সুখ প্রান্তর অতিথি আগমন । সারপ্রাইজ_পর্ব_০১

 #সুখ_প্রান্তর_অতিথি_আগমন

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#সারপ্রাইজ_পর্ব_০১



[নকলবাজি থেকে সতর্ক করা হল। ভালো লাগলে শেয়ার, মেনশন করবেন।]


“একা এসেছেন? সাথে কেউ আসেনি আজ!"


“হ্যাঁ এসেছে তো। আমার বড় ছেলে এসেছে। নাইফ, ভেতরে আসো বাবা।


গাইনি বিশেষজ্ঞ ডাঃ নার্গিসের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আফিয়া নাইফকে ভেতরে আসার জন্য বলল। থাই দরজার ঠেলে একটা ক্লান্ত মুখশ্রীর কিশোর মাথা একটু ঢুকিয়ে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,


“আম্মু, ডাকো?"

"হ্যাঁ বাবা, আসো এদিকে!"


দরজা ঠেলে ধীর পায়ে হেঁটে ভেতরে ঢুকে মায়ের পাশে গিয়ে বসল। কাঁধের স্কুল ব্যাগটি কাঁধ থেকে খুলে কোলের উপর রেখে জিজ্ঞাসু চোখে মায়ের দিকে চাইতেই আফিয়া বলল,


“বস এখানে!"


“এটা আপনার বড় ছেলে?"


ডাঃ নার্গিসের চোখে বিস্ময়। এত বড় ছেলে আশা করেননি। উনি আফিয়ার দীর্ঘদিনের চিকিৎসক কিন্তু এত বড় বড় সন্তানের মা আফিয়াকে দেখলে বোঝা যায় না। উনি নিজের বিস্মিত মনোভাব লুকাতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন,


“কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?"


“সামনের বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দিব।"


“ওমা, তুমি তো মাশাআল্লাহ অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। তো তোমার আম্মু তোমার জন্য আবারও ভাইবোন আনছে, এই বিষয়ে তোমার মতামত কী?"


নাইফ বুঝল না ডাক্তারের কথার অর্থ! সে কী উত্তর দিবে? তার কী বলা উচিত? এখানে তার মতামতের কী আছে! আফিয়া ছেলের মনের চিন্তা বুঝতে পেরে ছেলেকে বলল,


“তুমি কী খুশি বাবা আবার একটা ভাই অথবা বোন পাবে বলে, আন্টি তাই জিজ্ঞেস করেছে! তোমার অনুভূতি কেমন, আন্টি তা বুঝতে চাইছে!"


“দারুণ! আমি অপেক্ষা করছি যেন তাড়াতাড়ি বেবি চলে আসে!"


“বেবি তো বেবির সময়েই আসবে। তবে তোমার উচ্ছ্বাস ভালো লাগল। তা তোমার কি চাই? ভাই নাকি বোন!"


“ বোন!"


“তোমার বোন নেই?"


“আছে তো! আমার একটা ছোট বোন একটা ছোট ভাই আছে।"


“তবে বোন চাইলে যে!"


“আমার অনেক শখ একটা পুতুলের মতোন বোনের। যদি আল্লাহ বোন গিফট দেয়, তবে ওকে আমি সবসময়ই আগলে রাখব। একটুও কাঁদতে দিব না।"


“বাহ্, প্রমিসিং বড় ভাই। তোমার ইচ্ছে পূরণ হোক, দোয়া করি। তবে তোমাকে কিন্তু তার জন্য অনেক কষ্ট করতে হবে।"


“কী করতে হবে?"


নাইফ উৎসুক হয়ে চেয়ে আছে ডাক্তারের দিকে। ডাঃ নার্গিস নাইফের সরল আচরণে মুগ্ধ হয়ে হাসলেন। হেসেই বললেন,


“মায়ের দিয়ে বিশেষ যত্নশীল হতে হবে। এই সময়ে তাকে ভারি কোন কাজ, দুশ্চিন্তা করতে দেওয়া যাবে না। তার খাবার-দাবারে‌ও খেয়াল রাখতে হবে এবং তা করতে হবে ফ্যামিলি মেম্বারদের‌ই। যেহেতু তুমি বড় ভাই হচ্ছো, সেহেতু এটা তোমার মূখ্য দায়িত্ব। বুঝেছ?"


