#সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_১৪৪



[কপি করা/চুরি করা, নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ। দয়া করে এগুলো করবেন না কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন। ধন্যবাদ সবাইকে।]


ফাহাদ,তুহির মাঝে কোন শব্দ বিনিময় হয়নি। সরাসরি দৃষ্টি‌ বিনিময়‌ও না। মিনিট দশ ছিলো, মুখোমুখি বসে কিন্তু শব্দ, বাক্যহীন।

যখন তুহি কিছু বলছিলো না, আর ফাহাদ নিজেও বলতে পারছিলো না তখন সে বাইরে চলে যাওয়াই উত্তম মনে করে উঠে বেরিয়ে যায়।মূলত ফাহাদ আঁটকে ছিলো তুহির পা, লম্বা চুলে।তার যেন এতেই পাত্রী দেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে গিয়েছিল। এদিকে তুহির দৃষ্টি বিছানার চাদরের পদ্ম ফুলেই আবদ্ধ ছিলো।সে কি বলবে,কি জিজ্ঞেস করবে তাই তো বুঝতে পারছিলো না।তার শুধু মাথায় ঘুরছিল,ঐ অত বড় লোকটাকে তার পরিবার তার জন্য পছন্দ করেছে।


ফাহাদ বেরিয়ে যেতেই তাইফ ঘরে ঢুকে।তুহি ফাহাদকে নিঃশব্দে বেরিয়ে যেতে দেখে বিব্রত হয়।কম্পিত নয়নে দরজা পানে আড় দৃষ্টি ফেলতেই তাইফকে ঢুকতে দেখে।ভাইকে দেখে কি হলো জানে না।উঠে দাঁড়ালো ফট করে।তাইফ বোনের মুখ দেখেই বুঝে নিলো সবটা।বুকের উপর মাথাটা চেপে ধরে, পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,


“ ভয় পেয়েছো?"


সত্যিই তুহির হাত পা কাঁপছে।সে ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথা দুলিয়ে নিচু কন্ঠে উত্তর দেয়,


“ হুম!"


“ আরেহ বোকা ভয় কিসের!এটি একটা সামান্য প্রসেস। একদম সহজ একটা ব্যাপার। তুই শান্ত হ।"


তুহি ভাইকে ছাড়লো না।তাইফ‌ও তাড়া দিলো না। ঐভাবে রেখেই জিজ্ঞেস করলো,


“ পছন্দ হয়েছে?"


তুহি নিরুত্তর।তাইফ খানিকটা দুশ্চিন্তায় পড়লো।বোনের কি পছন্দ হয়নি!মুখটা তুলে উঁচিয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো,


“ ভাইয়াকে বলো! তোমার পছন্দ না হলে এখানেই কথার সমাপ্তি হবে।বলো পছন্দ হয়নি!"


তুহি নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে,একটু সময় চুপ থেকে,


“ হয়েছে!"


ব্যস্! কথা চুড়ান্ত হলো।


ফাহাদের অনেক ছুটি জমা। তাছাড়াও বিয়ের জন্য ছুটি পাবেই।তাই সময়টা কাজে লাগাতে চায়। প্রস্তাব খানা দিলেন মিসেস পুষ্পি। দু'জন দু'জনকে জানার জন্য একটু সময় দরকার। কিন্তু দুই পরিবার‌ই যথেষ্ট রক্ষণশীল এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের বিষয়ে ভীষণ সচেতন। সুতরাং এখানে কোনভাবেই শরীয়াহ আইনের বাইরে দুজন সাবালক নারী পুরুষের মেলামেশা সম্ভব নয় এবং তারা করবেও না। তাহলে একটা দারুন সমাধান হলো, আঁকদ করে রাখা। এরপর দুজন আনুষ্ঠানিক বিয়ের জন্য কেনাকাটা করবে একসাথে, একটু ঘোরাঘুরি করুক, এর মধ্যেই তুহির প্রথম সেমিষ্টারের পরীক্ষা হয়ে যাক তারপর‌ই না হয় সংসারে ঢুকবে।


