সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১৩৪

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_১৩৪



[কপি করা/চুরি করা, নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ দয়া করে এগুলো করবেন না কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন। ধন্যবাদ সবাইকে।]


সকাল বেলা আফিয়া বিছানা ঠিকঠাক করছে,নাসিফ পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে তজবি বের করতে করতে বললো,


“ ছেলেকে ডাকো,যা বলার আজ‌ই বলে দেই। এভাবে ফেলে রাখা যাবে না তাহলে এই ঘটনার পূণরাবৃত্তি ঘটানোর দুঃসাহস করবে।"


আফিয়া হাত থামিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে স্বামীর দিকে চাইলো।এরপর বললো,


” আজ‌ই বলবেন? আজ থাক।"


নাসিফ ভ্রু কুঁচকে ঝাঁঝালো গলায় বললো,


“ আজ থাকবে কেন?"


“ আজ বললে ছেলে মনে কষ্ট পাবে। ভাববে কালকের জন্য‌ই তাকে এত বড় শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।"


“ সে যা খুশি ভাবুক।কারো ভাবনা তো ধরে ধরে বদলাতে পারবো না।আর রোজ রোজ এসব অসভ্যতামিও দেখতে পারবো না।লোহা গরম থাকতেই তাকে পিটিয়ে আঁকার দিতে হয়।"


“ তাও, থাকুক আজ।পরে অন্য সময় একটু চাপা পড়ুক তারপর..."


“ মানে মাছ‌ওয়ালীদের মতো চুল ছেঁড়া ছিড়ি করতে বেশ লাগছে তাই না?"


“ এমন করে বলার কি আছে! তাছাড়াও পরের বাড়ির মেয়েকে শাস্তি দিতে গিয়ে আমি আমার ছেলের কথাও ভাববো না?"


“ যা খুশি ভাবো, কিন্তু ঘরে এসব চলবে না।সে কথা যদি ছেলে ব‌উকে ভালো করে বুঝিয়ে বলতে পারো তবেই বেশ!"


“ আমি আর ও মেয়ের সাথে কথাই বলতে চাই না।"


“ তবে আর কি! ডাকো তাদের!"


“ বাবা,আসবো?"


আফিয়ার ডাকতে হয়নি।নাইফ নিজেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় শব্দ করলো।নাসিফ দরজার বাইরে ছেলের কন্ঠ পেয়ে একবার স্ত্রীর দিকে চাইলো অতঃপর অনুমতি দিলো,


“ আসো।"


বাবা যে এখনো রেগে আছে তা নাইফ অনুমান করেই এখানে এসেছে তা-ও আগেই জিজ্ঞেস করলো,


“ বাবা তুমি এখনো আমার উপর রেগে আছো?"


নাসিফ খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসে পাঞ্জাবির পকেট টানতে টানতে বললো,


“ তোমরা যদি ভেবে থাকো আমি বুড়ো হয়েছি বলেই সব ভুলে যাই তাহলে মারাত্মক ভ্রান্ত ধারণা লালন করছো।আমার স্ত্রীকে কেউ হেয় করে কথা বলবে আর আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো এতটাও মহান যে আমি ন‌ই সেটা তুমি আমার সন্তান, তোমার খুব ভালো করেই জানা উচিত।"


“ বাবা আমি.."


“ আম্মু!"


আফিয়া এতক্ষণ বালিশ রাখছিলো ড্রয়ারে। ছেলের ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে বললো,


“ হ্যাঁ বলো!"


নাইফ এগিয়ে গিয়ে খুব সাহস করে মায়ের হাত ধরে বাবার পাশে এনে বসালো।বললো,


“ আমার তোমাদের সাথে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা আছে।

_আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।না-না হুট করেই নেইনি। অনেক ভেবে চিন্তে তারপর নিয়েছি!"


আফিয়া নাসিফ একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো, দৃষ্টিতে বিনিময় হলো দুশ্চিন্তা, উৎকন্ঠা! আফিয়াই জিজ্ঞেস করলো,


“ কোন বিষয়ে?"


“ বাবা তুমি আজকে একটু বাসায় থাকো। নূরের ছোট মামা আর মেজো খালামনি আসছে।আমি চাই তোমাদের উপস্থিতিতে উনাদের সঙ্গে চুড়ান্ত আলোচনা করবো।আর ..."


“ সে না হয় বুঝলাম কিন্তু কি এমন সিদ্ধান্ত নিলে? আর উনারা আসবে বলতে তুমি কি তাদের আসতে বলেছো?"


“ হ্যা!"


“ কেন?"


“ আমি অনেক ভেবেছি বাবা।নূর যা চায় তা কখনোই সম্ভব নয়। ওর এহেন ঔদ্ধত্য, দুঃসাহস হিংসাত্মক মনোভাব হজম করে ওকে নিয়ে সংসার করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।হয় ও নিজেকে বদলাবে নয় আমাকে ছাড়বে! যে কোন একটি পথ ওকে আমি বাছাই করতে বলেছি।আজ ওকে ওর মামার হাতে তুলে দিবো।যদি কখনো বদলায় তবে ফিরে আসার সুযোগ পাবে নয়তো!"


