চড়ুইভাতি । পর্ব_০৩

 #চড়ুইভাতি

#কালেম_ভে_রিমা

#পর্ব_০৩



[নকল/ চুরি নিষিদ্ধ।মেনশন করতে পারেন অথবা শেয়ার করে দিয়েন।]


চড়ুইভাতি

৩....


ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশটার ঘরে আসতেই মুঠোফোন থেকে ভুমিকম্পের ন্যায় চারদিক কাঁপিয়ে আওয়াজ আসতে থাকলো। সাড়ে দশটার এলার্ম দিয়ে লিলি তৌকির দম্পতি ঘুমিয়েছিলো।

তৌকির নিজের বাম পাশে মোবাইল রেখেছিল যেটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে এলার্ম বন্ধ করে মিনিট পাঁচেক চোখ বন্ধ করে থম মেরে আধ শোয়া অবস্থায় বসে র‌ইলো।চোখ জ্বালা করছে,শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে কিন্তু উঠতেই হবে। কাজে যেতে হবে।বিয়ে উপলক্ষে প্রায় এগারো দিন ছুটি নিয়েছে,আর একদিনও সম্ভব নয়।আজ না গেলে চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যাবে। তাই আজ যেতেই হবে।তৌকির চট করে চোখটা ঢলে নিয়ে ভালো করে মেললো।তার ডান পাশে শোয়া লিলির দিকে তাকিয়ে দেখলো সে হাত পা ছড়িয়ে একদম টানটান সোজা হয়ে শুয়ে আছে।তার পরনের প্ল্যাজো হাঁটুর উপর উঠে আছে,কামিজ কুঁচকে পিঠের নিচে পড়ায় উদর উন্মুক্ত হয়ে আছে।এত সময় সে ওকে এভাবেই জড়িয়ে শুয়ে ছিলো।সে নিজের দিকেও চাইলো। লুঙ্গি প্রায় খুলে যাবে যাবে অবস্থা,গা খালি।সে লিলির প্ল্যাজো টেনে নিচে নামিয়ে দিলো,জামাটা বের করে ঠিক করে দিলো। অতঃপর সবটা পরখ করে পায়ের সামনে পড়ে থাকা চাদরটা তুলে লিলির গাঁয়ের উপর মেলে দিয়ে নিজের লুঙ্গির গিট হাতের মুঠোয় আঁকড়ে খাট থেকে নেমে তা গুছিয়ে সুন্দর করে ভাঁজ করে বেঁধে নিলো। অতঃপর বাথরুমে গিয়ে ভালো করে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে বের হলো।


বের হয়ে গামছা দিয়ে মুখ মুছে মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে দেখলো প্রায় পৌনে এগারোটা। পাঁচ মিনিট ফেসবুকে কাটিয়ে তারপর ফোনটা পাশেই রেখে ব্যাগ খুলে একটা শার্ট বের করে গাঁয়ে জড়িয়ে নিলো, বিছানায় ঘুমে মগ্ন লিলির দিকে চেয়ে মিনিট এক কিছু একটা ভাবলো অতঃপর না চাইতেও তুলতে বাধ্য হলো।


“ লিলি,এ্যাই লিলি,উঠো।এগারোটা বাজে।আমাকে যেতে হবে।লিলি,শুনছো! লিলি!"


