#সুখ_প্রান্তর_অতিথি_আগমন
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_৪
মাতৃত্বকালীন সময়টায় আফিয়া ঘর থেকে খুব কম বের হয়েছে। শারীরিক পরিবর্তন আর পরিবর্ধনে খানিকটা লজ্জা লজ্জা অনুভব হয় তার। তাইফের সময় বের হতো কারণ তখন জীবনের প্রয়োজন ছিল, পেট বাঁচাতে চাকরি করতে যাওয়া জরুরি ছিল। এখন যেহেতু তার কোন বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়ার কোন কারণ নেই, তাই সে চেষ্টা করে সব সময় ঘরেই থাকার। তবে আজ প্রায় সাড়ে চার মাস পর সে নিজের বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। এদিকে নাসিফ সাহেবের মাথায় রক্ত চেপে বসেছে। সাত মাসের গর্ভবতী নারী কেন এত দূরের পথ ভ্রমণের জন্য নাচোনকোদন করবে? মেজাজ দেখিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে কোথায় যেন গেল।
এই সময়ে নাইফ, নাবীহাকে স্কুল থেকে আনার দায়িত্ব তাদের দাদাজান আর বাপজানের। তাইফের বাইরে ঘোরার বায়না বরাবরই তার দাদা পূরণ করে। মাঝে মাঝে নাসিফ ছেলেকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যায় কাজে। সারাদিন সে তার বাবার সাথে কাজ করার নাম করে খেলাধুলা করে। দোকানে, গোডাউনে তার নতুন কয়েকজন সিনিয়র বন্ধু হয়েছে। মার্কেট কমিটির প্রবীণ, বৃদ্ধা কর্মকর্তারা তাকে কমিটি অফিসের সভাপতিত্বে বসিয়ে তার নতুন নাম দিয়েছে সভাপতি মশাই। সে বাবার সাথে গেলেই দু'হাত ভর্তি গিফট, খেলনা, সালামি নিয়ে রাতে বাড়ি ফেরে। তা নিয়ে আবার কয়েকদিন বড় বড়াই করে বেড়ায় বাড়ির ভাড়াটিয়াদের ছেলে মেয়ের সঙ্গে।
বড় ভাইকে তো সে গোনাতেই ধরে না। তবে বুবুনকে সব ঢেলে দিতেও তার ভাবতে হয় না। এনে সব বুবুনের হাতে দিয়ে দিবে। দিয়ে বলবে,
_ বুবুন, তুমাকে দিব, ভাইয়াকে দিব না। ভাইয়া আমাকে মালে।
নাইফ পাশ দিয়ে কোন কিছু ধরার চেষ্টা করলেই নাইফের নাকেমুখে চাপড় মারতে মারতে বলবে,
_ তুমি কেন ধল। আমাল খেলনা কেন ধল। তোমাল
খেলনা দাও আমায়? আমি মুবাইল নিলে আছাল দিবে বলেছ না!
নাইফ সেই মার হজম করে হলেও সেখান থেকে ভাগ নিবে। নাকেমুখে তাইফের নখের আঁচড় নিয়ে থমথমে মুখ করে তাকিয়ে থাকবে তাইফের দিকে। যেন সে ভীষণ দুঃখ পেয়েছে আদৌওতে তেমন কিছু নয়। তাইফ যখনি তার দিক থেকে মনোযোগ পরাবে তখনি সে কিছু একটা নিয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুট দিবে অতঃপর দরজায় খিল এঁটে দরজায় কান পেতে তাইফের মধুর বাক্য শ্রবণ করবে। হাফপ্যান্ট পরুয়া তাইফ নাক টানতে টানতে ছোট ছোট পা দিয়ে নাইফের ঘরের দরজায় লাথি মারবে আর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলবে,
_ আমাল খেলনা দাও, পঁচা ভাইয়াআআ! খেলনা দাও! আমি তোমাকে গুলি কলব। বিলাই ভাইয়া! নান্টুপুন্তু ভাইয়া! আমার খেলনা না দিলে আমি তোমাল খাতে ছিছি কলব। ভাইয়া....আমাল বুনদুকে ডেকে তুমাকে মালব। বাবা!
