সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১৪৩

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_১৪৩



[কপি করা/চুরি করা,নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ। দয়া করে এগুলো করবেন না কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন। ধন্যবাদ সবাইকে।]


আফিয়া স্বামী আর বড় সন্তানের কথায় বিরতি দিয়ে,


“ কত হবে বয়স এখন?"


“ আমার বড় আম্মু!"


তাইফের উত্তর দেওয়ার সাথেই সাথেই দ্বিমত করলো নাইফ,সে ঘোর অমত জানিয়ে বললো,


“ এখন‌ই! না এখন‌ই বিয়ে দেওয়া যাবে না। মাত্র কামিলে ভর্তি হলো।শেষ হোক অন্তত!"


“ দেখো ভেবে।আমি শুধু তোমাদের পর্যন্ত ইনফর্মেশন এনে দিলাম।তবে হ্যাঁ বাবা, ফাহাদ স্যার অমায়িক একজন মানুষ।আমি শুধু একজন জুনিয়র হিসেবে উনার তরফ থেকে এতটুকু বলছি, উনার কাছে যেকোন মেয়ের পরিবার মেয়ে দিয়ে সুখে থাকবে।তবে আমাদের তুহিটার বয়স কম বলে,নয়তো আমি তোমাদের সাথে আলোচনা ছাড়াই মতামত দিয়ে আসতাম।এখন ঝামেলা যত আমাদের মেয়ের বয়স নিয়ে, অবশ্য এটা আমাদের তরফ থেকে। উনাদের সমস্যা নেই।ইভেন ওর পড়াশোনার বিষয়েও কোন বাঁধা নেই। মিসেস ফরহাদ‌ সিদ্দিকী চৌধুরী‌ও দুর্দান্ত মেধাবী এবং চমৎকার মনের একজন নারী।

আম্মু তুমি জানো,উনি এত হায়ার এডুকেট তোমার মতোই,তার কথাও তোমার মতো।অন্য সিনিয়র অফিসারদের মিসেসদের যেমন চোটপাট তেমনটা উনার মধ্যে দেখা যায় না। একদম মাটির মানুষ আম্মু!"


“ সব‌ই বুঝলাম বাবা, কিন্তু তোমার বোনের‌ই তো এখনো বাচ্চামো গেলো না।এই সময়েই কি বিয়ে নিয়ে ভাববো? পড়াশোনার বিষয়েও!"


“ পড়াশোনা বিয়ের পরেও করা যায়।যদি ইচ্ছা থাকে। তোমার মেয়ের তো সেই ইচ্ছাই নেই।কি করে সারাদিন! পড়ে? একবার‌ও ব‌ই নিয়ে বসে না।ব‌ইয়ে একদম মন নেই।তার চেয়ে ভালো বিয়ে দিয়ে দেই,স্বামী সংসার সামলাক।বয়স হয়ে গিয়েছে।"


কথাগুলো আফিয়া বললো। খানিকটা নাসিফের উপর রাগ দেখিয়ে। সারাক্ষণ মেয়েকে আহ্লাদ দিয়ে দিয়ে বিগড়ে দিচ্ছে তার ভাষ্যমতে, তাই এমন প্রতিক্রিয়া। তাছাড়াও সত্যি কথা,তুহির এইচএসসি ফলাফল খুব একটা ভালো হয়নি।যেটার জন্য দায়ী অবশ্যই তার অমনোযোগিতা আর মোবাইলে আসক্তিতা।


“ শান্ত হ‌ও আম্মু।এই বয়সে একটু আধটু এমন হয়। তাছাড়াও এক‌ই ঘরে সবার ব্রেইন শার্প থাকে না , একটু আধটু বোকাসোকা থাকেই। আমাদের তুহিটাও তো বোকাসোকা।"


“ এটাই তো ভয় রে বাবা।এই বোকা মেয়েকে আমি কোথায়, কার কাছে দিবো?"


