#এক_আধেলা_দুঃখের_ভেলা
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_০১
[গল্পটা অল্প পরিসরে হবে। আমার লেখার ধরন ভিন্ন, এটা তেমনটা নয় তাই ভিন্ন বলেছি। ভুলত্রুটি দেখলে নগদে ধরিয়ে দিবেন যেন শুধরে নিতে পারি। ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন, যেন অন্যরা পড়তে পারে। কপি/ নকল থেকে সতর্ক করা হল!]
প্রত্যাশার প্রত্যাশা ফুরিয়ে গেল ৯০ দিনের ইদ্দত পালনের সময় ফুরানোর সঙ্গে সঙ্গে। সে কাউন্সিলর অফিসের দরজার পানে চাতকের মতোন চেয়ে রয়েছিল দীর্ঘ দেড় ঘন্টা। আজকে তাদের তালাক বাতিলের শেষ দিন। অথচ তালাক চূড়ান্ত হয়ে গেল। হ্যাঁ, আজ তার জীবনের একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তার শ্যাম বর্ণের পরিষ্কার গাত্রে আজ থেকে পরিত্যাক্তার দাগ লেগে গেল। এখন থেকে আমৃত্যু লোকে জানবে সে কারো ছুঁড়ে ফেলা, পরিত্যাগ করা । প্রত্যাশা দৃষ্টি ঘুরিয়ে একবার দেখল উপস্থিত সকলকে। এখানে উপস্থিত তার পক্ষের উকিল, কাউন্সিলর এবং তার মামা, বাবা ও কাউন্সিলর এর একজন কর্মী। সবার কৌতূহলী চাহনি তার উপরেই নির্দিষ্ট ভাবে স্থির। প্রত্যাশা সবাইকে এক পলক দেখে নিয়ে তাকাল তার সামনে টেবিলের উপর সুন্দর করে রেখে দেওয়া তালাকনামা কাগজের উপর। অফ হোয়াইট পেপারের উপর খুব সুন্দর মোটা হরফে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে, ‘Notice of Talak (Divorce Deed)'
প্রত্যাশার দৃষ্টি আরো নিচে নামল, যেখানে খুব সুন্দর করে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে তালাকের বিবরণী। প্রত্যাশার চাহনি সেখানেই থমকাল, ‘আমি, মোঃ দুরন্ত ইন্তেখাব ইসলাম, আমার স্ত্রী প্রত্যাশা মাহবুবকে শরীয়ত ও আইনের বিধান অনুযায়ী তালাক প্রদান করেছি।
তালাক ঘোষণার তারিখ: ১০- ই, অক্টোবর ২০২২
তালাকের কারণ (সংক্ষেপে): বনিবনা না হওয়া।
লাইনটুকু পড়ে প্রত্যাশা ফিক করে হেসে দিল। তার ঠোঁটের পাশ চওড়া হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডান চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা জল। প্রত্যাশার ঠিক সামনে বসা কাউন্সিলর বারেক হাওলাদার। এই প্রথম তিনি এই অপূর্ব, লাস্যময়ী মেয়েটার চোখে পানি দেখেছেন। অথচ এই নিয়ে তিনবার উনারা এই তালাক ঠেকানোর সালিশ বসিয়েছে এবং বরাবরই মেয়েটাকে বেশ শক্ত মনের মনে হয়েছে। না একবার কেঁদেছে আর না একবার অনুনয় করেছে। অনেকেই মেয়েটার এই লৌহ রূপে অতিষ্ঠ হয়ে কটু কথা বলেছে। তাতেও মেয়েটার মাঝে নড়চড় দেখা যায়নি। বরঞ্চ সে যেন কোন ভরসায় তীব্র জেদ ঠেসে রেখেছিল। কিসের আশা ছিল মেয়েটার মনে? কার ভরসায় এত অহমিকা পুষেছিল বুকে? কোন কারণ কী আসলেই ছিল? নারী বোকা হয় প্রেমিকের ছলনায় পড়ে, তেমনি নারী কঠোরও হয় ছলনার বিষাক্ত ছোবলে আহত হয়ে। এই নারীর দু'টো রূপ। এক, সে নিজেকে ভীষণ শক্ত মনে করে, আদৌওতে যা সে নয়। দুই, এই নারী নিজেও জানে না এর ভেতরে নরম মন রয়েছে যা প্রকাশ করতে সে ব্যর্থ এবং তার দায়ভার তারই।
