সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১৩৩

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_১৩৩



[কপি করা/চুরি করা, নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ দয়া করে এগুলো করবেন না কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন। ধন্যবাদ সবাইকে।]


নাসিফ উত্তর পাওয়ার পর দুইবার মিনিট চুপ ছিল, এরপর উঠে গিয়ে বসার ঘরের সোফায় বসে।তুহি তখন সোফায় চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকে। একদম নিশ্চুপ শান্ত হয়ে।নাসিফ মেয়ের পাশ ঘেঁষে বসে পায়ে হাত দিতেই তুহি চমকে পা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ একটু আগেই তাকে তার বড় বোন বুঝিয়ে গিয়েছে যাতে আজকের ঘটনা আর কিছুই বাবাকে না বলে। কিন্তু সে তো আগেই যা বলার বলে দিয়েছে।


“ এদিকে বাবা, কতটুকু কাটলো দেখি।"


নাসিফ একরকম জোর করেই পা তুলে সোফায় উঠায়। নেড়ে চেড়ে দেখলো,বেশখানি ক্ষত হয়েছে ব্যান্ডেজের জন্য বোঝা না গেলেও অনুমান করে নিলো।পা দু'টো নিজের কোলে রেখে মেয়ের মাথা বুকে চেপে অনেক সময় হাত বুলিয়ে দিলো।আদর দিয়ে নানা কথায় ব্যথা কম অনুভব করানোর চেষ্টা করলো। এরপর বললো,


“ আম্মা এখন নিজের রুমে যাও।বাবা একটু কাজ করবে এখন।"


“ আচ্ছা!"


তুহি মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিয়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো,এর মধ্যেই নাসিফ হালকা মৃদু শব্দে ডাক দিলো,


“ রেশমি!"


রেশমি ডাকার সাথে সাথেই উপস্থিত হলো, যেন সে এটার জন্য তৈরিই ছিলো।


“ জি খালু!"


“ তোমার ভাবীসাবকে ডাকো তো, সঙ্গে ভাইয়াকেও আসতে বলবে!"


“ জি, আচ্ছা খালু।"


খবর পাঠানোর প্রায়ই দশ মিনিট পর উপস্থিত হলো দুজন।নাসিফ মাথা নুইয়ে নিজের পায়ে বৃদ্ধাঙ্গুলির দিকে চেয়ে আছে।নাইফ পিছনে সামনে নূর।এসে সবার আগেই সালাম দিলো,


“ বাবা, আসসালামু আলাইকুম।"


কপাল ডেকে ঘোমটা‌ টানা, ফিরোজা জ্যাম রঙের সুতি থ্রি' পিসের সুতি ওড়না দিয়ে।হাত দুটো সামনে এনে আঙ্গুল দিয়ে আঙ্গুলের ঘর্ষণ করছে।নাইফ পিছনে থেকেই সালাম দিলো,


“ আসসালামু আলাইকুম,বাবা।"


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,বসো দু'জন!"


নাইফ বাবার কাছ থেকে খানিকটা দুরত্ব বজায় রেখে বসলেও নূর বসলো না।নাসিফ‌ও দ্বিতীয়বার বললো না বসতে।


নাসিফ নিজের দৃষ্টি নিচে রেখেই জিজ্ঞেস করলো,


“ কেমন আছো তুমি মা? আমার বাড়িতে যদিও তোমার‌ও বাড়ি কিন্তু ঠিক কতটা মানতে পারছো এটাই বড় প্রশ্ন!"


নাসিফ প্রশ্ন করলো, কিন্তু নূরের বোধগম্য হলো না।তাই সে ফিরতি প্রশ্নে বললো,


” জি, স্যরি বাবা আমি বুঝি নাই আপনার কথার মানে...ইয়ে..মানে আসলে!"


“ সমস্যা নাই।আমি আবারও বুঝিয়ে বলছি।"


নূর অবনত মস্তকে স্বীকৃতি দিলো মাথা উপরনিচ দুলিয়ে,নাসিফ পূণরায় প্রশ্ন করলো,


“ ভালো আছো তুমি!"


“ জি আলহামদুলিল্লাহ!"


“ তার মানে ভালো আছো বলছো?"


“ জি আসলে বাবা,আমি... হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।"


“ তার মানে বলছো ভালো আছো।

আচ্ছা ব‌উমা বলো তো এইটা কার বাড়ি?"


