#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_১১৫
কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️
আপনজনের মৃত্যু শোক কাটিয়ে উঠা যতটা সহজ বলা হয় ঠিক ততটাও সহজ নয়।নাযীর আহমাদের মৃত্যুর মাস দুই পেরুলেও সালমা ফাওযিয়া ঠিকঠাক শোক থেকে বের হতে পারলেন না।হয়তো দীর্ঘদিনের সাথিকে হারিয়ে এভাবেই জীবনযাপন করতে হবে।
মু'য়ায সিঙ্গাপুর নিজের এমডি কোর্সের জন্য চলে গিয়েছে।নাবীহাও আপাতত নিজের একাডেমিক পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ চাপে আছে, যাতায়াত সুবিধার জন্য সে এখন তার বাবার বাড়িতে অবস্থান করছে। অবশ্যই এতে স্বামী, শ্বশুর শাশুড়ির সম্মতি রয়েছে।
অনেকদিন পর সাফিয়া বোনের বাড়িতে এসেছে। সবসময়ের মতোই পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার দুপুর পেরিয়ে গিয়েছে।এখন বাড়িতে বউ শ্বাশুড়ি ছাড়া আর কেউ এই সময়ে থাকে না
এখন আর দুপুরে লাঞ্চে এই বাড়ির খাবার টেবিলে হইচই হয় না।এখন আর মায়ের হাতে মাখা খাবার নিয়ে হাতা-পাই হয় না।সকালের নাস্তায় আর সবাইকে এক সাথে পাওয়া যায় না। দুপুরটাও কাটে দুজন নারীর ভীষণ একাকীত্বের মাঝে।নিরব অক্ষর হীন চামচ বাটির ঝনঝনানি ছাড়া খুব একটা শব্দ এ বাড়িতে আজকাল শোনা যায় না। যাবে কিভাবে? সবাই যে সবার জীবন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে গেল হঠাৎ করেই।
নাইফের অফিস টাইম আটটায়। তাই তাকে বেরিয়ে যেতে হয় সাতটার মধ্যেই।ফিরতে ফিরতেও রাতের সেই আটটা কি নয়টা।
তাইফ হোস্টেলে।তার এইচএসসি সামনে।
তুহি মাদ্রাসার বোর্ডিংয়ে!
দেখতে দেখতেই বাচ্চাগুলো বড় হয়ে গিয়েছে, তাদের পদচারণার সীমানা বেড়েছে।তাদেরকে আফিয়াও ছেঁড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
ঐদিকে নাসিফের বয়সের সাথে সাথে অর্থের পিছনে ছোটার তাগিদ যেমন বাড়ছে তেমনি বাইরে বন্ধুদের সাথে তার আড্ডার নেশাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আগের মতো কিছুই রইলো না। সময়ের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সব। শুধু সম্পূর্ণ বিপরীতে বয়ে চলছে আফিয়া।সে যেন চিরন্তন না বদলানোর প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় ।
এত কিছুর মাঝেও টুকটাক পারিবারিক সময় কাটানো হয় তবে যদি মেহমানদের আগমন হয়।আফিয়া ভীষণ করে বাচ্চাদের অনুরোধ করে বলে যাতে তারা এই সময়টা বাড়িতে থাকে। নিজেদের ব্যক্তি জীবনের চাপে যে মা'কে সময় দিতে পারে না তাতে তারাও ভীষণ লজ্জিত হয় তাই মায়ের কথা যখন অনুরোধে রুপান্তরিত হয় তখন সবাই খুব অনুশোচিত কন্ঠে নিজেদের গাফিলতি স্বীকার বলে,
“ আম্মু প্লিজ , এভাবে বলো না।"
এর বিপরীতে মুখ ফিরিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উত্তর মায়ের তরফ থেকে তারা পায় না।
আজকে সাফিয়ার আসার কথা শোনার পর নাইফ নিজেই আগ্রহ দেখিয়ে আগে বাড়িয়ে বললো,
“ আমার আজকে পরীক্ষার ডিউটি আছে তবে তুমি চিন্তা করো না আম্মু,আমি লাঞ্চ বাড়িতেই করবো। খালা মনিকে বলো আমি তাকে অনেক মিস করি।"
অনেকদিন ছেলে বাড়িতে লাঞ্চ করে না।আজ লাঞ্চ করবে শুনেই আফিয়ার চোখেমুখে খুশিরা উতলে উঠলো।সে নিজের আবেগকে চেপে রাখতে না পেরে চঞ্চলা কন্ঠে শুধালো,
“ ঠিক! লাঞ্চ বাড়িতেই করবে? তবে কিন্তু আমি রান্না বান্না করবো নয়তো!"
“ সে কি কথা আম্মু! খালা মনি আসবে,ফেরা আসবে,রিফা থাকবে। এতদিন পর আসছে আর তুমি রান্না কেবল আমি আসলেই করবে মানে কি?
