#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১৩৭
[কপি করা/চুরি করা, নিজ ফিডে শেয়ার করাও নিষেধ। দয়া করে এগুলো কেউ করবেন না। আপনার ভালো লাগলে আপনার উপন্যাস প্রেমী বন্ধুদের মেনশন দিন।ধন্যবাদ সবাইকে।]
নাইফ অফিস থেকে ক্লান্ত সিক্ত বদনে সদর দরজা পেরিয়ে বসার ঘরে ঢুকতেই নাসিফ ডেকে উঠলো,
“ বাবু শোন!"
“ জি বাবা।"
“ গোডাউনে মাল কেমন দেখলে?"
“ জি আলহামদুলিল্লাহ,বেশ কয়েকটি কালার এসেছে।কাল সকালে কিছু সময় পাবো তখন গিয়ে সবটা ডিস্ট্রিবিউট করে দিবো ইনশাআল্লাহ!"
“ তোমাকে বললাম একজন দক্ষ লোক নিয়োগ দিতে। এভাবে চাপ নিলে অসুস্থ হয়ে পড়বে তো!"
“ দক্ষ লোক চাইলেই পাওয়া যায় বাবা? তাছাড়াও আপনি আমি যেভাবে দেখি তারা কি সেবা দেখবে?"
“ তা তোমার মা'কে গিয়ে বোঝাও।সে তো ভাবে আমি ইচ্ছে করেই লোক রাখি না।"
“ আম্মু সাধারণ মানুষ,অত বুঝে! যাক চিন্তা করো না। ইনশাআল্লাহ সবটা হয়ে যাবে তাছাড়াও আমি তো ফার্মের জবটা ছাড়ছি খুব শিগগিরই।"
ছেলের কথায় চমকে উঠলো নাসিফ, জিজ্ঞেস করলো,
“ কি বলছো, কেন?"
“ এমনিতেই,খুব একটা তো পাচ্ছি না তাছাড়াও ঐটার চেয়ে বেশি সময় নিজের ব্যাবসায় দিলে আরো ভালো করবো ইনশাআল্লাহ!"
“ কিন্তু!"
“ চিন্তা নেই বাবা।আমি বুঝে শুনেই ছাড়ছি। তাছাড়াও বুয়েট বোধহয় এবার আমাকে নিবেই ইনশাআল্লাহ।তখন তো একসাথে এতদিকে পারবো না।"
“ দেখো, তোমার যা ভালো মনে হয় করো।
আমি তোমাকে যার জন্যে ডেকেছি,এক কাজ কর ফ্রেশ হয়ে আসো।আমি অপেক্ষা করছি।"
“ জি,তাইফ কোথায়?"
“ ঐ কোন বন্ধুর সাথে মিট করতে গিয়েছে।আসবে চলে কিছু সময়ের মধ্যেই!"
“ ওহ, আচ্ছা। আচ্ছা আমি আসি তাহলে!"
“ হ্যাঁ হ্যাঁ যাও।"
“ তুহি বুড়ি! কোথায় তুমি?"
ছোট বোনের নাম ধরে হাকতে হাকতে নিজ ঘরের দিকে এগুলো।
নাইফ ফ্রেশ হয়ে বসার ঘরে আসলো।আফিয়াও ছেলেকে দেখে হাত বাড়িয়ে বললো,
“ এদিকে এসো!"
নাসিফ গম্ভীর মুখে পাশেই বসে আছে। ঠিক এই সময়েই দরজায় বেল বেজে উঠল।নাইফ উঠে দাঁড়ালো, এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই তাইফের দাঁত ক্যালানো হাঁসি দেখে বললো,
“ ওহ, তুমি?"
“ কেন,কাকে আশা করছিলেন!"
“ ভাবলাম ন্যাকু রানী খুলবে তার জন্য সারপ্রাইজ আছে!"
