সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১৩০_প্রথমাংশ

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_১৩০_প্রথমাংশ



[কপি করা/চুরি করা, কিংবা নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ।দয়া করে করবেন না এগুলো কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন।]


নাইফ যখন মায়ের ঘর থেকে নিজের ঘরে ফিরে তখন বেশ রাত।এগারোটা পেরিয়েছে।নাইফ নিজেই মা'কে খাইয়েছে। পায়ের পাশে বসে অপলক চোখে চেয়েছিলো।সে শুনেছে নূরের কান্ড।সে ভাবছে নূর যদি রান্না ঘরে যেতো তবে নিশ্চয়ই মা এই শরীরে এত ভারী কাজ করতে যেতো না।তার মা নিজের সংসারের বিশেষ করে রান্না এবং তাদের খাওয়ানোর দায়িত্বটা নূর বৈ কারো হাতে ছাড়েনি।কেন জানি মা সংসারের ভার কাউকে দেওয়ায় ভরসা পায় না।তার মায়ের বিশ্বাস সংসার একটা বিশাল দামী সম্পদ।এটার দায়িত্ব খুব শ্রদ্ধায় পালন করতে হয়। যত্নে,আদরে, ভালোবেসে পালন করতে হয়।আর এই কাজটা যে কেউ করতে পারে না। এগুলো করার জন্য প্রেম থাকতে হয়, আবেগ থাকতে হয়। শ্রদ্ধা, সম্মান, ভক্তি, ধৈর্য্য, সততা সব থাকতে হয়।নচেৎ সংসার টিকে না।


নূর বোধহয় তার মায়ের দৃষ্টিতে সেই মানুষটি হয়েছিল যাকে সে সব দিতে পারে কিন্তু তা‌-ও তো।

কিছুই যে কানে আসে না,তা কিন্তু না।তার মায়ের প্রতি নূরের বিরূপ মনোভাব তার কানে আসে,তার ছোট বোনকে নিয়ে নূরের বিরক্তি,তার ভাইয়ের উপস্থিতি তার ব‌উয়ের অসন্তুষ্টির কারণ,সবটাই তার কানে আসে। কিন্তু দিন শেষে মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই। স্ত্রীর প্রতি উচ্চ বাচ্যের শিক্ষা তার মা‌'ই দেয়নি।যেকোন বিষয়ে সরাসরি দর্শন ছাড়া শোনা কথায় প্রতিক্রিয়া দেখানো তার বাবার শিক্ষায় নেই।তবুও..


“ জানি না।

আমার শ্বাশুড়ির পা পুড়েছে,এমন অবস্থায় কি করে আসা যায়?

তোমরা এসো একদিন।"


দরজার খিলে হাত ছুঁইয়ে এই শব্দগুলোই নাইফের কানে এসেছিলো।তাতে নাইফের একটু খারাপ লাগলেও পাত্তা দিলো না বিশেষ।মূলত এখানে কিছুই করার নেই। সবটা পরিস্থিতির সৃষ্টি।

যদিও সে এই সময়ে শ্বশুর বাড়িতে থাকতো মায়ের দূর্ঘটনা তখন‌ও ঘটতে পারতো।তখনো নাইফের ফিরে আসা বাধ্য হতে পারতো।


“ আসসালামু আলাইকুম।"


দরজা খুলে পা দিয়েই নাইফ সালাম দিলো।নূর বারান্দার শিকে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে কথা বলছিলো।সালামের প্রত্যুত্তরে জবাব দিলো,ফোনে থাকা মানুষের উদ্দেশ্যে বললো,


“ রাখছি,উনি এসেছেন।"


****


“ হুম! "


***


“ আম্মার কি অবস্থা?"


“ এইতো, ঘুমিয়ে পড়েছে। এতক্ষণ বেশ জ্বালাপোড়া করছিলো, মুখে না বললেও চোখ দেখে বোঝা যায়।"


“ তুমি আম্মার চোখ পড়তে পারো?"


নাইফ নূরের এই প্রশ্নে হাসলো।হালকা মৃদু হাস্যকর কন্ঠে উচ্চারণ করলো,


“ বোধহয়!"


নাইফ পায়ের মোজা খুলে হাতেই রাখলো। অতঃপর চোখ তুলে নূরের দিকে চাইলো। নূর নাইফের উত্তরে নিরব চাহনিতে চেয়ে আছে।নাইফ জিজ্ঞেস করলো,


“ আম্মার যখন পা পুড়েছিল তুমি তখন কোথায় ছিলে?"


খানিকটা সময় নিলো, অতঃপর মাথা নিচু করে অপরাধী কন্ঠে বললো,


“ ঘরেই।"


“ ওহ।

_ আচ্ছা ফ্রেশ হবো।একটু সব রেডি..


“ সব দেওয়াই আছে। তুমি যা‌ও। "


ঘটনার বেশ দিন পেরিয়ে যায়,আফিয়ার পা তাকে বেশ ভুগান্তিতে ফেলে সঙ্গে তার পরিবারের সবাইকে। সুলতানা আযিযাহ চিকিৎসা নিতে এসে মেয়ের অবস্থায় আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে দুশ্চিন্তা করে করে। ঐদিকে তাকে অপারেশন করাতে হয় কিডনির পাথরের সমস্যার জন্য।সাফিয়া প্রায় দেড় সপ্তাহ এসে কাটিয়ে গিয়েছে বোন এবং ভাইয়ের বাসায় মা ও বোনের জন্য।


মায়ের এই অবস্থায় মন না টানলেও যেতে বাধ্য হয় তাইফ।নাইফের ক্যালিফোর্নিয়ায় একটা সেমিনার এ ইনভাইটেশন আসলে তাও বাতিল করতে বাধ্য হয় মায়ের শারীরিক অবস্থার কারণে। দুশ্চিন্তায় সালমা ফাওযিয়ার‌ও শারীরিক অবনতি ঘটে।


সবকিছুর চাপ এসে পড়ে নূরের উপর। অসুস্থ শ্বাশুড়ি,দাদী শ্বাশুড়ি,ফরমালিটির জন্য নানী শ্বাশুড়ির খেয়াল, বয়সী শ্বশুরের দৈনন্দিন ওষুধের খেয়াল,স্বামী সংসারের খেয়াল রাখতে রাখতে খানিকটা যেন ভীমরতিই খাচ্ছিলো সে।তথাপি চলছে সবটা কোনভাবে।


“ আসো সাবধানে,এত চাপের কিছু নেই বাবা।"


****


“ হ্যাঁ মলম লাগিয়েছি।"