প্রত্যাশা কালো বলপয়েন্ট কলমটি তুলে নিয়ে খসখস আওয়াজ তুলে দ্বিতীয়বারের মতো সই করে দিল। প্রথম সইয়ে ঐ লোকটার নামে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল, দ্বিতীয় সইয়ে নিজেকে ফিরিয়ে নিল।
এই নিয়ে তিন পর্ব সালিস বৈঠকে সে একাই উপস্থিত হয়েছে, কেন হয়েছে জানে না। তবে যখনই সময় ঘনিয়ে এসেছে সে অজানা এক আশ্বাসে তীব্র প্রত্যাশা বুকে ধরে এখানে এসেছিল। সে কী বিশ্বাস করেছিল, দুরন্ত আসবে? দুরন্ত এসে বলবে, ‘প্রত্যাশা, বউ আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পেরেছি তুমি নির্দোষ।' না, আসেনি দুরন্ত। সে একবারের জন্যেও আসেনি। কাউন্সিলর বারেক হাওলাদার তাকে ফোন করিয়েও আনাতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং সে বারবারই ভীষণ অহমিকার সঙ্গে বলেছে, ‘সংসার করার হলে দেড় বছর আলাদা থাকত না। আলাদা থাকার অর্থই হলো বিচ্ছেদ চাওয়া। সে বিচ্ছেদ চেয়েছে আমি দিয়েছি, ব্যস্!'
অথচ আলাদা থাকার কারণ সে সুস্পষ্ট ভাবে জানে। তারপরেও সবটা দোষ প্রত্যাশার কাঁধেই চাপিয়ে দিল? কীভাবে পারল এটা দুরন্ত? প্রত্যাশার হাত ছেড়ে দিতে দুরন্তের বুক কাঁপল না? দুরন্ত না প্রত্যাশাকে ভালোবাসে? কোথায় গেল সেই ভালোবাসার আবেগ!
_চলো বাবা!
বলেই প্রত্যাশা নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ কাঁধে তুলে নিল। কাউন্সিলর সাহেব প্রত্যাশার দিকে একপলক তাকিয়ে নিজের কাজ সম্পন্ন করে তালাকের একটা কপি ধরিয়ে দিতে দিতে বললেন,
_ জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না। আশা করি তোমারও থাকবে না। অতীতকে ভুলে সামনে এগিয়ে যাও, নতুন উদ্দামে বাঁচো, দোয়া করি।
_ জি, ধন্যবাদ। আসসালামু আলাইকুম।
বলেই প্রত্যাশা পা ঘুরালো। প্রত্যাশা যেতেই প্রত্যাশার বাবা মাহবুব হোসেন কাউন্সিলরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন,
_ দোয়া করবেন আমার বাচ্চাটার জন্য। আল্লাহ যেন, এই ট্রমা কাটিয়ে ওঠার তৌফিক দান করেন।
_ ফি আমানিল্লাহ্।
বিদায় নিয়ে একে একে সবাই বেরিয়ে এলেন। প্রত্যাশা বাইরে বের হয়েই আকাশের পানে চাইল, মেঘাচ্ছন্ন গগণ। যেকোন সময় ভারী বর্ষণে পৃথিবীর সব নোংরা পরিস্কার করে ফেলবে। প্রত্যাশা আকাশের পানে মুখ উঁচিয়ে চোখ জোড়া বুজে নিল। বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠল কিছু সোনালী মুহূর্ত।
বছর তিনেক আগে...
ঢাবির সিনেট ভবন গেইট থেকে বেরিয়ে একটু পাশে দাঁড়াতেই দূর থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর,
_ প্রত্যাশা, এ্যাই প্রত্যাশা!
