#চড়ুইভাতি
#রিমা_আক্তার
#পর্ব_০৯
[নকল/চুরি নিষিদ্ধ!]
লিলি ফজরের নামাজ পড়ে নাস্তা বানাতে বসে গেলো।আজ তৌকিরকে দুপুরে আলু ভর্তা,মুশুরির ডাল ঘন করে, চিংড়ি মাছের দোপেঁয়াজা,সাথে লাল শাক ভাঁজা করে দিবে।এখন নাস্তায় ডিম পোঁচ আর লাল শাক দিয়ে আটার রুটি খাবে।
দ্রুত হাত চালিয়ে রুটি বেলছে।চুলায় ডাল আর ভাত চাপা। সোনিয়া ভাবি এত সকালে রান্না করেন না।উনার প্রয়োজন পড়ে না তেমন একটা। তাই সকালে লিলি দু'টো চুলাতেই রান্না চাপিয়ে তাড়াতাড়ি সব শেষ করতে পারে।
লিলি রুটি সেকছে, তৌকির বাড়ির বাইরে গিয়েছে।তার ইদানিং নিজের ভুঁড়ি নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।কারণ তা দিনদিন বেড়েই চলছে,তাই একটু সচেতনতা অবলম্বন করে সকালে এক ঘন্টা দৌড়ায়, হাঁটে।
কামরাঙ্গীরচর ৩১ শয্যা হাসপাতাল!
২০০০ সালের সময়াধীন ক্ষমতাশালীরা বুড়িগঙ্গা নদীর এই দিকটা ভরাট করে দখলে নিয়ে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করতে থাকলে তৎকালীন সরকারের উদ্যেগে জায়গাটা সরকারি খাস জমির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং সেখানে তৎকালীন লালবাগ থানাধীন কামরাঙ্গীরচর ইউনিয়ন এর একমাত্র হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়।
কিন্তু ২০০৬ এর রাজনৈতিক চিত্রপটের বিশাল পরিবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং এমপির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দীর্ঘ সময়ক্ষেপনের মাধ্যমে বিএনপির প্রস্তাবকৃত কামরাঙ্গীরচর ৩১ শয্যা হাসপাতালটি তৎকালীন দেশ পরিচালক সরকার, আওয়ামী সরকারের অধীনে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।
যদিও ২০২০ সালের মধ্যেও সেই হাসপাতালের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়নি তবে করনাকালীন সময়ে এটা অত্র এলাকার সাধারণ হতদরিদ্রের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
সাধারণ রোগের চিকিৎসা সহ প্রসূতি এবং নানা রকম ডায়াগনস্টিক চিকিৎসা এখানে এখন নিয়মিত প্রদান করা হয়।
কামরাঙ্গীরচর ৩১ শয্যা হাসপাতালটির ভূমি যেই জায়গায় তার পরিচয় মূলত কুড়ার ঘাট নামেই।এটার বিশেষ কোন ইতিহাস জানা না গেলেও এখানে বহুদিন ধরে একটা খেয়াঘাট রয়েছে,তবে তার সাথে কুড়ার ঘাট নামের ইতিহাস আজও অজ্ঞাত। যেহেতু নদী ভরাট করে দখলকৃত এই ভূমির নাম কুড়ার ঘাট আর ছেলেপিলের খেলার জন্য একটা পরিপূর্ণ মাঠ আশেপাশে কোথাও না থাকায় শুরু থেকেই এখানে এলাকার ছেলেরা সবধরনের মাঠ খেলা খেলেছে তাই এই জায়গাটুকু কুড়ার ঘাট খেলার মাঠ হিসেবেই পরিচিত।