মায়ের চিন্তা থাকা স্বাভাবিক। মায়ের চিন্তিত বাক্য শুনে নাইফ,তাইফ নিজেদের দৃষ্টি নামিয়ে নিলো।মেয়ে জাতির কি ভাগ্য না!বাবা ভাইয়ের চোখের মনি থাকে,হাজারটা দোষ-ত্রুটি আড়ালে রেখেও তারা শুধু নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখে। একদিন সেই বাবা ভাইয়ের নিরাপত্তার ছায়া থেকে অদূরে সরে যেতে হয়। যেখানে কোন কিছুর নিশ্চয়তা থাকে না।

তুহি যত‌ই আহ্লাদি হোক কিংবা জেদি। দিনশেষে এটাই সত্য সে চরম বোকা একটা মেয়ে। বলাবাহুল্য অধিকাংশ ধনীর দুলালিরাই এমন রামবোকা জাতের হয়।

বিকেলের চা পর্বের এই আলোচনা এখানেই শেষ হয়। এরপর সবাই সবার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু রাতের বেলা ঘুমানোর সময় আফিয়া নিজেদের বিছানা ঝাড়তে ঝাড়ু খুঁজছিলো তখন‌ই তুহি ঘরের দরজায় কড়া ঘাত করে,


“ বাবা!"


নাসিফ পাঞ্জাবি খুলছিলো,সেটা মাথায় আঁটকে রেখেই মেয়ের ডাকে সাড়া দেয়,


“ আসো আম্মা!"


তুহি ঘরে ঢুকে মায়ের হাতে ঝাড়ু দেখে সেটা হাত থেকে নিয়ে নিজেই ঝাড়ু দিতে দিতে বললো,


“ আমার মনেই ছিলো না। মনে পড়তেই দৌড়ে আসলাম,আমি তো ভাবলাম তুমি ঝেড়েঝুড়ে শুয়েও পড়েছো।"


“ সমস্যা নাই আম্মা, তুমি যাও! বেশি রাত জেগে মোবাইল দেখো না।স্মরণ শক্তি তো কমেই যাচ্ছে। দিনদিনই তুমি ভুলোমনা হচ্ছো।"


“ রাত জেগে দেখি না আম্মু মোবাইল। শুধু একটু..."


“ মিথ্যা বলবে না।চোখমুখের কি অবস্থা হয়েছে আয়নায় একবারও নিজেকে দেখো? জিজ্ঞেস করো নিজেকে কিভাবে এটা হলো?"


এই কথার উত্তর দিলো না তুহি।সে ঝাড়ু দেওয়া শেষ করে বালিশ সাজিয়ে, কাঁথা পায়ের সামনে ভাঁজ করে রেখে বাবার খুলে সোফার উপর ফেলে রাখা পাঞ্জাবিখানা তুলে ময়লা কাপড়ের ঝুড়িতে রাখলো। এরপর ধীর পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলো, যাওয়ার পথে,


“ শুভ রাত্রি আম্মু বাবা, আসসালামু আলাইকুম।"


আফিয়া বিছানায় উঠে নিজের পাশে বসলো,নাসিফ‌ও বাথরুমে গিয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে ওযু করে বের হয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে বিছানায় উঠলো।পাশেই শুয়ে পড়লো।আফিয়াও বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ করেই নাসিফের বুকের উপর হাত রেখে নিচু গলায় ডাক দিলো,


“ এ্যাই শুনছো!"


“ হুম,ঘুমাইনি বলো!"


“ বলবো আর কি!"


“ না বলার হলে ঘুমাও।"


“ বলছিলাম ছেলের আনা প্রস্তাবটা ভেবে দেখবা একবার?"


এবার নাসিফ চোখ মেলে আফিয়ার দিকে চাইলো, কিছু মুহূর্ত চুপ থেকে কিছু একটা ভেবে বললো,


“ ছেলের সাথে আমাদের মেয়ের কম করে হলেও দশ বছরের গ্যাপ! এটা কি আদৌ মানানসই?"


“ যদি দেখে বয়স্ক না লাগে তাহলে সমস্যা কোথায়? তাছাড়াও... বয়সী ছেলেরা সংসারি হয়।কম বয়সী ব‌উদের প্রতি যত্নশীল হয়।"


“ কিন্তু?"


