এক আধেলা দুঃখের ভেলা | পর্বসংখ্যা_০৫

 #এক_আধেলা_দুঃখের_ভেলা

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_৫



জাভেদের পরীক্ষার সিট ঢাকা কলেজে পড়েছে। প্রত্যাশা সেমিনার ঢাবির কলাভবনে। প্রত্যাশা আড়চোখে বারবার জাভেদের দিকে তাকাচ্ছে। পাশেই বসা মৌরি। সেই মেয়েও ডুবে আছে ব‌ইয়ে। প্রত্যাশার ভ্রু কুঁচকে এলো। এত্ত পড়া মানুষ কীভাবে পড়ে? বিরক্ত লাগে না? প্রত্যাশা তো পরীক্ষার আগে জীবনে কোনদিন সিরিয়াস হয়ে পড়াশোনাই করেনি। অবশ্য প্রত্যাশার উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত হচ্ছে সে অল্প পড়েই অনেক মনে রাখতে পারে ‌। আর তার কোনদিন বড় কিছু হবার ইচ্ছা‌ও ছিল না। ঢাবিতে ভর্তি হ‌ওয়া এবং সেখান থেকে অনার্স, মাস্টার্সে ভালো মার্ক নিয়ে বের হ‌ওয়া অতঃপর, একজন সিনিয়র প্রফেসরের অধীনে গবেষণা করার সুযোগ পাওয়া, পিএইচডি রানিং রাখা! সবটাই সে আল্লাহর কারিশমা বলে স্বীকৃতি দেয়।

নচেৎ প্রত্যাশার এত ধৈর্য আর ইচ্ছে কোন কালেই ছিল না এতকিছু করার বা অর্জন করার। তবে ঢাবির শিক্ষকতার যেই চাকরিটা কপালে জুটেছে সেখানে প্রত্যাশার অনেক মেহনত ছিল। কারো অপমান, তাচ্ছিল্যের প্রতিবাদেই এই অর্জনটা প্রত্যাশা শ্রমের দ্বারা পেয়েছে বলেই প্রমাণিত করেছে।


ঢাবির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে সদ্য জয়েন দেওয়া একজন সহকারী অধ্যাপিকা প্রত্যাশা মাহবুব। দুর্দান্ত ফলাফল, কালচারাল এক্টিভিটিস, সোস্যাল ওয়ার্ক, বিভিন্ন সেমিনার ও গবেষণা মূলক কর্মসূচি, সব খানেই প্রত্যাশার প্রতিভার ছাপ পড়েছে। যদিও তা নিয়ে প্রত্যাশা কোনকালেই বিশেষ ভাবাবেগ দেখায়নি। প্রত্যাশা না মানলেও ও প্রচন্ড পরিশ্রমী, মননশীল ও দায়িত্বশীল। ওর সঙ্গে কাজ করা, পড়াশোনা করা সবাই তা এক বাক্যে মানে। মানল না কেবল গোটা চারেক জন, প্রত্যাশার কোন কিছু‌ই যাদের মন ছুঁতে পারেনি।


_ আপু, আমি যদি তোমার সাথে তোমার বাসায় থাকি, তবে কি তোমার অসুবিধা হবে?


ভাবুক প্রত্যাশার দৃষ্টি গাড়ির গ্লাস ভেদ করে ব্যস্ত সড়কের যানজটের দিকে ছিল। হঠাৎ করেই পাশ থেকে কারো কণ্ঠস্বর কর্নকুহুরে প্রবেশ হতেই চমকাল। চকিত ভঙ্গিতে ফিরে তাকাল পাশেই বসা মৌরির দিকে‌। জিজ্ঞাসু চোখে বড় বোনকে চেয়ে থাকতে দেখে মৌরি নিজের প্রশ্নটি আবার রাখল। প্রত্যাশা কয়েক পলক কিছু একটা ভেবে বলল,


