#নতুন_ভোরের_আলোয়
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
প্রথম পরিচ্ছেদ পর্ব ০১
-- কি অবস্থা নয়ন মিয়া?
মোটা ভরাট কন্ঠে কাঁধে চাপানো বস্তা'কে একটু পাশ করে সেদিকে ফিরে তাকালো ৩১ বছর বয়সী তাগড়া, সুঠামদেহী, শ্যাম-সুশ্রী বর্ণের লম্বাটে গড়নের পুরুষ নয়ন মিয়া!
-- আসসালামু আলাইকুম কেয়ামত চাচা? কেমন আছেন?
কাঁধে থাকা বস্তার ভারে কন্ঠের খাদ কিছু টা ঝুঁকে রয়েছে, কেয়ামত নামের মুরব্বি ধাঁচের লোকটি দোকানের দা'সে পা রেখে পানের পিক দোকান থেকে কিছুটা দূরে ছুড়ে ফেলে,আর তা দেখেই নাক কুঁচকে মুখ ভেংচি দেয় বাঁধন নামের ছোট্ট বালক টি! লোকটি সেদিকে ধ্যান না দিয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকে গদির পাশে থাকা ছোট টুলে নিজের মোটা পুটলির ন্যায় পেটটি ছেড়ে দেয়,নয়ন কাঁধে থাকা ৫০ কেজির বস্তাটি অন্য বস্তার উপর রেখে,বড় করে একটা দম নিলো, এরপর নিজের হাতের ধুলা ঝাড়তে ঝাড়তে গদির উপর বসলো,, বাঁধন নামের সেই বালকটি দৌড়ে এসে স্টিলের এক মগ ঠান্ডা টিউবওয়েলের পানি দিয়ে গেল,,
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম,আমি আছি আলহামদুলিল্লাহ! তোমার কি হালচাল মিয়া?
-- এই তো চাচা আলহামদুলিল্লাহ!
-- তোমার আম্মার শরীর কেমন আছে?
-- জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো! কি খাইবেন কন?
-- না বাজান আইজ কিছু খামু না! আমি আসলে একটা প্রস্তাব নিয়া আইছি তোমার জন্য, তার কথা কইয়াই যামু গা!
-- আচ্ছা হেইডা কইয়েন,তার আগে কিছু একটা খান! চা আনাই,,নাকি ঠান্ডা কিছু দিমু?
-- জোর যহন করতাছো তাইলে একটা ঠান্ডাই খাওয়াও! অনেক দূর হাইটা আইছি মিয়া,,কি যে গরম লাগতাছে!!
-- এই বয়সেও এই কাম করা লাগবো ক্যান,, আপনার পোলারা বড় হইছে,চাষ বাষ ও নাকি করে, তারপরও আপনি ক্যান এত খাটেন?
-- করি তো নিজের খুশিতে! ভালো লাগে বুঝলা? বাপ দাদার পেশা ছিল,সেই সুত্রে আমিও পাইছিলাম, মানুষ মোতাশা-গিরিরে কত কিছু কয় কিন্তু আমি জানি এই কামে কি শান্তি! একবার ভাবো তো,দুই জন অচেনা মানুষের মাঝে মিলনের সেতু বানাইয়া দেই!যদিও জোড়া আল্লাহর হাতেই বানানো তবুও আমাদের তো দুনিয়ায় উছিলা কইরা পাঠাইছে; আমরা তার ইশারায় তার বান্দা বান্দীর মাঝে মহব্বতের পুল তৈয়ার কইরা দেই, তারা সারাজীবন সুখে দুঃখে একজন আরেক জনের লগে থাকে,তাতে যে দোয়া দেয় তাতে কিন্তু মেলা সওয়াব হয় ; এই সওয়াব কি এমনি এমনি পাওয়া যায়! বুঝলা মিয়া আল্লাহ ও কিন্তু এমনি এমনি সবকিছু দেয় না! তার ইশারা মতো কাম হইলেই না সব পাওয়া যায়! আর আমগো মতো মোতাশা গো প্রধান কাম ই হইলো জোড়া মিলাই দেওয়া,, আল্লাহর দুনিয়ায় তার সৃষ্টির বিচরণ থাইকা শুরু কইরা এখন অবধি যত মানুষ হইছে সব কিন্তু বৈবাহিক সুত্রে বাড়ছে,আর আমরা কি করি বিয়ার প্রথম কাম,ভালো পোলার জন্য ভালো মাইয়ার সন্ধান করে দেই,তাইলে কি হইলো কও তো ,ঘুইরা ফিরা হেই আমরাই হইলাম এই কামের প্রধান কর্মচারী!
বিশাল এক ভাষণের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে, হাতের সামনে থাকা অর্ধেক মুখ খোলা বোতল থেকে ঢকঢক করে প্রায় অর্ধেক এর অধিক ঠান্ডা কোমল পানীয় শেষ করলো,এত সময় একজন দুর্দান্ত স্রোতার ভূমিকায় তার মুখ পানে চেয়েছিলো ছোট বালক বাঁধন,, নয়নের হালকা আওয়াজে দেওয়া ধমকে নিজের কাজে ফিরে গেল, নয়ন নিজের কাজে হাত লাগিয়ে হিসাব নিকাশ কষতে কষতে বলতে লাগলো,,
-- তয় আর কি,, মাইনষের কথা'রে গুল্লি মারেন নিজের কামে'ই মনোযোগ দ্যান!
-- তাই তো করতাছি এত বছর ধইরা!
-- আচ্ছা এইবার কন কি কইবেন? আমার আবার বাইরে যাইতে হইবো!
-- ওহ হ! কইতাছিলাম তোমার জন্য একখান প্রস্তাব আছে!
-- কন হুনি!
-- পশ্চিম মাদবর গঞ্জের মোতালেব মাস্টারের ভাগিনী আছে,মাইয়া মেলা সুন্দরী,হুনছি সদরের গার্লস কলেজে এইবার নাকি বিএ পড়তাছে!
কেয়ামত মোতাশার কথায় নিজের হাতের কাজ থামিয়ে দিলো,তার দিকে মনোনিবেশ করে বাকীটা শোনার অপেক্ষায় রইলো,
-- মাইয়ার বড় দুলাভাই ভুমি মন্ত্রনালয়ের এক অফিসারের সহকারী হিসেবে আছে,বড় ভাইও নাকি পল্লী বিদ্যুতে কাম করতাছে,,তয় বাপে অসুস্থ,যেকোন সময় উপরে চইলা যাইতে পারে তাই ছোট মাইয়ার বিয়া দিতে চায় তাড়াতাড়ি! আমি তোমার কথা কইছিলাম; হেরা ছবি দেখবার চাইলো ,তাই কইতাছি যদি একখান ছবি দিতা!
-- দরকার নাই!
-- মানে?
-- এই প্রস্তাব হইবো না;
-- কি কও মিয়া? মাইয়া কিন্তু আসলেই মেলা সুন্দরী,,আমি নিজেই দেখছি মাইয়ার মা বইনরে,,পুরা খান্দানই দলা একদম কদুর মতো!মাইয়ার ছবিও দেখছি অপূর্ব,একদম হিরোইন!
-- আমার ঘরের বউ চাই চাচা, ফিল্মের হিরোইন না!
-- কিন্তু?
-- আমি আগের মতো ভুল করতে চাই না!
-- মানে? তুমি এহনও হেই কথা নিয়া পইড়া আছো?
-- আমি নিজের চেয়ে ছোট ঘরের মাইয়া আনতে চাই,যাতে তার আমাকে নিজের আপনজনদের সামনে পরিচয় দিতে লজ্জ্বাবোধ না হয়! তাছাড়া অত শিক্ষিত মাইয়া দিয়া আমার কাম নাই,আমি মুরক্ষ মানুষ, শিক্ষিত বউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারুম না!
-- তোমার জন্য কিন্তু এইডা মুখ্যম সুযোগ আছিল নিজের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার করা,, তুমি কিন্তু হেই মাইয়ারে দেখাইয়া দিতে পারতা যে তুমি তার চেয়েও ভালা কিছু পাইছো,হেয় উল্টা তোমারে ত্যাজ্য কইরা ভুল করছে!
-- হের লগে প্রতিযোগীতায় নামি নাই চাচা যে হের দেখানোর জন্য নিজেকে শুলে চড়ামু!!
-- তুমি বুঝাতছো না!
-- সরকারি চাকুরীজীবি ভাই দুলাভাইয়ের মাঝে মুরক্ষ জামাইরে নিয়া এক লগে খাইতে অবশ্যই লজ্জা পাইবো বিএ পাশ মাইয়া! তার চেয়েও বেশি লজ্জা পামু আমি জামাই হইয়া যখন তাগো লগে তাল মিলাইয়া চলতে না পারুম! সুতরাং এই সম্পর্ক না হওয়াই উত্তম;
-- কিন্তু?
-- চাচা আপনি ভালো মাইয়া দেখছেন ঠিক আছে কিন্তু আমার ও তো পছন্দ হওয়া লাগবো! আপনি আমার লইগা কোন দিন মজুরের,বর্গা চাষীর কালো কুৎসিত ঘন মুরক্ষ মাইয়ার খবর আনেন, চরিত্র ভালো পাইলে আর আমার মায়ের মন মতো হইলেই আমি রাজী!
-- তার মানে এইডাই তোমার শ্যাষ কথা?
-- হু!
-- তাইলে আর কি? যখন সিদ্ধান্ত নিয়াই নিছো!
আইচ্ছা এখন উঠি তাইলে,, ইনশাআল্লাহ তোমার মনের মতো ও পাইয়া যামু,তখন কিন্তু আমারে নিরাশ করতে পারবা না!
উঠে দাঁড়িয়ে নিজের লুঙ্গির কোছা ঝাড়তে ঝাড়তে বললো,,
-- তোমার বইন কেমন আছে?
-- জ্বী আপনাদের দোয়ায় আর আল্লাহর রহমতে আলহামদুলিল্লাহ ভালো!
-- আইচ্ছা আহি আইজ,,আহুম আবার তাড়াতাড়ি!!
-- আসসালামু আলাইকুম, সাবধানে যাইয়েন!
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম,, তুমি ও সাবধানে থাইকো!
,,কি গো নয়ন ভাই কেমন চলতাছে ব্যবসা বানিজ্য!
দুর থেকে আসা প্রশ্নের উত্তরে হাসি বিনিময় করে উপরওয়ালার রহমত বলে মুখে বললো,
-- আলহামদুলিল্লাহ!!
গঞ্জে দোকান হওয়ায় বেচাকেনার ধুম সারাক্ষণ লেগেই থাকে, নয়নের মতো ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততাও অনেক বেশি থাকে ,আর যাদের নয়নের মতো পাইকারি দোকান তাদের মাঝে মধ্যে দম ফেলাও দায়!! তবুও তাদের খুশি থাকে উপচে পড়া ,, কারণ বেচাকেনা ই হলো ব্যবসায়ীদের অক্সিজেন,তার কমতি হলেই দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম!!
-- আজকে নাকি কেয়ামত মোতাশা গেছিলো দোকানে?
-- হ আম্মা?
-- তুমি কি কইলা ?
-- না কইয়া দিছি?
-- ক্যান?
-- আমার পছন্দ হয় নাই?
-- ক্যান মাইয়া তো মেলা সুন্দরী?
-- তোমার পোলা তো কালা আম্মা!
-- কে কইছে? তাছাড়া ব্যাডা মানুষ কালা আর দলা কি? সোনার আংটি ব্যাকাও দামী!
-- সবার ই দাম আছে! তাছাড়া মুরক্ষ পোলার লইগা বিএ পাশ মাইয়া আইনা কি ঘর ছাড়া হইবা?
এত সময়ে আম্মা বুঝলো তার পোলার এই প্রস্তাবে নারাজীর কারণ,তাই আর কথা বাড়ানোর চেষ্টা করলো না! সারাদিন খাটুনি'র পর রাতে শান্তি মতো খাইতে বসছে ,এই সময় কোন ভাবেই তার মন খারাপের কারণ হতে চায় না আম্মা নামক মমতাময়ী রমনীটি!
ভাত খেয়ে গামছায় হাত মুছে নিজের ঘরে ঢুকে সবার আগে মোবাইল চেক করলো, টেবিলের উপর চার্জে লাগিয়ে গিয়েছিল খেতে,এসেই দেখলো প্রায় চার টা মিসকল! এতগুলো কল আসলো অথচ টেরই পাইলো না,কথা টা ভাবতেই দেখলো ভাইব্রেট করা, নাম্বারে চাপ দিলো সাথে সাথেই কল হচ্ছে!
-- আম্মা!
-- মুজিবুরের বউয়ের ভেলিভারি সময় হয়েছে, রক্ত দরকার! আমার যাইতে হইবো!
-- অহন?
-- হ আম্মা, সম্ভবত রাইতে'ই খুশির খবর পামু কিন্তু তার আগেই রক্তের দরকার হইবো!
-- তার মানে তুমি এহন ই যাইবা!
-- হ আম্মা,, তুমি আমারে একখান ভালো শার্ট বাইর কইরা দেও না!!
-- দিতাছি তয় তুমি আমারে ও লগে লইয়া যাও বাজান!
-- তুমি যাইবা?
-- পোলাডা দুনিয়ায় একা,এতিম মানুষ,বউয়ের বাড়িতে ও হেইরাম আপন কেউ নাই,এই সময় যদি আমরাও না থাকি তাইলে কেমন দেহায় না! কত সুন্দর কইরা তোমার মতোই আম্মা ডাকে!
-- তাইলে দাদাজান কই থাকবো?
-- আমি জমিলা বুয়ারে কইয়া যাইতাছি,,হেয় রাখবোনে আব্বার খবর!
-- আইচ্ছা তাড়াতাড়ি করো,মেলা দূর! সাইকেল ছাড়া এই রাইতে আর উপায় নাই!
পর্ব ০২
حي على الصلاة
حي على الصلاة
হাইয়া আলাস্ সালা - ২ বার
নামাজের জন্য এসো
حي على الفلاح
حي على الفلاح
হাইয়া আলাল ফালাহ্ - ২ বার
সাফল্যের জন্য এসো
আজানের মধুর সুরে সচকিত হলো নয়ন, হাসপাতালের বাইরে একটা বেঞ্চে বসে ঝিমাচ্ছিলো,
সেই রাতে সাইকেলে করে মা কে নিয়ে এই হাসপাতালে এসেছিলো, রক্ত দিয়ে বেশ সময় অপেক্ষায় ছিলো সুখবরের,সেই সুখবর আসে প্রায় রাত সোয়া তিনটায়, সুখবরে খুশি হলেও সারাদিনের কাজের চাপ আর রক্ত দেওয়ায় হঠাৎ সাময়িক দূর্বলতা অনুভব হয়,সব কিছু মিলিয়ে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু অতো রাতে আবার মা'কে নিয়ে সাইকেল চালিয়ে সেই শহর থেকে সুন্দর গঞ্জের মনোহর পুরের উত্তর কান্দায় আসা কম কথা নয়, তাছাড়া রাস্তায় চোর ডাকাতের ভয় ও কম নয়,,তাই আর ঝুঁকি নিলো না,মা'ও মুজিবুরের ছেলে সন্তান হওয়ায় বেশ খুশি,তার মুখেও অসম্ভব চমকিয় হাসি, মায়ের মুখের এই বহু আকাঙ্ক্ষিত হাসিটুকু আরো একটু বেশি সময় ধরে রাখার জন্য সিদ্ধান্ত নিলো আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে একদম সকালেই রওনা দিবে! যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ!
পাশে থাকা মসজিদে গিয়ে ওযু করে নিজের রোজকার প্রথম কাজ আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিয়ে শুরু করলো, এরপর মা'কে নিয়ে মুজিবর'কে বুঝিয়ে রওনা দিলো, সাইকেল রেখে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু আবার কখন আসবে সেটা ভেবে কষ্ট হলেও সাইকেল চড়েই যাত্রা শুরু করলো,বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করতেই মা বললো,,
-- সাইকেলটা একটু থামা তো বাপ!
-- ক্যান আম্মা?
-- দরকার আছে?
মায়ের আদেশে সাইকেল থামালো,মা বোরকার নিকাব তুলে আমতা আমতা করে বললো,,
- -- দ্যাহো না বাপ আশেপাশে কোন গৃহস্থ বাড়ি আছে নি? আমি একটু বাইরে যামু!
প্রথমে মায়ের কথায় প্রশ্ন জাগলেও মায়ের পরের কথাই উত্তর দিয়ে দিলো, নয়ন সাইকেল পাশ করে এদিক ওদিক তাকিতুকি করলো কিছু সময় ,
-- আম্মা এদিকে আহো!
-- হু!
চারদিকে নারকেল , সুপারি পাতার বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা বাড়ি, কাঁচা উঠান, মনে হচ্ছে দুই একদিনের মধ্যেই হয়তো গোবর দিয়ে লেপা হয়েছে,খুব বড় না, মাঝারী সাইজে'র মোটামুটি টিন-সেটে'র একটি বাড়ি, মনে হচ্ছে দুই কিংবা তিনটা রুম হবে!দুটো হালের বলদ ও দেখা যাচ্ছে,তয় বড় সড় কৃষকের বাড়ি মনে হচ্ছে না, নিশ্চয়ই অন্যের জমিতে বর্গা খাটে, নয়নের বুঝতে সময় লাগলো না কারণ নয়নের বাপ দাদা দুই জনই বর্গা চাষী ছিলো, তবুও!
-- কে কেডা ঐহানে?
-- ভেতর ঘর থেকে পুরুষালি কন্ঠস্বর!
-- কেউ কি আছেন,একটু দরকার ছিলো!
-- আমনে কেডা?কারে চান?
-- আমি নয়ন মিয়া, পথিক!
-- আমার বাড়িতে কি মনে কইরা?
-- আসলে আমার আম্মা একটু সমস্যায় পড়ছে তাই!
-- আপনের আম্মা! কি হইছে?
নয়নের পিছনে থাকা বোরকা পড়া মহিলার দিকে তাকিয়ে রোগা পাতলা তেলতেলে কালো বর্ণের লোকটা প্রশ্ন ছুঁড়লে,
-- আপনাদের পায়খানা কোনদিকে?
-- ওহ হেই সমস্যা হইছে? ঐ যে ওদিকে, পুকুরও ঐদিকে!
-- শুকরিয়া চাচা!
ঘরের পিছনের দিকে লোকটার ইশারা ছিলো, সেদিকে মাকে নিয়ে গিয়ে দেখে কোনরকম টিন দিয়ে বেড়া দেওয়া একটা বাথরুম,তার থেকে খানিকটা দূরে একটা বদনা রয়েছে,নিজেই সেটা তুলে নিয়ে পুকুরের দিকে এগিয়ে গেল,মা নিষেধ করলেও শুনলো না, পুকুর পাড়ে গিয়ে খানিকটা বিব্রত হলো কারণ একজন মেয়ে মানুষ সেখানে কাজ করছে, মনে হচ্ছে ওযু করছে, চারদিকে মাত্র ই অন্ধকার কাটিয়ে আলো ফুটতে শুরু করেছে, মেয়েটা নামাজ আদায় করবে? নিজ মনেই প্রশ্নটা করলো,হ্যা এত সকালে উঠে ওযু করছে তার মানে নিশ্চিত নামাজ আদায় করবে, কিন্তু ওযু রত অবস্থায়ই একজন পর-পুরুষের দর্শন নিশ্চয়ই ভালো লাগবে না, উচিতও না! নয়ন একটু ঘুরে দাঁড়ালো, ততক্ষণে মেয়েটাও কাজ শেষ করে ঘুরে গাছের গুঁড়ি ফেলে পুকুরে নামার জন্য তৈরি সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে ই চমকে গেল,বাড়ির মধ্যে বেগানা পুরুষের আগমন! যে বাড়িতে একজন বয়স্ক পুরুষ বাদে আর কোন পুরুষই নেই, সেখানে এমন যুবক কিভাবে?
-- তারা মা উইঠা আহো,উনি পানি নিবো!
বয়স্ক চেনা কন্ঠে ঘাট পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা নিজের চিন্তা লাগব করে মাথায় থাকা কাপড়টা আরো লম্বা করে টেনে নিলো, পুরুষটা'ও নিজের দৃষ্টি আরও নমনি'ত করলো,যাওয়ার পথে ওড়নার কারু-কার্যের ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি পড়লো শ্যামসুন্দর লম্বা যুবকের স্নিগ্ধ মুখের গম্ভীর হয়ে থাকা নয়ন জোড়ায়,সদ্য ফোঁটা আলোর রশ্নি গাছের পাতার আড়াল দিয়ে লুকিয়ে চুরি'য়ে তার চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে, অজানা অনুভূতি শির-শিরিয়ে উঠলো, আবারও সেই চেনা কন্ঠের শব্দ,,তড়ি-গড়ি করে নিজের কদমে'র গতি বাড়িয়ে চলে গেল বেগানা পুরুষের নজরের বাইরে, ফোঁস করে দম নিলো নয়ন নামক শ্যাম বাবু!
এত সময়ে এই যুবতীর উপস্থিতি তার মনেও অজানা অনুভূতির সুড়সুড়ি দিচ্ছিলো,তার আড়চোখে তাকানোও বাদ যায় নি, কিশোর বয়স থেকে ব্যবসায়ী নয়নের নারী মন বুঝতে খুব সময় লাগে না,নজরের ধরন অনুযায়ী বুঝতে পারে মানুষের মনের অস্তিত্ব!
-- নয়ন!
মায়ের ডাকে সচকিত হলো নয়নের মস্তিষ্ক, দ্রুত পানি নিয়ে মায়ের কাছে গেল!!
-- ধন্যবাদ চাচা! অনেক উপকার করলেন!
-- নয়নের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ,বয়স্ক রোগা পাতলা লোকটা সাদরে গ্রহন করলেন নয়নের কৃতজ্ঞতা স্বীকার,তার সাথে অনুরোধ করলো তার বাড়িতে সকালের জলপানের দাওয়াত কবুল করতে,নয়ন অস্বীকার করলেও বয়স্ক মানুষের অনুরোধ অবজ্ঞা করতে পারলো না!
আমাদের গ্রাম বাংলার মানুষের মন মাটির মতোই নরম,তারা তাদের বাড়িতে আসা অতিথিদের আপ্যায়ন করতে বড়ই ভালোবাসে, নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দেয় অতিথির খুশিতে,যদিও বর্তমানে কিছু কারণে মানুষের মাঝে পরিবর্তন লক্ষনীয় তবুও স্বভাবতই আপ্যায়ন প্রিয় বাঙালি অতিথি দেখলে আপ্যায়ন করতে কোন কার্পণ্য রাখতে চায় না, সাময়িক কাজে সাহায্য চাওয়া এই হতদরিদ্র পরিবারের সামান্য একজন পথিকের জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা নয়ন এবং তার মায়ের মনে বেশ আবেগি পরিস্থিতি করে তুললো, নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে বেশ ভালোই নাস্তার ব্যবস্থা করেছে,
উঠোনে পেতে দেওয়া টুলে বসে সেই আপ্যায়ন গ্রহন করলো!
-- খামোখা এত কষ্ট করলেন; এত সকালে এমনেই আপনা'গো এত কষ্ট দিলাম তার মইধ্যে আবার নাস্তা পানির ব্যবস্থা!
-- না না কোন কষ্ট হয় নাই,আপনেগো দেইখা মনে হইতাছিলো অনেক দূরের যাত্রী, ক্লান্ত মনে হইতাছিলো তাই, তাছাড়া আমরাও তো এহন নাস্তা পানি খামু,তাইলে বাড়িতে মেহমান রাইখা কেমতে খাই!
-- আসলে আমার পোলার এক বন্ধুর বউয়ের বাচ্চা হইছিলো গত রাইতে,তারে দেখতেই আইছিলাম! আমাদের বাড়ি সুন্দর গঞ্জের মনোহর পুরের উত্তর কান্দায়! রাইতেই বাড়িত চইলা যাইতাম , কিন্তু পোলা আমারে নিয়া এত দূর এত রাইতে যাইতে ভয় পাইতাছিলো, তাই যাওয়া হয় নাই,, সকালে পোলা নামাজ পইড়াই রওনা দিছে,,আপনেগো বাড়ির সামনে আইসা আমার একটু কষ্ট হইলো তাই আপনেগো জ্বালাইলাম! কিছু মনে কইরেন না!
বাড়ির কর্তৃর সাথে নিজের বর্তমান পরিস্থিতি ভাগ করলো নয়নের মা,নয়ন মাথা নিচু করে মাটিতেই চেয়ে আছে, এভাবে অচেনা অজানা কারো বাসায় বসে চা পান করা তার কাছে বেশ বিব্রতকর মনে হচ্ছে, এদিকে মা বাড়ির কর্তৃর সাথে গল্পে মেতে উঠেছে,, ওদিকে দোকান খোলার তাড়া!
-- বাবা আপনে তো কিছু খাইতাছেন না!
-- নাস্তা মনে হয় মনে ধরে নাই! কি করুম ভাবা,আমরা গরীব মানুষ, আমার স্বামী পরের ক্ষেতে বর্গা খাটে,,এর বেশি আয়োজন করা আমগো সামর্থ্যের বাইরে! আপনারে দেইখা মনে হইতাছে এইসব খাইয়া অভ্যস্ত না!
-- না না , ছি ছি কি বলছেন! আমি নিজেও কৃষকের সন্তান, আমার আব্বা ও বর্গা চাষী ছিলো,,আমরা এসব খেয়েই অভ্যস্ত! আসলে আমাকে যাইতে হবে,দোকান খোলা লাগবে! তাই একটু চিন্তায় আছি!
-- ওহ আচ্ছা কিসের দোকান আপনের বাবা?
-- মুদি দোকান! সুন্দর গঞ্জের সবচেয়ে বড় পাইকারি মুদি দোকান ই আমার বাপের !
-- ওহ! মাশাআল্লাহ ♥️
-- মামা?
-- হ মা!
-- উনাদের চা দিমু?
-- হ দেও,,হেগো তাড়া আছে?
-- আপনের মাইয়া?
-- না ভাগ্নী!
-- ওহ বইন'জি! মাশাআল্লাহ খুবই ভালো মাইয়া!
নানা কথার মাঝে ই চা দিয়ে গেল তারা নামের সেই রমনী, নয়নের দৃষ্টি তখনও নমনি'ত, মুরব্বিদের সামনে বরাবরই সে নিজের নজর ঝুঁকে রাখে, লম্বা ঘোমটা দেওয়া মেয়েটা এখন স্বাভাবিক ভাবেই ঘোমটা টেনে বড় একটা চ্যাপ্টা প্লেটে করে চা দিয়ে গেল, যত দ্রুত চা নিয়ে এসেছিলো ঠিক তত দ্রুত ই চলে গেল,নয়ন'রাও চা নাস্তা সেরে দ্রুত বেরিয়ে পড়লো আর রেখে গেল কোমল বিধ্বস্ত মনের সদ্য আঠারো পেরোনো যুবতী মনকে!
পর্ব ০৩
-- আব্বা তোমারে একটা কথা কই?
-- অনুমতি নেওয়ার কি আছে আম্মা!
-- তুমি যদি আবার রাগ দেহাও?
-- দেহামু না! কি কইবা কও!
-- আমি নিজেই তোমার লইগা একখান মাইয়া দেখছি!
মায়ের কথায় হাতে থাকা হিসাবের খাতার কলম থামিয়ে দিলো,চোখ উঠিয়ে মায়ের মুখে তাকালো,,
-- হেইদিন আমরা যেই বাড়িতে পথিক হইয়া সমাদার পাইছি,হেই বাড়ির ঐ মাইয়াডার কথা মনে আছে তোমার?
-- কোন মাইয়াডা মা?
-- মনে নাই যেই মাইয়া আমগোরে চা নাস্তা তৈয়ার কইরা দিলো!
-- আমি তো তারে দেহি নাই আম্মা!
-- কি কও? মাইয়া না তোমার সামনেই চা কইরা দিয়া গেলো?
-- কি জানি,আমি তো ঐদিকে খেয়াল রাহি নাই!
-- এইডা কুন কথা কইলা আব্বা? একজন মানুষ তোমার যত্ন আত্নীর করলো আর তুমি হেয় কেমন, দলা না কালা তাই খেয়াল রাখলা না !
-- আমি হেইদিকে খেয়াল রাইখা কি করমু আম্মা, আমি কি আর জানতাম আমার মায়ের মনে হেই মাইয়ার জন্যি ভালো লাগা তৈয়ার হইবো?
-- হ তুমি হেই দিকে ক্যান খেয়াল রাখবা,তুমি তো হারাদিন এই হিসাব নিয়াই থাকো, এদিকে যে বাড়তে বাড়তে বয়স তোমার ৩০ পার হইছে হেই খেয়াল রাখার দায়িত্ব খালি আমার,বিয়াই করতে চাও না,অথচ একবারও ভাবো না তুমি বিয়া না করলে বংশ ক্যামনে বাড়বো? আমি দাদী কবে হমু?
মায়ের হঠাৎ ক্ষিপ্ত মনোভাবের বিপরীতে নিরবতা ছাড়া আর কোন প্রতিক্রিয়া তার তরফ থেকে নেই,তবে নয়নের জানা আছে তার মায়ের কথা এখানেই শেষ নয়, তাই সে চুপ থাকলে কথা গিয়ে ঝড়ে পরিবর্তন হবে, মায়ের অভিমানের, অভিযোগের ঝড়!তাই চুপ থাকতে চেয়েও থাকলো না, কাজে মন দিয়ে তাতে চোখ বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলো,,
-- এহন কি করতে কও ?
-- আমি সিদ্ধান্ত নিছি এইবার তোমার বিয়া দিয়াই ক্ষান্ত হমু, এহন তুমি যতই বাহনা দেহাও কাম হইবো না!
-- কিন্তু আম্মা?
-- কোন কিন্তু না,আমি এইহানেই তোমার বিয়ার কথা পারমু!
-- তার আগে তো মাইয়ার খবর লও! মাইয়ার বিয়াও তো হইয়া যাইতে পারে! তাছাড়া?
-- তুমি কোনভাবেই আমার চিন্তা বদলাইতে পারবা না,তাই খামোখা আজেবাজে কথা কইয়া আমার মত বদলানোর চেষ্টা ও কইরো না,আর যদিও এই মাইয়ার বিয়া হইয়া যায় চাইলেও আমি মাইয়া খুঁইজা তোমার বিয়া দিয়াই ছাড়মু তাও এই মৌসুমে ই!
কথা না বাড়িয়ে তালে তাল মেলানোই আপাতত ঠিক মনে করলো, পরে ঠিক হয়ে গেলে মাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে,তাই ভেবেই,,
-- যা খুশি কর!
চারদিন পর,,,
-- আসসালামু আলাইকুম,আমি কেয়ামত মোতাশা, সুন্দর গঞ্জের মনোহর পুরের দক্ষিণ কান্দার বাসিন্দা!
--ওয়ালাইকুম আসসালাম, হ আপনার নাম তো মেলা হুনছি, অনেক নাম ডাক আপনার মোতাশার কামে! তয় আমার মতো গরীবের ঘরে আপনার ধূলি কি করে পড়লো ভাই সাহেব ?
-- ছি ছি কি কন! ধনী গরীব কিসের ? আমি মোতাশা মানুষ,জুড়ি মিলানো'ই আমার কাম,হেই হানে ধনী গরীব কোন কথা না!
-- হ ঠিক আছে তয়?
-- আমি আপনের জন্য একখান প্রস্তাব লইয়া আইছি!
-- জ্বী;
-- আপনের ঘরে বিবাহ যোগ্য কন্যা সন্তান আছে! অবশ্যই বিয়া দিবেন?
-- হ,তাতো দিমুই! মাইয়া আল্লাহ দেয়ই তো বিয়া দেওনের লইগা! তয় আপনে কোন মাইয়ার কথা কইতাছেন, আমার তো আল্লাহর মাল তিনজন!
-- আমরা আপনের নিজের মাইয়ার কথা না,আমি আইছি আপনের বইনজির লইগা প্রস্তাব নিয়া!
-- আমার ভাগ্নি তারার লইগা!
-- হ,তার লইগাই!
-- কিন্তু হেয় তো!
-- কোন সমেস্যা?
-- না , ভাগ্নির লইগা আইছেন ঠিক আছে তয় হের আসল অভিভাবক তো আর আমরা না, হের নিজের বাপ মা মানে আমার বইন দুলাভাই আছে!
-- হেরা কি এহানে থাকে না,থাকলে ডাক দেন,হেগো লগেই কথা কই!
-- হেগো বাড়ি পৌর এলাকার মইধ্যে, ভাদুরিগঞ্জের পূর্ব রসুল পুরে! ভাগ্নি এইহানে আমার লগে থাকে বছর এক ধইরা!
-- ক্যান!
-- ভাগ্নি তো পড়ালেহা করতো,যাওয়া আসার পথে কয়ডা বদমাইশ জ্বালাইতো,হোগো জ্বালায় মাইয়ারে এইহানে রাইখা গেছে,আমরাও ভাবতাছিলাম হের বিয়ার কথা কিন্তু তাও তো হের নিজের বাপ মায়ের সাথে কথা না কইয়া!
তারার মামার কথায় পিছন দিক থেকে হালকা চিমটি কেটে তারার মামী নিচু হয়ে বললো,
-- হেরা কি কয় আগে হেইয়া হুনেন!
-- আইচ্ছা তাইলে আমরা কি সরাসরি মাইয়ার বাপ মায়ের লগেই কথা কমু!
-- আ্যা্,সমেস্যা নাই,আপনি আমগো লগেই কন! আমিই না হয় বইনের লগে কথা কমু নে!
-- আপনে কন, আমার বিশ্বাস আমগো কথার বাইরে তারা যাইবো না!
তারার মামীর বিশ্বাসী আশ্বাস,কেয়ামত এবং তার সাথে আসা নয়নের মামা মুসতাক মাঝি আশ্বস্ত হয়েই বলতে লাগলো,
-- দ্যাহেন আমগো পোলা মাশাআল্লাহ সব দিক থেকে একদম ঠিকঠাক! বয়সটা একটু বেশি তয় বেডা মাইনসের আর বয়স কি! বেডা মানুষ কামাই করতে করতে সময় গড়াইয়া কহন সন্ধ্যা হয় হেইয়া কি আর টের পাওন যায়!
-- এমনে পোলা করে কি?
-- ব্যবসা! নিজের ব্যবসা!
-- কিসের ব্যবসা? মানে কি ব্যাচে?
-- মুদি দোকানি; সুন্দর গঞ্জের সবচেয়ে বড় পাইকারি মুদি দোকান পোলার নিজের!
-- পোলার বাপে কি করে?
-- পোলার বাপ নাই! এক মা আর একজন দাদা আছে সংসারে,একটাই বইন তাও বিয়া দিছে বছর দুই হইছে!
-- আপনেগো মাইয়ার সম্পর্কে কোন দেহি কিছু!
নয়নের মামার প্রশ্নে তারার মামা উত্তর দিলো,
-- আমগো নিজেগো মাইয়া সম্পর্কে আমরা নিজেরা কইলে কেমন দেহায়,আপনেরা আশপাশ পড়শিগো থেইকাই হুইনা নিয়েন তাইলেই বুঝবেন! তবুও কমু,আমার ভাগ্নি মাইয়া হিসেবে মাশাআল্লাহ! আল্লাহ আমগো সংসারে একটা চান্দের টুকরা দিছে
এমন সংসারি মাইয়া আমার নিজের ঘরেও হয় নাই!
-- ননদের মাইয়া দেইখা মিছা কতা কমু এমন মানুষ আমি না; আমার নিজের ও তিনটা মাইয়া আল্লাহ দিছে কিন্তু সত্য কইতে গেলে এই মাইয়া চইলা গেলে আমি পুরাই একা হইয়া যামু! পুরা ঘরের কাম একলাই করে, তারপর সবার খেয়ালও রাহে! তাছাড়া এই মাইয়া খলিফার কাম কইরা আমার ঘরের খরচেও সাহায্য করে!
-- মাইয়ার বাপে কি করে?
-- হেয় তো আগে সমিলে কাম করতো,এহন অসুস্থ তাই কিছু করে না কিন্তু মাঝে মইধ্যে কামলা খাটে হেগো মেম্বার বাড়িতে! আমার বইনে ঘরে বইসা নকশিকাঁথা সেলাই করে,তা দিয়েই তাগো সংসার চইলা যায়,আরো একটি মাইয়া আছে হেইডা পড়ালেহার পাশাপাশি বইনের লগে সংসারের কামও করে, আবার ঘরে বইসা খলিফার কামও করে,আর একটা ছোড ভাই আছে, হেয় পৌরসভার পাশেই যে মাদ্রাসা আছে হেইডায় হাফেজি পড়ে!
-- তাছাড়া মাইয়া নিজেও গতবছর আইএ পাস দিছে, আল্লাহ চাইলে বড় বিশ্ববিদ্যালয়েও যাইতো কিন্তু ঐ এলাকার কিছু বদমাইশ পোলাপাইনের জ্বালায় বেচারিরে নিজের ঘরই ছাড়তে হইছে!
-- আমার ভাগ্নি মাশাআল্লাহ দেখতেও ম্যালা সুন্দর!
কথার মাঝেই জলপানের ব্যবস্থা করে ফেললো তারা,মামাতো ছোট বোনের সাহায্যে মেহমানদের সামনে নাস্তা রেখে চলে গেল, তখনই শুনতে পায় কথাগুলো,,
-- দ্যাহেন আমাগো বেশি শিক্ষিত মাইয়া লাগবো না,অত সুন্দরী ও না! মাইয়ার গায়ের রং যাই থাকুক মনের রং যেন ফকফকা সাদা হয়; আমার শ্যামলা পোলার পাশে দাঁড়াইয়া তার সেবা করতে পারলেই আমি খুশি,ঘরে এক শ্বাশুড়ি ছাড়া আর কেউ নাই; একটা মাত্র ননদ,তার ও বিয়া হইছে বছর দুই আগে,হেয় আহে বছরের দুইবার দুই ঈদে! অসুস্থ এক দাদা শ্বশুর আছে, একমাত্র তার ই একটু খোঁজখবর নেওয়া লাগবো,,আর শ্বাশুড়ি মায়ের চিন্তা করোন লাগবো না!হেয় নিজের যত্ন নিজেই করতে পারে,, এমন পরিবারে নিজেরে মানাইয়া নিতে পারলেই আমরা খুশি! মোট কথা হেয় অইবো ঘরের রাণী!
-- তার মানে বুঝছেন তো আপনার মাইয়া যদি এই বিয়াতে রাজী হয় তাইলে হেইডা অইবো হের রাজ কপালের চিহ্ন!
নয়নের মামা বেশ দাম্ভিকতার সাথে কথাটা বলে বিস্কুটের শেষ অংশটি মুখে পুড়ে নিলো,তার কথায় তারার মামা আমতা আমতা করে বললো,
-- সবই ঠিক আছে, কিন্তু মাইয়ার পড়ালেখার ইচ্ছা আছে ,হেইডা যদি একবার দেখতেন!
-- মাইয়া মাইনষের এত পড়ালেহা কইরা কি অইবো? হেইতো সোয়ামীর সংসার ই করোন লাগবো, বাচ্চা জন্ম দেওয়া,হেগো মানুষ করা! এইডাই তো মাইয়া মাইনষের প্রধান কর্ম! হেগো এত পড়ালেহা কইরা কি অইবো? বিয়ার পর তো জামাই আর হেরে চাকরি করতে পাঠাইবো না,,পোলার মাশাআল্লাহ যা আছে তা দিয়া আপনার মাইয়া রাণীর হালে থাকবো!
পানির গ্লাসটা টেবিলের এক পাশে রেখে,বাম হাত দিয়ে নিজের মুখ এবং তার চারপাশ মুছে শেষোক্তিটা করলো,,তার কথার ধরনে কিছূ না বলে,তারার মামী জানতে চাইলো,
-- পোলা কি যেন করে কইলেন?
-- পোলা; হেয় তো মাশাআল্লাহ; সুন্দর গঞ্জ বাজারের সবচেয়ে বড় পাইকারি মুদি দোকান পোলার; তাছাড়া গ্রামে ধানী জমি আছে কয়েক শতাংশ তাতে সব মৌসুমের ধান চাষ হয়,চার শতাংশ সবজির জমি ও আছে, সাজানো গোছানো বসত ভিটা,শুনছি সদরে দোকান কেনার ও চেষ্টা করতাছে! এইবার বুঝছেন তো এই বিয়া হইলে আপনার মাইয়ার একা না আপনাগো ও কপাল খুইল্লা যাইবো!
-- এত বড় ঘরের থেইকা প্রস্তাব লইয়া আইছেন হেইডা আমগো মতো মাইনসের সত্যিই সাত জনমের ভাইগ্য কিন্তু এত বড় ঘরে মাইয়া দিলে! আমরা তো বর্গাচাষী,পরের ক্ষেতে কামলা খাইট্টা খাই,পোলারে কিছু দেওয়ার মতো সামর্থ্য নাই তো!
-- আমরা পোলারে বিয়া দিমু,হাটে বেচুম না, সুতরাং আপনেরা চিন্তা লইয়েন না!আমগো খালি একটা জাতের মাইয়া চাই! বাকি কিছু দরকার নেই,এক কাপড়ে বউ কইরা লইয়া যামু!
-- আপনেরা কথা পাকা করেন,,আমগো মাইয়া রাজী!
-- মাইয়ার লগে একবার কথা কইয়া লইতেন?
নয়নের মামার উপদেশ,
-- আমগো কথাই মাইয়ার কথা,আপনেরা পোলার সাথে কথা কইয়া দিন তারিখ জানাইয়েন?
-- আলহামদুলিল্লাহ!
কেয়ামত মোতাশার স্বস্তি হইলো মনে হয়, পরক্ষণেই কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে বললো,
-- তয় আমার মনে হয় আপনেগো একবার পোলার বাড়ি গিয়া ঘর দুয়ার দেইখা কথা কইয়া লইলে ভালো হয়!
-- হ তাতো যামুই,, কিন্তু আপনেরা এই রিস্তা পাকা মনে কইরা লন!
-- আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের তরফ থেকে নিশ্চিত,এহন আপনেরা মাইয়ার বাপ মায়ের লগে কথা কইয়া জানান,, আমি আপনেগো কথার অপেক্ষায় থাকলাম!
-- আমরা আগামী রবিবার আল্লাহ চাইলে আমার বইন জামাইয়ের লগে ইনশাআল্লাহ যামু আপনেগো পোলা আর তার বাড়ি দেখতো,, অসুবিধা হইবো না তো?
-- কিসের অসুবিধা হইবো,,আপনেরা আহেন,আমরা নতুন কুটুমদের অপেক্ষায় থাকলাম!
-- আইজ তাইলে উঠি!
-- আল্লাহ ভরসা; ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই দেহা হইবো!
--- আসসালামু আলাইকুম!
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম।
পর্ব ০৪
দিন শেষে রাতের আগমন, আবার রাতের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে সূর্যের উদয়, মানুষের জীবনেও অবধারিত ধারায় বয়ে যায় দিন রাতের এমন অবধারিত খেলা,, সামনে বিশাল ক্ষেত, সরিষার ফুলে হলদে পাখির ন্যায় পালক মেলে হিমেল হাওয়ায় আলিঙ্গনে রয়েছে নরম মৃতিকা,মাঝে মাঝে হিমেল থেকে দমকা রুপে আবির্ভূত হয় পরশ ভুলানো মৃদু বাতাস,তার ছোঁয়ায় শরীর শীতল হলেও মনের মাঝে নেই শীতলতা! কপালের উপর পড়ে থাকা হালকা পাতলা কিছু চুল বাতাসের প্রবাহে এদিকে ওদিকে উড়োউড়ি করছে,গায়ের পাতলা সাদা প্রিন্টের শার্টও তার সাথে তাল মেলাচ্ছে , নয়নের নয়নজোড়াও হলুদ পাখির মতো বিশাল ক্ষেতের উপর,,দূর থেকে দূর অবধি তার নয়নের বিস্তৃত অংশই কেবল দৃশ্যমান হচ্ছে মনি জোড়ায়,, বিশাল প্রান্ত জুড়ে সরিষার আবাদ, শ্রীঘ্রই তৃন থেকে দানায় পরিণত হবে এই সুন্দর হলুদিয়া ,তারই হিসেব নিকেশ করেছে দাঁড়িয়ে,তার সাথে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে আসছে দীর্ঘশ্বাস,এই তো এই ক্ষেতের আইলের মাঝেই পড়েছিলো তার পিতার নিথর দেহ,কখন কিভাবে মরেছিলো কেউ জানে না তবে অনেকেরই ধারণা হয়তো ঠাডায় মরেছিল,,নয়ন জানে না জানতেও পারেনি শুধু জানে সেদিন স্কুল থেকে এসে দেখলো ঘরের দুয়ারে মায়ের বেহুঁশ হয়ে পড়া থাকা আর তার থেকেও খানিকটা দূরে পাটিতে নিথর হয়ে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত বাবাকে,, বাড়ি ভর্তি মানুষের আনাগোনা, আহাজারি, আর্তনাদ,,বয়স্ক দাদীর সন্তান হারানোর প্রলাপ,দাদার স্তব্ধ চাহনি আর আত্নীয় বর্গের সান্তনা বানী!
মাত্রই সতেরোতে পা দেওয়া নয়ন ছিলো সদ্য কলেজের দরজায় দাঁড়িয়ে জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখায় বিভোর , রঙিন চশমায় ঝকমকে আলোয় মেতেছিলো তার ছোট কিশোর নয়ন জোড়া , বিদ্যা অর্জন করে বিদ্যাসাগর হতে না পারলেও জ্ঞানী, বিদ্যান হওয়ার মতো যথেষ্ট ভালো জ্ঞান নয়নের ছিলো, একাদশ শ্রেণী পড়ুয়া নয়নের বরাবরই ভালো এবং প্রশংসনীয় ফলাফল ,তার ফলাফলে বরই খুশি ছিলো তার পরিবার এবং আশপাশের মানুষজন, শুধু তারই নয় তার সাথে তার চেয়েও চার বছরের ছোট বোনের মেধাও ছিলো ঈর্ষণীয় ভালো ফলাফল! পরের জমিতে বর্গা চাষী বাবা গরীব হলেও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ায় ছিলো অতীব আগ্রহী;কখনো এক বেলা খেয়ে তো কখনো একবেলা না খেয়ে থাকলেও সন্তানদের পড়াশোনার জন্য কখনো কার্পন্য করেনি!তার চিন্তা চেতনায় সন্তানদের বড় হওয়াই ছিলো একমাত্র প্রতিজ্ঞা কিন্তু হায় আফসোস! তার সন্তানেরা বড় ঠিকই হলো কিন্তু সে তা নিজ চোখে দেখে যেতে পারলো না,,এই তো নয়ন! পড়াশোনা করে বড় বিদ্যান না হলেও তার দিয়ে যাওয়া সামান্য শিক্ষা কাজে লাগিয়ে আজ এই তল্লাটের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ীদের তালিকায় নিজ স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, আবার তারই বোন মনি পড়াশোনা করে আজ সে শহরের বড় সরকারী কলেজের সহকারী অধ্যাপিকা,তার স্বামীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিদ্যাপীঠে নিজের বিদ্যা বিলাচ্ছে! কিন্তু এর পেছনেও রয়েছে নয়নের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, তারাই আর কঠোর পরিশ্রম!!
টানা বর্ষণে চারদিকে পানি থইথই করছে, কিন্তু তারপরও রহম হয়নি মেঘের মনে,সে নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ধরনীর বুকে ঢেলে দিচ্ছে তার সবটুকু,তারই ধারায় ভেসে যাচ্ছে কৃষকের কষ্টের ফল,কেউ কেউ হাতপিত্যেশ করলেও যাদের এই ফসলই সম্বল তারা ঝড়কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নেমে পড়েছে সন্তান সমতুল্য ফসলকে রক্ষা করতে; তেমনি এক বর্ষনের দিনে নয়ন নিজের ছোট বোন মনিকে সাথে নিয়ে বিদ্যালয়ে চলে যায়,, বাবার স্বপ্ন তাদের উপর এমনভাবে বিস্তার করেছিলো যে কোন বাধাই তাদের আটকে রাখতে পারতো না সেদিনও পারেনি,
নয়নের বাবা নোয়াব মিয়া ছিলো বর্গা চাষী, নয়নের দাদাও তাই,, দুজন মিলে অন্যের জমিতে চাষাবাদ করে যা পেতো তা দিয়েই কোনরকম জীবন চলে যেতো!
নয়ন'দের ভিটা ছাড়া আর কোন জমি ছিলো না! অল্প একটু ভিটার কিছুটা অংশ বিক্রি করে তা দিয়েই নয়নের বড় ফুফুর বিয়ে দেয়, এরপর নিজেদের উপার্জনের সামান্য জমা দিয়ে নয়নের ছোট ফুফুর বিয়ে দেয়, নয়নের ছোট চাচা নিজেই অনেক আগেই প্রেম করে পাশের গ্রামের এক হিন্দুর মেয়ে কে বিয়ে করে আলাদা হয়ে গিয়েছিল, নয়নের চাচীর সাথে নয়নের দাদা দাদী কিংবা নয়নের মায়ের সাথে বনাবনি হতো না, নয়নের চাচী হিন্দু ঘরের হলেও নয়নের চাচাকে বিয়ে করে মুসলিম হয়, কিন্তু নয়নের দাদী কোনভাবেই একটি হিন্দু মেয়েকে নিজের ছেলের বউ হিসেবে মানতে পারেনি, তার অমতে ছেলে বিয়ে করাতে দিনরাত কথা শুনাতো তাদের, নয়নের দাদী ছিলো উগ্রী মেজাজী কট্টর মুসলিম,তার চিন্তা ভাবনায় কখনো মানুষ আগে ছিলো না তিনি ধর্মকে বড় করতে গিয়ে মানুষের মনে আঘাত দিতো,যাই হোক তার সাথে রোজ রোজ ঝগড়া হতো বলে নয়নের চাচা তার স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিল, যেহেতু মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করে মেয়ে মুসলিম হয়েছিলো তাই নয়নের চাচা নিজের শ্বশুর বাড়ির লোকজনের থেকে কোনরকম সাহায্য সহযোগিতাও পায়নি, উল্টো সামাজিক ভাবে তাদের নানান সময়ে নানান সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে,,জাত নষ্টের অভিযোগে নয়নের চাচাকে গ্রামের কেউ কোন কাজ দিতো না,গ্রামের অন্য বউরাও নয়নের চাচীর সাথে মিশতো না, নয়নের মা চাইলেও দেবরের বউয়ের সাথে সখ্যতা গড়তে পারেনি, কোথাও যেন একটা বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বাঁধা ছিলো হয়তো ধর্ম নষ্ট হওয়ার ভয় কিংবা সামাজিক ভাবে হেনস্থা হওয়ার ভয়,যেটাই হোক নয়নের মায়ের সহজ সরল মস্তিষ্কে এই চিন্তা ধারা ঢুকিয়েছিলো নয়নের দাদী,, নয়নের মা ছিলো শ্বাশুড়ি ভক্ত বউমা,তিনি রাত বললে রাত দিন বললে দিন; শ্বাশুড়ি কিংবা শ্বশুরের মুখের উপর কথা বলাকে তিনি একরকম গুনাহ বলেই মান্য করতো,, কিন্তু নয়নের বাবা ছিলো তার ব্যতিক্রম,, মায়ের আদেশ অমান্য করেই অগোচরে ছোট ভাইকে সাহায্য করতো! তার সংসার গড়তে সব রকমের সাহায্য তার তরফ থেকে সে করেছিলো, কিন্তু মানুষ খুবই স্বার্থপর,,এরা নিজের প্রয়োজনে অন্যকে ব্যবহার করার সময় যত সুমিষ্ট সেই উপকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে ঠিক ততটাই তেতো! নয়নের চাচাও তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে!
সেই সময়ের এক ঘন বর্ষনের দিনে দিকবিদিক ভুলে ঝড়ের তান্ডবে ধ্বংসস্তূপ হয়ে যাওয়া ফসলকে রক্ষা করতেই ঘর থেকে বেরিয়েছিল নয়নের বাবা নোয়াব মিয়া,, কিন্তু ঘরে ফিরেছিলো লাশ হয়ে! নয়ন নিজের বোন মনিকে নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল, ছোট মনিকে স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে পার্শ্ববর্তী কলেজের শ্রেনী রুমে ঢুকে মাত্রই দুটো ক্লাস শেষ করেছে,এর মধ্যেই খবর পায় দ্রুত বাসায় ফেরার,, হঠাৎ এহেন বার্তায় অজানা আতঙ্কে ছেয়ে কিশোর নয়নের চিত্ত,দ্রুত মনিকে নিয়ে বাড়ির দিকে রাস্তা ধরে, বাড়ির সীমানায় পৌঁছাতেই মানুষের সমাগম আর ভেতর থেকে আসা আর্তনাদে আতকে উঠে ছোট মনি,বোনকে আগলে নিয়ে বাড়িতে ঢুকেই বুকে ধাক্কা খায় যখন দেখে বারান্দায় মায়ের অবচেতন হয়ে পড়ে থাকা,তাকে ঘিরে মানুষের আহাজারি, অদূরেই বাবার নিথর দেহ,আর দাদীর আর্তনাদ, দাদার নির্বাক চাহনি! মূহুর্তেই এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল নয়নের স্বপ্নের জগত,,আর সেটা উপলব্ধি করেই সংসারের হাল ধরে; কারণ ঘরে রোজগার করার মতো সামর্থ্যবান পুরুষ তখন কেবল নয়ন একাই,, পুত্র শোকে দাদা স্টোক করে অসুস্থ হয়ে পড়ে,দাদীও চুপচাপ হয়ে যায়,,তার সাথে সরে যায় সব আত্নীয়র আত্নার টান! নয়নের চাচা ও যোগাযোগ কমাতে কমাতে এক সময়ে বন্ধই করে দেয়,ফুফুরাও বছরে ঈদে আসা ছাড়া আর কোন খোঁজখবর নেওয়া দরকার মনে করলো না,তাও আসে শুধু বায়না নিয়ে,ভাই ছাড়া বিধবা ভাবীর উপরেও তাদের হাজার বায়না, একমাত্র কিশোর ভাতিজা ভাতিজীকেও তাদের বায়নার জালে আটকে রাখতো,,আত্নীয় বর্গের এই রুপ নয়নকে আর কিশোর করে রাখেনি,হয়ে যায় পুরুষ, নিজের পড়াশোনা থামিয়ে সুন্দর গঞ্জের একটি মুদি দোকানে হিসাব নিকাশের কাজ নেয়, মাত্র এস এস সি পাশ হলেও ভালো ফলাফল আর মেধার কারনে এরকম একটা কাজে পায়,,মা তখন অন্যের বাড়িতে ধান ভানা সহ নানা খুঁটিনাটি কাজ করতো,কখনো কখনো ভিটার চারদিকে সবজি চাষ করতো তাই দিয়ে নিজেদের সংসারের খোরাক চলে যেতো,এর মধ্যেই অভাব অনটনের চাপে নিজের অস্তিত্বের ভার আর বইতে না পেরে দুনিয়ার মায়া ছাড়ে নয়নের দাদী, প্রথমে সন্তান পরে স্ত্রীর ছেড়ে যাওয়ায় আরো বেশি অসুস্থ হয়ে যায় দাদা, একদমই শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে,, কিন্তু এত কিছুর মাঝেও নয়নের আত্নবিশ্বাসী মন কখনো তাকে ভাঙতে দেয় নি,সে নিজে পড়ালেখা ছাড়লেও ছোট বোনের পড়াশোনা চালিয়ে গেছে!
সতেরো বছর বয়সী নয়ন তিন বছর অন্যের দোকানে কাজ করলেও পরবর্তীতে নিজেই ছোট একটি দোকান নিয়ে বসে, এর কিছু মাস পরেই এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে মাঝারি ধরনের একটি দোকান চালু করে সুন্দর গঞ্জের একদম প্রধান মুখে,, উপরওয়ালার দয়ায় আর মুরব্বিদের দোয়ায় ধীরে ধীরে নয়ন এগোয়, মাঝারী দোকান এখন সুন্দর গঞ্জের সবচেয়ে বড় পাইকারি মুদি দোকান,যেখানে এখন লাখ লাখ টাকার বেচাকেনা রোজ হয়,নোয়াব মিয়া যেই জমিতে বর্গা কাটতো সেই জমিই নয়ন কিনে নেয় সেই মালিকের থেকে আজ বছর তিন হলো, এছাড়াও সুন্দর গঞ্জের বাজারের পাশেই বিশাল ধানি জমি কিনেছে,যাতে এখন প্রতিবছর ধান চাষ হয়, এছাড়াও বিশাল জায়গা জুড়ে লিজ নিয়ে ফলের চাষ করছে, নয়নের দোকানে বিক্রি হওয়া চালের যোগানও এখন নয়নের জমি থেকে হয়, তবুও নয়ন অনেক বড় বড় জমির ধান পুরোটা ঠিকা কিনে, এবং পুরোটা প্রক্রিয়াজাত করে নিজেই বাজারে সাপ্লাই করে,নয়ন এগোচ্ছে নিজের গতিতে কিন্তু এর মধ্যেই আবারও একটা একবার বড়সড় ধাক্কা খায় নয়ন,বয়স যখন পঁচিশ, মাত্রই ব্যবসায় উন্নতি লাভ করছে, তখনই আসে জীবনে বসন্তের আগমন, উঠতি ব্যবসায়ী নয়ন তখন পূর্ণাঙ্গ যুবক,গায়ে গড়নে তখন তাগড়া যুবক, অনেক বিত্তবানদের চোখে তখন উপযুক্ত পাত্র, অনেক মেয়েরই কাঙ্ক্ষিত পুরুষ,এমনই এক সময়ে মিয়া বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায় কেয়ামত ঘটক, বর্গা চাষী,অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করা ততদিনে ঘুচে গেছে নয়ন ব্যবসায়ীর বাড়ি হয়ে! এখন এই বাড়িতে শুধু নয়ন মিয়ার পরিচয়ই পরিচিত হয় সবাই,, ততদিনে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আত্নীয়দেরও আনাগোনা বেড়েছে বহু মাত্রায়,, তাদের ও রয়েছে নয়নকে মেয়ে দেওয়ার অধম্য ইচ্ছা,, কিন্তু সবার সব ইচ্ছে কে দমন করতেই নয়নের মা কেয়ামত মোতাশার প্রস্তাবে রাজী হয়ে তাদের গ্রামের মাদবর এর বোনের মেয়ের প্রস্তাবে রাজী হয়! কিন্তু ঐ যে সব পাত্রে সব ঢালতে নেই!
পর্ব ০৫
বউ নিয়ে মাত্রই বাড়িতে তোলা হলো, চারদিকে হইচই লেগে আছে, নয়নের চাচাতো,ফুফাতো ভাই বোন, ভাইদের বউদের কথায় কিচিরমিচির শব্দ চলছে অবধারিত ভাবে, নয়নের মা ঘরে বউ আনতে পেরে বেজায় খুশি, নয়নের বোনও যেন আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতোই খুশি, কিন্তু কোথাও যেন খুশি নেই নয়নের মন! হয়তো একবার মন ভাঙার কষ্ট এতটাই প্রখর ছিলো যে দ্বিতীয়বার মনে অন্য কাউকে জায়গা দেওয়ার চেষ্টাও করতে ভয় পাচ্ছে!
-- নতুন বউ আইজ থেইকা এইডাই তোমার ঘর! আমার পোলাডা আউলা-জাউলা তুমি তোমার মতো কইরা গুছাইয়া নিও! আমি অন্য শ্বাশুড়িগো মতো কইরা কমু না যে তুমি আমার পোলারে আমার থেইকা কাইড়া নিও না,আমি কইতাছি তোমার আঁচলে এমনে বাধবা যে অন্য দিকে ছুইটা যাইতে না পারে!
-- *** (চুপ)
-- হ চাচী আম্মা অহন এই কথা কন,পরে দেহা যাইবো সব দোষ বউয়ের দিবেন!
-- দোষ করলে দোষ,,পোলারে আঁচলে বাঁধতে কইছি,তার মানে এই না যে আমারে ঘর থেইকা বাইর কইরা দিবো!
নয়নের মায়ের কথায় তারার জা শিউলি চুপ হয়ে গেল,কারণ কথাটা তার আতে লেগেছে, কিন্তু তানিয়া শ্বাশুড়ির কথায় চোখ তুলে তার দিকে তাকালো,কি আজব কথাবার্তা এই মহিলার, বিয়ে ঠিক করার সময়ও কত কথা বলেছিলো, তারার বুঝে আসছে না উনি কেমন মানুষ,, শ্বাশুড়ি হিসেবে কেমন, মায়ের মতো নাকি শুধুই শ্বাশুড়ি! তারার কেমন ভয় করছে, চারদিকে কত মানুষ অথচ কাউকে চিনে না,কেউ নাই আপন যাকে দেখলে নিজের আপন মনে হয়,এর মধ্যেই ঘরের দরজায় নক পড়লো,
-- আম্মা আসবো?
-- হ আব্বা আহো!
মায়ের অনুমতিতে ঘরে প্রবেশ নয়নের, হঠাৎ করেই তানিয়ার অন্তরে শীতল অনুভূতি ছেয়ে গেল,ঘরে ঢুকে নয়নের নজরও পড়লো সদ্য বিয়ে করে আনা টুকটুকে লাল কাতানে জড়িয়ে আঁটসাঁট হয়ে মাথা নুইয়ে বসে থাকা নববধূকে,, তার ভেতরে কোন অনুভূতি হচ্ছে না তবে নিঃসন্দেহে এই মেয়ে সুন্দরী,সাদা ফর্সা হলেই কি সুন্দর হয় ? নাহ! এই যে হলদে ফর্সা রং, চিন্তা আর পরিশ্রমের ফলে কিছুটা কালচে হয়ে গেছে কিন্তু তার চেহারার মাধুর্যতা ঠিকই তাকে সুন্দরী তকমা দিতে বাধ্য করছে! হয়তো এর জন্যই তাকে সুন্দরী বলে মানতে সবাই এক কথায় রাজী হয়ে যায়, মায়ের পছন্দ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার কারণ নেই,মা যদি কানা অন্ধও এনে দিতো নিঃসন্দেহে নয়ন তাকেই বিয়ে করতো; প্রথম দিন যেদিন পথিক হয়ে ঐ বাড়িতে গিয়েছিল তখন পেছনে দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ঠিকই কিন্তু আড়চোখে এই মেয়ের চোখে চোখও পড়েছিল তাই তো এরপর আর চোখ তুলে দেখার দুঃসাহস আর করেনি,কোন এক অজানা কারণে করেনি!
নয়নের ঘরে প্রবেশ করায় তানিয়ার ভেতরে চলা অস্থিরতা হঠাৎ করেই থেমে গেল, এত সময় চারদিকে একজন আপনজনকে খুজেছিলো,এখন মনে হচ্ছে সবচেয়ে আপনজনই চলে এসেছে,মাথা নিচু করে রাখলেও নয়নের নজর যে কেবল ওর উপরেই রয়েছে তা বুঝতে কষ্ট হলো না,এতে করে লজ্জা চেপে ধরেছে তাকে, দুজনেরই হুশ আছে তৃতীয় কারো কন্ঠস্বরে,,
-- ছোট মেয়া তোমার ঘরে এহন কি কাম!এহনো নিয়ম কানুন শ্যাষ হয় নাই, তুমি পরে আহো; যাও এহন এহান থেইকা!
-- আমি হিসাবের খাতা লইয়াই যামুগা!
-- কিহ! কি কও এগুলা তুমি ভাইজান? আজকেই বিয়ে করে আনলে মাত্রই,আর বলতেছো নতুন বউ রেখে এখন তুমি হিসাব নিকাশ নিয়ে বসবা?
-- তো? বিয়া করলে কি খাওন দাওন বন্ধ! তাছাড়া যারে আনছি তারে রাখতেও টেকার দরকার আছে! সুতরাং কাম বন্ধ করা যাইবো না?
নতুন বিয়ে করে এসে নব বরের মুখে নিজেকে নিয়ে এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ঠিক কি প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিৎ তারার বোধ ক্ষমতার বাইরে,তবে লোকটা বেশ কাঠখোট্টা ধাঁচের তা বুঝতে কষ্ট হলো না,,প্রথম যেদিন দেখেছিলো সেদিন কেন জানি এমন মনে হয়নি তবে এখন তার কথায় কি বোধ করা উচিত!
সব নিয়মের পাঠ চুকিয়ে তারাকে একা ঘরে রেখে সবাই চলে গেল,নয়ন এত মানুষের কোলাহলকে তুচ্ছ করে ঠিকই পেছনের বারান্দায় বসে হিসাব শেষ করলো, এতে অনেকেই ওর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ছিলো, কেউ কেউ ফিসফিস করে অনেক কথাও বলছিলো, কিন্তু কোন কথাই নয়নের কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে সক্ষম হয়নি,নয়ন জানে এদের কাজই হচ্ছে অন্যকে নিয়ে চর্চা করা,ভালো মন্দের ভাগ নেওয়া নয়, খারাপ সময় পাশে থেকে সাহস যোগানো এদের কাজ নয়,তাই এদের কথায় কান না দিয়ে নিজের কাজ করাই শ্রেয় তার কাছে!
মায়ের ডাকে মাথা তুলে সেদিকে নজর দিলো,
-- আব্বা তোমার কি কাম শ্যাষ হয় নাই? বউমা ঘরে একা তো!
-- এইতো আম্মা এইটুকুই আছে!
-- রাখো এগুলো ভাইজান, অনেক হইছে!
-- আরে কি করতাছোস? রাখ সকালে লাগবো এগুলো!
-- লাগলে লাগুক; তুমি সকালে কোথাও যাবা না!
-- পাগল হয়ে গেছিস? সকালে আমি না গেলে দোকান কে খুলবো?
-- পাগল আমরা না,তুমি হইয়া গেছো? টাকার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে ভুইলাই গেছো যে তুমি মানুষ!
ছোট বোনের অভিযোগে নিরবতাই উত্তর, কিন্তু ছোট বোন থেমে নেই,সে তার কথা চালিয়ে যাচ্ছে,,
-- ভাই এভাবে চললে কিভাবে হইবো? তুমি এরকম করলে মানুষ কি বলবে?
-- কি করলাম?
-- সত্যিই জানো না কি করলা?
মাথা নত করে ফেললো,সে জানে তো কি করেছে? কিন্তু কিসের এত সংকোচ, দোটানা তার! গত কয়েকটা বছর একইভাবে কাটছে, অনেক চেষ্টা করেছে খারাপ সময়গুলো, খারাপ ব্যাপারগুলো ভুলতে কিন্তু পারছে না কেন? কেনইবা তার দৃষ্টিতে সবাইকে এক মনে হচ্ছে? হতেও তো পারে নতুন কেউ অমন নয়!কি জানি হয়তো অথবা হয়তো নয়!
-- ভাইজান একজনের শাস্তি আরেকজনকে দিয়ো না,এতে একসময় তুমিই একা হয়ে যাবা!
-- তোমরা কি তারে আগের কথা কইছো?
-- হ আমি তো তার মামার লগেই কইছিলাম, কেয়ামত ভাইজানরেও কইছিলাম আগের কথাগুলো বুঝাইয়া কইতে,,হেয় কইছে তারা কোন অমত করে নাই ,মাইয়ার লগে কথা কইয়াই রাজী করাইছে,তা না হইলে কি আর রাজী হইতো বিয়া'তে!
আম্মা নিজের যুক্তি উপস্থাপন করে, নয়নের কাঁধে হাত বুলিয়ে বললো,
-- আব্বা, পেছনের কথা ভুইলা যাও; যাও ঘরে যাও,বউমা বইয়া রইছে,তার সাথে গিয়া সময় কাটাও,দেখবা মনের বিস্বাদ কাইট্টা গ্যাছে!
-- আইচ্ছা!
বোন আর মায়ের কথায় খাতাপত্র মায়ের হাতে দিয়ে চলে গেল ঘরের দিকে; ঘরের দরজায় খট করে আওয়াজ হওয়ায় নিজের গুটিয়ে রাখা পা জোড়া আরো একটু গুটিয়ে নিলো, নয়ন দরজা খুলে সর্বপ্রথম চোখ পড়লো খাটের ঠিক মাঝখানে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা লাল টুকটুকে বউটাকে, ঘোমটার আড়ালে মুখটা ঠিকঠাক না দেখা গেলেও তার নাকের ছোট্ট নাকছাপিটা ঠিকই দেখা যাচ্ছে! সোনার তৈরি নাকছাপিটা লাল শাড়ীর সোনালী কাজের সাথে মিশে একাকার,দেখলে মনে হয় লাল রক্ত জবাটি সোনার পালংকে বসে আছে, চারদিকে বেলি আর নয়ন-তারা'য় সজ্জিত বিছানা, খাটের দাসা আর মাথার অংশে নয়নতারা আর লাল গোলাপ দিয়ে সাজানো,ফুলে ফুলে সাজানো বিছানায় বসে থাকা নববধূকেও এক জলজ্যান্ত গোলাপ কলি মনে হচ্ছে,যার পাপড়িগুলো কোমল লাল আবরণে ঢাকা আর পত্রগুলো সোনায় মুড়ানো! নিজের মুগ্ধতায় তাকিয়ে থাকা বিষয়টাতে নিজেই খানিকটা বিব্রত হলো, এভাবে এক নজরে তাকিয়ে থাকায় তারাও লজ্জায় নেতিয়ে পড়ল, এমনিতেই লজ্জায় চোখ মেলতে পারছে না তার মধ্যে আড়চোখে দেখা সদ্য হওয়া স্বামীর এমন মোহনীয় নজর যেকোন নারীর জন্যই পরম লজ্জার!
নয়ন নিজের নজর সংযত করে দরজা লাগিয়ে দিলো,খুকখুক করে কাশি দিলো,জানান দিলো তার ঘরে ঢোকার,তারার হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই ধীর গতিতে উঠে এসে নিচে নামলো,নয়ন কিছুটা এগিয়ে গেল, হঠাৎ করেই তারা উঠে এসে নয়নের সামনে দাড়াতেই নয়ন প্রশ্নাত্নক হয়ে কপাল কুঁচকে ফেললো,তারা হুট করেই নিচু হয়ে নয়নের পা ছুঁয়ে সালাম করলো,নয়ন কিছুটা আঁতকে উঠলো,দ্রুত সরে দাঁড়ালো,
--- আরে আরে কি করতাছো?
নয়নের এমন প্রতিক্রিয়ায় তারা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো,নয়ন বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছে নিজেই বুঝলো,তাই কন্ঠ খাদে নামিয়ে নিম্নস্বরে বললো,
-- কি করতাছিলা?
-- সালাম করতেছিলাম!
অসহায় চাহনিতে, নিচু কন্ঠে উত্তর দান,নয়ন হতভম্ব হয়ে জানতে চাইলো,
-- তুমি না আইএ পাস?
তারা মাথা দুলিয়ে হ্যা সম্মতি, নয়ন বিরক্ত হয়ে বললো,
-- লাভ কি হইছে? সেই তো আমগো মতো মুরক্ষের কামই করলা?
নয়নের কথায় তারা ভয়ার্ত ও অভাব মিশিয়ে তাকালো,
-- তুমি জানো না এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো কদমে মাথা ঝুঁকতে নাই! তাইলে তুমি এইডা কি করলা?
-- সবাই কইছে আপনি আসলে আপনার কদম ছুঁয়ে সালাম করতে তাই!
-- যারা কইছে হ্যারা সকলে অশিক্ষিত মুরক্ষ আমার মতোই! তারা যা করবো তুমিও তাই করবা তাইলে তাগো আর তোমার মাঝে পার্থক্য কই?
-- **** ( নিরবতা)
-- আজকের পর আর কখনো কারো পায়ে হাত দিয়া সালাম করবা না! ঠিক আছে?
-- জ্বী!
-- আইচ্ছা যাও কাপড় বদলাইয়া নেও,পরে একসাথে নামাজ আদায় করবো!
নয়নের শেষের কথায় তারা খুশি হলেও প্রথম কথায় একটু কষ্ট পেল,,কারণ বাসর ঘরে ঢুকে স্বামী মুখও দেখলো না, প্রশংসাও করলো না, ছোট ভুলের জন্য কথা শুনালো এবং কেমন অনিহা দেখিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো,ও তো জানতো বিয়ের প্রথম রাতে স্বামী নিজের স্ত্রীর মুখ দেখে খুশি হয়ে অনেক প্রশংসা করে, উপহার দেয়,নয়ন উপহার তো দূরে থাক খারাপ সুন্দর কিছুই বললো না উল্টো নিজের কথা শুনিয়ে কিভাবে চলে গেল!নয়ন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবীর বোতাম খুলতে খুলতে তারাকে পর্যবেক্ষণ করছিলো , অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেন জানি ব্যবহারটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো, সুন্দর করে বলেও বুঝাতে পারতো,নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো,
-- আমি কি ইচ্ছা করেই ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করতাছি? কেন করতাছি?
তারা একবার নয়নকে আড়চোখে দেখে নিয়ে খাটের কোনায় কোনরকম বসে ধীরে ধীরে নিজের গায়ের অলংকার খুলতে লাগলো,সব গয়না খুলে শুধু নাকের নাকফুল আর নাকছাপিটাই রাখলো,হাতে থাকা চিকন চুড়িগুলো খুলবে কিনা তা নিয়ে একটু ভাবলো,পরে ভাবলো ওর মা খালা মামী কাউকেই কখনো চুড়ি খুলে রাখতে দেখেনি তাদের কাছ থেকে শুনেছিলো হাতের চুড়ি খুললে অথবা এক হাতে চুড়ি পড়লে স্বামীর অকল্যান হয়,,তারা জানে এগুলো কুসংস্কার,ও মানতেও চায় না কিন্তু এখন কেন জানি চুড়িগুলো ঐ কথা ভেবে খুলতে মন চাইলো না ,,তাই হাতেই রেখে দিলো,নয়নের পাঞ্জাবী খোলা শেষ হলে তারা দিকে ঘুরলো, হঠাৎ করেই পাতলা সেন্টু গেঞ্জি আর সাদা পাজামায় নয়নকে দেখে তারা লজ্জা পেল, বিব্রত হলো, এদিক ওদিক তাকিতুকি করতে লাগলো,নয়নও লজ্জা পাচ্ছে কিন্তু ঐ যে পুরুষ মানুষ, সবকিছুকে গায়ে মাখে না,এই ক্ষেত্রেও তাই করলো, লজ্জা কে বিদায় জানিয়ে নতুন বউয়ের উদ্দেশ্যে বললো,
পর্ব ০৬
-- চলো অযু করে আসি!
-- ***(তারা চুপ থেকে নয়নকে অনুসরণ করে ঘরের সাথে লাগিয়ে বানানো নতুন গোসলখানায় গেল,নয়ন কল ছেড়ে অযু করলো, তারা দাঁড়িয়ে রইলো,তারাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নয়ন ইশারায় জানতে চাইলো কেন দাঁড়িয়ে আছে,তারাও ইশারায় বুঝালো নয়নের শেষ হোক তবেই সে করবে, নতুন বউ একটু তো লজ্জা পাবেই,তাই আর কিছু না বলে নিজের কাজ শেষ করে ঘরে চলে গেল ,নয়ন যেতেই তারা তাড়াতাড়ি করে কাপড় বদলে নিলো, এরপর ওযু করে মাথায় লম্বা করে ঘোমটা টেনে পশ্চিম মুখী হয়ে কালিমা শাহাদাত পাঠ করলো, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলো, ততক্ষণে নয়ন নতুন পাঞ্জাবি পড়ে জায়নামাজ বিছিয়ে তাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে,তারা দেখলো নয়নের কিছুটা পেছনে একটু আড়াআড়ি করে আরেকটি জায়নামাজ বিছানো ,সেটায় গিয়ে দাঁড়ালো,তারাকে দেখে এক নজর দেখে নিলো নয়ন, এরপর আল্লাহর বন্দেগী স্বীকার করতে এবং নতুন জীবনকে বরণ করতে আদায় করলো দুই রাকাত নফল নামাজ! উদ্দেশ্যে এক চাওয়ার ধরণ আলাদা,,কেউ সম্পূর্ণ করে নিজের নতুন জীবনকে চাইছে,কেউ নতুন জীবনে সবধরনের সম্পর্কের সাথে সুন্দর শুরু চাইছে!
-- হুনো তোমারে কিছু কথা কই,, আমার সাথে যতদিন সংসার করবা ততদিন এই কথা মনা রাখবা,এই কথার একচুলও যদি হেরফের হয় তাইলে সেদিনই হইবো তোমার আমার এক সঙ্গে থাকার শ্যাষ দিন!
শুরুর আগেই শেষ ! কথাটা নয়ন যতটা সাবলীল ভাবে বললো,তারা কি ঠিক ততটাই সহজভাবে নিতে পারলো? পারলো না! ছ্যাৎ করেই তারার অন্তরে জ্বলে উঠলো,এই কেমন মানুষের সাথে জুড়ে দেওয়া হলো তার কপালকে যেকিনা শুরুর থেকেই সব শেষের ভয় দেখিয়ে যাচ্ছে,তারার চিন্তা হতে লাগলো,কি বলবে নয়ন?
-- আমার দুনিয়াতে দুইজন মানুষের মূল্য সব চাইতে বেশি! এক আমার আম্মা আরেক আমার ছোড বইন! তাগো খুশির লইগা আমি হাসতে হাসতে নিজের গলায় ছুড়ি চালাইতে পারি, কিন্তু তাগো চোখে পানি দেখতে পারি না!তাইলে বুঝতেই পারতাছো আমার জীবনে তাগো কত গুরুত্ব!
তারা মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো,মানে হ্যা সে বুঝতে পারছে! নয়ন আবারও বলতে লাগলো,,
-- কোনদিন যদি হুনছি তোমার লইগা আমার মায়ের,বইনের মুখে আ থেকে আহ উচ্চারণ অইছে তাইলে হেইদিনই হইবো তোমার এই সংসারে শ্যাষ দিন! আমি ডাইন বাম কিছু দেখমু না ,দেখার দরকার নাই,, আমার কাছে সবচাইতে দামী হেই দুইজনের খুশি! আশাকরি আমার কথা বুঝতে পারছো!
তারা বুঝলো লোকটা মা বোনের প্রতি অতিরিক্ত দূর্বল,আর এটাই তাকে এরকম চিন্তাশীল করে তুলেছে, কিন্তু তাই বলে ন্যায় অন্যায়ও ভাববে না,এ কেমন কথা! নয়নের কথার পিঠে উত্তর শুধু,
-- হুম!
তুমি শিক্ষিত এইডা জনেজনে জানানোর দরকার নাই, শিক্ষিতগিরি নিজের কাছেই রাখবা তার ফলন আমার পরিবারের উপরে চালাইবা না,, তোমার ব্যবহারে মনের ভুলেও যেন জাহির না হয় তা!!
চুপ থেকে শোনা ছাড়া উত্তর নাই,
-- যদি কোনদিন মনে হয় অশিক্ষিত স্বামী নিয়া সমাজে চলতে তোমার সম্মানে লাগে তাইলে আমারে কইবা,আমি নিজ দায়িত্বে তোমারে মুক্ত কইরা দিমু তাও আল্লাহর দোহাই লাগে আমার মুখে চুলকানি মাইখা চইলা যাইয়ো না!!
-- কি কন এগুলো?
আর পারেনি তারা চুপ থাকতে, যেখানে দুজনের পথ চলাই এখনো শুরু হয়নি সেখানে শেষ হওয়ার হুমকি,, আদৌও মেনে নেওয়া যায়,তারাও পারলো না,তার চেয়েও বেশি পারলো না নয়নের এত কঠোর ব্যবহার,, জিজ্ঞেস করেই বসলো,,
-- আপনি কি নিজের ইচ্ছায় আমারে বিয়া করেন নাই?
-- এইডা আবার কেমন প্রশ্ন?
নয়নের চমকিত প্রশ্ন,তারা দ্বিরুক্ত মনোভাব কাটিয়ে,হালকা তেজ নিয়েই জানতে চাইলো,
-- আমি আসার পর থেইকাই আপনি খালি চইলা যাওয়ার কথা বলতাছেন,আমি কি একবারও কইছি আমি যামুগা,, তাছাড়া আপনের শিক্ষিত অশিক্ষিত নিয়া যদি আমার সমস্যা হইতো তাইলে কি আমি এইহানে আপনের বউ হইয়া আপনের সামনে দাঁড়াইয়া থাকতাম,, নিশ্চিত কোন প্রফেসরের বউ হইতাম!
-- পছন্দ করতা নাকি কোন প্রফেসররে? করলে এহনই কইয়া দেও!
তারার অমন করে বলা কথার পিঠে এমন প্রশ্ন! হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রয়েছে, অপমানিত বোধ হলো তারার, ছলছল করে উঠলো কাজলে লেপ্টে যাওয়া নয়নজোড়া!
-- আপনি আ্যামন ক্যান?
--ক্যামন?
নয়নের বিরক্তিকর ধাঁচের প্রশ্ন,তারার কাঁদো কাঁদো গলায় দেওয়া উত্তর
-- এই যে খালি আমারে ক্যামন ক্যামন কইরা কথা কন?যেন আমারে সইহ্যই করতে পারতাছেন না!
নয়নের অন্তঃস্থলে চাপ অনুভূত হলো,সত্যিই তো বিয়ে করে আনলোই মাত্র কয়েকটা ঘন্টা,এইতো ২:৩০ - ৩ ঘন্টা হইছে, এর মধ্যেই বহুবার মেয়েটাকে চলে যাওয়ার কথা বলছে,টাকার খোটাও দিয়েছে, কথাগুলো যে খুব বাজেভাবে বলছে! একটু ভালো করেও তো বলা যেতো কিন্তু; তবুও তো নতুন বউ,ও তো অনেক রঙিন স্বপ্ন নিয়ে তার হাত ধরেই এসেছে, নিজের জীবনের ঘায়ের যন্ত্রনা কেন ওর মধ্যে বিস্তার করছে? এটা কি অন্যায় নয়,, আচ্ছা নতুন করে তো শুরু করাই যায়,,সবাই তো এক নয়!হতেও তো পারে এর সাথেই জীবনের বসন্তের সত্যিকারের আলিঙ্গন ঘটবে, নয়নের চিন্তার জাল ছিঁড়ে ভবিতব্যকে সামনে এনে দাড় করালো তারার নাক টানার শব্দে,সে বাচ্চাদের মতো করেই নাক টানছে আর ছলছল চোখে নয়নকে দেখছে ,একদম সরাসরি, কিছু সময় আগেই যে লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছিলো না সে এখন নির্দ্বিধায় একমনে তাকিয়ে দেখছে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শ্যাম পুরুষকে; এই প্রথম নয়নের নয়ন মিললো তারার অশ্রু ভরা নয়নে,দূর থেকে কিংবা কখনো আড়চোখে মুখের কিছুটা দেখলেও এইমাত্র সরাসরি চোখ পড়লো মায়াবতী তারার মুখপানে, কিছুটা থমকালো, চমকিত হলো,১৯ বছর বয়সী তারাকে নিশ্চিত পূর্ণাঙ্গ যুবতী বলেই মনে হয়, চেহারায়ও তার যৌবনের উদ্দিপ্ততার ছোঁয়া উপচে পড়ছে,বড় বড় কাজল টানা নয়নের গভীরতা দীর্ঘ সমুদ্রের ন্যায় উচ্ছলতায় মাখো মাখো, গোলাকার গড়নাকৃতি মুখশ্রীর মাঝে ছোট্ট একটু হাকলা মোটা ঠোঁট,তার মাঝের ভাঁজ যেন কমলার ন্যায় শেপের কাজ করছে,ওযুর কারণে লিপস্টিক উঠে গেলেও তার গোলাপী রেশ এখনও ঠোঁটের সৌন্দর্যে বৃদ্ধিতে কাজ করছে,,হুট করেই নয়নের মনে আঘাত করলো ভালো লাগার প্রবাহ, মুগ্ধতায় ছেয়ে গেল মন কুঠির, দ্বিগুণ হলো হৃদ ক্রিয়া, মেয়েটা এখনও নাক টানছে, চোখে পানি উতলে উঠছে কিন্তু যথেষ্ট আত্নসম্মান বোধ সম্পন্ন তাই তাকে বের না করার প্রবল প্রচেষ্টা যা তার অনবরত চোখ ঝাপটানোতেই বোঝা যাচ্ছে, মেয়েটা গরীব ঘরের কিন্তু আহ্লাদী, একটুতেই ছিঁচকাদুনে স্বভাবের হবে হয়তো! মুহূর্তেই নয়নের ভেতরে নিজেকে নিয়ে বিরক্তির আভা ছড়িয়ে গেল,এই বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই অজানা কারণে, অজানা কারণে? নাহ জানা কারণেই, একজনের অন্যায়ের তিক্ততা ভেতরকে এতটাই তেতো করে রেখেছে যে কাছাকাছি আসা যেকোন নারীর প্রতিই এখন অনীহা, বিরক্তি কাজ করে,তাইতো শুরু থেকেই তারার প্রতিও একই অনুভূতি কাজ করছিলো যার দরুন এত রূঢ় ব্যবহার করেছে; অনিচ্ছাকৃত কিন্তু করেছে তো? কিন্তু এই যে মুহূর্তেই দেখা মাত্রই সব বিস্বাদ কেটে গেল, কেমন ভালো লাগায় ছেয়ে গেল সমস্তটা, সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো তীব্র ভাবে নড়েচড়ে উঠলো,,নয়নের মস্তিষ্কের কাজ বন্ধ হয়ে গেল, হৃদয় তীব্র ভাবে জানান দিলো এই মেয়েটি তোর ভালো থাকার সঙ্গী,তোকে ভালো রাখতেই ওর আগমন তোর জীবনে,আগলে নে বাহুবন্ধনে, জড়িয়ে ধর খুব শক্ত করে! যেন কখনো ছেড়ে যেতে না পারে, বন্দি কর ভালোবাসা নামক খাঁচার মাঝে!
তারা মাথা নিচু করে নাক টেনে যাচ্ছে,নয়ন হাত বাড়িয়ে ডান বাহু ধরে নিজের কাছে টেনে নিলো, হঠাৎ করেই পুরুষালি ছোঁয়ায় শিউরে উঠলো আঁতকে উঠলো সদ্য যৌবনে পা দেয়া তারা নামক রমনী,উনিশ বছরে প্রথম পুরুষের একান্ত এভাবে ছোঁয়া,তাও কিনা যে তার নামে দলিল- কৃত, লজ্জা ভয় চাপা উত্তেজনা সব কিছু মিলিয়ে তারাকে বাক হীন করে তুলেছে,নিরব হয়ে শুধু নয়নের গভীর ছোঁয়া অনুভব করছে,নাক টানাও বন্ধ হয়ে গেছে,নয়ন হুট করেই একটা কাজ করে বসলো যার জন্য না তৈরি ছিলো তারা আর না তৈরি ছিলো নয়ন,, ঘোরের মাঝেই তারার বন্ধ চোখের পাতায় নিজের ওষ্ঠদ্বয়ের ছোঁয়া দিলো,তারার শরীরে কাঁপুনি দিলো,নয়ন শক্ত করে নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরলো, ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ নিয়ে মোহনীয় কন্ঠে বললো,,
-- আমি সইহ্য করতে পারলেও তুমি কি পারবা আমার ছোঁয়া সইহ্য করতে?
তারার কন্ঠ চেপে ধরেছে লজ্জাবতীরা, কোন রকম শব্দ নির্গত হচ্ছে না, কিন্তু লজ্জায় আরো একটু সেটে গেল নয়নের সাথে,নয়ন একই অবস্থায় তারাকে আরো একটু গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিলো,
-- এত কান্দইনা ক্যান তুমি? আমি তো খালি কথার কথাই কইছি! কি করমু কও ? ঘর পোড়া গরু তো তাই সিঁন্দুরে মেঘের গর্জনে ভয় পাই?