এক সময় এটাকে পুরোটা হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত জমি বললে এলাকার সুচিন্তাশীল মানুষ, গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও ক্রীড়াপ্রেমিদের আন্দোলন, প্রস্তাব এবং ঘোর বিরোধীতায় বাধ্য হয়ে একপাশে হাসপাতাল ও অন্য পাশে খেলার মাঠ নির্ধারণ করে পুরোটাকে একটা বিশাল দেওয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন এখানে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল, ক্রিকেট থেকে শুরু করে সবধরনের খেলার আয়োজনে বারোমাস উত্তেজনা বিরাজ করে।সব রকমের রাজনৈতিক সমাবেশ, বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন সহ নানা রকম জাতীয় আয়োজন করা হয়ে থাকে।
হাসপাতাল থাকলেও এটা এখনো সুপরিচিত তার পূর্ব নামেই। কামরাঙ্গীরচর,কুড়ার ঘাট খেলার মাঠ।
তৌকির হাসপাতালের সামনের ঢালাই করা পথ ধরে ঘুরে ঘুরে দৌড়াচ্ছে। কিছু কিছু রোগীকে এদিকে আসতে দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের পিছনের দিকে স্টাফ কোয়াটার। দুজনকে হাসপাতালের আউটডোরে ঢুকে পড়তে দেখলো। অর্থাৎ আজকের কার্যক্রম শুরু হবে। তৌসিফ নিজের হাতে থাকা কালো বেল্টের ঘড়িতে সময় দেখে নিলো।ছয়টা আটচল্লিশ। অর্থাৎ সময় কম তার।সে দৌড়েই বাড়ির পথে হাটা ধরলো ।
লিলি ডাল তুলে আলু সিদ্ধ দিয়েছে।ডাল নিয়ে ঘরে আসতেই শুনতে পেলো তৌকিরের চার্জ দেওয়া মুঠোফোন বেজে যাচ্ছে।সে তড়িঘড়ি করে ডালের পাতিল রেখে মুঠোফোন হাতে তুলে নিলো। তৌসিফ কলিং! মানে তৌকিরের ছোট ভাই ফোন করছে।লিলি সেকেন্ড খানিক ভাবলো ফোনটা তুলবে কি-না যদিও তৌকিরের এই বিষয়ে কোন বিধিনিষেধ নেই।তাও অন্যের ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দিতে একটু ভাবা উচিত।লিলির ভাবনার মাঝেই ফোনটা আবারও কেটে গেলো, পরক্ষনেই বেজে উঠলো।লিলি এবার ভাবনা চিন্তা বাদ দিয়ে রিসিভ করেই সালাম দিলো,ওপাশ থেকেও সালাম আসলো।একই সঙ্গে দু'টো সালাম আসায় আবার একই সঙ্গে তার উত্তর দেওয়া হলো।এতে করে দুই প্রান্তের মানুষই ফিক করে হেসে দিলো।লিলি হাসি থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ ভাইয়া কেমন আছো?"
তৌফিক তৌকিরের বড় চাচা শ্বশুরের ছোট ছেলে, হাওলাদার বাড়ির সবচেয়ে ছোট ছেলে।এবার মেট্রিক দিবে।
ওপাশ থেকে উত্তর দেওয়ার পর লিলিকে ফিরতি প্রশ্ন করলে লিলিও উত্তর দিলো। এরপর তৌফিক কিছু একটা বলার পর লিলি বললো,
“ আম্মা কথা বলবে? দাও তাহলে!"
তৌফিক ফোনটা দিতেই অপরপ্রান্ত থেকে বেশ পরিষ্কার একটা খলবলে কন্ঠ ভেসে আসলো,লিলি আদবের সহিত সালাম দিয়ে বললো,
“ আম্মা আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন আম্মা? আব্বা কেমন আছেন?"
উত্তর দিলেন দুরবার্তায় থাকা ভদ্রমহিলাটি,লিলিকেও জিজ্ঞেস করলেন,লিলি উত্তর প্রদানে বললো,
“ জি আম্মা, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমত আর আপনাদের দোয়ায় ভালো। আপনার ছেলেও সুস্থ আছে।"
******
“ না আম্মা।উনি তো একটু বাইরে গিয়েছেন।"
*******
“ সত্যিই আম্মা? আজকে রওনা দিবেন? কখন দিবেন?"
