সুখ প্রান্তর অতিথি আগমন । সারপ্রাইজ_পর্ব_০২

 #সুখ_প্রান্তর_অতিথি_আগমন

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্ব_০২



[সব ধরনের নকলবাজি থেকে সতর্ক করা হল। ভালো লাগলে শেয়ার করবেন মেনশন দিবেন। ]


আফিয়ার গর্ভকালীন সময় এখন মাস চা'রে পড়েছে। চার মাসের হালকা উঁচু পেট আর নানান জটিলতা নিয়ে বেশ ভালোই কাটছে তার দিন তবে রাতগুলো ভীষণ কষ্টের হয়। সারা দিনের সাংসারিক ধকল কাটিয়ে যখন রাতে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় তখনই মরন কামড় উঠে পায়ের উপর দিয়ে। তীব্র পা ব্যথা তার রাতের ঘুম হারাম করে দেওয়ার প্রচন্ড প্রচেষ্টা চালায় তবে সফলকাম এখনো হতে পারেনি। নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজী হতে দেয় না। সে ঐ মাঝ রাতে বসে ব‌উয়ের পা বালিশের উপর রেখে আলতো করে চেপে টিপে দেয়

যার দরুণ ব্যথা গায়েব হয়ে যায় ক্ষণিক সময়ের জন্য। তখন স্বামীর সেবায় সুখের আবেশে ভেসে যায় আফিয়ার নারীসত্ত্বা। পরম আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার চোখের জলে। অবশ্য এতে আবার তার কষ্ট‌ও হয় এই ভেবে যে সারাদিন মানুষটি পরিশ্রম করে এসে রাতে তাকে নিয়ে পড়ে থাকে। না ঘুম আর না খাওয়া। বাচ্চা পেটে তার কিন্তু তার চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে লোকটার। চব্বিশ ঘন্টার পাঁচ ঘন্টা‌ও লোকটা ঠিক মতো ঘুমাতে পারে না। এতে দিনদিনই স্বাস্থ্য ভাঙছে। আফিয়া যত ই বোঝাক তার কথা ধোপে টিকে না। তার জন্য আফিয়ার প্রেগন্যান্সি যত খুশির তত‌ই ভয়ের।


এদিকে আরেকজন আছে, নাফিস ওয়াসীত্ব গাজী। ঘরে আরো একটা বাবু আসবে শোনার পর তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে যেন। সে এটা মানতেই পারছে না। এই ঘরে তার উপর কেউ খবরদারি করতে আসছে। তার উপস্থিতিতে আরো একটা বাবু আসবে? এটা সে কীভাবে মেনে নিবে? না না সে এটা মানতেই পারবে না। কোনভাবেই না। তার এই বিষয়ে তীব্র অনিহা, কঠোর প্রতিবাদ জানানো উচিত। সে কোন বাবুটাবু আসতে দিবে না। কিন্তু তার এসব জারিজুরি তো কারো মত বদলাতে পারল না। তাকে কেউ পাত্তাই দিল না। বরং তার প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হল, সে হুটহাট মায়ের কোলে চড়ার বায়না করতে পারবে না। তার খাওয়া নিয়েও নটাঙ্কি কমাতে হবে। তাকে খাওয়াতে গিয়ে তার মায়ের খাওয়া নাওয়া গাছে উঠে, এসব নাকি বেশিদিন চলতে দেওয়া যাবে না। তাকে এখন বড় হতে হবে। নিজের খাবার নিজে খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। তার জেদ কমাতে হবে। তার রাগ হলেই এর ওর গায়ে এটা ওটা ছুঁড়ে মারার অভ্যাস বাদ দিতে হবে। তার সবকিছু নিয়ে অহেতুক জেদ করাটাও পরিত্যাগ করতে হবে। তাকে নাকি বড় হতে হবে। এত এত নিষেধাজ্ঞা, তাকে তো একেবারে জেলে পুড়ে দিল মনে হয়। বাবার এসব তাকে বলাটা সে মোটেই মেনে নিতে পারল না। তাকে কেন এতকিছু বদলাতে হবে? তাকেই কেন সব ত্যাগ করতে হবে?


