সুখ_প্রান্তর | ঈদ_স্পেশাল_সাক্ষাংকার_শেষাংশ

 #সুখ_প্রান্তর

#ঈদ_স্পেশাল_সাক্ষাংকার_শেষাংশ

#শেখ_মরিয়ম_বিবি



আফিয়া অবাক হলো এহেন কথায়,চমকে দৃষ্টি তুলে ছেলের পানে চাইলো, নিষ্পলক আর নিস্প্রভ গাঢ় চাহনি মেলে জিজ্ঞেস করলো,


“ মানে কি?কারা ডাস্টবিনে থাকে?"


তাইফ ঠোঁট টিপে মায়ের দিকে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে আছে,নাক দুটো শ্বাস-প্রক্রিয়ায় অবিরত ফুলছে নিভছে সঙ্গে সর্দির কারণে ফোঁস ফোঁস আওয়াজ তুলছে। আফিয়া ছেলের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে,তাইফের কথায় নাইফ ভ্রু কুঁচকে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে , আফিয়া আবার‌ও জিজ্ঞেস করলো,


“ কি হলো,কে থাকে ডাস্টবিনে?আর তোমার মাথায় এসব আসে কোথা থেকে বলো তো! দ্রুত তৈরি হ‌ও বাবা, তোমার জন্য আমাকে বকবে তোমার বাবা!"


“ তোমাকে কেন বকবে আম্মু,আমাকে আনার জন্য বকে?"


আফিয়া তাইফের পাঞ্জাবির গলা তাইফের মাথায় ঢুকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো,এহেন কথায় থমকে গেলো। অদ্ভুত রকম প্রশ্ন শুনে তার মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেলো।এর মধ্যেই নাযির সাহেবের গলা শোনা গেলো,


“ ও দাদু ভাইরা কোথায় তোমরা? তাড়াতাড়ি বের হ‌ও,আর কত মায়ের আদর নিবে! ঈদের নামাজ তো শেষ হয়ে এলো বলে!"


শ্বশুরের কন্ঠ শুনতে পেয়ে আফিয়া স্বাভাবিক হলো,জোর করেই ছেলের মাথা দিয়ে পাঞ্জাবি ঢুকিয়ে বললো,


“ তুমি এসব কথা কোথায় থেকে পাও যে আল্লাহ জানে। তোমাকে আনার জন্য বকবে কেন? তোমার দুষ্টুমির জন্য বকে।এখন নেও, তাড়াতাড়ি পরো,নামাজে যাও। আম্মা তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।সালামি নিবে না? বাবাকে,দাদুকে গিয়ে সালাম দেও,সালামি নেও!"


“ লাগবে না আমার সালামি!"


“ এসব কি কথা? এমন কেন করছো তুমি? কাল থেকে দেখছি ছ্যাত ছ্যাত করছো! এমন করছো কেন আব্বা? আম্মাকে বলো!"


আফিয়া তাইফের গাঁয়ে পাঞ্জাবির উপর আতর মেখে দিয়ে গালে গাল ঘষে আদর দিয়ে দিলো। মায়ের আদরে তাইফের অতি চিন্তিত অস্থির মনটা একটু ঠান্ডা হলো।সে নিজের মুখটা হালকা করে পিছনে পুলিশের ন্যায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বড় ভাইয়ের দিকে সরু দৃষ্টি মেলে চাইলো। অতঃপর আবারও মায়ের দিকে ফিরে মায়ের পানে দু কদম এগিয়ে মায়ের গালে আদর দিয়ে বললো,


“ আমি যাই আম্মু!"


হঠাৎ রুপ পরিবর্তন দেখে আফিয়া আবারও বিস্মিত হলো, বিহ্বল হয়ে উত্তর করলো,


“ হ্যাঁ বাবা,যাই না আসি বলতে হয়।"


“ ক‌ই হয়েছে সব তৈরি!"


“ আসসালামু আলাইকুম বাবা, ঈদ মোবারক!"


নাইফ ঘুরে আবারও বাবাকে সালাম দিলো,নাসিফ বড় ছেলের সালামের উত্তর নিয়ে হাসলো, বারবার সালামের অর্থ সে তো ভালোই বোঝে।সে পকেট হাতড়ে বের করলো একটা ব্যান্ডেল। দুটো নোট বের করে বড় ছেলের হাতে দিলো,


“ শুকরিয়া বাবা!"


