#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১৪৬
[কপি করা/চুরি করা,নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ।দয়া করে এগুলো করবেন না কেউ। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন। ধন্যবাদ সবাইকে।]
জিয়ান পরিবারের বিশাল ড্রইংরুমে খুব সাদামাটা জীবনের ছাপ দৃশ্যমান।
এহেন দামি এলাকা আর অ্যাপার্টমেন্টের ড্রইংরুম যে এত ছিমছাম হয় তা নাফিসার এখানে না আসলে বোঝা যেতো না।
তবে বাইরে থেকে পুরো দেওয়াল যেমন মানি প্ল্যান্ট সহ নানা দেশি বিদেশি রঙিন সবুজ ফুল পাতায় আঁকড়ে আছে তেমনি ভেতরটাও সবুজের অরণ্য বানিয়ে রেখেছে।
নাফিসার বাড়িতে এবার প্রথমই আসলো তাইফ। যেহেতু তাইফের অনুপস্থিতি কালে নাফিসা দেশে একেবারে ফিরে আসে এবং এই বাড়িটা নির্মাণ করা হয় তাই ওর আগে এখানে আসার সৌভাগ্য হয়নি।
নাফিসার ছেলে জিসান বড় ভাইকে সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। ঐদিকে বসার ঘরে.....
“ দেখো ফাতিন,এমন তো নয় যে আমরা কেউই জানি না। বিষয়টা সবাই আগে থেকেই জানি।তাও চেয়েছিলাম ছেলে মেয়ের সরাসরি স্বীকারোক্তি।যেটা পেয়েছি। আমাদের তরফ থেকে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই,থাকারও প্রশ্ন আসে না।আমার নিজের সন্তান, এবং আমার আপন ভাগ্নি।তো এখন তুমি মত দিলেই আমি খুবই তাড়াতাড়ি আমার মা'কে আমার ঘরে আজীবনের জন্য নিয়ে যেতে চাই।"
নাসিফ কথাটা বলে এক গ্লাস পানি পান করলো। সামনের সোফায় মাথা নত রেখে বসে থাকা ফাতিন একটু সময় ভেবে নিয়ে বললো,
“ ভাইজান,আমার তো অমত থাকার কথা নয়।এমন তো নয় আমি ছেলেকে চিনি না। ছেলে আমাদের তাইফ,সোনার ছেলে।যেকোন বাবার জন্য এটা সৌভাগ্য যে তাদের মেয়ে ওমন ঘরে,ওমন ছেলের হাতে যাবে।ভাবীজানের মতো একজন শ্বাশুড়ি পাবে কিন্তু আপনি তো জানেন মেডিক্যাল সাইন্স কাজিন বিয়েতে কত কি!"
“ আরে রাখো তোমার মেডিক্যাল সাইন্স, একজন ধার্মিক মানুষ হয়ে এসব ভেবে বসে থাকো কেমন করে? তাছাড়াও আমার ছেলেও ফিট, তোমার মেয়েও ফিট। দুজনের রক্ত গ্রুপ আলাদা, একদম সুস্থ দুজন মানুষ।অযথা এসব ভেবে সময় নষ্ট না করে দিনতারিখ ঠিক করো।ছেলের ছুটি কম, আবার কবে আসবে!!
“ এটাই তো বড় ঝামেলা।মেয়ের বিয়ের পর যদি মেয়ে স্বামী ছাড়াই থাকে তবে স্বামীর সংসার করবে কিভাবে? স্বামী ছাড়া বিবাহিত মেয়েদের আছে কি?আর ?"
“ এত কিছু ভাবলে তো তোমার কাছেও আমার বোন দেওয়াও দোষের ছিলো! তুমি তো এনজিওর মেডিক্যাল কাজে বিভিন্ন ফিল্ডে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়িয়েছো।তখন এসব মনে ছিলো না?"
এই কথার উত্তর নিরবতা ছাড়া কি দিবে? একটানে ২৬/২৭ বছর পিছনে নিয়ে ফেললো। আড়চোখে একবার সহধর্মিণীর মুখটা দেখলো যে কি-না তার প্রতি হতাশ হয়ে নিজের মাথা দুদিক দুলিয়ে হয়তো মনে মনে বলছে,
“ আর পারলাম না আপনাকে নিয়ে!"
