#চড়ুইভাতি
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#ঈদ_স্পেশাল_পর্ব
অফিস ছুটি দিয়েছে গত পরশু দিন। কাল সবার জন্য কেনাকাটা করেছে। আজ যাবে গ্রামে। তৌকির হাওলাদার নিজের গায়ের শার্টটা টেনেটুনে ঠিক করতে করতে বলল,
“শার্টটা খুব মানিয়েছে, বল?"
লিলি বোরকার সামনের বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে বলল,
“হ্যাঁ, মাশাআল্লাহ আপনাকে সুন্দর লাগছে।"
“কি যে বল, কালুয়াকে আবার সুন্দর লাগছে!"
তৌকির কথাটা বেশ অবজ্ঞা নিয়েই বলল। তাতে তেতে উঠল লিলি। হিজাব মাথায় পেচাতে পেচাতে বলল,
“আমার চোখে সুন্দর লাগছে। আপনার মতামত কে চাইছে শুনতে?"
লিলির মুখ ফুটেছে। বিয়ের দুই বছর ঘনিয়েছে। ঘরের বাইরে যাওয়া শিখেছে। এখন তার কত মানুষের সঙ্গে উঠাবসা। যার দরুন মুখের বাঁধ ভেঙ্গেছে। কথা বলে ফটাফট। তৌকিরের কাছে বেশ লাগছে এই নতুন লিলিকে। তবে ভয়েও আছে।
লিলি এখন ভার্সিটিতে পড়ে। কত লোকের সঙ্গে চলছে। এই চলার পথ যদি কখনো ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করে? তবে তৌকিরের কী হবে? এক জীবনে কতজনকে হারাবে? কতবার মন ভাঙ্গার বেদনা সইবে?
আবার আপন মনেই নিজেকে সাহস দিয়ে যায়। ভয়কে জয় করতে হবে। কিন্তু তার মনের মধ্যে জমে থাকা সুক্ষ্ম দাগ তা হতে দিচ্ছে না। ইদানিং কাজের চাপে তার বাহ্যিক সৌন্দর্যে ভাটা পড়েছে। কালচে গড়নের চেহারায় এখন আবার নতুন করে মেছতার আবির্ভাব ঘটেছে। যার দরুন তা আরও কালসিটে দেখাচ্ছে।
এদিকে লিলির যৌবনের পূর্ণ সময়। সে আরো রূপবতী, সুন্দরীতে পরিণত হচ্ছে। ভার্সিটিতে যাওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত তার মধ্যে রূচিগত পরিবর্তন ঘটছে। সামাজিক জীবনকে এডজাস্ট করতে যাওয়ায় নিজের প্রতি যত্নশীল হয়েছে, যার কারণে অনেক পরিবর্তনই লিলিকে ভিন্ন লিলিতে পরিনত করেছে। আর এসবই তৌকিরের মনের ভয় বাড়াচ্ছে। যদিও তা সে কাজে কর্মে বুঝতে দেয় না।
লিলি তাদের প্রয়োজনীয় চার্জার ক্যাবল, হেডফোন নিজের ব্যাগপ্যাকে ঢুকিয়ে নিল। তৌকির লিলিকে চুপ মেরে থাকতে দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। লিলির গাল দুটো আপেলের ন্যায় টসটসে। তা এখন ফুলে আছে। সে বুঝে গেল তার বউটার অভিমান হয়েছে। ঠোঁট ছড়িয়ে মৃদু হাসল। অতঃপর এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে চেপে ধরে কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে রেখে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার স্বামী সবচেয়ে সুন্দর, আন্ধার রাইতের জোনাকি। ঠিক আছে? খুশি এইবার?"
লিলি ফুলিয়ে রাখা গাল দুটো উপরে তুলে তাকাল তৌকিরের মুখপানে। ভাসা ভাসা চোখ দুটো মেলে টলটলে চোখে চেয়ে থাকল কয়েকটি সেকেন্ড। এরপর বলল,
“নিঃসন্দেহে!"
“আচ্ছা চলো। দেরি হয়ে গেল বলে।"
সাভার, নবীনগর থেকে ঢাকা সদরঘাট পর্যন্ত আসতে যেই হ্যাপা পোহাতে হবে তা ভাবতেই লিলির গায়ে জ্বর ওঠার উপক্রম হয়েছিল। তাই সোজা বাসে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৌকির।
লিলির ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ হয়নি। সে চান্স পেল জাহাঙ্গীরনগর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে। যদিও তার এই বিষয়ে মন যথেষ্ট খারাপ হয়েছিল। কিন্তু, তৌকির হাওলাদার বড়ই খুশি হয়েছিল। সে বউয়ের সুবিধায় বাসা পরিবর্তন করে কামরাঙ্গীরচর থেকে সোজা সাভার, নবীনগর করে। চাকরি পরিবর্তন করে। যদিও এটা আগেরটার চেয়ে ভালো।
“আব্বা, আম্মার জন্য স্যান্ডেল কেনা হইল না।"
“বাড়ি গিয়া কিইনো। তাগো মাপ বুইঝা।"
“জি।"
বিশাল বড় বড় দু'টো সুটকেস ঠেলেঠুলে রিক্সায় তুলল তৌকির। এরপর লিলিকে বলল,
“এইটায় বসতে পারবা?"
“পারব, আপনি একটু সাহায্য করলেই হবে।"
তৌকিরের হাতের মুঠোয় হাত রেখে সুটকেসের উপর পা ফেলে সিটে চেপে বসল। তৌকিরও একই কায়দায় রিক্সার চাকার মোটা শিকের উপর ভর ছেড়ে লিলির মতো পা উঠিয়ে বসল।
নিজে আঁটসাঁট হয়ে বসে লিলির পিছনে হাত রেখে ওকে আগলে রাখল। ওরা ঠিকঠাক হয়ে বসতেই রিক্সাওয়ালা প্যাডেলে পা রাখে।
নবীনগর বাসস্ট্যান্ডেই রয়েছে সাকুরা ও হানিফের কাউন্টার। এছাড়াও রয়েছে ঈগল নামের আরেকটি পরিবহন কোম্পানির ঢাকা টু কুয়াকাটা ভিআইপি বাস সার্ভিস চালু।
তৌকির সাকুরার টিকেট কেটে রেখেছিল। যেটা সরাসরি বরিশাল নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড নিয়ে থামবে। সেখান থেকে বাকীটা আবার পটুয়াখালীর লোকাল বাসে চড়ে যেতে হবে।
“আমাদের সিট কি এবারেও পিছনে পড়েছে?"
বাসে লিলির বমি হয়। সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পিছনে সিট পড়লে তো আরো বিপদ। তাই তৌকির ঘুষ খাইয়ে সামনের দিকে সিটের ব্যবস্থা করিয়েছে।
ঝালটক দেখে দেখে লজেন্স কিনছিল তৌকির। সে লিলির প্রশ্ন শুনেনি। দোকানিকে টাকা দিয়ে লিলির দিকে ফিরতেই লিলির কুঞ্চিত ললাট দেখে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে?"
তৌকিরের দৃষ্টিতে লিলি যতই পরিবর্তিত লাগুক, আদৌওতে ততটা হয়নি। বিড়ালকে বাঘের ভাগ্নে ডাকলেই সে বাঘের প্রজাতি হয়ে যায় না। সে বিড়ালই থাকে। লিলিও তাই। তৌকির ছাড়া প্রকৃত অর্থে সে এখনও অচল। নাজুক, দূর্বল, লাজুক প্রাণী।
“আমাদের কোন পাশে?"