“ তুমি কি তালাকের বিষয়ে ভাবছো?"


আফিয়া বিস্মিত বিস্ফোরিত চাহনিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো।নাইফ নত মস্তকে মাথা দুলিয়ে মা'কে বললো,


“ হুম!"


“ আসতাগফিরুল্লাহ্! নাউযুবিল্লাহ ,এসব কি ধরনের কথা বাবু? আমি তোমাকে এই শিক্ষা দিয়েছি?

_ তুমি জানো না, তালাক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সবচেয়ে অপছন্দের কাজ!তিনি সম্পর্ক ছিন্নকারীকে জান্নাতে না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন! আল্লাহ বাবা এগুলো কি বলো তুমি?"


আফিয়া উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।নাসিফ স্ত্রীর হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বললো,


“ থামো, বসো।অস্থির হয়ো না।

_ ছেলেকে শেষ করতে দাও।"


নাইফ মায়ের উত্তেজিত হ‌ওয়াতে বিব্রত, দ্বিধাগ্রস্ত হলেও বাবার কথায় খানিকটা স্বাভাবিক বোধ করে নিজের কথা বলার জন্য বাবার দিকে চাইতেই নাসিফ‌ই ছেলেকে নিজের পাশে বসার জন্য ইশারা করলো,


“ বসো এখানে।"


নাইফ বসলো‌।নাসিফ ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলো,


“ হ্যা বলো,যা বলেছো বুঝে বলেছো?

_ তুমি বুঝতে পারছো শব্দটার অর্থ কি? কতখানি ওজনদার একটা শব্দ?"


“ জি বাবা।আমি অনেক ভেবেছি, সারা রাত ভেবেছি। এভাবে সম্ভব নয়। অন্তত সব ছেড়ে শুধু ওকে নিয়ে‌ই থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।আর ও আমার মতো থাকতে পারছে না। সুতরাং আমাদের একসাথে থাকাতে কারো মনেই শান্তি আসবে না।তার চেয়ে বরং!'


“ তোমার মামা শ্বশুর কখন আসবেন?"


“ জি, উনাদের বলেছি আজকে আমাদের সাথে লাঞ্চ করতে। এতদূর থেকে আসতে তো দুপুর হবেই, তাই না?"


নাসিফ লম্বা এক প্রলম্বিত নিশ্বাস ছাড়লো, অতঃপর ছেলেকে বললো,


“ তোমার মামাকেও আসতে বলো।বলো দুপুরে যেন উপস্থিত থাকে।"


“ জি!"


বলেই নাইফ উঠে দাঁড়ালো। মায়ের দিকে চেয়ে বললো,


“ নানীকে নিয়ে আসতে বলছি!"


“ না,এসবের মাঝে আসলে তোমার নানী কান্নাকাটি করে অসুস্থ হয়ে যাবে তাছাড়া এহেন গর্হিত কাজ সে মোটেই পছন্দ করে না। চোখের সামনে নিজের নাতিকে..."


“ তুমি যাও। নিয়ে আসতে বলো।"


নাসিফ ছেলেকে অনুমতি দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য ইশারা করলো।নাইফ খুব ধীর পায়ে হেঁটে মা বাবার ঘর থেকে বেরুলো।

পরনে তার ধূসর রঙের ঢোলা টি শার্ট এবং ব্ল্যাক ট্রাউজার।সবটাই বেশ ঢোলা। এগুলো তাইফের।রাতে দুই ভাই একইসাথে ছিলো।তাইফ অভ্যাসগত খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু ঘুম আসে না নাইফের চোখে।পুরো একটা রাত সজাগ থেকে এই সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে।কাল থেকে নূরের সাথে আর কোন কথা বলেনি সেই যে তাইফকে আঘাত করার পর থেকেই।তার বাবার সাথেও ত্যাড়ামো করায় আরও বেশিই মনে লেগেছে। রাত থেকে নূরের মুখোমুখি‌ও হয়নি।তার পক্ষে কোনভাবেই নূরকে খুশি করতে গিয়ে মা বাবাকে ছেড়ে একা একা থাকার কথা ভাবা সম্ভব নয়।আর নূরের মনোভাব তো ঝর্নার জলের ন্যায় স্বচ্ছ।সে যেন ওয়াদা করে বসে আছে যে কোনভাবেই মিলেমিশে থাকবে না।


____________________________________


সালাহ ক্যাম্পাস থেকে সোজা এসেছে। কাঁধে তার অফিসিয়াল ব্যাগ,হাতে কিছু ফাইল। যেটাতে মূলত একাডেমিক কোন ডকুমেন্ট।পরনে কালো মিক্সড কটন সিল্ক চেইক শার্ট,ফরমাল কালো সিল্ক প্যান্ট। হাতে চামড়ার বেল্টের একটা ঘড়ি,চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। সোফায় বসে ডান পায়ের উপর বাম পা তুলে ধীরে তা নাচিয়ে নাচিয়ে ভাগ্নির কাটা পা দেখছে। এদিকে তুহি নিজের গাল ফুলিয়ে মামার কাছে মামার নামেই অভিযোগ করছে কেন মামা দিবা আর সামিকে নিয়ে আসেনি।


“ মামা কিভাবে আনবো!আমি তো অফিসেই ছিলাম আম্মা।জাসট তোমার নানীকে নিচে নামিয়ে দিয়ে গেলে আমি গাড়িতে তুলে নিয়ে আসলাম।"


“ তাহলে ওদের কি নামিয়ে দেওয়া যেতো না?"