“ তোকে না বলছি ওকে এসব বলবি না।বড় হচ্ছে তাইফ, লোকের সামনে এগুলো বলে লজ্জা দিবি না ওকে।"
“ আচ্ছা দিবো না ভাই,মাফ চাই! তোমার বোনকে তুমি কলিজায় লুকিয়ে রাখো।"
“ দিনদিন ফাজিলের হাড্ডি হচ্ছে!
কে বলবে এই ছেলে একজন ডিফেন্সের লোক!"
তাইফ ভাইয়ের কথা শুনতে শুনতেই বাবার পাশে গিয়ে বসলো।নাসিফ ছোট ছেলেকে চোখ রাঙানি দিয়ে বললো,
“ তোমাকে না বলেছি অযথা আমার মেয়েদের ক্ষেপাবে না।"
“ জি,শুনেছিও কিন্তু স্মরণে থাকে না।
বয়স হচ্ছে না?"
মাত্র বাইশও অতিক্রম না করা ছেলের এই কথায় নাসিফ হতবাক চোখে চেয়ে আছে।তাইফ বাবার চাহনি দেখে ফিক করে বিতলা হাসি দিলো।নাইফ এসে ভাইয়ের পিঠে চাপড় মেরে বললো,
“হট,বদ!"
“ ওকে আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।"
“ পরে যাও,বসো এখানে।কথা আছে!"
“ আমার সাথে?"
“ সবার সাথে। তোমাদের আম্মা আসছে!"
আফিয়া আসলো মিনিট দুইয়ের মধ্যেই। মা'কে দেখেই তাইফ সরে গিয়ে বাবার পাশে মায়ের জন্য জায়গা করে দিলো।অপর পাশে নাইফ বসেছে বাবার দিকে ফিরে।
বাবা যে খুবই সিরিয়াস কিছু নিয়ে আলোচনা করবে তা নাইফ বুঝতে পারছে,যার কারণে তার বুকে ইতি মধ্যে ধুকপুক শুরু করে দিয়েছে।
“ তুমি কি বউমাকে ফোনটোন দিয়েছো?"
স্ত্রীর কথা জিজ্ঞেস করায় নাইফ মাথা ঝুঁকিয়ে নিলো। নিরুৎসাহিত গলায় উত্তর করলো,
“ না!"
নাসিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, আফিয়ার দিকে একবার চেয়ে মাথা নিচু করে কিছু সময় ভাবলো, অতঃপর ছেলের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বললো,
“ ফোন করা উচিত। কথাবার্তা বলো, তার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করো। তাছাড়াও এভাবে বললেই তো সব চুকিয়ে দেওয়া যায় না বাবা।এটা একটা জীবনের প্রশ্ন। স্বামী স্ত্রী সম্পর্কটা কোন হেনতেন সম্পর্ক নয়। এখানে এক জীবনের সবটা জড়িত।"
“ বউমাকে ফোন দিয়ে তার খোঁজ নাও। শরীর কেমন আছে,তার পরিবারের সবাই কেমন আছে জিজ্ঞেস করো!"
“ কেন সে কি ফোন দিয়েছে একবারও? ভাইয়ার খোঁজ নিয়েছে?"
তাইফ পাশ থেকে বলে উঠলো।আফিয়া ছেলেকে মৃদু ধমক দিয়ে বললো,
” মেল ইগো দিয়ে সংসার চলে না বাবা।সে দেয়নি বলে আমিও দিবো না এসব চিন্তা নিয়ে সংসার করা যায় না। সংসার হচ্ছে ত্যাগ, সহনশীলতা আর ধৈর্য্যের ময়দান।যতই করবে দিবে ততই সুন্দর হবে এর পরিবেশ।"
“ ফোন দিয়েছিলো দু'বার,আমিই রিসিভ করিনি!"
নাইফ মায়ের কথার শেষে উত্তর দিলো।সবাই নাইফের দিকে তাকালো।নাসিফ বললো,
“ কেন রিসিভ করোনি? রিসিভ করে শোনা উচিত ওর কথা তোমার!"