নাসিফ ছেলের হাত ধরে সামনে দাঁড় করিয়ে ধীরে ধীরে এগুলো বলেছে, তা ছেলে বুঝুক আর না বুঝুক। বোঝানোর দরকার, তাই সে বুঝিয়েছে। তার কথা শুনে পাশ থেকে আফিয়া বলেছিল,


_কাকে বলেন আপনি এগুলো? অতটুকু মানুষ এত কিছু বুঝে?


_না বুঝলেও বুঝে নিবে! মানুষ শুনতে শুনতেই বুঝে যায়।


_আম্মু কুলে, কুলে নাও কুলে!


নাসিফের কথা শেষ হতেই তাইফের বায়না। মায়ের গলা পেঁচিয়ে তার কোলে উঠে বসার জন্য পা উপরে তুলে ধরেছে। আফিয়া হাসল নাসিফের মুখভঙ্গি দেখে। নাসিফ নাক কুঁচকে তার ছানার দিকে তাকিয়ে আছে হাতে গাল ঠেকিয়ে। আফিয়া ছেলেকে কোলে বসিয়ে দিল, তা দেখে নাসিফ চোখ রাঙাতেই আফিয়া বলল,


_ কিচ্ছু হবে না তো। অযথা টেনশন করে প্রেসার বাড়াইয়েন না।


নাসিফ আর কথা বাড়াল না। আর বলবেই বা কী! ছেলে তো তার বুড়ো হয়ে যায়নি। এগুলা স্বাভাবিক একটি প্রতিক্রিয়া। নিজের অবস্থানে হঠাৎ করেই অন্যের আগমণ কেউ স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে না। সেখানে এতো বাচ্চা।


_ বাবা বাইরে যাব, যাবে তুমি?


বাবাকে উঠতে দেখে এর মধ্যেই সে হাত উঁচিয়ে ধরেছে বাবার কোলে যাওয়ার জন্য। নাসিফ‌ও ছেলেকে প্রশ্ন করে হেসে দিল। অতঃপর কোলে তুলে নিয়ে গালে, নাকে, কপালে চুমু দিয়ে বলল,


_ তুমি যে বনুকে মারলে, এটা কি ঠিক হল?


তাইফ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। নাসিফ দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলছে,


_ তুমি যদি এভাবে মায়ের পেটে হুটহাট আক্রমণ কর, তবে তো বাবু ব্যথা পাবে আব্বা। এমন করতে নেই।


_ বাবু কেন আমাল আম্মুল পেতে গেছে? বাবুল কি আম্মু নাই?


_ কারণ বাবুর আম্মু আর তোমার আম্মু একজন‌ই!


এটাও তাইফ বুঝল না। সে ঠোঁট টিপে গোল গোল চোখ করে বাবার দিকে চেয়ে রইল। নাসিফ মুচকি হেসে ছেলের গায়ে হাত বুলিয়ে বলল,


_ এভাবে মাকে মারতে হয় না আব্বা। তুমি আমার বুদ্ধিমান ছেলে না। এরকম করো না আর, হ্যাঁ!


