।

_ কাল সকালে অফিসার আমাদের সাথে ব্রেক ফাস্ট করবে।

_ আলহামদুলিল্লাহ, কিন্তু কিসের জন্য ফোন দিয়েছে?

_ কাজ আছে। পারিকে কিডন্যাপের পিছনে কার হাত রয়েছে, তা বের না করে এভাবে ছেড়ে দেই কীভাবে?

_ ঠিক বলেছ ভাইয়া। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখন!

_হুম। একজনকেও ছাড় দিব না। আমার স্ত্রী, সন্তানদের জীবনে এত নারকীয়তা যাদের জন্য ঘটেছে তাদের কাউকে ছাড়ব না। প্রতিজনকে তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিব। কড়ায় গণ্ডায়!

_ ইনশাআল্লাহ। ফ্রেশ হ‌ও ভাইয়া! লাঞ্চ দেই।

_ হুম! আচ্ছা খালা মনি কবে আসবে?

_ তোমার বন্ধু বলেছে, মা'কে আসার জন্য বলে দিয়েছে। মা'ও খুব খুশি হয়েছে ওরা ফিরে আসাতে। হয়তো পরশুই র‌ওনা দিবে।

_ ফি আমানিল্লাহ্।

কথাটা বলেই সম্রাটের মুখটা ছোট হয়ে গেল। তার বাবা মায়ের কৃতকর্মের কথা ভেবে। যেখানে তার বাচ্চা দু'টো দাদা দাদীর সবচেয়ে আদরের হতে পারত, সেখানে তার বাবা মায়ের থেকেই বাচ্চাদের রক্ষা করার যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাকে। তার মত হতভাগা সন্তান আর কেউ আছে? দাদা দাদী থাকতেও বাচ্চা দু'টো এভাবে বড় হবে! নানা নানী পৃথিবীতে নেই। মায়ের তরফ থেকে কোন আদর পাবার সৌভাগ্য তাদের হবে না। দাদা দাদী থেকেও নেই। ফুফুরা থাকবে কি-না তা নির্ধারণ করবে সময়। সময় বলবে সম্রাট তার সন্তানদের প্রকাশ্যে বের করতে পারবে কি-না? তারা একটা সুস্থ পরিবেশ পাবে কি-না! তবে সম্রাট নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চেষ্টা করবে, তার সন্তানদের জন্য একটা নিরাপদ জীবনের ব্যবস্থা করা।

_ দেখুন মিসেস তালুকদার...

_চৌধুরী! পারিজাত চৌধুরী!

পারি তালুকদার বাড়ির ছেলে ছাড়া আর কোন কিছুতেই বিন্দুমাত্র আগ্রহী ন‌য়, সেটা অর্থ কিংবা পদবী। বিষয়টা পূণরায় পরিষ্কার করতেই উপরের শব্দ গুলো দিয়ে বুঝিয়ে দিল। পারির নিসকম্প শব্দগুলো শুনে, পারির গম্ভীর ভাবমূর্তি অবলোকন করে সম্রাটের দিকে তাকাল। সম্রাট ডান পায়ের উপর বাম পা তুলে নিশ্চল, ভাবলেশহীন চেয়ে রয়েছে অফিসারের পানে। পারি তার‌ই পাশে শিরদাঁড়া সোজা করে, শুকনো চোখেমুখে বসে রয়েছে। তার চোখেমুখে কিছু লুকিয়ে রাখার জোর চেষ্টা। অফিসার গলা খাঁকারি দিয়ে সম্বোধন ছাড়াই বলল,

_ দেখুন ম্যাডাম, আপনি আমাদের সাথে কো-অপারেট না করলে আমরা কোন সুরাহা করতে পারছি না। আপনার সাথে যা হয়েছে তার সঠিক তদন্তের জন্য অবশ্যই আপনার বিস্তারিত, চুল পরিমাণ তথ্য‌ও না লুকিয়ে আমাদের কাছে সবটা বলা দরকার। আসামিরা মাটির তলেও যদি থাকে, আমরা তাদেরকে খুঁজে বের করব!

_ কিন্তু আমার তো কোন অভিযোগ নেই। আমি কারো শাস্তি চাই না। আমি এখন শুধু আমার সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবছি। আশা করি তারা তাদের বাবার ছায়াতলে এত বছরের শূণ্যতা ভুলে আগামীতে ভালো থাকবে। দয়া করে এই বিষয়টি এখানেই থামিয়ে দিন।

_ মানে?

পারির কথায় সবাই ওর দিকে হতবাক ও প্রশ্ন নিয়ে তাকাল। সম্রাট ভ্রু কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলে তাকাল। সোজা হয়ে বসে পারির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,

_ মানে কী?

_ মানে আবার কী হবে? আমি কোন ঝামেলা বাড়াতে চাচ্ছি না। এই বিষয় এখানেই বন্ধ হোক। বাচ্চারা সুস্থ আছে, আমরা একসাথে আছি। ব্যস্। আর কিছু নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাচ্ছি না আমি। তু....

_ ওঠো!

বলেই সম্রাট পারির হাত টান দিয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তদন্ত অফিসার নাসির, বাপ্পী, তন্নি সেদিকে চেয়ে র‌ইল কৌতুহলী চোখে।
সম্রাট রুমে ঢুকিয়ে দরজা আটকে পারির দুই বাহু ধরে রাগান্বিত গলায় বলল,

_ সমস্যা কী তোমার? কাল রাত থেকে দেখছি মুখে আষাঢ়ের মেঘ নামিয়ে রেখেছ। কত বার বুঝিয়েছি আমি রাতে? এখন গোঁ ধরে বসেছ কেন?

_ প্লিজ, আমি এই বিষয়ে আর আগাতে চাই না। আর কোন অশান্তি চাই না। আমাদের বাচ্চা...

_ ওরা চার বছর.. চার বছর আমাকে আমার সন্তানদের থেকে দূরে রেখেছিল। ওদের এত সহজে ছেড়ে দিব? তাছাড়াও... সেদিন যদি তুমি ওদের হাত থেকে পালাতে না পারতে? তবে কি হতো? আমার এটা ভাবলেই ..... লিসেন, পারিজাত! জান আমার, সোনা পাখি। ভয়ের আর কোন কারণ নেই। আর কেউ তোমাদের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাতে পারবে না। কেউ আঙ্গুল বাড়িয়েও তোমাকে ছোঁয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারবে না। তার আগেই আমি সম্রাট ও কলিজা ছিঁড়ে কুকুরকে খাওয়াব। আমার সন্তান, আমার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে তাকানো চোখ আমি উগলে নিব।বুঝেছ? অফিসারকে সবটা সত্য বলবে। সেখানে যেই ইনভলভ থাকুক। আমি কষ্ট পাব না।

_ আমি জানি, তুমি যতক্ষণ আমাদের পাশে আছ, ততক্ষণে কেউ আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু আমি চাইছি না এই বিষয়ে আর কোন কথা বলতে!

এবার সম্রাটের মাথা সত্যিই গরম হয়ে গেল। রাত থেকে বোঝাচ্ছে। অথচ এই মেয়ে কোন কথাই বুঝতে চাইছে না। সম্রাট ক্ষ্যাপাটে গলায় বলল,

_ সমস্যা কী?

পারি চোখ মেলাচ্ছে না। সে কিছু লুকাচ্ছে। সম্রাটের বুক কাঁপছে। এমন কোন কিছু সে শুনতে চাইছে না যা শোনার সহ্য ক্ষমতা তার নেই।

৩৪

সেদিন যখন আমাকে ওরা থার্ড পার্টির কাছে বিক্রি করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিল তখন....অতীত...

পারিকে যখন থার্ড পার্টির কাছে তুলে দেওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছিল তখন পারি বাঁচার সব প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছে। তারা পুতুলের মত নিথর দেহখানা টানতে টানতে কোন এক জঙ্গলে নিয়ে ঢুকিয়েছে। পারির তখন হাত মুখ চোখ সবটা কালো কাপড়ে বাঁধা। সে নিজের অবস্থান অনুভব করতে পারে পায়ের নিচের স্যাঁতস্যাঁতে সোঁদা মাটির গন্ধ আর ঝোপ ঝাড়ে বারবার পা আঁটকে যাওয়ায়।
দীর্ঘদিন একটা অন্ধকার কুঠুরিতে বন্ধ থাকার পর হঠাৎ করেই প্রকৃতির শুদ্ধ বায়ুর শীতল ছোঁয়া পারির মনকে প্রবলভাবে ছুঁয়ে গেল। পনেরোটা দিন পঁচা মদ, সিগারেট আর বিচ্ছিরি সব কার্যকলাপের দূর্গন্ধে অন্তঃসত্ত্বা পারি ভেতর থেকে মরে যাচ্ছিল।
ওদের দেওয়া খাবার খাওয়ার ইচ্ছা হত না। আবার বাচ্চাদের কথা ভেবে খেতেও হত। কিন্তু যা খাবার দিত তা পারির রুচিতে কুলাতো না। কিন্তু অতিরিক্ত ক্ষুধা, তৃষ্ণায় না খেয়ে‌ও থাকা সম্ভব হত না। বাধ্য হয়েই চোখ, নাক বন্ধ করে শুধু গিলে যেত। সেগুলো আবার চোখের সামনে ওদের নোংরামো করতে দেখে বমি করে ফেলে দিত। বন্ধ চোখের আবডালে প্রকৃতির সুড়সুড়ি পারি প্রাণভরে অনুভব করতে লাগল। পরিস্থিতি ভুলে শুধু বিশুদ্ধ শ্বাস নেওয়ার জন্য ছটফট করতে শুরু করল। হা করে শ্বাস নিতে পারছে না মুখ বাঁধা থাকায়। পারির চোখ ফেটে আবারও অশ্রু বর্ষণ শুরু হল। তার ভেতরে ছটফটানি অচিরেই তাকে অস্থির করে তুলে। সে তার বাহু খামচে ধরে রাখা হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট শুরু করে দেয়। এতে করে লোকটা ক্ষেপে যায়। হঠাৎ করেই পারির গালে জোরে একটা চড় মারে। বিচ্ছিরি কিছু শব্দ উচ্চারণ করে বলে,

_মাগী খাউজ্জানি উঠছে? সব খাউজ্জানি মিটাইয়া দিব কাস্টমার। দেখুম কত খাউজ্জাইতে পারোস।

এসব শব্দ বিগত পনেরো দিনে পারি বহুবার শুনেছে। তাই এখন আর অতটা গাঁয়ে লাগল না। কিন্তু হুট পারির কী হল সে বুঝতে পারল না। প্রকৃতির শুদ্ধ বায়ুর ছোঁয়া তাকে প্রবলভাবে ছুঁয়ে যাওয়ার সাথে সাথে স্মরণ করিয়ে দেয় তার ক্ষমতার দাপট। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান টিকে থাকার জন্য কত লড়াই করে চলেছে অবিরত। কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হার মানে না। তাহলে পারি কী করছে? বিগত পনেরো দিনে পারি কী করেছে? শুধু কান্না, আর অনুনয়! কাদের কাছে অনুনয়, অনুরোধ করেছে? যারা তাকে খুন করার জন্য পয়সা নিয়ে এখন বিক্রি করে দিচ্ছে পাচারকারীদের কাছে! পারি এদের কাছে নিজেকে বাঁচানোর জন্য সাহায্য চেয়েছে! এদের কাছে পারির কান্নার কোন দাম আছে? তাহলে পারি কেন তাদের কাছেই অনুরোধ করছে বারবার? অথচ পারির উচিত ছিল শক্ত থেকে নিজের এবং বাচ্চাদের জন্য লড়াই করা। এখান থেকে মুক্তির পথ বের করা। হঠাৎ করেই একটা ধমকা হাওয়া জঙ্গলের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করে তুলল। ঝড়ের পূর্বাভাস! পারি কান সজাগ করে বাতাসের বেগ বোঝার চেষ্টা করছে। লোকটা পারিকে থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হয়ে বাহু ধরে টান দিয়ে এগিয়ে যেতে এক পা এগুতেই পারি গা শক্ত করে দাঁড়িয়ে পড়ল।
মধ্য বয়স্ক, পেট মোটা একটা লোক। গাঁয়ে হনুমানের মত শক্তি। রুক্ষ খরখরে হাতের চাপে পারির রুগ্ন নরম চিকন হাতটা যে পিষে ফেলার প্রয়াসে সর্ব শক্তি খাটিয়ে ধরে রেখেছে। পারির মাথায় ছলনার প্রেতাত্মা চাপল। ওর এখন ন্যায় অন্যায় বোধ উড়ে গেছে। বাঁচতে হলে কিছু একটা করতে হবে। এটাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

_ঐ মজিদ দাঁড়াই দাঁড়াই কী করোস? খবরদার তিড়িংবিবিং চিন্তা করবি না। লিপ্সায় লাগাম দে। এইডা বেঁচা মাল। বাবুজি কলিজা ছিড়া খাইয়া ফালাইব! তাড়াতাড়ি আয় ...

দূর থেকে অন্য একজন লোকটাকে তাড়া দিল। লোকটা এত সময় পারির দিকে লিপ্সা ফেলেই চেয়ে ছিল। যখন থেকে পারিকে দেখেছে তখন থেকেই ভেতরের পশু খাই খাই করছে। পারির বোরকা ছিঁড়েফেলে দিয়েছে ওরাই। এখন তার সামনে দৃশ্যমান ওড়না ছাড়া পারির সুউচ্চ টানটান বক্ষ, কামিজের কাঁধের দিক থেকে ছেড়া। সেই ছেঁড়া কাপড়ের অংশটুকু বাহুর উপর ঝুলছে। ভেতরে কমলা রঙের ব্রার ফিতে দেখা যাচ্ছে। অত্যাচার, অনাহারে চেহারা ভেঙে চুরে একাকার। কিন্তু নারীত্বের সৌন্দর্য অম্লান। পাঁচ মাসের বেশি ভরা পেট। যা ফিটিং কামিজের উপর দিয়ে উঁচু হয়ে জানান দিচ্ছে কেউ আছে এখানে। শুধুমাত্র এটার জন্যই লোকটা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছে। গর্ভবতী মহিলাদের সাথে ফিজিক্যাল হয়ে মজা নেই। তা-ও আবার জবরদস্তি করা লাগবে! ব‌উ স্বেচ্ছায় করে তাতেই তো মজা পায় না।

পারি যেন অলৌকিক দৃষ্টি দিয়ে লোকটার নোংরা কামনা পড়ে ফেলল। রাগে, ঘৃণায় ওর ইচ্ছে করল লোকটার মুখের উপর বমি করে দিতে। লোকটা যতবার ছোঁয় বিচ্ছিরি অনুভূতি হয়। গা ঘিন ঘিন করে। নিজের দেহটাকে এখন তার সবচেয়ে বেশি ঘৃনা হচ্ছে। কিন্তু পারি এখন শান্ত মস্তিষ্কে ভাবছে নিজেকে বাঁচানোর জন্য তার করণীয় কী?
লোকটা আবারও হ্যাঁচকা টানে পারিকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই পারি মৃদু চেঁচিয়ে বলল,

_ আমি বাথরুমে যাবো!

_কী!

খেকিয়ে উঠল। সতেরোটা মেয়ে গাড়িতে তুলতে হবে। এর মধ্যেই চৌদ্দটাকে তোলা হয়েছে। এই একজনকে নিয়ে আঁটকে আছে। মুখ ভর্তি থুতু গিলে লোকটা নিজের নোংরা চোখ দুটো পারির বুকের উপর রেখেই ঝাঁঝালো গলায় জিজ্ঞেস করল,

_কী করবা?

_আমি একটু বাথরুম করব ভাইয়া। আমি গর্ভবতী বুঝেন তো। একটু সময়!

_ঐ তামশা কর আমার লগে? এহোন তোমারে নিয়া বাথরুমে যামু? মশকরা কর?

_প্লিজ! আমি আর পারছি না। আঃ

বলেই সে চেঁচিয়ে উঠল। এদিক থেকে একজন তাড়া দিতে দিতে এদিকে এসে বলল,

_ মানুষ চ‌ইলা আসব। মাগীর মুখ বন্ধ কর।

_ঐ মাগী থাম।

_ কী কয়?

_বাথরুমে যাইব! এই জঙ্গলে বাথরুম ক‌ই পামু?

_চুপচাপ আমাগো লগে চল। ন‌ইলে পেটের উপর পারা দিয়া ভিত্রে যেইডা আছে ঐডারে গাইলা দিমু। এক্কেবারে চুদুর বুদুর করবি না কোন!

_আমার যাওয়া খুব জরুরি ভাইয়া। নয়তো...আমি যদি গাড়িতে করে ফেলি তাহলে কী সেটা ভালো হবে বলেন? আমি তো ঐ ঘর থাকতেই বলেছিলাম বাথরুমে যাব। একটু বুঝুন, আমি তো গর্ভবতী, চেপে রাখতে পারি না। এতটুকু দয়া করেন। আচ্ছা আপনারা একজন আমার সাথেই থাকবেন। আমার কোন সমস্যা নেই। তাছাড়াও আমি তো গর্ভবতী, অসুস্থ। হাঁটতেই পারছি না, পালাব কী করে বলেন? পালাতে হলে তো দৌড়াতে হবে! তা কী আমি পারব? এত শক্তি তো নেই আমার দেহে অবশিষ্ট। দয়া করে একজন সাথে থাকুন, তা-ও আমাক কোথাও বসে একটু কাজ সারতে দিন,প্লিজ!

পারির যুক্তি মানানসই। গাড়ির মধ্যে অতগুলো মানুষ থাকবে। সেখানে বেগ হারিয়ে করে ফেললে তো মহা মুসিবতে পড়বে সবাই। তার চেয়ে বরং এখন করিয়ে নিক। মোটা লোকটা দ্বিতীয় লোকটাকে বলল,

_তুই যা। চোখে চোখে রাখবি। ঐ জঙ্গলের দিকে যা। আলো জ্বালাইস না। খবরদার ছাড়বি না।

চল... বলেই পারিকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে খানিকটা দূরে অন্ধকারে টেনে নিয়ে গেল। পারি দাঁত চেপে সব সহ্য করছে।

_এই জায়গাতেই কর।

_আমার হাতটা খুলে দিন।

_ক্যান? আবার হাত খুলবো কেন?

_হাত না খুললে আমি কীভাবে কাপড় খুলব আর কীভাবে কাজ করব? আমি তো চোখে দেখতে পারছি না। একটু তাড়াতাড়ি করেন প্লিজ।

বলেই পারি ন্যাকা কান্না শুরু করে দিল। লোকটা আগুন চোখে পারির দিকে চেয়ে এগিয়ে এলো। সুন্দরী নারীদের আবদার এসব লোক ফেলতে পারে না। সে পারির হাতের বাঁধন খুলে দিল। অতঃপর বলল,

_তাড়াতাড়ি কর। নয়ত এদিকেই জিন্দা দাফন ক‌ইরা যামু।

শুকনা হুমকি! পারি জানে। ওরা চাইলেও পারির ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ পারি ওদের লাকি চার্ম। পারিকে বেঁচে এর মধ্যেই টাকা নিয়ে রাখছে। সুতরাং চাইলেও ওরা পারির ক্ষতি করবে না। পারি হাত খোলা পেতেই দেহে প্রাণ ফিরে পায়। কুটকুটে অন্ধকারের মাঝে গা ছমছমে সব শব্দ শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে থেমে থেমে ঝি ঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে। অদূরে কোথাও ব্যাঙ ডেকে চলেছে। ব্যাঙ আছে মানেই হল আশেপাশে সাপ থাকা স্বাভাবিক। পারি দু পা পিছিয়ে দাঁড়াল। লোকটার দিকে অনুমান করে তাকিয়ে বলল, আপনি একটু দূরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ান। নয়তো আমি কী করে কাজ করব? আপনার মুখের সামনে করলে কী সেটা ভালো দেখায়?

_অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। তুই করলে কর না করলে নাই। আমি কোথাও যাবো না।

_পানি কোথায় পাব?

একটার পর একটা আবদার। এবার যেন পারি সীমা অতিক্রম করে গেল। দাঁত চিবিয়ে পারির উপর চড়াও হল। গাঁয়ে উপর পড়ে যাওয়ার মত কাছাকাছি এসে বলল,

_এহানে তোমারে সোহাগ করতে আনছি? একটার পর একটা আবদার মারাও ক্যা?

পারি একটু মিছে মিছে হাসল। রসিকতা করার প্রয়াস করে বলল,

_ তখন‌ও পানি দরকার হয়। ফরজ গোসল করতে হবে না?

পারির এমন কথায় লোকটার ভ্রু কুঁচকে যায়।
পারি আগের মতোই নরম গলায় কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,

_আমার পেট ফেটে যাবে। আমি এখানে পেট ফেটে মরলে নিশ্চয়ই আপনার জন্য ভালো হবে না? তাই দয়া করে তাড়াতাড়ি করুন। একটু পানির কাছাকাছি নিয়ে যান! কাজ সেরে পরিষ্কার করতে হবে না? নয়তো গন্ধ থেকে যাবে।

দাঁত কিড়মিড় করে পারির দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, ঘন জঙ্গলে পানি কোথায় পাবে সে? পারিকে বলল,

_ তুই এখানে কর। আমি পানি আনতেছি।

হয়তো পারির জন্য আল্লাহর রহমতের পথ খুলে গিয়েছিল। নয়তো এত বোকামি তারা করে না। পারির চোখ বন্ধ, পারি তাকে দেখিয়ে অন্ধকারে বসে পড়ল। তখন‌ও সে কাপড় খোলার মত অভিনয় করছে। তার যে চোখ বাঁধা তাতে তার কিছু যায় আসে না। এটাই বোঝানোর চেষ্টা করল হাঁতড়ে হাঁতড়ে কাজ করার মাধ্যমে। লোকটা আসলে কোথাও যায়নি। সে উল্টো লোলুপ চোখে পারির দিকে চেয়ে আছে। পারি কাপড় খুলবে আর সে দেখতে পারবে, এই আশায়। কিন্তু পারি কান সজাগ রেখেছে। কেউ নড়চড় করলে বোঝা যাবে। পায়ের নিচের জমিন যদিও ভেজা। কিন্তু গাছের পাতায় পা লাগলে অবশ্যই শব্দ হবে। এদিকে বাতাসের বেগ‌ও অনেক। পারিকে কাপড় খুলতে না দেখে লোকটা খেকিয়ে উঠল,

_কী লো কাম অইয়া গ্যাছে!

_মনে হয় কাপড়েই....! আপনি পানি দিন আমি পরিষ্কার করে ফেলি।

লোকটাকে সরাতে পারছে না। চোখ গেঁড়ে পারির দিকে চেয়ে আছে। তাই পারি কথাটা বলল। লোকটা ছিহ ছিহ করতে করতে বেশ খানিকটা দূরে সরে গেল। পারির দিকে নাকমুখ কুঁচকে বলল,

_কেমন মাগি মানুষ তুই। এতটুকু ধৈর্য্য নাই। আবার বাচ্চা পয়দা করতাছিস। ধুর কীসব গলায় প্যাচাইয়া দেয়। ঐ মজিদ্দা...

বাতাসের কারণে পাতারা এত সংঘর্ষ করছে যে এত দূর থেকে কথাও শোনা যাবে না। ভ্রু কুঁচকে তাকাল লোকটা। মেজাজ চটছে তার। এখন কি-না কারো সুইপারের কাজ করতে হবে? সে পারির দিকে তাকিয়েই দু কদম পিছিয়ে গিয়ে আবারও ডাক দিল। এই সুযোগেই পারি নিজের চোখের বাঁধন খুলে ঢিলা করে রাখল। লোকটা পারির দিকে তাকিয়ে থেকেই আবারও হাঁক পাড়ল। তার চোখ সরছে না। ঐদিকে পারির চোখ তার হাতের ধারালো অস্ত্রের দিকে। যেটা নেওয়াই তার লক্ষ্য। লোকটা পা
একটু এঙ্গেল করে গলা উঁচিয়ে সেদিকে ফিরতেই পারি ঝাঁপিয়ে পড়ে হাত থেকে ছুঁড়িটা নিল। যেহেতু লোকটার মনোযোগ অন্যত্র ছিল, তাই পারির কৌশল আর দৈহিক শক্তি দু'টোই তার উপর প্রভাব ফেলল। লোকটা ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। পারি এক মুহূর্ত‌ও অপচয় করল না। পরপর দুবার আঘাত করল লোকটার গলায়। ওকে দেখতে ভয়ানক লাগছে। রক্ত আর ঘামে জবজবে হয়ে গিয়েছে। এত বাতাসেও ওর সর্বাঙ্গ দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে। শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে। চারদিকে প্রবল বাতাসের চোটে গাছের ডালপালাগুলো‌ও তান্ডব নাচে মেতে উঠেছে।
পারি লোকটার গলার ক্ষত দিকে তাকিয়ে এবার আতংকিত হয়ে পড়ল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে থমকাল। নিজের হাতের দিকে তাকাল দু'টো হাত ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। দুটো আঘাত‌‌ই লোকটার শ্বাস নালীতে গিয়ে লেগেছে। অত্যাধিক পরিমাণে ধারালো হ‌ওয়ায় হয়তো শ্বাসনালীর কেটে গিয়েছে। লোকটার শ্বাস প্রশ্বাসের গতি কমে আসছে। কিছু বলতে চাইছে কিন্তু ফ্যাসফেসে শোনাচ্ছে। পারির হাত পা কাঁপছে। তার আঘাতে কেউ মরে গেল? এটা পারি কীভাবে করল?

_আরে ঐ কালু, কতক্ষণ লাগব?

কেউ এদিকে আসছে! কাছাকাছিই সে! পারি হাতের অস্ত্রটা শক্ত করে ধরল। ওর সর্বাঙ্গে থরথর করে কাঁপছে। স্থির থাকা কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ওকে স্থির থাকতে হবে। পালাতে হবে। নয়তো আজ ওকে এখানেই নিজের সব হারাতে হবে।
পারি মৃতপ্রায় লোকটার দিকে তাকালো। নিভু নিভু চোখে পারির দিকেই চেয়ে আছে। হাত উঁচিয়ে কিছু বলার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অবিরত। রক্তে পারির হাত দু'টো পেটের উপর চলে গেল। নিজের উঁচু পেটে হাত রাখতেই পারির চেতন স্বাভাবিক হলো। তার সন্তানদের বাঁচানোর জন্য হলেও তাকে বাঁচতে হবে। পারি পায়ের তলার মাটি মুঠো ভরে তুলে সারা মুখে মেখে নিল। কর্দমাক্ত মুখে লোকটার মুখে এক দলা থুতু ছিটিয়ে পিছনে ফিরে এক কদম হেঁটে দৌড় দিলো জঙ্গলে ভেতরে। হাতে সেই রক্ত মাখা অস্ত্র। গাঁয়ের জামাটা রক্ত ঘামে একাকার। ওড়না ছাড়া, চুল খোলা, সারা মুখে কাঁদা মাটির মাখানো উন্মাদের মতো ছুটছে সে। আজ তার সারা অঙ্গ জুড়ে স্রষ্টার অলৌকিক শক্তি ভর করছে। সে নিজের ইজ্জত, জীবন, অস্তিত্বের জন্য বাঁচতে ছুটে চলছে দিক হারা হয়ে। জঙ্গলে ঘন থেকে ঘন হচ্ছে তার সঙ্গে ঐ লোকগুলোর চিৎকারের স্বর পাতলা হচ্ছে। ঝড়ের রাতের ঘন জঙ্গলে তাড়া পারিকে খুঁজছে। সারা জঙ্গল তাদের দখলে। পারি কী পারবে আজ এখান থেকে ফিরে যেতে? পারি কী পারবে আরেকবার নিজের প্রিয়তমের মুখটা দেখতে? পারি কী পারবে নিজের সন্তানদের এই নশ্বর পৃথিবীতে আনতে? পারি কী পারবে তার সন্তানদের সেই মানুষগুলোর সাথে পরিচয় করাতে যারা আজ তাদের জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে? পারিকে পারতেই হবে। পারতেই হবে যেকোনো ভাবে।

৩৫

কথাগুলো বলতে বলতে পারি উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ওর চোখ মুখে শঙ্কার বিচ্ছুরণ ঘটে। থরথর করে কাঁপছে ও। চোখে ফেটে অশ্রু রাশি গাল ভিজিয়ে দিল। সম্রাট ওর দিকে অপলক চেয়ে রয়েছে। পারি নিজের হাত দুটো চোখের সামনে তুলে ঠোঁট ভেঙে কাঁদে, কান্নারত স্বরে বলে,

_আমি কীভাবে পুলিশকে বলব, আমার এই দুহাতে কারো জীবন নিয়েছি! আমার বাচ্চাদের তখন...

_হিস!

সম্রাট পারিকে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। আলতো চাপে বাম হাতে পিঠ আঁকড়ে ডান হাত দিয়ে মাথা বুলিয়ে নরম গলায় বলে,

_কিচ্ছু হবে না জান। কেউ কিছু বলবে না। হিস! শান্ত হ‌ও। কেউ তোমাকে তোমার বাচ্চা, সংসার থেকে আলাদা করতে পারবে না। কেউ না।

অনেক সময় সম্রাট এভাবে বুঝাতে থাকে। পারি হাত গুটিয়ে সম্রাটের বুকের সাথে কোয়েল পাখির মত মিশে র‌ইল। ফুঁপিয়ে যাচ্ছে অবিরত। শরীরের কাঁপুনি কমেছে। এতক্ষণ পারির স্বীকারোক্তি না দেওয়ার কারণ বুঝতে না পেরে ওকে জোর করছিল। বিষয়টা মাথায় আসতেই সম্রাটের অনুশোচনা হল। পারি অন্যায়ের সাথে আপোষ করার মত মেয়ে না। সে ভয়ে কিছু বলতে চাইছে না। আর সম্রাট তারপরেও জোর করছিল। সম্রাট মনে মনে বলল,

_আমি এত স্টুপিট কেন? পারি এতদিন কোথায় ছিল, কীভাবে ছিল তা পুরো না শুনেই। ইস্, যদি অফিসারের সামনে সব বলে দিত! কী হত, আল্লাহ জানেন!

পারির কাঁপুনি থামে। সম্রাট ওর ভেজা মুখটা দু হাতের তালুতে রেখে নিচু স্বরে অনুনয় করে বলতে থাকল,

_ জান, এটা কোন বড় বিষয় নয়। জীবন, নারীত্বের সম্মান বাঁচাতে পাল্টা আক্রমণ করা আইনত অপরাধ নয়। তাও তুমি বলতে না চাইলে আমি জোর করব না। কিন্তু যেহেতু এটা বহুদিনের একটা সমস্যা তাই সেটাকে মেটানো জরুরি। তুমি পুরো বিষয়টির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তুমি সবটা জানো। তুমি যদি খুলে না বল, তবে তারা রেহাই পেয়ে যাবে। এতে তাদের সাহস লাগাম হারা হয়ে যাবে। তারা আবারও আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। বাচ্চাদের কথা ভেবে হলেও তাদের দমানো উচিত। বুঝেছো! তুমি জাস্ট তাই বলবে যা বাপ্পী, তন্নিকে বলেছ। ওকে?

_হুম।

বসার ঘরে ছমছমে পরিস্থিতি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অফিসার নাসির বাপ্পীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। পরিস্থিতি যেমন‌ই হোক, তা হালকা ভেবে উপভোগ করার মত মনোবল তার আছে। তিনি বাপ্পীকে বললেন,

_কি আশ্চর্য! আমরা আশা করেছিলাম মিসেস তালুকদার এক বাচ্চা নিয়ে ভ্যানিশ, অথচ এখন দেখছি জোড়া। মাশাআল্লাহ। বাচ্চা দুটো বাবার মতোই দেখতে হয়েছে।

বসার ঘরের এক কোণে তিনজনে কিছু নিয়ে সভা বসিয়েছে। বাচ্চাদের গুরু গম্ভীর চোখ মুখ দেখে তন্নি, বাপ্পীও হাসল। বিশেষ করে সমৃদ্ধ, এখন‌ই সম্রাটের ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ছেলেটার মধ্যে। কথাবার্তায়‌ও তেমন করে রাখে মুখভঙ্গিকে। এই যে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে, অত টুকু মানুষ। অথচ চোখ মুখ ভীষণ ভার ভার। যেন রাজ্য পাঠের মতো গুরু দায়িত্ব পালন করছে। দাঁড়ায় সবসময় শিড়দাড়া সোজা করে। কথাও বলে কাটকাট। এই দুদিনেই বাচ্চাটা প্রমাণ করে ছেড়েছে সে তার বাবার প্রতিচ্ছবি। মনে মনে ভাবনাটা জোরালো হতেই সে হেসে দিল। বিরবির করে বলল,

_হিস্ট্রি রিপিটস ইটস সেল্ফ!

_কী বলছো বিরবির করে?

তন্নি বাপ্পীকে বিরবির করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল। বাপ্পী কোলের উপর রাখা কুশন সরিয়ে পাশে রাখল। সোজা হয়ে বসে তন্নির দিকে ফিরে আলতো ছড়ানো ঠোঁটের কোণে চমৎকার হাসি রেখে বলল,

_ইতিহাস পূনরাবৃত্তি ঘটায়।

_মানে?

_ধর আজ থেকে পঁচিশ বছর পর এমন‌ই কোন দিন আসল। জানি না সেদিন বেঁচে থাকব কি-না! কিন্তু ধরে নাও থাকলাম। এই যে এখন, বাপের বিরুদ্ধে ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছি! আল্লাহ না করুক, সেদিন‌ও এমন কিছু ঘটল! সেদিন‌ও যদি এমন করেই বাপের বিরুদ্ধে ছেলেরা দাঁড়িয়ে পড়ে তখন!

_আর কী? এখন যা হচ্ছে তখন‌ও তাই হবে! তবে তোমার কথা বলতে পারছি না, কিন্তু সম্রাট ভাইয়ার কথা বলা যায়। কারণ এগুলো অনেক সময় জেনেটিক্যালি বয়ে চলে। আর সমৃদ্ধের মধ্যে ভাইয়ার ছায়া পুরো দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে কোন এককালে এমন কিছু ঘটলে তা একেবারেই সারপ্রাইজড করবে না।

_আসলেই তাই মনে হয়!

_হু...

_বাহ, ভাবির দেখছি দারুন পর্যবেক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি। দেখা যাক অতদিন বাঁচি কি-না, বাঁচলে অবশ্যই সেদিনের অপেক্ষায় থাকব।

_মানে আপনি এমন‌ ঘটনা ঘটুক বলেই চাইছেন? সিরিয়াসলি অফিসার!

বাপ্পীর কথায় অফিসার সাফাই দেওয়ার জন্য বলতে চাইল,

_আরে না তেমন কিছু.... ঐ তো তালুকদার সাহেব চলে আসছেন।

কথা শেষ না হতেই পারি, সম্রাটকে দেখে থেমে যান উনি‌। পারির আদ্র মুখশ্রী দেখে তন্নি, বাপ্পী একে অপরের দিকে চাওয়া করল। অতঃপর কিছু অনুমান করে আবারও পারি দিকে ফিরে তাকাল। সম্রাট পারির হাত ধরে এনে নিজের পাশে বসাল। পারির বাম হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় রেখে নরম সুরে বলল,

_জান, সবটা বলবে। ওকে!

_হু!

বলেই পারি সেদিন বাপ্পীকে যেভাবে বলেছে ঠিক সেভাবেই সবটা খুলে বলল। অফিসারের পারির কথা বিশ্বাস না হলেও কিছু করার নেই। এত বছরের ঘটনার সত্যতা যাচাই করার উপায় কোথায়? তাই পারির কথা অনুযায়ী পরের কাজ হবে।

______________________________________

দিন কেটে আর‌ও দু'দিন পেরিয়ে গেল। সব কিছু স্বাভাবিক ভাবেই চলছে। সম্রাট পারিজাত, সুখ, সমৃদ্ধকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছে আজ।
সম্রাট ঠিক করেছে নতুন একটা এপার্টমেন্ট গুছিয়ে তারপর সেখানে পারিজাত সহ বাচ্চাদের নিয়ে তুলবে। আগের ফ্ল্যাটে যাবে না। ঐটা তানহা চিনে। ও যেকোন সময় গিয়ে সেখানে যেকোনো দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। পারিকে নিয়ে চিন্তা কম হলেও বাচ্চাদের নিয়ে বেশি চিন্তিত সে। বাচ্চাদের কোন ঝামেলায় জড়াতে চায় না। বাচ্চা দুটোর নিরাপত্তা নিয়ে সে ভীষণ আতংকিত। তানহা ভয়ানক সাইকো। সম্রাট বিশ্বাস করে তানহার মানসিক সমস্যা রয়েছে। নয়তো একটা মেয়ে এত ক্রেজিনেস কীভাবে ক্যারি করতে পারে? সে তানহার এমন ধ্বংসাত্মক মানসিক সমস্যার শিকার তার বাচ্চাদের হতে দিবে না। সেটার জন্য তাকে আগে বাচ্চাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাপ্পীদের বিল্ডিং একজন প্রাক্তন আর্মি অফিসারের। তিনি নিজের প্রতিটি বিল্ডিং এর নিরাপত্তায় কড়া ব্যবস্থা রেখেছেন যার কারণে কেউ চাইলেই ঐখানে ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারে না। সুতরাং আপাতত এখানে কিছুদিন থেকে নিজেদের জন্য নিরাপদ আবাসন খোঁজা এবং গুছানো সম্রাটের গুরু দায়িত্ব। এখন তারা কিছুদিন বাপ্পীদের সাথেই থাকবে। যদিও বাপ্পী, তন্নি ভীষণ খুশি এতে। এদিকে আজ আবার বাপ্পীর মা বাহার বেগম গ্রাম থেকে আসছেন। তিনি এককালে পারিকে নিজের মেয়ে বানিয়েছিলেন। পারি ফিরে আসার খবরে অত্যন্ত খুশি ভদ্র মহিলা। সেদিন‌ই আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দীর্ঘদিন পর গ্রামে গিয়ে খানিকটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই বাপ্পী বুঝিয়েছে একটু সুস্থ হলেই আসতে। যেহেতু পারি এখন তাদের এখানেই আছে, আর পারি যাবেই বা কোথায়! মৃত্যু ছাড়া পারির সম্রাটের থেকে মুক্তি নেই। সুতরাং উনি পারিকে সবসময়ই দেখতে পারবেন।

_ দেখুন এই বয়সী বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একটু কম‌ই থাকে। ওরা শারীরিক ভাবে ভীষণ নাজুক হয়। তাই আমাদের বড়দের উচিত ওদের দিকে বিশেষ যত্নশীল হ‌ওয়া। বিশেষ করে মেয়ে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। কারণ মেয়েদের হরমোনাল নানা ইস্যু থাকে। তারা শারীরিক গাঁথুনিতেও দূর্বল হয়ে থাকে। বিশেষ করে শিশু মেয়েদের ছোট থেকেই নানা প্রতিকূলতার মাঝ দিয়ে যেতে হয়। এখন খুব কমন একটা রোগে পরিণত হয়েছে যোনিতে ইনফেকশন অর্থাৎ আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ভ্যাজাইনাইটিস বা নির্দিষ্ট করে বললে পেডিয়াট্রিক ভ্যাজাইনাইটিস (Pediatric Vaginitis)। এটা হ‌ওয়া সাধারণ কারণ হিসেবে ধরা হয়, অপরিচ্ছন্ন বা পরিষ্কার না থাকা। তারপর প্রস্রাব করে যোনিপথ অথবা অত্র এড়িয়া ঠিক ভাবে না মুছা। এরপর হতে পারে টাইট বা সিনথেটিক কাপড় পরিধানের জন্য। আমরা সবসময়ই বাচ্চা মেয়েদের একটু ফ্যান্সি পোশাক পরাতে পছন্দ করি। যেটা আসলে ওদের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না। এটা দেখতে সুন্দর, চমকদার হলেও, আসলে তা শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তারপর রয়েছে, অ্যালার্জির সমস্যা ! অ্যালার্জি যেকোন ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করা থেকেও হতে পারে। যেমন ধরেন, সাবান/শ্যাম্পু/পাউডার অথবা কখনও কখনও সংক্রমণ অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস, বা পরজীবী দ্বারা‌ও হতে পারে। ছোট বাচ্চাদের যেহেতু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, শারীরিক সক্ষমতা অত বেশি থাকে না। তাই যেকোনো রোগ তাদের খুব সহজে আক্রমণ করতে পারে এবং ছড়াতেও পারে। বিশেষ করে ছোট মেয়েদের ক্ষেত্রে, যেহেতু প্রতিরোধ ক্ষমতা ও শারীরিক গঠন এখনো সংবেদনশীল, তাই তারা এ ধরনের ইনফেকশনে বেশি ভোগে। আমি নির্দিষ্ট করে তো বলতে পারছি না ঠিক কোন কারণে আপনার মেয়ের এমন ইনফেকশন হল। তবে কারণ যাই হোক, আমি বলব একটু সতর্ক ভাবে মেয়ে বাচ্চার দেখভাল করবেন। আমি কিছু ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি আর কিছু ওর জন্য উপযুক্ত এমন প্রোডাক্ট সাজেস্ট করছি। আশা করি এতেই দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে। তবে আপনি একটু বেশিই সতর্ক থাকবেন, ওর দিকে চোখ রাখবেন যেন বারবার না চুলকায়। এতে ঘা হয়ে গেল সমস্যা হবে।
চুলকানির জন্য বাইরের অংশ দিনে দুই থেকে তিনবার হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে মুছে দিবেন। নরম কাপড় ব্যবহার করবেন এতে। অবশ্যই ডেটল অথবা স্যাভলন টাইপ কিছু ব্যবহার করা যাবে না। এতে ক্ষতি হবে। আর রোজ কুসুম গরম পানিতে গোসল করাবেন। দিনে একবার। পারলে সিটজ বাথ করাবেন। পারলে দুই থেকে তিন মিনিট ঐ পানিতে বসিয়ে রাখবেন। ও প্রসাব, পায়খানা করার পর সুন্দর করে নরম সুতি কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করে দিবেন এবং অবশ্যই সামনে থেকে পিছনে যাবেন। পিছন থেকে সামনে নয়। ঔষধ গুলো নিয়মিত খাওয়াবেন। ইনশাআল্লাহ এতেই হবে। পরবর্তী চেকাপের আগে এই টেস্ট গুলো করে নিয়ে আসবেন। আই হোপ ভালো ফলাফল‌ই পাবেন।

ডাক্তার এক দমে এতগুলো উপদেশ দিয়ে থামলেন। পারি মনোযোগ দিয়ে সবটা বুঝে নিল। সম্রাট মেয়েকে দেখছে করুন চোখে। কাল রাতেও ঘুমাতে পারেনি মেয়েটা তার। চুলকায় বলে ঠোঁট উল্টে তার দিকে করুন চোখে চেয়ে কান্না করেছে। শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে এই ডাক্তারের বেশ সুনাম, তাই সে মেয়েকে উনার কাছেই দেখাবে বলে দুদিন অপেক্ষা করেছে। অবশ্য ফোনে উপদেশ নিয়ে ঘরোয়া ট্রিটমেন্ট চালিয়েছে তারা। তবে এখন তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছেলের হেলদ কন্ডিশন ঠিকঠাক। শুধু খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক হতে বলেছে। ঠিকঠাক পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানোর উপদেশ দিয়েছেন ডাক্তার।
পারির থাইরয়েডের সমস্যা আগেই জানা রয়েছে।। আজ ব্লাড স্যাম্পল দিয়ে গেল। টিএইচ‌এস এর লেভেল জানার জন্য। রিপোর্ট বিকেলে পাবে। তবে থাইরয়েডের কারণেই নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। ঠিক সে জন্য‌ই পারির বুক ধরফর করে,
প্রেসার ফলড হয় অল্পতেই। মুড চেঞ্জ হয় ঘনঘন। পারিকে নিজের প্রতি যত্নশীল আর মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে সাবধানে থাকতে বলেছে। এতেই সে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে। যদি নিয়ম মেনে চলে তবে বড় ধরনের কিছু ঘটবে না বলেই চিকিৎসক আশ্বাস দিলেন।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সম্রাট বলল,

_চল বাচ্চাদের জন্য কমফোর্টেবল কিছু ড্রেস কিনে নিয়ে যাই।

_হুম।

এরপর গেল আড়ং এর শো রুমে। দেশিয় পোশাকের অন্যতম মানসম্মত ও রুচিসম্পন্ন ব্র্যান্ডের একটি আড়ং। বাচ্চাদের পোশাকগুলো ভীষণ আদর আদর হয় ওদের। আরামদায়ক, হালক এবং নরম কাপড়ের। পারি ঘুরে ঘুরে অনেকগুলো সুতি পোশাক কিনল দুই বাচ্চার জন্য। বাচ্চাদের কেনা শেষ করে নিজের জন্য শাড়ি সেকশনে পা রাখতেই ধাক্কা খেল কারো সাথে।
চমকে দু পা পিছিয়ে যেতেই সম্রাটের বুকে গিয়ে ঠেকল। সম্রাট শক্ত করে কোমর চেপে নিজের সাথে আগলে ধরল। পারি আতংকিত চোখে সামনে তাকাতেই তার মুখটা আঁধারে ডুবে গেল। সামনে দাঁড়ানো মানুষটাও ক্ষমা সুলভ কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই তার শব্দগুলো থেমে গেল। তার হাতে থাকা প্রায় দশ বারোটা ব্যাগ, সেগুলো সব পড়ে গেল। সে দুহাতে নিজের মুখ চেপে ধরে বিস্মিত চাহনিতে পারিকে দেখছে। মিনিট এক পেরিয়ে যেতেই সে মৃদু স্বরে উচ্চারণ করে বলল,

_ভাবী!

পারি রুহানির বলা শব্দটা শুনেনি। শোনার মত আওয়াজ তুলে রুহানি বলেও নি। সম্রাট এতগুলো মাস পর ছোট বোনকে দেখে আবেগি হয়ে পড়েছে। মা বাবার সাথে রাগ করে পারিবারিক সব সম্পর্ক থেকেই সে দূরে সরে রয়েছে। ব্যাবসাটা সামলেছে নিজের প্রয়োজনে। দু'টো বোনের একমাত্র ভাই সে। তার বোনেদের জান ছিটত তার উপর। তারা ভাইয়ের সিদ্ধান্তের বাইরে কোন কাজ করত না। অথচ আজ এতগুলো মাস ধরে সে সেই বোনেদের খোঁজ‌ও নেয়নি। বড় বোনের ঘরে এখন তার পাঁচ বছর বয়সী ভাগ্নি রয়েছে। যে ফোনে মামা মামা রব তুলে তাকে মাতিয়ে রাখত।
অথচ সে ভাগ্নিটাকেও সামনে বসে একটু আদর সে দেয়নি। কারণ ভাগ্নিকে দেখলেই তার নিজের সন্তানের কথা মনে পড়ত। সে মনে মনে নিজেকে অপরাধী ভাবে। তার বোনেরা তো দোষী না। তাও, শুধুমাত্র বাবা মা কে তার কষ্ট বোঝাতেই সে এত জঘন্য কাজ করছে। রুহানি দুকদম এগিয়ে আসল পারির দিকে। অতঃপর পারিকে জড়িয়ে ধরে ছটফটে গলায় বলল,

_ভাবী তুমি বেঁচে আছ? সত্যিই বেঁচে আছ?
তোমাকে কত খুঁজছে ভাইয়া! তুমি কোথায় হারিয়ে গিয়েছ? তুমি জানো ভাইয়া পাগলের মত তোমাকে....

কথা পুরো শেষ না হতেই তার বোধ উদয় হল। পারির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা তার বড় ভাই'ই। দাঁড়ি গোঁফ লম্বা, অগোছালো হ‌ওয়ায় সেই সুশ্রী বদন বোঝা যাচ্ছে না। পারিকে জড়িয়ে রেখেই ভাইয়ের দিকে তাকাল ছলছল চোখে। সম্রাট করুন চোখে বোনের দিকে এক পলক তাকিয়ে দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। রুহানি ভাইয়ের বিরূপ আচরণে কষ্ট পেলেও তার মাথায় ঘুরছে পারির ফিরে আসা। পারি ফিরেছে! তার ভাই কেন তাদের এই বিষয়ে অবগত করেনি!

পারি জমে গিয়েছে রুহানিকে দেখে। রুহানিকে সে এই প্রথম সরাসরি দেখছে। ফোনে অনেকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে তাদের মাঝে। কিন্তু এবার‌ই প্রথম সরাসরি দেখা, প্রথম আলিঙ্গন। রুহানি ভাইয়ের বিমুখ ব্যবহারে করুণ চোখে পারির দিকে তাকাল। পারি রুহানির ছলছল চাহনিতে অপরাধ বোধ করল। সে সম্রাটের মুখের দিকে এক পলক চেয়ে রুহানির দিকে ফিরল। রুহানির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল,

_আলহামদুলিল্লাহ, বেঁচে আছি। তুমি কেমন আছো রুহা?

রুহানি ঠোঁট উল্টে বড় ভাইয়ের দিকে চাইল। অর্থাৎ সে কেমন আছে তা তার ভাইয়ের থেকে শুনতে বলছে। সম্রাট আড়চোখে বোনকে দেখে মেয়েকে কোলে তুলে নিল। অতঃপর বলল,

_ এখান থেকে বের হয়ে কোথা‌ও গিয়ে বসি আমরা।

সমৃদ্ধ বাবার হাত ধরে সামনে দিকে এগিয়ে যেতে পথে জিজ্ঞেস করল,

_এতা কে বাবা?

_ঐতা একতা আনতি!

সুখ বাবার কোল থেকে উত্তর দেয়। পারি ভেজা চোখে হাসি মুখে রুহানির হাত দুটো নিজের হাতে পুরে নিয়ে বলল,

_ চল, সব বলব!

সম্রাট বুঝতে পারছে, পারির ফিরে আসার ব্যাপারটা চাইলেও লুকিয়ে রাখা যাবে না। কেননা ওরা বের হলে কেউ না কেউ দেখবেই। ও ভেবেছিল পারিকে লুকিয়ে রেখেই জব্বার মন্ডল আর তানহার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটা সম্ভব নয়। তাছাড়াও লুকিয়েই বা কতদিন বাঁচবে! তাই যা হবে সরাসরি। ও শিগগিরই নিজের বাচ্চাদের আগমনের খুশি সবার মাঝে বিলিয়ে দিবে।

পাশের একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসল সবাই। পারি ফিরে আসার গল্প রুহানিকে বলল। আর সম্রাট বলে তার বাবা মায়ের কীর্তির কথা। রুহানি লজ্জায় চোখ নামিয়ে বসে থাকে। সম্রাট ছোট বোনকে এত কুণ্ঠিত হয়ে থাকতে দেখে সামনের চেয়ার থেকে উঠে পাশে দাঁড়ায়। বোনের মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,

_ ভাই স্যরি! অনেক বেশি স্যরি। জানি তোমাদের অযথাই কষ্ট দিয়েছি। শাস্তি হিসেবে তুমি ভাইকে যা করতে বলবে তাই করব! তাও তুমি মনে কষ্ট চেপে রেখ না।

রুহানি ভাইকে জড়িয়ে শব্দ করে কেঁদে দিল। কতদিন পর ভাই তার সাথে সুন্দর করে কথা বলছে। এত গুলো বছর ফোন দিলেই ধমক দিত। তাদের কোন কিছুই যেন ভাইকে ছুঁতে পারত না। অথচ ভাই তাদের একটু উঁ শব্দ শুনলেই ছুটে আসত।
ভাই বোনের বিচ্ছেদ পারিকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। সে মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দেয়। ভেতরে ভেতরে গুমরে কাঁদতে শুরু করল। তার জন্য‌ই এতকিছু!
সুখ গালে হাত রেখে বাবা ফুফুর দিকে গভীর ভাবে চেয়ে আছে। অতঃপর বলল,

_বললাও কাঁদে। আমমু কাঁদে, বাবা কাঁদে আল ফুফুও কাঁদে! ছব্বাই কাঁদে!

সুখের কথায় ফিক করে হেসে দিল রুহানি। ভাইকে ছেড়ে ভাইয়ের ছেলে মেয়ের দিকে চাইল। তার মনটা ভরে গেল বাচ্চা দু'টো দেখে। আবার লজ্জাও পেল। তার বাবা মা এই বাচ্চা দুটোকে মেরে ফেলতে চাইছিল! ইস্! কত বড় গুণাহের কাজ করতে যাচ্ছিল তারা! রুহানি ভাইকে বলল,

_পুতুল দুটোকে আমার কাছে দাও না ভাইয়া।

সম্রাট হাসল বোনের কথায়। সে বাচ্চাদের বোনের দু পাশে বসিয়ে দিল। তারাও ফ্যালফ্যাল চোখে ফুফুকে দেখছে। রুহানি বুঝতে পারছে না কাকে আগে আদর দিবে। সে হাসি মুখে দুজনের দিকে চেয়েই র‌ইল।

_________________________________

মধ্যরাত...

সম্রাট বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর যুদ্ধ শেষ করে শোয়ার জন্য বিছানা গা এলিয়ে দিল। মিনিট পাঁচেক পেরিয়ে যাওয়ার পরেও পারিকে বিছানায় আসতে না দেখে উঠে বসল। গাঁয়ের চাদরটা বিছানায় আলগোছে রেখে বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকাল। দুজন আপাতত গভীর ঘুমে রয়েছে। সে পা টিপে বারান্দায় গিয়ে দেখল পারি বারান্দার গ্রিলের শিক ধরে উদাসী চোখে উর্ধ্বাকাশে চেয়ে রয়েছে। সম্রাট বারান্দার দরজা চাপিয়ে দিল নিঃশব্দে। পারির পিছনে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত গলিয়ে জড়িয়ে ধরে পারির দিকে এলিয়ে দাঁড়াল। গভীর ছোঁয়ায় পারির কায়ামন শিরশিরানি দিয়ে উঠল। সে‌ও গা এলিয়ে আমি দিল শক্তপোক্ত লোমশ বুকে। সম্রাট পারির গলায় মুখ গুঁজে ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,

_জান, কী নিয়ে এত ভাবছ?

_একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

_ কর!

_তুমি আমাকে এত কেন ভালোবাসো?

সম্রাট এই প্রশ্নে থমকাল। তবে মুখ তুলল না। বরং পর মুহূর্তেই আগের চেয়েও তীব্র গতিতে শব্দ তুলে গাঢ় করে চুমু দিতে থাকল। পাঁচ মিনিট চুমু ঝড় জারি রেখে অতঃপর ছাড়ল। পারিকে সোজা করে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেশাক্ত স্বরে বলল,

_তোমাকে ভালোবাসি! কারণে অকারণে ভালোবাসি! তোমাকে ভালোবেসে ভালো থাকার পথ্যি খুঁজে পেয়েছি। তোমাকে ভালোবেসে ভালো থাকার সন্ধান জেনেছি। তুমি আমার এক জীবনের সুখের দিশা। তুমি আমার ষড়ঋতুর প্রিয় বসন্তকাল। তোমাকে ভালোবাসি, শরতের মেঘ মুক্ত স্বচ্ছ নীলিমায় ডোবা বিশাল অম্বরের মতোই। তোমাকে ভালোবাসি, কারণ তোমাকে ভালোবেসেই আমি বাঁচি!

সম্রাটের ঘোর লাগা গলায় বলা কথাগুলো পারির ভেতরটা সিক্ত করে তুলল , সঙ্গে শঙ্কিত! ও সম্রাটের গলা দু হাতে জড়িয়ে ধরে আতংকিত স্বরে বলল,

_বেশি ভালোবাসতে হয় না। আল্লাহ এমন কোন কিছু মানুষের জীবনে বেশি দিন রাখে না। যার জন্য মানুষটা অতিরিক্ত পাগলামি করে। তুমি..

_চুপ! এসব বলবা না।

পারিকে থামিয়ে দিল। অতঃপর আবার নিজেই বলতে আরম্ভ করল,

_আল্লাহ জানে! পারি নামক রমনী ছাড়া সম্রাট নামের পুরুষটার অস্তিত্ব অর্থহীন। আল্লাহ জানে, পারিজাত ছাড়া সম্রাট শূন্য। সম্রাটের এই জীবনের সকল চাওয়া পাওয়া পারিকে পেলেই হয়ে যায় পূর্ণ! আল্লাহ নিষ্ঠুর নন। তিনি রহমানুর রাহীম। তিনি পরমা করুণাময়। আমি সবসময়ই চাই, তিনি যেন শেষ নিঃশ্বাস অবধি আমাকে আমার পারিজাতকে ভালোবাসার সামর্থ্য দেন। বুঝেছ?

_হুম!

পারি মাথা উপর নিচ করল। অল্প শব্দে উত্তর দিল। পারির উত্তর পেয়ে সম্রাট পারিকে কোলে তুলে নিল। এরপর ঘরের দিকে পা বাড়িয়ে বলল,

_ওকে! এখন চল প্রসেসিং করতে হবে।

_কিসের প্রসেসিং?

বলেই পারি ছটফটানি শুরু করে দিল। সম্রাট ঘরের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে নিচু কণ্ঠে বলে,

_আরেক জোড়ার!

__________________________________

গতকাল রাতে বাগেরহাট এক আসনের প্রাক্তন এমপি জব্বার মন্ডলকে অপহরণ ও হত্যা চেষ্টার মামলায় তার সাভার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে চাকরিচ্যুত অডিট অফিসার মোহাম্মদ সম্রাট মাহমুদ তালুকদারের স্ত্রীকে অপহরণ এবং নারী পাচারকারীদের হাতে তুলে দিয়েছিল, এবং হত্যার আদেশ করেছিলেন।
সূত্রমতে, বিতর্কিত এবং চাকরিচ্যুত অডিট অফিসার সম্রাটের সঙ্গে জব্বার মন্ডলের বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছিল এবং এই বিয়েকে কেন্দ্র করেই তিনি এই ধরনের ক্রাইম ঘটান বলেও জানা গিয়েছে।
জব্বার মন্ডলের প্ররোচনায় পরিকল্পিত ভাবে অডিট অফিসার সম্রাটকে মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে দীর্ঘদিন শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়
এবং এক‌ই সময়ে অডিট অফিসার সম্রাটের প্রথম স্ত্রী যিনি ঘটনা কালীন সময়ে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন তাকে অপহরণ করেন এবং হত্যার আদেশ দেন।
আরো শোনা গিয়েছে, জব্বার মন্ডলের বড় মেয়ে, তানহা মন্ডলের সাথে বিতর্কিত ও অভিযুক্ত সম্রাটের বিয়েটা সম্পূর্ণ ক্ষমতার অপব্যবহার। তিনি নিজের মেয়ের ইচ্ছাকে পূরণ করতেই অন্য একটি মেয়ের সংসার ভাঙ্গার প্রয়াস করেন। সেই মেয়ের স্বামীর সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দেন এবং জোরজবরদস্তি সংসার করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। তবে সম্রাট তালুকদার নিজের স্ত্রীকে ভালোবেসে বিয়ে করেন এবং নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকে প্রথম স্ত্রীর সাথেই সংসার করে যাচ্ছিলেন। তিনি বলছেন, উনাকে উনার স্ত্রীর ক্ষতি করার ভয় দেখিয়েই বিয়েটা করতে বাধ্য করা হয়। তবে সংসার করাতে পারেন নি বলেই উনাকে আঁটকে রেখে উনার স্ত্রীর ক্ষতি করার চেষ্টা করা হয়। ............

৩৬

জব্বার মন্ডল, খুলনা বাগেরহাট ১ আসনের গত মেয়াদের সাংসদ। টানা তিনবার সাংসদ পদে বহাল থেকে গত নির্বাচনে তরুণ প্রার্থী মুরসালিনের কাছে পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। এরপর থেকেই যেন রাজনীতির পাঠ চুকিয়ে পুরো দস্তুর ব্যাবসায়িক বনে যান বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রাক্তন সাংসদ জব্বার মন্ডল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কখনো তার নামে দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যায়নি। সামাজিক নানা কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কিংবা নিজ আসনের উন্নতির পিছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। এবার এমন একজন মানুষের বিরুদ্ধেই ভেসে বেড়াচ্ছে গুম এবং হত্যার মত গুরুতর অভিযোগ। ভুক্তভোগী নিজে বাদী হয়ে এই মামলা করেছেন।
অভিযোগীনির অভিযোগ আমলে নিয়ে এই মামলার দায়িত্ব নিয়েছেন শাহবাগ থানার এস‌আ‌ই নাসির। বিস্তারিত.... নিউজ প্রেজেন্টার জুলি খুব সুন্দর করে বর্ণণা করে যাচ্ছে।
অত্যাধুনিক হাসপাতালের বেডে শুয়ে টেলিভিশনের পর্দায় সেই খবর দেখছে তানহা। আজ প্রায় ছয় দিন এই হাসপাতালে পড়ে রয়েছে। ধানমন্ডি থেকে সাভার যাওয়ার পথে গাড়ি এক্সিডেন্ট করে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে পাশের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয় এর পরে সুপার মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
বাম হাতে ফ্যাংকচার, ডান পায়ের গোড়ালি থেকে হাঁটু পর্যন্ত বেশ কয়েক জায়গায় ছুঁলে গিয়েছে। মাথার ডান কোণের একাংশ থেঁতলে গিয়েছে। সব মিলিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কাল বিকেল অবধি জব্বার মন্ডল হাসপাতালে ছিলেন মেয়ের পাশে।
প্রায় ছয় দিনের নির্ঘুম থাকায় তিনিও কাহিল হয়ে পড়েন। তা দেখে তানহা নিজেই বাবাকে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য।

জব্বার মন্ডল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন ভীষণ ভালো মানুষ। মেয়ের খুশির জন্য যত অন্যায় করেছেন তা উনাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। সম্রাটের ক্যারিয়ার,
পারিকে সম্রাটের জীবন থেকে সরিয়ে ফেলা। সব কিছু তাকে অন্তঃদহনে দগ্ধ করে। নিজের মেয়েকে খুশি করতে, মেয়ের সুখ দেখতে এত বড় অপরাধ করে! এদিকে তার এই অপরাধের দায়ভারে সবচেয়ে বেশি নুয়ে পড়েছেন উনার স্ত্রী। ভদ্র মহিলা দীর্ঘদিন ধরে স্বামী, মেয়ের সাথে সুন্দর করে কথা বলে না। এত কিছুর বিনিময়ে‌ও যদি মেয়েটা সুখি হত! এই যে মৃতপ্রায় অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে রয়েছে, এতবার কল দিল সম্রাটকে। একবার রিসিভ করার‌ও প্রয়োজন বোধ করল না। তিনি জব্বার মন্ডল, এত বড় একজন মানুষ। সাংসদ পদটা না থাকলেও উনার দাপট, ক্ষমতা এক বিন্দুও কমেনি। উনার ফোন রিসিভ করবে না এমন কোন বাপের বেটা নেই। অথচ সম্রাট! ছেলেটা উনাকে একবিন্দু পরিমাণ সম্মান দেয় না, যেদিন থেকে তার মেয়ের সাথে বিয়ে হয়েছে।
মেয়েটাকেও ঠাঁই দিল না। কবুল পড়ে বিয়ে তো করে নিয়েছে কিন্তু কোনদিন মেয়েটাকে ছুঁয়েও দেখল না। এর চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে? তিনি একজন বাবা হয়ে প্রতিনিয়ত চোখের সামনে মেয়ের আহাজারি দেখেন। মেয়ে স্বামীর ভালোবাসা, ছোঁয়া পাওয়ার জন্য হাহাকার করে। একটু সম্মান, গুরুত্ব পেতে কত পাগলামি করে। অথচ স্বামী ভালোবাসা তো দূরের কথা, কোনদিন ভালো করে দু'টো কথাও বলে কি-না উনি জানেন না।

একজন বাবার কাছে এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কি হতে পারে? শুধুমাত্র মেয়ের জন্য উনি বাগেরহাট ছেঁড়ে সাভার এসে উঠেছেন। মেয়েটা জামাইয়ে আশেপাশে থাকতে চায়। এক ঘরে না হোক, অন্তত আশেপাশে থেকে মায়া লাগাতে চায়। মায়ার টানেই
নাকি একদিন তাকে আপন করে নিবে! অথচ মায়া তো দূরের কথা, কোনদিন করুণাও করল না মেয়েটার প্রতি। এত অবহেলা, ঘৃণার পরেও কীভাবে কাউকে এত ভালোবাসা যায়! তিনি নিজের মেয়ের এত ভালোবাসার উৎস খুঁজে বেড়ান। পান না, কোথাও মেয়েটার এত পাগলামির কারণ খুঁজে পান না। অথচ এই মেয়েটার জন্য উনার কাছে কত নামি ছেলেরা হাত পেতে রেখেছিল। যারা আদরে, যতনে মুড়িয়ে রাখত। কিন্তু মেয়েটা এমন একজনকে পছন্দ করল! তিনিও বাবা হয়ে মেয়ের পছন্দকেই গুরুত্ব দিলেন। না আর কোন কিছু ভাবলেন, না আর কোন কিছু চিন্তা করলেন!

তানহার ডান হাতের পাঁচ আঙুল থেঁতলে গিয়েছে। সবাই জানে এটা এক্সিডেন্টে হয়েছে। অথচ তানহা জানে প্রকৃত সত্য। এক্সিডেন্টের দিন সম্রাটের কাছে গিয়েছিল। সম্রাট তখন হয়তো মাত্র‌ই ফ্ল্যাটে ঢুকেছিল। তানহাকে সম্রাট ফ্ল্যাটে ঢোকার অনুমতি দিয়েছিল কারণ তানহা একদিন নিচে ভীষণ ঝামেলা করেছিল। বাধ্য হয়েই অনুমতি দেয়, যেন প্রতিবেশীদের সমস্যা না হয়। আর এই সুযোগেই তানহা যখন তখন চলে যেত। তানহা ঘরে ঢোকার মিনিট একের মধ্যে‌ই সম্রাট বেরিয়ে আসে কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে। ও কোন দিকে না তাকিয়েই সোজা নিজের কাপড় নিতে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এদিকে সদ্য স্নান করা, স্নিগ্ধ পুরুষালি পেটানো মেদহীন শরীর দেখে তানহার ভেতরের নারীত্ব জেগে উঠে। সুপ্ত বাসনা জাগ্রত হয়ে মাথায় চড়ে বসে। ঐ পুরুষের একটু ছোঁয়া, একটু আদর পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। পিনপিনে যন্ত্রণায় কাতর কোমল নারী সৈষ্ঠব আর কামুকে আহ্বানে সে এগিয়ে যায় সম্রাটের পানে। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে সম্রাটের বুকের বা পাশে হাত রাখতেই সম্রাট এক ঝটকায় হাত টেনে সরিয়ে দেয়। পরপর দু'টো শক্ত চড় অনুভব করে নিজের বাম গালে। একটুও সময় না নিয়ে বাম হাতটা নিয়ে আলমারির দুই দরজার মাঝে চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে। ব্যথায় কাতর তানহা মৃদু চেঁচিয়ে বলে উঠল,

_আহ্!কি করছ সম্রাট? ব্যথা পাচ্ছি আমি!

_মরে যাও। সাহস কী করে হয় আমার কলিজার জিনিস ছোঁয়ার! হাও ডেয়ার ইউ...ফ্ল্যাটে ঢোকার অনুমতি পেয়েছ তার মানে এই নয় যাচ্ছে তাই করবে! লিসেন, তোমাকে এই ফ্ল্যাটে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছি কেবল নিজের সম্মানের কথা ভেবে। তুমি নিচে বসে তামাশা করবে, লোকে শুনবে! সঠিক বেঠিক জানবে না কিন্তু বিচার বসিয়ে আমার পারিকে নিয়ে কটুক্তি করবে! তা আমি সম্রাট জীবদ্দশায় বরদাস্ত করতে পারব না। এন্ড দ্যাটস হুয়াই তোমায় এই ঘরে বরদাস্ত করছি, নয়তো! এর বেশি এক্সপেক্ট রাখ কোন সাহসে? হাও...সাহস যখন করেছোই! এই হাত যখন আমার পবিত্র পারির জিনিস ছুঁয়ে অপবিত্র করেছেই, তবে শাস্তি তো তাকে পেতেই হত!

_আমি অপবিত্র কীভাবে হলাম? আমার জীবনের একমাত্র পুরুষ তুমি! আর তা-ও বৈধ স্বামী! তা-ও তুমি ছোঁয় নি। এরপরেও আমি কীভাবে অপবিত্র হলাম সম্রাট! মানছি আমাকে তোমার সহ্য হয় না। তাই বলে আমার চরিত্রের উপর আঙ্গুল তুল না প্লিজ। আহ্, আমার লাগছে!

_লাগুক! মরে যাও না কেন তুমি? অবশ্য না মরলেও চলবে। পারিকে খোঁজা অবধি বেঁচে থাকা জরুরি! আই সয়ার, যদি আমি ক্ষুণাক্ষরেও টের পাই আমার পারির মিসিং হ‌ওয়ায় তোমার অথবা তোমার পরিবারের হাত রয়েছে! খোদার কসম! জাহান্নামের স্বাদ পাইয়ে ছাড়ব তোমায় আমি!

_তোমাকে ভালোবেসে রোজ‌ই তো আমি একটু একটু করে জাহান্নামের আগুণে জ্বলছি! এর চেয়ে বেশি কি জ্বালাবে তুমি আমায়!

_হু কেয়ারস! তোমাকে ভালোবাসতে বলেছি আমি? তুমি জানতে না আমার ভালোবাসার মানুষ আছে? তুমি জানতে না আমার যতন করার মানুষ আছে? তুমি জানতে না আমার সবটা জুড়ে কারো সাম্রাজ্য বিস্তার করা রয়েছে! তবে কেন তুমি ভালোবাসার রুপে নারকীয় তাণ্ডব চালালে? শুধুমাত্র তোমারই কারণে আজ আমি সর্বহারাদের দলে। শুধুমাত্র তোমারই কারণে আজ আমি রিক্ত। তুমি... হ্যাঁ তুমিই সব কিছুর জন্য দায়ী। আই উইল নেভার ফরগিভ ইউ! নেভার এভার! এন্ড লিসেন... এখানের অধিকারীনি কেবল একজন! সে আমার পারিজাত! ওর সম্পদে হাত লাগানোর সাহস কেন করলে? শাস্তি তো তোমাকে ভুগতেই হবে।

সম্রাট কথা বলার পাশাপাশি নিজের সর্বোচ্চ শক্তি খাটিয়ে দরজা দুটো চেপে ধরে। তানহা দাঁত কামড়ে সম্রাটের শাস্তি উপভোগ করে। আর তানহার সহ্য শক্তিকে মনে মনে বাহবা দিয়ে সম্রাট বাঁকা হাসে।

_খুশি তুমি?

কারো ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বরে তানহার ধ্যান ফিরে। সে ছয় দিন পিছিয়ে গিয়েছিল। সামনে দাঁড়িয়ে তার দিকে অগ্নি বর্ষণ করা মায়ের প্রশ্নে থমকে চেয়ে রয়েছে। মিসেস মন্ডল তেড়ে এলেন মেয়ের দিকে। কাঁটা ছেঁড়ায় ব্যাণ্ডেজে মোড়া মেয়ের গালে সপাটে এক চড় বসিয়ে দিলেন। স্বামী, সন্তানের দুঃখ, বেদনায় জর্জরিত তিনি। আজীবন সম্মানকে মাথার তাজ বানিয়ে চলা জব্বার মন্ডলকে পুলিশের গাড়িতে চড়তে দেখার পর থেকেই তিনি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। ক্ষুব্ধ, মানসিক ভাবে আহত মিসেস জব্বার সব দোষ মেয়ের উপর চাপিয়ে দেন। দিকবেদিক হারা হয়ে এখন এখানে ছুটে এসেছেন। তানহা মায়ের হাতের চড় খেয়ে নিঃশব্দে চোখের কোঠরে জমিয়ে রাখা জলকনাকে মুক্ত করে দেয়। তিনি অসুস্থ মেয়ের গায়ে হাত তুলে আরো চটে যান। কিন্তু কার উপরে তা বুঝতে পারছেন না। মেয়ের দিকে ছল‌ছল চোখে তাকিয়ে গাল ভিজিয়ে ফেলেন। তানহা মায়ের সিক্ত মুখ আর বাবার নত মাথা কল্পনা করে ফিক করে হেসে দিল। ওর চোখে কান্না, ঠোঁটে হাসি। হাসতে হাসতে মায়ের দিকে চাইল। মিসের মন্ডল মেয়ের এমন হাসি দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। তানহা কান্না হাসি মিশিয়ে বলে,

_আমার‌ই দোষ! সত্যিই আমার‌ই দোষ! কাউকে ছোট থেকে ভালোবাসা দোষ! কাউকে ভালোবেসে আপন করতে চাওয়া দোষ! কারো ভালোবাসা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা করাও দোষ! ভালোবেসে কাঙালীনি হ‌ওয়াও আমার‌ই দোষ। কাউকে ভালোবেসে একটু ছোঁয়া পাওয়ার চেষ্টা করাও আমার‌ই দোষ। সত্যিই আমার দোষ! আচ্ছা আম্মু, ভালোবাসা আমার‌ দোষ না কি ভালোবেসে ভালোবাসার মানুষটিকে চাওয়া আমার দোষ! বল তো! কোনটা আমার দোষ!