লিলির পাশে কাত হয়ে বসে গালে চাপড় মারতে মারতে ডাকছে,গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন লিলি বারবার উ আ আওয়াজ করলেও চোখ মেলে না। তৌকির কসরত করতে থামলো না।সে খুব আদুরে ভাবে লিলিকে তুলতে লিলির ঠোঁটে নিজের শুষ্ক আঙুল বুলাতে লাগলো। কোমল নরম ঠোঁটের উপর পাথরের ন্যায় খসখসা কিছুর ছোঁয়ায় লিলি শিউরে উঠলো।তাও চোখ মেললো না।তৌকিরের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চাপলো,সে লিলির ঠোঁটে ঠোঁট চেপে শ্বাস-প্রশ্বাস গমন পথ বন্ধ করে দিলো। দমবন্ধকর অনুভূতিতে লিলি ভেতরে ছটফটিয়ে চোখ মেলতে গিয়েও মেলতে পারলো না। চোখের সামনে একগুচ্ছ ঘন কালো চুল আর একটা শ্রবনযন্ত্র।তার সঙ্গে ওষ্ঠে চলমান প্রক্রিয়া,লিলি খামচে ধরলো তৌকিরের চুল। স্ত্রীর সাড়া পেয়ে তৌকির আরো বেসামাল ভাবে নিজ কার্য চালিয়ে যেতে থাকলো। মিনিট দুই অতিক্রান্ত করার পর তার নিজ উদ্দেশ্য স্মরণে আসতেই চট করে ছেড়ে দেয়।মুখ তুলে লজ্জায় বিধ্বস্ত পত্নীর দিকে চাইতেই দেখলো সে লজ্জায় কাঁপছে, আঁখি জোড়া বন্ধ।তাও অপ্রতিভ সুখের আবেশে অক্ষিপল্লবেও শিহরণ খেলছে।ঘন পাপড়িদ্বয় সিক্ত হয়ে তরতরিয়ে কাঁপছে।তৌকির আরো একবার লিলির ঠোঁটে গভীরভাবে ঠোঁট চেপে ধরলো, পরপর পাতলা করে হালকা ছোঁয়ায় বেশ কয়েকটি চুম্বনে নিজ কাজ সমাপ্ত করে সোজা হয়ে উঠে বসে শার্টের কলার ঠিক করতে করতে বললো,


“ ওঠো, বের হতে হবে আমাকে।"


লজ্জায় আড়ষ্ট লিলির হুট করেই সমস্ত লজ্জা উবে গেলো।সে চট করে চোখ মেলে জিজ্ঞাসু হয়ে বললো,


“ এখন‌ই যাবেন?"


“ হ্যাঁ এখন না গেলে,ইয়ে মানে আমি এখন বাজারে যাবো।না হলে তুমি রাঁধবে কি?"


“ ওহ, আচ্ছা!"


বলেই লিলি উঠলো,উঠতে গিয়ে খেয়াল করলো তার জামা ঠিক জায়গায় নেই। সামনের গলা অগ্রে এতটাই এগিয়ে আছে যে তার বক্ষ বিভাজন থেকে উদর‌ও দৃশ্যিত হচ্ছে। দ্রুত হাতে জামা ঠিক করতে গিয়ে সামনে চাইতেই চোখ পড়লো তৌকিরের চোখে।সে এত সময় তার দিকেই চেয়ে ছিলো। আবারও লিলি লজ্জায় মরিমরি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তৌকির ভাবালেশ।সে ভীষণ তাড়া দেখিয়ে উঠে দাঁড়ালো, অতঃপর কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বলতে থাকলো,


“ মানি ব্যাগ ক‌ই রেখেছিলাম?"


“ ওয়ার্ড্রবের ড্রয়ারে! ”


লিলি বললো, তৌকির সেদিকে এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটা বের করে নিলো, লুঙ্গির কোচে পেঁচিয়ে নিলো অতঃপর লিলির উদ্দেশ্যে বলতে আরম্ভ করলো,


“ শোন খাটের নিচে চালের বস্তা এনে রাখছি,বিশ কেজীর,ডাল এনেছি দুই কেজী , মুশুর ডাল।আর তেল আছে পাঁচ লিটারের একটা, সঙ্গে দুই কেজী আলু, আদা রসুন আছে। এখন কথা হলো আমি যতটা বুঝেছি তাই এনেছি।এখন তুমি আমাকে লিস্ট করে দাও তোমার কি কি লাগবে! মানে রান্নার জিনিস,বাকী যা লাগবে তা ছুটির দিন ছাড়া সম্ভব নয় আর !"


ততক্ষণে লিলি লজ্জাকে ছুটি দিয়ে খাট থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এখন তার সব স্বাভাবিক।ভরাট কন্ঠে তৌকির আবারও বলতে থাকলো,


“ আমি বোধহয় জরুরী একটা জিনিস ভুল গিয়েছি!"


লিলি আগ্রহী হয়ে তাকালো, তৌকির নিজেই নিজের ভুল বললো,


“ ঐ চালের ড্রাম লাগে না চাল রাখতে? সেটা তো আনিনি!"


