সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১৪১

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_১৪১



[কপি করা/চুরি করা,নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ।দয়া করে এগুলো করবেন না কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন। ধন্যবাদ সবাইকে।]


আব্বাস সাহেব মেয়ের হয়ে নিজে ক্ষমা চান কয়েকবার।এরপরেও মেয়েকে আদেশ করে শ্বাশুড়ি মায়ের হাত ধরে ক্ষমা চাইতে।নূর প্রথমে গাইগুই করলেও বাবার কঠোর দৃষ্টিতে আফিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,


“ আম্মা মাফ করে দিন।আমি তো আপনার মেয়ের মতোই।"


তাতে বিশেষ কোন নম্রতা ছিলো না।পরপর বাবার চোখে চোখ পড়তেই আফিয়ার সামনে বসে পড়ে হাত দুটো ধরে,


“ আম্মা আমি জানি আমার ব্যবহারে আপনি অনেক সময় কষ্ট পেয়েছেন।মুখ দিয়ে বের করা শব্দ তো ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।পারলে আমিও নিতাম। কিন্তু তাতো সম্ভব নয়।তাই বলছিলাম,সেসব মনে রাখবেন না আম্মা।আমি যদিও আপনার সন্তান ন‌ই তবুও তো সন্তানের মতোই। আপনার সন্তান মনে করে না আমাকে মাফ করে দিন।আপনি মুখ ফিরিয়ে রাখলে যাওয়ার জায়গা নেই। আপনি কি নিজের সন্তানকে ঘর ছাড়া করবেন আম্মা?"


মাথা নুইয়ে রাখলো।আফিয়া কথা আর বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে হাত ধরে টেনে তুলল, নিজের পাশে বসার জন্য জায়গা করে দিতে নাইফকে ইশারা করতেই নাইফ উঠে অপরপাশে গিয়ে বসলো।নূরকে নিজের পাশে বসিয়ে বললো,


“ ঐ যে বললে সন্তানের মতো।আসলে শব্দটা ঐখানেই জট পাকায়।হয়তো ভুল তোমার ছিলো সঙ্গে আমার‌ও ছিলো।কারো বেশি কারো কম। কিন্তু ছিলো তো অবশ্যই। তুমি আমার সন্তান নয় দেখেই তোমার সব কথা গাঁয়ে বিঁধছে, সন্তান হলে হয়তো লাগতো'ই না।তবে কি জানো ব‌উমা,আমি একটা কথা সবসময় বিশ্বাস করি শ্বাশুড়ি শ্বাশুড়ি'ই‌ হয়,মা মা‌'ই হয়।আর যে এই সমীকরণ বুঝে চলে তার জীবনে কোন জটিলতা থাকে না।

যাই হোক, আমার তোমার প্রতি কোন ক্ষোভ জমা নেই।সে সব আমি ভুলে গিয়েছি তাই মাফ চাওয়ার দরকার নাই।আর আমার ছেলে মেয়েদের দ্বারা তোমার যা অসম্মান হয়েছে আমি মা হয়ে তাদের সবার তরফ থেকে তোমার হাতে হাতজোড় মাফ চাইছি, তুমি দয়া করে সেগুলো মনে রেখো না। জীবন...


“ আহ্ বেয়াইন কি করছেন? আপনার মাফ চাওয়া লাগবে না।আপনি শ্বাশুড়ি, মায়ের সমতূল্য।....


এই পর্যায়ে আব্বাস সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে আফিয়ার দিকে খানিকটা এগিয়ে এলেন, এরপর ভেজা কন্ঠে বলতে লাগলেন,


“ দেখেন বেয়াইন,বয়স হয়েছে। দীর্ঘ জীবন একাকী কাটিয়েছি।এই মেয়ের সুখের জন্য কোন সঙ্গী আনিনি জীবনে। যাতে মেয়েটার মনে কোন কষ্ট না লাগে।এতে করে একা হাতে অফিস, মেয়ে সামলাতে গিয়ে কত সময় কত জটিলতার মুখোমুখি হয়েছি তা বলে বোঝানো যাবে না। তারপরেও যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি।একাকীই বড় হয়েছে তাই শেখাতে পারিনি কোনটা আমি ঠিক কোনটা ভুল।অন্যের কাছে রেখেছি, তাদের শিক্ষায় যতটা শিখেছে। সেখানে দোষ দেওয়াটা যায় না কাউকে।তাই ....আমার মেয়েটা মা মরা। মেয়েদের সংসার জ্ঞান হয় মা'কে দেখে। জন্মের পর মা পায়নি।

তাই শিখেওনি সংসার আসলে কেমন হয়।এক একা থেকেছে,তাই একাকী জীবনটাই তার কাছে ঠিক লাগে।এখন আপনার কাছে এসেছে, আপনার ব‌উ না, মেয়ে মনে করে তাকে নিজের হাতে গড়ে নিন।আমি এক অসহায় বাবা আপনার হাতে দিচ্ছি, ভুলত্রুটি শুধরে আপনার কাছেই রাখুন।

