সুখ_প্রান্তর | শান্তনা_পর্ব

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#শান্তনা_পর্ব



[কপি করা/চুরি করা, নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ! দয়া করে এগুলো করবেন না কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন। ধন্যবাদ সবাইকে।]


চাচু! চাচু,চাচু!"


তাইব ঘরময় দৌড়াচ্ছে আর চাচাকে ডাকছে।হাতে তার একটা ভাঙা রাইফেল যেটা সে নিজের ছোট চাচা মানে সামির সাথে খেলতে গিয়ে ভেঙে ফেলছে।চাচার সাথে গল্প করার সময় সে বলেছিল তার‌ও একটি রাইফেল আছে।চাচা দেখতে চাওয়ায় সেটা আনতেই নিজেদের ঘরে যায়। পথিমধ্যে সামির সাথে দেখা হ‌ওয়ায় খেলায় মজে গিয়ে এই অকাজ ঘটিয়ে ফেলে।এখন ছোট চাচুর নামে বিচার দেওয়ার জন্য বড় আর্মি চাচুর নিকট ছুটে এসেছে।


তাইফ বাথরুমে ছিলো।গোসল করে মাত্র‌ই তোয়ালে জড়াতেই ভাতিজার চেঁচামেচি কানে গেলো। বলাবাহুল্য আসার পর থেকেই তাদের নিয়েই সে ব্যস্ত ছিলো।যখন মিশনে গিয়েছিল তখন এই বাচ্চা দুটো ছিলো এক বছরের। নিজের প্রফেশনাল জীবনের কারণে বাড়িতে বেশি থাকা হয় না।যার কারণে বাচ্চা দুটোর প্রতি ভীষণ টান থাকা সত্ত্বেও যথেষ্ট সময় দিতে পারে না। এদিকে আড়াই বছরে তারা বেশ বড় হয়েছে গিয়েছে।তার যেন দুটোর একটাকেও কোল থেকে নামাতে ইচ্ছা করে না।

নিম্নাঙ্গে তোয়ালে পেঁচিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বাথরুমের দরজা খুলে পা বাইরে দিতেই দিতেই উত্তর করলো,


“ এই যে চাচু এখানে।কি হয়েছে আমার বাপের?"


তাইব ঠোঁট উল্টে করুন চোখে তাকিয়ে নিজের ভাঙ্গা রাইফেল উঁচুতে তুলে ধরে অভিযোগের ন্যায় বলতে আরম্ভ করলো,


“ এইতা ভেঙে দিয়েছে।"


ভ্রু কুঁচকে তাইফ রাইফেলটা নিজের হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলো এরপর বললো,


“ কে ভাঙ্গছে?"


“ ছোট চাচু!"


“ সামি?"


“ হুম।"


“ আচ্ছা ঠিক আছে।আমি দেখছি। তুমি কেঁদো না।আসো এদিকে আসো।"


বলেই তাইবকে কোলে তুলে নিলো।তাইব চাচার গলার পেঁচিয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দরজায় তাকাতেই দেখলো নূহা দৌড়ে এদিকে আসছে।


“ ভাইয়া!"


তাইফ,তাইব দু'জনেই ফিরে তাকাতেই নূহা বলে উঠলো,


“ ছোত ফুফু আছছে!"


তাইফ জিজ্ঞেস করলো,


“ ছোট ফুফু আসছে তোমার?"


“ হুম হুম!"


