সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১২৯

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_১২৯



[কপি করা/ চুরি করা/ কিংবা নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ,দয়া করে কেউ এগুলো করবেন না। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন।]


মাওয়া ঘাটের একটু আগে টোল লাইনে আঁটকে রয়েছে নাইফের গাড়ি।হাত ঘড়িতে বারবার সময় দেখছে আর বিরক্তিকর শব্দ বের করছে।

সাড়ে বারোটা পেরিয়ে গিয়েছে কামরাঙ্গীরচর থেকে এই অবধি আসতে।সদর ঘাট রোড ধরে পোস্তগোলা ব্রীজ পেরিয়ে এত জ্যাম ঠেলতে হয়েছে যে সোয়া নয়টা থেকে এই সময়ে এখন এই অবধি পৌঁছিয়েছে। অথচ এখনও কত পথ বাকী। আবার গিয়ে ফিরতেও হবে।নাইফ খুব করে চাইছে আজ অন্তত সন্ধ্যার আগে নূরের কাছে ফিরতে।

সে দেখেছে কাল রাতে কত উচ্ছ্বাস নিয়ে নূর নিজের আর ওর প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছে। বারবার ফোনে কাজিনদের সাথে প্ল্যান করছে।

নূর জন্ম থেকেই দেশের বাইরে বড় হয়েছে,একা একা থেকেছে, খেয়েছে।পরিবারের গুরুত্ব বোঝে না। তাদের সাথে সময় কাটানোর বিষয়টাও ওর কাছে খুব একটা উপভোগ‌্য নয়। বরং আরো বেশি ক্লামজি আর মেসি লাগে।হয়তো অভ্যাসের বাইরে তাই। ওর কাছে ঘুরে বেড়ানোটা বেশি আনন্দের।কারণ নূর ভীষণ ভ্রমন পিপাসু।তাই একটু সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তে চায়। এদিকে নাইফ সম্পূর্ণ ভিন্ন।তার কাছে বাইরে ঘোরার চেয়ে পরিবারের সাথে সময় কাটানো বেশি আনন্দের। দুজনের মাঝে ভীষণ ভিন্নতা থাকলেও কেন জানি নূর নামক রমনীর প্রতি নাইফের ভাবাবেগ দারুন শক্ত,নাইফের কাছে নূর সঙ্গীনি হিসেবে চমৎকার একজন মানুষ। দিনশেষে কোথাও একটা স্যাক্রিফাইস মাইন্ড নূর লালন করে,মুখ বুজে মেনেও নিতে জানে।তবে নাইফ ভেবেছে, এরপর থেকে নূরের কোন বিষয়ে যেন স্যাক্রিফাইস করতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবে। বিয়ের বয়স এক পেরুলেও নূরকে সময় দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারেনি নাইফ।তাতে সে নিজেই বেশ লজ্জিত। ঠিক করেছে তাইফ যাবার পর একটা লম্বা হানিমুন ট্রিপে যাবে।বেশি দূরে নয়।দেশের গন্ডিতেই তবে প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাবে প্রবাসে লালিত আদুরে বঙ্গ ললনাকে।


তাইফ ক্যান্টনমেন্ট গিয়েছিল নিজের এক সিনিয়রের সাথে কিছু জরুরী আলাপ করতে।যিনি ওকে কলেজ লাইফ থেকেই চিনে।তার সঙ্গে অফিসিয়াল কথা শেষ করে বিদায় নিয়ে বের হওয়ার সময় ভদ্রলোকের সাথে সামান্য কিছু দৈনন্দিন আলাপ করছিলো ঠিক সেই মুহূর্তে‌'ই মুঠোফোনটা শব্দ করে বেজে উঠলো।


“ এক্সকিউজ মি স্যার,ক্যান আই পিক দ্য কল?"


“ হা হা, শিওর প্লিজ!"


“ধন্যবাদ!"


তাইফ অনুমতি পেতেই ফোন তুললো‌। বাড়ির নাম্বার! ভ্রু কুঁচকে নিজেকেই জিজ্ঞেস করলো,


“ এই সময়ে বাড়ি থেকে!"


ভাবতে ভাবতেই রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো উদ্বেগিত কন্ঠস্বর,তুহি ভারি কন্ঠে বলতে থাকলো,


“ ভাইয়া তাড়াতাড়ি বাসায় আসো।আম্মুর পায়ে গরম ভাতের মাড় পড়ছে!"


“ কিভাবে?"