_ নো, কিন্তু আমার মনে হয় তোমার অসুবিধা হবে‌।


প্রত্যাশার কথায় মৌরি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। ড্রাইভারের পাশে বসা, পড়ায় ডুবে থাকা জাভেদ এত সময়ে নিজের চোখ উপরে তুলল। মোটা চশমার আড়ালে ঢেকে থাকা গাঢ় চাহনিতে লুকিং গ্লাসের প্রতিছায়ায় ভেসে উঠা প্রত্যাশার ভাঙ্গা চোয়ালের শক্ত গড়ন। জাভেদ তাকিয়ে রইল শ্যাম বর্ণের নারীটির দিকে‌। নারীটি সম্পর্কে তার কাজিন, সৎ কাজিন। তবে তার ফুফুর কাছে তাহার বড়‌ই প্রশংসা শোনা যায়। জীবনে প্রথম দেখা এই নারীটির সদ্য বিচ্ছেদ ঘটেছে। দীর্ঘ সময়ের প্রেমিক স্বামীটি তাকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, তাও নাকি মায়ের কথায়?

আজীবন পড়ায় ডুবে থাকা জাভেদ মানব জীবনের জটিলতা নিয়ে ভাবে কম। তবে একজন পরিপক্ক যুবকের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সেও খানিকটা ভাবুক হয়েছে। যতদূর তার মায়ের সাথে ফুফুর আলোচনায় শুনতে পাওয়া গিয়েছে, দীর্ঘকালীন প্রেমের পরিণতি বিয়েতে গড়ায়। অথচ মাত্র তিন বছর সংসার করতে পারেনি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। তবে কি প্রেম বিয়ের চেয়ে সহজ! নাকি প্রেমে ভালো রাখার দায়বদ্ধতা থাকে না বলেই তা বয়ে চলে অবধারিত ভাবে। কি জানি! জাভেদ এসব বুঝে না। জাভেদ বুঝে তার শিগগিরই একটা চাকরি দরকার, তার মা ঘরে তার টেকা দায় করে রেখেছে বিয়ের জন্য। অথচ চাকরি ছাড়া কোন পিতা তাহার কন্যাকে বেকার পুরুষের হাতে সমর্পণ করবে না। অবশ্য জাভেদ চায়‌ও না। যত দিন না সে নিজ যোগ্যতায় চাকরি যোগাড় করতে পারছে, ততদিন বিয়ে করবে না। বিয়ে করে ব‌উয়ের হক আদায় করতে না পারলে, তার সব চাহিদা যথার্থ নিজ অর্থে পূরণ করতে না পারলে সেই পুরুষের বিয়ে করা উচিত নয়। জাভেদ নিজের ব‌উয়ের দায়িত্ব আরেকজনের কাঁধে চাপাবে না। সে যত‌ই হোক তার বাবা। তাতে কি! ব‌উ তার, দায়িত্ব‌ও তার। তার বাবার সঙ্গে ব‌উয়ের দায়িত্বের কোন সম্পর্ক নাই।


_ আমার কেন অসুবিধা হবে?


_ কারণ, আমি রান্নাবান্না পারি না। নিজে কোনরকমে রেঁধে খাই, ঘরদ্বোর‌ও ওভাবে গুছিয়ে রাখতে পারি না। তাছাড়াও, আমি গানের প্র্যাকটিস, নাচের প্র্যাকটিস করি। সেক্ষেত্রে তোমার পড়াশোনায় ডিস্টার্ব হতে পারে।


_ তাহলে তো আমার তোমার সঙ্গে থাকা আরো বেশি জরুরি। কারণ তুমি সময় পাও না এসব করার। আর আমি ক্লাসের পর অবসরে কি করব তাই খুঁজে পাই না। বাবা, টিউশনিও করতে দিতে চায় না। তোমার সঙ্গে থাকলে আমি তোমার খেয়াল রাখতে পারব। আর তুমি আমার। আমরা দুইবোন দুইবোনের খেয়াল রাখব। ব্যস্, হয়ে গেল না চমৎকার একটি ব্যাপার।


মৌরির উৎফুল্ল আচরণে ব‌ইয়ে মুখ গুঁজে থাকা জাভেদ মৃদু হাসল। প্রত্যাশাও টলমলে চোখে দেখছে তার সৎ বোনের তার খেয়াল রাখার তীব্র আগ্রহকে। ও হাত বাড়িয়ে মৌরির বাম গালে আলতো করে ছুঁয়ে রেখে বলল,


_ আচ্ছা ঠিক আছে, আমি সেমিনার থেকে বেরিয়ে কল করব। তুমি ব্যাগপত্র গুছিয়ে তৈরি থেক।


_ ওকে।


বলেই মৌরি মিষ্টি করে হাসল। অতঃপর আবারও সে ব‌ইয়ে মন যোগ দিল। প্রত্যাশা আড়চোখে আরেকবার দেখল অতি মনোযোগী ছাত্র জাভেদকে। অতঃপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে আবারও বাইরে তাকাল।


_____________________________________


_ সবগুলো কোশ্চেন প্রিভিউ করে দেন প্রিন্ট করাবা, আর শোন...


