প্রবাসী না পরবাসী

  #প্রবাসী_না_পরবাসী

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 



পর্ব ০১

সারপ্রাইজ দিতে এসে নিজেই যে এত বড় সারপ্রাইজ পেয়ে যাবো সেটা ভাবতেই পারিনি! 
পাক্কা দশ বছরের ছোট ভাইকে যখন নিজের স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় নিজেরই ঘরে দেখি তখন পুরুষ হিসেবে কি করা উচিত আমার? 
 দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আজ দেশে আসলাম, কাউকে জানাইনি এমনকি নিজের স্ত্রীকেও না! কারন তাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম, প্রতিদিন ই ফোন করে কাঁদে কবে আসবো? তাই বারবার জিজ্ঞেস করে! আমিও বুঝি একজন সবল স্ত্রীর পক্ষে পাঁচ বছর স্বামীর সঙ্গ থেকে দূরে থাকা কতটা কষ্টকর ! আমার কি কষ্ট হয় না! অবশ্যই হয়! আমি তো পুরুষ! তাও পরিপূর্ণ বয়সের একজন তাগড়া পুরুষ! এই বয়সী পুরুষদের সবসময় নিজ স্ত্রীর সান্নিধ্যে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে! শরীরের সাথে লেপ্টে থেকে শরীরের উষ্ণতা অনুভব করতে ইচ্ছা করে কিন্তু! দায়িত্ব! চাইলেও যে দায়িত্ব এর কাছে বাঁধা পড়ে থাকতে হয়! পারি না তো নিজের দায়িত্ব কে ছোট করে দেখতে!আর তাই তো পরে আছি সেই দূর দেশে! নিজের পরিবার, আপনজন, প্রিয়জন সব ছেড়ে! হ্যা হয়তো দেশেই কিছু কাজ করতে পারতাম কিন্তু আদৌও তাতে আমার প্রয়োজনীয়তা মেটানো যেতো! দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এদেশে সামান্য আয়ে কোনরকম বাঁচা গেলেও স্বপ্ন পূরণ আমাদের মতো মধ্য নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য বিলাসীতা ছাড়া আর কিছুই নয়! তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই পড়ে আছি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ব্যয়বহুল উন্নত দেশে! মোটামুটি ভালো একটা পারিশ্রমিক পাই সেখানে থেকে! আর তাই দিয়েই নিজের ইচ্ছা পূরনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টায় আছি! 
আমি নিজে তো সরাসরি নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে পারিনি তাই ছোট ভাইয়ের মাধ্যমেই তা করতে চাই! ভাই আমার মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী! ইনশাআল্লাহ খুব তাড়াতাড়িই সার্টিফিকেট পাবে! এরপরেই আমার মুক্তি! ভাইয়ের গলায় ঐ স্টেথোস্কোপ আর পড়নে'র সাদা এপ্রন  আমার ভেতরে কি পরিমান শান্তি দেয় তা শুধু আমি‌ই জানি! যদিও সরাসরি দেখা হয়নি এখনো; ফেসবুকে দেওয়া ছবি কিংবা কখনো ভিডিও কলে দেখেই আমি নিজের চোখের শান্তি মিটিয়ে'ছি! ইনশাআল্লাহ এবার সরাসরি দেখবো তার সাথে স্বপ্নের মেডিকেল কলেজ ঢাকা একবার ঘুরে দেখবো! আর তাই তো হুট করেই কাউকে না জানিয়েই চলে আসলাম; জানি খুব সারপ্রাইজ হবে সবাই! সবচেয়ে বেশি হবে হয়তো বাবা! কারন এত বছর পর নিজের সন্তানের মুখ দেখে নিশ্চয়ই  সবচেয়ে বেশি খুশি হয় বাবা মা! আমার বাবা হবে কিন্তু মা নয়! মা আমার তো নাই! সেই যে গতবার দেখে গেলাম মুখটা; সেই মুখটা আর দেখার উপায় নেই! কেন এত অভিমান করলো মা! কি এমন অপরাধ ছিলো আমার! একটু সময়‌ই তো চেয়েছিলাম! তার জন্য এত অভিমান! এত অপেক্ষা! আচ্ছা আমি কি বেহেস্তে যেতে পারবো!মা তো বলতো যেই সন্তান বাবা মায়ের অবাধ্য হয় না তাকে নাকি আল্লাহ অনেক ভালোবাসেন তাহলে কি আল্লাহ আমার প্রতি খুশি? আমি তো চেষ্টা করেছি সবসময় বাবা মায়ের মন বুঝে চলতে! কিন্তু? আমি তো আমার মায়ের শেষ কথাটাই শুনিনি আর তাই তো মা আমার অভিমান করে চলে গেল! আচ্ছা মা তো বেহেস্তে যাবে! এখন মা যে আমার প্রতি অভিমান করে চলে গেল এতে তো আল্লাহ আমার প্রতি নারাজ হয়ে আছে হয়তো! তাহলে আমি কি জান্নাত পাবো না! তবে কি মায়ের সাথে দেখা করতে পারবো না! তাহলে কিভাবে শুনবো মায়ের সেই শেষ কথা? কে বলবে আমার মায়ের মনের সেই যন্ত্রনার কথা যা সহ্য করতে না পেরে,যা বুকের মধ্যে পাথরের ন্যায় ভারী হয়ে আমার মায়ের বুকে চাপ দিতো!যার কারনে মা আমাকে এভাবে এতিম করে চলে গেল!  
হ্যা আমার মা আল্লাহর প্রিয় হয়ে তার অতিথি সালা'য় চলে গেছেন! শেষবার যখন এসেছিলাম তারপর চলে যাওয়ার ঠিক চার বছর নয় মাসের মাথায় মা আমার চলে গেছে! যাওয়ার আগে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো কিন্তু আমি তখন বসের আদেশ পালনে ব্যস্ত ছিলাম তাই মা ফোন করে কথা বলার মধ্যেই আমি বলেছিলাম "মা আমি ব্যস্ত আছি! বাসায় গিয়ে কথা বলবো নে!" আসলে আমি মায়ের প্রতি একটু অভিমান ও করেছিলাম কারণ মা ইদানিং খালি আমার ব‌উয়ের নামে কথা বলতো যেটা আমার খুব একটা পছন্দ হতো না! কিভাবে হবে! অত শান্ত শিষ্ট একটা মেয়ের নামে কোন খারাপ কথা আদৌও বিশ্বাস হয়! মনে হচ্ছিল মা ও অনেক শ্বাশুড়ির মতোই ব‌উদের সাথে খ্যাঁচ-খ্যাঁচ করে! তাই আমি অতটা গুরুত্ব দেয় নি! রাতে ও অনেক দেরি করে বাসায় যাই,যেহেতু নিজেকেই রান্না করে খেতে হয় তাই রাতে আমি খুবই ক্লান্ত অনুভব করি এর জন্য রাতে আর ফোন দেই নি ভেবেছিলাম সকালে কাজে যাওয়ার আগে সবার সাথে কথা বলবো কিন্তু কে জানতো সেই সকালটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সকাল হয়ে আসবে!
খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গে ছোট ভাইয়ের ফোন পেয়ে আর তাতে ই যেন দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেল!
"ভাই মা আর নেই" !
এই একটা কথা বুঝিয়ে দিলো আমি কি হারিয়েছি! আর কোন অভিযোগ শুনতে পাইনি মায়ের তরফ থেকে আমার ব‌উয়ের নামে!আর না শুনতে পেলাম মায়ের শেষ কথাটা! কলিজা ফেটে যাচ্ছিলো ,অন্তর খা খা করছিলো কিন্তু কি ই বা আর করার আছে! পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সত্য মৃত্যু! যার স্বাদ পৃথিবীর সব প্রাণীকে নিতে হবে! তাই কষ্ট হলেও মানতে হয় আমাদের!
মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটি চাইলেও ছুটি পাই নি তাই মায়ের মুখটা আর শেষ দেখা হলো না! মা আমার সেই অধিকার ও দিলো না! তাই সব ভুলে আবারও সবাই স্বাভাবিক হয়ে গেলাম! অবশ্য এটাই নিয়ম! পৃথিবীতে কেউ কারো জন্য থেমে থাকে না! সে যত‌ই আপন হোক; বাঁচতে হলে অবশ্যই সব কষ্ট, হারানোর বেদনা ভুলতে হবেই! আমাদের ও তেমনি; মায়ের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর দেশের মাটিতে পা দিলাম কিন্তু কাউকে জানাইনি! এটা অবশ্যই অনেক বড় সারপ্রাইজ আমার স্ত্রী , সন্তানের জন্য! যদি ভাইটা বাড়ি থাকতো তার জন্য ও কিন্তু সে তো নাই! তাই কালকেই তার হসপিটালে গিয়ে ই একদম চমকে দিবো! আর বাবা সে ও খুশি হবে কিন্তু হয়তো সবার মতো জাহির করতে পারবে না! 
কিভাবে করবে? সে তো ভালোবাসার স্ত্রী হারানোর শোক স‌ইতে না পেরে ষ্টোক করে প্যারালাইজড হয়ে যায় তাও প্রায় চার বছর পাঁচ মাসের মাথায়! এরপর থেকে বাবার গলার আওয়াজ ও আর আমি শুনতে পারিনি!
 বড় আপু যোগাযোগ করে প্রায়‌ই ! আর ছোট ভাইটা ও ফোন দিয়ে খবরাখবর রাখে,তবে যখন‌ই ফোন দেয় তার একটা না একটা বায়না থাকে! আমার ও খারাপ লাগে না! কেন খারাপ লাগবে! যত‌ই হোক আমার একটা মাত্র ছোট ভাই!আমি বড় ! আবদার আমার কাছে করবে না তো কার কাছে করবে! মা হারা আজ কতটা বছর, বাবার আদর থেকেও দূরে! একমাত্র বড় বোন সেও কত দূর থাকে! চাইলেই তো আর তার কাছে যাওয়া যায় না! সেও নিজ শ্বশুর শ্বাশুড়ির সাথেই থাকে, দুলাভাই বেশ গম্ভীর স্বভাবের মানুষ! তাই অনেক ভেবেই তার বাড়িতে যেতে হয়! আমিও জীবনের তাগিদে এই দূর পরবাসে পড়ে আছি! ছায়ার মতো মাতৃস্নেহের হাতটা একমাত্র আমার স্ত্রী ই রেখেছে! সেই মায়ের চলে যাওয়ার পর থেকেই আমার স্ত্রী আর আমার ভাই ই ছিলো আমার একান্ত আপনজন এবং এরাও নিজেদের আপনজন!একে অপরের খেয়াল রেখে আসছে! আমার স্ত্রীর আদর যত্নে-ই ভাই টা আমার মানুষের মতোই মানুষ হয়েছে! না হলে ঐ বয়সে যখন মাকে হারিয়েছে,তখন অনেক খারাপ সঙ্গে নষ্ট পথে যেতে পারতো! কতরকম নোংরা বিষয়ে জড়িয়ে যেতে পারতো কিন্তু না আলহামদুলিল্লাহ ভালো ই আছে! একদম মানুষের মতো মানুষ হচ্ছে! মেডিক্যাল এ মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে সবার কাছেই পরিচিত, এলাকায় ও ভালো ভদ্র ছেলে হিসেবে সম্মানিত! এতে অবশ্যই আমার স্ত্রীর ও অনেক অবদান রয়েছে কিন্তু মা যে কেন ওর নামে উল্টো পাল্টা কথা বলতো কি জানি!
আমি সাইফুল! সাইফুল ভুঁইয়া! প্রবাসী;সেই অদূর কাতার থাকি!আজ থেকে পুরো ১৭ বছর আগে পারি দিয়ে ছিলাম শত মানুষের স্বপ্নের দেশে! বড় বোন, আমি, ছোট ভাই এবং মা বাবা নিয়ে আমাদের সুন্দর গোছানো সংসার কিন্তু কৃষক বাবা তাতেও হিমশিম খেতো সংসার চালাতে! আর তাই তো ইন্টার পরীক্ষার পর পারি জমাই এ দেশ থেকে বিদেশ নামক অচেনা পৃথিবীতে !
অবশ্য সেখানে গিয়ে কাতার উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এর অধীনে আমি অনার্স পড়েছি এবং মাস্টার্স ও করেছি!

পর্ব ০২

গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করেই নিজেকে আড়াল করি মুখোশের সাহায্যে,,যেহেতু অনেক বছর পর আজ আসলাম তাই চাইলেও অনেকেই চিনতে পারবে না! পারবে না বললে কিছুটা ভুল হবে হয়তো কষ্ট হবে মুখোশের কারনে! সিএনজিতে চড়ে একদম লুকিয়ে চুরিয়ে প্রবেশ করলাম নিজ বাড়ির আঙিনায়! 