বলতেই বলতেই তাইফ উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। সিনিয়র অফিসার‌ও তাইফের অবস্থা দেখে বিচলতি হয়ে কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে কাঁধে হালকা করে চাপ দিয়ে ধরলো,তাইফ আর কোন কথা না শুনেই বললো,


“ আসছি আমি। ডাক্তার ডাকো।"


বলেই ফোন কাটলো, অতঃপর হালকা ডান দিকে ফিরে বিনয়ী ভঙ্গিতে বললো,


“ স্যার আমাকে এখন‌ই যেতে হবে।আমার মায়ের পায়ে গরম ভাতের মাড় পড়েছে। এমনিতে ক'দিন ধরে হাঁটুর ব্যথায় ঘুমাতেও পারছে না।এর মধ্যেই.."


“ কোন এক্সপ্লেইনেশনের দরকার নেই।মা আগে। সবকিছুর আগে বাবা মা,যাও।আমি এদিকে ম্যানেজ করে নিবো নে।"


“ মেহেরবানী স্যার।আমি উইল বি ইয়র অবিডিয়েন্ট অলওয়েজ!"


“ আই নো ইট। ডোন্ট ওয়ারি, ইয়্যু গো এন্ড আপডেট মি দ্য ইউয়র মম'স কন্ডিশন।"


“ থ্যাংক ইয়ু স্যার, আসসালামু আলাইকুম !'


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম!"


____________________________________________


আফিয়া ভাতের মাড় ঝড়াতে পাতিলটা লুছনি দিয়ে ধরে নিচু হ‌ওয়ার সময় হাঁটুতে এত বেশি ব্যথা অনুভব হয় যে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ভাতের পাতিল ছেড়ে দেয়।যেটা গিয়ে সরাসরি পড়ে হাঁটুর উপর এবং গড়িয়ে পুরো পা ছেয়ে যায় গরম সাদা ঘন মাড় আর চকচকে আঠালো দানায়। মুহূর্তে চিৎকার করে উঠে।রুকাইয়াহ তখন সালমা ফাওযিয়াকে গোসল করাচ্ছিলো।রেশমি মাছ ধুচ্ছিলো। আফিয়া নিজেই বলেছে সে পারবে। এরপর যা হ‌ওয়ার তাই হলো।


নূর তখনো নিজের ঘরে বসে ছিলো। শ্বাশুড়ির চিৎকারে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে এবং অবস্থা দেখে সেও চিৎকার করে উঠে। তড়িঘড়ি করে পায়ের উপর ঠান্ডা পানি ঢেলে দেয়।এতে আরো বেশি জ্বালা করতে আরম্ভ করলে আফিয়া চেঁচিয়ে উঠে। এদিকে ঘর থেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করছে সালমা ফাওযিয়া।তুহি‌ ছলছল চোখে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে আছে, রুকাইয়াহ‌ও দৌড়ে এদিকে আসে।নূর ঘরোয়া চিকিৎসা সেড়ে শ্বাশুড়িকে রেস্ট করতে বলে।তুহি বড় বোনকে ফোন দেয় যেন তাড়াতাড়ি চলে আসে।এর মধ্যেই নাসিফ‌ও এসেও পৌঁছে যায়।ব‌উয়ের এই অবস্থা দেখে তার পিলে চমকে উঠে।রুকাইয়াহকে ধমকে জিজ্ঞেস করে,


“ এত বড় ঘটনা ঘটে গেল আমাকে জানাও নি কেন? আশ্চর্য আমার ব‌উ পুড়ে গেছে আর আমাকেই জানানোর দরকার পড়েনি?"


“. আমি‌ই নিষেধ করেছি।অযথা ওদের সাথে চেচিয়েন না তো!"


“ কেন তুমি নিষেধ করেছো?"


“ সামান্য একটু পুড়ছে, বেশি কিছু হয়নি।অযথা বাড়ি মাথা তুইলেন না তো। ছেলেরা আসবে, পেরেশান হয়ে যাবে আপনার চেঁচামেচিতে। শান্তি দেন ওদের একটু!"


নাসিফ শান্তি দিলো না।আফিয়া রেস্ট নিতে বললেও নিলো না। উল্টো বোরকা বের করে আফিয়ার মাথায় গলা ঢুকাতে ঢুকাতে বলতে থাকলো,


“ তৈরি হ‌ও। ডাক্তার দেখিয়ে আনবো।ওরাই বলবে বেশি নাকি কম!"