****"


“ আমার তুলতুলটা তো আসলো না।আসুক, তারপর বলবো যেন তোমার থেকে শুনে নেয়।"


*****


“ ব‌উমাকে সাবধানে রেখো।নিজেও গরম পোশাক পরে নিও। আনন্দ করতে গিয়ে রোগ বাঁধিয়ে এসো না বাবা।"


সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরাম আয়োজিত পিকনিকে অংশ নিতে চিটাগাং গিয়েছে।সেখান থেকেই ফোনে মায়ের শরীরের অবস্থা সম্পর্কে জেনে নিলো।আফিয়াও ছেলেকে সাবধান করে দিলো।


_______________________________________


মায়ের অপারেশনের পর‌ সালাহ্ মা'কে গ্রামে যেতে দিবে না।তা নিয়ে তদবির চলছে মোল্লার ঘরে।

আর আজ এখানে উপস্থিত মৃত্যু নিয়াজ মোর্শেদ মোল্লার সব সন্তান এবং তাদের সন্তানরা।


“ আপা মা'কে জিজ্ঞেস করো তো তার এখানে থাকতে আসলে কি সমস্যা? সে না থাকলে কি বাড়িঘর সব উধাও হয়ে যাবে?"


সুলতানা আযিযাহ ছেলের কথা শুনে ঘর থেকেই নিজের অসুস্থ রুগ্ন দেহখানি একটু খানি দুলিয়ে হেলে মৃদু চেঁচিয়ে বললেন,


“ তোমরা অযথা জেদ কেন করছো? বোঝো না ঐখানে থাকলে তোমার আব্বার কবরটা যতনে থাকে। তোমাদের পক্ষে কি রোজ রোজ গিয়ে যত্ন নেওয়া সম্ভব? তাছাড়াও আমি গেলে তোমাদের বাচ্চাদের‌ও যাওয়ার জন্য একটি জায়গা থাকবে।নানা বাড়ির মজাটা বুঝবে,দাদা বাড়ি বলতে কিছু একটা যে আছে তা আমার সামি দিবা বুঝতে পারবে।"


“ যুক্তি শুনছেন ভাইয়া?"


নাসিফ বসার ঘরেই সালাহর সামনের সোফায় বসে আছে।তার এক পাশে রেজ‌ওয়ান অন্য পাশে আফিয়া।সাফিয়া বসে আছে খাবার টেবিলের চেয়ারে।সে সেখানে বসে নিজের দুই মেয়ে আর ভাইয়ের ছেলেকে নাস্তা দিচ্ছে। অপরদিকে বসে বসে মোবাইলে নিজের বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং করছে নূর।নাইফ আরেকটি সোফায় বসে দিবার সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে।দোয়া সবার জন্য রান্নার প্রস্তুতি নিতে গৃহকর্মীকে সাহায্য করছে।

নাসিফ শ্যালককে থামিয়ে শ্বাশুড়ির উদ্দেশ্য বললো,


“ আম্মা, আপনার কথায় আমি সহমত। কিন্তু আপনার‌ও তো আমাদের বিষয়টা বোঝা উচিত তাই না!"


“ আপনি অতদূরে একা থাকেন। অসুস্থ থাকেন, জ্বর বৃষ্টির মধ্যে সব কাজ একা একা করেন। আপনার মেয়েদের দুশ্চিন্তায় ঘুম হয় না।মাঝ রাতে উঠেও সাফিয়া বসে থাকে, বারবার এক‌ই কথা এই সময়ে আম্মু কেমন আছে?"


“ তোমার আপার‌ও তো এক‌ই অবস্থা।

তাছাড়াও আপনি দূরে থাকেন যাদের জন্য তারা কি আপনার খোঁজ নেওয়ার সময়ও পায়? অন্তত কাছাকাছি থাকলে মাসে দুই একবার এসে সাক্ষাৎ করে যেতে পারতো।পাশে বসে দুটো ডালভাত খেতে পারে।"


নাসিফের কথার মাঝে রেজ‌ওয়ান কথা বলার পরেই উক্ত কথাগুলো বললো নাসিফ।নাসিফের বক্তব্যে ইতি টানলো স্যাফিয়া,


“ এত কথা বলার কি আছে? তার আর গ্রামে যাওয়া হচ্ছে না ব্যস্।দোয়া ব্যস্ত মানুষ,এখানে থাকলে বাচ্চা দু'টো অন্তত দাদীর ছায়ায় বড় হতে পারবে।দাদার আদর পাচ্ছে না। দাদী থেকেও দূরে থাকলে ঐ বছরের দুই ঘন্টার আদর দিয়ে কি হবে?

এখানে থাকুক, আব্বার কবরের দেখভাল করার জন্য লোক রাখা যাবে। পয়সা দিলে এমন কাজ করার মানুষের অভাব হবে না!"


আফিয়া বললো,


“ আম্মা যাইয়ো না।থাকো এখানে। আমাদের ভালো লাগবে তুমি পাশে থাকলে।"


নাইফ দিবাকে কোল থেকে নামিয়ে নানীর ঘরে গেলো। বাচ্চা নাইফকে বুকের উপর আগলে রেখে গোসল করাতো,গা মুছে দিতো।শাড়ির আঁচল দিয়ে যখন মাথা মুখ মুছে চুলগুলো গুছিয়ে দিতো তখন নাইফ একটা চমৎকার হাসি দিতো। নিজের মেয়ের পেটের সন্তান না হলেও তেমনটা করেই আদর করেছেন তিনি। ‌এখন‌ও করেন। কখনোই মনে করেন নি, ভুলেও করেন নি যে এটা তার সন্তানের সৎ সন্তান।নাইফের তরফ থেকেও তেমন কোন প্রতিক্রিয়া কখনো পান নি। সবসময় নাইফ উনাকে নানীর সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে।বলা বাহুল্য নাতী নাতনিদের সবার কাছ থেকেই তিনি চমৎকার ভালোবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধা পেয়ে যাচ্ছেন।


নাইফ নানীর ঘরে ঢুকে তার গা ঘেঁষে বসলো।সুলতানা আযিযাহ নাতির মনোভাব ঠাওর করে ঠোঁট ফুলিয়ে তাকালেন।নাইফ নানীর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,


“ আবার‌ও ঘাস চিবিয়েছো?"


“ ঘাস বলো না।পান এটা!"


“ ঐ এক‌ই! ছাগল, গোরুতে খায় ঘাস আর তুমি খাও!"


“ নোংরা কথা ব‌ইলো না।"


“ আচ্ছা নোংরা কথা বলবো না।যদি তুমি আমার কথা শুনো তবে সোজাসুজি চুপ থাকবো।নয়তো!"


