#চড়ুইভাতি
#রিমা_আক্তার
#পর্ব_১০_সমাপ্ত
[ নকল/ চুরি নিষিদ্ধ!]
তোমার খেদমতে সপিঁয়াছি দেহমন সব, তোমার সুখেই সুখী আমি জানে আমার রব।"
ছোট্ট একটা হলুদ চিরকুটে লেখা দুই লাইনের বাক্যটি তৌকির বিরবির করে কয়েকবার পড়লো। অজান্তেই ঠোঁট ফাঁক হয়ে হাসি ফুটলো।সে চিরকুটটা হাতে রেখেই হাঁক ছেড়ে লিলিকে ডাক দিলো।
সকালে চোখ মেলেই এই চমৎকার চিরকুটটা সে নিজের মোবাইলের পাশে গোলাপ দিয়ে চাঁপা দেওয়া পেয়েছে। এত সকালে লিলি ফুল কোথায় পেলো সেই প্রশ্ন তার মনে জাগেনি।তবে তার এখন নিজের বউয়ের লজ্জামাখা বদনখানি গভীরভাবে ছুঁয়ে দেওয়ার, চুমুতে চুমুতে ভিজিয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবলভাবে জেগেছে।
বিয়ের প্রায় ছয় মাস পেরুলো। লিলি দারুন ভাবে স্বামীর সোহাগে সংসারের পাঠ আয়ত্ত করে নিয়েছে।সকালে তাড়াতাড়ি সব সংসারি কাজ শেষ করে বিকেলে দুই ঘণ্টা কোচিং,আবার রাতের রান্না সেড়ে রাতে নিজেকে স্বামীর জন্য তৈরি রাখা। সবকিছুই সে ভীষণ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে করছে।
তৌকিরও একজন দায়িত্বশীল স্বামীর ভূমিকা খুব আদরে পালন করছে। মাঝে মাঝে অল্প বিস্তর মান অভিমানও চলে।এই যে কালকেই একটা ঘটনা ঘটে গেলো।
লিলির উচ্চ মাধ্যমিকের রিটেক পরীক্ষা দেওয়ার পর বিকেলের ঐ সময়টা আপাতত কোন কাজ থাকছে না। যদিও তার ভর্তি পরীক্ষার পড়া পড়তে হয়। কিন্তু এখন সে কোচিংয়ে যাচ্ছে না।মূলত তার কোচিংয়ে এখনও ভর্তি পরীক্ষার পড়া শুরু হয়নি।তাই স্যার লিলিকে পড়া বুঝিয়ে দেওয়ায় লিলি তা ঘরে বসেই পড়ে।তাই নিজের সুযোগ সুবিধা বুঝেই পড়তে পারে।
এদিকে লিলি কোচিং যাওয়া আসার পথে মাঠের শহীদ মিনারের বেড়িতে বসে কিছু বাচ্চাদের পড়তে দেখে। একদিন সাহস করে এগিয়ে গিয়ে কথা বলে জানতে পারে সেখানে ছিন্নমূল হতদরিদ্র বাচ্চাদের ফ্রি তে পড়ানো হয়।লিলি সাহস করে তৌকিরের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সেখানে এক ঘন্টা সময় দেয়।
তেমনি নিয়মিত ক্লাস করাতেই গতকাল সেখানে পড়াতে গিয়েছিল।
গতকাল ছিলো পহেলা ফাল্গুন। অর্থাৎ বসন্তের প্রথম দিন। চিরায়িত বাঙালি আবেশের দিন। বসন্ত মানেই বাঙালি নারীমনে শতরঞ্জির উড্ডয়ন।বাহারি ফুল আর রঙের পসরা সাজানো প্রকৃতির নাব্যতা।শীতের শেষে বসন্তের আগমনে গাছে গাছে রঙিন ফুল,ঝলমলে আর মেঘমুক্ত আসমানের নীলাভ ঝরঝরা রূপ।পল্লী কৃষক থেকে শহুরে বাবুদের ঘরে চলে বসন্তের লীলা খেলা। তবে পহেলা বসন্তের আবেগি আন্দোলন গ্রাম্য গৃহস্থের চৌচালায় তেমনটা দোল না দিলেও শহুরে জীবন পহেলা ফাল্গুন মানেই এক অভিনব উৎযাপনের বিষয়।তেমনি কাল যখন পহেলা বসন্তের রঙের খেলায় মেতেছিল শহুরে যুবক যুবতীর মন তখন তৌকির সাহেব কর্মস্থলে নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত।