বেলা তখন মধ্য দুপুর! সূর্যি মামা তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিলাচ্ছে ধরনীতে;
আমাদের বাড়িটা বড় বড় গাছপালা দিয়ে একদম ঢেকে ফেলা হয়েছে,যেন নববধূ ঘোমটা দিয়ে নিজেকে লজ্জার হাত থেকে রক্ষা করার আপ্রান প্রচেষ্টা চালাচ্ছে! অবশ্য এতে আমি সারপ্রাইজ হ‌ইনি কারন আমার মা ব‌উ দুজন‌ই বেশ রক্ষনশীল! সুতরাং নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য-বোধের জন্য বাড়িকে এভাবে ঢেকে রাখাটা স্বাভাবিক! কিন্তু অস্বাভাবিক ছিলো এটা যে আমি সিএনজি বাড়ির উঠানে থামালাম ,অথচ বাড়ির ভেতর থেকে কোন একজন মানুষ এলো না!সিএনজির বিৎখুতে শব্দ পেয়েও কেমনে কেউ বাইরে এলো না! পরে মনে পড়লো আমার সাত বছরের একমাত্র ছেলে মাদ্রাসায় আছে এইসময়! সে রাতে আসবে বাড়ি! আর আমার বাবা তো বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারে না,ভাইটাও হোস্টেলে সুতরাং বাসায় এখন একা আছে মাত্র আমার স্ত্রী! সে নিশ্চয়ই ঘুমাচ্ছে! তার আবার দুপুরে খাবার পরে ঘুমানোর অভ্যাস প্রখর! হয়তো এখনও তাই করছে! 
আমি ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম ঘরের দিকে, পরক্ষনেই মনে হলো মায়ের মুখটা একবার দেখে আসি,তাই আবার ও পিছিয়ে গেলাম! বাগানের বেশ খানিকটা ভেতরে অনেকখানি জায়গা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে আমাদের পারিবারিক কবরস্থান যেখানে প্রথম বিছানা পেতেছে আমার জননী! 
নিরব কান্না আর দোয়ায় বেশ খানিকটা সময় কাটালাম মায়ের পাশে বসে! তারপর উঠে চলে গেলাম মা বাবার ঘরে; সেখানে বিছানায় শুয়ে আছে আমার জনক! একদম সেঁটে আছে চাদরের সাথে! শরীরের হাড়গুলো ভাস্যমান; পাজরের হাড়গুলো গোনা যায়! ফরসা শরীরে তামাটে রং ধারন করেছে! কেমন কুঁচকে গেছে,যেন একদম পুঁটলি হয়ে যাবে কয়েক দিন বাদেই! 
বুঝলাম না এত টাকা পাঠানোর পর ও কেন আমার পিতার এই অবস্থা! সবাই কে তো বলেছি যত টাকা লাগে লাগুক আমার বাবা যেন ঠিক থাকে; তার চিকিৎসার যেন কোন কমতি না থাকে! তাহলে? এই কি অবস্থা? সঠিক ভাবে, ভালো ডাক্তার দ্বারা চিকিৎসা করানো হলে এই অবস্থা তো হতো না! তাহলে! দেখে তো মনে হচ্ছে কতদিন ধরে না খেয়ে আছে! আশেপাশে পোকামাকড় মাছির আনাগোনা অসম্ভব পরিমানে! শরীরে যেন যত্নের ছোঁয়া নেই বহুবছর ধরে! তাহলে কি আমার বাবাকে কেউ যত্ন করে না , রাখে না সঠিক ভাবে খেয়াল!
কিন্তু তাহলে ওরা! যখন‌ই ফোন দেই ও তো বলে বাবার সেবায় ব্যস্ত আছে! বাবার এই করছি তো বাবার ঐ করছি! এত‌ই যখন করে তাহলে এই অবস্থা কেন? 
আর ভাই! ও তো প্রায়‌ই বাবার চিকিৎসার নামে কত টাকা নেয়! সেই টাকা দিয়ে কি চিকিৎসা করে যে আমার বাবার জীবন এতটা দুর্বিষহ্ !
না আর ভাবতে পারছি না! এর জবাব চাই ! আসল ঘটনা কি জানতে চাই!
আমার রাগ উঠলে ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা আছে! আমি জানি রেগে নেওয়া কোন সিদ্ধান্ত ই সঠিক নয়! এবার ও তাই করলাম! ধীর পায়ে হেঁটে বাবার পাশে গিয়ে বসলাম; হাতটা রাখলাম বাবার নিস্তেজ হাতের উপর; নিভু নিভু চাহনিতে চোখ মেলে তাকালো আমার জনক; খুশি হয়েছে,তবে আশ্চর্যের বিষয় মনে হলো বাবা একটু ও চমকায় নি! হয়তো ভেবেছিল এটাই হবে! যাই হোক বাবাকে বাবা বলে ডাকতেই তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো দুফোঁটা জল এবং তা অবিরত চলছে! নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না! বুকের উপর মাথা রেখে তাকে দুহাতে আগলে নিলাম,চাপা কান্নার ধমকে বুকের চাপ অনুভূত হচ্ছে তাও কিছু সময় ওভাবেই পড়ে র‌ইলাম! মাকে তো পেলাম না তাই মায়ের গন্ধ ও বাবার কাছেই খোঁজার চেষ্টা করলাম!
অনেক সময় পরে নিজের অস্থিরতাকে প্রশমিত করে বাবার চোখে চোখ রাখলাম,বাবাও নির্বাক হয়ে শুধু দেখছে! আমার মনে হলো বাবার ঐ দু চোখ আমাকে কিছু বলতে চায়! কিন্তু বলতে যে পারছে না! আমি একা একাই অনেক কথা বললাম তারপর বাবাকে বলে বের হলাম তার ঘর থেকে !
এবার কেন জানি মনের ভেতরে অজানা কষ্ট খুব করে ছটফট করছে! মনে হচ্ছে এমন কিছুর সম্মুখীন হবো যেটা হয়তো আমি সহ্য করতে পারবো না! তাছাড়া বাবার এই অবস্থা আমাকে খুব করে ভাবাচ্ছে! মায়ের কবরের দিকে আরো একবার দৃষ্টি বিনিময় করলাম তারপর নিঃশব্দে হেঁটে গেলাম নিজ ঘরের দুয়ারে! 
