সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_১২৩

 #সুখ_প্রান্তর

#শেখ_মরিয়ম_বিবি

#পর্বসংখ্যা_১২৩



[কপি করা/চুরি করা/শেয়ার করা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। নিজের ফিডেও পোস্ট করা যাবে না। আপনার ভালো লাগলে অবশ্যই আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন।]


বাবা আপনি কি জানেন আপনার ছেলে আজ কত বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাও একা একা!"


নাসিফ মুখের সামনে তুলেও সবজি মেশানো রুটির টুকরো ধরা হাতটা নামিয়ে ফেললো,প্লেটে আঙ্গুল ঠেকিয়ে পুত্র বধূর মুখ পানে জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে শুধালো,


“ মানে?"


আফিয়া পাশ থেকে ব‌উকে একবার দেখলো, অতঃপর ছেলেকে দেখলো। এরপর জিজ্ঞেস করলো,


“ কোন বিষয়ে বলছো ব‌উমা?"


“ আম্মা,আপনি তো আপনার ছেলেকে কোল থেকেই নামান না।বাবু বাবু ডেকে তাকে এখন‌ও বাবুই বানিয়ে রেখেছেন।সেও নিজেকে বাবুই রাখতে চায়,তাইতো ঘরে ঢোকা রহমতকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়।"


নূর কথাটা বলে মাথাটা নুইয়ে ফেললো।


“ মানে?"


আফিয়া বিস্মিত, বিস্ফোরিত চাহনিতে প্রশ্নখানি করলো।

নাবীহা মাত্র মুখে গ্লাস লাগিয়ে পানি পান করছিলো।ঐ অবস্থাতেই থেমে গেলো। নাইফের ভ্রু কুঁচকে এলো। কন্ঠে ক্রোধের আভাস রেখেই বললো,


“ এটা কথা বলার কেমন ধরন নূর,তাও আম্মুর সাথে?"


“ যা সত্য তাই বলছি। পৃথিবীর কোন ছেলে বত্রিশ বছর বয়সেও নিজের ব্যক্তিগত জীবনে মা'কে ঢুকায়?কোন ছেলে মায়ের অনুমতি ছাড়া শ্বশুর বাড়িতেও যায় না? আচ্ছা এটাও মানলাম সবাই এক নয় তাই বলে এত বড় সিদ্ধান্ত কে নেয়? এটা তো মরনাত্নক সিদ্ধান্ত!"


“ কোন বিষয়ে কথা বলছো সেটাই তো বুঝতে পারছি না।"


নাসিফের প্রশ্ন।নাইফ অনুরোধের সুরে বললো,


“ নূর প্লিজ এই বিষয়ে আমাদের রাতেই কথা হয়েছে

অযথা বাবা মা'কে হয়রানি করার যৌক্তিকতা নেই।"


“ কেন নেই। বাবার‌ও তো জানা উচিত তার ছেলে কত বড় বড় সিদ্ধান্ত একাই নেয় অথচ তারা এখনো তাকে বাবু বলে বিশ্বাস করে!"


“ নূর!"


নাইফ চোখ রাঙানি দিয়ে মৃদু কন্ঠে ধমক দিলো।আফিয়া ছেলেকে শাসনের সুরে বললো,


“ ওকে চোখ রাঙাছো কেন?বলতে দাও।"


“ হ্যাঁ তাই,এখানে আমরা আছি তো। যেহেতু ও আমাদের কাছে বলতে চাইছে তার মানে বিষয়টা গৌণ।

বলো ব‌উমা!"


নাসিফের আদেশ পেতেই নূর বলতে আরম্ভ করলো,


“ আপনার ছেলে পরপর কয়েকবার রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার রিজেক্ট করেছে।বাবা বলেন তো কোন পাগলেও গর্ভরমেন্ট জব রিজেক্ট করে?"


“ মানে কি ? নাইফ! কি বলছে ব‌উমা?"


নাসিফের চোখ বড় বড় হয়ে গেছে।আফিয়াও অবাক হয়ে শুধালো,


“ বাবু ব‌উমা কি বলছে এগুলো? কখন, কবে? আর রিজেক্ট মানে কি?"


নূর আফিয়ার প্রশ্নে আড়ালে ভেংচি কাটলো।যা দৃষ্টি অগোচর হয়নি নাবীহার।

আফিয়া ইতিমধ্যেই উত্তেজিত হয়ে পড়েছে।নাসিফ নিজ স্ত্রীকে সামলানোর জন্য বললো,


“ শান্ত হ‌ও,বলছি কথা।

বলো কি সমস্যা তোমাদের মাঝে?"