এতটুকু বলে একটু থামে। পরপর‌ই আবার বলে উঠে,

_না! আসলে আমার বেঁচে থাকাটাই আমার দোষ। আমি বেঁচে থাকতে ওকে অন্যের হতে দেখতে পারব না। আর ও কোন দিন আমাকে মেনে নিবে না। তবে কী করা যায় আম্মু! আমি না থাকলেই তো সবার সব ঝামেলা মিটে যায়! বল? আমি না থাকলে তোমাকে‌ও তো কারো কত লোকের কথার মুখে পড়তে হয়! পাপাকেও মানুষ নিন্দে করে। আমি না থাকলে এতকিছু তো হতো না, বল!

_না মা এভাবে বলতে হয় না।

বলেই মিসেস মন্ডল মেয়ের মাথাটা নিজের বুকের উপর চেপে ধরল। তানহা অর্ধ শোয়া অবস্থায়ই মায়ের বুকে মাথা এলিয়ে দিল। বাবাকে গাড়িতে তোলার দৃশ্যটা ও টিভিতে দেখেছে। তখন থেকেই ওর ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে। মিসেস মন্ডল মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করে বলতে লাগলেন,

_দেখ মা, পৃথিবীতে যা হয় সব‌‌ই রবের ইশারায় হয়। তবে কিছু কিছু সময় আমাদের কর্ম দ্বারা আমাদের ভাগ্য পরিবর্তিত হয়। তুমি ভালোবাসো, সেটা তোমার কারণ! সে তোমাকে ভালোবাসে না, সেটা তার কারণ! তোমাদের দুজনের দৃষ্টি থেকে দু'টো কারণ! তাই বলে জোর করা যাবে না। জোর করে ভালোবাসা আদায় করা যায় না। ভালোবাসা একান্ত মনের ব্যাপার স্যাপার। কার প্রতি কখন, কীভাবে ভালোবাসা অনুভব হবে তা শুধু মন আর মনের মালিক জানে। এখানে কারো উপর প্রভাব প্রতিপত্তির জোর চলে না। কারো মনে অনুভূতি জাগানোর চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু জোর করে ঢোকা যায় না। যদি জোর করে লোকের মন পাওয়া যেত তবে কি পৃথিবীতে এত মন ভাঙার গল্প থাকত? তুমি আমার রাজকন্যা! তোমাকে আমরা পুতুলের মতোই লালনপালন করেছি। সেই তুমি একটা ছেলের জন্য, এমন একটা ছেলে যার কাছে তুমি মরলেও কিছু যায় আসে না। যে তোমার জানাজাও পড়তে চায় না। তবে কেন তুমি তার জন্য নিজেকে শেষ করছো? আমি মা, আমার কী কিছু পাওয়ার নেই তোমার থেকে? আমার কী কোন চাওয়া নেই তোমার থেকে? আমার জন্য করুণা হয় না তোমার? যে তোমাকে ভালোবাসা তো দূরের কথা, মানুষ বলেই মনে করে না। তুমি তার জন্য এত ডেস্পারেট হয়েছ! অথচ তুমি ছাড়া তোমার বাবা মায়ের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাদের কথা ভাবলে না একটা বার? আমরা কী ভালোবাসার যোগ্য ন‌ই তোমার?

তানহা নিরবে চোখের পানি ছাড়ছে আর মায়ের কথা শুনছে। ছোট থেকেই, সেই স্কুল জীবনের প্রথম দিন দেখা এক সুদর্শন কিশোরের প্রতিচ্ছবি ওর মানসপটে ভেসে উঠল। স্কুল কম্পাউন্ডের গোল চত্বর, যেখানে মূলত ছেলেরা বাস্কেটবল প্র্যাকটিস করে। তানহা নিজেও একজন প্লেয়ার ছিল। তেমনি একদিন ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের প্রতিযোগিতা হয়। বান্ধবীর প্রেমিককে জেতানোর তাড়ায় তারা হেরে যায়। তাই সবাই চলে যাওয়ার পর বান্ধবীর সাথে রাগ করে কড়কড়ে রোদের মধ্যে প্র্যাকটিস করছিল। অতিরিক্ত রোদ আর লাফালাফির দরুন ক্লান্ত তানহা হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে মাঠের ঘাসের উপর। সাদা শার্ট আর সবুজ স্কার্ট স্কুল পোশাক পরুয়া তানহার মুখটা তখন লাল টমেটো হয়েছিল। সে যখন ক্লান্ত হাত জমিনে ঠেকিয়ে উঠার জন্য চেষ্টা করতে লাগল ঠিক তখনই একটা সুঠাম হাত তার দিকে বাড়িয়ে ধরা দেখল। কপাল ঢেকে থাকা সিল্ক চুলের আড়ালে একজোড়া উজ্জ্বল চোখ। ঠোঁটের কোণে লেপ্টে থাকা মৃদু হাসি। সাদা শার্ট আর ডিপ সবুজ প্যান্টের সঙ্গে সাদা সবুজ চেইক টাই পরা গলায়। হাতে কালো রঙের মোটা লেদার বেল্টের বড় ডায়ালের ঘড়ি। সেদিন... ঠিক সেদিন‌আ তানহার কিশোরী মনে প্রেমের অঙ্কুর পতিত হয়। সেদিন থেকেই তানহা মনেপ্রাণে এই একজনকে চেয়ে এসেছে। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! সেই মানুষটি কোনদিন তানহাকে চাইল না!

____________________________________________

বাপ্পীর ধানমন্ডির সেই এগারো তলার ফ্ল্যাট আজ নববধূর বেশে সেজেছে। বাহারি সব দামি এবং বিদেশি খাবারের সুবাস এগারো তলার এগারো বি ফ্ল্যাট ছাড়িয়ে আশেপাশের ফ্ল্যাটেও ছড়িয়ে পড়েছে। বাচ্চাদের কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে কর্ণারের কক্ষ থেকে। বড়দের পদচারণায় গমগম করছে লিভিং এড়িয়া।
পারিকে ফিরে পাওয়া আর বাচ্চাদের স্বাগতম উপলক্ষে গেট টুগেদারের আয়োজন করেছে বাপ্পী, তন্নী। সম্রাট নিজেই করতে চেয়েছিল বড় করে। কোন ক্লাব অথবা রিসোর্টে। কিন্তু পারি ওদের ফ্ল্যাট গোছানো হলে সেখানেই করতে আগ্রহী। এদিকে সম্রাট নিজের খুশি দমাতে পারছে না। তাই সারপ্রাইজ গিফট হিসেবে বাপ্পী তন্নীই এই আয়োজন করেছে। অবশ্য এখানে ইনভাইটেড শুধু তাদের বন্ধু মহল। পারি একটা লাল গ্রাউনে নিজেকে সাজিয়েছে। সম্রাট ক্যাজুয়াল শার্ট আর গ্যাবার্ডিন পরেই ঘুরঘুর করছে। এদিকে তাদের একমাত্র মেয়ে মায়ের মত লাল টুকটুকে পরী দিয়ে পুরো ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে। অবশ্য ছুটে বেড়ানোর সময় খুব একটা পাচ্ছে না। সে আজ এর ওর কোলে চড়েই দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। আর তার ভাই! তার নাগাল‌ই কেউ পায় না। সে নিজের মত খেলে বেড়াচ্ছে অন্যদের সাথে। দলপতি হয়ে সবাইকে আদেশ করাই তার গুরু দায়িত্ব। এই নিন সবাই হেসে খুন।

_ভাই, নেতার ছেলে নেতাই হয়। তা আরো একবার প্রমাণ পেলাম।

সিয়াম কথাটা তাহসিনকে বলে। বন্ধুদের গেট টুগেদারের জন্য যে যেখানে ছিল সব ছুটে এসেছে। সবার প্রিয় বন্ধু সম্রাট। দীর্ঘ সময় একটা স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তার জীবনের স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে। সে একটা সুন্দর জীবনের শুরু করছে। এই মুহূর্তে তার পাশে থেকে তাকে অভিনন্দন জানানোর মত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন না করে থাকতে পারল না। তাই সবাই ছুটে চলে এসেছে। তবে সবচেয়ে বেশি মজার বিষয় হলো সম্রাটের বন্ধু মহলে মেয়ে দু'টো কেবল। একটা সম্রাটের, আরেকটা নাঈমুলের। নাঈমুলেরটা এখনও একবারে পুচকি। ছোট ছানা। আর সম্রাটের টা তো চড়ুই পাখির মতো ছটফটে। সে দুদন্ড কোথাও বসে না। অবিরাম এদিকে ওদিকে ছুটে বেড়ায়।

পারির দুই বান্ধবী এখনো এসে উপস্থিত হয়নি। পারি অপেক্ষায় চাতকের মতো চেয়ে রয়েছে দরজা পানে। দুপুর তখন প্রায় দু'টো। সবাই তখন খাবারের জন্য টেবিলে বসে পড়ল। ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠল। দরজা খুলল খালা। দরজার ওপাশে থাকা মানুষটাকে দেখে পারির চোখ খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠলো। আঁখি জোড়ায় প্লাবন বয়ে গেল। ওপাশের মানুষটার মধ্যেও এক‌ই অনুভূতি প্রকাশ পেল। তার চোখ ফেটে অশ্রুরাজীরা চিবুক ছুঁয়ে দিল। সে ভেজা নরম কণ্ঠে পারির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,

_ পারি! তুই বেঁচে আছিস?

বলেই সে পারিকে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিল। পারিও নিজেকে আটকাতে পারেনি। এতদিন পর প্রিয় বান্ধবীকে পেয়ে সে নিজের ভেতরের আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হল। নিশিকে জড়িয়ে ধরে সেও কেঁদে দিল শব্দ করে। মুহুর্তে ঘরের মধ্যে আবেগি অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। নিশি মেহরিন, ফারিহা পারির কাছে বান্ধবী কম, বোন বেশি। পারির নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিল ওরা। পারির খারাপ সময়ে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট পেয়েছিল ওদের থেকে। পারি নিশিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। ঠিক তখনই সিয়ামের কোলে থাকা সুখ মায়ের কান্না দেখে নিজেও কান্না শুরু করে দেয়। মেয়ের কান্নায় সম্রাট পারিকে থামানোর জন্য বলে,

_আমার মেয়ে কাঁদছে! দুই বান্ধবীকে কিন্তু শুলে চড়াব!

আমার মেয়ে শুনে নিশি পারিকে ছেড়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে সম্রাটের দিকে। নাঈমুল নিশির উদ্দেশ্যে বলে,

_বেয়াইন ভাগ্নি দেখবেন না? কেমন খালা আপনি, ভাগ্নির খোঁজ রাখেন না! আবার নাকি শুনলাম শ্বাশুড়ি‌ও হতে চেয়েছিলেন!

_মানে কী!

পারি নিশির চমকিত চাহনি দেখে হাসল। নিশির হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেল।
তাহসিনের থেকে সুখকে নিয়ে নিশির কোলে দিয়ে বলল,

_বলছিলি, পেটে রাখা অবধি‌ই কার আমার কষ্ট। এরপর তুই পালবি। আমার আর কোন কষ্ট করতে হবে না। নে এখন পেলেটেলে বিয়ে দিয়ে দিস।

_কিহ! সত্যিই! এই পুচকিটা তোর? সত্যিই এই পুতুলটা আমার পারির?

বলেই সে সুখকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। সুখ চোখ ছোট করে লেপ্টে র‌ইল খালার বুকের সাথে। তখনই ঘর থেকে ছুটে এদিকে আসে সমৃদ্ধ, বুরাক, তাহসিনের ছেলে তাসিন।
সমৃদ্ধকে দেখে সিয়াম কোলে তুলে নিশির কাছে নিয়ে আসে। নিশির সামনে ধরে বলে,

_নাও আরেকজন নাও। এটাকেও পেলে বিয়ে দিয়ে ওর বাপ মায়ের কষ্ট কমাও!

নিশি কৌতুহলী চোখে চেয়ে রইল। ওর চাহনি দেখে সবাই হেঁসে দিল একসাথে। সিয়ামের ব‌উ বলল,

_আপু আপনার বান্ধবী বোধহয় জোড়া কলা খেত বেশি। তাই আল্লাহ জোড়া ফল দিয়েছে।

_মানে কি! পারি সত্যিই! সত্যিই সত্যিই টুইন!

পারি মাথা উপর নিচ করল। ঠোঁটে মুচকি স্বলজ্জিত হাসি। নিশি দুজনকে এক সাথে কীভাবে কোলে নিবে? সে সিয়ামকে বলে,

_ভাইয়া আমার জামাইটাকে একটু এগিয়ে ধরেন তো। টপ করে কতগুলো চুমু খাই। ফারিহা এলে আর ভাগে পাব না।

সিয়াম সত্যিই এগিয়ে ধরল। নিশিও টপাটপ কতগুলো চুমু দিল সমৃদ্ধের মুখ জুড়ে। এদিকে চুমু বর্ষণে বিরক্ত সমৃদ্ধ বারবার হাত দিয়ে মুখ মুছছে। তা দেখে সবাই হেসে উঠল।

এর মধ্যেই এসে পৌঁছায় ফারিহা। সাত মাসের ভরা পেট নিয়ে সে ধীর পায়ে দরজা খোলা পেয়ে বিস্মিত চোখে ভেতরে পা রাখতে চমকে যাওয়ার মত উচ্চ আওয়াজ করে বলে উঠল,

_ও মাই রব! পারি! ইটস পারি! পারি!

বলেই সে ছুটে এলো পারির দিকে। ওর ভরা পেট নিয়ে এভাবে ছুটতে দেখে সবাই ভয় পায়। পারি ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে আটকাল। ফারিহার শরীর কাঁপছে থরথর করে। ও কাঁদতে কাঁদতে বলছে,

_তুই সত্যিই আছিস! আমি আল্লাহর কাছে সবসময় বলেছি, তুই যেখানেই থাকিস বেঁচে থাক। তোকে যেন আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখে। আল্লাহ আমার কথা শুনেছে। সত্যিই তুই ফিরে এসেছিস! আমি কীভাবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব!

_শুকরিয়া আদায়ের আরো কারণ আছে দোস্ত!

নিশি পাশ থেকে বলল। ওর কথায় ফারিহা পারিকে ছেড়ে নাট টানতে টানতে বলল,

_কী?

_এই যে দেখ! একা আসেনি। দু'জনকে নিয়ে এসেছে! এখন আমি কাকে রেখে কার দেখভাল করব? আমারটাই তো ডিম এখনও! এর মধ্যে পারির জোড়া! আবার তোর... আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের একসাথে এতগুলো বেবি হচ্ছে। দেখবি আমাদের মত ওরাও বেস্ট ফ্রেন্ড হবে।

নিশি গড়গড় করে নিজের খুশি জাহির করছে। নিশির পাশে দাঁড়ানো ফারিহার বর। সে নিশির কথা শুনে হাসছে।
ফারিহার ছলছল চোখ জোড়ায় খুশির ঝিলিক মেরে উঠল। ও পারির দিকে চেয়ে হেসে মাথা নাড়ায়। সত্যি কি-না বোঝার চেষ্টা করছে। পারি ওর হাত ধরে মাথা উপরনিচ করে। অর্থাৎ সত্যি!

বান্ধবীদের হাসি মজায় আরো কিছু সময় কাটল। এরমধ্যেই খাওয়া দাওয়ার পর্ব মিটল।

এখন সবাই বসে নিজেদের মত গল্প করছে। ঠিক তখনই প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে ফারিহার বরের কথা। দেখতে যেমনি সুদর্শন তেমনি যত্নশীল মনে হচ্ছে। প্রায় ঘন্টা লাগিয়ে খাচ্ছে ফারিহা। লোকটাও পাশে বসে দিব্যি খাইয়ে দিচ্ছে পারি সেদিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে নিশির সাথে গল্পের ছলে প্রশংসা করছে। এদিকে এই ছোট্ট বিষয়টাও হজম হচ্ছে না সম্রাটের
সে ভ্রু উঁচিয়ে পারির দিকে এক পলক দেখল, অতঃপর চোয়াল শক্ত করে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। হাতের মুঠ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। এটা বুঝতে পেরে পারি আড়ালেই হাসল। সঙ্গে তাল মেলালো নিশিও। একটুও পরেই নিশি নিজের মেয়ের কাছে চলে যায়। পারি সবার উপস্থিতি লক্ষ্য করে সম্রাটের দিকে এগিয়ে যায়। সম্রাট পাশে দাঁড়াতেই ছিটকে দাঁড়াল সম্রাট। চাপা কণ্ঠে ক্ষ্যাপাটে গলায় বলে,
_খুব অবজার্ভ করা হয় না।

_আরে তেমন কিছু না! এখন কি বান্ধবীকে বলব, ওর বর আমার বরের চেয়ে কম সুদর্শন!

লাভ হল না। সম্রাট ঐখান থেকে সরে যেতে যেতে বলল,

_আমি তোমার ছলনায় ভুলব না।

_আচ্ছা?

_হুম!

পারি এবার ইচ্ছে করেই আবারও আগের মতো করে তবে এবার এমন একজনের প্রশংসা করতে শুরু করল যাকে এখানের কেউ চিনে না। সুতরাং সে ভীষণ বাড়িয়ে চড়িয়ে মশলা মাখিয়ে করে বলতে থাকল। আবারও পারির মুখে অন্য পুরুষের প্রশংসা শুনে যখন সম্রাট চোখমুখে আঁধার নামিয়ে দাঁত কিড়মিড় করতে থাকল, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পারি মিটিমিটি হেসে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

_হেই পার্টনার! আই জাস্ট অনলি লাভ ইউ!

ব্যস্! সব রাগ, দুঃখ মুহুর্তে পানিতে ডুবে গেল। শক্ত চাহনি পরম সুখের আভায় ভেসে উঠল। ঠোঁটের কোণে এলিয়ে পড়ল এক টুকরো সুখ সুখ হাসি। যেই হাসি জানান দেয়, এই নারীটি তার। তার একান্ত সম্পত্তি। তার অর্ধাঙ্গিনী, তার সন্তানদের জননী, তার প্রেমিকা, তার প্রেয়সী।
সুতরাং সে যত‌ই অন্য পুরুষের রুপের প্রশংসা করুক! ভালো সে রুপ-শ্রীহীন তাকেই বাসে। এই নারীর কায়ামন জুড়ে শুধু তার‌ই বাস!

৩৭

_আংকেল আন্টির রিঅ্যাকশন কী?

তাহসিনের প্রশ্নে সম্রাট নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দৃষ্টি পথের ওপাশের বিল্ডিং ছাড়িয়েও দূরে। ডান হাত প্যান্টের পকেট ঢুকিয়ে বাম হাত ছেড়ে রেখেছে। তাহসিনের হাতে কোল্ড ড্রিংকস এর গ্লাস। ওর দৃষ্টি সম্রাটের দিকে। ওরা দাঁড়িয়ে আছে লিভিং রুমের পাশে থাকা বিশাল লনে। পারিজাত সমৃদ্ধকে ঘুম পারিয়ে দিচ্ছে। বাচ্চাটা সারাদিন ছুটোছুটি করায় কিছুক্ষণ আগে ক্লান্ত হয়ে মায়ের কাঁধে মাথা এলিয়ে ঘুমিয়ে যায়। সুখ অবশ্য তার খালা মনিদের আদর লুটে নিচ্ছে।

_ আর কি হবে! বাড়ি যেতে বলেছে ওদেরকে নিয়ে।

_যাবি?

_অসম্ভব!

_ কী বলছিস? উনারা তোর বাবা-মা! উনারা যাই করুক আমাদের অধিকার নেই শাস্তি দেওয়ার।

এবার‌ও সম্রাট কিছু সময় চুপ থাকল। অতঃপর ধীর গলায় বলল,

_একবার ভাব, পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা! অসুস্থ, দূর্বল! এমন একজন মেয়ে! যে কি-না তাদের পুত্র বধূ! একমাত্র! নাই বা মানুক তারা! তাতে কী! সত্য তো বদলানো যায় না। পারি তাদের ছেলের বৈধ স্ত্রী, তাদের ছেলের অংশ বয়ে বেড়ানো নারী। এটা তো বদলে যাবে না। তাহলে? মানবিকতা বলতেও তো কিছু আছে! কোন কুখ্যাত খুনিও তো এমন অবস্থায় নারীদের ওরকম অত্যাচার করে না। তবে তারা কী করে করল? তারা তো আমার‌ই বাবা-মা। আমার বাবা মা হয়ে, আমাকেই নিসন্তান করতে চাইছিল? হাও! সেদিন যদি ঐ সময়ে তারা পারিকে বের করে না দিত তবে আমার বাচ্চা গুলো এতিমের মতো শূন্য ঘরে জন্ম নিত না। আমার বাচ্চাগুলো পিতৃস্নেহ ছাড়া এত বড় হত না।

সম্রাট একটু থামল। ওর কণ্ঠস্বর কাঁপছে। তাহসিনের‌ও খারাপ লাগছে। সম্রাট‌ই আবার বলতে আরম্ভ করল,

_ হাহ্! তাদের সন্তান আমি। তাদের দেখভালের দায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ সব কিছুই আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এখানে ওদের কোন ভূমিকা নেই। তাই আমি চাই না আমার স্ত্রী সন্তান কেউ সেদিকে যাক। দরকার নেই। ওদের জন্য আমিই যথেষ্ট, সব হব। ইনশাআল্লাহ। আর তাদের সন্তানের দায়িত্ব‌ও সঠিক ভাবে পালন করতে পারব বলেই বিশ্বাস রাখি।

_একবার পরিচয়‌ও করাবি না?

_নাহ! আমি চাই না ওরা কখনো তাদের মুখোমুখি হোক। আমি যখনই ভাবি, আমার বাবা মায়ের কারণে আমার সন্তানরা তার মাতৃগর্ভে থাকতেই পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য ঘটনার শিকার হয়েছে, সবচেয়ে অপবিত্র স্থানে থাকতে হয়েছিল! আমার দেহের প্রতিটি কোষে স্ফুলিঙ্গের মত বারুদ ফুটে বেড়ায়। আমি খুব কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করি। তারা যদি আমার বাবা মা না হতো আমি তাদেরকেও ছাড়তাম না। জানিস, আমি পারির চোখে চোখ রাখতে পারি না। তারা আমাকে আজীবনের জন্য ছোট করে দিয়েছে নিজের স্ত্রী, সন্তানদের সামনে। আমি কোন দিন পারব, ওদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের সম্পর্কে দু'টো ভালো কথা বলতে? ভাব, যদি পারি সেদিন বুদ্ধি খাটিয়ে পালাতে না পারত তবে আজ কোথায় থাকত? কোথায় আমি ওকে পেতাম? কীভাবে আমি আমার সন্তানদের মুখ দেখতাম! আমার এই চাঁদের টুকরা দু'টো কোন নরকে পড়ে থাকত? আমি যখন এগুলো ভাবি... তারা তো বাবা মা! তাদের কোন কিছু বলার অধিকার তো স্রষ্টা দেন নি। কিন্তু নিজেকে তো..

_হিস! থাম! রিল্যাক্স হ! এখন আর ওসব ভাবিস না‌। যা হয়নি তা নিয়ে ভেবে কষ্ট বাড়িয়ে লাভ নেই। যা কিছু ঘটে তা তো রবের ইশারাতেই ঘটে। তাই সেসব মনে পুষে রেখে নিজের বুকের উপর চাপ দিতে নেই। বরং হয়নি বলে আলহামদুলিল্লাহ বলে শান্ত থাক। আর এখন ওদের নিয়ে ভাব। আল্লাহ তোকে চমৎকার দু'টো উপহার একসাথে দিয়েছে। পিছনের কথা ভুলে নিজেকে কষ্ট দিয়ে, নিজের ক্ষতি করে ওদের কষ্ট দিস না‌। এখন সময়টা আসলে ওদের। ওদেরকে বেশি বেশি সময় দে। পারিকে নিজের মতো করে সময় দে। দেখবি সব ভুলে গেছে। এখন তোর ভরা সংসার। সেটাতে সময় দে। আল্লাহ যা করার তা ভালো বুঝেই করেন। এখন তো আমরা বাবা মা, হয়তো একদিন আমরাও বাবা মায়ের এই বিষয়গুলো বুঝব। তাই ততদিনে নিজেদের প্রস্তুত করি।

বন্ধুর কথায় সম্রাট মৃদু ঠোঁট এলালো। কথাটা সত্য। সন্তান থাকা অবস্থায় যেসব কাজ আমাদের কাছে অন্যায়, অন্যায্য লাগে! এক সময় গিয়ে সেই কাজগুলোই আবার মানুষ পূনরাবৃত্তি ঘটায়! কেননা তখন সে‌ বাবা মা হয়ে যায়। মা বাবা সন্তানদের কল্যাণ চাইতে গিয়েই অনেক সময় অনেক জুলুম তাদের উপর করে যা সন্তানের মনে তাদের প্রতি বিতৃষ্ণা জমায়, ঘৃণায় পরিণত করে সব শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মান!

সবাই নিজেদের মত গল্প আড্ডায় সময় কাটাচ্ছে। পারি ছেলেকে ঘুম পারিয়ে মেয়ের পিছনে ছুটছে। কিন্তু সুখের নাগাল পাওয়া যায় না আজ। নিশি, মেহরিন ওরা সুখকে ছাড়েই না। যদিও নিশির নিজের‌ও মেয়ে। এদিকে মেহরিন শিগগিরই প্রথম সন্তানের মুখ দেখবে।

সন্ধ্যার চা নাস্তা পর্ব শেষ হবার পর সবাই মিলে বায়না ধরল সম্রাটের গান শুনবে। প্রথমে সম্রাট না না করলে পরে সবাই মিলে পারিকে ধরে। পারি ঠোঁট নাড়িয়ে বলার আগেই তার চোখের ভাষায় সম্রাট মৃদু হেসে সম্মতি দেয়। এ নিয়েও সবার মাঝে হাসাহাসি শুরু হয়ে যায়। বাপ্পী গিটার এনে দেয়। এই গিটার সম্রাটের। যেটা বহু আগেই বাপ্পী নিজের কাছে এনে রেখেছিল। গিটার দেখে আবেগি হয়ে পড়ে।
লিভিং রুমের ফ্লোরে সবাই আসন পেতে বসেছে। মধ্যমণি সম্রাট,পারিজাত। দীর্ঘদিন পর সম্রাট হাতে তুলে নিল নিজের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র, গিটারটাকে। যেটা তার মন খারাপের, ভালোর সঙ্গী ছিল এককালে। গিটারটা হাতে নিয়ে পারির দিকে চাইল। পারিকে হারিয়ে ফেলার পর আর কোনদিন এটাতে হাত দেয়নি। আজ দিনটা তার আর পারির। এক পশলা সুখের হাসি দিয়ে তারে আঙ্গুল রাখল। দৃষ্টি তার নিশ্চল, পারির রক্তিম বদনে, লজ্জামাখা চাহনিতে। সম্রাটের প্রেমমাখা গাঢ় চাহনিতে লজ্জায় সিক্ত হয়ে পারি স্বলজ্জিত হেসে নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল। লোক লজ্জার জড়তা কাটিয়ে মাথা এলিয়ে দিল সম্রাটের কাঁধে। সম্রাট প্রায় সাড়ে চার বছর পর গিটারে সুর তুলে গলায় আবেগ ঢেলে গেয়ে উঠল,

“Tere sang yaara
Khushrang bahara
Tu raat deewani
Main zard sitaara

O karam khudaya hai
Tujhe mujhse milaya hai
Tujhpe marke hi toh
Mujhe jeena aaya hai....!”

গানের তালে পারির প্রতি তার অনুভূতি প্রকাশ। পারির চোখ ছলছল করে উঠল। মনে মনে ভাবতে থাকে, একটা মানুষ এত কেন ভালোবাসবে? সে কি সত্যিই এত ভালোবাসার যোগ্য!

সম্রাটের গান শেষ হতেই সবাই কড়তালিতে মুখর করে তুলল লিভিং এড়িয়া। তন্নী পারির দিকে তাকিয়ে বলল,

_শুনেছি পারিও দারুন গায়। একবার কি শোনার সৌভাগ্য হবে?

তন্নীর কথায় পারি চোখ ঘুরিয়ে না না করে। নিশি কাকুতি মিনতি করে বলে,

_দোস্ত গা না! কতদিন হল তোর কণ্ঠে গান শুনি না। প্লিজ গা!

মেহরিন আবার নটাঙ্কিতে ওস্তাদ। সে নিজের পেটের ওপর হাত বুলিয়ে বলে,

_দেখ, আমার বাবুটাও তার খালা মনির গান শুনতে চাইছে। ওর মনটা ভেঙে দিস না প্লিজ।

পারি চোখ ছোট ছোট করে বলে,

_ বাচ্চাকে গান না, কোরআন তেলাওয়াত, হাদিস শুনিয়ে বড় করতে হয় গর্দভ।

_না আমার বাচ্চাটা বোধহয় সাংস্কৃতিকমনা হবে তাই আর কি! আমি মাঝে মাঝে ফিল করি ও গান শুনলেই পেটের মধ্যে নাচানাচি করে‌।

_কিহ!

ছেলেরা সব একসাথে মৃদু চেঁচিয়ে বলল। এদিকে রাব্বী ঠোঁট ভেঙ্গিয়ে বলে

_মা যেমন ছা তো তেমনি হবে। তুমিই তো নাচনকুদনে ওস্তাদ ছিলে। তো...

_আহ্!

তেহজীব চোখ রাঙানি দিল রাব্বীকে। মেহরিনের স্বামী কাছ ঘেঁষে বসে আছে মেহরিনের। ও কী ভাবছে! কিন্তু ভদ্রলোকের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সে বিষয়গুলো উপভোগ করছে। সবাইকে থামিয়ে সিয়াম বলে,

_হয়েছে! এবার থাম সবাই। পারি গাও তো বোন।
আমিও অনেকবার তোমার গলার প্রশংসা শুনেছি, আমার মনে হয় তোমার বান্ধবী ছাড়া সবাই ই কেবল প্রশংসা শুনেছে। গান শোনার সৌভাগ্য হয়নি। এবার একটু শোনাও। আমরা উপভোগ করি।

_শোনাও পাখি। আমি রাগ করব না। সমস্যা নাই।

_রাগ করবি না মানে কী? তুই নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছিস!

_অবশ্য‌ই! ব‌উটা আমার! তার সব লুকায়িত প্রতিভা উপভোগ করার অধিকারও আমার। এখানে আমি কাউকে ভাগ বসাতে দিতে পারি না।

_শালা তুই কী খারাপ! ওকে আমরা ছোট বোনের চোখে দেখি, তোর এমন জেলাসির জন্য ওকে কোনদিন মজার ছলেও ভাবী ডাকি না। আর তুই সামান্য...

_দিস ইজ নট সামান্য ব্রো! আমার পারির কণ্ঠে সুর ঝরে পড়ে। ও গাইলে শুনতেই ইচ্ছা করে। সুতরাং আমি চাই না ওর কণ্ঠে কেউ দিওয়ানা হয়ে ওকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিক‌।

_আল্লাহ! ভাই বোন আমারে কেউ এক গ্লাস লাল বিষ দাও‌। আমি খেয়ে টপকে যাই। তাও এসব দেখা, শোনা থেকে বেঁচে যাই।

তাহসানকে কেউ বিষ না দিলেও সম্রাটের যুক্তি শুনে হাসিতে খুন হয়ে যাচ্ছে সব।

পারি এদের বন্ধুদের মধ্যেকার খুনসুটিতে লাল টমেটো হয়ে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে তেহজিবের ব‌উ বলে উঠল,

_আপনারা প্লিজ থামুন। বেচারি ভাবী লজ্জায় জমে ক্ষীর হয়ে যাচ্ছে। প্লিজ! দেখুন পুরো রেড চেরি হয়ে গেছে মুখটা।

পারি এবার নিজের লজ্জাকে লুকাতে সম্রাটের বাহুতে মুখ লুকাল। সম্রাট পারির লজ্জারত কপাল দেখে মিষ্টি হাসল। গিটার থেকে হাত সরিয়ে পারির চুলে আদুরে ছোঁয়ায় হাত বুলিয়ে বলল,

_একটা গান গাও পাখি।

পারি মুখ তুলে। সম্রাটের চোখে চোখ রাখে। চোখের পলক ফেলে সম্মতি দেয়। সোজা হয়ে বসে। সম্রাট ওর দিকে তাকিয়ে সুর তোলার চেষ্টা করে। এক মিনিটের মাথায় পারি গেয়ে উঠল...

“অন্তর দিলাম বিছাইয়া,
ব‌ইসা ল‌ওনা জিরাইয়া!
যদি তোমার চায় মনে,
পরাণ রাইখ পরাণে!!
নয়ন রাইখা নয়নে!!

যদি কোন দিন আমি..
যাই গো..হারাইয়া
এই প্রেম, এই প্রীতি...
এই ভালোবাসার স্মৃতি।
স্বর্ণ লতার মত হইয়া
থাকবে তোমায় জড়াইয়া।
এইবার যদি আসে মরন
আদরে করিব বরণ!
ভয় কি আমার মরণে!!

এই অবধি গাওয়ার পর‌ই সম্রাটের আঙ্গুল থেমে গেল। ও পারির দিকে আহত চোখে তাকাল। পারির চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল কয়েট ফোঁটা অশ্রু। সম্রাট গিটার ছেড়ে পারির মুখটা দু হাতের আঁজলায় তুলে নিয়ে বলল,

_জান! কী হয়েছে? কতবার বলেছি না এই গানটা গাইবে না। তবে কেন?

পারি ফুঁপিয়ে উঠল। পরিস্থিতি, পরিবেশ ভুলে সম্রাটের বুকে মাথা গুঁজে দিল। ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সম্রাটের পিঠ খামচে ধরে বিরবির করে বলল,

_আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে। লোকে বলে পৃথিবীতে যা কিছু অধিক প্রিয় তাই স্রষ্টা তার বান্দার থেকে তুলে নেয়। আমার ভয় হচ্ছে! তানহার হাহাকার আমার সব শেষ করে দিবে না তো!

_হিস! কীসব নিয়ে ভাবছ! আল্লাহ এত নিষ্ঠুর নয় পাখি। নিশ্চয়ই তিনি আমাদের অন্তর পড়তে পারেন। এমন কিছু হবে না যেটা তার বান্দার উপর জুলুম হয়। কেন শুধু শুধু মন খারাপ করছো? আমরা তানহার সাথে অন্যায় করিনি। বরং ও নিজের থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ওর জীবনের সবচাইতে বড় ভুলটাকে ও শুধরে আমাদের সুন্দর ভাবে বাঁচার জন্য সবটা সহজ করে দিয়েছে। আমাদের উচিত এটার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা। এই মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করা। কেন এমন পাগলামি করছ।

পারির ভয়ের কারণে মুহূর্তে পরিবেশ গুমোট হয়ে গেল। আনন্দঘন আবহাওয়া দুশ্চিন্তা আর আতংকে ছেয়ে গেল।
তবে বেশিক্ষণ এমন থমথমে পরিস্থিতি টিকল না। যখন সুখ এসে বলল,

_বাবা আমিও গান ছুনব তোমার!

পারি সম্রাটকে ছেড়ে মেয়ের সরল আদুরে মুখটা দেখল। সুখ গিটার ডিঙিয়ে বাবার কোলে বসার জন্য ইতিউতি করছে। সম্রাট মেয়েকে কোলে বসাল। এর মধ্যেই হাজির হয় সমৃদ্ধ। ঘুমঘুম চোখে সেও বাবার কোলে বসার জন্য হাত বাড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠল,

_আমিও বাবাল কোলে বছব!

এবার সম্রাটের সামনে থেকে গিটার তুলে নিল বাপ্পী। এরপর সম্রাটকে বলল,

_নে এবার তুই গা!

সম্রাট তার দুই পাশে দুই সন্তানকে বসাল। পারি একটু এগিয়ে বাচ্চা সহ বাচ্চাদের বাবার গা ঘেঁষে বসল। বাপ্পী সুর তুলতেই সম্রাট বাচ্চাদের কপালে চুমু খেল। পারিকে এক হাতে নিজের সাথে চেপে ধরে গেয়ে উঠল,
_ লক্ষীসোনা,
আদর করে দিচ্ছি তোকে
লক্ষ চুমু, মায়া ভরা তোরই মুখে!!
কলিজা তুই আমার,
তুই যে নয়নের আলো,
লাগে না, তুই ছাড়া,,
লাগে না তো যে ভালো।
রূপকথা তুই তো আমারই,
জীবনের চেয়ে আরও দামী!!....


৩৮

ডিনারের পর্ব শেষ করে সবাই যখন চলে গেল তখন রাত প্রায় বারোটা ছুঁই ছুঁই। তন্নী, পারি মিলে গৃহকর্মীদের সহযোগিতা করে সব কিছু গুছিয়ে রাখতে। এদিকে লিভিং এড়িয়া ক্লিনিং এর কাজ বাপ্পী, সম্রাট মিলে শেষ করে এখন তারা নিজেরা ফ্রেশ হচ্ছে। বাহার বেগম বেশ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। উনার সঙ্গে বুরাক‌ও, যেহেতু বাচ্চাটা দিনে একবার‌ও ঘুমায় নি। তাই ডিনার করার আগেই তাকে ঘুম পাড়াতে হয়েছে। নয়তো ঘ্যানঘ্যান করতো। পারিও সুখকে একরকম জোর করেই ঘুম পাড়ায়। সে ভীষণ বিরক্ত করছিল। এদিকে সমৃদ্ধ বিকেলে ঘুমিয়ে এখন চোখ বড় বড় করে চেয়ে রয়েছে। বলতে হয় সে এখনও সজাগ। এই মুহুর্তে সে ব্যস্ত বাবার গিটার নিয়ে। গিটারের টুংটাং শব্দ তার কাছে দারুন কিছু লাগছে। সমৃদ্ধ নিজের ছোট ছোট আঙ্গুল দিয়ে তারে একটু ছোঁয়া দেয়, তাতে টুং করে শব্দ সৃষ্টি হয়। সেটা দেখে নিজেই আবার দু হাতে তালি বাজায়।

সম্রাট ফ্রেশ হয়ে এসে ছেলের প্রাণবন্ত হাসি দেখে হাসে। ছেলেকে কোলে তুলে হাঁটুর উপর বসিয়ে বলে,

_আমার বাবা গিটার বাজানো শিখবে?

_হুম!

_ওকে!

ছেলেকে কোলের মধ্যে বসিয়ে সামনে গিটার রেখে নিজের আঙ্গুলের মাঝে ছেলের আঙ্গুল মিশিয়ে সুর তোলার চেষ্টা করে।
পারি বাইরের সব পরিষ্কার করে ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত মেয়ের মুখ দেখে স্মিত হাসে। বারান্দা থেকে গিটারের সুর ভেসে আসছে। মেয়ের কপালের উপর উড়ে এসে জুড়ে বসা চুলগুলো সরিয়ে বারান্দায় গেল। বাবার কোলে বসে গিটারের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ছেলে। তা দেখে মিষ্টি হেসে পাশে গিয়ে বসে। সম্রাট পারিকে দেখে চমৎকার করে হাসল। ওর চোখে অন্যরকম দিপ্তী ফুটে উঠেছে। বহুদিনের একটা চাওয়া পূর্ণ হয়েছে। পারি সম্রাটকে এভাবে হাসতে দেখে নিজেও হাসল। সম্রাটের চাহনিতে চাহনি মিলিয়ে অফুরন্ত সুখের আবেশ অনুভব করল। ওদের ধ্যান ভাঙল সমৃদ্ধের উচ্ছ্বাস মাখা কণ্ঠে,

_আম্মু, বাবা আমাকে ছিখায়!

_তাই!

_হুম!

_আচ্ছা শিখো।

পারি ছেলের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বলে। সম্রাট মা ছেলের হাস্যোজ্জ্বল মুখ পরখ করে এবার সত্যিই গানের সু্র তুলে, তার চোখ তখন‌ও পারির দিকে, ঘোর লাগা চাহনিতে চেয়ে থেকেই গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল,

“আমি তোমারই প্রেম ভিখারি
ভালোবেসে ঠাঁই দিও পরানে গো...
ভালোবেসে ঠাঁই দিও পরানে!
আমি তোমারই, তুমি আমারই
পাশে থেকো জীবনে মরণে গো
পাশে থেকো জীবনে মরণে!"

এই গানটা গেয়েই দ্বিতীয়বার সবার সামনে পারিকে প্রপোজ করেছিল সম্রাট। গানের তালে তালে তাকে পাওয়ার আকুতি তার কঠোর মনকে ভিজিয়ে দিয়েছিল সেদিন। সে পারেনি দ্বিতীয় বারের মতো মানুষটাকে ফিরিয়ে দিতে। সে নিজেও তো কাঙাল। কাঙ্খিত আবেদনে সাড়া দিয়ে সেদিন সে হ্যাঁ বলেছিল। পারি ছলছল চোখে চেয়ে রইল সম্রাটের উজ্জীবিত বদন পানে। এই মুহুর্তে সম্রাটের গলায় ভাসল,

_তোমারে আমি যে কত ভালোবাসি গো বোঝাব, কেমনে বোঝাব?
তোমারে না পেলে জানি আমি জানি গো, মরিব অকালে মরিব!
ভালোবেসে ঠাঁই দিও পরাণে গো...!!

পারির চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল আবার‌ও কয়েক ফোঁটা জল। সে বুঝেই পায় না, তাকে এত উন্মাদের মত ভালোবাসার কারণ কী? ঠিক এভাবেই সেদিন পুরো মজলিসের মাঝে আকুতি করে চাইছিল তার প্রেম। যে প্রেমের জোয়ারে পারি ভেসে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এরপর আর কোনদিন পারিকে পিছনে ফিরে দেখতে দেয়নি লোকটা। এক মুহুর্তের জন্যেও পারির মনে আফসোস সৃষ্টির সুযোগ দেয়নি। প্রতি মুহূর্তে, প্রতি ক্ষণে সে পারিকে উপলব্ধি করিয়েছি তাকে ভালোবেসে পারি ঠকেনি। তার ভালোবাসা পারির অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে রেখেছে লোকটা। গানের মূর্ছনায় ভাসল পাশের বিল্ডিং এর দম্পতি‌ও। বারান্দার গ্রিলে গাল ঠেকিয়ে চেয়ে রয়েছে এদিক পানে। বাপ্পী, তন্নী‌ও মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে খাটের উপর হাঁটু ভাঁজ করে মনোযোগ দিয়ে শুনছে। তন্নী বাপ্পীর বুকে মাথা ঠেকিয়ে অনুভব করছে বাপ্পীর বুকের মাঝে ঢিপঢিপ করা যন্ত্রখানির অবিরত গুণগুণ। পারির চোখ সরে না। বরং সে হারিয়ে গেল স্মৃতির পাতায়। চলে গেল সেই দিনগুলোতে যেদিন গুলো ছিল তাদের একান্ত প্রেমের কাব্য গাঁথার।

অতীত.....

প্রায় এক মাস পর ক্যাম্পাসে পা রাখে পারি। ঢাকায় এসেছে কয়েক দিন হলেও ক্যাম্পাসে আসেনি ইচ্ছা করেই। কিন্তু আজ পরীক্ষার জন্য আসতেই হল, খুব শিগগিরই পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে। আর পড়াশোনাই পারির একমাত্র আপনজন। সুতরাং পড়াশোনার প্রতি অবহেলা সে করতে পারে না। ক্লাস শেষ করে ক্যাম্পাসের গেইটে এসে দাঁড়াতেই ওর সামনে এসে হাজির হয় ফারিশ।
পারিকে আড়াল করে দাঁড়াতেই পথের ওপাশে অপেক্ষায় থাকা কাঙ্গালটির বাড়িয়ে দেওয়া পা থেমে গেল। পারিকে আড়াল করে দাঁড়ানো লম্বা, চ‌ওড়া দেহী পুরুষের পিছন দিকে কৌতুহলী চাতকের মতোন জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকিয়ে র‌ইল।

সম্রাট দাঁড়ানো গেইট বরাবর বসা নতুন একটি চায়ের দোকানের ছাউনির নিচে। অপেক্ষা করছিল পারির বের হবার, নিশির মাধ্যমে খবর পেয়েছে আজ পারি ক্যাম্পাসে এসেছে। শুনতে দেরি হলেও তার এখানে পৌঁছাতে দেরি হয়নি। চাইলে তো সে পারির বিল্ডিংয়ের সামনেও চলে যেতে পারে কিন্তু তাতে পারির দিকে সবাই বাঁকা চোখে তাকাবে যা সে চায় না। সে চায় না তার জন্য পারির গায়ে কলঙ্কের চিহ্ন লাগুক। তাই তো এদিকেই ঘুরঘুর করে, যেটা তার আয়ত্তে আছে।

সম্রাট যেই দোকানে দাঁড়ানো তার থেকে একটু সামনে ফুটের উপর পা ঝুলিয়ে বসা দু'টো ছেলে। যারা পারিকে নতুন একটি ছেলের সাথে দেখে তির্যক হাসে। দু'জনের মধ্যে একজন বলে উঠল,

_এইডা ঐ মালডা না, ঐ যে বিরক্ত করে ব‌ইলা এক পোলারে পিটাইছিলো ক্লাবের পোলাপাইনরে লগে নিয়া?"

“হুম!"

“এই মাল দেখি একেক দিন একেক ক্লায়েন্ট নিয়া আসে! কি রে ভাই? এরা এগুলা করে তাতে দোষ হয় না, আর আমরা প্রস্তাব দিলেই দোষ?"

“ক‌ওন যাইবো না। ক‌ইলেই ক‌ইবো হুজুরের মুখ খারাপ।"

ছেলেটা কথাটি বলেই হেসে দিল, সঙ্গের জন‌ও হাসতে হাসতে বলল,

_ভাই মালডার কিন্তু খোমা সুন্দর আর মালডা মাল‌ও পটায় দেইখা দেইখা পয়সা‌ওয়ালা।"

_হ চেহারাই তো এগো বড় সম্পদ। চেহারা দিয়াই তো জগতে চলে। দেহোস না বেশিরভাগ আহে জরিনা, বছর পার ‌অ‌ইতেই অইয়া যায় ক্যাটরিনা! এই রূপ আর দেহ দিয়াই এই মালগুলা...

কথা শেষ করার আগেই লাথি খেয়ে গড়িয়ে ফুট থেকে নিচে রাস্তার মাঝ বরাবর গিয়ে পড়ল। মুহুর্তে
চারপাশের পরিস্থিতি থমকে গেল। সম্রাট চোয়াল শক্ত করে, হাতের মুষ্টি চেপে ধরে, নিজের ক্রোধের সর্বস্ব সীমায় পৌঁছে, গায়ের সব শক্তি দিয়ে লাথিটা মেরেছিল। রাগে ওর গা‌'ও কাঁপছে। ঐ ছেলেটার পাশের ছেলেটা আচানক এমন কান্ডে পিছন ঘুরে তাকাতেই সম্রাটকে দেখে থমকে গেল। ভীত চোখে ধীর গতিতে উঠতে উঠতে হাত উঁচিয়ে অপরাধ স্বীকার করার ন্যায় আমতা আমতা করে বলতে লাগল,

“ভাই মাফ ক‌ইরা দ্যান। ভুল হ‌ইয়া গ্যাছে। মাফ ক‌ইরা দ্যান। আর কমু না। আজক...

“শূয়োর কাকে মাল বলছিস? তোদের বলা হয়েছে না ক্যাম্পাসের তিনশো গজ দূরেও থাকবি না। তারপরেও এখানে বসে...বিচ, সাহস কী করে হয়!"

পরপর সম্রাটের ক্ষীপ্র গতির তিনটা চড় পড়লো ছেলেটার মুখে, ঘাড়ে। অপরদিকে লাথি খেয়ে পড়ে যাওয়া ছেলেটা উঠে পালানোর জন্য দৌড় দিতেই সম্রাটের পাশে থাকা মাহাদ, রাব্বী গিয়ে খপ করে ধরে ফেলল। সম্রাট ঐ ছেলেটাকে ধরে রেখেই মাহাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দুইটাকেই ক্লাবে ঢুকা। সিয়ামকে বলবি হ্যান্ডেল করতে।"

ছেলে দু'টো অনুনয় করে বারবার বলছে,

“ভাই, ভাই, ভাই মাফ ক‌ইরা দ্যান। আর এদিকে আসমু না! আজকের.."

“তোর প্রথম অন্যায় তুই এখানে এসে আড্ডা দিচ্ছিস, তাও মানা যেত। কিন্তু তুই এখানে বসে মেয়েদের উদ্দেশ্যে নোংরা কথা বলছিলি তাও আবার কাকে নিয়ে.. তোর সাহস কী করে হয় ওকে নিয়ে এসব বলার?"

সম্রাট কথা শেষ করেই ছেলেটার পেটে লাথি মারল। এত শক্ত পোক্ত দেহের লাথি খেয়ে ছেলেটা ভত করে আওয়াজ তুলে বমি করে দিল। পেটের থেকে সব উগড়ে দিতেই মাহাদ, রাব্বী নাক কুঁচকে সরে দাঁড়ায়। রাস্তার এদিকের গোলযোগে মুহূর্তে জ্যাম লেগে গেছে পুরো সড়কে। মানুষ, গাড়ির কোলাহলে মুহূর্তে তৈরি হল আতংকিত পরিবেশ। ঐ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ফারিশ, পারি ভ্রু কুঁচকে এদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে কী ঘটছে এখানে। কিন্তু ফারিশ আইনের লোক। সে তো চুপচাপ দেখতে পারে না। ও কঠোর স্বরে পারিকে বলল,

“এখানেই দাড়া, আমি গিয়ে দেখি কি হচ্ছে ঐখানে!"

পারি‌ও উৎসুক চোখে চেয়েছিল এবং চেয়েই র‌ইল, ফারিশের শেষ বলা কথাটি ওর কানে ঢুকেনি। ওর দৃষ্টি স্থির ঐ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা রাগে রক্তিম বর্ণ ধারণ করা পুরুষটির দিকে। ধূসর রঙের শার্টের হাতা গুটানো। ঘামে চেষ্টের দিকের অংশ ভিজে কালো রূপে বিবর্তন হয়েছে। কপালের উপর পড়ে রয়েছে কয়েকটি চুল। মানুষটি দাঁতে দাঁত চেপে চোয়াল শক্ত করে উচ্চ স্বরে কারো উদ্দেশ্যে গালি দিয়ে উঠল,

“বাস্টার্ড!"

“দেখি তো ভাই, কি হয়েছে এখানে?"

ফারিশ ভীর ঠেলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়, মানুষ উৎসুক চোখে দেখছে। যেন সিনেমার শুটিং হচ্ছে! রাব্বী, সম্রাটের হাত থেকে ছেলেটাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলতে লাগল,

“ভাই, মাঙ্গের নাতিরে আমার কাছে দেন। ওর থোতা ভাইঙ্গা চাটনি বানায় দিমু, কত্ত বড় সাহস আমগো ভাবীরে নিয়া...

এতটুকু উচ্চারণ করেই সম্রাটের রক্ত চোখ দেখে থেমে গেল। ছেলে দু'টো মাফ চেয়েও কুল পাচ্ছে না।

“কী হচ্ছে এখানে ?"

এবার ফারিশ সরাসরি সম্রাটের দিকে তাকিয়েই প্রশ্ন করল। সম্রাট তিরিক্ষি মেজাজে চোখ তুলে ফারিশের দিকে চাইতেই থমকে গেল ফারিশের পাশে দাঁড়ানো পারিকে দেখে। পারি ভীত চোখে সম্রাটের দিকে চেয়ে আছে। ফারিশের খুব কাছাকাছি, একটু দুরত্ব। যতটা গুচলেই একে অপরের ছোঁয়া পাবে। ওর বুকের ভেতরে ধক করে উঠল। সুচারু ব্যথা অনুভব হল। ফারিশ সম্রাটের চাহনি দেখে ভ্রু কুঁচকে নিল, সম্রাটের স্থির চাহনি অনুসরণ করে নিজের পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে চাইতেই ভীত, শংঙ্কিত পারিকে দেখে রাগান্বিত সুরে বলল,

“এখানে কেন? বলেছিলাম না ঐখানেই দাঁড়াতে! যাও বলছি!"

ফারিশের ধমকে পারি চমকে উঠল। সম্রাটের থেকে চোখ নামিয়ে নিম্নমুখী করে দাঁড়িয়ে রইল, ফারিশ এবার সিরিয়াস রাগ দেখিয়ে বলল,

“কি হল?"

পারি মাথা দুদিকে ঘুরিয়ে নিচু কণ্ঠে বলল,

“হু!"

বলেই ও চলে গেল। একবারও পিছনে ফিরে তাকাল না। ওর ঐ শান্ত, ভীত চাহনি আর ফারিশের ওর প্রতি এত অধিকার খাটিয়ে শাসন! সম্রাটের ভেতরে প্রশ্নেরা উতলে আসার প্রয়াসে চাপ দিচ্ছে মস্তিষ্ককে। কী সম্পর্ক দু'জনে মধ্যে? কী সম্পর্ক থাকলে এত অধিকার, এত মান্যতা থাকে? পারির বড় ভাই, ছোট ভাই, কোন ভাই নেই দ্বিকুলে। পারির যতটা সে জানে ততটায় পারি একা। তবে কী সম্পর্ক এই পুরুষের সাথে? তবে কী পারি তাকে, হৃদয়কে এই পুরুষের কারণেই গ্রহণ করতে পারেনি? পারি অন্য কারো?

বুকের উপর কয়েকশ টন ওজনের পাথর চাপায় বুক ফেটে মানুষ মারা যায় কিনা সম্রাটের জানা নেই, তবে সম্রাটের মনে হচ্ছে যেকোন সময় ওর হার্ট ব্লাস্ট করবে। দেহের প্রতিটি কোষে কোষে পারি নামক রমনীকে হারিয়ে ফেলার তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়েছে। ওর হাত কাঁপছে, গা কাঁপছে। রাব্বী সেটা অনুভব করে সম্রাটের কাছাকাছি এসে ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল,

“ভাই, আপনি ঠিক আছেন? আমার মনে হচ্ছে..

“কি হচ্ছিল এখানে? আপনারা এভাবে ছেলেগুলোকে মারছেন কেন?"

“মারতে ইচ্ছা করছে মারছি। আপনাকে কেন বলব, ওদের তো দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেওয়া উচিত! আমরা তো ভালো মানুষ, তাই মাত্র কয়টা চড় দিছি।"

“এমন একটি পাবলিক প্লেসে, একটা মহিলা কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে মাস্তানি মারাস? চৌদ্দ শিকের মধ্যে নিয়ে গরম ডিম থেরাপি দিলে টের পাবি .."

মাহাদের ত্যাড়া কথায় ফারিশের এবার সত্যিই রাগ চড়ে গেল। ছেলে দুটোর অবস্থা সত্যিই খারাপ। ও ছেলে দুটোর দিকে একবার তাকিয়ে নাটের গুরু সম্রাটকে মনে হল তার, তাই সে সরাসরি সম্রাটকেই বলল,

“আপনার পরিচয়? আর এদের অপরাধ কী?"

সম্রাট ফারিশের কথার ধরনে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে। এমনিতেই পারিকে তার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে, তার মধ্যে পারিকে তার সামনেই ধমক দিয়েছে, আবার তার সামনে দাঁড়িয়েই তার ছেলেদের বলছে চৌদ্দ শিকে পুরবে! ফারিশের গুড গেটাপ আর ফর্মাল ড্রেসাপ তার প্যাশন সম্পর্কে ধারণা দেয়। সম্রাট বুঝে নিল নিজ দায়িত্বে, যে লোকটা কোন লিগ্যাল প্রফেশনে রয়েছে যার জন্য এত গরম তার।
ও কথা বাড়াতে চাইছে না। পারি সংক্রান্ত কোন মানুষের সাথেই ও ঝঞ্ঝাটে যেতে চায় না। তাই ও ভেতরের রাগকে ভেতরে দাফন করে খুব শান্ত, নিস্পৃহ গলায় বলল,

“ওরা এখানে বসে মেয়েদের টিজ করেছে, তাই মার প্রাপ্য!"

“উনারা মেয়েদের টিজ করেছে তাই উনাদের আপনি মারবেন? আপনি কে? পুলিশ, র্যাব, আর্মি, ম্যাজিস্ট্রেট? আপনার পরিচয় প্লিজ!"

ফারিশ ধমকে ধমকে কথা বলছে। স্বভাবতই আইনের লোক বাইরে এমন কোন পরিবেশে কারো সাথে কথা বললে তাদের গলার স্বর চ‌ওড়া হয়ে যায়। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। ফারিশ ছেলে দুটোর হাল দেখে আরো বেশি ক্ষেপে গিয়েছে তাই না চাইতেও ওর কণ্ঠস্বর ঝাঁজালো লাগছে। সম্রাটের এবার সত্যিই ধৈর্য্যে কুলাচ্ছে না। ওর ভেতরে যে কি ঝড় বয়ে যাচ্ছে ফারিশকে দেখে তা শুধু ঐ অনুভব করতে পারছে। রাব্বী সম্রাটের দিকে চেয়ে কিছু বুঝে নিল আপন মনেই। এরপর ফারিশের দিকে তাকিয়ে বলল,

“দেখেন ভাই, আমরা এই এলাকার‌ই ছেলে। যুব সংসদের সদস্য। আমাদের এলাকায় মহিলা কলেজ দেখেই এখানে আমরা বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ করেছি। এরাও তাই, আর শুধু বহিরাগত‌ই না। এরা এখানে বসে মেয়েদের নিয়ে আজেবাজে কথা বলছিল। তাই ...

“কোন যুক্তিতেই আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার আপনার নাই। আপনাকে আইন সেই অধিকার দেয়নি। সমস্যা যত‌ই জটিল হোক, আইন রয়েছে তার সমাধানের জন্য। সুতরাং..."

“আরে ভাই সেই কখন থেকে আইন আইন করতাছেন! কোন আইনের কথা বলতাছেন আপনে, যেই আইন পাঁচ হাজার টাকায় ধর্ষিতা নারীর ইজ্জত বেঁচে দেয় সেই আইনের কথা? সেই আইন করবো ইভটিজিংয়ের বিচার? আইজ পর্যন্ত একটা পাইতে দেখছেন এই বিচারের ফলাফল? আর আপনে যে এগো ল‌ইগা এত দরদ দেখাইতাছেন জানেন এরা কারে টিজ করছে?"

“থাম!"

মাহাদকে থামিয়ে দিল সম্রাট। এরপর নিজেই বলতে লাগল ,

“আমরা ওদের পুলিশের হাতেই দিব। আপনার মেজাজ দেখে মনে হচ্ছে আপনি আইনের কেউ। না হলেও সমস্যা নেই, চাইলে আমাদের সাথেই যেতে পারেন।"

ফারিশ সম্রাটের শীতল আচরণে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। এত সময় এই ছেলেটা ভীষণ রাফ অ্যান্ড টাফ আচরণে ছিল। সে দুর থেকেই দেখেছ কীভাবে ছেলে দুটোকে মেরেছে অথচ এখন একদম শান্ত।
সম্রাট সত্যিই স্থানীয় থানায় ফোন দিয়ে নিজের পরিচয় দিতেই ওপাশ থেকে জানালো আসছে। থানা কাছাকাছি, দশ পনেরো মিনিটের পথ।

পারি রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে আর বোঝার চেষ্টা করছে এদিকে কী ঘটছে! মিনিট আট পের হতেই পুলিশ আসে।

“হেই সম্রাট ভাই, কী খবর?"

পুলিশ এসেই সম্রাটের সাথে মিলাল যা দেখে ফারিশের ভ্রু আরো কুঁচকে এলো।

“এইতো অফিসার, আপনাকে ফোনে যা জানালাম অবস্থা তাই। এই শুয়োর এখানে বসে আড্ডা দিচ্ছিল, যদিও তা বিশেষ সমস্যা নাই। কিন্তু ওরা মেয়েদের নিয়ে বাজে কথা বলছিল। তাই.."

“হেই চো**নার পুত, মাইয়া মাইনসের কলেজে সামনে কী করো? থানায় নিয়া ডিম পিছন দিয়া হান্দাইলে.."

“আর করমু না স্যার। জীবনেও আর এইদিকে আমু না। জীবনেও আর কোন মহিলা কলেজের সামনে যামু না। মাফ ক‌‌ইরা দেন!"

“ছাড়ব, আগে শ্বশুর বাড়ির দাওয়াত খাও তারপর ছাইড়া দিব। এত ভালো কাজ করলা, একটু আদর যত্ন না করলে হয়। চল শুয়োরের বাচ্চা!"

বলেই অফিসার হাবিলদারকে ইশারা করলেন গাড়িতে তুলতে। ফারিশ বিস্মিত চোখে দেখল কেবল। অফিসার আর কারো সাথে কথা বললেন না। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না, কোন সাক্ষী নিলেন না। আসলেন, সম্রাটের হাতে মিলিয়ে কুশলাদি বিনিময় করলেন অতঃপর ছেলে দু'টোকে গাড়িতে তোলার নির্দেশ দিলেন! সিরিয়াসলি? ফারিশের হতবাক চাহনিতে পাত্তা না দিয়ে সম্রাট বলল,

“আই হোপ আপনি খুশি এবার। আশা করি এখন সব আইনানুযায়ী হবে। আসি, ভালো থাকবেন! চল!"

ছেলেদের উদ্দেশ্য শেষ শব্দটি বলে নিজের ভাঙ্গা মন, ক্লান্ত দেহ নিয়ে পা বাড়ালো নিজের ঠিকানায়। আড়চোখে দুরে অপরাধী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীকে এক পলক দেখেই দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল। নিজেকে সতর্ক করে আপনমনে বলল,

“সে তোর নয়, নিজের দৃষ্টি সংযত কর। সে অন্য কারো রমণী। তার দিকে তাকানো‌ও পাপ!"

সময় গড়ায়, ফুরায় জীবনের মুহূর্তগুলো। মানুষের মন গুলো সময়ের তরঙ্গের তালে ভিন্ন রঙে মাতে, ভিন্ন মেজাজে সাজে। তাতে কারো হস্তক্ষেপ কার্যকরী নয়। সবটাই স্রষ্টার ইচ্ছায়, প্রকৃতির নিয়মে চলে। পারির পরীক্ষা শুরু হয়ে শেষ‌ও হয়ে গেল। এদিকে সেদিনের পর পারি সম্রাটের ছায়াও কোথাও দেখতে পেল না। তাতে ওর মস্তিষ্ক, বিবেক খুশি হলেও মন তো পুড়ছে। সম্রাট এভাবে কেন গা ঢাকা দিল? শুধুমাত্র সম্রাটকে এক নজর দেখবে বলেই তো সে আবারো বাচ্চাদের নিয়মিত পড়ানো শুরু করেছে, কিন্তু সেখানে অন্যরা আসলেও সম্রাটের পায়ের ধুলো পড়ল না একবার‌ও।

বিছানায় হাঁটুর উপর থুতনি ঠেকিয়ে গভীর ভাবনার অতলে ডুবে রয়েছে পারি। ঠিক তখনই ওর মুঠোফোনটি বেজে উঠল। ভাবনার অতলে থাকা পারি সেই শব্দে চমকে উঠে, এদিক ওদিক দেখে খুঁজে পেল নিজের ডান পাশে কামিজের কাপড়ের নিচে। মোবাইলটি নিয়ে দেখল নিশির কল।

“হ্যালো!"

“কি করিস?"

“কিছু না।"

“মন খারাপ?"

"না!"

পারি না বললেও ওর কণ্ঠ কাঁপছে। নিশি বুঝতে পেরে কিছুক্ষণ চুপ থাকল। এরপর বলল,

“তুই চাইলে আমি ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ করতে পারি, যদি তুই তার সাথে সরাসরি কথা বলে..."

“না দরকার নেই। আমি ঠিক আছি!"

“সত্যিই ঠিক আছিস তুই?"

এবার পারি চুপ করেই র‌ইল। নিশি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আচ্ছা তুই কি বাইরে যাবি? তবে আমি আসি, দুই জনে অনেক দিন হলো বাইরে কোথাও ঘুরতে যাই না। ফারিহাকেও বলছি আসতে!"

“আচ্ছা আয়!"

“ঠিক আছে আমি রেডি হচ্ছি, তুই‌ও হ।"

বলেই নিশি কল কেটে দিল। কল কাটতেই পারি কান থেকে ফোন সরিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই ওর চোখ আটকালো নোটিফিকেশন বাবলে। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সম্রাট মাহমুদ তালুকদারস আপলোডেড অ্যা আপডেট। বাবলে ক্লিক করতেই সেটা সোজা নিয়ে পৌঁছালো সম্রাটের ফেসবুক প্রোফাইলে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা সুন্দর তবে ভয়ংকর সুন্দর ছবিটি দেখে পারির দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল তার উপর, পলকহীন চোখে দেখতে থাকল, সুন্দর, অপ্সরার মতোন সুন্দর নারীর গা ঘেঁষে হাস্যোজ্জ্বল মুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকা সুদর্শন পুরুষটিকে।
পারির স্বভাব বহির্ভূত একটি কাজ পারি করে ফেলল। সেই নারীর প্রোফাইলে চলে গেল। যেখানে আধ ঘন্টা আগের একটি পোস্ট, মিউচুয়াল পোস্ট। সেখানে সম্রাটকে ট্যাগ করে খুব সুন্দর করে একটি ক্যাপশন লেখা, 'অনেক নারীর কাঙ্ক্ষিত ম্যান যখন আমার পাশে!' ছবিটিতে দু'জনেই ক্লোজ হয়ে দাঁড়ানো। হাস্যোজ্জ্বল, উচ্ছ্বল চোখমুখ। পারি ঠোঁটটা একটু নাড়াল, হাসার চেষ্টা করে বিড়বিড় বলল,

“ হ্যাঁ, পারফেক্ট। লাইক মেইড ফর ইচ আদারস!"

ছবিটিতে একটি লাভ রিএ্যাক্ট দিল। সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা উষ্ণ নোনা জল। বাম হাতের তালু দিয়ে তা মুছে একা একাই হাসল অনেক সময়। নিরবে শব্দহীন। হাসি কান্নার লহর ছড়িয়ে পড়ল পারির নিঃসঙ্গ একাকী জীবনে। মিনিট পনেরো পের হতেই আবারও ওর মুঠোফোনটি বেজে উঠল, পারির নিথর দেহে প্রাণের সঞ্চার ঘটল সেই শব্দে। ফারিহার কল,

“হ্যা-হ্যালো।"

“তুই কি রেডি?"

“হুম!"

“আচ্ছা, আমি তোর বাড়ির কাছাকাছি‌ই আছি, তুই নিচে নেমে আয়!"

“হু!"

পারির এখন কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু ওদের মন খারাপ করাতে চাইছে না। তাই বাধ্য হয়েই অসাড় দেহখানি টেনে হিচড়ে তৈরি হল। নিচে নামতেই ফারিহার সঙ্গে দেখা, নিশিও এসে মাত্র পৌঁছাল। অতঃপর ওদের দুজনের সিদ্ধান্তে অটল নির্ধারণ হল, ধানমন্ডি লেক।

“তুমি কী কোন কারণে আপসেট?"

তানহা প্রশ্ন করেই জিজ্ঞাসু চোখে সম্রাটের মুখপানে চেয়ে রইল। সম্রাটের দৃষ্টি অদূরে, একটি কাপলের উপর। যেখানে মেয়েটার পোশাকের ধরন অনেকটা পারির মতোন। ও ভাবছে আজ কতদিন হল পারিকে সরাসরি দেখে না। সেদিনের পর ইচ্ছা করেই পারির আশেপাশে কম যাওয়ার চেষ্টা করে। পারিকে না দেখে থাকতে পারবে না কিন্তু থাকতে হবে, অভ্যাস করতে হবে তাই, তাই পারির থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে। কাছাকাছি হলে চোখ পড়বেই। যা এখন অনুচিত। পারির জীবনে একজন দায়িত্ববান পুরুষ আছে। পারিকে নিয়ে ভাবা উচিত না। পারির অকল্যাণ হবে এমন কিছুই ভাবা বা করা উচিত নয়। তাই তো সে নিজের মতোন নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

“সম্রাট!"

তানহা আবারও ডাক দিল। এবারও সম্রাট নিরব। তানহা ভ্রু কুঁচকে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকাতেই দেখতে পায় সেই কাপলদের। মেয়েটা ননস্টপ কথা বলছে আর ছেলেটা মুগ্ধ চোখে তা দেখছে। মেয়েটা হাত নাচিয়ে নাচিয়ে কথা বলছে, ছেলেটা গালে হাত ঠেকিয়ে চেয়ে রয়েছে। চোখে কি দারুণ মুগ্ধতা ভেসে উঠেছে। তানহা স্মিত হাসে, বলল,

“কি দারুণ না কাপলটা?"

সম্রাট নিরুত্তর। ওর কানে তানহার কথা ঢুকছে কি-না ঐ জানে। ঠিক এই সময়ে দূর থেকে হাক মেরে ডাকতে ডাকতে এদিকে এলো বাপ্পি,

“স্যাম, স্যাম..স্যাম! এই বেটা, কখন থেকে ডাকছি তোকে! ধ্যান ক‌ই তোর?"

বাপ্পি এসে সম্রাটের কাঁধে ধাক্কা দিতেই ওর চেতন ফেরে। চমকে উঠে বাপ্পির দিকে তাকায়। বাপ্পি হতবাক চোখে জিজ্ঞেস করে,

“আর ইউ ওকে? কি হয়েছে?"

“নাথিং, কিছু না। তুই ডাকছিলি কেন?"

“ডাকছিলি কেন মানে কী? আমরা কী এখানে শোক দিবস পালন করতে এসেছি? আর তোরা দুজন এতদূরে বসেছিস কেন?"

“এমনি, আমার শোর সারাবা ভালো লাগছে না তাই!"

“ডুড, আজকের দিনে অন্তত একটু মাইন্ডটাকে রিফ্রেশ রাখ। সব বাদ দিয়ে একটু চিল কর। ঐ তানহা আসো !"

বলেই ও সম্রাটের হাত ধরে টেনে নিজের সাথে নিয়ে গেল। এদিকে তানহা সম্রাটের মুখের দিকে চেয়ে আছে। সম্রাটের সঙ্গে তার বিয়ের বিষয়টি সে পুরোপুরি না জানলেও কিছুটা অনুমান করে ফেলেছে, তবে সম্রাট একেবারেই অজ্ঞ। তানহাও চায় না সম্রাটের সঙ্গে তার বিয়ের বিষয়টি এখন‌ই খোলাসা হোক। ও চাইছে সম্রাটের মনে প্রেমের বীজ বুনে ধীরে ধীরে বিয়ের ফলে পরিণত করবে। সবটাই করবে নিজের মতো করে। সে তাদের সম্পর্কের পরিণতি সফল করবে, সুন্দর একটা দম্পতি হিসেবে। তানহা কথাটি ভেবেই চোখ ঘুরিয়ে সেই দম্পতিদের দিকে চাইল আরেকবার, এখন মেয়েটা ছেলেটার কাঁধে মাথা রেখে আহ্লাদ করছে আর ছেলেটা মেয়েটার গাল আলতো চাপে ছুঁয়ে সেই আহ্লাদকে আস্কারা দিচ্ছে। তানহা বুঝে নিল সম্রাটের এমন চুলবুলে মেয়ে পছন্দ। ও খুব শান্ত এবং স্থির স্বভাবের। এত কথা বলা, চঞ্চলতা , ছটফটানি আচরণ ওর মধ্যে নেই। সেই কারণেই কি সম্রাট ওর প্রতি কম আকর্ষিত হচ্ছে? তবে কী ও সম্রাটের রঙে নিজেকে সাজাবে? যদি সম্রাটের মনের রাণী হতে তাকে তাই করতে হয় তবে সে তা করবে। সম্রাটের ভালোবাসা পেতে, সম্রাটের ভালোবাসা হতে যা করা লাগবে সে তাই করবে!

“এখানেই বসি আমরা দোস্ত! আমি হাঁটতে হাঁটতে টায়ার্ড!"

বলেই ধপ করে বসে পড়ল ফারিহা। নিশি চোখমুখ খিচিয়ে বলল,

“এখানে বসলি কেন? এখানে কী ফুচকা তোর দাদায় দিয়ে যাবে?"

“তুই দাদী হলে দাদায় দিয়ে যাবে, সন্দেহ নেই!"

