#চড়ুইভাতি
#পর্ব_০১
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
[নকল অথবা চুরি করা থেকে বিরত থাকুন! আপনাদের রেসপন্স একান্ত কাম্য!]
চড়ুইভাতি..
গাদা গাদা মানুষের ভীড় দেখে থমকে ভীত চাহনিতে চেয়ে আছে অষ্টাদশী নববধূ লিলি,তার সামনে দুই হাতে দুটো ভারী বস্তার ন্যায় ব্যাগ ঝুলিয়ে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সদ্য হওয়া স্বামী ।
সদ্য বিবাহিত লিলি,যার পুরো নাম মোসাঃ ফাতিমা লিলি। বাবা পলাশ আর মা ফাল্গুনির চতুর্থ কন্যা ফাতিমা লিলি। বড় কন্যার নাম জুঁই তার ছোট জনের নাম চাঁপা,তারপরের জনের নাম বেলি! বেলির মতো শুভ্র আর স্নিগ্ধ বলেই তৃতীয় কন্যার নামটা রক্তিম রাঙা পলাশ মজুমদার তৃতীয় মেয়ের নাম বেলি রেখেছেন। তেমনি অপূর্ব তবে নিরব শান্ত এক কোনায় গুটিয়ে থাকা মেয়েটার নাম রেখেছে লিলি।ডাক নামটা লিলি রেখে ভালো নামটা কাগজে কলমে ফাতিমা রেখেছেন।সবার শেষে জন্ম নেওয়া ছোট সন্তান,পঞ্চম ও শেষ সন্তান একমাত্র পুত্র অঙ্কুর।
গোল গোল করে আদো ঘুম ভাঙ্গা চোখে চারদিক অবলোকন করছে আর সামনে উপস্থিত নবাগত স্বামীর শার্টের পিঠের অংশ দুই আঙ্গুল দিয়ে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের উদ্দেশ্য মানুষের চাপ কমলে তবেই তারা লঞ্চ থেকে ঘাটে পা রাখবে। তাছাড়াও তাদের সঙ্গে বেশ কিছু ভারী বস্তা আছে সেগুলোও নেওয়ার জন্য একজন সহায়তাকারী খোঁজা লাগবে আর এখন এত ভীড়ের মধ্যে তা সম্ভব নয়।তাই একটু সময় অপেক্ষা করলেই ভীড় কমবে আর দেখা মিলবে অনেক সহায়ককে অর্থাৎ কুলির। কথাগুলো তার নয়,তার থেকে গুনে গুনে এগারো বছর দুই মাসের বড় স্বামী তৌকির হাওলাদারের।
পিছনে ফিরে ভরাট কন্ঠে নববধূকে উদ্দেশ্য করে বললো তৌকির,
“ নিচে চেয়ে সাবধানে পা ফেলবে।আমি তোমাকে সহ এই দু'টো ব্যাগ নিচে রেখে বাকী গুলো নামাবো,এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় না কাউকে পাওয়া যাবে।"
“ জি্!"
নতশিরে নিচু কন্ঠে সম্মতি লিলির।তৌকির হাতে ঝুলানো ব্যাগ দুটো আরও শক্ত করে ধরে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা লঞ্চের একজন কর্মচারীর উদ্দেশ্য করে বললো,
“ ভাইজান এই ব্যাগগুলো একটু দেখিয়েন!"
“ আইচ্ছা!"