লিলি পূণরায় জিজ্ঞেস করল। তৌকির বাসের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“ভেতরে উঠলেই তো বুঝবে। আসো।"
স্বামীর পিছু পিছু বাসে উঠল। B3+4 সিট দুইটা তাদের। সামনের দিকে সিট পাওয়ায় লিলির মুখটাকে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চোখমুখে ফুটে উঠল মনের অভিব্যক্তি।
লিলি জানালার পাশে বসতেই তৌকির জানালা মেলে দিল। এরপর নিজেও বসল গা ঘেঁষে।
প্রায় তিরিশ মিনিট লেইট করে বাস ছাড়ল। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছেই না। যেন থম মেরে আছে। এদিকে এই অল্প সময়েই লিলির ভেতরে অস্বস্তি বোধ শুরু হয়ে গেছে। ঢেঁকুর আসছে বারবার। মুখ টক হয়ে গেছে।
তৌকির মোবাইলে খবর পড়ছিল মনোযোগ দিয়ে। লিলি বারবার জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাচ্ছে, আর থুতু ফেলছে।
সে বুঝতে পেরে ব্যাগ থেকে সেই লজেন্স গুলো বের করে একটার প্যাকেট ছিঁড়ে লিলির দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল,
“এইটা মুখে রাখো। দেখবে বেটার ফিল করছো।"
“না, এখন কিছু মুখে নিব না। তাহলে সত্যিই বমি করে দিব।"
“এটা মুখে দিয়েই দেখ, ইউ উইল ফিল রিল্যাক্সড।"
তৌকিরের জোরাজুরিতে লিলি মুখে নিল লজেন্সটা। স্বাদ দারুন। যেহেতু ঝালটক মিক্সড, তাই অল্প সময়ের মধ্যেই তার মুখে একটা চমৎকার অনুভূতি বোধ হয়। সে মুখটা চৌখা করে তৌকিরের দিকে তাকিয়ে রয়। তৌকির লিলির ঘাড়ের নিচে হাত ঢুকিয়ে আলতো করে চেপে ম্যাসেজ করে। এতে করে লিলির আরাম লাগে। সে তৌকিরের দিকে এগিয়ে তৌকিরের কাঁধে মাথা ছেড়ে দেয়।
সময় আরো পাড় হয়। ঘন্টা খানেক পার হতেই বিভিন্ন স্টপেজ থেকে যাত্রী তোলা শেষ হয়। বাস যথাসম্ভব দ্রুত গতিতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে যদিও পথে থেমে থেমে অনেক যানজট। তার মধ্যে দিয়েই সাকুরা তার সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রয়োগ করেছে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছানোর জন্য। কেননা কাল সকালে ঈদ।
লিলি তৌকিরের ঘাড়ে মাথা ফেলে আধশোয়া হয়ে বসে আছে। তৌকির লিলিকে সরাচ্ছে না। যদিওবা তার কাঁধ প্রচন্ড ব্যথা করছে এত সময় এভাবে ওর কাঁধে ভর ছেড়ে রাখার ফলে।
তবে এতেই তৌকিরের সুখ। নিজের বউয়ের এইটুকু ভার বইতে না পারলে সে কিসের পুরুষ মানুষ?
“কী দেখেন?"
লিলি ঘাড় তুলে চোখের বিস্ময় ধরে রেখেই জিজ্ঞেস করল। লিলির ঘুমঘুম টলমলে চোখে করা প্রশ্নের উত্তর তৌকির ওর দিকে বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে থেকে, ওর চোখে চোখ রেখেই দিল।
“আমার চাঁদকে!"
“আমি বুঝি আপনার চাঁদ?"
“হ্যাঁ! আমার আকাশের একমাত্র চাঁদ, বারোমাসি চাঁদ। যে নিজের মনের আলোয় আমার মনের আঁধার কাটিয়ে দিয়েছে। যে নিজের ভালোবাসা দিয়ে আমার শূন্য বুক পূর্ণতায় ভরে দিয়েছে!"
“তার ক্রেডিট তো আপনার!"
লিলি তৌকিরের বুকের উপর তার দুহাত রেখে তাতে থুতনি ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি আমাকে শিখিয়েছেন ভালোবাসা কাকে বলে। ভালো কীভাবে বাসে! সুতরাং আজ যদি আমি কিছু অর্জনও করে ফেলি তাও সবটুকু আপনার অবদান। আপনি আমাকে হাতকলমে শিখিয়েছেন সংসার কিভাবে করতে হয়। আপনাকে ছাড়া আমার আমি শূন্য। ধূ ধূ মরুভূমির মতোই উত্তপ্ত এক রিক্ত জীবন।"
তৌকির মুগ্ধ নয়নে দেখছে তার বউকে। সে লিলির একটা কলি এনেছিল। আজ তা ফুটন্ত লিলি। যার যৌবন উপচে পড়ছে নারীত্বের সৌন্দর্য। তৌকির গভীরভাবে অবলোকন করে তার বউকে। লিলির মুখের সেই কিশোরীপনা এখন আর নেই। পুরো বদনে প্রস্ফূটিত পূর্ণবতী নারীত্বের ছাপ।
বাসের ভেতর দুই একজনের গল্প গুজবের সুর শোনা যায়। এমতাবস্থায়ও তৌকির লিলিকে নিজের দিকে টেনে আরো লাগিয়ে বসাল। লিলির কোমরের দিকে হাত গলিয়ে কোমর চেপে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ওর কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“লঞ্চে গেলে ভালো হত না?"
এই কথার কারণ বুঝতে একটুও সময় লাগল না। লজ্জায় লাল চেরির মতো রক্তিম হয়ে উঠল। লিলি তৌকিরের লোমশ বুকে নখ দিয়ে খোঁচা দিয়ে বললো,
“বাড়ি অবধি সহ্য করেন।"
সহ্য করল তৌকির। এছাড়াও উপায় কী? সে তো রোজাদার, রমজানের মাসে কী চাইলেই বউকে আদর করা যায়? সে লঞ্চ হোক কিংবা বাস!
লিলিকে এক হাতে জড়িয়ে রেখে সিটে মাথা হেলিয়ে দিল। লিলি তৌকিরের শার্টের বুকের অংশ খামচে ধরে স্বামীর কাঁধে মাথা হেলে চোখ বুঝে সহ্য করে নিল এই অসহনীয় বাস ভ্রমনকে।
ঢাকার অসহ্য জ্যাম ঢেলে কোনরকম ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে চলছে বাস। এর মধ্যেই এক ফিলিং স্টেশনের ঢুকল। মানুষ বিরক্ত হচ্ছে। অনেক যাত্রী হালকা হবার জন্য বাস থেকে নেমে মিনিট দুই হাঁটাহাঁটি করল। যদিও তৌকিরেরও হালকা হবার দরকার ছিল কিন্তু লিলিকে সরিয়ে যেতে হবে বলে সে গেল না। মিনিট পাঁচেক এর মধ্যেই বাস পূণরায় ছাড়ল।
বাসের মধ্যে তাদের দুই সিটি পিছে বিপরীত লাইনে একটা দম্পতি বসেছে। তাদের কোলে দেড় বছরের একটা বাচ্চা রয়েছে। যে এই বাসের বোরিং ভ্রমনকে আনন্দে পরিণত করতে খুব পাকামো করছে। এখন সে এই চলন্ত বাসের সিট ধরে টুকটুক করে হাটছে আর অন্য যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে তার ফোকলা দাঁত বের করে হাসছে।
তৌকির ঘাড় সোজা রেখেই তার পায়ের কাছে তার প্যান্ট খামচে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই পুচকুটাকে দেখল। ছোট ছোট এক জোড়া চোখ, বোচা নাক। ফিক করে হেসে তাকায় তার দিকে। আবার অন্যদিকে ফিরে কিছু ভেবে আবারও তার দিকে তাকিয়ে হেঁসে দেয়।
তৌকিরের বেশ লাগছে। সে ফাঁকা হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করতেই লিলি গড়িয়ে পড়তে নিল। চট করে তৌকির লিলির ঝুলে পড়া ঘাড়টা চেপে ধরল নিজের বুক বরাবর। লিলির ঘুম ততক্ষণে পগারপার।
সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। চোখ, মাথা ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু হয়েছে?"
