চড়ুইভাতি । পর্ব_০৬

 #চড়ুইভাতি

#রিমা_আক্তার

#পর্ব_০৬



[কপি/ নকল, চুরি করা নিষিদ্ধ।]


আজ শুক্রবার, বন্ধের দিন...


সকালের কমলা রঙের কাঁচা মিঠা রোদের তির্যক রশ্মির দৌরাত্ম্যে কপাল কুঁচকে চোখ খিচিয়ে রাখলো তৌকির।তবুও চোখ মেললো না,বাহু বন্ধনে আবদ্ধ বস্ত্রহীন নরম কোমল দেহখানি আরো শক্ত করে ঝাপটে ধরে উদাম বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে তার চুলের গোড়ায় মুখ ডুবিয়ে নিলো। এদিকে এতটা চাপে দম আঁটকে ফাপড় খাচ্ছে লিলি। বাঁধন ঢিলে করার জন্য নড়াচড়া করতেই গাঢ় ভারী স্বরটা নির্গত হলো,


“ উঠতে হবে না, শুয়ে থাকো।"


বৃহস্পতিবার রাত, ফজর অবধি সজাগ রেখে এখন উঠতে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর পুরুষ সে নয়।তাই বোধহয় বুঝাতে চাইছে কিন্তু লিলিকে যে উঠতেই হবে।সূর্যের আলোটা চোখে বিঁধছে। তাছাড়াও তৌকির এত শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে যে তার পাঁজরের হাড় একত্রে চাপ খেয়ে গুঁড়ো পাউডার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। হাঁসফাঁস লাগছে,সে কোনভাবে হাতটা আলগা করে তৌকিরের বুকের উপর হাত ঠেকিয়ে পিছনে ধাক্কা দিলো, তৌকির বিরক্ত হয়ে চোখ মেললো,কপাল কুঁচকে নিয়ে বিরক্তি ভরা চোখেই তাকাতেই লিলি বললো,


“ ছাড়ুন,দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমার!"


মিনিট সময় তৌকির ওভাবেই তাকিয়ে থাকলো। এরপর একটু হালকা করে দিতেই লিলি দম ছাড়লো বড় করে।তা দেখে তৌকির ভ্রুদ্বয় নাকের ডগায় রেখে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বিপরীতে ঘুরে শুয়ে পড়লো।লিলি হতভম্ব চোখে তা দেখে ক্ষুদ্র শ্বাস ছাড়লো, এরপর চাদরের নিচে হাঁতড়ে নিজের পোশাক খুঁজে নিয়ে তা গায়ে জড়িয়ে বিছানা থেকে নামলো।


সকালের পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ করে নাস্তা তৈরি করছে,আর মনে মনে ভাবছে দুপুরের রান্নার আয়োজনে কি করবে? তাছাড়াও তার খুব মন খারাপ হচ্ছে।বাপের বাড়ির কথা ভীষণ মনে হচ্ছে।তার তো ফোন‌ও নেই যে চাইলেই একটু বাপের বাড়িতে কথা বলবে। বোনদের সাথে কথা বলবে! কতদিন হলো,প্রায় সপ্তাহ শেষ হয়ে গেছে গ্রাম থেকে এসেছে।লিলির বুকটা কেমন করে যেন চিলিক মেরে উঠলো,ইস্! কতদিন পেরিয়ে গেলো মায়ের মুখটা দেখা হয় না,বাবাকে জড়িয়ে ধরে কতশত আবদার করা হয় না।চাইলেও ছুটে গিয়ে দেখে আসতে পারবে না। লিলির মনে হলো তার জীবনটা যেন সাত সাগর তেরো নদীর উজানে ভেসে ভিন্ন গ্রহে গিয়ে উঠেছে।অথচ লিলির তিন আপার কি চমৎকার জীবন।তারা চাইলেই হুট করেই বাপের বাড়ি চলে আসতে পারে।লিলির কখনো মনেই হয়নি আপাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে! আপারা যেকোনো সময় বাবা মায়ের কাছে ছুটে আসতো।লিলিরাও যেতে পারতো কিন্তু তার জীবনটাই কেমন এত দুরত্ব নিতে গেলো?


