সুখ_প্রান্তর | ঈদ_স্পেশাল_সাক্ষাংকার

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#ঈদ_স্পেশাল_সাক্ষাংকার



সারপ্রাইজ সাক্ষাৎকার....


সেবার কি হলো, রমজানের ঈদ চলে আসলো। অথচ পুরো রমজান মাস জুড়ে তাইফের প্রথম সেমিষ্টারের পরীক্ষা থাকায় তার ছুটি মেলেনি।এই কারণে তার মার্কেটে গিয়ে নিজের জন্য কেনাকাটা করা হয়নি, কিন্তু সেটা বোঝার মতো পরিপক্ক জ্ঞান তাইফ সোনার তো নেই।সে বরং ভেবেই নিলো তাকে কেউ ভালোটালো বাসে না, নয়তো কি একা একা মাদ্রাসায় রেখে যায় জোর করে!


“ তাইফ উঠো বাবা,বাবু উঠছো?"


আফিয়া আড়াআড়ি এলোমেলো হয়ে ঘুমিয়ে থাকা দুই ছেলেকে ডাকছে আর মশারি খুলছে।সেহরি খেয়ে নামাজ, কোরআন তেলাওয়াতের পর‌ই ঘুমিয়েছে। কিন্তু ঈদের দিনের এই সময়ে কি ঘুম ঠিক?


চারদিক জামাতের জন্য ডাক পড়েছে।মাইকে চলছে নানান কেরাতের ধুম।

নাসিফ পাঞ্জাবির বোতাম লাগাতে লাগাতে এদিকে আসছে আর হাক পাড়ছে ছেলেদের উদ্দেশ্যে।আফিয়া দরজার দিকে একপলক নজর ফেলে আবারও চাপা কন্ঠে বড় ছেলের পিঠে হালকা চাপড় মেরে,


“ বাবু উঠো আব্বা,ঈদের দিন কেউ এত ঘুমায়!আজ ঈদ না?"


মায়ের ডাক আর বাপের হাঁকে নাইফের ঘুম ভাঙল,তাও ঝিম মেরে শুয়ে থেকে চোখ পিটপিট করে মেলে মায়ের দিকে চাইলো,কপালে তার দুই চারটা ভাঁজ পড়েছে।ঘুমটা পরিপূর্ণ হয়নি তা বোঝা গেলো।আফিয়া ঝিম মেরে থাকা ছেলের দিকে হাসি হাসি মুখে চেয়ে চুলে হাত বুলিয়ে আলতো করে কপালে স্পর্শ দিয়ে মিষ্টি হেসে বললো,


“ ঈদ মোবারক আব্বা, উঠে পড়েন!"


“ ঈদ মোবারক আম্মু!"


নাইফের সব ঘুম উধাও হয়ে গেল মায়ের নরম ছোঁয়ায়। মিষ্টি হেসে শুভেচ্ছা জানালো। অতঃপর তার পা দু হাতে জড়িয়ে ধরে উবু হয়ে ঘুমানো ছোট ভাইয়ের দিকে চেয়ে বললো,


“ উঠো তাইফ,ঈদ হয়ে গিয়েছে!"


তাইফ উঠলো তো নাই, বরং নড়লো‌ও না।এর মধ্যেই ঘরের মধ্যে নাসিফের আগমন।


“ কি ব্যাপার তোমার ছেলেরা উঠে নাই? জামাত কি সন্ধ্যায় ধরবে নাকি তারা?"


“ এই তো উঠে পড়েছে, তৈরি হতে বেশি সময় লাগবে না আপনি একটু বসার গিয়ে অপেক্ষা করেন।"


“ সে না হয় অপেক্ষা করলাম কিন্তু তার জন্য তৈরি তো হ‌ওয়া জরুরী, পাঞ্জাবি ধরিয়ে দিয়ে চলে আসলে বাকী জিনিস ক‌ই?"


আফিয়া হতাশ চোখে নাসিফের দিকে চাইলো।সব কিছু সে বিছানার উপর গুছিয়ে রেখেই এদিকে এসেছে তাও এই লোক পেলো না। অবশ্য জিনিসপত্র পেয়েছে ঠিক‌ই কিন্তু আফিয়াকে পেলো না সেটাই হলো মূখ্য বিষয়।


নাইফ বিছানায় উঠে বসে চোখ কচলে বললো,


“ বাবা আসসালামু আলাইকুম,ঈদ মোবারক!"


