চুড়ি‌ওয়ালা । পর্বসংখ্যা_০৩

 #চুড়ি‌ওয়ালা

#শেখ_মরিয়ম_বিবি #রিমা_আক্তার

#পর্বসংখ্যা_০৩



[নকল/চুরি নিষিদ্ধ]


ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে তা মুখে পুরে হাঁটতে হাঁটতে ঘাটের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। বাবু বাজার, সদরঘাট কিংবা সোয়ারিঘাটের ট্রলার এপাশ ওপাশ করে অপেক্ষায় থাকে যাত্রীদের জন্য।তবে আটটার আগে এপাড় থেকে ট্রলার পাওয়া অনিশ্চিত ।তাই এ'পাড় থেকে ও'পাড়ে সকালে যাওয়ার সহজ পদ্ধতি নৌকা।

তাওশি আর মুনিয়া নিজেদের ব্যাগ কাঁধে চেপে তড়িঘড়ি করে ঘাট দিয়ে নামছে।


“ দেরি হয়ে গেলে বুঝিস তুই মুনির বাচ্চা!"


“ দশটায় ক্লাস,এত তাড়াতাড়ি যেয়েও কেন দেরি হবে বল তো!"


“ কেন না আমার আজকে লাইব্রেরিতে বসে এসাইনমেন্ট সম্পন্ন করতে হবে।"


“ রাতে বাসায় কি করেছিস?"


“ এ বাসায় রাতে পড়া যায়?"


“ কাল আবার কি হয়েছে!"


“ আর কি হবে? লুচ্চাটা বাসায় এসেছিল! আর .."


তাওশি আর বলতে পারলো না।ওর ফর্সা শীর্ন বদনখানা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেলো।মুনিয়া ওর হাত চেপে ধরে সহানুভূতিশীল নয়নে বললো,


“ দেখিস, একদিন আল্লাহ ওর উত্তম বিচার করবে!"


“ ততদিন আমি থাকলেই চলে।"


“ আচ্ছা তুই তোর মামার বাড়ি কেন চলে যাচ্ছিস না? সেখানে গেলেও তো.."


“ যারা নিজের বোনের খোঁজ নেয় না তারা কি না আমার খোঁজ নিবে? তা-ও আবার...ধুর! চল তো দেরি হয়ে যাবে।"


বলেই তাওশি নৌকায় পা রাখতেই সেটা দুলে উঠলো।মুনিয়া ওকে ধরে সাহায্য করার জন্য নৌকায় উঠতেই আরো বিপদে পড়ে গেলো। নৌকার এক পাশে দুজনের ভর পড়ায় সেটা কাত হতেই তাওশি, মুনিয়া দু'জন‌ই একসাথে নদীতে পড়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ঝমঝমিয়ে উঠলো। দুজন কলেজ পোশাক পরুয়া কিশোরী, কাঁধে ভারী ব্যাগ সহ ধপাস করে পানিতে পড়লো। বিষয়টা যেমন বিব্রতকর তেমনি অনেকের কাছেই হাস্যকর। নৌকার মাঝি বৃদ্ধ বাশার।


বাশার চাচা এদের নিয়মিত নিয়ে যাওয়া আসা করেন, বেশিরভাগ দিনই তাওশি, মুনিয়া চাচার নৌকায় যাতায়াত করে।তিনি হতবিহ্বল হয়ে কয়েক পলক চেয়ে থাকলেন। ততক্ষণে অন্যান্য নৌকার অনেকেই এদিকে এসেছে ওদের উদ্ধার করতে কিন্তু পানি দেখে অনেকেই নামছে না।যদিও বা ঘাটের কিনার এতটা গভীর নয় কিন্তু বর্ষা মৌসুমে পানি থাকে উপচেপড়া।ঘাট পেরিয়েও বহু উপরে উঠে আসে।তাই একটু পানি বেশি হ‌ওয়ায় সবাই হাত বাড়িয়ে সহযোগিতা করছে। কিন্তু লজ্জায় তারা দুজন চোখ তুলতেই পারছে না। এদিকে সাদা পোশাক গাঁয়ে চিপকে গিয়েছে। মাথার হিজাব ভিজে চোখের উপর আছড়ে পড়ে চোখ, মুখ,নাক ঢেকে পড়লো।তার জন্য চোখে দেখতেও সমস্যা হচ্ছে।


ব্যাগে থাকা সব ব‌ই ভিজে কয়েক কেজি ভারী হয়ে উঠেছে তাতে আরো সমস্যা হচ্ছে উপরে উঠতে।তাওশি এক ডুব খেয়ে নাকে মুখে পানি ঢুকিয়ে চোখ খিচিয়ে বন্ধ করে রয়েছে, বুকের সাথে ব্যাগটা চেপে ধরে উপরে উঠে আসার চেষ্টা করছে।


এমতাবস্থায় কেউ তার বাহু ধরে তাকে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে ধরে কিনারের দিকে যাচ্ছে।শক্ত, ভীষণ রুক্ষ এক ছোঁয়া,মনে হচ্ছে লোহার ন্যায় শক্ত কোন দন্ড দিয়ে তাঁকে ছোঁয়া হয়েছে।