ভরসা পেয়ে ব্যাগ বলতে মোটা ভারী তিনটা বস্তা রেখে নিচে গিয়ে বউ আর ব্যাগ দুটো রেখে দ্রুত গতিতে আবারও ফিরে এসে পরপর তিনটা বস্তা নামালো।
চারদিকে এখনও তেমন আলো ফুটেনি।তাই কোন কুলির দেখা মিলছে না। নয়তো এত সময়ে টানাটানি হানাহানি লেগে যেতো।
লিলি দৃষ্টি নামিয়ে রেখেই এদিকে ওদিকে চাইছে আর বারবার বোরকার নিকাব ধরে টেনে চোখ ঢাকার চেষ্টা করছে।যদিও সে পর্দাশীল না,তবুও শালীনতা তার মাঝে আছে। কিন্তু এখন নতুন বিয়ে করা স্বামীর ভয়ে বারবার নিজেকে এভাবে আড়ষ্ট করে রাখছে।মাত্র বিয়ে হলো সপ্তাহ পার হচ্ছে, এখনো মানুষটার সাথে তো তার অতটা মাখো মাখো ভাব হয়নি যে সবসময়ের মতিগতি বুঝে ফেলবে।তবে নেহায়েত কাঠখোট্টা নয়, ভীষণ কঠোর কিন্তু ভদ্র লোক।তা বুঝেছে সে। কম কথা বলে, কিন্তু যতটা বলে খুবই আদুরে গলায় বুঝিয়ে বলে।যাক বলে সে ভীষণ আগ্রহ নিয়ে মন দিয়ে শুনতে বাধ্য হয়।
“ চলো লিলি, এদিকে আসো। সাবধানে! বোরকায় পা লেগে পড়ে যাবে, একটু তুলে হাটো।"
পাঁচ ফুট এক ইঞ্চির লিলি তার পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি স্বামীর কদমে কদম মিলিয়ে চলছে ডান হাতে বোরকার সামনের অংশ খানিকটা উঁচু করে ধরে।তার চেয়ে বোরকার সাইজ কম করে হলেও চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি বড়।তাই এত কষ্ট হচ্ছে। বিয়ের আগেই তার মাপ ছাড়া কিনেছিলো এই ভদ্রলোক তাই এমন গরমিল হয়ে গিয়েছে।তাও সে আজ এটা পরেই এসেছে ঢাকা, স্বামীর সঙ্গে থাকার জন্য।আজ থেকে সে এখানে তার স্বামীর সঙ্গেই থাকবে।
কামরাঙ্গীরচর,কুড়ারঘাট।মরে যাওয়া খালপাড়ের রোড ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সবুজ সিএনজিটা।তার মধ্যে বসা আছে তৌকির হাওলাদার ও তার নবপরিণীতা ফাতিমা লিলি। লজ্জারত নববধূ অস্থির নয়ন জোড়া ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সিএনজির জানালার ছোট ছিদ্র দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে বাইরের সবটা।তৌকির বিবির অস্থিরতা টের পেয়ে ভরাট গলায় বললো,
“ পরেও দেখতে পারবে।এখান থেকে বাসা খুব দূরে নয়।"
চমকে উঠলো লিলি। সঙ্গে ভীত হলো।তার মনোযোগ সবটা ছিলো বহির্মুখী, হঠাৎ করেই এহেন ভরাট গলায় কথা বলায় তার পিলে চমকে উঠে।সে থমতম মুখে আড়চোখে স্বামীকে দেখার চেষ্টা করেও সাহস করলো না সোজাসুজি দেখার।সোজা হয়ে দৃষ্টি নিজের কোলে থাকা হাতের মুঠোয় রেখে চুপ হয়ে বসে থাকলো। তৌকির বউয়ের এবারের মনোভাবও বুঝতে পারলো কিন্তু তার বিপরীতে বিশেষ ভাবাবেগ না দেখিয়ে স্বভাবসুলভ গম্ভীরতা জিইয়ে রেখে বললো,
“ এখানে লোকজন বিকেলে ঘুরতে আসে,আজ তো পারবো না।তবে ছুটির দিন নিয়ে আসবো।অবশ্য তুমি চাইলে নিজে একাও বের হতে পারবে কিন্তু আমি বলবো বের হইয়ো না। এখানে নিরাপত্তা নেই।"
লিলির ধুকপুক করা অস্থির বুকটা হুট করেই শান্ত হয়ে গেলো।একটু আগের ভারী আওয়াজের শব্দগুচ্ছ তাকে ভীত করলেও এই মুহূর্তের ভারী আওয়াজে তৈরি শব্দগুলো তার অন্তর শীতল করে দিলো।মনে মনে বললো,
“ লোকটা নেহায়েত মন্দ নয়।একটু চুপচাপ স্বভাবের এই যা।তোর মতো উড়নচণ্ডী নয় যে।"
