#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১২৮
[কপি করা/চুরি করা/নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ! দয়া করে এগুলো করবেন না। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন।]
“ আম্মু আমি বের হচ্ছি!"
“ ফি আমানিল্লাহ্, সাবধানে যাও।"
নাইফ মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে রওনা দিলো।সে যাবে কুনিয়া গ্রামে। নানীকে আনতে।তাইফ যেতে পারেনি নানীর সাথে দেখা করতে। কর্মে যোগ দেওয়ার পর কত বছর পর ছুটি পাবে তার তো কোন হদিস নাই।তাই যাওয়ার আগে নানীকে এক পলক দেখে যেতে চায়, হায়াত মউতের কথা কে জানে!
সালাহ্ সময় করে পারেনি মা'কে আনতে। অবশেষে আফিয়ার শেষ ভরসা তার বাধ্য সন্তান নাইফ'ই হলো।
নাইফের হাজার কাজের মাঝেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তার আম্মুর কথা।আজ তার মামাতো শ্বশুরের বাড়িতে নিমন্ত্রণ ছিলো।যেখানে পুরো বংশের বড়রা আসবে। মূলত সেই কাজের জন্যই ছুটি নেওয়া যদিও আয়োজন রাতে। কিন্তু নানী হঠাৎ করেই অসুস্থ অনুভব করায় আর তাইফের ক্যান্টনমেন্টে ডাক পড়ে যাওয়ায় তাই তাকেই নিজের প্রোগ্রাম সরিয়ে পরিবারের সমস্যা সমাধানের জন্য বের হতে হলো।
“ বিকালের মধ্যে চলে আসতে পারবে?"
নূর দরজায় দাঁড়িয়ে স্বামীকে বিদায় দেওয়ার সময় কথাটা জিজ্ঞেস করলো।তার কন্ঠে ছিলো আকুতি,নাইফ বিব্রত চাহনিতে বিবির দিকে চাইলো,বললো,
“ যাবো, নানীকে গাড়ীতে বসাবো এরপর সোজা চলে আসবো।আর কোন কিছু নয়।এখন আল্লাহর রহমতে যদি জ্যাম না থাকে তবে অবশ্যই থাকবো। কিন্তু যদি....এক কাজ করো তুমি চলে যেও।তাইফ তো দুপুর নাগাদ ফিরেই আসবে।ওকে বললেই গাড়িতে করে দিয়ে আসবে।"
নূর এই কথার উপর আর কোন শব্দ বললো না। কারণটা খুব সহজ।যতই বোঝানো হোক,নাইফের কথার পরিবর্তন হবে না।গত তিনদিন আগের প্ল্যান চপাট করে যেই লোক মায়ের আদেশ পালনে ছুটে তার কাছে বউয়ের এসব আবদারের যে কোন মূল্য নেই তা বলে বোঝাতে হয় না।
তিন দিন, তিনদিন আগেই বলা হয়েছে এই আয়োজনের কথা।নূর খুব আশা করে বসে ছিলো আজকে সকালের মধ্যে চলে যাবে। গাজীপুর ভাওয়াল এলাকায় একটা বাংলো করেছে নূরের ছোট মামা,সেই উপলক্ষে সেখানেই আয়োজন।নূরের কাজিনরা খুব করে ধরেছে আজকে তারা নতুন দুলাভাইকে নিয়ে পুরো গাজিপুর ঘুরবে। প্রচুর হইহল্লা করবে।নূর নাইফের কাজের দিনলিপির উপর নির্ভর করে এবং নাইফের অনুমতি নিয়েই তাদের কথা দিয়েছিল।কাল রাতেও সেই জন্য নিজেদের সবটা গুছিয়ে রেখেছে।রাতেও কাজিনরা ভীষণ উচ্ছাস নিয়ে নাইফকে নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা এঁটেছে,কত খুশি আর উল্লাস তাদের চোখেমুখে উপচে পড়ছিলো।ভেবেছিলো সকালে উঠে শ্বাশুড়ির সাথে কথা বলবে। যেহেতু নাইফের সঙ্গেই যাবে তাই আগে অনুমতি নেওয়ার কথা ভাবেনি।নাইফকে বললে নাইফ বলেছিলো সকালে বললেই হবে। কিন্তু সকালে উঠে মায়ের কাছে নিজের কথা বলার আগে মা তাকে তার কথা শোনায় অতঃপর নাইফ!