এদিকে পল্লী গাঁয়ে বড় হওয়া লিলির কাছে ষড়ঋতুর সৌন্দর্য দেখার সুযোগ খুব সহজ হলেও আহামরি হৃদয়গ্রাহী লাগেনি কখনো।হয়তো দেখতে দেখতে অভ্যস্ত ছিলো তাই।তবে ইট সুরকির এই রোবোটিক শহরের আবহে এখন তা খুব মনে পড়ে । এই যে পহেলা ফাল্গুন'ও যে এভাবে উৎযাপন করা যায় তা লিলি এবারই প্রথম জানলো।
বাচ্চাদের পড়িয়ে ছুটি দেওয়ার আগ মুহূর্তে বাংলার এই অপূর্ব সুন্দর ঋতু নিয়ে আলোচনা করছিলো সকল শিক্ষকরা মিলে । তাছাড়াও বাচ্চাদের নিয়ে সামান্য সাংস্কৃতিক আয়োজনও ছিলো দিনটা উপলক্ষে।
লিলি বাচ্চাদের মধ্যে একজনকে কবিতা আবৃত্তি শেখাচ্ছিলো। তখন লিলির একজন ছেলে সহকর্মী সব মেয়েদের মাঝে লাল গোলাপ ও হলুদ চন্দ্রমল্লিকা ফুল দিচ্ছিলো। তথাপি লিলিকেও সে দু'টো ফুলের একটা তোরা হাতে ধরিয়ে দেয়।লিলি স্বলজ্জ ভদ্রতা সূলভ হাসি বিনিময় দেয়। আর সেই দৃশ্যই রাস্তার অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে কুঞ্চিত ভ্রু আর ললাটে ভাঁজ ফেলে ক্রুধিত নয়নে দেখে ফেলে তৌকির। চোয়ালের দাঁত শক্ত করে চেপে রেখে তৎক্ষণাৎ এগিয়ে যায় ঐদিকে।লিলি তৌকিরকে দেখেনি তখনও।তবে লিলির একজন সিনিয়র সহকর্মী মুত্তাকীন,উনি তৌকিরকে দেখে ভীষণ আন্তরিক গলায় সালাম দেয়। বিনিময়ে তৌকিরও সালামের উত্তর দিয়ে লিলির পানে চাইতেই লিলির চোখে চোখ পড়ে। তৌকির তখনও আগের মতোই মুখভঙ্গি বানিয়ে দাঁড়ি থাকে। এদিকে ওদিকে তাকাতেই তার চোখ আটকায় উপস্থিত প্রতিটি মেয়ের হাতেই একই ফুল।এতে করে তার মেজাজ খানিকটা শান্ত হলেও পুরোপুরি বদলায়নি।
“ আপনি এখন?এই সময়ে আজ? শরীর ঠিক আছে?"
একের পর এক প্রশ্ন লিলির, তৌকির ভ্রু দুটো আরো কুঁচকে নিয়ে উত্তর না দিয়ে উল্টো নিজেই প্রশ্ন করলো,
“ দম ফেলো,এত অস্থিরতা কিসের?"
কন্ঠস্বর ভীষণ ঝাঁঝালো।লিলি চমকালো,ভীত হলো। তটস্থ হলো তার অক্ষিপট।পুরুষালী ঐ গম্ভীর রাগান্বিত কন্ঠে তার ছোট দিল কেঁপে উঠলো,নম্র চাহনি নামিয়ে নিলো।খনিক মুহূর্তেই তা তুলে ভীষণ ভেজা গলায় কাঁপা স্বরে বললো,
“ অস্থির হচ্ছি না। কিন্তু আপনি!"
“ চাবি দাও! "
“ আমি তো একটু পরে যাবো!বসেন একটু!"
“ না,তুমি তোমার প্রোগ্রাম শেষ করে আসো।"
“ আমিও আসছি, চলেন।"
“ দরকার নেই।যা করছিলে তা শেষ করে আসো।"
” কিন্তু! শেষ অনুষ্ঠান,এখন এমনিতেই বাচ্চাদের ছেড়ে দিবে। শুধু ওদের টিফিন দেওয়া বাকী।"
“ ওকে তাই শেষ করে নিজের মতো আসো।আমি যাই!"
