#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১২২
[কপি করা /চুরি করা কিংবা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন, আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন।]
“ ভাবী মনি, এদিকে একটু দেখো না প্লিজ!"
বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুহি নিজের লাগানো গাছে পানি দিচ্ছিলো আর লাউয়ের ডগায় ঝুঁলে থাকা সবুজ পাতার ন্যায় কীটকে দেখে আঁতকে উঠে ভাবীকে ডাক দিলো।নূর তখন নিজের বারান্দায় বসে রৌদ্রবিলাসে মুখটাকে উঁচিয়ে আকাশ পানে চোখ বুজে রয়েছে।এডজাস্ট লম্বা বারান্দায় কেবল ঘরের সীমান্ত নির্ণয়ের জন্য মাঝে মাঝে আর্টিস্টিক দেওয়ালে লতানো ফুলের বেরি দেওয়া।যেটা বেয়ে নিচের দিকে নামছে।মানি প্ল্যান্ট আর বাহারি অপরাজিতার সঙ্গে ভীঙ্গরাজের সমাহারে অপূর্ব এক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই অংশটুকু।নাবীহা আর তুহির খুব যত্নের ফলাফল এরা। আফিয়ার এই গুণটা তার দুই কন্যাই বেশ ভালো ভাবেই আয়ত্ত করতে পেরেছে।
কিন্তু আফিয়ার দুর্ভাগ্য তার বড় পুত্র মোটেই বৃক্ষ প্রেমী কিংবা বই প্রেমী নয়।তার চেয়ে তার কাছে ঢের শ্রেয় লাগে নিজেকে সাজানো। সারাদিন সাজগোজ করে পটের বিবি সেজে ঘরময় ঘুরঘুর করা তার অন্যতম শখ বলা যায়।পায়ের নূপুরের ছন্দে বাড়ির নিরবতায় ছন্দপতন ঘটানো তার অন্যতম ভালোলাগা।যদিও রান্না বান্নায় তার হাত দুর্দান্ত।সেটা সে বেশ করে। নতুন নতুন রান্নার রেসিপি আবিষ্কার করা তার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয়।
হয়তো এমনই,সবার সব ভালো লাগবে না,লাগেও না।আফিয়া এটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই দেখছে। পৃথিবীর সব মানুষ তো এক হবে না।এটাই স্বাভাবিক।এক হলে কি পৃথিবী বৈচিত্র্যময় হতো? এত রঙ,এত ঢং এত বৈশিষ্ট্য কি থাকতো?
তার দুই কন্যা যেমন পুত্র বধূও যদি তেমনি হয় তবে কি তাতে সংসারে বৈচিত্র্যতা আসতো? একটু ভিন্ন বলেই তো এখন নতুন নতুন জিনিস শিখতে পারছে, দেখতে পারছে!
বাড়িতে আরেকজন সদস্য নতুন যোগ হয়েছে,নূরের পোষ্য,‘শেরনি'! বিড়াল রমনী নূরের বাপের বাড়ি থেকে আনা একমাত্র উপহার।যেটা নূরের সঙ্গী।
তুহির ডাকে নূরের ধ্যান ভঙ্গ না হলেও শেরনির ঠিকই হয়েছে।সে দৌড়ে আসলো,তুহি নামক কিশোরীকে তার ভীষণ পছন্দ।এই রমনী তাকে অনেক আদর করে।যখনই বাইরে যাবে তার জন্য কিছু না মজা নিয়েই আসবে।তাই তো তুহি নামক কিশোরীর গা ঘেঁষে থাকতে চায় যদিও তার জননী মোটেই সেটা পছন্দ করে না।
“ ভাবি মনি!"
মৃদু আর্তনাদ করে তুহি নিজের হাতে থাকা পানির পাইপটা ছুঁড়ে মেরে একটা লাফে পিছিয়ে গেলো।হাত দুটো বুকের সামনে রেখে থরথরিয়ে কাঁপছে,তার কমলার কোয়ার ন্যায় পাতলা আর নরম গোলাপী ওষ্ঠ জোড়াও অবিরত কাঁপছে। ছলছল চোখে তার দিকে মাথা উঁচিয়ে লেজ এঁকে বেঁকে এগিয়ে আসা বিচ্ছু নামক কীটের দিকে চেয়ে রয়েছে।
“ মিঞাও "
বলেই তুহির পায়ে গা ঘেঁষে জিহ্ব দিয়ে সালোয়ারের উপর চাটা দিতে থাকলে শেরনি।তুহি নিজের জলে ডোবা আঁখি জোড়া নিচে নামিয়ে পায়ের দিকে তাকে আদর দেওয়া শেরনির দিকে চাইলো।
“ কী হয়েছে?"