ব্যস্, নাইফের কাঁধের ভুতের তরতর করে নেমে যাবে। দরজা খানিকটা ফাঁক করে সেখান দিয়ে তাইফের জিনিস ছুড়ে মেরে দ্রুত দরজা লাগিয়ে দিবে। তাইফ নিজের জিনিস পেয়ে খুশিতে বাকবাকুম হয়ে একবার ভাইয়ের দরজার দিকে তাকায়, ডান হাতের উল্টাপিঠ দিয়ে নিজের সর্দিতে ডোবা নাকখানি মুছে নিজের রাজ্যের দিকে ছুটবে। তার দৌড়ঝাঁপের কারণে তাকে তার বাবা খেলাঘর বানিয়ে দিয়েছে। সে সেখানে তার সব খেলনা মজুদে রাখে।
_ নানা বালি কখন যাব, আম্মু?
জিন্স প্যান্টের সাথে অলিভ ব্ল্যাক চেইক প্রিন্ট শার্ট ইন করে তার উপর কোট চাপিয়েছে তাইফ বাবু। পায়ে অরিজিনাল লেদারের লোফার। এই পিচ্চি লেদারের লোফার ছাড়া শুধু কেইডসে আরাম পায়। অন্য কোন কোয়ালিটির জুতো তার সয় না। তাই সবসময় তার অরিজিনাল লেদারের তৈরি জুতোই লাগে। আফিয়া গলার দিকে হিজাবে পিন লাগিয়ে চোখ ঘুরিয়ে দেখল তার গোলুমোলু লালচানকে। ফুলকো লুচির মতো লালচে গালগুলো ঠান্ডায় একটু রুক্ষ হয়ে উঠেছে যার কারণে আরো লাল দেখাচ্ছে । ঠোঁট গুলো উল্টে চোখ কুঁচকে নাক ফুলিয়ে চেয়ে আছে তার দিকে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই যখন শুনেছে বেড়াতে যাবে তাও নানাবাড়িতে, ব্যস্ তার তোরজোর দেখে কে? নিজের ব্যাগ পত্র নিজেই গোছানো শুরু করে দিয়েছে। নিজের কাপড়ের ড্রয়ার খুলে টেনে হিঁচড়ে কাপড়চোপড় বের করে সেগুলো বিছানায় স্তুপ করে ব্যাগের জন্য নিজের খেলাঘরে ছুটে যায়। তার কিছু ব্যাগ আছে যেগুলোয় সে খেলনা রাগে। সেই ব্যাগে কাপড় নিবে। তাই সে সেই ব্যাগ এনে মুড়িয়ে মুড়িয়ে কাপড় ঢুকাতেই নাসিফ ঘরে ঢুকে। ঘরে ঢুকে এসব তান্ডব দেখে তো তার আক্কেলগুড়ুম! কাপড়ের পাশে আবার ঘরে পরা স্যান্ডেল জোড়াও রয়েছে। নাসিফ স্পষ্ট স্বরে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, ‘কি হচ্ছে এসব?' বলতেই ছোট্ট তাইফ তার বাবাকে তাড়া দেখিয়ে বলে,
_ আমি নানা বালি যাবো, বাবা!
_ তাই বলে এসব কি?
_ আমাল জামা, আমাল জুতা নিব। আমি নেংতু তাকব না
নাসিফ ডান হাত দিয়ে চোখ মুখ ঢেকে ফিক করে হেসে দিল। নানা বাড়িতে বেড়াতে যাবে তাই নিজের লাগেজ গুছাচ্ছে, তাও কিসে? চটের ব্যাগে! তার পেট ফাটা হাসি আসছে। এতটুকু মানুষ, কত কি কান্ড করে থাকে সারাটা দিন। নাসিফ সামনের দিকে একটু ঝুঁকে ছেলেকে কোলে তুলে নিল, বাম হাত দিয়ে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে গালে চুমু দিয়ে বলল,
_ নানা বাড়িতে যাবেন, তাই ব্যাগ গুছাচ্ছেন?
