#সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_১৩২



[কপি করা/চুরি করা, নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ। দয়া করে কেউ এগুলো করবেন না। আপনার যদি ভালো লাগে তবে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন। ধন্যবাদ সবাইকে।]


মিনিট কয়েক অতিবাহিত হলো।নাইফ বসার ঘর ছেড়ে ধীর পায়ে হেঁটে তাইফের ঘরের দিকে গেলো‌। স্তব্ধ নিরব ঘরের ভেতর থেকে ফুপানোর শব্দ আসছে।হাত উঠিয়ে দরজায় চাপড় মারতেই দেখলো তার কব্জির গোঁড়া দিয়ে চিকন লাইন ছুঁয়ে চিপকে চিপকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে।হয়তো তুহিকে ধরার সময়ে তাইফের ধাক্কা খেয়ে হাতটা কোন কাঁচের টুকরোর উপর পড়েছিল।মনের ব্যথা এতটাই প্রখর হয়েছে যে এই দৈহিক ব্যথা অনুভব‌ই করেনি মন।তাই তো টের‌ই পায়নি। কিন্তু রক্তের প্রবাহ এখন‌ও জারি রয়েছে।তাইফ একপলক তাকিয়ে পরক্ষনেই দরজায় জোরে আঘাত করলো।কোন সাড়া আসলো না। পরপর কয়েকবার করলো।তাও কোন সাড়া আসলো না। এরপর নিচু কন্ঠে মাথা নুইয়ে রেখে ভেজা গলায় ডাক দিলো,


“ তাইফ দরজা খোল।কথা বল আমার সাথে।দেখ আমি তোর কথা শুনবো। আচ্ছা ঠিক আছে ভুল করছি আগে তোর কথা না শুনে,দরজা খোল।দেখ নিজেকে ব্যথা দিবি না বলে দিলাম। তাহলে কিন্তু কপালে আরো মার জুটবে বলে দিচ্ছি।

_ তাইফ,কি বলছি! দরজা খুল না।"


“ যাও,যাও এখান থেকে। আমার তোমার সাথে আর কোন কথা নেই।সব কথা ওখানেই শেষ। রাখঢাক করে ভালোবাসা দেখানোর দরকার নেই।সারা দুনিয়া জানে তুমি...আমি তোমার সৎ ভাই‌।আমি,তুহি আমরা দু'জনেই তোমার সৎ ভাই বোন।সো ওভাবেই থাকো।অত আলগা মায়া দেখানোর কিছু নাই।আজকের পর থেকে একটাই পরিচয় সত্য! তুমি আমাদের মায়ের পেটের ভাই ন‌ও,আমরাও তোমার মায়ের পেটের ন‌ই। ব্যস্ কথা শেষ। তোমার ব‌উকেও গিয়ে বলবে সে যা চেয়েছিলো তাই পেয়েছে। এবার বাবা আসুক,তার ইচ্ছা চুড়ান্ত পর্যায়ে রুপ নিবে ইনশাআল্লাহ।"


“ কি বলতে চাস তুই? দরজা খোল।"


“ আমার তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা, যাও এখান থেকে।"


“ তা...!"


নাইফ থেমে গেলো। আর ডাকলো না। বারবার ঐ তিক্ত শব্দগুলো শুনতে ইচ্ছে করছে না। ঘুরেফিরে ঐ শব্দগুলোই তো শুনতে হচ্ছে।কি ভয়ানক শক্ত শব্দ ওগুলো। যেগুলো এর আগে কোনদিন তাইফ জানতো বলে নাইফের ধারণা ছিলো না।অথচ আজ তাইফ কত অবলীলায় একের পর এক বার বলে যাচ্ছে,তাইফ কি বুঝতে পারছে ওর এই সাময়িক অভিমানে বলা বাক্যগুলো ওর প্রিয় ভাইয়ার বুকটা ঝাঁঝড়া করে দিয়েছে।তাইফ কি কখনো জানবে ওর এই রাগ ওর ভাইকে কতখানি ক্ষত বিক্ষত করলো?তাইফ কি কখনো অনুমান করতে পারবে ওর বাক্যের প্রতিটি শব্দ ওর ভাইয়ের বুকে দহন লাগিয়েছে!