“ আচ্ছা ওরা তো সবসময়ই আসে। তুমি কেন যাচ্ছো না।"


“ আমি তো যেতে চাই কিন্তু তোমার বোন‌ই তো যেতে দেয় না আর তার দু'টো ডায়নোসর ছেলে আছে,তারাও যেতে দেয় না।”


তুহির যে ভীষণ মন খারাপ তা তার কথায় বুঝা যাচ্ছে। সালাহ্ ভাগ্নির কাঁধে হাত রেখে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আদর দিয়ে বললো,


“ এত মন ছোট করতে নেই আম্মা।আজ মামু সঙ্গে করে নিয়েই যাবে তার তুহি বুড়িকে।"


“ মামা তুমি জানো কাল ভাইয়ারা ঝগড়া করেছে...আহ্!"


কথা শেষ হতে হতেই মাথার পিছন দিকে চাপড় মারলো তাইফ।তুহি চোখ কুঁচকে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,


“ মাথায় মারবা না।আমি বাবাকে বলে দিবো।"


“ তাইফ কতবার বলেছি ওকে মাথায় মারবা না তোমরা!"


“ তোমার ভাগ্নির সব জায়গাতেই সমস্যা মামু! কাল ভাইয়ের সাথে ফাইট হলো আমার অথচ দেখো জখম হয়ে বসে আছে ও! মানে যা তা!"


“ তাহলে তোমরা ফাইট করো কেন? তাও আবার ঘরের মধ্যে যেখানে একটি বাচ্চা থাকে।"


“ ও বাচ্চা? মামু তোমার আদরের চোখটা এবার একটু খোল। তোমার ভাগ্নির বিয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে।আর তুমি ওকে!"


“ তোমরা বড় ভাইরা যদি এভাবে বলো তাহলে বাইরের লোকের দোষ কোথায়?"


এবার তাইফ চুপ হয়ে গেলো। দরজায় বেল বাজলো।রেশমি দরজা খুলতেই বাইরে থেকে সালাম ভেসে আসলো,


“ আসসালামু আলাইকুম।"


নূরের মেজো খালা, সুবর্ণা সুলতানা,এক সময়ের কানাডা প্রবাসী হলেও বর্তমানে চিটাগাং হালিশহরে শ্বশুর বাড়িতে থাকছেন।স্বামী ব্যাবসায়ী।


নূরের মামা, খালেকুজ্জামান সিদ্দিকী।ব্যাবসায়ী ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।ঢাকার মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় থাকেন স্বপরিবারে।


তিনি নিজের সহধর্মিণী সহিত এসেছেন এদিকে সুবর্ণা এসেছেন স্বামী এবং বড় পুত্র সঙ্গে নিয়ে।

কুশলাদি পর্ব সেরে সবাই বসার ঘরে বসলেন।নাইফের ভার মুখ দেখে আফিয়া ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। ঐদিকে নাসিফ সালাহকে পাশে বসিয়ে বানিজ্যিক, রাজনৈতিক আলাপ করছে।

নূর এর মধ্যে একবার ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের আত্মীয়দের সাথে কথা বলে গিয়েছে।আর নাইফ বাবার পাশেই বসে আছে।নাবীহা মাকে সাহায্য করছে।তাইফ নিজের ঘরে।


“ আগে খাওয়া দাওয়া সেরে নিলে ভালো হতো না?"


নাসিফ বললো, খালেকুজ্জামান প্রস্তাব নাকোচ করে বললেন,


“ খাওয়া দাওয়া ইনশাআল্লাহ হবেই। দুপুরে যখন এসেছি না খেয়ে গৃহস্থ বাড়ির অকল্যাণ করতে তো পারি না।পেটের‌‌ও চাহিদা বাড়ছে, ইনশাআল্লাহ খাবো।"


“ আলহামদুলিল্লাহ!"


“ তো জামাই,কি হয়েছে? কি সমস্যা তোমাদের মাঝে যার জন্য আমাদের মেয়ের এই হাল!"


তিনি খানিকটা গা বিঁধিয়ে রসিকতা করলেন।নাইফ ঠিক ওভাবেই উত্তর করলো,


“ আপনাদের বাসায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন আশাকরি যা শুনতে চাইছেন তাই শুনতে পাবেন।"


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