#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৭৮
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
“ আমি এগুলোকে সিরিয়াস নেই না রে।আমার কাছে সবার আগে আমার সংসার। আমার চারটা বাচ্চার ভবিষ্যত। শ্বশুর শাশুড়ি।এরা ঠিক থাকলেই আমি আর তোর ভাইয়া ভালো থাকি।
যাই হোক তোকে দেখে মনে হচ্ছে একা এসেছিস।তুই কি একাই দেশে এসেছিস নাকি?"
“ না আমি একা থাকি না। সঙ্গে আমার মেয়েও থাকে।"
“মেয়ে থাকে মানে?"
“ সেটা অনেক বড় কথা,এখন এভাবে!"
আফিয়া বুঝতে পারলো মুনমুন বলতে চাইছে কিন্তু নাসিফ কিংবা বাচ্চাদের সামনে বলতে লজ্জা পাচ্ছ।তাই বাচ্চাদের উদ্দেশ্য বললো,
“ নাইস ভাই বোনদের নিয়ে কোথাও বসো বাবা,এক কাজ করো তোমরা স্ন্যাকস নেওয়া শুরু করো।আমি তোমার আন্টির সাথে একটু আলাপ করে আসি।"
“ তোমরা বান্ধবীরা মিলে আড্ডা দাও।আমরা আছি ঐদিকে!"
বলেই নাসিফ তুহির হাত ধরে স্ন্যাকস কাউন্টারের দিকে গেলো।আফিয়া নিজ সখির হাত ধরে টেনে নিয়ে পাশের একটা টেবিলের উপর নিজের ব্যাগ রেখে বসলো, অতঃপর..
“ আচ্ছা বলতো কি হয়েছে? তোকে দেখে কেমন জানি লাগছে। মনে হচ্ছে তুই ভালো নেই!"
“ আর ভালো।চারটা বছর ধরে যুদ্ধ করছি,দশ বছরের মেয়েটাকে নিয়ে কি যে একটা ছন্নছাড়া জীবন কাটাচ্ছি! "
“মানে কি? ভাইয়া কোথায়?"
“ নাই,তার সাথে আমার সেপারেশন হয়ে গিয়েছে!"
“ কি! কেন?"
“ আসলে কিভাবে বলবো?"
“তুই বলতে না চাইলে বলিস না। কিন্তু কিছু সময় কথা বললেও মন হালকা হয়, শরীরের ভর কম লাগে।তাই বলছি, তুই বিশ্বাস করতে পারিস!”
“ আমি তোকে বিশ্বাস করি আফিয়া।আমি জানি তুই জীবন দিবি তাও এই কথা চার কান হবে না।"
“ এই মুনমুন কি অবস্থা?"
বলতে বলতেই এগিয়ে এলো,বটল গ্রীন থ্রি পিস পরা তাহমিনা। আফিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি রে তুই ওকে নিয়ে এখানে একা বসে আছিস, ভাইয়া বাবুরা কোথায়?"
তাহমিনাকে দেখে মুনমুন নিজের কথা বলা বন্ধ করে দিলো। শুধু তাহমিনার কথার জবাবে বললো,
“ এইতো আলহামদুলিল্লাহ,আমি তোকে খুঁজেছিলাম কিন্তু পেলাম না। এরপর পেয়ে গেলাম আফিয়া সুন্দরীকে।তাই গপ্পে মজে গেলাম।"
“ হ্যাঁ তাতো বুঝতেছি পারছি।আমার কথা কারো মনেই নেই।"
“ এভাবে বলিস কেন তাহমিনা? তুই ডাকতেই কিন্তু আমরা সবাই চলে আসলাম। তারপরও..
আফিয়ার অভিযোগ শুনে তাহমিনা আফিয়ার হাতের উপর হাত রেখে বললো,
“ হইছে থাম।আমি ফান করছি।এখন চল ঐদিকে সবাই আসছে, একটু হালকা স্ন্যাকস খেয়ে পরে মজা করবো অনেক,তখন সবাই মিলে গল্প করবো।"
মুনমুন,আফিয়া উঠে দাঁড়ালো। যেহেতু সব বন্ধুরা চলেই এসেছে তাই এখন নিজেদের ব্যক্তি আলাপ বন্ধ রেখে সবার সাথে জয়েন করাই উত্তম।তাহমিনা আবারও জিজ্ঞেস করলো,
“ কিরে তোর বাবুরা কোথায়?"