নয়ন কাঁদুনে বলায় একটু রাগতে গেলেও পরের কথায় তা উবে গেল, মনের মাঝে উঁকি দিলো অজানা আতঙ্ক,ঘর পোড়া গরু মানে কি? কিন্তু তা আর করার সময় দিলো না নয়ন, এমনিতেই নয়নের ছোঁয়া গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে,নয়ন ঘোরের মাঝেই তারাকে নিজের একান্ত কাছে টেনে নিচ্ছে ঠিকই কিন্তু নয়নও চায় তারাকে একদম আপন করে পেতে, পুরুষ মানুষ শরীরের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পাবে তাও যদি হয় বৈধভাবে তবে কেন তাকে হাত ছাড়া করবে তাছাড়া নয়ন কোন ভাবেই তারাকে বোঝাতে চায় না তারার প্রতি কিছু সময় আগেও এক ধরনের অনীহা কিংবা অনুভূতি ছিলো যা তারার প্রতি তাকে রুঢ় করে তুলেছিলো কিন্তু তাকে দেখার পরই তার মোহে, না মায়ায় এমনভাবে আঁটকে গেছে যে তাঁকে কাছে টানার তীব্রতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত,,তারা নিজের স্বামীর গভীর ছোঁয়া অনুভব করতে লাগলো,বাসর ঘরে স্বামী একান্ত ভাবে কাছে টানবে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার ,সেটা নিয়ে অন্য কিছু ভাবার কোন কারণ নেই তারাও ভাবলো না,,অথচ জানতেই পারলো না কিছু মুহূর্ত আগেই তার স্বামী তার মোহে আটকা পড়েছে যার দরুন তাকে এত নিবিড় করে কাছে টেনে নিলো, নয়তো কখনো তার সঙ্গ তারার কপালে জুটতো কিনা তা শুধু সেই ভালো জানে!!
পর্ব ০৭
আটপৌরে করে পড়া বাহারী রঙের ছাপার সুতি শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথায় ঘোমটা টানা,তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে নাকছাপিটা ,ফর্সা পায়ে লাল আলতা দিয়ে সুন্দর নকশা করা,তার মাঝে চিকচিক করছে রুপার নুপুর জোড়া,অনবরত হাঁটার দরুন তার থেকে ঝুমঝুম শব্দ ভেসে আসছে,হাতেও রয়েছে রঙিন রেশমী চুড়ি,ঘন কালো চুল গুলো সুন্দর করে খোঁপা বাঁধা, মোট কথা যথার্থই একদম নতুন বউয়ের রুপেই নিজেকে সাজিয়েছে তারা এদিক থেকে ওদিক হেঁটে হেঁটে বারবার নেড়েচেড়ে দিচ্ছে নতুন ধান গুলো! সদর দরজায় দাঁড়িয়েই সর্বপ্রথম চোখে পড়লো ২১ দিনেও নববধূর রুপে থাকা তারাকে,নয়ন জানে এসব তার মায়েরই বুদ্ধি,আর যাই হোক তারা সারাদিন নিজেকে এভাবে গুছিয়ে রাখার মতো মেয়ে নয়, সংসারি তারা সংসার যত সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতে জানে ঠিক সেই তারাই নিজেকে গোছাতে একদম অনাগ্রহী,হয়তো নিজেকে নিয়ে অতটা ভাবনা তার মাঝে নেই!
মায়ের ধারণা পুত্রবধূ এভাবে সেজে গুজে থাকলে হয়তো ছেলে এদিকে ওদিকে নজর দিবে না, সুন্দরী বউ আছে বলে অন্যরাও সাহস দেখাবে না, কিন্তু মা কি জানে তার ছেলে কোন এক নতুন ভোরের আলোয় এক অগোছালো ললনায় নিজেকে বিলিয়েছে! ঘুমন্ত এলোমেলো হয়ে বিভোর রমনীর উদ্দাম শ্বাস প্রক্রিয়ার উথাল পাতাল ঢেউয়ের মাঝে তালেই সে নিজের তাল মেলাতে গিয়েই নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছে,এখন আর সেই ঢেউয়ের থেকে খেই হারানোর সামর্থ্য এই অধম নয়নের নেই!
এই যে বিয়ের মাত্র একুশদিন; এর মধ্যেই নয়ন নিজের মাঝে বিশাল পরিবর্তন অনুভব করছে,কাজ পাগল নয়ন এখন যখন তখন ঘরে ফেরার বায়না খুঁজে,মা ঠিকই বলেছিলো বিয়ে করলে, নতুন কাউকে জীবনে জায়গা দিলে সামনে এগোনো সহজ হবে, ভুলতে পারবে তিক্ত কিছু অভিজ্ঞতা,নয়নও পেরেছে কিনা নিশ্চিত নয় কিন্তু চেষ্টা করছে,তবে তার জন্য অবশ্যই নয়ন তারাকে ব্যবহার করছে না কারণ নয়ন মনেপ্রাণে মানে তারা ব্যবহারে জিনিস নয়, জীবনসঙ্গী! একজন প্রকৃত জীবনসঙ্গী হিসেবে যতটুকু পাওয়ার নয়ন তার পুরোটাই তারাকে দিতে চায়,হয়তো এখনও ভালোবাসা তৈরি হয়নি কিন্তু অদ্ভুত টান তৈরি ঠিকই হয়েছে! মোহ,মায়া যাই হোক নয়ন তারার মাঝেই নিজেকে বিছিয়ে দিতে চায়, বিশ্বাস করে এই মায়া কিংবা মোহ থেকেই একদিন ভালোবাসা তৈরি হবে!
একুশ দিনের সংসারে নয়ন মুগ্ধ তারার সেবা যত্নে,তার প্রতি তারার আনুগত্যে,ওর মায়ের মুখেও সারাদিন বউমার প্রশংসা; তবুও নয়ন ভয় পায়,যদি কোনদিন তারাও ওকে ছেড়ে চলে যায়,আর তাই তো তারার সামনে নিজেকে যথেষ্ট গম্ভীর আর কঠোর হিসেবে উপস্থিত করে!
-- আব্বা আইছো?
-- হ আম্মা! একটু পানি দেও!
-- বউমা আব্বার লাইগা পানি আনো!
তারা শ্বাশুড়ির আদেশ পেতেই তারা দৌড়ে ভেতরে গেল, নয়ন মুগ্ধ হয়ে ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো, বিয়ের এতদিনেও তারার লজ্জা কমেনি, এখনও ওকে দেখলে লম্বা ঘোমটা দিয়ে নিজেকে আড়াল করবে, কথাটা ভাবতেই মুচকি হাসলো!
নয়ন বসেছিলো উঠানের এক পাশে ইট গেঁথে তৈরি করা চেয়ারে,এই জায়গায় বসে বিকেলে হালকা নাস্তা পানি খায় পাশাপাশি গৃহস্থালি কাজকর্ম সাড়ে মেয়েরা,উঠোনে মেলে দেওয়া ধানের পাহারাও দেয়,নয়ন বাড়ি থাকলে এখানেই বসে থাকে বেশি সময়, হিসাব নিকাশও করে এখানে বসেই,,তারা চাপ কল চেপে ঠান্ডা পানি নিয়ে আসলো,ডান হাতে জগ রেখে বাম হাতে থাকা স্টিলের গ্লাসে পানি ঢেলে নয়নের দিকে এগিয়ে দেয়,নয়ন পরপর তিন চুমুকে পানিটুকু শেষ করে আবারও হাত বাড়িয়ে দেয় পানির জন্য ,তারা আবারও পানি ঢেলে দেয়, এবারও দ্রুত পানিটুকু শেষ করে,ডান হাত দিয়ে মুখটা মুছে শান্তির একটি নিঃশ্বাস ছাড়লো, এরপর তারার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-- রান্ধন শ্যাষ?
-- হু!
তারা জমিনের দিকে তাকিয়ে পা দিয়ে মাটি খুঁটতে খুঁটতে উত্তর দিলো,নয়ন এতদিনে টের পেয়েছে তারার এই নরম আচরণ কিংবা শান্তশিষ্ট রুপটা কেবল তার সামনেই থাকে,এমনিতে তারা যথেষ্ট চঞ্চল আর ডানপিঠে স্বভাবের! নয়ন বাদে সবার সাথেই তার কথার ফুলঝুরি ছুটে,হাসির ফোয়ারা ছুটে, কিন্তু আফসোস এতদিনেও নিজের বউয়ের এই প্রাণখোলা হাসি দেখার সৌভাগ্য তার কপালে জুটলো না,তার সামনে সবসময় এমন মাথা নত করেই রাখে, আচ্ছা নয়নের গম্ভীর হয়ে থাকায় কি তারা তাকে ভয় পায়! নাকি অন্য কিছু!তারা কি নয়নের সাথে সহজ হতে পারছে না! শরীরের মিলন তো হয়েই থাকে কিন্তু মনের মিলন! মনের মিলন কখন হবে! নয়নের ভেতরে কিছু অনুভূতি হয় কিন্তু মুখে আওড়াতে আটকায়,তবে তারার? তারার কি নয়নের জন্য কোন অনুভূতি হয়, দুইজনের বয়সের পার্থক্য অনেক,,তারা মাত্র ১৯ বছরের আর সেখানে নয়নের ৩১ বছর ,,এত বছরের গ্যাপের সম্পর্ক,, স্বাভাবিক ভাবেই তারাকে কিছু বলতে নয়নের কেমন একটা লাগে, শরীরের টানে শরীরের কাছাকাছি যাওয়া হলেও মনের মাঝে যে বয়স আর কিছু তেতো অনুভূতির বাস তার কারনেই নয়ন পারে না নিজেকে পুরোপুরি তারার নামে করতে,,তবে তারা কিভাবে?
-- ওদিকে চাইয়া কথা কও ক্যান?
-- জ্বী!
তারার চমকিত প্রশ্ন,নয়ন অদ্ভুত চাহনিতে চেয়ে রয়েছে,নয়নে নয়ন পড়তেই লজ্জ্বাবতী তারা আবারও তা সরিয়ে নিলো,নয়ন একটু উঁচু হয়ে ফিসফিস করে বললো,,
- এত লজ্জা কই থেকে আনো?
-- কি কন এগুলা!
লজ্জা মাখা হাঁসি দিলো তারা,নয়ন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তারার মুখোমুখি হলো, তারা মাশাআল্লাহ বেশ লম্বা,৫'১১ ইঞ্চি লম্বা নয়নের প্রায় কাঁধ সমান; হঠাৎ করেই সামনে এভাবে দাড়িয়ে পড়ায় তারা একটু হক-চকালো,ঘাবড়ালো, নয়নের হাসি বিস্তার পেলো, ঠোঁট প্রসারিত হলো,
-- সবার সামনে তো বেশ সাহসী,তাইলে আমার সামনে এমন ভেজা বিলাই ক্যান?
-- আপনে আ্যামনে তাকাইয়েন না!
-- ক্যামনে তাকাইলাম!
-- এই যে ক্যামন ক্যামন ক্যামন কইরা তাকান!
-- তাতে তোমার কি?
-- আমার লজ্জা লাগে?
কথা শেষ করেই তারা দৌড়ে চলে গেল, নয়ন সেদিকে চেয়ে উচ্চ স্বরে হেঁসে দিলো, আর দূর থেকে মায়াময় চোখে তা অবলোকন করলো মা! অনেক বছর পর ছেলের মুখে এই হাসি দেখলো,এই মেয়েকে পছন্দ করে ভুল করেনি,, মনের মতো সঙ্গী হলে যেকোন কষ্টই ভুলে যাওয়া সম্ভব,হয়তো একটু দেরি হয় কিন্তু তাও তো যায়!
এই যে নয়ন এখন প্রায়ই বাড়ি আসে দুপুরে খেতে,অথচ কত বছর হলো বিয়ের আগে অবধি দুপুরে বাড়িতে আসতো না খেতে, মা কৃতজ্ঞ হলো তারার প্রতি!
নয়নও আস্তে ধীরে হেটে ঘরের দিকে গেল,তারা বিছানায় বসে হাপাচ্ছিলো, এমনিতেই লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আছে,তার মধ্যে দৌড়ে আসায় একটু হাঁপিয়ে গেছে,নয়ন এসে একদম তারার গায়ে গা ঘেঁষে বসলো; তারা সরতে চাইলেও সরতে পারলো না! নয়ন একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো,তারা বুঝলো এখন তার স্বামী তার সঙ্গ চায়,সেও সাড়া দিলো, কেটে গেল আরো একটি প্রহর ভালোবাসায় মাখামাখি করে!
-- আম্মা আর দিও না!
-- ক্যান আব্বা মজা হয় নাই!
-- অইছে আম্মা অনেক মজা অইছে ,এর জন্যই তো এতগুলা ভাত খাইলাম!
-- কই খাইলা? তুমি তো খাওনদাওন একদমই কমাইয়া দিছো; আরো একটু লও!
-- না আম্মা আর দিও না,, এরপর খাইলে আর সাইকেল চালাইয়া দোকানে যাইতে পারুম না!
-- কি কও; তুমি এহন দোকানে যাইবা?
মায়ের প্রশ্নে নয়ন তার দিকে তাকালো, মায়ের কথা বোঝার চেষ্টা করলো, তারা নয়নের দিকে করুন ভাবে চেয়ে আছে,
-- মানে কি আম্মা ?
-- বউমারে আইজকা তোমার হের বাপের বাড়ি দিয়া আহোনের কথা আছিলো !
মায়ের কথায় মনে পড়লো সকালে শ্বশুর বাড়ি থেকে ফোন আসছিলো,তারার ফুফু গ্রামে আসছে,তার মেয়েকে নাকি দেখতে আসবে,তার আয়োজন তারাদের বাসায় করছে , সুতরাং সেখানে তারাকে দরকার! তখন নয়ন বলছিলো দিয়ে আসবে! কিন্তু এখন? এখন তো রাতে তারাকে ছাড়া একা থাকতে কষ্ট হয়, তাহলে কিভাবে দুই তিন দিনের জন্য ছাড়বে,নয়ন চোখ ঘুরিয়ে তারার দিকে তাকালো ,তারা উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে,চোখে মুখে আকুলতা স্পষ্ট,যাওয়ার অনুমতি চাইছে!
নয়ন মুখ নামিয়ে খাওয়া চালিয়ে গেল,নয়নের নির্লিপ্ততা তারাকে আহত করলো, আম্মাও কিছুটা চিন্তিত হলো,নয়ন যেতে দিবে না! এটা কি করলো,বউটা সকাল থেকে কত খুশি ছিলো,, বিয়ের পর বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা উঠলে মেয়েরা যে কি পরিমান খুশি হয় তা তো উনি জানেন,এমন সময় উনারও গেছে !
নয়ন ওর বাবার মতোই হয়েছে, বিয়ের পর বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা বললে নয়নের বাবাও এমন নিরবতা পালন করতো,কত বার যে কেঁদে কেঁদে তাকে রাজী করাতে হয়েছে তার কোন ইয়াত্তা নেই, লোকটা নিজের পরিবারকে এত বেশিই ভালবাসতো যে তার জন্য সমস্ত কষ্টের দায় এসে উনার কাঁধে পড়তো, বৃদ্ধ বাবা মায়ের কষ্ট হবে তাই কখনো উনাকে বাবার বাড়ি যেতে দিতে চাইতো না ,,উনার বাবার বাড়ির লোক কত আশা করে থাকতো কিন্তু!
পুরানো কথা ভাবতেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে!
তারা মুখটা কালো করেই খাওয়া শেষ করলো,হাতে হাতে সবটা গুছিয়ে রাখলো, দুপুরে খাওয়ার পর বেশ কিছুটা সময় পায় বিশ্রাম করার, এরপর আবার সংসারি কাজে লেগে পড়ে কিন্তু এখন মন কোনটার জন্যই সা দিচ্ছে না,সারা সকাল কত খুশি ছিলো, দুপুরে নয়ন আসায় খুশিটা দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল!
-- আব্বা তুমি এইডা কি করলা? বউ মা সারা সকাল কত খুশি আছিলো আর এহন দেহো মুখটা ক্যামন অমাবস্যার মতো আন্ধার হইয়া গ্যাছে! ছোড মানুষ,এতদিন পর বাপের বাড়ি যাইবো,ভাইবইনের লগে মজা মাস্তি করবো,কত আশা কইরা রাখছে, কাপড় চোপড়ও বাইন্ধা ফালাইছে আর এহন তুমি কইতাছো যাইতে দিবানা!
খাওয়ার পর নয়ন বাইরে উঠানে বসে ছিলো,আম্মা নয়নের পেছন পেছন এসে কথাগুলো বললো,
--হ্যায় তো আইলোই মাত্র কয়েকদিন,এর মধ্যেই!
-- নতুন নতুন বিয়ার পর এমন হয়, তাছাড়া এহন তো এমনিতে গ্যাতাছে না! তার ফুফাতো বইনের বিয়া লাগছে,হেয় না যাইলে ক্যামনে অইবো!
-- কিন্তু আম্মা?
-- তোমার বইনের বেলায় এমন করলে ভালা লাগতো?
-- আচ্ছা অরে কও তৈয়ার হইতে! আমি দিয়া আবার আইয়া পড়ুম!
আম্মার মুখে হাসি ফুটলো,উনি জানেন উনার ছেলেকে কাবু করার পদ্ধতি,, তাছাড়া আরো খুশি লাগলো এইটা বুঝতে পেরে যে ছেলে উনার বউকে ছাড়া থাকতে চায় না তাই বউয়ের বাপের বাড়ি যাওয়াতে এত সমস্যা ,, যাই হোক অবশেষে বউয়ের আঁচলে ছেলে বাঁধা পড়ছে এখন কোন শকুনি নজরই তার ছেলেকে বিপদে ফেলতে পারবো না!এতেই উনি খুশি,খুব খুশি!
-- তুমি আইবা ক্যান,দুই একদিন শ্বশুর বাড়িতে বেড়াইবা,জামাই আদর খাইবা তারপর বউ নিয়া একলগে আইবা!
-- কি যে কও? এদিকে দোকানের কি হইবো?
-- আব্বা সবসময় কাম কাম কইরো না, তোমার সখ আহ্লাদ না থাকলেও বউমার আছে! তোমার বয়স বাড়লেও,বউমা কিন্তু ছোড মানুষ! তার কিন্তু দুনিয়ার সব দেহা বাকি! আর তারে দেহানোর দায়িত্ব তোমারই ! এহন যাও নিজের দায়িত্ব পালন করো!
নয়ন বুঝলো আম্মা বয়সের খোঁটা দিয়ে তাকে বাধ্য করলো তারার সাথে যেতে!
পর্ব ০৮
-- ক্যামন আছে আমার মা?
মায়ের বুকে মাথা ঠেকিয়ে নয়নের জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে,এইতো দিন দশেক হলো এ বাড়ি থেকে গিয়েছে, অথচ মনে হলো কত বছর পর মায়ের মুখখানি দেখলো! এরকমই হয়! সব মেয়েদের ক্ষেত্রেই!
কি আজব আমাদের এই ধরনীর নিয়ম তাই না! বিয়ের ক্ষেত্রে, নতুন সম্পর্ক তৈরির সময় সবরকমের ত্যাগ কেবল নারীর ভাগেই কেন? সেই কেন নিজের পিতা মাতার গৃহ ত্যাগ করে? সেই কেন নতুনত্বের মাঝে নিজের চিরচেনা অস্তিত্বকে মুছে ফেলতে বাধ্য হয়?কত শত ইচ্ছাকে বলি দিতে হয় অন্যের ইচ্ছাকে, খুশিকে মেনে নিতে গিয়ে? যেখানে ছেলেরা নিজের বাবা মায়ের দায়িত্ব নেয় বিয়ের পরও,সেখানে কেবল নারীই কেন সেই দায়িত্বের বাইরে থাকে! ছেলে জন্ম দিতে, তাদের মানুষ করতে যতটা কষ্ট ঠিক ততটাইতো একটি মেয়ের ক্ষেত্রেও হয়, আধুনিকতার নামে যে সমাজে আমরা আছি,যে সমান অধিকার নিয়ে রোজ কতশত হট্টগোল, কই কাগজে কলমে কিংবা আন্দোলন হয়ে পত্রিকার পাতায়,খবরের শিরোনামে অবধিই তো তার দৌড়,কার্যত জীবনে আদৌও এর সঠিক ব্যবহার কারো নজরে পড়েছে? এখনও রোজ মেয়েদের বুঝিয়ে দেওয়া হয় তুমি মেয়ে, তোমার গন্ডি এতটুকু, অথচ এই সমাজের মানুষই বলে মেয়েদের সমান অধিকার!! আসলেই সমান অধিকার তবে সেটা শুধু তাদের ভাষায় কাজে নয়!
এই যে নয়নের বাবা নিজের বাবা মায়ের কথা চিন্তা করে নয়নের মা'কে কখনো তার বাবার বাড়ি যেতে দিতে চাইতো না এটা কি সমান অধিকারের প্রশ্নে উঠে না! আমাদের সমাজে অনেক পরিবারই আছে যারা ঈদ উৎসবে বউদের বাবার বাড়ি যেতে দিতে চায় না তাঁরা কি কখনো ভেবেছে এতে শুধু সামাজিক অধিকারই না, ইসলামি শরিয়ত মোতাবেকও অধিকার ক্ষুন্নও হচ্ছে; যদি হাদিস দেখি তবে, ই"সলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ একে অন্যের পরিপূরক। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে রয়েছে, ‘তারা তোমাদের আবরণস্বরূপ আর তোমরা তাদের আবরণ।’ (সূরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। স্ত্রীর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘উত্তম স্ত্রী সৌভাগ্যের পরিচায়ক।’ (মুসলিম শরিফ)। তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে–ই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি)। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণ করো।’ (সূরা-৪ নিসা, আয়াত: ১৯)। কোরআনে আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘নারীদের ওপর যেমন অধিকার রয়েছে পুরুষের, তেমনি রয়েছে পুরুষের ওপর নারীর অধিকার।’ (সূরা-২ বাকারা, আয়াত ২২৮)।
রাসুলের একটি হাদিসে এসেছে, নারীকে সম্মান করার পরিমাপের ওপর ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি নির্ভর করে। তিনটি বিষয় নবী করিম (সা.)-এর জীবনে লক্ষণীয় ছিল—এক. নামাজের প্রতি অনুরাগ; দুই. ফুলের প্রতি ভালোবাসা; তিন. নারীর প্রতি সম্মান। (বুখারি ও মুসলিম)।
আমাদের সমাজ এসব দেখে না দেখে খালি কিভাবে নারীকে দমিয়ে রাখা যায়! কিভাবে তাদের ছোট করা যায়! অত্যাধুনিক সমাজেও কোনঠাসা করে রাখার হাজারটা ফতোয়া জারি করা হয়!
অবশ্যই শুধু নারীরাই বৈষম্যের শিকার হয় না, পুরুষের ক্ষেত্রেও আজকাল এইসব বিষয় অহরহ! আমাদের উচিত একে অপরের অধিকার ক্ষুন্ন না হয় এভাবে নিজেদের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করা, অপরপক্ষে থাকা মানুষের মনের এবং ইচ্ছার গুরুত্ব দেওয়া! তবেই সব রকমের ভেদাভেদ, বৈষম্য কেটে আমাদের সমাজে সুন্দর একটা ধারা অব্যাহত হবে!
নয়ন অবাক হয়ে দেখছে কান্নারত তারাকে, মাত্র দশদিন পর নিজের মাকে দেখলো অথচ মনে হচ্ছে কত যুগ পর দেখলো,নয়নের মনে পড়লো ওর বোনও এরকম করে! যাওয়ার সময়ও মন খারাপ করে,কি যে কাঁদা কাঁদে! মুহূর্তেই নয়নের মনটা খারাপ হলো! ওর নিজের প্রতিই রাগ হলো, নিজের বোনের কান্নায় ওর অন্তর কাঁদে,বোনকে দেখার জন্য ছটফট করে অথচ তারার বেলায় কিভাবে আজ ও না করতে গিয়েছিলো! ওর বোন মনির তুলনায় তারা যথেষ্ট কমবয়সী,বয়স উনিশ হলেও তারার ভেতরে এখনও বাচ্চা বাচ্চা ভাব! নয়ন নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে মনে মনে গালিগালাজ করতে লাগলো!
-- বাবা তুমি ঘরে ঢুকো!
শ্বাশুড়ি মায়ের ডাকে নয়ন নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো, ততক্ষণে তারাও বাড়ীর ভেতরে ঢুকে পড়েছে, শুধু ঢুকছে বললে ভুল হবে সে এতক্ষণে তার ভাই বোনদের সাথে কথার ঝুড়ি খোলা শুরু করে দিয়েছে! তারাও এতদিন পর নিজের প্রিয় বোনকে কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছে!
তারার ফুফু দৌড়ে এসেছে নয়নকে ঘর অবধি নিয়ে যেতে,তারা তার অতি প্রিয় আদরের ভাতিজী,গরীব হলেও তারার জন্য নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করতো,
তারার বাবার পক্ষে একসাথে তিন ছেলে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব নয় তাই মাঝে মাঝেই উনি তারার জন্য এটা ওটা কিনে পাঠিয়ে দিতো,বই ,খাতা,কলম থেকে শুরু করে পরীক্ষার ফি ও প্রায় সময়ই দিতো! তাছাড়া এখন যে তারার ছোট ভাই তাওহীদ মাদ্রাসায় থেকে পড়াশোনা করছে তার অর্ধেক খরচও এই ফুফুগো দেয়! ফুফুর তিন কন্যা! তার মধ্যে দুইজন তারার বড়, তাদের বিয়ে হয়েছে বিগত চার বছরের মাঝামাঝি সময়েই! আল্লাহর রহমতে তাদের ঘর আলো করে পুত্র সন্তান দিয়েছে আল্লাহ! মেয়েদের সুখের সংসার দেখে তারার ফুফুর মন পরমানন্দেই মেতে থাকে! এখন বাকি আছে শেষ মেয়ের বিয়ে দেওয়া, গত বছর প্রস্তাব এসেছিল কিন্তু তখন ছোট বলে বিয়ে দেয়নি তাছাড়া তারার আগে এই মেয়ের বিয়ে দিতে চাননি তাই মেয়ে ছোট বলে পাত্র পক্ষকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো! কিন্তু গত সপ্তাহে আবারও সেই পাত্রের মা প্রস্তাব নিয়ে আসে, যেহেতু মেয়ের আঠারো হয়ে গেছে, তাছাড়া ইদানীং উনার শরীরের অবস্থাও খুব একটা ভালো যাচ্ছে না তাই উনি নিজের দায়িত্বের শেষ কাজটুকু করে ফেলতে চায়! তাই এবার আর না করেননি!
-- জামাই বাবা ক্যামন আছো?
-- জ্বী আলহামদুলিল্লাহ! আপনি?
-- এই তো আল্লাহ য্যামন রাখছে!
-- যাও ঘরে যাও! তারা এদিগে আয়, জামাইয়ের লগে যা,হাত মুখ ধোয়ার পানি আগাইয়া দে!
ফুফুর আদেশ শুনে তারা দৌড়ে এলো, নিজের বাড়ির সবাইকে পেয়ে নয়নের কথা ভুলেই গেছিলো,দৌড় দেওয়ায় তারার মাথার ঘোমটা পড়ে গেছে, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে তারার সেদিকে খেয়ালই রইলো না !
-- চলেন!
নয়ন হাসি হাসি মুখপানে তাকিয়ে নিজেও মুচকি হাসি দিলো,তারা হাসির বিনিময়ে হাসি উপহার দিয়ে নিজেই এগিয়ে গেল! এর মধ্যেই তারার ছোট ভাই তাওহীদ পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি এনে উঠানের একপাশে রেখেছে,ছোট বোন মুন সাবান গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,নয়ন ছোট শালীকে দেখে একটা হাঁসি দিলো,মেয়েটার বয়স মাত্রই পনেরো,অথচ লজ্জা এমনভাবে পায় যেন নতুন বিয়ে হয়েছে! নয়ন এখনও সরাসরি নিজের শালীর মুখ দেখেনি কারন সে মাশাআল্লাহ পর্দা করে! তারার সব বোনেরাই পর্দায় থাকে,তাই সম্পর্ক রসিকতার হলেও নয়নের পক্ষে তা সম্ভব নয়, এমনিতেই বয়সের একটা বিশাল দূরত্ব তার মধ্যে মেয়েগুলো যথেষ্ট পরহেজগার! তারা নিজেদের হেফাজতে যথেষ্ট সক্রিয়!
তারা বোনের হাত থেকে সাবান নিয়ে নয়নের উদ্দেশ্য বললো,
-- বয়েন!
তাওহীদ দুলাভাইয়ের জন্য ছোট একটি টুল নিয়ে এসেছে,নয়ন সেটায় বসে!তারা নিজেও পাশে বসে নয়নের পায়ে হাত দিতেই নয়ন আগলে ধরলো,
-- কি করো?
-- পা ধুইয়া দেই!
-- ক্যান তুমি ক্যান করবা?
-- ওমা আমি করবো না তো কে করবো?
-- ক্যান আমার কি হাত পাও নাই! আমি কি লুলা হইয়া গেছি!
-- না আমি তো!
-- তুমি ঘরে যাও! আম্মা আবার লগে সময় কাটাও, তাছাড়া বইনের বিয়া হইয়া যাইতাছে তার লগে গিয়া গল্প করো, আমার কাজ আমি নিজেই করতে পারুম!
-- কিন্তু?
-- কোন কিন্তু না! যা কইছি তাই করো!
তারা আর কথা বাড়ালো না,খালি ছোট ভাইকে বলে গেল,
-- এইহানেই থাক,তোর দুলাভাইয়ের খেয়াল রাখ!
-- আইচ্ছা!
তাওহীদ ভালো বাচ্চার ন্যায় বোনের আদেশ অনুযায়ী কাজ করলো,নয়ন হাত মুখ ধুয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের কাপড় হালকা ছেড়ে নিলো,ধীর পায়ে হেঁটে ঘরে ঢুকতে গিয়ে কিছু একটা ভেবে থেমে গেল।
তারাদের বাড়িটা খুবই ছোট জায়গা নিয়ে,দুটো ঘর, আলাদা রান্নাঘর, ছোট একটা গোয়ালঘর যাতে একটি মহিষ বাঁধা,আর দুটো বাছুর বাঁধা,, মহিষ টা তারাদের নিজেদের,এটা দিয়েই অন্যের জমিতে বর্গা দেয়, বাছুর দুটো মাস তিনেক আগে কেউ একজন দিয়ে গেছে বর্গা হিসেবে!
বাড়িটা ক্ষেতের কাছাকাছি,তাই ক্ষেতের পাশ ঘেঁষে করা ছোট্ট একটি পুকুর,যাতে নদীর পানির প্রবাহ নিয়মিত হয়,কারন ক্ষেতে সেচ দেওয়ার জন্য আইলের সাথে খাল মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে সরু নালা তৈরি করে,এটা নাকি বছর কয়েক আগে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা এসে করে দিয়েছে! যাই হোক ঐ পানির কারনেই তারাদের পুকুরে সবসময় পরিষ্কার পানি থাকে!
বাড়িটা ছোট কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখা, মোটামুটি সবধরনের ফলের গাছই আছে,ঘরটা টিন-সেটের,দুটো রুম,একটায় তারারা দুইবোন থাকতো আর একটায় ওর বাবা মা আর ছোট ভাই! মেহমান আসলে অনেক কষ্ট হয়! তখন তারার বাবা পিছনের বারান্দায় পাটি পেতে শোয় সাথে ওর ছোট ভাইও!আর মা তারাদের দুই বোনকে নিয়ে ওদের ঘরে ঘুমাতে; মেহমানদের জন্য নির্ধারিত করতো তাদের শোয়ার ঘরটা! এই যে এখন নয়ন এসেছে,জানে এতে উনাদের অনেক কষ্ট হবে! সামান্য বর্গা চাষী,দিন মজুর মানুষ কত টাকাই আর কামায়; তা দিয়ে কিভাবে কি করবে তাতো নয়নের খুব ভালো করেই জানা! সেও তো বর্গা চাষী,দিন মজুরের ছেলে ছিলো,,সে দেখেছে এরকম পরিস্থিতিতে তার বাবার কষ্ট! তাই নয়ন আসতে চায়নি কিন্তু তারাকে একা ছাড়াও তো সম্ভব নয়!
নয়ন ভালো করে আরো একবার দেখলো,ঘরটা বেশ পুরানো,হয়তো বৃষ্টির সময় পানি পড়ে চাল দিয়ে, পলিথিন দিয়ে আটকে রাখা,খেয়াল করলো পাকের ঘরে চাল হিসেবে খড় আর বাস দেওয়া! বৃষ্টির সময় রান্না করতে কি যে সমস্যা হয় তাও সে জানে, না জানার কারণ নেই,এই রকম জীবনযাপন তার ছিলো,ভাগ্যের খেলায় আজ তা ঘুচেছে কিন্তু তবুও অভিজ্ঞতা তো আছে!
মুহূতেই নয়ন একটি সিদ্ধান্ত নিলো, এবং তা সে খুব শীঘ্রই করবে!
--- জামাই কি হইছে বাবা?
চমকে উঠে পিছনে ঘুরলো,তার শ্বাশুড়ি তার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে, মায়াময় হাসি দিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে, ভদ্র মহিলার পড়নে পুরানো একটি সুতি শাড়ী,মনে হয় ধুয়ে মাড় দিয়ে তুলে রেখেছিলো, মেহমান আসবে বলেই তা এখন নামিয়েছে,পান খাওয়ার কারণে ঠোঁটগুলো লাল হয়ে থাকে, কিন্তু দেখতে মাশাআল্লাহ খুব ভালো লাগে,ফর্সা মুখের মাঝে টুকটুকে লাল ঠোঁট, নয়নের হাসি আসলো, এবং অজান্তেই সে হেসে দিলো,ওর হাসি দেখে শ্বাশুড়ি মাও হেসে দিলো, এবং জিজ্ঞেস করলো,
--কি অইছে আব্বা?
-- না আম্মা কিছু না; আপনের মাইয়া কই?
-- ঘরেই আছে যাও!
-- আইচ্ছা!
নয়ন হেঁটে ঘরের ভেতরে চলে গেল!
পর্ব ০৯
নতুন জামাই লুঙ্গি কাছা মেরে নিজের হাতে বাঁশ কেটে তা দিয়ে চ্যালা কাঠ তৈরি করে,কাঠ এনে নিজেই বসার জন্য বেঞ্চ তৈরি করছে! এটা খুব অদ্ভুত লাগছে না? কিন্তু সুন্দরও তো দেখায়! তবে সুন্দরের চেয়ে অদ্ভুতই বেশি দেখায়! নতুন জামাই প্রথমবারের মতো শ্বশুর বাড়িতে এসে এমন একটি কাজ করতেছে এটা শুনেই অনেকেই এসেছে তারাদের বাড়িতে , উনারা যেন বেশ মজা পাচ্ছে এরকম একটা ব্যাপারে; তারা তো লজ্জায় ঘরেই ঢুকে বসে আছে, কতবার নয়নকে বারন করেছে কিন্তু নয়ন শোনেনি; কেন শুনবে সে নিষেধাজ্ঞা! সে কাজ করছে এতে লজ্জার কি আছে?
আমাদের সমাজের এক চিরায়িত চেনা রুপ হচ্ছে নয়া জামাই আসলে তাকে ভোম্বলের মতো সেবাযত্ন করতে হবে! তিনবেলা মুরগি ছাড়া তার গলা দিয়ে ভাতের লোকমাই নামে না,দই মিষ্টি এমনভাবে তার সামনে রাখতে হবে যাতে সে বুঝতে পারে সে কোন ময়রার মেয়েকে বিয়ে করেছে? সামর্থ্য থাকুক আর না থাকুক তাকে রাজা বাদশাহের মতোই আদিখ্যেতা করতে হবে! পিঠাপুলি থেকে শুরু করে সেমাই -পায়েস সবকিছুই তার খাওয়া চাই,না খেলেও তার সামনে উপস্থিত করতে হবে তা না হলে জাত কূল মান সব শেষ! ওদিকে আবার তার দ্বারা সব বিনষ্ট হয়ে গেলেও মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হবে! কি বিরক্তিকর ব্যাপার স্যাপার!!
আর জামাই বাবা! সে তো মঙ্গল গ্রহের সবচেয়ে বিখ্যাত এলিয়েন যার কাজই হচ্ছে এদিকে সেদিকে তাকিয়ে আজব আজব ব্যবহার করা,এমন ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে যে মহান সম্রাট আকবরও তাদেরকে বলে বাপ ভুল হচ্ছে আসল সম্রাট আমি না আসল সম্রাট আপনিই! তারা শ্বশুরের বাড়িতে পায়ের উপর পা তুলে খালি ফরমায়েশ জারি করা আর ঠিক মতো না পেলে নাক ছিটকানোই নিজেদের জন্য ফরজ বিধান হিসেবে মান্য করে!
যাই হোক সমাজে জামাই আদর নামক যেই বেহুদা নিয়ম আছে তার বিধান ছিড়েও কিছু মানুষ বেরিয়ে আসে,তারা কোন সম্পর্কের দোহাই দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বেড়ায় না,তারা সম্পর্কের গুরুত্বও যেমনি বুঝে ঠিক তেমনি বুঝে নিজের দায়িত্বের সীমা!কখন কি করতে হবে তা তাদের বলে দিতে হয় না!
তারার ফুফাতো বোন সন্ধ্যাকে দেখতে আসবে আগামীকাল,মেয়ে পছন্দ হলে তারা তৎক্ষণাৎ কাবিন করিয়ে যেতে পারে! মেয়ে তো পছন্দই ,এখন শুধু কিছু মুরব্বি গোছের সদস্য আছে যাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদেরই এক নজরের সাক্ষাৎ দেওয়া আর কি !
প্রথমে দেখতে আসার কথা হলেও পরের কথায় তারার বাবা চান ইসলাম একটু চিন্তিত হয়,কারণ যতই হোক তারার বিয়ের এখনও এক মাস পার হয়নি, তার মধ্যেই আরেকটা বিয়ের আয়োজন করা উনার মতো মানুষের জন্য বেশ কষ্টের,, আবার বোনকেও কিছু বলতে পারছে না,যেই বোন সবসময় উনার বিপদে আপদে,উনার সন্তানদের সবরকমের বিষয়ে সহযোগিতা করে তার মেয়ের জন্য সামান্য কিছু করতে পারার সময় যখন এসেছে তখন উনি নিজের দারিদ্রতার কারণে সেটাকে এড়িয়ে যেতে পারে না,তাছাড়াও ভাগ্নির বিয়েতে উনারও তো দায়িত্ব আছে ,,চাইলেই সব দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে নেই, কিন্তু কি করবে তা নিয়েও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লো যদিও উনি জানেন উনার বোন অর্থনৈতিক বিষয়ে কোনভাবেই উনার উপর নির্ভর করবে না, কিন্তু উনিও বোনের থেকে হাত পেতে টাকা নিয়ে তারই মেয়ের বিয়েতে খরচ করতে ইচ্ছুক নন,এর মধ্যেই মেয়ের বিয়ের পর প্রথমবারের মতো জামাই উনার নিজের বাড়িতে এসেছে, নতুন জামাই,কত বড় ব্যবসায়ী তাকে কি নিজেদের মতো নুন পান্তা খাওয়ানো যায়,যতই হোক অন্তত ভালো মন্দ মিলিয়ে মুরগি কিংবা মাছের তরকারিতো রাখাই দরকার, অন্তত একবেলা পিঠা, মিষ্টির দরকার! চান মিয়া বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লো,এটা নজর এড়ালো না তারা কিংবা তার মায়ের!
তারার বিয়ের আয়োজন হয়েছিল ওর মামার বাড়িতে, সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থনৈতিক সব ব্যবস্থা চান মিয়া নিজেই করেছে, তার প্রথম সন্তান তারা,বড় আদর আর আহ্লাদের,এই মেয়ের বিয়ে সে নিজের সবটুকু খরচ করে হলেও বড় আয়োজন করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাধ সাধল নয়ন নিজেই,সে কোন রকমের বড় আয়োজন করতে চায় নি,হাতে গোনা কয়েকজন এসেছিল তারাদের বাড়িতে মানে তারার মামা ইলিয়াস শিকদারের বাড়িতে!খুবই সাধারণ একদম ঘরোয়াভাবে বিয়ের কাজ সেরেছিলো নয়ন,যদিও বউ ভাতের আয়োজন ছিলো বিশাল! গ্রামের এমন কোন মানুষ ছিলো না যাকে নয়নের মা দাওয়াত করেননি, সামর্থ্যের সবটুকু দিয়েই উনি ছেলের বউকে পরিচিত করেছিলো , এমনকি তাদেরকেও করেছে যাদের জন্য তার ছেলের মনে বিশাল ক্ষত তৈরি হয়েছে, শুধু দেখাতে চেয়েছিলো তার ছেলের বউ কোন ভাবেই তাদের চেয়ে কম নয়! যদিও তারাদের অর্থনৈতিক অবস্থার বিষয়টি উনি অনেকটা ঢেকেই রেখেছিল, তার সাথে আরো একটি বিষয় ঢেকে রেখেছে তারাকে সবসময়ই নিজের আয়ত্তে রেখে!
এরপর নাইওরি মানে তিনদিনের ফিরতিতেও নয়ন তারা তাদের বাড়িতে না এসে তারার মামার বাড়িতেই গিয়েছিল,,তারার এলাকায় যে ছেলে তারাকে উত্ত্যক্ত করতো তার ভয়েই এত সমস্যা! চান ইসলাম চাননি মেয়ের বিয়েতে ঐ বখাটেরা হামলা করুক, কিংবা কোনরকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হোক যার কারণে মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে যায়,এই সমস্যার কারণেই মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়েছিল,এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিলেন! কিন্তু সবসময় আমরা যা চাই কিংবা ভাবি তাই কি হয়?
নয়ন শ্বশুর বাড়িতে কাল বিকেলে এসেছিল, এরপর সবার সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলা,হালকা খাওয়া দাওয়া এসব করেই কাটিয়েছে, তারাদের ঘরে নয়ন আর তারাকে থাকতে বলা হয়েছিল কিন্তু নয়ন যখন দেখলো এক ঘরে তারা দুজন থাকলে বাকী সদস্যদের অনেক কষ্ট হবে , তাদের সবার জন্য মাত্র একটি ঘর বরাদ্দ তখন বেশ লজ্জিত হলো, এরপর সবাইকে বুঝিয়ে বললো, সব ছেলেরা এক ঘরে এবং সব মেয়েরা এক ঘরে থাকবে,এত করে তারা নিজের মা বোনের সান্নিধ্যে বেশি সময় থাকার সুযোগ পাবে,আর সবারও ঘুমাতে অসুবিধা হবে না! চান ইসলাম মেয়ের জামাইয়ের এমন মানবিক গুনাবলীতে আবেগি হলো,বিস্মিত হলো তাল সাথে লজ্জাও পেল, নিজের দারিদ্রতার দায়ে মেয়ে আর নতুন জামাইয়ের জন্য একটা ঘরও বরাদ্দ রাখাও উনার দ্বারা সম্ভব হলো না! নতুন অবস্থায়ই তার মেয়েকে জামাইয়ের থেকে আলাদা থাকতে হচ্ছে,, কিন্তু পরক্ষণেই নয়নের সন্তানসুলভ আচরণে সেই লজ্জাও কেটে গেল! নয়ন শ্বশুরের মনোভাব বুঝতে পেরে নিজেই উনার দুই হাত ধরে বললো,,
-- আব্বা আপনি লজ্জা নিবেন না দয়া কইরা,আমি সত্যই খুবই খুশি মনে এইহানে আছি! তাছাড়া এরকম বাঁচ্চা শালার লগে রাইত ভইরা গল্প কইরা কাটানোর সুযোগ কয়জন দুলাভাইয়ের আছে,আর ওর তো মাশাআল্লাহ অনেক জ্ঞিয়ান,সারারাইত ওর পাশে শুইয়া ওর থেকে ধর্মের সবক নিবো!
তারা আড়াল থেকে নয়নের এমন কথা শুনে বেশ খুশি হলো, মনের মধ্যে এক অন্যরকম ভালো লাগায় ছেয়ে গেল, অজান্তেই চোখের জল গড়িয়ে পড়লো! আবার তা ডান হাতের তিন আঙ্গুলের সাহায্যে মুছেও ফেললো!
চাঁন ইসলামও গর্বিত অনুভব করলো,এমন ভালো জামাই কয়জন বাপে পায় তার মেয়ের জন্য,উনি নিজের শ্যালক ইলিয়াসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন কারণ, যখন নয়নদের বাড়ি থেকে প্রস্তাব এসেছিল তখন উনি প্রথমেই মানা করেছিল,তার প্রথম কারণ ছিলো নয়নের সাথে তারার বয়সের পার্থক্য,এত বেশি বয়সের ছেলের সাথে উনি নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে চাননি, তাছাড়া নয়নের অর্থনৈতিক অবস্থারও ভয় ছিলো,দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ এত বড় ব্যবসায়ী জামাতাকে কিভাবে আপ্যায়ন করবে,তার জন্য উপহারের জোগার কিভাবে করবে? বড়লোকদের কতশত বায়না! কিন্তু ইলিয়াস যখন বুঝালো এগুলো কিছুই নয়নদের মাঝে নেই কিংবা নয়নরা কোনরকম উপহারের দায়িত্ব তাদের উপর চাপিয়ে দিতে চায় না তখন কিছুটা নরম হলেও, নয়নদের বাড়িতে গিয়ে নয়নের অতীত জেনে আবারও বেঁকে বসে তখনও তাকে বুঝিয়ে রাজী করায় ইলিয়াস শিকদার!যদিও এই সত্য উনি উনার মেয়ের থেকে লুকিয়ে গেছে,কারণ অতীত অতীতই হয় তাকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে বর্তমান, ভবিষ্যৎ নষ্টের মানে নেই!
গরীব ঘরের মেয়ে হয়ে ব্যবসায়ী নয়নের ঘরের রাণী হবে এটাই কম কিসে! উনার মতো দিন মজুরের মেয়ের জন্য এত বড় বাড়ি থেকে প্রস্তাব এসেছে নিঃসন্দেহে এটা উনার চৌদ্দ গুষ্টির ভাগ্য, এটাই বিশ্বাস করেন চাঁন ইসলাম!
অবশেষে নয়নের কথা অনুযায়ী সব মেয়েরা এক ঘরে ঘুমালো, কষ্টে হলেও ঢালা বিছানায় একে অপরের সাথে সেঁটে থাকলো,বেশ রাত অবধি গল্প চললো,ননাস আর নিজে চৌকিতে শুয়ে মেয়েদের জন্য ঢালা বিছানা পেতেছিলো তারার মা জাঈদা খাতুন!
নতুন বিবাহিত বোনের সংসার,স্বামীর ভালোবাসা, শ্বাশুড়ির আচরণ কেমন তা নিয়ে কৌতুহল জমা থাকে সব অবিবাহিত বোনদের মাঝে, এখানেও কম নয়! ২৩ দিনের বিবাহিত জীবনের রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিচ্ছে নিজের বোনদের সাথে! সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে সন্ধ্যা,ভোর হলেই পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে,এটাতে যেমন আতংকিত হয়ে আছে তেমনি রঙিন স্বপ্নে বিভোর হচ্ছে বড় বোনের সদ্য বিবাহিত জীবনের রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো শুনে!
-- আপা দুলাভাই তোমারে ভালোবাসে?
গল্পের মাঝেই সন্ধ্যার প্রশ্ন, মাঝখানে শুয়েছে তারা , তারার দুইপাশে সন্ধ্যা আর মুন,বড় বোনকে দুই দিক থেকেই জড়িয়ে আছে দুইজন মিলে, একটু আলাদা হয়ে নিজের ছোট্ট ছেলে তাইয়্যুমকে নিয়ে শুয়ে শুয়ে ছোট বোনদের বেফাঁস, লজ্জাহীন কথা শুনছে চাঁদনী, সন্ধ্যার মেজো বোন,যেকিনা আজ সন্ধ্যায়ই এসেছে, পাঁচ মাসের শিশু পুত্র আছে,সে শুয়ে শুয়ে মায়ের স্তন পান করছে, চাঁদনীর আরও একটি ছেলে আছে,তামজীদ,বয়স আড়াই বছর,তাকে নিয়ে কাল সকালে আসবে চাঁদনীর স্বামী তাইজুল মোফাজ্জল করিম! সে শহরে একটি মিলের হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করছে,দুই সন্তানকে নিয়ে এতদূর একা আসা সম্ভব নয়, আবার আজকেই সপরিবারে এসে এখানে এভাবে থাকাও সম্ভব নয় তাই শুধু দুধের শিশুকে নিয়েই এসেছে,বড়জনকে নিয়ে তার বাবা আসবে এটাই তাদের স্বামী স্ত্রীর সিদ্ধান্ত ছিলো;
তারা বোনদের কথায় লজ্জা পায়, এমনিতেই এরা ছোট , এদের সাথে এসব বিষয়ে কথা বলতে তার বেশ লজ্জা লাগছে, আবার পাশে বড় বোন শুয়ে আছে, চৌকিতে মা ও ফুফু শুয়ে আছে তার মধ্যে এরা কিসব প্রশ্ন করছে!তাই তারা উত্তর দিলো না,কথা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-- হ রে সন্ধ্যা তুই কালকে কি পড়বি? শাড়ী নাকি সালোয়ার কামিজ?
-- তুমি কি পড়ছিলা আপা?
-- শাড়ী!
-- কিন্তু তুমি শাড়ী কই পাইছো? তুমারে তো আম্মা শাড়ী কিইনা দেয় নাই!
বোনের শাড়ী
-- মামানির শাড়ী ছিলো ঐডা! হেয় নাকি হ্যার বিয়ার সময় ঐ শাড়ীটা হ্যার চাচী আম্মার থেইকা পাইছিলো!
-- কি কও তাইলে তো ঐডা ম্যালা পুরানা শাড়ী!
-- হ কিন্তু দ্যাখলে তা বুঝনই যায় না! ক্যামন যে সুন্দর তা কইয়া বোঝান যাইবো না! মামানিরে তো কইছি ঐ শাড়ীটা আমারেই য্যান দেয়!
-- মামানি কি কইলো তুমারে?
-- দিবো কইছে তয় আমারে না আমার মাইয়ারে দিবো।
-- কি কও আপা,তুমার মাইয়া? কবে অইবো?ঐ কি তুমার প্যাডে এহন?
ছোট বোনের এমন বেক্কলের মতো কথায় তারা একটু বিব্রত হলো, সন্ধ্যা পা দিয়ে মুনের পায়ে একটা লাথি মারলো,
-- চুপ কর বলদি মাইয়া; আপার তো বিয়াই অইলো মাত্র কয়দিন এইর মইধ্যেই কি বাচ্চা অয়?
সন্ধ্যার ঝাঝালিতে মুন একটু মন খারাপ করলো, বুঝাইয়া বললেও তো হতো এভাবে বকার কি আছে!
পর্ব ১০
গল্পেই কেটে যায় অর্ধ রাত, এরপর ঘুম পরীরা সবার চোখে এসে স্বপ্নের রাজ্যে নিয়ে যায়,কেউ নতুন জীবন সাজানোর স্বপ্ন তো কেউ নতুন জীবনে যাওয়ার স্বপ্ন! কারটা সত্য রুপ নেয় আর কারটা কেবল স্বপ্নেই আবদ্ধ থাকে তা কেবল মহান আল্লাহই জানে! আমরা মানুষ তো শুধু স্বপ্ন দেখাতেই সীমাবদ্ধ!
সকাল বেলা খবর আসলো ছেলেপক্ষরা কাল দুপুরের দিকে আসবে,যদিও আসার কথা ছিল আজ বিকেলে কিন্তু ছেলের বড় বোন আর বোন জামাই এখনও এসে পৌঁছায়নি তাই তারা এসে পৌঁছানোর পরই আসবে ইনশাআল্লাহ!
নয়ন একটু চিন্তিত হলো কারণ ব্যবসা বানিজ্য ছেড়ে এসেছে আজ পুরো একদিন হলো,অন্যের হাতে এত বড় দোকান ছেড়ে এসেছে আল্লাহ জানে কি অবস্থা, ভেবেছিল আজ দেখা হয়ে পাকা কথা হলেই ও চলে যাবে, তারা যদি থাকতে চায় তবে ওকে রেখেই যাবে, পরে অন্যদিন এসে না হয় নিয়ে যাবে কিন্তু এখন তো!চিন্তায় মন কেমন খ্যাচখ্যাচে হয়ে গেল! কিন্তু পরক্ষণেই ভালো হয়ে গেল হাস্যজ্জ্বল তারার মায়াবী মুখটা দেখে,কাল বিকেলে এসে এই বাড়িতে পৌছিয়েছে,তখন থেকেই মুখে চোখে খুশি উপচে পড়ছে ,নয়নের মন বললো কয়েকটি টাকার বান্ডেল এর কাছে কিছুই না,এই হাসি মুখের হাসিটুকু বজায় রাখতে সবটাই উৎসর্গ করা যায়!
সকালের নাস্তা হিসেবে শ্বশুর বাড়িতে প্রথম খাবার গ্রহন করলো হাসের গোস্ত দিয়ে আতপ চালের আটার রুটি, চিতই পিঠা সাথে কয়েক পদের ভর্তা! তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে বাইরে বেরিয়ে এলো, সবাইকে খেতে দেওয়া হয়েছিল পিছনের বারান্দায়।
দক্ষিণমুখী বারান্দা হওয়ায় বাতাসের প্রবাহে শরীর মন দুটোই জুড়োয়,তার সাথে হালকা মৃদু মিষ্টি ভোরের রোদ,খুব একটা সময় হয়নি কিন্তু গৃহস্থ বাড়ির জন্য এটাই অনেক বেলা; নয়ন খাওয়া শেষ করে তার জন্য এনে রাখা নতুন গামছায় হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো উঠানের দিকে, সঙ্গে কাপড় এনেছে তবুও শ্বশুরের দেওয়া নতুন লুঙ্গি তার পড়নে,ধূসর রঙের চেক শার্ট সাথে ভেতরে সাদা সেন্টু গেঞ্জি! হাত মুছে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে পুরো বাড়িটা আরো একবার পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো তখনই মনে পড়লো আরেকটি বিষয়!
দ্রুত কিশোর শ্যালক তাওহীদ কে সঙ্গে নিয়ে কাজে নেমে পড়লো, যেহেতু মেহমান কাল আসবে সুতরাং অনেক সময় আছে!
তারাদের বাড়ির পেছনে বেশ বড় একটা বাঁশ ঝাড়,
সেখান থেকে বেশ কয়েকটি বাশ কেটে আনলো,চান ইসলাম নতুন জামাইয়ের এমন কাজে হতভম্ব হয়ে গেল,নয়ন নিজের উদ্দেশ্য জানালে উনি আপত্তি করে বললো,
-- না বাবা তুমি এই কাম কইরো না! মাইনসে হাসবো!
-- হাসবো ক্যান,আমি জামাই তো কি অইছে? আমি কি আপনার পোলা না!
-- হ জামাই অইলেও তুমি আর পোলা অইলেও এহন তুমি আমগো কাছে! কিন্তু তাই বইলা পয়লা অবস্থায়ই তুমি ঘরামির কাম করবা হেইডা ক্যামন দ্যাহায় কও দেহি!
-- য্যামনই দেহাউক হেইডা নিয়া ভাবলে আমগো কাম অইবো? এত মানুষের বওনের জায়গা দেওন লাগবো না?
চাঁন ইসলাম লজ্জা পেল জামাইয়ের এহেন কথায়,আসার পর থেকেই দেখছে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে থাকতে,তার মানে এইসবই খেয়াল করছে, ভাবতেই লজ্জা পেল, নতুন জামাই আসছে তার জন্য না ভালো কোন খাবারের ব্যবস্থা করতে পারছে আর না তার থাকার জন্য ভালো ব্যবস্থা করতে পারছে,কালকেই মেয়েকে জামাই ছাড়া থাকতে হয়েছে,সেই ব্যাপারে এখনও নিজের প্রতি ধিক্কার দিচ্ছে!
চাঁন ইসলাম কথা বাড়ালো না,সেও হাত লাগালো তার সাথে, নয়ন বললো,
-- আব্বা এই গিরামে ঘরামীর কাম করে কেডা?
-- আছে তো পূর্ব পাড়ার নুরুইল্লা!
-- আপনে এক কাজ করেন,হ্যারে গিয়া ডাইকা লইয়া আহেন, ততক্ষণে আমি আর তাওহীদ মিয়া বাঁশের চ্যালা বানাইয়া হালাই ;
-- হ্যারে দিয়া কি অইবো বাবা?
-- হ্যারে ছাড়া তো পুরাডা আমগো দ্বারা সম্ভব না আব্বা!
-- ওহ আইচ্ছা,তাইলে আমি গিয়া হ্যারে ডাইকা লইয়া আই!
-- আপনের যাওয়া লাগবো ক্যা,তাওহীদরেই কন! ঐ পোলাপাইন আর কি কাম করতে পারবো ,আপনে জামাইয়ের লগে থাহেন,হ্যারে সাহাইয্য করেন!
-- হ হ এইডাও ভালা কথা কইছো!
তাওহীদ আব্বা যাও গিয়া নুরুইল্লারে গিয়া কও তাড়াতাড়ি আমগো বাড়িতে আইতে! ম্যালা জরুরী!
তাওহীদ বাপের নির্দেশ শুনে দৌড়ে চলে গেল, নয়ন আর তার শ্বশুর বসে পড়লো নিজেদের কাজ এগিয়ে রাখতে, ওদিকে মেয়েরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো, মেহমান কালকে আসলেও আজকেই সব তৈরি করে রাখার ব্যবস্থা করতে চাইলো যাতে কাল সমস্যা না হয়,যদিও অনেক কাজ এগিয়ে রাখা তবুও!
তারার মা ব্যস্ত হলেন রোজকার গৃহস্থ কাজে,মহিষ আর বাছুর গুলোকে দূরে কোন ক্ষেতে বেঁধে আসলো,ফুফু পিঠা বানানোর জন্য নারকেল কোড়াচ্ছে, চাঁদনী আপা তার ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে বসে গুড় গুড়ো করছে,তারা আর মুন মিলে ঘরের সবটা আবারও গুছাচ্ছে, সন্ধ্যার মাথায় নারকেল তেল,মুখে চন্দন আর দুধের সর মিলিয়ে প্যাক বানিয়ে তার সাথে নীম পাতার রস মিশিয়ে মুখে মেখে বসিয়ে রাখছে,,এতে সন্ধ্যা যথেষ্ট বিরক্ত হচ্ছে , কিন্তু কিছু করার নেই,বড় বোনদের শাসনের ভালোবাসা মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া আর কোন গতি নেই, সন্ধ্যার বিরক্তিকর মুখভঙ্গি দেখে তারা আর মুন হেসেই কুটিকুটি,, চাঁদনী ছোট বোনদের দুষ্টুমিতে মিটমিটিয়ে হাসছে,,
-- পরের বিয়া লইয়া এত নাচন কোদন দেও,এহন নিজের বিয়ার সময় বিরক্ত হও ক্যান সন্ধ্যামালতী?বইনেরা তুমার রুপের ঝলকানি বাড়ানোর লেইগাই তো এত ম্যাহনত করতাছে আর তুমি তোমার চ্যাহারারে আ্যামন শাকচুন্নীর শ্বাশুড়ির মতোন বানাইয়া রাখছো ক্যান?
কথা বলা নিষিদ্ধ তাই কথা বলতে পারলো না আবার বড় আপার খোঁচা মারা কথায় চুপও থাকা যায় না,তাই উসখুস করতে লাগলো,মুন বড় বোনদের দুষ্টুমি ঝগড়ায় তেল হিসেবে নিজের কথা লাগালো,,
-- মনে অয় দুলাভাই পছন্দ অয় নাই! আইচ্ছা সন্ধ্যা আপা কওতো তুমার কি কোন প্রেমিক আছে!যাইর লইগ্গা তোমার অন্তর ঝইলা যাইতাছে,য্যার কারনে তুমার চ্যাহারার এই দশা!
মুন কথা বলে শেষ করেই খিলখিলিয়ে হাসলো কিন্তু বাকী দুই বোন চোখ ছোট ছোট করে সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে আছে,ফুফু বারান্দায় বসে নিজের মেয়েদের দুষ্টুমি উপভোগ করছে তার সাথে কান্নাও আসছে,নিরবে চোখের পানি ফেলছে,দুই মেয়ে বিয়ে দিলেও এত কষ্ট হয়নি কারণ ছিলো এই সন্ধ্যা! নিজের আশেপাশে সন্ধ্যার উপস্থিতি দুই মেয়ের কমতি অনুভব করায়নি,ঘর খালি মনে হয়নি! তাই তো কিন্তু এখন যখন সন্ধ্যাও চলে যাচ্ছে তখন কিভাবে!
-- ঐ চুপ থাক! এতদুরানি মাইয়া তুই প্রেমিকের কি বুঝোস?
আর সম্ভব হলো না বেচারী সন্ধ্যার পক্ষে বসে থাকা,
ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল পুকুর পাড়ে, যাওয়ার সময় বলে গেল উক্ত কথাটি, সেই কোন সময় থেকে ওকে এভাবে বসিয়ে রাখছে আর নিজেরা ওকে নিয়ে যতসব আজাইরা কথা বলছে, এমনিতেই বসে থাকতে থাকতে পা ধরে গেছে তার মধ্যে আবার উল্টোপাল্টা কথা! আর সম্ভব নয় তাই গিয়ে একদম গোসল সেরে নিলো! তারা বলেছিল মুখে রূপচর্চার উপকার লাগানোর পর কোন কথা বলা যাবে না,পায়ে হাতে লাগানোর জন্য নড়াচড়াও করতে পারছিলো না তাই এত বিরক্ত হয়ে গেছে! তাছাড়া সবার দুষ্ট মিষ্টি কথায় লজ্জাও জেঁকে বসেছে! তার মধ্যে পাকা মুনের সবসময় পাকা কথা!
তাওহীদ খবর নিয়ে এলো ঘরামী নুরুল বাড়ি নেই,সে নাকি দূরে কোথাও কাজে গেছে,নয়ন একটু বিপাকে পড়লো বই পরক্ষণেই সমাধান করে ফেললো,
-- আইচ্ছা ঠিক আছে,আমারে আতুর,প্যারেক আর শাপল আইনা দেন!
ঘরেই ছিলো, গ্রামগঞ্জের ঘরে এগুলো সবসময় পাওয়া যায়, কিন্তু এরপরও বেশ কিছু দরকার ছিলো, নয়ন লিস্ট করে তাওহীদকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো! স্থানীয় বড় বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনলো তার সাথে সেরে নিলো শ্বশুর বাড়িতে প্রথম বাজারের নিয়মের দায়িত্ব!
ভ্যান ভর্তি বাজার দেখে আশেপাশের সব মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে গেল,যারা হাটবারের দিন কোনরকম সবজি নিয়ে ,হালকা মাছ নিয়ে আসে সেই বাড়িতে ভ্যান ভর্তি বাজার! চাঁন ইসলাম ও তারার মায়ের চোখ ছলছল করে উঠলো, জামাই না এতো ছেলে পেয়েছে,যতই মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখুক উনারাই কেবল জানে আজ এই বিয়ের আয়োজনে করতে উনাদের কত কাঠখড় পোড়াতে হতো, অথচ মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে পাওয়া সম্পর্কে জামাই রুপী ছেলেটা কত সহজেই সমাধান করে দিলো,
-- আম্মা দ্যাহেন তো বাজার ঠিকঠাক আছেনি? এইহানে পিরায় ৩০ জনের রান্ধন অইবো! মনে অয় কম অইবো না!
হ্যা নয়ন বাজারে গিয়ে একেবারে বিয়ের বাজার করে এনেছে, কারণ বিয়ের পর তারার কাছেই শুনেছে তারাদের জন্য তারার এই ফুফুর সহমর্মিতা আর ভালোবাসার কথা, এরপর এখানে এসে দেখেছে এহেন মুহূর্তেও তারার বাবা মায়ের মুখে কৃতজ্ঞতার প্রকাশ,তার চেয়েও বেশি চোখে পড়েছে তাদের করুন মুখ বোনের মেয়ের জন্য কিছু করতে না পারায়, নয়ন শ্বাশুড়ির হাতে বাজারের সব বুঝিয়ে দিলো,উনারা যা আগে ব্যবস্থা করেছে তাতো আছেই এগুলো অতিরিক্ত এনে রাখলো যাতে প্রয়োজন হলে লাগানো যায়!
নয়ন জানে তার শ্বশুর শাশুড়ি খুব একটা আয়োজন করতে পারেনি,যা পেরেছে তা দিয়ে হয়তো মেহমানদারি করা যাবে কিন্তু সত্যি বলতে ভালো পরিবারে মেয়ে দিতে গেলে তাদের আতিথেয়তায় ভালো বন্দোবস্ত করতে হয়,তা না হলে সারাজীবন খোটা'র তলে থাকতে হয়! নয়ন নিজের শ্বশুর শাশুড়ির,বউয়ের কৃতজ্ঞতা কিছুটা কমানোর জন্যই বাজার করে এনেছে তার সাথে এনেছে রাজমিস্ত্রীর কাজের সব জিনিস,কাঠ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র!!
-- তাওহীদ মিয়া যাইয়া বইনেরে কও দুলাভাই পানি খাইবো!
-- আইচ্ছা!
তারা সবটাই দেখছিলো দূরে দাঁড়িয়ে থেকে, ছলছল নয়নে দৌড়ে পাকের ঘরে গেল,লেবু চিপড়িয়ে লবন দিয়ে শরবত করে আনলো,ঘামে ভেজা ধূসর শার্ট কালো হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা খুব করে চোখে পড়েছে!! বাবা মায়ের সামনে জামাইয়ের সাথে কথা বলতে এখনও লজ্জা পায়,তাই ছোট ভাইকেই বললো,,
-- তাওহীদ দুলাভাইয়ের লইগ্গা শরবত লইয়া যাও!
-- আপা দেও!
নয়ন মুখে গ্লাস ধরতেই হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোনে,কাল থেকে এখন অবধি কাছাকাছি পাওয়া হয়নি একবারও কিন্তু দূর থেকে খেয়াল ঠিকই রাখছে!তিন চুমুকে পুরো শরবত শেষ করলো,
-- আলহামদুলিল্লাহ!
শুকরিয়া আদায় করে তাওহীদকে বললো,
-- চলো ছোট মিয়া শালা দুলাভাই কামে লাইগা যাই;
-- আইচ্ছা
তাওহীদ তো বেজায় খুশি, দুলাভাই তার একদম মনের মতো, বাজারে নিয়া কত কিছু কিনলো,বড় হোটেলে বসিয়ে মুরগী পোড়া আর রুটি খাইয়েছে, সেভেন আপ কিনে দিছে , ফুটবল আর ক্রিকেট খেলার বল ব্যাটও কিনে দিয়েছে! এমন দুলাভাই কয়জনে পায়!
এখন দুলাভাইয়ের সব কথা মান্য করা তার জন্য একান্ত জরুরী!
এরপর লুঙ্গি কাছা মেরে শালা দুলাভাই মিলে নেমে পড়ে উঠানের এক পাশে বসার জন্য জায়গা তৈরি করতে, চাঁন ইসলাম সাহায্য করতে চায় কিন্তু নয়ন তাকে সরিয়ে দেয়! একাই সবটা করার সমস্ত চেষ্টা করছে! তাওহীদ শুধু এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করছে!
পর্ব ১১
আসার কথা ছিলো ১৫ জন, সেখানে এসেছে ২১ জন! চাঁন ইসলাম একটু বিরক্ত হলেন,তবে কিছু করার নেই,এটা আমাদের বাংলার বিবাহের অনুষ্ঠানের চিরায়িত একটা সমস্যা ,, সবসময় একটা তালিকা ধরিয়ে দেয় এরপর তার চেয়েও বহু বেশি সংখ্যক উপস্থিত হয়,যাতে একটা যাতা অবস্থায় পড়ে গৃহস্থ পক্ষ! কিন্তু তবুও মুখ বুজে সহ্য করাই হয় একমাত্র উপায় এই পরিস্থিতি থেকে বের হবার!
তবে চান ইসলাম বিরক্ত হলেও অপমানজনক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেলেন নয়নের করে আনা বাজারের কারণে!
নয়ন বলেছিল ৩০ জনের বাজার কিন্তু নিঃসন্দেহে ঐ বাজার দিয়ে ৪৫-৫০ জনের আয়োজন করা যাবে!
চাঁদনীর স্বামী তোফাজ্জল এসেছে খুব ভোরে, ভদ্রলোক নামাজ পড়েই বেরিয়ে পড়েছে এখানে আসার উদ্দেশ্যে! সন্ধ্যার বড় বোন রাত্রীও এসেছে সকাল নাগাদ,তার স্বামী জুনায়েদ মোল্লা, এবং তার তিন বছরের ছেলে সন্তান জিহাদ সহ শ্বাশুড়ি এবং এক ছোট ননদ সহ মোট পাঁচজন এসেছে!
তারার এক চাচা আক্কাস আলী উনি থাকেন তারাদের থেকে কয়েকটি বাড়ি দূরে, তারা মেহমান আসার কিছু সময় পূর্বে এসেছেন তাদের সন্তানেরাও একই সাথেই এসেছে!
আত্নীয় স্বজন দিয়ে তারাদের ছোট ভিটা বাড়িটা ভরপুর, শুধু সন্ধ্যার জন্যই না, নতুন জামাই নয়নকে একবার দেখার জন্যও এসেছে; একদিকে নতুন সম্পর্ক গড়ার আয়োজন, অপরদিকে সদ্য হওয়া সম্পর্কের সমাদার! সব কিছু মিলিয়ে উৎসব উৎসব রব চারদিকে! কিন্তু সেদিকে কোন বিশেষ ভাবাবেগ নেই নয়নের,সে নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত!
চাঁদনীর স্বামী তোফাজ্জল এর সাথে বেশ ভালো খাতির হয়েছে কিন্তু রাত্রীর স্বামীর মাঝে অন্যরকম গাম্ভীর্যতা লক্ষনীয়!সে যেন খুবই ভাবের মাঝে বিস্তার করে! সুট ব্লেজারে নিজেকে সবার চেয়ে আলাদা প্রমানে এতই ব্যস্ত যে পায়ের উপর পা তুলে চেয়ারে নিজের মোটা ডেস্কির মতো পেট ছেড়ে বসেছে! নিজের ছেলেকে দুই হাতে আগলে রেখে মাঝেমধ্যে শুধু সবাইকে ফরমায়েশ দিচ্ছে!
তারার ফুফু নিজের এই জামাতার প্রতি বরই নাখোশ কিন্তু কিছু করার নেই, মেয়ের জামাইয়ের এহেন কর্মকান্ডে উনি অভ্যস্ত, তাছাড়া যার বিবেক নেই তার সাথে অযথা কথা বলার মানে নেই!
এই মহাশয় শহরের নামীদামী এক কোম্পানির
মার্কেটিং অফিসার হিসেবে আছে, যথেষ্ট ভালো সম্মানী পায়,তাতে তার ভাবও বেশ চওড়া, শহরে নিজের ফ্লাট,ব্যাংকেও বড় সংখ্যার অংক জমা থাকে প্রতি মাসে! গ্রামের বাড়িতেও ভালো অবস্থা, তাতেই যেন নিজেকে বড়সড় কিছু একটা ভেবে থাকেন! শ্বশুর বাড়িতে এলে হাত দিয়ে পানিও ঢেলে খেতে ইচ্ছুক নন; অথচ তোফাজ্জল যখনই আসে একদম ঘরের ছেলের ন্যায় সবটা করেন! আর এখন জুড়েছে নয়ন! এই যে নতুন জামাই হিসেবে ওকে ঘিরে এত শত আয়োজন সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই সে ব্যস্ত তার নিজ কাজে!
ছেলের নাম নাজমুস তালিব,সে স্থানীয় পল্লি বিদ্যুৎ এ কেরানী হিসেবে আছে,সরকারী চাকরি! তা কোন অবস্থায় আছে সেটা দেখার দরকার নেই, আমাদের দেশে সরকারি চাকরি করা ছেলে মানেই সোনার ডিম পাড়া হাঁস! সেখানে ছেলের আর কিছু দেখার দরকার নেই,মাস শেষে তার একাউন্টে সরকারী অর্থ,রেশন,ফ্রি অথবা অর্ধ ফ্রি বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং জীবনের শেষ প্রান্তে পেনশন,এগুলো পেলেই চলবে!
আমাদের সমাজের অধিকাংশ মেয়েদের জীবন ধ্বংস হয় এই এক চিন্তার দরুন,বাবা মা অনেক সময়ই ছেলেদের অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ কিছুই দেখে না, শুধু দেখে সরকারী চাকরির লোগো! বয়সের একটা বিশাল তফাৎ রেখেই বহু কিশোরী মেয়েদের জীবন জুড়ে দেওয়া হয় ত্রিশ উর্ধ্ব পুরুষের সাথে,আর এই ক্ষেত্রে বেশি এগিয়ে গ্রামের অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত বাবা মায়েরা,এতে করে যেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে পরকীয়া তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে পারিবারিক কলহের!
প্রতিটি সম্পর্কের প্রধান সুতা হয় বিশ্বাস আর সেই বিশ্বাসের একটা অংশ জুড়ে থাকে শারীরিক অবস্থা,
যখন বয়সের ব্যবধানে হওয়া মানসিক দূরত্ব কিংবা শারীরিক অবস্থার অমিল থাকে তখন এমনিতেই দুটি মানুষের মাঝে বিভেদ তৈরি হয়! মানসিক ভাবে তৈরি এই দূরত্ব, বিভেদই এক সময় যেকোন একজনকে অপরাধ,ঘৃনিত কাজ করতে প্রভাবিত করে! আমাদের সমাজে ঘটমান এ ধরনের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের গোড়ার ইতিহাস দেখবেন এই একটা কারণই দায়ী,অথচ আমরা বলি মনটাই সব, শরীরের কি আসে যায়! কিন্তু সত্য এটাই শরীর থেকেই মনের টান তৈরি, বিশেষ করে পারিবারিকভাবে হওয়া প্রতিটা বিয়েই শরীরের টানে মনের বাঁধনে বাঁধে; যদিও এটা খুব কম ক্ষেত্রেই ঘটে,কারণ আমি হলফ করে বলতে পারি এ শহরের অলিগলিতে বহু মানুষ আছে যারা কেবল দায়বদ্ধতার সংসার করছে! গ্রাম বাংলার মেয়েরা এই ঘটনার শিকার বেশি হয়, বিয়ের সময় তো তাদের মতামতেরও গুরুত্ব দেওয়া হয়নাই! এক্ষেত্রে একটি মেয়ে নিজের স্বপ্নে সাজানো সংসার আর বাস্তবের সংসারের পার্থক্য খুঁজতে গিয়ে বিপাকে পড়ে, নিজেকে আলাদা জগতের মাঝে মিলাতে গিয়ে আরো অজানায় ঢুকে যায়,কখন কিভাবে কেমন করে সমঝোতার সংসার শুরু করে তা নিজেই বুঝে না!
বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে অবশ্যই একজনের অপরজনের অতীত বর্তমান সম্পর্কে ভালো খোঁজ খবর নেওয়া উচিৎ, এবং অবশ্যই নিজেদের মাঝে কোন গোপনীয়তা বজায় না রেখে স্পষ্ট পরিষ্কার করে সবটা জানানো উচিত; এতে যেমন বিয়ের পর অশান্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তেমনি একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সচল থাকে!
নাজমুস তালিব বাবা মায়ের চতুর্থ সন্তান, পাঁচ ভাইবোনের সংসারে সে দ্বিতীয় পুত্র সন্তান! বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে, তাদের ঘরেও বিবাহ যোগ্য সন্তান রয়েছে,বড় এক ভাই বিয়ে করে বউ নিয়ে শহরে থাকে,তারা গ্রামে আসে বছরে দুই ঈদে কিংবা পারিবারিক কোন আয়োজনে, শহরের একটি বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের গনিতের সহকারী শিক্ষক হিসেবে আছেন,তার স্ত্রীও একই স্কুলের বাংলার শিক্ষিকা ; বড় বোনদের স্বামীরাও ভালো ভালো অবস্থানে আছেন,ছোট এক বোনের আঁকদ হয়ে আছে , এখনও শ্বশুর বাড়িতে নেওয়া হয়নি,তার মায়ের আবদার মেয়েকে অন্যের ঘরে একেবারে পাঠানোর আগে ঘরে আরেক মেয়ে আনতে হবে।মানে ছেলের বিয়ে দিতে চান!
এর মধ্যেই ছেলের চাকরি হয় পল্লী বিদ্যুৎ এ,উনি আরো বেশি জোড় দিতে থাকে বিয়ের জন্য,তার কারনেই বছর তিনেক ধরেই পাত্রী দেখছেন কিন্তু ছেলের মনে ধরে নাই, কিন্তু ভাগ্যক্রমে হঠাৎ এই গ্রামে বৈদ্যুতিক কোন কাজে আসে তালিব, তখনই চোখে পড়ে সন্ধ্যা নামক শান্ত চুপচাপ কিশোরীকে! সন্ধ্যা গ্রীষ্মের ছুটিতে মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলো,তখন তারার কলেজ ঘুরতে যাওয়ার বায়না ধরে আর তখনই চোখে পড়ে শ্যাম সুন্দর তালিবকে যেকিনা দূর থেকে অবলোকন করছিলো বোরকা পরিহিতা সন্ধ্যাকে; কে জানতো সেই অবলোকনই ছিলো তাল ভবিতব্যকে সামনে আনার প্রক্রিয়া!
-- মাইয়া কই ? মাইয়ারে লইয়া আহেন!
মুরব্বি গোছের একজনের কথায় তারার চাঁচা ইশারায় উনার স্ত্রীকে বললেন সন্ধ্যাকে নিয়ে আসতে, সুতি শাড়ী পড়ুয়া,মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে হাতে শরবতের গ্লাস রাখা চ্যাপ্টা বড় গোলাকার থালা নিয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে এলো সন্ধ্যা, সন্ধ্যাকে নিয়ে এসেছে চাঁদনী আর তারা, গৃহস্থ বাড়ির পক্ষ হতে মুরব্বি পুরুষদের সাথেই বসেছে রাত্রীর বর জুনায়েদ মোল্লা, চাঁদনীর বর তোফাজ্জল, নয়নকে বসার জন্য বলা হলেও নয়ন বাইরে কাজেল কথা বলে বাইরেই রয়ে গেছে!তারা তার পরিবারের প্রতি নয়নের এমন আত্নীক ব্যবহারে বারবার মুগ্ধ হচ্ছে, চাঁন ইসলাম আর তার স্ত্রীরও বুকের ছাতি চওড়া হয়ে ফুলে গেছে গর্বে! নয়ন যদি সবটা নিজের হাতে না সামলাতো তাহলে নিশ্চয়ই এখন এই আলোচনায় উনি সামিল হতে পারতো না,কারণ উনি জানেন উনাকে সাহায্য করার মন মানসিকতা অন্য কোন সদস্যের নাই,থাকলে নিশ্চয়ই অনুষ্ঠানের কিছু সময় পূর্বে এসে পৌঁছাতো না,তারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে , তারার এই ফুফু কেবল উনাকেই কেন আর্থিক ভাবে সাহায্য করেন এই নিয়ে উনাদের ভাই বোনদের মাঝে বিশাল রেষারেষি চলে,যদিও সবাই তারাদের চেয়ে কিছুটা ভালো অবস্থায় আছে তবুও! আসলে হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করে কখনো ভালো মানুষ হওয়া যায় না,আর যারা এগুলো নিজের মাঝে লালায়িত করে তারা কখনো কারো মঙ্গল চাইতে পারে না ; তারার বড় চাচারাও তেমনি মানুষের তালিকায়,এই কারণে তারার ফুফু উনাদের আজকে নিমন্ত্রণ করতে চাননি, কিন্তু চাঁন ইসলামের এক কথা বিয়ের মতো পবিত্র আয়োজনে পরিবারের সবার উপস্থিত থাকা একান্ত জরুরী,সেখানে আক্কাস আলী তো উনাদের বড় ভাই, বাবা মায়ের পর উনিই উনাদের একমাত্র অভিভাবক সুতরাং উনাকে ছেড়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়! ফুফুও আর কথা বাড়াননি, কিন্তু উনি জানেন উনার এই ডড় ভাই কখনোই উনাদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চান না!
-- এ মাইয়াউগ্গা ক্যাডা?
সভার মাঝ থেকে একজন মুরব্বির প্রশ্ন, চাঁন ইসলাম সচকিত হয়ে আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-- কোন মাইয়া?
-- ঐ যে কমলা সালুয়ার কামিজ পড়ছে! ধলা মাইয়াউগ্গা!
-- অহ ঐডা তো আমার বড় মাইয়া!
-- বিয়া দেবেন নাহ?
-- আল্লাহ মাইয়ার তো বিয়া অইয়া গেছে!
-- হাছা?
-- হ ঐ যে উঠানে আপনেগো পাও ধোয়ার পানি দিলো হেইডাই তো আমার জামাই!
-- মাইয়ারে দ্যাখলে মনে অয়না হ্যার বিয়া অইছে!
-- এই তো মাইত্র পঁচিশ দিন অইছে বিয়ার; তাই আ্যামন লাগে!
-- ওহ; তা জামাই কই হ্যার লগে পরিচিত অইলাম না!
আক্কাস আলী সামনে বসে থাকা তিন জামাইয়ের সাথে মেহমানদের পরিচয় করিয়ে দিলেন,তারার স্বামী হিসেবে নয়নকে উনার খুব একটা মনে ধরেনি, তার কারণ নয়নের অর্থনৈতিক অবস্থা! উনি নিজের ছেলের জন্য তারাকে চেয়েছিলো কিন্তু উনার ভাই তাতে রাজি হয়নি,উল্টো বাহানা দেখিয়ে তারাকে তারার মামার বাড়িতে পাঠিয়েদিলো; এছাড়াও বড় কারণ হলো উনার নিজের মেয়ে! উনার মেয়ে তারার চেয়েও সুন্দর অথচ তার কপালেও নয়নের মতো স্বামী জুটলো না,তারার মতো হতভাগীর , চাঁন ইসলাম যেখানে দিন এনে দিন খায় সেখানে নয়নের মতো ব্যবসায়ী জামাই যার নাম কিনা অত্র অঞ্চলের সবাই জানে তার ঘরে বিয়ে হলো,তারার মতো মেয়ে তার বাড়িতে রাজ করছে,এটা কোনভাবেই হজম করতে পারছে না!; এসব উনার মাথায় ঢুকিয়েছে উনার স্ত্রী! এই মহিলা সবসময়ই চায় তারারা সারাজীবন উনাদের চেয়ে ছোট অবস্থায় থাকুক, সারাজীবন উনাদের দ্বারস্থ হোক কিন্তু আল্লাহর চাওয়াই তো সবার আগে সেটা উনারা ভুলেই বসেছেন!
তারার ফুফু নিজের বড় ভাইয়ের মন পড়তে পারলো মনে হয় তাই তাওহীদ দিয়ে নয়নকে ডেকে এনে চান ইসলামের পাশে একটা চেয়ার পেতে বসিয়ে দিলেন, চাঁন ইসলাম গর্বে বুক ফুলিয়ে সবার সাথে নিজের জামাতার পরিচয় করিয়ে দিলো,নয়ন লজ্জা পাচ্ছিলো তাই মাথা নুইয়ে রেখেছে, এখানে সবাই বেশ শিক্ষিত কেবল সেই বাদে এটাই তাকে এতগুলো মানুষের মাঝে বিব্রত করার জন্য যথেষ্ট কিন্তু কেউ তার সেদিক নিয়ে প্রশ্ন তুললো না যদিও তারার চাচাতো ভাই যার জন্য তারাকে চেয়েছিলো সে এবং রাত্রীর বর কথাটা তুলতে চেয়েছিলো কিন্তু তারার বাবার প্রখর বুদ্ধির পরিচয় মেলে তখন সে নিজের জামাইয়ের সম্মান রক্ষার্থে কথা ঘুরিয়ে দেয় সন্ধ্যা প্রসংঙ্গ টেনে, পরিচয় হবার পর নয়ন উঠে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু চাঁন ইসলাম ছাড়েনিন,উনি ইশারায় এই আসরে থাকার জন্য অনুরোধ করে,নয়ন শ্বশুরের ইচ্ছাকে সম্মান দেখিয়ে এখানেই বসে থাকে!
গ্রামীণ বিভিন্ন উপায়ে,নিয়ম নামক মানসিক অত্যাচারের মাধ্যমে গরু দেখার মতো যাচাই বাছাই করে শেষে কন্যা পছন্দ হয়েছে কথাটা বলাই হলো বিয়ের প্রথম ধাপ অতিক্রম করা, সন্ধ্যার ক্ষেত্রেও তাই করলো, পানি দিয়ে পিচ্ছিল পথে তৈরি করে সেখানে হেঁটে দেখানো থেকে শুরু করে পায়ের গোড়ালি দেখানো, চুলের গোছা দেখানোর সহ নানা অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অবশেষে শুনতে পেল,
-- পোলার পছন্দই আমগো পছন্দ, এইখানে আমাদের আপিত্তি থাকার কারন নাই!
তালিবের মায়ের আস্বস্ত হবার ভঙ্গিতে বলা কথায় তারার বড় বোনের প্রত্তত্তর,
-- হ ভাই আমার এই মাইয়ার মইধ্যে কি পাইছে আল্লাহ জানে,সেই যে গো ধরছে তো ধরছে, বিয়ে করলে এরেই করবে!
চাঁন ইসলাম আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
-- আল্লাহ জোড়া যার লগে বানছে হ্যার লগেই অইবো এইডাই আল্লাহর হুকুম!
-- তাইলে কথা কি পাক্কা মনে করুম?
তারার বড় চাচার নিশ্চিত উত্তর চাই,তাই উক্ত কথা জিজ্ঞেস করলেন, উনার কথার প্রেক্ষিতে বিপরীত পক্ষের সবাই তালিবের দিকে তাকিয়ে তার সঠিক সম্মতির জন্য তাকালো,তালিব লজ্জা মাখা হাসি দিয়ে মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো, এরপর মুরব্বিদের সবার দিকে তাকালো , সবার এক কথা যারা সংসার করবো তাগো কথাই সব! অথচ এখানে মতামত দেওয়ার অনুমতি পেল কেবল একজন তাও শুধু পাত্র!
পর্ব ১২
-- তাহলে আর কি? কাজী সাহেব ডাক দেন,চার হাত এক করিয়া দেই!
তালিবের বড় দুলাভাইয়ের শেষ কথা, তার কথার পিঠে উত্তর না দিয়ে চাঁন ইসলাম নিজের বড় ভাইয়ের দিকে তাকালো,সেও ছোট ভাইয়ের দৃষ্টি বুঝে নিজের ছেলে আজোয়াদের দিকে তাকালো, ছেলে বাবার দৃষ্টি বুঝে উঠে চলে গেল!
পাত্র পক্ষের কথা অনুযায়ী আগেই কাজী ঠিক করে রাখা ছিলো,উনি আসতেই উপর ওয়ালাকে সাক্ষী রেখে তিন লক্ষ ধার্য করে এক লক্ষ গয়না বাবদ আর এক লক্ষ নগদ পরিশোধ এবং বাকি একলক্ষ বকেয়া রেখে বিবাহ সম্পন্ন হয়! কথা হয় অগ্রহায়ণ এর প্রথম শুক্রবার আয়োজন করে বউ ঘরে তুলে নিবে!
যেহেতু তারাদের বাড়িতে কেবল দুটো ঘর তাই নতুন জামাইকে রাখার ইচ্ছা থাকলেও কেউ মুখে তুললো না!
আগত সব মেহমানদের মুখেই ছিল নয়নের জন্য প্রশংসার বুলি ! তোফাজ্জলও বেশ খাতির পেয়েছে সবার কাছে!
সব কাজ মিটমাট হওয়ার পর মেহমানরা চলে গেলে নয়ন শ্বশুর শাশুড়ির কাছে অনুমতি চায় তাকে আর তারাকে বাড়ি ফেরার কিন্তু তারা অনুরোধ করে বলে,
-- আইজকা রাইত থাইকা কাইল বেয়াইনে রওনা দেও বাবা?