কথা পাকাপাকি হলো,এক সপ্তাহের মধ্যে পারিবারিক ভাবে আঁকদ করে রাখবে এবং মাস দেড় পরে আনুষ্ঠানিকতা।কারন ছোট ছেলের বিয়েটা আপাতত এই বাড়ির শেষ বিয়ে যেটা মোটামুটি লোক জানিয়ে আয়োজন করতে চায়।তাই ছেলের কর্মসূত্রে সেনা মালঞ্চে করতে হবে।সেখানে শিডিউল পাওয়ার জন্য দেড় মাস অপেক্ষা করতেই হবে।
যখন বিয়ের দিনতারিখ নিয়ে পাকা কথা হচ্ছিল তখন তাইফ নিচেই বসা ছিলো। বাবার পাশে।নাজিফাকে অফিসিয়ালি দেখানোর জন্য প্রস্তুতি রাখলেও আফিয়া ধমকে ননদকে বললো,
“ এ্যাই দেখাদিখির কি আছে? মেয়ে কি বাইরের? আমার মেয়ের সাথে আমার বাড়ির ছেলের বিয়ে। সেখানে এত নাটকের কি!যা,এখান থেকে। যতসব, শুধু শুধু স্বামী স্ত্রী মিলে বাচ্চা দু'টোকে অস্বস্তিতে ফেলে।"
এদিকে ফুফুর প্রস্তাব শুনে তুহি,তুলতুল,নূর দোয়া সহ নাইফ হাসতে থাকে।সব রকম হাসি আনন্দে সেদিন সময়টা কেটে যায়।আফিয়াও বাড়ি ফিরে নিজের গহনার খাজানা বের করে সব ধোলাই করতে দিতে থাকে। সঙ্গে বিয়ের কেনাকাটাও শুরু করে দেয়। এদিকে তাইফ ঘোর বিরোধী অতিরিক্ত জমজমাটে।সে নিজের জন্য শুধু একটা সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা কিনলো, সঙ্গে সুন্দর কারুকাজ করা টুপি। যেটা সে বহু আগে মায়ের থেকে ইদ উপহার পেয়েছিল মায়ের হাতের কাজ করা।
নাজিফাকে নিয়ে গিয়ে তার পছন্দে সুন্দর একটা সাদা জামদানি পছন্দ কিনে দেয়। আঁকদের দিন নাজিফা সাদা জামদানি পরলো। আনুষ্ঠানিক বিয়ের জন্য তুলে রাখলো লাল সিল্ক কাতান।যেটা আপাতত কারখানায় তৈরি হচ্ছে।
গা ভর্তি গহনা জড়িয়ে তার জন্য নির্ধারিত ঘরে বসেছিল নাজিফা, সঙ্গে তার সব বোনেরা।ফেরা নিজের এক বছরের মেয়েকে নিয়ে এসেছে।যে তার বাবার কোলে চড়ে এদিকে ওদিকে টুকুর টুকুর করে চেয়ে থাকে। এদিকে তাইফের কোলে নাবীহার মেয়ে ত্বোহা,আর তাইফের দিকে অসহায় চোখে চেয়ে আছে নূহা।ত্বোহার কারণে সে একবারও চাচুর কোলে উঠতে পারে না। এদিকে তাইব চাচুর পাঞ্জাবি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে।নাইফ,জিসান দৌড়ঝাঁপ করে সবদিক সামলাচ্ছে তাদের সাহায্য করছে পিচ্চি সামি।
নামিরা ফোন করে শুভকামনা জানিয়েছে, এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবে বলে নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে।