“ কি শুনবো?"


“ ছেলে মেয়ে যা বলছে তাই!


সুলতানা আযিযাহ করুন চোখে চাইলো।নাইফ নিজের দু কাঁধ উঁচিয়ে নিজেকে অপর পক্ষের লোক বলেই বোঝালো।


এসব আলোচনা পর্ব শেষ হতেই সালাহ ভাগ্নের উদ্দেশ্য বলতে লাগলো


“ সামনেই নিয়োগ পরীক্ষা, নিজের ধ্যানজ্ঞান আপাতত ঐদিকেই রাখো।যাতে এবার অন্তত ঢুকে যেতে পারো।আর অন্য যা সমস্যা আছে সবটা আমি দেখছি।"


“ জি মামা।"


সেদিন থেকে আবারও সুলতানা আযিযাহর অবস্থান ঢাকা আজিমপুর এলাকায় হলো। ঘুরে ঘুরে ছেলে মেয়ের বাড়িতে বেড়ান,নাতী নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটান।


______________________________


মাস তিন আরো কাটলো।তাইফ ছুটিতে বাড়ি এসেছে।তুহি‌রও পরীক্ষা শেষ, ছুটি চলছে।নাবীহার ইন্টার্নশিপ শুরু হবে।নাইফ এবার‌ও নিয়োগের জন্য নিজের সিভি ড্রপ করে রাখছে।

আফিয়া নিজের বয়সের তরে সংসারের প্রতি বেশি মনোযোগী হচ্ছে তাতে করে নূরের খুঁটিনাটি দোষ চোখে পড়ছে। ঐদিকে সুলতানা আযিযাহ দুইদিন বড় মেয়ের বাড়িতে বেড়িয়ে গেলেন, তার জন্য আবার এসে জুড়েছে সাফিয়া এবং তার মেয়েরা।এই মেহমানদের সঙ্গে দেখা করতে আরো জুড়েছে নাসিফের চাচাতো ভাইয়ের ব‌উয়েরা।সব মিলিয়ে বাড়ি এখন মানুষে গমগম।


তাইফ নিজের দরজায় খিল এঁটে নিজের কিছু কাজ করছিলো তখনই দরজায় কড়াঘাতের শব্দ হয়।


“ কে?"


“ দরজা খুলো ভাইয়া!"


দরজা খুলে ফেরাকে পেলো।ভ্রু কুঁচকে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি চাই?"


“ এ্যাই তাইপ এদিকে আসো!"


বলেই ফেরা তাইফের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকলো। ঐদিকে তাইফ ফেরার হাত ধরে থামানোর চেষ্টা করছে আর বলছে,


“ ছাড় আমাকে বলছি।আর ঠিক করে ডাকবি।তাইপ কি,হ্যাঁ!বড় ভাই হ‌ই তোর।ভাইয়া বলে ডাকবি!"


“ বয়েই যাচ্ছে তোকে ভাইয়া বলে ডাকতে। আজীবন তাইপ,টাইপ‌ই থাকবি।"


“ ফেরার বাচ্চা!"


“ আচ্ছা ঝগড়া বাদ,যার জন্য ডাকছি সেটা হলো তুমি...তুমি মিস্টার নাফিস ওয়াসীত্ব তাইফ আর্মিতে নিজের পছন্দের পজিশনে জব পেয়ে গিয়েছো কিন্তু তুমি এখনো আমাদেরকে ট্রিট দাও নি।তাই তোমার এখন আজকেই উচিত আমাদের সবাইকে ট্রিট দেওয়া।"


“ মগের মুল্লুক, না!চাইলেই সব পাওয়া যায়!"


“ সব তো চাইনি।ট্রিট চেয়েছি ট্রিট।দিবি নয়তো এই ছবিগুলো জায়গা মতো পাচার হয়ে যাবে।"


ফেরার মুঠোফোনে জ্বলজ্বল করছে কিছু ছবি যেখানে দেখা যাচ্ছে তাইফ সিভিল পোশাকে নিজের একজন মেয়ে কলিগের সাথে হেঁসে হেঁসে কথা বলছে। পাশাপাশি দেখলে বোঝা যায় কতটা দুরত্ব কিন্তু পেছন থেকে দেখলে মনে হবে খুবই ক্লোজ ছবিগুলো।তাইফ ভ্রু কুঁচকে ফেললো। ফেরার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ এগুলো তুই কোথায় পেয়েছিস? আর এসব কি ধরনের ছবি তোলা ফেরু?"


“ সেটা যেমন‌ই হোক,বলো দিবে কি-না?"


“ কিছুই দিবো না উল্টো এই ছবি এখন‌ই তুমি আমার সামনে ডিলিট করবে নয়তো আমি তোমায় এমন অবস্থায় ছাড়বো যে পরে পায়ে ধরে কাদলেও কুল পাবে না পিতলা চাঁন!"


“ আমি না হয়..... ডিলিট করলাম কিন্তু কয়-জনের'টা করবা?"


“ এটি অলরেডি অনেকগুলো কপি হয়ে আছে,আমাকে জোর করলে কেউ না কেউ পাঠিয়েই দিবে! সুতরাং! ভালোই ভালো ট্রিট দিয়ে দেও মিস্টার লেফটেন্যান্ট।"


ফেরা তাইফের তর্ক চলছে। ঐদিকে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে জগে পানি ভর্তি করা নূর এসব কথা শুনে মনে মনে প্রশ্ন করলো,


“ এমন কি ছবি,যার জন্য এত তদারকি করছে মিস্টার তাইফ!"


নাইফ আসলো সন্ধ্যার সময়.. ততক্ষণে বাড়িতে পিকনিক পিকনিক রব চলছে।তুহি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট পাওয়ার পর বড় ভাইয়ের কাছে অনেক অনুরোধ করে একখানা ফোন পায়।সেই ফোনের পর্দায় জ্বলজ্বল করছে তাইফের সেই ছবি।যেটা মূলত বসার ঘরের টি টেবিলের উপর পড়ে রয়েছে।মূলত তারা কিছু সময় আগেই এইখানে বসে এই ছবি নিয়ে ভাইকে ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পারায় দলবদ্ধভাবে হাসছিলো।তখন‌ই ডাক পড়ায় কোন দিকে হুঁশ জ্ঞান না রেখেই তুহি ছুটে যায় ঐদিকে।তার সঙ্গে তার সাঙ্গপাঙ্গরা।আর মুঠোফোন পড়ে রয় ওভাবেই।

বসার ঘরে কাউকে না দেখে এবং খানিকটা অগোছালো দেখেই বিরক্তি ঝেড়ে সেগুলো গুছাতে এসেই ছবিটা দেখে ফেলে।

তার বিরক্ত হয়ে কাজ করা আফিয়ার চোখে আঁটে।


“ কোথায় ছিলে তুমি? তোমার খালা ডাকলো শুনলে না যে!"