লিলি দ্রুত গতিতে হাত চালিয়ে ছয়টা রুটি বানালো। সবসময় দুই একটা বেশি বানায়, তৌকির খাদ্যরসিক মানুষ।তা লিলি বিবাহিত জীবনের এই বারো দিনেই বুঝে গিয়েছে। মোটামুটি সাইজের রুটি তৌকির অনায়াসে তিনটা শেষ করতে পারে।চাইলে বোধহয় চারটাও পারবে।তাই লিলি একটু বেশিই বানায়, তাছাড়াও পুরুষ মানুষ! বাইরে অত পরিশ্রমের কাজ করে! গায়ে একটু শক্তির দরকার আছে।আর শক্তির প্রধান উৎস খাদ্য।তাই লিলি চেষ্টা করে নিজের জ্ঞানে থাকা সবধরনের পুষ্টি রুচিসম্পন্ন খাবার রান্না করতে।যেন খেতে বসে তৌকিরের মুখ না ফিরিয়ে নিতে হয়।


আলু ভাজি,ডিম পোঁচ আর নরম নরম গরম রুটি। তাড়াতাড়ি শেষ করে থালাবাটি ধুতেই তৌকিরের হেঁড়ে গলার স্বর শোনা গেলো,ঘাড় ঘুরিয়ে রান্না ঘরের দরজায় একবার চেয়ে তাড়াতাড়ি হাতে থাকা থালাটা বেসিনে রেখে তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে ঘরের দিকে পা চালালো ভীষণ গতিতে।


তৌকির ততক্ষণে বিছানা ছেড়ে উঠেছে , লুঙ্গির গিট খুলে লুঙ্গিটি আরো সুন্দর করে গুছিয়ে কোমরে রেখে গিঁট দিতে দিতে বললো,


~ বাজারের লিস্ট করে রাখছো?"


~জি না করিনি,করে দিচ্ছি!"


~ কখন করবা? এগারোটা বাজে!তাড়াতাড়ি করো!"


তৌকির ডান হাতটা উঁচিয়ে প্রশ্নটা করলো,লিলি তটস্থ চোখে চেয়ে মিনমিনিয়ে উত্তর দিলো,


~ আপনি পরিষ্কার হয়ে নাস্তা খান আমি করে দিচ্ছি।"


~ প্যান্ট বাইর করো! তাড়াতাড়ি!


লিলিকে তাড়া দিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়লো।লিলি তড়িঘড়ি করে নাস্তার সব কিছু এনে টেবিলটার উপর রাখলো, তারপর খাট ঝেড়ে চাদর ঠিকঠাক করে কাঁথা ভাঁজ করে ড্রয়ারে রেখে ঘর ঝাড়ু দিয়ে ফেললো। ততক্ষণে তৌকির বেরিয়েছে,সে গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে লিলিকে দেখছে।


লিলি পাকা সংসারি,ঘরোয়া কাজে ভীষণ পটু,খুব চটপট করে সব কাজ দ্রুত সেরে ফেলতে পারে। এবং খুব শান্ত স্বভাবের দেখে সারাক্ষণ চুপ থাকে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে লিলি ভীষণ গা ছাড়া স্বভাবের।বিয়ের এই বারো দিন পেরিয়ে তৌকির লিলির এই খারাপ দিকটা সূক্ষ্ম নজরে কব্জা করেছে।যখন কাজ করে তখন ঝটপট করে করে,এতে করে অন্য কোনদিকে খেয়াল থাকে না।এমনকি আশেপাশে কোনদিকে তাকায়‌ও না।অথচ কাজ শেষ করে একটু বিশ্রাম পেলেই একেবারে গা ছেড়ে দেয়।অথচ এটা অনুচিত। একজন সুস্থ সবল মানুষের মস্তিষ্ক আর মাসেল সবসময় একটিভ থাকা জরুরি।যেন যেকোন মুহুর্তে তা হুট করেই চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে। তৌকির নিজেও তা।যত ই পরিশ্রম করুক সহজে ক্লান্তি নামক শব্দ দিয়ে সে গা ছেড়ে দিতে পারে না।এমনকি এটা তার পছন্দ‌ও না। কিন্তু তৌকিরের ভাগ্যের খেল কি মন্দ না কি বুঝতে পারছে না,কেন তার সহধর্মিণী এমন হলো?তবে এটি কি বয়সের দোষ!

তৌকির গামছাটা বারান্দায় গিয়ে মেলে দিয়ে আসলো,জমিনে পাটি বিছিয়ে তা উপর খেতে বসার বন্দোবস্ত করা হয়।লিলি তাই করছে। তৌকির লিলির দিকে গভীর চোখে চাইলো,কেন জানি তার মনে হলো লিলির মুখটা আঁধারে ডেকে আছে।সে হাত বাড়িয়ে লিলির কপালে রাখলো, তাপমাত্রা স্বাভাবিক! তবে কি সমস্যা?