“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম বাবা,ঈদ মোবারক।চলো উঠো, তাড়াতাড়ি উঠো,প্রথম জামাত ধরতে হবে।"


নাসিফ বড় ছেলের পিঠ চাপড়ে উঠার তাগাদা দিলো,আফিয়া পাশ থেকে বললো,


“ দু'জনকে উঠিয়ে ওয়াস রুমে পাঠিয়ে দিন।আমি আপনার জন্য সব গুছাচ্ছি।"


“ হুম!"


নাইফ উঠে বিছানার পাশ ঘেঁষে বাবার পাশে দাঁড়ালো,নাসিফ অর্ধ-উলঙ্গ ছেলের চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে কপালে চুমু দিলো। প্রায়ই কাঁধ বরাবর থাকা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী সুদর্শন কিশোর ছেলেকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,


“ আমার সুদর্শন বেটা, আল্লাহ তোমাকে আরো সুদর্শন, সুপুরুষ, বুদ্ধিমান হিসেবে বড় করুক। মানুষ হয়ে বাঁচো সহস্র বছর,ঈদের দিন বাবা তোমাদের জন্য এই দোয়াই করছি।

বাবার থেকে সালামি চাই?"


নাইফ হাসলো মিষ্টি করে,বাবার বুক থেকে আলগা হয়ে মুখটা তুলে মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো,


“ হুম,সালামি ছাড়া ঈদ হয় নাকি? কিন্তু আমাকে সবার চেয়ে বেশি দিবে আমি বড় না?"


নাসিফ ছেলের বায়না শুনে হাসলো। অতঃপর নিজের বাম হাতটা ছেলের মাথার উপর রেখে বললো,


“ আচ্ছা দিবো, তোমাদের জন্য‌ই তো আমার সব।এখন যাও তাড়াতাড়ি গোসল করে নতুন পাজামা পাঞ্জাবী পরে নেও, প্রথম জামাতে থাকবো বাপবেটারা ইনশাআল্লাহ!"


নাইফ বাবার কথা শেষ হতে সময় দিলো না।তড়াক করে ওয়ারড্রব খুলে নিজের লুঙ্গি আর তোয়ালে নিয়ে গোসলে চলে গেলো। এদিকে দ্বন্দ্ব বাঁধলো তাইফ সাহেবকে নিয়ে। মসজিদে টানা মাস ইবাদত, পরীক্ষার পড়া, নিয়মিত যোগব্যায়াম সহ একাডেমিক চাপে তার ঘুমের সুবিধে হয়নি।যার কারণ কাল বাড়ি আসার পর‌ই সে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে।নাসিফ হাঁক পেড়েও ছোট ছেলেকে উঠাতে না পেরে ভীষণ বিরক্ত হলো।উবু হয়ে শোয়াটা তার আর‌ও পছন্দ না।অথচ তার জন্ম দেওয়া এই ছেলেটা ভীষণ একরোখা, জেদি।এটা জন্মের পর থেকেই উবু হয়ে ঘুমায়।আরবী তো পড়তেই চায় না বরং কোন পড়ালেখাই তার ইচ্ছায় আসে না।সে নাটাইয়ের মতো বাড়িময় ঘুরবে,বাগানে গিয়ে এটা ওটা করবে, গাছে উঠার জন্য পাঁয়তারা করবে, ভাড়াটিয়াদের ছেলেদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজ্যের আকাজে ওস্তাদি করবে।তার বড় দুজনের মুখ কোন ভাড়াটিয়া সহজে দেখে না এদিকে তার এই ছোট ছেলের জন্য অভিযোগ লোকেরা বাড়ি বয়ে এসে করে যায়।

মসজিদ থেকেও অভিযোগ আসছে।এই তো সেদিন হুজুর ফোন করে বলেছিল,সে নাকি মাদ্রাসায় মার্বেল নিয়ে গিয়েছিল,ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সে সহ আর তিনজন মিলে মাদ্রাসার বাগানে মার্বেল খেলছিলো। ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল সেদিন নাসিফ। অদৃশ্য করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে ছেলের জন্য অনুরোধ করে যেন না মারে। বুঝিয়ে সমাধান করে।


কথাটা ভাবতেই নাসিফের রাগ তড়তড় করে আবারও পা থেকে মাথায় চড়ে গেল।সে খানিকটা ক্রোধিত গলায়‌ই এবার ডাক দিলো,


“ নাফিস উঠো,আর কত ঘুমাবে? মাদ্রাসায়‌ও তুমি এহেন গোস্তাকি করো,দেরি করে উঠো,নামাজ মিস দেও, বন্ধুদের নিয়ে মার্বেল খেলো।আর কত অভিযোগ শুনবো তোমার নামে? উঠো তাড়াতাড়ি, জামাতের সময় ফুরিয়ে এলো বলে!"