পুষ্পির এই প্রস্তাব দুই পরিবারের‌ই পছন্দ হলো। যেহেতু ছেলে মেয়ে উভয়ের বিষয়ে আগেই খোঁজ খবর নেওয়া হয়েছে তাই এসব নিয়ে আর কারো ভাবনা নেই।তারা আজ‌ই আঁকদ করিয়ে যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু ঝামেলা হলো কারো পক্ষের কোন আত্নীয়ের উপস্থিতি নেই। সালাহ্ তার পরিবার নিয়ে আসতে পারেনি।দিবা, সামির পরীক্ষা চলমান। এদিকে সালাহর নিজের ক্যাম্পাসেও পরীক্ষা হচ্ছে।

দোয়া ব্যস্ত। রেজওয়ানের শরীর অসুস্থ,তাই সাফিয়া আসতে পারেনি।যার কারণে রিফার‌ও আসা হলো না।ফেরা বাগেরহাট আছে স্বামীর সঙ্গে। উপস্থিত শুধু নাসিফের বড় চাচাতো ভাই আর ভাবী, সঙ্গে তার নাতী নাতনি আর নাফিসার পরিবারের ফাতিন ছাড়া সবাই।ঐদিকে ফাহাদের আত্নীয়র মধ্যে কেউ নেই।

অনেক সময় নিজেদের মাঝে নানারকম দোলাচলে কেটে গেল।আফিয়া ফোন করে ভাইকে জানাতেই সালাহ বললো,


“ আপা, পাত্র ভালো। আমি নিজেও ব্যক্তিগত ভাবে খোঁজ নিয়েছি।তোমরা করিয়ে ফেলো। সবাইকে থাকতে হবে এমন কথা নেই তো। দরকার বাবা মা'কে। তারাই আছে, আলহামদুলিল্লাহ। সম্পন্ন করে ফেলো,শুভ কাজ জিইয়ে রাখতে নেই।"


সাফিয়াও এক‌ই কথা বললো। ঐদিকে ফেরা আফসোস করছে বারবার ফোন করে।নাসিফের চাচাতো ভাই পরামর্শ দিলো কাজ সম্পন্ন করতে। সবদিক ভেবে অবশেষে সকল আপনজনদের ভিডিয়ো কলে রেখেই ছোট্ট পরিসরেই সেই রাতে বাদ এশা তুহির গায়ে সার্জেন্ট সিদ্দিকী ফাহাদ চৌধুরীর সহধর্মিণীর ট্যাগ লেগে যায়।যার আনুষ্ঠানিক পরিচয় পর্ব ঘটানোর দিন নির্ধারিত হয় ঠিক মাস তিন পর। কারণ সামনেই তুহির পরীক্ষা।


মিসেস সুদর্শনা যেন প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলেন।উনার হাতে বড় একটা সোনার আংটি ছিলো বক্সে বন্দি।একটা সোনার লহরের চেইন আর একজোড়া কানের ঝুমকা তিনি পুরুষের নামাজের ফাঁকে গিয়ে কিনে এনেছেন।সেই রাতে শ্বশুর বাড়ির থেকে পাওয়া তুহির প্রথম উপহার এই তিনটা সোনার অলংকার‌ই ছিলো।তুহি মায়ের সোনালী জামদানি আর নিজের লাল ওড়নায় ব‌উ সেজেছিলো।যার মেকাপ আর্টিস্ট ছিলো তার বোন আর জা!