তাহলে তারা কি খাবে?"
“ ও সে নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। তোমার খালা মনি থাকবে না।রাতেই চলে যাবে।"
“সে দেখা যাবে।আমরা আসি আর না আসি তুমি খালা মনিদের জন্য ভালো মন্দ রান্না করাও।
আর হ্যাঁ গাল ফুলিয়ে রেখো না।ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড, তুমি না বুঝলে কে বুঝবে? আমার গুড গার্ল!"
বলেই নাইফ মায়ের গালে চুমু দিলো।আর তাতেই আফিয়ার রাগ গলে পানি হয়ে ঝরে পড়লো।নাইফ নিজের কাঁধে ব্যাগ চাপাতে চাপাতে মা'কে শুধালো,
“ নাবু বেরিয়ে গিয়েছে?"
“ হ্যাঁ, আজ নাকি জাপানি এক মেডিক্যাল টিম আসবে, তাদের সাথে ভিজিটে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে তাই খুব তাড়াহুড়ো করে বের হলো। যদিও বা সেও তোমার মতোই বলেছে দুপুরে বাসায় আসবে কিন্তু আসলেই চলে!"
“ চলে আসবে।আসি আমি হ্যাঁ!"
বলেই সে মায়ের আগে আগে বের হলো।যাওয়ার পথেই নানীর সাথে দেখা হলো।আজ কয়দিন ধরে সুলতানা আযিযাহ মেয়ের বাড়িতে আছে। সালাহ নিজের খালাতো এক শ্যালকের বিয়েতে এটেন্ড করতে স্বপরিবারে সিলেট গিয়েছে। মায়ের বয়স,আর হুটহাট অসুস্থতার চিন্তায় নতুন জায়গায় এত শোরগোলের মাঝে নেওয়ার সাহস করেনি।আফিয়াও তাই মা কে এনে শ্বাশুড়ি সাথে রেখে যত্ন সেবা করছে।
“ নানুমনি আসি আমি। আল্লাহ হাফেজ,ভালো থেকো।"
“ হ্যাঁ ভাইয়া আসো। আল্লাহ হাফেজ,ওয়া আলাইকুম আসসালাম।"
দ্রুত কদমে দরজার সামনে এসে জুতায় পা ঢুকিয়ে মায়ের উদ্দেশ্য বললো,
“ কিছু নিয়ে আসতে হলে ফোন দিও আম্মু!"
আফিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছেলের জুতা পরা দেখছে।
“ আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম!"
অতঃপর বেরিয়ে যেতেই আফিয়া দোয়া পড়লো বিরবির করে।
বেলা চারটা....
মাত্র পনেরো মিনিট হবে সাফিয়া এ বাড়ি এসে পৌঁছিয়েছে।রিফা বড় খালার পাশে গা ঘেঁষে বলছে,
“ বড় আম্মু,বড় ভাইয়ার বিয়ে দিবে না?"
ভাগ্নির কথায় আফিয়া চোখে মেলে বিস্মিত চাহনিতে জিজ্ঞেস করলো,
“ দিবো তো আম্মা কিন্তু কেন তুমি হঠাৎ এই কথাটা জিজ্ঞেস করলে?"
“ তুমি ভাইয়াকে বিয়ে দিলেই তো একটা টুকটুকে বউ আসে!"
“ টুকটুকে বউ?"
“ হুম!"
আফিয়া চোখ বড় বড় করে তাকালো ছোট বোনের দিকে।সাফিয়া ঠোঁট ভেটকিয়ে বললো,
“ এভাবে তাকানোর কিছু নেই আপা।যা শুনে তাই শিখে ফেলে।পাশের অ্যাপার্টমেন্টের ভাবী তার ছেলেকে বিয়ে দিয়ে লাল টুকটুকে বউ এনেছে শোনার পর থেকেই তার এই কথা মনে ঢুকে আছে।
তাকেও বলে আসছে,তারও দুইটা বড় ভাইয়া আছে,তার ভাইয়াকে দিয়ে সেও একটা লাল টুকটুকে বউ আনবে।বড় আম্মুকে বলবে।এই যে এখন বললো!"
“ ওমা কত সিরিয়াস চিন্তা ভাবনা!"
“ হ্যাঁ,এটা কিছুই না।সে আজকাল তার বাবার ব্যাবসা নিয়েও চিন্তা ভাবনা করে।গত শুক্রবার ও লাঞ্চে এসে একটু সময়ের জন্য ঘুমিয়েছিল। এই মেয়ে তাকে টানতে টানতে ডেকে বলে,‘ বাবা উঠো,দোকানে যদি চোর আসে।তাহলে তো সব নিয়ে যাবে।ঐ দাদুটা একদমই ভালো কাজ করে না!' দাদু বলে হলো আমাদের ম্যানেজারকে।"
আফিয়ার মুখ হা হয়ে গিয়েছে এই কথা শুনে। তার চারটার একটাও এত বড় বড় কথা বলে না।আর এই পুঁচকে মেয়েটা কি-না!