এত সময় আমি বাড়িতে এসেছি অথচ এখন আমার স্ত্রীর কোন শব্দ পেলাম না! মানে খালি ঘর দুয়ার রেখে কিভাবে একটি মেয়ে যে কিনা ঘরের কর্তৃ সে এভাবে ঘুমায়! বড্ড খারাপ লাগলো ব্যাপারটা ! দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করতে হাত উঠাতে'ই মনে হলো ঘরের ভেতর থেকে পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসছে! অজান্তেই কপাল কুঁচকে গেল! অস্থিরতা বেড়ে গেল! কান পাতলাম! খুব সাবধানে! হ্যা নিশ্চিত হলাম পুরুষের কন্ঠ ! কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব! আমার ঘরে পুরুষ মানুষ! তাহলে আমার স্ত্রী কোথায়? আবারও কান পাতলাম
! চেনা কন্ঠ! খুব চেনা; যেন সবসময় বাজে আমার কানের কাছে! এরপরেই শুনতে পেলাম কাঙ্খিত নারীর কন্ঠ! আমার হাত পা শীতল হয়ে গেছে! বুঝতে পারছি না আমি ভুল শুনছি নাকি? 
এসব ভাবনার মাঝেই মনে হলো একবার দেখি! কিন্তু কিভাবে? দরজায় আঘাত করতে গিয়েও মনে হলো না! আমি যদি এভাবে সরাসরি আক্রমণ করি সেটা আমার জন্য ভালো না ও হতে পারে! তাই চেষ্টা করলাম কোনভাবে ভেতরে কি হচ্ছে সেটা দেখতে! এদিকে ওদিকে তাকিতুকি করতেই মনে পড়লো পিছনের জানালা আছে সেটা দিয়ে যদি কোনভাবে সম্ভব হয়! 
পিছনের জানালার পাশে গিয়ে,একটা মাঝারি সাইজের ইটের উপর ভর দিয়ে জানালার ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে দেখার বৃথা চেষ্টা করলাম; বুঝতে পারছি না কি করবো!এখান দিয়ে ভেতরের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে! এবং তার সাথে পরিষ্কার হচ্ছে ভেতরে থাকা নর নারীর কন্ঠস্বর! আমি আরো বিচলিত হয়ে পড়লাম!
দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, লক্ষ্য করলাম ভালো করে! এবং পেয়ে গেলাম দরজা থেকে খানিকটা দূরে অন্য জানালার অংশ! এখানে আগে জানালা ছিলো না হয়তো নতুন করে কাটা হয়েছে তাই আমার মাথায় আসেনি! আমি সেখানেই গেলাম! এটাও ভেতর থেকে লাগানো! তবে এটা কাঠ দিয়ে নকশা করা তার সাথে ধাতব ঝালি লাগানো এবং ভেতর থেকে পর্দা দেওয়া! নকশার ছিদ্র গুলো খুব‌ই ছোট! তাই পর্দা লাগালে'ই পুরো বদ্ধ মনে হয়! আমি সরু একটা পাটকাঠির সাহায্যে পর্দা সরালাম এবং তারপর যা দেখলাম তাতে আমার পায়ের তলার মাটি নড়েচড়ে উঠলো! বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে আমার এত বিশ্বাস ভালোবাসায় গড়া সংসারে এমন ঘুঁনে কবে ধরলো! 
অনেক সময় স্তব্ধ হয়ে র‌ইলাম কি করবো! চিৎকার চেঁচামেচি করবো! তাতে কি খুব ভালো হবে? এদের সাথে তো আমার ও সম্মান যাবে! যারা দিন দুপুরে এভাবে অবৈধভাবে মেলামেশা করতে পারে তারা নিশ্চয়ই সম্মানের তোয়াক্কা করে না! তাছাড়া যেভাবে নিশ্চিতভাবে আছে তাতে বোঝাই যায় এটা তাদের নিয়মিত; নাহ কি করবো? আগেই বলেছিলাম আমি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে পারি নিজের আবেগকে! তাই করলাম কাঁধে রাখা ব্যাগটা শক্ত করে ধরেই বেরিয়ে পড়লাম ! উদ্দেশ্য কোথাও গিয়ে মাথা ঠান্ডা করা! তারপর পরের পদক্ষেপ সম্পর্কে ভাববো!

পর্ব ০৩

মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে মায়ের চলে যাওয়ার আগের কিছু কথা, তারপর মায়ের চলে যাওয়ার পর পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা ফোন দিতো তাদের কিছু কথা, এবং সর্বোপরি নিজের চোখে দেখা আজকের সবকিছু!
হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ক্ষেত পেরিয়ে কোলাহলে চলে আসছি তার হদিস নেই,তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেদিকে পা গিয়েছে সেদিকেই হেঁটে চলেছি! উদ্দেশ্য রাগকে নিয়ন্ত্রন করা! এখানে থাকলে ভয়াবহ কিছু একটা নিশ্চিত আমার হাতে ঘটবে যা আমি চাই নাই!
রাগ আর অস্থিরতায় ঘেমে একাকার হয়ে গেছি,শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে যার কারন মাস্ক খুলে ফেলেছি অনেক আগেই! 
এত সময়ে অনেকেই আমাকে দেখে ফেলেছে,, চিনতেও হয়তো তাদের খুব একটা কষ্ট হয়নি !
কোলাহলে'র মাঝে আসতেই অনেকেই আমাকে ঘিরে ধরলো,কথা বলছে, কুশলাদি জিজ্ঞেস করছে,, আমি আমার ভেতরে দহনকে কমানোর চেষ্টা করছি কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছি ! কান্না আসছে,খুব বাজে ভাবে চিৎকার করে কান্না আসছে! ইচ্ছে করছে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদি! কিন্তু পুরুষদের তো কাঁদতে নেই! আচ্ছা এই নিয়ম কে আবিষ্কার করেছে? বিধাতা নাকি বিধাতার ই সৃষ্ট কোন স্বার্থপর মানব! জানিনা!  এখন এত জ্ঞান চর্চার ও সময় নেই! ভাবনার মাঝেই কখন যে চোখ ফেটে পানি গড়িয়ে পড়লো তার সময়টাও বুঝলাম না কিন্তু যখন গাল বেয়ে থুতনি ছুঁলো তখন অনুভব হলো আমি কাদের জন্য কাঁদছি যারা আমাকে এভাবে ঠকা'লো! তারা কেউ কি আমার এই চোখের পানির মূল্য বুঝে? বুঝলে কি আর এই ভাবে ঠকা'তো; 
আমার চোখের পানি ই হয়তো প্রতিবেশীদের বুঝিয়ে দিলো আমার অন্তঃস্থলে'র খবর! কেউ কেউ জিজ্ঞেস করছে তো কেউ আবার নিজের থেকেই অনুমান করে নিচ্ছে আমি কি দেখেছি কতটুকু দেখেছি! বাড়ি গিয়েছি কিনা! মায়ের জন্য মন খারাপ করছে কিনা, বাবার সমস্যা সম্পর্কে কতটুকু অবগত! ব্লা ব্লা ব্লা!  