“ ঘরেই ছিলাম আম্মা। আপনার ছেলে আসছে।"


“ তাতো জানিই।দরজায় দাঁড়িয়েই তো আম্মা বলে ডাক দেয়।"


“ বানিয়েছেন আম্মার ন্যাওটা,ডাকবে কাকে?"


“ কথাবার্তা ঠিক করে বলো। ছেলে মা'কে ডাকবে না তো কি তোমাকে ডাকবে? মানুষ কি মা করেছে না তুমিই করেছো?"


“ আমি ঠিক করেই কথা বলি আম্মা। মানুষ করার মানেই আঁচলের তলে রেখে দেওয়া না। যাই হোক আপনার ছেলেকে নাস্তা দেওয়া লাগবে!"


বলেই নূর চলে গেল।আফিয়া কথা বাড়ালো না। ঘরভর্তি মানুষ।তার মাঝে ছেলের ব‌উয়ের সাথে লাগতে চায় না।


_______________________________________


দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে মেহমানদারি করতে গিয়ে পা ঝি ঝি করতে থাকলো, সঙ্গে পোড়া ক্ষতে যন্ত্রণা।আজকে সুলতানা আযিযাহ চলে যাবেন, সঙ্গে সাফিয়া‌'ও।


নাইফ খালা আর নানীর উদ্দেশ্য করে বললো,


“ তোমরা আজকে থেকে যেতে পারতে খালামনি।আমি তো সময়‌ই দিতে পারলাম না একেবারে। অন্তত ফ্রায়ডে অবদি থাকো,আমি একটু সময় কাটাই তোমাদের সঙ্গে।"


“ কিন্তু আমাদের শুক্রবার প্ল্যান আছে তাই না!"


মাঝ খান থেকে নূর বলে উঠলো।নাইফ বিব্রত বোধ করলো। আফিয়া পুত্র বধূর কথায় ছেলের দিকে চাইলো, জানতে চাইলো,


“ কোথাও যাওয়ার প্ল্যান করেছিলে তোমরা?"


নাইফ মায়ের দিকে একবার তাকালো, অতঃপর ব‌উয়ের দিকে এরপর আবারও মায়ের দিকে চেয়ে বললো,


“ হ্যাঁ আসলে ও চাইছিলো কোথাও একটা বেরিয়ে আসবে তাই আমি ভাবছিলাম একবার টাঙ্গাইল ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।মহেরা জমিদার বাড়ি আছে,আরো কিছু স্পটে ঘুরিয়ে আনা যায়।"


“ ওহ্!"


আফিয়ার ছোট্ট উত্তর, যেটাতে ছিলো কিছু একটা।সাফিয়া পাশ থেকে বললো,


“ সমস্যা নেই। তোমরা যাও। তোমার নানী আবার আসবে নে!"


“ ব্যাপার না আমরা অন্য কোনদিন‌ও যেতে পারবো।"


“ কোথায় যাবে? আমিও যাবো ভাইয়া প্লিজ!"


মাঝ থেকে তুহির আবদার।বড় ভাইয়ের হাত ধরে অনুনয় করে তাকিয়ে আছে।নাইফ ছোট বোনের মুখ দেখলো অতঃপর দেখলো স্ত্রীর। তারপর মায়ের দিকে চেয়ে বললো,


“ চাইলে এটা ফ্যামিলি পিকনিক হতেই পারে আম্মু। অনেক দিন হলো পুরো পরিবার মিলে কোথাও যাওয়া হচ্ছে না।"


নাইফের প্রস্তাব,নূর থমথমে চাহনিতে চেয়ে আছে নাইফের দিকে।আফিয়া নাকোচ করে বললো,


“ না, তুমি যেহেতু তোমরা যাওয়ার পরিকল্পনাই করেছো আগেই, তাই তোমাদের‌ একাই যাওয়া উচিত।আমরা অন্য কোন সময়ে না হয় যাবো পুরো পরিবার মিলে।সে আর কি! তাছাড়া তোমার আব্বার শরীর‌ও তো তেমন ভালো না।"


আফিয়া কথা বলতে বলতে টেবিল গুছাচ্ছে, ঐদিকে নূর টেবিলের কোনা খামচে ধরে সবার কথোপকথন শুনছে।এর মধ্যেই এসে জুটেছে রিফা।তার‌ও এক‌ই বাহনা।তাকেও নিয়ে যেতে হবে।তাইফ বসার ঘরে এসে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কিছু করছে।তখন কিছু কথা কানে যায় তার। সুলতানা আযিযাহ‌ও নাতীকে বুঝাচ্ছে।সাফিয়াও নাইফকে ব‌উমাকে নিয়ে বেড়াতে যেতে বলছে। কিন্তু কলের গান বাজিয়ে যাচ্ছে তুহি আর রিফা।নীরব থেকেও তাল দিচ্ছে ফেরা।নাবীহা নিজের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসলো হাতে এপ্রোন নিয়ে।টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি নিয়ে এত হ‌ইচ‌ই হচ্ছে? কিসের এত হট্টগোল সকাল বেলা'ই!"


“ ভাইয়া ভাবী টাঙ্গাইল মহেরা জমিদার বাড়িতে ঘুরতে যাবে।আমরাও যাবো সঙ্গে তাই না ভাইয়া?"


ফেরা নাবীহাকে উক্ত কথাটি বলতেই নাবীহা ভ্রু কুঁচকে বোনদের দিকে তাকালো।হাত উপরে তুলে চড় দেখিয়ে ভীত করতে বললো,


“ চড় চিনিস? ভাইয়া ভাবী যাচ্ছে তাদের মাঝে তোদের কি? সব জায়গাতেই যেতে হবে কেন? মানুষের ব্যক্তিগত বলতে কিছু নেই? ভাইয়া ভাবীর স্পেশাল কোন মোমেন্ট নেই তোদের জন্য! সবকিছুতে বাড়াবাড়ি!"


“ আমি কি এতকিছু ভেবে বলেছি। আমি তো জাস্ট... ভাইয়া‌'ই তো বললো ফ্যামিলি ট্যুর; তাছাড়া কি আমি!"