নাইফ তাইফের থেকে বিতাড়িত হয়ে মায়ের কাছেই গেলো।আফিয়া বিছানায় বসে হাত পা ছেড়ে জমিনে চেয়ে আছে অপলক।নিথর, নিস্তব্ধ,ঘোলা চাহনি। দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাস চলমান।নাইফ ধীর পায়ে হেঁটে মায়ের সামনাসামনি দাঁড়ালো,অপরাধী ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে।ঢোক গিলে সাহস করে উচ্চারণ করলো,


“ আ..ম্..মু।স্যরি...


কথাটা উচ্চারণ করেই নাইফ ধপ করে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লো।মাথা নত রেখেই মায়ের পায়ের উপর নিজের দুই হাত রেখে পায়ের পাতা চেপে ধরে বলতে থাকলো,


“ আমি কি কখনো ওদের সাথে সৎ ভাইয়ের মতো আচরণ করেছি বলো? আমি কি কখনো ওদেরকে তুলতুলের চেয়ে আলাদা করে দেখেছি, তুমিই বলো? আমি কখনো তোমার অবাধ্য হয়েছি? কখনো আমি তোমার সাথে সৎ মায়ের মতো আচরণ করেছি?আম্মু!..."


নাইফ নিজের দৃষ্টি তুললো,চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো চিবুক ছুঁয়ে।চাপা ,গাল কাঁপছে তীব্রভাবে, সেভাবেই নাইফ পরবর্তী কথাগুলো বললো,


“ আমি কোনদিন.... কোনদিন ওদেরকে বুঝতে দিয়েছি ওরা আমার... মায়ের পেটের ভাই-বোন নয়! আম্মু আমি কি সত্যিই ওদের আপন ন‌ই? আপন ভাই বোনরা কি কখনো ছোট ভাই বোনদের শাসন করে না? তাদের কখনো আঘাত করে না? আমার তাইফটা এভাবে কিভাবে বললো আম্মু? ও কেন বারবার বলে আমি ওদের ভাই না? ও আম্মু? আমি কি সত্যিই ওদের যোগ্য বড় ভাই হতে পারিনি? আমি কি ওদের সৎ ভাই হয়েই থেকে গেলাম!

____ ও আম্মু বলো না, আমি তোমার সন্তান না? তুমি আমার,নাবুর মা ন‌ও! আমরা তোমার কেউ ন‌ই?"


নাইফ কথাগুলো শেষ করার আগেই আফিয়া নাইফের মাথা টেনে নিলো।বুকের উপর জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। মাথার চুলের উপর ঠোঁট বুলিয়ে খুব আলতো স্বরে আদর করতে করতে কান্নারত কন্ঠে‌ই বললো,


“ আমি‌ই তোমার আম্মু, তোমাদের আম্মু।এখানে কোন ভাগ নেই।তোমরা চারজন‌ই আমার সন্তান।পেটে ধরলেও আমার,না ধরলেও আমার।এই পৃথিবীতে এটাই সবচেয়ে বড় সত্য আমার জন্য।আর কোন সত্য নাই। তোমাদের জন্যেও না। তুমি বড়, সব বোঝ,তাই ছোটদের কথায় নিজের বুক ভার করতে নেই।চাপ বাড়বে।ওরা যখন নিজের ভুল বুঝবে তখন নিজের থেকেই আবারও তোমাকেই খুঁজবে।ওদের সবকিছুই ওদের ভাইয়াকে দিয়ে জড়িয়ে। এখানে ওদের‌‌ও কোন ভিন্ন খুশি নেই তুমি ছাড়া।থামো এখন।"


নাইফ থামলো না। উল্টো মায়ের বুকের উপর লেপ্টে থেকেই হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলো। কাঁদলো আফিয়াও,নিরবে।


এভাবে কাটলো অনেক সময়। কিছু সময় পর আফিয়া বললো,


“ আমাকে একটু একা ছাড়, কিছুক্ষণ একা থাকতে চাই।"