-- কিন্তু আব্বা, হেইলে কাইলও দোকানে যাওয়া অইবো না!
-- হ তা বুঝছি কিন্তু এত রাইতে গ্যালে পথে ঘাটে কোন বিপদ আপদ অইলে ক্যামনে কি করবা?
নয়ন বুঝলো শ্বশুরের কথার গুরুত্ব,সত্যিই এত রাতে বের হলে তাদের পৌঁছাতে আরো বেশি গভীর রাত হয়ে যাবে; তখন তারাকে নিয়ে বিপদেও পড়তে পারে,যাওয়ার পথে কান্দীরপাড়া নামক এলাকাটা বেশ ভয়ংকর, সেখানে নাকি দিনদুপুরেই ভয়াবহ রকমের হামলা হয়! মেয়ে মানুষের ইজ্জতের উপরও আঘাত করে! ঘন জঙ্গল এলাকা বলেই এসব করতে সহজ হয় তাই হয়তো ঐ এলাকাই বেছে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা, অবশ্য শোনা যায় এতে নাকি স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাধারী দলের লোকদেরও যোগসাজশ আছে!তাই তো কেউ সাহস করে প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসে না! সবারই জানের ভয় আছে,আর যদি তাও না থাকে তবে অবশ্যই ইজ্জতের মূল্য অনেক বেশি,আর এর জন্যই মুখ বুজে সহ্য করে নয়তো বিকল্প পথ পছন্দ করে!
সময়ের বহমান স্রোতের তালে তাল মিলিয়ে চলে গেছে বেশ কয়েকটি দিন,তারা নিজের বাপের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর যেন হুট করেই পুরো দমে গৃহিণী বনে গেছে,নয়নও নিজের ব্যবসায় পুরো দমে মনোযোগী হয়েছে! সরিষার বাম্পার ফলনে মনেও খুশির ঢেউ; বিগত কয়েক বছরের চেয়ে অনেক বেশি সরিষার দানা বের করতে পেরেছে,এটাকে অনেকেই নয়নের বিয়ের সুফল অথবা ওর ভাগ্যের চাকা আরো দ্রুত গতিতে ঘুরছে বলে মনে করছে!কেউ কেউ তারার প্রশংসা করছে,তারাকে নয়নের সৌভাগ্যের চাবি বলেও সম্বোধন করছে!এতে যেমন তারাও খুশি হচ্ছে,তেমনি নয়নও কোন না কোন ভাবে তারার প্রতি আরো বেশি দুর্বল হচ্ছে সত্যি কিন্তু নয়ন জানে এতে তার ঠিক কতটা পরিশ্রম আর অর্থ খরচ হয়েছে!
সরিষার গাছ কেটে মুঠি বেঁধে এক জায়গায় জমা করছে শ্রমিকেরা,নয়ন ক্ষেতের আইলের উপর বসে সেটাই দেখছে আর মনে মনে ভাবছে কেমন হতে পারে এবারের এই সরিষার উপর আয়; অনেক মেহনত করেছে এইবার এই ক্ষেতের উপর, তারাদের বাসায় গিয়েও মনে মনে দুশ্চিন্তায় ভুগেছে, তাইতো কাজ শেষ করে দ্রুতই তারাকে নিয়ে ফিরেছে আর এসেই এখন সরিষা নিয়ে পড়েছে;এর জন্য এইবার কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়েছে,তারা যেভাবে বলেছে সেভাবে এগিয়েছে!
সরিষা বাংলাদেশের প্রধান ভোজ্য তেল ফসল। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ হেক্টর জমিতে এর চাষাবাদ করা হয় এবং প্রায় আড়াই লক্ষ টন তেল পাওয়া যায়। বিভিন্ন জাতরে সরিষার বীজে প্রায় ৪০-৪৪% তেল থাকে। খৈলে প্রায় ৪০% আমিষ থাকে। তাই খৈল গরু ও মহিষের জন্য খুব পুষ্টিকর খাদ্য।
বাংলাদেশে ৩ প্রকার সরিষার চাষ করা হয়। এ গুলো হলো-টরি, শ্বেত ও রাই।
সরিষার জাত
টরি-৭
ফসল বোনা থেকে পাকা পর্যন্ত ৭০-৮০ দিন সময় লাগে। উন্নত পদ্দতিতে চাষ করলে হেক্টর প্রতি ফলন ৯৫০-১১০০ কেজি হয়। বীজে তেলের পরিমাণ ৩৮-৪১%। জাতটি রোগবালাই সহনশীল।
সোনালী সরিষা (এসএস-৭৫)
ফলে ৪ টি কক্ষ থাকে এবং প্রতি ফলে বীজের সংখ্যা ৩৫-৪৫ টি । বীজের রং হলদে সোনালী । বীজ গোলাকার।হাজার বীজের ওজন ৩.৫-৪.৫ গ্রাম এবং বীজে তেলের পরিমাণ ৪৪-৪৫%। গাছের কান্ড ও শিকড় শক্ত বলে অধিক সার ও সেচ প্রয়োগে গাছ নুয়ে পড়ে না।
কল্যাণীয়া (টিএস-৭২)
বীজ গোলাকার। হাজার বীজের ওজন ২.৫-৩.০ গ্রাম। বীজে তেলের পরিমাণ ৪০-৪২%। ফসল পাকতে ৭৫-৮৫ দিন সময় লাগে। উন্নত পদ্দতিতে চাষ করলে প্রতি হেক্টরে ১.৪৫-১.৬৫ টন ফলন পাওয়া যায়। কল্যাণীয়া জাতটি স্বল্প মেয়াদী উচ্চ ফলনশীল আগাম জাত।
দৌলত ( আর এস-৮১)
বপন থেকে তোলা পর্যন্ত ৯০-১০৫ দিন সময় লাগে। হেক্টর প্রতি ফলন ১.১-১.৩ টন। দৌলত জাত খরা ও কিছুটা লবনাক্ততা সহনশীল। বীজে তেলের পরিমাণ ৩৯-৪০%। জাতটি অলটারনারিয়া ব্লাইট রোগ সহনশীল।
বারি সরিষা -৬ (ধলি)
ফল ২ কক্ষ বিশিষ্ট এবং প্রতি ফলে বীজের সংখ্যা ২২-২৫ টি। হাজার বীজের ওজন ৩-৪ গ্রাম। বীজের রং হলদে। কান্ড ও শিকড় শক্ত হওয়ায় গাছ হেলে পড়ে না। পরিপক্ক ফল ফেটে গিয়ে বীজ ঝরে পড়ে না। ফল ও ফলের ঠোঁট তুলনামূলকভাবে লম্বা। বারি সরিষা -৬ (ধলি) পাকতে ৯০-১০০ দিন সময় লাগে। পরিমাণমত সার ও সেচ দিলে প্রতি হেক্টরে ১.৯-২.২ টন ফলন পাওয়া যায়। বীজে তেলের পরিমাণ ৪৪-৪৫%।
বারি সরিষা -৭ (ন্যাপাস-৩১৪২)
গাছের পাতা বোটাহীন ও তল মসৃণ । ফুলের পাঁপড়ির রং সাদা। প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা ৯০-১২৫ টি । ফল ২ কক্ষ বিশিষ্ট এবং প্রতি ফলে বীজের সংখ্যা ২৫-৩০ টি।
বারি সরিষা -৮ (ন্যাপাস-৮৫০৯)
ফুলের পাঁপড়ির রং হলদে। প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা ৯০-১২৫ টি, ফল ২ কক্ষ বিশিষ্ট । প্রতি ফলে বীজের সংখ্যা ২৫-৩০ টি। বীজের রং কালচে। হাজার বীজের ওজন ৩.৪-৩.৬ গ্রাম। ফসল পাকতে ৯০-৯৫ দিন সময় লাগে।বীজে তেলের পরিমাণ ৪৩-৪৫%। এ জাত অলটারনারিয়া ব্লাইট রোগ ও সাময়িক জলাবদ্দতা সহনশীল।
রাই-৫
প্রতি গাছে ৪-৬ টি প্রাথমিক শাখা থাকে। পাতা বোটাযুক্ত ও খসখসে। প্রস্ফুটিত ফুল কুড়ির নিচে অবস্থান করে।প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা ৯০-১২০। বীজে তেলের পরিমাণ ৩৯-৪০%।
বারি সরিষা -৯
এ জাতটি টরি-৭ এর চেয়ে শতকরা ১০-২৫ ভাগ বোশ ফলন দেয়। আমন ধান কাটার পর এবং বোরো ধান চাষের আগে। স্বল্প মেয়াদী এ জাতটি সহজে চাষ করা সম্ভব। বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৪৩-৪৪ ভাগ। ফসল পাকতে ৮০-৮৫ দিন সময় লাগে। পরিমাণমত সার ও সেচ দিলে হেক্টরে ১.২৫-১.৪৫ টন ফলন পাওয়া যায়।
বারি সরিষা -১০
গাছের উচ্চতা ৯০-১০০ সেমি। প্রতি গাছে ৪-৬ টি প্রাথমিক শাখা থাকে। শাখা থেকে প্রশাখা বের হয়। পাতা হালকা সবুজ রংয়ের। পাতা বোটাযুক্ত ও খসখসে । প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা ১০০-১২০ টি । ফল ২ কক্ষ বিশিষ্ট । প্রতি পলে বীজের সংখ্যা ১২-১৫ টি । বীজের রং পিঙ্গঁল । হাজার বীজের ওজন ২.০-৩.০ গ্রাম। বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৪২-৪৩ ভাগ। হেক্টর প্রতি ফলন ১.২৫-১.৪৫ টন। আমন ধান কাটার পর এ জাতটি নাবি জাত হিসাবে চাষ করা যায়।
বারি সরিষা -১১
হাজার বীজের ওজন ৩.৫-৪.০ গ্রাম। বীজের ওজন অন্যান্য রাই সরিষার চেয়ে বেশি। ফসল ১০৫-১১০ দিন পাকে। প্রতি হেক্টরে ২.০-২.৫ টন ফলন পাওয়া যায়। এ জাতটি দৌলতের চেয়ে ২০-২৫% বেশি ফলন দেয়। আমন ধান কাটার পর এ জাতটি নাবি জাত হিসাবে চাষ করা যায়। জাতটি খরা এবং লবনাক্ত সহনশীল। প্রতি ফলে বীজের সংখ্যা ১২-১৫ টি। বীজের রং পিঙ্গল।
বারি সরিষা -১২
হাজার বীজের ওজন ২.৬-৩.২ গ্রাম। বীজে তেলের পরিমাণ ৪৩- ৪৪%। ফসল ৭৮-৮৫ দিনে পাকে। প্রতি হেক্টরে ১.৪৫-১.৬৫ টন ফলন পাওয়া যায়। আমন ধান কাটার পর স্বল্প মেয়াদী জাত হিসেবে চাষ করে বোরো ধান রোপণ করা যায়।
বারি সরিষা-১৩:
হেক্টর প্রতি ফলন ২.২০-২.৮০ টন। ফসল ৯০-৯৫ দিনে পাকে। বীজে তেলের পরিমান শতকরা প্রায় ৪৩ ভাগ।
বারি সরিষা -১৪
হাজার বীজের ওজন ৩.৫-৩.৯ গ্রাম। ফসল ৭৫-৮০ দিনে পাকে। প্রতি হেক্টরে ১.৪-১.৬ টন ফলন পাওয়া যায়। আমন ধান কাটার পর স্বল্প মেয়াদী জাত হিসেবে চাষ করে বোরো ধান রোপণ করা যায়।
বারি সরিষা -১৫
হাজার বীজের ওজন ৩.২৫-৩.৫০ গ্রাম। ফসল ৮০-৮৫ দিনে পাকে। প্রতি হেক্টরে ১.৫৫-১.৬৫ টন ফলন পাওয়া যায়। আমন ধান কাটার পর স্বল্প মেয়াদী জাত হিসেবে চাষ করে বোরো ধান রোপণ করা যায়।
বারি সরিষা -১৬
হাজার বীজের ওজন ৪.৭-৪.৯ গ্রাম। ফসল ১০৫-১১৫ দিনে পাকে। প্রতি হেক্টরে ২.০-২.৫ টন ফলন পাওয়া যায়। আমন ধান কাটার পর বোরো ধান করে না এমন জমিতে এ জাতটি নাবি জাত হিসেবে চাষ করা যায়। এ জাতটি খরা ও লবনাক্ততা সহিষ্ঞু।
বারি সরিষা -১৭
হাজার বীজের ওজন ৩.০-৩.৪ গ্রাম। ফসল ৮২-৮৬ দিনে পাকে। প্রতি হেক্টরে ১.৭-১.৮ টন ফলন পাওয়া যায়। জাতটি স্বল্প মেয়াদী হওয়ায় রোপা আমন-সরিষা-বোরো ধান শস্য বিন্যাসের জন্য উপযুক্ত।
বিনাসরিষা-৪
হাজার বীজের ওজন ৩.৫০-৩.৮০ গ্রাম। বীজের রঙ লালচে কালো এবং বীজে তেলের পরিমাণ ৪৪% । জীবনকাল ৮০-৮৫ দিন। সর্বোচ্চ ২.৪০ টন /হেক্টর ফলন পাওয়া যায়। তবে হেক্টর প্রতি গড় ফলন ১.৭০ টন।
বিনা সরিষা-৭
জাতটি খরা এবং অল্টারনারিয়া জনিত পাতা ও ফলের ঝলসানো রোগ সহনশীল। বীজের আকার তুলনামূলকভাবে বড় এবং ১০০০ বীজের ওজন ৩.৫০-৪.২৫ গ্রাম। বীজে তেলের পরিমাণ ৩৬-৩৮%। জীবনকাল ১০২-১১০ দিন। হেক্টর প্রতি ফলন ২.০ টন।
বিনা সরিষা-৮
বীজে তেলের পরিমাণ ৩৯-৪১%। জীবনকাল ১০০-১০৮ দিন। হেক্টর প্রতি ফলন ২.৪ টন।
বিনা সরিষা-৯
জাতটি অল্টারনারিয়া জনিত পাতা ও ফলের ঝলসানো রোগ এবং বৃষ্টিজনিত সাময়িক জলাবদ্ধতা সহনশীল। বীজে তেলের পরিমাণ ৪৩%। জীবনকাল ৮০-৮৪ দিন। হেক্টর প্রতি ফলন গড়ে ১.৬০ টন।
বিনা সরিষা-১০
বীজে তেলের পরিমাণ ৪২%। জীবনকাল ৭৮-৮২ দিন। হেক্টর প্রতি ফলন ১.৫ টন।
বপন পদ্ধতি:
সরিষা বীজ সাধারণত ছিটিয়ে বপন করা হয়। লাইন করে বুনলে সার, সেচ ও নিড়ানী দিতে সুবিধা হয়। লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ১ ফুট রাখতে হয়। বপনের সময় জমিতে প্রয়োজনীয় রস থাকা দরকার।
বপনের সময়:
বিভিন্ন অঞ্চলের তারতম্য এবং জমির জো অবস্থা অনুযায়ী টরি-৭, কল্যাণীয়া, সোনালী সরিষা, বারি সরিষা-৬, বারি সরিষা-৭ ও বারি সরিষা-৮ এর বীজ মধ্য আশ্বিন থেকে মধ্য কার্তিক মাস পর্যন্ত বোনা যায়। রাই-৫ এবং দৌলত কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত বপন করা যেতে পারে।
নিড়ানী দেয়া:
বীজ বপনের ১৫-২০ দিন পর একবার এবং ফুল আসার সময় দ্বিতীয়বার নিড়ানি দিতে হয়।
সেচ প্রয়োগ:
বীজ বপনের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে (গাছে ফুল আসার সময়) প্রথম সেচ এবঙ ৫০-৫৫ দিসের মধ্যে (ফল ধরার সময়) দ্বিতীয় সেচ দিতে হবে। বপনের সময় মাটিতে রস কম থাকলে চারা গজানোর ১০-১৫ দিনের মধ্যে একটি হালকা সেচ দিতে হয়।
সারের পরিমান:
জাত, মাটি এ মাটিতে রসের তারতম্য অনুসারে সার দিতে হয়। সারের পরিমান নিম্নরুপ (গ্রাম/শতক)
সারের নাম সোনালী সরিষা, বারি সরিষা-৬, টরি-৭, কল্যাণীয়া, রাই-৫, দৌলত
বারি সরিষা-৭, বারি সরিষা-৮,
বারি সরিষা-১৩
ইউরিয়া ১২০০ ১১০০
টিএসপি ৬৫০ ৬২৫
এমওপি ৩৫০ ৩২৫
জিপসাম ৬৫০ ৬২৫
জিংক সালফেট ২০ ১৫
বোরাক্স/বরিক এসিড ২৫ ২৫
পচা গোবর ১৫ টন ১৫ টন
ইউরিয়া সার অর্ধেক ও অন্যান্য সমুদয় সার বপনের আগে এব১ বাকি অর্ধেক ইউরিয়া গাছে ফুল আসার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হয়। সার উপরি প্রয়োগের সময় মাটিতে রস থাকা দরকার।
সরিষার জাব পোকা :
লক্ষণ: পূর্ণবয়স্ক ও বাচ্চা পোকা উভয়ই সরিষার পাতা, কান্ড, ফুল ও ফল হতে রস শোষণ করে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে ফুল ও ফলের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং পাতা কুঁকড়ে যায়। জাব পোকা এক ধরনের রস নিঃসরণ করে, ফলে তাতে সুটিমোল্ড ছত্রাক জন্মে এবং আক্রান্ত অংশ কালো দেখায়। এজন্য ফল ঠিকমত বাড়তে পারে না, বীজ আকারে ছোট হয়। বীজে তেলের পরিমাণ কমে যায়। ফল ধারণ অবস্থায় বা তার আগে আক্রমণ হলে এবং প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার আশংকা থাকে।
প্রতিকার:
১. আগাম চাষ আশ্বিনের শেষ ভাগ ও মধ্য-কার্তিক (অক্টোবর) অর্থাৎ আগাম সরিষা বপন করলে জাব পোকার আক্রমণের আশংকা কম থাকে।
২. প্রতি গাছে ৫০ টির বেশি পোকা থাকলে ম্যালাথিয়ন-৫৭ ইসি বা সুমিথিয়ন-৫৭ ইসি বা ফলিথিয়ন-৫৭ ইসি বা একোথিয়ন-৫৭ ইসি ডায়াজিনন ৬০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে বিকালে সেপ্র করতে হবে।
সরিষার পাতা ঝলসানো রোগ
লক্ষণ: প্রাথমিক অবস্থায় সরিষা গাছের নীচে বয়স্ক পাতায় এ রোগের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীতে এ ছত্রাকের আক্রমণে গাছের পাতা, কান্ড ও ফলে চক্রাকার কালচে দাগের সৃষ্টি হয়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে পাতা ঝলসে যায়। ফলে সরিষার ফলন খুব কমে যায়।
প্রতিকার:
১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন জাতের সরিষার চাষ করতে হবে। ধলি, দৌলত, বারি সরিষা-৭, বারি সরিষা-৮ ইত্যাদি জাত কিছুটা পাতা ঝলসানো রোগ সহনশীল।
২. রোগমুক্ত বীজ বপন করতে হবে।
৩. বীজ বপনের আগে ভিটাভেক্স-২০০ দিয়ে (২-৩ গ্রাম ছত্রাকনাশক/কেজি বীজ) বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
৪. এ রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে রোভরাল-৫০ ডব্লিউপি বা ডাইথেন এম-৪৫, ০.২% হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম) পানিতে মিশিয়ে ২০-১২ দিন পরপর ৩-৪ বার সেপ্র করতে হবে।
পরজীবী উদ্ভিদজনিত রোগ
লক্ষণ: সরিষার পরজীবী উদ্ভিদের মধ্যে অরোবাংকিই প্রধান। সরিষা গাছের শিকড়ের সাথে এ পরজীবী উদ্ভিদ সংযোগ স্থাপন করে খাদ্য সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। এর ফলে পরজীবী আক্রান্ত সরিষার গাছ দুর্বল হয়, বৃদ্ধি কমে যায় এবং ফলন হ্রাস পায়। অরোবাংকি এক প্রকার সপুষ্কক পরজীবী উদ্ভিদ এবং এর বংশবৃদ্ধি সরিষা গাচের উপর নির্ভরশীল। এর বীজ মাটিতেই অবস্থান করে। মাটি, ফসলের পরিত্যক্ত অংশ, সেচের পানি প্রভৃতির মাধ্যমে অরোবাংকির উৎপত্তি ও বিস্তার ঘটে। বারবার একই জমিতে সরিষা পরিবারের ফসল চাষ করলে এ পরজীবীর বিস্তার ঘটে।
প্রতিকার:
১. ফুল আসর আগে পরজীবী উদ্ভিদ জমি হতে তুলে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
২. পরিমিত হারে টিএসপি সার ব্যবহার করতে হবে।
৩. আগে এ রোগে আক্রান্ত জমি গভীরভাবে চাষ করতে হবে।
আমি পুরো তথ্য প্রথম আলোর অনলাইন থেকে সংগ্রহ করেছি ,তাই ভুলত্রুটি আমার দায় না!
পর্ব ১৩
-- আসসালামু আলাইকুম নয়ন ভাই!
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম কামাল ভাই!ক্যামন আছেন?
-- আছি আলহামদুলিল্লাহ, আপনে ক্যামন আছেন,ভাবীজান, খালাম্মা ক্যামন আছে?
-- আছে আলহামদুলিল্লাহ সবাই ভালা ; আপনের বাড়ির মাইনসের কি খবর?
-- আমারও আলহামদুলিল্লাহ সবাই ভালা আছে, তয় কন কি কামের তাগিদে স্মরন করছিলেন?
-- হ স্মরণ করছিলাম জরুরী, আপনে কি দূর গিরামে গিয়া ঘরামীর কাম করতে পারবেন?
-- দূ্র গিরামে? কোন গিরাম এইডা, কতদূর?
-- ঐ আপনের ভাবীর বাপের বাড়ি! হ্যাগো গিরামেও ঘরামীর কাম করা লোক আছে তয় আমি তো হ্যারে চিনি না তাই তার উপর নিশ্চিতও অইতে পারতেছি না,তাই আপনেরে পাডাইতে চাইছিলাম আর কি!
-- ও আইচ্ছা অসুবিধা নাই,আমি পারুম! খালি খাওনদাওনের বন্দোবস্ত থাকলেই অইবো!
-- কি যে কন মিয়া! ঐডা আমার শ্বশুর বাড়ি,হ্যারা কি আপনেরে না খাওয়াই রাখবো?
-- আইচ্ছা কবে যাওন লাগবো কন,কবের থেইক্কা কাম ধরোন যাইবো!
-- যত শীঘ্র সম্ভব,বুঝেনই তো ,শীত শ্যাষ,গরমও আইয়া পড়তাছে,এর মইধ্যেই শুরু অইবো বর্ষাকাল,আম পাকুনির সময় ঝড়ও অয়,তাই আমি এ্যার আগেই ঘরডা পাকাপোক্ত কইরা দিতে চাই!
-- তাইলে কবে যাইতে কন?
-- আইজকালের মইধ্যেই রওনা দ্যান!
-- আইচ্ছা; আমি তৈয়ার অইয়া আপনেরে জানাই!
-- হ জানান!
সরিষার বাম্পার লাভে নয়নের মন বেজায় খুশি তাই শ্বশুর বাড়িতে বসে শ্বশুরের ঘরটা টিন-সেটের থেকে একটু উন্নত করে পাকাপোক্ত করে তোলার যে ইচ্ছা পোষন করেছিলো তা এবারেই ঠিক করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘরামী কামালের সাথে চুক্তি করলো; তারাকে জানায়নি,নয়ন চায় ঘর ঠিক হলে হুট করেই একদিন তারাকে তার বাপের বাড়ি নিয়ে গিয়ে চমক দিবে; তখন তারা নিশ্চয়ই অনেক খুশি হবে! আরো বেশি আবেগী হয়ে কান্না করে দিবে! নয়ন দেখেছে আড়ালে আবডালে নয়নের করা কাজে খুশিতে তারার চোখে পানি চলে এসেছে! এটা কি ভালোবাসা থেকে নাকি কৃতজ্ঞতা থেকে? নয়ন চায় তারা নিজের স্বামীর সব কাজে ভালোবাসা খুঁজে নিক,তার বিনিময়ে তার তরফ থেকেও ভালোবাসা আসুক, কৃতজ্ঞতা নয়; কিন্তু আমরা মানবজাতি, স্বভাবতই আমাদের উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা কাজ করে যদি সঠিক মানুষ হই তবে আরকি!
দোকানে বসে পাইকারি এক ক্রেতার মাল তাকে পৌঁছানোর আগে আরও একবার দেখে নিচ্ছিলো,তখনই আসে কামাল ঘরামী। তার সাথে আলাপ শেষ করে নিজের কাজ মনোনিবেশ করে!
---------------------------------------------------------------------
আম্মা খেয়ে উঠে গেছে সবার আগে, তারা নয়নের প্লেটে ভাত বেড়ে দিচ্ছে, নয়ন প্লেটে থাকা ভাতের লোকমা করে তারার মুখের কাছে তুলে ধরলো, তারাও স্বাচ্ছন্দে তা মুখে পড়ে নিলো,এটা সবসময় ঘটা একটা বিষয়, নয়ন খেতে বসার পর বেশ কয়েকবার তারাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিবে যদিও তারা নিজের জন্য আলাদা প্লেটে খাবার নেয় তবুও নয়ন নিজের প্লেট থেকে তুলেই খাওয়াবে,তারাও সেটা পরম আনন্দে খেয়ে নেয়, সারাদিন কাজ করে আসার পর ভালোবেসে আহ্লাদ করে তার স্বামী তাকে তুলে খাওয়াচ্ছে এটা নিশ্চয়ই তার জন্য আনন্দের বিষয়,তবে কেন সে সেই বিষয়ে খুশি হবে না!
তারাকে খাওয়ানোর পর নিজের মুখে ভাত তুলতে তুলতে নয়ন বললো,
-- আমার একটু কাম আছে তোমগো গিরামে দিকে!রাইতে নাও আইতে পারি; তুমি কি মায়েরে লইয়া একটা রাইত একা থাকতে পারবা না?
নিজের বাপের বাড়ির এলাকাতে যাবে শুনে স্বভাবতই তারার মনটা একটু দোল খেল, ভাত চিবানো বন্ধ করে নয়নের দিকে চেয়ে রইলো, প্রথমে ভেবেছিলো নয়ন তাঁকেও নিয়ে যাবে, পরক্ষনেই মনে হলো নয়ন বললো কাজে যাবে; তবে নিশ্চয়ই তাকে নিবে না! তাছাড়া বাপের বাড়ি থেকে এলোই মাত্র মাস দুই পার হলো এর মধ্যেই আবারও যাওয়ার কথা বলা নিশ্চয়ই ভালো দেখায় না,যতই হোক সে এখন এক গৃহস্থ বাড়ির বউ!তার কত কাজ থাকে,এই যে সরিষার ক্ষেতে এখন পুরো দমে সবুজ কচি ধানের শীষ বাতাসের সাথে আলিঙ্গনে মিষ্টি মৃদু ছন্দময় ঝগড়ায় মত্ত; সেই ক্ষেতে বেশ কয়েকজন কামলা খাটে তাদের জন্য রান্না করতে হয়, নাস্তা তৈরি করে দিতে হয়, মাঝে মাঝে তাদেরকে গিয়ে দেখে আসতে হয়; হ্যা সব কাজের জন্য লোক আছে তবুও যার কাজ সে না থাকলে লোক দিয়ে ঠিকঠাক কাজ হয় না; এটা নয়ন তাকে ভালোমতোই বুঝিয়ে দিয়েছে এতদিনে! তারাও বুঝেছে; সে দেখে লোক থাকা সত্ত্বেও নয়ন কিভাবে দৌড়ঝাঁপ করে সবটা নিজের হাতে করে, শ্বাশুড়ি মাও ঘরের কাজে সাহায্য করার জন্য লোক থাকা সত্ত্বেও সবটা নিজেই করে! তাই তারাও তাদের মতোই হতে চায়; এমনিতেই তারা সংসারি,তার মধ্যে বাপের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর একদিন আম্মা নিজের ঘরে ডেকে নিলো এরপর বেশ কিছু কথা বললো, যেমন;
-- দ্যাহো বউ তুমি কিন্তু খালি আমার পোলার বউ না! তুমি এহোন আমার মাইয়াও আর একমাত্র কতার সঙ্গীও; তাই তোমার যত কতা তা সব তুমি আমারে একদম ভয়ডর না কইরা কইতে পারো!
-- জ্বী আম্মা;
-- বও এহানে;
তারার হাত টেনে নিয়ে নিজের পাশেই বসালেন, এরপর হুট করেই নিজের বসার থেকে একটু দূরে তোষকের নিচ থেকে এক গোছা চাবি বের করলো,
-- আমার নয়ন জীবনে অনেক কষ্ট করছে!ম্যালা দুখখু পাইছে!হ্যারপরও কত হাসিখুশি! এইডার কারন জানো?
তারা মাথা দুদিকে দুলিয়ে বোঝালো "না",তারার শ্বাশুড়ি চাবির দিকে চেয়ে বললো,,
-- কারন আমি !
-- মানে?
-- ঐ যে ঐ দুখখু পাইলে আমিও পাই! তাই চেষ্টা করে নিজের কষ্ট লুকাইয়া আমারে খুশি রাখতে! আমার চইক্ষে পানি আওন হ্যার পছন্দ অয় না,তাই নিজের কষ্ট অইলেও আমার লগে ভাগ করে না!
-- কিন্তু আম্মা উনি কি নিয়া এত কষ্ট পাইছে,যার জইন্য আপনের উনার লইগা এত চিন্তা অয়?
তারার শ্বাশুড়ি কিছু মুহূর্ত তারার দিকে চেয়ে রইলো, কিছু বলতে চেয়েও বললো না উল্টো কথা ঘুরিয়ে তারার হাতের মুঠোয় নিজের হাতে থাকা চাবির গোছা গুঁজে দিয়ে বললো,,
-- মনে রাখবা আইজ থেইকা এই সংসারের সব দায়িত্ব তুমার; যত কিছুই অউক তুমি এই সংসার ছাইড়া কুতাও যাইবা না!যে যাই বলুক মনে রাখবা দিন শ্যাষে আমার পোলাও যেমন তুমার ত্যামনই এই ঘর বাড়ি,এই সংসারও তুমার; তাই কারো কতা কানে লওন যাইবো না!
তারা বুঝলো না শ্বাশুড়ি আম্মার শেষ কথার মানে,উনি বিয়ের থেকে শুরু করে প্রায়ই এই কথা বলে, কিন্তু এর সঠিক কোন কারণ তারা খুঁজে পায় না,তারা আরো একটি ব্যাপার খেয়াল করেছে তারাকে তার শ্বাশুড়ি কখনো একা ছাড়ে না, বাইরের মানুষ এলে তো আরোই ছাড়ে না!
-- হুনো তুমি অইলা এই ঘরের কর্তৃ ,এইডা জানি তোমার কামকাইজে বুঝন যায়! নিজের মর্যাদা বুইঝা কাম করবা; সবার লগে মিল্লা মিশ্শা থাকবা তয় অবশ্যি নিজের স্থান ধইরা রাইখা!
-- এই যে চাবির গোছাখান,এইডা খালি চাবিই না! আমার বাপের কষ্টে কামাই করা সম্মান! এহন যারা আমার বাপেরে মাথায় লইয়া নাচে কুন এক সময়ে এরাই আমগো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো! অথচ এহন এরা হগ্গলেই আমার বাপের কথায় নিজগো ভালোমন্দ চিন্তা ভাবনা লয়,তার কারণও আমার বাপে!
- কামলার ঘরে কামলা থেইক্কা নয়ন মিয়া,নয়ন সায়েব অওয়া কম কতা না; তার জন্য আমার বাপেরে বহুত মেহনত করতে অইছে! আমার দুধ সাদা পোলা কালাচান অইয়া গেছে মেহনতের ভারে! বউ তোমার আল্লাহর দোয়াই লাগে এমন কিছু কইরো না যাতে আমার পোলার এত কষ্টে কামাই করা সম্মান আবারও ধুলায় মিশ্শা যায়! একজনের দেওয়া আঘাতে আমার বাপে বহুদিন ভুগছে তুমি হ্যারে আর আঘাত কইরো না! হ্যার কথা হুনবা দ্যাখবা হ্যায় তুমারে মাথায় উডাইয়া রাখবো!
শেষের কথাগুলো উনি আনমনে উদাস ভঙ্গিতেই বললেন,তারা কিছুটা চিন্তিত তার সাথে আরো একটু বেশি অস্থির হলো জানতে কি এমন আছে যার জন্য নয়নের মনে বিষাদের সুর তোলা,আম্মা নিজের ছেলেকে নিয়ে এত ভাবে,যার জন্য উনাদের সব কথা গিয়ে ঠেকে তারার ছেড়ে না যাওয়ার আকুল আবেদনে!তারা নিজেকে দমিয়ে না রেখে শ্বাশুড়ির হাত দুটি ধরে নিজের দুই হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে খুব আন্তরিক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-- আম্মা এ্যামন কি আছে যা আমি জানি,যা জানলে আপনের মনে অয় আমি হ্যারে দুখ্খু দিমু!
-- কি থাকবো বউ; এ্যামন কিছুই নাই! আমিতো খালি কতার কতা কইছিলাম,তুমি আবার কি ভাবতাছো?
হুট করেই একটু উত্তেজিত হয়ে পড়লো মনে হয়,তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজেই কথার প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে ফেললো,
-- কিন্তু আম্মা এই চাবির গোছা আপনে আমারে ক্যান দিতাছেন,যেই হানে আপনে আছেন?
-- কারণ এহোন থেইক্কা আমি পেনশেন যামু,খালি নামাজ পড়মু আর তোমাগো লইগ্গা দোয়া করুম যাতে আল্লাহ খুব শীঘ্রই তুমাগো কোল আলো কইরা একটা নেয়ামত দ্যায়!
শ্বাশুড়ির কথা বুঝতে পেরে লজ্জায় মাথা নত করে ফেলে,
-- আমি শ্যাষ বয়সে আর কত খাটুম,এহোন তুমাগো বেলা,তুমরাই সামলাও নিজেগো ঘর দুয়ার! আল্লাহ ডাক দিলেই হ্যার কাছে চইলা যামু,খালি যাওনের আগে নাতিপুতির মুখ দ্যাখতে পারলেই অইলো!
-- আম্মা এগুলা কি কন? এইরকম কথা কইবেন না! আপনে আমগো মাথার উপরে ছায়া,আপনে ছাড়া আমি আপনের পোলা একদম একা অইয়া যামু,এ্যামন কথা আর কইবেন না আল্লাহর দোয়াই লাগে!
-- আইচ্ছা মন খারাপ কইরো না, আমি আর কমু না; যহন যা অইবো তা সবাই দ্যাখবো!
এই তো সেই কথার পর হুট করেই তারা নিজেকে পুরো দমে দায়িত্ববান বউমা হিসেবে প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগলো!
-- আমগো বাড়িতে যাইবেন?
-- ঠিক নাই যাইতেও পারি যদি সময় পাই!
-- ওহ আইচ্ছা; আমি কি কাপড়চোপড় গুছাইয়া দিমু!
-- হ একখান শার্ট আর একটা লুঙ্গি দিলেই চলবো!
-- প্যান্ট দেই?
-- না দরকার নাই,যেইডা পইড়া যামু ঐডা পইড়াই আমুনে!
কথার তালে খাওয়া শেষ করে,হাত মুখ গামছায় মুছে নিজের ঘরে চলে গেল,তারা সবকিছু গুছিয়ে রাখতে পাকের ঘরে গেল!
সকাল বেলা;;;
নয়ন কালো প্যান্টের সাথে সাদা চেক শার্ট পড়ে নিলো,তারা ছোট একটি ব্যাগে নয়নের জন্য একটা লুঙ্গি আর পাতলা একটা গেঞ্জি দিয়ে দিলো, নয়ন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি চালাচ্ছে,তারা সেদিকে বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকলো,নয়ন এককালে বেশ ফর্সা ছিলো,সেটা ওর শরীরের ভেতরের অংশ দেখলেই বোঝা যায়, তাছাড়া আম্মার ঘরে নয়নের ছোট বেলার ছবিও ছিলো যেটাতে নয়নকে দেখতে একদম আদুরে একটা বাচ্চা মনে হয়! নয়ন ভালো ছাত্রও ছিলো, অভাবের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি,তাতেই কি পড়াশোনার প্রতি এত বিতৃষ্ণা নাকি অন্য কিছু আছে!
তারার ইচ্ছা ছিলো তারার যার সাথে বিয়ে হবে সে যেন তারাকে পড়তে সূযোগ করে দেয় কিন্তু এতদিনে এটা তারা বুঝে গেছে এই বাড়ির কেউ এই ব্যাপারে তারাকে সাহায্য করবে না। তাছাড়া বিয়ের আগেই শুনেছে তাদের অতিরিক্ত শিক্ষিত বউ লাগবে না,এর জন্য তারা এই বিয়েতে রাজীও হচ্ছিলো না কিন্তু মায়ের জেদ আর বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা সবচেয়ে বড় কথা তারা চাইলে নিজের বাড়িতে ফেরত যেতে পারতো না ঐ বখাটের ভয়ে তাই বাধ্য হয়েই এই বিয়েটা করেছে যদিও এখন কোন আফসোস নেই কেবল নিজের পড়াশোনা মাঝ রাস্তায় বন্ধ হয়ে যাওয়া বাদে!
পর্ব ১৪
-- নয়ন মেয়ার কপাল কইতে অইবো! একদম সোনায় বান্ধা! বউগুলা একেকটা আস্তো হুর যদিও টিকাইতে ক্যাবল একটারেই পারছে!
তৃতীয় কারো বলা কথায় সর্ব শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো যেন তারার,সব কথা শূন্যে ভেসে গেলো কেবল একটি কথার ঝড়ে,"বউগুলা একেকটা আস্তো হুর "! টগবগিয়ে উঠলো ঘুমন্ত নিশ্চুপ মস্তিষ্কের সমস্ত নিউরনগুলো! মানে কি নয়নের বউগুলো! কতগুলো বউ নয়নের?
পাশ্ববর্তী বাড়ির পুকুর সেচের কাজ চলছে; আমাদের গ্রাম বাংলায় পুকুর সেচের সময়েও একধরনের উৎসবের আমেজ বিরাজ করে,এক বাড়িতে সেচ কাজ চললে তাকে নিয়ে মাতামাতি হয় আশেপাশের সব বাড়িতেই, তা নিয়ে চলে সেই মাতামাতির প্রখর উত্তেজনা; তেমনি চলছে নয়নদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূর, মোটামুটি তিন চার বাড়ি পরের বাড়িতে!
হাঁটু সমান পানিতে নেমে কাঁদায় মাখামাখি করে একে অপরের দিকে কাঁদা ছোড়াছুড়ি করেও যেন ভীষণ মজা পায় গ্রামের সহজ-সরল মানুষ গুলো! বিয়ে বাড়ীতে যেমন হলুদ মাখামাখি নিয়ে ভীষণ মজার মুহূর্ত তৈরি হয় ঠিক তখনও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়! ছোট্ট ছোট্ট ছেলে মেয়েরা তাদের ছোট ছোট জাল,নেট অথবা পুরানো মশারীর কাটা অংশ নিয়ে, নিজেদের ওড়নার আঁচল দিয়ে, ঝাঁকি জাল নিয়ে নেমে পড়ে মাছ ধরার প্রতিযোগীতা নামক মজার খেলায়, বয়স্ক,অর্ধ বয়স্ক মহিলারা পাতিল,গামলা, বালতি মোট কথা যে যা পারে তা নিয়েই পুকুর পাড়ে অপেক্ষায় থাকে নিজেদের প্রিয়জনদের ধরা মাছ নিয়ে তাদের দিকে ছুঁড়ে মারার, পিছিয়ে থাকে না বয়স্ক পুরুষদের দলও,তারাও এই খেলায় নিজেদের সামিল করে! মন জুড়িয়ে যায় এরকম দৃশ্য দেখলে!ইট পাথরের শহরে বাস করে কোটি কোটি টাকা কামাইয়ের প্রতিযোগীতা করা মানুষেরা গ্রামের সহজ-সরল মানুষের এমন মধুর প্রতিযোগীতার মূল্য খুব একটা বুঝতে পারে না!এটা কেবল তাদের কাছেই অমূল্য আর অপ্রকাশিত এক অনন্য অনুভূতি !
শীত পড়ে গেছে তার সাথে গ্রীষ্মের খরতাপে পুড়তে পুড়তে কখন আবার জানি বর্ষার আগমন হয় তখন আবার ভরে যাবে খরায় শুকিয়ে যাওয়া জলাশয় গুলো; কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়না কারণ এতে পুকুরে কিংবা জলাশয়ে জমে থাকা পুরানো পানি শ্যাওলাযুক্ত হয়ে যায়,সবুজাভ রং ধারন করে যেটা নানান প্রজাতি ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ দিয়ে ভরে থাকে, এতে জীবের জন্য অনেক ক্ষতিকারক উপাদানও থাকে সুতরাং এটা অবশ্যই প্রতিদিনের সংসারি কাজে ব্যবহার করা যায় না;তাই বর্ষা কাল আসার আগে পুকুর সেচ দিয়ে পুরানো পানি বের করে নিলে অথবা সরিয়ে ফেললে আবারও নতুন পানি উঠে অথবা ভূগর্ভস্থ পানি উঠে পুকুরে কিংবা জলাশয়ে নতুন পানির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়! এতে যেমন স্বচ্ছ আর পরিষ্কার পানি পাওয়া যায় তেমনি তাতে কাজের উপযোগী পানিও পাওয়া হয়! তাদের মধ্যে পুকুরও একটি! ঠিক এই কারণেই শীত কাল কিংবা এর একটু পরেই গ্রামাঞ্চলে বাড়ে পুকুর সেচের কাজ! নয়ন'দের পুকুরে মাছ চাষ হয় ,তারাকে বিয়ের কিছুদিন আগেই তেলাপিয়া আর বড় বড় রুই,শরপুটির পোনা ছেড়েছে, সেগুলো আর কিছুদিন পরেই বিক্রির যোগ্য হয়ে উঠবে,তাই আপাতত নয়ন সেচের কোন প্রস্তুতি নিচ্ছে না,আরো কিছুদিন পর হয়তো মাছগুলো বিক্রির উপযোগী হলে সেচ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিবে!
গত দুই সপ্তাহ ধরে নয়ন বেশ কয়েকবার তারাদের গ্রাম মনামীপুরে গিয়েছে,যখনই গিয়েছে সেই রাত পার করে পরেরদিন সন্ধ্যায় এসেছে, অবশ্য সুন্দর গঞ্জে এসেছে সকাল পেরিয়ে দুপুরের কিছুটা পরে, এরপর সারাদিন দোকানদারি করে রাতেই বাড়িতে ফিরেছে, কিন্তু একবারও তারাকে সাথে করে নিয়ে যায়নি,তারাও সাহস করে বলেনি; বিয়ের প্রায় তিনমাস হয়ে গেলেও এখনও কোথাও না কোথাও তারার মাঝে জড়তা রয়ে গেছে তার কারণও নয়ন নিজেই!
নয়ন নিজেই তারার প্রতি এমন একটা মনোভাব প্রকাশ করে যাতে তারা চেয়েও সহজ হতে পারে না! যত সময় বাসায় থাকে নিজের হিসাবের খাতা নিয়ে পড়ে থাকে,খুব একটা তারাকে নিয়ে ভাবতে খেয়াল করা যায় না,যদিও এটা কেবল তারার ভাবনা কারণ সে তো জানে না খাতার প্রতি পাতা উল্টানোর সময় নয়নের নয়ন কেবল তার তারাকেই খুঁজে! এই যে তারা পুরো উঠোন জুড়ে ঘুরে ঘুরে হাতের মোটা শলার ঝাড়ু দিয়ে শুকনো পাতা কুড়ায়, এরপর সেগুলো বস্তা ভরে নিয়ে বাইরে তৈরি করা মাটির চুলোর পাশে রাখে! তারার হাঁটার তালে তালে দুলে উঠে কানের ছোট্ট ঝুমকো জোড়া,মাথায় দেওয়া ঘোমটার ফাঁক দিয়ে বেহায়া বেলাজ ঝুমকো নয়নকে ইশারায় ডাকে,নাকের ঐ নাকছাপি আর লম্বা সরু টিংটিংয়ে নাকের ডগার উপর লেপ্টে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামের মাঝে যে মিষ্টি প্রেম বিনিময় হয় তা নয়নের ছোট্ট হৃদযন্ত্রের কাজের চাপ বহু হারে বৃদ্ধি করে,কখনো কখনো ধান নেড়ে চেড়ে দেওয়ার সময় পায়ের গোড়ালি থেকে কিছুটা উপরে উঠানো শাড়ির পাড়ের সোনালী জড়ির কাজটাও বেশ নজর কাড়ে নয়নের মুগ্ধ চাহনির,সোনালী পাড়ের ঠিক কিছুটা নিচে থাকা রুপালী নুপুর জোড়াও তার হৃদয় বড্ড পোড়ায়, কোমড়ের লতানো আকৃতি তার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা অচল করে দেয়! এত কিছু উপেক্ষা করে কেবলই হিসাবের বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা কোন প্রেমিক পুরুষের পক্ষে সম্ভব নয় তাও যদি কেবলই হয় স্বামী,আর নারীটি একান্তই বৈধগত ভাবে পাওয়া সবচেয়ে আপন, একান্ত কাছের নারী,রমনী অর্ধাঙ্গিনী,স্ত্রী,পত্নী কিংবা বিবি! যাই বলি না কেন কোন পুরুষের দ্বারা সম্ভব নয়! কিন্তু নয়ন পারে, নিজের ভেতরের থেকে কিছু একটা নয়নকে আটকে দেয়! আর এটাই যেন তারাকে ভাবায়, ভাবতে বাধ্য করে! রাত ছাড়া নয়ন খুব একটা তারার কাছাকাছি থাকে না,কেবল রাতেই যেন নয়নের তারাকে দরকার পড়ে; এটা কি কেবলই দেহের ক্ষুধা, মনের টান কি একদমই নেই! মনের টান থাকলে অবশ্যই দিনেও তো একটু কাছে আসতে পারে,পাশে বসে দু দন্ড গল্প করতে পারে, কিন্তু না নয়ন তারার কাছাকাছি কেবল দুটো সময়ই থাকে,এক রাতে,দুই খাওয়ার সময়! ঐ মুহুর্তে মনে হয় নয়ন তারাকে যতটা ভালোবাসে তার বিন্দুমাত্রও অন্য কেউ বাসতে পারবে না! কিন্তু এ ছাড়া সবসময় মনে হয় তারা নয়নের জীবনে কেবল কিছু সময়ের প্রয়োজন,অথবা নয়ন এখনও তারার মাঝে নিজেকে বিলিন করতে দ্বিধাবোধ করে!
এই যে ঘনঘন তারাদের এলাকায় যাওয়া এটা নিয়েও তারার মাঝে ভাবনার উদয় হয়েছে,তার কারণও সুস্পষ্ট! কারণ ঐদিকে নয়নদের কোন আত্নীয় নেই, আবার নয়নের ব্যবসায়িক কারণও তারার দৃষ্টি গোচর হয়নি,তারা জিজ্ঞেস করলেও এড়িয়ে গেছে! এটাই তারাকে ভাবায়,তবে কি কাজে নয়ন আজ কতদিন ধরে অত দূরে যাচ্ছে আবার থাকছেই বা কোথায়?
নয়ন কাল বিকালে গেছে,আজ আসবে রাতে তাও নাকি অনেক দেরি হবে! খবর পাঠিয়ে দিলো,তারা তাই ঘরের কাজ করে নিশ্চিত হয়ে রাতের রান্নার জন্য কচু শাক কাটছিলো,বেলা গড়িয়ে বারোটা পার হয়ে গেছে, গতকাল রাতের তরকারি ছিলো,সকালে বৌ শ্বাশুড়ি গত কাল রাতের ভাত আর তরকারি দিয়েই চালিয়ে নিয়েছিলো এরপরও অনেকটা তরকারি থেকে গিয়েছিল সেগুলো তারা আরো একবার গরম করে রেখে দিয়েছিল, এছাড়াও কামলাদের( দুঃখিত এমন ভাষা ব্যবহারের জন্য কিন্তু বোঝানোর জন্য আঞ্চলিক ভাষায় যা বলে তাই বললাম) জন্য রান্না করা কুমড়ো দিয়ে গুঁড়ো চিংড়ি,গাছ আলু দিয়ে পুঁটির ঝোল তরকারি আর ডাল থাকবে তা দিয়েই চালিয়ে দিবে আজকের দুপুরটা!এসব ভাবনার মাঝেই হাতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলো! এরমধ্যেই দৌড়ে এলো পাশের বাসার টুম্পা নামে এক কিশোরী! এর মধ্যে কেবল এই টুম্পার সাথেই ভালো ভাব হয়েছে তারার! ১৫/১৬ বছর বয়সী টুম্পা একদম মুনের মতোই ছটফটে! নিজের বোনের বয়সী একজনকে পেয়ে যেন তারা নিজের বোনকেই পেয়েছে,তার মধ্যে মেয়েটা এ বাড়িতেই পরে থাকে বেশি সময়; হয়তো সেও তারার সঙ্গ পছন্দ করছে!
-- ভাবী যাইবেন নি?
-- কুনহানেয়?
-- মাইনদের বাড়ি?( মাঈনউদ্দিন খলিল)
-- মাইন কে?
-- ঐ যে পিচ্চি একটা পোলা আমার লগে আহে মাঝে মইধ্যে,ঐ যে যেইডার নাক দিয়া হারাদিন সর্দি পড়ে!
-- ওহ্ ও! ঐ বাচ্চাগো বাইত্তে?
- হ,আয়েন,!
-- ক্যান? হ্যাগো বাইত্তে যাইবা ক্যান?
-- হেগো বাইত্তে মেশিন লাগাইছে?
-- কিয়ের মেশিন?
-- ওমা আপনে হুনেন না,ঐ যে ভটভট শব্দ অয়?
-- হ তাতো পাই কিন্তু হেইডা কিসের মেশিন হেইডা তো কইবা?
-- আল্লাহ ভাবী পানির স্যাচ পাম্প লাগাইছে? পুকুর হ্যাচতাছে ?
-- ও আইচ্ছা! আমি আবারও কই কি না কি অইতাছে?
-- ভাবী চলেন যাই,গিয়া দেহি মাইনরা কতগুলান মাছ পাইছে?
-- আমি? কিন্তু আমি ক্যামনে?
-- হ আপনে! ক্যান কি অইছে?
-- আম্মা বকা দিবো, তাছাড়া আমি নতুন বউ! আমার হুটহাট এদিকে ওদিকে যাওয়া উচিত না!
-- কিছু অইবো না,আমরা যামু দেখমু তারপর চইলা আসমু! আপনে আহেন!
কথা বলে তারার হাত ধরে টানাটানি করতে লাগলো,তারার চেয়ে কিছুটা দূরে নয়নের মায়ের ঘর উনি নিজের ঘরে বসেই তারাকে দেখছিলো,তাই পুরো কথাগুলোই শুনেছে! উনি কিছু একটা ভেবেই একটু জোরেই বললেন,
-- যাও বউ; যাইয়া দেইখ্যা আহো, সারাদিন বাড়ির মইধ্যেই থাকো, গিয়া একটু হাইট্টা আহো,ভালো লাগবো,তয় কারো লগে বেশি কথা কইয়ো না!
শ্বাশুড়ির অনুমতি পেয়ে তারা এমনিতেই আশ্চর্যের চরমে তার মধ্যে আবার পরের বলা কথায় কিছুটা আরো বেড়ে গেছে, কিন্তু তারার ভাবনা বেশিদূর এগোতে পারলো না ছটফটে টুম্পার কারণে,
-- চাচী আম্মা অনুমতি দিছে এহোন চলেন!
টুম্পার সাথেই এসেছিলো মাইনদের বাসার পুকুর পাড়ে, অনেকেই অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেও তারার উত্তর হুহা কিংবা নিরবতায় ছিলো, শ্বাশুড়ি মায়ের নির্দেশ সে কড়ায় গন্ডায় পালন করেছে, কিন্তু বিপত্তি ঘটে যাওয়ার সময় পেছন থেকে শোনা কথায়!
কি শুনলো? নয়নের বউগুলা! মনে হলো ঘুরে তাদের একবার জিজ্ঞেস করি, পরক্ষনেই ভাবলো বাইরের মানুষের থেকে ঘরের মানুষ সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করা ঠিক কতটা উচিত! কিন্তু মনের মাঝে যে খচখচানি শুরু হয়েছে তার উপক্রম কিভাবে করবে?
পর্ব ১৫
নয়ন বাড়ি এসেছে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে,গোসল করে মায়ের ঘরে গিয়ে তার সাথেও কিছু সময় কাটিয়ে এসেছে, কিন্তু তারাকে এসে বারান্দায় বসে থাকতে দেখেছে এখনও সেভাবেই বসে আছে!চোখ মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা হয়েছে! কিন্তু কি হয়েছে? মায়ের সাথে কিছু? নাহ! তার মা এমন নয় যে কোন কিছু নিয়ে ছেলের বউয়ের সাথে বাকবিতন্ডায় জড়াবে,উনি না খেয়ে থাকলেও কখনো এমন কিছু করবে না; তাছাড়া তারাকেও এতদিনে যতটুকু বুঝেছে তাতে নয়ন নিশ্চিত তারাও ঝগড়া কিংবা মনোমালিন্য হয় এমন কোন কিছুতে নিজেকে জড়াবে না! প্রায় তিনমাসের সংসারে এখন পর্যন্ত ওর চোখে পড়েনি তারার বেজার মুখ কেমন! মেয়েটা সবসময় হাসিখুশি থাকতে পছন্দ করে,নিজেও, অন্যকেও মাতিয়ে রাখে! যদিও নয়নের সামনে শান্ত চুপচাপ থাকে কিন্তু তার অগোচরে সে হয়ে উঠে ছোট্ট রঙিন প্রজাপতির মতো!
- - কি অইছে আমার একমাত্র বউয়ের? আইছি পরে থেইক্কা দেহি এইহানে থম মাইরা বইয়া রইছো? আমি আইছি হেই কুনসময় তহন থেইক্কা কথাও কইলা না,কইলাম গোসল করমু গামছা দিতে তাও দিলা না? কি অইছেডা কি?আম্মার লগে কিছু অইছে? আম্মা কিছু কইছে? কইলে আমারে কও!
নিজের মাঝেই নিজের সাথে লড়াই করছিলো এত সময়! যেই মানুষটিকে বিশ্বাস করে নিজের সব আপনজনকে ছেড়ে সারাজীবন এর জন্য চলে এসেছে সেই মানুষটিই তাকে ঠকাচ্ছে এটা কিভাবে মেনে নিবে তারা!
তারার হেলদোল নাই দেখে নয়ন নিজের ডান হাত দিয়ে তারার কাঁধে হালকা ধাক্কা দিলো,ধাক্কা খেয়ে তারা চোখ তুলে নয়নের দিকে তাকালো,ধক্ করে উঠলো নয়নের বুক,তারার চোখে পানি,লাল রক্তের ন্যায় রুপ নিয়েছে ভেতরের শ্বেত ধূসর অক্ষিগোলক, নিজের মাঝে পোষা কঠিন মানব রুপটা অতলে তলিয়ে গেল মুহুর্তেই, নয়ন ব্যতিব্যস্ত হয়ে তারার সামনে হাটু মুড়ে বসে পড়লো,
-- তারা কি অইছে? কানতাছোস ক্যান? আম্মা কিছু কইছে?
কিছু একটা মনে হতেই তারার হাত চেপে ধরে ধীর কন্ঠে বললো,
-- তুমার কি শরীর খারাপ অইছে,না মানে মাসিক শুরু হইছে?
শেষের কথাটা আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,তারা শুধু অপলক হয়ে দেখছে,কে বলবে এই মানুষটি আজ তিন মাসের বেশি সময় তাকে এভাবেই ঠকিয়ে যাচ্ছে, এখন একে দেখলে বোঝার উপায় আছে?তারাও তো বুঝেনি,কত যত্ন করে,কত খেয়াল রাখে,হয়তো ভালোবাসে কিনা তারা বুঝে না কিন্তু যতন করে আগলে রাখে এটা তো তারা বুঝতে পারে! কি বলবে তারা,যা শুনেছে সেটা কি সরাসরি জিজ্ঞাসা করবে নাকি অন্য কারো কাছে থেকে আগে জেনে নিবে? আচ্ছা এটা কি তারার বাড়ির সবাই জানে?জানার তো কথা কারণ তারা তো বিয়ের আগে খবর নিয়েছিল নয়ন সম্পর্কে তবে নিশ্চয়ই অজানা নয়! তাহলে শুধু কি তারা একাই অজ্ঞাত এই বিষয়ে!না বেশি ভাববে না, সন্দেহের বশে নিজের ক্ষতি করবে না! তার চেয়ে সরাসরি নয়নকে জিজ্ঞেস করবে,নয়ন বলেছিলো তার সম্পর্কে যাই জানার ইচ্ছা তা যেন তাকেই জিজ্ঞেস করে!
-- আমি আপনের একমাত্র বউ? তাহলে আগেরগুলা কি আছিলো, আচ্ছা আপনের বড় বউ কি আমগো ঐদিকেই থাকে? আপনি কালকে রাইতে কি তার লগেই আছিলেন?
ধাক্কা না বড়সড় বজ্রাঘাত হলে যেমন হয় নয়নের মনেও এখন এই মুহূর্তে ঠিক তেমনি এক ভাঙনের শব্দ হলো মনে হয়,তারা কি তাকে সন্দেহ করছে,তারা এ কেমন প্রশ্ন করলো? তারা কি জানে না তার সাথে নয়নের কোন সম্পর্ক নাই! থাকবেই বা কেন; যে বিয়ের মাঝ রাতে পরপুরুষের হাত ধরে পালিয়ে গিয়ে তার সম্মান ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে, সমাজের মানুষের সামনে তাকে করেছে অসম্মানিত, অবাঞ্ছিত তাকে নয়ন কখনো মনে ধরে রাখতে পারে না! সত্যিই রাখেনি! হ্যা রেখেছে;মিথ্যা বলবে না,নয়ন তাকে মনে রেখেছে তবে ভালোবাসা মাখিত ঘৃনায়! হ্যা তাকে নয়ন ঘৃনা করে কিন্তু ভালো তো বেসেছিল এক সময় তাই অস্বীকার করতে পারছে না! কিন্তু তাই বলে তার সাথে রাত্রীযাপন? অসম্ভব! যার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে আরো তিন বছর আগেই তার সাথে রাত্রীযাপন কিভাবে! যে নারী বিবাহিত হওয়া সত্ত্বে নতুন বরকে বাসরে ফেলে প্রেমিকের হাত ধরে পালায় আর যাই হোক কোন সুস্থ আর স্বাভাবিক পুরুষ মানুষের পক্ষে তাকে নিয়ে সংসার করার কথাও ভাবা সম্ভব নয়,রাত্রীযাপন তো দূরে থাক! কিন্তু কথা হলো হঠাৎ তারা কেন এই প্রশ্ন করছে? বিয়ের এতদিনেও কোনদিন তারা নয়নের আগের বিয়ে নিয়ে কিছু জানতে চায়নি তবে এখন কেন?
-- তুমার আ্যামন ক্যান মনে অইতাছে?
-- আমার উত্তর দ্যান!
-- না মানে কি কইতাছো তুমি? আমি ক্যান তার লগে থাকুম! আর তুমার মাথায় হঠাৎ এগুলা ক্যামনে আইলো?
-- ক্যান কি ভাবছিলেন সারা জীবন সত্য কথা লুকাইয়া রাখবেন,আর আমি জানতেই পারমু না!
-- কি লুকাইছি? কিসের সত্যি জানছো,কোন সত্যের কথা কইতাছো?
-- আপনে বিয়াইত্তা, আপনের আগেও একটা বিয়া অইছে,বউ আছিলো এগুলা কি মিছা কথা?
-- না মানে না সত্য?
-- তয়, হেইডা আমারে ক্যান কননাই?
-- কই নাই মানে? আম্মা তো..
-- আপনে আমারে ঠকাইছেন! বউ থাকতেও আমারে বিয়া করছেন,আর এহোন লুকাইয়া লুকাইয়া হ্যার লগে গিয়া থাকেন! ক্যান করছেন কন? আমরা গরীব, অসহায় তাই বইল্লা আমগো আ্যামনে ঠকাইলেন ক্যান? আপনের বউ থাকতেও ক্যান আমার মতো আবিয়াইত্তা একজনরে বিয়া করছেন?
-- তারা তুমি ভুল বুঝতাছো? য্যামনডা ভাবতাছো ত্যামন কিছুই না! আমি তো মনামীপুরে যাই খালি....
-- আমি হুনতে চাই না আপনের প্রথম বউয়ের লগে আপনের গোপন মুহূর্তের গল্প! আমি খালি আমার উত্তর চাই, আপনের ঠিক কয়ডা বউ?
তারা চিৎকার করে কান্না করছে তার সাথে অবিরত নিজের প্রশ্নের তীর নয়নের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে,নয়ন হতভম্ব হয়ে খালি দেখছে কান্না-রত তারাকে ,কি বলবে? তবে কি তারা জানে না তার আগের বিয়ের কথা? জানলে নিশ্চয়ই এমন ব্যবহার করতো না!
-- তুমি এগুলা কি কইতাছো? মানি আমার আগে একটা বিয়া অইছিলো তার মানে এই না আমি এহোনও তার লগে যোগাযোগ রাখি,আর আমার বউ কয়ডা মানে?বর্তমানে আমার একমাত্র বউ তুমি, তাছাড়া তার সাথে আমার...
-- আপনে ডকাইছেন আমারে, আমার পরিবারের সবাইরে ঠকাইছেন? আমি কুনদিনও আপনেরে ক্ষমা করমু না!
নিজের কথা শেষ করেই তারা দৌড়ে বেরিয়ে গেল,রেখে গেল মুমূর্ষু হৃদয়ের একজন পুরুষকে!নয়ন নিজের পায়ের দিকে তাকালো, মনে হচ্ছে ওর পা কাঁপছে, নাকি জমিন কাঁপছে; তারা ওকে ঠক বললো? নয়ন তারাকে ঠকিয়েছে? কিভাবে? নয়ন তো সবটা বিয়ের আগেই বলে দিয়েছিলো,হ্যা নয়ন নিজে গিয়ে বলেনি তবে ঘটক; তার মানে কি কেয়ামত মোতাশা বলেনি নাকি ওর নিজের মা ই বলেনি! ধাপ করে বসে পড়লো! মাত্রই তো ভালো থাকার পথটাকে আঁকড়ে ধরেছিলো এর মধ্যেই এমন ঝড়ে সবটা এবড়ো-থেবড়ো কেন হলো?
বয়স তখন পঁচিশ ; দোকানের তখন প্রায় পাঁচ বছর, আল্লাহর রহমতে নয়নের ব্যবসায় উন্নতি সবার চোখে পড়ার মতো! তেমনি চোখে পড়েছে বিবাহযোগ্যা সব কন্যার পিতাদের,তারই সুবাদে মিয়া বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল কেয়ামত মোতাশা! নয়নের জন্য স্থানীয় এক প্রভাবশালীর মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে! নিঃসন্দেহে নয়নদের জন্য এটা সৌভাগ্যের ব্যাপার! ছেলের বয়স আর আশেপাশের মানুষের ছেলের প্রতি আকর্ষণ দেখে আম্মা সিদ্ধান্ত নিলেন ঘরে পুত্র বধূ তুলবেন! নয়নেরও মর্জি ছিলো!যেমন কথা তেমন কাজ, দুই পরিবারের কথা অনুযায়ী পাত্র পাত্রীর মতামত নিয়ে বিয়ের দিন ধার্য হলো! ঠিক হলো পনেরো দিনের মধ্যেই বিয়ের দিন,এত তাড়াহুড়া করার কারণ নয়নদের জানা ছিলো না,ছেলের বউ ঘরে আনার খুশিতে আম্মাও অত খোঁজ খবর নিলেন না!
পর্ব ১৬
পনেরো দিনের সময়ে বেশ কয়েকবার পাত্র পাত্রীর দেখা হয়! স্বভাবতই নিজের হবু বউয়ের প্রতি এক অন্য টান অনুভব করে নয়ন,শিউলি নামের সুন্দরী সেই রমনীর মুখশ্রী ছিলো শিউলির মতোই স্নিগ্ধতায় ভরপুর; মায়াবী হরিণের ন্যায় ডাগর ডাগর টানা কাজল কালো চোখ, ছোট পাতলা ঠোঁট আর ফর্সা বদনের নারীটি কে দেখলে ২৫ বছরের উদ্দীপ্ত যৌবনের অধিকারী নয়নের অন্তরে প্রেমের ঝড় তুলতো, খানিকটা দুরত্ব বজায় রেখে চোখে চোখ মিলিয়ে নিরবেই বলতো বহু কথা!তাকে দেখলেই মনে হতো ভোরের শিশিরে ভেজা সদ্য ফোঁটা শিউলি যাকে দেখলেই একবার ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছা করতো কিন্তু কখনো তাঁকে ছোঁয়া হয়নি !
পনেরো দিনে বেশ কয়েকবার দেখার ব্যাপারটি কেবল সেই সুন্দরী রমনীর কারণেই হয়েছিলো, গঞ্জের স্কুলে যাতায়াত করা ছোট্ট ছোট্ট ছাত্র ছাত্রীদের হাতে সে গুঁজে দিতে দেখা করার চাহিদা সম্পন্ন ছোট একটি রঙিন চিরকুট! কখনো স্কুলের মাঠের পার্কে কিংবা কখনো মাদ্রাসার পাশে থাকা কদমতলাতে! সে খুবই আগ্রহ নিয়ে নয়নের সাথে কথা বলতো,কখনো তার আচরণে সন্দেহ করার কোন কারণ নয়নের দৃষ্টিতে পড়েনি! কিন্তু?
শিউলি ছিলো স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাধারী দলের প্রধানের মেয়ে,যার সুবাধে বিয়ের ব্যাপারটা বেশ রমরমা একটা ভাব ফুটে উঠে,এতে এলাকায় হঠাৎ করেই নয়নের কদর বেড়ে যায়, দোকানের বেচাকেনাও বেড়ে যায়, বিয়ের আগেই ওমুকের জামাই হিসেবে অত্র এলাকার সব মহলের মানুষই যথেষ্ট কদর করতে লাগলো! বাপের ক্ষমতার বাইরেও শিউলি ছিলো অসম্ভব সুন্দরী একজন মেয়ে,ঢাকার সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে, বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে তার সরব উপস্থিতি ছিলো লক্ষনীয়! এমন একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়া নির্ঘাত নয়নদের মতো ছেলেদের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার,নয়নও সারাজীবন এমন একজনকেই চেয়েছে!
নিজের পড়াশোনা কলেজের গন্ডিতেই বন্ধ হয়ে যাওয়াতে পড়াশোনার প্রতি এক অন্যরকম আবেগ কাজ করতো,তাই নয়ন নিজে কষ্ট করে নিজের বোনকে যেমন পড়িয়েছে তেমনি সবসময় মনেপ্রাণে চেয়েছে তার জীবনসঙ্গীও যেন অনেক শিক্ষিত একজন নারী হয়,যে সামাজিক ভাবে থাকবে সবার কাছে উদাহরণ হিসেবে; মানবিক গুনাবলীতে যার অন্তঃস্থল থাকবে ভরপুর ,মানুষকে মানুষ ভাববে তার কর্মের কারণে সে কখনো কাউকে ছোট করে কথা বলবে না! রুপে গুনে যে হবে তার মনের মাধুরী মেশানো কল্পনায় আঁকা রমনী! বিয়ের প্রস্তাব আসার পর নয়ন যেদিন শিউলিকে প্রথম দেখতে যায় সেদিনই মনে ধরে খুব, অজান্তেই হয়তো হারিয়ে বসেছিলো নিজের মন নামক অমূল্য সম্পদ,প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে একদম হাবুডুবু খাওয়ার অবস্থা তার,আর এটাই হয়তো তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো,ভাবতেই পারেনি ঠিক কতগুলো টুকরো হবে তার মন নামক মসজিদের মিনার গুলো, ছোট্ট কোমল হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কখনো হয়তো বন্ধ করতেই পারবে না,বদলে যাবে তার জীবনের সহজ-সরল হিসাবের পাতাগুলো!
শিউলির সাথে বিয়ে হওয়াতে এলাকায় নয়নের সম্মান অনেক বেড়ে গিয়েছিল,অত্র এলাকায় সবচেয়ে বড় পরিবারের মেয়ের জামাই হবে বলে বেশ প্রশংসিত হতো সবদিকে! বিয়ের একদিন আগেও শিউলির সাথে নয়ন অনেক সময় কাটিয়েছে,তার জন্য খুব সুন্দর এক জোড়া নুপুর গড়িয়েছিলো, বিয়ে উপলক্ষে সেটা শিউলির পায়ে পড়িয়ে দিয়েছিল,মজা করে বলেছিল,
নয়ন:- তুমি আমগো এলাকার মাইয়া,তুমার বিয়া যদি আমার লগে না অইয়া অন্য কারু লগে অইতো তাইলেও তো তুমার বিয়ার দাওয়াত খাইয়া তুমারে উপহার দেওয়া লাগতো, যেহেতু বিয়া তুমার আমার লগে অইতাছে তাই তুমি আমার তরফ থেইক্কা একখান উপহার আরাইয়া ফেললা কিন্তু আমার মনে অইতাছে এইডা ঠিক না তাই আমি ভাবলাম তুমারে এলাকার বড় ভাই অইয়া একখান উপহার তো দেওয়াই যায়, বিয়ার খাওনের সময় দিতে পারুম না তাই আগেই দিয়া দিলাম! কি কও খুশি তো?
নয়নের পাগলামী কথায় খিলখিলিয়ে হেঁসেছিলো সেদিন ,তার উত্তর ছিলো লজ্জা মাখা বদনে নমনিত নজর আর ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা অসম্ভব সুন্দর হাঁসি,নয়ন মুগ্ধ হয়ে শুধু দেখছিলো তাকে, পরক্ষণেই সে নয়নের হাতে চাপড় মেরে বললো,,
-- ধ্যাত আপনার খালি উদ্ভট কথা!
-- উদ্ভট? উদ্ভট কথা? কি কও!আমি তো তুমার শুভাকাঙ্ক্ষী অইয়া কথাখানি কইলাম আর তুমি কইলা উদ্ভট!
-- তাইলে উদ্ভট নয় তো কি! নিজের হবু বউরে কেউ কয় ভাই মনে কইরা উপহার নিতে!
-- ওহ ঐডা তো কথার কথা! আমি কি সত্যই তুমার ভাই হই নাকি!
-- আইচ্ছা কাইল থেইক্কা তো আর আমগো দ্যাহা অইবো না !
-- হ,বিয়ার আগে আর দেখা করতে পারমু না! আইচ্ছা বিয়ার পর আমি তো আবারও শহরে যামুগা তখন আপনে ক্যামনে থাকবেন?
নয়ন করুন চোখে তাকালো শিউলির দিকে,শিউলি নিজের নরম তুলতুলে পায়ের গোছানো সুন্দর আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছোট ছোট গর্ত সৃষ্টি করছে,নয়ন তার পায়ের খেলা দেখতে দেখতে তার উত্তর দিলো,
-- তুমার পা জোড়া সুন্দর,তার চাইতেও সুন্দর তার আঙ্গুল,তুমি পায়ে আংটি পড়তে পছন্দ করো তাই না!
-- হ ,আমি যখন কলেজে উঠছিলাম তখন থেইকাই পড়া শুরু করি, আমার সবসময়ই সাজগোজ করতে ভালো লাগে!
-- তুমি আ্যামনিতেই সুন্দর আরো বেশি সুন্দর লাগে যহন আ্যামন করে সাজগোজ কইরা থাহো!
-- ক্যান আপনের সাজগোজ করা ভালা লাগে না?
-- হ লাগে,ক্যান লাগবো না! আমি তো সবসময় চাইতাম যাতে আমার বউ সাজগোজ কইরা আমার সামনে ঘুরঘুর করে! আল্লাহর রহমতে তুমারেও বানাইছে আ্যামন!
-- যদি আমাগো বিয়াডা না হয়?
-- কি কও এগুলা; বিয়া অইবো না ক্যান?
-- আরে আপনে তো গুরুত্ব দিয়া দিলেন,আমি তো আ্যামনিতেই কইলাম!
-- আ্যামন কথা কইবা না! আমার ভাল লাগে না!
-- আপনে কি আমারে ভালোবাসেন?
-- তুমি আমার বউ অইবা, তুমারে ভালোবাসবো না তো কারে বাসবো!
শিউলির ঠোঁটের কোনে লজ্জা রাঙ্গা হাঁসি ফুটলো, এভাবে কেউ সরাসরি বলতে পারে তা নয়নকে না দেখলে বুঝতেই পারতো না! নয়ন শিউলির হাসি মাখা ঠোঁটে মোহনীয় চাহনি নিক্ষেপ করে বললো,
প্রেয়সীর ঠোঁটের হাসি,
আমি বড্ড ভালোবাসি!
তার কাজল কালো ডাগর নয়ন,
সহস্রাধিক বাড়িয়ে দেয় আমার হৃদয়ের স্পন্দন!
কানের ঐ ঝুমকো দুল,
যেন শিশিরের উপর আছড়ে পড়া সদ্য ফোঁটা নয়নতারা ফুল!
হাতের ঐ সোনালী বালা,
মনে করিয়ে দেয় এবার আমার নিঃশেষ হবার পালা!
নাকের ঐ ছোট্ট ফুল,
মনে দিয়ে যায় সুখেরই দোল!
তারে দেখলে বাড়ে হৃদয়ের চিনচিন,
তারে বিনা প্রেম হবে কি কোনদিন!
মরনের তরে চেয়েছি যারে,
বিধাতার রহমতে পেয়েছি তারে;
পর জন্মে চাইবো তারে,
এই জনমে পাইলাম যারে!
হবে কি সে মোর সুখের দিক,
তারে বিনা থাকবো আমি বেদিক!
কোনদিন নিঃশ্বাসে হলে অবরোধ,
মোর প্রিয়ার বিচ্ছেদই হবে সেই শোক!
-- বাহ্ সুন্দর একখান কবিতা কইলেন তো? কোন কবির এইটা?
-- নয়ন মিয়া!
আবারও সেই ঝংকার তোলা হাসি, যাতে নয়ন মিয়ার গলায় পড়েছিলো ফাঁসি! আরো নানান কথায় কেটে গিয়েছিল অনেকটা প্রহর, এরপর দুই জন দুই দিকে ছড়িয়ে যায়!
গায়ে হলুদের দিন, নয়নের মা নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বেশ ধুমপান করে আয়োজন করে একমাত্র ছেলের বিয়ের জন্য,পুরো গ্রামের এমন কেউ ছিলো না যাকে তিনি দাওয়াত করেনি,সদ্য নাম ফোটা ব্যাবসায়ী নয়ন মিয়ার বিয়ে নিয়ে এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গেরও অনেক আগ্রহ উচ্ছাস ছিলো! হলুদের ডালা ভর্তি তত্ত্ব নিয়ে গিয়েছিল মেয়ে বাড়িতে! চারদিকে নয়নের মায়ের এই খুশির প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছিলো আর এতেই যেন তাদের উপর, তাদের সুখের উপর বদলোকের বদ নজর লেগেছিল!
বিয়ে করে বউ নিয়ে আসতে আসতে প্রায় রাত ১১ টার বেশি বেজে যায়,নয়নের ভাবীরা,অন্য বোনেরা, নয়নের ছোট বোন মনি সবাই হইহুল্লোর করেই বাসর সাজিয়েছিলো! নতুন বউকে ঘরে রেখে, তারা ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেয়, এরপর দল বেঁধে অপেক্ষা করে নয়ন আসার,,
-- এই এই চুপ সবাই,ভাইয়া আসতেছে!
মনির কথায় সবাই চুপ হয়ে ভদ্র হয়ে দাঁড়ায়,তাদের দেখে নয়ন কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলে,,
-- এই কি সব আমার দুয়ারে ক্যান?
-- তুমার জন্যই দাড়িয়ে আছি দাদা ভাই!
-- ক্যান?
-- ওমা হারাদিন তুমার লইগ্গা কত কষ্ট করলাম,বাসর ঘরও সাজাইয়া দিলাম,তার একটা পারিশ্রমিক আছে না!
-- ওমা এইডা তো ভালোবাইসাই করে মাইনসে! এইহানে পরিশ্রমের কি আছে,আর পারিশ্রমিকই বা কিয়ের!
-- দাদা ভাই!
-- আরে তুই আমার একমাত্র ছুড বইন,আমার বিয়াতে তুই আমার লইগ্গা এতটুকু কাম করবি না তো ক্যাডায় করবো?
-- তার মানে তুমি দিবানা?
-- না; সর এইহান থে!
-- এইডা কিন্তু ঠিক অইতাছে না নয়ন মিয়া ?
-- তুমরাও ঠিক করতাছো না,কি একটা অবস্থা, আমার ঘরের দুয়ারে দাঁড়াইয়া আমারেই ছিনতাই করার পরিকল্পনা আটছো?
নয়নের বড় ভাবীর অভিযোগের উত্তর নয়ন উক্ত কথাটি মজার ছলে বলে,এর মধ্যেই নয়নের চাচাতো বোন ন্যাকা কান্না শুরু করে দেয়,
-- আ্যামন করলে খেলমূ না!
-- কি খেলবি না?
-- নয়নদাদা আ্যামন ক্যান করতাছে! সুন্দরী বউ লগে সুন্দর বাসর ঘর সব মিলাইয়া আইজকা রাইত তোমার,তার লগে আমগোও একটু আনন্দ করতে দেও!
-- করো আনন্দ! তার লইগ্গা আমার পকেট ক্যান কাটবা?
-- এইডারে পকেট কাটা কয় না! কয় বকশিস লওয়া !
-- দাদা,দেও না!
-- না দিলে কিন্তু আইজ রাইতে শিউলি বেগমরে পাবা না,আইজ রাইতে শিউলি বেগমের লগে আমি থাকমু, ঠিক আছে!
-- এইডা আবার কি কথা বড় ভাবী? এইডা কিন্তু ঠিক না!
-- তুমিও ঠিক করতাছো না,এত কিপ্টামি ক্যান করতাছো মিয়া; নতুন বউ অপেক্ষায় আছে,আমগো দাবী দাওয়া পূরন কইরা চইলা যাও! হের অপেক্ষার
প্রহর শ্যাষ করো!
সবাই একসাথে হইহই করতে লাগলো,শেষে না পেরে বাধ্য হয়েই নয়ন সবার উদ্দেশ্যে পাঁচ হাজার টাকার একটি বান্ডেল দেয়,সবাই খুশি হয়ে নয়নের জয়ধ্বনি করতে করতে বেরিয়ে যায়! নয়ন এত সময় দুষ্টুমি করেই ওদের আটকে রেখেছিলো, এটাই তো বিয়ে বাড়িতে মজা!
ঘরে ঢুকে দরজা খুলে বিছানায় বসে থাকা টুকটুকে বেনারসী পরিহিতা নব বধূকে দেখে নয়নের হৃদস্পন্দন বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে গেল,ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো হয়তো এটাই শেষ দেখা ছিলো তার বিয়ে করা বউকে!
পর্ব ১৭
নয়ন মিয়া,
সম্বোধন করার মতো কোন সম্পর্ক আমাদের মাঝে হয় নাই, আপনার তরফ থেকে থাকলেও আমার তরফ থেকে নাই,তাই কোন সম্বোধন ছাড়াই এই পত্র শুরু করলাম ; ক্ষমা করবেন এভাবে ছেড়ে যাওয়ার জন্য কিন্তু আমি অপারগ; আপনিই একবার ভেবে দেখেন আমার সাথে আপনার যায়?কই আপনি আর কই আমি একবার ভেবে দেখছেন? পারিবারিক অবস্থা বাদই দিলাম, ব্যক্তিগত দিকটাই বলি ''আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় অনার্স পড়ছি,তাও আবার সবচেয়ে দামী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে, আমার সামনে বিশাল সুযোগ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সেই আমি কেমনে আপনার মতো একজন কামলার ঘরের বউ হইয়া সারাজীবন দাসীর মতো পড়ে থাকি?এটা কি আদৌও সম্ভব? কোন ভাবেই সম্ভব? আপনি আমার জায়গায় নিজেকে দাড় করিয়ে একবার ভাবেন তো?
এখন আপনি বলতে পারেন তাইলে আমি এই বিয়াতে রাজী কেন হইছি? তাহলে বলবো আমি আগেই বলেছি আমি অপারগ! এছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না! আমার পরিবারের সিদ্ধান্তের বাইরে একা কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়; তাই আপনার সাথে বিয়াতে রাজী হওয়াই ছিলো একমাত্র পথ এই পরিস্থিতি থেকে বের হবার!
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছেলের সাথে আমার সম্পর্ক, দীর্ঘ চার বছরের সম্পর্ক! আমরা একে অপরকে অনেক ভালোবাসি,আমি তাকেই ভালবাসি,বাবা আমার বিয়ে দিতে চায় এটা যখন আমাকে বললো তখন আমি তার কথা তাদের বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু সাহস করে বলতে পারিনি,
কারণ আমার প্রেমিক এখনও বেকার,সে কোন চাকরি বাকরি এখনও করে না,ঢাকায়ই মেসে থাকে, ওদের বাড়ি চিটাগাং,বাবার অবস্থা আমাদের চেয়েও ভালো , তবুও ও সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বেই নিজের খরচ চালায়, কোনরকম টিউশনি করে, কিন্তু এখনও চাকরি পায়নি তাই এমন একজনের কথা নিজের পরিবারের কাছে কিভাবে বলি? আর বললেও তারা কখনো মেনে নিবে না?
তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ওকে নিয়ে পালিয়ে যাবো এরপর বিয়ে করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবো!
সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সুদর্শন একজন পুরুষ, সবচেয়ে ভালো তার ফলাফল হয়,তার জন্য পাগল নয় এমন মেয়ে সারা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুঁজে পাওয়া মুস্কিল,এমন একজন পুরুষই সব মেয়েদের জন্য স্বপ্ন,স্বপ্নের পুরুষ; আর সেই মানুষটি আমাকে ভালোবাসেন,তাহলে আমি তাকে কিভাবে ঠকাই!
কিন্তু ছিলাম নিরুপায়, আমার পরিবার কিভাবে যেন তার কথা জেনে যায় এবং এর জন্য আমাকে জবরদস্তি এবার বাড়ি নিয়ে আসে আর এসেই খুব তাড়াহুড়ো করেই আপনার মতো একটা কামলাকে খুঁজে বের করে যার না আছে চাল আর না আছে চুলো! আমি বুঝিনা কিভাবে আমার মতো একজন শিক্ষিত আধুনিকমনা মেয়ের জন্য আপনার মতো অশিক্ষিত কামলা,দিন মজুরকে তারা পছন্দ করে? কোন দিকেই আপনি আমার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা রাখেন! আমি পারবো না আপনার মতো একজন মানুষের সাথে নিজেকে জড়িয়ে আমার সুন্দর গুছানো স্বপ্নগুলো গোয়াল ঘরের গরুর গোবরের সাথে মিশিয়ে ফেলতে! আর না পারবো আমার প্রেমিককে ঠকাতে তাই আমি চলে যাচ্ছি!
তাছাড়া কোন মুখেই বা ঠকাবো? কিসের আশায় ঠকাবো? আমার পরিবার কি আমার জন্য তার চেয়ে ভালো কিছু ঠিক করেছে!তার পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো এবং তাদের পারিবারিক অবস্থানও ভালো ! তাদের দেখলে এখনও মানুষ সম্মান করে মাথা ঝুকে সালাম করে আর আপনাদের? পুরো গ্রামে আপনাদের সবাই জানে কামলা হিসাবে! আমাদের বাড়িতেও আপনার বাপে কামলার কাজ করছে,আর সেই কামলার ছেলের সাথে আমার বিয়ে আমি কেমনে মেনে নেই?এমন একজনের সাথে যেমনি আমার পক্ষে থাকা সম্ভব নয় তেমনি বাবা মায়ের মুখের উপরে কথা বলাও সাহস নয় তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তাদের সাথে তাল মিলিয়ে নিজের সুযোগ সুবিধা বুঝে পালিয়ে যাবো!
তাই আমি টোপ হিসেবে আপনাকে ব্যবহার করতাম কিন্তু তাতেও বাঁধা হতো আমার পরিবারের লোকজন! আমি যখনই ঘরে থেকে বের হবার কথা বলতাম ততবারই আপনার নাম বলেছি, আপনার সাথে দেখা করতে যাবার বাহনায় বের হয়েছি কিন্তু তাতেও বিশেষ লাভ হতো না কারণ তারা আমার পিছনে লোক লাগিয়ে দিতো এতে করে আমি চেয়েও পালাতে পারিনি তবে আমার প্রেমিকের সাথে দেখা ঠিকই হতো ,সেও দুর থেকে দেখতো আর আমিও দেখতাম! আপনার সাথে যতবারই কথা বলতাম আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন আমাদের আশেপাশে একটি ছেলে ঘুরঘুর করতো সেই ছিলো আমার প্রেমিক তাহসান তাবিব,আমি আসলে তাকে দেখেই হাসতাম আর আপনি ভাবতেন আপনার বেহুদা কথায় হাসছি,যাই হোক তখনই আমরা পরিকল্পনা করি বিয়ের দিনই পালিয়ে যাবো কারণ তখন সবাই ব্যস্ত থাকবে,, কিন্তু কপাল খারাপ তাই তখনও সুযোগ হয়নি কিন্তু তাবিব ঠিকই পথ বের করেছিলো,সে উপহারের প্যাকেটে ঘুমের বড়ি ঢুকিয়ে দিয়েছিলো যেটা খেয়ে আপনি এখন গভীর ঘুমে! আশাকরি আপনার এই ঘুম লম্বা হবে! আমিও ততক্ষণে আমার স্বপ্নের পথে অনেক দুর এগিয়ে যাবো!
ক্ষমা আমি চাইবো না কারণ আমি ভুল করিনি,ভুলটা আপনার বামুন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর দুঃস্বপ্ন দেখার দুঃসাহসী কাজটা করেছেন তার জন্য, আপনার নিজের যোগ্যতা আর অবস্থা বোঝার দরকার ছিলো,যাই হোক আশাকরি আপনি নিজের জন্য যথাযোগ্য জীবন সঙ্গী পেয়ে যাবেন!
ভালো থাকবেন।
ইতি,
শিউলি মুক্তা ।
০/০/০
বাদামী আভা ধারন করা মোটা সাদা কাগজের চিঠিটা টুপটপ করে পড়া চোখের জলে ভিজে একাকার হয়ে গেছে, কিন্তু নিজের চোখকে থামাতে ব্যর্থ হচ্ছে তারা! চিঠি পড়েই এত খারাপ লাগছে,তবে যখন নয়নের সাথে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে তখন কেমন লেগেছিল! এর জন্যই কি নয়ন পড়ালেখার প্রতি এত বিরক্ত?
--আম্মা!
গতকাল রাতের ঘটে যাওয়া প্রতিটি কথা না শুনলেও ছেলে আর বউয়ের মাঝে যে কিছু একটা ঘটছে তা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হয়নি নয়নের মায়ের,তাও যে ছেলের আগের বিয়ে নিয়ে তাও বুঝতে পেরেছে,তাই ঘটনা বেশিদূর গড়ানোর আগেই তিনি চিঠিটা তারার হাতে তুলে দিলো যেটা কিনা উনি অজানা কারণেই তুলে রেখেছিলো। এটা তার ছেলের জীবনে লাগা সেই ঘায়ের দাগ যেটা তার চঞ্চল ছেলেকে শান্ত নির্জীব করে তুলেছে! সেই এক ঘটনা তার ছেলেকে কতটা বদলে দিয়েছে তা উনি নিজে স্বচোখে দেখেছে! ছেলের ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার জন্য অনেক মানুষের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে,মনে প্রাণে চেয়েছে সেই সব মানুষের অমঙ্গল হোক যারা কিনা তার ছেলের কষ্টে আঘাতের পর আঘাত করে গেছে!
