চুড়ি‌ওয়ালা । পর্বসংখ্যা_০২

#চুড়ি‌ওয়ালা

#রিমা_আক্তার #শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_০২



[নকল/চুরি করবেন না।]


তোর মাইয়ারে এত পড়াইয়া কি অইবো? ব্যারিষ্টারনি বানাবি নি!দেহিস পরে কোন হিরঞ্চির হাত ধ‌ইরা না ভাইগা যায়?"


“ আমার মাইয়ার চিন্তা না ক‌ইরা আপনে চিন্তা করেন কেমনে আপনার বদমাইশ ভাইগনারে তাড়াইবেন!"


আটত্রিশ বছর বয়সী মলির কথায় মুখটা তেতো করে ঢেকুর গিলে পঞ্চাশের নুরুল-উদ্দিন ভেংচি কেটে বলতে লাগলেন,


”বদমাইশ ব‌ইলো না।এই বয়সী ছেলেদের একটু উচাটন থাকেই,তয় বিয়ার পর ঠিক হ‌ইয়া যাইবো।"


“ তয় তাই দেন,দিয়া আমার ঘাড় থেইকা বাড়তি ঝামেলা বিদায় করেন!"


“ আমি তো তাই ক‌ইতাছি,এত পড়নের দরকার নাই।পরে জামাইরে দাম দিবো না। দুইজনের চাইর হাত এক ক‌ইরা দেও,কামাই রোজগার ক‌ইরা এক লগে খাউক।"


“ যা ক‌ইছেন ক‌ইছেন,তা আর ফিরতিবার ক‌ইবেন না।

আমি প্যাডে না ধরলেও পিডে রাইখা মানুষ করছি।ওরটা খাইতাছি, পরতাছি। বেঈমানি করার দুঃসাহস করবেন না।"


মলির কথায় নুরুল উদ্দিন ঠোঁট বেঁকিয়ে তিরষ্কার করে বললো,


“রাবনের মুখে নমোঃ নমোঃ"


মলি নুরুল উদ্দিনের কথায় ঠোঁট এলিয়ে বিতলা হেসে বললো,


“ তাও তো আছে, তোর তো চামড়াই পোড়া,শূয়োরের মতো তাই কোন অনুভূতি ধরে না। নাইলে কি এত বছরেও..."


নিজের কথা সম্পূর্ণ শেষ করার আগেই দরজার সামনে দাঁড়ানো তাওশিকে দেখে থেমে গেল, নুরুল উদ্দিনের উপরের রাগ আর তাওশির দেরি একত্রে মিশিয়ে তাওশির উপরেই চেঁচিয়ে উঠলো,


“ কি লো হতীনের জি,কোন ভাতারের লগে গেছিলি যে এত বেলা হ‌ইয়া গ্যালো? গেছিলি'ই যহন তহন আইলি ক্যান আবার? একবারে জন্মের যাওয়া যাইতে পারোস না ,তোর মার্কা মারা মায়ের মতো!"


এগুলো রোজকার ঘটনা,মলি নুরুল উদ্দিনের সঙ্গে তাকে নিয়ে ঝগড়া করবে, অতঃপর সেই ঝাল তার উপর মিটাবে তাও এহেন কুৎসিত শব্দে।তাওশি আগে কাঁদতো ,তবে এখন আর কাঁদে না। বরং চোখমুখ শক্ত করে নিচে তাকিয়ে থাকে,জমিনের দিকে।হয়তো কান্না চাপতে চাপতে অনুভূতিরা সব ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। তাছাড়াও যার জন্য এসব প্রাত্যহিক,তার জন্য কাঁদা বেহুদা। রক্ত ক্ষরণের চেয়ে বেশি অশ্রু ক্ষরণের যন্ত্রণা যা তাকে রোজ ভোগ করতে হয়।


তাওশির শক্ত চোখ মুখ মলির রাগকে অগ্নিলাভায় পরিণত করে।সে তেড়ে এসে তাওশির চুলের ডান বিনুনির গোঁড়া ধরে কষে টান দিয়ে ধরলো। এতে করে তাওশির মুখটা ব্যাথায় রক্তিম হয়ে উঠলো। রক্তহীন শুভ্ররঙা তাওশির মুখটা যন্ত্রণায় ছেয়ে উঠলেও মুখভঙ্গি আগের মতোই র‌ইলো।এতে যেন সুযোগ পেয়ে বসলো নুরুল উদ্দিন। নিজের মুখ দিয়ে জঘন্য নোংরা শব্দ ব্যবহার করে তাওশিকে বললো,

“ খানকির বেটি,নাগর ধরে বদনাম করার দুঃসাহস করলে একদম গলা কেটে সদরঘাটের লঞ্চের নিচে ডুবিয়ে দিবো।

তোর নাগর খালি আমার তমিজ‌ই অইবো!"