হঠাৎ করেই সিএনজি ঝাঁকুনি দেওয়ায় লিলি গিয়ে ডান পাশে বসা নিরেট ভদ্রলোকের বাম বাহুতে কাত হয়ে পড়লো। মুহুর্তে তৌকির সাহেব নিজের ডান হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বললো,
“ কোমরটা শক্ত করে বসো লিলি,ভাই আপনি একটু দেখে শুনে চালান।"
কথাগুলো খুব স্বাভাবিক শান্ত কিন্তু কন্ঠস্বরটা ভীষণ গমগমে।লোকটা যতই শান্ত ভালো কথা বলুক, কন্ঠের আওয়াজে মনে হয় গর্জন দিচ্ছে।
লিলির ভেতরে কেমন যেন অনুভূতি হচ্ছে।গুনে গুনে এগারো বছর দুই মাসের বড় এই লোকটা তার স্বামী।গত সপ্তাহে রোজ শুক্রবার বাদ মাগরিব তাদের বাড়ির উঠানে বসে তাদের প্রণয়ের মাল্য গাঁথা হয়।লিলি এক উঠান মানুষ, তাদের বাড়ি উপচে ছেয়ে থাকা আকাশচুম্বী বৃক্ষরাজির পল্লব,তাকে জড়িয়ে লেপ্টে থাকা তরুলতা, গুল্ম লতা,উঁচু মগডালে বসে থাকা সন্ধ্যা পেঁচা,ভরাট থইথই পুকুরের জল ও তার মাঝে সাঁতার কাটা তেলাপিয়া মাছের পোনা,গোয়ালে হাম্বা হাম্বা করে চিৎকার করা গাই রাঙামতি,তাকে শিং দিয়ে গুঁতো দেওয়া ষাঁড় বল্টু,তার অতি আদরের ছাগলের নাতী পুতি, খোয়ার ভরা হাস মুরগী আর সবার স্রষ্টা মহান রাব্বুল আলামীন ও তার এবং আমাদের সকলের প্রিয় রাসুলকে মনে মনে সাক্ষী রেখে বাবা মায়ের সম্মতিতে সে এই লম্বা তামাটে বর্ণের গম্ভীর মুখের গুনে গুনে নিজের চেয়ে এগারো বছর দুই মাসের বড় লোকটাকে নিজের স্বামী বলে কবুল করেছে।
লিলির মনে হয় তার স্বামীর বয়সটা আরেকটু বেশিই হবে কেন না তাকে দেখতে মোটেই ঊনত্রিশ লাগে না,কেন জানি তাকে দেখলেই মনে হয় এই লোকের বয়স কম করে হলেও পঁয়ত্রিশ তো হবেই।
লিলির চেতন ফিরলো ভরাট কন্ঠের মালিকের হুংকারে।না না,সে হুংকার দেয়নি। লিলির মনে হচ্ছে হুংকার দিয়েছে।সে আবারও চমকে গেলো।তৌকির এটাও গভীর চাহনিতে লক্ষ্য করলো কিন্তু এবারও সে তা অদেখা করেই পূনরায় নিজের কথার পূনরাবৃত্তি ঘটালো,
“ বোরকা ধরে ধরে নামো,এটাই আমাদের বাড়ি। এখানেই থাকবো আমরা!"
লিলি তাই করলো,বোরকা ধরে ধরে নামলো। চোখ দুটো মেলে তাকিয়ে দেখলো টিনের গেট দেওয়া একটা বাড়ি ভেতরে অবশ্য চার তলা বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে।লিলি সিএনজির পাশে দাঁড়িয়ে রইল, তৌকির মানিব্যাগ হাতরে দু'টো একশো টাকার নোট সিএনজিওয়ালাকে দিলো। এরপর সেই তিনটা বস্তা টিনের ঐ গেটের ভেতরে নিয়ে রাখলো, তারপর লিলির দিকে তাকিয়ে ওকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ আসো!"
“ আমি একটা নেই!"
বলেই লিলি একটা ব্যাগ নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই তৌকির বাঁধা দেয়,
“ না তোমাকে কষ্ট করতে হবে না। তুমি নিজের বোরকা ধরে ধরে হাটো,পড়ে যাবে।পড়লেই হাত পা ছুঁলে যাবে ,সুরকি দিয়ে ঢালাই দেওয়া পথ।"
লিলি আর প্রত্যুত্তর করলো না।সে স্বামীর আদেশ মতে তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলো পিছন পিছন।
তৌকির লিলিকে নিয়ে ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে বেলে চাপ দিতেই এক ভদ্র মহিলা বেরিয়ে আসেন।দরজায় তৌকিরকে দেখে ন্যানো সেকেন্ড কিছু একটা ভাবেন এর মধ্যেই তৌকির সালাম দেয়,
“ আসসালামু আলাইকুম আপা। কেমন আছেন?"