“শাট আপ। এ্যাই পারি, এইটাকে উঠতে বল এখান থেকে। নয়তো আমি লাত্থি মাইরা লেকে ফালায় দিব!"

পারি ওদের ঝগড়া দেখে ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বলল,

“তোরা ঝগড়া না থামাইলে আমিই তোদের দুইটাকে লাত্থি মাইরা চ‌ইলা যামু!"

এত সময়ে মুখ খুলল, আর খুলেই কী বলল? নিশি, ফারিহা পারির দিকে করুণ চোখে চেয়ে বলল,

“এমন করে বলতে পারলি বান্ধবী।"

পারি ওদের কথার উত্তর দিল না। উত্তর কেন, তার শব্দ তোলার‌ই ইচ্ছে নেই। চোখে ভাসছে সম্রাটের পাশে দাঁড়ানো সুন্দরী নারীর প্রতিচ্ছবি। সম্রাটের সেই হাসি যা শুধু সে তার উপস্থিতিতে দেখতে পেত। তবে কী সত্যিই সম্রাট এগিয়ে গিয়েছে। গেলে তো ভালোই। পারি তো তাই চায়। এখানে তো তার মন খারাপ হবার কোন কারণ নেই। তবে কেন পারির এত মন খারাপ হচ্ছে? কেন তার কান্না পাচ্ছে বারবার। সে জানে না কতক্ষণ নিজেকে ধরে রাখতে পারবে, কিন্তু তার একটু কান্না করা জরুরি। নয়তো তার হার্ট অ্যাটাক করবে। প্রচণ্ড চাপ যাচ্ছে ছোট এই মাংস পিণ্ডের উপর দিয়ে।

“পারি?"

পিছন থেকে পরিচিত পুরুষালি স্বরে থেমে গেল পারির পা। বান্ধবীদের সাথে মেজাজ দেখিয়ে অনেক দূর একাই হেঁটে চলে এসেছে। তাহসিন এগিয়ে এলো পারির দিকে। বিস্মিত চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কী ব্যাপার এই সময়ে, তুমি এখানে?"

প্রায় সন্ধ্যা সাতটা পেরিয়ে গিয়েছে। স্বভাবতই পারির মতোন মেয়েরা এই সময়ে ধানমন্ডি লেকের দিকে থাকবে না। তাহসিন, সিয়ামকে পারি প্রথমদিন থেকেই ভয় পায়। ওরা খুব মেজাজি। সম্রাটের পর বাপ্পির সাথেই একটু হালকা হয়েছিল ওর আচরণ। নয়তো সম্রাট ছাড়া ওর বন্ধুদের সাথে খুব একটা আলাপ ও কখনো করেনি। তাহসিন পারির বিস্মিত চোখের দিকে চেয়েই রয়েছে জিজ্ঞাসু চোখে। ঠিক তখনই হাজির দুই বান্দী।

“আরেহ ভাইয়া আপনি এখানে?"

এই দুইটিকে তাহসিন ডাকে আজাব চিড়িয়া বলে। এখন‌ও তাই করল,

“আরে মানিক জোড়, আজাব চিড়িয়া, কী ব্যাপার এই রাতে এখানে?"

“এইতো, ঘুরতে এসেছিলাম ভাইয়া!"

“ঘুরতে, এই সময়ে এখানে? মোটেই এটা ভালো কথা নয়, এই সময়ে এখানে কত কী ঘটে। এভাবে সুন্দরী মেয়েদের এসব জায়গায় একা একা ঘোরা উচিত নয়। দিস ইজ ব্যাড থিংক!"

বড় ভাইয়ের মতোন শাসন করল তাহসিন। পারি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। নিশি, ফারিহা বলল,

“স্যরি ভাইয়া, আর আসব না। আসলে কী হয়েছে বলেন তো, ..

“হেই, এই ময়না, টিয়া, কোকিল আপারা কোথায় থেকে টপকাল?"

সিয়াম পেছন থেকে প্রশ্ন করল। নিশি ফারিহা থেমে সেদিকে তাকাতেই সিয়াম‌ও তাহসিন এর মতোন করে আবারও জিজ্ঞেস করল,

“কি ব্যাপার ছোট্ট আপুরা, তোমরা এই সময়ে এখানে কেন?"

“ভাইয়া আসলে...

“আচ্ছা যেই কারণেই আসুক, তোমরা যদি কোন বিশেষ প্ল্যানে না এসে থাকো তবে আমাদের সাথে জয়েন কর। চল!"

“কোথায়?"

দু'জনের চটপট উত্তর। পারি এখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সিয়াম পারির দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে সরাসরি ওকেই জিজ্ঞেস করল,

“পারি, তুমি কি অসুস্থ? তোমাকে এমন রোগাটে লাগছে কেন?"

পারি মাথা দুলিয়ে বোঝালো সে অসুস্থ না। মুখ দিয়ে বলল,

“না ঠিক আছি আমি।"

এতটুকু বলেই আবারও মাথা নুইয়ে নিল। চঞ্চল, বাঁচাল পারিকে এত শান্ত দেখে তাহসিন, সিয়াম একে অপরের দিকে তাকাল। নিশি বলে দিল,

“ওর মুড খারাপ,তাই আমরা ওকে বেড়াতে নিয়ে আসছি যেন মুড ভালো হয়!"

“কেন মুড খারাপ কেন? বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া হয়েছে?"

সিয়ামের খোঁচা মারা প্রশ্নে পারি একবার চোখ তুলে তাকালো। ওর কথার প্রত্যুত্তরে কিছু বলবে তার আগেই তাহসিন বলল,

“আচ্ছা মুড খারাপ হলে আমাদের সাথে জয়েন দাও। মুড অটোমেটিক ভালো হয়ে যাবে। আসো, আসো!"

বলেই ও তাড়া দিল। পারি মনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা
বাড়ালো। ও ভাবছে সম্রাট এখন এখানে নেই। ও আজ সম্রাটের মুখোমুখি না হলেই ভালো। ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। হয় কেঁদে দিবে নয় বাজে একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে যা উচিত হবে না।

কিন্তু সবসময় আমরা যা চাই তাই হয় না। কখনো কখনো এর বিপরীত‌ও হয়। আজ‌ও তাই হল, পারি ওদের আড্ডার স্থলে গিয়ে সবার আগেই মুখোমুখি হল সম্রাটের। সম্রাট হাসি হাসি মুখে তানহার সাথে গল্প করছে, সঙ্গে অবশ্য বাপ্পি‌ও আছে। তাতে কি! তানহার মুগ্ধ চাহনি সম্রাটের উপর আবদ্ধ।

অনেকগুলো দিন পর পারিকে দেখে সম্রাটের চাহনি স্থির, জমে গেল। পারির শুকিয়ে যাওয়া মুখশ্রী দেখে সম্রাট ভ্রু কুঁচকে নিল। পরমুহূর্তেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। এমন করে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ায় পারি অপমানিত বোধ করল। নিশি, মেহরিন এগিয়ে গিয়ে গদগদ হয়ে বলতে লাগল,

“ভাইয়া কেমন আছেন? কতদিন পর আপনাদের সাথে দেখা হল!"

সম্রাট খুব সাবলীল ভাবে ওদের কথার উত্তর দিল,

“দারুণ, তোমরা? হ্যাঁ অনেক দিন পর..
এনি ওয়ে তোমরা এখানে ঠিক বুঝতে পারলাম না বিষয়টি!"

“ওহ, আমরা পারির মুড খারাপ দেখে ওকে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হয়েছি। এখানে এসে সিয়াম ভাইয়া, তাহসিন ভাইয়ার সাথে দেখা হয়ে যায়, দেন ভাইয়ারা বললেন আপনাদের সাথে জয়েন করতে!"

পারির মুড খারাপ! কথাটা শোনার পর আড়চোখে একবার তাকাল। হ্যাঁ, তার মন খারাপ সেটা তার চোখেমুখে‌ই ভেসে উঠেছে। কারণ জিজ্ঞাসা করবে? না উচিত হবে না, হয়তো বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া লেগেছে নয়তো...হুহ্, সেদিন যেই মেজাজ দেখেছে, সেখানে মন খারাপ করার অনেক কারণ থাকতে পারে! কথাগুলো আপন মনে ভাবছে, ঠিক তখনই তানহা সম্রাটের বাহুতে নিজের হাত গলিয়ে ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কৌতুহলী চোখে জিজ্ঞেস করল,

“এরা কারা সম্রাট?"

তানহার প্রশ্নের উত্তরে বলল,

“জুনিয়র! ছোট বোন।"

“ওহ, হ্যালো ছোট বনুরা, আমি তানহা!"

তানহা খুব আন্তরিক ভাবে পরিচিত হচ্ছে। সম্রাটের সাথে সংযুক্ত সবকিছু‌ই সে নিজের আয়ত্তে রাখতে আগ্রহী। সেখানে মেয়ে থাকলে তো অবশ্যই। নয়তো সম্রাটের উপর খবরদারি চলবে কীভাবে? অন্য দিকে তানহা সম্রাটের বাহু এভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, পারি আড়চোখে সেটা দেখছে। তার ভেতর পুড়ে যাচ্ছে রাগ, দুঃখে। কিন্তু কেন? সে তো নিজেই চায়নি সম্রাটকে। এখন কেন তার এত জ্বলছে! পারি রাগে নিজের ব্যাগটিকে খামচে ধরল। সম্রাটের দৃষ্টির অগোচরে গেল না ঘটনাটি। ও ভ্রু কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলে আড়চোখে চেয়ে থেকেই ভাবছে এমন করছে কেন মেয়েটা?

পরিচয় পর্ব শেষে মেয়েরা একপাশে, ছেলেরা আরেক পাশ হয়ে বসল। ওরা তিন বান্ধবী ও তানহা ছাড়াও ওদের আরো দুজন মেয়ে ফ্রেন্ড ছিল। সবাই নিজেদের মধ্যে গল্প করছে! কিন্তু পারির দৃষ্টি নড়ে না। সে চেয়ে রয়েছে সম্রাটের গা ঘেঁষে বসা মেয়েটার দিকে। ফুলো ফুলো গাল দুটো আরো ফুলিয়ে রেখেছে। কপালে চ‌ওড়া ভাঁজ ফেলে বিড়বিড় করে বলল,

“কোলে উঠে বস, অবশ্য বাকীও তো রাখেনি। ডিজগাস্টিং!"

“কি ডিজগাস্টিং পারি?"

নিশি জিজ্ঞাসা করল। ওর প্রশ্নে পারি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল,

“আমি মনে মনে বললাম, ও শুনলো কীভাবে?"

“কি ডিজগাস্টিং লাগছে?"

ফারিহার প্রশ্ন। পারি পড়ল মুসিবতে। কী আশ্চর্য! এরা কী কী ওর মনের কথাও পড়ে ফেলতে পারছে? নাকি সে-ই.. পারি বুঝে নিল সে মনের কথা শব্দ তুলে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে ফেলেছে যার দরুন তার সখিরা শুনে ফেলেছে। সম্রাট‌ও পারির ভ্যাবলা কান্তা মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে। পারির দিকে সে শুরু থেকেই আড়চোখে চেয়ে রয়েছে, এবং সে এত সময়ে এটা বুঝতে পেরেছে কোন কারণে পারি তানহার উপস্থিতি সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু কেন? সে তো অন্য কারো সাথে আবদ্ধ। তবে সম্রাটের কারো সাথে কিছু হলে তার কী? সে তো সম্রাটকে চায় না। তা সে স্পষ্ট করেই বলেছিল। সে নিজেও অন্য কাউকে.... তাহলে এই জেলাসির কারণ কী?
সম্রাটের মনে শয়তানি চাপল। ও ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল, অতঃপর আপন মনে কিছু একটা ভেবে নিয়ে তানহাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“গান শুনবে?"

“তুমি গাইলে অফকোর্স!"

“ওকে, ওয়েট!"

বলেই সম্রাট উঠে দাঁড়াল। এরপর পারির সামনে দিয়ে হেটে গেল অন্য একটি দলের কাছে। যেখানে একটি ছেলের কাঁধে গিটার ছিল। সম্রাট গিটারটি চেয়ে নিয়ে আসল। আসার সময় পারির কুঁচকে রাখা কপাল আর কুঞ্চিত চোখ দেখে মৃদু হাসল। অতঃপর এবার ইচ্ছে করেই তানহার গা ঘেঁষে বসল, একেবারে মিশে। এরপর তানহার দিকে ফিরে বসে গিটারে সুর তুলে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল,

“হও যদি তুমি নীল আকাশ
আমি মেঘ হব আকাশে
হও যদি অথৈ সাগর
আমি ঢেউ হব সাগরের,
হও যদি ওই হিমালয়
তোমাকে করবো আমি জয়
তোমাকে....চাই তোমাকে,
তুমি যে আর কারো নও!
বলতে পারি আমি নির্ভয়ে
তুমি আছ হৃদয়ে
বলতে পারি আমি নির্ভয়ে
তুমি আছ হৃদয়ে!"

সম্রাট পুরোটা গান তানহার দিকে ফিরে মাথা নুইয়ে গাইলেও আড়চোখে ওর দৃষ্টি স্থির ছিল পারির দিকেই। কিন্তু পারির এসবে কী? পারি না গান শুনতে পেল আর না ওর দিকে তাকিয়ে তির্যক হাসা ব্যক্তির মন পড়তে পারল! উল্টো ও এটা নিতেই পারল না যে সম্রাট পুরোটা গান তানহাকে উদ্দেশ্য করে গাইল। গান গাওয়ার মধ্যে‌ই ও চট করে উঠে দাঁড়াল। কান্না আটকে রাখায় শরীর থরথর করে কাঁপছে। আসরের মধ্যে এভাবে দাড়িয়ে পড়ায় সবার চোখ পড়ল ওর উপর। সম্রাট‌ও গান থামিয়ে ওর দিকে চেয়ে আছে। নিশি, ফারিহা‌ কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই কোন রকম নিজেকে সামলে, কম্পিত স্বরে বলল,

“আমাকে যেতে হবে।"

বলেই কারো থেকে কোন মন্তব্য শোনার অপেক্ষা করল না। দৌড়ে চলে গেল সবাইকে অবাক করে দিয়ে। আসরে উপস্থিত সবাই হতবাক। আশেপাশের মানুষজন‌ও এদিকে তাকালো পারির ওভাবে ছুটে যাওয়ায়। সবার মনেই প্রশ্ন জেগেছে, কী হয়েছে মেয়েটার? নিশি ছলছল চোখে সম্রাটের দিকে তাকাতেই দেখল সম্রাট‌ও মাত্র‌ই ওর দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করছে। সম্রাটের চাহনিতে নিশির‌ও কান্না আসছে। ও ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্নাকে আঁটকে নিয়ে বলল,

“আমিও আসছি ভাইয়া, ফারু চল!"

ফারিহা এই বিষয়ে কিছুই জানে না। তাই ওর প্রতিক্রিয়া‌ও বাকীদের মতোন কৌতুহলী, জিজ্ঞাসু। ও পারির ওমন পাগলের মতোন ছুটে যাওয়ায় শংঙ্কিত হয়ে গেছে। মেয়েটাকে আজ কদিন ধরে কেমন মনমরা দেখছে। আর আজ এমন কেন করল?

সম্রাট পারির আচরণে বিভ্রান্ত। পারি কাঁদছিল , স্পট দেখেছে সে পারির চোখের চাঁপা কান্না। পারির থরথরিয়ে কম্পমান ঠোঁট, সিঁদুর রাঙা নাকের ঢগা। ও বাইরে স্থির থাকলেও ভেতরে থাকতে পারল না। বিচলিত কণ্ঠে উঠে দাঁড়িয়ে কোনদিকে না তাকিয়ে পা বাড়াল পারির দিকে। নিশি, ফারিহার আগেই ছুটে গেল পারির দিকে। কিন্তু ওরা যেতে যেতে পারি হারিয়ে গিয়েছে।
অনেক দুর গিয়ে খুঁজে না পেয়ে নিশি পারিকে ফোন করল।

পারি ততক্ষণে রিক্সায় চড়ে বসেছে, রিক্সার হুট তুলে দাঁত দিয়ে হাত কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর জোর চেষ্টা করছে। মুঠোফোন বেজে উঠতেই কান্নারত অবস্থায় বাম হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে ডান হাতে কল রিসিভ করে কানের সামনে ধরতেই নিশির ঝাঁঝালো স্বর ভেসে আসল,

“এ্যাই ফাজিল মেয়ে, ক‌ই তুই?"

“আমি ঠিক আছি, বাসায় যাচ্ছি। একা থাকতে চাই।"

নিশির কথা শেষ হতেই একনাগাড়ে এতগুলো কথা বলে ফোনটা কেটে দিল এবং মুঠোফোন একেবারে বন্ধ‌ও করে ফেলল।

নিশি কল কেটে সম্রাটের দিকে অসহায় চোখে চেয়ে
বলল,

“ও রিক্সায় উঠেছে, বাসায় যাচ্ছে।"

বাসায় পৌঁছে, নিজেকে সামলে ধীর পায়ে দরজা ঠেলে ঘরে পা রাখতেই ওর ভেতরটা আবারও শূন্যতায় খা খা করে উঠল। একটা জীবন, এতগুলো বছর সম্পূর্ণ একা নিজেকে সামলেছে। দুঃখ, সুখ সব কিছুই তার নিজের জন্য নিজেকে বয়ে আনতে হয়েছে। কেন একটা জীবন এত রূঢ় ওর প্রতি! কেন ওকে এত নিঃস্ব করে দুনিয়ায় পাঠিয়েছে আল্লাহ। কি হতো ওর জন্য কাউকে রাখলে, যার স্নেহের হাত ওর মাথায় রাখলে ওর সব দুঃখ লাগব হয়ে যেত!
এই যে পারির ভীষণ কান্না পাচ্ছে, আজ যদি বাবা মা থাকত, তবে নিশ্চয়ই তারা পারির মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিলে এই দুঃখ একটু হলেও কম বোধ হতো। হয়তো ওর সম্রাট নামক পুরুষটিকে হারাতে হতো না। আজ সে এতিম, অসহায় বলেই তো তার দিকে কিছু কুৎসিত মানুষ নিজেদের কালো হাত বাড়ানোর সাহস করেছিল, কিছু নোংরা মানসিকতার মানুষ তাকে অপবাদ দিয়ে তার গাঁয়ে কলঙ্কের দাগ লাগাতে পেরেছিল। আর তাই তো সে সাহস করে কাউকে চাইতে পারে না। পারির বুকে ব্যথা অনুভব হচ্ছে। ও দরজা আধখোলা রেখেই নিজের বেডরুমে ঢুকে সোজা বাথরুমে ঢুকে পড়ল। ঝর্না ছেড়ে ধপ করে বসে পড়ল। দু হাতে সারা শরীর খামচে খামচে কিছু নোংরা ছোঁয়া থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু যা মনে দাগ কেটে যায় তা কি দেহকে ক্ষতবিক্ষত করলে মুছে! অস্থিরতা, অতিরিক্ত কান্নায় এমনিতেই কাহিল হয়ে পড়েছে, তার মধ্যে শরীর খামচে রক্তাক্ত করে ফেলেছে। এভাবেই পারি বসে রইল।

ফ্লোর বেডের উপর এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে সম্রাট। পারির আচরণ ওকে বারবার ভাবাচ্ছে। পারি ওকে যেভাবে তিরষ্কার করে প্রত্যাখ্যান করেছে ওর জায়গায় অন্য কোন পুরুষ হলে কোনদিন পারির মুখ‌ও দেখত না। কিন্তু ও তো তা করতে পারছে না। সরাসরি না হলেও ওকে দিনে অন্তত একবার হলেও পারির মুখ দেখতেই হয়। পারিকে ছাড়া দিনদিনই ওর জীবনের মানে অর্থহীন লাগছে। ঐদিকে পারি, সে আসলে কী চায়? আজ ও পারির চোখে স্পষ্ট তানহার প্রতি হিংসা দেখেছে, পারি তানহাকে সম্রাটের পাশে সহ্য করতে পারছে না মানেই হলো পারি ওকে ফিল করে। পারির মনে ওর জন্য অনুভূতি রয়েছে। তবে কেন পারি ওকে প্রত্যাখ্যান করেছিল? আর সেই ছেলেটার সাথেই বা ওর কি সম্পর্ক?
নিশিকে জিজ্ঞেস করবে? নিশি সঠিক উত্তর জানে? কথাটি ভেবেই মুঠোফোন সামনে তুলে ধরল। রাতের প্রায় দু'টো ছুঁই ছুঁই। এখন এই সময়ে একটি মেয়েকে ফোন দেওয়া অনুচিত। সকালে ফোন দিয়ে সরাসরি কথা বলবে! না , সরাসরি কথা পারির সাথেই বলবে। যা জানার, যা শোনার পারির মুখ থেকেই শুনবে।

৩৯

পরের দিন,

সকালের কফি হাতে নিয়ে নিজের রুমের বারান্দার দোলনায় গা এলিয়ে মুঠোফোনের কন্টাক্ট লিস্টে ঢুকে পারির নাম্বার বের করে বসে রয়েছে অনেক সময় ধরে। ফোন দিবে কি দিবে না! মনের মাঝে চলা দোলাচলে অতিষ্ঠ সম্রাট নিজেই। পারির বিগত দিনের আচরণ, এড়িয়ে চলা, অপমান সবকিছু বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। পুরুষালি শক্ত ইগো, তিরষ্কারের আঘাত একেবারেই যে তাকে ছুঁতে পারেনি তেমনটা তো নয়। তাকে ছুঁয়েছে, ভয়াবহ ভাবে তার পৌরষিক সত্তায় আঘাত হেনেছে। তার ব্যক্তিত্বে আঘাত করেছে। সম্রাট চাইলেও ভুলতে পারবে না সেসব। আবার পারিকে ভুলে যাওয়াও সম্ভব নয়। তার পক্ষে এ নিষ্ঠুর নারীকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। সে হয় তার হবে নয় তার স্মৃতি আঁকড়েই সম্রাট একজীবন একাকিত্ব বয়ে নিবে।

মস্তিষ্কের সাথে সমঝোতা করে, মনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবশেষে কল দিয়েই দিল গ্রামীনফোন এর সিম ব্যবহার করা নাম্বারটিতে। কিন্তু তাতে লাভ হলো না। ঐ প্রান্ত থেকে বেসুরা কণ্ঠে ভেসে এলো,
“আপনার কল দেওয়া নাম্বারটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দয়া করে আবার চেষ্টা করুন।"

মোবাইল বন্ধ! সম্রাট কপালে চ‌ওড়া ভাঁজ ফেলে চিন্তিত ভঙ্গিতে ভাবতে থাকল, মোবাইল বন্ধ কেন? কাল রাতে ওভাবে গেল! ঠিক আছে তো? ওর চিন্তা তরতর করে বাড়তে থাকল। একটুও সময় অপচয় না করে, তাড়াতাড়ি করে ফোন করল নিশির নাম্বারে।

নিশি ফোন তুলতেই সম্রাট বলল,

“কোথায় আছো?"

“পারির বাসায়!"

“তোমার পাশে?"

“হুম!"

এরপর কিছুটা নিরবতা, সম্রাট ভাবল কিছুক্ষণ, এরপর বলল,
“ওকে দাও, কথা আছে আমার ওর সাথে!"

সম্রাটের কণ্ঠ কাঁপছে। সেদিনের পর আর পারির সাথে কথা হয়নি। ও নিজের ডান হাতটিকে বুকের বাঁ পাশে নিয়ে রাখল। বুকের ভেতরের যন্ত্রখানি ঢিপঢিপ করছে। কানের কাছে ধরে রাখা যন্ত্র থেকে আগত কারো সেই মধুর সুরেলা কণ্ঠ শোনার তীব্র অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু সম্রাটকে চুড়ান্ত হতাশ ও অপমান করে দিল পারির বলা কথাটুকু। সারারাত ওরকম পাগলামি করায় গায়ে আবার জ্বর চড়েছে। নিশি খুব ভোর ভোর পারির বাড়ি এসেছে। কেননা ওর মন বলছিল পারি ঠিক নেই। রাতে একা ছেড়ে দিয়ে সারারাত চিন্তায় ছটফট করেছিল। তাই সূর্য উঠার পর আর ঘরে বসে থাকেনি। পারির জন্য ওর মন সবসময় অস্থির থাকে। এতিম একটি অসহায় মেয়ে, ওর কাছে বান্ধবী কম বোন বেশি। সেই মেয়েটির কিছু হয়ে গেলে ওর অনেক দামি কিছু হারিয়ে যাবে। তাই তো এত টান মেয়েটির প্রতি। নিশি ফোন নিয়ে বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা পারির কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

“কথা বল।"

পারি চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করল, কে? নিশি‌ এক পলক ভেবে অতঃপর নিচু কণ্ঠেই বলল,

“ভাইয়া, সম্রাট ভাইয়া!"

উত্তর শুনে পারি একটুও না ভেবে কাঠখোট্টা ভাবে একেবারেই অনীহা প্রকাশ করে বলল,

“আমার উনার সাথে তো কোন কথা নেই।"

কথা শেষ করেই ও মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়ল অন্যদিকে ফিরে। নিশি বিনীত দৃষ্টিতে পারির পিঠ পিছনে তাকিয়ে র‌ইল। গলার স্বর আগের চেয়েও নিচু, করুণ করে বলল,

“ভাইয়া কিছু বলবে বোধহয়, প্লিজ কথা বল!"

“নাহ, অহেতুক যার তার সাথে আমি ফোনালাপ করি না। তুই জানিস, জোর করবি না ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে।"

পারি কি বুঝল ওর কথাগুলো কারো বুকে গিয়ে শিঁলের মতো বিঁধেছে? কারো বুক ফালাফালা করে দিয়েছে এহেন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করায়? সম্রাট পারির কাছে যারতার? অহেতুক মানুষ? এত হেলাফেলা! সম্রাট কী এত হেলাফেলার যোগ্য? বুকের উপর থাকা ডান হাতের থাবা শক্ত হল, খামচে ধরল উপরের অংশটুকু। অতিরিক্ত পীড়া দিচ্ছে হৃদাঙ্গ। অজান্তেই গাল ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ল দু'ফোটা উষ্ণ নোনা জল।
বিড়বিড় করে নিজের সাথেই বলল,

“ঠিক আছে, আর অহেতুক যারতার সাথে তোমাকে কথা বলতে হবে না। তোমাকে আর...

ফোনটি ছুঁড়ে মারল দেওয়ালে। মুহুর্তে চুর্ণবিচু্র্ন হয়ে গেল ফোনটি। ঠিক যেমনটি হয়েছে কিছুক্ষণ পূর্বে আবারও তার মন।

সেদিনের পর আবার সব স্বাভাবিক। কারো সাথে কারো ইচ্ছাকৃত দেখা হল না। কারো জন্য পথেঘাটে অপেক্ষা নামক পাগলামি করা হল না। তবে ক্যাম্পাসে যাতায়াত পথে আড়ালে আবডালে ঠিক‌ই চোখে চোখ পড়ে যায় এবং পরমুহূর্তেই তা ফিরিয়েও নেয় উভয়পক্ষ।
এর মধ্যেই ক্লাবের নির্বাচন চলে আসল। ক্লাবে নতুন সভাপতি নির্বাচিত করার জন্য। তা নিয়ে ব্যস্ততা বেড়ে যায় সম্রাটের। পাশাপাশি নিজের চাকরির পরীক্ষায় অতিরিক্ত মনোযোগী হয়ে উঠে। পারিও পড়াশোনা আর কেকের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, এর মধ্যে একবার নারায়ণগঞ্জ গিয়ে মামীকে ডাক্তার দেখিয়ে আনে। মামীর উন্নতির কোন আভাস দেয়নি ডাক্তার। দিনদিনই আরো অবনতি হচ্ছে, তাই তিনিও এবার পারিকে পাত্রস্থ করতে চান। ইশারায় পারিকে অনুনয় করেছেন যেন পারি এবার ঘরকন্নার কাজে নিয়োজিত হ‌ওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। মনে মনে পারি তা নিয়েও ভাবছে। মামীর শেষ ইচ্ছা তাকে কারো হাতে অর্পণ করা। পারিও ভেবে দেখেছে, মামী চলে গেলে পারি এই জগতে চিরতরে একা হয়ে পড়বে। আর এই সুবিশাল পৃথিবীতে একটি মেয়ে হয়ে সারা জীবন একা থাকা মোটেই সহজ কথা নয়। সুতরাং তার‌ও উচিত নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এখন বিয়ে নিয়ে ভাবা।

ফারিশের ট্রান্সফার হয়েছে রংপুরে। ঐদিকে পারির বিয়ে ভাঙার কারণে ফারিশ তার বাবা মায়ের চোখের বিষে পরিণত হয়েছে যার গোটা ঝাল তারা মেটায় তুবার উপর দিয়ে। তাই ফারিশ তুবাকে নিজের কাছে নিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে বুঝে গিয়েছে তার অমানুষ বাবা মা কোনভাবেই তুবাকে নিয়ে তাকে একটি সুখের সংসার গড়তে দিবে না। বরং তুবার জীবনে বাঁচা দায় করে দিবে যদি তাদের কাছে তুবা থাকে। তাছাড়াও রংপুর অনেক দূরের পথ। চাইলেও সে প্রতি মাসে তুবার কাছে যেতে পারবে না। আবার পুরুষ মানুষ হয়ে বিয়ে করা ব‌উয়ের থেকে লম্বা সময়ের দুরত্ব বজায় রাখাও তার দ্বারা সম্ভব নয়, উচিত‌ও নয়। তুবার‌ও তার সঙ্গ দরকার আছে। দু'জনের একটি ছোট পরিবার গড়তে হবে। আর সেই পরিবারের সদস্য বাড়ানোর জন্য একত্রে থাকা একান্তই জরুরি। সব কিছু বিবেচনা করেই ফারিশ তুবাকে নিজের কাছে নিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। অতঃপর গতকাল তুবাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। নিজে যেহেতু এখানে কোয়ার্টারে থাকত, এবং এখন তা ছেড়ে দিয়েছে, তাই তুবাকে পারির কাছে রেখে যায়। পারিও ভীষণ খুশি হয় এতদিন পর ভাবীকে কাছে পেয়ে। তুবাও একমাত্র ননদিনীকে পেয়ে ভীষণ আনন্দিত বোধ করে।

আজ তুবাকে নিয়ে পারি বের হবে টুকটাক প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে তার সঙ্গে তুবাকে কিছু মানসম্মত পোশাক কিনে দিতে। তুবার শহরে চলার মতোন ভালো পোশাক কম। ফারিশ কিনে দিলেও তুবা গ্রামে তা পরতে চাইত না। মূলত শ্বাশুড়ির ভয়ে। গরিব ঘরের মেয়ে বড় ঘরে এসে ফুটানি করছে টাইপ খোঁটা দিয়ে তুবাকে কথার অত্যাচারে রাখত তাই তুবা ইচ্ছে করেই পোশাকের বিষয়টি এড়িয়ে যেত। তাছাড়াও সে গ্রামে, নিম্নবিত্ত পরিসরে বড় হয়েছে। সে বিশ্বাস করে পোশাক মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য তুলে ধরলেও অন্তরের সৌন্দর্য পারে না। সেটা প্রকাশ হয় মানুষের কর্মে, আচরণে, ব্যবহারে। যা তার শ্বাশুড়ি নিজের কাজে এবং আচরণে প্রকাশ করে দেখাতে পারেনি। শুধু সুন্দর পোশাক পরে লোকের কাছে পশ সেজে থাকলেই তো হল না, যদি না কর্ম, আচরণ আর ব্যবহার পশ না হয়।

“পারি ব‌ইন দেহো তো এইয়া ঠিক আছে?"

“একেবারে ঝাক্কাস!"

ফারিহা বলে উঠল। পারি, তুবার সাথে ওরাও যাচ্ছে। তুবা ভাবী পারির এই দুই বান্ধবীর ফ্যান হয়ে গিয়েছে মাত্র কয়েক ঘন্টাতেই। মেয়ে দু'টো পারির প্রতি কি যত্নশীল আর আন্তরিক! বিষয়টি ভেবেই তুবা ওদের প্রতি মুগ্ধ হয়।

নিশি এগিয়ে এসে তুবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“ভাবী একটু সোজা হ‌ও তো, দাঁড়াও দেখি...

বলেই তুবার হালকা ছড়িয়ে পড়া কাজলটুকু টিস্যু দিয়ে মুছে দিল। এরপর আঁচলের ভাঁজ ঠিক করে দিতে দিতে বলল,

“এখন যদি ভাইয়া দেখে তাহলে নিশ্চিত বলবে, ‘তোদের যাওয়া লাগবে না। আমার ব‌উকে নিয়ে আমি একাই যাব, এরপর কোথায় যাবে জানো?ডেটে!"

বলেই নিশি হেসে দিল, ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফারিহাও। তুবা লজ্জিত ভঙ্গিতে হেসে আবারও পরমুহূর্তেই গাল ফুলিয়ে অভিযোগ করার মতো করে বলল,

“মোটেই না। ও ব্যাডা আস্তা একটা আনরোমান্টিক। জানো, বিয়ার আগে প্রেম করার সময় কত অনুরোধ করছি হলে নিয়া এউক্কা সিনেমা দেহানোর
লইগ্গা। হারামজাদা ব্যাডা মানুষ, বন্ধুগো ল‌ইগা গ্যাছে কিন্তু মোরে না। হ্যাঁ ক‌ইতো, মাইয়া মানুষ ল‌ইয়া সিনেমা হলে যামু কি ধাক্কা খাওয়াইতে? যা ধাক্কা খাওয়ার তা আমার থেইকাই খাও, তার জন্য সিনেমা হলে যাওয়া লাগবে না। ভাবো কি শয়তান!"

পারি ভ্রু কুঁচকে কোমরে হাত রেখে চেয়ে রয়েছে তুবার দিকে। পারির কুঁচকানো ভ্রু আর তাকানোর ভঙ্গি দেখে তুবা জিভ কাটে। কানে চিমটি কেটে দাঁত কেলিয়ে অনুরোধ করে বলল,

“স্যরি ননদিনী, মাফ ক‌ইরা দিও। তোমার ভাইয়ের কাছে এই কথা ক‌ইয়ো না। তাইলে মোর কপালে শনি নামাইয়া ছাড়বে।"

তুবার ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে তিনজন‌ই হাসিতে ফেটে পড়ল। পারি হাসতে হাসতে জমিনে বসে পড়ে। অনেক সময় পর পেটের উপর হাত রেখে নিজেকে সামলে উঠতে উঠতে বলল,

“তোমার কপালে শনি তো নামাবোই। নয়তো আমি কিসের ননদিনী?"

ওর কথা শেষ হতেই কলিং বেল বেজে উঠল। ওদের বুঝতে কষ্ট হল না যে ফারিশ এসেছে। ফারিশের এখানে আসতে এখন কোন বাঁধা নেই, কেননা বাড়ি‌ওয়ালা ফারিশের পরিচয় জানেন। এর মধ্যে একদিন পারির সঙ্গে দেখা করার সময় সরাসরি বাড়ি‌ওয়ালার সাথেই দেখা হয়ে যায়। পারি একা, এতিম একটি মেয়ে। তাই পারিকে তিনি ভীষণ স্নেহের নজরে দেখেন। সেই মেয়েটিকে বাড়ির সামনে কোন ছেলের সাথে কথা বলতে দেখে উনার কৌতুহল জাগে। পরিচয় জানার চেষ্টায় আগ বাড়িয়ে আলাপ করে জানতে পারে ফারিশ পারির কাজিন, বড় ভাই। তাছাড়াও ফারিশের কর্ম পরিচয়, বাহ্যিক উপস্থাপন সবকিছুই উনাকে মুগ্ধ করে। বিশ্বাস করায় যে আর যাই হোক এদের মধ্যে অনৈতিক কিছু নেই। তাই তিনিই পারিকে অনুমতি দিয়ে বলেন,
“বড় ভাই আসলে ঘরে নিয়ে বসাতে হয় বোকা মেয়ে। এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বললে তো লোকে মন্দ চোখে দেখবে! তারা তো জানবে না তোমরা ভাই-বোন! তারা অন্য কিছু ভেবে কুৎসিত সব কিছু চিন্তা করবে।"

পারি লজ্জিত হেসে মিনমিন করে বলেছিল,

“কিন্তু আমার ঘরে আমার দুই বান্ধবী ছাড়া আর কাউকে না নেওয়ার শর্তেই ভাড়া দেওয়া হয়েছিল!"

“হ্যাঁ, তা তো হয়েছিলো‌ই। সমস্যা নেই, তুমি তোমার আপন আত্নীয়স্বজন আসলে তাদের নিয়ে যেতে পারো। আমি অনুমতি দিলাম।"

“থ্যাংকিউ আংকেল!"

পারি কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে ধন্যবাদ জানাল। এরপর বেশ কয়েকবার ফারিশ পারির জন্য এটা ওটা নিয়ে এসেছে। পারি অসুস্থ থাকায় ডাক্তারের কাছেও নিয়ে গিয়েছিল। নিশি দরজা খুলতেই ফারিশ বোতল দিয়ে ওর মাথায় টোকা মারে। নিশি সেখানে হাতের তালু দিয়ে ঘষতে ঘষতে বলল,

“এ কেমন অত্যাচার ভাইয়া?"

নিশি, ফারিহার সাথেও ফারিশের বেশ দারুন একটি বন্ডি তৈরি হয়েছে এই অল্প দিনেই। বলাবাহুল্য পারির জন্য‌ই ফারিশ সবার সাথে ভালো করে মিশতে চেষ্টা করছে।
পরশ আবরার চৌধুরী ফারিশকে অসম্ভব ভালোবাসত। কিন্তু প্রিয়ন্তী খন্দকারকে বিয়ে করার পর সব কিছু ওলোটপালোট হয়ে যায়। পারির সাথে ছোট বেলায় খুব সময় কাটানো না হলেও সে এখন চেষ্টা করছে তার মৃত চাচা চাচীর রেখে যাওয়া এই আমানতের দেখভাল করার। বিশেষ করে মেয়ে দেখেই তার দায়িত্ববোধ বেশি কাজ করছে। সে তো জানে এই জগতে একটি মেয়ের একাকি থাকা কত ঝুঁকিপূর্ণ, কত কষ্টের। পারিকে সে নিজের কাছে নিয়ে রাখতে পারবে না লোকের কথার ভয়ে। যেহেতু তারা চাচাতো ভাই বোন। কিন্তু এভাবে দুর থেকে খেয়াল তো রাখাই যায়। আর নিশি, ফারিহা মেয়ে দুটোকেও তার এই কারণেই ভালো লাগে। ওরা পারির জন্য শুভাকাঙ্ক্ষী,পারির অন্যতম প্রিয়জন। যারা পারির ভালোমন্দ সব বিষয়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

“হয়েছে?"

ফারিশ তুবাকে এতটুকু জিজ্ঞেস করেই থমকে গেল। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,

“এত সেজেছ কেন?"

ফারিশের প্রশ্নে তুবা থমথমে মুখে চেয়ে রইল। পারি কোমরে হাত খুঁজে ভাইয়ের দিকে এক চোখ উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে। ফারিহা, নিশি বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে দুরত্ব বজায় রেখে। তুবা নাক কুঁচকে বলল,

“এত সাজলাম কোম্মে? শাড়ি পরলাম, হালকা ফেইস পাউডার দিলাম আর কাজল! এতেই, নিজের ব‌ইনেরা যে হিরোইন সাজছে, হেই বেলায়?"

“আমার ব‌ইনরা, আবিয়াইত্তা। বিয়া দেওয়া লাগবে, তাগো সাজনের বয়স, তাই সাজছে। তুমি কি আবিয়াইত্তা? সাজলেও যে দেখবে না সাজলেও সে। তয় এতো সাইজ্জা লাভ কি?"

“বিয়া অইয়া গ্যালে আর সাজোন যাইবে না? এ্যাইয়া কি আমনের বানাইন্না আইন?"

“হয়, এ্যা মোর‌ই বানাইন্না আইন!"

ফারিশের মুখে বরিশালের আঞ্চলিক টোন শুনে নিশি আবারও হেসে দিল। পারি ভাইয়ের নাটক দেখে হাসছে। ইচ্ছা করে তুবাকে ক্ষ্যাপাতে এমন করছে। তুবা গাল ফুলিয়ে কাঁদো কাঁদো ঢঙে বলল,

“এ্যামন করলে কিন্তু মুই আমনের লগে যামু না। এ্যাই পারি মোরে বরিশালের লঞ্চে উডাইয়া দিয়া আও ব‌ইন। মোরে নিয়া তোমার ভাইয়ের সংসার করা লাগবে না। একছের ফাজিল ব্যাডা।"

“আরে কাঁদছ কেন ভাবী, দেখ ভাইয়া মজা করছে। আর ভাইয়া তুমিও না! প্লিজ চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের! চল তো তোরা।"

বলেই পারি সবাইকে তাড়া দিয়ে নিজে আগে আগে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ওর পিছু পিছু নিশি, ফারিহাও। ফারিশ দুহাত নিজের কোমরে রেখে হাস্যোজ্জ্বল চোখে তুবার অভিমানী মুখের দিকে চেয়ে আছে। তুবা গাল ফুলিয়ে চেয়ে রয়েছে। ওরা বেরিয়ে যেতেই ফারিশ কাছাকাছি এলো, তুবার কোমরে হাত রেখে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে কাজল কালো চোখের পাতায় ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,

“এই সৌন্দর্য উপভোগ করার অধিকার তো কেবল আমার, আমি ছাড়া অন্য কেউ দেখলে যে আমার খুব জ্বালা করে, তা বুঝি বোঝ না তুমি?"

তুবা জানে, বোঝেও। তাই তো তাকে ছাড়া কারো সামনে এভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে না। অবশ্য দরকার পড়েও না তার। কেন না সে যথেষ্ট রূপসী, কোনরকম প্রসাধনী ছাড়াই। আঁচলের কোণা খুঁটতে খুঁটতে বলল,

“ওরা তিনজন জোর করল, ভাইয়ার সাথে প্রথম শহর ঘুরতে যাচ্ছো, একটু না সাজলে হয়? তাই তো..!"

“বুঝতে পেরেছি, আর ওরা তো জানে না ওদের ভাইয়ের কাছে এই রমণী কত মূল্যবান! খুব সুন্দর লাগছে! ভয় হয়, কেউ নিয়ে না গেলে...!"

তুবা ঠোঁট ভেঙ্গালো। তা দেখে ফারিশ ভ্রু কুঁচকে নিয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলল,

“ভেংচি দিলে কেন?"

“ঢং না করে হাঁটেন তো! ওরা দাঁড়িয়ে আছে!"

সে ফারিশের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ফারিশ এক চোখ উঁচিয়ে ঠোঁট কামড়ে তাকাল কিন্তু তার ভাবভঙ্গিকে পাত্তা না দিয়ে তুবা চলে গেল। ফোঁস করে আওয়াজ তুলে শ্বাস ছেড়ে ঘাড় ঢলতে ঢলতে সেও এগিয়ে গেল দরজার দিকে।

৪০

শপিং মল থেকে কেনাকাটা শেষ করে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল ডিনার করেই বাড়ি ফিরবে। নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে সেই উদ্দেশ্যেই স্টার কাবাব এলিফ্যান্ট রোড শাখার কাছে এসে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে যাওয়ার সময় পারির হাত থেকে একটা ব্যাগ ছুটে নিচে পড়ে যায়। পারি সেটা তুলে দাঁড়াতে গিয়েই কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে পিছিয়ে যায় কয়েক পা, পিছিয়ে গিয়ে পড়ে যেতে নিতেই পিছন থেকে কেউ শক্ত করে বাহু চেপে ধরে দাঁড় করিয়ে দিল। ভীত সন্ত্রস্ত পারি গা খিচে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, ভীত চোখ জোড়া উপরে তুলতেই থমকে যায় সামনের মানুষটিকে দেখে। সেই মানুষটিও থমথমে মুখে চেয়ে রয়েছে তার দিকে। মিনিট এক পের হতেই বাপ্পী উদ্বিগ্ন স্বরে পারির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করল,

“পারি, ঠিক আছো, বেশি লেগেছে?"

বাপ্পী উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করলেও সম্রাট নিশ্চল। ও কোনরকম বিচলতা না দেখিয়েই পারিকে পাশ কাটিয়ে সামনে চলে গেল। ঠিক তখনই ওর পাশ ঘেঁষে অস্থির হয়ে এগিয়ে এসে বিচলিত কণ্ঠে ফারিশের প্রশ্ন,

“পারি, কী হয়েছে?"

পারি নিজের অস্থির মনকে স্থির করে দৃষ্টি নামিয়ে হাতের ব্যাগ দুটো শক্ত করে চেপে ধরে স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে উত্তর দিল,

“কিছু না, ভাইয়া!"

'ভাইয়া!' পারির বলা বাক্যটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তরঙ্গ খেলে গেল সম্রাটের কর্ণকুহুরে, 'ভাইয়া'। পারি ছেলেটিকে ভাইয়া বলে সম্বোধন করেছে! সম্রাটের গতিশীল কদম থমকে গেল। স্থির হয়ে কান খাঁড়া করে পূণরায় শোনার জন্য অপেক্ষায় র‌ইল। তার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারি আরো একবার বলে উঠল,

“এই ব্যাগ দু'টো না‌ও তো, ভাইয়া।"

“আমি তো কখন থেকেই বলছি আমার কাছে দিতে, তুমিই তো দিচ্ছ না।"

ফারিশ পাবলিক প্লেসে ভাইবোনদের সাথে তুইতামারি করে কথা বলে না। তার যুক্তি তারা বড় হয়েছে, পাবলিক প্রেসে অবশ্যই সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। ছোট কিংবা বড়, সবার‌ই ব্যক্তিগত সম্মানবোধ রয়েছে। সেটা সঠিক ভাবে পাওয়াও তাদের অধিকার। সুতরাং সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। ফারিশ পারির হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে অন্য হাতে পারির কব্জি হালকা করে ধরে সিঁড়ি পেরিয়ে ভেতরে চলে গেল। পারি আড়চোখে একবার দেখল তার দিকেই আড়চোখে তাকিয়ে থাকা মানুষটার থমথমে মুখখানি, যার দৃষ্টি স্থির তার হাতের দিকে।

“এটা ওর ভাই?"

বাপ্পী সম্রাটের বরাবর দাঁড়িয়ে নিচু কণ্ঠে প্রশ্নটি করে। সিয়াম ভ্রু কুঁচকে পারিদের টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কিন্তু আমরা যতদূর জানি ওর আপন কোন ভাই নেই, ইভেন ওর আপনজন, ফ্যামিলি বলতেই কেউ নেই। তবে এই ভাইয়াটা আবার কোথায় থেকে টপকালো?"

“চল, পরে টেবিল ফাঁকা পাবি না।"

সম্রাট ওদের কথার উত্তর না দিয়েই সম্পূর্ণ না‌ শোনা করে ফাঁকা টেবিলের কাছে গিয়ে বসে পড়ল। যেখান থেকে সরাসরি পারিকে দেখা যাচ্ছে। ফারিশ মাঝে, দুই পাশে দুই রমনী। পারি ছাড়া বাকী দু'জনকে চিনে সে, নতুন একজনকে চিনে না। কৌতুহল জাগল। তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি সরল না ঐ টেবিল থেকে। এদিকে পারি নিজের চেয়ার বসে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে, সেটাও সম্রাটের চোখ এড়াল না। ও এক ভ্রু উঁচিয়ে চাইল, কি খুঁজছে সে ভালোই বুঝতে পারছে। কিন্তু কেন খুঁজছে? তাকে কেন ঐ নিষ্ঠুর, বেয়াদব মেয়েটা খুঁজবে! কথাটা ভেবেই ভেংচি কাটল, দূর থেকে পারি সম্রাটকে ওমন ঠোঁট ভেঙ্গাতে দেখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। সম্রাট তখন পারির দিকে চেয়ে আছে। পারিকে সামনের দিকে তাকাতে দেখে নিশি মোবাইল নিয়ে বলল,

“এ্যাই, সারাদিন ঘুরলাম আমরা, কিন্তু একটাও মেমোরি সেইভ করলাম না। চল অন্তত একটি সেলফি তুলি।"

নিশি মোবাইল উঁচিয়ে ক্যামেরা সামনে ধরতেই ফারিশ বিরক্তি ঝেড়ে বলল,

“খেতে বসে কে ছবি তুলে ভাই? খেয়ে নেও আগে!"

“একটা ছবি তুলতে কয় জনম লাগবে যে আমনের প্যাডে ক্ষুধায় চর প‌ইরা যাইবে! আল্লাহ আল্লাহ!"

এতটুকু বলেই তুবা ছবি তোলার জন্য দাঁত বের করে ক্যামেরার দিকে তাকালো। ফারিশ মুখটা হা করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল, এদিকে ওদের এমন খুনসুটিতে মুখ টিপে হাসছে বাকী তিন ললনা। ওরা সারাদিন‌ই এমন একজন আরেকজনে জ্বালায়। হাস্যোজ্জ্বল একটি সুন্দর পারিবারিক টেবিলের চিত্র ফুটে উঠল নিশির অত্যাধুনিক মুঠোফোনের স্ক্রিনে। ক্যামেরা থেকে চোখ সরে সামনের দিকে যেতেই নিশির চোখ বড় বড় হয়ে গেল খুশিতে। ও ছবি তোলা শেষ করেই উঠে দাঁড়িয়ে উচ্ছসিত গলায় ডেকে উঠল,

“ভাইয়া! সম্রাট ভাইয়া!"

হঠাৎ করেই নিশির এত উচ্ছ্বাস দেখে ফারিহাও পিছনে ঘুরে তাকায়, ঠিক দু টেবিল পিছনে বসা পরিচিত মুখ দেখে সেও চমকাল। অনেকদিন পর ওদেরকে দেখে তার‌ও খুশি উপচে পড়ছে। নিশি চেয়ার সরিয়ে ওদের কাছে গিয়ে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশে সালাম দিল, সম্রাট নিশিকে এদিকে আসতে দেখে স্বাভাবিক ভাবে বসল। নিশির সালামের উত্তর দিয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“কেমন আছো নিশি?"

“আলহামদুলিল্লাহ ভাইয়া। আপনারা?"

“এইতো দারুণ।"

“কার সাথে এসেছ তোমরা মানে তোমার রিলেটিভ?"

সিয়াম প্রশ্ন করে ইশারায় ফারিশদের দেখায়। নিশি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে ওদের দিকে দেখে সিয়ামের দিকে ফিরে হাসি হাসি মুখে উত্তর দিল,

“ভাইয়ার কথা জিজ্ঞেস করছেন? ঐটা তো পারির ভাইয়া, কাজিন। ভাইয়া, ভাবী রংপুর সেটেল হচ্ছেন,তাই যাওয়ার আগে কিছু কেনাকাটা শেষ করে নিল। কেনাকাটা করতে করতেই রাত হয়ে যাওয়ায় ডিনার সেরে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাই তো সবাই এখানে এলাম!"

শেষ কথাগুলো ও সম্রাটের দিকে তাকিয়ে বলল। কিন্তু সম্রাটের দৃষ্টি স্থির মেনু বোর্ডে। যেন নিশির কথা শোনায় ওর বিশেষ আগ্রহ নেই। অথচ ভেতরে ভেতরে তার আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে এ ভেবে যে ছেলেটা পারির বয়ফ্রেন্ড বা এমন কেউ নয়। অর্থাৎ পারি এখনো সিঙ্গেল!
নিশি সম্রাটের এত নির্লিপ্ত আচরণে মনোক্ষুণ্ন হল। পিছনে তাকিয়ে পারিকে দেখল, যে নিজের হাত ঘড়ি খুঁটতে মহা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফারিশ কৌতুহলী চোখে এদিকে তাকিয়ে আছে। নিশি হালকা হেসে সম্রাটদের উদ্দেশ্যে বলল,

“ওকে ভাইয়া, তাহলে আমি আসি।"

“হুম!"

বাপ্পী ছোট করে উত্তর দিল। নিশি গুটি পায়ে হেঁটে নিজের চেয়ারে বসতেই ফারিশ জিজ্ঞেস করল,

“ঐ ছেলেটাকে কী করে চিনো?"

“উনি তো...

নিশির কথার মাঝেই ফোড়ন দিয়ে পারি বলে উঠল,

”উনাকে আমাদের কলেজের সবাই চিনে! তুমি সেদিন ভুল বুঝেছ! উনি সন্ত্রাস অথবা বখাটে নয়, ভীষণ ভালো মানুষ, নিপাট ভদ্রলোক!"

বোনের সাফাই দেওয়ার ভঙ্গিতে ফারিশের কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। কপালে ভাঁজ রেখেই জিজ্ঞেস করল,

“মনে হচ্ছে তার সম্পর্কে খুব ভালো করে স্ট্যাডি করেছিস!"

ভাইয়ের সন্দেহের চোখে তাকানোয় পারি ঢোঁক গিলল। মিনমিন করে বলল,

“তেমন কিছু নয়! আমি তো শুধু..

“যেমন‌ই হোক। এসব ছেলের থেকে দূরে থাকবে। হি ইজ ঠু মাচ রেকলেস। নূন্যতম দয়া মায়া নেই ঐ ছেলের মধ্যে। সেদিন যেভাবে ঐ দু'টো ছেলেকে মেরেছিল, সেভাবে আমরা রিমান্ডের আসামিকেও মারি না।"

পারি মাথা নিচু করে চুপ করে রইল। নিশি, ফারিহার কৌতুহল জাগল, কোনদিনের কথা বলছে দুই ভাই বোন? ফারিহা জিজ্ঞেস করেই ফেলল,

“ ভাইয়া আবার কোনদিন সম্রাট ভাইয়াকে মারামারি করতে দেখেছে পারি?"

“এই ছেলে কি রোজ মারামারি করে নাকি? ক্যাডার ট্যাডার নাকি? কোন দলের?"

পারি বান্ধবীর ব্যাক্কলপনায় কপাল কুঁচকে ফেলল। বিড়বিড় করে কয়েকটি গালি দিয়ে ভাইকে বোঝানোর মতো করে বলতে লাগল,

“ভাইয়া আমার কথা শোন আগে, উনি কোন রাজনীতি করে না। কোন দলের‌ও না। উনি হচ্ছে একটি ক্লাবের সভাপতি। আর সেই ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য এলাকায় ইভটিজিং রুখে দেওয়া। হতদরিদ্র মানুষের জন্য কিছু করা, উনি অনেক গরিব অসহায়কে কাজ দিয়ে, অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেন। উনাদের নিজস্ব ডোনেশন টিম রয়েছে আর তাছাড়া, উনি একদিন আমাদের‌‌কেও হেল্প করেছিলেন। ফারিহাকে একটি ছেলে রোজ বিরক্ত করতো। সেখান থেকে উনি আমাদের সেইফ করেছেন। আমার স্কুলের জন্যেও উনি অনেক সহযোগিতা করেন। যথেষ্ট ভদ্রলোক আর বুঝদার উনি। উনি মারামারি করেন না তবে একটু ঘাড়ত্যাড়া। অন্যায় দেখলে নিজেকে সামলাতে পারেন না, ক্ষেপে পাগলা ষাঁড় হয়ে যায়! তখন নিজে যা বুঝে তাই করে, এই আর কি!"

তুবা বিস্মিত চোখে পারির দিকে চেয়ে আছে। ফারিশ‌ও বারবার এত প্রশংসা আর পক্ষ টানায় এবার গুরুতরভাবে পারির দিকে তাকাল। কঠোর চাহনিতে শক্ত গলায় বলল,

“তোর সাথে ব্যক্তিগত আলাপ রয়েছে? সেদিন‌ও তোকে বিরক্ত করার কারণেই সেই ছেলেদের মেরেছিল, তাই না? পাশে দাঁড়ানো ছেলে দুটো কিছু বলতে চাইছিল আমাকে, কিন্তু বলতে দেয়নি। বারবার তোর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ছিল! আমাকে কিছু বলতে গিয়েও বলেনি, কারণটা তুই! তাই না?"

পারি নিশ্চুপ। মাথা নুইয়ে বসে রয়েছে চুপচাপ। ওদিকে হাসিখুশি মুখে আঁধার নামতে দেখে আড়চোখে তাকিয়ে থাকা ব্যক্তি‌র‌ মনেও প্রশ্নেরা উঁকি দিতে আরম্ভ করল। ফারিশ কিছু নিয়ে জেরা করছে, সেদিন‌ও ধমকে ধমকে কথা বলছিল। সম্রাটের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মুঠ শক্ত করে চেপে ধরল আড়চোখে তাকিয়েই রইল। ফারিশ পারির চুপ থাকায় মৃদু ধমকের সুরে বলল,

“কী হলো, কথা বলছিস না কেন?"

“আচ্ছা বাসায় বসে এসব জিজ্ঞেস কর। এখানে এখন!"

“তুমি চুপ থাক।
__তোকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি!"

“হু!"

“কী হু?"

“হ্যাঁ সেদিন আমাকে কটু কথা বলাতেই মারামারি হয়েছিল কিন্তু... আমার সাথে উনার কোন সম্পর্ক নেই। সত্যিই বলছি। উনি সবার জন্য‌ই এমন করে। ফারিহাকে যেই ছেলেটা বিরক্ত করতো ওকেও ওভাবে পানিশড করেছিল ভাইয়া, ট্রাস্ট মি। আমি এমন কিছু কখনোই করিনি যা তোমাদের মানসম্মানে আঘাত করে!"

ফারিশ কয়েক পলক দেখল পারিকে অতঃপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পারি ভীত চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তুবাও প্রশ্নাত্মক চোখে ফারিশের দিকে তাকিয়ে রইল। নিশি, ফারিহা অপরাধী চোখে পারির দিকে চেয়ে আছে। ফারিশ হেঁটে গিয়ে সম্রাটের পাশে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“হেই ব্রো! আ'ম ফারিশ চৌধুরী। পারিস কাজিন! জানতে পারলাম পারিদের সাথে আপনাদের বেশ ভালো সম্পর্ক তাই.."

“বাপ্পী!"

“সিয়াম!"

দু'জনে হাত মেলালেও সম্রাট নিজের ডান হাতের মুঠি ঠোঁটের উপর ঠেকিয়ে কৌতুহলী চোখে চেয়ে রয়েছে। ফারিশ সম্রাটের দিকে হাত বাড়িয়ে রেখেই বলতে আরম্ভ করল,

“স্যরি ব্রো, সেদিন একটি মিস‌ আন্ডারস্ট্যান্ড হয়ে গিয়েছিল। আমি আসলে.."

“ইটস ওকে!"

বলেই সম্রাট হাত মেলায়। ফারিশ বিনয়ী গলায় বলল,

“এই টেবিল খালি হয়ে গিয়েছে, আমরা পাশাপাশি বসতেই পারি।"

“হ্যাঁ। ইভেন বড় টেবিল দেখে একসাথে বসি।"

সিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে বড় টেবিল না পেয়ে পাশাপাশি দু'টো টেবিল সিলেক্ট করল। অতঃপর সবাই বসল। রাতের খাবারের জন্য অর্ডার করল কাচ্চি উইথ চিকেন রোস্ট, বাটার গার্লিক নান, বিফ কারি, সালাদ, দ‌ই, শীতল পানীয়। ভাগ্য গুনে পারি সম্রাট মুখোমুখি পড়ে গেল। পারি বুঝতে পারল না কেন ফারিশ ওদেরকে পাশে বসাল। ও গাল ফুলিয়ে রেখে নিচু হয়ে খেয়ে যাচ্ছে আপনমনে। তবে ওর চিবানোর ধরনে মনে হচ্ছে কাউকে চিবিয়ে খাওয়ার জোর ইচ্ছা মনের মধ্যে দমন করে রাখছে রমনী। সম্রাট ললাটে ভাঁজ ফেলে দেখছে। ফারিশ একবার পারির দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার নিজের ব‌উয়ের দিকে। আবার কারি তুলে দুজনের পাতেই দিচ্ছে। পারির পাতে বিফের পাহাড় জমেছে। পারি চিবানো বাদ দিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ত্যাক্ত গলায় বলল,

“একটা একটা করে কেন দিচ্ছ? পুরো বাটি একেবারে ঢেলে দেও!"

“চুপচাপ খা‌ও! গতমাসে ডাক্তার ব্লাড পয়েন্ট কত বলেছিল, মনে আছে?"

এই কথা বলেই ফারিশ বারবার ওকে দমিয়ে দেয়। নিশি ফিক করে হেসে দিল ফারিশের যুক্তি দেখে। এই মেয়ের এই হুট করেই সব বিষয়ে হাসার রোগটা ফারিশের বিরক্ত লাগছে। ও নিশিকে মৃদু হুমকির তালে বলল,

“হাসির রোল পড়ল ম্যাম! কাঁদতে চাইছেন শিগগিরই?"

“মোটেই না। আমি আর হাসব না, এই যে মুখে কসটেপ লাগালুম!"

বলেই নিশি কসটেপ দেওয়ার ভঙ্গি করে মুখ বন্ধ করে নিল। পারি ভাইয়ের যুক্তিকে খন্ডিয়ে বলল,

“ডাক্তার বলেছে বেশি বেশি খেতে তাই বলে এক বেলাতেই এক সের ভাত আর দুই সের গোস্ত খেতে বলেনি ভাইয়া। তোমার কারণে আমার ওয়েট তিন কেজি বেড়ে গিয়েছে!"

“সো হোয়াট! এখনো তো পঞ্চান্ন কেজি হয়নি! আর চৌধুরী বাড়ির মেয়েরা একটু নাদুসনুদুস না হলে হয়? তোকে দেখলে সত্যিই মনে হয় চাচ্চু কুড়িয়ে এনেছে! এখন বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করতাম!"

“মোটেই আমাকে কুড়িয়ে আনেনি। আমি পাপার...'

“বুঝেছি বুঝেছি, আপনি পাপাকী পরী। এখন খান, এবং দয়া করে হিমোগ্লোবিন বাড়াতে উদ্যোগী হোন।"

“ধুর, এত খাওয়া যায় নাকি?"

“পারির হিমোগ্লোবিন কত? "

বাপ্পী জিজ্ঞেস করল,

“খুব‌ই কম! রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা দেইনি। ব্লাডসেল নিজে ব্লাড উৎপন্ন করতে না পারলে কতদিন অন্যের ব্লাডে বাঁচবে? ব্লাডসেলকে মোর এক্টিভ করাতেই হবে। তার জন্য সঠিক নিউট্রিশন অ্যান্ড প্রোপ্রার ফুডচেইন ফিক্সড করা জরুরি। তাই নিউট্রিশনিষ্ট এর সাথে কথা বলে ওর জন্য চার্ট তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এই মেয়ে মানলে তো সেসব।"

ফারিশ কথা শেষ করেই আড়চোখে সম্রাটের দিকে তাকাল। সে একেবারেই নির্লিপ্ত ভাবে খেয়ে যাচ্ছে। যেন পারির বিষয়ে তার কোন ভাবনা চিন্তা নেই। ওর এত নির্লিপ্ত আচরণে ফারিশের ভ্রু কুঁচকে এলো। মনে জাগা সন্দেহ থেকেই এখানে বসার আহ্বান করল। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে তেমন কিছু না। তবে কিছু হলে ফারিশ খুশি হত, সত্যিই খুশি হবে। পারি টুকটুক করে খাচ্ছে। ফারিশ বোনের চুপসে থাকা মুখটা দেখে মলিন চোখে আরেকবার সম্রাটকে দেখল। অতঃপর খাবার চিবুতে চিবুতে বলল,

“খাও, বেশি বেশি খেয়ে তাড়াতাড়ি সুস্থ হ‌ও। শিগগিরই বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব অন্য কারো হাতে সমর্পণ করতে চাই।"

সম্রাটের খাবার চিবানো বন্ধ হল এবার। ফারিশের কথায় হাতে থাকা লোকমাটুকু প্লেটে রেখে আড়চোখে একবার দেখল সামনে বসা দুই ভাই বোনকে। এদিকে পারি আড়ষ্ট হয়ে গেছে বিয়ের কথা উঠায়। তুবা ফট করে বলল

“আনাস ভাই কিন্তু পারিকে খুব পছন্দ করেছে! সেদিন‌ই বিয়ে করে নিত যদি না পারি..."

“আনাস কে?"

ফারিহার কৌতুহল, তুবা পানি পান করে গলা পরিষ্কার করে নিল। এরপর ধীর গলায়, হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল,

“তোমাদের ভাইয়ার বন্ধু। সাংবাদিক, সময় চ্যানেলের!"

এবার সম্রাটের চোখ সরাসরি পারিতে পড়ল। সে করুণ চোখে পারির দিকে চেয়ে আছে। পারি চোখ তুলে একবার সম্রাটকে দেখে আবারও মাথা নুইয়ে নিল। ফারিশ‌ও এবার সরাসরি সম্রাটের প্রতিক্রিয়া দেখল। কথার পরে কথা, নানা গল্পের মাঝেই ডিনার পর্ব শেষ হল। অতঃপর সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেল যার যার গন্তব্যে।

“আচ্ছা ও তোকে রিজেক্ট কেন করল? বুঝতে পারছি না, মেয়েটা এত রহস্য কেন পেঁচিয়ে রাখছে?"

“কিছু একটা আছে, যা বলতে পারছে না। নয়তো...জানিস, সেদিন তানহাকে আমার পাশে দেখে...! ওর চোখেমুখে স্পষ্ট হিংসা ছিল। ও তানহাকে আমার পাশে বসা সহ্য করতে না পেরেই এভাবে চলে গিয়েছিল অথচ জিজ্ঞেস করলে এমন ভাবে উত্তর দিবে যেন আমাকে চিনেই না। মেয়েটাকে মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে চড়িয়ে গাল লাল করে দেই।"

“তো দিস না কেন! দুইটা দিয়ে শাকিব খানের মতোন করে বলবি, ‘বল, ভালোবাসা দিবি কিনা বল'"

বাপ্পীর কথায় সম্রাট শব্দ করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বুকের বা পাশে হাত রেখে বলল,

“ওকে আঘাত করার কথা ভাবতেই তো এখানে যন্ত্রনা হচ্ছে। আঘাত করব কী করে? ওকে ভালোবাসতেই আমি জন্মেছি, আঘাত করতে নয়। তা ও যত‌ই আমাকে পোড়াক! আমি বরঞ্চ ওকে আরো না হয় কয়েক শতবার অনুনয় করে বলতে পারব, ‘ তোমাকে ভালোবাসার অধিকার দাও, কথা দিচ্ছি শেষ নিঃশ্বাস অবধি ভালোবেসে যাব।' এরপরও যদি ফিরিয়ে দেয় তাহলে আবারও চাইব, এরপর আবারও প্রত্যাখ্যান হয়ে আবারও চাইব, এভাবে চাইতেই থাকব। শেষ নিঃশ্বাস অবধি চেয়েই যাব, একদিন তো তার দয়া হবেই এই কাঙাল প্রেমিকের প্রতি!"

৪১

সেদিন ডিনারের পর কেটে গিয়েছে দু'টো দিন। পারি ক্লাস শেষে তড়িঘড়ি করে পারি, নিশি, ফারিহা ক্যাম্পাস এর গেইট পেরিয়ে রাস্তায় পা রাখতেই হুট করেই ওদের সামনে এসে দাঁড়ায় রাব্বী, মাহাদ।
পারি চমকে গিয়ে দু কদম পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে
পড়ল, ভীত চোখে রাব্বীকে ধমকে বলল,

“এভাবে কেউ হুট করেই সামনে এসে দাঁড়ায়? পিলে চমকে গিয়েছে আমার!"

“হুহ্, তেলাপোকার কলিজা! এই জন্যই তো বলি, বেডি মানুষ!"

“এ্যাই, একদম বেডি মানুষ বলবেন না।"

“ঠিক আছে বেডি বলবো না। আজ থেকে মহিলা মানুষ বলব!"

“কিহ! এ্যাই আপনি কিন্তু সবসময় বেশি বেশি করেন বলে দিলাম। একদম বাড়াবাড়ি ...!"

“ওকে ওকে, কাট্টিবাট্টি! এখন ঝগড়া নয়। পারি আপু, আপনাকে ভাইয়ারা সালাম জানিয়েছেন।"

মাহাদ রাব্বী, পারির ঝগড়ার মাঝে ঢুকে পড়ে ওদের থামিয়ে দিল। পারি মাহাদের কথায় ওর দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে রয়েছে। সালাম জানিয়েছে কথার অর্থ সে জানে। কিন্তু তাকে কেন সালাম জানাবে সেটা হচ্ছে তার প্রশ্ন! পারি কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই মাহাদ বলল,

“গেলেই বুঝবেন, ভাইয়েরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।"

পারি পিছনে ফিরে নিশি, ফারিহার দিকে চাইল। ওরা ইশারায় যাওয়ার জন্য উপদেশ দিল। ওদের দৃষ্টি বিনিময় দেখে রাব্বী বলল,

“তিনজন‌ই চলেন।"

পারি আর কথা বাড়াল না। রাব্বী, মাহাদকে অনুসরণ ওদের পিছু পিছু ক্লাবের পথ ধরল।

ক্লাবের মধ্যে জরুরি মিটিং হচ্ছে কিছু নিয়ে, সেখানে সবাই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে।

“দেখ, যদি দশজন মেয়েকে সাবলম্বী হতে সহযোগিতা করতে পারি তাও কিন্তু অনেক। এখানে আমাদের তো কোন প্রফিটের আশা নেই। শুধু কিছু মানুষকে স্বনির্ভর হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হেল্প করা দরকার, এই তো!"

সিয়ামের কথার প্রেক্ষিতে সম্রাট বলল,

“আচ্ছা, আমি মিরপুরের ঐ লোকটার সাথে কথা বলে রেখেছি। উনি বলেছেন আমাদের এখান থেকে যারা মোটামুটি একটি নলেজ নিয়ে বের হবে উনি তাদের তিন মাসের ট্রেনিং এর সকল ব্যবস্থা করে দিবেন। তার মানে হল, তারা মোটামুটি প্র্যাকটিক্যাল ও সার্টিফাইড হয়েই যেকোন ওয়ার্কশপে কাজে ঢুকতে পারবে।"

“দ্যাটস এ্যা গ্রেট নিউজ।"

“হু।"

“ভাই, আসসালামু আলাইকুম!"

রাব্বী, মাহাদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরের সবাইকে সালাম দিল। ওদের পিছনে দাঁড়িয়ে পারিরা তিনজন। সবার দৃষ্টি পড়ল গিয়ে দরজার দিকে। রাব্বী মাহাদ ভেতরে ঢুকে পারিদের জন্য পথ করে দিল। তাহসিন পারিকে দেখে দুষ্টুমি করে বলল,

“আরেহ, পারি ম্যাম যে, আসুন ম্যাম আসুন। প্লিজ কাম ইন।"

সম্রাট এক পলক দেখেই চোখ সরিয়ে নিয়েছে। একটি কাগজে কিছু লিখছে, সেখানে তার মনোযোগ ভীষণ গভীর। যদিও তা নিছকই দেখানো, মন তো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমনীর দিকেই। পারি সখিদের নিয়ে ভেতর ঢুকে সবাইকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিতেই সবাই একসঙ্গে সালামের উত্তর দিল। সিয়াম সম্রাটকে মেনশন করে বলল,

“স্যাম, তুই বল।"

“তোরাই বল!"

বলেই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে একবারে বাইরে চলে গেল পারিকে এড়িয়ে। এতগুলো ছেলের মধ্যে এভাবে একা রেখে চলে গেল! পারি অপমানিত বোধ করল। সম্রাট উপস্থিত থাকলে যেকোনো পরিবেশে পারি সাহস পায়, তা তো লোকটা জানে।
অথচ এভাবে রেখে চলে গেল। সম্রাটের এভাবে চলে যাওয়ায় তাহসিন, বাপ্পী, সিয়াম একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। এরপর তাহসিন সোফা খালি করে পারি সহ ওর বান্ধবীদেরকে বলল,

“আগে বস, বসে কথা বলি।"

“না ভাইয়া, সমস্যা নেই। আমরা এভাবেই ঠিক আছি।"

“বস প্লিজ!"