নাসিফ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো, অতঃপর ছোট জনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,


“ আপনার লাগবে না?"


বলেই নাসিফ একটা নোট বের করে বাড়িয়ে ধরলো তাইফের দিকে,তাইফ বড় ভাইয়ের হাতে থাকা দু'টো নোট আর বাবার হাতে থাকা তার জন্য বাড়িয়ে ধরা একটা নোট বারবার দেখলো অতঃপর নোটটা না নিয়েই তেজালো কন্ঠে বললো,


“ না!"


বলেই দৌড়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। আফিয়া এহেন দপদপিয়ে বাবাকে অবজ্ঞা করে ছেলের চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে স্বামীর দিকে ভীত নজরে চাইলো।এই সময় ছেলের এসব বেয়াদবি নিয়ে যদি লাগিয়ে দেয় তবে ভীষণ খারাপ হবে বিষয়টি।সে নিজের ঠোঁট দুটো একত্রে চেপে ধরে ভীত চোখে চেয়ে রইল,নাসিফ স্ত্রীর পানে চেয়ে ইশারা করলো,জানতে চাইলো,


“ এর আবার কি হয়েছে?"


আফিয়া অসহায় চোখে উত্তর করলো,


“ বুঝতে পারছি না।কি সব বলছে,আর কেমন অদ্ভুত প্রশ্ন করছে।"


“ ক‌ই আসো সবাই!দেরি হচ্ছে তো রে..."


“ জি আব্বা আসছি।চলো বাবু!"


“ আম্মু আমি আসছি।"


“ ফি আমানিল্লাহ্!"


নাসিফ,নাযির সাহেবের পিছনে পিছনে এগুচ্ছে তার পাশে তার বড় ছেলে, এদিকে ছোট ছেলে সবাইকে রেখেই বেরিয়ে পড়েছে। কাউকে সালাম‌ও দিচ্ছে না,কারো সাথে কথাও বলছে না। বারবার পাঞ্জাবির কলার ধরে টানাটানি করছে আর ইতিউতি করে অদৃশ্য কারো সাথে রাগ ঝাড়ছে। দূর থেকে ছেলের এসব অদ্ভুত আচরণ দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো।বিরবির করে বললো,


“ এই ছেলেকে নিয়ে আমি ক‌ই যাবো? কার সঙ্গে এত মেজাজ দেখায় এ! আসি আগে মসজিদ থেকে!"


আফিয়া রান্না ঘর গুছিয়ে সব ধরনের মিষ্টান্ন আর মুখরোচক খাবার দিয়ে ডাইনিং টেবিল ঠাসা করলো, অতঃপর ছোট মেয়েকে তৈরি করলো।বড় মেয়েকে সাজিয়ে গুজিয়ে তার কোলে ছোট মেয়েকে তুলে দিয়ে নিজেও গা গোসল দিতে ঢুকলো।


নামাজ শেষে সবাই বুকে বুক মিলাচ্ছে।তাইফ কপাল কুঁচকে চোখ অর্ধ বুজে চেয়ে আছে দূরে।নাসিফ ছেলের দিকে চেয়ে বললো,


“ ঈদি করো বাবা,মোসাফাহ করতে হয়,বুকে বুক মিলিয়ে ঈদের মোবারকবাদ দিতে হয়।ঈদ তো!"


“ আমি ঈদ করবো না!"


বলেই সে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো। এদিকে তার আগের মাদ্রাসা শিক্ষক বারবার ডাকতে থাকলো।এই বিষয়টি নাসিফকে রাগাতে যথেষ্ট,সে ভীষণ লজ্জা পেলো। বিব্রত হলো।নাযির সাহেব ছেলেকে শুধালেন,


“ কি হয়েছে ছোট গাজীর?"


“ বেয়াদব হচ্ছে দিনদিনই আপনার এই নাতিটা।

বাড়ি গিয়ে আজ যদি পিঠের ছাল না তুলছি!"


“ থাক বকাঝকা করো না। কিছু নিয়ে আপসেট তাই এমন করছে বোধহয়! শান্ত মাথায় জিজ্ঞেস করলেই বলবে!"


“ আর শান্ত, চলুন!"


