সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_সমাপ্ত

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_সমাপ্ত



[কপি করা/চুরি করা, নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ, দয়া করে এগুলো করবেন না কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন। ধন্যবাদ সবাইকে।]


কুঁচকে যাওয়া খসখসা দূর্বল পুরুষালী হাতের ছোঁয়া ভিজে ভিজে উঠছে তার বুজে যাওয়া অক্ষিপটের বারিধারায়। দাপুটে এই পুরুষ সঙ্গীনি বিয়োগে বারংবার শূন্যের উপর নিজের অস্তিত্ব হাঁতড়ে বেড়ায়। বিছানায় উবু হয়ে বসে সাদাকালো ছবির ফ্রেমটা বড্ড আদরে আর আবেশে ছুঁয়ে দিচ্ছে। যতবারই ছুচ্ছে ততবারই হারানোর শিহরণ অঙ্গাদিঙ্গানে ছড়িয়ে যাচ্ছে।কঠোর,কঠিন পুরুষালি বক্ষ ভেদ করে ফুঁপিয়ে বেরিয়ে আসে কান্নারা। ঠিকরে ঠিকরে হাহাকার আর চাপা আহাজারি তার বুকে আকাশসম ভারী পাহাড়ের ন্যায় ঠেকছে।


সামনে তিনটা ছবির ফ্রেম ফেলে রাখা।তিনটা তিন সময়ের চিত্র।তার হাতের মুঠোয় বুকের কাছে আঁকড়ে রাখা ফ্রেমের ছবিটা বিয়ের রাতের।কাবিনের পর স্মৃতি হিসেবে শুধু এই ছবিটাই তোলা হয়েছিল।

কেউ যেহেতু ছবি তোলার পক্ষে নয় তবে বিশেষ মুহূর্তটা ধরে রাখতেই পাশাপাশি বসিয়ে এই একটা ছবিই তোলা হয়েছিল তাদের। ছবিটা সাদাকালো রঙে, এ রকম চিত্র আফিয়ার পছন্দ তাই সে সাদাকালো রঙে ছবিটা বাঁধিয়ে রেখেছিলো যেটা সে সবসময় আলমারির কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখতো।


দ্বিতীয় ছবিটা তুহির কান ফুড়ানোর অনুষ্ঠানে। সেদিন পুরো পরিবার পাশাপাশি বসে ছবিটা নিয়েছিলো যেখানে সালমা ফাওযিয়াহ আর নাযির আহমাদ‌ও আছেন। তৃতীয় ছবিটা সেদিনের...এই তো মাস নয় হলো! তাদের আটচল্লিশতম বিবাহবার্ষিকীর দিনে তোলা হয়েছিল যে। ছবিটা ত্বোহা বাঁধিয়ে দিয়েছিল নানীর জন্মদিন উপলক্ষে। এরপর..... এরপর র‌ইলো কেবল স্মৃতি।যা কাউকে দেখানো যাবে না,বললে বোঝানো যাবে না।এই স্মৃতি এই বুড়িয়ে যাওয়া থকথকে জীর্ণ শীর্ণ বুকটা ধকধক করে অবিরত জানান দিবে কেউ তো ছিল যে নেই এই অবেলায়।কেউ যে ছিলো যৌবনের সঙ্গী,মধ্যমের সহযাত্রী আর বৃদ্ধকালের লাঠি।সে এখন নেই। কোথাও নেই।না বুকের বা পাশে আর না বিছানার বা পাশে।বুকটাকে খালি করে বিছানায় একাকীত্ব রেখে সে নিরবে চলে গিয়েছে আপন ঠিকানার খোঁজে।সে রয়েছে তার ঘরে বহুদূরে, রয়েছে নিরাশার দুনিয়া ছেড়ে নিরালায় একাকী লেনদেনের ঘাটে।


নাসিফের ফুঁপিয়ে কাঁদার দরুন রোগা শীর্ণ দেহখানা বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে।না সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছে আর না পারছে।তার শূন্যতা, একাকীত্বের সঙ্গী এখন কেবল এই অশ্রুরাই।তাকে কাঁদতে কেউ বাঁধা দেয় না,কেউ তার নির্ঘুম রাতের কারণ খতিয়ে বেড়ায় না।কেউ তার ভরসন্ধে রাতের একাকী নির্জনতার পথচারী হ‌ওয়ার জন্য কৈফিয়ত চায় না।


একটু পাশে অন্য একটা খোলা ছোট ছবি, সেটার দিকে তাকাতেই নাসিফের বুকটা আরো ফাপড়ে উঠলো।ছবিটা সেবার বেড়াতে যাওয়ার পর,তখন তারা সাজেকের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মেঘের সাথে ভাব জমাচ্ছিলো, তখনই কোথায় থেকে এক তরুণ ছুটে এসে বলতে লাগলো,


“ হেই লাভ বার্ডস,ক্যান আই ক্যাপচার্ট এ্যা পিক বোথ অফ ইয়্যু! ইয়্যু লুকস লাইক আ্য লাভিং কাপল বার্ডস!"