বলেই হাত বাড়িয়ে দিলো।লিলি বুঝতে পারছে না তৌকির এত রেগে আছে কেন? তার তরফ থেকে কি কোন ভুল হয়েছে? না তো! সে আজ তেমন কিছুই করেনি।তবে কি অফিসে কিছু হয়েছে? কিন্তু দুপুরে খাওয়ার সময়েও তো ফোনে কথা হয়েছিল। খারাপ কিছু হয়েছে বলে তো মনে হয়নি। লোকটা তখন শান্ত আর ভীষণ আহ্লাদি গলায় তার সাথে কথা বলছিলো।কত প্রেম্মাখিত স্বরে বলছিলো,
“ লিলি, শুনছো? তুমি কি জানো তুমি আমার ভীষণ প্রিয়! ঠিক যেমন প্রিয় লিলি ফুল!
___ জানো,আজ মনটা ভীষণ খারাপ হচ্ছে! কেন যে আজ তোমাকে নিয়ে এই ইট পাথরের শহরের রঙে মাখামাখি করতে পারলাম না । ইস্ যদি আমার অনেক পয়সা থাকতো তবে আজ সব ছেড়ে তোমাকে নিয়ে হারিয়ে যেতাম কোন অজানার দেশে। আচ্ছা লিলি তুমি কি যাবে আমার সাথে,যেথায় নিয়ে যাবো তোমাকে ভালোবেসে!"
লিলি তখন নিরব থেকে মিটিমিটি হেসেছিলো।লোকটা আজকাল প্রায়ই এমন অদ্ভুত সব কথা বলে।গভীর রাতে লিলিকে তুলে বারান্দায় গিয়ে বসে।পাশে বসিয়ে রাখে লিলিকে, বাচ্চাদের মতো একটা দুটো তিনটে করে তাঁরা গুনে। সেগুলো আবার মুঠোবন্দী করে লিলির আঁচলে ঢেলে দেয়, লিলির কানের কাছে উষ্ণ নিঃশ্বাস ছড়িয়ে ফিসফিস করে বলে,
“ এ্যাই নাও,আজ থেকে আমার আকাশের সব তাঁরা তোমার।তার বিনিময়ে তোমার বুকের বা পাশের রক্ত সঞ্চালন করা যন্ত্রখানি আমার।"
লিলির ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে ভীষণ আর্দ্রতায় বলে,
“ আমার আকাশের সব তারা তোমার,তার বিনিময়ে এই নরম ভেজা কোমল ওষ্ঠের সুধারস আমার!"
তার আবেগের ছোঁয়া ঠোঁট ছুঁয়ে ছুঁয়ে গ্রীবা,গ্রীবা থেকে কটিদেশে তারপর আরেকটু নিচে,নামতে নামতে তা এসে ঠেকে লিলির নরম নারীত্বের ভাঁজে।গভীর,তীব্র কামনায় আঁকড়ে ধরে, কামড়ে, চুম্বনে চুম্বনে লিলিকে অস্থির করে তুলে।দু হাতের বেষ্টনীতে লিলিকে চেপে ধরে উতলা কন্ঠে বলে,
“ আমার আকাশের সব তারা তোমার,তার বিনিময়ে এই দেহের এই চঞ্চলা উতলা কামুকে তৃষ্ণা নিবারণের আহবান শুধুই আমার।"
এরপর... এরপর সে উন্মুক্ত আকাশের নিচে থাকা ঐ ছোট্ট বারান্দার মাঝেই একে অপরকে নিজেদের মধ্যে গভীর ভাবে টেনে নেয়।আদিম খেলায় মত্ত হয়ে ছটফটাতে থাকে দু'জন নরনারীর দেহ।
যদিও তৌকির ফোনে বলেছিলো তার মন ভীষণ খারাপ কিন্তু তার কন্ঠে তেমন মন খারাপের লেশ নাহি ছিলো। বরঞ্চ তা ছিলো ভীষণ তারুণ্যে ভরা।যেন কোন অষ্টাদশের তরুণ তার প্রথম প্রেমের প্রেয়সীর কাছে সমর্পণ করছে নিজেকে। অথচ তৌকির এক ভরা যৌবনের যুবক।তার চেয়ে এগারো বছর দুই মাসের বড় একজন তরতাজা যুবক,সে কি-না তার স্বামী।
তৌকির লিলির থেকে চাবি চাইছে আর লিলি তার সঙ্গেই যাওয়ার জন্য মর্জি করছে,এমন সময়ে এসে উপস্থিত হয় মুত্তাকিন।সে বিনয়ী গলায় বলে,
“ ভাইয়া,আরেকটু সময় অপেক্ষা করেন।এখনই প্রোগ্রাম শেষ হবে।লিলি আপাকে নিয়েই যান।"