আর তারা সব আছে আজিমপুর এতিমখানায়।তাইফ নাজিফার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে এখানেই তাদের আকদের ব্যবস্থা করা হলো।
আল্লাহকে সাক্ষী রেখে,বাবা মায়ের অনুমতি আর গুরুজনদের দোয়ায় তাইফ নাজিফা পরপর একজন আরেকজনকে গ্রহন করলো। অতঃপর অতিথি হিসেবে সকল উপস্থিত মানুষকে খাওয়ানো হলো।প্রায় দশ কেজীর মতো খেজুর ও সন্দেশ বিলি হলো পথচারীদের মাঝে।
আঁকদ করিয়েই আফিয়া বউ নিয়ে যাওয়ার জন্য মর্জি ধরলো।প্রথমে ফাতিন রাজী না হলেও পরে হয়ে যায়।নাজিফাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা উঠতেই তাইফের ঘর সাজানো নিয়ে হইচই পরে গেলো ছোটদের মাঝে।যার উদ্ভাবন করলো নূর।সে একমাত্র দেবরের বউ ঘরে তোলার দায়িত্ব পেলো যা খুবই সাদরে গ্রহণ করলো। সঙ্গে তার আবদারও রাখতে হলো ,তাইফের ঘর সাজানো।এদের কান্ডে নাজিফা লজ্জায় রক্তিম বর্ণ ধারণ করে সেই যে ঘাড় নুইয়ে রেখেছে তা আর তোলেনি। এদিকে এসব নিয়ে একদমই নিরুত্তাপ তাইফ।সে ব্যস্ত নিজের ভাগ্নি আর ভাতিজা ভাতিজীকে নিয়ে।।এক ফাঁকে রিফা জুতা চুরি করে এরমধ্যেই একচোট তার হাতে ধমক খেয়েছে।যদিও নাইফ এসে তাদের খুশি করে দিয়েছে নিজের পকেট খসিয়ে।
🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍🤍
“ আয় মা আয়!"
নাজিফা বরাবরই মামীমা ডাকে।এবারও তাই ডাকলো,
“ মামীমা আমার এটাতে ভীষণ.....
“ ঐ,কিসের মামীমা? মা বল!"
তাইফ পাশ থেকে ধমক দিলো।ঘরে ঢুকাতেই একটা ধমক! নাজিফার চোখ ছলছল করে ওঠে। এমনিতেই তো নিজের বাড়ি থেকে বের হবার পর থেকেই মনটা খারাপ, ভীষণ। এরমধ্যেই এতগুলো মানুষের সামনেই প্রথম দিনেই ধমক। আগেও ধমকাতো কিন্তু তা আড়ালে আবডালে।কখনো সরাসরি না।আফিয়া ছেলেকে ধমক দিলো, চোখ রাঙানি দিয়ে বললো,
“ এ্যাই বদমাইশ,এসব কোন ধরনের ব্যবহার? মেয়েটাকে বিয়ে করে ঘরে ঢুকাতেই পারেনি তার মধ্যেই ধমকাধমকি!"
“ আম্মু এক মিনিট!"
বলেই তাইফ মা'কে থামিয়ে নাজিফার দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
“ লিসেন, শুনতে খারাপ লাগবে, কান্না পাবে বাট ইটস ট্রু! এন্ড এটা আমৃত্যু মনে রাখবি!