নূর খানিকটা বিরক্ত কন্ঠে তুহির পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,তুহি একইভাবে ভাবির দিকে চেয়ে হাত ইশারায় দেখিয়ে বললো,
“ ঐ দেখো ঐটা কি?"
বিচ্ছুটা বেশ লম্বা আর স্বাস্থ্যবান।নূর নিজেও ঢোক গিললো। পিছিয়ে গিয়ে দিলো এক চিৎকার,
“ পোকা!!"
যার কাছে সাহায্য চাইলো তার এই অবস্থা দেখে তুহি নিজেই বেক্কল হয়ে গেলো। নিজের ভয় ভুলে অবাক আর বিস্ময়কর চাহনিতে ভাবিকে দেখলো, দেখলো কিভাবে তার ভাবি মনি ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে তিন লাফে এই ঘর ছেড়ে ও ঘরে গেলো। অথচ সে কি না সাহায্যের জন্য ভাবিকেই ডাকছিলো!
নিজের মা আর ফুফির এমন ভীত হওয়ার কারণ শেরনি খুঁজে পেলো না।সে ফ্যালফ্যাল চোখ একবারে মা'কে তো আরেকবার ফুফুকে দেখছে।তুহি নিজের ভয়কে চাপা দিয়ে পিছন ফিরে ঐ বিচ্ছুকে আরেকবার দেখে অতঃপর সেও স্থান পরিত্যাগ করাই উত্তম মেনে সেও ভেতর ঘরে চলে গেল, যাওয়ার সময় দরজা লাগিয়ে দেওয়ায় শেরনি বাইরেই রয়ে গেল।
__________________________________
ল্যাপটপের পর্দায় জ্বলজ্বল করছে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রস্তাবের বিপরীতে দেওয়া রিজেকশন লেটারের ইমেইল। যেখানে খুব বিনয়ের সহিত জানানো হচ্ছে সে এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারছে না।
নাইটি পরে বাথরুম থেকে বের হয়ে চুলের আগায় তোয়ালে দিয়ে পানি মুছতে মুছতে সেই দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলো রেটিনার কার্যক্রম।হাত স্থির হলো।চোখ দুটো বড় বড় আকার ধারণ করে কপালে টানটান উত্তেজনা বিছিয়ে গেলো। মিনিট সময় ওভাবে রইলো। ল্যাপটপের মালিক আপাতত ল্যাপটপের সামনে নেই।থেমে যাওয়া গতিকে ধাক্কা দিয়ে তরিত্ব গতিতে এগিয়ে গেল ল্যাপটপের সামনে। বারবার দেখলো,পড়লো।একবারই নয়,এই প্রস্তাব এর আগেও দু'বার এসেছিল এবং দু'বারই তা নট এপ্রুভাল পেয়েছিলো।
নূর ইমেইল ঘাটতে ঘাটতে অনেকদূর এগিয়ে গেলো নানা ধরনের অফিসিয়াল ই-মেইল আর তথ্য।
বিরক্ত হয়ে বের হয়েও আসলো।
তোয়ালে বিছানায় ছুড়ে মেরে নিজেও ধপ করে বসে পড়লো।নাইটির ফিতে ঢিলে হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সেদিকেও মন না দিয়ে আলমারির দিকে একমনে চেয়ে থেকে ভাবতে বসলো কিছু একটা।
“ না,তোরা যা। ওদের নিয়ে ভাবতে হবে না তো।ওরা ওর ফুফুর কাছে আসছে । তোরা রিল্যাক্স থাকবি!"
আফিয়া বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে বসে ফোনে কথা বলছে ভাইয়ের সাথে। সালাহ্ আর দোয়া একাডেমিক সেমিনারে এটেন্ড করতে দুই দিনের জন্য চিটাগাং যাচ্ছে।তাই তাদের জমজদের বড় বোনের কাছে রেখে যাচ্ছে।
দু'জন এখন বেশ বড় হয়েছে।যদিও বাচ্চা তাও তাদের হাবভাব বড়দের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।
নাসিফ ঘরে ঢুকলো,পাশেই বসলো,বললো,
“ ছেলেকে বলতে, গিয়ে নিয়ে আসতো। বাচ্চা দুটো একা একা এতদূর!"