আমি উত্তর দিতে চাইছি না বললে ভুল হবে বলতেই পারছি না! গলার সামনে শব্দ গুলো জটলা পাকাচ্ছে,,কি আশ্চর্য অপরাধ করছে তারা আর লজ্জা হচ্ছে আমার! 
এই সময়ের মধ্যেই অনেক চাটুকার ধরনের মানুষ ও আমার আশেপাশে ছিলো, আবার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ও ছিলো তারা তাদের মতো করেই আমার অগোচরে ঘটমান অতীত সম্পর্কে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করলো! চেষ্টা করলো বলছি কারন তারাও সব কথায় 'হয়তো' লাগিয়ে দিচ্ছে!
আমার অনেক রক্তের আত্নীয় আছে যারা আমাদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে, তাদের মধ্যে ও দু একজন খবর পেয়ে এসেছে! নিজেদের বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য জোরালো ভূমিকা পালন করেছ কিন্তু আমি এখন এখান থেকে নড়তে'ই নারাজ! কোন মুখে যাবো তাদের বাড়িতে? তারাও অনেক কথাই অনেক সময় বলেছিলো আমার সবচেয়ে আপন দুজনের নামে আমি তো বিশ্বাস করিনি'ই, উল্টো তাদের দু চারটা মন্দ শুনাতে ও ভুল করিনি! তবে এখন? কিভাবে তাদের মুখোমুখি হবো?
আমি আপাতত যেখানে বসে আছি সেখানে একটা ছোটখাটো হাট বসে বলা যায়,আর সেই কারনেই অনেক মানুষ এখানে! বেশিরভাগই আমার গ্রামের,তাই তারা আমাকে এভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে হা হুতাশ শুরু করে,,এর মধ্যে কিছু মহিলা আছেন যারা আমার ব‌উয়ের কীর্তন গাইতে শুরু করলো, ভাইয়ের ও ছাড় দিলো না! এই মহিলা গুলো হলো সেই ধরনের যারা অন্যের বাড়ির হাঁড়ির খবর নিয়ে ঘুরে বেড়ায়! অবশ্য এদের আমার খুব একটা পছন্দ নয় তবে আজ কেন জানি এদের ই পরম বন্ধু মনে হলো! কারন তাদের কারনেই আমি আমার আপনজনের কিছু প্রশংসা বানী শুনলাম! পুরুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয় এই মামলায়! 
এক পর্যায়ে মনে হলো এভাবে কথা বলে কিংবা শুনে নিজের সম্মানে কাঁদা ছিটিয়ে ক্ষতি ব‌ই আমার কোন লাভ নেই! তাই তাদের সাথে বিদায় পর্ব সেরে চলে গেলাম আমার এক বন্ধুর বাসায় যেটা আমাদের গ্রাম বাদে তিনটা গ্রাম পরে!
আত্নীয়'দের বাড়ি যাই নি কারন সেখানে গেলেও এক‌ই গান চলবে সারাদিন!
বন্ধুর বাসায় গিয়ে বন্ধুর কাছে সবটা শেয়ার করলাম! সারারাত চোখে ঘুম নেই! পাঁচ দুয়ারে বসে ভাবছি কি করবো! ইচ্ছা করছে জবাই করি দুটোকে! কিন্তু তাতে সমাধান নেই উল্টা আমার জীবন টা শেষ হবে! নরপশুর রক্তে নিজের হাত নোংরা হবে! অসুস্থ বাবার দায়িত্ব কে নিবে! একমাত্র ছেলের ভবিষ্যত অন্ধকার হয়ে যাবে তার সাথে আমার আখিরাত এবং এই দুনিয়া দুটোই শেষ হবে! তাছাড়া মানুষ হত্যার মতো সাহস আমার নেই!
বসে বসে মনে করলাম গ্রামের মানুষের বলা কিছু কথা; তাদের ভাষ্যমতে আমার মায়ের মৃত্যু ছিলো অস্বাভাবিক! যে মানুষ রাতে ঘুমানোর আগেও সুস্থ তরতাজা সে কিভাবে ঘুমের মধ্যেই মরে যায়!আমার মনেও এই কথা বহু বার এসেছে কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা বলে সবকিছু দমিয়ে রেখেছি! মায়ের লাশ নাকি ডাক্তারের কাছে নেওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেছিলো আমার বড় আপা কিন্তু আমার ব‌উ আর ভাইয়ের কাছে তা টিকতে পারেনি!তারা খুব তাড়াহুড়ো করেই মাটি দিয়েছিল!শুনেছি তারপর থেকেই নাকি বড় আপা আমাদের বাড়িতে আর আসে না! এরপরেই হঠাৎ করেই বাবার অসুস্থতা; তিনিও নাকি আমার ব‌উ আর ভাইয়ের খামখেয়ালির শিকার; তারা তার সঠিক চিকিৎসার কোন চেষ্টাই করেনি এমনকি খোঁজ-খবর ঠিক মতো রাখে না! এর কারনেই আশেপাশে থাকা আত্নীয় স্বজনদের সাথে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে! অথচ আমাকে জানানো হতো সম্পত্তির কারনে, কিংবা কখনো বলা হতো আমার ব‌উকে হেনস্থা করার কারনেই নাকি তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে আমার আপনজনরা!
সারারাত ভাবার পর সিদ্ধান্ত নিলাম!! খুবই সহজ একটা সিদ্ধান্ত! খুব ভোরেই উঠে চলে গেলাম নিজ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে!!
বাড়ির উঠানে বিশাল বিচার সভা বসেছে! যার একপাশে আপাতত আমি ভুক্তভোগীর ভূমিকায় আছি,আর অন্য পাশে অপরাধীর ভূমিকায় আমার ব‌উ আর ভাই! অভিভাবক হিসেবে আছেন আমার বড় আপা আর দুলাভাই,ও আমার রক্তের সম্পর্কের আরো কিছু মুরব্বি! বিচার সভায় বিচারপতির আসনে আপাতত আছেন, চেয়ারম্যান, মেম্বার, স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত দুজন উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা,জেলা প্রশাসক, পারিবারিক আইন নিয়ে কাজ করেন এমন উকিল ও সমাজ কর্মী এবং জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করেন এমন একজন উকিল, এবং আরো অনেক জ্ঞানী মানুষজন! চেয়ারম্যানের বরাতে'ই এত বড় বড় মানুষের সহযোগিতা পেয়েছি অবশ্যই তাতে টাকা ও ঢালতে হচ্ছে!