_ আম্মু কাজ কলে, আমি জামা নেই।
_ আম্মা কাজ শেষ করে আপনার ব্যাগ গুছিয়ে দিবে।
_ কখন যাব?
_ যাবেন ক্ষণে! সেখানে গিয়ে বাবাকে মিস করবেন না?
এতকিছুর উত্তর দেওয়ার টাইম তাইফের কোথায়? নানা বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার এক্সাইটমেন্ট তাকে স্থির করতেই পারছে না। সে নিজের কপাল চুলকাচ্ছে, কান টানছে, পাছা চুলকাচ্ছে। এরপর আবারও একই গান তালে বলে চলল,
_ কখন যাবো নানা বালি?
_ এইতো বাবা, এখুনি আমরা তৈরি হব। কিন্তু এগুলো কি?
বলেই আফিয়া জিজ্ঞাসু চোখে নাসিফের দিকে তাকাল। নাসিফ আফিয়ার চাহনি দেখে শব্দ করে হেসে দিল, হাসতে হাসতে বলল,
_ নিজের ব্যাগ গুছানো শুরু করেছিল! লাগেজ গুছানো শিখে ফেলেছে!
_ এটাতে?
_ হুম।
_ কোথায় থেকে শিখ এসব তুমি, বাবা?
কে শেখায় এসব কান্ড কারখানা তোমাকে? এগুলো নিব না কি জামা? তোমার জামাকাপড় তো রাতেই গুছিয়ে রেখেছি, আম্মু! শুধু শুধু মায়ের কাজ বাড়াও তোমরা। দেখি...
বলেই আফিয়া ব্যাগে ঢুকানো কাপড়গুলো ঢেলে দিল বিছানায়। পুরানো, ঘরে পরা, ছেঁড়াফাটা সব ঢুকিয়েছে। আবার ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আফিয়া মাথা দুদিকে দুলিয়ে সেগুলো ভাঁজ না করেই ড্রয়ারে ঢুকাতে ঢুকাতে নাসিফকে বলল,
_ একটু ছেলেকে রেডি করে দেন না! আমি তাহলে একটু আস্তে ধীরে রেডি হতে পারব।
_ দাও তাহলে তার কাপড়।
_ এই তো।
বলেই আফিয়া নিজের ড্রয়ার থেকে নতুন এক সেট পোশাক বের করে দিল। নাসিফ দেখল তার ছেলের মুখটা ধৌত করানো জরুরি। সে কোলে তুলে নিয়ে বাথরুমে ঢুকল। ততক্ষণে আফিয়াও নিজের অন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছানো শেষ করে।
আফিয়া হিজাবের পিন আঁটকে ছেলের দিকে ফিরে বলল,
_ তোমার বাবা কোথায়?
_ বাবা, দাদা ভাইয়ের কাছে!
_ ওহ, গিয়ে বল আম্মু ডাকে। তুমি কিন্তু কাপড় নষ্ট করবে না।
মায়ের প্রথম কথা শুনেই সে ছুটেছে, শেষের কথা শোনার দরকার নেই। এত সময় তার নেই। আফিয়া গ্রামে যাবে, এই আবদার তোলার পর থেকেই নাসিফের মনমেজাজ চটে আছে। সাত মাস চলছে, এই সময়ে কোন নারী এত নড়চড় করে? নাসিফ পারলে তাকে নিজের বুক কেটে সেখানে ঢুকিয়ে রাখে। এত ভয় তার মধ্যে ঢুকে আছে। অথচ এই নারীর কোন হেলদোল নেই। সে দিব্যি নেচেকুদে বেড়াচ্ছে। প্রচন্ড শীত এখন। ঢাকাতেই হাড় কাঁপানো অবস্থা, সেই বাগেরহাটের অবস্থা তবে কেমন?