“ তেমন কিছু নয় বাবা।ও অযথা বিষয়টি নিয়ে এত মাতামাতি করছে।"


“ অবশ্যই বিষয়টা বড়, যেখানে তোমার মা'কে দোষারোপ করা হচ্ছে সেখানে অবশ্যই বিষয়টা বড় এবং জটিল।অযথা আমি আমার স্ত্রীকে কারো তোপের মুখে পড়তে দিতে পারি না।সে বিশ পঁচিশ বছর আগেও দেইনি,এখনো দিবো না। অনেক কথাই আমার কানে যায়,নানা কারণ বশত কোনটাই গুরুত্ব দিতে পারি না। কিন্তু এখন যখন আমাদের আদর স্নেহ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সেহেতু কথা তো অবশ্যই বলতে হবে।

বলো তুমি কি নিয়ে ব‌উমার অভিযোগ,কেন সে এমন কথা বললো?"


“ বললাম তো বাবা তেমন কিছু না।এটা আমার একান্ত ইস্যু, আমি নিজেই সমাধান করে নিবো নে।আমি নূরের হয়ে স্যরি বলছি।আম্মু!"


নাইফ খুব অসহায় কন্ঠে মা'কে ডাকলো। করুন চোখে চেয়ে মায়ের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে ক্ষমার আকাঙ্ক্ষা রাখলো।আফিয়া ছেলের বাহুতে হাত দিয়ে আলতো করে ছুয়ে বললো,


“ মায়েরা রাগ করে না কখনো। তাছাড়াও ব‌উমার অভিযোগ একেবারেই ভীত্তিহীন নয়। তোমাকে বাবু ডেকে ডেকে আসলেই আমি বাবু বানিয়ে রেখেছি।যাই হোক ব‌উমা যা বলে শোনো।সে তোমার স্ত্রী, তোমার একান্ত সঙ্গী, তোমার কল্যাণ তার চেয়ে বেশি কেউ চাইবে না বাবা।মনে রাখবে তোমার ভালো থাকা মানেই তার ভালো থাকা।অযথা নিশ্চয়ই তোমাকে কোন বিষয়ের জন্য চাপ দিবে না।"


“ আম্মু প্লিজ এভাবে এক্সপ্লেইন করবে না।আমি খুব ভালো করেই জানি কে আমাকে কতটা ভালোবাসে,কতটা গুরুত্ব দেয়।

আর তোমার ব‌উমার সব আবদার মানতে আমি একান্ত বাধ্য ন‌ই,সেটা তোমার ব‌উমাকে ভালো করে বুঝে নিতে বলো। অন্তত যেখানে জড়িয়ে থাকবে আমার ফ্যামিলি ইস্যু।"


নাইফ নিজের কথা শেষ করে উঠে দাড়াতেই নাসিফ রাগান্বিত কন্ঠে বললো,


“ দাঁড়াও কোথায় যাচ্ছো? কথা শেষ হয়েছে? এখন অবধি তুমি এটা বলোনি কেন তুমি এত বড় সুযোগ ছেড়ে দিলে?"


“ বাবা এখানে বলার কি আছে? তুমি তো জানোই আমি, আমার ড্রিম বুয়েট। রুয়েট,চুয়েট, কিংবা কুয়েট নয়। তাছাড়াও আমি পরিবার ছেড়ে বাইরে থাকতে পারি না। পারলে তো নিশ্চয়ই তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে আর্মিতে ট্রাই করতাম!এই চাকরির অফার তো নতুন নয়।আগেও দুইবার এসেছিল আর আমিও রিজেক্ট করেছিলাম।

সবচেয়ে বড় কথা এটা আমার একান্ত বিষয়।আমি কোন সেক্টরে ,কোন পজিশনে,কোন ফিল্ডে জব করবো সেটা টোটালি আমার ব্যক্তিগত চয়েস।এখানে কেন আমি এই বয়সে জবাবদিহিতার শিকার হবো।আগেও তো এক‌ই জায়গা থেকে প্রপোজ এসেছে আমি স্বাচ্ছন্দ্যে সেটাকে রিজেক্ট করেছি!

আমি বুঝতে পারছি না এটাতে ওর সমস্যা কোথায়?"