হয়তো ছেলেটা সদ্য পাওয়া ক্যামেরায় কারো বিশেষ মুহূর্ত আঁটকে রাখার তীব্র মনোবাসনা থেকেই এহেন আবদার করে বসে।আফিয়া ছেলেটার কথায় লজ্জায় জবুথবু হয়ে নাসিফের পিঠ ঘেষে মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।অথচ নাসিফ তখন‌ও তার আঁচল ছাড়েনি।সে এই আঠারো কি উনিশ বছর বয়সী ছেলেদের দিকে হাসি হাসি মুখে চেয়ে প্রত্ত্যতুরে বলেছিল,


“ কিন্তু আমি চাই না। তাছাড়াও আমি আমার স্ত্রীকে অন্যের ক্যামেরায় বন্দি দেখতে পছন্দ করছি না।"


“ ওহ, ইটস ওকে।তবে আমি আপনাদের দিয়ে দিতাম।রাখি না, আসলে আপনাদের একসাথে সুন্দর লাগছে ইভেন এই মুহূর্তে....আই থিংক আপনারা নিউলি ম্যারেইড কাপল,এ্যাম আই রাইট?"


“ ইয়াহ,ইয়্যু রাইট বাট! ইফ ইয়্যু ওয়ান্ট ইউ ক্যান ইউস মাই ক্যামেরা এন্ড মাই লেন্স!"


“ রিয়েলি, হ্যাভ ইয়্যু!ওকে শো মি,এন্ড আই উইল ট্রায়িং মাই বেস্ট!"


নাসিফ আফিয়াকে পিছন থেকে জড়িয়ে রেখে ওর গাল ধরে টানাটানি করছিলো,ছেলেটা সেটা দেখেই দৌড়ে এদিকে আসে। এবং এই ভাবেই দাঁড়াতে বলে। কিন্তু ক্যামেরায় ক্লিক করার মুহূর্তে আফিয়ার হিজাব ভেদ করে কিছু চুল বেরিয়ে বাইরে চলে আসে যেগুলো বাতাসের কারণে চোখেমুখে আঁছড়ে পড়ে আর আফিয়া সেগুলো থেকে সরতেই চোখ বুজে মাথা ঝাঁকিয়ে পিছনে ফিরতেই নাসিফ ওর দিকে মোহনীয় নজরে তাকিয়ে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রয়, আঙ্গুল দিয়ে চুল সরাতেই আফিয়া চোখ মেলে তাকায়,আর একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দেয় ঠিক সেই মুহূর্তটাই ছেলেটা ধরে রেখেছিলো। যেখানে দেখা যাচ্ছে নাসিফের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি আফিয়ার ডান গালের উপর আর বাকী চার আঙ্গুল আফিয়ার থুতনি আগলে ধরে রেখেছে, ঐদিকে আফিয়া নাসিফের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে আর নাসিফ‌ও মুচকি মুচকি হাসছে। ঠোঁট দুটো ছুঁই ছুঁই, চোখে চোখ আর অনিন্দ্য সুন্দরী প্রকৃতির উচ্ছ্বাস। দু'জনের মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। একটা রোমান্টিক হ্যাপি নিউলি ম্যারেইড কাপলের প্রথম মধুচন্দ্রিমার স্মৃতি হিসেবে নাসিফ আজীবন নিজের বুকপকেটে এটা সযতনে রেখে দিয়েছিল।যা এখন তাকে বাঁচায়, প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি ক্ষণে।

তার পরপর‌ই তো খবর পেয়েছিলো,সে তৃতীয়বারের মতো সন্তান সুখ লাভ করছে।সে বার!


ভাবতেই নাসিফের দৃষ্টিতে ভেসে উঠলো,সেই বীভৎস সময়ের স্মৃতি। যেখানে সে সন্তান গর্ভে ধারণ করার অপরাধে কতটা জালিম হয়ে গিয়েছিল! সে নিজের গর্ভবতী স্ত্রীকে ভয়াবহ অপমান, অপবাদ, লাঞ্ছনা গঞ্জনা শুনিয়েছিলো। নিজের সন্তানকে খুন অবধি করতে চেষ্টা চালিয়েছিল, গর্ভবতী স্ত্রীকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য পর্যন্ত করেছিলো।


হাসপাতালে মৃত্যু শয্যায় শায়িত সদ্য প্রসব সম্পন্ন করা স্ত্রীকেও দেখতে যায়নি। অর্থনৈতিক কষ্ট, সামাজিক কষ্ট কত কি সহ্য করেছিলো সেই সময়ে। এছাড়া‌ও কত সময়ে কত কারণে,অকারণেই তো কটু কথা বলেছিলো।অথচ আজ...নেই সেই মানুষটা।যার উপর তার সব জুলুম অবধারিত ছিলো।আজ কোথায় সে?


নাসিফের বুকে ব্যথা অনুভব হচ্ছে। কান্না করতেও শ্বাসে টান লাগছে।সে ফ্রেমটা বুকের সাথে চেপে রেখেই নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। ঠিক তখনই তার মুঠোফোনটা বেজে উঠলো।

চোখটা ডান হাতের পাঞ্জাবির কাপড় দিয়েই মুছে নিয়ে অনেকটা কষ্ট করে হিচড়ে হিচড়ে নিচে নেমে ড্রয়ারের উপর থেকে মোবাইলটা নিলো।তাইফের ফোন।


এর মধ্যেই দু'বার কল ঢুকেও কেটে গিয়েছে।কল ব্যাক করার জন্য বাটনে চাপ দিতেই তৃতীয় কলটা ঢুকলো।নাসিফ ইদানিং কানে কম শুনে।তাই ফোনের শব্দ উচ্চ তরঙ্গেই দিয়ে রাখে। ঠিক সেই কারণেই এই পাশে সবটা সবাই শুনতে পায়।


“ বাবা আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছো?"