“ কার বাড়ি মানে?"


“ মানে তোমার কি মনে হয় এই‌ বাড়ির প্রকৃত মালিক কারা? মানে মানব মালিক বলতে আল্লাহ যাদের যোগ্য মনে করেছেন তারা কারা?তুমি তো এলেমদার মানুষ,এসব ভালো বুঝো,আমরা তো অত আমল করতে পারি না, সারাক্ষণ দুনিয়ার পিছনে ছুটি।"


“ জি বাবা, এভাবে বলছেন কেন? আমি আপনার থেকেও অনেক কিছু শিখি।"


“ বলছো! যা বলেছো শুনে খুশি হলাম কিন্তু উত্তরটা কি হবে বলো তো মা!"


“ বাবা আপনি।"


পুত্র বধূর কথায় নাসিফ মৃদু ঠোঁট ছড়ালো।মাথা দুইদিকে দুলিয়ে অসম্মতি জানান দিয়ে বললো,


“ উহুম হয়নি।"


“ তাহলে কে বাবা!"


“ শোন মা,বাড়ির প্রকৃত মালিক হয় সে যে ভালোবেসে বাড়িকে নিজের করতে পারে।বাড়ি বলতে আমরা চার দেওয়ালের মাথায় ছাঁদকে বুঝলেও প্রকৃত বাড়ি হচ্ছে সেটা যেখানে একগুচ্ছ মানুষ একে অপরের সাথে ভালোবেসে,

মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে।যেখানে একে অপরের পরিপূরক। যেখানে বিপদে আপদে সবাই এক।যদি চার দেওয়ালের মাথায় ছাদকেই বাড়ি বলতো তবে হোটেল কি?"


” জি, বাবা....!"


নাইফ বাবার পাশে বসে,দুই হাটুর উপর নিজের দুই হাতের কনুই রেখে হাতের মুষ্ঠি একত্রে করে ডান হাতের থামস দিয়ে বাম হাতের থামস খামচাচ্ছে। পাশাপাশি বাবার কথা শুনছে।নূরকে এবার আরেকবার নাসিফ বসার জন্য নিজের ফাঁকা পাশ দেখালো। বললো,


“ শোন,হোটেল কেন বাড়ি হয় না জানো? কারণ সেখানে আমাদের সঙ্গে আমাদের আপনজনরা আজীবন থাকার সুযোগ পায় না। সেখানে আমরা চাইলেই নিজেদের খুশিকে মেলে ধরতে পারি না। কাউকে সঙ্গী করতে পারি না। তুমি এখানে বা বাড়িতে যা করতে পারবে সেটা কি অন্য কোথাও পারবে?"


নূর মাথা দুলিয়ে বুঝালো না পারবে না।নাসিফ পূণরায় বললো,


“ এই যে পার্থক্য! এটাই হচ্ছে বাড়ির প্রধান পরিচয়।যেমন‌ই হোক বাড়ি বাড়িই,সেটা নিজের‌ই হোক কিংবা...এখন তুমি কোন বাড়িতে থাকলেই সেটা তো তোমার বাড়ি হয়ে যাবে না মা।সেই বাড়িকে নিজের করতে হলেও তোমাকে অনেক পরিশ্রম, ত্যাগ সেবা করতে হবে।

তুমি নিশ্চয় জানো,যতনে রতন মেলে! কিংবা পরিশ্রম‌ই সফলতার চাবিকাঠি!"


“ জি বাবা।"


নূর পাশে বসে থেকেই উত্তর দিলো। নাসিফ পূণরায় বললো,


“ এখন তুমি বিনা পরিশ্রমে সফলতা পাবে বলে মনে হয়?"


“ না!"


“ তবে কি তুমি সফল হ‌ওয়ার জন্য কোন অসাধু শর্টকাট পথ ধরবে? “


“ জি না।"


তাহলে পরিশ্রম করতে হবে, তোমার কি মনে হয় না আমাদের জীবনে সফলতা আনতে আমাদের আপনজনদের অনেক ত্যাগ থাকে?"


“ জি থাকে।"


“ এই যে আমাদের ভালোর জন্য সবসময় পাশে থাকা আপনজনদের সহযোগিতা, সঙ্গ দেওয়া, পরামর্শ, অর্থ, সময় দেওয়া সবটাই কি এমনিই?'


“ না ভালোবেসে করে!"