*****
“ তাতো আমি জানি না। আপনার ছেলে জানে।তিনি আসলে বলতে পারবে। একটু পরেই চলে আসবে...
লিলির কথা শেষ হওয়ার আগেই কলিং বেলের আওয়াজ বেজে উঠলো।লিলি কান থেকে ফোনটা একটু সরিয়ে কলিং বেলের আওয়াজ বুঝে শ্বাশুড়িকে বললো,
“ আম্মা মনে হয় আপনার ছেলে চলে আসছে।একটু লাইনেই থাকেন,আমি দেখি!"
লিলি পা ছুটিয়ে দরজা খুললো।আসলেই তৌকির এসেছে। ঘর্মাক্ত মুখ,বুকের দিকের গেঞ্জি পুরোটা ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। তৌকির একটা সুখী হাসি দিয়ে সালাম দিতেই লিলি সালামের বিনিময়ে উত্তর প্রদান করে বললো,
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম।নেন, আম্মা লাইনে আছেন, কথা বলেন।"
“ আম্মা!"
তৌকির জিজ্ঞেস করতে করতেই ফোনটা কানের সামনে ধরে সালাম দিলো,
“ আম্মা আসসালামু আলাইকুম!"
**
“ এখন! এক কাজ করেন দুপুরের পরপর রওনা দেন।আমি সন্ধ্যায় অফিস থেকে বেরিয়ে আপনাকে রিসিভ করে নিয়ে আসবো।আর তখন ঝামেলাও কম হবে আম্মা।"
***
“ আচ্ছা। আম্মা, কোন ঝুট ঝামেলা বইবেন না। শুধু আপনি সুস্থ ভাবে রওনা দিয়ে আমার কাছে এসে পৌঁছান। আপনার বউমা, আমি অপেক্ষায় থাকলাম।"
****
“ জি আম্মা, আসসালামু আলাইকুম। সাবধানে আসেন,ফি আমানিল্লাহ্!"
তৌকির ফোনটা কেটে লিলির কৌতুহল মুখপানে চেয়ে থেকে বললো,
“ আম্মা আসছেন,আর বড় আপাও আসবে হয়তো কাল।"
“ ওহ,ফি আমানিল্লাহ্।ভালোই হবে সবাই আসলে!"
“ হ্যা তাতো হবে কিন্তু এক ঘরে একটু গ্যাদারিং হয়ে যাবে না!"
“ তাতে কি! আল্লাহ ভরসা।আপনি গোসল করবেন?"
“ হ্যাঁ হ্যাঁ,দেরি হয়ে যাবে। এমনিতেই সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি বের হতে হবে।"
লিলি তৌকিরের পোশাক বের করে দিলো, তৌকির গোসলে ঢুকে তাড়াতাড়ি সব সেড়ে বেরিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করে কাজে চলে যায়। এদিকে লিলি নিজ ঘর পরিষ্কার করতে থাকলো।
ভীষণ গুছানো সংসারি ও পরিপাটি,দাম্ভিক চরিত্রের তানজিলা বেগম ছয় সন্তানের সফল জননী। মাত্র কয়েকদিন শ্বশুরালয় থেকেই লিলি দেখেছে মহিলা কতটা খুঁতখুঁতে স্বভাবের।নিজে যেমন গুছানো পরিপাটি, আশেপাশে উপস্থিত সকলের কাছেই তেমন চিন্তা রাখেন।তার মধ্যে আবার আসছে সবার বড় ননাস।তৌকিরদের ছয় ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বোন তাহমিনা হাওলাদার তু্ষ্টি।তিনি যেমন দেখতে সুন্দরী তেমনি তার আড়ম্বরপূর্ণ জীবন-যাপন।
লিলি ননাস, শ্বাশুড়ির চিন্তায় ডুবে থেকেই ঘরের কোনা থেকে আসবাবপত্র সব পরিষ্কার করতে লেগে গেলো।
___________________
“ আম্মা আসসালামু আলাইকুম।"
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম, কেমন আছো তুমি?"