আমার ব‌উয়ের বাড়ির তরফ থেকে এসেছে তার মা বাবা,ভাই আর দুলাভাই ও বোন! আমি আমার শ্বাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বেশি অবাক হলাম! কারন আমি যখন বিয়ে করি তখন তাদের অবস্থা "নুন আনতে পান্তা ফুরায় " আর এখন তার হাতে মোটা স্বর্নের রুলি চুড়ি! শ্বশুরের চেহারাও বেশ চকচকে; বোঝাই যাচ্ছে বেশ আরাম আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন অথচ আমার জানামতে আমার শ্বশুর বেকার,ঘরে যেই ছেলে আছে সেও বেকার! এলাকায় ঘুরেফিরে হিরোগিরি করাই তার একমাত্র কাজ! আর আমার সুমন্ধি যাকে আমি নিজ উদ্যোগে বিদেশে পাঠিয়েছি সে তো কখনোই বাবা মায়ের খরচ বহন করবে না! তার জন্য ই তো তার ব‌উ বাপের বাড়ি গিয়ে পরে আছে! আমি যতটুকু জানি সে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত আছে! তাহলে এই বৈভবের ব্যবস্থা কেমনে হয়? 
অথচ আমার বাবার চিকিৎসার খরচ ও নাকি এদের কাছে হয় না! কি বলবো? পরের দোষ দিয়ে কি হবে? যেখানে আপন রক্ত ই বেঈমানি করে!
বিচারে সর্বপ্রথম ঠিক হলো, "সম্পত্তি বন্টন"! আমি যখন বিদেশে যাই তখন বাবার সম্পত্তি বলতে ছিলো শুধু তিন কড়া চাষের জমি! বাবার তিন কড়া চাষের জমি আর দুটো হালের মহিষ ই ছিলো আমাদের পেট চালানোর মেশিন! তার মধ্যে থেকে একটা মহিষ ও এক কড়া জমি  বিক্রি করেছিলো বড় আপার বিয়ে দেওয়ার জন্য! এরপর বাকী একটা মহিষ বিক্রি করে ও আরো টাকা ধার দেনা করে আমাকে বিদেশে পাঠিয়েছিল! যদিও আমি সেই দেনা পরিশোধ করেছি এবং বাবার একটার পরিবর্তে দুটো মহিষ কিনে দিয়েছি! তবুও!
বাবার সেই তিন কড়া জমি ও ভিটা জমি,বাকী যা ছিলো আমি যাওয়ার আগে সেই মোতাবেক ভাগ বাটোয়ারা চললো, বাবা কথা বলতে না পারলেও চোখের ইশারায় অনুমতি দিলেন! বাবার নিজস্ব আয়ের থেকে করা সম্পত্তি তার তিন সন্তানের নামে সমান বন্টন হলো! কিন্তু?
৪/শেষ পর্ব
আমি সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই যা যোগ হয়েছে তার সম্পূর্ণ টা আমার একার নামে করে নিলাম,,এতে সবার সমর্থন ছিলো! এমনকি এখন যেই দালান বাড়ি যেটাতে তারা বাস করতো সেটাও আমি আমার অংশ হিসেবে নিয়ে নিয়েছি!এক কথায় সব ! বড় আপা নিজের অংশ বিক্রি করার প্রস্তাব দিলে তৎক্ষণাৎ কিনে নেই! তাও নগদ দিয়ে! এখন যেহেতু বাড়ির অধিকাংশ আমার একার সুতরাং আমি চাইলেই যা খুশি করতে পারি,সেই মোতাবেক আমিও ঐ জমি পুরোটাই বিক্রি করার প্রস্তাব রাখি এবং চেয়ারম্যান কিনে নেওয়ার আগ্রহ দেখায়! 
আমার অংশ বিক্রি করলে যেই অংশ থাকে তাতে কোনরকমে একটা ঘরে আর পাকের ঘর হবে! এর পর? এরপরে কি করবে আমার ভাই? হ্যা সে এখন ডাক্তার;কিন্তু! এখনও সার্টিফিকেট অবধি যাওয়া বাকী আর এই অবধি খরচ বহন কিভাবে করবে? হয়তো সে ম্যানেজ করতে পারবে তার চিন্তা এখন আর নাই! কিন্তু আমার ব‌উ! স্বামীর টাকায় বাপের বাড়ির ভিত মজবুত করছে, নিজের বাপ মায়ের ফুটানি করতে সাহায্য করছে অথচ আমার বাবা মায়ের!
যাই হোক সম্পত্তি ভাগের সময় আমার ভাই প্রচুর গ্যান্জাম করে কিন্তু গন্য মান্য ব্যক্তিবর্গের কারনে আর যেহেতু আইনের লোক উপস্থিত ছিলো সেহেতু বেশি সাহস দেখিয়ে ভয়াবহ কিছু করতে পারেনি!
আমি যখন লোকজন নিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হ‌ই তখনই আমার স্ত্রী দৌড়ে আসে এবং আমাকে ছয়-নয় বহু কিছু বলে বোঝানোর চেষ্টা করে সে আমার জন্য চিন্তিত! আমার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করতেই আমি নিষেধ করি যাতে আমাকে না ছোঁয়!জানতে চায় কেন কাল এসে আজকে আমি বাড়িতে উপস্থিত হলাম! ওহ হ্যা আমি কালকে বেরিয়ে যাওয়ার কিছু সময় পরেই তারা বাইরে বেরিয়ে যখন তিনটা সুট-কেস ঘরের দুয়ারে দেখে তখনই বুঝতে পারে আমি এসেছিলাম, কিন্তু আমি যে তাদের কৃতকর্লাপ দেখে ফেলেছি সেটা বুঝতে পারে যখন বাড়ি বয়ে কয়েকজন মহিলা তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে তাদের ই গুন-কীর্তন করে! 
এরপরেই হয়তো অন্য নাটকের রচনা করে; সে যাই হোক; বিচার চলাকালীন সম্পত্তির ভাগের সময় আমার স্ত্রী চুপ ছিলো হয়তো ভেবেছিলো এটাই শেষ কিন্তু না! আমি যখন ব্যাংকে ফোন করে ম্যানেজারকে বলেছি আমার স্ত্রীর সাথে জয়েন্ট একাউন্ট বন্ধ করতে এবং আমার একাউন্ট থেকে তার একাউন্টে লেনদেন বন্ধ করতে তখনই আমার স্ত্রীর পিলে চমকে যায়! যদিও তাতে আমার খুব একটা উপকার হয় নাই কারন সে যা সরানোর তা আগেই সরিয়ে'ছে! তবে এখন থেকে আর সরাতে পারবে না!এই যা! আর্থিক কার্যক্রম শেষ করে ভরা মজলিসে ই আমি সবার সামনে আমার স্ত্রীকে মৌখিক তালাক দেই এবং সঙ্গে থাকা পারিবারিক উকিলের মাধ্যমে কাগজের মাধ্যমে ও তালাক দেই! তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন এবং আমার নিজের ভাইয়ের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করি ঘোষিত ভাবে! 