“ উহুম, সবসময়ই শুধু ভালোবাসাই না, কখনো কখনো এটা অর্থের বিনিময়েও হয়। কিন্তু কথা হচ্ছে এই যে, আপনজন এদের নিয়েই তো আমাদের বাঁচতে হয়।এদের নিয়েই আমাদের জীবন।এখন এই যে জীবনের মেইন উদ্দেশ্য সফল হ‌ওয়া এবং সেই সফলতার সময়ে অনেক আপনজনদের নিয়ে বেঁচে থাকার প্রয়াস এটা কিন্তু ঐ বাড়িকে ঘিরেই জারি থাকে। একটা বাড়ির আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আপনজনদের সঙ্গে থাকা নানা রঙিন স্বপ্ন।যেটা পুরোটাই কাল্পনিক জগতকে ঘিরে রাখা।

এই বাড়ির কেন্দ্রে থাকে কতশত গল্প,যেই গল্প

জুড়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি, জোড়া সাকোর ঠাকুর বাড়ি, কিংবা অগ্নিবিণার ন্যায় জ্বলজ্বলে চিত্রাংকন।

এই ভালোবাসা, খুনসুটিময় আবেগ দিয়ে জড়িয়ে থাকে প্রতিটি বাড়ি।এই যে যাদের জন্য ইট পাথরের দেওয়াল, খসখসে রঙ্গিন ইট সুড়কির পাহাড়‌ও বাড়িতে পরিণত হয় তারা‌ই কিন্তু আমাদের আপনজন।এই আপনজনদের নিয়েই কিন্তু আমাদের বাস। মৃত কংক্রিটের দেওয়ালকে‌ও এরা বাড়ি বানিয়ে ছাড়ে, তাহলে? যাদের জন্য প্রকৃত বাড়ি সৃষ্টি হয় তারাই বাড়ির মালিক নাকি কেবলি শুধু ইট সিমেন্টের তৈরি দেওয়ালের চারকোনা বাক্সকেই বাড়ি বলে এবং সেই খন্ড জমির মালিক কেই মালিক বলে?"


“ জি বাবা, যেটাতে মানুষ একে অপরের সাথে মিলে মিশে থাকে সেটাই প্রকৃত অর্থে বাড়ি।"


“ হুম। আচ্ছা এখন বলো যেখানে তুমি থাকো এটা কি?"


“ জি বাবা!"


“ না সমস্যা নাই, তুমি বলো। তোমার মন খুলে কথা বলো। এখানে তো তোমাকে বাঁধা দেওয়ার মতো কেউ নাই!"


“ আসলে বাবা,এটাও বাড়ি। আসলে বাবা আমি!"


“ এই বাড়িটা কি তোমার নয়?"


নাসিফের কথায় নূর দৃষ্টি উপরে তুললো। সেকেন্ড তিরিশ তাকিয়ে থেকে আবার‌ও নামিয়ে ফেললো।নাসিফ‌ই বলতে আরম্ভ করলো,


“ না‌ বলো তুমি কি এই বাড়িটাকে প্রকৃত অর্থেই নিজের বাড়ি বলে ভাবতে পারছো? কোথাও কি কোন সমস্যা হচ্ছে তোমার?"


“ জি বাবা মনে করি।"


“তার মানে তুমি মানছো এই‌ বাড়িটা তোমার‌ও!"


“ জি বাবা।"


“ আচ্ছা ব‌উমা একটা কথা বলো, তুমি কি আমাদের এখানে মানে তোমার‌ও বাড়ি যেটা সেখানে কোনরকম শারীরিক, মানসিক কষ্টে আছো?"


নূর চুপ। উত্তর দিলো না।নাসিফ অনেক সময় অপেক্ষা করলো , অতঃপর নূর উত্তর দিলো।


” বাবা আসলে আমি....তাইফ কথা শুনতে চায় না বাবা।

_ ভীষণ মুখ লাগে,ওর জন্য আমার পর্দার বিধান নষ্ট হচ্ছে।আর তুহি.."


“ তুহি সব বিষয়েই জেদ করে? এমনি তে ভালো কিন্তু একটু আদুরিই। আমি জানি কিন্তু কি করবো!"


“ জি আসলে বাবা।এমনটা নয় কিন্তু অনেকটা এখনো.....ও বাচ্চাদের মতো আচরণ করে। ওকে দেখলে কেউ বুঝবে না যে ও।"


“ সে যাই হোক তুমি অসুখী না।আমাকে শুধু এতটুকু ইনফর্ম করলেই খুশি হ‌ই মা!"


