#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৭৭
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
জীবনের কিছু মুহূর্ত খুব অপ্রত্যাশিত কিন্তু ঘটাটাও খুব জরুরী।নয়তো আমাদের অজানাই রয়ে যেতো যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তার অসহায় বান্দার প্রতি জুলুম করেন না।কখনো তাদের থেকে তা কেড়ে নেয় না যা তাদের জন্য কল্যাণকর। নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে বেশি তিনি বেশি জানেন, জানেন কিসে আমাদের কল্যাণ কিসে আমাদের অকল্যাণ! আমাদের রব মহান,পরম করুণাময় অতি দয়ালু, নিঃসন্দেহে তিনি সর্বোচ্চ জ্ঞানী এবং সুবিবেচক।তাই তার কোন সিদ্ধান্তে আমাদের সন্দেহ পোষণ করার অধিকার নেই।নেই তাকে প্রশ্ন করার কিংবা কৈফিয়ত চাওয়ার মতো অতি দুঃসাহসিক,বেয়াদবি করার অধিকার। আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের সেই সকল নাফরমানি থেকে দূরে রাখুন যাতে রবকে নিরাশ করা হয়।
কলেজ বন্ধুদের রিইউনিয়ন পার্টি।এটাকে ঠিক রিইউনিয়ন বলা যায় কিনা তা বোধগম্য হচ্ছে না। কারণ এটা মূলত প্রবাসী এক সহপাঠীর বাড়িতে করা আয়োজন, যেখানে উপস্থিত কলেজের সকল কাছের বন্ধুরা। তাদের মধ্যে আফিয়াও একজন।কলেজ জীবনের সবচেয়ে কাছের দু'জন মানুষের মধ্যে এই তাহমিনা একজন। দীর্ঘ সময় প্রবাসী সংসার জীবনের মধ্যে সে নিজের আপন সত্তাকে হারিয়ে হাঁপিয়ে যাচ্ছিলো।তাই স্বামী এবং স্বামীর সংসার থেকে কিছুদিনের ছুটি নিয়ে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসে শান্তির শ্বাস নিতে।
সঙ্গে আসে তার একুশ বছরের এক পুত্র এবং পনেরো বছরের এক কন্যা।
কিন্তু দীর্ঘ দিনের দুরত্ব অনেক কিছু থেকেই তাদের দুরে সরিয়ে রেখেছে সেটা শুধু এক তাহমিনার ক্ষেত্রেই নয়।সকল তাহমিনা, আফিয়াদের জীবনেই ঘটে।একটা সময় পর নিজের ভালো লাগা ভালো বাসা বলতে আর ব্যক্তিগত কোন শব্দ থাকে না।সবটা জুড়ে তখন আধিপত্য বিস্তার করে একজন মানুষ কিংবা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের মাঝে।
বিয়ের পর শুধু নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতাই নয়, বিলুপ্ত হয় তার অনেক আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছার। হারিয়ে যায় অতল গহিনের পাদদেশে।কখনো কখনো উঁকি দিয়ে অন্তরের দহনই বাড়ায়,তাতে পূর্ণতা দেওয়ার প্রয়াস আর সচল থাকে না তখন।
হারিয়ে যায় কত সম্পর্ক,কত আত্মার বাঁধন।মুছে যায় এবেলা থেকে ওবেলা, খেলতে খেলতে গড়িয়ে যাওয়া অজস্র আত্নকথন,পথের পর পথ পায়ে পায়ে , কদমে কদম মিলিয়ে চলা মানুষটার সাথে থাকা অজস্র সুখ স্মৃতি কথা।অবসরে কখনো তা মনের আবডালে উঁকি দিলেও প্রকটাকারে তা আঁকড়ে বাঁচা যায় না।
এই জীবনে একটা সময় পর কেন জানি সবটা খালি সংসার নামক এক পাঠাগারের গ্রন্থশালায় সাজিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছা করা সৌন্দর্য বর্ধনে ব্যবহার করতে। অধিকাংশ বাঙালি নারীরা তাই করে।
এই যেমন পড়াশোনার পাঠ চুকতে না চুকতেই আফিয়াকে পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে জীবনের অনেক শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিতে হয়েছিলো। অনেক স্বপ্ন, ইচ্ছাকে মাটি চাপা দিয়ে কেবল বাঁচতে হয়েছিল। এরপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, পাঠাগারের দায়িত্ব নেওয়ার পালা, সেটাকে বলা হয় সংসার।
“ আরেহ আফিয়া না?"