ছোট ছেলের গলার স্বর শুনে ধিম আওয়াজে মৃদু শব্দ উচ্চারণ করে বললো,


“ হ্যা,আ.. ওয়ালাইকু আসসালাম, আলহামদুলিল্লাহ! তোমরা কেমন আছো?"


বাবার কথা বলার ধরণ,আর নিঃশ্বাস ত্যাগের শব্দেই তাইফ বাবার হাল বুঝে নিলো। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বললো,


“ বাবা, ড্রাইভার গিয়েছে। তোমার ব্যাগ মিনহাজ তৈরি করে দিয়েছে।দয়া করে কোন মর্জি না করে সোজা গাড়িতে গিয়ে বসো।আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি বাবা।"


ছেলের কথায় যথেষ্ট শ্রদ্ধা, সম্মান, আবেগ। কিন্তু এসব নাসিফকে এখন আর ছোঁয় না। বরং বিরক্ত লাগে।সে ছেলের উপর ত্যক্ত তা বোঝাতেই বোধহয় এবার খানিকটা তেজি গলায় বলতে চেষ্টা করলো,


“ বলছি না আমি কোথাও যাবো না।আমি আমার বাড়িতেই মরতে চাই , তোমাদের ওসব মানবশূন্য আলিশান বাড়িতে আমার মরতেও কষ্ট হবে।"


“ বাবা,এসব বলতে হয় না।কেন জেদ করছো? বুঝতে পারছো না কেন তোমার শরীর ভালো না। ডাক্তারের কাছে এপোয়নমেন্ট নেওয়া হয়েছে,ভাইয়ার সাথে আমার কথা হয়েছে,এখানে তোমার নাতীরা, তোমার আদরের একমাত্র ভাগ্নি সবাই ওয়েট করছে।চলে আসো প্লিজ!"


“ আর এখানে তোমার আম্মু ,তোমাদের আম্মা অপেক্ষা করছে! সেই বেলায়!"


তাইফ এবার খানিকটা চেঁচিয়ে শাসনের সুরে বললো,


“ বাবা প্লিজ, এভাবে বলতে হয় না।কেন তুমি বুঝতে পারছ না। কতবার বলেছি আম্মু নেই, আম্মু নেই আমাদের।

বাবা একটু বুঝে নিজেকে সামলাও। আল্লাহর দোহাই লাগে,এমন করলে কিভাবে আমরা তোমাকে বাঁচানোর যুদ্ধ করবো? আমাদের কথাও একটু ভাবো আল্লাহর দোহাই লাগে!"


অতশত বোঝার দায়ভার দায়িত্ব নাসিফের এখন আর নাই,সে জেদ দেখিয়ে নিজের কথার‌ই পূনরাবৃত্তি ঘটায়,


“ আমি কোথাও যাবো না। তোমার ড্রাইভারকে বলে দাও,আমি কোথাও যাচ্ছিনা।ওকে বল দুপুরে খেয়ে চলে যেতে।"


নাসিফের জেদের কাছে এখন সবাই অসহায়।চোখে ভালো দেখতে পারে না, কানেও কম শুনে ইদানিং। হাঁটতে ঠিকঠাক শক্তি ব্যয় করতে পারে না।তাই ছেলেরা চায় তাদের কাছে নিয়ে রাখতে কিন্তু নাসিফ এই বাড়ির বাইরে যাবে না।কারণ তার বক্তব্য অনুযায়ী আফিয়া এখানে সবসময় আসে।এখন যদি সবসময় ঘর শুন্য পায় তখন সে কি করবে? কে মৃত ব্যক্তির মনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে?


তাইফ ফোন কেটে দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে নিজের অসহায়ত্ব জানান দেয়।তার কি বা করার আছে? তাদের বিরহ হয়তো বোঝা যায় না কিন্তু তার বিরহ!

মাতৃ বিয়োগ সন্তানকে এতিম করলেও শেষ বয়সে সঙ্গিনী বিয়োগ পুরুষকে করে নিংস্ব।আর সেই সঙ্গিনী যদি হয় জীবনসঙ্গী,প্রেমিকা স্ত্রী!


যৌবনে পুরুষের যতটা না নারীর সঙ্গ দরকার, বৃদ্ধ কালে তার চেয়েও বেশি নারীর উপস্থিতি দরকার।যার নাই সেই বোঝে জীবনের প্রকৃত অর্থ।


স্বামী মারা গেলে স্ত্রী নিজের জীবন সন্তানদের ছায়ায় কাটিয়ে দিতে পারলেও এই বিষয়ে পুরুষদের জীবন হয় ভয়ানক নিঃসঙ্গ, একাকীত্ব আর অবহেলার।তারা দায়বদ্ধতার ছায়ায় থাকতে চায় না।তারা নিজর পৌরুষের কাছে হার মানতে পারে না।তারা পারে না নিজ ঔরসের অধিনস্ততা মেনে নিতে।


🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍


নাইফ বাড়ির দরজায় পা রেখেই জোরে সালাম দিলো।বেশ কিছু সময় নিরবে দাঁড়িয়ে রইল।আ‌জও সে অভ্যাস থেকে বের হতে পারেনি। তার সালামের বিপরীতে একজন মানুষ সালাম দিতে দিতে এদিকে এগিয়ে আসতো। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে‌ই ,


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম বাবা,চলে আসছো তুমি।যাও তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হ‌‌ও, এরপর আরাম করো।"


এতগুলো মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সে এক‌ই ভাবে দাড়িয়ে থাকে। অলৌকিক ভাবে কিছু একটা পাবার আশায় কিন্তু তা তো হবার নয়।

যে যায় সে আর আসে না।নাইফের কাঙ্ক্ষিত আপন মানুষটাও আর আসবে না,তো।


নাইফ জোরে আরো একবার সালাম দিলো।কারণ ভেতরে এখন যে আছে সে আজ অনেক মাস ধরেই কানে কম শুনে।তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বললেও চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলতে হয়,নচেৎ কোনটাই কর্ণগুহর হয় না।


“ বাবা, আসসালামু আলাইকুম!"


কয়েকবার সালামের পর নাসিফের কানে ঢুকলো। ততক্ষণে নাইফ বাবা মায়ের ঘরে ঢুকে পড়েছে। নাসিফ তখন নিজের ঘরের আরাম কেদারায় বসে বারান্দার শূন্যতা মাপছে বোধহয়।নাইফ বাবার পিছনে দাঁড়িয়ে বাবার কাঁধে হাত রাখতেই সে চমকে পিছু ফিরলো।বিস্মিত চাহনি মেলে জিজ্ঞেস করলো,


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,কখন আসলে তুমি?"


“ অনেক সময় হয়েছে বাবা, তোমাকে অনেকবার আওয়াজ দিয়েছি।শোনোনি তুমি!

যাই হোক, কি করছো এখন?"


“ কি আর করবো? মৃত্যুর প্রহর গোনা ছাড়া আমার আর কোন কাজ এখন অবশিষ্ট আছে?"


“ বাবা প্লিজ! সারাদিন এভাবে!"


“ আশ্চর্য, তোমরা ভাইবোনেরা এমন ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাও যেন মানুষ অমর! কখনো মরে না।"


“ মরে বাবা।সবাই মরবে তাই বলে সবাই দিন দুনিয়া ভুলে মরার জন্য ঘরে পড়ে থাকে না। সারাদিন মৃত্যু চেয়ে জিকির করে না।"


“ সে যারা চায় না তারা নিষ্ঠুর।প্রিয় মানুষকে একা রেখে নশ্বর দুনিয়ার আলো বাতাস যার বেশি প্রিয় সে করে না স্মরণ। কিন্তু আমার মতো হবে হারানো মানুষের জন্য বাচাই বড় যুদ্ধ,বড় মরণ।"


“ বাবা!

মা আমাদের সঙ্গেই আছে,তুমিই বলো।

আচ্ছা তাইফের কাছে গেলে না কেন? সারাদিন এভাবে গৃহবন্দি কেউ থাকে? একটু আধটু বাইরে বের হলে মন ফ্রেশ থাকে বাবা,তার জন্য হলেও তো যেতেই পারতে কিন্তু না গেলে না।আবার কিছু হলেই আমাদের আম্মুকে দোষারোপ করো।এটা কি ঠিক বলো?"


“ দোষারোপ করবো না কেন বলো তো?

তোমার মাম্মা, তোমাদের সেই শিশু রেখে চলে গেল।আমাকে কত ভয়ানক নিঃসঙ্গতায় ফেলে সে দিব্যি চলে গেলো। এরপরে আসলো তোমার আম্মু!

একটা নিঃস্ব,শূন্য খাঁচার মতো একাকীত্ব বয়ে বেড়ানো পুরুষকে আঁচলের মায়ায় আঁটকে ফেললো।সে আমাকে তার প্রেম কায়ার বাঁধনে এভাবে আটকালো যে আমি ভুলেই গেলাম কখনো কারো মায়ায় আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। তোমার আম্মু আমাকে এতটা দিয়ে জাগিয়ে তুললো যে আমি তোমার মাম্মা, যাকে এককালে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম যাকে হারিয়ে আমি নিজের মাঝে ঘুমিয়ে পড়লাম, পৃথিবীর সব মোহমায়া থেকে মুক্তি নিলাম, জীবন্ত লাশ হয়ে শুধু বাক্সের একটা দেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম ঠিক সেই সময়ই সে আসলো আর আমাকে ভুলিয়ে দিলো সকল বেদনা, যন্ত্রনা, নিঃসঙ্গতা আর হারানোর হাহাকার.. সব ভুলিয়ে দিলো।

__তোমাদের মানুষের মতো মানুষ করলো, আমার সংসার বড় করলো। দিনরাত আমাকে নিয়ে তার শতসহস্র অনুভূতি সাজানো।.... বুঝবে না তোমরা আমার যন্ত্রনা।আমি যে সাধ্যি রাখি না তাকে ছেড়ে অদূরে একা থাকার। আমাকে যে এখানেই থাকতে হবে, তাকে নিয়ে ভাবতে হবে তার সঙ্গে আবারও সাক্ষাৎ করার প্রস্তুতি নিতে হবে।"