“ জি না বাবা।"


“ মা তোমার বাড়ি, তোমার বাড়িতে উপস্থিত বসবাসরত প্রত্যেকেই তোমার আপনজন।তবে তাদের সাথে কি নিয়ে এত মন কষাকষি তোমার?"


নূর নিরুত্তর।নাইফ উসখুস করছে।নাসিফ আড়ালে ছেলের পাংসুটে মুখটা অবলোকন করলো। অতঃপর আবার নূরকে জিজ্ঞেস করলো,


“ এমন কি সমস্যা যার জন্য আমার বাড়ির কথা পরের কানে যাবে? তুমি ঘরের ব‌উ, পুত্র বধূ। বাড়ির সম্মান, অহংকার, অলংকার। তোমার যে কোন সমস্যার সমাধান করার জন্য তোমার স্বামী, শ্বশুর শ্বাশুড়ি সবাই আছেন।তাহলে কেন তোমার কথা তাদের ছাপিয়ে অন্যদের কানে যাবে? তোমার কি মনে হয় এতে তোমার বাড়ির সম্মান রক্ষা পেয়েছে?"


নূর এবার‌ও নিরুত্তর।প্রায় পাঁচ মিনিট এমন নিরবেই কাটালো।নাসিফ হতাশ হয়ে বললো,


“ তুমি যাও।আমার এখন আমার ছেলের সাথে কথা আছে।"


মিনিট এক বসেই র‌ইলো এরপর ধীর পায়ে হেঁটে নিজের ঘরের দিকে র‌ওনা দিলো।নাসিফ চোয়াল শক্ত করে ছেলের দিকে ফিরলো,নাইফ নিজের দোষ স্বীকার করে বাবার নিকট ক্ষমা চাইলো কিন্তু নাসিফ কাটকাট গলায় বললো,


“ আমি মরে যাইনি।যে তুমি আমার ছেলেকে শাসন করবে! আজ যা করেছো ভবিষ্যতে এই দুঃসাহস আমার জীবদ্দশায় করবে না। নিজের ব‌উ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে নিজেকে পুরুষ ভাবা বন্ধ করে দাও। কিন্তু নিজের পুরুষত্ব আমার সন্তানের উপর জাহির করবে না।"


“ বাবা আমি..!"


“ যাও এখন। তোমার মুখ দেখতেও ইচ্ছা করছে না।"


বাবার এহেন তীব্র অপমানে নাইফ মাটিতে পিষে যাওয়ার ন্যায় নিচু হয়ে গেলো।উঠে দাঁড়ালো, কান্না আটকানোর প্রয়াসে থুতনি কাঁপছে,তাও কোনভাবে বললো,


“ আমাকে ক্ষমা করে দিও বাবা।আমি নিজের রাগ দমাতে না পেরে অযথাই ওর উপর... আ'ম স্যরি।আমার তোমার ভরসা ধরে রাখতে পারিনি।"


“ যাও এখন।আমার তোমার কোন কথা সহ্য হচ্ছে না!"


নাইফ এভাবে বাবার দেওয়া তিরষ্কার কাঁধে নিয়ে ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে গেলো।নাসিফ পায়ের উপর পা তুলে আঙ্গুল ঠোঁটে ঠেকিয়ে মিনিট পাঁচেক ভাবলো কিছু অতঃপর উঠে তাইফের ঘরের দিকে গেলো।


তাইফের দরজা আসার পর থেকেই বন্ধ পেয়েছে।কি দুঃসাহস ছেলের,এত বড় কান্ড ঘটিয়েও ক্ষান্ত হয়নি।নাসিফ দরজায় টোকা দিলো,তাইফ কোন প্রত্যুত্তর করলো না। পরপর পাঁচ ছয়বার ডাক দেওয়ার পর দরজা খুললো, বেরিয়ে আসলো, দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালো।নাসিফ রক্ত চোখ নিয়ে তাকিয়ে দেখলো ছেলেকে অতঃপর কষিয়ে এক চড় দিলো ডান গালে।

এরপরেও তাইফের নড়চড় হয়নি। উল্টো যেন রাগ আরো বাড়ছে। দরজায় কড়া ঘাত করার সময়েই তুহি,তুলতুল আফিয়া সহ নাইফ নূর বাদে সবাই এসে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে থাকে।


এরপরের ঘটনা আগেই পড়েছেন।


“ তার মানে আমার মা বোনকে অপমান করবে আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল চুষবো!"


