#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১৪৮_প্রথমাংশ
[কপি করা/ চুরি করা,নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ।দয়া করে এগুলো করবেন না কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন! ধন্যবাদ সবাইকে।]
বৃদ্ধ স্বামীর রুগ্ন ভগ্ন কন্ঠনালী ভেদিয়ে নির্গত বাক্যগুলো তার এখন বাঁচার উপাদান। কাঁপা কাঁপা হাত দুটো দিয়ে যখন তাকে হাঁতড়ে হাঁতড়ে আহ্লাদ করে,তার রুক্ষ সুক্ষ কুঁচকে যাওয়া চামড়ার উপরে নিজের শক্ত খসখসা হাতের তালু দিয়ে ছুয়ে ছুয়ে বলে,
“ ব্যথা কমেনি এখনও?"
তার পা দুটো নিজের কোলের ভাঁজে রেখে তার উপর নিজের ঐ ক্লান্ত হাতে শক্তিহীন চাপ দিয়ে হালকা করে টিপে দেয়,তখন আফিয়ার ভেতরে এক অজানা সুখেরা হাহাকার করে উঠে।এই বয়সে এসে স্বামীর এমন সেবা কতজন নারী পায়? দু'জনেই বৃদ্ধ,বয়সের হিসাবে লোকটা তার চেয়েও বৃদ্ধ অথচ! মধ্যরাতের ঘুম ভেঙ্গে স্ত্রীর সেবা করতে বিরক্ত হয় না।এই বয়সে এসেও স্ত্রীর পা টিপে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না।
কিডনি সহ নানা জটিলতায় জড়িয়ে রয়েছে আফিয়ার এই মোটাসোটা দেহ খানা। থাইরয়েডের পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ থাকলেও কেন জানি তার রোগেরা নিয়ন্ত্রণে থাকলো না। বয়সের কারণে দেহটাও বেড়েছে তার সঙ্গে বেড়েছে জটিলতা।এখন আর আগের মতো ইচ্ছা করলেই সব করা হয়ে উঠে না।তবে তাও চেষ্টা করে! কিন্তু বিগত কয়দিন ধরে গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ডাক্তার এসে দেখে যাচ্ছে দু বেলা।নাবীহা নিজেই মেডিসিন ডাক্তার সহ এক ল্যাব নার্স নিয়ে এসেছিল যিনি রক্তের স্যাম্পল নিয়ে গিয়েছিল সকল পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য। তাতে অবশ্য কিছু ধরা পড়েনি।এটা আবহাওয়া জনিত সমস্যা,কেটে যাবে খুব শিগগিরই কিন্তু তার চেয়ে বেশি জ্বালাতন করছে হাঁটু সহ অন্যান্য জোড়াগুলো।যেটার যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারে না নিজেও আর স্বামীকেও ঘুমাতে দিতে পারে না।
আশি পেরিয়ে যাওয়া নাসিফ স্ত্রীর রোগাক্রান্ত জীবন নিয়ে ভীষণ দুঃখিত।সে এত এত পয়সা খরচ করেও কোন ভাবেই স্ত্রীর পাশে দাঁড়াতে পারলো না বলে ভীষণ কষ্ট পায় মনে মনে
আল্লাহর কাছে সবসময় কান্নাকাটি করে যেন শেষ বয়সটা সঙ্গী বিহীন না কাটাতে হয়।এই বয়সে তার আর উপায় কোথায়? ছেলে মেয়েরা ভীষণ ব্যস্ত। তাদের সময় নেই তাকে নিয়ে ভাববে।তারা তো নিজেদের জীবনকেই সময় দিতে পারে না।এই তো গত মাসে একবার এসেছিল সময় করে তিন ভাইবোন।তাও এক বেলা কোনভাবে থেকে আবার যার যার জীবনে ফিরে গিয়েছে।
এদিকে বড় ছেলেটা এত চাপে থাকে।একা হাতে এত বড় ব্যাবসা, নিজের প্রফেশন, সংসার আবার তিনটা বাচ্চার চিন্তা।
সে রাতে বাড়ি ফিরলে অবশ্য একবার করে বাবা মায়ের সাথে সাক্ষাৎ করেই যায়, আবার সকালে যাওয়ার সময় খোঁজ নিয়ে যায়, মায়ের সাথে নিজের সুখদুঃখ ভাগ করে যায়।
বড় নাতীটা এখন জাপান আছে।নানার কাছে থেকে পড়াশোনা করছে।নাতনিটা এখানেই থাকে, তার এখন ঘর থেকে বেড়াতেও অনেক নিষেধাজ্ঞা।তার মায়ের অতিরিক্ত শাসন আর ধর্মীয় বিধিমালা তাকে ঘরকুনো করে ফেলেছে। তবে দাদা দাদীর খোঁজ নিতে দিনে একবার অন্তত নিচে নামে।ছোট নাতীটা না থাকলে বোধহয় তাদের বৃদ্ধ বৃদ্ধার জীবন আরো পানসে হয়ে উঠতো।ঐ দুষ্টু কিশোর চাঁদ, সারাদিন দাদা দাদীর পিছনে লেগে থাকে।তবে সে এখন ভীষণ ব্যস্ত। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, সামনেই বোর্ড এক্সাম।তাই সেও এখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে।
নাসিফ খুঁকখুঁক করে কাশতে কাশতে ঘরে ঢুকলো।আফিয়া শোয়া থেকেই মাথাটা উঁচিয়ে দুর থেকে করা নাসিফের প্রশ্নের উত্তরে বললো,
“ সে আমার ব্যথা মরণব্যাধি,তা আর আমার মরার আগে ভালো হবে না। কিন্তু আপনার কি সমস্যা?মেয়ে কতবার বলেছে একবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা করতে! কতবার বলবে বাচ্চাগুলো?যান না কেন একবার? বুকের পরীক্ষাটা করানো দরকার না কি?"