মুনমুন ইতস্তত করে দাঁড়ায় কিছুক্ষণ এরপর বলে,
“ আসেনি।আমিই আনিনি। বন্ধু বান্ধবীদের মাঝে!"
“ মানে কি? আমি তো বলেছিই পরিবারের সবাইকে নিয়ে আড্ডা হবে।তাহলে? দেখতো আমার আফিয়াকে,কি দারুন ভাবে ভাইয়াকে সহ উপস্থিত হয়েছে।আমি সত্যি বলছি ভীষণ ভালো লাগছে আমার।"
কথাটা তাহমিনা আফিয়াকে একপেশে জড়িয়ে বললো, মুনমুন আড়ষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়লো তা দেখে তাহমিনা বললো,
“ কি সমস্যা তোর? আয়!"
বলেই মুনমুনের ডান হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো। তাহমিনা মাঝে থেকে দুই পাশে দুই বান্ধবীকে জাপটে ধরে ধীর গতিতে হাঁটতে হাঁটতে বাগানের সামনের দিকে গেলো।
পুরো বাগানের মাঝে মাঝেই লাইটের ব্যবস্থা করা আছে তাই বাগানটা বেশ আলো ঝলমলে হয়ে থাকে। ফকফকা আলোতে চারদিক দৃশ্যমান।
ভেতরের দিকে বাচ্চাদের জন্য আয়োজন করা রয়েছে,যেখানে ইন্সট্যান্ট আইসক্রিম ভ্যান,ফুচকা চটপটি স্টল,হাওয়াই মিঠাই, ইন্সট্যান্ট হট চকোলেট ওয়েফারের ভ্যান, সহ খেলার জন্য টেম্পোরারি কিছু প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা হয়েছে।তাই বাচ্চাদের হইহট্টা সবটাই ঐদিকে। সামনের দিকে খালি বড়দের আসর।মাঝের অংশে মোটামুটি বুফে খাবারের আয়োজন করেছে।
বন্ধু বান্ধবীদের মাঝে নতুন কেবল তাদের সঙ্গী সঙ্গিনীরা।তারাও নিজেদের মধ্যে আলাপ সেরে পরিচিত হচ্ছে।আফিয়াকে ডেকে আনার সময় নাসিফকেও ডেকে নিয়ে এসেছে তাহমিনা। সবাই সবার মানুষকে নিজ বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, টুকটাক খুচরো সংসারী আলাপ করছিলো ঠিক সেই সময়েই সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেলো কালো স্যুট আর কালো শাড়ীতে মোড়ানো এক রমনীকে।
তাহমিনা বন্ধুদের সাথে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে একটু সময় নিয়ে দেখে আসছে বাচ্চাদের সমস্যা হচ্ছে কি-না,কেউ স্ন্যাকস নিলো কি নিলো না। যেহেতু এখানে তার বাড়ির লোক বলতে তার ছেলে আর ছোটো মেয়েটা তাই তাকেই সব দেখতে হচ্ছে।
একই কারণে তাহমিনা ভেতরে যাওয়ার জন্য আড্ডা থেকে সরে একটু আলাদা হতেই চোখে পড়ে সেই জুটিকে।যাদের দেখে তার ভেতরটা নড়চড় করে উঠলো।সে ঐ জুটিকে একপলক দেখে আবার দেখলো আড্ডার মধ্যমণি হয়ে স্বামীর পাশেই দাঁড়িয়ে হেঁসে হেসে কথা বলায় ব্যস্ত থাকা আফিয়াকে। তাহমিনা এদেরকে দাওয়াত দেয়নি তবে তাদেরই আরেক বন্ধু সিয়ামকে বলেছিলো যাতে অন্যান্য বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে দেয়।আসলে তাহমিনা সময় স্বল্পতার কারণে সবাইকে খুঁজে খুঁজে যোগাযোগ করে জনে জনে বলতে পারছিলো তাই সিয়ামকে বলেছিলো, আফিয়াকে বলেছিলো।এটাতো নিশ্চিত একে আফিয়া ডাকেনি।তবে কি সিয়াম! ‘ উফ্ সিয়াম! আজীবন গর্দভ গর্দভই রয়ে গেলি।এই সময়ে এই আয়োজনে কে বলেছে একে দাওয়াত দিতে?"
“ হেই মিনা!"