-- আম্মা এরপর কি আর কখনো শিউলি আপার সাথে দেখা অয় নাই? আর কুনোদিন হেয় এই গিরামে ফিররা আয়ে নাই?
-- আইছিলো,হেই দিনের পর থেইকা ঠিক নয় মাস পর আইছিলো!
-------------------------------++++-------------------------------
পুকুর পাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কানে তব্দা লাগানোর মতোই অবস্থা করেছে,তার মাঝেও একদম নিশ্চিত হয়ে বসে আছে নয়ন, পুকুরের পাড় ঘেঁষে বেড়ে ওঠা খেজুরের বাঁকানো গোড়ার মাঝ বরাবর বসে পানিতে পা চুবিয়ে একমনে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের ফাঁকে দৃশ্যমান চাঁদের আলোয় নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করছে,তারার ব্যবহার নয়নের মনে আঘাত করতে পারেনি কারণ নয়ন জানতো একদিন এমন কিছু হবেই,তারা নয়নের আগের বিয়ের কথা যে জানে না তা নয়ন অনেক আগেই আন্দাজ করেছিলো কিন্তু নিশ্চিত ছিলো না,তবে এখন বুঝলো নয়ন এটা তারার পরিবারের কেউ ও জানে না,এতে নয়ন কষ্ট পেয়েছে,তারার পরিবারকে জানানো উচিত ছিলো, এমনকি তারাকেও জানানো উচিত ছিলো! নয়ন মাকে বলেছিল বিয়ের আগে বিষয়গুলো পরিষ্কার করে বলতে কিন্তু তিনি বলেননি ,কেন বলেননি হয়তো নয়ন তা বুঝতে পারছে কিন্তু তবুও উনি কাজটা ঠিক করেননি!
তারাকে না জানিয়ে বিয়েটা সম্পন্ন হওয়ার ব্যাপারটা নয়নকে কষ্ট দিচ্ছে, ওর মা ওকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন এতেও কষ্ট পেয়েছে,যদি নাই ভুগতো তবে কেন উনি আগের ব্যাপারগুলো বিয়ের আগেই পরিষ্কার করে বলেননি?
তারার এহেন প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক তবে তা করতে গিয়ে তারা নয়নের শুকিয়ে যাওয়া ঘায়ে পুণরায় আঘাত করেছে,দগ্ধ হয়েছে নয়নের যন্ত্রনার জায়গাগুলো! কষ্ট গুলো চাউর হয়েছে, নিজের যোগ্যতায় যেই দাগ গুলো মুছতে সক্ষম হয়েছে, মনে হলো সেটা কেবল তার অভ্যন্তরীন চিন্তা আসলে তেমন কিছুই হয়নি! আসলে মানুষের চিন্তার মধ্যে কখনো পরিবর্তন হয়না! হয় কেবল মুখের খোলসের!
নয়ন নিজ কর্মে সম্মান তো কুড়িয়েছে কিন্তু পূর্ব পুরুষের কাজের পরিচয় ঘুচাতে পারেনি,নয়নের এতে কষ্ট নেই,আক্ষেপও নেই কারণ তারা সৎ কাজ করতো, তাদের মেহনতের রোজগারের জোরেই আজ নয়ন গলা উঁচিয়ে কথা বলার সাহ পায় কিন্তু এই সমাজ আর সমাজের মানুষের থেকে মাঝেমধ্যেই পাওয়া নিম্ন রুচির ধিক্কার তাকে কিছু সময়ের জন্য ভেঙে দেয়, বিধ্বস্ত করে তার চিন্তাশক্তির শক্তিশালী জালটাকে!
নিজের কাঁধে ঠান্ডা কিছু অনুভূতি হলো,তার সাথে ভেসে উঠলো কারো হিচকি তোলার শব্দ, কাঁদছে কেউ?হ্যা কাঁদছে, পিছু ঘুরে কান্নারত তারাকে দেখে নিজের অপরাধের চাপটা আরো একটু বেড়ে গেল, সুউচ্চ মাথা টা নিজ দায়িত্বে ঝুঁকে গেল,স্বামীর লজ্জায়, অপরাধ বোধে ঝুকিত মাথা তারাকে আহত করলো, লম্বা সুঠামদেহী এই পুরুষকে সে সবসময় মাথা উঁচু করে গলা উঁচিয়ে কথা বলতে দেখতেই অভ্যস্ত,সে মানুষটি এখন তার সামনে এভাবে নত মস্তিষ্কে দাড়িয়ে আছে এ যেন স্ত্রী হয়ে মেনে নেওয়া তারার পক্ষে অসম্ভব,,তারা কেন পৃথিবীর কোন স্ত্রীই নিজের আদর্শ স্বামীর হেনস্থা হওয়ার রুপটা দেখতে চায় না!
-- তুমি এইহানে?
পর্ব ১৮
তারা নিরব হয়ে কেবল অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে,নয়ন পারলো না আর সইতে ,তাই উঠে দাঁড়িয়ে পিছু ফিরে যেই না তারাকে ধরতে যাবে এহেন মুহূর্তে পা পিছলে পড়ে গেল পুকুরে, হঠাৎ করেই এমন ঘটনায় প্রথমে তারা কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও পর মুহূর্তেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো,নয়ন চুবানি খেয়ে উঠে পানিতে ভাসমান অবস্থায়ই খিলখিল করে হাসা রমনীর হাস্যজ্জ্বল মুখটা দেখে থমকে গেল,এক মনে দেখতে লাগলো,তারা হাসি থামানোর চেষ্টা করে ঐ অবস্থাতেই বললো,
-- কেমনে পড়লেন!
নয়ন নিজের সম্বিত ফিরে পেয়ে বললো,
-- এই মাইজ রাইতে আমি পুকুরে পইড়া চুবানি খাইতাছি আর তুমি এভাবে হাসতাছো? একটুও কষ্ট অইলো না তুমার!
তারা নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করে বললো,
-- আমি কি করমু হাসি আইলে!
-- আইচ্ছা হাত দেও! আমারে উডাও!
নিজের কথা শেষ করে সাঁতরে কিছুটা কাছাকাছি এসে নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে তারাকে বললো,"ওর হাত ধরতে" তারা এগিয়ে এসে গাছের গুঁড়ির উপর উপর দাঁড়িয়ে কিছুটা ঝুঁকে নিজের হাত যেই না বাড়িয়ে দিলো ওমনি নয়ন একটানে তারাকে নিজের কাছে টেনে নিলো,তারা কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও পরক্ষনেই নিজেকে নয়নের বুকে আবিষ্কার করলো,নয়ন খুব গভীর করে জড়িয়ে ধরলো,এক হাত দিয়ে কোমরের একটু উপরে চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো অন্য হাত দিয়ে কোমরের কিছুটা নিচে ধরলো, শক্ত করে উঁচিয়ে তুলে রাখলো,চোখে চোখ রেখে,একে অপরের মুখের নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে একে অপরের মুখে, অশ্রুসিক্ত দম্পতি, দুজনের চোখেই অনুভূতি,কারো অপরাধবোধ তো কারো অনুতাপের ছায়া! নয়নের চাহনি গভীর,তারা নিজের স্বামীর এই নজরে নজর রাখতে না পেরে নিজের নজর ঝুঁকিয়ে নিলো, এরপর অনুতাপের কন্ঠে বললো,
-- আমারে ক্ষমা কইরা দিয়েন! আমি না জেনেই আপনেরে কষ্ট দিছি! আপনের মনে ব্যথা দিছি আপনে ক্ষমা না করলে তো আল্লাহও করবো না!
তারার কথায় নয়নের অপরাধের দায় যেন আরো বেশি বেড়ে গেল, নিজের অপরাধে নিজের স্ত্রীর কষ্ট হচ্ছে এটাই তাকে বেশি পোড়াচ্ছে, নমনিত নয়নে বিনা অপরাধে অপরাধী সাজা তারাকে কিছু সময় দেখলো এরপরই নয়ন শক্ত করে তারাকে জড়িয়ে ধরলো, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখলো কিছু সময়, নয়নের চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো গরম নোনাজলের ধারা , তারার গাল বেয়ে চিবকু ছুয়ে পুকুরের ঘোলা পানি স্পর্শ করলো সেই নোনাজলের ধারা, ঠোঁট ছেড়ে তারার গলায় মুখ গুঁজে অনুতাপের কন্ঠে বললো,
-- তুমি ক্যান ক্ষমা চাইতাছো,ক্ষমা তো আমার চাওয়া উচিৎ,তুমারে নিজের অতীত না জানাইয়া নিজের জীবনে জড়াইছি,আসলে আমি ভাবছিলাম আম্মা তুমাগো সত্যি কথাডা কইছে ,আমি কইছিলাম আগেই কইতে! আম্মা বলছিলো কইছে কিন্তু এহোন বুঝতাছি হেয় মিছা কথা কইছে! আমার আম্মার অইয়া আমি তুমার কাছে,তুমার পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইতেছি,ক্ষমা কইরা দিও!
আসলে আম্মার মনে তুমারে অনেক ধরছে যার কারণে আম্মা তুমারে নিজের পোলার বউ বানাইতেই অয়তো মিছা কথা কইছে,পাছে সত্য হুনলে তুমরা রাজী না অও!
তারা স্বামীর বুকের মাঝে একদম আদুরে কাঠবিড়ালীর ন্যায় লেপ্টে গেল,দু হাত নয়নের দু বাহুর মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে জড়িয়ে রইলো, এরপর বললো,
-- আপনে আর অপরাধে ভুইগেন না ,আমি মনে কিছু রাখি নাই,আম্মার প্রতিও অভিযোগ নাই,তিনি মা, নিজের সন্তানের জন্য যা ভালা মনে লইছে, করছে! তার প্রতি আর গোস্যা কইরেন না! তয় আমি চাই আমগো বাড়ির সবাইরে এই কথাটা জানাইয়া দিতে যাতে হ্যারা অন্যের কাছ থেইক্কা হুইন্না আমার মতো কষ্ট না পায়! নিজেরা কইলে কষ্ট কম অইবো আর আপনেরেও বিশ্বাস করবো তাই আমি চাইছিলাম!
-- কইয়া দিমু,কাইলই তুমাগো বাড়ি লইয়া যামু তুমারে,তুমি নিজেই হেগোরে কইয়া দিও, এরপর হ্যাগো যা সিদ্ধান্ত থাকবো আমি মাথা পাইত্তা লমু!
কথার পরিসমাপ্তি এখানে ঘটলো, এরপর নিরবতায় কেটে গেছে কিছুক্ষণ, তারপর বাড়লো আলিঙ্গনের মুহূর্তে, কিছু সময়ের দুরত্ব যেন একে অপরকে আরো বেশি কাছে টেনে নিলো, গভীর থেকে গভীরতর, মধুর থেকে মধুর হলো পরবর্তী ক্ষন গুলো, মিষ্টি আলিঙ্গন আরো ভালোবাসায় মাখোমাখো কাটলো রাতের সেই প্রহর!
নিজেদের মাঝে সম্পর্ক আরো মজবুত করে তুললো এই দম্পতি,ভেজা শাড়ী চিপকে আছে অঙ্গের ভাঁজে ভাঁজে, নয়নের দৃষ্টি লোভনীয় হয়ে উঠলো, কোলে করেই পুকুর থেকে উঠে সোজা নিজেদের ঘরে গেল,ছেলে আর ছেলের বউয়ের এই মধুর মুহুর্তের সাক্ষী রইলো স্বয়ং নয়নের মা ,আর সাক্ষী হলো আসমান, জমিন,বাতাস, মেঘ কাটিয়ে নিজেকে ঝলমলে করে তোলা মেঘ মুক্ত তারা ও চাঁদও!
পৃথিবীর সব জঞ্জাল সাফ হোক মানবতার তরে,মুক্ত হোক ধারা, মানুষের চিন্তার বিকাশ হোক মানবীয় গুনে, কর্মে হোক পরিচয়,জন্মে রউক শুদ্ধতা!
মানুষের জন্য মানুষ,তার পরিচিত কর্মেই হওয়া উচিত ; কার পূর্ব পুরুষেরা কি করেছে তা দিয়ে বর্তমানের কাউকে বিচার করা উচিত নয়! তেমনি বর্তমান দিয়ে ভবিষ্যৎ কিংবা অতীত ভাবা উচিত নয়! বর্তমান যা আজ আছে তাই! তাই নিয়ে সন্তোষ থাকা উচিত,তা দিয়েই নিজের পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত,তা দিয়েই অপর-পক্ষকে বিচার বিশ্লেষণ করা উচিত!
নয়ন নিজ কর্ম গুনে সমাজে আজ সম্মানিত,নিজ পরিশ্রমে আজকের নয়ন মিয়া হয়েছে, নয়ন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রম করে নিজের আজকের অবস্থা তৈরি করেছে! সুতরাং এটাই তার পরিচয়,এটাই তার পরিচিত!
তারা শিক্ষিত নারী, সুশিক্ষিত নারী! তাই নয়নের পরিস্থিতি বুঝতে বেশি সময় নেয়নি,আর শিউলি ছিলো শিক্ষিত তবে সুশিক্ষিত নয় তাই নয়নকে বুঝতেও সময় নেয়নি আর না বুঝেছে নিজের পিতা মাতার সম্মান, পারিবারিক অবস্থা নিয়ে গর্ব ঠিকই করেছে কিন্তু সেই পরিবারের মুখে কালি লেপন করতেও দ্বিধা বোধ করেনি! তার নয়নকে ছেড়ে চলে যাওয়াতে কেবল নয়নই নয় তার পরিবারেরও অসম্মান হচ্ছে, সামাজিক ভাবে তাদের মানমর্যাদাও ক্ষুন্ন হয়েছে!
-- আপনে এই জন্য আমগো এদিকে আইতেন?
তারার অশ্রুসিক্ত নয়নে খুশির ছাপ,চমকিত প্রশ্ন, নয়ন মুগ্ধ হয়ে দেখছে নিজের স্ত্রীর খুশি মাখা কান্না! দূর থেকে তারার বাবা মা দেখছে মেয়ে জামাইয়ের জুটিকে! মনে মনে আওড়ালো,,
-- মাশা আল্লাহ!
-- কানতাছো ক্যান তুমি? খুশি হও নাই?
-- আপনে এদিকে এই কামে আইতেন আর আমি আপনেরে কত কিছু কইছি? আল্লাহ কি আমারে মাফ করবো?
-- হুস কাইন্দো না! আমি কিছু মনে করিও নাই আর কিছু রাহিও নাই!তুমি কও ক্যামন লাগলো ঘর দুয়ার?
-- খুব ভালো, অনেক সুন্দর অইছে! আমি একটু ঘুইড়া দেখি?
-- হ দ্যাখো!
ছোট্ট দুই ঘরের বাড়িটা, কোনরকম ছাউনি দেওয়া পাকের ঘর সবটাই নয়ন পরিবর্তন করে দিয়েছে!
চারদিকে টিন দিয়ে,জমিন ঢালাই দিয়ে, রঙিন টিন দিয়ে ছাদ দেওয়া হয়েছে,বড় ঘর চারটি,বাইরের দিকে দরজা রেখে আরো একটা ছোট ঘর করা হয়েছে,পূর্ব দিকের বসার ঘরের মতো ঘর করা হয়েছে তার সাথে লাগিয়ে পাকের ঘর বানানো, রয়েছে,এখান দিয়ে সোজা চলে যাওয়া যাবে ক্ষেতে! পুকুরের সব কাজও সহজ হবে এখান দিয়েই!
তারা চারদিক ঘুরে মুগ্ধ হয়ে দেখছে নিজের বাড়ির এই পরিবর্তনীয় রুপ, এরকম একটা বাড়িই তো তার স্বপ্ন ছিলো ছোট্ট থেকে,বাবার সামর্থ্যের বাইরে ছিলো তার এই স্বপ্ন পূরন করা তাই তো কখনো মুখ ফুটে বলা হয়নি!তবে নয়ন কিভাবে বুঝলো?
-- আপনে তো সবটাই পরিবর্তন করে দিয়েছেন!
-- তুমার লইগাই তো!
-- আমি আপনের এই ঋন কেমনে শোধামু?
-- এই আল্লাহ কি কও এগুলা! আমার কাছে তুমার ঋন অইবো ক্যান? তুমি আমার একমাত্র বউ , আমার সবটাই তো তুমার লইগ্গা; তাইলে এই ক্ষুদ্র একটা বিষয়ে তুমি ঋণী অইবা ক্যান !
-- তবুও আপনে এই বাড়ির জামাই,জামাই অইয়া এই বাড়ির জন্য যা করছেন তাতো পোলারাও করে না!
-- আইচ্ছা অইছে থামো এইবার,কাইন্দা নিজের কি অবস্থা করছো, একদম পেত্নির নাহান লাগতাছে!
-- চলো ঘরের ভিতরে গিয়া দ্যাহো আমগো রুম পছন্দ অইছে নাখি?
-- হুম!
------------------------------------------------------------------
-- আপা দুলাভাই ম্যালা ভালা,দেহো ক্যামন কইরা আমগো ঘর দুয়ার সব বদলাইয়া দিলো,একদম চৌকিদারের বাড়ির মতোনই লাগতাছে এহোন!
-- হুম !
-- আপা দুলাভাই তুমারে অনেক ভালোবাসে তাই না কও!
-- হুম!( লজ্জা রাঙ্গা হাঁসি দিলো)
-- আপা কয়দিন রইবা এইহানে?
-- কাইলকাই যামু গা,তোর দুলাভাইয়ের কাম আছে!
-- কাইল ক্যান যাইবা,থাকো না কয়দিন, কতদিন অইলো তুমার লগে ঘুমাই না!
--- চাইলেই কি থাকা যায়,বাইত্তে অনেক কাম পইড়া রইছে, নতুন ধানের বীজ ফালাইছে,হেইদিকে খেয়াল রাখতে অয়,এইডা ছাড়াও আম্মা মুরব্বি মানুষ,দাদাজানের খেয়াল রাখতে কষ্ট অয়! চাইলেও থাকতে পারমু না!
-- আপা তুমার কথা অনেক মনে অয়, কতদিন অইছে তুমার লগে মাদ্রাসার ঘাটে বইসা বাদাম বুট খাই না! আপা জানো ঐ যে আমগো মাদ্রাসার মারিয়া আছে না!
ছোট বোন মুনের কথার উত্তরে তারা মাথা দুলিয়ে বুঝালো সে তার মনে পড়ছে,মুন বোনের সম্মতি বুঝে নিজের কথা চালিয়ে গেল,
-- আপা অর বড় বইন ফারিয়ার বিয়া অইয়া গেছে, জানো হ্যার জামাই কে?
-- কে?
-- আমগো মাদ্রাসার পাশে যেই মুদি দোকান আছে না ,যেইডা থেইকা আমরা মাথার জন্য কাশ্মীরী ত্যাল কিনছিলাম?
-- হুম!
-- হেইডায় যেই কালা পোলাডা কাম করতো, লম্বা,চুলগুলা ক্যামন মোরগ মোরগ কাটিং দেওয়া হেই পোলাডার লগে!জানো হেই পোলার লগে মাদ্রাসার পিছনের বাগান থেইক্কা ধরা খাইছে!
-- কি কস?
মুন কথা শেষ করেই হিহি করে হেসে উঠলো,তারা আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলো কেবল!
ফারিয়া স্থানীয় এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তির মেয়ে, যথেষ্ট সুন্দরী , তাছাড়া এলাকায় পর্দাশীল মেয়েদের মধ্যে তার বেশ সুনাম রয়েছে,তবে মেয়েটা যথেষ্ট নমনীয় হলেও পারিবারিক ভাবে কিছুটা অহংকারীও আছে ,তার ছোট বোন মারিয়া মুনের সাথেই পড়ে,মারিয়া মেয়েটি যথেষ্ট অহংকারী,দিন মজুরের মেয়ে দেখে মুনের সাথে বন্ধুত্ব করেনি, তবে কখনো খারাপ ব্যবহারও করেনি, কিন্তু এই ফারিয়া মেয়ের এমন চরিত্র বের হবে তা তারার ভাবনারও বাইরে! আবার ধরা খেলো তো খেলো তো তাও আবার কিনা সেই এক দিন মজুরের সাথেই! এর জন্যই হয়তো বলা হয়েছে অহংকারীর পতন নিশ্চিত!
পর্ব ১৯
মেয়ের মুখে জামাইয়ের অতীত জেনে যতটা না আশ্চর্য হয়েছে তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি আশ্চর্য হয়েছে মেয়েকে স্বাভাবিক ভাবে সবটাই মেনে নিতে দেখে!
-- মা তুমি বুইঝা সব সিদ্ধান্ত লইছো তো? তুমি না চাইলে আমি তুমারে এই জামাইয়ের লগে থাকতে দিমু না! আমি চাই না আমার ফুলের মতো মাইয়া সতিন কাটার ব্যদনায় জলুক!
-- হ মা; আমি অনেক ভাইব্বা দেখছি,এই বিষয়ে উনার কোন হাত নাই,উনি তো জানতোই না যে উনাদের তরফ থেইকা এই কথা আমগো লুকাইয়া রাখছে!তাছাড়া এহোন উনার আগের বউয়ের লগে কুন সম্পর্কও নাই,হ্যাগো তো এক লগে সংসারও অয় নাই যেই দিন রাইতে বিয়া অইছিলো হেইদিন হেয় চইলা গেছেগা তাইলে আমি ক্যান খামোখা নিজের সংসারে অশান্তি করমু! হেরপরও তুমার জামাই আমার কাছে মাফ চাইছে! হেরপরও কি কও আমি তারে ছাইড়া দিমু, এমন একটা মানুষরে কি ছাড়ন যায়? না বইলাও যেই মানুষটা আমগো এত ভালো পায়,সাহায্য করলো হের লগে এই নিয়া আমি কেমনে অশান্তি করমু, তাছাড়া তারে ছাড়ার কথাও আমি ভাবতে পারমু না মা!
-- আমগো কুন অভিযোগ নাই যদি তুমি ভালা থাকো,তয় আমিও বুঝতাছি জামাই আমগো ম্যালা ভালা মানুষ,হ্যার মতো জামাই পাওয়া ভাইগ্যের ব্যাপার! ঐ যে সুরাইয়ার জামাইডা ,মাইয়াডারে কি মারে,উঠতে বইতে মারে,খাওন দেওনা,বছরে এখখান কাপড়ও ঠিক মতো দেয় না,তাইর মইধ্যে বাপের বাড়ির লোকজন আইলেও কুন সমাদার করে না! কি যে যন্ত্রনায় রাখছে মাইয়াডারে!
-- কি কও!
মায়ের বাবা মায়ের সাথে নয়নের সম্পর্কে সবটা খুলে বললো,তারা প্রথমে কিছুটা উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া দেখালেও মেয়ের বুদ্ধিমত্তার কাছে শান্ত হতে বাধ্য হলো, তাছাড়া বিগত কয়েকদিনে নয়নের ব্যবহার ,তারার প্রতি টান সবটাই তাদের কাছে দৃশ্যমান, নয়ন স্বাবলম্বী,সৎ পরিশ্রমী, তাদের চেয়েও ভালো অবস্থানে থেকেও কতটা সহজেই তাদের সাথে মিশে গেছে, শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে কতটা যত্নে আছে, সবকিছু বিবেচনা করেই নিজেদের রাগ,ক্ষোভ নিজেদের ভেতরেই দমিয়ে রাখলো, কিন্তু মায়ের মন বলে তারার মা শেষের কথাগুলো তারাকে বললো, এরপরও তারার সিদ্ধান্ত তাদের ভালো লাগলেও মনের দুশ্চিন্তা দূর করতে ব্যর্থ হলো, কারণ সতীনের সংসার কতটা বিষাদময় তা গ্রাম অঞ্চলের প্রতিটি মানুষেরই জানা,দেখা যায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মাঝে একাধিক বিবাহের প্রচলন বেশি! এক্ষেত্রে অবহেলা আর অশান্তির শিকার হয় অহরহ অসহায় নারীরা!তারার মতো মুখ বুজে সহ্য করা নারীরা এই বিষয়ে প্রথম অবস্থানে থাকে।তাই তারার মায়ের এই দুশ্চিন্তা হওয়া নিছকই অযাচিত নয়!
যত ভালোই হোক এভাবে অতীত লুকিয়ে সম্পর্ক তৈরি হলে তাতে অপর পক্ষের প্রতিক্রিয়া খারাপই হয়,তাই সম্পর্ক তৈরি করার আগে অবশ্যই নিজেদের অতীত বর্তমান সবটা পরিষ্কার করে যাচাই বাছাই করে বলা উচিত, এবং খোঁজ খবর দেওয়া নেওয়া উচিৎ! আমাদের সমাজে বর্তমানে তালাকের সংখ্যা বাড়ছে হুরহুর করে! এর জন্য যেমনি দায়ী নানান পারিবারিক সমস্যা তেমনি দায়ী অতীত লুকিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা!
নানা অর্থনৈতিক সমস্যা সহ ব্যক্তিগত কারণও অন্তর্নিহিত তালাক নামক শব্দের প্রবল বৃদ্ধির জন্য,একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা বোধ কমে যাওয়া, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা,নারীর অধিক শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাতে পুরুষের সমঝোতার অভাব, বিয়ের আগের সম্পর্কে লুকায়ন করা, একজনের প্রতি পরিবারের সবার ইচ্ছে চাপিয়ে দেওয়ার যে জঘন্য মনমানসিকতা যৌথ পরিবারে দেখা যায় তাও একটা বিশাল কারণ হয়ে দাঁড়ায়!তাছাড়াও রয়েছে বয়সের বিশাল ব্যবধানের কারণে সৃষ্ট হওয়া শারীরিক অবস্থার পার্থক্য কিংবা অক্ষমতা যার দরুন অহরহ জড়িয়ে পড়ছে পরোকিয়াতে। বিচ্ছেদের প্রভাব কেবল দুটি জীবনেই পড়ে না,তাদের সাথে জড়িত সকল সম্পর্কের মানুষের মধ্যেই পড়ে,এর মধ্যে সবচেয়ে করুন অবস্থায় পড়ে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উত্তরসূরী অথবা সন্তানসন্ততি!যাই হোক বিচ্ছেদ কিংবা ডিভোর্স,গ্রাম্য ভাষায় ছাড়াছাড়ি যাই বলি আমাদের কারোই কাম্য নয়! আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থেও এই বিষয়ে আছে কড়া নিষেধাজ্ঞা,এই বিষয়ে ইসলামিক বিভিন্ন স্কলাররা হাদিস কুরআনের আলোকে বলেন,তালাক ইসলামে অপছন্দনীয় বিয়ে আল্লাহতায়ালার নেয়ামত। বিয়ের মাধ্যমে নারী-পুরুষের মধ্যে একটি নতুন সম্পর্কের বন্ধন তৈরি হয়। দুটি পরিবারের আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি হয়। নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একের অন্যের ওপর নানান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাদের জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা নাবা, আয়াত : ০৮)
নারী-পুরুষ উভয়কে আল্লাহতায়ালা বিয়ের মাধ্যমে বিশেষ অনুগ্রহ করে থাকেন। আল্লাহতায়ালা নারী-পুরুষ পরস্পরকে বিয়ে করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, যদি তারা অভাবী হয়, আল্লাহ তায়ালা তার অনুগ্রহ দিয়ে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন; আল্লাহতায়ালা প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।’ (সুরা নুর, আয়াত : ৩২)
বিয়ে করা বা দেওয়া রাসুল (সা.)-এর সুন্নত। বিয়ে নারী-পুরুষ উভয়ের চরিত্রকে হিফাজত করে। জাহান্নাম থেকে দূরে রাখে। জান্নাতের পথ সুগম করে দেয়। মানুষকে অশ্লীল যৌনাচার, জিনা-ব্যভিচারের মতো মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে। উভয়ের জীবনে প্রশান্তি দান করে, যার মাধ্যমে পারস্পরিক প্রীতি ও ভালোবাসা তৈরি হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম, আয়াত : ২১)
বিয়ের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা নারী-পুরুষের ওপর যেমন অনুগ্রহ করে থাকেন। তেমনি বিয়ে পরবর্তী সময়ে তালাক বা বিচ্ছেদের কারণে তালাকদাতা ব্যক্তি বা পরিবার আল্লাহতায়ালার কাছে ঘৃণ্য হয়ে যায়। কারণ তালাকের মাধ্যমে দুটি পরিবারের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ বা দূরত্ব তৈরি হয়। আল্লাহতায়ালা পারস্পরিক বিবাদ সৃষ্টিকারী ব্যক্তিকে কখনো পছন্দ করেন না। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তালাক হচ্ছে হালাল বস্তুর মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা ঘৃণ্য।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২০১৮)।
ছোটখাটো সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রায়শই বিয়ে-বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটে। বিয়ে-বিচ্ছেদের হার বর্তমানে প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক হতাশা, সন্দেহ, সংশয়, যৌতুক, বন্ধ্যত্ব, দারিদ্র্য, পছন্দ-অপছন্দ, মাদকাসক্তি, বহু বিবাহ ও পরকীয়ার মতো ঘৃণ্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবারে দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকে। পরবর্তী সময়ে সেটি বিয়ে-বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা বিয়ে করো, কিন্তু তালাক দিয়ো না। কেননা তালাক দিলে তার দরুন আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে।’ (আকামুল কুরআন, ৩৯ খ-, পৃষ্ঠা : ১৩৩)
বিয়ে-বিচ্ছেদ সমাজ ও পরিবারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের ফলে সন্তানরা পারিবারিক স্নেহ ও ভালোবাসার অভাবে হতাশা হয়ে বিভিন্ন অসামাজিক অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে আমাদের এখনই বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নিতে হবে। নতুবা সমাজ ও পরিবারকে ভবিষ্যতে চরম মাশুল দিতে হবে। প্রয়োজনে সাপ্তাহিক জুমার খুতবায় পারিবারিক সুখশান্তি ও বিয়েবিচ্ছেদের কুফল নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। আল্লাহতায়ালা পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন ‘তাদের সঙ্গে সৎভাবে জীবনযাপন করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৯) মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।’ (মিশকাত, পৃষ্ঠা : ২৮১)।
আল্লাহতায়ালার দেওয়া নির্দেশ আর রাসুল (সা.)-এর সুন্নত বৈবাহিক বন্ধনকে অটুট রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিয়ে-বিচ্ছেদ থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। সামাজিকভাবেও উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। ফলে রাসুল (সা.) সুন্নতের মর্যাদা যেমন সমুন্নত থাকবে, তেমনি পারিবারিক, সামাজিক ও আত্মীয়তার বন্ধনও অটুট থাকবে। আল্লাহতায়ালা তৌফিক দান করুন।
ব্যক্তিগত ভাবে আমিও সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়টি একদমই পছন্দ করি না,তাই আমার মনে হয় সম্পর্ক তৈরির আগে সবকিছু পরিষ্কার এবং খোলাখুলি ভাবে বলে এবং জেনে নেওয়াই উত্তম!
----------------------------------------------------------------------
শান্তশিষ্ট নয়নের অগ্ধিরুপ দেখে তারা ভয়ে কুঁকড়ে গেছে,তার চেয়েও বেশি আতংকিত হয়ে পড়েছে জমিনে পড়ে ছটফট করা নাদিমের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে! মুনের হাত এতই শক্ত করে খামচে ধরেছে যে মুনের হাত তারার ছোট ছোট নখের দাগ স্পষ্ট বসে গেছে,হয়তো কিছুটা কেটেও গেছে, কিন্তু তাতে মুনও বেখবর, সেও তার বোনের মতোই আতংকিত হয়ে পড়েছে, কিন্তু নয়নের সেদিকে নজর নেই।সে এখন নিজের মধ্যে নেই,এ যেন নয়নের মাঝে স্বয়ং আজরাঈল ভর করেছে, নাদিমের আজরাঈল!
এসেছিলো দিন শেষ রাতেই চলে যাবার নিয়তে কিন্তু মুনের বায়না রাখতে থেকেই গেল, একমাত্র শালিকা মুনতাসির,তার আবদার কিভাবে অগ্রাহ্য করতে পারে নয়ন! মুনের আবদার ছিলো বসন্ত উপলক্ষে গ্রামে চলমান মাসব্যাপী মেলায় নিয়ে যাওয়া,তাও একমাত্র দুলাভাইয়ের সাথে,এতে তারাও তাল মিলিয়েছে, বিয়ের আগে প্রতিবছরই যেতো,গত দুই বছর ধরে মামার বাড়িতে থাকার কারণে যেতে পারেনি তাই নয়ন যেন তাকেও নিয়ে যায় !বউ শালীর যৌথ আবদারকে পাত্তা না দিয়ে উপায় ছিলো না,তাই বিকেলে বেলা যাবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো! দুপুরে পুকুরের ছোট মাছ,খোপ থেকে নেওয়া দেশি মুরগির বাচ্চার তরকারি, উঠানের কোনে লাগানো লাউ এর ডগা দিয়ে মুসুর ডাল,সাথে গুঁড়ো চিংড়ি দিয়ে লাউয়ের তরকারি দিয়ে ভরপুর খাওয়া দাওয়া করে বউ, শ্যালিকা এবং শ্যালককে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে স্থানীয় মেলায় ঘুরতে! বোন এবং বোন জামাই আসার খুশির খবর পেয়ে সকালেই বাড়ি এসে পৌঁছায় তাওহীদ, কিন্তু কে জানতো তার খুশিতে কালো নজর লেগে যাবে,যেই নজর থেকে বাঁচতে দুই বছর তারা নিজের বাপের বাড়ি রেখে মামার বাড়িতে গিয়ে পড়ে ছিলো,ভালো ফলাফল করার পরও নিজের উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন ওখানেই থামিয়ে দিতে হয়েছিলো!
মেলায় ঘুরে ঘুরে এদিকে ওদিকে এটা সেটা দেখছিলো,মুন দুই হাত ভরে পছন্দের জিনিস কিনে তার ব্যাগ নিয়ে ঘুরছে, নয়নের হাতও ফাঁকা নেই,এক হাতে তারার হাত ধরে রেখেছে অপর হাতে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট ব্যাগ,যেগুলো ভর্তি বউ শালীর আবদারের জিনিসপত্র,তাওহীদ নিজের পছন্দের জিনিস নিয়ে নিজেই ঘুরছে, দুলাভাইয়ের থেকে বায়না করে পছন্দের গাড়ি,উড়োজাহাজ সহ অনেক অনেক খেলনা সে কিনে নিয়েছে,নয়নও বেশ আনন্দিত হয়ে সবটা কিনে দিয়েছে,সত্যি বলতে নয়নেরও ভালো লাগে তাওহীদের আবদারগুলো পূরণ করতে যেহেতু নিজের আপন কোন ছোট ভাই নেই,তাওহীদ'কেই নিজের ভাইয়ের মতোই দেখে, সেহেতু বালক তাওহীদের আবদার পূরণে সে বেশ প্রফুল্ল অনুভব করে!
-- দুলাভাই!
-- হু;
-- চলেন ঘোড়ায় উডি!
-- ঘোড়ায় চড়বা?
-- হ! বড় আপারেও চড়ান!
-- তুমার আপা উডবো? ওয় ভয় পাইবো না!
-- হেইডাই তো মজা অইবো,দ্যাখবেন ক্যামনে ভয় পায়,আর কইবো আমারে নামাও, নামাও!
নিজের দুষ্ট বুদ্ধিতে নিজেই হেঁসে খুন হচ্ছে ,ওর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে আছে নয়ন, মাথায় ছোট একটি চাপড় মেরে বললো,
-- আমার বউরে কান্দানের এত শখ!
-- মাথায় হাত ঘষতে ঘষতে নিজের দুষ্ট হাসি চালিয়ে গেল,এর মধ্যেই নয়নের মনে হলো তারা ওর থেকে ছুটে গেছে,ভীরের মাঝে তারা বলেছিলো তাওহীদের হাত ধরে রাখতে,যাতে আলাদা হয়ে যেতে না পারে,তাই নয়ন তারার হাত ছেড়ে তাওহীদের হাত ধরেছিলো ,তাই কিছুটা দূরত্ব নিজেদের মাঝে তৈরি হয় কিন্তু এর মধ্যেই তারা কোথায় গেল?
পর্ব ২০
তারা নয়নের থেকে হাত ছাড়িয়ে একা হাঁটতে গিয়ে কিছুটা দুরে চলে গেল,মুন পাশেই এক দোকানে কিছু একটা দেখছে,তারা সেদিকেই এগিয়ে যেতে নিলেই তাড়াহুড়োয় বোরকার সাথে পা বেজে পড়ে যেতে নিলেই কেউ একজন ধরে ফেলে,যা ছিলো একদম অনাকাঙ্ক্ষিত একটা ঘটনা,তারা নিজের অসাবধানতার কারণে পড়েনি, বরং পেছন থেকে কেউ একজন বোরকা পা দিয়ে পারা দিয়ে ধরে রেখেছিলো যার দরুন মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে নেয় এবং পেছন থেকেই একজন কোমরের নিচের দিক হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের গোপনাঙ্গে চেপে ধরে এবং সেই সাথে তার অপর হাত চলে যায় তারার শরীরের উপরের স্পর্শকাতর দিকে,এহেন ঘটনায় লজ্জায় আর ভয়ে তারার চোখ ফেটে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, ভয়ে কুঁকড়ে যায়, লজ্জায় কন্ঠনালী নেতিয়ে পড়ে, এদিকে মানুষরূপী জানোয়ার নিজের কাজে ব্যস্ত,মেলার মতো জনসমাগমস্থলে এমন কিছু হতে পারে এটা যেমন ভাবনার বাইরে, আবার হলেও কারো দৃষ্টিতে পড়বে সেটা ভাবাও কঠিন ! তারা কোনরকম উঠার চেষ্টা করতেই পিছনে থেকেই একদমই নিজের সাথে আরও বাজে ভাবে জড়িয়ে নেয় সেই লোকটা, চারদিকে মাগরিবের আজান পড়ে গেছে, অন্ধকারে ছেয়ে চারদিক, কালো অমানিশায় ডেকে গেছে পৃথিবী, কিন্তু জ্বলজ্বল করছে লাল সবুজ সাদার মিশেলে মরিচ বাতি দিয়ে সজ্জিত মেলার চারদিকের প্যান্ডেলগুলো আর তার মাঝের ছোট ছোট দোকানের পসরা!নিজেকে হেফাজত করতে নয়নকে ডাক দিবে এমন অবস্থায় পিছু ঘুরতেই চোখ পড়লো মানুষরূপী সেই জানোয়ারের উপর,এত সময়ে তারার বুঝতে আর বাকী রইলো না এমন জঘন্য কাজটি কে করতে পারে ! যাও মুখ ফুটে কিছু বলার চেষ্টা করছে তাও এখন বন্ধ হয়ে গেছে,সামনে দাঁড়ানো কুচকুচে কালো বর্ণের লম্বা মানুষরূপী ভয়ংকর পশু নিজের সমস্ত কপাটি বের ভয়ংকর হাসি দিচ্ছে,তারা একটু পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না,সে শক্ত করে তারার ডান হাতের কব্জি মুচড়ে ধরলো,তারা বেদনাদায়ক আওয়াজ করলো, বোরকার নিকাবের ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান কন্দনরত ভীতু নয়নজোড়া পিচাশ নাদিমকে যেন আনন্দ দিলো,সে নিজের বিচ্ছিরি হাসি বজায় রেখে বললো,
-- কি ভাবছিলা আমার থেইক্কা পলাইয়া বাচবা?
উহুম এত্ত সওজ না,আমি নাদিম 'তুমারে কইছিলাম না আমার কাছে তুমার আওন লাগবোই! কইছিলাম আমার অপমানের শোধ আমি লমু! ভাবছিলা বিয়া কইরা ভীন গাওয়ে গ্যালেই আমি তুমার পিছু ছাইড়া দিমু!তুমার মামার গিরামে আমারে যেই চড় মারছিলা তার শব্দ এহোনও আমার কানে বাজে,গিরামের মাইনসের হেই জুতার বারি এহোনও আমার পিঠে জ্বলায় পোড়ায় ,কুনো কিছু ভুলিনাই,খালি সুযোগের অপেক্ষায় আছিলাম, আইজ যহোন জানলাম মেলায় আইছো তহোনই কইছি আইজই অইবো আমার মনের স্বাদ মিডানোর মুক্ষম সুযোগ!আর দ্যাহো এহোন তুমি আমার আতের মুডায়!
তারা নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করছে, বারবার মুক্ত হাত দিয়ে নাদিমকে আঘাত করার চেষ্টা করছে,নাদিম দাঁত খিচিয়ে বিচ্ছিরি কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে করতে বললো,
-- মা*গী,গতরের ত্যাজ দ্যাখাস? একদম মিটাইয়া দিমু, গতরের ত্যাল বাইর কইরা ছাড়মু আইজ রাইতেই!
চোখ মুখ চকচকে হয়ে উঠলো,বিচ্ছিরি হাসি দিয়ে মুখটা তারার কাছাকাছি আনলো,তারার সমস্ত মুখে ফু দিলো, সিগারেটের গন্ধে তারার বমি চলে আসলো,নাদিম তা দেখে কিটকিটিয়ে হেসে উঠলো,ওর হাসিতে তারার ভয় বেড় গেলো, আশপাশ দিয়ে যাওয়া পথচারীরা কেবল আড়চোখে দেখেই যাচ্ছে, তারা না কাছে এসে এর প্রতিবাদ করছে,আর না সরাসরি সামনাসামনি হয়ে ঘটনার ইতিবৃত্ত দেখছে,কারো সাধ্য নেই এই পরিস্থিতিতে তারাকে সাহায্য করা, তাছাড়া কে যায় অন্যকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের বিপদ টেনে আনতে কারণ মোটামুটি সবাই চেনে নাদিমকে, নাদিমের ভয়াবহ চরিত্র সম্পর্কে সবারই ধারনা আছে, ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলগুলোর হাত নাদিমের মাথার উপর, সামান্য কৃষক ছিলো ওর পিতা, ছেলের উচ্ছন্নে যাওয়া মানতে পারেনি তাই অনেক আগেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছে,তবে বিভিন্ন জায়গা থেকে ওর নামে তার কাছে নালিশ আসা বন্ধ হয়নি,গরীব হলেও নিজের প্রখর আত্নসম্মান ছিলো,যার দরুন মানুষের কঠিন বাক্য হজম করতে ব্যর্থ হোন এবং হঠাৎ একদিন স্টোক করে পৃথিবীর এই নারকীয় তাণ্ডব থেকে ছুটি নিয়ে উপরওয়ালার কাছে চলে যান! এরপরও নাদিম শোধরায় না উল্টো ওর উৎপাত আরো বেড়ে যায়, নেশার ঘোরে মা বোনের সাথে উল্টো পাল্টা কথা বলা, প্রায়দিনই মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করা, এমনকি শোনা যায় বদ্ধ ঘরে অসহায় বৃদ্ধা মায়ের গায়েও হাত তুলে, যার কারণ ছেলের সবরকমের অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করতে হয় অসহায় বৃদ্ধা মাকে, নাদিমের কারণে ওর বড় বোনের জীবনও ছিলো ওষ্ঠাগত! শ্বশুর বাড়িতে ওকে নিয়ে কথার খোঁটা সহ্য করতে হয়,তাই সেও নাদিমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, নাদিমের মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে নিজের আর ছোট মেয়ের খরচ চালায়,আর নাদিম চাঁদাবাজি করে নিজের উশৃঙ্খল জীবনের ব্যয় ভার বহন করে! মা বোন খেলো কি খেলো না তা নিয়ে নাদিমের বিশেষ ভাবনা নেই! কোন এক সময়ে প্রভাবশালী নেতার মিছিলে হাঙ্গামা তৈরি করে সেই নেতার দৃষ্টি কাড়ে এর পর থেকেই সে সব রকমের মিটিং মিছিলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সমান অংশগ্রহণ করে,যার দরুন ঐ মহলে তার পরিচিত বিশাল,থানা পুলিশ টাকা দিয়ে নিজের হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছে তাই কেউ অভিযোগ নিয়ে গেলেও তার কোন প্রতিফলন ঘটে না! তাইতো তার ভয়ে সাধারণ অসহায় মানুষ আতংকিত হয়ে থাকে, এটাই সন্ত্রাসী নাদিমের জীবন বৃত্তান্ত!
স্থানীয় বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, সাপ্তাহিক বাজারে চাঁদাবাজিসহ স্কুল কলেজগামী মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, যখন তখন যুবতী মেয়েদের বাসে উঠে মেয়েদের নিয়ে আজেবাজে কথা বলা এগুলো তার নিত্যদিনের কাজ! বাসে উঠে মেয়েদের পাশে বসে শারীরিক ভাবে হেনস্থা করা সবসময়ই চলে! আর যদি কোন মেয়ে তার চোখে পড়ে তবে সে মেয়ের জীবন তছনছ না করে ছাড়ে না!
নাদিমের নামে অলরেডি দুইটা ধর্ষনের মামলা চলমান, তাছাড়াও একাধিক মামলা আছে নানা অপরাধের দায়ে, তবুও এই নাদিম সোজা হয় না! কুকুরের লেজ বলে কথা, এগুলো সাত হাত মাটির নিচেও বেঁকিয়ে থাকে!
গ্রাম অঞ্চলে এমন নাদিম বহু আছে,যাদের বাবার ক্ষমতার জোরে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে!আর ক্ষমতার অ-পব্যবহারে তারা অন্যের জীবনকে ওষ্ঠাগত করে রাখে, মেয়েদের জীবন ছাড়াও তাদের পরিবারের জীবনও এরা তছনছ করে রাখে,,গ্রামের বহু মেয়ের বাল্যবিবাহ হয় এইসব নাদিমের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য, গ্রামের বাবা মায়েদের ধারনা বিয়ে দিলেই এই নাদিমদের হাত থেকে মেয়েকে বাঁচানো সম্ভব, কিন্তু এরা বুঝে না এরকম নাদিম সব জায়গাতেই থাকে, এদের থেকে না পালিয়ে বরং এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলে প্রতিহত করতে হবে,অন্যথা জীবনে কোনদিনও কোথাও গিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না!
তারার জীবনের কাল দিন বলে আখ্যা করা হয় সেদিনকে যেদিন নাদিমের নজরে তারা পড়েছিলো,
আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগের ঘটনা,তারা কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে মুনের আবদার মেটাতে বাজারের গিয়েছিল,মুন বড় বোনের কাছে বায়না করেছিলো তার জন্য পায়েল কিনে দিতে,তারা সেই আবদার মেটাতে গিয়েছিল কিন্তু কে জানতো সেটাই হবে তারার জীবনের কাল! মুন তারার জীবনে নেমে আসবে ঘোর অন্ধকারের ন্যায় কালো অমানিশার ছায়া!
-- আপা তুমি এইডা দ্যাহো?
-- কিহ?
-- এই নাকের নথ টা সুন্দর!
-- দেহি!
-- আপা এইডাতে তুমারে অনেক সুন্দর লাগবো!
মুনের হাত থেকে নথটা নিয়ে তারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নিকাবটা একটু তুলে নাকে লাগিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলো,এর মধ্যেই দোকানে ঢুকে পড়ে নাদিমের লোকজন সহ নাদিম,তারা সবসময়ই বোরকা পড়ে তাই খুব একটা পরপুরুষের সামনে আসে না, দোকানটা মোটামুটি খালি দেখেই নিজের নিকাব তুলে দোকানির থেকে কিছুটা দুরে দাঁড়িয়ে নথ নাকে লাগিয়ে দেখছিলো তাই দোকানি দেখতে পারার চিন্তা ছিলো না,মুনও বড় বোনের সামনে দাঁড়িয়ে আয়না ধরে দাঁড়িয়ে তাকে সাহায্য করছিলো, হঠাৎ করেই ভারী কিছু একটা পায়ে পড়াতে আর্তনাদ করে উঠে মুন,
-- আহ্!
শব্দ করেই নিচু হয়েই পায়ে হাত দিয়ে বসে পড়ে ,আর তখনই মুখোমুখি হয় নাদিম আর তারা, যেহেতু দুই বোন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলো,তাই মুন বসে পড়াতে তারাকে সরাসরি দেখা যায়, নাদিমের সাঙ্গপাঙ্গরা দোকানির থেকে টাকা নিচ্ছিলো আর নাদিম তাদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলো, নাদিম এদিকে সেদিকে ঘুরে ঘুরে দোকানের সবটা পর্যবেক্ষণ করছিলো, তখনই চোখ যায় তার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুই রমনীর দিকে,বোরকা পরিহিতা দেখে দেখা যাচ্ছিলো না তার মধ্যে একজন অন্যজনের সামনে দাঁড়ানো,শকুনি নজরে এক মনে তাকিয়ে ছিলো তাদের দেখার জন্য,এর মধ্যেই শুনতে পেল দোকানির সাথে তার সাঙ্গপাঙ্গরা তর্ক করছিলো, এতে ক্ষেপে গিয়ে দোকানির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দোকানিকে কয়েকটি বিচ্ছিরি গালি দেয় , তাছাড়া দোকানির সাহস দেখে রেগে গিয়েই একটি কাঁচের বয়াম তুলে আছাড় মারে যেটি গিয়ে মুনের পায়ের উপর পড়ে,মুন প্রচন্ড যন্ত্রনায় আর্তনাদ করে উঠলো, পায়ের বুড়ো আঙ্গুল কেটে গলগলিয়ে রক্ত পড়তে লাগলো,তারা বোনের পায়ের এই অবস্থা দেখে দিকবেদিক ভুলে নিচে বসে পড়লো,ঐদিকে তার মুখের পর্দার কথা বেমালুম ভুলে গেল, নাদিম সহ তার ছেলেপুলেদের লোভনীয় দৃষ্টি পড়লো সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে দোড়ে দাঁড়িয়ে যুবতী হওয়ার জন্য অপেক্ষমান তারার উপর; এক নজরে তাকিয়ে রইলো,তারা ক্ষিপ্র নজরে নাদিমকে দেখলো, এরপর জ্ঞানহীনদের মতোই নাদিমের সামনে গিয়ে একদম মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
-- কি করলেন এইডা আপনে, মানুষ নাকি অমানুষ! এমনে কেউ এত ভারী জিনিস ফিক্কা মারে? দ্যাখছেন আপনের জন্য আমার বইনডার পাও ক্যামনে কাইট্টা গ্যালো! এহোন ক্যামনে রক্ত পড়া বন্ধ করুম? তাছাড়া এই অবস্থায় বাড়ি বা যামু ক্যামনে?
-- চিন্তা লইও না, আমার পোলাপাইন সাহায্য করবো!
দুর্গন্ধযুক্ত মুখ খোলার সাথে সাথে তারার পেট উল্টে বমি চলে আসার উপক্রম হলো,তারা কিছুটা দুরে সরে দাঁড়ালো , নাদিমের এই ব্যাপারটা ভালো লাগলো না,কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো,তারার সেদিকে হুঁশ নেই,সে নিজের মতোই বলছে,
-- আপনেরা আ্যামন ক্যান,মাইনসের দুখ্খ কষ্ট বুঝেন না?
-- কে কইলো বুঝি না এই যে তুমারডা বুঝতাছি!
কথা শেষ করে হুট করেই তারার হাত ধরলো,এহেন কাজে তারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, হুট করেই মনে হলো ওর মুখ খোলা, তাছাড়া এরা কেউ ভালো লোক না,যারা জবরদস্তি অন্যের দোকান থেকে টাকা নেয়, চাঁদাবাজি করে তারা কখনো ভালো মানুষ হতে পারে না, তাছাড়া এদের দেখলেও বোঝা যায় এরা কতটা জঘন্য মানুষ,তারা দ্রুত নিজের নিকাব নামিয়ে নিলো,এত সময়ে মুনও পায়ের ব্যথা ভুলে উঠে দাঁড়িয়েছে,তারার নিকাব করে ফেলা নাদিমকে আরো ক্ষিপ্র করে তুললো,এক টানে নিকাবটা খুলে নিজের হাতে নিয়ে নিলো,তারা নাদিমের কাজে রেগে গেল,করে বসলো ভয়াবহ একটি কাজ,যা ছিলো তারার জন্য দ্বিতীয় ভুল, প্রথমটা ছিলো এখানে এসে নিকাব খুলে নাদিমের মুখোমুখি দাঁড়ানো,আর দ্বিতীয়টি ছিলো নাদিমের গালে চড় দেওয়া!
তারা নাদিমের গালে চড় দিয়ে হাত থেকে নিকাব ছিনিয়ে নেয়,খুব দ্রুত সেটা বাঁধে এরপর নাদিমের সামনে থেকে মুনকে নিয়ে দ্রুতই বেরিয়ে পড়ে, নাদিমের গালে চড় দিয়েছে এটা ভাবতেই আশপাশের লোকজন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, দোকানিও ভয়ে ঢোক গিললো, মেয়েটার সাথে ঠিক কি হবে ভাবতেছিলো,আর তাতেই তার কপাল চুয়ে ঘাম চিবুক বেয়ে নিচে পড়লো,নাদিম থাপ্পর খেয়ে নিজের গালে হাত দিলো, আশ্চর্য হয়ে রক্তচক্ষু নিয়ে তারাকে দেখছিলো ,কোন পুরুষ যার সাথে কথা বলার দুঃসাহস দেখায় না সেখানে একটি মেয়ে কিনা তাকে চড় মেরে দিলো,এটা ভাবতেও তার কেমন লাগছিলো,তার সাথে থাকা তার সাঙ্গপাঙ্গরাও প্রথম এমন একটি বিষয়ের মুখোমুখি হয়ে তারাও কিছুটা থমকে গেল,এর মাঝেই তারা মুনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো, কিন্তু সাথে করে নিয়ে গেল নিজের জন্য মাত্রই তৈরি করা মরন যন্ত্রনা!
এরপর থেকেই তারার জীবন নাদিম অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো, যেখানেই যেতো নাদিম সেখানেই হাজির হয়ে যেতো , চোখ দিয়েই বিচ্ছিরি ইঙ্গিত করতো, তারা চান ইসলামকে জানালে তিনি আতংকিত হয়ে পড়ে,তারাকে বাইরে বের হতে নিষেধ করে দেয়, শুরু হয় তারার গৃহবন্দি জীবন এমনকি নাদিমের হয়ে নাঈম নামে নাদিমের এক চ্যালা একদিন হুট করেই হাজির হয় তারাদের বাড়িতে নিজের বদমাইশ নাদিমের জন্য তারাকে চাইতে, চাঁন ইসলাম গরীব হলেও নিজের সন্তানদের সম্পর্কে ছিলো বেশ সচেতন! সে মুখের উপর না বলে দেয় এতে আতে লাগে! তবে কিছু করার সুযোগ পায় না,কারণ সেদিন রাতে নেতার আদেশে গ্রামের বাইরে যায়,আর এই ফাঁকে চাঁন ইসলাম রাতেই তারাকে তারার মামা বাড়িতে রেখে আসে,নাদিম ফিরে তারার খোঁজ লাগায়,না পেয়ে চাঁন ইসলামকে হুমকি দিয়ে যায়,তবে বেশি কিছু করার আগেই এক স্থানীয় ব্যাবসায়ীর চাঁদাবাজির অভিযোগে পুলিশে ধরে, এবং পাক্কা দেড় বছর হাজতবাসের পর ফেরত আসে! কিন্তু তখন আর তারাকে পায় না, চাঁন ইসলাম মুনের সদরের মাদ্রাসা বদলে মুনকে তারারর ফুফুর এলাকায় মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেয়,তাই চেয়েও কোন ক্ষতি করতে পারে না , তাওহীদকে মাদ্রাসায় রেখে পড়াশোনা করাচ্ছে! নাদিমের ভয়েই চাঁন ইসলাম মেয়ের বিয়েও দিয়েছে শ্যালকের বাড়িতে রেখে, প্রথমবার যখন নয়ন তারাকে নিয়ে এসেছিলো তখন উনি বারন করতে চেয়েছিল, কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানতে পারে হাজিরা না দেওয়ায় নাদিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মানে নাদিম তখনও হাজতে ছিলো তাই উনি বারন করেননি, কিন্তু এরপর আর খবর নেননি,যার দরুন এখন এই আক্রমণের শিকার হলো!
-- ঐ তুই এহোন এত টাইট ক্যামনে ,ভীনদেশি কি কিছু করতে পারে না? গায়ের জোর নাই নাকি! চল; আইজ রাইতেই বুঝাইয়া দিমু মরদ ক্যারে কয়! সাহস কত মা*গি আমার গায়ে আত তুলোস!
মুচড়ে ধরা বাম হাতের কব্জি ধরে যখনই একদমই নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিতে গেলো তখনই পেছন থেকে জোড়ালো টানে ছিটকে নিচে পড়ে গেল,এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেল হইচই,নাদিম ছিটকে ছোলাবুট মাখানো বিক্রি করে সেই ফেরিওয়ালার ঝুড়িতে গিয়ে পড়লো,বুটের ঝোল,তেলে মাখামাখি হয়ে গেছে ওর চোখ মুখ,মুখ দিয়ে নির্গত করলো বিচ্ছিরি কিছু শব্দ,
-- কুন খা**কির পোলারে,বাইন**,চু*মা**নির পোলারে,তুরে আইজকা!
কথা শেষ করার আগেই মুখের উপর জোড়ালো লাথিতে আবার মুখ থুবড়ে পড়ে গেল,ঝোল মাখানো মুখে এবার ধুলোতে মাখামাখি হয়ে গেল, পরপর লাথিতে উঠে দাঁড়াতে ব্যর্থ হলো, এদিকে পেছন থেকে শক্ত কিছুর আঘাতে নিচে পড়ে গেল নয়নও!
পর্ব ২১
নাদিমের কোন এক চ্যালা পিছন থেকে বাঁশের খন্ড দিয়ে নয়নের পিঠ বরাবর আঘাত করে, প্রচন্ড ব্যথায় নয়ন মুখ থুবড়ে মাটিতে বসে পড়ে, তবে সেখানেই থেমে থাকে না, নিজের আঘাতকে ভুলে পরক্ষণেই উঠে দাঁড়ায় সাথে মুঠ ভর্তি বালু নিয়ে নেয়,যা ছুঁড়ে মারে আঘাত দেওয়া লোকটির চোখেমুখে! সে আঁতকে সরে দাড়ায়,তার হাতের দন্ডটি নিচে পড়ে যায় এবং সেটাই নয়ন নিজে তুলে নেয়!
নয়ন দিকবেদিক ভুলে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে যার কারণে নাদিমের সাঙ্গপাঙ্গরা বেশ ক্ষত হয়,তারা নিজেদের রক্ষার্থে এতই ব্যাকুল থাকে যে নাদিমের কথা বেমালুম ভুলে বসে,নয়নের ভেতরের মানুষটা যে আজ নাদিমের আজরাঈলের রুপ নিয়েছে তা তাকে দেখলে যে কেউই বলে দিতে পারবে,নয়ন একদম জ্ঞানহীন ভাবেই একের পর এক আঘাত করছে নাদিমের সর্ব শরীরে, ঝোলের কারণে চোখ মেলে তাকাতে পারছে না,এর মধ্যে বালু ধুলিকনা চোখে ঢুকে যাওয়ায় আরো বেশি জ্বালাপোড়া করছে ,তার মধ্যে নয়নের উপর্যপূরি আঘাতের চোটে নাদিমের অবস্থা বেহাল! মাথায় আঘাত লাগায় সেখান দিয়ে রক্তপাত হয়ে আরো বিচ্ছিরি লাগছে রক্তাক্ত নাদিমকে!
নয়নের এহেন ভয়ংকর রুপে তারারও এখন ভয় করছে,নাদিমকে দেখে মনে হচ্ছে ওর জ্ঞান নেই কিন্তু নয়ন থামার নাম নিচ্ছে না, ভয়ে সামনেও কেউ এগুচ্ছে না!
কিছু সময় আগের ঘটনা,
মুন দোকানে পছন্দ হওয়া জিনিস যখন তারাকে দেখাতে যাবে তখন পিছনে ঘুরে তারাকে দেখতে না পেয়ে এদিকে ওদিকে তাকিতুকি করতে লাগলো,এত সোরগোলের মাঝে নিজের কথাই নিজে শুনতে পারছিলো না, তাই দোকান থেকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে খোঁজা শুরু করলো এহেন সময় কারো ব্যথাযুক্ত আর্তনাদের শব্দ শুনতে পেয়ে মুন পিছু ফিরে নাদিমকে দেখতে পায় সাথে তারাকেও,তাই কোনদিকে না তাকিয়ে দৌড়ে নয়নকে খুঁজে বের করে,ফিরে আসার এই অল্প মুহূর্তেই নাদিম সম্পর্কে ধারনা নয়নকে দিয়েছে,আর বাকীটা নয়ন নিজ চোখে দেখেছে, যখন নাদিম তারার সাথে অসভ্যতামী করছিলো তখন নয়ন ওদের থেকে কিছুটা দূরে থেকে আসতে আসতেই সবটা দেখেছিলো, কিভাবে নাদিম তারার স্পর্শকাতর জায়গায় ছুঁয়েছে, কিভাবে মুখভঙ্গি দিয়ে তারাকে অশ্লীল উক্তি করছে, এতগুলো মানুষের মাঝেও কতটা নোংরা ভাবে তারাকে বারবার ছোঁয়ার চেষ্টা করছে,সবটাই দেখছিলো,রাগে চোয়ালের হাড়গুলো শক্ত হয়ে উঠলো,হাতের মুঠোয় থাকা খেলনা গাড়িটাকে ছুঁড়ে মেরে সেখান থেকে ছুটে এসেই পেছন থেকেই নাদিমের কলার ধরে ছুঁড়ে মারে!
নাদিমকে যখন চুড়ান্ত এক আঘাত করতে যাবে ঠিক তখনই তারা চিৎকার করে উঠল,
-- থামুন!
তারার চিৎকারে নয়ন না থামলেও দূর থেকে ছুটে আসা ধারালো কিছুর আঘাতে ঠিকই থেমেছে!
তারা জমিনে পড়ে ছটফট করা নাদিমকে দেখছে একবার আর তার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নয়নকে, ভয়ংকর রাগী মুখেও কেমন আতংকের ছাপ ফুটে উঠেছে, বাম হাত পাশ করে যাওয়ার সময় নয়নের বাম হাতেও ক্ষত করে গেছে,বাদামী চেক শার্টের হাতার একাংশ কেটে গিয়ে সেখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে কাটা বাহুর ক্ষত,তা দিয়ে রক্ত ঝড়ে অংশটা ভিজে চপ চপে হয়ে গেছে, কিন্তু নয়নের কোন বিশেষ ভাবাবেগ দেখা গেলো না,তারা চিৎকার করে দৌড়ে নয়নের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,,
-- ইশ্ আপনের হাত কতখানি কাইট্টা গ্যাছে!ক্যান গ্যালেন এই জানোয়ারের লগে লাগতে!
-- অর সাওস অয় কি কইরা, আমার ঘরের ইজ্জতে হাত দেওনের? জানোয়ারের বাচ্চারে তো!
নয়নের সর্ব শরীর কাঁপছে,জেদ আর রাগে এখনও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না,তার মধ্যে হাত কেটে যাওয়ার কারণে জ্বালা করছে, তবুও নাদিমের দিকে এখনও সেই একই রকম ভাবে তাকিয়ে আছে,তারা নিজের বোরকার হিজাবের কোনা দিয়ে নয়নের কাঁটা অংশ চেপে ধরেছে, রক্তপাত বন্ধ করতে হবে,নয়ন তারার দিকে এক পলক তাকিয়ে দা ছুঁড়ে মারা সেই লোকটাকে খুঁজছে, তাদের উদ্দেশ্য ছিলো নয়নকে মারার , কিন্তু সৌর্ভাগ্যক্রমে সেটা নাদিমের গায়েই পড়ছে, নাদিমের ডান হাত কাঁধ হতে পুরো আলাদা হয়ে ঝুলে আছে,নাদিম মাটিতে পড়া অবস্থায় ছটফট করছে, আশেপাশের সবাই আতংকিত হয়ে কেবল দেখেই যাচ্ছে, নাদিমের এহেন হাল করার ফল ঠিক কতটা ভয়াবহ হবে নয়নতারার জন্য তাই ভাবছে সবাই,
-- ভাইয়া!
দূর থেকে ভেসে আসলো তাওহীদের গলার স্বর,নয়ন তারা শব্দের উৎস অনুযায়ী তাকিয়ে দেখতেই নয়নের মস্তিষ্ক আবারও ক্ষিপ্র হয়ে উঠলো,দিক বেদিক ভুলে নাদিমের পাশেই পড়ে থাকা দা তুলে ছুড়ে মারলো সেই লোকটার দিকে যে কিনা তাওহীদের গলায় কাঁস্তে ধরে নয়নকে হুমকি দিচ্ছে! আশ্চর্যের চরমে পৌঁছে দিয়ে সবাইকে সেই দা সোজা গিয়ে ঐ বদমাইশটার ডান হাতের পাঞ্জায় গিয়ে পড়ে এবং তার ফলে হাতের ঐ অংশ কেটে জমিনে পড়ে যায়! তাওহীদ এত সময় এমনিতেই ভয়ে গুটিয়ে ছিলো,এখন আবার এমন একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় আরো ঘাবড়ে গেছে যার দরুন ছোট্ট মস্তিস্ক এতটা চাপ না নিতে পারায় হুঁশ হারিয়ে ঐখানেই পড়ে যায়! নয়ন দৌড়ে ধরতে যাবার আগেই তারা মুন গিয়ে নিজেদের ভাইকে আগলে নিলো,আর নয়নের পা থেমে গেলো পুলিশের বহর দেখে!
হ্যা; এরকম জমজমাট মেলার মাঝে মারপিটের ঘটনায় আতংকিত হয়ে মেলার আয়োজকরাই পুলিশের সাহায্য কামনা করে, পুলিশকে ডাকার কিছু সময় বাদেই তারা এসে উপস্থিত কিন্তু তাতে বিশেষ কোন লাভ হলো না !
নাদিমকে চেনে সবাই,থানা আদালতের অধিকাংশ মানুষই নাদিম নামক দানবকে চিনে, কিন্তু সেই দানবের এই হাল দেখে পুলিশও প্রথমে কিছুটা থতমত খেয়েছে, চারদিকে ছিটকে পড়ে থাকা আহত,অত্যাধিক করুন ভাবে আহত, ক্ষতবিক্ষত নাদিমের চ্যালাদের, এবং এক হাত খুইয়ে মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে থাকা নাদিমকে দেখে তারাও কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেলো!
এক নজরে এক হাত দিয়ে অন্য হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা নয়নকে দেখে নিলো! দেখতেই মনে হয় ভালো বাড়ির ছেলে, ভদ্রলোক! এই তল্লাটে দেখেছে বলে মনে হয় না তবে কি নিয়ে এই নাদিম নামক ভয়ানক সন্ত্রাসীর সাথে লাগলো!
পুলিশের কিছু করার নেই,খবর পাওয়া অনুযায়ী এবং সরেজমিনে দেখা পরিস্থিতি বুঝেই নয়নকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়,কারো কোন অনুরোধ তারা কানে তোলেনি!
তারা মুন অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে, এদিকে এখনও তাওহীদ বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে মুনের কোলের উপর, পুলিশ যখন নয়নকে নিয়ে যাচ্ছিলো তারা তখন বারবার অনুরোধ করে বলার চেষ্টা করছিলো আসল ঘটনাটা কিন্তু পুলিশের এক কথা যা বলার থানায় গিয়ে বলবেন,নয়তো আদালতে! তারা বারবার আশেপাশে মানুষের থেকে সাহায্য চেয়েছে কিন্তু মানুষ এতটাই মেরুদন্ড ভাঙ্গা যে এই মুহুর্তেও সত্যটা বলতে দ্বিধাবোধ করছে,কেউ কেউ আমতা আমতা করছে তো কেউ কেউ ইতিউতি করেই স্থান পরিত্যাগ করছে! এখন কেবল তারার সাথে রয়েছে তার আর্তনাদ চিৎকার আর দম বদ্ধকর এক অসহ্যময় অনুভূতি!
নয়ন সহ সবাইকে আগে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, নয়নকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর থানায় নেওয়া হবে, নাদিমকে সহ ওর সাথের সবাইকে আপাতত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, সম্পূর্ণ চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর ওদের ব্যবস্থা করবে! তবে আপাত দৃষ্টিতে নয়নকে আসামী আর নাদিমকে ভিকটিম হিসেবে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে,যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে মেলার ভিরে ধাক্কা লাগায় প্রথমে বাকবিতন্ডা এবং তা এক পর্যায়ে মারপিটের ঘটনায় রুপান্তরিত হয় যার দরুন নয়ন মিয়া নাদিমকে সহ তার সঙ্গীদের বেদরম পেটায়;এতে উভয় পক্ষেরই শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে! তাছাড়াও মেলার অনেক দোকানপাটের ক্ষতি হয়েছে!
সন্ধ্যা পেরিয়ে এখন ঘোর অমানিশা, চারদিকে ঝি ঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে,মেলা অংশ বাদে সবটাই অন্ধকারে ডেকে আছে,তারা বুঝতে পারছে না কি করবে, চারদিকের এই অন্ধকারের চেয়েও বেশি অন্ধকার এখন তারার নিজের জীবনকে মনে হচ্ছে ; আশেপাশে এত মানুষের মাঝেও নিজেকে বড্ড একা লাগছে,কেমন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় একজন মনে হচ্ছে!
এর মাঝেই কেউ একজন পানি দিয়ে যাওয়াতে মুন তা ছিটিয়ে তাওহীদের হুঁশ ফেরায়;
-- ছোট আপা দুলাভাই কই?
হুঁশ ফেরার পর ছোট তাওহীদের প্রথম প্রশ্ন এটাই ছিলো,মুন ছোট ভাইয়ের উদ্বেগ বুঝতে পেরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো, বারবার নিজেকে দোষারোপ করছে,কেন সে মেলায় আসার বায়না করলো,সে তো জানে এখানে আপার জন্য বিপদ আছে, কতবছর এই এক ভয়ে তার আপা ঘর থেকেই বের হতো না, নিজের কত খুশি,কত ইচ্ছাকে মাটি দিতে দেখেছে সে, তারপরও সে জোর করেই আপাকে নিয়ে এসেছে, আবার যখন দেখলো নাদিমকে তখন কেন সবকিছু নয়নকে খুলে বলতে গেলো, কোনরকম তো বড় আপাকে নাদিমের থেকে উদ্ধার করে নিয়ে চলে গেলেই পারতো যেভাবে বিগত দিনে করেছে,এখন তো পুলিশ দুলাভাইকে নিয়ে গেলো, নাদিমের যা ক্ষমতা ও চাইলে পুলিশকে টাকা খাইয়ে দুলাভাইয়ের ক্ষতি করে দিতে পারে! তখন আপার কি হবে?মনে হতেই তারার দিকে তাকালো, তাদের থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে পুলিশের গাড়ি যাওয়ার পথের পানে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে, নিকাবের ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান অশ্রুসিক্ত নয়ন মুনের ভেতরে আরো দগ্ধ করলো, ভাঙ্গা কন্ঠেই ডেকে উঠলো,
-- আপা!
তারা কোনরকম প্রতিক্রিয়া দিলো না,মুন তাওহীদকে ঠেলে উঠিয়ে দাড় করালো, এরপর হাঁটু গেড়ে নিজেও উঠে দাঁড়ালো, তারপর তাওহীদের হাত ধরে তারার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো ,
-- আপা!
কোন প্রতিক্রিয়া নেই,মুনের বুঝতে বাকি নেই তার বোন আপাতত স্বাভাবিক অবস্থায় নেই, ভাবতেই বুক ভারি হয়ে উঠলো, কিভাবে সবটা ঠিক হবে?
-- আপা!
তাওহীদ তারার হাত ধরে ঝাক্কি দিয়ে ডাক দিলো,তারা এবার নিজের মধ্যে ফিরে এলো, তাওহীদকে দেখে মনে পড়লো তখন কিভাবে ঐ জঘন্য লোকটা এই এতটুকু বাচ্চার গলায় কাঁস্তে ধরে রেখেছিল, তারা দ্রুত তাওহীদের গলায় তাকালো,হাত দিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করলো, কোথাও কেটেছে কিনা,হ্যা কেটেছে! গলায় হালকা আঁচড় লেগে পাতলা সাদা চামড়াটা কেটে ভেতরে লালচে অংশ দেখা যাচ্ছে,তারা তাওহীদকে বুকের সাথে চেপে ধরলো,ফুপানো কান্না এবার বুক ফেটে নির্গত হলো, চিৎকার করে কাঁদছে তারা,তার সাথে যোগ দিয়েছে তার দুই ভাইবোন,মুন তাওহীদ!
সমাপ্ত!!
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ০১
বৌমা,তুমি কি এহোনই যাইবা?
--- হ মা,এহোনই যামুগা!
-- কয়ডা ভাত দেই খাইয়্যা যাও!
-- সময় নাই!
-- মন্ডল সায়েব আইয়া বইয়া থাকবো! হ্যার লগে ম্যালা হিসাবনিকাশ বাকী! আমি অহোন আহি, আপনে নিজের খেয়াল রাইখেন!
নিজের কথা শেষ করে বোরকার সামনের বোতাম লাগাতে লাগাতেই বেরিয়ে পড়লো, দোরের কোনে ঝুলিয়ে রাখা ধূসর কালো ছাতাটা হাতে নিয়ে নিলো, ভরপুর বর্ষার সময়,যখন তখন হুটহাট করে জুম বৃষ্টি নেমে পড়ে,এক হাতে ছাতা,অপর হাতে লেডিস ভ্যানিটি ব্যাগ! ব্যাগটি নয়ন বিয়ের পর প্রথম উপহার হিসেবে কিনে দিয়েছিল!তখন বলেছিল সে ঘরেই থাকে এত দামী ব্যাগ দিয়ে সে কি করবে! নয়নের উত্তর ছিলো কত কাজে লাগে, তাছাড়া মানুষ ব্যবহার্য জিনিস দিয়েই যোগ্যতা বিচার করে যদিও তাতে আসলেই যোগ্যতা প্রমাণ হয় না!
কথাগুলো ভাবতেই একটা সূক্ষ্ম নিঃশ্বাস বেড়িয়ে আসলো!দ্রুত গতিতে হাঁটা শুরু করলো,এই একটা কাঁচা মাটির পথ পেরুলেই পিচ ঢালা বড় রাস্তা,সেখান দিয়ে অহরহ যাওয়া আসা করছে টমটম,ভটভটি,মেশিন চালিত রিক্সা কিংবা ভ্যান যা যায় একদম বাজারের রাস্তা পর্যন্ত, বাজারে কিংবা গঞ্জে যাতায়াত করা সাধারণ মানুষজন এসব যানবাহন ব্যবহার করেই ঐ অবধি যায়,যদি কেউ শহরে কিংবা সদরে যেতে চায় তবে তাকে অবশ্যই এই বাজার অবধি এই ব্যবস্থা অবলম্বন করেই আসতে হবে, তারপর কিছুটা হেঁটে কিংবা রিক্সার সাহায্যে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যেতে হবে,তখন বাসের ব্যবহার করতে পারবে! তবে যাদের মোটরবাইক কিংবা সাইকেল আছে তারা সহজেই যেকোন জায়গায় যাতায়াত করতে সক্ষম হবে!
তারার জন্য একটি নির্দিষ্ট মেশিন চালিত রিক্সা আছে যেটাতে তারা নিয়মিত যাতায়াত করে,এটা সকালে নিয়ে যায় এবং রাতে দিয়ে যায়!
--- নয়নের বউ না?
কারো কন্ঠস্বরে পিছু ফিরে তাকালো, নিকাবের মাঝের প্রশ্নাত্নক চোখটা যেন পড়তে ব্যর্থ হলেন সামনে থাকা বয়স্ক মুরব্বি গোছের নারীটি ,তিনি নিজের মতোই বলে চললেন,
--- তুমি নয়ন মেয়ার বউ ,মেয়া বাড়ির বউ?
সময় কম তাই নিজের অযাচিত প্রশ্ন না করে উল্টো বিপরীতে থাকা মুরব্বি'র উত্তর দেওয়াটা বেশি তাড়াতাড়ি সারবে বলেই মনে করলো,
-- জ্বী!
-- কই যাও?
-- দোকানে!
-- কিহ দোকান যাও,ক্যান?
-- দোকানে যাই কামের খেয়াল করতে!
-- ওহ তোমগো দোকান না আগুনে পুইড়া ছাই অইয়া গ্যাছিলো?
-- হইছিলো,তয় এখন ঠিক আছে!
-- কি কও? ক্যাডায় ঠিক করলো? আমি তো হুনছিলাম তোমাগো ক্ষেতি জমিও আগুনে জইলা গেছিলোগা!
-- আল্লাহর রহমতে সবই ঠিক হইছে চাচী!
-- আমি তোমার চাচী না, সম্পর্কে নয়নের ভাবী অই,তোমারো ভাবীই অমু!
মহিলা কথাটা একটু বিরক্ত ঝেড়েই বললো,তারা বুঝলো চাচী বলাতে ক্ষেপছে,তাই বেশি কিছু বলে ঘাটানোর দরকার নেই, এমনিতেই সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সুতরাং কথা কেটে এখান থেকে গেলেই বাঁচে,
-- আইচ্ছা ভাবী তাইলে আমি এখন আসি!
--তুমি বেডি মানুষ অইয়া বাজারে ক্যামনে কাম করো? এত ব্যাডাগো মাইঝে অসুবিধা অয় না!
-- হয়! হইবো না ক্যান! তয় আমি ম্যানেজ করতে পারি! আল্লাহ সহায় আছে! আচ্ছা আমি যাই দেরি হইতাছে!
আর কথা না বাড়িয়ে রিক্সায় চড়ে বসলো, টুংটাং আওয়াজ তুলে প্যাডেল বিহীন মোটরচালিত তিন চাকার যানটি আপনি গতিতে স্বস্থানে নিয়ে যাচ্ছে তার কোলে চড়ে বসা এক অতি সাধারণ রমনীকে!
দোকানের সামনে ভীর করে দাঁড়িয়ে আছে কিশোর থেকে তরুণ,যুবক বয়সী সাতজন ছেলে; সবাই এই দোকানের কর্মচারী,নয়ন কাজ করতো পাঁচজনকে নিয়ে,আর তারার সাথে এখন আছে সাতজন! এক নয়নে যে কাজ হতো তা এখন তারা সহ মোট তিনজনকে মিলে করতে হয়! এটাই হয়তো নারী পুরুষের মাঝে বিশাল পার্থক্য!
-- ও নয়নের বউ কি অবস্থা তোমার?
-- এই চাচা তো আলহামদুলিল্লাহ!
-- কি অবস্থা কাজকামের?
-- আলহামদুলিল্লাহ, আপনেরা যেমনি দোয়া করছেন তেমনি!
-- হুনলাম জোয়াদ্দার নাকি হ্যার ক্ষেতের ব্যাভাক সরিষার চুক্তি তোমার লগে করছে!
-- জ্বী চাচা !
-- কাগজপত্রে করছে নাকি মুখে মুখে?
-- কাগজে চাচা! আপনে তো জানেন আমি মুখের কথায় কাজ করি না!
-- মাইয়া তোমার এইডাই ভালো লাগে ! তয় আমি তাও একবার সাবধান করতে চাই এ জোয়াদ্দার কিন্তু বহুত ভ্যাজাইলা লোক,হ্যার লগে কাম করতে ব্যাডারাই ভাবে হেইহানে তুমি একটা মাইয়া হইয়া! যাই হোক সাবধানে থাইকো, কিছু দরকার হইলে লোক পাঠাইয়া দিও!
-- আল্লাহ ভরসা চাচা!
সুন্দরগঞ্জের আপাতত সবচেয়ে বড় দোকান নয়নের, আগেও ছিল কিন্তু এখন আরো বড় হয়েছে আর তার পুরোটাই সম্ভব হয়েছে তারার অক্লান্ত পরিশ্রম আর কঠোর মনোবলের কারণে! নয়তো আগুনে ছাই হয়ে যাওয়া দোকানটার আবার এই রুপে ফিরিয়ে আনা কম কথা নয়! যেখানে ছিলো প্রতিশোধের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে যাওয়া আগুনের সেই লেলিহান,সর্বনাশের ছাই, সেখানে এখন আবারও দেখা যায় কৃষকের যত্নে পাওয়া সরিষার সোনালী দানা,নানা জাতের ধানের চাল,গম। একজন নারী হয়ে এতকিছু করা সহজ কথা ছিলো না! এমনিতেই নয়নের চিন্তা তার মধ্যে চারদিকে শত্রুর আক্রমণ সবকিছু মিলিয়ে তারার জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছিল! চোখের সামনে লাখ লাখ টাকার ধান পুড়ে ছাই হতে দেখেছে,নীরব অশ্রু বিসর্জন ছাড়া কিছুই করতে পারেনি!এক পুকুর মাছকে বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলেছিল তবুও তার পক্ষে প্রতিবাদ করার সাহস হয়নি!নয়নের কষ্টে গড়া দোকানটা লাখ লাখ টাকার মালামাল সহ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে,তারা যতক্ষনে এসে পৌঁছায় ততক্ষণে আগুন তার আগ্রাসী রুপ দেখিয়ে ফেলেছে!
ক্ষতি যা হয়েছে তা তো হয়েছে তা নিয়ে হাপিত্যেশ করার জন্য দুর্বল মানসিকতা তাঁরার নয়! স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার শেষ হয়ে যাওয়া ব্যাবসার হাল ধরতেই রাস্তায় নামলো।বোরকা দিয়ে নিজেকে আগাগোড়া মুড়িয়ে নিয়ে বাজারের মতো জায়গায় দোকান মেলে বসে!পুড়ে যাওয়া ভূখন্ডের উপর আবারও নতুন করে দোকান তৈরি করলো। ব্যাংকে বেশ ভালো অংক জমা করেছিলো নয়ন, সেখান থেকে টাকা তুলে,জমি বন্ধক রেখে আবারও শুরু করে ব্যাবসার কাজ।এর মধ্যেই মহিলা উদ্যোক্তা হিসেবে সরকারের বিভিন্ন প্রজেক্টের থেকে সাহায্য পায়। বিভিন্ন ভাবেই প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজে আরো দক্ষতা লাভ করে। তবুও শান্তি কোথায় এক জায়গায় গিয়ে আটকে ছিলো,তা ছিলো নয়নের অনুপস্থিতি! এত কিছুর মাঝেও নয়নের অনুপস্থিতি তারাকে তাড়া করতো,মায়ের চোখের পানি তারাকে অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতো! যদিও আম্মা কখনো মুখ ফুটে কিছু বলেনি তবুও!
সংসার,ব্যাবসা, নয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ, নিজের সম্মান বাঁচিয়ে চলা সবটাই তারা সাবধানে সামলে চলছে,যাতে সামান্য ভুলেও কোন ক্ষতির সম্মুখীন আর না হতে হয়!
তারা আজও মনে করে সেদিনের ঘটনার জন্য ঐ দায়ী! কিন্তু আসলেই কি তাই! না আমাদের কিসমতে যা আছে তাই হবে! এটাই একমাত্র সত্য; তবে অবশ্যই কিছু সময় কর্মের জোরেই কিসমত চলে কিন্তু দিনশেষে কিসমতের খেলই বড় খেল!
-- আপা!
কারো ডাকে সেদিকে ফিরে তাকালো তারা, এতসময় মনোযোগ দিয়ে হিসাবের খাতা কষছিলো,
তাওহীদ এখন তারার সাথেই থাকেই,এখানেই সুন্দর গঞ্জের বাজারের দিকে বড় মাদ্রাসা আছে, সেখানে যেয়ে এসে পড়াশোনা করে পাশাপাশি তারাকে কাজে সাহায্য করে, অর্ধেক বেলা পড়াশোনা করে,আর অর্ধেক বেলা দোকানে তারার পাশে বসে,যাতে করে যেকোন ভারী কাজে তারাকে সাহায্য করতে পারে! তাদের জীবনের গতি পথ পাল্টাতে দুলাভাই অনেক করেছে তার জন্য দুলাভাইয়ের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই,তবে এই সামান্য কাজ করে দুলাভাইয়ের ঋণ কমানো যাবে না, তাওহীদ চেষ্টাও করতে চায় না,সে শুধু চায় তার আপাকে সাহায্য করতে!তাই তো নিজের পড়াশোনায় কিছুটা ক্ষতি করে হলেও আপার পাশে থাকলো!
-- আইসা পড়ছিস?
-- হ কও!কি কাম করা লাগবো!
-- এদিকে আয়! দেখ তো হিসাবের এই খাতাটা ঠিক আছে কিনা?
সময় নিয়ে ভালো করে দেখে তারার হাতে খাতা ধরিয়ে দিয়ে বললো,
-- ঠিক আছে!
হিসাব নিকাশে তাওহীদ ভালো ছাত্র,তাই তারা চেষ্টা করে তাওহীদকে দিয়ে নিজের ভুলত্রুটি ধরানোর,যদিও সেটা কখনোই হয় না কারণ তারাও মেধাবী শিক্ষার্থী, সচেতন তাই ভুল করার সুযোগ নেই!
সারাদিনের কাজকর্ম গুটিয়ে তারা পথ ধরলো বাড়ির,যাওয়ার সময় হিসাবের খাতা নিতে ভুলেনি,এটা তারা শিখেছে নয়নের থেকে! নয়ন সবসময়ই হিসাবের প্রধান খাতা বাড়িতে নিয়ে যেতো,এর জন্যেই এত বড় দূর্ঘটনার শিকার হয়েও এত তাড়াতাড়ি নিজেদের সামলাতে পেরেছে,নয়তো দেখা যেতো এই সুযোগে অনেকেই হিসাব নিয়ে গড়মিল করার চেষ্টা করতো, নয়নের অনুপস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা অনেকেই করেছে, সেটা আরও সহজ হতো যদি না ঠিকঠাক হিসাবের তালিকা পাওয়া যেতো! ভাগ্যিস নয়ন সবসময়ই হিসাব করার সময় তারাকে আশেপাশে থাকার অনুরোধ করতো! তাই তো এই দোকানির সব কাজ শেখা এত সহজ হয়েছে!
-- আপা!
-- হুম!
-- কি ভাবো?
-- কিছু না! তুই কি মাদ্রাসার বড় হুজুরের সাথে কথা বলছিস?
-- হু!
-- কি বলছে?
-- বলছে তোমারে গিয়া কথা বলতে!
-- আচ্ছা!
পর্ব ০২
আজকের আকাশ বেশ পরিষ্কার, কোথাও কোন মেঘের আনাগোনা নেই! তারা উঠোনে নেমে আকাশ দেখে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলো আজকে একবার ক্ষেতে গিয়ে ধানের অবস্থা দেখে আসবে তাছাড়া কামলাদের সাথেও কথা বলতে হবে!ধান কাটার সময় ঘনিয়ে আসছে, ভয়ংকর ঝড় বাতাসের আগে ধান কাটতে পারলে ভালো হয়! যেমন ভাবা তেমনি কাজ! আগে ঘরের কাজ শেষ করা জরুরি তাই বেড়ার সাথে সেঁটে রাখা শলার ঝাড়ু নিয়ে উঠোনসহ আশপাশে ঝাড়ু দিতে লাগলো,
-- আরে কি করো তুমি,এহন আবার ঝাড়ু দিতে লাগলা ক্যান? মুনিয়ার আম্মায়ই দিতো!
-- না থাক আম্মা আমিই দেই,এমনিতেও অনেকদিন ঘর দুয়ারের কাজকাম করি না,ভালো লাগে না!
আম্মা কইতাছিলাম আমি যাওয়ার পথে একটু ক্ষেত অইয়া যাইতাম!
-- হ যাও তয় এহোন ক্যামনে যাইবা! তুমি তো দোকানে যাইবা!
-- আমি একবারে রেডি হইয়াই বাইর হমু!আপনেও আমার লগে চলেন!