খট করে আওয়াজ হতেই আফিয়া মুখ তুলে তাকাল দরজার দিকে। কালো সুতি কাপড়ের ঢিলে মেক্সি সঙ্গে নিকাব, হাত মোজা, পা মোজা পরে সে পুরোপুরি তৈরি। মেক্সি পরলেও এটা দেখতে বোরকার মতোই লাগে। অর্ডার দিয়ে বানিয়েছে। নাসিফের মনে হচ্ছে একটা জলজ্যান্ত নাদুসনুদুস পান্ডা পুতুল তার চোখের সামনে দাঁড়ানো। শুধু হাতে একটা কচি বাঁশের অভাব। তার আফিয়াকে দেখে এই মুহূর্তে প্রচন্ড হাঁসি আসছে। দম ফাটা হাসিতে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করছে। তবে সে হাসবে না। কেননা তার বউকে দেখে যতই আদর আদর লাগছে, ততই চিন্তা হচ্ছে। জ্ঞানীদের কথা মানুষের হঠাৎ করেই অতিরিক্ত সুখ হল বড় কোন ঝড়ের আগমনী বার্তা। এই একটা ভাবনাই ইদানিং নাসিফকে ঘুমাতে দেয় না। তার ঘুম উড়ে গিয়েছে অজানা আশঙ্কায়। কিছু পাওয়ার খুশি তার হারানোর ভয়ের কাছে তুচ্ছ হয়ে উঠেছে। নাসিফ মুসলিম, এক আল্লাহ ও তার সিদ্ধান্তের উপর শতভাগ আস্থাশীল, তবে এটাও সত্য নাসিফ একজন নগণ্য বান্দা। যার অন্তরে সুখদুঃখ অনূভুতি আছে। ভয় রয়েছে হারানোর। সেই ভয় থেকে যতসব ভ্রান্ত ধারণা জিইয়ে রাখে, না চাইলেও থাকে।
_ বলছি, রাতে একটু তাড়াতাড়ি বাসায় আসবেন। আব্বা আম্মা বয়স্ক মানুষ। আপনি তাড়াতাড়ি আসলে উনারা আপনাকে খাইয়ে নিজেরাও একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমাতে যেতে পারবে।
_ হু!
_ আর... গাল ফুলিয়ে রাইখেন না তো। আমি আজীবনের জন্য যাচ্ছি না। আমাদের আনতে যাবেন!
আফিয়া এগিয়ে এলো, নাসিফের গলা জড়িয়ে ধরে আহ্লাদি স্বরে বলল কথাটা। ওর কথাকে কাটিয়ে নাসিফ কাঠখোট্টা সুরে বলল,
_ এই অবস্থায় এতদূর যাওয়ার কি দরকার? তিনটা বাচ্চা সামলে আবার এইজনকে! অত ঠান্ডার মধ্যে কীভাবে কি করবে, তুমি? পানি তো হিমালয়ের বরফের মতো ঠান্ডা, কোথায় পাবে বারবার গরম পানি? কে করে দিবে রাতবিরেতে এগুলো? ছোট ছেলেটা রাতে একবার অন্তত উঠবেই। বড়গুলাও কিছু না কান্ড ঘটায়ই! এত দুশ্চিন্তা নিয়ে কোন সাহসে এত দূরের পথ ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে? এরপর যদি আল্লাহ চান আর তোমার প্রসবের সময় হয়ে যায়, তখন?
_ আপনি...সবসময় একটু বেশি বেশি করেন। আপনার বউ হয়ে এই বাড়িতে আসার পর থেকেই দেখছি বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা উঠলেই আপনি খেকিয়ে উঠেন। মানছি আবার বাপের বাড়িতে অত সুযোগ সুবিধা নেই, তাই বলে কি ঐখানে আর কেউ থাকে না? ঐখানে যারা বাস করে, সেখানকার যারা বাসিন্দা, তারা কি মানুষ না? তাদের শীত গ্রীষ্ম নেই? নাকি তারা বাচ্চাকাচ্চা পয়দা করে না? সব আপ....