তাহসিনের অনুরোধে বসল। অতঃপর সিয়াম‌ বোঝানোর মতো করে বলতে আরম্ভ করল,

“পারি, তোমাকে ডেকে আনার কারণ হচ্ছে, আমরা খুব শিগগিরই একটা ছোট্ট পরিসরে স্কিল ডেভেলপমেন্ট এর একটি আয়োজন করতে যাচ্ছি। যেখানে সাত দিনের ফ্রি কোর্স করানো হবে। আমরা আগেও এই আয়োজন করেছি তবে এবার একটু পরিসর বড় করার চেষ্টা চলছে। আর নতুন করে কিছু কোর্স‌ও বাড়ানো হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি হল বেকিং। যেহেতু তোমার আলহামদুলিল্লাহ, ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে তাই আমরা চাইছিলাম, মানে তোমাকে রিকুয়েস্ট করছি তুমি আমাদের এখানে এই সাতদিন সময় দাও। ডোন্ট ওয়ারি, আমরা পেমেন্ট করব।"

সিয়াম এক নাগাড়ে বলে থামল। পারি ডান হাত দিয়ে বাম হাতের কনুই চেপে ধরে বসে ওদের কথা শুনছিল। সিয়ামের কথা শেষ হবার মিনিট এক পার করে হালকা হাসার প্রয়াস করে বলল,

“পেমেন্ট করতে হবে না ভাইয়া। আমি এমনিতেই করব।"

“না, আমরা সবাইকেই পেমেন্ট করব, তুমি কেন বাদ যাবে!"

“সবাই আর আমি কি এক? কিন্তু আমি তো জানতাম আপনারা সবাই আমাকে আপনাদের বোনের মতোন‌ই ভাবেন!"

পারির কথায় বাপ্পী বলল,

“অবশ্য‌ই তুমি আমাদের বোন। তাই বলেই তো, তোমাকে বেগাড় খাটাতে চাই না। আমার বোনের পরিশ্রমের দাম আছে না!"

“আছে ভাইয়া, তবে সব জায়গাতেই নয়। তাছাড়াও এত ভালো একটি উদ্যোগের অংশ হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব। আপনারা সুযোগ করে দিচ্ছেন তাই অনেক, আমি আমার সবটুকু ঢেলে দিয়ে চেষ্টা করব কাজ করার।"

“ওকে ফাইন। তুমি তাহলে নিজেকে আরো বেশি করে ঝালিয়ে নেও। আগামি উইকেই সব শুরু হবে, ইনশাআল্লাহ।"

“ইনশাআল্লাহ, ধন্যবাদ আমাকে এত বড় কাজের জন্য যোগ্য মনে করায়!"

“তুমি তো অবশ্যই যোগ্য। তোমার কেকের রিভিউ দারুণ, আর কোয়ালিটির সাক্ষী তো আমরা নিজেরাই।"

“হ্যাঁ, পারি আপুর প্র্যাকটিস করা সব কেকের টেষ্টার আমি হব!"

মাহাদ বলল, ওর কথায় রাব্বী খোঁচা মেরে বলল,

“হ্যাঁ, তাতো সবাই জানে। যেখানেই ফ্রি খাবার সেখানেই মাহাদ!"

“ফাও কথা বলবা না রাব্বী!"

“ফাও কথা না মিয়া..

“এ্যাই, দু'টো বের হ‌ এখান থেকে!"

রাব্বী, মাহাদকে ধমকে বের করল সিয়াম। পারি, নিশি, ফারিহা মুচকি মুচকি হাসছে ওদের কান্ড দেখে। ওরা বেরিয়ে যেতেই বাপ্পী পারিকে জিজ্ঞেস করল,

“আচ্ছ পারি, সেদিন উনি কে ছিলেন? মানে যতটুকু শুনলাম তোমার কাজিন! কিন্তু কেমন কাজিন?"

“আমার বড় চাচার ছেলে!"

“তোমার বড় চাচা? তোমার কোন রিলেটিভের বিষয়ে অবশ্য কখনো কিছু বলো নি।"

বাপ্পীর কথায় পারি মাথা নুইয়ে নিল। অতঃপর সেভাবে থেকেই বলল,

“মাম্মা পাপার লাভ ম্যারেজ ছিল, দাদা দাদী মেনে নেননি। এতে করে দাদা বাড়ির সাথে বাবার সম্পর্ক অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়। তবে আমরা হ‌ওয়ার পর একটু ঠিক হলেও খুব একটা গ্রামে যাওয়া হতো না। কিছুটা অভিমান আর বাবা সবসময় ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকত তাই চাইলেও যেতে পারতেন না। এরপর তো একদিন,.... মাম্মা পাপা মারা যাওয়ার পর আমি মামা মামীর কাছেই বড় হ‌ই, দাদা দাদীও মাম্ম পাপার পর পর মারা যান। এমনিতেই সম্পর্ক ভালো ছিল না, আর বাবা মায়ের পর দাদা দাদা চলে গেলেন, তাই দাদা বাড়িতে একেবারেই যাওয়া হয়নি, তাই তাদের সম্পর্কে কাউকে কিছু বলা হয় না।"

“ ওহ্। তবে তোমার কাজিনকে খুব দায়িত্বশীল মনে হয়েছে সেদিন।"

“হ্যাঁ, ভাইয়া আমাকে খুব ভালোবাসে। তার নিজের‌ও কোন ভাইবোন নেই, তাই ..!"

“সে কী করে?"

“ভাইয়া ডিবিতে আছেন। এতদিন ঢাকা ছিলেন, শিগগিরই রংপুর চলে যাবে, ট্রান্সফার হয়েছে।"

“ওহ!"

এরপর আরো টুকটাক ব্যক্তিগত কথা হলো সবার সঙ্গে। কথা শেষ করে পারি সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার সময় দরজার পাশে প্যান্টে হাত গুঁজে শিনা টান টান করে দাঁড়িয়ে থাকা সম্রাটকে আড়চোখে একবার দেখল। সম্রাট আগের মতোই না দেখা করে দাঁড়িয়ে রইল। পারি ধীর পায়ে হেঁটে দরজা পেরিয়ে যখন ক্লাবের বাইরে চলে গেল তখন সম্রাট ক্লাবের ভেতরে ঢুকল।

“তুই এমন করলি কেন? আশ্চর্য! ডেকে আনালি নিজে, নিজেই তো কথা বলবি, তাই না! কথা বলার সুযোগ করে দিতেই ওকে ডেকে আনা হলো!"

বাপ্পী সম্রাটের দিকে কপাল কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে কথাগুলো বলল। সম্রাট মুখে নিশ্চুপ থেকে মনে মনে বলল,

“যেদিন ও নিজে সেধে কথা বলবে সেদিন আমিও বলব!"

বন্ধুর নিরুত্তর আচরণে ওরাও নির্বাক। বাপ্পী সম্রাটের এহেন আচরণে বিরক্ত ও হতবাক এক‌ইসাথে চিন্তিত। সবসময় পারি পারি করে হেদিয়ে মরে অথচ পারিকে দেখলেই এড়িয়ে চলে। কি চলছে এই ছেলের মাথায় তা এই ছেলেই ভালো বুঝে।

সন্ধ্যার পর,

পারি নিজের ঘরে ঢুকতেই ওর মুঠোফোনটি বেজে উঠল, ব্যাগ থেকে বের করে নাম্বার দেখে ভাবনায় পড়ে গেল। অনেক দিন পর হৃদয়ের ফোন। হৃদয় আংটি বদলের পর থেকেই পারিকে এড়িয়ে চলছে। কারণটা অবশ্যই পারি নিজে‌। যাকে ভালোবাসে তাকে ছেড়ে অন্য কাউকে গ্রহণ করতে বাধ্য করলে নিশ্চয়ই তা মেনে নিতে যে কারোই কষ্ট হবে! হৃদয় তাকে কতটা ভালোবাসে তা শুধু হৃদয় আর স্রষ্টা জানে। শুধুমাত্র পারির কারণেই সে হুরকে মেনে নিয়েছে, পারি তার শুদ্ধ অনূভুতির দোহাই দিয়ে বাধ্য করেছে তার কথা মেনে নিতে। নিষ্ঠুর নারী পারি, নিজের দোহাই দিয়ে তাকে বাধ্য করেছে হুরকে গ্রহণ করতে, তবে হৃদয় নিজের জীবন সঙ্গিনীর প্রতি শতভাগ সৎ। সেখানে সে কোন হঠকারিতা করেনি। হুরের আঙ্গুলে নিজের নামের সিলমোহর লাগাতেই সে নিজেকে পুরোপুরি হুরের তরে সঁপে দিয়েছে।

“ হ্যালো!"

পারি ফোন রিসিভ করে কানে ধরতেই হৃদয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে আসল। ফোনে কথা বলতে বলতে বারান্দায় চলে যায়। বারান্দার গ্রিলের ফাঁক গলিয়ে দৃষ্টি নিচে, রাস্তার দিকে পড়তেই তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল রাস্তার ওপাশে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ামানবটি দেখে। যে নিজেও ফোনে ব্যস্ত। পারি বুঝতে পারছে না এই লোক এই সময়ে এখানে কেন?
পারি একটু আড়াল হয়ে দাঁড়াল বারান্দায় তার মেলে দে‌ওয়া কাপড়ের পিছনে। সে আড়াল হতেই নিচ থেকে সম্রাট গলা উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। এবং পরপর‌ই হাঁটা ধরল। পারি আড়াল থেকে বেরিয়ে বারান্দার গ্রিলের সাথে গাল ঠেকিয়ে দেখতে থাকল তাকে পাহারা দেওয়া ঐ পাহারাদারের গমন পথ।
কিছু একটা ভেবে নিয়ে মুচকি হাসল। কানের কাছে ঠেসে রাখা মুঠোফোন থেকে বারবার ভেসে আসছে,

“পারি, শুনছো আমার কথা? হ্যালো পারি!"

“হু, হু হু শুনেছি। আচ্ছা ঠিক আছে আমি আসব!"

রাতের বেলা,

সম্রাট বেডে শুয়ে পায়ের উপর পা তুলে রেখে তা নাচিয়ে নাচিয়ে ভাবছে কীভাবে পারিকে কনভেন্স করবে! ইগোর জন্য পারির সাথে কথা বলতেও পারছে না আবার না বলে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে। ভাবনার অতলে হারিয়ে যাওয়ার আগেই সম্রাটের মুঠোফোন বেজে উঠল। পাশেই থাকা ফোনটি হাতে নিয়ে মায়ের নাম্বার দেখে খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে রিসিভারে টান দিয়ে কানে ধরেই সালাম দিল,

“আসসালামু আলাইকুম আম্মু!"

“ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কেমন আছে আমার বাপজান!"

“আলহামদুলিল্লাহ!"

“বাবা, সোহা, রুহি কেমন আছে আম্মু!"

“সবাই ভালো। কাল যে তোমাকে জরুরি একটু বাড়িতে আসতে হবে বাপজান!"

“কাল? "

“হ্যাঁ!"

“এত তাড়া কেন মা?"

“সোহাকে দেখতে আসতে চাইছে, তোমাকে যেই ছেলের কথা বলেছিলাম তারা।"

“ওহ, তাই নাকি? কিন্তু!"

“তোমার কি পড়াশোনা নিয়ে খুব চাপ যাচ্ছে?"

“না তেমন কিছু নয়। কিন্তু... আচ্ছা ঠিক আছে আমি আসব। ইনশাআল্লাহ!"

“ইনশাআল্লাহ, সাবধানে আসো।"

মায়ের সাথে কথা শেষ করেই ফোন কেটে পাশে রেখে বালিশে মাথা পেতে আবারও ডুব দিল পারির জগতে।

পরের দিন ..

পারি ক্যাম্পাসে বসে ভাবছে গতকালের কথা। সম্রাট কেন ওর বাড়ির সামনে গিয়েছিল ! ওকে দেখার জন্য? কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? ওর জন্য গেলে অবশ্যই ওকে ফোন করে বারান্দায় যেতে বলত। অথচ সম্রাট ওর সাথে কথাই বলে না। অবশ্য না বলার কারণ তো ও নিজেই দিয়ে রেখেছে। সেদিন ঐভাবে কথা বলায় নিশ্চয়ই অপমানিত বোধ করেছে। ওভাবে বলা উচিত হয়নি। এমনিতেই দিয়াবাড়ির সেই সন্ধ্যায় খুব বাজে আচরণ করেছিল, যা মোটেই মানুষটি ডিজার্ভ করে না। তারপর আবার সেদিন...পারি মনে মনে স্থির করে নিল আজ সম্রাটকে স্যরি বলবে। অন্তত সেদিনের দুর্ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাওয়াই উচিত।

“কি ভাবছিস এত?"

নিশি পিছনে থেকে এসে পারির পাশে বসেই প্রশ্নটা করল। পারি ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করে বসল,

“ এই তোর সকাল আটটা?"

“স্যরি রে, মামা মামী এসেছিল তাই!"

“ হঠাৎ করেই তারা!"

নিশি একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ সুরে বলল,

“ আবারো একটি পাত্রের খোঁজ নিয়ে এসেছে! বুঝি না, আমার বাবা মায়ের চেয়েও তাদের বেশি তাড়া কেন?"

“তারপর কী করলি?"

“কী আর করব? চুপচাপ ছিলাম, ছেলে প্রবাসী। মালয়েশিয়ায় একটি ফার্মের এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার।
এই কথা শোনার পর কি আব্বা আম্মা আমার মতামতের আশায় বসে থাকবে?"

“তার মানে তুই রাজী?"

“জানি না।"

নিশি মুখটা ঘুরিয়ে অন্য দিকে চেয়ে রইল। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের বিয়ের বিষয়ে মতামত থাকতে নেই। কেন না তাদের মতামতের কদর কেউ করে না। কেউ জানতেই চায় না। পারি নিশির কাঁধে হাত রেখে শান্তনা দিয়ে বলল,

“দোস্ত, মন খারাপ করিস না। দেখবি, নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে। আংকেল আন্টি অনেক বুঝদার, তোর মতের বিরুদ্ধ যাবে না।"

“আমি গ্রাজুয়েশন শেষ করতে চাই দোস্ত, মাস্টার্স করে বিসিএস দিতে চাই। আমি এখন‌ই বিয়ে করে নিজের স্বপ্নগুলোকে কবর দিতে চাই না। উনারা তা বুঝতেই চাইছে না।"

“আচ্ছা, শান্ত হ। উনারা মা-বাবা, আমাদের জন্য উত্তম ভেবেই এসব করেন। এটাও অনেক সুখের, বিশ্বাস কর। এই যে আমাকে দেখ, কেউ নেই আমার জন্য এমন করে ভাবার জন্য। "

কথাটা বলতেই পারির মুখটা উদাস হয়ে গেল। নিশি নিজের দুঃখ ভুলে পারির দিকে ফিরে ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

“কে বলল? আমরা কি তোর কেউ না? আর ফারিশ ভাইয়া, ভাবী? মানছি তোর চাচা চাচী ভালো মানুষ নন, কিন্তু মামনি, মামীমা, হাসান মামা? আর...

নিশি থেমে গেল। পারি ওর দিকে উৎসুক চোখে তাকায়, নিশি এবার আমতা আমতা করতে করতে পারির হাত দু'টো আরেকটু জোরালো ভাবে চেপে ধরে বলল,

“দোস্ত, তোকে একটা কথা বলি? রাগ করবি না, প্লিজ শান্ত মাথায় শুনবি!"

নিশির অনুরোধ করায় পারি ভাবছে কী এমন বলবে যার জন্য এত ফর্মালিটি! ও নিশিকে আশ্বস্ত করে বলল,

“হুম, বল!"

“তুই কি সত্যিই সম্রাট ভাইয়াকে ভালোবাসিস না? ইয়ে মানে, এক বিন্দুও না।"

পারি নিশির প্রশ্ন থমকাল। নিশির চোখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। ও চোখের কোন গড়িয়ে পড়া উষ্ণ জলেরা জানিয়ে দিল ওর উত্তরগুলো। নিশি আরো জোর দিয়ে বলল,

“দোস্ত, বিশ্বাস কর,আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, সম্রাট ভাইয়া তোকে যতটা ভালোবাসে ততটা ভালো কেউ বাসতে পারবে না। তিনি তোকে সত্যিই অনেক ভালোবাসে।"

“আমি জানি।"

“তাহলে তুই রাজী কেন হচ্ছিস না? দেখ, পাস্ট ইজ পাস্ট। তুই এক কাজ কর, ভাইয়াকে তোর ভয়ের কারণ জানা। আমার বিশ্বাস তিনি সব জেনেও তোকে ভালোবাসবে!"

“কিন্তু আমার ভয়। এখন উনার চোখে আমার জন্য রাগ দেখলেও আমি জানি উনি আমাকে ঘৃণা করেন না। কিন্তু, সত্যি জানার পর যদি ঘৃণা করেন তখন আমি স‌ইতে পারব না।"

“তোর সামনে দিয়ে অন্য কারো হয়ে গেলে স‌ইতে পারবি?"

পারি মাথা নুইয়ে নিল। নিশি বলে গেল,

“দেখ, আমি সেদিন রাতে যতটুকু বুঝেছি ভাইয়ার সাথে বসা ঐ মেয়েটা ভাইয়ার উপরে ফিদা। যদিও ভাইয়ার মনোভাবে তেমন কিছু মনে হয়নি কিন্তু মেয়েটা তো সুন্দর আর ভাইয়ার কাছের। তো হঠাৎ যদি কখনো!"

“করুক। আমিও চাই সে এগিয়ে যাক।"

“তাহলে তুই?"

“আমার আর কি! যেমন আছি তেমনি বেশ।"

“এভাবে এক জীবন কীভাবে কাটাবি তুই!"

“ব্যাপার না, একটাই তো জীবন। খুব কষ্টেরও হবে না দেখিস!"

“পারি!"

“বাদ দে, চল। কিছু বাজার করা দরকার। আচ্ছা এই ফারুটার কী খবর?"

"কী জানি? বলদ মাইয়া, ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে। ফাজিল একটা!"

পারি কথা ঘুরিয়ে ফেলায় নিশিও তাই করল। পারিকে বেশি চাপাচাপি করতে গেলে ওর মন খারাপ হয়ে যায়। তবে যতটুকু বোঝার বুঝে নিয়েছে। এখন শুধু সম্রাটের সাথে কথা বলবে।

৪২

তিনটা কেকের ফিনিশিং টাচ দিয়ে পারি ক্লান্ত দেহে বিছানায় গা এলাতেই মনে পড়ল সম্রাটের কথা। আজকে সবচেয়ে বড় কেকের যেই ক্লায়েন্ট সেটা সম্রাটের মাধ্যমে পরিচিত হয়েছিল। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দশটি কেক পারির থেকে নিয়েছে ভদ্রমহিলা। ভীষণ অমায়িক এবং নরম স্বভাবের। কখনোই দর নিয়ে কথা বলে না। সবসময় ফোন করে বলবে,

_তোমার পছন্দ মতো দিও, তোমার চয়েস সবসময় দারুণ হয়। দাম যাই হোক, কেক রেডি করে বলে দিও আমি এখন কিছু অগ্রিম পাঠিয়ে দিচ্ছি।

পারি কথাগুলো ভেবে একাই হাসল। এমন কিছু চমৎকার কাস্টমার পাওয়াও ভাগ্যের বিষয়। এরা যেকোন বিক্রেতা, ব্যবসায়ীর জন্য আল্লাহর রহমত স্বরূপ। এরা অন্যের শ্রম, সময়ের মূল্য দিতে জানেন। পারি উনার কথা ভাবতে ভাবতেই মোবাইলটা হাতে তুলে নিল।
ভদ্রমহিলাকে মেসেজ করে জানিয়ে দিল উনার কেক রেডি। কাল পার্সেল পাঠিয়ে দিবে। ভদ্রমহিলার ইনবক্স থেকে বের হতেই সম্রাটের ডে দেখে থেমে গেল। সম্রাট কিছু সময় আগে একটি স্টোরি আপলোড করেছে। বাইক আর হেলমেট এর ছবি দিয়ে ক্যাপশন দিয়েছে Way home. অর্থাৎ সে বাড়ি যাচ্ছে। পারির মনটা খারাপ হয়ে গেল স্টোরিটা দেখে। ও ভেবেছিল কাল সম্রাটের সাথে কথা বলে নিজেদের মাঝের স্বাভাবিক সম্পর্কটা ফিরিয়ে আনবে। ওর জন্য সম্রাট, হৃদয়ের দীর্ঘদিনের সম্পর্কেও চিড় ধরেছে। সেটাও ঠিক করিয়ে ফেলবে কিন্তু, এখন তো! কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ও সম্রাটের প্রোফাইলে ইন করল, অতঃপর ফটো ফাংশনে গিয়ে একের পর এক ছবি দেখতে থাকল সঙ্গে নিজের মোবাইলে সম্রাটের ছবিগুলো সেইভ করে যাচ্ছে। ওর আঙ্গুল গিয়ে থামল সেদিন রাতের ছবিগুলোয় যেখানে তানহার সাথে ওর অনেকগুলো ঘনিষ্ঠ ছবি দেখা যাচ্ছে। তানহা সহ সব বন্ধুদের মিউচুয়াল দেখাচ্ছে। পারির অন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা হিংসুটে পারির আত্না সজাগ হয়ে উঠল। যার জাহির হল সুন্দর সুন্দর ছবিগুলোতে এংগরি রিএ্যাক্ট দিয়ে। রিএ্যাক্টে‌ও রাগ কমল না তার, সে তানহার প্রোফাইলে ঢুকে তানহার ইতিবৃত্ত ঘেটে দেখল, এবং সহসাই তার মনটা আর‌ও খারাপ হয়ে গেল।
পাশাপাশি দাঁড়ানো অনেক ছবিই রয়েছে তাদের এবং তাতে দু'জনকে‌ই চমৎকার লাগছে। দু'জনের ব্যাকগ্রাউন্ড‌ও মানানসই। দু'জন দু'জনের সঙ্গে ভালো মানাবে। ছবি গুলো দেখার পর পারির মন সবার আগে এটাই গেয়ে উঠল। মনকে চুড়ান্ত খারাপ করে মোবাইলটা পাশে রেখে শুয়ে পড়ল। মনের সাথে দ্বন্দ্ব করে পারি আবারও তার মস্তিষ্কের কথা শুনল। বলবে না সম্রাটের সাথে কথা, দরকার নেই তার কারো ভুল ভাঙ্গানোর। ভুল বুঝে দূরে থাকলে, দূরেই থাকুক। এতেই উত্তম, এতেই সবার কল্যাণ। যা পাবার নয় তা না পাওয়ার দুঃখে পারি ভেসে যাবে না। পারির জীবনের অনেক দাম। অনেক কিছু হারিয়েও পারি টিকে রয়েছে বাবা মায়ের ভালোবাসার চিহ্ন হয়ে। পারিদের টিকে থাকতে হলে সব হারানোর শোক উপভোগ করা জানতে হয়। পারিরা তা পারেও বটে। কত কি হারিয়ে গেল, কত কী তার হল না। এবার‌ও না হয় তেমন কিছু হোক। নিরব কান্নায় দেহমন ক্লান্ত করে ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়ল।

****************************

_আম্মু, আসসালামু আলাইকুম।

_ওয়ালাইকুম আসসালাম, বাবা।

দরজা খুলতেই মা'কে দেখে সম্রাট আহ্লাদি হয়ে মায়ের গলায় ঝুলে পড়ল। মিসেস মাহমুদ‌ও ছেলেকে পেয়ে আবেগি হয়ে পড়লেন। পিঠে, কাঁধে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে কপালে, গালে চুমু দিতে থাকলেন। ঠিক তখনই পিছন থেকে রুহি বলে উঠল,

_আমি ছোট কিন্তু আমাকে তো কখনো এভাবে আদর কর না আম্মু! আমিও তো দূরে থাকি।

মেয়ের অভিযোগ শুনে মিসেস মাহমুদ বললেন,

_এই দু'দিন মায়ের আদর একা একা চুপি চুপি কে খাচ্ছে!

রুহি দুহাত বুকের উপর ক্রশ করে বেঁধে ঠোঁট উল্টে বলল,

_কী জানি?

সম্রাট বোনের নটাঙ্কিপনা দেখে হাসল, এগিয়ে গিয়ে কান টেনে ধরে বলল,

_কুড়িয়ে আনার পর থেকেই আমাদের আদরে ভাগ বসাচ্ছিস, আমরা কি হিংসে করি?

_আহ্, ভাইয়া ছাড়! লাগছে আমার!

_ছেড়ে দে বাবা, ব্যথা পাবে!

_একটু ব্যথা পেলে কিছু হয় না আম্মু! একটাকে তো বিদায় করেই দিচ্ছি, এখন এই কুড়িয়ে পাওয়াটাকেও!

_মোটেই আমাকেই কুড়িয়ে পাওয়া বলবে না। আমি হচ্ছি প্রিন্সেস, বুঝেছ। আমি হচ্ছি তালুকদার বংশের একমাত্র প্রিন্সেস। আর তোমরা সবাই পাইক পেয়াদা!

বোনের বাহাদুরি দেখে সম্রাট এবার কান ছেঁড়ে গাল টেনে দিয়ে বলল,

_জি, রাজকুমারী বুঝেছি। আপনি হচ্ছেন কুড়িয়ে পাওয়া রাজকন্যা আর আমরা...

_বাবা!

মাহমুদ তালুকদার বসার ঘরে বসে ছেলে মেয়ের খুনসুটি দেখে মিটিমিটি হাসছেন। সোহানি পাশেই স্বলজ্জিত চোখে তাকিয়ে আছে ভাইবোনের দিকে। সম্রাট রুহানিকে ছেড়ে সোহানির দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। লজ্জায় সোহা চোখ নামিয়ে ভাইয়ের বুকে মাথা ঠেকিয়ে দিল। সম্রাট বোনের মাথার উপর নিজের থুতনি ঠেকিয়ে ভেজা গলায় বলল,

_আমার পুতুলটা কখন এত বড় হয়ে গেল যে লোকের চোখ পড়ে গেল ব‌উ সাজিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য!

সবাই এই কথায় আবেগি হয়ে পড়ল। মিসেস সাবিনা ও মাহমুদ তালুকদার ভেজা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন মেয়ের পানে।

পরের দিন সকাল বেলা,

বাড়ির বড় মেয়ে এবং দীর্ঘ বছর পর প্রথম বিয়ের আয়োজন হ‌ওয়ায় মাহমুদ তালুকদার দু'হাতে খরচ করছে। মেয়েকে দেখতে আসা পাত্র পক্ষের জন্য কোনরকম ত্রুটি রাখছেন না তিনি। সম্রাট নিজেও ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল সব আয়োজনে। সকালে উঠেই খাসি জবাই করায়। সব কিছু নিজে তদারকি করেই করছে। ওকে সাহায্য করছে বাপ্পী। বাপ্পী এক‌ই গ্রামের ছেলে। সম্রাট গ্রামে আসছে তাও আবার বোনের অনুষ্ঠানে সেখানে বাপ্পী থাকবে না তা কি করে হয়!

মেহমান আসল একেবারেই সঠিক টাইমে। তালুকদার সাহেব বিশেষ করে অনুরোধ করে মন্ডলকে সাহেবকে উপস্থিত থাকার জন্য। মেয়ের ভবিষ্যত শ্বশুর বাড়িতে একটা আয়োজন হচ্ছে, সেখানে মন্ডল সাহেব থাকবে না, তা কি করে হয়? তিনিও সাদরে গ্রহণ করলেন পাত্র পাত্রী নির্বাচন করার এই বিশেষ অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ পত্র।
বাবার সঙ্গে এলো তানহা, মানহা ও তাদের মা।
যেন পারিবারিক অনুষ্ঠানের দারুণ একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। সম্রাট বোনের জন্য আসা পাত্র পক্ষের সেবায় এত‌ই ব্যস্ত হয়ে থাকল যে আর কোন দিকে তার ধ্যান দেওয়ার সময় হল না। তবে তার এই ধ্যান জ্ঞান হারিয়ে কাজ করার সুবিধা অন্য কেউ ঠিক‌ই নিল।

সম্রাটের এত ব্যস্ততার মাঝেও আকর্ষণীয় চার্মিং রূপে থাকা বাহ্যিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তানহা ফটাফট কিছু ছবি তুলে নিল যা একেবারে‌ই ওর অজান্তে ঘটলো। তানহা ছবিগুলো তুলতেই মানহা হাত থেকে ফোন ছিনিয়ে নিয়ে বোনের সঙ্গে খুনসুটি করে সেই ছবি তানহার ওয়ালে পোস্ট করে দিল, যার ক্যাপশনে লেখা ছিল,
‘Even if his heartbeat ceases, the gaze remains forbidden, for the king belongs to the princess, and to her alone.'

_তানহা!

বোনের দেওয়া ক্যাপশনটি তানহা বারবার পড়ছে আর মিটিমিটি হাসছে। ঠিক তখনই ওর পিছনে দাঁড়িয়ে সম্রাট ওর নাম ধরে ডাক দেয়, যাতে চমকে উঠে তানহা। এতে করে ওর হাতের ফোনটি নিচে পড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিন ফেটে ডিসপ্লে নষ্ট হয়ে গেল।
সম্রাট অপরাধী ভঙ্গিতে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

_স্যরি ডিয়ার!

_ইটস ওকে, স্যরি বল না প্লিজ!

_ডোন্ট ওয়ারি জি মানে ভাইয়া, আপুর কয়েক মাস পরপর নতুন ফোন কেনার অভ্যাস রয়েছে। আপনি ভবিষ্যতে প্রতি ছয় মাস পরপর নতুন ফোন কেনার অভ্যাস করে নিন।

_মানে?

_মানে কিছু না। তুমি কেন ডাকছিলে তাই বল!

_ওহ, হ্যাঁ তোমাকে মা ডাকছে। জানি না কেন, তুমি গিয়ে দেখ!

_হুম, যাচ্ছি। তুই আয় আমার সাথে।

বলেই তানহা মানহাকে টেনে নিজের সাথে নিয়ে গেল। সম্রাট ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করছে এদের দুই বোনের কাহিনী কী!

সোহানিকে দেখতে আসা পাত্র নিজেও ব্যারিস্টার। সোহানির সিনিয়র, শিগগিরই সে লন্ডন যাচ্ছে। আর যাওয়ার আগে সোহানিকে নিজের সাথে পাকাপোক্ত গিঁট দিয়ে যেতে চাচ্ছে। তাই সব বিষয়ে তাদের তোরজোর বেশি। যেহেতু পাত্রী তাদের দেখাই এবং পরিবার সম্পর্কেও যথেষ্ট ধারণা আছে তাই তারা আজ‌ই কাবিন করিয়ে যেতে চাইছে। পাত্রের সম্পর্কেও তালুকদার পরিবারের খোঁজা নেওয়া শেষ তাই তারাও দ্বিমত করল না। দুই পরিবারের সম্মতি আর নিকটাত্মীয়ের উপস্থিতিতে সোহানির আকদ সম্পন্ন হল। সিদ্ধান্ত হল আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই ব‌উ নিয়ে যাবে বর।
ঘর ভর্তি যথেষ্ট কাজের লোক, আত্নীয় স্বজন থাকলেও তানহা ভীষণ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিল আজ। সে মেহমানকে খেয়াল রাখা থেকে শুরু করে খাবারের তদারকি‌ও করল। মিসেস সাবিনার মন জয় করে নিল মেয়েটা। তিনি এমনিতেই তানহাকে পছন্দ করেন তার মধ্যে এত বড় ঘরের মেয়ে হয়েও কোনরকম নাক উঁচু স্বভাব ছাড়াই ভীষণ অমায়িক আর ঘরোয়া মেয়ের পরিচয় দিল আজ তানহা। তিনি মনেপ্রাণেই তানহাকে নিজের পুত্র বধূ হিসেবে মেনে নিলেন।

*******************************************

_সম্রাটের সাথে কথা হয়েছে?

হৃদয় পারিকে কথাটা বলেই ওর দিকে তাকিয়ে থাকল উৎসুক চোখে। পারির উত্তর শোনার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে। পারি বিব্রত হল ওর ঐ চাহনিতে। হৃদয়ের ধারণা পারি সম্রাটের সাথে সম্পর্কে রয়েছে। পারি ওর এই ভুল ধারণা ভাঙতে চাইছে না, অন্তত হুরের সাথে ওর বিয়ে সম্পন্ন হ‌ওয়ার আগে তো নয়ই। কারণ আজ পারি তার নিজের একটি ধারণাকে ভুল প্রমাণ হতে দেখেছে। ও ভেবেছিল হৃদয় হুরকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অবশ্যই ওকে ভুলে যাবে। যেহেতু বাগদান করেছে তাহলে নিশ্চয়ই পারির মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে কিন্তু পারি ভুল প্রমাণিত হল। আজ ও হৃদয়ের মায়ের অনুরোধে হৃদয়ের বাসায় গিয়েছিল, সেখানে গিয়ে যা বুঝতে পেরেছে তাতে ওর চিন্তা, লজ্জা, ভয় আরো বেড়েছে। নিজের ধারণা, বিশ্বাস ভুল প্রমাণ হ‌ওয়ায় কষ্ট‌ও পেয়েছে। হৃদয় ওকে ভুলেনি, চেষ্টা‌ও করছে না। বরং পারিকে মেনে নেয়নি বলে নিজের মায়ের সাথেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। এতদিন পারির মুখোমুখি হয়নি, হুরকে মেনে নেওয়ার প্রয়াস নামক নাটক চালিয়ে গিয়েছে কারণ সে বিশ্বাস করেছিল পারি সম্রাটকে ভালোবাসে। তবে অতি সাম্প্রতিক সে কোন ভাবে সত্যটা উৎঘাটন করতে পেরেছে অতঃপর! পারির সঙ্গে সম্রাটের সম্পর্ক কতদূর তা বোঝার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। পারি আজ এসেছে ওদের বিয়ের জন্য টুকটাক কেনাকাটায় অংশ নিতে।
ইচ্ছা না থাকলেও আসতে হয়েছে, পারির মনে হয় হুর মেয়েটা হয় অধিক বোকা নয় বোকা সেজে মহৎ হ‌ওয়ার চেষ্টা করছে। নয়তো কেউ যেচে নিজের পায়ে কুড়াল মারে না। পারিকে মেয়েটা জোর করেই ওদের মাঝে রাখে সবসময়। মেয়েটা হৃদয়কে অসম্ভব ভালোবাসে, যা তার চোখেমুখে আছড়ে পড়ে। তার উচিত হৃদয়ের পছন্দানুযায়ী নিজেকে গুছিয়ে রেখে হৃদয়ের সামনে ঘুরঘুর করে ওর মন জয় করার চেষ্টা করা। তা না করে মেয়েটা সবসময় পারিকে ওদের মাঝে রেখে নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলে, সঙ্গে পারিকেও করে বিব্রত, অপরাধী।
হৃদয় পারির নিরবতায় ফিচেল হাসল, যা পারির গাঁয়ে কাঁটার মতো হুল ফুটাল। ও হৃদয়ের দিকে তাকাতেই হৃদয় নিজের মোবাইলটা ওর চোখের সামনে তুলে ধরল। হতবাক চোখে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা পারি ভ্রু কুঁচকে মোবাইলে তাকাতেই ওর চাহনি নিশ্চল হয়ে এলো।
স্ক্রিনে ভেসে আছে তানহার ওয়ালে থাকা পোস্টটি। কয়েক পলক ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থেকে নিরুত্তাপ গলায় বলল,

_এসব আমাকে কেন দেখাচ্ছ?

_আমি ভেবেছিলাম, তুমি ওর সাথে ভালো থাকবে তাই, কিন্তু এখন তো!

_তুমি ভুলে ভেবেছ। আমার তার সাথে কোন সম্পর্ক নেই, কোন কালেই ছিল না। ইভেন কারো সাথেই আমি কোন সম্পর্কে নেই।

_তাহলে কেন?

_ হৃদয় প্লিজ, আমার জন্য এই শহরে থাকা কঠিন করে দিও না, তোমাকে আমি আগেও বলেছি, তোমাকে বন্ধু ছাড়া কখনোই কিছু ভাবিনি আর চাইলেও পারিনি। তুমি আমার কেবলি বন্ধু, এটার চেয়ে স্বচ্ছ সত্য আর কিছু নেই।
হৃদয়, এই শহরে তুমিই একমাত্র সেই মানুষ যাকে আমি অন্ধ বিশ্বাস করতে পারি। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমি যেকোন পরিস্থিতিতে, যেকোন প্রয়োজনে তোমাকে আমার পাশে পাই, পাবো‌। এটা নিয়ে কখনোই আমার মনে ভীতি কাজ করে না। কিন্তু.... যেদিন থেকে তুমি আমাকে ভালোবাসি বলেছ সেদিন থেকে আমি ভয় পাই, আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাওয়ার। আমার কাছে আমাদের বন্ধুত্বের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্য কিছু আমাদের মাঝে নেই। আমার এই নিঃস্ব জীবনে তোমরা কয়েকজন‌ই আমার সম্পদ, দয়া করে সেটা আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আমাকে কাঙাল বানিয়ে দিও না, প্লিজ।

এই অবধি বলে পারি থামল, হৃদয়ের থমথমে বেদনার্ত চাহনি। কিন্তু পারি যে নিষ্ঠুর, তাই তাকে এসব যাতনা ছুঁতে পারে না। ও অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা হুরের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল,

_হুর অসম্ভব সহজ আর নরম মনের একটি মেয়ে। তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে, ইভেন আমার মনে হয় ও তোমাকে তোমার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। ওকে হেলাফেলা করো না। ওকে ভালোবাসো, চেষ্টা করো ওকে নিয়ে সুখি হবার। বিশ্বাস করো, ও তোমাকে এত্ত ভালোবাসবে যে তুমি একদিন পারি নামক কেউ এই জগতে রয়েছে তাই ভুলে যাবে।

হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

_হৃদয়, ভালো তাকে বাসতে হয়, যে আমাদের ভালোবাসে।

পারির শেষ কথায় হৃদয় ফিক করে হেসে দিল। যাতে স্পষ্ট পারির প্রতি তিরষ্কার, নিজের বেদনা ছোঁয়া, তীব্র হাহাকারের আভাস। পারি ওর তিরষ্কারের কারণ বুঝে নিল। কিন্তু এরপর কিছু বলল না। ও মাথা নুইয়ে নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে হুরের দিকে এগিয়ে গেল। হৃদয় বুকের বাম পাশে হাত রেখে ধীম আওয়াজে বিড়বিড় করে বলল,

_এত নিষ্ঠুর নারীকেই তোর ভালোবাসতে হল? যে কিনা তোর অনুভূতির চার আনাও দাম দেয় না!

পারি ধীর পায়ে হাঁটছে আর ভাবছে হৃদয়কে বলা নিজের শেষ কথাটি। সে হৃদয়কে বোঝাল ‘ভালো তাকেই বাসতে হয়, যে আমাদের ভালোবাসে!'
পারি এবার নিজের প্রতিই হাসল। তাচ্ছিল্যের হাসি। যেখানে ছিল নিজের প্রতি বিষাদ, বিতৃষ্ণা আর তীব্র ঘৃণা। সে কেন কাউকে ভালোবাসতে পারছে না? কেন তাকে সেই অধিকার দেওয়া হয়নি! সে চাইলেও হৃদয়কে ভালোবাসতে পারবে না কেননা হৃদয়ের মা পারিকে মেয়ের চোখে দেখলেও কোনদিন পারির মতো গৃহহীন মেয়েকে ছেলের ব‌উ হিসেবে গ্রহণ করতো না। পারি তো এর আগেও একজনের দ্বারা তিরষ্কারের শিকার হয়েছে। আর সম্রাট! সম্রাট নামক পুরুষটি তো ধরা ছোঁয়ার বাইরে তার জন্য।

বোনের বিয়ে আনুষ্ঠানিক আলাপ পর্ব শেষ করে সম্রাট আজ ঢাকায় ফিরেছে। সকাল থেকেই প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে তার। স্থান নির্ধারণ থেকে কলাকুশলীদের সঙ্গে চুক্তি, যেহেতু সম্পূর্ণ প্রোগ্রামের ফাউন্ডার তারা নিজেরাই কয়েকজন, তাই একটু ভেবে চিন্তেই এগুচ্ছে। পারিকে ডাকা হয়েছে ওর কি কি প্রয়োজন হতে পারে সেসব লিস্ট নেওয়ার জন্য। নিশি তার এক কাজিনের বাড়িতে গিয়েছে তার বেবি সাওয়ারে অংশ নিতে, পারিকেও বলেছিল কিন্তু পারি এদিকের কাজের জন্য যায়নি। ফারিহা তার খালার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে কিছুদিনের জন্য। সুতরাং পারি এখন সম্পূর্ণ একা।
ক্লাবের ভেতরে ঢুকে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে কাউকে না দেখে হালকা উচ্চ স্বরে সালাম দিল,

_আসসালামু আলাইকুম, কেউ নাই এখানে?

কোন সাড়া আসল না। পারি ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো, গার্ডেনের পাশে দোলনা টাঙ্গানো তাতে বসে দোল দিতেই খেয়াল করল সম্রাট পিছনের দিকে কিন্তু একটা করছে। ও সেদিকে পা বাড়াতেই তাহসিনের গলার স্বর শুনে থেমে গেল,

_কখন এসেছ তুমি?

চমকে গিয়ে পারি তাহসিনের দিকে ফিরে তাকাল। তাহসিন জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে আছে।

_এইতো ভাইয়া একটু আগেই। কাউকে দেখছি না যে, সালাম দিলাম কেউ রেসপন্স করল না তাই আমি এখানে এসে বসেছি!

_ছেলেরা সব তো মাঠে, প্যান্ডেলের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু সম্রাট তো ক্লাবেই ছিল!

_না ভেতর কেউ নেই আর উনি...

এতটুকু বলে পারি আড়চোখে তাকাতেই তাহসিন ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকাল। সম্রাট গাছের গোড়া পরিষ্কার করছে। আজাইরা কাজ। এটা তো সকালেই তারা দুজন একসাথে করেছিল। পারিকে ইগনোর করার ছুতো শুধু। ও কথা ঘুরিয়ে পারিকে বলল,

_চল, তোমার কী কী লাগবে কাজ করতে তার লিস্ট দাও। ছেলেরা কেনাকাটা করতে যাবে।

পারি যা যা দরকার হতে পারে তার লিস্ট করে দিল। তাহসিন চায়ের অফার করলে সেটা নাকোচ করে বেরিয়ে যাওয়ার সময়‌ই সম্রাটের মুখোমুখি হল। সম্রাট পাশ কেটে ভেতর পা দিতেই পারি বলে উঠল,

_আপনার একটু সময় হবে? বেশি না, কিছু সময়। আমার কিছু জরুরি কথা ছিল।

এবার সম্রাট সরাসরি তাকাল ওর দিকে। পারি ঐ চাহনিতে নজর মেলানোর দুঃসাহস করল না। সে নিজের মাথা নত রেখেই উত্তরের আশায় দাঁড়িয়ে রইল। সম্রাট কয়েক মিনিট ভাবল অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরী তবে বোকা নারীটির দিকে। অতঃপর বলল,

_হুম!

তাহসিন এদের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রয়েছে, সম্রাট সেটা বুঝতে পেরে পারিকে বলল,

_কোথায় বলতে চাও?

_বাইরে কোথাও গিয়ে বলি!

_ওকে!

বলেই ও এগিয়ে গিয়ে নিজের বাইকে চাবি দিয়ে থেমে গেল, পারির দিকে ঘুরে বলল,

_তোমার তো আমার সাথে বাইকে বসতে সমস্যা হবে। আমার ছোঁয়া লাগলে তো তোমার...

_হবে না!

সম্রাটের কথার মাঝেই পারির উত্তর। সম্রাট চোখ চৌখা করে তাকিয়ে রইল। পারি কণ্ঠে জেদ ঢেলে বলল,

_আমার কোন সমস্যা হবে না। আপনি চলুন।

সম্রাট বসল, পারিও উঠে বসল ওর পিছনে ওর পিঠ থেকে ইঞ্চি খানিক দুরত্ব বজায় রেখে, তবে হাতের মুঠোয় ওর শার্টের কোণা খামচে ধরা থেকে বিরত থাকতে পারল না। সম্রাট হেলমেট পরা, মাস্কে কভার করা মুখ। তাই ওর ঠোট ছড়ানো হাসি কেউ দেখতেই পেল না।

ধানমন্ডি সাতাশ নাম্বার পেরিয়ে লেক পাশে এসে নিরিবিলি জায়গা খুঁজে নিয়ে আড়াল হয়ে দাঁড়াল দু'জন। পারি ভীত চোখে একবার সম্রাটের দিকে তাকিয়ে আবারও অন্য দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। সম্রাট পারির মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। আড়চোখে দেখছে পারির ভীত চাহনিতে বারবার ওকে দেখার বিষয়টি। ও ভ্রূকুটি করে বলল,

_তুমি এর আগেও আমার সাথে একা অনেক জায়গায় গিয়েছ, তাই অহেতুক ভয় পাওয়ার মতো ন্যাকামি কর না। মেজাজ গরম হয় আমার এতে, আমি মেয়ে মানুষের এসব ন্যাকামি নিতে পারি না।

সম্রাটের ঝাঁঝালো গলার ধমকে আরো শিটে গেল পারি। সম্রাট কোমরে দুই হাত রেখে বিরক্তি জাহির করে বলল,

_যদি ভয়‌ই পাবে তবে এখানে আনলে কেন? চল, কলাবাগান পুলিশ লাইনের সামনে গিয়ে কথা বলি। এতে নিশ্চয়ই...

_না আমি ভয় পাচ্ছি না। জাস্ট এমনি..

_লিসেন পারি, আমি তোমার নাটক দেখে ক্লান্ত। দয়া করে কাজের কথা থাকলে বল, না হয় চল। আমাদের অনেক কাজ রয়েছে।

পারির সঙ্গে দুটো মিনিট সময় কাটাতে, একটু কথা বলতে এত অনীহা দেখে পারি ভেতরে ভেতরে আরো বেশি কষ্ট পেল, ভেঙে পড়ল। অথচ বাইরে সে নীটল, নিশ্চল, অনুভূতিহীন। ঠোঁটে এক পশলা হাসি টানল জোর করে অতঃপর বলতে শুরু করল,

_আপনি আর হৃদয় একে অপরের সাথে কথা বলেন না কেন?

সম্রাটের কপালে চ‌ওড়া ভাঁজ পড়ল। এই মেয়ে হৃদয়কে নিয়ে কথা বলতে এতদূর আসতে বলছে ওকে? সে ভেবেছিল নিজের কোন কথা অথবা তাদের জন্য কথা বলতে চাইছে কিন্তু এতো অন্যের হয়ে কথা বলছে, তাও আবার হৃদয়কে নিয়ে। পারির মুখে হৃদয়ের নাম শুনে মুহূর্তে মনটা তেতো হয়ে গেল, রাগ মস্তিষ্কের সপ্তম আসমানে উঠে সম্রাটকে ক্ষেপিয়ে তুলল। কিন্তু ও কিছু বলার পূর্বে পারিই বলল,

_দেখুন, আমার জন্য আপনাদের বন্ধুদের মাঝে চিড় ধরেছে সেটা আমি বুঝতে পেরেছি এবং এটা আমাকে ভীষণ অপরাধবোধে ভুগাচ্ছে। আমি চাই না এটা আজীবন থাকুক। প্লিজ, নিজেদের মধ্যে সবকিছু ঠিক করে নিন।

_তোমার জন্য মানে! এ্যাই, কি মিন করতে চাইছ তুমি? লিসেন, তুমি কি নিজেকে খুব বেশি কিছু ভেবে নিয়েছ? নাকি এই সম্রাট মাহমুদ তালুকদার তোমার কাছে গিয়েছিল বলে তাকে দু পয়সার সস্তা কেউ ভেবে বসে আছ? লিসেন, তোমার মতোন মেয়েরা আর যাই হোক আমার মতো ছেলেদের জন্য মামুলি, ইউ চুটকির ব্যাপার। আর তুমি ভাবলে কি করে আমি তোমার মতো একটা মেয়ের জন্য নিজের বন্ধুদের সাথে...হাহ্! হাও ফানি! তোমার মতো মেয়ে একটা গেলে, চুটকি বাজালে কয়েকটি আসবে। সো, সেখানে নিজেকে এত গুরুত্বপূর্ণ কেউ ভেব না, প্লিজ। লাইফ ইজ ঠু শর্ট এন্ড আই নো হাও টু ..... ওয়েট! তুমি যদি এসব ফালতু বকার জন্য এতদূর এনে থাক তাহলে বলব, গো টু হেল উইথ ইউর ইস্টুপিটি! ডোন্ট বদার মি।

বলেই সম্রাট থামল, ওর দুচোখ জুড়ে ক্রোধের লাভা ঝরছে। পারি সেই ক্রোধান্বিত চোখে চোখ রেখে মৃদু হাসল এবং বলল,

_থ্যাংকিউ!

ওর অমন করে বলা থ্যাংকিউ মুহূর্তে সম্রাটের দেহ শীতল করে দিল। ক্রোধের বশীভূত হয়ে পারিকে যে ভয়ঙ্কর আঘাত করে বসেছে তা সে এবার বুঝতে পারল। অতঃপর.....পারি ধীর পায়ে হেঁটে ওর সামনে থেকে সরে গেল। আর ও ধপ করে বসে পড়ল লেকের সবুজ ঘাসের উপর।

৪৩

পারি ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন অনেক দূরে চলে গেল ঠিক তখনি সম্রাট ফিরে তাকাল পারির পথের পানে। অতঃপর এক সেকেন্ড‌ও দেরি না করে মুহূর্তেই ছুটে গেল সেদিকে। পারি সম্রাটের সামনে থেকে হাসি মুখ সরে আসলেও সম্রাটের কথাগুলো তীরের ফলা হয়ে ভেদ করেছে ওর কোমল মনটাকে। এই কথা যেন কোনদিন শোনা না লাগে তাই তো রাজী হচ্ছিল না। আর তাতেও সেই কথাই শোনা লাগল! পারি ফিক করে হেসে দিল, অথচ ওর চোখ জুড়ে জল থ‌ইথই করছে। গাল ভিজে জবজবে হয়ে গেছে চোখের পানিতে। ঠিক তখনই খুব কাছ থেকে সম্রাটের গলার স্বরে শুনতে পেল নিজের নামটি, সঙ্গে সঙ্গে পায়ের গতি আর‌ও বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ছেলেদের গতির সঙ্গে কি পারা যায়? পারিও পারল না। ছুটে চলা পারির ডান হাত টেনে ধরতেই রোধ হল গতি। পারি বাম হাতের তালু দিয়ে গাল, চোখ মুছে নিজেকে ঝরঝরে করে সামনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েই র‌ইল। সম্রাট ওর হাত ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে অপরাধী গলায় বলল,

_স্যরি, এভাবে বলতে চাইনি। আমি জাস্ট নিজেকে..

_আপনাকে স্যরি ফিল করতে হবে না। আপনি যা সত্য, তাই বলেছেন, এখানে আপনার কোন ভুল নেই। সুতরাং..

_প্লিজ পারি, ইউ নো আমি ওমন মানুষ‌ই ন‌ই।

_ আপনাকে এক্সপ্লেইনেশন দিতে হবে না। এখানে আপনার ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই!

_পারি!

_আমি কষ্ট পাইনি। সত্য আমাকে কষ্ট দেয় না। যাই হোক, আমি আসি। পারলে হৃদয়ের সাথে মিটাপ করে নিয়েন, সামনেই ওর বিয়ে। বিয়ের পরে ও চিটাগং চলে যাবে, এরপর হয়তো পার্মানেন্টলি ইউকে তে। তাই, নিজেদের মধ্যে দুরত্ব মিটিয়ে ভালো কিছু সময় কাটান। আসি আমি।

_পারি, প্লিজ!

পারি নিজের কথা শেষ করে চলেই যাচ্ছিল সম্রাট ওর সামনে হাত রেখে ওকে আঁটকে দিল। পারি চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল।

_কেন করছো এমন? বল, কিসের জন্য এত অবহেলা করছো আমাকে? আমাকে একবার বল, আমার দোষটা কোথায়? আমার খামতি কিসে? তুমি জাস্ট বল, আমি ওয়াদা করছি, আমি আমার সবটা দিয়ে সেটা কভার করার ট্রাই করব। প্লিজ! তাও বল, আল্লাহর দোহাই লাগে পারিজাত, আমাকে এভাবে বারবার ফিরিয়ে দিও না। বিশ্বাস করো, আমার সহ্য করতে কষ্ট হয়! আমি নিজেকে সামলাতে পারি না, বারবার তোমার কাছে বেহায়ার মতোন ছুটে আসি। একটু তো দয়া করো আমার প্রতি। করুণা করেই না হয় আমাকে গ্রহণ করো, আমি ওয়াদা করছি, তোমার জীবনটাকে রঙিন করে দিব আমার ভালোবাসার ছোঁয়ায়। আল্লাহর দোহাই লাগে পারিজাত , এভাবে আমাকে বারবার কাঙালের মতো ফিরিয়ে দিও না। অন্তত আমার অপরাধ, আমার মাঝের ত্রুটি কোথায়, সেটা বল!

_ আপনার কোন দোষ নেই। দোষটা আমার, আমি গরিব এতিম হয়ে এই পৃথিবীতে বেঁচে আছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় দোষ। আর ত্রুটি? সেটা তো আমার মধ্যে। আমি আপনার যোগ্য ন‌ই। কোন দিক দিয়েই আমি আপনার যোগ্য ন‌ই। আমার না আছে আপনার মতো পারিবারিক স্ট্যাটাস, না আছে বাহ্যিক সৌন্দর্য আর না আছে... একটি পবিত্র দেহ! শকুনে খুবলে খাওয়া দেহ নিয়ে কারো কাছে নিজেকে তুলে ধরার দুঃসাহসিক মানসিকতা আমার নেই। জানেন‌ই তো, আমি বড্ড ভীতু। আমি নিজের নোংরা পঁচা দেহ, মরে যাওয়া মন নিয়ে কারো জীবনে জড়াতে চাই না। কারো সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে তার জীবনটাও নোংরা ডোবায় ফেলতে চাই না। আমি অপবিত্র, পঁচা একটা অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে আছি, তাই অনেক। এর বেশি কিছু চাই না, চাওয়াও নেই। তাই বলছি, দয়া করে আমার দিকে দূরে থাকুন। আপনি অনেক ভালো, অনেক ভালোবাসার সক্ষমতা রাখেন। আমি চাই আপনি সেই ভালোবাসাটুকু সেই মানুষটির জন্য তুলে রাখুন যে আপনার যোগ্য। আপনার জীবনটিকে বসন্তের মতোই রঙিন করে তুলবে। যে আপনার জীবনের রহমত হয়ে আসবে, তাকেই দিবেন। আমার মতো পচে যাওয়া মেয়েদের জন্য নিজের মূল্যবান সময়, ভালোবাসা নষ্ট করবেন না প্লিজ। দয়া করে আমার থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলুন, আমি আর নিজেকে ভাঙতে চাই না। প্লিজ!

কথা শেষ হতেই ওর চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু ওর গালের উপর পড়ল। পারি বাম হাতের চার আঙ্গুলের ছোঁয়ায় সেটা মুছে নিয়ে আবারও পা বাড়ায়, ততক্ষণাৎ সম্রাট পারির ডান হাতের কব্জি ধরে ওকে আঁটকে দিল। পারি মুখ ফিরাতেই সম্রাট ওর বাম হালে হাত রেখে বলল,

_ভালোবাসার জন্য মন লাগে পারি, দেহ না। দেহ দৈহিক ক্ষুধা মেটালেও মনের ক্ষুধা মেটাতে পারে না। আমার তোমার গোটা মনটাই চাই, দেহকে না হয় আমার পরশে পবিত্র করে নিব। আমাকে অন্তত একটিবার সুযোগ দাও, অপবিত্র ছোঁয়াগুলোকে পবিত্রতায় ভরিয়ে দেওয়ার। একটি বার সুযোগ দাও তোমাকে ভালোবাসার, বিশ্বাস কর, তোমার মন থেকেই মুছে দিব সেই কুৎসিত মুহূর্তের স্মৃতি।

পারি উত্তর দিল না। সম্রাটের হাত নিজের কবজি থেকে সরিয়ে নিরুত্তর ভঙ্গিতে হনহন করে হেঁটে গেল। সম্রাট হতাশ হল। চরম হতাশায় চেপে ধরল তাকে। তবে এবার সে পারির পিছু নিল না। পাশেই থাকা খালি বেঞ্চে বসে পড়ল, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল অপলক চোখে অতঃপর হঠাৎ‌ই মুচকি হাসল। বিড়বিড় করে বলল,

_তুমি সাক্ষী, তার নয়ন জোড়ায় অনুভূতি ছিল, যা কেবল আমার নামেই লিপিবদ্ধ।

_______________________

বেশ বড়সড় আয়োজনে চলছে সম্রাটদের কাজ। মাঠের প্রায় অর্ধেক অংশ জুড়ে বিশাল করে সাজানো হয়েছে। সাজসজ্জার এই বিষয়টি পারির উপদেশ নিয়েই করেছে। আজ থেকে ক্লাস করানো শুরু হবে। সব কিছু সেট করছে ছেলেরা। যেহেতু ফ্রি প্রশিক্ষণ ক্লাস করাবে তাই শিক্ষার্থীদের ওপর রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। বেছে বেছে খুঁজে বের করেছে সেসব দুঃস্থ নারীদের যাদের আসলেই দরকার। প্রতিদিন তিন রাউন্ড ক্লাস হবে। প্রতি ক্লাস দেড় ঘন্টা। প্রতিটি ক্লাসে থাকবে দশজন করে প্রশিক্ষণার্থী।

সম্রাট পারির জন্য বেশ বড় পরিসরেই জায়গা নির্ধারণ করেছে এবং ওর জায়গাটুকুতে নিজেই সব দেখে শুনে সাজিয়েছে। কেক তৈরির জন্য যা যা লাগে সব রাব্বীকে দিয়ে এনে সুন্দর করে গুছিয়ে অতঃপর পারিকে আসতে বলল।

_দেখ, সব ঠিকঠাক আছে কিনা? আর কিছু লাগবে?

সেদিনের পর থেকে পারির সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ সহজ হয়েছে। আগের মতোই কথাবার্তা হচ্ছে, তবে তা প্রয়োজনে। পারি সব দেখে নিয়ে বলল,

_ঠিক আছে, আর কিছু লাগবে না। কখন শুরু হবে?

_এইতো, কমিশনার আসুক, উনি উদ্বোধন করলেই!

_ওহ্!

_তুমি সকালে ব্রেকফাস্ট করোনি কেন?

_আপনি কী করে জানলেন আমি ব্রেকফাস্ট করিনি?

পারি উত্তর না দিয়ে উল্টো চোখ কুঁচকে সন্দেহের চোখে তাকিয়েই প্রশ্নটি করল। সম্রাট অন্য দিকে তাকিয়ে ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল,

_যেভাবেই জেনেছি, জেনেছি। তুমি বল কেন খাওনি?

_ইচ্ছা করেনি, তাই।

ওর উত্তরে সম্রাট মুখটা বিকৃতি করে তাকাল। কিছু বলবে বলবে ভাব, ঠিক তখনই বাপ্পী পিছন থেকে ডাক দিল,

_মজনু সাহেব, এদিকে আসবেন দয়া করে।

বন্ধুর খোঁচায় কপাল কুঁচকে সেদিকে তাকাতেই পারি ফিক করে হেসে দিল। সেই হাসি দেখতেই বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করল। তাকে পচানোয় যদি মনের মানুষটি হাসে, তবে তাই ভালো।

সম্রাট দায়িত্ব নিয়েছে ডিজিটাল মার্কেটিং হাতেখড়ির। দশ জন ছেলে রাউন্ড হয়ে বসেছে, প্রত্যেকের হাতেই ল্যাপটপ। এগুলা তারা স্পন্সরশিপ থেকে পেয়েছে। সম্রাট মিডলে বসে তাদের মার্কেট প্লেসমেন্ট থেকে এড ক্রিয়েটিভ ক্রিয়েশন, ক্লায়েন্ট সার্ভে, ডাটা এন্ট্রি সহ খুঁটিনাটি সব শেখাচ্ছে। বাপ্পী, সিয়াম দায়িত্ব নিয়েছে গ্রাফিক্স এর ইতিবৃত্ত শেখানোর। বাকীরা খেয়াল রাখছে কার কি দরকার! মোটর মেকানিক আনা হয়েছে একেবারে গ্যারেজ থেকে ধরে। ক্রাফট শেখানোর জন্য তন্নির পরিচিত এক মেয়েকে আনা হয়েছে। এভাবেই প্রায় দশটি বিষয়ের উপর কোর্স করানো হচ্ছে।

পারি কেকের জন্য হোম মেইড টপার বানানোর ধাপ শিখাচ্ছিল। ঠিক তখনই তার মুঠোফোনটি বেজে উঠল। সম্রাট পারির পাশেই নিজের জায়গা সিলেক্ট করেছে। কেকের জন্য যেহেতু ঠান্ডা পরিবেশ লাগে তাই পারির জায়গায় শীতলীকরণ লাগিয়েছে টেম্পোরারি।
পারি তার প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্য করে বলল,

_এক্সকিউজ মি।

বলেই সে কল রিসিভ করে ফোনটি কানের সামনে ধরতেই ফারিশ বলল,

_পারি, তুই কোন পাশে?

_কোন পাশে মানে? তুমি কি এখানে এসেছ ভাইয়া?

_হু, ক্লাব ঘরের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি!

_ওহ, আমি আসছি একটু অপেক্ষা করো।

_তুই বল, আমি আসছি!

_ভেতরে ঢুকতেই সবচেয়ে বড়, যেই ঘরটা এসি লাগানো দেখবে, সেটাই আমার।

_আসছি।

মিনিট দুইয়ের মধ্যেই হাজির হল ফারিশ
সঙ্গে আরেকজন লোক। সে মুগ্ধ চোখে দেখছে বেক করা কেকের উপর ডিজাইন করায় ব্যস্ত থাকা পারিকে। পারির ঘরে পুরুষ ঢুকতে দেখেই নিজের কাজ ফেলে ছুটে এলো। ফারিশ তখন মুগ্ধ হয়ে পারির একজন প্রশিক্ষণার্থী কেক টেস্ট করেছিল। আর আনাস পারির ছবি তুলছিল! যা মুহূর্তে সম্রাটের মাথা গরম করে দিল।

_ কী কি হচ্ছে এখানে? আর এ্যাই আপনারা কা..?

_হেই ব্রাদার, হোয়াটস আপ? আফটার লং টাইম!

ফারিশ এগিয়ে আসল। আনাস ছবি তোলা বন্ধ করে বিব্রত চোখে তাকিয়ে রয়েছে। পারি নিজেও হুট করেই সম্রাটের লাউড সাউটে চমকে গিয়েছিল, ওর প্রশিক্ষণার্থীরাও। সবাই সম্রাটের দিকে তাকিয়ে আছে আর সম্রাটের অবস্থা! ফারিশের সঙ্গে হাসিমুখে কুশলাদি বিনিময় করে আড়চোখে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল, কে? ফারিশ সম্রাটের মনের হাল অনুমান করে ঠোঁট টিপে হাসল। সম্রাট ওর হাসি দেখে বাচ্চাদের মতো গাল ফুলিয়ে, কপালে ভাঁজ ফেলে তাকাতেই ফারিশ আনাসের বাহু চাপড়ে বলল,

_সেদিন যার কথা হয়েছিল না, আমার বন্ধু আনাস।
ঐ যে সময় চ্যানেলের সাংবাদিক!

_ওহ!

মুখে বললেও বুকটা ছ্যাত করে উঠল। আনাসের দিকে তাকাল, যেই তাকানো মোটেই স্বাভাবিক নয়
আনাস সম্রাটের আজব আচরণে বিস্মিত হল। তবে কিছু বলল না। সম্রাট আনাসের সাথে হাত মিলিয়ে হুট করেই কাউন্টার টপকে পারির পাশে গিয়ে দাঁড়াল। একদম গা ঘেঁষে দাড়াতেই পারি চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকায়, সম্রাট ওর প্রতিক্রিয়াকে পাত্তা না দিয়ে একদমই গা ছাড়া ভাব ধরে পারিকে জিজ্ঞেস করল,

_কয়টা শেষ করেছ আজ?

এমন করে বলল যেন ওদের মাঝে কত্ত গভীর সম্পর্ক! পারি সম্রাটের এমন কান্ডে ভরকাচ্ছে, লজ্জিত হচ্ছে। আনাসের দৃষ্টি ওদের উপর স্থির। লোকটা ওর সম্পর্কে কি ভাবছে কে জানে? ফারিশ বুঝতে পেরেছে আসল কারণ। আনাসকে দেখেই ইনসিকিউর ফিল করছে যার কারণে এমন অদ্ভুত আচরণ করছে।

_আনাস চাইলে এই প্রোগ্রাম নিয়ে একটা রিপোর্ট তৈরি করতে পারিস!

ফারিশ ওদের থেকে আনাসের ধ্যান সরাতেই কথাটা বলল। আনাস ফারিশের কথায় ধ্যানচুত্য হলেও দৃষ্টি সরাতে পারল না। ও আগের মতো থেকেই বলল,

_হুম, করা যায়। পারি তুমি কী ইন্টারভিউ দিবে!

_না!

পারির আগেই উত্তর দিল সম্রাট। পারি বিস্মিত হল এবার‌ও। কিন্তু কিছু মুখে বলল না। কেননা এখন ও কিছু বললে সম্রাটকে অপমান করার সামিল হবে, তাছাড়াও আনাস নামক প্যারা থেকে সে নিজেও মুক্তি চায়। এই লোক প্রায় সপ্তাহখানেক ধরেই ওকে কল দিয়ে জ্বালিয়ে মারছে যা ওর একেবারেই সহ্য হচ্ছে না। সম্রাটের পাগলামিতে যদি কাজ হয় তবে তাই হোক।

পারির বদলে সম্রাটের না বলায় আনাসের চোখ নাকের ডগায় এসে নামল। সম্রাট বুঝল ওর বলার ধরণ সঠিক হয়নি। ও কথা ঘুরিয়ে এবার নরম ভদ্রলোকি গলায় বলল,

_ইয়ে মানে, আমরা কোন ইন্সটিটিউট ন‌ই। তাই আমাদের এখানের কোন সাক্ষাৎকার নেওয়া যাবে না। আপনি চাইলে লার্নারদের নিতে পারেন। এক কাজ করুন আমার সাথে চলুন, ঐদিকে ছেলেদের থেকে ইন্টারভিউ নিতে পারবেন এবং সেটাই ভালো হবে।

আনাসের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে ‌। সবাই সরতেই পারি মুখ টিপে হাসল। অতঃপর সে আবারও ব্যস্ত হয়ে গেল নিজের কাজে।


৪৪










৪৫

#সুখ_ফড়িং_সিজন_২
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৪৫

[ সব ধরনের নকলবাজি থেকে সতর্ক করা হল। ভালো লাগলে শেয়ার করবেন মেনশন দিবেন।]

বর্তমান....

পারিজাত প্রায় সাড়ে চার বছর পর নারায়ণগঞ্জ পা রাখল। হাসান মামারা বাড়ি বদলিয়েছে। তবে পারির নিখোঁজ হবার পরেও সম্রাট নিয়মিত উনাদের খোঁজ খবর নিত। তাই অসুবিধা হয়নি। সম্রাট একটা কবরস্থানের সামনে গাড়ি থামাল। তা দেখে পারি ভীত চোখে ওর দিকে তাকাতেই সম্রাট বলল,

_ পারি, জান শান্ত হয়ে শুনো, মামনি আর নেই। তিনি তিন বছর আগেই.... আমি তোমাকে এতদিন বলতে চেয়েও সাহস পাইনি।

পারি ফুঁপিয়ে উঠল। মুখে ওড়না চেপে নিঃশব্দে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে থাকল। সম্রাট ওর কাঁধ চেপে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ভেজা গলায় বলল,

_ আল্লাহর কাছে দোয়া করো। দীর্ঘ যন্ত্রণার অবসান ঘটেছে ইহকাল ত্যাগে। আল্লাহ যেন উনার মাগফিরাত কবুল করেন।

এরপর সবাই মিলে কবরস্থানের ভেতরে ঢুকে। সম্রাট ছেলেকে পাশে দাঁড় করিয়ে দু হাতে মোনাজাত ধরানোর মতো করে ধরে দিয়ে বলল,

_ আল্লাহর কাছে দোয়া করো বাবা

সমৃদ্ধ ও সুখ এই প্রথম কবরস্থানের মতো জায়গা দেখল। তারা ভীষণ কৌতুহলী। সমৃদ্ধ নিজের কৌতুহল দমিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

_ এইতা কি বাবা?

সামনের কবরের দিকে আঙুল তাক করে দেখাল। সম্রাট ছেলেকে বোঝানোর মতো করে বলল,

_ এটা কবর বাবা।

_ কবল কী?

_ কবর হচ্ছে, ঘর।

_ ঘল?

_ হ্যাঁ বাবা, এখন আর কথা বল না। এখন নানুর জন্য দোয়া করো।

_ নানু কে?

_ নানু হচ্ছে তোমার আম্মুর আম্মু!

_ আম্মুল আম্মু আছে?

_ হ্যাঁ থাকে তো, সবার‌ই আম্মু থাকে।

_ তোমাল‌ও আছে?

_ হুম আছে!

_ কুতায়?

_ বাসায়!

_ তাহলে আম্মুল আম্মু একানে কেন থাকে?

ছেলের প্রশ্নের পর প্রশ্ন, তবে এই প্রশ্নে থমকাল সম্রাট। জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকা শিশুটির মুখটা ভীষণ নিষ্পাপ। শিশু কাল‌টাই বোধ
জীবনের একমাত্র নিষ্পাপ কাটে। এরপর তো কুটিলতায় আর জটিলতায় মানুষ আপন সত্ত্বা খুইয়ে বসে।
সম্রাট ছেলের পাশে বসে অবুঝ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। নরম সুরে বলল,

_ কারণ এটাই তার বাড়ি।

_ আমলা একানে ঘুমাব?

সম্রাটের কলিজা ধক্ করে উঠল এই প্রশ্নে। ও ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে পিঠে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,

_ হ্যাঁ বাবা, একদিন সবাইকেই এখানে এসে ঘুমাতে হয়।

পারি মেয়েকে নিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়েছে। ছেলের কথায় ওর চোখ ভরে উঠেছে। অর্ধ পাকা কবরটার দিকে অপলক তাকিয়ে র‌ইল। মায়ের পর এই মানুষটিই ওকে মায়ের স্নেহে রেখেছিল। পারির কী কপাল। মাথার উপর থাকা প্রতিটি শাসন, স্নেহের হাত সরে গিয়েছে। পারিকে এই পৃথিবীতে সত্যিকারের এতিম বানিয়ে চলে গিয়েছে সবাই। পারির নিরব কান্নায় তার মেয়েও ফুঁপিয়ে উঠল। ঠোঁট ফুলিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে।

সম্রাট ছেলেকে পাশে দাঁড় করিয়ে নিজেই দোয়া পাঠ করে জিয়ারত করল। অতঃপর দায়িত্বরত একজন গোড় খোদককে ডেকে কবর পরিষ্কার করিয়ে বেরিয়ে এলো। হাসান সাহেব তখনি এসে উপস্থিত হলেন কবরস্থানের সামনে। সম্রাট আসার আগেই খবর দিয়ে এসেছিল। পারিকে দেখে তিনি ফুঁপিয়ে উঠলেন, পারিকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে হাসান সাহেব হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। তার বোন শেষ মুহূর্তেও পারিকে একনজর দেখতে না পারার কারণে কান্না করেছেন।

পারির নিখোঁজ হবার খবর শুনতেই তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন সম্রাটের‌ও কোন খোঁজ ছিল না। উনাদের আর্থিক অবস্থা‌ও করুণ। উনারা চেয়েও পারেনি উন্নত চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে। সব মিলিয়ে মামনির শারীরিক অবস্থা আরো নাজুক হয়ে পড়ে। অতঃপর তিন বছর আগে হার্ট অ্যাটাক করে ঘুমের মধ্যেই পাড়ি জমান অচেনা দেশে।

পারি হাসান সাহেবের বুকে মাথা ঠেকিয়ে হাউমাউ করে অনেক সময় কাঁদল। সেদিন উনাদের বাসায় থেকে সন্ধ্যাতেই ফিরে এলো ধানমন্ডি।
আসার সময় বিশেষ করে দাওয়াত দিয়ে এসেছে পারির গৃহ প্রবেশের দিনের জন্য।

_______________________________________

লাল টুকটুকে জামদানি পরিহিত পারিকে নববধূর মতোই লাগছে। গা ভর্তি পাতলা ডিজাইনের সোনার অলংকার জড়ানো, সঙ্গে মাথায় রয়েছে মাতাল করা সুবাস ছড়ানো বেলির গাজরা। বিয়ের সময় পারিকে বধূ সাজাতে পারেনি বলে সম্রাটের আক্ষেপের শেষ নেই। একটা মেয়ের আজীবনের স্বপ্ন নিজের বিয়েতে ব‌উ সাজবে কিন্তু সম্রাটের হঠকারী সিদ্ধান্তের পাল্লায় পড়ে পারির সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে যায়। অবশ্য এতে পারির কোন আফসোস নেই। বরং সে বিশ্বাস করে এটা তার কপালে ছিল না। আর যদি সেদিন সম্রাটের পাগলামিতে সায় না দিত তবে কি আজ এভাবে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে পারতো? সেদিন ঐভাবে বিয়ে করেছিল বলেই তো আজ তারা একসঙ্গে। নয়তো বিচ্ছেদ কি নিশ্চিত ছিল না? এই বৈবাহিক সম্পর্কের টান‌ই তো তাদের একে অপরের সঙ্গে বেঁধে রাখল এই অবধি। সম্রাট মুগ্ধ চোখে দেখছে পারিকে। তার চোখে যেন আসমান থেকে নেমে আসা হুর মনে হচ্ছে। এত রূপসী নারী আদৌও এই জগতে থাকতে পারে? তাও তার জন্য‌ই নির্ধারিত করা হয়েছে। সম্রাট মাদকীয় চাহনিতে, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে লজ্জা মাখা রক্তিম আভায় সজ্জিত নববধূর রূপে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার দুই সন্তানের জননীকে। ঐ ঠোঁটে লেপ্টে থাকা টকটকা লাল লিপস্টিক, যা তাকে আর‌ও মাতাল করে দিচ্ছে। সে পরিবেশ, পরিস্থিতি ভুলে অপলক দৃষ্টিতে ঘোর লাগা চাহনিতে তাকিয়েই র‌ইল। কিন্তু তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। বাপ্পীর বাজখাঁই কণ্ঠে বলা কথায় সচেতন ভঙ্গিতে নিজেকে শুধরে নিল, বাপ্পী দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

_ ভাই, রাতে দেখিস! এখন তো ওদের ঘরে ঢুকতে দে!