“ আর পরীক্ষা,অত পরীক্ষা করে কি হয়? সেই তো বলবে আপনি চিন্তা করবেন না!এই করবেন না, সেই করবেন না? শুধু করবেন নাই বলবে! কোনটা করতে হবে,কোনটা করলে ভালো হবে তা তো বলে না!
এই যে তুমি এত চেকাপ নিয়ম-কানুন মেনে চললে তাতে লাভটা কি হলো? সেই তো কিডনীর সমস্যা ধরাই পড়লো।তো?ঐসব ট্রিটমেন্ট ফিটমেন্ট কিছু্ই না,মরার সময় এলে এমনিতেই মরবো!"
কথাগুলো বলতে বলতে নাসিফ আফিয়ার পায়ের সামনে থেকে আফিয়ার গায়ে জড়ানো চাদরখানা সরিয়ে নিজের জন্য জায়গা বানিয়ে বসলো।
অতঃপর আফিয়ার পায়ে হাত দেওয়ার প্রয়াস করতেই আফিয়া পা সরিয়ে নিয়ে বললো,
“ এ্যাই আপনাকে না বলছি আমার পায়ে হাত দিবেন না!"
“ কেন হাত দিলে কি হবে?"
“ আশ্চর্য,কেন দিবেন! স্বামী স্ত্রীর পায়ে হাত দিলে,টিপলে কেমন দেখায়?"
“ ওহ টিপাটিপি ছাড়াই যেন চার বাচ্চার মা হয়ে গিয়েছো তুমি?"
“ মুখে লাগাম দেন,এক ঠ্যাং কবরে রেখেও মুখের দরজায় তালা দিতে পারে না,বুইড়া খাটাস!"
“ মুখে লাগাম দিলে তো অনেক আগেই ছেড়ে চলে যেতা।বলতা বেডার মুখে রস নাই,ও আমার রস....
“ এ্যাই থামেন থামেন, আপনার আর কিছু বলা লাগবে না। থামেন, আল্লাহর দোহাই লাগে।"
নাসিফ পা টা তুলে নিজের হাঁটুর উপর রেখে পকেট হাতরে একটি মেশিন বের করলো, ব্যাটারি চালিত।সেটা ব্যথা কমায়। খানিকটা মেসেজের কাজ করে।ব্যথার নির্ধারিত স্থানে রেখে সার্কেলাকারে ঘুরালে পটপট আওয়াজ তুলে নিজের কর্ম সম্পাদন করে।সেটা বের করে আফিয়ার গোড়ালি থেকে শুরু করে হাঁটু অব্দি তুলতে থাকলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে।আফিয়ার চোখ ভিজে উঠলো। লোকটা সারাদিন ঘুরে ঘুরে এটাই সন্ধান করে কি করলে তার সহধর্মিণী সুস্থ থাকবে।এত এত পয়সা সময় তার উপর খরচ করেও একটু রাগ নেই,বিরক্ত হয় না। উল্টো ছেলেদের, মেয়েদের উপর চেঁচায়,তারা অসুস্থ বৃদ্ধ মা বাবার খোঁজ রাখে না। বয়স্ক মায়ের রোগান্য জীবন নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নাই। যদিও কথাটা মানানসই নয়।তার ছেলে মেয়ে যতটা পারে খোঁজখবর রাখে।তাইফের কাছে রেখে তাইফ বেশকিছু দিন সিএমএইচে চিকিৎসা করিয়েছে।সে তো আফিয়ার মন বসে না অত নিয়মে আবদ্ধ জীবনে।এটা করা যাবেনা, ঐটা ধরা যাবে না। এভাবে না, ওভাবে না। উফ্!আফিয়া বিরক্ত হয়ে ছেলে বউকে বলেছিল,
“ আমাকে আমার বাড়ি দিয়ে আয় বাবা।আমি সেখানে মরলেও শান্তি, তোদের এই নিয়মে ভরা জীবন আমার জন্য না।"
তাইফ খুব করে চায় তার মা বাবা তার কাছে থাকুক। ঐদিকে নাইফ বাড়ি ফিরে আগে মা বাবার
মুখ না দেখে নিজের ঘরে যায় না।সে সবার সাথে লড়াই করে মা বাবাকে তাঁর কাছে রাখার জন্য।তার একটাই কথা বড় সন্তান হিসেবে বাবা মায়ের সব দায়িত্ব তার।আর সে সেটা থেকে কাউকে ভাগ দিবে না।
মেয়েরাও অভিযোগ করে তাদের মা বাবা কেন কখনো তাদের বাড়ি গিয়ে দু'টো দিন বেড়ায় না।তারা কি বাবা মায়ের সেবা করার অধিকার রাখে না? সব দায়দায়িত্ব কি শুধু ছেলেদেরই,সব অধিকার বোধ শুধু ছেলেদেরই!