“জি।"


“ঠিক আছে, তোমার মায়ের দায়িত্ব আজ থেকে তোমার। এতদিন মা তোমাদের খেয়াল রেখেছে এখন তোমরা! পারবে না?"


“ইনশাআল্লাহ!"


“ফি আমানিল্লাহ্, এখন তুমি একটু বাইরে গিয়ে বসো, তোমার মায়ের সাথে কথা বলব।"


“ওকে!"


নাইফ মায়ের দিকে চেয়ে অনুমতি চাইতেই আফিয়া চোখের পলক ফেলে ছেলেকে অনুমতি দেয়। নাইফ বেরিয়ে যেতেই ডাক্তার নার্গিস আফিয়াকে প্রশ্ন করল,


“আপনি এত বড় ছেলে থাকতে আই মিন টু সে এই সময়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন! ভেবে নিয়েছেন? বাচ্চাদের মনোভাব কেমন?"


“কথা তো বললেনই, কেমন মনে হলো?"


“হ্যাঁ, এখন তো মাশাআল্লাহ বেশ বুঝদার‌ই দেখাচ্ছে।"


“আল্লাহর রহমতে আমার সব বাচ্চারাই বুঝদার। তারা খুব এক্সাইটেড এ বিষয়ে!"


“যাক আলহামদুলিল্লাহ, এটা সত্যিই ভালো লাগল। যদিও আমি আপনাকে প্রথমে সাজেশন দিয়েছিলাম তাও একটু ভয়েই ছিলাম। জানেন , আমার একজন ক্লায়েন্ট ছিলো, ভদ্রমহিলার একটা মাত্র মেয়ে। সেই মেয়ের সতেরো বছর বয়সে উনি আবার কনসিভ হয়। মানে উনি চেষ্টা করেছেন কিন্তু কোনভাবেই হয়নি। আল্লাহ কবুল করেননি তাই হয়নি। কিন্তু সতেরো বছর বয়সী মেয়ের সামনে, উনি ভেবেছিলেন সবাই বিষয়টি সহজভাবে নিবে। যেহেতু উনার এত বছরেও কোন ভাবেই কনসিভ হচ্ছিল না। এখন হয়েছে, হয়তো ছেলের আশা করেছিলেন ভদ্র মহিলা। যাই হোক, ভদ্রলোক কোন রকম নিরব ছিলেন। তিনি খুশি, নারাজি কিছুই জাহির করেননি। তবে মেয়েটা বিগড়ে যায়। আশেপাশে মানুষের কথা, আত্নীয় স্বজনের টিটকারী, বন্ধুবান্ধবদের হাসি তামাশা, সব মিলিয়ে মেয়েটার মন ভেঙ্গে যায়। সে তার এত বছর বয়সে তার মায়ের গর্ভধারণ একেবারেই সহজভাবে নিতে পারেনি। ভদ্রমহিলার সাথে মিস বিহেভ করে। যা মহিলার উপর ভয়ানক প্রভাব ফেলে। সাড়ে ছয় মাসের মাথায় মিসক্যারিজ হয়ে যায়,অথচ গর্ভকালীন পুরোটা সময় তিনি একদম ঝরঝরে, সুস্থ সবল। দুঃখের বিষয় কী জানেন না, বাচ্চাটা ছেলে বাচ্চা ছিল। ভদ্রলোক বাচ্চাটা থাকতে মহিলাকে একটু আগলে রাখেননি। কিন্তু মিসক্যারিজের পর কুমিরের কান্না কাঁদছে। আর ঐ মেয়েটার কথা কী বলব? সে যেন ভীষণ তৃপ্তি পেয়েছে বাচ্চাটা মারা যাওয়ায়। কী যে করুণ সে দৃশ্য, বলে বোঝাতে পারব না আপা।"