“ বাবা, আম্মুর সাথে দেখা করতে চাও? তবে নিয়মিত খাওয়া দাওয়া ঠিক করে করো।নয়তো আম্মুর কাছে নিয়ে যাবো না, তোমার জন্য আম্মুর কাছে বকা খেতে পারবো না।"


এই কথার প্রত্যুত্তরে নাসিফ কিছু বললো না। ওভাবেই চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো।বয়স হয়েছে ,এত বয়স! লাঠির সাহায্য ছাড়া এখন দাড়াতেও পারে না।তাকে নিয়ে ছেলে মেয়েদের এত দুশ্চিন্তার কারণ বুঝে।মা হারানো সন্তান,যত‌ই বয়স হোক,বুড়ো হোক মায়ের দরকার আজীবন।শতবর্ষী মানুষের কাছেও জিজ্ঞেস করলে শুনতে পাওয়া যাবে, পৃথিবীতে মায়ের প্রয়োজন এখনো তার জন্য কতটা জরুরি।মা! মা ছাড়া সন্তানের সবটা শূন্য,সেই সন্তান এক বছর বয়সী হোক কিংবা পঞ্চাশ অথবা শত বছর! মা সব বয়সের সন্তানের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।যার প্রয়োজন মৃত্যু অবধি অবর্ণনীয়।

নাইফ বাবার উপর পিতৃসুলভ আচরণ করে নিজেই হাসে আবার নিজেই কাঁদে,মনে মনে!আম্মু কোথায় থেকে বকবে? আম্মু তো কথাই বলে না কত মাস হয়ে গেল।কি আশ্চর্য না! যে যাই করতো,বকা সেই নাইফকেই খেতে হতো,কারণ? নাইফ আম্মুর বড় সন্তান,বড় ভরসার জায়গা ছিলো।আম্মু যে বলতো,বড়রা যা করে ছোটরা তা অনুসরণ করে চলে। সুতরাং ছোটদের ভুলের শুরু বড়দের থেকেই হয়,তারা করে দেখানো ভুল পথেই ছোটদের অনুকরণের পথ দেখিয়ে দিয়ে যায়।

তাই ছোটদের ভুলের মাশুল বড়দের দিতেই হবে।


________________________________


পিছনের বারান্দার বাগানের গাছে নাসিফ পানি দিচ্ছে, স্মৃতির কাতারে হাতিয়ে বেড়ানো বহু মুহূর্ত এই বাগানকে ঘিরে রয়েছে।এই যে সামনে লাগানো নতুন লাউ চারা গজিয়েছে,ওধারে বেষ কিছু কলমি আর লালের ডগা মাথা জেগে উঠেছে এগুলো সব....সব যাবে ছেলে মেয়েদের বাড়িতে। নাতি নাতনিদের জন্য।নাতী নাতনিদের গ্রামের বিষমুক্ত শাক সবজির স্বাদ নেওয়াতে আফিয়ার কমতির খামতি ছিলো না।এটা ঐটা লাগিয়ে তার ফল,সবজি, ঔষধি পাতা পাঠিয়ে দিতো ছেলে মেয়েদের বাসায়।সারা বছর একজন কৃষাণির ন্যায় এসব করতো।ঐ পাশে বড় করে খোয়ার করেছে, সেখানে দেশি মুরগি হাস পালন করতো‌।তা অবশ্য এখন বন্ধ।কে করবে এগুলো? নাসিফের তো নিজের‌ই জান চলে না।এই বাগাধ পরিচর্যা করে তাতে তার ভীষণ কষ্ট হয়। কিন্তু হাঁস মুরগির পিছনে ছুটার মতো শক্তি এখন আর কোথায়?নাসিফের পক্ষে সম্ভব হলে আফিয়ার সবটা বুক দিয়ে আগলে রাখতো। কিন্তু তা দৌরাত্ম্যে এই অবধিই, তাছাড়াও ছেলে মেয়েরা ভীষণ ক্ষেপে যায়।তুহিটা তো এই বয়সে এসেও বাবার সাথে রাগ করলেই গাল ফুলিয়ে থাকে।তার বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই।


সপ্তাহে অন্তে একটা দিন আসবে,এসে তার সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে যাবে। রান্নাবান্না করে খাইয়ে যাবে, বিকালে বাইরে হাঁটতে নিয়ে যাবে। মায়ের গাছের,বাগানের পরিচর্যা করবে। অতঃপর! রাত হতেই নিজের সংসারে ফিরে যাবে।

বড় মেয়েটা তার জন্য একটি ক্লিনিকের পার্ট টাইমের কাজটা ছেঁড়ে দিয়েছে। সপ্তাহে একদিন ঐটাতে বসতো।সেই দিনটা সে বাবাকে দেয়, তাছাড়াও শুক্রবার আসার চেষ্টা করেই।সেও বাবার ছোট থেকেই বড় সকল প্রয়োজন এখানে এসেই দেখে যায়। নিজের হাতে খাইয়ে দিবে, পাঞ্জাবি পরিয়ে গাঁয়ে আতর মাখিয়ে দেয়।নখ কেটে দেয়।


নাইফের যতনে ত্রুটি নেই।ব‌উ হিসাবে বড় ব‌উ‌ও যথেষ্ট করে।ছোট ব‌উমাও।নাইফ বাবার চুল দাড়ি কাটানোর জন্য লোক বাড়ি নিয়ে আসে। নিজের বসে হাতের পায়ের নখ কেটে দেয়।