নাফিস ওয়াসীত্ব গাজী ওরফে তাইফ উত্তর দিল না। সে বাবার গলা জড়িয়ে আহ্লাদ করা শুরু করল কোলেই থেকেই । স্বামী, সন্তান বেরিয়ে যেতেই আফিয়া বসা থেকে উঠল। ওয়ারড্রবের উপরে থাকা একটা নীল কালারের ফলের ঝুঁড়ি। নাসিফ কোথায় থেকে যেন গাছ থেকে পেড়ে পেয়ারা নিয়ে আসছে। একদম কচকচা দেশি পেয়ারা। তার চিন্তায় লোকটা পাগল হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। নয়তো ঘরে তিনটা বাচ্চা, বয়স্ক মা-বাবা থাকতে তাকে একা এগুলো খাওয়ার জন্য জোর করে? পরিমাণে অল্প, একদম বিশুদ্ধ তাই নাকি আফিয়ার একাই খাওয়া উচিত। অযথা সবাইকে দেখিয়ে লাভ কী? সবার সঙ্গে ভাগ করে খেতে গেলে দেখা যাবে আফিয়ার কপালে এক ফালিও জুটবে না। তাই সে ঘরে এনে লুকিয়ে রেখেছে, আফিয়াকে খেতে বলেছে চুপচাপ। কিন্তু একজন মায়ের পক্ষে তা সম্ভব ! সে পেটের ভেতরে থাকা একজনের জন্য বাইরের তিনজনকে তো ঠকাতে পারে না। তার কাছে তার সব সন্তান সমান। সবার জন্য সমান দরদ, সমান ভালোবাসা, সমান দুশ্চিন্তা। আফিয়া প্লাস্টিকের ব্যাগটি খুলে দেখল, তিনটা পেয়ারা। বেশ বড় বড় , রঙটা তো একেবারে খাই খাই। কার গাছ থেকে এনেছে কে জানে। আফিয়ার নিজের তিনটা পেয়ারা গাছ, কিন্তু এখন পর্যন্ত একটাতেও ফল তো দূরের কথা ফুলের দেখাও মিলল না। আফিয়া ব্যাগটা নিয়ে এগিয়ে গেল রান্না ঘরের দিকে।


ঘটনা দুপুরের একটু পরের, আফিয়া তিন ছেলে মেয়ের খাওয়া দাওয়া শেষ করে রান্না ঘরে গিয়ে সব গুছিয়ে রাখছে তখন মেয়ের নাম ধরে ডেকে বলল,


_ তুলতুল, ভাইকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমাও। তোমাদের দুই ভাই-বোনকে যেন এদিকে ওদিকে ঘুরঘুর করতে না দেখি।


ঘুমের কথা শুনেই তাইফ ছুট দিল। সে এখন খেলবে। ঘুমাবে না। সে খেলতে বাইরে যাবে। যখনি সে গেটের বাইরে যাওয়ার জন্য দৌড় দিল ঠিক তখনই দরজায় করাঘাত শোনা গেল। তাদের দরজা অধিকাংশ সময় চাপানো থাকে তার জন্য। সে উঠানে খেলতে যায়। তাই আফিয়া দরজার সিটকিনি লাগায় না। দরকার‌ও পড়ে না। বাড়ির মেইন গেইট যথেষ্ট সিকিউর করা।

আফিয়া জিজ্ঞাসু চোখে সামনে তাকিয়ে কান খাঁড়া রেখে বোঝার চেষ্টা করছে কে এসেছে। দরজা খুলল তাইফ। দরজা খুলেই দেখল একজন মহিলা একটা বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় বিদ্যুৎতের গতিতে ধ্বনিত হল, তাদের ঘরে একটা বাবু আসবে। তাহলে কি এইটা সেই বাবু? না না বাবুকে ঘরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। সে দরজা থেকে সরল না। দরজার চৌকাঠের সেগুন কাঠের ফ্রেমে নিজের ছোট হাত রেখে বাঁধা দেওয়ার ন্যায় দাঁড়িয়ে দৃঢ় গলায় বলল,


_আমাদেল বাবু লাগবে না। তোমাদেল বাবু নি যাও। আমাল আম্মু বাবু খেয়ে পেলে। বাবু নি যাও।"


দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিরিশ/ বত্রিশ বছরের ভদ্রমহিলা আড়াই মাসের একটি শিশুকে কোলে নিয়ে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে তাইফের দিকে। তার ঠোঁট জুড়ে হাসি। গা খালি, গেঞ্জি কাপড়ের হাফপ্যান্ট পরা, নাকের উপর ময়লা লেগে আছে যা জানান দেয় তার বারোমাসি সর্দির বিষয়টি। সে বাম হাত দিয়ে অবরিত তার পাছা চুলকাচ্ছে, ডান হাতে দরজা আঁটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উদ্দেশ্য ঘরে কোন বাবু ঢুকতে না দেওয়া। এই বিষয়ে মোটামুটি এই মহল্লার সবাই অবগত এর মধ্যেই হয়ে গেছে। আফিয়া, সালমা ফাওযিয়া তাবলীগে যায়। তখন কথায় কথায় এসব কথাও চলে আসে। তারাও মজা পায় এই ছোট্ট চাররত্তি বাচ্চাটার কান্ডে। ভদ্রমহিলা হাসি চেপে কৌতুহলী ভাব বজায় রেখে একটু উবু হয়ে তাইফের কাছাকাছি হয়ে জিজ্ঞেস করল,


_ আম্মু বাবু খেয়ে ফেলেছে?