এমতাবস্থায় আমার স্ত্রী প্রচন্ড তর্কের পরিবেশ তৈরি করে, এবং বোঝাতে চায় আমি তাকে শারীরিক সুখ দিতে অক্ষম; দীর্ঘ বছরের ক্ষুধা মেটাতেই সে এই পথ অবলম্বন করেছে! তার কথায় কথা না বাড়িয়ে আমি শুধু তাচ্ছিল্যের একটা হাসি দিয়েছিলাম! এবং আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ও স্থির ছিলাম!
আমার শ্বাশুড়ি নিজের মেয়ের ভুল শুধরানোর চেয়ে আমার ভাইকে দোষারোপ এবং আমাকে লানত দিতে ব্যস্ত ছিলো! আমি আসার পর থেকেই আমার স্ত্রীকে আমার কাছাকাছি আসতে বারন করা ছাড়া আর কোন কথা বলিনি কিন্তু শ্বাশুড়ির উদ্দেশ্যে শুধু বলেছিলাম," পরের টাকায় গা চকচকে বানালে'ই হয় না,তার সাথে চরিত্রের ও ঘষামাজা করার দরকার ছিলো'' কথাটা উনার গায়ে লেগেছিল তাই উনিও এক-রকম ঝগড়া করতে বসেন যার দরুন আমি মুখ ফুটে বলেই দেই তার বর্তমানে যা আছে তার পুরোটাই আমার অর্থে এবং তার জন্য ও আমি মামলা করবো!
হ্যা আমি আমার স্ত্রী নামে প্রতারনা এবং অর্থ আত্নসাৎ করার, এবং আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ির নামেও এক‌ই আইনে মামলা করি! তার সাথে বাবার দায়িত্ব পালন ঠিকঠাকভাবে না করার জন্য ভাইয়ের নামে!! সর্বোপরি যেটা করি সেটা হলো,, আমি সন্দেহ করছি আমার মায়ের মৃত্যু অস্বাভাবিক ছিলো তাই সেই বিষয়ে খতিয়ে দেখার জন্য সন্দেহের তালিকায় থাকা দু'জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য!!
আমি পুরো কাজটাই করেছি টাকার জোরে! যার দরুন পুরো বিষয়টি আমার অধীনে ই ছিলো! আমার ভাই আমার টাকায় খালি আয়েশ ই করেনি সে আমার ব‌উয়ের শরীর ভোগ করার জন্য তাকে পটানোর কৌশল ও অবলম্বন করতো আমার টাকায়! আর আমার ব‌উ ! সে তো শরীরে উত্তাপ কমাতেই তার কাছে গিয়েছিলো! ভেবেছিল টাকা আমার আর শরীর আমার ভাইয়ের! দুটোই সে নিজের অধীনে রাখবে কিন্তু হায়! তাছাড়া ভাই ডাক্তার হলে আমি তাকে ছেড়ে দিলেও (যদি কখনো ধরা পড়ে যায় আর কি) তাহলে হয়তো ভাই তাকে আপন করে নিবে! কিন্তু গর্দভ মহিলা এটা বুঝতে পারে নি আমার ভাই তাকে ও ঠকাতে পারে! সে যেমন আমার টাকায় আয়েশ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, তেমনি আমার ভাই ও!
আমার ভাই উঠতি বয়স থেকেই ভাবীর শরীরের স্বাদ আস্বাদন করেছে ঠিকই কিন্তু মেডিক্যাল লাইনে পড়ার পর তার মতো ছেলে কখনোই বয়সে বড় ভাবীকে বিয়ে করার মতো কাজ করবে না! এটা আর কেউ না জানলেও আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি! যাই হোক এটা এখন একান্তই তাদের বিষয়!!
আমার স্ত্রী প্রচন্ড রকম বাজে একটা পরিস্থিতি তৈরি করে, একরকম বাধ্য করতে চায় আমাকে তার সাথে সংসার করার জন্য কিন্তু ঐ যে টাকা! টাকার খেল‌ই আমাকে জিতিয়ে দিয়েছে!যদিও বিচারে উপস্থিত এবং গ্রামের ৯৫% মানুষ আমার পক্ষে তবুও এই জগতে যতটা না সততা কাজ করে তা চেয়েও কয়েকগুণ বেশি কাজ করে টাকার গুন! যদিও আমি সত্য তবু ও টাকার একটা ক্ষমতা দেখিয়েছি! 
সব রকমের মানসিক অশান্তির বিনাশ করলাম! বড় আপার সাথেও অনেক কিছু কাটাকাটি করলাম, কারন বাবার এই পরিস্থিতির জন্য সে নিজেও দায়ী! তার ও দায়িত্ব ছিলো বাবা-মায়ের প্রতি! মায়ের মৃত্যু অস্বাভাবিক মনে হলো কিন্তু কোন আইনি পদক্ষেপ কেন নিল না! বাবার খবর কেন নিলো না!যদি বাবার খোঁজ খবর নিয়মিত নিতো তাহলে অবশ্যই বাবার অবস্থা এতটা শোচনীয় হতো না!
সে নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ততা দেখিয়েছে অথচ এই সংসার গড়তে যারা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে যেই বাবা মা তাদের প্রতি ই সে ছিলো উদাসীন! সে ও স্বার্থপরতা দেখিয়েছে! 
আমি আইনি জটিলতার কাজ শেষ করে আমার ভাই আর ব‌উকে চৌদ্দ শিকের ভেতরে ঢুকিয়ে ছাড়ি এবং এক পর্যায়ে তারা রিমান্ডের মারের চোটে স্বীকারো'ক্তি দেয় যে হ্যা আমার মায়ের মৃত্যুর পিছনে তাদের ই হাত ছিলো!
পাঁচ বছর আগে যখন আমার ছেলের বয়স মাত্র আড়াই তখন আমি এসেছিলাম, এরপর আমি চলে যাওয়ার পর থেকেই মায়ের নজরে আসে আমার ব‌উ আর ভাইয়ের অস্বাভাবিক চাল-চলন! তাদের সখ্যতা আগেও ছিলো কিন্তু পরবর্তী সখ্যতা ছিলো দৃষ্টি কটু! যা অনেকের ই নজরে আসতো তাই আমার মা প্রায় ই সেই বিষয়ে নালিশ করতো যদিও এই ক্ষেত্রে আমার মা নিজের ছোট ছেলের নাম কেটে শুধু আমার ব‌উয়ের দোষ ই দিতো!