বলেই কাঁধ চেপে নিজের দিকে ফিরিয়ে দাঁড় করালো শ্যাম বর্ণের এক মধ্য বয়সী নারী। আফিয়া সেদিকে ঘুরে ঐ মুখটা দেখতেই ঝলমলে হাসি দিলো।একই ভাবে বাহুতে হাত রেখে উজ্জ্বল চঞ্চল বদনে চেয়ে খানিক পর বললো,
“ মুনমুন কেমন আছিস?"
“ এইতো আলহামদুলিল্লাহ,চলছে জীবন কোনভাবে।তোর খবর বল? ভাইয়া বাচ্চারা কেমন আছ!"
“ আলহামদুলিল্লাহ রে, অনেক ভালো আছি।
তো সাথে কেউ আসে নাই। ভাইয়ারা বাচ্চারা কোথায়?"
আফিয়ার প্রশ্নটা শেষ হতেই মুনমুনের মুখে আঁধার নেমে এলো তা দেখে আফিয়া ভ্রু কুঁচকে ফেললো।এর মধ্যেই পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নাসিফ, সঙ্গে নাবীহা আর তুহি।নাসিফের পিছনে নাইফ।
আফিয়ার বন্ধু মহল থেকে আত্নীয় বর্গ সবাই'ই জানে আফিয়া নিজ স্বামী এবং বাচ্চাদের ছাড়া কোথাও যায় না। তাছাড়াও তাহমিনা চাইছিলো অনেক দিনের বিচ্ছিন্নতায় সবার জীবনে নতুন করে যোগ হওয়া মানুষগুলোর সাথেও পরিচিত হতে।তার মানে বন্ধু মহলের পরিবারের,সংসার নিয়েও তার আগ্রহ ছিলো।তাই সে সব বান্ধবী আর বন্ধুদের সপরিবারে নিমন্ত্রণ করে।
এই বাড়িটা তাহমিনার শ্বশুরের,বিশাল এড়িয়া নিয়ে ঘন বনরাজির মাঝে একটা ছোট বাংলো।এক পাশে ছোট একটি মাটির পুকুর। বিনা সুদে প্রকৃত থেকে ধার করে নেওয়া শীতল বরফ টলটলে জল, তার মাঝে উঁকি দিচ্ছে বড় বড় কয়েকটি পদ্ম, লাল শাপলা। এক পাশে নারকেল গাছের গুঁড়ি ফেলে তার দুই পাশে মোটা গজারির ডাল দিয়ে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ঘাট।যদিও কেউ পুকুরে গোসল করে না।তাও পুকুরের পাশটা বেশ পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে। সাভারের মাঝে বহু বছর আগেই বয়সকালের অবসর যাপনের জন্য তোফাজ্জল মৃধা নামক এক সরকারি কর্মকর্তা যিনি কি-না ছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ে। নিষ্ঠা এবং সততার সঙ্গে কাজ তোফাজ্জল মৃধা নিজের আজীবনের স্বল্প সঞ্চয় দিয়ে এই আট কাঠার জমিটা কিনেন।ছেলে মেয়েকে পড়াশোনা শিখিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছেন এই মর্মে তিনি আর কোথাও কোন সম্পত্তি কিংবা অর্থ সঞ্চয় করেননি। শুধুমাত্র শেষকালে কারো শরনাপন্ন হতে চান না বলে স্ত্রীকে নিয়ে একান্ত জীবন কাটানোর জন্য নিজ পিতার থেকে পাওয়া সামান্য কিছু ভুমি বিক্রি করে এবং বুদ্ধিমতী স্ত্রীর বুদ্ধিমত্তার দরুন হওয়া অল্প কিছু সঞ্চয় দিয়েই জমিটা কিনেছিলেন।তবে উনার ভাগ্যে বেশিদিন বয়সকালের এই সুখ সইলো না। স্বপ্নকে বাস্তবে পূর্নাঙ্গ রুপ দেওয়ার আগেই প্রিয়তমা স্ত্রী হঠাৎ করেই এক রাতে একা করে চলে যান। এতে ভেঙে পড়েন মনোকষ্টে! ডুবে যান নিঃসঙ্গতার কাতরে।একাকী জীবন বইতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো যার কারণে বছর গড়াতেই নিজেও পাড়ি জমান পরপারে।