তাহমিনার ভাবনার মাঝেই তার সামনে এসে উপস্থিত হলো সেই দম্পতি! নিজের ডাক নামে ডাকায় চমকে উঠলো,খেয়াল করলো তারা এখন ওর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। তাহমিনা নিজেকে স্বাভাবিক করে হালকা করে হাসলো, এবং বললো,
“ আরে তাজিম ভাই! কেমন আছিস?"
“ এইতো আলহামদুলিল্লাহ!
তো সবাই কি চলে এসেছে?"
“ হ্যাঁ সবাই আছে, ভেতরেই আছে!
আয়!"
বলে তাহমিনা আগেই পা বাড়ালো।তার পিছু পিছু গেলো তাজিম এবার তার স্ত্রী প্রীতি।
“ আসসালামু আলাইকুম।"
সালাম দিলো সবার উদ্দেশ্যে এবং পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,
“ কে কেমন আছো?"
বলতেই থমকালো তার দৃষ্টি। আড্ডার মধ্যমণি আফিয়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা তার দিকে তাকাতেই থ হয়ে গেলো।নাসিফ তখনও পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আফিয়ার ব্যাচমেট অঞ্জনের সাথে কথা বলছিলো। তাহমিনা ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে আফিয়ার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কানে কানে ফিসফিস করে বললো,
“ ট্রাস্ট মি আমি ওকে আসতে বলিনি। কিভাবে জানলো তাই বুঝতে পারছি না। তুই প্লিস সিনক্রিয়েট করিস না!"
তাহমিনা কথাটা শেষ করেই অসহায় চোখে তাকালো।আফিয়া নিজের বান্ধবীর এমন অসহায়ত্বের মাঝে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে তার সামনে তারই দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে থাকা মানুষটার পানে চাইলো এবং বললো,
“ বাচ্চারা কি করছে একবার দেখে আসা উচিত নয় কি?"
“ হ্যা তা তো অবশ্য, তুমি থাকো আমি আসছি।"
“ না আমিও আসি।"
আফিয়া বন্ধুদের থেকে একটু সময় চেয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো আসর থেকে। ঐদিকে মুনমুনও চেয়ে আছে তাজিমের দিকে।আর তাজিমের দৃষ্টি আফিয়া এবং তার স্বামী নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজীর গমনপথে।
___________________
জীবনের লগ্ন ফুরিয়ে গেলে সবাইকে চলে যেতে হয় রবের ডাকে সাড়া দিয়ে।ভূমন্ডল সৃষ্টির আদিকাল থেকেই চলমান এই যাতায়াত প্রক্রিয়া কখনোই এক দন্ডের জন্যেও বিঘ্ন ঘটেনি, থামেনি।চলছে সে রবের তৈরি নিয়মানুযায়ী।তেমনি আজ আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন সাফিয়ার শ্বাশুড়ি।
সকালে বাদ ফজর খবরটা আসে।
তখন আফিয়া ভোরের কুসুম কুসুম আভায় স্নিগ্ধ শিশিরের টপটপ শব্দের মাঝে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছিলো নিজের বারান্দায় বসে।নাসিফ সবসময়ের মতোই মসজিদে। সঙ্গে বড় ছেলে আর বাবা।নাযির আহমাদ এখন লাঠির সাহায্যে মোটামুটি ভালোই হাঁটাচলা করতে পারছেন।
ঠিক এমন মুহূর্তে সাফিয়ার ফোন আসে।তার পরপরই ফোন আসে সালাহর।আফিয়া নাসিফকে ফোন দিয়ে জানানোর মিনিট কয়েকের মধ্যেই হাজির বাপ,ছেলে,দাদা।