যখন তুহিকে বারবার কবুল বলার জন্য বলা হচ্ছিলো তখন সে সবার আগে নিজের ভাইয়াদের খুঁজছিলো।সবাই খুঁজে মা বাবা কে।আর তুহি খুঁজে ভাইদেরকে। ঐদিকে দুই ভাই ব্যস্ত দুই বোনের শ্বশুর বাড়ির লোকদের সমাদর করা নিয়ে।নাসিফ অতিথিদের পাশে বসে সেসব‌ই খেয়াল করছিলো।দেখছিল আর ভাবছিল দেখতে দেখতে কিভাবে তার ভরা ঘর খালি হয়ে গেলো।তার চারটা সন্তান,লোকে হাসি মজায় বলতো একহালি।সে সময় মনে হতো এক হালি! মানে চারটা সন্তান! কতগুলো বাচ্চা! দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য তার নাকি জরিমানা খাওয়া উচিত। সচেতন বন্ধু মহলে সে প্রায়শই হাসির পাত্রে পরিণত হতো।অথচ এখন ? ক‌ই সব সন্তান? এই তো একে একে সব তাকে, তাঁদের ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে।এই তো সেদিন এই দুই হাতের তালুতে করে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করেছিল একটা ছোট তুলোর মতো নরম মানবপ্রাণ। ধীরে ধীরে একটু একটু করে তার সামনে হাঁটতে শুরু করলো,তার গাল ফুলিয়ে কপাল কুঁচকে রাগ দেখানো,নাক ফুলিয়ে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিজের অভিমান জাহির করা।না খাওয়ার জন্য হাজারটা বাহনার বিরুদ্ধে গিয়ে তার পিছনে খাবার নিয়ে ছুটোছুটি করা।বড় ভাই বোনদের সাথে তার আদরের বিরোধ। ভাইদের শার্টে নাক মুছে নিজেকে বিজয়ী ভাবা।বাবার পাতের খাবারে কারো ভাগ বরদাস্ত না করা। বাইরে থেকে যেই আসুক তার সামনে গিয়ে হাত পেতে নিজের জন্য কিছু দাবী করা।

মায়ের সাথে মতবিরোধে বাবার সাপোর্ট পাওয়ার আশায় ঠোঁট উল্টে ফেলা, অতিরিক্ত রাগে কেঁদে কেঁদে নাক দিয়ে সর্দি ঝরানো, বোনের জিনিসপত্র নিয়ে টানাটানি করে ভাইদের কাছে মিথ্যা নালিশ করা। কতশত আবদার,পড়তে না চাওয়ার বাহনা। দুনিয়া ঘোরার বাসনা। সবকিছু যেন আজ সিনেমার মতো তার চোখে ভাসছে।

আজ সকালেও তো তার মা যখন তার মুখে একটু রুপ চর্চা করানোর জন্য গোলাপ ফুল বাটা আর দুধের সর নিয়ে পিছু ছুটছিলো তখন‌ও সে কত আহ্লাদে বললো,


“ এসব দিয়ে আমাকে সুন্দর হতে হবে কেন? এমনিতেই আমি আমার বাবার মতো।আর তুমি জানো আমার বাবা পৃথিবীর সবচেয়ে হ্যান্ডসাম ছেলে।এই যে দেখো, আমার আর বাবার গায়ের রঙ একদম সেইম সেইম।না বাবা বলো?"


কথাগুলো সে বাবার গালে গাল ঘষতে ঘষতে বলছিলো। চুলগুলো ঠিক করে বাঁধে না।আজ সকালে এসে বড় মেয়ে ছোট বোনের চুল গুলো সুন্দর করে তেল দিয়ে পরে আবার শ্যাম্পু করিয়ে এখন আবার বিনুনি বেঁধে দিয়েছে।


বড় মেয়ে! এই তো এই মেয়েটা চলে গেলে তো সব খালি।বড় মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলো কতগুলো বছর। ধীরে ধীরে মেয়েটা শ্বশুর বাড়িতে একেবারেই চলে গেলো।যখন গেলো তখন মনে হয়েছিল ছোটটা আছে।তাই হয়তো খুব একটা কষ্ট লাগেনি। কিন্তু এখন কার মুখ দেখে বলবে,এই তো আরেকটা আছে!

বড় ছেলে আলাদা সংসার করছে, ছোটজনের বিয়েও শিগগিরই দিয়ে দিবে।সে নিশ্চয়ই নিজের কোয়াটারে থাকবে,তবে? তবে কি বৃদ্ধ বয়সটা বুড়ো বুড়ির একাই কাটবে?