_ তারা আর তুমি এক? তাদের জীবনযাপন আর তোমার জীবনযাপন এক? হ্যাঁ! কথা বলছো না কেন? ফাজিল, কত বড় সাহস, মুখের উপর তর্ক করে!
ধমকে উঠল নাসিফ, আঙ্গুল উঁচিয়ে শাসিয়ে বলতে লাগল,
_ আমার বাচ্চাদের কারো যদি কোন সমস্যা হয়, একটারও যদি বিন্দুমাত্র সমস্যা হয়, বাপের বাড়ির নাম ভুলিয়ে দিব। এইবারই লাস্ট এই জেদ বরদাস্ত করলাম। এরপর থেকে আর নয়! চার বাচ্চার মা হয়েও অহেতুক জেদ! একদম ছুটিয়ে দিব।
বলেই সে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নাসিফ বেরিয়ে যেতেই আফিয়া ফুঁপিয়ে উঠল। ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বিছানার উপর একহাত রেখে সেখানে ভর দিয়ে তারপর বসল। পেট তার মাশাআল্লাহ, বেশ উঁচু হয়েছে। দেখে মনে হয় দু'জন, কিন্তু না, একজনই। বেশ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী কেউ ঘাপটি মেরে বসে থেকে বাবা মায়ের মান অভিমানের কাহিনী শ্রবণ করছে।
_ আম্মু, বাবা গাড়িতে বসে রয়েছে, আসো!
বাইরে থেকে নাইফের হাঁক। আফিয়া নড়ল না। টললও না। বরং সে আরো এঁটে বসল। মিনিট তিন পেরুতেই নাইফ ছুটে এলো।
_ আম্মু, আমার হাত ধরে উঠো।
মায়ের বাহু ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করে নাইফ কথাটুকু বলল। আফিয়া ছেলের হাত ছাড়িয়ে ত্যক্ত মেজাজ দেখিয়ে বলল,
_ যাব না, তোমার বাবাকে গিয়ে বলো সব কিছু নামিয়ে রাখতে।
সহজ-সরল নাইফ তো মা বাবার ভেতরকার কাহিনী জানে না। সে বুঝল, মায়ের বোধহয় শরীর খারাপ করছে। সে মায়ের কপালে, গালে ডান হাতের উল্টো পিঠ রেখে বোঝার চেষ্টা করল মায়ের গা গরম কি-না! কিন্তু না, তেমন কিছু নয়। তবে কি ভিন্ন কিছু? হতে পারে। এতটুকু বড় তো সে হয়েছেই। এই তো বছর খানেক। এরপরই সে প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ। আঠারোর তরুণ হয়ে যাবে। সে মায়ের হাত ধরে বলল,
_ আমি বাবাকে বলছি, তোমার খারাপ লাগছে।
আফিয়া কোন কিছু বলার পূর্বেই নাইফ ছুটে চলে গেল। ও যাওয়ার মিনিট দুইয়ের মধ্যেই নাসিফ হম্বিতম্বি করে ঘরে ঢুকে রাগী গলায় গমগম করে বলল,
_ কি তামশা শুরু করছে, বাচ্চাদের গাড়িতে বসিয়ে।
আফিয়া ভেজা লাল টকটকে চোখে তাকাল। তবে ভীষণ শান্ত কণ্ঠে বলল,
_ যাবো না। আপনার বাচ্চাদের বের করে আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখেন। পারলে যেটা পেটে আছে সেটাকেও বের করে আপনার কলিজার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখুন, আমি যদি পেটের মধ্যেই গিলে খেয়ে ফেলি!