“ ম‌ইরা যামু তাও ঐ লুচ্চারে বিয়া করুম না।"


“ তুই করবি লগে তোর ভাইগা যাওয়া মায়েও করবো।মায় জি এক লগে সংসার করবি। আমার ভাইস্তার ধ* সেই জোর আছে!"


তাওশির যেন কান ঝাঝা করে উঠলো।বিনুনির গোড়ায় হাত রেখে মলির হাত ছাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে বলতে লাগলো,


“ আল্লাহর দোহাই লাগে,আমার মায়রে নিয়া অসভ্য কথা ক‌ইবেন না।ন‌ইলে কিন্তু আমি!"


“ ন‌ইলে তুই কি করবি? এ্যাঁ,মাগীর জি...


নুরুল উদ্দিন মলিকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে তাওশির গাঁয়ে হাত তোলার চেষ্টা করতেই মলি সরিয়ে নিলো। নুরুল উদ্দিনের দিকে অগ্নি দৃষ্টি পেতে শাসানো কন্ঠে বললো,


“ আমি ওর লগে কথা ক‌ইতাছি না? তোর সাহস কি করে অয় আমার সামনে দিয়া ওর গায়ে হাত তোলার?"


“ গায়েই হাত তুলতে গেছি,শুইতে না।"


“ঠিক ক‌ইরা কথা ক, শুয়োরের বাচ্চা!"


“ কি আমি শূয়োরের বাচ্চা?মাগি,খানকি,চুতমারানি তোর ইয়ে...


নুরুল উদ্দিন মলির নিম্নাঙ্গে লাথি মারলো। যোনির উপর লাগায় আ বর্গীয় ব্যথাতুর আওয়াজ তুলে মলি নিচে জমিনে পড়ে যায়।তাওশি ছাড়া পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে উঠানে চলে আসলো। এদিকে এ ঘর ও ঘর থেকে ভাড়াটিয়ারা উঁকি দিয়ে প্রাত্যহিক এই নাটক দেখছে। আর মনে মনে আফসোস করছে।তাওশি নামক রোগাসোগা এই কিশোরী মেয়েটার জন্য তাদের ভীষণ খারাপ লাগে কিন্তু তারাও নিরূপায়। জন্ম দেওয়া বাপ মা যদি খারাপ ব্যবহার করে তখন বহিরাগতদের করণীয় কি?

মূর্খ অশিক্ষিত নিম্ন শ্রেণীর বিভিন্ন পেশাজীবীদের এসব বোঝার মতো বুদ্ধি আর পর্যাপ্ত সময় হয় না।তারা কেবল নাটক সিনেমার মতো দেখেই যায়।আর নিরবে আফসোস করে যায়।


তাওশি বাড়ির উঠানের ডানপাশে বহু আগে লাগানো বিশাল বড় জাম গাছের গোড়ায় বসে মুখ চেপে নিরবে কাঁদতে থাকে।তার জীবনটা এমন কোন? কেন তার জীবনে এক ফোঁটা সুখ লেখা নাই। আল্লাহ কি তাকে ভালোবেসে সৃষ্টি করেন নি! তবে কেন সৃষ্টি করেছেন?


তাওশির চোখ গড়িয়ে পড়া উষ্ণ নোনাজল কেউ একজন নিজের তালু পেতে ধরে ফেললো।নুইয়ে রাখা মাথা তুলে সেই মুখটাকে দেখলো, ফর্সা শ্বেত পড়া এক বালক।যে তার দিকে‌ই ছলছল চোখে চেয়ে আছে।হয়তো বোনের কান্নার ভাগ নিতে এসেছে।তাওশি মৃদু হেসে দিলো।কে বললো তার কপালে একটুও সুখ নেই? এই যে তার সুখ।তার অবসাদগ্রস্ত জীবনের, অবিশ্রান্ত মনের এক পশলা সুখ।তার ভাই,আপন না হয়েও আপন।সৎয়ের চেয়ে বড় সৎ তবুও ভীষণ আপন।এই দুনিয়ায় তাওশির একমাত্র আপনজন।