“আমার শরীর শীতল হয়ে গেছে আপনার কথা শুনে। কীভাবে সম্ভব! আল্লাহ আল্লাহ, আল্লাহ সবাইকে মাফ করুক। আল্লাহর রহমত , আমার স্বামী সন্তান সহ সকল আত্নীয়স্বজন যথেষ্ট ভালো। আর দুই একজন যদিও খোঁচায় তাতে আমি গা মাখি না। আমার স্বামী খুশি, শ্বশুর- শ্বাশুড়ি খুশি। ব্যস্! আল্লাহর রহমতে বাচ্চারাও বুঝদার। আল্লাহ চাইলে সব ঠিকঠাক থাকবে ইনশাআল্লাহ।"


“ইনশাআল্লাহ্!"


" সাবধানে চলাফেরা করবেন, চার্ট অনুসরণ করে একটু মেইনটেইন করলেই দেখবেন সব ইজি।"


“আল্লাহ্ ভরসা, আসি। আসসালামু আলাইকুম!"


“আমাকে দাও আম্মু!"


আফিয়া দরজা ঠেলে বের হতেই নাইফ মায়ের হাত থেকে মেডিক্যাল ফাইলটি নিয়ে নিল। মায়ের বাম হাত নিজের ছোট হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে বলল,


“আমাকে ধরে ধরে হাঁট আম্মু!"


আফিয়া ছেলের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলল,


“আমি হাঁটতে পারব বাবা।"


“তাও!"


নাইফ জোর করেই মায়ের হাত চেপে ধরল। ধীর পায়ে মায়ের বরাবর হয়ে হাঁটছে। আফিয়া ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,


“আমার আব্বা তুমি?"


নাইফ আহ্লাদে মাথা দুলিয়ে মিষ্টি করে হেসে ছোট করে বলল,


“হুম। তোমার বড় আব্বা!"


“ও আল্লাহ! আল্লাহ তোমাকে সবসময় এমন রাখুক আব্বা।"


নাইফ মায়ের গাঁয়ে নাক ঘষল। নাইফ এটা তখন করে যখন সে মায়ের আহ্লাদের ক‌ইতরি হয়ে যায়।

আফিয়া ছেলের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বলল,


“একটু কিছু খেয়ে নাও আব্বা। আমাদের বাড়ি যেতে দেরি হবে।"


“এখন বাড়ি যাব না?"


“না মনা। আমাদের বাড়ি যেতে দেরি হবে। আমরা এখন একটু গাউছিয়া যাব, বোনের জন্য কিছু সুতি জামা কিনব।"


“ওর জন্য কত জামা কিনো তুমি?"


“একটা মাত্র মেয়ে না আমার, ওর জন্য‌ই তো কিনব। তোমরা তো ছেলে। ছেলেদের কী অত জামাকাপড় লাগে নাকি!"


“আরেকটি বনু আসলে ওর আদর কমে যাবে।"


“না আব্বা, কারো আগমনে কারো আদর কমে না। সবাই নিজের ভাগেরটা নিজে নিয়ে আসে।এসব ভেবে কখনো মন খারাপ করবে। আমাদের কাছে তোমরা চার ভাইবোন‌ই এক, কেউ কারো চেয়ে কম প্রিয় না আব্বা।"


“হুম, কিন্তু নাবু কে বেশি আদর করো!"


“নাবুও তো তাই বলে! আমি তার ভাইকে বেশি আদর করি। তবে সত্য কোনটা!"


“আমাকে বেশি আদর করো!"


বলেই নাইফ মায়ের বাহুতে মাথা ঘষল।আফিয়া ছেলের কথায় নিঃশব্দে হেসে দিল। এরপর পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে বলল,


“পাগল ছেলে আমার। চলো এখন!"