মুনিয়া নৌকার উপর পা ঝুলিয়ে বসে জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ছে।তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। নদীতে পড়তেই সে একবারে তলে চলে গিয়েছিল। সাঁতারের কৌশল জানে বিধেয় উপরে উঠে আসতে পেরেছে। কিন্তু, কাঁধের ব্যাগ ভারী থাকায় সমস্যা হচ্ছিল।উপরে উঠতেই পাশের নৌকার মাঝি হাত ধরে টেনে নিজের নৌকার পাঠাতনে বসিয়ে দিয়েছে। অন্য এক মাঝি লুঙ্গি কাছা বেঁধে পানিতে নেমে তাওশিকে তোলার জন্য হাত বাড়াতেই দেখলো ততক্ষণে তাওশি আরেকজনের বুকের কাছে মাথা ঠেকিয়ে দ্রুত শ্বাস ছাড়ছে।


তাওশি সাঁতার জানে না।তাই তার ভয় পাওয়া নিছকতা নয়। ভীতগ্রস্থ তাওশি জানে না কার বুকে মাথা ঠেসে সে দাঁড়িয়ে আছে। কার সঙ্গে মিশে আছে তার রোগা, ফ্যাকাশে গড়নের পাতলা দেহ খানা।কার লোমশ গহীনে প্রচ্ছন্ন প্রশ্বাস নির্গত করছে,কার খরখরা শক্ত হাতের তালুতে তার নরম রোগা হাতখানা,সে তা দেখার জন্য নিজের বন্ধ নয়ন মেললো না।ভয়ে, আতংকে তটস্থ তাওশির কলিজা থরথর করে কাঁপছে। সে ঐ রক্ষাকারী অজ্ঞাত ব্যক্তির চেয়েও শক্ত করে চেপে ধরে অবিরত কেঁপে যাচ্ছে। নিজের দৈত্যাকার নখ বিধিয়ে দিয়েছে ঐ শক্ত দন্ডাকৃতির বাহুতে।


তারা বুক সমান পানির মাঝে দাঁড়িয়ে র‌ইলো। শক্ত করে ধরতে গিয়ে নিজের নখের আঁচড় বসিয়ে দিলো তামাটে রঙের বাহুতে।


মিনহাজ দাঁত ব্রাশ করে একেবারে গোসল সেড়ে যাবে বলেই নদীর কুলে নেমেছিল।সে নৌকায় উঠার সময়েই তাওশি,মুনিয়াকে দেখেছিল।তার মুগ্ধ, নিপাট চাহনি যুগল স্থির হয়েছিল ঐ ফর্সা মুখটাতে। অবিচল চেয়ে দেখছিল, কিন্তু তার অমন মুগ্ধতা টিকেছিল কীয়ৎকাল।যা সেই রমনীদ্বয়ের এহেন বেকায়দায় পড়াতেই বিচূর্ণ হয়ে যায়।

ওরা পানিতে পড়ে যাবার সময়ে মিনহাজ হতবিহ্বল হয়ে চেয়েছিল ঠিক‌ই কিন্তু যখন ঠাওর করলো তাওশি সাঁতার জানে না।সেও ঝাঁপিয়ে পড়লো।অথচ সে নিজেও সাঁতার জানে না,তা যেন সে ভুলেই বলেছিলো।


মিনিট প্রায় পাঁচ পেরিয়ে যেতেই তাওশি একটু স্বাভাবিক হলো।

কিন্তু মুনিয়ার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো।তার শ্বাস টান উঠেছে।সে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে,মাঝি খেয়াল করতেই জিজ্ঞেস করলো,


“ এ্যাই এই মাইয়ার তো শ্বাস টান উঠেছে।এ্যার কি শ্বাসের ব্যারাম আছে নাকি?"


বাক্যগুলো কর্ণকুহুর হতেই তাওশি চোখ মেললো।আর সর্বপ্রথম তা গিয়ে মিলিত হলো একজোড়া ঘন,কুচকুচে কালো গভীর নয়নের সাথে।তার কোমর চেপে নিজের সাথে মিশিয়ে রেখে নিস্প্রলক চেয়ে আছে তার‌ই পানে। মানুষটার ডান হাতের তালুতে তাওশির বাম হাত,আর তার বাম বাহুতে তাওশির ডান হাত।সে বাম হাত দিয়ে তাওশির কোমর চেপে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে রেখেছে, ভীষণ গভীরভাবে।

ঐ ভেজা কুচকুচে কেশের জল ঝরে তার ঘন নেত্রপদ্মের পল্লবরাশী ছুঁয়ে তাওশির নরম কোমল ঠোঁট ছুঁয়ে পতিত হচ্ছে বর্ষায় ডোবা বুড়িগঙ্গাতে।