ছেলে মেয়ের এহেন টানাটানি আফিয়া নাসিফের ভালো লাগে না।সবাই ব্যস্ত।কেউ বাড়ি থাকে না।তারা কোথাও গেলেও একাই থাকা লাগে। বাড়ি ভর্তি কাজের লোক আর ঘর ভর্তি শৃঙ্খলা।এসব জাঁকজমকপূর্ণ জীবন আফিয়ার কাছে আড়ষ্টতা ঠেকে।সে এসবে এখন আর নিজেকে সামলাতে পারে না।তাই সে কোথাও যেতেও চায় না এদিকে তার স্বামী না কারো বাড়ি গিয়ে থাকবে আর না একা থাকতে অভ্যস্ত।এখনো ঘুমের সময় তার গাঁয়ে হাত না রাখলে,তার শরীরের উপর পা না তুললে ঘুমাতে পারে না।
সারাজীবন দাপট নিয়ে কতৃত্ব করা লোকটা ছেলে মেয়ের কর্তৃত্বে নিজেকে রাখতে পছন্দ করে না।সে সব ছেলে মেয়ের হাতে তুলে দিয়েছে, সহায় সম্পত্তি,ব্যাবসা বানিজ্য সব।তাও না।সে এখনও নিজেকে সবার কর্তা করেই রেখেছে যদিও তাতে সমস্যা কোথাও হচ্ছে না কিন্তু বয়সের কাছে ঝুঁকেও না ঝুঁকতে চাওয়া নাসিফ সাহেবের কাছে তা ভীষণ সমস্যা।সে নিজের জীবনে এই বয়সে ছেলেদের নানা চাপিয়ে দেওয়া মতামতের তোয়াক্কা করে না,তার কথা মতে বয়সের সৌন্দর্য থাকার সঙ্গে সঙ্গে বয়সের গুরুত্ব বোঝাও জরুরি।সে কোন ছেলে মেয়ের বাড়ি গিয়ে তাদের ঘরে মেহমান হয় থাকতে পারবে না।যতই ছেলে মেয়ে বলুক বাবা এটাও তোমার বাড়ি। আদৌও তে সেটা তার বাড়ি নয়।
সে যতটা গর্জে এই বাড়িটাকে নিজের বলে দাবী করতে পারে ততটা গর্জন নিশ্চয়ই সেখানে দিতে পারবে না।
এসব চিন্তায় আবিষ্ট নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজীকে ফেলে আর ছেলে মেয়ের টানাটানিতে পড়তে চায় না বলেই আফিয়া নামক বৃদ্ধা নিজ ঘর ছেড়ে কোথাও যায় না যদিও এটাতে সত্যতা বিশ ভাগ হলেও আশি ভাগ সত্য হচ্ছে আফিয়া নামক রমণী বৃদ্ধ নাসিফ সাহেবকে ছাড়া এক মুহুর্তও কোথাও কাটাতে চায় না, এবং নিজেও এই বাড়ির ছায়া থেকে সরতে পারে না। বাড়িটা যে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে।
আরামে আফিয়ার চোখ ভিজে উঠেছে,তা দেখে নাসিফ হালকা ঠোঁট মেলে নিলো। গালের কুঁচকে যাওয়া আভায় তা খুব একটা স্পষ্ট হলো না।নিচু কন্ঠে বিরবির করে বললো,
“ অসুস্থ স্ত্রীর সেবা করতে গিয়ে পা ধরলে গুনাহ হয় না। কোনভাবেই ধরলে হয় না।এটাও একটা সওয়াবের কাজ। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল হতে কতভাবে উৎসাহ দিয়েছেন বলো তো, এরপরেও কে যে এমন নিরুৎসাহিত করেছিলো বুঝি না।"
দীর্ঘ লম্বা প্রলম্বিত শ্বাস ছাড়লো, অতঃপর কন্ঠ উঁচিয়ে বললো,
“ শুনছো,এখন আরাম লাগলে চলো উঠো। একটু বাইরে গিয়ে হেঁটে আসবে!"