_ ভাই, ঐটা প্রত্যাশা আপু না?


দুরন্ত তার সঙ্গে থাকা এক জুনিয়রের উদ্দেশ্য কথাগুলো বলছিল, তার কথার মাঝে বাঁধা দিয়ে ছেলেটা গণতন্ত্র তোরনের ঢাবি অভিমুখের সড়কের ফুটে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যাশাকে দেখিয়ে প্রশ্নটি করে। দুরন্ত ছেলেটার ইশারাকৃত লক্ষ্যে তাকাতেই দেখতে পেল কালো ধূসর রঙের শাড়িতে গা তাঁতানো রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে রাস্তার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে প্রত্যাশা। কাউকে খুঁজছে? কাকে?

দুরন্তের মনটা হু হু করে উঠল দীর্ঘ আড়াই মাস পর প্রত্যাশার মুখটা দেখে। মেয়েটা এমনিতেই রোগাপাতলা। এখন যেন আরো কাঠ হয়ে গেছে। দুরন্তের পাশে থাকা ছেলেটার নাম আষাঢ় বোস। ও নিজের কৌতুহল মনকে না দমিয়ে দুরন্তকে বলল,


_ ভাই, আমি গিয়ে দেখব প্রত্যাশা আপু কি খুঁজছে?

এত্ত রোদের মধ্যে ওভাবে...


_ যা।


ওর কথা শেষ হবার আগেই দুরন্তের উত্তর। ছেলেটা একবার দুরন্তের মুখপানে চাইল। অতঃপর পা বাড়াল সামনের দিকে। ছেলেটা যেতেই দুরন্ত বড় একটা গাছের আড়ালে গিয়ে দাড়াল। দৃষ্টি স্থির র‌ইল শ্যাম বর্ণের কালো শাড়ি পরিহিত নারীটির পানে। ঝলমলে গা পোড়ানো রোদের আলোয় ভেসে উঠল নারীটির ভেজা দৃষ্টি, টলমলে চাহনিতে তার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করা সেই বিষধর প্রশ্নটা।


_ আমার গায়ের রঙ নিয়ে তোমার অভিযোগ আছে, আগে বলো নি তো?


হাতে পানির গ্লাস ধরে রাখা দুরন্ত হতভম্ব হয়ে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলে প্রত্যাশার সিক্ত মুখপানে চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,


_ আমি যখন বলিনি তার মানে আমার সমস্যা নেই, তবে এখন কে বলল?


_ যা জিজ্ঞেস করেছি, তার উত্তর দাও।


_ আমার অসুবিধা থাকলে তুমি নিশ্চয় আমার ব‌উ হতে না।


রাগে ফোঁস ফোঁস করছে প্রত্যাশা। দুরন্ত প্রত্যাশার ছাইচাপা রাগের তাপ আঁচ করতে পারল না।

বরং প্রত্যাশার রাগকে পাত্তা না দিয়ে হাস্যকর ভাবে উত্তর দিচ্ছে। যা প্রত্যাশার রাগ, ক্ষোভকে দ্বিগুণ করে তুলল। ও চেঁতে গিয়ে মৃদু চেঁচানো স্বরে জিজ্ঞেস করল,


_ তোমার অসুবিধা না থাকলে তোমার পরিবারের অন্যদের অসুবিধা কেন হচ্ছে?


_ কার অসুবিধা হচ্ছে?


এবার দুরন্তের টনক নড়ল। প্রত্যাশাকে কেউ কিছু বলেছে, নয়তো গায়ের রঙ নিয়ে প্রত্যাশার এমন প্রশ্ন করার কারণ নেই। প্রত্যাশা তো জানেই দুরন্ত তার সবটা কতখানি পছন্দ করে।


_ তোমার আম্মার। তোমার আম্মা জনে জনে ধরে ধরে বোঝায় তুমি কতখানি ঠকেছ, আমি কি আমার গায়ের রঙ লুকিয়ে তোমাকে বিয়ের জন্য ফাঁসিয়েছি?