তাইফ চোখ ঘুরিয়ে একবার উনার কোলে থাকা বাবুটাকে দেখল, এরপর চোখমুখ কুঁচকে মুখটা কালো করে বলল,


_ হুম!


ভদ্রমহিলা এতটুকু বাচ্চার ভাবভঙ্গিমা দেখে মুচকি হাসল। যা তাইফের পছন্দ হল না। কেন হাসছে তা বুঝতে না পারলেও তাকে নিয়ে হাসা তার পছন্দ হয় না কখনোই। সে ঠোঁট টিপে চোখ গোলগোল করে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে‌ই র‌ইল দরজা আঁটকে।


_ আসসালামু আলাইকুম আন্টি!


তাইফের পিছন থেকে সালাম দিল নাবীহা। মহিলা নাবীহাকে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সালামের উত্তর দিয়ে বলল,


_ ওয়া আলাইকুম আসসালাম, কেমন আছো তুলতুল?


_ আলহামদুলিল্লাহ্! এইটা আপনার বেবি?


নাবীহা বাবুটিকে কোলে নেওয়ার জন্য উৎসুক হয়ে এগিয়ে আসতেই তাইফ সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে, বড় বোনের দিকে দু'হাত উঁচিয়ে আহ্লাদি সুরে ঠোঁট উল্টে বলল,


_ কোলে উতব আমি!


নাবীহা ভাইয়ের আহ্লাদে গলে গিয়ে তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। সে ভালোই বুঝতে পেরেছে তার ভাইয়ের পন্ডিতি। সে পরম মমতায় দু হাতে আগলে কোলে তুলে নিল গোলুমলু তাইফকে। তাইফ বোনের কোলে চড়ে বিজয়ী ভাব ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে বাবুটিকে দেখল। ভদ্রমহিলার হাসি বন্ধ হয়ে গিয়েছে পিচ্চিটার কান্ডে। তিনি চোখ বড় বড় করে ফ্যালফ্যালিয়ে চেয়ে রয়েছে। নাবীহা ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল,


_ আন্টি ভেতরে এসে বসেন। আম্মু রান্না ঘরে কাজ করছে।


_ হ্যাঁ, তোমার আম্মাকেই দরকার।


বলেই তিনি ভেতরে ঢুকলেন। মহিলা ভেতরে ঢুকার পর‌ নাবীহা দরজা চেপে দিয়ে দু'হাতে তাইফকে শক্ত করে আগলে নিয়ে নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়ায়, কারণ সে জানে এখন তার ভাই এখানে অথবা বসার ঘরের আশেপাশে থাকলেই মায়ের হাতে দু চারটা খাবে এই হিংসেপনার জন্য।

কিন্তু বেচারি নাবীহা তো জানে না, সে যদি চলে ডালে তবে তার পিচ্চি ভাই চলে পাতায় পাতায়।


নাবীহা তাইফকে ঘরে নিয়ে বিছানায় শোয়ালো। অতঃপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,


_ ঘুমাও তাইফ বাবু। নয়তো ভাও আসবে!


তাইফ ঠোঁট টিপে চোখ বুজে নিল। নাবীহা মাথায় হাত বুলিয়েই যাচ্ছে। এদিকে তার মন‌ও ঐ ছোট্ট বাবুটাকে একবার কোলে নেওয়ার জন্য আঁকুপাঁকু করছে। সে পাঁচ মিনিটের মতো ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। দুষ্টু তাইফ‌ও সুকৌশলে ঘুমের ভং ধরে শুয়ে থাকল। যখনি নাবীহা তাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, সেও চোখ মেলে ফেলল।


_ তুমি ঘুমাও নি? দুষ্টু! চল ঘুমাও!