নাসিফ এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ফুঁপিয়ে উঠলো তা সে নিজেই টের পেলো না।তার ফোঁপানোর শব্দে পাশে বসা পুরানো বেয়াই পিঠ চাপড়ে বললেন,


“ শান্ত হোন বেয়াই,মনকে শান্ত করেন। আপনি তো সৌভাগ্যবান বাবা,যে কি-না দু'টো কন্যাকেই সুপাত্রস্থ করতে পারছেন।"


“ দোয়া করবেন বেয়াই। আল্লাহ যেন আমার মায়েদের আজীবন সুখে রাখে,ভালো রাখে।"


“ ফি আমানিল্লাহ্!"


নাসিফ নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে,উঠে দাঁড়ালো।


“ আপনারা বসেন, আমি দেখি ঐদিকে কতদূর কি হলো!"


তুহি কবুল তো বলছেই না। উল্টো চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে।নাবীহা বোনকে বুকের সাথে চেপে ধরে বললো,


“ কি হয়েছে বুবুনকে বল!"


পুষ্পি পাশ থেকে বললো,


“ কাউকে খুজছো তুমি তুহি?"


“ তুহি বোনের দিকে ছলছল চোখে চেয়ে বললো,


“ ভাইয়া কোথায়?"


নাবীহা জানে তুহি যখন ভীষণ নার্ভাস হয়ে যায় তখন ভাইয়াকে খুঁজে।সে নাজিফাকে বললো,


“ ভাইয়াকে ডাক দে,তাইফকেও আসতে বলবি।"


নাজিফা এমনিতেই তাইফের থেকে পালিয়ে বেড়ায়।কারণ?এবার দেশে আসার পর থেকেই তাইফ নাজিফাকে দৌড়ের উপর রেখেছে।সে মূলত ছুটি কাটাতে এসেছে। মাস্টার্স ফাইনাল শেষ করে আপাতত বেকার ঘুরছে। এদিকে তাইফ বলছে, পিএইচডি করতে। কিন্তু সে আর পড়তে ইচ্ছুক নয়।এই নিয়ে দুজনের মধ্যে তুমুল বিতর্ক চলছে।তাইফ বলছে পিএইচডি না করলে,সে তার বাচ্চাকে মুখ দেখাতে পারবে না।সে বাচ্চাদের জন্য মুর্খ মা নিতে চায় না।এতে করে নাজিফার মানে লেগেছে। মাস্টার্স সম্পন্ন, বেকিংয়ে এক্সপার্টস সার্টিফিকেট আছে,আরো নানা কোর্স করার সনদ আছে তার। এরপরেও সে মুর্খ? কিভাবে অপমান করে লোকটা! নিজেকে খুব পন্ডিত ভাবা শুরু করছে! মনের ভুলেই হোক কিংবা উল্টাপাল্টা কিছু খেয়েই হোক, শব্দটা নাজিফা মুখেই উচ্চারণ করেছিল যেটা সরাসরি তাইফের কান‌ই শ্রবণ করে নিয়েছে।এরপরে যা হবার তাই হয়েছে।

তাইফের ধারণা নাজিফার পাখা গজিয়েছে।তাই সে এখন আর তাইফকে দাম দেয় না।জিফার কাছে তাইফের চার আনার দাম‌ও নেই। তবে কেন তাইফ তাকে নিয়ে এত চাপ নিবে?