নাইফ মাথা তুললো।কোন শব্দ উচ্চারণ না করেই নিরবে মায়ের ঘর ত্যাগ করে আবারও বসার ঘরে গিয়ে বসলো‌। নিজের ঘরে যাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছে না তার।হয়তো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছে অনাকাঙ্ক্ষিত আর কোন ঘটনা ঘটানোর হাত থেকে। এইদিকে আফিয়া একাকীত্ব বেছে নিলো কয়েক মুহূর্তের জন্য কারণ তার এখন একা থাকতে হবে, শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে।


আফিয়ার প্রেসার নেমে শেষ দিকে।হাত পা কাঁপতে থাকলো, মাথা ভনভন করতে থাকলো।রুকাইয়াহ সালমা ফাওযিয়াকে শান্ত করে আফিয়ার খোঁজ নিতে এসে দেখে আফিয়া জমিনে পা ছড়িয়ে বসে মাথা বিছানার উপর রেখে উপরের দিকে চোখ বন্ধ করে আধ শোয়া ভাবে বসে আছে।হাত পা ভয়ানক কাঁপছে, শ্বাস নিচ্ছে দ্রুত।


“ ভাবী,ও ভাবী।কি হয়েছে আপনের? খারাপ লাগতাছে?"


রুকাইয়াহর আওয়াজ উচ্চ তরঙ্গের দোলে সবার কানে ভেসে গেলো শব্দগুলো।


“ভাবী? ও ভাবী! তুলতুল আম্মু! তাড়াতাড়ি আসো দেখো তোমার আম্মু কেমন করতাছে!"


নাবীহা তুহির মাথার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো।একটু আগেই তুহির ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে উঠেছিল।মু'য়াযের সাথে কথা বলার সময় বারবার এমন করতে দেখে নিজেই মু'য়াযকে ফোন রাখার কথা বলে। ঘরের এই অবস্থা সম্পর্কে নাবীহা নিজ স্বামী বা শ্বশুর বাড়ির কাউকে কিছু জানায়নি,জানাতেও চায়না।


রুকাইয়াহর চিৎকারে চমকে উঠে।বুকে কামড় দিতে থাকলো।লাফিয়ে উঠে তুহির গায়ের উপর চাদর ভালো করে টেনে দেয়। অনেক আগেই তুহির কানের মাঝে তুলো গুঁজে দেয় যাতে আর কোন শব্দে তুহির ঘুম না ভাঙ্গে।ভয় না পায়। সেগুলো দেখে নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।যাওয়ার সময় দরজা লাগাতে ভুলে না। ঐদিকে নাইফ বসার ঘরের জমিনেই বসেছিলো।সোফার সাথে হেলান দিয়ে।তাইফ ঘরের সব তছনছ করে হাত পা ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে ছিলো।

রুকাইয়াহর চিৎকারে সব নিজ নিজ অবস্থান থেকে দৌড়ে আফিয়ার কাছে যায়। ততক্ষণে রুকাইয়াহ আফিয়ার মাথা নিজের কোলে নিয়ে বারবার গালে চাপড় মারতে থাকে। কিন্তু আফিয়া নিশ্চুপ।


“ আম্মু! ও আম্মু কি হয়েছে তোমার?"


তুলতুল মা'কে ডাকতে ডাকতে কেঁদে ফেলে। কাঁদে রুকাইয়াহ‌ও।নাবীহা মায়ের মাথাটা নিজের বুকের উপর রেখে গালে হালকা চাপ দিয়ে কান্নারত অবস্থাতেই ডাকতে থাকে।হাত তুলে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বারবার আলতো করে ঘষতে থাকে। উষ্ণতায় আফিয়া নড়চড় করে কিন্তু কথা বলে না।


“ আম্মু?ও আম্মু! আম্মু গো!"


একদম গা ঘেঁষে বসলো নাইফ। মায়ের মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে গালে আঙ্গুল দিয়ে ছুয়ে ছুয়ে ডাকতে থাকে,


“ আম্মু আমার দিকে তাকাও।কি হয়েছে তোমার? কোথায় কষ্ট হচ্ছে, আম্মু!"