আগে ছিলো মামী, শুধু মামী।এখন হচ্ছে শ্বাশুড়ি, আগে শ্বাশুড়ি তারপর মামী।সো! আগে আমার মা তোমার মুখে তুলে দিতো তুমি খেতে,এখনো তাই চাবে তা হবে না। মনে রাখতে হবে,এখন তুমি এই বাড়ির বউ।এই বাড়ির প্রতিটি বিষয়ে যেমন অধিকার আছে তেমনি দায়িত্বও আছে। দায়িত্ব পালন করলেই সম্মান পাওয়ার আশা রাখা যাবে না,দায়িত্ব পালন করলেই জনে জনে প্রশংসা করে মুখে ফ্যানা তুলবে সেই আশাও করা যাবে না।মোদ্দে কথা কোন আশাই রাখা যাবে না।সব আশা ভরসা বাদ দিয়ে নিজের কাজ নিজের মতো করে যেতে হবে।যখন এভাবে ভাবতে পারবি ঠিক তখনই দেখবি কোন কষ্ট নাই।কোন বিষয়ে খারাপ লাগা কাজ করবে না কিন্তু চাহিদা রাখবি অথচ ঠিকঠাক পাবি না তখনই দেখবি সব হাহাকার করছে।তখন তোর আমার সংসার ভালো লাগবে না, আমার মা'কে ভালো লাগবে না,আমার বোনদের সহ্য হবে না,বড় ভাবীর সাথে এডজাস্ট করতে পারবি না।তখন মনে হবে কি জানিস,আগেই ভালো ছিলো।সবাই তো এমন ছিলো না।তবে কি শ্বশুর শাশুড়ি হলেই সবাই বদলে যায়? এসব চিন্তা ভাবনা করবি আর তার প্রভাব পড়বে তোর আমার মাঝে, আমাদের সংসারে। ঝামেলা হবে,অশান্তি বাড়বে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে।আর আমি তা মোটেই বরদাস্ত করবো না।আমার বড় ভাইয়ের মতো সব বুকে চাপা দিয়ে সহ্য করে নিজেকে অসুস্থ বানাবো না। সুতরাং! আজকে এই যে ঘরে ঢোকার আগেই সব বুঝিয়ে দিলাম আশাকরি আমৃত্যু এভাবেই চলবি।তোর মামা,মামী পরে আগে আমার বাবা মা।আমার ভাই বোন।ওকে?"
নাজিফা ছলছল চোখে উপরনিচ মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো, দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাদের দিকেই তাকিয়ে থাকা সব চোখ জোড়াকে দেখলো। সবাই বিরক্ত হচ্ছে, রাগে ফাটছে।
নাসিফ শেষ কথাগুলো শুনতে পেলো,সে কিছু সময় আগেই এখানে এসে দাঁড়িয়েছে।পিছন থেকে চেঁচিয়ে বললো,
“ কি হচ্ছে কি এখানে?"
তাইফ বাবার গর্জনে খানিকটা পাশ করে দাঁড়ালো।নাসিফ ছেলের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“ তোমার বউ পরে,আমার বোনের মেয়ে আগে।ওর সাথে মেজাজ দেখানোর আগে ভাববে এখানে ওর মামা উপস্থিত। তুমি আমার ছেলে বলে মাফ পাবে না।
এটা যেমন তোমার, তোমাদের বাড়ি, ঠিক তেমনি ওরও। বরং এই বাড়িতে ওর অধিকার সবার চেয়ে বেশি,কারণ একে তো এখন থেকে ওর শ্বশুর বাড়ি কিন্তু তার আগে মায়ের বাপের বাড়ি। সুতরাং ওর সাথে তোমার উগ্র মেজাজ একদম দেখাবে না।"
“ মেজাজ দেখাইনি বাবা।ওকে সঠিক একটা সবক
দিলাম যেন শ্বশুর বাড়িতে ঢুকার ফিল পায়। নয়তো আজীবন মামা বাড়িই মনে করবে!"
“ মামা বাড়িই তো, মনে করার কি আছে? আর হ্যাঁ সবক এখানে দাঁড়িয়ে এখনই দেওয়া লাগবে? এক ঘর ভর্তি মানুষের সামনে তুমি নিজের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে এহেন সবক দিচ্ছো যে তার চোখে পানি চলে এসেছে।"
“ স্যরি,ইফ আই হার্ট ইয়্যু।বাট এখন তোমার ফিল হচ্ছে না শ্বশুর বাড়িতে ঢুকছো?"
নাজিফা গাল ফুলিয়ে ফুলে আছে।তার চেহারা দেখে যেকেউ বুঝতে পারবে সে রেগে আছে। ঐদিকে ভাইয়ের পাগলামিতে এখন সবাই মিটিমিটি হাসছে।
নাসিফের রাগ চিড়বিড়িয়ে বাড়তে লাগলো,সে হাত উঠিয়ে চড় দেওয়ার ভঙ্গি করে বললো,
“ আমার ইচ্ছা করছে চড়িয়ে তোমার গাল ফাটিয়ে দেই, অসভ্য বর্বর ছেলে একটা!"