কাঁদো কাঁদো গলায় কথাগুলো বলেই তুহি পা নাচাতে নাচাতে নিজের ঘরের দিকে গেলো।রিফাও তার পথ অনুসরণ করলো।ফেরা মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে র‌ইলো।নাইফ হতভম্ব হয়ে গেলো মুহূর্তে কি ঘটলো তা ভেবেই। পরক্ষনেই নাবীহাকে চোখ রাঙানি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,


“ কি হলো এটা? মাঝখান থেকে তুই ওকে শাসালি কেন? মানে বুঝলাম না! আম্মু উপস্থিত,আমি উপস্থিত তার মাঝখানে এসে তুই ওকে শাসন কেন করবি? তাছাড়াও ও আমাদের ছোট,ওর খুশি সবার আগেই।ওর খুশির আগে কারো খুশি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।"


বড় ভাইয়ের ধমক খেয়ে নাবীহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে র‌ইলো। এদিকে ছেলে মেয়ের এই অযথা তর্কে আফিয়া বিরক্ত চাহনিতে, বিব্রত লজ্জাকর মুখশ্রী নিয়ে উপস্থিত মা এবং বোনের দিকে একপলক চেয়ে ধিম কন্ঠে বললো,


“ আমার উপস্থিতি কি তোমাদের কারো কাছে আসলেই কোন গুরুত্ব রাখে? থাকলে কি আর আমার সামনেই ভাই বোনেরা এমন আচরণ করতে পারতে?"


“ স্যরি আম্মু!"


” স্যরি!"


দুই ভাই বোন স্যরি বলে নিজেদের মাথা নত করে নিলো। তাদের স্যরি শেষ হতেই নূর টেবিলের কোনা ছেঁড়ে থমথমে মুখে শব্দ তুলে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো।


নাইফ সেদিকে তাকিয়ে সুক্ষ্ম শ্বাস ছাড়লো। নানী খালার দিকে আড়ালে চেয়ে ছোট বোনের ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়েও থেমে পিছিয়ে গেলো। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে নিজের সময় স্বল্পতার দরুন আর পা এগুলো না। বরং সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে বললো,


“ আসসালামু আলাইকুম সবাইকে, আল্লাহ হাফেজ আম্মু।আসি আমি।"


আফিয়া রাগকে পাশে রেখে ছেলের উদ্দেশ্যে বললো,


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,ফি আমানিল্লাহ্। সাবধানে যাও।"


নাবীহা মায়ের দিকে অপরাধী চোখে তাকিয়ে পা টিপে টিপে এগুলো।বসলো চেয়ারে,


“ আমি আজ বাড়িতেই লাঞ্চ করবো।"


মেয়ের দিকে না চেয়েই শীতল কন্ঠে প্রত্যুত্তর ছুড়লো,


“ কিছু খাবা?"


“ তোমার যা ইচ্ছা!"


খাবার দাবারের পাট চুকিয়ে সাফিয়া নিজ মেয়ে, মা'কে নিয়ে বিদায় নিলো। আফিয়া বড় ছেলে মেয়েকে বিদায় দিয়ে নিজের ঘরের নিত্যদিনের কাজকর্মে মনোযোগী হলো।তুহি ঘরে বসে ফ্যাচফ্যাচ করতে থাকলো।তাইফ সব দেখেও না দেখার ভান ধরে নিজের কাজে মন দিলো।


দুপুরের দিকে....


আফিয়া ছোট মেয়েকে বকাবকি করতে করতে কাজ করছিলো।বড় বোনের ধমক খেয়ে সেই যে গান শুরু করেছে তার অবসান এখন অবধি হয়নি।তাইফ‌ও একচোট বকাঝকা করেছে অতিরিক্ত ন্যাকামোপনায় বিরক্ত হয়ে।


“ দিনদিন বড় হচ্ছে আর ব্যক্তিত্বহীন হচ্ছে বেয়াদবটা।কোথায় কখন কি মর্জি করতে হবে তাও বোঝে না। ইচ্ছে করে মাথায় তুলে আছাড় দিতে,অসভ্য একটা।

আম্মু এবার মাদ্রাসায় গেলে আর আনবে না। থাকুক আঁটকে, দরকার নাই ঘরে এনে অশান্তি করার।"


“ তোমরাই দেখো।মাথায় তুলে নাচো। তোমার বাবাকে বলো যে সব ছেড়ে দিয়ে তোমার বোনকে নিয়ে বসে থাকতে।এসব আমার আর সহ্য হচ্ছে না।

_রুকাইয়াহ তোমার আম্মাকে ডাকো।"


রুকাইয়াহ নূরের দরজায় কড়াঘাত করে ডাক দিলো,


“ ব‌উমা ভাবী-সাব ডাকে।আসেন রান্না ঘরে।"


রান্না ঘরে নূর গেলো ঠিকই। কিন্তু তার কাজের ধরন, জিনিসপত্র জোর শব্দ তুলে রাখা,উঠানোর শব্দে আফিয়ার ভ্রু'তে ভাঁজ পড়লো। এমনিতেই মেয়ের উপর রাগ চড়ে আছে,তার মধ্যে আফিয়ার সংসারের জিনিসপত্র এরকম ছোড়াছুড়ি একদম পছন্দ না।রাগ ক্ষোভ যাই থাকুক,সেটা নিজের মধ্যে দমিয়ে তারপর সংসারের কাজে হাত লাগাবে। মানুষের উপর রাগ সংসারের কোন জিনিসের উপর মেটানো আফিয়ার একদম সহ্য হয় না।

তুহির রাগ নূরের উপর ঝাড়লো, তীব্র শব্দে গর্জিয়ে উঠে বললো,


“ সংসারের কাজকর্ম করতে যদি ইচ্ছে না করে সোজা বেরিয়ে যেতে পারো, কিন্তু আমার কোন জিনিসের ক্ষতি আমি বরদাস্ত করবো না। আমি, আমার পেটের সন্তানদের‌ই যেখানে ছাড় দেই না, সেখানে তোমাকে, ছেলের ব‌উকে ছাড় দেওয়ার তো প্রশ্নই নাই।

_সোজা এখান থেকে বেরিয়ে যাও, দুপুরে খাবার টেবিলে পেয়ে যাবে, কিন্তু আমার.."


” বুঝতে পারছি আপনার। এভাবে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে লোক জানিয়ে বোঝানোর দরকার নেই। আপনার‌ই সব।এই ঘর,এই সংসার, মানুষ সব আপনার। তাই তো সবটা আপনার মর্জিতেই হয়।"


“ মানে কি? কি বলতে চাইছো তুমি? আর গলার সাউন্ড এত উপরে তুলে কার সাথে কথা বলছো?"