ছোট্ট মাথাটা দ্রুত গতিতে উপরনিচ ঝুলিয়ে বললো।ছোট ফুফুর আসার কথা শুনেই তাইব গড়িয়ে চাচার কোল থেকে নামতে চেষ্টা করছে।তাইফ ছেড়ে দিলো।তাকেও পোশাক পরিধান করে বের হতে হবে যে।


পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু দেখলে মনে হয় সাত আট চলছে। অনেকেই ধারণা করেছিল এরও জমজ হবে। কিন্তু মেডিক্যাল ইনফরমেশন অনুযায়ী একজন‌ই আসছে।

তুহি নিজের পেটের উপর হাত ঠেকিয়ে সোফায় বসলো। পাশেই তার সুদর্শন স্বামী বিমান সেনা ওয়ারেন্ট অফিসার সিদ্দিকী ফাহাদ চৌধুরী দাঁড়িয়ে।হাসি হাসি মুখে সুদর্শন ফাহাদ শ্বাশুড়ি মায়ের উদ্দেশ্য প্রশ্ন রাখলো,


“ আম্মা শারীরিক অবস্থা কেমন এখন?"


আফিয়া ছোট জামাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহ ভরা গলায় উত্তর দিলো,


“ আলহামদুলিল্লাহ বাবা। তুমি বসো।"


নাফিসা জামাইয়ের জন্য পানি ঢেলে গ্লাস বাড়িয়ে ধরে বললো,


“ পানি খেয়ে না। এরপর ফ্রেশ হ‌ও।"


“ ছোট ভাইয়া কোথায় ফুপু?"


তুহির প্রশ্ন,এর মধ্যেই তাইব,নূহা দৌড়ে তার কাছে এসে হাজির।তুহি নিজের ভরা পেট নিয়েই খানিকটা উবু হ‌ওয়ার চেষ্টা করতেই ফাহাদ মৃদু ধমকে উঠলো,


“ কি করছো?"


তুহি দ্বিধান্বিত চোখে তাকালো, জিজ্ঞেস করলো,


“ কি হয়েছে?"


“ নিচু হচ্ছো কেন? পেটে চাপ লাগবে না?"


আফিয়াও মেয়েকে সতর্ক করতেই ধমকে উঠলো,


“ এভাবে নিচু হ‌ও কেন তুমি? এখনো এত কেয়ারলেস হলে চলবে?"


“ কিছু হবে না আম্মু!"


“ হতে কতক্ষন আম্মা?

একটু সাবধানে থাকতে হবে এই সময়ে।"


নাফিসা ভাতিজিকে বুঝিয়ে বললো।তাইব,নূহাকে নিজের কোলে তুলে দুই বাহুর মাঝে আঁকড়ে উঁচিয়ে ধরলো ফাহাদ।তুহির মুখোমুখি ধরে বললো,


“ এই নাও এবার আদর করো।"


তুহি বললো,


“ এখানে বসিয়ে দিন।আমি আর ঝুঁকবো না।"


ফাহাদ তাই করলো।

এর মধ্যে‌ই হাজির তাইফ।ধুর থেকে সালাম দিলো, নিজেদের আদর্শ স্বরূপ, নিয়মানুসারেই ওয়ারেন্ট অফিসার ফাহাদকে দেখে মেজর নাফিস ওয়াসীত্ব গাজী স্যালুট করলো।ফাহাদ‌ও এক‌‌ইভাবে নিজের দায়িত্ব সম্পন্ন করে খুব‌ই সাবলীল, মার্জিত ভাবে বললো,


“ ইটস ওকে মেজর নাফিস,এটা পারিবারিক সময়। এখানে এত ফর্মালিটির দরকার নেই।"


“ শিওর স্যার!প্লিজ বসুন!"


তুহি ভাইকে দেখে কেঁদে দিলো।উঠে দাঁড়িয়ে ফ্যাচফ্যাচ করতে করতেই বললো,


“ তুমি বলছিলা আগে আমার বাসায় যাবা। আমাকে নিয়ে আসবা। কিন্তু, গেলে না কেন?"


তাইফ বোনকে জড়িয়ে ধরে দুষ্টুমি করতেই বললো,


“ ম্যাডাম আমি জানতাম আপনি স্যারের সাথেই আসবেন।তাই আমি সময়ের অপচয় না করে দ্রুত বাড়িতে নিজের পরিবারের কাছে ফিরেছি।"


“ একদম ম্যাডাম বলবে না বলে দিচ্ছি আমি!"