তাইফের নড়চড় নেই।নাসিফ আবারও ডাক দিতে যাবে তখনই তার কানে ভেসে আসলো কারো চলার রিনিঝিনি গুঞ্জন। নাসিফ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো দরজায়। ডায়পার পরিহিত ছোট তুহি নিজের স্বাস্থ্যবান শরীরটা হেলিয়ে দুলিয়ে এদিকে আসছে।মুখে তার ফোকলা হাঁসি।নাসিফ হেসে দিলো সেই হাঁসি দেখে।তার দুই হাতে সোনার বয়লা পরা,গলায় সোনার চেইন আর কোমরে সোনার ঘন্টি কালো সুতোয় বাঁধা, পায়ে নূপুর।তাকে বোধহয় নতুন জামা পরানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু সে সেই সময় না দিয়ে এদিকে ছুটে আসছে।


“ বাব বাব বাব..."


সদ্য বুলি ফোঁটা তুহি নিজের দুই হাত নাচাচ্ছে আর বাবাকে ডাকছে।নাসিফ ছেলেকে রেখে মেয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে কোলে তুলে নিলো।তুহি বাবার কোলে উঠে বারবার দরজার দিকে ইশারা করছে।নাসিফ মেয়ের ইশারা দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলো। এদিকে তাইফ উবু থেকে সোজা হয়ে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো।তার ঘুম ভেঙ্গেছে কিন্তু বাবার উপর তার ভীষণ রাগ তাই তো উঠছে না।সে নামাজেও যাবে না,এই বাড়ির সেমাই‌ও খাবে না।কারো থেকে সালামিও নিবে না।সে তো এই বাড়ির কেউ না।তবে কেন সে এই বাড়ির কারো কথা শুনবে,কেন কারো সাথে কথা বলবে?সে আজকে ঘুমিয়েই থাকবে।


“ এই তো সব উঠছে, তৈরি করছি। এদের অবস্থা তো বুঝিস‌ই ,তোর ভাইয়া তো সবচেয়ে ছোট মানুষ। পাঞ্জাবি গায়ে ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছি ছেলেদের তুলতে।সে বাটন লাগাতে লাগাতে আমাকে খুঁজতে সেদিকে গিয়েছে সে না কি আর কিছু পাচ্ছে না অথচ সব খাটের উপরেই রাখা।"


আফিয়ার কথায় অপরপ্রান্তে থাকা সাফিয়া হেঁসে দিলো।সে ফোন করেছিল সকাল সকাল ঈদ শুভেচ্ছা জানাতে। অতঃপর টুকটাক আলাপের মাঝে উক্ত বাক্যগুলো বললো আফিয়া। সাফিয়া হাসছে সঙ্গে আফিয়াও।ঠিক সেই সময়েই নাসিফ ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকে।আফিয়া নাসিফকে দেখে ফোনে থাকা বোনকে উদ্দেশ্য করে বিদায় নেওয়ার তাড়ায় বললো,


“ আচ্ছা এখন রাখছি, সবাইকে তৈরি করতে হবে তো।ঈদ মোবারক,ভালো থাক।"


সাফিয়াও বিদায় নিলো।নাসিফ মেয়েকে খাটের উপর দাঁড় করিয়ে একহাতে বুকের সাথে চেপে ধরে আফিয়ার উদ্দেশ্য করে বললো,


“ তোমার ছোট ছেলেকে উঠাতে পারিনি। তাড়াতাড়ি উঠিয়ে তৈরি করে দেও। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে!"


“ কোথায় সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে,সোয়া সাতটায় প্রথম জামাত।এখন বাজে মাত্র ছয়টা।অযথাই বাচ্চাগুলোকে এমন পেরেশান করছেন কেন?"