উপস্থিত এত গুলো মানুষের সামনে বন্ধুর টিটকারীতে লজ্জা পেল। লজ্জায় কান চুলকে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল ঠোঁট কামড়ে। এদিকে পারি লজ্জায় জমে যাচ্ছে, সে ঠোঁটের কোণে লজ্জামাখা হাসি এঁটে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে‌ই র‌ইল। আজ ওদের নিজেদের সংসারের আনুষ্ঠানিক সূচনা হল।
এতদিনের বৈবাহিক জীবনের কোন আনুষ্ঠানিক পরিচয় ছিল না। বিয়ের পর থেকে‌ই দু'জন দুদিকে, একত্রে থাকার জন্য কত যুদ্ধ করতে হল। এক ছাদের নিচে টোনাটুনির একটি সংসার হবে! আহ্লাদ, আদরের ছোঁয়া দেয়ালে দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখবে। নিজেদের কিছু একান্ত মুহূর্তের মিষ্টি মিহি স্মৃতি গেঁথে দিবে ঘরের প্রতিটি কোণায়। তাদের প্রাণভরে বাঁচার সাক্ষী থাকবে ইট সিমেন্টের চার দেওয়ালের কক্ষটা। কিন্তু তার কিছুই হয়নি। হয়নি পারির একটা সংসার, হয়নি পারির স্মৃতি মাখা কিছু আদুরে মুহূর্ত। পারির যা হয়েছে তা তার জীবনকে ভেঙেচুড়ে রেখেছিল। তবে এবার থেকে হয়তো হবে। আল্লাহ চাইলে পারির আঁচলে এবার সুখেরা লুটিয়ে পড়বে। পারি খুব করে চাইছে, এবার যেন আল্লাহ ওকে নিরাশ না করে। ওর শিশু সন্তানদের জন্য হলেও যেন ওকে একটু সুখের আবেশ উপভোগ করার সুযোগ দেয়।

_ পারি, ভেতরে পা রাখো।

তন্নী ও পারি দরজার বাইরে। ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে বাপ্পীর মা বাহার বেগম, হাসান সাহেবের স্ত্রী আসমা বেগম। তাদের পাশেই সম্রাট দাঁড়িয়ে আছে। তন্নী পারিকে পার্লার থেকে নতুন ব‌উয়ের মতো করে সাজিয়ে এনেছে। এটা সম্রাটের জন্য সারপ্রাইজ ছিল ওর বন্ধুদের ব‌উদের তরফ থেকে।
ওদের নতুন ফ্ল্যাট ভর্তি মানুষজন, দু'জনের বন্ধুমহল। অল্পকিছু আত্নীয়স্বজন।
বাচ্চাদের হ‌ইচ‌ই, সব কিছু মিলিয়ে দেখে মনে হচ্ছে বিয়ের আয়োজন‌ই হচ্ছে। হ্যাঁ আজকে পারি সম্রাটের আরেকবার আনুষ্ঠানিক বিয়ে হবে। আগেরবার কোনরকম আয়োজন ছাড়াই মজার ছলে বিয়েটা করে ফেলেছিল তবে আজ অনেক আপন মানুষ, মুরব্বিদের উপস্থিতিতে বিয়েটা সম্পন্ন হবে।

বাহার বেগম পারিকে দ‌ই, মিষ্টি খাইয়ে ভেতরে প্রবেশ করালেন। নাঈমুল সম্রাটকে বলল,

_ আরে ভাই, এবার গিয়ে নিজে তৈরি হ। কাজী সাহেব বসে থাকবে এসে!

বন্ধুদের ধাক্কাধাক্কিতে অবশেষে সম্রাট সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে বসার ঘরে এসে বসল। যেখানে ফুলেল দেওয়ালের দু'পাশে তাদের দুজনের জন্য কুশি কাঁটার আসন পাতা। সম্রাটকে দেখেই তার মেয়ে ছুটে আসে,

_ বাবা আমি তোমাল ছাথে থাকব।

_ হ্যাঁ, তুমি বাবার সাথেই তো থাকবে আম্মা।

বলেই সম্রাট সুখকে কোলে তুলে নিল। মেয়েকে কোলে নিয়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখল ছেলে সোফায় ঝুঁলে পিছনে কিছু করছে। সে পেছন থেকে পেঁচিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। অতঃপর তার জায়গায় গিয়ে বসল। বন্ধুদের হাসি মজায় গমগম করছে ঘরের প্রতিটি কোণা। পারির মনটা একটু খারাপ। যত‌ই হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুক, পারছে না। জীবনের এই মুহূর্তগুলোতে প্রতিটি মেয়েই তার পরিবারকে মনে করে। পারির ভাগ্যের খেল বরাবরই ওকে নিষ্ঠুরতম আঘাত করে। এবার‌ও ওর সাথে তাই ঘটল।
ভেবেছিল মামনিকে একেবারের জন্য নিজের কাছে নিয়ে আসবে, কিন্তু মামনি পারিকে সেই সুযোগ দেয়নি। পারির কষ্ট কমাতেই মামনি পারিকে একা করে চলে গেছে। এদিকে ফারিশ, তুবার আসার কথা ছিল। কিন্তু গত পরশু তুবার মিসক্যারিজ হয়েছে, তাই ও চাইলেও আসতে পারছে না। তুবার শারীরিক অবস্থা খুবই নাজুক। এই নাজুক অবস্থায় জার্ণি করা নিষেধ। আর তুবাকে ঐ অচেনা শহরে একা রেখে ফারিশের পক্ষেও আসা সম্ভব নয়। তাই ফারিশ বোনের কাছে মাফ চেয়ে নিয়েছে। হাসান মামা ও তার পরিবারের কয়েকজন রয়েছে কিন্তু তাতে কী? রক্তের সম্পর্কিত কেউ তো নাই। পারির মন খারাপ হয়ে দেখে সম্রাট বলল,

_ ভাইয়াকে কলে রাখব জান, ডোন্ট বি স্যাড। প্লিজ!

সম্রাটের অনুরোধে মৃদূ হাসল। মাথা উপরনিচ করে বোঝালো সে ঠিক আছে। কাজী সাহেব আসলেন। তিনি এসে সমস্ত নিয়ম কানুন শেষ করে যখন পাত্রীর সম্মতি নিতে যাবে ঠিক তখনি পারির ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে উঠল। সবার দৃষ্টি পড়ল সেদিকে। পারিও জিজ্ঞাসু চোখে দরজার পানে চেয়ে রইল। দরজা খুলল তাহসিন।

_ আসসালামু আলাইকুম।

সোহানি, রূহানি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাহসিন ওদের দেখে মিষ্টি হেসে বলল,

_ ওয়ালাইকুমুস সালাম। ফাইনালি এলে। আসো।

সোহানি, রূহানি দরজা ঠেলে তাহসিনের পাশ কেটে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে সবাইকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিল। বোনদের কণ্ঠস্বর শুনে সম্রাট উঠে দাঁড়াল। পরিশেষে নিজের পরিবারের কাউকে পেয়ে তার মনটা আনন্দে ভরে গেল। পারিও খুশি হয়েছে। একেবারে নিজের কেউ তো উপস্থিত হল। সোহানি, রূহানি সম্রাটকে জড়িয়ে ধরে সাদা পাজামা পাঞ্জাবীতে দেখে বলল,

_ ইউ অলয়েস লুকস হ্যান্ডসাম ভাইয়া, এজ ইউজুয়াল। মাশাআল্লাহ।

_ তোরা কীভাবে?

_ তুমিই বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র ভাই, যে নিজের বিয়েতে নিজের ছোট বোনদের দাওয়াত করে না।

_ আমি চাই নি আমার জন্য তোরা বাবা মায়ের...

_ তারা কিছু বলবে না। তাছাড়াও তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে সো,.... আমার সোনুমনূ কোথায়?

বলেই রূহানি ভাতিজা, ভাতিজীর কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। ছোট সুখ, সমৃদ্ধ ফ্যালফ্যাল করে দেখছে সব। তাদের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে আজ যা কিছু হচ্ছে সব।
সোহানি পারির কাছে গেল। স্বলজ্জিত পারি নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিজের হাতের তালুতে সম্রাটের ব‌উ লেখা বাক্যটিতে স্থির করে রেখেছে। সোহানি গিয়ে লজ্জা রাঙ্গা পারিকে আলগোছে জড়িয়ে ধরে ওর মুখটা তুলে উচ্ছ্বল চোখে মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলল,

_ মাশাআল্লাহ! আমার ভাইয়ের ঘর নুরানী জ্যোতিতে ভরে উঠেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তোমাকে বেহেস্তি রূপ দান করেছে, ভাবী। আল্লাহ তোমাদের জুটি আমৃত্যু এভাবেই রাখুক। অনেক সুখি হ‌ও, সুখি করো আমার ভাইকে।

আশেপাশের সবাই সমস্বরে বলে উঠল, ‘ আমীন!'

ঠিক তখনই আবারও কলিং বেলের শব্দ এলো। ফারিহা বলল,

_ এখন আবার কে এলো?

বলতে বলতে দরজা খুলতেই চমকাল। দু হাত মুখে চেপে মৃদু চেঁচানোর সুরে বলে উঠল,

_ ভাইয়া!

ফারিশ নিজের ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে ফারিহাকে চুপ হতে বলল। কিন্তু ততক্ষণে অনেকেই এদিকে কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে এসে ফারিশকে দেখে, সবার প্রতিক্রিয়াই চমকিত। অসুস্থ তুবা একটি লাল তাতের শাড়ি পরেছে। যা ওর ম্লান বদনকে ঢেকে দিয়েছে। অসুস্থ মেয়েটার মুখ জুড়ে অন্যরকম ঔজ্জ্বল্যতা ছড়াচ্ছে। ফারিশ ভেতরে ঢুকে সালাম দিতেই পারি ফুঁপিয়ে উঠল। পরিশেষে তার‌ও আপন কেউ এই সময়ে তার পাশে থাকছে! ও উঠে দাঁড়াল, ক্রন্দনরত পারিকে দেখে ফারিশ মৃদু মুচকি হাসল। অতঃপর ওর মাথায় হাত রেখে স্নেহিত স্বরে বলল

_ কাঁদছিস কেন পাগলি? এসেছি তো ভাইয়া। আছে তোর‌ও কেউ আছে, এত আপসেট হতে নেই।

_ কিন্তু তুমি ভাইয়া, ভাবী অসুস্থ এই অবস্থায় এতদূর!

_ কিচ্ছু হয়নি আমার। একটা মাত্র আদুরে ননদিনী আমার, তার বিয়েতে একটু আনন্দ করতে না পারলে দুঃখে সত্যিই অসুস্থ হয়ে যাব।

_ ভাবী!

বলেই পারি তুবার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল। তুবা ওর গালে আদর করে দিয়ে বলল,

_ দুই বাচ্চার মা হয়ে গেছে পারি। এখনও এত্ত বাচ্চামো করলে হবে? কাজী সাহেব বসে আছেন, যাও গিয়ে আসনে বসো। বিয়া দিয়া দায়িত্ব শেষ করি।

তুবার কথায় পারি হেসে দিল। অতঃপর ফারিশ নিজেই হাত ধরে আসনে নিয়ে বসাল পারিকে। ফুল দিয়ে সুন্দর করে একটা নকল পাতলা দেওয়া বানানো হয়েছে। যার এক পাশে সম্রাট আরেক পাশে পারি। দু পক্ষের লোকেরাও সেভাবে বসেছে তবে সম্রাটের দু সন্তান সম্রাটের কোলে রয়েছে। কারণ তার ছেলে মেয়ে তার পক্ষের। অতঃপর এবার ময়-মুরুব্বি সবাইকে সাক্ষী রেখে আবার‌ও সম্রাটর পারির বিবাহ সম্পন্ন হলো। সবাই পারির পর সম্রাটের কবুল পর্ব শেষ হতেই সবাই যখন আলহামদুলিল্লাহ পড়ল তখন পারির চোখে ভেসে উঠল সেই দিনের স্মৃতি যেদিন তারা প্রথমবারের মতো একে অপরকে কবুল করে নিয়েছিল কাজী সাহেবের সামনে বদ্ধ গোডাউনের মধ্যে।

৪৬




৪৭

#সুখ_ফড়িং_সিজন_২
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৪৭

[ নকলবাজি থেকে সতর্ক করা হল। ভালো লাগলে শেয়ার করবেন প্লিজ!]

বাগেরহাটের এক্স এমপি, জব্বার মন্ডল হার্ট অ্যাটাক করে হসপিটালের জরুরি বিভাগে ভর্তি রয়েছেন। এই প্রাক্তন এমপি গত মাস তিনেক আগে গ্রেফতার হ‌ওয়ার পর থেকেই যেন তার কপালে শনির দশা নেমে এসেছে। প্রায় চার বছর পূর্বে একজন গর্ভবতী নারী অপহরণ ও হত্যা চেষ্টার দায়ে তিন মাস আগে একবার গ্রেপ্তার হন, এছাড়াও তার বিরুদ্ধে আনিত অন্যান্য অভিযোগ গুলো হল, তিনি উক্ত নারীর স্বামী চাকরিচ্যুত অডিট অফিসার সম্রাট মাহমুদ তালুকদারকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ লোপাট মামলায় ফাঁসিয়ে দীর্ঘদিন পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছেন এবং বলপূর্বক নিজ মেয়েকে বিয়ে করার জন্য মানসিক ও শারীরিক ভাবে নির্যাতন করেছেন।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করার পর থেকেই বেরিয়ে আসছে তার একের পর এক অপরাধে কল্পকাহিনী। রাজনীতি পাড়ায় অত্যন্ত ভদ্রলোক বলে সমীচিত জব্বার মন্ডলের ব্যক্তিগত জীবনের আক্রোশে নিঃস্ব হ‌ওয়া বহু পরিবার‌ও এখন মুখ খুলছে।

সাম্প্রতিক ঘটমান অন্যতম কিডন্যাপিংয়ের ইতিহাস‌ও জুড়ে রয়েছে তার সাথে। জব্বার মন্ডলের বড় মেয়ে যে কি-না সম্রাট মাহমুদ তালুকদারকে বিয়ের জন্য ফোর্স করেছে এবং বাবার ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্রাট মাহমুদ তালুকদারের গর্ভবতী স্ত্রীকে নারী পাচারকারী সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিয়েছিল ও হত্যার আদেশ করেছিল। বলাবাহুল্য, এই নারীটি কোন সাইকো থ্রিলার সিনেমার লিড ফিমেইল ক্যারেক্টারকেও হার মানিয়েছে।
মাস দেড়েক আগে সম্রাট মাহমুদ তালুকদার ও পারিজাত আবরার চৌধুরীর একমাত্র ছেলে কিডন্যাপিংয়ের পিছনেও তার‌ই হাত রয়েছে। সিআইডি ও বাংলাদেশ র্যাবের যৌথ উদ্যোগে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়‌। অপরদিকে গ্রেফতার করার পর থেকেই প্রাক্তন এমপি মহোদয়ের সাইকো মেয়েটি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে আপাতত মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে রয়েছে। মেয়ের হাল দেখে আর নিজের চাপা পাপের ফোয়ারা বেরিয়ে আসায় জব্বার মন্ডল‌ও স্থির থাকতে পারেন নি। হার্ট অ্যাটাক করে পড়ে রয়েছেন জরুরি বিভাগের বেডে।

টিভির পর্দায় ব্যঙ্গাত্মক ভাবে উপস্থিত রিপোর্ট দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তুবা , ওর পাশেই বসে থাকা রূহানি পারিজাতের দিকে ফিরে বসে পারিজাতের ডান গাল টেনে দিল। পারি রূহানির আকস্মিক কান্ডে চোখ বড় বড় করে ফেলল। বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে রূহানি আরেক গাল টেনে দিতেই সোহানী বলে উঠল,

_ ভাইয়া দেখলে দিবে নে। কার গাল টানতেছ?

রূহানি পারিকে দু'হাতে চেপে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদি সুরে বলল,

_ আমার একমাত্র সুইট এন্ড কিউট ভাবীর।

সোহানি রূহানির মাথায় চাপড় মেরে বলল,

_ এভাবে চাপলে ভর্তা হয়ে যাবে, দেন ভাই...

_ পারিজাত

এদিকের গল্পের মাঝেই সম্রাটের হাঁক, সবার সজাগ দৃষ্টি পড়ল সেদিকে। পারি রূহানির বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে হাসি মুখে বলল,

_ আসছি।

সময়টা দুপুর, লাঞ্চ শেষে সবাই বসার ঘরেই আড্ডা দিচ্ছিল। তুবাকে নিয়ে ফারিশ চলে যেতে চেয়েছিল কিন্তু পারিজাত যেতে না দেওয়ায় বাধ্য হয়ে থেকে গেল। সোহানী, রূহানি আজ থেকে কাল চলে যাবে। হাসান মামা ও তার স্ত্রী কয়েকদিন বেড়াবেন, সম্রাটের অনুরোধে। ঘরভর্তি মানুষ থাকায় পারির সংসার গমগম করছে, যা পারিকে ভীষণ আনন্দিত করছে। এই কারণেই সম্রাট কাউকে যেতে দিচ্ছে না।
ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল সম্রাট পোশাক বদলাচ্ছে। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে কদম ফেলতে ফেলতে জিজ্ঞেস করল,

_ কোথাও যাবে?

_ হুম। একজন ক্লাইন্টের সাথে হঠাৎ করেই মিটিং সেট হয়েছে। তোমার কিছু লাগবে রাতের জন্য?

_ উহুম।

সম্রাট গলায় টাইয়ের নট টাইট করছে, পারি এগিয়ে গিয়ে সেই টাই ধরে সুন্দর করে টাইট করে সেন্টের বোতল এগিয়ে দিল। অতঃপর সম্রাট রেডি হয়ে মোবাইল, গাড়ির চাবি হাতে নিতেই তার ঘরে এসে হাজির হল তার মেয়ে সুখ এবং তার বোনের মেয়ে সায়রা। অভিযোগ কাকে সম্রাট বেশি আদর করে।

_ বাবা!

_ হ্যাঁ আম্মা!

_ মামু?

_ হুম, আম্মা বলেন।

ব্যস্! সুখের গতি থেমে গেল। সে দেখছে তার বাবা আর বোনের মাখো মাখো ভাবটুকু।
সায়েরা মামার শার্টের কোণা খামচে মামার দিকে চেয়ে রয়েছে , কিন্তু কিছু বলছে না। সম্রাট ভাগ্নির নিষ্পাপ চাহনি দেখে মিষ্টি করে মুচকি হেসে হাঁটু গেড়ে বসে ভাগ্নিকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

_ কি হয়েছে আমার আম্মার? এত শুকনো কেন মুখটা?

সায়েরাকে ' আম্মা ' বলছে! অতি আদুরিনী সুখ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে সেই দৃশ্য দেখছে, সেই মধুর ডাক শুনছে।

_ তুমি কোথায় যাও মামু? আমি যাব!

ভাগ্নির আবদারে সম্রাট ফিক করে হেসে দিল, পারিজাত মৃদু হেসে মামা ভাগ্নিকে দেখছে। ঐদিকে তার মেয়ে যে ঠোঁট ফুলিয়ে তাদের দিকে চেয়ে রয়েছে সে বিষয়ে একেবারেই অজ্ঞাত রয়েছে।

_ মামু কাজে যাচ্ছি, আম্মা। তুমি ঘরে বসে ভাই, বনুর সাথে খেল। আমি আসার সময় তোমার জন্য চকোলেট নিয়ে আসব।

_ প্রাণ মিল্ক!

_ ওকে, প্রাণ মিল্ক।

ভাগ্নির সাথে কথা শেষ করে সামনে ঠোঁট উল্টে ভরা চোখে তাকিয়ে থাকা মেয়েকে দেখেই তার গলা শুকিয়ে গেল। মনে মনে বলল,

_ এই রে সেরেছে, এখন কীভাবে সামলাব?

_ কি হয়েছে মায়ের?

সম্রাট মেয়েকে টেনে বুকে মিশিয়ে নিল। বাবার সান্নিধ্য পেতেই সুখ গলে গেল। দু হাতে বাবার গলা জড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,

_ আমি আম্মা না!

মেয়ের কথা বুঝতে সেকেন্ড তিরিশ লাগল, অতঃপর সে ফিক করে হেসে দিল। মেয়ের কানে ফিসফিস করে বলল,

_ আর কাউকে আম্মা ডাকব না?

_ না!

_ শুধু আপনাকেই আম্মা বলব?

_ হু!

মেয়ের ফুলো গালে ঠোঁট ছুঁয়ে মাথায় আলতো করে ছুঁয়ে বলল,

_ কিন্তু এইটা তো আপনার বোন, আর বোনকে হিংসা করতে হয় না তো, আম্মা। ইউ আর মাই গুড গার্ল, তাই না!

_ হু।

সুখ মাথা উপরনিচ করল ঠিক‌ই কিন্তু মুখে তার একরোখা মনোভাব। সম্রাট মেয়ের মনোভাব ঠাওড় করে আবারও একটু আদর দিল, কোলে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ভাগ্নিকেও আরেক বাহুতে চেপে তুলল, দুজনকে মুখোমুখি তুলে স্নেহাশিস স্বরে বলল,

_ দু'জনকে বলছি, একদম হিংসাহিংসি করা যাবে না। দু'জন দু'জনকে আগলে রাখতে হবে! ওকে?

দু'জন‌ই মাথা উপরনিচ করে মুখে বলল, 'হু!'
পারি সম্রাটের ফাইলের ব্যাগটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে পাশেই। সম্রাট দু'জনকে কোলে নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে আসল।
এদিকে বসার ঘরে সবাই তখন নিজেদের মধ্যে আলাপে মশগুল। সম্রাটকে অফিসিয়াল লুকে দেখে কৌতূহল জাগল। ফারিশ জিজ্ঞেস করল,

_ কী ব্যাপার তুমি এই সময়ে...

_ ইটস ইমার্জেন্সি, ভাইয়া। জরুরি মিটিং পড়ে গিয়েছে।

_ ডিনার ঘরে করবে না?

_ হ্যাঁ হ্যাঁ, ডিনার আপনাদের সাথেই করব। জাস্ট মিটিং এটেন্ড করেই চলে আসব।

_ ওহ, আচ্ছা। ফি আমানিল্লাহ্, সাবধানে যাও।

_ ভাইয়া, জব্বার মন্ডলের ব্যক্তিগত সহকারীর গোপন সাম্রাজ্যের খবর পাওয়া গিয়েছে।

_ তাই নাকি? থ্যাংকস মাহবুব!

সোহানির স্বামী মাহবুব এই কেইস নিয়ে ভীষণ আগ্রহী।। যদিও কেইস অন্য ল'ইয়ারের তত্ত্বাবধায়নে কিন্তু সে ব্যক্তি উদ্যোগেই বিষয়টি নিয়ে বেশি ঘাটছে। যা সম্রাটকে সাহায্য করার পাশাপাশি হতাশ‌ও করছে। পারিকে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার দোষ তার বাবা মায়ের উপর পুরোপুরি না চাপলেও তাদের দোষ হচ্ছে তারা পারির লোকেশন বলেছিল। তাদের সঙ্গে তানহার সম্পর্কে ভালো থাকায় তার তানহার কথায় তাল মিলিয়েছে।
কিডন্যাপিংয়ের এই ছক সেদিন হঠাৎ করেই আঁকা হয়। পারিকে যখন তা শ্বশুর শাশুরি অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল তখন তানহা সেই বাড়িতেই উপস্থিত ছিল।

ফ্ল্যাশব্যাক.....

সম্রাটের তালাশে ঘর ছাড়া গর্ভবতী পারি যখন শ্বশুরবাড়ির থেকে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে আসে, তানহা তখন সম্রাটের ঘরে ব‌উয়ের অধিকারে স্বগর্বে ঘাপটি মেরে ছিল। তানহার আবদারেই যে সম্রাটকে
ফাঁসানো হয়েছিল সেই খবর সম্পর্কে তখন‌ও অবধি মাহবুব তালুকদার বেমালুম। তানহা খুব ভালো করেই তাদের ব্রেইন‌ওয়াশ করিয়ে বুঝিয়েছিল পারিজাত নামের এতিম মেয়েটিই সম্রাটের জীবনের অলক্ষ্মী, যার অস্তিত্ব সম্রাটের জীবনে কোনভাবেই শুভকর নয়। অন্য দিকে শুরু থেকেই পারির প্রতি থাকা বিরূপ মন্তব্য আর সামাজিক আত্নমর্যাদার অহমিকায় মাহবুব তালুকদার বেঁকে ছিলেন। তার মধ্যে অভিভাবকদের অনুপস্থিতিতে সম্রাট, পারির বিয়ের বিষয়টি তাদেরকে আরো ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। স্বভাবতই বাঙালি অন্য পাঁচটা বাবা মায়ের মতোই নিজ পুত্রের সাত খুন মাফ করে তারাও সব দায় চাপায় অসহায়, এতিম পারির উপর। তার‌ও যথার্থ কারণ তাদের কাছে ছিল।

নিঃস্ব অসহায় পারিজাতের গতিবিধি সম্পর্কে তানহা‌ই তার বাবা জব্বার মন্ডলের কাছে পৌঁছে দেয়, এবং নিজের চরিত্রের পুরোপুরি ব্যবহার করে বাবার কাছে নিজের উদ্দেশ্য জানাতে ফোন করে।

ছেলের খোঁজে দিশেহারা মাহবুব তালুকদার নিজের কক্ষে অস্থির চিত্তে পায়চারি করছে, পাশেই ক্রন্দনরত অবস্থায় বসে রয়েছে মিসেস তালুকদার। স্ত্রীর ফ্যাচফ্যাচে বিরক্ত হয়ে মাহবুব তালুকদার মৃদু ধমকে বলেছিলেন,

_ আহ্, মাথা খেও না। এখন মাথা খেয়ে আমার মেজাজ গরম না করবে না।

_ আমি তোমার মাথা খাচ্ছি? আমার ছেলের খোঁজ দিতে না পারলে সত্যিই মাথা চিবিয়ে খেয়ে ফেলব!

_ আহ্, বেশি বকো না। ছেলের যেই কেইসে ফেসেছে তা কি! আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, এই কাজ এমপি সাহেব ছাড়া...

_ তোমার কি মনে হয় এমপি সাহেব কোনভাবে ফাঁসিয়েছেন?

_ অস্বাভাবিক কিছু না। তার মেয়ে তোমার ছেলের দ্বারা অপমানিত হচ্ছেন, তিনি কি ছেড়ে দিবেন? নিজের তাগিদে চাকরি পাইয়ে দিয়েছে আবার নিজের তাগিদেই... উফ্। ছেলেটা যদি একটু বুঝত আমাদের কথাগুলো! কোথাকার কোন, কাঙ্গাল নিয়ে! ভুগুক কিছুদিন। অতিরিক্ত আহ্লাদে আর আস্কারায় এত বাড় বেড়ে গিয়েছিল, একটু কমুক। বোঝা দরকার, এই পৃথিবীতে ভালোভাবে বাঁচতে হলে পয়সা আর জশ-খ্যাতির কোন বিকল্প নেই। এখানে মানবদরদি হয়ে কেউ ভালো ভাবে বেঁচে থাকে না। অতি মানবিক হলে তাকে কতটা সাফার করতে হয় তা বোঝা দরকার, একান্তই দরকার।

_ কিন্তু যদি মারে? আমার ছেলে একটা মশার কামড় সহ্য করতে পারে না। এসি ছাড়া থাকতে পারে না। তুমি এত নিষ্ঠুর হয়ো না তালুকদার, আল্লাহর দোহাই লাগে। এমপি সাহেবের কাছে গিয়ে একটু কথা বল। এক কাজ করি, আমি তানহার সাথে...

_ আম্মু!

তানহার নাম উচ্চারণ করতে করতেই তানহার গলার স্বর শুনে পিছনে ফিরে তাকালেন মিসেস তালুকদার। দরজার কপাট ধরে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকা তানহাকে দেখে দু'জনেই থেমে গেলেন। অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটার মোমের মতো চকচকে চেহারার দিকে তাকালেই যেন মনে হয় সদ্য ঘুম থেকে সজাগ হ‌ওয়া কোন শিশু, যার ভেতরে কোন পাপ নেই। সাবিনা তালুকদার ছেলের জন্য কিছু সময় আগে করা হায়হুতাশ ভুলে ডুবে গেলেন তানহার অসহায়ত্বের উপর। তার মনে প্রবল ভাবে বেজে উঠল তার ছেলে তানহার সাথে অন্যায় করছে। তাও কার জন্য? একটা বাজে, অলক্ষ্মী, ঘর ছাড়া মেয়ের জন্য। যার দ্বিকূলে কেউ নেই, যার কোন সামাজিক মর্যাদা নেই, যার আগপিছ পুরোটাই ফাঁকা। যেখানে না আছে আত্নমর্যাদার বালাই আর না আছে পারিবারিক অস্তিত্ব। এমন একটা মেয়ের জন্য তার ছেলে কীভাবে তানহার মতো নিরীহ, নিষ্পাপ একটি মেয়েকে এত্ত কষ্ট দিতে পারে!

তানহা দরজা ঠেলে এগিয়ে এলো, সাবিনা তালুকদার এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভেজা চোখে তাকিয়ে নত মস্তকে নীচু কণ্ঠে বলল,

_ বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, আমাকে একটু দেখতে চাইছেন, আমি যাই?

জব্বার মন্ডলের অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর শুনে আরো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন মাহবুব তালুকদার ও সাবিনা তালুকদার। দু'জনেই চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

_ কী বল? কি হয়েছেন?

তানহা সামনে উপস্থিত দু'জন মধ্য বয়সী মানুষের দিকে তাকিয়ে অবলীলায় একটা চরম মিথ্যা বলে দিল।

_ প্রেসার বেড়েছে, মেইবি! সম্রাটের বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনেক চাপ আসছে বাবার উপর। সবার ধারণা, তার জামাতা তাই এসবে তার‌ও হাত রয়েছেন! আপনারা তো জানেন, বাবা আজীবন কত সলিড মানুষ ছিলেন। কোনদিন কোন দুর্নীতির সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিল না। অথচ আজ...

তানহার বলার ধরণ আর অসহায় বদনের চাহনিতে সাবিনা তালুকদার ও মাহবুব তালুকদার জমিনে মিশে যাওয়ার মতো লজ্জা অনুভব করলেন। কিছু সময় আগেই দু'জন জব্বার মন্ডলকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা বুনল, এইতো মিনিট দুয়েক আগেই তাদের মন হল এসবে জব্বার মন্ডলের হাত রয়েছে কিন্তু তানহার কথায় সব উল্টে গেল। জব্বার মন্ডলের মতো মানুষের হাত থাকতেই পারে না। আর এই সময়ে জব্বার মন্ডলের মুখোমুখি হতেও তাদের লজ্জা লাগছে। সুতরাং... তানহাকে অনুমতি দিলেন
তানহা ও অনুমতি পেয়ে মনে মনে এক ভয়ংকর পরিকল্পনা এঁটে বেরিয়ে গেল তালুকদার বাড়ির আঙ্গিনা পেরিয়ে।

পারি বাসস্ট্যান্ডে বসেছিল, ওর হাতে না ছিল মোবাইল আর না ছিল টাকা‌। আসার সময় যা অল্প টাকা ছিল তা দিয়ে এসেছিল, ভেবেছিল এই অবস্থায় অন্তত শ্বশুর শ্বাশুরি মানুষ দু'টো ওকে তাড়িয়ে দিবে না। কিন্তু পারির ভাবনা ভুল প্রমাণ হয়। তার উপর তখন রাত ঘনিয়ে আসে‌। ভীষণ আত্ন সম্মানে ভোগা পারির পক্ষে কারো কাছ হাত পেতে সাহায্য নেওয়াও কঠিন ছিল। তার মধ্যে তার তখন হিতাহিত জ্ঞান প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। যার পুরো সুযোগ তানহা কাজে লাগায়। তানহার উপস্থিতিতেই সেদিন পারিকে তুলে নিয়ে যায় জব্বার মন্ডলের লোকেরা। পারির নিখোঁজ হ‌ওয়ার খবর তালুকদার বাড়িতে পৌঁছালেও তাদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ জাগেনি এই বিষয়ে যে তানহার হস্তক্ষেপ থাকতে পারে! তারা বরং পারির চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করতে আরম্ভ করে। তাদের মন হয়েছিল সম্রাটের বিপদ দেখেই পারি দূরে সরে গিয়েছে। এবং এতে করে তারা পারিকে আরো ঘৃণা করতে আরম্ভ করে যার পুরো ফায়দা লুটে তানহা।


৪৮

#সুখ_ফড়িং_সিজন_২
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৪৮

পারি নিখোঁজ, বিষয়টি তালুকদার বাড়িতে পৌঁছায় বাপ্পীর মাধ্যমে। সেদিন পেরিয়ে রাত ফুরিয়ে পরের সকাল হয়ে যায়, কিন্তু পারি ফিরে না। একদিকে বন্ধু অদৃশ্য শত্রুর থাবায় কাবু অপরদিকে বন্ধুর রেখে যাওয়া আমানত নিখোঁজ। বাপ্পীর অবস্থা তখন পাগল পাগল। তন্নী‌ও ভেঙে পড়েছিল গর্ভবতী পারির চিন্তায়। দিশেহারা হয়েই বাপ্পী সম্রাটের বাড়ি যায়, গিয়ে জানতে পারে পারি গিয়েছিল কিন্তু শ্বশুর ভিটেয় তার জায়গা হয়নি‌। সেদিন চরম হতাশ হয়ে বাপ্পী আবার ঢাকা ফিরে আসে। ও ক্ষুণাক্ষরেও ভাবেনি এহেন কিছু ঘটতে পারে।
হৃদয়ের ইউকে ভিসা কনফার্ম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পারির নিখোঁজ খবর কানে পৌঁছাতেই সে সব ভুলে চিটাগং থেকে ছুটে আসে ঢাকা। কিন্তু পরিস্থিতি তখন সব দিক থেকেই তাদের বিমুখে ছিল। কারো পক্ষেই কোন কিছু করে ওঠা সম্ভব হয়নি।

সম্রাট রেহাই পায় ঠিক আড়াই মাসের একটু পরে। আইনিভাবে প্রমাণিত হয় সে নির্দোষ। তবে কে বা কারা তাকে এত বড় মিথ্যা মামলায় ফাঁসাল, অতগুলো টাকাই বা কোথায় গেল তা কোনদিন প্রকাশ হয়নি। সম্রাটকে রেহাই দিয়ে চাকরিতে পূর্নবহাল করার আদেশ স্বয়ং আদালত থেকে দেওয়া হয়। কিন্তু ততদিনে চাকরির প্রয়োজনীয়তা সম্রাটের ফুরিয়েছে।
সম্রাট যেদিন রেহাই পায় সেদিন ওকে আনতে মাহমুদ তালুকদার, বাপ্পী, তাহসিন ও তানহা যায়। ফারিশ যেতে চেয়েছিল কিন্তু তার বোনকে অপমান করে যে বাড়ির লোকেরা বের করে দিয়েছে, যাদের কারণে তার বোনের কোন খোঁজ নেই, তাদের মুখোমুখি হতে সে নারাজ। বলাবাহুল্য ফারিশ ব্যক্তি উদ্যোগে তখন‌ও পারির খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু পারির ছায়ার‌ও খোঁজ কেউ পাচ্ছিল না। এদিকে সম্রাট কারাগার থেকে বের হয় ভগ্ন দেহ নিয়ে, কিন্তু মনে তার প্রবল শক্তি, কারণ সে ভেবেছিল বের হয়েই সে তার পারি আর বাচ্চাকে দেখতে পারবে। কিন্তু তার মন ভেঙ্গে যায় যখন বের হয়ে তানহাকে দেখে তার স্ত্রী রূপে তাকে নিতে যাওয়ায়।
কেরানীগঞ্জ কারাগারের প্রধান গেইটের বাইরে এসে যখন দাড়াল তখন তানহা ছুটে গিয়ে ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সম্রাটের নিথর দেহ শীতল হয়ে যায় তানহার বুক ভাঙ্গা কান্না দেখে। ওদিকে তার দৃষ্টি ঘুরপাক খাচ্ছে আশেপাশে। কিন্তু কোথাও পারি নেই। তার বুকে কামড় দেয় এই ভেবে যে তার পারিজাত ঠিক আছে?

_ ছাড়, আহ্ তানহা কি হচ্ছে!

বলেই সম্রাট তানহাকে বুক থেকে টেনে সরায়। ততক্ষণে মাহমুদ তালুকদার ছেলের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। বাইরের খবর সম্পর্কে বেমালুম সম্রাট নিজের বাবাকে দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। বাবার বুকের উপর গা ছেড়ে দেই অঝর ধারায় কান্না শুরু করে। মাহমুদ তালুকদার নিজের চাঁদের মতো উজ্জ্বল দেহী সন্তানের বিবর্ণ মুখ আর ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে। বাবা ছেলের আর্তনাদে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল মুহূর্তে‌ই।
তাহসিন এগিয়ে গিয়ে সম্রাটের কাঁধের উপর হাত রেখে বলল,

_ শান্ত হ, দোস্ত।

বাপ্পী পাশ থেকে মাহমুদ তালুকদারের পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,

_ আংকেল, থামুন। ওকে বাসায় নিয়ে চলুন। ওর বিশ্রাম দরকার।

মিনিট পাঁচেক পর সম্রাট ও তার বাবা শান্ত হয়। তবে পরমুহূর্তেই সম্রাটের অস্থিরতা আবার‌ও বেড়ে যায়। যখন মাহমুদ তালুকদার বললেন,

_ চল, তোমার আম্মা অপেক্ষা করছে। আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এত দূরের পথ, অসুস্থ হয়ে পড়বেন তাই আনিনি তাছাড়াও ব‌উমা‌ই আছে সাথে তাই...

_ ব‌উমা!

সম্রাট মনে মনে শব্দটা উচ্চারণ করেই চোখ বুলাল তার চারপাশে। কিন্তু ক‌ই? পারিকে তো দেখা যাচ্ছে না। কি আশ্চর্য, এখানে সবার আগে তো পারিই থাকার কথা। ও বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

_ পারি কোথায়?

মাহমুদ তালুকদার প্রথমে ছেলের প্রশ্ন বুঝেননি। ভ্রু কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলে কয়েক সেকেন্ড ভাবতেই বোধহয় হয়, পারিজাত নামের মেয়েটির খোঁজ করছে তার ছেলে!
কারাগারে এমনিতেই অনেক অত্যাচারের মাঝে ছিল, এর মধ্যে আবার যদি ঐ মেয়ের হারিয়ে যাওয়ার কোন খবর পায় তবে নিজের ক্ষতি করে ফেলবে ভেবে সম্রাটকে কেউ কিছু জানায়নি। কিন্তু এখন?

মাহমুদ তালুকদার মাথা নুইয়ে নিলেন। বাবার নত চাহনি সম্রাটকে ভীত করে তুলল। ও কয়েক কদম পিছিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,

_ কি ব্যাপার? সবাই নিরবতা পালন করছ কেন? আমার পারি কোথায়? হুয়ার ইজ মাই পারিজাত।

সম্রাটের ঠোঁট কাঁপছে ‌। চিন্তা, অস্থিরতায় বুকে কাঁপন উঠেছে‌। বাপ্পী মাহমুদ তালুকদারের দিকে আড়চোখে এক পলক তাকিয়ে সম্রাটের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

_ আছে, তুই আগে বাসায় চল। তারপর সব বলছি, আগে শান্ত হ‌।

_ হোয়াট দ্য ফাক শান্ত হ, আই সেইড হোয়ার ইজ মাই পারিজাত? ওয়ান সেকেন্ড, ও এখানে কেন আসেনি? ওর তো সবার আগে আসার কথা। আচ্ছা ও কি বেশি অসুস্থ? ডাক্তার চলাফেরা করতে নিষেধ করেছে নিশ্চয়ই? হ্যাঁ করার‌ই কথা, নয় মাস তো প্রায় ঘনিয়েই আসছে! আচ্ছা তোর বাসায় নাকি আমাদের বাসায়, বাবা?

তাহসিন ছলছল চোখে সম্রাটের পাগলাম দেখছে। নিজেই প্রশ্ন করছে, নিজেই উত্তর খুঁজে নিচ্ছে। বলার সুযোগই দিচ্ছে না কাউকে। এই ছেলেকে যদি বলা হয় পারি আজ আড়াই মাসের মতো নিখোঁজ, পারি খোঁজ তাদের কাছে নেই তখন? কীভাবে সহ্য করবে? মাহমুদ তালুকদার‌ও বিস্মিত চোখে ছেলেকে দেখছে। এত ছটফটানি! মেয়েটার জন্য তার ছেলেটা কি পাগল হয়ে যাচ্ছে?

বাপ্পী হঠাৎ করেই সম্রাটকে বুকে জড়িয়ে নিল। বন্ধুর বুকে পড়তেই সম্রাট ক্ষান্ত হল কিন্তু ওর ভেতরে চলা প্রশ্নের ঝড়, হারিয়ে ফেলার ভয় ওর শরীরের স্থিরতা নিশ্চিত করতে পারল না। ছটফট করছেই সে অবিরত। বাপ্পী ওকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে অপরাধী দাবী করে ক্ষমা চাওয়ার ন্যায় বলল,

_ আ'ম স্যরি, দোস্ত। মাফ করিস না কোনদিন তুই, আমাকে‌। আমি তো আমানতের খেয়াল রাখতে পারিনি। আমি জানি না পারি কোথায়, কেমন আছে? আমি...

_ মানে?

সম্রাটের নির্জীব প্রশ্ন! তানহা দাঁত কিড়মিড় করছে। ওর উপস্থিতি, এত মানুষের মাঝেও ঐ একজনের জন্য এত উতলা হ‌ওয়া। সবকিছু ওর মাথা বিগড়ে দিচ্ছে। ও কারো পরোয়া করল না‌। মৃদু চেঁচিয়ে বলে দিল,

_ ভেগেছে! বিপদ দেখে অন্য কারো হাত ধরে ভেগে গেছে, বুঝেছ? তোমার বিপদে তানহা ছাড়া তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায় কেউ থাকেনি। বুঝেছ?

তানহার কথায় বাপ্পীর কপালে ভাঁজ পড়ল। সবাই ওর দিকে তাকাল। সম্রাট চোয়াল শক্ত করে রক্ত চোখে তাকাতেই তানহা অত্র স্থান থেকে সরে গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলল,

_ আমি গাড়িতে গিয়ে বসি।

বাপ্পী তানহার গমনপথে বিস্মিত চোখে চেয়ে র‌ইল। তাহসিন সম্রাটের কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বলল,

_ আগে বাসায় চল। গেলেই সব বুঝবি।

_ কি বুঝব? কি বোঝা দরকার?

এই কথার উত্তর নেই। সম্রাট বাপ্পীর দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে রয়েছে ‌। বাপ্পী‌ও অপরাধীর মতো অসহায় চোখে তাকিয়ে থেকে পারির হারিয়ে যাওয়ার গল্প বলল। অতঃপর ......

_________________________________________



বাড়িতে পা দিয়েই সম্রাট সবার আগে তার মায়ের মুখোমুখি হয়। তাকে দেখেই তার মায়ের আহাজারিতে তালুকদার বাড়ির উঠান লোক সমাগমে ভরে যায়। স্বয়ং জব্বার মন্ডল এসে হাজির হন। সঙ্গে সঙ্গে একে একে সম্রাটদের পরিচিত সকল জন, আত্নীয়স্বজন, শুভাকাঙ্খী, পরিজন এসে হাজির হতে থাকে।
কিন্তু এসব কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই সম্রাট তার মায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,

_ পারি এসেছিল আম্মু?

তানহা তখন এই বাড়ির একমাত্র পুত্রবধূ পরিচয়ে অতিথি সেবা করছে। সাবিনা তালুকদার ছেলের বিক্ষিপ্ত মুখে সরাসরি তাকানো সাহস না করে গায়ে হাত বুলিয়ে স্নেহিত স্বরে বলেন,

_ ওসব কথা পরে বলো। এখন গিয়ে ফ্রেশ হ‌ও, কিছু খেয়ে একটু বিশ্রাম নাও। পরে...

_ পারি এসেছিল কি-না?

_ ছেলের একরোখা প্রশ্ন। সাবিনা তালুকদার পারির প্রতি থাকা সমস্ত রাগ, ঘৃণা, ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বললেন,

_ এসেছিল, কিন্তু সুবিধে করতে পারেনি।আমি তো তোমার মতো আবেগি ন‌ই তাই লাথি মেরে উঠান থেকেই তাড়িয়েছি। ও

বাপ্পীর মুখে শোনার পরে অবিশ্বাস্য ঠেকেছিল সবটা। কিন্তু এখন তো স্বয়ং নিজের মায়েয মুখেই শুনে নিল। সম্রাটের মাথা সত্যিই এবার চুড়ান্ত রূপ বিগড়ে গেল। ও রাগে ক্ষোভে বসার ঘরে দেওয়াল ঘেঁষে থাকা সুবিশাল নান্দনিক কাঁচের এ্যাকুরিয়ামটা ফেলে দিল। মুহূর্তেই তরতাজা গৃহপালিত শৌখিন মাছগুলো চারদিকে লাফাতে লাফাতেই ছড়িয়ে পড়ল। পানিতে ভেসে গেল পুরো বসার ঘরের ফ্লোর। লিভিং এড়িয়ায় কথোপকথনে মশগুল উপস্থিত সব মানুষের মাঝে ছড়িয়ে গেল কৌতুহল আর বিস্ময়ের রঙ। সবাই তখন মা ছেলের দিকে বিস্ফোরক চাহনিতে চেয়ে রইল। সাবিনা তালুকদার ছেলের অগ্নি রূপ দেখে ভরকে গেলেন। তার মনে হলো নিশ্চিত তার ছেলে সত্যিই সত্যিই পাগল হয়ে গেছে। তানহা কোথায় থেকে যেন ছুটে এলো, সম্রাটের বাহু খামচে ধরে বিড়বিড় করে বলল,

_ এখন সিনক্রিয়েট কর না প্লিজ, আমরা পরে শান্ত হয়ে কথা বলব। দেখ, সব আত্নীয় স্বজন উপস্থিত। আমার আব্বুর...

সম্রাট নিজের বাহুতে তানহার হাত দেখে আরো ক্ষেপে গেল। এখানে পারি হাত রাখে। পারি কোথাও যাওয়ার সময় এভাবেই এই হাত, এখানে ধরে তারপর হাঁটে। যেই জায়গায় অন্য নারীর ছোঁয়া? পারি নিশ্চয়ই ভুল বুঝবে! পারিকে একটা সুযোগ‌ও সম্রাট দিবে না ওকে ছেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে। চোয়াল শক্ত করে ডান হাতের মুঠো চেপে ধরে ঝট করে তানহার হাতটা সরিয়ে দিল, তানহা গিয়ে ছিটকে পড়ল ফ্লোরের ভাঙ্গা কাঁচের গুঁড়োর উপর। সঙ্গে সঙ্গে ওর হাতের তালু দিয়ে গড়িয়ে পড়ল টকটকে লাল রক্তের স্রোত। সম্রাটের সঙ্গে সঙ্গে বলতে থাকল,

_ ইউ সাট আপ। হাও ডেয়ার টু ডু টাচ মি, কন্টিনিয়াসলি! বারবার বলেছি না আমার থেকে দূরে থাকতে! আ'ম ম্যারিড।এন্ড আই হ্যাভ এ্যা পারফেক্ট ওয়াইফ অলসো পারফেক্ট ফ্যামিলি। দেন হোয়াই... কেন তুমি বারবার গায়ে পড়ে যেচে! লিসেন, তুমি এই মহিলার ছেলের ব‌উ হতে পার। আমার কেউ ন‌ও‌। আমার সঙ্গে আজকের পর এই বাড়ির কারো সাথে কোন সম্পর্ক নেই। গো টু হেল, ইউ অল, টুগেদার।

_ ইউ ব্লাডি বাস্টার্ড, সাহস কি করে হয় আমার মেয়ের গায়ে হাত তোলার?

জব্বার মন্ডল তেড়ে এলেন সম্রাটের দিকে। মাহমুদ তালুকদার বাইরে ছিলেন লিভিং রুমের দরজায় এসে দাড়াতেই এসব দেখে থমকে গেলেন। বাপ্পী সম্রাটকে টেনে সরাতেই ওর পিঠের উপর পড়ল জব্বার মন্ডলের চড়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এগিয়ে এলো সম্রাটের চাচাতো ভাই, বড় চাচার ছেলে। সম্রাটের বাবার চাচাতো ভাই। তার ছেলে মাহিন জব্বার মন্ডলকে জড়িয়ে ধরে খানিকটা দূরে সরিয়ে নিতে নিতে অনুরোধ করে বললেন,

_ আংকেল মাথা ঠান্ডা করুন, ওরা স্বামী স্ত্রী। ওদের আগে... একটুখানি ঠান্ডা হোন। দেখছি আমরা।

ঐদিকে আশেপাশের সবার মাঝে গুণগুণ শুরু হয়ে গেল সম্রাটের কথাগুলো। সম্রাট বিবাহিত সবাই জানে। তবে একটু অন্যভাবে। সবার জানা মতে তানহার সাথে সম্রাটের বিয়ে আগে হয়েছে অতঃপর সম্রাট অন্য কোন নারীর প্রতি মোহিত হয়ে সেখানেও বিয়ে করেছে। অর্থাৎ সেটা পরোকিয়া থেকে বিয়ে। নিশ্চিত সেখানে দ্বিতীয়জন ভিলেন, যে অন্য নারীর সংসার ভেঙ্গেছে, তার স্বামী কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু এখন ঘটনার আবহ ভিন্ন কিছু বোঝাচ্ছে। ক্ষতবিক্ষত তানহাকে মন থেকে পছন্দ না হলেও বাধ্য হয়ে রূহানী তার সেবা করতে শুরু করল। তানহাকে টেনে তুলে নিজের ঘরে বসিয়ে ড্রেসিং ও ব্যান্ডেজ করে দিল। এদিকে ঘরোয়া শালিস বসল সম্রাটের নামে। সম্রাট শালিসে মুখোশ খুলল তানহার। তার আর পারির বিয়ের সময় এবং তানহাকে সে পারির সঙ্গে সম্পর্কের কথাও বলল। এরপরেও তার পরিবার এবং তানহার পরিবার মিলে তাকে তানহাকে বিয়ে করতে বাধ্য করেছে, সেটাও পরিস্কার করে দিল। কিন্তু তাতে কী? যেখানে মা বাবা‌ই প্রতিপক্ষ সেখানে সন্তানের কথায় কি যায় আসে?
শালিসে হারিয়ে যাওয়া পারির জন্য আফসোস বৈ কিছুই র‌‌ইল না। যেহেতু পারি এখন নেই সেহেতু করার‌ই বা কী আছে? তাছাড়াও, পারি কী আসলেই সম্রাটের জীবনসঙ্গী হ‌ওয়ার যোগ্য? রূপ ছাড়া কি আছে আর ঐ মেয়ের? তাই যে চলে গেছে তার জন্য অশান্তি না করে বরং তানহাকে মেনে নিয়ে বাবা মায়ের সঙ্গে মনোমালিন্য দূর করে সুন্দর করে সংসার করার উপদেশ দিয়ে সবাই চলে গেল।

তানহা এতে শাপের পাঁচ পা পেয়ে গেল। সম্রাট ভেতর থেকে মরতে শুরু করল। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে ভাবতে থাকল কোথায় থেকে শুরু করবে তার পারির খোঁজ। শরীর‌ও তখন চলে না। দীর্ঘদিনের পাশবিক নির্যাতনের ফলে শারীরিক সক্ষমতা‌ও ভঙ্গুর প্রায়। নিজেকে শান্ত করে আগে নিজের সুস্থ হ‌ওয়ার কথা ভাবল। এদিকে ওর ঘরে তানহার অনুপ্রবেশ। বিরক্ত হয়ে নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। গেস্ট রুমে নিজের ঠাঁই বানিয়ে সেখানেই থাকতে শুরু করল। নিজের বাড়িতে নিজের ছেলের এহেন হাল দেখে সাবিনা তালুকদার ও মাহমুদ তালুকদার ধীরে ধীরে ভেতরে ভেতরে মুর্ষে পড়তে থাকে। হঠাৎ করেই সম্রাটের মাথায় খেলে গেল চমৎকার একটি বুদ্ধি।
ও চট করে উঠে বসে ভাবতে থাকল সুচারু কিছু পরিকল্পনা। অতঃপর.....
বাবার ঘরে গিয়ে তার ল্যাপটপটা নিয়ে এসে গেস্ট রুমে বসে তাদের বাড়ির উঠানের দুই মাথায়, প্রধান গেইটের উপর লাগান সিসি ক্যামেরার বিগত কয়েক মাস আগের ফুটেজ দেখতে শুরু করল। পারির বাপ্পীদের ঘর ছাড়ার সেই দিনের ফুটেজের একটা মিনিট‌ও বাদ দিল না। ফুটেজে পারির সাথে করা তার বাবা মায়ের আচরণ তাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলল। পারির করুণ চাহনি, ওরকম ভরা পেট নিয়ে বারবার পায়ে পড়া, তাদের লাথি দেওয়া, টেনে হিচড়ে বের করার দৃশ্য! সব সব! সব দেখে সম্রাটের নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। মায়ের মুখের কথায় সে ভেবেছিল কতটুকু আর নিষ্ঠুর হবেন! কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে তার বাবা মা পারিকে মানুষ‌ই মনে করেনি। তাদের কাছে পারি পথের পাশে জন্ম নেওয়া আগাছার চেয়েও নিকৃষ্ট ছিল। সম্রাট হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। পুরুষালী কান্নায় তালুকদার বাড়ির দেওয়াল প্রকম্পিত হতে থাকল। সাবিনা তালুকদার, তানহা সব ছুটে এলেন। সাবিনা তালুকদার ছেলের মুখটা তুলে ধরে ক্রন্দনরত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

_ কি হয়েছে আব্বা? এভাবে কেন..

মায়ের প্রশ্ন শেষ করার সময় দিল না সম্রাট। তার মুখ থেকে মায়ের হাত সরিয়ে চেঁচিয়ে বলতে থাকল,

_ ও, আমার বিয়ে করা বৈধ ব‌উ ছিল আম্মু! ও গর্ভবতী! ও পাঁচ মাসের সন্তানসম্ভবা ছিল! আম্মু, ও আমার স্ত্রী, তোমার একমাত্র ছেলের ভালোবাসা। ও, তোমার একমাত্র ছেলের ঔরসের ধারণ করা অস্তিত্বের জননী। ও তোমার বংশের উত্তরসূরী বয়ে বেড়াচ্ছিল। ও, ও, ও আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন, কীভাবে পারলে তুমি ওকে এভাবে! এই পৃথিবীতে ওর জন্য আমি ছাড়া আর কেউ নেই, আম্মু! ওর জীবনের একমাত্র আশ্রয়, আমি! ওর একমাত্র ঠিকানা আমার এই বুকটা! ও, ও, ও এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় একজন মানুষ আম্মু! ওকে,... কীভাবে পারলে? তোমার একবার ওর ঐ মায়াবী, অসুস্থ মুখটা দেখে মায়া হয়নি? একবার আমার মুখটা ভাসেনি তোমার চোখে? আম্মু, ডাক্তার ওকে ফুল রেস্ট দিয়েছে! ওর বিশ্রামে থাকা একান্ত আবশ্যক নয়তো বাচ্চাটা .... আমার বাচ্চাটা বাঁচবে না আম্মু! ডাক্তার বারবার বলেছে ওকে দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখতে নয়তো মিসক্যারিজ হবার চান্স আছে? তারপরও..
আম্মু, মায়েরা তো মমতাময়ী হয়। তবে তুমি কেন ন‌ও? ও এতিম, এই পৃথিবীতে ওর যাওয়ার কোন জায়গা নেই, কোন আপনজন নেই। তুমি তো জানতে সব! ও তোমার কাছে এসেছিল সন্তানের দাবি নিয়ে, তোমার সন্তানের খোঁজে। ও একটু আশ্রয়, একটু ছায়া পেতে এসেছিল আম্মু। তবে কীভাবে তুমি? কীভাবে ওকে ওরকম অবস্থায় ঘর থেকে বের করে দিলে? আম্মু?

ল্যাপটপে স্থির থাকা পারির ভেজা বদনখানার চিত্র থেকে সাবিনা তালুকদারের বুকে কামড় দিল। ছেলের মুখে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই সম্রাট বলে উঠল,

_ আমি আমার সন্তানের মুখ দেখতে না পারলে, আজকের প তুমিও তোমার সন্তানকে দেখতে পাবে না।

কথাট বলেই সম্রাট ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পথিমধ্যে দাঁতে দাঁত পিষে তানহাকে শাসাতে ভুলল না। তানহা দেওয়ালে শিটে থেকে ওর রক্ত চক্ষু দেখল। সম্রাটের পিছু পিছু সাবিনা তালুকদার‌ও বের হয়ে যান কিন্তু দরজার সামনেই যেতেই উনার কানে ভেসে এলো,

_ ওকে এমন জায়গায় পাঠিয়েছি, এ জীবনে তুমি আর ঐ বিচের ছায়াও পাবে না। তুমি আমার ন‌ও, তো কারো না।

সাবিনা তালুকদারের শিড়দাড়া বেয়ে ঘাম ছুটে গেল। তিনি কিছুদিন ধরেই তানহাকে সন্দেহ করছিলেন কিন্তু সত্যিই এমন কিছু ঘটতে পারে, তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তানহা দরজা দিয়ে উঁকি দিতেই সাবিনা তালুকদারকে দেখে ঠোক গিলল। অতঃপর হাসার মিথ্যা প্রচেষ্টা করে বলল,

_ আম্মু!

_ আমার ছেলে কোন ক্ষতি করবে না। তুমি যা চাও, চাই পেয়ে যাবে কিন্তু আমার ছেলের যেন...

বলেই তিনি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।


৪৯

বর্তমান..

পড়ন্ত বিকালের নরম আভায় ছাদ বারান্দায় মাদুর পেতে বসেছে পারিজাত, রূহানী, সোহানী, তুবা, তন্নি ও হাসান মামার স্ত্রী আসমা মামী‌।
চাল, মুগডাল, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচা মরিচ একসাথে সব মিলিয়ে, ভেঁজে তা থাল ভর্তি করে সঙ্গে নিয়ে বসেছে। সবাই কুটকুট করে চিবাচ্ছে আর গল্প করছে‌। অবশ্য গল্পের কোন আগামাথা নেই। যখন যা মনে আসে তাই বলছে। যা হয় সচরাচর বাংলার ঘরে ঘরে। কয়েকজন নারী একত্রে বসা মানেই গল্পের পসরা মেলে বসা। গল্পের মাঝে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে পারির ফোনখানা বেজে উঠল। পারি, পাশেই রাখা মুঠোফোনটা তুলে দেখল সম্রাটের কল।

_ আসসালামু আলাইকুম!

_ .......

_ কে পাঠিয়েছে?

_ .......

_ হৃদয়!

_ .....

_ ওকে!

পারি ফোন রেখে ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট চোখা করে বিরক্তি জাহির করে তাকিয়ে রইল, তা দেখে কৌতূহলী রূহানী প্রশ্ন করে,

_ কি হয়েছে ভাবী?

_ কি হয়নি তাই বল! তোমার পাগল ভাই...

_ খবরদার আমার ভাইকে পাগল বলবে না।

রূহানীর প্রতিবাদী আওয়াজ। পারি ছোট ননদের ক্ষেপা রূপে ভরকে গেল। সোহানী চোখ ছোট ছোট করে পারিজাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

_ আমার ভাই যদি পাগল‌ও হয়ে থাকে না, সেটাও হয়েছে তোমার কারণে। তার আগে আমার ভাই ভালোই ছিল।

_ না, ভাই তোমাদের ভাই পাগল নয়। আমি পাগল। আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে তোমাদের ভাই।

_ কেন? কি করেছে শুনি!

_ এখনো যদি কিছু না করা মনে হয় তবে তৈরি থাক, রাতেই দেখবে তার পাগলামী। আল্লাহ জানে আজ কি নাটক শুরু করে এই লোক।

_ কেন? এভাবে অর্ধেক কথা কেন বলছ, ভাবী?

_ কি হয়েছে পারি?

তুবা, তন্নি একসাথে জিজ্ঞেস করল। সোহানীও প্রশ্ন করে উত্তরের আশায় চেয়ে রয়েছে। পারি, তন্নির দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,

_ হৃদয় ইউকে থেকে কিছু পাঠিয়েছে। এখন তাহলে বুঝো!

_ হৃদয় কে?

রূহানী পারির পিছনে পারির কাঁধে মাথা রেখে বসেছিল। ও পারির দিকে ঝুঁকে প্রশ্ন করে। এই মুহুর্তে ওর মুখটা দেখতে ভীষণ হাস্যকর লাগছে। সোহানীও ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তুবা আরেক দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসছে। তন্নি পারির মাথায় হাত রেখে দোয়া দেওয়ার মতো করে বলল,

_ আজকের রাত তোমার জন্য বড়‌ই কঠিন হবে, আল্লাহ তোমাকে পরিস্থিতি সামলানোর সাহস দিক।

_ আমিন।

বলেই তুবা শব্দ করে হেসে দিল। এদিকে সম্রাটের দুইবোন তখন‌ও জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রয়েছে। তন্নি ওদের কৌতুহল দমাতে সাহায্য করল।

_ হৃদয়, হৃদয় হচ্ছে তোমাদের ভাইয়ার সতিন।

_ সতিন?

দুইবোন একসাথে চেঁচিয়ে উঠল। ননদদের চেচানোয় পারি নিজের দু কান চেপে ধরল। তন্নি হাসতে হাসতে বলল,

_ হ্যাঁ, সতিন। তোমার ভাইয়ার কোন ফ্রেন্ডকে চিনো, হৃদয় নামে?

সোহানী, রূহানী ভাবার চেষ্টা করল। অতঃপর মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলে উঠল,

_ হ্যাঁ, ভাইয়ার সাথে কলেজে পড়ত। আমাদের বাসায় কয়েকবার এসেছিল কিন্তু সে তো অনেক আগের কথা।

_ জি, ম্যাডাম। তিনিই। তিনিই হচ্ছেন তোমার ভাইয়ার বর্তমান সতিন। যদিও এখন আর তেমন কিছু হবার সম্ভাবনা জিরো পার্সেন্ট‌ও নেই। কেননা সেও এখন এক বাচ্চার বাপ, আর তোমার ভাই-ভাবীও দুই বাচ্চারা প্যারেন্ট। সো, যা ছিল অতীতে কিন্তু তাতে আমাদের হিংসুক ভাইয়ের কি? সে হৃদয় ভাইয়ার নাম‌ই শুনতে পারে না।

_ আমি কিছু্ই বুঝলাম না। সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। ভাবী, একটু বুঝিয়ে বল না।

পারি ছোট ননদের কথায় মৃদু হাসল। অতঃপর সবটা বলতে আরম্ভ করল।

গল্পের ছলে ছলেই চলে এলো পারি সম্রাটের বিয়ের কাহিনী। অতি কৌতুহলী রূহানী পারির পিছনে বসে ওর পিঠে মাথা ঠেকিয়ে শুনতে থাকল,

_ তোমার ভাইয়া যেদিন দ্বিতীয়বার প্রপোজ করে সেদিন তাকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। ওভাবে কেউ চাইলে তার জন্য তো মানুষ জীবন‌ও দিয়ে দিতে পারে। সেখানে আমি শুধু তার হবো, এ আর কি!

_ ভাবী, তোমাদের লাভ স্টোরির কোন মোমেন্ট তোমাকে সবচেয়ে বেশি টাচ করে আজ‌‌ও!

_ আমাদের লাভ স্টোরির?

কথাটা বলেই পারি কল্পনায় ডুবে গেল সেই সময়ের। যখন তার আর সম্রাটের বিয়ে হয়।

অতীত...

বাড়ির গেইটে বাইক থামাতেই পারি নেমে পড়ল। পাশে দাঁড়িয়ে উসখুস করছে কিছু বলার জন্য। তা দেখে সম্রাট জিজ্ঞেস করল,

_ আমাকে কিছু বলার জন্য তোমাকে এত্তো ভাবতে হবে না। আমি তোমার, আমাকে তুমি সবসময়, সব কথাই বলতে পার। ইভেন আমি চাই, আজকের পর আমাদের মাঝে কোন লুকোচুরি না থাকুক। আমার, তোমার কোন শব্দ যেন আমাদের মধ্যে তৃতীয়জন হয়ে না দাঁড়ায়। বুঝেছ?

পারি মাথা উপরনিচ করল। তা দেখে সম্রাট বাইকের থেকে হাত সরিয়ে পারির বাম গালে রাখল। তারপর বলল,

_ পারিজাত, ভালোবাসি। শুধু বলার জন্য বলছি, ‘ভালোবাসি' , তা নয়। ভালোবাসি, বলার জন্য ভালোবাসি বলছি না। এই ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র খাদ নেই। আমার রূহ দেহ ত্যাগ করলেও, আমার ভালোবাসা কোনদিন তোমাকে ত্যাগ করবে না, রবকে সাক্ষী রেখে ওয়াদা করছি।

পারি তার গালে রাখা সম্রাটের হাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে সম্রাটের চোখে চোখ রেখে বলল,

_ আমি আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই।

_ হ্যাঁ, বল!

_ কিন্তু!

এতটুকু বলেই পারি আবারও থেমে গেল। ওর চোখে দ্বিধা, ভয়, লজ্জা। সম্রাট সাহস দিয়ে বলতে বলল,

_ পারিজাত, নির্ভয়ে বল। তোমার সব কথা শোনার মতো ধৈর্য্য আর সহন আমার রয়েছে। তুমি প্লিজ আমাদের মধ্যেকার অস্বস্তিটা কাটিয়ে নাও।

পারি অনেক সময় কিছু ভাবল অতঃপর বলল,

_ কাল বলব। কাল, কোথাও গিয়ে বলব।

সম্রাট পারির চোখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যেখানে স্পষ্ট ভয়, লজ্জা। তবে ও আর জোর করল না। যেহেতু এখন বলতে চাইছে না, কাল বলতে চাইছে। সুতরাং তাই হোক। ও পারিকে বলল,

_ ঠিক আছে, কোথায় যাবে বল?

_ আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন, সেখানেই!

_ আর ইউ শিওর?

বলেই সম্রাট চোখ মারে। পারির এই কথার সারমর্ম বুঝতে মিনিট এক লাগে। সম্রাট পারির বোকা মুখ দেখে মিটমিট করে হাসছে।
এদিকে কথাটা বুঝতেই পারি ওড়না দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নিয়ে বলল,

_ আপনি, সবসময়.. বেশি বেশি ! ধ্যাত!

_ কিহ, আমি কি করলাম? তুমিই তো বললে আমি যেখানে নিয়ে যাব সেখানেই যাব। তো আমি তাই জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু তুমি কি ভাবলে? বল!

_ কিছু না, আপনি যান তো। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে।

_ যাব, আগে তুমি যাও!

_ ওকে, আল্লাহ হাফেজ।

_ আল্লাহ হাফেজ!

বলেই পারি পা ঘুরাতেই সম্রাট ওর হাত টেনে ধরল। বাঁধা পড়ায় পারি ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল, সম্রাট ওকে টেনে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে পারির দু গালে নিজের দু'হাত রেখে পারির কপালে গভীর ভাবে চুমু দিল। পারির সারা শরীর শিউরে উঠল এই আকস্মিক ছোঁয়ায়। তিরতির করে কাঁপতে থাকল ওর পাতলা ঠোঁটজোড়া।
সম্রাট পারির চকচকে টানা কপাল থেকে ঠোঁট সরিয়ে মুচকি হাসল অতঃপর পারির মুখটা তুলে ধরে বলল,

_ বেশিদিন দূরে রাখব না। শিগগিরই আমার ঘরে নিয়ে যাব আমার ঘরণী করে। এই দুরত্ব আমার স‌ইবে না গো!

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া পারি মুখে কোন রা তুলল না। সম্রাট পারির এই নিরবতাকে সম্মতি মেনে ওকে ছেড়ে দিয়ে মৃদু হাঁকে খানিকটা দূরে গেটের ভেতরে চৌকির উপর ভোম্বলের মতো ওদের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা দাঁড়োয়ানকে ডাক দিল।
দাড়োয়ান সম্রাটের ডাকে সারা দিয়ে দ্রুত কদমে হেঁটে এসে সালাম দিল। আড়চোখে একবার পারির দিকেও তাকাল। সম্রাট উনার দিকে তাকিয়ে নমনীয় কণ্ঠে বলল,

_ ব‌উ, রেখে যাচ্ছি। শিগগিরই নিয়ে যাব। তবে ততদিন আপনার স্পেশাল দায়িত্ব হচ্ছে আমার ব‌উয়ের খোঁজখবর রাখা। বুঝতে পেরেছেন?

_ জি, মামা!

_ গুড!

বলেই সে পকেট হাতড়ে মানিব্যাগ বের করল। অতঃপর সেখান থেকে কচকচা হাজার টাকার একটি নোট বের করে দাড়োয়ানের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল,

_ রাখুন, আপনার নাস্তার খরচ। আমি আপনার ভরসায় রেখে গেলাম। আশা করি আশাহত হবো না।

_ ইনশাআল্লাহ, হবেন না মামা।

_ হুম, আল্লাহ হাফেজ।

_ সম্রাট আল্লাহ হাফেজ বলতেই ভদ্রলোক‌ও আল্লাহ হাফেজ বলে চলে গেলেন। পারি ছলছল চোখে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সম্রাট ওর ভেজা চাহনি দেখে চমৎকার করে হাসল। প্যান্টের পকেটে দু'হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে একটু নিচু হয়ে পারির চোখে চোখ রেখে বলল,

_ কি! কান্না আসছে? কেন?

সম্রাটের বুকে মাথা রেখে দু'হাতে সম্রাটের পিঠ খামচে ধরে বলতে থাকল,

_ এত্ত ভালো কেন বাসেন আমায়? কি আছে আমার মধ্যে!

_ কিছুই তো দেখাও নি। তবে বুঝব কী করে কি নেই।

পারি কান্নারত অবস্থায়‌ই ফিক করে হেসে দিল। সম্রাট দু হাতে পারিকে শক্ত করে জড়িয়ে নিজের সাথে চেপে ধরে পারির ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

_ জান, আমাকে কখনো ছেড়ে যেও না। আমি সত্যিই মরে যাব।

_ ইস্, এসব বলবেন না, প্লিজ। আপনি ছাড়া আমার আপন কেউ নেই, আপনাকে ছেড়ে কোথায় যাব? আমার কোন জায়গা নেই যেখানে গিয়ে আমি আশ্রয় পাব। আপনি আমার একমাত্র আশ্রয়, যেখানে আমি নির্ভয়ে থাকতে চাই।

_ ওয়াদা করছি, পুরো পৃথিবী ছেড়ে দিব, কিন্তু তোমাকে না, তোকে ছেড়ে আমি বাঁচতে পারব নারে পাগলি। তোকে ছাড়া সম্রাট রূহহীন খোলস হয়ে থাকবে শুধু।

রাত এখন প্রায় দুইটা। চারদিক শূনশান নিরবতায় ছমছম করছে। সম্রাটের বাইকের আওয়াজেই দাড়োয়ানের ঘুম ভেঙ্গেছিল, গেইটের সামনে দুজন মানব ছায়া দেখে উঠে বসেছিলেন। এবং তখন থেকেই সম্রাট পারিকে দেখে যাচ্ছিলেন। সম্রাট এখানে মাঝে মাঝেই আসেন। পারির টুকটাক খোঁজ সম্রাট দাড়োয়ানের থেকেই নেয়। তাই বলা চলে পূর্ব পরিচিত। তবে এত ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দু'জনকে এই প্রথম দেখায় উনার মাঝে কৌতুহল জাগে। যেই কৌতুহল মেটাতেই সম্রাট উনাকে ডেকে এনে পয়সা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দিল, সঙ্গে পারির সঙ্গে তার যে গভীর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে সেটাও আনুষ্ঠানিক ভাবে জানিয়ে গেল।

সম্রাট পারিকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

_ যাও, দৌড় দাও। ঘরে গিয়ে বারান্দায় এসে আমাকে বাই বলো!

