#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৭২
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
“আফিয়া!"
উচ্চ স্বরে কারো ডাকে অতিত থেকে বর্তমানে ফিরে এলো আফিয়া।মেয়েটা কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আবারও ডাক ভেসে আসলো,
“ আফিয়া!"
“ জ্বী বলেন।"
“ তোমাদের কাজ শেষ? আমাদের সব গুছানো হয়ে গিয়েছে।রওনা দিতে হবে। সন্ধ্যা নেমে আসছে।"
“ জ্বী বের হচ্ছি!"
“ আমার ব্যাগটা কোথায়?"
বলেই সাফিয়া নিজের আশেপাশে নিজের ব্যাগটা খুঁজতে লাগলো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে না।ভ্রু কুঁচকে চারদিকে খুঁজতেই দেখলো সেটা বেশ কিছু দুরে একটা টেবিলের নিচে পড়ে রয়েছে। বুঝতে পারলো না কখন সে ঐটা ঐখানে রেখেছিলো।সে তো আসার নিজের এই স্থান থেকে উঠেই না একবারের জন্যও।তাহলে?
“ আশ্চর্য ব্যাগটা ঐখানে গেলো কি করে? আমি তো নড়লামই না জায়গা থেকে! তাহলে?"
“ হ্যাঁ তাই তো।তুই এখানে তোর ব্যাগ ঐখানে কিভাবে কি?"
আফিয়ারও একই প্রশ্ন।দোয়া এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটা তুলে আনলো এবং বললো,
“ ছোট আপা দেখো তো সব ঠিকঠাক আছে কি-না?"
“ হ্যাঁ!"
সাফিয়া ব্যাগ খুলে দেখলো সব ঠিকঠাকই আছে তাহলে এটা স্থান থেকে সরলোই বা কিভাবে এবং সরালোই বা কেন?
“ ফায়রুজ বের হও! আরে কতক্ষন লাগবে তোমাদের? ঐদিকে মাগরিবের আজান পড়ে যাচ্ছে।ভর সন্ধ্যায় কি বাচ্চাদের নিয়ে বের হবো? "
“ দাঁড়ান তো একটু! সবসময় এত হম্বিতম্বি করেন কেন?"
বলেই সে ছিটতে ছিটতে বের হলো।রেজওয়ান ভ্রু কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলে তিক্ত কন্ঠে বললো,
“ এগুলো কেমন আচরণ সাফিয়া পাবলিক প্লেসে? ব্যবহারে লাগাম দাও!"
“ তো কি করবো? একটু আগেই ভাইয়া ডেকে গেলো না? এখনই আবার আপনাকেও কেন ডাকতে হবে? আমরা কি মানুষ না! রোবট মনে হয়? এতগুলো বাচ্চা নিয়ে বের হতে সময় লাগে না?"
“ আরে কি হচ্ছে এখানে? তোমরা এখানে দাঁড়িয়ে!"
রেজওয়ানের পিছনে দাঁড়িয়ে চোখ কপালে তুলে কথাটা বললো নাসিফ। আফিয়াও সাফিয়ার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।সেও বোনকে দেখছে। হতভম্ব হয়ে গিয়েছে।এত চটার কারণ খুঁজে পেলো না।
বড় দুলাভাইয়ের উপস্থিতিতে সাফিয়া আর কথা বাড়ালো না।পাশ কাটিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেলো। ছোট্ট ফেরা তার মামার কাছে আগেই গিয়েছে। ঐদিকে দোয়া বড় ননাসের ব্যাগ সামলাচ্ছে যেটা নাম ননাসরের হলেও কাজ হয় চৌবাচ্চার! সেও অত্যাশ্চর্য হয়ে চেয়ে আছে।ভাবছে হলোটা কি ! এমন কি হলো যার জন্য তার ছোট ননাস এত ক্ষেপছে! সালাহ্ এগিয়ে এলো,হাতের মুঠোয় তার মেজো ভাগ্নি,ছোট বোনের একমাত্র আমানত।
“ তোমরা বের হবে না?"
দোয়াও বেরিয়ে এলো। এবং বললো,
“ হুম!
_ চলেন!ওকে আমার কাছে দিয়ে ভেতরে একটা ব্যাগ আছে ঐটা নিলে ভালো হয়।ঐখানে টুকটাক জিনিস আছে বাচ্চাদের!"
“ আচ্ছা ঠিক আছে। তবে তুমি পারবে এত বড় ব্যাগটা নিয়ে আবার ওকে নিতে?"
“ হ্যাঁ পারবো। সমস্যা নাই।"
“ সাবধানে!
_ যাও মামা মামী মনির কাছে যাও!"