“ না,আমি চাই ওর বাবা আসুক। অতঃপর তিনি নিজে এসে নিজের এবং মেয়ের ভুলের স্বীকার দিয়ে তার মেয়েকে বুঝ দিয়ে যাবে, এবং যদি সত্যিই আম্মুর কাছে ক্ষমা না চায় তবে আমি কোনদিন ওকে এই ঘরে তুলবো না।এটা আমার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাবা।"
“ না,কোন ক্ষমাটমা চাওয়ার দরকার নাই।আমি ওসব মনে জিইয়ে রাখিনি। তাছাড়াও আমার বাচ্চারা বললে কি আমি মনে রাখতাম! ছেলের বউ বলে ওসব ধরে বসে থাকবো এমন মানুষ আমি না।আমি চাই তোমরা চার ভাইবোন'ই নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে সুখী হও। এখানে আমাদের জন্য কারো জীবনে অশান্তি চলুক এটা আমি, তোমাদের বাবা কেউই মানতে পারবো না, চাইও না।
_ তাছাড়াও তোমার শ্বশুর বৃদ্ধ মানুষ, পুরুষ মানুষ। দীর্ঘদিন সঙ্গী বিহীন কাটিয়েছেন,সংসারের এসব ক্যাচাল তার বোঝার কথা নয়।তিনি শুধু নিজের মা-হীন মেয়ের কান্নায় এসব বলেছেন।ঐখানে তোমার বাবা থাকলেও তাই করতেন। সুতরাং উনাকে অযথা অপমানিত করার কোন দরকার নেই বাবা। তুমি নিজের মা'কে বড় করতে গিয়ে আরেকজন বাবা মা'কে ছোট করবে এটা আমাদের শিক্ষা নয়।আমি চাই না আমার বাচ্চাদের দ্বারা এমন ছোট কাজ হোক।ওসব বাদ দিয়ে উনাকে শুধু বলবে যেন মেয়েকে একটু বুঝ দেয় যাতে পরের কথায় নিজের সংসারে অশান্তি না করে, ব্যস্।আমার বললে বুঝছে না তাই তার সহযোগিতা দরকার।উনাকে এতটুকু বুঝাবে তাতেই হবে।"
নাইফ,তাইফ দুই ভাই'ই চুপ।নাসিফ ছেলেদের দিকে ফিরে ফিরে তাকিয়ে অতঃপর আবারও নিজের দৃষ্টি বড় ছেলের দিকে স্থির করে বলতে আরম্ভ করলো,
“ এখন যেটা বলার তোমাদের দুই ভাইকে এখানে বসিয়েছি। দুজনেই সারাদিন পরিশ্রম করেছো বাইরে তারপর এসব পারিবারিক মিটিং এ একটু বিরক্ত লাগে, আমিও...
“ কি বলছো বাবা, বিরক্ত লাগবে কেন? পারিবারিক মিটিংই কেন বলছো? সারাদিন শেষে তোমাদের পাশে একটু কথা বলতে পারাটাও আমাদের জন্য অনেক বড় কিছু। কয়জনের সৌভাগ্যে বাবা মায়ের সাথে এভাবে কথা বলার সময় থাকে?"
“ এসব বলবে না বাবা।প্লিজ! আমাদের কাছে তোমাদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই!"
“ হু,যা বলছি শোন মন দিয়ে।আমি আর তোমার আম্মা অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমাদের দাদীরও সম্মতি আছে।"
“ কি নিয়ে?"
দুই ভাইয়ের একসাথে প্রশ্ন,এর মধ্যেই দুই মেয়েও এসে উপস্থিত।তারা সামনের ফাঁকা সোফায় বসলো।নাসিফ মেয়েদের দিকে তাকিয়ে একবার দেখলো অতঃপর বললো,
“ আমরা ভাবছি,এই বাড়িটা তো পাঁচ তলা অবধি অনুমোদন করে রাখা।তো আমার দাদার ইচ্ছা ছিলো না আর বড় করার।তবে যেন ভবিষ্যতে চাইলে বড় করতে পারি তাই অনুমতি এনে রাখছেন।আসলে উনার ছেলে সন্তান একজন, আবার তারও একজন।তাই হয়তো উনারা এতটা আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার আল্লাহর মাল দুজন। তাই আমি চাচ্ছি এখন এটাকে বড় করতে!"