নাসিফ বেরোবার পথে নাইফের হাতে কিছু ভাংতি টাকা দিলো নাইফ সেগুলো ঈদগাহ ময়দানের আশেপাশে থাকা মিস্কিন, ভিক্ষুকদের মাঝে বিলিয়ে দিলো। এরপর বাবা দাদার পাশে পাশে হেঁটে বাড়ি অবধি আস্তে তার সমবয়সী বন্ধুদের সাক্ষাৎ পেলো। তাদের সঙ্গে কুশলাদি,ঈদ শুভেচ্ছা করতে ঐখানেই দাঁড়িয়ে পড়লো,নাসিফ গাঢ় কন্ঠে ভারী গলায় বললো,


“ তাড়াতাড়ি বাড়ি ঢুকো, তোমার মা অপেক্ষা করছে।"


“ জি বাবা আসছি।"


নাসিফ,নাযির আহমাদ বাড়ি ঢুকলো,ঢুকার পথে ভাড়াটিয়ার তিনটা ছেলে একটা মেয়ে সামনে পড়লো,তারা সালাম দিলো, দু'জনেই সালামের উত্তর দিলো সঙ্গে দিলো সালামি। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতেই নাসিফ হাঁক মেরে আফিয়াকে ডাক দিলো,


“ কি গো ক‌ই তোমার ছোট ছেলে ক‌ই?"


আফিয়া মাত্র চুলের গোড়া শুকাচ্ছিলো,পরনে তার শ্রীগ্রীন রঙের সুতি সালোয়ার কামিজ, মাত্র গোসল করায় স্নিগ্ধতায় ছেয়ে আছে। ছোট্ট ছেলের তালাশে খানিকটা বিচলিত হলো,গামছা খুলে খাটের আড়ের উপর রেখে বেরিয়ে এলো ঘোমটা টানতে টানতে,


“ মানে কি আপনার সাথে নামাজে যায়নি?"


“ নামাজে তো তোমার সামনেই গেলো কিন্তু নামাজ পড়েই দৌড়ে চলে আসছে,সে এখন কোথায়? খবরদার বেয়াদব ছেলেটাকে আজকে আমার হাত রক্ষা করতে যদি তুমি মিথ্যা বলার দুঃসাহস করো তবে আমি ভুলে যাবো আজ ঈদের দিন। তোমার কপালে শনি নামিয়ে ছাড়বো বলে দিলাম !"


চেহারা লাল হয়ে আছে নাসিফের। আফিয়া এবার একটু বেশিই আতংকিত হলো। স্বামীর এই রাগ, ঐদিকে ছেলের অহেতুক অবাঞ্ছিত কথাবার্তা,এখনো ঘরে না ফেরা।সব মিলিয়ে তার ঈদ এমনিতেই দোদুল্যমান অবস্থায় আছে।

নাসিফ পাঞ্জাবির বোতাম খুলে গলার কাছটা মেললো।এসির বাতাস আরো শীতলে নামিয়ে দিলো।তুহির পরনে গোলাপি একটা সুতি ফ্রক,সে নিজের বাঁশি‌ওয়ালা জুতো জোড়া পায়ে দিয়ে প্যা পু বাঁশির আওয়াজ তুলে হেলতে দুলতে বাবার পায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়,নাসিফ চোখ নামিয়ে পায়ের সামনে হাসি হাসি মুখে মেয়েকে দেখে শান্ত হয়,নাইফ‌ বাবার পাশে এসে বসলো, বোনকে কোলে তুলে নিয়ে আহ্লাদ করতে থাকলো।তুলতুল সেজেগুজে পটের বিবি সেজে পুরো বাড়িতে ঘুরঘুর করছে আর ফোনে কিছু করছে।আফিয়া ছোট ছেলের চিন্তা মাথায় রেখেই সবাইকে সেমাই পায়েস দিলো।যদিও কারো‌ই মন ঠিক নেই তাইফকে ফিরতে না দেখে তাও! নাসিফ নিজেকে ঠান্ডা রাখতে যথেষ্ট চেষ্টা করছে কিন্তু তাও পারছে না।সে থেমে থেমে নানা বিষয় নিয়ে আফিয়াকে কথা শোনাচ্ছে যার কারণে বাকী তিনজন ভয়ে তটস্থ হয়ে গেছে,তারা নিজেদের ঘরে বসে চুপচাপ নিজেদের মতো থাকছে।


