বিঁধির_লিখন_না_যায়_খন্ডন

  #বিঁধির_লিখন_না_যায়_খন্ডন

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 



পর্ব ০১

"তুই এখন‌ও হাসছিস কিভাবে!"

"মানে?"

"মানে তুই এখনো এতটা হাসিখুশি কিভাবে আছিস? ঠিক আছিস তো!"

"আশ্চর্য; হাসবো না তো কি কাঁদবো? কাঁদার মতো কিছু কি হয়েছে!"

"কিছু হয়নি? এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও বলছিস কিছু হয়নি!তুই কি আসলেই সুস্থ আছিস!"

"ওয়েট আগে শুনি ও আসলেই ঘটনা জানে কিনা?" 


ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি পেরিয়ে দ্বোতলায় উঠতেই বাম পাশের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচ জন তরুণ-তরুণীর দিকে হাঁসি হাঁসি মুখে হেঁটে গিয়ে দাড়াতেই তাদের তরফ থেকে উপরোক্ত প্রশ্নে বিভ্রান্ত হয়ে গেল পারীজাত! চ‌‌ওড়া হাসির রেখা এখন খানিকটা সুক্ষ্ণ হয়ে গেছে।প্রশ্নাত্বক ভঙ্গিমায় তাকিয়ে আছে বন্ধুদের পানে। নিজেই এবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,

" কি হয়েছে,কি ঘটনা নিয়ে কথা বলছো তোমরা?"

"পারি তুই কি সত্যি কিছু জানিস না?"

"আরেহ বাবা কি জানার কথা বলছো তা না বললে জানবো কি করে জানি কি জানি না!"

"পারি..!"

"কি হয়েছে তারিন? কোন সমস্যা! বড় ধরনের কোন সমস্যা?"

" পারি তোমার তো সর্বনাশ হয়ে গেছে!"


করুন চাহনি ফেলে পারির উদ্দেশ্য কথাটা বললো জাবিন,পারি তারিনের থেকে মুখ ফিরিয়ে জাবিনের উপরে নিবদ্ধ করলো। বন্ধুদের চাহনি ভঙ্গিমা বলছে ভয়াবহ কিছু ঘটছে কিন্তু কি?


"সম্রাট ভাইকে তানহার সাথে একটা ফাঁকা ক্লাসে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় পাওয়া গেছে!"

"মানে?"


 চেঁচিয়ে উঠলো পারি,কথাটা শুনেছে কিন্তু কি শুনছে ঠিক বুঝলো না।রেহান পারিকে উদ্দেশ্য করে বললো,


"ঠান্ডা হ‌ও! ঠান্ডা মাথায় শুনো।"

রেহানের কথার ফাঁকেই কথা বললো আল আমিন,


"তানহার সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ছিলো ফাঁকা,মানে ঐ যে লাইব্রেরি পেরিয়ে ৫০৪ নাম্বার,যেই ফাঁকা রুমটা আছে,ঐখানে আপাতত ক্লাস তো হচ্ছে না তবে অব্যবহিত বেঞ্চ টেবিল নিয়ে সেখানে রাখে,আবার অনেক সময় অনেক সিনিয়রদের দেখা যায় সেখানে বসে আড্ডা দিতে।আজকেও সেখানে আড্ডা দিতে গিয়েছিলো কিছু সিনিয়র ভাইয়া আপুরা তারাই হাতেনাতে ধরছে , শুধু ধরলেও কথা ছিলো তারা মুখোমুখি যাওয়ার আগে ভিডিও করেছে যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সম্রাট ভাই ঐ মেয়েটাকে লিপ কি...!"


"থামো!কি বলছো তোমরা বুঝতে পারছো? সম্রাট কখনোই এমন জঘন্য কিছু করতে পারে না!" 


চেঁচিয়ে এক দমে কথাগুলো শেষ করলো পারি।ওর বন্ধুরা আহত চোখে তাকিয়ে র‌ইলো।জানতো বিশ্বাস করবে না।কেন‌ইবা করবে? চারটা বছরের সম্পর্ক! এই তো চুড়ান্ত পরীক্ষা বাকী আর মাস তিন এর পরেই বিয়ে করার ইচ্ছা পোষন করেছিলো দু'জন।পারি তো এর মধ্যেই নিজের জন্য বিয়ের শাড়ী লেহেঙ্গা পছন্দ করা শুরু করে দিয়েছে;এর মধ্যেই এমন কথা কে? কিন্তু তাদেরও তো মানতে কষ্ট হচ্ছে যে তাদের অতি প্রিয় ভাবী দুলাভাই এমন গর্হিত কাজ! চোখে না দেখলে কি বিশ্বাস করতো? কখনোই না।তারাও হয়তো পারির মতোই চিৎকার করে বলতো অসম্ভব! কিন্তু তা আর হলো ক‌ই?ভিডিওতে যে স্পর্ট তাদের রতিক্রিয়া চলমান! এটা কিভাবে করলো সম্রাট ভাই? একবারও কি এই কোমলবতি,অপ্সরীর ন্যায় নিষ্পাপ মুখটার কথা মনে হয়নি উনার!


" আমরাও তোমার মতোই অবিশ্বাস করছিলাম কিন্তু চোখে দেখার পর অবিশ্বাস আর করি কিভাবে বলো?"


" চোখে দেখেছো মানে?"


"ভিডিওটা তাদের মধ্যে থেকে কেউ একজন ভার্সিটির গ্রুপে ছেড়ে দিয়েছে, আর এখন এটা ভাইরাল। মাত্র কয়েক ঘন্টায় প্রায় ৩০ হাজারের মতো দেখছে।সবাই জেনে গেছে ব্যাপারটা!এই দেখো!"


কথা শেষ করতে করতে নিজের ফোন থেকে ভিডিওটা বের করে দেখালো রেহান।পারি ছলছল দৃষ্টি ফোনের পর্দায় নিক্ষেপ করলো, দেখতে দেখতে দুচোখের বারিধারার বর্ষনে চাপা গালের চিবুক ছুঁয়ে থুতনি বেয়ে কন্ঠনালী ভিজিয়ে দিচ্ছে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে শুধু নির্জীব নয়নে বললো,


" আমি বিশ্বাস করি না। এখন এগুলো ইডিট করা! নিশ্চয়ই কেউ ইচ্ছা করে আমার সম্রাটকে খারাপ বানানোর জন্য করেছে!"


"পারি কি বলছো? বিশ্বাস করা ভালো তাই বলে অন্ধ হয়ে যাওয়া নয়!"


