#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৭৩_সারপ্রাইজড
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
সেদিন রাতে সবাই গাজী বাড়িতেই থেকে গেলো।কেউ আর বাড়ি ফিরতে পারলো না,নাসিফ দিলো না।
বাড়িতে গিয়ে সবাই বেশ চমকিত হলো কারণ তাইফের জন্য উপহার এসেছে তাও কার তরফ থেকে! নাইফের আপন নানা বাড়ির থেকে।নাইফের নানা স্ট্রোক করে প্যারালাইজড শয্যাশায়ী হয়ে ছিলো দীর্ঘদিন।নাসিফ আফিয়া আর নাইফ, নাবীহাকে নিয়ে দেখে এসেছিলো।বেশ কয়েকদিন আফিয়া রান্না করে রোগীর পথ্য নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে দেখে এসেছিলো। খানিকটা সুস্থ হওয়ার পর নাইফের বড় খালা নিজের বাবা মা'কে নিজের সাথে রাখার জন্য কানাডা নিয়ে যায় যেহেতু কানাডার চিকিৎসা সেবা উন্নত এবং মান ভালো তাই। তাছাড়াও এখানে উনাদের দেখভালের জন্য তো আর কেউ নাই।সহায় সম্বল যা আছে তা দেখভালের জন্য উপযুক্ত লোক নিয়োগ করা হয়েছে এবং মাঝে মাঝে তার স্বামী এসে দেখে যায়।
নাসিফ নিয়মিত ফোনযোগে শ্বশুর শাশুড়ির খোঁজখবর নেয়।মাঝে মাঝে আফিয়াও ফোন দিয়ে কথাবার্তা বলে।যদিও নাইফের খালার সাথে তেমন কোন কথা এখনও হয়নি।তবুও আফিয়া বারবার নিমন্ত্রণ করেছে,যদি বাংলাদেশে আসে তবে অবশ্যই যেন এই বাড়িতে থাকে।
বসার ঘরের সোফায় পাশেই বিশাল একটা বক্স দেখে আশ্চর্যিত চোখে চেয়ে রইলো সবাই।সালমা ফাওযিয়া সবার কথার একত্রে উত্তরে বললেন,
“ তাইফের আরেক নানা বাড়ি থেকে তাইফের জন্য জন্মদিনের উপহার পাঠিয়েছে!
_ আর বলেছে যদি গিফট পছন্দ না হয় তাহলে তাইফকে নিজের পছন্দ করা কোন গিফটের কথা তাদের বলতে, পাঠিয়ে দিবে।"
“ মানে কি? এত বড় প্যাকেটে; এত কি ?"
“ খুলে দেখো।"
নাসিফের প্রশ্নে বললেন সুলতানা আযিযাহ।
“ আচ্ছা সবাই আগে ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম নাও। তারপর দেখা যাবে।"
“ হ্যাঁ তাই।
_ আমি রুমে যাচ্ছি!"
বলেই নাসিফ নিজেদের ঘরের দিকে এগুলো।তার কাঁধে মাথা রেখে তুহি ঘুমিয়ে আছে। মেয়েকে নিয়েই গেলো। এদিকে সালাহর হাতের মুঠোয় থাকা তাইফের হাত ছুটিয়ে তাইফ দৌড়ে বক্সের কাছে গেলো।
এইটা আমার?"
বলেই সে উচ্ছসিত হয়ে উঠে নিজের মায়ের দিকে চাইলো। আফিয়া ছেলের খুশি দেখে হাসলো। অতঃপর বললো,
“ হ্যাঁ এইটা তোমার
কিন্তু এখন খুলা যাবে না বাবা।আগে ফ্রেশ হও তারপর!"
রাস্তায়ই মাগরিবের আযান পড়ে যাওয়ায় পুরুষেরা সবাই এক জায়গায় গাড়ী থামিয়ে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করে নেয় আর মহিলারা সব গাড়ীতেই।
“ এখন খুলি!
_ প্লিজ!"