লিলি প্রতিক্রিয়াহীন ভাবে চেয়ে থাকলো।একটা পুরুষ মানুষ,কতটা সংসারী জ্ঞান রাখলে এতদিকে খেয়াল রাখে! লিলি মুগ্ধ হলো।এই গুমোট, ভারী উচ্চ কন্ঠের লোকটার এমন দায়িত্ববোধের উপর।সে দারুন ভাবে কৃতজ্ঞ হলো তার বাবার প্রতি।কারণ বাবা যখন তার জন্য এই পাত্রের কথা বললো,সে অতি বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলো,


“ এত বড় মানুষকে আমি বিয়ে করবো?"


বাবা অবুঝ মেয়ের কথায় হেসে মাথায় আলতো ছুঁয়ে আদর করে বলেছিল,


“ এত বড় মানুষ না হলে আমার এই অবুঝ বোকা আম্মাকে সংসার কে বুঝাবে?"


লিলির মোটেই ভীষণ পছন্দ হয়নি লোকটাকে।দেখতে বেশ খানিকটা লম্বা, গায়ের বর্ণ তামাটে, তার মধ্যে ওভালাকৃত্রির চেহারার গড়ন,ভরাট গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর ঘন গোঁফ, দৈহিক স্বাস্থ্য দানবীয়।চ‌ওড়া কাঁধ, একটা ছোটখাটো ভুঁড়ি।মাথা ভর্তি ঘন কুচকুচে কালো চুল, এক পাশ করে সিঁথি কেটে আঁচড়ে গুছিয়ে রাখা।কোথাও বিন্দুমাত্র অগাছালো নেই।চেহারায় ভদ্রতার জৌলুস আর গম্ভীরতার ছাপ স্পষ্ট।লিলি আতংকিত হলো। মনে মনে ভাবতে থাকলো,


“ এত বড় একটা মানুষ আমি কি করে ব‌ইবো? এই লোক আমার উপরে পড়লে তো আমি ছেঁচে যাবো!"


বুদ্ধি হবার পর উপন্যাসের নায়ককে ভালোবাসা লিলি কিভাবে বাস্তবের এমন ভিলেন টাইপ বর মেনে নিবে? লিলির ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল সেদিন।খুব বুক পুড়ছিলো সেসকল ছেলেদের জন্য যাদের সে স্কুল কলেজে অবজ্ঞা করেছিলো। তার সঙ্গে ভয়ে সিটিয়ে যাচ্ছিলো এই ভেবে পাছে তার বর দেখে না সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে! কিন্তু তাতে লিলির বিয়ে আঁটকে থাকেনি।আব্বার এই লোককে এতটাই মনে ধরলো যে তার মতামতের গুরুত্ব দেয়নি। খুব আড়ম্বর ভাবেই তার বিয়ের কাজটা হয়ে গেলো। অবশ্য তাকে আড়ালে আবডালে বড় আপা,মেজো আপা,সেজো আপা অনেক বুঝিয়েছে, বারবার তারা বলেছে,


“ দ্যাখ লিলি জীবনটা বাস্তবে, উপন্যাসের নয়।আর যদি উপন্যাসের‌ই খুজিস তবে ঐ লোককে তোকে মানতে হবে, রূপটাই সব না। তোর উপন্যাসের নায়ক নায়িকারা বলে না এই কথা? মানুষ বিবেচ্য হয় তার কর্মে, বর্ণে নয়! তবে কেন তুই সেটা মানতে পারছিস না? কি আশ্চর্য,কি অনাচার এটা লিলি। তুই তোর উপন্যাসের লেখক লেখিকার কথাও মানছিস না। যাদের ভালোবাসি সেই নায়ক নায়িকার কথায়‌ও গুরুত্ব দিচ্ছিস না! এটা কেমন ভালোবাসা লিলি তবে?"