ঠিক এই সময়েই কলিং বেল বেজে উঠলো। আফিয়া চেঁচিয়ে রুকাইয়াহকে বললো,
“ দরজাটা খুলো। বোধহয় ওরা কেউ আসলো।"
দরজা দিয়ে একে এঁকে ভেতরে ঢুকলো,নাইফ,নাবীহা,তুহি, তাইফ।
এক সাথে হইহই করতে করতেই ভেতরে ঢুকলো তারা। বিস্মিত,আবেগিত আর চমকানো বদনে নিজ আসন ত্যাগ করে দরজার পানে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ছলছল চোখে বললো,
“ ওমা এক সাথে চার ভাই বোন কোথা থেকে? আর কিভাবে? তাইফ!"
তাইফের এখানে আশা করাটা আসলেই বিশাল কিছু তার জন্য।কারণ আগামী সপ্তাহে ছেলের পরীক্ষা,এই সময়ে হোস্টেল থেকে ছাড়লো?
তাইফ মা'কে জড়িয়ে ধরে আবেগি গলায় বললো,
“ দেখতে ইচ্ছে করলো তোমাদের সবাইকে,ভাইয়াকে বললাম, গিয়ে নিয়ে আসলো।"
তুহি পাশ থেকে মা'কে ধরে বললো,
“ আমারও!"
যেহেতু তারা দু'জনেই তার থেকে দূরে থাকে তাই তাদের আগমনে তার আবেগের জোয়ার আসবে তাই স্বাভাবিক।নাইফ বসার ঘরের দিকে গিয়ে সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কেমন আছো খালা মনি!"
“ ভাইয়া!"
বলেই ফেরা ভাইয়ার কাঁধ জড়িয়ে ধরলো পিছন থেকে,রিফা বড় ভাইকে জড়িয়ে ধরলো।নাইফ আদরের সহিত গাল টেনে দিল দুজনেরই।
“ যাও যাও ফ্রেশ হও সবাই।"
তাড়া দিলেন সালমা ফাওযিয়া।
_______
রাতের খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে হাত মুছতে মুছতে সবেই মাত্র নাইফ চেয়ার ছাড়ছিল সেই সময় যেন বোম ব্লাস্ট হওয়ার মতোই ব্লাস্ট হলো সাফিয়ার কথা।একটু আগের ঘটনা...
“ আমি আসলে আজকে যার জন্য আসছি তা হচ্ছে তোমাদের সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ আছে।"
নাসিফ হাতে তোয়ালে পেঁচিয়ে শ্যালিকার মুখপানে চেয়ে আছে।সাফিয়া বোনের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দুলাভাইয়ের দিকে চেয়ে বললো,
“ আমরা ফেরার বিয়ে নিয়ে আগাচ্ছি!"
“ হোয়াট!"
চেঁচিয়ে উঠলো নাইফ,তাইফ বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে সাবান দিয়ে নিজের হাত পরিষ্কার করছিলো।আজকের গোরুর গোস্তে অনেক তেল ছিলো যেটা তার হাতে লেগেছিল।সেও চমকে, হতভম্ব হয়ে বিহ্বল নয়নে খালার পানে চেয়ে রইল।নাবীহাও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাশেই।তুহি অনুভূতিহীন দৃষ্টি আর নির্বোধ মস্তিষ্কের অধিকারীনি তার প্রতিক্রিয়াও একই।
ফেরা মাথা নুইয়ে টেবিলে উপর ঝুঁকে বসে রয়েছে।তার খাওয়া শেষ হয়নি।হাতটা প্লেটে'ই থেমে আছে।
যা দৃষ্টি এড়ালো না তাইফের।সে তীক্ষ্ণ নজরে খালা এবং বোন দুজনকেই পরখ করলো। সালমা ফাওযিয়া, সুলতানা আযিযাহও মেয়ের দিকে চেয়ে আছে কপালে ভাঁজ ফেলে।আফিয়া পাশ থেকে বললো,
“ কি সব বলছিস? ফেরার বিয়ে মানে কি?"
বড় খালার এই সামান্য প্রতিক্রিয়া ফেরাকে ভেঙে দিল,সে ফুঁপিয়ে উঠলো।তার ফুপানিতে সচেতন ভঙ্গিতে ঈগল চোখে খালাকে দেখে ছোট্ট বোনদেরকে উদ্দেশ্য করে আদেশের ভঙ্গিমায় বললো,
“ তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে ঘরে যাও তিনজন।"
চলমান....
স্যরি পর্বটা একটু ছোট তাও ম্যানেজ করে নিন।🥹
বেশি বেশি কমেন্ট করবেন,মেইন পার্ট শুরু কিন্তু... শেষ দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।







0 মন্তব্যসমূহ