“ কোথায় যাবেন এই ভর সন্ধ্যায়?"
“ নদীর পাড়ে চলো! এই বয়সে অত জোর কই যে বহুদূর নিয়ে যাবো তোমায়? নিতেই পারলাম কই? আজীবন তো....বিয়ে করে এনে এই সংসারের ঘানি টানতে ফেলেছি, আজও সেখানে রেখে দিলাম।কত স্বপ্ন দেখিয়েছি কোনটাই পূরণ করতে পারলাম না।"
নাসিফ নিজের আশেপাশে কিছু একটা খুঁজছে,আফিয়া গাঁয়ের চাদরটা ফেলে দিয়ে নিজের পরনের সালোয়ার ঠিক করে নিলো,সেটা হাঁটুতে উঠে এসেছে ততক্ষণে নাসিফ নিজের কাঙ্ক্ষিত জিনিস খুঁজে পেয়েছে।ঐ মেশিনটার প্যাকেট।আফিয়া ঐটা দেখে বললো,
“ কোথায় পেলেন এই জাদুর বাক্স?"
চুলের গোঁড়ায় আঙ্গুল চালিয়ে খোঁপা করতে করতে জিজ্ঞেস করলো। ছোট একটি পুটলির গিটের মতো খোঁপা হলো।এখন মাথায় চুল নেই বললেই চলে।সব শেষ! বয়স আর হরমোনের সমস্যা সব শেষ করে দিয়েছে।নাসিফ জিনিসটা ড্রয়ারের মধ্যে রাখতে রাখতে বললো,
“ ঐ ব্রীজের পাশে একটা ফার্মেসি আছে,ঐখানে বসেছিলাম।তো সেখানে কথায় কথায় ঐখানে কিছু ছেলে এই জিনিস নিয়ে আলোচনা করছিলো।হয়তো লোকটা কোম্পানির প্রচারণা করছিলো, তখন মনে হলো নিয়েই যাই।কাজ হলেও হতে পারে।
তোমার কি ভালো লাগছে না?আরাম পাচ্ছো!"
নাসিফের চোখেমুখে উদ্বেগ,তার সঙ্গে আগ্রহ। আফিয়া গায়ে ওড়না জড়াতে জড়াতে বললো,
“ সারাটা দিন পা ফেলতে পারছিলাম না এখন আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি তাও জিজ্ঞেস করছেন?"
নাসিফ এক তৃপ্তির হাসি হেসে উঠলো।হো হো করে হেসে দিয়ে হাসতে হাসতেই বললো,
“ হ্যা হ্যা আ... আসলেই তো! আমিও কি বোকা। তুমি আরাম পাচ্ছো বলেই তো উঠে দাঁড়াতে পারলে!যাক তাহলে আমার কষ্ট আর পয়সা বিফলে যায়নি বলো?"
আফিয়া দুকদম এগিয়ে এসে নাসিফের গায়ের পাঞ্জাবিতে আটকে থাকা একটা সুতাকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললো,
“ হ্যাঁ আপনি সফল,আর আপনাকে পেয়ে আমার এই জীবন, জন্ম নেওয়া সফল।"
“ কি যে বলো, তুমি না থাকলে কিভাবে এতদূর পথ হাটতাম ঐ দুটি বাচ্চাকে নিয়ে!"
“ আল্লাহ সবার জন্য উত্তম ফয়সাল করেন!
এখন বলেন এই সময়ে হঠাৎ কেন এতদূর যাবেন?"
“ সময়ই তো সমস্যা! আজীবনের সমস্যা! কোথাও যেতে হলেই সময় আমাদের বাঁধা দিয়েছে, এখনো দেয়। কিন্তু আজ আমি কোন বাঁধা মানছি না।চলো তো!"
“ এভাবেই যাবো, বোরকা পরে নেই! আর শুনেন না,আমার চাঁদ ভাইটাকে ডাকেন,আর হ্যাঁ সঙ্গে আমার সতীনকেও ডাকেন। সারাটা দিন তো ঘরেই পরে থাকে। আমাদের সাথে না হয়..."
“ কাউকে নিবো না, শুধু তুমি আর আমি যাবো।বহু ভেবেছি সবার কথা।এখন শুধু আমাদের কথা ভাববো।যাও তাড়াতাড়ি রেডি হও।"
নাসিফ যে এই বিষয়ে ভীষণ সিরিয়াস তা তার মুখ দেখেই পড়ে নিলো আফিয়া। অতঃপর হাত চালিয়ে একটা কালো সুতি আগাগোড়া ঢাকা খিমার পরে নিলো। হাতে মোজা গলিয়ে চোখে চশমা আটকে নাসিফের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ পাঞ্জাবি বদলাবেন না?"