“দেখ, এই পুচকুটা!"
তৌকিরের বাচ্চাদের প্রতি ভয়াবহ দূর্বলতা রয়েছে। সেটা লিলি বিয়ের পরপরই টের পেয়েছে। ভাতিজা, ভাতিজীদের নিয়ে তার আহ্লাদের অন্ত নেই। যখন যেভাবে চাইবে চাচা হিসেবে এসব সেভাবেই হাজির হয়ে যায়। তাই অন্য বাচ্চাদের দেখলে তৌকিরের খুশি হওয়াতে লিলি চমকায় না।
সে তৌকিরের হাঁটুর উপর হাত রেখে উবু হয়ে ঝুঁকে। বাচ্চাটাকে কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায়। কিন্তু নাগাল পায় না। তৌকির বাচ্চাটার মা-বাবার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আমার বউ একটু কোলে নিতে চায়, অনুমতি পাওয়া যাবে?"
“হ্যাঁ, অবশ্যই!"
ভদ্রমহিলা অনুমতি দিতেই তৌকির বাচ্চাটাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে লিলির কোলে বসিয়ে দিল। লিলি এই রোগাপাতলা শীর্ণকায় দেহের শিশুটিকে কোলের মধ্যে পেয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে গেল। বাচ্চাটার নাক টিপে বলল,
“ট্যাপা পুতুল, তোমার নাম কী?"
“আবসার!"
উত্তর দিল বাচ্চাটার বাবা। নামটা সুন্দর! লিলি-তৌকির একসাথেই বলল। বাচ্চাটা গোলগোল চোখে বারবার মাথা ঘুরিয়ে তৌকিরকে দেখছে। আরেকবার লিলিকে। এটা খেয়াল করে লিলি কৌতুহল নিয়ে বাচ্চাটার ছোট গালটা হাতের তালুতে রেখে জিজ্ঞেস করল,
“কী দেখ তুমি, মনু?"
“ও দেখছে, পূর্ণিমা ও অমাবস্যা একসাথে কীভাবে হল? এরা তো ভিন্ন পথের পথিক।"
“মানে?"
তৌকিরের কথার প্রেক্ষিতে লিলির প্রশ্ন। লিলির প্রশ্নে তৌকির ঠোঁট টিপে হাসল শুধু। উত্তর দিল না। লিলি তৌকিরের থেকে উত্তর না পেয়ে গাল ফুলিয়ে নিল। বাচ্চাটার মাথার চুলগুলো খুব সুন্দর। তার বাবা মা চুলগুলো সুন্দর করে কাটিং দিয়ে এনেছে। দেখতে দারুন লাগছে। পরণে ডায়পার, তার উপর লাল সুতি ফতুয়া। একজোড়া পুতুল কেইডস। এই নিয়েও ওরা হাসাহাসি করল।
তারা অনেক সময় বাচ্চাটাকে নিয়ে কাটাল। বাচ্চাটাও তাদের সঙ্গে মিলে গেছে।
তৌকির বাচ্চাটাকে তার প্যারেন্টস এর কাছে দিয়ে লিলিকে জিজ্ঞেস করল,
“বাচ্চাটা কিউট না? একদম তুলো। আমাদেরও যেন এমন একটি জলজআন্ত পুতুল হয়।"
তৌকির কথাটা মুখ ফস্কে বলে ফেলেছে। সত্যি বলতে তার এখন বাচ্চা নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। কেননা, লিলি মাত্র সেকেন্ড সেমিস্টারের ছাত্রী। এই সময়ে বাচ্চাকাচ্চা জন্ম দিয়ে তাদের লালনপালন করার দায়িত্ব চাপিয়ে মেয়েটার স্বপ্ন নষ্ট করতে চায় না সে। তাছাড়াও, সে মনে করে তাদের বৈবাহিক জীবনকে উপভোগ করার জন্য হলেও অন্তত তিন/চার বছর এরকম ভাবে কাটানো উচিত।
এতে করে তাদের মধ্যকার সম্পর্কের গভীরতা বাড়বে, পরিণত হবে। বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়ার মতো মানসিক স্ট্যাবিলিটি বিল্ডাপ হবে।
আর্থিক ও শারীরিক শক্তিও দৃঢ় হবে বলে সে আল্লাহর উপর আস্থা রাখে।
আছর পাড় করে মাগরিবের দিকে বেলা গড়াল। অথচ এখনো ঢাকা পাড় করতে পারেনি। সবাই দুশ্চিন্তায় ড্রাইভারের উপর চিল্লাচিল্লি শুরু করছে। তৌকির হতাশ মুখে চেয়ে আছে লিলির দিকে। লিলির জন্যেই বাসে করে যাওয়া। সে বাসে যাবে তাড়াতাড়ি বাসায় পৌঁছানোর জন্য। লঞ্চে গেলৈ ঈদের দিন সকাল হয়ে যাবে। এতে নাকি ঈদ মাটি।
হতাল লিলিও। পড়ন্ত বেলার সূর্য দেখার অভিলাষে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। ফুরফুরে বাতাস হুরহুর প্রবেশ করছে ভেতরে। নিকাব তুলে কপালে রাখায় সেটা পতপত করে উড়ছে।
তৌকির লিলির দিকে এগিয়ে ওর গায়ের উপর হেলে বসল। গায়ে পরিচিত ছোঁয়া অনুভব হতেই লিলি ফিরে তাকায়। তৌকির লিলির গা ঘেঁষে জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে বলল,
“বাইরে কাকে দেখছ?"
লিলি হতাশ। করুণ চোখে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“এখানে কাকে দেখব? প্রকৃতি দেখছি।"
“ওকে অত দেখার কি আছে? এদিকে তাকাও!"
বলেই সে লিলির মুখটা নিজের হাতের বিশাল তালুতে আবদ্ধ করে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। লিলি হতাশ কণ্ঠে স্বামীর খামখেয়ালিপনা বরদাস্ত করে হাত থেকে মুখটা ছাড়ানোর জন্য হাত উপরে তুলতেই তৌকিরের দৃষ্টি পড়ল সেই হাতে। সঙ্গে সঙ্গে
হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলল,
“তুমি তো এবার মেহেদী দেওনি। মেহেদি দিবা না?"
“কখন দিব? যেই অবস্থা জ্যামের, মনে হচ্ছে বাড়ি পৌঁছাতে সেই ঈদই হবে। আমার এবারের ঈদও মাটি হল বুঝি।"
“হবে না।"
“কীভাবে বুঝলেন?"