পারি ইন্সট্রাকশন শুনে হেসে দিল, অতঃপর সত্যিই সে ছুটে ভেতরে ঢুকল। মিনিট পাঁচ পেরুতেই সম্রাট উপরে তাকায়। ঠিক তখনি পারির ঘরের লাইট জ্বলে উঠল। যা দেখে সম্রাট শান্তির প্রশ্বাস ছাড়ল। পারি বারান্দার এসে হাত নাড়ায়। সম্রাট ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিয়ে বাইকে চড়ে বসল। পারির দিকে তাকিয়ে থেকেই বাইক স্টার্ড দেয়।

____________________________________

_ তখন আমি মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য অপেক্ষমাণ। কোচিং করছি, যেখানে ক্লাস নিতেন ভার্সিটি পড়ুয়া কিছু তরুণ শিক্ষক। তার মধ্যে একজন ছিলেন মেহরুব জামান। উনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের একজন কুখ্যাত যুবলীগ নেতার ভাই। তবে ব্যক্তি মানুষ হিসেবে রাজনৈতিক ছত্রছায়া থেকে উনি দূরে থাকতেন। সে যাই হোক, কোন অজানা কারণেই তিনি আমাকে পছন্দ করতেন। আমার মতো চাল চুলোহীন একটি কিশোরীকে উনি কেন পছন্দ করতেন তা ছিল আমার সবচেয়ে বড় কৌতুহল। উনি আমাকে কোনদিন সরাসরি প্রপোজ করেন নি। তবে উনার কর্মকান্ডে পুরো মহল্লা ছড়িয়ে পড়ল সেই বিষয়টি। অপর দিকে আমার মামা অল্প বয়সেই প্রেম ভালোবাসার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাছাড়াও, বাবা মায়ের লাভ স্টোরির পরিণতি দেখে তিনি এই বিষয়ে আরো সতর্ক হয়ে যান। তিনি চান নি আমি দাদা বাড়ির পরিচয়হীন হয়ে পড়ি। আমার দাদা ভালোবেসে বিয়ে করার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি কোনদিন আমার মাম্মা পাপার সম্পর্ক মেনে নেননি। তাই মামা সবসময় আমাকে বোঝাতেন, যেন এমন কিছু না করি যাতে দাদা কষ্ট পায়। তাছাড়াও আমি তখন ছোট, মামার চোখে আমি বাচ্চা। তিনি সবসময়ই চাইতেন আমি পড়াশোনা করে নিজেকে গড়ে তুলি। নিজের একটা পরিচয় গড়ে তুলি যেন আমাকে কখনো হীনমন্যতায় ভুগতে না হয়।
মামার আদরে বড় হচ্ছিলাম, মামার আদর্শ‌ই আমার আদর্শ। তাই এসব প্রেম ভালোবাসার চ্যাপ্টারের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। আমি এড়িয়ে চলতাম সবসময়। কিন্তু আমি এড়িয়ে চললে কি হবে? অন্যরা তো ইচ্ছে করে গা ঘেঁষে বিপদে ফেলত। তেমনি মেহবুব স্যার একদিন আমার চুড়ান্ত ক্ষতি করার প্রয়াস করলেন।

এতটুকু বলেই পারি থেমে যায়। দৃষ্টি তার নদীর বহমান রূপ আর নদীকে ঘিরে চলা জীবনের ব্যস্ততা। এত সময় সম্রাটের মনোযোগ‌ও অন্যত্র ছিল। সে দেখছে তাদের সামনে বহমান মৃতপ্রায় ইছামতির বৈকালিন চমৎকার রূপ। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্রষ্টার চমৎকার সৃষ্টি, অপ্সরার মতো সুন্দরী নারী তার পারিজাতকে। পারির জীবনের এই অধ্যায় তো তার আগেই জানা। তাই বিশেষ ধ্যান থাকার দরকার নেই। তার মনমস্তিস্ক ছুটোছুটি করেছে এই রমনীকে নিয়ে ভবিষ্যত সাজানোর পরিকল্পনায়।
তবে পারির শেষ কথায় ওর ছুটন্ত মস্তিষ্ক স্থির হল। পারির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। পারি সম্রাটের দিকে দৃষ্টি ফেরাল না। সম্রাটের চোখে চোখ রেখে বলার মতো সাহস করল না। নিজের জীবনের একটি কলঙ্কিত অধ্যায়ের পাতা সে উল্টানোর প্রয়াস করছে কিন্তু সদ্য পাওয়া সুখকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে বারবার পিছিয়ে‌ও যাচ্ছে।

সম্রাট পারির নিরবতাকে সহ্য করতে না পেরে পিছন থেকে পারিকে জড়িয়ে ধরল। পারির কাঁধে নিজের থুতনি ঠেকিয়ে নরম সুরে বলল,

_ তুমি পারিজাত, তোমাকে সম্রাট ভালোবাসে। আর সম্রাটের ভালোবাসা এত ঠুনকো নয় যে, সামান্য ধুলোয় তা ঢাকা পড়বে। সম্রাটের ভালোবাসার প্রখরতা মোমের ক্ষীণ আলোর মতো দূর্বল নয়, যে হালকা হাওয়ায় তা নিভে যাবে। সম্রাটের ভালোবাসা ফুলের মতো কোমল নয়, সকালে ফুটে সন্ধ্যায়ই ঝরে পড়বে! শোন মেয়ে, সম্রাটের ভালোবাসা ঐ সুবিশাল আকাশের মতোই অসীম। যার কোন সীমাবদ্ধতা নেই। সম্রাটের ভালোবাসা মৃতপ্রায় ইছামতির গতি নয়, যে মানবকুলের ইচ্ছায় গতিপথ পরিবর্তন করবে! সম্রাটের ভালোবাসা সমুদ্রের মতোই গভীর ও বিশাল। সেখানে যত নোংরাই ফেলা হোক তা সম্রাটের ভালোবাসার গভীরে ডুবে যাবে। সে অবলিলায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সব আবর্জনা, সে ঠিক নিজের বুকে পুষে রাখবে কেবল তার পারিজাতের জন্য ভালোবাসা।

_ বিশ্বাস করুন, সেদিন আমার কোন দোষ ছিল না। স্যার, আমাকে জোর করে... আর, আমি সত্যিই বলছি, সেদিন আমাদের মধ্যে তেমন কিছু হয়নি। স্যার চেষ্টা করেছিলেন আমাকে, ... কিন্তু তার আগেই আরেকজন স্যার আসায় আমি বেঁচে যাই। কিন্ত, সবাই জানে সত্য ঘটনা তাও মানুষ শুধু শুধু!

_ হিস, কেঁদ না। তুমি পবিত্র, এটা তোমাকে বলে বলে প্রমাণ করতে হবে না। আমি তোমার চোখ দেখে বলতে পারি তোমার মনে কি চলছে। সেখানে কে, কি বলল! তাছাড়াও, যেখানে তোমার স্বেচ্ছায় ইনভলভমেন্ট নেই সেখানে! লিসেন পারিজাত, আমার সত্যিই তোমার ঐ ঠুনকো অতীত নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। আমি জানি এখন তুমি কে, তোমার পরিচয় কি! ব্যস্, এতটুকুই আমার দরকার। এর বেশি কিছু জানার ইচ্ছাও নাই, দরকার‌ও নাই। আমি সেই ষোল বছরের কিশোরীকে ভালোবাসিনি, আমি ভালোবাসছি এই বাইশের যুবতীকে। সুতরাং, অতীত অতীতেই থাকুক। সেটাকে সামনে এনে বর্তমানকে নষ্ট করার কোন মানেই নেই। তাই না! বুঝেছ?

_ হুম!

_ গুড, সামনে দেখ। ভিউটা কি সুন্দর। আচ্ছা, তোমার কানে ফুল নেই তো। দাঁড়াও, দেখছি।

বলেই সম্রাট পায়ের স্যান্ডেল খুলল। অতঃপর প্যান্ট পায়ের দিক থেকে ফোল্ড করে, গোড়ালি ডুবিয়ে কাঁদা পেরিয়ে নদীর কুল থেকে ঢোলকলমির একটি সাদা বেগুনী ফুল তুলে আনল। ওড়নায় ঢাকা পারির কানে সেই ফুল গুঁজে দিয়ে পারির কপালে চুমু দিল। পারি অশ্রু সিক্ত নয়নে মুগ্ধ হয়ে দেখছে সম্রাটের পাগলামিকে। সম্রাট পারির মুগ্ধ চোখে চোখ মিলিয়ে কয়েক পলক তাকিয়ে র‌ইল। এরপর বলল,

_ পারিজাত, চল বিয়ে করি।

_ হ্যাঁ!

সম্রাটের ঘোরে ডুবে থাকা পারি অজান্তেই মুখ ফসকে বলে দিল, ' হ্যাঁ!'

৫০


_ সত্যিই সত্যিই!

_ এ্যাই না না প্লিজ। আমি মুখ ফস্কে বলে ফেলেছি।

_ মুখ ফস্কে লোকে সত্যটাই বলে, জান।

_ এ্যাহ , বলছে। মোটেই আমি...

_ কেন? আমার ব‌উ সাজার শখ জাগে না তোমার? আমার তো খুব জাগে। লাল টুকটুকে বেনারসী পরিহিতা নববধূ রূপে পারিজাতকে দেখার স্বাদ আমার বহু দিনের। কত রাত এই কল্পনা করে ঘুমহীন কাটিয়ে দেই, আমার পাশে আমার পারিজাত আমার ব‌উ সেজে, লম্বা ঘোমটা টেনে বসে আছে। আর আমি! তার ঐ নত লজ্জিত ললাটে গভীর চুম্বনে প্রেমের আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছি তার সারা অঙ্গে।

লজ্জায় পারির গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। উষ্ণ গরম আভায় তুলতুলে গাল দুটো আরো তুলতুলে হয়ে গেল। গোলাপের পাপড়ির মত নরম ওষ্ঠজোড়া তরতর করে কাঁপতে থাকল। সম্রাট পারির গালে হাত রেখে গাল দুটো কচলাচ্ছে আর আহ্লাদি সুরে কথাগুলো বলল,

_ কবে হবা আমার ব‌উ? আমার নাতি, নাতনিদের দাদী?

পারি ওর গালে রাখা সম্রাটের লোমশ হাতের উপর নিজের নরম হাত রেখে বলল,

_ এত স্বপ্ন যে দেখাচ্ছেন, আপনার বাবা মা যদি আমাকে না মেনে নেয়! তখন?

_ আমার পছন্দ‌ই তাদের পছন্দ! আজ অবধি কোনদিন আমার পছন্দ নিয়ে তারা দ্বিমত পোষণ করেননি। সো, তুমি নিশ্চিত থাক। তালুকদার বাড়ির ভবিষ্যতে কর্ত্রী হ‌ওয়ার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত হ‌ও‌।

_ আমার ভয় হচ্ছে!

_ কিসের ভয়?

_ কেন জানি মনে হচ্ছে আমাদের স্বপ্ন গুলো অধরাই রয়ে যাবে।

_ উহুম, পজেটিভ ভাবো। মিছে ভয়ের কোন মানে নেই, জান।

_ মিছে ভয় না। আমি তো ছোট থেকেই হারিয়ে অভ্যস্ত! তাই, পাওয়ার আগে হারানোর ভয় জাগে।

_ এত ভয় পেতে হয় না, পাগলি। ইনশাআল্লাহ, এই জীবনে সম্রাটের ব‌উ একজন‌ই হবে, আর সে তুমি! আমার দেহ থেকে প্রাণ আলাদা হবার আগে তোমাকে আমার থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে যেমন পারবে না তেমনি তোমার জায়গা অন্য কাউকে বসাতেও পারবে না। এতটুকু ভরসা করতে পার, এই কাঙালের উপর। তবে আমার চিন্তা হচ্ছে তোমার ঐ তদন্ত অফিসার বড় ভাইকে নিয়ে।

পারির গাল থেকে হাত নামিয়ে নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে কথাটা বলল সম্রাট। পারি ওর চিন্তাগ্রস্ত মুখপানে একপলক তাকিয়ে ওর বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে প্রশ্ন করল,

_ কেন?

_ প্রেমিকার বড়লোক বাবা থাকার চেয়ে বড় আতংকের নাম প্রেমিকার দায়িত্বশীল ব‌ড় ভাই থাকা।

পারি সম্রাটের কথায় ফিক করে হেসে দিল। সম্রাট ওর হাসিতে গাল ফুলিয়ে বলল,

_ সুমন্ধি সাথে নিয়ে ঘুরে ঐ ব্যাঘাবন্ডটা কে?

_ কার কথা বলছেন?

_ ঐ যে কি যেন নাম, আনাস না ফানাস?

সম্রাটের প্রশ্নের ধরনের পারি ফিক করে হেসে দিল। হাসতে হাসতে বলল,

_ ওহ, আনাস?

পারি এমন ভাবে বলল যেন আনাসের সাথে ওর খুব গাঢ় সম্পর্ক। সম্রাট চোখ পাকিয়ে তাকাল। পারিও সম্রাটের দিকে তাকায়, ওর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি। তা দেখে সম্রাট ডান চোখ চৌখা করে কপালে চ‌ওড়া ভাঁজ ফেলে বলল,

_ ফাজলামোতেও এই ঠোঁটে আমি অন্য কারো নাম টলারেট করব না পারিজাত। একদম এই দুঃসাহস দেখাবে না।

_ আচ্ছা, স্যরি!

সম্রাটের রাগ চড়ছে দেখে পারি সতর্ক হলো। বত্রিশ কপাটি বের করে হেসে দিল সঙ্গে মিষ্টি করে স্যরি বলল। সম্রাট ঠোঁট বেঁকিয়ে ভেংচি কেটে গাল ফুলিয়ে ডান হাত পকেটে গুঁজে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। পারি সম্রাটের মুড ঠিক করতে আগের মতোই সম্রাটের বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বলে চলল অতিতের কালো অধ্যায়ের গল্পগুলো,

_ মেহরুব স্যার যখন আমার কাছাকাছি এসে আমাকে ফিজিক্যালি হ্যারেজ করতে শুরু করলেন ঠিক তখনি বায়োলজির শিক্ষক জাহাঙ্গীর স্যার হাজির হন। তিনি সেদিন ক্লাস করান না। কিন্তু তার আগের দিন পরীক্ষা নিয়েছিলেন এবং সেদিন তিনি গ্রামে যাবেন। ছুটিতে যাওয়ার আগে পরীক্ষার খাতা দেখা শেষ করে কোচিং এর প্রধান শিক্ষকের কাছে জমা দিতে এসেছিলেন। এসেই দেখেন মেহরুব স্যার ও আমি খুব কাছাকাছি। তিনি বিচক্ষণ মানুষ। আমরা কাছাকাছি হলেও মেহরুব স্যারের আগ্রাসী আচরণ আর আমার চোখের অসহায়ত্ব, দুটোই তার বিবেকের কাছে সত্যটা মেলে ধরে। তিনি মেহরুব স্যারের হাত থেকে আমাকে ছাড়িয়ে নেয়, এবং মেহরুব স্যারের সঙ্গে অনেক চেঁচামেচি করেন। ঐ সময়ে মেহরুব স্যার নিজের সম্মান রক্ষা করতে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন। আমি তাকে শিডিউস করেছি বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর স্যারকে বিশ্বাস করাতে পারেননি। ঐ মুহুর্তে আমি এতটাই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে মুখ দিয়ে কথাও বলতে পারছিলাম না। আমার কণ্ঠস্বর অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল,যেন কেউ কণ্ঠনালী চেপে ধরে রেখেছিল।
জাহাঙ্গীর স্যার আমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে আমাকে সেখান থেকে বের করে বাসায় যাওয়ার জন্য রিক্সায় তুলে দেয়। আমার মামাকে ফোন দিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলবেন বলে আমার কাছে ফোন নাম্বার চাইলে আমি দিতে পারি না। কথাই বলতে পারছিলাম না। আমার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছিল। ভয়, লজ্জায় আমি জবুথবু হয়ে যাচ্ছিলাম‌। নাম্বার কীভাবে দিব! এদিকে মেহরুব স্যার নিজের সম্মানের চিন্তায় দ্বিগহারা হয়ে যায়। তিনি জাহাঙ্গীর স্যারের কাছে অনুরোধ করে যেন কাউকে না জানায়। তিনি এমন ভুল আর করবেন না। মেহরুব স্যার অত্র এলাকার ক্ষমতাসীন দলের নেতার ভাই, তার বিরুদ্ধে কিছু বলে কে ই বা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিবে! জাহাঙ্গীর স্যার‌ও নিতে পারলেন না। তিনি মুখ বন্ধ রেখে আমাকে আমার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে নিজে চলে গেলেন গ্রামে। আমি ভয়ে তারপরের দিন কোচিংয়ে গেলাম না। পরপর চারদিন যা যাওয়ায় মামা মামীর চোখে বিঁধে যায়। তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। আমাকে বারবার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। আমি বলতেও পারি না, ভুলতেও পারি না। এর মধ্যে আমাদের এলাকায় কোনভাবে ছড়িয়ে পড়ে আমি কোচিংয়ে কোন স্যারের সঙ্গে নোংরামো করে ধরা খেয়েছি তাই আমাকে কোচিং থেকে বের করে দিয়েছে। কথাটা খুব বাজেভাবে পুরো মহল্লা ছড়িয়ে যায়। প্রতিবেশীদের ভালোবাসায় মামা মামীর কানেও পৌঁছায়। অনেক লোকের মুখে শোনার পরেও মামা মামী বিশ্বাস করতে পারেননি তাদের আদরের একমাত্র মেয়েটা এমন কিছু ঘটাতে পারে। তবে মামী স্তব্ধ হয়ে যান লোকের নিন্দে শুনে। মামা আমাকে নিজের কসম দিয়ে সত্য কথা বের করায়। মামা, মামী আমার কথাই বিশ্বাস করেন। মামা আমাকে সঙ্গে নিয়ে মেহরুব স্যারের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে যান। পুলিশ অভিযোগ ফাইল করে না। বরং মামাকে উপদেশ দেয় আমাকে যেন এখান থেকে সরিয়ে ফেলে। নয়তো বড়সড় ক্ষতির সম্মুখীন হব তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে পুলিশের কাছে যাওয়ার জন্য। কি আশ্চর্য! পুলিশ জনতার নিরাপত্তা দিবে কি উল্টা তারাই ভয় দেখায় সন্ত্রাসীদের। মামা আমার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমাকে কোথায় রাখবে? কেউ তো তেমন আপনজন নেই!
এদিকে মহল্লার মানুষ! তারা আমাকেই অপরাধী বানিয়ে ফেললেন। মানুষের কটু কথায় আমি আরো শিটিয়ে যাচ্ছিলাম। ঘর থেকে বের হ‌ওয়া বন্ধ করে দেই। ঐদিকে আমার পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসছে। মামা, মামী বুঝতে পারছিলেন না কি করবেন!
আমি শারীরিক, মানসিক উভয় ভাবে ভেঙ্গে পড়ি‌। আমার অবস্থা বিবেচনা করে মামা, মামী সিদ্ধান্ত নিলেন আপাতত আমাকে মানসিক ভাবে সুস্থ রাখার জন্য পড়াশোনার কথা বাদ দিয়ে আমাকে অন্যত্র রেখে আসবেন। তাই করলেন। মামা আমাকে নিয়ে আমার দাদা বাড়ি গেলেন। সেখানে তখনও দাদা বেঁচে ছিলেন। দাদি মারা গিয়েছেন বছর খানেক আগে। আমাকে দেখে দাদা রাখতে রাজি হলেও বড় চাচ্চু রাজি হলেন না। তিনি দাদাকে বললেন,

_ আপনি রাখলে দায়িত্ব আপনার, এর কোন দায়দায়িত্ব আমাদের না‌। আপনার ছেলে আর এই আপদের মায়ের জন্য আমার শ্বশুর বাড়িতে আমার কোন মানসম্মান নেই। এরে রাখলে আমাদের সাথে কোন আলাপ করবেন না। এই মেয়ের কোন দায়িত্ব আমাদের পালন করতে বলবেন না।

বড় চাচার কথার পর মামা আমাকে সেখানে রাখার সাহস পেলেন না। কেননা দাদাও তখন শারীরিক ভাবে অক্ষম। তিনি নিজেই বড় চাচ্চুর উপর নির্ভরশীল। তার উপর আমার সহজ সরল মামা আমাকে সেখানে রাখার কারণ হিসেবে যখন ঘটনা খুলে বললেন তখন বড় চাচী‌ও পাড়া প্রতিবেশীদের মতো গল্প বানাতে লাগলেন। তিনি আহাজারি করে বলতে লাগলেন আমি নাকি নারায়ণগঞ্জ নাক কান কেটে এখন বরিশাল গিয়েছি। আমিও আমার মায়ের মতো বড়লোকের ছেলে ফাঁসাতে শুরু করেছি। আমিও আমার মায়ের মতো... বড় চাচী আমার মৃত্যু মা সম্পর্কে কুৎসা রটনোর বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখলেন না। এসব দেখার পর মামা একদিন‌ও আমাকে সেখানে রাখলেন না।
সেখান থেকে আমাকে নিয়ে বরিশাল গেলেন। বরিশাল আমাদের তেমন কোন আত্নীয় ছিল না। নানা নানী অনেক আগেই গত হয়েছেন। যারা ছিলেন তারা সবাই রক্তের হলেও ততটা ঘনিষ্ঠ ছিল না যতটা হলে মামা আমাকে নিশ্চিত মনে সেখানে রেখে আসতে পারেন। কিন্তু বাধ্য হয়ে তাদের চাচাতো ভাইয়ের বাড়িতে রেখে এলেন। আমিও রয়ে গেলাম।
দিন এভাবেই কাটছিল। অনেক গুলো সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আমার দেওয়া হল না। সেখানের কাজিনদের সঙ্গে গল্পগুজব আর তাদের সঙ্গে তাদের সংসারের কাজ করেই দিন কাটাচ্ছিলাম। তার মধ্যে হঠাৎ খবর এলো মামা অসুস্থ। আমার আর সেখানে মন টিকল না। পিতার সমতূল্য মামার অসুস্থতার খবরে আমি কি করে শান্ত থাকব! পারলাম না। গ্রামের মামার সঙ্গে কান্নাকাটি করলাম, তিনিও নিজের চাচাতো ভাইকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। অতঃপর আমাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ এলেন।
মামা স্ট্রোক করেছেন। মুখ বেকে গেছে। কথা বলার ধরন এলোমেলো হয়ে গেল।
মামার শারীরিক অবস্থার মধ্যে কিছু অসাধু কর্মচারী মামার অল্প পুঁজির ব্যবসাখানা লুটেপুটে খেল। মামা একটা কোম্পানিতে চাকরি করত, সেটাও চলে গেল। এত অল্প সময়ে এতকিছু দেখে মামা নিতে পারলেন না। হার্ট অ্যাটাক করে আমাদের ছেড়ে, আমাকে আবারও এতিম বানিয়ে চলে গেলেন।
মামার মৃত্যুতে মামী এতটা আঘাত পেলেন যে কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। স্ট্রোক করে বিছানায় পড়ে গেলেন। কিছু বলতো না, শুধু স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকেন। এদিকে মা বাবার ছায়া যাদের কাছে পেতাম তাদের হারিয়ে আমি অকুলে পরে গেলাম। চারদিক শূনশান নিরবতায় ছেয়ে গেল। কতদিন না খেয়ে ছিলাম! ঘর ভাড়ার জন্য বাড়ি‌ওয়ালার তাগাদা। মামার পাওনাদারদের তাগাদা। এসবের মধ্যে আবার পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলো। কোথায় থেকে যেন আল্লাহর রহমত হয়ে জাহাঙ্গীর স্যার হাজির হলেন।
আমি যখন বরিশাল ছিলাম, তখন স্যার গ্রাম থেকে এসে আমার খোঁজ করেছিলেন, তখন শুনেছিলেন আমাকে আমার দাদা বাড়িতে রেখে আসা হয়েছে। স্যার আমাদের পরিবারের গুরুজনদের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াটাকে স্বাভাবিক ভাবেই দেখেছিলেন। তবে কষ্ট পেয়েছিলেন আমার মতো একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দিতে না পারায়। এই বিষয়টি স্যারকে খুব কষ্ট দেয়। তিনি খবরটা শোনার পর কোচিং সেন্টারের পরিচালকদের কাছে আমার সঙ্গে ঘটা পুরো ঘটনা খুলে বললেন। তারা সবটা শুনলেন এবং পদক্ষেপ নিলেন। জাহাঙ্গীর স্যারকে বাতিল করে দিলেন। অন্যায় করল মেহরুব স্যার আর শাস্তি পেলেন জাহাঙ্গীর স্যার।

জাহাঙ্গীর স্যার নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। কোচিং, টিউশনি করিয়ে যা আয় করতেন তা দিয়েই তিনি নিজের খরচ এবং ছোট বোনের পড়াশোনার খরচ চালাতেন। চাকরিটা চলে যাওয়ায় স্যার বিপদেই পড়েছিলেন। এতেও তারা ক্ষান্ত হননি। স্যারকে সেদিন রাতে রাস্তায় ফেলে বেদম মারধর করে। স্যারের পায়ের গোড়ালি থেঁতলে দেয়, হাতের অনেকগুলো হাড় ভেঙে যায়। স্যার প্রায় পনেরোদিন নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

আমি সেই কোচিংয়ের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে খবর পেয়ে স্যারকে দেখতে যাই। স্যার আমাকে দেখে কেঁদে দেন। আমাকে উপদেশ দেন আমি যেন এই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকি‌! এই শহরে থাকলে তারা আমাকে বাঁচতে দিবে না। কথা সত্য। তখন প্রায়ই এলাকার বখাটে গুলো আমাকে উত্যক্ত করত। মামা যতদিন ছিলেন আমি পৃথিবীর কোন অন্ধকার দেখিনি। কিন্তু মামা যাওয়ার পর সবদিকেই শুধু আঁধার আর আঁধার। তার মধ্যে মেহরুব স্যারের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিল আমার মহল্লায়। তিনি নিজের ভদ্রতার লেবাস থেকে বের হতে পারতেন না বলে কখনো সরাসরি আমার সামনে পড়েননি। কিন্তু তাতে কি? তার আনাগোনায় মহল্লার লোকদের নোংরা কথার জোর আরো বেড়ে যায়। তারা সেই মিথ্যাকে সত্য বলেই প্রতিষ্ঠিত করতে উঠেপড়ে লাগে।
সেদিন স্যার আমাকে আরো একটি সত্য কথা বলেন, আমার সঙ্গে যখন মেহরুব স্যার জোরজবরদস্তি করছিলেন তখন কোচিংয়ে আমরা দুজন ছাড়া কেউ ছিল না। জাহাঙ্গীর স্যার পরে এসেছিলেন। সেই ঘটনার কথা আমরা তিনজন ছাড়া কেউ জানত না। তাহলে সেই ঘটনার কথা আমাদের মহল্লা পর্যন্ত কিভাবে ছড়াল? কেই বা এতদূর টেনে নিয়ে গেল।
স্যার যখন আমাকে প্রশ্ন করলেন আমি বোকার মতো তাকিয়ে ছিলাম। উত্তর স্যার‌ই দিলেন। সে আর কেউ না। আমার ক্লাসের সেই বান্ধবী, যে আমাকে নকলে ফাঁসাতে গিয়ে ফাঁসাতে পারেনি। বরং আমার জন্য তার মানসম্মান নষ্ট হয়েছে মেহরুব স্যারের সামনে। তাই সে এবার আমাকে চুড়ান্ত ভাবে অপমানিত করতে মেহরুব স্যারের সঙ্গে আমার ঘটা ঘটনাকে রসিয়ে কসিয়ে এতদূর বানিয়েছে। অর্থাৎ মেহরুব স্যারকে সুযোগ সেই করে দিয়েছে।
এই কথা শোনার পর আমি একেবারেই বিশ্বাস করতে পারিনি। একটি মেয়ে কীভাবে আরেকটি মেয়ের এত বড় ক্ষতি করতে পারে?
আমি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাইলে জাহাঙ্গীর স্যার আমাকে আমার অবস্থান বুঝিয়ে বললেন,

_ তুমি কীভাবে ওদের বিরুদ্ধে লড়বে? কে আছে তোমার? তোমার মামী শয্যাশায়ী। তার কথাও তোমাকে ভাবতে হবে। তোমার নিজের কথাও। সুতরাং এখন এসব নিয়ে না ভেবে কীভাবে নিজেকে এবার নিজের মামীর জীবন বাঁচাবে সেই চিন্তা কর। আর ওদের বিচারের কথা? মনে রাখবে, আল্লাহ আছেন। নিশ্চয়ই তিনি জুলুমকারী আর মজলুমের অবস্থান সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। তোমার ভালোর জন্য বলছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাও। অন্য কোথাও গিয়ে নিজেকে বাঁচাও। তোমার মামার চাকরিও তারাই খেয়েছে। তোমার মামা পুলিশের কাছে গিয়েছিল, তার শাস্তি স্বরূপ তাকে চাকরি, ব্যবসা সব হারাতে হয়েছে। তাও তিনি ওদের কাছে মাথা নত করেননি । মেহরুব, তোমাকে চেয়েছিল, তিনি রাজী হননি ওমন হীন লোকের হাতে তোমাকে তুলে দিতে। তাই বলছি, যদি জীবন ও সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাও, আপাতত গা ঢাকা দাও। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করো, যেন তোমাকে এই অমানুষদের শাস্তি দেখার সৌভাগ্য করে দেন।
জি হ্যাঁ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

এতদূর বলার পর পারি থামল। সম্রাট মুখ ফিরিয়ে দেখল পারির চোখেমুখে অন্যরকম জ্যোতি বিরাজ করছে। ওর চোখেমুখে শান্তির ছাপ। ইশারায় জানতে চাইল সেটা কীভাবে? পারি হাসি হাসি মুখে বলল,

_ আমি স্যারকে দেখে আসার তিন চারদিনের মধ্যে হাসান মামা আমাদের আনতে যান। মামী কথা না বললেও ইশারায় আমাকে বুঝিয়ে দিতেন কি করতে হবে। মামীর কথাতেই হাসান মামাকে ফোন করি। হাসান মামা এসে সব শোনার পর রাতের মধ্যেই আমাদের দু'জনকে তার কাছে নিয়ে গেলেন। একদিন তাদের বাসায় রাখার পর সেদিন রাতেই আমাকে হাসান মামা তার শ্যালকের বাড়ি ঢাকায় নিয়ে আসলেন। আমার জন্য মাসিক খরচ পাঠিয়ে দিবেন এই শর্তে তার শ্যালকের বাসাতেই আমার জন্য আবাসস্থল চুড়ান্ত করলেন। যাওয়ার সময় আমার মাথায় হাত রেখে স্নেহ ভরা গলায় বলেছিলেন ,

_ পারি আম্মা, মনে রাখবে, পৃথিবীতে স্রষ্টার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি মানুষ। স্রষ্টা মানুষকে তিনটা ক্ষমতা ছাড়া সব ক্ষমতাই দিয়েছেন, যেগুলো কাজে লাগানোর দায়িত্ব একান্ত‌ই মানুষের। আশা করি তুমি তোমার ভেতরের সেই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একদিন নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাবে। মনে রাখবে, আমরা তোমার পাশে আছি মানেই আজীবন থাকব তার নিশ্চয়তা নেই। তোমার মামাও তোমার পাশে ছিলেন, কিন্তু এখন নাই। আমিও আজ আছি, কাল থাকব না। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই নশ্বর পৃথিবীতে অবিনশ্বর হয়ে বাঁচতে হলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত কর। সৎ পথে হেঁটে সৎ ভাবে বাঁচার জন্য যতভাবে নিজেকে ভাঙ্গতে হবে ভাঙ্গো, যত ভাবে গড়া যায় গড়। আমার বোনের দায়িত্ব তুমি, আমার মৃত বোন জামাতার আমানত তুমি, তোমার জন্য আমার সামর্থ্যের সবটুকু করব।
আমার তিন সন্তান খেয়ে থাকলে তুমিও খাবে, তারা না খেয়ে থাকলে তুমিও তাই! কিন্তু আমি যেমন আমার সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যতে গড়তে তাদের বাস্তবিক শিক্ষা দেওয়া থেকে পিছিয়ে নেই, তেমনি তুমিও থাকবে না। মনে রাখবে, এই হাসান মামা আজ থেকে তোমার অভিভাবক। নিজেকে অভিভাবকহীন ভাববে না কখনো। যেকোন কিছু দরকার হাসান মামাকে জানাবে। শুধু একটু ধৈর্য্য আর সময় দিয়ে অপেক্ষা করবে। তবে, তোমার কাছে অনুরোধ, কখনোই অন্যায়কে বরদাস্ত করবে না, তবে কখনো বড়দের সাথে তর্কেও যাবে না। যদিও তারা অপরাধী হয়, তুমি নিরবে স্থান পরিত্যাগ করবে। কেননা, বড়রা ভুল করলেও তাদের সঙ্গে বেয়াদবির অধিকার ছোটদের নেই। কিন্তু আল্লাহর আছেন। আল্লাহ কিন্তু বড় ছোট সবাইকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি সবাইকে সমান ভাবে দেখেন। নিশ্চয়ই তিনি উত্তম বিচারক। তাই যখন মনে হবে কোন বড় তোমার প্রতি অন্যায় করছে, তুমি তার বিচার রবের দরবারে রেখে নিজে সরে আসবে। ইনশাআল্লাহ, তুমি তোমার সাথে করা অন্যায়ের বিচার ঠিক দেখতে পাবে।
মন দিয়ে পড়াশোনা করো, আমি তোমার মাসের খোরাকি পাঠিয়ে দিব। সেসব নিয়ে এখন চিন্তা করবে না। শুধু পড়াশোনা আর এখানের খালা মনির সঙ্গে তার ঘরের টুকটাক কাজ করে তাকে সহযোগিতা করো। বুঝোই তো, এই দুনিয়ায় কেউ ফ্রি তে কিছু দেয় না। কিছু পেতে গেলে কিছু দিয়ে সাহায্য করতে হয়। তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে, আশা করি হাসান মামার কথা বুঝতে পেরেছ!
‘ হ্যাঁ, আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
হাসান মামার শ্যালিকা ভালো মানুষ হলেও উনার স্বামী খুব একটা আন্তরিক ছিলেন না। আমি বুঝতে পারতাম উনি আমাকে ভালো ভাবে নিচ্ছেন না। তাই আমার চেষ্টা ছিল এস‌‌এসসি পরীক্ষার পর নিজের ব্যবস্থা নিজেই করা। আল্লাহর রহমতে একা একাই পড়তে থাকলাম। পরীক্ষার সময় যত ঘনিয়ে আসছিল আমার দুশ্চিন্তাও তত প্রখর হচ্ছিল। ঐদিকে তখন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অবস্থা ভীষণ অস্থিতিশীল। এমনিতেই মেহরুব স্যারের মতো বিপদ মাথার উপর চেপে ছিল। এর মধ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভয়াবহ। হাসান মামা দৌড়ঝাঁপ করে আমার পরীক্ষার সমস্ত ব্যবস্থা করে ফেললেন। তিনি নিজে এসে পরীক্ষার দু'দিন আগে আমাকে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে গেলেন। বোরকা পরে তার হাত ধরেই ঘর থেকে বের হতাম, এভাবেই লুকিয়ে লুকিয়ে তিনটা পরীক্ষা দেই। চার নাম্বার পরীক্ষার আগের দিন খাতা কেনার জন্য রাস্তায় বের হ‌ই।
ততদিনে আমার বিশ্বাস হয়েছিল বোরকা পরায় মেহরুব স্যার আমাকে চিনবেন না। তাই সাহস করে বের হতাম। রাস্তায় বের হয়েই শুনতে পাই সব চেয়ে আকাঙ্ক্ষিত খবরটা। আমি যেই স্টেশনারিজ দোকানে খাতা কিনতে যাই সেখানে বসে কিছু ছেলে রাজনৈতিক আলোচনা করছিল। তাদের মাধ্যমে‌ই শুনতে পাই মেহরুব স্যারকে তার ভাইয়ের প্রতিপক্ষের লোকেরা তিনদিন আঁটকে রেখে ইচ্ছা মতো মেরেছে। তার কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত থেঁতলে দিয়েছে। সম্ভবত তিনি আর কখনো দাঁড়াতে পারবেন না। হ্যাঁ, খবরটা শোনার পর আমার চোখে সবার প্রথমে জাহাঙ্গীর স্যারের মুখটাই ভেসে উঠেছিল। তারপর আমার মামার শেষ মুহূর্তের অসহায় চাহনিটা। যেখানে ছিল আমাকে অকুল পাথারে রেখে যাওয়ার আত্মগ্লানি।

পরীক্ষা যখন শেষ হয়ে গেল হাসান মামার স্ত্রী, আসমা মামী পরামর্শ দিলেন কিছু হাতের কাজ শেখার। আমার‌ও তখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ঘোর ইচ্ছা। আমি আগেই মামীর থেকে কাঁথা সেলাই শিখেছিলাম। সাহস করে পাশের ঘরের এক আপুর কাঁথা অর্ডার নিলাম। অল্প পয়সায় অনেক পরিশ্রম আর সময়ের কাজ ছিল এটা। আমার মনে হল এটা দিয়ে ভাগ্য ঘুরানো যায় না। শখ থেকে করা অথবা অল্প প্রয়োজনের জন্য, ঠিক আছে। কিন্তু জীবন বাঁচানোর জন্য এসব কাজ নয়।
মাম্মা কেক বানাতো। প্রশিক্ষণ নেওয়া ছিল। কোর্স করেছিল মাম্মা বেকিং এর উপর। চমৎকার কেক বানাতো। আমার‌ও ছোট থেকেই বেকিং এর উপর কিছু করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু কীভাবে কী করব বুঝতে পারছিলাম না। যেখানে থাকতাম, সেখানে সেই আন্টির বড় মেয়ে ছিল। আমার চেয়ে বড় দুই বছরের বড়‌। সেই আপুর মোবাইলে বেকিং এর ভিডিও দেখতাম। কিন্তু প্র্যাকটিস করার মতো কিছু তো ছিল না। তাই দেখেও কোন বিশেষ লাভ হতো না। এর মধ্যেই সেই আন্টির হাজবেন্ড, মানে আংকেল। আমার জন্য তার ভাগ্নের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। আমার খরচ হাসান মামা পাঠিয়ে দিতেন, তাতে নাকি পর্যাপ্ত হতো না। তিনি আন্টির সাথে চেঁচামেচি করতেন, আমাকে বিয়ে দিলেই নাকি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাই তিনি আমার জন্য যোগ্য পাত্র হিসেবে পছন্দ করলেন তার ভাগ্নে। সে নিউ মার্কেটে সেলসম্যানের চাকরি করতো। আমি সুন্দরী, তাই তারা তাদের ছেলের জন্য নিতে চাইছেন। নয়তো আমার মতো এতিমের বিয়ে কেই‌বা নিজের ছেলের সঙ্গে দিবেন। হাসান মামাকে ডেকে এভাবেই বুঝাতে লাগলেন সেই আংকেল। হাসান মামা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনের অবস্থা বুঝে নেন‌ এবং সেদিনই তিনি আমাকে সেই বাড়ি থেকে আবার নারায়ণগঞ্জ নিয়ে আসেন। আমার কারণে সেদিন থেকেই আসমা মামী‌র সঙ্গে তার সেই বোন জামাতার সম্পর্কে ভাঙন ধরে। আজ অবধি তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন না। কেননা আসমা আন্টির বোন জামাতার সেই ভাগ্নে ছিল মাদকাসক্ত। একটা মাদকাসক্ত ছেলের সঙ্গে কীভাবে তারা আমার মতো একটা অসহায় মেয়ের বিয়ে নিয়ে ভাবতে পারেন, এই কথা জিজ্ঞেস করার কারণে সেই লোক নিজের স্ত্রীকে আঘাত করেন। আসমা মামীর সঙ্গেও বাজে ভাষা ব্যবহার করেন। তাই আসমা মামীর বোন আসমা মামীকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তিনি এই বিষয়ে আর কোনদিন তাদের সঙ্গে কথা না বলেন। সেদিনের পর আসমা মামী আর কোনদিন তার বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নি।
নারায়ণগঞ্জ এসে আমি হাসান মামাকে জানাই আমি বেকিং শিখব। এর মধ্যেই একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির আবেদন শুরু হয়ে যায়। আসমা মামীর ঠান্ডা জনিত সমস্যা আছেন। তিনি প্রায় এক মাস হসপিটালে ভর্তি থাকতে বাধ্য হন। এসবের কারণে তখন হাসান মামার হাত খালি। আমাকে কীভাবে ভর্তি করবে? আমিও চুপ হয়ে গেলাম। ধীরে ধীরে তো বড় হচ্ছি, আর বাস্তবতা শিখছি। তাই বোধহয় আমার ভেতর থেকেই সব ঝিমিয়ে যাচ্ছিল।

হাসান মামার এক কলিগের মেয়ে, যে ঢাকায় হোস্টেলে থেকে এখানে একটি শপিং মলে সিকিউরিটির চাকরি করত। তার সাথে আলাপ হল। জানতে পারলাম ঈদ উপলক্ষে শপিং মলের বড় বড় দোকানে খন্ডকালীন কর্মী নিয়োগ দেয়। বেশ ভালো স্যালারি ধরে। আমার কেন জানি মনে হল আমার জন্য একটা দারুণ সুযোগ হতে পারে এটা, নিজেকে পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর একটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমি হাসান মামা ও আসমা মামীকে বললাম। আমার মামীকেও। মামী কথা বলতে না পারলেও কান্না করতেন অবিরত। হাসান মামা ও আসমা মামী প্রথমে রাজী হলেন না। আমার মতো একটা নাজুক মেয়েকে ঢাকা শহরের মতো বিশাল জায়গায় একা ছাড়তে পারবেন না তারা।
মামা একেবারেই রাজি হলেন না। কিন্তু আমিও সিদ্ধান্তে স্থির ছিলাম। সময় আছে, আমি চাইলে এখনি না পারলেও অন্তত কিছুটা দেরি করে হলেও একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হতে পারব। তার জন্য টাকা দরকার। এই সুযোগটা হাত ছাড়া করতে চাই না। আমি অনেক অনুরোধ করে হাসান মামাকে বুঝালাম। হাসান মামা আমার আকুতি ভরা চাহনি উপেক্ষা করতে পারলেন না। তিনি নিজেই এসে আমার হোস্টেল ঠিক করে দিয়ে গেলেন, আমি যেখানে কাজ করব সেই জায়গাও দেখে গেলেন। সঙ্গে আমার জন্য একাদশ শ্রেণির ব‌ই কিনে দিয়ে গেলেন এবং বললেন,

_ কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়বে। ইনশাআল্লাহ, আমি যেভাবেই হোক তোমাকে এবার‌ই ভর্তি করাবো। এই কাজ তোমার জন্য নয়। এখন সময় বিরূপ, তাই বলে সবসময় থাকবে না।

হ্যাঁ তার পর পারিকে আর পিছু ফিরতে হয়নি। পারি একা একাই হাঁটতে শিখেছে, বাঁচতে শিখেছে। সেই দোকানে তিন মাস ছিলাম। এরপর ঈদ এলো, নারায়ণগঞ্জ চলে গেলাম। ঢাকা থেকে আসার আগেই সেই শপিং মলের একটি দোকানে চাকরি নিশ্চিত করে আসলাম। আমি যেহেতু তথাকথিত সুন্দরী তাদের চোখে, তাই আমাকে কাজে রাখার তাগিদ ছিল অনেকেরই। চাকরি খুঁজতে বেশি কষ্ট হয়নি। চাকরি নিশ্চিত করেই নারায়ণগঞ্জ গিয়েছিলাম যেন হাসান মামা আটকাতে না পারেন।
ঈদের পর এসে সেই দোকানে কাজ করতে থাকলাম।
ধীরে ধীরে অল্প কিছু পয়সা জমে। হোস্টেলের অনেক খরচ। আর কাজের সূত্রে পরিচয় হ‌ওয়া মেয়েদের সঙ্গে মিশেও অনেক কিছু বুঝতে শিখলাম। ওরা দু'টো টাকা বাঁচাতে কত কষ্ট করে। ওদের দেখে শিখলাম সেভিংস। হোস্টেল ছেড়ে মেসে উঠলাম। অল্প কিছু টাকা জমিয়ে মোবাইল কিনলাম। অবসরে বেকিংয়ের অনেক ভিডিও দেখতাম। পড়াশোনার চিন্তা‌ও ছিল। কীভাবে পড়াশোনা শুরু করব তাও বুঝতে পারছিলাম না। এর মধ্যেই একদিন রাস্তায় একটা বিজ্ঞাপন দেখতে পাই। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তি!
আমার বুকের মাঝে ঝিমিয়ে পড়া প্রজাপতিটা আবারও ডানা ঝাপটানো শুরু করল। খোঁজ নিলাম, সমস্ত তথ্য জেনে নিয়ে হাসান মামাকে জানালাম। মামা এলেন। নিজেই অভিভাবক হয়ে আমাকে ভর্তি করালেন। যেহেতু চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা করতে অসুবিধা হবে না তাই তিনি চাকরিটাও চালিয়ে যেতে বললেন। সত্যি বলতে তিনি ছিলেন অল্প আয়ের মানুষ। নিজের তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচ, সংসারের খরচ, তার মধ্যে মামীর চিকিৎসার খরচ। একা মানুষ, কত কি করবেন! তাই আমার নিজ উদ্যোগে কিছু করার চেষ্টা, বিষয়টি তিনি একেবারেই অবজ্ঞা করতে পারেননি। বরং খুশিই হয়েছিলেন। এই তো, এভাবেই আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা দেওয়ার পর আরো একটু বেটার কিছু করার ইচ্ছা জাগল। তখন‌ও বেকিংয়ে আমি হাতেখড়ি নিতে পারলাম না। সারাদিন দোকানের কাজের পর পড়াশোনা, রান্না করে আর সময়‌ই কোথায়। আর স্যালারিও বাড়ছিল না। এত অল্প স্যালারিতে চলতে‌ও কষ্ট হচ্ছিল। ভেবে দেখলাম ভিন্ন কিছু করার। যেহেতু তখন উচ্চ মাধ্যমিক পাশ। তাই ভালো চাকরি পাবার করেছিলাম। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে চাকরির বিজ্ঞাপন পড়তাম। তেমনি একদিন দেখলাম একটা ফিজিওথেরাপি সেন্টারের বিজ্ঞাপন। যোগাযোগ করলাম, রিসিপশনিষ্ট পোস্টে আবেদন করলাম। ইন্টারভিউ কল এলো, চাকরি হল। সেখানে রিসিপশনিষ্ট পজিশনে কাজ করলেও নিজ আগ্রহ থেকে ফিজিওথেরাপি শিখতে চেষ্টা করলাম। এর পাশাপাশি খোঁজ নিতে থাকলাম বেকিংয়ের উপর ভালো কোর্স কোথায় করায়? ব্রেকিং কোর্সের ফিস অনেক। জিনিসপত্র কেনায়‌ও অনেক খরচ। সবকিছু হিসাব করে নিজের হাতের খরচ একেবারেই শূন্যে নামিয়ে দিলাম।
অল্প করে জমানো টাকা দিয়ে একটা একটা করে জিনিস কিনতে শুরু করলাম। ছোট ছোট কেক বানিয়ে তার ভিডিও করতাম। এরপর এগুলো ইডিট করা নিয়ে চিন্তা হতে থাকল। ইডিটে আমি একেবারেই ভালো না। আমি যত‌ই ভালো কেক বানাই, মানুষের কাছে না পৌঁছালে তা কি করে বিক্রি হবে?
এই কাজে এগিয়ে এলো হৃদয়!

এই অবধি আসতেই সম্রাট পারির কথার মাঝে বাঁধা দিল। কৌতুহল না দমিয়ে জিজ্ঞেস করল,

_ হৃদয়ের সাথে পরিচয় কীভাবে?


৫১

#সুখ_ফড়িং_সিজন_২
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৫১

[ভালো লাগলে অবশ্যই কমেন্ট করবেন, শেয়ার মেনশন করবেন।]

আমি একাশদ শ্রেনিতে ভর্তি হলাম ধানমন্ডি, ইউনিভার্সিটি উইমেন্স ফেডারেশন কলেজে। একদিন ক্লাস শেষ করে ফেরার পথে সাইন্সল্যাবের সড়কে দাঁড়িয়ে রাস্তা পার হবার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, এমন সময় হুট করেই ব্যাগে টান পড়ে। মুহূর্তেই ছিনতাইকারী ব্যাগ টান দিয়ে দৌড় মেরে চলে গেল ছয় স্কয়ারের দিকে। অপ্রত্যাশিত ভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনায় হাতে টান খেয়ে তাল সামলাতে পিছু ঘুরতেই হুট করেই সামনে আসা একটি ব্যাটারিচালিত রিক্সার উপর পড়ে যাই। আমার চোখে, নাকে রিক্সার হ্যান্ডেলের আঘাত লাগে। সেখান থেকে নিচে ভাঙ্গা রাস্তায় পড়ে যাই। নাক দিয়ে তৎক্ষণাৎ রক্ত ঝরতে থাকে, হাতের চামড়াও ছুলে যায় নিচে পড়ায়। সব মিলিয়ে খুব‌ই বাজে একটা পরিস্থিতি। চারদিকে কত মানুষ। কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে, কেউ পাশ কেটে চলে যাচ্ছে। আমি একদিকে ব্যাগের দুঃখে করুণ চোখে ছিনতাইকারীর যাওয়ার পথে তাকিয়ে ছিলাম, অন্যদিকে এত মানুষের সামনে পড়ে যাওয়ায় লজ্জা পেয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তখন কোথায় থেকে যেন হাজির হয় হৃদয়। ওর পাশেই থাকে আন্টি। হৃদয়ের আম্মু। আন্টি হৃদয়ের হাতে তার ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে নিজেই আমাকে টেনে তুলেছিলেন। ওঠার সময় টের পেলাম আমার হাঁটুতেও ভীষণ ব্যথা করছে, হাঁটুর ডান পাশে আঘাত লেগেছে। যেনতেন নয়। ভয়াবহ, রক্ত বের হচ্ছে, সাদা সালোয়ার ভিজে উঠেছে।
হৃদয় আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত। অতঃপর আমার পাশে দাড়িয়ে পথচারি একজন আপুকে বলেছিল,

_ উনাকে একটু ধরেন তো, আপু!

দুইজন মেয়ে এগিয়ে এলো। তারাও আমার ডান বাহু চেপে ধরে আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,

_ উনাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে ইমডিয়েটলি, উনার বোধহয় হাঁটু ছিলে গেছে।

_ লাগবে না, আমি বাসায় গিয়ে.. আহ্!

_ আপনি, দাড়াতেই পারছেন না। বাসায় যাবেন কি করে? আপনার সাথে কেউ নেই?

হৃদয়ের প্রশ্নে আমি উত্তর দেওয়ার আগেই আমাকে ধরে রাখা অন্য মেয়েটি বলল,

_ আপনার দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে, এখানে বসুন।

উনি ফুটপাত দেখিয়ে বলেছিলেন কথাটি। উনার কথা শেষ হতেই হৃদয় নিজের হাত এগিয়ে দিয়ে বলেছিল,

_ আমার উপর ভর দিন, সমস্যা নেই।

আমি হতবাক হয়ে যাই এই কথায়। চিনি না, জানি না! কোথায় থেকে এলো সাহায্য করতে। তাও কিনা এভাবে? আন্টি পাশ থেকে বলেছিলেন,

_ হ্যাঁ মা, তুমি আমার ছেলের উপর ভর ছেড়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে ঐ পা'টা ঝাড়া মারার চেষ্টা করো। তোমার সাথে কে এসেছে মা?

আন্টি যে কত নরম সুরে কথা বলেন, তা জানেন তো আপনি! প্রথম দেখাতেই যে কাউকে আপন বানিয়ে ফেলতে পারেন। ঐ রকম বিপদের সময় ওমন একজন মমতাময়ী, চমৎকার মানুষ পেয়ে আমিও গলে যাই। আন্টির প্রশ্নে আহ্লাদি গলায় উত্তর দিলাম,

_ কেউ না!

হৃদয়কে খেয়াল করলাম ততক্ষণে রিক্সাওয়ালা ডেকে নিয়েছে। একজন আপুকে অনুরোধ করে বলেছিল,

_ উনাকে একটু সাহায্য করুন তো, আপু।

একজন আপু এগিয়ে এসে আমার ডান হাতের কনুই শক্ত করে চেপে ধরতেই হৃদয় বলেছিল,

_ রিক্সায় উঠুন।

আমি বিস্মিত, জিঙ্গাসু চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

_ কেন?

বাম পাশ থেকে হৃদয়ের মা, আন্টি বললেন

_ তোমার তো অনেক ইনজুরি হয়েছে মেয়ে, বললে সাথে কেউ নেই। তাহলে এটা, কীভাবে তুমি বাড়ি যাবে। তোমার এখন জরুরি চিকিৎসা দরকার। রিক্সায় ওঠো, ডাক্তার দেখাতে চল। বাড়ির লোকের নাম্বার আছে না? নাম্বার মুখস্থ? আমার ছেলের মোবাইলে ফোন করে তাদেরকে আসতে বল। কি বিপদটাই না হয়ে গেল তোমার সাথে, আহারে! বাচ্চা মেয়েটা, একদম পুতুলের মতো‌। এরকম একটা মেয়ের সঙ্গে এমন একটা কান্ড ঘটে গেল! ... ওহোহ্!

আন্টি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন আর কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন। আশেপাশের মানুষজন‌ও আমাকে দেখে দুঃখপ্রকাশ করছিলেন। কয়েকজন পরামর্শ দিলেন উনাদের সঙ্গে হাসপাতালে যেতে। আমার ডান পাশে থাকা হৃদয় রিক্সা দেখিয়ে বলে উঠল,

_ আগে বাম পা রাখুন, তারপর ডান পা তুলুন। আপনার ব্যাগে কি খুব জরুরি কিছু ছিল? মানে টাকা ছাড়াও মোবাইল, ফোন, কোন ইম্পর্ট্যান্ট ফাইল! এমন কিছু?

হৃদয়ের সম্বোধন শুনে অষ্টাদশী আমি বিস্মিত চোখে তাকাই। মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বলেছিলাম,

_ আমার মোবাইলটাই ছিল ঐটাতে।

_ অহ!

হৃদয়ের হতাশ শব্দ শুনে আমি সেদিকে তাকাই, যেদিকে ছিনতাইকারী দৌড়ে গেছে। কেউ কোন প্রতিক্রিয়া করার আগেই কিশোরী পারিজাতের অল্প পুঁজির ব্যাগটা নিয়ে হারিয়ে গেল শত লোকের ভীড়ে। ঠোঁট ভেঙে কান্না আসছিল তখন আমার। ব্যাগটাতে ব‌ই, পুরো মাসের খরচের টাকা, মাত্র কেনা স্মার্ট ফোনটা। সব নিয়ে চলে গেল! কি জানি হৃদয় কি বুঝেছিল! হঠাৎ করেই সম্বোধন বদলে বলেছিল,

_ আচ্ছা, একটা ফোন‌ই তো‌, ব্যাপার না। তুমি যে বেঁচে আছ, সেটাই অনেক। বাড়ির লোকেদের ফোন দিও, আমরা বুঝিয়ে বলে দিলে বকবে না।

আমি এই কথার কোন উত্তর দিলাম না। রিক্সায় আমি উঠলাম, আমার সঙ্গে আন্টি। হৃদয় আরেকটি রিক্সা নিয়েছিল। আমাকে নিয়ে গেল ল্যাব এইডে। যাওয়ার পথে আন্টি আমাকে মানসিক ভাবে স্বাভাবিক করতে অনেক কথা বললেন। আমার পরিবারের খোঁজ নিচ্ছিলেন। আমিও উনার সব কথার উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাকে ফাস্ট এইড দিয়ে, ঔষধ লিখে ডাক্তার ছেড়ে দিলেন। তখন হৃদয় আমার বাড়ির লোকের তালাশ করলে আমার আগে আন্টিই সব বলেছিলেন। আন্টির থেকে সব শুনে হৃদয় করুণ চোখে আমার দিকে তাকায়। তারপর আন্টিকে বলেছিল,

_ তাহলে, আম্মা, আমি গিয়ে দিয়ে আসব? এভাবে একা ছাড়া তো মানবিক দেখায় না। তুমি বাসায় যাও, আমি ওকে, মানে উনাকে দিয়ে আসি।

_ উনাকে কেন বলছিস? বাচ্চা মেয়ে, তোর কত জুনিয়র, জানিস? মাত্র ইন্টারে ভর্তি হয়েছে। একদম পিচ্চি। লম্বা দেখে বড় বড় লাগে।

আন্টির কথায় সেদিন আমি ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলাম। হৃদয় নিজের মায়ের বলার ধরনে হেসে বলেছিল,

_ অপরিচিত মেয়েকে তুমি, তুই বলা যায় না কি আম্মু? যত‌ই হোক আমার ছোট। তুমিও না।
আচ্ছা বাদ দেও, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, তুমি বাসায় যাও। আমি উনাকে উনার মেস অবধি এগিয়ে দিয়ে আসি। নয়তো এই অবস্থায়...?

_ হ্যাঁ হ্যাঁ দিয়েই আয়। মানুষ হয়ে মানুষের কাজে না আসলে কি মানুষ হলাম। আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে তো, নাকি!

_ হ্যাঁ তাই তো‌। এবার তুমি চল।

বলেই হৃদয় তার মায়ের হাত ধরেছিল। তা দেখে আন্টি নিজের হাত ছাড়িয়ে বলেছিল,

_ বাবা, আমি অসুস্থ নয়। এক্সিডেন্ট‌ও আমার হয়নি। হয়েছে ঐ মেয়েটার। তুমি ওকে ধরো।

_ না না, আন্টি। আমি এখন একা হাঁটতে পারব।

বলেই আমি চট করে বেড থেকে পা নামিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে পড়ি‌ এবং সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ি পায়ের ব্যথায়। তা দেখে হৃদয় চোখ মুখ কুঁচকে মৃদু ধমকের সঙ্গে বলেছিল,

_ পিচ্চি মানুষ, পিচ্চি মানুষের মতোই থাক। বেশি বুঝো না।

ওর ধমকে ভীষণ অধিকার বোধ ছিল। সেদিন ঐ'ই আমাকে কামরাঙ্গীরচর, আমার বাসায় দিয়ে আসে রিক্সায় করে। যাওয়ার পথে আমার সম্পর্কে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে। আমিও বলে দেই।

_ তারপর থেকেই তোমাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল?

_ আন্টি উনার নাম্বার দিয়েছিলেন, যেন আমি উনার সাথে যোগাযোগ রাখি। কিন্তু আমি কখনো ফোন করিনি। যত‌ই হোক, আমরা তো অত পরিচিত ছিলাম না। মাস দুয়েক পর একদিন দুপুর বেলা, আমার কলেজের সামনে হৃদয়কে দাঁড়ানো দেখে প্রথমে চিনতে পারিনি। হৃদয় বুঝতে পেরে আমার দিকে এগিয়ে আসে, আমি কনফিউজড হয়ে ভীত চোখে তাকিয়ে থাকি। ও , আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল,

_ বিপদ ফুরিয়ে গেলে এভাবেই উপকারিকে ভুলে যাও?

_ স্যরি, আপনাকে ঠিক!

_ চিনবে কি করে? সবসময় তো চেয়ে থাক পায়ের দিকে। লুক, লুক এট মাই আইস! লুক হেয়ার। চোখের দিকে তাকাবে। তবেই না লোক চিনতে পারবে!

_ স্যরি, ভাইয়া!

_ হোয়াট; হু ইজ ভাইয়া? আ'ম নট এনি ওয়ান্স ভাইয়া টাইয়া! তবে স্যাইয়া বানালে ভাবতে পারি।

ওর ফ্লার্টিংয়ে মেজাজ চটে যায়। রেগে গিয়ে বলেছিলাম,

_ কিসব বলছেন আপনি? আমি মানছি আপনাকে প্রথমে চিনতে পারিনি তাই বলে আপনি এসব বলবেন? আপনার আম্মু কত্ত ভালো মানুষ, আর আপনি! আপনার আম্মুর কাছে নালিশ করব আমি।

_ তার জন্য কল দেওয়া লাগবে এন্ড আমার ধারনা তোমার হাতের তালু দিয়ে পানিও গড়ায় না। সো তুমি পয়সা খরচ করে কল দিবে এটা তো ভাবাও খরচের বিষয়, এবং তুমি সেটাও করতে চাইবে না।

ওর বলার ধরনটা আমার গায়ে ভীষণ বিধেঁছিল। যেন অপমান করছিল। আমি মাথা নিচু করে বলেছিলাম,

_ আমার ফোন নেই, আর আমি আপনার মতো ধনীর দুলাল না যে সবসময় টাকা থাকবে আমার কাছে।

_ হুম, টাকা না থাকলেও ইগো আছে। আমার মা আবার বলে তুমি নাকি বাচ্চা! অথচ আমার মনে হয় তুমি একটা চৌবাচ্চা! সাইজ‌ও তো তাই বলে!

_ সাইজ!
শব্দটা শুনে সবার আগে বিব্রতকর কিছু মনেই পড়ে সেটা হৃদয়‌ও বুঝেছিল তাই নিজেই আমার ভুল ধরিয়ে বলেছিল,

_ এ্যাই খবরদার উল্টাপাল্টা কিছু ভাববা না, সাইজ বলতে আমি তোমার হাইট বলেছি। মাথায় তো কিছু আছে বলে মনে হয় না।

এতটুকু বলেই পারি হেসে দিল। যা তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির সহ্য হল না। সে কপাল কুঁচকে রক্তিম চোখে তাকাল পারির দিকে। পারি সম্রাটের হঠাৎ পরিবর্তনে প্রথমে চিন্তিত হলেও পরমুহূর্তে নিজের নির্বুদ্ধিতায় ভীত হল। দাঁত বের হাসার চেষ্টা করতেই সম্রাট বিরক্তি ঝেড়ে বলল,

_ দাঁতে এত রস আসে কোথায় থেকে? বেয়াদব মেয়ে কোথাকার!


৫২

পারি মুখ কাচুমাচু করে বলল,

_ হাসাও যাবে না?

সম্রাট কাটকাট গলায় বলল,

_না, অন্য পুরুষের কারণে এই ঠোঁটে হাসিও আমি বরদাস্ত করব না। তোমার হাসি, কান্না সবটা জুড়ে কেবল আমিই থাকব, বুঝেছ?

_ হু!

বলেই পারি কপাল কুঁচকে গাল ফুলিয়ে অন্য দিকে তাকাল। এটা দেখে সম্রাট ওর থুতনি চেপে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে কপালে তর্জনী ও থামস দিয়ে দু'টো টোকা মেরে বলল,

_ আমি এদিকে, ওদিকে কি দেখ?

_ পাখি দেখছি!

পারি ঠোঁট উল্টে কপাল ঘষতে ঘষতে বলল। ওর কথায় সম্রাট বাম ভ্রু উঁচিয়ে ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে, অদূরে থাকা একটি অচেনা পাখিকে গভীর ভাবে নজর বুলিয়ে, সবটা দেখে বলল,

_ ঐটা পুরুষ পাখি!

_ কিহ!

পারি বিস্মিত চোখে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে র‌ইল। সম্রাট ওর বিস্ময়কে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে আগের ন্যায় দৃঢ় সুরে বলল,

_ হ্যাঁ, ঐটা মেইল বার্ড!

_ সো হোয়াট?

পারির কণ্ঠে বিস্ময় ঠাসা। সম্রাট ডান ভ্রু উঁচিয়ে, দাঁত খিচে বলল,

_ একটু আগে আমি কি বলেছি?

_ ওটা পাখি!

পারির কণ্ঠে হতাশা। সম্রাট পারির বিস্ময়, হতাশকে আরো কয়েক গুণ বাড়াতে বলল,

_ মেইল তো!

_ আল্লাহ, আল্লাহ। কোন পাগলের পাল্লায় ফেলছেন আমাকে!

আসমানের দিকে দুহাত বাড়িয়ে উপরোক্ত কথাটুকু বলেই ওড়নার আঁচল গুটিয়ে পিছু ফিরে সামনের দিকে হাঁটা ধরল। পারির প্রতিক্রিয়ায় সম্রাট ঠোঁট কামড়ে হাসে। পিছু থেকে পারির ওড়নার এক কোণা টেনে ধরে ওকে আঁটকে দিয়ে বলতে লাগল,

_ লিসেন, তুমি আমাকে এমন সাধারণ পাগল বলতে পারো না। you should call me a crazy lover.
Don’t you know? I’m crazy only for you,
and for each and every thing that belongs to you. জান, শোন এভাবে ....

_ ইউ আর জাস্ট ইম্পসিবল, টোটালি ম্যাড।

সম্রাট পারিকে ধরে ফেলল, দু হাতের বেড়িতে আঁটকে, পারির দু হাতের কনুই ধরে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে চোখ চোখ রেখে ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,

_ ইয়াহ আ'ম ম্যাড, ইটস অনলি ফর ইয়ু। এন্ড আ'ম প্রাউড অফ ইট।

_ পাগল লোক!

পারি উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে থেকে হাসি হাসি মুখে আহ্লাদি সুরে বলল। সম্রাট পারির চোখে চোখ রেখে, খুশিতে জ্বলজ্বল করা চোখের উজ্জ্বলতা অনুভব করে পারির দু গালে হাত রেখে আদুরে ভঙ্গিতে কচলে বলল,

_ আই লাভ ইউ!

_ ইউ পাগল!

_ আই লাভ ইউ!

_ পাগল লোক!

_ আই লাভ ইউ!

_ কতবার বলবেন?

_ আই লাভ ইউ!

পারি বুঝতে পারছে, সে যতক্ষণে না উত্তর দিবে সম্রাট বলেই যাবে। সে তো পাগল লোকের পাগলামিতে লজ্জায় শিউরে উঠছে। অথচ লোকটি কি নির্লিপ্ত। সে হার মানল। স্বীকৃতি দিল পাগল প্রেমিকের প্রেমিকার হ‌ওয়ার। সে হাসিতে ঢলে পড়তে পড়তে বলল,

_ আই লাভ ইয়ু টু।

_আই লাভ ইউ সো মাচ!

_ এন্ড আই ইউ লাভ মোর....

সম্রাট গাল থেকে হাত সরিয়ে পারির ডান হাত নিজের বাম হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে বলল,

_ চল!

_ কোথায় যাব?

_ মুভি দেখতে!

_ সত্যি‌ই?

_ জি ম্যাম, সত্যিই! আপনার নাকি একদিন সিনেমা হলে গিয়ে মুভি দেখার ইচ্ছে রয়েছে?

_আপনাকে কে বলছে?

_ কেউ তো বলেছে!

_ সত্যিই সত্যিই যাব?

_ জি, আজকে আপনার ইচ্ছাটুকু পূরণ করব। তবে, আই হ্যাভ এ্যা কন্ডিশন!

_ কন্ডিশন!

_ জি। যদি কন্ডিশন মেনে নিতে পারেন, তবেই নিয়ে যাব।

_ কি কন্ডিশন?

পারি ঠোঁট টিপে, গাল ফুলিয়ে, কপালে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে আছে। সম্রাট পারির মুখশ্রী দেখে আরেক দিকে মুখ ফিরিয়ে বত্রিশ কপাটি বের করে হাসল। তা দেখে পারি ওর বাম কনুই খামচে ধরে মিনমিন করে বলল,

_ বলেন না! আমি সব কন্ডিশনে রাজী!

সম্রাট, পারির কথা শুনে চোখ কপালে তুলে ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, পরমুহূর্তেই বাঁকা হেসে কিছুটা কাছাকাছি হয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলল,

_ আর ইউ শিওর?

_ হুম

অবুঝ পারি সম্রাটের মনের বদ মতলব তো বুঝল না। সম্রাট তা ভেবে আরেক দফা ঠোঁট টিপে হাসল। পারি সম্রাটের হাসির কারণ বুঝতে ব্যর্থ হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই র‌ইল কেবল। সম্রাট পারির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁ‌ই ছুঁই রেখে ফিসফিস করে বলল,

_ সত্যিই রাজী?

_ হ্যাঁ, সত্যিই রাজী।

_ বুঝে দেখ। পরে কিন্তু কথার বরখেলাপ করা চলবে না!

পারি দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

_ করব না!

_ আচ্ছা! তুমি শিওর না!

এবার পারি ক্ষেপে গেল। বারবার এক‌ই প্রশ্ন কেন করছে, আজব লোকটা। সে আঙ্গুলে পেঁচানো ওড়নার দলা পাকানো অংশটুকু সম্রাটের মুখের উপর ছুড়ে মেরে বলল,

_ ধুর! কখন থেকে শিওর কি-না, শিওর কি-না জিজ্ঞেস করেই যাচ্ছেন। কতবার বললাম, আমি শিওর। আর কতবার বলব?

পারির ক্ষ্যাপাটে রূপ দেখে সম্রাট এবার শব্দ করে হাসল, হাসতে হাসতে পারির হাত দুটো নিজের এক হাতের মুঠোয় নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝানোর মতো করে বলল,

_ আচ্ছা, ঠিক আছে! কাঁদে না বাবুটা। বলছি তো, কিন্তু আমি বলার আগে তুমি বল তো, তুমি কি জান সিনেমা হলে ছেলে মেয়ে পাশাপাশি, চিপায় বসে কি করে?

_নাহ। কি করে?