প্রত্যাশা এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি করে দেখল তার থেকে কয়েক কদম দূরে তার এক ব্যাচমেট দাঁড়িয়ে রয়েছে। দাঁড়িয়ে রয়েছে বললে ভুল হবে, সে এদিকেই আসছে। প্রত্যাশার জিজ্ঞাসু চাহনি জোড়া কুঁচকে এলো। মেয়েটা মিনিট পেরুনোর আগেই ওর সামনে এসে হাজির হল এবং হড়বড়িয়ে বলে গেল,
_ এ্যাই প্রত্যাশা, তোমার সাথে কী দুরন্ত ভাইয়ার ব্রেকাপ হয়েছে?
প্রশ্ন শুনে প্রত্যাশার ভ্রু আঁখি পল্লবে এসে ঠেকল, কুঁচকে গেল নাক মুখ, কপালে পড়ল ভাঁজ। প্রত্যাশার মুখভঙ্গি দেখে মেয়েটি নিজের কথার যুক্তি খন্ডিয়ে বলল,
_ দুরন্ত ভাইয়াকে দেখলাম একজন জুনিয়রের সঙ্গে খুব ক্লোজ হয়ে কথা বলছিল!
এবারও প্রত্যাশা নিরব। বরঞ্চ বলা যায় এসবে তার তেমন কিছু মনে হল না। মেয়েটা ওর নির্লিপ্ত আচরণে বিস্মিত হল। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বলল,
_ তোমার তো দেখছি রিঅ্যাকশনই নেই কোন। দুরন্ত ভাইয়ার...
_ মেয়েটা সুন্দরী?
প্রত্যাশার প্রশ্ন শুনে মেয়েটা এবার আগের চেয়েও বেশি বিস্মিত হল। হতবাক সুরে বলল,
_ হ্যাঁ!
_ ওহ্, ব্যাপার না। সুদর্শন ছেলেদের একাধিক গার্লফ্রেন্ড থাকা স্বাভাবিক। এখানে বিস্মিত হবার কিছু নেই।
_ সিরিয়াসলি প্রত্যাশা! তোমার কাছে এটা কিছু মনে হচ্ছে না!
_ না, হচ্ছে না। কারণ যত কিছুই করুক, দিন শেষে আমার কাছেই আসতে হবে।
বলেই সে নিজের অনামিকায় থাকা সোনার আংটিটা দেখালো। মেয়েটা আংটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। অতঃপর প্রত্যাশাকে খানিকটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
_ বিয়ে করে বাচ্চা হবার পরেও পুরুষ মানুষ চিট করে। আর তুমি সামান্য আংটির ভরসায় এত বিশ্বাস টিকিয়ে রেখেছ, তাও যদি মানতাম পরিবারের উপস্থিতিতে বাগদান হয়েছে!
_ ঠিক! তবে কি বল তো, কেউ চিট করলে কী তার জন্য মরে যাওয়া লাগবে? আমি আবার এসবে বিশ্বাসী নই। বরং সে চিট করে যদি অন্য কাউকে বেছে নেয়, তবে আমি তার চেয়েও উত্তম কাউকে বেছে নিয়ে তাকে দেখিয়ে দিব, আমি তার চেয়েও বেটার কাউকে ডিজার্ভ করি এবং সে আমাকে ধরে রাখার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ।
_ তার মানে...
_ মানে পরন্তু কিছু নেই। আমি জানি আমার দুরন্তের দৌড় কতটুকু। আর দুরন্তও জানে তার প্রত্যাশা কেমন! সুতরাং সে এমন কোন ভুল করবে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা একে অপরকে ভালোবাসি। ভালোবাসা শব্দটি শুধু চার অক্ষরের একটা শব্দ নয়। এটা হচ্ছে একটা মিষ্টি অনুভূতি। যেটার মাঝে রয়েছে বিশ্বাস, ভরসা, নির্ভরশীলতা, আকাঙ্ক্ষা। সবটা মিলিয়েই ভালোবাসা তৈরি হয়। ঠিক যেমন টক, ঝাল, মিষ্টির মিক্সড চাটনি, তেমনি। তাই আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি দুরন্ত আমাকে ঠকাবে না। আর কি বল তো...