"আমি সত্যিটা সম্রাটের থেকেই শুনে নিবো।আমি জানি ওমন কিছুই হয়নি।"


"তোমার কি মনে হয় সে সত্যি বলবে?"


"ওকে যেতে দাও! সরাসরি কথা বলুক! যাও পারি!"


তারিন রেহানকে থামিয়ে পারির উদ্দেশ্যে শেষ কথাগুলো বললো।পারি নিজের বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে থেকেই পিছু হয়ে হাঁটতে লাগলো, খানিকটা দূরে যাওয়ার পর দৌড়ে বেরিয়ে গেল ক্যাম্পাসের মাঠের উদ্দেশ্যে।


অবিরত ফোন দিয়ে যাচ্ছে পারি সম্রাটের ফোনে। রিং হচ্ছে কিন্তু কলটা রিসিভ করছে না।মাথার উপরে উত্তপ্ত সূর্যের ঝলসানো তাপ,সেই তাপে পায়ের নিচের পিচঢালা ফ্লোরের কোল টর গলে গিয়ে পা'কে জড়িয়ে নেওয়ার উপক্রম! এর মধ্যেও পারি কাঁপছে, হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়ানো দায় হয়ে পড়েছে। সর্বাঙ্গে যেন ভূমিকম্প আন্দোলিত হচ্ছে। অতিরিক্ত তাপে ঘামে শরীর ঘেমে একাকার তার মাঝেও কাঁপুনি দিয়ে অস্থিরতা বেড়েই চলছে। কান্নার দমকে দমকে কিছু সময় পরপর হিচকি উঠছে।তবু কোথাও যেন বিশ্বাসে চিড় ধরে নাই।একটাই আশা সম্রাট সত্যিটা বললেই সব সমাধান হয়ে যাবে।


"হ্যালো জাবেদ ভাই!"


জাবেদ নামে সম্রাটের এক ব্যাচমেটকে ফোন দিলো,তার থেকে কোথায় আছে সঠিক ধারনা না পেলেও আন্দাজ করা গেল। ফটাফট কল কেটে দৌড় দিলো গন্তব্যে।


ছাদের এক কোনায় রেলিং ঘেঁষে নির্বাক নয়নে তাকিয়ে আছে গগন পানে সম্রাট! রৌদ্রের তাপে তাকানো দায় হলেও চোখের কালো রোদ চশমা ঠিক‌ই সমাধান হিসেবে বেশ কাজ করছে। ফর্সা বদনের লোমশ অংশ কালো শার্টের বোতাম খোলা থাকায় তার ফাঁকফোকর গলিয়ে দুই চারটা লোম বেরিয়ে আছে। শার্টের কব্জি গুটানো দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে শক্তিহীন দেহে নির্জনতা বিলাস করছে।


এক দমে ছয় তলায় উঠে তার সিড়ি ভেঙ্গে অর্ধ নির্মিত সাত তলার অর্ধ ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা সম্রাটকে দেখে পারির দেহ যেন প্রান ফিরে পেল।এক দৌড়ে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো সম্রাটের পিঠে।সম্রাট চেনা স্পর্শে বিচলিত হলো না। কিছু সময় ওভাবেই দাঁড়িয়ে র‌ইলো। সম্রাটের নিরুত্তাপ পারিকে বিচলিত করলো,পিঠ ছেড়ে সামনাসামনি এসে দাঁড়ালো,এত সময়ে সম্রাট পারির মুখোমুখি হলো।

কান্নার ছাপ পারির ফর্সা গালে স্পষ্ট ফুটে আছে,লাল সিঁদুরের ন্যায় টকটকে হয়ে আছে নাকের উপরে অংশ। ঠোঁট জোড়া শুষ্ক হয়ে অবহেলিত দেখাচ্ছে।সম্রাট এখনও নিরুত্তাপ।তার দৃষ্টি কিংবা মুখশ্রী কোনটাই পরিবর্তিত হলো না।

পারি‌ই বলা শুরু করলো,


"কখন থেকে ফোন দিচ্ছিলাম,ধরছো না কেন?"


" ইচ্ছা করে নি তাই!"


সম্রাটের এমন অবজ্ঞা সূচক উত্তরে পারি একটু হোঁচট খেল।এমন কর্কশ শব্দে সম্রাট পারির সাথে কথা কখনো বলেনি।তবে কি আজ! নিজেই নিজের মতো উত্তর সাজিয়ে নিলো।


"কি হয়েছে? এমন করে কথা বলছো কেন? দেখো আমি ঐসব বিশ্বাস করিনি! আমি জানি আমার সম্রাট...!"


পারি কথা বলার মাঝেই সম্রাটের গালে হাত রাখতে গেলে সম্রাট পারির হাতটা ঝটকা দিয়ে পারিকে সরিয়ে দিয়ে নিজেও দুই পা পিছিয়ে যায়।পারি আর‌ও আশ্চর্য হয়। হতভম্ব , আহত নয়নে তাকিয়ে থাকে।সম্রাট প্রত্ততর করে,


"কেন করোনি?সবাই করেছে তুমি কেন করোনি।যা সত্য তাই বিশ্বাস করতে সমস্যা কোথায়!"


"কারণ আমি জানি ওটা সত্য নয়! আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি ওটা আমার সম্রাট নয়!আমার সম্রাট এতটা নিচু চরিত্রের নয়!"


"উহুম, ভুল জানো! ওটা আমি‌ই! এবং দিনরাত চন্দ্র সূর্যের ন্যায়‌ই ওটা সত্য!"


"তুমি কি সব বলছো? মাথা নষ্ট হয়ে গেছে তোমার? কেন বলছো এমন জঘন্য কথা! আমি জানি এটা তুমি ন‌ও!"


"আমি ঠিক‌ই আছি এবং সম্পূর্ণ সুস্থ আছি।এখন‌ও, তখনও! আর হ্যা কি বললে জঘন্য কথা! কোনটা জঘন্য কথা? যা করেছি তাই বলেছি! এখানে জঘন্য কথা কি দেখলে!"


কথা বলার ধরন আর থেমে থেমে দেওয়া ধমকে পারি চমকে যাচ্ছে।আড়ষ্ট হয়ে শুধু জিজ্ঞেস করলো,


" তুমি এভাবে কেন কথা বলছো আমার সাথে। আর তুমি ওসব করবেই বা কেন?"


" ওহ কাম ওন পারি! তুমি কি এখনও নাদান আছো? বুঝো না কেন করেছি? পারি আ'ম এডাল্ট!