“ মুখের ভাষায় লাগাম দাও বেয়াদব। তুমি তোমার বাপের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছো।কোন সন্ত্রাসী টোকাইয়ের সাথে ন‌ও।"


এই কথায় তাইফ নিজের দৃষ্টি নামিয়ে ফেললো, নাসিফ আবারও বললো,


“ তোমাকে হাফেজি পড়িয়েছি। তুমি একজন হাফেজ,ভুলে যেও না।সবার কপালে ও সৌভাগ্য থাকে না। তোমার আচরণে মনে হচ্ছে তুমি রাস্তায় বসবাস করা কোন নেশাখোর। একজন হাফেজ, একজন আর্মির লেফটেন্যান্ট এর আচরণ এত নিম্ন কেন হবে? তুমি কিসের আর্মি, কিসের হাফেজ যদি নিজের আচরণে‌ই নিয়ন্ত্রণ টানতে না পারো? দরকার নেই তো মুখের সনদ। শুধু গায়ে ডিফেন্সের পোশাক লাগালেই হলো না তার মর্যাদাও রাখতে জানতে হয়। তোমার আচরণের জন্য আমাকে আজ শুনতে হয় আমি বখাটে জন্ম দিয়েছি, আমি সন্ত্রাস ক্যাডারের পৃষ্ঠপোষকতা করি।এই দিন দেখার জন্য এই কথা শোনার জন্য আমাকে এত কষ্ট করতে হয়েছে? তোমার মতো কুলাঙ্গার সন্তান জন্ম দিয়ে তোমার মা পাপ করেছে যে তার লালন পালন নিয়ে লোকের মন্দ শুনতে হবে এই বয়সে? দরকার নেই আমার এমন সন্তান, দুষ্টু গোরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো আমার।"


“ ঠিক আছে,আমিই যখন খারাপ তাহলে আমিই চলে যাই। তাহলেই সব ঝামেলা মিটে যায়।"


তাইফ তেজ দেখিয়ে চলে যাবার কথা বলায় নাসিফ বললো,


“ আর কখনো যেন এই বাড়ির সীমানায় দেখি।"


“ দেখবে না। যেখানে অপরাধীকে মাথায় তুলে রাখা হয় সেখানে আমি থাকবো না।"


তাইফ বলেই নিজের ঘরের দরজা আবারও লাগিয়ে দেয়। এদিকে নাসিফ বকতে থাকে,


“ এখনো দু টাকা দিয়ে ঘরের একটা পর্দা কেনার খবর নাই আর সে নিজের মায়ের শখের কেনা জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। কুলাঙ্গার হচ্ছে দিনদিন। বাপ মা আছে তো তাই বোঝ না কোনটা কত কদর দিয়ে যোগার করা হয়,যখন থাকবে না তখন বুঝবে কিন্তু শত চেচালেও আর পাবে না।কুজাত জন্ম দিয়ে লোকের কথা শুনতে শুনতে জীবন ছাড়খার হচ্ছে আমার!"


তাইফ নিজের ব্যাগপ্যাক নিয়ে বের হলো।নাসিফ নিজের ঘরের দিকে চলে গেছে তখন‌ই।ভাইকে এভাবে তৈরি হতে দেখে নাবীহা আগলে ধরে বললো,


“ ভাই কোথায় যাচ্ছিস? পাগলামি করিস না।বাবা তো এমনিতেই বলেছে।"


“ না,ছাড়ো। থাকবো না এখানে আর।তুমিও চলে যাও তোমার বাড়িতে। এখানে থাকলে কুটনির জ্বালায় মরে যাবে।"


“ ভাই প্লিজ যেও না!"