_ প্রত্যাশা!
পেছন থেকে নিজের নামের ডাক শুনে প্রত্যাশা হাসল। মেয়েটার চোখে চোখ রেখে কিছু বোঝানোর ভঙ্গিতে হাসল। অতঃপর পিছনে ফিরতেই দুরন্তের হাস্যোজ্জ্বল চাহনিতে দৃষ্টি মেলালো। পর মূহুর্তেই দুরন্তের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকাল প্রশ্নাত্মক চোখে। দুরন্ত কয়েক কদম এগিয়ে এলো, প্রত্যাশার কপালে, কানের লতিতে আঁটকে থাকা চুলগুলো সরিয়ে মাথার উপর গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
_ ক্লাস শেষ?
_ হু!
প্রত্যাশার ছোট উত্তরে দুরন্তের ভ্রু কুঁচকে গেল। প্রত্যাশা চঞ্চল, ছটফটে, বাকপটু স্বভাবের। বলার সুযোগ পেলে ছাড়ে না। দুরন্তের সঙ্গে থাকলে তো তার মুখ থামতেই চায় না। অবশ্য দুরন্ত তা দেখেই তো এই নাক উঁচু স্বভাবের মেয়েটাকে ভালোবেসেছে। প্রত্যাশার দৃষ্টি অনুসরণ করে দুরন্ত নিজের পিছনে তাকাল। অতঃপর কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে চমকে গিয়ে বলে উঠল,
_ ওহ, এদিকে এসো।
দুরন্ত শেষ শব্দটি ঐ মেয়েটার উদ্দেশ্য বলে প্রত্যাশার দিকে ফিরে তাকাল। আদুরে গলায় বলল,
_ প্রত্তু, ও হচ্ছে আমার দুর সম্পর্কের মানে আমার মায়ের চাচাতো বোনের মেয়ের ননদ। লাইক মাই কাজিন, আমার ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র। একটু বোকাসোকা, গ্রাম থেকে আসছে তো, বুঝোই। আমি বলছিলাম, তুমি ওকে তোমার সাথে সাথে রেখে একটু বুঝিয়ে সুঝিয়ে দিও, কীভাবে ঢাকা শহরে চলাফেরা করতে হয়। প্লিজ, জান!
দুরন্ত অনুরোধ করছে প্রত্যাশার হাত নিজের হাতের মুঠোয় রেখে। প্রত্যাশা দুরন্তের হাতের তালুতে থাকা তার নরম কোমল হাত খানা দেখল অতঃপর দেখলো ঐ মেয়েটাকে যে তাদের থেকে দুই কি তিন হাত দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এরপর তাকাল নিজের ব্যাচমেটের দিকে। ব্যাচমেট মেয়েটা বিস্ফোরক চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। প্রত্যাশা দুরন্তের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_ থাকছে কোথায়?
_ আপাতত আমাদের বাসাতেই রয়েছে। শহরে তো আত্নীয় স্বজন তেমন কেউ নেই, আর একটা মেয়েকে তো এই শহরে একা ছাড়াও যায় না। তাই আম্মা!
_ ওহ, তোমার আম্মা মানল?
_ মানে?
প্রত্যাশার প্রশ্নে দুরন্তের কপালে ভাঁজ পড়েছে। প্রত্যাশা দুরন্তের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে কাঁধের ওড়না ঠিক করতে করতে বলল,
_ না মানে তুমি বলেছিলে, তোমার আম্মা ঘরে ইয়াং কাজের মেয়ে রাখে না ছেলে ইয়াং হয়েছে বলে, আবার বয়স্ক মহিলাও রাখে না আংকেলের জন্য। তো এখন আস্তো একটা ইয়াং মেয়ে রেখেছে। তাই...
_ আর ইউ আউট অফ ইউর মাইন্ড প্রত্তু? কাজের মেয়ে আর রিলেটিভস এক!