“ তোমার অভিযোগ কি ওর এই চাকরি রিজেক্ট করায়?"


আফিয়া ব‌উমার দিকে ঘুরে প্রশ্ন করলো।নূর মাথা নুইয়ে রেখে দাঁড়িয়ে আছে।আফিয়াই আবার বলা শুরু করলো,


“ আমার ছেলে কি কামাই কম করে মা? তুমি কি তোমার বাবার বাড়ির চেয়ে খারাপ আছো? মানে অর্থনৈতিক কষ্ট পাচ্ছো? আমি তো জানতাম আমার ছেলে মাশাআল্লাহ যথেষ্ট ভালো আয় করে।সে তোমাকে বিয়ের দেনমোহর হিসাবে যা দিয়েছে সবটা তার রোজগারের।এক টাকাও তোমার শ্বশুরের থেকে নেয়নি। এমনকি রুজি করা শুরু থেকে এখন অবধি কোনদিন বলেনি আম্মু আমার টাকা দরকার।আমার ছেলে যেভাবে সৎ রোজগার করে ঠিক সেভাবেই সৎ কাজে সঠিক পথে খরচ করে। অযথা খরচ সে ছোট থেকেই করে না।

সে যাই হোক তুমি কি চাইছো তোমার স্বামী সরকারি চাকরিজীবী হোক?কেন মা? তোমার কাজিনদের স্বামী সরকারি চাকরিজীবী তাই? তাদের গায়ে ওমুকে ব‌উ লেখা থাকে তাই? কিন্তু মা তোর মনে রাখা উচিত তোমার স্বামী খুবই পুরানো, বংশগত ব্যাবসায়িক ঘরের ছেলে, আল্লাহর রহমতে তার গাঁয়েও সফল ব্যাবসায়ী ট্যাগটা লাগানো।

চাকরি যেটা করে সেটা না করলেও চলবে, তোমার কোন কিছুতেই কমতি হবে না।যদি তোমার মনে হয় তোমার প্রতি মাসে গহনা জোরানো লাগবে তাহলে বলবে, দেখবে সে তোমাকে গহনায় মুড়িয়ে রাখবে। তোমার কাছে অনুরোধ তাও এভাবে পুরো পরিবারের সামনে, ছোট ভাই বোনদের সামনে আমার ছেলেকে লজ্জিত করবে না।এটা তাকে ছোট করার সামিল।স্বামীকে বড় করতে না পারো, তাকে তার কাছের মানুষের নিকট ছোট অন্তত করবে না।"


“ দেখো মা,আমরা খুবই সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত।এই দেখো আমি উচ্চ শিক্ষিত হয়েও কিন্তু ব্যাবসায়ী।এটা একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়,কে কি নিয়ে কাজ করে এটা একান্তই তার ব্যক্তিগত পছন্দ, এখানে অন্য কারো মতামত দেওয়া,জোর খাটানো উচিত নয়।তবে হ্যাঁ যদি অসৎ কিছু করে তবে তখন অবশ্যই তাকে রুখতে হবে,বোঝাতে হবে। সেখানেও কিন্তু জোর করা চলে না।

তুমি চাইছো তোমার স্বামী সরকারি কর্মকর্তা হোক,আমি কিন্তু কখনোই এটা চাইনি।আমি চেয়েছি আমার ছেলে স্বাধীন হোক, রোজগার করুক,যখন যেখানে মন চাইবে বেড়াতে যাক, পরিবারের সাথে সময় কাটাক।এটা অবশ্যই কোথাও দায়বদ্ধ থাকলে সম্ভব নয়।এখন অবশ্য সে দুটোই ব্যালেন্স করে চলছে। সবচেয়ে বড় কথা মা আমার তো দুটোই ছেলে,দুজন‌ই যদি এভাবে বাইরে নিজেদের বিজি করে ফেলে তবে আমার এত বড় ব্যাবসার কি হবে?আমার মরার পর তো এগুলোর উত্তরাধিকার এরাই। একজন পারছে না, অন্তত আরেকজন পারুক। সবটা বুঝে নিক। এমনিতেও সে বড়, দায়িত্ব নিয়ে ভবিষ্যতে সবটা ভাই-বোনকে বুঝিয়ে দিবে। আশাকরি সরকারি চাকরির যাঁতাকলে আমার ছেলেকে পিষে ফেলার জন্য জোর করবে না। তোমার কোন কিছুতেই অভাব হবে এতটুকু নিশ্চয়তা আমি দিতে পারি আমার ছেলের হয়ে।"