তাইফ ঘরে আসলো,তাও প্রায় দুই ঘণ্টা পর।তখন নাসিফ মাত্র সদর দরজায় পা দিয়েছে খুঁজতে বের হবে বলে। তখন‌ই পকেটে হাত ঢুকিয়ে হেলতে দুলতে ঘরে ঢুকলো তাইফ সাহেব।নাসিফ ছেলেকে দেখে আড়ালে একটু স্বস্তির শ্বাস ফেললো। কিন্তু উপরে উপরে রাগ জিইয়ে রেখে ভেতরে ঢুকলো।সোফায় বসে তাইফকে উদ্দেশ্য করে বললো,


“এদিকে এসো!"


বাবার গলায় রাগ বুঝে তাইফ ধীর পায়ে এগিয়ে এলো।আফিয়া করুন চাহনিতে অনুনয় করছে ঈদের দিন যেন বাচ্চাটার গাঁয়ে হাত না তুলে।নাযির আহমাদ ছেলের রাগ ঠাওর করে নাতীকে বাঁচাতে নিজেই আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,


“ কোথায় গিয়েছিলেন দাদু ভাই? এভাবে কাউকে কিছু না বলে কোথাও কেউ চলে যায়? বাবা মায়ের চিন্তা হয় না বুঝি?"


“ এদিকে আসো!"


বাবার প্রশ্নে ছেলেকে নিরুত্তাপ দেখে নাসিফের রাগ আর বাড়লো।সে রক্ত চক্ষু নিয়েই আবারও ডাক দিলো।তাইফ পিছনে হাত রেখে বাবার সামনে এসে দাঁড়াল।ঈদের দিন ছেলেকে আঘাত করার মতো বাবা নাসিফ না, এমনিতেই সে বাচ্চাদের গাঁয়ে আঘাত করা পছন্দ করে না নিজে তো করেই না।তাও আজ ভীষণ রাগ থেকে চড় দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বললো,


“ কি সমস্যা তোমার?হুম!"


তাইফ চুপ,নাসিফ সোজা হয়ে বসলো, অতঃপর ছেলের ডান হাতের বাহু শক্ত করে চেপে ধরলো,ক্রোধিত চোখে চেয়ে ভীষণ ক্ষ্যাপাটে গলায় আবারও জানতে চাইলো,


“ কি হলো কথা বলছো না কেন? কোথায় গিয়েছিলে ?

এখনো চুপ করে আছো যে? সাহস দিনদিনই মাথায় উঠে নাচছে? আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিচ্ছো?আছাড় দিয়ে ভুঁড়ি বের করে ফেলবো বেয়াদব কোথাকার?"


তাইফ তখন‌ও চুপ,নাইফ তুলতুল নিজেদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে এদিকে চেয়ে আছে।নাযির আহমাদ ছেলেকে বোঝানোর জন্য শব্দ উচ্চারণ করতেই নাসিফ থামিয়ে দিলো।বাবার দিকে খানিকটা রাগ দেখিয়েই বললো,


“ আব্বা দয়া করে আমাকে একটু দেখতে দিন,এই ছেলের এত দুঃসাহস আসে কোথায় থেকে? আজ ও আমাকে যথেষ্ট লজ্জায় ফেলেছে, কিভাবে লোকের সামনে যাবো? দিনদিনই বেয়াদবের ওস্তাদ হচ্ছে, আপনার নাতির জন্য মাদ্রাসার বড় হুজুর‌ও ফোন দিয়ে অভিযোগ জানায়।বড় হুজুর ফোন করে বলে আমার ছেলের জন্য অন্য ছেলেরাও নষ্ট হচ্ছে,এমন চললে বের করে দিবে।আপনি বুঝতে পারছেন এটা কত বড় অপমান আমার জন্য? আমার ছেলেকে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলছে? এর চেয়ে নিচু অপমান আর কি হয় আব্বা?"


তাইফ শুনছে তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ,নাসিফ আরো শক্ত করে চেপে ধরলো, থুতনি উঁচু করে তুলে ধরে বললো,


“ তাকাও আমার দিকে! কথা বলছো না কেন? তুমি মার্বেল নিয়ে গিয়েছিলে কোন সাহসে?

কথা বলছো না কেন?"