“ আমি তো কোন কিন্তুর জায়গা দেখি না। মেয়ে তো আমাদের আর নাবালিকা নয়! সে বিবাহের বয়স্কা‌। সবদিক থেকেই প্রাপ্ত বয়স্ক।আমার মতে বিয়ের জন্য উত্তম সময় পার করছে। তাছাড়াও আমরা আজ আছি কাল নাই।একটা দিন রোগবালাই ছাড়া কাটে না।এই অবস্থায় কখন কে হুট করেই চলে যাই, তখন কার উপর রেখে যাবেন এই মহা বিশাল দায়িত্ব?

_ মেয়ে আমাদের, তাকে সুপ্রাত্রস্থ করার দায়িত্ব‌ও আমাদের।সেটা তো আরেকজনের ঘাড়ের উপর রেখে মরতেও পারবো না। আল্লাহর কাছেও তো জবাবদিহি করতে হবে তাই না?"


রাতের অর্ধেক প্রহর কাটলো স্বামী স্ত্রীর জীবনের নানা গল্প দিয়ে, তার সঙ্গে খুঁজে বেড়ালো নিজেদের ফেলে আসা দিনগুলোকে।



গাজী বাড়িতে ধুমধাম আয়োজন হচ্ছে। বাইরে গ্রাম থেকে আনা ছাগলের বাচ্চাকে লালনপালন করে আফিয়া অনেক বড় করেছিলো সেটাই জবেহ করে নতুন অতিথির সঙ্গে সম্পর্ক পাকাপোক্ত করতে চলছে। রাতের দাওয়াত।বড় জামাই‌ও আসছে।নাবীহাও সঙ্গে আসবে।


“ আম্মু আমি কি সহযোগিতা করতে পারি?"


“ কিছু করতে হবে না। তুমি গিয়ে পরিষ্কার হ‌ও‌ গা, গোসল দিয়ে একদম চাঙ্গা হয়ে যাও।"


সেদিন রাতের আলাপচারিতার পর নাসিফ মেয়ের জন্য এই পাত্র পছন্দ করে।তবে, তাও সরাসরি দেখা জরুরী বলে সরাসরি কোন মন্তব্য করেনি।নাইফকে নিয়ে সকালে আবারও মিটিংএ বসে।নাইফ দোনামোনা থেকেই বাবাকে সমর্থন করে। এবং তার মনে এখন‌ও সেই খচখচানি।এখানেও তুহির মতামত নেওয়ার দায়িত্ব পড়ে নাইফের কাঁধে।নাইফ বোনের ঘরে বসে সবটা বুঝিয়ে বলে সুন্দর করে জিজ্ঞেস করে,


“ এখন তুমি বলো তুমি কি করবা?"


তুহি অনেক সময় নিশ্চুপ থেকে শুধু এই কথাটাই বলেছিলো,


“ তোমরা যা বলো তাই করবো।"


ব্যস্ কথা শেষ। এরপর তাইফ নিজ তাগিদেই তাদের সবটা জানায়, এবং বাবা মায়ের নির্দেশে তাদের নিমন্ত্রণ করে।

ঠিক বাদ মাগরিব পাত্র পক্ষ গাজী পরিবারের সামনে এসে উপস্থিত হয়।

সিদ্দিকী ফাহাদ চৌধুরী, ফরহাদ সিদ্দিকী চৌধুরী, এবং সুদর্শনা সিদ্দিকী চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র। পেশায় সম্মানিত বিমান সেনা, সার্জেন্ট অফিসার।দেখতে সুদর্শন, পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির সুদর্শন, সুঠামদেহী পুরুষ। নিয়মিত ব্যায়ামে তার পেটা শরীরের সৌন্দর্য আরো তীব্র ভাবে ফুটে উঠেছে।চোয়াল ভাঙ্গা গাল ভর্তি ছোট ছাঁটের চাপ দাঁড়ি ফর্সা মুখটাকে আরো ফুটিয়ে তুলেছে। একজোড়া প্রখর তীক্ষ্ণ, ধারালো নজর।চিকন ভ্রু, খাঁড়া নাক, ছোট চায়না কমলার মত ঠোঁট।