_ এসব কি ধরনের কথা ? আম্মা এসব কেন বলতে যাবে?


_ জিজ্ঞেস করো গিয়ে! আমি নাকি , আমার গায়ের রঙ বদলানোর জন্য নানা প্রসাধনী ব্যবহার করি!


_ কী আশ্চর্য, এগুলো..! আচ্ছা, তুমি আগে রিল্যাক্স হ‌ও‌। দেখছি, আমি আম্মার সাথে কথা বলে আসছি।


_ দরকার নেই!


বলেই প্রত্যাশা দুরন্তকে আঁটকে দিল। দুরন্ত ওর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই প্রত্যাশা বলল,


_ দুরন্ত, কিছু বলা তো দূরের কথা, আমি জানি তুমি তাকে জিজ্ঞেসটুকুও করতে পারবে না কেন সে আমার সম্পর্কে এসব বলে। সুতরাং, ভং ধরার দরকার নেই।


_ স্যরি, প্রত্তু। আমি আম্মার মুখের উপর কিছু বলি না তার মানে এই নয় আমি বলতে পারি না। আমি বলি না কারণ আমি তার একটা মাত্র সন্তান। তাই বলে এই নয় আমি তোমার অপমানের প্রতিবাদ‌ও করতে পারি না। আমি আম্মাকে জিজ্ঞেস করে আসছি কেন...


_ লাভ নেই তো।


_ মানে?


_ খুব সহজ। তোমার আম্মা আমাকে পছন্দ করেন না। তাই আমার সবকিছুই উনার অপছন্দ হয়। আর এখন তুমি উনাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলবে, আমি তোমার কানে বিষ ঢালি। যা কত বড় মিথ্যা, তুমি‌ও জানো।


_ প্রত্তু!


দুরন্ত প্রত্যাশার হাত দুটো আলতো করে চেপে ধরল। প্রত্যাশা টলমলে চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। দুরন্ত ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকল অপরাধ বোধে। তার মা প্রত্যাশাকে ব‌উ বানাতেই চায়নি। আর তাই প্রত্যাশার এই বাড়িতে ব‌উ হয়ে আসার পর যা হচ্ছে, তা প্রত্যাশার উপর ক্ষোভ থেকেই, সব‌ই দুরন্ত জানে। কিন্তু সে কী করবে? প্রত্যাশাকে ছাড়ার কথাও সে ভাবতে পারে না। এদিকে মা বাবার একমাত্র সন্তান হয়েও তাদেরকেও ছাড়তে পারবে না। দুরন্তের যে সবাইকেই চাই।


দুরন্ত প্রত্যাশার হাতটা নিজের বুকের কাছে চেপে ধরে অপরাধী স্বরে বলল,


_ স্যরি প্রত্তু। তোমাকে ভালো রাখার ওয়াদা করে আমি ব্যর্থ হচ্ছি বারবার। আমি..


_ ইটস ওকে, এন্ড আ'ম স্যরি! এত বেশি রিএ্যাক্ট করার জন্য।


প্রত্যাশা কথা শেষ করে নিজেই নিজের চোখ মুছে নিল। পরনে থাকা মিচমিচে কালো জামদানি শাড়ির তুলে মুখ মুছে আলমারির সামনে গিয়ে দাড়াতেই পেছন থেকে দুরন্ত জড়িয়ে ধরে মিনমিন করে বলল,


_ খুলো না প্লিজ, আমার এখনো দেখা হয়নি মন ভরে।


_ রাতে দেখ, এখন বদলাতে হবে। তোমার খালারা চলে আসবেন যেকোন সময়।


আজকে দুরন্তের মেজো খালা আসবেন। এই মহিলাকে প্রত্যাশা বোঝে না। ভীষণ জটিল একজন নারী। প্রত্যাশার সামনে বসেই ওকে হাসাতে হাসাতে কাঁদিয়ে ফেলতে পারে, অথচ এমন ভাবে বলে যেন কিছুই বলেনি। প্রত্যাশাকে উনার এত অপছন্দের কারণ কি তা উনি‌ই হয়তো জানে না। তবে দুরন্তের প্রতি টান অসম্ভব। ভদ্রমহিলার কোন ছেলে সন্তান না থাকায় বোনের ছেলেকেই নিজের ছেলের মতো স্নেহ করেন। দু'টো মেয়ে। একটা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়ছে আরেকজন ভর্তি পরীক্ষার্থী। তাদের কাছেও দুরন্ত ভাইয়া মানেই সব। তবে বড় মেয়েটা বেশি গা ঘেঁষা। যা প্রত্যাশার একবারেই সহ্য হয় না। বিয়ের পরের একটা ঘটনা,