আফিয়া স্বামীর হাত ধরে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে বললো,


“ ব‌উমা মলম লাগিয়ে দিয়েছে। একটু জ্বলছিলো তা কমে গিয়েছে।আপনি এখন শান্ত হোন তো।এমনিই চলে যাবে!"


“ কিভাবে হলো এটা?"


“ ঐ ভাতের মাড় ঝড়ানোর জন্য আর কি!"


“ কেন? তোমাকে কেন ভাতের ঝড়াতে হবে? বাড়ির মধ্যে এত লোক কিসের জন্য আছে? একটা জগ তুলতে পারো নাই ব্যথার জন্য তাঁরপরেও কেন এত বড় !"


“ তাহলে! কে করবে? সংসারটা তো আমার‌ই!"


নাসিফ তাকিয়ে আছে আফিয়ার দিকে, আফিয়া তাকিয়ে আছে নিজের পায়ের দিকে।


“আম্মু!"


নাবীহা হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের ঢুকলো, মা'কে পা ঝুলিয়ে বসতে দেখে আগেই বললো,


“ পা ঝুলিয়ে কেন রাখছো? পানি নেমে ভার হয়ে যাবে আম্মু!"


বলেই পা দুটো তুলে নিজের হাঁটুর উপর রাখলো।তুহি বালিশ গুছিয়ে পাশের দিলে নাবীহা মায়ের পা তুলে বালিশের উপর রেখে বোনকে জিজ্ঞেস করলো,


“ কিভাবে পুড়লো?"


“ আম্মু ভাত ঝড়াতে গিয়ে হাত থেকে পাতিল ছুটে পড়েছে।"


“ মানে কি? তুমি কেন ভাত ঝড়াতে গেছো? আর কেউ ছিল না?"


“ সবাই কাজ করছিল।এটা একটা দূর্ঘটনা,হতেই পারে।"


“ আম্মু! ইচ্ছা করে বিপদ টানলে সেটা দূর্ঘটনা না। তুমি হাঁটতে পারছো না ব্যথায়। তোমাকে বেড রেস্ট করতে বলেছিলাম আর তুমি গিয়েছো ঐ দেড় কেজির ভাতের পাতিল তুলে মাড় ঝড়াতে? কেন? বাড়ির সব মানুষ কি মরে গিয়েছিল? যদি তোমাকেই এখন‌‌ও এত ভারী কাজ করতে হয় তবে এত লোক থেকে লাভ কি? "


“ ঠান্ডা হ‌ও।সবাই কাজ করছিল।আমি নিজেই মাতব্বরি করতে গিয়ে এসব ঘটছে।"


“ হ্যাঁ ঐ তো করো সবসময়, মাতব্বরি। থাকো এখন ল্যাংড়া হয়ে। বুঝবে কত ধানে কত চাল।"


নাসিফ রাগ দেখিয়ে ঘরে থেকে বেরিয়ে গেল।নাবীহা বোনকে উদ্দেশ্য করে বললো,


“ ভাবী কোথায়?"


“ বোধহয় শাওয়ার নিচ্ছে। একটু আগে রান্না শেষ করেছে!"


“ ওহ,আচ্ছা আর কারো কিছু হয়েছে? ভাবী ঠিক আছে?"


“ হ্যাঁ ওই সময় তো ভাবী ঘরে ছিলো আর রেশমি আপু মাছ ধুচ্ছিলো।"


“ ওষুধ কে লাগিয়েছে?"


“ ভাবী'ই!"


“ আচ্ছা! দেখি আম্মু!"


নাবীহা নিজের কাজ শুরু করে দিলো। খুঁটে খুঁটে দেখতে থাকলো ,খুব বেশি না পুড়লেও হাঁটুর একটু নিচে আর পায়ের পাতার উপরে ফোস্কা পড়ে গেছে।


“ আম্মা!"


নূর ওড়না টানতে ঘরে ঢুকলো।নাবীহাকে দেখ একটু থেমে জিজ্ঞেস করলো,


“ কখন আসছো তুমি?”


“ এই তো একটু আগে।"


নাবীহা উত্তর দিয়ে আবারও নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।আফিয়া ব‌উকে বললো,


“ তোমার সব কাজ শেষ?"


“ জি!"


“ তাহলে যাও, তোমার আব্বাকে,দাদীকে গিয়ে একটু কষ্ট করে খাবার দাও।আমি আছি, ঠিক হয়ে যাবো চিন্তা করো না?"


“ আচ্ছা আম্মা। আপনার খাবার‌ কি এখানে দিয়ে যাবো?"