আফিয়া খানিকটা ঝাঁঝালো গলায়‌ই বললো,নাসিফ চোখ রাঙিয়ে নাক ফুলিয়ে কঠোর শব্দে বললো,


“ এক ঘন্টা ধরে ডেকেও তোর ছেলেদের তুলতে পারিসনি।কোন বাড়ির ছেলেপুলে এত বেলা অবধি ঘুমায় ঈদের দিন? হ্যাঁ, উত্তর দিচ্ছো না কেন?"


আফিয়া নাসিফের রাগ দেখে খানিকটা নিভে গেলো। দৃষ্টি অন্যত্র মেলে মিনমিন করে বললো,


“ সব বাচ্চারা আমার বাচ্চাদের মতো এত বন্দি জীবন-যাপন‌ও করে না।"


“ এ্যাঁ কি বললে, এদিকে ঘুরে,এই যে আমার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট করে বলো কি বললে! এভাবে মিনমিন করছো কেন?"


আফিয়া বুঝতে পারলো অযথা রাগ দেখিয়ে সকাল সকাল কথা বাড়িয়ে একটা অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে এই লোক।তাই সে কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে পাজামা তুলে ধরে বললো,


“ ছেলেদের পরে দেখছি,আগে আপনি তৈরি হোন।"


“ মেয়েকে তৈরি করে দেও।আমার মেয়েই ভালো, একবারে সকাল সকাল উঠে পড়েছে, মাশাআল্লাহ, বারাকাল্লাহ!"


আফিয়া নরম হ‌ওয়াতে নাসিফ‌ও নরম গলায় কথাগুলো বললো।তুহি নিজের ডান হাতের মাঝে বাম হাতের আঙ্গুল পুরে সমান তালে কচলাচ্ছে ঐদিকে তার থুতনি বেয়ে ঝরা লোলে গলা বুক ভেসে যাচ্ছে।আফিয়া মেয়ের এই অবস্থা দেখে নাসিফের কোল থেকে নিয়ে নিজের গাঁয়ে থাকা ওড়না দিয়ে আলতো ছুঁয়ে মুছিয়ে দিলো। মায়ের ছোঁয়া অনুভব করে তুহি নিজের দন্ত বিহীন মাড়ি বের করে ফিক করে হেসে দিলো।যা দেখে আফিয়াও হাসলো।


নাইফ লুঙ্গি পরে, তোয়ালের এককোনা কাঁধে ফেলে রেখে অন্য কোনা দিয়ে ঘাড় মুছতে মুছতে বের হলো।তখন তাইফ বিছানার মাঝবরাবর চিত হয়ে শুয়ে আছে।নাইফ তোয়ালে ঘাড়ে ফেলে রেখে লুঙ্গির ভাঁজ তুলে ধরে বিছানার দুই পাশে হাত ঠেকিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে,


“ এ্যাই তাফু উঠে পড়। অনেক ভং ধরেছিস। এবার বাবা আসলে কপালে শনি ছাড়াবে বলে দিচ্ছি।"


কতক্ষন আর ভং ধরে থাকা যায়!ঘুম ভাঙ্গলেই বা আর কতকাল এভাবে নেতিয়ে বিছানায় পড়ে থাকা যায়?আদৌওতে তার কোন সুফল আছে? ঐ যে চারদিকে মাইকে ডাকাডাকি হচ্ছে!সবাই ঈদের জামাতে যাচ্ছে।তাইফের মনে পড়লো একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কথা।