লিলি তাতে একটু লজ্জিত হলো, কুণ্ঠিত হলো নিজের বিবেক বোধে।সে আসলেই কি অনাচার করছিলো না? সে একজন মানুষের রূপ দেখে তাচ্ছিল্য করে তাকে বিয়ে না করার জন্য বাতিল করছে? সে তো উপন্যাসে এটা পড়েনি! উপন্যাসের নায়ককে অবহেলিত হতে দেখলে তার বুক পুড়ে,নায়কের প্রতি কারো অবজ্ঞায় তার চিত্তে রক্ত ক্ষরণ হয়। তবে সে কেমনে একজন মানুষের বাহ্যিকতায় তাকে অবজ্ঞা, অবহেলা অপ্রদস্ত করছে? সে কি মানুষ ভালো নয়?


লিলির মনে জাগা প্রশ্নের উত্তর লিলি নিজেই খুঁজে বের করতো। তারপরেও আবার তা নিয়ে হতাশ হতো।

তবে তার আম্মা বারবার তার সেই হতাশাকে কাটিয়ে দিতে বলেছিলো,


“ শোন আম্মা, স্বামী বয়সে বড় হ‌ওয়া ভালা।সে তোমাকে ভালো বুঝবো।বয়সে জ্ঞানে বড় হ‌ওয়ায় তার সব দিকের ধারণা বেশি থাকবো।বয়সী বেডারা ব‌উকে অনেক যত্ন করে, ভালোবাসে, তাদের মন-মেজাজের অনেক তোয়াজ করে।দেখবা তুমি তার মাথার তাজ হয়ে থাকবা।তয় তার জন্য তোমাকেও স্বামীর বাধ্য হয়ে থাকতে হবে।সে যেভাবে চাইবে তোমার সেভাবে থাকতে হবে।তার ইচ্ছার বাইরে কিছু বলবা না, করবা না। তাহলেই দেখবা সে তোমাকে কত আদরে রাখবে।”


লিলি বাবা মায়ের পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করে নিলো। তাছাড়া করার‌ই বা কি আছে? বিয়ে তো করতেই হতো।আর বাবা মায়ের এই লোককে কেন জানি ভীষণ মনে ধরেছে,এই গুমোট গুরুগম্ভীর ভার ভার লোকটাকে লিলির জীবনের সুতায় জড়িয়ে দিলো।এখন একে লিলির আজীবন মেনে চলতে হবে।তবে লিলি তাতে বিশেষ অসুবিধা দেখছে না।লোকটা বাইরে যতটা কঠোর শক্ত দেখায় লিলির কাছে আসলে ঠিক ততটাই পরিবর্তিত হয়ে ধরা দেয়। একদম কিশোরদের মতো চঞ্চল হয়ে তার চাওয়া পাওয়া গুলো লিলির কাছে খুলে বলে।


তৌকির ঝুঁকে খাটের নিচ থেকে সব বের করে লিলির সামনে দিলো,লিলি হাত বাড়িয়ে চালের বস্তা নাড়ানোর চেষ্টা করতেই তৌকির বাঁধা দিয়ে বললো,


“ রাখো তুমি, কোথায় রাখবে বলো আমি নিয়ে দিচ্ছি।"


লিলি খাটের এক কোনায় রাখার জন্য দেখিয়ে দিলে তৌকির বস্তা নিয়ে সেখানেই রাখলো। এরপর সোজা হয়ে বললো,


“ আচ্ছা বাজারের লিস্ট করে দাও তাহলে!"


লিলি নিজের ব্যাগ হাতড়ে একটা নোট আর কলম নিয়ে তাতে সুন্দর করে নিজের প্রয়োজনীয় মশলাপাতি লিখে দিলো আর বললো,


“ এগুলো আনবেন আর তরকারিতে আপনি যা খাবেন তাই আনবেন বাজার থেকে।"


“ তুমি কি খাবে তাই বলো,মাছ গোশত!"


“ আপনি যা খাবেন আমিও তাই খাবো?"


“ ঠিক!"


“ হুম!"