ল্যাব এইড থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে এলিফ্যান্ট রোডের একটি ফাস্টফুডে বসিয়ে কাস্টার্ড আর লেমনেড খাওয়ালো ছেলেকে। নিজে শুধু একটা স্যান্ডউইচ নিয়ে উঠে পড়ল। এরপর ছেলের হাত ধরে ইস্টার্ন মল্লিকার প্রতিটি ফ্লোরে চক্কর দিয়ে মেয়ের জন্য এক গাদা সুতি পোশাক কিনে বাড়ির পথ ধরে। ইস্টার্ন মল্লিকার গ্যারেজের সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে ঠিক তখনই আফিয়ার মুঠোফোন বেজে উঠল। ফোন ছিল নাইফের কাছে। সে স্কিনে বাবার নাম্বার দেখে কল রিসিভ করে সালাম দিল। নাসিফ ছেলের সালামের উত্তর দিয়েই জিজ্ঞেস করল,


“আম্মা কোথায় তোমার?"


“আমার পাশেই!"


নাইফ ফোন বাড়িয়ে দিতেই আফিয়া ফোন নিয়ে কানের কাছে ধরে সালাম দিল,


“আসসালামু আলাইকুম।"


“ওয়ালাইকুম আসসালাম। তোমাকে না বললাম ডাক্তার দেখানোর পর সোজা বাসায় চলে যাবা।"


“যাচ্ছি, একটু কাজ ছিল!"


“এই সময়ে কেন মার্কেট ঘুরতে যাও। রাতে ঘুমাতে পারো না গাঁটের ব্যথায় । এখন একটু... তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো। ছেলেকে দাও ফোন!"


“বাবা!"


“আম্মাকে সাবধানে বাসায় নিয়ে যাবা, নিজেও সাবধানে চলাফেরা করবে। আর খবরদার কিছু দেখলেই গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামবে না। যাও বাসায় যাও তাড়াতাড়ি, মা ছেলে মার্কেট ঘুরঘুর করো না সারাদিন।"


“ওকে বাবা।"


বাবার ধমক খেয়ে নাইফ আরো বেশি দায়িত্ববান হয়ে গেল। মা'কে শাসনের সুরে বলল,


“বলেছিলাম জামা কিনা লাগবে না। এখন হলো তো, বাবা বকছে!"


নাইফ মায়ের হাত ধরে গাড়িতে নিয়ে বসালো।


বিকাল বেলা...


আফিয়া রাতের রান্নার সব আয়োজন করে বিছানায় এসে বসল। তার মনে হচ্ছে তার পায়ের তালু ফেটে যাবে। এত ব্যথা শুরু হয়েছে। পা দুটো বিছানার উপর উঠিয়ে বালিশ নিচে দিয়ে তার উপর পা রাখল। ঠিক তখনই ঘরে ঢুকে নাসিফ।


“কিহ পায়ের ব্যথা শুরু হয়ে গেছে? বারণ করেছিলাম আমি, শুনোই না কথা!"


নাসিফ কথাগুলো বলতে বলতে কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রাখল ওয়ারড্রবের উপরে। শার্টের বোতাম উপর থেকে দু'টো গুলো খুলে ফেলল, হাতা গুটিয়ে আফিয়ার পাশে গা ঘেঁষে বসতেই।আফিয়া জিজ্ঞেস করল,


“আজ এত তাড়াতাড়ি যে! শরীর ঠিক আছে?"


“আমার আম্মাকে মিস করছিলাম। চাচি আমি জানি তুমি আজ সারাদিন আমার আম্মাকে অনেক কষ্ট দিয়েছ, তোমাকে তো শাস্তি দিতে হবে তাই না আম্মা!"


বলেই সে আফিয়ার পেটের উপর ঠোঁট ছোঁয়াল। আফিয়া নেড়েচেড়ে উঠল তাতে।


“বাইম মাছের মতোন করো কেন?"


“কত বার বলছি আপনারেই এই ভাবে ছুইবেন না। আমার সুড়সুড়ি লাগে।


“এখন‌ও সুড়সুড়ি আছে? হায় হায় কী বল? এত বছরেও সুড়সুড়ি তাড়াতে পারিনি আমি!"


“ধ্যাত চুপ থাকেন তো। সবসময়ই বেশি বেশি করে। যান গোসল করে আসেন, ঘাম গায়ে বসে গেলে ঠান্ডা লেগে যাবে।"


“যাচ্ছি তার আগে তুমি সোজা হয়ে বসো তো।"


“ কী করবেন?"