কিছুদিন পর মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিবো। বাচ্চা ন‌ই। সুতরাং আমার‌ও জৈবিক চাহিদা আছে! আমার‌ও ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে কিছু ইনজয়,একটু অন্যরকম উপভোগ করি।ইউ নো ইটস সো ইনজয়াবেল।ওহ তুমি কি করে জানবে! তুমি তো আবার সতি সাবিত্রী! চার বছরের সম্পর্কে কেবল হাত ধরার অনুমতিটাই পেয়েছি তাও আবার পাবলিক প্লেসে নয়!সিরিয়াসলি ! আমি জাস্ট সারপ্রাইজড হয়ে যাই কিভাবে আমি চারটা বছর তোমার সাথে ছিলাম!"


কিছুক্ষণ থেমে হালকা শ্বাস ছেড়ে আবারও পারির মুখের নিকটবর্তী হয়ে জ্বলজ্বল নয়নে বলতে থাকলো,


"ট্রাস্ট মি পারি আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো তোমার সাথে থাকতে থাকতে। তোমার ন্যাকামিগুলো জাস্ট ট্রলারেট করা যাচ্ছিলো না। একটা এডাল্ট মেয়ে কিভাবে এত ন্যাকা আর নাদান হয়! আমার পক্ষে তোমার এত ভালো মানুষি আর নেওয়া যাচ্ছিলো না।মানে কোনভাবেই আমি তোমাকে ক্লোজ করতে পারছিলাম না! যত‌ই ক্লোজ হতে চাইতাম ততই যেন তোমার ন্যাকামো আর নাদানি বেরিয়ে আসতো তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তোমার সাথে ব্রেকাপ করবো কিন্তু তুমি যেভাবে চিপকে থাকো কোনভাবেই সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। তুমি হয়তো খেয়াল করেছো আমি গত একমাস ধরে তোমার সাথে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছি কারণ আমি গত এক মাস থেকেই তানহার সাথে কমিডেট।আর হ্যা তুমি যেই ডিমান্ড চার বছরেও ফিলাপ করতে পারোনি তা তানহা এক মাসেই করে দিয়েছে।এন্ড বিলিভ মি ইজ জাস্ট স্পিচলেস ওসাম।সো হট ওন্ড সেক্সি।এন্ড হারস বেড পারফরম্যান্স ইজ..উম.উম্মম ; ইউ কান্ট ইমাজিন!হারস বুবস ওহো;আহ্ আমি তো পুরো ডুবে গেছি ওর মাঝে! তাই আমি..."


সম্রাটের অনর্গল তিক্ততা বিষাক্ত হয়ে পারির শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হ‌ওয়ার উপক্রম করে তুললো! সম্রাট খেয়াল‌ই করলো না তার এমন বাক্যেবানে তার সামনে উপস্থিত নরম কোমল মনের সহজ-সরল পারির উপর কি প্রভাব পড়লো! খবর‌ই নিলো না মনের সাথে সাথে এই নারীর দেহখানাও 

কতটা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলো।

অতিরিক্ত গরমের মাঝে পিচঢালা রাস্তায় ঘন্টা নাগাদ দাঁড়িয়ে থাকা, দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতায় পাগলের মতো ছুটে ছুটে এই বিল্ডিং থেকে সেই বিল্ডিং দৌড়ে, পাঁচ তলা,চার তলা,ছয় তলা বিল্ডিং অবিরত দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠা। নিজের মানুষের এমন ভয়ঙ্কর রুপ প্রকাশ তার সাথে এমন জঘন্য অপমান! সব মিলিয়ে কোনটাই পারির মস্তিষ্ক নিতে পারলো না।মন শরীরের সাথে তাল মিলিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেল। রক্তের প্রবাহ দ্বিগুণ হয়ে গেল।হুট করেই পারি নিচে পড়ে গেল। সম্রাট কিছু বোঝার আগেই পারি ছাদের জমিনে শুয়ে পড়লো। হঠাৎ করেই পড়ায় মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেল। পরপর দুইবার জোরেশোরে খিঁচুনি দিয়ে বেহুঁশ হয়ে গেল।সম্রাট হতভম্ব,অবাক, অপলক দৃষ্টিতে দেখে গেল।যেন মাথা ফাঁকা হয়ে গেছে।কি করণীয় কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না।কেবল নির্জীব নয়নে তাকিয়ে র‌ইলো খিঁচুনি দিয়ে মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকা বেহুঁশ ফুটফুটে বিধ্বস্ত রমনীকে।


পর্ব ০২

২য় এবং শেষ পর্ব 


পর্ব. ২
[২৭৫৯ শব্দে আছে পর্বটি তাই ফেসবুক লাইট থেকে পড়া না গেলে প্রধান ফেসবুক থেকে পড়তে পারেন। অবশ্যই কমেন্টে জানাবেন কেমন হলো শেষটা!]

❌কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ ❌

যানজটের শহর ঢাকা।সেই জটকে তোয়াক্কা না করে উম্মাদের ন্যায় দৌড়াচ্ছে লাল কাতানে সজ্জিত এক রমনী।যার সর্বাঙ্গে সোনায় মোড়ানো।মাথায় খোঁপা গোঁজা কাঠবেলীর মালা থেকে ফুলগুলো ছিটকে যাচ্ছে এদিকে ওদিকে। গোলাপের গোছা ঝুলে নিচে নেমে এসেছে।পায়ের তলার গুড়ো ইট,সুড়কির ধারালো আঘাতে বিক্ষিপ্ত কোমল পায়ের তালু। অগোছালো, এলোমেলো তবুও রাতের প্রথম প্রহরেও এই রমনী আকর্ষণ কাড়ছে সবার। তার এমন লাগামহীন দৌড়ানো আর সাজের সম্ভারে আশ্চর্য, প্রশ্নাত্বক হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে সমস্ত পথচারীগন। মনে মনে হয়তো সবার প্রশ্ন‌ই এক ; এই মেয়ে কোথায় যাচ্ছে এভাবে? কেন'ই বা এমন করে দৌড়াচ্ছে! বাড়ি থেকে পালিয়েছে? কেউ কেউ নিজেই উত্তর তৈরি করে নিয়েছে, নিশ্চয়ই প্রেমিক ধোঁকা দিয়েছে তাই এমন পাগলামো করছে!