আফিয়া নিজের ভাইয়ের সাথে কথা শেষ করলো,ফোন কাটলো।পা গুটিয়ে বসে স্বামীর দিকে চেয়ে নরম গলায় বললো,
“ সারাদিন পর ছেলেটা আমার একটু বিশ্রাম পেলো।এই সময়ে আমি বলবো গিয়ে আমার ভাইয়ের ছেলে মেয়েকে নিয়ে আসতে ,তাই হয়?কত খাটুনি যায় অতটুকু মানুষের উপর।"
নাসিফ এই কথার প্রত্যুত্তরে কিছু বললো না।কথা সত্য! নিজের প্রফেশন, পারিবারিক ব্যাবসা সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়, অনেক ধৈর্য্য আর সহনশীল হলেই তবে সম্ভব। তাছাড়াও সে খেয়াল করেছে এই এতটুকু বয়সী ছেলেটা তার পাক্কা ব্যাবসায়ী।কারো উপর ভরসা করে না।সবটা নিজে উপস্থিত থেকেই করতে চায়।কী করবে? দু'টো ছেলে, একজন এমন এক প্রফেশন বেছে নিলো যে পৃথিবীর সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখছে।না কোন আনন্দ,না কোন পারিবারিক অনুষ্ঠান।এই তো ছয় মাস পড়লো বলে,সেই যে ট্রেনিংয়ের জন্য গেলো এই অবধি খবর নেই।অথচ দুই ভাই পারতো এত চাপ না নিয়ে পারিবারিক ব্যাবসায় মনোস্থির করতে, অন্তত বাহ্যিক চাপ থেকে বেঁচে পারিবারিক সময় কাটাতে পারতো।
রাত এখন এগারোটার উপর।নাবীহা নিজ ঘরে বসে ফাইনাল পরীক্ষার প্রিপারেশন নিচ্ছে।তার খুব শিগগিরই বৈদেশে ডাক পড়বে।স্বামী যে তার সেখানেই সেটেল হওয়ার বন্দোবস্ত করে ফেলছে।তাই খুব মনোযোগ দিয়ে নিজের পড়াশোনা করছে।
ঠিক সেই সময় কলিং বেলের আওয়াজে তার মনোযোগ ছিন্ন হলো।
“ কে এই সময়?"
বিরবির করে নিজেকেই জিজ্ঞেস করলো।মাথায় ওড়না টেনে উঠে দাঁড়ালো,বিনা শব্দে চেয়ার পিছিয়ে বেরিয়ে আসলো পড়ার টেবিল থেকে। ততক্ষণে দরজা খোলা হয়ে গিয়েছে।তার সঙ্গে হৈচৈ পড়লো এক জোড়া চড়ুই পাখির কিচিরমিচির শব্দে।দিবা,সামির পিছুপিছু ওদের জন্য রাখা ন্যানী মেয়েটা।একুশ কি বাইশ হবে বয়স,গ্রাম থেকে আনা হয়েছে।দোয়া, সালাহ্ সারাদিন ব্যস্ত থাকে, ওদের মা গ্রাম থেকে আসতে রাজী হোন না। শেষ বয়সটা স্বামীর কবর দেখেই কাটিয়ে দিতে চান। মায়ের আবেগকে সম্মান করে সালাহ্ আর জোর করেনি।তাই দোয়া বাধ্য হয়েছে ন্যানী রাখতে। মেয়েটা দারুন দায়িত্বশীল। দূরে গেলে সালাহ্ বোনের কাছে বাচ্চাদের রেখে যায়,নয়তো ন্যানী রেশমিই দেখে রাখে সারাদিন।
“ ফুফু "
বলেই সামি ঝাঁপিয়ে পড়লো ফুফুর কোলে।দিবাও গিয়ে ফুফুকে জড়িয়ে ধরেছে।একে একে সবাই বসার ঘরে জড়ো হলো।
তুহি মাত্র গা লাগিয়েছে হালকা শীতের এই রাতে, তখনই বাইরে তার প্রিয়দের কন্ঠে চট করে উঠে বেরিয়ে আসলো একদম খালি পায়ে।
“ সামি!"