নাইফ চলে গেলো। বেলা এখন সকাল সোয়া নয়টা।
নূর ক্ষত মনে নিরব গতিতে হেঁটে নিজের ঘরে চলে গেলো।দরজাও লাগালো খুব সাবধানে। দরজা লাগিয়ে দরজার পাশেই বসে পড়লো।তার কেন জানি ভীষণ কান্না পাচ্ছে।অতি আদর আর আহ্লাদে বড় হওয়া নূরের মনে হচ্ছে এখানে সে অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ।এমন একজন মানুষের সাথে তার জীবন জুড়েছে যার কাছে তার গুরুত্ব কেবলি ঘরে সীমাবদ্ধ।মা, বাবা,ভাই বোনদের খুশির আগে তার কাছে কারো মূল্য নেই।কারো অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া পাওয়ার তোয়াক্কা সে করে না।প্রতিটি শব্দে কেবলই তার পরিবার আর পরিবার। অথচ তার জীবনে নূরও যে বিরাজ করে,তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ যে নূর সেটা সে কখনোই অনুভব করে না।না নূরকে কোনদিন অনুভব করালো। কোনদিন লোকটাকে বলতে শুনলো না ‘ আমার কাছে তোমার খুশি সবার আগে।'
আড়ালে আবডালেও কখনো বললো না , ‘নূর নামক যুবতী আমার ভীষণ প্রিয়,তার চেয়ে আপন কেউ না।'
অথচ নূর কি চায় তার কাছে? একটু গুরুত্ব,একটু একাকী সময়। সবাই ভাবে নূর তার স্বামীর অর্থেই খুশি,সবাই ভাবে নূর তার স্বামীর পদবিতে বিলাসীতা খুঁজে। কিন্তু আসলেই কি তাই?নূর চায় নাইফ নামক লোকটা পৃথিবী বিখ্যাত হোক। নাইফ নামক পুরুষটার একমাত্র সঙ্গিনী হয়ে তার সবকিছুতে সবার আগে থাকতে।নাইফ নামক পুরুষটার সফলতার পিছনে সে থাকুক।এত যোগ্যতা সম্পন্ন একজন মানুষ শুধু পরিবারের চিন্তা করে নিজেকে হাতে পাওয়া হাজার সফলতার থেকে দূরে রাখে।নূর তো জানে মালয়শিয়ায় চাকরির অফার পেয়েও নাইফ রিজেক্ট করেছে, বৃদ্ধা বাবা মা'কে ছেড়ে যাবে না বলে। জাপান যেখানে পড়েছে সেখান থেকেও অফার পেয়েও রিজেক্ট করেছে।যাকে সবাই চায় তার প্রতিভার সম্মান করে, সেখানে সেই লোকটাই কেবল বুঝলো না।
আচ্ছা সে কি বোঝেনা চাইলে শত মাইল দূরে থেকেও নিজের দায়িত্ব পালন করা যায়।সে যদি দূরে থেকেও করে নূর বাঁধা দিবে না। তবে কেন সে বোঝে না?