বলতে বলতেই কেঁদে দিলো নাইফ। পুরুষ কাঁদে না! কে বলে কাঁদে না?এই যে নাইফ কাঁদছে! মাতৃ বিয়োগ তাকে বারবার আড়ষ্ট করে,ভীত করে। মায়ের অভাব তাকে নিঃস্ব করে দেওয়ার ভয় দেখায়।নাইফ বোনের থেকে মায়ের মুখটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলতে লাগলো,


“ আম্মুর প্রেসার মাপ। প্রেসার ফলট করছে। তাড়াতাড়ি কর।"


দুশ্চিন্তায় দিক হারা নাবীহা ভুলেই গেছে বোধহয় সে যে একজন চিকিৎসক।ভাইয়ের কথায় মনে পড়লো। দ্রুত নিজের ঘরে গিয়ে চাপ মাপার যন্ত্রখানি আর ডায়াবেটিস পরিমাপের যন্ত্র নিয়ে আসলো।

হ্যাঁ ঘটনা সত্য। প্রেসার প্রায় নিম্নের নিম্নে অবস্থান করছে ঐদিকে ডায়াবেটিস‌ও পাঁচের নিচে।নাবীহার বলার আগেই রুকাইয়াহ গিয়ে ডিম দুধ চুলায় বসিয়ে দিয়ে মিষ্টি নিয়ে আসলো। ডার্ক চকোলেট নিয়ে আসলো। কোনরকম পিটপিট করে চেয়ে থাকা আফিয়া দেখলো তার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাইফ।সে এখন‌ই আসলো এবং এসেই আবার‌‌ও নাইফের সাথে লাগলো।নাইফের হাত থেকে মা'কে নেওয়ার জন্য হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো,


“ ছাড়ো আমার মা'কে! ধরবা না। গিয়ে ব‌উয়ের আঁচলের তলায় লুকাও,শোন গিয়ে এখন তোমার ব‌উ কি পরামর্শ দেয়, মহারানী অনুমতি দিলে আসবা নয়তো ভুলে যাও আমাদের।"


“ তাইফ, তুই কিন্তু এখন চুড়ান্ত মার খাবি আমার হাতে।বেয়াদবির লিমিট ক্রস করছিস!"


নাইফ ধমক দিলো তাইফকে। এরপর আফিয়ার কোমরের নিচ দিয়ে হাত গলিয়ে কোলে তুলে নিলো। নাবীহা বালিশ ঠিক করে দিতেই নাইফ সেখানেই শুইয়ে দিলো। এদিকে তাইফ ধমক খেয়ে থামলেও রাগ কমেনি।এখনো চোখমুখ শক্ত করে চেয়ে আছে জমিনে।নাবীহা চকলেট ভেঙে মায়ের মুখে দিলো।তাইফ বোনের পাশ দিয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আফিয়া নিজের দুর্বল হাতে ওকে ঠেলে সরিয়ে দিলো। মায়ের এভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াতে তাইফের রাগ গিয়ে ক্ষোভে পরিণত হলো।তার যে সবসময় মনে হয় মা তাকে কম ভালোবাসে আজ সেটাই প্রমাণিত হলো‌।নয়তো যার দোষ নাই তাকেই কেন এভাবে সরিয়ে দিবে!সে দাঁত চেপে নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রন করলো।পাশেই দাঁড়িয়ে র‌ইলো ছলছল দৃষ্টি ফেলে।নাইফ মায়ের মুখের সামনে মুখ নিয়ে নিম্ন কন্ঠে ডাক দিলো,


“ আম্মু,ঘুম পাচ্ছে? ঘুমিও না।দুধ, ডিম খেলেই ফিট হয়ে যাবে।একটু কষ্ট করো।আর কখনো কষ্ট দিবো না।ওয়াদা করছি।"


পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের মধ্যেই আফিয়াকে দুধ ডিম খাওয়ানো হলো, চকোলেট,স্যালাইন আগেই খাওয়ানো হয়েছে।এখন কিছুটা শিথিলতায় রয়েছে তবে চোখ বন্ধ করে।নাইফ নাবীহাকে পাশে রেখে নিজে বেরিয়ে পড়লো।তাইফ‌ও নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। মায়ের পাশে রয়েছে শুধু নাবীহা।হাত পা ম্যাসাজ করছে একটু পরপর।আফিয়া একটু আরামবোধ করতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।


_______________________________


তুহি,নাবীহা ভীত চোখে তাকিয়ে আছে সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরুয়া বাবার দিকে।যার গালের চাপ দাঁড়িগুলো লাল সাদায় মিশে একাকার।মেহেদির রঙে রাঙা দাঁড়ি গুলো চকচক করছে। উঁকি মেরে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে সাদা সাদা তুলোসম দাঁড়িগুলো। আড়ালে আছে কিছু কালোও।আফিয়া নিরব চোখে চেয়ে আছে। নাসিফ চড় দিয়েও থামলো না। পাঞ্জাবির কলার ধরে টেনে হিচড়ে নিয়ে গেলো ছেলের ঘরে, পরপর আরো দুটি চড় দিলো।বাবার দেওয়া আঘাতে চুপ হয়ে গেলেও ভেতরে থাকা জেদ রাগ ক্ষোভ তাকে স্থির থাকতে দিলো না।হাত দুটো পেছনে নিয়ে বাঁধা রাখলেও থরথরিয়ে কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ।নাসিফ ছেলের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ এরপরে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠলো আফিয়ার উপর,


“ তোমার সামনে বাড়ির ব‌উয়ের সাথে উচ্চ বাচ্য করার সাহস পায় কি করে?

_তুমি তো এই শিক্ষা দিয়েছো বলে আমি বিশ্বাস করি না! তাহলে কোন দুঃসাহসে আমার বাড়ির ছেলে, আমার‌ই ঔরসের ফসল আমার‌ই বাড়ির ব‌উদের সাথে এহেন বিশ্রী শব্দ ব্যবহার করে?"


“ বাবা ভাই.."


“ চুপ !

_ যাও রুমে যাও।বিয়ে দিয়েছি বলে খুব লায়েক হয়ে যাওনি তোমরা যে আমার গোছানো সংসারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে আর আমি,নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজী সেগুলো সব মুখ বুজে সহ্য করে নিবো!এমন অসভ্যতামি আমি বরদাস্ত করবো না।আমার বাড়িতে থাকতে হলে,আমার সংসারে থাকতে হলে প্রত্যককে নিজের গন্ডি বুঝতে হবে,প্রত্যককে সভ্যতা, ভদ্রতা বজায় রেখে চলতে হবে‌।আমার বাড়িতে থেকে এসব নোংরামো চলবে না।যদি মনে হয় এগুলো মেনে চলতে সমস্যা হচ্ছে,পারছো না এডজাস্ট করতে, দরজা তো খোলাই থাকে।সোজা বেরিয়ে যাবে।কেউ আটকাবে না তোমাদের কিন্তু এই বাড়ির মধ্যে উপস্থিত কারো কন্ঠ এই বাড়ির বাইরে যাওয়া চলবে না।আমি এগুলো সহ্য করবো না।

এসব রাস্তার মেয়ে ছেলের মতো আচরণ করা ছেলে মেয়ে আমার দরকার নেই।"


নাবীহা ভাইয়ের হয়ে সাফাই দিতে গেলে ওভাবেই ধমক দেয় নাসিফ। অতঃপর নাসিফ কথাগুলো তাইফের দিকে চেয়ে বললেও কথার তীর কার দিকে ছিলো সেটা খুব সহজেই অনুমেয়। কিন্তু অতি রাগান্বিত তাইফের মাথায় তা ঢুকলো না।সে এখানেও নিজের গায়ে টেনে নিয়ে বললো,


“ ঠিক আছে,থাকবো না তোমার ঘরে। তোমার ঘরে থাকতে হলে যদি সব অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করতে হয় তবে থাকো তোমরাই।আমি আর এখানে থাকবো না।"