বলেই সে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। আফিয়া যতই চঞ্চল হোক, নাসিফের সঙ্গে কথা বলে সতর্ক হয়ে, সবসময়ই। নাসিফ মুখে মুখে তর্ক করা পছন্দ করে না। উগ্র আচরণ একদমই নিতে পারে না। সে যেই হোক। এসব আফিয়া ভালো করেই জানে
তাই সে সেভাবেই আজ অবধি চলে এসেছে। সে বিয়ের পর বাড়ির কাজের লোকেদের কাছ থেকে শুনেছিল, আমিরার সঙ্গে নাসিফের প্রায়ই বাঁধত, একমাত্র আমিরার উগ্র মেজাজ আর তর্কের স্বভাবের কারণে। নাসিফের যুক্তি, যখন একপক্ষ কোন বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে এবং ঐ মুহুর্তে তার মাথা গরম, সে ভালো মন্দ বোঝার মতো পরিস্থিতিতে থাকে না তখন তাকে বোঝানোর দায়ে তর্ক না করাই শ্রেয়। বরং উত্তম সময় দেখে সেই ব্যক্তিকে শান্ত পেয়ে তার ভুলগুলো তুলে ধরে তাকে শুধরানোর সুযোগ করে দেওয়াই উত্তম সিদ্ধান্ত। এই মুহুর্তে সে তাই করল। আফিয়ার অবস্থা পরিস্থিতি না বোঝার মতোই। তার মধ্যে গর্ভকালীনের মতো সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। ইস্যু বাপের বাড়ি যাওয়া। এখানে কুরুক্ষেত্র ঘটে গেলেও তো মেয়ে মানুষকে বোঝানো যাবে না। সুতরাং অশান্তি না করাই শ্রেয়। তার নিজের চিন্তা কমানোর জন্য যা করা দরকার, তাকেই করতে হবে। সে আফিয়াকে ঘাটালো না। আলমারি খুলল। কিছুক্ষণ হাতিয়ে তিন চারটা শার্ট প্যান্ট বের করে বিছানায় ছুড়ে মারল। এরপরও আলমারির উপর থেকে একটা কাপড়ের ট্রাভেলিং ব্যাগ বের করে তাতে সেই কাপড়গুলো ঢুকিয়ে আফিয়ার হাত ধরে বলল,
_ চলো।
_ না, আমি যাব না।
আফিয়া জেদ ধরে আরো শক্তভাবে এটে বসল বিছানার সঙ্গে নাসিফ ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়লেও বাইরে শান্ত। দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
_ ব্যাবসা বানিজ্য সব ফেলে রেখে ঘরে বসে এসব নাটক দেখতে পারব না আমি। এবার না গেলে চিরতরে যাওয়া বন্ধ করে দিব, আর তুমি খুব ভালো করেই জান আমি যা বলি তাই করি।
থ্রেট শুনে আফিয়া ছলছল চোখে মুখ তুলে তাকাল নিষ্ঠুর পুরুষের দিকে। তবে তার ন্যাকা কান্নাতেও নাসিফের মন গলাতে পারল না। উল্টো নাসিফ তাকে ফেলে রেখে একাই বেরিয়ে গেল। নাসিফ তাকে জোর করে তুলে নিয়ে গেল না, আহ্লাদ করে দুটো কথাও বলল না। কথাগুলো ভেবে সে ঠোঁট ফুলিয়ে কতক্ষণ চুপচাপ কাঁদল অতঃপর দুই হাতে চোখ মুছে হিজাব ঠিক করে সেও উঠে দাড়াল। নাসিফ ততক্ষণে গাড়িতে সব মালপত্র সহ তার আন্ডাবাচ্চাকে তুলে নিয়েছে। বাকী শুধু আফিয়া। সামনে চালকের পাশে নাইফ, তাইফ। পিছনে নাবীহা, আফিয়া, ও নাসিফ। উদ্দেশ্য বাগেরহাট গ্রামের বাড়ি, জুনিয়র গাজিদের নানা বাড়ি। আফিয়া উঠতেই নাসিফ ও গা ঘেঁষে বসে পড়ল। এরপর আল্লাহর নাম জপতে জপতে চালক গাড়ির মেশিনে চাপ দেয়, গাড়ি ছুটে চলে আপন শক্তিতে।






0 মন্তব্যসমূহ