বলেই সে ছোট ভাইয়ের কাছে ছুটে গেলো।সামিও ফুফুর কোল থেকে উঁকি দিয়ে বোনের কোলে গেলো।দিবাকে কোলে নিয়ে আফিয়া ঠোঁট চেপে চুমু দিতে দিতে বলতে থাকলো,
“ ওরে আমার আম্মারে, আম্মা আমার, কেমন আছেন?"
“ আলহামদুলিল্লাহ ফুফু, তুমি কেমন আছো?"
ফুফু ভাতিজির কুশলে ব্যাগড়া দিলো নাবীহার আগমন।সে সামিকে টেনে নিয়ে কচলাতে কচলাতে বলতেই থাকলো,
“ তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছো? হুম,বুবুনকে কেউ ভুলে যায়?"
এদিকে এগুলো চলছিলো,তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে অফিসিয়াল কথা বলছিলো নাইফ ফোনে।সে এত শোর শব্দ কানে যেতেই মুঠো ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বললো,
“ আমি সকালে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি,এখন রাখছি তাহলে।হ্যাভ এ গুড নাইট। আসসালামু আলাইকুম, আল্লাহ হাফেজ।"
ফোন কেটে ঘরে ঢুকলো দ্রুত কদমে, বিছানায় শক্ত হয়ে চোয়াল চেপে বসে থাকা স্ব-স্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে প্রশ্ন ছুড়লো,
“ মামারা এসেছে নাকি? এত রাতে?"
কিন্তু কোন উত্তর আসলো না। ঐভাবেই বসে রইল।ফিরেও তাকালো না।নাইফও অবশ্য সেদিকে ধ্যান দেওয়ার অবকাশ পেলো না।সে দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো,বসার ঘরে আসতেই তার পৃথিবী খিলখিল করে উঠলো তার তিন বোনের হাসিতে।দিবা তার ছোট ছোট হাত নেড়ে নেড়ে তার বাবার কোলে চড়ে কথা বলছে বোনদের সাথে।পরনে তার পিকাচু পোশাক,তার বাবাও খুব মনোযোগ দিয়ে সেই কথা শুনছে। ঐদিকে সামি ব্যস্ত তার ফুফুর সাথে দিবার নামে অভিযোগ করায়।যা শুনছে তার মা মুচকি হেসে হেসে।নাবীহা,তুহি দুই বোন বাবার দুই পাশে বসে গালে হাত ঠেকিয়ে সেই কথা শুনছে হাসি হাসি মুখে।
পাশের সোফায় হাসি মুখে বসে রয়েছে রেশমি নামের মেয়েটা।
নাইফ লম্বা কদমে বাবার সামনে গিয়ে দাড়াতেই দিবা চোখ তুলে তাকালো,চিড়ল চিড়ল দন্ত কপাটি বের হাত দু'টো বাড়িয়ে ধরে বললো,
“ ভাইয়া!"
নাইফ চট করে বোনকে তুলে নিয়ে আহ্লাদ করতে লাগলো।
যখন পুরো পরিবার বসার ঘরে বসে আনন্দ জমায়েত করেছিলো তখন নিজের ঘরে বসে নূর ল্যাপটপের আলোয় জ্বলজ্বল করা ঐ প্রত্যাশিত লেটারখানায় অপলক চেয়েছিলো, বিরবির করে বললো,
“ মধ্যিরাতেও ড্রামা শেষ হয় না।বুঝে শুনে আমাকে জঙ্গলে ফেললে বাবা!"