তিরিশ থেকে বত্রিশ বছর বয়সী মহিলাটা এই পর্বে হেসে দিলেন, মুগ্ধতা জড়ানো সেই হাসি বজায় রেখে তৌকিরের সালামের প্রত্যুত্তরে বললেন,
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম,ভাবীকে নিয়ে চলে আসছেন।আসেন আসেন, ভেতরে আসেন।আসেন, ভাবী আসেন।"
তিনি ভীষণ তড়িঘড়ি করছেন,কথার বাক্য জড়িয়ে যাচ্ছে। তৌকির ভেতরে ব্যাগ দুটো রেখে লিলির দিকে ফিরে ভেতরে ঢোকার জন্য বলতেই ভেতর থেকে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলার গলার স্বর শোনা গেলো,
“ এ্যাই দাঁড়াও দাঁড়াও, নতুন বউ এভাবে কেউ ঘরে ঢুকায়। দাঁড়াও...বউমা যাও দুধ চিনি নিয়া আসো তো।মধু থাকলে নিয়ে আইসো।"
লিলি আড়ষ্ট নয়নে তার দিকে চাইলো, কৌতুহল তার চোখে মুখে। তৌকির খানিকটা লজ্জিত কম্পিত তবে মৃদু হাসির সহিত বাঁধা দেয়,বললো,
“ খালাম্মা লাগবে না।কি করছেন আমাদের বিয়ে হয়েছে আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল।আপনি এত কষ্ট করবেন না এই সকালে,ভাবী বাদ দেন।"
তিনি শুনলেন না।এ পর্যায়ে লিলির দৃষ্টি আবারও নত।সে স্বামীর খানিকটা পিছেই দাঁড়িয়ে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে।তৌকিরকে থামিয়ে দিলো মুরব্বি। বললেন,
“ কি লাগবো না। নতুন বউ আনছো তুমি বাবা।যতই বিয়ের বয়স এক সপ্তাহ কি এক বছর হোক,তারে তো তুমি তার সংসারে ঢুকাও নাই।সে এতদিন ছিলো তোমার মায়ের সংসারে,তার শ্বশুরের বাড়িতে।আর এইটা হচ্ছে তোমার ঘর বাড়ি, মানে তোমার রাজ্য,এহোন যারে আনছো সম্পর্কে তোমার বিবি,সে হলো এই রাজ্যের রাণী,এইটা হইবো তার সংসার।এইহানে হইবো তার রাজত্ব,আর নিজের রাজ্যের দায়িত্ব যখন রানীমা নেয় তহন তারে সেইভাবেই সম্বর্ধণা জানাতে হয়।বুঝলা বাবা,আমাগো মহিলাগো কাছে সংসারটাই আমাগো রাজ্য আর আমরা হলাম সেই রাজ্যের মহারানী।যদিও আমাগো সাথে চাকরাণীর মতো আচরণ করা হয় তবে সত্য কিন্তু এটাই,এই রাজত্ব রাজ্য সবটাই আমাদের।
এইহানে যেহেতু তোমাদের আপন কেউ নাই,আর আমরা একই সাথে পাশাপাশি থাকবো,তাই তোমাদের সুখদুঃখের সাথী হওয়া আমাদের দায়দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।এহোন তুমি নতুন বউ নিয়া আসছো, নতুন সংসার শুরু করবা তারে একটু আলাদা অনুভব করাবা না।তা কি হয়?আসো বউমা আসো!"
তিনি হাত দিয়ে লিলিকে ডাকলেন নিজের দিকে,দুই পা এগিয়ে দরজা পেরুলেন।লিলি তৌকিরের দিকে চাইলো, তৌকির চোখের পলক ফেলে সাহস দিলো। মুরব্বি লিলিকে আধো জড়িয়ে ধরে দরজার ওপারে থাকা নিজ পুত্র বধূকে বললেন,
“ মুখে মধু দিয়া মিষ্টি মুখ করাও বউমা।"
তিনি তাই করলেন,প্রথমে মধু এরপর দিলেন দুধ চিনির শরবত।তৌকির খেতে না চাইলেও মুরব্বির কথায় খেতে বাধ্য হলো।
অতঃপর ওদের ঘরে ঢুকতে দিয়ে নিজেরা দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়।
আগের মহিলা নিজের ঘরে গিয়ে একটা চাবি নিয়ে আসলো।তৌকির তখন তাদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে,লিলি বসার ঘরে সোফায় বসে অপেক্ষা করছে।তাকে মূলত ঐ বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলাই বসিয়ে রেখেছে নিজের কাছে।
তৌকির চাবি নিয়ে দরজা খুলতে খুলতে ঐ মহিলাকে জিজ্ঞেস করলো,
“ ভাবি খালা কি পরিষ্কার করে দিয়ে গিয়েছে?"