এমন‌ই কোন এক রাতে মা তাদের আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে এবং তাতে ক্ষেপে গিয়ে মা আমাকে নালিশ করার জন্য ই সেদিন ফোন দিয়েছিলো যার দরুন আমার মায়ের কপালে ছিলো নিজ সন্তানের হাতে মৃত্যু! হ্যা আমার ভাই আর ব‌উ মিলে মা'কে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলে! মা আমাকে ফোন দিয়েছিলো কিন্তু আমি কথা বলতে পারিনি বরং রাগ করে ফোন ব্যাক ও করিনি আর সেটাই ছিলো আমার ভুল! যদি তখন কথাটা শুনতাম! যাই হোক আমার সাথে কথা বলা অবস্থায় ই মায়ের ফোন কেড়ে নিয়েছিলো ওরা! যেহেতু আমি বসের সামনে কাজ করা অবস্থায় কথা বলেছিলাম তাই তখন খেয়াল করি নি যে আমার মা আমার কথা শেষ হ‌ওয়ার আগেই ফোন কেটে দিয়েছে এবং আর ফোন করেনি!
বাবা ঘুমের ওষুধ খায় রাতে তাই তার পাশেই তার প্রিয়তমা স্ত্রীর এমন করুন মৃত্যুর ইতিহাসের বিন্দুমাত্র খবর তার ছিলো না কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর তার চোখেও পড়ে ছোট ছেলে আর বড় ব‌উয়ের 
নোংরামি! যার দরুন হার্ট অ্যাটাক এবং ষ্টোক এক সাথে হয়! আল্লাহ চেয়েছেন বলে বেঁচে আছেন তবে যাকে উনি মানুষের ভালোর জন্য ডাক্তার বানাচ্ছেন তার হাতেই উনি নিজের সর্বনাশ দেখছেন! হ্যা আমার ভাইয়ের ইচ্ছা-কৃত ভুল চিকিৎসার কারনেই বাবার এই অবস্থা! বাবা অসুস্থ হ‌ওয়ার পর ডাক্তার বলেছিলেন ভালো ও উন্নতমানের চিকিৎসা এবং সঠিক সেবার মাধ্যমে বাবা ঠিক হতে পারে কিন্তু সেই চিকিৎসা আর সেবাই তো বাবা পায় নাই! বরং টাকার অভাব আর নানান অজুহাতে বাবাকে ফেলে রাখা হয়েছে ঘরের এক কোণে!
এই কথাগুলো পুরোটাই আমার স্ত্রী আর ভাইয়ের মুখের স্বীকারোক্তি! তাদের একে অপরের প্রতি ক্ষেপিয়ে'ই পুলিশ এই কথাগুলো বের করেছে! আমি শুধু নির্বাক হয়ে শুনে গেছি!কি বলবো! কি বলা উচিৎ? একজন সন্তান কি করে পারে নারীর প্রভাবে নিজের জন্ম-দাত্রীকে হত্যা করতে? নিজের পিতার জীবনের ক্ষতি করতে? কিভাবে? নারী‌ই কি সব? যারা জন্ম দিলো,যাদের মাধ্যমে পৃথিবীর আলো দেখলো,যাদের হাত ধরে হাঁটা শিখলো তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে কিভাবে পারে?
প্রচলিত আইন অনুযায়ী আমার ভাই আর ব‌উয়ের বিচার হয়েছে! আমি আর বিদেশে যাই নি! ছেলেকে মাদ্রাসায় রেখেই পড়াশোনা করাচ্ছি,বাবাকে ভারত নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছি এবং আমি নিজেই চেষ্টা করছি সম্পূর্ণ সময় পাশে থেকে সেবা করার! বাবা আপাতত কিছুটা সুস্থ আছেন! আমি আমাদের শহরে একটা ছোটখাটো কনফেকশনারি'র দোকান নিয়ে আছি! যা বিক্রি হয় তাতেই আমার আলহামদুলিল্লাহ! গ্রামের সব বিক্রি করে এখানে এক টুকরো মাটি কিনে ঘর তুলে ভাড়া দিচ্ছি এবং নিজে থাকছি! বাবার সেবা এবং ঘরের কাজ করার জন্য একটা ২০/২১ বছরের ছেলে রেখেছি! রান্না নিজেই করি!  সবকিছু মিলিয়ে আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো আছি!
তবে জীবনে দ্বিতীয়বার কোন নারীর আগমন ঘটবে না! সেই বিশ্বাস আর নেই বরং নারী দেখলেই এখন ঘৃনা কাজ করে! যাই হোক আমিও বিশ্বাস করি পৃথিবীর সব মানুষ এক নয় তবুও!
আমি গল্পটা কিভাবে শেষ করলাম জানিনা, কেমন হয়েছে তাও জানিনা শুধু জানি চেষ্টা করেছি! বিচার করার দায়িত্ব আপনাদের! 
হয়তো পারতাম আরো কঠোর কিছু করতে কিন্তু পরকিয়া'র কারনে অজস্র খারাপ খবর রোজ দেখি টিভির পর্দায় কিংবা খবরে পাতায় কিন্তু খুন কিংবা হত্যার চেয়েও কঠোর শাস্তি দেওয়া যেতে পারে যা হচ্ছে মানসিক শাস্তি! আমি তাই চেষ্টা করেছি! হত্যা কোন সমস্যার সমাধান নয়,আর রাগ কিন্তু আমাদের সমস্যা তৈরির প্রধান হাতিয়ার সেই হাতিয়ার কে সরিয়ে নিজের ক্রোধ রাগকে দমিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া‌ই হচ্ছে  প্রকৃত বুদ্ধিমানের পরিচয় দেওয়া!
আমি গল্পের মাঝে বোঝাতে চেয়েছি একজন প্রবাসী নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে নিজের প্রিয়জন'দের ভালো রাখতে অথচ সেই প্রিয়জন'রাই কোন একসময় তার মনের কষ্টের কারন হয়ে উঠে! কিছু সময় তারাও এক‌ই কাজ করে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রবাসীরা নিজেদের কাছের লোকদের দ্বারা প্রতারনা'র শিকার হয়ে থাকে!! প্রবাসে গিয়ে যেমন হয় প্রবাসী তেমনি নিজ গৃহে ফিরেও হয়ে থাকে পর- বাসী! মানে নিজের মাঝে থেকেও পরের অনুভূতি!
ধন্যবাদ সবাইকে মন দিয়ে পড়ে আমাকে সাহায্য করার জন্য! আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো মতামত দিয়ে উপকৃত করার জন্য!!
 
সমাপ্তি!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