দুরন্ত নতুন ব‌উ নিয়ে নানা বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। সব আত্নীয় স্বজন দিয়ে ভরে যায় দুরদানা সিদ্দিকীর পৈতৃক বাড়ির মাটির উঠান। মামাতো, খালাতো, চাচাতো সূত্রের তিন প্রজন্মের সব আত্নীয় এসে জড়ো হয় নতুন ব‌উ দেখতে।

নানীর বয়সী কিছু মহিলাদের খুনসুটিতে প্রত্যাশা লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছিল বারবার । তখন দুরন্ত ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই পাশ কেটে বাইরের দিকে যাওয়ার প্রচেষ্টা করা দুরন্তকে দেখতে পেয়ে ওর এক মামাতো বোন টেনে প্রত্যাশার পাশে বসিয়ে দিল। দুরন্ত‌ও নানীদের খুনসুটিতে তাল মিলিয়ে প্রত্যাশার গা ঘেঁষে বসে। তা দেখে অনেকেই হাসি মজা করলেও কেউ কেউ চোখমুখ কালো করে ফিসফিস শুরু করে এই বলে যে,


_ গায়ের রঙটা আরেকটু ফর্সা হলে ভালো হত তাই না।


_ দুরন্ত এত ফর্সা, ওর চোখে কি মেয়ে পড়েনি আর?


_ আমি তো ভাবছিলাম ডায়নার বড় মেয়ের সাথেই বিয়ে হবে। এখন তো দেখি...


_ ছোট থেকেই তো ডালিয়ার সাথে দুরন্তের মাখোমাখো ভাব, সবাই তাই ভাবত ওদের ভবিষ্যতে বিয়ে হবে। অবশ্য ছোট বেলার সবকিছুই বড় হলে বদলে যায়।


প্রত্যাশার কানের পাশে বসেই এসব ফুসুরফুসুর করছে। অথচ প্রত্যাশা নতুন ব‌উ। ওর কানে এসব গেলে ওর খারাপ লাগবে তা মনে করার ইচ্ছাই যেন উপস্থিত গল্পবাজদের ভাবার দরকার পড়ল না। এর মধ্যে আগুনে ঘি হয়ে হাজির হয় ডালিয়া, দুরন্তের মেজো খালার বড় মেয়ে ফাতেমা সাঈদ। ভালো নাম ফাতেমা সাঈদ হলেও ডাক নাম ডালিয়া। মেয়েটা অপূর্ব সুন্দরী, অপ্সরার মতো সুন্দরী। সবাই আগে আসলেও সে মাত্র‌ই এসে পৌঁছায়। দু্রদানা সিদ্দিকীর বাবা দবির সিদ্দিকর প্রথম নাতনি ডালিয়া। ছেলে মেয়ের ঘরে উনার নাতীর আধিক্যই বেশি। তার ছেলে মেয়ে মিলিয়ে চার নাতনি, আর নাতনিদের প্রতি বৃদ্ধা সিদ্দিকীর টান অতি মাত্রায় বেশি।

নানা বাড়ীর আহ্লাদি ডালিয়া বাড়ির উঠানে পা দিয়েই সবার আগে পৌঁছায় নতুন ব‌উয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে। যেখানে সবাই নতুন ব‌উ আর পুরাতন বরকে ঘিরে বসেছে। ডালিয়া ভীর ঢেলে আসরের ঢুকতেই সব হ‌ইহ‌ই করে উঠল। ডালিয়া ধপ করে দুরন্তের পাশে গা ঘেঁষে বসল। এহেন কান্ডে প্রত্যাশা চোখ বড় বড় করে ডালিয়ার দিকে তাকাল। কিন্তু ওকে আশ্চর্য করে দিয়ে উপস্থিত সবাই দুরন্ত, ডালিয়াকে নিয়ে মেতে উঠল।


_ কি লো ডালিয়া, তোর ছোড কালের জামাই যে আরেক জায়গায় বিয়া করল, তোর কেমন লাগতাছে?