এখানের সব কয়টা স্বেচ্ছাসেবী ছেলে মেয়ে তৌকিরের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট।এরা সবাই তৌকিরকে বেশ সম্মান করে।তৌকিরও এদের প্রতি স্নেহশীল।তবে এখন তার কেন জানি মেজাজ ভীষণ খিটখিটে হচ্ছে।কারো কথাই সহ্য হচ্ছে না আপাতত।লিলি স্বামীর মুখের পরিবর্তিত রঙ দেখে দ্বিধান্বিত, তটস্থ তার চাহনি। আড়চোখে দেখছে সে । তৌকির নিজের প্রতি যথেষ্ট ধৈর্য্যশীল।সে আর যাই করুক বাইরের লোকের সামনে মেজাজ হারায় না।সে যার রাগ তার উপরেই দেখায়। এখনও তা করারই চেষ্টা জারি রাখছে।
মুত্তাকিন সহ আরো একটি মেয়ে, মিষ্টি! দু'জনের অনুরোধে তৌকির অপেক্ষা করলো।লিলিও স্বামীর রাগের অজানা কারণেই তটস্থ থেকে অনুষ্ঠান শেষ করে চলে যাওয়ার সময়ে মিষ্টি মেয়েটা একটা ফুলের তোরা এনে তৌকিরের সামনে ধরে বললো,
“ দুলাভাই, ফাল্গুনের শুভেচ্ছা নেন।আজকে আপনি আমাদের হঠাৎ আগমনী অতিথি। কিছু তো দিতে পারলাম না, অন্তত শালীর তরফ থেকে এক গুচ্ছ লাল হলুদ ভালোবাসা নেন।"
তৌকির নিশ্চল চোখে মেয়েটার মুখের দিকে চাইলো অতঃপর চাইলো লিলির পানে। তৌকির এই অবাঞ্চিত ভালোবাসায় বিব্রতবোধ করলেও লিলি দিব্যি হাঁসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। তৌকির বুঝতে পারছে না ফুলটা নেওয়া উচিত কিনা! লিলি কি মনে করবে। কিন্তু লিলির হাস্যোজ্জ্বল মুখ তো বুঝিয়ে দিচ্ছে এটাতে সে কিছু মনে করবে না।সে বরং নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চেয়ে আছে। তৌকির মেয়েটার থেকে ফুলটা নিলো, পরক্ষনেই তা লিলির হাতে দিয়ে বললো,
“ ধন্যবাদ বোন!
_ চলো! "
বলেই সে একটু এগিয়ে গেলো।লিলিও সবার থেকে বিদায় নিয়ে পিছু পিছু হাঁটা ধরলো।তৌকির রাস্তায় বের হলে লিলিকে নিজের বরাবর রেখেই হাঁটে। কখনো আগপিছ করে না। কিন্তু আজ যেন তার ভীষণ তাড়া।সে লিলির দিকে তাকাচ্ছেই না। হনহনিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।লিলি তৌকিরের এমন হুট আগমনের কারণ আর এই রাগের কারণ কোনটাই ধরতে পারছে না।সে একরকম ছুটে গিয়েই পাশপাশি হলো।নিচু গলায় শুধালো,
“ কি হয়েছে আপনার? "
তৌকির চুপ! লিলি আবারও জিজ্ঞেস করলো। এবারও চুপ! লিলি তৌকিরের বাম হাতটা আঁকড়ে ধরলো ভীষণ শক্ত মুঠোয়, তৌকির সেদিকে ফিরে তাকালো। অতঃপর লিলির চোখে,লিলি আঁতকে উঠলো তৌকিরের রক্তাক্ত চাহনিতে।তাও ছাড়লো না। উল্টো তার দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে গেলো। তার স্বামীর রাগের কারণ তার অজ্ঞাত কেন?এটা ভেবেই তার চোখ ভরে উঠছে। তার সঙ্গে তৌকিরের এই প্রথম ক্রুধিত চাহনি, থরথর করে কাঁপা কপোল দ্বয়।লিলি নিঃশব্দে মাথা নুইয়ে নিলো।তৌকির কথা না বললেও লিলির হাতটা ছাড়ায়নি।ওভাবেই বাড়ি পৌঁছায়।দরজা খুলে দেয় সোনিয়া ভাবি।দরজা খুলে বরাবরের মতোই সে এই নবদম্পতিকে দেখে হাসি দেয়।এবার হাসির সঙ্গে খুনসুটি মিশিয়ে বললো,
“ বাহ্,লাভ বার্ডস ফাল্গুন পালন করে এলো নাকি একদিন আগেই ভালোবাসা দিবস পালন করে ফেললো!"