“মন বলছে।"
লিলি ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকা বৈ উত্তর পেল না। ঠিক তখনই কন্ট্যাক্টর লোকটি ঘোষণা দিলেন,
“বিশ মিনিটের জন্য বাস আমরা এখানে থামাব, আপনাদের যার যার ফ্রেশ হওয়া, ইফতার কেনা লাগবে সেড়ে নিন।"
পোস্তা পাড় হয়েছে কিছু সময় আগে। এটা সম্ভবত নীমতলা। ঘোষণা দিতে যাত্রীদের মধ্যে হইহল্লা শুরু পড়ে গেল। কেউ কেউ বলে উঠল, ‘বিশ মিনিটের মধ্যে কীভাবে শেষ করব? নামাজ পড়া লাগবে না?'
কেউ বাড়তি শব্দ খরচ না করে তড়িঘড়ি করে নেমে পড়ল। তৌহিদ তার বিবির দিকে তাকিয়ে বলল,
“ব্যাগে বাড়তি ওড়না আছে না?"
“জি আছে!"
“আচ্ছা, আসো।"
বলেই সে সিট থেকে বেরিয়ে লিলিকে বের হতে সাহায্য করল।
নীমতলা প্রচন্ড ব্যস্ত একটা এলাকা। বড় বড় ট্রান্সপোর্ট স্টপেজ এখানে রয়েছে। তাছাড়াও মাওয়া অভিমূখী সড়ক হওয়ায় পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে অত্র এলাকা অত্যাধুনিক একটি এলাকায় পরিণত হয়েছে যার দরুন বড় বড় ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল কোম্পানির বিভিন্ন অফিস, শো রুম, ব্রাঞ্চ এখানে খোলা হয়েছে। অর্থনৈতিক ভাবে উত্তরোত্তর এলাকাটি হিংস্রনীয় রেখায় উন্নতির প্রমাণ রাখছে।
তৌকির-দম্পতি নামতেই তাদের পিছু পিছু সেই পরিবারটিও নামে। বাচ্চাটা কোলে থাকতে চায় না। বারবার সে নিচের দিকে হিচড়ে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করছে যা তার বাবা শক্ত আঁটকে রাখার চেষ্টা করছে।
তৌকির এদিকে ওদিকে তাকিতুকি করে লিলিকে বলল,
“শোন ঘাস দেখে কোথাও বসতে হবে। আমি তোমাকে বসিয়ে ইফতারের জন্য কিছু নিয়ে আসি। কোনরকম টালবাহানা ছাড়া ইফতার করবে। বুঝেছ?"
“আমি শুধু একটু জুস খাব, আর কিছু না। আপনি কিন্তু..."
“সে দেখা যাবে। তুমি চলো!"
বলে বেশ খুঁজে সুন্দর একটা নিরিবিলি জায়গা খুঁজে বের করল। এরপর লিলির ব্যাগ থেকে ওড়নাটা বের করে সেখানটায় বিছিয়ে লিলিকে বসিয়ে দিল। তখনি সেই দম্পতিকে দেখে তৌকিরই বলল,
“ভাই, ইফতারি করবেন না? "
“জি ভাইয়া। ভাবছি কোন দোকানে গিয়ে বসেই করি। বাসে বসে খাওয়া যায় নাকি? সারাদিনের রোজাদার মানুষ এখনো যদি.."
“এখানেই বসুন না। আমরা একসাথেই করি। আসেন আপু!"
লিলিও উঠে দাঁড়িয়ে নিমন্ত্রণ করল। বাচ্চাটাকে ততক্ষণে তার বাবা নিচে নামাতে বাধ্য হয়েছে। তৌকিরের দাওয়াত গ্রহণ করল তারা। লিলির পাশে ভদ্রমহিলা গিয়ে বসে পড়লেন। তার স্বামী নিজের বিবিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তাহলে তুমি আপার সাথে বসো। আমি গিয়ে ইফতার নিয়ে আসি।"
“জি।"
দুজন চলে গেল।
“আপাদের বাসা কোথায়?"
লিলি জিজ্ঞেস করল। ভদ্রমহিলা উত্তরের বললে,
“সদরেই।"
“বরিশাল সদরেই?"
“জি!"
“তাহলে তো আপনারা একরকম চলেই গেছেন। আমাদের এখনো অনেক দূর বাকী।"
“কোথায়?"
“পটুয়াখালি।"
“ওহ্, লাভ ম্যারেজ?"
“না। এ্যারেঞ্জ ম্যারেজ।"
“সত্যিই?"
“জি আপা!"
“নতুন বিয়ে?"
“না, দু বছর পেরিয়েছে!"
“কি বলেন? আমি তো ভাবলাম নতুন বিয়ে! লাভ ম্যারেজও না।"
মহিলার চোখমুখে বিস্ময়। লিলি তাতে লজ্জা পায়। রক্তিম হয়ে ওঠে তার গাল। সে লজ্জিত নয়ন জোড়া নামিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করে,
“ জি, আমাদের পারিবারিক ভাবেই বিয়ে হয়েছে। আমি তাকে সরাসরি বিয়ের পরই দেখেছি। বিয়ের আগে কথা বলার সুযোগ থাকলেও আমি সরাসরি তাকাতে পারিনি লজ্জায়।"
“ইয়া আল্লাহ সত্যিই! আমি তো আশ্চর্য হচ্ছি।"
“কেন আপা?"
“এই অবধি আপনাকে যেভাবে ট্রিট করতে দেখলাম তাতে মনে হল নবদম্পতি। বিয়ের দুবছর পরেও এত আহ্লাদ সচরাচর থাকে না। আমাদেরটা দেখেন না। বাচ্চা হবার পর এখন আর আগের মতো সেই আহ্লাদ, আবেগ পাই না। অথচ আমাদের লাভ ম্যারেজ। বিয়ের আগে চার বছর চুটিয়ে প্রেম করেছি। বিয়ের বছরটাও আমার স্বপ্নের মতো কেটেছে অথচ বাচ্চা নেওয়ার পর যেন সব জোস কোথায় গায়েব হয়ে গেল। এখন সব কিছু বাচ্চাকে ঘিরেই। অথচ স্বামী স্ত্রীর মাঝেও সে একটা অন্যরকম বন্ডিং থাকে সেটা ঠিক গড়ে উঠল না আমাদের মধ্যে। অনেক চেষ্টা করি বুঝেছেন, কিন্তু কেন জানি সেই ফিল আসছে না।"
লিলি অপরিচিত এই মহিলার বুকের ভেতরে চাপা দীর্ঘশ্বাস শুনেছে নিরব চোখে। এটাও কখনো ঘটে?