আর বেয়াই সাহেব, জামাই বাবাজিকে যত মন্দ বলেছি তা এই আমি সবার সামনে দাঁড়িয়ে মাফ চাইছি। মেয়ের কান্নায় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে,দিক হারিয়ে যা মনে হয়েছিল তাই বলে দিয়েছি।আমি ভীষণ লজ্জিত আমার হঠকারিতায়।দয়া করে বয়স্ক মানুষ হিসেবে মাফ করে দিও জামাই বাবা।"


শেষ কথাটা উনি নাইফের কাঁধে হাত রেখে বললেন।নাইফ লজ্জিত দৃষ্টি উঁচিয়ে ইতস্তত করে উঠলো। শ্বশুরের হাতটা খপ করে ধরে শ্বশুরের উদ্দেশ্য বললো,


“ ছি ছি পাপা,কি করছেন।এসব আমি মনে রাখিনি।ইয়া আল্লাহ এভাবে,আমাকে পাপের ভাগীদার করবেন না প্লিজ।"


নাসিফ‌ উঠে বেয়াইয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে নিজের পাশে বসিয়ে বললেন,


“ এসব কথা এখন ভুলে যাই।আমরা আমাদের ব‌উমাকে নিতে এসেছি।নিয়ে যাচ্ছি সঙ্গে আপনিও চলুন।"


” হ্যাঁ ভাইসাব আপনিও চলুন। তাছাড়াও...


আফিয়া একটুও থামলো অতঃপর স্বামী সন্তানের দিকে এক পলক চেয়ে বললো,


“ মেয়ের নতুন সংসার‌ও দেখে আসবেন।"


“ নতুন সংসার মানে, ঠিক বুঝলাম না?"


“ আসলে, বাড়ি চলেন।গেলেই দেখবেন।"


এই পারিবারিক মিটিং শেষ হলো। সেই দুপুর সেখানে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ব‌‌উ নিয়ে বাড়ি ফিরলো।তার দুই দিন পর আব্বাস সাহেব মেয়ের বাড়ি আসলেন চলে যাবার আগে।তিনি বাড়ির বাইরে থেকেই দেখলেন বিল্ডিং উঁচু করার কাজ চলছে। এরপর ভেতরে এসে শুনলেন মূল ঘটনা।উনি ব্যক্তিগত ভাবে ভীষণ ক্ষুণ্ণ হলেন কিন্তু নিজের মেয়ের মুখ দেখে বুঝলেন না আসলেই উনার মতোই উনার মেয়ের মনটা খারাপ হয়েছে কি-না?


মাত্র তিন মাসের মধ্যে উপরের এক তলা উঠানো হলো।পুরো ইন্টিরিয়র শেষ করে সম্পূর্ণ সাজিয়ে দেওয়া হলো এবং তার সবটা নূরের পছন্দের।আফিয়া তাকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়ে বলছে,


“ তোমার সংসার তোমার মতো করেই সাজাও মা।যদি সহযোগিতা লাগে তো ব‌ইলো।"


কিন্তু নূরের ততটা সহযোগিতা তার লাগেনি। বরং সে নিজের কাজিন এবং স্বামীকে নিয়েই যা করার করেছে।কখনো সখনো নাবীহার সহযোগিতা চাইলেও নাবীহা এড়িয়ে গিয়েছে।আর তুহি,তাইফ বরাবরই এড়িয়ে চলে সেই ঘটনার পর থেকে।তবে একেবারে‌ই যে আফিয়ার সাহায্য নেয়নি সেটাও না।ভারি জিনিসপত্র কেনার সময়ে ঠিক‌ই শ্বাশুড়ির সহযোগিতা নিয়েছে।আফিয়াও খুশি মনে তা করেছে।


এরপর ধীরে ধীরে ছোট ছেলের ফ্লোর বানানোর কাজ শেষ করেছে। যদিও তাইফ তাতে ভীষণ চটেছিলো।তাও আফিয়ার সিদ্ধান্ত বদলেনি।


একাকী সংসার করতে গিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে ভাসা নূর প্রথম কয় মাস ভালো থাকলেও ধীরে ধীরে একা থাকার মজা টের পায়।যত‌ই একা থাকার অভ্যাস থাকুক, সংসার জীবনে ভরা সংসারের স্বাদ তার সেই একাকী সহ্য করার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলো।তার চাপ‌ই বোধহয় তার গর্ভে পড়ে। তাতে আফিয়ার মনেও খানিকটা প্রভাব পড়ে কিন্তু তারপরেও কেন জানি আবারও একত্রে থাকার মনোবল তার মরে যায়।সব মিলিয়ে এভাবেই চলছে আফিয়ার সংসার জীবন।


তুহিকে চাপে রাখার বিষয়টি খুব কঠোর হলো।তার মাদ্রাসা যাওয়ার বিষয়টি আসলেই তার বড় ভাইয়ের হাতে থাকলো এবং তাতে কোন বাঁধা থাকার কারণ নেই। কিন্তু তাকে এভাবে গাইড দেওয়ার ফলে সে বন্ধু মহলে হাসির পাত্র হয়ে উঠে।যেটা তাকে কষ্ট দেয়।সে মন মনে দুঃখ পায়। কিন্তু মুখ ফুটে বলার সাহস করে না।এখন তার সময় কাটে ঘরের কাজের পর পড়াশোনা আর মোবাইল ঘেঁটে।