কিন্তু এবার তাইফ গায়ে মাখল না বোনের মৃদু শাসন। সে বিছানা ছেড়ে গড়িয়ে নামল নিচে। নাবীহা ভাইকে আটকে রাখার জন্য তার হাত ধরার চেষ্টা করতে করতে বলল,


_ তাফু বুবুনের কথা শুনো। না ঘুমালে ড্র‌ইং করতে দিব না আমার কালার দিয়ে। তাইফ!


কিসের তাইফ, কোথাকার তাইফ। থোরা পাত্তা‌ও দিল না সে প্রিয় বুবুনকে। নাবীহাও ধরে রাখতে পারল না। ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে এবং বসার ঘরে যেতেই তার মাথায় বজ্রপাত হল। তার মা সেই বাবুটাকে কোলে নিয়ে আদর দিচ্ছে? দাদীও আছে। কীভাবে সে এসব সহ্য করবে? ভাইয়া পাশে বসে আছে। তার আর সহ্য হল না। রাগে, ক্ষোভে, হিঃসায় পুড়তে পুড়তে সে দৌড়ে তার আর তার ভাইয়ার ঘরের দিকে গেল। গিয়ে সোজা খাটের নিচে ঢুকল। এদিকে মহিলা আফিয়ার সাথে আলাপ শেষ করে বেরিয়ে গিয়েছে। তারপর শ্বাশুড়ির সাথে কথা বলছে। নাইফ নিজের স্কুল ব্যাগ কাঁধে চাপিয়ে মায়ের পাশে বসে রয়েছে। উদ্দেশ্য কিছু টাকা নেওয়া। তাইফ হাতে করে তার ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে ছুটে এসেছে বসার ঘরে। প্রাণপণে উদ্দেশ্য করেছে বাচ্চাটাকে মারবে। আফিয়া ছেলের ক্ষোভের আগুন আঁচ পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,


_ ঘুমাও নি তুমি?


সে কথার উত্তর দেওয়ার তাগাদা তার নেই। সে বরং এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে আর বলছে,


_ মালব আমি!


বলতে বলতেই কেঁদে দিল। কাঁদতে কাঁদতে নাক দিয়ে সর্দি বের করে লোল ফেলতে ফেলতে বলতে থাকল,


_ বাবু ক‌ই , মালব আমি।


মারবে তাও আবার তাকে বলছে। আফিয়া ছেলের অবস্থা দেখে ফিক করে হেসে দিল। নাইফ ভাইয়ের মুখ দেখে ব্যাগটা কাঁধ থেকে সরিয়ে সোফায় রাখল। তাইফের দিকে এগুতেই তাইফ আবারও চিৎকার করে উঠল। তাকে ঐ বাবুটাকে এনে দিতে হবে। সে মারবে। নয়তো তার রাগ পড়বে না। আফিয়া বড় ছেলেকে বলল,


_ তুমি যাও, তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি ওকে দেখছি।


_দাদির কাছে আসো দাদাভাই।


কিসের দাদা ভাই আর কিসের কী? তার এখন ঐ বাবুটাকে মারতেই হবে। কেন সে তার মায়ের কোলে চড়েছে। দাদীর আদর নিয়েছে। তাইফ ঠোঁট ছড়িয়ে শব্দ করে কান্না করতে থাকল। আফিয়া একবার কাছে ডাকলেও পরে ভাবল পাত্তা দিবে না।

কিন্তু বেশিক্ষণ কাঁদানোও তো যাবে না। দু পা এগিয়ে এসে তাইফের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,


_ আচ্ছা ওমন করে না। শোন মায়ের কথা!