হ্যাঁ ঘটে। সে ঘটতে দেখেছে।
তার বড় আপার বেলায়। বেশ চেয়ে নিয়েছিল তার বড় আপাকে তার দুলাভাই। বছর দুই গড়াতেই বাচ্চা হয়ে গেল। এরপর থেকেই দুলাভাই যেন উদাসিন হয়ে গেল। আপার কোন বিষয়ে তার কোন হেলদোল নেই। আপা তাকে খুশি করার জন্য সেজেগুজে থাকত, দুলাভাই ফিরেও তাকাত না। না, সে অন্য কোন নারীতে আসক্ত হয়নি। আজও তার আপার হয়েই আছে। তবে সেটা শুধু ধরাবাঁধা দাম্পত্যে। শরীরের জৈবিক প্রয়োজনে শোয়। পেটের প্রয়োজনে রোজগার করে। সামাজিকতার প্রয়োজনে একসঙ্গে থাকে। বড় আপা কেঁদে কুদে মা'কে অভিযোগ করলে মা বুঝিয়েছিল এটাই নাকি বিয়ের পর ঘটে। এটাই বৈবাহিক জীবনের বৈশিষ্ট্য
এটাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। এটা স্বাভাবিক ও রীতিসিদ্ধ।
তাই লিলিও আগে বুঝত এটাই বুঝি বিয়ের মহিমা। এটাই বুঝি দাম্পত্য। বিয়ের পর বুঝি এটাকেই বৈবাহিক জীবন বলে। এটাই হচ্ছে বৈবাহিক জীবনের বৈশিষ্ট্য, সংসার ধর্ম।
কিন্তু তৌকির হাওলাদারের সহধর্মিণী হওয়ার পর সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে আবিষ্কার করেছে বৈবাহিক সম্পর্কটাকে। বিয়ের পরের জীবন সম্পর্কে নতুন করে ধারণা আহরণ করেছে। তৌকির হাওলাদার তাকে শিখিয়েছে বিয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য, গুণাবলী, করণীয় ও বর্জনীয়।
তাকে শিখিয়েছে বিয়ে শুধু দুটি দেহের মিলন নয়, দুটি হৃদয়ের, আত্নার বন্ধন ঘটায়। যদি তা ঘটানো সম্ভব হয় তবেই সেই বিয়ে প্রকৃত জীবন পায়, অর্থবহ করে। যুগান্তর ভাবে টিকে থাকে বটবৃক্ষের মূলের ন্যায়।
লিলি খুব ভয় পায়। কখনো যদি তৌকির তার থেকে
দুরত্ব টেনে নেয়। কখনো তার প্রতি হতাশ হয়ে তাকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়? তবে লিলি কীভাবে বাঁচবে? তৌকিরকে লিলি কখনো বলেনি, বলতে পারেনি। তৌকির লিলি অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গেছে। লিলির অঙ্গের প্রতিটি রোমকূপ তৌকির হাওলাদারের ভালোবাসার পাগল, তৌকির হাওলাদারের উন্মাদের মতো ছোঁয়ার কান্ডারি। লিলি সত্যিই মরে যাবে কখনো তৌকির হাওলাদার থেকে বিচ্ছিন্ন হলে। সে দু সেকেন্ড এর নারাজী বরদাস্ত করতে পারে না। এক জীবনেরটা কীভাবে সহ্য করবে?
“কী হয়েছে, বেশি খারাপ লাগছে? মুখ এমন চিমসে গিয়েছে কেন? দেখি!"
তৌকির লিলির পাশে বসতে বসতে ওর কপালে হাত চেপে ধরল। লিলির কবজি চেপে পালস বোঝার চেষ্টা করল। পাশেই বসে থাকা ভদ্রমহিলা মুচকি মুচকি হাসছে তা দেখে। তাতে এদের কোন হেলদোল নেই।
লিলি তৌকিরের ছটফটানি দেখে মন থেকে তৃপ্তি পায়। সে এই মুহূর্তে নিজেকে ভাগ্যবতীদের একজন ভেবে খুশি হয়। ভবিষ্যত ভেবে বর্তমানকে নষ্ট করতে চাইল না। তার কপালে থাকা স্বামীর হাতটা নামিয়ে তার তালুতে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“শান্ত হোন, আমি ঠিক আছি।"
“তাহলে মুখের হাল অমন কেন ছিল?"
“এমনি। কি আনছেন ইফতারিতে? দেখি!"
বলেই সে প্যাকেটগুলো টেনে নিল। চার প্যাকেট তেহারি, তিনটা দই, দুটো আধা লিটারের প্রাণ আপ,
আলুর চপ, বেগুনি, পিঁয়াজু, ছোলা, পাকা পেঁপে, আনারস, তরমুজ, খেজুর ও পানি।
লিলি চোখ বড় বড় করে বলল,
“এতকিছু কখন খাবো?"
“এখুনি খাবো। চিন্তা করো না। চারজন মানুষ আমার। এ্যাই, বাবা আংকেল আসবে?"
বাচ্চাটা বারবার তৌকিরের হাঁটুর উপর বসে প্যাকেট খুলো নেড়েচেড়ে দেখার চেষ্টা করছে। তৌকির বাচ্চাটাকে কোলের মধ্যে বসিয়ে তার হাতে তরমুজের একটা স্লাইস দিয়ে বলল,
“খেতে পারবা তুমি? "
“পারবে, আপনি ছেড়ে দেন ভাই।"
উনার স্বামী একটা পেপার এনেছিল, সেটা বিছিয়ে উনার পাশেই বসে পড়ল।
মহিলাটি সব গুলো প্যাকেট ছিঁড়ে সামনে সাজিয়ে দিল। আযান পড়ে গেছে।
সবাই খেজুর হাতে নিয়ে দোয়া পড়ে খেজুর দিয়ে রোজা খুলে। অতঃপর পানি। লিলি সব কিছু রেখে আলুর চপ নিল। ঠিক তখনি পাশ দিয়ে দুজন বয়োঃবৃদ্ধ যাচ্ছিলেন। তাদেরকে দেখেই লিলি মৃদু স্বরে চিৎকার করে ডেকে উঠল,
“আংকেল, আন্টি, আমাদের সঙ্গে ইফতার করেন।"
তৌকির অপরিচিত কাউকে ডাকতে দেখে প্রথমে লিলির দিকে তাকাল। এরপর নিজেও বলল,
“খালাম্মা আসেন। এখানে আমাদের সাথে বসেন।"
উনারা ইশারায় না করল তারপরও লিলি ডাকে। তা দেখে তৌকির উঠে গিয়ে উনাদের বলল,
“চলেন, একসাথে ইফতার করি। আপনারা দুজন, আমরা চারজন।"
তৌকিরের আন্তরিক আহ্বানে সাড়া দিলেন বয়োঃবৃদ্ধ লোকটি। নিজের সহধর্মিণীর উদ্দেশ্য করে বললেন,
“চল, বাচ্চারা এত করে ডাকছে। ওদের কাছে গিয়েই ইফতার করি।"
ভদ্রলোকের ‘বাচ্চারা' শব্দটি তৌকিরের বুক শীতল করে দিল। একটা মাস রোজার, অথচ একদিনও বাবা মায়ের সঙ্গে ইফতার করার সৌভাগ্য হয় না। আজ কতগুলো বছর ধরে মা বাবার পাশে বসে, ভাইবোনদের সঙ্গে খুনসুটি করতে করতে ইফতারের আনন্দ উপভোগ করা হয় না। তাও তো দু'টো বছর হল পরিবার বলতে লিলিকে পেয়েছে। তার অর্ধাঙ্গিনীকে পেয়েছ। লিলির কথা অস্ফুটে উচ্চারণে করতেই মনে পড়ল, দু'টো বছর হল লিলিও তার পরিবারের সঙ্গে, ভাই-বোনদের সঙ্গে বসে ইফতারের আমেজ পায় না। লিলিও একই কষ্টে রোজা পাড় করছে।
না, আগামী বছর চেষ্টা করবে। অন্তত দু'টো দিনের জন্য হলেও লিলিকে গ্রামে তার বাপের বাড়িতে পাঠানোর। সে পুরুষ মানুষ। অর্থ কামানোর দায়িত্ব তার। সেটা তাকে পালন করতেই হবে। সৃষ্টিগত নিয়মের আওতায় সে পড়েছে। এর অন্যথা তো ঘটানো সম্ভব নয়। সুতরাং তার দায়িত্বের দায়ে আরেকজনের খুশি কেন জলাঞ্জলি দিবে? না তৌকির এই অন্যায় করবে না। সে লিলিকে পরিবারের সঙ্গে রমজানের আহকাম পালনের খুশি উপভোগ করার সুযোগ করে দিবে। যদি বেঁচে থাকে আগামি বছর তৌকির লিলির এই খুশিটুকুও এনে দিবে, ইনশাআল্লাহ।
মুরব্বি দুজন যেতেই লিলি উঠে দাঁড়াল। নিজের আসন থেকে খানিকটা সরে বসে মহিলাটিকে জায়গা করে দিয়ে বললেন,
“খালাম্মা এখানে বসেন।"
পুরুষ লোকটি পেপারের উপর বসল। ছয় জন নারী-পুরুষ, তিন জোড়া দম্পতি। একটা শিশু। তৌকির বলল,
“আমি দু প্যাকেট তেহারি নিয়ে আসি।"
“আপনি বসেন, আমি যাই।"
বলেই বাচ্চাটার বাবা উঠে দাঁড়াল। তৌকির তাকে বাধা দিয়ে নিজেই যাবে বলে বলতেই আংকেল ওদেরকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“না না বাবা। কিছু আনতে হবে না। তোমাদের খালাম্মা, বাড়ি থেকে আমাদের জন্য ইফতার বানিয়ে এনেছে। আমরা শুধু একটা আরাম করে বসার জন্য জায়গা খুঁজছিলাম। বোঝোই তো, বয়স হয়েছে। এখন আর কষ্ট সহ্য হয় না।"
“কিন্ত তাই বলে.