হাজার জনের হাজার প্রশ্নের উত্তরে কেবল একটি শব্দ সৃষ্টি হলো, মুহূর্তে থেমে গেল একটা জীবন! পাল্টে গেল অনেকের কল্পনা।

যানজটের শহরে দিশাহীন হয়ে দৌড়ানো পারির জীবন থমকে যায় বাসের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে মালিকানাধীন গাড়ির নিচে চাপা পড়ে।এক হাত গাড়িটার চাকার নিচে অন্যটা বিপরীতে,পিচ ঢালা রাস্তায় রক্তের প্রবাহের উপরে নির্জীব হয়ে পড়ে আছে।লাল কাতান রক্তের রঙ শুষে নিয়ে নিজেকে আর‌ও উজ্জল করে তুলেছে।নিভু নিভু চোখে কেবল তাকিয়ে আছে, চারদিকে কতশত কোলাহল।সবাই হ‌ইচ‌ইত মেতে উঠেছে।কেউ কেউ ড্রাইভারকে দোষারোপ করছে তো কেউ আবার পারির উম্মাদের ন্যায় দৌড়ানোর গাফিলতি নিয়ে পড়েছে।বাস চালককে মারার জন্য কিছু লোক ছুটে যাচ্ছে।কেউ কেউ মালিকানাধীন গাড়ির চালককে নিয়ে ব্যস্ত আছে।আবার কেউ চিৎকার করে পারির জন্য সাহায্য কামনা করছে।
কানের মাঝে এতশত শব্দের আন্দোলন থাকলেও মস্তিষ্ক কেবল একটাই শব্দ উচ্চারণ করছে,যা অতি কষ্টে ঠোঁটের আগায় টেনে আনলো,

"সম্রাট!"

আঁখির পাতায় ভেসে আসলো সেই সময় যখন চোখ খুলে নিজেকে আবিষ্কার করলো সে হাসপাতালে বিছানায়।ডাক্তার বলছিলো,

"তার ভেতরে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা খুবই কম; এমতাবস্থায় রোগীকে নিয়ে চিন্তা বেশি থাকে।উনি কিছু নিয়ে খুবই মানসিক আঘাত পেয়েছে যা উনাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলেছে। আপনাদের উচিত আমার সাথে সবটা শেয়ার করা তবেই আমি সঠিক চিকিৎসায় ব্যবস্থা করতে পারবো।"

পারির বাবা পরশ আবরার চৌধুরী এবং মা মিসেস প্রিয়ন্তি একে অপরের পানে তাকিয়ে সত্যিটা খুলে বললেন।যথা,

"শোন তোমাদের ফ্রেন্ড গনিত বিভাগের ছাঁদে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে তাকে নিয়ে যাও " 
কথা শেষ করেই ফোন কেটে এক পলক পারিকে দেখে চলে গেল!

সম্রাট ফোন কাঁটার ঠিক দশ মিনিটের মধ্যেই একটা এ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছালো গনিত বিভাগের বিল্ডিংয়ের সামনে ততক্ষণে পারির পুরো বন্ধু মহল এসে উপস্থিত হয় ছাদে ।এসে দেখে পারি একাই ছাদে পড়ে আছে।তারা বেশ হতাশ হয়।একটা মানুষ এতটা হৃদয়হীন কি করে হয়। চারটা বছরের সম্পর্ক এভাবে শেষ করে দিলো আবার সেই মানুষটাকে এভাবেই মৃত্যুর মুখে রেখে চলে গেল? একবারও কি বুক কাঁপলো না! এরপর কেটে গেছে প্রায় পাঁচ মাস;ব্রেইন স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক এক সাথেই করেছে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ সহ্য করতে পারেনি তাই বেহুঁশ হয়ে পড়ে। তাছাড়া হঠাৎ করেই সবটা এমন হ‌ওয়ায় চাপ আরও বেড়ে যায়।সব কিছু মিলিয়ে পারির অবস্থা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে। কোমায় চলে যায় পারি। পাঁচ মাস পরে কোমা থেকে ফিরলেও স্বাভাবিক হয়নি জীবন।কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। হুটহাট চেনা মানুষকে‌ও চিনে না। শুধু নিথর চাহনি ফেলে তাকিয়ে থাকে। এভাবেই কেটে গেছে আর‌ও এক মাস! পারির মানসিক উন্নতি না দেখে তার পরিবার চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। 

ডাক্তার সব শুনে বললেন,

"যা শুনলাম তাতে আমি নিজেই হতাশায় পড়ে গেলাম।মেয়েটার সাথে এমন না হলেও পারতো।ছেলেটার জন্য‌ও খারাপ লাগছে!যাই হোক আপাতত উনাকে একজন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যেতে সাজেস্ট করছি।এখন উনার জন্য এটাই একমাত্র সঠিক চিকিৎসা পন্থা হবে বলে মনে হচ্ছে।তার পাশাপাশি উনাকে খোলামেলা কোলাহল পরিপূর্ণ পরিবেশে রাখার চেষ্টা করবেন। মানুষের মাঝে থেকে স্বাভাবিক হলেও হতে পারে তবে যাই হোক উনাকে নিজের থেকে চেষ্টা করতেই হবে।তবে অবশ্যই উনাকে আপনাদের সাহায্য করতে হবে।
- আমি একজন সাইক্রিয়াটিস্টের নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি,আপনারা তার সাথে যোগাযোগ করুন,আমি উনার সমস্ত ডকুমেন্ট ইমেইল করে দিবো নে।"

ডাক্তারের সাজেশন অনুযায়ী পরশ আবরার চৌধুরী এবং মিসেস প্রিয়ন্তি পারিকে নিয়ে সাইক্রিয়াটিস্টের সাথে যোগাযোগ করলো। সেখানে তার পর্যাবেক্ষনায় ছিলো আর‌ও সাত মাস‌। এখনও আছে তবে সাত মাস পরে মোটামুটি একটু স্বাভাবিক হয়ে আসছে।বাড়ি ফিরে এসেছে আজ প্রায় আট মাস। পারি সম্রাটের স্মৃতি ভুলতে চায় না, চেষ্টাও করে না।কারণ পারি ধরেই নিয়েছে সম্রাটের স্মৃতি ভুলে গেলে সে নিজেকেই ভুলে যাবে।সম্রাট মিথ্যা ভালোবাসলেও সে তো বাসেনি। তার ভালোবাসা ছিলো দিনরাতের মতোই সত্য, শুদ্ধ স্নিগ্ধ! তাছাড়া সম্রাটকে ভুললে হয়তো আবার‌ও কাউকে বিশ্বাস করার মতো ভুল করবে। অবশ্য সেদিনের পর থেকে সম্রাটের সাথে কারো যোগাযোগ হয়নি।কেউ জানে না সম্রাট কোথায় আছে।এত বড় ঘটনার পর পারির এমন অসুস্থতার খবরেও সম্রাট একবারও আসেনি।এটাই পারিকে আর‌ও বেশি আহত করে ফেলে।