লিলি তৌকিরের প্লেটে রুটি,তার পাশে ভাজি অন্যপাশে ডিম দিয়ে পানির গ্লাস ভরে সামনে এগিয়ে দিয়ে উঠতেই তৌকির হাত টেনে বসিয়ে দিলো।


~ কোথায় যাচ্ছো? নাস্তা করবে না?


~ আপনি খান, আমি লিস্টটা রেডি করি।


তৌকির লিলিকে ভালো করে বসার জন্য নিজের পাশে ইশারা করলো,লিলি বসলেই তৌকির প্লেট থেকে রুটি ছিঁড়ে তাতে ভাজি আর ডিম নিয়ে লিলির মুখের সামনে ধরতেই লিলি জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো । তৌকির ভারি গলায় বললো,


~ আশ্চর্য,হা করো!


তৌকিরের গাঢ় আর ভারি কন্ঠস্বরে লিলি আর কোন শব্দ উচ্চারণ করার সাহস দেখালো না।সে মুখ খুলে খাবার মুখে তুলতেই তৌকির‌ই আবার বলতে আরম্ভ করলো,


~ বাড়ির জন্য ভীষণ মন খারাপ করলে মোবাইলে তো কথা বলতেই পারো।আমাকে বললে কি আমি নিষেধ করতাম! অবশ্য ভুল তো আমার‌ও আছে,আমার‌ই উচিত ছিলো অন্তত দুই দিনে একবার হলেও কথা বলানো।যাই হোক, যা হয়েছে হয়েছে! যখন মন চাইবে বাড়িতে কথা বলবে।তবে অবশ্যই তোমার কথা, আমাদের কথা না।বুঝেছো?


আমাদের কথা না! লাইনটা মাথার উপর দিয়ে গেলো আলাভোলা লিলির।সে মুখ হা করে চেয়ে রইল। তৌকির পরবর্তী টুকরো নিয়ে লিলির দিকে তাকাতেই লিলির মুখভঙ্গি দেখে হতাশ হলো।এই বোধহয় সমস্যা হয় অল্প বয়সী ব‌উ আনলে।প্রতিটি করি ভেঙে বলতে হবে, নয়তো এভাবেই হা করে তাকিয়ে থাকবে যা কখনো কখনো বিরক্তি ঠেকায়। তৌকির রুটির খন্ডটা লিলির মুখে পুরে দিয়ে বললো,


~ আমাদের কথা বলতে আমাদের স্বামী স্ত্রীর কথা।স্বামী স্ত্রীর একান্ত কথাগুলো। তাছাড়াও আমি চাই না আমাদের সংসারের সামান্য একটা শলাকার খবর‌ও অন্য লোকের কানে যাক। তোমার বাপের বাড়ি, আমার বাড়ি কারো বাড়িতেই না।কারো হস্তক্ষেপ আমি আমাদের সংসারের চাই না

আর এদিকে তোমাদের মেয়েদের সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে নিজের সংসারে কিছু একটা ঘটলেই তা ফলাও করে বাপের বাড়িতে ঢোল পিটিয়ে জানানো।যা আমার একদম পছন্দ হয় না। আশাকরি তুমি এমন কিছু করবে না, তাই তো লিলি?


লিলি রুটি চিবুতে চিবুতে দুই দিকে মাথা দুলালো, যার অর্থ 'আচ্ছা!' তৌকির আবারও বলা শুরু করলো,


~শোন লিলি সুখী হবার প্রথম শর্ত গোপনীয়তা বজায় রাখা। স্বামী স্ত্রী একে অপরের ভূষণ,পোশাক যেমন আমাদের লজ্জাস্থানে আবরণ দেয় তেমনি স্বামী স্ত্রী একে অপরের সকল গোপনে আবরণ দেয় যেন তা লোকের চোখে না পড়ে এবং তা নিয়ে পরচর্চা করার সুযোগ না পায়।আমরা নিজেদের সুখের মুহূর্তগুলোও যেমন শুধু নিজেদের জন্য রাখবো তেমনি দুঃখের মুহূর্তগুলোও।আমি আমার তরফ থেকে চেষ্টা করবো, আশাকরি তুমিও করবে।আমি জানি তোমার বয়স কম,এই বয়সে এমন ভুল টুকটাক হবে কিন্তু তাই বলে তুমি এতটাও ছোট ন‌ও যে নিজের ভালো খারাপ বুঝবে না, তাই না?