পারি প্রশ্নটি করেই তার বড় বড় পাপড়িওয়ালা ডাগর চোখজোড়া মেলে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে র‌ইল। ওর বোকা বোকা চাহনি আর অবুঝ প্রশ্নে সম্রাটের পেট ফাটা হাসি আসছে। কিন্তু এখন হাসলে নির্ঘাত ফাঁসি। মজাটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই সে ঠোঁট কামড়ে ধরে হাসি সামলিয়ে পারিকে আরেকটু কাছে টেনে বলল,

_ এদিকে এসো‌।

পারি সম্রাটের দিকে ঝুঁকতেই সম্রাট ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলে। যা কর্ণগুহুর হতেই পারি চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলল। লজ্জায় ওর কান, গাল, নাকের ডগা লালচে হয়ে উঠল। ও নিজের লজ্জা লুকাতে দু'হাতের আজলায় রক্তিম হয়ে আসা মুখখানা লুকিয়ে নিল। পারির প্রতিক্রিয়া, ওর কানের লতিতে ফুটে ওঠা লজ্জাবতীর সিঁদুর আভা দেখে সম্রাট এবার আর নিজেকে নিয়ন্ত্রন করল না। পেটে হাত চেপে হাসতে হাসতে বসে পড়ল। সম্রাটের ওমন দম ফাটানো হাসিতে পারির লজ্জারা দ্বিগুণ হয়। সে দু'পা পিছিয়ে সামনে দিকে ফিরে দৌড় দিতেই সম্রাট বসা থেকেই ওর হাত টেনে ধরল। বাঁধা পেয়েও পারি দৃষ্টি ফেরাল না। সামনের দিকে চোখ খিচে বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। এই মুহূর্তে সম্রাটের এই হালকা ছোঁয়া‌ও ওর কায়ামনে সুপ্ত অনুভূতির ঝড় তুলে দিয়েছে। ভেতরে বহমান কালবৈশাখী শরীরের মধ্যে তীব্র ঝাঁকুনি দিচ্ছে। চাইলেও সে এই মুহূর্তে কোনভাবেই সম্রাটের মুখোমুখি হতে পারবে না। পারবে না চোখে চোখ মেলাতে। পারির দেহ জুড়ে চলা অস্থিরতা ওর আঙ্গুলে প্রবাহমান। সেই ছটফটানি অনুভব করে সম্রাট বাঁকা হাসল। তৃপ্তি পেল কিছু অপ্রতিভ না পাওয়া সুখের কল্পনা করে।

উঠে দাঁড়িয়ে পারির পিঠে বুক ঠেকিয়ে পারির কোমর ধরে কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁ‌ই ছুঁই রেখে আগের মতো ঘোর লাগানো কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,

_ তোমাকে প্রথমেই অত বড় টাস্ক দিব না। ছোট খাট! এই ধর, হালকা চুমু।

বলেই পারিকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। তখন‌ও পারির দুচোখ বন্ধ। পাপড়িদ্বয় কম্পমান। তিরতির করে কাঁপছে শুষ্ক নরম ঠোঁট জোড়া। সম্রাট অপলক চেয়েই রইল সেই কম্পমান ওষ্ঠের পানে। সে চাইলেই এখন পারি ধরা দিবে তাকে। কিন্ত সে তো এভাবে চায় না। সে এই ফুলটাকে নিজের কাছে নিজের নামে আজীবনের জন্য নিবন্ধন করে অতঃপর রোজ তার সুবাস নিতে চায়। তার ফুলদানিতে একান্তই তার ব্যক্তিগত গোলাপ করে রাখতে চায়। এই নারীর দেহের প্রতিটি লোমে সে তার নামের সিলমোহর মারবে, শুধু একটু ধৈর্য্য ও সময়ের অপেক্ষা। যা সে দীর্ঘ করবে না। পারি চোখ মেলল না। সম্রাট পারির দু চোখের পাতায় ফু দিয়ে বলল,

_ থাক। বিয়ের আগে তোমাকে কোন টাস্ক‌ই দিব না। আপাতত সব মাফ তোমার জন্য। এখন চল।

পারির বাম হাত নিজের ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়াল। বিয়ের আগে কোন টাস্ক দিবে না। কথাটা কানে যেতেই পারির হৃদক্রিয়া কয়েক বার থমকাল। কয়েকবার দ্রুত গতিতে স্পন্দিত হল। কতকবার তা মন্থর হল। হৃদয়ের এলোমেলো প্রতিক্রিয়ায় পারি ফিক করে হেসে দিল। চোখ মেলে তার হাত ধরে অজানা সুখের পথে টেনে নিয়ে যাওয়া সুদর্শন পুরুষটিকেই দেখতে পেল।

যমুনা ফিউচার পার্ক..

টিকেট কাউন্টার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে কারো সাথে ফোনে কথা বলছে এক যুবক। তার থেকে একটু দুরে অপূর্ব এক সুন্দরী নারী দাঁড়িয়ে রয়েছে, যার হাতের মুঠোয় রয়েছে পাঁচ বছরের এক শিশুর হাত। পুতুলের মতো সুন্দর বাচ্চাটা নিজের বড় বড় পাপড়িওয়ালা চোখ দুটো মেলে বিস্ময়ের সঙ্গে সব কিছু দেখছে। এখানে সে এই প্রথম এলো। বাবা মায়ের সঙ্গে কত জায়গায় বেড়াতে যায়, বড় ফুপু, ফুপা, আপুর সঙ্গে কত জায়গায় গেল বেড়াতে সে। কিন্তু এখানে প্রথম আসা। এটা তার জন্য একদম নতুন পরিবেশ, নতুন অভিজ্ঞতা। সে আজ মুভি দেখতে এসেছে। তার এতটুকু জীবনে এই প্রথম মুভি দেখার সুযোগ হল। তাও বাবা মায়ের সঙ্গে। আজ এখানে একটি চমৎকার এনিমেশন মুভির প্রিমিয়ার শো হচ্ছে। তাই মা বাবাকে বলতেই বাবা রাজী হয়ে গেল।

সম্রাট টিকেট কিনে এনে পারির হাতে দিয়ে বলল,

_এখানেই ওয়েট কর, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।

_ এখন আবার কোথায় যাবেন?

সম্রাট লিটল ফিঙ্গার দেখিয়ে বোঝাল, ওয়াশরুমে যাবে। পারি দাঁত দিয়ে জিহ্ব কেঁটে অন্যদিকে ফিরে মিটিমিটি করে হাসতে হাসতে সেই মা ও বাবুর দিকে তাকিয়ে র‌ইল। পারির লজ্জানত মুখশ্রী দেখে সম্রাট‌ও হাসতে হাসতে নিজের কাজে চলে গেল। তারা টিকেট কেটে ফেললেও হলের ভেতর এখন ঢুকবে না। কেননা সম্রাট তার শ্যালিকাদের‌ও আসতে বলেছে, সঙ্গে তার বদ বন্ধুদের। পারিকে সে যেই কথা বলেছে, তাতে যে পারির মনের মধ্যে ভয় ঢুকে গেছে তা লোকটা ঠিক‌ই বুঝতে পেরেছে। তাই পারির ভয় কাটানোর জন্য, এছাড়াও জীবনের প্রথম সিনেমা হলে মুভি দেখার অভিজ্ঞতা আনন্দদায়ক করতেই বন্ধুদের আমন্ত্রণ করা। পারি চোখ ফিরিয়ে তাকাল সম্রাটের গমন পথের দিকে। না, সম্রাটের দুষ্টুমি করে বলা কথায় ও ভয় পায়নি। সম্রাটের দ্বারা এমন কাজ কখনোই হবে না যা তার পারিজাতকে অসম্মানিত করে, তা পারিজাত খুব ভালো করেই জানে। পারি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, পারির বিন্দুমাত্র ক্ষতি সম্রাটের দ্বারা হবে না, সম্রাট‌ তার জীবদ্দশায় কাউকে করতেও দিবে না।

কথাটি ভাবতে ভাবতে পারি চোখ ফিরিয়ে তাকাল দরজা অভিমুখে। নিশি, ফারিয়া কলে বলেছিল কাছাকাছিই আছে। তবে তো ওদের এতক্ষণে পৌঁছে যাওয়ার কথা, তাহলে এখন‌‌ও পৌঁছাল না কেন?

সে দাঁড়িয়ে আছে ফুড কাউন্টারের পাশে। সিনেমা হলে দর্শকের সমাগম বাড়ছে, তাই ফুড কাউন্টারে‌ও তার চাপ পড়ছে। পারি একটু সরে দাঁড়াল। হাঁটতে হাঁটতে খানিকটা সামনে এগিয়ে গেল। তখনি ওর পায়ের সামনে গড়িয়ে এলো একটি রুবি কিউব। পারি নিচে তাকাতেই দেখতে পেল একটা পুতুল তার দিকে গোল গোল চোখে চেয়ে রয়েছে। ঠোঁট দুটো গোল গোল চোখে, বিস্মিত চাহনিতে চেয়ে আছে। পারির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। সে উবু হয়ে পুতুলটার দিকে স্নেহ ভরা চাহনিতে চেয়ে বলল,

_ কি বেবি?

_ আমার কিউব!

গোল ঠোঁট দুটো চেপে ধরে গালটা ফুলিয়ে ফেলল। ততক্ষণে সেই অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা শাড়ি পরিহিতা সুন্দরী নারীটি এসে মিষ্টি সুরে ডেকে উঠল বাচ্চাটাকে,

_ পাকিজা!

পারি চোখ তুলে তাকাল, সোজা হয়ে দাড়িয়ে দেখল তার সামনে অপ্সরার মতো সুন্দরী নারীটি নিচে বসে থাকা বাচ্চা মেয়েটার ডান কনুই ধরে বসা থেকে তুলে দাঁড় করিয়ে তার ফিরোজা ফ্রকটি ঝেড়ে দিচ্ছে। এরপর মেয়ের হাতের কিউবটা নিজের হাতে নিয়ে ব্যাগে ঢুকাতে ঢুকাতে মেয়েকে আদুরে শাসন করে বলল,

_ মাম্মা নিষেধ করেছিলাম ছুটোছুটি করতে? এখন তুমি এটা পাবে না।

পাকিজা নামের বাচ্চা মেয়েটা ঠোঁট উল্টে চোখ কুঁচকে তাকাল। অর্থাৎ মায়ের সিদ্ধান্তে সে মোটেই সম্মত নয়। পারি মা-মেয়ের মধ্যকার মিষ্টি মুহূর্ত দেখে মুচকি হাসল। পাকিজার মা পারির দিকে তাকিয়ে ভীষণ বিনয়ী সুরে বলল,

_ স্যরি, আমার মেয়...

_ ইটস ওকে, আপু। ও তো কিছু করেনি। বেচারীকে শাস্তি দিবেন না, প্লিজ।

_ আর বলবেন, যেখানেই যাবে এটা নিয়ে যাবে। তার জন্য‌ই তো মুভি দেখতে আসা, অথচ দেখুন।

_ ছোট মানুষ তো!

পারি পাকিজার মাম্মার সাথে গল্প করছে, ঐদিকে পারিকে রেখে যাওয়া জায়গায় এসে পারিকে না পেয়ে চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়া সম্রাট এদিক ওদিক তাকিতুকি করছে। এক‌ই দিনে দুটো মুভির প্রিমিয়ার শো থাকায় ভীর হচ্ছে উপচেপড়া। এত মানুষের মধ্যে কাউকে খোঁজাও কষ্টের। মোবাইলে কল দেওয়ার জন্য নাম্বার বের করে কলিং এ চাপ দিতেই চোখে পড়ল দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পারিকে, যে একটি বাচ্চার হাত ধরে তার চুলে আঙ্গুল বুলাতে বুলাতে তার সামনে দাঁড়ানো একজন নারীর সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল মুখে কথা বলে যাচ্ছে। সম্রাট নিজ মনে বিড়বিড় করে বলল,

_ কার সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছে এই মেয়ে? ওর পরিচিত কেউ?

ও খানিকটা দূর থেকে হাত উপরে তুলে আওয়াজ দিল,

_ পারি!

এক‌ই সঙ্গে বিপরীত দিকে থেকেও ভেসে এলো,

_ পারিজাত!

সম্রাট থমকাল। থমকাল বিপরীত দিকের ব্যক্তিটিও। এদিকে এক‌ই সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা নারী দুটো‌ও তাদের উদ্দেশ্য হাঁক ছাড়া পুরুষদের দিকে না তাকিয়ে বিপরীতে থাকা পুরুষটির দিকে তাকাল। তাদের চোখে বিস্ময়, কৌতুহল, জিজ্ঞাসা!

৫৩

পরমুহূর্তেই দু'জনে নিজের পুরুষটির দিকে তাকিয়ে আবারও বিপরীতে তাকাল। দু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকদ্বয়‌ও চমকিত। এক‌‌ই সঙ্গে দু'জনে পারিজাত বলে ডেকে উঠল? তবে কি পারিজাতকে চিনে? কীভাবে চিনে? তারা নিজেদের নারীটিকে অনুসরণ করে এগিয়ে এলো এবং আবারও এক‌ই সঙ্গে বলে উঠল,

_ পারি, এখানে কি করছ?

নিজেদের কথা শেষ হতেই তারা একে অপরের দিকে তাকাল। বিস্ময়ে হতবাক চোখে একবার নিজের পাশের নারীকে দেখছে তো আরেকবার ঐপাশের পুরুষের পাশে দাঁড়ানো নারীকে। তবে অপরিচিত যুবকের বিস্ময়কে আরো কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিতে হাজির হল নিশি, ফারিয়া। একটু দূরে থেকে পারি, সম্রাটকে দেখতে পেয়েই তারা ছুটে আসছে আর মৃদু চেঁচানোর সুরে ডেকে চলছে।

_ হেই, জিজু।

নিশি সম্রাটের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হেসে দিল। ওকে দেখে পারি ওর চুলের ঝুটি টেনে দিয়ে বলল,

_ এত সময় লাগে? দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নিজেকে খাম্বা মনে হচ্ছে।

_ আহ্, পারি শাকচুন্নী ছাড় বলছি। নয়তো...

_ কি হচ্ছে কি বাচ্চাদের মতো?

_ পারি?

অপরিচিত যুবকটি ঘোরে ডুবে গিয়েছে। সে ঘোরের মধ্যেই নিজের সঙ্গে থাকা নারীটিকে জিজ্ঞেস করল। তবে মজার বিষয় সেই নারী নিজেও অবাক। গোল গোল চোখ এইতো পাঁচ মিনিটের মতো গল্প করা অচেনা তরুণীর দিকে তাকিয়ে রইল। গল্পের সময়কাল পাঁচ মিনিট কিংবা একটু বেশি হলেও তাদের মধ্যে পরিচয় হয় নি। তবে এই কয়েক মুহুর্ত বুঝতে পারছে মেয়েটার নাম‌ও পারি। সম্রাট পারির কানের কাছে মুখ রেখে নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

_ উনারা কারা? চিনো উনাদের?

পারিও ঐভাবেই ফিসফিস করে বলল,

_ র্যান্ডম পাবলিক, এখানে দাঁড়িয়েই পরিচয় হল।

পাকিজাকে দেখিয়ে বলল,

_ আপু, এই পুতুলটার মা। আর ভাইয়া মেইবি!

_ বাবা!

উত্তর দিল সেই নারী। উত্তর দিয়েই নিজের কৌতুহল মেটাতে পারিকে জিজ্ঞেস করল,

_ কিছু মনে না করলে, আপনার নামটা প্লিজ!

নারীটির বলার ধরন দেখে পারি একবার সম্রাটের দিকে তাকাল। সম্রাট দু চোখের পাতা এক করে অনুমতি দিতেই পারি হাসি হাসি মুখে বলল,

_ পারি, পারিজাত আবরার চৌধুরী।

_ এ্যাহ! সত্যিই?

নারীটির কণ্ঠে অবিশ্বাস। প্রশ্ন করার ধরনে পারি বিব্রত হল, ভীত হল। সম্রাট কপালে চ‌ওড়া ভাঁজ ফেলে বলল,

_ এরকম রিএ্যাক্টের কোন কারণ?

_ স্যরি, আমার মিসেসের নাম‌ও সেইম।

তার স্বামী কথাটি বলতেই এইবার সম্রাটের পালা চমকানোর। তার মানে দু'জনের নাম‌ই পারিজাত। তবে ও স্বাভাবিক ভাবেই নিল বিষয়টি। বলল,

_ ইটস নরমাল। এক সঙ্গে এক‌‌ই নাম অনেক মানুষের হতে পারে। এখানে এমন প্রতিক্রিয়ার কোন কারণ তো নেই।

_ আছে! আপনার মি... স্যরি আপনাদের পরিচয় সম্পর্কে অবগত ন‌ই।

_ লাইফ!

বলেই সে পারিকে নিজের ডান পাশে মিলিয়ে ধরল। তা দেখে সেই যুবকটি মুচকি হাসল। আড়চোখে নিজের অর্ধাঙ্গিনীর দিকে তাকাতেই দেখল সেও তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। দুজনের ঠোঁটের কোণে হাসি। পারি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে দৃষ্টি নিচে নামিয়ে হাত খামচে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে রইল। আগন্তুক যুবকটি সম্রাটের দিকে হাত বাড়িয়ে পরিচয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,

_ আ'ম সম্রাট মাহমুদ তালুকদার, হাজব্যান্ড অফ মিসেস পারিজাত আবরার চৌধুরী।

এত সময় সম্রাটদের বিস্ময়ের সীমা থাকলেও এখন পারিজাতদের নেই। নিশি, ফারিয়াও চমকিত, বিস্মিত। একে অপরের মুখপানে চাওয়া চাওয়ি করছে। সম্রাট হতবাক চোখে পারির দিকে তাকিয়ে ব্যাক্কলের মতো হেসে আবার সিনিয়র সম্রাটের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল,

_ স্যরি, ভাইয়া... আমি আসল!

_ আমিও সারপ্রাইজ হচ্ছি! হাও ইজ দিস পসসিবল! আপনার নাম আমার নাম সেইম, আমাদের মিসেসের নামে‌ও মিল, শুধু নাম‌ই তো নয়। পদবী, সারনেম অল ইজ পারফেক্টলি ম্যাচ। আ'ম শকড।

শকড উভয়পক্ষ‌ই। জুনিয়র পারিজাত গোল গোল চোখে তার সামনে দাঁড়ানো দম্পতি যারা বিস্মিত চোখে তাদেরকে দেখছে। তারাও, উপস্থিত বন্ধু মহল‌ও। কীভাবে সম্ভব! এত মিল? নিশি নিজের দু গালে হাত রেখে ঘাড় কাত করে দু'পক্ষকেই দেখছে। আপনমনে বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করল,

_ ইয়া আল্লাহ, কি হচ্ছে এসব? এক‌ই চেহারার সাতজন পৃথিবীতে আছে শুনেছি, কিন্তু এ একই নাম, পদবীর একাধিক ব্যক্তি আছে এই প্রথম দেখলাম! তাও সব হুবুহু।

ফারিয়া একবার নিজের দলের দিকে আরেকবার ঐ দম্পতির দিকে তাকিয়ে বলল,

_ চেহারা আলাদা, তবে দুই পক্ষ‌ই ভয়াবহ সুন্দর, যাকে বলে আগুন সুন্দর।

_ হেই, গার্লস!

পিছন থেকে সিয়াম হাঁক পেড়ে উঠল। ওদের কণ্ঠে এদিকের সবার দৃষ্টি নড়চড় হল। জুনিয়র সম্রাট, পারিজাত পিছনে ঘুরে সিয়াম, তেহজীব, বাপ্পী, রাব্বীদের দিকে তাকাতেই ওরা কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করল,

_ টিকেট নেওয়া শেষ না?

ফারিয়া উত্তরে বলল,

_ টিকেট নিয়ে আর কি হবে, ভাইয়া? এখানেই তো হেব্বি থ্রিল হচ্ছে।

ওর প্যাঁচানো কথায় মাত্র আসা সবাই কপালে কয়েক পদর ভাঁজ ফেলে তাকাল। নাক মুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে সিয়াম বলল,

_ এ্যাই, তোমাদের না বলছি খিচুড়ি পাকাবা না। ক্লিয়ার করে বল।

_ ক্লিয়ার তো আমরাই হতে পারলাম না এখনো, ভাইয়া।

_ মানে?

_ মানে হল, এই কিউট ভাইয়া আপু আর আমার বেস্টি পারিজাত আবরার চৌধুরী এবং আমার ওয়ান এন্ড অনলি হ্যান্ডসাম জিজুর হোল ডাটা সেইম।

_ হোয়াট!

_ এ্যাই, পাজি মেয়ে দুটো সবসময় ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলবে!

সিয়ামের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি প্রকাশ হবার আগেই তেহজীবের মৃদু ধমক। ধমক খেয়ে নিশি, ফারিয়া ঠোঁট উল্টে সম্রাটের দিকে তাকায়। সম্রাট ওদের দুজনের বকা খাওয়ার পরের প্রতিক্রিয়া দেখে মৃদু হাসল, অতঃপর তার বন্ধুদের উদ্দেশ্য সবটা খুলে বলল। এরপর আর কি! তাদের মুখ‌ও হা।

এদিকে সিনিয়র লাভ বার্ডস হাসছে, যা জুনিয়রদের কাছে অদ্ভুত ঠেকছে। সিনিয়র সম্রাট জুনিয়র সম্রাটের কাঁধে হাত রেখে হালকা চাপড়ে বলল,

_ আমি আমাদের নাম, পদবী মেলায় সারপ্রাইজড হলেও বেশি সারপ্রাইজ হয়েছি এই দেখে যে, আমাদের দুজনের কাছেই দু'টো পারিজাত আছে।

জুনিয়র সম্রাট এই কথায় তার পারিজাতের দিকে তাকিয়ে হাসল। পারিজাত‌ও তাকিয়ে আছে তার সম্রাটের দিকে।
সিনিয়র পারিজাত জুনিয়র পারিজাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে জুনিয়র সম্রাটকে জিজ্ঞেস করল,

_ ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, বিয়ে তো বোধ হয় হয়নি!

_ উমম, নো!

সম্রাট 'না' বলেই মাথা নুইয়ে নিল। লজ্জায় তার কানের লতি লাল হয়ে উঠেছে। পারি এত সময় সম্রাটের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল। এই প্রশ্ন উঠতেই সে খানিকটা সরে দাঁড়াল। ওদের বন্ধু মহলের কেউ ভ্রু কুঁচকে, কেউ এক চোখ উঁচিয়ে তাকাল সিনিয়র জুটির দিকে। জুনিয়র সম্রাট, পারির প্রতিক্রিয়া দেখে সিনিয়র দম্পতি বলল,

_ ইটস ওকে! লজ্জা পাবার কিছু নেই। আমরা‌ও আপনাদের মতোই ছিলাম। ইউনিভার্সিটির সিনিয়র, জুনিয়র।

এটা বলতেই যেন সে নিজেদের সম্পর্কের শুরুর সময়ে চলে গেল, চোখের সামনে ভেসে উঠল তার সম্রাটকে পেতে করা সেই খুনসুটি, দুষ্টুমির মুহূর্তগুলো। তাকে এড়িয়ে চলার জন্য সম্রাটের দেখানো হাজার রকমের বাহনা। যা কোনটাই তার মন থেকে বের হয়নি।
পারিজাতের কল্পনা অনুভব করে সিনিয়র সম্রাট তার পারিজাতের কাঁধে হাত রেখে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,

_ যত শিগগির সম্ভব বিয়ে করে নিজের নামের মোহর গেঁথে নিন। মনে রাখবেন, সম্পর্ক পাকাপোক্ত করায় যত দেরি তত সমস্যা। সাত বছর পস্তিয়েছি। আল্লাহ রহম হয়েছে, তাই এখন একসঙ্গে আছি, নয়তো!

সিনিয়র সম্রাটের মুখে আঁধার নেমে এলো। সে তার পাশে তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসার চেষ্টা করল। সিনিয়র পারিজাত স্বামীর বুকে হাত রেখে আদ্র কণ্ঠে বলল,

_ ওসব কেন মনে করছ।

_ তুমিও তো করলে!

_ সেগুলো ভালো মুহূর্ত, যেখানে কোন বিরহ নেই।

_ হুম।

বলেই সে পারির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে এতগুলো মানুষের সামনে পারির কপালে ঠোঁট চেপে ধরল, প্রগাঢ় চুম্বনে তার সমস্ত আবেগ ঢেলে দিচ্ছে। অপর পাশের সিনিয়র দম্পতির কান্ডে জুনিয়র পারি লজ্জায় টমেটো হয়ে তার সম্রাটের পিঠ পিছনে মুখ লুকিয়ে নিল। যদিও তার সম্রাট বেলাজের মতো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে র‌ইল, তার ওষ্ঠ জুড়ে দুষ্টু হাসি। বাকীরা এদিকে ওদিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। তবে বেয়াদব, বেলাজ নিশি, ফারিয়া হাতের তালুতে গাল ঠেকিয়ে সেই হাত অন্য হাতের কনুইয়ের উপর রেখে ঘাড় কাত দেখছে আর হাসছে। জুনিয়র পারি তার লোকের বেশরমের মতো আচরণে ক্ষীণ চটল, সে পিছন থেকে সম্রাটের চোখের উপর নিজের হাত রেখে ঐ দৃশ্য দেখা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে আরো লজ্জায় পড়ে গেল। সম্রাট তার হাতের তালুতে ঠোঁট ছুঁয়ে দিতেই চট করে সে হাত নামিয়ে নিজের পিছনে লুকিয়ে ফেলল। জুনিয়র সম্রাট তার বোকা নারীর কান্ডে হেসে কুটিকুটি। কিন্তু সবার মাঝখান দিয়ে আরো এক চমক হিসেবে ছোট পাকিজা মাহমুদ সুখ বলে উঠল,

_ পাপা, আমাকেও পাপ্পা দাও।

সিনিয়র সম্রাট ব‌উকে ছেড়ে তার প্যান্টের কাপড় খামচে ধরা শিশু কন্যার নিষ্পাপ হিংসুটে মুখখানা দেখছে। যার কাছে তার বাবার সব আদর শুধু তার জন্যই বরাদ্দ থাকতে হবে। সেখান থেকে এক বিন্দু‌উ কাউকে দেবে না সে। মাকেও না। সে এক হাত দিয়ে মেয়েকে চট করে কোলে তুলে নিয়ে মেয়ের নাকে মুখে আদর করে দিল। জুনিয়র সম্রাট পুতুলের মতো সুন্দর বাচ্চাটাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললে,

_ বেবি, আংকেল আসো!

সুখ তার বড় বড় চোখ জোড়া মেলে জিজ্ঞাসু চাহনিতে তার বাবার দিকে চাইল। সম্রাট দুচোখের পাপড়ি নামিয়ে মেয়েকে অনুমতি দিতেই তার মেয়ে ঐ সম্রাটের কোলে চলে গেল। পুতুলটাকে কোলে পেয়ে জুনিয়র দম্পতি সহ তাদের বন্ধুরা তাকে নিয়ে মেতে উঠেছে। এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। সিনেমা দেখতে আসা দর্শকদের সবাই একে একে ভেতরে ঢুকছে। বাকী শুধু এই কয়েক জন। সুখ এত অচেনা আন্টি আংকেলদের আদর পেয়ে বাবা মাকেই ভুলে যাচ্ছে। এদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিনিয়র দম্পতি মুগ্ধ চোখে দেখছে তাদের কার্বন কপিদের। জুনিয়র দম্পতি তাদের মেয়ে নিয়ে মেতে উঠেছে। এর মধ্যে বাপ্পী এক গাদা চকোলেট কিনে এনেছে। তা দেখে সম্রাট নিষেধ করতে যেতেই পারি আঁটকে দিয়ে বলল,

_ থাক। দেখছ না তোমার মেয়ে তাদের কাছে গিয়ে আমাদের‌ই ভুলে গিয়েছে।

_ হুম!

বলেই সম্রাট মুচকি হাসল। অতঃপর অবাক হবার ন্যায় বলল,

_ অমিল রয়েছে কোথাও না কোথাও!

_ কোন বিষয়ে?

পারির জিজ্ঞাসা। সম্রাট সামনের দম্পতির থেকে দৃষ্টি সরাল না। বরং আর গাঢ় চাহনিতে চাইল, এরপর বলল,

_ আমাদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি এফোর্ট দিয়েছ, তুমি। তুমিই আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছিলে। তুমিই নিজেকে বারবার বেহায়া রূপে হাজির করেছিলে। তোমার বারবার প্রেম ভিক্ষা চাওয়া, আমাকে নিজের করে নেওয়ার তীব্র জেদ‌, যা একদিন আমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল। আমাকে নিজের ছোট পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে তোমার উচ্চাভিলাষী জীবনের দিকে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিল। আবার সেই তুমিই একদিন হারিয়ে গিয়ে আমাকে নতুন রূপে গড়তে উৎসাহ যোগালে। আমার একটা ভুলের দায়ে তুমি জীবননাশের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে। আমাদের সম্পর্কে সবদিক থেকেই তুমি এগিয়ে। আর এদের মধ্যে কে, জান?

_ কে?

_ সম্রাট!

_ কীভাবে বুঝলে!

_ প্রেমিকের ধরণ বুঝতে হলে তার চোখের দিকে তাকাতে হয়। ঐদিকে দেখ, ওর চোখ ঘুরেফিরে তার নারীর পানেই আঁটকে থাকে।

হ্যাঁ, পারিও দেখছে। জুনিয়র সম্রাটের মুগ্ধতা জড়ানো চাহনি তার নারীতেই আবদ্ধ। সিনিয়র পারি হাসল। নিজের পুরুষের বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বলল,

_ তোমার একটু ভুল আছে।

_ কেমন?

_ আমাদের সম্পর্ক শুরুর এফোর্ট আমার থাকলেও, তাকে বাঁচিয়ে রাখার এফোর্ট তোমার। আর ওদের মধ্যে, ওদের উভয়েরই। দেখ, ওরাও একদিন সব বাঁধা ডিঙিয়ে এক হবে। আমাদের মতো।

_ ইনশাআল্লাহ।

_ আরো একটি চমৎকার বিষয় আছে, কি বল তো!

_ কি?

_ তোমারও এমন পাগলি কয়টা বান্ধবী ছিল, আর আমার ছিল পাগল জাভেদ।

_ হুম, আমি ওদের খুঁজে মিস করছি। জানি না কে, কোথায় আছে?

_ যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক। আমরা এই দোয়াই করি, তাই না!

_ হুম।

__ পাপা!

সুখ জুনিয়র সম্রাটের কোল থেকে উঁকি দিয়ে তার বাবাকে ডেকে উঠল। সম্রাট, পারিজাত মেয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে এক‌‌ই সঙ্গে উত্তর দিয়ে উঠল,

_ হ্যাঁ মা।

_ পাপা, আংকেল বলে নাম বলে সম্লাট!

বাবার নামে নাম শুনে তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। সে তো জানে তার বাবার নাম সম্রাট। এক‌ই নামে অনেক মানুষ হয় নাকি? মেয়ের অবুঝ ভাবনা বুঝতে পেরে সম্রাট, পারিজাত এক‌ই হেসে দিল। সম্রাট হাত বাড়িয়ে কোলে নিয়ে বলল,

_ হ্যাঁ, মামা। ঐ আংকেলের নাম‌ও সম্রাট!

_ দুইতা সম্লাট, দুইটা পালিজাত?

_ হুম, দুইতা সম্লাট দুইটা পালিজাত!

_ তাহলে দুইতা মাম্মা, পাপা?

সে মাথায় হাত দিয়ে কথাটা বলল। তার কথায় থমকাল সবাই। সিনিয়ররা হাসছে মেয়ের অবুঝ বদনে তাকিয়ে। জুনিয়রা বিস্ময়কর চোখে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে।

সময় ফুরাল, বিদায়ের পর্ব এলো।
সিনিয়ররা জুনিয়রদের উপদেশ দিয়ে বলল,

_ হালাল হয়ে যান, হারামে থাকতে নেই বেশিদিন। আর হ্যাঁ, যেকোন সহযোগিতায়, পাশে আছি।

বলেই হাত বাড়িয়ে দিল। জুনিয়র সম্রাট হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে সিনিয়রের বুকে লাগল। এরপর বলল,

_ নিজের নামের কাউকে ভাই ডাকতে লজ্জা করছে, তবে আমরা মিতা হতে পারি!

_ অবশ্য‌ই!
আমার পারিজাতের ছায়া আরেকটি পারিজাত তোমার কাছে, আশাকরি তাকে ভালো রাখবে!

_ সম্রাটের দেহ থেকে রূহ আলাদা হয়ে যাবে, তবুও সে পারিজাতকে ছাড়বে না।

_ আল্লাহ সুখি করুক, একসঙ্গে রাখুক জীবন মরনের সাথী করে।
হেই, জুনিয়র পারিজাত, আমার মিতাকে খুব ভালোবেসো। যদিও পারিজাতরা জন্মগত ভালোবাসার সমুদ্র হয়ে জন্মায়, তাদের পুরো হৃদয়‌ জুড়েই শুদ্ধ ভালোবাসা থাকে। আশা করি তোমার মাঝেও তাই , আমার মিতার সঙ্গে বহু বছর সরলরেখায় বাচো।

_ আমিন।

সবাই একসঙ্গে উত্তর দিল। এরপর বিদায় নিয়ে চলে গেল।

যার যার পারিজাতের হাত তার তার মুঠোয় পুরে নিজেদের গন্তব্যে যেতে পা বাড়াল। সিনিয়র পারিজাত তার সম্রাটের কোলে থাকা তার ভালোবাসার অস্তিত্বের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, ছোট ছোট হাত দুটো নাড়িয়ে সুখ রাজ্যের অলীক গল্প বলে চলে, সে প্রাণ ভরে সুখ অনুভব করে তা শুনে। জুনিয়র পারি তার সম্রাটের কদমে কদম মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একবার পিছু ফিরে তাকাল। অতঃপর মুচকি হেসে সম্রাটের দিকে ফিরে বলল,

_ বাবুটা পুতুলের মতো সুন্দর না!

_ ও সত্যিই যেন ওর বাবা মায়ের সুখের চিহ্ন। বাবা মায়ের সুখ!

_ হুম, ইনশাআল্লাহ, আমাদের বিয়ের পর যখন আমাদের মেয়ে হবে, তখন আমরা আমাদের মেয়ের নাম সুখ রাখব।

বিয়ে, মেয়ে! শব্দ গুলো পারির মনে অজানা সুখের ঝক্কার তুলল। সে চোখ তুলে চাইল, সম্রাটের চোখের দিকে। যেই চোখে ভেসে থাকে কঠোর অঙ্গীকার, পূর্ণ আস্থা।

বোনের বিয়ের কেনাকাটা নিয়ে সম্রাট বেশ ভালোই ব্যস্ত সময় পার করছে। এর মধ্যেই একদিন তার মা, বোনেরা এসে অনেক কেনাকাটা করে গিয়েছে। এখন শুধু বাড়ির সাজসজ্জা বাকী। সম্রাট দু'দিন আগে যাবে বলে সবাইকে জানিয়েছে। নেহায়েৎ বোনের বিয়ে, নয়তো এই মুহূর্তে তার পারিকে ছাড়া কোথাও কিছু করতে ইচ্ছে করে না। বিয়ের মৌসুম উপলক্ষে পারিও বেশ ব্যস্ত সময় পার করছে। আজকাল মানুষ সব প্রোগ্রামেই কেক রাখে। যা কেক ব্যাবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত খুশির খবর। পারির ব্যস্ততায় সে সম্রাটের ব্যস্ততা টের পাচ্ছে না যা তার জন্য ভালো হলেও সম্রাটের জন্য নয়। সে ভীষণ‌ই দুঃখ পাচ্ছে এই ভেবে যে একমাত্র ভাই হিসেবে সে বোনের বিয়েতেও অতিথি হয়ে যাবে অথচ যার জন্য তার এই এত বড় ত্যাগ সেই বেপাত্তা থাকে। তাকে একদম সময় দিতে চায় না মেয়েটা।

একদিকে এই নিয়ে তার অভিযোগ আরেক দিকে নিজের পকেটের পয়সা খসিয়ে সে পারির আর্জেন্ট কেকের ভেলিভারি সম্পন্ন করে তার ক্লাবের ছেলেদের দিয়ে। তবে আজ সকাল থেকেই মনটা খচখচ করছে। কিছু উদ্ভট অনুভূতি হচ্ছে। সকালে ঘুম ভেঙেছে ভুলে যাওয়া কোন অর্থহীন স্বপ্ন দেখে। সে পারিকে নিয়ে এমন স্বপ্ন দেখে না। দেখতেও চায় না। সে পারিকে সরাসরি ওভাবে পেতে চায়। তার চাওয়ার মাঝে পারি পবিত্র, ভোরের শিশিরের মতো স্নিগ্ধ। শিগগিরই সে পারিকে তার জন্য হালাল করবে। এসব প্রেমেটেম চলবে না। প্রেমিকা হিসেবে নয়, সে পারিকে সবার সামনে ব‌উ হিসেবে পরিচয় করাতে চায়। চাকরিবাকরির একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলে ভালো না হলে নাই। বাবার কথায় রাজী হয়ে পারিবারিক ব্যাবসায় বসে যাবে। তাও পারিকে তাই। খুব তাড়াতাড়ি, খুব কাছে।

সম্রাট হান্ড্রেড টাইম পুষ আপ করে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে বারান্দায়, বাইরে প্রখর রোদ উঠেছে। তার মধ্যে‌ই সে চকচকে সাদা টাইলসের উপর গা মেলে চোখ বুজে শুয়ে রয়েছে উপরের দিকে মুখ করে। ঠোঁট জুড়ে মিষ্টি হাসির বলিরেখা।
তার সুখ সহ্য হল না তার প্রিয় বন্ধুর। সে ফোন করে এই সুখি সম্রাটের সুখে বিঘ্ন সৃষ্টি করল।
সম্রাট রুমে চার্জিংয়ে থাকা মুঠোফোনের তীব্র কর্কশ আওয়াজে বিরক্ত হয়ে চোখ মেলতেই তীব্র রোদের প্রখর আঁচে মুহুর্তের মধ্যে চোখমুখ কুঁচকে নিল। বিরক্তি সূচক শব্দ তুলে হালকা কাত হয়ে এক চোটে উঠে দাঁড়াল। ট্রাউজারের পকেট হাত ঢুকিয়ে বেড সাইড টেবিলের উপর থেকে ফোনটা নিয়ে চার্জিং পয়েন্ট থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বাপ্পীর নাম্বার দেখে বিড়বিড় করে কয়টা গালি দিল, রিসিভ করে এরপর কানের ধরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই বাপ্পীর কম্পিত কণ্ঠস্বর শুনে থমকাল।

৫৪



৫৫


৫৬

#সুখ_ফড়িং_সিজন_২
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৫৬

“কি করতেছ তোমরা?"

ঘরের বাইরে থেকে জোর ধমকে কেঁপে উঠল মানব পুতুল জোড়া। নরম কদম ঘুরিয়ে দরজার সামনে অগ্নিশর্মা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মা'কে দেখে চোখের পাপড়িদ্বয় কয়েকবার ঝাপটা মেরে নিষ্পাপ বুলিতে বলল,

“আমলা খেলনা নেই, আম্মু!"

সম্রাট তালুকদারের আলা ভোলা ছানা দু'টো হাত পিছনে লুকিয়ে ঠোঁট গোল করে গুটুর গুটুর চোখে চেয়ে থেকে সৎ উত্তর দিল। উত্তর শুনে পারিজাতের মনে হচ্ছে তার মাথায় কেউ বারি মেরে ক্ষণিক সময়ের জন্য বেহুঁশ করে দিলে ভালো হতো। এসব অত্যাচার নেওয়া তার জন্য কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। রাতে ঘন্টা লাগিয়ে গুছিয়ে রাখা লাগেজের সব কাপড় ফ্লোরে ম্যাটের উপর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। পারিজাতের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল। ইচ্ছা করছে দুটোর পিঠ ফাটিয়ে দিতে।
সে পা বাড়ায় ঘরের ভেতর, গলার স্বর পূর্বের চেয়ে‌ও উঁচিয়ে যেই না ধমকে উঠল তখুনি দরজার সামনে থেকে শোনা গেল বাজখাঁই কণ্ঠে তাকে শাসানোর স্বরে সম্রাটের বলা কথা,

“ কি হয়েছে? সকাল সকাল কেন আমার মা বাবাকে বকছ?"

পারিজাত পিছনে ঘাড় ফিরিয়ে গাল ফুলিয়ে, কপাল কুঁচকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

“ সারা রাত তুমি শান্তি দেও না, সারাদিন তোমার বাচ্চারা! কী করছে, দেখ? কাল কত সময় লাগিয়ে আমি এসবে গুছিয়ে ছিলাম! এখন এসে দেখি সব ফেলে দিয়ে তারা খেলনা.... খেলনা ওদের পিঠে দিব!"

ন“ আচ্ছা ঠিক আছে,এত রাগের কিছু হয়নি। তুমি গিয়ে নাস্তা রেডি করো। আমি দেখছি, আমার বাচ্চারা যেহেতু তোমার ক্ষতি করছে সেহেতু তারা দায়ভার আমার‌ই। ”

পারিজাত দাঁতে দাঁত চেপে ঠোঁট টিপে কয়েক পলক দেখল সম্রাটের আলাভোলা সাজার নাটক। অতঃপর পা ছিটাতে ছিটাতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,

“ যা খুশি করো। আমি সব গোছানো পেলেই হল।"
“ হু!"

পারিজাত বেরিয়ে গেল। সম্রাট ঘরের ভেতর অসহায় চোখে চেয়ে থাকা দুই অপরাধীর দিকে তাকাল। একজন অসহায় চোখে এমন ভাবে চেয়ে আছে যেন সে কিছুই করেনি। ভাজা মাছটিও উল্টে খেতে জানে না। আরেকজন ছলছল চোখে চেয়ে আছে তার দিকে।
এই বুঝি তার গাল গড়িয়ে পড়ল মুক্তোর দানাগুলো। সম্রাট চার কদমে মেয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পিছনে হাত নিয়ে লুকিয়ে রাখা ছোট বার্বি ডলটা নিয়ে লাগেজের ভেতর রাখল। মেয়ের ছোট্ট নরম তুলতুলে হাত দুটো নিজের বাম হাতের মুঠোয় পুরে ডান হাতে মেয়ের গাল ছুঁয়ে আহ্লাদি সুরে জিজ্ঞেস করে,

“ কি হয়েছে আমার আম্মার? কাঁদে কেন?"

বাবা আহ্লাদি সুখ আইসক্রিম এর মতো গলে পড়ল। টলমলে চোখ জোড়া মেলে বড় বড় চোখে চেয়ে থেকে ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো স্বরে অভিযোগ দায়ের করল মায়ের নামে,

“ আম্মু, মালে!”

“আমাকেও মারে! দুষ্টুমি করলে সবাইকে মারে!"

সম্রাট মেয়ের চোখ মুছে অসহায় মুখ বানিয়ে বলল। যা শুনে ন্যাকা কান্না বন্ধ করে ফ্যালফ্যাল চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে তার মেয়ে। এদিকে তার অতি বুদ্ধিমান ছেলে তার ঘাড়ের কাছে খামচির দাগ দেখে সেখানে নিজের তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে ছুঁয়ে বাবাকে বলল,

“আম্মু, তোমাকেও মেলেছে বাবা?"

সম্রাট চোখ মুখ কুঁচকে অন্যদিকে ফিরে তাকাল। ছেলের রাখা হাতের উপর নিজের হাত রেখে ব্যাক্কলের মতোন হেসে ছেলের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলত লাগল,

“কথা না শুনলে আম্মু সবাইকে মারতে পারে। নাও, এখন ফটাফট বাবাকে হেল্প করো। সব গুছিয়ে রেখে রেডি হতে হবে তো নাকি! নানা বাড়ি যাবে না?"

“যাব নানা বালি!"

“ গুড। ফাস্ট, বাবাকে হেল্প করো দুজন।"

পারি চটপট হাতে নাস্তা তৈরি করছে। তাকে সাহায্য করছে খালা। তিনি পারির স্থির গতিতে কাজ করতে দেখে পারির উদাস মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কীয়ৎকাল। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন,

“বাপের বাড়ি যাইতেছেন, মুখটা ওমন শুকনা ক‌ইরা রাখছেন ক্যান মামী?"

পারিজাতের হাত থেমে গেল। মাথা তুলে জানালার বাইরে তাকায়। মেঘ মুক্ত ঝলমলে আকাশপানে উদাস নয়নে চেয়ে থেকে আপনমনে বিড়বিড় করে বলল,

“বাপ-মা ছাড়া বাপের বাড়ি হয় না খালা।"

পারিজাত সম্পর্কে মোটামুটি উনি অনেকটাই জানেন। তাই এই কথায় তার‌ও মুখে আঁধার নেমে এলো। সঙ্গে নিজের জীবনের কিছু শূন্যতা বুকের মধ্যে পীড়া দিতে শুরু করল। পারিজাত আবার‌ও কাজে মনোযোগ দিল। খালা জিজ্ঞেস করলেন,

“ বাড়িতে যে চাচী আছে আপনার, হেয় কি যত্ন আর্তি করে না?"

খালার কথায় ঠোঁট ভেটকিয়ে হাসল পারিজাত। তার যত্নের কিছু নমুনা কল্পনা করে বিড়বিড় করে বলল,

" তার যত্নের কারণেই তো আমার জীবন জাহান্নামে পরিণত হয়েছিল। আল্লাহ উনাকে হেদায়েত দান করুক।"

পারিজাতের বিড়বিড় করে বলা বাক্যটুকু খালার কান অবধি পৌঁছাল না। তবে তিনি বুঝে নিয়েছেন বোধহয়। তাই আর কোন প্রশ্ন না করে নিজের কাজে মনোযোগ দিল। পারি পরোটায় ঘি দিয়ে ভাঁজতে ভাঁজতে ভাবতে থাকল জীবনের ফেলে আসা সেই দগদগে অতীত গুলো। কেন সে তার চাচীর চক্ষুশূল? কেনই বা তার মায়ের মারা যাবার এত বছর পরেও তার চাচী অত কুৎসিত মন্তব্য করে তার মাকে নিয়ে! একটা মানুষ কতখানি কদর্যতা ধারণ করতে পারে?
আর তার বড় চাচা! একমাত্র ভাইয়ের রেখে যাওয়া একমাত্র সন্তান, অস্তিত্ব। যে তাদের কাছে কোনদিন এক থালা ভাত‌ও চায়নি। তারপরেও এত কিসের আক্ষেপ তার নিজের ভাইয়ের প্রতি, তার অস্তিত্বের প্রতি?

সময়টি পিছিয়ে গেল সেদিনে। পারিজাতকে বিয়ে করে সম্রাটের খুশি বাঁধন হারা হয়। খুশিতে দিশেহারা সম্রাট পারিকে নিয়েই বাগেরহাট যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কোন্ কোন্ আনুষ্ঠানিক বিয়ে ছাড়া পারি শ্বশুর ভিটেয় যাবে না বলে সিদ্ধান্তে অটল থাকে। সম্রাট প্রথম গাঁইগুই করলেও পরে তার নব্য বিবাহিতা স্ত্রীর অনুরোধে তাদের বিয়ের দ্বিতীয় দিন‌ই বাগেরহাট যেতে বাধ্য হয়।

সোহানির বিয়ের সব আয়োজন তখন মাহমুদ তালুকদার একাই সামলাচ্ছেন। ছেলে মেয়ের স্বাধীনতায় কখনোই তিনি বাঁধা হয়ে দাঁড়াননি। সেবার‌ও দাঁড়াল না। মেয়ের বিয়েতে তার একমত ছেলে এত উদাসী বিষয়টিতে উনার খটকা লাগলেও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাননি। ছেলে সমাজ সেবা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, যুবক ছেলে। তাকে কিইবা বলবে?
এদিকে তানহার আনাগোনা বাড়িতে তখন একদম স্বাভাবিক। তিনি মনে মনে এটে নিলেন এবার ছেলেকে জানাবেন। চাকরিবাকরির হোক বা না হোক। বড় মেয়ে বিদায় দিয়েই তিনি ছেলেকে বিয়ের ফাঁদে আঁটকে ফেলবেন। পাছে ছেলে ভুল কিছু ঘটিয়ে না ফেলে। সিদ্ধান্ত মনের মধ্যে পুষে রেখে যুবক ছেলের যৌবনের দায়িত্ব নিলেন পিতা হয়ে তিনিই।

“ আংকেল, সকালে গাঁদা ফুল দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল! এখন‌ও আসেনি?"

তানহা ঘরের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে সুবিশাল উঠান জুড়ে প্যান্ডেল বানানোর কাজে ব্যস্ত থাকা মাহমুদ তালুকদারকে জিজ্ঞেস করল। গদখালি থেকে ফুল আনানো হচ্ছে। পুরো বাড়ি ফুলে মুড়িয়েছে সোহানির পছন্দ অনুযায়ী। আর এই দায়িত্ব স্বানন্দে পালন করছে তানহা, মানহা। রূহানীর মেডিক্যাল কলেজে পরীক্ষা ছিল। আজ শেষ পরীক্ষা দিয়েই সে বাড়িতে ফিরেছে।
মাহমুদ তালুকদার তানহার আদুরে চেহারার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন। এই চমৎকার কণ্ঠের মেয়েটি তার ভবিষ্যৎ পুত্রবধূ। যেমনি দেখতে তেমনি দায়িত্বশীল। বিষয়টা একজন ছেলের বাবা হিসেবে উনাকে আনন্দিত করে। প্রত্যেক বাবা মাই ছেলের জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী কাম্য করে। সেখানে মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতোই তাদের ঝুলিতে এসে পড়ে এই অপ্সরার মতো সুন্দরী মেয়েটা। তানহা পূণরায় জিজ্ঞেস করতে যাবে বলে মুখ হা করতেই উঠান পেরিয়ে মাথা উঁচিয়ে থাকা খান্দানি লোহার সুউচ্চ ফটকের কলাপসিবল গেইট পেরিয়ে একজন লোক বাড়ির ভেতর উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ তালুকদার ম্যানশন, ফুলের অর্ডার ছিল!"

“ জি, জি আসুন।"

একজন যুবক বয়সী লোক এগিয়ে গিয়ে দরজার বড় অংশ খুলে দিল। একটা মাঝারি সাইজের পিকাপ ভ্যান ভেতর ঢুকল। তানহা উচ্ছাস নিয়ে বেরিয়ে এলো মাথায় ওড়না টেনে। মাহমুদ তালুকদার তানহাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ দেখ নেন, আম্মা। আরো কিছু লাগলে উনার কাছেই বলুন, ব্যবস্থা হয়ে যাবে।"

রোগাপাতলা একটা মধ্যবয়স্ক লোককে ইশারা করে দেখিয়ে বললেন। তানহা আপ্লুত গলায় বলল,

“ জি, আংকেল!"

সোহানি বাড়ির চারপাশে ঘিরে থাকা বিশাল চ‌ওড়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে দেখছে তার বিয়ে উপলক্ষে বাড়ির সবার ব্যস্ততা। তবে মনটা একটু খারাপ। কেননা তার একমাত্র বড় ভাই ও বোন নেই। তার চেয়েও বড় কথা তার একমাত্র ভাবীও থাকছে না। হ্যাঁ, তানহাকে বলা হয়েছে। সম্রাট নিজেই জানিয়েছে কাল ফোন করে। নিজের খুশি পরিবারের সাথে ভাগ না করে থাকতে পারে না সে। কিন্তু এই মুহূর্তে এভাবে কাউকে বলাও যায় না। তাই বোনকে ফোন করে কিভাবে বলবে ভাবছিল। বড় ভাইয়ের নিরবতায় সোহানি আদুরে গলায় শাসনের সুরে বলল,

“ কিহ! তোমার আগে আমার বিয়ে হচ্ছে বলে, তোমার মানসম্মানে লেগেছে? এখন তুমি বিয়ে করে ব‌উ ছাড়া বাড়িই আসবে না? আচ্ছা, সমস্যা নাই। এসো, তোমাকে আমার ননদদের মধ্যে থেকে সবচেয়ে সুন্দরী একটার সাথে বিয়ে দিয়ে দিব। ইন ফিউচারে তোমার ব‌উ আমাকে টর্চার করলে, আমি তার ভাইকে টর্চার করে প্রতিশোধ নিতে পারব।"

সম্রাট বোনের দুষ্টু কথায় হেসে ফেলে। এমনিতেই সে খুশিতে বাকবাকুম তার মধ্যে বোনের পাগলামি কথা। সে হাসতে হাসতে সগর্বে অবলীলায় বলে দিল তার রাজ্য জয়ের কথা। তার রাণীকে নিজের নামে লিখে নেবার সেই দুঃসাহসী যুদ্ধের বর্ণনা।

“ এমন কিছু করার সুযোগ তুমি পাচ্ছ না, সিস্টার।"

সোহানি ভাইয়ের কথায় কপালে ভাঁজ ফেলে কিছু নতুন আবিষ্কার করার প্রয়াসে জিজ্ঞেস করে,

“ কেন?"

“কেন?"

এতটুকু বলেই সম্রাট আবার হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতে মাথার গুছিয়ে রাখা চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। আবার সেগুলো গুছিয়ে নিল। বাপ্পী বল সোফায় বসে বন্ধুর উচ্ছাস দেখতে। মাতালের মতো খুশি উৎযাপন দেখছে। পাগলের মতো তখন থেকে হেসেই চলেছে। যে সে ভীষণ বড় কিছু অর্জন করে ফেলেছে। সম্রাট চুল গুছিয়ে ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলতে লাগল,

“এখন যা বলব, তা শোনার জন্য তুমি নিজেকে স্থির করো, ব্যাহেন। আর হ্যাঁ, খবরদার এই কথা এখন পাঁচকান করবি না। সময় হলে, আমিই সবার সামনে নিয়ে হাজির করব। বুঝেছ?"

সোহানীর এবার সত্যিই চিন্তা হতে লাগল। সে এবার গুরুগম্ভীর স্বরে ভাইকে জিজ্ঞেস করল,

“ কি হয়েছে, ভাই? সিরিয়াস কিছু? প্লিজ, তাড়াতাড়ি বল! আমার চিন্তা হচ্ছে!"

“ শুধু চিন্তাই না। তোমার প্রেসার ফলড করবে, কুটুপাখি। তাই বলছি, বি কেয়ারফুল আর হ্যাঁ!"

“সোহানী!"

বাইরে থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর। যা মোবাইল থেকেও শোনা গেল। সম্রাট ললাটে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,

“তানহা না?"

সোহানি তানহার ডাকে সাড় দিল না। সে নিজের ভাইয়ের কথা শোনায় মনোযোগ দিয়ে তার উত্তর দিল,

“ হুম!"

“ ও, আমাদের বাসায় কি করছে?"

“ আমার বিয়ে উপলক্ষে এসেছে! বাবা নিজেই দাওয়াত করেছে, এখানে থেকে সব আয়োজন উপভোগ করার জন্য!"

“ওহ!"

যেহেতু জব্বার মন্ডলের সঙ্গে মাহমুদ তালুকদারের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে, তাছাড়াও দুজনের মধ্যে বেশ ভালো বন্ধুত্ব সেখানে তার মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে তার বাড়িতে তানহার দীর্ঘদিন থাকা খুবই সাধারণ বিষয়। সম্রাট সেটা নিয়ে ঘাঁটল না। সহজ ভাবে নিয়ে বোনকে বলল,

“ ও কি তোর পাশে?"

“ না, বাইরে থেকে ডাকছে। বোধহয় কোন কাজ আছে। তুমি আমাকে আসল কথাটা বল, প্লিজ। আমার প্রেসার ফলড করবে, ভাই!"

“ আমি বিয়ে করেছি!"

খুব সহজে এক বাক্যে বলে দিল। সোহানির মনে হল সে ভুল শুনেছে। তার কান ভুল কিছু শুনে বসে আছে। সে আঙ্গুল দিয়ে নিজের কান খুঁচিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকাল। যেখানে জ্বলজ্বল করছে ‘ভাইয়া' শব্দটি। ঢোঁক গিলে নিজের ধুকপুক করা বুকের উপর হাত রেখে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল,

“ ভাই, তুমিই বলছ?"

সম্রাট বোনের প্রতিক্রিয়া অনুভব করে হাসল। সে হাসিতে কি ছিল জানা নেই। তবে বাপ্পীর মনে হল এই হাসির সমাপ্তি ঘটবে, খুব শিগগিরই। কেননা লোকে তখনি অতি হাসে যখন স্রষ্টা তাঁর জন্য কান্নার ব্যবস্থা করে রাখে। বাপ্পীর বুকে কামড় দিল। সম্রাটের মুখের ঐ উজ্জ্বলতা, ঠোঁটের ঐ ভুবন ভুলানো হাসি, তা কি মিলিয়ে যাবে?

“তোর ভাবীর ছবি দেখবি?"

সোহানি ঘোরে ডুবে গেছে। ঘোর থেকে জিজ্ঞেস করে,

“ সত্যিই বিয়ে করেছ?"

“ ওয়েট, তোর ভাবীর ছবি পাঠাচ্ছি। সি ইজ মাই কুইন। ডু ইউ নো? সি ইজ দ্যা মোস্ট বিউটিফুল উইমেন আই হ্যাভ ইভার সিন। আ'ম জাস্ট বিয়িং ক্রেজি ফর হার। গো, এন্ড সি হার। আই সেন্ট এ্যা পিকচার টু ইউর হোয়াটসঅ্যাপ

“ হু!"

সোহানি গলার স্বর নামিয়ে কম্পিত হাতে মোবাইল কান থেকে সরিয়ে মোবাইলে জ্বলজ্বল করা স্ক্রিনের পর্দা নাড়িয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ভাইয়া লেখা একাউন্ট ঢুকতেই ভেসে উঠল মায়াবীনি এক মুখ। যে তার ভাইয়ের বুকে লেপ্টে থেকে লজ্জা মাখা আঁখিতে, লাজরাঙা হাসি ঠোঁটের কোণে লেপে ক্যামেরা দিকে তাকিয়ে আছে। যাকে নিজের বুকের সাথে চেপে, জড়িয়ে ধরে প্রাণবন্ত হাসি ঠোঁটে এঁটে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে তার ভাইয়া। দু'জনের গলায় ইয়া বড় ফুলের মালা। আশেপাশে সব পরিচিত মুখ। স্থানটাও পরিচিত। সোহানীর গলার পানি শুকিয়ে গেল। কণ্ঠস্বর খরখরে হয়ে উঠল। তার চোখ, কান যা দেখছে তার মন তা বিশ্বাস করতে চাইছে না।

“ সোহা! কখন থেকে ডাকছি তোমাকে! সাড়াই দিচ্ছ না।"

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল তানহা।
তানহাকে দেখে সোহার ডান চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রু। ঠোঁট ভেঙে আসতে চাইল। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাও তো তার ভাইয়ের বুকে এভাবে লেপ্টে থাকার স্বপ্ন বুকে পুষে অপেক্ষার প্রহর ফুরানোর দিন গুনছে। অথচ তার ভাইয়ের বুক জুড়ে এখন অন্য কেউ রাজত্ব করছে!


৫৭

“কি হয়েছে সোহা? কাঁদছ কেন? ফোনে কে?"

সোহানীর চোখে পানি দেখে তানহা বিচলিত হয়ে একনাগাড়ে তিনটা প্রশ্ন করল। সম্রাট তখনো কানে ফোন চেপে রেখেছে। তানহার অস্থির কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। ওর টান টান ললাটে গভীর ভাঁজ পড়ল। চোখ মুখে দুশ্চিন্তার আঁধার নেমে আসল। বোনের কান্নার কথা শুনে চিত্তে আঘাত খেয়ে আপনমনে ভেবে চলল, বলাটা কি ভুল হয়েছে?

“ হ্যালো, সোহা!"

সম্রাট হাল্কা চেঁচানো স্বরে আওয়াজ দিল। সোহা হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা তখনো কানের কাছে চেপে ধরে রেখেছে। তানহার ছটফটানি দেখে ওর দিকেই অপলক তাকিয়ে ছিল সে। ভাইয়ের কণ্ঠের গাঢ় স্বরে সচকিত হয়ে প্রত্যুত্তরে বলল,

“ হ্যাঁ হ্যাঁ ভাই, বলো আমি শুনছি!"

“ কি রে কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন? ভাইয়ের উপর রাগ হচ্ছে? না জানিয়ে, দেখ সিদ্ধান্ত হুট করেই নিয়েছি। নিতে হয়েছে, আমি এসে সব বলছি। কিন্তু তুই কারো সাথে এখনি শেয়ার করিস না। আমি নিজেই সময় মতো বলব।"

সামনে তানহা দাঁড়িয়ে থাকায় সোহানী কথা বাড়াল না। শুধু জিজ্ঞেস করল,

“ কখন আসবে, তুমি?"

“ এই তো, র‌ওনা দিচ্ছি। ঐ যে হৃদয়ের বিয়েতে তো থাকতে পারছি না তাই ভাবলাম একটা গিফট অন্তত ওর ব‌উয়ের জন্য পাঠিয়ে দিয়ে যাই।"

“ তা তো উচিত‌ই। কি দিলে?"

“ শাড়ি। ঐ, তোর ভাবী বলল, শাড়ি দিলে ভালো হয়। তাছাড়াও, হৃদয়ের ব‌উয়ের সাথে তোর ভাবীর খাতির আছে। তাই ওর পছন্দেই.."

সম্রাট মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলছে কথাগুলো। তার কেমন জানি লজ্জা লজ্জা অনুভব হচ্ছে ছোট বোনের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে। সোহানী আড়চোখে তানহাকে দেখে নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“ নিয়ে আসবে?"

বোনের প্রশ্ন সম্রাট প্রথমে বুঝতে না পারলেও কয়েক মিনিট পর বুঝল। অতঃপর বলল,

“ না। আনুষ্ঠানিক বিয়ে ছাড়া ওকে বাড়িতে নিব না।"

“ ওহ্, আচ্ছা আসো। বাবা, আম্মুর সাথে চেঁচামেচি করছে!"

“ আসছি, বনু।"

“ আল্লাহ হাফেজ ভাই, আসসালামু আলাইকুম!"

সোহানী কল কাটতেই তানহা অতি উৎসাহী হয়ে প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সোহানীর উপর। অতর্কিত প্রশ্নে নাজেহাল অবস্থা করতে থাকল।

“ কখন আসছে তোমার, ভাই?"

“ এই তো। বলল তো র‌ওনা দিয়েছে!"

“ ওহ্! কাকে নিয়ে আসার কথা বলছিলে?"

“ ভাইয়ার বন্ধুদের কথা। ভেবেছিলাম তারা আসবে!"

“ তো, কি বলেছে? আসবে না?"

“ তুমি জানো না? হৃদয় ভাইয়ার‌ও তো বিয়ে! তো, ভাইয়ার সব বন্ধুরা তো এখন ঐখানেই। আমার এখানে বোধহয় শুধু বাপ্পী ভাইয়া একাই আসবে।"

“ হ্যাঁ তাতো আসবেই। তোমার ভাইয়া আর বাপ্পী যেভাবে চিপকে থাকে, অপরিচিত যে কেউ ওদের সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ করবে।"

“ মানে কি?"

সোহানী বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে। তানহা সেই চাহনি দেখে হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতে সোহানীর উপর ঢলে পড়ে ওর গলা পেঁচিয়ে ধরে বলল,

“ ওরা যদি বিয়ের পরেও এমন থাকে, তবে জেনে রেখ, তোমাদের বংশ আগাবে না।"

“ ধ্যাত! কি সব বল তানহা আপু তুমি!"

সোহানী তানহাকে মৃদু ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। ঠিক তখনি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে মানহা। হাতে তার তানহার ফোন। সে সোহানীকে ডিঙিয়ে তানহার সম্মূখে দাঁড়িয়ে বলল,

“ আপু, তোমার ফোন। ইউএস থেকে মেইল এসেছে।"

“ ইউএস থেকে?"

“ হুম!"

মানহার দিকে কয়েক সেকেন্ড ঠোঁট উল্টে ভাবুক চোখে চেয়ে থেকে পরক্ষণেই হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে মেইল বক্সে ঢুকে। কয়েক সেকেন্ড পেরুতেই উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, এক লাফে দুহাত উপরে ওঠে পরক্ষণেই জমিনে ধপ করে বসে পড়ে। খুশিতে চোখ জোড়া চিকচিক করছে তার। আত্নহারা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মানহাকে নিয়ে কয়েক পাক ঘুরতে ঘুরতে বলল,

“ আমার এতদিনের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে, বনু। আমি অনেক খুশি!"

“ আ'ম সো প্রাউড অফ ইউ আপু।"

মানহা বোনকে উষ্ণ আলিঙ্গনে অভ্যর্থনা জানায়। সোহানী কিছু বুঝতে না পেরে গোলগোল চোখে চেয়ে রইল কয়েক পলক অতঃপর আন্দাজে অভিনন্দন জানিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ বলা যাবে কি? এত খুশির কারণ?"

“ অবশ্যই সোনা পাখি। ইউ আর সো লাকি ফর মি!"

সোহানীর গাল টেনে ওর গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল তানহা। এদিকে তানহার এই খুশির কান্নায় সোহানী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চেয়ে র‌ইল, ফ্যালফ্যাল করে। তানহা সোহানীর গলা ছেড়ে নিজের আনন্দ অশ্রু দু হাতের তালুতে মুছে খুশির খবরটা জানায়,

“ আমি অনেক দিন আগে জাতিসংঘের একটি প্রজেক্টে কাজ করার স্বপ্ন দেখছিলাম। বেশ কয়েকবার কয়েকটি ডকুমেন্ট জমা দিয়েছি। তেমন রেসপন্স পাইনি। অবশেষে ওরা আমার ডকুমেন্ট একসেপ্ট করেছে এবং আমাকে কল করেছে মিটিং এর জন্য। ইউ নো হোয়াট, ইট ওয়াজ বিগেস্ট ড্রিম ইন মাই হোল লাইফ।"

তানহার আনন্দ অশ্রু দেখে সোহানীর মন কেমন করে উঠল। মনে মনে ভাবল, আল্লাহ কাউকেই একেবারে রিক্ত রাখেন না। কিছু মুহূর্ত পূর্বেই মেয়েটা নিজের জীবনের অনেক কাঙ্ক্ষিত একজনকে হারিয়েছে, আর এখুনি আল্লাহর তরফ থেকে খুশির বার্তা এলো। ও সম্রাটের তরফ থেকে আসা খবর কোনভাবেই বলবে না বলে সিদ্ধান্ত নিল। নয়তো মেয়েটা এই এত বড় এচিভমেন্ট জলে ভাসিয়ে দিবে এসবের পিছনে। তাছাড়াও, সোহানী বুঝতে পারছে, তানহার এই অনুভূতি একতরফা। সেখানে তার ভাইয়ের কোন খুশি নেই। তার ভাইয়ের যদি বিন্দুমাত্র‌ অনুভূতি থাকত তবে সে কখনোই অত বড় সিদ্ধান্ত একা একা নিতে পারত না। সুতরাং, একতরফা আবেগে ভেসে দু'জন মানুষকে বিচ্ছেদের দহনে পোড়ানোর কোন যৌক্তিকতা নেই। এর চেয়ে বরং তানহার সরে যাওয়াই উত্তম। আর এখন যদি তানহা দূরে চলে যায় তাহলে তার ভাবীকে ঘরে তুলতে সুবিধা হবে ভাইয়ের জন্য।

একা, আপনমনে কথাগুলো ভেবে
ও তানহাকে আবারও গলায় জড়িয়ে অভিনন্দন জানাল। এরপর জিজ্ঞেস করল,

“ কবে যাচ্ছ তবে?"

প্রশ্নটা করার সাথে সাথে তানহার মুখটা আঁধারে ডুবে গেল। হাতের মুঠোয় থাকা মুঠোফোনটির দিকে তাকিয়ে বলল,

“ আমাকে কাল‌ই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। এ্যাজ সুন এ্যাজ পস্সিবল টিকেটের ব্যবস্থা করা লাগবে।"

“ তবে কি তুমি বিয়েতে থাকছ না?"

“ স্যরি, সোহানী। তুমি তো জানোই, আমি কত এক্সাইটেড ছিলাম। কিন্তু এখন!"

“ আরেহ! স্যরি কেন বলছ, আপু? এটা বেশি জরুরি। তাছাড়াও, আমি তো আর মরে যাচ্ছি না। আর এসব ফর্মাল প্রোগ্রাম‌ও ফুরিয়ে যাচ্ছে না। তুমি গিয়ে নিজের স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে আসো। দেন, একসাথে সেলিব্রেট করব। ওকে!"

“ হুম। থ্যাংকিউ ডিয়ার।"

“ এগেইন কনগ্রাচুলেশন!"

তানহা, সাবিনা তালুকদার ও মাহমুদ তালুকদারকে খুশির খবর জানিয়ে তাদের থেকে দোয়া নিয়ে বিদায় নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে যায়। মানহাও বড় বোনের সঙ্গেই চলে যায়। সারাদিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামতেই বাড়ি পৌঁছায় সম্রাট। সঙ্গে বাপ্পী, ফালাক ও মুন্নী।
সম্রাট ফালাককে মুন্নীকে বাড়িতে আসার জন্য নিমন্ত্রণ করে। ফালাক‌ও দুদিনের ব‌উকে নিয়ে বন্ধুর বাড়িতে মধুচন্দ্রিমা করতে চলে আসে।

“আম্মা, আসসালামু আলাইকুম!"

হাঁক পেড়ে সালাম দিয়ে দরজায় করাঘাত করে মায়ের আকর্ষণ পাওয়ার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে চোরের মতো মুখ লুকিয়ে। সাবিনা তালুকদার ছেলের প্রতি এক বুক অভিমান চেপে গালের মধ্যে ঠুসে দিলেন একছিলি পান। তা চিবাতে চিবাতে দুদিকে মাথা দুলিয়ে বিড়বিড় করে বললেন,

“বাড়ি আসার কি দরকার? বাড়িতে কে আছে তার?"

“ আম্মা, মেহমান নিয়ে আসছি। ঘরে ঢুকাবা না?"

“মাহমুদ তালুকদার বাড়িতে নেই। সোহানী বোধহয় ঘুমিয়েছে। এই সময়ে ঘুমের অভ্যেস আছে তার। রূহানীটা কোথায় কে জানে! সাবিনা তালুকদার টললেন না। সম্রাট বুঝল মায়ের অভিমান এবার অনেক বেশি হয়েছে। তাই সে একটু দুষ্টু বুদ্ধি আটল। গলার স্বর ডাবিয়ে বলল,

“ আম্মা, তোমার জন্য ব‌উমা নিয়ে আসছি। এসে বরন করো!"

মাথায় ছোটখাটো বাজ পড়ার মতো করে চক্কর খেলেন সাবিনা তালুকদার। এটা যে দুষ্টুমি হতে পারে তা উনার মাথাতেই খেলল না। কেননা তার বিশ্বাস তার ছেলে এহেন দুষ্টুমি ইহজনমে করে না। তবে কি সত্যি? মায়ের মন উতলা হয়ে উঠে। বসা থেকে এক লাফে দাড়িয়ে পানের বাটা পায়ের নিচে ফেলে চার কদমে দরজার সামনে এসে দাড়াতেই ছেলের দুষ্টু হাসি থেকে থমকালেন। ছেলের পাশে কালো বোরকা ও কালো হিজাবে মাথা আবৃত এক কিশোরীকে দেখে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। এক কদম পিছিয়ে গেল পা। গা টলে উঠল। সম্রাট মায়ের মনের হাল ঠাওড় করে হাত উঁচিয়ে আত্মসমর্পণ করে বলল,

“আমার ব‌উ না। ফা ফা ফালাকে ব‌উ!
এই বেটা, তুই ঐখানে কি করছিস? এখানে দাঁড়া। তোর জন্য আজকে আমি ঘর ছাড়া হবো নাকি?"

এতটুকু বলেই সম্রাট তার পিছনে থাকা ফালাককে ঠেলে তার সামনে এনে মুন্নীর পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিয়ে মায়ের দিকে ভীত চোখে তাকিয়ে গদগদ হয়ে বলল,

“এই যে আম্মা, এই হতচ্ছাড়ার ব‌উ। দয়া করে এদের ঘরে তোল নয়তো আমি পাছায় লাথি দিয়ে বাড়ির বাইরে বের করে আমার ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিব।"

“ ওদের তো আমি তুলবো‌ই। কিন্তু বাইরে থাকবে তুমি। তোমার তো ঘর বাড়ির দরকার নেই। বাস্তহারার মতোন শহরে একা একা পড়ে থাকবে। মা বাবা থেকেও না থাকার সামিল তোমার জীবনে। নিজের ছোট বোনের বিয়ে আর তুমি আজ অতিথির মতোন এখন এসে পৌঁছেছ?"

“আম্মা, স্যরি। এই যে এদের জন্য‌ই দেরি হয়েছে, বিশ্বাস না করলে জিজ্ঞেস করো।"

জিজ্ঞেস করা লাগেনি। বাপ্পী ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে সাবিনা তালুকদারকে একপেশে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদি গলায় বলল,

“চাচীমা, এবারের জন্য মাফ করে দাও। প্লিজ!"

বাপ্পীর নিষ্পাপ ভঙ্গির তাকানোয় লাভ হল না। সে রণমূর্তি রূপে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন,

" তোর, আম্মা কোথায়? সে কবে আসবে?"

বাপ্পী ঢোঁক গিলে কণ্ঠ পরিষ্কার করে ডাহা একটা মিথ্যা বলে দিল।

“ আসছে তো‌। কাল সকালেই হাজির থাকবে। আজ অফিসে আর্জেন্ট মিটিং তাই আমাকে বলল, আমি যেন চলে আসি, আজ‌ই।"

“ ওমা, এত দূর থেকে একা আসবে? "

“সমস্যা হবে না। বাড়ির গাড়ি নিয়েই তো আসবে। এছাড়াও এখানে সম্রাটকে একা ছাড়ি কিভাবে?"

“হুম। তাই বলে একজন মেয়ে মানুষ অত দূরের পথ থেকে একা একা!"

“আচ্ছা তুমি আমাদের কথা বাদ দাও। এদের দিকে তাকাও। এই যে, ফালাক! ওকে তো চিনোই। কিন্তু ওর পাশে দাঁড়ানো, মেয়েটি কে জান? ও হচ্ছে ফালাকের সদ্য বিয়ে করা ব‌উ। ফালাকের তো বাবা মা কেউ নেই, জানোই। তাই বিয়ের পরপরই আমাদের সঙ্গে নিয়ে এলাম। ভালো করেছি না, বলো?"

বাপ্পী এমন ভাবে বলল যেন তারা রাণী এলিজাবেথের থাবা থেকে কোহিনুর ছিনিয়ে এনেছে। সাবিনা তালুকদার ছেলেদের নাটক দেখে মুখ ভেংচিয়ে তিরষ্কার করে বললেন,

“খুব ভালো হয়েছে।"

“ আসো, আসো মা।"

তার কাঁধ থেকে বাপ্পীর হাত সরিয়ে মুন্নীর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর হাত ধরে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বললেন,

“কাউকে বলে দাও, ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি টেবিলে বসতে। চেহারার কি হাল করেছে!"