তাইফ ব্যথা পেলো,ছলছল চোখে মায়ের দিকে চাইলো! ছেলের বিরুদ্ধে আয়িত অভিযোগ শুনে আফিয়ার‌ও রাগ হলো।তাই এখন আর ছেলের জন্য দরদ দেখালো না। বরং কঠোর চোখটা ফিরিয়ে নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লো। মায়ের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় তাইফের বাচ্চা অভিমানী মনটা আরো ভাঙ্গলো। বিশ্বাস হলো সে আসলেই এদের কেউ না।নাসিফ ছেলের হাতটা ছাড়লো,ভেজা চোখের মনিকোঠর তার দৃষ্টিঅগোচর হয়নি।হাত ছেড়ে দিয়ে খানিকটা নরম গলায় বললো,


“ আজ ঈদ থেকে ছেড়ে দিলাম।সকাল থেকে তোর বেয়াদবি দেখছি,সহ্য করছি। কোথায় গিয়েছিলে মসজিদ থেকে বেরিয়ে? সেটা অন্তত বলো?"


তাইফ চুপ‌ই র‌ইলো।নাসিফ তেতে বললো,


“ এ্যাই,কথা না বললে বের করে দিবো বলছি।আমার ঘরে এসব ঘাড়ত্যাড়া বদ ছেলে মেয়ে আমি জায়গা দিবো না।এখন‌ই আমার চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যাও।যাও বলছি। অসভ্য!"


কথাটা টনিকের মতো কাজ করলো। ফুঁপিয়ে উঠলো, দৌড়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।তাইফ যেতেই সালমা ফাওযিয়াহ ছেলের উপর চটলেন। ভীষণ ভাবে ক্ষেপলেন।কথা শুনাতে থাকলেন।নাসিফ মায়ের কথা চুপচাপ হজম করতে থাকলো।নাযির আহমাদ ছেলের উপর বিরক্ত হয়ে বিরবির করে ছেলেকে বকতে বকতে নিজের ঘরের দিকে গেলেন। এদিকে আফিয়া রুমে গিয়ে নিজের কাজ করতে থাকলো। ছোট্ট ছেলে নিয়ে তার যে কত নিন্দে শোনা লাগবে এই জীবনে তা ভাবতে বসলো।


তাইফ ঘরে গিয়ে ফুপাতে ফুপাতে নিজের মাদ্রাসার ব্যাগটায় একসেট গেঞ্জি প্যান্ট আর জোব্বা পাজামা ঢুকিয়ে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে কপালের উপর এলোমেলো হয়ে থাকা চুল গুলো ডান হাতের তালু দিয়ে গুছিয়ে নিলো। অতঃপর হনহন করে বেরিয়ে এলো।

নাইফ দরজায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ছিলো,তার করণীয় বুঝতে পারছে না। ঠিক তখনই তাইফকে এভাবে বের হতে দেখে কাঁধের ব্যাগটা টেনে ধরে বললো,


” ব্যাগ নিয়ে ক‌ই যাচ্ছিস?"


“ছাড়ো আমাকে তুমি, ধরবে না আমাকে!”


দুই ভাইয়ের মাঝে টানাহেঁচড়া শুরু হয়ে গেলো।এদের শোরগোল শুনে নাসিফ এদিকে ফিরে সোজা হয়ে বসলো।তাইফ জেদ করছে ছেঁড়ে দেওয়ার জন্য ঐদিকে নাইফ পেঁচিয়ে ধরে রাখছে।


“ কি হচ্ছে এখানে?"


নাসিফ সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো,নাইফ ছেঁড়ে দিলো।তাইফ ব্যাগটা কাঁধে এঁটে ধরে আবারও পা বাড়াতেই এবার নাসিফ ঘাড় ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললো,


“ কোথায় যাচ্ছো!"


“ চলে যাবো আমি!"


“ আচ্ছা চলে যাবে? তা কোথায় যাবে?"


তাইফ বাবার দিকে চাইলো,তার দু'চোখ ভরা অভিমান।নাসিফ এই বাচ্চা ছেলের মুখ ভরা আভিজাত্য আর চোখ ভরা অভিমান দেখে ইতিমধ্যেই ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে তাও।

আফিয়া বেরিয়ে আসলো। ছেলের কাঁধে ব্যাগ দেখে একবার স্বামীর দিকে চাইলো,নাসিফ নিজেও ছেলের আচরণে বিভ্রান্ত। আফিয়া‌ই জিজ্ঞেস করলো আবার‌ও,


“ কোথায় যাচ্ছো ব্যাগ নিয়ে!"