“ ফিহা আইসো আম্মা! মামী মনির কাছে আসো তো বাচ্চা!"
বলেই সে ফিহাকে কোলে তুলে নিলো।ফিহা ওরফে ফেরাও সানন্দে নিজ মাতৃতুল্য মামীমনির কাছে গেলো।তাইফ দৌড়ে আসলো এটা দেখে।মামী মনির কাছে এসে বললো,
“ মামী মনি।"
তাইফকে দেখে প্রথমে দোয়ার একটু ভয় করলো এই ভেবে যে এই পন্ডিত এখনই আবার ভ্যাঁ করে না উঠে তাহলেই কেল্লাফতে হয়ে যাবে।দেখা যাবে ছোট আপা দৌড়ে এসে ফেরার পিঠে দুটো দিবে আর আহাজারি করতে করতে বলবে,
“ তোর সাহস কি করে হয় আমার ভাগ্নেকে কাদানোর।"
তাইফের প্রতি সাফিয়ার অন্যরকম টান।যেটা খালা ভাগ্নের চেয়ে অনেক উপরে,অনেকটা ছাপিয়ে।
কিন্তু তাইফ তেমন কিছুই বললো না। উল্টো নিজের ডান হাত বাড়িয়ে ফেরাকে বললো,
“ ফেরা চকোলেট নেও।এটা তোমার! ভাইয়া দিলাম ঠিক আছে!"
দোয়ার চোখ কপালে উঠে যাওয়ার উপক্রম।ওমা এত সহজেই নিজের চকোলেট দিচ্ছে তাও কাকে? ফেরাকে! এক সেকেন্ড নিজের আশেপাশে সহ্য করতে পারে না আর এখন চকোলেট দিচ্ছে আর বলছে ভাইয়া দিলাম!দোয়াকে আর চমক দিয়ে তাইফ বললো,
“ ফেরা আমি তোমার জন্য একটা হাদিয়া বানিয়েছি। তুমি যদি আমাদের বাসায় বেড়াতে যাও তাহলে আমি সেইটা তোমাকে দিবো।ওকে! বলো আসবে?"
দোয়া শকডের উপর শকড খেয়ে থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে।তাকে পাত্তা না দিয়ে চিকন চিকন ইঁদুরে দাত বের করে ফেরা বললো,
“ আচ্ছা তাইফ। তুমি অনেক ভালো!"
ফেরা তাইফকে তাইফ'ই ডাকে।ভাইয়া বলে না।
যেটা তাইফের খুব একটা ভালো লাগে না কিন্তু তাও তাইফ আজ কিছু বললো না।ঐদিকে ফেরার কাছে ভাইয়া শুধু নাইফ।আর ভাইয়া বলতেই সে পাগল।যখন তার নাইফ ভাইয়া তার পাশে থাকে তখন তার আর কিছু লাগে না।
“ কি ব্যাপার তুমি এখনো এইদিকে দাঁড়িয়ে আছো কেন?"
“ দাঁড়িয়ে নই ভাই।আমি জমে গিয়েছি!"
“ মানে কি?"
“ মানে আমি অষ্টমাশ্চর্য দেখে ফেলেছি!"
“ মানে কি? কি সব আবোল তাবোল বকছো?"
“ আবোলতাবোল না আবোলতাবোল না। আপনার ভাগ্নে মিস্টার নাফিস ওয়াসীত্ব গাজী ওরফে তাইফ আজ একদম অত্যাশ্চর্য একটি কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে! যেটা অষ্টমাশ্চর্যের চেয়ে কোন অংশে কম না।"
“ কি ! কি করছে?"
বলেই সে ভাগ্নের দিকে তাকালো।তাইফ গোল গোল চোখে ফেরাকে দেখছে।আর ফেরা মামী মনির কোল চড়েই চকোলেটের প্যাকেট ছেঁড়ার চেষ্টা করছে কিন্তু সে ফেইল করলো।পারলো না।তা দেখে হাত বাড়িয়ে তাইফ বললো,
“ আমাকে দাও।আমি তোমাকে ছিঁড়ে দেই।"
এটা দেখে সালাহ্ও থম মেরে গেলো।কি হচ্ছে এগুলো? এরা এমন ভাব কবে ঘটালো? বাপরে! একজনের সামনে আরেকজনকে আদর করা যায় না।কিছু দেওয়া যায় না।কোলে নেওয়া যায় না।আর এখন কি-না একজন আরেকজনকে! আসলেই এটা অষ্টমাশ্চর্যের মতোই! না না এটা তার চেয়েও বেশি!