সময়ের সাথে এগিয়ে চলছ মানুষের জীবন।কারো জন্য কারো জীবন থেমে থাকে না।যত‌ই বলা হোক তার অনুপস্থিতিতে মরে যাবো আদৌও তে কেউ মরে না।তাও এমন কারো জন্য যার জন্য জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। সবার মতোই পারিও এগিয়ে যাচ্ছে।হাজার অনিচ্ছা, অনাগ্রহ থাকা সত্ত্বেও বাবা মায়ের আবেগীপনায় বাধ্য হয়ে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে।
সমস্ত আয়োজনে সাথে ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ের বন্দোবস্ত করেছে পরশ আবরার চৌধুরী, একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিবেন নিজের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে।যদিও আনুষ্ঠানিকতায় পারির মত ছিলো না কিন্তু ছোট ছোট চাচাতো, খালাতো ভাইবোন এবং বাবা মায়ের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের এই সিদ্ধান্তেও বদল আনতে বাধ্য হয় পারি।

বরযাত্রী আসার ঠিক পঁচিশ মিনিট আগেই একটা পার্সেল আসে পারির নামে।সবাই একটু কৌতুহলী হয়ে তাকিয়ে থাকে পারির পানে।সবাই ভাবছে হয়তো দূরের কোন বন্ধু বিয়ে উপলক্ষে উপহার পাঠিয়েছে।আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে,পারি নিজের কাছের মানুষের এমন মনোভাবে খানিকটা হাসলো বোধহয়। পার্সেল আসার ঠিকানা,প্রাপকের নাম লেখা থাকলেও প্রেরকের নাম নাই।পারির ভ্রু কুঞ্চিত হলো।এমন কেউ নেই যে পার্সেল করে উপহার পাঠাতে পারে তবে কে সে?

কৌতুহলী পারি বক্স খুলতেই বর এসেছে বর এসেছে রবে চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠলো।বক্স খোলা,তার মাঝে কি আছে দেখার কৌতুহল সবার নিমিষেই গায়েব হয়ে গেল।পারিকে রেখেই সবাই বরকে বরণে চলে গেল।রয়ে গেল একা পারি। বুকের মাঝে নতুনত্বের ধুকপুকানি।পুরাতন অনুভূতিকে ভুলে নতুন ভাবে সাজানো। স্বপ্নের পুরুষকে রেখে এমন একজনকে নিয়ে আগানো যে ছিলো না কোন ভাবনাতেই। আচ্ছা আদৌও কি সেই স্বপ্নের পুরুষ ছিলো;নাকি যে আসছে সে? 

ভাবনার মাঝেই পারি নিজের সামনে থাকা বক্সটায় নজর বুলালো।কেন জানি মনে হচ্ছে এই বক্সে এমন কিছু আছে যা বদলে দিবে সবকিছু! কাঁপা কাঁপা হাতে বক্সটা খুলতে শুরু করলো।

শুরতেই বেরিয়ে এলো একগুচ্ছ কাঠবেলীর মালা, কাঠগোলাপের একটি লহর, একগুচ্ছ টকটকে লাল গোলাপ,তার নিচে একটা টকটকে লাল বেনারসী যার মাঝে সুন্দর করে ভাঁজ করা আছে কারচুপির অত্যন্ত নিপুণ সুন্দর কাজ করা একটি ব্লাউজ, সুতির পেটিকোট, দারুন কারুকার্য সম্বলিত একটা লাল বিয়ের ওড়না,এক বক্স বিভিন্ন রঙের রেশমী চুড়ি, চকমক করা রুপোর নূপুর,আর সাথে ছিলো এক সেট সোনার গহনা। একটা বৌয়ের সব প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে পরিপূর্ণ বক্সটার নিচে ছিলো দ্বি ভাজিত একটি সাদা চিঠি।

পারির সমস্ত শরীর কাঁপছে,এই জিনিস, এই রঙ,এই সাজের ধরন কেবল একজনের‌ই পছন্দের। শুধু সেই বলতো, "বিয়ের দিন তোমাকে আমি এভাবেই দেখতে চাই। কিন্তু কিভাবে সম্ভব? সে তো নিজেই সবটা শেষ করেছে!" পারি বুঝতেই পারলো না কাপুনির সাথে সাথে কখন যেন তার চোখ ভিজে উঠেছে। অস্থির,ভয়,রাগ সব মিলিয়ে পারি আবার‌ও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে মনে হলো। নিজেকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টায় আপ্রাণ মনোস্থির করলো।হাত বাড়িয়ে সাদা কাগজটা তুলে নিলো। দ্বিভাজিত কাগজের ভাঁজ খুলতেই ছোট্ট একটি হলুদ কাগজ পড়ে গেল। নিজের কোলে পড়ে যাওয়া হলুদ কাগজটা দেখে সাদা কাগজে চোখ রাখলো,

আমার প্রাণনাশিনী,
পত্রের শুরুতেই বলে দিচ্ছি এগুলো কিন্তু খুব পুরোনো,একদম প্রথম প্রেমের শুরুতে কেনা। শুধু সোনার অলংকার কেনা এইতো বছর হলো।কি করবো বলো তো! সোনার যে দাম তা তো আমার মতো বেকার ছাত্র মানুষের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়।তবুও খুব ইচ্ছে ছিলো আমি আমার বউকে আমার নিজের টাকায় কেনা সোনা দিয়ে মুড়িয়ে ঘরে তুলবো।তাই তো উচ্চ মাধ্যমিক থেকেই টিউশনির একটু একটু করে জমিয়ে রাখা ভান্ডার থেকে অবশেষে কেনার সামর্থ্য হলো ; যদিও তা খুব একটা নয় তবুও তো শান্তি পাবো এই ভেবে যে আমার লাল বধূর অঙ্গে জড়ানো আমার শ্রমের মর্যাদা। আমার প্রাণহরিণীর অঙ্গের শোভাবর্ধনে জড়িয়ে আছে আমার সততা। বাবার টাকায় কেনা অলংকার দিয়ে ব‌উ আনতে পারে অনেকেই কিন্তু নিজের বেকারত্ব উপভোগের সময়ে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে কজন পারে ব‌উকে সাজাতে।আমি হয়তো পেরেছি! আসলেই কি পেরেছি!  আমি যাকে ব‌উ বানানোর স্বপ্নে বিভোর ছিলাম,যাকে এখন‌ও ব‌উয়ের আসনে রেখে নিজেকে বিবাহিত ব্যাচেলর বলে সম্বোধন করছি সে কি আদৌও আমার ব‌উ ! না! সে এখন অন্যের বধূ!অন্য কারো সম্পদ; অন্য কারো অস্তিত্বের মাঝে মিশে রয়েছে! তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা কেবল তার‌ই সাজে। তার স্বপ্নে এখন অন্য কেউ নিয়মিত যাতায়াত করবে,যেথা হবে প্রেমের উপন্যাস,তৈরী হবে নতুন প্রেমের কাব্য, গাঁথবে সেথা অজস্র কবিতার লাইন।আমি তো এখন শুষ্ক অনুভূতি, ফুরিয়ে যাওয়া আকাঙ্ক্ষা, নিভে যাওয়া স্বপ্নপ্রদীপ! আমার জন্ম কেবল তাকে চাওয়ার মাঝেই ছিলো,পাওয়ার জন্য স্রষ্টা আমাকে সৃষ্টি করেনি তাই তো খুব করে চেয়েও পেলাম না। 