ভদ্রলোক তিন ছেলে সন্তানের পিতা।তিনজনই ভালো ভালো অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত তাও নিজ যোগ্যতায়।তবে ভাগ্যক্রমে সবাই প্রবাসী এবং সেখানেই সেটেল। একেবারেই স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গিয়েছেন। যেহেতু দেশে পিতা-মাতা কেউ ছিলো না।এমন কোন পিছুটানও নেই তাই তাদের দেশে আসার তাগিদও নেই।তবে বাবার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে,বাবার রেখে যাওয়া অপূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতেই তিন ভাই মিলে বাবার রেখে যাওয়া এই সামান্য ভুখন্ডকে স্বর্গে পরিণত করে।বাবার ইচ্ছানুযায়ী চারদিকে নানারকম ফল, সবজি,ঔষধী,ফুলের গাছ লাগিয়ে মাঝে ছোট একটি বাংলাও বানিয়ে রাখে।যখন আসে এখানেই থাকে।তার পাশাপাশি আরো সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়ে যায়। দেখভালের জন্য একজন বিশ্বস্ত লোক রাখা আছে।তারা'ই কেউ আসলে খাতিরদারি করে থাকে।
তাহমিনার নিমন্ত্রণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অনেকেই নিজের বাচ্চা স্বামী সহ এসেছে।তেমনি আফিয়াও তার সব নিয়ে এসেছে।নাইফ নাবীহা বেশ উৎসুক ছিলো মায়ের বন্ধু বান্ধবীদের দেখার জন্য। সবসময় মায়ের মুখে যাদের কথা শুনে তারা আসলেই দেখতাম কেমন? এই বিষয়টা ওদের খুব উৎসুক করে তুলতো।তাই মায়ের আঁচলের গিঁট ধরেই চলে এসেছে।
মুনমুনের উত্তর পাওয়ার আগেই,আফিয়া নিজের পাশে নিজের পরিবারের সবাইকে দেখে বান্ধবীর সাথে পরিচয় করানোর ভঙ্গিতে হেসে হেঁসে বললো,
“ তোর দুলাভাই!"
“ তাই নাকি মাশাআল্লাহ বেশ সুদর্শন তো; ঐ স্বার্থপরটার চাইতেও!"
কথাটা বলেই মুনমুন একটু বেক্কল বনে গেলো।নাসিফ নিজের ভ্রু কুঁচকে ফেললো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো একবার আফিয়ার পানে আরেকবার মুনমুনের মুখে। আফিয়া বান্ধবীর কথা ঠিকই বুঝে নিলো। কিন্তু ওর মুখের প্রতিক্রিয়া বদলালো না।সে আগের মতোই হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো,
“ আল্লাহ মহান, নিশ্চয়ই যা নেন তার চেয়েও উত্তম কিছু ফিরিয়ে দেন।"
“ এটা তো অবশ্যই।তা বাচ্চা কাচ্চা!"
“ হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে আমার চারজন। দুই ছেলে দুই মেয়ে।.. এই যে আমার... এইদিকে আসো নাইফ!"
বলে বড় ছেলেকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বললো,
“ “ আমার বড় ছেলে।নাইফ ওয়াসীত্ব গাজী। বুয়েটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে,এবার প্রথম বর্ষের ফাইনাল দিলো।দোয়া করিস, এখনো রেজাল্ট দেয়নি!