কিন্তু আত্মগ্লানিতে ভুগে তাইফ।তার পক্ষে তো হুটহাট এদিকে ওদিকে চলে যাওয়া বা আসা সম্ভব হয় না।অত বড় পদে রয়েছে,সে কি চাইলেই পারে যেথাসেথা একাকী ছুটতে? তাই তো সে সব ভাইবোনের মতো বাবাকে চাইলেই ছুঁয়ে দিতে পারে না।তার নির্দিষ্ট দিন লাগে,সেই যে মাস তিন হলো ছোট ছেলেটার মুখ দেখেছে, এরপর তো শুধু কন্ঠ শুনেই মনকে শান্ত রাখছে।


লাল শাকে ক্ষেতে আগাছা পড়ে রয়েছে, কিছু শুকনো মরমরে পাতাও আছে।কোমর নুইয়ে সেগুলো তুলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে হাঁক দিলো,


“ মিনহাজুল হক!"


পুরো নাম ধরেই ডাকে, মিনহাজ নামটি লোকটা ছুটে এগিয়ে আসলো।


“ চাচা কন!"


“ এগুলো পরিষ্কার করো।"


লাঠি দিয়ে দেখিয়ে দিলো। মিনহাজ যুবকের চেয়ে একটু বেশি মধ্যমের চেয়ে একটু কম বয়সের পুরুষ।তার দায়িত্ব নাসিফের সার্বক্ষণিক দেখভাল আর যত্ন করা।কথা বলার সঙ্গী হ‌ওয়া।গোসল করানো,খাওয়ানো ঘুম পাড়ানোর কাজটা নাইফ নিজেই করে। সুন্দর করে গা ঢলে ঢলে গোসল করায় সে তার বাবাকে। বাচ্চাদের মতো আদর করে মাথা টিপে,হাত পা টিপে দিয়ে ঘুম পাড়ানোর কাজটা করে। চাঁদ‌ এখন নিচেই থাকে দাদার সঙ্গী হয়ে।তার বাবার রুমটা এখন তার রুম। পড়াশোনার পাশাপাশি তার প্রধান দায়িত্ব দাদার খেয়াল রাখা।


এখন সে স্কুলে আছে। আজ আবার তুহি আসবে..সে আসলে একগাদা খাবার রান্না করে আনবে। পরিমাণে অল্প আনে কিন্তু অনেক পদ আনে।কারণ তারা কেউ বাবাকে বাসি খাবার খাওয়ায় না।কাজের মেয়েটার উপর স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,


“ তিন বেলা গরম রাঁধবে,বাবাকে খাবার ঠান্ডা করে পাশে দাঁড়িয়ে খাওয়াবে।কারো আশায় বসে থেকে আমার বাবার খাওয়ার সময় পেরিয়ে খাওয়াবে না।"


যদিওবা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কাজের লোকের উদ্দেশ্যে তবু কাজটা নূর হাসি হাসিই করে। বৃদ্ধ শ্বশুরের সেবা করতে পিছ পা হয়না।তবে সে এখন‌ও উপরেই থাকে। যদিও বা আফিয়া বলে গিয়েছে তার মৃত্যুর পর এই নিচের অংশে নাইফ নিজের স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকতে পারে।যেন এই ঘরটা কোনদিন মানবশূন্য না থাকে। খাঁ খাঁ না করে।

মায়ের শেষ কথা অনুযায়ী নাইফ নিজের প্রকৌশলী বুদ্ধি খাটিয়ে ভেতর দিয়েই উপরে সিঁড়ি উঠিয়েছে।যেটার কারণে এখন এই বাড়িটা অত্যাধুনিক তিনতলা বিল্ডিং বলা যায়।


সেই জন্য নূহার এখন উপরনিচ করতে সুবিধা হয়,দাদার কথা বলার সঙ্গী হতেও সমস্যা হয় না। এক্ষেত্রে মিনহাজের দায়িত্ব শুধু বাইরেই সীমাবদ্ধ।তার অন্দরে ঢোকার অনুমতি নেই।


নাসিফ লাঠির সহযোগিতা নিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছে আর মিনহাজের কাজ দেখছে।তার সঙ্গে সঙ্গে অতীতে ডুব দিলো।সময়টা তখন মধ্য দুপুর....


কচি ডাঁটা শাক তুলে একত্রে অনেকগুলো আঁটি বাঁধে আফিয়া।নাসিফের তখন চোখের ছানি অপারেশন হয়।সে রোদ চশমা চোখে এঁটে চেয়ারে বসে আফিয়ার কাজ দেখতে দেখতে বললো,


“ এক কাজ করো এগুলো নিয়ে নিজেই যাও‌।ছোট ছেলেটা কত করে বলে মা বাবা তার বাড়িতে গিয়ে থাকে না। এমনিতেই তো তোমার ছোট ছেলের মাথায় সবসময় আজগুবি চিন্তা ঘুরপাক খায়, তাকে নাকি আমরা কেউ ভালোবাসি না।"


আফিয়া হাসলো মৃদু শব্দে, অতঃপর একটু ভেবে বললো,


“ আপনিও চলেন।আমি তো যাইই,আপনি গেলে বাচ্চা গুলাও খুশি হবে।এই সুযোগে ছেলের সাথেও অনেকদিন সময় কাটাতে পারবেন!"