“ আচ্ছা ভাবী তোমার মাথায় হঠাৎ করেই ভাইয়াকে সরকারি চাকর বানানোর খোয়াইশ কেন জাগলো? তুমি তো জেনেই বিয়ে করেছো যে আমার ভাইয়া পার্ট টাইম প্রাইভেট শিক্ষকতা করে, পারিবারিক ব্যাবসায়িক। তাছাড়াও আমার ভাইয়া একজন প্রতিভাবান প্রকৌশল,সে ভালো একটা ফার্মে ট্রেইন করায়।এত কিছুর পরেও এখন ভাইয়াকে সরকারি চাকরির জন্য জোর করছো? কেন? এই ভুত কেন চাপলো তোমার মাথায়?"


“ আহ্ বাদ দাও আম্মা, তোমার দেরি হচ্ছে না।যাও যাও বের হ‌ও!

ওঠো আমিও বের হবো।"


বড় মেয়েকে থামিয়ে দিয়ে, স্ত্রীর উদ্দেশ্যে শেষ লাইনটা বললো।নাবীহা বাবার কথার পর কথা বাড়ালো না। নিজের সাদা পোশাকট কনুইয়ের উপর ভাঁজ করে ফেলে,ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিকাব নামিয়ে নিলো। অতঃপর মায়ের উদ্দেশ্য করে বললো,


“ আম্মু মা আসতে পারে।আমি বলেছি আমার চারটা অবধি টানা ক্লাস থাকবে।ফোনে পাবে না।উনি আজকে এখানে থাকবে।"


“ আছে যাও, সাবধানে যাও।ফি আমানিল্লাহ্, আল্লাহ তোমার সহায় হোক।"


আফিয়া বিরবির করে দোয়া পাঠ করে মেয়ের গায়ে ফু দিয়ে দিলো।নাবীহা হাসি মুখে মায়ের দিকে বিদায় নিয়ে ছোট বোনকে উদ্দেশ্য করে বললো,


“ তোমার জন্য কিছু আনতে হবে?"


“ না,তবে দিবার জন্য রঙ নিয়ে এসো। নয়তো একটা কালার‌ও থাকবে না!"


“ আচ্ছা নিয়ে আসবো।"


নাবীহা বেরিয়ে গেলো।আফিয়াও উঠে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। তুহিও নিরবে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো।

র‌ইলো কেবল নাইফ,নূর আর সালমা ফাওযিয়া।

নাইফ কঠোর চোখে নূরকে দেখলো অতঃপর শব্দহীন ক্রোধে ফেটে উঠে দাঁড়ালো,পাশেই রাখা কোর্ট,ব্যাগটা তুলে নিয়ে দরজা অবধি গেলো। পিছনে ফিরে বললো,


“ আম্মু আমি গেলাম।

দাদী সাবধানে থেকো।"


এমন অবজ্ঞা নূরের হজম হলো না।সে গটগট করে নিজের ঘরে গিয়ে ধপাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো।বয়স্কা বৃদ্ধা সালমা ফাওযিয়া নাতি ব‌উয়ের এমন বেলাগাম কথা আর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে নির্বাক হয়ে গেছেন।তিনি সবটা দেখলেন এবং কিছু অনুমেয় করেই মুখটাকে করুন বানিয়ে আফসোস করতে বসলেন।


_____________________________


লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ নাফিস ওয়াসীত্ব গাজী, গৌরবময় আর্মিদের গেঞ্জি পরিহিত,মাথায় ক্যাপ,গাল ভর্তি চাপ দাঁড়ি নিয়ে লম্বা শ্যাম বর্ণের রোগা পাতলা একটা ছেলে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটে তার মুচকি হাসি।আফিয়া বসার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে দিলো। কতদিন পরে দেখেছে তার মানিককে! টুকটুকে ফর্সা ছেলেটার গা এখন মেঘের রঙ ধারণ করেছে।ভরাট গোলাগাল গাল।তা ভেঙে একদম চাপার সাথে লেগে আছে।ডাগর ডাগর চক্ষু জোড়া শুকিয়ে ভেসে আছে।তাতে জ্বলজ্বল করছে কিছু পাওয়ার খুশি। ঠোঁটের ঐ হাসি পরম তৃপ্তির। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো আফিয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