_ ধুর, নানী কিসব বলতাছ।


_ যা, আমরা কি বলতাছি? ছোট বেলায় তো তুইই বলছিলি দুরন্ত ভাইকে বিয়া করবি। তাইলে এহোন!


_ আহ্, নানী। ছোট বেলার কথা ছোট বেলায় খতম। এখন পাশে আমার রূপবতী ব‌উ, চোখে দেখ না কি!


দুরন্ত পাশ থেকে প্রত্যাশার কোমর পেঁচিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। ডালিয়া গালে হাত ঠেকিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি করে হেসে বলল,


_ বাপরে, যেন ব‌উ রাগ না করে তাই কত ঢং। যা ফোট, আমার চয়েস তোর মতো সাদা মুলা না। আমি কোন বাদামি টোন ওয়ালা মেইলকে চয়েস করব। দেখিস, আমার জামাই তোর চেয়েও সুদর্শন হবে।


ডালিয়া কথাটা বেশ ভাব দেখিয়ে বলল। যেন দুরন্ত ওর প্রাক্তন আর এই কথায় ও দুরন্তকে খোঁচা মারল। দুরন্ত ঠোঁট ভেটকি মেরে বলল,


_ আলহামদুলিল্লাহ। আমার ঘাড় রক্ষা পেল। পেত্নি চাপার চান্স নেই।


খুনসুটিতে সেই প্রহর কাটলেও প্রত্যাশার মনের মেঘ কাটল না। বরং দিনদিনই ওর উপর চেপে বসল একটা অপ্রত্যাশিত ভয়।


_ দুরন্ত, এবার ব‌উয়ের আঁচল ছাড় বাবা। মেজো খালা মনি এসেছি।


বাইরে থেকে ডায়না খালামনির কন্ঠস্বর ভেসে আসল। আলমারিতে কাপড় খোজায় ব্যস্ত থাকা প্রত্যাশা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল একটা। দুরন্ত‌ও কপাল কুঁচকে দরজা অভিমুখে দৃষ্টি ফেলে চ জাতীয় শব্দ করে বলল,


_ এদের সবার মাথা গিয়েছে নাকি! কিসব বলে বেড়ায়!


_ আরো কিছু বলার আগে তাড়াতাড়ি হাজিরা দাও। আমি কাপড় বদলে আসছি‌।


_ ভাই!


কারো ডাকে কল্পনা থেকে বর্তমানে ফিরে এলো দুরন্ত। আষাঢ় দুরন্তের চকিত মনোভাবে দ্বিধায় পড়লে থামল না। নিজে যা বলতে চাইল তা বলে গেল।


_ প্রত্যাশা আপু, তার কোন কাজিনের জন্য অপেক্ষা করছে।


_ কাজিন?


_ জি, তাই তো বলল।


দুরন্ত ছেলেটার সাথে কথা বলতে বলতেই তাকাল রাস্তার ঐপাড়ে সুউচ্চ এক সুদর্শন যুবকের সামনে কপালে চেপে কথা বলায় মজে থাকা প্রত্যাশার দিকে।

ডাগর ডাগর চোখে ঐ যুবকের পানে প্রত্যাশা চেয়ে রয়েছে। দুরন্তের বুকের উপর সোয়ামন ওজনের পাথর চাপা পড়ল। ভারী বুকটা আগলে নিয়ে পথের ধার হয়ে ধীর পায়ে হেঁটে গণতন্ত্র তোরনের সুবিশাল নান্দনিক ফটক পেরিয়ে পা রাখল ঢাবির এড়িয়ায়। কল্পনার জাল ঘিরে থাকা অজস্র স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই ঢাবির প্রতিটি পথে, প্রতিটি সড়কে। কীভাবে দুরন্ত ভুলবে প্রত্যাশা নামক রমনীকে। প্রত্যাশা কী ভুলতে পেরেছে দুরন্ত নামক এক অধম পুরুষকে?


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