“ বাবা নতুন বউয়ের সামনে মাইরেন না। ইজ্জত খোয়া যাবে, আর পাবো না।"
“ নিজের ইজ্জতের চিন্তা করলে অন্যকে হেয় করার দুঃসাহস করতে না।"
“ হেয় করিনি বাবা। আপনার ভাগ্নি স্যরি ছোট বউমাকে শুধু বুঝিয়ে দিয়েছি এই যে ভদ্রমহিলা তাকে মিষ্টি খাইয়ে ঘরে তুললো তিনি এখন থেকে তার শ্বাশুড়ি আম্মা। আজীবন যেন এইটা মনে রাখে।এখানে খারাপের কি দেখলেন?"
“ ও কি জানে না তোমার আম্মা ওর কি হয়?"
“ জানে? কই! ও তো মামীমা বলেই ডাকলো!"
নাসিফ বুঝলো ছেলে অযথা কথা পেচাচ্ছে।সে নিজের ধৈর্য্য হারিয়ে আফিয়াকে ধমকে বললো,
“ তোমার এই অসভ্য বেয়ারা ছেলের জন্য যদি আমার ভাগ্নির চোখে পানি আসে তবে এই বয়সে তোমার কপালে আমি শনি নামিয়ে ছাড়বো।
__এ্যাই বউমা, যাও,ওকে নিয়ে ঘরে দিয়ে আসো।মেয়েটা একটু রেস্ট নিক।এরা মা ছেলে ড্রামা জারি রাখুক।"
নিজের বউকে ঝেড়ে ছেলের বউকে আদেশ দিলো।ঐদিকে আফিয়া অগ্নি কুন্ডের ন্যায় রেগে ছেলেকে দেখছে,যাওয়ার পথে নাসিফ বললো,
“ খবরদার,আর কোন নাটকফাটক করো না। সবাইকে শান্তিতে থাকতে দাও!"
“ কি হয়েছে এখানে?"
নাইফ সবার পিছনে ছিলো।সে মূলত এলাকার মসজিদে মিষ্টি দিয়ে আসতে গিয়েছিল।বাবার শেষ কথাটা শুনতে পেয়েই এটা জিজ্ঞাসা করলো।
আফিয়া ছোটটার ঝাল বড়টার উপর মিটিয়ে বললো,
“ কি আর হবে? তোমাদের ভাই বোনদের বদৌলতে বুড়ো বয়সে স্বামীর হাতে কিল খাবো। আল্লাহ এমন সন্তান দিয়েছে আমার কপালে!"
সেও চলে গেলো। এদিকে অসহায় নাইফ ভাইয়ের দিকে একপলক তাকিয়ে মায়ের যাওয়ার পথে চেয়ে রইল।নাবীহা ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করলো,
“ এমন করলি কেন শুধু শুধু?"
“ এখানে ওকে জ্বালানোর কেউ নাই।তাই ভাবলাম আমিই করি!ইয়ে মানে ফেসবুকে অনেক উপন্যাসে পড়ি নববধূর প্রথম গৃহ প্রবেশের সময়েই কেউ না কেউ তাকে এমন অপমান করে তাই আর কি!"
তার চাহনি অসহায়,নাবীহা থমথমে মুখে ভাইয়ের দিকে চেয়ে রইল। এদিকে তাইফের কথা শুনে তিন বোন জামাই হাসিতে ফেটে পড়ে।তুহি কপালে হাত ঠেকিয়ে আফসোস করতে থাকলো।ফেরা বললো,
“ হায়রে ড্রামাবাজ,সাধেই কি টাইপ বলি!"
নাইফ এখনও ভ্যাবলার মতো চেহারা করে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি হয়েছে কেউ তো বলো? নয়তো আমি কিছুই বুঝবো না!"
তুহি সবটা বলতেই নাইফ তাইফের পাছায় লাথি মারলো,ঘাড়ে হাত দিয়ে চাপ দিয়ে নুইয়ে ধরে বললো,
“ উপন্যাস পড়ো তুমি না উপন্যাস! উপন্যাসের খলখালাম্মা সাজো! আর একদিন যদি ...."