আড্ডা পর্ব শেষ করে যে যার ঘরে গেলো।নাবীহা, তুহি দুই বোন দায়িত্ব নিয়ে ছোট ভাই বোনদের সঙ্গে নিয়ে ঘুমানোর কথা বললে বাবা নাসিফ এবং মা আফিয়া দু'জনেই না করে দেয়।আফিয়া নিজ ভাইপো আর ভাইজিকে নিজের কাছে রেখেই ঘুম পাড়াতে চায়।
রেশমির জন্য অতিথি কক্ষ ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো।
অতঃপর সবাই যার যার কক্ষে.. ততক্ষণে নূর বিছানায় গা এলিয়েছে। পরনের সেই নাইটি তাকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সারাদিনের ক্লান্তি আর অবসাদ নিমিষেই দূর হয়ে গেলো নাইফের। বিছানায় লাল সিল্কের নাইটি পরিহিতা অতীব সুন্দরী রমনীর অর্ধ উদাম কোমল সুশ্রী পায়ের আহ্বান নাইফের পৌরুষত্বায় তীব্র আক্রমণ করলো,প্রকোট আকারে টানলো ঐ দিকে।নাইফ পকেটে গুঁজে রাখা ডান হাতটা বের করে চুলের গোড়ায় হাত চালাতে চালাতে দরজার খিল দিলো।ধীর পায়ে এগুতে এগুতে বললো,
“ ড্রেসটা চেঞ্জ করে তো বের হতে পারতে! বাচ্চা দুটো কত পছন্দ করে তোমায়!"
“ কিন্তু আমি বাচ্চা পছন্দ করি না। ইয়্যু নো ইট!"
“ যখন আমাদের হবে ?"
“ তখন দেখা যাবে!"
নাইফের শেষ বাক্যে নূরের বদন লালিমায় ছেয়ে গেলো।সে সোজা থেকে কাত হয়ে বাম দিকে ফিরে শুয়ে পড়লো। সেকেন্ড পেরুতেই লোমশ শক্ত হাতের ছোঁয়ায় কুঁকড়ে গেলো।তার কোমল নরম পাতলা কোমরে নাইফের শক্ত লোমশ হাতের বেরি পড়লো।
নাইফ নিজের ডান পা নূরের পায়ের উপর তুলে দুপায়ের মাঝে নূরের নরম তুলতুলে পা জোড়া আঁটকে নিলো, কোমর চেপে নিজের পেটের সাথে মিশিয়ে নিয়ে মুখটা ঘাড়ের উপর রেখে কন্ঠনালীতে গভীর আশ্লেষে চুম্বন করতে করতে ধীর কন্ঠে বললো,
“ কিন্তু আমার অনেকগুলো বেবি চাই। ঠিক আমার সামি দিবার মতো। তুলতুলে গাল,গোলুমলু হাত পা,ডাগর ডাগর চক্ষু,আদুরে বাচনভঙ্গি আর আহ্লাদি আভা।প্লিজ নূর গিভ মি না দিস টাইপ অফ গিফট,আই উইল বি গ্রেট ফুল হোল লাইফ,আই উইল বি ইয়্যর অনার!ডু ইয়ু!"
“ আপনার সমস্যা হবে না তো?"
“ সমস্যা! কোন বিষয়ে বলছো?"
আফিয়ার প্রশ্নে নাসিফের দ্বিধান্বিত উল্টো প্রশ্ন,আফিয়া খানিকটা ইতস্তত ভঙিতে বললো,
“ না মানে আমি বাচ্চাদের আমাদের মাঝে শোয়াবো বললাম তো তাই বলছিলাম আপনার সমস্যা হবে কি না?"
“ বাচ্চারা আমাদের মাঝে শোবে আমার সমস্যা হবে কি-না! সমস্যা হবে মানে?
মানে বুঝলাম না, সমস্যা হবে কিনা জিজ্ঞেস করছো, কেন?ওরা বাচ্চা মানুষ আমাদের মাঝে শোবে, সেখানে আমার সমস্যা হওয়ার কথা কেন আসছে? মানে ঠিক বুঝলাম না!"
“ না আপনি তো এভাবে শুতে পারেন না। আমাদের মাঝে দু'টো বাচ্চা থাকবে,আপনি তো এভাবে শোয়ায় অভ্যস্ত নন।মাঝ রাতে আমাকে খুঁজবেন নয়তো হাত পা গুটিয়ে শোয়ায় সমস্যা হলে!"
“ আশ্চর্যের ব্যাপার! একটু হাত পা গুটিয়ে শুতে পারবো না! অবশ্যই পারবো। হ্যাঁ হয়তো তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর একটা চমৎকার অভ্যাস আমার আছে তার মানে এই নয় দু'টো বাচ্চার সঙ্গে ঘুমাতে পারবো না! দু'টো একটা দিনই তো ,ব্যাপার না।আমি পারবো!"
“ নিশ্চিত আপনি পারবেন? দেখুন কষ্ট হলে বলে দিন,আমি ওদের মেয়েদের কাছে রেখে আসি।"
“ না না, দরকার নেই। মেয়েদের ঘুমে সমস্যা হবে।ওরা আমাদের সাথেই থাকুক!"