“ এ্যা না,থাক।আমি পুরুষ মানুষ, এমনিই ঠিক আছি, চলো।"
নাসিফ পোশাক বদলালো না।আফিয়ার হাত ধরে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।আফিয়া সেই হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রান্না ঘরের দরজায় গিয়ে উনিশ বিশ বছর বয়সী এক মেয়ে,নাম তৃষা।তাকে ডেকে বললো,
“ হ্যারে তৃষা,রাতের জন্য রাধিস না বু।আমি আর তোমার দাদা বাইরে থেকেই খেয়ে আসবো, তোর জন্যেও নিয়ে আসবো।এরপরেও বেশি ক্ষুধা লাগলে কতকিছুই তো আছে ঘরে,সেখান থেকে খেয়ে নিস। পরে আমরা আসলে বেশি খাইস।"
তৃষা নামের তরুণী মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো বললো সমস্যা নাই দাদী। আপনারা আসেন তারপরেই খাবো।
“ আসো আসো,দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
বয়স্ক নরনারী নিজেদের বয়সী শরীর হেলিয়ে দুলিয়ে এগিয়ে গেলো জীবনের উদ্দেশ্যে।
কামরাঙ্গীরচর,মূলত বুড়িগঙ্গার একটা প্রবাহ এদিকে বয়ে বেড়াচ্ছে যেটার মোহাম্মদপুর ছাড়িয়ে গিয়েছে,এটার ঐপারে কেরানীগঞ্জ এই পাড়ে পুরান ঢাকা।পুরান ঢাকার লালবাগ , শহীদ নগর, ইসলামবাগ, চকবাজার কিংবা বাবুবাজার, সবটা মিলিয়েই যখন পুরান ঢাকা তখন বলা হয় পুরান ঢাকা আর কেরানীগঞ্জের বুক চিরে বয়ে বেড়ানো মাতৃতুল্য নদী বুড়িগঙ্গার মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে জেগে উঠা এবং যুগের পর যুগ নিজেকে অবিলীন করে রাখা একটা চরের নাম কামরাঙ্গীরচর। নিম্ন বিত্ত থেকে উচ্চ বিত্তের বসবাস এবং সকল রাজনৈতিক, বানিজ্যিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই অঞ্চল।এই অঞ্চল নিয়ে প্রতি সরকারের চলে নানা উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা।তারই ধারাবাহিকতায় বিগত আওয়ামী লীগের ক্ষমতকালীন সময়ে নানা উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়।এরই একটা হচ্ছে নদীর বাঁধ অক্ষুন্ন রাখা এবং বেরিবাঁধ ঘিরে বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন পার্ক নির্মাণ,ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ সহ বাহারি বৃক্ষ রোপন।
এই নান্দনিক সৌন্দর্যের পরিকল্পনা সম্পন্ন হতে হতেই অত্র এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ ব্যাবসায়িক কেন্দ্র যেটাকে সহজে ফুডকোর্ট বলা যায়।কিশোর কিশোরী থেকে তরুন প্রজন্মের জন্য অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই অংশটুকু।তার সঙ্গে সকল বয়সী স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মানসিক অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসার জন্যেও নানারকম শারীরিক ব্যায়ামের একটা কেন্দ্র গড়ে উঠে সাধারণ মানুষের মনোবলে।
সকাল বিকাল দুবেলা দেখা মিলে বিভিন্ন বয়সীদের তোরজোর।কেউ খাচ্ছে তো আবার কেউ সেই খাবার হজম করার জন্য ব্যায়াম করছে।
তবে সব জায়গাতেই পরিচিত কিছু বিশেষ দিক থাকে, কেন্দ্র থাকে।তেমনি খালপাড়ের এই অংশটুকু এক বাক্যে পরিচিত হয় সরকারিভাবে নির্মিত একটা মাধ্যমিক স্কুল এর পরিচয়ে যার নাম শেখ জামাল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
আফিয়া নাসিফের হাত ধরে তিন চাকার মোটর যান মটরওয়ালা রিক্সা থেকে নামলো।
নাসিফ পকেটে হাতড়ে পয়সা দিয়ে স্ত্রীর উদ্দেশ্য বললো,
“ দেখে দেখে পা রাখো।"
আফিয়া চারদিকে তাকিয়ে দেখছে, কতদিন পর বাইরে বের হলো। চারদিকে কি ঝাঁজালো সৌন্দর্য। রঙিন রঙিন মরিচ বাতি দিয়ে ছোট ছোট রেস্টুরেন্ট সাজানো, সাজুগুজু করা একেকটা মেয়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে নিজের সঙ্গে থাকা ভ্রমন সঙ্গি অথবা সঙ্গিনীর উপর।এখন যদি চাঁদ থাকতো তবে আফিয়া দুষ্টুমি করে বলতো,
“ দেখো তো ভাইয়া এই মেয়ে পছন্দ হয় নাকি তোমার?"