“ ভাই কি করছো? ছোট বোন জামাইদের সামনে কেউ সুমন্ধিকে মারে তাও এভাবে আরে ভাই একটু তো বুঝো আমি নতুন বর!"
এই প্রহর এভাবে কাটলো।সবাই বুঝলো ঐসময়ের ব্যাপারটা পুরোটাই অযথা তাইফের একটা নাটক ছিলো।
নাজিফাকে গেস্ট রুমে রেখে তাইফের ঘর সাজানো হয়। যেহেতু আঁকদ এবং রেজিস্ট্রেশন দুটোই সম্পন্ন তাই এক ঘরে থাকতে কোন বাঁধা নেই যদিও ফাতিন আনুষ্ঠানিকতার আগে এভাবে থাকায় রাজী ছিলো না তাও আফিয়া রাজী করায়।
অতঃপর বউকে তার ঘরে নেওয়া হলো।তাইফকে নাইফ নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে টুকটাক পরামর্শ দিলো যেন নাজিফার সাথে অযথা মেজাজ না দেখায়।মু'য়ায ভদ্রলোকের মুখোশ খুলে শ্যালককে কিছু টিপস দিলো তাই নিয়ে আবার ফেরার স্বামী সাদিক ও তুহির স্বামী ফাহাদ হাসাহাসি করলো।
দোয়া নিজে হাতে একটা সুন্দর সুতি শাড়ি পরিয়ে দিলো নাজিফাকে।তুহি নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছে তার শরীর খুব একটা ভালো লাগছে না।ফেরাও নিজের বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত।
সব শেষে তাইফকে ছাড়া হলো।তাইফ দরজা ঢেলে ভেতরে ঢুকলো।তখন থেকেই নাজিফা মুখ ভার করে রেখেছে। পাঞ্জাবির বোতাম খুলতে খুলতে ঘরে ঢুকে সালাম দিলো,
“ আসসালামু আলাইকুম!"
নাজিফা সালামের উত্তর দিলো। এরপর চুপ।তাইফ মুচকি হেসে পাঞ্জাবি খুলে ফেললো। ফর্সা লোমশ শক্তপোক্ত ঐ পেটা শরীরের ফুলেফেঁপে থাকা টাইসেপ বাইসেপের মাসল আড়চোখে দেখে নাজিফা ঢোঁক গিললো।তাইফ সেটাও খেয়াল করে মুখ ফিরিয়ে হাসলো। পাতলা একটা টি শার্ট আর ট্রাউজার নিয়ে বাথরুমে ঢুকে ওযু করে বের হলো।তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললো,
“ ওয়ারড্রবের সেকেন্ড ড্রয়ারে নামাজের হিজাব আর টপস প্লাজো রয়েছে।পরে তাড়াতাড়ি আয়!"
নাজিফা কথা বললো না ঠিকই তবে আদেশ অনুযায়ী কাজ করলো। ততক্ষণে তাইফ আগপিছ করে জায়নামাজ বিছিয়ে ফেলেছে এবং সে সম্ভবত কোন নিয়তের নফল নামাজ আদায় করে নিয়েছে।নাজিফা মুগ্ধ হয়ে দেখলো কি চমৎকার সুর দিয়ে তাইফ কোরআন তেলাওয়াত করলো। যেহেতু হাফেজ তাই তার সব সুরা মুখস্থ। চলমান তেলাওয়াতে বিরতি টেনে হাসি বজায় রেখেই নাজিফাকে বললো,
“ এসো!"
নাজিফা জায়নামাজের উপর পা রাখতেই দুজন এক সাথে আদায় করলো নতুন জীবনের জন্য দুরাকাত নফল নামাজ।
অতঃপর লম্বা তেলাওয়াত এবং দোয়ার মাধ্যমে শেষ করলো এখনকার ইবাদত।
এই ভাবে তাদের দাম্পত্যের আরম্ভ হলো। আশাকরি সুখে থাকবে।






0 মন্তব্যসমূহ