আচ্ছা সে যদি এই বাড়িতে না থাকতো,যদি সত্যিই সত্যিই সে রাস্তায় থাকতো,যদি সে ছেলেগুলোর মতো কাগজ কুড়াতো,যদি সেও কোন রেলস্টেশনে ময়লা বস্তা নিয়ে ঘুরতো আর রাতে সেখানে ঘুমিয়ে পড়তো তবে কি তার ঈদ হতো? আচ্ছা তাকে যদি হাসপাতাল, না না!বুবুনের কথায় হাসপাতাল হলেও ভাইয়ার কথায় কোন এক ময়লার আঁস্তাকুড়ো থেকে তাকে নিয়ে আসছে! আচ্ছা কোনটা সত্য? হাসপাতাল না কি ময়লার আঁস্তাকুড়ো! উমম! যেহেতু ভাইয়া বড় সেহেতু ভাইয়া বেশি জানে।আর ভাইয়া বেশি জানেই মানে হলো ভাইয়ার কথাই সত্য!তাহলে সে কোন এক ময়লার আঁস্তাকুড়োয় ছিলো! তার যে আসল বাবা মা তাকে তারা সেখানেই ফেলে রেখে গিয়েছিল আর এখনকার যে বাবা আম্মু তারা মায়া দেখিয়ে তাকে তুলে নিয়ে আসছে আর এখন বড় করছে!তাই তো তার প্রতি তাদের বেশি ভালোবাসা নাই।তাকে সবসময় ধুর ধুর করে। তাকে সবসময় দূরে রাখে।শুনেছে সে তাকে আনবে বলেই তো আম্মুকে বাবা বকা দিয়েছিল এবং আম্মু বাবার সাথে রাগ করে নানাবাড়ি চলে গিয়েছিল। এরপর?


তাইফের ভাবনা ফুরোবার নয়।সে ভাবছে অবিরত। কিন্তু তাকে বেশি সময় দেওয়া হলো না।নাইফ হাতের মুঠোয় করে পানি নিয়ে তাইফের মুখে ছুড়ে মারলো।সজাগ মানুষ, চোখের উপর পানি পড়ায় চটচট করে ছিটকে দাঁড়িয়ে পড়লো।ডান হাত দিয়ে চোখ মুখ চেপে মুছে বড় ভাইয়ের দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে রইল।নাইফ হাস্যোজ্জ্বল মুখটা উঁচিয়ে ছোট ভাইয়ের হাত ধরে নিজের দিকে টান দিয়ে বললো,


“ ভান করছিস কেন বল?তুই ঘুমানোর ভং করলেই বেঁচে যাবি? ফাজিল, সবসময় নামাজ কামাই করার ফন্দি আঁটে!"


“ ছাড়ো আমাকে; আমি যাবো না কোথাও!"


“ কেন যাবি না? ঈদের দিন কেউ এই কথা বলে?উঠো তাড়াতাড়ি,চল নামাজ পড়ে নানাবাড়ি যাবো,দেখবি মামা আজকে অনেক সালামি দিবে!"


“ লাগবে না তোমাদের সালামি আমার। তোমাদেরটা তোমরাই নেও!"


বলেই নিজের হাত ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে নামলো বিছানা থেকে,পলকেই বাথরুমে ঢুকে পড়লো।

নাইফ এই পিচ্চি ভাইয়ের এই আচরণের আগামাথা কোনটাই বুঝতে পারছে না।সে হতভম্ব হয়ে বাথরুমের দরজার দিকে চেয়ে রইল।


নাসিফকে তৈরি হতে সাহায্য করছিলো আফিয়া,তুহি সেই সুযোগ পেয়ে আবার‌ও বেরিয়ে পড়েছে।এবার তার গন্তব্য দাদার ঘর।নাসিফ আতর মাখছিলো,আফিয়া পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। তুলতুল টুকটুকে লাল একটা সিল্ক সালোয়ার কামিজ গায়ে জড়িয়ে বাবা মায়ের ঘরে ঢুকলো,


” আসসালামু আলাইকুম আম্মু বাবা,ঈদ মোবারক!"


সে সদ্য গোসল করায় তার চুল বেয়ে টুপটপ করে পানি ঝড়ছে যা তার কোমর ভিজিয়ে দিচ্ছে।আফিয়া স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে‌ই মেয়েকে দেখলো, অপলক,মনভরে।বিরবির করে বললো,


“ মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ।"


একসাথে দুজন সালামের উত্তর দিলো।নাসিফ হাত বাড়িয়ে ইশারায় মেয়েকে ডাকলো।তুলতুল বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে মৃদু দৌড়ে বাবার বুকে পড়লো।নাসিফ মেয়েকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে কপালে গভীর করে চুমু দিলো।দুই গালে হাত রেখে উঁচিয়ে ধরলো।চোখের বন্ধ পাতায় আদর দিয়ে বললো,


“ আমার চক্ষুশীতল করা রাজকন্যা। আল্লাহ তোমাকে সবচেয়ে সুশ্রী চেহারার অধিকারীনি বানিয়ে আমার ঘরে পাঠিয়েছেন, তুমি আজীবন আমার দায়িত্ব। মৃত্যু অবধি আমি আমার দায়িত্বে সচেষ্ট থাকবো আম্মা। আল্লাহ তোমাকে হেফাজতে রাখুক।"


“ আমীন!"