“ কিন্তু ম্যাম আমাদের রুলস এটা। সিনিয়র অফিসারদের মিসেসদেরকে ম্যাডাম ডাকতেই হবে।"


“ নিকুচি করি তোমার সিনিয়র অফিসারদের আর তোমার রুলসকে!"


“ নো ম্যাম,আপনি এটা পারেন না ম্যাম! ইটস ই'লিগাল!"


“ ভাই, তুমি তোমার লিগালিটি রাখো। একদম আমাকে অযথা ক্ষেপাবে না।"


“ আসসালামু আলাইকুম!"


নাইফ পেছন থেকে সালাম দিলো ফাহাদকে।ফাহাদ পিছু ফিরে নাইফকে দেখে সালামের প্রত্যুত্তর করলো এবং করমর্দন করে গলায় গলা মিলিয়ে নিজেদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেই তুহি নিজের স্বভাব সুলভ ন্যাকামি নিয়েই বড় ভাইয়ের কাছে গিয়ে বিচার দিতে থাকলো ছোট ভাইয়ের নামে।


” ভাইয়া।"


নাইফ বোনকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদি গলায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,


“ কেমন আছে আমার বুড়ি পাখিটা?"


“ ন্যাকার ষষ্ঠি যেমনটি থাকে।"


তাইফ পাশ থেকে উত্তর করলো,তুহি ঠোঁট ফুলিয়ে বড় ভাইকে বললো,


“ দেখছো,আসতে না আসতেই কিভাবে আমাকে পচাচ্ছে!"


“ তাইফ তোকে কতবার নিষেধ করেছি,শুনছিস না কেন?"


“ কি শুনবো!তোমাদের দুই ভাই বোনের ন্যাকামো দেখতে দেখতে আমার চোখ পচে যাচ্ছে।আর কত .... ওহ্।কর তোমরা ন্যাকামি। আমার বুবুন চলে এসেছে।এখন দেখবে তোমরা আসল জিনিস!"


নাবীহা দরজায় পা দিতেই শুনতে পেলো তার পাগলা ভাইয়ের কথাগুলো। মিষ্টি হেসে একরকম ছুটে এলো।তাইফ‌ও ছুটে গিয়ে বড় বোনকে জড়িয়ে ধরে ঘুরতে থাকলো।মু'য়ায দরজাতেই পা থামিয়ে দুই ভাই-বোনের মিলন দেখছে।


“ কত শুকিয়ে গেছো তুমি? একদম কালো হয়ে গিয়েছো?"


নাবীহা ভাইয়ের মুখে হাত দিয়ে হাতড়াচ্ছে আর কাঁদো কাঁদো গলায় বলছে কথাগুলো।তাইফ বড় বোনের দু'টো হাত আটকে ধরলো, একত্র করে হাতের তালুতে ঠোঁট ছুঁইয়ে হাসি হাসি মুখে বললো,


“ কালো চান লাগছে?"


নাবীহা ভাইয়ের কথার অর্থ বুঝতে পেরে হেঁসে দিলো।বললো,


“ তুমি সবসময় প্রতিভার জোরে সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করো। চাঁদের মতো স্নিগ্ধ তোমার রুপ।বুবুনের দোয়া সবসময় তোমাকে ঘিরে রাখবে। আল্লাহ সুস্থ সুন্দর রাখুক।"


“ আমীন।"


পাশ থেকে বললো,মু'য়ায! তাইফ বোনকে ছেড়ে

দুলাভাইয়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে থাকা ছোট পরীকে টেনে নিজের কাছে নিলো।গালে ঠোঁট ছুঁয়ে ছুঁয়ে বললো,


“ মাশাআল্লাহ! একদম আমার বুবুনের ছোট বেলা।"


মু'য়ায হতাশ গলায় বললো,


“ তুমিও বলছো!"


“ হিংসে হয় ভাইয়া?"