তাইফ মা'কে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলো।আফিয়া ছেলের ব্যবহারে মনোক্ষুণ্ন হলো,স্বামীর দিকে চাইলো।নাসিফ বেশি কথা না বাড়িয়ে তাইফের হাত ধরে টেনে তার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল,বললো,


“ তোমার জন্য এই দরজা আজ বন্ধ।ঈদ তুমি এই ঘরের মধ্যে পালন করবে। তোমার মা খাইয়ে দিবে!"


“ না‌ আমি থাকবো না তোমাদের ঘরে।করবো না ঈদ তোমাদের সেমাই দিয়ে!"


“ তাহলে কোথায় থাকবে? কার সেমাই ঈদ করবে?"


দরজার এপাশ‌ ওপাশ থেকেই বাবা ছেলের প্রশ্ন উত্তর,তাইফ দরজায় আঘাত করছে আর বারবার দরজা খোলার জন্য বলছে।জেদ করছে।এসব দেখে সালমা ফাওযিয়াহ ক্ষেপলেন, ছেলের পিঠে চাপড় মেরে বললেন,


“ কি সমস্যা তোমাদের স্বামী স্ত্রীর, আজকে ঈদের দিন বাচ্চাগুলোকে এভাবে কাদাচ্ছো কেন?দেখো কি চায় ও!"


নাসিফ মায়ের পানে চেয়ে বললো,


“ আপনার নাতি বললে তো বুঝবো? কোন কথার‌ই তো উত্তর দিচ্ছে না, উল্টো রাগ দেখাচ্ছে!"


“ নিশ্চয়ই কিছু নিয়ে মনে কষ্ট পেয়েছে তাই এমন করছে!"


কথোপকথনের মাঝেই ঘরে ভাঙ্গচুরের আওয়াজ শোনা গেলো।নাসিফ ভয়ে তটস্থ হয়ে দ্রুত দরজা খুলে দেখলো তাইফ নিজের খেলনা ছুঁড়ে মারছে দেওয়ালে।নাসিফ দরজার সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো।তাইফ ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বলছে,


“ আমি চলে যাবো!"


ছেলের চোখের পানি দেখে এমনিতেই নাসিফের দেহ শীতল তার মধ্যে ছেলে বারবার বলছে চলে যাবো!সে করুন চোখে চেয়ে শুধালো,


“ মাদ্রাসায় যেতে চাইছো?"


“ নাহ, ঐখানে আমি যাবো না!"


নাসিফ ভ্রু কুটি করলো, দ্বিধান্বিত হয়ে জানতে চাইলো,


“ তাহলে কোথায় যেতে চাইছো?"


“ আমার আব্বু আম্মুর কাছে?"


নাসিফ আফিয়া সহ উপস্থিত সবাই আক্কেল গুড়ুম হয়ে চেয়ে রইলো, আফিয়া জিজ্ঞেস করলো,


“ মানে কি? আর ঐটা রাখো,ঐটা ছুড়ে মারলে বাবা ব্যথা পাবে!"


হাতে একটা চাইনিজ বল,তাইফ ঐটা রাখলো না। উল্টো জেদ নিয়ে বললো,


“ আমাকে যেতে না দিলে ব্যথা দিবো!"


আফিয়া চোখ রাঙালো,ধমকে বললো,


“ তাইফ এবার বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু, অনেক সময় থেকে,সেই সকাল থেকে তোমার এসব সহ্য করছি আমি।ঈদের দিন কি শুরু করেছো তুমি? তোমার জন্য সবার ঈদ মাটি হয়ে যাচ্ছে!"


তাইফ বলটা উঁচিয়ে রেখেই ছলছল চোখে মা'কে দেখছে।নাসিফ খানিকটা এগিয়ে গেলো পা বাড়িয়ে।তাইফ বাবার দিকে চেয়েই র‌ইলো। কিন্তু বল নামালো না।নাসিফ নিজে গিয়েই পাঁজাকোলা করে ছেলেকে উপরে তুললো। কোলের মধ্যে আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো,


“ কি হয়েছে বলো তো? কি নিয়ে তুমি এত ডিস্টার্ব?বাবাকে বলো,কেউ কিছু বলেছে? বাবা কি তাকে পানিশস্ট দিবো? তুমি খুশি হবে?"