এই যে বাবার প্রিন্সেস,ফাতিমা নূর আব্বাস,যার কথাই তার বাবার কাছে শেষ কথা ছিলো! সেই ফাতিমা নূর আব্বাসের কথার কোন গুরুত্ব এইখানে নেই।সবাই কেন জানি নিজেদের মতামত নূরের উপর চাপিয়ে দিতে চায়! নূর তো জানে এখানে থাকতে নূর কত কি ত্যাগ করেছে।বাবাকে ছাড়া থাকতে পারবে না বলেই তো সে এমন কাউকে বিয়ে করতে চেয়েছিলে যাকে বিয়ে করলে তার বাবাও তার সাথে থাকতে পারবে! কিন্তু কি হলো? এমন একজন কপালে জুটেছে যে কি-না মাসেও একদিন সময় করে তাকে তার বাবার কাছে নিয়ে যায় না।বললেই বলবে,সময় হোক।অথচ তার পরিবারের ব্যাপারে সময় ঠিক হয়েই যায়,তখন কিভাবে যেন সারাদিন,সারা সপ্তাহ, সারা মাসই সময় হয়ে যায়।
নূরের চাহিদা নাইফের সময়, নূরের চাহিদা নাইফের গুরুত্ব, আকর্ষণ।পয়সার দরকার নেই। নূরের একাউন্টে তার বাবা যত জমিয়ে রেখেছে,তা দিয়ে অনায়াসে নূর বিশ বছর আয়েস করতে পারবে। তাছাড়াও নূর তার বাবা, মায়ের বিশাল সম্পত্তির একমাত্র অধিকারী, সুতরাং নাইফের চাকরি নিয়েও তার ভাবনা নেই। নূর শুধু চায় নাইফ তার চব্বিশ ঘন্টার ভাবনায় কেবল নূরকে গুরুত্ব দিবে। সবাইকে নিয়ে ভাবুক কিন্তু নূরের ভাবনা হবে সবার আগে।
অথচ.... হচ্ছে উল্টো।নাইফ যেন অবসর পেলে তবেই নূরকে নিয়ে ভাবে।যেটা কেবলি রাতের মধ্যিভাগে আসে।
________________________
সকাল পেরিয়ে দুপুরের দিকে আগাচ্ছে বেলা, আপাতত বাড়ি ভীষণ নিরব।নাবীহা তার শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছে সকাল বেলা।তবে হয়তো দুপুরের খাবার এখানেই খাবে।তুহি বাড়ি এসেছে।তাকে আনার জন্য তার ছোট ভাইয়া বড় ভাইয়ের কান পঁচিয়েছে,যার কারণে সে এখন বাড়িতে।আফিয়া ঘর থেকে বের হলো। দুপুরের রান্নার কি আয়োজন করবে তার জন্য নূর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।অথচ এতক্ষনে নূরের দু'টো পদ হয়ে যায়।একটু চিন্তা গ্রস্থ হয়েই নিজের হাতের কাজ রেখে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে।সুফিয়াকে বিদায় করার কথা জানানো হয়েছে তবে আজ গ্রাম থেকে মায়ের সাথে একটা মহিলাও আসবে কাজের জন্য।সে আসলে,সুফিয়া তাকে সবটা বুঝিয়ে দিবে এই মাসের বাকীটা সময় অতঃপর তার অবসর।
“ সুফিয়া?"
“ জি ভাবী!"
সুফিয়া বেরিয়ে আসলো সালমা ফাওযিয়ার ঘর থেকে।আফিয়া নিজের হাতের কাজ করা গোলাপি সালোয়ার কামিজের লম্বা চওড়া সুতি ওড়নাটা দিয়ে নিজেকে মুড়িয়ে নিয়েছে। বয়সের তোরে পেটটা বেড়েছে। হাতের চামড়ায় খাঁজ পড়ছে। কপালের সামনের কয়েকটা চুলে পাক ধরেছে। গোলগাল হাতে সোনার একজোড়া চিকন চুড়ি।হাতে একটা রুবি, হীরের আংটি।যেটা তাকে বাগদানে দেওয়া হয়েছিল বিয়ের দিন। নাকের উপর জ্বলজ্বল করে নাসিফের গত হজ্জে গিয়ে এনে দেওয়া হীরের নাকফুলটা।চিন্তিত মুখশ্রী নিয়ে সোফার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি ব্যাপার দুপুরের রান্নার কি হলো? বউ কোথায়?কোন খবর নাই যে?