“ জি, আম্মা আলহামদুলিল্লাহ। আপনাদের দোয়ায়, আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। তৌফিক ভাইয়া কেমন আছো তুমি?"
“ আলহামদুলিল্লাহ ভাবী।আপনি কেমন আছেন?"
“ এইতো আলহামদুলিল্লাহ!"
তানজিলা বেগম ছেলে বউয়ের ঘরে ঢুকে বিছানায় বসলেন।লিলি সানিয়া ভাবীর ফ্রিজে লেবুর শরবত বানিয়ে রেখেছিল সেটা বের করে আনলো।
তানজিলা বেগম নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে ছেলের সংসার দেখছে। একটা খাট, ওয়ারড্রব, ড্রেসিং টেবিল, খানাডুলি,একটা ছোট পুরাতন পড়ার টেবিল, অল্প কিছু হাঁড়িপাতিল আর এক কোনায় রয়েছে একটি আরএফএল প্লাস্টিকের র্যাংক।সব মিলিয়ে অল্পতেই গুছানো একটি নতুন সংসার,টোনাটুনির আবাসন, তাদের নতুন জীবনের অভিলাষী মনের চড়ুইভাতি খেলা।তিনি অজান্তেই এক পশলা মুচকি হাসলেন।
এটাই তো দেখতে এসেছেন তিনি। ছেলের জন্য একটা বাচ্চা বয়সী মেয়ে এনেছেন বউ করে,সেই বউ কতটা কি তার ছেলের সংসার সাজাতে পারলো তা-ই দেখতে এসেছেন। মুরব্বিদের কথায় আছে,যার বুদ্ধি হয় নয়ে'ই হয়,যার হয় না তার নব্বইতেও হয় না।তিনিও তা বিশ্বাস করেন।মেয়ে যদি সংসারি হয় তবে সে এখন থেকেই তার প্রমাণ রেখে যাবে আর যদি তা না হয় তবে তার প্রমাণও এখনই পাওয়া যাবে।
তৌকির শবরত পান শেষে মায়ের পাশে বসে শার্ট খুলতে খুলতে বললো,
“ আম্মা,গোসল করে বিশ্রাম নেন।আরাম লাগবে।"
“ আমি করবো, আগে তুমি করো!"
তৌফিক জমিনে পা দুটো আধ ভাঁজ করে মেলে,হাত দুটো পিছনে জমিনে ঠেক দিয়ে পিছনে হেলে বসেছে।লিলি গামছা, লুঙ্গি বের করে গোসলখানায় রেখে দিলো।তৌফিককে জিজ্ঞেস করলো,
“ ভাইয়া তোমাকেও লুঙ্গি দিবো?"
“ না,আমি নিয়ে আসছি।ব্যাগেই আছে।"
বলেই সে পুরো চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো।তা দেখে তৌকির ভ্রু কুঁচকে ফেললো,
“ কি ব্যাপার এভাবে জমিনে শুয়েছিস কেন? বিছানায় উঠে শো!"
“ না, এখানেই ঠিক আছি। ঠান্ডা লাগছে। তোমাদের ঢাকা কত গরম ভাইয়া!"