“ ছাড়ো আমাকে,আমি তোমার কোলে থাকবো না!"


“ তাহলে কার কোলে থাকবে বলো তো?

আমার আব্বা আমার কোল ছেড়ে কার কোলে গিয়ে চড়বে! আমিও আর বা কাকে কোলে কাঁধে নিয়ে ঘুরবো?"


“ কেন তুমি আমাকে কোলে নিবে? "


“ তুমি আমার আব্বা না? আমার ছোট্ট আব্বা? আমার ছোট্ট কলিজা?"


তাইফ চুপ, নিশ্চুপ।নাসিফ‌ই বললো,


“ কেউ পঁচা কথা বলছে আব্বা? বাবাকে বলেন। মাদ্রাসায় হুজুর বকছে তাই কষ্ট হচ্ছে?"


তাইফ এবার‌ও চুপ!নাসিফ ছেলেকে বিছানায় বসিয়ে দিলো। আফিয়া বিরক্ত হয়ে নিজের কাজে গেলো।নাযির আহমাদ নাতনির পাশে বসে চুলের গোড়ায় হাত চালিয়ে বললেন,


“ আমার দাদা ভাইয়ের কি নিয়ে এত মনোকষ্ট বলেন তো,কেউ কি পঁচা কথা বলছে?"


সালমা ফাওযিয়াহ মুখটা তুলে কপালে কয়েকটি চুমু দিলেন, বললেন,


“ কাউকে কিছু বলতে হবে না।আপনি দাদীর সঙ্গে আসেন তো।দেখেন দাদী আপনার জন্য কি করছি।"


তাইফ ঠোঁট টিপে শক্ত করে চেয়ে আছে।নাসিফ ছেলের নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে হতাশ হলো। নিজের দিকে টেনে নিয়ে গালে হাত বুলিয়ে বললো,


“ বাবাকে বলবে না?

কোথায় কষ্ট হচ্ছে?"


তাইফ বাবা দিকে চাইলো, ফ্যালফ্যাল করে।বেশ সময় নিয়ে বললো,


“ আমি আমার আব্বু মায়ের কাছে যাবো!"


এই কথার বিনিময়ে কি কথা বলবেন কেউ বুঝতে পারছে না। নাসিফ নিজের বাবা মায়ের দিকে এক নজর চেয়ে অতঃপর নিজ পুত্রের উদ্দেশ্যে বললো,


“ আমি কে? আমরা কারা?"


আফিয়া পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তাঁকে দেখেই নাসিফ কথাটা বললো।তাইফ বেশ সাবলীলভাবেই বললো,


“ তোমরা তো আমাকে ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে এনেছো।তাই তোমরা বাবা আর আম্মু। আব্বু মা না তো!"


নাসিফ হাঁটুর উপর ডান হাতের কনুই রেখে তালুর উপর থুতনি ঠেকিয়ে বসলো। অতঃপর ধীম আওয়াজে জিজ্ঞেস করলো,


“ তোমাকে আমরা ডাস্টবিন থেকে এনেছি? এটা কে বললো?"


“ আমি জানি!"


“ কিভাবে?"


“ আমাকে আম্মু এনেছিল তাই তুমি আম্মুকে সবসময় বকো।আর আমি .... আমি যখন ছোট তখন আমাকেও তুমি নানাবাড়ি রেখে দিয়েছিলে যেন আমার গায়ের গন্ধ না আসে!আর কেউ ডাস্টবিনের বেবির সঙ্গে না মিশে নোংরা না হয়ে যায় তাই তুমি আমাকে আদর করোনি,কোলেও নাওনি আম্মুকেও অনেক বকছো অনেক অনেক পঁচা কথা বলছো।"


কথাটা তাইফ না বুঝেই বলছে, উল্টাপাল্টা বলছে। কিন্তু কথার মর্মার্থ কতটা নির্মম তা তাইফ তো জানে না। কিন্তু তার বাবার বুকটা এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে গেল মুহুর্তেই।নাসিফের মুখটা রক্ত শূন্যতায় ছেয়ে গেলো।নিথর চাহনিতে একবার আড়চোখে আফিয়ার দিকে চাইলো, আফিয়া ছেলের দিকে ছ‌লছল চোখে চেয়ে আছে।তাইফ বলেই থামলো।নাসিফ আবারও জিজ্ঞেস করলো,


“ এগুলো তোমাকে কে বলেছে?"