“ আমি এখন খাবো না।পরে খাই! তোমরা গিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করো!"


“ নাবীহা তুমি?"


“ আমিও পরে খাবো?"


তুহি আসো! নূর বেরিয়ে গেলো।তুহি গেলো না। উল্টো মায়ের গায়ের সাথে সেঁটে বসে র‌ইলো,বললো,


“ আমি ভাইয়ার কাছে খাবো!"


আফিয়া কপাল কুঁচকে মেজাজ দেখিয়ে মেয়েকে বললো,


“ এত দূর থেকে পেরেশানি হয়ে এসে তোমার সেবা করবে সবাই? কাজ নেই কারো? ওদের শরীর না? মানসিক আরাম দরকার হয় না?"


তুহি গাল দুটো ফুলিয়ে মাথা নিচু করে বসেই র‌ইলো।নাবীহা মায়ের অযথা ঝাঝালি বুঝলো,বোনের দিকে চেয়ে ছোট করে শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,


“ আমি বোরকা ছেড়ে আসি। আম্মু প্লিজ উঠবা না এখান থেকে!"


তাইফ আসতে আসতে অনেক সময় পেরিয়ে যায়।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট তো আর ঘরের পাশে না।

তার মধ্যে ঢাকার রাস্তার জ্যাম!


তুহি মায়ের সাথে গা ঢলাঢলি করতে করতে মায়ের পাশেই শুয়ে র‌ইলো। এদিকে আফিয়া পায়ের যন্ত্রনায় ভেতরে ভেতরে ছটফট করলেও বাইরে কিছু্ই হয়নি ভং ধরে বসে র‌ইলো।


“ আম্মা!"


বসার ঘরে নূর খাচ্ছে,তাইফ এতটাই উদগ্রীব যে তার হুঁশ‌ই ছিলো না এখানে নূর থাকতে পারে।ও পর্দা গলিয়ে ভেতরে ঢুকে জিজ্ঞেস করলো,


“ আম্মা ক‌ই?"


তাইফকে দেখে নূর তড়িঘড়ি করে ওড়না দিয়ে পুরো মুখ মন্ডল ঢাকতে ঢাকতে বললো,


“ হায় আল্লাহ, আল্লাহুমাগফিরলি। আসতাগফিরুল্লাহ্, আল্লাহ আল্লাহ! কি হচ্ছে তাইফ?"


“ ওহ স্যরি ভাবীমনি।আমি খেয়াল করিনি।"


“ তুমি খেয়াল করোনি মানে কি তাইফ?সব জায়গাতেই হরবর করে ঢুকে যাওয়া তোমার স্বভাব হয়ে গেছে। হুট করেই কিচেনে ঢুকে যাও,ভুতের মতো বারান্দায় ঘুরঘুর করো।যতসব!"


বলেই নূর ঐ পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলো। তাইফ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানে সে বুঝতেই পারলো না তার দোষ কোথায়। এদিকে নূরের উঁচু কন্ঠস্বর শুনে আফিয়ার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো নাবীহা, তুহি।নাসিফ নামাজে বেরিয়েছে।


“ কি হয়েছে ভাই?"


“ তেমন কিছু হয়নি।"


তাইফ বড় বোনের প্রশ্নের জবাবে মুহূর্তে নিজেকে ঠিক করলো, ছোট করে বললো।


তাইফের মুখ চোখ অল্প সময়ের মধ্যেই কেমন জানি হয়ে গিয়েছে।নাবীহা ভাইয়ের মুখ তুলে নিজের দিকে ধরে বললো,


“ মুখটা এমন শুকিয়ে গেছে কেন? কি হয়েছে?"


“ আমার কিছু হয়নি। আম্মু ক‌ই?"


“ ঘরেই আছে চল।"


মা'কে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঐদিকে নূরের মামাতো কাজিনরা ফোন দিয়ে বারবার জিজ্ঞেস করছে কখন আসবে?