“ কি হচ্ছে এখানে? এত চেঁচামেচি কেন?"


তাইফ ছুটে আসলো,ঘর থেকে চেঁচিয়ে এক‌ই ভাবে প্রশ্ন করলো সালমা ফাওযিয়া।রুকাইয়াহ পাশ থেকে ফিসফিস করে নূরের দিকে হাত নাড়িয়ে সাবধান করে বলছে,


“ থামো ব‌উ থামো। শ্বাশুড়ি মায়ের মতো,মেজাজ গরম। কি থেকে কি বলছে!তার সাথে মুখ লাগাতে নেই। তুমি ব‌উ মানুষ,এত জোরে কথা বললে লোকে কি বলবে।"


পাশ থেকে রেশমি নামের মেয়েটা বললো,


“ ভাবী থামেন,আপনি‌ পর্দাশীল মানুষ।এমন করে কথা বললে সব বাইরে থেকে শোনা যায়।"


“ এ্যাই চুপ থাকো। আমাদের মাঝে তোমার কিসের এত কথা?"


রেশমিকে ধমক দিলো।রেশমি চুপ হয়ে সরে গেলো।

রুকাইয়াহকে ধমক দেওয়ার সাহস করলো না কারণ সে তার স্বামীর আমলের লোক। তবুও রুকাইয়াহ সরে গেল। কারণ রেশমিকে ধমক দেওয়া মানেই তাকে ধমক দেওয়া।


তাইফ পাশ থেকে হাক দিল,


“ আম্মা কি হয়েছে? এত চেঁচামেচি কিসের?"


“ কিছু হয়নি।"


“ কিছু না হলে এত চেঁচামেচি কিসের জন্য? মেইন গেইটে চলে যাচ্ছে গলার সাউন্ড।"


তুহি ছুটে এসে রান্না ঘরের দিকে দাড়াতেই আফিয়া খেকিয়ে উঠলো,


“ এখানে কেন আসছো? কি দরকার তোমার?"


আফিয়ার উত্তর নূর দিলো,


“ নাটক করতে আসছে। আফটার অল সব নাটকের প্রধান অভিনেত্রী তো সেই'ই!"


“ কি বলতে চাইছো তুমি?"


“ যা সত্যি তাই বলছি।সব বিষয়ে ব্যাগড়া দেওয়া যার স্বভাব তাকেই তো অভিনেত্রী বলা যায়।"


“ তোমার কি বিষয়ে আমার মেয়ে ব্যাগড়া দিলো?"


“ আপনি বুঝবেন না আম্মা, এগুলো বোঝার জন্য মানসিকতা থাকা লাগে। মানুষের মনকে বোঝা লাগে।আপনি আপনার নিজের ছেলে মেয়ের মন ছাড়া কারো মন বুঝেন না!"


“ তুমি ঠিক বলতে চাইছো তাই বলো!"


“ আমি আসলে কিছুই বলতে চাই না। আমার এখন আপনার সাথে কথা বলতেই ইচ্ছা করছে না!"


নূর ধপধপ শব্দ তুলে নিজের ঘরে চলে গেলো।আফিয়া যে নূরের রাগের কারণ বুঝেনি তেমনটা না।

দুপুরের দিকে সৃষ্টি হ‌ওয়া এই অনাচারের পালা চললো সন্ধ্যা নাগাদ।তার মধ্যে আফিয়াই রান্নাবান্না সেড়ে নিজের শ্বাশুড়িকে খাইয়েছে।কপাল ভালো নাসিফ লাঞ্চে বাসায় আসেনি।নাইফ আসার কথা থাকলেও আসেনি। ঐদিকে নাবীহা লাঞ্চে এসে ঘরের পরিস্থিতি ঠাওর করতে চাইলেও ব্যর্থ হয়। কিন্তু খাবার টেবিলে মায়ের থমথমে মুখ আর ভাবীর অনুপস্থিতিতে চিন্তা গ্রস্থ হয়ে পড়ে।আফিয়া খাবার সাজিয়ে ছোট মেয়েকে ডাকার জন্য বড় মেয়েকে আদেশ করলে সে উঠে যায়।


“ তুহি,খেতে আসো। আম্মু ডাকছে।"


তুহি উত্তর করে না।নাবীহা এরপরেও কয়েকবার শব্দ করে।নাবীহার ডাকে সাড়া না দেওয়ায় তাইফ উঠে আসে, দরজায় জোরে চাপড় মেরে ডাক দেয়,


“ তুহি বের হ।সাহস কত বড় তোর বুবুনের ডাকে রেসপন্স করিস না।"


ভাইয়ের রাগান্বিত ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য হলো। দরজা খুলে দাড়াতেই নাবীহা টেনে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে আদুরে গলায় বললো,


“ বুবুনের উপর এত রাগ হয়েছে? স্যরি বলছি বুবুন!"


“ তুমি স্যরি কেন বলবে? আমরাই ওকে নষ্ট করছি।ওর সব মর্জিতে তাল মিলিয়ে ওকে আসলেই বিগড়ে দিচ্ছি।আর তার জন্য মন্দ শুনতে হয় আমার মা'কে।"


“ মানে কি?"


“ মানে তোমার এই ড্রামাবাজকে জিজ্ঞেস করো।"


তাইফ চলে গেলো।নাবীহা বোনের মুখটা তুলে উঁচিয়ে ধরলো। ফর্সা বদনটা টকটকে লাল টমেটো হয়ে আছে। সারাদিন কাঁদছে তা তার ফুলানো চোখ, বিধ্বস্ত মুখ দেখলেই বোঝা যায়। অতিরিক্ত আদরে লালিত হ‌ওয়া কিশোরী হঠাৎ করেই বড় ভাই বোনদের কাছে শাসনের শিকার।না মন মানতে পারছে আর না মস্তিষ্ক। সব কিছু মিলিয়ে সেই একদম হাহাকার করে কান্না করছে।তুলতুল বোনের মুখ দেখে ভীষণ আতংকিত হয়ে মায়ের কাছে একরকম কৈফিয়ত চাওয়ার ভঙ্গিতেই জানতে চাইলো,


“ আম্মু! তুমি ওকে বকছো?"


“ কেন বকলে কি তুমি আমাকে মারবে?"


বড় মেয়ের উপর খেকিয়ে উঠলো। তুলতুল মায়ের সাথে তর্ক লাগিয়ে,রাগ দেখিয়ে বললো,


“ বকবা কেন? দেখো তো কি অবস্থা হয়েছে মুখটার।সকালে আমি বকলাম আবার কি হলো যে তোমার‌ও বকতে হলো।"


“ তোমার বোনকে নয়, তোমাদের সবাইকে মারা উচিত। শুধু বকাতে কিছু হয় না তোমাদের।আমি তোমার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি তুমি আমাকে প্রশ্ন করছো? আমার কাছে কৈফিয়ত চাইছো?"