“দেখি কী করা যায়? কী করলে ব‌উয়ের আরাম লাগে।"


নাসির আফিয়ার পা তুলে কোলের উপর রাখতেই আফিয়া পা সরানোর প্রয়াস করল, এতে নাসিফ ভ্রুকুঞ্চণ করে নিল। শাসনের সুরে বলে,


“সমস্যা কী?"


“আপনি আমার পা কেন এভাবে....!"


“চুপ করে বসো। তোমাকে না, আমি আমার আম্মার জন্য করছি সব।"


আফিয়া চুপ করে গেল। নাসিফ একটু এগিয়ে এসে ঝুঁকে আফিয়ার পিছনে বালিশ দিয়ে বলল,


“এবার আরাম করে শোয়।"


আফিয়া বেডের হেডের উপর নিজের ভর ছেড়ে দিয়ে গা এলিয়ে দিল। নাসিফ আফিয়ার পায়ের পাতা থেকে গোড়ালি সব সুন্দর করে আলতো ছোঁয়ায় মালিশ করতে থাকল ঠিক তখনই ঘূর্ণিঝড়ের মতোন হাজির হল তাইফ,


“বাবা বাবা বাবা বাবা...


ছেলের এহেন আগমন আর এহেন টেপ রেকর্ডারের মতোন বাবা ডাকে নাসিফ অস্থির হয়ে পড়ে।


“কী হয়েছে বাবা?"


আফিয়ার পা কোল থেকে সরিয়ে ছেলেকে ধরে কোলে বসিয়ে আহ্লাদি সুরে জিজ্ঞেস করল। তাইফ ঠোঁট দুটো উল্টে গাল ফুলিয়ে অভিযোগ করার মতোন করে বলে উঠল,


“ভাইয়া বলছে একতা বাবু আছবে।"


“ভাইয়া বলেছে একটা বাবু আসবে?"


“হুম!"


“হ্যাঁ, সত্যিই তো একটা বাবু আসবে!"


“কিন্তু আমাল বাবু চাই না।"


“বাবু চাও না! কিন্তু কেন চাও না আব্বা?"


“না আমি একতা বাবু। বাবু চাই না।"


তাইফ তর্জনী আঙ্গুল বুকের উপর রেখে নিজেকে দেখিয়ে আঙ্গুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথাগুলো বলছে।নাসিফ ছেলের মনোভাব বুঝতে পেরে মিটিমিটি হাসছে আর উত্তর দিচ্ছে। আফিয়া ছেলের দিকে করুণ চোখে চেয়ে আছে। তাকে ছাড়া এই বাড়িতে অন্য বাচ্চা সে মেনে নিতে পারে না। আল্লাহ জানে কীভাবে নতুন বাচ্চাটাকে বরদাস্ত করবে! হিংসায় আবার কোন ক্ষতি না করলেই হয়। নাসিফ ছেলের মুখটা ডান হাতের তালু দিয়ে আলতো চাপে ধরে নিজের দিকে রেখে নরম সুরে আবারও বলল,


“তুমি একটা বাবু তাই আর বাবু চাও না!"


“হ্যাঁ, আমি বাবু চাই না।"


“কিন্তু সেটা তো তোমার বনু হবে বাবা। বনু তো!"


“না আমাল বুনু চাই না।"


তাইফের জেদি উত্তর। নাসিফ ছেলের জেদ দেখে মৃদু হেসে আরো একটি ক্ষেপাতে এবার সেও জেদ দেখিয়ে বলল,


“তুমি চাইলেও কী না চাইলেও বা কী বাবা,যে আসার সে ঠিক‌ই চলে আসছে। আর হ্যাঁ তুমি খবরদার যদি তিড়িং বিড়িং করছ তো! বাবা তোমাকে একদম কাঁধে চড়িয়ে বাজারে নিয়ে যাবে না!"


“যাবে!"


বলেই নাসিফের মুখের উপর থাবড়া মারল তাইফ। এতটুকু ছানার সাহস দেখে নাসিফ বিমূঢ়। ছেলেটা তার কথায় কথায় তার গালে চড় থাপ্পড় মারে। আফিয়া ভীত চোখে স্বামী, সন্তানকে দেখছে। নাসিফ থমথমে মুখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে,তাইফ আবারও একটা থাবড়া মেরে গলায় জোর ঢেলে বলল,

“নিবি বল!"