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নাসিফ আফিয়া আর বড় ছেলেকে নিয়ে সালাহর কোয়াটারের সামনে থেকে সালাহকে তুলে নিয়ে অতঃপর রেজওয়ানের গ্রামের বাড়ির পথে রওনা দিবে।তুহিকে তার মামীমনির কাছে রেখে যাবে।ঘরে তুলতুল দাদা দাদীর সাথে থাকবে।নাসিফ ছোট ছেলেকে মসজিদে ফোন করে বলে দিয়েছে যাতে সে মৃত ব্যক্তির কল্যানে কোরআন তেলাওয়াত করে।
সাত বছরের ফেরা আর দুই বছরের রিজাকে নিয়ে বহুবছর পর শ্বশুর বাড়িতে আসলো সাফিয়া। শ্বাশুড়ির অমানসিক নির্যাতনের কারণে এই বাড়ি ছেড়েছিল, তাদের ছেলে রেজওয়ানই সিদ্ধান্ত নিয়ে ছেড়েছিলো।মায়ের করা বউয়ের উপর নির্যাতন তাকে প্রকৃত মানুষ হতে বাধ্য করেছিলো।তাই মায়ের চোখে অমানুষ হয়েই বহুবছর পৈত্রিক বাড়ির ছায়া থেকে দুরে ছিলো। দ্বিতীয় সন্তান কন্যা হওয়ার জন্যেও সাফিয়াকে আঘাত করে কথা বলেছিলো।তাই রেজওয়ান তার কোন সন্তানকেই তার মায়ের ছায়ায় আসতে দেয়নি।তবে আজ তো চলেই গেলো।
যত যাই হোক আজ মা চলে গেলো।তার সঙ্গে দিয়ে গেলো এতিমের তকমা।মা যতই খারাপ হোক দিনশেষে সে মা ই থাকে। মায়ের মতো কেউ হয় না
যদিও কিছু কিছু মায়ের আচরণ আর কার্যকলাপে এখন মাতৃত্বের উপরেও আঙ্গুল তুলে লোকে। কিন্তু তারপরেও.... শত অজস্র অভিযোগের ভীড়েও মা মা ই হয়!
রেজওয়ান মায়ের খাঁটিয়া ধরে বসে আছে মায়ের মাথার পাশে,আর তাকে ঘিরে বসে আছে তার অন্যান্য আত্নীয় আপনজন।কেউ কেউ শান্তনা দিচ্ছে তো কেউ কেউ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বোঝাচ্ছে একমাত্র পুত্র সন্তান হয়েও রেজওয়ান কতটা অপদার্থ!দুই বোনের এক ভাই।
যদিও আরেকটি চাচাতো ভাই আছে যাকে রেজওয়ানের মা রিজিয়া খাতুন বড্ড আদর করে পেলেছে।তখন রেজওয়ান দুনিয়ায় আসে নাই।সেই বাচ্চাকে জন্ম দিয়েই তার মা পরলোকগমন করেন।তখন রেজওয়ান তার মায়ের গর্ভে,নিজ গর্ভে সন্তান থাকায় রিজিয়া খাতুন অনুভব করতে পারলেন একটা সন্তান মায়ের কাছে কি? এবং মা ছাড়া সন্তানের জীবন কতটা জটিল।তিনি ভাসুরের কাছ থেকে চেয়ে নিলেন ছোট ফারহানকে। এর কয়েক মাসের মধ্যেই দুনিয়ার আলো দেখে রেজওয়ান। ঐদিকে মাস দুই গড়াতেই ফারহানের পিতা দ্বিতীয় বিবাহ করিয়া নতুন বধূ ঘরে তুলে।যার পরে ফারহানকে তার বাবার কাছে ফেরত দেওয়ার কোন পথ থাকে না।কারণ দ্বিতীয় বউ কোন পিছুটান থাকলে সংসার করবে না সত্ত্বেই এই বিয়েতে রাজী হয় যাতে নিঃসন্দেহ ভাবে সম্মতি দেয় ফারহানের বাবা ফারুক ভূঁইয়া।
রিজিয়া খাতুন ভাসুরের এমন মতিভ্রম দেখে প্রচন্ড বাজেভাবে মুখ নেড়ে কথা শোনায়। নতুন বউকেও ছাড় দেয় না।এরপরেই ফারুক ভূঁইয়া নিজের নতুন সংসার নিয়ে জমিজমা ভাগাভাগি করে আলাদ ভিটা বাঁধে।হাড়িঁ আলাদা করে আলাদা থাকতে আরম্ভ করলো।
মাঝে তৈরি হয় বড় করে বাঁশের চ্যালা কাঠ দিয়ে তৈরি মুলির বেড়া।বেড়ার ঐ পাশে বড় বড় ফারহানের অন্য ভাই-বোন আর এই পাশে ফারহান নিজের চাচাতো ভাই বোন।