তুলতুল নিজের ভুল শুধরাতে নত শিরে বললো,


“ আমি কৈফিয়ত চাইনি।বলছি ওকে বকবা না।ওকে কাঁদতে দেখলে ভালো লাগে না আমাদের।"


“ সব ভালো লাগবে,আমি না থাকলে সব ভালো লাগবে তোমাদের!"


“ আম্মু প্লিজ। কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে যাচ্ছো তুমি?অযথা কেন অন্যের রাগ আমাদের উপরে ঝাড়ছো?"


তাইফ পাশ থেকে বড় বোনকে রক্ষা করতে প্রত্যুত্তর করলো।আফিয়া এবার ফেটে পড়লো তিন ছেলে মেয়ের উপরেই।হাতের চামচ শব্দ করে টেবিলে ছুঁড়ে নাক উঁচিয়ে শাসাতে শাসাতে বললো,


“ সংসার আমার, সংসারের সব সিদ্ধান্ত‌ও আমার।যার ভালো লাগবে না সোজা বেরিয়ে যাবে।এত কৈফিয়ত দিতে পারবো না আমি।

বিয়ে দিয়ে দিয়েছি এখন আর এখানে কারো হস্তক্ষেপ সহ্য করবো না,বুঝেছো!আর তুমি, খুব বেশি লায়েক মনে হলে সোজা নিজের পথ দেখবে।আমার ঘরে কতৃত্ব ফলাতে আসবে না।আমার কর্তা এখনো বেঁচে আছে।আর তুমি!"


তুহির হাত ধরে ঝটকা মারলো, অতর্কিত চড় দিলো তিন চারটা।তুহির নাকে মুখে লাগলো।তাইফ মা'কে ঠেলে বোনকে ছাড়িয়ে নিয়ে কাঁদো কাদো সুরে বললো,


“ আমার বোনকে মারবা না। তোমার সংসারে বেশি হয়ে গেলে চলে যাবো। কিন্তু আমার উপস্থিতিতে আমার বোনদের সাথে খারাপ ব্যবহার করবা না।"


“ এখুনি বের হ‌ও।এই অসভ্য, বেয়াদব, জানোয়ার মেয়েটাকে নিয়ে।আজ বিয়ে দিলে কাল দুই বাচ্চার মা হবে,আর এখনো সে নাকে কান্না করে যা খুশি আবদার নিয়ে বসে। জানোয়ার জন্ম দিয়ে লোকের কথা শুনতে শুনতে আমার পিত্তি পচে যাচ্ছে।

মরলেও বাঁচি,মরেও না।"


“ আম্মু প্লিজ।"


নাবীহা মায়ের এই রুপ দেখেনি, দেখেনি কেউই।রাগে যেন অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। ঐদিকে ঘরের মধ্যে নূর ফুলছে।তার মনে হচ্ছে তুহির গায়ের মার গুলো তার গায়ে পড়ছে।তার উপরের রাগ‌ই তো ওদের উপর ঝাড়ছে।আফিয়া বকতে বকতে ক্লান্ত হয়ে বসার ঘরের সোফায় গিয়ে বসে পড়লো,তার বুকে হাপড় উঠছে।বুকে হাত চেপে বসে রইল, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে থাকলো।

এদিকে সালমা ফাওযিয়া রুকাইয়াহর সহযোগিতায় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আফিয়াকে থামতে বলছে।


“ তোমার সাহস কি করে হয় আমার ফুলের মতো নাতনির গায়ে হাত তোলার!এত দুঃসাহস তুমি আনো কোথায় থেকে?খবরদার যদি আরেকবার গাঁয়ে হাত তুলছো তো।আমি হাঁটতে পারি না বলে যে আমার সংসারের সব ক্ষমতা তোমার হাতে তুলে দিয়েছি তা ভেবো না।আমার নাতী নাতনির গায়ে হাত দেওয়ার ফল তোমাকে ভুগতেই হবে।আসুক আমার ছেলে।"


কিছুক্ষণ থামলো। অতঃপর আবার শুরু করে বললো,


“ আসো দাদীপা তুমি আমার কাছে আসো।বাবা আসুক,আজ এর একটা বিহিত হবেই হবে।অনেক দিন ধরে দেখছি এই নোংরামো।"


তুহি ভাইয়ের বুকে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে হিঁচকি দিয়ে কাঁদছে ।তাইফ নিজের রাগ দমন করতে ব্যর্থ হয়ে কাঁপছে। দৃষ্টি তার জমিনে।নাবীহা রাগ দেখিয়ে নিজের ঘরে গেলো। ঘরে গিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বোরকা পরা অবস্থায় বেরিয়ে এসে মায়ের দিকে না তাকিয়েই বলতে থাকলো,


“ চলে যাচ্ছি তোমার সংসার থেকে।দোয়া করো যেন আর আসা না লাগে।"


তাইফ ছোট বোনকে ছেড়ে বড় বোনের দিকে এগিয়ে গেল, হাত ধরে আটকে টানাটানি করতে করতে বললো,


“ কোথায় যাচ্ছো? কোথাও যাবে না।ঘরে যাও।"


“ না ঘরে যাবো না।দেখলি না আম্মু বললো, বিয়ে দিয়ে বিদায় করে দিয়েছে।এখন আর এখানে আমার কিসের অধিকার।কথা বলার‌ই জায়গা নেই আবার থাকবো।"


সালমা ফাওযিয়া কান্না জুড়ে দিলেন, মৃদু স্বল্পভাষী নিম্ন কন্ঠনালীর অধিকারীনি সালমা ফাওযিয়া আজ চেঁচিয়ে কাঁদছে আর নাবীহাকে অনুরোধ করতে থাকলেন,


“ ওভাবে যায় না দাদী। ওভাবে মায়ের সাথে রাগ করে চলে যেতে নেই!বাপের বাড়ির সাথে রাগারাগী করতে নেই।এই ঘর বাড়ি তোমার‌ও, তোমার‌ও অধিকার আছে।যেও না।আসো!"