তৌকির মৃদু হেসে ঘরের দিকে গেলো।লিলি অনিচ্ছায় ঠোঁট এলালো শুধু, শব্দ উচ্চারণ করলো না।এদের এই নিরবতায় সোনিয়া ভাবি ভ্রু কুঁচকে নিলো। কিন্তু আর কোন কথা বললো না।লিলি কাঁপা হাতে দরজা খুলতে থাকলো কিন্তু তার হাত অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে।তাই চাবিও ঠিকঠাক লাগাতে পারছে না। তৌকির এটা দেখে চাবিটা হাত থেকে একরকম কেড়ে নিয়ে নিজেই তালায় লাগিয়ে খুলে ফেললো।দরজা খুলতেই লিলি ভেতরে ঢুকে, তৌকিরও! দরজা লাগায় শব্দ করে। উচ্চাওয়াজে লিলি চমকে উঠে।ভীত নজরে তৌকিরের পানে চাইতেই তৌকির লিলির হাতে থাকা ফুলট ছুঁড়ে মারে বারান্দার দিকে।ভয়ে লিলি আঁটসাঁট হয়ে যায়।
তৌকির ক্ষীপ্র গলায় বলে,
“ তোর ঐ ছেলের সাথে এত মধুর হাঁসা লাগবে কিসের জন্য?
আর ফুলই বা কেন নিবি?"
লিলির দুই বাহু খামচে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়েছে।লালাভ চোখের অগ্নি ঝরা বাক্য নরম মনের লিলিকে আরো ভীত করে দিচ্ছে।লিলির সিক্ত,ভীত চাহনি তৌকিরের কঠোর মনকে ভিজিয়ে দিলো।হুট করেই দমে গেলো।লিলিকে বিছানায় ছুড়ে ফেলে বারান্দায় চলে গেলো। যাওয়ার পথে মাড়িয়ে দিলো ফুলগুলো।
এদিকে লিলি বিছানায় পড়ে আহ্ শব্দ তুলে ফুঁপিয়ে উঠলো। তৌকির বারান্দায় গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো।রাগটাকে দমানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ তার রাগ অযাচিত, অহেতুক।তা সে নিজেও বুঝতে পারছে। কিন্তু যেটা বুঝতে পারছে না সেটা হলো লিলি,তার স্ত্রী!
যাকে সে ভালোবেসে বুকের বাঁ পাশের অধিকারীনি বানিয়েছে,যাকে বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখে অন্যের দু্র্নজর থেকে বাঁচাতে,যাকে সে ভালোবাসি বলতে একবারও ভাবে না।যাকে অকপটে রোজ অজস্রবার ভালোবাসি বলে।যার জন্য তার হাজার রঙের অনুভূতি জমানো।সে কেন অন্য কোন পুরুষের হাত থেকে ঐ প্রেমময় ফুল নিবে? সে কেন পরপুরুষকে খুশি করতে মুচকি হাসবে? সে কি জানে না,তার ঐ মুচকি হাসি,তার ঐ ঠোঁট চাপা হাসি এই তৌকিরের বুকে প্রেমের প্লাবন বইয়ে দেয়।এই তৌকিরের অন্ত গহীনে সুপ্ত কামনার জোয়ার টেনে আনে।সে কি বুঝে,তার ঐ হাসি, চোখ, যেকোন পুরুষের বুকের আকাঙ্ক্ষার আগুনের খা খা দ্বিগুণ করে তুলে!