বড় হওয়ার পর সবটাই জানতে পারে ফারহান। রিজিয়া ইচ্ছা করেই জানায় যাতে ফারহান নিজের সম্পত্তির ভাগ কষে নিতে পারে।তাকে ঠকানোর সুযোগ না পায় ফারুক ভূঁইয়ার অন্য তিন সন্তান।যার মধ্যে রয়েছে দুটো ছেলে মুনসার,ও মাদিব,একটি মেয়ে মুনসুরা।
রেজওয়ান বিদেশে যাওয়ার পর এই ফারহানই ছিলো রিজিয়ার রেজওয়ান হয়ে। রিজিয়া ফারহানকে লালন পালন করলেও কখনো মা বলে ডাকতে বলেনি। ফারহান ছোট আম্মা বলেই ডাকে। রিজিয়া নিজেই শিখিয়েছে এই বুলি।ছোট বেলায় ফারহান না বুঝলেও বড় হয়ে ঠিকই বুঝেছে এই ডাকের কারণ।তবে রিজিয়া কখনোই ফারহানকে রেজওয়ানের চেয়ে কম ভালোবাসেননি।একই ভাবে,একই পোশাকে,একই খাবারে দুজনকে যত্ন করেছে। নিজে মাঝে শুয়ে দুইজনকে দুই পাশে শোয়াতো।তাই কি নামে ডাকতে বললো তাতে ফারহান ভাবুক ছিলো না।সে শুধু বুঝতো এই মানুষটি তাকে মায়ের স্নেহে বড় করেছে।রেজওয়ান যখন সাফিয়াকে নিয়ে এই বাড়ি ছাড়লো তখনও ফারহান রিজিয়া খাতুনের পাশে রয়ে গেলো।যদিও তার বউয়ের সাথেও রিজিয়া খিটখিট করতো কিন্তু তারপরেও ফারহান বাড়ি ছাড়েনি।এই নিয়ে তার সংসারে অনেক অশান্তি হতো তাও যায়নি।
এই দিকে রেজওয়ানের জীবিত বোন এবং মৃত বোনের স্বামী যার পাশে বসে রয়েছে তিরিশের এক নারী।মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি,নাকে বড় একটা সোনার ফুল, ঠোঁট ভর্তি টকটকে রক্তজবা লাল লিপস্টিক লাগানো।তিনিও মাঝে মাঝে রেজওয়ানের ছোট বোনের সাথে তাল মিলিয়ে মিলিয়ে বলছে,
“ এ আবার কেমন ছেলে বউ,এত বছর বাইচা ছিলো একদিনও শ্বাশুড়ির সেবা করে নাই। কোনদিন খোঁজও নেয়নাই।এমন পোলা ,পোলার বউ আল্লাহ আমার শত্তুরেও না দেউক। আল্লাহ ছিহ..ছিহ..ছিহ্"
“ হাহ্ এগুলো বলিয়েন না আপা। এগুলো শুনতে আমার ভাইয়ের পছন্দ হয় না। পছন্দ হইলে কি আর দুই দিনের পাওয়া মাগী নিয়া মায়ের আঁচল পাড়াইয়া ঘর ছাড়ে!বিধবা মায়ের কথা মনে করলে কি আর বউয়ের কথায় নাচে? মায়ের কথা ভাবলো না।যেই মা জন্ম দিলো তার কথা না ভাইবা ভাবলো মাগীর মায়ের কথা।বইনের কথা।"
“ এইহানে ভাইয়ের তো দোষ নাই। দোষ তো মাগীগো। কামাইওয়ালা,পয়সাওয়ালা ব্যাডা দেখলেই এহোন মহিলাগো মাথা বিগড়ায় যায়। তাই মাইয়া বিয়া দিয়া পরের পোলারে ফুসলায় ফাসলায় নিজেদের আয়ত্তে নিয়া ন্যায়।সবই টেকার মায়া।নাইলে কেউ এমন আছে যে মায়ের চাইতে বেশি ভালোবাসে!"
“ আপা চুপ থাকেন। কি সব বলছেন? মেজো ভাইয়ার শ্বশুড় বাড়ির লোক আছে,তার বড় ভায়রা,শ্যালক আছে ।কি ভাবছে সবাই।"
ফারহানের বউ মৃদু ধমকে থামতে বললো।তাতে আরো তেতে উঠলো রেজওয়ানের ছোট বোন,রিনি।সেও উচ্চ স্বরে ধমক দিলো বড় ভাইয়ের বউকে।বললো,
“ ক্যান চুপ থাকবো কেন? তুমিও তো কালপ্রিট।আমার মা তোমার জামাইরে কম ভালোবাসতো? কিন্তু তুমি কি করছো? শেষ বয়সে আমার মা খালি ঘরে মরছে,মুখে পানিডাও পড়ে নাই।কেউ দেও নাই।আর তোমাগো উচিত কথা বললেই খারাপ লাগে!"