-- আমি যামু!
-- চলেন আম্মা!
বউ শ্বাশুড়ি মিলে একসাথে সকালের জলখাবার সেড়ে বেরিয়ে পড়লো,এই জমিটা বেশ খানিকটা দূরে,তাই একটু সময় লাগলো,তারা আইলের পথ ধরে ধীর পায়ে নেমে গেল, আম্মা রাস্তার ধারে বসে পড়লো, এতদূর হেঁটে আসতে বেশ কষ্ট হয়েছে,তবুও আসলো ছেলের কষ্টে গড়া আমানতের খেয়াল রাখতে এতটুকু কষ্ট করাই যায়! তারা দুই চোখ বন্ধ করে প্রাণ ভরে শ্বাস নিলো, ঝলমলে রোদের মাঝেও বাতাসের আদ্রতা শরীর শীতল করে দেয়,তার সাথে পাকা সোনালী ধানের ঢেউ খেলানো সৌন্দর্য মনের সব খারাপ লাগাকে উধাও করে দেয়, আইলের উপর দাঁড়িয়ে চারদিকে একবার দেখলো, এর মধ্যেই ক্ষেতের মাঝে কাজ করা একজন দৌড়ে এলো,তারা সেদিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিয়ে সালাম দিলো,
-- আসসালামু আলাইকুম!
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাবী সাহেবা! কেমন আছেন?
-- এই তো আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো, আপনাদের কি অবস্থা?
-- রাখছে আল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ!
আপনি এতদূর এই রইদের মইধ্যে আইলেন কিসের জন্যে! আমাদের কেউরে কইলেই চইলা যাইতাম!
-- না আসার দরকার ছিলো তাই আসলাম! তাছাড়া আপনাদের সাথেও তো দেখা হয় না অনেকদিন!
-- কি দরকার ভাবী,কন তো হুনি!
-- ধান কাটার সময় হইয়া গেছে তাই না! তা কবের থেকে শুর করবেন, আল্লাহ না করুক আবার ঝড় তুফান শুরু হইয়া যায়!
-- আপনি কন কবের থেইকা শুরু করা যায়! একদম শেষ পর্যায়ে আছে, আমরাও সবাই তৈয়ার আছি!
-- আচ্ছা কি পরিমান হতে পারে আন্দাজ আছে?
-- ভাবী অহোন ওমনে তো কওয়া যাইবো না তয় এতটুকু কইতে পারি আগের বারের চেয়েও দ্বিগুণ অইবো! ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আপনার কষ্টের মূল্য ভালো মতোই দিবো!
লোকটির কথায় তারার হাসি চওড়া হলো, ধান পান সম্পর্কে ভালো ধারনা আছে,ছোট থেকেই নিজের বাবাকে দেখে অভ্যস্ত তাছাড়া গ্রামের মেয়েরা এগুলো বেশ ভালো বুঝে!নয়ন নাই, নয়নের লাগিয়ে যাওয়া ধানগুলো পাকা অবস্থায় অজানা শত্রুর দেওয়া আগুনে সবটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, এমনিতেই ঐ সময়ে নয়নের জন্যে মনের মাঝে হাহাকার তার মধ্যে চারদিকে অজানা শত্রুর দেওয়া আগুনে সব শেষ হয়ে যাওয়া! দুইজন অসহায় নারী নিরবে দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারেনি,যদিও তারা আইনের পথ অবধি গিয়েছিল কিন্তু শত্রুরা খুবই সাবধানে নিজেদের জঘন্য কর্ম সম্পাদন করেছে যার কারণে কোন প্রমান না পাওয়ায় আজও সেই কেসের সুরাহা হয়নি! তবে তারা এখনও নিজের বিচার চেয়ে যাচ্ছে! ইনশাআল্লাহ একদিন এর সমাধান হবেই!
তারা নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে কচকচে দুটো পাঁচশ টাকার নোট বের করে লোকটার হাতে গুঁজে দিলো,লোকটা প্রশ্নাত্নক চোখে তারার দিকে তাকালো,
-- ভাবী সাহেবা!
-- অনেক মেহনত করছেন,এই যে সোনালি রঙের স্বপ্ন তা আপনাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল! আল্লাহ আপনাদের খুশি করতেই আমারে এগুলো দান করছে!
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ধরনে লোকটা খুশি হলো মনে মনে বললো ,"যে যেমন তার কপালে জুটেও তেমন" নয়নও নিজের শ্রমিকদের বড় ভালোবাসতো, তাদের সুবিধা অসুবিধার খেয়াল সবসময়ই রাখতো! তারাও ঠিক তেমনি, মাত্র কয়েকদিনেই কেমন সবার কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে,সবাই তারার ব্যবহারের প্রশংসা করে!
-- আচ্ছা আমি যাই,আমি বাড়ি গিয়া ভাবি, তারপর বলবো!
-- আইচ্ছা ভাবী!
তারা কথা বলছিলো আর আম্মা দূর থেকে দাঁড়িয়ে ধানের ঢেউ খেলানো দেখেছিলো, সাথে মনে করছিলো নয়নকে খুব করে। নয়ন থাকলে এই খুশির আমেজে বাড়িতে ঢেউ ভয়ে যেতো! আজ ছেলেটা নাই,সবদিক কেমন নির্জীব হয়ে আছে, নয়নের দাদাও আগের চেয়েও চুপ হয়ে গেছে,খাওয়াদাওয়াও কমিয়ে দিয়েছে, তার সামনে যাওয়া মানেই প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া! বারবার জিজ্ঞেস করে নয়ন কোথায়,আসেনা কেন? উত্তর একই , কিন্তু তাতে সেই বয়স্ক মানুষটির মন ভরে না, আদরের নাতীকে দেখার জন্য তার সেই আকুতি কোনভাবেই এড়ানো যায় না আবার তার ইচ্ছাকেও প্রাধান্য দেওয়া যায় না! ভাবতে ভাবতেই আম্মার চোখ ভরে এলো,আপন মনে গড়িয়ে পড়লো, ভিজিয়ে দিলো নয়নের প্রান্তদেহ থেকে চিবুকের প্রান্তদেশ! আঁচলের কোনা দিয়ে গাল সহ চিবুক মুছে নিলো,নয়ন বারবার বলেছে না কাঁদতে, কাঁদলে তার সাথে দেখা করবে না! তার জন্যই তো বউ শ্বাশুড়ি কেউ কাঁদে না! আসলেই কাঁদে না? নাকি কাঁদে শুধু অশ্রু দেখা যায় না! আম্মা তো তাও কখনো কখনো অশ্রুপাত ঘটিয়ে নিজের অন্তরের চাপ কমায় কিন্তু তারা!সেতো সেই সুযোগও পায় না! তাকে কাঁদতে হলেও ভাবতে হয়! নয়তো আড়াল আবডালে নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে হয়! কারণ সে কাঁদলে আম্মাও কাঁদে এটা তো বুঝে তাইতো!
তারাকে আসতে দেখে আম্মা উঠে দাঁড়ালো,তারা শ্বাশুড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
-- আম্মা চলেন আপনাকে আগাইয়া দিয়ে আসি!
-- না থাউক আমি যাইতে পারমু তুমি যাও দোকানে! এমনিতেই ম্যালা দেরি অইয়া গ্যাছে তুমার!
-- আচ্ছা সাবধানে যাইয়েন!
কথার মাঝেই তারার বাটন ফোনটা বেজে উঠলো,এটা তারার নিজের না, নয়নের ব্যবহৃত, ফোনটা আপাতত তারাই সেটা ব্যবহার করছে,ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে দেখলো মনির ফোন, আম্মার দিকে তাকিয়ে বললো,
-- মনি আপা দিছে আম্মা!
-- ধরো,দ্যাহো কি কয়, আল্লাহ আমারে খুশির খবর দিক!
-- হ আম্মা দোয়া পড়েন!
-- আসসালামু আলাইকুম মনি!
-- ***
-- আছি আলহামদুলিল্লাহ,তুমি কও তোমরা ক্যামন আছো? দুলামিয়া ক্যামন আছেন?
--***
-- ওদিকের কি কোন খবর আছে? আমি ভাবছিলাম এই শুক্রবার যাবো!
-- ***
-- কিহ্ সত্যি!
-- ***
-- আচ্ছা তাইলে আমি আম্মাকে নিয়ে আসবো!
--- ***
--- আমি তার অপেক্ষায় থাকবো!
তারার কন্ঠস্বর ভারি হয়ে উঠলো, ঢোক গিলে নিজের গলার স্বর স্বাভাবিক করে নিলো , আম্মার দিকে তাকাতেই, অশ্রুরা নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে গড়িয়ে পড়লো,পাপড়িদ্বয় ভিজে সিক্ত হয়ে উঠলো তার সাথে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে, আম্মা তাঁরাকে কাঁদতে দেখে অস্থির হয়ে পড়লো,হাত ধরে অস্থির চিত্তে শুধালো,
-- বউমা কি কইছে? কও তারাতাড়ি,
-- আম্মা আপনের পোলার জামিন হইছে!
কথাটি বলার সময় কান্নার মাঝেও খুশিতে হেসে দেয় তারা,শ্যাম মুখের ভেজা গালের মাঝে সিক্ত নয়নের খুশির ঝিলিক সমুদ্রের গহীন থেকে উত্তোলিত শ্বেত শামুকের ন্যায় ঝলমলে মনে হলো! আম্মা অবিশ্বাস্য কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
-- সত্য কথা!
-- হ আম্মা,পরশুদিন বাইর হইবো! মনি বলছে তারে নিয়া মনিই আসবো, আমাদের এতদূর কষ্টে করে যাইতে মানা করছে আপনের পোলা,তাই আমগো আর ঐদিকে যাইতে নিষেধ করছে!
তারার চোখ না চাইতেও বারবার ছলছলিয়ে উঠছে, এতদিন পর নিজের প্রিয় মানুষটিকে এত কাছে থেকে দেখতে পাবে,তাকে ছুঁতে পারবে! আজ কতগুলো মাস হয়ে গেছে তাকে ছুঁয়ে দিতে পারে না। শেষবার যখন কোর্টে গিয়েছিল তখন নয়ন হাত ধরতে যেয়েও ধরতে পারেনি,পুলিশ টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল, কারাগারের ঐ ছোট্ট খোপ খোপ ছিদ্র দিয়ে মুখটাই তো দেখা যেতো না ছোঁয়া তো দূরের কথা!
তারার স্মৃতিপটে ভেসে উঠলো সেই দিনের ঘটনা,
ফ্লাসব্যাক,,
মেলার থেকে গ্রেফতার করে নয়নসহ সবাইকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, নয়নের কাঁধে অনেক খানি কেটে গিয়েছিল, পেছনে ঘাড়ের থেকে ঠিক পাচ ছয় ইঞ্চি নিচে বেশ অনেকখানি ফেটে গিয়েছিল, চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত ঝড়ছিলো!
নাদিমের এক হাত মেলায়ই আলাদা হয়ে যায়,
অপর হাত ভেঙে পেছনের দিকে হয়ে থাকে,ওর সাথে কয়েকটি ছেলের অবস্থাও বেশ নাজুক হয়ে পড়ে, এরমধ্যে একজনের হাতের পাঞ্জা পড়ে যাওয়ায় তার শরীর থেকে প্রচন্ড রক্তক্ষরণ হয় যার কারণে তার অবস্থাও শোচনীয়। মোটামুটি সবাই ভয়াবহ ভাবে আহত হয়, নয়নের মাঝে যে এদের জন্য আজরাঈল ভর করেও চলে গেছে এটাই এখন সবার মুখে মুখে! কিন্তু তাতে নয়নের অপরাধ কমে যায় না, অন্তত আইনের চোখে তো নাই! নয়ন নিজের সম্মান বাঁচাতে আইনের সাহায্য নিতে পারতো তা না করে নিজেই আইন হাতে তুলে নিয়েছে আবার এতগুলো মানুষের এত ভয়াবহ হাল করছে! আইনের দৃষ্টিতে অবশ্যই নয়ন অপরাধী এবং ভয়ংকর মানুষ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে!
প্রায় একদিনের চিকিৎসা সম্পন্ন করে নয়নকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়,তার সাথে পুলিশ বাদী হয়ে নয়নের বিরুদ্ধে মামলা করে এটা অবশ্যই নাদিমের থেকে টাকা খেয়ে করেছে, যেহেতু নাদিমের উপর রাজনৈতিক দলগুলোর ছায়া আছে তাই এটা নাদিমের জন্য খুব একটা ব্যাপার হয়নি,তবে কথায় আছে না চোরের দশদিন গৃহস্থের একদিন এবারের বেলায় ঠিক তাই'ই হয়েছে! নাদিমের প্রতি এলাকায় অনেক মানুষেরই সুপ্ত ক্ষোভ ছিলো কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস কারোই হয়নি তবে নয়নের সাহসে যেন সবারই সাহস বেড়ে গিয়েছিল তাই অনেকেই নাদিমের বিরুদ্ধে মুখ খুলে,তার সাথে নয়নের তরফ থেকে সাক্ষী হয়! তবে এতেও বিশেষ কিছু হয়নি,কারণ দূষিত আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়তে হয় অনেক নিরাপধীকেই
, নয়নও তেমনি ঝামেলায় পেঁচিয়ে অন্ধকার ঐ কারাগারে আজ ১১ টি মাস! একদিকে আইনি জটিলতায় কারাগারে নয়ন অপরদিকে নাদিমের টাকা খেয়ে বাইরে নয়নের ধ্বংস চালাচ্ছে নাদিমের চ্যালাপ্যালারা! যদিও তার প্রমান একদমই নাই! তাছাড়াও এই সুযোগে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে নয়নের অদৃশ্য লুকায়িত শত্রুরা যারা নয়নের সফলতা সহ্য করতে পারেনি কখনোই তাই তো দোকানে আগুন,এক বিশাল ক্ষেত জুড়ে পাকা ধানে আগুন,এক পুকুর চিংড়ি মাছে আগুন! সব ! সব দিয়ে নয়নকে শেষ করার পরিকল্পনা করেছে তারা!
নয়ন শোনার পর তারাকে শুধু বলেছে তার আর মায়ের খেয়াল রাখতে, কোনভাবেই কারো মুখোমুখি না হতে।নয়ন চায় না তারা তার অজানা শত্রুর মুখোমুখি হোক, কারণ যারা অবুঝ প্রাণীর ক্ষতি করতে ভাবেনি তারা তারাকে ছিঁড়ে খেতেও ভাববে না! নয়নের অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে তারাকে! তাই তো তারাকে ঘরে বন্দি থাকার আদেশ করে, কিন্তু স্বামীর আদেশ মেনে তাকে নিঃস্ব হতে দেখতে পারবে না,তাই নয়নের অজান্তেই শ্বাশুরি,ননদ,ননদের জামাইয়ের পরামর্শে এবং তাদের সহযোগিতা নিয়েই তারা নয়নের ব্যাবসার হাল ধরেছে! নয়ন এসে দেখলে হয়তো অবশ্যই রাগ করবে কিন্তু খুশিও তো হবে তার এত কষ্টে অর্জিত সবকিছু এভাবেই ধ্বংস হতে দেয়নি তার জীবনসাথী!
তারার চোখেমুখে খুশির ঝলক,পানি যেন থামছেই না, আম্মারও একই অবস্থা! তারা কোনরকমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বললো,
-- আম্মা আপনে বাড়ি যান,গিয়া আপনার পোলার জন্য প্রস্তুতি ন্যান। আমি আজকে শেষবারের মতো দোকানে যাই, আল্লাহ বাচাইলে তো আগামী চার পাঁচদিনের মইধ্যে আপনের পোলাই তো দোকানে যাইবো!
-- হ হ সাবধানে যাও,আমিও যাই! গিয়া আমার বাজানের লইগা আয়োজন করি!
পর্ব ০৩
-- ও নয়নের বউ!
-- আসসালামু আলাইকুম চাচা!
-- ব্যাচাকিনির কি অবস্থা? আর তোমার দিনকালই বা কেমন যাইতাছে?
-- আলহামদুলিল্লাহ চাচা! আপনি কন আপনের শরীর ক্যামন আছে?
-- এই রাখছে আল্লাহ য্যামন! তা নয়নের খোঁজখবর কি? জামিনটামিন কি পাইবো না? আর কতদিন এই মিথ্যা ফ্যাছাদে এইমন জেইল খাটবো!
-- আল্লাহ দিলে ইনশাআল্লাহ শ্রীঘ্রই পাইবো চাচা,দোয়া কইরেন যাতে তাড়াতাড়ি আপনেগো পোলা আপনেগো কাছে ফিইরা আসতে পারে!
-- হ; হেই দোয়াই তো করি! নয়ন অইছে আমগো গিরামের অহংকার! অর মতো পোলা পাওয়া বাপ মায়ের লইগ্গা য্যামনি ভাইগ্য ত্যামনি গিরামের মানুষ ইসাবে আমগোও ভাইগ্য! কিন্তু আপসোস অয় পোলাডার কিসমত ম্যালা খারাপ, সুখের দ্যাহাই পায় না! যহনই একটু সুখ পাইলো পইড়া গ্যালো এ্যাক অযাচিত অশান্তিতে! আল্লাহ জানে কবে এই বালা থেইক্কা মুক্তি পাইবো!
তারা নয়নের জামিনের কথাটা এখনই কাউকে বলতে চায় না,বলা তো যায় না অদৃশ্য সেই লুকায়িত শত্রু আসলেই কে? কে বন্ধু সেজে পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে, তাছাড়া নয়ন আসলে সবাই এমনিতেই দেখতে পাবে,তাই আগেভাগে কাউকে শুনিয়ে খাল কেটে কুমির আনার মতো কোন ভুল করতে চায় না! মন্ডল সাহেব আরো কিছু সময় নয়নের বন্দনা করে অবশেষে নিজের কাজের কথায় ফিরলেন,,
-- তা বউ মা কইতাছিলাম ধান কাটার প্রস্তুতি নিতাছো?
-- জ্বী চাচা নেওয়ার চেষ্টা করতাছি! আইজকা কামলাগো লগে গিয়া আলাপ আলোচনা কইরা আসছি! শুভক্ষণ দেইখা আল্লাহর রহমতে কাটা শুরু করমু! বুঝেনই তো আমি একা মাইয়া মানুষ, আম্মা বয়স্ক মানুষ চাইলেও অনেক সময় খাটতে পারে না, তাছাড়া উনারে রইদের মইধ্যে দাড় করাইয়া রাখতে আমার বিবেক বাঁধা দেয়!তাই ভাবছি আমার বাপের বাড়ি থেইক্কা কোন মানুষ আইনা কয়দিন রাখমু তাগোরে দায়িত্ব দিমু! তাতে যদি একটু শান্তিতে ধান কাটার কাম শ্যাষ করতে পারি!
-- এইডা ভালা বুদ্ধি! নিজেগো লোক রাখলে চিন্তা কম অয়,নাইলে দ্যাখবা দশ মণ ধানের মইধ্যে চিটাই বাইর অইবো পাঁচ মণ ,বাকী পাঁচ মণের থেইক্কা কামলা লইয়া যাইবো আড়াই মণ আর তুমারে দিবো আড়াই মণ! মানে অইলো আগের চিটা ধান পাঁচ মণ,আর তুমারে দ্যাহাইয়া নিলো আড়াই মণ মোট সাড়ে সাত হ্যারাই লইয়া গ্যালো! আর তুমার জমি তুমি কি পাইলা! বুঝছো এত বছর এই কামলাগো নিয়া খেইলা খুব ভালো কইরা এগো বুঝছি,আর তুমি তো এহোনও বাচ্চা মানুষ তুমারে ঠকাইতে এগো বিবেকে বাঁধবো না !
তারা মনযোগ সহকারে মন্ডল সাহেবের কথা শুনলো, উনি একদম মিথ্যে বলেননি ,জমি বর্গা দিলে কিংবা নিজস্ব লোকবল ছাড়া একমাত্র কামলাদের উপর নির্ভর করে চাষাবাদ করলে এরকম ঘটনার স্বীকার কমবেশি সব চাষীই হয়! কামলারা মজুরিও নেয় আবার চুরি করে ফসলও নিজের ভাগে বেশি নেয়! তবে অবশ্যই সবাই এক না! পৃথিবীতে সবাই এমন হলে নিশ্চয়ই মানুষ মানুষে এত মিল থাকতো না! আর তাছাড়া শ্রমিক মালিকের সম্পর্কই বিশ্বাসের, বিশ্বাস না করলে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি সামান্য একজন কর্মচারীর উপর নির্ভর করে ফেলে রাখতে পারতো না! বিশ্বাস করেই তো মানুষ সম্পর্ক গড়ে, সম্পত্তির ভার ছাড়ে! তবে সেই বিশ্বাসের অমর্যাদা যে করে সে নিশ্চয়ই তার চুড়ান্ত খেসারত দেয়!তারা চায় তার শ্রমিকদের বিশ্বাস করতে তাছাড়া এরা সবাই নয়নের সাথে কাজ করা লোক,নয়ন বলছে এরা সবসময় নয়নের হয়ে কাজ করে!নয়ন এদের অনেক বিশ্বাস করে, তাঁরাও চায় বিশ্বাস করতে,এখন তারা যদি তাঁরাকে ঠকায় নিশ্চয়ই এর জন্য তারা দায়ী থাকবে। তাঁরা নাই বা দেখুক, উপরে বসে যিনি বিশ্ব ভ্রমান্ড পরিচালনা করছে তিনি তো দেখছে,তিনিই না হয় রোজ হাসরে এর সঠিক জবাব দিবেন! মনে মনে কথাগুলো ভাবতেই বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস।
মন্ডল সাহেব কথা শেষ করে তারার দিকে তাকিয়ে বললো,
-- তোমার লইগা একখান প্রস্তাব আছে! যদি ভালো লাগে গ্রহন করতে পারো!
-- কি প্রস্তাব চাঁচা!
-- আমি এইবার ধানের উপরেই আছি, দক্ষিন কান্দির হগ্গলের ধানের জমি পুরাডা আমিই নিছি,মানে অইলো এইবার এই সুন্দর গঞ্জের ব্যাভাকের ধান আমিই কিন্না লইছি, যেহেতু নয়ন নাই তাই তুমাগো লগে আলোচনাও করা অয় নাই, নয়ন থাকলে আলাদা ব্যাপার! বুঝলা যতই কই ,তুমি তো মাইয়া মানুষ,আর আমি আবার মাইয়া মাইনসের লগে ব্যাবসা কইরা খুব একটা মজা পাই না,এরা বুঝে কম চিল্লায় বেশি! না বুইঝাই সিদ্ধান্ত লয়! যাই হোক তুমার লগে কাম করার উদ্দেশ্যে অবশ্যই নয়ন মিয়া! নয়নের লগে আগেও কাম করার ইচ্ছা ছিলো, কিন্তু করা অয় নাই, এইবার দ্যাখলাম তোমাগো সরিষা গুলা ক্যামন অইয়া গ্যাতাছে তাই ভাবলাম আমি কিন্না নেই,নাইলে য্যামনে আগুনে সব জইলা গ্যাতাছে তাতে তো পথে বসতে সময় লাগবো না , নয়নের কষ্ট দেখছি তাই মায়া অইলো,ভাবলাম পোলাডা এত কষ্ট কইরা এত উপরে উঠলো, সামান্য একটা ভুলে সব শ্যাষ অইয়া যাইবো তাও আমরা থাকতে! ক্যামনে অয়! তাই তো সব সরিষার বীজ কিন্না নিলাম তুমার থেইক্কা,তয় অস্বীকার করুম না তুমি ম্যালা বুদ্ধিমতী!তাই তো ঠিক সময়ে ঠিক কাম করার সিদ্ধান্ত নিতে পারো! তাইতো তুমার লগে কাম করার ইচ্ছা আবারও জাগলো,তয় কও এইবার আমার প্রস্তাব ক্যামন লাগলো?
-- জ্বী চাঁচা কোন প্রস্তাবের কথা কইতাছেন?
-- ওমা এত সময়ে কি কইলাম তুমারে বুঝো নাইকা!
-- না মানে আপনে তো অনেক কিছুই কইলেন কিন্তু ঠিক কোনটা প্রস্তাব তাই বুঝি নাই আর কি!
বিস্ময়ে মন্ডল সাহেব হতবাক হয়ে গেলেন,এত কিছু বলার পর তারা বলছে উনার কথাই তারা বুঝেনি, হতভম্ব হয়ে বেশ কিছুক্ষণ তারার পাণে তাকিয়ে এর পর কিছু একটা ভেবে বললেন,,
-- বুঝতে পারছি তুমি নয়নের কথা ভাবতাছিলা! নয়নের কথা কইলাম তাই তোমার ওর কথা মনে পইড়া গ্যাছে! এইডাই স্বাভাবিক! স্বামী অয় তোমার, বিয়ার মাত্র কয়েকমাস এইর মধ্যেই বিচ্ছেদ,আসলেই কষ্টদায়ক! যাই হোক তুমার কষ্ট তো কমাইতে পারুম না,তাই আর বাড়ানোর ইচ্ছাও নাই!
আচ্ছা আমি কইতে চাইছিলাম, তুমাগো দক্ষিণ কান্দির যেই জমি আছে ঐডায় আউশের আবাদ করছো না! আমি চাইছিলাম হেইডার ব্যাভাক ধান আমি নিমু,তুমি কইলে কাইল পরশু কাগজে কলমে চুক্তি অইলাম,তুমি তো আবার কাগজের সই ছাড়া কাম করো না!
-- কিন্তু আমি তো সেই ধান সবটা সরকারের কাছে বিক্রি কইরা দিছি!কাটার পর তারাই আইসা মাইপা নিয়া যাইবো!
-- কিহ!
-- জ্বী চাচা!
-- কি কও ? এই কাম কহোন করলা? কিছুই খবর পাইলাম না! আর তুমারে এই বুদ্ধি দিছে ক্যাডা?
-- জ্বী আপনে তো জানেন আমি কিছুদিন প্রশিক্ষণ নিছিলাম নারী উন্নয়নের সংগঠনে,সেই সময়ই পরিচয় হইছিলো এক কৃষি কর্মকর্তার সাথে,সেই সবটা করতে সাহায্য করছে!
-- কত কইরা দিবো মণ!
-- তা ধরছে বাজার অনুযায়ী! আর এহোন থেইকা আমার ক্ষেতের সব ফসল তাগো কাছেই বিক্রি করমু! উনারও মত আছে!
-- নয়ন জানে এই বিষয়ে!
-- জ্বী জানে!
-- আইচ্ছা তাইলে আর কি কমু! এত বড় কাম কইরা ফালাইছো অথচ আমগোরে জানানোর প্রয়োজনই যখন মনে করলা না তাইলে আর কওনের কি আছে!
তয় ব্যাপারটায় ম্যালা দুঃখ পাইছি,যেইহানে আমরা বড় বড় ব্যাপারিরা আছি হেইহানে তুমার সরকারি লোক ঢুকানোর দরকার আছিলো না! যহোন ন্যাইয্য দাম দিবো না তহন কিন্তু সাহায্যের লইগা আমগোরে পাইবা না!
আহি আইজকা, আল্লাহ চাইলে তুমারে আমগো দুয়ারে দেহুম তয় নিরাশ করুম না!
শেষের কথাটা বেশ হুমকি দেওয়ার মতো করেই বললো,কথা শেষ করেই উঠতে লাগলো,তারা মনে মনে কিছু উদ্ভট গালি দিলো কারণ মুখে বলতে পারলেও বলা উচিত নয়, মুরব্বি মানুষ তাই শিক্ষায় বাঁধা পড়লো! সরকারি ভাবে ধান বেচাকেনার বিষয়টি নয়নই তারাকে বুঝিয়েছে,কারণ নয়ন গত মৌসুমেই নাকি ঐ কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করে রেখেছে, তাছাড়াও নয়নের অনুপস্থিতির সুযোগে মন্ডল সাহেব সাহায্য করার নামে অনেক কম মূল্যে তারার থেকে সরিষার বীজ নিয়েছে! এক কথায় সূযোগ পেয়ে ইচ্ছা মতো ঠকিয়েছে! তাই নয়ন আগেই সাবধান করেছে তাঁরাকে যাতে নিজের এত কষ্টের ফসল মন্ডলদের মতো সুযোগসন্ধানী লোকের ফাঁদে পা দিয়ে ঠকে গিয়ে বিক্রি না করে।
তারা ভাবলো এই লোককে ক্ষেপানো উচিত হবে না, বাজারে বড় বড় ডিল উনিই করে,যতই সুযোগসন্ধানী হোক এদের সাথে মুখ লাগলে বাজারে টেকা কষ্টের হয়ে যাবে, তাছাড়া নয়ন আসা অবধি আর কোন ঝামেলায় পড়তে চায় না তাই কিছুটা নমনীয় হয়েই বললো,
-- চাঁচা আপনি ভুল বুঝতাছেন! আমি তো আর আগে জানতাম না, আপনার সুদৃষ্টি আমগো দক্ষিণ কান্দির আউশের উপরে পড়বো তাইলে কি আর এতো কষ্ট করি! বুঝেনই তো আপনেগো পোলা নাই,আর আমিও তো আগে কখনো এত বড় বড় কাম করি নাই তাই ভুলভাল সিদ্ধান্ত মাঝে মাঝেই নিয়া ফেলি!এর জন্য আপনে আমার উপরে নিরাশ হইলে আমগো কি অইবো! আমি তো আপনের মাইয়ার মতোই,আমারে এইভাবে ভুল বুইঝেন না চাঁচা!
ততক্ষণে উনি পা বাড়িয়েছে দোকান থেকে বাইরের দিকে, তাঁরার শেষ কথায় পিছনে ফিরে তাকালো এরপর বললো,
-- দ্যাহো তুমাগো ভালা চাই তাইতো সাইধা আইয়া খোঁজখবর নেই,নাইলে আমারে ফসল দেওয়ার লইগ্গা দোকানে সিরিয়াল দেয়!
-- আচ্ছা আগামীবার তো আপনেগো পোলা থাকবো তার সাথেই কথা বইলেন!
আর কোন প্রত্তত্তর না করে গম্ভীর হয়ে বেরিয়ে গেল,তারা একটু ভাবুক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো,কে জানে এই মন্ডল এখন আবার কি মুসিবত খাড়া করে!
পর্ব ০৪
স্থির নয়নে তাকিয়ে আছে সামনে থাকা মানুষটির দিকে,টলমলে চাহনি,যেকোন মুহূর্তেই গড়িয়ে পড়বে বারিধারার ন্যায় অশ্রুরাশী,তারা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো না! ঝাঁপিয়ে পড়লো ঐ জীর্ণ শীর্ণ দেহের চওড়া পাঁজরের হাড়ের মধ্যে,দুই হাত দিয়ে আষ্ঠেপৃষ্টে আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো, দুর্বল দেহে ক্লান্তিরা ভর করলেও মনের শক্তি ঠিকই স্থির থাকালো,প্রিয়তমার বাঁধভাঙা কান্না চিত্তে অশান্তি সৃষ্টি করলেও হৃদয়ে সুপ্ত অনুভূতিরা শান্তনা দিচ্ছে এই বলে যে সে কেবল তার বিরহেই ব্যাকুল ছিলো!তার উপস্থিতি তার প্রেয়সীর সকল অনুভূতির আগমন ঘটায়! সে তো জানে প্রিয়তমা তার ভীষন বাধ্য! তাই তো এতগুলো মাস তার আদেশ পালনেই নিজের সমস্ত অনুভূতিকে শিকলে বেঁধে দূর অজানায় লুকিয়ে রেখেছিলো,আজ তাথূ উপস্থিতি তাকে যে আর এত নিয়ন্ত্রণে রাখবে না সেটা তো জানাই ছিলো! নয়ন ক্লান্তি ভরা কন্ঠে আদুরে গলায় ডাক দিলো,
-- বউ !
অনেকগুলো মাস, অনেকগুলো দিন, অনেকগুলো মুহূর্তের পর সেই চিরচেনা কন্ঠে,সেই প্রিয় অনুভুতির দোলে,সেই ভালোবাসার ডাক তারার ভেতরে আরও ঝড় তুললো,যা তাকে আরও বেশি আবেগী করে তুললো, কান্নার দাপট বেড়ে গেল,নয়ন নিজের বাঁধন শক্ত করলো,একদম ভাঙা পাঁজরের মাঝে মিশিয়ে নিলো,এক হাত দিয়ে কোমর পেঁচিয়ে রেখে অন্য হাত মাথার উপরে চলে গেল,চুলের উপর হাত বুলিয়ে মিষ্টি মিশিয়ে ভালোবাসার সুর জড়িয়ে বললো,
-- বউ কাইন্দো না! এতদিন পর আসছি তুমি হাসিখুশি কথা না বইলা এমনে কান্দলে আমার ভালো লাগবো?
তারার কান্না থামলো না বরং বোধহয় আরো একটু বাড়লো, নয়ন আর কিছু বললো না , এভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো কিছু সময়,ওভাবেই তারার মাথায় চুলের উপর হাত বুলাতে থাকলো,মাঝে মাঝে ছোট্ট চুমু দিতে থাকলো, অনেক সময় পর তারা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনলো, নয়নের মুখ থেকে মুখ তুলে নয়নের মুখের দিকে তাকালো,মায়াময় সেই দৃষ্টিতে নয়নের ভেতরে নড়েচড়ে উঠলো,এত কেন ভালোবাসে এই মেয়েটা তাকে! কতই আর দিন হলো তাদের প্রণয়ের! মাত্রই বছর পার হলো অথচ মনে হয় এক জন্মের পরিচয়! স্বামী স্ত্রী বলেই কি?
তারা নয়নের দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখেই নিজের দুই হাতের আঁজলায় নয়নের মুখটা আগলে ধরলো, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো,নয়ন তারার বাচ্চামিতে তাল মিলিয়ে শুধু তারাকেই দেখছে, নয়ন শ্যাম বর্ণের হলেও ওর মুখে কোথাও কোন চিহ্ন ছিলো না! একসময় দুধ ফর্সা নয়ন জীবনের টানাপোড়েন চামড়া পুড়িয়ে তাতে রংয়ের পরিবর্তন ঘটাতে পারলেও শরীরের কোথাও কোন অযাচিত চিহ্ন ছিলো না! বিয়ের পর সোহাগের চিহ্ন হিসেবে তারার নখের আঁচড় দেহের মাঝে দু একটা পড়লেও মুখ ছিলো একদম পরিষ্কার! অথচ আজ সেই মুখে কত দাগ! ঐ ঘটনায় কপালের এক কোনে কেটে গিয়েছিল যার দাগ এখনো দগ্ধমান! ঠিক ভ্রুরুর কোন ঘেঁষে! হাতের বাহুতে লাগা সেই কোপের দাগও একদম জ্বলজ্বল করছে তা তারাকে আরও বেশি যন্ত্রনা দিচ্ছে! মুখে অজস্র ছোট ছোট দাগ! এগুলো নাকি মশার কামড়ে হয়েছে! তাছাড়াও কারাগারের অতিরিক্ত গরম আর নোংরা পরিবেশের কারণে শরীরের গুটি গুটি হয়েছে যেটার দাগও রয়ে গেছে! তারা এগুলো দেখে আবারও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো,দুই হাত দিয়ে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদতে শুরু করলো,নয়ন এবার তারার হাত সরিয়ে মুখটা দু হাতের আঁজলায় ধরে নিয়ে একদম নিজের মুখ ছুঁই ছুঁই করে বললো,
-- এভাবে কাইন্দো না বউ? কষ্ট হয়! এগুলো কিছু না,তুমি যত্ন নিলে, সোহাগ দিলে সব ঠিক হইয়া যাইবো! কিন্তু তুমার চোখের পানিতে যেই কষ্ট হয় তা কেমনে ঠিক করমু! আল্লাহর দোহাই লাগে কাইন্দো না,তার চেয়ে বরং একটু কাছে আইয়া সোহাগ কইরা দাও! কতদিন হইলো তোমারে কাছে পাই না!আহো!
-- আপনের সারা শরীরের এই দাগ আমারে ভালো থাকতে দিবো না! কিভাবে আমি নিজেরে বুঝ দিমু! আপনি জেলে গেছেন আমার জন্য! আমি যদি সেদিন ঐ মেলায় না যাইতাম তাইলে কোনদিনও আপনার লগে ঐ নাদিমের দেখা হইতো না আর না মারামারি হইতো! আমি ক্যান গেছিলাম? যতবার ভাবি খালি এইডাই মনে হয় আপনার এই পরিস্থিতির জন্য আমিই দায়ী!
নয়ন তারাকে নিজের বুকে টেনে নিলো,একদম মিশিয়ে নিয়ে ধীর কন্ঠে বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে বললো,
-- তুমার কোন দোষ নাই! এগুলো কিসমতে আছিলো তাই অইছে! তাছাড়া ঐ অসভ্যের একটা চরম শাস্তি অওয়ার দরকার ছিলো যা ও অহোন পাইতাছে!তুমি খামোখা নিজেরে দোষ দিও না! তাছাড়া তুমি আমার স্ত্রী তোমার সাথে সবটাই আমার! এইখানে তুমি নিজেরে দোষারোপ কইরা আমারে কষ্ট দিতাছো!
-- কিন্তু আমি!
--- হিস্ কোন কথা নাই! খালি আমারে একটু শক্ত কইরা জড়াইয়া ধইরা থাকো! আমি তোমার শরীরের গন্ধ নিতে চাই কিছুক্ষণ!
তারা আর কোন কথা বললো না, একদম দুই হাতে যত শক্তি কুলায় ঠিক ততটাই দিয়ে নয়নকে আষ্ঠেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো, নয়নের উদাম শরীরের সাথে একদম লেপ্টে রইলো,ভেজা শরীরের সাথে শরীর লাগায় তারার ছাইরঙা সুতির কামিজটাও ভিজে চপচপে হয়ে গেল, সেঁটে আছে অঙ্গের প্রতিটি খাঁজে খাঁজে, নয়নও পরম ভালোবাসায় মিশিয়ে রাখলো প্রিয়তমাকে!
নির্দিষ্ট দিনেই নয়নের জামিন হয়েছে,নয়ন আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে বিকেলের শেষভাগে এসে পৌঁছায় বেলা!সকালে জামিন হয়েছে,মনি আর তার স্বামী গিয়ে নিয়ে এসেছে, মনি চেয়েছিলো আজকে তার বাড়িতে থেকে কাল সকালে গ্রামের উদ্দেশ্য রওনা দিবে কিন্তু নয়ন জেলগেট থেকে বেরিয়েই সোজা বাড়িতে আসার জেদ ধরে। মনিও সবটা বুঝে আর কোন দ্বিমত করেনি! এমনিতেই এত দিন পর নিজের পিতার সমতূল্য ভাইকে পেয়ে আবেগে অনেক সময় কেঁদেছে!ভাইবোনের এই আবেগঘন মুহূর্তের দর্শক ছিলো মনির স্বামীসহ জেলগেটে উপস্থিত অনেক মানুষই ! নয়ন ছোট বোনের মমতাময়ী আদরে বেশ আপ্লুত ছিলো, যেহেতু আম্মা আর তারাকে যেতে নিষেধ করেছিলো তাই তারা কেউ যায়নি! নয়ন তাদের দেখতেই বেশি অস্থির ছিলো কারণ এই প্রায় এক বছরের মধ্যে হাতে গোনা দুই তিনবার আম্মা আর তারাকে দেখছে তাও কোর্টের সামনে কারণ জেলে যাওয়া একদম নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো তাদের জন্য নয়ন!
বিকেলের অগ্রভাগে গ্রামের মাটিতে পা রাখে! মনির স্বামীর নিজস্ব গাড়ি দিয়েই এসেছে, কিন্তু যে সুন্দরগঞ্জের মাটি নয়নের অস্তিত্ব সেখানে নয়ন গাড়ি চড়ে বিলাসী ব্যবহার করতে পারেনা ,তাই বাজারের রাস্তা আসতেই নামতে চেয়েছিল কিন্তু মনির অনুরোধ আর মা বউয়ের কথা ভেবে আর নামেনি,তবে মনোহর পুরের উত্তর কান্দায় আসতেই আর কোন বাঁধা নয়নকে আঁটকে রাখতে পারেনি,গাড়ি থেকে নেমে ক্ষেতের আইলের উপরে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে মুখ হা করে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়েছে! অনেক সময় চুপ হয়ে শুধু উপভোগ করেছে মুক্তির এই স্বাধ! গত প্রায় এগারো মাসেরও অধিক সময় ধরে বন্দি ঐ অন্ধকার কাল কুঠুরিতে,যেথায় কেবল অন্যায় আর অপরাধীর মেলা,কেউ সেধে ঐ পথ বেছে নেয় তো কেউ জীবনের দোলাচলে দুলতে দুলতে গিয়ে পৌঁছায়! ওখানে মানুষ নয় প্রত্যেকের পরিচয় কেবল অপরাধী! সেখানে টিকতেও হতে হয় অন্যের চোখে ভয়ংকর কিন্তু নয়নদের মতো মানুষ অযথাই কখনো কারো জন্য ভয়াবহ হতে পারে না তাই তো নয়নও পারেনি, যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল মনি কিন্তু নয়নের পক্ষে সেগুলো কোনটাই গ্রহন করা সম্ভব হয়নি! নয়নের খালি মনে হয়েছিল তার অনুপস্থিতিতে কেউ তারার ক্ষতি না করে দেয়! বাড়িতে রেখে যাওয়া দুই নারীকে নিয়েই তার চিন্তার শেষ ছিলো না , আবার তার সাথে সঙ্গী হয়ে থাকা কারাবন্দীদের জীবনের উচাটন তাকে এতটাই প্রবাহিত করেছিলো যে সে নিজের এই সুযোগ-সুবিধা ভোগের বিষয়টি একদম মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে!
চোখ বন্ধ করে জেলবাসের মুহূর্তগুলো মনে করছিলো, ছটফট চিত্ত খুলে ফেললো নয়নদোর,আর মনে করতে চায় না সেই দিনগুলোর কথা! দিগন্ত জোড়া ক্ষেতের উপরে দৃষ্টি ফেললো,জীবনের ছন্দ তো সে এখানেই খুঁজে পায়! বেড়ে ওঠা এই মাটির কোলে, বিশুদ্ধ বায়ুর ছোঁয়া হৃদয়ের প্রতিটি রক্ত বিন্দুতে, পাখির কুহকাহলিতে গুঞ্জরিত হয় যার মনের আঙ্গিনা সে কিভাবে ঐ বন্ধ কুঠুরীতে নিজের অস্তিত্ব মেলে ধরবে!
-- ভাইজান!
মনির ডাকে ভাবনার জাল ভেদ হয়ে বাস্তবে ফিরে নয়ন,হালকা হেসে বললো,
-- বুঝলি মনি হাজত না খাটলে কোনদিন বুঝতেই পারতাম না এই মাটির গন্ধ আমার কতটা কাছের! এই মুক্ত বাতাসের আদ্রতা শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে রয়েছে,এই ঝলমলে রোদে পুড়ে যাওয়া চামড়ায় কি যে ভালোলাগা জড়িয়ে রয়েছে এই প্রকৃতির! এই যে বাতাসের শনশন শব্দ এটাও আমার খুব মনে পড়তো, পানি বয়ে যাওয়ার কলকল শব্দ ছোট্ট বেলায় মায়ের গাওয়া সেই ছন্দের ন্যায় হৃদয়ে দাগ কেটে রয়েছে,যাকে ছাড়া ছোট বেলায় কোনদিন ঘুমই আসতো না!এটাও আমার খুব মনে পড়তো! আমি একটা রাত ঘুমাতে পারিনি মনে হতো আমি যেন দম বন্ধ হয়েই মরে যাবো; প্রাণ ভরে শ্বাস নিতেই পারিনি! ওখানে তো জীবন ছিলো না,ছিলো কতগুলো আধমরা মানবের কঙ্কাল আর অপরাধীর আখড়া!
কিছু সময় থেমে আবারও বলতে লাগলো,
-- আমার কি মনে হয় জানিস," এই বিশাল আকাশটা হচ্ছে পিতার ছায়ার ন্যায়,যা আমাদের মাথার উপর দাঁড়িয়ে থেকে অবিরত আমাদের পাহারা দিচ্ছে,যার মধ্যে মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় উড়ে বেড়াচ্ছি! মনি এই কাঁদা মাটির দেশটা আসলেই আমাদের মা রে! আর এই মুক্ত বাতাসের প্রকৃতি, মাটি,গাছ, পানি,ধান , সরিষা ,মাছ সব; সব যা পাই প্রকৃতির থেকে উপরওয়ালার উপহার হিসেবে, সবটাই মায়ের জন্যে ভালোবাসার উপহার! আমি এই, এই মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ,আমি এই মাটির প্রতি কৃতজ্ঞ! আমি পরম করুনাময়ের প্রতি কৃতজ্ঞ যে এই ধরনী তৈরি করেছে!যে এই সোনা ফলা মাটির সন্তান করে এত সুন্দর ভূমিতে আমাকে পাঠিয়েছেন!
পর্ব ০৫
-- ভাইজান চলো বাড়িতে ভাবী, মা সবাই অপেক্ষা করছে!
-- হ চল!
আইলের থেকে এসে কাঁচা মাটির রাস্তায় উঠে হেঁটেই সামনে এগিয়ে গেল,মনির স্বামী গাড়ি নিয়ে একাই চলে গেছে, জানে এই দুই ভাইবোন এখন হেঁটেই যাবে!
-- নয়ন! তুই আইছোস?
পথের মাঝে এক চাচীর সাথে দেখা হয়ে গেল,তিনি নয়নকে দেখে যে খুশি হয়েছেন তা উনার ছলছল চোখ দেখেই বোঝা গেল,
-- হ চাচী আম্মা আমিই!
-- বাইর অইলি কবে? তোর মা তো কিছু কইলোও না!
-- আইজই আসছি চাচী! মায়েরে আমিই মানা করছিলাম কাউরে কইতে;
-- ক্যান!
-- কইলে কি আর এহোন চমকাইতা? চমকানোর লইগ্গাই তো মানা করছিলাম!
-- পাগল পোলা! যাই হোক অনেক খুশি লাগতাছে তোরে দেইখ্যা!তুই তো একদম শুখাইয়া গ্যাছোসগা!
-- অসুবিধা নাই! এহোন আইছি তোমরা ভালমন্দ রাইন্ধা খাওয়াইবা, দ্যাখবা আবার মোটা অইয়া গেছিগা!
-- হ হ খাওয়ামু তো! এতদিন পরে পোলা আইলে মায়েরা না খাওয়াইয়া পারে!
নয়ন আর প্রতিবেশী চাচীর কথার মাঝেই উপস্থিত হলো আরো একজন ,বয়স নয়নের কাছাকাছিই হবে,সেও দূর থেকে নয়নকে দেখে দৌড়ে এসে জাপটে ধরলো,
--- নয়ন ভাই ক্যামন আছো? যদিও জেলে কেউ ভালো থাকেনা আর হেইডা জিগানও খারাপ দ্যাহায় তবুও!
-- আরে ধুর,এত চিন্তা কইরো না তো মামুন ভাই! আমি কি পর যে আমারে কিছু কইতে তোমার এত ভাবতে অইবো!
মামুন নামের মানুষটা কেঁদে দিবে অভিপ্রায়, কোনরকম আঁটকে নিলো চোখের পানি,নয়নও বেশ আবেগী হয়ে গেল,এর মধ্যেই উপস্থিত আরও কয়েকজন প্রতিবেশী! সবাই নয়নের হালচাল জিজ্ঞেস করছে,নয়নও হাসি হাসি মুখে সবার উত্তর দিয়ে যাচ্ছে ! মনিও বেশ অনেকদিন পর গ্রামে এসেছে তাই সেও সবার সাথে আলাপে মজে গেল, অনেক সময় নিয়ে প্রতিবেশী মানুষের সাথে কুশলাদি সেরে অবশেষে বাড়ির উঠোনে পৌঁছালো, আম্মা সদর দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলো, নয়নকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে নয়নের বুকে পড়ে,মায়ের দৌড়ানো দেখে প্রথমে নয়ন ভরকে যায়,যদি পরে গিয়ে ব্যথা পায় তাই দ্রুত দুই হাতে সামলে নেয়! অনেক সময় ছেলের বুকে পরে কাঁদে,নয়নও নিজের কান্না আঁটকে রাখতে পারে না,মাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে দেয়, এদিকে ঘরেল দরজায় দাঁড়িয়ে তারাও নিরবে অশ্রু জড়ায়!
-- আম্মা ভাইজানরে নিয়া ঘরে যান! কত সময় এমনে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবো! সারা রাস্তায় কিছু খায়নি!তারাতাড়ি খাবারের ব্যবস্থা করেন!
মনির স্বামী রিয়াজুলের বলা কথায় আম্মা স্বাভাবিক হলো,নয়নের বুক থেকে সরে নয়নে মুখের দিকে, শরীরের দিকে তাকালো,পুরো শরীরে আদুরে হাত বুলিয়ে বললো,
-- আল্লাহ আমার বাপে একদম শুখাইয়া কাঠ অইয়া গ্যাছে! অরা কি তোমারে খাইতে দিতো না বাপ?
-- দিতো আম্মা কিন্তু তাতে তো তোমার হাতের স্বাধ থাকতো না তাই চাইলেও খাইতে পারতাম না!
কথা বলেই আম্মার দুই হাতে চুমু দেয়, আম্মা আবারও নয়নের কপালে চুমু দেয়, তারপর মুখে হাত বুলিয়ে বললো,
-- চলো ঘরে চলো! আম্মা তোমার পছন্দের সব রানছি!
-- হুম!
ঘরে ঢোকার আগেই আম্মার কিছু মনে পড়ায় চিৎকার করে কাউরে ডাকলো, এদিকে বাড়ি ভর্তি নয়নের মানুষ এখন, নয়নের আসার কথা শোনায় নয়নকে দেখতে সবাই চলে এসেছে,তাওহীদও আজ এ বাড়িতে,এত দিন পর দুলাভাইকে দেখে খুশিতে সেও কেঁদে দিয়েছে,তারা এত সময় দরজায় দাঁড়িয়েই নয়নকে দেখছিলো,নয়ন মায়ের গলা জড়িয়েই উঠোনের বেঞ্চে বসে পড়লো, এদিকে ওদিকে তাকিয়ে তারাকে খুঁজছে, কিন্তু কোথাও পেলো না,বাড়ি ভর্তি মুরব্বিদের সামনে দিয়ে তারাকে ডাকতেও লজ্জা লাগছে আবার উঠে গিয়ে খুজতেও দ্বিধা করছে! তাওহীদ এত সময়ে নয়নের কাছাকাছি আসলো,নয়ন তাওহীদকে দেখে খুশি হলো,মাথায় হাত দিয়ে গোছানো চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে গাল টেনে বললো,
-- কি অবস্থা তাওহীদ মিয়া?কেমন আছো?
-- আলহামদুলিল্লাহ দুলাভাই! আপনার কেমন লাগতাছে এখন?
-- এইতো তোমাগো কাছে আইসা আলহামদুলিল্লাহ ভালা অইয়া গেছি!
তাওহীদ হুট করেই নয়নকে জড়িয়ে ধরলো, নিঃশব্দে কাঁদতে থাকলো, নয়ন এক হাত দিয়ে আম্মাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলো,অন্য হাত ফাঁকা ছিলো,সেই কাঁধেই তাওহীদ মুখ গুঁজে কাঁদছে, নয়ন আম্মাকে ছেড়ে একটু বাঁকা হয়ে বসে ফাঁকা হাত দিয়ে তাওহীদকে আগলে ধরলো,বুকের মাঝে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললো,
-- তাওহীদ কানতাছোস ক্যান ব্যাডা? দুলাভাই তো চলে আসছি; আর কোন ডর নাই! কেউ আর কিছু কইতে পারবো না! আমি থাকতে তোর গায়ে কেউ একটা আঁচড়ও দিতে পারবো না!
তাওহীদ ঐভাবেই মুখ গুঁজে হিচকি দিতে দিতে ধীর আওয়াজে বলতে থাকলো,
-- আমি অনেক ভয় পাইছিলাম দুলাভাই! মনে অইছিলো আপনেরে আর কোনদিন দ্যাখতে পারুম না! আপনি আর কোনদিন আমার বড় আপার লগে আমগো বাইত্তে যাইবেন না!আর কোনদিন আমারে ছোড মিয়া কইয়া ডাকবেন না, আর কোন দিন কইবেন না তাওহীদ মিয়া চলো তোমারে গেইমস কিন্না দেই,চলো বাজারে যাইয়া বড় বড় মুরগী পোড়া দিয়া রুড খাই! আপাও আপনেরে ছাড়া ক্যামন অইয়া গ্যাছেগা, আপনি না আইলে বড় আপার কি অইতো! বড় আপা সবসময় আপনার জন্য কানতো!আমি - আমি - আম!
আর বলতে পারলো না কান্না আরও বেড়ে গেল, নয়ন আশ্চর্য হলো, তার সাথে খুশিও হলো,এই ভেবে যে এতটুকু বাচ্চা নিজের জন্য চিন্তা না করে নিজের বোনের জন্য ভাবছে!তার বোনের সংসার নিয়ে ভাবছে,দুলাভাইকে ছাড়া তার বোনের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করছে,সেই কোনদিন সামান্য মুরগী পোড়া খাইয়েছে তা নিয়ে স্মৃতিচারণ করছে! এটাই তবে ভালোবাসা! এতটুকু বাচ্চা তার জন্য করা ছোট থেকে ছোট বিষয়টাও মনে রেখেছে!
এই যে কান্না এটা নিশ্চয়ই মায়াকান্না নয়,কতটা ভালোবাসলে কারো অনুপস্থিতিতে তার জন্য এতটা কষ্ট হয় যে সামনে পাওয়ার পর এভাবে কাঁদা যায়!তাওহীদ নয়নের প্রতি দুর্বল সেটা তো আগেই বুঝেছে এখন তার প্রখরতা আন্দাজ করলো, বাচ্চা মানুষ বেশি কাঁদলে মাথা ব্যথা করবে তাই নয়ন থামানো জরুরী মনে করলো,
-- আইচ্ছা এহোন কান্দিস না! মাথা ব্যথা করবো! কই এতদিন পর আসলাম দুলাভাইয়ের সেবাযত্ন করবি তা না করে মাইয়াগো মতো কানতাছোস !
নয়নের কথায় তাওহীদ হেসে দিলো,নয়ন তাওহীদকে স্বাভাবিক হতে দেখে আবারও বুকে টেনে নিলো,কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে আদর করে দিলো , এরপর কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
-- তোর আপা কোথায়?
নয়ন যেভাবে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করছে,তাওহীদও ঠিক সেভাবেই ফিসফিস করে উত্তর দিলো,
-- পাকের ঘরে,এত সময় দরজায়'ই ছিলো,এখন পাকের ঘরে গেছে!এত মানুষের সামনে লজ্জা পাইতাছে মনে অয়!
নয়ন এত সময়ে বুঝলো কেন তারা এখনও তার সামনে আসেনি,যদিও বিয়ের অনেকদিন হয়েছে তবুও সবার সামনে দাঁড়িয়ে স্বামীর সাথে আহ্লাদ করার মতো মেয়ে তারা নয়,হুট করেই শোনা গেল কাঙ্খিত গলার আওয়াজ,
-- তাওহীদ!
আম্মা এত সময় নিজের ছেলে আর সেই ছেলের সম্পর্কিত ছোট্ট বাচ্চা একটা ছেলে যে কিনা তার ছেলের একমাত্র শ্যালক,তার সম্পর্কের গভীরতা মাপছিলো,নয়ন সবসময়ই বলতো তার একটা ছোট ভাই কেন নেই! তবে কি নয়ন শ্যালকের মাঝেই ছোট ভাইকে খুঁজে নিলো! আম্মাও তাওহীদকে যথেষ্ট ভালোবাসে ,ভালোবাসার মতোই একটা ছেলে তাওহীদ, যথেষ্ট বাধ্য আর ভদ্র, বড়দের যেমনি সম্মান করে তেমনি ছোটদের সাথেও মিলেমিশে থাকে! নয়ন যাওয়ার পর উনিই তাওহীদকে এ বাড়ি আনার উপদেশ দিয়েছিলো,যাতে তাঁরার সাথে থেকে তাঁরাকে সবসময় খেয়ালে রাখে!
তাওহীদ বোনের ডাকে সেদিকে গেল,এক বালতি দুধ নিয়ে উপস্থিত হলো নয়নের সামনে, আম্মা গরুর দুধ দুইয়ে রেখেছিল নয়ন আসার পর নয়নকে দুধ দিয়ে গোসল দিবে যাতে পবিত্র হবে মনে করে।
নয়ন মায়ের নির্দেশ মত উঠোনের পাশে লাগানো কল পাড়ে গেল,
-- বউ মা!
আম্মা চিৎকার করে তারাকে ডাক দিলো, তারা মাথার ঘোমটা টেনে দৌড়ে এলো,মনির জামাইকে দেখে ঘোমটা আরও একটু লম্বা করলো,নয়ন আড়চোখে তারাকে দেখছে, একদম শুকিয়ে গেছে, হাতগুলোও কেমন সাড় হয়ে গেছে, দীর্ঘশ্বাস ফেললো, তারপর একটা একটা করে বোতাম খুলে গায়ে থাকা বাদামী শার্টটা খুলে কলের পাশে টাঙানো রশিতে ঝুলিয়ে রাখলো, তারা নয়নের দিকে না তাকিয়েই কল চাপতে লাগলো, নয়ন আগে দুধ দিয়ে গোসল দিলো এরপর চাপ কল থেকে ভরা বালতি থেকে পানি দিয়ে গোসল শেষ করলো, এরপর তারার নিয়ে আসা লুঙ্গি হাতে নিলো, গামছা নিলো,পুরো শরীর কোন রকমের মুছে লুঙ্গি পেঁচিয়ে পড়নের প্যান্ট খুললো, তারপর ঘরে পড়া একজোড়া বার্মিজ স্যান্ডেল এনে এগিয়ে দিয়েছিল তাওহীদ সেটা পরে কল পাড় থেকে সরে গিয়ে আম্মার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, আম্মা মায়াময় চাহনী ফেলে বললো,
-- যাও নিজের ঘরে যাও,গিয়া একটু বিশ্রাম নেও! বউমা খাওনদাওনের ব্যবস্থা কইরা আইতাছে!
নয়নের শরীরও বেশ ম্যাজম্যাজ করছিলো,গোসল দেওয়ার পর শরীরটা হালকা হলেও ক্লান্তি কমেনি, বরং মনে হচ্ছে অনেকদিন পর শরীর এতটাই হালকা লাগছে যে যেকোন সময় টলে পড়বে,তাই এখন বিশ্রাম নেওয়া একান্ত জরুরী, আম্মার কথায় একবার তারার দিকে তাকিয়ে ঘরে চলে গেল, শরীরটাও ঠিক মতো মুছেনি,চুল দিয়ে এখনও পানি পড়ছে,তারা নয়নের পড়নের প্যান্টটা একবার ভাবলো ধুয়ে শুকিয়ে রাখবে পরক্ষণেই কি মনে করে তা আর করলো না! ওভাবেই কল পাড়ের উঁচু বেড়িতে রেখে দিলো শার্টটাও ঐভাবেই প্যান্টের সাথে রেখে দিলো,মগ বালতি রেখেই তাওহীদকে বললো,
-- তাওহীদ!
তাওহীদ পাশেই ছিলো,বোনের ডাকে সাড়া দিয়ে বললো,
--- জ্বী আপা!
-- এই বালতি আর মগ নিয়া পাকের ঘরের রাখো,যেইহানে রাখছিলাম! আর হাত মুখ ধুইয়া খাওনের লইগা তৈয়ার থাকো,একসাথে বইসা সবাই খাইবা!
তাওহীদকে আদেশ দিয়ে চলে গেল ঘরে, অনেক সময় নয়ন এসেছে কিন্তু কাছে গিয়ে একবারও সরাসরি কথা বলতে পারেনি লজ্জায়, মুখের দিকেও তাকায়নি ভয়ে পাছে নয়নকে দেখে নিজেকে আঁটকে রাখতে না পারে! যাওয়ার পথে মুনিয়ার মায়ের উদ্দেশ্য খালি বললো,
-- চাচী খাওনের বন্দোবস্ত করেন!
ঘরে গিয়ে দেখলো নয়ন চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখছে,আজ কতদিন পর নিজের ঘরে এসেছে, অনেক মনে করেছে এই ঘরটিকে। তারার চোখ ছলছল করে উঠলো নয়নের পিঠের দাগগুলো দেখে।ধীর পায়ে এগিয়ে গেল নয়নের দিকে।
এরপরের ঘটনা তো জানাই সবার!
পর্ব ০৬
পেরিয়ে গেছে আরো চারদিন দিন,এই চারদিন নয়ন ঘরেই কাটিয়েছে, আম্মার কড়া আদেশ আর তারার অনুরোধে সম্পূর্ণ বিশ্রামে ছিলো! তারা চারদিনের দুই দিন কেবল দোকানে গিয়ে তাওহীদকে দায়িত্ব দিয়ে চলে এসেছে,আর দুই দিন সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে, বাজারের অনেকেই এসে দেখা করে গেছে নয়নের সাথে! তারার বাবা মা ও মামা মামীও এসেছিলেন, উনারা দুইদিন থেকে চলে গেছে তবে তারার বাবা আবার আসবে,কারণ ধান কাটার সময় উনাকে উপস্থিত রেখে কামলাদের দিয়ে কাজ করাতে চায় তাঁরা ,নয়নের উপর এতো কাজের চাপ দিতে চায় না অন্তত একটা মাস আরামে কাটাক কিন্তু কি করে সম্ভব হবে তা কেবল আল্লাহ জানে,নয়ন তো ঘরেই থাকতে চায় না। কাজ পাগল মানুষ এতগুলো মাস নিজের কাজ থেকে বাধ্য হয়ে দূরে থেকেছে সেটাই অনেক; এখন মুক্ত হয়েও বসে থাকবে তা কি করে হয়! তবে মা আর বউয়ের কাছে নিজের যুক্তি টিকাতেও পারছে না! তাই আজ একরকম যুদ্ধ করেই বেরিয়ে গেল বাইরে তবে বাদ সাধে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা রমনীর আগমন! হঠাৎ করেই তার আগমনে তারার সামনেও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে!
নয়ন জেলে থাকতেই তারাকে নিষেধ করেছিলো বাজারে গিয়ে দোকানে না বসতে কিন্তু তারার অনুরোধ,আর বোন, বোন জামাইয়ের বোঝানোর পর সম্মতি দিয়েছিলো,তবে তারাকে কাজ করতে বাঁধা অন্য কোন কারণে দেওয়া হয়েছিলো,দেওয়ার কারণ ছিলো বাজারে থাকা মানুষরূপী অসুরের উপস্থিতি! যারা সুযোগ পেলে তারাকে খুবলে খাবে! তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে আর তারার বুদ্ধির জোরে তাঁরা নিজের মানসম্মান বাচিয়েই বাজারে দোকানদারি করেছে!
তবে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁরাকে আর দোকানে না যাওয়ার জন্য আদেশ করে, তাঁরাও স্বামীর আদেশ শীর ধার্য বলে মেনে নেয়,তাই ঘরে বসেই সব হিসাব নিকাশ বুঝিয়ে দিতে শুরু করে কিন্তু তাও মনে হয় কিছুটা এলোমেলো যা দোকানে বসেই করতে হবে তাই নয়ন নিজেই সাথে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকে! তারা বোরকা পড়ে বের হবে ততক্ষনে নয়ন সাইকেল বের করে বাড়ির বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করবে বলে ঘর থেকে বেরোয় ,বেরোতেই দেখতে পায় সদর দরজায় উঁকিঝুঁকি মেরে কিছু একটা খুঁজছে একজন নারী! ভ্রু কুঁচকে সেদিকে তাকিয়েই সাইকেলের তালায় চাবি ঝুলিয়ে রেখেই দরজার দিকে গেল!
সামনে উপস্থিত এই নারীর উপস্থিতি কিভাবে নিবে নয়ন,তার চেয়েও বড় কথা তারার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে! ভাবতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল,রাগে হাতের শিরা উপশিরায় বহমান লোলিত কনিকা গুলো তরতর করে মাথায় উঠে গেল,হাতের মুঠ শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলো,
-- এইহানে ক্যান আইছো?
-- আপনাকে দেখতে! কেমন আছেন?
-- আমারে দ্যাহার কি দরকার? আর আমি ক্যামন আছি এইডা জাইনা তুমি কি করবা?
-- এইভাবে কেন কথা বলছেন! আমি শুনলাম আপনার জামিন হয়েছে তাই ভাবলাম একটু দেখে আসি, এতদিন আসিনি কারণ এতদিন পরে আসছেন হয়তো বাড়ির মানুষ নিয়ে ব্যস্ত আছেন তাই আর...
-- আমি এতকিছু জিগাইছি তুমারে?আমি ক্যামন আছি,কি করতাছি তা জাইনা তোমার কি লাভ! নাকি ভাবছিলা তোমার বাপে না ছাড়াইলে এই নয়ন আজীবন জেলে পইচা মরবো! এইডাই তো!
-- আপনি শুধু শুধু ভুল বুঝতাছেন! আমি এমন কিছু.....
-- কে উনি?
নয়নের পেছন থেকে আসা প্রশ্নে থমকে গেল নয়ন, যা ভয় পাচ্ছে তা না হলেই চলে, নয়নের পেছনে আগাগোড়া কালো আবরুতে জড়ানো নারীটিকে দেখে নয়নের সামনে থাকা রমনীর দৃষ্টিও কিছু সময়ের জন্য থমকে গেল,একে অপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে,নয়ন মাঝখানে দাড়িয়ে রয়েছে! তারার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি ঘটলো,তবে এবার কিছুটা এগিয়ে নয়নের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নয়নের মুখপানে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো,
-- কে উনি?
নয়ন কিছু বলার আগেই উঠোনের থেকে ভেসে এলো আম্মার ডাক,নয়ন তখন কথা বলার সময় বেশ উঁচু আওয়াজেই বলেছিলো যেটা ঘরের পেছনের দিকে পাতা কুড়ানোর কাজ করা আম্মার কানেও গিয়ে পৌঁছেছিল তাই আসতে দেরি হলেও এসেই বুঝতে পারলেন ছেলের উচ্চ আওয়াজে কথা বলার কারণ!
-- এই মাইয়া তুমি এইহানে ক্যান? কি চাও আমগো বাইত্তে?
-- আম্মা?
-- এই কিয়ের আম্মা কও তুমি আমারে? আমি কোন জন্মে তুমারে প্যাডে ধরছিলাম? তুমার মতো মাইয়ার মা অওনের চাইয়া আজীবন আটকুড়া থাকাও ভালা!
-- আমি...
-- একটা কতাও কইবা না! চুপচাপ বাইর অইয়া যাও আমার বাড়ির থেইক্কা! আর কুনদিন য্যানো তুমারে আমার বাড়ির আশেপাশে, আমার পোলা বউয়ের ধারেকাছেও না দেহি! যাও এইহান থেইক্কা!
তারার স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো শ্বাশুড়ির দিকে, শান্ত শিষ্ট মানুষটি কিভাবে অগ্নিরুপ ধারণ করেছে,তারা মুখ ঘুরিয়ে নয়নের দিকে তাকালো, নয়নের নাক মুখ কাঁপছে, দাঁত যেন পিষে ফেলতে চাইছে,চোয়ালগুলো ভয়ংকর রকমের শক্ত করে রেখেছে,এত রাগ কেন হচ্ছে নয়নের, তাঁরা খেয়াল করলো নয়নের অগ্নিঝরা চাহনি সামনের ঐ সুন্দরী নারীটির দিকে স্থির হয়ে আছে, অজানা আতঙ্কে তারার কলিজায় চাপ অনুভূত হলো, কিছু জিজ্ঞেস করতেও দ্বিধাবোধ করছে, পরিবেশ থমথমে হয়ে আছে, কিন্তু তারার মন উকি দিচ্ছে বহু অযাচিত প্রশ্ন সেগুলো, ভাবতেই শোনা গেল নয়নের পরবর্তি কথা,
-- একটা মানুষ ঠিক কতটা বেয়ায়া অইলে এতকিছুর পরেও এইহানে আসার সাহস করে তা তোমারে না দ্যাখলে বুঝতেই পারতাম না শিউলি মুক্তা!
"শিউলি মুক্তা "শব্দটি তারার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলো! এই মহিলাই তবে উনার আগের বউ! মনে মনে কয়েকবার আওড়ালো। ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলো শিউলি নামক ঝড়কে,বয়সে নয়নের চেয়ে দুই বছরের ছোট বলেই জানা অথচ এখনও কত সুন্দর, মনেই হয় না এই নারীর বয়স ত্রিশের কোটায়,হয়তো বড়জোর ২৫/২৬ বলেই বলবে সবাই! একদম টানা চামড়া মাঝে প্রসাধনীর প্রলেপে আরো বেশি সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে নিজেকে,কোথাও কোন খাদ নেই! চোখে চিকন করে টানা ঘন কালো কাজল, ঠোঁটে দেওয়া কৃত্রিম রং যেন চিকন ঠোঁটের সৌন্দর্য আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে, মাথায় একরাশ ঘন লালচে চুল যা বেশ সৌখিন করে কাঁটা,গায়ের জর্জেট থ্রী পিসের ওড়নাটা ভাঁজ করে দুই পাশে ফেলে রাখা! মোট কথা একদম পরিপাটি একজন নারী,একে দেখলে যেকোন পুরুষই নিজের নিয়ন্ত্রন হারাবে , একবার হলেও কামুকীয় দৃষ্টিতে এর দিকে তাকাবে! মুহুর্তেই তারার মনে হলো নয়নের কথা; উনি কি এইভাবে নিজেকে উপস্থাপন করছে নয়নের আকর্ষণ পাওয়ার জন্য!অস্থির হয়ে উঠলো চিত্ত! করুন দৃষ্টিতে নয়নের দিকে তাকালো, নয়নের চাহনি এখনও সেইরকম! তারা অসহায় মুখে কেবল তাকিয়েই রইলো, এদিকে আম্মা ঝাঁঝালো কন্ঠে আবারও বললো,
-- তুমার বাপে কি ভাবছে হ্যায় চালাকি কইরা আমার পোলারে ব্লেকমেইল কইরা তুমার মতো নষ্টা মাইয়ারে আবারও আমার পোলার কাইনদে চড়ায় দিবো! এইডা অইতে দিমু না, অন্তইত আমি বাইচা থাকতে না! আমার পোলায় যদি জেলে পইচাও মরতো তাও আমি তুমারে আর আমার পোলার জীবনে আইতে দিমু না!
-- আম্মা হ্যার লগে এত বাড়তি কথা কওনের কি আছে! য্যামনে আইছে হ্যামনেই চইলা যাইতে কও! এতদিন পর কামে যামু,যাত্রা পথেই অশুভ ছায়া পইড়া পুরা যাত্রাই নষ্ট কইরা দিছে!
নয়ন শেষের কথা বলতে বলতেই ভেতরে ঢুকে গেল,তারা কি করবে বুঝতে পারছে না! নয়নের ভাবভঙ্গি বোঝার সাধ্য এই মুহূর্তে হচ্ছে না,নয়ন রেগে আছে অথচ শিউলিকে খুব একটা কিছু বলতে দেখা গেলো না, এদিকে শিউলি নিরুত্তাপ ভাবে দাড়িয়ে কেবল হাত কচলেই যাচ্ছে!আম্মা একটু এগিয়ে এসে বললো,
-- আজকের পর আমার পোলার আশেপাশে তুমারে য্যানো না দেহি! হুনো মাইয়া আমার পোলা বউ লইয়া সুখে আছে,তুমি হ্যাগো মাইঝখানে অশান্তি একদম সৃষ্টি করবা না! তাইলে কিন্তু আমি আর তুমারে আর তুমার বাপেরে ছাইড়া দিমু না, অনেক জ্বালাইছো আমার পোলাডারে! এতদিন পর একটু শান্তি পাইছে এহোন একটু শান্তি দ্যাও!
যাও এইহান থেইক্কা !
-- আমি জানি আমি ভুল করছি তাও কি আমারে একটু ক্ষমা করোন যায় না আম...
-- একদম না! এই তুমার কি শরম লজ্জা একদমই নাই! তুমি জানো না আমার পোলা বিয়া করছে, আল্লাহ বাচাইলে খুব শীঘ্রই আমার ঘরে নাতী নাতনি আইবো! তাইলে তুমি আশা ক্যামনে করো তুমারে আমি আমার সংসারে জায়গা দিমু!আর তাছাড়া তুমাগো ছাড়াছাড়ি আরো চাইর বছর আগেই অইছে তাইর পরেও তুমার বাপে ক্যামনে সাহস করে তুমারে আমার পোলার কান্দে চড়াইতে!
তুমি না ম্যালা শিক্ষিত,তুমার নাগর ম্যালা বড়লোক তাইর পরেও আমার পোলার পিছনে ক্যান পইড়া আছো?যাও হেই সময় আমার পোলার জীবন নষ্ট কইরা যেই ব্যাডার লগে গ্যাছিলা অহোন হ্যার কাছেই যাও!
-- আম্মা বাদ দেও না,ক্যান এর লগে মুখ লাগাইতাছো! তারা তারে যাইতে কও,আমি আইলে কিন্তু খারাপ কিছু অইয়া যাইবো!
নয়ন ভেতর থেকে চিৎকার করে তারাকে আদেশ করলো, আম্মা কোমরে হাত রেখে এখনও অগ্নিমূর্তি হয়ে শিউলিকে দেখে যাচ্ছে,তারা কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না,তবে এই মুহূর্তে নয়নের আদেশ মান্য করাই উত্তম মনে করলো তাই কিছুটা এগিয়ে এসে শিউলির বরাবর দাঁড়িয়ে বললো,
-- দ্যাহেন আপনে ক্যান আইছেন,কি চান আমি জানতে চামু না,খালি কমু আপনি এহোন এইহান থেইকা যান,উনি এমনিতেই অনেক চিন্তায় আছেন তার মধ্যে আপনাকে দেইখা রাগ উইঠা গ্যাছে,শ্যাষে দ্যাখা যাইবো রাগের মাথায় আবার কোন অঘটন ঘটাইয়া ফ্যালবো তাই কইতাছি দয়া কইরা যান!
শিউলি এত সময়ে ভালো করে তাকালো তারার দিকে, তারা মুখের নিকাব কখন খুলেছে তা কেউ বলতে পারবে না, হলদে ফর্সা তারার মুখটা কোনরকম জৌলুসতা ছাড়াই অসম্ভব মায়াবী, কোনরকম প্রসাধনী নাই তবুও মুখটা চকচক করছে, চোখের নিচে কালো মোটা প্রলেপ,কাজল দিয়েছে তবুও প্রকৃত গত হওয়া কালো দাগটা কিছুতেই লুকাতে পারেনি,হয়তো বহু রাত না ঘুমানোর কারণেই হয়েছে এমন,নয়ন ছিলো না কতগুলো মাস,স্বামীর বিপদে কোন আদর্শ স্ত্রীই ভালো থাকতে পারে না তাই হয়তো তারাও ঠিক মতো ঘুমাতে পারেনি! শিউলি একমনে তারাকে দেখে যাচ্ছে,সবাই বলতো নয়নের মতো ছেলের বউ যেই মেয়ে হবে সে অনেক ভাগ্যবতী হবে কারণ খুবই যত্নশীল একজন পুরুষ নয়ন, শিউলি নিজেই তো সাক্ষী, মাত্র পনেরো দিনের মধ্যে দেখছে নয়ন তার প্রতি কতটা যত্নশীল ছিলো,কতটা খেয়াল রাখতো তার পছন্দের, নিশ্চয়ই সেই ভাগ্যবতী সে ছিলো কিন্তু ভাগ্যের ফেরে নাহ নিজের কর্মের দায়ে আজ সেই ভাগ্যবতীর নামটা হচ্ছে তারা! তারার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে মুখে প্রাপ্তির ছাপও অগাধ! কারণটা শিউলি দুর থেকেই অবলোকন করেছে!
শিউলির একমনে দেখে যাওয়ায় তারার অস্বস্তি লাগছে কিন্তু কিছু বলতে পারছে না, ঐদিকে আম্মা শিউলির এমন চাহনিতে বিরক্ত হয়ে তাঁরাকে নিজের দিকে সরিয়ে আনে, শিউলির দিকে ক্রোধান্বিত বাক্য ছুড়ে দিলো,
-- খবরদার নিজের কুনজর আমার বউমার দিকে দিবানা! যাও এইহান থেইক্কা! এহোন বাইর অও,তুমারে ধাক্কা দিয়া বাইর করার চাইলেও ইচ্ছা নাই,তুমারে ছুইতেও আমার ঘেন্না অয়!
শিউলি আর কোন কথা না বলে দৌড়ে বেরিয়ে গেল, এদিকে বাইরে থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে পুরো বিষয়টি সার্কাস দেখার মতোই উপভোগ করলো আশেপাশের প্রতিবেশীরা!
তারা কোন কথা বললো না,বলার অনেক হলেও,চুপ থেকে ধীর পায়ে নিরবে হেঁটে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসলো!
পর্ব ০৭
"বুম বুম "
মোবাইলের ভাইব্রেট শব্দে সচকিত হলো নয়ন, বাইরে থেকে এসে সেই যে খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসেছে এখনও সেভাবেই আছে,কখন যে অতীতে ডুব দিয়েছে হুঁশ নেই! আজ অনেক গুলো দিন পর শিউলির মুখোমুখি হয়েছে, স্বভাবতই একটু হোঁচট খেয়েছে,শত হলেও শিউলি তার প্রথম অনুভূতি,প্রথম স্ত্রী! যৌবনের প্রথম আকাংঙ্খা! প্রথম নারী যাকে দেখে যৌবনের বন্দরে নোঙর গেড়েছিলো প্রেম নামক নৌকো,যাকে দেখে হৃদয়ে জেগেছিল সুপ্ত পুরুষালি কামনা! কম বয়সের অনুভূতি কখনোই ভোলা যায় না,প্রণয়ে যতটা অনুভূতি প্রখর হয় তার চেয়েও বহুগুণ প্রখর হয় বিরহের!আর সেই বিরহ যদি হয় অত্যন্ত জঘন্য ভাবে তবে তা কখনোই ভোলা যায় না , ভুলতে পারে না!
শিউলি তো তেমন ভাবেই চলে গিয়েছিল,একদম নয়নকে অপদস্থ,আহত করে! শরীরের ক্ষত সবাই দেখাতে পারে কিন্তু মনের ক্ষত? সেটা কি কখনো কাউকে দেখানো যায়? যায় না! নয়নও পারেনি! নিজের বিয়ে করা বউয়ের এমন ধোঁকা, প্রথম অনুভূতির থেকে পাওয়া এহেন অপমান কোনটাই মানতে পারেনি, কিন্তু কিছু করেও উঠতে পারেনি! অনেকটা সময় মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়েছিল! তার মাঝে আগুনে ঘি ঢালার ন্যায় কাজ করেছে সমাজেরই কিছু অতি আপনজন,যাদের কাজই ছিলো তিনবেলা রুটিন মাফিক এসে এটা মনে করিয়ে দেওয়া! নয়নের মা যে ছেলের জন্য অতিরিক্ত ভালো চাইতে গিয়ে নিজের যোগ্যতার বাইরে হাত বাড়িয়েছি তার জন্যই এমন জঘন্য পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে!
তাও তো থামেনি,চলে যাওয়ার পর অনেক সময় নিয়ে নয়ন নিজের ক্ষত সারানোর চেষ্টা করেছে যখনই মনে হয়েছে কিছুটা পেরেছে নিজের জন্য কিছু করতে ঠিক তখনই আবার আগমন হয় শিউলি নামক প্রতারকের!
দীর্ঘ নয় মাস অন্য একজনের সাথে সংসার করে আবারও গ্রামে ফিরে আসে শিউলি, বিধ্বস্ত হয়ে,প্রতারিত হয়ে ফিরে আসে! তাহসান তাবিব নামক সেই সুদর্শন প্রেমিকের সাথে এখান থেকে গিয়েই ফের বিয়ে করে অথচ এদিকে সে তখনও একজনের বিবাহিতা স্ত্রী কিন্তু সেটা কি শিউলির মতো মেয়েদের মনে থাকে!
তাহসান তাবিব নিজের সম্পর্কে যতটাই বলছিলো পুরোটাই ছিলো বানোয়াট! গ্রামে নিজেদের যেই অবস্থার বর্ণনা তার মুখ দিয়ে নির্গত হয়েছিল পুরোটাই ছিলো শিউলির মতো সুন্দরী,আর ধনীর দুলারিকে বস করার জন্য!
তাহসানের বাবা ছিলো সাধারণ একজন মানুষ,গ্রামের বাজারের এক পাইকারি দোকানের হিসাব রক্ষক,তিন ভাই বোনের সংসারে বড় বোনের পর তাহসান তাবিব তারপর ছোট বোন! মেধা শক্তি ভালো বলে নিজের কষ্ট হলেও ছেলেকে শহরে রেখে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলো কর্মজীবী বৃদ্ধ বাবা আহসান তাজিব,গ্রামে থাকা সহজসরল বাবারা এমনই হয়,তারা নিজেদের কষ্টকে তুচ্ছ করে ছেলে মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সবটুকু ত্যাগ স্বীকার করে! নিজেরা এক বেলা খেয়ে তো আরেক বেলা না খেয়েই জীবন যাপন করে তবুও সন্তানদের ভবিষ্যতে আঁচ পড়তে দেয় না অথচ তারা খবরই জানলো না আদৌও তাদের এত ত্যাগ কোন সুফল পেল কিনা!
হলফ করে বলতে পারি বেশির ভাগ ছেলে মেয়েই বাবা মায়ের কষ্টের মূল্য দিতে জানে না,এরা শহরের চাকচিক্যের মাঝে এভাবে ডুবে যায় যে ভুলেই যায় কেন তাদের এই শহরে পাঠানো হয়েছিল; তাদের গোড়া কোনটা! এই অকৃতজ্ঞতার দরুন জীবনে ডেকে আনে চরম বিশৃঙ্খলা,করে বেড়ায় অহরহ অপরাধ মূলক কর্মকান্ড! তাদেরই একজন ছিলো তাহসান তাবিব! সুদর্শন আর মেধাবী হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ধনী কন্যার নজরে পড়ে তার সাথে গড়ে উঠে দুলাল ধাঁচের বন্ধু মহল! যাদের কাজই হলো বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে বাপের টাকার ফুটানি দেখানো আর তা উড়িয়ে মোজ মারা!এই বিশৃঙ্খল বন্ধু আর মেয়েদের তালে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে তাহসান তাবিব হারিয়ে ফেলে নিজের মাটির গন্ধ, হারিয়ে ফেলে অস্তিত্বের পরিচয়! প্রথমে প্রথমে টিউশনি করিয়ে সেই টাকা দিয়ে এটা সেটা কিনে বাড়িতে পাঠালেও ধীরে ধীরে সেই টিউশনির ভাগে ভাগ বসায় বন্ধুমহল; যাদের নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন ক্লাবে আড্ডা বসাতো তাহসান! একাধিক প্রেমিকা গড়িয়ে নেয়,যাদের থেকে আদায় করে নিতো নিজের প্রয়োজনীয় চাহিদা!
যত নোংরা কাজই করতো সবটাই থাকতো ভদ্রতার আড়ালে,এতই নিপুণ অভিনয় করতো যে কারো কখনোই আন্দাজ হয়নি এই ভদ্র চেহারার আড়ালে এত খারাপ একটা মানুষ থাকতে পারে।আর পরিবারের লোকেরা তো জানতো তাদের ছেলে শহরে নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরাচ্ছে, কিন্তু হায় আফসোস!
এমনি এক সময় কোন এক বন্ধু আসরে দৃষ্টিতে পড়ে শিউলি মুক্তা! সুন্দরী,লাবণ্যময়ী এক তরুনী! ঠাটবাটে বুঝে নেয় পয়সাওয়ালা ঘরের মেয়ে! তৎক্ষণাৎ মাঠে নেমে পড়ে তার দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য!
শিউলি ছিলো সদ্য ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী, বান্ধবী কিংবা সিনিয়র ব্যাচের আপুদের কৌতুহল দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলাতেই চোখে পড়ে তাবিব নামক সুদর্শন পুরুষকে! মুহুর্তেই চোখে পড়ে যায় গাঠনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি,মনে জমে যায় আকাঙ্ক্ষা,হয় তৃষ্ণার্ত! যেকোন মূল্যে পাওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা চেপে বসে মস্তিষ্কে! এটাই ছিলো তার জীবনের চরম ভুল!
যেখানে তাবিব নিজেই ঝুঁকে ছিলো শিউলির প্রতি সেখানে শিউলির বেশি কষ্ট হবেনা এটাই স্বাভাবিক,তবে তাবিব নিজের কদর বাড়াতে বেশ কৌশল খাটিয়েছিলো যার দরুন একের পর এক মিথ্যা বলে মিথ্যার পাহাড় গড়ে তুলেছিলো! শিউলি তাবিবে এতটাই বিভোর ছিলো যে সত্য মিথ্যা ঘাটার প্রয়োজন মনেই করেনি! তবে বাঁধ সাধে শিউলির বাবা!
নিজের পরিচিত সূত্রের মাধ্যমে যখন জানতে পারে মেয়ের উচ্ছ্বনে যাওয়ার খবর তখনই দ্রুত বাড়ি আনে কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে,সে তাবিবের শিকলে বন্দি এক তোতাপাখির ন্যায় তাবিবের বুলিই আওড়িয়েছে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় বিয়ের রাতে নয়নকে ঘুমের বড়ি খাইয়ে তাবিবের হাত ধরে পালিয়ে যায়!
পালিয়ে যাওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই বেরিয়ে আসে তাবিবের আসল অবস্থা!তাবিব যেই ফ্লাটে থাকতো ওটা ছিলো মেস বাড়ি! যেখানে প্রায় সাত জন ছেলে থাকতো,তিন রুমের ফ্লাটে বাকী দুই ঘরে তিনজন করে, আর এক ঘরে তাবিব একাই থাকতো! আগে যখন তাবিবের ফ্লাটে গিয়েছিলো তখন বুঝতে পারেনি! কিভাবে বুঝবে তখন তো এতকিছু ঘাটেনি,সোজা তাবিবের রুমে যেতো,সেখান থেকেই সোজা বেরিয়ে আসতো কিন্তু যখন থাকার জন্য একেবারে গেল তখন তো সবটাই দেখা লাগলো,এটাই ছিলো প্রথম ধাক্কা!
অতীত;;
শিউলি - তাবিব এটা কি? এটা তো মনে হচ্ছে ব্যাচেলরদের ঘর? তুমি কি এখন ফ্লাটে ভাড়া লোক রাখছো? আগে তো ছিলো না!
তাবিব আমতা আমতা করতে থাকে, কিছু বলার আগেই শিউলি আবারও বলতে শুরু করে,
-- ওহ বুঝেছি একা থাকতে খারাপ লাগে তাই সঙ্গ খুঁজতেই এই বুদ্ধি খাটিয়েছো, অবশ্য এতে ভালোই হয়েছে যেহেতু তোমার এখনও চাকরি নেই সেহেতু অযথা একা একা এত বড় ফ্লাটের ভাড়া দেওয়ার মানেই হয় না!
শিউলির কথাম তাবিব কিছুটা স্বস্তি পায়, মনে মনে বলে,
-- যাক কিছু বুঝেনি, কিন্তু কিছু বোঝার আগেই সবটা সামলে নিতে হবে! কিন্তু কিভাবে?
-- তাবিব আমি খুব ক্লান্ত! ক্ষিধেও পেয়েছ খুব! চলো রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেই তারপর খাবো!
-- হুম!
তাবিব শিউলির কথায় "হুম" তো বলে কিন্তু কোন ঘরে নিয়ে যাবে সেটা নিয়েই কনফিউজড হয়ে পড়ে,কারণ?