“ কেউ বলেনি,আমি জানি!"


“ কিভাবে জানো?"


“ আমি জানি তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো না। তুমি আম্মুকেও বকো আমাকেও একা একা রেখে আসো মাদ্রাসায় বোর্ডিং এ!"


নাসিফ নিথর চাহনিটা স্ত্রীর থেকে সরিয়ে ছেলের দিকে নিক্ষেপ করলো, অতঃপর নিজেকে ধাতস্থ করতে ছেলের মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো, এরপর খুব শান্ত গলায় বুঝানোর ভঙ্গিমায় বলতে থাকলো,


“ শোন প্রথমত তোমাকে তোমার আম্মু ডাস্টবিন থেকে আনেনি, আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে এনেছে। তুমি ডাস্টবিনে থাকোনি। তুমি তোমার মায়ের জন্য আল্লাহর কাছে ছিলে। তারপর...... বাবা তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তোমার আম্মু বাবাকে না বলেই একা একা আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে এনেছে বলে বাবা একটু রাগ করেছিল তাই দেরি করে তোমাকে বাসায় এনেছিল তাই বলে এই নয় যে বাবা তোমাকে ভালবাসে না। বাবার তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

আর ভালোবাসে বলেই বাবা চায় তুমি অনেক বড় হ‌ও। আল্লাহর পথে বাবা তোমাকে সপতে চায়। তুমি অনেক বড় কামেলদার হবে এই দোয়াই বাবা কামনা।আর উত্তম মুসলিম হ‌ওয়ার জন্য মাদ্রাসার বৈ কোন বড় উত্তম স্থান নেই আববা। তুমি এখন এটা না বুঝলেও আগামীকাল কয়েক বছর পর ঠিক বুঝবে।

আর তুমি দুষ্টুমি না করলে তো বাবা তোমার জন্য আম্মুকে বকা দেই না। তুমি গুড বাচ্চা হয়ে যাও,বাবা আম্মুকে একটুও বকা দিবো না প্রমিজ।"


তাইফ যেন সবটা খুব মন দিয়ে শুনলো অতঃপর খুবই বুঝদার বাচ্চার মতো মাথা দুলিয়ে বললো,


“ আমি আল্লাহর কাছে ছিলাম? "


“ হুম!"


“ ভাইয়া বুবুনের মতোই?"


“ হুম।"


“ সত্যিই?"


“ হুম!"


“ তাহলে ভাইয়া বুবুন কেন বলে আমাকে ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে এনেছে?"


“ তারা দুষ্টুমি করে,তুমিও বলে দিবে, তুমি আল্লাহর স্পেশালে গিফট তোমার বাবা আম্মুর জন্য!"


“ সত্যিই?"


“ হুম,তুমি স্পেশাল। ঠিক কতটা স্পেশাল তা এখন না হলেও বছর কয়েক পর ঠিক বুঝবে।"


তাইফ শান্ত হলো। নাসিফ ছেলেকে বুকের সাথে চেপে ধরলো,তার কেন জানি এত সময় ভীষণ বুক পুড়ছিলো। ছেলেকে শান্ত করতে পেরে এখন ভালো লাগছে।তাইফ স্বাভাবিক হলো। বাবার বুকে চুপচাপ পড়ে র‌ইলো।মিনিট দশ পর আফিয়া সবাইকে সেমাই,পায়েস দিলো।তাইফ বাবার পাশে বসে সেগুলো থেকে খেলো। অতঃপর জেদ করেই বড় ভাইয়ের চেয়ে বেশি সালামি আদায় করে নিলো নিজের জন্য।সেই টাকা নিয়ে আবার বড়াই করতে বেরিয়ে পড়লো বাড়ির বাইরে যা দিয়ে সে আজ সারাদিন ফুটানি করবে।


সমাপ্ত.......


ঈদের ছোঁয়া দিতেই এই পর্বটা লিখা।ভালো লাগলেই সার্থক, বেড়াতে আসছি। ফাঁকে লিখে দিলাম। কেমন লিখছি বুঝতে পারছি না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