কিন্তু জানো তো এই না পাওয়ার দায়ভার কিন্তু একার তোমার‌ই;কেন তুমি আমাকে এতটা ভালোবাসতে গেলে বল তো!এই মেয়ে তুমি জানতে না কাউকে অতিরিক্ত ভালোবাসতে নেই! আল্লাহ অতিরিক্ত ভালোবাসার মানুষদের নিয়ে যায়।দেখো তোমার অতিরিক্ত ভালোবাসায় আল্লাহ বিরক্ত হয়েই আমাকে তোমার থেকে আলাদ করে দিলো!এর জন্য মোটেই আমি দায়ী নই,তুমি দায়ী! কেন এত ভালোবাসতে গেলে জান! একটু কমই না হয় বাসতে অন্তত একটা জীবন তোমায় নিয়ে কাটাতাম! একটা সুখের ছোট্ট পৃথিবী সাজাতাম! আমাদের ছোট্ট ঘরে অনেকগুলো ফড়িং উড়ে আসতো সুখের বার্তা নিয়ে। আমাদের জীবনটা হতো সুখ ফড়িংয়ের ন্যায় চঞ্চলা! পাখি এতটা ভালো না বাসলেও তো পারতি অন্তত তোকে অন্যের হতে দেখা লাগতো না। তোমাকে না পাওয়ার এই আক্ষেপ আমায় পুড়াবে কেয়ামত অবধি।হাশরে খুব করে জানতে চাইবো উপর‌ওয়ালার কাছে কেন দিলো না আমার প্রাপ্তির ঝুলিতে তোকে!
এই পারীজাত একবার সাজবে আমার সাজে! হবে একবার এই অভাগার দলিলহীন ব‌ধু? স্বচক্ষে নাই হোক অন্তত অদৃশ্য দৃষ্টিতে দেখবো আমার সেই লাল টুকটুকে পরীটাকে। দুষ্টুমি করবো না প্রমিস, শুধু দেখবো! দিবে এতটুকু অধিকার?
না থাক লাগবে না; এতে তোমার পাপ হবে,লাগবে গায়ে কলঙ্কের কালি! আমার পারীজাত তো শুদ্ধ, ভোরের শিশিরে ন্যায় স্নিগ্ধ, নতুন ভোরের আলোর ন্যায় বিশুদ্ধতা তাকে ঘিরে রাখে।তাকে আমি কলঙ্কিত হতে দেখতে পারি না।সে তো পবিত্র। পৃথিবীর কোন কলুষতা তাকে যেন ছুঁতে না পারে।

তুমি সবসময়ই জিজ্ঞেস করতে কেন তোমাকে প্রাণনাশিনী বলি,কখনো উত্তর দেইনি তাতে তোমার রাগ হতো,অভিমান করে গাল ফুলিয়ে রাখতে,হা হা হা! বিশ্বাস করো আমার খুব মজা লাগতো তখন; তাইতো কখনো কখনো ইচ্ছে করেই তোমাকে রাগাতাম! যাই হোক আজকে তোমার বহু কাঙ্ক্ষিত উত্তর দিচ্ছি!  শিক্ষাজীবনের তৃতীয় বর্ষে বসন্ত বরন উৎসব স্টেজে উঠে গান গাইতে গিয়ে থমকে যাই এক লাল জামদানি পরিহিতা রমনীকে দেখে। লম্বা কেশে সে রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার মুকুট পড়ে নিজেকে রানী ভিক্টোরিয়ার ন্যায় অতি মূল্যবান করে তুলেছিলো।ডাগর ডাগর হরিণী মায়াবী নয়নে লেপা কাজলে মুখ লুকিয়েছিলো মেঘেরা।লাল রঙের লিপস্টিকে নিজের ওষ্ঠদ্বয়ের সৌন্দর্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে দিয়েছিলো।আলগা প্রলেপ ছাড়াও নিজেকে অন্তত মায়াবী করে তোলা যায় সেদিন‌‌ই সর্ব প্রথম বিশ্বাস করেছিলাম।লাল জামদানি পড়ুয়া ঐ নারীকে সরাসরি দেখার পর থমকে গিয়েছিল আমার প্রাণস্পন্দন!অতি আকারে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছিলো নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসে! অসাড় হয়ে যাচ্ছিলো আমার সমস্ত ইন্ধন! মনে হচ্ছিলো ডুবে যাচ্ছি!এই মায়াবীর মায়াজালে ফেঁসে যাচ্ছি,হ্যা ফেঁসে গিয়েছিলাম, হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজের অস্তিত্ব! হয়েছিলো বিনাশ এক শক্ত পোক্ত পুরুষের নিজস্বতা। সেদিন‌ই বুঝেছিলাম এই মেয়ে আমার প্রাণ নিয়েই ছাড়বে! হলোও তাই! তাইতো তোমায় ডাকি প্রাণণাশিনী বলে!
পারীজাত ভালোবাসি,সবটা দিয়ে শুধু তোমাকেই ভালোবাসি!আমার জীবনে তুমি বিনা কোন নারী কখনো ছিলো না, আর আসবেও না। আমি তোমাতে আবদ্ধ, তোমাতে বিলিন হয়ে গেছি!হেথায় অন্য কারো ঢোকার অধিকার নাই।