“ এখুনি বের হ‌ও।অসভ্য রগত্যাড়া ছেলে। তোমার মতো অত রক্ত গরম ছেলে একটা গেলে আমি একশোটা পয়দা করতে পারবো কিন্তু আমার ইজ্জত, সম্মান আমার পারিবারিক শিক্ষা নিয়ে কেউ আঙুল তুললে সেটা আমি ফিরিয়ে আনতে পারবো না।"


নূরের বাবা নাইফকে যেভাবে ফোন করে কথা শুনিয়েছে ঠিক এক‌ইভাবে ফোন করে কথা শুনিয়েছে নাসিফকে। মার্কেট কমিটির মিটিংয়ে ছিলো। তখন‌ই নূরের বাবার ফোন আসে। এবং তিনি নিজের মেয়ের মতো করেই তাইফ ও তুহিকে নিয়ে অভিযোগ করেছেন,উনার অভিযুক্তদের তালিকা থেকে বাদ যায়নি স্বয়ং আফিয়াও।নাসিফ তখন সম্মানের জন্য চুপ ছিলো। এরপর‌ই আফিয়াও ফোন দেওয়ায় নাবীহাকে দিয়ে।আফিয়া নিজের শারীরিক অবনতির কথা বলিয়েই বাড়িতে আনায়। কিন্তু ঘরে ঢুকেই ঘরের অবস্থা ভয়াবহ নিরব দেখেই তার ভেতর নড়েচড়ে উঠে। আফিয়াকে বিছানায় শোয়া দেখে আরো অস্থির হয়ে উঠে।


তখন আফিয়া ঘুমে ছিলো।আর তুহি ছিলো সজাগ। কলিং বেলের শব্দে সে বেরিয়ে আসে।নাবীহা ছিলো রান্না ঘরে। সারাদিন কারো খাওয়া দাওয়া হয়নি। এদিকে বাবা রাতে তার মায়ের হাতের রান্না ছাড়া খায় না।তবে তাদের দুই বোনের হলে আলাদা বিষয়।মা যেহেতু খানিকটা অসুস্থ তাই সেই রাঁধতে বসেছে।নাইফ কিছুক্ষণ আগেই নিজের ঘরে ঢুকেছে এবং এখন অবধি সেখানেই আছে।তুহি পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মায়ের কাছে গিয়ে মায়ের পাশেই শুয়েছিলো।তাইফ‌ও নিজের ঘরেই আছে।বলা যায় যে যার মতো একা একা সময় কাটাচ্ছে।

পা খুঁড়িয়ে তুহি বেশি দূর অবধি বের হতে পারেনি।এর আগেই রেশমি খুলে দেয়।নাসিফ রাগ নিয়ে ঘরে ঢুকেছে তার মধ্যে সবার আগেই চোখে পড়ে নিজের সবচেয়ে আহ্লাদি মেয়ের খুঁড়িয়ে হাঁটা। সারাদিন না খাওয়া আর ভয়ে,কান্নায় মুখটাও চুপসে গিয়েছে যা পিতা নাসিফের দৃষ্টি এড়াতে পারলো না। দ্রুত কদমে হেঁটে মেয়ের পায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,উবু হয়ে পা তুলে জিজ্ঞাসা করে,


“ আম্মা পায়ে কি হয়েছে আপনার? এভাবে হাঁটছেন কেন?"


রান্না ঘর থেকে নাবীহাও বেরিয়ে আসে।সে বাবার কাঁধ থেকে ব্যাগ নিয়ে হাতে রেখে বলে,


“ বাবা তুমি আগে ফ্রেশ হ‌ও। তারপর..!"


নাবীহা ভেবেছে বাবা জানে না। জানিয়ে আর ঘরে অশান্তি বাড়ানোর দরকার নেই। কিন্তু নাসিফ তো সব জেনেই ঘরে ঢুকেছে।তার মধ্যে ছোট মেয়ের এই অবস্থা।সে বড় মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলো,


“ তোমার আম্মা কোথায়?"


“ আম্মু ঘুমাচ্ছে!"