“লাগবে না। বসো বাবা, বসো বসো। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। নামাজের টাইম পাবা না পরে।"
তৌকির আর বাচ্চাটার বাবা আর কোথাও গেল না তারা চার প্যাকেট তেহারি ছয় ভাগ করল। মুরব্বিদের আনা খেজুর, রুটি মাংস ভাগ করে শেষ রোজা ভাঙ্গল।
চারপাশ থেকে চাঁদ উঠেছে ধ্বনিতে গমগম করে উঠল। লিলি, সেই বাবুর মা, মুরব্বি আন্টি , সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ দেখছে। আংকেল নিজের পুরু, পাকা দাঁড়িতে ঢেকে যাওয়া ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলেন। নতুন ওঠা চাঁদের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন। বিরবির করে দোয়া পড়লেন। আসমানে তাকিয়ে মোনাজাত ধরে দীর্ঘ সময় নিয়ে আল্লাহর সবার জন্য কল্যাণ আর্জি করলেন। অতঃপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“ঈদ মোবারক। চল, সবাই সালাত আদায় করে নাও। মেয়েরাও, আল্লাহর সালাত যেকোন অবস্থায় আদায় করা বাঞ্ছনীয়। যেকোন পরিস্থিতিতে থাকো, আদায় করতেই হবে।"
পেপার, ওড়নার মধ্যেই দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করল তিন পুরুষ। মুরব্বি আংকেল ছিল ঈমাম। খালাম্মা লিলিকে বললেন ,
“চল মা, আমরা বাসে গিয়ে বসে পড়ি। এখন তো বাসে পর-পুরুষরা নেই।"
“জি খালাম্মা।"
বাচ্চার মা বলল,
“আপনারা যান। আমি বাচ্চা রেখে কীভাবে! বাড়ি গিয়ে কাযা আদায় করে নিব।"
কেউ জোর করল না। লিলি সিজদারত তৌকিরের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে বাসে গিয়ে উঠল খালাম্মাকে অনুসরণ করে। এরপর নিতে সিটে বসে সালাত আদায় করে নিল তায়াম্মুম করে।
ইফতার, সালাত শেষে বাস পূণরায় যাত্রা শুরু করল। এখন যার যার সিটে সে বসে ঝিমুচ্ছে। কেউ কেউ ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে। ইফতারের পর ক্লান্তিতে সবার দেহই অসাড় হয়ে আসে। এখন তো আবার ভ্রমণে, তাই এটা হওয়া স্বাভাবিক।
লিলি নিজের সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে, বিপরীত দিকে মুখ রেখে আধ শোয়া হয়ে বসে আছে। তৌকির কিছু সময় চুপ থেকে সোজা হয়ে বসল। বাসের আলোক উৎস বন্ধ। সে লিলির দিকে ঘুরে লিলির বাম হাত নিজের হাতের তালুতে রেখে, প্যান্টের পকেট হাতড়ে একটা মেহেদির কোণ বের করল। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে দাঁত দিয়ে মোবাইল ধরে লিলির হাতের তালুতে আগে সেপ দিয়ে ডিজাইন সাজিয়ে নিল।
হাতের তালুতে ঠান্ডা অনুভব হতেই লিলির সুড়সুড়ি লাগতে শুরু করল। সে তড়াক করে চোখ মেলে তাকাল। তৌকির গভীর মনোযোগের সহিত ডিজাইন করার চেষ্টা করছে। লিলি খুশিতে উদ্বেলা হয়ে সোজা হয়ে বসতেই হাত নড়ে চড়ে উঠল। তাতে বিরক্ত হয়ে তৌকির চোখ কুঁচকে কপালে নামিয়ে বলল,
“নড়ছো কেন?"
“আপনি মেহেদি কোথায় পাইলেন?"
“দোকানে!"
“আবার কিনেছেন?"
“তো আমি কী আমার বউকে মেহেদি ছাড়া ঈদ করাব?"
তৌকিরের কথায় লিলির চোখ ছলছল করে উঠল। সে আবেগে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“আপনি এত ভালো কেন বলেন তো?"
“কারণ আমার এত ভালো একটা বউ আছে যে।"
লিলি তৌকিরের দিকে ঝুঁকে আহ্লাদে গদগদ হয়ে বলল,
“আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি!"
এই প্রথম মুখে, সরাসরি স্বীকারোক্তি। তৌকির চমকাল, থমকাল। আনন্দে বাকহারা হয়ে গেল। কীয়ৎকাল নিষ্পলক চেয়ে থাকল। অতঃপর
লিলির দুগাল তার বিরাটাকার দু'হাতের তালুতে রেখে কপালে প্রগাঢ় চুম্বন করে বলল,
“আমিও।"
লিলি তার ডান হাতে মোবাইল ধরে রেখেছে অন্য হাতে তার বর মেহেদি পরিয়ে দিচ্ছে। গত ঈদেও দিয়েছিল তবে সুন্দর হয়নি, মেখে গিয়েছিল। তাতে বেচারার মন বেশ ভার হয়ে গিয়েছিল। তাই এবার সাহস করেনি। কিন্তু আজ আবার পাগলামি করছে।
সত্যি বলতে এসব বিষয়ে লিলির চেয়েও তার বর বেশি শৌখিন। লিলি পেলেও খুশি না পেলেও খুশি। কিন্তু তার বরের এসব লাগবেই।
আঁকা এবড়োথেবড়ো হয়ে গেছে মেহেদির ডিজাইন, বাসের ঝাঁকুনিতে। তাও লিলির খুশি আকাশ চুম্বি। সে এই আলো আঁধারির মাঝে বরের কোল ঘেঁষে বসল। টুক করে পটাপট দূ গালে চুমু খেল। কতটা পূণরায় মেহেদি রাঙা উঁচিয়ে দেখতে থাকল। এ যেন কিশোরী লিলিকে দেখছে তৌকির। তার রগচটা, গুরুগম্ভীর জীবনের এক পশলা বাচ্চামো।
দুপুর আড়াইটায় যেই বাস ছেড়েছে সেই বাশ বরিশাল, নথুল্লাবাদ পৌঁছাল রাতের এগারোটার পর। ঢাকার অসহনীয় জ্যাম ঢেলতে ঢেলতে অবশেষে মানুষের জীবনে শান্তির ক্ষণ এলো।
-------------------------------------------------------
" আসসালামু আলাইকুম।"
অলিভ কালার টাঙ্গাইল সিল্কের শাড়ি পরুয়া লিলিকে সদ্য জন্মানো কচি পাতার মতো সতেজ লাগছে। সে হাত পেতে তাকিয়ে আছে তার স্বামীর দিকে। সালামি চাইছে। তৌকির অলিভ কালার পাঞ্জাবির পকেটে হাত রেখে মনোমুগ্ধ নয়নে চেয়ে থেকে বলল,
“রাতে দিলে হয় না?"