সুখে থেকো আমার ভালোবাসা! আর শোন কখনো কাঁদবে না, আমি জানি তুমি এই চিঠি পড়ার পর ভীষন কাঁদবে! কিন্তু আমি আদেশ করছি কাঁদবে না।তুমি জানো তোমার চোখের পানি আমার সহ্য হয় না। সেদিন অনেক কষ্টে নিজেকে আটকিয়েছি।আর পারবো না, শক্তি নেই আমার দেহে।কি করবে বলো,এটাই আমাদের ভাগ্য, এটাই বিধির লিখন।আর বিধির লিখন না যায় খন্ডন! তোমার সাথে রেহানের ভাগ্য জোড়া তাইতো আজ রেহান তোমার পাশে এটাও তিনি‌ই লিখেছেন,এটাও খন্ডানোর সাধ্য আমাদের নেই।রেহান তোমাকে অনেক ভালোবাসে,ও নিজের সবটা দিয়ে তোমাকে সুখী করবে,তুমিও করো।

 শেষ কথা বলবো হয়তো এরপর আর এই কথা বলার সুযোগ থাকবে না, খুউববব ভালোবাসি আমার না হ‌ওয়া দলিলহীন ব‌উ! শেষ প্রহরেও সম্রাটের সমাজ্ঞী পারীজাত আবরার চৌধুরী! ভালো থেকো, ভালো রেখো!

আল্লাহ হাফেজ, দেখা হবে হাশরের ময়দানে! 

ইতি,
তোমার পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য মানবটি"

এক নাগাড়ে শেষ করে চিঠিটা বুকে চেপে ধরে অজর ধারায় কাঁদছে পারি। পাগলের মতো করেই কাঁদছে।বিয়ে বাড়ির হ‌ইহট্টায় পারির আর্তনাদ কারো কর্ণগুহে গেল না।পারির অঝর ধারায় কান্না থামে দরজার করাঘাতে।

"আপু দুলাভাইয়ের জুতা তোমার কাছে রেখে গেলাম, খবরদার কাউকে দিবে না।"

খুশির উচ্ছাসে ভেসে যাওয়া চাচাতো বোনটার নজরে আসলো না বিধ্বস্ত বধুরুপী বোনের পরিস্থিতি,সে নিজের কাজে এসে কাজ শেষ করেই দৌড় দিলো।তার চলে যাওয়ার পর পারি নিজেকে ধাতস্থ করে নিলো, আরও একবার চিঠিতে চোখ বুলিয়ে, কোলের উপরে রাখা হলুদ রঙের কাগজটা মেললো,

"ওর শেষ ইচ্ছা ছিলো তোমাকে ব‌উ রুপে দেখা, কিন্তু ভাগ্য হয়তো এবারও ওর পক্ষে ছিলো না তাই হয়তো এটাও সম্ভব নয়।তবে আমি অনুরোধ করবো ওর চেষ্টাকে বিফলে দিও না ।তোমাকে সুখী করার যেই কঠিন প্রত্যাশায় সে নিজেকে পুরো পৃথিবীর চোখে খারাপ করেছে সেই সুখ যেন তোমার আঁচলে বাঁধা পড়ে। এগুলো তোমার অবধি পৌঁছানোর দায়িত্ব ছিলো আমার উপরে,আমি নিজের দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলাম।পেলে শুধু একটা সাংকেতিক চিহ্ন দিও যেকোন উপায়ে! আর হ্যা রেহান ছেলে হিসেবে যতটা না ভালো নিশ্চিত করে বলতে পারি স্বামী হিসেবে তার চেয়েও দ্বিগুণ ভালো। তোমার জন্য এই রত্নকে ঐ ই বেছে নিয়েছে!
সুতরাং প্লিজ আমার বন্ধুর শেষ ইচ্ছেকে অন্তত রেখো,এইটা একজন হতভাগা বন্ধুর , একজন অসহায় বড় ভাইয়ের অনুরোধ তার ছোট বোনের প্রতি!

তোমার অপদার্থ জাবেদ ভাই!"

রাগে চিরকুটাটা মুচড়ে ছুঁড়ে মারলো,এরা সবাই ওর সুখ চায় অথচ সুখে থাকার কারণটা কেড়ে নিচ্ছে।কে চায় এমন সুখ? পারি চায় না! পারি শুধু তার সম্রাটকে চায়।
কথাগুলো বিরবির করেই বললো, এরপর আরও একবার সম্রাটের চিঠি বুকের মাঝে চেপে ধরলো,হুট করেই মাথাম কিছু একটা ঢুকলো, দ্রুত উঠে গিয়ে দরজার খিল মেরে দিলো! 
মাথার উপরে থাকা মেজেন্ডা মসলিন ওড়নাটা খুলে ছুড়ে মারলো।এক টানে গলার গহনা ছিঁড়ে ফেললো, তাতে বেশখানি চামড়া ছুঁলে রক্ত বের হলো বোধহয় কিন্তু পারি এখন কোন কিছুতেই থামবে না।বিছানায় ছুড়ে নিজের সজ্জার টেবিলের সামনে গিয়ে পাগলে মতো হাতরিয়ে বের করলো আলগা প্রলেপ তোলার বস্তুটি কোনরকমে তুলে ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে আসলো। দৌড়ে এসে সম্রাটের পাঠানো জিনিস থেকে সাজতে লাগলো,মোটা করে চোখে লেপ্টে কাজল দিলো, ঠোঁটে সম্রাটের দেওয়া লাল লিপস্টিক,হাত ভরলো রেশমি চুড়ি দিয়ে। এর মধ্যেই দরজায় করাঘাত শুরু হয়ে গেছে, বুঝতে পারলো তাকেই নিতে এসেছে কিন্তু পারি আজ আর দরজা খুলবে না, কোনভাবেই না।
কোনদিকে মন দিয়ে সময় নষ্ট করলো না, নিজের মতোই কাজ করে গেল, পায়ে রুপোর নূপুর পড়লো, মাথায় দেওয়া গাঁজরা ,গোলাপের গুচ্ছ খুলে সম্রাটের পাঠানো ফুলগুলো মাথায় লাগিয়ে নিলো।শাড়ীটা পিন দিয়ে আঁটসাঁট করে বাধানো তাই একটানে পেটিকোট খুলে সম্রাটের পাঠানোগুলো পড়ে নিলো। নিজেকে সম্রাটের সাজে সাজিয়ে আয়নায় গিয়ে দেখতে লাগলো, মনে মনে কল্পনা করলো সম্রাট তার পিছনেই আছে। তাকে দেখে দুষ্ট হাসি দিচ্ছে, লজ্জায় রক্তিম আভায় ছেয়ে গেল পারির সমস্ত বদন। কল্পনার রেশ বাস্তবে উপলব্ধি করার চেষ্টায় নিজেকে আড়াল করলো দুই হাতের মাঝে।যেন সম্রাট সমানে বসেই ওকে দেখছে আর ও সম্রাটের নেশাক্ত চাহনিতে লজ্জায় মরে যাই যাই অবস্থা;আনমনেই বলে উঠলো,

"যাহ দুষ্টু!"