_ রাগছ কেন? এভাবেই বলেছি। কৌতুহল থেকে, তা মেয়ে তোমার নাম কী?
প্রত্যাশার প্রশ্নে মেয়েটা একটু এগিয়ে এলো। এরপর নিচু কণ্ঠে মাথা নুইয়ে নিয়ে আস্তে করে বলল,
_ নীহারিকা খাতুন।
_ বাহ্! দারুণ নাম তো! তা মাথা নুইয়ে রেখেছ কেন? মাথা তোলো। মনে রাখবে এই শহরে টিকতে গেলে মাথা নুইয়ে না, মাথা উঁচু করে বাঁচতে হবে। তুমি নিজের মাথা ঝুঁকিয়েছ মানেই হল লোকে তোমার ঘাড়ের চেপে বসবে। বুঝেছ?
_ জি আপু!
_ আপু কী? ভাবী বল!
দুরন্ত মৃদু শাসনের সুরে ধমকে উঠল। মেয়েটা দুরন্তের শাসনে লজ্জা পেয়ে একবার প্রত্যাশার দিকে চাইল অতঃপর বলল,
_ স্যরি ভাবী।
_ ইটস ওকে!
প্রত্যাশার কণ্ঠস্বর ভারী ভারী ঠেকছে। দুরন্তের মনে খচখচানি শুরু হল, ও প্রত্যাশার দিকে চাইল। অতঃপর নীহারিকার উদ্দেশ্য করে বলল,
_ নীহার, ক্লাসে যাও।
প্রত্যাশা দুরন্তের চোখে চোখ মিলিয়ে বলল,
_ চিনবে?
_ পারবে! আঁখি, তুমি কী গণিত অনুষদের সামনে দিয়ে যাবে না?
_ হ্যাঁ!
_ তাহলে ওকে নিয়ে যাও, প্লিজ!
প্রত্যাশার ব্যাচমেট মেয়েটার নাম আঁখি। দুরন্ত ওকে অনুরোধ করে কথাটি বলে নীহারিকে বলল,
_ আঁখি তোমার ভাবীর ব্যাচেমট। ওকে আপু বলতে পারো।
_ ওকে ভাইয়া!
বলেই নীহারিকা আঁখির দিকে এগিয়ে গেল। ওরা চলে যেতেই প্রত্যাশা বলল,
_ আঁখির সাথে কেন পাঠালে? তুমিই তো দিয়ে আসতে পারতে!
_ পারতাম, কিন্তু ইচ্ছা নেই। আমার এখন তোমার সাথে থাকতে ইচ্ছে করছে।
_ কেন, অন্য মেয়েদের সঙ্গে বাজেটকৃত সময় ফুরিয়ে গেছে?
_ কীসব বলছো প্রত্তু?.
_ তুমি যা করে বেড়াও তাই!
_ আমি কী করলাম?
_ ঢাবির আকাশেবাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে দুরন্ত ইন্তেখাব ইসলাম মেয়েদের কোলে নিয়ে ঘোরে। আর তুমি..
_আসতাগফিরুল্লাহ্। ঢাবির প্রতিটি ইট সুড়কিও সাক্ষী, এই দুরন্ত ইন্তেখাব ইসলাম বিগত সাত বছর ধরে একটি মেয়ে, যার চোখগুলো ডাগর ডাগর, ঠোঁট যার কমলার মতো লোভনীয় ও রসালো, গাল দুটো ছবেদার মতো মিষ্টি আর গাত্রের সুগন্ধি কাশ্মীরী চন্দন, তাকেই ভালোবাসে। এই দুরন্ত ইন্তেখাব ইসলাম নিজের ইহকাল পরকাল তার নামেই লিখে দিয়েছে। তাকে পাওয়ার সাধনায় সে প্রতি ওয়াক্তে রবের কাছে আর্জি করতে ভুলে না। তার জন্য তার কতশত পাগলামি। সেই মেয়েকে ছেড়ে অন্য কোন মেয়েকে কোলে তুলে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এমন কিছু ঘটার আগেই দুরন্তের মৃত্যু হোক।
_ না হলেও সেই মেয়েটি ঠিকই মেরে দিবে।
শালা, আমার সাত বছর নষ্ট করে এখন অন্য মেয়েদের নিয়ে লুতুপুতু করা হয়? একেবারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গেঁড়ে রাখব, দেন রাজুর পাশে ভাস্কর্য ঝুলিয়ে লিখে দিব, প্রেমিকাকে প্রতারিত করার নমুনা' !