শেষ কথাটা তৌকির দুষ্টুমির ছলেই বলেছিলো কিন্তু বোকা লিলি তা বুঝতে পারেনি দেখে তৌকির একটু হতাশ হলো। অতঃপর লিস্ট নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,


“ তুমি ভাত,ডাল বসিয়ে দাও।আমি এসে রান্না হ‌ওয়ার আশায় বসে থাকতে পারবো না।সময় নেই আমার।"


লিলি মাথা দুলিয়ে বিদায় দিলো, এরপর সে একে একে সব হাঁড়িপাতিল নেড়েচেড়ে ভাত,তরকারি, ডালের কোনটা হতে পারে তা বুঝে নিয়ে আলাদা করে নিলো।তার ভেতরে এক অন্য রকম উদ্দিপনা কাজ করছে।সে ভীষণ আদুরে ভাবে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে সবটা।

নিজের সংসার! এই পৃথিবীতে একজন নারীর প্রকৃত ঠিকানা নিজের সংসারে। একটা মেয়ে,কন্যা থেকে বালিকা হবার সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তরে সংসার নামক অঙ্কুরের বীজ বপন হয়ে থাকে।যা ধীরে ধীরে তরু থেকে বৃক্ষের ন্যায় শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে পূর্নাঙ্গ একটা জীবনের ব্যাপ্তি ঘটায়। তার সারা জীবনের একমাত্র চাহিদা থাকে একটা সুখী সংসার।একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা সঞ্চিত থাকে একটা সংসারের মাঝে। একজন নারীর জীবনের সফলতার জানান দেয় তার সংসার ধর্মের আড়ালে। একজন নারীর জীবনকে পূর্নতা এনে দেয় সংসার নামক এক অপ্রার্থিব পাওয়াতে।

নব্য বধূদের জীবনের এই দিনটা থাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দের।সে পরম মমতায়, আবেগে আবেশে ছুঁয়ে দেখে তার জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরুতে থাকা প্রতিটি জিনিসকে। একটা একটা করে যোগান দেওয়া জিনিসগুলো তার কাছে থাকে সবচেয়ে বেশি অমূল্যবান সম্পদের ন্যায়। ছোট থেকে বড় সব কিছুই সে পরম আবেগে নিজের বলে দাবী করতে পারে। যেখানে কারো বাঁধা থাকে না,কারো নিষেধাজ্ঞা থাকে না।

আর তা যদি হয় একান্ত মানুষটার কষ্টে যোগার করা তবে তা কেমন অনুভূতি যোগায় তা কেবলি সেই নারীই জানে।


লিলি প্রতিটি জিনিস হাত দিয়ে ছুয়ে ছুয়ে দেখছে আর অন্যরকম অনুভূতিতে আপ্লুত হচ্ছে। বারবার এক‌ইভাবে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে,হাজার ভাবে সেগুলো সাজাচ্ছে।নানা রঙীন কল্পনা করছে। ঠিক তখনই তার ঘরের দরজায় টোকা পড়লো।


“ জি, আসছি!"


বলেই এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখলো সকালের সেই ভাবী।


“ জি ভাবী!"


“ ভাবী রান্না বসাবেন না? ভাইয়া মনে হয় বাজারে গেলেন!"


লিলি তার নতুন সংসারের জিনিসপত্র দেখতে দেখতে কল্পনায় এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিল যে রান্নার কথা বেমালুম ভুলে বসে আছে। ভাবী বলাতে মনে পড়ায় অনিচ্ছায় ঠোঁট এলিয়ে বললো,


“ জি ভাবী, রান্না বসাবো!"


“ আচ্ছা আসেন,চুলা খালি করে দিচ্ছি।আপনি সব গুছিয়ে নিয়ে আসেন!"


বলেই তিনি চলে গেলেন।লিলি দরজার দিকে ভেতরে ঢুকে নিজের মাথায় গাট্টা মারলো।

এরপর দ্রুত পায়ে বস্তার মুখ তৌকির খুলেই দিয়ে গিয়েছে তার থেকে চাল বের করে নিলো, এরপর ডালের পাতিলে ডাল নিয়ে তাড়াতাড়ি রান্না ঘরের দিকে গেলো।সকালে ভাবী রান্না ঘর চিনিয়ে দিয়েছে।তাই বেশি ঝামেলা হলো না।


“ আসেন ভাবী আসেন।"


ভদ্রমহিলা এই ফ্ল্যাটের পুরাতন ভাড়াটিয়া।স্বামী একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে স্টক ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন, হটাৎ করেই কোম্পানিটা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে ভদ্রলোক বেশ ঝামেলায় পড়ে যান।