“ বাড়িঘর খালি রেখে বুড়োবুড়ি দুটোই চলে গেলে এসব আগাছা দেখভাল করবে কে? বাড়ি তো এখন বাড়ি নেই,পুরো সবজি ক্ষেতে পরিণত হয়েছে।"


“ তাই তো তাজা সবজি,শাক, ফলমূল খেতে পান।নয়তো পঁচা বাসি খেতে হতো।"


আফিয়া কথা বলছে আর ডাঁটা গুলো একত্রে বেঁধে উঠার চেষ্টা করছে,নাসিফ তা দেখে বললো,


“ সাবধানে উঠো, তোমার এভাবে উঠবস করা বারণ না?"


বলতে বলতেই আফিয়া বুকে হাত চেপে তিরিশ সেকেন্ডের ন্যায় থম মেয়ে দাড়িয়ে রয়।নাসিফ তা দেখেই লাঠির উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো, ব্যতিব্যস্ত হয়ে তড়িৎ গতিতে আফিয়ার পানে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি কি হয়েছে? আবার‌ও বুকে ব্যথা উঠেছে? কতবার বললাম এমন করে উঠবস করো না বুকে চাপ লাগবে,চাপ লাগবে।সে শুনলেই না আমার কথা! আসলো দেখি এদিকে!"


“ কিছু্ই হয়নি, শান্ত হোন। শুধু....


“ কিছু হয়নি! না হলে এভাবে কেন ছিলে?"


“ বললাম তো তেমন কিছু হয়নি। শুধু একটু শ্বাস টান লাগছিলো,বোধহয় অনেক সময় এসব ধুলোবালির মধ্যে থাকায় তা নাকে ঢুকে পড়েছে আর তাতেই শ্বাস নিতে...দম আঁটকে আসছিলো শুধু আর কিছু নয়।আপনি শান্ত হোন।এত দৌড়ঝাঁপ করিয়েন না।চোখের ঘা কিন্তু এখনো শুকায়নি মনে হয়।"


“ আমার তেমন কিছু হবেনা।তুমি আসো।"


ডান হাতে লাঠি আর বাম হাতে আফিয়ার ডান বাহু শক্ত করে ধরে ভেতরে টানতে থাকলো।আফিয়াও তাল মিলিয়ে স্বামীর সঙ্গে ভেতরে গেলো। ঐদিকে বিশাল মোটা আঁটি বাঁধা ডাটা শাক গুলো ওভাবেই পড়ে রইলো সেখানে।


সেদিন বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলো,রাত ঘনিয়ে আসলো। চারদিকে তখন তাপমাত্রা নিম্নাঙ্গে স্পর্শ করছে, অথচ আফিয়ার গাঁয়ের তাপমাত্রা তরতর করে বৃদ্ধি পেতে থাকলো।বাড়তে বাড়তে তা ১০৩° ডিগ্রীতে গিয়ে উঠলো। হঠাৎ বিনা আমন্ত্রণের জ্বর আর গাঁ ব্যাথায় ককিয়ে উঠছে আফিয়া। মৃদু শব্দ তুলে নিজের কষ্ট জানান দিচ্ছে।নাইফ বেশ রাত অবধি মায়ের পাশে ছিলো,তার সঙ্গে তার দুই সন্তান সহ স্ত্রী।তখন‌ই আফিয়া বলেছিল নাইফ চাইলে তার স্ত্রী পুত্র কন্যাকে নিয়ে নিচে নিজের ঘরে থাকতে পারে।জ্বর গাঁ ব্যথা নিয়েও আফিয়া এশারের সালাত আদায় করে নিলো বসে বসেই।অতঃপর নামাজ শেষ করে ব্যাথায় কাতর আফিয়া ছেলের সেবায় যখন আরামবোধ করে ঘুমিয়ে পড়েছে ঠিক তখনই নাইফ বাবার থেকে অনুমতি নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে যায়।


নাসিফ বিছানায় ঘুমে অচেতন অসুস্থ স্ত্রীর একপাশে জায়নামাজ বিছিয়ে বসেই তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করে নেয়। অনেক সময় নিয়ে দোয়া ও দরুদ পাঠ করে সহধর্মিণীর জন্য সেফা কামনা করে।এই সময়ে আফিয়ার গোঙানির আওয়াজ শুনে মোনাজাত শেষ করে স্ত্রীর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জানতে চায়,


“ কি খুব খারাপ লাগছে?"


আফিয়া মাথা দুলিয়ে বোঝায়,না। আবারও নাসিফ জিজ্ঞেস করে,


“ পানি খাবে? কিছু একটা খেতে আনবো? রাতে তো খেলেও না কিছু,এখন খাও।ভালো লাগবে! জ্বর কেমন দেখি!"


বলেই কপালে,গালে হাত ছুঁয়ে দিলো। এখন তাপমাত্রা খানিকটা কম।নাসিফ যেন নিশ্চিত হলো।সে আফিয়ার কপাল থেকে হাত সরিয়ে গুটিয়ে নিলো। অতঃপর আফিয়াকে আবারও জিজ্ঞেস করলো,


“ কি বলতে চাইছো?"