লিলি মাথা দুলালো, তৌকির শেষ টুকরো লিলির মুখে দিয়ে নিজে আঙ্গুল চাটতে চাটতে বলতে থাকলো,


~ আমার‌ও অনেক ভুল ভ্রান্তি হবে,কখনো বুঝে কখনো না বুঝে। মানুষ তো! তাই হ‌ওয়াটাই স্বাভাবিক।তাই বলছি যখন মনে হবে আমার জন্য তোমার অসুবিধে হচ্ছে,কোন বিষয়ে খারাপ লাগছে তখন আমাকে বলবে,সময় দিবে শুধরানোর জন্য।আমি চেষ্টা করবো নিজের ভুল শুধরে নিতে।


লিলি গাঢ় চাহনিতে তৌকিরের কথাগুলো শুনলো, ভীষণ মনোযোগ দিয়েই শুনলো। তৌকির হাত ধুয়ে হাত রুমালে মুছতে মুছতে গাঁয়ে থাকা গেঞ্জিটা খুলে টি শার্ট আর প্যান্ট পরে নিলো। লিলি ততক্ষণে লিস্ট বানাতে বসে পড়ছে। তৌকির লিলির ডায়রির পাতায় চোখ রেখে বললো,


~ বাজারের লিস্ট করো শুধু, বিকেলে তোমাকে নিয়ে বের হবো, তখন সংসারের টুকিটাকি যা লাগে কিনে এনো সঙ্গে থেকে।


~ বাইরে যাবো? কোথায় যাবো?


লিলির কন্ঠে কৌতুহল, চোখজোড়া খুশিতে ডগমগ করছে। জ্বলজ্বলে চাহনি। তৌকির পকেটে মানিব্যাগ ঢুকাতে ঢুকাতে বললো,


~ দেখি কোথায় নিয়ে যাওয়া যায়!

____ হয়েছে?


~ হুম!


লিলি কাগজটা এগিয়ে দিলো। ছোট গুটি গুটি অক্ষরে স্পষ্ট করে কতগুলো শব্দ লেখা। ঠিক লিলির মতোই সুন্দর লিলির লেখা।তবে মেয়েটা ভীষণ পড়াচোর চাই বোধহয় ডাব্বা মেরেছে।


সজনের ডাল, মিষ্টি কুমড়ার ফুলের বড়া, গাছ আলু দিয়ে গোরুর কষা তরকারি,কাঁচকি মাছের গুড়া চচ্চড়ি আর সাদা ভাত দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন সারলো লিলি তৌকির দম্পতি।লিলির রান্নার পাশাপাশি তৌকির ঘরের অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করেছে।সে খুব সুন্দর করে ঘরের কোনা, ছাঁদ,দেওয়াল ঝাড় দিয়ে মুছে দিয়েছে পুরানো গেঞ্জি কাপড় দিয়ে। এরপর লিলি তাদের বিছানার চাদর ভিজিয়ে রাখায় তা সুন্দর করে কেঁচে বারান্দায় মেলে দিয়েছে।লিলি রান্নার পাশাপাশি নিজের ঘরের টুকটাক থাকা আসবাবপত্র মুছে ফেলেছে।সংসারের কাজ চার হাত শেষ করে দ্রুত খাওয়া দাওয়া সম্পন্ন করে বাইরে বের হবার জন্য তৈরি হতেই কলিং বেলের আওয়াজ শোনা গেলো।


তৌকির নিজেই খুলে দিলো,পাশের ঘরের ভাবী,উনার নাম সোনিয়া ।সোনিয়া ভাবি আজকে বাসায় নেই। উনি নাকি উনার বাবার বাড়িতে গিয়েছেন,উনার বৃদ্ধা শ্বাশুড়ি রয়েছেন। তাকে দুপুরের খাবার লিলিরাই দিয়েছে। তৌকির আদেশ করেছিলো যদিও লিলি নিজেই দিতে যেতো কিন্তু তৌকির বলায় ভেতর থেকে একটা অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করেছে।


দরজা খুলেই তৌকির চমকালো।তার সামনে দাঁড়িয়ে তার অফিসের দুজন মেয়ে। তৌকির বিস্মিত চাহনি মেলে চমকে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,


~ তোমরা?"


~ আসসালামু আলাইকুম, তৌকির ভাই? কেমন আছেন?


~ আছি আলহামদুলিল্লাহ, কিন্তু তোমরা আমার বাড়িতে কিভাবে?


~ এইটা কেমন কথা তৌকির ভাই! আমরা আপনার বাসায় আসতে পারি না? আপনি না হয় ভাবীকে দেখাবেন না ট্রিট দেওয়ার ভয়ে তাই বলে আমরাও কি ভাবীর সাথে পরিচিত হতে আসবো না? আমাদের বুঝি দায়িত্ব নেই কোন?


~ তাছাড়াও একজন মানুষ নতুন আসলো তাকে সব বোঝাতে হবে না এ শহরের!