একার রোজগারে অসুস্থ বৃদ্ধ মা, পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান, স্ত্রী নিয়ে বিপাকে পড়ে যান।তাই খরচ কমানোর জন্য এত বড় ফ্ল্যাটটা একা থাকার জায়গায় সাবলেট হিসেবে ছোট পরিবার দিবেন বলে লিফলেট টানান।ব‌উ নিয়ে থাকার জন্য ভালো একটা সাবলেট তালাশ করতে গিয়ে তৌকিরের চোখে পড়ে। বিয়ের আগেই সে তার ব‌উ এনে উঠানোর সব বন্দোবস্ত করে রেখে যেতে চেয়েছিল,তাই ফ্ল্যাটে এসে তাদের সাথে আলাপ করে এবং রুম দেখে পছন্দ হ‌ওয়ায় সব চুড়ান্ত করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে রেখে যায়।


ভদ্রমহিলা নরম তবে মিশুক স্বভাবের তা অল্পতেই তৌকির আন্দাজ করে নেয়। সবচেয়ে বড় কথা ভদ্রলোক এখন আর এখানে থাকছেন না।তিনি আপাতত চিটাগাং রোডে একটা মাঝারি আকারের কোম্পানিতে জয়েন দিয়েছে। সেখানে কোম্পানির স্টাফদের সঙ্গে কোয়াটারে থাকছেন। সাপ্তাহিক অথবা সরকারি ছুটিতে পরিবারের কাছে চলে আসেন।তাই তাদের সমস্যা হয় না।ব‌উ শ্বাশুড়ি এক ঘরেই থাকেন।আর ছেলে আসলে মুরব্বি বসার ঘরে থাকা এক বেডের খাটে থাকেন।

সবটা বুঝেই তৌকির ঘরটা নেয়।


লিলি চাল ধুয়ে ভাত চড়িয়ে দিলো।অন্য চুলাতে মহিলা রান্না করছে।লিলি ডাল ধুয়ে ভিজিয়ে রাখবে বলে ডালে পানি দিলো। তখন মহিলা তাকের একপাশ দেখিয়ে বললো,


“ ভাবী এই জায়গা আপনার জন্য খালি করছি।আপনি নিজের রান্নায় প্রয়োজনীয় হাঁড়িপাতিল এখানে রাইখেন। বারবার ঘরে যাওয়া ঝামেলার বিষয়।"


লিলি মুচকি হাসলো,মুখ দিয়ে কিছু বললো না তবে মাথা দুলিয়ে বুঝালো। এরপর মহিলা নিজের ফ্রিজের সামনে গিয়ে ডিপের উপরের তাক ফাঁকা করে বললো,


“ আর মাছ মাংস এখানে রাইখেন।এই তাকে সব আপনার থাকবে।"


লিলি এবারও মুচকি হাসলো। তার চোখে অবশ্য বিস্ময় ভাসছিলো।সে মনে মনে বিস্মিত হচ্ছে। কেউ এভাবেও সেধে সহযোগিতা করে? আদৌও কেউ করে?লিলি জানে না।


লিলি ঐখানে দাঁড়িয়ে টুকটাক আলাপ করতে থাকলো।


এদিকে....


তৌকির বাজারে গিয়ে একটা নয়'শ গ্রামের ইলিশ কিনলো, সঙ্গে নিলো কচি দেখে লাউ।এক ডজন ডিম, বেগুন, ঝিঙ্গা, কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ সহ লিলির লিস্টে থাকা সবকিছু। গোরুর মাংস নিলো এক কেজী। এরপর বাজার থেকে বেরিয়ে গেলো পাশেই থাকা প্লাস্টিকের দোকানে, গিয়ে প্রায় তিরিশ কেজির একটি চালের ড্রাম কিনলো, পাঁচ কেজির দু'টো ড্রাম কিনলো। একটা রুটি বানানোর পিঁড়ি বেলুন। তারপর সব কিছু নিয়ে আবার ছুটলো রাস্তার বিপরীতে থাকা ফার্মেসিতে। সেখানে গিয়ে দু'টো জিনিস নিলো। এরপর রিক্সায় চড়ে বাড়ির পথ ধরলো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