"পারি মা দরজা খোল!"
"পারিপু দরজা খোল!"

বাইরে থেকে অনুরোধ সূচক শব্দে পারি বাস্তবে ফিরে আসলো,বুঝলো এত সময় সে কল্পনায় ছিলো।ভয় ভয় চোখে দরজায় তাকালো,এত সময় এতকিছু ঘটিয়েও চিন্তা ভয় কিছুই হয়নি কিন্তু এখন।পরক্ষনেই নিজের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিলো,ভয়কে ঠেলে দিয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেল বাবা মায়ের ভয়ার্ত চেহারা। রেহানের ভয়মিশ্রত চিন্তিত মুখ, অনেকেই উপস্থিত এখানে, সবাই কৌতুহলী হয়ে দেখে যাচ্ছে পারিকে।

" একি! এই অবস্থা কেন তোর?" এভাবে কেন সাজলি? তোকে তো মাত্র‌ই সাজিয়ে দিয়ে গেল, হঠাৎ পরিবর্তন করলি কেন?"

সবার মুখে একবার নজর বুলিয়ে মায়ের প্রশ্নকে এড়িয়ে গিয়ে দরজা পেরিয়ে বাইরে এলো, মানুষ এর‌ই মধ্যে ফিসফিস শুরু করে দিয়েছে,রেহান‌ও হতবাক হয়ে তাকাতেই আছে।কি বলবে,কি করবে কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না তার আপাতত। সে শুধু দেখে যাচ্ছে পারির মতিগতি।

পারিকে বের হয়ে যেতে দেখে সবাই একটু ফাঁক হয়ে দাঁড়ালো,জায়গা পেয়ে পারি বোধহয় সাহস পেল। কোনদিকে না তাকিয়ে দৌড় দিলো,এক দৌড়ে ড্রয়িং রুম পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে সোজা রাস্তায় নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে কেবল দৌড়াচ্ছে,যেন আজ দৌড়াতে পারলেই সম্রাটকে পাবে আজীবনের জন্য।

পারির এহেন কান্ডে হতভম্ব,নিরব হয়ে দেখেই গেল, বুঝতে সময় লাগলো ঠিক কি করলো একটু আগে পারি। বাড়ির বাইরে চলে যেতেই রেহানের উদ্দেশ্যে পরশ আবরার চৌধুরী খালি একবার বললেন,

"রেহান আমার মেয়েকে ধরো!"

রেহান চেতনায় আসলো,পরশ আবরার চৌধুরীর আদেশ শুনতেই ছুটে গেল কিন্তু ততক্ষণে পারি দিক হারা হলো।পারির ছুটে যাওয়াতে আগত মেহমানদের মাঝে গুনগুন শুরু হয়ে গেল, মিসেস প্রিয়ন্তি কান্নার রোল বসিয়ে দিলেন, ঘরের ভেতর থেকে সেই চাচাতো বোন চিঠি দুটো পরশ আবরার চৌধুরীর হাতে দিতেই তিনি পড়া শুরু করলেন, শেষে শুধু বললো,

"আমার মেয়েটাকে বুঝি আর বাঁচানো গেল না  প্রিয়ন্তি,যেই ভয়ে সত্যিটা এতদিন সবাই লুকিয়েছি আজ সেই সত্যিটা সামনে এসেই গেল! একেই হয়তো বলে বিধির লিখন না যায় খন্ডন!সত্য একদিন সামনে আসবেই। আমাদের সব শেষ হয়ে গেল!"

এ্যাম্বুলেন্সের শব্দ কানে বাজছে,তার সাথে সাধারণ জনগণের হট্টগোল।সব কিছু কেমন অসাড় মনে হচ্ছে।সবাই পারির দিকে ঝুঁকে আছে,কেউ কেউ জিজ্ঞেস করছে পারির পরিচয় কি? শুনতে পারলেও বলার মতো অবস্থাতে নেই। হঠাৎ করেই নিভু নিভু চোখে দেখতে পেল ভীড় ঠেলে সাদা ফকফকা একটা জুম্বা পরিহিত এক সুদর্শন সুপুরুষ পারির দিকে এগিয়ে আসছে। মিষ্টি হেসে হাত বাড়িয়ে দিলো পারির পানে,আলতো স্বরে শুধালো, "যাবে আমার সাথে!" মিষ্টি হেসে ঠোঁট এলিয়ে চোখে প্রত্ততর করলো।হাত উঁচিয়ে তার হাতে রেখে ছোট শব্দে বললো, "হুম!"

এরপর.....

বাংলাদেশ ক্যান্সার হসপিটালের ইমারজেন্সি আইসিইউতে সবার অগোচরে শ্বাস প্রশ্বাসের গতিধারা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথেই তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দুই ফোঁটা অশ্রু।অসাড় শরীরের কঙ্কালন্যায় হাত উঁচিয়ে নকল শ্বাস নালী খুলে প্রকৃত শ্বাস নেওয়ার বৃথা চেষ্টা। বুঝতে পারলো লগ্ন চলে এসেছে।মুচকি হেসে বিরবির করে শুধালো " ভালো থেকো ভালোবাসা! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদূর রাসুলুল্লাহ (সা.আ)!"

জানলো না কেউ কারো চলে যাওয়ার কথা।পেল না দেখা এপারে,পাবে কি দেখা ওপারে!

পৃথিবীতে সব প্রেমের প্রণয় ঘটে না! সবার প্রেমে পূর্ণতা আসে না।কেউ পেয়েও পায় না ,আবার কেউ পেয়েও রাখে না। ভাগ্যের খেলায় কেউ গো হারা হারে তো কেউ বাজিমাতের বাজিমাত করে।এটাই জীবনের একমাত্র সত্য যার নাম মৃত্যু! যার আগমণ নিশ্চিত! এটাকে এড়িয়ে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়।ভাগ্যকে বদলানো কোন মানবকুলের সম্ভব নয়।ভাগ্য কেবল রবের হাতে।তিনি যা নির্ধারণ করবেন তাই হবে তাকে বদলানো কোনভাবেই সম্ভব নয়।তাই তো বলা হয় বিধির লিখন না যায় খন্ডন!

সমাপ্ত..

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