“এ্যাহহ একদম বাহানা করবেন না। এখুনি দিন। আপনি দিলে আমি বাচ্চাদের দিব। দিন বলছি!"
“আচ্ছা, নিন, সবটা আপনার।"
বলেই তৌকির মানিব্যাগ বের করে দিল। লিলি মানিব্যাগ ধরল না। সে তৌকিরের মানিব্যাগে হাত দেয় না কখনো। আপত্তি জানিয়ে বলল,
“আপনি বের করে দিন।"
তৌকির জানত এমন কিছুই হবে। তাও সে বলেছিল। তার তরফ থেকে কোনদিন কোন বিধিনিষেধ দেওয়া হয়নি তাও মেয়েটা এমন করে। তৌকির দুই হাজার টাকার একটা খুচরো বান্ডেল ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“এখানের জন্য। ওর বাড়িরটা ও বাড়িতে গিয়ে নিও।"
“আল্লাহ আপনার কামাইয়ে বরকত দিক।"
বলেই সে চোখের পলকে তৌকিরের ঠোঁট ছুঁয়ে ফড়িং এর মতো উড়াল দিল। তৌকির লিলির কান্ডে মুখ টিপে হাসে। এদিকে এই দম্পতির এহেন ভাব ভালোবাসা দেখে মেজো ভাবী মুখ টিপে হাসল। তিনি তৌকিরের ঘরের পাশে উঠানে ছিল। ওদের জানালা খোলা থাকায় সবটা না চাইতেও চোখে পড়েছে। তিনি মুখ চেপে বিস্ময়কর চাহনিতে বিরবির করে বলল,
“যাক, এই বাড়ির কোন ছেলে তো বউয়ের বর হয়েছে। নয়তো সব ইগোর যন্ত্রণায় চোখে দেখে না।"
লিলি বাড়ির সব বাচ্চাদের মন্তব্য সালামি বিলিয়ে দিয়ে ঘর অভিমূখে পা ঘুরাতেই তার শ্বাশুড়ি ডেকে উঠল,
“ছোট বউ!"
“জি আম্মা!"
“বাপের বাড়ি কখন যাবা?"
“আপনি বললে বিকেলে!"
“বিকেলে যাবা? যাও, তবে একদিনের বেশি থাইক না। তোমরা তো আবার তিনদিনের মধ্যেই চলে যাবা। আমার সাথেও দুই একদিন থাক।"
সবসময় থাকে। বরং গতবার ঈদের দুইদিন পর বাপের বাড়ি গিয়ে আবার পরের দিন বিকেলে চলে আসতে হয়েছিল। অথচ বলছে তার সঙ্গে নাকি থাকা হয় না।
লিলি কথা বাড়াল না। শ্বাশুড়ির কথায় মাথা দুলিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেল।
সেখানে তার বড় জা দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিয়েছে। খাসি জবাই করেছে সকালে। সেটা গুছিয়ে নিয়েছে। কাল পুকুর থেকে মাছ ধরিয়েছে তৌকিররা আসবে বলে। সেগুলোও রান্নার প্রস্তুতি নিতে হবে। লিলিকে নয়া শাড়িতে দেখে বড় জা খুঁচিয়ে বলল,
“বাহ! মনে হচ্ছে ঈদ খালি এই বাড়ির ছোট বউয়ের জন্যই এসেছে। আমরা তো বারোমাস ত্যানা পরা থাকি, আজও তাই।"
লিলির মুখটা চুপসে গেল। বড় জা এর খোঁচা শুনে মেজো জা বলল,
“ছোট বউয়ের বর তো তার বউকে কোলে তুলে রাখে। মাথায় রাখে না উকুনের ভয়ে, জমিনে রাখে না পিঁপড়ার ভয়ে। আর আমাদের বরেরা তো শোয়ার দরকার ছাড়া পা দিয়ে নেড়েও কোনদিন জিজ্ঞাস করে না, বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি? সুতরাং, ছোট বউ চাইলে রোজই ঈদ পালন করতে পারে। তার সঙ্গে আমাদের তুলনা চলে না বড় ভাবী। শ্বশুর বাড়িতে মেয়েদের কদর হয় স্বামীর দায়িত্ববোধে। বউয়ের প্রতি স্বামী যত দায়িত্বশীল হবে, শ্বশুর বাড়িতে সেই বউয়ের গুরুত্ব তত বেশি।"
বড় জা চুপ মেরে গেলেন। লিলি কোন প্রত্যুত্তর করেনি। সে বটি টেনে নিয়ে শোল মাছ কাটতে শুরু করল। এদিকে বড় জা লিলির স্নিগ্ধ পান পাতার মতো চকচকে মুখখানি দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
“ছোট মিয়া কত দিল সালামি?"
লিলি মাথা উপরে তুলে কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল,
“দুই হাজার দিয়েছিল।"
“সব বাচ্চাদের দিয়ে দিয়েছ?"
“জি ভাবী।"
“ওহ্, ভালো তো। তয় এত বেশি খরচ করো না। নিজের হাতে যা পাবে তার থেকে সঞ্চয় করো কিছুটা। তৌকিরের হাত খরুচে। বিপদ আপদের কথা বলা যায় না। তাই তোমাকেই একটু সঞ্চয়কারি হতে হবে। বুঝেছ?"