“ মানে বুঝলাম না, হঠাৎ বাড়ি বড় করা মানে বুঝলাম না।এমন কি দরকার হলো বাবা? এই কয়জনই তো মানুষ আমরা! বেশ থাকছি,কোন সমস্যা তো হচ্ছে না।তবে হঠাৎ করেই বাড়ি উঁচু করার তাগাদা মানে ইচ্ছা কেন জাগলো তোমাদের মনে?"
তাইফ প্রশ্ন করলো, নাইফ বাবার দিকে গভীর ভাবে চেয়ে আছে।তার মন কেন জানি অশনি সংকেত দিচ্ছে।সে মনে মনে চাচ্ছে বাবা তা না বলুক যা সে শুনতে চায় না। কিন্তু সব চাওয়াই পূরণ হবার নয়।নাইফের এই চাওয়াটাও হলো না।নাসিফ খুব সাবলীল ভাবে বলে দিলো,
“ তোমরা বড় হচ্ছো।প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সংসার হচ্ছে।সবার আলাদা করে পরিবার হবে,আত্নীয় বাড়বে।স্বজন পরিজন বাড়বে, তাদের আনাগোনাও বাড়বে। সেক্ষেত্রে একজনের জন্য আরেকজনের নানা সমস্যা হবে। বিভিন্ন সময়ে একজনের বিষয় আরেকজনের পছন্দ হবে না।এটা খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়। মানুষ মানুষের মাঝে ভেদাভেদ থাকে, পছন্দ অপছন্দের অনেক বিষয় থাকে। সৃষ্টি থেকেই এসব চলে আসছে। এখানে কোন দোষ নেই।আমরা শুধু নিজের দিক দিয়ে ভাবি,অপরের দিকে ভাবি না বলেই এত সমস্যা সৃষ্টি হয়।যদি অপরপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তবে সেও ঠিক আমিও ভুল। কিন্তু তা করি না বলেই কেবলি অন্যকে ভুল দেখি।
_ সে যাই আমি আর তোমার আম্মা ভেবেছি উপরে আরো দু'টো তলা করবো এবং ঠিক উপরের তলা আমি তোমাকে (নাইফের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে) এবং তার উপরের তলা তোমাকে( তাইফকে বললো)। আমার মেয়েদের জন্য এখানে আমি কোন অংশ রাখছি না। তাদের অন্যত্র দিবো ঠিক যেভাবে আমার বাবা করেছে।তবে নিচের এই অংশ এমনই থাকবে।এখানে তোমার সবাই বেড়াতে আসবে আমাদের কাছে।যখন আমরা থাকবো না তখন আমার মেয়েরা এখানে এসে বাবার বাড়ির স্বাদ নিবে। তোমরা তাদের ভাইয়েরা যতটুকু পারো চেষ্টা করবে তাদের জন্য করার। করতেই হবে এমন কোন জুলুমের মধ্যে আমি তোমাদের রাখবো না। যেহেতু মেয়ে আমার, তাদের সব রকমের দায়দায়িত্ব আমিই পালন করবো এবং মরার পরেও যেন তা অবধারিত থাকে সেই ব্যবস্থাও করে যাবো। ইনশাআল্লাহ।"
“ কিন্তু বাবা তার জন্য?"