“ স্বাভাবিক,শহর না।শহরের গাছপালা কম থাকে বিধেয় গরম বেশিই লাগে।"
“ হুম,বেজায় তাপ। একদম গা জ্বলে যাচ্ছে এতটা পঁচা গরম।"
“ যা ওঠ,গোসল করে আয়।বাইরে বসার ঘরের পাশেই একটা বাথরুম আছে।চাইলে ঐটাতে যেতে পারিস। কেউ কিছু বলবে না।
এক কাজ কর আগে তুই যা। তারপর আমি।"
তৌফিক বড় ভাইয়ের ধাক্কাধাক্কিতে গোসলে গেলো। এদিকে লিলি ব্যস্ত হয়ে তড়িঘড়ি হাতে রাতের খাবার সাজাতে বসলো। শ্বাশুড়ি বিকেলে গাড়িতে উঠেছে।এখন প্রায় রাত সাড়ে নয়টার বেশি।
লিলির হাতের রান্না খাওয়ার সুযোগ তার শ্বাশুড়ির হয়নি। বিয়ের মাত্র পাঁচ/সাত দিনের মধ্যেই তো তাকে চলে আসতে হয়েছিল।ঐ সময়ে তার শ্বাশুড়ি তাকে দিয়ে রান্নার মতো ভারী কাজ করায়নি। বরং ছেলে বাড়িতে যাওয়ার খুশিতে সে নিজেই রান্না করে খাইয়েছে।তাই পুত্র বধূকে দিয়ে রান্না করিয়ে তার স্বাদ বোঝার সুযোগ হয়নি ভদ্রমহিলার।
লিলি ভীষণ ভীত মনে সব রান্না করেছে।যদিও তৌকির অমৃতের মতো চেটেপুটে খায় তবে বিশেষ প্রশংসা কোনদিন মুখ ফুটে করেনি। সেখানে আজ তার মা ভাইকেও খাওয়াতে হবে।
পাবদা মাছের ঝোল,লাল শাক ভাঁজা, টমেটো চাটনি আর মুরগি কষা তরকারি। জমিনে একটা শীতল পাটি বিছিয়ে তার উপর লিলি সবার খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছে।লিলি সব এনে পাটিতে রাখছে আর তৌকির মা বউয়ের মাঝে বসেছে,তার বিপরীতে বসেছে তৌফিক। তানজিলা বেগম ছেলেদের পাতে ভাত তরকারি তুলে দিচ্ছে।লিলি গ্লাসে পানি ঢেলে দিয়ে বসে রইল তা দেখে তৌকির বললো,
“ কি ব্যাপার! প্লেটে খাবার নিচ্ছো না কেন?"
“ আপনারা খান,আমি পরে খাই।"
“ কেন?"
“ এমনি!"
“ এমনি কেন? খাবার নাও।প্লেট কোথায় তোমার?"
বলেই তানজিলা বেগম ছেলে বউয়ের প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে থাকলেন। এরপর ভীষণ রাশভারী গলায় বললেন,
“ এক সাথেই খাও।স্বামী স্ত্রী একসাথে খাওয়ার আনন্দই আলাদা।"
লিলি শ্বাশুড়ির কথার পিঠে কথা না বাড়িয়ে টুকটুক করে খেতে থাকলো।এ বেলায় তৌকির সাহেবের তার বিবির গালে তুলে খাইয়ে দেওয়ার সুযোগ হলো না।মা, ভাইয়ের সামনে এত প্রেম দেখানো সম্ভব নয় তার পক্ষে।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঠিক হলো মা, বউ মাটিতে শু'বে আর তারা দুই ভাই বিছানায়। যদিও তারাই জমিনে শু'তে চেয়েছিলো কিন্তু মহিলাদের যুক্তির কাছে হার মানে।
____________________
পরের দিন সকালে এসে হাজির হলো তৌকিরের বড় বোন তাহমিনা।দুই বাচ্চার জননী সে।ভাইয়ের জন্য এই ঘরটা পছন্দ সেই করেছিলো।যদিও ঘর খুঁজতে সাহায্য তৌকিরের সহকর্মীরা করেছিল কিন্তু পছন্দ করে নিশ্চিত করেছিলো তাহমিনা'ই । সে স্বপরিবারে নারায়ণগঞ্জ থাকে। দুই সন্তানকে নিয়ে সে তার ভাইয়ের নতুন সংসারে প্রথম বেড়াতে আসলো।