যেই ঘরে আগে নিয়ে আসতো সেটা মূলত এই ফ্লাট যে ভাড়া নিয়ে বাকীদের ভাড়া রাখছে তার একার! তাবিবের তো একার রুম কোন কালেই ছিলো না, কিভাবে থাকবে? বাবা তো কোনরকম খরচ দিতেই হিমশিম খায়,সেখানে এমন একটি ফ্লাটে একা থাকার কথা তো স্বপ্নেই সম্ভব! বাস্তবে নয়, আপাতত নয়!
আগে যখন কোন মেয়েকে নিয়ে আসতো তখন অনুরোধ করে সেই লোকের ঘরটাকে খালি করে রাখতো,যদিও এগুলো অহরহই ব্যাচেলর ছেলেদের ঘরে হয়! তাছাড়া ঐ লোকও ছিলো একই ধাঁচের! দিনের বেলা বাড়িতে না থাকায় তাবিবেরও সুবিধা হতো!তাই শিউলিও বুঝতে পারেনি! কিন্তু এখন তাবিব কি করবে!
চেনাজানা ঘর তাই শিউলি সেদিকেই এগিয়ে যেতে লাগলো, কিন্তু তাবিবের কথায় থেমে গেল,
-- ঐদিকে যেও না মুক্তা!
পিছু ফিরে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে,তাবিব আমতা আমতা করে বলল,
-- না মানে আমাদের রুম ঐখানে না।
-- মানে?
শিউলির হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-- না মানে, তুমি এখানে একটু বসো আমি একটু আসি!
কথা শেষ করেই উল্টো দিকের ঘরে ঢুকে গেল,ভোরের দিকে তাই সবাই ঘুমে বিভোর,তাবিব নিজের কাছে থাকা ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে তালা খুলে ফ্লাটে ঢুকেছিলো, ছেলেদের ঘর,আবার যেহেতু ফ্লাটের মধ্যে নিরাপদেই সব আছে তাই আলাদা করে আর নিজেদের ঘরের ছিটকিনি লাগানোর দরকার হয় না , চেপে রাখা দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকে গেল, বেরিয়ে এলো কিছু সময় পর সাথে করে দুইজন ছেলে নিয়ে!
শিউলি বসার ঘরের একটা পুরানো সোফার উপর বসে ছিলো, ব্যাচেলর ছেলেদের রুম স্বভাবতই এলোমেলো থাকে এখানেও তাই আছে! আগে কখনো এত খুঁটিয়ে দেখেনি,আজ কেন জানি প্রতিটি কোনায় কোনায় নজর বুলাচ্ছে! ঘরটা মোটামুটি পরিচ্ছন্ন কিন্তু তারপরও কেমন অস্বস্তি হচ্ছে,আগে তো কখনো এমন হয়নি! শিউলির নিজের শরীরটাও কেমন ভার ভার লাগছে! গায়ে এখনও রাতের বিয়ের পড়া শাড়ী,বউয়ের সাজটা এখনও ঠিক আছে যেমন সাজিয়ে দিয়েছিলো কিছুটা নমনীয় হলেও কোথাও এখনো এবড়োথেবড়ো হয়নি! গা ভর্তি নয়নের দেওয়া, বাবার দেওয়া সোনার গয়না ছিলো যেটা আপাতত তাবিবের দখলে! শুধু শাড়ীতেই কেমন ওজন হয়ে উঠেছে শরীরটা! শিউলির মনে হলো গতকাল দুপুর থেকে আর কিছু খাওয়া হয়নি, পালানোর চিন্তায় খাওয়া-দাওয়া সব বাদ দিয়েছিলো, পালিয়ে আসার সময় পথের মাঝে বাস থেমেছিলো তখন তাবিবকে বললেও তাবিব তাড়া দেখিয়ে কোথাও বসেনি! এখন এখানে এসে একটু ফ্রেশ হয়ে খাবে তাও তাবিব কি শুরু করছে ভাবতেই বিরক্তি চেপে ধরলো! আনমনেই এসব ভেবে যাচ্ছিলো তখনই শুনতে পেল,
-- ঐ শালা কি করছিস? বিয়ার আসর থেইকা ভাঙ্গাইয়া আনছিস?
এহেন কথায় শিউলি সেদিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালো, অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো,বিব্রত হচ্ছে, ছেলেগুলো একদমই অর্ধনগ্ন! মানে, শর্টস পড়ে উদাম শরীরের বেরিয়ে এসেছে, দুজনেই একই অবস্থায়! ঘুমিয়ে যে ছিলো তা চোখ মুখ দেখলেই বোঝা যায়! তাবিব ওদের পিছু থেকে বেরিয়ে এসে বললো,
-- ব্রো কিছু করো? কিভাবে কি করবো সাহায্য করো!
শিউলি তাবিবকে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলেও ছেলেগুলোর এহেন অবস্থায় সেদিকে তাকাতেই পারছে না,আবার ছেলেগুলোর দৃষ্টিও খুব একটা ভালো না,এদের মধ্যে একজনকে চিনে,তাকে এর আগেও একবার দেখেছিলো যথেষ্ট লাগামহীন কথাবার্তা বলেন, আবার চাটনিও কেমন অস্বস্তিকর,আরেকজনকে চিনে না,আজই প্রথম দেখলো কিন্তু এরা এখন এই অবস্থায় কেন! উত্তর তাবিবের কথাই মিললো,
-- এখন আমরা কোথায় থাকবো, কিছুই বুঝতে পারছি না!
-- মাইয়া ভাঙ্গাইয়া আনার আগেই সব ব্যবস্থা করতে পারো নাই! তাছাড়া আমগো সাথেও তো এগুলো শেয়ার করো নাই! তাইলে আগেই একটা ব্যবস্থা করতে পারতাম! এহোন হুট কইরা কি এতকিছু ব্যবস্থা করা যায়?
লোকটার কথায় তাবিব প্রত্তত্তর দিলো না,মাথা নত করেই কেবল নিজের গাফিলতির জন্য অনুতাপ করলো,অপর একজন বললো,
-- বাদ দাও,এখন কি করা যায় তাই ভাবো! তাছাড়া নিজেদের পোলাপাইন এইরকম একটা কাজ কইরাই ফেলছে এইখানে এখন বলার কি আছে!
কথা শেষ করে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলো যা শুনে শিউলির মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে!
পর্ব ০৮
তাবিবের সাথে শিউলির বিয়ে হলো সেদিন বিকেল সাড়ে তিনটায়, একজনের এক দিনের বিবাহিতা স্ত্রী হয়েও অবলিলায় আরেকজনেরও নিকট বিয়ে বসলো শিউলি; কিন্তু তাতেও কোন দ্বিধাবোধ কাজ করেনি, তবে অশান্তি ঠিকই কাজ করছিলো! তার কারণ ততক্ষণে বুঝতে পেরেছে তাবিবের অবস্থা!
তাবিব শিউলিকে বিয়ে করে সেখানে রেখেই বেরিয়ে পরে ঘর খোঁজার জন্য, এবং কোনরকম খুঁজে একটা এক রুমের ঘর পায়!
-- তাবিবি এসব কি? তুমি তো বলেছিলে এই ফ্ল্যাট তোমার! তবে এখন এসব কি বলছো?
-- দেখো এটা আমার নয়,আমি কখনোই বলিনি এটা আমার,তুমি নিজেই ভুল বুঝেছো!
শিউলির মনে হলো তাবিব কখনোই নিজে মুখ ফুটে বলেনি এই ফ্লাট তার কিন্তু সত্যিও তো বলেনি!
-- তাহলে আগে যখন আসতাম তখন ঐ রুমে কিভাবে ;
-- ওটা মিনহাজ ভাইয়ের রুম,এই ফ্লাটের দায়িত্ব উনারই , আমাদের সাথে যখন কোন মেয়ে আসে তখন ঐ রুম আমরা ব্যবহার করি,যেহেতু উনি দিনের বেলা বাসায় থাকে না!
-- মেয়ে আসে মানে? তুমি কি;
-- আরে তুমি আমায় ভুল বুঝছো,আমি তো আমার কথা বলিনি, আসলে মুখ ফসকে ভুল কথা বেরিয়ে গেছে!
-- ভুল ঠিক যাই হোক আমি এখানে এতগুলো ছেলের সাথে থাকবো না, তুমি আমাদের জন্য আলাদা ফ্ল্যাট দেখো! নয়তো চলো তোমার বাড়ি!
বাড়ির কথা শুনে তাবিব আমতা আমতা করতে লাগলো,তা দেখে শিউলি ভ্রু কুঁচকে ফেললো, তাবিবের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো,
-- তুমি এমন করছো কেন? আমাকে কি তোমার বাবা মায়ের সাথে এখনও পরিচয় করাবে না? দেখো তাবিব বাবা যেকোন সময় এদিকে চলে আসতে পারে,আর তখন এখানে এসেও পড়তে সময় লাগবে না! তাই বলছি চলো তোমাদের বাড়ি যাই,বাবা মায়ের সাথে কথা বলি নিশ্চয়ই উনারা আমাকে মেনে নিবে,যেহেতু আমাদের বিয়ে হয়েই গেছে, তারপর আমার বাবা চাইলেও কিছু করতে পারবে না!
-- না মানে বলছিলাম এখন,এই অবস্থায়!
-- কি অবস্থা?
-- দেখো তোমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে তার সাথে তো তালাক হয়নি! তার মধ্যেই আমরা বিয়ে করে নিয়েছি এটাতো কেউ জানেনা,জানলে তো আমাদের বিয়ে বৈধ হবে না তাই বলছি!
-- কি বলতে চাইছো তুমি?
-- এখন এই মুহূর্তে কোনভাবেই তোমাকে নিয়ে বাড়ি যাওয়া যাবে না!
-- কিন্তু কেন?
-- আমাদের বাড়ি গেলেও কিন্তু এই সত্যি বেরিয়ে আসবে! তাই বলছি অন্তত কিছুদিন আমরা নিজেদের আড়ালে রাখি,এমন জায়গায় যেখানে কেউ খুঁজে পাবে না! তাছাড়া আমার এখনও কোন চাকরিবাকরি হয়নি এই অবস্থায় বিয়ে করেছি শুনলে বাবা ভীষণ রাগ করবে তাই চাইলেও আমি এখন তোমাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে তুলতে পারবো না!
-- তার মানে তুমি বলতে চাইছো আমি এখন এইখানে এতগুলো ছেলের মাঝে থাকবো?
-- না তা কেন হবে? আমি তো আমাদের জন্য ঘর দেখেছি,সেখানেই কিছুদিন থাকবো, এরপর যখন তোমার বাবা মা সবটা মেনে নিবে তখন না হয় ;
-- তোমার কি মনে হয় তুমি যা ভাবছো তাই হবে?
-- কেন হবে না, নিশ্চয়ই হবে! কোন বাবা মাই বেশিদিন নিজের সন্তানের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারে না; আর সেখানে তো তুমি তোমার বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে তারাও পারবে না!
-- এখন তোমার পরিকল্পনা কি?
-- চলো আমার সাথে!
তাবিব শিউলিকে নিয়ে যায় নিজের পছন্দ করা ঘরে, যেখানে গিয়ে শিউলি স্তব্ধ হয়ে যায়, এমন একটা পরিবেশে তাকে রাখার ব্যাপারটা কিভাবে ভাবতে পারে তাবিব,পুরো বস্তি এলাকা, চারিদিকে নোংরা আর দুর্গন্ধ!
-- এটা কোথায় নিয়ে এলে তাবিব? এখানে কি করে থাকবো?
-- দেখো আমাদের লুকানোর জন্য একদম পারফেক্ট জায়গা এটা! আমাদের দুই ফ্যামিলির কেউই আন্দাজ করতে পারবে না যে তাদের ছেলে মেয়ে এরকম জায়গায় থাকতে পারে! তাছাড়া তুমি তো জানো আপাতত আমার কোন চাকরী নাই, তাই চাইলেও আমি তোমাকে এর চেয়ে ভালো কোন জায়গায় নিয়ে রাখতে পারছিনা! সুতরাং কষ্ট হলেও তোমাকে এখানে এডজাস্ট করতে হবে, এরপর যখন তোমার পরিবার সবটা মেনে নেবে তখন দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে! আর আমাদের ভাগ্যের চাকাও খুলে যাবে!
-- শুধু আমার পরিবার কেন? তাছাড়া তোমার পরিবারের লোকদের কবে জানাবে?
-- উফ মুক্তি তুমি এক কথা কেন বারবার বলছো? বলছি তো সময় হলে সবাই জানবে!
শিউলি আর কোন কথা বলেনি, এমনিতেই মাথা ঘুরছে! কি থেকে কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না!
দিন যাচ্ছে,তাবিব শিউলির গহনা বিক্রি করে থাকার মতো ব্যবস্থা করেছে,তাই বিক্রি করে সংসার কোনরকমে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তার চেয়েও বেশী খরচ করছে নিজেল বিলাসীতায়! শিউলি কোন কথা বললেই ধমকে চুপ করিয়ে দিচ্ছে, তাবিবের পরিবর্তিত ব্যবহারে শিউলি কষ্টের চেয়ে বেশি আতংকিত হয়ে গেছে! তাবিব কাজকর্ম না করলেও রাত করে ঘরে ফিরে, এদিকে কাজ ঠিক করার কোন তাগিদ তার মাঝে নেই।শিউলি বার কয়েক তাবিবের বাড়িতে যোগাযোগের কথা বললে, চেষ্টা করলে তাবিবের দ্বারা কটু কথার স্বীকার হয়েছে!
এভাবেই চলছিলো কিন্তু সমস্যা হলো যখন বিক্রি করার মতো আর কিছু অবশিষ্ট রইলো না!
-- এভাবে আর কতদিন তাবিব? এখন তো কিছু একটা করার চেষ্টা করো! দেখো কাল অবধি ঘরে খাবারের জন্য চাল ছিলো আজ তো তাও নেই! এখন কি করে কি করবো?
-- শুধু আমাকেই কেন বলছো? তুমি নিজেও তো কিছু করার চেষ্টা করতে পারো! এমনিতেই তোমাদের মেয়েদের তো আর কাজের অভাব হয় না
ঠিকঠাক গেটাপ দিলে বসেরা খুশি হয়ে এমনিতেই তোমাদের চাকরিতে রেখে দেয়,এতো সুন্দর ফিগার কোন কাজে লাগবে যদি জীবনে একটা চাকরীই না ঠিক করতে পারো?
তাবিবের এহেন কথায় শিউলি নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কি করবে ভাবতেই পারলো না, তবুও মুখ ফুটে অনেক কষ্টে কেবল উচ্চারণ করলো
-- তুমি এসব কি বলছো তাবিব? আমি নিজের শরীর দেখিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করবো!
-- এখানে এত আশ্চর্য হওয়ার মতো কি বললাম? তোমরা মেয়েরা কি তাই করো না? তাছাড়া আমি এর মধ্যে খারাপ কিছু দেখি না! উপরওয়ালা এত সুন্দর করে সৃষ্টি করেছে তা যদি যথার্থ কাজেই না লাগাই তবে লাভ কি এত সুন্দর হয়ে জন্ম নেওয়ার! আমি তো মনে করি তোমার নিজেরও এই সৌন্দর্যের সঠিক ব্যবহার করা উচিত!
-- ছিহ তাবিব! আমি ভাবতেই পারছি না তোমার মতো এত ছোট নিচু মানসিকতার মানুষের জন্য আমি নিজের পরিবারের মুখে চুলকানি দিয়েছি! কেমন স্বামী তুমি যে কিনা নিজের স্ত্রীর শরীর বিকিয়ে খেতে চায়!এত জঘন্য কি করে কেউ হতে পারে!
-- সাট্ আপ! মুখ সামলে কথা বলবে! কাকে জঘন্য,ছোট নিচু মানসিকতার লোক বলছো? নিজের দিকে একবার তাকিয়ে দেখো! তুমি কতটা তুলশি পাতা! যে নিজের নতুন বরকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে প্রেমিকের সাথে রাতের আঁধারে পালিয়ে আসতে পারে সে কতটা সাধু !
তাবিবের কথায় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো শিউলি,যার জন্য করলো এখন সেই তাকে অপরাধের দায়ে কথা শোনাচ্ছে,তাবিব নিজের কথা শেষ করেই শিউলিকে ধাক্কা দিয়ে নিজের পথ থেকে সরিয়ে দেয়, শিউলি ছিটকে গিয়ে পড়ে খানা ডুলির ওপর,নগদেই কপালে মাঝবরাবর কেটে মুহূর্তেই রক্তে চোখমুখ ছেয়ে যায়,তাবিব সেদিকে দেখলোই না, নিজের মতো করে বিছানার কোনায় পা গুটিয়ে বসে মোবাইল টিপতে লাগলো,তার কাজে সে মোটেই অনুতাপিত নয়, কোনরকম অনুশোচনা তার চোখে মুখে নেই,শিউলি কপালে হাত চেপে ধরে দৌড়ে বেরিয়ে গেল,কল পাড়ে আসতেই আশেপাশে থাকা উপস্থিত দু চারজন মহিলারা এগিয়ে এলো!
প্রতিবেশী মহিলাদের সাহায্যে কপাল পরিষ্কার করলো, একজন নিজের ঘর থেকে টুথপেস্ট এনে শিউলির কপালে চেপে ধরলো, শিউলি শুধু নিরব হয়ে চোখের পানি জড়াচ্ছে,
-- বাপ মায়ের মনে দুখখু দিলে কহনো সুখী অওন যায় না! বাপ মা পোলা মাইয়ার ক্ষেতি চায় না কুনদিন!
বেশ বয়স্ক একজন মুরব্বি মহিলা শিউলির থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শিউলিকে বললো,এত সময়ে শিউলি আর তাবিবের মাঝে চলমান তর্কাতর্কি তাদের কানেও এসেছে,টিন সেটের ঘর, একটার সাথে আরেকটা এটে বানানো,এক ঘরে জোরে কথা বললে ঠিকই অন্য ঘরে শোনা যায়! প্রথমে শিউলি তাবিবের কথা শোনা না গেলেও শেষে শিউলিকে উদ্দেশ্য করে তাবিবের উচ্চস্বরে বলা কথাগুলো ঠিকই সবাই শুনেছে! তাছাড়াও এতদিনে শিউলি তাবিবের অবস্থা দেখেও কিছুটা আঁচ করেছে, শিউলির প্রতি তাবিবের এহেন ব্যবহার আজ নতুন নয়; বিয়ের সপ্তাহ পার হতেই শুরু হয়েছিলো,শিউলি মুখ বুঝে সহ্য করতো কারণ ভাবতো চিন্তায় এমন করছে কিন্তু না!
দিন গড়াচ্ছে তাবিবের আচরণে কঠিন থেকে কঠিনতর শব্দ যোগ হচ্ছে শিউলির জন্য!
এরই মধ্যে প্রতিবেশী এক মেয়ের সাহায্যে শিউলি গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছে,কারণ আর চলছিলো না! তাবিব কোন কাজেই যেতে চায় না,কোন কাজ করতেই আগ্রহী না! শিউলি শিক্ষিত কিন্তু চাইলেই চাকরী পাওয়া যায় না! তাছাড়াও গ্যাজুয়েশন শেষ করেনি তাই সনদপত্রও নাই! পালিয়ে আসার সময় কোন কাজও আনেনি! তাই এই গার্মেন্টস ছাড়া আপাতত কোন পথ খোলা দেখেনি, এদিকে তাবিবের খামখেয়ালি বেড়েই চলছে তার সাথে রাতে দেরি করে ফেরার সময়টা বাড়ছে! রাতে ফিরেও শিউলির চেয়ে বেশি সময় দেয় মোবাইলে! কার সাথে এত কথা বলে শিউলির বোধগম্য হয় কিন্তু কিছু বলার থাকে না যেখানে নিজের কুয়ো নিজেই করছে,সেখানে কাকে দোষ দিবে?
একদিন তাবিব গোসল করতে গেলে শিউলি তাবিবের ফোন নিয়ে ওর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে, কিন্তু ফোন লক থাকায় পারেনি,তাবিব গোসল সেড়ে ঘরে এসে সবার আগে নিজের ফোনটা দেখে তখন লক খোলা থাকে,তাবিব প্যান্ট পড়ার জন্য পিছু ঘুরতেই শিউলি তাবিবের ফোন হাতে নেয় যখনই নাম্বার নিজের মোবাইল নিতে যায় তখনই তাবিবের হাতে ধরা পড়ে এবং তার ফলাফল মোটেই ভালো হয়নি,কারণ তাবিব সেদিন শিউলিকে প্রচন্ড মেরেছিলো! সেদিন শিউলি এত বেশি আহত হয়েছিলো যে আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি,সেদিন আর কাজে যায় নি;
এভাবেই চলছিলো,তার সাথে যোগ হয়েছিল তাবিবের গলার চিকন সুর,তা ছিলো শিউলীকে বাড়ি গিয়ে নিজের বাবা মায়ের সাথে সম্পর্ক ঠিক করতে বলা! যাতে তারা তাবিবকে মেনে নেয় কিন্তু শিউলি নিজের বাবা মায়ের ভয়ে সে কথায় রাজী হয়নি,তাতে করে তাবিব আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠে! হুটহাট যখন তখন শিউলির গায়ে তুলত লাগলো,টাকার জন্য অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করলো, শিউলি তবুও চুপ করে সহ্য করে যেতো কারণ এছাড়া উপায় আপাত দৃষ্টিতে তার পড়েনি! কিন্তু সব সীমা সেদিন ছাড়লো যেদিন কাজ থেকে এস শুনলো তাবিব কোন মেয়েকে ঘরে নিয়ে এসেছিল এবং সারাদিন সেই মেয়েকে নিয়েই ঘরে সময় কাটিয়েছে! যার কারণে বাড়িওয়ালা সেদিনের মধ্যেই ঘর ছাড়তে বলে গিয়েছিলো;
পর্ব ০৯
প্রত্যেকে তার কর্ম ফল পায় সেদিন শিউলিও পেয়েছিলো,বাবা মায়ের মুখে চুলকানি দিয়ে, নয়নের মতো মানুষকে ধোঁকা দিয়ে যার সাথে সুখের ঘর বেঁধেছিলো তার কাছেই চরম অবহেলা, অপমান নির্যাতিত হয়েই সেদিন ফিরে এসেছিলো বাপের বাড়ি!
তাবিব সেদিন অনেক রাতেই ঘরে ফিরে তাও একরকম মাতাল হয়েই! শিউলির বুঝতে অসুবিধা হয় না তাবিব এত সময় কোথায় ছিলো কারণ এটা নিয়মিত ঘটছে! তবে আগে প্রতিবাদ করার সাহস না করলেও সেদিন রাতে করেছিল, যার কারণে সেদিন রাতে ঘটে চুড়ান্ত ঘটনা!
তাবিব যে মেয়েদের সাথে অবাধ অবৈধ মেলামেশা করে সেটা শিউলি এতদিন একাই জানতো আজ সবাই জানলো!
অর্ধেক রাত তাবিব ফোনে মেয়েদের সাথে ভিডিও কলে অশ্লীল কথাবার্তা বলে,তাও শিউলির পাশে শুয়েই! সেগুলো শোনা আর নিরবে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কোন কিছুই শিউলির করার ছিলো না! তাই মুখ বুঝে সহ্য করাই উত্তম মনে করতো! কিন্তু যেই কথা লোকে শুনবে বলে এত দিন সহ্য করে গেছে তা যখন তাবিব নিজেই সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে তখন চুপ থাকার কোন মানেই হয় না ভেবেই সেরাতে প্রতিবাদ করার সাহস জোগায়!
-- তুমি বিয়ের পর থেকে যা করছো তা কেবল মুখ বুজে সহ্য করেই যাচ্ছি কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি,তোমাকে ভালোবাসি বলেই নিজের সব ছেড়ে এসেছি তাহলে তুমি কেন আমার সাথে এমন জঘন্য ব্যবহার করছো? কি অপরাধে?
-- অপরাধ তোমার একটাই; আমার কথা না শোনা?
-- তোমার কথা শোনা মানেই তো হলো বাবার কাছে গিয়ে ভিক্ষা চাওয়া! আচ্ছা তাবিব তুমি কি বুঝো না এতে তোমারই সম্মান ক্ষুন্ন হবে! এমনিতেই আমার বাড়ির কেউ তোমাকে পছন্দ করেনি এখন যদি এগুলো শোনে তাহলে তারা কোনদিনও তোমাকে মেনে নিবে না! তাছাড়া..
-- আহ্! থাম! লেকচার বন্ধ কর? কানের সামনে একদম ঘ্যানঘ্যান করবি না!
শিউলি থামে না বরং এগিয়ে গিয়ে তাবিবের শার্টের কলার ধরে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-- কোন মেয়েকে নিয়ে আসছিলি আজ বল? তুই সারা রাত আমার পাশে শুয়ে অন্য মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করিস তাও আমি মুখ বুজে সহ্য করি কারণ বাপ মায়ের অবাধ্য হয়ে তাদের ঠকিয়ে, একজন নিরপরাধ ভালো মানুষকে ধোঁকা দিয়ে তোর কাছে এসেছি! এত এত মানুষের মনের কষ্টের কারণ, তাদের অসম্মানের কারণ যখন হয়েছি তখন তাদের চোখের পানির অভিশাপ তো আমাকে নিতেই হবে!তাই নিজের পাপের শাস্তি হিসেবে তোর করা সব অত্যাচার আমি সহ্য করেছি হয়তো করেও যেতাম কিন্তু আজ যা করলি তা কোনভাবেই মানতে পারবো না আমি! তুই ফোনে কথা বলিস তাতেও তোর মন ভরেনি আজ ঘরে অবধি নিয়ে এসেছিস! তোর জন্য পুরো বস্তির মানুষ ছি ছি করছে! এমন কেন করলি আমার সাথে?
তাবিবের কানে শিউলির কোন কথা ঢুকেছি কিনা বলা যাচ্ছিলো না কারণ ও চোখমুখ শক্ত করে চেয়ে আছে শিউলির হাতের মুঠোর দিকে যেটা আপাতত তার কলার ধরে রেখেছে! মাতাল হলেও তো পুরুষ মানুষ! তার শক্তির সাথে শিউলির মতো পাতলা গঠনের নারী কিভাবে পারবে? তাছাড়া ঠিকমতো পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ায় শিউলি আরো বেশি শুকিয়ে গেছে, দুর্বল হয়ে পড়েছে, এদিকে তাবিব শক্তিশালী তাগড়া ২৯ বছর বয়সী যুবক!
নিজের শরীরে সর্বশক্তি দিয়ে শিউলির হাত মুচড়ে ধরে,অপর হাত দিয়ে চুলের মুঠি শক্ত করে টেনে ধরে,এভাবে দুদিকের আঘাতে শিউলি নেতিয়ে পড়ে, আর্তনাদ করে উঠে,তাবিব চুল ছেড়ে মুখ চেপে ধরে! শিউলি চুল ছাড়া পেয়ে কিছুটা রক্ষা পায় বলেই তাবিবের হাতে কামড় দিতেই তাবিব শিউলিকে মাটিতে ফেলে দেয়!
এত মার খেয়েও শিউলি সেদিন দমে যায়নি! উল্টো মাটি থেকে উঠে তাবিবকে ধাক্কা মারে,যার কারনে তাবিব উল্টে গিয়ে দরজায় পড়ে, দরজার সিটকিনির শক্ত লোহার দন্ডে পিঠে বেশ জোরে আঘাত পায়,যেহেতু মাতাল ছিলো তাই এমনিতেই ঢুলুঢুলু করছিলো, শক্তি কম পাওয়ায় বেশি শক্তি খাটাতে হয়নি শিউলির!তবে তাবিব ব্যথা পেয়েও থেমে যায়নি তেড়ে এসে এলোপাথাড়ি শিউলিকে আঘাত করে, চড় থাপ্পড় মারতে মারতে নাকমুখ দিয়ে রক্ত বের করে ছাড়ে,শিউলি কোনভাবেই নিজেকে রক্ষা করতে পারছিলো না কারণ তাবিব শক্ত করে শিউলির চুলের গোছার মুঠি ধরে রেখেছে,এক পর্যায়ে সহ্য করতে না পেরে যখন আবারও তাবিবের হাত ধরে কামড় বসাতে যায় তখনই তাবিব শিউলির তলপেটে জোরে আঘাত করে হাঁটু দিয়ে; তলপেটে ব্যথা পাওয়ায় তাবিবের হাত ছেড়ে দেয় শিউলি, সেখানে হাত দিয়ে নিজেকে সামলাতেই তাবিব পরবর্তী লাথি দেয় নিম্নাঙ্গে, পুরুষালী পায়ের শক্ত আঘাত নিতে পারেনি নারীর অমন নরম অংশ! তৎক্ষণাৎ শুয়ে পড়ে মাটিতে!
শিউলির আর্তনাদ আর ধস্তাধস্তিতে ভেতরে হওয়া ভাঙচুরের শব্দে আশেপাশের সব মানুষ জেগে উঠে, শিউলিদের ঘরের বাইরে এসে জড়ো হয়,শিউলির চিৎকার শুনে বাইরে থেকে দরজায় জোরে জোরে করাঘাত করতে থাকে,তাবিব তখনও শিউলির পেটে একটা লাথি মারে, বাইরের শব্দ কানে এলেও মাতাল তাবিব সেদিকে খেয়াল করলো না কিন্তু যখন শব্দ প্রখর হলো তখন ঢুলত ঢুলতে গিয়ে দরজা খুলে একটু ফাঁক করলো,বাইরে মুখ বের করে বিরক্তি ঝেড়ে বললো,
-- এত রাতে কি চান?
-- দরজা খুলেন মেয়া!
বাইরে এক যুবকের ক্রোধিত চিৎকার, তাবিব বিরক্ত নিগড়ে বললো,
--- এত রাতে আমার ঘরের দরজা আপনার জন্য কেন খুলবো? কিহ আমার বউয়ের প্রতি কুনজর আছে?
বিরবির করে শেষের কথাটা বললো, ছেলেটা বুঝলো তাবিব এখন হুঁশে নেই তাই ওর সাথে অযথা
কথা বলে সময় নষ্ট করা ছাড়া কিছুই হবে না , ঐদিকে পেছন থেকে একজন মুরব্বি বললো,
-- আরে ধুর এই ব্যাডার লগে কথা কইয়া কি অইবো,এই ব্যাডা কি অহন উশে আছে? ভিতরে মাইয়াডারে মনে অম মাইরালাইছে!
ছেলেট কথা বাড়ালো না,তাবিব হালকা ধাক্কা দিয়ে দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো, ভেতরে ঢুকতে গায়েও ঢুকলো না, পেছনে ঘুরে একজন মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-- আপনে যান গিয়া দ্যাহেন কি অবস্থা!
-- আইচ্ছা!
শিউলির অবস্থা খুব একটা ভালো না ,নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে তা কান ছুঁয়েছে,কাত হয়ে পড়ায় ফ্লোরে চুপচুপ করছে,তার মধ্যে বিরবির করে আহাজারি করছে,
-- এই এর তো অবস্থা ভালা না, মনে অয় ডাক্তার ডাকা লাগবো!
কথাটা বলেই বাইরের সেই ছেলেকে ইশারা করলো, তাবিবকে আটকাতে,ছেলেটা ইশারা বুঝেই তাবিবের দিকে তাকালো,তাবিব কোনরকম দোনামোনা ছাড়াই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো, এদিকে সবাই ধরাধরি করেই শিউলিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে, যাওয়ার সময় দরজাটা বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে যায়!
শিউলির নাক মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল, নিম্নাঙ্গেও প্রচন্ড ব্যথা করছে, এলোপাথাড়ি থাপ্পড়ের কারণে কানেও লেগেছিল সেখান থেকে রক্ত দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত দূর্বলতায় শিউলির মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে শিউলি হাসপাতালে নেয়!
প্রাথমিক চিকিৎসার পর শিউলিকে স্যালাইন দেওয়া হয়! এদিকে পুলিশে ফোন করে তাবিবকে ধরিয়ে দেয়!
পরদিন সকালে শিউলির কাছে জোরাজুরি করে ওর বাড়ির ঠিকানা নেয়,ফোন নাম্বার নেয়!
তারা সবটা শুনে রাগ পুষে রাখতে পারেনি! পৃথিবীর কোন বাবা মাই পারে না! এতদিন খোঁজ নেয়নি কারণ ভেবেছিলো সুখে আছে; তাছাড়া যেই মেয়ে এভাবে অপমানিত করে গেছে তার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেই এতদিন নিজেদের দমিয়ে রেখেছিল কিন্তু যখন সবটা শুনলো আর এদিকের লোকজন বোঝালো তখন আর নিজেদের রাগ জিইয়ে রাখতে পারেনি !
ঘটনা আরো তিক্ত হলো তখন যখন সবাই জানলো শিউলি সাড়ে তিন মাসের গর্ভবতী! এই খবরটা খুশির হলেও ততক্ষণে তা সবার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে! কারণ যতই হোক এত কিছুর পর শিউলিকে তাবিবের সাথে থাকতে দিতে দেওয়া যায় না! আর শিউলিও আর তাবিবের সাথে থাকতে চাচ্ছে না!
সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় গর্ভপাতের! শিউলির স্বাস্থগত সমস্যার কারণে তখনই গর্ভপাত সম্ভব নয় কিন্তু তাও তারা করবে বলেই সিদ্ধান্ত নেয়!
তাবিবকে পুলিশি হেফাজতে রাখে,শিউলি নিজেই বাদী হয়ে বাবার শেখানো বুলি আওড়িয়ে তাবিবকে ফাঁসিয়ে দেয়,সত্য মিথ্যা বলে অপহরণসহ যৌতুকের কারণে শারীরিক মানসিক অত্যাচার, অর্থ ও অলংকার আত্নসাৎ সহ নারী নির্যাতন মামলা দেয়,তাবিব তখন হুঁশে থাকলেও করণীয় কিছুই নেই, কারণ সবটাই তার কর্মফল!
তাবিবকে থানায় রেখেই শিউলিকে নিয়ে ওর বাবা মা চলে যায় গ্রামে! বাড়ি পৌঁছানোর ঠিক তিন দিনের মধ্যে তালাক পাঠানো হয় তাবিবের কাছে, যেহেতু ক্ষমতাশীল তাই গারদের লোকদের টাকা খাইয়ে সই করিয়ে নিতে সমস্যা হয়নি! বরং তাবিব দিতে না চাওয়ায় হুমকি দেওয়া হয় আরো মামলা দেওয়ার! তাবিব নিজেকে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতেই সই করে দেয়, তাছাড়া এতটুকু বুঝে গেছে কোনভাবেই শিউলির বাপের টাকা তার জন্য নয়,তার চেয়ে বরং তালাকের কাগজে সই করে দেওয়াই ভালো! করলোও তাই!
গ্রামে আনার সপ্তাহের মধ্যে শিউলি বেশ সুস্থ বোধ করে এদিকে ওর বাবা সিদ্ধান্ত নেয় নয়নের সাথে মিটমাট করে যদি কোনরকম ভাবে শিউলিকে নয়নের ঘরে পাঠানো যায়! কিন্তু তার জন্য আগে শিউলিকে মুক্ত হতে হবে, পুরোপুরি! তালাকের কাগজে সই হলেও এখনও তিন মাস অবধি এক সম্পর্কে থাকতে হবে! তাই একটু অপেক্ষা করতেই হবে!
ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হাসপাতালে গেলে ডাক্তার সরাসরি জানায় এখন গর্ভপাত সম্ভব নয়,আর যদি করেই তবে শিউলির সমস্যা হবে! তাই তারা কোনরকম দায়িত্ব নিয়ে এই কাজ করতে পারবে না কিন্তু শিউলি কোনমতেই বাচ্চা রাখতে রাজী নয়!
সে নয়নের সাথে জীবন সাজাতে রাজী তবে তা একদম নতুন করে যার মাঝে নিজের অতীতের কোন পিছুটান রাখতে রাজী নয়,তাই নিজের জীবনের মায়াও ভুলে গেল,ডাক্তারকে অতিরিক্ত টাকার লোভ দেখিয়ে করে নিলো গর্ভপাত!
## ইচ্ছাকৃত গর্ভপাত ভয়াবহ অপরাধ!!!
আমাদের ধর্মে সুস্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে এবং যে এই কাজ করবে তার জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি!
পর্ব ১০
দিন যেতে যেতে তিন মাস পেরোলো,শিউলি তাবিবের তালাক সম্পন্ন হলো কিন্তু এখনও তাবিব জেলে পড়ে রইলো,এর মধ্যেই তাবিবের বাবা এসেছিল ! ছেলের অপকর্মের দায় নিজের মাথায় নিয়ে ক্ষমাও চেয়েছিলো, সব ভুলে তাবিবকে কেইস মুক্ত করতেও অনুরোধ করেছিলো কিন্তু শিউলির বাবা তার কোন কথাতেই টলেনি, উল্টো আরো নানা হুমকি ধামকি দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন!
শিউলি নিজেকে তাবিব মুক্ত করে নয়নের সাথে ঘর বাঁধতে নিজেকে প্রস্তুত করলো,এরই ধারাবাহিকতায় একদিন সকাল সকাল বিশাল আয়োজনের সহিত মিয়া বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালো বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ,এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তি,শিউলির বাবা শহীদুল খাঁ!
-- আসসালামু আলাইকুম বেয়ান সায়েবা!
পাক ঘর লেপছিলো আম্মা,ভারী পুরুষালি কন্ঠে পিছনে ফিরে তাকালো,সকালের কাঁচা রোদের আলোয় উঠোনে পরা একাধিক ছায়া দেখে বুঝে নিলো বাড়িতে কেউ এসেছে! তড়িঘড়ি করে হাতের কাজ থামিয়ে দিলো,অন্য হাতে হালকা কাদা থাকলেও তাতে বিশেষ ধ্যান দিলো না , মাথার উপরে থাকা ঘোমটাটা আরো একটু লম্বা করে টেনে নিলো,ঘুরে এসে দাড়িয়ে উত্তর করলো,
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম!
সালামের উত্তর পেয়ে শহীদুল খাঁ কিছুটা হাসলেন, এরপর ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলেন, শুরু করলো,
--- নয়ন বাড়িত আছেনি?
-- হ; আছে তো! তয় আপনেরা এই সাইজ সকালে! কি মনে কইরা ভাই সায়েব!
-- আহ্ কি ভাই ভাই করেন! সম্পর্কে আমরা বিয়ান বিয়াই! আপনি হেই নামেই ডাকেন! একমাত্র মাইয়ার শ্বাশুড়ির সাথে এইরকম রসিকতার সম্পর্ক থাকাই ভালা লাগে!
-- না ঠিক আছে কিন্তু;
-- কইছিলাম জামাই বাবাজিরে একটু ডাকেন দেখি; তার লগেই একটু আলাপ আছে! আপনারেও দরকার আছিলো!
ডাকার দরকার হয়নি,নয়ন নিজেই ততক্ষনে বেরিয়ে এসেছে,
-- আসসালামু আলাইকুম শহীদুল কাকা!
-- আরেহ জামাই বাবা, ওয়ালাইকুম আসসালাম! আরে কাকা ডাকো ক্যান? নিজের শ্বশুরকে কেউ কাকা ডাকে! আব্বা ডাকবা আমার মাইয়া মতো!
-- কিন্তু আমাদের মাঝে এমন সম্পর্ক তো নাই যার কারণ আমি আপনাকে বাবা ডাকতে পারি! তাছাড়া!
-- দেখো আমি আজকে এই নিয়াই কথা বলতে আইছি!
-- আইচ্ছা আপনে কথা যা কওনের বইসা কন! আগে একটু নাস্তা পানি খান তারপর কন!
-- হ হ ,বেয়ান একটু চা দিয়েন,এই চিনি কম দিয়েন,মশলা বেশি দিয়েন!
আম্মা বুঝলো উনি মশলা চা চাচ্ছেন, আম্মা নয়নের দিকে তাকিয়ে পাকের ঘরের দিকে গেল, হুকুম শুনে ইতি মধ্যেই একজন চায়ের পানি বসিয়ে দিয়েছে, আম্মা গিয়ে খালি ঠিকঠাক করার জন্য বললো, এরপর বাইরে এসে কল চেপে পানি নিলো,হাত মুখ ধুয়ে নিজের গায়ের ধুলো ঝাড়লো, এরপর মাথার কাপড়টা আরো একবার ঠিক করে নিজের দিকে ভালো মতো দেখে এরপর হেঁটে এগিয়ে গেল উঠোনে আসরের দিকে!
-- দ্যাখো আমি জানি আমার মাইয়া অন্যায় করছে! তোমার কাছে মুখ দেখানোর জায়গা নাই, কিন্তু কি করুম কও? বাপ তো! পোলা মাইয়া অন্যায় করলে মুখ ফিরাইয়া রাখতে পারি না! তাদের কষ্ট দ্যাখলে সব রাগ পানি অইয়া যায়! তাই সব ভুইলা তাদের সুখের সন্ধান করি!
নয়ন কথার প্রতুত্তরে কিছু বললো না,কেবল মাথা নুইয়ে শুনেই গেল, শহীদুল খাঁ নিজের বক্তব্য চালিয়ে গেলেন,
-- আমি আইজ আইছিলাম তোমার কাছে একখান প্রস্তাব লইয়া !!
নয়ন এত সময়ে মুখ তুলে চেয়ারম্যানের পানে তাকালো, কি প্রস্তাব! ভাবতে লাগলো,ওর কাছে কি প্রস্তাব থাকতে পারে?
-- আমি আসলে;
কথা শেষ করার আগেই শহীদুল খাঁ নয়নের দুই হাত চেপে ধরলো, অনেকটা নতজানু হয়েই কান্না ভরা গলায় বলতে লাগলো,
-- আমি বাপ আমার মাইয়ার সুখ দ্যাখবার চাই,তাই তোমার কাছে হাত পাতছি,আমারে ফিরাইয়া দিও না বাবা!
নয়ন হঠাৎ এহেন কাজে নির্বোধ হয়ে গেল, বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে! এমন করে এক উঠোন মানুষের মাঝে হঠাৎ এমন কাজের মানে কি?
-- তুমি আমার মাইয়াডারে তোমার ঘরে জায়গা দাও বাবা! একটাই মাইয়া আমার; তার সুখ দেইখা মরলেও শান্তি পামু! আমি এক বৃদ্ধ বাবা তোমার কাছে এই এতটুকু চাইতাছি!
-- অসম্ভব!
ঝটকা দিয়ে নয়ন নিজের হাত সরিয়ে নিলো, শহীদুল খাঁয়ের শেষ কথায় মাথায় যেন আগুন ধরে গেল, মনে শুধু ভাবনা এলো কোন সাহসে এমন একটা প্রস্তাব উনি রাখতে পারে? কিভাবে ভাবলো উনার ঐ বেরিয়ে যাওয়া মেয়েকে নয়ন ঘরে তুলে নিবে? অসম্ভব! এই জীবন থাকতে তো না! যত কিছুই হয়ে যাক নয়ন কখনোই ঐ দুঃশ্চরিত্র নারীকে কখনোই মেনে নিতে পারে না !
-- কি সব বলছেন?
-- বাবা আমি জানি তুমি রাগ করছো তার প্রতি কিন্তু বিশ্বাস করো এতে কিন্তু আমার মাইয়ার কোন দোষ নাই! ঐ পোলায় ভুলাইয়া ভালাইয়া আমার অবুঝ নাদান মাইয়ারে ভাগাইয়া নিয়া গ্যাছে! আর তার জন্য এহোন জ্যালের ঘানি টানতাছে!
-- আপনার মাইয়া নাদান, অবুঝ? আপনি কি ঠিক বলতাছেন?
আপনার মাইয়া নাদান অবুঝ তার জন্যই বুঝি নিজের প্যাটের বাচ্চারে ফালাইয়া দিছে?
নয়নের কথায় শহীদুল খাঁ একটু চমকালো, বিব্রত হলো! শিউলির গর্ভপাতের কথা তো কারো জানার কথা না! এমনকি শিউলি যে এই গ্রামে আছে তাই তো কারো জানার কথা না! শিউলি আসছে তিন মাস ১৭ দিন,এর মধ্যে একবারও বাড়ির বাইরে যায়নি! এমনকি যেদিন এসেছিল সেদিন আগাগোড়া নিজেকে বোরকায় মুড়িয়ে এসেছিলো,গাড়ী থেকে নেমে সোজা ঘরে ঢুকেছে,কেউ দেখেনি এইতো ধারনা ছিলো এতদিন! আবার হাসপাতাল থেকেও এসেছে একরকম লুকিয়ে লুকিয়ে! তবে নয়ন কিভাবে জানলো এত লুকানো কথা!
-- বাবা তুমি এইসব কি কইতাছো! মানি মাইয়া আমার একটা ছোড ভুল করছে তার মানে এই নয় সে নিজের সন্তানের খুনও করতে পারে!
-- থামেন আপনে? আপনার মাইয়া বিয়ার রাইতে বাসর ঘরে আমার পোলারে ঘুমের ওষুধ খাওয়াইয়া তার নাগরের হাত ধইরা পালাইছে,আমার পোলার জীবনে একটা কালা দাগ ফালাইয়া দিছে! তার কারণে আমার পোলাডা মাইনসের সামনে মাথা তুইলা কথা কইতে পারে না! আর আপনি কইতাছেন তার এই কাম ছোড একটা ভুল! আবার কি হুনলাম প্যাটের চাইর মাসের বাচ্চাও নাকি ফালাইয়া দিছে! মাইনে হেই পোলার লগে ভাইগা যাওনের সময় টেকা দ্যাখছিলো, কিন্তু যাইয়া যহোন দ্যাখলো আসলে পোলার কিছুই নাই তাই ওহোন তারে ফাসাইয়া জ্যালের মইধ্যে ঢুকাইয়া মারতাছেন! আবার তার চিহ্ন মুছতে প্যাটের বাচ্চা ফালাইতেও আল্লাহর ভয় করেন নাই! এতো কিছুর পরেও কন আপনের মাইয়া ছোড অবুঝ নাদান!
আপনে এতকিছুর পরেও ক্যামনে কন আপনের ঐ বাইরাইয়া যাওইন্না মাইয়ারে আমি আমার ঘরের বউ হিসাবে মাইন্না নিমু!
আম্মার একদমে বলে যাওয়া কথায় শহীদুল খাঁ বেশ লজ্জা পেলেন, অপমানিত বোধ করলেন,তার সাথে থাকা মানুষেরাও অবাক,কারণ এতকিছু উনারাও জানতো না, উনারা সাথে এসেছিলেন শহিদুল খাঁ এর অনুরোধে কিন্তু এসে যে এমন একটি ঘটনার মুখোমুখি হবে তাতো জানা ছিলো না!
অনেক কথা কাটাকাটি হলো এক পর্যায়ে কাটকাট গলায় নয়ন জানালো কোনভাবেই সে শিউলিকে মেনে নিবে না! এমন একজন মানুষকে কখনোই মানা যায় না যে কিনা নিজের খুশির জন্য একটা অনাগত জীবনকে হত্যা করতে পারে তাও কিনা নিজেরই সন্তান!
শহীদুল খাঁ ব্যর্থ হয়ে রেগে গেলেন, একরকম হুমকি দিয়ে গেলেন, নয়ন কোন দেশের ফেরেস্তা দেখে বিয়ে করে তাও দেখে নিবেন বলে তাচ্ছিল্য করে গেলো, একসাথে নয়নের অতীতের অবস্থা নিয়েও কথা শুনাতে ছাড় দিলো না! মোদ্দে কথায় মেয়ের সংসার সাজাতে এসে মেয়ের মতোই অহমিকায় সবটা শেষ করে দিয়ে গেল!
সময় পেরিয়ে সেই দিন গেলো! পরের দিনই নয়ন তালাকের বন্দোবস্ত করলো, কিন্তু আটকে গেল মোটা অংকের দেনমোহরে! কিভাবে তা পরিশোধ করবে! এদিকে অহংকারী শিউলি নিজের রুপ আরো একবার দেখালো! দেনমোহরে দায়ে নয়ন তালাক দিতে পারবে না ভেবেই চাপ দিতে লাগলো তাকে মেনে নিতে,নয়ন কোনভাবেই শিউলির সাথে সংসার করবে না! প্রয়োজনে জেলের ঘানি টানবে তবুও না! শেষ অবধি নয়ন নিজের সদ্য সঞ্চয় দিয়ে কেনা মোটা দাগের ধানি জমি বিক্রি করে,তার সাথে ভিটা বন্ধক রেখে ব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে পরিশোধ করে দেনমোহরের টাকা যার ঋণ নয়ন এখনও টেনে যাচ্ছে!
সবরকমের সম্পর্কের পিছুটান ছেড়ে নয়ন সামনে এগোনোর বদ্ধ পরিকর কিন্তু চাইলেই কি
এগিয়ে যাওয়া যায়! শরীরের দাগ মোছার হাজারটা উপাদান থাকলেও মনের দাগ সহজে মুছে না! মনটা তো স্বচ্ছ কাঁচের ন্যায়,যাতে একবার আঁচড় লাগলে তা প্রতিয়মান হয় আজীবন! নয়নের অবস্থাও তেমনি হয়েছিলো! মেয়ে মানুষের প্রতি বিশেষ করে শিক্ষিত নারী সমাজের প্রতি তৈরি হলো এক বিশাল পাথরের মতো শক্ত ধারনা,ভুল ধারণা যেটা ছিলো নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক চিন্তার কারিগর!
নয়নের এই ধারনা আর মজবুত হতো যখন আমাদের সমাজেরই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী নারীদের দেখতো!যারা রুপের দাপটে মানুষের সাথে অসৎব্যবহার করে,যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশে মানুষের কমতি নিয়ে কৌতুক করে বেড়ায়, অসহায় শ্বশুর শাশুড়িকে অত্যাচার, অবহেলা করে! তাদের সাথে অমানবিক আচরণ করে!
এই ধরনের নারী আমাদের সমাজকে কলুষিত করে রাখছে! এরা ভুলেই যায় কোন এককালে তারাও বৃদ্ধ হবে! শরীরের এই শক্তপোক্ত খাঁজ ঝুঁলে নড়বড়ে হয়ে যাবে!অসৎ কর্ম শেষ বয়সে অসহায় একা করে দিবে! অমানবিক আচরণের দায়ে মানুষের নিকট চক্ষুশূল হয়ে থাকবে, তাদের একই পরিনতি হবে! যদি বুঝতো তবে নিশ্চয়ই এরা এই রকমের গর্হিত কাজ করে সাহস করতো না!
শ্বশুর শাশুড়িকে সেবা এবং তাদের প্রতি সদয় হতে আমাদের আছে শক্তিশালী হাদিসের বর্ণনা,
শ্বশুরবাড়ির সম্পর্ক— আবহমানকাল থেকে চলমান নিয়ম। মানবসভ্যতার শুরু থেকেই এই ব্যবস্থা। কালের ঘুর্ণাবর্তে এতে ব্যাত্যয় ঘটেনি। ব্যাপারটা নিয়ে নতুন ও আলাদা করে পরিচয় দিতে হয় না। তবে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা কী স্ত্রীর দায়িত্ব? এ নিয়ে আমাদের আলোচনা।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, পুত্রবধু ও শ্বশুর-শাশুড়ির সম্পর্কের দায়িত্বগুলো কখনো একপক্ষীয় নয়। সন্তানের যেমন মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হয়। মা-বাবারও তেমন সন্তানের জন্য অনেক কিছু করতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেটা হয়, উভয়পক্ষ যখন নিজের অধিকার আর পাওনাগুলো নিয়েই ভাবতে শুরু করে এবং কর্তব্যগুলো ভুলে যায়— তখনই সংসারে কলহ ও দ্বন্ধ্বের আগুন জ্বলে ওঠে।
শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা
শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ও ননদ-দেবরদের কোনো কাজে সহযোগিতা করা— স্ত্রীর দায়িত্ব নয়। বরং এটা তার একটি অতিরিক্ত কাজ। কিন্তু বর্তমান সমাজে বিষয়টাকে এমনভাবে দেখা হয় যে, যেন এটা তার অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য। বরং এটিই যেন তার প্রধান দায়িত্ব! বিভিন্ন পরিবারের অবস্থা তো এমন যে, ছেলের জন্য বউ আনা হয় কেবল শ্বশুর-শাশুড়ির সেবার জন্য। ইসলামের সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। মা-বাবার সেবা-শুশ্রূষা করা সন্তানের দায়িত্ব— কোনোভাবেই পুত্রবধূর নয়। (আল-বাহরুর রায়েক : ৪/১৯৩; কিফায়াতুল মুফতি : ৫/২৩০)
প্রসঙ্গত, স্বামীর মা-বাবার খেদমতের প্রয়োজন দেখা দিলে, স্বামী নিজ কর্তব্যে তাদের সেবা-যত্ন করবেন। স্ত্রী যদি সন্তুষ্টচিত্তে শ্বশুর-শ্বাশুড়ির বা স্বামীর মা-বাবার সেবা করে, সেটা প্রশংসনীয়। বিনিময়ে তিনি বিপুল সওয়াব পাবেন। তবে একটা কথা স্মরণ রাখতে হবে, এসব করতে স্ত্রী আইনত বাধ্য নয়।
মধ্যপন্থা, পরিমিতিবোধ ও নৈতিকতার দাবি
মোটকথা, মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের দাবি হলো, আইনত অধিকার নিয়েই স্বামী স্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। অতিরিক্ত কিছু তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। তবে স্ত্রী স্বতঃস্ফূর্তভাবে করলে ভিন্ন কথা।
আর স্ত্রীর কর্তব্য হলো- নৈতিকতাবোধ ও দায়বদ্ধতা রক্ষা করা। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের কাছেই পরিষ্কার থাকতে হবে, কার দায়িত্ব কতটুকু এবং নৈতিকতার চাহিদা কী? নৈতিকতার ভিত্তিতে স্ত্রী যা করবে— তা মর্যাদার চোখে দেখতে হবে। তার আন্তরিকতা ও সহযোগিতাকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে নিতে হবে।
ইসলাম ও নৈতিকতাবোধের দাবি এটা যে, স্ত্রী স্বামীর বাবা-মাকে নিজের মা-বাবার মতো সম্মান দেবেন। তাদের প্রতি সমীহের চোখে দেখবেন। মনেপ্রাণে তাদের ভালোবাসবেন। তাদের সেবা-যত্নকে নিজের জন্য পরম সৌভাগ্য মনে করবেন। অনুরূপ শ্বশুর-শাশুড়িরও কর্তব্য হলো- পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো আদর ও মমতায় আবদ্ধ করা। তার সুখ, আনন্দ ও সুবিধার প্রতি সবিশেষ মনোযোগ দেওয়া।
( হাদিস আমি গুগল থেকে সংগ্রহ করেছি)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিজেদের বাবা মায়ের পাশাপাশি শ্বশুর শাশুড়িকে যথাযোগ্য সম্মান এবং সেবা করার মানসিকতা দিক! তার সাথে বউমাদের প্রতি তাদের সদয় আচরণ করার মানসিকতা তৈরি হোক!!!
পর্ব ১১
ভাবনার অভিলাষ নয়নকে আষ্ঠে ধরেছে,না চাইতেও অতীতের কালো অধ্যায় মনে পড়ে গেছে,সর্বনাশা নারীর উপস্থিতি দগ্ধ করে দিয়েছে শুকিয়ে যাওয়া ঘা! বিশেষ করে আহত হয়েছে তারার সামনে এই নারীর উপস্থিতি! তারা এখন কি ভাবছে! নিশ্চয়ই মনে অনেক প্রশ্ন জমা হয়েছে! চিন্তার মাঝেই নয়ন আরও একবার অতীতে ডুব দিলো!
জেলে যখন পুলিশি হেফাজতে ছিলো তখন একদিন হুট করেই এক বড় মাপের আইনজীবীর উপস্থিতি ঘটলো, নয়ন নিশ্চিত হলো উনি তার পরিবারের তরফ থেকে চুক্তি করা নয়! তবুও কথা বলার জন্য তার মুখোমুখি হলো,
--- আসসালামু আলাইকুম! আমি হাইকোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আশরাফুল সৈকত, নিয়মিত প্র্যাক্টিস করছি! আমাকে আপনার কেইস লড়ার জন্য হায়ার করা হয়েছে,আপনি আমাকে কিছু তথ্য দিয়ে সাহায্য করুন, ইনশাআল্লাহ এই চলতি সপ্তাহের মধ্যেই জামিন পাবেন!
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম, কিন্তু!
-- জ্বী, আপনি যেকোন প্রশ্ন করতে পারেন!
-- আমার তো আগেই উকিল আছে,তাইলে আপনারে কে ভাড়া করছে?
-- ওহ্! জ্বী; আমাকে আপনার শ্বশুর শহীদুল খাঁ হায়ার করেছে!
-- শহীদুল খাঁ!
-- জ্বী!
-- কিন্তু উনি আমার শ্বশুর নয়!
-- তবে আমি তো জানি আপনি উনার মেয়ের জামাই! আমার সাথে আলোচনা চলাকালীন তো তাই পরিচয় দিয়েছিলেন! তবে আপনি যা বলছেন..!
-- না আপনারে ভুল বলা হইছে,কেন হইছে তা জানিনা! আর আমার উকিল আছে, নতুন করে অন্য উকিলকে দরকার নাই! আপনি আইতে পারেন!
নয়ন অনিহা দেখিয়েই কথা শেষ করে ফিরে যাওয়ার জন্য পা ঘুরাতেই আইনজীবীর গম্ভীর জোরালো কথায় থেমে গেল,
-- আমার কাছে আপনার জন্য একটা চিঠি আছে!
-- কিসের চিঠি,কার চিঠি?
একসাথেই দুটো প্রশ্ন, আইনজীবী বিরক্ত হলো,নয়ন যে তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে, অপছন্দ করছে সেটা হজম হচ্ছে না,তবুও দায়িত্ববোধ থেকেই বললো,
-- দেখুন পড়েই!
ভদ্রলোক নিজের কালো কোটের পকেট থেকে সুন্দর করে চার ভাঁজের একটা সাদা কাগজ বের করলো,হাত বাড়িয়ে ইশারায় নয়নকে বললো নিতে,নয়ন ইশারা বুঝে হাত এগিয়ে কাগজটা নিলো, একবার ভাঁজকৃত কাগজের দিকে তাকিয়ে আরেকবার সামনে উপস্থিত ফর্সা মুখে অজস্র বসন্তের ছোপ ছোপ দাগ বয়ে বেড়ানো চল্লিশের কোটা পেরোনো মানুষটির চোখের চাহনি তীক্ষ্ণ,যেন এই দৃষ্টি দিয়েই নয়নের অস্থিমজ্জা পড়ে নিচ্ছে! চোয়ালগুলো শক্ত করে রাখার বিশেষ কারণ নয়ন দেখলো না; তবে নয়নের কাছে তা ক্ষুদ্র ব্যাপার হলেও উক্ত ব্যক্তির কাছে নয়! তার মতো এত বড় আইনজীবী যে কিনা সেধে এসে এমন একজন দুই টাকার মানুষের কেইস লড়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে তাকে কিনা সেই লোকটা সম্পূর্ণ অনিহা দেখাচ্ছ,এটা তো তার জন্য বিশাল অপমান! যার কাছে সামান্য পরামর্শ নিতে দেশের বড় সড় নেতারা আগের থেকে অনুমতি নিয়ে রাখে, তার সাথে এমন ব্যবহার! উহুম কোনভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না! যদিও এখানে আসা এবং এরকম দুই টাকার এক ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলার কারণ একমাত্র শহীদুল খাঁ এর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, অবশ্য শহীদুল খাঁ এর জন্যেও না! এসেছেন তো এমপি সিদ্দিকুর রহমানের অনুরোধে,তার সাথে শহীদুল খাঁয়ের মোটা অংকের প্রস্তাব! বুঝে কুল পান না কেন এই ছেলের জন্য এত টাকা খরচ করতে হবে! উনি চাইলেই উনার মেয়েকে এর চেয়েও ভালো ছেলের সাথে বিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু কেন দিচ্ছেন না! শুধু শুধু এই কামলার ঘরের কামলার উপরে এত আগ্রহ দেখাচ্ছে!
নিজের খিটখিটে মেজাজ নিজের মাঝেই দমিয়ে রাখলেন, যথেষ্ট শান্ত ভঙ্গিতে পরবর্তী কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন,
-- আমার মনে হয় আপনার এই প্রস্তাবে রাজী হওয়া উচিত! এতে আপনারই ভালো! আপনার মতো একজন সামান্য কামলার জন্য এত বড় সুযোগ নিশ্চয়ই আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই,তাই সেটাকে অগ্রাহ্য করে বোকামো করার মতো ভুল করবেন না!
নয়ন আইনজীবী আশরাফুল সৈকতের কথাকে আবারও কিছুটা তুচ্ছ করেই চিঠি পড়ায় মন দিলো, না চাইতেও পড়লো! কি উদ্দেশ্যে জানার জন্য।
অনেক সময় নিয়ে পড়ার পর যা বুঝলো শহিদুল খাঁ বেশ আগ্রহী হয়েই এই উকিলের সাথে চুক্তি করেছে কিন্তু কেন? তা স্পষ্ট হলো না! শুধু বলা হলো নয়নের ভালোর জন্যই করেছে! নয়ন যাতে রাজী হয়ে ওকালত নামায় স্বাক্ষর করে দেয় এবং সেদিনের বিস্তারিত বর্ণনা করে!
চিঠির ইতিবৃত্ত নয়নকে আদেশ করার মতোই,তবে নয়নের মনে খটকা লাগলো কেন শহীদুল খাঁ এতদিন পরে তাকে সাহায্য করার জন্য একদম এত বড় উকিল লাগালো , নিশ্চয়ই স্বার্থ আছে! স্বার্থ ছাড়া রাজনৈতিক নেতারা কিছু করে না! চিঠিতে স্পষ্ট নয় তবে নয়ন সন্দেহ নিয়ে কোন কাজ করে না! তাই স্বাক্ষর করবে না। তাছাড়াও শিউলির পরিবারের সাথে সম্পর্কিত কোন মানুষের সাথেই নয়ন সম্পর্ক রাখতে চায় না। জেলে পচে মরলেও ঐ পরিবারের সাথে কোন যোগাযোগ রাখতে চায় না নয়ন, কারণ একবার জড়িয়ে গেলেই শিউলি ঝোঁকের মতোই নয়নের পিছু পড়বে যা কোন মতেই নয়ন হতে দিবে না! এই মন জুড়ে এখন তারার মতো পবিত্র মুখের প্রতিচ্ছবি ভেসে থাকে সেখানে শিউলির মতো নোংরা রমনীর ছায়াও পড়তে দিবে না!
-- ধন্যবাদ,উনাকে গিয়ে বলবেন আমার উনার থেকে কোন সাহায্যের দরকার নাই! আপনি আসতে পারেন!
-- আপনি কিন্তু না ভেবেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন,এত বড় সুযোগ হাত ছাড়া করা কোনভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ না! আমার মনে হয়... !
-- আপনে এত বড় উকিল, আমার মতো তুচ্ছ এক মানুষের জন্য এতটা কষ্ট করছেন তাতেই আমি ধইন্য,এর বেশি আমার দরকার নাই! তাছাড়া আমার পরিবার আমার জন্য আগেই একজন উকিল ভাড়া করেছে, সেই কাজ করতাছে!
আর হ্যা শহীদুল খাঁকে বলবেন আমার জন্য উনার এত ভাবনা না থাকলেও চলবে!
নয়ন কথা শেষ করেই চলে যাচ্ছিল, আইনজীবী সৈকতের কথায় থেমে গেল,
-- আপনি কিন্তু চাইলে উনার সাথে কথা বলতে পারেন! আমার মনে হয় একবার শহিদুল খাঁয়ের সাথেই কথা বলে নিলে ভালো হয়!
নয়ন কপাল কুঁচকালো, "কিভাবে?" জানতে চাইলো! সৈকত কিছুটা গুরু গম্ভীর হয়েই উঠে দাঁড়ালো, এরপর ধীর পায়ে একটু হেঁটে সাক্ষাৎ রুমের বাইরে উঁকি দিলো,ক্ষনিক বাদেই ভেতরে এলো সাথে আসলো শহীদুল খাঁ!
কুশলাদি পর্ব শেষ করেই নয়ন সোজাসুজি মূল কথায় আসার জন্য অনুরোধ করলো, শহীদুল খাঁ কিছুটা হাসলো, নয়নের এমন আচরণ উনার বরাবরই ভালো লাগে,নয়ন অহেতুক বেশি কথা বলা পছন্দ করেনা তবে কখনোই অভদ্র আচরণ করে না,সে যতই খারাপ ব্যক্তি হোক তার জন্য! তাছাড়াও ধৈর্য্যের ব্যাপারেও এই ছেলের জুড়ি মেলা ভার ! শিউলির বাবা হওয়া সত্ত্বেও কখনোই নয়ন উনার সাথে খারাপ কিংবা কটু কথা বলেনি! শেষ যেদিন কথা হয়েছিলো সেদিনও নয়নের মা'ই কথা বলেছিলো,কোটে অপদস্থ করার চেষ্টা করার পরেও একদম নিরব হয়েই তালাকের কাজ শেষ করেছিলো! তবুও কটু কথা বলেনি!
শহীদুল খাঁ জানেন উনার মেয়ে যেই অপরাধ করেছে তাতে নয়ন আইনী পদক্ষেপ নিতে পারতো কিন্তু নেয়নি,যার প্রথম কারণ নিজের সম্মানের কথা ভেবে, দ্বিতীয় কারণ তাদের কথা ভেবে! যাই হোক নয়ন শান্ত স্বভাবের তবে তার চিন্তা দৃঢ়! একবার যা ভেবে নেয় তাতে একদম অটল থাকে, একমাত্র উপরওয়ালার পর মা ছাড়া তাকে সেখান থেকে কেউ নড়াতে পারে না ! এ জন্যই অনেকের কাছেই বেশ রাগী বলে পরিচিত! কিন্তু শহীদুল খাঁ অনেক বিশ্লেষণ করেই নিজের মেয়ের জন্য নয়নকে বাছাই করেছে!
নয়নকে অনেক দিন পর্যবেক্ষণ করেই উনার মনে হয়েছিল উনার উশৃঙ্খল অবাধ্য মেয়ের জন্য নয়নের মতো শান্ত শিষ্ট মানুষই একদম যথেষ্ট,কারণ নয়নের সহ্য ক্ষমতা,উনি ভেবেছিলেন শিউলির সব রকমের অপরাধ মুখ বুজে সহ্য করবে, তাছাড়াও উনার ক্ষমতার ভয়ে অবশ্যই মেনে নিবে! সুন্দরী, শিক্ষিত ধনী বাবার মেয়ে দেখে নয়ন ও তার পরিবার এমনিতেই শিউলির সবকিছু মেনে নিবে! এরকম ঠুনকো চিন্তা ভাবনা নিয়েই উনি এগিয়ে ছিলো,তার সাথে নয়নের উঠতি ব্যাবসায়ী রুপটাও নজর কেড়েছিলো! নয়ন ভবিষ্যতে বড় সড় জায়গা দখল করতে পারবে ব্যাবসায়ী জগতে এটাও মাথায় রেখেছিলো! তবে এখন নয়নের সাথে মেয়েকে জুড়ে দেওয়ার কাহিনীটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ উনার কাছে!
--- আমি বেশি কথা বলবো না,খালি বলবো প্রস্তাবটি মাইনা নাও! তোমার জন্যই ভালা! তোমার মতো ভদ্রলোকদের জন্য এই গারদ না!
-- আপনার উদ্দেশ্য কি আমারে সাহায্য করার?
-- আমি জানি তুমি বেশি কথা পছন্দ করো না তাই কথা বাড়িয়েও বলবো না,আমি কি চাই আমার মনে হয় তা তোমার জানা!
-- না জানি না! কারণ, আমি সর্বজান্তা নই ; তাই আপনিই বলুন !
-- আমি চাই আমার মাইয়াটাকে তুমি গ্রহন করো! আমার মাইয়াটা তোমারে ভালোবেসে এহোনও অপেক্ষায় আছে! তাই...
-- আপনি হয়তো ভুলে গ্যাছেন আমি এহোন বিবাহিত! আর যদি বলেন আপনার মাইয়া আমারে ভালোবাসে তাইলে সেইটা তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা! আপনার মাইয়া কওনোই আমারে ভালোবাসেনি! আগেও না এহোনও না! সুতরাং আমার অপেক্ষায় সে আছে এইটাও সত্য না; বরং সত্যটা কি তা আমিই বইলা দেই!
আপনার মাইয়ার বাচ্চা নষ্ট করার কিছুদিনের মধ্যেই তার জরায়ুতে ইনফেকশন দেখা দেয় ,যার কারণে তার জরায়ু ফালাইয়া দেওয়া হয় ,এহোন যেই হানেই মাইয়ার বিয়ার প্রস্তাব রাখেন হেইহান থেইকাই ভাঙ্গনি আহে! আর তাই আমি বিবাহিত জাইনাও আপনি নিজের অমন মাইয়ারে আমার ঘাড়ে চাপাইতে চান!
শহীদুল খাঁ থতমত খেয়ে গেল,এই ছেলে এত কিছু কিভাবে জানে? এগুলো তো একদমই ঘরের কথা! হাসপাতাল থেকে আসার পর কেউ এই নিয়ে ঘরেও আলোচনা করেনি,পাছে কাজের লোক জেনে গেল! যদি ক্ষুনাক্ষরেও বাইরের মানুষের কানে যায় তাহলে আর মেয়ের বিয়ে দিতে পারবে না! এমনিতেই আগের এত বড় কলঙ্কের দাগ লাগানো তার মধ্যে যদি শোনে বাচ্চা জন্ম দিতে অক্ষম তাহলে কোনদিনও মেয়ের বিয়ে দিতে পারবে না! তাই তো উনি জেনেই একরকম জোর করেই নয়নের সাথে সংসার করানোর জন্য নয়নের কাঁধে চাপাতে চেয়েছিল, ভেবেছিলো নয়ন দেনমোহর পরিশোধ করার ভয়ে হলেও মেনে নিবে! কিন্তু তা হয়নি! নয়ন সম্পূর্ণ দেনমোহর শোধ করেই শিউলির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলো, এরপর আর দেখা করেনি! সামান্য একজন কামলার ছেলের এহেন জবাবে শহীদুল খাঁ রেগে গিয়ে মেয়ের অন্যত্র ধনী পরিবারে বিয়ে ঠিক করে কিন্তু সবটা ফিক্সড হয়েও বিয়ের কিছুদিন আগেই তা ভেঙে যায়! কারণ নিশ্চিত! বিয়ের রাতে পালিয়ে যাওয়া এবং গর্ভপাত কোনটাই লুকানো যায়নি! কিন্তু তারাও এটা জানতো না! তবে নয়ন কিভাবে?
কথাটা ভাবতেই নয়নের পানে তাকালো, নয়নের ঠোঁটের কোনে তাচ্ছিল্যের হাসি! লজ্জা আর ক্রোধে ঘা রি রি করে উঠলো শহীদুল খাঁয়ের! কিন্তু কিছু করার নেই, নয়ন সত্যি বলেছে! আর এখন উনি চাইলেও নয়নের উপরে উচ্চ বাচ্চ্য করতে পারবে না! তাছাড়াও এখন নয়নের জন্য পাশে আহাম্মকের মতো প্রশ্নাত্নক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা আইনজীবী সৈকতও জানলো!যেটা যথেষ্ট লজ্জাদায়ক ব্যাপার উনার জন্য!
সৈকত কিছুটা ভাবুক হলো, নয়নের এত তেজের কারণও বুঝলো, তাছাড়াও তৃক্ত এক অভিজ্ঞতা হলো শহীদুল খাঁয়ের জন্য! কারণ উনার মেয়ের জন্য পাত্র খোঁজার তরফদারি উনার কাছেও এসেছিলো,ভাগ্যিস খুঁজে দেয়নি!
পর্ব ১২
ঘরের দরজায় শব্দ পেয়ে উদাস নয়ন চেতনে আসলো, দরজায় মুখ ঘুরিয়ে তারার লুকোচুরি নজরে পড়তেই নিজের ভাবনার লাগাম টানলো,কি থেকে শুরু করবে বুঝতে সময় নিলো, অনেক মুহূর্ত অতিক্রম করে অবশেষে কিছু বলার আগেই মোবাইলের বুমবুম শব্দে পরিবেশ আবারও কম্পিত হলো,তারাও নিজের লুকোচুরি খেলা থামিয়ে নয়নের প্রতি দৃষ্টি স্থির করলো,নয়ন নিজের আশপাশ হাতরে ফোন খুঁজে বের করলো, নাম্বার দেখে ভাবুক মনে তা তুলে ধরে কানে ধরলো,
--- ***
-- আসতাছি!
কথা শেষ করে নয়ন তারার উদ্দেশ্য তৈরি করা নিজের কথা ঘুরিয়ে বললো,
-- আমগো দোকানে যাওয়া জরুরি,সকলে আইয়া বইয়া রইছে!
তারা মুখ দিয়ে শব্দ নির্গত না করলেও মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো, নয়ন উঠে দাঁড়িয়ে নিজের গাঁয়ের চেইক ছাপার ছাই রঙা শার্টের কলার এবং নিচের অংশ টেনেটুনে ঠিক করলো, এরপর গলার বোতাম খোটাতে খোটাতে ইতিউতি করে বলতে লাগলো,
--- তুমি তারে দেইখা কষ্ট পাইয়ো না! আমি তারে আইতে কই নাই! আসলে আমি..
-- আপনে এত কিছু ভাইবেন না ! আমি তারে দেইখা কষ্ট ক্যান পামু? হ্যায় তো আমগো কিছু লাগে না! তয় প্রথমবার দেইখা একটু চমকাইছি খালি!
তারার কথার প্রত্তত্তর নয়নের কাছে নাই তাই কিছু বললো না , নিরবতায় খালি পলকহীন চোখে দেখে গেল কিছু মুহুর্ত, তারাই আবার বললো,
-- দোকানে যাইবেন না?
-- হ চলো,সোহাগ ফোন দিতাছে অরা সবাই বইয়া আছে!
~~~~~~~~~~
-- আম্মা আমরা বাইর অইলাম!
নয়ন সাইকেলে পা দিতে দিতে আম্মাকে চিৎকার করে যাওয়ার কথা জানায়, আম্মা দৌড়ে এসে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
-- বউ মা বোরখা ঠিক কইরা লও,চাক্কায় প্যাচাইবো তো!
তারাকে বলতে বলতে নিজেই তারার বোরকার নিচের অংশ তুলে পায়ের ভাঁজে আঁটকে দিলো, নয়নের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
-- মাথা ঠান্ডা রাইখ্যো ,কারো কথায় কান দিয়া নিজের কাম নষ্ট করবা না!
-- আইচ্ছা আম্মা,দোয়া কইরো!
-- ফি আমানিল্লাহ্! বউমারে সাবধানে লইয়া যাও!
নয়ন, তারা আম্মার থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হলো নিজেদের গন্তব্যে!
<<<<<<<<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
সময় গড়িয়ে মাস পেরিয়ে আজ দেড় মাস হলো নয়ন জেল থেকে বেরিয়ে আসছে,এর মধ্যেই একবার হাজিরাও দিয়ে আসছে!তার মধ্যে ব্যাবসার অবস্থাও আগের মতো জমজমাট আমেজের আভা ছড়িয়ে পড়েছে! কিছু মানুষের ভাগ্যের জোর অনেক বেশি, আল্লাহ এদের দুই হাতে বরকতের ঢালা ভরে দেয়, পরিশ্রম আর ভাগ্যের খেলে এরা অনেক দূরে এগিয়ে যায়,কোন বাঁধা,কন্টর পথ তাদের আটকে রাখতে পারে না! নয়নও তেমনি ভাগ্যবানদের প্রতিচ্ছবি! এই যে এত বাধার মাঝেও নিজের অসম্ভব শক্ত মনোবল আর হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম ঠিকই তার পথের ধৃষ্টতা দূর হয়ে যায়!
সেদিন দোকানে এসে নয়ন আশ্চর্যের চুড়ায় গিয়ে ঠেকেছিলো,আগুনে পুড়ে যাওয়া দোকানের খবর জানার পর ভেঙে পড়েছিল বেশ, কিন্তু পরে যখন বোনের কাছে তারার বুদ্ধির কথা শুনে তখন খুশিও হয়েছিল কিন্তু তারা যে এত সুন্দর করে সবটা গুছাবে তা নয়নের ভাবনার অতলেও ছিলো না!
নয়নের চোখের দিপ্ততাই তারাকে বুঝিয়েছে নয়নের ভেতরের উচ্ছাস,তাই মুখ থেকে শোনার ইচ্ছা পোষন করলো না! নয়ন ধীরে ধীরে তারার থেকে সবটা বুঝে নিলো,পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাওহীদ! নয়ন তাওহীদকে পেয়ে আরও খুশি! তাওহীদও দুলাভাইয়ের এক হাত আঁকড়ে এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে! গঞ্জের অনেক ব্যাবসায়ীই নয়নের সাথে সাক্ষাৎ করে যাচ্ছে তার সাথে তারার গুনের ফোয়ারা ছিটিয়ে যাচ্ছে। নয়ন মুগ্ধ, বিমোহিত, উচ্ছসিত নিজ পত্নীর বুদ্ধিতে! তার সাথে নয়ন খেয়াল করলো তারার ব্যাবসায়ীক প্রখর বুদ্ধির!
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
কাঠের জানালার সরু নকশার ফাঁকফোকর দিয়ে উপচেপড়া জোস্নার আলোতে চিকমিক করছে তারার ঘন কালো লম্বা কেশ রাশির বহর! তার মাঝে অনবরত ঢেউ খেলছে নয়নের শক্ত আঙ্গুলের ডগা, তারা নয়নের বুকের মাঝের ভাঁজের মধ্যে নিজের মাথা রেখে পরম সুখে শুয়ে কল্পনা করছে আজকের সকালের প্রথম প্রহরের ঘটনা,আর নয়ন ভাবছে আজকে বাজারে গিয়ে নিজের পত্নীকে নিয়ে সবার প্রশংসাবানী! অজান্তেই ঠোঁটের কোনদ্বয় ফাঁক হয়ে গেল, মনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সুখের নিঃশ্বাস! চুল থেকে হাত সরিয়ে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, একদম নিজের উপরে তুলে নিলো,তারা নয়নের কাজে চমকালো তার সাথে আড়ষ্ট হলো লজ্জ্বায়,মুখ তুললো না,আরো একটু মিশে গেলো বুকের পাঁজরের মাঝে, নয়ন ফিসফিস করে বললো,
-- বউ!
-- হুঁ
আদুরে ডাকে তারার কেবল ছোট্ট উত্তর,নয়ন হাসলো, আদরের মুহূর্তে তারার লজ্জা কয়েকগুণ বেড়ে যায়,তখন যেন তার মুখপানে তাকালেও সে মরিমরি অবস্থায় থাকে, রক্তিম আভায় ছেয়ে যায়, বদনখানি যেন রক্ত জবার পাপড়ি হয়ে উঠে,নয়ন এহেন মুহূর্তে বেশ মজা পায়, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তারার সর্বাঙ্গ, আলতো আদরে ছুঁয়ে দেয় প্রতিটি লোমকূপ,তারা কেবল নিঃশ্বাস বন্ধ করে উপভোগ করে স্বামীর দেওয়া প্রতিটি ছোঁয়া, আঁকড়ে ধরে হৃদস্পন্দন,তুলে নেয় প্রেমস্পর্শ !
ভালোবাসায় ঘনিভূত হওয়া দম্পতি মধুর আবেগ বিলিয়ে যখন আবেশে মিশে থাকে তখন বিনিময় হয় অজস্র প্রেমকাব্য , চাঁদের বিলিয়ে দেওয়া জোস্নার উপহার আর মৃদু পবনের ঢেউয়ে ভেসে আসা বাহারী বুনো ফুলের সুবাসে মাতাল হয়ে একে অপরের সাথে লেপ্টে থাকে,ঝি ঝি পোকার ছন্দময় গানে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে চারিদিক! তার মাঝেই প্রেমিকযুগলের প্রেম আদান প্রদান চলে অনবরত!
ভোরের দিকে আজান দেওয়ার অগ্রভাগে, অনুমানেই নয়ন তারাকে বললো,
-- বউ উঠো; মনে অয় আজান দিয়া দিবো গোসল দিয়া আহি!
-- জ্বী!
নয়নের উদাম শরীরের নিচে উল্টো পিঠে শুয়ে থাকা তারা এতসময় যেন চ্যাপ্টা হওয়ার উপক্রম কিন্তু বিয়ের পর থেকে এভাবেই একে অপরে মিশে ঘুমায়! হাজতবাসের দূরত্ব ছাড়া আর কোন ঘটনাই এই দম্পতির মাঝে দুরত্ব তৈরি করতে সক্ষম হয়নি!তাই তো তারার প্রতিটি রাত কাটে স্বামীর প্রেমী ছোঁয়ায়, ভালোবাসায় , মধুরতায়! নয়নের যেন তারাকে ছাড়া চলে না! ঘুমের সময় তারাকে কোলবালিশ না বানালেই চলে না! সারাদিনের ক্লান্তি আর অবসাদ কেবল তারাতে জড়ালেই কমে যায়, তারার নরম শরীরের খাঁজে নিজের সুঠাম দেহটাকে আলগোছে ছেড়ে নিজেও যেন সুখবিলাসী বনে যায়!ভুলেই যায় এই শক্তিশালী অহের ওজন আদৌও তারার মতো লতানো অঙ্গের নারীর পক্ষে বয়ে বেড়ানো সম্ভব কিনা!
নয়ন তারাকে উঠতে বলেও নিজে উঠলো না,তারাকে সারা অঙ্গে লতানো তরুর মতোই লতিয়ে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে সুড়সুড়ি দিতে লাগলো, তারা মৃদু আওয়াজে তীব্র লজ্জা নিয়ে বললো,
-- আমারে ছাড়েন!
-- ইচ্ছা করতাছে না!
-- তাইলে নামাজ আদায় করমু ক্যামনে?
-- উহ্!
নয়ন তারার পিঠের উপর নিজের শরীর আষ্ঠে,খোলা পিঠের মাঝ বরাবর গভীর চুম্বন দিয়ে ঐ অবস্থাতেই তারাকে উল্টে ফেললো,চাদর সহিত পেঁচিয়ে নিজের উদাম বুকের সাথে চেপে ধরেই অনেক কসরত করে উঠে বসলো, তারা নয়নের কাজে লজ্জাও পাচ্ছে তার সাথে হাসিও আসছে! নয়ন তারাকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টিয়ে রেখেছ, বস্ত্রহীন দুজন মানুষের একই অঙ্গ যখন আষ্টেপৃষ্টে মিশে থাকে তখন পুরুষের অনুভূতি কেমন হয় তারা তা বুঝে উঠতে পারে না কিন্তু নারীর তো লজ্জায় মরিমরি অবস্থা হয়ে যায়!
-- আহারে এমনে হাসলে তো আমার আইজ আর উঠা লাগবো না!
-- যান ছাড়েন আমারে; আমি একাই উঠতে পারমু!
-- নাহ আইজ এমনেই পুকুরে লইয়া নামুম!
-- কিহ!
তারা হতবিহ্বল প্রশ্নে নয়ন গগন ফাটানো হাসি দিয়ে উঠলো,তারা বুঝলো অহেতুক তাকে নিয়ে মজা করছে,তাই নিজেও তাল মিলিয়ে মিটমিট করে হাসতে লাগলো!
দুজনের গোসল সেরে আসতে আসতে আজান পড়ে গেলো, এক সাথে নামাজ আদায় করে নয়ন বাইরে বেরিয়ে গেল,তারা আরও কিছু সময় জিকির, কোরআন তেলাওয়াত করলো!ঘুম পাচ্ছে,তাই বেশি সময় পড়লো না! জায়নামাজ এবং কোরআন শরীফ জায়গা মতো রেখে উঠে দাঁড়িয়ে একবার ঘরের চারদিকে চোখ বুলালো, এরপর বিরবির করে কিছু একটা দোয়া পড়ে চার কোনায় ফু দিলো! বিছানার উপর পড়ে থাকা কাঁথা বালিশ ঠিক করে নির্দিষ্ট স্থানে রাখলো,চাদরটা টানটান করে বিছানায় ঝাড় দিলো! এরপর বেরিয়ে গেল বাইরে!
-------- বিস্তীর্ণ জোড়া চাষের জমির উপর নিজের নয়নের গভীরতা ডুবিয়ে দিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেছে; পাশে দাঁড়ানো নারীটির প্রতি ভালোবাসা বেড়ে গেল!যেখানে একজন পুরুষের পক্ষে এমন একটি বিশালাকার জমির উপর চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা কষ্টকর সেখানে তারা এত কম বয়সে একজন নারী হয়েও কি সুন্দর নিশ্চিত হয়েই সাহস দেখিয়েছে! ঢেউ খেলানো বাতাসের দোলে দুলে যায় ধানের শীষ, উচ্ছাসে ঝড়ে পড়ে সোনালি ধানের থোকা,ঝড়ঝড় শব্দে মুখরিত পবনের তালে হেলে পড়া সোনালী ধানের শীষ জানান দেয় প্রকৃতির অপার মুগ্ধয়তায় জড়িয়ে থাকা তাদের জীবনী!
-- আইজ থেইকাই ধান কাটা শুরু করবেন?
নয়নের মুগ্ধতা কাটলো তারার কথায়, তারার দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলো,
-- কি জিগাইলা বউ?
-- কইতাছিলাম ধান কি আইজ থেইকাই কাটা শুরু করবেন?
-- হ,আর ফালাইয়া রাখুম না! তাইলে ধানের বীজে পচন ধরবো তাছাড়াও কওন ঝড় বাদলা শুরু অইয়া যায়!
-- আইচ্ছা আমি কইতাছিলাম ;
-- থামলা ক্যান কও!
-- আব্বারে আইতে কইছিলাম! আপনে গঞ্জে দোকানে বইবেন আবার এদিকেও খেয়াল রাখবেন, পেরেশানি অইয়া যাইবো,তাই! তাছাড়া আপনে আওনের আগেই আমি আব্বারে কইছিলাম যেয়েতু আপনে আছিলেন না তাই! আব্বা তো এগুনাল ভালা বুঝে! আমি কি?
-- ঠিক কাম করছো! আমি এতকাল একা করলেও পেরেশানিতে পড়তাম, এদিকে ওদিকে সামলাইতে কষ্ট অইতো, তারপরও নিজের জিনিস তাই কষ্টেও সুখ মিলে ভাইবা করতাছি! কিন্তু তুমি যেয়েতু নিজে বুদ্ধি খাটাইয়া একখান সিদ্ধান্ত নিছো তাতে আমার আপত্তি থাকার কারণ নাই,আর উনি তো পর না! আমার নিজের মানুষ! তোমার বাবা মানেই তো আমার বাবা! তয় আমার মনে অয় আম্মা আর মুনেরে নিয়া আওন ভালা অইবো! একা ঘরে রাইখা আইতে মানা করো! আইচ্ছা আমিই কমুনে! ধান কাইট্টা,একবারে নবান্নের উৎসবে থাইকা খাওয়া দাওয়া, আনন্দ কইরা যাইবোনে বড় বইনের লগে!
নয়ন তারার সিদ্ধান্তে খুশি জানতেই তারার ভেতরে সুখের হাওয়া ভয়ে গেল,যেখানে গ্রাম অঞ্চলে এখনও ঘরের বউদের মেয়ে মানুষের বাইরে কিছু চিন্তা করে না সেখানে নয়ন বারবার তারার সিদ্ধান্তে নিজের সম্মতি দিয়ে সবচেয়ে সুন্দর উপহার দিচ্ছে তা হলো "সম্মান"! এল চেয়ে বড় উপহার কারো জন্য আছে কিনা তারা জানে না ! তার কাছেই এই সম্মান, গুরুত্ব, ভালোবাসা এটাই সবচেয়ে দামী উপহার, সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি!