“ উম্ থামো! আমার শেষ হয়নি।বলতে দাও।"
তাইফকে থামিয়ে দিলো,
“ আমি কারো উপর রাগ করে এই কথা বলিনি। তোমার আম্মা আর আমি অনেক ভেবে, তোমার দাদীর সাথে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আসলেই এটা আমাদের দেশের বাবা মায়ের সমস্যা।তারা ছেলে মেয়ের বিয়ের পরেও তাদের নিয়ে অতিরিক্ত ভাবে যার দরুন তাদের কখনোই আলাদা জীবনের স্বাদ নিতে দেয় না।এতে করে অন্য বাড়ির মেয়েটাও যেমন দায়িত্ব বুঝে না,সংসার গড়ার কষ্ট বুঝে না, আনন্দ পায় না তেমনি আমাদের ছেলেরাও দায়দায়িত্ব ঠিকঠাক শিখতে পারেনা। কিন্তু উচিত এবং ধর্মও বলে কোন পুত্র বধূ্র তার শ্বশুর শাশুড়িকে সেবা করার অথবা দেবর ননদের দেখভাল করার বিধান নেই।তারা তাদের স্বামী সন্তান এবং সংসারের দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু আমরা বাঙালি বাবা মায়েরা হাপিত্যেশ করি পুত্র বধূ্র সেবা নেওয়ার জন্য যা ঘোরতর অন্যায় এবং ধর্মের বিধান ভঙ্গের জন্য দায়ী।
এই কারণেই এত এত সংসার ভাঙ্গার কাহিনী শোনা যায়।যা একদম অহেতুক কিছু কারণেই ঘটে।অথচ সমাধান কত সহজ!"
“ বাবা,আমার মনে হয় না আমাদের বিষয়ে তোমরা কেউ বাড়াবাড়ি করেছো।আর না আমার মা কোন জুলুমকারী শ্বাশুড়ি তাছাড়াও....
এত সময় পর নাইফ মুখ খুললো।আফিয়া ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো,নাইফ খুব আলতো হাতে মায়ের হাত ধরে মায়ের পায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ভেজা কন্ঠে অনুনয় করে বললো,
“ মা মাগো,প্লিজ আমাকে তোমার থেকে দূরে সরিয়ে দিও না।আমি দিন শেষে তোমার মুখ না দেখে কি করে থাকবো? বলো? তুমি তো জানো আমি এখনো তোমাকে না দেখে বাড়ির বাইরে যাই না।আমি কিভাবে?"
আফিয়া স্বামীর পানে ছলছল চোখে তাকিয়ে ছেলের হাতের মুঠোয় থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো।ছেলের মাথায় হাত রেখে আদর দিয়ে ভারাক্রান্ত গলায়ই বললো,
“ পাগলামি করো না। বাবার কথা সবটা শোন মন দিয়ে। তোমাদের ভালোর জন্যই বলছে।"
“ কিন্তু আম্মু! বাবা কেন আমাকে পানিশড করছে? আমি তো.."