যাক এই অবধি ঠিক ছিলো, অভিমান করে মান জিইয়ে রাখাও সহি। কিন্তু নাজিফা আবার‌ও ভুল করে।যেচে গিয়ে স্যরি বলে,যেন আগুনে ঘি ঢাললো।এখন দেখলেই ছোৎ ছোৎ আওয়াজ তুলে ফনা বের করে ফেলে।যা নাজিফার শান্তির ষষ্ঠী পূজা করে ফেলছে।


তাইফ মূলত সময় ধরে রাখার চেষ্টা করছে।তার ধারণা নাজিফা পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে তার ফুফু ফুফার চোখে পড়বে না। এমনিতেই জিফাকে তার কাছে বাচ্চা বাচ্চা লাগে, অর্থাৎ জিফার চেহারা কাটিং বাচ্চা বাচ্চা মনে হয়। সেক্ষেত্রে বয়স খুব একটা ধরা যায় না। এমতাবস্থায় নাজিফা যদি পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে তবে বাঙালি কানাডিয়ান ফুফা নিশ্চয়ই এত তাড়াতাড়ি মেয়ের বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগবে না।আর লাগলেও জিফা পড়াশোনার বাহনা দেখিয়ে বিয়েটা আটকে দিতে পারবে। কিন্তু যদি এভাবেই বেকার চোখের সামনে ঘুরঘুর করে তবেই হলো! যেকোন মুহুর্তে একটা ব্যাঘাবন্ড এনে ধরিয়ে দিয়ে বলবে,এই নাও! তোমার ভবিষ্যৎ।

এই রিস্ক নিতেই চায় না তাইফ।নয়তো তার অতো ঠেকা ক‌ই,যেচে কাউকে পড়ার জন্য চাপ দিবে!


নাজিফা মনে মনে আল্লাহর নাম জপতে জপতে মাথার ঘোমটা লম্বা করে আগাগোড়া নিজেকে ঢেকে খাবার ঘরের দিকে গেলো।তাইফ তখন রান্না ঘর থেকে খাবার এনে টেবিল সাজাচ্ছে।পাশে দাঁড়িয়ে নিচু কন্ঠে বললো,


“ ভেতরে ডাকছে!"


তাইফ চমকে পাশে ফিরলো,আজ সারাদিন পর নাজিফার গলার স্বর!চেহারাও তো দেখেনি।নাজিফা নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিলো,ঐ চাহনিতে সে বারবার ক্ষত হয়।লোকটা সবসময় তার দিকে ভয়ানক নেশালো দৃষ্টিতে তাকায়।ওড়নার মাঝে আঙ্গুল ঢুকিয়ে একটা দিয়ে আরেকটাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বলছে,


“ ভাইয়াকে নিয়ে তাড়াতাড়ি আসুন, আপনাদের ছাড়া কবুল বলছে না।"


নাইফ তখন পুরুষ মহলের মধ্যে।তুহির থেকে সম্মতি নিয়ে এদিকে আসবে তাই সবাই মনে মনে দোয়া দরুদ পাঠ করছে। ঐদিকে খাবার নিয়ে তো আফিয়া এত পুরুষের মাঝে আসবে না।তাই মা'কে সহযোগিতা করতে তাইফ‌ই ঐদিকে থাকলো।

তাইফ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে,মাথা দুলিয়ে নিচু এবং ছোট করেই বললো,“ হুম!"


“ ভাইয়া এদিকে আসো।"


নাইফ ছোট ভাইয়ের ডাকে সাড়া দিতে উপস্থিত মহলের উদ্দেশ্যে বললো,


“ এক্সকিউজ মি!"


অনুমতি পেতেই নাইফ ভেতরে ঢুকে,তাইফ ইশারায় বললো,


“ চলো ভেতরে, দরকার আছে আমাদের ঐখানে থাকা।"


তুহি ভরা শ্রাবণের আঁখি জোড়া মেলে দরজার পানে চেয়ে ছিলো।ভাইদের ছায়া দেখেই ফুঁপিয়ে উঠলো।নাইফ,তাইফকে দেখে পুষ্পি আর নূর সরে বসলো।নাবীহাও পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।নাইফ এবং তাইফ দুই পাশে বসে দুই দিক থেকে বোনকে আগলে নিলো।তুহি ভাইদের দেখে নিজের চোখে আঁটকে রাখা বাঁধ ছেঁড়ে দিলো।বাম পাশে ছোট ভাইয়ের দিকে চেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে নিলো,ডান পাশে বসা বড় ভাইয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে হিচকি দিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলো।এর মাঝে হতাশ চোখে পর্দার ওপাশে চেয়ে আছেন কাজী সাহেব।যিনি এতক্ষনেও কনের মুখের একটা শব্দ শোনেনি।