নয়ন নিজ দায়িত্বে শ্বশুরালয়ে লোক পাঠিয়ে শালিকা,শ্বশুড়,শ্বাশুড়িকে আনালো!নিজেই আগ্রহ দেখিয়ে শ্বশুরের কাছে কিছুদিনের জন্য তার পাশে থেকে সাহায্য করতে বললো! কারণ অনেক কিছুই নতুন করে শুরু করতে হবে! তার অগোচরে নিরব শত্রুদের করা ক্ষতির পরিমাণ দেখা না গেলেও যার যায় সেই বুঝে ব্যাপারটা তেমন ভাবেই হয়েছে। এমন অবস্থায় যদি একজন মানুষ পাওয়া যায় যে কিনা একান্ত নির্ভরযোগ্য তখন তো আর কথাই নাই! তাছাড়াও নয়ন এখন অন্য কিছু ভাবছে!যার রুপদান করতেই হবে আল্লাহ যদি কবুল করে, নয়ন করবেও!
পর্ব ১৩
ছন্দ উত্থান পতনের দোলাচলে পেরিয়ে গেছে বহুদিন,মাস! নয়ন তারার জীবনে এসেছে সংসার নামক খেলার প্রকৃত রূপ! সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কেবল সংসার সংসার খেলাই চলে! কোমড়ে আঁচল গুঁজে সকাল থেকে রাত অবধি গৃহিনী হয়ে পুরো দস্তুর ঘরুয়া হয়েই কাজে নামে!কখনো কখনো মাঠে গিয়ে খবরদারি করা,নয়নের সাথে ব্যাবসায়ীক কাজে সাহায্য করাও তার এখন নিত্য নৈমিত্তিক কাজ! আর নয়ন! সে এখন দিক দিশা ভুলে কেবল ব্যাবসা নিয়েই পড়ে থাকে! হারিয়ে যাওয়া অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাচ্ছে! তার অবর্তমানে হয়ে যাওয়া ক্ষতির পূরণ করতেই হবে এমন মনোভাব নিয়ে উদ্দাম গতিতে এগিয়ে চলছে! এখন আর সংসার নিয়ে ভাবে না কারণ ভাবার জন্য মানুষতো ঘরেই আছে!
চলছে এভাবেই নয়ন-তারার জীবন! চলে যাচ্ছে সংসার!
তবে যতই কাজ থাকুক তার গন্ডি নয়ন বাইরেই রেখে আসে,ঘরে ঢুকলে সে মায়ের ছেলে এবং বউয়ের স্বামী হয়েই থাকে তাই তাকে নিয়ে অভিযোগ করার সূযোগ কারোর নেই!
সেবার ধান কাটার উৎসবে অংশগ্রহণ করেই তারার বাবা মা চলে যান, কিন্তু তাওহীদকে নয়ন দেয়নি! নয়নের স্পষ্ট কথা তাওহীদ বাকী পড়াশোনা ওর কাছে থেকেই করবে! তারাও আর আপত্তি করেন নি কারণ নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে তো তারা জানেই,তবুও যদি জামাইয়ের সহায়তায় ছেলেটা ভালো মানুষ হয়!
মনিও বাড়ি এসেছে,কারণ খুশির খবর! মায়ের কাছে থেকেই প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে চায়!মনির গর্ভকালীন যত্নের দায়িত্ব তারা স্বেচ্ছায় নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে!মুনকে নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠিয়েছে নয়ন! তারাকে সাহায্য করার জন্য আপাতত ছুটিকালীন সময় এখানে থাকুক এটা তারাই বলেছে! আম্মারও বেশ লাগে যখন ছেলে মেয়ে দিয়ে তার বাড়ি ঘর ভরা থাকে!মুনকে আনার আরও একটা কারণ আছে! তারার স্কুল কলেজের কাগজপত্র গুলো নিয়ে আসছে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
কোমড়ে গোঁজা আঁচলের কোনা খুলে নিয়ে হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলো তারা,দিনের প্রারম্ভে করা গৃহস্থালি কাজ সেরে হাত মুখ ধুয়ে এসেছে।নয়ন উল্টো হয়ে এখনও ঘুমাচ্ছে!মুখটা ডান দিকে ঘুরিয়ে রেখেছে! অসম্ভব মায়া ঘিরে ধরেছে চোখেমুখে,ঘন চাপ দাড়ি আর সুসজ্জিত গোঁফে যেন রাজকীয় জৌলুস ঝড়ে পড়ছে, শরীরের গঠনও আর সুঠাম হয়েছে! কায়িক পরিশ্রমের কারণে নয়নের শরীরে মেদ জমে না যার দরুন দেহের গঠন সবসময় পেটা তবে বাহু দেখলে মনে হয় নিয়মিত শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে নিজের পেশীর উন্নতি ঘটিয়েছে। কিন্তু না,ভারী জিনিস তোলার কারনেই এমন হয়েছে যাকে বলে প্রকৃতির দান! তাছাড়াও নয়ন বেশ ভোজন রসিক মানুষ! খাবারের মামলায় একটু ভালোই খেতে পছন্দ করে তবে স্বাস্থ সচেতনও বটে খেলেও বাদ বিচার করেই খায়!
মুখটা বালিশের সাথে চাপ খেয়ে চ্যাপ্টা হওয়ার উপক্রম,যার দরুন ঠোট ফাঁকা হয়ে আছে দেখতে একদমই ফানি লাগছে,তারা মিটিমিটি হেসে এগিয়ে গেল, নয়নের পাশে বসে কপালে হাত ছুঁইয়ে দিলো, চুলগুলো কপাল থেকে একটু সরিয়ে দিলো, বেশ বড় হয়েছে চুলগুলো!চুলের গোড়ায় আঙ্গুল বুলাতে
বুলাতেই ঠোঁট ছোয়ালো কপালে! ভ্যাপসা গরমের মাঝে শীতল অনুভব হতেই একটু নড়েচড়ে উঠলো নয়ন! তারা নিজের ঠোঁট সরিয়ে আদুরে গলায় ডাকলো,নয়ন শব্দ পেয়ে সজাগ হলো তবে উঠলো না বরং তারাকে টেনে নিলো নিজের বন্ধনে! নিজের নিচে ফেলে তারার উপরে চড়ে চেপে ধরলো দুই হাতে দিয়ে, দুই পা দিয়ে পেঁচিয়ে রেখে ওভাবেই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে শুয়ে থাকলো,তারা হাসলো নয়নের কাজে, কিন্তু কিছু বললো না!
ওভাবেই ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত পার করলো দুজন কিছু সময়। নয়ন ঘুম জড়ানো অবস্থাতেই তারাকে নিজের ভালোবাসায় রাঙিয়ে দিলো তারাও স্বামীর আদরে ভেসে যাওয়ার মুহূর্তটা উপভোগ করতে থাকলো!
-- এই যে শুনছেন উঠেন!
নিজেদের মাঝের সময়টা কাটানোর বেশ সময় বাধেই তারা নয়নকে ডেকে তুললো,নয়ন উঠতে চাইছিলো না কিন্তু না উঠেও উপায় নাই! আজ তো তাকে বিশেষ কাজে সদরে যেতে হবে কাল যে কারো জন্য বিশেষ উপহারের ব্যবস্থা করতে হবে!
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
খাওয়া দাওয়ার পর্ব সেড়ে নয়ন বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মনির ডাকে পিছু ফিরলো।৭ মাসের ভরা পেট নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে মনি,নয়ন বোনকে আসতে দেখে অস্থির হয়ে নিজেই কয়েক কদম এগিয়ে গেল।
-- তুই আইতে গেলি ক্যান? আমারেই ডাকতি!
-- অসুবিধা নাই ভাইজান! এতটুকু পথ আমি হাটতে পারি। তুমি অস্থির হইয়ো না!
-- আইচ্ছা বয় এইহানে!
হাত ধরে নিয়ে বাইরের বেঞ্চে বসিয়ে দিলো। মনি এদিকে ওদিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলো,তারা বুঝলো মনি হয়তো একান্তই ভাইয়ের সাথে কিছু বলতে চায়! নয়নও ইশারায় যেতে বললো। তারা যেতেই মনি বললো,
-- আজকেই যাইয়ো! তোমাগো জামাই কথা কইয়া রাখছে!
-- হ আমি এহোনই হেইদিকে যামু।
-- তোমাকে কি কি আনাতে বলছিলাম মনে আছে তো?
-- হুম আছে!
-- আইচ্ছা যাও! সাবধানে।
-- তুইও নিজের খেয়াল রাখিস! তারা আসি আমি! আম্মা দোয়া রাইখো!
নয়ন মনির সাথে কথা শেষ করেই বেরিয়ে পড়লো,তারা মনে মনে 'ফি আমানিল্লাহ্' পড়লো, আম্মাও ছেলের জন্য দোয়া চেয়ে আল্লাহর উপরে ছেড়ে দিলো! দুজনের কেউ বুঝলো না দুই ভাই-বোনের কথপোকথন এর বিষয়! কিন্তু কেউ জিজ্ঞেসও করলো না!কারণ এটা একান্তই তাদের ভাইবোনের মধ্যে থাকা উচিত বলেই মনে করে!
---------------------------------------------------------------------
একদিন পর______
নয়ন আজ বেশ বেলা অব্দি ঘুমাচ্ছে যা সচরাচর সে করে না,তারা প্রথমে ভাবলো জেগে তুলবে পরে আর ডাকলো না! এমনিতেই আজ তারার মনটা অনেক খুশি! দুই বছর পূর্ণ হলো নয়ন তারার বিয়ের! যদিও প্রথমে একটু খারাপ লেগেছিল নয়নের মনে নেই দেখে কিন্তু পরেই আবার নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছে! সারাদিন এত খাটুনি খাটে, তারপর এদিকে ওদিকে দৌড় ঝাঁপ করে তার মধ্যে এত ছোট একটি বিষয় মনে না থাকাই স্বাভাবিক! এত সামান্য বিষয় নিয়ে মন খারাপ করে নিজের মানুষের থেকে দুরে থাকার মানেই হয় না! তবে তারা অবশ্যই নিজের মতো করেই খুশি পালন করবে! আজকের দিনটা তার জন্য অবশ্যই খুশির ,কারণ এই দিনটিতেই সে এই মানুষটিকে পেয়েছিলো! এক জীবনে এমন একজন সঙ্গী পাওয়া ভাগ্যেরই ব্যাপার! কতজন নারী পায় এমন জীবনসঙ্গী? কথাই নিজের মনে আওড়াতে আওড়াতেই তারা নয়নের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো! নয়ন একটু নড়েচড়ে উঠলো,ভ্যাপসা গরমের মধ্যে শীতল কিছুর ছোঁয়ায় মুখের ভঙ্গিমা পরিবর্তন হলো,তারা নিজ কাজ শেষ করে উঠতে চাইলেই বুঝতে পারলো সে কারো শক্ত বেরিতে আটকে পড়েছে! চোখ রাখলো নয়নের নয়নে,সে আধ বুজা নয়নে তাকিয়ে আছে তারার পানে!তারা লজ্জা পেল, লুকিয়ে নিলো নিজেকে নয়নের বুকের মাঝে! নয়ন সেই অবস্থায় চুলের উপর দিয়েই তারার কানের লতিকায় চুমু দিলো!এক হাত দিয়ে শক্ত করে আগলে ধরলো,অপর হাত চলে গেল তারার আধ ভেজা চুলে! মুচকি হেসে প্রাণ ভরে শ্বাস নিলো আর মনে মনে ভাবলো কিছু একটা!
সময় কেটে গেছে অনেকটা ঐ একই অবস্থায়! নিজেদের থেকে আলাদা হলো মনির ডাকে!
-- ভাই - ভাবী!
তারা উঠে নয়নকে উঠার কথা বলে বাহিরের উদ্দেশ্য পা রাখলো! নয়ন তারার দিকে তাকিয়ে হাসলো! তারা একটা কচু পাতা রঙের শাড়ী পড়েছে সাথে লাল ব্লাউজ,যার মাঝে শাড়ির রঙের নকশা করা,শাড়ীর পাড়েও লাল পাড়ের কাজ! এই শাড়ীটা নয়ন ঢাকা থেকে এনে দিয়েছিল!নয়ন অনেকদিন পড়তে বলেছিলো কিন্তু তারা বলেছিল বিশেষ কোনদিন পড়বে!তবে আজ কি বিশেষ দিন? হ্যা আজ তো বিশেষ দিনই তাদের জন্য! এই দিনটিতেই তো এই মানুষটিকে নিজের জীবনসঙ্গীনি হিসেবে পেয়েছে;উপরওয়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করতে পারবে না নয়ন! মানুষ জান্নাতে গিয়ে হুর চায় আর নয়নের মনে হয় আল্লাহ ওকে দুনিয়ায়ই জান্নাত দিয়েছে তার সাথে দিয়েছে জান্নাতি হুর; ঐ সত্তর জন হুরের চেয়েও এই একজন হুর অনেক বেশি শান্তিদায়ক! নয়ন খুব করেই চায় উপরওয়ালা তাকে যেন জান্নাতে ঐ সত্তর হুরের বদলে এই একজনকেই দেয়! কথাগুলো ভাবতেই একবার উপরের দিকে তাকালো, জানালো আর্জি রবের প্রতি,
-- জীবনের সবটাই আপনার মহিমার উপহার, আপনার শুকরিয়া আদায় করে শ্যাষ করতে পারবো না,তবুও বলবো আমি ধন্য আপনাকে আমার রব হিসাবে পাইয়া! আপনার কাছে সবসময়ই চাইবো আমাকে জান্নাতে দিলে আমার সাথে আমার এই জন্মের সঙ্গীনিকে দিয়েন! আমি তাকে নিয়া
ই আপনার জান্নাতের পথে হাঁটতে চাই! ইয়া রব আমার মতো নগন্য একজন বান্দার এই ডাক আপনি শুইনেন! আমীন!!!
-~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
তারা একদম নতুন বউয়ের মতোই আজ সেজেছে!কচু পাতা রঙের শাড়ী তার সাথে লাল ব্লাউজ,পায়ে নূপুর, গলায় চিকন লম্বা একটা চেইন,হাতে মোটা সোনার চুড়ি, অনেক দিন পর নাকে নাকছাপি পড়েছে, কোমরে চিকন একটা কোমরবন্ধ, চুল গুলো খোলা তবে কানের পাশে একটা লাল নয়নতারা গোঁজা! তারার সাজ সবার চোখে মুগ্ধতার রেশ লাগিয়ে দিচ্ছে তার সাথে তারার ছটফট করে কাজ করার বিষয়টিও প্রশ্ন জাগাচ্ছে! তারা চাচ্ছে তাড়াতাড়ি সব কাজ সেড়ে যাওয়ার আগে নয়নের সাথে একান্ত কিছু সময় কাটাতে! নয়ন আজকাল অনেক ব্যস্ত,আসতে আসতে আসতে অনেক রাত হয়ে যায়! তাই চাইলেও দুজনের মধ্যে একান্ত কিছু সময়, গল্প করার মতো মুহুর্ত বের করতে পারে না!
--- আইজকে আমার আম্মারে তো মাশাআল্লাহ ম্যালা সুন্দর লাগতাছে! একদম একখান টিয়া পাখির মতোন!
আম্মা তারার মাথায় হাত রেখেই কথাগুলো বললেন, তারা লজ্জা পেয়ে মাথা নুইয়ে নিলো,হুট করেই কিছু একটা মনে হতেই নিচে বসে পড়লো ,মাথাটা উচু রেখে পা ছুঁয়ে সালাম করলো। হুট করেই এমন কিছু ঘটায় আম্মা হতভম্ব হলেন! তারা খুশি খুশি মুখ করে বললো,
-- আম্মা দোয়া করবেন আমাদের জন্য!
-- হ তাতো সবসময়ই করি, কিন্তু আমার আম্মার আইজ এত খুশির কারন কি হেইডাইতো বুঝলাম না! আইজকা কি কুথাও যাওয়া অইবো আব্বার লগে!
-- না আম্মা এমনিতেই একটু সাজতে ইচ্ছা করলো তাই আর কি!
-- বুঝছি বুঝছি; যান ঘরে যান!
-- হ আম্মা যাইতাছি এই সিন্নিটুকু ( পায়েস) অইলেই নিয়া যামু!
এইবার আম্মা নিশ্চিন্ত হলেন কিছু একটা আছে, কিন্তু মনে পড়লো না! আসলে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের কাছে এই বিবাহ বার্ষিকী, জন্মদিন খুব একটা মনে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়!তাই হয়তো আম্মারও মনে নেই! তারার তাতে মন খারাপ হয়নি কারণ সে বিষয়টি বুঝে! তবে মুখ ফুটে বলতেও চায় না, লজ্জা লাগছে তার চেয়েও বড় কথা মানুষ হাসবে এই ভেবে আর বলা হলো না! তাছাড়া এই দিনটা তাদের দুজনের,হয়তো নয়নের মনে নেই তাতে কি তারার মনে আছে তো! তারা একাই নিজেদের জীবনের এই দিনটা উপভোগ করবে! ভাবতে ভাবতেই হাতে সিন্নির বাটি নিয়ে ঢুকলো। নয়ন মাত্রই গোসল করে এসেছে, লুঙ্গিটা ছিটা ছিটা পানিতে ভিজে গেছে,গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আয়নার সামনে এসে দাড়িয়ে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করছে;খালি গাঁয়ে এখনও বিন্দু বিন্দু পানি দৃশ্যমান! তারার নয়ন মুগ্ধতায় জড়িয়ে গেল,বেশ কিছুক্ষণ মন ভরে দেখলো তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই সুদর্শন সুপুরুষকে!
-- দ্যাখা কি এই জনমে শ্যাষ অইবো না বিবিজান!
নয়নের কথায় তারা নিজের ভালো লাগার রেশে লাগাম দিলো, দ্রুত পায়ে হেঁটে নয়নের মুখোমুখি দাঁড়ালো,নয়ন ঘুরে তারার বরাবর হলো!
-- হা করেন!
প্রশ্নাত্নক নয়ন একবার তারাকে দেখলো তো আরেকবার তারার হাতের বাটিটা! কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই তারা চামচ ঢুকিয়ে দিলো! নয়ন স্বাধের তোপে চোখ বন্ধ করে ফেললো,মুখ দিয়ে আপন মনেই বেরিয়ে আসলো,তৃপ্তিময় শব্দ! তারা হাসলো নয়নের অভিব্যক্তি দেখে! একে একে পুরোটা খাইয়েই ছাড়লো। নয়ন শেষ চামচ মুখে নিয়েই মুখটা মুছলো হাতে থাকা গামছা দিয়ে, অজ্ঞাত সুরেই শুধালো,
-- সক্কাল সক্কাল মিষ্টি মুখ! আইজ কি খুশির দিন বউ?
তারা ঠিক উত্তর দিলো না খালি বললো 'হ্যা আইজ ম্যালা খুশির দিন!'
নয়ন ঠোঁট চেপে হাসলো কিন্তু তারাকে বুঝতে দিলো না, তারা নয়নকে খাইয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই নয়নের কথায় থেমে গেল। নয়ন তারাকে থামিয়ে কিছু একটা নিলো ড্রয়ার থেকে হাতরে, তারা উৎসুক মনে দেখলো,নয়ন তারার দিকে নজর রেখেই বললো,
-- আমার কাছে আসো!
তারা যতটুকু দুরত্ব ছিলো পুরোটাই ঘুচিয়ে নিলো,গা ছুঁই ছুঁই এতটা কাছে এসে দাঁড়ালো,নয়ন তারার মুখটা তুলে ধরলো,নিজের মুখের কাছে এনে বললো,
-- শুভ বিবাহ বার্ষিকী বউ!
তারার চোখমুখ মুহুর্তেই রঙ পাল্টে গেল, এই খুশির রঙ আলাদা! নয়নেরও মনে আছে ভাবতেই খুশির পরিমাণ বেড়ে কয়েকশো গুন হয়ে উঠলো! নয়ন তারার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলো,তারা ভ্রু কুচকে বোঝার চেষ্টা করলো,
-- খোলো! খুইল্লা পড়ো!
তারা আদেশ মতো কাজ করলো,কাগজটা পড়তেই খুশির সাথে প্রশ্নের জন্য নয়নের পানে তাকালো! নয়ন নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো,আদুরে গলায় বললো,
-- তুমি আবার পড়ালেখা শুরু করবা! এইডাই আইজকার দিনে তোমার জন্য উপহার,আর তোমার ভালো ফলাফল অইবো আমার জন্য উপহার!
পর্ব ১৪
সদরের সবচেয়ে সুনামী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তারাকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে নয়ন, সরকারী অথবা পাবলিকে ভর্তি হতে হলে তারাকে ঢাকায় থাকতে হবে অথবা নিজ বাড়ি থেকে দূরে একা থাকতে হবে যা নয়ন চায়নি! নয়ন যতই তারাকে পড়ার জন্য সুযোগ দিক মনে মনে ঠিকই ভয় কাজ করছে যদি তারা উচ্চ শিক্ষিত হয়ে নয়নকে ছেড়ে যায় অথবা আগের মতো সম্মান না করে! তাছাড়াও তারাকে ছেড়ে রাতে একা থাকার কথা নয়ন একদমই মনের ত্রিধারেও আসতে দিতে পারে না। অজানা কারন,অজানা আতঙ্কে নয়ন তারাকে নিজের থেকে কাছ ছাড়া করে না! কিন্তু পুরোটাই নয়নের অহেতুক ভাবনা!এমন কিছু যে হবার নয় তা নয়নও মানে তবুও!...
তারাকে নিজে গিয়ে সকালে দিয়ে আসে আবার নিজেই নিয়ে আসে!যাতায়াত সুবিধার্থে একটা মোটর সাইকেল কিনেছে নয়ন। গ্রামের মানুষের কানাঘুষা চলে তা নিয়ে।নয়ন নাকি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছে! বউকে বড় শিক্ষা দিয়ে তার চোখ ফুটিয়ে তুলছে! দেখা গেলো এই বউও একদিন কোন এক নাগরের হাত ধরে পালিয়ে গেলো,নয়তো বেশি জ্ঞান পেয়ে নয়ন ও তার মাকেই অবহেলা করলো! আবার বিয়ের বয়স তিন বছরে অথচ এখনও তারা বাঁচ্চা নিলো না এই নিয়েও চর্চা হচ্ছে! কেউ কেউ তারাকে সরাসরি বাজ (বন্ধ্যা )বলেও সম্বোধন করছে! অনেকেই ঘরে এসে নয়নের মায়ের কান ভরিয়ে যাচ্ছে!আম্মা প্রথমে কিছু না বললেও এখনও সেও কিছুটা মনোক্ষুণ্ন তারার নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া নিয়ে!তার মধ্যে মস্তিষ্কের গহীনে ঢুকে গেছে নাতী নাতনির শখ যা এখন তীব্র জটিলতা তৈরি করছে সংসার জীবনে!
একটা কথা চিরন্তন সত্য,আমরা যতই নিজের কাছের মানুষকে বিশ্বাস করি দেখবেন তার বিরুদ্ধে একটা কথা যখন নিয়মিত কেউ কানের কাছে এসে বলে যায় তখন কোন না কোন সময়, মুহূর্তের জন্য হলেও খানিকটা সন্দেহ হলেও আমাদের ভেতরে ঢুকে যায়।আর সেই বিষয়ে যদি সরাসরি খোলামেলা ভাবে আলোচনা না করি তখন দেখবেন তা নিয়ে বিশাল জটিলতার সৃষ্টি হয় যা কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কে ফাটল ধরায়, ছিন্ন হয় মধুর সম্পর্ক, বিচ্ছেদ ঘটে মধুর থেকে মধুর প্রণয়ের, দূরত্বে টেনে নেয় নিকটাত্মীয়কে!
মানুষের কানাঘুষা তারার কানেও আসে তাই মন খারাপ করে অনেক সময়ই ভেঙে পড়ে! একদিন তো নয়নকে বলেই ফেললো,
-- হুনেন আমি আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যামু না।
নয়ন মাত্রই মুখে ভাতের লোকমা তুলেছিলো সেই অবস্থায় হাত থেমে গেল। চমকিত, প্রশ্নাত্নক ভঙিতে,ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো ,তারা মাথা নুইয়ে ভাতের বোলে চামচ নাড়তে নাড়তে আবারও একই কথা বললো,
-- আমি আর পড়াল্যাখা করুম না!
নয়ন মুখের সামনে থাকা ভাতের লোকমা নামিয়ে নিলো,প্লেটে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো,
-- ক্যান!
-- এমনেই ভালো লাগে না!
-- তাইলে কি করবা?
-- আমি সংসার করুম আগের মতোই!
-- তো এহোন কি করতাছো?
তারা হাতের চামচ বোলের উপরে রেখে দিলো।রাগে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা নয়নের পানে তাকালো। সারাদিনের কাজ শেষ করে ঘরে এসেছে মিনিট তিরিশ হবে,মাত্রই খেতে বসেছে,আম্মা আজকে সন্ধ্যার সময় ভারী নাস্তা খেয়েছিলো তাই রাতে খাবে না বলে ঘুমিয়ে পড়ছে, তারার খাওয়ার ইচ্ছা নাই তাই নয়নকে আম্মার সাথে খেয়েছি বলে থামিয়ে দিয়েছে,নয়ন স্পষ্ট বুঝতে পারলো তারার মিথ্যা,তা নিয়েই এমনিতেই মনোক্ষুণ্ন হয়েছে তবুও তারাকে কিছু বলেনি কারণ মানুষের কানাঘুষা এবং তার পরিবর্তে তার ঘরে চলা প্রতিক্রিয়া সবটাই তার কানে যায়! তাই তারাকে কিছু বলেনি। এদিকে তারাও ঠিক বুঝতে পারছে নয়নের ভেতরে পুষে রাখা রাগটাকে! তবুও নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলো না! বাচ্চা নেওয়া নিয়ে নয়নের আপত্তি! নয়নই বলেছিলো বাচ্চা নেওয়া নিয়ে আপাতত তার কোন পরিকল্পনা নাই, তারা যেন তার পড়াশোনায় মনোযোগী হয়! কিন্তু কথা তো সবাই তারাকেই শোনায়! নয়ন চাপা রাগ নিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করলো,
-- কইলা না এহোন কি করতাছো?
-- আমি আগের মতো ঘরের কাজ কাম, দোকানের কাম,আপনার লগে মাঠে গিয়া কাজ করতে চাই! এত পইড়া কি অইবো? তাছাড়াও আমি বাচ্চা নিতে চাই!
শেষের কথাটা মাথা নুইয়ে মিনমিন করেই বললো।
-- আগে পড়াল্যাখা শ্যাষ করো তারপর বাচ্চার কথা ভাবুম!
নয়ন ফট করে উঠে দাঁড়ালো,জুটা হাত উঁচিয়ে রেখে বাম হাত দিয়ে লুঙ্গিটা তুলে ধরে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে,তারা ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলো নয়নের যাওয়ার পথে।এক লোকমা ভাতও নয়ন খায়নি! যেভাবে মেখেছিল সেভাবেই পড়ে আছে ভাতগুলো!
লোকমা করা ভাতের মুঠটা সেভাবেই গোল গোল হয়ে পড়ে আছে ভাতের উপরে!তারা ওড়নায় মুখ চেপে কেঁদে উঠলো! নয়ন জেদ ধরে আছে এদিকে তাকে বাজ বানিয়ে বসে আছে পাড়া প্রতিবেশীরা! আম্মাও ইদানিং খ্যাচখ্যাচ করে; আম্মার পরিবর্তিত রূপ তারাকে কষ্ট দেয়! সে তো নরম আদুরে শ্বাশুড়ি পেয়ে অভ্যস্ত! তার পড়ালেখা করা যদি আম্মাকে কষ্ট দেয় তবে সে করবে না পড়ালেখা কিন্তু নয়ন?
পেরিয়ে গেছে অনেক সময়,নয়ন এলো না। শেষে তারা নিজেই উঠে দাঁড়ালো। নয়নের প্লেটটা অন্য আরেকটি প্লেট দিয়ে ডেকে রাখলো,ভাতের বোলটা জালি ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখলো, তরকারির বাটিগুলোও তাই করলো! পাশ কেটে বাইরে গেল,মাথার ওড়না আরও একটু টেনে লম্বা করে নিলো।নয়ন ততক্ষণে হাত ধুইয়ে বাইরের বেঞ্চে বসেছে,এক উপরে উঠিয়ে ভাজ করে অন্য পা ঝুলিয়ে বসেছে! মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মাঝে চাদ তারার ছোয়াছুয়ি খেলা চলছে,কখনো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে নিজেকে বাঁচাচ্ছে তো কখনো উঁকি দিয়ে মুচকি হাসছে, একমনে তাই দেখে চলছে নয়ন!তারা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পেরেই বললো,
-- জানো আমার খুব শখ আছিলো ডাক্তারের ঐ সাদা পোশাকটা পড়ার কিন্তু যেইদিন বাস্তবতা বুঝলাম,যেইদিন জানতে পারলাম কামলাগো পোলাপাইনের এত বড় বড় স্বপ্ন থাকতে নাই হেইদিন থেইকা ভুইলা গেলাম ঐ সাদা পোশাকের কথা! ছোড আছিলাম তবুও কথাডা কলিজায় লাগছিলো! কিন্তু এইডাও বুঝতে পারছিলাম আমার দিনমজুর বাপের সামর্থ্য নাই! সামান্য কয়ডা টেকা দিয়া মাসের বেতন দিতেই হিমশিম খাইতে অইতো তার মইধ্যে আবার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ! তয় আশা ছাড়ি নাই ডাক্তার না হই পড়ালেখা কইরা ভালো কিছু একটা হমু যাতে বাপের কামলা নামটা কেউ তাচ্ছিল্য কইরা ডাকতে না পারে! আমার আব্বা কামলা দিতো তাতে আমার লজ্জা লাগতো না! লজ্জা ক্যান লাগবো? কামই করতো।সৎ কাম! হেয় তো অন্যায় কিছু করতো না যে লজ্জা লাগবো!
তয় কষ্ট লাগতো যহন কেউ আমার সৎ,সহজ-সরল বাপেরে তার পেশা নিয়া কটাক্ষ করতো!
তাই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছিলাম আমি ডাক্তার না অইতে পারলেও এমন কিছু হমু যা দেইখ্যা সবাই আমার বাপের নাম নিয়া ডাকবো, কামলা কইয়া না!
তারা নয়নের পাশে বসে ওর কাঁধে হাত রাখলো,নয়ন একবার মুখ ঘুরিয়ে তারাকে দেখলো, আবারও দৃষ্টি রাখলো গগন পানে,ফের বলা শুরু করলো,
-- কিন্তু আমার সব মাটি চাপা পইড়া গ্যালো যেদিন আব্বায় আমগো ছাইড়া চইলা গ্যালো! আমার ইচ্ছা,শখ,স্বপ্ন সব! সব মাটির তলে মিইশ্শা গ্যাছেগা!
-- আপনি আমার কথায় দুঃখ পাইছেন তাই না? কিন্তু আমি..
-- তারা জীবন আমগো! আমরা ক্যামনে চালামু হেই সিদ্ধান্তও আমাগো! মাইনসের কথায় কি আহে যায়?
আব্বা আমগো রাইখা চইলা যাওয়ার পর কতদিন আমগো প্যাটে ভাত পড়ে নাই,কেউ তো খবর নেয় নাই একবারও!দাদার সমস্যা বাইড়া গ্যালো, ওষুধ নাই,কেউ আইসা একবেলার ওষুধ দিয়া যায় নাই।এমনকি আমার চাচা,চাচী, ফুফুরাও না! শিউলি যখন চইলা গ্যালো,আমগো দুঃখের সঙ্গী হইয়া আহে নাই কেউ,যারা আইছিলো তারা নুনের ছিডা দিতেই আইছিলো! মনিরে ক্যান ঘরের বাইরে রাইখা পড়াইতাছি তা নিয়াও ম্যালা সমস্যা ছিলো এই মাইনসের! আমগো সব ভালাতেই তাদের সমস্যা,আবার সব খারাপেই তারা নুন মরিচ ছিডায়! তাইলে তারা আমগো কাছের মানুষ ক্যামনে অইলো তারা! ক্যান আমরা তাগো কথা হুইনা নিজেদের মাঝে ঝামেলা তৈরি করি,ক্যান বিবাদ ফ্যাসাদে জড়াই! মাইনসের সব কথায় কান দিতে নাই তারা।কিছু সময় নিজেদেরটা নিজেদেরই বুইঝা লইতে অয়!
-- কিন্তু আম্মাও তো.!
-- আম্মারে আমি বুঝামু নে,হেয় মাইনসের কান পড়ায় এমন পাগলামি করতাছে! নাইলে আমার আম্মা এমন না!
-- আপনিও তো পড়ালেখা করা পছন্দ করতেন না।
তারার কথায় নয়ন ওর দিকে হতবাক হয়ে তাকালো, নয়নের চাহনি দেখে তারা চোখ নামিয়ে নিলো,তারা ধীরে বলতে লাগলো,
-- আমার মনে আছে বিয়ার পরে আপনে কইছিলেন আমার শিক্ষার দাপট আমার কাছেই রাখতে,আমার পড়ালেখার ছাপ যেন সংসারের ক্ষতি না করে তাইলে আপনি এহোন?
-- কইছিলাম কারণ তহোন তার কারন ছিলো! শিউলির কৃর্তি তহনও মনের মইধ্যে গাইথ্থা ছিলো, তাছাড়াও আরেকজনের নমুনা ছিলো চোখের সামনে যার জন্য তোমার উপরে রাগ দেখাইয়া ঐসব বলছিলাম কিন্তু এহোন আর এগুলো নিয়া ভাবি না! যার থাকার হেয় থাকবো আর যার যাওয়ার হেয় এমনিতেই যাইবো। তাছাড়া,
-- তাছাড়া কি?
-- হাজতে থাইকা একটা জিনিস খেয়াল করছি অনেক!
-- কি ?
-- এই যে তুমি পড়াল্যাখা জানো দেইখাই তো আমার ব্যাবসায় হাত লাগানোর সাহস করছো! তুমি শিক্ষিত দেইখাই সবাই তোমার লগে কাম করার সময় সতর্ক আছিলো! এইডা অন্য কেউ পারতো না! তাছাড়া আমি খেয়াল করছি তুমি যহোনই কোর্টে যাইতা সবসময়ই উকিলের পোশাকের দিকে চাইয়া থাকতা!তহোন আমার মনে অইছিলো আমার তারার এই কালো পোশাকের ইচ্ছা আছে তাইতো তার নজর কেবল ঐ পোশাকেই থাকে !
নয়নের কথায় তারার ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি ফুটে,চোখ নামিয়ে হাত দিয়ে ওড়নার কোনা খুটতে থাকে। নয়ন আবার বলতে থাকলো,
-- তাই হাজতে বইসাই ঠিক করছিলাম বাইর অইয়া তুমারে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কইরা দিমু,মনিও মত দিলো! আমি চাই তুমি এহোন মন দিয়া খালি পড়াল্যাখা করো,বাদ বাকীটা আল্লাহর ইচ্ছা! বাচ্চা আল্লাহর যহোন দেওয়ার দিবোই! তা নিয়া আমগো এত ভাইবাও লাভ নাই আর আজাইরা মাইনসের কথায় কান দিয়াও লাভ নাই!
-- আইচ্ছা! এহোন উঠেন ভাত কয়ডা খাইয়া লইবেন! ভাত নষ্ট করতে অয় না আল্লাহ রিজিক কমাইয়া দিবো!
-- হু চলো। কিন্তু তোমারো খাইতে অইবো আমার লগে!
-- আইচ্ছা খামুনে!
-- ওহ তোমার তো আবার ক্ষিধা নাই!
-- না আছে!
-- তাইলে মিথ্যা কইলা ক্যান তহোন?
-- আর কমুনা!
-- কানে ধরো!
-- আইজকার জন্য মাফ কইরা দ্যান না!
-- কোন মাফ নাই! মিথ্যাবাদির জন্য কোন দয়া হয় না আমার!
-- আমি না আপনার একটা মাত্র বউ!
-- তাতে কি অইছে? মিথ্যা কইছো এহোন শাস্তি পাইবা এইডাই কথা; তা বউয়ের নাম্বার এক কিংবা দশ যাই হউক কোন মাফ নাই!
-- কিহ আপনি দশটা বিয়া করবেন?
-- আরেহ ঐডা তো কথার কথা!
-- কিসের কথার কথা! আপনে আরো বিয়া করবেন আমি এহোনই আম্মারে কমু! আম্মা!
তারা চিৎকার করতেই নয়ন মুখ চেপে ধরলো,তারা নয়নের হাতে কামড় দিয়ে নিজের মুখ ছাড়িয়ে নিলো,নয়ন হাতের দিকে তাকিয়ে তারাকে কটমট করে দেখতে লাগলো, নয়নের ভঙ্গিমায় তারা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো!মোট কথা সে নিজের শাস্তি থেকে বেঁচে যাওয়ার রাস্তা ঠিক খুঁজে নিয়েছে মাঝ থেকে ফেঁসে গেল নয়ন!
পর্ব ১৫
সময় গড়িয়ে মাস ছয় গেল,তারার পড়ালেখার প্রথম সেমিষ্টার পাড় করলো,আজ তার ফলাফল দিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো ফলাফল এসেছে,তারা খুবই খুশি আপাতত অপেক্ষায় আছে নয়নের!
নয়ন আসার আগেই তারা আরও একটি কাজ সারলো! মনে মনে হাসিও আসছে আবার চিন্তাও হচ্ছে,আদৌও নয়ন মানবে কিনা?
-- তারা।
বান্ধবীদের সাথে খোশগল্পে মেতে ছিলো নয়নের ডাকে সেদিকে মুখ ফেরালো! নয়ন তারার হাসি হাসি মুখে দেখে নিজেও হেসে দিলো! মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-- কি অবস্থা?
-- আলহামদুলিল্লাহ!
-- আইচ্ছা চলো!
তারা নয়নের সাথে মোটর সাইকেলে উঠে চলে গেল। মোটর সাইকেলে থাকা অবস্থায় টুকটাক কথাবার্তা হলো নিজেদের মধ্যে,মাঝ রাস্তায় থেমে নয়ন তারাকে কিছুই খাওয়ালো।
\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|\|
রাতে.......
-- হুনেন আপনে কইছিলেন আমি ভালো ফলাফল করলে আপনে আমারে যা চাইবো তাই দিবেন!
-- হ কইছিলাম তো!
-- তাইলে আপনে কি আপনার কথায় এহোনও স্থির আছেন?
-- কও কি চাই তোমার?
নয়ন খাটের উপরে বসে এক পা ঝুলিয়ে দোকানের হিসাব দেখছিলো,তারার কথায় টালি খাতার উপরে
কলমটা রেখে উঠে দাঁড়ালো।খাটের দাসার উপরের অংশ হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে হাঁসি হাঁসি মুখ করে দাঁড়ানো তারার বরাবর এসে দাঁড়ালো,তারার গোলগাল মুখটা দুই হাতে তুলে ধরে নিজের মুখ বরাবর করলো, ছোট ফু দিয়ে উড়ু উড়ু ছোট চুলোগুলো সরিয়ে দিলো,আদুরে গলায় জানতে চাইলো,
-- কি লাগবো আমার তারা রানীর!
-- আপনে কিন্তু কথা দিছেন যা চাইবো তাই দিবেন!
-- আমার একটা মাত্র বউ ,তার জন্য জীবন ছাড়া সব দিয়ে দিবো!
-- জীবন কার জন্য রাখবেন?
-
তারারা কথায় নয়ন ফিক করে হেসে দিলো,তারা বাচ্চাদের মতোই গাল ফুলিয়ে নিলো,নয়ন আঙ্গুল দিয়ে গালের ফুটো করে দেওয়ার মতোই খোঁচা মারলো।তার সাথে সাথেই তারাও খিলখিল করে হেসে উঠলো। নয়ন তারাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বললো,
-- জীবন না থাকলে তোমারে ভালোবাসুম ক্যামনে?
তাই জীবন দেওন যাইবো না!
-- আমার আপনার জীবন চাইও না! আমি চাই শ্যাষদিন পর্যন্ত আপনে আমারে এইভাবে আপনের বুকের মইধ্যে রাখেন!
-- সবসময়ই থাকো!
-- আচ্ছা এহোন কও কি দিমু তোমারে! এত ভালো করলা পরীক্ষায়;আমার তো গর্বে বুক ভইরা যাইতাছে।
তারা নয়নের বাহু থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো,
-- আপনে এইখানে একটু বয়েন, আমি আইতাছি।
কথা শেষ করেই এগিয়ে গেল পড়ার টেবিলের সামনে, নিজের ব্যাগের মধ্যে কিছু একটা খুঁজে আনলো, হাতের মুঠোয় কাগজের মতো কিছু একটা দেখে নয়ন জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো কিন্তু কিছু বললো না!
-- আজ থেকে ছয় মাস আগে আপনে এমন করেই আমারে একটা কাগজ দিয়া চমকাইয়া দিয়াছিলেন,আইজকা আমি চাই আপনেও একবার দ্যাখেন এইটা!
-- কি এইডা?
নয়ন হাতে নিয়ে দেখলো এটা একটা ভর্তির ফরম,
-- তারা এইডা কিসের জন্য?
-- আমি চাই আপনে আবার পড়ালেখা শুরু করেন!
-- মানে?
-- আপনে আপনের ছুইট্টা যাওয়া স্বপ্নরে আবার আগলাইয়া ন্যান!
-- তারা কি সব কইতাছো?
-- ক্যান কি সমস্যা?
-- কি সমস্যা মানে? অনেক সমস্যা! আমার কি এহোন এই বয়স আছে যে কান্ধে ব্যাগ ঝুলাইয়া পোলাপাইনের মতো স্কুলে যামু! এহোন আমার পোলাপাইনের স্কুলে যাওয়ার বয়স! ঠিক সময়ে বিয়া করলে আমার মাইয়া পোলা স্কুলের বড় ক্লাসে থাকতো!
-- থাকতো তাতে কি অইছে!
-- তারা তোমার মাথা নষ্ট অইয়া গ্যাছে!
-- আমার মাথা ঠিকই আছে!
-- কিন্তু আমার মনে অয় নষ্ট অইয়া গ্যাছে এই লইগ্গা এ্যামন উদ্ভট কথাবার্তা কইতাছো?
-- আপনে আমারে কইছেন তা চামু তাই দিবেন,তাইলে এহোন এ্যামন করতাছেন ক্যান?
-- অন্য কিছু চাও! সোনাদান যা চাও দিমু!
-- আমার কাছে সোনাদানার চাইতেও দামী এইডা,আপনের পড়ালেখা করা, আরও শিক্ষিত অইয়া উঠা!
-- ক্যান অশিক্ষিত জামাইরে বান্ধবীদের মাঝে পরিচয় দিতে লজ্জা করে?
-- আপনে এগুলা কি কইতাছেন? আপনে শিক্ষিত না অশিক্ষিত তা নিয়া চিন্তা কোনদিনও আমার মাঝে আহে নাই! আপনে আমার অহংকার; যারে নিয়া সারা দুনিয়ার মাঝে আমি গর্ব করে কথা কইতে পারি!
-- তাইলে আমারে পড়াল্যাখা করাইতে চাইতাছো ক্যান?
-- আপনে আমারে ক্যান করাইতাছেন?
-- কারন এইডা তোমার স্বপ্ন আছিলো আর আমি স্বামী অইয়া নিজের স্ত্রীর সব স্বপ্ন পূরণ করতে চাই!
-- আমিও চাই!
-- কি?
-- আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে! হ্যা হয়তো সব অইবো না তয় যতটুকু অইবো তাতেই আমি খুশি হমু।
-- তারা এই বয়সে পড়ালেখা করলে মাইনসে আমারে নিয়া হাসবো! আমারে নিয়া কেউ হাসলে তোমার ভালো লাগবো কও?
-- মাইনসের কথা আপনে গায়ে মাখেন? আমার পড়া নিয়াও তো মাইনসে কথা কইছিলো কই তহোন তো আপনে তাগো কথার গুরুত্ব দ্যান নাই তাইলে এহোন ক্যান?
-- আমার এহোন পড়ালেখার কি দরকার আছে কও? আর তুমি এইডা ক্যান চাইতাছো! ব্যাবসা রাইখ্খা আমি এহোন পড়াল্যাখা করলে মাইনসে হাসাহাসি করবো!
-- চাইতাছি কারণ দরকার আছে!
-- দরকার আছে?
-- ফ দরকার আছে; কারণ আমি চাই আমগো ভবিষ্যতে প্রজন্ম জানুক তার বাপ মা একসাথেই শিক্ষিত অইয়া উঠছে আর তাতে মানুষের কথায় তাগো পথ থামে নাই! তারা শিক্ষিত বাপ মায়ের পরিচয়ে বাইড়া উঠুক! শুনেন পোলাপাইন সত্যিকার মানুষ করতে খালি মায়ের শিক্ষা থাকলেই অয় না,বাপেরও লাগে!
-- কিন্তু তারা?
-- আপনের তো ইচ্ছা আছিলো।দ্যাখেন এহোন আল্লাহ পথ দ্যাখাইছে আপনে সেই পথে হাইট্টা যান ইনশাআল্লাহ নিজের স্বপ্ন পূরণ অইতে দ্যাখবেন।
--- কিন্তু তারা তুমি বুঝতাছো না?
-- মনে করেন এইডা আমার আখেরি ইচ্ছা,আর কোনদিন কিছু চামু না! দয়া কইরা খালি হাতে ফিরাইবেন না!
-- তারা!
আখেরী শব্দটা নয়নের বুক ভেদ করে হৃদপিন্ডে আঘাত করলো যেন,ঝট করেই তারাকে নিজের সারে মিশিয়ে নিলো,
-- এইরকম কথা আর কোনদিন কইবা না!
-- আপনে আমার কথা মাইন্না ন্যান তাইলে!!
-- তারা জেদ কইরো না ,এইডা সম্ভব না!
-- ক্যান সম্ভব না?
-- আরেহ আমি ব্যাবসা রাইখ্খা এহোন স্কুলে গিয়া বইয়া থাকুম?
-- কোন সমস্যা অইবো না! সপ্তাহে একদিনই তো , আপনে ক্লাসে যতক্ষন থাকবেন ততক্ষন আমি চেষ্টা করুম সামলাইতে!
-- আর তোমার পড়াল্যাখা!
-- আমারডাও অইবো?
-- কিন্তু ক্যামনে?
-- দ্যাখেন এইডার ক্লাস অয় শুক্রবার,আর শুক্রবার আমার বন্ধ,তো আমি দোকানে আপনি পড়তে গ্যালেন!
-- শুক্রবার ক্লাস?
-- হ !এইডা অইতাছে কর্মজীবী, নানা সমস্যার কারণে পড়ালেখা ছাইড়া দেওয়া মানুষের জন্য একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান! যেইহানে মানুষের হারাইয়া যাওয়া স্বপ্নগুলারে ফিরাইয়া দেয়! এই য্যামন আপনে অনেক আগে জীবনের ঝামেলায় পইড়া পড়াল্যাখা ছাড়তে বাধ্য অইছিলেন,ত্যামনি আরো অনেক মানুষ আছে! আপনাদের মতো সবাইকে আবারও পড়ালেখা কইরা নিজেরে শিক্ষিত, আদর্শ মানুষ করার সূযোগ আছে!
-- মানে এইহানে সবাই বয়স্ক?
-- না ছোড মানুষও আছে আবার অনেক বয়স্কও আছে?
-- মানে সবাই এক ক্লাসে?
-- না,মানে এক ক্লাসে যারা তারা সবাই একই ক্লাসে!
-- বুড়া বাচ্চা সব এক লগে ক্যামনে পড়ে; শরম করবো না?
-- শরম ক্যান করবো?আপনে পড়তে গ্যাছেন,জ্ঞান বৃদ্ধি করতে গ্যাছেন! অন্যায় কাজতো আর করতে যান নাই; তাইলে শরম ক্যান করবো?
-- কিন্তু সব বয়সী এক লগে!
-- হ এইডাই তো এই স্কুলের বৈশিষ্ট্য! এরা বয়সের কাঁটাতারে মানুষের ইচ্ছাকে বান্দে নাই। যেকোন বয়সী নিজের কাংঙ্খি'ত ইচ্ছাকে পূরণ করতে পারতাছে!
-- কিন্তু এইডা কি সরকারি না বেসরকারি?
-- এইডা অইতাছে সরকারি প্রতিষ্ঠান! এইডা অইলো "বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এর অধীনস্থ"স্কুল প্রোগ্রাম,কলেজ প্রোগ্রাম! এইহানে কলেজ শ্যাষ কইরা আপনে চাইলে ডিগ্রীও পড়তে পারেন আবার আমার মতো অনার্সও পড়তে পারেন,তয় আমি কমু আপনেও অনার্স পড়বেন! তাও 'আইন' নিয়া!
-- আমি কিছু বুঝতাছি না! এই বয়সে স্কুলে যামু,মাইনসে হাসবো! তাছাড়াও ঐহানের পরিবেশ ক্যামন অইবো,হগলে ক্যামন অইবো!
-- ইনশাআল্লাহ গ্যালেই বুঝবেন আপনে কালকেই আমার সাথে যাইবেন ,আমি নিজেই ভর্তির সব কাজ কইরা দিমু!
-- কিন্তু তারা আমার কথা হুনো!
-- আর কোন কথা নাই; আপনে কালকে যাইবেন, ভর্তিও অইবেন! এরপর ইনশাআল্লাহ নিয়মিত পড়াল্যাখা করবেন! হুনেন আমি কিন্তু আপনের প্রাইভেট মাস্টারনি হমু তয় ফ্রি পড়ামু না কিন্তু!
তারা কথা শেষ করেই হেসে দিলো,নয়ন মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো সেই ভুবন ভোলানো হাসি!
নয়ন তারার হাত ধরে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিলো, এরপর কিছু একটা খুঁজতে লাগলো, পরমুহূর্তেই মনে পড়ার ভঙিতে মুখটা বাকালো,মাথা চুলকে বিছানার চাদর উল্টে ফেললো,তারা কেবল উৎসুক চোখে দেখছে, নয়ন একটা বাক্স বের করলো, গয়নার বাক্স,সেটা খুলে তারার গলায় ঝুলিয়ে দিলো, তারা চকচক চোখে নিজের গলায় ঝুলে থাকা ভারী লকেটসহ চিকন চেইনটা দেখছে যার মাঝে খোদাই করে লেখা 'নয়ন-তারা'!
পর্ব ১৬
জেদ অনুযায়ী আজ তারা নয়নকে নিয়ে কলেজে এসেছে, যেহেতু আগেই কথা বলে গিয়েছিলো তাই বেশি সময় নষ্ট করতে হলো না।সব নিয়মকানুন মেনে ভর্তি সংক্রান্ত কাগজপত্র জমা দিয়ে টাকা দিয়ে নিজেকে আবারও শিক্ষার আলোয় মেখে নিতে প্রস্তুত হলো নয়ন! প্রথমে একটু ইতস্তত বোধ করলেও পরে যখন দেখলো তার চেয়েও বয়সে বড় অনেক মানুষ আছে,আবার ছোটও আছে তখন নিজের ভেতরে থাকা হীনমন্যতা বের করে দিলো।তারার ইচ্ছা অনুযায়ী মানবিক শাখায় ভর্তি হলো।তারা একদম অভিভাবক হয়েই সবটা সারলো।তারার এহেন কাজে মুগ্ধ হলো আশেপাশের মানুষ থেকে শিক্ষকরা! তারাও নয়নকে উৎসাহ দিলো!
ক্লাস কবে থেকে শুরু হবে জেনে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো দুজন। তারার মুখ থেকে হাসি যেন সরছেই না।নয়ন মুগ্ধ হয়ে কেবল দেখেই যাচ্ছে ভোরের রবির ন্যায় স্নিগ্ধ,চকমকে,জ্বলজ্বল করে চারদিকে নিজের আলো ছড়িয়ে দেওয়া তারাকে!
তারা!রাতের কুটকুটে অন্ধকারকে ছাপিয়ে নিজের মিটমিটে মৃদু আলোয় ধরনীকে অন্ধকার মুক্ত রাখতে অবিরত ঝলতে থাকা মহাবিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য। চাঁদের অপরুপ সৌন্দর্য্যকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে, নিশুতি রাতের আসমান ঢালা রুপকে উপচিয়ে দিতে তারার মহাত্ব অপরিসীম! মহান রাব্বুল আলামীন এর অপার সৃষ্টির মাঝে এক অন্যতম সৃষ্টি দুর আসমানে নিজেকে বিস্ময়িত করে রাখা তাঁরা! বিশাল গগনের মাঝে একাকিত্ব বয়ে বেড়ানো থেকে চাঁদকে মুক্তি দেওয়ায়ও তারার ভূমিকা যে অপরিসীম!
নয়নের কাছে আসমানের ঐ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পিটপিট করে উজ্জ্বলতা ছড়ানো তারার চেয়ে কোন অংশে কম মনে হচ্ছে না তার থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে দাঁড়িয়ে আসমানের তারার সাথে আলাপনে ব্যস্ত ধরনীর রক্ত মাংসের তারাকে।
রবের তৈরী নিয়মেই তাকে জীবনে এনে দিয়েছিল রাব্বুল আলামীন নিজেই। মহান আল্লাহ যা করেন তা আমাদের সবার জন্য উত্তমই করেন! হয়তো খানিক সময়ের জন্য আমরা তার সিদ্ধান্তে অখুশী বনে যাই কিন্তু আমরা সবাই জানি আল্লাহ যা করেন তা তার বান্দার প্রতি কল্যান বলেই করেন!তাই তো কখনো আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপরে নিরাশ হতে হয় না , তুলতে হয় না প্রশ্ন।
মহান আল্লাহ ইচ্ছাময় বাদশা। তিনি যা ইচ্ছা ফয়সালা করেন। বান্দার জন্য যে ফয়সালা করেন, তা তার জন্য মঙ্গলময়। তার কোন ফয়সালাতে জুলুম বা অন্যায় থাকে না। তিনি আমাকে গরীব আর আপনাকে ধনী বানিয়েছেন- এটা তার বেইনসাফি নয়। তিনি আপনার ছেলেকে সুস্থ সবল রেখেছেন এবং আমার ছেলেকে বিকলাঙ্গ বানিয়েছেন--- এটা তার ফয়সালার অন্যায় নয়। কারণ তার কাছে আমাদের কোন অধিকার নেই , কোন প্রাপ্য নেই --- যা না পাওয়ার ফলে আমরা তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনতে পারি। তিনি ইচ্ছা করলে আপনাকে নর্দমার কীটও বানাতে পারতেন, তাতে কি আপনার কোন প্রতিবাদ চলত? কখনো না। সুতরাং তার কোন ফয়সালার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে যে তা ‘অন্যায়’ বলে অভিহিত করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। (ইবনে উসাইমিন)
মহান আল্লাহ বলেছেন,
“আল্লাহ আদেশ করেন। তাঁর আদেশের সমালোচনা (পুনবিবেচনা) করার কেউ নেই এবং তিনি হিসাব গ্রহণে তৎপর। (রা’দঃ ৪১০)
তিনি আরও বলেছেন, “তিনি যা করেন, সে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হবে না; বরং ওদেরকেই প্রশ্ন করা হবে।” (আম্বিয়াঃ ২৩)
যখন শিউলি নয়নকে তিরস্কার করে চলে গিয়েছিল,দিয়ে গিয়েছিল এক পৃথিবী সমান ধিক্কার তখন নয়ন ভেঙে পড়েছিলো,সিজদায় পড়ে জানতে চেয়েছিলো কি এমন কল্যান ছিলো এহেন কাজে?কেন তাকে এমন অপমানের মুখোমুখি করলেন? নয়ন আল্লাহর কাছে প্রশ্ন তো করেছিলো কিন্তু অভিযোগ করতে সাহস করেনি,হয়তো রবের সিদ্ধান্তের প্রতি অভিযোগ ছিলো না কিন্তু নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়কে মানতে কষ্ট হচ্ছিলো!
নয়ন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিজ্ঞা তো করেছিলো কিন্তু জীবনে এই অধ্যায় আর খুলতে চায়নি!তাইতো ঘটককে বারবার বিতাড়িত হতে হয়েছিলো তবে সেই ভোরের আলোয় দেখা এক নিখুঁত মুখশ্রী যেন নয়নের সেই প্রতিজ্ঞায় ভাঙ্গন ধরালো। তাইতো ভোরের আলোয় দেখা উজ্জ্বল মানবী রক্ত মাংসের তারাকে আজ তার ঘরে দিয়ে দিলো আল্লাহ। খুশি নয়ন! খুব খুশি! আল্লাহ তারাকে দিবে বলেই তো শিউলির মতো নারীকে জীবন থেকে সরিয়ে দিলো!শিউলি না গেলে কি তারা আসতো? আমাদের সৃষ্টিকর্তার সিদ্ধান্ত সবচেয়ে সুন্দর, নিঃসন্দেহে সুন্দর;তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী! তার মহিমা বোঝার ক্ষমতা কারো হয়নি!
উপরওয়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা জাহির করে নয়ন আসমানে তাকালো, বিরবির করে বললো,
-- ইয়া রব আমি আপনার ফয়সালায় সবসময় খুশি, আমারে আপনার হেদায়েত আর রহমতের ছায়া তলে রাখুন;আমারে আমার জীবনসঙ্গীকে সাথে লইয়া আপনার বেহেস্তে যাওয়ার জন্য পথ সুগম কইরা দ্যান!আমি যেন সবসময় আপনার প্রিয় বান্দাদের তালিকায় থাকতে পারি!
আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়ে আবারও দৃষ্টি দিলো তারার পানে! এখন রাত প্রায় বারোটা পেড়িয়ে গেছে! তারার আবদারে চন্দ্র বিলাস করতে দুজনে এসেছে ক্ষেতে!
পুরো মাঠ জুড়ে সবুজ কচি ধান! তার ঘ্রানে মাতোয়ার চারদিক,শনশন বাতাসের স্রোতে ভেসে তা নাকে বারি খাচ্ছে!কচি ধানের ঘ্রান নাকি তারার খুব ভালো লাগে!তাই খুব বায়না করছিলো এই রাতে যেন তাকে ধান ক্ষেতে নিয়ে আসা হয়, দুপুরের তীক্ষ্ণ রোদের আদর থেকে বাঁচতে বাঁশ কাঠ দিয়ে উঁচু মাচা দিয়ে তৈরি করা মাঝারি ধরনের একটা ঘর যার ছাউনী ছিলো খড়ের!দেওয়াল ছাড়া ঘরের ন্যায় পাটাতনের উপরে বসে নিচে পা ঝুলিয়ে চারদিকে অপার মুগ্ধতা মিশিয়ে কেবল নয়ন বুলাচ্ছে তারা আর তাতে নয়ন আবদ্ধ রেখে নিজের নয়নের তেষ্টা মিটাচ্ছে শ্যামপুরুষ নয়ন !
আজ পূর্ণিমা! চারদিক উপচে পড়ছে চাঁদের অংশু! তার মাঝে প্রতিযোগীতায় নেমে নিজেদের প্রতি টিমটিমে আলোর বিন্যাস ঘটিয়ে নিম্নাংশ উঁচিয়ে ইচিং বিচিং ধাঁচের নাচ নেচে চলেছে অনবরত জোনাকি পোকারা। তারা মুগ্ধ হয়ে দেখছে তা! চাঁদের আলোয় উজ্জ্বলতার চাদর মুড়িয়ে এমনিতেই চকচক করছে ধানের সবুজ পাতাগুলো,তার উপরে বেহেস্ত থেকে নির্গত বাতাসের স্নিগ্ধতা,জোনাকির নাচ সব মিলিয়ে পরিবেশ এখন অপূর্ব, মনোমুগ্ধকর! প্রেমিক যুগলের কাছে এই মুহূর্ত কেবলি প্রেম বিলাসের। অতল অজানায় নিছক খেয়ালিপনায়, বাতায়নের স্রোতের তালে জোনাকির ছন্দে হুরমুর করে জেগে উঠা প্রেমের তরঙ্গে কেবলি ভাসতে ইচ্ছা জাগে,খুইয়ে দিতে ইচ্ছা করে সর্বস্ব! কোথাও কোন বাধাকে তোয়াজ না করে কেবলি বলতে মনোচ্ছাস হয় 'ভালোবাসি তোমায় প্রিয়'! বলতে হৃদাকাঙ্গা জাগে তুমিময় সবটা আমার, তুমি ছাড়া আর কে-ই বা আছে আর,যার জন্য হৃদয়ের ছোট্ট গৃহে এত উতলা ঝড় উঠে! কিন্তু হায় সব কি বলে উঠা যায়? তারাদের মতো রমনীরা কখনোই নিজের অনুভূতি জাহির করতে পারে না, লজ্জায় লজ্জাবতীর ন্যায় নেতিয়ে থাকা নারীরা কখনোই মুখ ফুটে নিজের অর্ধাঙ্গকেও বলতে পারে না ঠিক কতটা জুড়ে জড়িয়ে থাকে স্বামী নামক ঐ শক্তপোক্ত মানুষটি!
জ্বলমলে করে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া সুপারির ন্যায় সমস্ত অম্বর দখলে রাখা তারাকে কেন্দ্র করেই স্থির রেখে নিজের অনুভূতিগুলো ভাগ করছিলো তারা ঠিক তখনই শীতল হাতের ছোঁয়ায় শিউরে উঠলো,হাতের মালিককে চেনা তাই ফিরে দেখার প্রয়োজন মনে করলো না তবে লজ্জায় আরও একটু নেতিয়ে পড়লো,মাথা ঝুঁকিয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে দেখতে লাগলো পায়ের নীচে থাকা ধানের শীষ এবং বাতাসের প্রেমের মিষ্টি যুদ্ধ! ধান একদিকে যেতে চায় তো প্রবন তার সর্বশক্তি খাটিয়ে বিপরীতে নিতে চায়।তারা নিজের মনের অবস্থান যতই অন্যত্র নিতে চেষ্টা করছে ততই গভীর হচ্ছে নয়নের ছোঁয়া!যার দরুন চেয়েও তারা পারছে না নিজের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতাকে দমিয়ে রাখতে,নয়ন গভীরভাবে বারবার ছুঁয়ে দিচ্ছ লতানো শরীরের কোমল অঙ্গগুলো! ঘাড়ের উপরে বারবার ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়ায় বুঝিয়ে দিচ্ছে তার ভেতরের অনুভূতিগুলো! যা প্রশমিত হচ্ছে লজ্জাবতী লতার মতোই গুটিয়ে থাকা ধরনীর তারার গহীনে।
তারা নিজে না পারছে সহ্য করতে আর না পারছে নিজেকে এই অনুভূতির বেড়াজাল থেকে ছাড়িয়ে নিতে। তবুও পরিবেশের বিবেচনায় ধীর আওয়াজে অল্প শব্দে বললো,
-- কেউ দ্যাখলে কি কইবো?
নয়ন তারার দিকে নজর বুলিয়ে খুব আলতো করে নিজের সাথে চেপে ধরলো,তারার পিছনে বসে নিজের বুকের সাথে তারার পিঠ ঠেকিয়ে তারার দুই পাশ দিয়ে পা ঝুলিয়ে বসলো। ওড়নার দুই আঁচল সমানতালে ফটফট করে উড়ছে বাতায়নের চোটপাটে,হালকা হিমেল বাতাসেও শরীর শিরশির করে উঠলো,তার মাঝে নয়নের হাতকাটা গেঞ্জির ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসা লোমশবুক,বুকের খাঁজে তৈরি হওয়া শীতলতা তারার সর্বাঙ্গে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে,তার মধ্যে দুই হাতে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়েছে নয়ন নিজের সাথে,পা দিয়ে পা পেঁচিয়ে ধরে কানের লতিতে প্রথমে একটু একটু করে ঠোঁট ছুঁইয়ে সেই ঠোঁট গলায় ডুবিয়ে একদমই নিচু শব্দে বললো,
-- আমার বউরে আমি আদর করতাছি তাতে কার কি কওয়ার আছে?
-- আপনের বউ ঠিক আছে,তাই বইলা যেইখানে সেইখানে!
নয়ন ঠোঁট আরও চেপে ধরলো,গভীর করে! তারার শিরশিরানি আরও বেড়ে গেল! নয়ন যেন বুঝলো, তাই হাতের বাঁধন আরও শক্ত করলো। শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরেই অনবরত চুম্বনে ভরিয়ে তুললো তারার গলা,ঘাড় কাঁধ!এক হাত ছেড়ে দিলো,সেই হাত গিয়ে ঠেকলো তারার চিকন লতানো গুল্ম বৃক্ষের ন্যায় কোমল কোমরে। স্পর্শ গভীর থেকে গভীরতর হলো ,তার সাথে বাড়লো একে অপরের প্রতি টান, আকাঙ্ক্ষা,মিলিত হওয়ার টান। মুহুর্ত কেটে গেল,বেশ খানিকক্ষণ চলতে থাকলো এভাবেই।তারা পারলো না নিজের অস্থির চিত্তের আকাঙ্ক্ষা দমন করতে, ফট করেই পিছনে ফিরে জড়িয়ে ধরলো নয়নকে!
পবণের খুশি উপচে পড়ছে,উতলা হয়ে উদ্দাম গতিতে চলতে শুরু করলো,তার সাথে ছন্দ মিলিয়ে ঝিরিঝিরি নাদের তাল তুলে মুখরিত করছে কচি ধানের সবুজ ঘষঘষে পল্লবগুলো!
মানবযুগলের প্রেম বিলাসে বিলাসিত
প্রকৃতি। এ যেন মিলন হলো দুজোড়া প্রেমের, মানবের সাথে মানবীর আর পবনের সাথে সবুজাভ শিষ পল্লবের।সাক্ষ্য দিলো বিশাল গগনে একাকি জীবন উপভোগ করা কাসার থালার ন্যায় চকমকে চন্দ্র মামা! পিটপিট করে জ্বলতে থাকা তারারা।স্মৃতি তৈরি হলো মধুরতার! এভাবেই কেটে যাবে জীবনের খানিকটা তো কভু কালবৈশাখীর ঝড়ে ওলটপালট হবে। আবার রাঙিয়ে দিবে রঙের পসরা নিয়ে উদীয়মান রঙিন রংধনু।
পর্ব ১৭
-- আলো নয়ন তোরে কি বুইড়া বয়সে ভীমরতিতে ধরছেনিরে?
কাঁপা শব্দ, বয়স্ক কন্ঠলানীর বিদ্রুপাত্মক কথায় প্যাডেলের থেকে পা ফস্কে গেল, কোনরকমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বেগতিক ধারায় ছুটে চলা সাইকেলটা থামালো কৌশল খাটিয়ে! চোখমুখ কুচকে পিছু ফিরে দেখলো সেই বিদ্রুপের অধিকারীনিকে।থুরথুরে বয়সী না হলেও অভাব আর অবহেলায় চামড়ার ভাঁজে তাকে বয়স্ক করে তুলেছে! ঐ অনাদরে ঢেকে থাকা মায়াবী মুখটা চিনতে নয়নের খুব একটা কষ্ট হলো না।
অনেকদিন পর দেখলো। অনেক দিন! নাহ; অনেকগুলো মাস পর। বলা যায় বছর পেরিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি! এক সময় খুনশুটিতে মেতে থাকতো এই মানুষটি অথচ আজ তার অবস্থা!
আল্লাহ কখন কার ভাগ্যে কি রাখছে আল্লাহ জানেন কেবল! কিন্তু যাই করেন তাতে অবশ্যই বান্দার মঙ্গলের জন্য করেন! তবে এটাতে কি মঙ্গল আছে তা নয়ন জানে না। কিভাবে জানবে? আল্লাহ কি কারো কাছে কৈফিয়ত দিবে? আদৌও এটা কল্পনায়ও সম্ভব! তিনি সর্বেসর্বা! পরম করুনাময়,অসীম ক্ষমতার অধিকারী, মহব্বতের সাগর , সমস্ত দুনিয়ার বাদশা,তিল থেকে বিন্দু পানি, সাগর থেকে মহাসাগর, আসমান থেকে জমিনে প্রতিটি কনা তার তৈরি,সে তার সৃষ্টিকে কিভাবে ব্যবহার করবে, কিভাবে নাচাবে সেটা একান্তই তার ইচ্ছা! তিনি তার মর্জির মালিক! তার তো কোন স্রষ্টা নাই,কেউ তাকে সৃষ্টি করে নাই । তবে কাকে সে কৈফিয়ত দিবে? কাউকে না।যে ইহজাগতিক পরজাগতিক সমস্ত কিছুর মালিক তার কোন দায়বদ্ধতা নেই কাউকে কিছু বলে করার।
আল্লাহ বান্দাদের ভালোর জন্য করে তবে এটাতে ঠিক কি ভালো নয়নের জানতে ইচ্ছে করছে কিন্তু ঐ যে কার কাছে জিজ্ঞেস করবে?
-- আরে নুরী চাচীম্মা না?
-- হ চিনছোছ তাইলে?
--- চিনমু না ক্যা?
-- না শিক্ষিত বউ আইন্না যদি তুইও ভুইলা যাইছ তাই জিগ্গাস করলাম!অহোন তো আবার দ্যাখতাছি তুইও কাইন্ধে ব্যাগ লইয়া পোলাপাইনের মতোন ইস্কুলে যাছ? আলো নয়ন তোর কি বুইড়া বয়সে মাথায় ব্যারাম অইছে?
নয়ন চাচীর কথার মানে বুঝলো কিন্তু তারপরও জিজ্ঞেস করলো ,
-- ক্যান চাচী,এই কথা কও ক্যান?
-- এওন তোর পোলা মাইয়ারে ইস্কুলে দেওয়ার সময় অইয়া আইছে,এই সময়ে তুই নিজে ইস্কুলে যাছ আবার বউরেও নাকি ম্যালা পড়াবি! তোরও কি আমার পোলার মতো মারে রাখতে কষ্ট অইতাছে তাই এইরাম কামকাজ করতাছোছ?
-- না চাচী সবাই দুনিয়ায় এক না! তুমি তো আমার বউরে নিজে চোখে দ্যাখো নাই তাই বুঝতাছো না! চলো; আমগো বাড়িত লও! আগে গিয়া আমার বউয়ের মুখ দ্যাখবা তারপর কইবা কথা!
বৃদ্ধা নুরি যেতে না চাইলেও নয়নের জোরাজুরিতে অবশেষে যেতে বাধ্য হলো!
আম্মা উঠানের এক কোনায় বসে সাদা কাপড়ে হলুদ রং সুতোয় ভরিয়ে তা দিয়ে ছাপা দিচ্ছে! হুগলি পাতার পাটি বিছিয়ে তার উপর সাদা সুতি শাড়ি দুই ভাগ করে মাঝে অন্য রঙের পুরানো শাড়ি দিয়ে কাঁথার জন্য ঠিকঠাক করে ভাঁজ ফেলে ছোট ছোট পেরেক গেঁথে শক্ত করে আটকে নিয়েছে। কোথাও কোথাও খেজুরের কাটাও আছে। তারা হলুদ রঙের বাটিটা পাশে রেখে বললো
-- আম্মা এর মাঝে মাঝে কিছু ছোট ছোট নয়নতারা আঁকি! এহোন না আঁকলে সেলাই কালে মনে থাকবো না!
-- আঁকো!
আম্মার নির্দেশনা পেতেই তারা দৌড় লাগালো ঘরের দিকে উদ্দেশ্য পেন্সিল আনা!
মনির ছেলে হয়েছিল, আল্লাহর রহমতে সুস্থ সবল হয়েছে! নাতীকে আগামী শীতের উপহার হিসেবে আম্মা মাঝারি মাপের নকশিকাঁথা দিতে চাচ্ছে,তাই ফুল আঁকার জন্য এমন আয়োজন! এ কাজে আম্মার সহকারী তাঁরাও আছে।তারার হাতের কাজ খুবই অসাধারণ, যেহেতু ওর মায়ের এই কাজটা নিয়মিত করা হয় ,তারার মায়ের আয়ের উৎসই হচ্ছে কাঁথা সেলাই,ছোট থেকেই মায়ের এই অপূর্ব সুন্দর গুনের গুনাগাণ শুনে এবং দেখে এসেছে, আর মায়ের থেকেই রপ্ত করেছে এগুলো!
কাজের মাঝেই কর্ণ দোরে সাইকেলের টুং টাং শব্দ পেয়ে সেদিকে চোখ বুলাচ্ছে।নয়ন দোকানে যায়নি। কাল নাকি পরীক্ষা আছে তাই আজ বাড়ি থেকে পড়াশোনা করবে। কিন্তু কোথায় সে? সকাল হতেই নাকি বেরিয়ে পড়েছে ক্ষেতের উদ্দেশ্যে! বেলা গড়িয়ে এখন এগারোটা হলো বোধহয়,অথচ নয়নের খবর নাই! না খাওয়া আর না নাওয়া!
নয়নের পড়ালেখা শুরু করাতে আম্মা ভীষণ খুশি। তবে আশেপাশের মানুষেরা হাসাহাসি করছে। করুক;তাতে তাদের কি? মানুষের কাজই হলো অন্যের বিষয় নিয়ে সমালোচনা করা। কিন্তু তাই বলে কি নিজেদের ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখবে? তাও কিনা যেটাতে কেবলই ভালো হবে! মোটেই না! এই যে নয়ন সারাদিন খাটাখাটুনি করে এসেও বাচ্চাদের মতো তারার সামনে বই খুলে বসে; তারা স্কুলের সেই রাগী বদমেজাজি রাবেয়া শিক্ষিকার মতো নয়নকে পড়া বুঝায়! না পারলে,কান ধরিয়ে রাখে,আবার বুকের উপরে হাত ভাঁজ করে মুখটা গম্ভীর করে তার কাছে বিচার দিয়ে যায়,
-- শুনুন আপনার ছেলে ঠিকঠাক পড়াশোনা করছে না! এরকম করলে আগামী পরীক্ষায় সে পাশ করতে পারবে না! আমিও কিন্তু এমন ফাজিল পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে আমার স্কুলে দ্বিতীয়বার পড়ার সুযোগ দিবো না!
তখন আম্মাও অসহায় মায়ের মতো করেই বলে,
-- আ্যামন করিয়া কইয়েন না ম্যাডাম আফা; আমি ওরে বুঝামুনে যাতে ঐ আপনারে আর না জ্বালায়, ঠিকঠাক পড়াল্যাখা করে!
আম্মার কথায় হাসির রোল পড়ে চারিদিকে,তারা হেসে কুটিকুটি হয়ে যায়!আর নয়ন মুগ্ধ হয়ে দেখে সেই হাসি!আর নয়নের মুগ্ধতা জড়িয়ে ধরে আম্মাকে! সে ছেলের চোখে বউয়ের জন্য অগাধ ভালোবাসা দেখে,তার সাথে তারা নামের অতি অসাধারণ মেয়েটাকে যে কিনা নিজের চঞলতায়,প্রখর বুদ্ধি আর সততায় আঁচলে বেঁধে রেখেছে তাদের খুশিটাকে,নিত্যদিন সুন্দর করে তুলেছে তাদের জীবনটাকে!
আনমনে এগুলোই ভাবছিলো তার মধ্যেই উচ্চ শব্দ ভেসে এলো কাঙ্খিত কন্ঠস্বর,
-- আম্মা - আম্মা।
নয়নের ডাকে ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে দৃষ্টি ফেললো, সাইকেল রাখতে রাখতে নয়ন মাকে ডাকছিলো তাই দেখতে পায়নি মা যে বাইরেই আছে, আম্মা সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সদর দরজার পাশে আধ পাগল কাউকে দেখেই চোখ কুঁচকে ফেললো,পরধ জমলো কপালের চামড়ায়,কিছু মুহূর্তে সেই ভাঁজ আবার সোজা রুপে ফিরে আসলো,একটু বেশী টান পড়লো, কুঁচকে যাওয়া চোখ বড় বড় হয়ে গেল, অস্পষ্ট শব্দে বেরিয়ে এলো,
-- নুরি বু!
ততক্ষণে নয়নও মাকে দেখতে পেলো, মায়ের চমকে যাওয়া মুখ দেখে হালকা হেসে উত্তর দিলো,
-- হ আম্মা নুরি চাচী!
নয়নের গলার স্বর শুনে বাইরে এসে তারা দেখতে পেলো নুরি নামক বৃদ্ধাকে, চিনতে পারছে না ! পারারও কথা না! আগে কখনো দেখেনি তবে এতটুকু নিশ্চিত নয়নদের আত্নীয় নয়। কারণ তেমন কেউ হলে চিনতে পারতো। তবে কে উনি...
পর্ব ১৮
-- এক সময় অনেক না থাকলেও যা ক্ষ্যাত খামারি আছিলো তাই দিয়া তাগো বেশ ভালা চলতো! শুনছিলাম চাচীর পরপর তিন বাচ্চা মারা গ্যাছিলো! প্রথমজন জন্মের তিনদিনের দিন জ্বর আইয়া মরছিলো। তার পরের জন দেড় বছরের আছিলো, পানিতে ডুইবা মরছিলো। তহোন বরষা কাল আছিলো। এরপরের জন নাকি চাচীর প্যাডেই মারা গ্যাছিলো! পরপর তিন বাচ্চা মারা যাওয়ায় চাচীরে সবাই অলক্ষি কইয়া ডাকতো! চাচায় ভালোবাসলেও দিনশেষে সন্তানের জন্য হাহাকার তারেও অমানুষ কইরা তুলছিলো। এইর মইধ্যেই চাচীর শ্বাশুরি মানে দাদী চাচারে আবার বিয়া দিতে চাইলো, প্রথমে চাচা রাজী না অইলেও পরে ঠিকই অইয়া গ্যালো।
-- উনি সত্যি বিয়া করছিলো?
-- হ ; ঠিক পনেরোদিন পরে চাচায় নতুন বউ নিয়া হাজির অইলো! চাচী তিন সন্তানের শোকে এমনিতেই নির্বাক ছিলো সবসময়,তাইর মইধ্যে চাইরদিকের মানুষের নানা ধরনের কুট কথায় আরো চুপ অইয়া গ্যাছিলো আর সবকিছুই ছাড়াইয়া ছিলো চাচার আবার বিয়া করা! একদম একটি বোবা, শান্ত মানুষ!
চাচী যহোন এই এলাকায় বউ অইয়া আইছিলো তহোন নাকি অনেক চঞ্চল আছিলো,তার হাসিখুশি স্বভাব আর গায়ে পড়ে আত্নীয়তা গড়াই তারে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রিয় কইরা তুলছিলো! কিন্তু আল্লাহ কি বুইঝা; জানিনা!
যাই হোউক চাচা বিয়া করলেও চাচীরে বাড়িত থেইকা সরাই নাই,তার ঘরও পরিবর্তন করে নাই! বরং নতুন ঘরেই নতুন বউরে তুলছিলো ,রাইতে সপ্তাহের ছয়দিন নতুন চাচীর লগে থাকলেও একদিন এই চাচীর লগেই থাকতো! তাও নতুন চাচীর সইহ্য অইতো না, এদিকে চাচার ভয়ে কিছু কইতোও না, আবার আল্লাহ পাপ দিবো তাই দাদীও নতুন চাচীরে বুঝাইতো! যাই হোক সতিনের সংসার য্যামন অয় ত্যামনি আছিলো তাগো সংসার! চাচীর জীবনের সুখ ফিরাইয়া আনতেই আল্লাহ খুশির খবর দিলো তাও আবার নতুন চাচীর আগেই!
-- ক্যামন?
তারার আগ্রহী মুখ দেখে হাসলো নয়ন; এমন ভাবে কথাগুলো শুনছে যেন বড়সড় কেইসের ইতিবৃত্ত জানানো হচ্ছে! অবশ্য প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার পর থেকেই পড়াশোনায় আরো মনোযোগী হয়েছে তারা। এখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সে,এই তো গত কয়েকদিন আগেই তার তৃতীয় সেমিস্টারে পরীক্ষা শেষ হলো, এখনও ফলাফল আসেনি।তবে নয়ন শুনেছে অধ্যাপকরা সবাই তারাকে নিয়ে আশাবাদী! তাছাড়া আজকাল ছোট থেকে ছোট বিষয়ে তারা এমনভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে যেন কোর্টে বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে কুখ্যাত কোন আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে! ভালো লাগে নয়নের তারার এমন গুরুত্ব দিয়ে পড়াশোনা করাটা! নয়নের ভাবুক দৃষ্টি আপাতত তারার ভালো লাগছে না। সে আগ্রহী পরের অংশ টুকু শোনার জন্য; তাই কুটুস করে নয়নের হাতে একটা রাম চিমটি দিলো! লোমশ হাতের পুরু চামড়ায় এমন চিমটিতে আঁতকে উঠলো নয়ন! বেদনার্ত আর্তনাদ করে উঠলো! চোখমুখ কুচকে হাতের উপর দৃষ্টি পাতলো,বাম হাতের তালু দিয়ে উক্ত স্থান ঘষতে লাগলো,করুন চাহনি ফেলে তারার দিকে তাকালো! তারা নয়নের অবস্থা দেখে হেসে খুন হওয়ার উপক্রম! হাসতে হাসতে নয়নের উপরেই ঢলে পড়লো! নয়ন ছল করে রাগী দৃষ্টি ফেললো, শক্ত কন্ঠে বললো,
-- বেয়াদপ মহিলা স্বামীকে আঘাত করে এহোন আবার দাঁত বাইর কইরা হাসতাছে! ভয়ও করে না!
-- ভয় করবো ক্যান? আমি আমার স্বামীরেই আঘাত করছি, তাছাড়া এইটা সামান্য একটা চিমটিই দিছি! তাতে এত কানদোনের কি আছে! হুহ হ্যায় আবার ব্যাডা মানুষ!
-- আল্লাহ পাপ দিবো ; স্বামীরে মারার জন্য ভয়ঙ্কর পাপ দিবো! ভয় করো রমনী!
-- দিবো না কারণ আমার স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে নালিশ দেয় না আমি জানি!সে তার বিবিকে অনেক ভালোবাসে; তার কাছে এই চিমটি পিঁপড়ার কামড়!
-- তাই নাহ! সব বুঝেন আপনে! কিভাবে রাহেন আমার মনে খবর? হুম!
নয়ন কথা শেষ করেই তারাকে টেনে নিজের বাহুর বেড়িতে আঁটকে নিতে চেষ্টা করতেই তারা ছাড়িয়ে নিলো,এক ভ্রু উচু করে চোখ রাঙানি দেখালো,নয়ন অসহায় মুখে তারার পানে চেয়ে রইলো। মুহুর্তের মধ্যে তারা নিজের ভঙ্গি পরিবর্তন করে অনুরোধের সুরে বললো,
-- কন না কি অইছিলো তহোন? কি খুশির খবর আইলো?
-- চাচী আবারও মা অইবো!
-- হেইডা তো অওনেরই আছিলো! চাচীতো আর বাজ আছিলো না! আল্লাহ দিয়া নিয়া যাইতো!
-- হ তাতো আছিলোই তারপরও আমগো সমাজের লোককি আর তা বুঝে? যাই হউক; এই বাচ্চা নিয়াও চাচীরে আল্লাহ বহুত পরীক্ষা নিছে!
সতিনের সন্তান অইতাছে আর তার এহোনও খবর নাই, এই খবরে নতুন চাচী পাগল অইয়া যাওয়ার উপক্রম! হ্যায় প্রতিনিয়ত সংসারে ঝামেলা পাকাইতো, ইচ্ছা করিয়া চাচারে ক্ষেপাইতো চাচীর বিরুদ্ধে,চাচাও নতুন বউয়ের প্রেমে দিবানা অইয়া চাচীর গায়ে হাত তুলতো! এমনিতেই গর্ভবতী আছিলো তারমধ্যে চাচার মাইরে চাচী অসুস্থ অইয়া যাইতো প্রায় দিনই! দাদীর মায়া লাগলো, চাচীর প্রতি সদয় অইলো। চাচারে বুঝাইতে লাগলো,না বুঝলে গালিগালাজ করতো,দুই একবার তো চড় থাপ্পড়ও দিছিলো! এগুলো আবার নতুন চাচীর ভালা লাগলো না! হ্যায় চাচার পক্ষ নিয়া দাদীর লগে ঝগড়া করতো! চাচা আবার নিজের মায়ের বিরুদ্ধে কথা কওয়া পছন্দ করতো না! কিন্তু নতুন চাচী দাদীরে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতো তাই নিয়া চাচার লগে লাগতো নতুন চাচীর লগে!এমনেই যাইতেছিলো তাগো সংসার! প্রতিদিন কোন না কোন কিছু কারণ বানাইয়া নতুন চাচী ঝগড়া লাগাইতো আর তা গিয়া থামতো নুরি চাচীর শরীরের উপর চাচার হাত পইড়া! মাস পার অইতে অইতে চাচীর প্যাট বড় অইলো,হয়তো আল্লাহর রহমত অইলো তাই চাচার ভিতরে মানুষ ঢুকলো, নতুন চাচী যেভাবেই ঝগড়া বাধাউক চাচা নুরি চাচীর উপরে চড়তো না! তারে একাই ছাইড়া দিলো।নুরি চাচী কেবল দেইখাই যাইতো কিছু করার বা কওয়ার আছিলো না।দাদীও ততদিনে নুরি চাচীর সাথেই থাকা শুরু করলো। সময়ের তালে তালে অন্ধকার কাইট্টা চাচীর জীবনে দিশার আলো জ্বললো! আল্লাহর রহমতে আবারও চাচী পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন। তাও ভয় কমে নাই ঐ যে আগের তিনজনের জীবন নিয়া ভয়ংকর অতিত!
-- ঐ নতুন চাচীর কি কোন বাচ্চা অয় নাই?
-- নাহ,তার কোন বাচ্চা অয় নাই আর কোনদিন অইবোও না! মানুষের ক্ষতি যারা চিন্তা করে আল্লাহ তাদের জন্য উত্তম বিচার করে! ত্যামনি তার জন্যেও আল্লাহ ঠিকঠাক বিচার নির্ধারণ কইরা রাখছিলো!
-- মানে?
-- না তার কোন বাচ্চা অয় নাই।বিয়ার বয়স দুই পার অইয়া গ্যালেও চাচীর বাচ্চা অয় নাই দেইখা ডাক্তারের কাছে গ্যাছিলো আর ডাক্তার জানাইয়া দিছিলো হ্যার কোনদিন বাচ্চা অইবো না! তার পর থেইকা হ্যায় আরও ভয়ংকর অইয়া গ্যালো।
-- কি কন? কি করছিলো?
-- নুরি চাচীর পোলা অইলো, নাম রাখলো নুর আলম; আমরা ছোটরা সবাই তারে নুর ভাই কইয়া ডাকতাম! সহজ-সরল, হাসি খুশি একজন মানুষ ছিলো। ছোট বড় সবার প্রতি তার সদয় ব্যবহার আছিলো!
কথা শেষ করে নয়ন একটা বড় দম ছাড়লো।একটানা অনেকক্ষণ কথা বলছে! নয়ন এত কথা কখনো বলেনি; তাছাড়া এগুলো নয়নের নিজের চোখে দেখা অথবা সরাসরি জানাও নয়,সবটাই মা আর অন্য চাচী ফুফু, দাদীদের থেকে শোনা! নুর আলম ছেলেটার প্রতি তার অন্যরকম টান ছিলো।আপন বড় ভাই নাই,আত্নীয়দের মধ্যে যারা বড় ভাই আছে তাদের সাথে কখনোই ভালো সম্পর্ক নয়নের ছিলো না তার কারণ যখন নয়নদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিলো তখন তারা নয়নদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতো এটা বোঝার পর নয়ন নিজেও তাদের থেকে দুরে থেকেছে।যারা রক্তের টান ভুলে যায় টাকার হিসাবে তাদের সাথে কিসের সম্পর্ক! তবে এখন তারা সম্পর্ক সুন্দর করতে চায় কিন্তু নয়ন আগ্রহী হয় না তার কারণও সুস্পষ্ট! এখন নয়নের টাকা আছে আর এই টাকার ঘ্রাণই তাদের কাছে নয়নকে সমাদিত করছে যেটা নয়ন চায় না।আবার যদি কখনো নয়নের টাকা ফুরিয়ে যায় তবে তারাও পালিয়ে যাবে।তবে নয়ন নিজে না গেলেও তারা আসলে খারাপ ব্যবহার করে না আবার একদম গেড়ে বসার সুযোগও দেয় না।
রক্তের সম্পর্ক কখনো আত্নার সম্পর্কের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়! রক্ত কেবল পরিচয় বহন করে কিন্তু আত্না মানুষের বাঁচার জন্য একান্তই আবশ্যক!