লিলির ছোট্ট ঘর এখন মানুষে গমগম করছে।তৌকিরের এই ভাগ্নি প্রায় তৌফিক,লিলির সমবয়সী। এবার মেট্রিক দিবে।আর ছেলেটা পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। তাহমিনা ভাইয়ের বাড়িতে এসেই মা'কে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য বারবার অনুনয় করছে। তানজিলা বেগম যদিও কয়টা দিন ছেলের কাছে থাকবে বলেই মনঃস্থির করেছে তবে এখানে এসে সেই ইচ্ছা আর নেই। এতটুকু ঘরে, নতুন বিবাহিত ছেলে বউয়ের মাঝে থাকা উনার এখন রুচিতে বিঁধছে। তাছাড়াও সঙ্গে যেখানে বউয়ের সমবয়সী ছেলে নিয়ে এসেছে আবার তার ব্যাক্কল মেয়েও নিজের উপযুক্ত সন্তানদের নিয়েই এভাবে হাজির হয়েছে তাতে উনি বেশ চটেছেন।
এ রকম ঘরে, এরকম পরিবেশে এক বেলা খাওয়ানো গেলেও থাকতে দেওয়া ভীষণ কষ্টের। সেখানে সব যখন উপযুক্ত বয়সী হয় তখন তা আরো বেশি বিব্রত হবার।
তবে লিলি নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে শ্বাশুড়ি ননদের মন যুগিয়ে তাদের যোগ্য পুত্র বধূ প্রমাণ হবার।
তৌকির বিয়ে উপলক্ষে বেশি ছুটি নেওয়ায় এখন আর ছুটি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাই তার বোনকে বলেছে,
“ আপা আপনি ওদেরকে নিয়ে একটু ঘুরিয়ে আনেন। আপনাদের বউমা তো কিছু চেনে না যে ওকে বলবো।আপনি যান, খরচাপাতি সব আমি দিয়ে দিচ্ছি।"
তাহমিনা ভাইয়ের প্রস্তাব গ্রহন করলেন, অতঃপর আজ তারা যাচ্ছে সদরঘাটে অবস্থিত আহসান মঞ্জিল দেখতে। আহসান মঞ্জিল ঘুরে তারা নান্নার কাচ্চি খেয়ে বাড়ি ফিরবে।
সারাদিনের দৌড়ঝাঁপের পর লিলি যখন বিশ্রামের সুযোগ পেলো তখন রাত প্রায় দশটার বেশি বাজে। নিচের বিছানা পেতে তাতে মেয়েরা সব শুয়েছে আর খাটে ছেলেরা।
তৌকির খাটের এক কোনায় বসে মোবাইলে কিছু একটা পড়ছে।লিলি বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই তৌকির বললো,
“ তোমাকে আগামী এক তারিখে এখানকার একটা কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দিবো।আজ কথা বলে এসেছি আমি।"
লিলি তৌকিরের কথা শুনে উঠে বসলো। সঙ্গে আধো ঘুমে থাকা তারা মা বোনও।
লিলি মিশ্র প্রতিক্রিয়া সহিত চেয়ে রইলো। তৌকির মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে লিলির পানে চেয়ে বললো,
“ এখন তুমি রিটার্ন পরীক্ষার পড়া পড়বে। এরপরেই ওরা তোমাকে ভর্তি পরীক্ষার পড়া পড়াবে। প্রতিদিন বিকেল চারটায় ক্লাস হবে। আপাতত চারটা থেকে ছয়টা টানা ক্লাস হবে।রোজ দু ঘন্টা ।বুঝেছো!"
লিলি বিহ্বল নয়নে মাথা দুলালো।সে বুঝতে পেরেছে। তৌকিরের মা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ কিসের পড়া?"
তৌকির নিরেট গলায় উত্তর দিলো,
“ ওর যেই বিষয়ে রেজাল্ট খারাপ হয়েছে সেটার জন্য।"
“ তার জন্য কোচিংয়ে যাওয়ার কি দরকার? তুই পড়ালেই তো হয়!"
তাহমিনা বলে উঠলো। তৌকির টানটান কপালে বোনের দিকে চেয়ে আগের মতোই গাঢ় গলায় বললো,
“ আমি কিভাবে পড়াবো? আমার অত সময় আছে!"
“ যতটুকুই সময় পাস,নিজে পড়ালেই তো হয়।বউ ঝি'কে কেউ এভাবে পরপুরুষের কাছে পাঠায়? তাও লিলির মতো সহজ-সরল মানুষকে।ও কি এখানকার মানুষের হাবভাব কিছু বুঝবে? কোচিং ফোচিংয়ে কত কি ঘটে।ভোদাই পেয়ে কি থেকে কি ঘটিয়ে ফেলবে।তার চেয়ে বরং..."