সম্রাট মায়ের কথায় মৃদু হাসল। মা তো মা‌ই! শাসন, স্নেহ, যতনের এক অদ্ভুত জগত। সে ভেতরে ঢুকে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই সোহানীকে দেখে থমকে দাঁড়াল।
বোন তার এমনিতেই সুন্দরী কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আরো সুন্দর হয়ে উঠেছে। রুপ উপচে পড়ছে মেয়েটার। ফর্সা মুখে ঘুমের লেশ লেগে আছে। বালিশের ভাঁজ চেহারায় ছাপ ফেলেছে যার কারণে বাম গালের এক তৃতীয়াংশ রক্তিম হয়ে আছে। সম্রাট মুগ্ধ চোখে বোনকে দেখল। তার চোখে ভেসে উঠেছে বোনের জন্ম থেকে এই অবধি তাদের একসঙ্গে কাটানো দিনগুলির স্মৃতি। পরমুহূর্তেই বেদনাদায়ক সুখে বুক হুহু করে উঠল। আর তো দু'টো দিন। এরপরেই চলে যাবে বোনটা। এক জীবন রাজকুমারী হয়ে বাবা, ভাইয়ের পৃথিবীতে সাজানো মেয়েটা দিন তিনেকের মধ্যেই অন্যের বাড়ির ফুট ফরমায়েশ খাটার একমাত্র..
সম্রাটের ভাই সত্তা আবেগী হয়ে পড়ল। লম্বা কদমে বোনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বোনের মাথায় হাত রেখে বলল,

“উঠেছিস কেন? ঘুমিয়েই থাকতি!"

দুপুরে তানহার খুশিতে ভুলেই গিয়েছিল তার ভাইয়ের বিয়ের কথা। তাই তানহা চলে যেতেই কোন কাজ না থাকায় একটু বিশ্রামের জন্য বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।
আর তাতেই কখন যে ঘুমে ঢলে পড়েছে তা সে নিজেই জানে না। যার দরুন ভাই আসার এত সময় পেরিয়ে যেতেও এখানে আসতে পারেনি।
সোহানী ঘুম ঘুম চোখজোড়া টেনে মেলে বলল,

“ তুমি একাই আসছ? "

“না! তোর বাপ্পী ভাইয়া, ফালাক ভাই ও তার ব‌উ‌ও আসছে।"

“আর তোমার ব‌উ?"

সোহানীর ঠোঁটের কোণে হাসি। সম্রাট বোনের দুষ্টু হাসি দেখে বলল,

“আমার ব‌উ বলছে, তাকে যখন তার ননদরা গিয়ে নিয়ে আসবে তখনি সে শ্বশুর ভিটেয় আসবে। তার আগে নয়। বুঝেছেন!"

“মহারাণী বুঝি তিনি?"

“আলবৎ মহারানী। আমার ব‌উ না! তোর কি মনে হয়, তোর ভাই যাকেতাকে নিজের মনের অধিকারীনি বানিয়েছে? ফুল যোগ্যতা নিয়ে সে অর্জন করে নিয়েছে তোর ভাইকে। দেখলে তোর ফেরাতে পারবি না। আ'ম ড্যা শিওর!"

“ তাতো আগেই বুঝেছি। নয়তো কি আমার ভাই এমন বশ হয়ে যায় যে বাবা-মা, বোনদের না জানিয়েই সোজা ব‌উয়ের আসনে! কিছু তো অবশ্যই আছে। কিন্তু তুমি মা বাবাকে কীভাবে এসব বোঝাবে, সেটা ভেবে দেখেছ?"

“ভেবেছি। আর এখনি বলছি না তাও সিদ্ধান্ত নেওয়া শেষ!"

“মানে? কেন?"

“ বলব, সব বলব। কিন্তু তুই এই বিষয়ে কাউকে কিছু বলিস না। আমি এখন ফ্রেশ হয়ে নেই। ওকে?"

“ হুম। নাস্তা রেডি করি আমি!"

“ আগে ফালাক আর ওর ব‌উয়ের থাকার ব্যবস্থা কর। দে আর নিউলি ম্যারেইড কাপল।"

“ওকে!"

“ভাই!"

সম্রাট নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই শুনতে পেল উঠান থেকে তার ছোট বোন তাকে ডাকতে ডাকতে তার দিকে ছুটে আসছে। সে আর ঘরের দিকে না গিয়ে বোনের ডাকে সাড়া দিয়ে সেদিকে পা বাড়াল। সোহানীও বড় ভাই, ছোট বোনের দিকে এগিয়ে গেল।
ভাই-বোনের মিলন পর্বে এই সন্ধ্যা কেটে গেল।

_____________________________________

“ আচ্ছা, তোদের বিয়ের বিষয়টি কি ফারিশ ভাইয়াকেও বলবি না?"

মেহরিন ইয়ার রিং পরতে পরতে পারিকে জিজ্ঞেস করল। পারি শাড়ির কুঁচি ঠিক করছিল। প্রশ্ন শুনে কয়েক পলক থমকে থাকে। এরপর আঁচল ঠিক করতে করতে বলল,

“আপাতত, তোরা ছাড়া কাউকেই জানাচ্ছি না। যতদিন না উনি জব পাচ্ছেন।"

“ভাইয়া, ভালো ইনকাম করেন। তাদের ফ্যামিলি স্ট্যাটাস‌ও ভালো তবে জবের কি দরকার?"

ফারিহা প্রশ্ন করে উত্তরের আশায় চেয়ে র‌য়। পারি বান্ধবীর প্রশ্নে তার দিকে এক সেকেন্ড নিরব চোখে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই বলল,

“গর্ভর্মেন্ট জব তার সাধনা। আর আমি তার সাধনার পথে বাঁধা হতে চাই না। সবচেয়ে বড় কথা, তার বাবার সম্পত্তি দেখে আমি তাকে ভালোবাসিনি। ইভেন আমি তো এটাও জানতাম না সে একটা ব্যবসা করে। বেকার, চাকরি প্রত্যাশী জেনেই যখন তার হয়েছি সেখানে সেই বিষয়ে দ্বিমত রাখার কোন যৌক্তিকতা নেই। আর র‌ইল, আমার ভাইয়ের বিষয়! ভাইয়াও এমন ভাবে বিয়ে করাটা সহজ ভাবে নিবে না। ভীষণ কষ্ট পাবে। আর যদি চাচা চাচী শোনে তবে তো হলোই। আমার মৃত মা বাবার চরিত্রে চলে যাবে। যে সুযোগ আমি দিতে চাই না।"

“তাহলে? তোদের বিয়ের পরিণতি কি হবে?"

“কি আর হবে? বলেছে তো, সোহানীর বিয়ের ঝামেলা মিটুক। কিছুদিন সময় যাক। এর মধ্যে সে যেভাবেই হোক চাকরি একটা জুগিয়েই ফেলবে। সেটা হোক বেসরকারি। এরপর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নিয়ে আমার অভিভাবকদের মানে যারা আছেন, তাদের কাছে বাবা মাকে মানে আমার শ্বশুর শ্বাশুরিকে পাঠাবে। তারপর সেভাবেই সব হবে, যেভাবে সবারটা হয়!"

“ইনশাআল্লাহ। সব পরিকল্পনা অনুযায়ী হলেই ভালো।"

“তবে, আমার ভয় হচ্ছে অন্য জায়গায়!"

পারি কথাটা বলেই উদাস চোখে জানালার বাইরে তাকাল। নিশি, মেহরিন ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,

“কি?"

“তারা যদি আমাকে পছন্দ না করে?"

কারণ শুনে দু'জন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। জিজ্ঞেস করল,

“কেন করবে না?"

“আমার সাথে তাদের যায় না রে। আমি একটা এতিম মেয়ে, যার না আছে চাল আর না আছে চুলো। এতটুকু বয়স থেকে এই শহরে একা একা। কত কি রকম কাজ করেছি। পরিবার তো ভালো কথা, মাথার উপর তেমন কোন দায়িত্বশীল লোকের ছায়াও নেই। এসব শোনার পর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়!"

“আমার মনে হয় এই কারণেই, ঠিক এই কারণেই ভাইয়া বিয়ে করে তোদের সম্পর্ক পাকাপোক্ত করে ফেলেছে যেন তার বাবা মা চাইলেও তোকে অস্বীকার করতে না পারে।"

পারিজাত মুচকি হাসল। তার নিজের‌ও তাই মনে হচ্ছে। সম্রাট নিজের তরফের ইনসিকিউরিটি থেকেই এত তড়িঘড়ি করে বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরেছে। নয়তো এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ছেলে সম্রাট মাহমুদ তালুকদার না । কিন্তু, আসলেই কি তাতে কোন লাভ হবে? বিয়ে করলেই কি? বিয়ে ভাঙ্গা যায় না?

৫৮

আজ সোহানীর বিয়ে।...

বোনের বিয়ের ব্যস্ততা, তার মধ্যেও সুযোগ পেলেই ফোন করে পারির খোঁজ রাখা। রাত ভরে দু'জনে কথা বলার মধ্যে দিয়েই কেটে গেছে দুটো দিন। বাড়ির কানায় কানায় অতিথি। ডুপ্লেক্স বিশাল বাড়িটির প্রত্যেকটি রুমে আত্নীয় স্বজন। সম্রাট নিজের রুম ফালাক আর ওর ব‌উয়ের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। বাপ্পীর রুমে গিয়ে সে থাকছে। আনন্দ উল্লাসের বিয়ের শেষ লগ্নে আজ। কাজী সাহেব এসে পৌঁছেছে। সোহানীর ব‌উ সাজাও শেষ।
সম্রাট নিজে প্রস্তুত হয়ে ঘর থেকে বের হবার আগে পারির নাম্বারে ফোন দিল। দু'বার রিং বেজে কল কেটে যায়। পারি ধরল না। চিন্তায় কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ ফেলে কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে র‌ইল দরজার মুখে। বাপ্পী পাঞ্জাবির উপর ব্লেজার চাপিয়েছে। বুকপকেটে লাল চন্দ্রমল্লিকা ফুল গুঁজে দিয়েছে রূহানী। বাপ্পীর কোন ভাইবোন নেই। ছোট থেকেই পাশাপাশি বড় হ‌ওয়ায় সোহানী, রূহানীকে তার ছোট বোনের মতো দেখে এসেছে। সম্রাটকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

" কি রে, কাজী সাহেব বসে আছেন। ঐদিকে যাবি না?"

“যাবো তো। দাঁড়া একটু কথা বলে নেই।"

“ কার সাথে কথা বলবি?"

“ঐ যে! একজনকে ঢাকা রেখে আসছি না। আমাকে চিন্তায় ডুবিয়ে মারার জন্য!"

“কী হয়েছে? ফোন ধরে না?"

“না। কয়েকবার দিয়েছি.."

বলতে বলতেই সম্রাট আবার ফোন করল। এবার একবার রিং হতেই ফোন রিসিভড। কানের সামনে ফোন ধরেই সে খেকিয়ে উঠল। ঝাঁঝালো স্বরে বলল,

“কী ব্যাপার? কোথায় ছিলে তুমি?"

“হুরকে নিয়ে পার্লার গিয়েছিলাম। ফোন ফেলে রেখে গিয়েছিলাম ঘরে। স্যরি‌!"

“দারুন। এরকম‌ই তো করবেন আপনি। নাহলে আমাকে অসুস্থ করে তুলবে কে?"

“স্যরি!"

“ছবি পাঠাও!"

“হুম!"

এই কয়দিন পারিকে সে এভাবেই নজরে রেখেছে। পারি কখন, কোন পোশাক পরবে, সব‌ তার মর্জিতে হয়েছে। সাজগোজ শেষ করে সবার আগে তাকে ছবি পাঠিয়ে কনফার্ম করে ঘর থেকে বের হতে হয়েছে।

হোয়াটসঅ্যাপে ভেসে উঠল অনবদ্য রূপসী রূপে হাস্যোজ্জ্বল এক মায়াবী মুখশ্রী। হোয়াইট গ্রাউনের সঙ্গে লাল দোপাট্টা। মাথায় খেজুর বেনী করে তাতে জুঁই ফুলের মালা দিয়ে পেঁচিয়ে কাঁধের পাশে ফেলে রেখেছে। কানে ডায়মন্ড কাটের বড় বড় ঝুমকো। ঠোঁট ভর্তি লাল লিপস্টিক। সম্রাট ঢোঁক গিলল। এত ভয়ঙ্কর সাজ কে দিতে বলেছে এই মেয়েকে?

মেয়েটাকে ভয়াবহ সুন্দরী লাগছে। তার নিজের‌ই কষ্ট হচ্ছে নিজেকে সামলাতে। সেখানে অন্য পুরুষদের কি হাল হবে? তার ব‌উকে দেখে অন্য পুরুষ কামুকে চোখে চাইবে! না না! সেটা কীভাবে সহ্য করবে? কিন্তু কিছু বলাও যাবে না। আজ একটা বিশেষ দিন। এই মুহূর্তে মেয়েদের সাজসজ্জা নিয়ে কিছু বলা অনুচিত। তবে সে নিজের অন্তরে জ্বলজ্বল ওঠা আগুনের লেলিহান ঢাকতে ব্যর্থ হল। বাপ্পী বন্ধুর বেগতিক অবস্থা দেখে মৃদু হেসে কাঁধে হাত চাপড় বলল,

“কাম ফাস্ট।"

“ইয়াহ্!"

এতটুকু বলেই ফোনটা নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। দরজায় খিল দিয়ে সুক্ষ্ম চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল তার ব‌উয়ের ছবিটি। অতঃপর ফোন করল। কানের সামনে ধরে সম্মোহিত স্বরে ডেকে উঠল,

“ব‌উ!"

বিয়ের পর থেকেই ব‌উ ব‌উ চলছে। তারপরেও পারির লজ্জা কমছে না একবিন্দু। সে আঁটসাঁট কণ্ঠে চিবুক নামিয়ে উত্তর দিল,

“হুম!"

“ আমাকে মেরে ফেলার পাঁয়তারা করছ?"

“উহু!"

“তবে এভাবে সাজার মানে কী? ঐখানে কত ছেলেরা থাকবে! সবচেয়ে বড় কথা হৃদয়.. যার কিনা আগের থেকেই আমার ব‌উয়ের উপর বদনজর আছে। আজ যদি এমন রূপে দেখে, ও তো নির্ঘাত নিজের বিয়ে ভেঙে আমার ব‌উ নিয়ে ভাঙ্গবে!"

“ধ্যাত!"

“জান!"

“হু!"

“প্লিজ, আর কখনো আমি ছাড়া অন্য কারো সামনে এভাবে...

সম্রাটের আহাজারিতে পারি গাল ফুলিয়ে নিল। চোখে মুখে আষাঢ় মাসের মেকি আর্দ্রতা ফুটিয়ে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল।

“আমি কী সাজ পাল্টে ফেলব?"

পারিকে সম্রাটের চোখে এত্ত বেশি মোহনীয় লাগছে যে সম্রাট এই মুহূর্তে তার ব‌উকে ছুঁতে না পারার আক্ষেপে ভেতরে ভেতরে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে।
তার মধ্যে ব‌উটা তার অবাধ্য হয়ে উঠেছে দিনদিন। ব‌উটা বেশ জানে তার এভাবে বাইরে ঘুরঘুর করাটা সম্রাটের সহ্য হবে না। তার ব‌উকে তার আগে অন্য কেউ এভাবে দেখবে সে সেটা কীভাবে বরদাস্ত করবে? কিন্তু কিছু বলাও যাবে না। যাচ্ছে তো বন্ধুর বিয়েতে। সেখানে তো আর ছেঁড়া কাপড় পরে যেতে দেওয়া যায় না। আর ভালো কাপড়ের সঙ্গে ভালো সাজটাও জরুরি। উফ! সম্রাটের অন্তর পুড়ছে! সেই পোড়ার উটকো গন্ধ মুঠোফোনের তরঙ্গ বরাতে পৌঁছে যাচ্ছে অপরপ্রান্তের রমনীর নাসিকা রন্ধ্রে। সে মুখে কাপড় পুরে নিঃশব্দে খিলখিলিয়ে হাসতে। এদিকে তার বর মশাই বুকের উপর সোয়ামন পাথর চেপে দাঁতে দাঁত কামড়ে বলল,

“না থাক। আজকে থাকুক। কিন্তু, প্লিজ! আমার আমানতের খেয়াল রেখ!"

“হুম।"

পারি বালিকা ব‌উয়ের মতো মাথা উপরনিচ করল। থুতনি তার কণ্ঠনালীর সাথে লেপ্টে রয়েছে। সম্রাট ভাব ধরে বলল,

“গুড!"

এরপর কণ্ঠের স্বর বদলে আদুরে গলায় বলল,

“‌ব‌উ শোন, তোমাকে একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই। কলে থাকো।"

‘জি!'

সম্রাট দরজা খুলে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সোহানীর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড ভাবল। ঘর ভর্তি কাজিনরা। এখন কথা বলানো যাবে কি-না! ভাবতে ভাবতে দরজার কপাটে টোকা দিল। শব্দ হতেই ভেতর দিয়ে দরজা খুলে দাঁড়াল ওর চাচাতো ভাবী।

“কী চাই?"

ভাবী ঠোঁট চৌখা করে চেয়ে আছে। সম্রাটের সঙ্গে তা সম্পর্কে বড়‌ই খুনসুটিময়। সুদর্শন দেবররা ভাবীদের রসকষের উপযোগান হয়। তাছাড়াও, দেবর হিসেবে সম্রাট‌ও কম নয়। ভাবীদের বোনের নজরে দেখে বলে তাদের প্রতি দায়িত্ব বোধ‌ও চ‌ওড়া। কিন্তু সময় সাপেক্ষে তা পরিবর্তন ঘটে কখনোসখনো।
কলে থাকা পারি চুপটি মেরে শুনছে কেবল। সম্রাট মিনমিনে স্বরে বলল,

“তোমরা একটু বের হও তো। আমার সোহার সাথে কিছু কথা আছে। "

সম্রাটকে মিনমিন করে কথা বলতে দেখে ভাবী তার ডান ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল। রহস্য উন্মোচন করার উদ্দেশ্যে করে বলল,

“কি এমন কথা যা আমাদের সামনে বলা যাবে না?"

“আছে, ভাইবোনের সিক্রেট।"

“আমাদেরকেও বল। আমরা কাউকে বলব না। সিক্রেট ভালো লুকাতে জানি আমরা।"

“কত জানো জানা আছে। এ ঘর থেকে পা এখানে রাখতে না রাখতেই এই কথা পুরো কুনিয়ার গরম খবরে পরিণত হয়ে যাবে। আসছে আমার সিক্রেট লুকানো সিন্দুকখানা গো।"

“ইস্! অত অকর্মা ভেব না। যদি পেট পাতলা হতাম তবে তো তোমার ভাইয়ের কীর্তি এই গ্রাম না। পুরো দেশ জানত।"

“পেট পাতলা না হলেও ঠোঁট যে পাতলা তা বহু পূর্বেই আপনি প্রমাণিত করে দিয়েছেন। নয়তো কোন ব্যাক্কল মহিলা ছাড়া কেউ নিজের এক্সের সাথে সাক্ষাৎ এর কথা প্রেজেন্ট স্বামীকে বলে না। আসছে উনি আমার ... এ্যাই বের ‌হ‌ও তো‌। আমার অনেক কাজ আছে। তোমার সাথে খাজুরে আলাপ পাড়লে আমার চলবে না।"

সম্রাটের কথা ভঙ্গিতে ওর ভাবী খোঁচা মেরে বলল,

“এমন ভাবে আদেশ করছ যেন নিজের ব‌উকে আদেশ করছ? আসুক ব‌উ, দেখব কত পারো এহেন বুলেট পয়েন্টে রাখতে!"

“আমার ব‌উ বুলেট পয়েন্টে থাকবে কেন? আমার ব‌উ আমার বুকে থাকে। সবসময় থাকবে!"

কথার ঝোঁকে মুখ ফস্কে সত্যটা উগড়ে দিয়ে নিজেই হা করে তাকিয়ে থাকল কয়েক পলক অতঃপর জিহ্বা কামড়ে মাথা দুদিকে দুলিয়ে বিড়বিড় করে নিজেকে বলল,

“ইডিয়ট!"

সম্রাটের থতমত মুখশ্রী দেখে ভাবী জহুরি নজরে তাকায়। অতঃপর জিজ্ঞেস করল,

“ব‌উ কি জুটিয়ে ফেলছ নাকি? ঘটনা কি? চেহারায় এতো ঝিলিক মারতেছে? হুম!"

ভাবীর হাত থেকে বাঁচতে মেজাজ দেখিয়ে বলল,

“আরেহ, বাবারে মহিলা কত কথা বলে! বের হ‌ও তো। সব কয়টা!"

ঘরের ভেতরে থাকা তার কাজিন মহলের সব কয়টাকে বলল, আঙ্গুলের তুড়ি বাজিয়ে দরজা দেখিয়ে বলল,

“ইউ অল, গেট আউট ফ্রম হেয়ার।"

সম্রাটের মুখের উপরে কেউ কথা বলে না। তার উপর কথা বললেই রাম ধমক। আজ এই সুন্দর মুহূর্তে কে যায় ভাই ধমক খেয়ে মুডের ঘড়ি নষ্ট করতে! তার চেয়ে বরং কেটে পড়াই ভালো। সব বেরিয়ে গেল। ভাবী তখনো দরজা আঁটকে দাঁড়িয়ে ঠাঁয় আছে। তা দেখে সম্রাট বলল,

“ম্যাম আপনার পায়ে কি খুঁটি পুঁতে রাখা?"

“যাচ্ছি যাচ্ছি। বাবারে বাবা, এখনো ব‌উ আসেনি তাতেই এই ব্যবহার। না জানি ব‌উ আসলে কী করে! তখন তো..

“মেয়েলোকে কথ কথা বলে রে মাবুদ। ভাই ঠিকই বলে বেশি কথা..."

“হ্যাঁ, এখন তো আমরা বেশি কথা বলি। দেখবা, তোমার কপালে আমাদের চেয়েও বেশি কথা‌ওয়ালী বেডি জুটবে। যাকে বলে তোতাপাখি।"

“সে তো জুটেই গিয়েছে। নতুন করে আর কি জুটবে!"

সম্রাট নিজের বেফাঁস কথায় তটস্থ হয়ে গেল। মুখ হা করে হাসার ভঙ্গিতে দাঁত বের করে চেয়ে আছে। ভাবী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি!"

“কিছু না কিছু না। তুমি যাও তো ভাবি। আমার জরুরি কথা আছে।"

এবার সে ভাবীর আঁচলের কোণ ধরে টেনে দরজার বাইরে রেখে মুখের উপর লাগিয়ে দিল দরজার কপাট।

ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা পারি মুচকি মুচকি হাসছে দেবর ভাবীর খুনসুটিময় কথা শুনে। সম্রাট তার ভাবীকে বের করে দিয়ে বিশ্বজয়ের হাসি দিল বোনের দিকে চেয়ে। তা দেখে সোহাও মুখ টিপে হাসল।

সোহানী ভাইয়ের হাবভাবে বুঝে নিল আশু বিষয়টি। সে বসা অবস্থায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে ভাইয়ের পানে। সম্রাট মুঠোয় থাকা ফোনটি কানের সামনে তুলে বলল,

“জান, আছো!"

“হু!"

লজ্জায় পারির কান গরম হয়ে উঠেছে। না জানি ঐপাশে অচ মানুষের সামনে এভাবে লাগামহীন কথা বলে চলেছে লোকটা। পারির লজ্জা সম্রাট মাইল দুরে থেকে অনুভব করতে পেরে মুচকি হাসল। অতঃপর ফোনটা বোনের হাতের মুঠোয় দিয়ে বলল,

“নে, কথা বল!"

সোহা চট করে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। খুশিতে ছলকে উঠেছে তার মন। হাতের তালুতে থাকা অত্যন্ত আধুনিক ফোনখানার উপর জ্বল জ্বল করছে ব‌উ শব্দটি। সেটা দেখে ঠোঁট টিপে হাসল। সম্রাট বোনের হাসির কারণ বুঝতে পেরে অন্য দিকে ফিরে ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল,

“কথা বল, আমি আছি!"

সোহা কানের সামনে ফোন তুলে ধরে মিহি সুরে ডাক দিল,

“ভাবী!"

এদিকে সম্রাটের আচানক করা কাজে পারি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তার বুক ধুক ধুক করছে। প্রথমবার সম্রাটের পরিবারের কারো সঙ্গে কথা বলবে। তা আবার সম্পর্কে ননদ। পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল সম্পর্কের একটা। সে নিজের কানে চেপে রাখা ফোনের তরঙ্গ গুনে গুনে বোঝার চেষ্টা করেছে অপরদিকের মানুষের মনের হালচাল। কিন্তু না দেখে কি কারো মন পড়া যায়? পারির চুপ করে থাকায় সোহা দ্বিধায় পড়ে গেল। সে গোলগোল চোখে বড় ভাইয়ের দিকে তাকাল। সম্রাট বোনের নিরবতায় ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে কৌতুহল চোখে ইশারা করতেই সোহা ফোন বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“ভাবী বোধহয় লজ্জা পাচ্ছে!"

“দেখি!"

সম্রাট ফোন নিয়ে ন্যানো সেঁকে পলকহীন চেয়ে থেকে কানের সামনে ধরে আদুরে গলায় ডেকে উঠল,

“পারি, কি হয়েছে?"

পরিচিত কণ্ঠস্বরে ঢোঁক গিলে নিজেকে স্বাবলম্বী করল পারি। নিচু কণ্ঠে বলল,

“নার্ভাস লাগছে আমার।"

“আরেহ বোকা। নার্ভাস লাগার কি আছে? ওরা ছোট তোমার। নাও ফটাফট দোয়া করে দেও‌। আফটার অল, একমাত্র ভাবী তুমি ওদের। তোমার দোয়া ওদের জন্য আবশ্যক। "

সোহা এগিয়ে এসে ভাইয়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গলার স্বর চাপিয়ে বলল,

“ভয় পেয়ো না। আমি দজ্জাল ননদ ন‌ই।"

সোহার কথায় পারি ঠোঁট কামড়ে হাসল। মেয়েটা তার নার্ভাস হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে মজা করছে।

“এভাবে ফিসফিস করে কার সাথে কথা বলছ তোমরা?"

পিছন থেকে অপ্রত্যাশিত পরিচিত কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল দুই ভাইবোন! বড় বড় চোখ করে পিছনে ঘাড় ঘোরাতেই তাদের একমাত্র ছোট বোন রূহানিকে দেখে থমথমে মুখে তাকাল একজন আরেকজনের দিকে। অতঃপর সম্রাট তড়িঘড়ি করে সোহার হাতে মোবাইল দিয়ে রূহানির দিকে এক কদম এগিয়ে গিয়ে বলল,

“আমার ফ্রেন্ড। ওকে দোয়া দিবে তাই। কিন্তু বনু দরজা আটকানো। আপনি কোথায় থেকে টপকালেন?"

“আমি তো ওয়াশরুমেই ছিলাম। আর আমি তোমাদের সব কথাও শুনেছি। এখন বল আপুনি কার সাথে কথা বলছে? আমিও বলব। ভাবি হয় না আমার?"

ছোট বোনের অতি পাকা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতায় বরাবর উচ্ছাস লাগলেও এবার সে হতাশ হল। চরম হতাশা চোখমুখে ফুটিয়ে বলল,

“কি-কি-কিসের ভাবী। খুব পাকা পাকা কথা হচ্ছে তাই না? চল, আমার সাথে‌ বাইরে অনেক কাজ আছে। কিচেনে অনেকগুলো থালাবাটি ধোঁয়া বাকী, সেগুলো ক্লিন করতে হবে। আপাতত এই বাড়ির একমাত্র কাজের বেটি তুই। সো চল...

“না আমি যাব না। আমি ভাবীর সাথে কথা বলব। ছাড়, আমাকে কথা বলতে দাও না !"

ভাই বোন ক্যাটফাইট করছে ঐদিকে পারি মুখ চেপে হেসেই চলেছে।

এদের এই যুদ্ধে অবসান নামল দরজায় জোরালো চপটেঘাত পড়ায়।


৫৯

“তানহা তুমি?"

দরজার বাইরে ময়ূরকণ্ঠী জামদানি শাড়ি পরুয়া মেয়েটাকে চোখ ধাঁধানো সুন্দর লাগছে। হালকা ডায়মন্ড কাটের অরনামেন্টস ঐ দুধে আলতা অঙ্গের সৌন্দর্য কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে দিয়েছে। নুড লিপস্টিক ল্যাপা ঠোঁট নাড়িয়ে নারীটি উত্তর দিল।

“হ্যাঁ আমি। তোমরা তো আর খোঁজ নিবে না তাই আমিই খোঁজ দিতে এলাম!"

“তানহা আপু তুমি যাওনি?"

রূহানী বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করল,

“না ডিয়ার‌। তবে আজ মিড নাইটে যাব!"

তানহা উত্তর দিতেই সম্রাট ওকে জিজ্ঞাসা করল,

“টিকেট নিয়ে ইস্যু হয়েছে?"

“না।"

“তবে তুমি এখন‌ও যাওনি যে!"

“সময় আছে পরশুদিন পর্যন্ত। এত তাড়াতাড়ি গিয়ে কী করব? তার চেয়ে বরং তোমাদের সাথেই থাকি।"

শেষ বাক্যটা সম্রাটের চোখে চোখ রেখে বলল। তানহার চোখে চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল সম্রাট। সে পারিজাত ছাড়া অন্য কারো চোখের ভাষা পড়তে ইচ্ছুক নয়। সম্রাটের এভাবে এড়িয়ে যাওয়া দৃষ্টি তানহাকে মর্মাহত করে। সম্রাটের চোখে কখনোই সে নিজের প্রতি অনুভূতি দেখে না। যা তাকে ভীত করে তুলেছে। অথচ সে রাতে ঐ মেয়েটার প্রতি তার দৃষ্টি উপচেপড়া অনুভূতি ছিল। তবে কি তার সম্রাটের জীবনে অন্য নারীর অস্তিত্ব আছে!

“বর এসেছে বর এসেছে!"

বাইরে থেকে হট্টগোলের স্বর ভেসে আসছে। এদিকপানে অনেকগুলো কদম ফেলার ঠকঠক আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তানহা দরজা থেকে সরে দাড়াতেই ভাবী এসে হাজির হল। হাঁক মেরে বলল,

“হয়েছে ভাই-বোনের ফুসুরফাসুর! তাড়াতাড়ি ওকে নিয়ে বাইরে আসো। পাত্রপক্ষ অপেক্ষা করছে। সম্রাট, বড় ভাই হয়ে তুমি এখানে বসে থাকলে হবে?"

ভাবীর একনাগাড়ে বলে যাওয়া কথার প্রেক্ষিতে সম্রাটের ছোট উত্তর,

“যাচ্ছি!"

বলেই সোহানীর দিকে ফিরে তাকাল। ততক্ষণে সোহানীর মুখটা লজ্জা ভয়ে জমে গিয়েছে। এই কিছু সময় আগ অবধি নিজের বিয়ে নিয়ে বুকের ভেতরে যেই আনন্দ, অনুভূতি কাজ করছিল তা এই মুহূর্তে নিজের পরিবারকে ছেঁড়ে যাবার ভয়ে পরিণত হল। সে দৃষ্টি নামিয়ে নিল। থুতনি কাঁপতে শুরু করল। সম্রাট গুটি গুটি পায়ে বোনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বোনের মাথায় হাত রেখে কয়েক পলক বোনের ঝুঁকে রাখা মুখের দিকে চেয়ে র‌ইল। অজান্তেই তার গাল গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রু জল। ভাইয়ের নিরব কান্না আঁচ পেয়ে সোহানী মাথা তুলল। চোখ উপরে তুলে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে কান্না থামানোর চেষ্টা করল। সম্রাট বোনকে বুকের সাথে মিশিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

“কান্না থামা। নয়তো সাজ নষ্ট হয়ে পেত্নি হয়ে যাবি!"

বড় ভাই বোনের কান্না দেখে রূহানীও কেঁদে দিল। সে ভাই-বোনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করতেই সম্রাট আরেক হাতে ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে।
ভাইবোনের এমন আবেগি মুহুর্তের সাক্ষী হয়ে ভাবী ও তানহাও আবেগী হয়ে পড়ে। তাদের চোখেও পানি চলে আসে‌।

“আরেহ সম্রাট, বোনকে সামলানোর নামে এভাবে কাদাচ্ছিস কেন? এদিকে আয়!"

ফালাক ভাবীর পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে। সম্রাটের কাঁধে হাত রেখে বলল,

“চল, পাত্রের সঙ্গে আসা মেহমানদের খাওয়াতে বসাবে হবে। আয়, ওদের কাদাস না। মেয়েটার সাজ নষ্ট হয়ে যাবে।"

বন্ধুর টানাটানিতে সম্রাট বোনদের ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সোহানীর গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,

“ভাই, সবসময় তোমার জন্য এভেইলেবল থাকবে, যেকোন প্রয়োজনে যেকোন সময়ে তুমি ভাইকে নক করবে। বুঝেছ, পরী?"

“হুম!"

ঠোঁট ফুলিয়ে সোহানী মাথা উপর নিচ করে উত্তর দেয়। রূহানীর দিকে ফিরে ওর ভেজা গাল মুছে দিতে দিতে বলল,

“আপুর সাথেই থাক।"

পারির সাথে আর কথা বলা হল না। বলাও সম্ভব নয়। এত মানুষের মধ্যে এভাবে পরিচয় ছাড়া কথা বদলাতেও সম্রাটের অনীহা। তার কাছে দুটো দিক‌ই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আপাতত পরিচয় করার বিষয়টা বাদ দিয়ে দিল। সোহানীর হাত থেকে ফোন নিতেই সোহানী আর্তনাদ করে উঠলো। বলল,

“আমি কথা বলব না ভা...

এতটুকু বলতেই সম্রাট থামিয়ে দিল। রক্ত চোখে ইশারায় ধমকে বলল,

“পরে!"

“কার সাথে কথা বলবে এখন?"

তানহার প্রশ্ন। সম্রাট দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,

“কারো সাথে না।"

তানহার মনে খটকা লাগল। এমন কার সাথে কথা বলার জন্য সোহানীর এত আগ্রহ।

সম্রাট বেরিয়ে যেতেই মেয়েদের হ‌ইহল্লা পড়ে যায় সোহানীর ঘরে। রূহানী তখনো অবুঝ চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে, তার ভাই কার সঙ্গে কথা বলাতেই চাইছিল এই উত্তরের আশায়।

সম্রাট বোনের ঘর থেকে বেরিয়ে লিভিং এড়িয়ায় আসতে আসতে ফোন কানে তুলল। পারি তখনো লাইনে। সে ভেজা কণ্ঠ স্বাভাবিক করতে খুক করে কাশল। পারি সম্রাটের ভারি কণ্ঠ বুঝতে পেরে চুপ মেরে গেলো। সম্রাট পারিকে নিরব দেখে ফিসফিস করে বলল,

“মন খারাপ করো না। পরে কথা বলে দিব নে। বিদায়ের আগে।"

“হুম!"

“আচ্ছা রাখছি। পরে আবার ফোন দিব। সাথে সাথে রিসিভ করবে।"

“হু! শুনেন!"

“হুম বল ব‌উ!"

“মন খারাপ করবেন না। বিয়ে হলেও তো আপনি চাইলেই গিয়ে দেখে আসতে পারবেন। আপনি মন খারাপ করলে ওর মন‌ও খারাপ হয়ে যাবে।"

“হু! ব‌উ, আই লাভ ইউ।"

“আই লাভ ইউ টু!"

“রাখি!"

“আল্লাহ্ হাফেজ!"

“আল্লাহ হাফেজ।"

বিরহ কথন শেষ হয়েও হয় না। এই স্বল্প সময়ের দুরত্ব তাদের হৃদয়ে গভির ক্ষতের দহন দিচ্ছে। এমনি এক অনূভুতি বুকে চেপে দু'জন মানবমানবী দুদিকে জীবন-যাপন করে চলছে।

________________________________________

হুরকে নিয়ে ব‌উয়েয আসনে বসাল পারিজাত। হুরের কোন বোন নেই। হুরের তরফের সব দায়দায়িত্ব হৃদয়ের পরিবার থেকেই পালিত হচ্ছে।
তাই হৃয়দের পরিচিত সকল মেয়েই হুরকে নিয়ে ব্যস্ত।

হৃদয়ের মা ইচ্ছা করেই পারির কাঁধে হুরের দায়িত্ব দিয়েছেন। উনি এখনো ভয়ে আছেন
বিশ্বাস করতে পারছেন না যে হৃদয় সত্যিই পারির মোহ থেকে বেরিয়ে এসেছে। অথবা পারির হৃদয়ের প্রতি কোন টান নেই। তিনি দু'জনকেই চোখে চোখে রাখছে।

সাদা গ্রাউনের উপর লাল ওড়না মাথায় দিয়ে নববধূর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পারিকে দেখে হৃদয়ের হৃদস্পন্দন কয়েকবার থমকাল। স্থির হয়ে গেল তার চোখের মণি। অটল চোখে চেয়েই র‌ইল সে। জগত ভুলে অপলক চাহনি পারির সুশ্রী বদনের মায়াময় চাহনিতে স্থির রেখে তাকিয়ে থাকে সে।

“বাপরে, ব‌উ তোর‌ই ভাই। দেখার অনেক সময় পাবি।"

তাহসান পাশ থেকে হৃয়দের কাঁধে চাপড় মেরে বলল। যেহেতু হুরের পাশেই পারি দাঁড়িয়ে আছে তাই ওর ধারনা হৃদয় হুরকে দেখেই থমকে গিয়েছে। কিন্তু হৃদয়ের চোখ সেদিকে পড়েই নি। সে চেয়ে আছে পারির দিকে।

মাথার ওড়নাটা পড়ে যেতেই পারি টুক করে সেটা তুলে আগের চেয়েও সুন্দর করে গুছিয়ে মাথার উপর ছড়িয়ে দিল। অতঃপর হাতের বালা জোড়া ঠিক করে হুরের দিকে ঝুঁকে। হুর বসারত অবস্থায় পারির কানে কিছু একটা বলল।

সিয়াম হৃদয়কে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল,

“চল, সামনে নিয়ে দেখার ব্যবস্থা করে দেই।"

সিয়ামের ধাক্কায় হৃদয়ের ভ্রম ভাঙ্গে। অবচেতন খেয়াল থেকে চেতনে ফিরতেই সে চমকায়। এত সময় সে কি করছিল! ভাবতেই সে নিজেকে ধিক্কার দেয়। নিজের প্রতিই বিরক্ত হয়। দৃষ্টি সরিয়ে হুরের দিকে তাকাল। টুকটুকে লাল জামদানি পরুয়া নারীটির সারা গা মোড়ানো সোনার অলংকারে। কিশোরীর মতো আলাভোলা, ফর্সা চকচকে একটি মুখ। পাতলা চিকন এক জোড়া ঠোঁট, যাতে লাল লিপস্টিক লাগানো। হৃদয় নিজের স্ত্রীর দিকে চোখ রেখে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা নারীটিকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। যা আদৌও সম্ভবপর হচ্ছে না।

অতঃপর সে চোখ নামায়। ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে স্টেজে উঠতেই পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের মধ্যে বর আসার আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। সেই নিয়ে মেয়েদের মধ্যে হট্টগোল শুরু হয়।

হৃদয় আড়চোখে পারিকে দেখে হুরের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। হুর স্বলজ্জ হেসে হৃদয়ের হাতের মুঠোয় নিজের রাখে। হৃদয় হুরকে বসা থেকে টেনে দাঁড় করায়। এখন ওদের কাপল ফটোশ্যুট হবে।
দু'জন বরাবর দাঁড়ায়। পারি ওদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ইন্সট্র্যাকশন দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেই তার মুঠোফোন স্বশব্দে বেজে উঠে।
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে আছে হাসান মামা। ভ্রু দ্বয় কুঁচকে আসে তার। এই সময়ে মামার ফোন! ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই যে ভয় পায়। তার দশাও তেমন। মামার ফোন দেখলেই তার মন অস্থির হয়ে ওঠে। মামী ঠিক আছে তো? এই এক চিন্তার বলিরেখা তার চেহারায় বয়সের ছাপ কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে দেয়।

পারি ওদের থেকে অনুমতি নেয়। ধীর কণ্ঠে বলল,

“এক্সকিউজ মি!"

বলেই পারি স্টেজ থেকে নেমে দ্রুত পায়ে হেঁটে সোজা গেটের বাইরে আসে। মিউজিকের উচ্চ আওয়াজে কানে তালা লেগে যাওয়ার উপক্রম।
সেই শব্দ এভোয়েড করে কল রিসিভ করে সালাম দেয়।

“আসসালামু আলাইকুম মামা। কেমন আছেন?"

***

“কী হয়েছে মামীর?"

*******

“আমি এখুনি র‌ওনা দিচ্ছি।"

পারি মামার সাথে কথা শেষ করে কল কাটে। ততক্ষণে তার চোখ ভিজে উঠেছে। অজানা আতঙ্কে থুতনি কাঁপছে। সে নিজেকে শান্ত করে স্টেজের দিকে পা বাড়াতেই এসে হাজির হয় নিশি, ফারিহা।

“কী হয়েছে পারি?"

ফারিহা জিজ্ঞেস করেই পারির চোখের পানি দেখে আঁতকে উঠে। নিশিও উদগ্রীব হয়ে উঠে। পারি ওদের বিচলিত করতে চায় না বলে অল্প শব্দে উত্তর দেয়।

“মামী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমাকে দেখতে চাইছে বারবার।"

“তাহলে এখন তুই যাবি?"

নিশি চিন্তিত গলায় বলল। ওর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠেছে। ফারিহা বলল,

“কিন্তু এখন তো অলরেডি আটটা বাজে। এত রাতে র‌ওনা দিলে তোর পৌঁছাতে পৌঁছাতে অন্তত বারোটা বাজবে আর যদি জ্যাম পড়ে তবে তো হলোই। এত রাতে একা, এত বড় রিস্ক নিয়ে যাবি?"

“যেতে তো হবেই। কিছু করার নেই। আমি মামীকে ছটপট করতে রেখে দিতে পারি না রে‌।"

“তাহলে আমরাও যাই। তিনজন গেলে ভয় কম করবে তোর।"

“না থাক। তোরা এখানেই থাক। এখানে অনেকগুলো কেকের অর্ডার আছে কালকের। সেগুলোও তো দেখতে হবে।"

“কিন্তু তাই বলে তোকে একা ছাড়ব? অসম্ভব! এই দেশে দিনদুপুরে মেয়েদের নিরাপত্তা নেই, সেখানে এত রাতে একা একটা মেয়ে পেলে তার কি হাল হতে পারে, তা তুই অজানা নয় পারি। আমরা যাচিছ তোর সঙ্গে!"

“শোন, লাগবে না যাওয়া। তোরা এদিকটা সামলা। আমি কতদিন পরে আসতে পারব তার তো ঠিক নেই। তাছাড়াও, ঐখানে... থাকার জায়গার‌ও অভাব। তোরা বরং..

“এভরিথিং ইজ ওকে, পারি?"

পাশ থেকে চতুর্থ কারো প্রশ্নে ঘুরে তাকাল তিনজন‌ই। তাহসান প্রশ্ন করে উত্তরের আশায় চেয়ে আছে ওদের দিকে। পারি সময় নষ্ট করল না।

“আমার মামী খুব অসুস্থ ভাইয়া, আমাকে এক্ষুনি নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার জন্য র‌ওনা দিতে হবে।”

“সিরিয়াস কিছু? এত রাতে তুমি একা!"

“আমার মামী প্যারালাইজড। বারবার আমাকে দেখতে চাইছে, তাছাড়াও!"

“ঠিক আছে যাও, তবে সম্রাটকে জানিয়ে যাও। নয়তো টেনশন করবে!"

“জি! আমি হৃদয়কে জানিয়ে আসি।"

“হুম, যাও!"

পারি কোনদিকে তাকাল না। গ্রাউন একটু উপরে তুলে ছুটে গেল স্টেজের দিকে।

তখন হুর, হৃদয়ের ফটোসেশন চলছে। বিবর্ণ চেহারা পারিকে দেখে হুর,হৃদয় দুজনের ললাটেই ভাঁজ পড়ল। ক্যামেরা ম্যানকে থামিয়ে দুজন‌ই পারির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে পারি?"

“কী হয়েছে আপু?"

এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে পারি উত্তর দেয়,

“মামী হঠাৎ করেই অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমাকে দেখতে চাইছে বারবার। আমাকে যেতে হচ্ছে। আ'ম স্যরি।"

“স্যরির কিছু নেই। যাও তুমি। আগে মামী তারপর অন্য কিছু। চল তোমাকে গাড়িতে উঠিয়ে দেই।"

হৃদয় স্টেজ থেকে নামতে নামতে কথাটা বলল। এদিকে ওর কাজে উপস্থিত সবার চোখে কপালে। নিজের বিয়ের আসর ছেড়ে বন্ধুকে গাড়িতে তুলে দিতে যায় কে ভাই? এই কাজের জন্য অন্য কেউ নেই বুঝি?
হৃদয়ের ব্যতিব্যস্ততায় কুণ্ঠে যায় হুর। ভেতরে দমে যাওয়া ভয়টা পূণরায় বুকের ভেতর ডামাডোল বাজাতে আরম্ভ করল। হৃদয় পারিকে ভুলেনি তা সে জানে, বুঝতে পারে। কিন্তু পারির প্রতি এই টান, যাও যে চুল পরিমান কমেনি। তা সে ঠাওর করতেই পারেনি। এই টান যেই টানে বিয়ের আসর থেকে নেমে যায়, তা কি কোন স্বাভাবিক বন্ধুত্বের টান? এভাবেই কী হৃদয় সবসময় হুরকে ছেড়ে পারিকে বেছে নিবে?
তার ঘন কাজল টানা চোখের দুটো ভরে উঠেছে। ছলছল করছে মণিকোঠা। সে ঘনঘন পলক ঝাপটে অশ্রুপাতকে প্রতিহত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে হৃদয়কে স্টেজ থেকে নামতে দেখে ওর বড় বোন ছুটে আসে। পথ আঁটকে জিজ্ঞেস করে,

“কোথায় যাচ্ছিস?"

বোনের বাঁধায় বিরক্ত হয় হৃদয়। নাক কুঁচকে বলল,

“ভয় নেই। পালিয়ে যাব না। বিয়ে যখন নিজের ইচ্ছায় করতে রাজী হয়েছি তো বিয়ে আমি হুরকেই করছি। পারিকে শুধু গাড়িতে তুলে দেই।"

“গাড়িতে তুলে দিবি মানে? পারি কোথায় যাচ্ছে?"

এই প্রশ্নটা করেই এসব বেশ দুরত্ব মেনে দাঁড়িয়ে থাকা পারির দিকে ফিরে তাকাল। অযাচিত কারণেই আজকাল পারি নামের মেয়েটাকে সহ্য হচ্ছে না তার। মেয়েটার জন্য তার ভাইয়ের বুকভাঙা কান্নার সাক্ষী সে। অথচ মেয়েটা তার ভাইকে জাস্ট পায়ে ঠেলে দিয়েছে। বিষয়টি ভাবলেই তার পায়ের রক্ত মাথায় চড়ে বসে। সে রক্তিম চোখে বিবর্ণিত পারির দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে পূণরায় এক‌ই প্রশ্ন করে। বড় বোনের আচরণ অস্বাভাবিক টের পেয়ে হৃদয় সতর্ক হয়ে ওঠে। পারিকে অসম্মান করলে সে শুধু পারির কাছেই না। সম্রাটের কাছেও ছোট হয়ে যাবে। এই ভয়ে তটস্থ থেকে উত্তর দেয়,

“ওর মামী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই ওকে যেতে হচ্ছে!"

“তো তাতে তোর কি? এই তোর কী শরম লজ্জা বলতে কিছু নাই? এই মেয়ে তোকে রিজেক্ট করেছে। কতগুলো বছর তোর থেকে ফায়দা লুটে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে অথচ ফিরতি মূল্য দেওয়ার বেলায়...

হৃদয়ের বোনের কথায় পারির চোখ ভরে আসে। সে থ‌ইথ‌ই করা চোখ দুটো নামিয়ে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির উপর রাখে। হৃদয় বড় বোনের হাত চেপে ধরে শাসনের ভঙ্গিতে বলল,

“আপা, কি হচ্ছে কি? ওর এমনিতেই চিন্তায় আছে, অযথা ওকে আর চাপ দিস না।"

“এসব মানুষের জীবনের চাপ কখনোই কমে না। এমন স্বার্থপর, লোভী মেয়েদের দুঃখ আজীবন থাকে।"

“আপা!"

“পারি!"

মৃদু ধমকে ওঠে হৃদয়। ঠিক তখনি পেছন থেকে সিয়ামের গলার স্বর।
ওর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে নিশি, ফারিহা। সিয়াম এগিয়ে এসে বলল,

“তুমি আমার গাড়িতে করেই যাও। যেকোন প্রয়োজনে কল আস। কোন হেজিটেশন নয়, বুঝেছ?"

“জি ভাইয়া!"

সিয়াম গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

“আমি ড্রাইভারকে বলে রেখেছি, তুমি লোকেশন বললেই ও যত দুরত্ব সম্ভব নিয়ে পৌঁছে দিবে।"

হৃদয়কে আর যেতে হল না। সিয়ামের গাড়িতে করেই পারি র‌ওনা দিল। সিয়াম যেতে চাইলে পারি নিষেধ করে বলল,

“কষ্ট করতে হবে না ভাইয়া। গাড়ি দিয়েছেন তাতেই আমার অনেক উপকার হয়েছে এখন আমি একা যেতে পারব। আপনারা প্লিজ এখানে আনন্দ করুন।"

পারি যাওয়ার কালে হৃদয়ের সঙ্গে আর কোন কথা বলল না। কিন্তু ওর বোন তখনো রক্ত চোখে তাকিয়ে ছিল পারির দিকে। আর হৃদয় করুণ চোখে পারির দিকে চেয়ে ছিল। তার ভীষণ লজ্জা লাগছে নিজের বোনের আচরণে। মেয়েটাকে এখন সাহায্য করতে চেয়েছিল সে। অথচ হয়ে গেল হিতে বিপরীত। মেয়েটা তার জন্য অপমানিত হল। যেটা সে প্রাপ্য নয়।

পারি সিয়ামের গাড়িতে চড়ে বসে। সিয়াম ড্রাইভারকে ইন্সট্র্যাকশন দিয়ে পারিকে নির্ভয় করে দিল।

__________________________________________

বিদায় পর্ব...

কন্যা বিদায় এই পৃথিবীর অন্যতম বেদনার ক্ষণ। জীবনের একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত একটা মেয়ে থাকে তার বাবার বাড়ির রাজকন্যা। সৃষ্টির নিয়মানুসারে সেই মেয়েটাকেই অন্যের হাতে তুলে দিতে হয় সব রকম দাবি ছেড়ে। এটা যে কতটা যন্ত্রণার তা কেবল একজন মেয়ের বাবা মা'ই জানে।

মেয়ে যেদিন হয় সেদিন থেকেই বাবাদের বুক কাঁপে এই হারানোর ভয়ে। মাহমুদ সাহেব প্যান্ডেলের সদর গেইটে দাঁড়িয়ে অবিরত ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। মেয়ে বিদায়ের সময় এসেছে। ভেতরে এখনো কিছু রিচ্যুয়াল পালিত হচ্ছে। তিনি সেদিকে যাননি। কেননা সদ্য কবুল বলে পর হয়ে যাওয়া মেয়েটার দিকে তাকালেই উনার পাজরভাঙ্গা কান্না উতলে আসে। এতে মেয়ের মন খারাপ হয়। এই বেলায় তিনি মেয়ের মন খারাপের কারণ হতে চায় না। তাই দুর থেকেই দেখছে তার চব্বিশ বছরের পরীটাকে।

সম্রাট বোনের দিকে চেয়ে আছে অপলক চোখে। তার স্থির দৃষ্টির সামনে স্মৃতি পর্দায় ভেসে আছে তাদের শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের এক সাথে বেড়ে ওঠার সেই আবেগি মুহুর্ত গুলো। তার ভাই সত্তা হু হু করে কাঁদছে। আজকের পর তো বোনটাকে আর আগের মতো পাওয়া হবে না। বাইরে থেকে এসেই এটা দে ওটা দে বলে ফরমায়েশ করার কেউ থাকবে না। এই বোনটা তো শুধু তার বোন‌ই নয়। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। যার সঙ্গে তার জীবনের সবকিছু শেয়ার করা যায়।

সম্রাটের এহেন দুঃখের মুহুর্তে তার পাশে এসে দাঁড়াল তানহা। পাশে দাঁড়িয়ে শান্তনা দেওয়ার ন্যায় বলে উঠল,

“মন খারাপ করো না। এখন তো আর আগের যুগের মতো যোগাযোগ সমসা নেই। চাইলে যেকোন সময়েই বোনকে দেখতে পারবে।"

সম্রাট মৃদু হাসল।

“হ্যাঁ তা তো অবশ্যই। কিন্তু বিয়ের পর চাইলেই দেখা পাওয়াটা সহজ থাকে না তানহা। মেয়েরা অন্যের ঘরে গেলে তাদের সেই ঘরের নিয়মের শিকলে আবদ্ধ হতে হয়। নচেৎ সুখ জুটে না। আমি চাই না আমার বোনেরা অসুখি হোক। আমার ওরা পৃথিবীর সবটুকু সুখ ডিজার্ভ করে।"

“ওরা খুব লাকি।"

সম্রাট আগের মতোই চুপ। তানহা বলে চলল,

“ওদের জন্য তোমার মতো একজন বড় ভাই আছে, যিনি ওদের খোঁজ খেয়াল রাখবে বাবা মায়ের অবর্তমানে। কিন্তু আমাদের জন্য দেখ, তেমন কেউ নেই। আমাদের তো কোন কাজিন ভাই‌ও নেই।"

“টেনশন করো না। আমি রাখব‌, তোমার বিয়ের পর মাঝেমধ্যে গিয়ে খোঁজ নিব।"

সম্রাটের কথা শুনে তানহার মুখটা থমথমে হয়ে গেল। হতবাক চোখে তাকিয়ে থাকল। সম্রাট ঠিক কি বুঝাল? সম্রাট ওর বিয়ের পর খোঁজ নিতে যাবে? তাহলে তানহা যে ওর প্রতি দুর্বল সেটা ও এখনো বুঝেনি! না বুঝতে চাইছে না। আচ্ছা ওর পরিবার‌ও যে তানহাকে পছন্দ করে সেটাও কি ও বুঝে না!

তানহার যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। ও ভেবেছিল এসে সরাসরি সম্রাটকে প্রপোজ করবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দেরি হয়ে যাবে। যা করার ওকে এক্ষুনি করে যেতে হবে। নয়তো সম্রাটকে হারাবে।

সম্রাটের মনোযোগ পেতে মুখের উপর হাত রেখে খুক করে কাশল। সম্রাট সেই কাশির শব্দে চোখ ঘুরিয়ে তাকাল ওর দিকে। খানিকটা উদ্বিগ্নতা দেখিয়ে বলল,

“ঠিক আছো?"

“হু!"

বলেই মাথা দুলিয়ে পূণরায় কাশি দিল। সম্রাট তানহার আচানক শারীরিক পরিবর্তন দেখে কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলল,

“তোমার ফ্লাইট কিছু ঘন্টা পর আর এখন ঠান্ডা লাগিয়ে বসে আছ!"

“ঠান্ডা লাগেনি। গলায় কিছু বিঁধছে।"

“কি বলছ? আচ্ছা চলো ঐদিকে চলো। একটু পানি খেলে বেটার ফিল করবা।"

কাশিতে আক্রান্ত তানহার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল ডাইনিং এড়িয়ার দিকে। সম্রাট তানহার হাত ধরতেই তানহার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। ওর পায়ের তালুর রক্ত কণিকা তরতর করে উপরের দিকে ব‌ইতে থাকল। স্থির নার্ভ গুলো কম্পন শুরু করে দিল। যার প্রতিক্রিয়া সারা শরীরে ফুটে উঠল। সম্রাট তানহার হাতের কম্পন অনুভব করে ঘাড় ঘুরিয়ে বিস্মিত চোখে তাকায়। কীয়ৎকাল নিষ্পলক চেয়ে থেকে বিস্মিত সুরে জিজ্ঞেস করল,

“কাপঁছ কেন?"

নিরুত্তর তানহা দৃষ্টি নামিয়ে সম্রাটের হাতের মুঠোয় থাকা তার কব্জির দিকে তাকাল। তানহার দৃষ্টি অনুসরণ করে সম্রাট‌ও সেদিকে তাকাল অতঃপর চট করে ছেড়ে দিয়ে বলল,

“স্যরি। আচানক তোমাকে এত কাঁশতে দেখে টেনশনড হয়ে গিয়েছিলাম, যার ফলে অজান্তেই অনাধিকার চর্চা....এক্সট্রিমলি স্যরি।"

“স্যরি বলতে হবে না। আমার প্রতি তোমার পূর্ণ অধিকার আছে।"

“মানে?"

“মানে আমাদ....

“সম্রাট! এদিকে আয়। বেরিয়ে যাচ্ছে ওরা!"

তানহার কথা সম্পূর্ণ হবার আগেই সম্রাটের ডাক পড়ে। সে সেদিকে ফিরে উত্তর দেয়,

“এইতো এখানে, আসছি। চল।"

বলেই সম্রাট সেদিকে পা বাড়ায়। তানহা সম্রাটের কদমে কদমের পর রাখা অপলক চোখে দেখে। এই চলন‌ও যে তার বড্ড প্রিয়।

পারি গাড়িতে চড়তেই গাড়ি গেইট পেরিয়ে মেইন রোডে উঠে যায়। ড্রাইভারকে ঠিকানা বলতেই তিনি ট্র্যাকার রান করে লোকেশন সেট করে নিল। অতঃপর রাতের এই ব্যস্ততাকে পাশ করে হুড়হুড় করে গাড়ি টেনে চলল।

৬০

উঠোনের এক পাশে সুন্দর করে বসার জায়গা বানানো রয়েছে। মেয়ে বিদায় দিয়ে মাহমুদ সাহেব ধপ করে সেখানটায় বসে পড়লেন। বাড়িতে আত্নীয়-স্বজন দিয়ে ভরা। সবাই যার যার মতো গল্পগুজব করছে। মিসেস সাবিনা মেয়ের ঘরে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। রূহানী মায়ের কাঁধে জড়িয়ে থম মেরে বসে আছে। ঘর ভর্তি খালা, চাচী, ফুফু, বোনেরা। সবাই সাবিনাকে বুঝ দিচ্ছেন। মেয়েদের ভাগ্য নিয়ে সবক দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মায়ের মন কি তা বুঝে? সব জেনে বুঝেও তাদের মন হুহু করে।

তানহা কয়েক মিনিট চুপ থেকে সবটা দেখল। তার চলে যাবার সময় ঘন ঘনিয়ে এসেছে। এদিকে সম্রাটের সঙ্গে সরাসরি কোন কথা হল না। তখন সম্রাটের বলা কথাগুলো তার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। তার প্রতি সম্রাটের অনুভূতি কোন রকম? সম্রাটের কাছে তার গুরুত্ব কতটা! সবটা না জেনে, নিশ্চিত না হয়েই সে চলে যাবে! যদি সম্রাট তার অবর্তমানে অন্য কারো হয়ে যায়? তবে?

“আপু, চল!"

মানহা তানহার পাশে দাঁড়িয়ে তাড়া দিচ্ছে। কারণ তাদের ঢাকা এয়ারপোর্ট এর উদ্দেশ্য র‌ওনা দিতে হবে।
তানহা বোনকে চোখের ইশারায় থামতে বলে মিসেস সাবিনার পাশে গিয়ে বসে। তানহার সম্পর্কে সবাই মোটামুটি জানে। তবে মাহমুদ সাহেব ও সাবিনার তানহার প্রতি এত আবেগের কারন না জানলেও বুঝতে পারে। ঘরে যুবক ছেলে আছে। মেয়েটি সুন্দরী, বিত্তশালী বাপের সুশিক্ষিত, সুতরাং তার প্রতি এত আহ্লাদের কারণ বোঝা কঠিন নয়।

সাবিনা তানহাকে দেখে একপেশে জড়িয়ে ধরে বললেন,

“এক মেয়ে নিজের সংসার পাততে গেল। এখন তুমিও যাবে নিজের স্বপ্ন পূরণে। যাও, দোয়া করি। আকাশসম উঁচুতে ওঠো, দিনশেষে মায়েদের বুকে ফিরে এসো তাহলেই চলবে।"

এটুকু বলেই তিনি তানহার কপালে চুমু দিলেন। অতঃপর তানহার দু গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বললেন,

“আমার খুব ইচ্ছে করছে, আজ‌‌ই তোমাকে আমার ছেলের সঙ্গে বেঁধে দেই। একটুও তর স‌ইছে না। কেন বল তো?"

“বেঁধে দাও। বারণ কে করেছে?"

পাশ থেকে বলে উঠলেন সম্রাটের বড় চাচী। মিসেস সাবিনার কথায় তানহা গাল লাল হয়ে উঠেছে। মানহা ঠোঁট উল্টে চেয়ে আছেন। বিছানার অপরপাশে বসে থাকা জব্বার মন্ডলের মিসেস। তানহা, মানহার মা। তিনিও সোৎসাহে বললেন,

“মেয়ের বাবা তো আপনার নামে মেয়ে লিখেই দিয়েছে। এখন মেয়ে আপনার সিদ্ধান্ত‌ও আপনারা।"

তিনি মিসেস সাবিনাকে খুশি করতেই কথাটা বললেন। তানহা তার মা'কে দেখল আড়চোখে। মেয়ের মায়ের সম্মতি পেয়ে সাবিনা ঝরঝরে গলায় ভাসুর মেয়েকে বললেন,

“তোমার চাচ্চুকে ডাকো তো মা।"

মিনিট দশেকের মধ্যে পূণরায় বাড়ি গমগম করে উঠল।
সম্রাট বোনকে বিদায় দিয়ে পথের ধারে বসেছিল।
হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল অনেক সময় পেরিয়ে গেছে পারির কোন ম্যাসেজ আসেনি। সে না হয় এদিককার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় কল, ম্যাসেজ কিছু দিতে পারছে না। তাই বলে পারিও দিবে না?

রুক্ষ মেজাজে মোবাইলের লক খুলতেই তখনি তার স্ক্রিনে এসে ভীর জমাল দুটো বাক্য।

“আমি নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছি। মামী অসুস্থ, এখুনি যেতে হবে তাই।"

ব্যস্! আর কিছু না! সম্রাটের কপালে ভাঁজ পড়ল। রাতের প্রায় সাড়ে বারোটা। এই সময়ে নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছে? একা? নাকি কেউ সাথে আছে?

আপন মনে প্রশ্ন করে চলে। অতঃপর কল দিল পারির নাম্বারে। কল ঢোকার সেকেন্ড পেরুনোর আগেই পারি রিসিভ করে।

“আসসালামু আলাইকুম।"

“ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কোথায় আছ?"

“আমি নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছি!"

“সেটা তো বুঝলাম কিন্তু এখন আছ কতদূর?"

“বুঝতে পারছি। অন্ধকারে...

“এত রাতে একা যাওয়ার সাহস কোথায় পেয়েছ? আর বের হবার আগে আমাকে জানানো উচিত মনে হয়নি? না দরকার নেই!"

“আমি কল দিতে চাইছিলাম কিন্তু আপনি ব্যস্ত তাই ম্যাসেজ করেছি।"

এটুকু বলে চুপ করে র‌ইল কীয়ৎকাল। অতঃপর ভীত গলায় বলল,

“সিয়াম ভাইয়ার গাড়িতে যাচ্ছি।"

“সিয়াম যাচ্ছে?"
“না আমি একাই। ভাইয়ারা যেতে চাইছিল কিন্তু আমি রাজী হ‌ইনি। তাই উনার গাড়ি আর ড্রাইভার দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে!"

“ওহ, আচ্ছা সাবধানে যাও।
আর হ্যাঁ, আপডেট দিও‌। মামীর কি অবস্থা জানিও! আমি তোমার স্বামী। আমাকে কোন বিষয়ে অবগত করার জন্য তোমাকে টাইম টেবিল মেইনটেইন করার দরকার নেই। আমি রাতেও তোমার, দিনেও তোমার। চব্বিশ ঘন্টাই তোমার। সুতরাং, নো হাঙ্কিপাঙ্কি, বুঝেছ?"

“হুম!"

“ব‌উ শোন!"

“হুম!"

সম্রাট যতবার এভাবে ডাকে, পারির গাল ততবার‌ই রেড অ্যাপলের মতো লালচে হয়ে ওঠে।
কান দু'টো গরম হয়ে যায়। তার মাথার উপর মামীর দুশ্চিন্তাও এই মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেছে। সে ডুবে গেল সম্রাটের ঘোরে। সম্রাট পারির মুড ঠিক করার জন্য স্বচরিত্রে ফিরে। পারির দেহের প্রতিটি ভাঁজকে আন্দোলিত করতে দুষ্টু কিছু কথা বলতে থাকে। যেগুলো শুনে পারি ড্রাইভারের দিকে তাকাল।
তার মনে হচ্ছে এই মৃদু আলোতেই ড্রাইভার তার লজ্জিত বদন দেখে ফেলছে। সে ড্রাইভারকে বলল,

“ভাইয়া, আলো নিভিয়ে দিন।"

ড্রাইভার বিনা শব্দে আদেশ পালন করল। সম্রাট পারির লজ্জিত মুখশ্রী কল্পনা হাসে। দু'চোখ বন্ধ করে উর্ধ্বে তাকাল। চোখের পাতায় ভেসে উঠল লজ্জিত পারির রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার মতো বদনখানি। টকটকে ঠোঁট জোড়া দিয়ে যেন মধু ঝরছে। সে কানে চেপে রাখা ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা নারীটিকে বলে উঠল,

“ব‌উ, আর কখনো এভাবে ঠোঁটে এভাবে লিপস্টিক দিবা না। আমি সামনে না থাকলে তো নাই। জানো আমার কত কষ্ট হচ্ছে? ইচ্ছা করছে ঐ কামড়ে খেয়ে ফেলি অথচ দুরত্ব...

এই টুকু বলেই সে বড় একটি শ্বাস ফেলল। পারি তাতে মুখ টিপে হাসে। পারির হাসি বুঝতে পেরে বলল,

“দহন লাগিয়ে এখন মজা নিচ্ছ? খোদার কসম, আমি তোমাকে ধরলে সাত দিনের জন্য বিছানা ছাড়তে পারবে না।"

পারির কান ঝাঁঝিয়ে উঠল। সে কান থেকে ফোনটা সরিয়ে ফেলল। বুকে হাত চেপে ঘনঘন শ্বাস নিতে থাকল। নিজের দহন পারির দিকে ছুঁড়ে মেরে মুখে হাত চেপে হাসতে থাকে। পারি কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে কথা ঘুরিয়ে ফেলল। জিজ্ঞেস করল,

“আপুর বিদায় হয়ে গেছে?"

“হুম। ওদের গাড়ির পিছু নিয়েই রোডে এসে পড়েছি।"

“মন খারাপ করবেন না। ইনশাআল্লাহ কাল তো দেখা হচ্ছেই।"

“হুম। কাল তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিব। আজ তো এত লোকের মধ্যে পারলাম না।"

“সম্রাট?"

অল্প দূর হতে কেউ হেঁটে উঠল। মরিচ বাতির আলোয় লোকটার আবছায়া ভেসে আছে। সম্রাট পারিকে বলল,

“পরে কল দিচ্ছি।"

“হুম!"

কল কেটে সম্রাট সেদিকে গেল।

লিভিং এড়িয়ায় সব মুরুব্বিরা জমায়েত হয়েছে। সম্রাট লিভিং এড়িয়ায় এসে পৌঁছাতেই রূহানীর শুকনো মুখ দেখে থমকাল।
জমকালো বাড়ির উৎসবমুখর পরিবেশ যেন পূণরায় ফিরে এসেছে। সম্রাট এক পলক ছোট বোনের শুকনো মুখ, আরেক পলক বাকীদের দেখল। অতঃপর বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বাবা, কী হয়েছে?"

মাহমুদ সাহেব ছেলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। গালভর্তি হাসি উনার। খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে আছেন। সম্রাট বাবার মুখের এই চমৎকার হাসির কারণ বুঝতে ব্যর্থ হলেন। তবে বাবার মুখের হাসিতে তার ঠোঁটের হাসি ফুটে উঠল। সে বাবার বাড়িয়ে রাখা হাতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পূণরায় জিজ্ঞেস করল,

“বাবা, এত খুশির কারণ কী?"

“কারণ বিদায় দেওয়ার সাথে সাথে মেয়ে ফিরে আসছে!"

“মানে?"

সম্রাটের কণ্ঠে বিস্ময়। মাহমুদ সাহেব ছেলের ক্লান্ত মুখশ্রীতে আদুরে হাত বুলিয়ে বললেন,

“মানে বলছি। তোমার সঙ্গে তানহা মায়ের আঁকদ আজ‌ই সেড়ে রাখতে চাইছি। তোমার জব্বার আংকেল‌ও তাই চাইছেন। তানহা মায়ের‌ও মত আছে! তুমি..."

“বাবা কীসব বলছ? কার আঁকদ কিসের আঁকদ!"

বর্তমান...

গাড়ির পিছনের সিটে দুই ছানাকে রেখে সামনে গিয়ে বসল সম্রাট। আজ ড্রাইভার সে। আজ সপরিবারে গাড়ি করেই বরিশাল যাবে। সেখান থেকে যাবে কক্সবাজার। পারি এতদিন যেখানে ছিল, সেখানে।

পারি ঘাড় ফিরিয়ে তার ছানাদের উদ্দেশ্য করে বলল,

“খবরদার, ভাই-বোন মারামারি করবে না। গাড়ির মধ্যে কোন দুষ্টুমি না।"

“আমি দুশতুমি কলি না। ভাইয়া কলে।"

“হ্যাঁ তুমি তো সাধু, সব দোষ ভাইয়ার।"

সুখ মায়ের কথায় গাল ফুলিয়ে নিল। দুহাত আড়াআড়ি করে বুকের বেঁধে গাল ফুলিয়ে বাইরে তাকাল। বিড়বিড় করে বলল,

“ছুধু ছুধু বকে।"

সম্রাট চোখে সানগ্লাস পরতে পরতে মেয়ের কথা শুনে ফিক করে হেসে দিল। পারি ঠোঁটের উপর আঙ্গুল রেখে মুখ টিপে হেসে সম্রাটের দিকে ফিরে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হতেই সম্রাট চশমা তুলে কপালে রেখে পারিকে চোখ মারল। পারি চোখ বড় বড় বিপরীত দিকে ফিরে তাকিয়ে বিড়বিড় বলল,

“অসভ্য লোক।"

মায়ের কথা শুনে ফেলল সমৃদ্ধ। সে মায়ের দিকে এগিয়ে সিটে হেলান দিয়ে মায়ের গাল দুটো আঁকড়ে ধরে বিজ্ঞের মতো করে জিজ্ঞেস করল,

“কে অছভ্য আম্মু? পঁচা কথা বলে কে?"

ছেলের কান্ডে সম্রাট ভ্রু উঁচিয়ে তাকায়। এই ছেলের জন্য সে এখন তার ব‌উয়ের কাছ ঘেঁষতে পারে না। সবসময় ব্যাগাভন্ডের মতো গাঁয়ের সাথে লেপ্টে থাকে। আর সবকিছু তাকে বলতে হয়।

পারি ঘাড় উপর দিকে উঁচিয়ে ছেলের ঠোঁটে চুমু দেয়। এরপর ছেলের চুলগুলোয় আঙ্গুল ছুঁইয়ে বলে,

“কেউ কিছু বলেনি বাবা। তুমি সুন্দর করে বস।"

সমৃদ্ধ তার বাবার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাল। ছেলের সাহস দেখে সম্রাট তাজ্জব। তার ছাঁ তাকেই ম্যাও?

ছেলে মেয়েকে প্রকৃতি দেখাতে ব্যস্ত করে দিয়ে পারি একটা ব‌ই খুলে পড়তে লাগল। সম্রাট নিরবে, মন দিয়ে ড্রাইভ করছে। সে এখন খুব সাবধানে ড্রাইভ করে। কেননা এখন তার গাড়িতে তার জান আঁটকে থাকে। তার দুই সন্তান।

৬১








একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