নাইফের গলা কাঁপছে।তুহি শক্তপোক্ত বড় ভাইয়ের এহেন করুন অবস্থা দেখে ছলছল চোখে চেয়ে আছে।নাবীহা বাবা মায়ের দিকে একবার তাকাচ্ছে তো ভাইকে দেখছে।তাইফ নিজেও অসহায় চোখে বড় ভাইয়ের দিকে চেয়ে আছে।
নাসিফ ছেলের পিঠে হাত রেখে বুলাতে বুলাতে বললো,
“ কাউকে পানিশড করছি না। যথেষ্ট ম্যাচিউর তুমি, এবং জানো এসব।অযথা মা বাবা কে ভুল বুঝে তাদের বুকের ভার ভারিও না।কথা শোন আমার।"
নাইফ বাবার দিকে চেয়ে আবারও মায়ের দিকে চাইলো। হুট করেই মায়ের কোলে মাথা রেখে বললো,
“ তুমি যা বলো আমি তাই করি আম্মু। হ্যাঁ আমি মানছি আমি শুরু থেকেই নূরে দুর্ব্যবহার দেখেও চুপ ছিলাম।আমি শুরু থেকেই প্রতিবাদ করলে নূরের দুঃসাহস এত দূর হতো না।আমি নিরব থেকেই ওকে সাহস দিয়েছি।আমি আমার অপরাধ স্বীকার করছি। তুমি প্লিজ বাবাকে বলো আমাকে এত বড় শাস্তি না দিয়ে নিজের হাতে জ বা ই করে ফেলতে।তাও আমাকে তোমাদের থেকে দূরে না সরিয়ে দিতে।"
আফিয়ার চোখ গলিয়ে পানি করে পড়লোই। কিন্তু তাতেও আফিয়া নরম হলো না। বরং ছেলের মাথায় হাত রেখে এবার নিজের মাতৃত্বের ব্যবহার করে শান্ত গলায় বললো,
“ বিষয়টা আজকালে নয় বাবা। ভবিষ্যতের। আমি আর তোমার বাবা আর কতদিন? একদিন তো চলে যাবোই। তোমার বাবা, শুধু তোমাদেরই বাবাই নয় আমিও চাইছি আমরা থাকতে থাকতেই তোমাদের ভাই-বোনের সবটা বুঝিয়ে দিতে।
দেখো আমাদের দেশের অধিকাংশ বাবা মাই জীবদ্দশায় সহায় সম্পত্তির সঠিক বণ্টন করে না।এসব করে না বলেই তাদের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে একরকম হাঙ্গামা শুরু হয়ে যায়।অথচ ধর্মের নিয়ম বলে যার যার সম্পতির সঠিক বণ্টন করে যাওয়া উচিত।আমরা চাই না ভবিষ্যতে তোমাদের ভাইবোনের এই ভালোবাসার মাঝে দেওয়াল হয়ে দাঁড়াক সম্পত্তি। মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছো। মানুষের মন বলা যায় না কখন পরিবর্তন ঘটে।আমি তোমাকে নিয়ে যতটা আত্নবিশ্বাসী ততটা আত্নবিশ্বাসী আমি আমার তাইফকে নিয়ে হতে পারি না।রগচটা বদমেজাজি পুরুষ মানুষ,কখন কাকে কি বলে ফেলে তার কোন ঠিক তার নিজের কাছেই নেই। মানুষের মুখ বুলেটের চেয়েও দ্রুত ছুটে, তরবারির চেয়েও দাঁড়ালো।ক্ষনিকেই বুকের এফোঁড়ওফোঁড় করে রাখে।সেখানে যদি থাকে স্বার্থের তাড়া তাহলে তো কথাই নেই। তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান,বুঝদার।ধীরে সুস্থ মস্তিষ্কে সিদ্ধান্ত নিলেও তোমার ছোট ভাই তা পারে না। ঐদিকে তার পক্ষে নিরবে অন্যায় সহ্য করাও সম্ভব নয়।আমি চাই না তার মুখের জন্য তোমার ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যা হোক। তাছাড়াও সেও শিগগিরই বিয়ে করবে।সংসারে ঢুকবে।তার সহধর্মিণী কেমন হয় সেটাও তো ভাবার বিষয়।সেও যদি একই ছাদের তলায় না থাকতে পারে?আমি তো আমার অহেতুক ব্যক্তি ইচ্ছার চাপে আমার ছেলেদের সুস্থ সুন্দর জীবনের বাঁধা হতে পারি না।আর হতেও চাই না।আমি সবসময়ই চাই আমার চার ছেলে মেয়ে পৃথিবীর সব সুখ পাক,সব আনন্দ পাক।আর তার জন্য যা করার দরকার তাই করবো।