আট বছর বয়সী তুষার, বোনের জীবনের যন্ত্রণা কমানোর ক্ষমতা তার না থাকলেও বোনের পাশে থাকার গুরুত্ব ঠিক বুঝে।ছলছল চোখে বোনের চোখ মুছিয়ে দিয়ে মুরব্বিদের মতো গাঢ় কন্ঠে বলতে লাগলো,


“ কেঁদো না তাওশি মনি,দেখো একদিন একটা রাজপুত্তুর এসে তোমাকে এই রাক্ষস পুরী থেকে উদ্ধার করবে।"


তাওশি ভাইয়ের কথা শুনে কান্নার মাঝেই ফিক করে হেসে দিলো।

এই কথাগুলো তুষার ফেইরি টেইল থেকে শিখেছে। যেখানে দেখানো হয়েছিল রাজ্য দখল করে রাক্ষসরা রাজকন্যা আর বালক রাজকুমারকে বন্দি করে রাক্ষস পুরীতে আঁটকে রাখে। তাদের মধ্যে থেকে একজন রাক্ষস রাজকন্যাকে বিয়ে করতে চাইলে রাজকন্যা রাজী হয় না।তাই রোজ রাজকন্যাকে অত্যাচার করা হয়। তখন ছোট্ট রাজকুমার নিজের বোনকে এভাবেই শান্তনা দিতো।


তুষার বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো।তাওশি চোখ নামিয়ে নিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি করছে। ঐদিকে ঘরে চলা তান্ডব এত সময়ে শান্ত হলেও থেমে থেমে মলির মুখের বিচ্ছিরি শব্দগুলো ভেসে আসছে।তাওশি একবার মাথা তুলে সেদিকে চাইলো, অতঃপর চাইলো তাদের এক তলা বিল্ডিংয়ের পিছনের খালি অংশে। অনুভূতিহীন চাহনিতে চেয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। এরপর উঠে জামা ঝেড়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটে গেলো।তুষার‌ও বোনের পিছু পিছু দৌড়ায়।


__________________________


বিকেলের মধ্যেই মেলা জমে উঠলো।যদিও সব দোকান বসেনি।তাতে কি? শিশু কিশোরদের তো দোকানি দিয়ে কাজ নেই,তারা এসেছে চরকি, নাগরদোলা,জাদু দেখার লোভে।দলে দলে ছেলে মেয়েরা ছুটে যাচ্ছে মেলার দিকে।

মেলার সদর ফটকে প্রতিস্থাপন করা সাময়িক তথ্য ঘর,সেখান থেকে উচ্চাওয়াজে বেজে চলছে সব পুরানো বাংলা সিনেমার গান, যাত্রার অভিবাদন ও বিভিন্ন সুরেল কন্ঠের উপস্থাপনা।

মিনহাজ দুপুরের খাওয়া শেষ করে লুঙ্গির কোছে হাত মুছে উঠে বসলো দোকানের গদিতে।

তারেক তখন‌ও খাচ্ছে। মুর্শিদ খাঁ,এই দোকানির বড় অংশিদার।তিনি পানের পিক দোকানের দরজার চিপায় ফেলে তারেককে বললেন,


“ প্যাড ছাইড়া খাইস না ব্যাটা।পরে ছাড়নের জায়গা পাবি না।এইডা বাড়িঘর না।"


“ খাওনের ল‌ইগাই তো এত কষ্ট করতাছি মাহাজন চাচা।খাওন‌ই যদি না খাইতে পারি তাইলে লাভ কি কষ্ট ক‌ইরা!"


তারেকের কথায় মিনহাজ মাথা দুলিয়ে শব্দহীন মৃদু হাসলো। মুর্শিদ খাঁ পান চিবাতে চিবাতে তিনিও অস্ফুট স্বরে বিরবির করলেন,


“ গরীবের ঘোড়া রোগ বোধহয় এইডারেই কয়!"


“ চাচা,এই এলাকার হাবভাবে কয় এবার আল্লাহ দিলে নিরাশ হমু না। আপনের কি মনে হয়?"


“ হ ব্যাটা,গরীব এলাকা তো‌। মানুষজনের মাঝে এহোন ম্যালা নিয়ে ম্যালা আগ্রহ দেহা যায়। আল্লাহ আল্লাহ কর,জানি পকেট দুইডা শান্তি পায়।"


“ ফি আমানিল্লাহ্ চাচা।

আপনি এহোন বাইরে যাইবেন?"