কানটা আফিয়ার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলো। অবিরত ঠোঁট নড়াতে থাকা আফিয়ার অসুস্থ ,রুগ্ন কন্ঠ ভেদ উচ্চারিত হলো,


“ নামাজ পড়বো!"


“ নামাজ পড়বা? সে তো ভালো কথা।পড়ো তবে!

দাঁড়া‌ও আমি পানির ব্যবস্থা করি।"


নাসিফ ভীষণ খুশি।আজ বহুদিন পর তার স্ত্রী তার সঙ্গে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করবে।নানা রোগে আক্রান্ত আফিয়া কড়া ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তাহাজ্জুদের সালাত সবসময় আদায় করতে পারে না।তাই হয় তো এশারের পরপর‌ই আদায় করে নেয় নয়তো বাদ যায়। সবসময় মাঝ রাতে উঠে নাসিফ একাই তাহাজ্জুদ আদায় করে।তাই আজ এত খুশি লাগলো।সে নিজের সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়ে লুঙ্গির কোছ শক্ত করে গিঁট দিলো। অতঃপর ছুটলো এই সংগ্রামের বিজেতা হবার নেশায়।

সে বড় প্লাস্টিকের পাত্র আর আফিয়ার সকল প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে এলো।


আফিয়া অনেকটা কষ্ট করে চেয়ারে বসে ওযু করলো অতঃপর নামাজ। এভাবে সময় কেটে যায় অনেকটা, তখন সময় পৌনে পাঁচটা অর্থাৎ পাঁচটার কাছাকাছি।সে‌ইটুকু সময়েই নানা গল্পের ছলেই আফিয়া নিজের জীবনের অনেক অতৃপ্ত কিছু স্বপ্ন, পাওয়া না পাওয়ার গল্পের ঢালা মেলে দেয়।এসব করতে করতেই আফিয়া হঠাৎ করেই নাসিফের হাত ধরে মাফ চায়, অতঃপর পানির জন্য অনুনয় করে।নাসিফ পাশ থেকে নাইফের ভরে রাখা বোতল থেকে পানি পান করায়।আফিয়া পানি পান করে হাসলো। ঠোঁটের কোনে পরিপূর্ণ এক হাসি ফুটে উঠে।সে সেই হাসি বজায় রেখেই বলতে লাগলো,


“ মাফ করে দিয়েন আপনার অবাধ্য হয়ে আপনার আগেই চলে যাচ্ছি বলে। আপনার জন্য জান্নাতে অপেক্ষা করবো। আসবেন কিন্তু! আপনি কিন্তু কথা দিয়েছিলেন আমাকে ছাড়া আর কাউকে জান্নাতে চাইবেন না,হুরদের‌ও না।আপনি কিন্তু কথার বরখেলাপ করবেন না। হ্যাঁ! আল্লাহ আপনাকে দেখে রাখবে ইনশাআল্লাহ,ফি আমানিল্লাহ্!

_লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ!"


শেষ করেই চোখ বুজে গা এলিয়ে দেয় জায়নামাজের উপরেই।নাসিফ নিজের পুরুষালি লোমশ হাতের মুঠ আর ছেড়ে দেওয়া নিস্তেজ হাতের কব্জি দেখছে।যেটা একটু আগেই তার হাত ছেড়ে দিয়ে দিব্যি নেতিয়ে পড়েছে।অথচ কথা ছিলো একসাথে অনেকদূর হাঁটবে এই হাত ধরেই,তবে এখন কিভাবে কি হবে?

নাসিফের উত্তর আফিয়া শুনলো কি-না বোঝা গেলো না, কিন্তু নাসিফ বলেছিলো,


“ ইনশাআল্লাহ!"


“ হাইয়্যা আলাল ফালাহ্....

ফজরের আযানের ধ্বনি চারদিকে প্রতিধ্বনি তুলছে।নাসিফ নিজের ডান হাতের তালু মেলে দিয়ে আফিয়ার চোখ দুটো ভালো করে বন্ধ করে দেয়।নিস্তেজ হাসি হাসি মুখটা দেখতে দেখতে বিরবির করে বললো,


“ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন!"



সমাপ্ত.......


আপনাদের অনেকের অপেক্ষার অবসান ঘটলো।

আরো আগেই ঘটতো কিন্তু আমার ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন আপনাদের ভুগিয়েছে,তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।


বেশি কিছু বলবো না, আপনাদের থেকে বিশেষ আশাও রাখছি না কারণ আশা করলেই আশাহত হতে হয়। সুতরাং....

আমার হাত-পা কাঁপছে কেন জানি! ভীষণ কান্নাও পাচ্ছে! কিছু একটা নাই হয়ে গেল তার অনুভূতি জাগছে! আপনারা কি আমার অনুভূতি অনুভব করছেন? বোধহয় না!


এই ইদের আগে আর হয়তো নতুন কিছু নিয়ে দেখা হবে না,হলেও ইদের পর,ইদের আগে টুকটাক কথা হবে ইনশাআল্লাহ।


ভালো লাগলে চারদিকে উপন্যাসটার কথা ছড়িয়ে দিয়েন,আমি জানি না এই উপন্যাস থেকে কিছু শিখতে পারলেন কি-না কিন্তু আমি অনেক কিছু শেখানোর জন্য‌ই এইটা লিখেছিলাম এবং সময় করে সেগুলো কখনো তুলে ধরবো আপনাদের মাঝে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