নাইফ তখন তাইফকে ফোন দিয়ে পায়নি। ভেবেছিল তাইফ নিজেই কল ব্যাক করবে কিন্তু করেনি। আর তাইফ মায়ের কথা শুনার পর থেকে অস্থির হয় আছে। কোনদিকে ধ্যান নাই তার। নাইফের গাড়ি যখন গোপালগঞ্জ পেরিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় ঢুকলো ঠিক তখনই নাইফ আবারও ফোন করলো ছোট ভাইয়ের নাম্বারে।তাইফ তখন তুহিকে খাইয়ে দিচ্ছে,আর তুহি নিজের মাদ্রাসার গল্প করছে ভাইয়ের সাথে। ঐদিকে নাবীহা নিজের ব‌ই পাশে রেখে বিরবির করে পড়ছে আর মায়ের মাথায় বিলি দিয়ে দিচ্ছে সঙ্গে বাচ্চা বোনের বাচ্চামো শুনছে।

তাইফের ফোন ছিলো তুহির পাশে পড়ে,তুহি ফোনে বড় ভাইয়ের নাম্বারে দেখেই চট করে রিসিভ করে নিলো।তাইফ চোখ রাঙানি দিয়ে বললো,


” ইটস্ ব্যাড ম্যানার্স। তুমি যে কারো ফোন রিসিভ করতে পারো না। সিক্রেট বলতেও কিছু আছে।"


“ এটাতো বড় ভাইয়ার নাম্বার!"


গালে ভাত চিবানো বন্ধ করে গাল ফুলিয়ে ভাইয়ের উত্তর দিলো।তাইফ ইশারায় বললো,


“ কথা বলো!"


“ ভাইয়া আসসালামু আলাইকুম।"


অনুমতি পেয়েই রিসিভ করে আগে সালাম দিলো।নাইফ বোনের কন্ঠ শুনতে পেয়েছি জিজ্ঞেস করলো,


“ ছোট ভাইয়া বাসায়?"


“ হুম!"


“ দাও তো ওকে!"


“ আসস..


“ তোকে কতবার ফোন দিয়েছি? রিসিভ করিসনি কেন?আর ব্যাক‌ও তো করলি না?"


“ ওহ স্যরি।আমি আসলে!"


“ তোর আসলে নকলে রাখ,এখন যেখানে থাকিস যেই অবস্থায় থাকবি সব বাদ দিবি,তোর ভাবীকে নিয়ে গাজীপুর ছেঁড়ে আসবি।আমি নানীকে নিয়ে আসছি।নানীকে পোস্তগোলা ব্রীজ অবধি নিয়ে গাড়িতে করে মামার কাছে পাঠিয়ে দিবো তারপর আমি সিএনজি অথবা উবার নিয়ে গাজীপুরে চলে যাবো সোজা।কি বলেছি বুঝেছিস?"


“ হ্যাঁ কিন্তু এত সিরিয়াস! কিছু কি হয়েছে?"


“ তেমন কিছু হয়নি।আবার অনেক কিছু। বিয়ে কর তাহলেই বুঝবি।"


“ মানে বিয়ে... কিন্তু এই সময়ে আমি কিভাবে!

ভাবীকে গাড়িতে উঠিয়ে দেই। ড্রাইভার নিয়ে যাক!"


“ ড্রাইভার নেওয়া আর তুই নেওয়া এক? তাহলে কি আমি তোকে বলতাম?"


“ কিন্তু এই সময়ে আমি কি করে যাই ভাই?এখন তো !"


“ কেন এখন তোর কি কাজ? সেই তো ঘরে বসে তুহির সাথে অযথা ঝগড়া করবি।তো কাজ কি?"


“ না মানে আম্মা!"


“ আম্মা কি?অযথা আম্মার বাহনা দিবি না তাইফ, একটা কাজে বললেই..!"


“ তুমি জানো না?"


“ কি?"


“ আম্মুর তো পা পুড়ে গেছে!"


“ মানে কি? পা পুড়ে গেছে মানে কি?"


তাইফ সব ভেঙ্গে বললো। তাইফ আসলে নূরের সাথে যেতেই ইচ্ছুক নয়।তাই ভাইকে বুঝালো মায়ের বিষয়ে এখানে থাকা তার জরুরী।মা ভক্ত নাইফ‌ও খুব বুঝলো। এদিকে নাইফকে জানানোর জন্য নাবীহা,আফিয়া তাইফকে ঝাড়তে থাকলো।


নাইফের আসতে আসতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলো।নূরের প্রোগ্রাম বাতিল হলো, সঙ্গে আবারও নূরের মনে ক্ষত লাগলো। এদিকে নাইফ ঘরে ঢুকে আগেই ব্যস্ত হয়ে পড়লো মা'কে নিয়ে। ইচ্ছা মতো রুকাইয়াহ,রেশমিকে ঝাড়লো। মা'কেও শাসন করলো।সে ভুলে গেলো আজ তার কোথাও কথা দেওয়া হয়েছিল। সন্ধ্যার পর আফিয়ার পা জ্বালাপোড়া বেড়ে যেতে থাকলো।


___________________________________


“ আম্মা!"