নাবীহাকে জিজ্ঞেস করলেও তুহি ঠোঁট ফুলিয়ে উত্তর দিলো।নাসিফ ছোট মেয়ের উত্তর দেওয়ার পর আবারো জিজ্ঞেস করলো,


“ আপনার পায়ের এই অবস্থা কিভাবে করলেন আম্মা?কি ভেঙ্গেছেন?"


“ আমি ভাঙ্গি নি। ভাইয়ারা মারামারি করতে গিয়ে ওয়ালমেট ভেঙ্গে ফেলছে।আর তখন আমার পায়ে কাঁচ ঢুকে গিয়েছিল!"


তুহি গড়গড় করে বলে দিলো।নাসিফ নিজের কিশোরী মেয়ের সরলতায় হতাশ হলো।অন্য মেয়েরা হলে অবশ্যই এখন ছয়নয় বলে কথা ঘুরিয়ে দিতো। কিন্তু তার মেয়েটা এতটাই আদর আর আহ্লাদে বড় হচ্ছে যে মানুষের কুৎসিত চিন্তা ভাবনা তার মস্তিষ্কে ধারণ করতে সক্ষম নয়।

নাবীহাও হতাশ হলো বোনের সহজসরল জবানবন্দিতে।তার‌ই ভুল হয়েছিল,আগেই বুঝিয়ে দেওয়া উচিত ছিল যে আজকের কিছু যেন বাবার কানে না যায়।কারণ সে তো জানে বাড়িতে যাই ঘটুক সবার সব দোষের দায় সবার আগে আম্মুর উপর চাপাবে বাবা।আম্মুকে আগে বকবে। অতঃপর আম্মু মন খারাপ করে শরীর অসুস্থ বানিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে থাকবে।নাসিফ ছোট মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে নিচু কন্ঠে বললো,


“ বেশি হাঁটা চলা করো না।পা ব্যথা করবে।এক জায়গায় বসে থাকো আম্মা!"


নাসিফ নিজের ঘরে ঢুকলো, কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা স্ত্রীর কপালে হাত ছুয়ে দেখলো জ্বর কেমন আসছে।আফিয়া বরাবরই পাতলা ঘুমের অধিকারীনি।কপালে পরিচিত ছোঁয়া অনুভব হতেই জেগে উঠলো।নাসিফ বেশি চাপ না নিয়ে বললো,


“ উঠো না।শুয়ে থাকো।যা বলার শুয়েই বলো।"


কিন্তু আফিয়া শুনলো না।নাসিফ বুঝতে পারছে আফিয়া কিছু চেপে রাখতে গিয়েও পারছে না।তাই নিজের পাঞ্জাবির বোতাম উপর থেকে একটা খুলে একটু হালকা হয়ে আফিয়ার গা ঘেঁষে বসলো।


“ হ্যাঁ বলো,আমি সব শোনার জন্য আছি।মরে যাইনি যে, যে যা খুশি করে যাবে।আমার জীবিত অবস্থায়‌ই যদি তোমাকে হেয় হতে হয় তবে আমার থাকার‌'ই কি দরকার!"


এতটুকুই দরকার ছিলো আফিয়ার জন্য। সারাদিন যেন এই দুটো বাক্য, দু'টোই লাইন, এইটুকু ভরসাই তার জন্য সবচেয়ে বড় ঔষুধ।এইতো আফিয়া এখন সুস্থ বোধ করছে।তরতর করে যেন রক্তের চাপের পারদ উপরে উঠছে।এই মিষ্টি বাক্যের মিষ্টতা ডার্ক চকোলেটের চেয়েও বেশি কার্যকরী।আফিয়া নাসিফের কাঁধে গাল ঠেকিয়ে নিজের সমস্ত বেদনার ভার ছেড়ে দিলো। তিক্ত কথা, অপবাদ, অপমান অবহেলা সব,সবটা উড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে চোখ বুজে র‌ইলো।নাসিফ নিজের সহধর্মিণীর বহু বছর আগের ভয় চোখের সামনে দেখে কষ্ট পেলো। তাদের অনিচ্ছায়‌ই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো তারা।


“ তোমার ছোট ছেলে ক‌ই?"


“ আছে ঘরেই আছে,ক‌ই আর যাবে!"