“ হ, এক পাক দিয়া আহি।দেহি এলাকায় সুন্দর ছেমরি কতগুলা আছে! বোঝোই তো, সুন্দর সুন্দর মুখ দেখলেও দিন সুন্দর হয়ে যায়!"


মুর্শিদ রসিক মানুষ, কিন্তু একটু দোষ‌ও আছে‌। যাকে বলে চারিত্রিক ত্রুটি।তা হলো,এই বয়সেও অল্প বয়সি মেয়েদের দেখে চোখের তৃষ্ণা নিবারণ করা।যদিও আজ পর্যন্ত তার দ্বারা কোন মেয়ের চুড়ান্ত ক্ষতির কথা কখনো মিনহাজের কানে আসেনি । কিন্তু যেখানেই মেলায় দোকান নিয়ে বসে,সেখানেই একজন নারী জুটিয়ে ফেলে।যতদিন থাকে ততদিন সেই নারীর পিছু পিছু ঘুরপাক খায়।অথচ তার ঘরেও একজন বিবাহ যোগ্যা কন্যা, একজন দু সন্তানের কন্যা রয়েছে।

কিন্তু যার চোখে দোষ সে কি এত কিছু দেখে? ভাবার সময় পায়?


“ এ্যাই চুড়ির মুঠ কত?"


মিনহাজ মুর্শিদকে নিয়ে ভাবছে ঠিক তখনই এক নারী কন্ঠ ভেসে আসে।

সে সেদিকে তাকিয়ে চুড়ির মুঠ নিজের ডান হাতের মধ্যমা তিন অঙ্গুলির মাঝে তুলে নিয়ে নারীটির হাতে দিলো সঙ্গে বললো দাম।


“ দেড়শো টাকা আপা!"


“ কিহ্,এত দাম? কত কম রাখবেন?"


মিনহাজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো,তারেক‌ও আপন মনে খেতে থাকলো। চারদিকের হ‌ইচ‌ইয়ে মেলার বাজার জমে জমজমাট হচ্ছে।


“ মিঞাও..চি চি চি চি।হিস, হিস!হুহ!"


তাওশি নিজে পড়ার টেবিলে বসে ড্রয়িং পেপারে মেহেদী ডিজাইন তোলার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই জানালার বাইরে থেকে অদ্ভুত সব শব্দ ভেসে আসায় অনুমান করে নিলো তাকে ডাকছে।এসব তাদের পুরানো পদ্ধতি।তাওশি একবার দেখলো দরজাদ দিকে।কেউ নেই। তারপর জানালার পর্দা সরিয়ে এদিকে ওদিকে চাইতেই জানালার পাশে দেওয়ালে সাথে পিঠ সেটিয়ে দাঁড়ি থাকা মুনিয়ার আধো আধো দেখা পেলো।


“ মুনি....কি হয়েছে?"


ফিসফিস করে বললো কথাটা। মুনিয়া এবার মুখোমুখি হয়ে ফিক করে হাসলো।তাওশি সেই হাসি দেখে ভ্রু কুঁচকে নিলো।শুধালো,


“ কি চাই? তোরে না বলছি এভাবে ডাকবি না। দেখলেই কি হইতো?


“ আমি বুঝতে পারছি, এহোন ঘরে তুই একাই আছিস।তাই এমনে ডাকছি।আর্য বুঝবে কেমনে, এগুলো তো পশুপাখির ডাক।"


“ তাও এমনে ডাকবি না।ঐ নুরুল উদ্দিন দেখলে খুব খারাপ কিছু হ‌ইবো!"


“ হেয় না তোর বাপ,বাপের নাম ধ‌ইরা ডাকে কেউ?"


“ বাপ না, সৎ বাপ।আর তাছাড়াও.."


“ কার লগে কথা কস রে ঐহান দিয়া?"


মলির রুক্ষ গলার স্বর।তাওশি চমকে উঠলো।মুনিয়াও,সে দ্রুত আবার সরে গেলো।তবে এবার বেশ খানিকটা দুরত্বে দাঁড়ালো।তাওশির সাথে মুনিয়ার মেলামেশা মলি পছন্দ করে না।তাওশির সাথে কারো ওঠাবসাই মলি, নুরুল উদ্দিন পছন্দ করে না।তারা তাওশিকে নিজেদের আয়ত্তে রাখতে চায়। সেখানে কারো সঙ্গতায় যদি তাওশির ডানা গজায় তখন?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