তবে এখন আমাদের যা সিদ্ধান্ত সেটা শুধু এতটুকুর জন্যই নয়। আমার মনে হচ্ছিল তোমাদের দুই ভাইয়ের আলাদা সংসার হোক।সত্যি বলতে আমি তোমার দাদীর সংসারে এসে ঢুকেছি।এখানে আমার কোন সংসার হয়নি।আমাকে তো একটা খুন্তিও কিনতে হয়নি।আসলেই এমন সংসারের মজা নেই।আমি চাই তোমাদের বউয়েরা সংসার সাজাক।খুন্তি থেকে বিছানার চাদর নিজেরা পছন্দ করে কিনুক।আমি মাঝে মাঝে গিয়ে এটা ওটা দেখে দোষ ধরবো।শাসাবো আমার ছেলেদের পয়সা অযথা খরচ করার জন্য।তারাও গাল ফুলিয়ে একটু আধটু বিচার দিক আমার ছেলেদের বিরুদ্ধে। তোমাদের একটা ব্যক্তিগত বিকাল হোক, দুজন রান্না ঘরে খুনসুটি করে কিছু সময় কাটাও। চায়ের আড্ডায় নিজেদের মধ্যে মধুর সময় কাটাও। ছাদে বৃষ্টি বিলাস করো।কখনো কখনো একে অপরকে খাইয়ে দেও,একটা বিকাল আমার কাছে এসে বসে নিজেদের সাংসারিক সমস্যা নিয়ে আলাপ করো।
আমি আসলেই ভেবে দেখেছি এগুলো আমি কখনোই পাইনি। অথচ আমার পাওয়া উচিত ছিলো। তোমাদের বাবার সাথে সংসার ছাড়া আমার আর কোন মুহূর্ত নাই।যেটা কল্পনা করে আমি একাকী একটা বিকাল কাটাতে পারি, তোমার বাবার একাকীত্ব অনুভব করতে পারি।
তাই আমি চাই আমার ছেলের বউয়েরা এই সময়টা পাক।আমার অনেক না পাওয়া আমি তাদের মাঝে দেখে তৃপ্ত হবো। মেয়েদেরটা দেখার সৌভাগ্য তো হবে না,তারা তো পরের বাড়ির আমানত। কিন্তু ঘরে আনা মেয়েদের দিয়ে আমি সেই ইচ্ছা পূরণ করবো। এখন যদি তোমাদের ভাইদের কাছে মনে হয় মা স্বার্থপর, তবে তাই ।আমি স্বার্থপর।আমি স্বার্থপরের মতোই নিজের ইচ্ছা তোমাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছি। অনেক বছর তো তোমাদের জন্য নিজেদের ইচ্ছাকে দমন করেছি এখন সেগুলো ফিরিয়ে দাও।"
নাইফ মাথা তুললো মায়ের কোল থেকে।আফিয়া ছেলের অগোছালো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বললো,
“ সব বিষয়েরই একটা পজেটিভ দিক আছে বাবা।আজ হোক কিংবা কাল, একদিন তো বাবা মায়ের কোল ছাড়তেই হবে। আমি চাই খুব শিগগিরই তোমার কোল ভরে যাক।আমি অনেকগুলো নাতী নাতনির দাদী নানী হতে চাই।ওরাও দাদা নানা বাড়ির আনন্দ বুঝুক।আর এই অংশটা ওদের দাদা বাড়িই হয়ে থাক।মা বাবা কখনোই দূরে করে দেয় না। বরং দূরে রেখে কাছে আসার সুযোগ করে দেয়।”
কপালে চুমু দিয়ে বললো,
“ তুমি আমার বুদ্ধিমান ছেলে, সব বুঝো।এই আলাদা, কোনভাবেই আলাদা হয়ে যাওয়া নয়। বরং নতুন করে একটা সুন্দর শুরুর বার্তা!"
মা ছেলের মাঝে ব্যাগড়া দিলো নাসিফ,
“ এখন তুমি কি নিজেই নকশা করবে না কি আমাকে অন্য নকশাকার হায়ার করতে হবে? যদিওবা আমি তোমাকেও পয়সা দিতাম কিন্তু তুমি না চাইলে!"
“ বাবা প্লিজ,লেগপুল করো না।"






0 মন্তব্যসমূহ