“ না বাবা, তুমি এটা খুলতে পারবে না।আগে বাবা, মামা, খালুজান ফ্রেশ হোক তারপর তারা এসে খুলে দিবেনে।তখন দেখো।এখন চলো তো মায়ের সাথে। মায়ের তোমাকে দরকার!"
তাইফ শুনলো।এখন সে খুব একটা জেদ করে না। খুব স্বাভাবিকভাবেই সে মায়ের হাত ধরে ঘরে গেলো
বাথরুমে নাসিফ। মেয়েকে দোলনায় শুইয়ে সে গোসলে গিয়েছে বোধহয়।আফিয়া ছেলেকে নিয়ে ছেলেদের ঘরে গেলো,সেখানেও নাইফ বাথরুমে। অতঃপর গেলো মেয়ের ঘরে। গিয়ে দেখলো মেয়ে তার বিছানায় গা এলিয়ে পা ঝুলিয়ে শুয়ে আছে।
“ কি ব্যাপার তুমি ফ্রেশ না হয়েই এভাবে শুয়ে আছো কেন?"
মায়ের কন্ঠ শুনতে পেয়ে উঠে বসলো নাবীহা।পড়নে তার একটা সুতার কাজ করা হালকা গোলাপি সুতার কুর্তি আর চুড়িদার।গোলাপী সুতায় কাজ করা সাদা ওড়নাটা পাশেই ছিলো। দ্রুত সেটা গায়ে তুলে সামনে ছড়িয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসলো।
“বেশি টায়ার্ড লাগলেও আগে ফ্রেশ হও।দেখবে চট করে সতেজ হয়ে গিয়েছো।আম্মুকে একটু সময় দাও তোমাদের ঠান্ডা ঠান্ডা শরবত বানিয়ে দিচ্ছি।”
“ওকে!
কিন্তু একটু পর গোসল করি?"
“ আচ্ছা করো। ততক্ষণে আমি তাইফেক করাই।"
তাইফ বড় বোনের সামনে দাঁড়িয়ে গর্ব করে বললো,
“ বুবুন তুমি দেখেছো আমার জন্য এত্ত বড় গিফট এসেছে?"
“ হ্যা দেখেছি।খালামনি পাঠিয়েছে তোমার জন্য।"
“ কিন্তু এটা কোন খালামনি? আমার খালামনি তো আমাকে সকালেই গিফট দিয়েছে,তাই না আম্মা!"
তাইফ নাবীহার আপন খালাকে চিনে না।নাবীহাও খুব একটা চিনে না। এমনকি আজ অবধি সরাসরি দেখাও হয়নি।যখন ছোট ছিলো,যখন ওর মা মারা গেলো সেবারই প্রথম দেখা,তখন তো নাবীহা একেবারেই পুঁচকে ছিলো। এরপর আর দেখা হয়নি। কোনদিন সরাসরি কথাও হয়নি।এখনো যে ওর খালা ওকে খুব একটা ভালোবাসে তাও না।ফোন করে,নাইফের সাথে কথা বলে। মাঝে মাঝে ওর কথা জিজ্ঞেস করে এবং কখনো সখনো টুকটাক কথা বলে।তাইতো নাবীহারও তাদের প্রতি খুব একটা টান আসে না।অথচ সাফিয়ার কথা শুনলেই নাবীহা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়।মাস দুই আগেই তাদের স্কুল সংস্কারে জন্য কিছুদিন ছুটি দিয়েছিলো,সেই ছুটি সে খালা বাড়িতে গিয়ে কাটিয়েছে।সাফিয়াও ভাগ্নিকে পেয়ে ইচ্ছা মতো আদর দিয়েছে।
রেজওয়ান কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে নিজের মেয়ে এবং জেঠাসের মেয়েকে নিয়ে ইচ্ছা মতো ঘুরে বেরিয়েছে তার এলাকার আশেপাশে।একগাদা কাপড়,খেলনা, কসমেটিকস কিনে তারপর নিজেই বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলো।
নাসিফ তখন বেশ মুগ্ধ হয়েছিলো তার শালী এবং ভায়রার এত ভালোবাসা তার মেয়ের প্রতি দেখে।
তাইফকে নিজ হাতে গোসল করিয়ে ভালো করে গা মুছিয়ে টাওয়াল পেঁচিয়ে ঘরে পাঠালো। তারপর তাইফের গায়ের মাত্র ছেঁড়ে যাওয়া কাপড়গুলো ঝুড়িতে রেখে বেরিয়ে আসলো।
তাইফ তার ঘরে চলে গিয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখলো তার বড় ভাইও কাপড় পড়ছে।তাইফকে দেখে নাইফ বললো,
“ কিরে, গোসল শেষ লাল চাঁন!"