“ মোটেই না। শুধু দেখতেই হয়েছে মায়ের মতো। এমনিতে স্বভাব পুরোটাই আমি।"


“ তাহলে তো কিপটে হবে!"


“ কি বললা তুমি? ইয়্যু মিন আমি কিপটে?"


খুনসুটি পর্বের মাঝেই দুই জামাইয়ের আলাপ, কুশলাদি,বড় সুমন্ধির সাথে আলাপ সাড়লো।গাজী বাড়ি আজ ছেলে মেয়ে,মেয়ে জামাইদের আগমনে গমগম করছে। সন্ধ্যার দিকে আসবে সালাহ,নাফিসার স্বামী এবং মেয়ে ও ছোট ছেলে।তাইফের ছুটি কম।তাই মোটামুটি আজ থেকেই আত্নীয় স্বজন সবাই এসে দেখা করছে।তুহি বেশ ক'দিন থাকবে।থাকবে নাবীহাও। সম্ভাবত জামাইরা চলে যাবে‌। এতে অবশ্য আফিয়ার মন বেশ নারাজ হয়।বেছে বেছে মেয়েদের বিয়ে এত ভালো পজিশনধারী ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছে যে কেউ এক রাত শ্বশুর বাড়িতে থাকতে পারে না।সবার কাজের ব্যস্ততা।


সন্ধ্যার খানিকটা আগে..


নাসিফ বোনকে উদ্দেশ্য করে বললো,


“ তোর কাছে যদি ভালো ছেলের সন্ধান থাকে তাহলে অপেক্ষা করছিস কিসের জন্য? মেয়ে মানুষ,বয়স কি বসে থাকে?"


“ তোমার ভাগ্নি রাজি না হলে আমি কি করবো ভাইয়া?"


“ জিজ্ঞেস করিসনি ওর কোন পছন্দ আছে কি-না? কারো জন্য অপেক্ষা করছে কি-না?"


যদিও নাসিফ খানিকটা জানে তবুও কেন জানি বোনকে বলতে তার মাঝে দ্বিধা কাজ করছে। ঐদিকে নাফিসার অবস্থাও তাই।বললে যদি ভাই ভাবে তার ছেলের অবস্থান ভালো দেখে বোন নিজের মেয়ে গছাতে চাইছে! তাই সেও দ্বিধায় ভুগছে। এদিকে আফিয়া স্বপ্নের জাল বুনে বসেই আছে ভাগ্নিকে পুত্র বধূ বানানোর।নাইফ বাবা মায়ের দ্বিধা আর দুশ্চিন্তার কারণ বুঝে উঠতে পারছে না। এদিকে তাদের টপকে নিজেও কিছু করতে পারছে না।আফিয়া খুব করে চায় এই ছুটিতেই ছেলের টুঁটি চেপে ধরতে।


মোরাল অফ দা হিস্ট্রি,সবাই অনুমান করছে তাইফ নাজিফার মাঝে কিছু আছে। কিন্তু কেউ নিশ্চিত নয়।কারণ এদের কখনোই ওরকম ভাবে কথাও বলতে দেখেনি।সবার অনুমান এতটই জটিল হয়ে উঠছে যে সরাসরি জিজ্ঞাসা করতেও ভাবতে হচ্ছে। ঐদিকে ফাতিন মেয়ের বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।সে আবার কাজিন বিয়েতে ঘোর বিরোধী।


“ওর বাবার এক বন্ধুর ভাগিনা, ছেলে আইটি বিশেষজ্ঞ।কানাডাতেই আছে।তারা তো নাজিফাকে আগেই দেখেছে।এখন সোজা বলছে,দেখাদিখির দরকার নেই। একদিন সরাসরি বসে আংটি বদল করে রাখতে নয়তো সোজা আকদ করিয়ে যাবে।পরে সময় বের করে আনুষ্ঠানিকতা।"


“ কার আকদের কথা হচ্ছে ফুপু?"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