"বাবাকে কেউ মারে? আমার কাছে এসো!"


“না, বুনু চাই না আমি! আমার আম্মু না!"


তাইফ মা'কে জড়িয়ে ধরে বারবার বলেই যাচ্ছে কথাগুলো। এদিকে সে দু'হাতে শক্ত গলা জড়িয়ে ধরলেও পা দিয়ে বিছানায় ঠেলছে যার কারণে তার হাঁটুর খোঁচা আফিয়ার পেটে লাগছে। নাসিফ আঁতকে উঠে ছেলেকে তার মায়ের থেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল,


“কি করছ, বনু ব্যথা পাবে তো!"


“কুতায় বুনু?"


“ঐ যে মায়ের পেটে!"


নাসিফ আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে দেখাতেই তাইফ ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে কয়েক পলক। এরপর হাঁটু দিয়ে হাপুড় পেরে আফিয়ার কাছাকাছি গিয়ে পেটের দিকে বিস্ময়কর চোখে চেয়ে থেকেই জিজ্ঞেস করল,


“বুনু পেতে কীভাবে গেছে আম্মু! বুনু খেয়ে ফেলেছ?"


তার মুখ বড় বড় হয়ে গেছে। চোখ বিস্ফোরিত, কৌতুহলী।


“ভালো কলেছ আম্মু, বুনু চাই না আমাল।"


“বুনু খাওয়া যায় না আব্বা, বুনু তো আল্লাহ দেয়। এমন করে না বাবা। তুমি না আমার বুদ্ধিমান আব্বা। শুনো, শুনো আম্মুর কথা!"


আফিয়া ছেলেকে কোলে নিবে তার আগেই নাসিফ বলে উঠল,


“এদিকে আসো, বাবার কাছে আসো তোমাকে একটা জিনিস দেখাই!"


নাসিফ আফিয়ার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজের কোলে তুলে উঠে দাঁড়িয়ে মোবাইল বের করতে করতে বলল,


“এই যে দেখ এখানে কী বলেছে আল্লাহ। দুষ্টু বাচ্চাদের আল্লাহ কীভাবে দুঃখ দেয়, দেখ আল্লাহ দুষ্টু বাচ্চাদের মজা দিবে না বলেছে। দেখ হিংসা করলে আল্লাহ সবাইকে পানিশড করে। তুমি আল্লাহর কাছ থেকে চকোলেট চাও না?"


“হুম, চাই!"


বিজ্ঞের মতোন মাথা দুলালো। নাসিহ লোভী ছেলের লোভী আচরণে মুখ টিপে হাসল। অতঃপর বলল,


“ভাই বোনকে নিয়ে মিলেমিশে থাকতে হয়। নাহলে আল্লাহ ভালোবাসে না। আল্লাহ বলেছেন, সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকতে। আম্মু বাবার ভালোবাসা, আদর শুধু একা একা পেতে না। শুধু শুধু অন্যকে হিংসা করতে না। বুঝেছ?"


“হুম, কিন্তু আমাল বাবু চাই না। আল্লাহ বুনু চাই না।"


এত বুঝানোর পরেও এক‌ই সুর। নাসিফ বাচ্চা ছেলের জেলাসিতে করুণ চোখে চাইল আফিয়ার দিকে। এরপর ছেলের দিকে চেয়ে স্মিত হেসে বলল,


“কিন্তু বুনু আসলে তো তোমার‌ই ভালো। তুমিও কারো উপর শাসন চালানোর ক্ষমতা পেয়ে যাবে। কারো বড় ভাইয়া হয়ে যাবে। কাউকে নিজের কথায় কাজ করাতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা তুমিও গার্ডিয়ান হয়ে যাবে।"


এত বড় কথার মর্মার্থ বোঝার বয়স কী তাইফের হয়েছে?সে বাম হাত দিয়ে কানের লতি টানছে আর ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ছে। তার আবারও সর্দি হল বলে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