চাঁদ নাক ছিটকে,কপাল কুঁচকে বললো,
“ ছ্যাহ্! এটা মেয়ে হলো নাকি! কেমন ব্যাটাছেলে লাগে। মেয়ে হতে হবে তোমার মতো বউ। একদম ছুঁয়ে দিলেই গলে যাবে যাবে টাইপ।"
আফিয়া নারী সম্পর্কে এই পনেরো পেরিয়ে ষোল ছুঁই ছুঁই নাতীর বক্তব্য শুনে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তো।তার এই নাতী অল্প বয়সেই পেকে সারা।
এই জন্য তাইফ, নাইফ তাকে দোষ দেয়। তারা বলে বাকীরা তার সান্নিধ্য থেকে দূরে বলেই এভাবে পাকতে পারেনি।যদিও তারা কথাটা মজার ছলে বলে তাতেও আফিয়ার মনটা ভাড় হয়ে উঠে।
তাইফের বাড়ি যেতে চায় না এই জন্যই। বাচ্চা দু'টো থাকে মাদ্রাসায়।ছুটিতে আসলেও তারা ছুটে এদিকে ওদিকে বেড়াতে।কখনো নানা বাড়ি যায় তো কখনো এদিকে সেদিকে।এসব নিয়ে আফিয়া অভিযোগ করতেও পারে না।কার কাছে করবে অভিযোগ, কিসের জন্যই বা করবে? সে আজীবন ছেলে মেয়েকে নিজের কোলে আঁটকে রেখেছে তাই বলে কি নাতী নাতনির সঙ্গেও তাই করবে? এটাও কি মানায়।
ঐদিকে ত্বোহা এখন মেডিকেল পড়ুয়া,তার তো মাঝে মাঝে খাওয়ার সময় নিয়েও টানাটানি পড়ে।মা বাবা দুজনেই সফল চিকিৎসক, তাদের মেয়ে যদি ফলাফল ভালো না করে তবে কি চলে?তাই সে পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ চাপে থাকে।তার ছোটটাও তাই।
তুহির সন্তানদের বিষয়ে আর কি বলবে? সবার জীবন নিজস্বতায় মোড়ানো। যদিও তুহি ফাঁকফোকরে চলে আসে নিজের সন্তানদের নিয়ে কিন্তু তার থাকার জো নেই।ফাহাদ তুহিকে এখনও চোখে হারায়।
চাঁদ আর নূহাই তার একমাত্র ভরসা।নূহাটা ছোট বেলায় যত মুখোরা ছিলো এখন ঠিক ততটাই মুখচোরা হয়েছে। সামান্য দুষ্টুমি করলেই মেয়েটা লজ্জায় লজ্জাবতীর ন্যায় গুটিয়ে যায়।
বয়স্ক দুজন মানুষ,একজন আরেকজনের হাত ধরে হাঁটছে। আশপাশের যাতায়াতরত পথচারীদের কেউ কেউ সেটা দেখে মুখ টিপে হাসছে।কেউ কেউ মনে মনে প্রশংসা করছে।কেউ একজন আবার পাশ দিয়ে বলেই দিলো,
“ হেব্বি মানিয়েছে নানা নানী।ধরে রাখুন,নয়তো নিয়ে কেউ দৌড় দিবে!"
তাদের কথা শুনে আফিয়া লজ্জিত ভঙ্গিতে হেসে মাথা নুইয়ে নিলো, ঠোঁট টিপে হাসি নিয়ন্ত্রণ করে হাঁটতে থাকলো।নাসিফ প্রত্ত্যতুরে বললো,
“ কেউ এত দুঃসাহস করবে না এই হাত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার।বয়স হলেও মনের শক্তি কিন্তু কমে নাই!"
“ ওহ,জোস নানা।এই না পুরুষ মানুষ,প্রিয় নারীকে আগলে রাখতে জানে!"
নাতীর বয়সী ছোকরাদের সাথে এভাবে কথা বলতে পারায় নাসিফের ভালো লাগছে। নিজের চিরাচরিত চরিত্র থেকে বেরিয়ে সে এভাবে পথের কারো সাথে,কোন অচেনা মানুষের সাথে এতটা খোশালাপ করছে।আফিয়াকে খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে হাতটা আলগা করলো।আফিয়া এগিয়ে যেতেই নাসিফ ছেলেটার কানে কানে কিছু একটা বললো।কলেজগামি কিশোর হবে হয়তো,নাসিফের কথা শুনে মুচকি হেসে আফিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
“ আপনি সামনে ওয়াকওয়েতে গিয়ে বসেন,আমি এখনই আসছি।এ্যাই চল।"
বলেই নিজের বন্ধুর হাত ধরে টান দিয়ে দৌড় দিলো।নাসিফ একপলক তাকিয়ে চেঁচিয়ে ডেকে বললো,
“ আরেহ এ্যাই ছেলে পয়সা তো নিয়ে যাও!"