নাইফের থুতনি কাঁপছে।বোনকে সামলাবে কি! সে তো নিজেকেই সামলাতে পারছে না।সে যে ঘন্টা খানেক আগেও নিজের ঘরে বসে কেঁদেছে তা কি কাউকে বলা যায়! নিজেকে সামলাতে পারবে না বলেই তো এত সময়ে একবারও এদিকে উঁকি দেয়নি।

তাইফ চোখ এইদিকে ঐদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অযথাই রুম দেখছে।কত বাচ্চামো ভাবে সাজানো ঘরটা।নানা রঙের কাগুজে ফুল দিয়ে দেয়াল সাজিয়েছে।নানা ক্রাফটস, ক্যালিগ্রাফি ওয়ালমেট,দেওয়াল অঙ্কনের নানা চিত্র।পুরো খাটের চারদিকে রকমারি কৃত্রিম ফুল দিয়ে সাজানো। চলে গেলে এই ঘরটা কি এমন থাকবে? নিশ্চয়ই বহুদিনের বদ্ধ রুমে পরিণত হবে। মাসে এক‌বার কিংবা কখনো ছয় মাসে একবার।হয়তো কখনো রাতে থাকবে না,চাইলেও পারবে না। অর্থাৎ এই রুমটা এভাবেই পড়ে থাকবে।


নূর নাইফের পিঠে হাত রেখে শান্ত হতে বললো।নাবীহা পাশে বসে ভাইকে জড়িয়ে নিলো। পিঠে মাথা ঠেকিয়ে দিলো।নাইফ হাসলো বোনদের এহেন পাগলামোতে। কোনভাবে নিজের গলাকে পরিষ্কার করে, কান্না লুকিয়ে তুহির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,


“ বলো তুহি বুড়ি,কাজী সাহেব কখন থেকে অপেক্ষা করছে। বয়স্ক লোকদের এত অপেক্ষা করাতে নেই বনু।"


তুহি তাও বললো না।তাইফ‌ও বুঝালো,


“ তুহি,কবুল বলো বনু।

আরে এটা তো ছোট একটি শব্দ। একদম সহজ।চট করে বলে দাও!"


এরপরেও কয়েক মিনিট কাটলো। অতঃপর তুহি ভাইয়ের বুকে মুখ গুঁজেই বললো,


“ কবুল!"


পরপর আরো দু'বার!


“ কবুল!

_ কবুল!"


এদিকে কবুল উচ্চারণ হ‌ওয়ার সাথে সাথেই বসার ঘরে আলহামদুলিল্লাহ রব ধ্বনি আরম্ভ হলো।তুহি এখন তার বাবাকে, মা'কে খুঁজছে। অতিরিক্ত কাঁদলে যা হয় তুহির সাথে,তাই হলো এবার‌ও।কাজল লেপ্টে গেলো। ফর্সা নাকটা একদম চেরির মতো হয়ে গেলো,কালো কাজল আর ফর্সা ত্বকের লাল আভা মিশে একদম খিচুড়ি হয়ে গেছে।যেন কোন সিনেমার ভুতের চরিত্র সাজছে।নাইফ নিজের পাঞ্জাবির হাতার কাপড় দিয়ে বোনের চোখ মুছছে আর বলছে,


“ কাঁদতে কাঁদতে কি হাল করেছো নিজের দেখেছো? এত কাঁদে কেউ?"


“ একদম পেত্নি দেখাচ্ছে।"


পাশ থেকে তাইফ বললো।তুহি ঠোঁট ফুলিয়ে তাইফের হাঁটুতে চাপড় মারলো।ফুলানো ঠোঁট উল্টে বড় ভাইয়ের বুকে থুতনি রেখে বললো,


“ আম্মু বাবা ক‌ই?"