“ হ্যাঁ ভাইয়া,কালকেই করিয়েছি। একদম ছাঁদ পর্যন্ত ঝাড়ু দিয়ে মুছে দিয়েছি।নিজে দাঁড়িয়ে করিয়েছি। বারবার বলেছি নতুন মানুষ আসবে ঠিক করে করো খালা!"
তৌকির গাম্ভীর্যের ছাল ছিঁড়ে খানিকটা ঠোঁট মেলে হাসলো, বোধহয় জোর করেই হাসলো। অতঃপর একটু গলা উঁচিয়ে,
“ লিলি আসো!"
লিলি চট করে উঠে দাঁড়ালো। তাড়াহুড়ো করতেই তৌকিরের গলা ভেসে আসলো,
“ সাবধানে হাটো লিলি,বোরকা তুলে হাটো,ফ্লোরে টাইলস, স্লিপ কাটবে!"
তড়িঘড়ি করে চলা লিলির কদম আপনাআপনিই ধীর হয়ে গেছে।সে আগের মতোই শান্ত নদীর গতিতে এগিয়ে গেলো নিজের রাজত্বে।
তৌকির দরজার পাশে দাঁড়িয়ে লিলিকে ভেতরে ঢোকার জন্য জায়গা করে দিলো। প্রতিবেশী ঐ প্রথম ভাবী সম্বন্ধিত মহিলা তৌকিরের উদ্দেশ্য করে বললো,
“ নাস্তা আমাদের তরফ থেকে থাকবে, আপনারা বরং এখন রেস্ট নিন।"
লিলি আগের মতো দাঁড়িয়ে থেকে শুনলো কেবল, তৌকির অতি বিনয়ে ভদ্রমহিলাকে নারাজি জানিয়ে বললো,
“ এত কষ্ট করতে হবে না ভাবী,আমরা বাইরে থেকে নিয়ে আসবো।"
“ আরেহ কষ্ট কিসের? একসাথে পাশাপাশি আছি, থাকবো।আমরাই তো একে অপরের পরম আত্মীয়।আপনি ভাবীকে সময় দিন, আমি নাস্তা তৈরি করতে যাই।"
ভদ্রমহিলার আন্তরিকতায় লিলি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে, তৌকির হাসি দিয়ে উনাকে বিদায় দিলো,দরজা চাপিয়ে ছিটকিনি লাগিয়ে আরেকটু ভেতরে ঢুকে লিলির উদ্দেশ্যে বললো,
“ দেখো তোমার ঘর, পছন্দ হয় কি-না?"
তৃতীয় তলার দক্ষিণমুখী একটা ফ্ল্যাট। দু'টো বড় রুম,একটা মাঝারি রুম যেটা সামনে,মূলত এটাকে বসার অথবা খাবার ঘর বলা যেতে পারে। দু'টো টয়লেট,একটা শোয়ার ঘরে আরেকটি বসার ঘরে।বেশ সুন্দর পরিপাটি করা বড়সড় একটা রান্না ঘর।তবে আনন্দের বিষয় বারান্দায় দুই রুম জুড়ে। অর্থাৎ দু'টো শোয়ার ঘরেই বিশাল বারান্দা জোড়া দেওয়া।
লিলি তৌকির দম্পতির ঘরটা দক্ষিণের সবচেয়ে সুন্দর জায়গায়,এখান দিয়ে একটা বিশাল খেলার মাঠ দেখা যাচ্ছে, বিল্ডিং ছুঁয়ে উর্ধ্বমুখী দু'টো গাছ,একটা জারুল আরেকটি রাধাচূড়া। রাধাচূড়ার ডালটা ঘরের পশ্চিমের জানালার শিখ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।জারুলের মাথা দেখা যাচ্ছে জানালার শিক গলিয়ে।
ঘরের ভেতর একটা চার পাঁচ হাতের খাট,একটা ওয়ারড্রব,একটা ড্রেসিং টেবিল তার উপর রাখা একটা টেলিভিশন, এক কোনায় একটা টেবিল তার উপর রাখা একটা পানির ফিল্টার! কয়েকটি হাঁড়ি-পাতিল, ব্যস্! এই হচ্ছে লিলির রাজত্বের সম্পদ।
লিলি দেখলো নিজের রাজ্য আর তার মাঝে তার রাজার রাখা সম্পত্তি!






0 মন্তব্যসমূহ