_________
“ কি হয়েছে তোমাদের মধ্যে রেজওয়ান? আমার একমাত্র শ্যালিকা এমন বোম হয়ে আছে কেন? কি করেছো তুমি?"
বড় ভায়রার এমন সন্ধানি প্রশ্নে বেশ বিব্রত হলো রেজওয়ান।কেন এমন ব্যবহার করলো সাফিয়া তার চেয়েও বেশি খোচাচ্ছে কেন এই জায়গাতেই কেন সবার সামনেই করলো সেটা ভেবে! নাসিফ ভায়রার নিশ্চুপতায় উত্তর না পেয়ে স্বপত্নীর প্রতি মনোনিবেশ করলো, চোখের ইশারায় জানতে চাইলো,
“ কি হয়েছে? "
আফিয়া ঠোঁট উল্টে কাঁধ উঁচিয়ে বুঝালো সেও জানে না।নাসিফ ভায়রার কাঁধে হালকা চাপড় মেরে বললো,
“ আচ্ছা ঠিক আছে বলতে চাইছো না বলো না।তবে বলবো আমার শ্যালিকা ভুলটুল কিছু করলে মাফ করে দিও । স্ত্রীর উপর চটে থাকতে নেই।জানোই তো একটু স্ক্রু ঢিলা।"
“ হুম। চিন্তা কইরেন না।
চলেন!
_ আপা আসেন!"
বলেই রেজওয়ান এক পলক আফিয়ার দিকে চেয়ে নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিচের দিকে তাকিয়েই হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলো।
“ ঘুমাচ্ছে?"
“ হ্যাঁ। খাওয়াচ্ছিলাম, কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো টেরই পাইনি।"
“ দাও।আমার কোলে দাও!"
“ এখানের সব কাজ শেষ?"
“ হ্যাঁ বাচ্চাদের খাওয়া-দাওয়া শেষ। তারপর ডোনেশন যা দেওয়ার দিয়ে অফিসিয়াল কাজকর্ম শেষ করেই এলাম। তোমাদের এখানে কোন সমস্যা হয়েছিলো!"
“ না আল্লাহর রহমতে সব ঠিকঠাকই ছিলো।"
কথাটা বলতে বলতেই আফিয়ার মনে পড়লো সামিয়ার ব্যাগের কাহিনী,সে একটু এগিয়ে বরাবর হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললো,
“ আমি না বুঝলাম না,সাফিয়ার ব্যাগ ছিলো ওর পাশেই।ওতো আসার পর যেখানে এসে বসেছে সেখানেই ছিলো।এক মিনিটের জন্যও উঠে নাই। তাহলে ওর ব্যাগটা অন্য কোনায় গেলো কিভাবে বলেন তো?আমরা কেউ তো আর ওর ব্যাগ নিয়ে অন্যত্র ফেলে আসবো না! "
” কি বলছো? কিছু চুরিটুরি হয়েছে নাকি?"
“ না সাফু তো বললো সব ঠিকই আছে। কিছু গায়েব হয়নি।গায়েব হলে ভাবতাম চুরির করেই ফেলে দিয়েছে কিন্তু তেমন কিছু করেনি এখন কি ভাববো বলেন তো?"
“ যেই নিক চুরির জন্যই নিয়েছিলো কিন্তু হয়তো শেষ পর্যায়ে সাহসে কুলোয়নি।তাই ফেলে দিয়েছে। অন্তত জিনিসপত্র ঠিক থাকলে তদন্ত করা হবে না তাই ।"
“ আপনার কি সত্যিই তাই মনে হচ্ছে?"
“ মনে হওয়ার কিছুই নেই।এটাই সত্য, আসল ঘটনা!"
“ আল্লাহ জানে কোনটা সত্য!"
কথা বলতে বলতেই দু'জন মাঠের মধ্যে এসে পৌঁছিয়েছে।ঐদিক থেকে এতিমখানার শিক্ষক দুজন, একজন সহকারী শিক্ষক আরেকজন প্রধান শিক্ষক। আরেকজন হচ্ছে এই এতিমখানার দায়িত্বে আছেন। তিনজন সহ তাইফের সমবয়সী কিছু বাচ্চা এসে ওদের বিদায় দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।
নাসিফ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে করমর্দন করে টুকটাক আরো আলাপ করে বিদায় নিলো।আফিয়াও তাদের সালাম দিয়ে বাচ্চাদের আদর করে বেরিয়ে আসলো।
চলমান....
সবাই বেশি বেশি কমেন্ট করবেন এবং অবশ্যই সমালোচনামূলক গঠনমূলক কমেন্ট করবেন!
সবাইকে ভালোবাসা!🌸







0 মন্তব্যসমূহ