কিন্তু উত্তর আসলো না।তারা বহুদূর চলে গিয়েছে এর মধ্যেই।নাসিফ সামনে ঘুরে আফিয়ার দিকে এগিয়ে বললো,
“ সামনে বসার জায়গা আছে,চলো গিয়ে সেখানে বসি।"
আবারও হাতটা আঁকড়ে ধরলো। অতঃপর ধীর পায়ে হেঁটে নির্ধারিত স্থানে বসলো। সামনে ফুডকোর্ট গুলো।ফুচকা দেখে নাসিফ জিজ্ঞেস করলো,
“ ফুচকা খাবে? আনবো?"
“ আনেন। মিষ্টি টক আনিয়েন!"
“ আচ্ছা!"
উঠে গিয়ে এক প্লেট ফুচকা আনলো। আফিয়া নিকাব তুলে তো খাবে না।তাই নাসিফ তাতে টক ঢুকিয়ে দিয়ে আফিয়ার দিকে বাড়িয়ে ধরলো,আফিয়া সেটা নিয়ে নিকাবের নিচ দিয়ে কোনভাবে খাচ্ছে,তাতে টক পানি,বুটমশলা তার খিমারে পড়ছে।এদিকে একটু হাঁটার কারণে আবারও পায়ে ব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছে কিন্তু তা সে লুকানোর চেষ্টা করছে।নয়তো লোকটার এত হাসি হাসি মুখটা আঁধারে ঢেকে যাবে।
ফুচকা শেষ হতে হতেই ছেলেগুলোকে দেখা গেলো তাদের খুঁজতে।সে প্লেট নিয়ে উঠে দাঁড়ালো,বললো,
“ আমি প্লেটটা দিয়ে আসি। তুমি বসো।"
“ আপনি বসেন,ওরা এসে নিয়ে যাবে নে!"
“ না আমিই দিয়ে আসি। তুমি বসো।"
নাসিফ এগিয়ে গিয়ে প্লেটটা দিলো,আর পকেট থেকে টাকা বের করতে করতে গলা উঁচিয়ে ছেলেদের দিকে হাঁক ছাড়লো। এদিকে আফিয়া বিরবির করে নিজেকে জিজ্ঞেস করছে,
“ কাকে ডাকছে এই লোক?কত মানুষ চিনে তাকে।সব জায়গাতেই পরিচিত কেউ না কেউ আছেই।"
ঠিক তখনই নাসিফ তার সামনে এসে উপস্থিত হলো। ফর্সা চকচকে চেহারাটা জ্বলজ্বল করছে কিছু পাবার খুশিতে।সাদা পাকা দাঁড়িগোঁফের আড়ালে থাকা ঝকঝকে সাদা মুক্ত ন্যায়ের দাঁতগুলো যা এখনও সবল।তা হাসির ফোয়ারা ছিটিয়ে দিচ্ছে।সাদা পাঞ্জাবি পরুয়া অত্যন্ত সুদর্শন পুরুষটা তার দিকে ঝুঁকে হাসি হাসি মুখে চেয়ে আছে।হাত দুটো পিছনে,আফিয়া কৌতুহলী নয়নে চেয়ে রইলো অপলক।তার কাছে বরাবর নাসিফকে বেহেস্ত থেকে আসা কোন পুরুষ মনে হয়।সে নিজের ঠোট চেপে হাসি আটকে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি ব্যাপার এমনভাবে হাসছেন কেন?"
নাসিফ আফিয়ার সামনে হাঁটু মুড়ে বসলো।যদিও এভাবে বসতে তার ভীষণ কষ্ট হয়। একটানে বসা আর উঠা, দুটোতেই তার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।কোমরের হাড় ক্ষয়,তাতে চাপ দেওয়া নিষেধ। অপারেশন করে তার ভেতর বেশ কিছুদিন রড লাগানো হয়েছিল। তারপর খুলে ফেললেও এখনও নানা সতর্কতা তার জন্য জারিমান।
ছেলেগুলো সহযোগিতা করলো।নাসিফ সামনে বসতেই আফিয়া উঠে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করলো,
“ কি করছেন কি? কোমরে...
“ শুভ বিবাহ বার্ষিকী বউ!"
হাতে তার একজোড়া গোলাপ। ফুটন্ত একটা ফুলের পাশে আরেকটি কলি!