‘লাল চাঁন?'তাইফের মনে প্রশ্ন জাগলো,সে নিজের টাওয়াল খুলে তা দিয়ে মাথার পাগড়ি বানিয়ে বললো,
“ লাল চাঁন কি? "
নাইফ ভাইয়ের অজ্ঞতায় হাসলো অতঃপর ভাইকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বললো,
“ ঐ দেখ আম্মু তোকে এমন ভাবে সাবান দিয়ে কচলিয়েছে যে তোর নু/নুও লাল হয়ে গিয়েছে!
তাইতো তোর নাম লাল চাঁন!
_ মানুষকে নু/নু দেখিয়ে মাথায় পাগড়ী পড়ে হাফেজ সাজছে!লালালালালল চাঁন!"
বলেই তাইফ নিজের মাথা মুছতে মুছতে হাসতে লাগলো।তাইফ এত সময়ে বুঝলো ভাই তাকে অপমান করছে।তার রাগ হলো।ক্রোধে গাল ফুলিয়ে জোরে একটা ফোঁস করে আওয়াজ তুলে নিঃশ্বাস ছাড়লো এবং বললো,
“ আমি লাল চাঁন না। কাউকে নাম ধরে ভেঙ্গালে আল্লাহ গুনাহ দেয়। আমার নাম নাফিস ওয়াসীত্ব গাজী ওরফে তাইফ, বুঝেছো তুমি!"
“ বাপরে!"
নাইফ বড় বড় চোখ করে কথাটা বললো।ছোট ভাইয়ের প্রতিক্রিয়া দেখে তার দমফাটা হাসি আসছে। কিন্তু হাসলো না।এখন হাসলেই ভ্যাঁ করে উঠবে অতঃপর তার পিঠে মায়ের কয়েকটি পড়বে।তাই সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে দুই হাত একত্রে মুঠো করে ভীত হওয়ার ভান ধরে স্বীকারোক্তি ভাব করে বললো,
“ জ্বী হাফেজ সাহেব বুঝেছি।"
তাইফ গাল , নাক ফুলিয়ে রেগে বললো,
“ তুমি একটা পঁচা ভাইয়া!"
বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে ড্রয়ারে নিজের প্যান্ট খুঁজতে লাগলো। নাইফ এগিয়ে গিয়ে তাইফের গাল ধরে টান দিয়েই ভোঁ দৌড়। এদিকে তাইফ গাল ধরে ছলছল চোখে ভাইয়ের গমনপথে চেয়ে রইলো।সে এখন চিৎকার করে কাঁদে না।কারণ হুজুর বুঝিয়েছে সে একজন পুরুষ,আর পুরুষদের এভাবে কাঁদতে নেই।এতে পুরুষের পুরুষত্ব ক্ষরণ হয়।যেটা মোটেই হতে দেওয়া যাবে না কিন্তু ভাইয়া যে তার গাল ধরে টান দিলো! এক কি ঠিক! কেন গাল ধরবে? সে কি মেয়ে? এখন যদি গালটা বড় হয়ে যায়! না তাইফ চুপচাপ এসব বরদাস্ত করবে না।সে এখনই বাবাকে গিয়ে বলবে! বাবার কাছে নালিশ দিবে ভাইয়ার নামে!
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ।সে প্যান্ট পরার কথা বেমালুম ভুলে বসে,ঐ অর্ধ নেংটু অবস্থাতেই দৌড়ে বাবা মায়ের ঘরে গেলো।
নাসিফ গোসল সেড়ে মাত্র খাটে এসে বসেছে পা ঝুলিয়ে। ছোট্ট মেয়েটাকে দেখছে মন ভরে। কি শান্তির ঘুম দিয়েছে।
“ বাবা!"