_বাবা উনি তোমার একটা আন্টি হয়,আমার কলেজের অন্যতম ক্লোজ ফ্রেন্ড যদিও আমাদের একাডেমিক সাবজেক্ট আলাদা ছিলো তাও নিজ ডিপার্টমেন্ট ছাড়া অন্য ডিপার্টমেন্টের মধ্যে তোমার আন্টির সাথেই আমার ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো।বেশ মিশুকে আর প্রাণখোলা মানুষ।"
শেষ কথাগুলো ছেলের দিকে তাকিয়েই বললো।
ছেলের কাছে বান্ধবীর পরিচয় তুলে ধরলো। মুনমুন আফিয়ার দিকে চেয়ে হাসলো,ভাবছে মেয়েটার বয়সের ফেরে চেহারায় পরিবর্তন আসলেও আচরণ আর চঞ্চলতায় কোন পরিবর্তন আসেনি।
নাইফ মায়ের বর্ণনা শেষ হতেই মায়ের বান্ধবীকে সালাম দিলো,
“ আসসালামু আলাইকুম আন্টি!"
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম বাবা। মাশাআল্লাহ তুমিও তো তোমার বাবার মতোই সুদর্শন।"
নাইফ এই কথার প্ররিপ্রেক্ষিতে মৃদু মুচকি হাসলো , লজ্জা পেয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে নজর নামিয়ে ফেললো।
বড় মেয়ে আর ছোট মেয়েকেও একইভাবে পরিচয় করিয়ে বললো,
“ আমার নাবীহা এবার নবম শ্রেণিতে আছে।আর তুহিটাকে মাত্র মাদ্রাসা দিলাম।ছোট ছেলেটা মাদ্রাসায় পড়ছে আল্লাহর রহমতে সে এখন তিরিশ পারার হাফেজ!"
বলেই আফিয়া থেমে দম নিলো, সঙ্গে সঙ্গে একটা চমৎকার হাসি দিয়ে বান্ধবীর দিকে চেয়ে রইলো। মুনমুন আফিয়ার সাংসারিক জীবন অনুভব করে প্রকৃত অর্থেই খুশি হলো। সঙ্গে ভাবলো ভাঙাচুরা একটা মনকে এত সুন্দর করে সাজিয়ে তোলাটাও অনেক বড় শিক্ষা জীবনের।
মুনমুন বান্ধবীর সবটা শুনে বললো,
“ আলহামদুলিল্লাহ । আল্লাহ তোকে সত্যিই সুখে রেখেছে।সবার কাছ থেকে শুনেছি তুই সুখে আছিস কিন্তু আজ চোখে দেখে সত্যিই শান্তি লাগছে।তুই আসলে এই সুখটা ডিজার্ভ করিস। আল্লাহ এভাবেই রাখুক।"
“ আচ্ছা তোর কথা তো কিছু বললি না।কি করছিস আজকাল? কোথায় আছিস? মাঝে অবশ্য শুনেছিলাম তুই নাকি দুবাই সেটেল হয়ে গিয়েছিস! ভাইয়ার নাকি ঐখানেই স্থায়ী হওয়ার ইচ্ছে!
আসলে কি বলতো, চার ছেলে মেয়ে নিয়ে আমি এত ব্যস্ত থাকি যে আর কারো খোঁজ নেওয়ার সময়ই পাই না।মাঝে মাঝে তো দম ফেলারও ফুরসৎ মিলে না রে! সবাই ভাবে বড়লোক স্বামী শ্বশুর বাড়ি পেয়ে আমি সব ভুলে গিয়েছি কিন্তু আসলে তেমনটা না।আমি আসলেই..
“ বাদ দে,যার যার অবস্থা সে সে বুঝে। এখানে অন্যদের মতামতের গুরুত্ব নেই,দিবিও না।"
চলমান....
বানান ভুল, শব্দ মিসিং যাই দেখবেন কমেন্ট করে অবশ্যই বলবেন,চেক করার সময় পাই না।







0 মন্তব্যসমূহ