তাওশির ভেজা নরম ঠোঁট জোড়া কাঁপছে, মিনহাজের পুরুষালি মন ঠোক গিললো।সে অবচেতনেই এতটা নিকটে আঁকড়ে রেখেছে সদ্য চিত্ত হরন করা এই কিশোরীর পানে।


এই যুগলের এহেন বাক্য বিনে মন বিনিময়ের মধুরতম সুরের ছন্দ কাটলো চারদিকের হ‌ইহল্লায়।


তাওশি মিনহাজকে ছেড়ে দিতেই পা পিছলে আবারও নদী গর্ভে যাওয়ার উপক্রম হতেই মিনহাজ পূনরায় এক‌ই ভাবে তবে এবার কোমর নয়, হাত ধরে টেনে উপরের দিকে এগুলো মিনহাজ।


ততক্ষণে ঘাট কুলে মুনিয়াকে নিয়ে সোরগোল পড়ে গেলো।তাওশি ভেজা জামা নিয়ে উপরে উঠতেই ওর দেহের নিম্নাঙ্গের সৌন্দর্য দৃশ্যিত হতেই মিনহাজ তাওশির হাত ধরে থামিয়ে দিলো।তাওশি বড় বড় চোখে সেই হাতের বাঁধনে চাইতেই মিনহাজ বললো,


“ এইটা গাঁয়ের উপরে ফালায় নেও। নয়তো লোকে...


আর কোন বাক্যের প্রয়োজন হলো না।সে নিজেই

নিজের গামছা দিয়ে তাওশির কোমর পেঁচিয়ে বেঁধে দিলো। তাওশি নিজেও ভেজা হিজাব দিয়ে নিজের উপরের অংশ ঢেকে নিলো।


মুনিয়ার শ্বাস টানা উঠায় সবাই ধরাধরি করে ওকে একটা ফার্মেসির সামনে নিয়ে গেলো।যদিও তখন দোকান খুলেনি কিন্তু সিরিয়াস অবস্থা দেখে সবাই মিলে দোকানিকে ধরে আনে।তাওশি মুনিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।আর ওর পিছনে দাঁড়িয়ে ওকে দেখছে মিনহাজ।


“ তুমি কে বাবা? তোমারে তো আগে কখনো দেখি নাই।

_ এ্যাই মাইয়া দুইডারে তো চিনি।এরা এই এলাকার‌'ই মাইয়া। কিন্তু তুমি কেডা?"


একজন বয়স্ক লোক জিজ্ঞেস করলো মিনহাজকে।তিনি শুরু থেকেই সবটা দেখেছেন।এত সময় তাওশি, মুনিয়াকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকায় কেউ এত কিছু ভাবেনি। কিন্তু এখন যেন সব বিষয়ে ভাবার সময় এসেছে।তিনি খেয়াল করেছে কিভাবে মিনহাজ তাওশিকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো।তাওশি'ও তো ছিল। যত‌ই বিপদের সময় হোক।এক জোয়ান ছাওয়াল জোয়ান গেদিরে খোলা আকাশের নিচে ওমনে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে তা কি আদৌ মেনে নেওয়া যায়? এটা আমাদের সামাজিক অবক্ষয় নয়?


“ তা ঘাটে কোন নাগরের লগে ল্যাপ্টাল্যাপ্টি চলতাছিলো?"


ঘরে পা ফেলতেই নূরুল উদ্দিনের গাঁ জ্বালানো তিরস্কার।লোহার দোলনায় বসে এক পা তুলে অন্য পা জমিনে রেখে তা দিয়ে দোলনা দুলিয়ে, পান চিবুতে চিবুতে কথাটা বললো নুরুল উদ্দিন।পরনের লুঙ্গি হাঁটুর উপরে তোলা।ডান পাশে ফুটাওয়ালা একটা পুরানো সেন্টু গেঞ্জি পরনে তার। ভীষণ বিচ্ছিরি বসার ধরন।তাওশি বুকের উপর চেপে ধরা ব্যাগটা আরো শক্ত করে ধরলো। আড়চোখে একবার নুরুল উদ্দিনকে দেখে আবারও পা বাড়াতেই নুরুল উদ্দিন আগের মতোই, থু থু ছিটানোর ন্যায় অভিব্যক্তি জাহির করে বললো,


“ তোমরা মাগিরা করলে দোষ নাই,দোষ খালি আমরা মামা ভাইগনা করলেই।

তা যা খুশি করতাছো করো।বিয়ার পর আমার ভাইগনা ঠিক‌ই পিডায় পাডাইয়া সোজা ক‌ইরা ফেলবো।"


তাওশি এই কথার প্রেক্ষিতে কিছু বলতে পারে, কিন্তু এখন বলা সমুচিত সময় নয়।কেননা তার দিকে তো শুধু নূরুল উদ্দিনের ভাগ্নের‌ই নয়, স্বয়ং নুরুল উদ্দিনের‌ই কুৎসিত নজর পড়ে থাকে সারাক্ষন।

শুধু অর্থের লোভে ছুঁয়ে দেখতে পারে না।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