তৌকির অনেক সময় ভাবলো।নিরবে, একাকী। চোখ বন্ধ করে।মিনিট দশেক পেরুনোর পর নিজের মাথা ঠান্ডা করে মনকে স্থির করলো। বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকলো।লিলি তখন উবু হয়ে শুয়ে বালিশে বাম গাল চাপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
শান্ত চিত্তের তৌকির বিছানায় লিলির পাশে বসলো। ফুঁপিয়ে কাঁদা নারীটির পানে চেয়ে থাকলো মিনিট পাঁচেক।হাত বাড়িয়ে লিলির পিঠের উপর রেখে,
“ ওঠো, কান্না থামাও।"
তৌকিরের কন্ঠ ভীষণ আর্দ্র,লিলির ফোঁপানি আরো বেড়ে গেলো। তৌকির কিছু মিনিট আগে করা নিজ কর্মে লজ্জিত হচ্ছে। অহেতুক রাগে শুধু শুধু বউকে কাদালো। ব্যাপারটা ভীষণ লজ্জাজনক। তৌকিরের মতো বয়সী লোকেদের এসব কান্ড করা মানায় না। তাছাড়াও দোষটা তো তার বউয়েরও না।ফুল দিয়েছে ঐ ছেলেটা,তার বোকা বউটা না বুঝেই নিয়েছে।সে ক্ষেত্রে তার বউ এমন দুর্ব্যবহার একদম প্রাপ্য নয়।ছেলেটা কেন তার বউকে ফুল দিবে? সে কি বুঝে না, বিবাহিত মেয়েদের লাল গোলাপ দিতে নেই! লাল গোলাপ দেওয়ার জন্য তাদের স্বামী থাকে।
লিলি বলেছিলো তাকে আজ অবধি কেউ লাল গোলাপ দেয়নি।তাই তৌকির ভেবেছিল আজ সে লিলিকে লাল গোলাপ দিয়ে প্রেম নিবেদন করবে। কিন্তু কি হলো এটা? তার আগেই তার বউটাকে অন্য কেউ ফুল দিয়ে ফেললো।বিষয়টা ভাবলেই তো তার আবারও রাগ চড়ছে। ভীষণ রাগ হচ্ছে।উফ্!
তৌকির লিলির উপর উবু হয়ে শুয়ে পড়লো, ওভাবেই,লিলির গাল ঢেকে ফেলা লম্বা চুলগুলো সরিয়ে ভেজা গালে ঠোঁট চেপে ধরলো। চোখ বন্ধ করে ওভাবেই রইলো, মিনিট দুই। লিলি চুপ হয়ে গেলো এমন উষ্ণতায়। চোখ বন্ধ করে নিরবে পানি ছাড়ছে। তৌকির ঐ চেপে রাখা ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে ফিসফিস করে বললো,
“ আমি ভীষণ বাচ্চা হয়ে যাচ্ছি দিনদিন লিলি।আমার মনে হচ্ছে আমি ষোল বছরের কোন কিশোরে রুপান্তর হচ্ছি যে কিনা জীবনের প্রথম প্রেমে পড়া নারীটির ছায়াকেও হিংসে করে।আমি ঠিক তেমনি করছি।আমার ইদানিং তোমার ছায়াকেও তোমার পাশে সহ্য হচ্ছে না।হয়তো এটা ভীষণ ন্যাকামি ঠেকছে তোমার কাছে, মনে হচ্ছে তিরিশ বছর বয়সী এই পুরুষের মুখে এসব বেমানান। কিন্তু আমি স্বীকার যাচ্ছি,এটাই হচ্ছে আমার সাথে আজকাল।আমি তোমাকে কারো পাশে, তোমার আশেপাশে কাউকে যেনে নিতে পারছি না। আমি শুধু তোমার পাশে নিজেকেই চাই।আমি তোমাকে ভালোবাসি! ততটা, যতটা ভালোবেসে নিজেকে ভালো রাখা যায়।আমার ভালো থাকার একমাত্র কারণ তুমি লিলি, আমার ভালো থাকার একমাত্র ঔষধ এখন তুমি!"