ফারহানের বউ মোটেই চুপ থাকলো না।সে চুপ থাকার মানসিকতা রাখে না।এই ভরা মজলিসের মাঝেই,মৃত লাশ পাশে রেখেই উঠানের মাঝে দাঁড়িয়ে মাথার ঘোমটা লম্বা করে টেনে চিৎকার করে বললো,
“ আপনের মায়ের মুখে পানি পড়ে নাই ক্যান এহোনও বুঝেন নাই? আপনার মায়ের যেই চোপা ছিলো তার জন্য। আপনের মায় খালি আপনাগোই ভালোবাসতো। বাইরে থেকে বউয়ের ট্যাগ লাগিয়ে আনা দাসীদের, এই আমাদের না।
তার কাছে আমাগো দাম এই বাড়ির বাইরে ঘুরঘুর করা কুত্তার চাইতেও কম।
আমার কথা তো বাদই দিলাম।ঐ যে ভাবী, সাফিয়া ভাবীর জীবনটা জাহান্নাম বানাইয়া দিছিলো আপনের মায়ে। রেজওয়ান ভাই মানুষ তাই বউরে নিজের রাক্ষুসী মায়ের মুখ থেকে কাইড়া নিয়া দুরে রাখছে যাতে বউডা বাইচা থাকে।আর ফারহান তো অমানুষের বাচ্চা। তাই ওর চোখের সামনে ওর ছোড আম্মা আমারে দিনরাইত খাবারে খোঁটা দিছে কিন্তু ঐ কানে তালা মাইরা হুনছে খালি।ওর সামনে আমারে,আমি সাত মাসের পেটের, আমার ফাহিম আমার প্যাডে তখন আমারে দিয়া ঘর মুছাইছে,ধান সিদ্ধ করাইছে।সেই ধান কুলা দিয়া চিটা বাছতে হইছে।তাও ঐ ফারহান চোখ মেইলা মেইলা দেখছে।এরপরেও আশা করেন কেমনে আপনের মায়ে সেবা পাওনের যোগ্যি?
আপনের মা তো এত মানুষের আফসোস পাইতাছে তাই অনেক, কবরের মাটি পাইতাছে তাই অনেক,দ্যাহেন না কবরের নিচের আল্লাহ কি বিচার করেন।"
“ আহ্ বউ থামো।"
বলেই ধমক দিলো ফারুক ভূঁইয়া। ঐদিকে রেজওয়ানের ছোট বোন শাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে বললো,
“ আল্লাহর তোগো উপরে আযাব ফেলুক, কোল খালি হউক তোগো।এমন ঠাডা পড়া মিথ্যা কথা বলার জন্য।একটা মরা মাইনসের নামে এমন কুটনামি যে করছে আল্লাহ তার কোল খালি করুক।"
কথাটা সাফিয়ার দিকে তাকিয়েই বললো,রেজওয়ান নির্লিপ্ত চোখে মায়ের নিথর মুখটাকে দেখছে।সাফিয়া দুই বছরের ফিজাকে বুকে চেপে কথাগুলো শুনছে।তাকে ঘিরে রেখে গ্র্যামের অন্য নারীরা এই মরা বাড়িতে অনুষ্ঠিত হওয়া তামশা দেখছে তার সাথে গোলগোল চোখে বহু বছর বাড়ির উঠানে পা রাখা বাড়ির একমাত্র পুত্র বধূকে দেখছে।যারা সাফিয়াকে চিনে, এবং আগেই দেখেছি তারা সত্যটা জানে তাই তারা সাফিয়ার কাঁধে হাত রেখে শান্তনা দিচ্ছে আর যারা চিনে না তারা কৌতুহলী চোখে একবার এর কথা শুনছে তো আরেকবার ওর কথা পরক্ষনেই ঘুরেঘুরে সাফিয়া,আফিয়া,রেজওয়ান,নাসিফ,সালাহকে দেখছে। সঙ্গে বড় বড় চোখ মেলে ফেরা আর রিজাকে দেখছে।
চলমান...







0 মন্তব্যসমূহ