আমি তো কাঁথা সেলাই করতে করতে বেলার হদিসই পাইনি। আল্লাহ আযান পড়লো বলে, যেকোন সময় তোমার ভাইসাব,বাচ্চারা চলে আসবে! আর এখনো.. আমার ছেলের বউ কই?"
বলেই আফিয়া নাইফের ঘরের দিকে গেলো।সুফিয়া আফিয়ার পিছু না গিয়ে খানিকটা গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ ভাবী ভাত বসাইয়া দিমু?"
“ বসাও, সেটাও বলা লাগবে! এত বছর কি করলে তাহলে!
_ নূর! বউমা?"
সুফিয়াকে বকতে বকতে দরজায় হালকা হাতে চাপড় মেরে নূরকে ডাক দিলো। নূর কোন কথা বললো না। উল্টো বিছানায় শক্ত হয়ে বসে রইলো। এতক্ষণ সে নিজের মতো করে সময় কাটিয়েছে। নিজের মায়ের ছবি নিয়ে অপ্রাপ্ত নানা কল্পকাহিনী সাজিয়েছে। কখনো মনে করেছে,যদি মা থাকতো তবে অবশ্যই তাকে আজকের এই সময়ে একটি সমাধান দিতো।এই যে নাইফের থেকে গুরুত্ব না পাওয়া,এই কথা কি সবাইকে বলা যায়? এগুলো একান্ত একার কষ্ট,যদি কারো সাথে ভাগ করাও যায় সেও হচ্ছে মা।অথচ নূর তো অভাগা। জন্ম দিয়েই মা'কে হারিয়েছে।বাবা বিয়ের আগ অবধি কোনদিন বুঝতে দেয়নি মা কি জিনিস। কিন্তু বিয়ের পর ঠিক নূর বুঝেছে।মা আসলে কি? অন্তত বিবাহিত মেয়েদের জীবনে মা কতটা জরুরি।মামীমনি,খালামনি যত বুদ্ধি দেয় তা হয়তো এভাবেই সবটা মেনে নেওয়া নয়তো একবারে ছেড়ে দেওয়া।যার কোনটাই নূরের পছন্দ নয়।নূর নাইফকে নিয়ে থাকতে চায়। নিজের মতো করে সংসার করতে চায়।দিন শেষে খুনসুটি আর প্রেমে ভাসতে চায়। নূরের খুব ইচ্ছে করে সে যখন রান্না করবে তখন নাইফ একটু দুষ্টুমি করুক, নূর চায় বসার ঘরে তাদের একাকী একটা রাত রোমান্টিক ডিনার হোক, নূর খুব চায় নাইফ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নূরকে একটু আদুরে ছোঁয়া দিক। কখনো সখনো ছাদের চিলেকোঠায় তাদের প্রেমপ্রহর কাটুক। বৃষ্টি বিলাস হোক, চন্দ্রবিলাস হোক। অথচ কোনটাই নূরের হলো না। বিয়ের প্রায় বছর হতে চললো।এর মধ্যে কানাডা মামীমনির বাসা, হানিমুন সেন্ট মার্টিন যাওয়া ছাড়া তাদের আর কোন একান্ত সময় কাটলো না। নাইফের সবটা যেন এই পরিবারের,এই বাড়ির চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ।এর বাইরে নাইফ না ভাবতে চায় আর না ভাবে! কেন ভাবে না? কেন নাইফের ভাবনা এতেই সীমাবদ্ধ?
নাইফ কি কখনো বুঝবে নূর তাদের মধ্যে একটা টোনা টুনি সংসার চায়? নাইফ কি কখনো বুঝবে নূর একটা চড়ুইভাতি সংসার চায়?যেটাতে সবটা হবে নূরের ইচ্ছায়? যেখানে অন্যের ব্যবহৃত জিনিস যেমন থাকবে না তেমনি থাকবে না অন্যের মর্জিতে বাঁচার আদেশ!
নূর চায় নাইফ নূরের সংসার,নূর চায় নাইফ নূরের ব্যক্তি স্বাধীনতা!






0 মন্তব্যসমূহ