“ যতই সহজ-সরল হোক আপা,ওকে যেহেতু এই শহরেই থাকতে হচ্ছে সুতরাং এখানকার মানুষের হাবভাব বুঝে নেওয়া ওর জন্য বাঞ্ছনীয়।
তাছাড়াও আগামী দিনে উচ্চ শিক্ষার জন্য বাইরে বের হবে,তখন তো রোজ আমি ওর সঙ্গে থাকতে পারবো না। আর আমি চাইও না ও আমার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকুক। প্রত্যেক মানুষের নিজস্বতা আছে,তার নিজের জন্য হলেও তার স্বনির্ভর হওয়া একান্ত আবশ্যক। ভবিষ্যত কেউ জানে না । কতদিন বাঁচব তার কোন নিশ্চয়তা নেই।আমার মরার পর ও প্রতিবন্ধীদের মতো অন্যের উপর চেপে থাক তা আমি চাই না। আমি চাই একজন মানুষ হিসেবে ওর যতটুকু পাওয়ার অধিকার এই পৃথিবীর থেকে আছে ও তা সবটুকু পাক।তার জন্য আমি ওর স্বামী হিসেবে, অভিভাবক হিসেবে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে ওকে সমর্থন করবো।
অভিভাবক হিসেবে ওর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমার প্রথম দায়িত্ব,আমি তাও পালন করার চেষ্টা করবো। ওকে বেঁধে রেখে ওর অধিকার হরণ করার মানসিকতা আপনার ভাইয়ের নেই।"
“ উচ্চ শিক্ষা মানে? বউমা কি আরো পড়তে চাও নাকি,বউমা?"
তানজিলা বেগম প্রশ্ন করলেন,লিলির আগেই উত্তর দিলো তৌকির,
“ ওকে পড়তে হবে আম্মা।
আমি চাইছি ও আমার অপূর্ণ শখটা পূরণ করুক।আমি ঢাবি,জাবির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারিনি।আমি চাই ও পড়ে আমার সে-ই শখটা পূরণ করুক।"
“ তাহলে সংসার কিভাবে কি হবে?"
“ আপনি একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে এসব বললে অশিক্ষিতরা কি বলবে আপা? "
“ এমন কি বললাম যে!"
“ যে পারে সে সব পারে আপা। ইচ্ছাশক্তি সবচেয়ে বড় শক্তি।যদি কারো ইচ্ছা হয় পৃথিবী জয় করার তবে সে তাই করতে পারে। কিন্তু চেষ্টা করতে হবে মনপ্রাণ ঢেলে দিয়ে।আর যদি কেউ কেবল হায়হুতাশ করেই জীবন কাটিয়ে দিতে চায় তবে তার সঙ্গে তাই ঘটবে। এখানে সব মানুষের ইচ্ছাশক্তির উপর নির্ভর করছে।
আমি চাইছি লিলি আরো পড়ুক,আমি ওকে দিয়ে চাকরি করিয়ে খাবো না।ওর উচ্চ শিক্ষা ওকে প্রকৃত মানুষ করে তুলুক তাই চাচ্ছি।"
“ আচ্ছা বউমা যদি পড়তে চায় তবে পড়াও। সেখানে আমাদের কোন বাঁধা নেই।তোমরা দুজন মিলেমিশে সিদ্ধান্ত নিয়ে যদি নিজেদের মধ্যে ভালো থাকতে পারো তবে তাই ভালো।আমি তাই চাই। তোমাদের সুখেই আমার সুখ।"
মা বোনের সাথে বউকে নিয়ে তৌকিরের তর্কবিতর্কের সমাপ্তি এখানেই ঘটলো।
তাহমিনাও আর কথা বাড়ালো না।
সময় কাটছে.....






0 মন্তব্যসমূহ