প্রত্যাশা ক্ষেপে গিয়ে দুরন্তের শার্টের সামনে অংশ খামচে ধরেছে। দুরন্ত প্রত্যাশার শ্যামা অঙ্গের অগ্নি মুর্তি দেখে হাসল। অতঃপর হুট করেই প্রত্যাশা কনুই চেপে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
_ সবাই দেখছে বিয়ের আগেই এক নারী তার অবিবাহিত অসহায় বরকে এভাবে লোক সম্মূখে পেটাচ্ছে!
মুহুর্তে প্রত্যাশার হুঁশ ফিরল। দুরন্তের শার্ট ছেড়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে নিজের লজ্জিত দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে বলল,
_ স্যরি!
অতঃপর সে হনহন করে এগিয়ে এলো। দুরন্ত ওর পিছু ছুটে বরাবর। হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগল,
_ প্রথমত, যে তোমার কানে আপডেট দিয়েছে ওর কানের গোঁড়ায় দু'টো দিবে প্রোপ্রার ইনফর্মেশন না দিতে পারায়। দ্বিতীয়ত, সেই মেয়েটা আর কেউ নয় নীহারিকাই। গর্দভ মেয়েটা পা ফসকে আমার গায়ের উপর পড়ে গিয়েছে, সম্ভবত গোড়ালিতে লেগেছে। তাই অনেক সময় আমাকে ধরেই হেঁটেছে, তখনই হয়তো কেউ... এক মিনিট এই আঁখি বলছে না? ওকে পেয়ে নেই! বদ মেয়ে!
দুরন্ত বকবক করছে। কিন্তু প্রত্যাশা না রেসপন্স করছে আর না ফিরে তাকাচ্ছে। দুরন্ত প্রত্যাশার কাঁধের উপর দিয়ে হাত রাখল, যেন ছোঁয়া না লাগে এমন ভাবে ধরার মতো করে ধরে বলল,
_ প্রত্তু, জান, বেবি, প্লিজ এমন করে না। ট্রাস্ট মি, আমি ওকে ছুঁইনি। আচ্ছা ওয়াদা করছি, এরপর কেউ মরে গেলেও ধরব না।
_ রাফায়েত ভাইয়ার কথা মনে আছে?
দুরন্তের কথার উত্তর না দিয়েই সম্পূর্ণ কথা ঘুরিয়ে প্রত্যাশার জিজ্ঞাসা! দুরন্তের পা থেমে গেল। থমকাল প্রত্যাশার কদমও কিন্তু পর মূহুর্তেই তা সচল হল। সে সামনের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি করে হাসতে হাসতে হাঁটতে হাঁটতে বলে গেল,
_ রাফায়েত ভাই গত পরশু নক করেছিলেন।
_ খবরদার প্রত্যাশা, ওকে রেসপন্স করবে না। খুব খারাপ কিছু হয়ে যাবে কিন্তু!
_ অন্যকে বলার আগে নিজেকে বুঝান, মিস্টার দুরন্ত ইন্তেখাব ইসলাম।
বলেই পায়ের গতি বাড়াল। দুরন্ত দৌড়ে প্রত্যাশার কাছাকাছি হয়ে বলল,
_ আম্মা আব্বাকে পাঠাবো? আংকেল ফ্রি কবে?
প্রত্যাশার হাসি চওড়া হল। থেমে, দুরন্তের দিকে ফিরে দুরন্তের কুঁচকে যাওয়া শার্টের বুকের অংশ ঠিক করতে করতে বলল,
_ ফ্রাইডে!






0 মন্তব্যসমূহ