সময় কাটে,দেখতে দেখতে তুহি আঠারো পাড় করে। সেদিন তার ছোট ভাইয়ের আগমন হয় তাকে অভিনন্দন জানাতে।

যদিও জন্মদিন পালনে তারা কেউ আগ্রহী নয় তবুও একমাত্র ছোট বোনের এত বড় দিনে সবাই তার পাশে থাকতে চায়।নাসিফ বরাবরের মতো করেই তার সব সন্তানদের মতো করেই এতিমখানায় আয়োজন করে। শেষ সন্তানের আঠারো হ‌ওয়াতে সে যেন খুশির সাথে দুঃখ‌ও পাচ্ছে। কারণ এমনিতেই বছর ধরে মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসছে আর সে রিজেক্ট করছে।কেন জানি এই বাচ্চা মেয়েটার প্রতি এত এত লোকের নজর পড়ছে। কয়েকদিন পর পর কেউ না কেউ দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যায় প্রস্তাব নিয়ে।


তাইফ বহুদিন পর বাড়ি আসলো,হাতে তার বিশাল একটা ক্যানভাস আর কালার সেট। বোনের জন্য নিয়ে আসছে।নাবীহা অনেক গুলো নতুন পোশাক এনে দিয়েছে।নাইফ পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো,


“ আমাকেও গিফট দিতে হবে?"


তুহি সোফায় বাবু হয়ে বসলো।বড় ভাইয়ের দিকে ফিরে। ঠোঁট টিপে উপর নিচ মাথা দুলিয়ে বুঝালো হ্যাঁ।


“ হুম!"


“ কি লাগবে?"


তুহি নিজের হাতের মুঠোয় থাকা মুঠোফোনটা তুলে ধরে দেখিয়ে বললো,


“ নতুন ফোন!"


নাইফ দেখলো তুহির হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা।পুরানো হয়ে গিয়েছে। অনেক জায়গায় দাগ পড়ে আছে।ভ্রু কুঁচকে ফেললো।পাশেই তাইফ বসে ছিলো।সে বড় ভাইয়ের আগেই থাবা দিয়ে নিজের হাতে টেনে নিলো। নেড়েচেড়ে বললো,


“ নতুন‌ই তো লাগছে। তাহলে আবার কি?"


তুহি নাক ফুলিয়ে চোখ খিচে ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বললো,


“ তুমি তো নতুন দেখবেই।নিজে যে কয়দিন পরপর নতুন ফোন কিনো!"


“ একদম মাথার উপর দিবো।এত কি ফোনে?"


নাইফ চোখ রাঙানি দিলো তাইফকে।তাইফ দাঁত কেলিয়ে বললো,


“ ওকে নতুন দিলে এটা আমি নেই?"


“ কেন তুই ওর ফোন দিয়ে কি করবি?"


“ দেখবো তোমার বোন ফোনে কি করে?"


“ এটা অভদ্রতা তাইফ, ছোট বোনের কে ঘাঁটে?"


“ কিসের অভদ্রতা? এত কি এই পিচ্চি মেয়ের ফোনে? সারাদিন ফোন টিপে!"


“ একা থাকে বান্ধবীদের সাথে..."


” দেখি কেমন বান্ধবী!"


“ না তুমি আমার ফোন ঘাটবে না। তুমি না আর্মির লোক, এগুলো তোমার ম্যানার্স! ছ্যাহ্,দাও আমার ফোন দাও।"


“ না দিবো না,যা!"


তুহি তাইফের মাঝে হাতাহাতি শুরু হয়।তাইফ দেখবেই।নাইফ দিলো এক ধমক।দুই ভাই-বোন‌ই থেমে গেলো।নাবীহা পাশে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি হচ্ছে এখানে?"


“ ওর সিক্রেট ফাঁস করবো।"


“ কিসের সিক্রেট?"


“ দাঁড়াও দেখি।"


তুহির মুখটা ছোট হয়ে আছে।নাবীহা বোনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ এমন কি আছে ওতে? ভাইয়া একটু দেখলে কি হয়?"


” কেন দেখবে আমার ফোন? আমি কি তারটা দেখি?"


“ তুই দেখবি আমার ফোন?নে দেখ!"


বলেই তাইফ নিজের ফোন তুহির দিকে ছুড়ে মারলো।বড় ভাই-বোন দুজন ছোট দুজনের তামশা দেখছে।তুহি বড় ভাই-বোনদের সাপোর্ট না পেয়ে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তাইফ দাঁত কেলিয়ে লক খুলে ঢুকলো।যদিও তার ইচ্ছা নাই ঘাঁটার শুধু ভয় দেখানো ছাড়া। কিন্তু তার আঙ্গুলের চাপ লেগেই মেসেঞ্জারে ঢুকে যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