মেয়ে দুটোর এমন কথায় তৌকিরের ভারি মুখটা আরো ভারি হয়ে উঠেছে তবে তার পাশেও এক চিলতে হাসির সঙ্গে নমনীয়তা ফুটে উঠলো।সে দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে মেয়েগুলোর উদ্দেশ্য করে বললো,


~তোমরা ভেতরে আসো। ভেতরে এসে কথা বলো।


মেয়ে দু'টো তড়িঘড়ি করে ভেতরে ঢুকলো,লিলি ততক্ষণে বোরকা পরে মাথায় স্কার্ফ বাঁধছে।হুট করেই অপরিচিত মেয়েদের দেখে চমকালো। তৌকির মেয়েগুলোর পিছু পিছু ঘরে ঢুকে পরিচয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,


~ লিলি ওরা আমার অফিসের লোক।আমরা একসাথেই কাজ করি।আর তোমরা তো বুঝতেই পারছো।


পরিচয় পর্বের পর লিলিকে পাশে বসিয়ে মেয়ে দুটো গল্পের ঝুড়ি মেলে বসতেই তৌকির উঠে দাঁড়ালো,লিলির দিকে তাকিয়ে বললো,


~আমি নিচের থেকে আসছি।


লিলি এই অপরিচিত মেয়ে দুটোর মাঝে খুব একটা আরাম পাচ্ছে না তাও বাধ্য হয়ে বসে আছে। তৌকির বেরিয়ে যেতেই লিলি উঠে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য চা বসাতে রান্না ঘরের দিকে এগুলো।মনটা খারাপ হয়ে গেল আবারও। বেরিয়ে যাবে, কতদিন পর ঘরের বাইরে গিয়ে একটু মুক্ত শ্বাস নিবে।তা আর হবে না মনে হচ্ছে। সে ভীষণ মন খারাপ নিয়ে ফ্রিজ থেকে দুধ বের করে চুলায় বসিয়ে দিলো।যত‌ই মন খারাপ হোক মেহমানকে তো আর অবহেলা করা যাবে না তাও আবার স্বামীর অফিসের লোক।স্বামীর কর্মস্থলে তো তাকে ছোট করা যাবে না তাছাড়া মেহমান ফেরেস্তা স্বরূপ। তাদের মনঃকষ্ট দেওয়া গুনাহ।


~ গায়ের রঙ দেখছিস! দুধ আলতা!


~তাতে লাভ কি? সেই তো একজন গার্মেন্টসে কাজ করা বেডার লগেই বিয়া দিলো বাপ মা।


~ আমি বুঝি না সুন্দর সুন্দর মাইয়াগো এমন কাইল্লা ভোটকা বেডাগো লগে বিয়া দেয় ক্যা বাপ মায়ে? এগো ল‌ইগা কি সরকারি চাকরি‌ওয়ালা বেডা অভাব?


~ আরে ধুর, সুন্দর অসুন্দরে কী আয় যায়? এহোন মানুষ দেহে টেকা পয়সা।যার যত পয়সা তার তত কদর।আর সরকারি চাকরি তো মোয়া না,যে চাইলেই পাওয়া যায়? অনেক চাকরিতে চাইলে সরকারির চেয়ে বেশি আয় করা সম্ভব! সুতরাং বেডাগো থাকা দরকার টেকা আর মাইয়াগো রূপ।সে তুমি যেমন‌ই হও,বেশ্যালয় থেকেই আসো আর কর্মজীবী পতিতাদের ঘর থেকেই আসো,পয়সা থাকলে সবাই কদর করবে। সুতরাং আমি মনে করি বেডাদের পয়সা থাকলেই তাদের যৌবনে ভাটা পড়ে না।


~ তার মানে বলতে চাইছো বুইড়া বুইড়া বেডারা যুয়ান যুয়ান মাইয়াদের সাথে কবু্ল বললেই সব হালাল!


~ হালাল হারামের মাসায়েল ধরলে অনেক সময় লাগবে, শুধু মনে রাখবি পকেট ভারিওয়ালা পুরুষদের দোষ খুব কম।নারীর সব তার যৌবন কাল।তাকে এই যৌবনেই সব পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মিটাতে হয় তাই সব বাদ দিয়ে যৌবনের যত্ন নিতে হয়। যৌবন নাই মানে কিছু‌ই নাই।


~ আর যৌবন,যৌবন দিয়ে কি হ‌ইলো? সেই তো মাঝি অন্য গাঙ্গেই নাও বাইতাছে!


বলেই মেয়েটা লিলির পুরো সংসারের চোখ বুলিয়ে দিলো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