“জি ভাবী।"
ঈদের প্রথম প্রহর কাটল এভাবে। অতঃপর দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর বাপের বাড়ির পথ ধরল তৌকির লিলি দম্পতি।
-------------------------------------------------------------------
শ্বশুর বাড়িতে তৌকিরের ভূড়ি নিয়ে বিশদ আলোচনা চলে। ভূড়িওয়ালা জামাতাকে ভূড়িভোজ করানো নিয়ে লিলির মাতার বড্ড বেশি চিন্তা থাকে সবসময়।
আজকেও সেই বন্দোবস্ত হচ্ছে। তৌকির তার ছোট শ্যালকের সঙ্গে বসে তার দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার পাঠ পড়ছিল। কিশোর শ্যালক ইতিমধ্যেই প্রেমিক পুরুষ বনে গেছে। স্কুল কম্পাউন্ডে নারীঘটিত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে দু'বার প্রিন্সিপালের কান মলা খেয়েছে। তাতেও তার শিক্ষা হয়নি। এখনো সে দিব্যি প্রেমের ফাঁদ পেতে ওৎ পেতে বসে আছে। ঠিকঠাক ঘুঘুর দেখা মিললেই সে চট করে চেপে ধরবে।
এহেন গুরুগম্ভীর আলোচনার মাঝে ব্যাগড়া দিল তার ভায়রা ভাই। ছোট ভায়রার উপস্থিতিতে বড় তিন ভায়রাও আজ শ্বশুর বাড়িতে এসে হাজির।
পলাশ ও ফাল্গুনী দম্পতি কন্যা ও জামাতের আয়োজনে ব্যস্ত সময় পাড় করছে। ফাল্গুনী রোজার মধ্যে বেশ কয়েক পদের পিঠে বানিয়ে রেখেছিল। আজ সেগুলো তেলে ভেজে জামাইদের সামনে এনে রাখছে। রাতে দুধ পুলি ও পাটিসাপটার আয়োজন করছে। তৌকিরের খুব পছন্দের পিঠে দুধ পুলি। নিজেদের গাইয়ের দুধের দই পেতেছে।
পলাশ খাল থেকে বড় বড় বাইম মাছ ধরিয়ে এনেছে। বাইম মাছের মাখো মাখো কষা তরকারি তৌকির ও বড় জামাতার বড্ড পছন্দ। তাই সেগুলো কেটে গুছিয়ে নিচ্ছে ফাল্গুনী।
একমাত্র শ্যালককে নিয়ে সব জামাইই আহ্লাদ করে। আর চার দুলার একমাত্র শ্যালক অঙ্কুর, বড্ড আদরের ছানা সে তার বাবা মায়ের। বোনেদের আদরের চাঁদ। আবদারের জায়গা অনেক, তবে তার চাহিদা সীমিত।
-------
হাঁসের পাতলা ঝোল ও চালের আটার রুটি দিয়ে সকালের নাস্তা দিল ফাল্গুনী। চার জামাতাকে এক আসরে বসালেন পলাশ। ফাল্গুনী তড়িঘড়ি করে নাস্তা পরিবেশন করছেন। তা দেখে তৌকির বলল,
“আম্মা, আপনি রাখেন। আমরা নিয়ে খেতে পারব। আপনাকে এত ব্যতিব্যস্ত হতে হবে না।
আপনি একটু বিশ্রাম নিন, বসেন আমাদের সঙ্গে। একসাথে নাস্তা করি সবাই।"
“না বাবা, তোমরা খাও। তোমাদের খাওয়া দেখেই আমি খুশি হই।"
“আর আপনাকে আমাদের সঙ্গে খেতে দেখলে আমরা খাবার খাওয়ার চেয়েও বেশি তৃপ্তি পাব। আসুন, বসুন এখানে। বাবা আসেন।"
তৌকির নিজে টেনে তার পাশে বসাল শ্বাশুড়িকে। পলাশও বসলেন। লিলির চোখ ভরে আসল তৌকিরের কাজে। ফাল্গুনীর চোখ ঘোলাটে হয়ে আসল। তার আগের তিন জামাই দিব্যি মুখ বুজে খেয়ে যাচ্ছে। তাদের এসবে কোন হেলদোল নেই।
তিনি তৌকিরের তেলচে কালো মেছতা পড়া মুখটা দেখলেন। পরক্ষনেই দেখলেন তার বাকী তিন জামাইদের ফর্সা, চকচকে চেহারা। তাদের সুদর্শন হ পেটা ফিটনের। তৌকিরের মেদভুঁড়ি। সব দেখে আঁচলের কোণা দিয়ে মুখ মোছার ন্যায় সবার অগোচরে চোখ মুছলেন। অতঃপর আনমনে বিরবির করে বললেন,
“সৌন্দর্য্যের উৎস মন। মন সুন্দর যার, সব সুন্দর তার।"
তৌকির নিজেই শ্বাশুড়িকে খাবার সাজিয়ে দিল। পলাশ বুক ফুলিয়ে ছোট জামাইকে দেখছে। তার এই জামাইয়ের সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগে তার স্ত্রীও দীর্ঘদিন তার প্রতি রুষ্ট ছিল। প্রতিবেশীদের অভিযোগ ছিল পলাশ নাকি মেয়েকে টাকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। পলাশ নাকি মেয়ের জীবনটা নাস করে দিয়েছে। কীভাবে এমন একটি ছেলের কাছে, যে কিনা বয়সে তার মেয়ের থেকে গুনে গুনে এগারো বছর দুই মাসের বড়। এত বয়স্ক, দেখতেও কুৎসিত, এমন একটি ছেলের কাছে এত রূপবতী কন্যার বিবাহের কারণ কী? তবে কি পলাশ মেয়ের বিয়ের বিনিময়ে পয়সা নিয়েছে? নাকি চার কন্যাকে লালনপালন করতে গিয়ে অর্থকষ্টে পড়েছে। তাই বুঝি এত হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে এই অল্প বয়সী মেয়েটার গলায় এত বয়স্ক ছেলেকে ঝুলিয়ে দিয়েছে! ইশ্। জীবনটা শেষ করে দিল মেয়েটার।
কই তারা? আজ এসে দেখুক! তারা মেয়েকে জলে ভাসিয়ে দেয়নি। বরং একটা প্রকৃত মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে। সে রূপ দিয়ে রূপবান না হতে পারলেও মন দিয়ে সে সবচেয়ে সুন্দর মনের অধিকারী। তার মেয়ের কপাল সোনায় সোহাগা। নায়কের মতো স্বামী না পেলেও প্রকৃত মানুষকে স্বামী রূপে পেয়েছে। তিনি বাবা হিসেবে কসাই নয়। মানুষ খুঁজে মানুষের হাতে দিয়েছে। বয়সের ফারাক থাকলেও, তার মেয়ে ও জামাইয়ের মধ্যে মনের ফারাক নেই। সে বাবা হয়ে দেখেছে, তার মেয়েকে কতটা আগলে রাখে এই কুৎসিত বর্ণের ছেলেটা। তিনি স্বার্থক। কন্যাকে সঠিক পাত্রস্থ করতে পেরে।
পলাশ মুচকি হাসলেন। স্বার্থকতার হাসি। অতঃপর এক নজরে সব কন্যা,ও জামাতাদের দেখে হাসের মাংসের ঝোলে রুটি চুবিয়ে মুখে দিলেন।
ঈদের দিন ও পরের দিন, পরিবারের সঙ্গে কাটাল লিলি। স্বামীর মহত্ত্বে ঈদের দিন বাবা মায়ের সান্নিধ্য পেল সে।
তাদের বাড়িতে গাই রাঙামতিকেও সাজিয়েছে অঙ্কুর। নতুন একটি মালা এনে পরিয়েছে তাকে। তার মুখে নতুন করে রঙ লাগিয়েছে। পরনে নতুন একটি বস্তা পরিয়েছে। যেটাতে রঙে করে লিখে দিয়েছে রাঙামতির ঈদ।
এ তো গ্রাম বাংলার চিরায়ত উৎসবের দৃশ্য। তারা উৎসবে শুধু নিজেরাই না। সাজায় বাড়ির উঠান সাজায় তাদের পালিত পশুকে। তার সঙ্গে সাজায় নিজেদের মনকে। মনের রঙে তারা সুন্দরতম উৎসব উৎযাপন করে।
সবাইকে পবিত্র উৎসব ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।






0 মন্তব্যসমূহ