বলেই তুহি ফুঁপিয়ে উঠলো।দুই বোন ভাইকে দুই দিক থেকে টানাটানি করছে। কিন্তু একজন ফিট ম্যানকে আটকানো তাদের মতো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।আফিয়াও স্বামীর পথ অনুসরণ করে ঘরে গিয়ে বসে আছে। তাদের কানে যাচ্ছে সবটাই কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না।


এদিকে ভাই বোনদের মধ্যে ধস্তাধস্তি চলছে। ঐদিকে নাইফ নিথর হয়ে বসে আছে জমিনে পা ছড়িয়ে। তার কানেও যাচ্ছে তার বোনদের হাহাকার আর ভাইয়ের জেদের বশীভূত শব্দগুলো।


নাইফ উঠে দাঁড়ালো। তারপর বেরিয়ে এলো।তাইফ সু ফিতে বাঁধছে। এদিকে তুহি তাইফের ব্যাগ ধরে টানছে।নাবীহা জুতার ফিতে আঁটকে ধরে বারবার বাঁধা দিচ্ছে আর অনুরোধ করছে।নাইফ এসে বোনদের ঠেলে তাইফের টি শার্টের কলার খামচে ধরে টেনে উঠালো।তাইফ বড় ভাইয়ের সাথেও জোর করে কলার ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু তার দৃষ্টি এখনো নিচে।নাইফ কলার ধরেই টানতে টানতে তাইফের ঘরের দিকে নিয়ে যেতে থাকলো।


” ছাড়ো আমাকে।আমার কলারে হাত দিবে না তুমি!"


নাইফ কোন শব্দ উচ্চারণ না করে একরকম তাইফকে ঘরের মধ্যে ছুঁড়ে মারলো এরপর নিজেও ভেতরে ঢুকে দরজা আঁটকে দিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।


“এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন? আমাকে যেতে দাও।"


“ যা আমাকে সরিয়ে!"


“ তুমি সরো।আমার তোমার সাথে কোন কথা নেই!"


“ বলতে হবে না কথা। শুধু সরিয়ে যা।"


তাইফ এগিয়ে এসে পাশ কেটে যাওয়ার চেষ্টা করলো, নাইফ গলা পেঁচিয়ে সামনের দিকে ঘুরিয়ে বললো,


“ এত কৌশল শেখালাম, আর্মির ট্রেনিংয়ের ছিলি, আর্মির লেফটেন্যান্ট হলি অথচ এখনো প্রতিপক্ষকে রুখতে শিখলি না। তাহলে কি লাভ হলো?"


“ আমার তোমার সাথে কোন কিছু দেখানোর নাই। ছাড়ো আমায়, আমি ক্যান্টনমেন্ট যাবো।"


“ ছুটি শেষে।এখন কোথাও না।"


“ না আমি এখানে থাকবো না। তোমাদের বাড়ি তোমরাই থাকো।"


“ হ্যাঁ আমাদের বাড়িতে আমরাই থাকবো, এটাই স্বাভাবিক।"


“ ছাড়ো বলছি।"


“ চুপ।"


নাইফ ভাইয়ের গলা পেঁচিয়ে রেখে কাঁধে থুতনি ঠেকালো।ওর চোখ গলে ঝড়ে পড়া মুক্তোর দানা তাইফের শক্ত লোমশ কাঁধ বেয়ে বুকের পাঁজর ভিজিয়ে দিলো। মিনিটে কত সময় পার হলো বলা যায় না কিন্তু পিতার সমতূল্য বড় ভাইয়ের চোখের পানি তাইফের অন্তর কাঁপিয়ে দিলো। স্থির হয়ে গেল সে। সারাদিন নিজের করা দুর্চারণ একে একে ভেসে উঠলো চোখের সামনে। নিজের ভুলগুলো বুঝতেই মাথা নুইয়ে নিলো। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কাঁদো কাঁদো সুরে বললো,


“ স্যরি ভাই।"


নাইফ ভাইয়ের গলা আরো শক্ত করে পেঁচিয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরলো,গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বললো,


” ভাই‌ও অনেক স্যরি।

_আজ অনেক মেরেছি।ভেরি‌ স্যরি!"


মুহূর্তেই তাইফের প্রতিক্রিয়া বদলে গেলো, নিজের ইগো ধরে লাগতে বললো,


“ কিন্তু আমার একটুও লাগেনি।"


নাইফ এত বড় ভাইয়ের বাচ্চামো দেখে হেসে দিলো। অতঃপর দুই ভাই বুকে বুক মিলিয়ে গলায় জড়িয়ে ধরে নিজেদের ভুলগুলোকে আবার স্বীকার করলো, বারবার ক্ষমা চাইলো।

ঐদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে দুই বোন দরজায় কান পেতে বোঝার চেষ্টা করছে ঠিক কি হচ্ছে ঘরের ভেতরে?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