“ আ্যা ইয়্যু সিওর?"
“ হ্যাঁ শতভাগ, তুমি আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারছো না?"
“ কিভাবে রাখবো? আপনার অভ্যাস আছে?"
“ আমি বোধহয় চার বাচ্চার বাপ! এবং সেটা একেবারেই সহজ ছিলো না।তাই না? এরকম মুহূর্ত আমাদের জীবনে বহুবার এসেছে তাই না!"
“ তা ঠিক, কিন্তু সেটা তো অনেক আগের কথা।কত বছর হয়েছে আমাদের মাঝে বাচ্চারা আসে না।আর আপনারও আমাকে ভাগ করা নিয়ে কারো সাথে প্রতিযোগিতা করতে হয় না।
সময় কত তাড়াতাড়ি চলে যায়,বাচ্চারা বড় হয়ে যায়,আমরা বুড়িয়ে যাই!"
আফিয়া আবেগি হয়ে পড়লো।চোখের পর্দায় যেন ভেসে উঠলো কিছু দারুন স্মৃতি, যেখানে তার চার বাচ্চার শৈশব খেলে বেড়াচ্ছে।নাসিফও হারিয়ে গেলো ভাবনায়।অতল ভাবনায় বিভোর থেকেই বলতে লাগলো,
“ হ্যাঁ সেই,কত তাড়াতাড়ি সবটা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।এই তো সেদিন তুমি বউ সেজে এই ঘরে ঢুকলে। অতঃপর একদিন আমার উপর অভিমান করে চলে গেলে।ফিরলে আমার তাইফকে কোলে নিয়ে। এরপর আমার তুহি এলো।আমার চারজন প্রজাপতির রঙিন ডানায় ভর করে রঙিন হয়ে গেল আমার পৃথিবী।আমার বাগানের ফুলেরা খিলখিলিয়ে হাসতে থাকলো। দেখতে দেখতে প্রজাপতি গুলো এতটাই বড় হয়ে যাচ্ছে যে তাদেরকে এখন আর এই ছোট্ট বাগানে আঁটকে রাখা গেল না। তাদের ছাড়তে বাধ্য হলাম বিশাল বাগানের এই পৃথিবীতে। তাদের রঙে রাঙিয়ে দিতে সবাইকে।তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো যে এখন আর আমাদের সাথে দু'টো কথা বলার সময়ও হয়ে উঠছে না।
আসলে এটাই পৃথিবীর নিয়ম।বাবা মা যাদের জন্য সবটা করে তাদের কল্যাণেই তাদের ছেড়ে থাকতে হয়। শেষ কবে আম্মার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছি তাই তো ভুলে গিয়েছি।আমার বাচ্চাদের আর কি অভিযোগ করবো? পৃথিবী তার আপন নিয়মেই চলছে, এভাবেই চলবে পরকাল অবধি।"
_________________________
সকাল বেলা...
খাবার টেবিলে পরিবারের কয়েকজন একসঙ্গে জমায়েত হলো।নূর খুব চটজলদি করে সবটা এনে টেবিলে রাখছে।নাবীহার সোয়া নয়টায় একটা রাউন্ড আছে,তাই সে খুব সকাল সকাল নিজের সবটা গুছিয়ে নিয়ে টুকটাক পড়া রিভাইস করছে। ঐদিকে তুহি বেশ রাত করে ঘুমানো আবার সকালে উঠে নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াতের পর আবারও একটু ঘুমানোর বায়না ধরায় আফিয়া প্রথমে চোখ রাঙানি দিলেও বাবার আহ্লাদি মেয়েকে এর বেশি কিছু বলতে পারেনি।তাই সে এখন ঘুমাচ্ছে।
খাবার টেবিলে এখন নাসিফ, নাইফ আর সালমা ফাওযিয়া, আফিয়া পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ,নাবীহাও মাত্র এসে বসলো।নূর সিদ্ধ ডিমের বাটিটা এনে মাঝে রাখলো। অতঃপর নাইফের প্লেটে রুটি তুলে দিয়ে নাসিফের প্লেটে দিতে দিতে বলতে আরম্ভ করলো,






0 মন্তব্যসমূহ