আফিয়ার চোখ ছলছল করে উঠলো।আজ তাদের আটচল্লিশতম বিবাহবার্ষিকী।তার তো মনেই নেই।কি করে থাকবে? সে তো রোগে শোকে সব ভুলে যায়।অথচ লোকটা ঠিক মনে রাখে।
ফুলটা নিলো আফিয়া।নাইফের হাত ধরে টান দিয়ে বললো,
“ উঠুন এবার।কি সব পাগলামি করেন
আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে দেখার কেউ আছে? আমাকেই তো আপনি দেখেন।"
নাসিফ উঠলো তবে আফিয়ার হাত ধরে না, ছেলেগুলো সাহায্য করলো।তারা পাশ থেকে চিয়ার আপ করছে।নাসিফ উঠতেই আফিয়া নাসিফের বুকে মাথা ঠেকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলো। বিরবির করে বলছে,
“ এই জীবনে আপনি আমার জন্য আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামত।আমি আপনার ঠিকঠাক সেবা করতে পারিনি। কখনো ভুল করলে মাফ করে দিয়েন আপনি নিজের মহিমায়।আপনি মাফ না করলে আল্লাহ আমাকে ছাড়বে না।"
“ আহ্ কাঁদছো কেন? এই যে দেখো আনলাম একটু ভালো সময় কাটাতে সে এখন কাঁদতে বসেছে। আশেপাশে মানুষ কি বলছে দেখো।"
আসলেই ততক্ষণে চারদিকে মানুষ জড়ো হয়ে গিয়েছে। যদিও ছেলেগুলো সবাইকে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছে।
তবুও মানুষের কৌতূহল শেষ হয় না।
নাসিফ আফিয়ার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলছে,
“ তোমার প্রতি আমার কোন অভিযোগ থাকতেই পারে না। তুমি আমার জীবনটাকে রঙিন চাদরে মুড়িয়ে রেখেছো আজ অবধি। তোমার মতো সহধর্মিণী পাওয়া একজন পুরুষের সৌভাগ্যের চিহৃ।
আমি বরং বহুবার বহু কারণে অকারণে তোমাকে আঘাত করেছি,কটুকথা বলেছি,অপমান,হেয় করেছি। তারপরেও তুমি বারংবার আমাকে সেরা স্বামীর সম্মান দিয়েছো।আমি তাতে কৃতজ্ঞ তোমার প্রতি। যে পুরুষ নিজ সহধর্মিণীর কাছে ভালো মানুষ হতে পারে না সে কখনো কোথাও ভালো মানুষ না।
প্রত্যেক পুরুষের চরিত্রের সাক্ষী আল্লাহ তার সহধর্মিণীর থেকে নিবে।আমি সবসময়ই ভয়ে থাকি কিভাবে আল্লাহর নারাজী থেকে বাঁচবো।আমি শুধু তোমাকে বলবো,আমাকে ছেড়ে জান্নাতে যেও না।জান্নাতেও আমি এভাবে তোমার বুক ঠেকিয়ে কাঁদার মানুষ হতে চাই। আল্লাহ পাক পর জন্মেও আমাকে তোমার সঙ্গী হবার সৌভাগ্য দিন।"
একসাথে পাশ থেকে সবাই বলে উঠলো,
“ আমিন!"
আফিয়া থামলো আশেপাশে এত মানুষের কন্ঠস্বর শুনে।সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের চোখমুখে মুছে বললো,
“ বাচ্চাদের ফুল আনতে পাঠিয়েছেন? কোথায় থেকে আনছো এত কষ্ট করে দাদু ভাইয়ারা?"
আফিয়াই জিজ্ঞেস করলো,নাসিফ নিজের পকেট থেকে টাকা বের ছেলেটার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো,
“ টাকা না নিয়েই দৌড় দিয়েছিলে কেন? এই নাও!"
ছেলেটা নাসিফের হাত ঠেলে দিয়ে বললো,
“ উহুম নানা,এটা আমার ছাদবাগান থেকে আনছি। দু'টোই ছিলো নয়তো বড় করে তোড়া বানিয়ে আনতাম।
আফটার অল একজোড়া কিউট লাভ বার্ডদের আটচল্লিশতম বিবাহবার্ষিকী বলে কথা! কিন্তু দুটি ছিলো বলেই দুটিই আনছি।এটি আমাদের তরফ থেকে এই দম্পতির জন্য উপহার!"
“ কি বলছো!"
নাসিফ উৎফুল্ল হয়ে উঠলো।আফিয়া পাশ থেকে বললো,
“ ঠিক আছে, তাহলে এখন ট্রিট না নিয়ে যেতে দিবো না।আজকে আমাদের গেস্ট তোমরা।"
জোর করেই ছেলেগুলোকে নিয়ে এই সন্ধ্যাটা তারা কাটালো। খাওয়া দাওয়া,নানা গল্প,ছেলে গুলোও মন দিয়ে শুনছে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ঠেকা দুটি মানুষের জীবনের, ভালোবাসার,সংসারের গল্প।






0 মন্তব্যসমূহ