চমকে উঠলো নাসিফ হঠাৎ করেই চিৎকার শুনে! পিছনে ফিরে হাতে প্যান্ট মাথায় তোয়ালে আর পুরো ন্যাংটো শরীর নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকা ছোট ছেলেকে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো, তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গিয়ে সামনে হাঁটু ভেঙ্গে বসে বললো,
“ কি হয়েছে? এভাবে কেন?"
“ ভাইয়া গাল ধরে টানে আর বলে লাল চাঁন!"
“ লাল চাঁন?"
নাসিফ নিজেও হতভম্ব হয়ে গেলো শুনে।তাইফ বোঝানোর ভঙ্গিমা করে বললো,
“ হ্যা এই দেখো আমার নুনু লাল দেখে ভাইয়া আমাকে লাল চাঁন বলেছিলো,আমি বলেছি নাম ভেঙ্গাবে না আল্লাহ পাপ দিবে তাই আমার গাল টেনে দিয়ে দৌড় দিয়েছে!"
“ তাই!"
“ হ্যাঁ!"
“ বাবা বলো,গাল টানলে বড় হয়ে যায় না?"
এটা নাসিফই বলেছিলো অনেকদিন আগে।কারণ তখন তাইফ প্রায়ই ঠোঁটের দুই কোনে আঙ্গুল ঠেকিয়ে ঠোঁট দুই পাশে টানতো।গাল ধরে টানতো।তখন নাসিফ বলেছিলো এমন করলে গাল বড় হয়ে যাবে তখন আর দেখতে সুন্দর লাগবে না।আর কেউ ভালোও বাসবে না।সেই কথারই প্রতিফলন এই!
নাসিফ ফোঁস করে একটা তপ্ত শ্বাস ছাড়লো। বাচ্চাদের উপরে মেজাজ আবারও চটলো।এই সারাদিন এত দৌড় ঝাপের পরও এদের এত এনার্জি কোথায় থেকে আসে যে নিজেদের মাঝে এখন এমন খোঁচাখুঁচি করছে।সে ছেলেকে বললো,
“ আচ্ছা ভাইয়াকে বকে দিবো নে। তুমি আগে প্যান্ট পড়ো।সবাই তোমার শরম দেখে ফেলছে!"
“ তুমি পড়িয়ে দাও!"
নাসিফ ছেলেকে প্যান্ট পড়িয়ে দিয়ে দ্রুত ঘরে গিয়ে গেঞ্জি গায়ে দিতে বললো। তারপর সে আবারও বিছানার দিকে এগিয়ে গেলো এবং গা এলিয়ে দিলো মেয়ের পাশেই।
ঐদিকে নাইফ রান্না ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে...
“ রুকাইয়া আন্টি আমাকে এক মগ কফি দাও না প্লিজ!
_ আমাকে পড়তে বসতে হবে!"
এই কথা শুনেই আফিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ তুমি এখন কি খাবে?"
মা'কে নাইফ খেয়াল করেনি।করলে এই রাতে কফি চাইতো না।মনের ভুলেও না।কারণ এখন কফি খেলে সারা রাত সে ঘুমাবে না।এতে তার সমস্যা নাই। সমস্যা তো তার বাবা-মায়ের।বাবা মায়ের কথা হলো সবকিছু একদিকে আর সময় মতো খাওয়া,ঘুম একদিকে।নাইফ অসহায় চোখে চেয়ে বললো,
“ আম্মু পড়া বাকি আছে। সেগুলো..
“ এখন তুমি এই শরবত খাবে। অতঃপর আমি ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার দিবো সেটা খেয়ে চার ভাই বোন চুপচাপ ঘুমাবে।আর একটা টু টা শব্দও আমি শুনতে চাই না।
_যাও!"
“ ওকে!"
নাইফ যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই চলে গেলো।আফিয়া একা একাই বিরবির করতে থাকলো।
চলমান...







0 মন্তব্যসমূহ