সদর দরজায় দাঁড়িয়ে নাইফ মা'কে ডাকছে।ডান হাতে তার দু'টো নীল পলিথিনের ব্যাগ।কালো সুট, ক্লান্ত মুখশ্রী। কাঁধে চাপানো অফিসিয়াল ব্যাগ।অন্য হাতে একটা গোলাপী ফাইল আর মোবাইল।চৌকাঠে পা রেখেই নিজ সন্তানের কচি কন্ঠ আর মায়ের খুনসুটির শব্দ পাচ্ছে। ক্লান্ত মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটলো। ঠোঁটটা ছড়িয়ে রেখেই পূণরায় মা'কে আওয়াজ দিলো।


“ আম্মা, আসসালামু আলাইকুম।"


বড় ছেলের কন্ঠ কানে যেতেই আফিয়া প্রধান ফটকের দিকে দৃষ্টি পাতলো। পর্দা ভেদ করে কিছুই দেখা না গেলেও মাতৃত্বের অলৌকিক দৃষ্টি দিয়ে সে ঠিক‌ই দেখে নিলো ক্লান্ত, স্থির ঐ চাঁদ বদন খানি।সালামের প্রত্যুত্তরে বললো,


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম।আসো!"


উত্তর আসলো,


“ না আম্মা।আমার সু'তে কাঁদা লেগে আছে। তুমি এদিকে আসো।"


আফিয়া নিজের হাঁটুর উপর ভর দিলো,কোমরের ব্যথা বাড়ছে। বয়সের সাথে সাথে দেহের কার্যক্ষমতা‌ও নিজের সক্ষমতা হারাচ্ছে। দিনদিন‌ই তার অবনতি ঘটছে।হুট করেই উঠা কিংবা বসা কোনটাই এখন তার পক্ষে সম্ভব নয়।তাও নাতি নাতনির সাথে সময় কাটাতে নিজের দেহের সব জটিলতা তাকে ভুলতেই হয়।বড় মেয়ের এক ছেলে,যাকে কাছে পায়না খুব একটা এখন।এই তো বছর তিন হচ্ছে তার।কি চমৎকার অঙ্গ ভঙ্গি করে সে কথা বলে।আফিয়া মুঠোফোনের ঐ পর্দায় মন ভরে দেখে তা।নাসিফের সাথে নাতনির কত দুষ্টুমি ভরা কথা চলে ঘন্টার পর ঘন্টা।মু'য়ায মেয়ের সাথে নানা-নানী,দাদা-দাদীর সখ্যতা বাড়াতেই এই ব্যবস্থা করেছে। সিসিটিভির ফুটেজ থেকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এভাবেই সম্পর্কে মধুরতা আনছে তারা।

ঐদিকে বড় ছেলের ঘরে জমজ নাতি নাতনির রহমত এসেছে।উপরের তলায় তারা থাকে।তারা বলতে নাইফ এবং তার সহধর্মিণী।কারণ নাতি নাতনির দিন তার দাদা দাদীর সাথেই কাটে।এই তো এখন নাইফটা নিয়ে যাবে।আবার হয়তো আসবে ঘন্টা দুয়েক পর। এরপর আবার চলে যাবে তারপর দেখা হবে একেবারে কাল সকালে।


দাদীর ওড়নার তলে মুখ লুকিয়ে মিটিমিটি হাসির ঝুড়ি ঠোঁটে একে ধীর পায়ে হেঁটে এলো ছোট তাকিয়া ওয়াসিহা নূহা। আফিয়া ওড়নার তলে হাত গলিয়ে নাতনির হাত ধরে টেনে বের করে খানিকটা গলা উঁচিয়েই বললো,


“ এখন কেন ভয় পাচ্ছো? এই না তুমি আমার ছেলেকে ভয় পাও না।এখন বলবো তুমি আমাকে কি বলেছো?"


নাইফ মায়ের কথা শুনলো। কপাল কুঁচকে খানিকটা মুহূর্তে ভাবলো, অতঃপর আন্দাজ করেই বললো,


“ আজকে আবার দাদীর সাথে ঝগড়া করেছো নূহা?"


সময় পেরিয়ে সাত বছর এগিয়ে গেলো।তাইফের আর্মি জীবন ভীষণ দারুন কাটছে। আজকে ছুটিতে বাড়ি আসবে। সঙ্গে ভীষণ চমৎকার এক দায়িত্ব নিয়ে আসছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