সাদা পাঞ্জাবি,পাজামার সাথে কালো চামড়ার ফিতেওয়ালা ঘড়ি, আর্মি কাট সিল্ক চুল

অবনত মস্তকে সোফার ঠিক মাঝে বসেছে।তার এক পাশে মু'য়ায অন্যপাশে তার নিজের একজন বন্ধু। অপর দিকের সোফায় ফরহাদ সিদ্দিকী চৌধুরী এবং তার সহধর্মিণী সুদর্শনা সিদ্দিকী চৌধুরী এবং বড় পুত্র বধূ পুষ্পি সিরাজ খন্দকার।


নানা আলাপে অনেক সময় কাটলো, আফিয়া আড়াল থেকে পাত্রের মুখটা দেখে বিরবির করে বললো,


“ মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ। সুদর্শন পুরুষ।"


আফিয়ার সঙ্গে আড়ালে উপস্থিত সকলেই বললো। ঠিক তখনই তুহির ডাক পড়লে পুষ্পি বলে উঠলো,


“ পাত্রীকে এখানে আনার দরকার নেই।ও ঘরেই থাকুক বরং পাত্রকে নিয়ে যান সেখানে।"


তাই করা হলো।তুহিকে ঘরে রেখে সবাই বেরিয়ে আসলো।ফাহাদকে মু'য়ায এগিয়ে নিয়ে গেলো তুহির ঘর অবধি।


সাদা সালোয়ার কামিজের মাঝে একটা টমেটো ঢুকে আছে।তুহিকে প্রথম দেখে ফাহাদের ঠিক তাই মনে হলো। তাকে বারবার বোঝানো হয়েছিল মেয়ের বয়স কম, অনেক ছোট, সে যেন সেসব মাথায় রেখেই কথা বার্তা বলে।এটা শোনার পর সে এখানে আসতে রাজী হয়নি।সে এত ছোট মেয়েকে বিয়ে করে বাসরে গিয়েই শিশু নির্যাতন মামলা খেতে ইচ্ছুক নয়। কিন্তু তার বাবার জন্য আসতে হলো।বাবার এই মেয়েই নাকি মনে ধরেছে। অবশ্য বাবা এটাও বলেছে মেয়ে দেখলে মনেই হয় না কমবয়সী।

এখন তার কাছে ঠিক তাই মনে হচ্ছে।মেয়েটা তার কান ছাড়িয়ে যাচ্ছে এতটা লম্বা।গায়ের গড়ন, বর্ণ আকৃতি সবটাই ভীষণ মানুষ টানে। অর্থাৎ আকর্ষণীয়।যা ভয়াবহ ভাবে তার দিকে মানুষকে টানে।


তুহি বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসেছিল ঐদিকে ফাহাদ বসেছিল তুহির ঘরে থাকা একসেটের সোফায়।সে আড়চোখে কেবল দেখলো মেয়েটার দুই বেনি পাকানো চুলের গোছাটা বিছানা ছেড়ে নিচে ঝুলছে। এর বেশি উপরে দৃষ্টি তার উঠে নাই।আর তুহি?

বাবা,ভাই ছাড়া এই প্রথম কোন পুরুষের সঙ্গে একাকী ঘরে বসে আছে। ভেতরে তার থরথর করে কাঁপছে। দৃষ্টি উপরে তুলতেই ভয় করছে।শুনেছে সে এই লোক নাকি ভয়ানক সাহসী।তার ভাইয়াও অনেক সাহসী।ঘরে ভাইয়া যত‌ই তার সাথে খুনসুটি আর ননস্টপ কথা বলতে থাকে।বাইরে তার ভাইয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ।সেই মানুষটির মুখেই যখন শুনতে পায় সামনে উপস্থিত ভদ্রলোকের ভয়ে তার জুনিয়ররা তো ভালো অনেক সিনিয়র‌ও তটস্থ থাকে। নিয়মের বাইরে একচুল অনিয়ম তার বরদাস্ত হয় না। অথচ তুহি মানেই হাজারটা অনিয়ম আর অনিয়ম।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