পর্ব ১৯
নুরি চাচীর ছেলে হলো। নতুন চাচীর ভালো লাগলো না , এবং লাগবে না যে এটাই স্বাভাবিক! কিন্তু তিনি যে ভয়ংকর হয় উঠবে তা কেউ বুঝতে পারেনি। দিন যেতে থাকলো তার মধ্যে পুষতে থাকলো হিংসার অজগরের বাচ্চা,যা পরিনত অজগর হওয়ার অপেক্ষায় ছিলো। দিন গড়িয়ে হয়ে গেল নুর আলম দুনিয়ায় আসার তিন মাস। নতুন চাচী যেন সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো।
নুরি চাচী তিন মাসের নুর আলমকে পুকুর ঘাট থেকে বেশ দূরে শুইয়ে রেখেছিল রোদে রাখার জন্য,শরীর হালকা গরম হলেই গোসল করিয়ে দিবে তাই। নুর আলমের জন্য সরিষার তেল আনতে ঘরে যায়,ফিরে এসে কেবল খালি মাদুর দেখে ছলাৎ করে উঠলো তার অন্তর, চিৎকার করে চারিদিকে দৌড়াতে থাকে,তার চিৎকারে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে চাচা আলমগীর মৃধা। নুরি চাচীর অবস্থা আর চিৎকার শুনে বুঝতে দেরি হয় না ঘটনা কি? এর মধ্যেই আশেপাশে লোকজন এসে ভরে যায় পুকুর ঘাট,দাদী আবারও বিচ্ছিরি ভাবে গালিগালাজ করতে থাকে।এই সুযোগে নতুন চাচীও নুরি চাচীর নামে অপ্রতিভ কথা ছড়াতে থাকে! খোঁজ শুরু হয় । এদিকে ওদিকে।কেউ কিছুই বুঝতে পারছেনা। কেউ কেউ জ্বীন ভূতের গল্প সাজিয়ে বসে,কেউ কেউ চাচীর ভাগ্যের গননা শুরু করে দিয়েছে। হঠাৎ করেই শোনা যায় এক বাচ্চার চিৎকার!
-- এই পুকুরে পইড়া রইছে মনে হয়!
একটা লাইন মুহূর্তে পরিবেশ শীতল করে দিলো! চাচী চাচা দৌড়ে আসলো এর মধ্যেই কেউ একজন বাচ্চাটা তুলে আনলো।মনে করলো মারা গেছে! কিন্তু হয়তো আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্য কিছু তাই এবার আর নুরি চাচীর কোল খালি করলো না। কিন্তু তৎক্ষণাৎ বুঝতে একটু সময় লাগলো। বাড়িতে মরা কান্না জুড়ে দিলো নতুন চাচী যেন বাচ্চা নুরির নয় তারই ছিলো।যা মুখে আসছিলো তাই বলে নুরি চাচীকে সম্বোধন করছিলো,অকথ্য ভাষায় অনবরত গালি দিয়ে যাচ্ছিলো,তার সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিযোগীতায় নেমেছিলো দাদী।
বাচ্চা নিয়ে চাচা বুকে জড়িয়ে কাঁদতেছিলো আর বারবার ঝাকাচ্ছিলো নুরি চাচী দুরে বসে কেবল নির্বাক হয়ে দেখে যাচ্ছিলো আর বিরবির করে বলছিলো," সেতো অতদুরে রেখে গিয়েছিল তবে কিভাবে তার বাচ্চা পানিতে পড়লো।চাচীর বিরবির করে বলা কথায় কেউ কেউ কান না পাতলেও আবার কেউ ভীষণ গুরুতর ভাবে নিলো।কথা ছড়িয়ে পড়লো।সবাই মুখে মুখ আওড়াতে লাগলো "কিভাবে গেলো?" উত্তর পাওয়ার আগেই আল্লাহর রহমত হলো, বারবার ঝাঁকুনিতে বাচ্চা হিচকি তুলে শ্বাস নিলো।ছোট মুখ দিয়ে গড়গড় করে বমি করলো। পানির সাথে পেটের সবটা বেড়িয়ে আসলো! আল্লাহর রহমতে সেই ছোট্ট নুর আলম মায়ের কষ্ট অনুভব করলো তাইতো নির্ঘাত মরনের ঘর থেকে ফিরে আসলো!
নুর আলম বাঁচার খুশিতে তলিয়ে গেল নুর আলমকে হত্যার হোতা কে খুঁজে বের করার প্রশ্নটা!
আলমগীর নুরি চাচীকে যাতা বলে দোষারোপ করলো, নতুন চাচীর ছল কান্নায় ভুলে গিয়ে তার হাতে তুলে দিলো নুর আলমকে, অনিচ্ছুক হওয়া সত্ত্বেও নুরি চাচীকে অপদস্থ করার জন্য কোলে তুলে নিলো! একে একে চলে গেল সবাই শুধু ধূলোয় মাখামাখি হয়ে পড়ে রইলো নুরি চাচী পুকুর পাড়ের এক পাশে!
সারা বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হলো।অলক্ষি,অপয়া সহ নানা অপবাদ দিয়ে নুর আলমকে দুরে সরিয়ে রাখলো চাচা আর দাদী। এদিকে তিন মাসের নুর সারাদিন মায়ের ছোয়া না পেয়ে, বুকের খাবার না পেয়ে ছটফট করতে লাগলো, চিৎকার করে আর্তনাদ করতে থাকলো। আলমগীর গাইয়ের দুধ দুইয়ে একটা বাটিতে করে এনে নতুন চাচী ময়নার সামনে রাখলো।সে সবটা দাঁত চেপে সহ্য করে যাচ্ছিলো যা অলক্ষে রইলো আলমগীরের! ঘটনার ইতি ঘটলো রাতের প্রথম প্রহরে!
আলমগীর পেছনের বারান্দায় বসে চিৎকার করে নুরী চাচীকে গালিগালাজ করছিলো,কারণ কিছু সময় আগেই নুরি চাচী নূরকে ফেরত চেয়েছে।
কিন্তু আলমগীরের মায়ের পরামর্শ কোনভাবেই নুরির কাছে নুরকে দেওয়া যাবে না নয়তো এই বাচ্চাও মরে যাবে। আগের তিন বাচ্চা খেয়েছে এখন এটাকেও খাবে/নুরির সাথে বদ জ্বীনের ছোয়া আছে আর তারা চায় না নুরি বাচ্চা নিয়ে, স্বামী নিয়ে সংসার করুক।তাইতো পরপর বাচ্চা মরে যায়। আসলে এরা নিয়ে যায়। এরকম আজগুবি কথাবার্তা দিয়ে আলমগীরের কান ভরিয়ে দিচ্ছে যার প্রভাবে আলমগীর যা মুখে আসছে তাই বলে নুরি চাচীকে গালিগালাজ করছে।
ঐদিকে নুর আলম মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাঁদছিল,মেজাজ গরম হয়ে গেল ময়নার। এমনিতেই পরিকল্পনা বিফলে যাওয়ায় মন মেজাজ খারাপ হয়ে আছে তার মধ্যে বেশি হম্বিতম্বি দেখিয়ে নুরের দায়িত্ব নিলেও আপাতত তা মনে ধরছে না যতই হোক দিন শেষে এটা সতিনের অংশ! কোনভাবেই মন থেকে মানতে পারছে না।তার মধ্যে শোনা যাচ্ছে আলমগীর এই বাচ্চার দায়িত্ব তার কাঁধেই চড়াবে যা সে কোন মতেই চায় না। সে কেন সতিনের সন্তানের দায়িত্ব নিবে? তার নিজের সন্তানের দায়িত্ব নিবে কেবল সে।আর যদি কোনদিন তার নিজের বাচ্চা না হয় তবে সে নিঃসন্তান থাকবে তবুও সে সতিনের বাচ্চা পালবে না।
এরকম শয়তানি চিন্তা করছিলো আর নুরকে মারছিলো! আলমগীর নিজের চিৎকার চেঁচামেচি নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলো যে ঘরের ভেতরে ঘটমান খবরে বেমালুম!
নুরিকে মনের মতো গালি দিয়ে আলমগীর বেরিয়ে গেল, মিনিট তিরিশের মধ্যে আবার ফিরে এলো,দরজায় পা দিয়েই শুনতে পেল নুরের আতৎচিৎকার। দৌড় দিতে যেয়েও কি মনে করে ধীর পায়ে হেঁটে দরজায় টোকা না দিয়েই ঘরে ঢুকতেই শুনতে পেল ভয়ংকর কিছু কথা।
-- ইবলিশের কলিজা লইয়া দুনিয়ায় আইছিস? এত বড় পুকুরেও মরলি না! ভাবলাম তুই মরলে তোর মায়ের কপালের ভাত এই বাড়িত থে উইঠ্ঠা যাইবো,আমিও শান্তিতে সংসার করতে পারমু! মরলিতো নাই উল্টা আমার কান্দে আইয়া উঠছোস!মায় পোলা কি জান বাইন্ধা লইয়া আইছোস! মরোস না ক্যান? যতক্ষনে ফালাইয়া আইছি ততক্ষণে তো বুড়া ব্যাডারাও ডুইব্বা মরতো তাইলে তুই বাইচ্চা রইলো ক্যামনে!
আর কিছু শোনার ধৈর্য্য আলমগীরের ছিলো না।ময়না নিজের মনের ঝাল মিটিয়ে নুরকে মারছে তার সাথে নিজের কুকীর্তি স্বীকার করে নিচ্ছে! আলমগীর দৌড়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল, দরজায় খট করে শব্দ হওয়াতে ময়না ভয়ার্ত চোখে সেদিকে তাকালো, বুঝতে চেষ্টা করলো কেউ ছিলো কিনা; তার কথা শুনলো কিনা?দেখার জন্য হাত থেকে ছেড়ে দিলো নুরকে,নুর গিয়ে পড়লো বালিশের উপরে, ছোট্ট তুলতুলে শরীর বালিশে পড়েও যেন ব্যাথা পেল, আবারও চিৎকার করে উঠলো।ময়না সেদিকে কর্ণপাত না করে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে যেতেই বাম বাহুর উপরে আলমগীরের গজারির বারি পড়লো! বেদনার্ত শব্দ করে চিৎকার দিয়ে উঠল ময়না।
নুরের চিৎকার এত সময় ময়নার ঘরের বেড়ার সাথে মাথা ঠেকিয়ে অসহায়ের মতো শুনছিলো নুরি সাথে তার নিরব বোবা কান্না চলছিলো! হঠাৎ করেই ময়নার চিৎকার শুনে ঘুরে এসে উঠানের মাঝ বরাবর এমন দৃশ্য দেখতে থমকে যায়, মিনিটের মধ্যে পুরোপুরি উঠোন ভরে যায় আশেপাশের লোকজন দিয়ে। কাউকে কিছু বলছে না তবে অবিরত হয়ে শুধু গজারি দিয়ে ময়নার পিঠের মালিশ করছে। অনেকেই কারণ জিজ্ঞাসা করছে কিন্তু আলমগীরের যেন হুশ নেই।মার খেতে খেতে ময়না বেহুঁশ হয়ে যায়,কেউ কেউ ভাবে মারা গেছে। ভয় পেয়ে যায় সবাই কিন্তু তখনও শান্ত হয় না আলমগীর!
নিজের মায়ের আদেশে থামে,মারার কারণ জানতে চাইলে চিৎকার করে বলতে থাকে,
-- ঐ একটা রাক্ষসি, আমরা এতটুকু বাচ্চার লগেও ওর হিংসা করা লাগে!কত বড় কলিজা থাকলে ঐ আমার অতটুকু পোলারে পানিতে ফালায়া মারতে চাইছে!
কারন সবাই বুঝে গেল।সবাই ময়নাকে গালিগালাজ করতে থাকলো।কেউ কেউ মারার কথা উল্লেখ করে বললো,"উচিত হয়েছে!"
পরের দিন এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ থেকে চেয়ারম্যান সহ সবাই উপস্থিত হয়ে ময়নাকে তালাক দিলো আলমগীর!তালাক দেওয়ার সময় দেনমোহর শোধ করার বিষয়টি তোলা হলো। তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে পারবে না জানালো আলমগীর। রাজী হলো না ময়না।হয় তখনই টাকা দিবে নয় সে তালাকের কাগজে সই দিবে না। বাধ্য হয়ে সমপরিমাণ মূল্যের জমি তার নামে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।
যেহেতু কোন প্রমান ছিলো না সেহেতু তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারলো না।আবার রাতে মারার কারণে তার অবস্থা খারাপ,যেটা নিয়ে ময়নার পরিবার আলমগীরের উপরে চড়াও হয়।তাকে নারী নির্যাতন মামলার ভয় দেখায়। আলমগীর মা ছেলেকে বাঁচাতে কোন আইনি ঝামেলায় না গিয়ে শুধু তালাক দেওয়ার কথা বলে।মাতৃভক্ত আলমগীর তাই মান্য করে নেয়। অবশেষে সম পরিমাণ মূল্যের জমি নিজের নামে লিখে নিয়ে ময়না বিদায় হয় আলমগীর নুরির জীবন থেকে!
পর্ব ২০
বহমান নদীর স্রোতের মতোই চলে গেল অনেক গুলো বছর, ছোট্ট নুর বড় হতে থাকে,বয়সের বেলা গড়িয়ে ছয়ে পা দেয়! শৈশবময়তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে চারদিকে, দুরন্তপনা আর চঞলতায় হয়ে উঠেছে সবার চোখের তারা।নুরি চাচীর একমাত্র সম্বলের তকমা লাগিয়ে পুরো আঙ্গিনায় নিজ আধিপত্য দাপিয়ে চড়ায়। তেমনি এক দ্বিপ্রহরের
চরম উৎকর্ষতায় নিজের চঞলতায় মেতে নারিকেল গাছের খরখরাতাকে পায়ের নিম্নে পিষে উপরে উঠার বাজী ধরে, কিন্তু ভয়ংকরভাবে নিচে পড়ে বেশ জোরালো আঘাত পায়।
ডাক্তারের ভাষ্যমতে কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল,তার সাথে মাথায় বেশ আঘাত পায় যাতে ভেতরে স্নায়ুকোষ দুর্বল হয়ে পড়ে,বলা হয়েছিল কখনো কখনো নুর মাথার যন্ত্রনায় পাগলামী করতে পারে, যন্ত্রনার তীব্রতা সইতে না পেরে নিজেকেই আঘাত করবে। ডাক্তারের কথায় নুরি আর আলমঙ্গীর মৃধা পাগলের ন্যায় অস্থির হয়ে পড়ে, একমাত্র ছেলের এমন মরনব্যাধি মেনে নিতে নারাজ ছিলো, সহায় সম্পত্তি যা ছিলো তার অধিকাংশই বিক্রি করে দেয় নুরের চিকিৎসার পিছনে!
সঠিক চিকিৎসায় নুর কিছুটা সুস্থ হলেও পুরোপুরি হয়নি,মাথার ব্যথা থেকেই যায় তবে তা কিছুটা সময়ের জন্য। অবশ্য ডাক্তার বলে দিয়েছে এটা সাময়িক ব্যথায় পরিনত হলেও এর জন্য ভুগবে সারাজীবন! কিন্তু অতিরিক্ত মানসিক চাপে ভয়াবহ রুপে আকার নিতে পারে।
নূরের চিকিৎসার জন্য জমিজমা বেঁচে দেওয়ার পর কেবল ভিটা জমিনটুকুই ছিলো, আলমগীর চাচা অনেক কষ্টে সংসার খরচ চালাতো,পরের জমিতে চাষ থেকে শুরু করে গঞ্জে দোকানের সহকারীর কাজ সবই করেছে, অনেক বছর পর অনেক কষ্টে এক খন্ড চাষের জমি কিনতে সক্ষম হয় ততদিনে নূর সাবালক হয়ে উঠে, পড়াশোনার পাঠ ইতি টেনে আট ক্লাস অবধি পড়ে। এরপর নূর আর স্কুলে যায়নি,তবে সংসারের দায়িত্ব নিতে বাবার সাথে ক্ষেতে কাজ করেছে,কখনো কখনো অন্যের জমিতে বর্গা দিয়েছে।
কিন্তু জীবন সবসময় একই স্রোতে বহমান রয় না।তার উচাটন বয়েই চলে,কখনো সুখি তো কখনো দুঃখী।নুরের জীবনেরও সুখের পায়রা উড়ে গিয়ে রেখে গেছে দুঃখের খালি খাঁচার হাহাকার।
হঠাৎ এক রজনীর নিস্তব্ধতা ভেঙে নুরি চাচীর আর্তনাদে জেগে উঠে পুরো গ্রাম।ঘুমের ঘোরেই আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমান আলমগীর মৃধা।হালকা জ্বরে কাবু ছিলো কয়েকদিন,বুকের ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেও বিশেষ কোন ভাবান্তর ছিলো না চিকিৎসা নেওয়ার ব্যাপারে।নুর শত বলেও তাকে চিকিৎসার জন্য নিতে পারেনি। অনেকেই ধারনা করেন বুকের ব্যথায় মৃত্যু ঘটলো যাকে শুদ্ধ চিন্তায় বলা যায় হৃদরোগে মারা গেলো।
সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়লো নুরের কাঁধে।খুশি মনে সবটা সামলে নিলো।বাবার রেখে যাওয়া এক খন্ড জমিতেই সোনা ফলালোর আপ্রান চেষ্টা করে গেলো, অর্থের ছড়াছড়ি না হলেও মা ছেলের সুখের তরী আবারও বইতে থাকলো, কাটছিলো দিন!
বয়স যখন ২৫ তখন এক সুশ্রী রমনীর মুগ্ধতায় জড়িয়ে পড়লো নুর,পাশের গ্রামে কাজে গিয়েছিল, তখনই দেখতে পায় সদ্য ১৯ পেড়োনো এক মায়াবী রমনীর লম্বা গোছার কৃষ্ণবেনী,ডাগর ডাগর কাজল লেপা নয়ন-জোড়া, আল্পনায় রং মিশেলে সৃষ্টি হওয়া ওষ্ঠের ভাঁজ শীতলতা বিলিয়ে দিয়েছিলো নুর নামক পুরুষের সর্বাঙ্গে। নিজেকে ধ্বংসের পণ করে মায়ের নিকট তুলে ধরে নিজের আবদার।
পিতা ছাড়া একমাত্র পুত্রের ইচ্ছা পূরণের জন্য ঠিক তার পরের সপ্তাহেই সেই মেয়ের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হয় নুরি চাচী,খবর নিয়ে জানতে পারে মেয়েদের অবস্থাও তাদের মতোই, তবে মেয়ের ঘরেও সৎ মা।মেয়ের নিজের মা তাকে জন্ম দিয়েই নাকি কার সাথে পালিয়ে যায়। এরপর মেয়েকে মানুষ করতে তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলেও আদৌও মানুষ হয়েছে কিনা কে জানে!
নুরি চাচী খবর নিলেন কোন বদনাম নাই মেয়ের নামে,মেয়ে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়ে। মেয়ে পড়তে চাইলেও বাবার সামর্থ্য আর সৎ মায়ের না খুশির কারনে ঠিকঠাক পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হয় না।তাই বাবার ইচ্ছা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দিয়ে মেয়েকে তার নিজ গন্তব্যে প্রেরন করবে।কথা অনুযায়ী কাজ।
ঠিক মাসের মধ্যেই খুব ঘটা করে না হলেও মোটামুটি আয়োজন করে ঘরে বউ তুলে নুর মৃধা। সুন্দরী রমনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ আড়শিপড়শি সকলে,আর সেই খুশিতে বুকের ছাতি যেন চওড়া হয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেল, নিজের পছন্দের তারিফ করতে নিজেই উতলা হয়ে পড়লো নুর মৃধা।
সংসার সংসার খেলায় নুর ডুবে গেল সুন্দরী বউয়ের মোহে,আবিষ্ট হলো ভালোবাসার জালে! কিন্তু সবই কি এত সহজ? তাসের ঘরের ন্যায় একদিন ভেঙে পড়লো নুরের স্বপ্নের পৃথিবী; হাওয়ায় মিলিয়ে গেল শতশত প্রেমবাক্য।বিলিন হলো সমস্ত আকাঙ্ক্ষা যার প্রভাবে নুর মৃধা হলো আধ পাগল!
একদিন হুট করেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গায়েব হলো নুরের সুন্দরী বউ লায়লা।খবর নেওয়া হলো চারদিকে, প্রথমে কেউ কিছু জানাতে পারলো না। কিন্তু হুট করেই মাস দুয়েক পরে গ্রামের মোড়ল এসে উপস্থিত হলো নুরের বাড়ির উঠোনে,জানান দিলো নুরের অসুস্থতার কথা শুনিয়ে তার কাছে সম্পত্তি বন্ধক রেখে লায়লা লাখ খানেক টাকা নিয়েছে এবং তাতে নুরের সম্মতি ছিলো। কিভাবে?
জানতো চাইলো নুরসহ উপস্থিত সকলে,মোড়ল দেখালো নুরের সইসহ দলিলের কাগজ। যাতে স্পষ্ট লেখা ছিলো নুর স্বেচ্ছায় তার ক্ষেতি জমি তার স্ত্রীর নামে লিখে দিলো এবং সে যা চাইবে তাই করতে পারবে এই সম্পতি নিয়ে।
মোড়লের কথায় সবাই আকাশ থেকে পড়ার মতো চমকে উঠলো,নুর হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো! কখন কিভাবে সে লায়লাকে সব লিখে দিলো? মনেই তো পড়ছে না! আর কেনই বা লিখে দিবে? তার কোন যথাযোগ্য যুক্তি তো নাই। কোনভাবেই নুর মনে করতে পারলো না; এমন কিছু সে করেছে!
-- বিশ্বাস করেন মোড়ল সায়েব আমি এই বিষয়ে কিছুই জানিনা; তাছাড়া হ্যায় আইজ মাস দুই ধইরা গায়েব,কই গেছে কার লগে গেছে কিছু্ই জানিনা!আমি তো তার খোঁজে পাগলের মতো দৌড়াইতাছি!
-- তুমি কি কইতে চাও আমি মিছা কইতাছি?আমার হাতের কাগজগুলান কি মিছা মনে অইতাছে?
-- না মানে;
-- হুনো মিয়া বউয়ের পিরিতে অন্ধ অইয়া কহোন লেইখা দিছো হেইডা নিজেই ভালো জানো! আর নাইলে তোমার বউ তোমারে বেকুব বানাইয়া কুন সময়ে লেইখা নিছে হেইডা হ্যায় জানে! শিক্ষিত মাইয়া মানুষ আছিলো হুনছিলাম,বড় কলেজে পড়ে! তার বুদ্ধি কি কম নাকি? খবর লইয়া দ্যাহো কলেজের কোন পোলার লগেই ভাগছে নাকি?
হেইয়া যাই অউক! আমার দরকার আমার টেহা! টেহা না দিলে আমি বাড়ি দখল নিতে বাইধ্য অমু।
নুর অসহায়ের মতো চেয়ে রইলো মোড়লের দিকে,বাড়ি দখল করবে তার সেদিকে ধ্যান যায়নি,কানে বাজছে 'কুন পোলার লগে ভাইগ্গা গ্যাছেগা ' ! 'আচ্ছা আমি কি কম ভালোবাসছি? তার কি দরকার আছে,অন্য ব্যাডার হাত ধরনের?'
-- দ্যাহেন আপনে না জাইনা আমার বউয়ের সম্পর্কে উল্টাপাল্টা কথা কইতে পারেন না,অইতেও তো পারে আপনে মিছা দলিল লইয়া আইছেন; আমি কহনোই আমার বউরে সম্পতি লেইখা দেই নাই!তাইলে হ্যায় হেই সম্পতি আপনের কাছে ব্যাচবো ক্যামনে? তাছাড়া আমি কোনদিন অসুস্থো অইনাই! এমন অসুস্থ তো অইনাই যার জন্য সম্পত্তি ব্যাচন লাগবো!
-- হুনো নুর তুমি যে বউ পাগলা তা সবাই জানে; পুরা সুন্দরগঞ্জ বাসী জানে তুমি বউয়ের ন্যাওটা! বউয়ের অইয়া মায়ের লগে ঝগড়া করো,হেই খবরও কানে যায় আমগো! আর তুমি কইলা আ্যামন রোগ নাই যার জন্য সম্পত্তি ব্যাচন লাগবো! আরে মিয়া তুমি তো জাতপাগল; জন্মের পর বাপের সহায়সম্বল ব্যাচতে বাইধ্য করছো, তারপরও সুস্থ অওনাই; আজীবনের পাগলামি রোগ লইয়া জীবন কাটাইতাছো।তোমার মাথায় যে সমস্যা আছে তাতো পুরা গ্রামই জানে তাই আমি ভাবছিলাম হাছাই অয়তো তোমার সমস্যা আবারও শুরু অইছে,তাই কোনদিকে না ভাইবা ছ্যাপ দিয়া গুইনা তোমার বিবিরে লাখ টেকার বান্ডিল দিছিলাম! তহোন কি জানতাম হ্যায় নাগরের হাত ধইরা পলাইয়া যাইয়া আমারেই বাটপার বানানোর লাইন করছে?
আর কি কইলা , আমার দলিল ভুয়া? আমি মিছা কথা কইতাছি? পারলে প্রমান কইরা দ্যাহাইয়ো এই কাগজ ভুয়া,আমি মিছা কথা কইতাছি!
আইজকা যাইতাছি তয় আমি এই সপ্তাহের শ্যাষে আবার আমু তহোন অয় টেকা আন অয় জমিন একটা লইয়া তারপর এই জায়গা ত্যাগ করমু!
মোড়ল নিজের দাপট দেখিয়ে চলে গেল ,রেখে গেল অসহায় নুর আর বৃদ্ধা নুরিকে!
নুর থম মেরে বসে রইলো! মাথায় বারবার চাপ দিয়ে ভাবতে লাগলো, কিন্তু কিছুই মনে পড়লো না।অনেক সময় পেরিয়ে ধীরে ধীরে সবাই বাড়ি ছেড়ে যার যার বাড়িতে চলে গেল,নুরি চাচী উঠোনে থাকা পেয়ারা গাছের গোড়ায় বসে আল্লাহর কাছে বিচার দিতে থাকলো, নুর কিছু একটা ভেবে নিজের ঘরে গেল, আশেপাশের আত্নীয় স্বজনের কেউ কেউ এখনো বসে আছে, আফসোস করছে তো কেউ নানা কথায় লায়লাকে গালিগালাজ করছে!
ঘরে গিয়ে লায়লার পড়ার টেবিল ঘাটতে লাগলো,যদি কিছু পায়! পেলো না তেমন কিছু! হুট করেই লায়লার জন্য বানানো ট্রাংকটা চৌকির নিচ থেকে বের করে খুলে ফেললো,বিয়ে উপলক্ষে পাওয়া লায়লার যাবতীয় দামি উপহার এখানেই লায়লা সংরক্ষণ করতো তা স্বর্ণ থেকে শুরু করে রুপোর অলংকার সব। কিন্তু আশ্চর্য কিছুই নেই সেখানে! পুরানো কাপড় ছাড়া দামি কোন অলংকার নেই! নুর স্তব্ধ হয়ে গেল! এই ট্রাংক লায়লা ছাড়া কেউ ধরতো না। একবার নুরের এক চাচাতো বোন ধরেছিল বলে লায়লা অনেক অশান্তি করেছিল,তার প্রতিবাদ করায় নুর লায়লার হয়ে নিজের মায়ের সাথেও ঝগড়া করেছিল!সেই রাত নুরি চাচী না খেয়ে ঘুমিয়েছিল! লায়লা তো ডাকেই নাই,নুরও মাকে গিয়ে খাওয়ার জন্য বলেনি। ভাবতেই চাপা আর্তনাদে বুক ভারী হয়ে উঠলো নুরের!
তবে কি মোড়লের কথাই সত্য? মনে মনে নিজেকে প্রশ্নটা করলো নুর! পরক্ষনেই আবারও টেবিলের দিকে গেল।খাতা,বই নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবতে লাগলো কখনও এমন কিছু করেছে কিনা? না মনে পড়ছে না!
সেদিন রাত পেরিয়ে পরের দিন কাক ডাকা ভোরে রওনা দিলো নুর লায়লার গ্রামে; উদ্দেশ্য লায়লার বাবা মাকে জেরা করা!
লায়লার বাবা মায়ের সাথে কথা বলার সময় তাদের হতভম্ব রুপ দেখে বোঝা গেল তারা এ ব্যাপারে কিছুই না; যদিও লায়লার বাবা মেয়ে যে এমন কাজ করতে পারে তা বিশ্বাস করতে পারছে না , কিন্তু তার সৎ মা ঠিকই রসিয়ে রসিয়ে পাড়া প্রতিবেশীকে জানানোর কাজ শেষ করলো! নুর খোজ দিতে বললো লায়লার আপন মায়ের! লায়লার বাবা বললো তার সাথে যোগাযোগ নেই বহুবছর,তবে তিনি লায়লার নানীর বাড়ির ঠিকানা দিলো!
নুর সেখানে গিয়েও লায়লাকে পেলো না তবে যা পেয়েছে তা ছিলো নুরের জন্য খুবই খারাপ সংবাদ! হ্যা; লায়লা তার নানা বাড়ির গ্রামের এক ছেলের হাত ধরেই গ্রাম ছেড়েছে!
ছেলের সাথে পরিচয় নানা বাড়িতে বেড়াতে গিয়েই হয়,বেড়াতে গিয়ে একবার পুরো একমাস ছিলো । তখন থেকেই প্রণয়ের সুচনা যার কথা কানে যেতেই লায়লার বাবা লায়লাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে,এর মধ্যেই প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয় নুরি।তাই তিনি আর কোনরকম ঝুঁকি না নিয়ে লায়লার মতের বিরুদ্ধে গিয়েই বিয়ে দিয়ে দেয়। লায়লা বাবার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেনি তাই তখন চুপচাপ বিয়ে করে নেয়।
বিয়ের পর মাস তিনেক ঠিকই চলছিলো, কিন্তু দুষ্ট বুদ্ধি মস্তিষ্কে ঢুকে আবারও বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে!যখন বান্ধবীদের সাথে কথার তাল মেলাতে গিয়ে পুরানো প্রেমিকের কথা বেরিয়ে আসে। হুট করেই সুপ্ত অনুভূতি সজাগ হয়,নানা বাড়ির গ্রামের এক বান্ধবীর মাধ্যমে আবারও যোগাযোগ হয়।ঐ সময় ছোটখাটো বিষয়ে নুরের সাথে তর্ক হয়েছিল যার কারণও ছিলো নুরি! বয়স্ক অসুস্থ নুরির সেবা নিয়ে ঝামেলা করায় নুর ধমক দিয়েছিল বলে নুরের প্রতি মনোক্ষুণ্ন হয় এবং পুরাতন প্রেমিকের সাথে কাটানো কিছু মুহূর্ত মনে পড়ে যায়।দেখা হয় ,কথা হয়। পরপর কয়েকদিন একসাথে ঘোরাঘুরি হয়।এর মধ্যেই ঘটনা ঘটে আরও একটা।
ছোট বেলায় পড়ে যাওয়ায় যেই আঘাত নুর পেয়েছিল তার জন্য মাথায় সমস্যা ততদিনে দেখা না দিলেও কোমরে ঠিকই সমস্যা দেখা দেয়, বিয়ের পর প্রায় রাতই নুরের কোমরে ব্যথা করতো যার প্রভাব পড়তো তাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের সময়। লায়লার মনে হতে লাগলো নুর শারীরিক মিলনের জন্য অক্ষম।তার শারীরিক অসুস্থতার জন্য নুরকে কাছে টেনে কখনোই লায়লা তৃপ্তি পেতো না! তার মধ্যে কারো থেকে শুনেছিল নুরের মানসিক সমস্যা হতে পারে,শিক্ষিত তবে সুশিক্ষিত নয় বলেই লায়লা এইসব অহেতুক কারণ বলে নিজেকে অসহায় বানিয়ে পুরানো প্রেমিকের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয় যার প্রভাবে সেই ছেলে লায়লাকে নিয়ে ঘর করার স্বপ্ন সাজায় কিন্তু বাঁধ সাধে তার আর্থিক অবস্থা!
পালিয়ে যাওয়ার সপ্তাহ আগে সেই ছেলে প্রস্তাব দেয় তার সাথে পালিয়ে যাওয়ার।বোধ বুদ্ধি লোপ পাওয়া লায়লা ডান বাম না ভেবে রাজী হয়ে যায়।
সাজায় একটা কুৎসিত পরিকল্পনা। যেহেতু টাকার অভাব তাই টোপ হিসেবে ব্যবহার করে সহজ-সরল নুরের বউ প্রীতিকে!মাঝ রাতের ভালোবাসায় জড়িয়ে আবেগ তাড়িত করে নিজেদের তৈরি করা কাগজের খসড়ায় নুরের সই নেয়, ঘুমিয়ে পড়ার পর পাকাপোক্ত দলিলের নির্দিষ্ট পাশে টিপ সই নেয়। সবরকমের সতর্কতা অবলম্বন করেই লায়লা ভয়ংকর এই কাজটি সম্পন্ন করে।
নুর ক্ষুনাক্ষরেও টের পেল না তার পাশে থেকেই তার সহধর্মিণী তাকে নিঃস্ব করার পরিকল্পনা করেছে।সেই রাতের সপ্তাহ পেরোনোর পরই এক ভোরে নিজের বইয়ের ব্যাগে সমস্ত গহনা আর ভালো ভালো কিছু কাপড় সহ দলিল নিয়ে নেয়।নুর অবশ্য সেদিন সারারাত কোমরের ব্যথায় কাতরিয়েছে, লায়লা সেই অসুখের কথা রসিয়ে বিশাল রোগের পাহাড় বানিয়ে মোড়লের থেকে দলিলের বিনিময়ে টাকা নিয়ে নেয় তার সাথে শেষ করে নুরের সাথে জীবনের গল্প!
নামিয়ে যায় ধ্বংসের পাথেয়,করে দেয় বিলিন এক অসহায় জীবনের ছন্দ।
চারদিকে নুরের এমন বেকুবিপনার কথা ছড়িয়ে পড়লো,কেউ কেউ হায়হুতাশ করে নুরের দুর্ভাগ্য নিয়ে আফসোস করতে লাগলো তো কেউ বাড়ি বয়ে এসে দুচারটা ত্যাড়া কথায় আঘাত করে যেতো।
ঘুমের ঘোরে বউ সব লিখে নিছে এটা কেউ জানলো না তবে আন্দাজ করে নিলো হয়তো নুর ভালোবাসায় অন্ধ হয়েই সবটা লিখে দিছে। নুরেরও কিছুই মনে পড়লো না। কেবল এক রাতে সাদা কাগজে সই দিয়েছিল,কথা হয়েছিলো কিছু নিজস্ব ধারায়,তার মাঝেই এক মুহূর্তে লায়লা হঠাৎ সাদা কাগজ সামনে ধরে বলেছিল,
-- আপনার হাতের সইটা ক্যামন দ্যাখান তো।আমার তো ঠিকঠাক সই'ই অয় না।
খেলার ছলে সব লিখে নিয়ে বিক্রি করে দিয়ে গায়েব লায়লা।আজ অবধি কেউ লায়লার খোঁজ পায়নি। না পেয়েছে সেই ছেলের খোঁজ।যদিও ছেলের পরিবারের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। তবুও,তারাও এই বিষয়ে বেমালুম! যেকোন ব্যবস্থা নিতে পারে তাদের ছেলের বিরুদ্ধে তাতে তাদের কোন মাথা থাকবে না বলেই তারা আশ্বস্ত করে।আইনিভাবেও সাহায্য নিয়েছিলো নুর কিন্তু কোন হদিসই দিতে পারেনি কেউ।
মায়ের চোখের অবিশ্বাস আর কথার তীর, আশেপাশের মানুষের কানাঘুষা,লায়লার তাকে ছেড়ে যাওয়ার অজানা কারণ সব মিলিয়ে অতিরিক্ত মানসিক চাপ নুরের সেই সুপ্ত অসুখ জাগিয়ে তুলে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার সাথে সাথেই শরীরের যন্ত্রনআ বৃদ্ধি পেলো।
শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে ডাক্তারের সরনাপন্ন হতেই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পথেই দেখা হলো লায়লার এক বান্ধবীর সাথে। নানারকম জিজ্ঞাসা পর্বের একক্ষনে লায়লার বান্ধবী বললো তাদের সাথে নাকি লায়লা ভাগ করেছিল নিজের দুঃখ, বলেছিল নুর শারীরিক ভাবে সুস্থ নয়।
মেয়েরা সচরাচর নিজের জীবনের এমন গোপন তথ্য একমাত্র বোন,ভাবী অথবা বান্ধবীদের সাথেই ভাগ করে।তেমনি লায়লা ভাগ করেছিল তার আর নুরের মাঝের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের সময়ে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা নুরের শারীরিক অবস্থার কথা।যাতে স্পষ্ট বুঝিয়েছে নুর শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে অক্ষম।লায়লার তার জৈবিক চাহিদা নুরের সাথে থেকে ঠিকঠাক পাচ্ছে না।
লায়লা চলে যাওয়াতে যতটা কষ্ট পেয়েছে তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি পেয়েছে এমন অপবাদে, লায়লার বান্ধবী কথাগুলো বলার সময় এমনভাবে বলেছে যাতে স্পষ্ট ছিলো নুরের জন্য বিদ্রুপ আর অবজ্ঞা! সহজ মনের নুর মানুষের কপটতা না বুঝলেও অপমান ঠিকই বুঝে।
ডাক্তারের কাছে আর যায়নি ,সোজা বাড়ি চলে যায়। নুরের সাথে নুরের এক দুঃসম্পর্কের চাচাতো ভাই ছিলো,তার সামনে এমন কথায় নুর আরও বেশি অপমানিত হয়।বয়সে ছোট ভাইয়ের সামনে স্ত্রীর বান্ধবী তার পুরুষত্ব নিয়ে বিদ্রুপ করেছে , কথাটা তার মাথায় সারা পথে ঘুরপাক খেয়েছো। শরীরের কষ্ট প্রকট আকার ধারণ করে,মনের উপরে চাপ বেড়ে যায়।মাথার যন্ত্রনা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। পাগলামি শুরু করে দেয়। নুরের পাগলামি দেখে অনেকেই আতংকিত হয়ে যায়।
চলতি পথে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে সমস্যা কি।কেউ কেউ নিজের থেকেই বলে," বউ চইলা যাওয়াতে পোলাডা আ্যামন পাগল অইয়া গ্যালো? আহারে পেরেম; মানুষের জীবনের সাথেও ক্যামনে খ্যালোস?"
অনেকেই আবার নুরের ভাইকে ধরে জিজ্ঞেস করতে থাকে,সদ্য ১৫ পেরিয়ে ১৬ তে পা রাখা এই কিশোর না বুঝেই সবটা খুলে বলে!যা শুনে অনেকেই অদ্ভুত নজরে দেখতে থাকে আধপাগল হওয়ার উপক্রম নুরকে।
শুরু হয়ে যায় ফিসফিস, গুনগুন শব্দে আলোচিত হয় নুরের পুরুষত্ব নিয়ে।
সহ্য হয় না এত শোরগোল,চুপ করে ঘরে উঠে খিল দেয় দরজায়। হঠাৎ করেই ছেলেকে ফিরতে দেখে নুরি চাচী হতভম্ব হয়ে যায়।ডাক্তারের কাছে গেলে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার কথা।অথচ বাড়ি থেকে বের হলোই মাত্র ঘন্টা তিনেক,আর সন্ধ্যা হতে এখনও ৪/৩ঘণ্টা বাকি। নুরকে ডাক দিলো কোন সাড়া দিলো না নুর।নুরি চাচী কিছু সময় দরজায় আঘাত করে হতাশ হয়ে ফিরে গেল,কদিন ধরেই নুর এমন একা থাকে,কারো সাথে কথা খুব একটা বলে না।তাই বেশি না ভেবে চলে গেল,সেই কিশোরের নিকট। পুকুর ধারে বসে সে সবার কথায় তাল মিলিয়ে সেভাবেই উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলো,তখনই নুরি চাচী গিয়ে জিজ্ঞেস করায় তাকেও সবটা খুলে বলে।
সবটা শোনার পর মা হিসেবে তার কি উচিত বুঝলো না, বৃদ্ধা নুরি আল্লাহর কাছে ছেলের জন্য ধৈর্য্য আর লায়লার নামে নালিশ করে উঠোনের এক কোনে বসে রইলো,সেয়ানা ছেলের সাথে এই বিষয়ে মা হয়ে কথা বলা যায় না।এই মুহূর্তে উনি নুরের বাবাকে খুব দরকারি মনে করলেন।
সারা দুপুর পেরিয়ে বিকেল হয়ে সন্ধা গড়াতেই তিনি আবারও নুরের দরজায় করাঘাত করে, অনেক সময়ের ব্যবধানেও নুরের দরজা না খোলায় চিন্তিত হয়ে পড়েন, তারমধ্যেই আশেপাশের আত্নীয়দের মধ্যে কেউ কেউ চলে আসছে,সবাই ডাকছে কিন্তু কোন সাড়া পেলো না অবশেষে দরজা ভাঙার প্রস্তুতি নেয় এবং ভেঙেও ফেলে। এরপর যা দেখে তাতে নুরি চাচীর পৃথিবী হিলে যায়।
পর্ব ২১
ভাতের থালায় নিবদ্ধ আঁখির অশ্রুধারায় কতশত অভিযোগ বর্ষিত হচ্ছে রবেব প্রতি তা কেউ ঠাহর করতে সমর্থ নয়।মুষ্ঠিগত দানাগুলোও হয়তো এই অর্ধশত বর্ষের নিকটবর্তী বৃদ্ধার হৃদয়ের কান্না খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে।
তারা একমনে দেখে যাচ্ছে তার সামনে অশ্রুপাত ঘটাতে ঘটাতে মুষ্ঠিমেয় দানাকে কোনমতে নিজের গালে পুড়ে থুরথুরে, রোদে পুড়ে কালশিটে হয়ে যাওয়া চিকন ওষ্ঠদ্বয়ের চাপে আগলে রেখে, ভেতরের চাপা কান্নার ঝড়টাকে ঢেকে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা।
তারার খুব খারাপ লাগলো।তারও খুবই কান্না পাচ্ছে। এতটা করুন কেন হয় মানুষের জীবন?খুব কি জরুরী এতটা নারকীয়তা এই এক জীবনেই পাওয়ার?বয়স তো ৫০ এ কেবল হয়তো!তার মধ্যেই একাধিকবার সন্তান বিয়োগের শোক, সতিনের কুটিলতা ,স্বামীর অত্যাচার, প্রতিবেশীর কটু কথা,স্বামীর চলে যাওয়া, শেষ অবলম্বন একমাত্র সন্তানের আত্নহত্যা অবশেষে লোভী মানুষের ভিটামাটি দখল!এক জীবনে এতকিছু সহ্য করে কেউ ভালো থাকতে পারে? উনিও তো পারেনি! তাইতো মাথাটা গেছে!
নুরি চাচী ছেলের লাশ দেখার সাথে সাথেই জ্ঞান হারায়,সেই জ্ঞান ফিরে প্রায় আড়াই ঘন্টা করে। ততক্ষণে পুরো গ্রাম ছড়িয়ে পরে নুরের আত্নহুত্তির ঘটনা। স্বামী হারা বৃদ্ধা মা সন্তান হারানোর শোক সইতে পারে না, প্রথমে খুব চিৎকার করে কান্না করলেও দাফন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে চুপ হয়ে যায়।এক দম স্তব্ধ হয়ে কেবল এক মনে তাকিয়ে থাকে সদ্য দেওয়া নতুন কবরটার দিকে।
সময়ের সাথে সাথে নুরি চাচীর অস্বাভাবিকতা সবার নজরে আসে, সারাদিন কবরের পাশে বসে থাকে, কোনরকম টু টা'ও করে না। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেই বুকফাটা আর্তনাদে কবরস্থান ভারী হয়ে উঠে। তার চিৎকারে ভয়ানকভাবে মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেই থামাতে যেতো তাকেই মাটির শক্ত খন্ড তুলে ছুঁড়ে মারতো,মুখে যা আসে বলে গালিগালাজ করতো।
এভাবেই নুরী চাচী লোকমুখে পাগলের খেতাব পায়।সবার ধারণা হয় নুরের শোকে নুরি চাচী পুরোপুরি
পাগল হয়ে গেছে।
মোড়ল জমি দখলের পর অবলম্বন ছিলো বাড়ির ভিটাটুকু যা আজও তেমনি পড়ে আছে। এখন সেই ঘরে বাদুরের বসবাস।দুর থেকে উড়ে আসা পায়রারা নিজের আখড়া খুলে বসেছে।ছোট ছোট পাখিরা নির্ভয়ে গড়ে তুলেছে আপন নিবাস।
এক নারীর ছলনা শেষ করে দিলো একটা সাজানো সংসার! পরকিয়ার কালো ধোঁয়া জ্বালিয়ে দিলো একজন নারীর স্বপ্নের নিবাস? একটা তরতাজা জীবনের ইতি ঘটালো কতটা নিরবে,একটা মায়ের কোল খালি করলো কতটা আগলে! এমন কেন হয় এরা! কি হতো নুর নামের সেই সাদাসিধে মানুষটির জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকলে,কি হতো এই অসহায় মায়ের শেষ বয়সের কান্ডারি হলে?
কথাগুলো ভাবতেই বুকটা আরও ভারি হয়ে উঠলো তারার।
নুরি চাচী আজ দুই বছরের অধিক সময় ধরে তারাদের সাথেই থাকছেন।সেদিন তার সব কথা শোনার পর তারা নয়নকে অনুরোধ করে যাতে উনাকে এ বাড়িতেই রেখে দেওয়া হয়।তারার প্রস্তাব ভালো লাগে নয়ন আর তার মায়ের,তাছাড়া নুরি চাচী থাকলে মায়েরও একজন সঙ্গী হবে।সবটা ভেবেই শেষ অবধি নুরিকে রেখে দেওয়া হয়।
নয়ন প্রথম অবস্থায় নুরিকে ডাক্তার দেখায়, মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ায় মাঝে মাঝে একটু আধটু অদ্ভুত ব্যবহার করা ছাড়া আর কোন দোষ নেই।ডাক্তারের কথা অনুযায়ী ভারসাম্য হারিয়ে যাওয়ায় তিনি এমন করছেন, তাছাড়া আর কোন সমস্যা নেই।তবে আদর যত্নে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ আছে।
নুরিকে যত্নের দায়িত্ব তারা স্বেচ্ছায় নিজ কাঁধে নেয়,খুশি হয় সবাই।
--------------------------
তারা খুব দ্রুত তৈরি হচ্ছে,বোরকা পড়ার পর একবার নিজের দিকে তাকালো, আনমনে কিছু ভেবে হেসে ফেললো।হিজাব বেঁধে নিকাবের কাপড়টা ফেলে মুখ ঢেকে ফেললো,চোখের প্রতিভম্ব
আয়নায় পড়তেই তা আড়াআড়ি হয়ে নিচের দিকে প্রতিফলিত হলো।বোরকাটা নতুন।গলা থেকে শুরু হয়ে পেটের নিচ অবধি সূক্ষ্ম সুতার কাজ। কালো কাপড়ের বোরকা তার মাঝে মাঝে ছোট ছোট সোনালী খয়েরী রঙের ছিটা পাথর দেওয়া! নির্ঘাত একটি অসম্ভব সুন্দর বোরকা।এই বোরকাটা গত ঈদে নয়ন উপহার দিয়েছিলো। পঞ্চম সেমিষ্টারের ফলাফল ভালো হয়েছিল বলে। ঈদে একবার পড়ার পর আর পড়া হয়নি।আজ একটা বিশেষ দিন তাই আবার বের করেছে। পেটের অংশে হাত বুলিয়ে হাসি হাসি মুখ করে আগাগোড়া আরও একবার দেখে নিলো। এরপর আয়নার সামনে থাকা ছোট্ট টুলের উপরে রাখা ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলো।ধীর পায়ে নিচের দিকে নত দৃষ্টি রেখে এগিয়ে গেল উঠোনে অপেক্ষায় থাকা নয়নের কাছে।
-- মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দর লাগতাছে আমার আম্মারে; সাবধানে যাইয়ো!
--- হ বউ তুমারে আসলেই ম্যালা সুন্দর লাগতাছে; মনে অইতাছে বেহেস্তি হুর নাইমা আইছে আইজ মিয়া বাড়িতে! আল্লাহ নজর না লাগাউক কারো!
-- দোয়া করিয়েন চাচীম্মা!
শ্বাশুড়ি আর নুরি চাচির প্রশংসার পরিবর্তে উপহার হিসেবে মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে উঠে বসলো নয়নের পিছনে! নয়ন বিদায় জানিয়ে ভোঁ শব্দ তুলে চোখের পলকেই উঠান পেরিয়ে কাঁচা রাস্তায় উঠে পড়লো।
//////////////////////////////////
-- আলহামদুলিল্লাহ! আপনি জিপিএ ফাইভ পাইছেন নয়ন মিয়া! এই বয়সেও এত বড় অর্জন হাসিল করছেন,অবশ্য না করার কারণও ছিলো না। আপনের যেই ইচ্ছা শক্তি আর প্রচেষ্টা তার জন্য এই ফলাফল আপনি প্রাপ্য।
-- শুকরিয়া স্যার! সবই আল্লাহর ইচ্ছা আর আমার স্ত্রী তারার সহযোগিতা!; আপনারাও আমারে অনেক সাহায্য করেছেন। আপনাদের সবার সহযোগিতা না থাকলে কোনভাবেই এইটা সম্ভব হইতো না।
-- আমাদের কথা বাদ দেন, আমাদের দায়িত্ব এইটা,করাই লাগবে।তাছাড়া আমাদের কোন শিক্ষার্থী ভালো করলে সেটা আমাদের জন্যই অতি উত্তম, তাই আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে সব শিক্ষার্থীদের সঠিক পরিচর্যা করা।
জড়ে পড়া,টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা যেকোন সমস্যার কারণে পড়াশোনা থামিয়ে দেওয়া,কেউ কেউ চাকরির পাশাপাশি আরও পড়াশোনা করতে চায়,এমন প্রত্যেককে সুযোগ দেওয়াই বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিজ্ঞা! আমাদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিলো বাংলাদেশের সর্বস্তরের শিক্ষাকে দূরশিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে সকল স্তরের জনগনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার। কতশত মেধা জড়ে পড়ে এদেশের প্রতিটি অলিতেগলিতে; বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক তাদের সেই সুপ্ত প্রতিভাকে খুঁজে বের করে দেশের সব ক্ষেত্রে সেবা প্রদানের জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলে!আমি খুবই গর্বিত বোধ করি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক হয়ে।আমি আশা রাখবো আপনি নিজের এই জ্ঞান আহরণের আকাঙ্ক্ষা জিইয়ে রাখবেন। সামনে আরও এগিয়ে যাবেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য এভাবেই মানসিক শক্তি রাখবেন,বিশ্বাস করি আপনিও একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষের তালিকায় নিজের নামটা লিপিবদ্ধ করবেন! আমার তরফ থেকে আপনার জন্য সবসময় শুভকামনা থাকবে।
--- ধন্যবাদ স্যার; দোয়া করবেন আমাদের জন্য!
-- অবশ্যই, মনের থেকে দোয়া থাকবে আপনার এবং অবশ্যই আপনার এই গৃহ শিক্ষিকার জন্য!
স্যার মোহাম্মদ মাহবুব এর কথায় হেসে দিলো নয়ন-তারা। আজ নয়নের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে। দোকানদারি, ক্ষেতের কাজ দেখার পাশাপাশি বেশ পরিশ্রম করেছে পড়াশোনায় ভালো করার জন্য। অবশ্য পরীক্ষার সময় তারা সব দিকে থেকে সরিয়ে এনে কেবল পড়াশোনায় মন দিতে বলেছে,ততদিন তারা নিজেই আগের মতোই সামলে নিয়েছে। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় ভালো ফলাফল এসেছে।তারা খুবই খুশি। বলা যায় নয়নের চেয়েও বেশি খুশি।নয়ন তারার উচ্ছাস দেখছে আর মন দিয়ে তৃপ্তি সহকারে তা উপভোগ করছে।
-- শুনেন চলেন মিষ্টি নিয়া আসি।স্যারদের মিষ্টি দেওয়া উচিত!
-- হ চলো।
-- চলেন।
নয়ন তারা বেশ কিছু মিষ্টি কিনে এনে স্যারদের উপলক্ষে দিয়ে গেলো। তাদের এহেন কাজে শিক্ষকমহল বেশ খুশি হলো।তারা (স্নাতক)সম্মানে ভর্তির জন্য সব তথ্য জেনে গেলো।
-----------------------------
উঠানের এক কোনে বসে পুরানো এক বন্ধুর সাথে কথা বলছে নয়ন, আম্মা হাসি হাসি মুখে নানারকম মুখরোচক খাবার বানাচ্ছে, সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে। ছেলের সফলতায় মা সবচেয়ে বেশি খুশি
হবে এটাই স্বাভাবিক।যখন নয়ন উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছিল তখন কত মানুষ কত রকম কথা বলেছিলো। আম্মা কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে কেবল শুনে গেছে। বিশ্বাস ছিলো তার ছেলে সফল হবে।তাই হয়েছে।তার মানিক জিতে ফিরেছে।তারাকে ছেলের বউ করে যে উনি ভুল করেননি মেয়েটা তা বারবার প্রমান করে দিচ্ছে।এই মেয়েটা তার ছেলের জীবনের আলোর রেখা হয়ে এসেছে।তার সংসারের হাল ধরে তার সংসারটাকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। তাদের জীবনের সমস্ত অন্ধকারকে কাটিয়ে ভোরের আলোর ন্যায় নতুন দিনের সূচনা করেছে।তিনি বড়ই কৃতজ্ঞ এই মেয়েটার প্রতি।
-- শুনছেন!
তারার ডাকে সেদিকে মুখ বাড়িয়ে তাকালো নয়ন, নয়নের পাশে অচেনা কাউকে দেখে তারা আর উঠোনে আসেনি। বারান্দার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে একটু উঁচু স্বরেই বললো,
-- খাইতে আসেন, আম্মা সব তৈয়ার কইরা বইয়া রইছে! মেহমানরে কি এমনেই বসাইয়া রাখবেন!
-- আইতাছি,তুমি সব প্লেটে দিয়া রাখো!
-- তোর বউটা কিন্তু মাশাআল্লাহ! সব দিকেই ভালো;গুনী! তুই আসলেই কিসমত ওয়ালা!
বউয়ের প্রশংসা শুনতে নয়নের ভালো লাগলেও এই মুহূর্তে বন্ধুর মুখে ভালো লাগছে না। মনে মনে একটু বিরক্ত হলো।কি দরকার এত খেয়াল করার।বিরবির করে বললো,
-- আবার ঐদিকে তাকাইয়া আছোস ক্যান; আজব! আমার বউয়ের সব ভালা মানে তুই কি কইতে চাস?
-- নয়ন,চল ভিতরে যাই!
বন্ধুর ডাকে হুশে আসে,প্রথমে কিছুটা আমতা আমতা করে পরে বলে,
-- না কইতাছিলাম কি; না মানে আসলে!
-- কি কবি ক না! এত না মানে করতাছোস ক্যান?
-- এক কাম করি আমরা এইহানে উঠানেই বইয়া খাই! দ্যাখ সন্ধ্যা তারায় আকাশটা ক্যামন চিকমিক করতাছে! চান মামাও তো নিজের উপস্থিতি জানান দিতাছে! কতদিন অইলো এক লগে বইয়া চান তারা দেহি না ক! আয় আইজ দুই ভাই মিল্লা ছোট বেলার
মতো তারা গুনী!
-- তারা গুনমু? তোর ঘরেই তো আস্তো একটা তারা আইনা রাখছোস! তারেই সারাদিন গুনিস।এহোন চল খাইতে যাই!
-- আরেহ না,ঘরে যাওনের কাম নাই! ঘরে ম্যালা গরম লাগে,আইজ বাইরে বইয়াই খামু।এক কাম কর তুই এইহানে ব,আমি আইতাছি।
-- কি কস! শীত আইলো বইলা আর তুই কস গরম লাগে। নয়ন তোর জ্বর আইতাছে না তো খুশিতে?
-- আরে না না ।আমি ঠিক আছি তুই বয়।
নয়নের বন্ধু ফয়সাল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো নয়নের যাওয়ার পানে,কি হলো কিছু্ই বুঝলো না। হঠাৎ এমন অদ্ভুত ব্যবহারের কারণ কি!
-- আম্মা আমগো খাওন উঠানের দেওয়ার ব্যবস্থা করো!
-- উঠানে এই সন্ধ্যা বেলায়!
-- হ আইজ আমি আর আমার দোস্ত উঠানেই খামু!
-- চারিদিকে আন্ধার অইয়া আইছে আপনে ক্যামনে খাইবেন।এক কাম করেন বারান্দায় বয়েন,আমি হেইহানে সব নিয়া যাই।
-- না উঠানেই দেও।
-- আম্মা অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো নয়নের দিকে,তারাও কিছুটা আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে।এই সন্ধ্যায় উঠানে তাও আবার মেহমান নিয়ে! আশ্চর্য!
-- কি অইলো সব আ্যমানে তাকাইয়া আছো ক্যান আমার দিকে? যেন ভুত দ্যাখতাছো!
-- আমি তো তোমারে দ্যাখতাছি।পোলাডা এতদিন পরে আইলো ঘরে আইনা সুন্দর কইরা বসাইয়া খাওন দাওন দিবা তা না কইরা ঐ উঠানের অন্ধকারে খাওন দিতে কইতাছো। অন্ধকার,মশা কত পোকামাকড় আইতে পারে!
-- আম্মা ঐ উঠানে তুমি সারাদিন কাম করো তহোন যহোন কিছু অয় না এহোনও অইবো না।আর কোন কথা না বইলা তাড়াতাড়ি সব তৈয়ার করো,ঐ আবার বাড়িত যাইবো তো! রাইত অইতাছে ম্যালা।
-- তাইতো রাইত অইতাছে,তাইলে আবার বাড়িত যাইবো ক্যান? কতদিন পরে আইলো আইজ থাকুক, সকালে একটু ভালো মন্দ রাইন্ধা পোলাডারে খাওয়ামুনে!
-- রাইন্ধা, আর তা খাওনের লইগা তোমার নিজের প্যাডের পোলাই আছে তাই ওরে রাহোনের দরকার নাই।জলদি করো না ক্ষিধা লাগছে আমার আম্মা!
-- আইচ্ছা আমি নিয়া আইতাছি আপনে খালি একখান পাটি লইয়া বিছাইয়া রাখেন!
-- এই না তোমার আওনের দরকার নাই! আম্মা; না আম্মার কষ্টের দরকার নাই। তোমরা সব বাটি প্লেটে তুইলা দাও আমিই নিয়া যাইতাছি!
-- কি সব কইতাছেন;সরেন আমিই নিয়া যাইতাছি।
-- না; খবরদার তুমি আইজকে রাইতে ঘরের বাইরে পা দিবানা। কেয়ামত অইয়া গ্যালেও না।ঠিক আছে!
নয়নের হাবভাব বোঝার মতো জ্ঞানি হয়তো কেউ নয় তাই বুঝলো না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে দেখেই গেলো।নয়ন নিজের মর্জি মতো কাজ হাসিল করে খুশি খুশি চলে গেল। আম্মা তারার দিকে তাকিয়ে বললো,
-- পোলা আমার খুশিতে পাগল অইয়া গ্যালোনি বউ?
-- জানিনা আম্মা তয় উনার হাবভাব বেশি ভালো না!
রাতের আগেই রাতের খাবারের পর্ব শেষ করলো সবাই। নয়ন সত্যি সত্যিই খাইয়ে দাইয়ে একরকম জোর করেই বন্ধুকে বাড়ি থেকে বিতারিত করলো,ফয়সালও নয়নের কিছু্ই বুঝলো না।তবে কিছুটা মনোক্ষুণ্ন হয়েছে হয়তো।ছোট বেলার বন্ধু।যখনই আসতো কত হইহুল্লোর করতো, সারারাত একসাথে গল্প করে কাটিয়ে দিতো।কখনো কখনো মাঝরাতে মাছ ধরতে যেতো।কখনো মেম্বারের গাছের খেজুরের রস, নানারকম ফল চুরি করে খেতো।আহ নয়ন সব কি ভুলে গেলো সুন্দরী বউ পেয়ে! মনে মনেই আফসোসের পাহাড় চেপে নিয়ে নিজের বাড়ির পথ ধরলো সেই রাতের প্রহরেরই।
আম্মা একটু বিরক্ত হলো নয়নের এহেন কাজে। কিন্তু কি বলবে? এত বড় ছেলেকে কি বলা যায়!
-------------------
নয়নের ব্যবহার অদ্ভুত ঠেকলেও সেদিকে আপাতত মন নেই কেবল তারার।সে আপন মনে আড়শিতে নিজেকে দেখছে। মুচকি হেসে বারবার পেটে হাত বুলাচ্ছে।দরজায় দাঁড়িয়ে তাই পর্যবেক্ষন করে চলেছে নয়ন।
-- কি করতাছে ও?
পর্ব ২২
-- কি দ্যাখে আমার বিবিজান?
পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে তাঁরার পেটে উপরে থাকা হাতের উপরে হাত রেখেই প্রশ্নটা করে নয়ন। তাঁরা লাজুক হেসে হাতের বাধন খুলে,সামনামুখী হয়ে চোখে চোখ রেখে বললো,
-- আমি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল আনলে আপনি খুশি অইয়া আমারে উপহার দেন।
-- হুম , তো?
- তাই আমি ভাবছিলাম আপনের ফলাফলের পর আমি আপনার জন্য একটা উপহার আনবো!
-- ওরে আল্লাহ; তা কি উপহার আমার বউ আমার জন্য আনছেন?
তাঁরা কোন উত্তর দিলো না,কেবল লজ্জা মিশ্রিত হাসির রেশ বজায় রেখেই নয়নের ডান হাত নিয়ে নিজের পেটের উপরে রাখলো।
-- আপনের উপহার এইখানে!
নয়ন বুঝলো না।প্রশ্নাত্নক, হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। তাঁরা নয়নের অবস্থা দেখে লাজুক হাসলো,নয়ন কিছুই বুঝলো না।
-- মানে এইখানে; কি কইতাছো বউ? খুইলা কও!
-- আমি পারুম না, আমার শরম করে!
-- শরম করে ক্যান!
আশ্চর্য কও না!
তাঁরা বুঝলো তাকে মুখ ফুটেই বলতে হবে।তাই নয়নের বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে টেবিলের উপর থেকে একটা খাম বের করলো, নয়নের নয়ন-জোড়া সেদিকে নিহিত হলো। বিস্কিট রঙের খামের ভেতর থেকে ফকফকা একটা দ্বিভাজিত কাগজ বের করলো।হাত বাড়িয়ে নয়নের দিকে তুলে ধরে, দৃষ্টি সরিয়ে জানালায় রাখলো,গাল দুটো লাল বর্ণে রাঙিয়ে উষ্ণতা বাড়িয়ে দিলো।নয়ন বাড়ানো পত্রের অন্তঃস্থলে লিপিবদ্ধ হওয়া নাম,"সদর মা ও শিশু হাসপাতাল" মোটা অক্ষরে কাটা বাংলায় লেখা লেখাটি পড়ে তার ভেতরে পড়তেই চকমক করে উঠলো দৃষ্টি, মুহূর্তে খুশির আভায় ছেয়ে গেল সর্ব বদনে। অযাচিত অশ্রুরা ভারী করে তুললো অক্ষিকোটর।ঘোলা হয়ে গেল দৃষ্টি।তারা মাথা নুইয়ে লাজুক রাঙা হয়ে নয়নের পানে ফিরলো,নয়ন কেবল উচ্চারণ করলো,
--- বউ!
--------------------
গুটি গুটি পায়ে এক জোড়া ছোট্ট পায়ে এগিয়ে চলছে রিনিক-ঝিনিক ছন্দ তুলে।তার সাথে ধীর গতিতে ছোট্ট তাল মিলিয়ে নিরব ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এক জোড়া সুদর্শন পুরুষালি পা।
-- মা!
মা ডাকের মধুর শব্দে চিন্তায় ঝুঁকে থাকা মাথা তুলে দৃষ্টি রাখলো দরজায় খিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট চড়ুইয়ের পানে। মুহুর্তে খুশির ছটায় সব ক্লান্তি, চিন্তা উবে গিয়ে একরাশ আনন্দ ছড়িয়ে পড়লো সমস্ত অঙ্গে।
-- মা!
মা ডাকে দৌড়ে গিয়ে চেয়ারের হাতল ঘেঁষে ঝাঁপিয়ে পড়লো মায়ের বুকে।মা'ও খুব আলতো হাতে আঁকড়ে নিয়ে বুকের মাঝে চেপে ধরলো। ধীরে,সন্তর্পণে চেপে জড়িয়ে রাখলো নিজের অস্তিত্বের অংশটাকে।
দুই পাশে দুটো জুটি করা যার চুলের বাঁধন শক্ত হয়ে আছে সুন্দর লাল ফিতের কষে দেওয়া বাঁধনে।দুই জুটির দুই পাশে সুন্দর দুটো পাখির ক্লিপ লাগানো।হাতে এক জোড়া সোনার বালা।পায়ে দেওয়া রুপোর নূপুর যার তোলা সুরে জানান দেয় তার উপস্থিতি।
-- কেমন আছে আমার মা'টা?
-- আলহামদুলিল্লাহ,ভালু!
মেয়ের উত্তরে খুশি হয়ে আলতো করে দুই গালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরলো। মায়ের আদরে ছোট্ট জুঁইও আপ্লুত হলো।এই তো এই কারণেই মায়ের কাছে আসা।বাড়ি গেলে মায়ের আদর ভাগ হয়ে যায়।সে কখনোই আগে ভাগে পায় না ।পাবে কিভাবে? ভাই তো সবসময়ই তাকে বোকা বানিয়ে আগেই মায়ের কাছে চলে যায় এবং বেশি বেশি আদর পায়। মায়ের কোলেও উঠে আগেই।যদিও বাবা সবসময় তাকেই আগে আদর দেয় তবুও।
-- হয়েছে? এখন কি বের হবে?
নয়নের প্রশ্নে মেয়েকে ছেড়ে সোজা হয়ে বসলো তাঁরা।নয়ন এগিয়ে এসে চেয়ারে বসে জিজ্ঞাসু ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো। তার চুপ হয়ে রইলো।
-- মা , তুমি জুনায়েদ মামার সাথে একটু বাইরে গিয়ে চকোলেট কিনে খাও তো।
পকেট থেকে টাকা বের করে তারার জুনিয়র জুনায়েদের উদ্দেশ্য টাকার হাত বাড়িয়ে কথাটা শেষ করে, জুঁই বাবার আদেশ মোতাবেক জুনায়েদের সাথে চলে গেল।
-- এখন বলো কি হয়েছে? কি নিয়ে এত চিন্তিত?
-- না তেমন কিছু না! আসলে শুধু একটু ক্লান্তি চেপে ধরেছে।
-- ক্লান্তি আর চিন্তার মাঝে পার্থক্য বোধহয় আমি বুঝি তাঁরা!তাই কথা না ঘুরাইয়া আসল কথা কও!
-- কি বলবো;আসল নকল কিছু্ই নাই!
-- তাঁরা!
-- আচ্ছা বলতাছি, আসলে আজকে একটা কেইস আসছিলো তা নিয়েই চিন্তিত!
-- কিসের জন্য?
-- সমস্যা জমিজমা সংক্রান্ত,তবে তা গিয়ে গড়িয়েছে পরোকিয়ায়! পাশাপাশি দুই বাড়ির ভিটা জমির সীমানা নির্ধারণ নিয়ে ঝামেলা হয়, এরপর তা নিয়ে মারামারি কয়েক দফা হয়।এই অবধি জমিজমা সংক্রান্ত কিন্তু তা গিয়ে আরও জটিল হয়ে উঠে যখন সে দুই প্রতিবেশীর একজনের পুত্রবধূর সঙ্গে অন্য জনের ছোট ছেলের পরোকিয়ার ঘটনা প্রকাশ পায়।তাও ঠিক, এখন আরও জটিল হচ্ছে এই মহিলার বাচ্চা পেটে।এখন এই বাচ্চার বাবা কে? তার চেয়েও কঠিন সত্য এই মহিলা সম্পর্ক এমন জটিল করে রেখেছে যে স্বামীর হাতের টিপ সই নিয়ে স্বামীর নামের পাঁচ শতাংশ জমি নিজের নামে করে নেয়।এখন না এদিকে না ওদিকে। ঐ ছেলে ছাড়বে না ,এই লোকও ছাড়তে চায় না। দু'জনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট।এক সম্পতি দুই বাচ্চা! যদিও তাদের কথায় বাচ্চার জন্য কোন গুরুত্ব প্রকাশ পায়নি।আর মহিলার দোষ তো আছেই।তা তো সবার উর্ধ্বে,এখন বলতাছে ঐ ছেলে নাকি ঐ মহিলাকে তাবিজ করেছে যার কারণে মহিলা এমন গর্হিত কাজ করেছে। কিন্তু মহিলাকে আমার একদমই স্বাভাবিক লেগেছে। মানে আমি এসব শোনার পর থেকেই মাথা পুরো এলোমেলো হয়ে আছে।কি সমাধান হবে এর?
-- তো এখন এরা চায় কি? আর মহিলা কি বললো,সে কার সাথে থাকবে?
-- মহিলার কথা তার বাচ্চার দায়িত্ব যে নিবে তার সাথেই থাকবে সে।কথায় বোঝা যায় বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে হয়তো আগেই তাদের মাঝে কথা কাটাকাটি হয়েছে,ওহ এই মহিলার আরও দুই সন্তান আছে। মানে বুঝতে পারছেন কি জঘন্য কাজ করেছে উনি।
নয়ন কিছুই বললো না, ফোঁস করে কেবল একটা হতাশার শ্বাস ছাড়লো। তাঁরা যবে থেকে অনুশীলন শুরু করেছে তবে থেকেই এরকম জটিল ঘটনা শুনে যাচ্ছে। তবুও এটা বেশ বিব্রতকর। মানে বাচ্চার আসল বাবা কে তা একজন নারী, একজন মা'ই জানে অথচ এই মহিলা কি না?তারার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-- তুমি এর চেয়েও কঠিন কেইস লড়ছো তাহলে এটা নিয়ে এত চিন্তিত কেন?
-- আমি চিন্তিত কারণ দুটো বাচ্চার জীবন; বাবা মায়ের বিচ্ছেদে হয়তো তাদের জীবনের ক্লান্তি কমে যায় কিন্তু বাচ্চাদের? আমি আজ অবধি যতগুলো কেইস এমন দেখেছি সবগুলোতেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে কেবল শিশুদের দেখেছি। তাদের কিন্তু বিশেষ কিছু হয় না বরং তারা উভয়েই বেশিরভাগ সময়ই নতুনত্বের স্বাদ পায়।
আর এই নারীদের কি হচ্ছে? এরা কেন এভাবে পরোকিয়ায় জড়িয়ে পড়ছে? কিসের অভাবে,কোন তাড়নায়?কেন নিজের সঙ্গীর মাঝে সুখ খুঁজে পাচ্ছে না? দোষটা আসলে কার?
উত্তর খোঁজা কঠিন, বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা যতই যুক্তি তর্ক দেখাক আসলেই এর সঠিক উত্তর খোঁজা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। যদিও উত্তর সুস্পষ্ট করে আমাদের পবিত্র গ্রন্থে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু মানুষ যেন আজকাল সব দেখেও না দেখার মতোই আছে।
-- আচ্ছা চলো ছোট মেয়া আবার অপেক্ষায় আছে!
-- আপনি এত রাতে মেয়েকে কেন আনতে গেলেন?
-- সে আসবে । কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিল দেখে তার দাদী আদেশ করেছে তাকে নিয়ে আসতে।তাই !
-- আপনার মেয়ে আপনার মতোই জেদী হচ্ছে!
-- হ্যা তোমার ছেলে তোমার মতোই বোকার হদ্দ হচ্ছে!
তাঁরা জানে এটা তাকে রাগানোর প্রথম ধাপ কিন্তু সে রাগবে না।তাই এক নজর নয়নের পানে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে এগিয়ে গেল। নয়ন
মুচকি হেসে তাঁরার হাত টেনে ধরলো। তাঁরা পিছু ফিরে চোখ রাঙালো
-- কি হচ্ছে এটা অফিস! কেউ চলে আসবে।
বলতে না বলতেই হাজির হয় জুঁই আর জুনায়েদ।নয়ন ব্যাক্কল হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে, জুনায়েদ ভ্যাবলাকান্তের মতো তাকিয়ে থাকে তারা মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
-- আব্বু তুমি কি করছিলে?
কি কি কিছু না।চলো আমরা বাসায় যাবো।
তারা নয়নরে ব্যাক্কল হওয়া দেখে মিটমিটিয়ে হাসছে। সেদিকে তাকিয়ে নয়ন চোখ রাঙালো।
-- আসি তাহলে।
জুনায়েদের থেকে বিদায় নিয়ে নয়ন-তারা- জুঁই রওনা দিলো বাড়ির উদ্দেশ্যে!
--- দাদী!
-- হ ভাই কও?
-- কও না বলো, বলো!
-- আইচ্ছা কমুনে?
-- আইচ্ছা কমুনে না ! বলো আচ্ছা বলবো।
-- আইচ্ছা বলবো!
-- উফ্!
দাদীকে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলানোর চেষ্টা তার সকাল থেকেই চলে কিন্তু তার ধৈর্য হার মানে দাদীর অনভিজ্ঞতার কাছে। আঞ্চলিক অশুদ্ধ ভাষায় পটু দাদী হঠাৎ করেই এই বয়সে শুদ্ধ রপ্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে কিন্তু আদরের নাতীর কাছে শেখার অধম্য ইচ্ছাও অপ্রতুল্য।তাইতো যা বলে তাই মেনে চলে।রাত এখন দশটা পেরিয়েছে কিন্তু এখনও মা আসেনি। না এসেছে তার পাকা বুড়ি বোনটা।বাবা এসেছিল, মা'কে আনতে গেল। তার সাথে জেদ টিকিয়ে বাবার সাথে গেল মাত্র ৯ মিনিটের ছোট বোনটাও।সে যায়নি।কারণ সে বড়।আর বড়রা বুঝে সবসময় জেদ করতে হয় না।মা তো তাই শেখায়। বোনটা বুঝে না।ছোট তো তাই! বাবা বললো এত রাতে বাচ্চাদের বাইরে যেতে হয় না সে শুনলো কিন্তু শুনলো না কেবল ছোট বনু।
কথাগুলো মনে মনে ভাবছিলো হয়তো পাঁচ বছরের
তয়ন।তার ভাবনার মাঝেই ভেসে এলো বাইকের শব্দ। ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা দুশ্চিন্তার রেখা কেটে চওড়া হয়ে ভেসে উঠলো হাসির রেখা। তাড়াহুড়া করলো না।এটা তার কাজ নয়। তাড়াহুড়ো, ছুটোছুটি করে বোন।সে সবসময় শান্ত স্বভাবের।তাই বলে যে তার মাঝে বাবার বাড়ি ফেরা নিয়ে উচ্ছ্বাস নেই এমন নয়? মা ঘরে আসছে তাতে সে আপ্লুত নয় এমনটা নয়।মা শিখিয়েছে বাবা মা যেহেতু বাড়ি এসেছে সেহেতু তারা অবশ্যই তাদের কাছেই আসবে সুতরাং ছুটোছুটি করে ঘরের বাইরে বেড়িয়ে যাওয়ার দরকার নাই।যদি পড়ে গিয়ে ব্যথা পায়, কোথাও আঘাত লাগে তাহলে? তাই এমন করে ছুটে বেড়ানোর দরকার নাই।তার চেয়ে বরং তারা ঘরেই অপেক্ষা করুক,বাবা মায়ের জন্য ঠান্ডা পানি এনে সামনে দিক। তাদের দেখলে মিষ্টি করে হেসে সালাম দিক, তাদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করুক।
ছোট্ট পাঁচ বছরের এই বাচ্চা তয়ন নিজের জমজ বোন জুঁইয়ের থেকে অনেকটাই আলাদা।চেহারায় যেমন মিল দেয়নি আল্লাহ ঠিক তেমনি ভিন্নতা রেখেছে তাদের স্বভাব,পছন্দ,ভালো লাগায়। জুঁই ছটফটে, চঞলতায় মেতে থাকে। তেমনি তনয় শান্ত,বুঝদার।
নয়ন-তারার জীবনের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে উপরওয়ালা তাদের ঘর আলো করে দিয়েছিলো দুটো পাখি। ভালোবেসে নাম রেখেছ তয়ন আর জুঁই! নয়ন-তারা ফুলের সাথে নিজেদের নাম মিল দেখে মেয়ের নাম রেখেছিল তাফসিয়া জুঁই ইবনে নয়ন আর ছেলের নাম মোহাম্মদ আইয়ুব তয়ন ইবনে নয়ন!
-- আসসালামু আলাইকুম মা,আব্বু!
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম বাবাজান!
ছেলেকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাঁরা একটু দ্রুত হেটেই এগিয়ে যায়,কোলে তুলে ছেলের সালামের উত্তর দেয়। কপালে, গালে চুমু দিয়ে মাথার এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দেয়। মায়ের আদরে বুঝদার তয়ন মুচকি হাসে। জুঁই মুখ গোমড়া করে তাই দেখে। মনে মনে ভাবে মা তাকে শুধু গালে চুমু দিয়েছিলো আর ভাইকে গালে কপালে! মানে সে মাকে আনতে গেলেও কম আদর পেলো আর ভাই!
মেয়ের মনোভাব বুঝতে একটুও সময় লাগলো না নয়নের, মৃদু হেসে মেয়েকে কোলে তুলে ছেলের দিকে এগিয়ে গেল,তারার মুখোমুখি হয়ে বললো,
-- আমাদেরও একটু আদর দাও।এমন করো কেন?
তাঁরা নয়নের কথার মানে বুঝতে পেরে মেয়ের দিকে তাকালো, তারপর নয়নের কোলে থাকা অবস্থাতেই মেয়ের গালে,কপালে,চোখের পাতায়,হাতে চুমুতে ভরিয়ে দিলো। খুশিতে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো জুঁই। নয়ন-তারা-তয়ন মুগ্ধ হয়ে দেখলো সেই হাসি।
শান্ত দেখে তারা সবসময় তয়নের প্রতি একটু বেশি সচেতন থাকে।এ বয়সেই অনেক গম্ভীর আর বুঝদার তাই তার মনের মাঝেই থাকে তার সব অনুভূতি যা বের করতে পারে কেবল তার মা। এদিকে অশান্ত আর চঞ্চল জুঁই নিজের ভেতর কিছু্ই রাখে না অবশ্য বয়স অনুসারে তার সবটাই স্বাভাবিক তাই তাকে নিয়ে তারার চিন্তা কম হয়। তাছাড়াও জন্মের চার দিন পর তয়ন বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে, একদম বাঁচা সম্ভব নয় বলেই সকলে ধরে নিয়েছিলো কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্য তাইতো এখনও সে নিজের পরিবারের সাথে আছে।এটাও অন্যতম কারণ তারার ছেলের প্রতি বিশেষ দূর্বলতার। কিন্তু তা কি জুঁইয়ের বাচ্চা মন বুঝে? হয়তো বুঝবে বড় হলে নয়তো এভাবেই আদরের ভাগ নিয়ে চলবে খুনশুটি।
রাতের মধ্যভাগে.....
নয়ন পড়ছে,তারা মাত্র কয়েক মিনিট হলো চোখ বন্ধ করেছিলো এর মধ্যেই আবার খুলে ফেললো।নয়নকে টেবিলে দেখে উঠে পড়লো,ওড়নাটা বুকে ভালো মতো জড়িয়ে নিলো। বিয়ের পর শাড়ী পড়লেও এখন নিয়মিত সালোয়ার কামিজ পড়ে।ছেলে মেয়ে বড় হচ্ছে তাদের সামনে শাড়ী পড়ে ঘুমানো উচিত নয়, ঘুমের মাঝে কখনো শাড়ীটা সরে পড়লে বেশ লজ্জাজনক পরিস্থিতি হবে তাই আগেই নিজের অভ্যাস পরিবর্তন করে ফেলেছিলো, তাছাড়া নয়নও গর্ভবতী হওয়ার পর থেকেই শাড়ী পড়তে নিষেধ করে দেয়। নিজেই অনেকগুলো সালোয়ার কামিজ এনে দেয়। শুধু কোর্টে গেলে শাড়ী পড়তে হয় তাই কেবল কোর্টেই শাড়ী পড়ে যায়।
-- আপনি এখনও ঘুমান নাই কেন?
-- পড়তাছি!
-- দেখতাছি, কিন্তু এখনই রাত জেগে পড়ার দরকার নাই! এখনও মাস দুই বাকি আছে।
-- না তারা ; দোকানে কাজের চাপ বেশী! তখন পড়া যায় না। তাছাড়া সামনে আমনের মৌসুম,ক্ষেতে যাওয়া লাগবে নিয়মিত।পড়ার সময় ঠিক মতো পাবো না।তাই আগেই সব পড়া শেষ করে রাখি যাতে পরীক্ষার আগে একটু চোখ বুলালেই পারি!
-- পারবেন ইনশাআল্লাহ! এখন ঘুমান, সকালে তো দোকানে যাইবেন তাই না!
-- ঘুমামু আরেকটু পর।
-- আচ্ছা তাড়াতাড়ি করেন।
-- তুমি যাও ঘুমাও।
তারা কথা বাড়ালো না।নয়ন পড়াশোনা নিয়ে বেশ দায়িত্ববান।এই যে তিনটা বছর শেষ করলো সম্মান (স্নাতক) এ কখনোই ফলাফল খারাপ হয়নি। সবসময় টপে থেকেছে।দুই মাস বাদে সপ্তম সেমিস্টারের পরীক্ষা তাই এত মনোযোগ দিয়ে পড়ছে।তারা নয়নকে দেখে আরও বেশি অনুপ্রেরণা পায়।তার কাজেও নয়ন সবসময় সাহায্য করে।বলা যায় নয়ন এখন থেকেই তারার পাশে থেকে জুনিয়র হওয়ার মতোই কাজ করছে।
বিছানায় শুয়ে একমনে দেখতে লাগলো নয়নকে।শ্যাম বর্ণের এই সুদর্শন পুরুষটি দুই বাচ্চার বাবা, দিনরাত পরিশ্রম করে তারপরও কখনো যেন ক্লান্তি তাকে ছুঁতে পারে না।স্ত্রীকে সময় দেওয়া, বাচ্চাদের ইচ্ছা পূরণের জন্য সবসময়ই তাদের খুশিকে গুরুত্ব দেওয়া, মায়ের আদেশ অনুদেশ মেনে চলা,ছোট বোনের আবদারগুলো দূর থেকেই পূর্ণ করা,ব্যবসা করা,ক্ষেতের কাজে সমানতালে চাষিদের সাথে হাত লাগানো, নিজের পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া সবটাই খুব নিখুঁত,নির্ভুল আর গোছালোভাবে করে।
তারা শুধু ভাবে একটা মানুষ এতটা নিখুঁত হয় কি করে? আচ্ছা এই মানুষটাই কারো দ্বারা তিরষ্কিত হয়েছিলো,হয়েছিলো অবহেলিত- অবজ্ঞার শিকার! কিভাবে কেউ এমন একজনকে পেয়েও ছেড়ে দিলো।
-- "সে ছেড়েছিলো বলেই তো আমি পেয়েছি" আল্লাহ আমার কপালেই লিখেছিলো এই রত্নের ন্যায় মানুষটিকে! আমাকে ধন্যি করার জন্যই আল্লাহ তাকে অতটা অপমানিত করেছিলো।এটা কি আল্লাহর অপার করুণা নয়!
মনে মনে আল্লাহর কারিশমা কল্পনা করছিলো, আর তার সাথে শুকরিয়া জ্ঞাপন।
তারা ভাবলো আজকে চেম্বারে হওয়া সেই কথা যা তারা নয়নের থেকে লুকিয়ে ছিলো। তারাকে সে যা বলছে তা কেবল একটা ঘটনা,এমন ঘটনা তারাকে বিচলিত করে না।তারা বিচলিত হয়েছিল অনেক দিন পর শিউলি মুক্তাকে দেখে।"শিউলি মুক্তা"সেই নারী যার সাথে তার মানুষটির জীবন প্রথমে জড়িয়েছিলো।
শিউলির স্বামী শারীরিক, মানসিক নির্যাতন করে,ভরন-পোষন দেয় না।তাই শিউলি এসেছিলো
তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে তার সাথে তালাক।অথচ শিউলির বর্তমানে একটা বাচ্চা আছে। লোকটা নাকি তার প্রতিও দায়িত্বশীল নয়।
শিউলি উকিলের চেয়ারে তারাকে দেখে প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, কিন্তু ঐ যে স্বভাব যায় না মরলে তার দশাও তাই। নিজের জীবনের এতটা করুন পরিনতিতেও তারাকে খোঁচা দিতে ভুল করেনি।কথা এভাবে বলেছে যেন তার আর নয়নের সহস্র বছরের সম্পর্ক ছিলো আর তাদের মাঝে বিচ্ছেদের কারণ তাঁরা ছিলো। আসলে কিছু মানুষ এমনই থাকে।এরা কোন ভাবেই নিজের ভুলকে চোখে দেখে না,আর না শুধরাতে চায় না। শিউলি মুক্তাও তেমনি একজন নারী।
শিউলির পরিস্থিতি নিয়ে তারার একটু মন খারাপ হয়েছিল তবে তার চেয়েও বেশি হয়েছিল এটা ভেবে এই মহিলা তাদের সম্পর্কে নিয়ে অহেতুক কথা বলেছে তাই।
সমাজে শিউলি মুক্তা আছে,লায়লা আছে আবার আছে তারারা! এই সমাজে তাহসান আছে,নূর আছে আবার নয়নরাও আছে!
শিক্ষিত সমাজ গঠনের প্রথম শর্ত সুশিক্ষিত হওয়া।শিক্ষা হওয়া উচিত মনস্তাত্ত্বিক উন্নতির জন্য, সামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন এবং তার সংশোধন সাধনের জন্য।আমার শিক্ষা কোনভাবেই যেন অন্যের উপরে ভারী না হয়ে পড়ে এটাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
নারী শিক্ষা একান্তই জরুরী। একজন সন্তান তখনই আদর্শ এবং সৎ হয়ে উঠবে যখন তার মা সুশিক্ষিত থাকবে।তাই নারীকে শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব অবশ্যই তার পরিবারের উপরে বর্তায় এবং তা যেন প্রতিটি পরিবার স্বাচ্ছন্দে করে।তবে এটাও খেয়াল রাখা জরুরি শিক্ষিত হতে গিয়ে যাতে বর্বর না হয়ে পড়ে।তার শিক্ষা তাকে মানুষ তৈরি করে,নারীত্ব ধরে রাখে।
নয়নের জীবনের দুই নারী নয়নকে দিয়েছে দুটো অনুভূতি,শিউলির জীবনে দুই পুরুষের থেকে পেয়েছে দুই ধরনের পরিস্থিতি,নূর লায়লার জীবনের ঘটনা আমাদের সমাজের অন্যতম কুৎসিত সত্য।কোনটাই কাম্য নয় কিন্তু ঘটে অহরহ।
আমি ছোটখাটো মানুষ,হালকা করে সাধারণ একটি প্লটে লিখতে ইচ্ছে করেছিলো তাই চেষ্টা করেছিলাম কতটা পারলাম জানিনা। অনেক সময় নিয়ে শেষ করলাম, আমার পেইজে যারা নিয়মিত তারা বিগত দিনে আমার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত তাই আশাকরি অভিযোগ করবেন না।
তবে ভালো খারাপ যাই হোক অবশেষে জানাবেন।
স মা প্ত
0 মন্তব্যসমূহ