পাশ থেকে বললো আফিয়া।তুলতুল বাবার বুক থেকে মুখ তুলে মায়ের বুকে রাখলো।আফিয়াও মেয়েকে আদরে আদরে সিক্ত করে দোয়ায় দোয়ায় মেয়ের কল্যাণ কামনা করলো।


“ এ্যাই তুই এমন ঘুরঘুর করছিস কেন তাইফ? তাড়াতাড়ি তৈরি হ‌।আয় হেল্প করি।"


“ লাগবে না আমার কারো হেল্প আমি একা একাই পারবো!"


পাঞ্জাবি, পাজামা না পরেই ভেজা চুলে চিরুনি ঢুকিয়ে ওলোটপালোট আচড়াচ্ছে আর এদিকে ওদিকে ঘুরছে।নাইফ পাঞ্জাবি পরে পাজামার পকেটে হাত গলিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের নটাংকি দেখছে।মূলত সে অবজারভেশন করছে।মুখটাকে বাংলার পাঁচ বানিয়ে রেখে সে সবটা করছে।


“ উঠেছো দুই ভাই?"


আফিয়া প্রশ্নটা করতে করতেই ঘরে ঢুকলো।ঘরে ঢুকেই সাদা পাঞ্জাবি পাজামায় শুভ্রতায় ডুবে থাকা বড় ছেলেকে দেখে তার মাতৃ দৃষ্টি শীতল হলো।নাইফ মা'কে দেখে আবারও মিষ্টি হাসলো। আফিয়া ছেলেকে দেখে বিরবির করে পড়লো,


“আমি তোমাদের দুজনের জন্য আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কালেমাগুলোর মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত প্রাণী থেকে এবং সর্বপ্রকার কুদৃষ্টি থেকে মুক্তি কামনা করছি।"


“ আম্মু দেখো না কেমন করছে তোমার ছেলে!"


নাইফ ভাইয়ের নামে মায়ের কাছে অভিযোগ করলো।তাইফ এই অভিযোগ শুনে কপাল কুঁচকে, নাক কুঁচকে আড়চোখে একবার বড় ভাইকে দেখলো অতঃপর আবারও অযথাই চিরুনি দিয়ে চুল এদিক ওদিক করছে। আফিয়া বড় ছেলের অভিযোগ শুনে কোমরে কমলা রঙের তোয়ালে পেঁচিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল নিয়ে ব্যস্ত থাকা ছোট ছেলের দিকে এগিয়ে গেল,হাত থেকে চিরুনিটা কেড়ে নিয়ে থুতনি ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো।তাইফ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।আফিয়া ছেলের চুল গুছিয়ে দিতে দিতে বললো,


“ গায়ে কাপড় না জড়িয়ে কে আগে চুলসেট করে আব্বা! তুমি এত এলোমেলো কাজ করো কেন? ভাইকে দেখেও কিছু শিখবে না?"


“ লাগবে না আমার কিছু শেখা!"


বলেই মায়ের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বারান্দায় চলে গেল।নাইফ বড় বড় চোখ করলো,আফিয়াও হতবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালো। পর মূহুর্তেই বারান্দায় গিয়ে বাহু ধরে টেনে নিয়ে আসলো ঘরের মাঝে।


“ কি হচ্ছে কি তাইফ? সকাল সকাল কি বেয়াদবি শুরু করেছো তুমি? বাবা,দাদু তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে;ঈদের জামাত কি বেশি সময় থাকে?"


“ আমি যাবো না!"


“কোথায় যাবে না?"


“ ঈদের জামাতে!"


“ হায় আল্লাহ এসব কি কথা? কেন যাবে না তুমি ঈদের জামাতে?ঈদের দিন কেউ এসব কুকথা বলে? ঈদের দিন নতুন জামা পরে প্রথম কাজ‌ই তো হয় ঈদের নামাজ আদায় করতে জামাতে অংশ নেওয়া। সেখানে তুমি!"


“ কিন্তু যারা ডাস্টবিনে থাকে তো তাদের কোন জামা হয় না।তাহলে তারা কিভাবে ঈদের জামাতে যায়?"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