নাবীহা ফুঁপিয়ে উঠলো,তাইফ জোর করে ব্যাগ টেনে নিলো।এত বড় ভাইয়ের শক্তির সাথে নাবীহার মতো রোগাপাতলা দৈহিক গড়নের মেয়ে কি পারে?এখন‌ও পারলো না।তাইফ একরকম জোর করেই বড় বোনকে কোলে তুলে নেওয়ার মতো করেই ঘরে নিয়ে গেলো।তুহিও দাদীর কাছে গিয়ে আশ্রয় নিলো।এখন মোটামুটি পরিবেশ শান্ত। শুধু থেমে থেমে বৃদ্ধা সালমা ফাওযিয়ার ফ্যাচফ্যাচ শোনা যাচ্ছে।তাইফ বড় একটা প্লেটে খাবার নিয়ে বড় বোনের ঘরে ঢুকলো।তুহিকে দাদীর থেকে টেনে নিয়ে বড় বোনের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো।


তুহি থেমে থেমে হিচকি দিচ্ছে আর ফুপাচ্ছে। অপরদিকে তুলতুল হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাঁটুর উপর ভর দিয়ে মুখ লুকিয়ে মাথা নুইয়ে রেখেছে।তাইফ নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে প্লেটটা নিয়ে বড় বোনের পাশে রেখে বললো,


“ খাইয়ে দাও।ক্ষুধা লাগছে আমার,তুহি সকালেও খায়নি।"


নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভাই বোনদের জন্য খাবারে হাত দিলো।তুহিকে জোর করলেও খেতে চাইলো না।তাইফের নানান ফুসলানোয় দুই গাল মুখে নিলো। এদিকে শত কথায়‌ও নাবীহা কিছুই মুখে নিলো না।তাইফ নিজেও বোনদের জন্য কয়েক লোকমা নিলো।আফিয়া ওভাবেই বসে রইল।


বাদ আছর সবাই নিজের সালাত আদায় করে নিলো।

আফিয়া সালাত শেষে মোনাজাতে জায়নামাজের উপরে‌ই বসে রইল।


নূর দুপুরে খায়নি।আছরের সালাত আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ ক্ষুধায় সহ্য করতে না পেরে রান্না ঘরে যায়। প্লেটে খাবার তুলে নিয়ে বের হতেই মুখোমুখি হয় রুকাইয়াহর।রুকাইয়াহ ফিসফিস করে নূরকে বললো,


“ শোন ব‌উ যা হয়েছে হোক,ভাবীসাব তোমার শ্বাশুড়ি, শ্বাশুড়ি মায়ের সমান।তোমাকে কত ভালোবাসে।মানুষটা আজ প্রথমবারের মতো ছেলে মেয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। সে যাই হোক। তুমি তো জানোই তোমার শ্বাশুড়ি না খেয়ে থাকতে পারেন না। থাইরয়েডের মানুষ। এই বেলা অবধি না খেয়ে আছে। তুমি গিয়ে একটু খাওয়াও। সুন্দর করে আম্মা ডাকো দেখবা রাগ পানি হয়ে ঝরে গেছে।যাও...!"


“ শোন রুকাইয়াহ আন্টি,আমি অত ভং ধরতে পারি না।ওসব নাটক আমার দ্বারা হবে না। এগুলোর জন্য উনি আর উনার দুই ছেলে মেয়েই যথেষ্ট। উনাদের বলো এসব করতে।"


রুকাইয়াহ যদিও নূরের এহেন কথায় হতবাক হয়ে গিয়েছে তাও সে অনুনয় করে বললো,


“ তুমি ব‌উমা , তোমার একটা দায়িত্ব আছে না?"


“ কিসের দায়িত্ব?সব দায়দায়িত্ব কেবল আমার‌ই?উনাদের আমার প্রতি কোন দায়দায়িত্ব নেই? আমি এ বাড়িতে ব‌উ হয়ে আসার পর থেকেই এই দায়িত্ব ও দায়িত্ব শুনেই যাচ্ছি,দেখেই যাচ্ছি।বড় ব‌উ বলে মুখ বুজে সহ্য‌ও করে যাচ্ছি, তাতেও হয় না।আমার সামান্য খুশিও উনাদের সহ্য হয় না। যেটাতেই আমার খুশি মেলে সেটাতেই উনাদের ব্যাগড়া দিতে হয়।তা নিয়েই উনারা বিচ্ছিরি সব নাটক, সিনেমা তৈরি করে ফেলে।আর যাকে আপনি মায়ের সমান বলে জানাচ্ছেন তিনি হচ্ছেন এসবের প্রডিউসার।কখনো ছেলে মেয়েদের বুঝিয়েছেন এটা ঠিক না,ওটা ঠিক না! আর নাইফকে কি বলবো? ও তো হচ্ছে... উনার কাছে কলুর বলদ।সৎ ছেলে বলে কথা! সৎ বলেই তো বড় ছেলে,বড় ছেলে বলে বলে ওকে দিয়ে নিজের গুষ্টির সকলের কেয়ারটেকার বানিয়ে রেখেছে।আমি যে ওর জীবনে আছি,আমার‌ও যে গুরুত্ব আছে তা কি কখনোই নাইফ বুঝেছে? উনি কোনদিন বুঝিয়েছেন? কোনদিন বলেছে নাইফ আজ তোমার এটা করার দরকার নেই তুমি ব‌উমাকে নিয়ে আনন্দ করো! না,তা করেন নাই। উল্টো বাবু বাবু ডেকে বাবুই বানিয়ে রেখেছে।বাবুর চোখের তারায় মায়ের প্রতিচ্ছবি স্থাপন করে রেখেছে যার কারণে উনি আর উনার আদেশ ছাড়া বাবুর চোখে কিছুই পড়ে না।আমার ছায়া তো পড়েই না।পড়বে কেন? সৎ ছেলে আর ছেলে ব‌উ বলে কথা।আপন ছেলের ব‌উ হলেই বোঝা যাবে কতদূর দায়িত্ব পালন করাতে পারে! স্যরি গো,অত ভালো মানুষ আমি ন‌ই। সারাদিন যা করি তাই যথেষ্ট এর বেশি সম্ভব নয়।

এমনিতেই এই ঘর সংসার আমার নয়।আমার হলে তো সবটা আমার মতোই হতো।আমার নয় বলেই প্রতি কদমে খোঁটা, বাঁধা,তিতা কথা শুনতে হয়। আমার হলে কি আজ কেউ এভাবে কাজের লোকের সামনে কথা শোনানোর সাহস করতো?আমাকে জীবনে কেউ কোনদিন কথা শোনানোর সাহস পায়নি,অথচ এখন এমন মানুষের কথাও সহ্য করতে হচ্ছে যে আমার নখের যোগ্যতাও রাখে না।"


“ আপনি কথাগুলো কাকে বললেন?"


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