উপরোক্ত বাক্যগুলো ফিসফিসিয়ে বললেও,মনে মনে বললো,
“ আমার ভয় হয় লিলি। তুমি যত বাইরে মানুষের মাঝে যাচ্ছো আমি ততই ইনসিকিউর ফিল করছি।আমার ভয় হয়, তুমি কখনো আমাকে ছেড়ে না যাও। তুমি কখনো বলে না বসো আমি তোমার পাশে চলার যোগ্য না। তোমার রুপে তুমি অপ্সরা,গুনে তুমি অন্যান্য, তোমার আদব, চলন-বলনে আমি মুগ্ধ তেমনি অনেকেই।আমি পড়তে পারি তাদের সেই চোখের ভাষা,যা তুমি পারছো না। আর তাই তো আমার ভয় হয়,কখনো কোন বেলায় যদি তুমি বলে বসো....লিলি,আমি তোমাকে পৃথিবী দেখাতে চাইছি, তোমার জীবনের সূক্ষ্ম থেকে উচ্চ সব ইচ্ছাই পূরণ করার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ। কিন্তু তা সব আমি তোমাকে আমার মুঠোয় রেখে করতে চাই, তোমাকে আমি আমার গন্ডির বাইরে যেতে দিতে পারবো না।আমি চাই না তুমি আমাকে ছাড়া পৃথিবী দেখো। তুমি পৃথিবী দেখো, বিচরণ করো রবের দুনিয়ায় কিন্তু তা আমার হাত ধরে।আমার সঙ্গী হয়ে।আমি তোমাকে আমার পায়ে পায়ে রেখে হাঁটা শেখাবো, বিনিময়ে শুধু তুমি আমার থেকো। আমি তোমাকে কারো জন্য ত্যাগ করতে পারবো না। তোমাকে কোনভাবেই অন্যের অধীনে মানতে পারবো না। তুমি আমার,কেবলি আমার হয়েই এই পৃথিবীতে বাঁচবে।"
তৌকির লিলির পেটের নিচে হাত ঢুকিয়ে ওভাবেই লিলিকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে উল্টে গেলো। নিজে নিচে থেকে বুকের উপর লিলিকে তুলে ফেললো। ততক্ষণে লিলি শান্ত কিন্তু অভিমানীনি হয়ে চুপ করে আছে।তৌকির লিলির ভেজা গাল দুটো আঁকড়ে ধরে নিজের মুখের কাছে তুলে নিলো।লিলি চোখ নামিয়ে রেখেছে। ফোঁস ফোঁস আওয়াজ তুলে কান্না চাপানোর চেষ্টা।তৌকির লিলির চোখের পাতায় চোখ রেখে বললো,
“ মাফ করে দাও বউ। তোমার হাতে অন্য কারো দেওয়া ফুল দেখে মাথা বিগড়ে গিয়েছিল।
আচ্ছা মাফ করতে হবে না। তুমি যেই শাস্তি দিতে চাও,দাও।আমি সাদরে মাথা পেতে নিবো।তাও থামো। কান্না বন্ধ করো।দয়া করো।"
বলেই লিলির চোখের পাতায় চুমু দিলো। কেঁপে উঠলো লিলির ভেজা আদ্র পল্লবরাশি।
লিলি চোখ তুলে চাইলো তৌকিরের পানে। কিন্তু কিছু বললো না।গোলাকার মুখের বড় বড় চোখ দুটো রক্ত জবার ন্যায় হয়ে আছে,থইথই জলে ভাসা লাল পদ্মের মতো লাগছে। ফুলো ফুলো দুই গালের মাঝের ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে।যা তৌকিরকে ভীষণ হতাশ করলো, সঙ্গে আকুল আবেদনে কাছে টানছে।লিলি চোখ নামিয়ে নিয়ে নাক টানছে।তৌকির নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার কষ্ট করলো না। ঐ ফোলা ফোলা ফ্যাকাশে ঠোঁটে নিজের পুরু খসখসা ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো।তার, তার বউয়ের ফ্যাকাশে ঠোঁট সহ্য হয় না।তার বউয়ের ঠোঁট থাকবে সবসময় লাল।যেই লাল ঠোঁট দেখে সে মোহিত হয়ে এক দেখাতেই বিয়ের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। তখন সে কৃত্রিম রঞ্জকের ছোঁয়ায় লালাভ দেখলেও আজীবন নিজের ছোঁয়ায় লাল বানানোর সিদ্ধান্তে স্থির হয়েছিল। তৌকির হাওলাদার ভীষণ ভালোবাসে তার সহধর্মিণীকে,ভালোবাসে তার চেয়ে এগারো বছর দুই মাসের ছোট এই বাচ্চা মনের তরুণীকে। ভালোবাসে তার অঙ্গের প্রতিটি খাঁজকে,ভালোবাসে তার আলতা দুধে রঙ মাখানো এই গাত্রবর্ণকে।ভালোবাসে তার এই আকাশ ডোবা আঁখিযুগলকে। ভালোবাসে রক্ত জবার মতো টসটসা একজোড়া চেরি ওষ্ঠপল্লবকে কে। তৌকির সাহেব ভীষণ ভালোবাসে তার বউকে।
ভালোবাসার প্রহর বলেই কি-না লিলির জানা নেই।তবে সকালে নামাজ পড়ার আগে আজান শোনার জন্য বারান্দায় এসে যখন দেখলো তার সদ্য লাগানো গোলাপ চাড়ায় বেশ বড়সড় একটা গোলাপ ফুটে রয়েছে।লিলি বেশ চমকালো, আনন্দিত হলো।আজ ভালোবাসার প্রথম প্রহরে রবের তরফ থেকে এত চমৎকার এক উপহার পেয়ে সে উল্লাসিত হলো। আনন্দে খলবলিয়ে উঠে ফুলটা ছিঁড়ে ভালোবাসার দিনে, একমাত্র ভালোবাসার মানুষের জন্য জীবনের প্রথম প্রেমপত্র লিখলো সে। দু'টো বাক্যের প্রেমবাক্য তাতে লিপিবদ্ধ করে স্বলজ্জিত নয়নে শব্দহীন কদমে বিছানার পাশে তৌকিরের চার্জ দেওয়া মুঠোফোনের নিচে রাখলো।তার উপর গোলাপটা রাখলো। তৌকির তখন নামাজ আদায় করার জন্য উঠবে। আজ সে আবার ছুটি নিয়েছে যা লিলির জন্য সারপ্রাইজ।আজ সে সারাদিন লিলিকে নিয়ে ঘুরবে।তিরিশ বছর জীবনের প্রথম ভালোবাসা দিবস উৎযাপন।যা লিলির জন্যেও প্রথম।
সমাপ্ত.....
আমার মতে,সংসার একটা খেলা। চড়ুইভাতির মতো আদুরে খেলা।যার লেশ কোনদিন শেষ হয় না।
শৈশবের সবচেয়ে বেশি আনন্দিত খেলা, চড়ুইভাতি।যা আমাদের স্মৃতিপটে শৈশব পেরিয়ে কৈশোর,যৌবন, বৃদ্ধকালকেও জড়িয়ে রাখে।এই চড়ুইভাতি খেলার আমেজ আমৃত্যু আমাদের আবেশিত করে রাখে। যেটা থেকে না আমরা পরিত্রাণ চাই আর না আমর পাই। আমাদের এক জীবনে সবার জন্য সবচেয়ে বেশি আনন্দে জোয়ার বয়ে আনা মুহূর্তই হচ্ছে চড়ুইভাতি খেলার মুহূর্তগুলো।আর বিয়ের (একট পরিবার) প্রথম গুটি কয়েক বছর জীবনটা আসলে এভাবেই কাটে, যেভাবে খেলি আমরা চড়ুইভাতি। অনেকেই ভালোবেসে এদেরক সম্বোধন করে, দুই চড়ুইয়ের সংসার সংসার খেলা, তাই তারা চড়ুইভাতি! ছোট সংসারের গপ্পো সাজায় তারা।যা একসময় গিয়ে বৃহৎ, যৌথ পরিবার গড়ে তুলে।
কেমন ছিলো এই ছোট্ট জার্নিটা? জানাবেন কিন্তু!
ওকে টাটা বাই বাই, আবার দেখা হবে অন্য কোথাও।অন্য কারো সঙ্গে।
আল্লাহ হাফেজ।






0 মন্তব্যসমূহ