তাইফ শুনল না কথা। সে ব্যাট উঁচিয়ে আফিয়ার পেটের উপর আঘাত করতেই সামনে এসে দাঁড়ায় নাইফ। মা'কে জড়িয়ে ধরল, মায়ের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। যার দরুণ তাইফের ব্যাটের বারি লাগল নাইফের পিঠে। চড়াৎ করে একটা আওয়াজ হল। নাইফ নাক মুখ কুঁচকে ফেলল। আফিয়া ছেলের দুই বাহু ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, ছেলের ব্যথাতুর মুখশ্রী দেখে রক্ত চোখে তাকাল ছোট ছেলের দিকে। এবার সত্যিই সত্যিই রাগ হল যার

সে ক্রোধিত স্বরে অগ্নি চোখে তাকিয়ে ধমকে বলল,


_ কী করছ এসব তুমি? একদম হাত পা ভেঙ্গে বসিয়ে রাখব। বদমাইশ ছেলে।


নাইফ‌ও ধমকাল। পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে ছোট ভাইকে শাসনের সুরে বলল,


_ কি করলি এটা? যদি আম্মুর লেগে যেত? বেবি ব্যথা পেত না।


বকা খেয়ে তাইফের দুঃখ আরো চড়াও হল। মা বকল, ভাইয়াও বকল! দুঃখে সে ব্যাট ছুঁড়ে মারল জমিনে। নিজেও চিৎপটাং হয়ে পড়ল। হাত পা ছড়িয়ে গগণ কাঁপিয়ে কান্না শুরু করল। আফিয়া সেদিকে তাকালোই না আর। সে বড় ছেলের পিঠ মালিশ করতে করতে বলল,


_ কেন সামনে এসে দাঁড়ালে তুমি। দেখি শার্ট খোল, কতখানি লাগল দেখি।


নাইফ শার্ট খুলল। আফিয়া ছেলের পিঠের মাঝ বরাবর সদ্য পড়া লালচে রেখার উপর হালকা করে ছুঁয়ে গৃহকর্মীকে বলল,


_ একটু মলম আনো তো।


এদিকে সালমা ফাওযিয়া ছোট নাতির পাশে বসে তাকে কোলে তোলার চেষ্টা করছে। তা দেখে আফিয়া বলল,


_ আম্মা আপনার কোমরে চাপ লাগবে। এভাবে কেন জমিনে বসছেন। রাখেন এটাকে এভাবে ফেলে। আদরে আদরে বিগড়ে যাচ্ছে। যা খুশি তাই করতে চায়, অসভ্য বর্বর হচ্ছে দিনদিন।


সালমা ফাওযিয়া কপাল কুঁচকে আফিয়ার দিকে না তাকিয়েই বললেন,


_ তোমাকে তো আমি বললাম বাচ্চাটা কোলে নিও না, দেখলে কান্না করবে। সে তুমি শুনলে আমার কথা?


_ আশ্চর্য আম্মা, আপনার নাতির আজাইরা সব আবদার রাখতে কি আমাকে অসামাজিক হতে বলছেন। আপনার নাতি এখন এমন করছে, আরেকজন আসলে তখন কী করবে? সেও তো আপনার নাতি নাতনি।


_ ততদিনে বুঝদার হয়ে যাবে আমার দাদা ভাই।


আফিয়াকে কথাটা বলে তাইফের গায়ে আদুরে হাত বুলিয়ে বললেন,


_ ও দাদা ভাই, আসো আমার কোলে। চল তোমাকে একটাই জিনিস দেখাই..


_ ভাই আসো, বুবুন আসো।


কারো কথাই তার মন গলাতে পারছে না। আফিয়া বিরক্ত হয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। নাইফ শার্ট পরে বলল,


_ ওকে বাইরে থেকে ঘুরিয়ে আনি?


আফিয়া বড় ছেলেকে ধমকে স্পষ্ট করে বলল,


_ তুমি তোমার কাজে যাও। সামনে পরীক্ষা, এখন এসব নাটকে অংশ নেওয়া লাগবে না।


এরপর সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে উবু হয়ে তাইফের হাত ধরে টেনে তুলল। এতটুকু কাজ করতে তার ভীষণ কষ্ট হয়েছে। তার পেটে চাপ লাগানো স্পষ্ট নিষেধ। তাইফ মায়ের কোলে উঠে মরন কান্নায় মেতে উঠল। আফিয়া নাক মুখ কুঁচকে কিছু সময় তা দেখল অতঃপর অপরাধী স্বরে বলল,


_ আচ্ছা আর নিব না ‌। মাফ করে দাও।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